জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

কোরআনে একেশ্বরবাদ বনাম বহু-সত্তার প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতি

প্রকাশিত: আগস্ট 13, 2025 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 45 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলাম নিজেকে একটি কঠোর একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে, যার মূল ভিত্তি হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ – অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই বা উপাসনা পাওয়ার যোগ্য আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। এই বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক ভিত্তি এবং এর ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু, যা এক আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা ও একমাত্র উপাস্য হওয়ার উপর জোর দেয়। তবে, কোরআনের কিছু আয়াত এবং তাদের ধ্রুপদী ব্যাখ্যার গভীর পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ইসলামের দাবী আল্লাহ ব্যতীত “উপাস্য কেউ না থাকলেও” অন্য ঐশ্বরিক সত্তার অস্তিত্বের প্রতি এক ধরনের কার্যকর (functional) বা অস্তিত্বগত (ontological) সম্মতির সন্ধান পাওয়া যায়। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো কোরআনের এমন কিছু বক্তব্য বিশ্লেষণ করা, যা একদিকে একেশ্বরবাদের কথা বললেও বহু ঐশ্বরিক সত্তার শাস্তি, বিচার এবং চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের প্রচ্ছন্ন অস্তিত্বকে মেনে নেয়। বিশেষত, সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১৪) এর মতো আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত ভাষা, যেখানে আল্লাহকে ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা একটি স্পষ্ট ধারনা তৈরি করে এবং একাধিক ঐশ্বরিক বা অলৌকিক সত্তার ধারণাকে ইঙ্গিত করে, যা ইসলামের কঠোর একত্ববাদী ভাষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই প্রবন্ধে আমরা এই আয়াতগুলোর ভাষাতাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বৈপরীত্য, আরবের পৌত্তলিক ধর্মীয় পরিবেশ, কোরআনে বাস্তব জিন-শয়তানকে উপাস্য হিসেবে উপস্থাপনের বর্ণনা, আল্লাহর নিজের জন্য একবচন “আমি” ও বহুবচন “আমরা”-র পরিবর্তনশীল ব্যবহার, প্রাচীন সেমিটিক দেবসভার ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং‘স্যাটানিক ভার্সেস’ এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করব। একই সঙ্গে দেখা হবে, কঠোর একেশ্বরবাদের ঘোষণা সত্ত্বেও কোরআনের ভাষা ও কাহিনির মধ্যে কেন এমন বহু উপাদান রয়ে গেছে, যেগুলো আরও পুরনো বহু-দেবতাভিত্তিক ও দেবসভাকেন্দ্রিক সেমিটিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বহন করে। পরিশেষে, এই সমস্ত উপাদান কীভাবে ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের মৌলিকতা ও অভ্রান্ততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সে বিষয়ে একটি সমন্বিত চিত্র উপস্থাপন করা হবে।


কোরআনের অভ্যন্তরীণ সাংঘর্ষ: ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা’ বনাম একচ্ছত্র একত্ব

কোরআন নিজেকে একটি পরিপূর্ণ ও স্ববিরোধহীন গ্রন্থ হিসেবে দাবি করলেও, এর কিছু আয়াত একে অপরের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলির একটি হলো সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১৪) যেখানে বলা হয়েছে, [1]

“فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ” “অতএব, বরকতময় আল্লাহ, যিনি সর্বোত্তম স্রষ্টা।”

ভিন্ন অনুবাদে, [1]

“فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ”
“সুতরাং ধন্য মহান আল্লাহ, যিনি সৃষ্টিকর্তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।”

এই আয়াতের দুটি শব্দ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: “الخالقين” (al-khāliqīn) বহুবচন—“স্রষ্টাগণ” বা “সৃষ্টিকারীরা”; আর “أحسن” (aḥsanu) তুলনামূলক ও সর্বোচ্চতার অর্থ প্রকাশ করে—“উত্তম”, “শ্রেষ্ঠ” বা “সর্বোত্তম”। ফলে “أحسن الخالقين” বাক্যে আল্লাহকে ব্যাকরণগতভাবে একদল খালিক-এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। সমস্যাটি আরও প্রকট হয় যখন একই কোরআন অন্যত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সৃষ্টিক্ষমতাই অস্বীকার করে। তাই ধ্রুপদী তাফসিরে খালিক শব্দটির অর্থ বদলে অন্যদের ক্ষেত্রে “পরিকল্পনাকারী”, “রূপদাতা” বা “নির্মাতা” করা হয়েছে, আর আল্লাহর ক্ষেত্রে রাখা হয়েছে প্রকৃত অস্তিত্বদাতা অর্থে। ফখরুদ্দীন আল-রাযী পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, আয়াতটির বাহ্যিক অর্থে একাধিক খালিক-এর ধারণা উপস্থিত—“ظاهر الآية يقتضي أنه سبحانه أحسن الخالقين الذين هم جمع”[2]

  • “আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা।” – সূরা জুমার (৩৯ঃ৬২)
  • “আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো স্রষ্টা কি আছে?” – সূরা ফাতির (৩৫ঃ৩)
  • “তারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং নিজেরাই সৃষ্ট।” – সূরা নাহল (১৬ঃ২০)

যদি আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা হন এবং অন্য কোনো স্রষ্টা না থাকে, অন্য কোন দেবদেবী বা গডস না থাকে, তাহলে আল্লাহর নিজেকে ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা’ বলার কোনো অর্থ থাকে না; এবং সেখানে এই ধরণের তুলনার প্রশ্নই ওঠে না। এই বৈপরীত্য ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের একত্ববাদের দাবির মৌলিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনেক ইসলামি ভাষ্যকার এই আয়াতটিকে নিছক একটি ভাষাগত অলংকার বা কাব্য সৌন্দর্য্য হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তবে, এমন অলংকার যদি ঈশ্বরতত্ত্বে মৌলিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তবে সেটিকে ঈশ্বরপ্রদত্ত ‘সর্বশ্রেষ্ঠ, নিখুঁত ও স্বচ্ছ ভাষা’ বলা যায় না, বিশেষ করে যখন কুরআন নিজেই দাবি করে: “এই কিতাবের আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাযুক্ত এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুস্পষ্ট ভাষায় নাজিল করা হয়েছে।” [3]। যে ঈশ্বরের বাণী এমন ভাষায় রচিত, যার অর্থ বোঝাতে বহু শতকের শত শত তাফসিরকারের সাহায্য নিতে হয়, সেই ভাষাকে কি আসলেই ‘সুস্পষ্ট’ বলা যায়? এই ভাষাগত দ্ব্যর্থতা কি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে কাম্য?


মানুষ ও জ্বীনদের তুলনায় আল্লাহ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্তা?

ক্লাসিকাল তাফসিরকারকগণ, বিশেষত আল-তাবারী ও আল-করতুবি, কোরআনের “আহসানুল খালিকীন” (সর্বোত্তম স্রষ্টা) আয়াতের ব্যাখ্যায় “খালিক” শব্দটির ব্যপ্তি প্রসারিত করার চেষ্টা করেছেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “স্রষ্টা” কেবল আল্লাহর একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়, বরং মানুষকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যেহেতু মানুষও কিছু না কিছু সৃষ্টি বা নির্মাণ করে—যেমন ভাস্কর্য তৈরি করা, ঘর নির্মাণ করা ইত্যাদি। এইভাবে তারা দাবি করেন যে, আল্লাহ তাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, যেহেতু আল্লাহর সৃষ্টি নিখুঁত, আর মানুষের সৃষ্টি সীমাবদ্ধ। মূলত এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তারা “সর্বোত্তম স্রষ্টা” বাক্যাংশের তুলনামূলক চরিত্রকে মানুষের মত সৃষ্টিশীল সত্তার সাথে যুক্ত করে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।

তাফসিরকারীদের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে আরেকটি সমস্যা সামনে আসে। একই বাক্যে একই খালিক শব্দ আল্লাহর ক্ষেত্রে এক অর্থে, আর মানুষ বা অন্য সত্তার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষ খালিক হলে তার অর্থ “পরিকল্পনাকারী” বা “রূপদাতা”; আল্লাহ খালিক হলে তার অর্থ অস্তিত্বের প্রকৃত স্রষ্টা। এরপর এই দুই ভিন্ন অর্থের সত্তাকেই একই বহুবচন “খালিকীন”-এর মধ্যে বসিয়ে আল্লাহকে তাদের “সর্বোত্তম” বলা হচ্ছে। এটি একই শব্দের অর্থ মাঝপথে বদলে দিয়ে তুলনা রক্ষা করার চেষ্টা। আল-রাযীর আলোচনাতেও সমস্যাটি এতটাই স্পষ্ট যে তিনি মানুষের কাজ, ঈসার সৃষ্টি এবং আল্লাহর সৃষ্টি—এই বিভিন্ন অর্থকে আলাদা করে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। [4] আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, একই “أحسن الخالقين” বাক্য সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১২৫-এ আবার এসেছে, সেখানে সরাসরি বাআল নামের উপাস্যের বিপরীতে আল্লাহকে “সর্বোত্তম স্রষ্টা” বলা হয়েছে। [5]

তুলনার যৌক্তিক সংকট

আল্লাহ নিজেকে মানুষ বা জ্বীনদের সাথে তুলনা করে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্তা’ হিসেবে দাবি করছেন। যদি তিনি অতুলনীয়ই হন, তবে কেন এই তুলনার অবতারণা? [6]

অতুলনীয়তা বনাম তুলনামূলক ভাষা

কোরআন বলে, “তাঁর সদৃশ কিছুই নেই”; অথচ “সর্বোত্তম স্রষ্টা” বলার সময় আল্লাহকে অন্য খালিক-দের সঙ্গে একই তুলনামূলক কাঠামোর মধ্যে বসানো হয়েছে। অতুলনীয় সত্তাকে কেন তুলনার একটি শ্রেণির সদস্য হিসেবে ভাষায় উপস্থাপন করা হচ্ছে? [7]

একত্ববাদ ও স্বয়ম্ভূ সত্তা

‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ বিশেষণটি ভাষাগতভাবে একাধিক সৃষ্টিকারীর অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এটি কোরআনের একত্ববাদের মৌলিক দাবি ও আল্লাহর নিরঙ্কুশ অদ্বিতীয় ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। [8]

ইসলামের মৌলিক আকীদা বা বিশ্বাস হচ্ছে, কোনকিছুই আল্লাহর সাথে তুলনীয় নয়। আল্লাহর সাথে অন্য কোন সত্তার তুলনা করাই ইসলামের দৃষ্টিতে সবচাইতে মারাত্মক অপরাধ, যাকে শিরক বলা হয়। যেখানে এই বিষয়টি ইসলামের দৃষ্টিতে সবচাইতে মারাত্মক অপরাধ, সেই কাজটি আল্লাহ নিজেই কেন করতে যাবেন? তিনি কেন সামান্য মানুষের সাথে নিজেকে তুলনা করে নিজেকে সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দাবী করবেন? এখানেই তো সামান্য মানুষের সাথে আল্লাহর তুলনা করে ফেলা হচ্ছে, তাই না? ঐসকল আয়াতের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে, আল্লাহ নিজেই যে সামান্য মানুষের সাথে নিজেকে তুলনা করে নিজের বড়াই করছেন, শিরক করছেন- অন্তত পক্ষে তার ভাষাতেই শিরকের ছায়া বিদ্যমান, সেটি প্রতীয়মান হয়। যা আরও বড় সমস্যা সৃষ্টি করে।


