ভূমিকা
একটি কূপের পানি দেখতে স্বচ্ছ হলেও তাতে রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকতে পারে। মানুষের মলজাত বর্জ্য, পচনশীল প্রাণীদেহ কিংবা ব্যবহৃত রক্তমাখা কাপড় কূপে পৌঁছালে পানির স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অথচ বুযাআহ কূপের বর্ণনায় এসব ধরনের আবর্জনার উপস্থিতি জানার পর মুহাম্মদ ঘোষণা করেন, ‘পানি পবিত্র; কোনো কিছু তাকে অপবিত্র করে না।’ অজুর সময় পানি মুখে নিয়ে কুলি করা ও নাকে দেওয়া হয়; ফলে পানির স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার প্রশ্নকে শুধু ‘পান করার বিষয় নয়’ বলে সরিয়ে রাখা যায় না। কূপের পানি রোগজীবাণু থেকে নিরাপদ কি না, তা কোনো ধর্মীয় ঘোষণায় নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় পানির প্রকৃত দূষণ ও পরীক্ষার ফল দিয়ে।
ইসলামি হাদিসশাস্ত্রে মদিনার বুযাআহ কূপের একটি বর্ণনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আবু সাঈদ খুদরির সূত্রে সংরক্ষিত এই হাদিসে বলা হয়েছে, কূপটিতে ঋতুস্রাবের ব্যবহৃত কাপড়, কুকুরের মৃতদেহ বা মাংস এবং দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা পড়ত। ওই কূপের পানি দিয়ে অজু করা যাবে কি না জানতে চাইলে মুহাম্মদ উত্তর দেন, «الْمَاءُ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ»—’পানি পবিত্র; কোনো কিছুই তাকে অপবিত্র করে না।’ বাক্যটি সরাসরি এবং ব্যাপক। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সেখানে কেবল বিমূর্ত পবিত্রতার আলোচনা ছিল না; বাস্তবে আবর্জনা পড়া একটি নির্দিষ্ট পানির উৎস ব্যবহারের বিষয়ও ছিল। [1] [2]
এই বর্ণনা পরীক্ষা করার জন্য প্রাচীন ইসলামি উৎসগুলোর মধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। আবু দাউদের পরবর্তী হাদিসে একই কূপের পানিতে মানুষের মলজাত আবর্জনা পড়ার কথাও এসেছে এবং কূপের মাপ ও পানির পরিবর্তিত রং সম্পর্কে পরবর্তী পর্যবেক্ষণ সংরক্ষিত হয়েছে। অন্য একটি হাদিসে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি থাকলে অপবিত্রতা বহন না করার কথা বলা হয়েছে। অপরদিকে সহিহ মুসলিমে স্থির পানিতে প্রস্রাব করে পরে সেই পানিতে গোসল করতে নিষেধ করা হয়েছে। ধ্রুপদি ফকিহদের মধ্যেও দূষণের কারণে রং, গন্ধ বা স্বাদ বদলে যাওয়া পানিকে অপবিত্র গণ্য করার ঐকমত্য এবং অপরিবর্তিত পানির ক্ষেত্রে পরিমাণভিত্তিক মতভেদ রয়েছে। ফলে মূল হাদিসের নিঃশর্ত ভাষা, তার প্রয়োগ এবং পরবর্তী ইসলামি বিধিব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্কটি পরীক্ষা না করলে বক্তব্যটির প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্য বোঝা যায় না।
মানবমল, প্রাণীর দেহাবশেষ কিংবা অন্য জৈব বর্জ্য কূপে পড়লে তা পানি দূষণের বাস্তব উৎস হতে পারে। পানিতে রোগজীবাণুর উপস্থিতি, দূষণের মাত্রা, অক্সিজেন ও জৈব পদার্থের পরিবর্তন এবং মানুষের সংক্রমণঝুঁকি পরীক্ষাযোগ্য বিষয়। মুহাম্মদের ‘কোনো কিছুই পানিকে অপবিত্র করে না’ বক্তব্যের সঙ্গে এই বাস্তবতার সংঘাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হাদিসটি কোনো বিমূর্ত বস্তু নয়, আবর্জনা পড়া একটি নির্দিষ্ট কূপের পানি ব্যবহারের প্রশ্নে উচ্চারিত হয়েছিল। অজুর অনুমতির মাধ্যমে সেই পানি মুখ ও নাকের সংস্পর্শেও আনার অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল। [3]
বুযাআহ কূপের হাদিস: ধর্মীয় দাবির মূল বর্ণনা
সুনান আবু দাউদের ৬৬ নম্বর হাদিসে আবু সাঈদ খুদরির সূত্রে বুযাআহ কূপ সম্পর্কে প্রশ্ন ও মুহাম্মদের উত্তর সংরক্ষিত হয়েছে। একই বক্তব্য জামে তিরমিজি ৬৬ এবং সুনান নাসায়ি ৩২৬-এও রয়েছে। মূল বাক্যে طَهُورٌ শব্দটি আচারগত পবিত্রতা ও পবিত্রতা অর্জনের উপযোগিতা নির্দেশ করে; لا ينجسه شيء কথাটির সরাসরি অর্থ, ‘কোনো বস্তু তাকে অপবিত্র করে না’। উত্তরটির ভাষায় নির্দিষ্ট ধরনের বর্জ্য, পরিমাণ কিংবা পানির রং–গন্ধের কোনো ব্যতিক্রম দেওয়া হয়নি। প্রশ্নটি অজু নিয়ে করা হয়েছিল, কিন্তু অজুতে কুলি ও নাকে পানি নেওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট কূপের পানি শরীরের সংবেদনশীল অংশের সংস্পর্শে আসে। ‘প্রশ্নটি পান করা নিয়ে নয়’—এমন কথা এই সংস্পর্শজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বাতিল করে না। [4] [5]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৩: পাক-পবিত্রতা
পরিচ্ছেদঃ ৭. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – পানির বিবরণ
৪৭৮-[৫] আবূ সা’ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একদিন) জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি ’’বুযা-’আহ্’’ কূপের পানি দিয়ে উযূ (ওযু/ওজু/অজু) করতে পারি? কেননা এ কূপটিতে হায়যের নেঁকড়া, মরা কুকুর ও বিভিন্ন ধরনের দুর্গন্ধময় আবর্জনা ফেলা হয়। উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পানি পবিত্র। কোন জিনিসই সেটাকে নাপাক করতে পারে না। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও নাসায়ী)[1]
[1] সহীহ : আহমাদ ২১০১, আবূ দাঊদ ৬৬, তিরমিযী ৬৬, নাসায়ী ৩২৬, ইরওয়া ১৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনান আবু দাউদের বাংলা অনুবাদেও আবর্জনার উপস্থিতি এবং পানিকে অপরিবর্তনীয়ভাবে পবিত্র বলার বক্তব্য একইভাবে পাওয়া যায়। মূল সংকলনে বিষয়টি ‘বুযাআহ নামক কূপ প্রসঙ্গে’ শিরোনামে রাখা হয়েছে। বাংলা সংস্করণে হাদিসের পর সংযুক্ত ব্যাখ্যায় আবার বলা হয়েছে, অপবিত্রতা পড়ার ফলে পানির কোনো একটি বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হলে পানি আর পবিত্র থাকে না এবং অন্যান্য হাদিস দ্বারা মূল বক্তব্যের ব্যাপকতা সীমিত করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যা হাদিসটির মূল বাক্যের অংশ নয়; সম্পাদকীয় বা ফিকহি ব্যাখ্যা। মূল বর্ণনা ও তার পরবর্তী ব্যাখ্যার পার্থক্য তাই গুরুত্বপূর্ণ। [6]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
অধ্যায়ঃ ১/ পবিত্রতা অর্জন
৩৪. বুযা‘আহ নামক কূপ প্রসঙ্গে
৬৬। আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আমরা কি (মদীনার) ‘বুযাআহ’ নামক কূপের পানি দিয়ে অযু করতে পারি? কূপটির মধ্যে মেয়েলোকের হায়িযের নেকড়া, কুকুরের গোশত ও যাবতীয় দুর্গন্ধযুক্ত জিনিস নিক্ষেপ করা হত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ পানি পবিত্র, কোন কিছু একে অপবিত্র করতে পারে না।(1)
সহীহ।
