সারসংক্ষেপ
মধ্যযুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে ইবনে সিনা নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে তাঁর প্রভাব বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপ ও এশিয়ার জ্ঞানচর্চায় টিকে ছিল। আধুনিক মুসলিম সমাজে এই বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক কৃতিত্বকে প্রায়ই “ইসলামী সভ্যতার” সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং ইবনে সিনাকে সরাসরি “মুসলিম বিজ্ঞানী” পরিচয়ে গৌরবের প্রতীক বানানো হয়। কিন্তু তাঁর নিজের দার্শনিক বিশ্বাস এবং ধ্রুপদী ইসলামী আকীদার সম্পর্ক পরীক্ষা করলে একটি ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। জগতের সময়গত সূচনা, আল্লাহর নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞানের প্রকৃতি, দেহগত পুনরুত্থান, নবুয়ত ও ওহির প্রকৃতি—এসব মৌলিক প্রশ্নে ইবনে সিনা এমন এক দার্শনিক ব্যবস্থা নির্মাণ করেছিলেন যা পরবর্তী ধ্রুপদী সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সঙ্গে একাধিক জায়গায় মৌলিক সংঘাতে পড়ে।
ইবনে সিনার পরিবারে ইসমাইলি প্রভাব ছিল, যদিও তাঁর নিজের আত্মজীবনীতে তিনি সেই মত গ্রহণ না করার কথা বলেছেন। তাঁকে সরাসরি মুতাজিলা বলারও প্রমাণ নেই; কিন্তু আল্লাহর গুণাবলি, সত্তা-গুণের সম্পর্ক এবং কার্যকারণ নিয়ে তাঁর দর্শনের কিছু অংশ মুতাজিলা কালামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল—এ সাদৃশ্য গাজ্জালি নিজেই চিহ্নিত করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাজ্জালি ইবনে সিনা ও ফারাবির তিনটি মৌলিক মতকে সরাসরি কুফর বলে চিহ্নিত করেন: জগতের অনাদিত্ব, আল্লাহর নির্দিষ্ট ঘটনা ও ব্যক্তিবিশেষ সম্পর্কে জ্ঞানের বিশেষ ব্যাখ্যা, এবং দেহগত পুনরুত্থানের অস্বীকৃতি। পরবর্তী ইবনে তাইমিয়্যাহহ, ইবনুল কাইয়্যিম, যাহাবি, ইবন হাজর, ইবনে কাসীর, ইবনুল ইমাদসহ বহু প্রভাবশালী আলেমও তাঁর দর্শনকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। আধুনিক ইসলামওয়েব ও ইসলামকিউএ পর্যন্ত একই ঐতিহাসিক রায় পুনরাবৃত্তি করে। ফলে ইবনে সিনার বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বকে ধ্রুপদী ইসলামী আকীদার কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসের একটি নির্বাচিত ও অসম্পূর্ণ ব্যবহার।
ভূমিকা
মুসলিম সভ্যতার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি নাম প্রায় অবধারিতভাবে সামনে আসে—আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, ইবনে হাইসাম, ইবনে রুশদ প্রমুখ। জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তৃতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পাঠ্যবই এবং সভ্যতাগত গৌরবের আলোচনায় এঁদের অনেককেই একসঙ্গে “মুসলিম বিজ্ঞানী” বা “ইসলামী বিজ্ঞানী” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই পরিচয় অনেক সময় নিছক ভৌগোলিক বা সভ্যতাগত পরিচয় নয়; এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন তাঁদের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক সাফল্য একই সঙ্গে কোরআন হাদিসের শিক্ষা এবং ইসলামের ধ্রুপদী ধর্মতত্ত্বের সাফল্যও প্রমাণ করে। এখানেই ইতিহাসের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো ব্যক্তি মুসলিম-অধ্যুষিত সমাজে জন্মেছেন, মুসলিম নাম বহন করেছেন বা মুসলিম শাসকের অধীনে কাজ করেছেন—এগুলো তাঁর চিন্তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক প্রচলিত আকীদার প্রতিনিধি বানায় না।
