জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

একশ মানুষ হত্যা করেও জান্নাত: আল্লাহর ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের স্ববিরোধিতা

প্রকাশিত: জুন 8, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন34 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামী নৈতিকতা ও পরকালীন বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক দাবি হলো, মানুষ যত গুরুতর অপরাধই করুক না কেন, আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করলে তার জন্য ক্ষমার দরজা খোলা থাকতে পারে। এমনকি একাধিক মানুষকে হত্যা করার মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও এই ক্ষমার সম্ভাবনা অস্বীকার করা হয় না। ইসলামী ধর্মতত্ত্বে এটিকে আল্লাহর অসীম দয়া, ক্ষমাশীলতা ও করুণার পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার এবং অপরাধীর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন এক বিষয় নয়। একজন মানুষ অনুতপ্ত হলে তার ভবিষ্যতের আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু তার অতীতের অপরাধ, নিহত মানুষের জীবনহানি এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের ক্ষতি সেই অনুশোচনার মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। ফলে গুরুতর অপরাধের জন্য ক্ষমার ধর্মীয় প্রতিশ্রুতিকে ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে বিচার করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: অপরাধীকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার অপরাধের শিকার মানুষগুলোর অধিকার, ক্ষতি ও প্রাপ্য বিচার কতটা গুরুত্ব পায়?

এই প্রশ্নটি সবচেয়ে তীব্রভাবে সামনে আসে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একশ মানুষ হত্যাকারীর বিখ্যাত হাদিসে। মুহাম্মদের বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তি নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করার পরে নিজের তওবার সুযোগ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। প্রথমে একজন রাহিব তাকে জানায়, তার তওবার কোনো সুযোগ নেই। এই উত্তর শুনে সে রাহিবকেও হত্যা করে একশ পূর্ণ করে। এরপর আরেকজন আলেমের কাছে গেলে তিনি জানান, তার তওবার সুযোগ রয়েছে এবং তাকে এমন এক জনপদে চলে যেতে বলেন, যেখানে সৎ ও ধর্মপরায়ণ মানুষের বসবাস। হত্যাকারী সেই জনপদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেও পথেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরে রহমতের ফেরেশতা ও শাস্তির ফেরেশতাদের মধ্যে তার পরিণতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। একপক্ষ তার অনুশোচনা ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের কথা বলে, অন্যপক্ষ জানায় যে সে এখনো কোনো ভালো কাজ করেনি। শেষ পর্যন্ত দুই জনপদের দূরত্ব পরিমাপের মাধ্যমে তার পরিণতি নির্ধারিত হয় এবং সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। অপর একটি বর্ণনায় আল্লাহ নিজেই এক জনপদকে কাছে আসতে এবং অন্যটিকে দূরে সরে যেতে নির্দেশ দেন, যাতে হত্যাকারী ভালো জনপদের অধিক নিকটবর্তী হয়। [1] [2]

এই কাহিনির সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় শুধু একশ হত্যার পরেও ক্ষমা পাওয়ার ঘটনা নয়; বরং সম্পূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়ায় নিহত একশ মানুষের অনুপস্থিতি। তাঁদের প্রত্যেকের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাঁদের পরিবার স্বজন হারিয়েছে এবং হত্যাকারীর অপরাধের ফলে অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হয়েছে। অথচ হাদিসে কোথাও বলা হয়নি, নিহতদের উত্তরাধিকারীদের কাছে হত্যাকারী আত্মসমর্পণ করেছে, কোনো বিচারিক জবাবদিহির সম্মুখীন হয়েছে, ক্ষতিপূরণ দিয়েছে অথবা নিহতদের অধিকার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করেছে। ফেরেশতাদের বিতর্কেও এই মানুষগুলোর অধিকার বিচার্য বিষয় হয়ে ওঠেনি। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে হত্যাকারীর ব্যক্তিগত অনুশোচনা, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ইচ্ছা এবং মৃত্যুর সময় তার ভৌগোলিক অবস্থান। একটি ন্যায়বিচারব্যবস্থা যদি হত্যাকারীর ক্ষমাকে বিস্তারিতভাবে প্রতিষ্ঠা করে, অথচ নিহতদের প্রাপ্য বিচারের কোনো বিবরণ না দেয়, তাহলে সেই ব্যবস্থায় করুণা ও ন্যায়বিচারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।

সমস্যাটি আরও গভীর, কারণ ইসলামি উৎসগুলোর মধ্যেই হত্যাকারীর তওবা ও নিহত মানুষের অধিকার সম্পর্কে পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অবস্থান পাওয়া যায়। কোরআনের সূরা নিসা ৪:৯৩-এ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যার জন্য জাহান্নাম, আল্লাহর ক্রোধ, অভিশাপ ও মহাশাস্তির ঘোষণা রয়েছে। অন্যদিকে সূরা ফুরকান ২৫:৬৮–৭০-এ হত্যাসহ গুরুতর অপরাধের পরে তওবা, ঈমান ও সৎকর্মের শর্তে ক্ষমা এবং পাপকে পুণ্যে পরিবর্তন করার কথা বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিম ও সহিহ বুখারিতে সংরক্ষিত ইবন আব্বাসের একটি প্রসিদ্ধ বক্তব্য অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত মুমিন হত্যাকারীর জন্য তওবার সুযোগ নেই। আবার পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যায় হত্যাকারীর তওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার মতটি প্রাধান্য পেয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামি ফিকহে স্বীকার করা হয়েছে যে হত্যার সঙ্গে আল্লাহর অধিকার ছাড়াও নিহত ব্যক্তি ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের পৃথক অধিকার সম্পর্কিত, যার নিষ্পত্তি শুধু ব্যক্তিগত অনুশোচনার মাধ্যমে হয় না। ফলে একশ হত্যাকারীর কাহিনি বিচ্ছিন্ন কোনো অলৌকিক ক্ষমার গল্প নয়; এটি ইসলামী ধর্মতত্ত্বে অপরাধ, তওবা, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং পরকালীন শাস্তির সম্পর্ক নিয়ে বিদ্যমান গভীর অসংগতিগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। [3] [4] [5] [6]

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসলামের তাকদিরসংক্রান্ত বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরকালীন পরিণতি নির্ধারণের প্রশ্ন। যদি মানুষের জীবন, কর্ম ও চূড়ান্ত পরিণতি আল্লাহর পূর্বনির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে একশ হত্যাকারীর অপরাধ, তার অনুশোচনা এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমাপ্রাপ্ত হওয়াও সেই নির্ধারণের বাইরে নয়। অন্যদিকে যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেনি, মানুষের উপকার করেছে, কিন্তু অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তার পরকালীন পরিণতি নির্ধারণে ধর্মীয় বিশ্বাসকে মৌলিক মানদণ্ড করা হয়। এই তুলনায় প্রশ্ন ওঠে, মানুষের প্রতি সংঘটিত অপরাধ এবং মানুষের কল্যাণে করা কাজের নৈতিক গুরুত্বের তুলনায় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য কেন এত বেশি নির্ধারক হয়ে ওঠে। একশ হত্যাকারীর হাদিসে অপরাধীর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে; কিন্তু সেই ক্ষমার সিদ্ধান্ত নিহতদের ন্যায়বিচার, অপরাধের অনুপাত অনুযায়ী জবাবদিহি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে মানুষের নৈতিক মূল্যকে কীভাবে সংরক্ষণ করে, তার উত্তর পাওয়া যায় না। আল্লাহর করুণাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত এই বিচারকাহিনি তাই একই সঙ্গে ইসলামী নৈতিকতা, বিচারব্যবস্থা ও পরকালীন মুক্তির ধারণার একটি মৌলিক সংকট প্রকাশ করে।


হাদিসের বিবরণসমূহ

এই হাদিসের বিবরণ ও তার প্রচলিত ব্যাখ্যা থেকে একটি গভীর নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে। একজন মানুষ একশ জনকে হত্যা করার পরেও আল্লাহর প্রতি যুক্তিপ্রমাণহীন বিশ্বাস এবং আল্লাহর কাছে তওবার ইচ্ছা নিয়ে সৎ লোকদের জনপদের দিকে যাত্রা করার মাধ্যমে ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে যেতে পারবে। অথচ তার হাতে নিহত মানুষগুলোর জীবনের মূল্য, পরিবারের ক্ষতি এবং হত্যার বিচার কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা এই কাহিনিতে বলা হয়নি। তাহলে যারা একটি মানুষকেও হত্যা করেনি, অথচ আল্লাহর পূর্বনির্ধারণ অনুযায়ী জাহান্নামের পরিণতি লাভ করবে এবং যারা অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের সঙ্গে এই পার্থক্য কতটা ন্যায়সংগত? মূল ঘটনাটি এবং এর বিভিন্ন বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো। [7] [8] [9]