(1) তিরমিযী (অধ্যায়ঃ পবিত্রতা, অনুঃ পানিকে কোনো জিনিস অপবিত্র করতে পারে না, হাঃ ৬৬, ইমাম তিরমিযী বলেন, এ হাদীসটি হাসান), নাসায়ী (অধ্যায়ঃ পানি, অনুঃ বুদ‘আহ কূপের বর্ণনা, হাঃ ৩২৫), আহমাদ (৩/১৫, ১৬, ৩১, ৮৬), দারাকুতনী (১/৩০-৩১) আবূ সাঈদ খুদরী সূত্রে। এর সানাদ সহীহ। হাদীস থেকে শিক্ষাঃ অপবিত্রতা পড়ার কারণে পানির কোনো একটি বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়ে গেলে তা পবিত্রতা থেকে বের হয়ে যায়। আলোচ্য হাদীসের ‘উমূম (ব্যাপকতা) অন্য হাদীসাবলী দ্বারা খাস করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বুযাআহ কূপের কথাটি আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসায়িতে পাওয়া গেলেও এগুলোকে সরলভাবে তিনটি স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে গণনা করা যায় না। আবু দাউদ ৬৬, তিরমিজি ৬৬ ও নাসায়ি ৩২৬-এ আবু সাঈদ খুদরি পর্যন্ত বর্ণনাধারার উল্লেখযোগ্য অংশ একই, বিশেষত আবু উসামা, ওয়ালিদ ইবনে কাসির ও মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাজির পর্যায়। আবু দাউদ ৬৭-এ পৃথক মধ্যবর্তী বর্ণনাপথ সংরক্ষিত থাকলেও সেটির উৎসও আবু সাঈদ। এসব পাঠের মিল ও পার্থক্য বর্ণনাটির প্রাচীন সংবহন বুঝতে সাহায্য করে; এগুলোর সংখ্যা দিয়ে কূপের পানি সত্যিই জীবাণুমুক্ত ছিল—এমন সিদ্ধান্ত আসে না। [7] [8]
আবু দাউদ ৬৭: মানুষের বর্জ্য, কূপের মাপ ও পানির পরিবর্তিত রং
বুযাআহ কূপের আলোচনায় আবু দাউদের পরবর্তী হাদিসটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ৬৭ নম্বর হাদিসে প্রশ্নের ধরন কিছুটা ভিন্ন: মুহাম্মদের জন্য যে কূপ থেকে পানি আনা হয়, সেখানে কুকুরের মৃতদেহের অংশ, ঋতুস্রাবের ব্যবহৃত কাপড় এবং عَذِرُ النَّاسِ, অর্থাৎ মানুষের মলজাত বর্জ্য পড়ার কথা বলা হয়েছে। আগের বর্ণনায় দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থের সাধারণ উল্লেখ থাকলেও এখানে মানুষের বর্জ্যের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। অথচ এই বর্ণনাতেও উত্তর একই—পানি পবিত্র, কোনো কিছু তাকে অপবিত্র করে না। আবু দাউদ এই হাদিসের শেষে কূপের গভীরতা, প্রস্থ এবং পানির রং সম্পর্কে তাঁর সংগ্রহ করা তথ্যও সংযুক্ত করেছেন। [9]
وَهِيَ بِئْرٌ يُلْقَى فِيهَا لُحُومُ الْكِلاَبِ وَالْمَحَايِضُ وَعَذِرُ النَّاسِ . قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِنَّ الْمَاءَ طَهُورٌ لاَ يُنَجِّسُهُ شَىْءٌ
বাংলা অনুবাদ: এটি এমন একটি কূপ, যাতে কুকুরের দেহের অংশ, ঋতুস্রাবের ব্যবহৃত কাপড় এবং মানুষের মলজাত আবর্জনা পড়ে। [মুহাম্মদ বলেন:] পানি পবিত্র; কোনো কিছুই তাকে অপবিত্র করে না।
পরবর্তী অংশে আবু দাউদ জানান, কুতাইবা ইবনে সাঈদ কূপটির দেখাশোনাকারী ব্যক্তিকে পানির গভীরতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাঁর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ অবস্থায় কোমরের নিচের অঞ্চল পর্যন্ত এবং কমলে তারও নিচে থাকত। আবু দাউদ নিজের কাপড় দিয়ে কূপের প্রস্থ মেপে প্রায় ছয় হাত পেয়েছিলেন। তিনি বাগানের প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়া ব্যক্তিকে কূপের নির্মাণকাঠামো বদলেছে কি না প্রশ্ন করলে সেই ব্যক্তি ‘না’ বলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি আবু দাউদের নিজের ভাষায়: তিনি কূপে পরিবর্তিত রঙের পানি দেখেছিলেন। [10]
وَرَأَيْتُ فِيهَا مَاءً مُتَغَيِّرَ اللَّوْنِ
বাংলা অনুবাদ: আর আমি সেখানে পরিবর্তিত রঙের পানি দেখেছি।
এই বিবরণ থেকে দুটি পৃথক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। প্রথমত, আবু দাউদের সংকলনে কূপ সম্পর্কে নিছক মুখে মুখে প্রচলিত প্রশ্নোত্তরই নেই; পরবর্তী সময়ে কূপটির দৃশ্যমান অবস্থা পর্যবেক্ষণের নথিও রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আবু দাউদের দেখা পানির রং পরিবর্তিত হওয়ার কারণ তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি। কাজেই এই বাক্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে মানুষের মল বা পশুর দেহাবশেষের কারণেই পানির রং পাল্টেছিল। একইভাবে পরবর্তী যুগে পর্যবেক্ষিত পানির রং মুহাম্মদের সময়েও ঠিক তেমন ছিল—এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না। তবে কূপটির পানি যে সবসময় সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ও স্বচ্ছ ছিল—এমন দাবি করার জন্য এই বর্ণনাটি কোনো ভিত্তি সরবরাহ করে না।
একটি কূপের প্রস্থ ও পানির গভীরতা থেকে আনুমানিক ধারণক্ষমতা অনুমান করা গেলেও তার জীবাণুবৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা নির্ধারিত হয় না। কূপে ভূগর্ভস্থ পানি কত দ্রুত প্রবাহিত হতো, কোন পথ দিয়ে বর্জ্য প্রবেশ করত, কতদিন পানি স্থির থাকত এবং জীবাণুর ঘনত্ব কত ছিল—এসব বিষয়ে আবু দাউদের বিবরণে কোনো পরীক্ষাযোগ্য তথ্য নেই। ‘কূপে প্রচুর পানি ছিল’ কথাটিও তাই একা স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার প্রমাণ নয়।
আবর্জনা কূপে কীভাবে পড়ত: মূল হাদিস ও পরবর্তী ব্যাখ্যার পার্থক্য
মূল আরবি বর্ণনায় يُطْرَحُ فِيهَا ও يُلْقَى فِيهَا ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ কূপটিতে ঋতুস্রাবের ব্যবহৃত কাপড়, কুকুরের দেহাবশেষ ও অন্যান্য আবর্জনা নিক্ষিপ্ত হতো বা পড়ত। আবু দাউদ ৬৭-তে মানুষের মলজাত বর্জ্যের কথাও রয়েছে। হাদিসে কে এসব বস্তু ফেলত, সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়নি। কিন্তু দূষণের প্রশ্নে বস্তুগুলো কীভাবে কূপে পৌঁছেছিল তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেগুলো কূপের পানির সংস্পর্শে এসেছিল।
পরবর্তী ইসলামি ব্যাখ্যায় আবর্জনা বৃষ্টির পানি বা ঢলের স্রোতে ভেসে কূপে পৌঁছানোর ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই ব্যাখ্যা মূল হাদিসে সরাসরি নেই। তদুপরি, স্রোতে ভেসে আসা মানবমল বা প্রাণীর পচনশীল দেহাবশেষও পানিদূষণের উৎস; ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলা না হলে বর্জ্য জীবাণুমুক্ত হয়ে যায় না। আধুনিক কূপ-সুরক্ষায় বৃষ্টির দূষিত প্রবাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ও বন্যার পানি প্রবেশকে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে বর্জ্য ফেলা হয়েছিল নাকি ভেসে এসেছিল, এই বিতর্ক মুহাম্মদের পানির পবিত্রতা-সংক্রান্ত সাধারণ ঘোষণার বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। [11] [12] [13]
‘পানি পবিত্র’—ইসলামি আচারগত অর্থ বনাম স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা
বুযাআহ কূপের হাদিসে প্রশ্নটি ছিল আবর্জনাপূর্ণ কূপের পানি দিয়ে অজু করা যাবে কি না। মুহাম্মদের উত্তর ছিল, ‘পানি পবিত্র; কোনো কিছু তাকে অপবিত্র করে না।’ এই বাক্যে বর্জ্যের ধরন, পরিমাণ কিংবা পানির পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্য অনুসারে কোনো শর্ত দেওয়া হয়নি। ইসলামি ফিকহে طَهُورٌ আচারগত পবিত্রতার শব্দ হলেও এর ভিত্তিতে ওই কূপের পানি বাস্তবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে পানি ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি সরাসরি প্রাসঙ্গিক।
অজুতে মুখে পানি নিয়ে কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ফলে অজুর জন্য গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা কূপের পানি মুখগহ্বর, নাসাপথ, ত্বক ও চোখের সংস্পর্শে আসতে পারে; অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু পানি গিলে ফেলার সম্ভাবনাও থাকে। দূষিত পানিতে থাকা রোগজীবাণু সংস্পর্শ ও প্রবেশের পথ অনুযায়ী সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই ‘পান করার কথা বলা হয়নি’—এই যুক্তি অজুর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর নয়। বাস্তব ঝুঁকির মাত্রা পানির দূষণ, অণুজীবের প্রকৃতি এবং সংস্পর্শের ওপর নির্ভর করে, ধর্মীয় অনুমতির ওপর নয়।
