সারসংক্ষেপ
ইসলামে দাসদাসীকে প্রহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম, এই বহুল প্রচারিত দাবি ইসলামি উৎস, সাহাবিদের আচরণ এবং ধ্রুপদী ফিকহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলামের নিজস্ব আইনতাত্ত্বিক কাঠামোয় নবীর মৌন সম্মতি বা তাকরীর শরয়ি দলিল হিসেবে গণ্য হয়; একইভাবে সাহাবি ও খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলও ইসলামি আইন ও ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই উৎসগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, দাসদাসীকে শারীরিকভাবে শাসনের ক্ষমতাকে ইসলাম বিলোপ করেনি; বরং সেই ক্ষমতার প্রয়োগে কিছু সীমা নির্ধারণ করেছে।
হাদিসে দাসকে মারার সময় মুখে আঘাত না করার নির্দেশ রয়েছে, স্ত্রীকে “দাসীর মতো” প্রহার না করতে বলা হয়েছে, এবং মুহাম্মদের সামনেই আবু বকর নিজের দাসকে প্রহার করলে মুহাম্মদ তা দেখেছেন, মৃদু হেসেছেন এবং নিষেধ করেননি। ইসলামের নিজস্ব উসূল অনুযায়ী এই তাকরীর কাজটির শরয়ি বৈধতারই প্রমাণ। একইভাবে আলীর হাতে আয়িশার দাসী বারীরাকে সত্য বলানোর জন্য “ভীষণ প্রহার” করার বর্ণনা এবং উমরের হাতে দাসীকে পোশাকের কারণে প্রহার করার বিবরণও ইসলামি ঐতিহ্যে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে দাসপ্রহার কোনো ব্যতিক্রমী বা ইসলামবহির্ভূত অপব্যবহার ছিল—এমন দাবি টেকে না।
ধ্রুপদী ফিকহ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। ইবনে কুদামার মতো ফকিহ সরাসরি বলেছেন, দাস বা দাসী অপরাধ করলে মালিক তিরস্কার ও হালকা প্রহারের মাধ্যমে তাদের শাসন করতে পারে। অন্যদিকে অন্যায় প্রহারের পরে দাসকে মুক্ত করার কথা হাদিসে থাকলেও ফকিহদের সাধারণ সিদ্ধান্ত ছিল—এ মুক্তি বাধ্যতামূলক নয়, বরং মুস্তাহাব। এমনকি প্রচণ্ড প্রহার, আগুনে পোড়ানো বা অঙ্গহানীর ক্ষেত্রেও দাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্ত হয়ে যাবে কি না, সে প্রশ্নে ফকিহদের মতভেদ ছিল। অর্থাৎ এখানে দাসের ওপর শারীরিক শাস্তির অধিকার বিলোপ করা হয়নি; বরং তার মাত্রা, পদ্ধতি ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
সুতরাং বাস্তব চিত্রটি হলো: ইসলাম দাসপ্রহার নিষিদ্ধ করেনি; ইসলাম মাত্রাতিরিক্ত দাসপ্রহারকে নিয়ন্ত্রিত করেছে। “মুখে নয়”, “অতিরিক্ত নয়”, “বিনা কারণে নয়”, “হালকা প্রহার”—এসব ভাষা সরাসরি হারাম বা নিষেধাজ্ঞার ভাষা নয়; এগুলো একটি বিদ্যমান শারীরিক শাস্তির ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার ভাষা। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের মালিক হবে, তার শ্রম, চলাফেরা ও শরীরের ওপর কর্তৃত্ব রাখবে, এবং প্রয়োজন বা শাসনের নামে তাকে প্রহার করতে পারবে—এই নৈতিক কাঠামোটিই ইসলামি দাসপ্রথার মৌলিক সমস্যা। কয়েকটি সীমাবদ্ধতা সেই কাঠামোকে মানবিক করে না; বরং প্রমাণ করে যে ব্যবস্থাটি ছিল নিয়ন্ত্রিত দাসপ্রথা, নিষিদ্ধ দাসপ্রথা নয়।

ভূমিকা
ইসলামি দাসপ্রথাকে আধুনিক নৈতিকতার সামনে গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি পরিচিত কৌশল হলো দাসপ্রথার মৌলিক বাস্তবতাকে আড়াল করে কিছু বিচ্ছিন্ন সদাচরণমূলক নির্দেশকে সামনে আনা। বলা হয়, ইসলাম নাকি দাসদাসীদের এতটাই সুরক্ষা দিয়েছে যে তাদের সামান্য প্রহার করাও নিষিদ্ধ ছিল; এমনকি কোনো মালিক দাসকে আঘাত করলেই তাকে মুক্ত করে দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে যেত। এই বক্তব্য ইসলামি মূল উৎস ও ধ্রুপদী ফিকহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে মূল প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল: ইসলাম কি দাসদাসীর ওপর মালিকের শারীরিক শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতাকেই নিষিদ্ধ করেছিল, নাকি সেই ক্ষমতা বহাল রেখে তার কিছু সীমা নির্ধারণ করেছিল? এই দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কাউকে মুখে না মারতে বলা, বিনা অপরাধে বা প্রচণ্ডভাবে না মারতে বলা কিংবা অন্যায় প্রহারের পরে তাকে মুক্ত করা উত্তম বলা—কোনোটিই দাসকে প্রহার করার অধিকার বিলোপের সমান নয়। বরং এগুলো এমন একটি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণমূলক বিধান, যে ব্যবস্থায় একজন মানুষ আরেকজন মানুষের মালিক এবং মালিক নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার ওপর শারীরিক শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে।
সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন হাদিস, ফিকহি ব্যাখ্যা এবং সাহাবিদের আচরণ পাশাপাশি রাখা হয়। সেখানে দেখা যায়, দাসপ্রহারকে সর্বাংশে হারাম ঘোষণা করা হয়নি; বরং কোথায় মারা যাবে না, কতটা মারা যাবে, কোন প্রহার অন্যায়, অন্যায় প্রহারের পরে মুক্ত করা ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব—এসব নিয়েই আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ আলোচনার ভিত্তিই ছিল দাসের ওপর মালিকের শাস্তিমূলক কর্তৃত্বের অস্তিত্ব।

“দাসকে প্রহার নিষিদ্ধ” নয়, বরং প্রহারের সীমা নির্ধারণ
দাসপ্রহার সম্পর্কে ইসলামি উৎসের ভাষা লক্ষ্য করলে প্রথমেই একটি মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ে। সহীহ বুখারীতে দাসকে মারার ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ নির্দেশটি “দাসকে মারবে না” নয়; নির্দেশটি হলো মারার পরিস্থিতিতে মুখে আঘাত না করা। সহীহ বুখারীর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের শিরোনামই হচ্ছে—দাসকে মারলে তার মুখ এড়িয়ে চলতে হবে। বুখারী ২৫৫৯-এর মূল হাদিসে সাধারণভাবে মারধর বা সংঘর্ষের সময় মুখ এড়িয়ে চলার নির্দেশ এসেছে, কিন্তু বুখারী নিজেই সেই হাদিসকে “দাসকে মারলে মুখ এড়িয়ে চলবে” শিরোনামের অধীনে স্থাপন করেছেন। সহীহ মুসলিম ২৬১২ এবং সুনান আবু দাউদ ৪৪৯৩-তেও মুখে আঘাত এড়িয়ে চলার একই সাধারণ নির্দেশ পাওয়া যায় [1] [2] [3]।
কোনো আঘাতের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিষিদ্ধ হওয়া এবং সব ধরনের প্রহার নিষিদ্ধ হওয়া এক বিষয় নয়। সহিহ বুখারীর অধ্যায়ের শিরোনামে দাসকে প্রহার করার সময় মুখ এড়িয়ে চলার নির্দেশ রয়েছে; মূল হাদিসে মারধর বা সংঘর্ষের সময় মুখে আঘাত না করার কথা বলা হয়েছে। মুখে আঘাতের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও দাসের শরীরের অন্য স্থানে শাসনমূলক প্রহারের অনুমোদন ধ্রুপদি ফিকহে বহাল রয়েছে। ফলে মুখে আঘাত না করার বিধানটি মালিকের শারীরিক শাস্তির ক্ষমতা বিলোপ করেনি; বরং প্রহারের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে।
বাংলা বুখারী সংস্করণের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের শিরোনামে রয়েছে: “দাসদের মারধোর করা এবং আমার ক্রীতদাস ও আমার বাঁদী এরূপ বলা মাকরূহ।” নিচের হাদিসটির মূল বক্তব্য দাস ও মালিকের সম্বোধনসংক্রান্ত। অধ্যায়ের আরবি শিরোনাম ও ইবনে হাজারের ব্যাখ্যায় দাসদের ওপর ঔদ্ধত্য এবং সম্বোধনের ভাষা আলোচিত হয়েছে। আর দাসকে প্রহার করার সময় মুখ এড়িয়ে চলার নির্দেশ বুখারির পৃথক অধ্যায়ে রয়েছে। এই দুটি অধ্যায়ের বক্তব্যের সঙ্গে শাসনমূলক প্রহারের প্রত্যক্ষ ফিকহি বিধান যুক্ত হয়ে মালিকের কর্তৃত্ব ও তার প্রয়োগসীমার চিত্র প্রকাশ করে। [4]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৪৯/ ক্রীতদাস আযাদ করা
পরিচ্ছেদঃ ৪৯/১৭. দাসদের মারধোর করা এবং আমার ক্রীতদাস ও আমার বাঁদী এরূপ বলা মাকরূহ।
২৫৫২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন এমন কথা না বলে ‘‘তোমার প্রভুকে আহার করাও’’ ‘‘তোমার প্রভুকে অযু করাও’’ ‘‘তোমার প্রভুকে পান করাও’’ আর যেন (দাস ও বাঁদীরা) এরূপ বলে, ‘‘আমার মনিব’’ ‘আমার অভিভাবক’, তোমাদের কেউ যেন এরূপ না বলে ‘‘আমার দাস, আমার দাসী’’। বরং বলবে- ‘আমার বালক’ ‘আমার বালিকা’ ‘আমার খাদিম’। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৬৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৩৮৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
ইবনে হাজার আল-আসকালানি ফাতহুল বারি-তে অধ্যায়ের “তাতাওয়ুল” শব্দের অর্থ করেছেন দাসদের ওপর নিজেকে উঁচু মনে করা এবং সে বিষয়ে সীমা অতিক্রম করা। “মাকরূহ” বলতে তিনি এখানে কারাহাতে তানযিহ বুঝিয়েছেন—হারাম ঘোষণার স্তরের নিচে অপছন্দনীয়তা। তাঁর পূর্ণ ব্যাখ্যাটি হলো: [5]
قوله: (باب كراهية التطاول على الرقيق) أي الترفع عليهم، والمراد مجاوزة الحد في ذلك، والمراد بالكراهة كراهة التنزيه.
বাংলা অনুবাদ:
তাঁর বক্তব্য: “দাসদের ওপর ঔদ্ধত্য প্রদর্শন অপছন্দনীয় হওয়ার অধ্যায়”—অর্থাৎ তাদের ওপর নিজেকে উঁচু মনে করা। এখানে উদ্দেশ্য হলো এ ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করা। আর অপছন্দনীয়তা বলতে কারাহাতে তানযিহ বোঝানো হয়েছে।
বাংলা শিরোনামের “মারধোর” শব্দে আরবি মূলের ঔদ্ধত্য ও সীমালঙ্ঘনের অর্থটি যথাযথভাবে প্রকাশ পায়নি। ইবনে হাজারের ব্যাখ্যায় এই অধ্যায়ের বিষয় হলো মালিকের আচরণগত উচ্চম্মন্যতা। মানুষকে নিজের অধীনস্থ সম্পত্তি হিসেবে রাখা এবং তার সঙ্গে কথাবার্তায় আত্মম্ভরিতা কমানোর নির্দেশ একই কাঠামোয় উপস্থিত। সম্বোধনের ভাষা ও প্রকাশ্য আচরণ নিয়ন্ত্রণ করেও মালিকানা, শ্রম আদায় এবং শাসনের ক্ষমতা বহাল থাকে। পরের অধ্যায়ে মুখে আঘাত এড়িয়ে চলার নির্দেশ এবং পরবর্তী ফিকহে তিরস্কার ও প্রহারের প্রত্যক্ষ অনুমতি সেই শারীরিক কর্তৃত্বের প্রয়োগসীমা নির্ধারণ করেছে।
Manumission of Slaves
(20)Chapter: If somebody beats a slave, he should avoid his face.(20)باب إِذَا ضَرَبَ الْعَبْدَ فَلْيَجْتَنِبِ الْوَجْهَ
Narrated Abu Huraira:
The Prophet (ﷺ) said, “If somebody fights (or beats somebody) then he should avoid the face.”
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا ابْنُ وَهْبٍ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ، قَالَ وَأَخْبَرَنِي ابْنُ فُلاَنٍ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَحَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ هَمَّامٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” إِذَا قَاتَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَجْتَنِبِ الْوَجْهَ ”.
Reference : Sahih al-Bukhari 2559
In-book reference : Book 49, Hadith 41
USC-MSA web (English) reference : Vol. 3, Book 46, Hadith 734
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বৈপরীত্যও রয়েছে। একজন মানুষকে কেনাবেচাযোগ্য সম্পত্তি, উত্তরাধিকারযোগ্য মালিকানাধীন ব্যক্তি ও বাধ্যতামূলক শ্রমদাতা হিসেবে রেখে তাকে “আমার দাস” না বলে “আমার বালক” বা “আমার খাদিম” বলতে শেখানো দাসত্বের বাস্তবতা পরিবর্তন করে না। ভাষা কোমল করলেই মালিকানা বিলুপ্ত হয় না। একটি নিপীড়নমূলক প্রতিষ্ঠানের terminology ভদ্র করা আর সেই প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা এক জিনিস নয়।
স্ত্রীকে “ক্রীতদাসীর ন্যায়” প্রহার: তুলনাটিই অনেক কিছু প্রকাশ করে
দাসপ্রহারের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে স্ত্রী-প্রহারসংক্রান্ত হাদিসেও স্পষ্ট সাক্ষ্য রয়েছে। মুহাম্মদ পুরুষদের স্ত্রীকে ‘ক্রীতদাসীর ন্যায়’ বা ‘গোলামের মতো’ প্রহার না করতে বলেছেন, কারণ দিনের শেষে সেই স্ত্রীর সঙ্গে আবার যৌনসম্পর্ক করতে হবে। দাসীর মতো প্রহার করার উপমায় দাসের ওপর শারীরিক নির্যাতন একটি পরিচিত আচরণ ও তুলনার মানদণ্ড হিসেবে উপস্থিত। স্ত্রী-প্রহারের পৃথক আইনগত আলোচনা রয়েছে অন্য প্রবন্ধে। [6]
“স্ত্রীকে গোলাম/দাসীর মতো পেটাবে না”—এই তুলনায় দাসপ্রহার একটি পরিচিত সামাজিক আচরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তুলনাটি দাসপ্রহারকে নিষিদ্ধ করছে না; বরং স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার করার তীব্রতা ও তার পরবর্তী যৌনসম্পর্কের অসঙ্গতি তুলে ধরছে। দাসপ্রহার এতটাই পরিচিত ছিল যে, তার মাত্রাকে স্ত্রী-প্রহারের তুলনামূলক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। এই ভাষা দাসের ওপর মালিকের শারীরিক কর্তৃত্বের সামাজিক বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। [7]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ – স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪২-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু যাম্’আহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন ক্রীতদাসীর ন্যায় স্ত্রীকে না মারে (অত্যাচার না করা হয়), অথচ দিনের শেষেই তার সাথে সহবাস করে।
অপর বর্ণনায় আছে- তোমাদের কেউ যেন ইচ্ছা করে স্ত্রীকে ক্রীতদাসীর ন্যায় মারমুখো না হয়, হয়তো দিন শেষে তার সাথে সহবাস করতে চাইবে; আর এতে সে অনাগ্রহ প্রকাশ করবে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বায়ু নির্গত হওয়ায় হাসি-ঠাট্টাচ্ছলের কারণে উপদেশ করলেন, যে কাজ নিজে কর অন্যের সে কাজে তোমরা কেন হাসবে! (বুখারী ও মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৪৯৪২, মুসলিম ১৪৭০।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু যাম‘আহ (রাঃ)
একই বক্তব্য সহীহ বুখারীতেও একাধিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। বুখারী ৫২০৪-এ স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার করে পরে একই দিনে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করার অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে; বুখারী ৪৯৪২ এবং ৬০৪২-তেও একই তুলনার বিভিন্ন পাঠ রয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন পরবর্তী গ্রন্থের ভাষা নয়; বুখারীর নিজস্ব হাদিস-কর্পাসেই “slave-like beating” একটি সুস্পষ্ট তুলনামূলক ধারণা হিসেবে উপস্থিত।
দারুস সালাম প্রকাশিত মুহাম্মদ মুহসিন খানের আরবি–ইংরেজি বুখারী সংস্করণের সংশ্লিষ্ট পাতাতেও দাসকে প্রহার করার সময় মুখ এড়িয়ে চলার অধ্যায়শিরোনাম ও মূল বর্ণনা মুদ্রিত রয়েছে। [8]

আরও একটি সংকলনে একই হাদিসের ভাষা সরাসরি “গোলামের মত প্রহার” হিসেবে এসেছে। আবারও লক্ষ্য করার বিষয় হলো, সমালোচনাটি দাসপ্রহারকে বিলোপ করার জন্য নয়; স্ত্রীকে সেই মাত্রায় প্রহার করে পরে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করার অসঙ্গতি নিয়ে। [9]
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৮ঃ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৫. স্ত্রীদের হক বণ্টন – স্ত্রীকে অধিক প্ৰহার করা নিষেধ
১০৬৪। ’আবদুল্লাহ বিন যাম’আহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্ৰহার করো না।[1]
[1] বুখারী ৫২০৪, ৩৩৭৭, ৫৯৪২, ৬০৪২, মুসলিম ২৮৫৫, তিরমিযী ৩৩৪৩, ইবনু মাজাহ ১৯৮৩, আহমাদ ১৫৭৮৮, দারেমী ২২২০। পূর্ণাঙ্গ হাদীসটি হচ্ছেঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لا يجلد أحدكم امرأته جلد العبد ثم يجامعها في آخر اليوم তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্রহার করো না। কেননা, দিনের শেষে তার সঙ্গে তো মিলিত হবে। ইমাম হাইসামী তাঁর মাজমাউয যাওযায়েদ ৫/৭ গ্রন্থে বলেন, এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে হাজ্জাজ বিন আরত্বআ নামক বর্ণনাকারী রয়েছে সে মুদাল্লিস।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু যাম‘আহ (রাঃ)
বুখারির মূল আরবি পাঠ: প্রহার ও একই দিনের সহবাস
বুখারির মূল আরবি পাঠে ব্যবহৃত হয়েছে «جَلْدَ الْعَبْدِ»—দাসকে বেত্রাঘাত করার মতো বেত্রাঘাত। এখানে দাসের ওপর প্রহার একটি পরিচিত মাত্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার সঙ্গে স্ত্রীর ওপর প্রহারের তুলনা করা হচ্ছে। বাক্যটির পরের অংশে একই দিনের শেষে স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের কথা এসেছে। একজন পুরুষ প্রথমে স্ত্রীকে দাসের মতো পেটাবে, তারপর সেই নারীর সঙ্গেই যৌনঘনিষ্ঠতা চাইবে—এই আচরণের অসংগতিকে সামনে আনা হয়েছে। দাসের শরীরের ওপর মালিকের প্রহারকে তুলনার মানদণ্ড বানানোর মধ্যেই অধীনস্থ মানুষের ওপর সহিংসতার স্বীকৃত সামাজিক অবস্থান প্রকাশিত। [10]
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ هِشَامٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَمْعَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «لاَ يَجْلِدُ أَحَدُكُمُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ، ثُمَّ يُجَامِعُهَا فِي آخِرِ الْيَوْمِ».
বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ আমাদের বর্ণনা করেছেন; সুফিয়ান তাঁকে বর্ণনা করেছেন; তিনি হিশাম থেকে, হিশাম তাঁর পিতা থেকে এবং তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে যামআ থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী বলেছেন: তোমাদের কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসকে বেত্রাঘাত করার মতো বেত্রাঘাত না করে, তারপর দিনের শেষে তার সঙ্গে সহবাস করে।
এই তুলনায় স্ত্রী ও দাসের জন্য শারীরিক আচরণের দুটি স্তর তৈরি হয়েছে। দাসকে যেভাবে পেটানো হয়, স্ত্রীকে সেভাবে পেটানো অনুচিত; স্ত্রীর সঙ্গে পরবর্তী ঘনিষ্ঠতার সম্পর্কটি সেই আপত্তির ব্যাখ্যায় এসেছে। দাসের ক্ষেত্রে একই ঘনিষ্ঠতার প্রশ্ন তোলা হয়নি। ফলে প্রহারে আক্রান্ত মানুষের যন্ত্রণা এখানে সমান মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে বিচার পায়নি; ব্যক্তিটি স্ত্রী, না মালিকানাধীন দাস—তার ওপর আচরণের মাত্রা নির্ধারিত হচ্ছে। একজন মানুষের শরীরকে অন্য মানুষের শাসনের ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করার পর সেই শরীরে কতটা আঘাত করা যাবে, তা সম্পর্ক ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী আলাদা করা হয়েছে।
দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গটিও গুরুত্বপূর্ণ। আঘাতপ্রাপ্ত নারী ভয়, অপমান ও বিরাগ অনুভব করতে পারেন; অথচ প্রহারকারী পুরুষ একই দিনের শেষে তাঁর কাছেই যৌনসঙ্গ চাইছেন। হাদিসের ভাষ্যে এই বিরাগকে স্বীকার করা হয়েছে। সেই স্বীকৃতির পাশাপাশি দাসকে কঠোরভাবে প্রহারের অনুমতি নির্ণয় করেছেন পরবর্তী ভাষ্যকারেরা। ফলে প্রহৃত মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়া জানা থাকা এবং দাসের ওপর শাস্তিমূলক সহিংসতাকে অনুমোদন করা—দুটিই একই ব্যাখ্যার মধ্যে উপস্থিত। দাসের শরীর ও অনুভূতির মূল্য এখানে তার মালিকানাধীন পরিচয়ের অধীন হয়ে পড়ে।
দাসীর মতো স্ত্রীকে প্রহার না করার পৃথক বর্ণনা
লাকিত ইবনে সাবিরার বর্ণনায় একই তুলনা একটি নির্দিষ্ট দাম্পত্য প্রশ্নের উত্তরে এসেছে। লাকিত নিজের স্ত্রীর অশোভন কথাবার্তার অভিযোগ করলে মুহাম্মদ প্রথমে তাঁকে তালাক দেওয়ার কথা বলেন। লাকিত দাম্পত্য সম্পর্ক ও সন্তানের কথা জানালে স্ত্রীকে উপদেশ দেওয়ার নির্দেশ আসে। এরপর বলা হয়, নিজের দাসীকে যেভাবে প্রহার করা হয়, স্ত্রীকে সেভাবে প্রহার করা যাবে না। এখানে «أُمَيَّتَكَ» শব্দটি নিজের মালিকানাধীন দাসীকেই নির্দেশ করছে। একজন পুরুষের নিজের দাসীকে প্রহারের আচরণকে স্ত্রীপ্রহারের তুলনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [11]
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، فِي آخَرِينَ، قَالُوا حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سُلَيْمٍ، عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ كَثِيرٍ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ لَقِيطِ بْنِ صَبْرَةَ، عَنْ أَبِيهِ، لَقِيطِ بْنِ صَبْرَةَ قَالَ: كُنْتُ وَافِدَ بَنِي الْمُنْتَفِقِ، أَوْ فِي وَفْدِ بَنِي الْمُنْتَفِقِ، إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم. قَالَ: فَلَمَّا قَدِمْنَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَلَمْ نُصَادِفْهُ فِي مَنْزِلِهِ، وَصَادَفْنَا عَائِشَةَ أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ. قَالَ: فَأَمَرَتْ لَنَا بِخَزِيرَةٍ فَصُنِعَتْ لَنَا. قَالَ: وَأُتِينَا بِقِنَاعٍ، وَلَمْ يَقُلْ قُتَيْبَةُ الْقِنَاعَ، وَالْقِنَاعُ الطَّبَقُ فِيهِ تَمْرٌ. ثُمَّ جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: «هَلْ أَصَبْتُمْ شَيْئًا أَوْ أُمِرَ لَكُمْ بِشَىْءٍ؟». قَالَ: قُلْنَا نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ: فَبَيْنَا نَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم جُلُوسٌ إِذْ دَفَعَ الرَّاعِي غَنَمَهُ إِلَى الْمُرَاحِ، وَمَعَهُ سَخْلَةٌ تَيْعَرُ. فَقَالَ: «مَا وَلَّدْتَ يَا فُلاَنُ؟». قَالَ: بَهْمَةً. قَالَ: «فَاذْبَحْ لَنَا مَكَانَهَا شَاةً». ثُمَّ قَالَ: لاَ تَحْسِبَنَّ، وَلَمْ يَقُلْ لاَ تَحْسَبَنَّ، «أَنَّا مِنْ أَجْلِكَ ذَبَحْنَاهَا. لَنَا غَنَمٌ مِائَةٌ لاَ نُرِيدُ أَنْ تَزِيدَ، فَإِذَا وَلَّدَ الرَّاعِي بَهْمَةً ذَبَحْنَا مَكَانَهَا شَاةً». قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي امْرَأَةً وَإِنَّ فِي لِسَانِهَا شَيْئًا، يَعْنِي الْبَذَاءَ. قَالَ: «فَطَلِّقْهَا إِذًا». قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لَهَا صُحْبَةً وَلِي مِنْهَا وَلَدٌ. قَالَ: «فَمُرْهَا»، يَقُولُ عِظْهَا، «فَإِنْ يَكُ فِيهَا خَيْرٌ فَسَتَفْعَلُ، وَلاَ تَضْرِبْ ظَعِينَتَكَ كَضَرْبِكَ أُمَيَّتَكَ». فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَخْبِرْنِي عَنِ الْوُضُوءِ. قَالَ: «أَسْبِغِ الْوُضُوءَ وَخَلِّلْ بَيْنَ الأَصَابِعِ وَبَالِغْ فِي الاِسْتِنْشَاقِ إِلاَّ أَنْ تَكُونَ صَائِمًا».
বাংলা অনুবাদ:
কুতাইবা ইবনে সাঈদসহ কয়েকজন বর্ণনা করেছেন: ইয়াহইয়া ইবনে সুলাইম তাঁদের বর্ণনা করেছেন; তিনি ইসমাঈল ইবনে কাসির থেকে, তিনি আসিম ইবনে লাকিত ইবনে সাবিরা থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা লাকিত ইবনে সাবিরা থেকে বর্ণনা করেছেন। লাকিত বলেন: আমি বনি মুনতাফিকের প্রতিনিধি ছিলাম, অথবা বনি মুনতাফিকের প্রতিনিধিদলের মধ্যে ছিলাম, যারা আল্লাহর রাসুলের কাছে এসেছিল। আমরা তাঁর কাছে এসে তাঁকে বাড়িতে পেলাম না; সেখানে মুমিনদের মা আয়িশাকে পেলাম। তিনি আমাদের জন্য খাজিরা নামের খাবার প্রস্তুতের নির্দেশ দিলেন এবং তা তৈরি করা হলো। আমাদের কাছে একটি খেজুরের থালাও আনা হলো। কুতাইবা ‘কিনা’ শব্দটি বলেননি; ‘কিনা’ হলো খেজুর রাখা থালা। এরপর আল্লাহর রাসুল এসে বললেন: তোমরা কিছু খেয়েছ, অথবা তোমাদের জন্য কিছু দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি? আমরা বললাম: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল। আমরা তাঁর সঙ্গে বসে থাকা অবস্থায় রাখাল তার ভেড়াগুলোকে বিশ্রামের জায়গায় নিয়ে এলো। তার সঙ্গে ডাকতে থাকা একটি শাবকও ছিল। তিনি বললেন: অমুক, কী বাচ্চা হয়েছে? রাখাল বলল: একটি ভেড়ার শাবক। তিনি বললেন: তার পরিবর্তে আমাদের জন্য একটি ভেড়া জবাই করো। এরপর তিনি ‘লা তাহসিবান্না’ বললেন, ‘লা তাহসাবান্না’ বলেননি: ভেবো না যে তোমার জন্য আমরা এটি জবাই করেছি। আমাদের একশ ভেড়া আছে; আমরা সংখ্যা বাড়াতে চাই না। রাখালের তত্ত্বাবধানে একটি শাবক জন্মালে তার পরিবর্তে আমরা একটি ভেড়া জবাই করি। লাকিত বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার একজন স্ত্রী আছে, তার জিহ্বায় কিছু সমস্যা আছে—অর্থাৎ সে অশোভন কথা বলে। তিনি বললেন: তাহলে তাকে তালাক দাও। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, তার সঙ্গে আমার দাম্পত্য সম্পর্ক আছে এবং তার গর্ভে আমার সন্তানও আছে। তিনি বললেন: তাকে নির্দেশ দাও—অর্থাৎ উপদেশ দাও। তার মধ্যে ভালো কিছু থাকলে সে তা পালন করবে। আর নিজের দাসীকে যেভাবে প্রহার করো, নিজের স্ত্রীকে সেভাবে প্রহার করো না। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে অজু সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন: পূর্ণভাবে অজু করো, আঙুলগুলোর ফাঁক খিলাল করো এবং ভালোভাবে নাকে পানি টানো, তবে রোজা রাখা অবস্থায় নয়।
বর্ণনায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁর কথাবার্তা নিয়ে। সেই অভিযোগের জবাবে উপদেশ দেওয়ার নির্দেশের সঙ্গে দাসীপ্রহারের তুলনাটি এসেছে। দাসী এখানে এমন একজন অধীনস্থ নারী, যাকে প্রহার করার আচরণ দিয়ে স্ত্রীর প্রতি নিষিদ্ধ আচরণের মাত্রা বোঝানো হচ্ছে। দুই নারীর শরীরেই আঘাত লাগে, দুজনই ব্যথা ও অপমান অনুভব করেন; অথচ একজনের মালিকানাধীন পরিচয় তাঁকে কঠোর প্রহারের তুলনামূলক উদাহরণে পরিণত করেছে। দাসীর প্রতি এই আচরণের সামাজিক পরিচিতিই সংক্ষিপ্ত তুলনাটিকে বোধগম্য করে তুলেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে যামআর বর্ণনায় দাসকে বেত্রাঘাত করার সঙ্গে স্ত্রীর ওপর প্রহারের তুলনা এসেছে; লাকিতের বর্ণনায় নিজের দাসীর সঙ্গে নিজের স্ত্রীর তুলনা এসেছে। এই ভাষা গৃহস্থালির ভেতরে পুরুষের কর্তৃত্বের একটি শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করে: স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসী উভয়েই শাসনের আলোচনায় উপস্থিত, কিন্তু দাসীর ওপর প্রহার অধিক কঠোর আচরণের মানদণ্ড। মানুষের শরীরের নিরাপত্তাকে তার স্বাধীন সত্তার অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বদলে সামাজিক সম্পর্ক ও মালিকানার পরিচয় দিয়ে আচরণের সীমা নির্ধারিত হচ্ছে।
ইবনে হাজারের ব্যাখ্যা: দাসকে কঠোর প্রহারের অনুমতি
ইবনে হাজার আল-আসকালানি ফাতহুল বারি-তে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় সরাসরি বলেছেন, এতে দাসকে কঠোরভাবে প্রহার করে শাসন করার অনুমতি রয়েছে। তাঁর ব্যবহৃত শব্দ «جَوَازُ تَأْدِيبِ الرَّقِيقِ بِالضَّرْبِ الشَّدِيدِ»—দাসকে কঠোর প্রহারের মাধ্যমে শাসন করার বৈধতা। এরপর তিনি স্ত্রীর প্রহারকে সেই মাত্রার নিচে রাখার কথা বলেছেন এবং প্রহৃত ব্যক্তি কেন প্রহারকারীর প্রতি বিরাগ অনুভব করেন, তা ব্যাখ্যা করেছেন। একই অনুচ্ছেদে মুহাল্লাবের বক্তব্য উদ্ধৃত করে দাস ও স্বাধীন ব্যক্তির অবস্থান পৃথক হওয়ার কারণে দাসের প্রহার বেশি হওয়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। [12]
وفي الحديث جواز تأديب الرقيق بالضرب الشديد، والإيماء إلى جواز ضرب النساء دون ذلك، وإليه أشار المصنف بقوله «غير مبرح»، وفي سياقه استبعاد وقوع الأمرين من العاقل: أن يبالغ في ضرب امرأته ثم يجامعها من بقية يومه أو ليلته، والمجامعة أو المضاجعة إنما تستحسن مع ميل النفس والرغبة في العشرة، والمجلود غالبا ينفر ممن جلده، فوقعت الإشارة إلى ذم ذلك، وأنه إن كان ولا بد فليكن التأديب بالضرب اليسير بحيث لا يحصل منه النفور التام، فلا يفرط في الضرب ولا يفرط في التأديب. قال المهلب: بين صلى الله عليه وسلم بقوله «جلد العبد» أن ضرب الرقيق فوق ضرب الحر لتباين حالتيهما، ولأن ضرب المرأة إنما أبيح من أجل عصيانها زوجها فيما يجب من حقه عليها. اهـ.
