ভূমিকা
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী সমকামিতা একটি গুরুতর অপরাধ, যার শাস্তি হিসেবে অসংখ্য ইসলামিক ফকিহ বা ব্যাখ্যাকার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করেছেন, যা আসলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে কোনো অন্যায় বা অপরাধ হিসেবেই গণ্য হতে পারে না [1]। ইসলামী বিশ্বাস, বিশেষ করে কুরআন, হাদিস ও প্রাথমিক আমলের ফিকাহ গ্রন্থে এই বিষয়টি ‘লওয়াত’ বা ‘কওমে লূতের কর্ম’ নামে পরিচিত। কুরআনে “কওমে লূত”-এর কাহিনি বারবার উল্লেখিত হয়েছে [2] [3] [4], যেখানে লূত জাতির পুরুষরা নারীদের পরিবর্তে পুরুষদের প্রতি যৌন আকর্ষণ প্রদর্শন করেছিল বলে বর্ণিত আছে, এবং ফলস্বরূপ তারা ‘আল্লাহর আযাবে’ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ইসলামী ব্যাখ্যা মতে, এই কাহিনি থেকেই ইসলামী শরীয়তের ‘লওয়াত’ সংক্রান্ত আইনগত ভিত্তি গড়ে ওঠে।
তবে ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লিখিত এই গল্পটি ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক নয়; বরং এটি একটি ধর্মীয় মিথ, যার ভিত্তিতে পরবর্তী যুগের ফিকাহবিদরা নৈতিক ও আইনি বিধান রচনা করেন। ইসলামী সভ্যতার প্রাথমিক যুগে যখন সামাজিক কাঠামো ছিল গোত্রনির্ভর, তখন যৌন আচরণ নিয়ন্ত্রণকে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হতো। সেখান থেকেই সমকামিতাকে কেবল পাপ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু আধুনিক সভ্যতায় ব্যক্তিগত যৌন পরিচয়কে ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলে এই শরীয়তীয় বিধান বর্তমান মানবাধিকার ও নৈতিক দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে পড়ে। যদিও এই আধুনিক যুগেও যেসব দেশে ইসলামী শরীয়া শাসন চালু আছে, সেসব দেশে সমকামীদের প্রকাশ্যে উঁচু স্থান থেকে ছুড়ে হত্যা করা হয়, নতুবা প্রকাশ্যে পাথর ছুড়ে হত্যা বা শিরঃচ্ছেদ করা হয় [5] [6] । যা শুধুমাত্র মানুষের মানবাধিকার হরণই নয়, মানুষের যৌন স্বাধীনতারও লঙ্ঘন। একইসাথে পছন্দ করে নিজ যৌন সঙ্গী নির্বাচন এবং জীবন যাপনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এই বর্বর ও মধ্যযুগীয় শাস্তির ধর্মীয়-আইনি ভিত্তি কোরআনের লূত-কাহিনি, লওয়াতকারীদের হত্যার হাদিস, সাহাবিদের নামে সংরক্ষিত শাস্তির নজির এবং পরবর্তী ফিকহি বিধানের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
কোরআনে লওয়াতের নিন্দা ও লূতের কওমের ধ্বংস
কোরআনে পুরুষ কর্তৃক পুরুষের কাছে কামতৃপ্তির জন্য গমনকে একাধিক স্থানে ফাহিশা, সীমালঙ্ঘন ও অপরাধ হিসেবে নিন্দা করা হয়েছে এবং লূতের কওমকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের ওপর আল্লাহর ধ্বংসাত্মক শাস্তি নেমে আসার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। তবে কোরআনে মানবীয় আদালতের জন্য “লওয়াতকারীকে হত্যা করো” এমন কোনো সরাসরি দণ্ডবিধি নেই। লওয়াতের জন্য রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি বিধান পাওয়া যায় হাদিসে এবং সেই হাদিস, লূতের কওমের কাহিনি ও সাহাবিদের নামে বর্ণিত আমলের ভিত্তিতে পরবর্তী ফিকহে রজম, আগুনে পোড়ানো, উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপ এবং অন্যান্য মৃত্যুদণ্ডের মত গড়ে ওঠে।
সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৮০-৮৪
আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। যখন সে তার জাতিকে বলেছিল, ‘তোমরা এমন নির্লজ্জতার কাজ করছ যা বিশ্বজগতে তোমাদের পূর্বে কোন একজনও করেনি।’
— Taisirul Quran
আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার কাওমকে বলেছিলঃ তোমরা এমন অশ্লীল ও কু-কর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেহই করেনি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর (প্রেরণ করেছি) লূতকে। যখন সে তার কওমকে বলল, ‘তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি’?
— Rawai Al-bayan
আর আমি লূতকেও [১] পাঠিয়েছিলাম [২]। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা কি এমন খারাপ কাজ করে যাচ্ছ যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি ?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তোমরা যৌন তাড়নায় স্ত্রীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের নিকট গমন করছ, তোমরা হচ্ছ এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।
— Taisirul Quran
তোমরা স্ত্রীলোকদের বাদ দিয়ে পুরুষদের দ্বারা নিজেদের যৌন ইচ্ছা নিবারণ করে নিচ্ছ। প্রকৃত পক্ষে, তোমরা হচ্ছ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘তোমরা তো নারীদের ছাড়া পুরুষদের সাথে কামনা পূর্ণ করছ, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী কওম’।
— Rawai Al-bayan
‘তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষের কাছে যাও, বরং তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তার জাতির এ ছাড়া আর কোন জবাব ছিল না যে, ‘তোমাদের জনপদ থেকে এদেরকে বের করে দাও, এরা এমন লোক যারা খুব পবিত্র হতে চায়।’
— Taisirul Quran
তার জাতির লোকদের এটা ছাড়া আর কোন জবাবই ছিলনা যে, এদের তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও, এরা নিজেদেরকে বড় পবিত্র রাখতে চায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তার কওমের উত্তর কেবল এই ছিল যে, তারা বলল, ‘তাদেরকে তোমরা তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। নিশ্চয় তারা এমন লোক, যারা অতি পবিত্র হতে চায়’।
— Rawai Al-bayan
উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, ‘এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বহিস্কার কর, এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অতঃপর আমি তাকে আর তার পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করলাম কিন্তু তার স্ত্রী ছাড়া, কেননা সে ছিল পেছনে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
— Taisirul Quran
পরিশেষে, আমি তাকে এবং তার পরিবারের লোকদেরকে, তার স্ত্রী ছাড়া, শাস্তি হতে রক্ষা করেছিলাম, তার স্ত্রী তাদের সাথে পিছনেই রয়ে গিয়েছিল।
— Sheikh Mujibur Rahman
তাই আমি তাকে ও তার পরিবারকে রক্ষা করলাম তার স্ত্রী ছাড়া। সে ছিল পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর আমরা তাকে ও তার পরিজনদের সবাইকে উদ্ধার করেছিলাম, তার স্ত্রী ছাড়া, সে ছিল পিছনে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তাদের উপর এক পাথরের বৃষ্টি বর্ষিয়ে দিলাম। তারপর দেখ, অপরাধীদের পরিণতি কী হয়েছিল!
— Taisirul Quran
অতঃপর আমি তাদের উপর মুষলধারে বারিপাত ঘটালাম, অতঃপর লক্ষ্য কর, অপরাধী লোকদের পরিণাম কি হয়েছিল।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আমি তাদের উপর বর্ষণ করেছিলাম বৃষ্টি। সুতরাং দেখ, অপরাধীদের পরিণতি কিরূপ ছিল।
— Rawai Al-bayan
আর আমরা তাদের উপর ভীষণভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। কাজেই দেখুন, অপরাধীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছিল [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা আন-নামল ২৭:৫৪-৫৮
স্মরণ কর লূতের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল- তোমরা দেখে-শুনে কেন অশ্লীল কাজ করছ,
— Taisirul Quran
স্মরণ কর লূতের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমরা জেনে শুনে কেন অশ্লীল কাজ করছ?
— Sheikh Mujibur Rahman
আর স্মরণ কর লূতের কথা, যখন সে তার কওমকে বলেছিল, ‘তোমরা কেন অশ্লীল কাজ করছ, অথচ তা তোমরা ভালভাবে প্রত্যক্ষ করছ’?
— Rawai Al-bayan
আর স্মরণ করুন লূতের কথা [১], তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা জেনে-দেখে [২] কেন অশ্লীল কাজ করছ?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তোমরা কি কাম আসক্তি মিটানোর জন্য নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের নিকট গমন কর? তোমরা এমন এক জাতি যারা মূর্খের আচরণ করছ।
— Taisirul Quran
তোমরা কি কাম-তৃপ্তির জন্য নারীকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরাতো এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘তোমরা কি নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের উপর কামতৃপ্তির জন্য উপগত হবে? বরং তোমরা এমন এক কওম যারা জানে না’।
— Rawai Al-bayan
‘তোমরা কি কামতৃপ্তির জন্য নারীকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক অজ্ঞ [১] সম্প্রদায়।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তখন তার সম্প্রদায়ের এ কথা বলা ছাড়া আর কোন জওয়াব ছিল না যে, তোমাদের জনপদ থেকে লূতের পরিবারবর্গকে বের করে দাও, এরা এমন লোক যারা পবিত্র সাজতে চায়।
— Taisirul Quran
উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বললঃ লূত পরিবারকে তোমাদের জনপদ হতে বহিস্কার কর, এরাতো এমন লোক যারা অতি পবিত্র সাজতে চায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
ফলে তার কওমের জবাব একমাত্র এই ছিল যে, ‘লূতের পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। নিশ্চয় এরা এমন লোক যারা পবিত্র থাকতে চায়’।
— Rawai Al-bayan
উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, ‘লূত-পরিবারকে তোমরা জনপদ থেকে বহিস্কার কর, এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র থাকতে চায়।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অতঃপর আমি তাকে ও তার পরিবারবর্গকে রক্ষা করলাম, তার স্ত্রী ব্যতীত। আমি তার ভাগ্য ধ্বংসপ্রাপ্তদের মধ্যে নির্ধারণ করেছিলাম।
— Taisirul Quran
অতঃপর তাকে ও তার পরিজনবর্গকে আমি উদ্ধার করলাম, তার স্ত্রী ব্যতীত, তাকে করেছিলাম ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।
— Sheikh Mujibur Rahman
অতএব আমি মুক্তি দিলাম তাকে ও তার পরিবারকে, তবে তার স্ত্রীকে ছাড়া। আমি তাকে ধ্বংসপ্রাপ্তদের মধ্যে সাব্যস্ত করে রেখেছিলাম।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর আমরা তাকে ও তার পরিজনবর্গকে উদ্ধার করলাম, তার স্ত্রী ছাড়া, আমরা তাকে অবশিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আর আমি তাদের উপর বর্ষিয়ে ছিলাম এক ভয়ংকর বৃষ্টি। ভীতি প্রদর্শিতদের উপর এ বৃষ্টি ছিল কতই না মন্দ!
— Taisirul Quran
তাদের উপর ভয়ঙ্কর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম; যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল তাদের জন্য এই বর্ষণ ছিল কত মারাত্মক।
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি তাদের উপর মুষলধারে (পাথরের) বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। ভীতি প্রদর্শিতদের জন্য কতইনা নিকৃষ্ট ছিল এই বৃষ্টি!
— Rawai Al-bayan
আর আমরা তাদের উপর ভয়ংকর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম; সুতরাং ভীতি প্রদর্শিতদের জন্য এ বর্ষণ কতই না নিকৃষ্ট ছিল !
