সারসংক্ষেপ
এই প্রবন্ধে কোরআনের সূরা আহযাবের ৪৯ নম্বর আয়াত এবং সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াতকে পাশাপাশি রেখে ইসলামে শিশুবিবাহ [1] ও ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের প্রশ্ন পরীক্ষা করা হয়েছে। সূরা আহযাব ৩৩:৪৯ জানায়, সহবাসের আগে তালাক দিলে কোনো ইদ্দত নেই। অন্যদিকে সূরা তালাক ৬৫:৪ এমন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর জন্য তিন মাসের ইদ্দত নির্ধারণ করে, যার এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি। দুটি বিধান একত্রে পড়লে সিদ্ধান্তটি সরাসরি দাঁড়ায়: কোরআনের আইনি কাঠামো এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর অস্তিত্ব স্বীকার করছে, যার বিবাহ কার্যকর হয়েছে এবং যার সঙ্গে দাম্পত্য সহবাসও সংঘটিত হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কোনো একটি অনুবাদ, বিচ্ছিন্ন তাফসীর বা আধুনিক সমালোচকের অনুমানের ওপর দাঁড়ানো নয়। সহিহ বুখারির অধ্যায়-শিরোনাম, ইবনে কাসীর, জালালাইন, মাযহারী, মা‘আরিফুল কোরআন, তাফহীমুল কুরআন, তাওযীহুল কুরআন, জাস্সাসের আহকামুল কুরআন, আল-হিদায়া, আশরাফুল হিদায়া, ফিকহুস সুন্নাহ, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ধ্রুপদি আলেমদের ইজমা, ইসলামওয়েব এবং সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্য একই পাঠকে আইন, তাফসীর ও ফতোয়ার ভাষায় প্রতিষ্ঠা করেছে। আয়িশার শিশু অবস্থায় বিবাহ ও সহবাসের হাদিস এবং সেই ঘটনা থেকে ফিকহি বিধান নির্মাণের বিস্তারিত প্রমাণ পৃথক প্রবন্ধে একত্র করা হয়েছে [2]। আলোচ্য প্রবন্ধে কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াত এবং সেগুলোর তাফসীর, ফিকহি প্রয়োগ ও সমকালীন ফতোয়াগত পরিণতি একত্র করা হয়েছে।
প্রবন্ধের বিষয়-মানচিত্র
- মূল কোরআনিক যুক্তি: সহবাসের আগে তালাক হলে ইদ্দত নেই, কিন্তু যাদের ঋতুস্রাব শুরু হয়নি তাদের জন্য তিন মাসের ইদ্দত আছে।
- তাফসীরের সাক্ষ্য: ধ্রুপদি ও আধুনিক তাফসীরগুলো “যারা ঋতুমতী হয়নি” বলতে অল্পবয়স্ক বা নাবালিকা স্ত্রী বুঝিয়েছে।
- হাদিসের প্রয়োগ: সহিহ বুখারি একই আয়াতের অধীনে আয়িশার ছয় বছরে বিবাহ ও নয় বছরে সহবাসের বর্ণনা স্থাপন করেছে।
- ফিকহের বিধান: হানাফি ও অন্যান্য ফিকহি গ্রন্থ এই আয়াত থেকে নাবালিকার বিবাহ, ইদ্দত, অভিভাবকের ক্ষমতা এবং সহবাসের বিধান নির্মাণ করেছে।
- আধুনিক ফতোয়া: ইসলামওয়েব ও সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটি এখনও এই ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যাই পুনর্ব্যক্ত করে।
- সামাজিক পরিণতি: ধর্মীয় বিধান কার্যকর রাখতে বয়স জালিয়াতির অনুমোদন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।
ভূমিকা
শিশুবিবাহ সম্পর্কে আধুনিক ইসলামি আত্মপক্ষসমর্থনের একটি পরিচিত দাবি হলো, কোরআনে কোথাও শিশুবিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াতকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করা নাকি ভুল অনুবাদ। এই দাবি ইসলামের নিজস্ব তাফসীর, হাদিস ও ফিকহি ঐতিহ্যের সঙ্গে অসংগত। আয়াতটির ভাষা, অবতরণের প্রেক্ষাপট, প্রাচীন মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা, সহিহ বুখারির অধ্যায়বিন্যাস এবং পরবর্তী ইসলামি আইনশাস্ত্র একই অর্থে মিলিত হয়েছে। এখানে “যারা এখনো ঋতুমতী হয়নি” বলতে এমন স্ত্রীদের বোঝানো হয়েছে, যাদের অল্প বয়সের কারণে ঋতুস্রাব শুরু হয়নি।
ইদ্দত কেবল একটি অপেক্ষাকাল নয়; তালাকের পর বৈবাহিক সম্পর্কের আইনি পরিণতি নির্ধারণের বিধান। কোরআন নিজেই বলে, সহবাসের আগে তালাক হলে স্ত্রীর কোনো ইদ্দত নেই। ফলে ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর জন্য আলাদা ইদ্দত নির্ধারণের অর্থ হলো, সেই স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের সম্ভাবনা শরিয়তের আইনি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। এই মৌলিক সম্পর্ক বাদ দিয়ে সূরা তালাক ৬৫:৪ ব্যাখ্যা করলে আয়াতটির আইনগত কার্যকারণই ধ্বংস হয়ে যায়।
প্রবন্ধটিতে প্রথমে কোরআনের দুটি সংশ্লিষ্ট আয়াত পরীক্ষা করা হবে। এরপর সহিহ বুখারি, ধ্রুপদি ও আধুনিক তাফসীর, হানাফি আইনগ্রন্থ, ইজমার দাবি এবং সমকালীন ফতোয়া সংস্থাগুলোর বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। প্রতিটি দীর্ঘ উদ্ধৃতি পূর্ণাঙ্গভাবে রাখা হয়েছে, যাতে উৎসের বক্তব্যকে সংক্ষেপ, পুনর্গঠন বা নরম করে দেখানোর কোনো সুযোগ না থাকে। উদ্ধৃতির পরে তার আইনগত ও যৌক্তিক তাৎপর্য পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কোরআনে সহবাসের পূর্বে তালাক ও ইদ্দতের বিধান
এই আলোচনার ভিত্তি দুটি কোরআনিক বিধানের পারস্পরিক সম্পর্ক। সূরা আহযাব ৩৩:৪৯ সহবাসের আগে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত নাকচ করেছে। সূরা তালাক ৬৫:৪ ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন স্ত্রীর জন্য তিন মাসের ইদ্দত নির্ধারণ করেছে। অতএব দ্বিতীয় আয়াতের শ্রেণিটি কেবল বাগ্দত্তা বা কাগুজে স্ত্রী নয়; ইদ্দত প্রযোজ্য হওয়ার জন্য তার বৈবাহিক সম্পর্ক সহবাসের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কোরআনের বিধান অনুসারে, সহবাসের পূর্বে তালাক দিলে ইদ্দতের বিধান নেই। শুরুতেই এ-সম্পর্কিত আয়াতটি দেখে নিই [3] –
হে মুমিনগণ, যখন তোমরা মুমিন নারীদেরকে বিবাহ করবে অতঃপর তাদের সাথে সহবাসের পূর্বেই তালাক দিয়ে দেবে তবে তোমাদের জন্য তাদের কোন ইদ্দত নেই যা তোমরা গণনা করবে। সুতরাং তাদেরকে কিছু উপহার সামগ্রী প্রদান কর এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে বিদায় দাও।
আসুন, ড. মনজুর ইলাহির মুখ থেকে বিষয়টি আরও ভালোভাবে জেনে নিই।
অর্থাৎ বোঝা গেল, সহবাসের আগেই স্বামী তালাক দিলে ইদ্দত পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। এবারে সুরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াতটি পড়ি, যেখানে বলা আছে, যেসব স্ত্রী এখনো ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি, তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস [4] –
যে সব তালাকপ্রাপ্তারা বয়সের কারণে মাসিক থেকে নিরাশ হয়েছে তাদের ইদ্দতের ব্যাপারে যদি তোমরা সন্দিহান হও তাহলে তাদের মেয়াদ তিন মাস বলে গণ্য হবে। তেমনিভাবে যারা ছোট থাকার ফলে মাসিকের বয়সে উপনীত হয় নি তাদের ইদ্দতও তিন মাস। আর গর্ভবতীদের তালাক কিংবা স্বামীর মরণোত্তর ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব। বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মান্য করার মাধ্যমে তাঁকে ভয় করে তিনি তার সকল বিষয় ও সমস্যা সহজ করে দেন।
— Bengali Mokhtasar
তোমাদের যে সব স্ত্রীগণ মাসিক ঋতু আসার বয়স অতিক্রম করেছে তাদের (‘ইদ্দাতের) ব্যাপারে যদি তোমাদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে তাদের ‘ইদ্দাতকাল তিন মাস, আর যারা (অল্প বয়স্কা হওয়ার কারণে) এখনও ঋতুবতী হয়নি (এ নিয়ম) তাদের জন্যও। আর গর্ভবতী স্ত্রীদের ‘ইদ্দাতকাল তাদের সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার কাজ সহজ করে দেন।
— Taisirul Quran
তোমাদের যে সব স্ত্রীর ঋতুমতী হওয়ার আশা নেই তাদের ইদ্দাত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দাতকাল হবে তিন মাস এবং যাদের এখনও রজশ্বালা হয়নি তাদেরও। এবং গর্ভবতী নারীদের ইদ্দাতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আল্লাহকে যে ভয় করে আল্লাহ তার সমস্যার সমাধান সহজ করে দিবেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস। আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন।
— Rawai Al-bayan
তোমাদের যে সব স্ত্রী আর ঋতুবর্তী হওয়ার আশা নেই [১] তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস এবং যারা এখনো ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদেরও; আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আর যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ্ তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এবার আসুন, শায়েখ মতিউর রহমান মাদানির ব্যাখ্যায় আয়াতটির তাফসীর শোনা যাক।
তাহলে স্পষ্টতই বোঝা যায়, যারা ঋতুস্রাবের বয়সে পৌঁছেনি, তাদের জন্য কোরআনে ইদ্দতের বিধান দেওয়া হয়েছে। অথচ সূরা আহযাব ৩৩:৪৯ অনুসারে সহবাসের আগে তালাক হলে কোনো ইদ্দতই থাকে না। অতএব ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন স্ত্রীর জন্য তিন মাসের ইদ্দত নির্ধারণ করার অর্থ হলো, তার সঙ্গে দাম্পত্য সহবাস সংঘটিত হওয়ার অবস্থাকেও কোরআনের আইন স্বীকার করছে। অন্যথায় এই শ্রেণির জন্য পৃথক ইদ্দতের বিধান সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেত।
দুটি আয়াতের পারস্পরিক সম্পর্কটি অত্যন্ত সরল। সূরা আহযাব ৩৩:৪৯ একটি নেতিবাচক বিধান দিয়েছে: সহবাসের পূর্বে তালাক হলে ইদ্দত নেই। সূরা তালাক ৬৫:৪ একটি ইতিবাচক বিধান দিয়েছে: যেসব তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি, তাদের ইদ্দত তিন মাস। প্রথম বিধানটি দ্বিতীয় বিধানের প্রয়োগক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেয়। ফলে “যারা এখনো ঋতুমতী হয়নি” বলতে কেবল এমন কোনো শিশুকে বোঝানো হচ্ছে না, যার নামে একটি আনুষ্ঠানিক বিবাহচুক্তি লেখা হয়েছিল কিন্তু কোনো দাম্পত্য সম্পর্ক তৈরি হয়নি। আয়াতটি এমন বিবাহের আইনি পরিণতি নির্ধারণ করছে, যেখানে সহবাস সংঘটিত হয়েছে এবং পরে তালাক দেওয়া হয়েছে।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরআন ঋতুস্রাব শুরু হওয়াকে বিবাহ কিংবা সহবাসের অপরিহার্য পূর্বশর্ত হিসেবে স্থাপন করেনি। বরং ঋতুস্রাব শুরু না-হওয়া অবস্থাতেই একজন মেয়েকে “স্ত্রী”, “তালাকপ্রাপ্তা” এবং “ইদ্দত পালনকারী” হিসেবে আইনি শ্রেণির মধ্যে রেখেছে। অর্থাৎ বিবাহ, দাম্পত্য সম্পর্ক, তালাক এবং ইদ্দত—সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই তার বয়ঃসন্ধির আগের অবস্থায় কোরআনিক আইনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অতএব সূরা তালাক ৬৫:৪ শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহচুক্তিকে স্বীকার করেনি; অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস সংঘটিত হওয়ার পর তার তালাক ও ইদ্দতের আইনি ব্যবস্থাও নির্ধারণ করেছে। আধুনিক আত্মপক্ষসমর্থনে বিবাহচুক্তি ও সহবাসকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আয়াতটির অর্থ বদলে দেওয়ার চেষ্টা কোরআনের নিজের ইদ্দত-নীতির সামনেই ভেঙে পড়ে।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে বোখারী শরীফ
সহিহ বুখারি সুন্নি ইসলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ হাদিসসংকলন। ইমাম বুখারি কেবল হাদিস সংগ্রহ করেননি; অধ্যায়ের শিরোনাম ও সংশ্লিষ্ট আয়াত নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের ফিকহি সিদ্ধান্তও প্রকাশ করেছেন। তিনি সূরা তালাক ৬৫:৪-কে “ছোট শিশুদের বিবাহ” অধ্যায়ের দলিল হিসেবে বসিয়ে অবিলম্বে আয়িশার ছয় বছরে বিবাহ ও নয় বছরে সহবাসের হাদিস এনেছেন। এই বিন্যাস আয়াতটির ঐতিহ্যগত অর্থ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম বুখারির সহিহ বুখারি গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই সূরা তালাকের চার নম্বর আয়াতের অর্থ বলে দেয়া হয়েছে [5] [6]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬৭/ বিয়ে
পরিচ্ছেদঃ ৬৭/৩৯. কার জন্য ছোট শিশুদের বিয়ে দেয়া বৈধ।
لِقَوْلِهِ تَعَالَى: وَاللاَّئِي لَمْ يَحِضْنَ) فَجَعَلَ عِدَّتَهَا ثَلاَثَةَ أَشْهُرٍ قَبْلَ الْبُلُوغِ
আল্লাহ্ তা‘আলার কালাম ‘‘এবং যারা ঋতুমতী হয়নি’’-(সূরাহ আত-ত্বলাক (তালাক): ৪) এই আয়াতকে দলীল হিসাবে ধরে নাবালেগার ইদ্দাত তিন মাস নির্ধারণ করা হয়েছে।
৫১৩৩. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর এবং নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর ঘর করেন এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে নয় বছরকাল ছিলেন। (৩৮৯৪)(আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭৫৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৫৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

বুখারির অধ্যায়-শিরোনাম আয়াতটির অর্থ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখে না। তিনি “যারা ঋতুমতী হয়নি” বাক্যাংশকে বয়ঃসন্ধির আগের মেয়ের ইদ্দত হিসেবে পড়েছেন এবং সেই বিধানের বাস্তব নজির হিসেবে আয়িশার বিবাহ উপস্থাপন করেছেন।
এখানে কোরআন ও হাদিস আলাদা দুটি বিচ্ছিন্ন প্রমাণ নয়। বুখারির বিন্যাসে আয়াতটি সাধারণ বিধান এবং আয়িশার ঘটনা তার নববী প্রয়োগ। তাই আয়িশার ঘটনাকে “শুধু নবীর বিশেষত্ব” বলা বুখারির নিজের আইনগত উপস্থাপনার বিরোধী।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে তাফসীরে ইবনে কাসীর
ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসীরের তাফসীর সুন্নি জগতে সর্বাধিক পঠিত বর্ণনাভিত্তিক তাফসীরগুলোর একটি। কোরআনের আয়াত ব্যাখ্যায় তিনি কোরআন, হাদিস, সাহাবি-তাবেঈদের বক্তব্য ও পূর্ববর্তী তাফসীর ব্যবহার করেছেন। ফলে সূরা তালাক ৬৫:৪ সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা কোনো আধুনিক অনুবাদকের ব্যক্তিগত মত নয়; মধ্যযুগীয় সুন্নি তাফসীর-ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল পাঠ।
তাফসীরে ইবনে কাসীরে বলা হয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের কথা [7]
সূরা তালাক, পৃষ্ঠা ১৬৩
৪. তোমাদিগের যে সকল স্ত্রীর ঋতুমতী হইবার আশা নাই তাহাদিগের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করিলে তাহাদিগের ইদ্দতকাল হইবে তিন মাস এবং যাহারা এখনও রজঃস্বলা হয় নাই তাহাদিগেরও এবং গর্ভবর্তী নারীদিগের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আল্লাহকে যে ভয় করে আল্লাহ্ তাহার সমস্যা সমাধান করিয়া দিবেন।
৫. ইহা আল্লাহর বিধান যাহা তিনি তোমাদিগের প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছেন, আল্লাহকে যে ভয় করে তিনি তাহার পাপমোচন করিবেন এবং তাহাকে দিবেন মহাপুরস্কার।
তাফসীর: আল্লাহ্ তা’আলা বলিতেছেন যে, বার্ধক্যের কারণে যে মহিলার ঋতু
আসা বন্ধ হইয়া গিয়াছে, তালাকপ্রাপ্তা হইলে তাহা তিন মাস ইদ্দত পালন করিবে। অনুরূপভাবে যেই মেয়েরা এখনও ঋতুবতী হয় নাই তাহাদিগের ইদ্দতও তিন মাস।
إِنِ ارْتَبْتُمْ )যদি তোমাদের সন্দেহ হয়) এই আয়াতাংশের দুইটি ব্যাখ্যা হইতে পারে। প্রথমত, বার্ধক্যে উপনীত হইবার পর যদি রক্ত দেখা দেয় আর তোমাদের এই সন্দেহ হয় যে, ইহা কি ঋতুর রক্ত না কি রোগের। ইহা পূর্বসূরী এক জামাআতের উক্তি, যেমন মুজাহিদ যুহরী ও ইবন যায়দ (র)। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের মহিলাদের ইদ্দতের ব্যাপারে যদি তোমাদের সন্দেহ থাকে এবং উহা তোমাদের জানা না থাকে তো এখন জানিয়া নাও যে, উহাদিগের ইদ্দত হইল তিন মাস। এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি সাঈদ ইব্ন জুবায়র (র) হইতে বর্ণিত এবং ইবন জারীর (র) এই ব্যাখ্যাটি পছন্দ করিয়াছেন। বস্তুত আয়াতাংশের স্পষ্ট অর্থ ইহাই।
ইব্ন জারীর (র) আবূ কুরাইব ও ইব্ন সায়িব (র)……. আমর ইব্ন সালিম (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, আমর ইবন সালিম (র) বলেন যে উবাই ইব্ন কা’ব (রা)
একদিন বলিলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! অনেক মহিলাদের ইদ্দত সম্পর্কে তো কুরআনে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। যেমন অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ে বৃদ্ধা ও গর্ভবর্তী নারী, তখন আল্লাহ্ তা’আলা وَالى يُنسن الخ আয়াতটি নাযিল করেন। এই হাদীস দ্বারা ইন জারীর (র) দলীল পেশ করেন।
ইবন আবূ হাতিম (র)……. উবাই ইব্ন কা’ব (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, উবাই ইবন কা’ব (রা) বলেন, আমি বলিলাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! মহিলাদের ইদ্দত সম্পর্কে সূরা বাকারার সেই আয়াত নাযিল হইবার পর মদীনার কতিপয় লোকেরা বলিল যে, কিছু মহিলার ইদ্দত সম্পর্কে তো কুরআনে কিছুই বলা হইল না। যেমন অপ্রাপ্ত বয়স্কা, বৃদ্ধা, গর্ভবর্তী নারী। তখন আল্লাহ্ তা’আলা وَإِلَىٰ يُنسن الخ আয়াতটি নাযিল করেন।