পরবর্তী ইসলামি ফকিহরা পানিতে অপবিত্র পদার্থ পড়ে রং, স্বাদ বা গন্ধ পরিবর্তিত হলে তা অপবিত্র গণ্য করার বিধান দিয়েছেন। কিন্তু এই শর্ত মুহাম্মদের উল্লিখিত বাক্যে নেই; এটি অন্যান্য বর্ণনা ও ফিকহি বিশ্লেষণ দিয়ে পরবর্তী সময়ে আরোপিত সীমা। এমনকি রং, স্বাদ ও গন্ধ অপরিবর্তিত থাকলেও পানিতে রোগজীবাণু উপস্থিত থাকতে পারে। ফলে পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যাও কোনো কূপের পানিকে জীবাণুবৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ প্রমাণ করে না।
একই হাদিসশাস্ত্রে দূষিত পানি সম্পর্কে পৃথক নির্দেশ
সুনান আবু দাউদে বুযাআহ কূপের হাদিসের ঠিক আগেই পানির পরিমাণসংক্রান্ত একটি বর্ণনা রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমরের সূত্রে মুহাম্মদ বলেছেন, পানি দুই কুল্লা পরিমাণ হলে তা অপবিত্রতা বহন করে না। কুল্লা ছিল বড় পাত্রের একটি একক; এর সুনির্দিষ্ট আধুনিক আয়তন নির্ধারণ নিয়ে ধ্রুপদি ফিকহে হিসাব ও মতভেদ রয়েছে। বক্তব্যটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে পানির পরিমাণকে অপবিত্রতার বিধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে—যা ‘কোনো কিছুই পানিকে অপবিত্র করে না’ বাক্যের নিঃশর্ত পাঠের তুলনায় একটি পৃথক শর্ত। [14]
إِذَا كَانَ الْمَاءُ قُلَّتَيْنِ لَمْ يَحْمِلِ الْخَبَثَ
বাংলা অনুবাদ: পানি যখন দুই কুল্লা পরিমাণ হয়, তখন তা অপবিত্রতা বহন করে না।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ পবিত্রতা
পরিচ্ছেদঃ ৩৬. বদ্ধ পানিতে পেশাব করা সম্পর্কে।
৬৯. আহমাদ ইবনু ইউনূস …. আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন বদ্ধ পানিতে পেশাব না করে; অতঃপর উক্ত পানি দ্বারা গোসল করে। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, নাসাঈ)।
باب الْبَوْلِ فِي الْمَاءِ الرَّاكِدِ
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا زَائِدَةُ، فِي حَدِيثِ هِشَامٍ عَنْ مُحَمَّدٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ لاَ يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الدَّائِمِ ثُمَّ يَغْتَسِلُ مِنْهُ ” .
حكم : صحيح (الألباني
حدثنا احمد بن يونس، حدثنا زاىدة، في حديث هشام عن محمد، عن ابي هريرة، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال “ لا يبولن احدكم في الماء الداىم ثم يغتسل منه ” . حكم : صحيح (الالباني
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রার সূত্রে আরও একটি নির্দেশ পাওয়া যায়: স্থির পানিতে প্রস্রাব করে তারপর সেই পানিতে গোসল করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই বক্তব্যে পানি দূষণের একটি নির্দিষ্ট আচরণ নিষিদ্ধ হচ্ছে। বুযাআহ কূপের বর্ণনার পাশাপাশি এটি রাখলে বোঝা যায়, ইসলামি হাদিসশাস্ত্রে পানিকে সব অবস্থায় অপরিবর্তিত ও ব্যবহারযোগ্য ধরে নেওয়ার একমাত্রিক ধারণা নেই। একদিকে আবর্জনা পড়া কূপের পানি অজুর উপযোগী বলা হয়েছে, অন্যদিকে স্থির পানিতে মানবমূত্র যোগ করার আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই দুই বর্ণনার পারস্পরিক সম্পর্ক পরবর্তী ফিকহি আলোচনার একটি বাস্তব প্রশ্ন। [15]
لاَ يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الدَّائِمِ ثُمَّ يَغْتَسِلُ مِنْهُ
বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কেউ যেন স্থির পানিতে প্রস্রাব না করে এবং তারপর সেই পানিতে গোসল না করে।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২/ তাহারাত (পবিত্রতা)
পরিচ্ছেদঃ ২৮. স্থির পানিতে পেশাব করা নিষেধ
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫৪৯ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৮২
৫৪৯। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ যেন পানিতে পেশাব করে পরে তা দিয়ে যেন গোসল না করে।
باب النَّهْىِ عَنِ الْبَوْلِ، فِي الْمَاءِ الرَّاكِدِ
وَحَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ هِشَامٍ، عَنِ ابْنِ سِيرِينَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ لاَ يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الدَّائِمِ ثُمَّ يَغْتَسِلُ مِنْهُ ” .
وحدثني زهير بن حرب، حدثنا جرير، عن هشام، عن ابن سيرين، عن ابي هريرة، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال “ لا يبولن احدكم في الماء الداىم ثم يغتسل منه ” .
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
একই হাদিসশাস্ত্রে দুই কুল্লা পানির বিধান এবং স্থির পানিতে প্রস্রাবের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এগুলো দেখায়, পানি দূষণ ও ব্যবহার নিয়ে মুহাম্মদের বিভিন্ন বক্তব্যে এক ধরনের অভিন্ন নিয়ম পাওয়া যায় না। এক জায়গায় বলা হয়েছে ‘কোনো কিছুই পানিকে অপবিত্র করে না’; অন্য জায়গায় পানির পরিমাণের শর্ত এসেছে এবং স্থির পানিতে প্রস্রাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তী ফকিহরা এই বক্তব্যগুলো মিলিয়ে বিধান নির্মাণ করেছেন। কিন্তু ভিন্ন হাদিস দিয়ে মূল বাক্যের ব্যাপকতা সীমিত করা মুহাম্মদের নিঃশর্ত ঘোষণাটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক প্রমাণ করে না।
নবীর নিঃশর্ত বক্তব্যের বিপরীতে আলেমদের ইজমা: দুর্বল হাদিসে ঐক্যমত্য ও মূল অর্থ পরিবর্তন
বুযাআহ কূপের পানি সম্পর্কে মুহাম্মদের উত্তর ছিল, «الْمَاءُ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ»—‘পানি পবিত্র; কোনো কিছু একে অপবিত্র করতে পারে না।’ বক্তব্যটি এমন কূপের প্রসঙ্গে এসেছে, যেখানে মাসিকের কাপড়, কুকুরের মৃতদেহ বা মাংস এবং দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য পড়ার কথা প্রশ্নেই উল্লেখ ছিল। অথচ মুহাম্মদ উত্তরটিতে কোনো পরিমাণগত সীমা, রং-গন্ধ-স্বাদের শর্ত কিংবা ব্যতিক্রম উল্লেখ করেননি। হাদিসের সাধারণ ভাষাকে পরবর্তী ফকিহরা যেভাবে সীমিত করেছেন, সেখানে একটি গভীর অসংগতি দেখা যায়: যে ব্যতিক্রমটি মুহাম্মদের সহিহ বক্তব্যে নেই, তা-ই পরবর্তী ইসলামী আইনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলেমদের ইজমা দিয়ে; আর সেই ব্যতিক্রমের ভাষা বহনকারী পৃথক হাদিসকে মুহাদ্দিসেরা দুর্বল বলেছেন। এটি কেবল ধর্মীয় পরিভাষার বিরোধ নয়। মূল বক্তব্য, ব্যতিক্রমের সনদ এবং পরে গৃহীত আইন—এই তিন স্তর পাশাপাশি রাখলেই পরিবর্তনটি স্পষ্ট হয়। [16] [17]
কোন বক্তব্য সহিহ, কোন ব্যতিক্রম দুর্বল: দলিল ও বিধানের তুলনামূলক সারণি