উপাস্য সত্তার শাস্তি ও বিচার: অস্তিত্বের প্রচ্ছন্ন স্বীকারোক্তি

কোরআনের এমন কিছু আয়াত রয়েছে যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্য সত্তাদের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা তাদের বাস্তব অস্তিত্বের প্রতি একটি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নের সৃষ্টি করে। সূরা আম্বিয়া (২১:৯৮-১০০)- তে বলা হয়েছে, [9]

তোমরা (কাফিররা) আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো জাহান্নামের জ্বালানী। তাতে তোমরা প্রবেশ করবে।
— Taisirul Quran
তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদাত কর সেগুলিতো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের পূজা কর, সেগুলো তো জাহান্নামের জ্বালানী। তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

তারা যদি ইলাহ হত, তাহলে তারা তাতে প্রবেশ করত না, তাতে তারা সবাই স্থায়ী হয়ে থাকবে।
— Taisirul Quran
যদি তারা উপাস্য হত তাহলে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না; তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
যদি তারা ইলাহ হত তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না। আর তারা সবাই তাতে স্থায়ী হয়ে থাকবে।
— Rawai Al-bayan
যদি তারা ইলাহ হত তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না; আর তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সেখানে তারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে, সেখানে কিছুই শুনবে না।
— Taisirul Quran
সেখানে থাকবে তাদের আর্তনাদ এবং সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
সেখানে থাকবে তাদের আর্তনাদ, আর সেখানে তারা শুনতে পাবে না।
— Rawai Al-bayan
সেখানে থাকবে তাদের নাভিশ্বাসের শব্দ [১] এবং সেখানে তার কিছুই শুনতে পাবে না;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ধ্রুপদী তাফসিরকারকেরা এই “উপাস্য” শব্দটি দিয়ে বোঝেন সেই সকল সত্তা – যেমন লাত, মানাত, উজ্জা, হুবল – যাদের মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো: এই দেবদেবী যদি নিছক কাল্পনিক চরিত্র বা জড় মূর্তি হয়, তাহলে তাদের জাহান্নামে পাঠানো সম্ভব কিভাবে? শাস্তি প্রাপ্তি এবং আর্তনাদ করা একটি সত্তার অস্তিত্ব এবং সচেতনতা নির্ধারণ করে। কোনো অস্তিত্বহীন বস্তু বা নিছক কাল্পনিক মূর্তি শাস্তির আওতাভুক্ত হয় না।

কোরআনের এই বক্তব্য সরাসরি একটি সচেতন, নৈতিক দায় এবং ইচ্ছাশক্তি আরোপ করে “মিথ্যা উপাস্যদের” উপর। এর অর্থ এই উপাস্যরা সচেতন ছিল, নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ ছিল, এবং ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সত্তা ছিল – যা তাদের নিছক কল্পনার বাইরে একটি বাস্তব অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।


আরবদের বাস্তব জিন-উপাসনা: সহিহ মুসলিমের বর্ণনা

পৌত্তলিক উপাস্যের পেছনে বাস্তব জিন বা অতিপ্রাকৃত সত্তার ধারণা শুধু পরবর্তী তাফসির বা লোককাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ সূরা আল-ইসরা ১৭:৫৭-এর ব্যাখ্যায় সরাসরি বলেছেন, আরবদের একটি দল একদল জিনের উপাসনা করত। পরে সেই জিনেরা ইসলাম গ্রহণ করলেও মানুষগুলো তা জানতে পারেনি এবং আগের মতোই তাদের উপাসনা চালিয়ে যায়। [10]

كَانَ نَفَرٌ مِنَ الْعَرَبِ كَانُوا يَعْبُدُونَ نَفَرًا مِنَ الْجِنِّ فَأَسْلَمَ الْجِنِّيُّونَ وَالإِنْسُ الَّذِينَ كَانُوا يَعْبُدُونَهُمْ لاَ يَشْعُرُونَ

“আরবদের একটি দল একদল জিনের উপাসনা করত। পরে সেই জিনেরা ইসলাম গ্রহণ করে, কিন্তু যেসব মানুষ তাদের উপাসনা করত তারা তা না জেনে আগের মতোই তাদের উপাসনা করতে থাকে।”
— সহিহ মুসলিম ৩০৩০d

এই বর্ণনায় উপাস্যের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। একদিকে বাস্তব মানুষ, অন্যদিকে বাস্তব জিন; এবং মানুষগুলো সেই জিনদেরই উপাসনা করছে। একই ঘটনার একাধিক বর্ণনা সহিহ মুসলিম ৩০৩০a–d-তে এসেছে। [11] ফলে ইসলামি উৎসে পৌত্তলিক উপাসনার একটি অংশকে নিছক অস্তিত্বহীন দেবতার প্রতি মানসিক বিশ্বাস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; উপাসনার অপর প্রান্তে সচেতন জিন-সত্তাকেও রাখা হয়েছে।

কোরআনেও একই বক্তব্য আরও সরাসরি এসেছে। সূরা সাবা ৩৪:৪০–৪১-এ আল্লাহ ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করবেন, মানুষ কি তাদের উপাসনা করত? ফেরেশতারা উত্তর দেবে: “بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ”—“বরং তারা জিনদের উপাসনা করত।” অর্থাৎ পৌত্তলিক উপাসনার পেছনে বাস্তব জিনের উপস্থিতি কোরআন ও সহিহ হাদিস—দুই জায়গাতেই পাওয়া যায়। এটি উযযার পেছনে নারী-শয়তানের ইসলামি ব্যাখ্যার সঙ্গেও সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।


ইসা বা যীশু জাহান্নামে যাবে না

প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তো একই যুক্তিতে ইসা নবী বা খ্রিস্টানদের যীশুরও জাহান্নামে যাওয়ার কথা, কারণ ইসা নবীকেও খ্রিস্টানদের একটি বড় অংশ ঈশ্বর বলে উপাসনা করেছে। এই প্রশ্ন মুহাম্মদের আমলেও উঠেছিল, এবং এটি নিয়ে আল্লাহ কোরআনেই জবাব দিচ্ছে। আসুন যাকারিয়ার তাফসীর থেকে একটি পাতা দেখে নেয়া যাক [12]

সত্তা

আসুন বেশ কয়েকটি তাফসীর পড়ি, [13]

তাফসীর ইবনে কাসীর
৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো ‘জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা’রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না।
তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।” সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।” অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে।
জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।” (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো।
আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন।
এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট।
কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন।
এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই।
আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়।
তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো।
এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না।
তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া
98: নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
99: যদি তারা ইলাহ হত তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না; আর তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে,
100: সেখানে থাকবে তাদের নাভিশ্বাসের শব্দ [১] এবং সেখানে তার কিছুই শুনতে পাবে না;
101: নিশ্চয় যাদের জন্য আমাদের কাছ থেকে পূর্ব থেকেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা থেকে দূরে রাখা হবে [১]।
[১] পূর্ববর্তী ৯৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, “তোমরা এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাদের ইবাদত কর, সবাই জাহান্নামের ইন্দন হবে।” দুনিয়াতে কাফেরদের বিভিন্ন দল যেসব মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করেছে, এ আয়াতে তাদের সবার জাহান্নামে প্রবেশ করার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ আয়াত শোনার পর কাফেররা এটা বলতে শুরু করল যে, যদি প্রত্যেক অবৈধ উপাস্যই জাহান্নামে যায় তবে ঈসা আলাইহিসসালাম ও ফেরেশতারাও জাহান্নামে যাবে; কারণ অবৈধ ইবাদত তো ঈসা আলাইহিস সালাম ও ফেরেশতাদেরও করা হয়েছে। তাহলে তারাও কি জাহান্নামে যাবেন? এর জওয়াবে আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন।
[দেখুনঃ মুস্তাদরাকে হাকিমঃ ২/৩৮৪৩৮৫] এ থেকে জানা যায় যে, যারা দুনিয়ায় মানুষকে আল্লাহর বন্দেগী করার শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং লোকেরা তাদেরকেই উপাস্য পরিণত করে অথবা যারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ বেখবর যে দুনিয়ায় তাদের বন্দেগী ও পূজা করা হচ্ছে এবং এ কর্মে তাদের ইচ্ছা ও আকাংখার কোন দখল নেই, তাদের জাহান্নামে যাবার কোন কারণ নেই। কারণ, তারা এ শির্কের জন্য দায়ী নয়।
[১] ভয়ংকর গরম, পরিশ্রম ও ক্লান্তিকর অবস্থায় মানুষ যখন টানা টানা শ্বাস বের করতে থাকে সেটাকে বলা হয় “যাফীর”। আর সে শ্বাস টানাকে বলে “শাহীক”। [ইবন কাসীর]