ইবনে কাসীর আয়াতটির মধ্যে তিনটি পৃথক আইনগত শ্রেণি শনাক্ত করেছেন: বার্ধক্যের কারণে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া নারী, এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে এবং গর্ভবতী নারী। প্রথম দুই শ্রেণির ইদ্দত তিন মাস এবং তৃতীয় শ্রেণির ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ফলে “যারা এখনো রজঃস্বলা হয়নি” কথাটিকে বার্ধক্য, অসুস্থতা কিংবা ঋতুস্রাবের সাময়িক অনিয়মের সঙ্গে একাকার করার সুযোগ নেই। ইবনে কাসীর অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে স্বতন্ত্র শ্রেণি হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন।
উদ্ধৃত শানে নুযুলের বর্ণনাও একই অর্থকে শক্তিশালী করে। সূরা বাকারায় সাধারণ তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত বর্ণিত হওয়ার পর যেসব শ্রেণির বিধান অনুল্লিখিত ছিল, তাদের মধ্যে “অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়ে”, বৃদ্ধা এবং গর্ভবতী নারীর কথা প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত হয়। সেই প্রশ্নের জবাব হিসেবেই সূরা তালাকের আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের অন্তর্ভুক্তি কোনো অনুবাদকের অনুমান নয়; আয়াতটির প্রচলিত অবতরণ-ব্যাখ্যার মধ্যেই সে উপস্থিত।
এর আইনগত তাৎপর্যও পরিষ্কার। আয়াতটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে শুধু বিবাহযোগ্য হিসেবে ধরে নেয়নি; তাকে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী এবং ইদ্দত পালনকারী হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে। সূরা আহযাব ৩৩:৪৯ অনুসারে সহবাসের আগে তালাক হলে ইদ্দত নেই। অতএব ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের জন্য তিন মাসের ইদ্দত নির্ধারণের অর্থ হলো, তার সঙ্গে দাম্পত্য সহবাস সংঘটিত হওয়ার পর তালাকের বিধান এখানে আলোচিত হচ্ছে।
ফলে ইবনে কাসীরের তাফসীরে শিশুবিবাহের সম্পর্কটি শুধু একটি শব্দের সম্ভাব্য অর্থ নয়; অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী, সহবাস-পরবর্তী তালাক এবং তিন মাসের ইদ্দতের একটি সম্পূর্ণ আইনগত কাঠামো।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে তাফসীরে জালালাইন
তাফসীরে জালালাইন সংক্ষিপ্ত অথচ প্রভাবশালী সুন্নি তাফসীর। জালালুদ্দিন আল-মাহাল্লি ও জালালুদ্দিন আল-সুয়ুতির রচিত এই গ্রন্থ দীর্ঘকাল ধরে মাদ্রাসা শিক্ষায় প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী তাফসীর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর গুরুত্ব হলো, এটি বিতর্কিত দীর্ঘ আলোচনা না করে আয়াতের প্রচলিত ভাষাগত অর্থ সংক্ষেপে জানায়।
তাফসীরে জালালাইনেও বলা হয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্কতার কারণে যে সব মেয়ে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়নি, তাদের কথা [8] –
আয়াতের শানে নুযূল:
১. বর্ণিত আছে যে, হযরত মা’আয ইবনে জাবাল (রা.) রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করেছেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! যে মহিলার হায়েজ হয় তার ইদ্দত সম্পর্কে তো জানতে পেরেছি; কিন্তু যাদের হায়েজ হয় না তাদের ইদ্দত কি রকম? তখন واللي আয়াতটি নাজিল হয়। কাবীর, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর, রাওয়ায়ে)
২. হাকিম, ইবনে জারীর, তাবারী এবং বায়হাকী (র.) বর্ণনা করেছেন যে, যখন সূরা বাকারায় তালাকপ্রাপ্তা মহিলা এবং স্বামীমৃত মহিলাদের ইদ্দত সম্বলিত আয়াত নাজিল হলো, তখন উবাই ইবনে কা’ব বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ মদীনার কিছু মহিলা বলছেন যে, কিছু কিছু মহিলা এখনও এমন রয়ে গেছে যাদের সম্বন্ধে কিছুই বলা হয়নি। রাসূলুল্লাহ বললেন, কোন কোন মহিলা সম্বন্ধে বলা হয়নি? তখন তিনি বললেন, ছোট এবং বড় (অর্থাৎ যাদের হায়েজ বন্ধ হয়ে গেছে) আর গর্ভবর্তী মহিলা। তখনই এ আয়াতটি নাজিল হয়। কাবীর, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
৩. ইমাম বাগবী, ওয়াহেদী ও খাযেন (র.) বর্ণনা করেছেন যে, যখন :الْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِانْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ فَرُو আয়াতটি নাজিল হলো, তখন খালেদ ইবনে আন-নো’মান আনসারী (রা.) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যেসব মহিলার হায়েজ হয় না, আর যাদের হায়েজ বন্ধ হয়ে গেছে এবং গর্ভবতী মহিলাদের ইদ্দত কি রকম? তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো।
-(রাওয়ায়ে, কাবীর, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর, রূহুল মা’আনী।
মুজাহিদের মতে, এ আয়াত যেসব মহিলার ইস্তেহাযার কারণে হায়েজের রক্ত না রোগের রক্ত জানা যায় না, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। [কুরতুবী]
قَوْلُهُ تَعَالَى إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةَ أَشْهُرٍ: ইমাম জাস্সাস (র.) বলেছেন, এর অর্থ ‘আয়েসা’ হওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহ হতে পারে না, কারণ আমরা কোনো মহিলা ‘আয়েসা’র বয়সে উত্তীর্ণ হয়েছে কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ করলে বলিনা যে, তার ইদ্দত তিন মাস। অতঃপর তিনি বলেন, এখানে সন্দেহ বা اِرْتِبَابُ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে শানে নুযুলের প্রতি লক্ষ্য করে। সুতরাং এর অর্থ হলো, তোমাদের যেসব স্ত্রীলোক হায়েজ হতে নিরাশ হয়ে গেছে, যদি তোমরা তাদের ব্যাপারে কোনো সন্দেহে পড়ে যাও, তাহলে তোমরা জেনে রেখো যে, তাদের ইদ্দত তিন মাস।
ইমাম তাবারীও এ অর্থকেই গ্রহণ করেছেন, গ্রন্থকারেরও এ অভিমত, ইমাম তাবারী বলেন, ‘যদি তোমাদের সন্দেহ হয়, আর তোমরা তাদের হুকুম কি তা না জানতে পার, তাহলে জেনে রাখো যে, তাদের হুকুম হলো তাদের ইদ্দত তিন মাস।’
হযরত ইকরামা এবং কাতাদাহ (রা.) বলেছেন, ‘রীবা’ বা সন্দেহের অন্তর্ভুক্ত হলো সে রুগ্ণ মহিলা, যার হায়েজ ঠিক থাকে না। মাসের প্রথম দিকে কয়েকবার হায়েজ হয়, আবার কতেক মাসে একবারও হয়।
আর কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ, ‘যদি তোমাদের ইয়াকীন হয়’ এ শব্দটি পরস্পর বিরোধী অর্থ দানকারী শব্দসমূহের মধ্যে একটি। কুরতুবী, রূহুল মা’আনী, জাস্সাস, কাবীর, রাওয়ায়ে।
خَيْرٌ مبتدأ 1 وَاللَّاتِي لَمْ يَحِضْنَ : قَوْلُهُ تَعَالَى وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ তা হলো فَمَدَّنْهُنَّ ثَلَاثَةٌ أَشْهُرٍ যাদের এখনও হায়েজ আসেনি তাদের ইদ্দত হলো তিন মাস। অর্থাৎ হায়েজ অল্পবয়স্কতার কারণে আসেনি, কিংবা অনেক স্ত্রীলোকের যেমন বহু বিলম্বে হায়েজ হয়, এমনিভাবে সারা জীবনে হায়েজ হয় না এমন স্ত্রীলোক কমই হয়ে থাকে। যা হোক না কেন সব অবস্থাই এ ধরনের স্ত্রীলোকের ইদ্দত তা-ই যা হায়েজ হওয়া হতে নিরাশ স্ত্রীলোকের ইদ্দত। অর্থাৎ তালাকের সময় হতে তিন মাস।
এখানে মনে রাখতে হবে, কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী ইদ্দত পালনের প্রয়োজন হয় সে স্ত্রীলোকের যার সাথে স্বামী নিবিড় একাকীত্বে মিলিত হয়েছে। কারণ নিবিড় একাকীত্বে মিলিত হওয়ার পূর্বে তালাক হলে আদৌ কোনো ইদ্দত পালন করতে হয়
না [ আল-আহযাব-৪৯ ]

তাফসীরে জালালাইনের উদ্ধৃত অংশে “যাদের এখনো হায়েজ আসেনি” কথাটিকে অস্পষ্ট কোনো চিকিৎসাগত অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সেখানে সরাসরি বলা হয়েছে, অল্পবয়স্কতার কারণে যেসব মেয়ের ঋতুস্রাব শুরু হয়নি, তাদের ইদ্দতও তিন মাস। একই আলোচনায় “ছোট”, “অল্পবয়স্ক” এবং “হায়েজ আসেনি”—এই শব্দগুলো পরস্পর সম্পর্কিত শ্রেণি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে আয়াতটি শুধু বয়স্ক বা অসুস্থ নারীর অনিয়মিত ঋতুস্রাব নিয়ে কথা বলছে—এমন দাবি এই তাফসীরের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
জালালাইনের ব্যাখ্যায় আয়াতটির অবতরণের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। সূরা বাকারায় সাধারণ তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত বর্ণিত হওয়ার পর অপ্রাপ্তবয়স্কা, বার্ধক্যের কারণে ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া নারী এবং গর্ভবতী নারীর বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্নের উত্তরে সূরা তালাকের আলোচ্য আয়াত নাজিল হওয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের অন্তর্ভুক্তি পরবর্তী কোনো আধুনিক সমালোচকের অনুমান নয়; আয়াতটির প্রথাগত অবতরণ-ব্যাখ্যার মধ্যেই তাকে পৃথক আইনগত শ্রেণি হিসেবে রাখা হয়েছে।
উদ্ধৃত ব্যাখ্যার শেষাংশে সূরা আহযাব ৩৩:৪৯-এর বিধানও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে: স্বামীর সঙ্গে নিবিড় একাকীত্ব বা দাম্পত্য সম্পর্কের পূর্বে তালাক হলে কোনো ইদ্দত পালন করতে হয় না। এই বক্তব্য সূরা তালাক ৬৫:৪-এর অর্থ আরও পরিষ্কার করে। অল্পবয়স্কতার কারণে ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন স্ত্রীর যদি তিন মাসের ইদ্দত থাকে, তবে তার বিবাহ কেবল কাগুজে চুক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; দাম্পত্য সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার কারণে ইদ্দতের বিধান কার্যকর হয়েছে।
অতএব জালালাইনের ব্যাখ্যায় অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহ এবং তার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক—দুটিই আয়াতটির আইনগত কাঠামোর মধ্যে উপস্থিত। আধুনিক আত্মপক্ষসমর্থনের জন্য “যারা ঋতুমতী হয়নি” থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বাদ দেওয়া তাফসীরটির ভাষা, অবতরণের প্রেক্ষাপট এবং ইদ্দত-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা—তিনটিরই সরাসরি অস্বীকার।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে তাফসীরে মাযহারী
তাফসীরে মাযহারী আঠারো শতকের হানাফি আলেম কাজী সানাউল্লাহ পানিপথীর রচনা। লেখক বিচারক, মুহাদ্দিস ও মুফাসসির হওয়ায় গ্রন্থটিতে ভাষাগত তাফসীরের সঙ্গে হানাফি আইনগত বিশ্লেষণও বিস্তৃতভাবে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি শিক্ষায় এর বিশেষ প্রভাব রয়েছে।
কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী একজন বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত, যার লিখিত তাফসীর গ্রন্থের নাম তাফসীরে মাযহারী। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের একজন কাজী (বিচারপতি), মুহাদ্দিস, গবেষক ও বিশিষ্ট মুফাসসির তথা আল-কোরআনের ভাষ্যকার। এবারে সেই তাফসীরে মাযহারী [9] থেকে দেখে নিইঃ
তোমাদের যে সকল স্ত্রী আর ঋতুবর্তী হইবার আশা নাই তাহাদের ‘ইদ্দাত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করিলে তাহাদের ‘ইদ্দাতকাল হইবে তিন মাস এবং যাহারা এখনও রজঃস্বলা হয় নাই তাহাদেরও; আর গর্ভবর্তী নারীদের ‘ইদ্দাতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আল্লাহকে যে ভয় করে আল্লাহ্ তাহার সমস্যা সমাধান সহজ করিয়া দিবেন।
ইহা আল্লাহর বিধান যাহা তিনি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছেন। আল্লাহকে যে ভয় করে তিনি তাহার পাপ মোচন করিবেন এবং তাহাকে দিবেন মহাপুরস্কার।
(তাফসীরে মাযহারী/৫৬২)
প্রথমে বলা হয়েছে- ‘তোমাদের যে সকল স্ত্রীর আর ঋতুবতী হবার আশা নেই’। একথার অর্থ বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার কারণে তোমাদের যে সকল স্ত্রীর ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, মেয়েদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় পঞ্চান্ন বৎসর বয়সে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ষাট বৎসর বয়সে।
এরপর বলা হয়েছে- ‘তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস এবং যারা এখনো রজঃস্বলা হয়নি, তাদেরও; আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত’। একথার অর্থ- সাধারণভাবে সকল
তালাকপ্রাপ্তাদের ইদ্দতের সময়সীমা তো ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছেই, এখন যদি দ্যাখো তোমাদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীরা বৃদ্ধা হওয়ার কারণে ঋতুস্রাব রহিতা, অথবা ঋতুস্রাবমুক্তা অপ্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার কারণে, তবে তাদের জন্য ইদ্দতের সময়সীমা নির্ধারণ করা হলো তিন মাস। উল্লেখ্য, তিন ঋতু হয়ে থাকে সাধারণত তিন মাসেই, যেমন প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার বয়স ধরা হয় সাধারণত পনেরো অথবা সতের বৎসর। এর মধ্যে কোনো মেয়ে ঋতুগ্রস্তা না হলেও তাকে ধরে নিতে হয় প্রাপ্তবয়স্কা। যেমন সম্পদের জাকাত ফরজ হয় এক বৎসর পূর্ণ হলে। এর মধ্যে সম্পদ সাধারণত কিছু না কিছু বর্ধিত হয়েই থাকে। অথবা ঋতুস্রাব হওয়া থেকে নিরাশ হওয়ার বয়স ধরা হয় পঞ্চান্ন বা ষাট বৎসর, তেমনি বৃদ্ধা ও অপ্রাপ্তবয়স্কাদের ইদ্দতের সময়সীমা এখানে নির্ধারণ করা হয়েছে তিন মাস। শরিয়তে এরকম সময় বেঁধে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আরও রয়েছে।
মুকাতিল তাঁর তাফসীরগ্রন্থে লিখেছেন, হজরত খাল্লাদ ইবনে আমর ইবনে জমূহ ঋতুবিবর্জিতা রমণীদের ইদ্দত সম্পর্কে রসুল স.কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাঁর ওই জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতেই অবতীর্ণ হয় আলোচ্য আয়াত। এভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে একথা জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তাদের ইদ্দতের সময়সীমা হচ্ছে তিন মাস। এখানকার ‘তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস’ কথাটির সম্পর্ক রয়েছে প্রথম আয়াতের ‘তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে’ কথাটির সঙ্গে। আর এখানকার ‘আল ই’দদাতি’ (ইদ্দত) এর আলিফ লাম জাতিবাচক। অর্থাৎ বৃদ্ধা ও অপ্রাপ্ত বয়স্কাদের ইদ্দতের সময়সীমাও তিন ঋতুর পরিমাণ, অর্থাৎ তিন মাস।
উল্লেখ্য, বর্ণিত বিধান প্রযোজ্য হবে কেবল স্বাধীনা স্ত্রীদের বেলায়। আর বিধানটি হচ্ছে সাধারণ। অর্থাৎ ‘বাইন’ ও ‘রেজয়ী’ উভয় প্রকৃতির তালাক প্রাপ্তাদের ইদ্দতের বিধান একই। আর মুসলমান পুরুষের মুসলমান স্ত্রী, কিতাবী স্ত্রী উভয়ের বিধানও এক। আর পূর্ণ ক্রীতদাসী, অথবা মুকাতাবা, কিংবা মুদারাবা ক্রীতদাসী যদি হয় বৃদ্ধা, অথবা অপ্রাপ্তবয়স্কা, বয়স বেশী হওয়ার কারণে যাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কিংবা প্রাপ্তবয়স্কা না হওয়ার কারণে এখানে যারা রজঃস্বলা হয়নি, তাদের ইদ্দত আলেমগণের ঐকমত্যক্রমে দেড়মাস। আমি সুরা বাকারার যথাস্থানে লিখেছি যে, ক্রীতদাসীর জন্য পূর্ণ তালাক দেড় তালাক (তিন তালাকের অর্ধেক) হওয়াই রীতিসম্মত। কিন্তু তালাক ও ঋতু যেহেতু
(তাফসীরে মাযহারী/৫৬৩)
বিভাজন যোগ্য নয়, তাই ক্রীতদাসীর পূর্ণ তালাক হবে দুই তালাক এবং তার পূর্ণ ইদ্দত হবে দুই ঋতু। কিন্তু যারা ঋতুবিবর্জিতা, তাদের তালাক ও ইদ্দত গণনা করতে হবে দিন গণনার মাধ্যমে। আর এই দিন গণনা ক্রীতদাসীদের ক্ষেত্রে হবে স্বাধীনাগণের অর্ধেক, অর্থাৎ দেড় মাস।
আবদুল্লাহ্ ইবনে উজ্জ্বা সালমান ইবনে ইয়াসার মোহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা- এই সূত্রে ইমাম শাফেয়ী বর্ণনা করেছেন, হজরত ওমর বলেছেন, একজন ক্রীতদাস এক সঙ্গে দু’জন নারীকে বিবাহ করতে পারবে (স্বাধীন পুরুষদের মতো এক সঙ্গে চারজন নারীকে বিবাহ করতে পারবে না)। আর সে দুই তালাক দেওয়ার অধিকার রাখে। আর ক্রীতদাসী ইদ্দত পালন করবে দুই ঋতু পর্যন্ত। আর ঋতুবিবর্জিতা হলে দুই মাস, অথবা দেড় মাস।
মাসআলাঃ যুবতী নারী, যাদের নিয়মিত ঋতুস্রাব হওয়ার কথা, কোনো কারণে যদি তাদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অধিকাংশ আলেমগণের মতে তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে পুনরায় ঋতুস্রাব না হওয়া পর্যন্ত। এভাবে তার ইদ্দত পালিত হওয়ার জন্য তিন ঋতু অতিবাহিত হওয়া অপরিহার্য। আর যদি সে ঋতুগ্রস্তা হওয়া থেকে একেবারে নিরাশ হয়ে যায়, তবে তিন মাস অতিক্রান্ত হলে তার ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যাবে। হজরত ওসমান, হজরত আলী, হজরত জায়েদ ইবনে সাবেত এবং হজরত ইবনে মাসউদ এরকমই বলেন। আতা বলেছেন, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীও এমতো অভিমতের প্রবক্তা। হজরত ওমর বলেছেন, এরকম রমণীকে অপেক্ষা করতে হবে নয় মাস। এর পরেও যদি সে ঋতুগ্রস্তা না হয়, তবে তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে আরও তিন মাস। ইমাম মালেকও এমতো অভিমতের প্রবক্তা। হাসান বসরী বলেছেন, তাকে অপেক্ষা করতে হবে ছয় মাস। তারপর পালন করতে হবে তিন মাসের ইদ্দত।
মাসআলা: দু’বার ঋতুগ্রস্তা হওয়ার পর বয়স বাড়ার কারণে কোনো নারীর যদি তৃতীয় ঋতু আর না আসে, তবে তাকে নতুন করে পালন করতে হবে তিন মাসের ইদ্দত। কিন্তু ঋতু হওয়া সম্পর্কে নিরাশ কোনো নারী যদি মাস গণনার মাধ্যমে তার ইদ্দত পালন শুরু করে, আর তার ইদ্দত শেষ হওয়ার পর, অথবা ইদ্দত পালনকালে আবার তার রজস্রাব শুরু হয়, তবে তার অতীতের ইদ্দত আর ধর্তব্য হবে না। এমতাবস্থায় সে বিবাহবন্ধা হলেও তার বিবাহ পণ্ড হয়ে যাবে। আর এ বিধানটি তার উপরে প্রযোজ্য হবে তখন, যখন তার আগের নিয়ম মতো বের হবে লাল অথবা কালো বর্ণের রক্ত। যদি তা না হয়ে বের হয় হলুদ, সবুজ, কিংবা মেটে রঙের স্রাব, তবে তা ঋতুস্রাব বলে গণ্য হবে না। কিন্তু ঋতু বন্ধ হওয়ার পূর্বে যদি তার এরকম রঙের স্রাব নির্গত হওয়ার নিয়ম থেকে থাকে, তবে তা গণ্য হবে ঋতুস্রাব হিসেবেই।
তালাক যদি মাসের শুরুতে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে আলেমগণের ঐকমত্যানুসারে ইদ্দতের হিসাব করতে হবে চন্দ্রমাস অনুসারে। আর মাসের মাঝামাঝি তালাক দেওয়া হলে ইদ্দত পালন করতে হবে দিন গণনার মাধ্যমে।
(তাফসীরে মাযহারী/৫৬৪)
এভাবে নব্বই দিন পূর্ণ হলে তার ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যাবে। এর কমে ইদ্দত পূর্ণ হবে না। ইমাম আবু হানিফা এরকম বলেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মোহাম্মদ বলেছেন, এমতাবস্থায় প্রথম মাস পূর্ণ করতে হবে দিন গণনার মাধ্যমে এবং পরের দুই মাস পূর্ণ করতে হবে চন্দ্র মাস হিসেবে (সে মাস উনতিরিশ দিনের অথবা তিরিশ দিনের যাই হোক না কেনো)।
মাসআলা: ইদ্দতের এসকল হিসাব প্রযোজ্য হবে কেবল তালাকপ্রাপ্তাদের উপর। বিধবাদের উপরে এ সকল হিসাব প্রযোজ্য হবে না। বিধবা যদি গর্ভবতী না হয়, তবে তার ইদ্দত হবে চার মাস দশদিন, সে অপ্রাপ্তবয়স্কা, যুবতী, বৃদ্ধা, যে-ই হোক না কেনো। একথার উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সলফে সালেহীনের ঐকমত্য। আর এমতো ঐকমত্যের ভিত্তি হচ্ছে ওই হাদিস, যা হজরত উবাই ইবনে কা’ব কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে আলোচ্য আয়াতসমূহে অবতরণের পরিপ্রেক্ষিতরূপে।
হজরত উবাই ইবনে কা’ব বর্ণনা করেছেন, সাহাবীগণ যখন বলাবলি করলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কা, যারা ঋতুবতী নয় এবং বিধবাদের সম্পর্কে তো কিছু বলা হলো না, তখন অবতীর্ণ হলো আলোচ্য আয়াত। সাহাবীগণ ঠিকই বলেছিলেন। সেকারণেই আলোচ্য আয়াতে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে ‘তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে’। এখন কথা হচ্ছে ‘আর তোমাদের মধ্যে যারা পরলোক গমন করো’ এই আয়াত নিয়ে। এই আয়াত সাধারণার্থক। সকল প্রকার রমণীই এর অন্তর্ভূতা। কাজেই এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই। অস্পষ্টতা তো ওই বিধানে থাকে, যা পাওয়া যায় সন্দিগ্ধ প্রমাণের মাধ্যমে। কিন্তু এই আয়াতটি অকাট্য।
একটি সন্দেহ: এখানে আলোচিত তিনটি আয়াতের বক্তব্য একই রকম। অথচ বলা হলো, আলোচ্য আয়াত প্রযোজ্য কেবল তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের বেলায়। আবার এ দলিলটি এরকমও দাবি করে যে ‘ওয়া উলাতুল আহমাল’ এই আয়াতও বিশেষভাবে নির্ধারিত হোক কেবল তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের বেলায়। কিন্তু এরকম কথা তো আর কেউ বলেননি।
সন্দেহভঞ্জন: আলোচ্য আয়াতসমূহ যে তালাকপ্রাপ্তাগণের জন্যই বিশিষ্ট, তা সাব্যস্ত হয়েছে আলেমগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। কেবল একক বর্ণিত হাদিস কোনো অকাট্য বিধানকে বিশিষ্ট করতে পারে না। আর আমরা সেকথা বলিও না। বরং ঐকমত্য তো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একথার উপরে যে ‘আর গর্ভবর্তী নারীদের’ আয়াতখানি সাধারণার্থক, গর্ভবতী, বিধবা সকলেই এর অন্তর্ভূতা।
হজরত ইবনে আব্বাস এবং ইবনে আলিয়া বলেন, বিধবা যদি গর্ভবতী হয়, তবে তার ইদ্দত পূর্ণ হবে তার সন্তান প্রসবের পর। আবার এর পরে চার মাস দশ দিন অতিবাহিত হওয়াও অপরিহার্য। তাঁরা সাবধানতা বজায়ার্থে দুই আয়াতের উপরেই আমল করেছেন। তবে এক্ষেত্রে জমহুরের অভিমত হচ্ছে, কেবল প্রসবের পরেই ইদ্দত শেষ হয়ে যায়। ইমাম মালেক তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে হজরত ওমর এবং হজরত ইবনে ওমর থেকে এরকমই বর্ণনা করেছেন গর্ভবতীদের ইদ্দত প্রসঙ্গে কেউই এমন বলেননি যে, এ ধরনের রমণীর গর্ভমুক্ত হওয়া অপরিহার্য নয়।