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা আল-আনকাবূত ২৯:২৮-৩৫
স্মরণ কর লূতের কথা, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল- অবশ্যই তোমরা এমন এক অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বজগতে কেউ করেনি।
— Taisirul Quran
স্মরণ কর লূতের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেহ করেনি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর (স্মরণ কর) লূত এর কথা, যখন সে তার কওমের লোকদেরকে বলেছিল, ‘নিশ্চয় তোমরা এমন অশ্লীল কাজ কর, যা সৃষ্টিকুলের কেউ তোমাদের আগে করেনি’।
— Rawai Al-bayan
আর স্মরণ করুন লূতের কথা, যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তোমরা (কাম-তাড়িত হয়ে) পুরুষদের কাছে যাও, রাহাজানি কর এবং নিজেদের মজলিসে ঘৃণ্য কর্ম কর। তার সম্প্রদায়ের এ কথা বলা ছাড়া কোন জওয়াব ছিল না যে, তুমি সত্যবাদী হলে আমাদের উপর আল্লাহর ‘আযাব নিয়ে এসো।
— Taisirul Quran
তোমরা পুরুষের উপর উপগত হচ্ছ এবং তোমরা রাহাজানি করে থাক এবং তোমরা নিজেদের মজলিশে প্রকাশ্য ঘৃণ্য কাজ করে থাক। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এই বললঃ আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আনয়ন কর, যদি তুমি সত্যবাদী হও।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘তোমরা তো পুরুষের উপর উপগত হও এবং রাস্তায় ডাকাতি কর; আর নিজদের বৈঠকে গর্হিত কাজ কর!’ তার কওমের জবাব ছিল কেবল এই যে, তারা বলল, ‘তুমি আল্লাহর আযাব নিয়ে আস যদি তুমি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও’।
— Rawai Al-bayan
‘তোমরাই তো পুরুষে উপগত হচ্ছ, তোমরাই তো রাহাজানি করে থাক এবং তোমরাই তো নিজেদের মজলিশে প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কাজ করে থাক [১] ।’ উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এটাই বলল, ‘আমাদের উপর আল্লাহ্র শাস্তি আনয়ন কর—তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সে বলল- হে আমার প্রতিপালক! ফাসাদ সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য কর।
— Taisirul Quran
সে বললঃ হে আমার রাব্ব! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।
— Sheikh Mujibur Rahman
সে বলল, ‘হে আমার রব, আমাকে সাহায্য করুন ফাসাদ সৃষ্টিকারী কওমের বিরুদ্ধে’।
— Rawai Al-bayan
তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
যখন আমার দূতগণ (অর্থাৎ ফেরেশতারা) ইব্রাহীমের কাছে সুসংবাদ নিয়ে আসল, তারা বলল- আমরা এ জনপদের বাসিন্দাদের ধ্বংস করব, এর অধিবাসীরা তো যালিম।
— Taisirul Quran
যখন আমার প্রেরিত মালাইকা/ফেরেশতারা সুসংবাদসহ ইবরাহীমের নিকট এলো, তারা বলেছিলঃ আমরা এই জনপদবাসীকে ধ্বংস করব, এর অধিবাসীতো সীমা লংঘনকারী।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আমার ফেরেশতারা যখন ইবরাহীমের কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল তখন তারা বলেছিল, ‘নিশ্চয় আমরা এ জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব, নিশ্চয় এর অধিবাসীরা যালিম’।
— Rawai Al-bayan
আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদসহ ইবরাহিমের কাছে আসল, তারা বলেছিল, ‘নিশ্চয় আমরা এ জনপদবাসীকে ধ্বংস করব [১], এর অধিবাসীরা তো যালিম।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
ইবরাহীম বলল- ওখানে তো লূত আছে। তারা বলল- ওখানে কারা আছে আমরা তা ভাল করেই জানি, আমরা তাকে আর তার পরিবারবর্গকে অবশ্য অবশ্যই রক্ষা করব তার স্ত্রীকে ছাড়া, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।
— Taisirul Quran
ইবরাহীম বললঃ এই জনপদে লূত রয়েছে। তারা বললঃ সেখানে কারা আছে তা আমরা ভাল জানি; আমরাতো লূতকে ও তাঁর পরিজনবর্গকে রক্ষা করবই, তাঁর স্ত্রীকে ব্যতীত; সে পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
— Sheikh Mujibur Rahman
ইবরাহীম বলল, ‘নিশ্চয় সেখানে লূত আছে।’ তারা বলল, ‘আমরা ভালই জানি সেখানে কারা আছে, আমরা অবশ্যই তাকে ও তার পরিবারকে রক্ষা করব; তবে তার স্ত্রীকে নয়, সে হবে পিছনে পড়ে থাকা লোকদের একজন’।
— Rawai Al-bayan
ইবরাহীম বললেন, ‘এ জনপদে তো লূত রয়েছে।’ তারা বলল, ‘সেখানে কারা আছে, তা আমরা ভাল জানি, নিশ্চয় আমরা লূতকে ও তার পরিজনবর্গকে রক্ষা করব তার স্ত্রীকে ছাড়া [১]; সে তো পিছনে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আমার দূতরা যখন লূতের কাছে আসল তখন সে তাদের জন্য বিষণ্ণ হয়ে পড়ল এবং (তাদের রক্ষার ব্যাপারে) নিজেকে অসহায় মনে করল। তখন তারা বলল- তোমরা ভয় কর না, দুঃখ কর না, আমরা তোমাকে আর তোমার পরিবারবর্গকে রক্ষা করব তোমার স্ত্রীকে ছাড়া, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।
— Taisirul Quran
এবং যখন আমার প্রেরিত মালাইকা/ফেরেশতারা লূতের নিকট এলো তখন তাদের জন্য সে বিষণ্ণ হয়ে পড়ল এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করল। তারা বললঃ ভয় করনা, দুঃখও করনা; আমরা তোমাকে ও তোমার পরিবারবর্গকে রক্ষা করব, তোমার স্ত্রী ব্যতীত; সে পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যখন আমার ফেরেশতারা লূতের কাছে আসল তখন তাদের জন্য সে চিন্তিত হয়ে পড়ল এবং তাদের রক্ষায় নিজেকে অক্ষম মনে করল; আর তারা বলল, ‘ভয় পাবেন না এবং চিন্তিত হবেন না; আপনাকে ও আপনার পরিবারকে আমরা রক্ষা করব; তবে আপনার স্ত্রীকে নয়, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের একজন হবে’।
— Rawai Al-bayan
আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের কাছে আসল, তখন তাদের জন্য তিনি বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করলেন। আর তারা বলল, ‘ভয় করবেন না, দুঃখও করবেন না; আমরা আপনাকে ও আপনার পরিজনবৰ্গকে রক্ষা করব, আপনার স্ত্রী ছাড়া; সে তো পিছনে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আমরা এ জনপদের বাসিন্দাদের উপর আসমানী শাস্তি নাযিল করব, কারণ তারা ছিল পাপাচারে লিপ্ত।
— Taisirul Quran
আমরা এই জনপদবাসীর উপর আকাশ হতে শাস্তি নাযিল করব, কারণ তারা ছিল পাপাচারী।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আমরা এ জনপদবাসীর উপর আসমান থেকে শাস্তি নাযিল করব। কারণ তারা পাপাচার করত।
— Rawai Al-bayan
‘নিশ্চয় আমরা এ জনপদবাসীদের উপর আকাশ হতে শাস্তি নাযিল করব, কারণ তারা পাপাচার করছিল।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এতে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য এক সুস্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি।
— Taisirul Quran
আমি বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর অবশ্যই আমি ঐ জনপদে সুস্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি সে কওমের জন্য যারা বুঝে।
— Rawai Al-bayan
আর অবশ্যই আমরা এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তাফসীর গ্রন্থে সমকামীদের হত্যার বিধান
তাফসীরে মাযহারীতে এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় পুরুষে পুরুষে যৌনসম্পর্ককে সরাসরি ফাহিশা, সীমালঙ্ঘন ও লূতের কওমের ধ্বংসের কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে [7]
→ এবং লূতকেও পাঠাইয়াছিলাম। সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, ‘তোমরা এমন কুকর্ম করিতেছ যাহা তোমাদিগের পূর্বে বিশ্বে কেহ করে নাই’;
→ ‘তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারী ছাড়িয়া পুরুষের নিকট গমন কর, তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।’
→ উত্তরে তাহার সম্প্রদায় শুধু বলিল, “ইহাদিগকে জনপদ হইতে বহিষ্কৃত কর, ইহারা তো এমন লোক যাহারা পবিত্র হইতে চাহে।
→ অতঃপর তাহাকে ও তাহার স্ত্রী ব্যতীত তাহার পরিজনবর্গকে উদ্ধার করিয়াছিলাম, তাহার স্ত্রী ছিলো ধ্বংসপ্রাপ্তদিগের অন্তর্ভুক্ত।
→ তাহাদিগের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করিয়াছিলাম, সুতরাং অপরাধীদিগের পরিণাম কী হইয়াছিল তাহা লক্ষ্য কর।
উদ্ধৃত পাঁচ আয়াতের প্রথমটিতে বলা হয়েছে—‘এবং লুতকেও পাঠিয়েছিলাম। সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, তোমরা এমন কুকর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি।’ এখানে লুতান (লুত) শব্দটির পূর্বে ‘আরসালনা’ (পাঠিয়েছিলাম) কথাটি উহ্য রয়েছে। অথবা উহ্য রয়েছে … (স্মরণ করো) কথাটি।
‘আ তা’তুনাল ফাহিশাতা’ (তোমরা কি কুকর্ম করছো) কথাটির মধ্যে রয়েছে চরম হুঁশিয়ারী। “আল ফাহিশাতা’ (কুকর্ম) কথাটির অর্থ এখানে পুরুষে পুরুষে সমকামিতা। ‘মা সাবাক্বাকুম বিহা মিন আহাদিম্ মিনাল আ’লামীন’ অর্থ— যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। এখানে ‘মিন্ আহাদিন’ কথাটির ‘মিন’ (মধ্যে) হচ্ছে মিন-এ জায়েদা (অতিরিক্ত সংযোজন)। এ রকম সংযোজনের মাধ্যমে বক্তব্যকে সাধারণভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হয়। আর “মিনাল আ’লামীন’ কথাটির ‘মিন’ হচ্ছে মিন-এ তাবয়্যিজিয়াহ্ (আংশিক অর্থ প্রকাশক মিন) ৷
আমর বিন দীনার বলেছেন, পুরুষের উপর পুরুষের উপগত হওয়ার এই কুপ্রথাটি হজরত লুতের সম্প্রদায়ের লোকেরাই সর্বপ্রথম শুরু করেছিলো। আয়াতে তাই স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে যে— তোমরা এমন কুকর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি।
পরের আয়াতে (৮১) বলা হয়েছে— ‘তোমরা তো কামতৃপ্তির জন্য নারী ছেড়ে পুরুষের নিকট গমন করো, তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।’ হজরত লুতের পিতা ছিলেন হারেছ অথবা হারম। তাঁর পিতামহ ছিলেন তারেক। তিনি ছিলেন হজরত ইব্রাহিমের ভ্রাতুষ্পুত্র।
আলোচ্য আয়াতে তাদেরকে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ তারা কাম-তৃপ্তির জন্য নারী গমনের স্বাভাবিক বিধানটিকে লংঘন করে পুরুষের উপর উপগত হতো। নিঃসন্দেহে ওই কুকর্মটি ছিলো ঘৃণ্য ও নিষ্ফল। আল্লাহ্তায়ালার সাধারণ ও স্বাভাবিক বিধান এই যে, কাম পরিতৃপ্তির জন্য ও সন্তান লাভের লক্ষ্যে নারী ও পুরুষ বৈধ স্বামী-স্ত্রী হিসেবে রতিকর্মে লিপ্ত হবে। কিন্তু হজরত লুতের অবাধ্য সম্প্রদায় হয়ে গিয়েছিলো জ্ঞানহীন পশুর মতো। এ আয়াতের মাধ্যমে এ কথাটিও প্রমাণিত হয় যে, রমণীদের সঙ্গে পায়ু সঙ্গম হারাম। কারণ তা পুরুষে পুরুষে সমকামের মতোই অপবিত্র, ঘৃণ্য এবং শুভ উদ্দেশ্যবর্জিত। সুরা বাকারার তাফসীরে এই মাসআলাটির বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সেখানকার এ সম্পর্কিত আয়াতটি হচ্ছে— তোমাদের অভ্যাসই হচ্ছে শরিয়তের যুক্তিসঙ্গত বিধানকে লংঘন করা। বিবাহকে ত্যাগ করে তোমরা এমন কাজের দিকে ধাবিত হয়েছো— যা মানবতাবিরোধী ও অকল্যাণকর।
