জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

পালিতপুত্রের স্ত্রীর প্রতি নবীর কামভাব এবং ওহী নাজিল করে বিবাহ সম্পন্ন করা

প্রকাশিত: ডিসেম্বর 18, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন58 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামী ইতিহাসের এক অত্যন্ত বিতর্কিত এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যায় হলো নবী মুহাম্মদের পালিত পুত্র জায়েদ ইবনে হারিসার স্ত্রী জয়নব বিনতে জাহশকে বিবাহ করার ঘটনা। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, পালিত পুত্রের স্ত্রীকে স্বল্পবসনা বা অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখে নবীর মনে যে কামভাব বা আকর্ষণের সৃষ্টি হয়, তা কেবল একটি ব্যক্তিগত আবেগ ছিল না; বরং তা ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাবক। যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিবাহটি জায়েদ ও জয়নবের মধ্যকার কোনো স্বাভাবিক বিচ্ছেদের ফল ছিল না, বরং তা ছিল একটি ঐশ্বরিক বৈধতার আড়ালে ব্যক্তিগত ইচ্ছা পূরণের এক সুপরিকল্পিত প্রেক্ষাপট।

সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয় মুসলিম ঐতিহাসিক ও আলেমদের দ্বিমুখী অবস্থানে। ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান তথ্যসূত্র আল-ওয়াকিদিকে যখনই নবীর জীবনের কোনো নেতিবাচক বা কামজ আচরণ বর্ণনায় পাওয়া যায়, তখনই রক্ষণশীল আলেম সমাজ তাকে ‘মিথ্যাবাদী’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে দাগিয়ে দেন। অথচ এটি একটি চরম লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যুক্তির বিচ্যুতি। কারণ, এই আলেমরাই যখন ‘রেযাআতিল কাবীর’ বা বয়স্ক লোকের দুধপান সংক্রান্ত কোরআন-হাদিসের অবাস্তব নির্দেশনাকে জাস্টিফাই করতে চান, তখন তারা ঠিকই ওয়াকিদির শরণাপন্ন হন। পাত্রে দুধ ঢেলে পানের যে বর্ণনা দিয়ে সরাসরি স্তন থেকে দুধ চুষে খাওয়ার সেই ইসলামিক লজ্জাজনক প্রথাকে কিছুটা ‘ভদ্রোচিত’ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তার একমাত্র উৎসই হলো ওয়াকিদি। ফলে, ওয়াকিদিকে অস্বীকার করা মানে হলো সরাসরি স্তন চুষে দুধ পানের আদি ও কদর্য বিধানটিকেই চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নেওয়া। এই সিলেক্টিভ এক্সেপটেন্স বা সুবিধাবাদী গ্রহণ-বর্জন নীতি প্রমাণ করে যে, ঐতিহাসিক সত্যের চেয়ে নবীচরিত্রের একটি কল্পিত ভাবমূর্তি রক্ষাই তাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আসুন শুরুতেই একটি ওয়াজ শুনে নিই,


পালিত সন্তান গ্রহণের প্রথা: মানবিকতা বনাম ব্যক্তিস্বার্থের সংঘাত

যুগ যুগ ধরে মানব সভ্যতায় ‘পালক সন্তান গ্রহণ’ বা ‘তবানি’ প্রথাটি একটি অনন্য মানবিক ও সামাজিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে স্বীকৃত। পিতৃ-মাতৃহীন বা পরিচয়হীন একটি শিশুকে নিজের নাম, পরিচয় এবং উত্তরাধিকার প্রদানের মাধ্যমে তাকে সমাজের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করা যে কোনো সুস্থ ও বিবেকবান সমাজের লক্ষণ। এটি কেবল একটি শিশুর ব্যক্তিগত জীবনের আমূল পরিবর্তন নয়, বরং অনাথ ও অবহেলিত শিশুদের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য ‘পরিচয়’ এবং ‘পারিবারিক বন্ধন’ অপরিহার্য মৌলিক অধিকার।

কিন্তু আরবের এই প্রাচীন ও কল্যাণকর প্রথাটি নবী মুহাম্মদের জীবনে এক বিশাল বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রাক-ইসলামী আরব সমাজে পালিত পুত্রকে নিজের রক্তের পুত্রের মতোই মর্যাদা দেওয়া হতো। মুহাম্মদ নিজেও কাবার চত্বরে দাঁড়িয়ে সর্বসমক্ষে জায়েদকে নিজের পুত্র হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তবে যখনই জায়েদের সুন্দরী স্ত্রী জয়নবের প্রতি নবীর আসক্তি বা কামভাবের বিষয়টি সামনে আসে, তখনই এই মানবিক প্রথাটির টুঁটি চেপে ধরা হয়।

যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি প্রাচীন ও প্রতিষ্ঠিত সামাজিক প্রথাকে রাতারাতি রদ করে দেওয়ার পেছনে কোনো বৃহত্তর জনকল্যাণ বা শিশুদের অধিকার রক্ষার তাগিদ ছিল না। বরং এর পেছনে নিহিত ছিল এক সুদূরপ্রসারী ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য। পালিত পুত্রকে যদি আইনিভাবে ‘পুত্র’ হিসেবে বহাল রাখা হতো, তবে তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করা আরব্য প্রথা এবং তৎকালীন নৈতিকতা অনুযায়ী ‘অজাচার’ (Incest) হিসেবে গণ্য হতো। এই সামাজিক ও নৈতিক বাধা দূর করতেই অত্যন্ত সুকৌশলে পালিত সন্তানের অধিকার হরণ করা হয় এবং তাকে তার জৈবিক পিতার পরিচয়ে ডাকার নির্দেশ দিয়ে ‘পরিত্যজ্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, একজন নির্দিষ্ট নারীর সাথে যৌন সংসর্গের পথ প্রশস্ত করতে গিয়ে কোটি কোটি অনাথ শিশুর স্থায়ী পরিচয় এবং আইনি অভিভাবকত্বের অধিকারকে চিরতরে বিসর্জন দেওয়া হলো। এটি কেবল একটি আইনি পরিবর্তন ছিল না, বরং মানবিকতার ওপর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার এক নগ্ন বিজয়।


পালক মায়ের কাছেও গায়রে মাহরাম: দত্তক প্রথা বিলোপের বাস্তব পারিবারিক পরিণতি

দত্তক প্রথার শরিয়তি বিলোপ কেবল একজন শিশুকে কোন নামে ডাকা হবে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যে পরিবার একটি শিশুকে শৈশব থেকে বড় করে, খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তা দেয়, এমন পরিবারের সঙ্গে শিশুটির স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কও শরিয়তি বংশসম্পর্কের অনুপস্থিতিতে ভিন্ন ধরনের বিধানের অধীন হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতার একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ ইসলামকিউএর ১২৯৯৮৮ নম্বর ফতোয়া। সেখানে পনেরো বছর বয়সী এক কিশোর জানিয়েছে, ছয় মাস বয়সে আফগান একটি পরিবার তাকে দত্তক নিয়েছিল। পালক মা তাকে বুকের দুধ পান করাননি। কিশোরটি জানতে চেয়েছে, যিনি তাকে শিশু বয়স থেকে লালনপালন করেছেন, তিনি কি এখন তাঁর কাছে মাহরাম নন এবং তাঁর সামনে পর্দা করতে হবে? ফতোয়ার উত্তর হলো, ওই নারী শরিয়ত অনুসারে তাঁর মা নন, পালক পরিবারের মেয়েরাও তাঁর বোন নন; উপযুক্ত বয়সে দুধসম্পর্ক স্থাপিত না হওয়ায় তাঁরা গায়রে মাহরাম। এমনকি যে পরিবার তাকে নিজেদের পদবিতে লালন করেছে, তাদের আনুষ্ঠানিক নথিপত্র থেকেও সেই বংশপরিচয় সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [1]

الإسلام سؤال وجواب — السؤال 129988
تبنَّته أسرة بسبب فساد أهله، ونسبوه لهم، فماذا يترتب على ذلك التصرف؟
১৫ মে ২০০৯

মূল আরবি উদ্ধৃতি:
فالمرأة التي تبنتْك : أجنبية عنك ، ولا يحل لك رؤيتها ، فضلاً عن مسِّها ، وتقبيلها

বাংলা অনুবাদ ও ফতোয়ার প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তরের বিস্তারিত ভাবানুবাদ:
প্রশ্ন: আমার বয়স ১৫ বছর। আমার বয়স যখন ছয় মাস, তখন একটি আফগান পরিবার আমাকে দত্তক গ্রহণ করে। আমার জন্মদাতা পিতামাতা অসৎ জীবনযাপন করতেন এবং আমাকে প্রতিপালনের উপযুক্ত ছিলেন না। দত্তক গ্রহণকারী পরিবার আমার নামও পরিবর্তন করেছে। কিন্তু যে নারী আমাকে দত্তক নিয়েছেন, তিনি আমাকে বুকের দুধ পান করাননি। এর অর্থ কি তিনি আমার জন্য মাহরাম নন? এখন কি তাঁকে আমার সামনে পর্দা করতে হবে? আমার অবস্থার ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধানগুলো কী?
উত্তরের প্রাসঙ্গিক বক্তব্য: ফতোয়ায় প্রথমে বলা হয়েছে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে দত্তক গ্রহণের প্রচলন ছিল এবং দত্তক সন্তানকে গ্রহণকারী ব্যক্তির বংশের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। পরবর্তীতে কোরআনের সূরা আহজাবের ৪–৫ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করা হয়। প্রত্যেক সন্তানকে তার প্রকৃত জন্মদাতা পিতার নামে পরিচিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ফতোয়া অনুযায়ী, দত্তক গ্রহণকারী পরিবারকে সরকারি কাগজপত্রে প্রতিষ্ঠিত বংশপরিচয়ও সংশোধন করতে হবে। জন্মদাতা পরিবারের অনুপযুক্ততা শিশুকে অন্য পরিবারের বংশে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দেয় না।
কেবল দত্তক গ্রহণের কারণে পালক পরিবার ও সন্তানের মধ্যে শরিয়তসম্মত বংশসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে দত্তক গ্রহণকারী পরিবারের সদস্যরা বিবাহ ও পর্দাসংক্রান্ত বিধানের ক্ষেত্রে গায়রে মাহরাম হিসেবে গণ্য হন। যে নারী তোমাকে দত্তক নিয়েছেন, তিনি শরিয়তি অর্থে তোমার কাছে অপরিচিত নারী। তাঁকে দেখা তোমার জন্য বৈধ নয়; তাঁকে স্পর্শ করা বা চুম্বন করা তো আরও নয়। তুমি তাঁর কিংবা তাঁর মেয়েদের মাহরাম নও।
ফতোয়ায় মুহাম্মদের সঙ্গে জয়নব বিনতে জাহশের বিবাহকে দত্তকপুত্রত্বের আইনগত প্রভাব বাতিল হওয়ার একটি বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ জয়নব ছিলেন মুহাম্মদের সাবেক পালকপুত্র যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী।
অন্যদিকে, পালক মা যদি শিশুর দুই বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে তাকে পাঁচবার বুকের দুধ পান করাতেন, তাহলে দুধসম্পর্কের মাধ্যমে তিনি শিশুটির মা, তাঁর স্বামী পিতা এবং তাঁদের সন্তানরা ভাইবোন হিসেবে গণ্য হতেন। কিন্তু প্রশ্নকারী কিশোরের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। তাই যে নারী তাকে শিশুকাল থেকে লালনপালন করেছেন, তাঁকে গায়রে মাহরাম নারীর মতো পর্দার বিধান মানতে হবে।
একই সঙ্গে ফতোয়ায় কিশোরটিকে তার প্রতিপালক পরিবারের প্রতি সদাচরণ, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাদের খোঁজখবর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পরও শরিয়তি বংশসম্পর্ক বা মাহরাম হওয়ার বিধান পরিবর্তিত হবে না।

এই নির্দেশের ফলে একই ঘরে বড় হওয়া শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবারের নারীদের কাছে আইনগতভাবে অপরিচিত পুরুষে পরিণত হতে পারে। পনেরো বছরের নিরবচ্ছিন্ন লালনপালন, মানসিক বন্ধন, সন্তানের প্রতিপালনে মায়ের শ্রম কিংবা পারিবারিক স্বীকৃতি—কোনোটিই শরিয়তি মাহরাম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট গণ্য হচ্ছে না। এর প্রত্যক্ষ ফল হলো, আশ্রয়দাতা পরিবারকে আইনগতভাবে নিজের পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী প্রাচীর। দত্তক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক বসবাস ও ঘনিষ্ঠতার ওপর সেই প্রাচীরের প্রভাব পড়ে। ইসলামের পালকসন্তানবিরোধী বিধানকে কেবল ‘প্রকৃত পিতার পরিচয় রক্ষা’ বলে উপস্থাপন করলে লালনপালনকারী পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের এই বাস্তব পরিণতি আড়ালে থেকে যায়।


দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী করার প্রথাও রহিত: ফিকহি বিশ্বকোষের প্রত্যক্ষ বিবরণ

একই ফতোয়ায় উদ্ধৃত আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলাম-পূর্ব আরবে কোনো ব্যক্তিকে দত্তক নেওয়া হলে তাকে নিজের সন্তানের মতো উত্তরাধিকারের অংশ দেওয়া হতো এবং নিজের নামেই পরিচিত করা হতো। মুহাম্মদও যায়েদকে এভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। পরে কোরআনের নির্দেশে দত্তকপুত্রকে প্রকৃত পুত্র গণ্য করার এই ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়। উত্তরাধিকারের অধিকারসহ পুরোনো পুত্রত্বের আইনগত ফলগুলোও বাতিল হয়। ফলে ঘটনাটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য শুধু যায়েদের নাম পরিবর্তন নয়; একটি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক পিতৃত্ব ও সম্পত্তিগত সম্পর্কের ধর্মীয় অবসান। নিজের সন্তান করে গ্রহণ করা মানুষকে উত্তরাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থাটিকেই কেন অকার্যকর করা হলো, সেই প্রশ্ন শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। [2]

الموسوعة الفقهية الكويتية
الجزء العاشر، الصفحتان 121–122
باب التبني — الحكم التكليفي