তাফসীরে মাযহারীর বক্তব্যে “ঋতুস্রাবমুক্তা অপ্রাপ্তবয়স্কা” কথাটি দ্ব্যর্থহীনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে অপ্রাপ্তবয়স্কা বলতে শুধু বয়সের হিসাবে প্রাপ্তবয়স্ক হলেও ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন নারী বোঝানো হয়নি। বরং বৃদ্ধা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কাকে দুটি পৃথক শ্রেণি হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বয়সের স্বল্পতার কারণে ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দতও তিন মাস।
মাযহারী শুধু আয়াতের সাধারণ অর্থ জানিয়েই থেমে যাননি। তিনি কোন বয়সে একজন মেয়েকে শরিয়তের হিসাবে প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হবে, ঋতুস্রাব না হলে ইদ্দত কীভাবে গণনা করা হবে, ইদ্দতের মধ্যে ঋতুস্রাব শুরু হলে আগের হিসাব বাতিল হবে কি না এবং বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তার বিধান কীভাবে পৃথক হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদকে একটি বাস্তব ও নিয়মিত আইনগত ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে।
গ্রন্থটি স্বাধীন অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দাসীর জন্য পৃথক ইদ্দতও নির্ধারণ করেছে। স্বাধীন অপ্রাপ্তবয়স্কার ইদ্দত তিন মাস, আর ঋতুবিবর্জিতা দাসীর ইদ্দত দেড় মাস। এখানে স্বাধীনতা ও দাসত্বের ভিত্তিতে অপেক্ষাকাল অর্ধেক করা হয়েছে, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহ বা তার সঙ্গে সহবাসকে অবৈধ বলা হয়নি। বরং উভয়ের সহবাস-পরবর্তী বিচ্ছেদের জন্য পৃথক হিসাব তৈরি হয়েছে।
এই বিস্তৃত শ্রেণিবিন্যাস প্রমাণ করে যে অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর ইদ্দত কোনো অনুবাদগত দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন মত নয়; এটি পূর্ণাঙ্গ শরিয়তি আইন, যার মধ্যে শিশুর বিবাহ, সহবাস, সম্ভাব্য গর্ভধারণ, তালাক, দাসত্ব ও পুনর্বিবাহের নিয়ম পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে মা’আরেফুল কোরআন
মা‘আরিফুল কোরআন পাকিস্তানের সাবেক প্রধান মুফতি এবং দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষিত হানাফি আলেম মুহাম্মদ শফি উসমানীর তাফসীর। এটি আধুনিক দক্ষিণ এশীয় দেওবন্দি সমাজে বহুলপঠিত এবং কোরআনের আয়াত থেকে হানাফি শরিয়তের ব্যবহারিক বিধান ব্যাখ্যা করার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মুফতি মুহাম্মদ শফি উসমানী ছিলেন একজন প্রখ্যাত দেওবন্দি হানাফি আলেম, দারুল উলূম দেওবন্দের সাবেক মুফতি এবং দেশভাগের পর পাকিস্তানের প্রধান মুফতি। তাঁর বহু-খণ্ডের তাফসীর মা’আরিফুল কোরআন দক্ষিণ এশিয়ার দেওবন্দি পরিসরে ব্যাপকভাবে পঠিত। এবার আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা দেখা যাক [10]।
يَا أَيُّهَا النبي- বাক্যের দাবী ছিল এই যে, এরপরেও একবচনের বিধান বর্ণনা اذا طلقتم النسا বলা হয়েছে। এতে করা হত। কিন্তু এখানে বহুবচন ব্যবহার করে প্রত্যক্ষভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু বহুবচনে সম্বোধন করার মধ্যে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন আছে এবং এদিকে ইঙ্গিতও রয়েছে যে, এই বিধান বিশেষ-ভাবে আপনার জন্য নয়-সমগ্র উম্মতের জন্য।
কেউ কেউ এ স্থলে বাক্য উহ্য সাব্যস্ত করে এরূপ তফসীর করেছেন যে, হে নবী!
আপনি মু’মিনদেরকে বলে দিন যে, তারা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়, তখন যেন পরে বর্ণিত আইন পালন করে। তফসীরের সার-সংক্ষেপে এই ব্যাখ্যাই গ্রহণ করা হয়েছে।
অতঃপর তালাকের কতিপয় বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম বিধান-نطلقوهن لعد
১৬-এর শাব্দিক অর্থ গণনা করা। শরীয়তের পরিভাষায় সেই সময়কালকে ت تهن ইদ্দত বলা হয়, যাতে স্ত্রী এক স্বামীর বিবাহ থেকে বের হওয়ার পর দ্বিতীয় বিবাহের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাধীন থাকে। কোন স্বামীর বিবাহ থেকে বের হওয়ার উপায় দু’টি। এক. স্বামীর ইন্তেকাল হয়ে গেলে। এই ইদ্দতকে ‘ইদ্দতে-ওফাত’ বলা হয়। গর্ভবর্তী নয়-এমন মহিলাদের জন্য এই ইদ্দত চার মাস দশ দিন। দুই. বিবাহ থেকে বের হওয়ার দ্বিতীয় উপায় তালাক। গর্ভবতী নয়-এমন মহিলাদের জন্য তালাকের ইদ্দত ইমাম আবু হানীফা (র) ও অন্য কয়েকজন ইমামের মতে পূর্ণ তিন হায়েয। ইমাম শাফেয়ী (র) ও অন্য কয়েকজন ইমামের মতে তালাকের ইদ্দত তিন তোত্র (পবিত্রতাকাল)। সারকথা, এর জন্য কোন দিন ও মাস নির্ধারিত নেই; বরং যত মাসে তিন হায়েয অথবা তিন তোহর পূর্ণ হয়, তাই তালাকের ইদ্দত। যেসব নারীর বয়সের স্বল্পতা হেতু এখনও হায়েয হয় না অথবা বেশী বয়স হওয়ার কারণে হায়েয আসা বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের বিধান পরে আলাদাভাবে বর্ণিত হচ্ছে এবং গর্ভবতী স্ত্রীদের ইদ্দতও পরে বর্ণিত হচ্ছে। এতে ওফাতের ইদ্দত ও তালাকের ইদ্দত একই রূপ।
و هن لعد تهن (1) فطلقو هن لعد : সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ্ (সা)।
فطلقوهن لقبل عد تهنপাঠ করেছেন। হযরত ইবনে ওমর ও ইবনে আব্বাস (রা)-এর
لقبل عد تهن এক রেওয়ায়েতে تهن ও এক রেওয়ায়েতে مد تهن في قبل مد تهن বণিত আছে। –(রূহল-মা’আনী)
করে যে, তালাক কোন রাগ মিটানোর অথবা প্রতিশোধ গ্রহণের বিষয় নয় বরং এটা অপারক অবস্থায় উভয় পক্ষের সুখ ও শান্তির ব্যবস্থা। তাই তালাক দেওয়ার সময়েই এদিক খেয়াল রাখা জরুরী যে, স্ত্রীকে যেন দীর্ঘদিন ইদ্দত অতিবাহিত করার অহেতুক কষ্ট ভোগ করতে না হয়। এই বিধান কেবল সেই স্ত্রীদের জন্য, যাদের পক্ষে হায়েয অথবা তোহর দ্বারা ইদ্দত অতিবাহিত করা জরুরী। পক্ষান্তরে যে স্ত্রীর সাথে এখনও স্বামীর নির্জনবাসই হয়নি, তার যেহেতু কোন ইদ্দতই নেই, তাই তাকে হায়েয অবস্থায় তালাক দেওয়া জায়েয। এমনিভাবে যেসব স্ত্রীর স্বল্প বয়স অথবা বেশী বয়স হেতু হায়েম আসে না, তাদেরকে যে কোন অবস্থায় এমনকি সহবাসের পরে তালাক দেওয়া জায়েয। কেননা তাদের ইদ্দত মাসের হিসাবে তিন মাস হবে। পরবর্তী আয়াতসমূহে একথা বণিত হবে। (মাযহারী)
দ্বিতীয় বিধান হচ্ছে
احصاء واحصوا العدة
আয়াতের অর্থ এই যে, ইদ্দতের দিনগুলো সযত্নে স্মরণ রেখো এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই শেষ মনে করে নেওয়ার মত ভুল করো না। ইদ্দতের দিনগুলো স্মরণে রাখার এই দায়িত্ব পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের। কিন্তু আয়াতে পুরুষবাচক পদ ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, সাধারণভাবে সেসব বিধান পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যে অভিন্ন, সেগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত পুরুষবাচক পদই ব্যবহার করা হয়; স্ত্রীরা প্রসঙ্গত তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই বিশেষ ক্ষেত্রে * তফসীরের সার-সংক্ষেপে বর্ণিত বিশেষ রহস্যও থাকতে পারে যে, স্ত্রীরা অধিক আনমনা, তাই সরাসরি পুরুষদেরকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ول refle لا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ faat o
স্ত্রীদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করো না। এখানে তাদের গৃহ বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যে পর্যন্ত তাদের বসবাসের হক পুরুষের দায়িত্বে থাকে, সেই পর্যন্ত গৃহে তাদের অধিকার আছে। তাতে তাদের বসবাস বহাল রাখা কোন কৃপা নয় বরং প্রাপ্য আদায়। বসবাসের হকও স্ত্রীর অন্যতম হক। আয়াত ব্যক্ত করেছে যে, এই হক কেবল তালাক দিলেই নিঃশেষ হয়ে যায় না বরং ইদ্দতের দিনগুলোতে এই গৃহে বসবাস করার অধিকার স্ত্রীর আছে। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বে স্ত্রীকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করা জুলুম ও হারাম। এমনিভাবে স্ত্রীর স্বেচ্ছায় বের হয়ে যাওয়াও হারাম, যদিও স্বামী এর অনুমতি দেয়। কেননা, এই গৃহেই ইদ্দত অতিবাহিত করা স্বামীরই হক নয় আল্লাহরও হক, যা ইদ্দত পালন-কারিণীর উপর ওয়াজিব। হানাফী মযহাব তাই।
চতুর্থ বিধান হচ্ছে الا ان ياتين بفاحشة مبينة অর্থাৎ ইদ্দত পালন-
কারিণী স্ত্রী কোন প্রকাশ্য নির্লজ্জ কাজে জড়িত হয়ে পড়লে তাকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করা হারাম নয়। এটা তৃতীয় বিধানের ব্যতিক্রম। প্রকাশ্য নির্লজ্জ কাজ বলে কি বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে তিন প্রকার উক্তি বর্ণিত আছে।


মা‘আরিফুল কোরআন স্পষ্টভাবে বলেছে, যেসব স্ত্রীর “বয়সের স্বল্পতা হেতু” এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি, তাদের বিধান সূরা তালাকের পরবর্তী আয়াতে পৃথকভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখানে বয়সের স্বল্পতা ও বার্ধক্যকে ঋতুস্রাব না-হওয়ার দুটি স্বতন্ত্র কারণ হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের অন্তর্ভুক্তিকে রোগ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা অনুবাদের অস্পষ্টতা দিয়ে বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
গ্রন্থটি আরও বলেছে, যেসব স্ত্রীর স্বল্প বয়স বা বেশি বয়সের কারণে ঋতুস্রাব আসে না, তাদের সহবাসের পর যেকোনো অবস্থায় তালাক দেওয়া যায়; কারণ তাদের ইদ্দত ঋতুস্রাবের পরিবর্তে মাসের হিসাবে তিন মাস নির্ধারিত হবে। “সহবাসের পরে” কথাটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিষ্কার করে যে আলোচনাটি কেবল অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের নামে একটি বিবাহচুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে সহবাস সংঘটিত হওয়ার পর তালাক দিলে কীভাবে ইদ্দত গণনা করতে হবে, সেটিই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
মা‘আরিফুল কোরআন দেওবন্দি ধারার একটি বহুলপঠিত আধুনিক তাফসীর। ফলে এই বক্তব্যকে শুধু প্রাচীন আরবের বিলুপ্ত সামাজিক রীতি বলে পাশ কাটানো যায় না। বিংশ শতাব্দীর একটি প্রভাবশালী উপমহাদেশীয় তাফসীরও একই আয়াত থেকে অল্পবয়স্ক স্ত্রীর সহবাস-পরবর্তী তালাক ও ইদ্দতের বিধান শিক্ষা দিয়েছে।
অতএব অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের বিষয়টি কোনো সমালোচকের আরোপ নয়; মা‘আরিফুল কোরআন নিজেই “বয়সের স্বল্পতা”, “সহবাসের পরে” এবং “তিন মাসের ইদ্দত”—এই তিনটি বিষয়কে একই আইনগত ব্যাখ্যার মধ্যে যুক্ত করেছে।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে তাফহীমুল কুরআন
সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদুদীর তাফহীমুল কুরআন আধুনিক ইসলামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে প্রভাবশালী তাফসীরগুলোর একটি। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী কোরআনের বিধানকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর আইন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই আধুনিক ইসলামপন্থী পরিসরে সূরা তালাক ৬৫:৪ কীভাবে বোঝা হয়েছে, তা নির্ধারণে এই গ্রন্থ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী ইসলামে অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর তাফহীমুল কুরআন আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামপন্থী তাফসীরগুলোর একটি। এবার তাফহীমুল কুরআনে সূরা তালাকের আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা দেখে নেওয়া যাক [11]।
ইদ্দত গণনা করতে হবে ঋতুস্রাব দ্বারা যদি তা পরে শুরু হয় কিংবা যে বয়সে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় সেই বয়সের বিচারে। এ রকম বয়সে উপনীত হয়ে থাকলে সে তিন মাস ইদ্দত পালন করার পর বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যাবে এটাই ইমাম শাফেয়ীর (র), ইমাম সাওরী এবং ইমাম লাইসের মত। হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা) এবং হযরত যায়েদ (রা) ইবনে সাবেতের মাযহাবও এটাই।
ইমাম মালেক হযরত উমর এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মত গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মত হচ্ছে, স্ত্রী প্রথমে ৯ মাস অতিবাহিত করবে। যদি এই সময়ের মধ্যে ঋতুস্রাব শুরু না হয় তাহলে সে বার্ধক্য জনিত কারণে স্থায়ীভাবে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া স্ত্রীলোকের মত তিন মাস ইদ্দত পালন করবে। ইবনুল কাসেম ইমাম মালেকের অনুসৃত মতের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, যখন শেষবারের মত স্ত্রীলোকটির ঋতুস্রাব বন্ধ হয়েছিল তখন থেকে ৯ মাসের গণনা শুরু হবে, তালাক দেওয়ার সময় থেকে নয়। (জাসসাসের আহকামুল কুরআন এবং কাসানীর বাদায়েউস্ সানায়ে’ গ্রন্থদ্বয় থেকে এসব বিবরণ গৃহীত হয়েছে।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মাযহাব হচ্ছে, যে নারীর ইদ্দতের হিসেব হায়েজ থেকে শুরু হয়েছিল ইদ্দত চলাকালে তার ঋতুস্রাব যদি বার্ধক্যজনিত কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে ঋতুবর্তী নারীদের মত ইদ্দত পালন না করে বৃদ্ধদের মত ইদ্দত পালন করবে। যদি তার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু কি কারণে বন্ধ হয়েছে তা জানা না যায় তাহলে প্রথমে গর্ভসঞ্চারের সন্দেহে ৯ মাস সময়-কাল অতিবাহিত করবে এবং পরে তিন মাস ইদ্দত পূরণ করতে হবে। তবে ঋতুস্রাব কেন বন্ধ হয়েছে তা যদি জানা যায়, যেমন: কোন রোগে আক্রান্ত হয় অথবা সন্তানকে স্তন্যদান করে অথবা অন্য কোন কারণ থাকে তাহলে যতদিন ঋতুস্রাব পুনরায় শুরু না হবে এবং ঋতুস্রাবের হিসেবে ইদ্দত গণনা শুরু না হতে পারবে অথবা সে ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার মত বৃদ্ধবয়সে উপনীত হবে এবং রুদ্ধস্রাব বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের মত ইদ্দত পালন করতে পারবে ততো দিন পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। (আল ইনসাফ)
১৩. ঋতুস্রাব যদি অল্প বয়সের জন্য না হয়ে থাকে অথবা কিছু সংখ্যক মহিলাদের অনেক দেরীতে হয়ে থাকে বলে না হয়ে থাকে এবং বিরল কিছু ঘটনা এমনও হয়ে থাকে যে সারা জীবন কোন স্ত্রীলোকের ঋতুস্রাব হয় না এরূপ সর্বক্ষেত্রে এ রকম স্ত্রীলোকদের ইদ্দত রুদ্ধস্রাব বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের মত। অর্থাৎ তাদের ইদ্দত তালাকের সময় থেকে তিন মাস।
এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, কুরআন মজীদের স্পষ্ট বক্তব্য অনুসারে যে স্ত্রীর সাথে তার স্বামী নির্জনবাস করেছে কেবল তার ক্ষেত্রেই ইদ্দত পালনের প্রশ্ন আসে। কারণ, নির্জনবাসের পূর্বে তালাক হলে আদৌ কোন ইদ্দত পালন করতে হয় না। (আল আহযাব, ৪৯) সুতরাং যেসব মেয়েদের এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি তাদের ইদ্দত বর্ণনা করা স্পষ্টত এ কথাই প্রমাণ করে যে, এ বয়সে মেয়েদের বিয়ে শুধু জায়েযই নয়, বরং তার সাথে স্বামীর নির্জনবাস এবং মেলামেশাও জায়েয। এখন এ কথা স্পষ্ট যে, কুরআন যে জিনিসকে জায়েয বলে ঘোষণা করেছে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করার অধিকার কোন মুসলমানের নেই।