বাংলা অনুবাদ:
এই হাদিসে দাসকে কঠোর প্রহারের মাধ্যমে শাসন করার অনুমতি রয়েছে এবং নারীদের তার চেয়ে কম মাত্রায় প্রহার করার অনুমতির ইঙ্গিত রয়েছে। সংকলক ‘গুরুতর আঘাতকারী নয়’ কথাটি দিয়ে সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। এর বক্তব্যে একজন বিবেকবান মানুষের দ্বারা দুটি কাজ সংঘটিত হওয়াকে অসংগত হিসেবে দেখানো হয়েছে: সে নিজের স্ত্রীকে অত্যধিক প্রহার করবে, তারপর একই দিন বা রাতের অবশিষ্ট সময়ে তার সঙ্গে সহবাস করবে। সহবাস বা একসঙ্গে শয়ন তখনই সুখকর হয়, যখন মনের আকর্ষণ ও দাম্পত্যসঙ্গের আকাঙ্ক্ষা থাকে। আর যাকে বেত্রাঘাত করা হয়েছে, সে সাধারণত তার প্রহারকারীর প্রতি বিরাগ অনুভব করে। তাই এ আচরণের নিন্দার ইঙ্গিত এসেছে। একান্তই শাসন করতে হলে তা অল্প প্রহারের মাধ্যমে হবে, যাতে সম্পূর্ণ বিরাগ সৃষ্টি না হয়। প্রহারে বাড়াবাড়ি করবে না এবং শাসনেও অবহেলা করবে না। মুহাল্লাব বলেছেন: নবী ‘দাসকে বেত্রাঘাতের মতো’ কথাটির মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, দাসের প্রহার স্বাধীন ব্যক্তির প্রহারের চেয়ে বেশি, কারণ দুজনের অবস্থা পৃথক; আর স্ত্রীকে প্রহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে স্বামীর যেসব অধিকার পালন করা তার কর্তব্য, সেগুলোতে স্বামীর অবাধ্য হওয়ার কারণে। উদ্ধৃতি শেষ।
ইবনে হাজারের সিদ্ধান্তে তিনটি বিষয় স্পষ্ট: দাসকে প্রহার করার বৈধতা, সেই প্রহারের কঠোর মাত্রা এবং স্ত্রীর জন্য তার চেয়ে কম মাত্রার প্রহার। ‘বৈধতা’ বোঝাতে তিনি «جواز» এবং প্রহারের ধরন বোঝাতে «الشديد» ব্যবহার করেছেন। এই শব্দগুলো দিয়ে তিনি মালিকের হাতে দাসের ওপর শারীরিক শাস্তির অনুমোদন নির্ণয় করেছেন। দাসত্বের নৈতিক সমস্যাটি এখানেই তীব্র: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে—এই নীতির জায়গায় মালিকের শাসনের অধিকারকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। দাসের শরীর কতটা আঘাত সহ্য করবে, সেই প্রশ্নের উত্তরও মালিকানার সম্পর্কের ভেতর নির্ধারিত হচ্ছে।
মুহাল্লাবের উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় শ্রেণিবৈষম্যের যুক্তিটি আরও সরাসরি: দাস ও স্বাধীন ব্যক্তির অবস্থা আলাদা, তাই দাসের ওপর প্রহার বেশি। একই মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া তার ওপর অধিক শারীরিক শাস্তির ভিত্তি হয়ে উঠেছে। দাসত্ব এখানে শুধু শ্রম আদায়ের ব্যবস্থা নয়; শরীরের ওপর অধিক সহিংসতা প্রয়োগের অবস্থানও তৈরি করছে। স্বাধীনতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি নিজের শ্রম, চলাফেরা ও দেহের ওপর কর্তৃত্ব হারাচ্ছেন, আর সেই অধস্তন অবস্থানকেই তাঁর প্রতি কঠোর আচরণের ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইনির ব্যাখ্যা: দাস ও স্ত্রীর জন্য প্রহারের পৃথক মাত্রা
বদরুদ্দিন আল-আইনিও উমদাতুল কারি-তে একই হাদিস থেকে দাসকে কঠোর প্রহারের মাধ্যমে শাসন করার অনুমতি নির্ণয় করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্ত্রীর প্রহার দাসের প্রহারের চেয়ে কম হবে। এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, অত্যধিক প্রহারের পরে একই নারীর সঙ্গে সহবাসের আকাঙ্ক্ষা কেন অসংগত: প্রহৃত ব্যক্তি তার প্রহারকারীর প্রতি বিরাগ অনুভব করেন। এই ব্যাখ্যায় প্রহারের ফলে সৃষ্ট বিরাগ স্বীকৃত হলেও দাসের ওপর কঠোর শাস্তির অধিকার বহাল রয়েছে। [13]
وفي الحديث جواز ضرب العبد بالضرب الشديد للتأديب، وفيه أن ضرب النساء دون ضرب العبيد، وفيه استبعاد وقوع الأمرين من العاقل: أن يبالغ في ضرب امرأته ثم يجامعها في بقية يومه أو ليلته، وذلك أن المضاجعة إنما تستحسن مع ميل النفس والرغبة، والمضروب غالبا ينفر من ضاربه، ولكن يجوز الضرب اليسير بحيث لا يحصل منه النفور التام، فلا يفرط في الضرب ولا يفرط في التأديب.
বাংলা অনুবাদ:
এই হাদিসে শাসনের উদ্দেশ্যে দাসকে কঠোরভাবে প্রহার করার অনুমতি রয়েছে। এতে আরও রয়েছে যে, নারীদের প্রহার দাসদের প্রহারের চেয়ে কম হবে। এতে একজন বিবেকবান মানুষের দ্বারা দুটি কাজ সংঘটিত হওয়াকে অসংগত হিসেবে দেখানো হয়েছে: সে নিজের স্ত্রীকে অত্যধিক প্রহার করবে, তারপর একই দিন বা রাতের অবশিষ্ট সময়ে তার সঙ্গে সহবাস করবে। কারণ একসঙ্গে শয়ন তখনই সুখকর হয়, যখন মনের আকর্ষণ ও আকাঙ্ক্ষা থাকে; আর প্রহৃত ব্যক্তি সাধারণত তার প্রহারকারীর প্রতি বিরাগ অনুভব করে। তবে অল্প প্রহার বৈধ, যাতে সম্পূর্ণ বিরাগ সৃষ্টি না হয়। সুতরাং প্রহারে বাড়াবাড়ি করবে না এবং শাসনেও অবহেলা করবে না।
ইবনে হাজার ও আইনির ব্যাখ্যায় দাসপ্রহার একটি স্বীকৃত শাসনপদ্ধতি। তাঁদের আলোচনায় স্ত্রীকে সেই মাত্রায় প্রহার করা থেকে বিরত রাখার সঙ্গে দাসের ওপর কঠোর প্রহারের বৈধতা পাশাপাশি এসেছে। এর ফলে মালিকানাধীন মানুষের যন্ত্রণাকে অধস্তন মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করে বিচার করা হয়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রহারের মাত্রা কমানোর কারণ হতে পারে, অথচ দাসের ক্ষেত্রে তার মালিকানাধীন অবস্থান অধিক কঠোর শাস্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই আইনগত শ্রেণিবিন্যাসে মানুষের শরীরের সমান নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি; প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মালিকের শাস্তির ক্ষমতা এবং অধীনস্থ পরিচয় অনুসারে সেই ক্ষমতার পৃথক মাত্রা।
প্রহারের কাফ্ফারা, দাসমুক্তি ও আইনগত বাধ্যবাধকতা
সহিহ মুসলিমে দাসকে চড় মারা বা প্রহার করার কাফ্ফারা হিসেবে তাকে মুক্ত করার বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু ধ্রুপদি ইসলামি আইনশাস্ত্রে এই মুক্তিকে সব ধরনের প্রহারের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ও বাধ্যতামূলক পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। নববী, ইবনে হাযম এবং মালিকি ফকিহদের সিদ্ধান্তে পার্থক্য রয়েছে—দাসের ওপর মালিকের আঘাত কখন অন্যায় হবে, সেই অন্যায়ের প্রতিকার কী এবং কোন পরিস্থিতিতে মালিকানা শেষ হবে, তা নিয়ে তাঁরা ভিন্ন আইনগত অবস্থান নিয়েছেন।
সহীহ মুসলিমে ইবনে উমরের বর্ণনায় স্পষ্টভাবেই এসেছে, যে ব্যক্তি নিজের দাসকে চড় মারে বা প্রহার করে, তার কাফ্ফারা তাকে মুক্ত করা [14]। অন্যদিকে সুওয়াইদ ইবনে মুকাররিনের বর্ণনায় একটি দাসীকে চড় মারার পরে মুহাম্মদ তাকে মুক্ত করার নির্দেশ দেন [15]। কিন্তু ফিকহি প্রশ্ন হলো: এই নির্দেশ কি ফরজ বা ওয়াজিব, অর্থাৎ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক, নাকি মুস্তাহাব/মানদুব, অর্থাৎ প্রশংসনীয় ও পাপমোচনের জন্য সুপারিশকৃত?
ইমাম নববী তাঁর শরহ সহিহ মুসলিম-এ প্রহৃত দাসকে মুক্ত করাকে মুস্তাহাব বা মানদুব বলেছেন; আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয় বলে আলেমদের ঐকমত্যের দাবিও করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “وأجمع المسلمون على أن عتقه بهذا ليس واجبا”—এই কারণে দাসকে মুক্ত করা ওয়াজিব নয় বলে মুসলমানদের ঐকমত্য রয়েছে। এর বাস্তব পরিণতি হলো, প্রহারের কাফ্ফারা হিসেবে দাসমুক্তির হাদিস স্বীকার করার পরও মালিকের মালিকানা অবসানকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ইবনে হাযমের পৃথক সিদ্ধান্ত অবশ্য নববীর ঘোষিত এই সর্বসম্মতির দাবির সঙ্গে মেলে না। [16]
নববী ও কাজি ইয়াজের মতামত বাংলা ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইযাহুল মুসলিম-এও উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে সামান্য প্রহারের পরে মুক্তিকে ওয়াজিব না বলা এবং অঙ্গহানি, আগুনে পোড়ানো অথবা বিনা কারণে প্রচণ্ড প্রহারের পর মুক্তি বাধ্যতামূলক হওয়ার বিষয়ে ফকিহদের মতভেদ উল্লেখ করা হয়েছে। [17]
باب صحبة المماليك
অধ্যায়: গোলাম বাঁদীর সাথে আচরণ প্রসঙ্গে
عَنْ زَاذَانَ أَبِي عُمَرَ قَالَ: أَتَيْتُ ابْنَ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَقَدْ أَعْتَقَ مَمْلُوكًا، قَالَ: فَأَخَذَ مِنَ الْأَرْضِ عُودًا أَوْ شَيْئًا فَقَالَ: مَا فِيهِ مِنَ الْأَجْرِ مَا يَسْوَى هَذَا إِلَّا أَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ لَطَمَ مَمْلُوكَهُ أَوْ ضَرَبَهُ فَكَفَّارَتُهُ أَنْ يُعْتِقَهُ.
‘যাযান (রহ.) বলেন, একদা আমি হযরত ইবনে ওমরের (রা.) কাছে আগমন করলাম। তিনি একটি গোলাম আযাদ করেছিলেন সে সময়। মাটি থেকে একটি কাঠের টুকরা বা এ জাতীয় কিছু হাতে নিয়ে বললেন-এই আযাদ করায় এই কাঠের টুকরা সমপরিমাণ সওয়াবেরও আশা করি না। কিন্তু আসল কথা হলো, হুযুর (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার গোলামকে চড়-থাপ্পড় দিবে তার কাফ্ফারা হলো সেই গোলামকে আযাদ করা।
তিনি এজন্য সওয়াবের প্রত্যাশা করেননি। কারণ তিনি তাকে আঘাত করেছিলেন। হুযুর (সা.)-এর কথা মত আযাদ করা ছিল কাফ্ফারা স্বরূপ।
ইযাহুল মুসলিম
৩৬৫
সুতরাং আযাদ করার বিশেষ সওয়াব আঘাত করার ক্ষতিপূরণ হিসেবে মনে করেছেন তিনি।
فَكَفَّارَتُهُ أَنْ يُعْتِقَهُ
আল্লামা নববী (রহ.) বলেন, সকল আলিম এ ব্যাপারে একমত যে, প্রহৃত গোলাম আযাদ করা ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব। ওয়াজিব না হওয়ার দলীল হযরত সুয়াদ ইবনে মুক্তিনের হাদীস-তিনি বলেন, রাসূলের (সা.) যুগে আমাদের একটি মাত্র গোলাম ছিল। একদা আমাদের মধ্য হতে কেউ তাকে আঘাত করে। ঘটনা শুনে রাসূল (সা.) বলেন-তাকে আযাদ করে দাও। রাসূল (সা.)-কে বলা হলো, তাদের গোলাম এই একটিই। তখন তিনি বললেন-আপাতত খেদমত গ্রহণ করো, সুযোগ হলে আযাদ করে দিও।
কাজী ঈয়ায (রহ.) বলেন-সামান্য পরিমাণ আঘাত করলে আযাদ করা ওয়াজিব না এ ব্যাপারে সবাই একমত। তবে যদি আগুন দিয়ে পোড়ায় অথবা অঙ্গহানী করে কিংবা বিনা কারণে প্রচন্ড আঘাত করে তাহলে ইমাম মালেক ও ফকীহ আবু লাইছের মতে তাকে আযাদ করা ওয়াজিব। কিন্তু অন্যান্য আলিমদের মতে এক্ষেত্রেও আযাদ করা ওয়াজিব নয়।

এখানে শুধু সামান্য আঘাতে মুক্তির বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করা হয়নি; প্রচণ্ড প্রহার, আগুনে পোড়ানো এবং অঙ্গহানীর ক্ষেত্রেও মালিকানা শেষ হবে কি না, সে বিষয়ে মতভেদ সংরক্ষিত হয়েছে। মালিক ও লাইছের মতে এসব চরম নির্যাতনে মুক্তি বাধ্যতামূলক হওয়ার বিধান থাকলেও অন্য বহু ফকিহ তা বাধ্যতামূলক করেননি। দাসের শরীরের ওপর এমন মাত্রার সহিংসতার পরও তার স্বাধীনতা অর্জন আইনগত বিরোধের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সহিহ মুসলিম শরিফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ) গ্রন্থের ব্যাখ্যায়ও নববীর মুস্তাহাব হওয়ার সিদ্ধান্ত এবং কাজি ইয়াজের উদ্ধৃত মতভেদ পাওয়া যায়। বিশেষত অঙ্গহানি বা আগুনে পোড়ানোর মতো চরম নির্যাতনে দাসকে মুক্ত করা বাধ্যতামূলক কি না, তার পৃথক আইনগত সিদ্ধান্ত এই ব্যাখ্যায় উল্লেখিত। [18]
بَابُ صُحْبَةِ الْمَمَالِيكِ وَكَفَّارَةِ مَنْ لَطَمَ عَبْدَهُ
অনুচ্ছেদ: ক্রীতদাসদের সহিত সদ্ব্যবহার করা এবং দাসকে চপেটাঘাতের কাফ্ফারা
(۹۹(8) حَدَّثَنِي أَبُو كَامِلٍ فُضَيْلُ بْنُ حُسَيْنِ الْجَحْدَرِي قَالَ نَا أَبُو عَوَانَةً عَنْ فِرَاسٍ عَنْ ذَكْوَانَ أَبِي صَالِحٍ عَنْ زَاذَانَ أَبِي عُمَرَ قَالَ أَتَيْتُ ابْنَ عُمَرَ وَقَدْ أَعْتَقَ مَمْلُوكًا قَالَ فَأَخَذَ مِنَ الْأَرْضِ عُودًا أَوْ شَيْئًا فَقَالَ مَا فِيهِ مِنَ الأَجْرِ مَا يَسْوَى هَذَا إِلَّا أَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ مَنْ لَطَمَ مَمْلُوكَهُ أَوْ ضَرَبَهُ فَكَفَّارَتُهُ أَنْ يُعْتِقَهُ”.
(৪১৭৭) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন আবু কামিল ফুযাইল বিন জাহদারী (রহ.) তিনি… আবু উমর (রহ.) হইতে, তিনি বলেন, একদা আমি হযরত ইবন উমর (রাযিঃ)-এর নিকট গিয়া প্রত্যক্ষ করি যে, তিনি একজন ক্রীতদাসকে আযাদ করিয়া দিয়াছেন। রাবী বলেন যে, তিনি মাটি হইতে একটি কাঠি কিংবা অন্য কোন বস্তু হাতে নিয়া বলিলেন, তাহাকে আযাদ করার মধ্যে ইহার সমতুল্য পুণ্যও নাই। তবে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইরশাদ করিতে শ্রবণ করিয়াছি, যেই ব্যক্তি নিজ দাসকে বিনা অপরাধে প্রহার কিংবা চপেটাঘাত করিল, ইহার কাফ্ফারা হইল তাহাকে আযাদ করিয়া দেওয়া।
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ
فَكَفَّارَتُهُ أَنْ يُعْتِقَهُ )ইহার কাফ্ফারা হইল তাহাকে আযাদ করিয়া দেওয়া)। শারেহ নওয়াভী (রহ.) বলেন, সকল মুসলমান একমত যে, প্রহৃত গোলাম আযাদ করা ওয়াজিব নহে, তবে মুস্তাহাব। গোলামের প্রতি যুলুম করার কারণে যেই গুনাহ হইয়াছে তাহা দুরীভূত হইবার জন্য। আর আযাদ করা ওয়াজিব না হইবার দলীল হইতেছে পরবর্তী ৪১৮০ নং হযরত মুআবিয়া বিন সুওয়াইদ (রহ.) বর্ণিত হাদীছ। উহার শেষ দিকে আছে “তখন তিনি ইরশাদ করিলেন, তোমরা তাহার দ্বারা সেবা গ্রহণ করিতে থাক, যখনই তোমরা তাহার অমুখাপেক্ষী হইবে তখনই তোমরা তাহাকে আযাদ করিয়া দিবে।”
কাযী ইয়ায (রহ.) বলেন, সামান্য আঘাত করার দ্বারা আযাদ করা ওয়াজিব না হইবার ব্যাপারে উলামায়ে কিরাম একমত। কিন্তু যদি অহেতুক প্রচন্ড আঘাত করে কিংবা আগুন দিয়া পোড়ায় কিংবা মুছলা তথা নাক-কান কর্তন করিয়া অঙ্গহানী করে তাহা হইলে ইমাম মালিক ও তাহার অনুসারীগণ এবং ফকীহ লায়ছ (রহ.)-এর মতে উক্ত গোলামকে আযাদ করিয়া দেওয়া ওয়াজিব। আর প্রশাসক তাহার অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিবেন। কিন্তু অন্যান্য উলামায়ে কিরামের মতে এই ক্ষেত্রেও আযাদ করা ওয়াজিব নহে। (তাকমিলা ২য়, ২২৪)

দাসকে খোজা করার ঘটনা ও মুক্তির নির্দেশ
সুনান আবু দাউদে নিজের দাসের লিঙ্গ কেটে দেওয়ার একটি ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে। মালিকের নাম যিনবা আবু রাওহ; নির্যাতিত দাসটির নাম রাওহ ইবনে দিনার। বর্ণনায় মালিকের ঈর্ষা এবং সেই ঈর্ষা থেকে দাসের যৌনাঙ্গ কেটে দেওয়ার কথা এসেছে। আহত ব্যক্তি আর্তচিৎকার করে মুহাম্মদের কাছে সাহায্য চান। মুহাম্মদ মালিককে হাজির করতে বলেন; তাঁকে খুঁজে আনা সম্ভব না হলে দাসটিকে মুক্ত ঘোষণা করেন। এরপরও ওই ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে সেই স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনও তাঁর প্রশ্নে উঠে এসেছে। [19]
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ بْنِ تَسْنِيمٍ الْعَتَكِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَكْرٍ، أَخْبَرَنَا سَوَّارٌ أَبُو حَمْزَةَ، حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ مُسْتَصْرِخٌ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: جَارِيَةٌ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ. فَقَالَ: «وَيْحَكَ مَا لَكَ؟». قَالَ: شَرًّا، أَبْصَرَ لِسَيِّدِهِ جَارِيَةً لَهُ فَغَارَ فَجَبَّ مَذَاكِيرَهُ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «عَلَىَّ بِالرَّجُلِ». فَطُلِبَ فَلَمْ يُقْدَرْ عَلَيْهِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «اذْهَبْ فَأَنْتَ حُرٌّ». فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ عَلَى مَنْ نُصْرَتِي؟ قَالَ: «عَلَى كُلِّ مُؤْمِنٍ»، أَوْ قَالَ: «كُلِّ مُسْلِمٍ». قَالَ أَبُو دَاوُدَ: الَّذِي عُتِقَ كَانَ اسْمُهُ رَوْحُ بْنُ دِينَارٍ. قَالَ أَبُو دَاوُدَ: الَّذِي جَبَّهُ زِنْبَاعٌ. قَالَ أَبُو دَاوُدَ: هَذَا زِنْبَاعٌ أَبُو رَوْحٍ كَانَ مَوْلَى الْعَبْدِ.
বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনে তাসনিম আল-আতাকি আমাদের বর্ণনা করেছেন; মুহাম্মদ ইবনে বকর তাঁকে বর্ণনা করেছেন; সাওয়ার আবু হামযা তাঁকে জানিয়েছেন; আমর ইবনে শুআইব তাঁকে বর্ণনা করেছেন তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি সাহায্য চেয়ে আর্তচিৎকার করতে করতে নবীর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, তার এক দাসীর কারণে! তিনি বললেন: আহা! তোমার কী হয়েছে? সে বলল: অনিষ্ট হয়েছে। সে তার মনিবের এক দাসীকে দেখেছিল; এতে মনিব ঈর্ষান্বিত হয়ে তার লিঙ্গ কেটে দেয়। আল্লাহর রাসুল বললেন: লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তাকে খোঁজা হলো, কিন্তু পাওয়া গেল না। তখন আল্লাহর রাসুল বললেন: যাও, তুমি মুক্ত। সে বলল: হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে সাহায্য করার দায়িত্ব কার ওপর? তিনি বললেন: প্রত্যেক মুমিনের ওপর; অথবা বলেছেন: প্রত্যেক মুসলিমের ওপর। আবু দাউদ বলেছেন: যাকে মুক্ত করা হয়েছিল, তার নাম ছিল রাওহ ইবনে দিনার। আবু দাউদ বলেছেন: যে তার লিঙ্গ কেটেছিল, তার নাম যিনবা। আবু দাউদ বলেছেন: এই যিনবা আবু রাওহ ছিল ওই দাসের মনিব।
ইবনে মাজাহর পাঠে আক্রমণের কারণ আরও নির্দিষ্টভাবে এসেছে: দাসটি মালিকের এক দাসীকে চুম্বন করছিল, মালিক তা দেখে তার লিঙ্গ কেটে দেয়। এখানে একজন মালিক নিজের অধীনস্থ দুই মানুষের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার ওপর সহিংস কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছেন। দাসীর প্রতি ঈর্ষার প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে দাসপুরুষের শরীর স্থায়ীভাবে বিকৃত করে। নারীটির মালিকানাধীন পরিচয় এবং পুরুষটির দাসত্ব—দুটি সম্পর্ক একসঙ্গে এই সহিংসতার পটভূমি তৈরি করেছে। মুক্তির নির্দেশের পর দাসটি আবার মনিবের হাতে দাসত্বে ফেরার আশঙ্কা প্রকাশ করে। [20]
حَدَّثَنَا رَجَاءُ بْنُ الْمُرَجَّى السَّمَرْقَنْدِيُّ، حَدَّثَنَا النَّضْرُ بْنُ شُمَيْلٍ، حَدَّثَنَا أَبُو حَمْزَةَ الصَّيْرَفِيُّ، حَدَّثَنِي عَمْرُو بْنُ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صَارِخًا، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «مَا لَكَ؟». قَالَ: سَيِّدِي رَآنِي أُقَبِّلُ جَارِيَةً لَهُ فَجَبَّ مَذَاكِيرِي. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: «عَلَىَّ بِالرَّجُلِ». فَطُلِبَ فَلَمْ يُقْدَرْ عَلَيْهِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «اذْهَبْ فَأَنْتَ حُرٌّ». قَالَ: عَلَى مَنْ نُصْرَتِي يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ يَقُولُ: أَرَأَيْتَ إِنِ اسْتَرَقَّنِي مَوْلاَىَ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «عَلَى كُلِّ مُؤْمِنٍ أَوْ مُسْلِمٍ».
বাংলা অনুবাদ:
রাজা ইবনুল মুরাজ্জা আস-সামারকান্দি আমাদের বর্ণনা করেছেন; নাদর ইবনে শুমাইল তাঁকে বর্ণনা করেছেন; আবু হামযা আস-সাইরাফি তাঁকে বর্ণনা করেছেন; আমর ইবনে শুআইব তাঁকে বর্ণনা করেছেন তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি চিৎকার করতে করতে নবীর কাছে এলো। আল্লাহর রাসুল তাকে বললেন: তোমার কী হয়েছে? সে বলল: আমার মনিব আমাকে তার এক দাসীকে চুম্বন করতে দেখেছে, তারপর আমার লিঙ্গ কেটে দিয়েছে। নবী বললেন: লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তাকে খোঁজা হলো, কিন্তু পাওয়া গেল না। তখন আল্লাহর রাসুল বললেন: যাও, তুমি মুক্ত। সে বলল: হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে সাহায্য করার দায়িত্ব কার ওপর? বর্ণনাকারী বলেন, সে বলতে চাচ্ছিল: আমার মনিব যদি আমাকে আবার দাস বানায়, তখন কী হবে? আল্লাহর রাসুল বললেন: প্রত্যেক মুমিন অথবা মুসলিমের ওপর তোমাকে সাহায্য করার দায়িত্ব।
দাসটির বক্তব্যে অভিযুক্তের অপরাধ এবং ভুক্তভোগীর অসহায়তা একসঙ্গে উপস্থিত। তার মনিব নিজের ঈর্ষা চরিতার্থ করতে তার শরীরের একটি অঙ্গ কেটে দিয়েছে। দাসপুরুষের শরীর এখানে মালিকের ক্রোধের লক্ষ্য এবং দাসীর ওপর মালিকের কর্তৃত্ব প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যে ঘনিষ্ঠতা দেখে মালিক ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি অন্য মানুষের যৌনাঙ্গ ধ্বংস করেছেন। নিজের অধীনস্থ মানুষকে শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ব্যক্তিগত ঈর্ষার সঙ্গে যুক্ত হলে কতটা ভয়াবহ সহিংসতা ঘটতে পারে, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ এই ঘটনায় সংরক্ষিত।
মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত ছিল আক্রান্ত ব্যক্তিকে মুক্ত ঘোষণা করা। অঙ্গচ্ছেদের পরে তার ওপর মালিকের অধিকার শেষ করা হয়েছে; কিন্তু স্বাধীনতার এই ঘোষণা পাওয়া পর্যন্ত তাকে যে পথ অতিক্রম করতে হয়েছে, তা নির্মম। প্রথমে তাকে মালিকানাধীন অবস্থায় বাস করতে হয়েছে, তারপর মনিবের হাতে লিঙ্গচ্ছেদের শিকার হতে হয়েছে, এরপর আহত অবস্থায় আর্তচিৎকার করে প্রতিকার চাইতে হয়েছে। মানুষ হিসেবে যে স্বাধীনতা তার প্রাপ্য, সেটি এই ঘটনায় চরম নির্যাতনের পর প্রতিকার হিসেবে কার্যকর হয়েছে। দাসত্বে থাকার সময় নিজের শরীরের ওপর নিরাপদ কর্তৃত্ব তার ছিল না; শরীর স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে সে মালিকানার বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছে।
অঙ্গচ্ছেদের স্থায়ী ক্ষতি বহন করেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে মুক্ত জীবনে প্রবেশ করতে হয়েছে। নিজের শরীরের ওপর এমন আক্রমণের পরে স্বাধীনতা অর্জন দাসপ্রথার নিষ্ঠুর মূল্যটিকে প্রকাশ করে। তার শরীর, যৌনজীবন এবং ভবিষ্যৎকে মালিকের ব্যক্তিগত ক্রোধ বিপর্যস্ত করেছে। দাসকে বিক্রি করা, তার শ্রম আদায় করা এবং তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যে মালিকানার সম্পর্ক তৈরি করে, সেই সম্পর্কের ভেতরেই এই ব্যক্তির জীবনে এমন সহিংসতা ঘটেছে। তাঁর দেহের ওপর আক্রমণের কারণ হিসেবে বর্ণনায় এসেছে মনিবের ঈর্ষা—অধীনস্থ মানুষের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ওপর মালিকের দখলদারি মানসিকতা।
মুক্তির পরের প্রশ্নটি আরও গভীর নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ করে: মনিব যদি আবার তাকে দাস বানায়, তখন কে রক্ষা করবে? আহত ব্যক্তি স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারেনি। যে ব্যক্তি তার শরীর বিকৃত করেছে, তার হাতে আবার বন্দী হওয়ার আশঙ্কা তার রয়ে গেছে। মুহাম্মদ প্রত্যেক মুমিন বা মুসলিমের ওপর তাকে সাহায্য করার দায়িত্ব দিয়েছেন। ফলে ঘোষিত স্বাধীনতার বাস্তব সুরক্ষার জন্যও অন্য মানুষের সহায়তা প্রয়োজন হয়েছে। মালিকানার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পরও সাবেক মালিকের ক্ষমতার ভয় আক্রান্ত ব্যক্তির নিজের কথাতেই স্পষ্ট।
দাসমুক্তির নির্দেশটি এই নির্দিষ্ট ঘটনায় মালিকানার অবসান ঘটিয়েছে। সেই নির্দেশ কার্যকর রাখার প্রয়োজনও সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে, কারণ নির্যাতিত ব্যক্তি নিজের সাবেক মনিবের হাতে পুনরায় দাসত্বের আশঙ্কা করেছেন। ফলে প্রতিকারের দুটি স্তর রয়েছে: মালিকানা শেষ করার ঘোষণা এবং সেই ঘোষণার পরে ব্যক্তিকে রক্ষা করার দায়িত্ব। চরম নির্যাতনের পরে স্বাধীনতা ঘোষণা পেয়েও একজন মানুষকে নিজের নিরাপত্তার জন্য অন্যদের সাহায্য চাইতে হচ্ছে—এই অবস্থায় তার পূর্ববর্তী দাসত্বের ক্ষমতার অসমতা কত গভীর ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্যায় প্রহারের পর দাসমুক্তি: ইবনে হাযম ও অন্যান্য ফকিহের মতভেদ
দাসকে প্রহার করার পরে মুক্ত করে দেওয়ার বিধান সম্পর্কে ধ্রুপদি ইসলামি আইনশাস্ত্রের অবস্থান সম্পূর্ণ একরূপ ছিল না। ইমাম নববী তাঁর সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় প্রহৃত দাসকে মুক্ত করা বাধ্যতামূলক নয় বলে আলেমদের ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু জাহিরি ফকিহ ইবনে হাযমের আল-মুহাল্লা বিল আসার গ্রন্থে এর বিপরীত একটি সুস্পষ্ট আইনগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। ইবনে হাযমের মতে, কোনো মালিক তার দাস বা দাসীর গালে হাতের তালু দিয়ে চড় মারলে, কিংবা তারা করেনি এমন অপরাধের জন্য তাদের শাস্তি দিলে, নির্দিষ্ট শর্তে তারা মুক্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ অন্যায় প্রহারে মুক্তি কেবল প্রশংসনীয় কাজ নয়; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটি আইনগতভাবে কার্যকর হওয়ার বিধান। [21]
ومن لطم خد عبده أو خد أمته بباطن كفه فهما حران ساعتئذ إذا كان اللاطم بالغا مميزا.