একই বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনার মান এক নয়। মূল বাক্যটির গ্রহণযোগ্যতা এবং পরে যুক্ত হওয়া ব্যতিক্রমের দুর্বলতা গুলিয়ে ফেললে মনে হতে পারে, মুহাম্মদ নিজেই প্রথম বাক্যের সঙ্গে শর্তটি নির্ভরযোগ্যভাবে যোগ করেছিলেন। নিচের সারণিতে উৎস, বক্তব্য, বর্ণনার মূল্যায়ন এবং পরে গৃহীত বিধান পৃথক করা হয়েছে। এখানে ‘সহিহ’ ও ‘দুর্বল’ ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের সনদগত মূল্যায়ন; পানির বাস্তব জীবাণুবৈজ্ঞানিক নিরাপত্তার পরীক্ষা নয়।
| উৎস | বক্তব্য ও তার পরিসর | হাদিসশাস্ত্রীয় মান বা কর্তৃত্ব | মূল সমস্যা |
|---|---|---|---|
| সুনান আবু দাউদ ৬৬ | «الْمَاءُ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ» — পানি পবিত্র; কোনো কিছু একে অপবিত্র করে না। | সহিহ — আলবানির মূল্যায়ন। | মূল বাক্যে স্বাদ, রং, গন্ধ বা পানির পরিমাণের ব্যতিক্রম নেই। |
| জামে তিরমিজি ৬৬ | বুযাআহ কূপের একই মৌলিক বক্তব্য: পানিকে কোনো কিছু অপবিত্র করে না। | হাসান — তিরমিজির নিজস্ব মূল্যায়ন। | একই ঘটনার বর্ণনা; পৃথক গ্রন্থে উপস্থিতি মানেই সম্পূর্ণ স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য নয়। |
| ইবনে মাজাহ ৫২১; বুলুগুল মারাম ৩ | ‘পানি অপবিত্র হয় না, তবে স্বাদ, গন্ধ বা রং পরিবর্তিত হলে।’ | দুর্বল — আবু হাতিম; নববি শেষের ব্যতিক্রমকে দুর্বল বলেছেন। | সহিহ মূল বাক্যে অনুপস্থিত শর্তটি এখানেই যুক্ত হয়েছে; এটি সহিহ প্রমাণিত নয়। |
| সুনান আবু দাউদ ৬৫ | পানি দুই কুল্লা পরিমাণ হলে অপবিত্র হয় না—পরিমাণনির্ভর পৃথক বর্ণনা। | সহিহ — আলবানির মূল্যায়ন। | দুই কুল্লার কম পানি সম্পর্কে বিপরীত বিধান নির্ণয়ে ফকিহদের মতভেদ আছে। |
| নববি, আল-মাজমু, ১/১৬০–১৬১ | অপবিত্র বস্তুর কারণে পানির রং, স্বাদ বা গন্ধ বদলালে তা অপবিত্র। | ইজমাভিত্তিক ফিকহি বিধান — হাদিস নয়। | দুর্বল ব্যতিক্রমী বর্ণনার বিধান ইজমাকে ভিত্তি করে কার্যকর রাখা হয়েছে। |
এই সারণির সিদ্ধান্ত সরল: সহিহ মূল বর্ণনা নিঃশর্ত; সরাসরি ব্যতিক্রম যুক্ত করা বর্ণনাটি দুর্বল; ব্যতিক্রমের বিধানটি পরবর্তী ফকিহদের ঐকমত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘ইজমা সহিহ’ কিংবা ‘ইজমা জইফ’—এভাবে বলা সঠিক হবে না, কারণ ইজমা নিজে কোনো হাদিস নয়। কিন্তু ইজমার মাধ্যমে এমন একটি বিধান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা মূল সহিহ হাদিসের সাধারণ অর্থ সীমিত করে। এই সীমাবদ্ধতা নিজে থেকে মুহাম্মদের মুখে অনুপস্থিত বাক্যটি বসিয়ে দেয় না।
ইবনুল মুনযির: মূল হাদিসের ব্যাপকতা স্বীকার করেও ব্যতিক্রমের ইজমা
ইবনুল মুনযির তাঁর আল-আওসাত ফিস সুনানি ওয়াল ইজমা ওয়াল ইখতিলাফ গ্রন্থে প্রথমে বলেছেন, পানির পরিমাণ কম হোক বা বেশি, অপবিত্র পদার্থ পড়ে স্বাদ, রং অথবা গন্ধ পরিবর্তিত হলে পানি অপবিত্র এবং তা দিয়ে অজু বা গোসল যথেষ্ট হবে না। তিনি আরও বলেছেন, বিপুল পানিতে অপবিত্র বস্তু পড়লেও এসব বৈশিষ্ট্য না বদলালে পানি আগের মতো পবিত্র থাকে। কিন্তু অল্প পানিতে অপবিত্র বস্তু পড়লে—রং, স্বাদ, গন্ধ না বদলানো সত্ত্বেও—কী হবে, সেই প্রশ্নে তিনি আলেমদের মতভেদ নথিবদ্ধ করেছেন। তাঁর আলোচনা এখানেই শেষ নয়; বুযাআহ কূপের বর্ণনা উদ্ধৃত করে তিনি নিজেই বলেছেন, মুহাম্মদের উত্তরটি সমস্ত পানির জন্য সাধারণ, এমনকি অল্প পানির জন্যও। অর্থাৎ মূল বক্তব্যের ব্যাপকতা প্রাচীন ইসলামি ফিকহশাস্ত্রেই স্বীকৃত; সেটিকে অগ্রাহ্য করে পরিমাণভিত্তিক সীমা তৈরি করা সর্বসম্মত কোনো মূল পাঠ নয়। [18]
সুতরাং এখানে দুটি পৃথক বিষয় রয়েছে: দূষণের কারণে পানির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হলে তা অপবিত্র—এই বিধানে ইজমার দাবি; এবং পানি সামান্য হলেও অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শে আসামাত্র অপবিত্র হবে কি না—সেই বিষয়ে আলেমদের মতভেদ। ‘সব আলেম একমত’ কথাটি দ্বিতীয় প্রশ্নে প্রয়োগ করলে ইবনুল মুনযিরের নিজের আলোচনাই বিকৃত হয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মূল হাদিসের ব্যাপক ভাষা স্বীকার করেও এর প্রয়োগ সীমিত করার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে। এর ফলে প্রশ্ন উঠে: মুহাম্মদের বক্তব্য যদি নিজেই পরিষ্কার ও নিঃশর্ত হয়, তাহলে তার প্রযোজ্যতা নির্ধারণ করতে পরবর্তী আলেমদের পৃথক শর্ত ও পরিমাণগত নিয়ম কেন প্রয়োজন হলো?
শিরাজি ও নববি: দুর্বল হাদিস দিয়ে বিধান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, পরে ইজমার আশ্রয়
সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে নববির আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব-এ। মূল গ্রন্থকার আবু ইসহাক শিরাজি পানির স্বাদ, রং বা গন্ধ বদলালে তা অপবিত্র হওয়ার বিধান প্রতিষ্ঠা করতে এমন একটি হাদিস ব্যবহার করেছেন, যেখানে ‘পানি পবিত্র; কোনো কিছু একে অপবিত্র করতে পারে না’ বাক্যের পরে ‘তবে যা তার স্বাদ বা গন্ধ পরিবর্তন করে’—এই শর্ত আছে। নববি সরাসরি জানিয়েছেন, এই ব্যতিক্রমসংবলিত হাদিস দুর্বল, তা দিয়ে দলিল প্রতিষ্ঠা করা যায় না; দুর্বলতা বিশেষভাবে শেষাংশে অর্থাৎ ব্যতিক্রমে। অথচ ব্যতিক্রম ছাড়া মূল বাক্যটি সহিহ। এরপর তিনি স্পষ্ট বলেছেন, দুর্বলতার কারণে ইজমাকেই প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একই জায়গায় তিনি শিরাজির ব্যবহৃত দলিলের সমস্যাও আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ আলেমদের গ্রহণ করা বিধান অপরিবর্তিত থাকলেও সেই বিধানের পক্ষে প্রথমে উপস্থাপিত হাদিসকে পরবর্তী ভাষ্যকার দুর্বল বলেছেন এবং দলিলের ভিত্তি সরিয়ে নিয়েছেন ইজমায়। [19]
قال المصنف – رحمه الله تعالى – باب ما يفسد الماء من النجاسة وما لا يفسده:
( إذا وقعت في الماء نجاسة لا يخلو: إما أن يكون راكدا أو جاريا أو بعضه راكدا وبعضه جاريا، فإن كان راكدا نظرت في النجاسة، فإن كانت نجاسة يدركها الطرف من خمر أو بول أو ميتة لها نفس سائلة؛ نظرت، فإن تغير أحد أوصاف الماء من طعم أو لون أو رائحة بالنجاسة، فهو نجس لقوله صلى الله عليه وسلم: { الماء طهور لا ينجسه شيء إلا ما غير طعمه أو ريحه } فنص على الطعم والريح، وقسنا اللون عليهما؛ لأنه في معناهما ).
( الشرح ) هذا الحكم الذي ذكره وهو نجاسة الماء المتغير بنجاسة مجمع عليه، قال ابن المنذر: أجمعوا أن الماء القليل أو الكثير إذا وقعت فيه نجاسة فغيرت طعما أو لونا أو ريحا، فهو نجس، ونقل الإجماع كذلك جماعات من أصحابنا وغيرهم، وسواء كان الماء جاريا أو راكدا قليلا أو كثيرا، تغير تغيرا فاحشا أو يسيرا، طعمه أو لونه أو ريحه، فكله نجس بالإجماع، وقد سبق في المتغير بطاهر: أنه لا يعتبر التغير اليسير على الأصح، وأنه يعتبر تغير الأوصاف الثلاثة على قول ضعيف، وتقدم الفرق، ويستثنى مما ذكرناه ما إذا تغير الماء بميتة لا نفس لها سائلة كثرت فيه، فإنه لا ينجس عن وجه ضعيف مع قولنا بنجاسة هذا الحيوان، لكن لما كان هذا الوجه ضعيفا لم يلتفت الأصحاب إليه فلم يستثنوه، وأما الحديث الذي ذكره المصنف فضعيف لا يصح الاحتجاج به، وقد رواه ابن ماجه والبيهقي من رواية أبي أمامة وذكرا فيه: طعمه أو ريحه أو لونه، واتفقوا على ضعفه، ونقل الإمام الشافعي تضعيفه عن أهل العلم بالحديث، وبين البيهقي ضعفه، وهذا الضعف في آخره وهو الاستثناء.