মধ্যযুগীয় মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ কখনও একরৈখিক ছিল না। ফালাসিফা, মুতাজিলা, আশআরি, মাতুরিদি, ইসমাইলি, বিভিন্ন শিয়া ধারা এবং পরবর্তী সুফি ও কালামি ঐতিহ্যের মধ্যে জগতের সৃষ্টি, আল্লাহর গুণাবলি, কার্যকারণ, আত্মা, পরকাল, নবুয়ত ও ওহির প্রকৃতি নিয়ে গভীর মতভেদ ছিল। একই সাংস্কৃতিক অঞ্চলের চিন্তাবিদরা একই প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ফলে কোনো দার্শনিকের চিকিৎসা বা গণিতের অবদানকে তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থানের সঙ্গে এক করে দেখা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। একজন ব্যক্তির বৈজ্ঞানিক কাজ গ্রহণ করা যায়, অথচ তাঁর ধর্মতত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করা যায়; ইসলামী ঐতিহ্য ইবনে সিনার ক্ষেত্রে ঠিক এই কাজটিই করেছে।
ইবনে সিনা এই বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি। চিকিৎসাবিদ্যায় তাঁর ঐতিহাসিক অবদান বিপুল; একই সঙ্গে তাঁর অধিবিদ্যা, আত্মাতত্ত্ব ও নবুয়ত-তত্ত্বও মধ্যযুগীয় দর্শনের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী। কিন্তু জনপ্রিয় “মুসলিম বিজ্ঞানী” বয়ানে তাঁর দার্শনিক অবস্থানের এই অংশ প্রায় অদৃশ্য থাকে। অথচ যে ধর্মতাত্ত্বিক মতগুলোকে পরবর্তী সুন্নি ঐতিহ্য ইসলামের মৌলিক আকীদা বলে গণ্য করেছে, ইবনে সিনা তার কয়েকটির এমন পুনর্ব্যাখ্যা করেছিলেন যে গাজ্জালি সেগুলোকে সরাসরি কুফর বলে ঘোষণা করেন। এই প্রবন্ধের প্রশ্ন তাই ইবনে সিনা প্রতিভাবান ছিলেন কি না নয়; প্রশ্ন হলো, আজ যে ধর্মীয় পরিচয়ে তাঁকে গৌরবের প্রতীক করা হয়, তাঁর নিজের দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বিচার সেই পরিচয়কে কতটা সমর্থন করে।
“মুসলিম বিজ্ঞানী” পরিচয়ের সমস্যাটি কোথায়?
কোনো বিজ্ঞানীর ধর্মীয় পরিচয় উল্লেখ করা নিজে থেকে ভুল নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ব্যক্তির বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বকে কোরআন পাঠের মহিমা কিংবা ইসলামের সৌন্দর্য বা তার ধর্মতাত্ত্বিক আনুগত্যের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আইনস্টাইন ইহুদি পরিবারে জন্মেছিলেন, নিউটন খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিপুল পরিমাণ লিখেছিলেন, কিন্তু আপেক্ষিকতা বা ক্যালকুলাসকে যথাক্রমে “ইহুদি বিজ্ঞান” বা “খ্রিষ্টীয় বিজ্ঞান” বলা হয় না। একইভাবে ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যার কৃতিত্ব তাঁর অধিবিদ্যাগত মতকে ইসলামের আকীদা বানিয়ে দেয় না। ইসলামকিউএ-র একটি উত্তর এই বিভাজনটি সরাসরি স্বীকার করে: ইবনে সিনাকে চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন বা অন্য পার্থিব বিজ্ঞানের জন্য কাফের বলা হয়নি; কুফরের রায় এসেছে তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক মতের কারণে [1]
فإن العلماء الذين حكموا عليه بالكفر، لم يكفروه من أجل علمه بالطب، بل لأمور تتصل بالعلم الشرعي