রিয়াযুস স্বা-লিহীন
অধ্যায়ঃ ১/ বিবিধ
পরিচ্ছেদঃ ২: তওবার বিবরণ
৮/২১। আবূ সাঈদ সা‘দ ইবনু মালেক ইবনু সিনান খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমাদের পূর্বে (বনী ইস্রাইলের যুগে) একটি লোক ছিল; যে ৯৯টি মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর লোকদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে একটি খ্রিষ্টান সন্নাসীর কথা বলা হল। সে তার কাছে এসে বলল, ‘সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তওবার কোন সুযোগ আছে?’ সে বলল, ‘না।’ সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকেও হত্যা করে একশত পূরণ করে দিল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবারও তাকে এক আলেমের খোঁজ দেওয়া হল। সে তার নিকট এসে বলল যে, সে একশত মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তওবার কোন সুযোগ আছে? সে বলল, ‘হ্যাঁ আছে! তার ও তওবার মধ্যে কে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশে চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে যারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ও দেশ পাপের দেশ।’
সুতরাং সে ব্যক্তি ঐ দেশ অভিমুখে যেতে আরম্ভ করল। যখন সে মধ্য রাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আযাবের উভয় প্রকার ফিরিশ্তা উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হল। রহমতের ফিরিশ্তাগণ বললেন, ‘এই ব্যক্তি তওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে।’ আর আযাবের ফিরিশ্তারা বললেন, ‘এ এখনো ভাল কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)।’ এমতাবস্থায় একজন ফিরিশ্তা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাগণ তাঁকে সালিস মানলেন। তিনি ফায়সালা দিলেন যে, ‘তোমরা দু’ দেশের দূরত্ব মেপে দেখ। (অর্থাৎ এ যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশী নিকটবর্তী হবে, সে তারই অন্তর্ভুক্ত হবে।’ অতএব তাঁরা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশী নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফিরিশতাগণ তার জান কবয করলেন।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
সহীহতে আর একটি বর্ণনায় এরূপ আছে যে, ‘‘পরিমাপে ঐ ব্যক্তিকে সৎশীল লোকদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পাওয়া গেল। সুতরাং তাকে ঐ সৎশীল ব্যক্তিদের দেশবাসী বলে গণ্য করা হল।’’
সহীহতে আরো একটি বর্ণনায় এইরূপ এসেছে যে, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ দেশকে (যেখান থেকে সে আসছিল তাকে) আদেশ করলেন যে, তুমি দূরে সরে যাও এবং এই সৎশীলদের দেশকে আদেশ করলেন যে, তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও। অতঃপর বললেন, ‘তোমরা এ দু’য়ের দূরত্ব মাপ।’ সুতরাং তাকে সৎশীলদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পেলেন। যার ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হল।’’
আরো একটি বর্ণনায় আছে, ‘‘সে ব্যক্তি নিজের বুকের উপর ভর করে ভালো দেশের দিকে একটু সরে গিয়েছিল।’’(1)
(1) সহীহুল বুখারী ৩৪৭০, মুসলিম ২৭৬৬, ইবনু মাজাহ ২৬২৬, আহমাদ ১০৭৭০, ১১২৯০
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫২। মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক লোক ছিলো। সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করার পর জিজ্ঞাসা করল, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলিম ব্যক্তি কে? তাকে এক রাহিবের সন্ধান দেওয়া হয়। সে তার কাছে এসে বলল, যে, সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করেছে এমতাবস্থায় তার জন্য কি তাওবা আছে? রাহিব বলল, না। তখন সে রাহিবকেও হত্যা করে ফেলল। এবং এর (রাহিবের) হত্যা দ্বারা একশ পূর্ণ করল।
তারপর সে আবার প্রশ্ন করল এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলিম কে? তখন তাকে এক আলিম ব্যক্তির সন্ধান দেওয়া হল। সে আলিমকে সে বলল যে, সে একশ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, তার জন্য কি তাওবা আছে? আলিম ব্যক্তি বললেন, হ্যাঁ। এ তাওবার মধ্যে কে অন্তরায় হতে পারে? তুমি অমুক দেশে যাও। সেখানে কতিপয় লোক আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত আছে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদতে মশশুল হয়ে যাও। নিজের দেশে আর কখনো ফিরে যেয়ো না। কেননা এ দেশটি বড় মন্দ। তারপর সে চলতে লাগল। এমন কি যখন সে অর্ধ পথে পৌছে তখন তার মৃত্যু এল।
এরপর রহমতের ফিরিশতা ও আযাবের ফিরিশতার মধ্যে তার সম্পর্কে বিবাদ লেগে গেল। রহমতের ফিরিশতারা বললেন, সে অন্তরের আবেগ নিয়ে আল্লাহর দিকে তাওবার জন্য ধাবিত হয়ে এসেছে। আর আযাবের ফিরিশতারা বললেন, সে তো কখনো কোন নেক আমল করেনি। এ সময় মানুষের সুরতে এক ফিরিশতা এলেন। তারা তাকে তাদের মধ্যে মীমাংসাকারী নির্ধারণ করলেন।
তিনি তাদের বললেন, তোমরা দুই দেশের মধ্যবর্তী দূরত্ব মেপে নাও। দুই স্থানের মধ্যে যে স্থানের দিকে সে অধিক নিকটবর্তী হবে তাকে সে স্থানেরই গণ্য করা হবে। তারা মাপলেন।তখন তাঁরা তাকে উদ্দিষ্ট স্থানের অধিক নিকটবর্তী পেলেন। তখন রহমতের ফিরিশতা তাকে কবজ করে নিলেন। কাদাতা (রহঃ) বলেন, হাসান (রহঃ) বলেছেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন তার মৃত্যু এল, তখন সে বুকের উপর ভর দিয়ে (কিছু এগিয়ে) গেল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫৩। উবায়দুল্লাহ ইবনু মু’আয আনবারী (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক ব্যক্তি নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতে লাগল, তার কি তাওবা আছে?অবশেষে সে এক পাদ্রীর নিকট এসে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। পাদ্রী বলল, তোমার জন্য তাওবা নেই। তখন সে পাদ্রীকে হত্যা করল।এরপর সে আবারো লোকদের জিজ্ঞাসা করতে লাগল। তারপর সে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল যেখানে কিছু নেক লোকের বসবাস ছিলো। রাস্তার এক অংশে তাকে মৃত্যু পেয়ে বসল। তখন সে বুকের উপর ভর করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে। তারপর সে মারা গেল। তখন রহমতের ফিরিশতা ও আযাবের ফিরিশতা তার সম্পর্কে বিবাদে লিপ্ত হল। তখন দেখা গেল যে, সে নেক লোকদের জনপদের দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী রয়েছে। তাই তাকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)


আলেমদের ওয়াজঃ নৈতিক শিক্ষা নাকি আনুগত্যের?

মিজানুর রহমান আজহারীর এই ওয়াজটি একশ হত্যাকারীর কাহিনির প্রচলিত ধর্মীয় উপস্থাপনার একটি উদাহরণ। এ ধরনের আলোচনায় হত্যাকারীর তওবা, আল্লাহর ক্ষমা এবং পাপ থেকে ফিরে আসার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। কিন্তু শুধু হত্যাকারীর ক্ষমাপ্রাপ্তির ঘটনাকে নৈতিক শিক্ষার চূড়ান্ত পরিণতি ধরে নিলে নিহত একশ মানুষের অধিকার সম্পর্কে অপরিহার্য প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। অপরাধীর অনুশোচনা তার নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে; কিন্তু সেই পরিবর্তন হত্যাকাণ্ডের বিচার কিংবা ভুক্তভোগীদের পাওনা নিষ্পত্তির সমতুল্য নয়। ধর্মীয় করুণার সঙ্গে প্রকৃত ন্যায়বিচারের এই পার্থক্য থেকেই হাদিসটির সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য নির্ধারিত হয়।


একশ নিহত মানুষের ন্যায়বিচার কোথায়?

একশ মানুষ হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার হাদিসটির সবচেয়ে গুরুতর নৈতিক সমস্যা হলো, সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহে হত্যাকারীর প্রতি আল্লাহর করুণা ও ক্ষমার বিষয়টি প্রাধান্য পেলেও নিহত একশ মানুষের অধিকার, তাঁদের পরিবারগুলোর ক্ষতি এবং তাঁদের প্রাপ্য ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। একজন মানুষ নিরানব্বই জনকে হত্যা করেছে, এরপর তওবার সুযোগ নেই শুনে একজন রাহিবকেও হত্যা করে একশ পূর্ণ করেছে। অর্থাৎ তার অপরাধের শিকার শুধু একশটি সংখ্যা নয়; একশজন স্বতন্ত্র মানুষ, যাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব জীবন, পরিবার, সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ ও বেঁচে থাকার অধিকার ছিল। তাঁদের হত্যার ফলে অসংখ্য মানুষ স্বজন হারিয়েছে, পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একশটি জীবন চিরতরে ধ্বংস হয়েছে। অথচ হাদিসের বিচারকাহিনিতে এই মানুষগুলোর কাউকে উপস্থিত করা হয়নি। তাঁদের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের বিচার কীভাবে হবে, তাঁদের পরিবারের দাবি কী হবে, অথবা হত্যাকারী তাঁদের প্রতি কোনো দায় পালন করেছে কি না—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হত্যাকারী নিজেই: তিনি অনুতপ্ত হয়েছেন কি না, কোন জনপদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন এবং মৃত্যুর সময় কোন জনপদের কতটা কাছে পৌঁছেছেন।

হাদিসে রহমতের ফেরেশতারা হত্যাকারীর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন যে তিনি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে শাস্তির ফেরেশতারা বলেছেন, তিনি এখনো কোনো ভালো কাজ করেননি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিতর্কের কোনো পর্যায়েই নিহত মানুষদের অধিকারকে বিচারের নির্ধারক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। হত্যাকারী তাঁর অপরাধের জন্য ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন কি না, তাঁদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন কি না, কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছেন কি না, কিংবা তাঁর অপরাধের জন্য কোনো বিচারিক জবাবদিহির সম্মুখীন হয়েছেন কি না—সেসবের কোনো বিবরণ নেই। শেষ পর্যন্ত দুই জনপদের দূরত্ব পরিমাপের মাধ্যমে তাঁর পরিণতি নির্ধারিত হয়েছে। অন্য বর্ণনায় আল্লাহ নিজেই এক জনপদকে কাছে আসতে এবং অন্যটিকে দূরে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন, যার ফলে হত্যাকারী ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছেন। অর্থাৎ যে বিচারপ্রক্রিয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছে, সেখানে একশ মানুষের প্রাণহানির তুলনায় হত্যাকারীর শেষ মুহূর্তের মানসিক পরিবর্তন ও ভৌগোলিক অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একটি ন্যায়সংগত বিচারব্যবস্থায় অপরাধীর অনুশোচনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু অনুশোচনা অপরাধের বাস্তব ক্ষতিকে বিলুপ্ত করে না। একজন হত্যাকারী আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হলেও তাঁর হাতে নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে ফিরে আসেন না। নিহতের সন্তান পিতা বা মাতাকে ফিরে পায় না, পরিবার হারানো স্বজনকে ফিরে পায় না এবং অপরাধের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি ইতিহাস থেকে মুছে যায় না। ফলে অপরাধীর সংশোধন, অপরাধীর ক্ষমা এবং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার তিনটি পৃথক বিষয়। কাউকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই ব্যক্তির অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর অধিকার কীভাবে নিষ্পত্তি হলো, সেটিও ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্ন। কিন্তু এই হাদিসে হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ হলেও নিহত একশ মানুষের প্রাপ্য বিচার কীভাবে সম্পন্ন হলো, তার কোনো বিবরণ নেই। অপরাধীর পরকালীন মুক্তির সিদ্ধান্তকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, অথচ তাঁর অপরাধের শিকার মানুষগুলোর জন্য কোনো সমতুল্য বিচারিক প্রক্রিয়া দেখানো হয়নি।