মওদুদী সরাসরি বলেছেন, যেসব মেয়ের ঋতুস্রাব শুরু হয়নি তাদের ইদ্দত বর্ণনা প্রমাণ করে যে এই বয়সে তাদের বিবাহ, নির্জনবাস ও মেলামেশা জায়েজ। তিনি এটিকে কোরআনের “স্পষ্ট বক্তব্য” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
এই ব্যাখ্যার তাৎপর্য হলো, এটি কোনো প্রাচীন যুগের বিলুপ্ত মত নয়। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামপন্থী চিন্তাবিদও একই আয়াত থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে দাম্পত্য মেলামেশার বৈধতা ঘোষণা করেছেন এবং মুসলমানের তা নিষিদ্ধ করার অধিকার অস্বীকার করেছেন।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে তাওযীহুল কুর’আন
তাওযীহুল কুরআন সমকালীন হানাফি-দেওবন্দি আলেম ও সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ তাকি উসমানীর রচনা। তিনি ইসলামি অর্থনীতি, হাদিস ও ফিকহে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। আধুনিক যুগের একজন জীবিত প্রভাবশালী ফকিহ আয়াতটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন, তা দেখার জন্য এই তাফসীর গুরুত্বপূর্ণ।
মুহাম্মদ তাকি উসমানী পাকিস্তানের একজন প্রভাবশালী হানাফি আলেম, সাবেক বিচারপতি এবং হাদিস, ফিকহ, তাসাউফ ও ইসলামি অর্থনীতির লেখক। The Muslim 500 তালিকায় তাঁকে প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর তাওযীহুল কুরআনে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা দেখে নেওয়া যাক [12]।
وَالَي يَسْنَ مِنَ الْمَحِيْضِ مِنْ نِسَابِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَثَةُ أَشْهُرٍ وَالَّىٰ لَمْ يَحِضْنَ وَ أَوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ، وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلُ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا
৪. তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ঋ وَ আসার কোন আশা নেই, তোমাদের যদি (তাদের ইদ্দত সম্পর্কে) সন্দেহ হয়, তবে (জেনে রাখ) তাদের ইদ্দত হল তিন মাস। আর এখনও পর্যন্ত যারা ঋতুমতীই হয়নি, তাদেরও (ইদ্দত এটাই)। যারা গর্ভবতী, তাদের (ইদ্দতের) মেয়াদ হল, সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার কাজ সহজে সমাধান করে দেন।
৭. অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করে, আল্লাহ তাআলা তার কাজ পূর্ণ করে দেন। তবে কাজ পূর্ণ করার ধরণ ও তার সময় আল্লাহ তাআলা নিজেই নির্ধারণ করেন। কেননা তিনি প্রতিটি জিনিসের এক মাপজোখকৃত পরিমাণ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।
৮. সূরা বাকারায় (২: ২২৮) বলা হয়েছিল তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতকাল তিনটি ঋতু। এতে কারও মনে প্রশ্ন দেখা দিল, যাদের বয়স বেশি হওয়ার কারণে ঋতু আসা বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের ইদ্দত কী হবে? এ আয়াতে তার জবাব দেওয়া হয়েছে যে, তাদের ইদ্দতকাল তিন ঋতুর স্থানে তিন মাস হবে। এমনিভাবে নাবালেগ মেয়ে, যার এখনও পর্যন্ত ঋতু দেখা দেয়নি, তার ইদ্দতও তিন মাস। যাদেরকে গর্ভাবস্থায় তালাক দেওয়া হয়েছে, তার ইদ্দত ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকবে, যতক্ষণ না সন্তান প্রসব হয় বা কোন কারণে গর্ভপাত ঘটে, তা তিন মাসের আগেই হোক বা তার পরে।

তাকি উসমানীর ব্যাখ্যায় “নাবালেগ মেয়ে, যার এখনও পর্যন্ত ঋতু দেখা দেয়নি” কথাটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে। তার ইদ্দত তিন মাস বলে তিনি কোনো রূপক, রোগ বা প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিশেষ অবস্থা বোঝাননি।
এটি দেখায় যে ধ্রুপদি ব্যাখ্যা আধুনিক দেওবন্দি তাফসীরেও অপরিবর্তিত আছে। সময় বদলেছে, শিশু অধিকার ও সম্মতির মানদণ্ড বদলেছে, কিন্তু আয়াতটির প্রথাগত শরিয়তি অর্থ বদলায়নি।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে আহকামুল কুরআন
আবু বকর আল-জাস্সাসের আহকামুল কুরআন প্রাচীনতম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হানাফি আইনভিত্তিক তাফসীরগুলোর একটি। জাস্সাস কোরআনের আয়াত থেকে সরাসরি ফিকহি বিধান নির্ণয় করেছেন। ফলে এই গ্রন্থে সূরা তালাক ৬৫:৪-এর আলোচনা কেবল ভাষ্য নয়; হানাফি আইনে আয়াতটির কার্যকর পরিণতি দেখায়।
হানাফী মাজহাবের প্রখ্যাত ইমাম আহমাদ ইবনে আলী আবূ বকর আর-রায়ী আল-যাস্সাস রচিত আহকামুল কুরআন গ্রন্থেও একই বিষয় দেখতে পাওয়া যায় [13] –
কিতাবের একটি মেয়ে বিয়ে করার ইচ্ছা করলেন। তিনি এ বিষয়ে রাসূলে করীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করলেন। কিন্তু তাকে তা করতে নিষেধ করলেন। বললেন : إِنَّهَا لا تخصك না, সে তোমার পবিত্রতা সংরক্ষিত করতে পারবে না।
রাসূলের এই নিষেধ কিতাবী মেয়ে বিয়ে করা বিপর্যয়ের কারণ স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। বলা যেতে পারে যে, এই হাদীস সূত্রের দিক দিয়ে مقطوع বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত। এরূপ হাদীস নিয়ে কুরআনের স্পষ্ট প্রকাশ্য ঘোষণার উপর আপত্তি তোলা বা ভিন্ন মত প্রমাণ করতে চেষ্টা করা চলে না। কেননা কুরআন তো সে কথাকে নাকচ করে দিয়েছে। আর তাতে কোন বিশেষীকরণ নেই। যদি তা প্রমাণিতও হয়, তাহলেও হতে পারে তা শুধু মাকরূহ, যেমন হযরত উমর (রা)-এর কথায়ও সেই মাকরূহই বলা যায়। তিনি হযরত হুযায়ফা (রা)-কে হারাম বলে নিষেধ করেন নি, তিনি মাকরূহ মনে করেন, এই হিসেবেই নিষেধ করেছিলেন। তাছাড়া রাসূলের কথা: ‘সে তোমার পবিত্রতা রক্ষা করবে না’لانك যদি প্রমাণিতও হয়, তবু তাতে বিয়ে জায়েয নয়, প্রমাণিত হয় না। কেননা হতে পারে, মেয়েটি নাবালেগ ছিল। আর নাবালেগা তাঁর পবিত্রতা রক্ষা করতে পারবে না, কথাটি তো সত্য। ক্রীতদাসীও তাই। তবে এ দুটি ক্রীতদাসী ও অল্প বয়স্কা মেয়ে বিয়ে করা যে জায়েয, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
মুসলমানদের সাথে যে আহলি কিতাবরা যুদ্ধরত, তাদের মেয়ে বিয়ে করা পর্যায়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আল ওয়াসেতী, জাফর ইবনে মুহাম্মাদুল ইয়ামন, আবু উবায়দ, উব্বাদ ইবনুল আওয়াম, সুফিয়ান ইবনে হুসায়ন, হিকাম, মুজাহিদ, ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
لَا تَحِلُّ نِسَاءُ أَهْلِ الْكِتَابِ إِذَا كَانُوا حَرَبًا –
আহলি কিতাব যদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত থাকে তাহলে তাদের মেয়েদের বিয়ে করা মুসলমানদের জন্যে হালাল নয়।
এই কথা বলার পর তিনি এ আয়াতটি পাঠ করেন: قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ –
হে মুসলমান, তোমরা যুদ্ধ কর সেই লোকদের বিরুদ্ধে যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানদার নয়।
(সূরা তওবা: ২৯)
. শেষ শব্দ وَهُمْ صَاغَرُونَ ‘তারা ছোট’।
আল-হিকাম বলেছেন; আমি এই ঘটনা ইবরাহীম নখয়ীকে বললাম। তিনি তা শুনে বিস্মিত হলেন।
আবূ বকর বলেছেন, সম্ভবত ইবনে আব্বাস (রা) উক্ত কথা বলেছেন মাকরূহ মনে করে। হানাফী ফিকাহবিদগণও তা মাকরূহ মনে করেন, তবে হারাম মনে করেন না।
হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনিও আহলি কিতাবের মধ্য থেকে মুসলমানদের সাথে যুধ্যমান লোকদের মেয়েদের বিয়ে করা মাকরূহ মনে করতেন।
আর আল্লাহর কথাঃ
وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ
তোমাদের পূর্বে কিতাব পাওয়া লোকদের মধ্যে সুরক্ষিত মেয়েরা ……….

আরও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে একই গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে যে, এ বিষয়ে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল আলেমের ঐক্যমত্য রয়েছে যে, সমস্ত অভিভাবকের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিবাহ দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ জায়েজ। এ বিষয়ে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী আলেমদের ঐক্যমত্য বা ইজমা রয়েছে [14] –
আলোচ্য আয়াতে এ কথারও প্রমাণ রয়েছে যে, পিতার জন্যে তার ছোট বয়সের কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার অধিকার আছে এ হিসেবে যে, সমস্ত অভিভাবকের জন্যেই তা জায়েয। আর পিতা তাদের সকলের তুলনায় অতি নিকটবর্তী অভিভাবক। আর বিভিন্ন দেশের আগের ও পরবর্তীকালের ফিকাহবিদদের মধ্যে তার জায়েয হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য আছে বলে আমরা জানি না। তবে বশর ইবনুল অলীদ শিবরামাতা থেকে বর্ণনা প্রচার করেছেন যে, ছোট বয়সের ছেলেমেয়েকে বিয়ে দেওয়া পিতার জন্যেও জায়েয নয়। এটা আল-আসাম-এর মাযহাব। এ মাযহাব যে বাতিল, তা আমরা ইতিপূর্বেই বলেছি। তাছাড়া এ আয়াতটিও এ মাযহাবের বাতুলতা প্রমাণ করে:
وَالَّتِي Y يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِّسَاءِ كُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ تَلْقَةُ أَشْهُرٍ وَالَّتِي لَمْ يَحِضْنَ –
তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা হায়য হওয়া থেকে নিরাশ হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে তোমরা সন্দিহান হয়ে পড়লে, তাহলে তাদের ইদ্দত তিন মাসকাল ধরবে। এ নিয়ম তাদের জন্যেও,
যাদের এখনও হায়য আসতে শুরু করেনি।
(সূরা তালাক: ৪)
অতএব হায়য হয়নি- এমন অল্প বয়সী মেয়েকে তালাক দেওয়া সহীহ্ হবে। আর তালাক তো সহীহ্ বিয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে। তাই আয়াতের এ তাৎপর্য রয়েছে যে, অল্প বয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েয। তাছাড়া বাস্তব প্রমাণ হচ্ছে, রাসূলে করীম (স) হযরত আয়েশা (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন যখন তাঁর বয়স মাত্র ছয় বছর। তাঁর পিতা হযরত আবু বকর (রা)-ই তাঁকে বিয়ে দিয়েছিলেন। এ ঘটনার দুটি তাৎপর্য। একটি, ছোট বয়সের মেয়েকে তার পিতা বিয়ে দিতে পারে সম্পূর্ণ জায়েয। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, এই ছোট বয়সের মেয়ে পূর্ণবয়স্কা হয়ে সে বিয়ে রাখা-না-রাখার অধিকারিণী হবে না। তা বাধ্যতামূলক। কেননা নবী করীম (স) পূর্ণবয়স্কতা লাভের পর তাঁকে সে ইখতিয়ার দেন নি।

জাস্সাসের আইনগত যুক্তি অত্যন্ত সরল। সূরা তালাক ৬৫:৪ ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন অল্পবয়স্ক মেয়ের তালাক-পরবর্তী ইদ্দত নির্ধারণ করেছে। তালাক কেবল বৈধ বিবাহের ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে পারে। অতএব কোরআন যখন এমন মেয়ের তালাক ও ইদ্দতের বিধান দিয়েছে, তখন তার বিবাহের বৈধতাও স্বীকার করেছে। জাস্সাস এই সিদ্ধান্তকে কোনো পরোক্ষ সম্ভাবনা হিসেবে নয়, আয়াতটির সরাসরি আইনগত তাৎপর্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
এরপর তিনি বিভিন্ন দেশের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ফকিহদের মধ্যে অল্পবয়স্ক মেয়ের বিবাহের বৈধতা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য জানা নেই বলে দাবি করেছেন। বিরোধী মত হিসেবে যে সীমিত ব্যতিক্রমের উল্লেখ করা হয়েছে, তাকেও তিনি বাতিল বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থাৎ হানাফি আইনভিত্তিক এই তাফসীরে শিশুবিবাহ শুধু অনুমোদিত মত নয়; বিরোধী মতকে অগ্রহণযোগ্য বলে সরিয়ে দিয়ে এটিকে প্রতিষ্ঠিত ফিকহি অবস্থান হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জাস্সাস আয়িশার ছয় বছর বয়সে বিবাহকে এই বিধানের বাস্তব নববী নজির হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার বক্তব্য অনুসারে, আবু বকর অল্পবয়স্ক আয়িশাকে মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ায় প্রমাণিত হয় যে পিতা নাবালিকা কন্যাকে বিবাহ দিতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই বিবাহ বহাল রাখবে কি না, সে বিষয়ে তাকে নতুন করে নির্বাচন করার স্বয়ংক্রিয় অধিকার দিতে হবে না।
ফলে আয়াতটির ফিকহি প্রয়োগ শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর ইদ্দতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি শিশুর সম্মতি ছাড়াই বিবাহ সম্পাদন, অভিভাবকের জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও সেই বিবাহ থেকে বের হওয়ার স্বাধীনতা অস্বীকার করার ভিত্তি হয়েছে।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে আহকামুল হাদিস
উদ্ধৃত আহকামুল হাদিস একটি আধুনিক বাংলা সংকলন, যেখানে হাদিসের সঙ্গে প্রচলিত ফিকহি সিদ্ধান্ত ও মাযহাবি মতগুলো সাজানো হয়েছে। এটি ধ্রুপদি মূলগ্রন্থ নয়, কিন্তু বাংলা ভাষাভাষী ধর্মীয় পাঠকের কাছে অভিভাবকত্ব, সম্মতি ও ইদ্দতের বিধান কীভাবে শেখানো হচ্ছে, তা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
হাদিস এবং ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হচ্ছে আহকামুল হাদীস। সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াত সম্পর্কে এই গ্রন্থে কী বলা আছে, আসুন দেখে নেওয়া যাক [15]
বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতিঃ
এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে যে, وَلَايَةُ الإِجْبَار তথা বলপ্রয়োগের অভিভাবকত্ব কোন্ ধরনের নারীর উপর প্রযোজ্য হবে। উল্লেখ্য যে, এক্ষেত্রে মহিলাদের চারটি প্রকার রয়েছে-
)১( ثَيِّمَة بَالِغَة তথা বালেগা অকুমারী। এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, বিয়ের ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের প্রয়োজন নেই।
)২( بَاكِرَةِ صَغِيرَة তথা নাবালেগা কুমারী। এ ব্যাপারেও সকলেই একমত যে, বিয়ের ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের প্রয়োজন রয়েছে।
)৩( بَاكِرَةِ بَالِغَة তথা বালেগা কুমারী। ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে এমন মহিলার অভিভাবক প্রয়োজন এবং ইমাম আবু হানিফার (রহ.) মতে প্রয়োজন নেই।
)8( ثَيِّبَةَ صَغِيرَة তথা নাবালেগা অকুমারী। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এমন মহিলার অভিভাবক প্রয়োজন এবং ইমাম শাফেঈ (রহ)-এর মতে প্রয়োজন درس مشكوة ج ۳ ص ۱۲)
উল্লেখ্য যে, এখানে কুমারী (চبکر( বলতে এমন মহিলাকে বুঝানো হয়েছে, যে নারী কোন দিন যেকোন উপায়ে সহবাসে লিপ্ত হয়নি এবং তার যৌনাঙ্গের এক ধরনের পাতলা পর্দা ক্ষুণ্ণ হয়নি। সে বালেগা হোক অথবা নাবালেগা হোক। আর অকুমারী )ثيبة( বলতে এর বিপরীত দিকটি বুঝানো হয়েছে।
ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে, ولاية الإجبار তথা বলপ্রয়োগের দ্বারা অভিভাবক প্রয়োজন হওয়ার মাপকাঠি হল بکارت বা কুমারীত্ব। অতএব, মহিলা যদি কুমারী হয়, সে বালেগা হোক অথবা নাবালেগা হোক, অভিভাবক ইচ্ছা করলে মহিলার অনুমতি ব্যতীত তাকে বিবাহ দিতে পারবে। আর যদি ثيبة তথা অকুমারী হয় তাহলে মহিলার অনুমতি ব্যতীত বিয়ে দিতে পারবে না। সে বালেগা হোক অথবা নাবালেগা।
পক্ষান্তরে ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, অভিভাবকত্বের মাপকাঠি হল صفر বা অল্পবয়স্কতা। অতএব মহিলা যদি অপ্রাপ্তবয়স্কা হয়, সে কুমারী থাকুক বা অকুমারী থাকুক, অভিভাবক ইচ্ছা করলে তার অনুমতি ব্যতীত বিবাহ দিতে পারবে। আর যদি মহিলা বয়স্কা তথা বালেগা হয়, চাই সে কুমারী থাকুক বা না থাকুক, তার উপর অভিভাবকের কোন বল প্রয়োগ চলবে না। এমন মহিলা যদি অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত নিজে নিজে বিয়ে করে ফেলে তাহলে তা কার্যকরী (بدائع الصنائع ج ٢ ص ٢٤١ ، فتح القدير ج ٣ ص ١٦١) 21
অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিয়ের হুকুম )حُكْمُ النَّكَاحِ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيُّ( :
সকল ইমাম এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন যে, অপ্রাপ্তবয়স্কা, জ্ঞান-বুদ্ধিহীনা ও দাসীর বিবাহ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত শুদ্ধ হবে না।
তবে স্বাধীনা, প্রাপ্তবয়স্কা ও বুদ্ধি-বিবেকসম্পন্ন মহিলার বিবাহ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত শুদ্ধ হবে কিনা- এ ব্যাপারে ইমামদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। যেমন-
ইমাম মালিক, শাফেঈ, আহমদ ইবন হাম্বল, ইসহাক, ইবন হুযম (রহ.) ও জমহুরের মতে, এ স্তরের মহিলাদের বিবাহ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত শুদ্ধ হবে بداية المجتهد ج ۲ ص ٧ ، المغني ج ٦ ص ٤٤٩ ، المحلى ج9 ص ٤٥١) ١
দলীল (১)ঃ আল্লাহ তাআলার বাণী- وَأَنْكِحُوا الْآيَامَى مِنْكُمْ অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে
যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও। (নূরঃ ৩২)
উক্ত আয়াতটিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অভিভাবকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, যেন মহিলাদেরকে বিবাহ দিয়ে দেয়। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, বিবাহের ক্ষেত্রে মহিলাদের নিজেদের কোন অধিকার নেই, বরং এর যিম্মাদার হচ্ছে অভিভাবকগণ।
অর্থাৎ, বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবার পর মহিলাগণ যে সময়টুকু নিজেদেরকে বিবাহ হতে বিরত রাখে তাকে ইদ্দত বলা হয়।
তানযীমুল আশতাত প্রণেতা বলেন, ইদ্দত বলা হয় ঐ সময়কালকে, যা স্ত্রীলোক স্বীয় স্বামীর মৃত্যু অথবা তালাক প্রদানের পর সন্তান প্রসবের মাধ্যমে অথবা হায়েয কিংবা মাসসমূহের মাধ্যমে গণনা করে থাকে। )۲۱۰ تَنْظِيمُ الأَشْتَات ج ۲ ص( সংক্ষেপে বলা যায়- তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের শরীয়ত নির্ধারিত অতিবাহিত সময়কালকে ইদ্দত বলা হয়।
ইদ্দতের প্রকারভেদঃ ইদ্দত দু’ভাগে বিভক্ত-
১। বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে ইদ্দতঃ তালাক বা খুলআর কারণে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইদ্দত পালন করা।
২। স্বামীর মৃত্যুর কারণে ইদ্দতঃ স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে স্ত্রীর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইদ্দত পালন করা।
তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা মহিলার ইদ্দতের পার্থক্যঃ
১। তালাকপ্রাপ্তা মহিলার ইদ্দতঃ যদি অপ্রাপ্ত বয়স্কা ও বৃদ্ধা (যার হায়েয বন্ধ হয়ে গেছে এমন মহিলা) হয়, তবে তালাকের অবস্থায় তিন মাস ইদ্দত পালন করতে হবে। যেমন, আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَالَّذِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ … فَعِدْتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَالَّتِي لَمْ يَحِضْنَ … অর্থাৎ, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ঋতুবতী হওয়ার আশা নেই, তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস। আর যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি, তাদেরও অনুরূপ ইদ্দতকাল হবে। (তালাকঃ ৪)
আর যে নারীর হায়েয আসে এমন প্রাপ্ত বয়স্কা নারী তালাকপ্রাপ্তা হলে, সে ইদ্দত হিসেবে তিন হায়েয পালন করবে, নাকি তিন তুহুর পালন করবে, এ নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ
অর্থাৎ, আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন কুরু (হায়েয) পর্যন্ত। (বাকারাঃ ২২৮)
উক্ত আয়াতে তিন قُرُوْء পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। আর অভিধানে قروء শব্দটি হায়েয এবং তুহুর (পবিত্রতা) উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়।