তাফসীর আল-কুরতুবী
কপি
[সূরা আল-আম্বিয়া (২১): আয়াত ৯৮]নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত করতে, সেগুলো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা তাতে প্রবেশ করবে। (৯৮)এতে চারটি মাসয়ালা (আলোচ্য বিষয়) রয়েছে: প্রথমত: মহান আল্লাহর বাণী: “নিশ্চয়ই তোমরা এবং তোমরা যা কিছু ইবাদত করতে…” ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: এটি এমন একটি আয়াত যা সম্পর্কে মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করে না! আমি জানি না তারা কি এটি বুঝতে পেরেছে তাই জিজ্ঞেস করে না, নাকি তারা এ সম্পর্কে অজ্ঞ (১) তাই জিজ্ঞেস করে না। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: সেই আয়াতটি কোনটি? তিনি বললেন: “নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত করতে, সেগুলো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা তাতে প্রবেশ করবে।” যখন এই আয়াত নাজিল হলো, তখন কুরাইশ কাফেরদের নিকট এটি অত্যন্ত কঠিন মনে হলো।
তারা বলল: তিনি (রাসূল ﷺ) আমাদের উপাস্যদের গালি দিয়েছেন। তারা ইবনুল জিবারার কাছে গিয়ে তাকে বিষয়টি জানাল। সে বলল: আমি যদি তাঁর সামনে উপস্থিত থাকতাম তবে অবশ্যই এর প্রতিউত্তর দিতাম। তারা বলল: তুমি তাঁকে কী বলতে? সে বলল: আমি তাঁকে বলতাম—এই যে মাসীহ (ঈসা আ.), তাঁর ইবাদত করা হয়; ইহুদিরা উযাইরের ইবাদত করে; তবে কি তারাও জাহান্নামের ইন্ধন হবে? কুরাইশরা তার এই কথায় অত্যন্ত চমৎকার বোধ করল এবং তারা মনে করল যে মুহাম্মদ (ﷺ) তর্কে পরাজিত হয়েছেন। তখন মহান আল্লাহ নাজিল করলেন: “নিশ্চয়ই যাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে পূর্বেই কল্যাণ নির্ধারিত হয়েছে, তাদেরকে তা (জাহান্নাম) থেকে দূরে রাখা হবে” [আল-আম্বিয়া: ১০১]।
আর এই প্রেক্ষাপটেই নাজিল হয়েছে: “যখন মরিয়ম-তনয়ের উদাহরণ পেশ করা হলো” [আয-যুখরুফ: ৫৭], অর্থাৎ ইবনুল (২) জিবারার তর্কের প্রেক্ষিতে, “তখন তোমার সম্প্রদায় উল্লাসে শোরগোল শুরু করে দিল” [আয-যুখরুফ: ৫৭], এখানে ‘ইয়াসিদদুন’ শব্দটি সোয়াদ বর্ণে কাসরা (জের) যোগে পঠিত, যার অর্থ—তারা শোরগোল বা হইচই করছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত সামনে আসবে (৩)। দ্বিতীয়ত: এই আয়াতটি শব্দের ব্যাপকার্থকতার (উমুম) স্বপক্ষে এবং এর জন্য নির্দিষ্ট রূপ বা গঠন থাকার বিষয়ে একটি মৌলিক দলিল। যারা মনে করেন যে ব্যাপকার্থক শব্দ বুঝানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভাষাগত রূপ নেই, তাদের মত এই আয়াত ও অন্যান্য প্রমাণ দ্বারা অসার প্রমাণিত হয়।
কেননা, এই আব্দুল্লাহ ইবনুল জিবারা তার জাহেলি অবস্থাতেও ‘মা’ (যা কিছু) শব্দটি দ্বারা ইবাদতকৃত সকলকেই (বস্তু ও ব্যক্তি) বুঝেছিলেন এবং কুরাইশরা—যারা বিশুদ্ধ ও অলংকারপূর্ণ আরবি ভাষায় পারদর্শী ছিল—তারাও তার এই বুঝের সাথে একমত হয়েছিল। যদি শব্দটি ব্যাপকার্থক না হতো, তবে তা থেকে কাউকে ব্যতিক্রম করা সঠিক হতো না। যেহেতু এখানে ব্যতিক্রম (ইস্তিসনা) করা হয়েছে, তাই প্রমাণিত হয় যে এটি ব্যাপকার্থক শব্দ; আর এটি অত্যন্ত স্পষ্ট। তৃতীয়ত: সাধারণ পাঠরীতিতে শব্দটি ‘হসাব’ অর্থাৎ সোয়াদ বর্ণ দিয়ে পঠিত। এর অর্থ হলো—হে কাফের সম্প্রদায়, তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যেসব মূর্তির পূজা করতে, সেগুলো জাহান্নামের জ্বালানি।
ইবনে আব্বাস (রা.) এরূপ বলেছেন। মুজাহিদ, ইকরিমা ও কাতাদা (র.) বলেন: এর অর্থ জাহান্নামের কাঠ বা ইন্ধন। আলী ইবনে আবি তালিব ও আয়েশা (রা.) শব্দটি ‘হাতাব’ অর্থাৎ ত’ বর্ণ দিয়ে পাঠ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) ‘হদাব’ অর্থাৎ দ্বদ বর্ণ দিয়েও পাঠ করেছেন। আল-ফাররা বলেন: এর দ্বারা ‘হসাব’ (জ্বালানি)-ই উদ্দেশ্য। তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণিত হয়েছে যে, ‘হদাব’ শব্দটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের অধিবাসীদের ভাষায়…(১). পাণ্ডুলিপি ‘ত্ব’ এবং ‘কাফ’-এ এভাবেই ‘জাহিলুহা’ (তারা এ সম্পর্কে অজ্ঞ) এসেছে। অন্যগুলোতে ‘জাহিলু’ রয়েছে।(২). পাণ্ডুলিপি ‘কাফ’-এ এসেছে: ‘হে ইবনুল জিবারা’।(৩).
দেখুন ১৬শ খণ্ড, ২০১ পৃষ্ঠা।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর
আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারীর এবং আবুশ শায়খ কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী সে কিয়ামতের দিন তার সম্প্রদায়ের আগে আগে থাকবে এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ফিরআউন তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে পথ চলবে, এমনকি সে তাদের নিয়ে জাহান্নামে গিয়ে পড়বে।আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী অতঃপর সে তাদের জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছাবে এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ‘উরুূদ’ অর্থ হলো প্রবেশ করা।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কুরআনে ‘উরুূদ’ শব্দটি চারটি স্থানে (প্রবেশ করা অর্থে) এসেছে—সূরা হুদে আর সেটি কতই না মন্দ গন্তব্য যেখানে তারা পৌঁছাবে; সূরা মারইয়ামে তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে তা অতিক্রম করতে হবে না (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭১); এবং সেই সূরায় আরও রয়েছে আর আমি অপরাধীদের পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৮৬); এবং সূরা আল-আম্বিয়ায় তোমরা জাহান্নামের ইন্ধন, তোমরাই তাতে প্রবেশ করবে (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯৮)।
তিনি বলেন: এই সবগুলোর অর্থই হলো প্রবেশ করা।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন— আর এ দুনিয়ায় তাদের পেছনে লানত লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কিয়ামতের দিনও (তা অব্যাহত থাকবে); এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: তাদের এক লানতের সাথে আরও এক লানত যুক্ত করা হয়েছে, ফলে তা হলো দ্বিগুণ লানত। কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ লানতের পিঠে লানত।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এটি হলো দুনিয়া ও আখিরাতের লানত।ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী (রা.) থেকে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ফিরআউনের পরে এমন কোনো নবী প্রেরিত হননি যিনি তার জবানিতে ফিরআউনকে অভিশাপ দেননি এবং কিয়ামতের দিন জাহান্নামে তার জন্য আরও একটি লানত বৃদ্ধি করা হবে।ইবনুল আনবারী ‘আল-ওয়াকফ ওয়াল ইবতিদা’ গ্রন্থে এবং তুসতি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন—নাফি ইবনুল আযরাক তাকে বললেন: মহান আল্লাহর বাণী কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন।
তিনি বললেন: এর অর্থ হলো অভিশাপের পর নিকৃষ্ট অভিশাপ।তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আরবরা কি এই অর্থ সম্পর্কে অবগত? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তুমি কি বনু যুবইয়ানের নাবিগাহর উক্তিটি শোননি যেখানে সে বলেছে: ‘এমন এক শক্তির মোকাবিলা করো না যার কোনো তুলনা নেই, কারণ শত্রুরা তো সাহায্যের (রিফদ) মাধ্যমেই পর্যুদস্ত হয়।’আয়াত ১০০
সৃষ্টিজগতের ওপর এমন এক গ্রীবা বা গর্দান প্রকাশিত হবে যার দেখার মতো দুটি চোখ এবং একটি বাকপটু জিহ্বা থাকবে। সে বলবে: “আমাকে তোমাদের মধ্য হতে তিন শ্রেণির জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে: প্রত্যেক উদ্ধত ও অবাধ্য স্বৈরাচারীর জন্য।” অতঃপর সে কাতারসমূহ থেকে তাদেরকে সেভাবে ছোঁ মেরে তুলে নেবে যেভাবে পাখি তিলের দানা তুলে নেয় এবং তাদেরকে জাহান্নামে বন্দি করবে। এরপর সে দ্বিতীয়বার বের হয়ে বলবে: “আমাকে তোমাদের মধ্য হতে ঐ ব্যক্তির জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে যে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।” অতঃপর সে তাদেরকে কাতারসমূহ থেকে সেভাবে ছোঁ মেরে তুলে নেবে যেভাবে পাখি তিলের দানা তুলে নেয় এবং তাদেরকে জাহান্নামে বন্দি করবে।
অতঃপর সে তৃতীয়বার বের হয়ে বলবে: “আমাকে প্রতিকৃতি বা ছবি নির্মাণকারীদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে।” অতঃপর সে তাদেরকে কাতারসমূহ থেকে সেভাবে ছোঁ মেরে তুলে নেবে যেভাবে পাখি তিলের দানা তুলে নেয় এবং তাদেরকে জাহান্নামে বন্দি করবে। যখন এই তিন শ্রেণি এবং ঐ তিন শ্রেণিকে পাকড়াও করা শেষ হবে, তখন আমলনামাসমূহ উন্মুক্ত করা হবে, মিযান স্থাপন করা হবে এবং সৃষ্টিজগতকে হিসাবের জন্য ডাকা হবে।আহমদ, আবদ বিন হুমাইদ, হাকীম তিরমিযী, ইবনুল মুনযির, ইবনু আবি হাতিম, হাকীম (যিনি একে সহীহ বলেছেন), ইবনু মারদুওয়াইহ এবং বায়হাকী ‘আল-বা’স’ গ্রন্থে আবু সুমাইয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ‘উরুূদ’ (আগমন বা প্রবেশ) প্রসঙ্গে আমাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল।
আমাদের কেউ কেউ বলল: কোনো মুমিন এতে প্রবেশ করবে না। আবার কেউ কেউ বলল: তারা সকলেই এতে প্রবেশ করবে। [আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:] “অতঃপর আমি মুত্তাকীদের মুক্তি দেব।” এরপর আমি জাবির বিন আবদুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি তাঁকে জানালাম। তিনি নিজের দুই কানের দিকে ইশারা করে বললেন: এই কান দুটি বধির হয়ে যাক যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে না শুনে থাকি যে: “কোনো পুণ্যবান বা পাপাচারী বাকি থাকবে না যে এতে প্রবেশ করবে না। তবে মুমিনের জন্য এটি এমন শীতল ও শান্তিপূর্ণ হবে যেমনটি ইব্রাহীমের জন্য হয়েছিল; এমনকি মুমিনদের শীতলতার আধিক্যের কারণে জাহান্নামের আগুন আর্তনাদ করে উঠবে।
অতঃপর আমি আল্লাহভীরুদের নাজাত দেব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।”আবদুর রাজ্জাক, সাঈদ বিন মানসূর, হান্নাদ, আবদ বিন হুমাইদ, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনু আবি হাতিম এবং বায়হাকী ‘আল-বা’স’ গ্রন্থে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নাফে’ বিন আল-আযরাক ইবনে আব্বাসের সাথে তর্কে লিপ্ত হলেন। ইবনে আব্বাস বললেন: ‘উরুূদ’ অর্থ হলো প্রবেশ করা। নাফে’ বললেন: না।তখন ইবনে আব্বাস পাঠ করলেন— “নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা করো, তারা জাহান্নামের ইন্ধন। তোমরা তাতে প্রবেশ করবে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯৮]।
তিনি বললেন: তারা প্রবেশ করেছে কি করেনি? অতঃপর তিনি পাঠ করলেন— “কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদেরকে আগুনে প্রবেশ করাবে।” (সূরা হুদ, আয়াত: ৯৮)। তারা প্রবেশ করেছে কি করেনি? আর আমি ও আপনি তো এতে প্রবেশ করবই, এখন দেখুন আমরা তা থেকে বের হতে পারি কি না।আবদ বিন হুমাইদ এবং ইবনু আবি হাতিম “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে সেখানে পৌঁছাবে না” (সূরা মারইয়াম: ৭১) আল্লাহর এই বাণীর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: পুণ্যবান এবং পাপাচারী সকলেই সেখানে প্রবেশ করবে।আপনি কি আল্লাহর এই বাণী শোনেননি: “অতঃপর তিনি তাদেরকে আগুনে প্রবেশ করালেন, আর যেখানে প্রবেশ করানো হলো তা কতই না নিকৃষ্ট স্থান।” (সূরা হুদ, আয়াত: ৯৮)।
এবং তাঁর বাণী: “আর আমি অপরাধীদেরকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব।” (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৮৬)।