বাংলা অনুবাদ: যেসব আলেম তাঁকে কাফের বলেছেন, তাঁরা তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞানের কারণে তাঁকে কাফের বলেননি; বরং শরিয়তি জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বিষয়ের কারণে বলেছেন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, একই ইসলামি পরিসরের ভেতর ইবনে সিনাকে একদিকে মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানের গৌরব হিসেবে তুলে ধরা হয়, অন্যদিকে আকীদার প্রশ্নে কাফের বা মুলহিদ বলা হয়। ইসলামওয়েবের সভ্যতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি প্রবন্ধে ইবনে সিনাকে বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করে তাঁর আল-কানুন ফিত-তিব-কে মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-পাঠ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। [2]
واشتهر كذلك الطبيب المسلم ابن سينا، حتى أصبح كتابه “القانون في الطب” واحدًا من أهم المراجع الدراسية في المدارس الطبية خلال العصور الوسطى
বাংলা অনুবাদ: মুসলিম চিকিৎসক ইবনে সিনাও খ্যাতি অর্জন করেন; তাঁর ‘আল-কানুন ফিত-তিব’ মধ্যযুগের চিকিৎসাবিদ্যার বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যসূত্রে পরিণত হয়েছিল।
একই ইসলামওয়েবের আকীদা-বিষয়ক ফতোয়ায় ইবনে সিনার বিরুদ্ধে কুফর ও ইলহাদের অভিযোগের কারণ হিসেবে জগতের অনাদিত্ব, পরকাল-সংক্রান্ত মত এবং অন্যান্য দার্শনিক ধারণা উল্লেখ করা হয়েছে; সেখানে গাজ্জালি, ইবনে তাইমিয়্যাহহ, ইবনুল কাইয়্যিম ও যাহাবির নামও উল্লেখ করা হয়। একই ব্যক্তি তাই এক পৃষ্ঠায় মুসলিম সভ্যতার চিকিৎসক-গৌরব, আরেক পৃষ্ঠায় আকীদাগত বিচারে কাফের বা নাস্তিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত দার্শনিক। এই দ্বৈততা দেখায় যে তাঁর চিকিৎসাবিদ্যাকে তাঁর আকীদার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না [3]
Ibn Sinna (Avicenna) was accused of being a Kafir and an atheist because of his statements about the antiquity of the world
বাংলা অনুবাদ: জগতের অনাদিত্ব সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যের কারণে ইবনে সিনাকে কাফের ও নাস্তিক বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
এই দ্বৈত ব্যবহারই আসল ঐতিহাসিক সমস্যাটিকে সামনে আনে। চিকিৎসক ইবনে সিনার জ্ঞানকে গ্রহণ করা এবং দার্শনিক ইবনে সিনার আকীদাকে প্রত্যাখ্যান করা—দুটি কাজ একই সঙ্গে করা সম্ভব এবং ইসলামী ঐতিহ্য বাস্তবে সেটিই করেছে। কিন্তু তখন তাঁর চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের অর্জনকে “বিশুদ্ধ ইসলামী আকীদার ফল” হিসেবে দেখানো যায় না। বরং ইতিহাস দেখায়, মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর এতটাই বৈচিত্র্যময় ছিল যে সেই সমাজের ভেতর এমন চিন্তাবিদও জন্মেছেন, যাঁদের জ্ঞান পরবর্তী মুসলিমরা গ্রহণ করেছে অথচ তাঁদের মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তকে কুফর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইবনে সিনার ধর্মবিশ্বাস ও দার্শনিক অবস্থান
ইবনে সিনা সম্পর্কে আলেমের বক্তব্য (ভিডিও)
ইসমাইলি পরিবার, ফালাসিফা ও মুতাজিলা: ইবনে সিনা আসলে কোন ধারার?