ইসলামী আইনশাস্ত্রও হত্যাকারীর তওবা এবং নিহতদের অধিকারকে একই বিষয় বলে গণ্য করে না। হত্যার সঙ্গে নিহত ব্যক্তি ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের পৃথক অধিকার জড়িত—এই স্বীকৃতি থাকলে একশ হত্যাকারীর ক্ষমাপ্রাপ্তির বিবরণে সেই অধিকারগুলোর নিষ্পত্তি কোথায়, প্রশ্নটি অনিবার্য। এখানে হত্যাকারীকে ক্ষমা করা হয়েছে, কিন্তু তাঁর হাতে নিহত মানুষগুলোর জন্য বিচার সম্পন্ন হওয়ার কোনো বিবরণ নেই। ক্ষমা করার ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচার সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ এক নয়। এই পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ইসলামি ফিকহের নিজের স্বীকৃত অধিকারগুলো পরীক্ষা করা হয়।


হত্যার ক্ষেত্রে তিনটি অধিকার: ১০০ নিহত মানুষের পাওনা কোথায়?

একশ মানুষ হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার কাহিনির সঙ্গে ইসলামী ফিকহের হত্যাসংক্রান্ত বিধানের একটি গুরুতর অসংগতি রয়েছে। ইসলামি আইনশাস্ত্রের আলোচনায় হত্যা কেবল আল্লাহর বিরুদ্ধে সংঘটিত পাপ নয়; এর সঙ্গে নিহত ব্যক্তি এবং তার উত্তরাধিকারীদের অধিকারও জড়িত। একজন হত্যাকারী আল্লাহর কাছে তওবা করলেই নিহত ব্যক্তির অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। এই বিষয়টি ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর আল-জাওয়াবুল কাফি গ্রন্থে স্পষ্টভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, হত্যার সঙ্গে তিনটি পৃথক অধিকার সম্পর্কিত: আল্লাহর অধিকার, নিহত ব্যক্তির অধিকার এবং নিহতের উত্তরাধিকারীদের অধিকার। হত্যাকারী আন্তরিকভাবে তওবা করলে আল্লাহর অধিকার ক্ষমা হতে পারে; কিন্তু উত্তরাধিকারীদের অধিকার নিষ্পত্তির জন্য নিজেকে তাঁদের কাছে সমর্পণ করতে হবে, যাতে তাঁরা কিসাস, রক্তপণ অথবা ক্ষমার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। নিহত ব্যক্তির নিজস্ব অধিকারও অবশিষ্ট থাকে, যা পরকালে আল্লাহ ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করবেন বলে ইবনুল কাইয়্যিম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। [10]

والتحقيق في المسألة أن القتل يتعلق به ثلاثة حقوق: حق لله وحق للمقتول، وحق للولي، فإذا سلم القاتل نفسه طوعا واختيارا إلى الولي ندما على ما فعل، وخوفا من الله، وتوبة نصوحا، سقط حق الله بالتوبة، وحق الولي بالاستيفاء أو الصلح أو العفو، وبقي حق المقتول يعوضه الله عنه يوم القيامة عن عبده التائب المحسن، ويصلح بينه وبينه، فلا يبطل حق هذا، ولا تبطل توبة هذا.

বাংলা অনুবাদ: এই বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো, হত্যার সঙ্গে তিনটি অধিকার সম্পর্কিত: আল্লাহর অধিকার, নিহত ব্যক্তির অধিকার এবং নিহত ব্যক্তির অভিভাবক বা উত্তরাধিকারীর অধিকার। হত্যাকারী যদি নিজের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়ে, আল্লাহকে ভয় করে এবং আন্তরিক তওবার মাধ্যমে স্বেচ্ছায় নিজেকে নিহতের অভিভাবকের কাছে সমর্পণ করে, তাহলে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর অধিকার নিষ্পত্তি হয়। আর নিহতের অভিভাবকের অধিকার কিসাস কার্যকর করা, আপসরফা করা অথবা ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু নিহত ব্যক্তির অধিকার অবশিষ্ট থাকে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর অনুতপ্ত ও সৎকর্মশীল বান্দার পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেবেন এবং উভয়ের মধ্যে মীমাংসা করবেন। এভাবে নিহতের অধিকারও বাতিল হবে না, আবার হত্যাকারীর তওবাও বাতিল হবে না।

ইবনুল কাইয়্যিমের এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিন ধরনের অধিকারের নিষ্পত্তি তিনটি পৃথক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। আল্লাহর অধিকার ক্ষমার বিষয় হতে পারে, উত্তরাধিকারীদের অধিকার কিসাস, আপসরফা বা ক্ষমার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় এবং নিহত ব্যক্তির অধিকার পরকালের পৃথক দাবি হিসেবে থেকে যায়। কিন্তু একশ হত্যাকারীর হাদিসে এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধিকারের নিষ্পত্তি বর্ণিত হয়নি। সেখানে একমাত্র বিস্তারিত বিচারটি হত্যাকারীর তওবা, তাঁর যাত্রার উদ্দেশ্য এবং কোন জনপদের কাছাকাছি তিনি মারা গেছেন, তা নিয়ে। অর্থাৎ অপরাধীর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শনের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করা হলেও হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষগুলোর পৃথক পাওনার কোনো বিচারপ্রক্রিয়া দেখানো হয়নি।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ইসলামকিউএর ১৪৭০১৭ নম্বর ফতোয়ায়। সেখানে ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী যদি অপরাধ গোপন করে এবং নিহতের উত্তরাধিকারীদের তা না জানায়, তাহলে উত্তরাধিকারী ও নিহত ব্যক্তির অধিকার তার ওপর অবশিষ্ট থাকে। অন্য মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শুধু অনুশোচনা যথেষ্ট নয়; অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা নেওয়াও প্রয়োজন। হত্যাকারীকে নিহতের উত্তরাধিকারীদের জানাতে হবে, যাতে তাঁরা কিসাস, রক্তপণ বা ক্ষমার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অর্থাৎ হত্যাকারীর ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশোচনা এবং তার অপরাধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রাপ্য বিচারকে একই বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়নি। [11]

فإذا أخفى القاتل جريمته، ولم يخبر أولياء المقتول، فقد بقي عليه حق الأولياء وحق القتيل.
ومن شروط التوبة إذا كان الذنب متعلقا بالغير: رد الحق إليه، أو التحلل منه، فيلزم القاتل أن يخبر أولياء المقتول ليعفوا، أو يقتصوا، أو يطلبوا الدية.

বাংলা অনুবাদ: হত্যাকারী যদি নিজের অপরাধ গোপন করে এবং নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের বিষয়টি না জানায়, তাহলে তার ওপর উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং নিহত ব্যক্তির অধিকার অবশিষ্ট থাকবে।
তওবার একটি শর্ত হলো, অপরাধটি যদি অন্য মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা নিতে হবে। সুতরাং হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের জানাতে হবে, যাতে তাঁরা ক্ষমা করতে পারেন, কিসাস কার্যকর করতে পারেন অথবা রক্তপণ দাবি করতে পারেন।

এই ব্যাখ্যার নৈতিক পরিণতি তাৎপর্যপূর্ণ। যদি হত্যাকারীর তওবা আল্লাহ গ্রহণ করেন, কিন্তু নিহত ব্যক্তির অধিকার এখনো বাকি থাকে, তাহলে ক্ষমা ও বিচার যে দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া, তা ইসলামি উৎসগুলোর বক্তব্য থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়। ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, নিহত ব্যক্তির পাওনা আল্লাহ পরকালে মিটিয়ে দেবেন। এতে হত্যাকারীর দায়িত্ব নিজে পালন না করলেও তাকে ক্ষমা করার ব্যবস্থা তৈরি হয়। হত্যাকারী অপরাধ করেছে, কিন্তু তাঁর হাতে নিহত মানুষের পাওনা মেটানোর দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত অন্য কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং অপরাধীর নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি এক বিষয় নয়। এই জায়গাতেই ভুক্তভোগীর অধিকার স্বীকার করা এবং হত্যাকারীকে অব্যাহতি দেওয়ার মধ্যে গভীর নৈতিক অসংগতি তৈরি হয়।

নিহত মানুষকে পরকালে পুরস্কার দেওয়ার সম্ভাবনা তাঁর হারানো পার্থিব জীবনকে ফিরিয়ে আনে না। তাঁর পরিবারকে ফিরিয়ে দেয় না হারানো সম্পর্ক, দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও অপরাধের ফল বহনের সময়। আর হত্যাকারীর অপরাধের দায়িত্বকে সম্পূর্ণরূপে অন্য কেউ গ্রহণ করলেই সেই হত্যাকাণ্ড ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। ফিকহে তিন ধরনের অধিকার আলাদা করে স্বীকার করার অর্থই হলো, আল্লাহর কাছে তওবা করাকে মানুষের বিরুদ্ধে করা অপরাধের পূর্ণ প্রতিকার বলা যায় না। এই বিধান ১০০ হত্যাকারীর হাদিসের অনুল্লিখিত অংশটিকেই সামনে আনে: হত্যাকারীর ভাগ্য নির্ধারিত হলেও একশ নিহত মানুষের অধিকার কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে, তা অজানাই রয়ে গেছে।


কিসাসের জন্য আত্মসমর্পণ ছাড়া পূর্ণ তওবা নয়: ইসলামওয়েবের ফতোয়া ও একশ হত্যাকারীর ক্ষমা