মূল আরবি উদ্ধৃতি:
حرَّم الإسلام التبنِّي ، وأبطل كل آثاره

বাংলা অনুবাদ ও মূল পরিচ্ছেদের বিস্তারিত ভাবানুবাদ:
দত্তক গ্রহণের শরিয়তি বিধান:
ইসলাম দত্তকপুত্র গ্রহণের ব্যবস্থাকে নিষিদ্ধ করেছে এবং এর সমস্ত আইনগত প্রভাব বাতিল করেছে। এ বিষয়ে কোরআনের সূরা আহজাবের বক্তব্যকে ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে দত্তক সন্তানদের প্রকৃত সন্তান গণ্য না করে তাদের জন্মদাতা পিতাদের নামে ডাকার নির্দেশ রয়েছে।
গ্রন্থটির বিবরণ অনুযায়ী, ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগেও দত্তক গ্রহণের প্রথা প্রচলিত ছিল। কোনো ব্যক্তি অন্য একজনের শক্তি, সক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত গুণাবলিতে সন্তুষ্ট হলে তাকে নিজের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করতেন। দত্তক সন্তানকে নিজের সন্তানদের মতো উত্তরাধিকারের অংশ দেওয়া হতো এবং তাকে দত্তক গ্রহণকারী ব্যক্তির বংশপরিচয়ে ডাকা হতো। অর্থাৎ দত্তক গ্রহণ কেবল কোনো শিশুকে আশ্রয় দেওয়া কিংবা লালনপালনের ব্যবস্থা ছিল না; এর সঙ্গে পুত্রত্বের পরিচয় ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার যুক্ত ছিল।
এই প্রথা অনুসারে মুহাম্মদও যায়েদ ইবনে হারিসাকে দত্তক গ্রহণ করেছিলেন। ফলে যায়েদ পরিচিত ছিলেন ‘যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ নামে। মুহাম্মদের নবুয়ত লাভের আগেই এই দত্তক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়েও তা বহাল ছিল।
পরবর্তীতে সূরা আহজাবের সংশ্লিষ্ট আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর দত্তক গ্রহণের মাধ্যমে পুত্রত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। কোনো ব্যক্তি আর দত্তক সন্তানকে নিজের বংশের সন্তান হিসেবে পরিচিত করতে পারবেন না। তার প্রকৃত জন্মদাতা পিতা পরিচিত থাকলে সেই পিতার নামেই তাকে ডাকতে হবে।
জন্মদাতা পিতা অজ্ঞাত হলে সন্তানটিকে দত্তক গ্রহণকারীর জৈবিক সন্তান হিসেবে পরিচিত না করে ধর্মীয় ভাই কিংবা মাওলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এই বিধানের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রন্থে বংশপরিচয়ের প্রকৃত তথ্য অক্ষুণ্ণ রাখা এবং অন্য উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তিগত অধিকার সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে ইসলামের পূর্ববর্তী দত্তক ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় অন্য কাউকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে বংশপরিচয় ও উত্তরাধিকারের অধিকার দিতে পারতেন, তা শরিয়তি বিধানের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। মুহাম্মদের নিজের দত্তকপুত্র যায়েদ ইবনে হারিসার ‘যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ পরিচয়ের অবসান এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক উদাহরণ।

এটি পালকসন্তানের পরিচয় ও উত্তরাধিকারের প্রশ্নে একটি মৌলিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। যে মানুষটি শিশুকে জীবনভর লালনপালন করেন, তাঁর সঙ্গে আইনি পিতৃত্ব অস্বীকার করা হয়; অথচ যে পরিবার শিশুকে আশ্রয় দেয়নি, সেখানে রক্তসম্পর্ক উত্তরাধিকারের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে। দত্তক গ্রহণের ফলে স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকারটি আর থাকে না। এই বঞ্চনা দত্তক সন্তানের নিজের কোনো দোষ বা আচরণের ফল নয়; এটি নির্ধারিত হয়েছে পরিবার গঠনের ধর্মীয় সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার মাধ্যমে।


যায়েদ: দাস থেকে পুত্র এবং পুনরায় ‘অপরিচিত’ হওয়ার আখ্যান

জায়েদ ইবনে হারিসার জীবন এক বিচিত্র ট্র্যাজেডির গল্প, যেখানে তাকে কখনো দাসে পরিণত করা হয়েছে, কখনো পুত্রত্বের সিংহাসনে বসানো হয়েছে, আবার প্রয়োজনে তাকে সেই পরিচয় থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। মূলত নবী মুহাম্মদের প্রথম স্ত্রী খাদিজার মালিকানাধীন দাস হিসেবে জায়েদের যাত্রা শুরু। খাদিজাকে বিয়ের সুবাদে মুহাম্মদ জায়েদের মালিকানা লাভ করেন। পরবর্তীতে মুহাম্মদ তাকে মুক্ত করে নিজের ‘পালিত পুত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এটি কেবল একটি মৌখিক দাবি ছিল না, বরং তৎকালীন আরবীয় রীতি অনুযায়ী কাবার সামনে দাঁড়িয়ে এক আনুষ্ঠানিক চুক্তিনামা ছিল। মুহাম্মদ ঘোষণা করেছিলেন যে, জায়েদ তার উত্তরাধিকারী হবে এবং সে মুহাম্মদের পুত্র হিসেবেই পরিচিতি পাবে। [3] –

যায়িদের এ সিদ্ধান্তের পর মুহাম্মাদ (সা) তাঁর হাত ধরে কা’বার কাছে নিয়ে আসেন এবং হাজরে আসওয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে উপস্থিত কুরাইশদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করেন : ‘ওহে কুরাইশ জনমণ্ডলী! তোমরা সাক্ষী থাক, আজ থেকে যায়িদ আমার ছেলে। সে হবে আমার এবং আমি হবো তার উত্তরাধিকারী।’
এ ঘোষণায় যায়িদের বাবা-চাচা খুব খুশী হলেন। তাঁরা তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর নিকট রেখে প্রশান্ত চিত্তে দেশে ফিরে গেলেন। সেই দিন থেকে যায়িদ ইবন হারিসা হলেন যায়িদ ইবন মুহাম্মাদ। সবাই তাঁকে মুহাম্মাদের ছেলে হিসেবেই সম্বোধন করতো। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা সূরা আহযাবের- ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক’- এ আয়াত নাযিল করে ধর্মপুত্র গ্রহণের প্রথা বাতিল করেন। অতঃপর আবার তিনি যায়িদ ইবন হারিসা নামে পরিচিতি লাভ করেন।

কামভাব

এই ঘোষণার ফলে জায়েদ ইবনে হারিসা রাতারাতি ‘জায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ হয়ে ওঠেন। তৎকালীন সমাজে এটি একটি চূড়ান্ত আইনি ও সামাজিক বন্ধন ছিল। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, নবীর বিশিষ্ট সাহাবীগণ পর্যন্ত তাকে এই নামেই ডাকতেন, যতক্ষণ না সূরা আহযাবের সেই বিতর্কিত আয়াত নাজিল হয়।[4]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/৩৩/২. আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীঃ তোমরা তাদেরকে ডাক তাদের প্রকৃত পিতৃ পরিচয়ে। (সূরাহ আহযাব ৩৩/৫)
৪৭৮২. ’আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আযাদকৃত গোলাম যায়দ ইবনু হারিসাহ্কে আমরা ’’যায়দ ইবনু মুহাম্মদ-ই’’ ডাকতাম, যে পর্যন্ত না এ আয়াত নাযিল হয়। তোমরা তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক, আল্লাহর দৃষ্টিতে এটিই অধিক ন্যায়সঙ্গত। [মুসলিম ৪৪/১০, হাঃ ২৪২৫, আহমাদ ৫৪৮০] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৪১৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানে একটি গভীর যৌক্তিক প্রশ্ন দেখা দেয়—একজন ব্যক্তি যাকে আপনি নিজের পুত্রের মর্যাদা দিলেন, যার নামে নিজের বংশপরিচয় জুড়ে দিলেন, তাকে কেন হঠাৎ করে আবার পর করে দিতে হলো? তাবারীর ইতিহাস এবং অন্যান্য প্রামাণ্য দলিল বলছে, এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো মহৎ আধ্যাত্মিক বিপ্লব অপেক্ষা জয়নবের প্রতি মুহাম্মদের কামভাব বা আসক্তিই প্রধান প্রভাবক ছিল। কারণ জায়েদ যদি ‘পুত্র’ হিসেবে বহাল থাকতেন, তবে জয়নব হতেন মুহাম্মদের ‘পুত্রবধূ’। আর তৎকালীন আরবে পুত্রবধূকে বিয়ে করা ছিল এক অমোচনীয় সামাজিক কলঙ্ক ও অজাচার। [5] –

কামভাব 1

যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুহাম্মদ নিজেই জায়েদকে পুত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সেই ‘পুত্রত্বের’ দেয়ালটি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল, তখন আল্লাহর ওহীর দোহাই দিয়ে সেই দেয়ালটিকেই ভেঙে ফেলা হলো। এটি কি কেবলই একটি সমাপতন, নাকি সুপরিকল্পিত কোনো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত চাল?


‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন’: কোরআন ৩৩:৪০ এবং বিবাহসংক্রান্ত আপত্তির জবাব

সূরা আহজাবের ৩৭ নম্বর আয়াতে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহের অনুমোদনের পাশাপাশি ৪০ নম্বর আয়াতে মুহাম্মদের পিতৃত্ব সম্পর্কেই একটি ঘোষণা এসেছে: ‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন।’ এই বাক্যটির তাৎপর্য ধ্রুপদি তাফসিরে আরও স্পষ্ট। কুরতুবি লিখেছেন, মুহাম্মদ যখন জয়নবকে বিয়ে করেন, তখন লোকেরা অভিযোগ করেছিল যে তিনি নিজের পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন। তার জবাবেই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়—যায়েদ প্রকৃত পুত্র নন, তাই তাঁর স্ত্রী মুহাম্মদের জন্য নিষিদ্ধ নন। অর্থাৎ দত্তক পিতৃত্বের সামাজিক ও আইনগত মর্যাদার বিরোধিতা এবং এই নির্দিষ্ট বিবাহকে বৈধ করার ঘোষণা একই কোরআনিক আলোচনায় এসেছে। [6]

تفسير القرطبي — الجامع لأحكام القرآن
سورة الأحزاب، الآية ٤٠
المسألة الأولى

মূল কোরআনের আয়াত:
مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا

কুরতুবির মূল আরবি বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ:
لما تزوج زينب قال الناس : تزوج امرأة ابنه ، فنزلت الآية ، أي ليس هو بابنه حتى تحرم عليه حليلته
বাংলা অনুবাদ:
সূরা আহজাব, আয়াত ৪০:
‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং নবীদের সর্বশেষ। আর আল্লাহ সমস্ত বিষয়ে সর্বজ্ঞ।’
প্রথম মাসআলা — কুরতুবির ব্যাখ্যার প্রাসঙ্গিক অংশের অনুবাদ:
মুহাম্মদ যখন জয়নবকে বিবাহ করেন, তখন লোকেরা বলতে শুরু করে, ‘তিনি নিজের পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করেছেন।’ তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। অর্থাৎ, যায়েদ প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদের পুত্র নন যে তাঁর স্ত্রী মুহাম্মদের জন্য বিবাহে নিষিদ্ধ হয়ে যাবেন।
কুরতুবির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুহাম্মদ সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে তাঁর উম্মতের পিতৃতুল্য। তাঁর স্ত্রীদের বিবাহ করা মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ। কিন্তু এই মর্যাদা তাঁকে তাঁর সমসাময়িক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের প্রকৃত জন্মদাতা পিতা বানায় না।
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ মুনাফিক ও অন্যদের মনে সৃষ্টি হওয়া আপত্তি দূর করেন এবং জানিয়ে দেন যে, মুহাম্মদ প্রকৃত অর্থে তাঁর সমসাময়িক কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের পিতা ছিলেন না।
কুরতুবি আরও ব্যাখ্যা করেছেন, এই আয়াতের উদ্দেশ্য মুহাম্মদের কখনো কোনো পুত্রসন্তান ছিল না—এমন দাবি করা নয়। তাঁর ইব্রাহিম, কাসিম, তাইয়িব ও মুতাহহার নামে পুত্রসন্তান জন্মেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁদের কেউ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হওয়ার বয়স পর্যন্ত জীবিত থাকেননি। হাসান ও হুসাইনও তাঁর জীবদ্দশায় শিশু ছিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ছিলেন না।
ফলে আয়াতটির আলোচনার কেন্দ্র হলো জয়নবের সঙ্গে বিবাহ নিয়ে উত্থাপিত আপত্তি এবং পালকপুত্র যায়েদের সঙ্গে মুহাম্মদের সম্পর্কের আইনগত মর্যাদা। জন্মদাতা পিতার সঙ্গে পালকপিতার পার্থক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জয়নবের সঙ্গে মুহাম্মদের বিবাহে সামাজিকভাবে প্রচলিত নিষেধের ভিত্তিটি বাতিল করা হয়েছে।

এই ঘটনাক্রমে একটি ব্যক্তিগত বিবাহ নিয়ে উত্থাপিত আপত্তির উত্তর দেওয়া হয়েছে সকল পালকসন্তানের আইনগত অবস্থান বদলে দিয়ে। প্রশ্নটি কেবল মুহাম্মদ জয়নবকে বিয়ে করতে পারতেন কি না, তা নয়; কেন তাঁর বিবাহকে ঘিরে বিদ্যমান সামাজিক পিতৃত্বের সংজ্ঞাটিই পরিবর্তিত হলো, সেটিও প্রশ্ন। আয়াত ৩৩:৫ দত্তক সন্তানকে জৈবিক পিতার নামে ডাকতে বলে, ৩৩:৩৭ পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহের অনুমোদন দেয়, আর ৩৩:৪০ ঘোষণা করে মুহাম্মদ কারও পিতা নন। একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত এই বিধানগুলোর সম্মিলিত ফল যায়েদের পূর্বে স্বীকৃত পুত্রত্বের অবসান এবং জয়নবের সঙ্গে বিবাহের পথে আরব সমাজের আপত্তির আইনগত নিরসন।


পালিত পুত্রের স্ত্রীকে দেখে কামভাব: ঐশ্বরিক বাণীর আড়ালে মানবিক লালসা

মানব ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ও বিতর্কিত ঘটনা হলো পালিত পুত্রের স্ত্রীকে কেন্দ্র করে আরশের অধিপতি আল্লাহর পক্ষ থেকে একের পর এক আয়াত নাজিল হওয়া। যৌক্তিকভাবে চিন্তা করলে প্রশ্ন জাগে, মহাবিশ্বের বিশালতা, দাস প্রথা বিলোপ, যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ বা শিশু বিবাহের মতো গুরুতর সামাজিক ব্যাধিগুলো সংস্কারের চেয়ে পালিত পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করার পথ প্রশস্ত করা আল্লাহর কাছে কেন এত বেশি জরুরি হয়ে পড়ল? যেখানে মানবিক বিচারে পালিত সন্তানকে নিজের ঔরসজাত সন্তানের মতোই দেখা হয়, সেখানে সেই পুত্রের ঘর ভাঙা এবং তার স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গিনী করার বিষয়টি কেবল নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

আল্লাহ এবং তার রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে মুমিনদের আর কোনো অধিকার থাকে না—এই ভীতিকর সতর্কবার্তার মাধ্যমেই মূলত জয়নব ও জায়েদের এই অসম বিয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছিল। [7]

আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারী উক্ত নির্দেশের ভিন্নতা করার কোন অধিকার রাখে না। যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে সে স্পষ্টতই সত্য পথ হতে দুরে সরে পড়ল।
— Taisirul Quran
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিনা নারীর সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবেনা। কেহ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সেতো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।
— Rawai Al-bayan
আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন আর তুমিও যাকে অনুগ্রহ করেছ তাকে তুমি যখন বলছিলে- তুমি তোমার স্ত্রীকে (বিবাহবন্ধনে) রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে লুকিয়ে রাখছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চান, তুমি লোকদেরকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহই সবচেয়ে বেশি এ অধিকার রাখেন যে, তুমি তাঁকে ভয় করবে। অতঃপর যায়্দ যখন তার (যায়নাবের) সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম যাতে মু’মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব নারীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু’মিনদের কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হবেই।
— Taisirul Quran
স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করছ, তুমি তাকে বলেছিলেঃ তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন রেখেছ আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোকদেরকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকে ভয় করাই তোমার পক্ষে অধিকতর সঙ্গত। অতঃপর যায়িদ যখন তার (যাইনাবের) সাথে বিয়ের সর্ম্পক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করলাম, যাতে মু’মিনদের পোষ্য পুত্ররা নিজ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সূত্র ছিন্ন করলে সেই সব রমনীকে বিয়ে করায় মু’মিনদের জন্য কোন বিঘ্ন না হয়। আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হয়েই থাকে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর স্মরণ কর, আল্লাহ যার উপর নিআমত দিয়েছিলেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তুমি যখন তাকে বলেছিলে ‘তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর’। আর তুমি অন্তরে যা গোপন রাখছ আল্লাহ তা প্রকাশকারী এবং তুমি মানুষকে ভয় করছ অথচ আল্লাহই অধিকতর হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে; অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে।* আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়ে থাকে। * فَلَمَّا قَضَىٰ زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا এর আভিধানিক অর্থ হল: তার (স্ত্রীর) ব্যাপারে যায়েদের প্রয়োজন যখন শেষ হল। ভাবার্থ হল: বিয়ের প্রয়োজনীয়তা শেষে যায়েদ যখন তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিল। যায়েদ ইবন হারিসা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাস ছিলেন; আল্লাহ ইসলামের পথে হিদায়াত দানে তার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে পালক পুত্র ঘোষণা দিয়ে তার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলেন। যায়েদ বিয়ে করেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফুফাতো বোন যয়নব বিন্‌ত জাহশকে। তাদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় যায়েদ যয়নবকে তালাক দেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যয়নবকে বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করার ব্যাপারে সামাজিক নিষেধাজ্ঞা দূরীভূত করেন।
— Rawai Al-bayan
আর স্মরন করুন, আল্লাহ্ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর [১]।’ আর আপনি আপনার অন্তরে গোপন করছিলেন এমন কিছু যা আল্লাহ্ প্রকাশ করে দিচ্ছেন [২] এবং আপনি লোকদেরকে ভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহ্কেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সংগত। তারপর যখন যায়েদ তার (স্ত্রীর) সাথে প্রয়োজন শেষ করল [৩], তখন আমরা তাকে আপনার নিকট বিয়ে দিলাম [৪], যাতে মুমিনদের পোষ্য পুত্রদের স্ত্রীদেরকে (স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে) কোনো সমস্যা না হয় যখন তারা (পোষ্য পুত্ররা) নিজ স্ত্রীর সাথে প্রয়োজন শেষ করবে (এবং তালাক দিবে)। আর আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


প্রথম বিবাহে জয়নবের আপত্তি ও কোরআনিক কর্তৃত্ব: ইসলামকিউএর প্রত্যক্ষ স্বীকৃতি

জয়নবের প্রথম বিবাহে তাঁর নিজের আপত্তি এবং সেই আপত্তি দূর করতে ধর্মীয় নির্দেশের ভূমিকা ইসলামকিউএর বিস্তারিত আলোচনাতেও স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ জায়েদের পক্ষ থেকে জয়নবের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেন। জয়নব বংশমর্যাদার কারণে আপত্তি করেন; এরপর সূরা আহজাবের ৩৬ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত হয় এবং তিনি আল্লাহর আনুগত্য ও মুহাম্মদের ইচ্ছা পূরণের জন্য সম্মত হন। এখানে বিবাহের প্রথম পর্যায়েই একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নবীর কর্তৃত্ব ও ধর্মীয় অবাধ্যতার ভয় কার্যকর হয়েছে। জয়নবের আপত্তির পেছনে শ্রেণিগত অহংকার ছিল বলে যে ইসলামি ব্যাখ্যা রয়েছে, তা তাঁর নিজের বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের স্বাধীনতার প্রশ্নটি মুছে দেয় না। [8]

الإسلام سؤال وجواب — السؤال رقم 96464
تفصيل القول في قوله تعالى (وتخفي في نفسك ما الله مبديه)
উদ্ধৃত উৎস: সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটি, فتاوى إسلامية, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ১৩৭–১৪১

মূল আরবি বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ:
فخطبها من نفسها على زيد ، فاستنكفت وقالت : أنا خير منه حسباً
فاستجابت طاعةً لله ، وتحقيقًا لرغبة رسوله صلى الله عليه وسلم

বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্ন: যায়েদ ইবনে হারিসা এবং জয়নব বিনতে জাহশের বিবাহের প্রকৃত ঘটনা কী? তাঁদের বিবাহ কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং কীভাবে শেষ হয়েছিল? মুহাম্মদ জয়নবের প্রেমে পড়েছিলেন বলে যে বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে।
উত্তরে সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক অংশ:
যায়েদ ছিলেন হারিসা ইবনে শুরাহিল আল-কালবির পুত্র এবং মুহাম্মদের মুক্ত করা দাস। মুহাম্মদ তাঁকে দত্তক গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে তিনি ‘যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরে কোরআনে ‘তোমরা তাদের পিতার নামে ডাকো’ নির্দেশ অবতীর্ণ হলে তাঁকে পুনরায় ‘যায়েদ ইবনে হারিসা’ বলা হতে থাকে।
জয়নব ছিলেন জাহশ ইবনে রিবাব আল-আসাদির কন্যা। তাঁর মা উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু। অর্থাৎ জয়নব মুহাম্মদের ফুফাতো বোন ছিলেন।
যায়েদের সঙ্গে জয়নবের বিবাহের ব্যবস্থা মুহাম্মদ নিজেই করেছিলেন। যায়েদ তাঁর মুক্ত করা দাস ও পালকপুত্র ছিলেন বলে মুহাম্মদ তাঁর পক্ষ থেকে জয়নবের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেন। কিন্তু জয়নব এই প্রস্তাবে আপত্তি করেন এবং বলেন, ‘বংশমর্যাদার দিক থেকে আমি তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা আহজাবের ৩৬ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল বলে বর্ণিত রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে:
‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সেই বিষয়ে নিজের পছন্দমতো অন্য কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নেই। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অমান্য করে, সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।’
এরপর জয়নব আল্লাহর আনুগত্য এবং মুহাম্মদের ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে বিবাহে সম্মত হন।
ফতোয়া কমিটির বিবরণ অনুযায়ী, জয়নব প্রায় এক বছর যায়েদের সঙ্গে সংসার করেন। তারপর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। যায়েদ মুহাম্মদের কাছে জয়নব সম্পর্কে অভিযোগ করেন। কারণ যায়েদ ছিলেন তাঁর মুক্ত করা দাস ও পালকপুত্র এবং জয়নব ছিলেন তাঁর ফুফাতো বোন। যায়েদের কথায় তাঁকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছার ইঙ্গিত ছিল।
মুহাম্মদ তাঁকে জয়নবকে বিবাহবন্ধনে রেখে দিতে এবং ধৈর্য ধারণ করতে বলেন। ফতোয়া কমিটির ব্যাখ্যায়, মুহাম্মদ তখন ওহীর মাধ্যমে আগে থেকেই জানতেন যে যায়েদ জয়নবকে তালাক দেবেন এবং পরবর্তীতে জয়নব তাঁর নিজের স্ত্রী হবেন। কিন্তু পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করার কারণে মানুষ তাঁকে নিন্দা করবে—এই আশঙ্কা তাঁর ছিল। কারণ ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে এমন বিবাহ নিষিদ্ধ গণ্য হতো।
ফলে প্রথমে যে বিবাহে জয়নব আপত্তি জানিয়েছিলেন, সেই বিবাহ মুহাম্মদের প্রস্তাব ও কোরআনের নির্দেশের পর তাঁর সম্মতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে সেই বিবাহ বিচ্ছেদের পর মুহাম্মদ নিজেই জয়নবকে বিবাহ করেন।

একই বিবাহের ধারাবাহিকতায় প্রথমে জয়নব জায়েদকে বিয়ে করতে অনাগ্রহী ছিলেন, পরে নবীর নির্দেশ ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার পরিবেশে সেই বিয়ে সম্পন্ন হয়, এরপর জয়নবের প্রতি মুহাম্মদের আকর্ষণ ও তাঁর নিজের বিবাহের ঘটনা ইসলামি বর্ণনায় আসে। এক ব্যক্তির হাতে বিবাহের প্রস্তাব, ধর্মীয় নির্দেশ, পারিবারিক মধ্যস্থতা এবং পরবর্তী বিবাহের সিদ্ধান্ত—এই সব ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সম্পর্কটিকে স্বাধীন দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণ বিবাহের তুলনায় গভীরভাবে অসম করে তোলে।


তফসীরের ব্যবচ্ছেদ: অন্তরে লুকানো সেই গোপন কথা

কোরআনের সূরা আহজাবের ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তুমি তোমার অন্তরে গোপন করছিলে এমন কিছু যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিচ্ছেন।” এই ‘গোপন’ বিষয়টি আসলে কী ছিল? আধুনিক ও প্রাচীন প্রায় সকল নির্ভরযোগ্য তফসীরকারকই স্বীকার করেছেন যে, সেই গোপন বিষয়টি ছিল জয়নবের প্রতি মুহাম্মদের তীব্র আকর্ষণ বা কামভাব। আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া থেকে শুরু করে জালালাইন—সবখানেই এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।


কুরআনুল করীমঃ আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া যাকারিয়া

তফসীরে যাকারিয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুহাম্মদ মনে মনে চেয়েছিলেন জায়েদ যেন জয়নবকে তালাক দেয় এবং তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন। অথচ মুখে তিনি লোকলজ্জার ভয়ে জায়েদকে বলছিলেন, “তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছেই রাখো।” এই দ্বিমুখী আচরণ খোদ কোরআনের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। আসুন আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার অনুবাদে এই আয়াতটি পড়ে নিই, [9]

৩৭.
আর স্মরণ করুন, আল্লাহ্ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলছিলেন, ‘তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহ্ তাকওয়া অবলম্বন কর (১)।’ আর আপনি আপনার অন্তরে গোপন করছিলেন এমন কিছু যা আল্লাহ্ প্রকাশ করে দিচ্ছেন (২); এবং আপনি লোকদেরকে ভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা আপনার পক্ষে অধিকতর সংগত। তারপর যখন যায়েদ তার (স্ত্রীর) সাথে প্রয়োজন শেষ করল (৩), তখন আমরা তাকে আপনার নিকট বিয়ে দিলাম (৪), যাতে…
(১)
অর্থাৎ “স্মরণ করুন যখন আল্লাহ্ ও আপনি নিজে যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তাকে
বলছিলেন যে, তুমি নিজের স্ত্রীকে তোমার বিবাহাধীনে থাকতে দাও।” এ ব্যক্তি হলো যায়েদ। আল্লাহ্ তাকে ইসলামে দীক্ষিত করে তার প্রতি প্রথম অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যয়নব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার সম্পর্কে ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব, গোত্রগত কৌলিন্যভিমান এবং আনুগত্য ও শৈথিল্য প্রদর্শনের অভিযোগ উত্থাপন করতেন। একদিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে এসব অভিযোগ পেশ করতে গিয়ে যয়নবকে তালাক দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন: ‘নিজ স্ত্রীকে তোমার বিবাহধীনে থাকতে দাও এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর।’ [দেখুন, বাগভী; ফাতহুল কাদীর; তাবারী।
(২)
এর ব্যাখ্যা এই যে, আপনি অন্তরে যে বিষয় গোপন রেখেছেন তা এ বাসনা যে, যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যয়নবকে তালাক দিলে পরে আপনি তাকে বিয়ে করবেন। [ফাতহুল কাদীর; বাগভী]

কামভাব 3

তাবারির মূল আরবি তাফসির: ‘জায়েদ যেন তালাক দেন’—অন্তরে গোপন সেই প্রত্যাশা

সূরা আহজাব ৩৩:৩৭-এর ব্যাখ্যায় তাবারি কেবল জয়নবের প্রতি মুহাম্মদের আকর্ষণের কথা বলেননি; তিনি আয়াতের ‘তুমি তোমার অন্তরে গোপন করছিলে’ বাক্যের অর্থ সরাসরি নির্ধারণ করেছেন জায়েদের সঙ্গে জয়নবের বিচ্ছেদের প্রত্যাশা হিসেবে। তাবারির বক্তব্য অনুসারে, জয়নবকে দেখে মুহাম্মদের মনে আকর্ষণ জন্মেছিল; জায়েদ তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে মুহাম্মদ মুখে তাঁকে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার চালিয়ে যেতে বলছিলেন, কিন্তু মনে মনে চাইছিলেন জয়নব জায়েদের বিবাহবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আসুন, যাতে তিনি নিজে তাঁকে বিয়ে করতে পারেন। তাবারির সূত্রে কাতাদার মন্তব্যও একই দিকে যায়—মুহাম্মদ মনে মনে জায়েদের তালাক কামনা করছিলেন। এই বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পরবর্তী কোনো আধুনিক সমালোচকের তৈরি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নয়; প্রাথমিক মুসলিম তাফসিরেই গোপন আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় এসেছে। [10]

تفسير الطبري — جامع البيان عن تأويل آي القرآن
سورة الأحزاب، الآية ٣٧
الجزء العشرون، الصفحتان 273–274

মূল আরবি বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ:
وهو صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم يحب أن تكون قد بانت منه لينكحها
وتخفي في نفسك محبة فراقه إياها لتتزوجها إن هو فارقها

বাংলা অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যার বিস্তারিত অর্থানুবাদ:
আল্লাহ মুহাম্মদকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, তিনি এমন এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, যাকে আল্লাহ ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে অনুগ্রহ করেছেন এবং মুহাম্মদ দাসত্ব থেকে মুক্ত করে অনুগ্রহ করেছেন, ‘তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রাখো এবং আল্লাহকে ভয় করো।’ এখানে সেই ব্যক্তি হলেন যায়েদ ইবনে হারিসা।
তাবারির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদ একসময় জয়নব বিনতে জাহশকে দেখেন এবং তাঁকে তাঁর পছন্দ হয়। তখন জয়নব ছিলেন যায়েদের স্ত্রী। মুহাম্মদের মনে জয়নব সম্পর্কে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল, আল্লাহ তা জানতেন। এরপর যায়েদের মনে জয়নবের প্রতি অনাগ্রহ জন্মায়। যায়েদ তাঁকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে মুহাম্মদের কাছে বিষয়টি জানান।
মুহাম্মদ তখন তাঁকে বলেন, ‘তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রাখো।’ কিন্তু তিনি মনে মনে চাইছিলেন, জয়নব যেন যায়েদের বিবাহবন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, যাতে তিনি নিজে তাঁকে বিবাহ করতে পারেন।
‘তুমি নিজের অন্তরে গোপন করছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করবেন’—এই বাক্যের ব্যাখ্যায় তাবারি বলেছেন, মুহাম্মদ নিজের অন্তরে গোপন রেখেছিলেন যায়েদের সঙ্গে জয়নবের বিচ্ছেদের আকাঙ্ক্ষা, যাতে যায়েদ তাঁকে তালাক দিলে তিনি নিজে তাঁকে বিবাহ করতে পারেন।
‘তুমি মানুষকে ভয় করছিলে’—এর ব্যাখ্যায় তাবারি বলেন, মুহাম্মদ আশঙ্কা করছিলেন, লোকেরা বলবে, তিনি একজন ব্যক্তিকে নিজের স্ত্রী তালাক দিতে বলেছেন এবং পরে সেই নারীকে নিজেই বিবাহ করেছেন।
কাতাদার সূত্রে সংরক্ষিত ব্যাখ্যায়ও বলা হয়েছে, মুহাম্মদ মনে মনে চাইছিলেন যায়েদ যেন জয়নবকে তালাক দেন। ইবনে যায়েদের বিবরণে আরও এসেছে, একদিন মুহাম্মদ যায়েদের বাড়িতে গেলে বাতাসে দরজার পর্দা সরে যায় এবং ঘরের মধ্যে জয়নবকে অনাবৃত অবস্থায় দেখতে পান। তাঁর প্রতি মুহাম্মদের আকর্ষণ জন্মায়। এরপর যায়েদ বিবাহবিচ্ছেদের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও মুহাম্মদ তাঁকে স্ত্রীকে রেখে দিতে বলেন।
অবশেষে যায়েদ জয়নবকে তালাক দেওয়ার পর আল্লাহ তাঁকে মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেছেন বলে কোরআনে ঘোষণা করা হয়। তাবারি এই ঘটনার সঙ্গে দত্তকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহের সামাজিক বাধা দূর করার বিধানকে যুক্ত করেছেন।