একই যুক্তির প্রতিফলন দেখা যায় সূরা মা’ইদাহ (৫:১১৬–১১৭) এ, যেখানে আল্লাহ ঈসা (যীশু) কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমার উপাসনা করো?’ ঈসা তখন তা অস্বীকার করে বলবে, ‘না আমি কখনোই এমনটি বলিনি!’ আসুন আয়াতগুলো পড়ি, [14]

স্মরণ কর, যখন আল্লাহ ঈসা ইবনু মারইয়ামকে বললেন, তুমি কি লোকেদেরকে বলেছিলে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে আর আমার মাতাকে ইলাহ বানিয়ে নাও।’ (উত্তরে) সে বলেছিল, ‘পবিত্র মহান তুমি, এমন কথা বলা আমার শোভা পায় না যে কথা বলার কোন অধিকার আমার নেই, আমি যদি তা বলতাম, সেটা তো তুমি জানতেই; আমার অন্তরে কী আছে তা তুমি জান কিন্তু তোমার অন্তরে কী আছে তা আমি জানি না, তুমি অবশ্যই যাবতীয় গোপনীয় তত্ত্ব সম্পর্কে পূর্ণরূপে ওয়াকেফহাল।
— Taisirul Quran
আর যখন আল্লাহ বলবেনঃ হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলেঃ তোমরা আল্লাহর সাথে আমার ও আমার মায়েরও ইবাদাত কর? ঈসা নিবেদন করবেঃ আপনি পবিত্র! আমার পক্ষে কোনক্রমেই শোভনীয় ছিলনা যে, আমি এমন কথা বলি যা বলার আমার কোন অধিকার নেই; যদি আমি বলে থাকি তাহলে অবশ্যই আপনার জানা থাকবে; আপনিতো আমার অন্তরে যা আছে তাও জানেন, পক্ষান্তরে আপনার জ্ঞানে যা কিছু রয়েছে আমি তা জানিনা; সমস্ত গাইবের বিষয় আপনিই জ্ঞাত।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?’ সে বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, যার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য সম্ভব নয়। যদি আমি তা বলতাম তাহলে অবশ্যই আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরে যা আছে তা আপনি জানেন, আর আপনার অন্তরে যা আছে তা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি গায়েবী বিষয়সমূহে সর্বজ্ঞাত’।
— Rawai Al-bayan
আরও স্মরণ করুন, আল্লাহ্‌ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়াম –তনয় ‘ঈসা! আপনি কি লোকদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্‌ ছাড়া আমাকে আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ কর? ‘তিনি বলবেন, ‘আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তো তা জানতেন। আমার অন্তরের কথাতো আপনি জানেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি অদৃশ্য সম্বদ্ধে সবচেয়ে ভালো জানেন।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

তুমি আমাকে যে ব্যাপারে নির্দেশ করেছ তা ছাড়া আমি তাদেরকে অন্য কিছুই বলিনি, (তা এই) যে, তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর যিনি আমার ও তোমাদের প্রতিপালক, আর তাদের কাজ কর্মের ব্যাপারে সাক্ষী ছিলাম যদ্দিন আমি তাদের মাঝে ছিলাম, অতঃপর যখন তুমি আমাকে উঠিয়ে নিলে, তখন তুমিই ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক, আর তুমি হলে প্রত্যেক ব্যাপারে সাক্ষী।
— Taisirul Quran
আমি তাদেরকে উহা ব্যতীত কিছুই বলিনি যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, যিনি আমার রাব্ব এবং তোমাদেরও রাব্ব। আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম, অতঃপর আপনি যখন আমাকে তুলে নিলেন তখন আপনিই ছিলেন তাদের রক্ষক, বস্তুতঃ আপনিই সর্ব বিষয়ে পূর্ণ খবর রাখেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘আমি তাদেরকে কেবল তাই বলেছি, যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আললাহর ইবাদাত কর। আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনি ছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণকারী। আর আপনি সব কিছুর উপর সাক্ষী।
— Rawai Al-bayan
‘আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ছাড়া তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি, তা এই যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহ্‌র ইবাদত কর এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কাজ-কর্মের সাক্ষী, কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন [১] তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কাজ-কর্মের তত্ত্বাবধায়ক এবং আপনিই সব বিষয়ে সাক্ষী [২]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামিক দৃষ্টিকোণে ইসা নির্দোষ, কারণ তিনি নিজেকে উপাস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। অর্থাৎ, শুধুমাত্র উপাস্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া নয়, বরং সেই দাবি বা অবস্থান গ্রহণ করাটাই এই কাজের নৈতিক দায়ের উৎস।

এ থেকে বিপরীত যুক্তি দাঁড়ায় – যেসব দেবদেবী উপাসনা পেতে সম্মত হয়েছিল বা নিজেরা দাবি করেছিল, কেবল তারাই দোষী, তাদেরকেই শুধুমাত্র জাহান্নামের শাস্তি দেয়া হবে। সুতরাং, ইসলাম যেসব মিথ্যা উপাস্যকে “জাহান্নামে যাওয়ার যোগ্য” বলে মনে করে, তাদের নিছক কল্পনানির্ভর মূর্তি হিসেবে নয়, বরং সচেতন ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে, যা তাদের প্রচ্ছন্ন অস্তিত্বকে স্বীকার করে।[15]

সত্তা 1
সত্তা 3

আসুন কয়েকটি তাফসীর পড়ি, [16] [17]

তাফসীর ইবনে কাসীর
১১৬-১১৮ নং আয়াতের তাফসীর: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে এই কথাগুলো ঐসব লোকের সামনে সম্বোধন করে বলবেন যারা তাকে ও তার মাতাকে মা’বুদ বানিয়ে নিয়েছিল। এ কথাগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহ খ্রীষ্টানদেরকে ধমক দিয়েছেন ও ভয় প্রদর্শন করেছেন। কাতাদা (রঃ) ও অন্যান্যগণ এরূপই বলেছেন। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উপর আল্লাহ পাকের (আরবী) (অর্থাৎ এটা ঐ দিন যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদীতার পুরস্কার দেয়া হবে) এ উক্তিটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এ সম্বোধন ও উত্তর দুনিয়াতেই ছিল। ইবনে জারীর (রঃ) এ কথাকে সমর্থন করে বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল এটা ঐ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত।
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) দু’প্রকারে-এর উপর দলীল গ্রহণ করেছেন। প্রথম প্রকার এই যে, এ কথাটি (আরবী) বা অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বলা হয়েছে, (আরবী) অর্থাৎ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার এই যে, (আরবী) এবং (আরবী)- এটা হচ্ছে শর্তযুক্ত উক্তি এবং এই উক্তি দুনিয়াতেই করা হয়েছিল। আর শাস্তি প্রদান ও ক্ষমা করণের শর্ত আখিরাতের জন্যে উঠিয়ে রাখা হয়েছে। এ দু’টি দলীলের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। কেননা, অতীতকালের ক্রিয়া আসলো তো কি হলো? কিয়ামতের অধিকাংশ ঘটনাকেই অতীতকালের ক্রিয়া দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে ওটা সংঘটিত হওয়ার উপর যথেষ্ট দলীল হতে পারে।
এখন বাকী থাকলো (আরবী) শব্দটির কালামে শরতিয়া হওয়ার কথা। এ সম্পর্কে বলা যাবে যে, এর দ্বারা পাপীদের প্রতি হযরত ঈসা (আঃ)-এর অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে এবং তাদের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর শর্তের উপর কোন কিছু সম্পর্কিত হওয়া ওটা সংঘটিত হওয়ার দাবিদার হতে পারে না। কুরআন কারীমের আয়াতসমূহে এর বহু নযীর বিদ্যমান রয়েছে। এই ব্যাপারে হযরত কাতাদা (রঃ)-এর বর্ণনা রয়েছে তা খুবই স্পষ্ট। তা হচ্ছে এই যে, এটা হবে কিয়ামতের দিনের কথোপকথন, যাতে সেদিন সকলের সামনে খ্রীষ্টানদের সব কিছু খুলে যায় এবং তাদের মনে ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়।
হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- কিয়ামতের দিন নবীগণ ও তাদের উম্মতদেরকে ডাক দেয়া হবে। অতঃপর হযরত ঈসা (আঃ)-কে আহ্বান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বীয় নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। তিনি তা স্বীকার করে নেবেন। তারপর আল্লাহ পাক তাঁকে জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে- তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে ও আমার মাতাকে মা’বুদ বানিয়ে নাও? তখন তিনি তা অস্বীকার করবেন। অতঃপর নাসারাদেরকে আনয়ন করা হবে এবং তাদেরকে ঐ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তারা তখন বলবেঃ ‘হ্যা, তিনি আমাদেরকে এ আদেশই করেছিলেন।