বাংলা অনুবাদ: যে ব্যক্তি নিজের দাস কিংবা দাসীর গালে হাতের তালু দিয়ে চড় মারে, প্রহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেচনাশক্তিসম্পন্ন হলে সেই মুহূর্ত থেকেই ওই দাস বা দাসী মুক্ত হয়ে যাবে।
ইবনে হাযম একই মাসআলায় এমন অপরাধে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও মুক্তির বিধান প্রয়োগ করেছেন, যা দাস বা দাসী করেনি। তাঁর সিদ্ধান্তে গালে হাতের তালু দিয়ে চড় মারা এবং নির্দোষ দাসকে শাস্তি দেওয়া—দুটিই মালিকানা অবসানের কারণ। অথচ মালিক যদি ওই দাস বা দাসীর সেবা ছাড়া চলতে না পারেন, তাহলে তাঁর প্রয়োজন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেবা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। একজন নির্দোষ মানুষের ওপর অন্যায় শাস্তির পরে যে স্বাধীনতা কার্যকর হওয়ার কথা, তার বাস্তব প্রয়োগও এভাবে মালিকের প্রয়োজনের অধীন হয়ে পড়ে।
এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ইবনে হাযম ইবনে উমরের বর্ণিত প্রহারের কাফ্ফারাসংক্রান্ত হাদিস এবং সুওয়াইদ ইবনে মুকাররিনের পরিবারের দাসীকে চড় মারার ঘটনা ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয় ঘটনায় মুহাম্মদ দাসীটিকে মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের আর কোনো দাসী নেই। তখন মুহাম্মদ তাদের প্রয়োজন থাকা পর্যন্ত দাসীটির সেবা গ্রহণ করে পরে তাকে মুক্ত করার নির্দেশ দেন। ইবনে হাযমের কাছে এই বক্তব্য সাধারণ নৈতিক উৎসাহ নয়; মুহাম্মদের একটি কার্যকর নির্দেশ। তিনি কোরআনের নির্দেশ অমান্য না করার বিধান উদ্ধৃত করে যুক্তি দিয়েছেন, মুহাম্মদের দেওয়া নির্দেশ পালন বাধ্যতামূলক। তাঁর সিদ্ধান্তে তাই দাসমুক্তি শুধু পুণ্য অর্জনের কাজ হয়ে থাকেনি; নির্দিষ্ট অন্যায় প্রহারের পর মালিকানার অবসানের আইনগত কারণ হয়েছে।
ইবনে হাযম আবু মাসউদের দাসপ্রহারের ঘটনাটিও পরীক্ষা করেছেন। সেখানে মুহাম্মদ প্রহার বন্ধের জন্য সতর্ক করেন এবং আবু মাসউদ নিজের সিদ্ধান্তে দাসটিকে মুক্ত করেন; মুহাম্মদের পক্ষ থেকে সরাসরি মুক্ত করার আদেশ ওই বর্ণনায় নেই। ইবনে হাযম তাঁর বাধ্যতামূলক মুক্তির সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই পৃথক বর্ণনাকে ভিত্তি করে, যেখানে মুহাম্মদ দাসীটিকে মুক্ত করতে সরাসরি নির্দেশ দেন। এই পার্থক্য দেখায়, ধ্রুপদি আইনশাস্ত্রে দাসকে আঘাতের ঘটনা, মুক্ত করার নির্দেশ এবং মুক্তি কার্যকর হওয়ার শর্তগুলো নিয়ে পৃথক আইনগত সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে।
ধ্রুপদি ইসলামি ফিকহে দাসপ্রহারের পর মুক্তির বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রকৃত মতবিরোধ ছিল। নববীর ব্যাখ্যায় প্রহৃত দাসকে মুক্ত করা সাধারণভাবে মুস্তাহাব; ইবনে হাযমের সিদ্ধান্তে গালে চড় মারা অথবা নির্দোষ দাসকে শাস্তি দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট ঘটনায় মুক্তি বাধ্যতামূলক। মালিকি আইনশাস্ত্রেও প্রচণ্ড প্রহার, অঙ্গহানি ও অগ্নিদগ্ধ করার ঘটনায় বাধ্যতামূলক মুক্তির মত পাওয়া যায়। এ মতবিরোধ মালিকের দাসকে শারীরিকভাবে শাসনের ক্ষমতা বিলোপের প্রশ্নে নয়; বরং মালিক সেই ক্ষমতার কোন সীমা অতিক্রম করলে দাসের ওপর তাঁর মালিকানা শেষ হবে, সেই প্রশ্নে।
মালিকানাধীন একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে আঘাত করার পরও তার মুক্তি কার্যকর হবে কি না, তা ধ্রুপদি ফকিহদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করেছে। ইবনে হাযম যেখানে কিছু নির্দিষ্ট আঘাতকে বাধ্যতামূলক মুক্তির কারণ বলেছেন, নববীর ব্যাখ্যায় সাধারণ প্রহারের পর মুক্তির নির্দেশ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হয়নি। ইবনে হাযমের সিদ্ধান্তেও মালিকের সেবার প্রয়োজন থাকলে মুক্তির বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। দাসের নিজের শরীরের ওপর তার কর্তৃত্ব এবং নির্যাতন থেকে মুক্তির অধিকার—দুটিই এভাবে মালিকানার আইনগত শর্ত দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। স্বীকৃত শারীরিক শাসনক্ষমতার ভেতরে কোনো কোনো অন্যায়ের জন্য মুক্তির বিধান থাকা দাসের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির ক্ষমতাকে বিলোপ করেনি।
তিনশ বেত্রাঘাতের পরও দাসমুক্তি না হওয়ার মত
মালিকি ফকিহ শিহাবুদ্দিন আল-কারাফি তাঁর আয-যাখিরা গ্রন্থে ইবনুল কাসিমের এমন একটি সিদ্ধান্ত সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে তিনশ বেত্রাঘাতে দাস চরমভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার পরও তার মুক্তি বাধ্যতামূলক হয় না। আলোচনার পটভূমি হলো দাসমুক্তির শর্ত যুক্ত করে দাসকে প্রহার করার শপথ এবং সেই শপথের পরিণতি। ইবনুল কাসিমের উদ্ধৃত সিদ্ধান্তে মালিক শপথ অনুসারে তিনশ বেত্রাঘাত করে দাসকে বিপর্যস্ত করলেও মালিকানার অবসান ঘটবে গুরুতর অঙ্গবিকৃতির পর্যায়ে পৌঁছালে। সেই ক্ষতির উদাহরণ হিসেবে মাংস নষ্ট হয়ে ক্ষয় হতে হতে হাড়ের ওপর চামড়া অবশিষ্ট থাকার কথা এসেছে; এই অবস্থাকে অঙ্গচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। [22]
قال ابن القاسم: وليضربنه ثلاثمائة سوط، ففعل فأنهكه، لا يعتق عليه إلى أن يبلغ منه مثلة شديدة، مثل ذهاب لحم، وتآكله حتى يبقى جلد على عظم فيعتقه، مثل قطع عضو.
বাংলা অনুবাদ:
ইবনুল কাসিম বলেছেন: সে তাকে তিনশ বেত্রাঘাত করবেই—এরপর সে তা করল এবং তাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করল; এতে দাস তার মালিকানা থেকে মুক্ত হবে না, যতক্ষণ না প্রহারের ফলে তার শরীরে গুরুতর অঙ্গবিকৃতি ঘটে। যেমন মাংস উঠে যাওয়া এবং তা ক্ষয় হতে হতে হাড়ের ওপর চামড়া অবশিষ্ট থাকা; তখন অঙ্গচ্ছেদের ক্ষেত্রের মতো তাকে মুক্ত করা হবে।
বক্তব্যটির কেন্দ্রে রয়েছে «فَفَعَلَ فَأَنْهَكَهُ»—সে প্রহার করল এবং তাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করল। ফিকহি প্রশ্নটিতে গুরুতর প্রহারের ফল স্বীকার করেই পরের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে: «لَا يَعْتِقُ عَلَيْهِ»—দাস তার মালিকানা থেকে মুক্ত হবে না। অর্থাৎ আক্রান্ত মানুষের শারীরিক বিপর্যয় এবং মালিকের মালিকানা বহাল থাকা একই সিদ্ধান্তে পাশাপাশি রয়েছে। তিনশ বেত্রাঘাতের পরও ওই ব্যক্তির স্বাধীনতা অর্জন আরও একটি শর্তের অধীন: শরীরের ক্ষতি গুরুতর অঙ্গবিকৃতির পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। এই বিধানে নির্যাতনের পরও মালিকানার সম্পর্ক টিকে থাকার সুযোগ স্পষ্ট।
মুক্তির শর্ত হিসেবে ব্যবহৃত «مُثْلَةً شَدِيدَةً» কথাটির অর্থ গুরুতর অঙ্গবিকৃতি। তার উদাহরণে মাংস উঠে যাওয়া, ক্ষয় এবং হাড়ের ওপর চামড়া অবশিষ্ট থাকার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। মানুষের শরীরের এমন বিপর্যয়কে অঙ্গচ্ছেদের সমতুল্য ধরে মুক্তির বিধান কার্যকর করা হচ্ছে। ফলে সিদ্ধান্তটির নির্মমতা শুধু বেত্রাঘাতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই; স্বাধীনতা কার্যকর হওয়ার জন্য শারীরিক ধ্বংসের যে উচ্চ সীমা নির্ধারিত হয়েছে, সেখানেও রয়েছে। আহত মানুষের যন্ত্রণা ও বিপর্যয়ের পরও তাকে মালিকানার বন্ধন থেকে বের হতে হলে ক্ষতির নির্দিষ্ট আইনগত শ্রেণিতে পৌঁছাতে হচ্ছে।
এর বাস্তব আইনগত ফল অত্যন্ত কঠোর। প্রহারের পরও মুক্তি কার্যকর না হলে দাস সেই ব্যক্তির মালিকানাধীন থাকে, যার প্রহারে সে বিপর্যস্ত হয়েছে। তার শ্রম ও সেবার ওপর মালিকের দাবি এবং তাকে অন্যের কাছে হস্তান্তর করার মালিকানাভিত্তিক ক্ষমতাও সেই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে। নিজের ওপর আক্রমণের পরে আক্রমণকারীর মালিকানা থেকে বেরিয়ে আসার অধিকারও এভাবে ক্ষতের মাত্রার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একজন মানুষকে প্রথমে সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছে; তারপর সেই সম্পত্তির সম্পর্ক কখন ভাঙবে, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে তার শরীর কতটা বিকৃত হয়েছে তার ভিত্তিতে।
শপথের পটভূমিটিও গুরুত্বপূর্ণ। মালিক নিজের ঘোষণার সঙ্গে অন্য একজন মানুষের শরীরের ওপর প্রহার এবং তার স্বাধীনতার শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। শপথকারী ব্যক্তি ও প্রহারের শিকার ব্যক্তি এখানে সম্পূর্ণ অসম অবস্থানে। সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন মালিক; আঘাত বহন করছে দাস; আর প্রহারের পরে মালিকানার অবসান হবে কি না, তা নির্ধারণ করছে ফিকহি বিধান। দাসের নিজের ইচ্ছা বা নিরাপদে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এই ব্যবস্থার ভিত্তি হয়নি। তার শরীর মালিকের শপথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, আর তার স্বাধীনতা সেই শপথ ও আঘাতের পরিণতি হিসেবে বিচার করা হয়েছে।
ইবনে হাযমের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই মতের পার্থক্য সুস্পষ্ট। ইবনে হাযম গালে হাতের তালু দিয়ে চড় মারা এবং নির্দোষ দাসকে নির্দিষ্ট অন্যায় শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় মুক্তির বিধান দিয়েছেন। কারাফির উদ্ধৃত ইবনুল কাসিমের এই মাসআলায় তিনশ বেত্রাঘাতে বিপর্যস্ত হওয়ার পরও গুরুতর অঙ্গবিকৃতির শর্ত রয়েছে। মুক্তি কার্যকর হওয়ার সীমা ধ্রুপদি ফকিহদের সিদ্ধান্তে কতটা পৃথক হতে পারত, এই দুটি অবস্থান তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। একজন মানুষের স্বাধীনতা ও তার ওপর মালিকের অধিকার অবসানের প্রশ্ন এভাবে আঘাতের ধরন, ক্ষতির মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত মতের ওপর নির্ভর করেছে।
ধ্রুপদী ফিকহে দাসকে “শাসন” করার অধিকার
হাম্বলি ফকিহ ইবনে কুদামা আল-মুগনি গ্রন্থের দাসদাসীর ভরণপোষণসংক্রান্ত আলোচনায় মালিকের শাস্তিদানের ক্ষমতা সরাসরি স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দাস বা দাসী অপরাধ করলে মালিক তাকে তিরস্কার এবং হালকা প্রহারের মাধ্যমে শাসন করতে পারে। একই অনুচ্ছেদে তিনি অপরাধ ছাড়া প্রহার, অপরাধ করলেও গুরুতর প্রহার এবং মুখে চড় মারাকে নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ তাঁর আইনগত সিদ্ধান্তে দাসের শরীরে আঘাত করা সামগ্রিকভাবে নিষিদ্ধ নয়; অনুমোদিত ও অননুমোদিত প্রহারের মধ্যে একটি সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইবনে কুদামা ওই বিধানের পরেই সুওয়াইদ ইবনে মুকাররিনের পরিবারের দাসীকে চড় মেরে মুক্ত করার ঘটনা এবং আবু মাসউদের দাসপ্রহারে মুহাম্মদের সতর্কবাণী উল্লেখ করেছেন। ফলে প্রহারের বিরোধী হাদিসগুলো তাঁর অজানা ছিল না; সেই হাদিসগুলো আলোচনায় রেখেই তিনি মালিকের সীমিত শাস্তিদানের ক্ষমতা বহাল রেখেছেন। [23]
فصل: وله تأديب عبده وأمته إذا أذنبا، بالتوبيخ، والضرب الخفيف، كما يؤدب ولده، وامرأته في النشوز، وليس له ضربه على غير ذنب، ولا ضربه ضربا مبرحا وإن أذنب، ولا لطمه في وجهه، وقد روي عن ابن مقرن المزني، قال: «لقد رأيتني سابع سبعة، ليس لنا إلا خادم واحد، فلطمها أحدنا، فأمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم بإعتاقها، فأعتقناها». وروي عن أبي مسعود، قال: «كنت أضرب غلاما لي، فإذا رجل من خلفي يقول: اعلم أبا مسعود، اعلم أبا مسعود فالتفت، فإذا النبي صلى الله عليه وسلم يقول: اعلم أبا مسعود، أن الله أقدر عليك منك على هذا الغلام».
বাংলা অনুবাদ:
পরিচ্ছেদ: দাস ও দাসী অপরাধ করলে মালিক তাদের তিরস্কার এবং হালকা প্রহারের মাধ্যমে শাসন করতে পারে; যেমন সে নিজের সন্তানকে এবং অবাধ্যতার ক্ষেত্রে স্ত্রীকে শাসন করে। অপরাধ ছাড়া তাকে প্রহার করার অধিকার নেই; অপরাধ করলেও গুরুতরভাবে প্রহার করা কিংবা তার মুখে চড় মারার অধিকার নেই। ইবনে মুকাররিন আল-মুযানি থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: আমি সাত ভাইয়ের একজন ছিলাম; আমাদের একটিমাত্র দাসী ছিল। আমাদের একজন তাকে চড় মারে। তখন আল্লাহর রাসুল আমাদের তাকে মুক্ত করতে নির্দেশ দেন এবং আমরা তাকে মুক্ত করি। আবু মাসউদ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: আমি নিজের এক দাসকে প্রহার করছিলাম। পেছন থেকে একজন বলছিলেন: আবু মাসউদ, জেনে রাখো; আবু মাসউদ, জেনে রাখো। ফিরে দেখি নবী বলছেন: আবু মাসউদ, জেনে রাখো, এই দাসের ওপর তোমার যত ক্ষমতা, তোমার ওপর আল্লাহর ক্ষমতা তার চেয়ে বেশি।
ইবনে কুদামার তুলনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দাসকে শাসনের বিধান ব্যাখ্যা করতে সন্তান ও স্ত্রীকে শাসনের উদাহরণ দিয়েছেন; একজন স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর অন্য ব্যক্তির বলপ্রয়োগকে নিষিদ্ধ করার কোনো নীতি এখানে প্রতিষ্ঠা করেননি। আর মালিকানাধীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ক্ষমতার অসমতা আরও গভীর: দাসের শ্রম ও সেবার ওপর মালিকের কর্তৃত্ব রয়েছে, এবং ফিকহি ভাষায় সেই কর্তৃত্ব কার্যকর করার স্বীকৃত উপায়গুলোর একটি শারীরিক প্রহার। ইবনে কুদামা দাসকে বিনা অপরাধে বা গুরুতরভাবে মারা নিষিদ্ধ করেছেন—কিন্তু অপরাধের জন্য হালকা প্রহারের অধিকার বহাল রেখেছেন। এই দুটি বক্তব্য একই আইনগত সিদ্ধান্তের অংশ। “মুখে নয়”, “বিনা অপরাধে নয়” এবং “অতিরিক্ত নয়”—এই সীমাগুলো মালিকের শাস্তিদানের ক্ষমতা বিলোপ করে না; তার প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।
এই ক্ষমতার সীমা নিয়ে হাম্বলি মাযহাবের ভেতরেও একাধিক বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। ইবনে মুফলিহ তাঁর আল-ফুরু গ্রন্থে ইমাম আহমদের কাছ থেকে হারবের বর্ণনা এনেছেন: দাসকে একবার বা দুবার ক্ষমা করার পর অপরাধের কারণে শাস্তি দেওয়া যাবে, কিন্তু প্রচণ্ডভাবে নয়। হাম্বল ইবনে ইসহাকের মাধ্যমে সংরক্ষিত আরেক বক্তব্যে গুরুতর অপরাধের শর্ত এসেছে। একই ধারার আলোচনায় মালিকের নির্দেশ অমান্যকারী দাসকে বাঁধা, সীমিতভাবে প্রহার করা এবং আনুগত্য না করলে বিক্রি করার কথাও রয়েছে; অন্য বর্ণনায় বেঁধে রাখার বদলে বিক্রিকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে। আবু দাউদের মাধ্যমে ইমাম আহমদের নামে নামাজ, অন্যান্য ফরজ এবং সামর্থ্যের মধ্যে অর্পিত কাজের বিষয়ে দাসকে শাসনের অনুমোদনও সংরক্ষিত রয়েছে। এসব পৃথক অবস্থান ইসলামওয়েবের ফতোয়া বিভাগের ১৩৭৫২৭ নম্বর উত্তরে ইবনে মুফলিহের উদ্ধৃতি হিসেবে একত্রে পাওয়া যায়। এই আইনগত বক্তব্যগুলো ইবনে মুফলিহের গ্রন্থে ইমাম আহমদের বিভিন্ন বর্ণনা হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। [24]
نقل حرب ـ يعني عن الإمام أحمد: لا يضربه إلا في ذنب بعد عفوه عنه مرة أو مرتين، ولا يضربه شديدا.
বাংলা অনুবাদ: হারব ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেছেন: একবার বা দুবার ক্ষমা করার পরে অপরাধ ছাড়া দাসকে প্রহার করা যাবে না; আর তাকে প্রচণ্ডভাবে প্রহার করা যাবে না।
একই ফিকহি পরম্পরার এই বর্ণনাগুলোতে শাস্তির সীমা নিয়ে মতভেদ থাকলেও মূল প্রশ্নটি একই: মালিক কোন পরিস্থিতিতে নিজের অধীনস্থ মানুষকে আঘাত করতে পারবে? ইবনে কুদামার অনুমোদিত ‘হালকা প্রহার’, ইবনে মুফলিহের উদ্ধৃত এক–দুবার ক্ষমা করার শর্ত, গুরুতর অপরাধের শর্ত এবং আদেশ অমান্য করলে প্রহার বা বিক্রির বিধান—সবগুলোই দাসের ওপর মালিকানাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের পৃথক রূপ। দাসের অবাধ্যতা এখানে কোনো স্বাধীন কর্মীর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; মালিকের নির্দেশ অস্বীকার করার অপরাধ। শাস্তির ক্ষমতা ও বিক্রির ক্ষমতা একই ব্যক্তির হাতে থাকা দাসপ্রথার মৌলিক অসাম্যকে প্রকাশ করে। ধ্রুপদি ইসলামি আইন মালিকের এই ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি।
আল-ইকনায় মালিকের প্রহার ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার
হাম্বলি ফকিহ মুসা ইবনে আহমদ আল-হাজ্জাওয়ি তাঁর আল-ইকনা ফি ফিকহিল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল গ্রন্থে দাসদাসীর ওপর মালিকের কর্তৃত্বকে একাধিক নির্দিষ্ট বিধানে প্রকাশ করেছেন। মালিক তিরস্কার ও প্রহারের মাধ্যমে তাদের শাসন করতে পারবে; আশঙ্কা হলে দাসকে বেড়ি দিয়ে বাঁধতে পারবে; ফরজ দায়িত্ব এবং সামর্থ্যের মধ্যে অর্পিত কাজ প্রত্যাখ্যানের জন্য শাসন করতে পারবে। একই বক্তব্যে প্রথমে ক্ষমা করা, গুরুতর অপরাধের শর্ত এবং কঠোর প্রহারের নিষেধ রয়েছে। এই শর্তগুলোর মধ্যেই মালিকের শারীরিক শাস্তিদান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। [25]
وللسيد تأديبهم باللوم والضرب كولد وزوجة، والأحاديث الصحيحة تدل على جواز الزيادة، ويسن العفو عنه أولا، ويكون مرة أو مرتين نصا، ولا يضربه شديدا، ولا يضربه إلا في ذنب عظيم نصا، ويقيده بقيد إذا خاف عليه، ويؤدب على فرائضه، وعلى ما إذا كلفه ما يطيق فامتنع، وليس له لطمه في وجهه، ولا خصاؤه، ولا التمثيل، ولا يشتم أبويه الكافرين، ولا يعود لسانه الخنا والردا، ولا يدخل الجنة سيء الملكة، وهو الذي يسيء إلى مماليكه.
বাংলা অনুবাদ:
মালিক তাদের তিরস্কার ও প্রহারের মাধ্যমে শাসন করার অধিকার রাখে, সন্তান ও স্ত্রীকে শাসন করার মতো। সহিহ হাদিসগুলো আরও বেশি প্রহারের অনুমতি নির্দেশ করে। প্রথমে তাকে ক্ষমা করা সুন্নাত; একবার বা দুবার ক্ষমা করবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। তাকে কঠোরভাবে প্রহার করবে না এবং গুরুতর অপরাধ ছাড়া প্রহার করবে না—এ বিষয়েও সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। তার ব্যাপারে আশঙ্কা হলে তাকে বেড়ি দিয়ে বাঁধবে। ফরজ দায়িত্বসমূহের জন্য তাকে শাসন করা হবে এবং তার সামর্থ্যের মধ্যে কোনো কাজ দেওয়া হলে সে তা করতে অস্বীকার করলেও শাসন করা হবে। তার মুখে চড় মারা, তাকে খোজা করা কিংবা অঙ্গবিকৃত করা মালিকের জন্য বৈধ নয়। তার অমুসলিম পিতা-মাতাকে গালি দেবে না এবং নিজের জিহ্বাকে অশ্লীল ও মন্দ কথায় অভ্যস্ত করবে না। মন্দ আচরণকারী মালিক জান্নাতে প্রবেশ করবে না; সে হলো এমন ব্যক্তি, যে নিজের দাসদাসীর সঙ্গে মন্দ আচরণ করে।
বিধানটির সূচনাতেই অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে «السيد»—মালিক। আর সেই অধিকারের পদ্ধতি হলো «باللوم والضرب»—তিরস্কার ও প্রহার। একজন মানুষের ওপর অন্য মানুষের শারীরিক শাস্তির ক্ষমতাকে এখানে মালিকানার সম্পর্কের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সন্তান ও স্ত্রীকে শাসন করার তুলনার অধীনে দাসকেও রাখা হয়েছে। ফলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক দাসের নিজের শরীরের ওপর স্বাধীন কর্তৃত্ব মালিকের শাসনের অধীন হয়ে পড়ে। মালিক অপরাধের জন্য তাকে আঘাত করতে পারে এবং ফিকহ সেই আঘাতকে ‘তাদিব’ বা শাসনের আইনগত মর্যাদা দেয়। শারীরিক আঘাত এখানে মালিকের হাতে আনুগত্য আদায়ের একটি স্বীকৃত উপায়।
প্রথমে একবার বা দুবার ক্ষমা করার নির্দেশও মালিকের এই অবস্থানকে স্পষ্ট করে। ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা একই ব্যক্তির হাতে রয়েছে। দাস সেই ক্ষমতার অধীনস্থ মানুষ; মালিক তার আচরণ বিচার করে তাকে ক্ষমা অথবা প্রহারের মুখোমুখি করতে পারে। গুরুতর অপরাধের শর্ত এবং প্রহারের মাত্রাসংক্রান্ত নিয়ম সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সীমানা নির্ধারণ করেছে। এই ব্যবস্থায় দাসের শরীরের ওপর মালিকের শাস্তিদানের অধিকার আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত, আর দাসের নিরাপত্তা সেই অধিকার প্রয়োগের শর্তগুলোর অধীন।
মূল বক্তব্যের «جواز الزيادة»—আরও বেশি প্রহারের অনুমতি—কথাটির ব্যাখ্যায় এই সংস্করণের পাদটীকায় স্ত্রীর তুলনায় দাসকে বেশি প্রহারের কথা বলা হয়েছে। ‘তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য’ কথাটির মাধ্যমে সেই বৃদ্ধিকে শাসন ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় দাসপ্রহার স্ত্রীপ্রহারের তুলনায় অধিক মাত্রার একটি অনুমোদিত শাস্তি হিসেবে উপস্থিত। [26]
يريد جواز الزيادة في ضرب الرقيق على ضرب الزوجة لتعليمهم.
বাংলা অনুবাদ:
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দাসদাসীকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্ত্রীকে প্রহারের তুলনায় তাদের বেশি প্রহার করার অনুমতি।
এই ব্যাখ্যায় শারীরিক শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান কার্যকর হয়েছে। স্ত্রীকে প্রহারের তুলনায় দাসকে বেশি প্রহারের সুযোগ দাসত্বের অধস্তন অবস্থানকে আরও গভীর করে। একই মানুষের শরীরে আঘাতের মাত্রা তার অনুভূতি বা মর্যাদার ভিত্তিতে সমান রাখা হচ্ছে না; তাকে কোন সম্পর্কের অধীনে রাখা হয়েছে, সেই পরিচয় দিয়ে শাস্তির মাত্রা আলাদা করা হচ্ছে। ‘শিক্ষা’ ও ‘শাসন’ শব্দের অধীনে মালিকের বলপ্রয়োগকে নিয়মবদ্ধ করা হয়েছে, আর সেই বলপ্রয়োগের লক্ষ্য হয়ে আছে মালিকানাধীন মানুষের শরীর।
প্রহারের সঙ্গে বেড়ি পরানোর বিধান যুক্ত হওয়ায় মালিকের নিয়ন্ত্রণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দাসের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করার শারীরিক উপায়ও মালিকের হাতে রয়েছে। একই অনুচ্ছেদে ফরজ দায়িত্ব এবং সামর্থ্যের মধ্যে দেওয়া কাজ প্রত্যাখ্যানের জন্য শাসনের কথা আছে। ধর্মীয় কর্তব্য পালন এবং মালিকের জন্য কাজ করা—উভয় ক্ষেত্রেই দাস মালিকের শাসনক্ষমতার অধীন। এই বিধানে মানুষের শ্রম, চলাফেরা ও শরীরের ওপর এক ব্যক্তির বহুমুখী কর্তৃত্বকে আইনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আনুগত্য আদায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তিরস্কার, প্রহার এবং শারীরিকভাবে বেঁধে রাখার ক্ষমতা।
দাসের নিজের অনুরোধে মালিক বদলের প্রশ্নেও আল-ইকনা মালিকের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করেছে। মালিক তার ওপর বর্তানো ভরণপোষণ, পোশাক বা বিবাহের ব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করলে দাস বিক্রির দাবি করতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে মালিককে বিক্রি করতে হবে। মালিক প্রাপ্য দায়িত্বগুলো পালন করলে দাসের অনুরোধে তাকে বিক্রি করা মালিকের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ফলে দাস নিজে সেই মালিকের অধীনে থাকতে অনিচ্ছুক হলেও সম্পর্কের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত তার হাতে থাকে না। [27]
ومتى امتنع السيد من الواجب عليه من نفقة أو كسوة أو تزويج فطلب العبد البيع لزمه بيعه، سواء كان امتناع السيد لعجزه عنه أو مع قدرته عليه، ولا يلزمه بيعه بطلبه مع القيام بما يجب له.