ইবনে সিনার পারিবারিক পরিবেশে ইসমাইলি প্রভাব ছিল—এ বিষয়ে তাঁর নিজের আত্মজীবনীই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিলগুলোর একটি। সেখানে তিনি জানান যে তাঁর পিতা “মিসরীয় দাঈ”-এর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং ইসমাইলি হিসেবে গণ্য হতেন; তাঁর ভাইও সেই আলোচনার অংশ ছিলেন। কিন্তু একই জায়গায় ইবনে সিনা বলেন, তিনি তাঁদের আলোচনা বুঝতেন অথচ তাঁর মন তা গ্রহণ করত না, এবং তাঁকে সেই মতের দিকে আহ্বান করা হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। ফলে তাঁর পিতা ও পরিবারের ইসমাইলি প্রভাব একটি প্রমাণিত বিষয়, কিন্তু সেখান থেকে ইবনে সিনা নিজে ইসমাইলি ছিলেন—এ সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা যায় না [4]
وكان أبي ممَّن أجاب داعي المصريين ويُعدُّ من الإسماعيلية، وقد سمع منهم ذكر النفس والعقل … وأنا أسمعهم وأُدرك ما يقولونه ولا تقبله نفسي
বাংলা অনুবাদ: আমার পিতা মিসরীয় দাঈদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং তাঁকে ইসমাইলিদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হতো; তিনি তাঁদের কাছ থেকে আত্মা ও বুদ্ধি সম্পর্কে আলোচনা শুনেছিলেন… আমি তাঁদের কথা শুনতাম এবং তাঁরা যা বলতেন তা বুঝতাম, কিন্তু আমার মন তা গ্রহণ করত না।
ইবনে সিনার সবচেয়ে নির্ভুল বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় হলো ফালাসিফা ধারার একজন স্বতন্ত্র দার্শনিক। অ্যারিস্টটলীয় যুক্তি, নব্য-প্লেটোনিক সৃষ্টিতত্ত্ব, আরবি দার্শনিক ঐতিহ্য এবং সমকালীন কালামের সঙ্গে বিতর্কের ভিতর তিনি নিজের একটি সুসংহত ব্যবস্থা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁকে সরাসরি মুতাজিলা বলা যায় না; তবে তাঁর দর্শনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মুতাজিলা কালামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। গাজ্জালি নিজেই তাহাফুত আল-ফালাসিফা-র শেষে বলেন, তিনটি কুফরি মতের বাইরে আল্লাহর গুণাবলি ও কিছু কার্যকারণগত প্রশ্নে ফালাসিফাদের বক্তব্য মুতাজিলাদের অবস্থানের কাছাকাছি। এই পর্যবেক্ষণ ইবনে সিনাকে মুতাজিলি বানায় না, কিন্তু তাঁর দর্শন ও মুতাজিলা কালামের মধ্যে বাস্তব বুদ্ধিবৃত্তিক সাদৃশ্য দেখায় [5]
فأما ما عدا هذه المسائل الثلث من تصرفهم في الصفات الإلهية واعتقاد التوحيد فيها فمذهبهم قريب من مذاهب المعتزلة
বাংলা অনুবাদ: এই তিনটি বিষয় ছাড়া আল্লাহর গুণাবলি ও তাওহিদ সম্পর্কে তাঁদের অন্যান্য বক্তব্যে তাঁদের মত মুতাজিলাদের মতের কাছাকাছি।
জগতের সৃষ্টি: সময়ের মধ্যে সৃষ্টি নয়, চিরন্তন কার্যকারণগত নির্ভরতা