এই কথা শুনে হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাথা ও দেহের লোম ভয়ে খাড়া হয়ে যাবে। ফেরেশতাগণ তখন তার চুলগুলো ধরে রাখবেন। আর এই নাসারাদেরকে আল্লাহর সামনে এক হাজার বছর পর্যন্ত জোড় পায়ে বসিয়ে রাখা হবে। অবশেষে তাদের উপর হুজ্জত কায়েম হয়ে যাবে এবং সত্য তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর তাদের জন্যে ক্রুশ উঠানো হবে। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (হাফিয ইবনে আসাকির এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে কাসীর একে গারীব ও আযীয বলেছেন)(আরবী) এ জবাবে হযরত ঈসা (আঃ)-কে উত্তম ভদ্রতার কতইনা তাওফীক দান করা হয়েছিল এবং তার অন্তরে কতইনা সুন্দর দলীল ভরে দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন-হে আল্লাহ! যে কথা বলার আমার কোন অধিকার নেই সে কথা আমি কিরূপে বলতে পারি? যদি আমি এ কথা বলেও থাকি তবে অবশ্যই সেটা আপনি ভাল রূপেই জানেন। কেননা, আপনার কাছে তো কোন কিছুই গোপন থাকে না। আপনি আমার অন্তরের কথা অবগত আছেন, কিন্তু আমি আপনার ইচ্ছা সম্পর্কে মোটেই অবগত নই। আপনি আমাকে যা নির্দেশ দিয়েছিলেন আমি তার একটি অক্ষরও বেশী করিনি। আমি তো শুধু এ কথাই বলেছিলাম- তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করবে যিনি আমারও প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন তাদের কার্যাবলী তদারক করেছি। অতঃপর যখন থেকে আপনি আমাকে উঠিয়ে নিয়েছেন তখন থেকে আপনিই তাদের কার্যাবলী তদারক করেছেন।
আর আপনি প্রত্যেক কাজ সম্বন্ধেই পূর্ণ অবগত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের মধ্যে খুত্ব দিতে গিয়ে বলেনঃ হে লোক সকল! কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে উলঙ্গ মাথা, উলঙ্গ দেহ এবং উলঙ্গ পা অবস্থায় উঠানো হবে, যেমন তোমরা তোমাদের জন্মের দিন ছিলে। সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পোশাক পরানো হবে। এরপর আমার উম্মতের মধ্য হতে কতক লোককে আনয়ন করা হবে যাদেরকে জাহান্নামের নিদর্শন হিসেবে বাম দিকে রাখা হবে। তখন আমি বলবো- এরা তো আমারই উম্মত। সেই সময় বলা হবে- তুমি জান না যে, এরা তোমার (ইন্তেকালের) পরে তোমার সুন্নাতকে পরিত্যাগ করেছিল এবং বিদআত চালু করে দিয়েছিল।
আমি একজন সৎ বান্দার মত ঐ কথাই বলবো যে কথা হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেন। (এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন) তাহলে (আরবী) আল্লাহ পাকের এই কালাম তাঁরই ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তিনি যা চাইবেন তাই করবেন। তিনি সবারই কৈফিয়ত তলব করতে পারেন, কিন্তু তার কাছে কেউই কোন কৈফিয়ত তলব করতে পারে না। তা ছাড়া এই কালাম নাসারাদের উপর তার অসন্তুষ্টি প্রকাশকারী, যারা হযরত ঈসা (আঃ) -কে তাঁর শরীক ও পুত্র এবং মারইয়াম (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) সাব্যস্ত করেছিল। এ আয়াতের বড়ই মাহাত্ম্য রয়েছে। হদীসে আছে যে, নবী (সঃ) এক রাত্রে সকাল পর্যন্ত নামাযে এ আয়াতটিই পড়তে থাকেন।ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবু যার (রাঃ) বলেন, একদা রাত্রে নবী (সঃ) (আরবী) এ আয়াতটি নামাযে পাঠ করতে থাকেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি রুকূ ও সিজদা করেন।
আর এভাবেই সকাল হয়ে যায়। সকালে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রাত্রে নামাযে আপনি এ আয়াতটিই পড়তে থাকলেন এবং এর মাধ্যমেই রুকু ও সিজদা করতে রইলেন, শেষ পর্যন্ত সকাল হয়ে গেল, এর কারণ কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি মহিমান্বিত আল্লাহর কাছে আমার উম্মতের জন্যে সুপারিশের প্রার্থনা করছিলাম। তখন তিনি তার সাথে অংশী স্থাপন করেছে এরূপ লোক ছাড়া সকলকেই ক্ষমা করে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।” ইবনে আবি হাতিম (রঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে। আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) হযরত ঈসা (আঃ)-এর (আরবী) -এ উক্তিটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি স্বীয় হস্তদ্বয় উত্তোলন করেন এবং বলেনঃ “হে আল্লাহ!
আমার উম্মত (অর্থাৎ আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন)।’ এ বলে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। আল্লাহ তা’আলা তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি তাঁকে যা উত্তর দেয়ার ছিল তাই দেন। তখন মহান আল্লাহ হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে বলেনঃ “হে জিবরাঈল (আঃ)! তুমি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর কাছে গিয়ে বল যে, আল্লাহ তাঁকে তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করবেন, দুঃখিত করবেন না।” ইমাম আহমাদ (রঃ) হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট অনুপস্থিত থাকলেন, বের হলেন না, এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি কখনই বের হবেন না।
অতঃপর তিনি বের হলেন এবং এমনভাবে সিজদায় পড়ে গেলেন যে, তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেছে বলে আমাদের ধারণা হলো। তারপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেনঃ আমার প্রতিপালক আমার নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে কি করা যায় সেই পরামর্শ চেয়েছিলেন। আমি বললাম, হে আমার প্রভু! এরা তো আপনারই মাখলুক ও আপনারই বান্দা! দ্বিতীয় বার তিনি আমার নিকট পরামর্শ চাইলে আমি ঐ কথাই বললাম। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! তোমার উম্মতের ব্যাপারে আমি তোমাকে অপদস্থ করবো না। আর তিনি আমাকে এই সুসংবাদ দিলেন যে, আমার সঙ্গে আমার উম্মতের যে প্রথম দলটি জান্নাতে যাবে তাদের সংখ্যা হবে সত্তর হাজার এবং এরূপ প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে থাকবে।
এরা সবাই বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর আল্লাহ তা’আলা জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে আমাকে বললেনঃ তুমি প্রার্থনা কর, তা কবুল করা হবে এবং চাও, তা দেয়া হবে। আমি জিবরাঈল (আঃ)-কে বললাম, আল্লাহ কি আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করার ইচ্ছা করেছেন? জিবরাঈল (আঃ) উত্তরে বললেনঃ হ্যা, আল্লাহ আমাকে আপনার নিকট এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছেন। আল্লাহ আমাকে সব কিছুই প্রদান করেছেন। আমি এ জন্যে অহংকার করছি না। আর আমার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে এবং আমি ভূ-পৃষ্ঠে সুস্থ শরীরে বিচরণ করছি। আমাকে এই বিশেষত্ব দেয়া হয়েছে যে, আমার উম্মত দুর্ভিক্ষে মারা যাবে না এবং তারা পরাজিত হবে না।
আল্লাহ আমাকে কাওসার দান করেছেন। এটা হচ্ছে জান্নাতের একটি নহরের নাম যা আমার হাওযে বয়ে আসবে। আর আমাকে মর্যাদা, সাহায্য এবং রুউব বা ভক্তি প্রযুক্ত ভীতি প্রদান করা হয়েছে, যা আমার উম্মতের সামনে জনগণের উপর এক মাসের পথের ব্যবধান হতে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। আমি সকল নবীর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবো। আমার উম্মতের জন্যে গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ মাল হালাল করা হয়েছে এবং আরও এমন কতক জিনিস আমার উম্মতের জন্যে হালাল করা হয়েছে যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের উপর হালাল ছিল না। আর মাযহাব হিসেবে আমার ধর্মে কোন কাঠিন্য রাখা হয়নি। (সনদের দিক দিয়ে এই হাদীসটি দুর্বল হলেও সাফাআতের হাদীসগুলো এর দুর্বলতা দূর করে দিয়েছে)