বাংলা অনুবাদ:
মালিক তার ওপর কর্তব্য ভরণপোষণ, পোশাক অথবা বিবাহের ব্যবস্থা করতে অস্বীকার করলে এবং দাস তাকে বিক্রি করার অনুরোধ জানালে মালিকের জন্য তাকে বিক্রি করা বাধ্যতামূলক হবে; মালিকের এই অস্বীকৃতি অক্ষমতার কারণে হোক অথবা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হোক। কিন্তু দাসের প্রাপ্য কর্তব্যগুলো পালন করা হলে, তার অনুরোধে তাকে বিক্রি করা মালিকের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
এই বিধানে মালিকের কর্তব্যপালন তার মালিকানা বজায় রাখার ভিত্তি হয়েছে। দাসের ব্যক্তিগত অনিচ্ছার চেয়ে মালিকের অধিকার প্রাধান্য পেয়েছে। নিজের শ্রম কার জন্য ব্যয় করবে এবং কার অধীনে থাকবে—এই সিদ্ধান্তে মানুষটির স্বাধীন সম্মতি নিয়ামক হয়নি। সম্পর্ক পরিবর্তনের যে প্রতিকার রয়েছে, সেটিও অন্য মালিকের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা। বিক্রির প্রতিকার কার্যকর হলে মানুষটি অন্য মালিকের সম্পত্তি হিসেবে হস্তান্তরিত হয়। তার শ্রম, চলাফেরা এবং শাসনের সম্পর্ক তখন নতুন মালিকের অধীনে চলে যায়। মালিকানার কাঠামোর ভেতরেই তার অবস্থান ও প্রতিকার নির্ধারিত হয়েছে।
হানাফি ফিকহে দাসের ওপর মালিকের তাজিরের অধিকার
হানাফি ফিকহে মালিকের দাসকে শাসন করার ক্ষমতা সরাসরি স্বীকৃত। ইবনে আবিদীন রদ্দুল মুহতার-এ “মালিক তার দাসকে তাজির দিতে পারে” বিধানটির ব্যাখ্যায় ফাতহুল কাদির থেকে দাসের বেয়াদবিকে শাসনের বৈধ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাজির বলতে এখানে শাস্তিমূলক শাসন বোঝানো হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে দাস কেমন আচরণ করবে, সেই প্রশ্নেও মালিকের দণ্ডক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার রয়েছে। [28]
(قوله يعزر المولى عبده) قال في الفتح: وإذا أساء العبد الأدب حل لمولاه تأديبه، وكذا الزوجة.
বাংলা অনুবাদ:
“মালিক তার দাসকে তাজির দিতে পারে”—এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ফাতহে বলা হয়েছে: দাস বেয়াদবি করলে তার মালিকের জন্য তাকে শাসন করা বৈধ; স্ত্রীর ক্ষেত্রেও অনুরূপ।
“বেয়াদবি” এমন একটি ধারণা, যা মালিকের সঙ্গে অধীনস্থ ব্যক্তির আচরণগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। কার সামনে কীভাবে কথা বলতে হবে এবং কর্তৃত্বের প্রতি কেমন আচরণ করতে হবে—এসব প্রশ্ন এর মধ্যে প্রবেশ করে। বেয়াদবির জন্য মালিকের শাস্তিদানের অধিকার দাসত্বের অপমানকে দৈনন্দিন সম্পর্কের গভীরে নিয়ে যায়। আনুগত্য প্রদর্শনের ধরনও তখন শাস্তির কারণ হয়ে ওঠে। মালিকের সামনে অধীনস্থ মানুষটির নিজের মর্যাদা নিয়ে কথা বলা, কর্তৃত্বের সঙ্গে বিরোধে জড়ানো কিংবা কথাবার্তায় অসন্তোষ প্রকাশ করার পরিসর এই ক্ষমতার দ্বারা সংকুচিত হয়। কারণ আচরণকে বেয়াদবি হিসেবে চিহ্নিত করার সঙ্গে শাসনের বৈধতা যুক্ত হয়েছে।
যার শ্রম ও সেবা আদায় করা হচ্ছে, তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্যও মালিকের হাতে দণ্ডক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে শ্রম আদায় এবং আনুগত্য বজায় রাখার স্বার্থ একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। মানুষের ওপর মালিকানার সঙ্গে তার শরীর ও আচরণকে শাস্তির অধীন করার ক্ষমতা যুক্ত হলে জবরদস্তি সম্পর্কটির স্থায়ী উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। একজন মানুষ অন্য একজনের শ্রম ভোগ করবে এবং সেই মানুষের আচরণ শাসনের ক্ষমতাও বহন করবে—এটি গভীর ক্ষমতাবৈষম্য। এই বৈষম্যকে আইনসম্মত করে দাসের ওপর মালিকের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বেয়াদবির জন্য দণ্ড দেওয়ার বিধান সেই কর্তৃত্বকে ঘরের ভেতরের কথাবার্তা ও দৈনন্দিন আচরণ পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।
মুহাম্মদের মৌন সম্মতিও ইসলামে শরয়ি দলিল
ইসলামি আইনতত্ত্বে মুহাম্মদের সুন্নাহ কেবল মুখে দেওয়া নির্দেশে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে তাঁর বক্তব্যকে কওলী সুন্নাহ, কাজকে ফে’লী সুন্নাহ এবং তাঁর জ্ঞাতসারে সংঘটিত কোনো কাজ বা বক্তব্যে আপত্তি না জানানোকে তাকরীরী সুন্নাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাকরীরের বৈশিষ্ট্য হলো, কাজটি মুহাম্মদ নিজে না করলেও তাঁর সামনে সংঘটিত হয়েছে অথবা তিনি তা জানতে পেরেছেন এবং অস্বীকার করেননি। ইসলামি আইনশাস্ত্রে এই নীরব অনুমোদন অন্তত নির্দিষ্ট কাজের শরয়ি বৈধতা নির্ণয়ের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। সুন্নাহর তিন প্রকারের এই সংজ্ঞা ইসলামওয়েবের ফতোয়া বিভাগের ৩৮৯৩৮ নম্বর উত্তরেও রয়েছে; সেখানে লিখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, মুহাম্মদের জ্ঞাতসারে কোনো বক্তব্য বা কাজ ঘটার পরে তাঁর অস্বীকৃতি না জানানোর ঘটনাও তাকরীরের অন্তর্ভুক্ত। [29]
والسنة التقريرية: هي أن يسكت النبي صلى الله عليه وسلم عن إنكار قول أو فعل صدر أمامه، أو في عصره وعلم به.
বাংলা অনুবাদ: তাকরীরী সুন্নাহ হলো, নবীর সামনে অথবা তাঁর যুগে তাঁর জ্ঞাতসারে কোনো কথা বা কাজ সংঘটিত হওয়ার পর তিনি তার প্রতিবাদ না করে নীরব থাকেন।
ইবনে হাজার আল-আসকালানী ফাতহুল বারী গ্রন্থে বুখারির ‘নবীর প্রতিবাদ না করাকে দলিল মনে করা, অন্য কারও নীরবতাকে নয়’ অধ্যায়ের ব্যাখ্যায় এই নীতির আইনগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুহাম্মদের উপস্থিতিতে কোনো কাজ করা হলে কিংবা কোনো বক্তব্য তাঁকে জানানো হলে তিনি প্রতিবাদ না করলে তা বৈধতার নির্দেশক—এই নীতি সম্পর্কে ঐকমত্যের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজার যুক্তি দিয়েছেন, নবীর নিষ্পাপত্বের বিশ্বাসের কারণে তাঁর জ্ঞাতসারে কোনো বাতিল কাজকে নির্বিচারে অনুমোদিত রেখে দেওয়ার ধারণা গ্রহণ করা হয় না। সাধারণ মানুষের নীরবতার ক্ষেত্রে এই মর্যাদা নেই। তিনি একই আলোচনায় সাধারণ সাহাবিদের নীরবতা থেকে ঐকমত্য নির্ণয়ের বিতর্কও আলাদা করেছেন। অর্থাৎ এখানে নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির নীরবতার আইনগত মর্যাদা নিয়ে কথা হচ্ছে, সব ব্যক্তির নীরবতাকে সমান প্রমাণ ধরার নিয়ম নয়। [30]
وقد اتفقوا على أن تقرير النبي صلى الله عليه وسلم لما يفعل بحضرته أو يقال ويطلع عليه بغير إنكار دال على الجواز.
বাংলা অনুবাদ: তাঁরা একমত হয়েছেন যে, নবীর উপস্থিতিতে যা করা হয় কিংবা বলা হয় এবং তিনি তা জানতে পেরেও আপত্তি না জানান—নবীর সেই অনুমোদন কাজটির বৈধতার নির্দেশক।
ইবনুল কাইয়্যিম বাদাইউল ফাওয়াইদ গ্রন্থে বৈধতা নির্ণয়ের পদ্ধতি হিসেবে ওহি অবতরণের যুগে সংঘটিত কাজের অনুমোদনের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে কাজটি অনুমোদিত থাকা এবং মুহাম্মদ জেনে সেটি অনুমোদন করা—দুটি পৃথক প্রক্রিয়া হিসেবে এসেছে। ফলে মুহাম্মদের সামনে সংঘটিত কাজ তাঁর নিজের কাজ না হলেও তাঁর সম্মতির কারণে শরয়ি প্রমাণের মর্যাদা পায়। ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্যটি ইসলামকিউএর ২১৬০১৬ নম্বর উত্তরে বাদাইউল ফাওয়াইদ-এর সূত্রে সংরক্ষিত রয়েছে। [31]
ومن الإقرار على الفعل في زمن الوحي، وهو نوعان: إقرار الرب تبارك وتعالى، وإقرار رسوله صلى الله عليه وسلم إذا علم الفعل.
বাংলা অনুবাদ: ওহি অবতরণের যুগে কোনো কাজকে অনুমোদন করার মাধ্যমেও বৈধতা জানা যায়। এই অনুমোদন দুই ধরনের: আল্লাহর অনুমোদন এবং কাজটি সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার পরে তাঁর রাসুলের অনুমোদন।
ইবনে হাজারের উদ্ধৃত ‘জায়েয’ শব্দটি তাকরীরের আইনগত ফলকে নির্দিষ্ট করে: মুহাম্মদ যে কাজ জেনে অনুমোদন করেছেন, সেটি বৈধতার প্রমাণ। শাতিবির আল-মুওয়াফাকাত-এ পৃথক ঘটনার অনুমোদন থেকে সাধারণ ও স্থায়ী বিধান নির্ণয়ের সীমা আলোচিত হয়েছে। আবু বকরের দাসপ্রহারের ঘটনাটিতে মুহাম্মদ প্রহার প্রত্যক্ষ করে আপত্তি করেননি; আবু দাউদ সেই ঘটনাকে দাসকে শাসনের অধ্যায়ে রেখেছেন এবং পরবর্তী ভাষ্যকার আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদ প্রহারের মাধ্যমে শাসনের অনুমোদন নির্ণয় করেছেন। একই ঘটনার মূল বর্ণনা এবং ইসলামি আইনতাত্ত্বিক ব্যবহার—উভয় ক্ষেত্রেই দাসকে শাসনের জন্য প্রহারের অনুমোদন পাওয়া যায়। [32]
আবু বকরের ঘটনাটিতে প্রহারের সময় মুহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন, তা প্রত্যক্ষ করেছেন, মুচকি হেসে মন্তব্য করেছেন এবং বর্ণনায় প্রহার বন্ধ করার নির্দেশ নেই। তাকরীরকে শরয়ি দলিল গণ্য করার ইসলামি নীতি এবং আবু দাউদের অধ্যায়ের বিন্যাস—দুটিই এই ঘটনাকে শাসনমূলক প্রহারের অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে একজন মালিক তার দাসকে শারীরিকভাবে শাসন করার যে ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন, তা মুহাম্মদের সামনেই সংঘটিত হওয়ার সাক্ষ্য পাওয়া যায়।
আবু বকর দাসকে প্রহার করছেন, মুহাম্মদ দেখে হেসেছেন
এই উসূলি নীতির আলোকে আবু বকরের দাসপ্রহারের হাদিসটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকরের দায়িত্বে থাকা একজন দাস একটি উট হারিয়ে ফেলেছিল। এর কারণে আবু বকর মুহাম্মদের সামনেই সেই দাসকে প্রহার করতে শুরু করেন। মুহাম্মদ ঘটনাটি শুধু জানতে পেরেছিলেন এমন নয়—তিনি সরাসরি ঘটনাটি দেখছিলেন, মুচকি হাসছিলেন এবং উপস্থিত লোকদের বলছিলেন, “তোমরা এই মুহরিম ব্যক্তির দিকে দেখ, কী করছে।” অথচ তিনি আবু বকরকে দাসটি প্রহার করতে নিষেধ করেননি, প্রহার বন্ধ করার নির্দেশ দেননি, কাজটিকে হারাম বলেননি এবং দাসটিকে মুক্ত করার নির্দেশও দেননি। [33] [34]
আবু বকরের হাতে দাসপ্রহার মুহাম্মদের সামনেই সংঘটিত হয়েছে। তিনি শুধু ঘটনাটি দেখেননি, আবু বকরের আচরণ সম্পর্কে মন্তব্যও করেছেন। তারপরও বর্ণনায় প্রহার বন্ধের নির্দেশ, দাসকে মুক্ত করার আদেশ কিংবা আবু বকরের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তির উল্লেখ নেই। মুহাম্মদের জ্ঞাতসারে এমন একটি কাজের প্রতি আপত্তি না জানানোর ঘটনা ইসলামি আইনতত্ত্বে তাকরীরের অন্তর্ভুক্ত; তাই এই বর্ণনা দাসকে প্রহারের বিদ্যমান সামাজিক চর্চা এবং সেই চর্চার শরয়ি অনুমোদন—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
আবু দাউদ হাদিসটির অধ্যায়ের নাম রেখেছেন—“باب المحرم يؤدب غلامه”, অর্থাৎ “ইহরামরত ব্যক্তি তার গোলামকে শাসন করা প্রসঙ্গে।” আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদ তাঁর শরহ সুনান আবি দাউদ-এ ওই শিরোনামের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, “أي: يؤدب غلامه بالضرب غير المبرح”—দাসকে মাত্রাতিরিক্ত নয় এমন প্রহারের মাধ্যমে শাসন করা। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, “فيدل هذا الحديث على أنه لا بأس للمحرم أن يؤدب غلامه”—এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইহরামরত অবস্থায় নিজের গোলামকে শাসন করায় অসুবিধা নেই। অর্থাৎ আবু বকরের দাসপ্রহারের ঘটনাটিকে পরবর্তী ইসলামি ভাষ্যকার সরাসরি শাসনমূলক প্রহারের অনুমোদনের দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। [35]
আবু বকরের দাসপ্রহারের বিবরণে মুহাম্মদের হাসি, মন্তব্য এবং প্রহার বন্ধ না করার ঘটনা একই সঙ্গে এসেছে। ইসলামি উসূলের তাকরীর নীতিতে মুহাম্মদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত কাজের প্রতি আপত্তি না জানানো শরয়ি বৈধতার দলিল। আবু দাউদের অধ্যায়ের বিন্যাসেও এই ঘটনাকে দাসকে শাসন করার প্রসঙ্গে রাখা হয়েছে। উট হারানোর কারণে একজন মালিক তার দাসকে প্রহার করছেন এবং মুহাম্মদের সামনে সেই প্রহার ঘটছে—এই ঘটনাই মালিকানাভিত্তিক শারীরিক শাস্তির স্বীকৃত সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করে।
দাসপ্রহার সম্পর্কে এই বর্ণনাটি ইসলামি আইন ও সামাজিক ইতিহাসে মালিকানাভিত্তিক শাস্তির অবস্থানকে সরাসরি প্রকাশ করে। আবু বকর উট হারানোর জন্য নিজের দাসকে প্রহার করেছেন; মুহাম্মদ তা দেখেছেন এবং নিষেধ করেননি। আবু দাউদ ঘটনাটিকে গোলাম শাসনের অধ্যায়ে রেখেছেন এবং আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদ প্রহারের মাধ্যমে শাসনের অনুমোদন নির্ণয় করেছেন। মালিকের হাতে দাসকে আঘাত করার ক্ষমতা যে স্বীকৃত সামাজিক ও আইনগত কাঠামোর অংশ ছিল, এই ঘটনাটি তার প্রত্যক্ষ দলিল।
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ২৮. ইহরা্ম অবস্থায় কোনো ব্যক্তি নিজ গোলামকে প্রহার করলে।
১৮১৮. আহমাদ ইবন হাম্বল (রহঃ) …… আসমা বিনত আবূ বাকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (বিদায় হজ্জের সময়) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমরা আরাজ নামক স্থানে উপনীত হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাহন থেকে অবতরণ করলেন এবং আমরাও অবতরণ করলাম। আয়েশা (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পার্শ্বে উপবেশন করেন এবং আমি আমার পিতা (আবূ বাকর) এর পার্শ্বে উপবেশন করি। আবূ বাকর (রাঃ) ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খাদ্য পানীয় ও সফরের সরঞ্জাম একই সংগে আবূ বাকরের একটি গোলামের নিকট (একটি উষ্ট্রের পৃষ্ঠে) রক্ষিত ছিল।
আবূ বাকর (রাঃ) গোলামের অপেক্ষায় ছিলেন (যেন খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করা যায়)। কিন্তু সে এমন অবস্থায় উপস্থিত হল যে, সে উট তার সাথে ছিল না। তিনি (আবূ বাকর) জিজ্ঞাসা করেন, তোমার সে উটটি কোথায়? জবাবে সে বলল, আমি গতকাল তাকে হারিয়ে ফেলেছি। আবূ বাকর (রাঃ) বলেন, মাত্র একটি উট, তুমি তাও হারিয়ে ফেললে? রাবী বলেন, তখন তিনি তাকে মারধর করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বলেনঃ তোমরা এ মুহরিম ব্যক্তির দিকে দেখ, কী করছে। রাবী ইবন আবূ রিয্মা বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উক্তির চাইতে অধিক কিছু বলেননি যে, ‘তোমরা এ মুহরিম ব্যক্তির দিকে দেখ কী কাজ করছে, আর তিনি মুচকি হাসছিলেন।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আসমা বিনতু আবূ বাকর (রাঃ)

এই হাদিসটি আরও বহু হাদিস গ্রন্থেই পাওয়া যায় [36] [37] [38]
মূল আরবি
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ إِدْرِيسَ، قَالَ: حَدَّثَنَا ابْنُ إِسْحَاقَ، عَنْ يَحْيَى بْنِ عَبَّادِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ أَسْمَاءَ بِنْتَ أَبِي بَكْرٍ، قَالَتْ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حُجَّاجًا، حَتَّى إِذَا كُنَّا بِالْعَرْجِ، نَزَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَجَلَسَتْ عَائِشَةُ إِلَى جَنْبِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَجَلَسْتُ إِلَى جَنْبِ أَبِي، وَكَانَتْ زِمَالَةُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَزِمَالَةُ أَبِي بَكْرٍ وَاحِدَةً مَعَ غُلَامِ أَبِي بَكْرٍ، فَجَلَسَ أَبُو بَكْرٍ يَنْتَظِرُهُ أَنْ يَطْلُعَ عَلَيْهِ، فَطَلَعَ، وَلَيْسَ مَعَهُ بَعِيرُهُ، فَقَالَ: أَيْنَ بَعِيرُكَ؟ قَالَ: أَضْلَلْتُهُ الْبَارِحَةَ، فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: بَعِيرٌ وَاحِدٌ تُضِلُّهُ، فَطَفِقَ يَضْرِبُهُ وَرَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَبَسَّمُ، وَيَقُولُ: ” انْظُرُوا إِلَى هَذَا الْمُحْرِمِ وَمَا يَصْنَعُ “
تحقيق الشيخ شعيب الأرناؤوط: [إسناده ضعيف ]
বাংলা অনুবাদ
২৬৯১৬ – আসমা বিনতে আবী বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – এর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম । উরুজ নামক স্থানে পৌঁছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁবু ফেললেন । আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – এর পাশে এসে বসলেন এবং আমি আমার পিতার পাশে । নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু – এর সওয়ারী একই ছিল এবং তা আবূ বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু – এর গোলামের কাছে ছিল । আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিজের গোলামের আসার অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু যখন সে আসলো, তখন তার সাথে উট ছিল না । আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার উট কোথায় গেল?’ সে বললো যে, ‘সেটা রাতারাতি আমার থেকে হারিয়ে গেছে’ । আবূ বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘একটি উট ছিল এবং সেটাও তুমি হারিয়ে দিলে?’ এবং তাকে মারতে লাগলেন । নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দেখে হাসতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন যে, ‘এই মুহরিমকে দেখো, এ কী করছে?’
দাসের আশ্রয়প্রার্থনার পরও প্রহার: আবু মাসউদের ঘটনা ও মুহাম্মদের হস্তক্ষেপ
দাসপ্রহারের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে আবু মাসউদ আল-আনসারির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে। আবু মাসউদ নিজের দাসকে চাবুক দিয়ে মারছিলেন। মুহাম্মদ তাঁর পেছন থেকে তাঁকে সতর্ক করে ডাকতে থাকেন। কিন্তু আবু মাসউদ এতটাই ক্রুদ্ধ ছিলেন যে প্রথমে ডাকটি বুঝতে পারেননি। মুহাম্মদ কাছে আসার পরে তিনি তাঁকে চিনতে পারেন এবং চাবুক ফেলে দেন। মুহাম্মদ তখন বলেন, আবু মাসউদের নিজের দাসের ওপর যতখানি ক্ষমতা রয়েছে, আল্লাহর তাঁর ওপর তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রয়েছে। এই ঘটনার একটি বর্ণনায় আবু মাসউদ এরপর আর কখনো নিজের দাসকে প্রহার করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেন। ঘটনাটি সরাসরি দেখায়, একজন সাহাবি নিজের দাসকে চাবুক দিয়ে প্রহার করতেন এবং মুহাম্মদের হস্তক্ষেপের সময়ও সেই প্রহার চলছিল। [39]
كُنْتُ أَضْرِبُ غُلاَمًا لِي بِالسَّوْطِ فَسَمِعْتُ صَوْتًا مِنْ خَلْفِي «اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ» فَلَمْ أَفْهَمِ الصَّوْتَ مِنَ الْغَضَبِ.
বাংলা অনুবাদ: আমি আমার এক দাসকে চাবুক দিয়ে প্রহার করছিলাম। তখন পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম, “আবু মাসউদ, জেনে রাখো।” কিন্তু ক্রোধের কারণে আমি সেই আওয়াজ বুঝতে পারিনি।
একই ঘটনার আরেকটি বর্ণনায় দাসটির নিজের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দাসটি প্রহার চলাকালে আল্লাহর আশ্রয় চাইছিল। কিন্তু আবু মাসউদ তাঁকে মারতে থাকেন। এরপর দাসটি মুহাম্মদের আশ্রয় চাইলে আবু মাসউদ প্রহার বন্ধ করেন। মুহাম্মদ তখন আল্লাহর ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং আবু মাসউদ দাসটিকে মুক্ত করেন। এই বর্ণনায় দাসটির অসহায় অবস্থান বিশেষভাবে স্পষ্ট। সে প্রহার বন্ধ করার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছে, কিন্তু সেই আবেদন তার মালিককে নিবৃত্ত করছে না। মুহাম্মদের আশ্রয়ের কথা বলার পর প্রহার বন্ধ হচ্ছে। অর্থাৎ আঘাত বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তটিও মালিকের হাতে; দাসের নিজের আবেদন তাকে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়নি। [40]
فَجَعَلَ يَقُولُ أَعُوذُ بِاللَّهِ – قَالَ – فَجَعَلَ يَضْرِبُهُ فَقَالَ أَعُوذُ بِرَسُولِ اللَّهِ فَتَرَكَهُ.
বাংলা অনুবাদ: দাসটি বলতে থাকল, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই।” কিন্তু তিনি তাকে প্রহার করতে থাকলেন। এরপর দাসটি বলল, “আমি আল্লাহর রাসুলের আশ্রয় চাই।” তখন তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন।
সহিহ মুসলিমের তৃতীয় বর্ণনায় আবু মাসউদ দাসটিকে মুক্ত করার ঘোষণা দেন। মুহাম্মদ তাঁকে বলেন, তিনি তা না করলে জাহান্নামের আগুন তাঁকে স্পর্শ করত বা দগ্ধ করত। এই বর্ণনায় নির্দিষ্ট প্রহারের বিরুদ্ধে কঠোর পরকালীন শাস্তির সতর্কবাণী এসেছে। ইবনে হাযম এ ঘটনা থেকে স্বতন্ত্রভাবে বাধ্যতামূলক মুক্তির বিধান নির্ণয় করেননি; তিনি সেই অন্য হাদিসকে ভিত্তি করেছেন, যেখানে মুহাম্মদ সরাসরি দাসীকে মুক্ত করার আদেশ দিয়েছিলেন। ফলে আবু মাসউদের ঘটনার কেন্দ্রীয় তথ্য হলো, প্রহারের সময় মুহাম্মদের হস্তক্ষেপ, দাসমুক্তি এবং প্রহারকারীর প্রতি ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবাণী। [41] [42]
فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ هُوَ حُرٌّ لِوَجْهِ اللَّهِ فَقَالَ «أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ».
বাংলা অনুবাদ: তখন আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত।” তিনি বললেন, “তুমি যদি তা না করতে, তাহলে আগুন তোমাকে দগ্ধ করত অথবা স্পর্শ করত।”
আবু বকর ও আবু মাসউদের ঘটনা দাসপ্রহারের চর্চার দুটি স্বতন্ত্র বিবরণ। আবু বকরের ঘটনায় মুহাম্মদ প্রহার প্রত্যক্ষ করে হাসতে হাসতে মন্তব্য করেছেন, কিন্তু বন্ধ করার নির্দেশ দেননি। আবু মাসউদের ঘটনায় তিনি প্রহার বন্ধের জন্য হস্তক্ষেপ করেছেন এবং দাসমুক্তি না হলে আগুনের শাস্তির কথা বলেছেন। একই হাদিস-ঐতিহ্যে এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া সংরক্ষিত থাকার অর্থ, নির্দিষ্ট প্রহারের নিন্দা ও মালিকের শাসনমূলক প্রহারের স্বীকৃতি পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। কোনো ঘটনাতেই দাসত্ব বা মালিকের কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করা হয়নি। দাসের শারীরিক নিরাপত্তা মালিকানাধীন অবস্থায় থেকেই বিবেচিত হয়েছে।
এই বর্ণনাগুলোর সম্মিলিত গুরুত্ব আরও গভীর। আবু মাসউদের দাসটি প্রহারের বিরুদ্ধে নিজে আবেদন করেও তা বন্ধ করাতে পারেনি। আবু মাসউদের হাতে চাবুক, দাসের শরীরে আঘাত, মালিকের ক্রোধ এবং দাসের আশ্রয়প্রার্থনা—এসবই মালিকানা ও আনুগত্যের অসম সম্পর্কের বাস্তব চিত্র। মুহাম্মদের হস্তক্ষেপের ফলে একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় প্রহার বন্ধ হয়েছে এবং দাসমুক্তি ঘটেছে। কিন্তু এই ঘটনা যে ব্যবস্থার মধ্যে সংঘটিত হয়েছে, সেখানে দাসকে শাসনের জন্য প্রহার করার মালিকানাভিত্তিক ক্ষমতা সামগ্রিকভাবে বিলুপ্ত হয়নি। পরবর্তী ফকিহরা সেই ক্ষমতার অনুমোদিত সীমা, অন্যায় প্রহারের কাফ্ফারা এবং মুক্তির বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিস্তারিত বিধান তৈরি করেছেন। অর্থাৎ নির্যাতনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট হস্তক্ষেপ এবং দাসের ওপর শারীরিক শাস্তির প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা একই আইনগত পরম্পরায় পাশাপাশি সংরক্ষিত রয়েছে।
ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যায় প্রহারের অনুমতি ও সীমালঙ্ঘনের শাস্তি
হুসাইন ইবনে আওদা আল-আওয়ায়িশার শরহু সহিহিল আদাবিল মুফরাদ-এ ইবনে উমরের ঘটনাটির ব্যাখ্যায় খাদেম নিষিদ্ধ বা হারাম কাজে জড়ালে তাকে শাসন ও প্রহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর পরেই আবু মাসউদের ঘটনাটি এবং আল্লাহর ক্ষমতা স্মরণ করিয়ে সতর্ক করার ব্যাখ্যা এসেছে। একই পৃষ্ঠায় এই বিন্যাসে শাসনমূলক প্রহারের বৈধতা এবং প্রহারকারীকে সতর্ক করার বক্তব্য একত্রে রয়েছে। [43]

والنسيئة: هي البيع إلى أجل معلوم، وأصل النسأ التأخير.
(فرجع إليه فجلده جلداً وجيعاً، وقال: اذهب فخذ الذي لي ولا تصرفه): فيه تأديب الخادم وضربه إذا وقع في محظور أو حرام.
* * *
١٢٧/١٧١ ـ عن أبي مسعود قال: كنت أضرب غلاماً لي فسمعت من خلفي صوتاً:
«اعلم أبا مسعود! لله أقدر عليك منك عليه».
فالتفت فإذا هو رسول الله ﷺ، قلت: يا رسول الله! فهو حر لوجه الله، فقال:
«أما إن لو لم تفعل لمستك النار»، أو «للفحتك النار».
[م: ٢٧ ـ ك الأيمان، ح ٣٤، ٣٥].
* الشرح *
(كنت أضرب غلاماً لي فسمعت من خلفي صوتاً): فيه ذكر ما يحصل مع المرء ليعتبر غيره.
(اعلم أبا مسعود! لله أقدر عليك منك عليه): لله بفتح لام التوكيد، والمعنى أن قدرة الله عليك، أعظم من قدرتك عليه.
وفيه التذكير بقدرة الله تعالى والتخويف به للائتمار بما أمر، والانتهاء عما نهى سبحانه.
(فالتفت فإذا هو رسول الله ﷺ): في «صحيح مسلم» (١٦٥٩):
١٩٩
বাংলা অনুবাদ:
নাসিআ হলো নির্দিষ্ট মেয়াদে বিক্রয়; ‘নাসা’ শব্দের মূল অর্থ বিলম্ব করা।
“ফিরে এলে তিনি তাকে যন্ত্রণাদায়কভাবে বেত্রাঘাত করলেন এবং বললেন: যাও, আমার জিনিস ফেরত নিয়ে এসো; তা বিনিময় করো না”—এতে খাদেম নিষিদ্ধ বা হারাম কাজে লিপ্ত হলে তাকে শাসন ও প্রহার করার বিধান রয়েছে।
* * *
১২৭/১৭১. আবু মাসউদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি আমার এক দাসকে প্রহার করছিলাম। তখন পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম:
“আবু মাসউদ, জেনে রাখো! তোমার তার ওপর যতখানি ক্ষমতা আছে, আল্লাহর তোমার ওপর তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রয়েছে।”
আমি ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি রাসুলুল্লাহ। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত। তিনি বললেন:
“তুমি যদি তা না করতে, আগুন তোমাকে স্পর্শ করত”—অথবা “আগুন তোমাকে ঝলসে দিত।”
মুসলিম: ২৭ নম্বর গ্রন্থ, কিতাবুল আইমান; হাদিস ৩৪, ৩৫।
ব্যাখ্যা:
“আমি আমার এক দাসকে প্রহার করছিলাম। তখন পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম”—এতে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বর্ণনা করার বিষয় রয়েছে, যাতে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
“আবু মাসউদ, জেনে রাখো! তোমার তার ওপর যতখানি ক্ষমতা আছে, আল্লাহর তোমার ওপর তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রয়েছে”—এখানে «لله» শব্দের প্রথম লাম জোর দেওয়ার লাম এবং তা ফাতহাযুক্ত। অর্থ হলো, তোমার ওপর আল্লাহর ক্ষমতা তোমার তার ওপর থাকা ক্ষমতার চেয়ে বেশি।
এতে আল্লাহর ক্ষমতা স্মরণ করানো এবং তাঁকে ভয় দেখানোর বিষয় রয়েছে, যাতে তাঁর আদেশ পালন করা হয় ও তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা হয়।
“আমি ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি রাসুলুল্লাহ”—সহিহ মুসলিম, নম্বর ১৬৫৯-এ রয়েছে:
পৃষ্ঠা ১৯৯।
এই ভাষ্যে ইবনে উমরের দাসকে যন্ত্রণাদায়কভাবে বেত্রাঘাত করার বিবরণ থেকে প্রহারের অনুমতি নির্ণয় করা হয়েছে। দাসের আচরণকে নিষিদ্ধ বা হারাম কাজ হিসেবে চিহ্নিত করলেই তাকে শারীরিক শাস্তির অধীন করার ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে। আবু মাসউদের প্রতি সতর্কবাণী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভাষ্যকার আল্লাহর ক্ষমতা ও ভয় দেখানোর কথা বলেছেন। মালিকের আঘাত করার ক্ষমতা নিয়ে এই ধর্মীয় বিন্যাসে মূল পার্থক্য তৈরি হচ্ছে কোন কাজের জন্য এবং কীভাবে প্রহার করা হচ্ছে, তা দিয়ে। দাসের শরীর মালিকের শাসনের অধীনেই থাকছে।
আবদুর রাজ্জাক আল-বদরের শরহুল আদাবিল মুফরাদ-এর পাঠসংকলনে আবু মাসউদের হাদিসের শাস্তির সতর্কবাণীকে সরাসরি সীমালঙ্ঘনকারী প্রহারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যেকোনো কারণে খাদেমকে প্রহার করলেই যদি আগুনের শাস্তি হতো, তাহলে সব ধরনের প্রহার হারাম হয়ে যেত। তিনি প্রহারের বিভিন্ন অবস্থার পৃথক বিধান গ্রহণ করেছেন। আবু মাসউদের আর কখনো দাসকে না মারার অঙ্গীকারও একই অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছেন। [44]

قال: يا رسول الله! فهو حر لوجه الله. فقال: «أما إن لو لم تفعل لمستك النار»، أو: «للفحتك النار» أي أصابك لفحها وهو حرها وسمومها.