তাবারির এই ব্যাখ্যা কোরআনের বাক্যটির তাৎপর্যকে আরও সুনির্দিষ্ট করে। আয়াতে শুধু বলা হয়েছে, মুহাম্মদ নিজের মনে কিছু গোপন রেখেছিলেন; তাবারি সেই গোপন বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন জায়েদের তালাক এবং জয়নবের সঙ্গে নিজের বিবাহের প্রত্যাশা হিসেবে। ফলে মুখে ‘তোমার স্ত্রীকে রেখে দাও’ বলা এবং মনে সেই দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান কামনা করার মধ্যকার অসংগতি নিছক ধারণা নয়, তাবারির নিজস্ব ব্যাখ্যাতেই প্রতিষ্ঠিত।


তাফসীরে মাযহারীঃ কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথী

ঘটনাটি কেবল মানসিক আকর্ষণে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট শারীরিক প্রেক্ষাপট ছিল। তফসীরে মাযহারী এবং জালালাইনের বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন মুহাম্মদ জায়েদের বাড়িতে গিয়ে জয়নবকে অত্যন্ত অপ্রস্তুত এবং স্বল্পবসনা অবস্থায় দেখতে পান। জয়নবের অনিন্দ্য রূপ দেখে নবীর হৃদয়ে এক গভীর ভাবান্তরের সৃষ্টি হয় এবং তিনি স্বগোতোক্তি করেন, “সুবহানাল্লাহ! আল্লাহই অন্তরসমূহের বিবর্তক।” এবারে আসুন এই আয়াতটির আরেকটি তাফসীর পড়ি, [11]

বাগবী লিখেছেন, আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর হজরত যয়নাব ও তাঁর ভ্রাতা বিবাহ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। বিষয়টি তাঁরা সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলেন রসুল স. এর অধিকারে। রসুল স. হজরত জায়েদ ও হজরত যয়নাবের পরিণয় সম্পন্ন করলেন। নিজের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে উপহার হিসেবে দিলেন দশ দীনার, ষাট দিরহাম, একটি চাদর, একটি কুর্তা, একটি ওড়না ও একটি লুঙ্গি । আর খাদ্যশস্য হিসেবে দিলেন পঞ্চাশ সের আটা ও চার মন খেজুর।কিছুদিন পর কোনো এক কার্যোপলক্ষে রসুল স. উপস্থিত হলেন হজরত জায়েদের গৃহে। দেখলেন, হজরত যয়নাব দাঁড়িয়ে আছেন একটি কামিজ ও দোপাট্টা পরিহিত অবস্থায় । তিনি ছিলেন অনিন্দ্যরূপসী কুরায়েশ বালা। রসুল স. এর ভাবান্তর জন্মালো। মুখে কেবল বললেন সুবহানাল্লাহ্। আল্লাহ্ই অন্তরসমূহের বিবর্তক। তারপর ফিরে এলেন স্বগৃহে। পরে হজরত জায়েদের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি স. তাঁর অন্তরের ভাবান্তরের কথা তাঁকে জানালেন। হজরত জায়েদের অন্তরে তখন থেকে হজরত জয়নাবের প্রতি সৃষ্টি হলো বীতরাগ । কিছুদিন পর তিনি রসুল স. সকাশে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ্র রসুল! আমি জয়নবের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে চাই ।তিনি স. বললেন, কেনো? যয়নব কি তোমার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে? তিনি বললেন, শপথ আল্লাহ্ । আমি তাঁর নিকট ইষ্ট ব্যতীত অনিষ্ট কিছু পাইনি। তবে জাত্যাভিমান তার প্রকট। মাঝে মাঝে সে একথা প্রকাশও করে। রসুল স. বললেন, তোমার সহধর্মিণীকে তোমার কাছেই রাখো। তার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। আবু জায়েদের সূত্রে ইবনে জারীর এরকমই বর্ণনা করেছেন। আরো বলেছেন, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই অবতীর্ণ হয় নিম্নের আয়াত ।
… এরপর বলা হয়েছে- ‘তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছো, আল্লাহ্ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন’।
হজরত আনাস থেকে বোখারী বর্ণনা করেছেন, হজরত জায়েদ ও হজরত যয়নাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে আলোচ্য আয়াত। হাসান বলেছেন, হজরত জায়েদ তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর কথা বললে রসুল স. এর অন্তরে উদ্ভুত হয়েছিলো অনিচ্ছাকৃত প্রীতির। কিন্তু লজ্জা ও আত্মসম্মানবোধের কারণে তিনি স. তা প্রকাশ হতে দেননি।
কেউ কেউ বলেছেন, রসুল স. মনে মনে এরূপ ধারণা পোষণ করতেন যে, জায়েদ যয়নাবকে ছেড়ে দিলে তিনি স. তাঁকে বিয়ে করবেন। হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, রসুল স. হজরত যয়নাবের প্রতি অনুরাগ লালন করতেন অন্তরাভ্যন্তরে। কাতাদা বলেছেন, তিনি স. মনে মনে চাইতেন, হজরত জায়েদ যেনো হজরত যয়নাবকে পরিত্যাগ করেন।
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা সূত্রে বাগবী লিখেছেন, জায়েদ ইবনে জাজআন বলেছেন, একদিন আমাকে ইমাম জয়নুল আবেদীন জিজ্ঞেস করলেন ‘তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছো আল্লাহ্ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন’ এই আয়াত সম্পর্কে হাসান কী বলেন? আমি বললাম, তিনি বলেন, হজরত জায়েদ যখন বললেন, আমি যয়নাবকে পরিত্যাগ করতে চাই, তখন রসুল স. মনে মনে খুশী হলেন। কিন্তু মুখে বললেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও। তার

কামভাব 5
কামভাব 7
কামভাব 9

তফসীরে জালালাইনঃ মাহাল্লী ও সুয়ুতী

তফসীরে জালালাইন আরও স্পষ্ট করে বলেছে যে, মুহাম্মদ যখন জয়নবকে দেখেন, তখনই তার মনে ‘মহব্বত’ বা অনুরাগের সৃষ্টি হয়। জায়েদ যখন বুঝতে পারেন যে তার পালিত পিতার নজর তার স্ত্রীর ওপর পড়েছে, তখন তিনি স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে জয়নবের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন এবং তাকে তালাক দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এবারে আসুন তাফসীরে জালালাইন থেকে পড়ি, [12] –

… আলোচ্য আয়াতটি আব্দুল্লাহ বিন জাহাশ ও তার বোন যয়নব-এর শানে অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ হযরত যয়নব বিনতে জাহশকে যায়েদ বিন হারেসার নিকট বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পাঠান তখন তারা উভয়ে এতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। কেননা তারা প্রথমে মনে করেন রাসূলুল্লাহ নিজের জন্য প্রস্তাব দেন। অতঃপর উক্ত আয়াত নাজিল হওয়ার পর তারা সম্মতি দেন। এবং যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ হযরত যায়েদের সাথে যয়নবকে বিবাহ দেন। কিন্তু কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত যয়নবের সাথে যায়েদের মনোমালিন্য দেখা দেয় ও রাসূলুল্লাহ-এর কাছে যয়নবের মহব্বত সৃষ্টি হয় অতঃপর যায়েদ রাসূলুল্লাহ -এর কাছে এসে যয়নবকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আল্লাহর রাসূল বলেন, তুমি তোমার স্ত্রীকে তোমার পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ রাখ। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,
৩৭. আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন, ইসলামের দ্বারা আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন, আজাদের মাধ্যমে এবং তিনি হলেন যায়েদ বিন হারেসা, তিনি জাহেলী যুগে বন্দীদের মধ্যে ছিলেন অতঃপর রাসূলুল্লাহ নবুওতের পূর্বে তাকে ক্রয় করেন এবং মুক্তি দিয়ে নিজের পালকপুত্র হিসেবে সম্বোধন করেন তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, এখানে ১। শব্দটি উহ্য ফে’লের মাফউল হিসেবে মানসূব তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং তালাকের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। আপনি আপনার অন্তরে এমন দেবেন। তোমার অন্তরে যয়নবের মহব্বত ও যায়েদ তাকে তালাক দেওয়ার পর আপনি তাকে বিবাহ করার বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে সিদ্ধান্ত আল্লাহ প্রকাশ করে দেবেন এবং আপনি লোকনিন্দার ভয় করছিলেন, লোকেরা বলবে মুহাম্মদ তার পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ করেছে অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত প্রত্যেক বিষয়ে, অতএব তিনি তোমাকে তার সাথে বিবাহ দেবেন এবং এতে লোকনিন্দায় তোমার কোনো ক্ষতি নেই। অতঃপর যায়েদ তাকে তালাক দিলেন এবং যয়নব ইদ্দতের সময় পুরা করলেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তার সাথে অনুমতি
বিহীন [আকদ ও মহর ব্যতীত। বাসর রাত সম্পন্ন করলেন ও মুসলমানদেরকে রুটি ও গোস্ত দ্বারা ওলীমার দাওয়াত আপ্যায়ন করালেন যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোনো অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।

কামভাব 11
কামভাব 13

উপরে লক্ষ্য করুন, তাফসীরে জালালাইনের অনুবাদের সময় অনুবাদক একটি কৌশল অবলম্বন করেছেন, যার ফলে কোন ঘটনার পরে কোন ঘটনাটি ঘটেছিল তা বদলে গেছে। তাই আসুন ইংরেজি অনুবাদ থেকে ঘটনার ধারাবাহিকতাটি বুঝে নিই, [13]

[33:36] And it is not [fitting] for any believing man or believing woman, when God and His Messenger have decided on a matter, to have (read takūna or yakūna) a choice in their matter, in contravention of the decision of God and His Messenger. This [verse] was revealed regarding ‘Abd Allah b. Jabsh and his sister Zaynab, whose hand the Prophet had asked for in marriage, but meaning on behalf of Zayd b. Haritha. They were loathe to this [proposal] when they found out [that it was on the latter’s behalf], for they had thought that the Prophet (s) wanted to marry her himself. But afterwards they consented because of the [following part of the] verse: And whoever disobeys God and His Messenger has certainly strayed into manifest error. Thus the Prophet ($) gave her in marriage to Zayd. Then on one occasion he [the Prophet] caught sight of her and felt love for her, whereafter [when he realised that] Zayd lost his affection for her and so said to the Prophet ($), ‘I want to part with her. But the Prophet said to him, ‘Retain your wife for yourself, as God, exalted be He, says:
[33:37] And when (idh is dependent because of [an implied preceding] udhkur, ‘mention [when]’) you said to him to whom God had shown favour, by [guiding him to] Islam, and to whom you [too] had shown favour: by manumitting him – this was Zayd b. Haritha, who had been a prisoner of war before [the coming of] Islam (in the period of al-jahiliyya). The Messenger of God (s) purchased him before his call to prophethood, and then manumitted him and adopted him as his son – ‘Retain your wife for yourself and fear God’, before divorcing her. But you had hidden in your heart what God was to disclose, [what] He was to manifest of your love for her and of [the fact] that should Zayd part with her you would marry her, and you feared people, would say, ‘He has married his son’s wife!, though God is worthier that you should fear Him, in all things, so take her in marriage and do not be concerned with what people say. Zayd subsequently divorced her and her [obligatory] waiting period was completed. God, exalted be He, says: So when Zayd had fulfilled whatever need he had of her, We joined her in marriage to you the Prophet consummated his marriage with her without [the customary] permis-sion [from her legal guardian] and gratified the Muslims with [a feast of] bread and meat so that there may not be any restriction for the believers in respect of the wives of their adopted sons, when the latter have fulfilled whatever wish they have of them. And God’s commandment, that which He has decreed, is bound to be realised.

কামভাব 15

তাবারীর ইতিহাস: সুবহানাল্লাহর আড়ালে যা লুকিয়ে ছিল

ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পরিচিত আল-তাবারীর ইতিহাসে এই ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত করবে। মুহাম্মদ যখন জায়েদের বাড়িতে যান, জয়নব তখন পরিধেয় বস্ত্র পরিধান করতে করতে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে আসেন। জয়নবের সেই রূপ মুহাম্মদের মনে স্থায়ীভাবে দাগ কেটে যায়। তিনি অস্পষ্টভাবে “সুবহানাল্লাহ” বলতে বলতে ফিরে আসেন, যার অর্থ হয়তো ছিল—এমন রূপসী নারী তার পালিত পুত্রের ঘরে কীভাবে আছে! [14] [15]

মুহাম্মাদ ইবনে উমার (আল ওয়াকেদী) বলেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর আল আসলামী বলেছেন, মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে হিশাম বলেছেন “রাসূল ﷺ জাইদ বিন হারেছার বাসায় তাঁকে খুঁজতে গেলেন, তখন যাইদকে বলা হতো ‘মুহাম্মাদের পুত্র’। কিন্তু তিনি তাঁকে বাসায় খুঁজে পেলেন না। এমতাবস্থায়, জয়নাব তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে তাঁর রাতের পোশাক পরে বের হলেন। নবীﷺতাঁর মুখ ফেরালেন এবং তিনি (জয়নাব) বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! সে এখানে নেই, দয়া করে ভেতরে আসুন।’ কিন্তু নবী ﷺ (ভেতরে প্রবেশ করতে) রাজি হলেন না। তিনি (জয়নাব) রাতের পোশাক পরে বের হয়েছিলেন, কারণ তাঁকে বলা হয়েছিলো নবী ﷺ দরজায় দাঁড়িয়ে, তাই তিনি তাড়াহুড়ো করেছিলেন। তিনি নবী ﷺ এর হৃদয়ে জায়গা করে নিলেন। নবী ﷺ অস্পষ্ট গুঞ্জন করতে করতে বের হয়ে গেলেন, (যার মধ্যে শুধু এতোটুকু বোঝা গেলো) ‘সকল প্রশংসা তাঁর যিনি হৃদয়ের পরিবর্তন করেন।

এবারে আসুন সরাসরি সর্বাধিক প্রখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ তাবারীর গ্রন্থ থেকে পুরো বিবরণটি জেনে নেয়া যাক, [16] –

Zaynab bt. Jahsh b. Ri’ab, sister of `Abd al-Rahman b. Jalhsh.
Her mother was Umaymah bt. `Abd al-Muttalib b. Hashim.
According to Ibn `Umar [al-Wagidi]-`Umar b. `Uthman alJahshi-his father: Zaynab bt. Jahsh, who was a beautiful woman, was among those who emigrated [to Medina] with the Prophet. When the Prophet arrived at Medina he asked that she be given to [his adopted son] Zayd b. Harithah in marriage, but she said “0 Messenger of God, I cannot give my consent, for I am the widow of the Quraysh. The Prophet replied “But I give my consent that you should [marry him].” So Zayd b. IHarithah married her.
According to Ibn Umar [al-Wagidi]-`Abdallah b. `Amir al-Aslami-Muhammad b. Yahya b. abban: The Prophet came to Zayd b. Harithah’s house looking for him. Zayd was [at that time] called only Zayd b. Muhammad, and the Prophet sometimes would miss him [after] a time and would say “Where is Zayd?” [Once] he went to Zayd’s house but did not find him [there].
Zaynab rose toward him and said “Come here, O Messenger of God,” but he turned away, muttering something unintelligible, except the words “Praised be God the Great, praised be God, who turns the hearts.”( Subhanallah!) When Zayd came home his wife told him that the Prophet had come to his house. Zayd asked “Didn’t you ask him to come in?” She said “I proposed it to him but he declined.”
Zayd asked “Did you hear him say anything?” She said: “When he turned away I heard him say something I did not understand, and I heard him say ‘Praised be God the Great, praised be God who turns the hearts.” Zayd left [his house] and went to the Prophet. He said: “O Messenger of God, I heard that you came to my house.
Why didn’t you come in? O Messenger of God, may my father and mother be your ransom! Perhaps [the problem is] that you like Zaynab? In that case, I shall divorce her.” The Prophet said “Keep your wife.” [But] Zayd could not touch her [after that]. He would
come to the Prophet and tell him [about it], and the latter would say “Keep your wife,” and Zayd would say “O Messenger of God, I shall divorce her,” and the Prophet would say “Keep your wife.”
Zayd divorced her [all the same] and abstained from her, and she became lawful [for remarriage]
. [One day], while talking to `A’ishah, the Prophet fainted. On regaining consciousness he smiled and said “Who will go to Zaynab to bring her the glad tidings that God from above gave her to me in marriage?” The Prophet [then] recited “(Recall) when thou wert saying to him upon whom Allah bestowed favor and upon whom thou didst bestow favor.” A’ishah narrated: I was upset by both near and remote troubles, having heard of Zaynab’s beauty. What was more, the greatest and noblest of all things happened to her, as God from heaven gave her in marriage. I said [to myself ] “She is going to boast of it to us.” Salma, the Prophet’s servant, then went quickly and told [Zaynab] about it. [Zaynab] gave her silver ornaments for this [service].