নিহত ব্যক্তি ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের অধিকার স্বতন্ত্র—এই ফিকহি অবস্থান শুধু গ্রন্থের তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। ইসলামওয়েবের ১০১০৩৩ নম্বর ফতোয়ায় এর ব্যবহারিক শর্তও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ২০০৭ সালের ১০ নভেম্বর প্রকাশিত ফতোয়াটির প্রশ্ন ছিল: একজন মুসলমান হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বিচার এড়িয়ে পালিয়েছে, পরে আল্লাহর কাছে তওবা করেছে; তার তওবা কি গ্রহণযোগ্য হবে, আর পরকালে কি তাকে শাস্তি পেতে হবে? জবাবে ইসলামওয়েব ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর তওবা নিয়ে আলেমদের মতভেদ স্বীকার করেছে এবং তওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার মতটি প্রাধান্য দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বলেছে, হত্যাকারীকে নিহতের উত্তরাধিকারীদের দাবি নিষ্পত্তির সুযোগ দিতে হবে। এখানে অপরাধীর ব্যক্তিগত অনুশোচনা নয়, অপরাধের শিকার মানুষের অধিকারও তওবার পূর্ণতার প্রশ্নে অনিবার্য। [12]

ফতোয়ায় বলা হয়েছে, নিহত ব্যক্তির নিজের অধিকার পৃথিবীতে সম্পূর্ণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এ কারণে হত্যাকারীকে নিহতের উত্তরাধিকারীদের আইনগত দাবি এড়িয়ে যাওয়ার ছাড় দেওয়া হয়নি। পূর্ণ তওবার জন্য তাকে তাঁদের সামনে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে, যাতে তাঁরা কিসাস, ক্ষমা অথবা আপসরফার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মৃত্যুর পরে পরকালীন ক্ষমার আশ্বাস আর পৃথিবীতে অপরাধের বিচার এড়িয়ে যাওয়া একই প্রক্রিয়া নয়—এই পার্থক্য ইসলামওয়েবের ফতোয়ার ভাষাতেই স্পষ্ট। হত্যাকারীর নিজের জীবনও তখন নিহতের উত্তরাধিকারীদের আইনগত সিদ্ধান্তের অধীন হওয়ার কথা। [13]

ولما كان حق القتيل لا يمكن الوفاء به في الدنيا، فإن من تمام توبته أن يسلم نفسه إلى أولياء المقتول ليقتصوا أو يعفوا أو يصالحوا.

বাংলা অনুবাদ: যেহেতু নিহত ব্যক্তির অধিকার পৃথিবীতে সম্পূর্ণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়, তাই হত্যাকারীর তওবা পূর্ণ হওয়ার জন্য তাকে নিজেকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের কাছে সমর্পণ করতে হবে, যাতে তাঁরা কিসাস কার্যকর করতে পারেন, ক্ষমা করতে পারেন অথবা আপসরফা করতে পারেন।

ইসলামওয়েব আরও স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী যদি নিজেকে এমনভাবে সমর্পণ না করে যাতে তার বিরুদ্ধে কিসাস কার্যকর করা যায় অথবা নিহতের উত্তরাধিকারীরা তাকে ক্ষমা করার সুযোগ পান, তাহলে তাকে পূর্ণ তওবাকারী গণ্য করা যায় না। ফতোয়াটি এ কথাও বলেছে, এমন ব্যক্তিকে পরকালে শাস্তি দেওয়া হবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়; বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। ফলে ফতোয়ার নিজস্ব সিদ্ধান্তে দুটি স্তর রয়েছে। প্রথমত, হত্যাকারীর ওপর নিহতের উত্তরাধিকারীদের আইনগত অধিকার বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত, সেই অধিকার নিষ্পত্তি না করেও তার পরকালীন পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই দ্বিতীয় অবস্থানে নিহতের আইনগত পাওনা এবং অপরাধীর চূড়ান্ত ধর্মীয় মুক্তির মধ্যে একটি স্পষ্ট বিচ্ছেদ তৈরি হয়।

এখন হাদিসের হত্যাকারীর পরিণতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, আলেমের দেওয়া একমাত্র বাস্তব নির্দেশ ছিল পাপাচারের জনপদ ছেড়ে ইবাদতকারীদের জনপদে চলে যাওয়া। নির্দেশের মধ্যে নিহতদের পরিবারের কাছে আত্মসমর্পণ, কিসাসের সম্মুখীন হওয়া কিংবা তাঁদের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার কথা নেই। ওই ব্যক্তি জনপদে পৌঁছানোর আগেই মারা যায়। এ পর্যায়ে তার পরিণতি নির্ধারণের জন্য ফেরেশতারা বিতর্ক করেন, কিন্তু নিহতদের উত্তরাধিকারীদের কোনো দাবি বিচারাধীন হিসেবে উত্থাপিত হয় না। বিষয়টি কেবল এই নয় যে হত্যাকারী বিচার এড়িয়ে বেঁচে গিয়েছিল; কাহিনির শেষেও তার ক্ষমার কারণ হিসেবে ভুক্তভোগীদের পাওনা মেটানোর কোনো প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি। [14]

রহমতের ফেরেশতাদের বক্তব্য ছিল, হত্যাকারী অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। শাস্তির ফেরেশতাদের বক্তব্য ছিল, সে কোনো ভালো কাজ করেনি। এই দুই বক্তব্যের কোনোটিতেই নিহতদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিকার নেই। অথচ ইসলামওয়েবের ফতোয়ায় পূর্ণ তওবার সঙ্গে যে আত্মসমর্পণের শর্তটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটি সরাসরি নিহতের উত্তরাধিকারীদের অধিকার নিয়ে। হাদিসের বিচারকাহিনিতে এই বিষয়টি অনুপস্থিত; আলোচ্য হয়েছে হত্যাকারীর ধর্মীয় অভিমুখ ও শেষ যাত্রার অবস্থান। ফলে অপরাধের জন্য জবাবদিহি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়াকে একই বিচার ধরে নেওয়া যায় না। [15]

فَقَالَتْ مَلاَئِكَةُ الرَّحْمَةِ جَاءَ تَائِبًا مُقْبِلاً بِقَلْبِهِ إِلَى اللَّهِ وَقَالَتْ مَلاَئِكَةُ الْعَذَابِ إِنَّهُ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ

বাংলা অনুবাদ: রহমতের ফেরেশতারা বললেন, সে তওবাকারী হিসেবে অন্তর দিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। আর শাস্তির ফেরেশতারা বললেন, সে তো কখনো কোনো ভালো কাজই করেনি।

ইসলামওয়েবের ফতোয়াটি মুসলমান হত্যাকারীর বিচারিক দায় নিয়ে, আর হাদিসের কাহিনিটি মুহাম্মদের পূর্ববর্তী যুগের—তাই দুটির নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অভিন্ন বলে দাবি করা হচ্ছে না। কিন্তু তুলনার কেন্দ্রীয় বিষয় আইনগত পদ্ধতির ঐতিহাসিক অভিন্নতা নয়; মানুষের বিরুদ্ধে হত্যার দায় এবং অপরাধীর ধর্মীয় ক্ষমা একই নৈতিক বিষয় কি না, সেটি। পরবর্তী ইসলামি ফিকহে যখন নিহতের উত্তরাধিকারীদের অধিকার আলাদা করে স্বীকার করা হয়েছে, তখন ১০০ হত্যাকারীর কাহিনিকে ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো ভিত্তি নেই। হাদিসের বিচারটি হত্যাকারীর পরকালীন অবস্থান নির্ধারণ করেছে, কিন্তু নিহতদের অধিকার নিষ্পত্তির কথা বলেনি।

নিহত ব্যক্তির নিজের অধিকার আরও গভীর প্রশ্ন তৈরি করে। ইসলামওয়েব স্বীকার করেছে, এই অধিকার পৃথিবীতে সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। হত্যার ফলে হারানো জীবন, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ ফেরত দেওয়া যায় না। পরকালে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিহত ব্যক্তির অবস্থার এক ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক মীমাংসা করা হলেও হত্যাকারীর স্বতন্ত্র অপরাধের দায় মুছে যায় না। যদি ক্ষমা পেতে পারে হত্যাকারী, অথচ অপরাধের অপূরণীয় ক্ষতির ভার বহন করতে হয় অন্যদের, তাহলে শুধু ক্ষমার সিদ্ধান্তকে ন্যায়বিচারের পূর্ণতা বলা যায় না।

ইসলামওয়েবের ১০১০৩৩ নম্বর ফতোয়া তাই একশ হত্যাকারীর কাহিনির সঙ্গে তুলনা করার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে হত্যাকারীর আত্মসমর্পণ ও নিহতের উত্তরাধিকারীদের অধিকারকে পূর্ণ তওবার শর্ত বলা হচ্ছে; অন্যদিকে হাদিসে হত্যাকারীর ধর্মীয় প্রত্যাবর্তন এবং দূরত্বের পরিমাপই তার ক্ষমার সিদ্ধান্তে নির্ধারক। নিহতদের দাবি নিষ্পত্তির কোনো বিবরণ নেই। হত্যাকারীর অনুশোচনাকে ন্যায়বিচারের পূর্ণ বিকল্প হিসেবে গণ্য করার বিপক্ষে ইসলামি আইনশাস্ত্রের নিজস্ব বিধান থেকেই এখানে যুক্তি পাওয়া যায়।


হত্যার পাপ পুণ্যে রূপান্তর: কোরআনের ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের দ্বন্দ্ব

একশ মানুষ হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার কাহিনির সঙ্গে কোরআনের আরেকটি বিধান যুক্ত করলে ইসলামী নৈতিক ব্যবস্থার সমস্যাটি আরও গভীর হয়। সূরা ফুরকানের ৬৮–৭০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা, শিরক এবং ব্যভিচারের জন্য কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। হত্যার মতো অপরাধের জন্য কিয়ামতে শাস্তি বৃদ্ধি এবং অপমানিত অবস্থায় স্থায়ীভাবে থাকার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু পরের আয়াতেই তওবা, ঈমান ও সৎকর্মের শর্তে অপরাধীর পাপগুলোকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। এখানে শুধু অপরাধ ক্ষমা করার কথা বলা হয়নি; পাপকে পুণ্যে রূপান্তর করার ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। যে কাজ একটি মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে, সেই কাজের ধর্মীয় হিসাব কীভাবে পরিবর্তিত হবে এবং তাতে নিহত মানুষের অধিকার কী অবস্থায় থাকবে—এটি একটি গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন। [16]