وأما قوله: الماء طهور لا ينجسه شيء فصحيح من رواية أبي سعيد الخدري وسبق بيانه في أول الباب الأول، وإذا علم ضعف الحديث تعين الاحتجاج بالإجماع كما قاله البيهقي وغيره من الأئمة، وقد أشار إليه الشافعي أيضا فقال: الحديث لا يثبت أهل الحديث مثله ولكنه قول العامة لا أعلم بينهم فيه خلافا، وأما قول المصنف: فنص على الطعم والريح وقسنا اللون عليهما فكأنه قاله؛ لأنه لم يقف على الرواية التي فيها اللون وهي موجودة في سنن ابن ماجه والبيهقي كما قدمنا، فإن قيل: لعله رآها فتركها لضعفها، قلنا: هذا لا يصح؛ لأنه لو راعى الضعف واجتنبه لترك جملة الحديث لضعفه المتفق عليه، والله أعلم.
( فرع ) لو وقعت جيفة في ماء كثير فتروح بها بالمجاورة ولم ينحل منها شيء فوجهان. الصحيح الذي صرح به كثيرون واقتضاه كلام الباقين: أنه نجس، ونقله إمام الحرمين عن دلالة كلام الأئمة وصححه؛ لأنه يعد متغيرا بالنجاسة ومستقذرا، وقال الشيخ أبو محمد: طاهر؛ لأنه مجاور فأشبه الجيفة خارج الماء.
বাংলা অনুবাদ:
গ্রন্থকার আবু ইসহাক শিরাজি বলেছেন—‘অপবিত্র বস্তু দ্বারা পানি কীভাবে নষ্ট হয় এবং কীভাবে হয় না’ অধ্যায়:
যখন কোনো অপবিত্র বস্তু পানিতে পড়ে, তখন পানিটি স্থির হতে পারে, প্রবাহমান হতে পারে অথবা তার একাংশ স্থির এবং অন্য অংশ প্রবাহমান হতে পারে। পানি স্থির হলে তাতে পতিত অপবিত্র বস্তুর প্রকৃতি বিবেচনা করতে হবে। যদি সেটি চোখে দেখা যায় এমন কোনো অপবিত্র বস্তু হয়—যেমন মদ, প্রস্রাব অথবা প্রবাহমান রক্তবিশিষ্ট মৃত প্রাণী—তাহলে দেখতে হবে, ওই অপবিত্র বস্তুর কারণে পানির স্বাদ, রং কিংবা গন্ধের কোনো একটি পরিবর্তিত হয়েছে কি না। এ ধরনের পরিবর্তন ঘটলে পানি অপবিত্র হয়ে যাবে। কারণ মুহাম্মদ বলেছেন: ‘পানি পবিত্র; কোনো কিছু একে অপবিত্র করতে পারে না, তবে যা এর স্বাদ বা গন্ধ পরিবর্তন করে।’ এখানে স্বাদ ও গন্ধের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা রংকেও এই দুটির ওপর কিয়াস করেছি, কারণ রং পরিবর্তনের বিষয়টিও একই ধরনের।
নববির ব্যাখ্যা:
গ্রন্থকার যে বিধানটি উল্লেখ করেছেন—অর্থাৎ অপবিত্র বস্তুর কারণে পানির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হলে পানি অপবিত্র হয়ে যায়—এ বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমরা একমত হয়েছেন যে, পানি অল্প হোক কিংবা বেশি, তাতে কোনো অপবিত্র বস্তু পড়ে যদি পানির স্বাদ, রং অথবা গন্ধ পরিবর্তিত হয়, তাহলে সেই পানি অপবিত্র। আমাদের মাজহাবের বহু আলেম এবং অন্যান্য আলেমও এই ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। পানি প্রবাহমান হোক কিংবা স্থির, অল্প হোক কিংবা বেশি, তার স্বাদ, রং অথবা গন্ধে বড় পরিবর্তন হোক কিংবা সামান্য পরিবর্তন—অপবিত্র বস্তুর কারণে এসব বৈশিষ্ট্যের কোনো একটি পরিবর্তিত হলে ঐকমত্য অনুযায়ী সেই পানি অপবিত্র।
এর আগে পবিত্র কোনো বস্তুর কারণে পানির পরিবর্তন ঘটার প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে যে, অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী সামান্য পরিবর্তন বিবেচ্য নয়। আবার একটি দুর্বল মত অনুযায়ী তিনটি বৈশিষ্ট্যের সবগুলো পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন। এই দুটি অবস্থার পার্থক্য আগেই আলোচনা করা হয়েছে।
উপরের বিধান থেকে একটি ব্যতিক্রমের সম্ভাবনা উত্থাপিত হয়েছে। প্রবাহমান রক্ত নেই এমন মৃত প্রাণী বিপুল পরিমাণে পানিতে পড়ে যদি পানির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে, তাহলে একটি দুর্বল মত অনুযায়ী পানি অপবিত্র হবে না, যদিও আমরা সেই প্রাণীকে অপবিত্র বলে গণ্য করি। কিন্তু এই মতটি দুর্বল হওয়ায় আমাদের মাজহাবের আলেমরা একে গুরুত্ব দেননি এবং ব্যতিক্রম হিসেবেও গ্রহণ করেননি।
গ্রন্থকার যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, সেটি দুর্বল এবং তার ভিত্তিতে দলিল প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইবনে মাজাহ ও বায়হাকি আবু উমামার সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বর্ণনায় পানির স্বাদ, গন্ধ অথবা রং পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। আলেমরা এই হাদিসের দুর্বলতার বিষয়ে একমত হয়েছেন। ইমাম শাফেয়িও হাদিসবিশারদদের কাছ থেকে এর দুর্বলতার মূল্যায়ন উদ্ধৃত করেছেন এবং বায়হাকি এর দুর্বলতা ব্যাখ্যা করেছেন। এই দুর্বলতা হাদিসটির শেষাংশে, অর্থাৎ ব্যতিক্রমসূচক অংশে রয়েছে।
অন্যদিকে ‘পানি পবিত্র; কোনো কিছু একে অপবিত্র করতে পারে না’—এই বক্তব্যটি আবু সাঈদ খুদরির সূত্রে সহিহ। প্রথম অধ্যায়ের শুরুতে বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে। আর যেহেতু ব্যতিক্রমসংবলিত হাদিসটির দুর্বলতা জানা গেল, তাই এ বিষয়ে ইজমা বা আলেমদের ঐকমত্যকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা আবশ্যক, যেমনটি বায়হাকি এবং অন্যান্য ইমাম বলেছেন।
ইমাম শাফেয়িও বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন: হাদিসবিশারদরা এ ধরনের হাদিসকে প্রতিষ্ঠিত বলে গ্রহণ করেন না। কিন্তু এটি সাধারণ আলেমদের অভিমত এবং এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো মতভেদ আছে বলে আমার জানা নেই।
গ্রন্থকার বলেছেন, হাদিসে স্বাদ ও গন্ধের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে এবং আমরা রংকে এই দুটির ওপর কিয়াস করেছি। সম্ভবত তিনি এ কথা বলেছেন, কারণ রংয়ের উল্লেখ রয়েছে—এমন বর্ণনাটি তাঁর জানা ছিল না। অথচ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ইবনে মাজাহ ও বায়হাকির সুনানে এই বর্ণনা রয়েছে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, হয়তো গ্রন্থকার বর্ণনাটি জানতেন, কিন্তু দুর্বল হওয়ার কারণে তা বাদ দিয়েছেন—তাহলে আমরা বলব, এই ব্যাখ্যা সঠিক নয়। কারণ তিনি যদি বর্ণনার দুর্বলতা বিবেচনা করে সেটি এড়িয়ে যেতেন, তাহলে সম্পূর্ণ হাদিসটিই বাদ দিতেন; কেননা এর দুর্বলতা সম্পর্কে ঐকমত্য রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
শাখা আলোচনা:
যদি কোনো বড় জলাশয়ে মৃত প্রাণীর দেহ পড়ে থাকে এবং সেই মৃতদেহ থেকে কোনো পদার্থ পানিতে মিশে না গেলেও কেবল সংলগ্ন অবস্থানে থাকার কারণে পানিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এ বিষয়ে দুটি মত রয়েছে। বহু আলেম স্পষ্টভাবে যে মতটি উল্লেখ করেছেন এবং অন্যদের বক্তব্য থেকেও যে সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়, অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী সেই পানি অপবিত্র। ইমামুল হারামাইন অন্যান্য ইমামের বক্তব্যের তাৎপর্য থেকে এই মতটি উদ্ধৃত করেছেন এবং সঠিক বলেছেন। কারণ এ ধরনের পানিকে অপবিত্র বস্তুর প্রভাবে পরিবর্তিত এবং ঘৃণ্য বলে গণ্য করা হয়।