অনুবাদঃ জয়নাব বিনতে জাহশ। তার মা ছিলেন উমাইমাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম।
ইবনে উমরের সূত্রে জানা যায় যে, জয়নাব বিনতে জাহশ ছিলেন এক অপরূপ সুন্দরী নারী। তিনি নবীর সঙ্গে মদিনায় হিজরতকারী সাহাবিদের অন্যতম। নবী যখন মদিনায় পৌঁছালেন, তখন তিনি জয়নাবকে তাঁর দত্তকপুত্র জায়েদ বিন হারিসার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বললেন। কিন্তু জয়নাব বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি রাজি নই, কারণ আমি কুরাইশদের একজন বিধবা।” নবী উত্তর দিলেন, “কিন্তু আমি তোমার জন্য এই বিয়ের নির্দেশ দিচ্ছি।” এরপর জায়েদ বিন হারিসা তাকে বিয়ে করলেন।
ইবনে উমরের সূত্রে আরো জানা যায়, (একদিন) নবী জায়েদ বিন হারিসার বাড়িতে তাকে খুঁজতে গেলেন। তখন জায়েদকে “জায়েদ বিন মুহাম্মদ” বলেই ডাকা হতো। নবী তাকে খুঁজতেন এবং বলতেন, “জায়েদ কোথায়?” (একদিন) জায়েদের বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে ফিরে আসেন।
জয়নাব নবীকে দেখে বললেন, “ও আল্লাহর রাসুল, ভেতরে আসুন।” কিন্তু নবী চলে গেলেন এবং যাওয়ার সময় কিছু অস্পষ্ট বাক্য উচ্চারণ করলেন। তিনি বললেন, “সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহর প্রশংসা যিনি অন্তরকে পরিবর্তন করে দেন।” জায়েদ বাড়িতে ফিরে আসার পর তার স্ত্রী ঘটনাটি তাকে জানালেন। জায়েদ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি তাকে ঘরে আসতে বলোনি?” জয়নাব বললেন, “আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।”
জায়েদ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি কিছু শুনতে পেয়েছ?” জয়নাব বললেন, “তিনি যখন সরে গেলেন, তখন তিনি অস্পষ্ট কিছু বলেছিলেন। তবে আমি শুনেছি তিনি বলেছেন, “সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহর প্রশংসা যিনি অন্তরকে পরিবর্তন করে দেন।”
জায়েদ এরপর নবীর কাছে গেলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি শুনেছি আপনি আমার বাড়িতে গিয়েছিলেন। কেন আপনি ভিতরে আসেননি? যদি আপনার মনে হয় যে আপনি জয়নাবকে পছন্দ করেন, তাহলে আমি তাকে তালাক দিয়ে দেব।” নবী বললেন, “তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছেই রাখো।” কিন্তু জায়েদ আর জয়নাবের প্রতি আগের মতো অনুভব করতে পারলেন না।
বারবার নবী বলতেন, “তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছেই রাখো।” কিন্তু জায়েদ উত্তর দিতেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি তাকে তালাক দিতে চাই।” শেষ পর্যন্ত জায়েদ তাকে তালাক দেন এবং তিনি পুনরায় বিয়ের জন্য বৈধ হয়ে ওঠেন।

একদিন নবী আয়েশার সঙ্গে কথা বলার সময় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি হাসলেন এবং বললেন, “কে যাবে জয়নাবের কাছে তাকে এই সুসংবাদ দিতে যে আল্লাহ ওপর থেকে তাকে আমার জন্য বিয়ে দিয়েছেন?” নবী তখন কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন: “তুমি তাকে বলছিলে যার প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং যাকে তুমি অনুগ্রহ করেছ।” আয়েশা বলেন, “আমি জয়নাবের সৌন্দর্যের কথা শুনে দুঃখিত ছিলাম এবং জানতাম যে এই ঘটনা তার জন্য গর্বের বিষয় হবে। আল্লাহ সরাসরি তার সঙ্গে এই বিশেষ সম্মান করলেন।”
এরপর নবীর খাদেম সালমা দ্রুত জয়নাবের কাছে গিয়ে এই সুসংবাদ জানালেন। জয়নাব তাকে এই খুশির জন্য রূপার অলংকার উপহার দেন।

কামভাব 17

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াঃ ইবনে কাসীরের গ্রন্থে আহমদ ইব্‌ন হাম্বল

জায়েদ যখন বাড়ি ফিরলেন, জয়নব তাকে সব খুলে বললেন। জায়েদ বুঝতে পারলেন তার স্ত্রীকে নবীর পছন্দ হয়েছে। তিনি কালক্ষেপণ না করে নবীর কাছে গিয়ে বললেন, “যদি আপনার মনে হয় আপনি জয়নবকে পছন্দ করেন, তবে আমি তাকে তালাক দেব।” মুহাম্মদ মুখে “রাখো তোমার স্ত্রীকে” বললেও অন্তরে যে ভিন্ন ইচ্ছা পোষণ করছিলেন, তা জয়নবের সাথে তার পরবর্তী বাসর রাত এবং বিনা আকদে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। এই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইব্‌ন হাম্বলের একটি বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বক্তব্য অনেকটা এরকম যে, এই বিষয়টি উল্লেখ করলে দুষ্টু লোকেরা দুষ্টু কথা বলবে, তাই এই কথাটি গোপন করে গেলাম! ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল এই কদর্য ঘটনাটি কেন গোপন করতে চেয়েছিলেন, তা সহজেই অনুমেয়। কারণ একজন নবীর এমন আচরণকে কোনো নৈতিক মানদণ্ড দিয়েই জাস্টিফাই করা সম্ভব নয়। [17] –

ইবন জারীর তাবারীসহ একাধিক ঐতিহাসিক এ মত সমর্থন করেন। একাধিক মুফাস্সির ফকীহ এবং ঐতিহাসিক নবী করীম (সা) কর্তৃক তাঁকে বিবাহ করার সম্পর্কে একটা ঘটনার উল্লেখ করেছেন!
ইমাম আহমদ ইব্‌ন হাম্বল (রা) তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে তা বর্ণনা করেছেন, অজ্ঞ মূর্খরা যাতে এর কদর্য (অর্থ!) না করতে পারে সে কারণে আমরা এখানে ইচ্ছা করেই তা উদ্ধৃত করা থেকে বিরত থাকলাম।

কামভাব 19

জয়নবের কাছে বিয়ের প্রস্তাব: প্রাক্তন স্বামীকে দিয়ে ঘটকালী

যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার দাপট যখন চরমে পৌঁছায়, তখন মানবিক শিষ্টাচার ও নৈতিকতা যে কতটা তুচ্ছ হয়ে পড়ে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো জয়নব বিনতে জাহশকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর ঘটনাটি। জয়নবের ইদ্দত (তালাক পরবর্তী অপেক্ষার সময়) শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মুহাম্মদ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু চরম বিস্ময়ের বিষয় হলো, তিনি এই প্রস্তাবটি পাঠানোর জন্য দূত হিসেবে বেছে নিলেন জয়নবেরই প্রাক্তন স্বামী এবং নিজের পালিত পুত্র জায়েদকে।

যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে মানুষটি মাত্র কিছুদিন আগে নিজের স্ত্রীকে ত্যাগ করেছেন—তাও আবার নবীর সেই স্ত্রীর প্রতি আসক্তির কথা জানতে পেরে—তাকে দিয়েই পুনরায় সেই নারীর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো এক চরম মনস্তাত্ত্বিক নিষ্ঠুরতা। এটি জায়েদকে মানসিকভাবে পিষ্ট করার এবং তাকে তার চূড়ান্ত ‘অধীনতা’ বুঝিয়ে দেওয়ার একটি নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। [18]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. যায়নাব বিনত জাহশকে বিবাহ করা, পর্দার হুকুম নাযিল হওয়া এবং বিবাহের ওলীমা সাবিত প্রসঙ্গ
৩৩৭১। মুহাম্মদ ইবনু হাতিম ইবনু মায়মূন ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন যয়নাব (রাঃ) এর ইদ্দত পূর্ণ হল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়িদ (রাঃ) কে বললেন, তুমি যয়নাবের নিকট আমার কথা উল্লেখ কর। আনাস (রাঃ) বলেন, যায়িদ (রাঃ) রওনা হলেন এবং তাঁর নিকট গেলেন। তখন তিনি আটার খামির করছিলেন। যায়িদ (রাঃ) বলেন, আমি যখন তাঁকে দেখলাম তাঁর মর্যাদা আমার অন্তরে এমনভাবে জাগ্রত হল যে, আমি তার প্রতি তাকাতে পারলাম না। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে স্মরণ করেছেন। তাই আমি তাঁর দিকে পিঠ ফিরে দাঁড়ালাম এবং পিছনের দিকে সরে পড়লাম। এরপর বললাম, হে যয়নাব! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে স্মরণ করে আমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই করব না যে পর্যন্ত না আমি আমার রবের কাছ থেকে নির্দেশ লাভ না করি। এরপর তিনি তার সালাতের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
এদিকে কুরআন নাযিল হল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে যয়নাবের বিনা অনুমতিতেই তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আমরা দেখেছি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (যয়নাবের সেই বিবাহ উপলক্ষে) দুপুর বেলায় আমাদের মাংস খাইয়েছেন। খাওয়া দাওয়ার পর লোকেরা বের হয়ে গেল কিন্তু কয়েকজন লোক খাওয়ার পর আলাপে মশগুল থাকল। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে পড়লেন, আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি তাঁর বিবিগণের ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়ে তাঁদের সালাম করতে লাগলেন। আর বিবিগণ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার এ স্ত্রীকে কেমন পেয়েছেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আমার মনে নেই, (আলাপরত) সে লোকদের বের হয়ে যাওয়ার কথা আমিই তাঁকে জানিয়ে ছিলাম না তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তারপর তিনি চললেন এবং সে ঘরে প্রবেশ করলেন আমিও তাঁর সঙ্গে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম। তিনি আমার ও তাঁর মধ্যে পর্দা টেনে দিলেন। আর পর্দার বিধান নাযিল হল। আনাস (রাঃ) বলেন, লোকদের উপদেশ দেওয়া হল, যে উপদেশ দেওয়ার ছিল।
ইবনু রাফি তার হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করতে গিয়ে এ আয়াত উল্লেখ করেনঃ (অর্থ) ’তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নবীগৃহে প্রবেশ করবে না …… কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই নির্দেশের পর জায়েদের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা হাদীসের বর্ণনা থেকেই স্পষ্ট। জায়েদ যখন জয়নবের কাছে গেলেন, তিনি তার দিকে তাকাতেও পারছিলেন না। মুসলিম ঐতিহ্য একে ‘মর্যাদা’ বা ‘ভক্তি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, এটি আসলে একজন ভেঙে পড়া মানুষের চরম অসহায়ত্ব। যে নারীকে তিনি নিজের স্ত্রী হিসেবে জানতেন, আজ তাকেই অন্যের (তাও আবার নিজের পালিত পিতার) শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার প্রস্তাব দিতে হচ্ছে—এই গ্লানি জায়েদকে কতটা কুঁকড়ে দিয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়।


বিনা অনুমতিতে বাসর এবং অলৌকিক বিয়ের দাবি

জয়নব যখন এই প্রস্তাবে সরাসরি সম্মতি না দিয়ে ‘রবের নির্দেশের’ অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই অত্যন্ত সুবিধাজনকভাবে কোরআনের আয়াত নাজিল হয়। এই আয়াতের দোহাই দিয়ে মুহাম্মদ কোনো আনুষ্ঠানিক আকদ (বিয়ে পড়ানো), মোহরানা বা সাক্ষী ছাড়াই সরাসরি জয়নবের ঘরে প্রবেশ করেন এবং বাসর সম্পন্ন করেন। [18]