سورة الفرقان: ٦٨–٧٠
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ۚ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا ﴿٦٨﴾
يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا ﴿٦٩﴾
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا ﴿٧٠﴾

বাংলা অনুবাদ:
৬৮. আর তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না এবং আল্লাহ যে প্রাণ হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথাযথ অধিকার ছাড়া সেই প্রাণ হত্যা করে না; আর ব্যভিচারও করে না। যে ব্যক্তি এসব কাজ করবে, সে তার পাপের শাস্তির সম্মুখীন হবে।
৬৯. কিয়ামতের দিন তার শাস্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হবে এবং সে সেখানে অপমানিত অবস্থায় স্থায়ীভাবে থাকবে।
৭০. তবে যে তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবন কাসির সরাসরি হত্যাকারীর তওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তিনি সূরা নিসা ৪:৯৩-এ ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিন হত্যার জন্য জাহান্নাম, আল্লাহর ক্রোধ ও অভিশাপের বিধান উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করেছেন, সূরা ফুরকানের তওবার বিধানের কারণে সেই শাস্তির ঘোষণা তওবা না করা হত্যাকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবন কাসির এই ব্যাখ্যায় সেই একশ মানুষ হত্যাকারীর হাদিসের কথাও উল্লেখ করেছেন, যার তওবা আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। ফলে একশ হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার কাহিনি এবং কোরআনের পাপকে পুণ্যে পরিবর্তনের বিধান একই ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনার অংশ—এটি শুধু বাইরের কোনো সমালোচকের তৈরি সম্পর্ক নয়; ইবন কাসির নিজেই এই দুটি উৎসকে একসঙ্গে আলোচনা করেছেন। [17]

ইবন কাসির পাপকে পুণ্যে রূপান্তরের দুটি ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন। প্রথম ব্যাখ্যায় বোঝানো হয়েছে, তওবার পরে একজন ব্যক্তি পূর্বের মন্দ কাজ ছেড়ে ভালো কাজ শুরু করে; অর্থাৎ তার আচরণের পরিবর্তন ঘটে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে, আন্তরিক তওবার মাধ্যমে অতীতের পাপগুলোই পুণ্যে রূপান্তরিত হয় এবং কিয়ামতের দিন আমলনামায় সেগুলো পুণ্য হিসেবে গণ্য হতে পারে। এই ব্যাখ্যায় শুধু ভবিষ্যতের আচরণ সংশোধনের কথা নেই; অতীতে সংঘটিত অপরাধের পরকালীন হিসাব পরিবর্তনের কথাও রয়েছে। ইবন কাসির এ বিষয়ে নিম্নলিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। [18]

والقول الثاني: أن تلك السيئات الماضية تنقلب بنفس التوبة النصوح حسنات، وما ذاك إلا أنه كلما تذكر ما مضى ندم واسترجع واستغفر، فينقلب الذنب طاعة بهذا الاعتبار. فيوم القيامة وإن وجده مكتوبا عليه لكنه لا يضره وينقلب حسنة في صحيفته، كما ثبتت السنة بذلك، وصحت به الآثار المروية عن السلف.

বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয় মত হলো, অতীতের সেই পাপগুলো আন্তরিক তওবার মাধ্যমেই পুণ্যে পরিণত হয়। এর কারণ হলো, ব্যক্তি যখনই অতীতের কাজ স্মরণ করে, তখন সে অনুতপ্ত হয়, আল্লাহর কাছে ফিরে আসে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। এই বিবেচনায় পাপটি আনুগত্যের কাজে পরিণত হয়। ফলে কিয়ামতের দিন সে তার আমলনামায় সেই পাপ লেখা দেখতে পেলেও তা তার ক্ষতি করবে না; বরং তা তার আমলনামায় পুণ্যে পরিণত হবে। এ বিষয়ে হাদিসে এবং পূর্ববর্তী আলেমদের বর্ণনায় প্রমাণ রয়েছে।

এই ব্যাখ্যা একশ মানুষ হত্যাকারীর কাহিনির নৈতিক সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে। একজন মানুষ অন্য মানুষের জীবন কেড়ে নিলে সেই কাজের বাস্তব ফলাফল অপরিবর্তনীয়। নিহত ব্যক্তি আর জীবিত হয় না, তার সন্তান ফিরে পায় না পিতাকে, তার পরিবার ফিরে পায় না প্রিয়জনকে। অথচ ধর্মীয় মুক্তির হিসাব অনুযায়ী অপরাধীর অতীত পাপ ক্ষমা হতে পারে এবং একটি স্বীকৃত তাফসিরি ব্যাখ্যায় সেই পাপ পুণ্যেও রূপান্তরিত হতে পারে। কোনো ব্যক্তি হত্যার পরে অনুতপ্ত হলে তার ভবিষ্যতের আচরণ সংশোধিত হতে পারে; কিন্তু অনুতাপ অতীতে সংঘটিত হত্যাকে ভালো কাজে পরিণত করে না। হত্যার নৈতিক প্রকৃতি অপরাধীর পরবর্তী অনুভূতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয় না। ভুক্তভোগীর ক্ষতি একই থেকে যাওয়ার পরও হত্যাকারীর অপরাধকে তার নিজের পরকালীন কল্যাণের অংশে রূপান্তর করার ধারণা অপরাধী ও ভুক্তভোগীর স্বার্থের মধ্যে একটি গভীর অসামঞ্জস্য তৈরি করে।

সূরা ফুরকান ২৫:৭০-এ তওবা ও ঈমানের সঙ্গে সৎকর্মের শর্তও রয়েছে। অন্যদিকে একশ হত্যাকারীর হাদিসে শাস্তির ফেরেশতারাই বলেছেন, লোকটি এখনো কোনো ভালো কাজ করেনি; তবু তার তওবার উদ্দেশ্য এবং ভালো জনপদের দিকে যাত্রার কারণে সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছে। ফলে কোরআনের ওই আয়াতের সমস্ত শর্ত হাদিসের হত্যাকারী পূরণ করেছিল—এমন কথা সরাসরি হাদিসে নেই। কিন্তু উভয় উৎসই একটি বৃহত্তর ধর্মতাত্ত্বিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে: গুরুতর অপরাধের পরকালীন পরিণতি অপরাধীর তওবা ও আল্লাহর ক্ষমার মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে। এই পরিবর্তনের কাহিনিতে নিহতদের ন্যায়বিচার কীভাবে সম্পন্ন হলো, তাদের নিজস্ব অধিকার কীভাবে রক্ষিত হলো এবং অপরাধীর ক্ষমার সঙ্গে সেই অধিকারগুলোর সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দেওয়া হয়নি।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক পার্থক্য হলো, একজন অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং তার অতীতের অপরাধকে পুণ্যে রূপান্তর করা এক বিষয় নয়। অপরাধী সংশোধিত হলে তাকে ভবিষ্যতে অপরাধ না করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একশ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ঘটনা কেবল হত্যাকারীর ব্যক্তিগত ধর্মীয় উন্নতির একটি ধাপে পরিণত হতে পারে না। ন্যায়বিচারের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হওয়া প্রয়োজন নিহতদের অধিকার, অপরাধীর দায় এবং অপরাধের বাস্তব ক্ষতির প্রতিকার। সূরা ফুরকানের ক্ষমা ও পাপকে পুণ্যে পরিবর্তনের বিধান এবং একশ হত্যাকারীর মুক্তির কাহিনিতে সেই কেন্দ্রীয় স্থানটি অধিকার করে আছে অপরাধীর আল্লাহমুখী প্রত্যাবর্তন। এর ফলে মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার ধর্মীয় আনুগত্য ও ক্ষমার অধীন হয়ে পড়েছে।


ইবন আব্বাসের বক্তব্য: ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর তওবা নেই—তাহলে একশ হত্যাকারীর ক্ষমা?

একশ মানুষ হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার হাদিসের সঙ্গে ইসলামের প্রাথমিক সূত্রে সংরক্ষিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের সরাসরি সংঘাত রয়েছে। মুহাম্মদের সাহাবি এবং কোরআনের প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকারী ইবন আব্বাসের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে সেই হত্যাকারীর তওবা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি পরবর্তী যুগের কোনো অজ্ঞাত ধর্মীয় বক্তার ব্যক্তিগত মতামত নয়; সহিহ মুসলিম ও সহিহ বুখারিতে তাঁর বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি কোরআনের দুটি পৃথক আয়াতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেই এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। একদিকে সূরা ফুরকান ২৫:৬৮–৭০-এ হত্যা, শিরক ও ব্যভিচারের পরে তওবা, ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে ক্ষমা এবং পাপকে পুণ্যে পরিবর্তনের ঘোষণা রয়েছে; অন্যদিকে সূরা নিসা ৪:৯৩-এ ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিন হত্যাকারীর জন্য জাহান্নাম, আল্লাহর ক্রোধ, অভিশাপ ও মহাশাস্তির ঘোষণা রয়েছে। ইবন আব্বাস এই দুটি বক্তব্যকে সমানভাবে কার্যকর ধরে নেননি; তাঁর ব্যাখ্যায় পরবর্তী মদিনায় অবতীর্ণ আয়াতটি পূর্ববর্তী মক্কার আয়াতের বিধান রহিত করেছে। [19] [3] [4]

قُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ أَلِمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا مِنْ تَوْبَةٍ قَالَ لاَ

বাংলা অনুবাদ: সাঈদ ইবন জুবাইর বলেন, আমি ইবন আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করেছে, তার কি তওবার সুযোগ আছে? তিনি বললেন, না।