وجاء في صحيح مسلم أن أبا مسعود رضي الله عنه قال: ـ وهذا أيضاً من تأثره واستجابته رضي الله عنه ـ «لا أضرب مملوكاً بعده أبداً»، فأخذ على نفسه عهداً ألا يضرب مملوكاً أبداً؛ لأن العقوبة التي ذُكرت عقوبة شديدة.
قال: «لمستك النار»، أو: «للفحتك النار» ومس النار للمؤدِّب أو للمعاقِب إذا كان ضربه أو تأديبه فيه تجاوز، وإلا فلو كان كل من ضرب خادمه لأي أمر مسته النار لأصبح الضرب في كل أحواله حراماً ولا يجوز، والصحيح أن الأمر فيه تفصيل سبق الإشارة إليه وبيانه من حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم.
٩١ ـ باب لا تقل: قَبَّحَ اللهُ وجهه
١٧٢ ـ حدثنا حجاج قال: حدثنا ابن عيينة، عن ابن عجلان، عن سعيد، عن أبي هريرة، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «لا تقولوا: قَبَّحَ اللهُ وجهه».
الشرح:
ثم قال الإمام البخاري رحمه الله: (باب لا تقل: قبح الله وجهه) وهذه الترجمة عقدها المصنف رحمه الله في هذه الأبواب التي تتعلق بتأديب الخادم تنبيهاً منه إلى أن بعض الناس عندما ينزعج من خادمه ويريد أن يؤدبه بالزجر يأتي بمثل هذه الكلمات، فيقول مثلاً هذه الكلمة أو يقول نظيرها من الكلمات التي قد يأتي بها بعض الناس في مقام التأديب.
فعقد الإمام البخاري رحمه الله هذه الترجمة ليبين أن هذا اللفظ الذي قد يرد على ألسنة بعض الناس في مقام الزجر والتأديب هو لفظ خاطئ وجاءت السنة النبوية بالنهي عنه والمنع منه.
ثم أورد حديث أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: «لا تقولوا: قبح الله وجهه» أي لا تقولوا هذه الكلمة.
والوجه هو أشرف شيء في الإنسان، والله تبارك وتعالى لم يخلقه على هيئة قبيحة وإنما خلقه على هيئة حسنة وصورة جميلة ومنظر بهي {لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ} [التين/٤]، {وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ} [الإسراء/٧٠].
٤٠٠
বাংলা অনুবাদ:
তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত। তখন তিনি বললেন: “তুমি যদি তা না করতে, আগুন তোমাকে স্পর্শ করত”—অথবা “আগুন তোমাকে ঝলসে দিত।” অর্থাৎ আগুনের দাহ তোমাকে আঘাত করত; তা হলো আগুনের উত্তাপ ও দহনকারী তাপ।
সহিহ মুসলিমে এসেছে, আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন—এটিও তাঁর প্রভাবিত হওয়া ও সাড়া দেওয়ার প্রকাশ—“এরপর আমি আর কখনো কোনো মালিকানাধীন দাসকে প্রহার করব না।” তিনি নিজের ওপর অঙ্গীকার নিলেন যে, আর কখনো কোনো দাসকে প্রহার করবেন না; কারণ উল্লিখিত শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।
তিনি বলেছেন: “আগুন তোমাকে স্পর্শ করত”—অথবা “আগুন তোমাকে ঝলসে দিত।” শাসনকারী বা শাস্তিদানকারীকে আগুন স্পর্শ করার বিষয়টি প্রযোজ্য, যখন তার প্রহার বা শাসনে সীমালঙ্ঘন থাকে। তা ছাড়া যে কেউ যেকোনো কারণে নিজের খাদেমকে প্রহার করলেই যদি আগুন তাকে স্পর্শ করত, তাহলে সব অবস্থায় প্রহার হারাম ও অবৈধ হয়ে যেত। সঠিক কথা হলো, এ বিষয়ে পৃথক অবস্থার পৃথক বিধান রয়েছে; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মাধ্যমে আগে তার ইঙ্গিত ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
৯১. “আল্লাহ তার মুখ কুৎসিত করুন”—এ কথা বলবে না।
১৭২. হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইবনে উয়াইনা আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবনে আজলান থেকে, তিনি সাঈদ থেকে, তিনি আবু হুরায়রা থেকে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী বলেছেন: “তোমরা বলবে না: আল্লাহ তার মুখ কুৎসিত করুন।”
ব্যাখ্যা:
এরপর ইমাম বুখারি বলেছেন: “আল্লাহ তার মুখ কুৎসিত করুন”—এ কথা বলবে না। গ্রন্থকার খাদেমকে শাসনসংক্রান্ত অধ্যায়গুলোর মধ্যে এই শিরোনাম এনেছেন এই বিষয়টি বোঝাতে যে, কেউ কেউ নিজের খাদেমের ওপর বিরক্ত হয়ে তাকে ধমকের মাধ্যমে শাসন করতে চাইলে এ ধরনের কথা বলে। যেমন, এই কথাটি কিংবা শাসনের সময় ব্যবহৃত অনুরূপ অন্য কোনো কথা বলে।
ইমাম বুখারি এই শিরোনাম এনেছেন বোঝাতে যে, ধমক ও শাসনের সময় মানুষের মুখে উচ্চারিত এ কথাটি ভুল; নবীর সুন্নাহ এই কথা বলতে নিষেধ করেছে এবং তা থেকে বিরত থাকতে বলেছে।
এরপর তিনি আবু হুরায়রার সূত্রে নবীর এই হাদিস এনেছেন: “তোমরা বলবে না: আল্লাহ তার মুখ কুৎসিত করুন।” অর্থাৎ এই কথাটি বলবে না।
মুখ মানুষের সবচেয়ে মর্যাদাবান অঙ্গ। আল্লাহ মানুষকে কুৎসিত আকৃতিতে সৃষ্টি করেননি; তিনি তাকে সুন্দর গঠন, সুন্দর আকৃতি ও মনোরম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। “অবশ্যই আমি মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছি”—সূরা আত-তিন, ৯৫:৪। “আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি”—সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০।
পৃষ্ঠা ৪০০।
আল-বদরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগুনের শাস্তির সতর্কবাণী শাসনের সীমা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অপরাধের কারণে অনুমোদিত শাসন হিসেবে যে প্রহার গৃহীত হয়, তা এই নিষেধের আওতায় পড়ে না। ফলে আবু মাসউদের ঘটনায় প্রহার থামানো এবং মালিকের সাধারণ শাসনক্ষমতা বজায় রাখা একই ব্যাখ্যার মধ্যে সম্ভব হয়েছে। দাসকে আঘাত করা বৈধ হতে পারে—এই অবস্থান গ্রহণ করেই ভাষ্যকার প্রহারের পরিমাণ ও কারণের বিচার করেছেন। দাসের শারীরিক স্বাধীনতা এই বিধানের ভিত্তি নয়; ভিত্তি হলো মালিকের শাসনের অনুমোদিত সীমানা।
আবু মাসউদ ভবিষ্যতে কোনো দাসকে প্রহার করবেন না বলে নিজের জন্য অঙ্গীকার করেছেন। আল-বদরের এই ব্যাখ্যায় সেই ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের পাশাপাশি অন্যান্য মালিকের জন্য অনুমোদিত শাসনমূলক প্রহার বহাল রয়েছে। নিচের মুখ কুৎসিত করার অভিশাপসংক্রান্ত ব্যাখ্যাতেও খাদেমকে ধমক ও শাসন করার সময় কোন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, তা নির্ধারিত হয়েছে। শারীরিক ও মৌখিক শাসনের সীমা নিয়ে এই বিধানগুলো দাসের ওপর মালিকের নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে ধরে নেয়। মানুষকে মালিকানাধীন রেখে তার শরীর ও আচরণ অন্য মানুষের শাস্তির ক্ষমতার অধীন করাই এই ব্যবস্থার মৌলিক নিপীড়ন।
দাসী মাথা ঢাকলে উমর তাকে প্রহার করতেন
দাসীর ওপর শারীরিক কর্তৃত্ব যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, উমর ইবনুল খাত্তাবের আচরণ সম্পর্কিত ইসলামি বর্ণনাতেও তার স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। IslamQA ইবনে তাইমিয়্যার মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া থেকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, উমর কোনো দাসীকে মাথা ঢেকে রাখতে দেখলে তাকে প্রহার করতেন এবং বলতেন—স্বাধীন নারীদের অনুকরণ করছ কেন? এর উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন নারী ও দাসীর পোশাকগত পার্থক্য বজায় রাখা [45] [46] ।
ইবনে তাইমিয়্যার মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া-তে বক্তব্যটি আরও সরাসরি ভাষায় সংরক্ষিত হয়েছে: “وكان عمر رضي الله عنه إذا رأى أمة مختمرة ضربها وقال أتتشبهين بالحرائر”—অর্থাৎ, উমর কোনো দাসীকে মাথা ঢাকতে দেখলে তাকে প্রহার করতেন এবং বলতেন, “তুমি কি স্বাধীন নারীদের অনুকরণ করছ?” এখানে প্রহারের কারণ কোনো অপরাধ, চুরি বা অবাধ্যতা নয়; অপরাধ ছিল দাসী হয়েও স্বাধীন নারীর মতো মাথা ঢাকার চেষ্টা। অর্থাৎ শারীরিক সহিংসতা ব্যবহৃত হয়েছে দাসীকে তার সামাজিক অধস্তন পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখার জন্য [47]।
ইবনে আবি শাইবার আল-মুসান্নাফ-এ আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে ঘটনাটির পূর্ণ বিবরণ রয়েছে। দাসীটি মুক্ত হয়েছে কি না, উমর প্রথমে সেটিই জানতে চান। মুক্ত হয়নি জানার পরে তার মাথার কাপড় খুলতে বলেন এবং ইতস্তত করায় মাথায় চাবুক দিয়ে আঘাত করেন। প্রহারের শেষসীমা হিসেবে বর্ণনায় এসেছে মাথা থেকে কাপড় সরিয়ে ফেলা। সাদ আশ-শাসরির সম্পাদিত সংস্করণে বর্ণনাটির পাদটীকায় “সহিহ” বলা হয়েছে। [48]
٦٣٨٣ ـ حدثنا علي بن مسهر عن المختار بن فلفل عن أنس بن مالك قال: دخلت على عمر بن الخطاب أمة (قد) (١) كان يعرفها لبعض (٢) المهاجرين أو الأنصار وعليها جلباب متقنعة به فسألها: عتقت؟ قالت: لا، قال: فما بال الجلباب؟ ضعيه عن رأسك إنما الجلباب على الحرائر من نساء المؤمنين (فتلكأت) (٣) فقام إليها بالدرة فضربها بها (برأسها) (٤) حتى ألقته عن رأسها (٥).
(١) في [أ]: (و).
(٢) في [هـ]: (ببعض).
(٣) في [أ، ب، جـ]: (فتلكات)، وفي [ز، هـ]: (فتلكت).
(٤) في [أ، جـ، ك]: (رأسها)، وفي [ب]: (رأسه).
(٥) صحيح.
বাংলা অনুবাদ:
৬৩৮৩. আলী ইবনে মুসহির আমাদের বর্ণনা করেছেন, আল-মুখতার ইবনে ফুলফুল থেকে, তিনি আনাস ইবনে মালিক থেকে। আনাস বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে এক দাসী প্রবেশ করল। তিনি তাকে চিনতেন; সে ছিল কোনো মুহাজির অথবা আনসারির দাসী। তার পরনে একটি জিলবাব ছিল এবং তা দিয়ে সে নিজের মাথা ঢেকে রেখেছিল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি মুক্ত হয়েছ? সে বলল: না। তিনি বললেন: তাহলে এই জিলবাব কেন? নিজের মাথা থেকে তা সরিয়ে ফেলো। জিলবাব তো মুমিন নারীদের মধ্যে স্বাধীন নারীদের জন্য। সে ইতস্তত করতে লাগল। তখন তিনি চাবুক নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তা দিয়ে তার মাথায় আঘাত করলেন, যতক্ষণ না সে নিজের মাথা থেকে কাপড়টি সরিয়ে ফেলল।
(১) “قد” শব্দের স্থানে “أ” চিহ্নিত পাণ্ডুলিপিতে “و” রয়েছে।
(২) “لبعض” শব্দের স্থানে “هـ” চিহ্নিত পাণ্ডুলিপিতে “ببعض” রয়েছে।
(৩) “فتلكأت” শব্দের স্থানে “أ، ب، جـ” চিহ্নিত পাণ্ডুলিপিতে “فتلكات” এবং “ز، هـ” চিহ্নিত পাণ্ডুলিপিতে “فتلكت” রয়েছে।
(৪) “برأسها” শব্দের স্থানে “أ، جـ، ك” চিহ্নিত পাণ্ডুলিপিতে “رأسها” এবং “ب” চিহ্নিত পাণ্ডুলিপিতে “رأسه” রয়েছে।
(৫) সহিহ।
ঘটনাটির প্রশ্নোত্তরেই পোশাকের অধিকারকে স্বাধীনতার অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। নারীটি মুক্ত হলে যে আবরণ গ্রহণ করতে পারত, দাসী থাকা অবস্থায় তা পরায় তাকে আঘাত করা হয়েছে। সে কাপড় সরাতে ইতস্তত করেছে; তারপর প্রহারের মাধ্যমে তার পোশাক বদলানো হয়েছে। আঘাতের লক্ষ্য মাথা এবং আঘাত বন্ধ হওয়ার সঙ্গে কাপড় সরানোর ফল যুক্ত। ফলে সহিংসতার কাজটি সরাসরি বোঝা যায়: স্বাধীন নারী ও দাসী নারীর দৃশ্যমান পার্থক্য বলপ্রয়োগ করে বজায় রাখা। দাসীর শরীর কীভাবে আবৃত থাকবে, সেটিও শাসনকারীর নির্দেশের অধীন করা হয়েছে।
এই ঘটনাটি দাসপ্রহারের ক্ষমতাগত চরিত্রকে আরও নগ্নভাবে প্রকাশ করে। এখানে কোনো সহিংস অপরাধের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না; একজন নারী তার শরীর ঢাকতে চাওয়ায় তাকে মারধর করা হচ্ছে, কারণ তার সামাজিক পরিচয় “দাসী” এবং তাকে স্বাধীন নারীর মতো পোশাক পরতে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ দাসীর ওপর শারীরিক শাস্তির ব্যবহার শুধু কর্মগত শৃঙ্খলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; দাসত্বের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং দৃশ্যমান অধস্তন অবস্থান বজায় রাখতেও প্রহার ব্যবহারের বর্ণনা ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যেই রয়েছে।
প্রহার দিয়ে পোশাকের শ্রেণিচিহ্ন রক্ষা: ইবনে কুদামা ও ইবনে মুফলিহ
ইবনে কুদামা দাসীর মাথা খোলা রেখে নামাজ পড়ার বিধান প্রতিষ্ঠা করতে উমরের প্রহারের ঘটনা ব্যবহার করেছেন। আনাসের পরিবারের এক দাসীকে মাথা ঢাকা অবস্থায় দেখে উমর তাকে প্রহার করেন এবং স্বাধীন নারীদের অনুকরণ করতে নিষেধ করেন। লেখক ঘটনাটির প্রচলন ও প্রতিবাদ না হওয়ার কথা নিজের বিধানের পক্ষে যুক্তি হিসেবে এনেছেন। [49]
فصل: قال: وصلاة الأمة مكشوفة الرأس جائزة. هذا قول عامة أهل العلم. لا نعلم أحدا خالف في هذا إلا الحسن، فإنه من بين أهل العلم أوجب عليها الخمار إذا تزوجت، أو اتخذها الرجل لنفسه، واستحب لها عطاء أن تقنع إذا صلت، ولم يوجبه. ولنا، أن عمر رضي الله عنه ضرب أمة لآل أنس رآها متقنعة، وقال: اكشفي رأسك، ولا تشبهي بالحرائر. وهذا يدل على أن هذا كان مشهورا بين الصحابة لا ينكر، حتى أنكر عمر مخالفته كان ينهى الإماء عن التقنع. قال أبو قلابة: إن عمر بن الخطاب كان لا يدع أمة تقنع في خلافته، وقال: إنما القناع للحرائر.
বাংলা অনুবাদ:
পরিচ্ছেদ: তিনি বলেছেন, দাসীর মাথা খোলা রেখে নামাজ পড়া বৈধ। এটি সাধারণভাবে আলেমদের মত। হাসান ছাড়া এতে কারও ভিন্নমত আমাদের জানা নেই। আলেমদের মধ্যে তিনিই দাসী বিবাহিত হলে অথবা কোনো ব্যক্তি তাকে নিজের জন্য গ্রহণ করলে তার মাথার আবরণ আবশ্যক করেছেন। আতা নামাজে তার মাথা ঢাকাকে পছন্দনীয় বলেছেন, আবশ্যক করেননি। আমাদের পক্ষে দলিল হলো, উমর আনাসের পরিবারের এক দাসীকে মাথা ঢাকা অবস্থায় দেখে প্রহার করেছিলেন এবং বলেছিলেন: মাথা খুলে দাও; স্বাধীন নারীদের অনুকরণ করো না। এটি নির্দেশ করে যে বিষয়টি সাহাবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং এর প্রতিবাদ করা হতো না; এমনকি উমর এর ব্যতিক্রমের প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি দাসীদের মাথা ঢাকতে নিষেধ করতেন। আবু কিলাবা বলেছেন: উমর ইবনে খাত্তাব তাঁর খিলাফতে কোনো দাসীকে মাথা ঢাকতে দিতেন না এবং বলতেন: মাথার এই আবরণ স্বাধীন নারীদের জন্য।
বুরহানুদ্দিন ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুফলিহ আল-মুবদি-তে একই প্রথা উল্লেখ করে তাকে “ইজমার মতো” বলেছেন। তাঁর যুক্তিতে প্রচলন ও প্রতিবাদ না হওয়া ফিকহি অনুমোদনের ভিত্তি হয়েছে। [50]
ولا فرق بين الحر والعبد وكذا من بلغ عشرا في الأصح وأما الأمة فذكر معظم الأصحاب وهو المذهب أن عورتها كالرجل لما روى عمرو ابن شعيب عن أبيه عن جده مرفوعا قال: «إذا زوج أحدكم عبده أو أمته أو أجيره فلا ينظر إلى شيء من عورته فإن ما تحت السرة إلى ركبته عورة» رواه أحمد وأبو داود يريد به الأمة فإن الأجير والعبد لا يختلف حاله بالتزويج وعدمه وكان عمر ينهى الإماء عن التقنع وقال إنما القناع للحرائر واشتهر ذلك ولم ينكر فكان كالإجماع.
বাংলা অনুবাদ:
স্বাধীন পুরুষ ও দাসের মধ্যে পার্থক্য নেই; অধিক শুদ্ধ মতে দশ বছর বয়সে পৌঁছানো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তাই। দাসীর ক্ষেত্রে অধিকাংশ হাম্বলি ফকিহ উল্লেখ করেছেন, এবং এটিই মাযহাবের মত, তার সতর পুরুষের মতো। কারণ আমর ইবনে শুয়াইব তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে নবীর বক্তব্য বর্ণনা করেছেন: তোমাদের কেউ নিজের দাস, দাসী বা ভাড়াটে কর্মচারীর বিয়ে দিলে তার সতরের কোনো অংশ দেখবে না; নাভির নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর। আহমদ ও আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেন। এখানে দাসী উদ্দেশ্য; কারণ ভাড়াটে কর্মচারী ও পুরুষ দাসের অবস্থা বিয়ে করা বা না করার কারণে বদলায় না। উমর দাসীদের মাথা ঢাকতে নিষেধ করতেন এবং বলতেন: মাথার এই আবরণ স্বাধীন নারীদের জন্য। বিষয়টি প্রচলিত হয়েছিল এবং এর প্রতিবাদ হয়নি; ফলে তা ইজমার মতো হয়েছিল।
এই প্রহারের সামাজিক কাজ ছিল স্বাধীন নারী ও দাসী নারীর দৃশ্যমান পার্থক্য বজায় রাখা। মাথার কাপড় নারীটির নিজের পোশাক নির্বাচনের বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি; সেটি তার সামাজিক অবস্থানের চিহ্ন হয়ে উঠেছে। যে পোশাক স্বাধীন নারীর মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত, দাসী সেই পোশাক গ্রহণ করায় তার শরীরে আঘাত করা হয়েছে। পরবর্তী ফকিহরা সেই প্রথাকেই পোশাক ও সতরের বিধানের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। দাসীর মর্যাদা নিচে ধরে রাখার প্রয়োগ এবং তার ধর্মীয় আইনগত ব্যাখ্যা এভাবে পরস্পরকে শক্তিশালী করেছে। ইবনে মুফলিহের “ইজমার মতো” মূল্যায়ন এই প্রথাকে ফিকহি কর্তৃত্ব দেওয়ার তাঁর নিজস্ব যুক্তি।
সাহাবিদের নীরবতা থেকে বিধানের অনুমোদন: সাইমারির ইজমা-নীতি
ইবনে কুদামা ও ইবনে মুফলিহ দাসীর মাথার আবরণ সরানোর প্রথাকে সাহাবিদের মধ্যে প্রচলিত ও প্রতিবাদহীন বলে উল্লেখ করেছেন। প্রচলন ও প্রতিবাদ না থাকার এই যুক্তির পেছনে উসুলুল ফিকহের একটি নির্দিষ্ট নীতি রয়েছে। হানাফি উসুলবিদ হুসাইন ইবনে আলী আস-সাইমারি মাসাইলুল খিলাফ ফি উসুলিল ফিকহ-এ সাহাবিদের মধ্যে কোনো বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর তার বিরোধিতাকারী জানা না গেলে সেটিকে ইজমা গণ্য করার মত গ্রহণ করেছেন। তাঁর যুক্তিতে, মতভেদ থাকলে তা প্রকাশ ও বর্ণিত হতো; বিরোধিতা বর্ণিত না হওয়াকে তাই ঐকমত্যের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। একই আলোচনায় তিনি এই বিষয়ে অন্য দুটি অবস্থানও নথিভুক্ত করেছেন। [51]

مسائل الخلاف — ٣٤٦
مسألة: إذا ظهر القول في الصحابة وانتشر ولم يُعرف له مخالف
فإن ذلك إجماع لا يسوغ مخالفته، سواء كان القائلون بذلك جمعاً(١) كثيراً أو واحداً أو اثنين(٢).
ومن الناس من قال: يكون حجة ولا يكون إجماعاً(٣).
ومنهم من قال: لا يكون إجماعاً ولا حجة، وهو قول الشيخ أبي عبد الله [الكرخي](٤).
دليلنا أن الحادثة التي يتعلق حكمها بالجماعة فإن حدوثها يدعو كل واحد من أهل الاجتهاد إلى إظهار ما عنده في ذلك، كما أن وقوع التحدي يدعو المتحدى إلى [إظهار] ما عنده فيما تحدي به. ألا ترى أنه لما حدث في الصحابة الحل والحرام أظهر(٥) كل واحد ما كان عنده. وإذا كان كذلك، فالقول إذا ظهر وانتشر ولم يعرف له مخالف علمنا أنه لا خلاف هناك؛ لأنه لو كان فيه خلاف لظهر، ولو ظهر لنقل كما نقل غيره من الخلاف.
(١) في الأصل: جميعا.
(٢) وإليه ذهب الشيرازي وابن برهان من الشافعية. «شرح اللمع» ٢/٦٩١.
(٣) وهو قول أبي بكر الصيرفي. «شرح اللمع» ٢/٦٩١.
(٤) وإليه ذهب أبو داود الظاهري والباقلاني. «شرح اللمع» ٢/٦٩١.
(٥) في الأصل: وأظهر.
বাংলা অনুবাদ:
মাসাইলুল খিলাফ — পৃষ্ঠা ৩৪৬।
প্রশ্ন: সাহাবিদের মধ্যে কোনো বক্তব্য প্রকাশিত ও প্রচারিত হলে এবং তার কোনো বিরোধিতাকারী জানা না গেলে।
তাহলে তা ইজমা; তার বিরোধিতা করা বৈধ নয়। বক্তব্যের প্রবক্তা বিপুলসংখ্যক মানুষ হোক, একজন হোক কিংবা দুজন হোক—বিধান একই। (১–২)
কেউ কেউ বলেছেন: এটি দলিল হবে, তবে ইজমা হবে না। (৩)
আবার কেউ বলেছেন: এটি ইজমাও হবে না, দলিলও হবে না। এটি শায়খ আবু আবদুল্লাহ আল-কারখির মত। (৪)
আমাদের দলিল হলো, যে ঘটনার বিধান গোটা গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত, সেই ঘটনার উদ্ভব প্রত্যেক মুজতাহিদকে ওই বিষয়ে তাঁর অবস্থান প্রকাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন, চ্যালেঞ্জ করা হলে যাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তা তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। দেখা যায়, সাহাবিদের মধ্যে হালাল ও হারামের প্রশ্ন দেখা দিলে প্রত্যেকেই নিজের জানা অবস্থান প্রকাশ করেছেন। (৫) অতএব কোনো বক্তব্য প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার পরও তার কোনো বিরোধিতাকারী জানা না গেলে আমরা বুঝি, সেখানে মতভেদ নেই। কারণ মতভেদ থাকলে তা প্রকাশ পেত; আর প্রকাশ পেলে অন্যান্য মতভেদের মতো সেটিও বর্ণিত হতো।
(১) মূল পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে: «جميعا»—সকলেই।
(২) শাফেয়িদের মধ্যে শিরাজি ও ইবনে বুরহান এই মত গ্রহণ করেছেন। শরহুল লুমা, ২/৬৯১।
(৩) এটি আবু বকর আস-সাইরাফির মত। শরহুল লুমা, ২/৬৯১।
(৪) আবু দাউদ আয-যাহিরি ও আল-বাকিল্লানি এই মত গ্রহণ করেছেন। শরহুল লুমা, ২/৬৯১।
(৫) মূল পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে: «وأظهر»—এবং প্রকাশ করেছেন।
এই নীতির প্রয়োগে কোনো প্রথার প্রচলন ধর্মীয় বিধানের ভিত্তি হয়ে ওঠে। দাসীর মাথার কাপড় খুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ইবনে কুদামা ও ইবনে মুফলিহ সাহাবিদের মধ্যে প্রচলন এবং আপত্তি না হওয়ার তথ্যকে ব্যবহার করেছেন। তাঁদের বিবেচনায় প্রথাটির আইনগত কর্তৃত্ব গড়ে উঠছে স্বীকৃত ধর্মীয় ব্যক্তিদের আচরণ ও নীরবতা থেকে। দাসী নারীটি নিজের মাথা ঢাকতে চান কি না, সেই ইচ্ছা এই যুক্তির কোনো শর্ত নয়। ফলে যার শরীরে আঘাত করা হচ্ছে এবং যার পোশাক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, বিধান প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়ায় তার সম্মতির কোনো ভূমিকা নেই। কর্তৃত্বশালী পুরুষদের মধ্যে বিরোধিতা জানা না যাওয়াই তার ওপর প্রয়োগ করা শ্রেণিবিধানের অনুমোদন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাইমারির নির্বাচিত মতটি সেই নীরবতাকে ইজমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তার বিরোধিতাও অবৈধ ঘোষণা করে। ইবনে মুফলিহ নির্দিষ্ট পোশাকবিধানটির ক্ষেত্রে “ইজমার মতো” শব্দ ব্যবহার করেছেন। এই দুই বক্তব্য একত্রে দেখায়, দাসীর পোশাক নিয়ন্ত্রণের প্রথা কীভাবে ফিকহি যুক্তির মধ্যে কর্তৃত্ব পেয়েছে। স্বাধীন নারীর সঙ্গে দৃশ্যমান সাদৃশ্য গ্রহণ করার কারণে দাসীকে প্রহার করার বিবরণ এবং সেই পার্থক্য বজায় রাখার পক্ষে ধর্মীয় আইনগত যুক্তি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। মানুষকে স্বাধীন ও মালিকানাধীন শ্রেণিতে ভাগ করার ব্যবস্থা এভাবেই পোশাকের অধিকার পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করেছে।
সত্য বের করার জন্য দাসীকে “ভীষণ প্রহার”
একই নীতিটি ইবনে হিশামের সীরাতে বর্ণিত বারীরার ঘটনাটিকেও আরও গুরুতর করে তোলে। আয়িশার বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পরে মুহাম্মদ আলী ও উসামার পরামর্শ চান। আলী আয়িশার দাসী বারীরাকে জিজ্ঞাসাবাদের পরামর্শ দেন। এরপর মুহাম্মদ বারীরাকে ডেকে আনেন এবং বর্ণনা অনুযায়ী আলী তাকে “ভীষণ প্রহার” করে সত্য বলাতে চেষ্টা করেন [52]।
IslamWeb-ও ঘটনাটির এই অর্থ আড়াল করেনি। তাদের ফতোয়ায় সরাসরি বলা হয়েছে, “وإنما كان ضرب علي لها لتصدق فيما تجيب به”—অর্থাৎ আলী তাকে প্রহার করেছিলেন, যেন সে তার উত্তরে সত্য বলে। ইসলামওয়েবের এই ব্যাখ্যায় প্রহারের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে জিজ্ঞাসাবাদে সত্য আদায় করা [53]।
আলী বারীরাকে প্রহার করার ঘটনা আয়িশার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মদ বারীরাকে ডেকে আনেন; আলী তাঁকে প্রবলভাবে প্রহার করে সত্য বলতে বলেন। অথচ বর্ণনায় এই সহিংসতার বিরুদ্ধে মুহাম্মদের কোনো নিষেধ, আলীর বিরুদ্ধে শাস্তি বা বারীরার জন্য কোনো প্রতিকারের উল্লেখ নেই। একজন অধীনস্থ নারীকে তথ্য আদায়ের জন্য মারধর করা হয়েছে এবং সেই ঘটনার বিবরণে শারীরিক নির্যাতনকে জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি হিসেবেই পাওয়া যায়।
মুহাম্মদের উদ্যোগে আয়িশার দাসীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা এবং সেই জিজ্ঞাসাবাদের সময় আলীর হাতে তাঁর প্রহৃত হওয়ার ঘটনাটি সীরাতের বর্ণনায় পরপর এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি হিসেবে দাসীকে মারধরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য নেই। আইনগত কর্তৃত্বের সঙ্গে এই সহিংসতার সম্পর্ক স্পষ্ট: যাঁর কথা শোনার জন্য দাসীকে ডেকে আনা হয়েছে, তাঁকে সত্য বলতে বাধ্য করার উপায় হিসেবে শারীরিক আঘাত ব্যবহার করা হয়েছে। একজন দাসীর ওপর শাস্তিমূলক কর্তৃত্বের সামাজিক বাস্তবতা এই ঘটনাতেও উপস্থিত।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জিজ্ঞাসাবাদ
আয়েশা (রা) বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) ও উসামা
ইব্ন যায়দ (রা)-কে ডেকে তাঁদের পরামর্শ জানতে চাইলেন। এঁদের মধ্যে উসামা আমার প্রশংসাই করলেন এবং উত্তম কথাই বললেন। তারপর তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনার পরিবার, আমরা তো তাঁর সম্পর্কে উত্তম বৈ কিছুই জানি না। এটা একটা অপপ্রচার ও মিথ্যাচার। আর আলী (রা) বললেন:
৩১০
সীরাতুন নবী (সা)
“ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মেয়ে লোকতো প্রচুর রয়েছে। আর আপনার এ সামর্থ্যও রয়েছে যে, একজনের বদলে অপরজন নিয়ে আসবেন। আর আপনি দাসীকে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনাকে সত্য সত্য সব বলে দেবে।”
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে বারী’রাকে ডাকলেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আলী ইব্ন আবু তালিব তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি তাকে ভীষণ প্রহার করলেন এবং বললেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সত্য সত্য সব বলবি।
সে বলল: আল্লাহর কসম! উত্তম ছাড়া তাঁর সম্পর্কে আর কিছুই আমি জানি না। আমি তো আয়েশার মধ্যে কোন দোষই খুঁজে পাই না। তবে হ্যাঁ, আমি যখন রুটির জন্যে, খামীর তৈরি করি, আর তাঁকে একটু দেখতে বলি, তখন তিনি সেদিকে খেয়াল না করে নিদ্রায় বিভোর হয়ে পড়েন আর এদিকে ছাগী এসে তা খেয়ে ফেলে।

দৈনন্দিন কাজ ও সেবার ঘটনায় সাহাবি–তাবেঈদের দাসপ্রহার
মালিকের কাজ করতে গিয়ে লেনদেনের নিয়মে বিচ্যুতি, পশু হারানো কিংবা সেবার কাজে অসন্তোষ—এসব কারণে দাসদাসীর ওপর প্রহারের বিবরণ সংরক্ষিত আছে। এই ঘটনাগুলোতে মালিকের অর্থনৈতিক স্বার্থ, ব্যক্তিগত ক্রোধ এবং অধীনস্থ মানুষের শরীরের ওপর বলপ্রয়োগ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দাস নিজের শ্রম দিয়ে মালিকের সম্পদ ও আরামের ব্যবস্থা করছে; কাজের ফল নিয়ে মালিক অসন্তুষ্ট হলে সেই মানুষের শরীর আঘাতের লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
মুদ্রা বিনিময়ের ঘটনায় ইবনে উমরের যন্ত্রণাদায়ক প্রহার
ইবনে উমর নিজের এক দাসকে সোনা অথবা রুপা বিনিময় করতে পাঠিয়েছিলেন। দাসটি বিনিময়ের অপর পক্ষকে সময় দিয়েছিল। ফিরে আসার পরে ইবনে উমর তাকে যন্ত্রণাদায়কভাবে বেত্রাঘাত করেন এবং নিজের সম্পদ ফেরত আনতে বলেন। আরবি সংস্করণের আল-আদাবুল মুফরাদে বর্ণনাটির নম্বর ১৭০; কিছু বাংলা সংস্করণে ১৬৯ হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে। [54]
أرسل عبدُ اللهِ بنُ عمرَ غلامًا له بذهبٍ أو بورقٍ فصرفه فأنظر بالصَّرفِ فرجع إليه فجلده جلدًا وجيعًا وقال اذهبْ فخُذْ الذي لي ولا تَصرِفْه.