যৌক্তিক প্রশ্ন ওঠে, যে ধর্মে বিয়ের জন্য ন্যূনতম সাক্ষীর প্রয়োজন হয়, সেখানে স্বয়ং নবীর ক্ষেত্রে কেন সমস্ত নিয়ম রহিত হয়ে গেল? আল্লাহর পক্ষ থেকে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার এই দাবিটি মূলত তৎকালীন আরবের প্রবল সামাজিক সমালোচনাকে ধামাচাপা দেওয়ার একটি ধর্মীয় হাতিয়ার ছিল। পালিত পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা যে অজাচার হিসেবে গণ্য হতো, তাকে ‘ঐশ্বরিক বিধান’ বলে চালিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই মুহাম্মদ তার ব্যক্তিগত লালসাকে একটি পবিত্র রূপ দিতে সক্ষম হন।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. যায়নাব বিনত জাহশকে বিবাহ করা, পর্দার হুকুম নাযিল হওয়া এবং বিবাহের ওলীমা সাবিত প্রসঙ্গ
৩৩৭১। মুহাম্মদ ইবনু হাতিম ইবনু মায়মূন ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন যয়নাব (রাঃ) এর ইদ্দত পূর্ণ হল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়িদ (রাঃ) কে বললেন, তুমি যয়নাবের নিকট আমার কথা উল্লেখ কর। আনাস (রাঃ) বলেন, যায়িদ (রাঃ) রওনা হলেন এবং তাঁর নিকট গেলেন। তখন তিনি আটার খামির করছিলেন। যায়িদ (রাঃ) বলেন, আমি যখন তাঁকে দেখলাম তাঁর মর্যাদা আমার অন্তরে এমনভাবে জাগ্রত হল যে, আমি তার প্রতি তাকাতে পারলাম না।কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে স্মরণ করেছেন। তাই আমি তাঁর দিকে পিঠ ফিরে দাঁড়ালাম এবং পিছনের দিকে সরে পড়লাম। এরপর বললাম, হে যয়নাব! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে স্মরণ করে আমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই করব না যে পর্যন্ত না আমি আমার রবের কাছ থেকে নির্দেশ লাভ না করি। এরপর তিনি তার সালাতের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
এদিকে কুরআন নাযিল হল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে যয়নাবের বিনা অনুমতিতেই তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আমরা দেখেছি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (যয়নাবের সেই বিবাহ উপলক্ষে) দুপুর বেলায় আমাদের মাংস খাইয়েছেন। খাওয়া দাওয়ার পর লোকেরা বের হয়ে গেল কিন্তু কয়েকজন লোক খাওয়ার পর আলাপে মশগুল থাকল। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে পড়লেন, আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি তাঁর বিবিগণের ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়ে তাঁদের সালাম করতে লাগলেন। আর বিবিগণ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার এ স্ত্রীকে কেমন পেয়েছেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আমার মনে নেই, (আলাপরত) সে লোকদের বের হয়ে যাওয়ার কথা আমিই তাঁকে জানিয়ে ছিলাম না তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তারপর তিনি চললেন এবং সে ঘরে প্রবেশ করলেন আমিও তাঁর সঙ্গে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম। তিনি আমার ও তাঁর মধ্যে পর্দা টেনে দিলেন। আর পর্দার বিধান নাযিল হল। আনাস (রাঃ) বলেন, লোকদের উপদেশ দেওয়া হল, যে উপদেশ দেওয়ার ছিল।
ইবনু রাফি তার হাদীসে অতিরিক্ত বর্ণনা করতে গিয়ে এ আয়াত উল্লেখ করেনঃ (অর্থ) ’তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নবীগৃহে প্রবেশ করবে না …… কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই বাসর রাতের মাধ্যমেই ইসলামী ইতিহাসে ‘পর্দা’ বা ‘হিজাব’ প্রথার সূচনা হয়। মজার ব্যাপার হলো, নবীর ব্যক্তিগত জীবনের এক বিতর্কিত বিয়ের গোপনীয়তা রক্ষা করতেই যেন এই পর্দার বিধানটি নাজিল হয়েছিল। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, আনাস ইবনে মালিক যখন নবীর সাথে ঘরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন, তখন নবী তার মুখের ওপর পর্দা টেনে দেন। অর্থাৎ, নিজের ব্যক্তিগত কামনার বহিঃপ্রকাশ যেন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে, সেই উদ্দেশ্যেই এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা।


বিবাহের অভিভাবক ও সাক্ষী ছাড়াই ‘ঐশ্বরিক বিয়ে’: ইসলামকিউএর ফতোয়ায় বিশেষাধিকার

জয়নবের সঙ্গে মুহাম্মদের বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণ বিবাহবিধির বাইরে বিশেষ অনুমোদনের বিষয়টি শুধু কোনো সমালোচনামূলক অনুমান নয়। ইসলামকিউএর ৯৬৪৬৪ নম্বর ফতোয়ায় সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্য সরাসরি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জায়েদের তালাকের পর ইদ্দত শেষ হলে মুহাম্মদ জয়নবকে বিবাহের প্রস্তাব দেন, আর আল্লাহ কোনো বিবাহ-অভিভাবক ও সাক্ষী ছাড়াই তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন করেন। এখানকার যুক্তি হলো, মুহাম্মদ সব মুমিনের ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত; ফলে তাঁর ক্ষেত্রে আল্লাহর সরাসরি বিবাহ সম্পন্ন করাই যথেষ্ট। এটি প্রচলিত বিবাহের শর্তগুলোকে একজন বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে পৃথকভাবে বিবেচনা করার এক সুস্পষ্ট উদাহরণ। [19]

الإسلام سؤال وجواب — السؤال رقم 96464
تفصيل القول في قوله تعالى (وتخفي في نفسك ما الله مبديه)
المصدر المنقول: فتاوى اللجنة الدائمة — فتاوى إسلامية، الجزء 18، الصفحات 137–141

মূল আরবি বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ:
بعد انتهاء عدتها من طلاق زيد ، وزوّجه الله إياها بلا ولي ولا شهود ؛ فإنه صلى الله عليه وسلم ، وليّ المؤمنين جميعاً

বাংলা অনুবাদ ও প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদের বিস্তারিত অর্থানুবাদ:
জয়নবের সঙ্গে মুহাম্মদের বিবাহ সম্পর্কে সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্য:
যায়েদ ইবনে হারিসার সঙ্গে জয়নব বিনতে জাহশের বিবাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাঁর ইদ্দত বা নির্ধারিত অপেক্ষার সময় শেষ হয়। এরপর মুহাম্মদ জয়নবকে বিবাহের প্রস্তাব দেন।
আল্লাহ কোনো বিবাহ-অভিভাবক এবং সাক্ষী ছাড়াই মুহাম্মদের সঙ্গে জয়নবের বিবাহ সম্পন্ন করেন।
ফতোয়া কমিটির ব্যাখ্যায় এই বিশেষ ব্যবস্থার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সমগ্র মুমিন সম্প্রদায়ের অভিভাবক; বরং মুমিনদের নিজেদের ওপর তাঁদের নিজেদের চেয়েও তাঁর অধিকার বেশি। এ প্রসঙ্গে সূরা আহজাবের ৬ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে: ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক অধিকারী।’
ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, এই বিবাহের মাধ্যমে আল্লাহ ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে প্রচলিত দত্তকপুত্র গ্রহণের আইনগত প্রথা বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে মুসলমানদের জন্য এমন নারীদের বিবাহ বৈধ করেছেন, যাঁরা তাঁদের পালকপুত্রদের স্ত্রী ছিলেন এবং পরে মৃত্যু বা তালাকের কারণে সেই বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হয়েছেন।
ফতোয়া কমিটির মতে, এই বিধান মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁদের ওপর থেকে বিবাহসংক্রান্ত বাধা দূর করার ব্যবস্থা।
এই বিবরণ অনুসারে জয়নবের সঙ্গে মুহাম্মদের বিবাহ সাধারণ অভিভাবক বা সাক্ষীর উপস্থিতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়নি। বরং আল্লাহর সরাসরি বিবাহ সম্পন্ন করার ঘোষণাকেই এই বিবাহের বৈধতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মুহাম্মদের বিশেষ ধর্মীয় কর্তৃত্বকে এখানে প্রচলিত বিবাহ-অনুষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই বক্তব্য সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির আলেমদের নামে উদ্ধৃত হয়েছে, যাঁদের মধ্যে আবদুল আজিজ ইবনে বায, আবদুর রাজ্জাক আফিফি, আবদুল্লাহ ইবনে গুদাইয়ান এবং আবদুল্লাহ ইবনে কুউদ অন্তর্ভুক্ত।

এই বক্তব্য অনুসারে বিবাহের বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য সমাজে প্রচলিত প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার পরিবর্তে একটি ব্যক্তিগত ওহীই সিদ্ধান্তমূলক হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় কর্তৃত্বের সর্বোচ্চ দাবি যার নিজের কাছ থেকে আসে, তাঁর ব্যক্তিগত বিবাহের ক্ষেত্রে সেই কর্তৃত্বই আবার প্রথাগত প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে আইন প্রণয়নকারী, সেই আইনের সুবিধাভোগী এবং নতুন ব্যতিক্রম ঘোষণাকারীর অবস্থান একই ব্যক্তির মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রশ্ন ওঠে।


জয়নবের নিজস্ব বক্তব্য: ‘তোমাদের বিয়ে দিয়েছে পরিবার, আমাকে দিয়েছেন আল্লাহ’

সহিহ বুখারি ৭৪২০ নম্বর হাদিসে আনাসের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, জয়নব মুহাম্মদের অন্য স্ত্রীদের সামনে এই বিবাহকে নিজের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, অন্যদের বিয়ে তাঁদের পরিবার সম্পন্ন করেছে, কিন্তু তাঁর বিবাহ সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহ সম্পন্ন করেছেন। এই বর্ণনায় ঐশ্বরিক বিবাহের দাবি কেবল পরবর্তী ফতোয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, জয়নবের নিজের গর্বের বক্তব্য হিসেবেও সংরক্ষিত। একই হাদিসে সূরা আহজাবের ৩৭ নম্বর আয়াতটি যায়েদ ও জয়নবের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [20]

صحيح البخاري، 7420
زَوَّجَكُنَّ أَهَالِيكُنَّ، وَزَوَّجَنِي اللَّهُ تَعَالَى مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَوَاتٍ

বাংলা অনুবাদ:
তোমাদের বিয়ে দিয়েছে তোমাদের পরিবার; আর আমাকে সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহ বিয়ে দিয়েছেন।

এই বক্তব্যের সঙ্গে দত্তকপুত্রের পরিচয় পরিবর্তন ও জয়নবের বিবাহের আয়াতগুলো মিলিয়ে দেখলে পুরো ঘটনাটির ক্ষমতার কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়। একজন নারীকে বিয়ের বৈধতা নিয়ে সামাজিক আপত্তি দেখা দিল; সেই আপত্তির জবাবে পালকপুত্রের আইনগত অবস্থান বদলানো হলো; তারপর বিবাহটিকে সাধারণ পারিবারিক আয়োজনের ঊর্ধ্বে ঐশ্বরিকভাবে সম্পন্ন বিশেষ বিবাহ হিসেবে ঘোষণা করা হলো। যে সামাজিক আপত্তি মানুষের মধ্যে উঠেছিল, তার সমাধান মানুষের আলোচনায় নয়, প্রশ্নাতীত ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবিতে নির্ধারিত হয়েছে।


বাসরে বিলম্ব এবং আরশ থেকে নাজিল হওয়া ‘তাগাদা’

মহাবিশ্বের অগণিত নক্ষত্ররাজি, কোটি কোটি ছায়াপথ এবং মানবজাতির হাজারো জটিল সমস্যার সমাধান ফেলে রেখে মহাবিশ্বের তথাকথিত স্রষ্টা যখন একজন ব্যক্তির বাসর রাতের বিলম্ব নিয়ে বিচলিত হয়ে পড়েন, তখন সেই ‘স্রষ্টা’র মহিমা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। জয়নব বিনতে জাহশকে কেন্দ্র করে নবীর যে তীব্র কামনার উদ্রেক হয়েছিল, তা কেবল জায়েদের ঘর ভাঙার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বাসর ঘরের দরজায় অপেক্ষমাণ মেহমানদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ওহী নাজিল পর্যন্ত গড়িয়েছে।

যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুহাম্মদ যখন এই বিবাহ উপলক্ষে ওলীমার (ভোজ) আয়োজন করেছিলেন, তখন সাহাবীরা খাবার খেয়ে গল্পগুজবে মগ্ন ছিলেন। নবীর মনে তখন জয়নবের সাথে মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সামাজিক শিষ্টাচারের খাতিরে তিনি মুখে মেহমানদের চলে যেতে বলতে পারছিলেন না। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এই লজ্জা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু অস্বাভাবিক বিষয় হলো—তৎক্ষণাৎ মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষ থেকে একটি ‘অর্ডিন্যান্স’ বা আইন জারি হওয়া, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নবীর যৌন মিলনের পথটি নিষ্কণ্টক করা। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত পড়ার জন্য এই প্রবন্ধটি দেখুন।


আল্লাহ কি নবীর ‘প্রাইভেট সেক্রেটারি’?

সহীহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মেহমানরা ঘর থেকে না যাওয়ায় নবী বারবার বাইরে যাচ্ছিলেন এবং ভেতরে আসছিলেন। তাঁর এই অস্থিরতা দেখে আল্লাহ অত্যন্ত ‘বিচলিত’ হয়ে সূরা আহযাবের ৫৩ নম্বর আয়াত নাজিল করেন। যেখানে পরিষ্কার বলা হলো যে, মেহমানদের এভাবে বসে থাকা নবীকে কষ্ট দেয় এবং আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। [21]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. যায়নাব বিনত জাহশকে বিবাহ করা, পর্দার হুকুম নাযিল হওয়া এবং বিবাহের ওলীমা সাবিত প্রসঙ্গ
৩৩৭৭। মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়নাবকে বিবাহ করলেন তখন উস্মু সুলায়ম (রাঃ) পাথরের একটি পাত্রে তাঁর জন্য হায়স পাঠালেন। আনাস (রাঃ) বলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি যাও, মুসলিমদের মধ্যে যার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে আমার পক্ষ থেকে দাওয়াত দাও। তারপর যার সাথে সাক্ষাৎ হল আমি তাকে দাওয়াত দিলাম। তারা তাঁর কাছে আসতে শুরু করল এবং খেয়ে চলে যেতে লাগল। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত খাদ্যের উপর রাখলেন এবং তাতে দুআ পড়লেন। এতে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি যা পাঠ করার তা পড়লেন।
যারই সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে তাকেই দাওয়াত দিতে বাদ দেইনি। সকলেই খেল এবং তৃপ্ত হল। তারা বেরিয়ে গেল কিন্তু তাদের একদল রয়ে গেল। তারা তাঁর সেখানে দীর্ঘালাপে লিপ্ত রইল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কিছু বলতে লজ্জাবোধ করছিলেন। তাই তিনি নিজেই বেরিয়ে গেলেন এবং তাদের ঘরে রেখে গেলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেনঃ (অর্থ) হে মুমিনগণ! তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে আহার্য প্রস্তুতের জন্য অপেক্ষা না করে আহার গ্রহণের জন্য তোমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে প্রবেশ করবে না।
কাতাদা (রহঃ) বলেন,غير ناظرين إناه এর অর্থ তোমরা আহার্য প্রস্তুতির সময়ের যদি অপেক্ষা না কর তবে তোমাদের আহবান করলে তোমরা প্রবেশ করবে। এ বিধান তোমাদের ও তাদের হীদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র।’
(৩৩ঃ ৫৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এখানে একটি গভীর যৌক্তিক প্রশ্ন দেখা দেয়—একজন স্রষ্টা যার কাছে কোটি কোটি মজলুমের আর্তনাদ পৌঁছানোর কথা, তিনি কেন একজন ব্যক্তির বাসর রাতের ‘টাইমিং’ ঠিক করতে এত ব্যস্ত? সাহাবীদের সাধারণ শিষ্টাচার শেখানোর জন্য কি খোদ আরশ থেকে আয়াত পাঠাতে হয়? নাকি এটি মুহাম্মদের নিজের মনের অবদমিত ইচ্ছা ছিল, যা তিনি ‘ঐশ্বরিক বাণী’র মোড়কে মেহমানদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন? [22]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. যায়নাব বিনত জাহশকে বিবাহ করা, পর্দার হুকুম নাযিল হওয়া এবং বিবাহের ওলীমা সাবিত প্রসঙ্গ
৩৩৭৪। ইয়াহইয়া ইবনু হাবীব হারিসী, আসিম ইবনু নযর তায়মী এবং মুহাম্মদ ইবনু আবদুর আ’লা (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যায়নাব বিনত জাহশ (রাঃ) কে বিবাহ করেন তখন তিনি লোকদের দাওয়াত করেন। তারা খাওয়া-দাওয়া করে বসে কথাবার্তা বলতে লাগল। আনাস (রাঃ) বলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন দাঁড়াতে উদ্যত হলেন তবুও তারা উঠল না। এরূপ দেখে তিনি উঠে গেলেন। তারা উঠে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে যারা উঠবার তারা উঠে গেল।
আসিম ও ইবনু আবদুল আ’লার বর্ননায় অতিরিক্ত রয়েছে, আনাস (রাঃ) বলেন, কিন্তু তিনজন লোক ঘরে বসে রইল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করার জন্য এসে দেখতে পান যে, কয়েকজন লোক বসে আছে। এরপর তারাও উঠে চলে গেল। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি এসে তাদের চলে যাবার সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিলাম। আনাস (রাঃ) বলেন, তিনি এসে প্রবেশ করলেন। আমিও তার সঙ্গে প্রবেশ করতে অগ্রসর হলাম।
এ সময় তিনি আমার ও তাঁর মাঝখানে পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, আর আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেনঃ ’তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে নবীগৃহে প্রবেশ করবে না … আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা গুরুতর অপরাধ’
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)