গ্রন্থটি নারীদের বালেগা-নাবালেগা এবং কুমারী-অকুমারী—এই চার শ্রেণিতে ভাগ করে ওয়ালায়াতুল ইজবার বা বলপ্রয়োগের অভিভাবকত্ব কার ওপর কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করেছে। এই শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যেই “নাবালেগা অকুমারী” নামে এমন একটি আইনগত শ্রেণি রাখা হয়েছে, যা প্রমাণ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের পূর্ববর্তী সহবাস বা বিবাহবিচ্ছেদ ফিকহের কাছে অচিন্তনীয় কোনো ঘটনা ছিল না।
হানাফি ও শাফেয়ি মতের পার্থক্য শিশুর স্বাধীনতার প্রশ্নে নয়; অভিভাবকের বলপ্রয়োগের ক্ষমতার ভিত্তি কী হবে, সেই প্রশ্নে। হানাফি মতে অল্পবয়স্কতা হলো এই ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কুমারী হোক বা অকুমারী, অভিভাবক তার অনুমতি ছাড়াই তাকে বিবাহ দিতে পারে। শাফেয়ি মতে কুমারীত্ব প্রধান মাপকাঠি; কুমারী হলে সে প্রাপ্তবয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক—উভয় অবস্থাতেই অভিভাবকের বাধ্যতামূলক ক্ষমতার অধীন হতে পারে।
দুই মাযহাবের এই মতভেদকে নারীর সম্মতি রক্ষার বিতর্ক হিসেবে উপস্থাপন করা মিথ্যা হবে। বিতর্কটি আসলে নির্ধারণ করছে, বয়স নাকি কুমারীত্ব—কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অভিভাবক মেয়েটির সিদ্ধান্ত বাতিল করে তার হয়ে বিবাহ সম্পাদন করতে পারবে। নাবালিকার স্বাধীন, অবহিত ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি কোনো মতেই কেন্দ্রীয় পূর্বশর্ত নয়।
অর্থাৎ ফিকহি আলোচনায় প্রশ্নটি “শিশুটি বিবাহে সম্মতি দিয়েছে কি না” নয়; প্রশ্নটি “কোন অভিভাবক কোন পরিস্থিতিতে তার সম্মতি ছাড়াই তাকে বিবাহ দিতে পারবে।” আধুনিক সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং শিশু অধিকারের সঙ্গে এই আইনি কাঠামোর সংঘাত তাই প্রান্তিক নয়; কাঠামোটির একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত।
ফিকাহশাস্ত্র আল হিদায়ার আইন
বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানীর আল-হিদায়া হানাফি মাযহাবের সবচেয়ে প্রভাবশালী আইনগ্রন্থগুলোর একটি। শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি মাদ্রাসা, বিচারব্যবস্থা ও ফিকহি শিক্ষায় মান্য পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এর বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন আলেমের ব্যক্তিগত মত নয়; প্রাতিষ্ঠানিক হানাফি আইনের প্রতিনিধিত্ব করে। ইমাম আবু হানিফার মাজহাবের প্রখ্যাত ফিকাহ গ্রন্থ আল হিদায়াতে এই বিষয়ে যা বলা আছে সেটিও দেখে নিই [16] –
অধ্যায়: ইদ্দত
স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তালাকে বায়ন বা তালাকে রেজয়ী দেয় কিংবা তালাক ছাড়া অন্য কোন কারণে উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে আর স্ত্রী যদি স্বাধীনা ও ঋতুবতী হয়, তাহলে তার ইদ্দত হলো তিন হায়য। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,
وَالْمُطَلَّقْتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَثَةَ قُرُوءٍ
তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীগণ তিন কুরু পর্যন্ত নিজেকে আবদ্ধ করে রাখবে।
আর তালাক ছাড়া অন্য মাধ্যমে বিচ্ছেদ তালাকেরই সমপর্যায়ের। কেননা ইদ্দত অবশ্য পালনীয় হয়েছে, বিবাহের মাঝে উদ্ভূত বিচ্ছেদের পর, গর্ভাশয় মুক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য। আর এ প্রয়োজন অন্যান্য বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান।
আমাদের মতে আয়াতে উল্লেখিত قروء শব্দের অর্থ হলো হায়য। পক্ষান্তরে ইমাম শাফেয়ী (র)-এর মতে ঋতুস্রাব মুক্ত তুর। অবশ্য শব্দটি বিপরীত অর্থ জ্ঞাপক এবং উভয় অর্থের ক্ষেত্রেই শব্দটি হাকীকত বা মৌলিক। ইবনুস সুকায়ত এ কথা বলেছেন। আর একাধিক অর্থবিশিষ্ট শব্দের একই সাথে একাধিক অর্থ প্রহণ করা যেতে পারে না। আর হায়যের অর্থে গ্রহণ করাই অধিকতর উত্তম, যাতে শব্দটির বহুবচনত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে’।
কেননা শব্দটিকে যদি তোহর অর্থে গ্রহণ করা হয়, আর তালাক তোহরের সময়েই দেওয়া হয়ে থাকে, তখন বহুচবনের অর্থ অক্ষুণ্ণ থাকে না।
কিংবা কারণ এই যে, হায়যই হচ্ছে গর্ভমুক্ত থাকার পরিচায়ক। আর সেটাই হচ্ছে ইদ্দতের উদ্দেশ্য। আর দ্বিতীয় দলীল নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী: وعدة الامة حيضتان )দাসীর ইদ্দত হলো দুই হায়য)। সুতরাং এই হাদীস কোরআনে উল্লেখিত শব্দের ব্যাখ্যা রূপে যুক্ত হবে।
আর যদি অল্প বয়স্কতা কিংবা বার্ধক্যের কারণে সে ঋতুবতী না হয় তাহলে তার ইদ্দত হবে তিন মাস। কেননা আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন,
وَالَّتِي يَبْسُنُ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِسَائِكُم
তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুস্রাব সম্পর্কে নিরাশ, তাদের বিষয়ে যদি সন্দিহান হও তাহলে তাদের ইদ্দত হলো তিন মাস।
তদ্রূপ যারা বয়স গণণা দ্বারা সাবালিকা হয়েছে কিন্তু এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি (তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস)।

আল-হিদায়া অল্পবয়স্কতা ও বার্ধক্যকে ঋতুস্রাব না-হওয়ার দুটি পৃথক কারণ হিসেবে উল্লেখ করে উভয়ের ইদ্দত তিন মাস নির্ধারণ করেছে। একই বিধান বয়সের হিসাবে সাবালিকা হলেও ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন নারীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছে। এখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী একটি স্বীকৃত আইনগত শ্রেণি। তার বিবাহবিচ্ছেদ ও ইদ্দতের বিধান নিয়মিত ফিকহি অধ্যায়ের অংশ, ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক ঘটনা নয়।
ফিকাহ শাস্ত্র আশরাফুল হিদায়ার আইন
আশরাফুল হিদায়া আল-হিদায়ার ব্যাখ্যা ও অনুবাদভিত্তিক বিস্তৃত হানাফি ফিকহগ্রন্থ। উপমহাদেশের পাঠকের জন্য মূল আরবি ইবারত, অনুবাদ ও প্রাসঙ্গিক মাসআলা পাশাপাশি উপস্থাপন করায় এটি প্রচলিত হানাফি বিধানের ব্যবহারিক ব্যাখ্যা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
হানাফি ফিকাহশাস্ত্রে আশরাফুল হিদায়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী কর্তৃক নির্দেশিত এবং বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আলেমের অনুদিত আশরাফুল হিদায়া গ্রন্থে এই বিষয়ে কী বলা আছে সেটি দেখে নিই [17] –
وَإِنْ كَانَتْ مِمَّنْ لَا تَحِيضُ مِنْ صِغَرٍ أَوْ كِبَرٍ فَعِدَّتُهَا ثَلْثَةُ أَشْهُرٍ لِقَوْلِهِ تَعَالَى وَاللَّاتِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَائِكُمْ (الْآيَةُ) وَكَذَا الَّتِي بَلَغَتْ بِالسِّنِّ وَلَمْ نَحِضُ بِأَخِيرِ الْآيَةِ وَإِنْ كَانَتْ حَامِلاً فَعِدَّتُهَا أَنْ تَضَعُ حَمْلَهَا لِقَوْلِهِ تَعَالَى وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ – وَإِنْ كَانَتْ اَمَةٌ فَعِدَّتُهَا حَيْضَتَانِ لِقَوْلِهِ عَلَيْهِ السَّلَامُ طَلَاقُ الْأَمَةِ تَطْلِيقَتَانِ وَعِدَّتُهَا حَيْضَتَانِ وَلِأَنَّ الرِّقَ مُنَصِفُ وَالْحَيْضَةِ لَا نَتَجَزَّى فَكَمُلَتْ فَصَارَتْ حَيْضَتَيْنِ وَالَيْهِ أَشَارَ عُمَرُ (رض) بِقَوْلِهِ لَوْ اسْتَطَعْتُ لَجَعَلْتُهَا حَيْضَةً وَنِصْفَا وَإِنْ كَانَتْ لَا تَحِيضُ فَعِدَّتُهَا شَهْرُ وَنِصْفُ لِأَنَّهُ مُتَجَرٍ فَامْكَنَ تَنْصِيفَهُ عَمَلًا بِالرِّقِ .
অনুবাদ: আর যদি অল্পবয়স্কতা কিংবা বার্ধক্যের কারণে সে ঋতুমতী না হয়, তাহলে তার ইদ্দত হবে তিন মাস
কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন- وَاللَّاتِي بَيْسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن يُسَائِكُمْ …. الخ – ‘তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুস্রাব সম্পর্কে নিরাশ, তাদের বিষয়ে যদি সন্দিহান হও, তাহলে তাদের ইদ্দত হলো তিন মাস।’ তদ্রপ যারা বয়স গণনা দ্বারা সাবালিকা হয়েছে, কিন্তু এখনো ঋতুস্রাব শুরু হয়নি [তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস)। আর এর প্রমাণ হলো উল্লিখিত আয়াতের শেষাংশ। আর যদি সে গর্ভবতী হয়, তাহলে গর্ভ প্রসব হলো তার ইদ্দত। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন- وَأَوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ – আর যারা গর্ভবতী তাদের (ইদ্দতের মেয়াদ হলো গর্ভ প্রসব করা।’ আর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী যদি দাসী হয় তাহলে তার ইদ্দত হলো দুই হায়েজ। কেননা, নবী করীম ইরশাদ করেছেন, “দাসীর তালাক হলো দুই তালাক আর তার ইদ্দত হলো দুই হায়েজ।” তাছাড়া এই যে, দাসত্ব হলো অর্ধেককারী, আর এক হায়েজ খণ্ডিত হয় না, কাজেই পূর্ণ ধরা হবে। অতঃপর তা দুই হায়েজ হয়ে যাবে। এদিকে ইঙ্গিত করেই হযরত ওমর (রা.) বলেছিলেন- لو اسْتَطَعْتَ لَجَعَلْتُهَا حَيْضَةً وَيَصْنً পারতাম তাহলে তার ইদ্দত এক হায়েজ এবং অর্ধ হায়েজ নির্ধারণ করে দিতাম।। আর যদি দাসী ঋতুমতী না হয়, তাহলে তার ইদ্দত হবে এক মাস ও অর্ধ মাস। কেননা, মাস খণ্ডন গ্রহণ করে। সুতরাং দাসত্বের ভিত্তিতে মাসের অর্ধেকীকরণ সম্ভব।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
قوله وإِن كَانَتْ مِمَّنْ لَا تَحِبْضُ الحَ – যে সকল নারী ঋতুস্রাববর্তী নয় তাদের ইদ্দত প্রসঙ্গে: গ্রন্থকার (র.) উক্ত
ইবারতের মাঝে যে সকল মহিলাদের হায়েজ আসে না তার কয়েকটি সুরত বর্ণনা করেছেন। স্বল্প বয়সের কারণে কিংবা
অতিবৃদ্ধা হওয়ার দরুন, অথবা নারী বয়সের হিসেবে বালেগা হয়েছে অর্থাৎ সাহেবাইনের মতে পনের বছর আর ইমাম

উদ্ধৃত অংশে আরবি মূলপাঠ ও বাংলা ব্যাখ্যা উভয় ক্ষেত্রেই অল্পবয়স্কতার কারণে ঋতুমতী না-হওয়া স্ত্রীর ইদ্দত তিন মাস বলা হয়েছে। দাসী হলে সেই সময় অর্ধেক করার পৃথক হিসাবও দেওয়া হয়েছে। এই শ্রেণিবিন্যাস দেখায়, শরিয়তি আইনে সমস্যাটি শুধু শিশুর বিবাহ অনুমোদনে থেমে নেই। স্বাধীন ও দাসী অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর সহবাস-পরবর্তী বিচ্ছেদের জন্যও পৃথক গণনা তৈরি করা হয়েছে।
সূরা তালাক প্রসঙ্গে বোখারীর ব্যাখ্যা
এখানে উদ্ধৃত বাংলা বোখারী শরীফ মূল আরবি সহিহ বুখারির শুধু অনুবাদ নয়; এর সঙ্গে উপমহাদেশীয় আলেমদের ব্যাখ্যাও যুক্ত হয়েছে। ফলে ব্যাখ্যাকারীর বক্তব্যকে সরাসরি ইমাম বুখারির নিজের বাক্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। তবে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সমাজে ইমাম বুখারির অধ্যায়-শিরোনাম, সূরা তালাক ৬৫:৪ এবং আয়িশার হাদিসের আইনগত তাৎপর্য কীভাবে শেখানো হয়েছে, সেটি বোঝার জন্য এই সংস্করণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাখ্যাকারী প্রথমে ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন মেয়ের তিন মাসের ইদ্দতসংক্রান্ত আয়াত তুলে ধরেছেন। এরপর সরাসরি যুক্তি দিয়েছেন, যদি এমন মেয়ের বিবাহের অনুমতি না থাকত, তবে তাকে তালাক দেওয়া এবং তার জন্য ইদ্দত নির্ধারণের প্রশ্নই উঠত না। তারপর একই অধ্যায়ে আয়িশার ছয় বছর বয়সে বিবাহ এবং নয় বছর বয়সে দাম্পত্য জীবন শুরুর হাদিসকে সেই বিধানের বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ব্যাখ্যার বিশেষ গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। ব্যাখ্যাকারী অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিবাহকে শরিয়ত-অনুমোদিত বলে ঘোষণা করার পর বলেছেন, এই অনুমোদনকে বেআইনি বা নিন্দনীয় বলা শরিয়তের বিকৃতি এবং মুহাম্মদের কাজকে দূষণীয় বলার সমতুল্য। অর্থাৎ এখানে শিশুবিবাহকে অনিচ্ছাকৃত ঐতিহাসিক অবশেষ হিসেবে নয়, সর্বকালের জন্য আল্লাহ ও রাসুলের অনুমোদিত বিধান হিসেবে রক্ষা করা হয়েছে। এবার সংশ্লিষ্ট অংশটি দেখা যাক [18]—
নাবালেগ মেয়ের বিবাহ
আল্লাহ তায়ালা বলিয়াছেন:-
وَالَّتِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ وَالَّذِي لَمْ يَعِضُنَ
“যে সব নারী ঋতু আসার সম্ভাবনার বয়স অতিক্রম করিয়া গিয়াছে এবং যে সমস্ত রমণীর এখনও ঋতু আসে নাই-উভয়ের (তালাকের) ইদ্দৎ তিন
মাস। (২৮ পারা-ছুরা তালাক)
এই আয়াতে ঋতু আরম্ভ হয় নাই এরূপ রমণীর তালাকের ইদ্দৎ বর্ণনা কর। হইয়াছে, সুতরাং ইহা অতি সুস্পষ্ট যে, তাহার বিবাহেরও অবকাশ রহিয়াছে, নতুবা তালাক ও উহার ইদ্দৎ কোথা হইতে আসিবে?
২০২৬। হাদীছঃ-আয়েশ। (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে, হযরত নবী ছাল্লাল্লাহু
আলাইহে অসাল্লাম যখন তাঁহাকে বিবাহ করিয়াছিলেন, তখন তাঁহার বয়স ছয় বৎসর ছিল এবং তাঁহার রোখছতী তথা দাম্পত্য জীবন আরম্ভ হইয়াছে নয় বৎসর বয়সে, আর হযরতের সঙ্গে তিনি নয় বৎসর কাল অবস্থান করার সুযোগ পাইয়াছিলেন। (সেমতে তাঁহার আঠার বৎসর বয়সে হযরত (দঃ) ইহকাল ত্যাগ করিয়াছিলেন।)
ব্যাখ্যা:-শরীয়ত অনুমোদিত বিষয়কে বে-আইনী সাব্যস্ত করা এবং শরীয়তের বে-আইনী বিষয়কে অনুমোদন করা ইহারই নাম তাহরীফ বা শরীয়তের বিকৃতি সাধন যাহা ইহুদী নাছারাগণ করিয়াছিল।
আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞ, তিনি ভূত ভবিষ্যৎ সব কিছু আদি হইতেই জানেন! তাহার প্রদত্ত শাসনতন্ত্রের নামই হইল শরীয়ত। কোন প্রকার যুক্তি বা উপকার
বোখারী শরীফ, পৃষ্ঠা ১৯৭
অপকার ইত্যাদির বুলি আওড়াইয়া শরীয়তের তাহরীফ বা বিকৃতি সাধন করা প্রকারান্তরে সর্বজ্ঞ আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানের প্রতি দোষারোপ করার শামিল।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়েদের বিবাহ সম্পর্কে ইমাম বোখারী (রঃ) কোরআন ও হাদীছ দ্বারা শরীয়তের অনুমোদন প্রমানিত করিয়াছেন। ইহাকে বে-আইনী করা বস্তুতঃ শরীয়ত তথা আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক তাঁহার বান্দাদের জীবন-ব্যবস্থারূপে প্রদত্ত শাসনতন্ত্রে হস্তক্ষেপ ও উহার তাহরীফ বা বিকৃতি সাধন করা। যেহেতু এই অনুমোদনের উপর স্বয়ং হযরত রসুলুল্লাহ (দঃ) আমল করিয়াছিলেন, অতএব, এই অনুমোদনকে দুষণীয় সাব্যস্ত করা রসুলের কার্য্যকে দূষণীয় সাব্যস্ত করারই শামিল।