ইবনে সিনার অবস্থানকে “আল্লাহ ছাড়াই পদার্থ চিরন্তন” বলা সঠিক নয়। তিনি নাস্তিক বস্তুবাদী ছিলেন না; তাঁর দর্শনে আল্লাহ বা “প্রথম অপরিহার্য সত্তা” সমস্ত অস্তিত্বের চূড়ান্ত কারণ। সংঘাতটি ছিল জগতের সময়গত সূচনা নিয়ে। ধ্রুপদী কালামের প্রচলিত ধারণায় আল্লাহ একসময় জগত সৃষ্টি করেছেন—অর্থাৎ জগতের একটি শুরু আছে। ইবনে সিনার দার্শনিক ব্যবস্থায় জগত আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ কার্যকারণগতভাবে নির্ভরশীল, কিন্তু সময়ের বিচারে এমন কোনো মুহূর্ত নেই যখন আল্লাহ ছিলেন অথচ জগতের কার্যকারণ-শৃঙ্খলা ছিল না। সৃষ্টিকে তিনি সময়ের মধ্যে কোনো প্রথম ঘটনামাত্র হিসেবে নয়, অপরিহার্য প্রথম কারণ থেকে চিরন্তন নির্ভরশীল উদ্ভব হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
গাজ্জালি যে ফালাসিফা-দর্শনের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন, তিনি তাদের অবস্থানকে এভাবেই বর্ণনা করেন: জগত আল্লাহর সঙ্গে তাঁর কার্য হিসেবে অনাদিকাল ধরে বিদ্যমান; আল্লাহ জগতের চেয়ে অগ্রগণ্য, কিন্তু এই অগ্রাধিকার সময়গত নয়—কারণগত ও সত্তাগত। এই পার্থক্যই গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে সিনা জগতকে আল্লাহ থেকে স্বাধীন বলেননি; বরং জগতকে এমনভাবে আল্লাহ-নির্ভর বলেছেন যাতে আল্লাহ ও জগতের সম্পর্কের কোনো সময়গত শুরু নেই। সুন্নি কালামের সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে সংঘাতটি ঠিক এখানেই [6]
فالذي استقر عليه رأي جماهيرهم المتقدمين والمتأخرين القول بقدمه وأنه لم يزل موجوداً مع الله تعالى ومعلولاً له … غير متأخر عنه بالزمان
বাংলা অনুবাদ: প্রাচীন ও পরবর্তী ফালাসিফাদের অধিকাংশের স্থির মত হলো, জগত অনাদি; তা আল্লাহর সঙ্গে সর্বদা বিদ্যমান এবং তাঁর কার্য, সময়ের দিক থেকে তাঁর পরে নয়।
এই মতের ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য ছিল বিশাল। কোরআনিক সৃষ্টিতত্ত্বের প্রচলিত সুন্নি পাঠে সৃষ্টির আগে সৃষ্টিজগত ছিল না এবং আল্লাহ ইচ্ছা করে তাকে অস্তিত্বে আনেন। ইবনে সিনার ব্যবস্থায় অপরিহার্য প্রথম সত্তা থেকে অস্তিত্বের ধারাবাহিক উদ্ভব তাঁর প্রকৃতি ও বুদ্ধিগত ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত; ফলে “একসময় সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত” ধরনের কালগত পরিবর্তন তাঁর ঈশ্বরতত্ত্বের সঙ্গে খাপ খায় না। গাজ্জালি এই দর্শনকে ইসলামী সৃষ্টিতত্ত্বের বিরোধী মনে করে সরাসরি কুফরের পর্যায়ে রেখেছেন।
আল্লাহর গুণাবলি ও নির্দিষ্ট ব্যক্তি-ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞান
ইবনে সিনার ঈশ্বরতত্ত্বে আল্লাহ এক, সরল ও অপরিহার্য সত্তা; তাঁর মধ্যে এমন বহুত্ব থাকতে পারে না যা সত্তার অভ্যন্তরে পৃথক চিরন্তন উপাদানের মতো দাঁড়ায়। এই কারণেই সত্তা ও গুণাবলির সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ধ্রুপদী সুন্নি গুণতত্ত্ব থেকে ভিন্ন হয়ে যায় এবং মুতাজিলা তাওহিদ-তত্ত্বের সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য তৈরি করে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বরের পরম একত্ব ও অপরিবর্তনীয়তা রক্ষা করা; কিন্তু এর ফল হিসেবে আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও গুণাবলির বহু প্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিক বর্ণনা নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়।