এই আয়াতেও জঘন্য কুকর্মটি সম্পর্কে ঘৃণা ও নিন্দাজ্ঞাপন করা হয়েছে। এই নির্দেশনাটি দেয়াই আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য যে, কামতৃপ্তির জন্য তোমরা অবলম্বন করেছো অপবিত্রতা, অবৈধতা ও অস্বাভাবিকতাকে। অতএব হে লুতের সম্প্রদায়! এ কথাটি জেনে রাখো যে, এটা নিশ্চিত সীমালংঘন। এটাও সুনিশ্চিত যে, তোমরা হচ্ছো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে পরবর্তী আয়াতেও (৮২)। বলা হয়েছে———উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বললো, এদেরকে জনপদ থেকে বহিষ্কার করো, এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র হতে চায়।’ পাপিষ্ঠদের এ বক্তব্যটি ছিলো হজরত লুত ও তাঁর বিশ্বাসী অনুচরবৃন্দের প্রতি একটি স্পষ্ট বিদ্রূপ। অপবিত্রতায় আপাদমস্তক নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিলো তারা। তাই স্বাভাবিক পবিত্রতার বিরুদ্ধে বিদ্রূপপ্রবণ হতে বাধেনি তাদের। পরের আয়াতে (৮৩) বলা হয়েছে—~— ‘অতঃপর তাকে ও তার স্ত্রী ব্যতীত তার পরিজনবর্গকে উদ্ধার করেছিলাম, তার স্ত্রী ছিলো ধ্বংস প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ এখানে ‘ওয়া আলাহু’ কথাটির অর্থ বিশ্বাসী পরিজনবর্গ। কেউ কেউ বলেছেন, হজরত লুতের ছিলো দুই স্ত্রী। প্রকাশ্যে বিশ্বাসিনীর ভান করলেও তাঁর এক স্ত্রী ছিলো কাফের। ওই স্ত্রী সম্পর্কে এখানে বলা হয়েছে, ‘তার স্ত্রী ছিলো ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।
সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের উপর যখন আল্লাহ্ আযাব নেমে এলো তখন আল্লাহ্তায়ালা হজরত লুত ও তাঁর বিশ্বাসী সাথীদেরকে ওই পাপিষ্ঠ জনপদ থেকে অন্যত্র গমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই অবিশ্বাসী স্ত্রী তখন সেই নির্দেশ মানেনি। সে রয়ে গিয়েছিলো তার সম্প্রদায়ের বৃদ্ধ লোকদের সঙ্গে এবং অবাধ্যদের সঙ্গে। সে-ও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো আল্লাহ্ আযাবে।
পরের আয়াতে (৮৪) বলা হয়েছে— ‘তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম, সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হয়েছিলো তা লক্ষ্য করো।’ এখানে ‘মাতারান’ (মুষলধারে বৃষ্টি) কথাটির অর্থ বিস্ময়কর বৃষ্টি। ওই বিস্ময়কর বৃষ্টি ছিলো পাথরের বৃষ্টি। প্রতিটি পাপিষ্ঠের জন্য নির্দিষ্ট ছিলো একটি করে পাথর। ওই তীব্র গতিতে বর্ষিত নির্ধারিত পাথরের আঘাতে ধ্বংস হয়েছিলো পাপিষ্ঠরা। ওয়াহাব লিখেছেন, ওই বৃষ্টি ছিলো গন্ধক ও আগুনের বৃষ্টি। আবু উবায়দা বলেছেন, ‘আমতারা’ অর্থ রহমতের বৃষ্টি। আর মাতারা অর্থ গজবের বৃষ্টি। আর ‘আল-মুজরিমীন’ কথাটির অর্থ এখানে অপরাধী, সীমালংঘনকারী এবং কাফের।
বর্ণিত হয়েছে, হজরত লুত তাঁর পিতৃব্য হজরত ইব্রাহিমের সঙ্গে বাবেল শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে সিরিয়া অতিক্রম কালে তিনি যাত্রা স্থগিত করলেন জর্ডান নামক স্থানে। আল্লাহ্তায়ালা সেখান থেকে তাঁকে নবী বানিয়ে প্রেরণ করলেন সদোমবাসীদেরকে হেদায়েতের উদ্দেশ্যে। সদোমের লোকেরাই শুরু করেছিলো ঘৃণ্য সমকামিতা। হজরত লুত তাদেরকে ওই জঘন্য পাপ থেকে প্রত্যাবর্তন করতে বললেন। কিন্তু তারা হজরত লুতের কথায় কর্ণপাত করলো না। তখন আল্লাহ্তায়ালা তাদেরকে প্রস্তর বৃষ্টির মাধ্যমে ধ্বংস করে দিলেন। হজরত ইবনে আব্বাস থেকে ইসহাক বিন বশীর এবং ইবনে আসাকেরও এ রকম বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বর্ণনায় এ কথাও বলা হয়েছে যে, গৃহবাসী সদোমদেরকে ভূমিধ্বসের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিলো। আর মুসাফির সদোমদেরকে বিনাশ করা হয়েছিলো পাথরের বৃষ্টির দ্বারা।
মোহাম্মদ বিন ইসহাক বর্ণনা করেছেন, সদোম সম্প্রদায়ের এলাকাটি ছিলো সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা। আশে পাশের সকল অঞ্চলের চেয়েও সুন্দর অঞ্চল ছিলো ওই সদোম। তাই আশে পাশের লোকেরা প্রায়শঃই অত্যাচার করতো তাদের উপর। ফল ও ফসল লুঠ করে নিয়ে যেতো। অবাধে পশুপাল চরাতো ফসলের ক্ষেতে। ইবলিস একদিন মানুষের আকৃতিতে শুভাকাঙ্খীর ভূমিকা নিয়ে উপস্থিত হলো বিমর্ষ সদোমদের নিকট। পরামর্শ দিলো— তোমরা যদি পুরুষ সম্ভোগ করো, তবে বেঁচে থাকতে পারবে সকল অত্যাচার থেকে। সদোমেরা প্রথমে এ পরামর্শকে ভালো মনে করলো না। কিন্তু বহিরাগতদের উপদ্রব যখন চরমে পৌঁছলো, তখন উদ্ধারের আশায় মরিয়া হয়ে চোর, ডাকাত অথবা তাদের অল্পবয়সী সন্তানদেরকে ধরে শুরু করলো পুরুষ সম্ভোগ।
হাসান বসরী বলেছেন, সদোম সম্প্রদায়ের লোকেরা এতো চরমে পৌঁছলো যে, তারা রমণীদেরকে কেবল বিয়েই করতো। কিন্তু কাম চরিতার্থ করতো পুরুষদের সঙ্গে। কালাবী বলেছেন, ইবলিসই সদোম সম্প্রদায়ের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রথম এনেছিলো এই ঘৃণিত প্রথাটি। সদোমদের জনপদ ছিলো ফল ও ফসলে ভরা। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকেরা সেখানে আসতো। কিন্তু সদোমবাসীরা ছিলো বড়ই সংকীর্ণচিত্ত। পথিক ও অনাথদেরকে তারা কিছুই দিতে চাইতো না। একদিন ইবলিস উঠতি বয়সের যুবকের আকৃতিতে লোভনীয় ভঙ্গিতে হাজির হলো তাদের এলাকায়। যারা তার প্রতি আকৃষ্ট হলো তাদেরকে সে ইঙ্গিত করলো তার পশ্চাৎদেশের দিকে। এভাবে তাদেরকে সে প্রথম শিক্ষা দিলো সমকাম। ধীরে ধীরে ওই ঘৃণ্য কুকর্মের মধ্যে ডুবে গেলো সকলে। পরিণাম হলো অত্যন্ত ভয়াবহ। পাথর বৃষ্টি এবং ভূমিধ্বসের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া হলো সকলকে।




হাদিসে সমকামীদের হত্যার বিধান
হাদিসসমূহ ইসলামী আইনে লওয়াতের মৃত্যুদণ্ড প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত একই মূল বক্তব্য সুনান আত-তিরমিযী ১৪৫৬, সুনান আবু দাউদ ৪৪৬২ এবং সুনান ইবন মাজাহ ২৫৬১-এ এসেছে: “তোমরা যাকে লূত জাতির কাজ করতে পাবে, যে কাজটি করে এবং যার সঙ্গে কাজটি করা হয়—উভয়কেই হত্যা করো।” আবু দাউদ ৪৪৬২-এর বর্ণনাকে মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী হাসান সহিহ বলেছেন। তিরমিজী ১৪৫৬ ও ইবন মাজাহ ২৫৬১-এর Sunnah.com সংস্করণে Darussalam grading হাসান। তিরমিজী একই অধ্যায়ে বিভিন্ন সনদ নিয়েও আলোচনা করেছেন এবং আবু হুরায়রা থেকে আসা একটি বিকল্প সনদের রাবি আসিম ইবন উমরের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। [8] [9] [10]
সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ১৪/ হদ্দ (দন্ড)
১৪/১২. যে ব্যক্তি লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে লিপ্ত হয়
১/২৫৬১। ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা কাউকে লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে লিপ্ত পেলে তাকে এবং যার সাথে তা করা হয় তাকে হত্যা করো।
তিরমিযী ১৪৫৬, আবূ দাউদ ৪৪৬২, বায়হাকী ফিস সুনান ৮/২৩২, ইরওয়া ২৩৫০, মিশকাত ৩৫৭৫। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ। উক্ত হাদিসের রাবী আবদুল আযীয বিন মুহাম্মাদ সম্পর্কে মুহাম্মাদ বিন সা’দ বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় সংমিশ্রণ করেন। ইবনু হিব্বান বলেন, তিনি হাদিস বর্ণনায় ভুল করেন। মালিক বিন আনাস তাকে সিকাহ বলেছেন। আহমাদ বিন শু’আয়ব আন নাসায়ী বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য নয়। ইবনু হাজার আল-আসকালানী বলেন, তিনি সত্যবাদী তবে নিজ কিতাব ছাড়া অন্যত্র থেকে হাদিস বর্ণনায় ভুল করেন। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৩৪৭০, ১৮/১৮৭ নং পৃষ্ঠা)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
২৯. কেউ কওমে লূতের অনুরূপ অপকর্ম করলে
৪৪৬৩। ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, অবিবাহিতদের লাওয়াতাতে (পায়ুকামে) লিপ্ত পাওয়া গেলে রজম করা হবে। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, ‘আসিম (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত হাদীস আমর ইবনু আবূ আমরের হাদীসকে দুর্বল প্রমাণিত করে।(1)
সনদ সহীহ মাওকুফ।
(1). বায়হাক্বী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই হাদীসগুলো ইসলামী ফিকাহের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ইমাম মালিক, শাফেয়ী ও হাম্বলিরা একে সরাসরি হদ্দ অপরাধের আওতায় ফেলেছেন, আর ইমাম আবু হানিফা একে তাযীর হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ, বিচারকের বিবেচনায় শাস্তি নির্ধারিত হতে পারে — কিন্তু সর্বাধিক প্রচলিত মত হলো মৃত্যু। মধ্যযুগীয় ফিকাহ গ্রন্থ যেমন আল-মুয়াত্তা, আল-হিদায়া, আল-মুগনী, বদায়েউস-সানায়ি প্রভৃতিতে এই শাস্তি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী ফিকহে লওয়াতের মৃত্যুদণ্ড: সাহাবি, ফকিহ ও ধ্রুপদী উৎস
ইসলামী ফিকহে লওয়াত বলতে মূলত পুরুষের সঙ্গে পুরুষের পায়ুসঙ্গমকে বোঝানো হয়েছে; আধুনিক অর্থে কোনো ব্যক্তির যৌন অভিমুখিতা বা পরিচয়কে নয়। কিন্তু এই যৌনকর্ম প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড, রজম, আগুনে পোড়ানো, উঁচু স্থান থেকে নিচে নিক্ষেপ, দেয়াল চাপিয়ে হত্যা—এমন একাধিক শাস্তির মত ধ্রুপদী ইসলামি বর্ণনায় পাওয়া যায়। শাইখ মুহাম্মদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত Islam Question & Answer-এর ৩৮৬২২ নম্বর উত্তরে ইবনুল কাইয়্যিমের আল-জাওয়াব আল-কাফি এবং ইবন তাইমিয়ার আস-সিয়াসাহ আশ-শারইয়্যাহ-সহ ধ্রুপদী ফিকহি উৎসে বলা হয়েছে, সাহাবিগণ লওয়াতকারীকে হত্যার বিষয়ে একমত ছিলেন; তাদের মতভেদ ছিল হত্যার পদ্ধতি নিয়ে। সেখানে আলি ও আবু বকরের ক্ষেত্রে আগুনে পোড়ানো, ইবন আব্বাসের ক্ষেত্রে উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপ করে পাথর মারা এবং আলি ও ইবন আব্বাস থেকে রজমের মত উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী ফকিহদের মধ্যে শাস্তির ধরন নিয়ে মতভেদ ছিল—একদল বিবাহিত-অবিবাহিত নির্বিশেষে হত্যা, একদল যিনার শাস্তি এবং আরেকদল তাযীরের পক্ষে ছিলেন। [11]
عقوبة اللواط
13/صفر/1427 الموافق 13/مارس/2006
766,219
السؤال 38622
ما هي عقوبة اللواط، وهل هناك فرق بين الفاعل والمفعول به؟
ملخص الجواب
أجمع الصحابة على قتل اللوطي، لكن اختلفوا في طريقة قتله، فمنهم من ذهب إلى أن يحرق بالنار، وهذا قول علي رضي الله عنه، وبه أخذ أبو بكر رضي الله عنه، كما سيأتي. ومنهم قال: يرمى به من أعلى شاهق، ويتبع بالحجارة، وهذا قول ابن عباس رضي الله عنه. ومنهم من قال: يرجم بالحجارة حتى يموت، وهذا مروي عن علي وابن عباس أيضاً. ثم اختلف الفقهاء بعد الصحابة، فمنهم من قال يقتل على أي حال كان، محصنا أو غير محصن. ومنهم من قال: بل يعاقب عقوبة الزاني، فيرجم إن كان محصنا، ويجلد إن كان غير محصن. ومنهم من قال: يعزر التعزير البليغ الذي يراه الحاكم.