ব্যাখ্যাকার স্পষ্ট বলেছেন, ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন নারীর তালাকের ইদ্দত থাকায় তার বিবাহের অবকাশও আছে; অন্যথায় তালাক ও ইদ্দত আসত না। এটি প্রবন্ধের মূল কোরআনিক যুক্তিরই হাদিস-ব্যাখ্যামূলক পুনর্ব্যক্তি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ব্যাখ্যাটি এই অনুমোদনকে বেআইনি বা দূষণীয় বলা শরিয়তের বিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্র শিশুবিবাহ নিষিদ্ধ করলে ঐতিহ্যগত এই ব্যাখ্যার সঙ্গে তার সংঘাত অনিবার্য।
নাবালিকা সঙ্গম বিষয়ে ফিকাহুস সুন্নাহ
মিশরীয় আলেম সাইয়েদ সাবিকের ফিকহুস সুন্নাহ বিংশ শতাব্দীর বহুলপঠিত সুন্নি আইনগ্রন্থ। সহজ ভাষায় দলিলসহ ফিকহ উপস্থাপন করায় এটি আরব বিশ্ব ও অনুবাদের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ধৃত অংশগুলো অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর ইদ্দত এবং সহবাসে ভয়াবহ শারীরিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা করে।
আল-আজহারে শিক্ষিত মিশরীয় আলেম সাইয়েদ সাবিকের ফিকহুস সুন্নাহ সমকালীন আরবি ফিকহের একটি বহুলপঠিত গ্রন্থ। এখানে অঋতুবতী অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকার ইদ্দত তিন মাস বলা হয়েছে। কোরআন ৩৩:৪৯ অনুযায়ী সহবাসের আগে তালাক হলে ইদ্দত নেই; আবার কতিপয় ফিকহি ধারায় বৈধ নির্জনবাসকেও সহবাসের আইনি সমতুল্য ধরা হয়। ফলে এই বিধান এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেয়, যার দাম্পত্য সম্পর্ক সহবাস বা তার আইনি সমতুল্য পর্যায়ে পৌঁছেছে [19]।
পুনরায় দশ দিনের হায়েয, অতপর পুনরায় পনেরো দিনের পবিত্রতা। অতপর তৃতীয় হায়েয, যার মেয়াদ দশ দিন। এভাবে মোট ইদ্দত দাঁড়ালো ষাট দিন। এই মেয়াদ যখন শেষ হলো এবং স্ত্রী দাবি করলো যে, তার ইদ্দত শেষ হয়েছে, তখন সে অন্য স্বামীর জন্য হালাল হবে।
পক্ষান্তরে আবু হানিফার শিষ্যদ্বয় প্রত্যেক হায়েয বাবদ তিন দিন গণনা করেন, যা তার. ন্যূনতম মেয়াদ, আর তিন হায়েযের মধ্যবর্তী দুটি পবিত্রাবস্থার প্রত্যেকটির জন্য পনেরো দিন গণনা করেন। এভাবে মোট ইদ্দত দাঁড়ায় ৩৯ দিন।
অঋতুবতীর (যার হায়েয এখনো হয়নি) ইদ্দত স্ত্রী যদি অঋতুবতী হয় তবে তার ইদ্দত তিন মাস। এটা অপ্রাপ্তবয়স্কা বালিকা এবং মাসিক স্রাবের বয়স পেরিয়ে যাওয়া বৃদ্ধা উভয়ের বেলায় প্রযোজ্য, চাই তার আদৌ মাসিক স্রাব না হয়ে থাকুক, অথবা মাসিক স্রাব হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকুক। এর প্রমাণ ইতিপূর্বে উল্লিখিত সূরা তালাকের ৪ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।
ইবনে আবি হাশেম তার তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, উবাই বিন কা’ব বলেন: আমি
বললাম: হে রসূলুল্লাহ, কুরআনে আল্লাহ অপ্রাপ্তবয়স্কা, বৃদ্ধা ও গর্ভবতী মহিলাদের ইদ্দত সম্পর্কে কিছু না বলায় মদিনার কিছু লোক নানা কথা বলে। তখন আল্লাহ সূরা তালাকের ৪নং আয়াত নাযিল করলেন। ঐ আয়াতে বলা হয়েছে, গর্ভবতী মহিলার ইদ্দত তার সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যখন প্রসব করবে, তখন তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে।
জারিরের বর্ণনার ভাষা এরকম: “আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ, মহিলাদের ইদ্দত সম্পর্কে
সূরা বাকারার আয়াত নাযিল হওয়ার পর মদিনার কিছু লোক বললো: কুরআনে কিছু সংখ্যক মহিলার ইদ্দত উল্লেখ করা হয়নি। তারা হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্কা, হায়েযের বয়স পেরিয়ে যাওয়া বৃদ্ধা এবং গর্ভবতী নারীগণ। তখন আল্লাহ সূরা তালাকের ৪নং আয়াত * নাযিল করলেন।
ঋতুবতী মহিলার যখন ঋতু হয়না তখন কী করবে? পবিত্রাবস্থায় বিরাজমান মহিলা
যখন তালাকপ্রাপ্ত হয় অথচ সে যথানিয়মে হায়েয দেখতে পায় না এবং তার কারণও তার জানা নেই। তখন সে এক বছর ইদ্দত পালন করবে। প্রথমে নয় মাস অপেক্ষা করবে, যাতে তার জরায়ু ভ্রূণমুক্ত আছে কিনা জানতে পারে। কেননা এটাই প্রধানতঃ গর্ভের মেয়াদ। এর মধ্যে যখন গর্ভ প্রকাশ পেলনা, তখন তার জরায়ু ভ্রূণমুক্ত আছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো। এরপর সে মাসিক স্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা মহিলাদের ইদ্দত তিন মাস পালন করবে। এটা ছিলো উমর রা.-এর ফায়সালা। ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: এটা ছিলো মুহাজির ও আনসারদের মাঝে উমর রা.-এর ফায়সালা। কেউ এটা অস্বীকার করেছে বলে আমাদের জানা নেই।
বার্ধক্যহেতু হায়েয বন্ধ হওয়ার বয়স: এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন: বার্ধক্যহেতু হায়েয বন্ধ হওয়ার বয়স হচ্ছে পঞ্চাশ বছর। কেউ বলেন: ষাট বছর। তবে প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এটা বিভিন্ন মহিলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: “ঋতু বন্ধ হওয়ার বয়স এক এক মহিলার এক এক রকম। সকল মহিলা একমত হবে, কোনো বয়সসীমা এর জন্য নির্দিষ্ট নেই। সূরা তালাকের ৪নং আয়াতের মর্মার্থ হলো, প্রত্যেক মহিলা নিজেই বুঝতে পারে তার মাসিক

এই একই গ্রন্থে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সাথে সঙ্গমকালে যোনীপথ ফেটে গেলে স্বামীর জরিমানা হওয়ার কথা বলা আছে। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে, যোনীপথ এবং পায়ুপথ একাকার হয়ে গেলেই শুধুমাত্র এই জরিমানা প্রযোজ্য হবে। মাঝে কোন আড়াল থাকলে কোন জরিমানা হবে না। যদিও এগুলো মুহাম্মদের অনেক পরে ইমামগণের সংযুক্তি, তারপরেও ইসলাম যে খুব পরিষ্কারভাবে শিশুকামকে বৈধতা দিয়েছে, তার প্রমাণ বহন করে। অর্থাৎ মুমিনদের খেয়াল রাখতে হবে যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাটির যোনীপথ এবং পায়ুপথ যেন ফেটে একাকার না হয়ে যায়। এইটুকু না করলেই হলো। আর সেটি হয়ে গেলে সামান্য জরিমানা দিয়ে দিলেই তো হলো! [20] –
হয়, তাহলে সে দায়ী হবে। তবে যদি অজানা কোনো জায়গা থেকে পানির ঢল আসে, তাহলে তার জন্য সে দায়ী হবেনা। কেননা তার পক্ষ থেকে কোনো বাড়াবাড়ি হয়নি।
৭. নৌকা ডুবির দায় কোনো নৌকা মানুষ ও জীবজন্তু নিয়ে পার হওয়ার সময় ডুবে গেলে নৌকার মালিকের যদি তাতে প্রত্যক্ষ কোনো হাত না থেকে থাকে, তবে ক্ষয়ক্ষতির জন্য সে দায়ী হবেনা। আর যদি নৌকা ডুবির কারণ তার সৃষ্টি করা হয় তবে সে দায়ী হবে।
৮. চিকিৎসকের দায় দায়িত্ব আলেমদের এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, যার
চিকিৎসা বিদ্যা সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই, সে যদি কোনো রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে বিপত্তি ঘটায়, তাহলে সে ঐ রোগীর যে ক্ষতি সাধন করবে তার জন্য দায়ী হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। কেননা এই কাজ দ্বারা সে একজন সীমালঙ্ঘনকারী বিবেচিত হবে এবং তার সম্পদ থেকেই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি চিকিৎসক সাজে অথচ ইতিপূর্বে সে চিকিৎসক বলে পরিচিত ছিলোনা, সে দায়ী হবে।”-আবু দাউদ, নাসায়ী।
উমর বিন আব্দুল আযীযের ছেলে আব্দুল আযীয বলেন, আমার পিতার নিকট আগত প্রতিনিধি দলের এক ব্যক্তি আমাকে বলেছে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি ইতিপূর্বে চিকিৎসা করেছে বলে জানা যায়না, অথচ কোনো জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা করতে শুরু করলো এবং রোগীর ক্ষতি সাধন করলো, সে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।” (আবু দাউদ) তবে চিকিৎসক চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও যদি ভুল করে, তবে ফকিহগণ মনে করেন, তার দিয়াত দিতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ ফকিহর মতে, দিয়াত দেবে চিকিৎসকের পিতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়গণ। (রোগী মারা গেলে কিসাস নয়, দিয়াত দিতে হবে। কেননা চিকিৎসা রোগীর অনুমতি নিয়ে করা হয়েছে)। আবার কেউ কেউ বলেন: চিকিৎসকের নিজের সম্মতি থেকেই দিয়াত আদায় করা হবে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এই বাধ্যবাধকতা মানুষের প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চিকিৎসকদেরকে দায়িত্ব সচেতন করা এবং তাদের জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত তৎপরতার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের অপরিহার্যতার দিক নির্দেশক। পক্ষান্তরে ইমাম মালেক বলেন: তাকে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবেনা।
১. স্বামীর সহবাসে যদি স্ত্রীর যোনি ফেটে প্রশস্ত হয়ে যায় কোনো ব্যক্তি যখন স্বীয় স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে গিয়ে তার যোনি বিদীর্ণ করে প্রশস্ত করে দেয়, তবে স্ত্রী যদি এরূপ প্রাপ্তবয়স্কা হয় যে, তার সমান মহিলার সাথে সাধারণ সহবাস করা হয়ে থাকে, তাহলে তার কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবেনা। এটা ইমাম আবু হানিফা ও আহমদের মত, শাফেয়ি ও মালেকের মতে দিয়াত দিতে হবে। তবে মালেকের যে মতটি অধিক প্রসিদ্ধ, তদনুসারে সালিশী দ্বারা ফায়সালা করা হবে। আর যদি এমন অপ্রাপ্তবয়স্কা হয়, যার সমান মেয়ের সাথে সচরাচর সহবাস করা হয়না, তাহলে তার উপর দিয়াত ওয়াজিব। উল্লেখ্য যে, এই বিধিটি তখনই প্রযোজ্য, যখন যোনি বিদীর্ণ হয়ে মলদ্বারের সাথে একাকার হয়ে যায় এবং এই দুই অঙ্গের মধ্যে কোনো আড়াল থাকেনা।
১০. কোনো ব্যক্তির উপর প্রাচীর ভেংগে পড়ে মৃত্যু ঘটলে যখন কারো প্রাচীর রাস্তার দিকে ধ্বসে পড়ে ও তার নিচে চাপা পড়ে কেউ মারা যায়, তাহলে দেখতে হবে, ঐ প্রাচীর

ফিকহুস সুন্নাহর প্রথম উদ্ধৃতিতে অঋতুবতী নারীর শ্রেণির মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকা ও ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা—উভয়কে রাখা হয়েছে এবং উভয়ের ইদ্দত তিন মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকার ক্ষেত্রে এই ইদ্দতের ভিত্তি হিসেবে সরাসরি সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াত ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আয়াতটির অবতরণের প্রেক্ষাপট হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্কা, বৃদ্ধা ও গর্ভবতী নারীর ইদ্দত সম্পর্কে প্রশ্নের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ফলে গ্রন্থটির বক্তব্যে নাবালিকা মেয়ের অন্তর্ভুক্তি কোনো অস্পষ্ট ইঙ্গিত নয়; এটি নামোল্লেখসহ পৃথক ফিকহি শ্রেণি।
দ্বিতীয় উদ্ধৃতিটি আরও ভয়াবহ। সেখানে এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের বিধান আলোচনা করা হয়েছে, যার সমবয়সী মেয়েদের সঙ্গে সচরাচর সহবাস করা হয় না। সহবাসের ফলে শিশুটির যোনি বিদীর্ণ হয়ে মলদ্বারের সঙ্গে একাকার হয়ে গেলে স্বামীর ওপর আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা দিয়াত আরোপের প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অর্থাৎ ফকিহদের সামনে শিশুর দেহ সহবাসের উপযুক্ত কি না—এই প্রশ্নটি কোনো বিমূর্ত সম্ভাবনা ছিল না; ভয়াবহ শারীরিক ক্ষতির বাস্তব পরিণতি হিসাব করার জন্য তাদের পৃথক আইন তৈরি করতে হয়েছে।
এখানে নৈতিক ও আইনগত কাঠামোর পার্থক্যটি পরিষ্কার। আধুনিক শিশু-সুরক্ষা নীতিতে এমন শারীরিক ঝুঁকির উপস্থিতিই যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু উদ্ধৃত ফিকহি বিধানে শিশুর অক্ষমতা সহবাসকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ করেনি। সহবাস সংঘটিত হওয়ার পরে ক্ষতি কত দূর পর্যন্ত পৌঁছেছে, যোনি ও মলদ্বারের মধ্যকার আড়াল সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে কি না এবং স্বামীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কি না—বিচারটি সেই পর্যায়ে গিয়ে শুরু হয়েছে।
অর্থাৎ এই আইন শিশুটিকে যৌন সহিংসতা থেকে রক্ষা করেনি; তার দেহ কতটা ছিন্নভিন্ন হলে স্বামীর আর্থিক দায় সৃষ্টি হবে, সেটি নির্ধারণ করেছে। শিশুর স্বাধীন সম্মতি, মানসিক পরিপক্কতা এবং নিরাপত্তা এখানে কেন্দ্রীয় বিষয় নয়। কেন্দ্রীয় বিষয় হলো, স্বামীর আইনগত দায় সৃষ্টি হওয়ার মতো যথেষ্ট গুরুতর শারীরিক ক্ষতি ঘটেছে কি না।
উপমহাদেশীয় হানাফি আইন: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী বা আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু হানাফি আলেমের সমন্বয়ে প্রস্তুত একটি বৃহৎ আইনসংকলন। উপমহাদেশের বিচার ও ফতোয়া-ঐতিহ্যে এটি দীর্ঘকাল কর্তৃত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামি ফিকহগ্রন্থ ফতওয়ায়ে আলমগীরী গ্রন্থেও নাবালিকা স্ত্রীর সাথে সহবাস এবং তালাকের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে [21] –
২০. মাসআলা। ‘বাদায়েউস সানায়ে’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, এখনো হায়িয জারি হয়নি এমন নাবালিকা স্ত্রীর সঙ্গে তার স্বামী যদি সহবাস করে থাকে, তবে সে যদি এমন বয়সী হয় যে বয়সী বালিকাদের সাথে সচরাচর সহবাস করা যায়, তবে তালাকের পর তার ইদ্দত হবে তিন মাস। শায়খ আবু আলী নাসাফী (র) বলেন, এই হুকুম তখনই প্রযোজ্য হবে যদি সে ‘মুরাহাকা’ তথা বালিগ হওয়ার কাছাকাছি বয়সে না পৌঁছে থাকে, পক্ষান্তরে সে যদি বালিগ হওয়ার কাছাকাছি বয়সে পৌঁছে তবে আবুল ফযল (র)-এর মতে, তার ইদ্দত মাসের হিসাব অনুসারে সম্পন্ন হবে না। বরং উক্ত সহবাসে তার গর্ভ সঞ্চারিত হয়েছে কিনা তা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তার বিষয়টি মুলতবী থাকবে। (তামারতাশী) কোনো নাবালিকাকে তার স্বামী তালাক দিয়ে দিল, তারপর একদিন কম তিন মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেল, অতঃপর তার হায়িয আসল। তাহলে তিন হায়িয না যাওয়া পর্যন্ত তার ইদ্দত পূর্ণ হবে না। এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে রজয়ী তালাক দেওয়ার পর সে একদিন কম তিন হায়িয ইদ্দত পালন করল। অতঃপর তার স্বামী মারা গেল, তবে তার উপর চার মাস দশ দিনের ইদ্দত পুনরায় ওয়াজিব হবে। (গায়াতুল বয়ান)
২১. মাসআলাঃ কোনো তালাকপ্রাপ্তা মহিলা হায়িয দ্বারা ইদ্দত পালন করতে আরম্ভ করল। তারপর এক হায়িয বা দুই হায়িয এসে তার হায়িয বন্ধ হয়ে গেল, তাহলে ‘আইসা’ হওয়া পর্যন্ত সে ইদ্দত হতে মুক্ত হতে পারবে না। তারপর সে যখন ‘আইসা’ হয়ে যাবে, তখন পুনরায় প্রথম হতে মাসের হিসাব অনুসারে (তিন মাস দ্বারা) ইদ্দত পালন করবে। (ফাতওয়ায়ে কাযীখান) বিবাহিতা দাসীকে তার স্বামী যদি রজয়ী তালাক প্রদান করে তারপর তার ইদ্দতের অবস্থায় মুনিব তাকে আজাদ করে দেয়, তাহলে আজাদীর সময় হতেই তার ইদ্দত পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং তা আজাদ মহিলাদের ইদ্দতের অনুরূপ হবে। অর্থাৎ সে যদি ঋতুমতী মহিলা হয়, তবে তার ইদ্দত হবে তিন হায়িয। আর যদি সে ঋতুমতী না হয় তবে তার ইদ্দত হবে তিন মাস। পক্ষান্তরে স্বামী যদি তাকে বায়িন তালাক প্রদান করে বা তিন তালাক প্রদান করে অথবা স্ত্রীকে রেখে মারা যায় অতঃপর ইদ্দতের অবস্থায় তাকে আজাদ করা হয় তাহলে তার ইদ্দত পরিবর্তিত হয়ে আজাদ স্ত্রীর ইদ্দতের অনুরূপ হবে না। কাজেই তার উপর ওয়াজিব হবে দুই হায়িয অথবা দেড় মাস অথবা দুই মাস, পাঁচ দিনের দ্বারা নিজের অবস্থা অনুসারে ইদ্দত পালন করা। (গায়াতুল বয়ান) কোনো নাবালিকা দাসীকে যদি সহবাসের পর তালাক দেওয়া হয়, তবে তার ইদ্দত দেড় মাস হবে। যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার নিকটে পৌঁছে তার হায়িয এসে যায়, তবে তার ইদ্দত পরিবর্তিত হয়ে তা হায়িযের ইদ্দতে পরিণত হয়ে যাবে। অতএব সে দুই হায়িয দ্বারা ইদ্দত পালন করবে। তারপর হায়িযের ইদ্দত ঘনিয়ে আসলে যদি তাকে আজাদ করে দেওয়া হয়, তবে তার ইদ্দত তিন হায়িয হয়ে যাবে। অতঃপর এই ইদ্দত ঘনিয়ে আসবার পর যদি স্বামী মারা যায়, তাহলে তার ইদ্দত হবে চার মাস দশ দিন। (ইতাবিয়া।)