আল্লাহর জ্ঞান সম্পর্কে ইবনে সিনার অবস্থানকে শুধু “আল্লাহ সর্বজ্ঞানী নন” বলা যথেষ্ট নির্ভুল নয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, আল্লাহ পরিবর্তনশীল নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও ঘটনাকে মানুষের মতো পৃথক পৃথক পরিবর্তনশীল জ্ঞানে জানেন না; তিনি সেগুলোকে কারণগত সামগ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সার্বিক বা কুল্লি জ্ঞানে জানেন। এই তত্ত্বের পেছনে তাঁর ঈশ্বরের অপরিবর্তনীয়তার ধারণা কাজ করে: যদি প্রতিটি নতুন ঘটনার সঙ্গে ঈশ্বরের জ্ঞানে নতুন অবস্থা সৃষ্টি হয়, তাহলে ঈশ্বর পরিবর্তনশীল হয়ে পড়বেন। ইবনে সিনা সেই পরিবর্তন এড়াতে ঈশ্বরীয় জ্ঞানকে এক অপরিবর্তনীয় সার্বিক জ্ঞান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন [7]
إن الله لا يعلم الجزئيات بعلم جزئي، بل بعلم كلي
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ নির্দিষ্ট বিষয়গুলোকে পৃথক-পৃথক জ্ঞানে জানেন না; বরং সার্বিক বা কুল্লি জ্ঞানে জানেন।
এই পার্থক্য কেবল শব্দের নয়। কোরআনিক বর্ণনায় আল্লাহ নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোপন কথা, চিন্তা, ক্ষুদ্র কাজ এবং ভবিষ্যৎ ঘটনাসহ সবকিছুকে প্রত্যক্ষভাবে জানেন। ইবনে সিনার দর্শনে একই সর্বজ্ঞতার ধারণা একটি ভিন্ন অধিবিদ্যাগত কাঠামোয় পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে ঈশ্বরের জ্ঞান পরিবর্তনহীন। গাজ্জালির বিচারে এই পুনর্ব্যাখ্যা কোরআনিক সর্বজ্ঞতার দাবি রক্ষা করে না; তাই তিনি এটিকে কুফরের তিনটি বিষয়ের একটি হিসেবে গণ্য করেন।
মৃত্যুর পরে আত্মা থাকবে, কিন্তু দেহগত পুনরুত্থান নয়
ইবনে সিনা মৃত্যুর পরে আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। তাঁর আত্মাতত্ত্বে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মা দেহের মৃত্যুতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না; আত্মা অব্যাহত থাকে এবং তার নৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার সঙ্গে পরবর্তী সুখ বা দুর্দশা সম্পর্কিত। সংঘাতটি ছিল দেহগত পুনরুত্থান নিয়ে। প্রচলিত ইসলামী আকীদায় কিয়ামতে মানুষ দেহসহ পুনরুত্থিত হবে, বিচার হবে এবং জান্নাত-জাহান্নামের পুরস্কার-শাস্তির শারীরিক মাত্রাও বাস্তব। ফালাসিফাদের যে মত গাজ্জালি আক্রমণ করেন, সেখানে আত্মার পরকাল মানা হলেও দেহ পুনর্গঠন ও দেহগত হাশরকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় না [8]
فإن القول ببعث الروح دون الجسد يوم القيامة كفر بالله وتكذيب للقرآن … وتحمل ذلك عنه ابن سينا ونصره
বাংলা অনুবাদ: কিয়ামতের দিন দেহ ছাড়া শুধু আত্মার পুনরুত্থানের কথা বলা আল্লাহর প্রতি কুফর এবং কোরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা… ইবনে সিনা এই মত গ্রহণ করেছিলেন এবং এর সমর্থন করেছিলেন।