বাংলা অনুবাদ:
লওয়াতের শাস্তি
১৩ সফর ১৪২৭ হিজরি, মোতাবেক ১৩ মার্চ ২০০৬
৭৬৬,২১৯ বার দেখা হয়েছে
প্রশ্ন ৩৮৬২২
লওয়াতের শাস্তি কী? এবং যে ব্যক্তি কাজটি করে ও যার সঙ্গে কাজটি করা হয়—এই দুজনের মধ্যে শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য আছে কি?
উত্তরের সারসংক্ষেপ
সাহাবিগণ লওয়াতকারীর হত্যার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন; তবে তাকে কীভাবে হত্যা করা হবে, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ ছিল। তাদের মধ্যে কেউ বলেছেন, তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে। এটি আলির মত, এবং আবু বকরও এই মত গ্রহণ করেছিলেন—যেমন পরে বিস্তারিতভাবে আসবে। আবার কেউ বলেছেন, তাকে কোনো উঁচু স্থান থেকে নিচে নিক্ষেপ করা হবে এবং এরপর তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হবে। এটি ইবন আব্বাসের মত। আবার কেউ বলেছেন, তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে যতক্ষণ না সে মারা যায়। এই মতও আলি ও ইবন আব্বাস—উভয়ের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে।
এরপর সাহাবিদের পরবর্তী যুগে ফকিহদের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়। তাদের কেউ বলেছেন, লওয়াতকারীকে সর্বাবস্থায় হত্যা করা হবে—সে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত। আবার কেউ বলেছেন, তাকে ব্যভিচারীর শাস্তি দেওয়া হবে; সে বিবাহিত হলে তাকে রজম করা হবে এবং অবিবাহিত হলে তাকে চাবুক মারা হবে। আরেকদল বলেছেন, শাসক যে কঠোর তাযীরমূলক শাস্তিকে উপযুক্ত মনে করবেন, তাকে সেই শাস্তি দেওয়া হবে।
ইবন তাইমিয়া তাঁর আস-সিয়াসাহ আশ-শারইয়্যাহ ফি ইসলাহির রাঈ ওয়াল রাঈয়্যাহ গ্রন্থে লওয়াতের শাস্তি নিয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, তার মতে সাহাবিদের সম্মত সিদ্ধান্ত ছিল—দুই অংশগ্রহণকারী, অর্থাৎ “উপরের” ও “নিচের” ব্যক্তি, উভয়কেই হত্যা করা হবে; তারা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত। এরপর তিনি সাহাবি ও সালাফদের থেকে বর্ণিত মৃত্যুদণ্ডের বিভিন্ন পদ্ধতি উল্লেখ করেন: আগুনে পোড়ানো, সরাসরি হত্যা, দেয়াল চাপিয়ে মৃত্যু ঘটানো, দুর্গন্ধযুক্ত স্থানে বন্দি রেখে মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করা, জনপদের সবচেয়ে উঁচু দেয়াল থেকে নিচে নিক্ষেপ করে পাথর মারা এবং রজম। ইবন তাইমিয়া আরও বলেন, অধিকাংশ সালাফ রজমের মত গ্রহণ করেছিলেন এবং এর যুক্তি হিসেবে লূতের কওমকে পাথর মেরে ধ্বংস করার কোরআনিক কাহিনিকে ব্যবহার করেছিলেন। [12]
وأما اللواط فمن العلماء من يقول : حده كحد الزنا ، وقد قيل دون ذلك . والصحيح الذي اتفقت عليه الصحابة : أن يقتل الاثنان الأعلى والأسفل . سواء كانا محصنين ، أو غير محصنين .
فإن أهل السنن رووا عن ابن عباس رضي الله تعالى عنهما ، { عن النبي صلى الله عليه وسلم ، قال : من وجدتموه يعمل عمل قوم لوط ، فاقتلوا الفاعل والمفعول به } وروى أبو داود عن ابن عباس رضي الله تعالى عنهما : ” في البكر يوجد على اللواطية ، قال : يرجم ” ويروى عن علي بن أبي طالب رضي الله عنه نحو ذلك . ولم تختلف الصحابة في قتله ، ولكن تنوعوا فيه ، فروي عن الصديق رضي الله عنه أنه أمر بتحريقه ، وعن غيره قتله ، وعن بعضهم : أنه يلقى عليه جدار حتى يموت تحت الهدم ، وقيل : يحبسان في أنتن موضع حتى يموتا .
وعن بعضهم : أنه يرفع على أعلى جدار في القرية ، ويرمى منه ، ويتبع بالحجارة ، كما فعل الله بقوم لوط وهذه رواية عن ابن عباس ، والرواية الأخرى قال : يرجم
وعلى هذا أكثر السلف ، قالوا : لأن الله رجم قوم لوط ، وشرع رجم الزاني تشبيها برجم لوط ، فيرجم الاثنان ، سواء كانا حرين أو مملوكين ، أو كان أحدهما مملوك الآخر ، إذا كانا بالغين ، فإن كان أحدهما غير بالغ عوقب بما دون القتل ، ولا يرجم إلا البالغ .
বাংলা অনুবাদ:
আর লওয়াতের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কেউ বলেছেন, এর হদ্দ যিনার হদ্দের মতো। আবার এর চেয়ে কম শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু যে মতটি সঠিক এবং যার ওপর সাহাবিগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন তা হলো—উভয় ব্যক্তিকেই হত্যা করা হবে; উপরের ব্যক্তি এবং নিচের ব্যক্তি—দুজনকেই। তারা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত।
কারণ সুনান গ্রন্থসমূহের লেখকেরা ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী বলেছেন: “তোমরা যাকে লূত জাতির কাজ করতে দেখবে, যে কাজটি করে এবং যার সঙ্গে কাজটি করা হয়—উভয়কেই হত্যা করো।” আবু দাউদ ইবন আব্বাস থেকে আরও বর্ণনা করেছেন, অবিবাহিত কোনো ব্যক্তিকে লওয়াতের কাজে পাওয়া গেলে তার ব্যাপারে তিনি বলেছেন: “তাকে রজম করা হবে।” আলি ইবন আবি তালিব থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।
তাকে হত্যা করা হবে—এ বিষয়ে সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ ছিল না; বরং কীভাবে হত্যা করা হবে, সে বিষয়ে তাদের পদ্ধতি ভিন্ন ছিল। আবু বকরের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্যদের কাছ থেকে সরাসরি হত্যা করার মত বর্ণিত হয়েছে। আবার কারও মতে, তার ওপর একটি দেয়াল ফেলে দেওয়া হবে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে সে মারা যায়। আরও বলা হয়েছে, দুজনকে সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত স্থানে বন্দি করে রাখা হবে যতক্ষণ না তারা মারা যায়।
আবার কারও মতে, তাকে জনপদের সবচেয়ে উঁচু দেয়ালের ওপর তুলে সেখান থেকে নিচে নিক্ষেপ করা হবে, এরপর তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হবে—যেভাবে আল্লাহ লূত জাতির সঙ্গে করেছিলেন। এটি ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত একটি মত। তার কাছ থেকে বর্ণিত আরেকটি মত হলো: তাকে রজম করা হবে।
অধিকাংশ সালাফ এই মতের ওপর ছিলেন। তারা বলেছেন, কারণ আল্লাহ লূত জাতিকে পাথর মেরে ধ্বংস করেছিলেন, আর যিনাকারীর রজমের বিধানও লূত জাতিকে পাথর মারার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে প্রবর্তিত হয়েছে। তাই উভয় ব্যক্তিকেই রজম করা হবে—তারা স্বাধীন হোক বা দাস, অথবা তাদের একজন অন্যজনের মালিকানাধীন দাস হোক—যদি তারা উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তবে তাদের একজন যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কম শাস্তি দেওয়া হবে; কারণ কেবল প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকেই রজম করা হবে।
ইবন আব্বাসের বিধান: সর্বোচ্চ ভবন থেকে মাথা নিচে করে ফেলে পাথর মারা
এই শাস্তির সবচেয়ে স্পষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বর্ণনাগুলোর একটি পাওয়া যায় ইবন আবি শাইবার আল-মুসান্নাফ-এ। আবু নাদরা থেকে বর্ণিত, ইবন আব্বাসকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—লওয়াতকারীর শাস্তি কী? তার উত্তর ছিল, জনপদের সর্বোচ্চ ভবনটি নির্বাচন করতে হবে, অপরাধীকে সেখান থেকে মাথা নিচের দিকে করে ফেলে দিতে হবে, এরপর তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। একই অধ্যায়ে ইবন আব্বাসের নামে আরেকটি বর্ণনায় লওয়াতের অভিযোগে ধরা পড়া ব্যক্তিকে রজম করার কথা এবং আলির নামে একজন লওয়াতকারীকে রজম করার বর্ণনাও রয়েছে। [13] [14]
سئل ابن عباس: ما حد اللوطي؟ قال: ينظر أعلى بناء في القرية فيرمى به منكسا ثم يتبع بالحجارة.
বাংলা অনুবাদ: ইবন আব্বাসকে জিজ্ঞেস করা হলো: লওয়াতকারীর শাস্তি কী? তিনি বললেন: জনপদের সর্বোচ্চ ভবনটি দেখা হবে; তাকে সেখান থেকে মাথা নিচের দিকে করে নিক্ষেপ করা হবে, এরপর তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হবে।
এই বর্ণনাটি শুধু পরবর্তী কোনো ফিকহি কল্পনা নয়। ইবন হাজার আল-আসকালানি এর সনদকে সহিহ বলেছেন; আলবানিও একই বর্ণনার সনদকে সহিহ বলেছেন। দুরার আস-সানিয়্যাহর তাকরিজে এটিকে ইবন আবি শাইবা ২৮৯২৫, বায়হাকি ১৭১০৬ এবং আল-আজুররির যাম্মুল লিওয়াত-এ সংরক্ষিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [15]
خلاصة حكم المحدث: إسناده صحيح.