উদ্ধৃত মাসআলায় এখনো ঋতুস্রাব হয়নি এমন নাবালিকা স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর সহবাসকে ধরে তার তালাক-পরবর্তী ইদ্দতের হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। বালেগ হওয়ার কাছাকাছি হলে গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে। এখানে শিশুবিবাহ কোনো বিমূর্ত অনুমোদন নয়। সহবাস, সম্ভাব্য গর্ভধারণ, তালাক এবং ইদ্দতের ধারাবাহিক আইনগত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে “বিয়ে বৈধ, কিন্তু সহবাসের প্রশ্নই ওঠে না” ধরনের দাবি এই গ্রন্থের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সরাসরি অসত্য।
বাল্যবিবাহ বিষয়ে আলেমদের ইজমা
এই অংশে ইবনে আব্দিল বার, ইমাম মালিক, ইসমাইল ইবনে ইসহাক, ইবনুল মুনযির, ইবনে হাজার এবং ইবনে হাযামের বক্তব্য একত্র করা হয়েছে। তাঁরা বিভিন্ন মাযহাব ও শতাব্দীর আলেম হলেও পিতার মাধ্যমে নাবালিকা কন্যার বিবাহের বৈধতা স্বীকার করেছেন। ইবনে আব্দিল বার, ইসমাইল ইবনে ইসহাক ও ইবনুল মুনযির একে সরাসরি আলেমদের ইজমা বা ঐকমত্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার আরও উল্লেখ করেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহ বৈধ—এমনকি মেয়েটি দোলনায় থাকার মতো ছোট হলেও। নিচে তাঁদের বক্তব্যগুলো দেখা যাক—
ইমাম ইবনে আব্দিল বার রহ. (মৃ: ৪২৩ হি:) লিখেছেন- أجمع العلماء على أن للأب أن يزوج ابنته الصغيرة ولا يشاورها ، لتزويج رسول الله صلى الله عليه وسلم عائشة وهي بنت ست سنين …انتهى – এ ব্যাপারে আলেমগণের ইজমা রয়েছে যে, পিতা তার নাবালেগ বাচ্চার সাথে পরামর্শ না করেও তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারেন। কারণ, রাসুলুল্লাহ হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেছিলেন যখন তার বয়স ছিল ছয় বছর। (আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ১৯/৯৪)
ইমাম মালেক রহ. (মৃ: ১৭৯ হি:) বলেছেন- وإنكاح الأب جائز على الصغار من ولده ، ذكراً كان أو أنثى– পিতার জন্য তার কোনো নাবালেগ বাচ্চার বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয -চাই বাচ্চাটি ছেলে হোক বা মেয়ে। (আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ১৯/৯৮)
ইমাম ইসমাঈল বিন ইসহাক রহ. বলেছেন- والأب له أن يزوج الصغيرة بإجماع من المسلمين– এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ’র ইজমা রয়েছে যে, পিতার জন্য তার নাবালেগ বাচ্চার বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয। (আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ১৯/৮৪)
ইমাম ইবনুল মুনযীর নিশাপুরী রহ. (মৃ: ৩১৮ হি:) বলেছেন- أجمع كل من نحفظ عنه من أهل العلم أن نكاح الأب ابنته الصغيرة جائز إذا زوجها من كفء– এ ব্যাপারে আহলে হক্ব আলেমগণের ইজমা রয়েছে যে, পিতার জন্য তার নাবালেগ বাচ্চার বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয – যদি তিনি কুফু’র সাথে তার বিয়ে দেন। (আত-তামহীদ, ইবনুল বার- ১৯/৮৪; আল-মুগনী, ইবনে কুদামা- ৯/৩৯৮)
ইমাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. (মৃ: ৮৫২ হি:) ইবনুল বাত্তাল রহ.-এর মত উল্লেখ করেছেন- يجوز تزويج الصغيرة بالكبير إجماعاً ، ولو كانت في المهد– (আহলে হক্ব আলেমগণের) সকলের মতে বালেগ ছেলের সাথে নাবালেগা মেয়ের বিয়ে দেয়া জায়েয – এমনকি যদিও সেই মেয়ে অতীব ছোটই হোক না কেনো। (ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৯/১২৩)
ইমাম ইবনে হাযাম রহ. (মৃ: ৪৫৬ হি:) লিখেছেন- الحجة في إجازة إنكاح الأب ابنته الصغيرة البكر ، إنكاح أبي بكر رضي الله عنه النبي صلى الله عليه وسلم من عائشة رضي الله عنها وهي بنت ست سنين– পিতার জন্য তার নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয হওয়ার দলিল হল, হযরত আবু বকর রা. (তাঁর নাবালেগা মেয়ে) হযরত আয়েশাকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন যখন হযরত আয়েশা ছিলেন ছয় বয়সের এক মেয়ে। (আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযাম- ৯/৪৫৮)
ইজমার দাবিগুলোর সাধারণ ভিত্তি হলো আয়িশার ছয় বছর বয়সে বিবাহ। অর্থাৎ নবীর ব্যক্তিগত ঘটনা পরবর্তী ফকিহদের কাছে সাধারণ আইন তৈরির নজির হয়েছে। কুফু, অভিভাবকের পরিচয় বা পরবর্তী বিকল্পের কিছু খুঁটিনাটি নিয়ে মতভেদ থাকলেও মূল অনুমোদনটি অক্ষুণ্ণ। ফিকহি বিতর্কের কেন্দ্র শিশুর স্বাধীন সম্মতি নয়; কোন অভিভাবক কোন শর্তে তাকে বিবাহ দিতে পারে, সেটিই কেন্দ্র।
ইসলাম ওয়েব এর ফতোয়া
ইসলামওয়েব কাতারভিত্তিক একটি বৃহৎ আরবি ইসলামি ফতোয়া ও গ্রন্থভাণ্ডার। সমকালীন সুন্নি প্রশ্নোত্তরে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফতোয়া নম্বর ২৩০৫১৮ সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক কুমারীকে জোর করে বিবাহ দেওয়ার শরিয়তি প্রমাণ আছে কি না।
ইসলাম ওয়েব ডট নেট ইসলাম বিষয়ক ফতোয়ার একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। এই ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে একটি ফতোয়া দেখে নিই, ফতোয়াটি আরবিতে, ইংরেজিও নিচে দেওয়া হচ্ছে (ইংরেজি অনুবাদটি গুগল ট্রান্সলেটর থেকে নেওয়া) [22] –
الدليل على جواز تزويج الأب البنت الصغيرة دون إذنها أو رضاها
رقم الفتوى: 230518
السؤال
هل يوجد دليل في النصوص الشرعية يقول بجواز إجبار البكر الصغيرة على الزواج؟.
الإجابــة
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه، أما بعد:
فقد حكى بعض العلماء الإجماع على أن للأب تزويج ابنته البكر الصغيرة بغير رضاها، ولا يشترط إذنها، ونعني بالصغيرة من ليست بالغة، جاء في المغني لابن قدامة: أما البكر الصغيرة: فلا خلاف فيها، قال ابن المنذر: أجمع كل من نحفظ عنه من أهل العلم أن نكاح الأب ابنته البكر الصغيرة جائز, إذا زوجها من كفء. اهـ.
ومستند هذا الإجماع أن أبا بكر زوج عائشة ـ رضي الله عنها ـ من رسول الله صلى الله عليه وسلم ولم يشاورها، قال ابن عبد البر: أجمع العلماء على أن للأب أن يزوج ابنته الصغيرة ولا يشاورها، لتزويج رسول الله صلى الله عليه وسلم عائشة وهي بنت ست سنين…. اهـ.
ولمزيد الفائدة نرجو مراجعة الفتويين رقم: 223414، ورقم: 172491
والله أعلم.
Evidence that a father may marry off his young daughter without her permission or consent
Fatwa Number: 230518
Publication date: Thursday, 2 Safar 1435 AH — 5 December 2013
Question:
Is there any evidence in the Sharia texts establishing that a young virgin girl may be compelled to marry?
Answer:
Praise be to Allah, and may peace and blessings be upon the Messenger of Allah, his family and his Companions.
Some scholars have reported a consensus that a father may marry off his young virgin daughter without her consent and that her permission is not required. By “young” we mean a girl who has not reached puberty. Ibn Qudamah states in Al-Mughni: “As for the young virgin, there is no disagreement concerning her. Ibn al-Mundhir said: Every scholar from whom we have preserved knowledge unanimously agrees that a father’s marriage of his young virgin daughter is valid when he marries her to a compatible match.” End quote.
The basis of this consensus is that Abu Bakr married his daughter Aisha, may Allah be pleased with her, to the Messenger of Allah, peace and blessings be upon him, without consulting her. Ibn Abd al-Barr said: “The scholars unanimously agree that a father may marry off his young daughter without consulting her, because the Messenger of Allah, peace and blessings be upon him, married Aisha when she was six years old.” End quote.
For further information, please refer to Fatwas No. 223414 and No. 172491.
Allah knows best.
ফতোয়াটি “ছোট মেয়ে” বলতে কাকে বোঝাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। আরবি উত্তরে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এখানে সাগিরা বলতে এমন মেয়েকে বোঝানো হচ্ছে, যে এখনো বালেগ হয়নি। পিতা তাকে তার সম্মতি ছাড়াই বিবাহ দিতে পারে এবং বিবাহের জন্য তার অনুমতি নেওয়াও শর্ত নয়। অর্থাৎ মেয়েটির সম্মতি অনুপস্থিত হলেও বিবাহের বৈধতায় কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয় না; বরং অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণেই তার সম্মতিকে আইনগতভাবে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা হয়েছে।
ফতোয়ার দলিল দুটি। প্রথমত, ইবনুল মুনযির ও ইবনে আব্দিল বারের নামে আলেমদের ইজমা বা ঐকমত্যের দাবি। দ্বিতীয়ত, আবু বকর আয়িশাকে ছয় বছর বয়সে মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে পরামর্শ করেননি—এই ঘটনা। ফলে আয়িশার বিবাহকে এখানে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত বা ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। সেটিকে সাধারণ মুসলিম পিতার জন্য নাবালিকা কন্যাকে তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ দেওয়ার শরিয়তি নজিরে পরিণত করা হয়েছে।
এই ফতোয়ার কাঠামোয় শিশুর ইচ্ছা, ভয়, মানসিক প্রস্তুতি বা ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর বিবাহের প্রভাব কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। আলোচনা সীমাবদ্ধ থেকেছে পিতার ক্ষমতা এবং প্রস্তাবিত স্বামীকে উপযুক্ত বা কুফু মনে করা হয়েছে কি না—এই প্রশ্নে। অর্থাৎ বিবাহের সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি যে শিশুকে বহন করতে হবে, আইনগত সিদ্ধান্তে সেই শিশুই কার্যত অনুপস্থিত।
এটি প্রমাণ করে যে সম্মতিবিহীন শিশুবিবাহের বিধান কোনো পরিত্যক্ত মধ্যযুগীয় অনুচ্ছেদ নয়; সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠান এখনো একই বিধানকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ বলে প্রচার করছে। প্রযুক্তি ও প্রকাশনার মাধ্যম আধুনিক হয়েছে, কিন্তু শিশুর ওপর অভিভাবকের জবরদস্তিমূলক কর্তৃত্বের আইনটি বদলায়নি।
সৌদি সরকারি ও গ্র্যান্ড মুফতির ফতোয়া
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি দেশটির সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্তৃপক্ষগুলোর একটি। ফতোয়া নম্বর ১৮৭৩৪-এ কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ ইবনে বাজসহ শীর্ষ আলেমেরা নির্ধারণ করেছেন, আয়িশার অল্প বয়সে বিবাহ ও সহবাস নবীর বিশেষ সুবিধা ছিল কি না এবং সাধারণ মুসলমানের জন্য একই বিধান প্রযোজ্য কি না।
সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত সরাসরি সরকারি ওয়েবসাইটে এই ফতোয়া পরিষ্কারভাবে দেওয়া হয়েছে যে, বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ হালাল, সহবাসও হালাল এবং তা শুধু নবীর জন্যেই নয়, সকলের জন্যেই হালাল। এই ফতোয়াটিতে সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির তৎকালীন শীর্ষ আলেমবৃন্দের স্বাক্ষর রয়েছে; তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাজ, তৎকালীন ডেপুটি চেয়ারম্যান শায়েখ আবদুল আজিজ আল আল-শায়েখ এবং কমিটির সদস্য শায়েখ সালিহ আল-ফাওযান। আসুন সেটিও দেখে নিই- [23]
The first question of Fatwa no. 18734
Q 1: Is it true that the Prophet’s marriage to `A’ishah while still young was one of his particularities or was it a legislation for the whole Ummah?
Is it permissible to consummate marriage with immature girl? If not, how then should she observe three months as `Iddah (waiting period)?
A: The Prophet (peace be upon him) betrothed `Aishah (may Allah be pleased with her) while she was six years old. He consummated the marriage in Al-Madinah when she was nine years old. Actually, this was not a ruling exclusive to him. Therefore, it is permissible to contract the marriage of an immature girl and to consummate the marriage even before puberty if she is physically able.
(Part No. 18; Page No. 125)
As for the `Iddah of an immature girl, Allah (Glorified and Exalted be He) defined the `Iddah of those who have passed the age of monthly courses and those who are still immature to be three months. Allah (Exalted be He) said, And those of your women as have passed the age of monthly courses, for them the ‘Iddah (prescribed period), if you have doubt (about their periods), is three months; and for those who have no courses (i.e. they are still immature) In fact, immature girls are included under the category: …and for those who have no courses (i.e. they are still immature) their ‘Iddah (prescribed period) is three months likewise, except in case of death). May Allah grant us success. May peace and blessings be upon our Prophet Muhammad, his family, and Companions.
The Permanent Committee for Scholarly Research and Ifta’
Member: Bakr Abu Zayd Member: Salih Al-Fawzan Deputy Chairman: `Abdul-`Aziz Al Al-Shaykh Chairman:`Abdul-`Aziz ibn `Abdullah ibn Baz

সৌদি আলেম সালেহ আল-ফাওযানের মুমিন নারীদের বিশেষ বিধান গ্রন্থটির বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করেছে ইসলাম হাউস; অনুবাদ করেছেন সানাউল্লাহ নজির আহমেদ এবং সম্পাদনা করেছেন ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া। এবার পৃষ্ঠা ৯৫–৯৬-এ নাবালিকার বিবাহ ও সম্মতি সম্পর্কে লেখকের বক্তব্য দেখা যাক।
বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর অনুমতি গ্রহণ করা
বিয়ের উপযুক্ত নারী তিন প্রকার:
ক. নাবালিকা অবিবাহিত কিশোরী।
খ. সাবালিকা অবিবাহিত নারী।
গ. বিবাহিতা নারী।
প্রত্যেক প্রকার নারীর জন্য রয়েছে পৃথক বিধান।
১. নাবালিকা ছোট বাচ্চাকে বাবা তার অনুমতি ছাড়াই বিয়ে দিবে, এতে কারো দ্বিমত নেই। কারণ, সে এখনো অনুমতির মালিক হয় নি। দ্বিতীয়ত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নিজের ছোট মেয়ে আয়েশাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বিয়ে দিয়েছেন, যখন তার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর, নয় বছর পূর্ণ হলে তাকে বাসর ঘরে প্রেরণ করেন।
ইমাম শাওকানী রহ. ‘নাইলুল আওতার’: (৬/১২৮, ১২৯) গ্রন্থে বলেন: “এ
হাদীস প্রমাণ করে যে, বাবার জন্য নিজের মেয়েকে সাবালক হওয়ার পূর্বেই বিয়ে দেওয়া জায়েয। তিনি আরও বলেন: এ হাদীস প্রমাণ করে ছোট মেয়েকে বড়দের সাথে বিয়ে দেওয়া বৈধ। ইমাম বুখারী এ মাস’আলার জন্য একটি অধ্যায় রচনা করে তাতে তিনি আয়েশার হাদীস উল্লেখ করেছেন। ইবন হাজার আসকালানী রহ. ‘ফাতহুল বারী’তে এ মাস’আলায় উম্মতের ঐকমত্য বর্ণনা করেছেন।” সমাপ্ত।
ইবন কুদামাহ ‘আল-মুগনি’: (৬/৪৮৭) গ্রন্থে বলেন: ইবনুল মুনযির বলেছেন:
যাদের ইলম আমরা অর্জন করেছি, তারা সবাই একমত যে, বাবার জন্য নিজের
ছোট মেয়েকে বিয়ে দেওয়া বৈধ, যদি সমমর্যাদা সম্পন্ন পুরুষের নিকট বিয়ে
আমি (গ্রন্থকার) বলছি: আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নিজের ছোট মেয়ে আয়েশাকে মাত্র ছয় বছর বয়সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বিয়ে দেন, এ ঘটনা তাদেরকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে, যারা বড় ছেলের নিকট ছোট মেয়ের বিয়েকে অস্বীকার করে, বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং অপরাধ গণ্য করে। এটি হয়তো তাদের মূর্খতা কিংবা তারা স্বার্থান্বেষী ও বিজাতীয় ষড়যন্ত্রের একটা অংশ।
২. সাবালিকা অবিবাহিত নারীকে তার অনুমতি ব্যতীত বিয়ে দেওয়া যাবে না, তবে চুপ থাকাই তার অনুমতি। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
ولا تنكح البكر حتى تستأذن، قالوا: يا رسول الله فكيف إذنها ؟ قال: أن تسكت
“বাকেরা (অর্থাৎ সাবালিকা অবিবাহিতা) মেয়েকে তার অনুমতি ব্যতীত বিয়ে দেওয়া যাবে না, তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল, তার অনুমতির পদ্ধতি কী? তিনি বলেন: তার চুপ থাকা”।
অতএব, বিয়েতে তার অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন, যদিও তাকে বিয়ে দেয় তার বাবা, আলেমদের দু’টি মত থেকে এটিই অধিক বিশুদ্ধ।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ‘আল-হাদইউন নববী’: (৫/৯৬) গ্রন্থে বলেন: “জমহুর সালাফের অভিমত এটিই। ইমাম আবু হানিফার মাযহাব ও ইমাম আহমদের একটি মত এরূপ। এ অভিমত মোতাবেক আমরা আল্লাহর ইবাদত আঞ্জাম দেই, তার বিপরীত বিশ্বাস করি না। এটিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ ও নির্দেশ মোতাবেক ফয়সালা”। সমাপ্ত।
৩. বিবাহিতা নারী স্বামীশূণ্যা হলে তাকে তার অনুমতি ব্যতীত বিয়ে দেওয়া
1 সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮৪৩; তিরমিযী, হাদীস নং ১১০৭; নাসাঈ, হাদীস নং ২২৬৫; আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৯২; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৮৭১; আহমদ (২/৪২৪); দারেমী,
হাদীস নং ১১৮৬


সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির উত্তর দ্ব্যর্থহীন। প্রথমে তারা আয়িশার ছয় বছর বয়সে বিবাহ এবং নয় বছর বয়সে সহবাসের বর্ণনা পুনরুল্লেখ করেছে। এরপর স্পষ্টভাবে বলেছে, এই ঘটনা মুহাম্মদের জন্য নির্ধারিত কোনো বিশেষ বিধান ছিল না। অর্থাৎ সাধারণ মুসলমানের ক্ষেত্রেও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহ সম্পাদন এবং তাকে সক্ষম মনে করা হলে বয়ঃসন্ধির আগেই তার সঙ্গে সহবাস বৈধ।
কমিটি এই সিদ্ধান্তের কোরআনিক ভিত্তি হিসেবে সরাসরি সূরা তালাক ৬৫:৪ ব্যবহার করেছে। তাদের ব্যাখ্যায় “যাদের ঋতুস্রাব হয়নি” বলতে এখনো পরিণত হয়নি এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বোঝানো হয়েছে এবং তাদের ইদ্দত তিন মাস। প্রশ্নটির মধ্যেই যুক্তিটি উত্থাপিত হয়েছিল: অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে সহবাস বৈধ না হলে তার তিন মাসের ইদ্দত কীভাবে আসবে? কমিটির উত্তর এই যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং সহবাসের বৈধতা নিশ্চিত করে সেটিকেই সমর্থন করেছে।
এরপর সালেহ আল-ফাওযানের গ্রন্থে নাবালিকা শিশুর সম্মতির প্রশ্ন আরও পরিষ্কার হয়েছে। তিনি বলেছেন, পিতা নাবালিকা মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়াই বিবাহ দেবে এবং এতে কারও দ্বিমত নেই। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, শিশুটি এখনো “অনুমতির মালিক হয়নি”। অর্থাৎ সম্মতি গ্রহণ করা অসম্ভব বলে বিবাহ স্থগিত রাখা হয়নি; বরং সম্মতি দেওয়ার ক্ষমতা নেই—এই কারণেই তাকে বাদ দিয়ে অভিভাবককে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে।
এখানে শিশুর সম্মতির অনুপস্থিতি বিবাহ বাতিল করার কারণ নয়; সম্মতিবিহীন বিবাহ কার্যকর করার শরিয়তি ভিত্তি। সৌদি স্থায়ী কমিটি বিবাহ ও বয়ঃসন্ধির আগের সহবাসকে বৈধ করেছে, আর আল-ফাওযান শিশুর অনুমতি ছাড়াই সেই বিবাহ সম্পাদনের পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে বিবাহচুক্তি, সম্মতির অনুপস্থিতি এবং বয়ঃসন্ধির আগের সহবাস—তিনটি বিষয়ই একই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে অনুমোদিত হয়েছে।
অল্পবয়সে বিয়ের জন্য প্রতারণার ফতোয়া
ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাতের এই প্রশ্নোত্তর দেখায়, শিশুবিবাহের শরিয়তি অনুমোদন আধুনিক বাংলাদেশের আইনের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়লে একটি ফতোয়া কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রশ্নটি ছিল চৌদ্দ বছরের মেয়েকে সরকারি নথিতে আঠারো দেখিয়ে বিবাহ দেওয়া যাবে কি না।
উপরের তথ্যসূত্রগুলো থেকে এটি খুবই পরিষ্কার যে, ইসলাম অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়া উৎসাহিত করে। ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত নামক ফিকাহ গ্রন্থে এটিও বলা আছে যে, ইসলাম শুধু অল্প বয়সে বিয়েকেই জায়েজ নয়, এর জন্য বাংলাদেশের আইন লঙ্ঘন করে মিথ্যা বলাও জায়েজ আছে [24] –
আইনি ঝামেলা এড়ানোর জন্য বয়স বাড়িয়ে লেখা
প্রশ্ন: বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সের কমে কোনো মেয়েকে বিবাহ দেওয়া নিষিদ্ধ। অথচ শরয়ী আইন অনুযায়ী বিবাহে আবদ্ধ করানো জায়েয আছে। শরীয়ত অনুযায়ী বিবাহ দিলে অনেক সময় সরকারিভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। প্রশ্ন হলো, সরকারি হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে সরকারি খাতায় ১৮ বছর লিখিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা জায়েয হবে কি না?
উত্তর: ইসলামী শরীয়ত মেয়ের অভিভাবকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে যে মেয়ে বিবাহের উপযুক্ত হওয়ামাত্রই যেন তাড়াতাড়ি বিবাহ দেওয়া হয়। এর বিপরীতে কেউ যদি চাপ সৃষ্টি করে তাহলে জুলুম বা অন্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। শরীয়তের বিধান মানতে গিয়ে জুলুম বা অন্যায় থেকে বাঁচার যেকোনো পদ্ধতি অবলম্বন করার অবকাশ আছে।
(১৬/৪৭৯/৬৬১৮)
شعب الإيمان دار الكتب العلمية) ٦/ ٤٠١ (٨٦٦٦) : عن أبي سعيد، وابن عباس قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ” من ولد له ولد فليحسن اسمه وأدبه، فإذا بلغ فليزوجه فإن بلغ ولم يزوجه فأصاب إثما، فإنما إثمه على أبيه “.

প্রশ্নটিতে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। চৌদ্দ বছর বয়সী একটি মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার জন্য সরকারি নথিতে তার বয়স আঠারো বছর দেখানো যাবে কি না, সেটিই সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল। উত্তরেও বয়স সংশোধনের বৈধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আদালতের অনুমতি কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনি ছাড়ের কথা বলা হয়নি। বরং আঠারো বছরের নিচে বিবাহ নিষিদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় আইনকে শরিয়তের পথে বাধা এবং জুলুম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ফতোয়াটি বলেছে, শরিয়তের বিধান পালন করতে গিয়ে এই জুলুম থেকে বাঁচার জন্য “যেকোনো পদ্ধতি” গ্রহণের অবকাশ আছে। প্রশ্নের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এই উত্তরের অর্থ পরিষ্কার: চৌদ্দ বছর বয়সী মেয়েকে সরকারি কাগজে আঠারো বছর দেখিয়ে বিবাহ নিবন্ধন করা বৈধ। অর্থাৎ সরকারি নথিতে জেনে-শুনে মিথ্যা তথ্য প্রদান, শিশুর প্রকৃত বয়স গোপন এবং রাষ্ট্রীয় আইনকে প্রতারণার মাধ্যমে অকার্যকর করার ধর্মীয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এই ফতোয়ার নৈতিক বিকৃতি শুধু মিথ্যা বলার অনুমতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুবিবাহবিরোধী বয়সসীমা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শারীরিক নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ এবং স্বাধীন ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। বয়স জালিয়াতি করলে রাষ্ট্র, বিদ্যালয়, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং শিশু-সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান মেয়েটির প্রকৃত অবস্থা জানতে পারে না। ফলে যে আইন শিশুটিকে রক্ষার জন্য তৈরি, ধর্মীয় নির্দেশের নামে সেই আইনকেই অন্ধ করে দেওয়া হয়।
এটি শুধু শিশুবিবাহকে বৈধ বলা নয়; শিশুকে রক্ষার আইন অকার্যকর করতে পরিকল্পিত প্রতারণার ধর্মীয় অনুমোদন। এই ফতোয়া দেখায়, প্রাচীন ফিকহি বিধান বর্তমান সমাজে নিছক বইয়ের পাতায় পড়ে নেই। সেই বিধান রক্ষার জন্য আধুনিক রাষ্ট্রের আইন ভাঙা, শিশুর বয়স গোপন করা এবং সরকারি নথিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়াকেও বৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে।
আয়াতদ্বয়ের সম্মিলিত যুক্তি
সূরা আহযাব ৩৩:৪৯ এবং সূরা তালাক ৬৫:৪-কে আলাদা করে পড়লে মূল আইনগত সম্পর্ক আড়াল করা যায়। প্রথম আয়াতটি একটি নেতিবাচক শর্ত স্থাপন করেছে: সহবাসের আগে তালাক হলে ইদ্দত নেই। দ্বিতীয় আয়াতটি ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর জন্য তিন মাসের ইদ্দত নির্ধারণ করেছে। অতএব দ্বিতীয় আয়াতের বিধান এমন বিবাহের কথা বলছে, যেখানে সহবাস বা শরিয়তে তার সমতুল্য নির্জনবাস ঘটেছে।
যুক্তিটির রূপ হলো: সহবাস না হলে ইদ্দত নেই; ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন স্ত্রীর ইদ্দত আছে; অতএব ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসকে কোরআনিক আইন ধরে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিটি ধাপ কোরআনের আয়াত, তাফসীর ও ফিকহি প্রয়োগে উপস্থিত।
“যারা ঋতুমতী হয়নি” কথাটির ঐতিহ্যগত অর্থ
আরবি বাক্যাংশ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ আক্ষরিকভাবে “এবং যারা ঋতুমতী হয়নি”। শব্দগুচ্ছটি নিজে সব সম্ভাব্য কারণের তালিকা দেয় না; কিন্তু প্রাচীন তাফসীরগুলো এর অন্তর্ভুক্ত প্রধান শ্রেণি হিসেবে অল্পবয়স্ক মেয়েদের চিহ্নিত করেছে। তাবারি ব্যাখ্যা করেছেন, এটি অল্প বয়সের কারণে ঋতুস্রাব না-হওয়া মেয়েদের কথা এবং স্বামীরা সহবাসের পর তালাক দিলে তাদের ইদ্দত তিন মাস [25]। ইসলামওয়েবও স্বীকার করেছে, আয়াতটি বয়ঃসন্ধির নিচে থাকা মেয়ের বিবাহের বৈধতা এবং স্বামী সহবাস করলে মাসের হিসাবে তার ইদ্দত প্রমাণ করে [26]।
রোগ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা বিলম্বিত ঋতুস্রাবের নারীও কোনো কোনো ফিকহি আলোচনায় এই বিধানের আওতায় আসতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বাদ দেওয়া যায় না। একটি সাধারণ বিধানে একাধিক শ্রেণি থাকতে পারে; অন্য শ্রেণির উপস্থিতি শিশুর শ্রেণিটিকে বাতিল করে না। তাবারি, ইবনে কাসীর, জালালাইন, মাযহারী, জাস্সাস, মওদুদী ও তাকি উসমানীর বক্তব্যে অল্পবয়স্ক বা নাবালিকা মেয়ের উল্লেখ প্রত্যক্ষ।
বিবাহচুক্তি ও সহবাসকে আলাদা করে প্রতিরক্ষার সমস্যা
আধুনিক আত্মপক্ষসমর্থনে প্রায়ই বলা হয়, ইসলাম হয়তো অল্পবয়স্কের বিবাহচুক্তি অনুমোদন করেছে, কিন্তু সহবাস অনুমোদন করেনি। এই দাবি সূরা আহযাবের ইদ্দত-নীতি, মওদুদীর “নির্জনবাস এবং মেলামেশা”, মা‘আরিফুল কোরআনের “সহবাসের পরে”, ফিকহুস সুন্নাহর শারীরিক ক্ষতির বিধান এবং সৌদি স্থায়ী কমিটির “বয়ঃসন্ধির আগেই” সহবাসের ঘোষণার সামনে টেকে না।
ফিকহে “সহবাসে সক্ষমতা” কোনো নির্দিষ্ট বয়স, স্বাধীন সম্মতি, মানসিক পরিপক্কতা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিরাপত্তা-মানদণ্ড নয়। এটি অভিভাবক, স্বামী বা বিচারকের মূল্যায়ননির্ভর অস্পষ্ট শর্ত। এমন শর্ত শিশু অধিকার রক্ষা করে না; বরং বয়সসীমাহীন সহবাসকে বৈধ রেখে ক্ষতি ঘটার পর দায় বা ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন তোলে।
উৎসসমূহের সম্মিলিত সাক্ষ্য
| উৎসের স্তর | যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে |
|---|---|
| কোরআন | ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর তিন মাসের ইদ্দত |
| সহিহ বুখারি | আয়াতটিকে ছোট মেয়ের বিবাহের দলিল এবং আয়িশার ঘটনাকে তার প্রয়োগ হিসেবে স্থাপন |
| তাফসীর | “যারা ঋতুমতী হয়নি” শ্রেণির মধ্যে অল্পবয়স্ক বা নাবালিকা মেয়ের অন্তর্ভুক্তি |
| ফিকহ | অভিভাবকের মাধ্যমে নাবালিকার বিবাহ, সহবাস-পরবর্তী ইদ্দত এবং ক্ষতিপূরণের বিধান |
| ইজমার দাবি | পিতার নাবালিকা কন্যাকে সম্মতি ছাড়াই বিবাহ দেওয়ার ব্যাপক স্বীকৃতি |
| আধুনিক ফতোয়া | বিধানটি নবীর বিশেষত্ব নয় এবং আজও সাধারণভাবে বৈধ বলে ঘোষণা |
এই উৎসগুলো স্বাধীনভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি; তারা একটি ধারাবাহিক ধর্মীয় আইনব্যবস্থার স্তর। কোরআনের আয়াতকে বুখারি নির্দিষ্ট অধ্যায়ে প্রয়োগ করেছেন, তাফসীরকারেরা তার অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন, ফকিহরা তা থেকে বিস্তারিত আইন তৈরি করেছেন এবং আধুনিক ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সেই আইন পুনর্ব্যক্ত করেছে। তাই বিষয়টিকে একটি ভুল অনুবাদ বা বিচ্ছিন্ন মধ্যযুগীয় মত বলে উড়িয়ে দেওয়া তথ্যগতভাবে মিথ্যা।
নৈতিক ও মানবাধিকারগত মূল্যায়ন
একটি শিশু বিবাহ, যৌনসম্পর্ক, গর্ভধারণ, তালাক ও আজীবন পারিবারিক নির্ভরতার পরিণতি বুঝে স্বাধীন ও অবহিত সম্মতি দিতে পারে না। পিতা বা অভিভাবকের সম্মতি শিশুর নিজের সম্মতির বিকল্প নয়। শিশু বিবাহ বলতে আঠারো বছরের কম বয়সী কারও আনুষ্ঠানিক বিবাহ বা অনানুষ্ঠানিক দাম্পত্যকে বোঝায় এবং ইউনিসেফ একে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে [27]। ঋতুস্রাব শুরু হওয়া বা যৌনাঙ্গ সহবাস সহ্য করতে পারবে বলে কারও অনুমান মানসিক পরিপক্কতা, সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা কিংবা নিরাপত্তার প্রমাণ নয়।
এই কারণে আধুনিক শিশু অধিকার ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডে শিশুবিবাহ এবং শিশুর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক শোষণ ও সহিংসতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ১০–১৯ বছর বয়সী মায়েরা ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের তুলনায় এক্ল্যাম্পসিয়া, প্রসবোত্তর জরায়ুর সংক্রমণ ও সিস্টেমিক সংক্রমণের বেশি ঝুঁকিতে থাকেন; তাঁদের শিশুদেরও কম জন্মওজন, সময়ের আগে জন্ম ও গুরুতর নবজাতকীয় জটিলতার ঝুঁকি বেশি [28]। কোনো ধর্মগ্রন্থ, নবীর নজির, মাযহাবি ঐকমত্য বা ফতোয়া ক্ষতিকর কাজকে নৈতিক করে না। প্রাচীন উৎস কী অনুমোদন করেছে, সেটি ঐতিহাসিক সত্যের প্রশ্ন; সেই অনুমোদন ন্যায়সংগত কি না, সেটি যুক্তি, ক্ষতি, অধিকার ও সম্মতির প্রশ্ন।
উপসংহার
উপস্থাপিত দলিলসমূহ থেকে সিদ্ধান্ত স্পষ্ট। সূরা তালাক ৬৫:৪ ঋতুস্রাব শুরু হয়নি এমন স্ত্রীর ইদ্দত নির্ধারণ করেছে; সূরা আহযাব ৩৩:৪৯ অনুযায়ী সেই ইদ্দত সহবাস বা তার আইনগত সমতুল্য সম্পর্কের পরেই প্রযোজ্য। সহিহ বুখারি আয়াতটিকে ছোট মেয়ের বিবাহের অধ্যায়ে ব্যবহার করেছে। ধ্রুপদি ও আধুনিক তাফসীর অল্পবয়স্ক মেয়েকে আয়াতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফিকহি গ্রন্থগুলো বিবাহ, অভিভাবকের জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা, সহবাস, তালাক, ইদ্দত, গর্ভধারণ ও শারীরিক ক্ষতির বিস্তারিত বিধান নির্মাণ করেছে। আধুনিক ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও একই বৈধতা পুনর্ব্যক্ত করছে।
অতএব কোরআন ও ইসলামি আইনশাস্ত্রে শিশুবিবাহের অনুমোদন নেই বলে দাবি করা মিথ্যা। প্রকৃত বিতর্ক আয়াত ও ঐতিহ্য কী বলেছে তা নিয়ে নয়; আধুনিক শিশু অধিকার, বৈধ সম্মতি ও মানবিক নৈতিকতার সামনে সেই বিধান গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে। প্রমাণগুলো দেখায়, এই বিধান শিশুর অধিকারকে নয়, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও অভিভাবকের কর্তৃত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
- শিশুবিবাহ, বয়ঃসন্ধি ও প্রাপ্তবয়স্কতা: সংজ্ঞা, সম্মতি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ↩︎
- বিবাহ ও সহবাসের সময় আয়িশার বয়স: হাদিস ও ফিকহের পূর্ণ প্রমাণ ↩︎
- সুরা ৩৩:৪৯ ↩︎
- সুরা ৬৫:৪ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫১৩৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৭৫৭ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, একাদশ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১৬৩ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ষষ্ঠ খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ৫৮৮ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫৬২, ৫৬৩ ↩︎
- মা’আরিফুল কোরআন, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৮১, ৪৮৩ ↩︎
- তাফহীমুল কুরআন, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী ↩︎
- মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী, তাওযীহুল কুরআন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৭ ↩︎
- আহকামুল কুরআন, ইমাম আহমাদ ইবনে আলী আবূ বকর আর-রায়ী আল-যাস্সাস, অনুবাদঃ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৫ ↩︎
- আহকামুল কুরআন, ইমাম আহমাদ ইবনে আলী আবূ বকর আর-রায়ী আল-যাস্সাস, অনুবাদঃ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, খায়রুন প্রকাশনী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩১ ↩︎
- আহকামুল হাদীস, লেখকঃ মাওলানা মোঃ কামরুল হাসান, সম্পাদকঃ ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, রিয়াদ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৭৪, ৪৭৫, ৫৬১ ↩︎
- আল হিদায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ২০১ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, তৃতীয় খণ্ড, মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫৭৬ ↩︎
- বোখারী শরীফ—বাংলা তরজমা ও ব্যাখ্যা, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৯৬–১৯৭ ↩︎
- ফিকাহুস সুন্নাহ, ২য় খণ্ড, সাইয়েদ সাবিক, শতাব্দী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৬৬ ↩︎
- ফিকাহুস সুন্নাহ, ২য় খণ্ড, সাইয়েদ সাবেক, শতাব্দী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৬৩ ↩︎
- ফতওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৯ ↩︎
- الدليل على جواز تزويج الأب البنت الصغيرة دون إذنها أو رضاها رقم الفتوى: 230518 ↩︎
- It is permissible to contract the marriage of an immature girl and consummate it ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত, ষষ্ঠ খণ্ড, ফকীহুল মিল্লাত ফাউন্ডেশন, ফকীহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান, পৃষ্ঠা ৪২ ↩︎
- তাফসীরে তাবারি, সূরা তালাক ৬৫:৪ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১০৯৭৯৮ ↩︎
- ইউনিসেফ: শিশু বিবাহ ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: কিশোরী গর্ভাবস্থা ↩︎