সহিহ মুসলিমের এই বর্ণনায় সাঈদ ইবন জুবাইর এরপর ইবন আব্বাসের সামনে সূরা ফুরকানের সেই আয়াতটি তুলে ধরেন, যেখানে হত্যাসহ গুরুতর পাপের পরে তওবার সুযোগ এবং পাপকে পুণ্যে পরিবর্তন করার কথা বলা হয়েছে। ইবন আব্বাস জবাবে বলেন, সেটি মক্কায় অবতীর্ণ আয়াত; পরে মদিনায় অবতীর্ণ সূরা নিসা ৪:৯৩-এর বিধান সেটিকে রহিত করেছে। ফলে তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত মুমিন হত্যার ক্ষেত্রে সূরা ফুরকানের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা প্রয়োগ করা যাবে না। এই ব্যাখ্যায় হত্যাকারীর তওবার প্রশ্নটি শুধু অনুশোচনার আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে না; কোরআনের কোন আয়াতকে চূড়ান্ত বিধান হিসেবে গণ্য করা হবে, তার ওপরও নির্ভর করে। যে অপরাধের জন্য একটি আয়াতে ক্ষমার সুযোগ রয়েছে, অন্য আয়াতের ভিত্তিতে সেই অপরাধের তওবার সুযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

সহিহ মুসলিম ৩০২৩d-তে ইবন আব্বাসের অবস্থান আরও নির্দিষ্টভাবে এসেছে। সেখানে তিনি মক্কার মুশরিকদের প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন, যারা ইসলাম গ্রহণের আগে শিরক, হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল এবং নিজেদের জন্য ক্ষমার কোনো সুযোগ আছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছিল। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী সূরা ফুরকানের তওবার বিধান তাদের ইসলাম গ্রহণের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে তার বিধান বুঝে নেওয়ার পরে ইচ্ছাকৃত হত্যা করলে তার জন্য তওবা নেই। অর্থাৎ ইবন আব্বাস পূর্ববর্তী অপরাধসহ ইসলাম গ্রহণ এবং মুসলমান হওয়ার পরে ইচ্ছাকৃত হত্যাকে একই অবস্থায় রাখেননি। [20]

فَأَمَّا مَنْ دَخَلَ فِي الإِسْلاَمِ وَعَقَلَهُ ثُمَّ قَتَلَ فَلاَ تَوْبَةَ لَهُ

বাংলা অনুবাদ: কিন্তু যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, ইসলামকে বুঝেছে, তারপর হত্যা করেছে—তার জন্য কোনো তওবা নেই।

সহিহ বুখারি ৪৭৬৪-তেও একই অবস্থান পাওয়া যায়। সাঈদ ইবন জুবাইর সূরা নিসার ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর জাহান্নামের শাস্তি সম্পর্কে ইবন আব্বাসকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তার জন্য তওবা নেই। সূরা ফুরকানের ক্ষমার আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সেটিকে জাহেলি যুগের মুশরিকদের প্রসঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এভাবে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে একই সাহাবির নামে এমন একটি কঠোর ব্যাখ্যা সংরক্ষিত হয়েছে, যা ইচ্ছাকৃত মুমিন হত্যাকারীর জন্য তওবার সুযোগ অস্বীকার করে। এটি হত্যার শাস্তি সম্পর্কে ইসলামের প্রাথমিক ব্যাখ্যাগত মতভেদের প্রত্যক্ষ দলিল। [21]

পরবর্তী সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় অবশ্য ইবন আব্বাসের এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হয়নি। ইমাম নববি তাঁর শরহ সহিহ মুসলিম-এ স্বীকার করেছেন যে ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর তওবা নেই—এটি ইবন আব্বাসের প্রসিদ্ধ বক্তব্য। একই সঙ্গে তাঁর নামে তওবা ও ক্ষমার সুযোগ থাকার আরেকটি অবস্থানও বর্ণিত হয়েছে। নববি দ্বিতীয় অবস্থানটিকে সুন্নি আলেমদের গৃহীত মত হিসেবে উপস্থাপন করেন। যেসব প্রাথমিক বর্ণনায় হত্যাকারীর তওবা অস্বীকার করা হয়েছে, সেগুলোকে তিনি হত্যার ভয়াবহতা বোঝানো ও হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে উচ্চারিত কঠোর সতর্কবাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি আরও যুক্তি দেন, সূরা নিসা ৪:৯৩-এ জাহান্নাম হত্যাকারীর প্রাপ্য শাস্তি হিসেবে ঘোষিত হয়েছে; কিন্তু তাই বলে প্রত্যেক ক্ষেত্রে সেই শাস্তি অবশ্যই কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্ত অনিবার্য নয়। [22]

هَذَا هُوَ الْمَشْهُورُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، وَرُوِيَ عَنْهُ أَنَّ لَهُ تَوْبَةً وَجَوَازُ الْمَغْفِرَةِ لَهُ

বাংলা অনুবাদ: এটিই ইবন আব্বাসের প্রসিদ্ধ বক্তব্য। তবে তাঁর কাছ থেকে এ কথাও বর্ণিত হয়েছে যে হত্যাকারীর তওবার সুযোগ রয়েছে এবং তাকে ক্ষমা করা সম্ভব।

এখানে মতবিরোধটি শুধু একটি আয়াতের ভাষাগত ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; অপরাধ, অনুশোচনা, শাস্তি ও ক্ষমার মৌলিক বিচারনীতিকে স্পর্শ করেছে। ইবন আব্বাসের প্রসিদ্ধ অবস্থানে ইচ্ছাকৃত মুমিন হত্যার অপরাধ এত গুরুতর যে তার জন্য তওবা নেই। অন্যদিকে পরবর্তী প্রচলিত সুন্নি ব্যাখ্যায় একই অপরাধের জন্য তওবা ও ক্ষমার সুযোগ রয়েছে। একশ হত্যাকারীর হাদিসে এই দ্বিতীয় নীতির সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ পাওয়া যায়: সেখানে একজন ব্যক্তি একশ মানুষ হত্যার পরও ভালো জনপদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কারণে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়। অথচ ইবন আব্বাসের ব্যাখ্যায় একটি ইচ্ছাকৃত মুমিন হত্যাই তওবার সুযোগ অস্বীকার করার জন্য যথেষ্ট। ওই একশ নিহত মানুষের ধর্মীয় পরিচয় হাদিসে নির্দিষ্ট করা হয়নি; তাই ইবন আব্বাসের মুমিন হত্যাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সেই ব্যক্তির প্রতিটি হত্যার ওপর সরাসরি প্রযোজ্য ছিল, এমন দাবি করার ভিত্তি নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃত হত্যার জন্য ক্ষমা আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না, সেই মূল প্রশ্নে ইসলামি সূত্রগুলোতে যে গভীর ব্যাখ্যাগত বিরোধ রয়েছে, তা স্পষ্ট।

পরবর্তী আলেমরা এই মতভেদ সমাধান করতে গিয়ে কখনো ইবন আব্বাসের বক্তব্যকে কঠোর সতর্কবাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, কখনো কোরআনের জাহান্নামের ঘোষণাকে অপরাধীর প্রাপ্য শাস্তি হিসেবে দেখিয়েছেন, যা আল্লাহ চাইলে কার্যকর না-ও করতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের ব্যাখ্যার পরও একটি নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়: ইচ্ছাকৃত হত্যার জন্য আল্লাহ জাহান্নাম, ক্রোধ ও অভিশাপ ঘোষণা করার পর সেই শাস্তি বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, যদি শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ক্ষমার ওপর নির্ভর করে, তাহলে নিহত মানুষের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার অবস্থান কোথায়? হত্যাকারীর ব্যক্তিগত তওবার সম্ভাবনা এবং নিহত ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকার দুটি ভিন্ন প্রশ্ন। একশ হত্যাকারীর কাহিনিতে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের নিষ্পত্তি দেখানো হয়নি। ইবন আব্বাসের কঠোর অবস্থান এবং পরবর্তী ক্ষমাকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার পার্থক্য এই ন্যায়সংকটকে আরও স্পষ্ট করে।


নৈতিক ঝুঁকি: অনুশোচনা দিয়ে অপরাধের দায় মওকুফ

একশ হত্যাকারীর ক্ষমাপ্রাপ্তির কাহিনি শুধু অপরাধের পরে অনুশোচনা করার সুযোগের কথা বলে না; এটি এমন একটি ধর্মীয় বিচারকাঠামো দেখায়, যেখানে ভয়াবহ অপরাধের পরিণতি শেষ পর্যন্ত অপরাধীর ব্যক্তিগত ধর্মীয় অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলে যেতে পারে। অপরাধটি মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত হলেও মুক্তির নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ইচ্ছা। এতে একটি নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। হত্যার ফলে সৃষ্ট ক্ষতি অপরিবর্তনীয়, কিন্তু হত্যাকারীর পরকালীন দায় ক্ষমার সিদ্ধান্তে পরিবর্তনযোগ্য। অপরাধীর সংশোধন অবশ্যই ভবিষ্যতের আচরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু ন্যায়বিচারের কেন্দ্রে নিহত মানুষের অধিকার না রেখে অপরাধীর মুক্তির সম্ভাবনাকে প্রধান করে তুললে অপরাধের জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণের প্রয়োজনীয়তা গৌণ হয়ে পড়তে পারে।

এখানে বিশেষভাবে আলাদা করা প্রয়োজন অপরাধ থেকে ফিরে আসা এবং অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়া। যে ব্যক্তি একশ মানুষকে হত্যা করেছে, তার অনুশোচনা সত্য হলেও সেটি নিহত মানুষগুলোর জীবনের মূল্য কিংবা তাঁদের পরিবারের পাওনা নির্ধারণ করে না। হাদিসটির কাহিনিতে শেষ মুহূর্তের ধর্মীয় প্রত্যাবর্তন এমন গুরুত্ব পেয়েছে যে একশ হত্যার পরেও ক্ষমার সিদ্ধান্ত সম্ভব হয়েছে, যদিও নিহতদের দাবি নিষ্পত্তির কথা বলা হয়নি। এমন শিক্ষা বাস্তবে মানুষকে অপরাধে উৎসাহিত করে—এ দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য স্বতন্ত্র সামাজিক প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু কাহিনিটির নৈতিক অগ্রাধিকার বিচার করতে সেই প্রমাণের দরকার হয় না: এখানে অপরাধীর মুক্তির পথ সুস্পষ্ট, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের পথ অনুল্লিখিত। এটাই নৈতিক ঝুঁকির মৌলিক কাঠামো।