বাংলা অনুবাদ: মুহাদ্দিসের সিদ্ধান্ত: এর সনদ সহিহ।
অবিবাহিত ব্যক্তিকেও রজম: ইবন আব্বাসের আরেকটি বর্ণনা
সুনান আবু দাউদ ৪৪৬৩-তে মুজাহিদ ও সাঈদ ইবন জুবাইরের মাধ্যমে ইবন আব্বাসের আরেকটি বক্তব্য এসেছে। সেখানে প্রশ্নটি বিশেষভাবে একজন অবিবাহিত পুরুষকে নিয়ে; অর্থাৎ যিনার প্রচলিত ফিকহি কাঠামোয় যে ব্যক্তি মুহসান নয়। ইবন আব্বাসের উত্তর—তাকেও রজম করা হবে। মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী এই বর্ণনার সনদকে “সহিহুল-ইসনাদ মাওকুফ” বলেছেন। [16]
فِي الْبِكْرِ يُوجَدُ عَلَى اللُّوطِيَّةِ قَالَ يُرْجَمُ.
বাংলা অনুবাদ: অবিবাহিত কোনো পুরুষকে লওয়াতের কাজে ধরা পড়লে—ইবন আব্বাস বলেন: তাকে রজম করা হবে।
আলি কর্তৃক লওয়াতকারীকে রজম
ইবন আবি শাইবার আল-মুসান্নাফ, বায়হাকির গ্রন্থ এবং পরবর্তী বহু ফিকহি রচনায় আলি কর্তৃক একজন লওয়াতকারীকে রজম করার বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। আল-মুসান্নাফ-এ ইয়াজিদ ইবন কায়েসের সূত্রে সরাসরি বলা হয়েছে যে, আলি একজন লওয়াতকারীকে রজম করেছিলেন। এই নির্দিষ্ট সনদকে দুর্বল বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে; কিন্তু বর্ণনাটি প্রাথমিক হাদিস-ফিকহ সাহিত্য থেকেই লওয়াতের শাস্তি হিসেবে রজমের পক্ষে ব্যবহৃত হয়েছে। [17]
عن يزيد بن قيس أن عليا رجم لوطيا.
বাংলা অনুবাদ: ইয়াজিদ ইবন কায়েস থেকে বর্ণিত যে, আলি একজন লওয়াতকারীকে রজম করেছিলেন।
আবু বকরের নির্দেশে খালিদ কর্তৃক লওয়াতকারীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা
বায়হাকির আস-সুনান আল-কুবরা-তে আরও ভয়াবহ একটি বর্ণনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ আবু বকরকে চিঠি দিয়ে জানান যে আরবের এক এলাকায় এমন এক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে “যাকে নারীর মতো উপগত করা হয়।” আবু বকর মুহাম্মদের সাহাবিদের একত্র করে পরামর্শ করেন। বর্ণনা অনুযায়ী আলি বলেন, পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে কেবল একটি জাতিই এই কাজ করেছিল এবং তাদের পরিণতি সবার জানা; তাই তার মত হলো ওই ব্যক্তিকে আগুনে পোড়ানো। এরপর আবু বকর খালিদকে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেন। বায়হাকি বর্ণনাটিকে “هذا مرسل” বা মুরসাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; একই ঘটনা পরবর্তী ইসলামি ফিকহে লওয়াতকারীকে আগুনে পোড়ানোর পূর্বনজির হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। [18]
نرى أن نحرقه بالنار … هذا مرسل.
বাংলা অনুবাদ: “আমাদের মত হলো তাকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে।” বায়হাকি এরপর বলেন: “এটি মুরসাল।”
একই কাহিনি কুরতুবি, ইবন হাযম, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবন আরাবি এবং অন্যান্য বহু ধ্রুপদী লেখকের গ্রন্থে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। একই মূল বর্ণনা বহু বইয়ে উপস্থিত হওয়া স্বাধীন corroboration নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরবর্তী লেখকেরা আগের প্রচলিত বর্ণনাই ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এটি দেখায় যে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ধারণাটি বিচ্ছিন্ন বা আধুনিক কোনো ব্যাখ্যা নয়; ধ্রুপদী ফিকহি সাহিত্যে তা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
ইবন আল-জুবাইর, হিশাম ইবন আবদুল মালিক ও খালিদ আল-কাসরির আমলে আগুনে পোড়ানোর বর্ণনা
ইবন আরাবির আহকামুল কুরআন এবং ইবন হাযমের আল-মুহাল্লা-তে আরও বলা হয়েছে যে, আবু বকর–খালিদের ঘটনার পর ইবন আল-জুবাইর তার শাসনামলে একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আগুনে পুড়িয়েছিলেন; পরবর্তীতে উমাইয়া শাসক হিশাম ইবন আবদুল মালিক এবং ইরাকে খালিদ আল-কাসরির নামেও একই শাস্তির বর্ণনা এসেছে। এগুলো সব একই মানের স্বাধীন ঐতিহাসিক দলিল নয়; কিন্তু মধ্যযুগীয় ইসলামি আইন ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলো কী ধরনের রাষ্ট্রীয় শাস্তিকে বৈধ ও পূর্বনজির হিসেবে প্রচার করেছে, তা স্পষ্ট করে। [19]
ثم أحرقهم ابن الزبير في زمانه، ثم أحرقهم هشام بن عبد الملك، ثم أحرقهم خالد القسري بالعراق.
বাংলা অনুবাদ: এরপর ইবন আল-জুবাইর তার সময়ে তাদের আগুনে পোড়ান; তারপর হিশাম ইবন আবদুল মালিক এবং পরে ইরাকে খালিদ আল-কাসরির নামেও একই শাস্তির বর্ণনা এসেছে।
ইবন আল-জুবাইরের আমলে সাত লওয়াতকারীর বিচার ও রজম
আল-খারাইতির মাসাওয়ি আল-আখলাক-এ আতা ইবন আবি রাবাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, ইবন আল-জুবাইরের কাছে লওয়াতের ঘটনায় ধরা পড়া সাতজনকে আনা হয়। তাদের চারজন বিবাহিত এবং তিনজন অবিবাহিত ছিল। বর্ণনা অনুযায়ী, চারজনকে মসজিদ থেকে বাইরে নিয়ে পাথর মেরে হত্যা করা হয় এবং বাকি তিনজনের ওপর হদ্দ কার্যকর করা হয়। ইবন উমর ও ইবন আব্বাস সে সময় মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। [20]
شهدت ابن الزبير أتي بسبعة أخذوا في لواط: أربعة قد أحصنوا، وثلاثة لم يحصنوا.
বাংলা অনুবাদ: আতা বলেন: আমি ইবন আল-জুবাইরকে দেখেছি; তার কাছে লওয়াতের অভিযোগে সাতজনকে আনা হয়েছিল—চারজন বিবাহিত এবং তিনজন অবিবাহিত।
ইবনুল কাইয়্যিম: বিবাহিত-অবিবাহিত নির্বিশেষে হত্যা
ইবনুল কাইয়্যিমের আল-জাওয়াব আল-কাফি বা আদ-দা ওয়াদ-দাওয়া-তে লওয়াতের শাস্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। সেখানে তিনি আবু বকর, আলি, খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ, আবদুল্লাহ ইবন আল-জুবাইর, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসসহ বহু প্রাথমিক ব্যক্তিত্ব ও পরবর্তী ফকিহের নাম উল্লেখ করে এমন মতকে সমর্থন করেন যে এই অপরাধের শাস্তি যিনার চেয়েও কঠোর এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত—দুই অবস্থাতেই হত্যা। শামেলার সংরক্ষিত সংস্করণেও এই আলোচনাটি পাওয়া যায়। [21]
عقوبته القتل على كل حال، محصنا كان أو غير محصن.
বাংলা অনুবাদ: তার শাস্তি সর্বাবস্থায় হত্যা—সে বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত।
হানাফি ফিকহে ভিন্নমত: আবু হানিফার তাযীর ও কারাবাস
তবে “চার মাজহাবই একইভাবে সর্বাবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে”—এ দাবি সঠিক নয়। হানাফি ফিকহে আবু হানিফার মূল অবস্থান ভিন্ন। ফাতহুল কাদীর-এ বলা হয়েছে, তার মতে লওয়াতের জন্য যিনার নির্দিষ্ট হদ্দ প্রযোজ্য নয়; বরং তাযীর করা হবে এবং আল-জামি আস-সাগির-এর ভাষ্যে তাকে কারাগারে পাঠানোর কথাও আছে। একই আলোচনায় আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের মতকে যিনার হদ্দের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আর আরেক শাফেয়ি মত হিসেবে সর্বাবস্থায় হত্যার কথাও এসেছে। অর্থাৎ ধ্রুপদী ফিকহে অপরাধীকরণে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও সুনির্দিষ্ট শাস্তি নিয়ে বাস্তব মতভেদ ছিল। [22]
فلا حد عليه عند أبي حنيفة ويعزر … ويودع في السجن.
বাংলা অনুবাদ: আবু হানিফার মতে তার ওপর নির্ধারিত হদ্দ নেই; তাকে তাযীর করা হবে এবং কারাগারে রাখা হবে।
মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি: তরবারি, রজম, আগুন, দেয়াল চাপা, উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপ
মুহাম্মদ আল-আমিন আশ-শানকিতির আদওয়া আল-বায়ান-এ লওয়াতের শাস্তি নিয়ে ফকিহদের মতভেদ সংকলন করতে গিয়ে মৃত্যুদণ্ডের চারটি প্রধান পদ্ধতি স্পষ্টভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে: তরবারি দিয়ে হত্যা; পাথর মেরে হত্যা; আগুনে পুড়িয়ে হত্যা; এবং জনপদের সবচেয়ে উঁচু ভবন থেকে মাথা নিচে করে ফেলে দেওয়ার পর পাথর মারা। একই আলোচনায় “কাজটি যে করেছে এবং যার সঙ্গে করা হয়েছে”—উভয়কে হত্যার হাদিস, ইবন আব্বাসের রজমের বক্তব্য এবং আলির নামে রজমের বর্ণনা আলোচনা করা হয়েছে। [23]
قال بعضهم: يقتل بالسيف. وقال بعضهم: يرجم بالحجارة. وقال بعضهم: يحرق بالنار.
বাংলা অনুবাদ: কেউ বলেছেন তাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করা হবে; কেউ বলেছেন পাথর মেরে; আবার কেউ বলেছেন আগুনে পুড়িয়ে।
মানসুর আল-বুহুতি: লওয়াতের হদ্দ ও অপরাধ প্রমাণের কাঠামো
হাম্বলি ফকিহ মানসুর ইবন ইউনুস আল-বুহুতি তাঁর শারহ মুনতাহা আল-ইরাদাত গ্রন্থে পুরুষ কর্তৃক পুরুষের পায়ুসঙ্গমকে যিনার হদ্দের কাঠামোর মধ্যে রেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই ব্যক্তির মধ্যে যে মুহসান বা বিবাহিত, তাকে রজম করা হবে; স্বাধীন অবিবাহিত ব্যক্তিকে একশত চাবুক মারা এবং এক বছরের জন্য নির্বাসিত করা হবে। একই গ্রন্থে হদ্দ প্রমাণের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি এবং চারজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষীর কাঠামো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তী ফিকহি সংকলনগুলো লওয়াতের ক্ষেত্রেও যিনার অনুরূপ প্রমাণের এই কাঠামো প্রয়োগ করেছে। [24] [25]
ولو وطئ فاعل مفعولا به كزان، فمن كان منهما محصنا رجم، وغير المحصن الحر يجلد مائة ويغرب عاما.
বাংলা অনুবাদ: কোনো কর্তা যদি অন্য পুরুষের সঙ্গে পায়ুসঙ্গম করে, তবে তাদেরকে যিনাকারীর মতো গণ্য করা হবে। তাদের মধ্যে যে মুহসান, তাকে রজম করা হবে; আর স্বাধীন অবিবাহিত ব্যক্তিকে একশত চাবুক মারা হবে এবং এক বছরের জন্য নির্বাসিত করা হবে।
ইবনুল কাইয়্যিম: সম্মত মাফউল বিহিকেও হত্যা
ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর আল-জাওয়াব আল-কাফি লিমান সাআলা আনিদ-দাওয়া আশ-শাফি গ্রন্থে শুধু লওয়াতকারী ব্যক্তিকেই নয়, স্বেচ্ছায় যার সঙ্গে লওয়াত করা হয় তাকেও হত্যার পক্ষে অত্যন্ত কঠোর যুক্তি দিয়েছেন। তার মতে লওয়াতের “মাফউল বিহি” বা passive অংশগ্রহণকারীর ওপর এমন নৈতিক ও আত্মিক “দুর্নীতি” ঘটে যে, তাকে জীবিত রাখার চেয়ে হত্যা করাই নাকি তার জন্য উত্তম। একই আলোচনায় তিনি লওয়াতকে হত্যার চেয়েও বড় ধরনের “ফাসাদ” হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং সাহাবিদের ঐকমত্যের দাবি ব্যবহার করে উভয় অংশগ্রহণকারীর মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করেন। [26]
وقتل المفعول به خير له من وطئه، فإنه إذا وطئه قتله قتلا لا ترجى الحياة معه.