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া
আরও স্মরণ করুন, আল্লাহ্‌ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়াম –তনয় ‘ঈসা! আপনি কি লোকদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্‌ ছাড়া আমাকে আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ কর? ‘তিনি বলবেন, ‘আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তো তা জানতেন। আমার অন্তরের কথাতো আপনি জানেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি জানি না ; নিশ্চয় আপনি অদৃশ্য সম্বদ্ধে সবচেয়ে ভাল জানেন।’
ষোলতম রুকু’

তাফসীর আল-কুরতুবী
[সূরা আল-মায়িদাহ (৫): আয়াত ১১৬] পূর্ণ পৃষ্ঠা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তরখওয়ানে যা খাওয়া হয়েছে, তা মুসলিম ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ফেরেশতারা ততক্ষণ কোনো ব্যক্তির জন্য প্রার্থনা করেন, যতক্ষণ তার দস্তরখওয়ান বিছানো থাকে।” নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীগণ এটি উদ্ধৃত করেছেন। বলা হয়েছে যে, ‘মায়িদাহ’ (দস্তরখওয়ান) হলো এমন প্রতিটি বস্তু যা বিছানো বা প্রসারিত করা হয়, যেমন রুমাল বা কাপড়। ভাষাগতভাবে ‘দাল’ বর্ণটি দ্বিত্ব হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তারা একটি ‘দাল’কে ‘ইয়া’ দ্বারা পরিবর্তন করেছেন, ফলে এটি ‘মায়িদাহ’ হয়েছে।
যেহেতু এটি বিছানো হয়, তাই এটি কর্মবাচ্যের (মাফউলের) অর্থে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আরবি ভাষায় এটি কর্তৃবাচ্যের (ফা’ইলের) কাঠামোতে এসেছে। যেমন তারা বলে থাকে: ‘গোপনকারী রহস্য’ অথচ তা আসলে ‘গোপনকৃত রহস্য’, এবং ‘সন্তুষ্ট জীবন’ অথচ তা আসলে ‘সন্তোষজনক জীবন’। একইভাবে ভাষাতে যা কর্তৃবাচ্য তা কর্মবাচ্যের কাঠামোতে আসে, যেমন তারা বলে: ‘অশুভ ব্যক্তি’ অথচ সে হলো ‘অশুভকারী’, এবং ‘আবৃত পর্দা’ অথচ তা হলো ‘আবরণকারী’। তিনি (তদানীন্তন আলেমগণ) বলেন: ‘খিওয়ান’ হলো যা পায়ার ওপর ভর করে মাটি থেকে উঁচু থাকে, আর ‘মায়িদাহ’ হলো যা বিছানো ও প্রসারিত করা হয়।
এবং ‘সুফরাহ’ হলো যা তার ভেতরের জিনিসকে উন্মোচিত করে, কারণ এটি তার চারপাশের ফিতা বা বন্ধনী দিয়ে গুটিয়ে রাখা হয়। হাসান (বসরী) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উঁচু টেবিলে বসে খাওয়া বাদশাহদের কাজ, রুমালের ওপর খাওয়া অনারবদের কাজ, আর দস্তরখওয়ানে (সুফরায়) বসে খাওয়া আরবদের কাজ এবং এটিই সুন্নাহ। এবং আল্লাহই ভালো জানেন। ‌‌[সূরা আল-মায়িদাহ (৫): আয়াত ১১৬]এবং স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ বলবেন: হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! তুমি কি মানুষকে বলেছিলে যে, আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করো? তিনি বলবেন: আপনি পবিত্র ও মহান! যা বলার অধিকার আমার নেই, তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়।
যদি আমি তা বলতাম, তবে আপনি নিশ্চয়ই তা জানতেন। আমার অন্তরে যা আছে তা আপনি জানেন, কিন্তু আপনার অন্তরে যা আছে তা আমি জানি না। নিশ্চয়ই আপনি অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত। (১১৬)মহান আল্লাহর বাণী: (এবং স্মরণ করুন যখন আল্লাহ বলবেন: হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! তুমি কি মানুষকে বলেছিলে যে, আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করো?)। এই কথোপকথনের সময়কাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কাতাদাহ, ইবনে জুরাইজ এবং অধিকাংশ মুফাসসির বলেন: কিয়ামতের দিন তাঁকে এটি বলা হবে। আর সুদ্দী ও কুতরুব বলেন: যখন তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং নাসারারা (খ্রিস্টানরা) তাঁর সম্পর্কে অবাস্তব কথা বলতে শুরু করেছিল, তখন তাঁকে এটি বলা হয়েছিল।
তারা মহান আল্লাহর বাণী: “যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা” [মায়িদাহ: ১১৮]-কে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন। কারণ আরবি ভাষায় ‘ইজ’ শব্দ মূলত অতীতকালের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে প্রথম মতটিই অধিক বিশুদ্ধ, যা পূর্ববর্তী আয়াত: “সেদিন আল্লাহ যখন রাসূলগণকে সমবেত করবেন” [মায়িদাহ: ১০৯] দ্বারা প্রমাণিত হয়।(১). আল-জামাল এর টীকায় কুরতুবী থেকে বর্ণিত: মায়িদাহ হলো কাপড় বা রুমাল যা প্রসারিত ও বিছানো হয়… ইত্যাদি।(২). ‘কাফ’ থেকে সংগৃহীত।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর
ঈসা (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে একদল বলল যে, তিনি আল্লাহ।অন্য একদল বলল, তিনি আল্লাহর পুত্র।আর একদল বলল, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রূহ; আর এটিই হলো পরিমিত বা মধ্যমপন্থী দল এবং এরাই কিতাবধারীদের (আহলে কিতাব) মধ্যকার মুসলিম।ইবনে জারীর ও ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী (রহ.) থেকে আল্লাহর এই বাণী— “নিশ্চয়ই তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে যে, আল্লাহ তিনজনের মধ্যে তৃতীয়”—প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: খ্রিষ্টানরা বলেছিল যে, আল্লাহ হলেন মসীহ এবং তাঁর মাতা। আর এটিই হলো মহান আল্লাহর বাণী— “তুমি কি মানুষকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে ও আমার মাতাকে দুই উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করো?” (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ১১৬)ইবনে আবি হাতিম বলেন: আমাদের কাছে আবদুল্লাহ বিন হিলাল আদ-দিমাশকী বর্ণনা করেছেন, আমাদের কাছে আহমাদ বিন আবিল হাওয়াযী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আবু সুলায়মান আদ-দারানী বলেছেন: হে আহমাদ!
আল্লাহর কসম, ‘তিনজনের তৃতীয়’—তাদের এই কথা বলার জন্য তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত আর কেউ তাদের জিহ্বাকে সচল করেনি; অথচ আল্লাহ চাইলে অবশ্যই তাদের জিহ্বাকে নিস্তব্ধ করে দিতে পারতেন।
মহান আল্লাহর বাণী: স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ বলবেন, “হে মারইয়াম-তনয় ঈসা! আপনার প্রতি ও আপনার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ করুন, যখন আমি আপনাকে পবিত্র আত্মা দ্বারা শক্তিশালী করেছিলাম, আপনি দোলনায় থাকা অবস্থায় এবং পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলতেন; এবং যখন আমি আপনাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম; এবং যখন আপনি আমার আদেশে কাদা দিয়ে পাখির প্রতিকৃতির মতো তৈরি করতেন, অতঃপর আপনি তাতে ফুঁ দিতেন, ফলে আমার আদেশে তা পাখি হয়ে যেত; আর আপনি আমার আদেশে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করতেন এবং যখন আপনি আমার আদেশে মৃতকে জীবিত করে উত্থিত করতেন; আর যখন আমি বনী ইসরাঈলকে আপনার থেকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম যখন আপনি তাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলেন, তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল তারা বলেছিল, ‘এ তো স্পষ্ট জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়’।”ইবনে আবি হাতিম, ইবনে আসাকির এবং ইবনে মারদুওয়াইহ আবু মুসা আল-আশআরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন নবীগণ এবং তাঁদের উম্মতদের ডাকা হবে।
এরপর ঈসা (আ.)-কে আহ্বান করা হবে এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর প্রতি প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেবেন এবং তিনি তা স্বীকার করবেন। আল্লাহ বলবেন: হে মারইয়াম-তনয় ঈসা! আপনার প্রতি ও আপনার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ করুন… (আয়াতের শেষ পর্যন্ত)।অতঃপর তিনি বলবেন: আপনি কি মানুষকে বলেছিলেন, আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে দুই উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করো? (সূরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ১১৬)। তখন তিনি তা অস্বীকার করবেন। এরপর খ্রিস্টানদের আনা হবে এবং তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে, তারা বলবে: “হ্যাঁ, তিনিই এ কথা বলেছিলেন।”
ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শাইখ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে মহান আল্লাহর বাণী “এটি এমন একটি দিন যেদিন সত্যবাদীদের তাদের সত্যবাদিতা উপকারে আসবে” এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি এমন একটি দিন যেদিন একত্ববাদীদের তাদের তাওহীদ (একত্ববাদ) উপকারে আসবে।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী (রহ.) থেকে মহান আল্লাহর বাণী “আল্লাহ বললেন: এটি এমন একটি দিন যেদিন সত্যবাদীদের তাদের সত্যবাদিতা উপকারে আসবে” এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর বক্তব্যের পরিসমাপ্তি এবং এটি হলো কিয়ামতের দিন।আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনুল মুনযির এবং আবুশ শাইখ কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: কিয়ামতের দিন দুইজন বক্তা কথা বলবেন।আল্লাহর নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর শত্রু ইবলিস।
ইবলিস বলবে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন” (সূরা ইবরাহীম, আয়াত ৪২) থেকে তাঁর বাণী “তবে আমি যে তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম এবং তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে” পর্যন্ত। আল্লাহর এই শত্রু সেদিন সত্য কথা বলবে, অথচ সে দুনিয়াতে মিথ্যাবাদী ছিল। আর ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর ব্যাপারে মহান আল্লাহ তোমাদের নিকট যা বর্ণনা করেছেন তা হলো তাঁর বাণী: “আর যখন আল্লাহ বলবেন: হে মারইয়াম তনয় ঈসা! তুমি কি মানুষকে বলেছিলে—আল্লাহর পরিবর্তে আমাকে ও আমার জননীকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করো? তিনি বলবেন: আপনি পবিত্র, আমার জন্য যা শোভন নয় তা বলা আমার কাজ নয়” (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ১১৬) থেকে আয়াতের শেষ পর্যন্ত: “আল্লাহ বলবেন: এটি এমন একটি দিন যেদিন সত্যবাদীদের তাদের সত্যবাদিতা উপকারে আসবে।” তিনি পার্থিব জীবনে এবং মৃত্যুর পরেও সত্যবাদী ছিলেন।মহান আল্লাহর বাণী: “আসমানসমূহের রাজত্ব আল্লাহরই” (আয়াতের শেষ পর্যন্ত)।আবু উবাইদ তাঁর ‘ফাদায়িল’ গ্রন্থে আবুল যাহিরিয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সূরা আল-মায়িদাহর শেষে লিখেছিলেন: “আসমান ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”


ওযযা নামে বাস্তব জগতে কিছুর অস্তিত্ব আছে?

ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মক্কা বিজয়ের পর নবী মুহাম্মদ সাহাবী খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পাঠিয়েছিলেন ‘উযযা’ নামের বিখ্যাত দেবীমূর্তি ধ্বংস করতে। এটি ছিল কুরায়েশ এবং বনু কেনানাহ গোত্রের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দেবী। খালিদ প্রথমবার গিয়ে ওই মূর্তিটি ভেঙে ফিরে এলে নবী মুহাম্মদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি কিছু দেখেছ?” খালিদ উত্তর দেন, না। তখন মুহাম্মদ বলেন, “তাহলে তুমি মূর্তিটি ধ্বংস করোনি। আবার যাও।” দ্বিতীয়বার খালিদ মন্দিরের কাছে পৌঁছে দেখতে পান, এক কৃষ্ণাঙ্গ নগ্ন নারী, যার চুল বিশৃঙ্খল, তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। স্থানীয় মন্দির-প্রহরী তাকে দেখে চিৎকার শুরু করলে খালিদ সেই নারীকে এক কোপে হত্যা করেন। এরপর যখন তিনি নবীর কাছে ফিরে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ বলেছিলেন—“হ্যাঁ, সেই নারীই ছিল উযযা। সে তোমাদের দেশে পূজা পাওয়ার আশা চিরতরে হারাল।”[18]

সেনাদল এবং প্রতিনিধি দল প্রেরণ
১. মক্কা বিজয়ের পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৮ হিজরীর রমযানের ২৫ তারিখে খালেদ ইবনে ওলীদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি ছারিয়্যা প্রেরণ করেন। ওযযা নির্মূল করতে এ অভিযান প্রেরণ করা হয়। ওযযা ছিলো নাখলায়। কোরায়শ এবং সমগ্র বনু কেনানা গোত্র এ মূর্তির পূজা করতো। এটি ছিলো তাদের সবেচেয়ে বড় মূর্তি। বনু শায়বান গোত্র এ মূর্তির তত্ত্বাবধান করতো। হযরত খালেদ ত্রিশ জন সওয়ারী সৈন্যসহ নাখলায় গিয়ে এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেন। ফিরে আসার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত খালেদকে
জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি কিছু দেখেছ? তিনি বলেন, কই না তো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তবে তো তুমি মূর্তিই ভাঙ্গতে পারোনি?
হযরত খালেদ পুনরায় নাঙ্গা তলোয়ার উঁচিয়ে গেলেন। এবার তিনি দেখলেন তাঁর দিকে এক কালো নগ্ন মাথা ন্যাড়া মহিলা এগিয়ে আসছে। হযরত খালেদ তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন।
এতে সেই মহিলা দুই টুকরো হয়ে গেলো। হযরত খালেদ এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এসে খবর দিলেন। তিনি বললেন, হাঁ, সেই ছিলো ওযযা। এবার সে তোমাদের দেশে তার পূজার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে।
২. এরপর সেই মাসেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোয়া নামক অন্য একটি মূর্তি ধ্বংস করতে আমর ইবনুল আসকে পাঠালেন। এটা ছিলো মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে। রেহাত এলাকায় বনু হোয়াইল গোত্র এর পূজা করতো। হযরত আমর সেখানে যাওয়ার পর পুরোহিত বললো, তুমি কি চাও? তিনি বললেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে এ মূর্তি

সত্তা 5

উযযার কাহিনিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। ইসলামQA তাবারী, সা’লাবী, ইয়াকুত এবং নাসাঈর বর্ণনা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে উযযার উপাসনাস্থলে একটি নারী-শয়তান ছিল, সে মন্দিরের ভেতর থেকে উপাসকদের সঙ্গে কথা বলত এবং খালিদ তাকে হত্যা করেন। তাদের ভাষায়: “فيها شيطانة”—“তার মধ্যে একটি নারী-শয়তান ছিল”; আরও স্পষ্টভাবে, “وهي التي كانوا يعبدونها في الحقيقة من دون الله”—“বাস্তবে আল্লাহর পরিবর্তে তাকেই তারা উপাসনা করত।” নাসাঈর ১১৪৮৩ নম্বর বর্ণনাটির সনদকেও সেখানে হাসান বলা হয়েছে। [19] অর্থাৎ উযযার মূর্তি বা উপাসনাস্থল ধ্বংস করাই শেষ কথা ছিল না; ইসলামি ব্যাখ্যা নিজেই তার পেছনে পূজা গ্রহণকারী একটি বাস্তব শয়তানি সত্তা বসিয়েছে।

তাহলে এই সত্তাগুলো কী নিজেদের উপাসনা চেয়েছিল? উপাসনা চাওয়ার কারনেই কী এই সত্তাগুলো জাহান্নামের জ্বালানি হবে?