তাকদির: পূর্বনির্ধারিত অপরাধ, তওবা ও পরিণতির বিচার

তাকদিরের বিশ্বাসের সঙ্গে এই বিচারকাহিনি মিলিয়ে দেখলে সমস্যাটি আরও গভীর হয়। ইসলামের প্রচলিত পূর্বনির্ধারণতত্ত্ব অনুযায়ী মানুষের জীবন, কর্ম, আয়ু এবং শেষ পরিণতি আল্লাহর জ্ঞাত ও নির্ধারিত। সেই কাঠামোতে একশ হত্যাকারীর অপরাধ, পরে তওবার সুযোগ খোঁজা, সৎ লোকদের জনপদের দিকে রওয়ানা হওয়া এবং ক্ষমাপ্রাপ্তি—সবই চূড়ান্ত পূর্বনির্ধারণের মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে এমন মানুষও রয়েছে, যারা একটি হত্যাকাণ্ডও করেনি, অথচ অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় তাদের জন্য জাহান্নামের পরিণতি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একই পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থায় কারও ভয়াবহ অপরাধের পরেও ক্ষমা লাভ এবং অন্যের অবিশ্বাসের কারণে শাস্তি লাভের মধ্যে ন্যায়সংগত অনুপাত কোথায়? অপরাধীর পক্ষে অনুশোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও নিরপরাধ মানুষের প্রতি তার অপরাধের হিসাব সেই পরিণতি নির্ধারণে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠেনি। [23]

শুধু আল্লাহ আগে থেকেই জানেন বলে ঘটনা ঘটে—এই ব্যাখ্যা এবং আল্লাহ ঘটনাগুলো পূর্বনির্ধারণ করেছেন—এই দাবি এক নয়। পূর্বজ্ঞানকে দিয়ে পূর্বনির্ধারণের দায় অস্বীকার করা হলে মূল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। একশ হত্যাকারীর কাহিনিতে আল্লাহর ইচ্ছা কেবল দূরবর্তী কোনো জ্ঞান নয়; একটি বর্ণনায় তিনি সরাসরি দুটি জনপদকে কাছে ও দূরে সরে যেতে নির্দেশ দিয়ে ক্ষমার সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত দূরত্বের বাস্তব অবস্থাই পরিবর্তন করেছেন। ফলে বিচারকার্য, ঘটনার শর্ত এবং অপরাধীর চূড়ান্ত পরিণতি—সব ক্ষেত্রেই ঈশ্বরীয় কর্তৃত্ব সক্রিয়। অথচ অপরাধীর স্বাধীন নৈতিক দায়িত্ব ও নিহতদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলোর কোনো সমতুল্য মীমাংসা দেখানো হয়নি। পূর্বনির্ধারিত ঘটনা এবং ন্যায়সংগত জবাবদিহির এই সংঘাত ইসলামি তাকদিরবিশ্বাসের বৃহত্তর সমস্যারই একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ।


‘ফেরেশতাদের বিতর্ক’ এবং বিচার-নীতির শূন্যতা

রহমত ও শাস্তির ফেরেশতাদের বিতর্কও এই বিচারকাহিনির একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। একপক্ষ হত্যাকারীর তওবা ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকে গুরুত্ব দেয়, অন্যপক্ষ বলে সে কোনো ভালো কাজ করেনি। শেষে মানুষরূপী একজন ফেরেশতা এসে দূরত্ব পরিমাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পরামর্শ দেন। এখানে প্রশ্ন ওঠে, যে অপরাধে একশ মানুষের প্রাণ গেছে, তার বিচার কেন নিহতদের অধিকার কিংবা অপরাধের ক্ষতির অনুপাত দিয়ে নয়, দুই জনপদের আপেক্ষিক দূরত্ব দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপর বর্ণনায় আল্লাহ নিজেই ভূমিকে কাছে আসতে বা দূরে সরে যেতে নির্দেশ দেন। অর্থাৎ যে দূরত্বকে মাপকাঠি ধরা হয়েছে, সেটি বিচারকর্তার ইচ্ছায় পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে পরিমাপের আড়ালে কোনো স্বাধীন নৈতিক মানদণ্ড নয়, কর্তৃত্বের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়ে ওঠে।

এর অর্থ এটিও যে, আল্লাহর বিধানে সুনির্দিষ্ট কোন ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞা এবং কোনটির জন্য কি শাস্তি তা পরিষ্কার নয়, উকিলের মত ফেরেশতাদের বিতর্কের সেখানে প্রয়োজন হয়। সেই বিতর্কে যে জয় লাভ করে, বান্দাকে সেই শাস্তি বা রহমত দেয়া হয়। এগুলো খুবই মানবীয় উদাহরণ, যা পড়লে বোঝা যায় মানুষের আচার আচরণ দেখেই এসব গল্প তৈরি করা হয়েছে। যেই ফেরেশতারা আল্লাহর আইন ও নির্দেশ মোতাবেক চলে, তাদের এরকম মানুষের আদালতের উকিলদের মত বিতর্ক করার কথা নয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, পুরো বিরোধে যে একশ হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিচার চলছে, সেই হত্যাকাণ্ডগুলোর শিকার মানুষেরা কোনো পক্ষের যুক্তিতেই স্থান পায়নি। হত্যাকারীর অনুশোচনা ও তার অবস্থান নিয়ে দরকষাকষির মধ্যেই ন্যায়বিচারের অর্থ সীমিত হয়ে গেছে।


নৈতিকতার বদলে আনুগত্য-নীতির আধিপত্য

এই হাদিস থেকে একটি বড় কাঠামোগত বার্তা তৈরি হয়: মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের চূড়ান্ত পরকালীন পরিণতি নির্ধারণে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, অনুশোচনা ও আনুগত্য এমন প্রাধান্য পায় যে ভুক্তভোগীর ক্ষতি এবং বিচারপ্রাপ্তির প্রশ্ন তার আড়ালে চলে যায়। একজন মানুষ একশজনকে হত্যা করেছে; কিন্তু তার মুক্তির সিদ্ধান্তে বিবেচিত হচ্ছে সে শেষ মুহূর্তে আল্লাহর দিকে ফিরেছে কি না। অপরাধীর ধর্মীয় অবস্থানকে এভাবে মুখ্য করার ফলে মানবিক ন্যায়বিচার ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যনির্ভর মুক্তির অধীন হয়ে পড়ে। যদি যুক্তিপ্রমাণহীন বিশ্বাস ও তওবার ইচ্ছা একশ হত্যার পরেও জান্নাতের পথ খুলে দিতে পারে, কিন্তু একশ নিহত মানুষের অধিকার নিষ্পত্তির বিবরণ ছাড়া সেই ক্ষমার কাহিনি সম্পূর্ণ হয়, তাহলে এখানে অপরাধের বিচার আর ক্ষমতার প্রয়োগকে এক করে দেখা হচ্ছে। কে ক্ষমা করবেন এবং কাকে ক্ষমা করবেন—এ সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে কর্তৃত্ব থাকলেও নিহত মানুষের স্বতন্ত্র ন্যায়দাবি তার সমান মর্যাদা পায়নি। মানুষের জীবন ও অধিকারের মূল্য বিচার করতে হলে অপরাধীর ঈশ্বরসম্পর্কের পাশাপাশি তাঁর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর প্রতি দায়ও অপরিহার্য; কিন্তু এই কাহিনির চূড়ান্ত পরিণতিতে সেই দায় অনুপস্থিত।


উপসংহার

একশ মানুষ হত্যাকারীর ক্ষমা পাওয়ার হাদিসটি ইসলামী ধর্মীয় আলোচনায় সাধারণত আল্লাহর অসীম করুণা এবং তওবার গুরুত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু এই কাহিনির নৈতিক তাৎপর্য শুধু একজন অপরাধীর অনুশোচনা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে একশটি হত্যাকাণ্ড, একশজন নিহত মানুষ এবং তাঁদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। হত্যাকারী নিরানব্বই জনকে হত্যা করার পরও আরেকজন রাহিবকে হত্যা করেছে। এরপর সে তওবার সুযোগ খুঁজেছে, ভালো জনপদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে এবং পথেই মারা গেছে। তার পক্ষে রহমতের ফেরেশতারা যুক্তি দিয়েছেন, শাস্তির ফেরেশতারা আপত্তি জানিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত দূরত্বের পরিমাপের মাধ্যমে তার ক্ষমা পাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে নিহত একশ মানুষের কোনো বিচারিক উপস্থিতি নেই। তাঁদের প্রতি সংঘটিত অপরাধের প্রতিকার, পরিবারের দাবি, ক্ষতিপূরণ কিংবা হত্যাকারীর জবাবদিহির কোনো নিষ্পত্তি দেখানো হয়নি। যে কাহিনি হত্যাকারীর প্রতি করুণাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ হয়েছে, সেই কাহিনিতে হত্যার শিকার মানুষগুলোর ন্যায়বিচার অনুল্লিখিত রয়ে গেছে।