ব্যক্তিগত বাসনা বনাম ঐশ্বরিক আইন

এই আয়াতটির মাধ্যমে কেবল মেহমানদেরই বের করে দেওয়া হয়নি, বরং মুসলিম নারীদের জন্য ‘পর্দা’র মতো একটি কঠোর ও বৈষম্যমূলক প্রথারও গোড়াপত্তন করা হলো। জয়নবের সাথে নবীর এই বিতর্কিত বাসরকে কেন্দ্র করেই পর্দার বিধানটি এসেছিল, যাতে বাইরের কেউ নবীর সুন্দরী স্ত্রীদের দেখতে না পায়। অর্থাৎ, মুহাম্মদের ব্যক্তিগত ঈর্ষা এবং অধিকারবোধকে আল্লাহ ‘বৈশ্বিক আইন’ হিসেবে সিলমোহর দিলেন।

যৌক্তিক বিচারে এটি কোনো আধ্যাত্মিক বিপ্লব নয়, বরং একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য এবং যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্য ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক অপব্যবহার। যেখানে খোদ স্রষ্টাকে নবীর ‘কামনা’র পাহারাদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।


নিজের জন্য পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী, কিন্তু নিজের স্ত্রীদের পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ

জয়নবকে বিবাহের অনুমোদন এবং মুহাম্মদের স্ত্রীদের জন্য আরোপিত আজীবন নিষেধাজ্ঞা সূরা আহজাবের একই ধারাবাহিকতায় রয়েছে। ৩৩:৩৭ নম্বর আয়াতে মুহাম্মদের পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহের বাধা তুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩৩:৫৩ নম্বর আয়াতে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদের অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহ চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাবারির ব্যাখ্যায় এই নিষেধাজ্ঞা মুহাম্মদের স্ত্রীদের ‘মুমিনদের মা’ হিসেবে গণ্য করার সঙ্গে যুক্ত; আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর মৃত্যুর পর কোনো স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাওয়ার কথাও বর্ণিত হয়েছে। ফলে একই ধর্মীয় আইনি কাঠামোয় একজন ব্যক্তির বিবাহসংক্রান্ত সুযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু তাঁর স্ত্রীদের ভবিষ্যৎ বিবাহের স্বাধীনতা স্থায়ীভাবে সংকুচিত হচ্ছে। [23] [24]

سورة الأحزاب: ٥٣
وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا

বাংলা অনুবাদ:
এবং তাঁর মৃত্যুর পর তোমরা কখনো তাঁর স্ত্রীদের বিয়ে করতে পারবে না।

এখানে বিবাহের স্বাধীনতা নির্ধারিত হয়েছে মূলত মুহাম্মদের বিশেষ ব্যক্তিগত অবস্থানের ভিত্তিতে। জয়নবের ক্ষেত্রে পালকপুত্রের সঙ্গে অতীত বিবাহকে নতুন সম্পর্কের প্রতিবন্ধক গণ্য করা হয়নি; কিন্তু মুহাম্মদের স্ত্রীদের ক্ষেত্রে তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁদের পূর্ববর্তী বৈবাহিক অবস্থানকে এমন স্থায়ী প্রতিবন্ধক করা হয়েছে, যা তাঁরা আর দূর করতে পারতেন না। একজন নারীর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, ভবিষ্যৎ সংসার গঠনের ইচ্ছা এবং মৃত্যুর পর স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হওয়ার সাধারণ বাস্তবতা—এসবের ওপর একটি ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই দুই বিধান পাশাপাশি রাখলে আইনগত সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণের অসম বণ্টন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


যায়েদের মৃত্যুঃ যুদ্ধের ময়দানে কি সুপরিকল্পিত ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’?

জয়নব বিনতে জাহশকে কেন্দ্র করে যে নাটকের সূত্রপাত হয়েছিল, তার চূড়ান্ত ও ট্র্যাজিক পরিসমাপ্তি ঘটে মুতা’র যুদ্ধে। যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জয়নবকে বিয়ের কিছুকাল পরেই মুহাম্মাদ তাঁর প্রাক্তন পালিত পুত্র যায়েদকে এমন এক সামরিক অভিযানে সেনাপতি হিসেবে পাঠান, যা ছিল প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ। প্রায় এক লক্ষ (মতান্তরে দুই লক্ষ) সুপ্রশিক্ষিত রোমান সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের এই আত্মঘাতী যাত্রায় যায়েদকে পাঠানো কি কেবলই রণকৌশল ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ব্যক্তিগত সমীকরণ কাজ করছিল?

মুতা’র যুদ্ধের প্রাক্কালে মুহাম্মাদের দেওয়া নির্দেশনাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং রহস্যজনক। তিনি ধারাবাহিকভাবে তিনজনকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন—যায়েদ বিন হারেসা, জাফর ইবনে আবি তালিব এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। এই অগ্রিম সেনাপতি নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, মুহাম্মাদ জানতেন (বা চেয়েছিলেন) এই যুদ্ধে তাঁর সেনাপতিরা একে একে মারা যাবেন। [25] –

সৈন্য পরিচালকগণ এবং রাসূলুল্লাহ-এর অসিয়ত )أمراء الجيش ووصية رسول الله إليهم
রাসূলুল্লাহ জায়েদ বিন হারেসকে এ সৈন্যদলের সেনাপতি নিযুক্ত করেন। এবং অসিয়ত করেন যে, যায়েদকে যদি শহীদ করা হয় তবে জাফর এবং জাফরকে শহীদ করা হলে আব্দুল্লাহ বনি রাওয়াহা সেনাপতি হবেন। সৈন্যদলের জন্য সাদা পতাকা বেঁধে তা যায়েদের হাতে দিলেন। অতঃপর সৈন্যদলের উদ্দেশ্যে নিম্নবর্ণিত উপদেশাবলী প্রদান করলেন।

কামভাব 21

যৌক্তিক প্রশ্ন ওঠে, যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের প্রথম লক্ষ্য থাকে পতাকাবাহী সেনাপতি। যায়েদকে সেই পতাকাবাহী করে অগ্রভাগে পাঠানো এবং তাঁর মৃত্যুর পর কারা দায়িত্ব নিবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়া কি কেবলই ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ ছিল? নাকি এটি ছিল জয়নবকাণ্ডের পর লজ্জিত ও কোণঠাসা যায়েদকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত সামরিক প্রস্থান? আসুন দেখি আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, বিপক্ষে ছিল দুই লক্ষ সৈন্য [26]

হিজরী অষ্টম সনে একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল। এ বছর রাসূল (সা) ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্রসহ হারিস ইবন উমাইর আল-আযদীকে বসরার শাসকের নিকট পাঠান। হারিস জর্দানের পূর্ব সীমান্তে ‘মৃতা’ নামক স্থানে পৌঁছলে গাস্সানী সম্রাটের একজন শাসক শুরাবীল ইবন ‘আমর পথ রোধ করে তাঁকে বন্দী করে। তারপর তাঁকে হত্যা করে। রাসূল (সা) ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। কারণ, এর আগে আর কোন দূত এভাবে নিহত হয়নি। রাসূল (সা) মৃতায় অভিযান পরিচালনার জন্য তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলেন এবং পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন হযরত খায়িদ ইবন হারিসার হাতে। রওয়ানার পূর্ব মুহূর্তে রাসূল (সা) উপদেশ দিলেন: ‘যদি যায়িদ শহীদ হয়, দলটির পরবর্তী পরিচালক হবে জা’ফর ইবন আবী তালিব। জা’ফর শহীদ হলে পরিচালক হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। সেও যদি শহীদ হয় তাহলে তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে পরিচালক নির্বাচন করে নেবে।’
যায়িদের নেতৃত্বে বাহিনীটি মদীনা থেকে যাত্রা করে জর্দানের পূর্ব সীমান্তে ‘মায়ান’ নামক স্থানে পৌঁছলো। রোম সম্রাট হিরাক্স গাস্সানীদের পক্ষে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এক লাখ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলো। তার সাথে যোগ দিল পৌত্তলিক আরবদের আরও এক লাখ সৈন্য। এ সম্মিলিত বাহিনী মুসলিম বাহিনীর অনতি দূরে অবস্থান গ্রহণ করলো। ‘মায়ানে’ মুসলিম বাহিনী দু’ রাত অবস্থান করে করণীয় বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ করলেন। কেউ বললেন, পত্র মারফত শত্রু বাহিনীর সংখ্যা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে অবহিত করে পরবর্তী নির্দেশের প্রতীক্ষায় থাকা উচিত। কেউ বললেন, আমরা সংখ্যা, শক্তি বা আধিক্যের দ্বারা লড়াই করিনা। আমরা লড়াই করি এ দ্বীনের দ্বারা। যে উদ্দেশ্যে তোমরা বের হয়েছো, সেজন্য এগিয়ে চলো। হয় কামিয়াবী না হয় শাহাদাত-এর যে কোন একটি সাফল্য তোমরা লাভ করবে।
অতঃপর এই দুই অসম বাহিনী মুখোমুখি সংঘর্ষে অবতীর্ণ হলো। দু’লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সৈন্যের বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে রোমান বাহিনী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তাদের অন্তরে ভীতিরও সঞ্চার হলো।
যায়িদ ইবন হারিসা রাসূলুল্লাহর (সা) পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য যে বীরত্ব সহকারে লড়াই করেন তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। তীর ও বর্শার অসংখ্য আঘাতে তাঁর দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। অবশেষে, তিনি রণক্ষেত্রে ঢলে পড়েন। তারপর একে একে জাফর ইবন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা তুলে নেন এবং বীরত্বের সাথে শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে খালিদ ইবন ওয়ালিদ কমাণ্ডার নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন নও মুসলিম। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী অনিবার্য পরাজয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবে নবম হিজরীতে ৫৪ অথবা ৫৫ বছর বয়সে হযরত যায়িদ শাহাদাত বরণ করেন।

কামভাব 23

এই অসম যুদ্ধে তিন হাজার সৈন্যের বিপরীতে দুই লক্ষ সৈন্যের উপস্থিতি কোনো সামরিক বিজ্ঞানেই জয়ের সম্ভাবনা রাখে না। খোদ মুসলিম বাহিনীর মধ্যেও এ নিয়ে সংশয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই চেয়েছিলেন মদিনায় পত্র পাঠিয়ে সংখ্যা বৃদ্ধির আবেদন জানাতে, কিন্তু তাদেরকে মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দেওয়া হয়। তীরের আঘাতে যখন যায়েদের দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়, তখন কি মুহাম্মাদের মনে তাঁর একসময়ের ‘পুত্র’ ও ‘উত্তরাধিকারী’র জন্য মমতা ছিল, নাকি জয়নবকে সম্পূর্ণ নিজের করে পাওয়ার পথে শেষ বাধাটি অপসারিত হওয়ার তৃপ্তি ছিল?

যৌক্তিক বিচারে এই ঘটনাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি জয়নবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরো কাহিনীর একটি সুবিধাজনক সমাপ্তি। যায়েদের মৃত্যু মুহাম্মাদকে কেবল জয়নবের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণই দেয়নি, বরং পালিত পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ের যে সামাজিক গ্লানি ছিল, তা যায়েদের ‘শাহাদাত’-এর মহিমায় ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। হয়তো এই ঘটনার পরে যায়েদের দিকে সরাসরি তাকাতে কিংবা কথা বলতে নবী মুহাম্মদের খুব সংকোচ হতো, তাই যায়েদের মৃত্যুই ছিল মুহাম্মদের এই গ্লানি থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়।


আয়িশার সাক্ষ্য: এক অস্বস্তিকর সত্যের স্বীকারোক্তি

জয়নব বিনতে জাহশকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এই পুরো নাটকের সবচেয়ে নির্মোহ এবং তীক্ষ্ণ দর্শক ছিলেন মুহাম্মদের প্রিয়তমা স্ত্রী আয়িশা। পালিত পুত্রের স্ত্রীকে কেন্দ্র করে আরশ থেকে ওহী নামিয়ে বিয়ে করার এই ঘটনাটি যে তৎকালীন সময়ে কতটা ‘অস্বস্তিকর’ এবং ‘লজ্জাজনক’ ছিল, তা আয়িশার একটি প্রসিদ্ধ বক্তব্য থেকেই দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আয়াতের মধ্যে এমন কিছু উপাদান ছিল যা স্বয়ং নবীর চরিত্রের ওপর নৈতিক কলঙ্ক লেপন করার জন্য যথেষ্ট ছিল, আর সে কারণেই আয়িশা একে ‘গোপনযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। [27]

সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ কুরআন তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ সূরা আহযাব
৩২০৮. আবদুল্লাহ্ ইবন ওয়াযাহ কূফী (রহঃ) …… আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি ওহীর কিছু গোপন করতেন তবে এই আয়াতটি গোপন করতেনঃ (إِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ)।
সহীহ, বুখারি ও মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩২০৮ [আল মাদানী প্রকাশনী]
(আবু ঈসা বলেন)এই হাদীসটি হাসান-সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)


কেন আল্লাহর ওহী সম্পর্কে এই লজ্জা এবং এই লুকোচুরি?