অন্যদিকে শায়খ আবু মুহাম্মদ বলেছেন, সেই পানি পবিত্র থাকবে। কারণ মৃতদেহটি কেবল পানির সংস্পর্শে রয়েছে; তার কোনো অংশ পানিতে মিশে যায়নি। ফলে এই অবস্থাকে পানির বাইরে মৃতদেহ পড়ে থাকার অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়।
এখানে নববির বক্তব্যের তিনটি ধাপ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি মূল বাক্যের সহিহ হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন; যে সংযোজনটি মূল বাক্যের অর্থ সীমিত করে, সেটির দুর্বলতা প্রতিষ্ঠা করেছেন; এবং সবশেষে ফিকহি সিদ্ধান্তটি ইজমা দিয়ে বহাল রেখেছেন। এর ফলে যে বিধানটি মুহাম্মদের নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় সরাসরি নেই, তা আলেমদের সমষ্টিগত কর্তৃত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একে ইসলামী আইনতত্ত্বে ‘তাখসিস’ বা সাধারণ বক্তব্যকে নির্দিষ্ট শর্তে সীমাবদ্ধ করা বলা হয়। কিন্তু একটি ব্যাখ্যাগত পদ্ধতির নামকরণ তার পক্ষে স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ সরবরাহ করে না। বিশেষত শিরাজি যে বাক্যটিকে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে উদ্ধৃত করেছিলেন, নববি যখন সেই অতিরিক্ত অংশের সনদ দুর্বল বলে জানাচ্ছেন, তখন সেটিকে সহিহ নববী বক্তব্যের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা সরাসরি ভুল।
নববির উদ্ধৃতির শেষাংশে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ মতভেদ রয়েছে। কোনো বড় জলাশয়ের পাশে মৃত প্রাণীর দেহ পড়ে থেকে তার গন্ধ পানিতে ছড়ালে, কিন্তু মৃতদেহের কোনো অংশ পানিতে না মিশলেও, বহু ফকিহ সেই পানিকে অপবিত্র বলেছেন। বিপরীতে শায়খ আবু মুহাম্মদ সেটিকে পবিত্র বলেছেন। একই দৃশ্যের জন্য দুটো বিপরীত বিধান—একটিতে ‘অপবিত্র’, অন্যটিতে ‘পবিত্র’। এখানে পানির রাসায়নিক ও জীবাণুবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নয়, বরং ‘সংস্পর্শ’ ও ‘পরিবর্তন’ কীভাবে আইনি শ্রেণিতে পড়বে, তা নিয়ে বিরোধ চলছে। যদি বাস্তব নিরাপত্তা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হয়, তবে পানিতে রোগজীবাণু আছে কি না সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো পক্ষের বিধান থেকেই পাওয়া যায় না।
শাওকানির স্বীকারোক্তি: হাদিসের সাধারণ অর্থকে সীমিত করছে ইজমা ও অন্য বিধান
শাওকানি নাইলুল আওতার গ্রন্থে পানিতে অপবিত্র বস্তু পড়ার বিধান নিয়ে আলোচনায় বলেছেন, দুই কুল্লা বা তার বেশি পানি অপবিত্র পদার্থে বদলে গেলে ইজমার কারণে তাকে অপবিত্র গণ্য করা হয় এবং এর মাধ্যমে ‘কোনো কিছু পানিকে অপবিত্র করে না’ হাদিসের সাধারণ অর্থ সীমিত করা হয়। অল্প পানির ক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত না হলেও তা অপবিত্র হবে কি না—এই প্রশ্নে ‘দুই কুল্লা’ বর্ণনার ধারণাগত বিপরীত অর্থ গ্রহণ করা নিয়ে তিনি মতভেদ জানিয়েছেন। তিনি সরাসরি দেখিয়েছেন, মূল হাদিসের ব্যাপক শব্দার্থ এবং পরিমাণভিত্তিক বিধানের মধ্যে টানাপোড়েন আছে; ফকিহদের বিভিন্ন ব্যাখ্যায় সেই টানাপোড়েন মেটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। [20]
শাওকানির বক্তব্যে ‘ইজমার দ্বারা সাধারণ হাদিস সীমিত’ করার বিষয়টি সরাসরি উপস্থিত। অর্থাৎ সমালোচনাটি এমন নয় যে, পরবর্তী ফকিহদের সকলেই মুহাম্মদের বক্তব্যের আক্ষরিক ব্যাপকতা বুঝতে পারেননি। তাঁরা সেই ব্যাপকতা বুঝেই অন্য বিধানের সাহায্যে তার পরিসর সংকুচিত করেছেন। ইজমা কোনো সহিহ হাদিসের দুর্বল অংশকে ঐতিহাসিকভাবে সহিহ বানায় না; তা সর্বোচ্চ একটি পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে পারে। ফলে দুই প্রশ্ন আলাদা থেকেই যায়: পানি সম্পর্কে মুহাম্মদ কী বলেছেন, এবং আলেমরা পরে কোন শর্তে পানি অপবিত্র হওয়ার বিধান দিয়েছেন? প্রথম প্রশ্নের পাঠ দ্বিতীয় প্রশ্নের আইনগত সিদ্ধান্ত দিয়ে বদলে ফেলা যায় না।
দুই কুল্লা, অল্প পানি এবং রং-গন্ধ-স্বাদ: একই বিষয়ে বিপরীত মানদণ্ড
‘দুই কুল্লা’ হাদিসে বলা হয়েছে, পানি ওই পরিমাণে পৌঁছালে তা অপবিত্র হয় না। এই বর্ণনাকে কেন্দ্র করে কিছু ফকিহ দুই কুল্লার কম পানিতে অপবিত্র বস্তু পড়লে দৃশ্যমান পরিবর্তন না ঘটলেও তা অপবিত্র হবে বলে মত দিয়েছেন। অন্যরা বলেছেন, এমন বিপরীত অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাদিস থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ইবনুল মুনযির অল্প ও বেশি পানির সীমা নির্ধারণ এবং অল্প পানিতে অপবিত্র পদার্থ পড়ার বিধানে একাধিক ভিন্ন মত সংরক্ষণ করেছেন। এর ফলে একই দূষণের ঘটনা কোনো মতানুযায়ী পানিকে অপবিত্র করে, আবার অন্য মতানুযায়ী করে না। এই বিভেদ ‘সহিহ’ ও ‘দুর্বল’ হাদিসের সংখ্যাগত তুলনায় মেটে না; কারণ বিরোধের একটি বড় অংশ বর্ণনা থেকে বিধান আহরণের পদ্ধতিতেই নিহিত। [21] [22]
এই শর্তগুলোর ভেতরেও একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পানির রং, স্বাদ ও গন্ধ অপরিবর্তিত থাকলেও তাতে মলদূষণের সূচক ব্যাকটেরিয়া কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর অণুজীব থাকতে পারে। আবার কোনো পবিত্র ও অক্ষতিকর উপাদান পানির রং পরিবর্তন করতে পারে। ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তনকে পানির ধর্মীয় অপবিত্রতার মানদণ্ড বানানো আর সেই পানি দিয়ে কুলি করা বা নাকে পানি দেওয়া স্বাস্থ্যগতভাবে নিরাপদ কি না—এ দুটি ভিন্ন প্রশ্ন। আধুনিক পানির নিরাপত্তা নির্ধারণে জীবাণুবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, দূষণের উৎস, রাসায়নিক উপাদান এবং প্রাসঙ্গিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন; খালি চোখে স্বচ্ছ পানি বা অপরিবর্তিত গন্ধ সুরক্ষার নিশ্চয়তা নয়। বুযাআহ কূপের মতো বর্জ্যসংস্পর্শের বিবরণ থাকা পানির ক্ষেত্রে এই পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ।
সারকথা, একটি সহিহ বর্ণনায় মুহাম্মদ পানি সম্পর্কে নিঃশর্ত ঘোষণা দিয়েছেন; ব্যতিক্রম যোগ করা বর্ণনাটিকে নববি দুর্বল বলেছেন; ফকিহরা সেই ব্যতিক্রমী বিধান ইজমা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন; আর পানির পরিমাণ ও পরিবর্তনের সীমা নিয়েও পরস্পরবিরোধী নিয়ম তৈরি হয়েছে। এই ইতিহাসে মূল হাদিসের ভাষা ও পরবর্তী আইনগত প্রয়োগের ব্যবধান আড়াল করার সুযোগ নেই। ধর্মীয় আইনতত্ত্ব সেই ব্যবধানকে ‘ব্যাখ্যা’ বা ‘তাখসিস’ বলতে পারে; কিন্তু এতে মূল বক্তব্যের শব্দ বদলায় না এবং বর্জ্যযুক্ত পানির জীবাণুবৈজ্ঞানিক নিরাপত্তাও প্রমাণিত হয় না। নবীর নিঃশর্ত বক্তব্য, আলেমদের শর্তযুক্ত বিধান এবং পরীক্ষাযোগ্য বাস্তবতার মধ্যে যে সংঘাত রয়েছে, তা কোনো সনদের মর্যাদা বা ইজমার দাবি দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