উযযার ক্ষেত্রে ইসলামি বর্ণনা তাই এক অদ্ভুত দ্বিস্তর তৈরি করে। দেবী হিসেবে উযযার দেবত্ব অস্বীকার করা হচ্ছে, কিন্তু তার উপাসনাস্থলের পেছনে থাকা পূজা-গ্রহণকারী সত্তাটিকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে না; তাকে নতুন পরিচয়ে শয়তান বলা হচ্ছে। নাম বদলেছে, ধর্মতাত্ত্বিক মর্যাদা বদলেছে, কিন্তু পৌত্তলিক উপাসনার অপর প্রান্তে থাকা অতিপ্রাকৃত সত্তাটি রয়ে গেছে। সহিহ মুসলিমের জিন-উপাসনা, কোরআন ৩৪:৪১-এর “তারা জিনদের উপাসনা করত” এবং উযযার “বাস্তবে তাকেই তারা উপাসনা করত”—এই বর্ণনাগুলো পাশাপাশি রাখলে ইসলামের পৌত্তলিকতা-বিরোধী ব্যাখ্যার ভেতরে একটি পরিষ্কার সাদৃশ্য দেখা যায়: পুরনো দেবতাদের অস্তিত্ব পুরোপুরি মুছে না দিয়ে তাদের জিন বা শয়তান হিসেবে পুনঃপরিচিত করা হয়েছে।


‘আমি’ ও ‘আমরা’: কোরআনের ঈশ্বরের কণ্ঠে সংখ্যার পরিবর্তন

কোরআনের ঈশ্বর নিজের সম্পর্কে সর্বত্র একই ব্যাকরণগত রূপ ব্যবহার করেন না। কোথাও তিনি সরাসরি একবচনে “আমি”, “আমাকে”“আমার” বলেন, আবার কোথাও একই ঈশ্বরের কাজ বোঝাতে “আমরা”, “আমাদের” এবং বহুবচন ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়। এর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ সূরা আম্বিয়ার ২১:২৫ আয়াত, যেখানে একই বাক্যের শুরুতে বলা হচ্ছে—“আমরা তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসূল পাঠাইনি যাকে আমরা ওহি করিনি”—আর বাক্যের শেষেই সেই বক্তা একবচনে ঘোষণা করছেন—“আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; অতএব আমারই ইবাদত কর।” অর্থাৎ একই আয়াতের একই বক্তা কয়েকটি শব্দের ব্যবধানেই “আমরা” থেকে “আমি”-তে চলে যাচ্ছেন। [20] অনুরূপ পরিবর্তন সূরা কিয়ামাহ ৭৫:১–৪-এও দেখা যায়: প্রথমে “আমি শপথ করছি”, তারপরই “আমরা কি তার অস্থি একত্র করব না?”। ইসলামি ব্যাখ্যায় একে সাধারণত জাম‘ আত-তা‘যীম বা মহিমাসূচক বহুবচন এবং কোরআনের ইলতিফাত বা বক্তৃতার রূপান্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যাকে প্রাক-ইসলামি আরবের সাধারণ রাজকীয় ভাষার সরাসরি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখানো কঠিন। কোরআনের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে M. A. S. Abdel Haleem-এর গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাক-ইসলামি আরবি সাহিত্য এবং কোরআন নাজিলের সময় সামাজিক মর্যাদা বোঝাতে রাজা বা গোত্রপ্রধানদের নিজের জন্য এই ধরনের বহুবচন সর্বনাম ব্যবহারের স্পষ্ট নজির পাওয়া যায় না; তাঁর মতে কোরআনেই এই ব্যবহার একটি বিশেষ অলংকারিক রূপ লাভ করেছে। [21]


‘আমরা’ কি শুধুই মহিমাসূচক বহুবচন?

আরও লক্ষণীয় হলো, ইসলামি ব্যাখ্যার মধ্যেও কোরআনের প্রতিটি “আমরা”-কে শুধু একজন বক্তার আত্মমর্যাদাসূচক বহুবচন হিসেবে বোঝানো হয়নি। ইবনে তাইমিয়া “নাহনু” বা “আমরা” নিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এই রূপ এমন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় যার অধীনে অনুগত সহায়করা কাজ করে; অধীনস্থরা তার নির্দেশে কোনো কাজ সম্পন্ন করলে সেই ক্ষমতাবান বলতে পারে, “আমরা এটি করেছি।” তিনি কোরআনের ফেরেশতাদের এই ব্যাখ্যার মধ্যে সরাসরি নিয়ে আসেন এবং বলেন, আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের মাধ্যমে যেসব কাজ করান, সেখানে এই বহুবচন ব্যবহৃত হতে পারে। [22] ইসলামQA-ও ইবনে তাইমিয়ার একই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে—আল্লাহর “আমরা” এমন কাজের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় যা তাঁর নির্দেশে ফেরেশতারা সম্পন্ন করে। [23] অর্থাৎ পরবর্তী ইসলামি ধর্মতত্ত্বে প্রচলিত “এটা শুধু রাজকীয় আমরা” উত্তরটি পুরো চিত্র নয়; প্রভাবশালী ইসলামি ব্যাখ্যার মধ্যেই বক্তার সঙ্গে অধীনস্থ অতিপ্রাকৃত সত্তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের ধারণা রয়েছে।

এখানে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়, কারণ কোরআনে “আমরা” শব্দটি নিজেই সবসময় আল্লাহকে বোঝায় না। সূরা সাফফাত ৩৭:১৬৪–১৬৬-এ ফেরেশতারাই নিজেদের সম্পর্কে “আমরা” বলে; সূরা মারইয়াম ১৯:৬৪-তেও বক্তা বলে, “আমরা আপনার প্রতিপালকের আদেশ ছাড়া অবতরণ করি না”—এখানে বক্তা আল্লাহ হতে পারেন না, কারণ একই বাক্যে “আপনার প্রতিপালক” আলাদা তৃতীয় পুরুষে উল্লেখিত। Richard Bell ও W. Montgomery Watt এই কারণেই কোরআনের বেশ কিছু জায়গার “আমরা”-কে আল্লাহর তথাকথিত majestic plural না ধরে ফেরেশতা বা জিবরাইলের কণ্ঠ হিসেবে পড়ার সম্ভাবনা আলোচনা করেছেন। তারা এমনকি স্বীকার করেছেন যে অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর “আমরা” এবং ফেরেশতাদের “আমরা”-র মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণ করা সহজ নয়। [24] ফলে কোরআনের বহুবচন সর্বনামকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে “মহিমাসূচক আমরা” হিসেবে অনুবাদ করে সমস্যাটি শেষ করে দেওয়া যায় না; প্রথমে নির্ধারণ করতে হয় আসলে কে কথা বলছে।


পুরনো সেমিটিক দেবসভা থেকে কোরআনের ফেরেশতাদের সভা

এই ভাষাগত বৈশিষ্ট্যকে আরও পুরনো সেমিটিক ধর্মীয় সাহিত্যের পটভূমি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখারও কারণ নেই। প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্ম শুরু থেকেই বর্তমান ইহুদি একেশ্বরবাদের মতো ছিল না। প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্ম নিয়ে আধুনিক গবেষণায় এল, ইয়াহওয়ে, বাআল, আশেরা এবং একটি স্বর্গীয় divine council বা দেবসভার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। Oxford Bibliographies-এর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ইসরায়েলীয় ঈশ্বর-ধারণা কেনানীয় ধর্মীয় পরিবেশ থেকেই গড়ে উঠেছিল এবং প্রাচীন পর্যায়ে অন্য দেবতার অস্তিত্ব বা উপাসনাকে বাদ দেওয়া হয়নি; কঠোর একেশ্বরবাদ অনেক পরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। [25] Mark S. Smith-এর The Origins of Biblical Monotheism-এও প্রাচীন ইসরায়েলের বহু-দেবতাবিশিষ্ট পটভূমি, এল ও বাআলের দেবসভা এবং ইসরায়েলীয় ধর্মে সেই স্বর্গীয় সভার চিহ্ন বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। [26]

প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মের ইতিহাসে এই স্বর্গীয় সভা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাচীন ইসরায়েল শুরু থেকেই বর্তমান ইহুদি একেশ্বরবাদের ধর্মতত্ত্ব অনুসরণ করত না। ইয়াহওয়ের পাশাপাশি অন্য দেবতার বিশ্বাস ও উপাসনা ছিল; এল, বাআল, আশেরা এবং স্বর্গীয় দেবসভার ধারণা সেই ধর্মীয় পরিবেশের অংশ ছিল। Oxford Bibliographies-এর পর্যালোচনায় প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মের প্রথম পর্যায়ে অন্য দেবতার বিশ্বাস ও উপাসনা এবং divine council-এর উপস্থিতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। [25] Mark S. Smith দেখিয়েছেন, ইয়াহওয়েকে একমাত্র সত্য ঈশ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধর্মতত্ত্ব বহু-দেবতাবিশিষ্ট প্রাচীন ইসরায়েলীয় পরিবেশের মধ্য থেকেই বিকশিত হয়েছে। পুরনো দেবসভা পরে পুরোপুরি উধাও হয়নি; অন্য স্বর্গীয় সত্তাগুলো ধীরে ধীরে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের অধীনস্থ সত্তায় পরিণত হয়েছে। [26] কোরআনের আল্লাহকেও একই ধরনের স্বর্গীয় পরিবেশে দেখা যায়—তাঁর চারপাশে ফেরেশতা, জিন ও অন্য অতিপ্রাকৃত সত্তা; তিনি তাদের সামনে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেন, নির্দেশ দেন এবং তাদের দিয়ে কাজ করান।

কোরআনের আদম-কাহিনিতেই পুরনো দেবসভার এই কাঠামো সরাসরি দৃশ্যমান। কোরআনের আদম-সৃষ্টির কাহিনি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় এর সঙ্গে ইহুদি রাব্বিনিক সাহিত্যের divine council বা স্বর্গীয় সভার কাহিনির সরাসরি সাহিত্যিক সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। কোরআন ২:৩০–৩৪-এ আল্লাহ আদম সৃষ্টির সিদ্ধান্ত ফেরেশতাদের সামনে ঘোষণা করেন, ফেরেশতারা প্রশ্ন তোলে, পরে আদমকে তাদের সামনে হাজির করা হয়—এই কাহিনির গঠন Genesis Rabbah ও অন্য রাব্বিনিক আদম-কাহিনির দেবসভা-পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বহন করে। Cambridge University Press-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা এই কোরআনিক আদম-কাহিনির অন্যতম প্রধান পটভূমি হিসেবেই divine council-কে চিহ্নিত করেছে। [27]

এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে কোরআনের “আমি”“আমরা”-র ঘনঘন পরিবর্তন নতুন তাৎপর্য পায়। পুরনো সেমিটিক ধর্মে সর্বোচ্চ দেবতা একা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কথা বলেন না; তাঁকে ঘিরে থাকে একটি স্বর্গীয় সভা। পরবর্তী একেশ্বরবাদে সেই সভার সদস্যদের দেবত্ব কমিয়ে ফেরেশতা ও অধীনস্থ স্বর্গীয় সত্তায় পরিণত করা হলেও সভা, স্বর্গীয় অনুচর এবং যৌথ কার্যকলাপের ভাষা থেকে যায়। কোরআনেও আল্লাহ কখনো “আমি”, কখনো “আমরা”; আবার ফেরেশতারাও নিজেদের “আমরা” বলে। ইবনে তাইমিয়ার ব্যাখ্যায় আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা কাজ করলে সেই কাজের জন্য আল্লাহ “আমরা করেছি” বলতে পারেন। অর্থাৎ কোরআনের বহুবচন শুধু একজন একাকী বক্তার আত্মমর্যাদার ভাষা নয়; ইসলামি ব্যাখ্যার মধ্যেই আল্লাহর সঙ্গে তাঁর স্বর্গীয় কর্মীদের যৌথ কার্যসম্পাদনের ধারণা ঢুকে আছে। এর সঙ্গে আরও পুরনো সেমিটিক দেবসভার ভাষাগত ও কাহিনিগত সাদৃশ্য উপেক্ষা করার মতো নয়।