বাংলা অনুবাদ:
আবদুল্লাহ ইবনে উমর নিজের এক দাসকে সোনা অথবা রুপা দিয়ে পাঠালেন। সে তা বিনিময় করল এবং বিনিময়ের অপর পক্ষকে সময় দিল। ফিরে এলে তিনি তাকে যন্ত্রণাদায়কভাবে বেত্রাঘাত করলেন এবং বললেন: যাও, আমার জিনিস ফেরত নিয়ে এসো; তা বিনিময় করো না।
দাসকে আঘাত করার বর্ণনায় ব্যবহৃত “জালদান ওয়াজিআন” কথাটির অর্থ যন্ত্রণাদায়ক বেত্রাঘাত। লেনদেনের নিয়মভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় মালিক অধীনস্থ মানুষের শরীরকে শাস্তির স্থান বানিয়েছেন। যিনি নিজের সম্পদ বিনিময়ের কাজে অন্য মানুষকে পাঠানোর ক্ষমতা রাখেন, তিনিই সেই কাজের ফল পছন্দ না হলে তাকে শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতাও প্রয়োগ করছেন। লেনদেন সংশোধনের আদেশের সঙ্গে বেত্রাঘাত যুক্ত হওয়ায় মালিকের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং দাসের ওপর শারীরিক কর্তৃত্বের সংযোগ স্পষ্ট হয়ে যায়।
আল-আদাবুল মুফরাদের মুদ্রিত পাঠে ইবনে উমরের ঘটনাটির পূর্ণ বর্ণনাসূত্রের সঙ্গে “যন্ত্রণাদায়ক বেত্রাঘাত” কথাটিও রয়েছে। একই পৃষ্ঠায় পরের বর্ণনাটি আবু মাসউদের দাসপ্রহার সম্পর্কে। নিচের টীকায় প্রথমটিকে মওকুফ বর্ণনা এবং তার সনদকে হাসান বলা হয়েছে; দ্বিতীয়টির সনদকে সহিহ বলা হয়েছে। টীকাকার প্রথম বর্ণনার বর্ণনাকারীদের নিয়েও বিস্তারিত মূল্যায়ন দিয়েছেন। একই “খাদেমকে শিষ্টাচার শিক্ষাদান” অধ্যায়ে শাসনমূলক প্রহার ও প্রহারের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী পাশাপাশি সংরক্ষিত হয়েছে। [55]

الأدب المفرد — ١٦٢
(٩٠) بَابُ أَدَبِ الْخَادِمِ
١٧٠ ـ حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ عِيسَى قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ وَهْبٍ قَالَ: أَخْبَرَنِي مَخْرَمَةُ بْنُ بُكَيْرٍ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ: سَمِعْتُ يَزِيدَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ قُسَيْطٍ قَالَ: أَرْسَلَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ غُلَامًا لَهُ بِذَهَبٍ أَوْ بِوَرِقٍ، فَصَرَفَهُ، فَأَنْظَرَ بِالصَّرْفِ، فَرَجَعَ إِلَيْهِ فَجَلَدَهُ جَلْدًا وَجِيعًا وَقَالَ: اذْهَبْ، فَخُذِ الَّذِي لِي، وَلَا تَصْرِفْهُ(١).
١٧١ ـ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلَامٍ قَالَ: أَخْبَرَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، عَنِ الْأَعْمَشِ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ قَالَ: كُنْتُ أَضْرِبُ غُلَامًا لِي، فَسَمِعْتُ مِنْ خَلْفِي صَوْتًا: «اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ، لَلَّهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ»، فَالْتَفَتُّ فَإِذَا هُوَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَهُوَ حُرٌّ لِوَجْهِ اللَّهِ، فَقَالَ: «أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ» أَوْ «لَلَفَحَتْكَ النَّارُ»(٢).
= والخبر أخرجه الخرائطي في «مكارم الأخلاق» عن حفص بن عمر النمري (٤٧٥)، والبيهقي في «الشعب» عن أبي الوليد الطيالسي (٦٢٨٣)، كلاهما عن شعبة، عن أبي إسحاق، به… وانظر بقية الطرق في الخبر السابق.
(١) خبر موقوف، وإسناده حسن.
❖ مخرمة بن بكير بن عبد الله الأشج، والراجح أنه صدوق على تفصيل في حديثه، وقد تكلم في روايته عن أبيه، وهو بالجملة قد سمع منه والباقي صحيفة رواها عن أبيه، وهي رواية صحيحة، وقد خرج له الإمام مسلم عنه عن أبيه.
❖ وأبوه بكير بن الأشج، ثقة جليل.
❖ ويزيد بن عبد الله بن قسيط، الليثي، المدني، ثقة. ونص البخاري على سماعه من ابن عمر.
❖ وعبد الله بن وهب هو ابن مسلم القرشي الفهري، مولاهم المصري، ثقة حافظ.
❖ وأحمد بن عيسى هو المصري، والراجح أنه صدوق، وقد تكلم فيه؛ لأنه كان يتحدث أحياناً كتاباً وإجازة ولا يهتم في صيغ السماع، وهي عادة شيخه ابن وهب أيضاً.
(٢) إسناده صحيح.
বাংলা অনুবাদ:
আল-আদাবুল মুফরাদ — পৃষ্ঠা ১৬২।
৯০. খাদেমকে শিষ্টাচার শিক্ষাদান।
১৭০. আহমদ ইবনে ঈসা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মাখরামা ইবনে বুকাইর আমাকে তাঁর পিতার সূত্রে জানিয়েছেন। তাঁর পিতা বলেন, আমি ইয়াযীদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কুসাইতকে বলতে শুনেছি: আবদুল্লাহ ইবনে উমর নিজের এক দাসকে সোনা অথবা রুপা দিয়ে পাঠালেন। সে তা বিনিময় করল এবং বিনিময়ের ক্ষেত্রে অপর পক্ষকে সময় দিল। ফিরে এলে তিনি তাকে যন্ত্রণাদায়কভাবে বেত্রাঘাত করলেন এবং বললেন: যাও, আমার জিনিস ফেরত নিয়ে এসো; তা বিনিময় করো না। (১)
১৭১. মুহাম্মদ ইবনে সালাম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু মুআবিয়া আমাদের জানিয়েছেন, আল-আ‘মাশ থেকে, তিনি ইবরাহিম আত-তাইমি থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আবু মাসউদ থেকে। আবু মাসউদ বলেন: আমি আমার এক দাসকে প্রহার করছিলাম। তখন পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম: “আবু মাসউদ, জেনে রাখো, তোমার তার ওপর যতখানি ক্ষমতা আছে, আল্লাহর তোমার ওপর তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রয়েছে।” আমি ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত। তিনি বললেন: “তুমি যদি তা না করতে, আগুন তোমাকে স্পর্শ করত”—অথবা “আগুন তোমাকে ঝলসে দিত।” (২)
= বর্ণনাটি খারায়েতি মাকারিমুল আখলাক-এ হাফস ইবনে উমর আন-নামারির সূত্রে, নম্বর ৪৭৫; এবং বাইহাকি আশ-শুআব-এ আবুল ওয়ালিদ আত-তায়ালিসির সূত্রে, নম্বর ৬২৮৩, বর্ণনা করেছেন। দুজনই শুআবা থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে ওই সূত্রে বর্ণনা করেছেন… অবশিষ্ট বর্ণনাপথ আগের বর্ণনায় দেখুন।
(১) এটি সাহাবির বক্তব্য বা কাজ পর্যন্ত সীমিত একটি মওকুফ বর্ণনা; এর সনদ হাসান।
❖ মাখরামা ইবনে বুকাইর ইবনে আবদুল্লাহ আল-আশাজ: তাঁর বর্ণনার বিস্তারিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত হলো, তিনি সত্যবাদী। তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে শুনেছেন; অবশিষ্ট অংশ তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত একটি লিখিত সহিফা। সেই বর্ণনা সহিহ। ইমাম মুসলিমও তাঁর পিতার সূত্রে তাঁর বর্ণনা সংকলন করেছেন।
❖ তাঁর পিতা বুকাইর ইবনে আল-আশাজ একজন নির্ভরযোগ্য ও মর্যাদাবান বর্ণনাকারী।
❖ ইয়াযীদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কুসাইত আল-লাইসি আল-মাদানি নির্ভরযোগ্য। বুখারি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি ইবনে উমরের কাছ থেকে শুনেছেন।
❖ আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব হলেন আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম আল-কুরাশি আল-ফিহরি; তিনি তাঁদের মুক্তিপ্রাপ্ত দাস এবং মিসরীয়। তিনি নির্ভরযোগ্য ও হাফিজ।
❖ আহমদ ইবনে ঈসা হলেন মিসরীয়। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত হলো, তিনি সত্যবাদী। তাঁকে নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, কারণ তিনি কখনো কখনো লিখিত কিতাব ও বর্ণনার অনুমতির ভিত্তিতে বর্ণনা করতেন, অথচ সরাসরি শোনা বোঝানোর বর্ণনাসূচক শব্দগুলোর ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন না। তাঁর শায়খ ইবনে ওয়াহবেরও একই অভ্যাস ছিল।
(২) এর সনদ সহিহ।
ইবনে উমরের নির্দেশের সঙ্গে যন্ত্রণাদায়ক বেত্রাঘাতের সংযোগ বর্ণনার মধ্যেই স্পষ্ট। তিনি নিজের সম্পদ ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছেন এবং দাসের শরীরে আঘাত করেছেন। সম্পদের লেনদেন সংশোধন ও মানুষকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া এখানে একই মালিকের হাতে সংঘটিত হচ্ছে। বর্ণনার “খাদেমকে শিষ্টাচার শিক্ষাদান” শিরোনামও এই আঘাতকে শাসনের প্রসঙ্গে স্থান দিয়েছে। দাসের জন্য কাজের দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ তাই ভুল হলে কেবল কাজের জবাবদিহি করা নয়; সেই ভুলের জন্য নিজের শরীরে মালিকের শাস্তিও সহ্য করা। এই ক্ষমতার ভিত্তি হলো একজন মানুষের ওপর আরেকজনের মালিকানা।
মুহাম্মদ লুকমান আস-সালাফি রশ্শুল বারদ শারহুল আদাবিল মুফরাদ-এ ঘটনাটির শব্দার্থ ও বিধান আলাদা করে দিয়েছেন। তিনি বিনিময়ে বিলম্বকে হারাম এবং “যন্ত্রণাদায়ক বেত্রাঘাত”কে কষ্টদায়ক প্রহার বলেছেন। এরপর অপরাধের জন্য দাসকে শাসন করতে প্রহারের বৈধতা নির্ণয় করেছেন। একই পৃষ্ঠায় আবু মাসউদের হাদিসের ব্যাখ্যায় প্রহারের পর মুক্তিকে ওয়াজিব নয়, সুপারিশকৃত বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় শাসনমূলক প্রহারের অনুমোদন, প্রহারের সীমা এবং অন্যায় প্রহারের পাপমোচন একই ব্যবস্থার পৃথক বিধান। [56]

رَشُّ البَرَد شَرْحُ الأَدَبِ المُفْرَد — ١١٠ — (باب: ٩١)
بن عمر غلاماً له بذهب أو بورق، فصرفه، فأنظر بالصرف، فرجع إليه، فجلده جلداً وجيعاً، وقال: «اذهب، فخذ الذي لي، ولا تصرفه».
١٧١ ـ حدثنا محمد بن سلام قال: أخبرنا أبو معاوية، عن الأعمش، عن إبراهيم التيمي، عن أبيه، عن أبي مسعود قال: كنت أضرب غلاماً لي، فسمعت من خلفي صوتاً: «اعلم أبا مسعود! لله أقدر عليك منك عليه»، فالتفت فإذا هو رسول الله ﷺ، قلت: يا رسول الله! فهو حر لوجه الله. فقال: «أما لو لم تفعل لمستك النار»، أو: «للفحتك النار».
٩١ ـ باب لا تقل: قَبَّحَ اللهُ وجهه
١٧٢ ـ حدثنا حجاج قال: حدثنا ابن عيينة، عن ابن عجلان، عن سعيد، عن
(١٧٠) شرح الكلمات:
فأنظر بالصرف: أي: صرفه إلى أجل، وذلك حرام. جلداً وجيعاً: أي ضرباً مؤلماً.
فقه الحديث:
١ ـ جواز ضرب العبد للتأديب على الجريمة، وجواز المحاسبة الشديدة على قدر شدة الخطإ وعظمه.
(١٧١) شرح الكلمات:
للفحتك النار: أخذك لهيبها أو أحرقتك.
فقه الحديث:
١ ـ فيه الحث على الرفق بالمملوك، والوعظ والتنبيه على استعمال العفو وكظم الغيظ والحكم كما يحكم الله على عباده.
٢ ـ إجماع المسلمين على عدم وجوب العتق بضرب العبد وإنما هو مندوب ليكون كفارة للذنب وإزالة لإثم الظلم عنه.
١٧١ ـ أخرجه مسلم في الإيمان، باب صحبة المماليك، وكفارة من لطم عبده (٣٥).
١٧٢ ـ حسن؛ ابن عجلان صدوق. (انظر الصحيحة ٨٦٢). أخرجه أحمد (٢/٢٥١) مطولاً، وابن حبان (٥٧١٠).
বাংলা অনুবাদ:
রশ্শুল বারদ শারহুল আদাবিল মুফরাদ — পৃষ্ঠা ১১০ — অধ্যায় ৯১।
ইবনে উমর তাঁর এক দাসকে সোনা অথবা রুপা দিয়ে পাঠালেন। সে তা বিনিময় করল এবং বিনিময়ের ক্ষেত্রে সময় দিল। ফিরে এলে তিনি তাকে যন্ত্রণাদায়কভাবে বেত্রাঘাত করলেন এবং বললেন: “যাও, আমার জিনিস ফেরত নিয়ে এসো; তা বিনিময় করো না।”
১৭১. মুহাম্মদ ইবনে সালাম আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু মুআবিয়া আমাদের জানিয়েছেন, আল-আ‘মাশ থেকে, তিনি ইবরাহিম আত-তাইমি থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আবু মাসউদ থেকে। আবু মাসউদ বলেন: আমি আমার এক দাসকে প্রহার করছিলাম। তখন পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম: “আবু মাসউদ, জেনে রাখো! তোমার তার ওপর যতখানি ক্ষমতা আছে, আল্লাহর তোমার ওপর তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা রয়েছে।” আমি ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি রাসুলুল্লাহ। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে মুক্ত। তিনি বললেন: “তুমি যদি তা না করতে, আগুন তোমাকে স্পর্শ করত”—অথবা “আগুন তোমাকে ঝলসে দিত।”
৯১. “আল্লাহ তার মুখ কুৎসিত করুন”—এ কথা বলবে না।
১৭২. হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইবনে উয়াইনা আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবনে আজলান থেকে, তিনি সাঈদ থেকে, তিনি থেকে—
১৭০ নম্বর বর্ণনার শব্দার্থ:
“বিনিময়ে সময় দিল”—অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বিলম্ব রেখে বিনিময় করেছে; এটি হারাম। “যন্ত্রণাদায়ক বেত্রাঘাত”—অর্থাৎ কষ্টদায়ক প্রহার।
হাদিস থেকে প্রাপ্ত বিধান:
১. অপরাধের কারণে শাসন করার জন্য দাসকে প্রহার করা বৈধ। ভুলের গুরুতরতা ও মাত্রা অনুযায়ী কঠোরভাবে জবাবদিহি করাও বৈধ।
১৭১ নম্বর বর্ণনার শব্দার্থ:
“আগুন তোমাকে ঝলসে দিত”—অর্থাৎ আগুনের শিখা তোমাকে পাকড়াও করত অথবা পুড়িয়ে দিত।
হাদিস থেকে প্রাপ্ত বিধান:
১. এতে মালিকানাধীন দাসের প্রতি কোমল আচরণের উৎসাহ রয়েছে; ক্ষমা অবলম্বন, ক্রোধ সংবরণ এবং আল্লাহ তাঁর বান্দাদের বিষয়ে যেভাবে বিচার করেন সেভাবে বিচার করার ব্যাপারে উপদেশ ও সতর্কীকরণ রয়েছে।
২. দাসকে প্রহার করার কারণে তাকে মুক্ত করা ওয়াজিব নয়—এ বিষয়ে মুসলমানদের ঐকমত্য রয়েছে। বরং তা সুপারিশকৃত, যাতে পাপের কাফ্ফারা হয় এবং অন্যায় করার পাপ দূর হয়।
১৭১. মুসলিম কিতাবুল ঈমান-এ দাসদের সঙ্গে আচরণ ও নিজের দাসকে চড় মারার কাফ্ফারা অধ্যায়ে এটি বর্ণনা করেছেন, নম্বর ৩৫।
১৭২. হাসান; ইবনে আজলান সত্যবাদী। আস-সাহিহা, নম্বর ৮৬২ দেখুন। আহমদ ২/২৫১-এ বিস্তারিতভাবে এবং ইবনে হিব্বান নম্বর ৫৭১০-এ বর্ণনা করেছেন।
লুকমানের “অপরাধের জন্য শাসন করতে দাসকে প্রহার করা বৈধ” সিদ্ধান্তটি এই ঘটনার আইনগত গ্রহণের স্পষ্ট উদাহরণ। লেনদেনে বিলম্ব করার ভুলকে তিনি প্রহারের বৈধ কারণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। একই ব্যাখ্যায় ভুলের গুরুতরতা অনুযায়ী কঠোর জবাবদিহির অনুমোদনও দিয়েছেন। মালিকের কাজে নিয়োজিত মানুষটির ভুল তার ওপর শারীরিক আঘাত প্রয়োগের অধিকার তৈরি করছে। এমন ব্যবস্থায় মালিকের সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষার সঙ্গে দাসের শরীরকে শাস্তির অধীন রাখার বিধান জড়িয়ে যায়। ভুল সংশোধনের দায়িত্বের সঙ্গে শারীরিক যন্ত্রণা চাপিয়ে দেওয়া মালিকানা-সম্পর্কের নিষ্ঠুর ক্ষমতা প্রকাশ করে।
একই পৃষ্ঠায় দাসকে প্রহারের পর মুক্তি ওয়াজিব নয় বলে যে ঐকমত্যের দাবি এসেছে, তা আগের আলোচিত নববীর অবস্থানের পুনরুল্লেখ। প্রহারের অনুমতি এবং অন্যায় প্রহারের পরে মুক্তির বিধান পৃথক প্রশ্ন হিসেবে বিচার করা হয়েছে। এর ফলে অনুমোদিত শাসনের ক্ষেত্রে মালিকের প্রহারক্ষমতা বহাল থাকে; আর পাপমোচনের প্রসঙ্গে মুক্তির সুপারিশ করা হলেও ওই মত অনুযায়ী মুক্তি বাধ্যতামূলক হয় না। দাসের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং তার স্বাধীনতা অর্জনের পথ—দুটিই মালিকানার কাঠামোর মধ্যে নির্ধারিত হচ্ছে।
আবদুল আজিজ আর-রাজিহী তাঁর শরহু সহিহিল আদাবিল মুফরাদ-এ ইবনে উমরের এই প্রহারের ঘটনাটির সঙ্গে আবু মাসউদের দাসপ্রহারের ঘটনাটি সরাসরি তুলনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় ইবনে উমরের হাতে দাসের যন্ত্রণাদায়ক বেত্রাঘাত শাসন হিসেবে গৃহীত হয়েছে, কারণ দাসটি মুদ্রা বিনিময়ের নিয়ম ভেঙেছিল। আবু মাসউদের ঘটনায় তিনি অপরাধ ছাড়া রাগের বশে কঠোর প্রহারের অর্থ গ্রহণ করেছেন। একই আলোচনায় এক মালিকের বেত্রাঘাতকে অনুমোদিত শাসন এবং আরেক মালিকের প্রহারকে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে মালিকের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করেছেন। [57]
هذا فيه دليل على أنه لا يجوز ضرب الغلام بغير حق أما في الحديث الأول ابن عمر أدبه لأنه تجاوز الحد ولأنه صرف فعل شيئا أما هذا ظاهره أنه يؤدبه وليس له ذنب ويضربه ضربا شديدا بسبب الغضب.
বাংলা অনুবাদ:
এতে প্রমাণ রয়েছে যে, অন্যায়ভাবে দাসকে প্রহার করা জায়েজ নয়। প্রথম হাদিসে ইবনে উমর তাকে শাসন করেছিলেন, কারণ সে সীমা অতিক্রম করেছিল এবং মুদ্রা বিনিময়ের কাজটি করেছিল। আর এই ঘটনায় বাহ্যত বোঝা যায়, তিনি তাকে শাসন করছেন অথচ তার কোনো অপরাধ নেই; রাগের কারণে তাকে কঠোরভাবে প্রহার করছেন।
আর-রাজিহীর ব্যাখ্যায় দাসের ওপর প্রহারের বৈধতা নির্ধারিত হচ্ছে তার আচরণ এবং মালিকের শাসনের ধরন দিয়ে। ইবনে উমরের ঘটনায় বর্ণিত যন্ত্রণাদায়ক বেত্রাঘাতকে তিনি শাসন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুদ্রা বিনিময়ে নিয়মভঙ্গ ঘটেছে বলে সেই ভুল সংশোধনের পাশাপাশি দাসের শরীরেও শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় দাসকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া, তার কাজের ভুল নির্ধারণ করা এবং সেই ভুলের জন্য তাকে বেত্রাঘাত করা—তিনটি ক্ষমতাই মালিকের হাতে একত্রিত। অর্থনৈতিক লেনদেনের একটি ত্রুটি অধীনস্থ মানুষকে শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়ার কারণ হয়ে উঠেছে। মালিকের সম্পত্তির ওপর কর্তৃত্বের সঙ্গে মালিকানাধীন মানুষের শরীরের ওপর দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা এখানে সরাসরি যুক্ত।
আবু মাসউদের ঘটনায় অপরাধ ছাড়া প্রহারের সিদ্ধান্তটি আর-রাজিহীর ব্যাখ্যা; তাঁর “বাহ্যত” শব্দটি সেই ব্যাখ্যার অবস্থান স্পষ্ট করে। সেই ব্যাখ্যা অনুসারেই তিনি রাগের বশে কঠোর প্রহারের নিন্দা এবং অপরাধের জন্য শাসনমূলক প্রহারের বৈধতা পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দাসকে আঘাত করার ক্ষমতা এই বিধানে মালিকের স্বীকৃত ক্ষমতার অংশ। একজন স্বাধীন মানুষের লেনদেনের ভুল সংশোধনের জন্য আলোচনা, হিসাব ফেরত নেওয়া বা লেনদেন বাতিল করার পথ রয়েছে; এখানে তার সঙ্গে দাসের শরীরে বেত্রাঘাত যুক্ত হয়েছে। মানুষকে সম্পত্তি হিসেবে অধীনস্থ রাখার ফলেই তার কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ শরীরের ওপর শাস্তির অধিকারে বিস্তৃত হয়েছে। এই শারীরিক অধীনতাই দাসত্বের নিষ্ঠুরতা: অন্যের আর্থিক কাজে ভুল করার মূল্য দিতে হচ্ছে নিজের শরীরে যন্ত্রণা সহ্য করে।
ভেড়া হারানোর পরে দাসীকে চড়: মুআবিয়া ইবনে হাকামের ঘটনা
মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামি নিজের পশুপালক দাসীকে চড় মারার ঘটনা বলেছেন। নেকড়ে একটি ভেড়া নিয়ে যাওয়ার পরে তিনি রেগে গিয়ে তাকে আঘাত করেন। মুহাম্মদ ঘটনাটিকে গুরুতর বলে চিহ্নিত করেন; পরে দাসীকে তাঁর কাছে আনা হয় এবং তাকে মুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। দাসীকে প্রহার থেকে মুক্তির নির্দেশ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনাটি হলো: [58]
قَالَ وَكَانَتْ لِي جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِي قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّيبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِهَا وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِي آدَمَ آسَفُ كَمَا يَأْسَفُونَ لَكِنِّي صَكَكْتُهَا صَكَّةً فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَىَّ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلاَ أُعْتِقُهَا قَالَ «ائْتِنِي بِهَا». فَأَتَيْتُهُ بِهَا فَقَالَ لَهَا «أَيْنَ اللَّهُ». قَالَتْ فِي السَّمَاءِ. قَالَ «مَنْ أَنَا». قَالَتْ أَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ. قَالَ «أَعْتِقْهَا فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ».
বাংলা অনুবাদ:
তিনি বলেন: আমার এক দাসী ছিল, যে উহুদ ও আল-জাওয়ানিয়্যার দিকে আমার ভেড়া চরাত। একদিন গিয়ে দেখি, নেকড়ে তার পাল থেকে একটি ভেড়া নিয়ে গেছে। আমি আদমসন্তানদের একজন; তারা যেমন রাগ করে, আমিও রাগ করি। কিন্তু আমি তাকে একটি চড় মেরে বসি। আল্লাহর রাসুলের কাছে এলে তিনি আমার এই কাজকে গুরুতর বলে দেখালেন। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি তাকে মুক্ত করে দেব না? তিনি বললেন: তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তাকে নিয়ে এলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহ কোথায়? সে বলল: আসমানে। তিনি বললেন: আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন: তাকে মুক্ত করে দাও; কারণ সে মুমিন।
একটি ভেড়া নেকড়ের মুখে পড়ার পরে মালিকের ক্রোধের লক্ষ্য হয়েছে পশুপালনের কাজে নিযুক্ত নারীটি। তার শরীর মালিকের ক্ষতির প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সহজ স্থানে পরিণত হয়েছে। মালিক নিজেই রাগকে মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তারপর চড় মারার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। দাসের ওপর মালিকের দৈনন্দিন ক্ষমতার বিপদ এই ঘটনাতেই প্রকাশিত: নিজের সম্পত্তির ক্ষতি হলে অধীনস্থ মানুষকে আঘাত করা তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়। ঘটনাটির শেষে মুক্তির নির্দেশ রয়েছে; প্রহার, প্রতিবাদ এবং মুক্তির এই ধারাবাহিকতা দাসীটির ওপর ইতিমধ্যে সংঘটিত সহিংসতার পূর্ণ বিবরণ বহন করে।
ঠান্ডা পানি ঢালায় দুই চাবুক: বিচারক ইয়াস ইবনে মুআবিয়ার ঘটনা
ওয়াকির আখবারুল কুদাত-এ বিচারক ইয়াস ইবনে মুআবিয়ার নামে একটি ঘটনা সংরক্ষিত আছে। শাসক ইউসুফ ইবনে উমর তাঁকে ছাপ্পান্নটি বেত্রাঘাত করার পরে তিনি নিজের দাসদের প্রহারের হিসাবের সঙ্গে তার তুলনা করেন। সেই স্মৃতিচারণে ঠান্ডার দিনে মাথায় ঠান্ডা পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য এক দাসকে দুই চাবুক মারার ঘটনাও উল্লেখ করেন। [59]
أخبرني إبراهيم بن أبي عثمان، عن سليمان بن أبي شيخ، عن صالح بن بن سليمان، عن حفص بن عمر بن حفص بن عبد الله بن الحارث بن هشام، قال: كنت غائبا عن واسط أيام يوسف بن عمر؛ فقدمت فقال لي: إني أتيت إياس بن معاوية؛ قلت: وما له؟ قال: ضربه الأمير يوسف؛ أراده على أن يتولى له السوق؛ فأبى فضربه، فأتيته، فوجدت عنده جماعة، جماعة، فقال: إلي إلي يا أبا عمر ها هنا، فأجلسني إلى جنبه، ثم قال: لقد ضربني الأمير ستة وخمسين سوطا، فنظرت في ضربي مملوكي فإذا هو ينقص على ضرب يوسف إياي سوطين؛ فقلت: أرجو أن يكون قصاصا وأن يكون لي فوات السوطين، ثم اقتص ضربه مملوكيه لما ضربهم عليه، فحفظت قصة غلام منهم؛ قال: جئت في يوم بارد فوضعت قلنسوتي، وعمامتي عن رأسي، ودعوت بالوضوء، فجاء بماء بارد؛ فقال: بالفارسية: أصب على رأسك؟ فقلت متعجبا منه: نعم، فصب على رأسي ماء باردا في يوم بارد، فضربته سوطين.