বাংলা অনুবাদ: যার সঙ্গে লওয়াত করা হয়, তার জন্য লওয়াতের শিকার হওয়ার চেয়ে তাকে হত্যা করাই উত্তম; কারণ তার সঙ্গে এই কাজ করা হলে তাকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়, যার পরে তার জীবনের কোনো আশা থাকে না।
এই সমস্ত উৎস একত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট করে: ধ্রুপদী ইসলামী আইনশাস্ত্রে লওয়াতকে নিছক ব্যক্তিগত পাপ হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয়নি; এটিকে রাষ্ট্রীয় শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করা হয়েছে। ইবন আব্বাসের নামে উঁচু ভবন থেকে মাথা নিচে করে নিক্ষেপ করে পাথর মারা ও অবিবাহিত ব্যক্তিকেও রজম, আলি কর্তৃক রজম, আবু বকরের নির্দেশে আগুনে পোড়ানো, ইবন আল-জুবাইরের আমলে রজম এবং পরবর্তী ফকিহদের তরবারি, আগুন, রজম ও উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপের বিধান—সব মিলিয়ে লওয়াতের জন্য হত্যা ধ্রুপদী ইসলামি আইনি ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠিত ধারা। একই বর্ণনা পরবর্তী বহু গ্রন্থে পুনরাবৃত্ত হওয়া স্বাধীন corroboration নয়, কিন্তু সেই পুনরাবৃত্তি এই মৃত্যুদণ্ডগুলোর দীর্ঘস্থায়ী ফিকহি গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচলন স্পষ্ট করে।
আধুনিক ইসলামিক গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, এই আইনি প্রক্রিয়া মূলত ধর্মীয় শাস্তির চেয়ে বেশি ছিল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে রাষ্ট্র, ধর্ম ও নৈতিকতা ছিল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে যৌনতার যে কোনো ভিন্নতা রাষ্ট্রবিরোধী বা ধর্মবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিছু গবেষক যেমন খালেদ এল-রুয়াইহেব [27] দেখিয়েছেন, ইসলামি সমাজে প্রকৃত সমকামী আচরণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতো সামাজিক লজ্জা ও সম্মানরক্ষা। অর্থাৎ, সমকামিতা নিয়ে ভয় ও নিষেধাজ্ঞা মূলত সামাজিক রক্ষণশীলতা ও ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদের অংশ।
খিলাফত আমলে খলিফাদের প্রকাশ্য সমকামিতা
যদিও ইসলামী শরীয়তে সমকামিতার শাস্তি কঠোর ও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলা হয়েছে, ইতিহাসে দেখা যায় — খিলাফতের রাজদরবারে ঠিক বিপরীত প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। বহু খলিফা, আমির ও রাজপুরুষ নিজের প্রাসাদে প্রকাশ্যে পুরুষপ্রেমে লিপ্ত ছিলেন এবং তরুণ দাস বা “গেলমান” বা “আমরদ” (beardless youths)-এর প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ দেখাতেন। ইসলামী ইতিহাসবিদ আল-মাসউদী, আল-তাবারী, ইবন খাল্লিকান ও ইবন আল-জাওযী সহ বহু প্রাচীন লেখক তাঁদের গ্রন্থে এই ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করেছেন।
আব্বাসীয় খলিফা আল-আমিন (শাসনকাল ৮০৯–৮১৩ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত শাসক। আল-মাসউদী তাঁর Muruj al-Dhahab-এ লিখেছেন, “আল-আমিন নারীদের প্রতি অনাগ্রহী ছিলেন এবং সুদর্শন তরুণ দাসদের সঙ্গেই সময় কাটাতেন; তাদের তিনি ‘প্রিয়জন’ বলে ডাকতেন” [28]. ইবন আল-জাওযী তাঁর Al-Muntazam fi Tarikh al-Umam wal-Muluk-এ উল্লেখ করেছেন যে, আল-আমিনের প্রাসাদে শতাধিক তরুণ গায়ক ও দাস ছিল, যাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের গুজব ছড়িয়ে পড়ে [29]. আল-তাবারীর Tarikh al-Rusul wa al-Muluk-এও একই তথ্য পাওয়া যায়, যেখানে তিনি বলেন, “খলিফা তাঁর সভায় তরুণ দাসদের সঙ্গে কবিতা পাঠ করতেন এবং তাদের সৌন্দর্যের প্রশংসা করতেন” [30].
আরেক আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাসিম বিল্লাহ (শাসনকাল ৮৩৩–৮৪২) সম্পর্কে ইবন খাল্লিকান লিখেছেন যে, তিনি তুর্কি সৈন্যদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন এবং তাঁদের মধ্য থেকেই রাজপ্রাসাদের রক্ষীবাহিনী গঠন করেন [31]। আল-মাসউদীর বিবরণে দেখা যায়, তাঁর প্রিয় সৈন্য আফশিনের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা ছিল, যা প্রাসাদীয় রাজনীতির মূল বিষয় হয়ে ওঠে [32]. আধুনিক ইতিহাসবিদ Hugh Kennedy এই সম্পর্ককে “personal intimacy and political favoritism intertwined with homoerotic overtones” বলে বর্ণনা করেছেন [33].
ফাতেমীয় খলিফা আল-আমির ফি আহকমিল্লাহ (শাসনকাল ১১০১–১১৩০ খ্রিস্টাব্দ) সম্পর্কেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। মিশরের ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজী তাঁর al-Khitat গ্রন্থে লিখেছেন যে, “খলিফা যুবকদের প্রতি প্রবল আকৃষ্ট ছিলেন; তাঁর প্রাসাদে প্রায়শই নগ্ন নর্তক ও দাসদের নৃত্য আয়োজন হতো” [34]। এই সমকামী আচরণের কারণে প্রাসাদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে এবং পরবর্তীতে তিনি আততায়ী হামলায় নিহত হন।
আন্দালুসে উমাইয়া রাজবংশের খলিফাদের মধ্যেও সমকামিতার প্রবণতা স্পষ্ট দেখা যায়। কর্ডোভার খলিফা আল-হাকাম দ্বিতীয় (শাসনকাল ৯৬১–৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর প্রাসাদে এক তরুণ গায়ক “সান্দাল”-এর প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগ দেখাতেন, যাকে তিনি প্রায় স্ত্রীর মর্যাদা দিতেন [35]। আধুনিক ইতিহাসবিদ Reinhart Dozy লিখেছেন, “আল-হাকামের রাজসভায় পুরুষপ্রেম ছিল এক ধরণের রোমান্টিক ফ্যাশন, যা কবিতা, সংগীত ও রাজকীয় সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়” [36]।
এ সময়ের প্রখ্যাত কবি আবু নুয়াস (৭৫৬–৮১৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন আল-আমিনের রাজদরবারের ঘনিষ্ঠ। তাঁর কবিতায় পুরুষপ্রেম ও তরুণদের প্রতি যৌন আকর্ষণ প্রকাশ্যে বর্ণিত হয়েছে, যেমন—“হে তরুণ, তোর গালের গোলাপ আর ঠোঁটের মদে মত্ত আমি” [37]। আবু নুয়াসের এই সাহসী কবিতা ও আল-আমিনের সমর্থন মধ্যযুগীয় ইসলামী সভ্যতার অন্তর্গত বৈপরীত্যকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে—যেখানে শরীয়ত সমকামিতার জন্য মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেয়, অথচ রাজদরবারে সেটিই ছিল একধরনের বিলাসিতা ও সংস্কৃতি।
আরবি ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে খলিফা, রাজদরবার, গেলমান, আমরদ এবং পুরুষপ্রেমের এই বিবরণগুলো বারবার নথিবদ্ধ হয়েছে। শরীয়তে লওয়াতের জন্য হত্যা, রজম ও অন্যান্য কঠোর শাস্তি প্রতিষ্ঠিত থাকার পাশাপাশি শাসকশ্রেণির দরবারে পুরুষপ্রেম ও তরুণ পুরুষদের প্রতি যৌন আকর্ষণের সংস্কৃতি টিকে থাকা ইসলামী খিলাফতের আইন ও ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগের গভীর দ্বিচারিতা প্রকাশ করে।
আধুনিক শরিয়াভিত্তিক শাসনে লওয়াত ও সমকামিতার শাস্তি: বাস্তব কেস স্টাডি
লওয়াতের জন্য মৃত্যুদণ্ডের ধ্রুপদী ফিকহি বিধান শুধু মধ্যযুগীয় গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আধুনিক যুগেও শরিয়া প্রয়োগকারী রাষ্ট্র, সরকার ও সশস্ত্র ইসলামি শাসকগোষ্ঠী এই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে অথবা মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করেছে। কোথাও শিরশ্ছেদ, কোথাও ফাঁসি, কোথাও দেয়াল চাপিয়ে হত্যা, কোথাও ভবনের ছাদ থেকে নিক্ষেপ, আবার কোথাও রজম ও ক্রুশবিদ্ধ করার রায় পাওয়া যায়। নিচের ঘটনাগুলো অনুমান বা প্রচারণা নয়; Amnesty International, Human Rights Watch, United Nations, সরকারি প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নিজস্ব ঘোষণায় নথিবদ্ধ।
কেস স্টাডি: তালেবান আফগানিস্তান, ১৯৯৮ — দেয়াল চাপিয়ে মৃত্যুদণ্ড
১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে ফজলুর রহমান, আহমদ শাহ এবং আবদুল কাহির নামে তিন ব্যক্তিকে একটি তালেবান শরিয়া আদালত লওয়াতের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। ২৫ ফেব্রুয়ারি কান্দাহারের উত্তরে কোটাল মোরচায় হাজারো দর্শকের সামনে একটি যুদ্ধট্যাংক দিয়ে পাথরের দেয়াল তাদের ওপর ফেলে দেওয়া হয়। Amnesty International-এর নথি অনুযায়ী তিনজনই প্রথমে জীবিত ছিলেন; তালেবান নেতা মোল্লা মুহাম্মদ ওমর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের আধঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে রাখার নির্দেশ দেন। আধঘণ্টা পরও জীবিত থাকায় তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়; দুজন পরদিন মারা যান এবং তৃতীয় ব্যক্তি বেঁচে ছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। তালেবানের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম এই শাস্তিকে সরাসরি শরিয়া আদালতের রায় ও “শরিয়তি শাস্তি” হিসেবে বর্ণনা করেছিল। [38]
“were publicly put under a wall after a verdict of the Shari’a court”
বাংলা অনুবাদ: “শরিয়া আদালতের রায়ের পর তাদের প্রকাশ্যে একটি দেয়ালের নিচে রাখা হয়েছিল।”
এক মাসেরও কম সময় পরে একই পদ্ধতি আবার ব্যবহার করা হয়। ২২ মার্চ ১৯৯৮ হেরাতের বাসিন্দা আবদুল সামি, বয়স ১৮, এবং বিসমিল্লাহ, বয়স ২২—দুজনকে চার মাস আগে লওয়াতের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তালেবান শরিয়া আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। একটি কাঁচামাটির দেয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে বুলডোজার দিয়ে দেয়ালটি তাদের ওপর ফেলে দেয়া হয়। তালেবান-নিয়ন্ত্রিত Voice of Shari’a রেডিও নিজেই ঘোষণা করেছিল যে “শরিয়তি হদ্দ” দুই অভিযুক্তের ওপর কার্যকর করা হয়েছে এবং রায়টি মোল্লা ওমরের অনুমোদন পেয়েছিল। [39]
“Shari’a prescribed punishment … has been administered to two sodomites.”