এই অনুপস্থিতি বিশেষভাবে গুরুতর, কারণ ইসলামি আইনশাস্ত্র নিজেই স্বীকার করেছে যে হত্যার সঙ্গে তিনটি পৃথক অধিকার সম্পর্কিত—আল্লাহর অধিকার, নিহত ব্যক্তির অধিকার এবং নিহতের উত্তরাধিকারীদের অধিকার। ইবনুল কাইয়্যিমের আলোচনা এবং ইসলামকিউএ ও ইসলামওয়েবের ফতোয়ায় নিহতের উত্তরাধিকারীদের কাছে আত্মসমর্পণ, কিসাস, রক্তপণ অথবা তাঁদের ক্ষমার মাধ্যমে অধিকার নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে। এই কাঠামোতে হত্যাকারীর ব্যক্তিগত তওবা কোনোভাবেই অপরাধের শিকার মানুষগুলোর অধিকার নিষ্পত্তির সমার্থক নয়। অথচ একশ হত্যাকারীর হাদিসে তার অনুশোচনা ও ধর্মীয় পরিবেশ পরিবর্তনের ইচ্ছা পরকালীন ক্ষমার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। নিহতদের পরিবার কিসাস দাবি করেছে কি না, তারা হত্যাকারীকে ক্ষমা করেছে কি না, কিংবা নিহত ব্যক্তিদের নিজস্ব অধিকার কীভাবে পূরণ করা হয়েছে—এসবের কোনো বিবরণ নেই। পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যায় আল্লাহ নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেবেন বলে যে সমাধান দেওয়া হয়েছে, সেটিও হত্যাকারীর ব্যক্তিগত দায় এবং নিহতদের অপরিবর্তনীয় ক্ষতির মধ্যকার নৈতিক পার্থক্য দূর করে না। একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অপরাধকে কেবল অপরাধীর অনুশোচনা ও অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ন্যায়সংগতভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার কোনো যুক্তিসংগত ভিত্তি নেই।

কোরআনের ক্ষমা ও শাস্তিসংক্রান্ত বক্তব্যগুলো এই অসংগতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সূরা নিসা ৪:৯৩-এ ইচ্ছাকৃত মুমিন হত্যাকারীর জন্য জাহান্নাম, আল্লাহর ক্রোধ, অভিশাপ ও মহাশাস্তির ঘোষণা রয়েছে। সূরা ফুরকান ২৫:৬৮–৭০-এ আবার হত্যাসহ গুরুতর অপরাধের পরে তওবার মাধ্যমে ক্ষমা এবং পাপকে পুণ্যে পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইবন আব্বাসের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যায় ইচ্ছাকৃত মুমিন হত্যাকারীর তওবা গ্রহণযোগ্য নয়; অন্যদিকে পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যায় তওবার মাধ্যমে ক্ষমাপ্রাপ্তির সুযোগ স্বীকৃত হয়েছে। ইবন কাসিরের তাফসিরে অতীতের পাপকেও পরকালীন আমলনামায় পুণ্যে পরিবর্তন করার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ফলে একই ধর্মীয় কাঠামোয় হত্যা একদিকে চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ, অন্যদিকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় শর্তে সেই অপরাধের শাস্তি মওকুফ এবং পাপকে পুণ্যে রূপান্তরের সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু হত্যাকারীর আমলনামায় অপরাধের হিসাব পরিবর্তিত হলে নিহত মানুষের জীবনহানি ও তাঁদের পরিবারের বাস্তব ক্ষতি পরিবর্তিত হয় না। অপরাধীর পরকালীন কল্যাণের সঙ্গে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের কোনো স্বয়ংক্রিয় সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

হাদিসটির বিচারপ্রক্রিয়াও স্বতন্ত্রভাবে সমস্যাপূর্ণ। রহমত ও শাস্তির ফেরেশতাদের বিতর্কে অপরাধের ভয়াবহতা, নিহতদের অধিকার কিংবা ক্ষতির প্রতিকার নির্ধারক হয়নি; আলোচনার কেন্দ্র হয়েছে হত্যাকারীর তওবার উদ্দেশ্য এবং তার কোনো ভালো কাজ করা হয়েছিল কি না। এরপর দুই জনপদের দূরত্ব পরিমাপ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্য বর্ণনায় আল্লাহ নিজেই ভূমির দূরত্ব পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন, যার ফলে হত্যাকারী ভালো জনপদের কাছাকাছি হিসেবে গণ্য হয়েছে। যে কর্তৃত্ব বিচারকার্য পরিচালনা করছে, সেই কর্তৃত্বই যদি পরিমাপের ভৌগোলিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে দূরত্বের হিসাব কোনো স্বাধীন নৈতিক মানদণ্ডের প্রতিনিধিত্ব করে না। একশ মানুষের হত্যার দায় নির্ধারণে অপরাধের বাস্তব ক্ষতি ও ভুক্তভোগীদের অধিকার বাদ দিয়ে দূরত্বের এমন হিসাবকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা ন্যায়বিচারের যুক্তিসংগত পদ্ধতি নয়। এটি এমন এক বিচারকাহিনি, যেখানে অপরাধীর ধর্মীয় অভিমুখ ও ক্ষমাপ্রাপ্তির ইচ্ছা তার হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর নৈতিক গুরুত্বকে ছাপিয়ে গেছে।

ইসলামের তাকদিরসংক্রান্ত বিশ্বাস এই সমস্যার সঙ্গে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন যুক্ত করে। যদি আল্লাহ মানুষের কর্ম, আয়ু ও পরিণতি পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে থাকেন, তাহলে একশ মানুষের হত্যাকাণ্ড, হত্যাকারীর পরবর্তী অনুশোচনা এবং তার ক্ষমাপ্রাপ্তির ঘটনাও সেই পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থার অংশ। এমন অবস্থায় হত্যাকারীর অপরাধ ও তওবার জন্য তাকে কতটা স্বাধীন নৈতিক কর্তৃত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং সেই একই পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থায় অন্য মানুষের পরকালীন শাস্তি কতটা ন্যায়সংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষভাবে, কোনো মানুষ হত্যা না করেও অবিশ্বাসের কারণে পরকালীন শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে একশ হত্যাকারীর ক্ষমাপ্রাপ্তির কাহিনি তুলনা করলে নৈতিক মূল্যায়নের মানদণ্ডে একটি গভীর বৈষম্য দেখা যায়। মানুষের জীবন রক্ষা, অন্যের ক্ষতি না করা এবং মানবিক দায়িত্ব পালনের তুলনায় ধর্মীয় বিশ্বাস, আনুগত্য ও তওবার অবস্থান যদি চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সেই বিচারব্যবস্থাকে মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক বলা কঠিন।

একজন অপরাধী অনুতপ্ত হলে তার সংশোধনের সম্ভাবনা স্বীকার করা এবং তাকে ভবিষ্যতে অপরাধ থেকে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া নৈতিকভাবে অর্থবহ হতে পারে। কিন্তু অনুশোচনা অতীতের অপরাধকে নিরপরাধ কাজের সমতুল্য করে না; ক্ষমা নিহত মানুষের অধিকারকে অপ্রাসঙ্গিক করে না; আর আল্লাহর করুণার দাবি নিজে থেকে ন্যায়বিচারের প্রমাণ হয়ে যায় না। একশ হত্যাকারীর কাহিনির মৌলিক সমস্যা এখানেই। যে একশ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের জীবন ও অধিকার বিচারকাহিনির কেন্দ্র নয়; কেন্দ্রে রয়েছে হত্যাকারীর আল্লাহমুখী প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর প্রতি প্রদর্শিত করুণা। ইসলামী ধর্মতত্ত্বে হত্যার জন্য কঠোর শাস্তি, তওবার মাধ্যমে ক্ষমা, নিহতের স্বতন্ত্র অধিকার, পাপকে পুণ্যে পরিবর্তন এবং পূর্বনির্ধারিত পরিণতির যে ধারণাগুলো পাশাপাশি অবস্থান করছে, সেগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচারের একটি সুসংগত নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হত্যাকারীর ক্ষমার সিদ্ধান্ত বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু নিহতদের প্রাপ্য বিচার সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ দেওয়া হয়নি। একশ হত্যাকারীর প্রতি করুণা প্রদর্শনকে ন্যায়বিচারের বিজয় বলা যায় না, যখন সেই করুণার কাহিনিতে একশ নিহত মানুষের ন্যায়বিচারের হিসাবই অনুপস্থিত।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৭০ ↩︎
  2. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৬৬ ↩︎
  3. কোরআন ৪:৯৩ 1 2
  4. কোরআন ২৫:৬৮–৭০ 1 2
  5. সহিহ মুসলিম ৩০২৩ ↩︎
  6. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১৪৭০১৭: হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন ধরনের অধিকার ↩︎
  7. রিয়াযুস স্বা-লিহীন, হাদিসঃ ২১ ↩︎
  8. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৫২ ↩︎
  9. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৫৩ ↩︎
  10. ইবনুল কাইয়্যিম, আল-জাওয়াবুল কাফি, ‘ফাসলুয যুলমি ওয়াল উদওয়ান’, পৃষ্ঠা ১৪৬–১৪৭ ↩︎
  11. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১৪৭০১৭: هل تكفي توبة القاتل دون أن يسلم نفسه لأولياء المقتول ↩︎
  12. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১০১০৩৩, «القاتل التائب هل يعاقب يوم القيامة», ১০ নভেম্বর ২০০৭ ↩︎
  13. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১০১০৩৩: কিসাস ও তওবার পূর্ণতা ↩︎
  14. সহিহ মুসলিম ২৭৬৬a, কিতাবুত তওবা: একশ মানুষ হত্যাকারীর ঘটনা ↩︎
  15. সহিহ মুসলিম ২৭৬৬a: রহমত ও শাস্তির ফেরেশতাদের বিতর্ক ↩︎
  16. কোরআন, সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৮–৭০ ↩︎
  17. ইবন কাসির, তাফসিরুল কোরআনিল আজিম, সূরা ফুরকান ২৫:৭০-এর তাফসির ↩︎
  18. তাফসির ইবন কাসির, সূরা ফুরকান, আয়াত ৭০, কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরআন প্রকল্প ↩︎
  19. সহিহ মুসলিম ৩০২৩e, কিতাবুত তাফসির: ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর তওবা সম্পর্কে ইবন আব্বাসের বক্তব্য ↩︎
  20. সহিহ মুসলিম ৩০২৩d: ইসলাম গ্রহণের আগে ও পরে হত্যার বিষয়ে ইবন আব্বাসের পার্থক্য ↩︎
  21. সহিহ বুখারি ৪৭৬৪, কিতাবুত তাফসির ↩︎
  22. ইমাম নববি, আল-মিনহাজ শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৮, কিতাবুত তাফসির, পৃষ্ঠা ৪৪০–৪৪১ ↩︎
  23. ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.