বাংলা অনুবাদ:
ইবরাহিম ইবনে আবু উসমান আমাকে জানিয়েছেন, সুলায়মান ইবনে আবু শাইখ থেকে, তিনি সালিহ ইবনে ইবনে সুলায়মান থেকে, তিনি হাফস ইবনে উমর ইবনে হাফস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হারিস ইবনে হিশাম থেকে। তিনি বলেন: ইউসুফ ইবনে উমরের সময়ে আমি ওয়াসিতের বাইরে ছিলাম। ফিরে এলে তিনি আমাকে বললেন: আমি ইয়াস ইবনে মুআবিয়ার কাছে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম: তাঁর কী হয়েছে? তিনি বললেন: আমির ইউসুফ তাঁকে প্রহার করেছেন। তাঁকে বাজারের দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন; তিনি অস্বীকার করায় তাঁকে প্রহার করেছেন। তাঁর কাছে গিয়ে দেখি একদল লোক রয়েছে। তিনি বললেন: আবু উমর, এখানে আমার কাছে এসো। আমাকে পাশে বসিয়ে বললেন: আমির আমাকে ছাপ্পান্নটি বেত্রাঘাত করেছেন। নিজের দাসদের প্রহারের হিসাব দেখলাম, তা ইউসুফ আমাকে যতবার মেরেছে তার চেয়ে দুই আঘাত কম। বললাম: আশা করি এটি প্রতিশোধস্বরূপ হবে এবং অতিরিক্ত দুই আঘাতের প্রতিদান আমার থাকবে। এরপর তিনি নিজের দাসদের কী কারণে মেরেছিলেন, তা বলতে লাগলেন। তাদের একজনের ঘটনাটি আমার মনে আছে। তিনি বললেন: এক ঠান্ডার দিনে এসে মাথা থেকে টুপি ও পাগড়ি খুলে অজুর পানি চাইলাম। সে ঠান্ডা পানি আনল এবং ফারসি ভাষায় বলল: আপনার মাথায় ঢালব? আমি অবাক হয়ে বললাম: হ্যাঁ। তখন সে ঠান্ডার দিনে আমার মাথায় ঠান্ডা পানি ঢেলে দিল। তাই তাকে দুই চাবুক মারলাম।
এই ঘটনায় দাসটি পানি ঢালার আগে জিজ্ঞেস করেছিল এবং মালিকের কাছ থেকে “হ্যাঁ” উত্তর পেয়েছিল। এরপরও মালিকের অসন্তোষের শাস্তি তার শরীরে পড়েছে। মালিকের সম্মতি নিয়ে কাজ করার পরেও অধীনস্থ মানুষটি নিরাপদ ছিল না। ব্যক্তিগত অস্বস্তি, বিস্ময়সূচক উত্তর এবং পরে ক্রোধ—এই সবকিছুর ভার বহন করেছে সেবার কাজে নিযুক্ত দাস। বর্ণনায় ইয়াস নিজের ওপর শাসকের আঘাতকে নিজের দাসদের প্রহারের প্রতিফল হিসেবে হিসাব করেছেন। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায় একই শারীরিক যন্ত্রণা ক্ষমতার দুই স্তরকে যুক্ত করেছে: উপরে শাসক তাঁকে প্রহার করছেন, আর নিচে তিনি দাসদের প্রহার করেছেন।
আদেশ অমান্য করলে দাসকে প্রহার
ইসলামি দাসপ্রথার ক্ষমতার কাঠামো বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল পাওয়া যায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের ফিকহি মতামতে। আবু দাউদ আল-সিজিস্তানী সংকলিত মাসায়িল আল-ইমাম আহমদ গ্রন্থে ইমাম আহমদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একজন দাস বা দাসীকে কোন কোন বিষয়ে শাসন বা শাস্তি দেওয়া যাবে। উত্তরে তিনি বলেন, দাসদাসীদেরকে তার নামাজ, অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব এবং তার সামর্থ্যের মধ্যে অর্পিত কাজের ব্যাপারে শাসন করা যাবে [60]।
سَمِعْتُ أَحْمَدَ، سُئِلَ عَنِ الْمَمْلُوكِ: فِيمَ يُؤَدَّبُ؟ قَالَ: فِي صَلَاتِهِ، وَفِي فَرَائِضِهِ، وَإِذَا حُمِّلَ مَا يُطِيقُ
আবু দাউদ বলেন: আমি আহমদকে শুনেছি—তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “দাসকে কোন কোন বিষয়ে শাসন করা যাবে?” তিনি বললেন, “তার নামাজের ব্যাপারে, তার ফরজ দায়িত্বসমূহের ব্যাপারে এবং যখন তার ওপর তার সামর্থ্যের মধ্যে কোনো কাজ অর্পণ করা হয়।”
পরবর্তী হাম্বলি ফকিহ আল-বুহূতী কাশশাফ আল-কিনা‘ গ্রন্থে এই বিধানের অর্থ আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, “وَيُؤَدِّبُهُ السَّيِّدُ عَلَى مَا إِذَا كَلَّفَهُ مَا يُطِيقُ فَامْتَنَعَ مِنْ امْتِثَالِهِ”—অর্থাৎ, মালিক দাসকে তার সামর্থ্যের মধ্যে কোনো কাজের নির্দেশ দিলে এবং দাস সেই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করলে মালিক তাকে শাসন করতে পারে। একই আলোচনায় আরও সরাসরি বলা হয়েছে, “وَلِلسَّيِّدِ تَأْدِيبُهُمْ … بِاللَّوْمِ وَالضَّرْبِ”—মালিকের তার দাসদের তিরস্কার ও প্রহারের মাধ্যমে শাসন করার অধিকার রয়েছে [61]।
ইবনে কুদামার আল-মুগনি-তে দাস বা দাসীর অপরাধের ক্ষেত্রে তিরস্কার ও হালকা প্রহারের অনুমোদন রয়েছে। ইবনে মুফলিহের আল-ফুরু-তে ইমাম আহমদের মত হিসেবে নামাজ, অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব এবং সামর্থ্যের মধ্যে অর্পিত কাজের ব্যাপারে শাসনের বিধান সংরক্ষিত হয়েছে। এই দুটি ধ্রুপদি বক্তব্য একই সঙ্গে উদ্ধৃত হয়েছে ইসলামওয়েবের ১৩৭৫২৭ নম্বর ফতোয়ায়; মূল আইনগত সিদ্ধান্তগুলোর রচয়িতা ইবনে কুদামা ও ইবনে মুফলিহের উদ্ধৃত ইমাম আহমদ। [62]
এই দলিলটির তাৎপর্য শুধু এটুকু নয় যে ইসলামি ফিকহে দাসকে প্রহার বৈধ ছিল। আরও মৌলিক বাস্তবতা হলো—দাসের ওপর মালিকের আদেশ কার্যকর করার পেছনে শারীরিক শাস্তির আইনগত ক্ষমতা দাঁড়িয়ে ছিল। মালিক তার সামর্থ্যের মধ্যে কোনো কাজের নির্দেশ দেবে, দাসদাসী সেই নির্দেশ অমান্য করবে, আর সেই অমান্যতার কারণে মালিক তাকে প্রহারসহ শাসন করতে পারবে—এটি স্বাধীন দুই মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি আদেশদাতা মালিক এবং বাধ্যগত মালিকানাধীন মানুষের সম্পর্ক।
দাসদাসীর আনুগত্য আদায়ের জন্য শারীরিক শাস্তির ক্ষমতা স্বীকার করার ফলে শ্রম, সেবা ও দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্তের ওপর মালিকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকে। মালিক আদেশ দেন; দাস সেই আদেশ পালনে বাধ্য; আর অবাধ্যতার জন্য প্রহার ব্যবহারের বিধান রয়েছে। এই সম্পর্ক স্বাধীন দুই ব্যক্তির মধ্যে সমান অধিকারভিত্তিক সম্মতির সম্পর্ক নয়। এটি মালিকানা, বাধ্যতামূলক আনুগত্য এবং সেই আনুগত্য কার্যকর করার শাস্তিমূলক ক্ষমতার আইনগত কাঠামো।
বুহুতির বিধানে কাজ আদায়, প্রহার ও শিকল
বুহুতি কাশশাফুল কিনা-তে দাসকে স্ত্রীর তুলনায় বেশি প্রহার করার ফিকহি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একই বিধানে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বেড়ি পরানো, ফরজ দায়িত্ব পালনের জন্য শাসন এবং সামর্থ্যের মধ্যে দেওয়া কাজ প্রত্যাখ্যানের জন্য শাস্তির অনুমোদন আছে। উপদেশ, ক্ষমা, গুরুতর অপরাধের শর্ত এবং নিষিদ্ধ নির্যাতনের বিবরণসহ পূর্ণ প্রাসঙ্গিক অংশটি হলো: [63]
(وللسيد تأديبهم) أي الأرقاء (باللوم والضرب كولد وزوجة) ناشز (والأحاديث الصحيحة تدل على جواز الزيادة) في الرقيق على الزوجة، منها ما رواه أحمد وأبو داود عن لقيط أن النبي صلى الله عليه وسلم قال له: «ولا تضرب ظعينتك ضرب أمتك» ولأحمد والبخاري «لا يجلد أحدكم امرأته جلد العبد ثم لعله يجامعها أو يضاجعها من آخر اليوم» ولابن ماجه بدل العبد الأمة فهذه تدل على أن ضرب الرقيق أشد من ضرب المرأة (ويسن) للسيد (العفو عنه أولا) أي قبل التأديب (ويكون) العفو (مرة أو مرتين نصا) نقل حرب «لا تضرب إلا في ذنب بعد عفو مرة أو مرتين» (ولا يضربه شديدا ولا يضربه إلا في ذنب عظيم نصا) لقوله صلى الله عليه وسلم: «إذا زنت أمة أحدكم فليجلدها» (ويقيده بقيد إذا خاف عليه) الإباق (ويؤدب على فرائضه) أي فرائض الله تعالى من الصلاة والصوم. (و) يؤدبه السيد (على ما إذا كلفه ما يطيق فامتنع) من امتثاله (وليس له لطمه في وجهه) لحديث ابن عمر مرفوعا: «من لطم غلامه فكفارته عتقه» رواه مسلم (ولا خصاؤه ولا التمثيل به) بجدع أنف أو نحوه ويعتق بذلك لما تقدم في العتق.
বাংলা অনুবাদ:
মালিক তার দাসদাসীদের তিরস্কার ও প্রহারের মাধ্যমে শাসন করতে পারে, যেমন সন্তান ও অবাধ্য স্ত্রীকে শাসন করে। সহিহ হাদিসগুলো দাসকে স্ত্রীর তুলনায় বেশি প্রহার করার বৈধতা নির্দেশ করে। এর মধ্যে আহমদ ও আবু দাউদ লাকিত থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী তাঁকে বলেছেন: নিজের স্ত্রীকে নিজের দাসীর মতো প্রহার করো না। আহমদ ও বুখারিতে আছে: তোমাদের কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো বেত্রাঘাত না করে, তারপর হয়তো দিনের শেষে তার সঙ্গে সহবাস বা শয্যায় মিলিত হয়। ইবনে মাজাহতে দাসের স্থানে দাসী এসেছে। এগুলো নির্দেশ করে, দাসকে প্রহার স্ত্রীর প্রহারের চেয়ে কঠোর। মালিকের জন্য শাসনের আগে তাকে ক্ষমা করা সুন্নত; স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী একবার বা দুবার ক্ষমা করবে। হারব উদ্ধৃত করেছেন: একবার বা দুবার ক্ষমা করার পরে অপরাধ ছাড়া প্রহার করবে না। তাকে কঠোরভাবে প্রহার করবে না এবং গুরুতর অপরাধ ছাড়া প্রহার করবে না—এ মর্মে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। কারণ নবী বলেছেন: তোমাদের কারও দাসী যিনা করলে তাকে বেত্রাঘাত করবে। পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হলে তাকে বেড়ি দিয়ে বাঁধতে পারে। নামাজ ও রোজার মতো আল্লাহর ফরজ দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে শাসন করতে পারে। মালিক সামর্থ্যের মধ্যে কাজের দায়িত্ব দিলে সে তা পালনে অস্বীকার করলেও তাকে শাসন করতে পারে। তার মুখে চড় মারা মালিকের অধিকার নয়। কারণ ইবনে উমরের সূত্রে নবীর হাদিসে আছে: যে নিজের দাসকে চড় মারে, তার কাফ্ফারা তাকে মুক্ত করা—মুসলিম বর্ণনা করেছেন। তাকে খোজা করা কিংবা নাক কেটে দেওয়া বা অনুরূপ অঙ্গবিকৃতিও করা যাবে না; ইতকের আলোচনায় পূর্বে বলা বিধান অনুসারে এতে সে মুক্ত হয়ে যায়।
পালানোর আশঙ্কায় বেড়ি পরানো এবং কাজ প্রত্যাখ্যান করলে শাস্তি—এই দুটি ক্ষমতা একত্রে দাসের শ্রম আদায়ের পদ্ধতি প্রকাশ করে। মানুষটি কাজ ছাড়তে চাইলে তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায়; কাজের নির্দেশ অমান্য করলে শরীরে শাস্তি দেওয়া যায়। মালিকের কাছে থেকে সেবা দেওয়া তখন বাধ্যতামূলক আনুগত্যে পরিণত হয়। ধর্মীয় ফরজ আদায়ের ক্ষেত্রেও একই মালিক দণ্ডদানের অবস্থানে থাকেন। ফলে শ্রম নিয়ন্ত্রণ, চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ—তিনটিই একই মালিকানাগত কর্তৃত্বের অধীনে যুক্ত হয়েছে।
শাফেয়ি ফিকহে কাজ প্রত্যাখ্যানের জন্য প্রহারের ফতোয়া
জয়নুদ্দিন আল-মালিবারি ফাতহুল মুঈন-এ দাসের ওপর মালিকের তাজিরের অধিকার উল্লেখ করে আবদুর রহমান ইবনে যিয়াদের একটি বিস্তারিত ফতোয়া উদ্ধৃত করেছেন। মালিকের সেবা প্রত্যাখ্যান করলে ফলপ্রসূ অগুরুতর প্রহারের অনুমতি সেখানে দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত প্রহারে শাসকের হস্তক্ষেপ ও প্রয়োজনে দাসকে বিক্রির ব্যবস্থাও একই ফতোয়ার অংশ। [64]
وسئل شيخنا عبد الرحمن بن زياد رحمه الله تعالى عن عبد مملوك عصى سيده وخالف أمره ولم يخدمه خدمة مثله هل لسيده أن يضربه ضربا غير مبرح أم ليس له ذلك؟ وإذا ضربه سيده ضربا مبرحا ورفع به إلى أحد حكام الشريعة فهل للحاكم أن يمنعه عن الضرب المبرح أم ليس له ذلك؟ وإذا منعه الحاكم مثلا ولم يمتنع فهل للحاكم أن يبيع العبد ويسلم ثمنه إلى سيده أم ليس له ذلك؟ وبماذا يبيعه بمثل الثمن الذي اشتراه به سيده أو بما قاله المقومون أو بما انتهت إليه الرغبات في الوقت؟ فأجاب إذا امتنع العبد من خدمة سيده الخدمة الواجبة عليه شرعا فللسيد أن يضربه على الامتناع ضربا غير مبرح إن أفاد الضرب المذكور وليس له أن يضربه ضربا مبرحا ويمنعه الحاكم من ذلك فإن لم يمتنع من الضرب المذكور فهو كما لو كلفه من العمل ما لا يطيق بل أولى إذ الضرب المبرح ربما يؤدي إلى الزهوق بجامع التحريم. قد أفتى القاضي حسين بأنه إذا كلف مملوكه ما لا يطيق أنه يباع عليه بثمن المثل وهو ما انتهت إليه الرغبات في ذلك الزمان والمكان انتهى.
বাংলা অনুবাদ:
আমাদের শিক্ষক আবদুর রহমান ইবনে যিয়াদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: কোনো মালিকানাধীন দাস নিজের মালিকের অবাধ্য হলে, তাঁর আদেশ অমান্য করলে এবং তার মতো দাসের উপযুক্ত সেবা না দিলে মালিক কি তাকে গুরুতর নয় এমনভাবে প্রহার করতে পারেন? মালিক গুরুতরভাবে প্রহার করলে এবং বিষয়টি শরিয়তি বিচারকের কাছে গেলে বিচারক কি তাঁকে সেই প্রহার থেকে বিরত রাখতে পারেন? বিচারক বাধা দেওয়ার পরও মালিক বিরত না হলে বিচারক কি দাসটিকে বিক্রি করে দাম মালিককে দিতে পারেন? বিক্রির দাম কি মালিকের কেনা দামের সমান হবে, মূল্যনির্ধারকদের নির্ধারিত হবে, নাকি সেই সময়ে ক্রেতারা যত দিতে ইচ্ছুক তার ভিত্তিতে হবে? তিনি উত্তর দেন: দাস নিজের মালিকের শরিয়তসম্মত আবশ্যক সেবা প্রত্যাখ্যান করলে মালিক তাকে সেই অস্বীকৃতির জন্য গুরুতর নয় এমনভাবে প্রহার করতে পারেন, যদি ওই প্রহার ফলপ্রসূ হয়। গুরুতরভাবে প্রহার করার অধিকার তাঁর নেই; বিচারক তাঁকে তা থেকে বিরত রাখবেন। নিষেধের পরও সেই প্রহার থেকে বিরত না হলে বিষয়টি সামর্থ্যের বাইরে কাজ চাপানোর মতো; বরং আরও গুরুতর, কারণ গুরুতর প্রহারে প্রাণ যেতে পারে। উভয় কাজই নিষিদ্ধ। কাজি হুসাইন ফতোয়া দিয়েছেন: মালিক নিজের দাসকে সামর্থ্যের বাইরে কাজ দিলে তাকে ন্যায্য বাজারদরে বিক্রি করে দেওয়া হবে; অর্থাৎ সেই সময় ও স্থানে ক্রেতারা যে দাম দিতে ইচ্ছুক, সেটিই দাম।
ফতোয়াটিতে দাসের শ্রমকে মালিকের প্রাপ্য সেবা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সেবা প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়ায় প্রহারকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। “ফলপ্রসূ” হওয়ার শর্তের অর্থ, আঘাত অধীনস্থ ব্যক্তির আচরণ বদলে আনুগত্য আদায়ে কাজ করবে। মানুষটির শরীরকে শ্রম আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যম করা হয়েছে। অতিরিক্ত প্রহারের প্রতিকার হিসেবে বিক্রি কার্যকর হলে দাস অন্য মালিকের সম্পত্তি হয়ে যায় এবং বিক্রির দাম আগের মালিক পান। নির্যাতনের প্রতিকারও এই কাঠামোয় মালিকানা ও বাজারদরের হিসাবের মধ্য দিয়ে সংগঠিত হয়েছে।
নিজের অধিকার আদায়ে প্রহার: ইযযুদ্দিন ইবনে আবদিস সালামের বিধান
ইযযুদ্দিন ইবনে আবদিস সালাম কাওয়াইদুল আহকাম ফি মাসালিহিল আনাম-এ সাধারণ নিয়ম হিসেবে বলেছেন, কেউ নিজের অধিকার প্রহারের মাধ্যমে আদায় করবে না। এরপর সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে দাস ও দাসীকে উল্লেখ করেছেন। মালিকের সেবা ও অধিকার পালনে বিরত থাকা এবং কথায় নিবৃত্ত না হওয়ার অবস্থায় তাদের ওপর প্রহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায়ে বলপ্রয়োগের এই বিশেষ অধিকার মালিক ও দাসের মধ্যকার আইনগত অসমতা সরাসরি প্রকাশ করে। [65]
المثال الرابع والثلاثون: لا يستوفي أحد حق نفسه بالضرب واستثني من ذلك العبد والأمة إذا استغنى من خدمة السيد والقيام بحقوقه ولم يرتدعا بالوعظ والكلام، وكذلك المرأة الناشزة على زوجها، وهو أن يضربها لاستيفاء حقه، والضرب في هذا كله غير مبرح، ويختلف باختلاف المضروب في الضعف والقوة.
বাংলা অনুবাদ:
চৌত্রিশতম উদাহরণ: কেউ নিজের অধিকার প্রহারের মাধ্যমে আদায় করবে না। এর ব্যতিক্রম হলো দাস ও দাসী, যখন তারা মালিকের সেবা এবং তাঁর অধিকার পালনে বিরত থাকে এবং উপদেশ ও কথাবার্তায় নিবৃত্ত হয় না। স্বামীর প্রতি অবাধ্য স্ত্রীর ক্ষেত্রেও অনুরূপ; স্বামী নিজের অধিকার আদায় করতে তাকে প্রহার করতে পারে। এসব ক্ষেত্রেই প্রহার গুরুতর আঘাতকারী হবে না। প্রহারপ্রাপ্ত ব্যক্তির দুর্বলতা ও শক্তির পার্থক্য অনুযায়ী এর মাত্রা ভিন্ন হবে।
এই বিধানে মালিকের সেবা পাওয়ার দাবিকে দাসের শরীরে বলপ্রয়োগের ভিত্তি করা হয়েছে। উপদেশে কাজ না হলে প্রহারের পর্যায়ে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। দাসের অস্বীকৃতি তখন তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে কার্যকর থাকে না; শারীরিক আঘাতের মাধ্যমে সেই অস্বীকৃতি ভাঙার অধিকার মালিক পান। “নিজের অধিকার আদায়” কথাটির মধ্যে ক্ষমতার স্বার্থও স্পষ্ট: যে ব্যক্তি সেবা দাবি করছেন, তিনিই সেই দাবি আদায়ে প্রহার করার অবস্থানে আছেন। একজন মানুষের শ্রম অন্যজনের প্রাপ্য সম্পত্তিগত সুবিধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে সেই সুবিধা আদায়ের জন্য শরীরের ওপর শাস্তি প্রয়োগও আইনগত অধিকার হয়ে দাঁড়ায়।
সাধারণ মানুষের নিজের দাবি আদায়ে প্রহারের ওপর যে বাধা দেওয়া হয়েছে, দাসের ক্ষেত্রে মালিককে তার ব্যতিক্রমী ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। দাসত্ব মানুষের শারীরিক নিরাপত্তাকে এইভাবেই দুর্বল করে: মালিকানাধীন পরিচয়ের কারণে তার শরীর অন্য ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায়ের অনুমোদিত লক্ষ্য হয়ে ওঠে। প্রহারের মাত্রা তার শক্তি ও দুর্বলতা অনুযায়ী নির্ধারণের নির্দেশও সেই ক্ষমতার প্রয়োগপদ্ধতি স্থির করেছে। শ্রম ও আনুগত্য আদায়ের জন্য মালিকের এই বিশেষ বলপ্রয়োগের অধিকারই দাসের অধীনতার বাস্তব ভিত্তি।
দাসকে শাসনের জন্য দশ বেত্রাঘাত: প্রহারের সীমা নির্ধারণের ফিকহি বিধান
ইসলামি দাসপ্রথায় মালিকের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা শুধু অস্পষ্টভাবে স্বীকৃত ছিল না; সেই ক্ষমতার প্রয়োগে বেত্রাঘাতের সংখ্যাগত সীমা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন ধ্রুপদি ফকিহরা। ইমাম শাওকানি তাঁর নায়লুল আওতার গ্রন্থে দাসকে প্রহার করার পরে মুক্তির বিধান আলোচনা করতে গিয়ে সরাসরি বলেছেন, শরিয়তের দলিল অনুসারে মালিক নিজের দাসকে শাসনের উদ্দেশ্যে প্রহার করতে পারে, তবে দশ বেত্রাঘাত অতিক্রম করবে না। এটি দাসপ্রহারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বিধান নয়; বরং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেত্রাঘাতের অনুমোদন। একই আলোচনায় মুখে আঘাত এড়িয়ে চলার বিধানও শাসনমূলক প্রহারের প্রয়োগসীমার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে। [66]
وَقَدْ دَلَّتِ الْأَدِلَّةُ عَلَى أَنَّهُ يَجُوزُ لِلسَّيِّدِ أَنْ يَضْرِبَ عَبْدَهُ لِلتَّأْدِيبِ، وَلَكِنْ لَا يُجَاوِزُ بِهِ عَشَرَةَ أَسْوَاطٍ.
বাংলা অনুবাদ: দলিলসমূহে প্রমাণিত হয়েছে যে মালিক তার দাসকে শাসনের উদ্দেশ্যে প্রহার করতে পারে; তবে তাকে দশ বেত্রাঘাতের বেশি মারবে না।
শাওকানির আলোচনার বিশেষ গুরুত্ব হলো, তিনি শুধু দাসপ্রহারের অনুমোদন উল্লেখ করে থেমে যাননি। ইবনে উমরের বর্ণিত সেই হাদিসও তিনি আলোচনা করেছেন, যেখানে নিজের দাসকে চড় মারা বা প্রহার করার কাফ্ফারা হিসেবে তাকে মুক্ত করার কথা রয়েছে। হাদিসটির সাধারণ ভাষা গ্রহণ করলে সামান্য বা গুরুতর, অনুমোদিত বা অননুমোদিত—সব ধরনের প্রহারেই দাস মুক্ত করার প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু শাওকানি অন্যান্য ফিকহি দলিলের ভিত্তিতে এই সাধারণ বক্তব্যের প্রয়োগ সীমিত করেছেন। তাঁর যুক্তি অনুসারে, শরিয়ত যে প্রহারের অনুমতি দিয়েছে, তা মুক্তি বাধ্যতামূলক হওয়ার বিধানের আওতায় একইভাবে পড়ে না। ফলে একদিকে দাসকে প্রহারের পরে মুক্ত করার হাদিস সংরক্ষিত রয়েছে, অন্যদিকে সেই হাদিসের ব্যাখ্যাতেই মালিকের শাসনমূলক প্রহারের ক্ষমতা বহাল রাখা হয়েছে।
এই আইনগত বিন্যাসে দাসের শরীরের ওপর মালিকের কর্তৃত্ব একটি স্বীকৃত ভিত্তি। প্রশ্ন হচ্ছে না, একজন মানুষ আরেকজন মালিকানাধীন মানুষকে শারীরিক আঘাত করার অধিকার আদৌ রাখে কি না। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন উদ্দেশ্যে আঘাত করা যাবে, কতবার আঘাত করা যাবে এবং কোন মাত্রা অতিক্রম করলে তা নিষিদ্ধ প্রহারে পরিণত হবে। দশ বেত্রাঘাতের সীমা নির্ধারণের মধ্যেই শারীরিক শাস্তির অনুমোদিত ক্ষেত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায়। একজন স্বাধীন মানুষের ক্ষেত্রে যা শারীরিক নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, দাসপ্রথার এই আইনগত কাঠামোয় তা মালিকের শাসনক্ষমতার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রহারের পরিমাণ কমানো দাসের শরীরের ওপর মালিকের কর্তৃত্ব বিলোপ করে না; বরং সেই কর্তৃত্বকে একটি নিয়ন্ত্রিত আইনগত রূপ দেয়।
শাওকানির আলোচনায় মুখে আঘাত এড়ানোর নির্দেশ এবং শাসনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সীমায় বেত্রাঘাতের অনুমোদন পাশাপাশি আছে। মুখে আঘাতের নিষেধকে তিনি দাসপ্রহারের সার্বিক নিষেধ হিসেবে গ্রহণ করেননি; তাঁর ব্যাখ্যায় তা শরীরের অন্য স্থানে অনুমোদিত প্রহারের সীমা নির্ধারণ করে। দশ বেত্রাঘাতের সীমা, মুখে আঘাত না করা এবং শাসনের উদ্দেশ্য থাকা—এই শর্তগুলো মালিকের শারীরিক শাস্তির ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, বিলোপ করেনি।
দাসকে মারার শপথ পূরণের ফিকহি হিসাব
আবু বকর আল-জাসসাস সূরা সোয়াদের ৪৪ নম্বর আয়াত ব্যাখ্যা করতে দাসকে দশ বেত্রাঘাত করার শপথের উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর আলোচনায় বেতগুলো একত্র করে একবার আঘাত করলে শপথ পূরণ হবে কি না, তা বিচার করা হয়েছে। আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, যুফার ও মুহাম্মদের মত এবং মালিক ও লাইসের ভিন্নমত সেখানে পাশাপাশি আছে। [67]
قال أبو بكر: وفي هذه الآية دلالة على أن من حلف أن يضرب عبده عشرة أسواط فجمعها كلها وضربه ضربة واحدة أنه يبر في يمينه إذا أصابه جميعها لقوله تعالى: «وخذ بيدك ضغثا فاضرب به ولا تحنث» والضغث هو ملء الكف من الخشب أو السياط أو الشماريخ ونحو ذلك فأخبر الله تعالى أنه إذا فعل ذلك فقد بر في يمينه لقوله: «ولا تحنث» وقد اختلف الفقهاء في ذلك فقال أبو حنيفة وأبو يوسف وزفر ومحمد إذا ضربه ضربة واحدة بعد أن يصيبه كل واحدة منه فقد بر في يمينه وقال مالك والليث لا يبر وهذا القول خلاف الكتاب لأن الله تعالى قد أخبر أن فاعل ذلك لا يحنث وقد روي عن مجاهد أنه قال هي لأيوب خاصة وقال عطاء للناس عامة قال أبو بكر: دلالة الآية ظاهرة على صحة القول الأول من وجهين أحدهما أن فاعل ذلك يسمى ضاربا لما شرط من العدد وذلك يقتضي البر في يمينه والثاني أنه لا يحنث لقوله: «ولا تحنث».
বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর বলেছেন: এই আয়াত নির্দেশ করে, কেউ নিজের দাসকে দশ বেত্রাঘাত করার শপথ করে বেতগুলো একত্রে নিয়ে একবার আঘাত করলে এবং সবগুলো তার শরীরে লাগলে তার শপথ পূরণ হবে। কারণ আল্লাহ বলেছেন: হাতে এক গোছা নিয়ে তা দিয়ে আঘাত করো এবং শপথ ভঙ্গ করো না। দিগস হলো এক মুঠো কাঠ, বেত, খেজুরের সরু ডাল বা অনুরূপ জিনিস। আল্লাহ জানিয়েছেন, এভাবে করলে তার শপথ পূরণ হবে; কারণ বলেছেন, শপথ ভঙ্গ করো না। এ বিষয়ে ফকিহদের মতভেদ হয়েছে। আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, যুফার ও মুহাম্মদ বলেছেন, একবার আঘাত করে প্রতিটি বেত শরীরে লাগালে শপথ পূরণ হবে। মালিক ও লাইস বলেছেন, তা পূরণ হবে না। এই মত কিতাবের বিপরীত; কারণ আল্লাহ জানিয়েছেন, এভাবে কাজ করলে শপথ ভঙ্গ হয় না। মুজাহিদ থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, এটি আইয়ুবের জন্য বিশেষ বিধান। আতা বলেছেন, এটি সবার জন্য সাধারণ। আবু বকর বলেছেন: দুটি কারণে আয়াতটি প্রথম মতের সঠিকতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। প্রথমত, যে এভাবে কাজ করে তাকে নির্ধারিত সংখ্যায় আঘাতকারী বলা হয়, ফলে তার শপথ পূরণ হয়। দ্বিতীয়ত, সে শপথ ভঙ্গ করে না; কারণ বলা হয়েছে, শপথ ভঙ্গ করো না।
এই উদাহরণে দাসের শরীর অন্য ব্যক্তির শপথ পূরণের বিষয়বস্তু হয়েছে। মালিক কতবার প্রহার করার অঙ্গীকার করেছেন, একটি গোছার প্রতিটি বেত শরীরে লেগেছে কি না এবং একটি আঘাতকে কতটি আঘাত হিসেবে গণনা করা হবে—এসব প্রশ্ন ফিকহি হিসাবের কেন্দ্রে এসেছে। একসঙ্গে আঘাত করে সংখ্যা পূরণ করার বিধানে প্রহারের পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু দাসের ওপর প্রহারকে শপথের বিষয় করার সামাজিক অবস্থানটি কার্যকর রয়েছে। একজন মানুষের শরীরের ওপর অন্য ব্যক্তির ব্যক্তিগত অঙ্গীকার কার্যকর করার এমন অধিকার দাসত্বের গভীর অধীনতা প্রকাশ করে।
মালিকের নির্দেশে দশ বেত্রাঘাতে দাসের মৃত্যু: ক্ষতিপূরণের দায় নেই
দাসকে শাসনের জন্য প্রহার করার ক্ষমতা কতদূর বিস্তৃত ছিল, তার আরও ভয়াবহ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মালিকি ফিকহের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ আল-মুদাওয়ানা-তে। সেখানে শুধু দাসকে প্রহারের অনুমোদন নয়, সেই প্রহারের ফলে দাসের মৃত্যু ঘটলে প্রহারকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কি না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত নির্দিষ্ট: একজন মালিক অন্য একজন ব্যক্তিকে নিজের দাসকে দশটি বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিলেন। সেই ব্যক্তি নির্দেশ অনুসারে দশটি বেত্রাঘাত করলেন এবং তাতেই দাসটি মারা গেল। প্রহারকারীকে কি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে? ইমাম মালিকের নামে সংরক্ষিত উত্তর হলো, তার ওপর ক্ষতিপূরণের দায় নেই। তবে ভুলবশত হত্যার কাফ্ফারা আদায় করা পছন্দনীয় বলা হয়েছে। একই আলোচনায় নির্দেশিত দশ বেত্রাঘাত অতিক্রম করে এগারো বা বিশবার আঘাত করার পরিস্থিতিও বিবেচনা করা হয়েছে। বাড়তি আঘাত মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা হলে প্রহারকারীর ওপর দায় আরোপের মত দেওয়া হয়েছে। [68]
فَضَرَبَهُ عَشَرَةَ أَسْوَاطٍ فَمَاتَ الْعَبْدُ مِنْهَا، أَيَضْمَنُ الضَّارِبُ أَمْ لَا؟ قَالَ: قَالَ مَالِكٌ: لَا ضَمَانَ عَلَيْهِ.
বাংলা অনুবাদ: এরপর সে তাকে দশটি বেত্রাঘাত করল এবং সেই আঘাতে দাসটি মারা গেল। প্রহারকারীকে কি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, নাকি দিতে হবে না? উত্তরে বলা হলো, মালিক বলেছেন: তার ওপর ক্ষতিপূরণের দায় নেই।
এই বিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, দাসের মৃত্যু ঘটেছে—এটি স্বীকার করার পরও ক্ষতিপূরণের দায় নির্ধারণে প্রহারকারীর কাজ মালিকের নির্দেশের মধ্যে ছিল কি না, সেই বিষয়টিকে কেন্দ্র করা হয়েছে। মালিক যতগুলো বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিয়েছেন, প্রহারকারী ঠিক ততগুলো আঘাত করলে এবং সেই আঘাতেই দাস মারা গেলে তাঁর ওপর ক্ষতিপূরণের দায় আরোপ করা হয়নি। বিপরীতে অনুমোদিত সংখ্যার বেশি আঘাত করলে এবং সেই অতিরিক্ত আঘাত মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা হলে দায়ের প্রশ্ন উঠেছে। এখানে প্রহারের ফল শুধু আহত হওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; মৃত্যু ঘটার পরও অনুমোদিত ও অননুমোদিত আঘাতের পার্থক্য দিয়ে ক্ষতিপূরণের দায় নির্ধারণ করা হচ্ছে।
এই আলোচনা দাসপ্রথার একটি মৌলিক আইনগত বাস্তবতা প্রকাশ করে। দাসের ওপর শারীরিক শাস্তি প্রয়োগের অধিকার মালিকের; অন্য ব্যক্তি সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করছেন। দাসটি মারা গেলে প্রশ্ন উঠছে, নির্দেশ পালনকারী ব্যক্তি মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য কি না। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে মালিকের অনুমতি, আঘাতের সংখ্যা এবং সেই সীমা অতিক্রমের ফলে উদ্ভূত দায়। যে মানুষটি আঘাতে মারা গেল, তার জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তা মালিকের শাস্তিদানের অধিকারের অধীনস্থ অবস্থায় বিচার করা হচ্ছে। দশটি আঘাতেই মৃত্যু ঘটলে ক্ষতিপূরণের দায় নেই, কিন্তু অতিরিক্ত আঘাতে মৃত্যু ঘটলে দায় তৈরি হতে পারে—এই পার্থক্য ব্যক্তির জীবনের সমান মর্যাদার বদলে মালিকানাভিত্তিক শাস্তির ক্ষমতাকেই আইনের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে প্রকাশ করে।
আল-মুদাওয়ানা-র আলোচ্য বিধানটি নির্দিষ্টভাবে প্রহারকারীর ক্ষতিপূরণের দায় সম্পর্কে। মালিকের নির্দেশে দশ বেত্রাঘাত করার ফলে একজন দাস মারা গেছে; তবু ওই প্রহারকারীর ওপর ক্ষতিপূরণের দায় আরোপ করা হয়নি। এখানে মৃত্যুর কারণ শারীরিক আঘাত, আর ক্ষতিপূরণের দায় থেকে অব্যাহতির কারণ প্রহারকারীর মালিক-নির্ধারিত সংখ্যার মধ্যে থাকা। দাসের জীবনহানির পরেও ক্ষতিপূরণের বিচার মালিকের নির্দেশ এবং প্রহারের সংখ্যাকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়েছে। সেই আইনগত বিন্যাসেই দাসের ওপর শারীরিক শাস্তির ক্ষমতার ভয়াবহ পরিণতি প্রকাশিত।
দাসকে প্রহার করার অনুমোদন এবং সেই প্রহারে মৃত্যু ঘটলে ক্ষতিপূরণের দায়ের বিধান একই আইনগত আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আঘাতের সংখ্যা, মালিকের অনুমতি এবং সীমা অতিক্রমের কারণে ক্ষতিপূরণের দায়—এসব নিয়ম দাসের জীবনকেও মালিকানাভিত্তিক শাস্তির ব্যবস্থার অধীন করেছে। আল-মুদাওয়ানা-র এই বিধান দেখায়, দাসের ওপর শারীরিক কর্তৃত্ব শুধু চড়-থাপ্পড় বা হালকা প্রহারে সীমাবদ্ধ ছিল না; মালিকের অনুমোদিত প্রহারে দাসের মৃত্যুর মতো পরিণতিও ধ্রুপদি ফিকহের আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
মালিকের অনুমতিতে প্রহার ও মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ: বাগাভির মত
নববি রওদাতুত তালিবিন-এ শাসনমূলক প্রহারে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের আলোচনা করতে শিক্ষক, স্বামী এবং শাসকের দায় উল্লেখ করেছেন। সেই আলোচনায় বাগাভির নামে মালিকানাধীন ব্যক্তির জন্য একটি পৃথক বিধান এসেছে: মালিকের অনুমতিতে শিক্ষক দাসকে প্রহার করে এবং তাতে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের দায় থাকবে না। এর যুক্তিতেও মালিকের অনুমতি কেন্দ্রীয় স্থান পেয়েছে। [69]
أما الأول فما يفضي إلى الهلاك من التصرفات المتعلقة بالولاة أنواع: أحدها: التعزير، فإذا مات منه المعزر، وجب ضمانه؛ لأنه تبين بالهلاك أنه جاوز الحد المشروع، وحكي وجه أنه لا ضمان إذا عزر لحق الآدمي بناء على أنه واجب إذا طلب المستحق فصار كالحد، والصحيح الأول، ويجب الضمان أيضا في تعزير الزوج والمعلم إذا أفضى إلى الهلاك، سواء ضربه المعلم بإذن أبيه، أو دون إذنه، لكن لو كان مملوكا، فضربه بإذن سيده، قال البغوي: لا ضمان؛ لأنه لو أذن في قتله، فقتله، لم يضمنه، ثم الضمان الواجب الدية على عاقلة الزوج والمعلم، وفي حق الإمام هل هو على عاقلته أم في بيت المال؟ فيه خلاف سبق ويعود أيضا إن شاء الله تعالى لكن لو أسرف المعزر، وظهر منه قصد القتل، تعلق به القصاص والدية المغلظة في ماله.
বাংলা অনুবাদ:
প্রথমটির ক্ষেত্রে, কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের যেসব কাজ মৃত্যু ঘটায়, তা কয়েক ধরনের। প্রথম: তাজির। তাজিরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এতে মারা গেলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; কারণ মৃত্যুর মাধ্যমে বোঝা যায়, শরিয়তসম্মত সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। একটি মত উদ্ধৃত হয়েছে, মানুষের অধিকার রক্ষায় তাজির দিলে ক্ষতিপূরণ নেই; কারণ অধিকারী তা দাবি করলে তাজির দেওয়া আবশ্যক হয়, ফলে তা হদদণ্ডের মতো। অধিক শুদ্ধ মত প্রথমটি। স্বামী ও শিক্ষকের তাজিরে মৃত্যু হলেও ক্ষতিপূরণ আবশ্যক; শিক্ষক পিতার অনুমতি নিয়ে অথবা অনুমতি ছাড়া প্রহার করুক। কিন্তু প্রহারপ্রাপ্ত ব্যক্তি মালিকানাধীন দাস হলে এবং শিক্ষক তার মালিকের অনুমতিতে প্রহার করলে বাগাভি বলেছেন: ক্ষতিপূরণের দায় নেই। কারণ মালিক তাকে হত্যা করার অনুমতি দিলে এবং সে হত্যা করলেও ক্ষতিপূরণের দায় হতো না। এরপর যে ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হয়, অর্থাৎ দিয়াত, তা স্বামী ও শিক্ষকের আকিলার ওপর। শাসকের ক্ষেত্রে তা তাঁর আকিলার ওপর, নাকি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর, সে বিষয়ে আগে মতভেদ এসেছে এবং আল্লাহ চাইলে আবার আসবে। তবে শাস্তিদাতা সীমা ছাড়িয়ে গেলে এবং তার হত্যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলে কিসাস এবং তার নিজের সম্পদ থেকে গুরুতর দিয়াতের বিধান প্রযোজ্য হবে।
একই আলোচনায় সাধারণ শাসনমূলক প্রহারে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের নীতি এবং মালিকের অনুমতিপ্রাপ্ত দাসপ্রহারে ক্ষতিপূরণ না থাকার মত স্থান পেয়েছে। পার্থক্যটির কেন্দ্রে মৃত মানুষটির মালিকানাধীন পরিচয় এবং তার মালিকের অনুমতি। বাগাভির উদ্ধৃত যুক্তিতে এমনকি মালিকের অনুমতিতে হত্যার ক্ষেত্রেও ক্ষতিপূরণের দায় না থাকার কথা এসেছে। ফলে মৃত ব্যক্তির শরীরের ওপর অন্যের মালিকানা তার মৃত্যুর অর্থনৈতিক দায় নির্ধারণে নির্ণায়ক ভূমিকা নিচ্ছে। একটি মানুষের প্রাণহানির বিচার তার স্বাধীন মর্যাদার সঙ্গে মালিকানাধীন অবস্থার পার্থক্য টেনে করা হচ্ছে।
আধুনিক ফতোয়ায় দাসপ্রহারের অনুমোদন: বিন বাযের বক্তব্য
আধুনিক সৌদি আলেম আবদুল আজিজ ইবনে বাযের বক্তব্যেও দাসকে প্রহারের অনুমোদন সরাসরি পাওয়া যায়। স্ত্রীকে দাসের মতো না মারার হাদিস ব্যাখ্যা করতে তিনি দাসের প্রহার এবং স্ত্রীর প্রহারের মাত্রা আলাদা করেছেন। ভাড়াটে গৃহকর্মী ও মালিকানাধীন দাসের বিধানের পার্থক্যও তাঁর ফতোয়ায় স্পষ্ট। ফলে মালিকানাধীন মানুষের ওপর প্রহারের অনুমোদন আধুনিক ফতোয়ার ভাষাতেও বহাল রয়েছে।
দাসকে বেত্রাঘাতের সরাসরি অনুমোদন
বিন বাযের হাদিসের পাঠে দাসকে বেত্রাঘাত করার বৈধতা সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়। তিনি হ্যাঁ বলে উত্তর দেন। একই আলোচনায় তিনি বলেন, উপযুক্ত কারণ থাকলে দাসের প্রহার স্ত্রীর তুলনায় বেশি কঠোর হতে পারে। [70]
س: هل يدل على جواز جلد العبد؟
ج: نعم.
বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্ন: এটি কি দাসকে বেত্রাঘাত করার বৈধতা নির্দেশ করে?
উত্তর: হ্যাঁ।
এই উত্তরে দাসের ওপর শারীরিক দণ্ডপ্রয়োগ বৈধ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। মালিকের শাসনক্ষমতার পক্ষে ধ্রুপদী ব্যাখ্যা আধুনিক আলেমের সিদ্ধান্তেও একইভাবে কাজ করছে। দাসের জন্য অনুমোদিত প্রহারকে স্ত্রীর প্রহারের তুলনার মানদণ্ড করা হয়েছে; সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য শরীরে শাস্তির মাত্রার পার্থক্য হিসেবেও প্রতিফলিত হয়েছে।
ভাড়াটে গৃহকর্মী ও মালিকানাধীন দাসের পৃথক বিধান
ভাড়াটে গৃহকর্মীকে নিজের দাসী মনে করে প্রহার করার প্রশ্নে বিন বায তা নিষিদ্ধ বলেছেন এবং কাজ পছন্দ না হলে তাকে পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়ার কথা বলেছেন। একই উত্তরে তিনি মালিকানাধীন দাসকে শাসনযোগ্য বলে পৃথক করেছেন। [71]
المملوك معناه: الخادم المملوك، هذا الذي يُؤَدَّب.
বাংলা অনুবাদ:
মামলুক বলতে বোঝায় মালিকানাধীন সেবক; তাকেই শাসন করা হয়।
এই পার্থক্যের ভিত্তি কর্মীর ওপর মালিকানা। দুজন মানুষ একই ধরনের গৃহস্থালি সেবা দিতে পারে, কিন্তু একজনের সঙ্গে শ্রমের চুক্তি এবং অন্যজনের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা থাকায় তাদের শরীরের ওপর প্রহারের বিধান ভিন্ন হচ্ছে। মানুষকে সম্পত্তি করার অধিকারই এখানে তাকে শাসনের নামে আঘাত করার ক্ষমতার ভিত্তি। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে নৈতিক আপত্তির কেন্দ্রে এই মালিকানাগত অধীনতাই রয়েছে।
নিষিদ্ধ নয়: নিয়ন্ত্রিত শারীরিক শাস্তি
সবগুলো দলিল একত্রে রাখলে ছবিটি অস্পষ্ট নয়। হাদিসে দাসকে মারার সময় মুখ এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে; স্ত্রীকে দাসের মতো মারতে নিষেধ করা হচ্ছে; অন্যায় প্রহারের কাফ্ফারা হিসেবে মুক্তির কথা বলা হলেও ফকিহরা সেটিকে সাধারণভাবে ওয়াজিব করেননি; ধ্রুপদী ফিকহ দাসকে “শাসন” করার জন্য সীমিত প্রহারের অনুমতি দিয়েছে; এবং মুহাম্মদের সামনেই আবু বকর নিজের দাসকে প্রহার করলে মুহাম্মদ তা নিষিদ্ধ করেননি।
অতএব এখানে কোনো সামগ্রিক corporal-punishment ban নেই। রয়েছে corporal punishment-এর regulation। অর্থাৎ মালিকের হাতে দাসকে শারীরিকভাবে শাসনের ক্ষমতাটি বিলোপ করা হয়নি; বরং কোন পরিস্থিতিতে, কোন মাত্রায় এবং কোথায় আঘাত করা যাবে না—সেই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দুই বিষয়কে এক করে “ইসলাম দাসকে মারাই নিষিদ্ধ করেছে” বলা ইতিহাস এবং ইসলামি আইন—দুটোকেই বিকৃত করা।
আর এই বাস্তবতা আরও ভয়াবহ হয় যখন মনে রাখা হয়, এখানে দুই সমান স্বাধীন ব্যক্তির মধ্যে কোনো disciplinary relationship নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের মালিক; মালিক তার শ্রম নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে বিক্রি করতে পারে, তার ওপর কর্তৃত্ব চালায়, এবং সেই মালিকানাভিত্তিক কর্তৃত্বের অংশ হিসেবেই তাকে শারীরিকভাবে “শাসন” করার প্রশ্ন উঠছে। এমন একটি ব্যবস্থাকে কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কারণে “মানবিক” বলে প্রচার করা নৈতিকতার ভাষাকে অর্থহীন করে ফেলা ছাড়া আর কিছু নয়।
শব্দের মানবিকীকরণ বনাম মানুষের স্বাধীনতা
দাসপ্রথায় প্রহারের মাত্রা, খাদ্য-পোশাক এবং মালিকের আচরণ নিয়ন্ত্রণের বিধান মালিকানার সম্পর্কের ভেতরেই কাজ করে। মানুষের নিজের শরীর ও শ্রমের ওপর স্বাধীন অধিকার সেখানে মালিকের কর্তৃত্বের অধীন। একজন মানুষকে অন্যের সম্পত্তি করে রাখার পরে সেই সম্পত্তির সঙ্গে কেমন আচরণ করা হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। দাসপ্রথার নৈতিক সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের ওপর মানুষের এই মালিকানা এবং তার ভিত্তিতে শ্রম আদায় ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা।
ইসলামি উৎসে দাসমুক্তির প্রশংসা থাকা সত্ত্বেও দাসের অস্তিত্বকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি; মালিকানার সম্পর্ক বহাল রাখা হয়েছে। এমনকি IslamQA-র দাসপ্রথার পক্ষে লেখা দীর্ঘ নিবন্ধটিও বিষয়টি অস্বীকার করেনি। সেখানে প্রশ্নটির উত্তরে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, “we reply emphatically and without shame that slavery is permitted in Islam”—অর্থাৎ তারা “দৃঢ়ভাবে এবং কোনো লজ্জা ছাড়াই” স্বীকার করছে যে ইসলামে দাসপ্রথা বৈধ। এরপর যুদ্ধবন্দীদের দাসে পরিণত করার ব্যবস্থাকেও ইসলামি দাসত্বের বৈধ উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে [72]। একইভাবে অন্যায় বা মাত্রাতিরিক্ত প্রহারের নিন্দা থাকলেও মালিকের সমস্ত শারীরিক শাসনক্ষমতা বাতিল করা হয়নি। ধ্রুপদী ফিকহের “হালকা প্রহার”, “বিনা অপরাধে নয়”, “মুখে নয়”, “প্রচণ্ড নয়”—এই শব্দগুলো সেই বাস্তবতাকেই প্রকাশ করে। স্বাধীন মানুষের শরীরের ওপর অন্য মানুষের মালিকানাভিত্তিক শাস্তি দেওয়ার অধিকারকে সীমিত করা হয়েছে; অধিকারটি নীতিগতভাবে অস্বীকার করা হয়নি।
উপসংহার
ইসলামে দাসদাসীকে সামান্য আঘাত করাও সম্পূর্ণ হারাম ছিল এবং দাসকে একবার মারলেই তাকে মুক্ত করে দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল—এই প্রচলিত দাবি সত্য নয়। ইসলামি উৎসের সামগ্রিক চিত্র হলো অনেক বেশি অস্বস্তিকর: দাসপ্রথা বৈধ ছিল, মানুষ মানুষের মালিক হতে পারত, এবং সেই মালিকানার সম্পর্কের মধ্যেই দাসকে শাসন ও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে শারীরিকভাবে প্রহার করার ক্ষমতা স্বীকৃত ছিল। অন্যায়, মুখে আঘাত বা অতিরিক্ত প্রহারের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ ছিল; কিন্তু বিধিনিষেধ থাকা আর দাসপ্রহারকে নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ করা এক বিষয় নয়।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, অন্যায় প্রহারের পরে দাস মুক্ত করার যে নির্দেশকে আজ প্রায়ই ইসলামের অসাধারণ মানবিকতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্র সেটিকেও সাধারণভাবে বাধ্যতামূলক মুক্তি হিসেবে গ্রহণ করেনি। ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকারীদের একটি প্রভাবশালী অবস্থানেই সামান্য প্রহারের পরে মুক্তিকে ওয়াজিব করা হয়নি। এমনকি চরম নির্যাতনের ক্ষেত্রেও মুক্তি বাধ্যতামূলক কি না, তা নিয়ে ফকিহদের মতভেদ ছিল।
মালিকানাভিত্তিক শাস্তির ক্ষমতার সামনে মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন হলো—একজন মানুষের শরীর, শ্রম ও স্বাধীনতার ওপর আরেকজন মানুষের এমন মালিকানাভিত্তিক কর্তৃত্ব থাকার অধিকারই বা কেন থাকবে? আধুনিক মানবিক নীতিবোধের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট: কোনো মানুষের থাকা উচিত নয়। যে ব্যবস্থায় এই কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে কেবল তার প্রয়োগের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাকে মানুষের স্বাধীনতার আদর্শ ব্যবস্থা বলা যায় না। সেটি দাসপ্রথাই—কেবল কিছু নিয়ন্ত্রক বিধিসহ দাসপ্রথা।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৫৫৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৬১২ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৪৯৩ ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ২৫৫২ ও সংশ্লিষ্ট অধ্যায়শিরোনাম ↩︎
- ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি, কিতাবুল ইতক, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১১; দাসদের ওপর ঔদ্ধত্য ও সম্বোধনসংক্রান্ত অধ্যায়ের ব্যাখ্যা ↩︎
- ইসলাম ও নারী – সর্বোচ্চ সম্মান এবং সুমহান মর্যাদা! ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৩২৪২ ↩︎
- Sahih al-Bukhari, Vol. 3, p. 421, Darussalam Publications ↩︎
- বুলুগুল মারাম, হাদিস: ১০৬৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৫২০৪, স্ত্রীপ্রহারসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ১৪২, লাকিত ইবনে সাবিরার বর্ণনা ↩︎
- ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, কিতাবুন নিকাহ, باب ما يكره من ضرب النساء, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২১৪ ↩︎
- বদরুদ্দিন আল-আইনি, উমদাতুল কারি, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ১৯৩, باب ما يكره من ضرب النساء ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৬৫৭a, ১৬৫৭b ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৬৫৮a-d ↩︎
- ইমাম নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, باب صحبة المماليك وكفارة من لطم عبده ↩︎
- ইযাহুল মুসলিম, পৃষ্ঠা ৩৬৪–৩৬৫ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরিফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদিস প্রকাশনী, ১৬তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৪৫১৯, কিতাবুদ দিয়াত, নিজের দাসকে হত্যা বা অঙ্গবিকৃত করার প্রসঙ্গ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ ২৬৮০, باب من مثل بعبده فهو حر ↩︎
- ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা বিল আসার, কিতাবুল ইতক ওয়া উম্মাহাতিল আওলাদ, মাসআলা ১৬৭৭, ৮/২০১; ইসলামওয়েব ↩︎
- শিহাবুদ্দিন আল-কারাফি, আয-যাখিরা, কিতাবুল ইতক, الركن الثالث الصيغة, দশম আলোচনা, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ১১৫ ↩︎
- ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৮/২০৫, فصل لسيد تأديب عبده وأمته ↩︎
- ইবনে মুফলিহ, আল-ফুরু গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত হাম্বলি মতসমূহ; ফতোয়া ১৩৭৫২৭ ↩︎
- মুসা ইবনে আহমদ আল-হাজ্জাওয়ি, আল-ইকনা, দারুল মারিফা সংস্করণ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৫৪; পরের পৃষ্ঠায় অব্যাহত মূল পাঠ ↩︎
- আল-ইকনা, দারুল মারিফা সংস্করণ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৫৪, পাদটীকা ২ ↩︎
- আল-ইকনা, কিতাবুন নাফাকাত, দাসদাসীর ভরণপোষণ ও বিক্রির বিধান ↩︎
- ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৭৭; মালিকের দাসকে তাজির দেওয়ার বিধানের ব্যাখ্যা ↩︎
- সুন্নাহর কওলী, ফে’লী ও তাকরীরী শ্রেণিবিভাগ; ফতোয়া ৩৮৯৩৮ ↩︎
- ইবনে হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১৩/৩৩৬, باب من رأى ترك النكير من النبي حجة ↩︎
- ইবনুল কাইয়্যিম, বাদাইউল ফাওয়াইদ, ৪/৬; ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২১৬০১৬ ↩︎
- শাতিবি, আল-মুওয়াফাকাত থেকে তাকরীরের ব্যাখ্যা; ফতোয়া ৩৪৪৩৫৩ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ১৮১৮ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮, ৩৯ ↩︎
- আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদ, শরহ সুনান আবি দাউদ [২১৫], باب المحرم يؤدب غلامه ↩︎
- মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৬৯১৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ১৮১৮ ↩︎
- সুনান ইবনে মাজাহ ২৯৩৩ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১৬৫৯ক, কিতাবুল আইমান, দাসদের সঙ্গে আচরণ ও দাসকে চড় মারার কাফ্ফারা ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১৬৫৯ঘ, আবু মাসউদের দাসের আশ্রয়প্রার্থনার বর্ণনা ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১৬৫৯গ, দাসমুক্তি না করলে আগুনের শাস্তির সতর্কবাণী ↩︎
- ইবনে হাযম, আল-মুহাল্লা, মাসআলা ১৬৭৭ ↩︎
- হুসাইন ইবনে আওদা আল-আওয়ায়িশা, শরহু সহিহিল আদাবিল মুফরাদ, পৃষ্ঠা ১৯৯ ↩︎
- আবদুর রাজ্জাক আল-বদর, শরহুল আদাবিল মুফরাদ, পৃষ্ঠা ৪০০ ↩︎
- ইবনে তাইমিয়্যা, মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া, ১৫/৩৭২; IslamQA Answer 198645 ↩︎
- ইসলামি উৎসে উমরের নারী-দৃষ্টিভঙ্গি: পর্দা, যৌন জবরদস্তি, স্ত্রী প্রহার ও দাসী নির্যাতন ↩︎
- ইবনে তাইমিয়্যা, মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া, ১৫/৩৭২-৩৭৩; IslamWeb Library ↩︎
- ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, সাদ আশ-শাসরি সম্পাদিত সংস্করণ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৫৪–৩৫৫, বর্ণনা ৬৩৮৩; দাসীর মাথার আবরণসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
- ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫০–৩৫১; মাথা খোলা রেখে দাসীর নামাজ ↩︎
- বুরহানুদ্দিন ইবনে মুফলিহ, আল-মুবদি শারহুল মুকনি; সতর ও দাসীর পোশাকের বিধান ↩︎
- হুসাইন ইবনে আলী আস-সাইমারি, মাসাইলুল খিলাফ ফি উসুলিল ফিকহ, পৃষ্ঠা ৩৪৬ ↩︎
- সিরাতুন নবী (সাঃ), ইবনে হিশাম, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৯, ৩১০; ইবনে হিশাম, আল-সীরাহ আল-নাবাবিয়্যাহ, গাযওয়াত বানী আল-মুস্তালিক; IslamWeb Fatwa no. 198439, “هذا السياق من قصة الإفك صحيح” ↩︎
- IslamWeb Fatwa no. 198439, هذا السياق من قصة الإفك صحيح ↩︎
- আল-বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, বর্ণনা ১৭০; সহিহুল আদাবিল মুফরাদ, ১২৬; দোরারে মূল বর্ণনা ↩︎
- আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃষ্ঠা ১৬২; বর্ণনা ১৭০–১৭১ এবং বর্ণনাসূত্রের টীকা ↩︎
- মুহাম্মদ লুকমান আস-সালাফি, রশ্শুল বারদ শারহুল আদাবিল মুফরাদ, পৃষ্ঠা ১১০ ↩︎
- আবদুল আজিজ আর-রাজিহী, শরহু সহিহিল আদাবিল মুফরাদ, পাঠ ৩২; বর্ণনা ১৭০–১৭১-এর ব্যাখ্যা ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৩৭ক; মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামির বর্ণনায় পশুপালক দাসীর ঘটনা ↩︎
- ওয়াকি, আখবারুল কুদাত, ইয়াস ইবনে মুআবিয়ার জীবনী; ইউসুফ ইবনে উমরের প্রহার ও দাসদের প্রহারের তুলনা ↩︎
- আবু দাউদ আল-সিজিস্তানী, মাসায়িল আল-ইমাম আহমদ, রিওয়ায়াত আবি দাউদ আল-সিজিস্তানী, মাসআলা ১৮৩০, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৮; ইবন মুফলিহ, আল-ফুরু‘ ↩︎
- আল-বুহূতী, কাশশাফ আল-কিনা‘ আন মাতন আল-ইকনা‘, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৯১–৪৯২; IslamWeb Library ↩︎
- ইবনে কুদামা, আল-মুগনি; ইবনে মুফলিহ, আল-ফুরু—উদ্ধৃত ফতোয়া ১৩৭৫২৭ ↩︎
- আল-বুহুতি, কাশশাফুল কিনা, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৯১–৪৯২; দাসের শাসন ও কাজ আদায়ের বিধান ↩︎
- জয়নুদ্দিন আল-মালিবারি, ফাতহুল মুঈন, তাজিরের আলোচনা; আবদুর রহমান ইবনে যিয়াদের ফতোয়া ↩︎
- ইযযুদ্দিন ইবনে আবদিস সালাম, কাওয়াইদুল আহকাম ফি মাসালিহিল আনাম, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৯৭; চৌত্রিশতম উদাহরণ; উইকিসংকলনে একই গ্রন্থের পূর্ণ পাঠ ↩︎
- ইমাম শাওকানি, নায়লুল আওতার, কিতাবুল ইতক, باب أن من مثل بعبده عتق عليه, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১০১; ইসলামওয়েব ↩︎
- আল-জাসসাস, আহকামুল কোরআন, সূরা সোয়াদ ৩৮:৪৪; বেতের গোছা দিয়ে শপথ পূরণের বিধান ↩︎
- আল-মুদাওয়ানা, কিতাবুল আরিয়্যা, باب فيمن أمر رجلا يضرب عبدا له فضربه فمات, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৪৯; ইসলামওয়েব ↩︎
- আন-নববি, রওদাতুত তালিবিন, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৭৭; বাগাভির মতে মালিকের অনুমতিতে প্রহারে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ ↩︎
- বিন বাযের সরকারি ওয়েবসাইট, স্ত্রীদের মধ্যে পালা বণ্টন ও “দাসের মতো স্ত্রীকে প্রহার” বিষয়ক হাদিসের পাঠ; প্রশ্নোত্তর ↩︎
- বিন বায, ফতোয়া ২১৮৮৭; গৃহকর্মীকে মালিকানাধীন দাসী হিসেবে ব্যবহার ও প্রহারের বিধান ↩︎
- IslamQA, Answer 94840, “Slavery in Islam” ↩︎