বাংলা অনুবাদ: “দুই লওয়াতকারীর ওপর শরিয়তে নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে।”
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৯৯৯ সালের আফগানিস্তান মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৮ সালে লওয়াত বা সমকামী যৌনকর্মের অভিযোগে দেয়াল চাপিয়ে শাস্তি দেওয়ার অন্তত সাতটি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছিল এবং পাঁচজন এই পদ্ধতিতে মারা যায়। প্রতিবেদনে তালেবানের বিচারব্যবস্থাকে তাদের নিজস্ব “Islamic law”-এর ব্যাখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্রুত ও summary trial ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। [40]
“five persons reportedly were killed by this method in 1998.”
বাংলা অনুবাদ: “১৯৯৮ সালে এই পদ্ধতিতে পাঁচজন নিহত হয়েছে বলে রিপোর্ট করা হয়েছিল।”
কেস স্টাডি: সৌদি আরব, ২০০২ — তিন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ
১ জানুয়ারি ২০০২ সৌদি আরবের আসির প্রদেশের আবহা শহরে তিন সৌদি নাগরিক—আলি বিন হিত্তান বিন সাঈদ, মুহাম্মদ বিন সুলাইমান বিন মুহাম্মদ এবং মুহাম্মদ বিন খলিল বিন আবদুল্লাহ—কে প্রকাশ্যে তরবারি দিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় তাদের বিরুদ্ধে homosexual acts বা সমকামী যৌনকর্মের অভিযোগের পাশাপাশি আরও কয়েকটি অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ সমকামী যৌনকর্ম তাদের রাষ্ট্রীয় conviction-এর সরাসরি অংশ ছিল এবং শরিয়াভিত্তিক বিচারব্যবস্থায় তাদের প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়। [41]
“The three men … were publicly beheaded in Abha, Asir province.”
বাংলা অনুবাদ: “তিন ব্যক্তিকে আসির প্রদেশের আবহায় প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।”
কানাডার Immigration and Refugee Board-এর গবেষণা নথিতেও একই ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, তিন ব্যক্তি “sodomy, marriage among themselves, and inciting pedophilia”-র অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল এবং তাদের প্রকাশ্যে তরবারি দিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয়। একই নথিতে ২০০০ সালে সৌদি আরবে নয়জনকে “deviant sexual behaviour”-এর জন্য চাবুক মারার এবং আরও ছয়জনের মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ যৌন আচরণের সঙ্গে আংশিকভাবে সম্পর্কিত থাকার কথাও পাওয়া যায়। [42]
“The three men were beheaded by sword in public.”
বাংলা অনুবাদ: “তিন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে তরবারি দিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।”
কেস স্টাডি: ইরান, ২০১১ — লওয়াত আইনে তিন ব্যক্তির ফাঁসি
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরানের আহভাজের কারুন কারাগারে ছয়জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ISNA-র বরাত দিয়ে Iran Human Rights জানায়, তাদের মধ্যে তিনজন—শুধু আদ্যক্ষর M.T., T.T. এবং M.Ch. দিয়ে পরিচিত—ইরানি ইসলামী দণ্ডবিধির ১০৮ ও ১১০ ধারার অধীনে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তৎকালীন ১০৮ ধারায় lavat বা লওয়াতকে পুরুষে-পুরুষে যৌনসঙ্গম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এবং ১১০ ধারায় এর শাস্তি ছিল হত্যা; মৃত্যুদণ্ড কীভাবে কার্যকর করা হবে তা শরিয়া বিচারকের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগও ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশিত conviction-এ লওয়াতের মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ১০৮ ও ১১০ ধারা সরাসরি প্রয়োগ করা হয়েছিল। [43]
“Punishment for sodomy is killing; the Sharia judge decides on how to carry out the killing.”
বাংলা অনুবাদ: “লওয়াতের শাস্তি হত্যা; কীভাবে হত্যা করা হবে তা শরিয়া বিচারক নির্ধারণ করবেন।”
Human Rights Watch-এর ২০১২ World Report-ও নিশ্চিত করে যে, ২০১১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ISNA ছয় ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা দেয় এবং তাদের মধ্যে তিনজন ইরানের anti-sodomy laws-এর অধীনে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। [44]
“Three of the men were convicted under Iran’s anti-sodomy laws.”
বাংলা অনুবাদ: “তিন ব্যক্তি ইরানের লওয়াতবিরোধী আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।”
কেস স্টাডি: আইএসআইএস, ইরাক ২০১৫ — ভবন থেকে ফেলে হত্যা
আইএসআইএসের অধীনে লওয়াত বা সমকামিতার অভিযোগে উঁচু ভবন থেকে মানুষকে নিক্ষেপের বহু ঘটনা জাতিসংঘ সরাসরি যাচাই করেছে। UNAMI/OHCHR-এর ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ জুন মসুলে দুই তরুণ এবং একজন ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিকে alleged homosexual acts-এর অভিযোগে National Insurance Company ভবন থেকে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়। তাদের হত্যার আগে আইএসআইএসের স্বঘোষিত আদালতের রায় পড়ে শোনানো হয়েছিল। ২৭ জুন ফালুজায় আরও চার ব্যক্তিকে “sodomy”-র অভিযোগে শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন থেকে নিক্ষেপ করা হয়। জুলাই, আগস্ট ও অক্টোবরেও মসুলে একই পদ্ধতির আরও ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। [45]
“individuals murdered (by throwing them from buildings) by ISIL for being homosexual.”
বাংলা অনুবাদ: “সমকামী বলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইএসআইএস ভবন থেকে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছে।”
জাতিসংঘের UNITAD তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট পদ্ধতিগত pattern হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের factual findings অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উঁচু ভবনের ছাদে নিয়ে রায় পড়ে শোনানো হতো; এরপর নিচে ফেলে দেওয়া হতো বা নিজে নিচে হাঁটতে বাধ্য করা হতো। পতনে মৃত্যু না হলে আইএসআইএস সদস্যরা গুলি করত অথবা উপস্থিত জনতাকে পাথর মেরে হত্যা করতে বলত। এই পদ্ধতির সঙ্গে ইবন আব্বাসের নামে ধ্রুপদী ফিকহি সাহিত্যে সংরক্ষিত শাস্তির সরাসরি পদ্ধতিগত সাদৃশ্য রয়েছে: উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপ, এরপর পাথর মেরে হত্যা। [46]
“If the victim did not die from the fall … the crowd [would] stone him to death.”
বাংলা অনুবাদ: “পতনে ব্যক্তি মারা না গেলে … জনতাকে পাথর মেরে তাকে হত্যা করতে বলা হতো।”
কেস স্টাডি: হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন, ২০২৪ — রজম ও ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ডের রায়
২৩ জানুয়ারি ২০২৪ হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি আদালত ৩২ জন পুরুষের বিরুদ্ধে “sodomy” বা লওয়াতের অভিযোগে গণবিচার করে। Human Rights Watch আদালতের indictment, বিচারপ্রক্রিয়ার ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর তথ্য পরীক্ষা করে জানায়, নয়জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২৩ জনকে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়; তিনজনের জন্য প্রকাশ্য চাবুকের শাস্তিও ছিল। মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতির মধ্যে রজম ও crucifixion বা ক্রুশবিদ্ধকরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুতর due-process violation-এর কথাও HRW নথিবদ্ধ করেছে। [47]
“death sentences that include crucifixion and stoning”
বাংলা অনুবাদ: “মৃত্যুদণ্ডের রায়গুলোর মধ্যে ক্রুশবিদ্ধকরণ ও পাথর মেরে হত্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।”
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের Yemen Panel of Experts-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই বছরে সানায় নয়জনকে রজম ও ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড এবং ২৩ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ ইব্বে homosexuality-related charges-এর ভিত্তিতে আরও ১৩ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে কারাদণ্ড এবং ৩৫ জনকে আটক করার তথ্য Panel পেয়েছিল। [48]
“13 men were sentenced to death … on homosexuality-related charges.”
বাংলা অনুবাদ: “সমকামিতা-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ১৩ জন পুরুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।”
ইয়েমেনের দণ্ডবিধিতেও এই শাস্তির আইনি ভিত্তি স্পষ্ট। Human Rights Watch-এর Yemen country report অনুযায়ী Penal Code-এর ২৬৪ ধারায় অবিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পায়ুসঙ্গমের শাস্তি ১০০ চাবুক ও এক বছরের কারাদণ্ড, কিন্তু বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই ধারায় পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। [49]
“If married, the same article prescribes death by stoning.”
বাংলা অনুবাদ: “ব্যক্তি বিবাহিত হলে একই ধারায় পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।”
ধ্রুপদী বিধান থেকে আধুনিক প্রয়োগ: ধারাবাহিকতাটি কোথায়
এখানে ধারাবাহিকতাটি স্পষ্ট: কোরআনের লূত-কাহিনিতে পুরুষে পুরুষে যৌনকর্মের নৈতিক নিন্দা ও ধ্বংসের আখ্যান, হাদিসে “ফায়েল” ও “মাফউল বিহি” উভয়কে হত্যার নির্দেশ, সাহাবি ও ফকিহদের রজম, আগুনে পোড়ানো, দেয়াল চাপিয়ে হত্যা ও উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপের বিধান, এবং আধুনিক শরিয়াভিত্তিক শাসনে একই শ্রেণির যৌনকর্মের জন্য মৃত্যুদণ্ড ও সেইসব পদ্ধতির বাস্তব প্রয়োগ। সম্মতিমূলক সমলিঙ্গ যৌনকর্মকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখার এই ধর্মীয়-আইনি ধারণা কোনো মৃত মধ্যযুগীয় বিধান নয়; আধুনিক যুগেও এর প্রয়োগে মানুষ নিহত হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সম্মতিপূর্ণ সমলিঙ্গ যৌন সম্পর্কের জন্য মৃত্যুদণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। জীবন, গোপনীয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীনতার অধিকারের সঙ্গে এই শাস্তি সরাসরি সংঘর্ষে পড়ে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, বহু কেসে গোপন বিচার, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, পর্যাপ্ত আইনি প্রতিনিধিত্বের অভাব, অস্পষ্ট অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক কলঙ্ক—সবগুলো উপাদান একই সঙ্গে দেখা যায়। অর্থাৎ এখানে শুধু একটি নিষ্ঠুর substantive law নয়; অনেক ক্ষেত্রে তার সঙ্গে অন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়াও যুক্ত হয়েছে।
মানবাধিকার, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার আলোকে সমালোচনা
সমলিঙ্গ যৌন আকর্ষণকে নিজেই কোনো মানসিক রোগ বা বিকার হিসেবে গণ্য করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। American Psychiatric Association ১৯৭৩ সালে homosexuality-কে DSM-এর মানসিক রোগের শ্রেণি থেকে বাদ দেয়। World Health Organization ১৯৯০ সালে homosexuality-কে ICD-এর diagnostic category থেকে সরিয়ে দেয়; WHO-র ভাষায়, এই পরিবর্তন যৌন অভিমুখিতার বৈচিত্র্যকে রোগ হিসেবে দেখানোর পক্ষে empirical evidence না থাকার প্রতিফলন। [50] [51]