এই প্রেক্ষাপটে আলোচিত হওয়া জরুরি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হল “স্যাটানিক ভার্সেস”। ইসলামি ঐতিহাসিক গ্রন্থ যেমনঃ আল-তাবারী, ইবনে সা’দ, ওয়াকিদি ইত্যাদি অনুসারে, সূরা আন-নাজম পাঠের সময় মুহাম্মদ বলেছিলেন: “এই তিন নারী দেবী—আল-লাত, আল-উজ্জা ও মানাত—উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। নিশ্চয়ই তাঁদের সুপারিশ প্রত্যাশিত।” এই আয়াত শুনে মক্কার পৌত্তলিকরা খুশি হয়ে সিজদা করে। পরে মুহাম্মদ বলেন, শয়তান তাঁকে এই আয়াত মুখে দিয়েছিল এবং তিনি তা বাতিল করেন। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে, মুহাম্মদ প্রাথমিক পর্যায়ে পৌত্তলিক সমাজকে তুষ্ট করতে ধর্মতাত্ত্বিক আপস করেন। এই বর্ণনায় আল-লাত, আল-উজ্জা ও মানাতকে নিছক অস্তিত্বহীন নাম হিসেবে বাতিল করা হয়নি; বরং তাদের জন্য উচ্চ মর্যাদা ও সুপারিশের ক্ষমতার ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। ২৩:১৪-এর “সর্বোত্তম স্রষ্টা”, ৩৭:১২৫-এর বাআলের বিপরীতে একই “সর্বোত্তম স্রষ্টা” এবং পৌত্তলিক দেবীদের সুপারিশের এই বর্ণনা একত্রে রাখলে মক্কার বহু-দেবতাভিত্তিক ধর্মীয় ভাষার প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


একই মাক্কী সূরাগুলোতেই দুই বিপরীত ভাষা

এই সমস্যাকে মক্কা ও মদিনার দুই আলাদা পর্যায়ে ভাগ করেও সমাধান করা যায় না। কারণ আল্লাহর একচ্ছত্র সৃষ্টিক্ষমতার সবচেয়ে শক্ত ঘোষণাগুলোর কয়েকটিও মাক্কী সূরাতেই রয়েছে। সূরা যুমার মাক্কী এবং সেখানেই বলা হয়েছে, “আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা” (৩৯:৬২)। সূরা ফাতিরও মাক্কী; সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছে, “আল্লাহ ছাড়া কি কোনো স্রষ্টা আছে?” (৩৫:৩)। আবার মাক্কী সূরা নাহলে আল্লাহ ছাড়া উপাসিত সত্তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, “তারা কিছুই সৃষ্টি করে না; বরং তারাই সৃষ্ট” (১৬:২০)। একই মাক্কী সময়ের সূরা মু’মিনুনে আল্লাহ “সর্বোত্তম স্রষ্টা” (২৩:১৪), আর সূরা সাফফাতে বাআলের বিপরীতে আবার “সর্বোত্তম স্রষ্টা” (৩৭:১২৫)। অর্থাৎ সমস্যাটি পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে শুধু ভাষা বদলে যাওয়ার নয়; একই প্রাথমিক কোরআনিক ধর্মতত্ত্বের মধ্যেই একদিকে একমাত্র স্রষ্টার ঘোষণা, অন্যদিকে একাধিক খালিক-এর মধ্যে সর্বোত্তম হওয়ার তুলনামূলক ভাষা পাশাপাশি রয়েছে।

  • “আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা।” — সূরা যুমার ৩৯:৬২
  • “আল্লাহ ছাড়া কি তোমাদের কোনো স্রষ্টা আছে?” — সূরা ফাতির ৩৫:৩
  • “তারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং নিজেরাই সৃষ্ট।” — সূরা নাহল ১৬:২০
  • “আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা।” — সূরা মু’মিনুন ২৩:১৪
  • “তোমরা কি বাআলকে ডাকছ এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে ছেড়ে দিচ্ছ?” — সূরা সাফফাত ৩৭:১২৫

এই পাঁচটি আয়াত পাশাপাশি রাখলেই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রটি পরিষ্কার হয়। এক জায়গায় অন্য কারও সৃষ্টিক্ষমতা নেই; অন্য জায়গায় আল্লাহ নিজেই একাধিক খালিক-এর মধ্যে “আহসান” বা শ্রেষ্ঠ। তাফসিরকারীরা এই সংঘাত সামলেছেন খালিক শব্দটির অর্থ ভাগ করে—আল্লাহর সৃষ্টি প্রকৃত সৃষ্টি, অন্যদের সৃষ্টি কেবল পরিকল্পনা বা রূপদান। কিন্তু সেই সমাধান কোরআনের মূল বাক্যকে বদলায় না: “أحسن الخالقين” একটি বহুবচন গোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্বের ভাষা।


উপসংহার: প্রশ্ন, সন্দেহ এবং এর প্রভাব

এই প্রবন্ধে আমরা কুরআনের অভ্যন্তরে নিহিত একটি মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক সংশয় বিশ্লেষণ করেছি, যা ইসলামের ঘোষিত কঠোর একেশ্বরবাদী অবস্থানের সাথে বহু উপাস্য সত্তার প্রচ্ছন্ন অস্তিত্বের ধারণার সাংঘর্ষিকতাকে তুলে ধরে। বিশেষত, সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১৪) এর ‘আল্লাহ, যিনি সর্বোত্তম স্রষ্টা’ বাক্যটি ভাষাতাত্ত্বিকভাবে একাধিক স্রষ্টার অনুমানকে সমর্থন করে, যা সূরা ফাতির (৩৫:৩) এবং সূরা জুমার (৩৯:৬২) এর মতো অন্যান্য আয়াত যেখানে আল্লাহকে একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে দাবি করা হয়েছে, তার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই বৈপরীত্য কেবল ভাষাগত অলংকার নয়, বরং ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের একটি অন্তর্নিহিত সংকটের প্রতীক।

এছাড়াও, কোরআনের আয়াত (সূরা আল-ইসরা ১৭:৫৭, সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৯৮–১০১, সূরা সাবা ৩৪:৪০–৪১, সূরা মা’ইদাহ ৫:১১৬–১১৭) যেখানে মিথ্যা উপাস্য, জিন, শয়তান এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে উপাসিত ঈসা-ফেরেশতাদের আলাদা করা হয়েছে, সেখানে পৌত্তলিক উপাসনার পেছনে বাস্তব অতিপ্রাকৃত সত্তার ধারণা বারবার উঠে আসে। সহিহ মুসলিম সরাসরি আরবদের জিন-উপাসনার কথা বলেছে; সূরা সাবা ৩৪:৪১ বলেছে, “তারা জিনদের উপাসনা করত”; আর উযযার ইসলামি ব্যাখ্যায় মূর্তির পেছনের নারী-শয়তানকে বলা হয়েছে—“বাস্তবে তাকেই তারা উপাসনা করত।” অর্থাৎ ইসলাম পুরনো দেবতাদের দেবত্ব বাতিল করেছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে যুক্ত অতিপ্রাকৃত সত্তাকে বহু ক্ষেত্রে জিন বা শয়তান হিসেবে পুনঃস্থাপন করেছে।

ঐতিহাসিক পটভূমিতে কোরআনের এই বৈচিত্র্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই গ্রন্থ একদিকে আল্লাহর একক উপাস্য হওয়ার ঘোষণা দেয়, অন্যদিকে “সর্বোত্তম স্রষ্টা”, আল্লাহর স্বর্গীয় সভা, ফেরেশতা ও জিনের সক্রিয় ভূমিকা এবং বক্তার “আমি” থেকে “আমরা”-য় যাতায়াতও ধরে রাখে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আরও পুরনো সেমিটিক ধর্মীয় ভাষার সঙ্গে স্পষ্ট সাদৃশ্য বহন করে, যার ইতিহাসে সর্বোচ্চ দেবতার চারপাশে অন্য স্বর্গীয় সত্তার সভা, বহু দেবতার অস্তিত্ব এবং পরে সেই কাঠামোকে একেশ্বরবাদী রূপ দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মে এই পরিবর্তন এখন ধর্মের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র: প্রথম দিকের ধর্মে অন্য দেবতার অস্তিত্ব ও উপাসনা ছিল, পরে ইয়াহওয়ের একচ্ছত্র উপাসনা এবং আরও পরে অন্য দেবতার অস্তিত্বকেই অস্বীকারকারী একেশ্বরবাদ শক্তিশালী হয়। কোরআন সেই অনেক পরের একেশ্বরবাদী ধারার অংশ হলেও তার কাহিনি ও ভাষায় পুরনো স্বর্গীয় সভার কাঠামো নতুন নামে—ফেরেশতা, জিন ও আল্লাহর অনুগত স্বর্গীয় বাহিনী হিসেবে—দৃশ্যমান থাকে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘আল্লাহ’ কোনো চিরস্থায়ী পরম সত্তা নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গঠিত চরিত্র, যার গঠনপ্রক্রিয়া ধর্মপ্রচারক মুহাম্মদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতেই নির্ধারিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কুরআনের এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যগুলো ইসলামের মৌলিক একত্ববাদের দাবির সাথে একটি গভীর ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা তৈরি করে, যা ইসলামে অন্ধবিশ্বাসীগণ নানাভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। তবে ব্যাখ্যাগুলো একটু পর্যালোচনা করলেই সেসব ব্যাখ্যার অযৌক্তিক অবস্থান পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন ২৩ঃ১৪ 1 2
  2. তাফসীর আল-কাবীর — সূরা আল-মু’মিনুন ২৩:১৪ ↩︎
  3. সূরা হুদ, ১১:১ ↩︎
  4. তাফসীর আল-কাবীর — ২৩:১৪ ↩︎
  5. তাফসীর আত-তাবারী — ৩৭:১২৫ ↩︎
  6. কুরআন ২৩:১৪ ↩︎
  7. কুরআন ৪২:১১; ২৩:১৪ ↩︎
  8. কুরআন ৩৭:১২৫ ↩︎
  9. কোরআন ২১:৯৮-১০০ ↩︎
  10. সহিহ মুসলিম ৩০৩০d ↩︎
  11. সহিহ মুসলিম ৩০৩০a–d ↩︎
  12. কুরআনুল কারীম ২য় খণ্ড – ড. যাকারীয়া, পৃষ্ঠা ১৭৩১ ↩︎
  13. সূরা আল-আম্বিয়া: 98 ↩︎
  14. কোরআন ৫:১১৬১১৭ ↩︎
  15. কুরআনুল কারীম ১ম খণ্ড – ড. যাকারীয়া, পৃষ্ঠা ৬১২-৬১৩ ↩︎
  16. আল-মায়িদা: 116 ↩︎
  17. আল-মায়িদা: 117 ↩︎
  18. আর রাহীকুল মাখতুম, আল কোরআন একাডেমী, পৃষ্ঠা ৪২৬ ↩︎
  19. IslamQA — What was al-‘Uzza? ↩︎
  20. Qur’anic Arabic Corpus — Quran 21:25 ↩︎
  21. M. A. S. Abdel Haleem, “Grammatical Shift for Rhetorical Purposes: Iltifāt and Related Features in the Qur’an” ↩︎
  22. Ibn Taymiyyah, Majmūʿ al-Fatāwā — IslamWeb ↩︎
  23. IslamQA — هل يقال: أعوان الله؟ ↩︎
  24. Discussion of Bell–Watt and Qur’anic speaker shifts ↩︎
  25. Oxford Bibliographies — God, Ancient Israel 1 2
  26. Mark S. Smith, The Origins of Biblical Monotheism 1 2
  27. “Adam and the Names,” Bulletin of the School of Oriental and African Studies ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.