পানি দূষণের বিজ্ঞান: জৈব পদার্থ, পচন ও জীবাণু
কোনো কূপে রক্তমাখা ব্যবহৃত কাপড়, প্রাণীর দেহাবশেষ কিংবা মানুষের মলজাত বর্জ্য পৌঁছানো পানিদূষণের বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করে। এসব পদার্থে জৈব যৌগ, পুষ্টি উপাদান এবং উৎসভেদে বিভিন্ন অণুজীব থাকে। মৃত প্রাণীর দেহ পচলে জৈব পদার্থ ভেঙে যায়; পানিতে দুর্গন্ধ, ঘোলাটে ভাব এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। মানুষের মলজাত বর্জ্য অন্ত্রীয় জীবাণু পানিতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই প্রক্রিয়াগুলো পানির স্বচ্ছতা বা ধর্মীয় পবিত্রতার ঘোষণা দিয়ে বন্ধ হয় না; পানির দূষণ শনাক্ত ও ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য বাস্তব পরীক্ষা প্রয়োজন।
মানুষ বা অন্য উষ্ণরক্তবিশিষ্ট প্রাণীর মলজাত বর্জ্য পানিতে পৌঁছালে অন্ত্রীয় অণুজীব ও রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। দূষণের প্রকৃতি অনুযায়ী ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয়, কলেরা, হেপাটাইটিস এ ও পরজীবীজনিত রোগ ছড়াতে পারে। বুযাআহ কূপের পানি থেকে কোনো পরীক্ষাগার নমুনা সংরক্ষিত নেই, তাই নির্দিষ্ট রোগজীবাণুর উপস্থিতি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আবু দাউদের বর্ণনায় মানবমল ও পচনশীল বর্জ্যের উপস্থিতির যে বিবরণ রয়েছে, তা পানির উৎসের নিরাপত্তা পরীক্ষা করার যথেষ্ট বাস্তব কারণ। [23]
জৈব পদার্থের পচনে পানির জৈবিক অক্সিজেন চাহিদা বা Biochemical Oxygen Demand (BOD) বাড়তে পারে। এই পরিমাপটি পানিতে থাকা পচনযোগ্য জৈব পদার্থ ভাঙতে অণুজীবের কত অক্সিজেন প্রয়োজন, তার একটি নির্দেশক। BOD বৃদ্ধি, দ্রবীভূত অক্সিজেন হ্রাস, অস্বাভাবিক গন্ধ বা রং—এসব পানির অবস্থার পরিবর্তনের সাক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু কোনো একটি সূচক একা সব রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতি নির্ধারণ করে না। সেই কারণে পানির স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নির্ণয়ে জীবাণুবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, দূষণের উৎস পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রাসায়নিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়।
পানিতে জীবাণুর সংখ্যা বৃদ্ধির হার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। অনুকূল অবস্থায় কিছু ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করে; কূপের পানিতে তাপমাত্রা, জৈব খাদ্য, অক্সিজেন, প্রতিযোগী জীবাণু এবং পরিবেশগত চাপ সেই হার পরিবর্তন করে। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার মতো পানিতে নিজে নিজে বিভাজিত হয় না; তাদের বংশবিস্তারের জন্য উপযুক্ত জীবন্ত পোষক কোষ প্রয়োজন। এসব পার্থক্য থাকলেও মানুষের মলজাত বর্জ্য ও পচনশীল প্রাণীদেহ কূপে প্রবেশ করা একটি বাস্তব দূষণ-ঝুঁকি। সেই ঝুঁকি পরিমাপযোগ্য অণুজীব ও দূষণসূচক দিয়ে পরীক্ষা করতে হয়।
স্বচ্ছ পানি কেন নিরাপদ পানির সমার্থক নয়
মানুষ সাধারণত পানির রং, স্বাদ, গন্ধ এবং দৃশ্যমান ময়লা দেখে পানির গুণমান বিচার করে। এই লক্ষণগুলো সতর্কবার্তা দিতে পারে, কিন্তু এগুলো সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী এমন পরিমাণে পানিতে থাকতে পারে যা খালি চোখে দেখা যায় না এবং পানির স্বাদ বা গন্ধে কোনো অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে না। একইভাবে পানির মধ্যে কিছু রাসায়নিক দূষকও দৃশ্যমান পরিবর্তন ছাড়াই উপস্থিত থাকতে পারে। সুতরাং ‘কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে না’ থেকে ‘রোগজীবাণু নেই’—এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিকভাবে অনুসরণ করে না।
ধ্রুপদি ফিকহে পানির রং, স্বাদ ও গন্ধের পরিবর্তনকে অপবিত্রতা নির্ধারণের মানদণ্ড করা হয়েছে। কিন্তু সংক্রামক জীবাণু ও কিছু রাসায়নিক দূষক এসব দৃশ্যমান পরিবর্তন ছাড়াও পানিতে থাকতে পারে। ফলে এই ফিকহি মানদণ্ডকে পানির স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার ভিত্তি করলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থা (CDC) ব্যক্তিগত কূপের পানি বছরে অন্তত একবার কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া, নাইট্রেট, দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ ও pH-এর জন্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়। দূষণের সন্দেহ থাকলে পানি ব্যবহার সম্পর্কে সতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনঃপরীক্ষার নির্দেশ রয়েছে। [24] [25]
বুযাআহ কূপ সম্পর্কে হাদিসে আবর্জনা, প্রাণীর দেহাবশেষ এবং মানুষের মলজাত বর্জ্য পৌঁছানোর বিবরণ রয়েছে; কিন্তু পানির জীবাণুবৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কোনো তথ্য নেই। তাই ওই কূপের পানিকে নিরাপদ ঘোষণা করার পরীক্ষালব্ধ ভিত্তিও নেই। এমন অবস্থায় শুধু ‘পানি পবিত্র’ ঘোষণা করে অজুর অনুমতি দেওয়া পানির দূষণজনিত ঝুঁকি যাচাইয়ের বিকল্প নয়। পানির স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নির্ধারণের জন্য দূষণের উৎস ও মাত্রা পরীক্ষা করতে হয়; ধর্মীয় ঘোষণা সেই তথ্য সরবরাহ করে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড: প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ই. কোলাই
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Guidelines for Drinking-water Quality-তে পানীয়জলের অণুজীবগত নিরাপত্তা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো Escherichia coli বা ই. কোলাই। পান করার জন্য নির্ধারিত পানির ১০০ মিলিলিটার নমুনায় এই ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হওয়া উচিত নয়। ই. কোলাইকে মলজাত দূষণের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা হয়; এর উপস্থিতি অন্য অন্ত্রীয় রোগজীবাণুর সম্ভাব্য প্রবেশপথেরও সতর্কসংকেত। তবে ই. কোলাই পাওয়া গেলেই পানিতে প্রতিটি নির্দিষ্ট রোগজীবাণু আছে—এমন সিদ্ধান্ত হয় না; একইভাবে একবার পরীক্ষায় ই. কোলাই না পাওয়া মানেই সব সম্ভাব্য রাসায়নিক ও জীবাণুগত ঝুঁকি চিরতরে অনুপস্থিত নয়। [26]