ধ্রুপদী ইসলামি ফিকহে যে কাজকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সেই সমলিঙ্গ আকর্ষণকে কোনো রোগ বলে স্বীকার করে না এবং আধুনিক বিশ্বের বড় অংশ সম্মতিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক সমলিঙ্গ যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবেও গণ্য করে না। ILGA World-এর ২০২৪ সালের বৈশ্বিক আইনি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ১৩১টি রাষ্ট্রে সম্মতিপূর্ণ সমলিঙ্গ যৌনকর্মের কোনো অপরাধীকরণ ছিল না; ৬২টি জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রে তখনও তা প্রত্যক্ষ বা কার্যত অপরাধ ছিল। সাতটি রাষ্ট্রে এর জন্য আইনে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত ছিল এবং আরও পাঁচটি রাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাব্য প্রয়োগ সম্পর্কে আইনি অনিশ্চয়তা ছিল। [52]
নৈতিক সমস্যাটিও সরাসরি। দুই সম্মতিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে সেখানে কেবল সেই সম্পর্কের কারণে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির জীবন, দেহ, সম্পত্তি বা স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ ঘটে না। তাই এটিকে হত্যা, ধর্ষণ বা সহিংসতার মতো victim-producing অপরাধের সঙ্গে একই শ্রেণিতে রেখে রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া harm principle-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে “অপরাধ” তৈরি হচ্ছে কোনো বাস্তব ভুক্তভোগীর ক্ষতি থেকে নয়, বরং একটি ধর্মীয় নৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে। সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে একজন মানুষকে রজম, শিরশ্ছেদ, আগুনে পোড়ানো, দেয়াল চাপিয়ে বা উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপ করে হত্যা করা জীবন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সমতা এবং নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি থেকে মুক্ত থাকার অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
উপসংহার
লওয়াতের শাস্তি নিয়ে ইসলামী উৎসগুলোর সামগ্রিক চিত্র অস্পষ্ট নয়। কোরআন পুরুষ কর্তৃক পুরুষের কাছে কামতৃপ্তির জন্য গমনকে ফাহিশা ও সীমালঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করে এবং লূতের কওমকে ঐশীভাবে ধ্বংস করার কাহিনি বারবার বর্ণনা করে। কোরআন নিজে মানবীয় আদালতের জন্য লওয়াতকারীর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ না করলেও, হাদিসে সেই পরবর্তী ধাপটি সরাসরি এসেছে: “যে কাজটি করে এবং যার সঙ্গে কাজটি করা হয়—উভয়কেই হত্যা করো।” ইবন আব্বাস থেকে অবিবাহিত লওয়াতকারীকেও রজম করার বক্তব্য এসেছে; তারই আরেকটি বর্ণনায় জনপদের সর্বোচ্চ ভবন থেকে মাথা নিচে করে ফেলে এরপর পাথর মারার শাস্তি পাওয়া যায়। আলি কর্তৃক রজম, আবু বকরের নির্দেশে আগুনে পোড়ানো, দেয়াল চাপিয়ে হত্যা, দুর্গন্ধযুক্ত স্থানে আটকে মৃত্যু পর্যন্ত রাখা এবং সরাসরি রজম—এই সমস্ত পদ্ধতি সাহাবি, সালাফ ও পরবর্তী ফকিহদের নামে ধ্রুপদী ইসলামি আইনি সাহিত্যে সংরক্ষিত হয়েছে।
ফিকহবিদদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট শাস্তি নিয়ে মতভেদ ছিল, কিন্তু সেই মতভেদকে লওয়াতের অপরাধীকরণ নিয়ে মৌলিক আপত্তি হিসেবে দেখানো ভুল। আবু হানিফার অবস্থানে নির্ধারিত হদ্দের বদলে তাযীর ও কারাবাস পাওয়া যায়; অন্যদিকে মালিকি, হাম্বলি এবং বহু শাফেয়ি ও অন্যান্য ফকিহের ধারায় রজম বা সরাসরি হত্যার মত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইবন তাইমিয়া বিবাহিত-অবিবাহিত নির্বিশেষে উভয় অংশগ্রহণকারীকে হত্যাকে সাহাবিদের সম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ইবনুল কাইয়্যিম আরও এগিয়ে লওয়াতকে হত্যার চেয়েও বড় “ফাসাদ” হিসেবে বর্ণনা করে passive অংশগ্রহণকারীকেও হত্যা করা তার জন্য নাকি বেঁচে থাকার চেয়ে উত্তম—এমন ভয়াবহ যুক্তি দিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে কোনো আধুনিক চরমপন্থী গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা নয়; মানুষের ব্যক্তিগত ও সম্মত যৌন আচরণকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তি দেওয়ার একটি সুগঠিত ধ্রুপদী ফিকহি ঐতিহ্য রয়েছে।
এই বিধানকে শুধু মধ্যযুগের বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো মৃত আইন বলাও তথ্যের সঙ্গে মেলে না। ১৯৯৮ সালে তালেবান শরিয়া আদালতের রায়ে আফগানিস্তানে লওয়াতের অভিযোগে মানুষকে দেয়াল চাপিয়ে হত্যা করা হয়েছে; ২০০২ সালে সৌদি আরবে homosexual acts-সহ একাধিক অভিযোগে তিন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে; ২০১১ সালে ইরানে anti-sodomy ধারার অধীনে দোষী ব্যক্তিদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে; ২০১৫ সালে আইএসআইএস মসুল ও ফালুজায় সমকামিতার অভিযোগে মানুষকে উঁচু ভবন থেকে নিক্ষেপ করেছে এবং পতনে মৃত্যু না হলে পাথর মারার পদ্ধতি ব্যবহার করেছে; ২০২৪ সালে হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনে লওয়াতের অভিযোগে রজম ও ক্রুশবিদ্ধকরণসহ মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। এই আধুনিক প্রয়োগগুলো দেখায়, সম্মতিপূর্ণ সমলিঙ্গ যৌনকর্মকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ধর্মীয়-আইনি কাঠামো আজও বাস্তবে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই আইনের নৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে যখন ধর্মীয় দাবিটিকে বাস্তব ক্ষতির মানদণ্ডে পরীক্ষা করা হয়। দুই সম্মতিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত যৌন সম্পর্ক নিজে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ওপর সহিংসতা সৃষ্টি করে না। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সমলিঙ্গ যৌন আকর্ষণকে মানসিক রোগ বলে স্বীকার করে না; American Psychiatric Association ১৯৭৩ সালে এবং World Health Organization ১৯৯০ সালে homosexuality-কে রোগের শ্রেণি থেকে সরিয়ে দিয়েছে। অথচ ধ্রুপদী শরিয়তি কাঠামো একটি victimless consensual act-এর জন্য মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়াকে বৈধতা দিয়েছে। যে আইনে কোনো বাস্তব ভুক্তভোগী ছাড়াই কেবল ধর্মীয় নৈতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কারণে মানুষকে রজম, শিরশ্ছেদ, আগুনে পোড়ানো, দেয়াল চাপিয়ে বা উঁচু স্থান থেকে নিক্ষেপ করে হত্যা করা যায়, সেই আইনকে ন্যায়বিচার বলা যায় না। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে ধর্মীয় কুসংস্কার ও যৌন নিয়ন্ত্রণকে প্রাণদণ্ডে রূপান্তর করার ব্যবস্থা।
সুতরাং ইসলামী শরীয়তে লওয়াতের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সমস্যাটি কোনো বিচ্ছিন্ন হাদিস, কোনো একটি মাজহাব বা কোনো আধুনিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অপব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। কোরআনিক নৈতিক নিন্দা, নবীর নামে বর্ণিত হত্যার নির্দেশ, সাহাবিদের নামে সংরক্ষিত শাস্তির নজির, ধ্রুপদী ফকিহদের আইনগত ব্যাখ্যা এবং আধুনিক শরিয়াভিত্তিক প্রয়োগ—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘ ও সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক নৈতিক ব্যর্থতা: দুই সম্মতিপূর্ণ মানুষের ব্যক্তিগত যৌন আচরণের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রকে তাদের দেহ ও জীবনের মালিক বানানো। মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং ক্ষতিভিত্তিক নৈতিকতার মানদণ্ডে এই বিধান ন্যায় নয়; এটি প্রমাণহীন ধর্মীয় নৈতিকতার ভিত্তিতে বৈধতা পাওয়া নির্মম রাষ্ট্রীয় সহিংসতা।
তথ্যসূত্রঃ
- যৌন বৈচিত্র্য ও মানবাধিকারঃ সমকামিতা কি আসলেই মানসিক রোগ নাকি স্বাভাবিক প্রকরণ? ↩︎
- সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৮০-৮৪ ↩︎
- সূরা আন-নামল ২৭:৫৪-৫৮ ↩︎
- সূরা আল-আনকাবূত ২৯:২৮-৩৫ ↩︎
- Persecution of homosexuals in the Palestinian autonomous areas ↩︎
- Iran defends execution of gay people ↩︎
- তাফসীরে মায়হারী, ৪র্থ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৫০৮-৫১১ ↩︎
- জামে আত-তিরমিজী ১৪৫৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৪৪৬২ — আলবানী: হাসান সহিহ ↩︎
- সুনান ইবন মাজাহ ২৫৬১ ↩︎
- শাইখ মুহাম্মদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত Islam Question & Answer, প্রশ্ন ৩৮৬২২: عقوبة اللواط ↩︎
- ইবন তাইমিয়া, আস-সিয়াসাহ আশ-শারইয়্যাহ ফি ইসলাহির রাঈ ওয়াল রাঈয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৩৮ ↩︎
- মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবা, কিতাবুল হুদুদ — Islamweb ↩︎
- দুরার আস-সানিয়্যাহ — ইবন হাজার: إسناده صحيح ↩︎
- দুরার আস-সানিয়্যাহ: ইবন আব্বাসের বর্ণনার সনদ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৪৪৬৩ — আলবানী: صحيح الإسناد موقوف ↩︎
- ইবন আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, কিতাবুল হুদুদ ↩︎
- বায়হাকি, আস-সুনান আল-কুবরা, বাব মা জা’আ ফি হাদ্দিল লূতি — Islamweb ↩︎
- ইবন আরাবি, আহকামুল কুরআন — Islamweb ↩︎
- আল-খারাইতি, মাসাওয়ি আল-আখলাক — Islamweb ↩︎
- المكتبة الشاملة — ابن القيم، الداء والدواء / الجواب الكافي ↩︎
- ফাতহুল কাদীর, কিতাবুল হুদুদ — Islamweb ↩︎
- আদওয়া আল-বায়ান: عقوبة من ارتكب فاحشة قوم لوط — Islamweb ↩︎
- মানসুর আল-বুহুতি, শারহ মুনতাহা আল-ইরাদাত, কিতাবুল হুদুদ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৪৬ ↩︎
- মানসুর আল-বুহুতি, শারহ মুনতাহা আল-ইরাদাত, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৫০ ↩︎
- ইবনুল কাইয়্যিম, আল-জাওয়াব আল-কাফি লিমান সাআলা আনিদ-দাওয়া আশ-শাফি — فصل عقوبة اللواط ↩︎
- Harvard University, Before Homosexuality in the Arab-Islamic World, 1500–1800 ↩︎
- Muruj al-Dhahab, vol. 4, p. 61 ↩︎
- Al-Muntazam, vol. 9, p. 28 ↩︎
- Tarikh al-Tabari, vol. 31, p. 28–29 ↩︎
- Ibn Khallikan, Wafayat al-A’yan, vol. 5, p. 241 ↩︎
- Muruj al-Dhahab, vol. 4, p. 102 ↩︎
- Kennedy, The Prophet and the Age of the Caliphates, 2004, p. 165 ↩︎
- al-Maqrizi, al-Khitat, vol. 2, p. 148 ↩︎
- Ibn Hayyan, al-Muqtabis fi Tarikh al-Andalus, vol. 5, p. 312 ↩︎
- Dozy, Spanish Islam: A History of the Moslems in Spain, 1913, p. 458 ↩︎
- Abu Nuwas: The Libertine Poet of Baghdad, Philip Kennedy, 2005, p. 72 ↩︎
- Amnesty International: Afghanistan — Flagrant Abuse of the Right to Life and Dignity ↩︎
- Amnesty International, Afghanistan, April 1998 ↩︎
- U.S. Department of State: Afghanistan Human Rights Report 1999 ↩︎
- Amnesty International: Saudi Arabia — ‘Sexual orientation’ executions condemned ↩︎
- Immigration and Refugee Board of Canada: Treatment and Legal Penalties for Homosexuals in Saudi Arabia ↩︎
- Iran Human Rights: Three Men Were Executed Convicted of Sodomy ↩︎
- Human Rights Watch, World Report 2012: Iran ↩︎
- UNAMI/OHCHR: Report on the Protection of Civilians in Iraq, 1 May–31 October 2015 ↩︎
- UNITAD: ISIL Crimes Committed Against LGBTQ Individuals — Factual Findings ↩︎
- Human Rights Watch: Yemen — Houthis Sentence Men to Death, Flogging ↩︎
- United Nations Security Council, Panel of Experts on Yemen, S/2024/731 ↩︎
- Human Rights Watch, World Report 2024: Yemen ↩︎
- American Psychiatric Association: Removal of Homosexuality from the DSM in 1973 ↩︎
- World Health Organization: SOGIESC FAQ — homosexuality removed from the ICD in 1990 ↩︎
- ILGA World, Laws on Us: A Global Overview, 2024 ↩︎