আয়িশার এই স্বীকারোক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে:

১. নৈতিক দ্বিধা: একজন নবীর চরিত্রে যদি কেবল মহানুভবতা এবং ঐশ্বরিক নির্দেশ পালনের আকাঙ্ক্ষাই থাকত, তবে সেই ওহী গোপন করার কোনো প্রশ্নই উঠত না। আয়িশার এই বক্তব্যের পেছনে লুকিয়ে আছে সেই গভীর লজ্জা—যা একজন পালিত পুত্রের ঘর ভেঙে তার স্ত্রীকে গ্রহণ করার ফলে উদ্ভূত হয়েছিল।

২. অপ্রতিরোধ্য দলিল: মুহাম্মদ যখনই কোনো আয়াত পাঠ করতেন, লেখক সাহাবীরা তা লিখে ফেলতেন এবং তা লোকমুখে প্রচারিত হয়ে যেত। ফলে, ইচ্ছা থাকলেও এই বিশেষ আয়াতটি (সূরা আহজাব: ৩৭) মুছে ফেলা বা মানসুখ (রহিত) করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। আয়িশার বক্তব্যের গূঢ় অর্থ হলো—এই আয়াতটি নবীর জন্য এতটাই বিব্রতকর ছিল যে, সম্ভব হলে তিনি এটি মানুষের কাছ থেকে লুকিয়েই রাখতেন।


আয়েশার আরও সরাসরি মন্তব্য: ‘আপনার প্রতিপালক আপনার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত সাড়া দেন’

মুহাম্মদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং তাঁর জন্য নাজিল হওয়া বিশেষ বৈবাহিক বিধানের সম্পর্ক নিয়ে আয়েশার আরেকটি সরাসরি মন্তব্য সহিহ বুখারিতে সংরক্ষিত আছে। বুখারি ৪৭৮৮ নম্বর হাদিসে আয়েশা বলেন, যেসব নারী মুহাম্মদের কাছে নিজেদের বিবাহের জন্য সমর্পণ করতেন, তাঁদের ব্যাপারে তাঁর আপত্তি ছিল। পরে সূরা আহজাব ৩৩:৫১ আয়াত নাজিল হলে মুহাম্মদকে স্ত্রীদের পালাক্রম ও গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। এই বিধান শুনে আয়েশা মন্তব্য করেন, তাঁর প্রতিপালক মুহাম্মদের ইচ্ছা পূরণে অত্যন্ত দ্রুত সাড়া দেন। মন্তব্যটি সূরা আহজাব ৩৩:৫১-এর প্রসঙ্গে—জয়নবের বিবাহসংক্রান্ত আয়াত ৩৩:৩৭-এর প্রসঙ্গে নয়। এটি মুহাম্মদের বৈবাহিক জীবনের আরেকটি বিশেষ বিধান নিয়ে তাঁর স্ত্রীর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। একই নবীর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঘিরে পরপর আইনগত ছাড় ও ওহী আসার বিষয়টি এ মন্তব্যে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও তীক্ষ্ণভাবে ধরা পড়েছে। [28]

صحيح البخاري، 4788
قُلْتُ مَا أُرَى رَبَّكَ إِلاَّ يُسَارِعُ فِي هَوَاكَ

বাংলা অনুবাদ:
আমি বললাম, আমি তো দেখছি আপনার প্রতিপালক আপনার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত সাড়া দেন।

আয়েশার এই মন্তব্যের তাৎপর্য হলো, মুহাম্মদের ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে ওহীর সুবিধাজনক সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন শুধু পরবর্তী যুগের ধর্মসমালোচকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ পরিবারের মধ্যেই এমন একটি মন্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। জয়নবের ঘটনার সঙ্গে বিষয়টিকে পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হয়: কেন বিবাহ, স্ত্রীদের পালাক্রম, সামাজিক আপত্তি এবং ব্যক্তিগত ঘরের অতিথি বিদায়ের মতো বিষয়গুলোতে মুহাম্মদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ নির্দেশ এত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান? ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবিকে ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও আইন প্রণয়নের সম্পর্কটি উপেক্ষা করা যায় না।


জয়নব ও আয়িশার ক্ষমতার লড়াই

উল্লেখ্য যে, জয়নব বিনতে জাহশ এই বিয়ের পর নবীর অন্যান্য স্ত্রীদের সামনে গর্ব করে বলতেন যে, তাদের বিয়ে দিয়েছে তাদের পরিবার, আর জয়নবের বিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ সাত আসমানের ওপর থেকে। আয়িশা এই ঘটনায় কেবল নৈতিকভাবে লজ্জিতই ছিলেন না, বরং নবীর নতুন স্ত্রীর এই ‘ডিভাইন’ মর্যাদা তাঁকে মানসিকভাবেও আহত করেছিল।

যৌক্তিক বিচারে, এই পুরো ঘটনাটি কোনো আধ্যাত্মিক বিপ্লব নয়, বরং একটি ব্যক্তিগত বাসনাকে ‘ধর্মীয় বৈধতা’ দেওয়ার চূড়ান্ত প্রয়াস। পালিত পুত্রের পরিচয় মুছে ফেলা, জয়নবের রূপ দেখে নবীর ভাবান্তর, জায়েদকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো, এবং সর্বশেষ বাসর ঘরের জন্য আয়াত নাজিল করা—এই পুরো ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, জয়নব কাণ্ডটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি স্ক্যান্ডাল, যাকে ওহীর মোড়কে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আয়িশার সেই ঐতিহাসিক মন্তব্যটি কেবল সেই ঢাকনার নিচ থেকে উঁকি দেওয়া সত্যের এক ঝলক মাত্র।


এক বিবাহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পালকপিতৃত্ব, উত্তরাধিকার ও নারীর অধিকারের পরিবর্তন

জায়েদ–জয়নবের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বর্ণনায় ভাগ করলে পুরো ধর্মীয় কাঠামোর পরিবর্তনটি অস্পষ্ট থাকে। প্রথমে জয়নবের সঙ্গে জায়েদের বিবাহে নবীর মধ্যস্থতা ও ধর্মীয় নির্দেশের ভূমিকা দেখা যায়। পরে জয়নবের প্রতি মুহাম্মদের আকর্ষণ-সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা, তাঁর অন্তরের গোপন প্রত্যাশা, যায়েদের তালাক এবং কোরআনের মাধ্যমে নতুন বিবাহের ঘোষণা আসে। এই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত আয়াত ও ফিকহি বিধানের মাধ্যমে পালকপুত্রকে জৈবিক পুত্রের সমকক্ষ গণ্য করার আইনগত সম্পর্ক প্রত্যাহার করা হয়। দত্তকপুত্রের সঙ্গে পালকপিতার পূর্বে স্বীকৃত উত্তরাধিকার ও বংশপরিচয়ের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়; একই সামাজিক পিতৃত্বের অধীনে থাকা পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহের আপত্তিও দূর হয়। এই পরিবর্তন একা যায়েদের জীবনের ঘটনা নয়; একই নিয়ম পরে অন্য পালকসন্তান ও তাঁদের পরিবারের ওপরও প্রযোজ্য হয়।

এরপর বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা নিয়েও মুহাম্মদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা দেখা যায়। সহিহ বুখারিতে জয়নবের নিজের বক্তব্য, তাঁর বিয়ে সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহ সম্পন্ন করেছেন। ইসলামকিউএর উদ্ধৃত ফতোয়া কমিটি একই বিবাহকে অভিভাবক ও সাক্ষী ছাড়াই সম্পন্ন হওয়া বিবাহ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পরবর্তী আয়াতে মুহাম্মদের গৃহে অতিথিদের আচরণ নিয়ে বিশেষ নির্দেশ এসেছে, স্ত্রীর সঙ্গে পর্দার বিধান যুক্ত হয়েছে এবং তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রীদের অন্য কোথাও বিবাহ স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটি বিধানের কেন্দ্রেই একই ব্যক্তির পারিবারিক পরিস্থিতি ও বিশেষ মর্যাদা। এই ধারাবাহিকতাকে ‘বিশ্বজনীন ন্যায়নীতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে প্রশ্ন আসে, এই বিধানগুলোর সুবিধা, নিয়ন্ত্রণ ও বঞ্চনা কার জীবনে কীভাবে বণ্টিত হয়েছে।

একদিকে যে দত্তকপুত্রকে নিজের নাম, পুত্রত্ব ও সম্পত্তিগত সম্পর্কের মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছিল, তাঁর সেই স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হয়েছে; অন্যদিকে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহের ক্ষেত্রে নবীর ব্যক্তিগত পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। যে নারী প্রথম বিবাহে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর সিদ্ধান্তে ধর্মীয় কর্তৃত্বের চাপ এসেছে; পরে নতুন বিবাহকে সাক্ষী-অভিভাবকের বদলে ঐশ্বরিকভাবে সম্পন্ন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মৃত্যুর পরে নবীর স্ত্রীদের বিবাহের স্বাধীনতাও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এই সমগ্র ব্যবস্থায় ধর্মীয় আইন সমানভাবে সবার স্বাধীনতা বাড়ায়নি। বরং একজন বিশেষ ব্যক্তির সম্পর্ক ও মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অন্যদের পরিচয়, সম্পত্তি, বৈবাহিক ভবিষ্যৎ এবং পারিবারিক অধিকার নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে।


উপসংহার: ঐশ্বরিক আবরণে এক মানবিক লালসার ব্যবচ্ছেদ

জায়েদ-জয়নব এবং নবী মুহাম্মদের এই পুরো আখ্যানটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং এটি ধর্মের নামে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক ধ্রুপদী উদাহরণ। যৌক্তিকভাবে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করলে কয়েকটি অকাট্য সত্য বেরিয়ে আসে যা কোনো অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক বয়ান দিয়ে ঢাকা সম্ভব নয়।

১. মানবিক প্রথার বলিদান: একটি অনাথ শিশুকে নিজের পরিচয় দিয়ে বড় করা এবং তাকে উত্তরাধিকার প্রদান করা একটি উচ্চতর মানবিক কাজ। কিন্তু জয়নবের প্রতি মুহাম্মদের আকস্মিক আকর্ষণের ফলে আরবের এই কল্যাণকর ‘তবানি’ বা পালক সন্তান প্রথাটি ধ্বংস করে দেওয়া হলো। একজন নির্দিষ্ট নারীর সাথে যৌন সংসর্গের পথ প্রশস্ত করতে গিয়ে কোটি কোটি পরিচয়হীন শিশুর আইনি ও সামাজিক সুরক্ষাকে চিরতরে বিলোপ করা হলো—যা কোনোভাবেই বৈশ্বিক বা কল্যাণকর পদক্ষেপ হতে পারে না।

২. আল্লাহর ভূমিকা ও ওহীর ‘টাইমিং’: পুরো ঘটনায় লক্ষ্যণীয় যে, যখনই মুহাম্মদের কোনো ব্যক্তিগত বা শারীরিক বাধার সৃষ্টি হয়েছে, তখনই অত্যন্ত অলৌকিকভাবে আরশ থেকে আয়াত নাজিল হয়ে সেই বাধা দূর করে দিয়েছে।

পালিত পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ?

ওহী নাজিল করে পালক প্রথা বাতিল করা হলো।

জয়নব বিয়েতে রাজি নন?

ওহী নাজিল করে বিয়ের সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হলো।

লোকনিন্দার ভয়?

ওহী নাজিল করে নবীকে ভর্ৎসনা করা হলো।

বাসর ঘরে মেহমানদের ভিড়?

ওহী নাজিল করে মেহমানদের তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করা হলো।

“যৌক্তিক বিচারে, এই ওহীগুলো কোনো স্বর্গীয় বিধানের চেয়ে ‘ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের নির্দেশিকা’ হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হয়।”

৩. জায়েদের ট্র্যাজেডি: ব্যবহার এবং বিসর্জন: জায়েদ ইবনে হারিসার জীবনটি এখানে এক দাবার গুটির মতো ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমে তাকে দাস থেকে পুত্রে উন্নীত করা হলো, তারপর জয়নবের সাথে অসম বিয়েতে বাধ্য করা হলো। যখন সেই স্ত্রীর ওপর নবীর নজর পড়ল, তখন তাকে বাধ্য করা হলো তালাক দিতে। সর্বশেষ, জয়নবকাণ্ডের গ্লানি ও অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে তাকে এক নিশ্চিত মৃত্যুর যুদ্ধে (মুতা) সেনাপতি হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং একটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া চরিত্রের ‘সুপরিকল্পিত প্রস্থান’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

৪. ঐতিহাসিক ও নৈতিক দ্বিমুখীতা: মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওয়াকিদি সংক্রান্ত অবস্থান—অর্থাৎ যখন নবীর লাম্পট্য ঢাকা দরকার তখন ওয়াকিদি ‘মিথ্যুক’, আর যখন স্তন থেকে সরাসরি দুধ পানের কদর্য বিধান আড়াল করা দরকার তখন সেই ওয়াকিদিই ‘নির্ভরযোগ্য’—এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে এখানে সত্যের চেয়ে বিশ্বাস রক্ষা বড়। কিন্তু আয়িশার সেই স্বীকারোক্তি যে, “মুহাম্মদ ওহীর কিছু গোপন করতে চাইলে এই আয়াতটিই (জয়নব সংক্রান্ত) গোপন করতেন,” পুরো ঘটনাটির অন্তর্নিহিত লজ্জা ও অনৈতিকতাকে চিরস্থায়ী সিলমোহর মেরে দেয়।

৫. চূড়ান্ত মূল্যায়ন: সারসংক্ষেপে, জয়নব বিনতে জাহশের সাথে নবীর এই বিবাহ কোনো অলৌকিক হিকমত বা সামাজিক সংস্কার ছিল না। বরং এটি ছিল ক্ষমতা, কামভাব এবং ওহীর দোহাই দিয়ে প্রচলিত নৈতিকতাকে ভেঙে নিজের ইচ্ছা পূরণের এক নগ্ন প্রদর্শনী। পালিত পুত্রের স্ত্রীকে বিবাহের মাধ্যমে আরব্য অজাচারকে (Incest) ঐশ্বরিক বৈধতা প্রদান করা ইসলামের ইতিহাসে এমন এক কলঙ্কিত অধ্যায়, যা আজও যুক্তি ও মানবিকতার কাঠগড়ায় অপরাধী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১২৯৯৮৮, تبنَّته أسرة بسبب فساد أهله، ونسبوه لهم، فماذا يترتب على ذلك التصرف؟, ১৫ মে ২০০৯ ↩︎
  2. ইসলামকিউএ ১২৯৯৮৮; উদ্ধৃত উৎস: الموسوعة الفقهية, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১২১–১২২ ↩︎
  3. আসহাবে রাসুলের জীবনকথা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৭ ↩︎
  4. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নং ৪৭৮২ ↩︎
  5. তাবারী, ৩৯তম খন্ড, বায়োগ্রাফি অব প্রফেটস কম্পেনিয়নস এন্ড দেয়ার সাক্সেসরস, পৃষ্ঠা ৯ ↩︎
  6. কুরতুবি, আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, সূরা আল-আহজাব ৩৩:৪০-এর তাফসির ↩︎
  7. সূরা আহজাব, আয়াত ৩৬- ৩৭ ↩︎
  8. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৯৬৪৬৪, تفصيل القول في قوله تعالى (وتخفي في نفسك ما الله مبديه), উদ্ধৃত সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্য ↩︎
  9. কুরআনুল করীম, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া যাকারিয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৫৬ ↩︎
  10. ইবনে জারির তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা আল-আহজাব ৩৩:৩৭-এর ব্যাখ্যা; খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ২৭৩–২৭৪ ↩︎
  11. তাফসীরে মাযহারী, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০১, ৫০২, ৫০৩ ↩︎
  12. তাফসীরে জালালাইন, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৯ ↩︎
  13. TafsÏr al-Jal¥layn, Great Commentaries on the Holy Qur’an, translated by Feras Hamza, Royal Aal al‐Bayt Institute for Islamic Thought 2008, ISSN 1943‐1821, Page: 399, 400 ↩︎
  14. ইবনে জারীর তাবারী (রহঃ), তারীখ ৩/১৬১ ↩︎
  15. ইবনে সাদ, তাবাকাত ৮/১০১ ↩︎
  16. THE HISTORY OF AL-TABARI: AN ANNOTATED TRANSLATION, VOLUME XXXIX, Biographies of the Prophet’s Companions and Their Successors, AL-TABARI’S SUPPLEMENT TO HIS HISTORY, translated and annotated by Ella Landau-Tasseron, The Hebrew University of Jerusalem, State University of New York Press, Page: 180, 181 ↩︎
  17. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭২, ২৭৩ ↩︎
  18. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৭১ 1 2
  19. ইসলামকিউএ ৯৬৪৬৪, জয়নবের বিবাহসংক্রান্ত সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্য ↩︎
  20. সহিহ বুখারি ৭৪২০, কিতাবুত তাওহিদ ↩︎
  21. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৭৭ ↩︎
  22. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৭৪ ↩︎
  23. তাবারি, সূরা আল-আহজাব ৩৩:৫৩-এর তাফসির ↩︎
  24. ইবনে কাসির, সূরা আল-আহজাব ৩৩:৫৩-এর তাফসির ↩︎
  25. আর রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ৪৪২ ↩︎
  26. আসহাবে রাসুলের জীবনকথা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৮ – ১২৯ ↩︎
  27. সুনান আত তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২০৮ ↩︎
  28. সহিহ বুখারি ৪৭৮৮, সূরা আহজাব ৩৩:৫১-এর তাফসির ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.