E. coli or thermotolerant coliform bacteria — Must not be detectable in any 100 ml sample.
বাংলা অনুবাদ: ই. কোলাই বা তাপসহনশীল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া—পানির কোনো ১০০ মিলিলিটার নমুনায় শনাক্ত হওয়া চলবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ই. কোলাই মানদণ্ড পানীয়জলের মলজাত দূষণ যাচাইয়ের একটি পরীক্ষাযোগ্য সূচক। আজ একই ধরনের কূপে মানুষের মলজাত বর্জ্য প্রবেশের আশঙ্কা থাকলে শুধু পানি স্বচ্ছ দেখাচ্ছে অথবা আচারগতভাবে পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে—এই কারণে সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় নমুনা পরীক্ষা, দূষণের উৎস শনাক্তকরণ ও পরিশোধন ছাড়া পানির স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনির্ভরযোগ্য।
জনস্বাস্থ্যের তথ্য: দূষিত পানির ক্ষতি কত বড়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের Drinking-water তথ্যপত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বের অন্তত ১৭০ কোটি মানুষ মলজাত দূষণযুক্ত পানীয়জলের উৎস ব্যবহার করছিল। একই তথ্যপত্রে দূষিত পানির মাধ্যমে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড ও পোলিওসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে; অনিরাপদ পানীয়জলের কারণে বছরে আনুমানিক ৫ লাখ ৫ হাজার ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুর হিসাবও দেওয়া হয়েছে। দূষণের উৎস পরীক্ষা না করে পানি নিরাপদ ধরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন বিপজ্জনক, এই পরিসংখ্যান তার বাস্তব জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব দেখায়। [27]
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গবেষকদের ২০১৯ সালের বৈশ্বিক রোগভার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলে ওই বছরে প্রায় ১৪ লাখ মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেত। এই হিসাবের মধ্যে শুধু পানিদূষণ নয়, অনিরাপদ স্যানিটেশন, হাত ধোয়ার অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও অন্তর্ভুক্ত। তাই ১৪ লাখ মৃত্যুকে একা পানিদূষণের মৃত্যুসংখ্যা বলা ভুল। বিভিন্ন ঝুঁকিকে পৃথকভাবে গণনা করেই গবেষণাটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত ক্ষতি নির্ধারণ করেছে। [28] [29]
দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাস্তব এবং পরিমাপযোগ্য। মানবমল বা প্রাণীর বর্জ্যযুক্ত পানিকে পরীক্ষার আগে নিরাপদ ধরে নেওয়া দূষণ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে অজুর মতো নিয়মিত কাজে পানি মুখ ও নাকের সংস্পর্শে আসে। তাই কোনো কূপের পানি ‘পবিত্র’ বলে ঘোষিত হলেই সেটি ব্যবহারকারীর জন্য স্বাস্থ্যগতভাবে নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
একই কূপ আজ পরীক্ষা করা হলে: ধর্মীয় বিধান ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পার্থক্য
ধরা যাক, কোনো আধুনিক কূপের পানি সম্পর্কে অভিযোগ পাওয়া গেল যে সেখানে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মানবমল, পশুর মৃতদেহের অংশ এবং ব্যবহৃত কাপড় এসে পড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যকর্মীরা কূপের পানি ধর্মীয়ভাবে পবিত্র কি না—এই প্রশ্ন দিয়ে নিরাপত্তা নির্ধারণ করবেন না। দূষণের উৎস, কূপের নির্মাণকাঠামো, আশপাশের পয়ঃনিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ এবং বন্যার ঝুঁকি মূল্যায়ন করবেন। পানির নমুনা সংগ্রহ করে মলজাত দূষণের নির্দেশক জীবাণু ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পরীক্ষা করবেন। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে পানি পান ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার স্থগিত করে উপযুক্ত পরিশোধন এবং পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। [30] [31]
এই ধরনের কূপের পানির নিরাপত্তা নির্ধারণের জন্য মানুষের মলজাত দূষণ, রোগজীবাণু, দূষণের উৎস ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সূচক পরীক্ষা করা হয়। পানির মাধ্যমে মুখ বা নাকে জীবাণু প্রবেশের ঝুঁকি থাকলে সেই ব্যবহারও নিরাপত্তা মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত। বুযাআহ কূপ সম্পর্কে মুহাম্মদের উত্তর ছিল ‘কোনো কিছু পানিকে অপবিত্র করে না’; কিন্তু এই বাক্য দিয়ে পানিতে ক্ষতিকর জীবাণু অনুপস্থিত থাকা বা পানি ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
উপসংহার: পানির ধর্মীয় পবিত্রতা ও জীবাণুমুক্ততার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
বুযাআহ কূপের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ঋতুস্রাবের ব্যবহৃত কাপড়, কুকুরের দেহাবশেষ ও দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা পড়া কূপের পানি দিয়ে অজু করা যাবে কি না জানতে চাওয়া হয়েছিল। আবু দাউদের আরেকটি বর্ণনায় মানুষের মলজাত বর্জ্যের কথাও রয়েছে। মুহাম্মদের উত্তর ছিল: ‘পানি পবিত্র; কোনো কিছু তাকে অপবিত্র করে না।’ এই সাধারণ ঘোষণায় বর্জ্যের ধরন, পানির পরিমাণ কিংবা পানির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের কোনো ব্যতিক্রম নেই। প্রশ্নটি অজুর হওয়ায় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি বাদ যায় না। অজুতে পানি মুখ ও নাকের সংস্পর্শে আসে, এবং কুলি করার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু পানি গিলেও ফেলা সম্ভব। দূষিত কূপের পানি ব্যবহারের অনুমতি তাই কেবল বিমূর্ত ধর্মীয় পরিভাষার বিষয় নয়; মানুষের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শের বিষয়।
পরবর্তী ইসলামি ফকিহরা রং, স্বাদ ও গন্ধ পরিবর্তিত হলে পানিকে অপবিত্র গণ্য করেছেন এবং অন্যান্য হাদিসের ভিত্তিতে দুই কুল্লাসহ বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেছেন। এসব পরবর্তী ব্যাখ্যায় মূল বক্তব্যের ব্যাপকতা সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়া কোনো পানিতে ক্ষতিকর জীবাণু নেই—এমন প্রমাণ নয়। একই হাদিসসমষ্টিতে স্থির পানিতে প্রস্রাবের নিষেধাজ্ঞা এবং আবর্জনা পড়া কূপের পানিকে পবিত্র ঘোষণা করার বক্তব্য পাশাপাশি রয়েছে। এ থেকে প্রাচীন পানিবিধানের পার্থক্য ও পরবর্তী ফিকহি সমন্বয়ের ইতিহাস জানা যায়; পানির প্রকৃত জীবাণুবৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা জানা যায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী নিরাপদ পানীয়জলের ১০০ মিলিলিটার নমুনায় ই. কোলাই শনাক্ত হওয়া উচিত নয়। কারণ মানুষের বা প্রাণীর মলজাত দূষণ পানিতে বিভিন্ন সংক্রামক রোগজীবাণু প্রবেশের ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। কূপের পানিতে মলজাত বর্জ্য বা পচনশীল প্রাণীদেহ পৌঁছালে স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নির্ধারণের জন্য দূষণের উৎস, জীবাণু ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সূচক পরীক্ষা করতে হয়। বুযাআহ কূপের ঐতিহাসিক জীবাণুগণনা জানা নেই; কিন্তু এই তথ্যের অনুপস্থিতি কূপের পানিকে জীবাণুমুক্ত প্রমাণ করে না। মুহাম্মদের ‘কোনো কিছু পানিকে অপবিত্র করে না’ ঘোষণা ধর্মীয় বিধান হিসেবে সংরক্ষিত থাকলেও সেটি পানির স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ নয়। মানুষের শরীরে দূষিত পানি প্রবেশ বা সংস্পর্শের ঝুঁকি দূর করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা, সুরক্ষিত পানির উৎস ও যথাযথ পরিশোধন—অলৌকিক পবিত্রতার ঘোষণা নয়।
তথ্যসূত্রঃ
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৬৬, বুযাআহ কূপ অধ্যায় ↩︎
- জামে তিরমিজি, হাদিস ৬৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৬৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৬৬: আরবি ও ইংরেজি মূলপাঠ ↩︎
- সুনান নাসায়ি ৩২৬ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিস ৬৬, বাংলা অনুবাদ ও সংযুক্ত ব্যাখ্যা ↩︎
- তিরমিজি ৬৬: বর্ণনাপথ ↩︎
- নাসায়ি ৩২৬: বর্ণনাপথ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৬৭, মূল বর্ণনা ও কূপের পর্যবেক্ষণ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ ৬৭, কূপের গভীরতা ও প্রস্থের বিবরণ ↩︎
- দোরার: বুযাআহ কূপের হাদিসের ব্যাখ্যা ↩︎
- ইসলামওয়েব, শরহু সুনান আবু দাউদ ↩︎
- CDC, How to Disinfect Wells After an Emergency ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৬৩, দুই কুল্লা পানির বর্ণনা ↩︎
- সহিহ মুসলিম ২৮২ক, স্থির পানিতে প্রস্রাব নিষিদ্ধ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ৬৬: বুযাআহ কূপের পানি ↩︎
- নববি, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, ১/১৬০–১৬১ ↩︎
- ইবনুল মুনযির, আল-আওসাত, কিতাবুল মিয়াহ, পৃষ্ঠা ৩৬৯–৩৭৭ ↩︎
- নববি, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, ১/১৬০–১৬১, বাব মা ইউফসিদুল মা মিনান নাজাসা ↩︎
- শাওকানি, নাইলুল আওতার, খণ্ড ১, ‘পানির সঙ্গে অপবিত্র পদার্থের সংস্পর্শ’ অধ্যায় ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ৬৫, দুই কুল্লা ↩︎
- ইবনুল মুনযির, আল-আওসাত, পৃষ্ঠা ৩৬৯–৩৭৮ ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Drinking-water, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ↩︎
- CDC, Guidelines for Testing Well Water, ২০২৪ ↩︎
- CDC, Guidelines for Treating Well Water, ২০২৪ ↩︎
- WHO, Guidelines for Drinking-water Quality, চতুর্থ সংস্করণ, ২০২২, সারণি ৭.১০ ↩︎
- WHO, Drinking-water, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ↩︎
- WHO Global Health Observatory, WASH Burden of Disease ↩︎
- Wolf et al., The Lancet, ২০২৩: unsafe WASH-এর রোগভার ↩︎
- CDC, Emergency Well Disinfection ↩︎
- CDC, Well-Water Testing ↩︎