এই জায়গায় ইবনে সিনার অবস্থানকে “মৃত্যুই সবকিছুর শেষ” বলা যেমন ভুল, তেমনি তাঁকে প্রচলিত ইসলামী পরকালতত্ত্বের অনুসারী বলা আরও ভুল। তিনি আত্মার অমরত্বের এক দার্শনিক তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দেহগত হাশরের সাধারণ সুন্নি পাঠ গ্রহণ করেননি। এই পার্থক্যটিই গাজ্জালির তাকফিরের অন্যতম কেন্দ্রীয় ভিত্তি।
নবুয়ত ও ওহি: দার্শনিক-মনস্তাত্ত্বিক পুনর্ব্যাখ্যা
ইবনে সিনা নবীদের নিছক প্রতারক বা সাধারণ সমাজসংস্কারক মনে করতেন না। তাঁর ব্যবস্থায় নবুয়ত মানুষের সর্বোচ্চ জ্ঞানগত ক্ষমতার একটি বিশেষ স্তর। নবীর একটি অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টিশক্তি বা “পবিত্র বুদ্ধি” থাকে, যার মাধ্যমে তিনি যুক্তির মধ্যবর্তী সম্পর্ক দ্রুত উপলব্ধি করতে পারেন। এই জ্ঞান সক্রিয় বুদ্ধি বা আল-আকল আল-ফা’আল থেকে মানব আত্মায় প্রবাহিত হয়; নবীর অত্যন্ত শক্তিশালী কল্পনাশক্তি সেই বৌদ্ধিক সত্যকে ভাষা, দৃশ্য, প্রতীক ও বিধানে রূপ দেয়। ফলে ওহি এখানে কেবল উপর থেকে মানবভাষায় উচ্চারিত বাক্য গ্রহণের ঘটনা নয়; সক্রিয় বুদ্ধি, নবীর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা এবং কল্পনাশক্তির সমন্বিত প্রক্রিয়া [9]
this capacity is coupled with an equally highly developed internal sense of imagination that can translate this intellective knowledge into language and images
বাংলা অনুবাদ: এই ক্ষমতার সঙ্গে সমানভাবে উন্নত একটি অভ্যন্তরীণ কল্পনাশক্তি যুক্ত থাকে, যা বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানকে ভাষা ও চিত্রে রূপান্তর করতে পারে।
ইবনে সিনার এই ব্যাখ্যায় নবী দার্শনিকের চেয়ে নিচু কেউ নন; বরং তাঁর জ্ঞানগ্রহণের ক্ষমতা মানুষের সর্বোচ্চ স্তরে। কিন্তু ধ্রুপদী আক্ষরিক প্রত্যাদেশ-মডেলের সঙ্গে এখানে মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়। ওহির শব্দ, দৃশ্য ও প্রতীক নবীর কল্পনাশক্তির সক্রিয় ভূমিকার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। আধুনিক গবেষণায় তাই ইবনে সিনার নবুয়ত-তত্ত্বকে এমন এক দার্শনিক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা হয় যেখানে ঐশী জ্ঞান সক্রিয় বুদ্ধির মধ্যস্থতায় নবীর বুদ্ধি ও কল্পনার মাধ্যমে মানবভাষায় রূপ নেয় [10]
prophets receive universal concepts or intelligibles from the Active Intellect, after which their imaginative faculties transform them into figurative (visual or auditory) images.
বাংলা অনুবাদ: নবীরা সক্রিয় বুদ্ধি থেকে সার্বিক ধারণা বা বোধগম্য সত্য গ্রহণ করেন; এরপর তাঁদের কল্পনাশক্তি সেগুলোকে রূপক দৃশ্যমান বা শ্রাব্য চিত্রে রূপান্তর করে।
অতএব ইবনে সিনা নবুয়ত অস্বীকার করেননি; তিনি নবুয়তকে নিজের অধিবিদ্যা ও মনস্তত্ত্বের মধ্যে পুনর্গঠন করেছেন। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর দর্শনের সঙ্গে ইসলামী আকীদার বিরোধ দেখাতে গিয়ে তাঁকে এমন কিছু বলা দরকার নেই যা তিনি বলেননি। বরং প্রকৃত বিরোধটিই যথেষ্ট শক্তিশালী: ঐশী প্রত্যাদেশের প্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোকে তিনি সক্রিয় বুদ্ধি, পবিত্র অন্তর্দৃষ্টি এবং কল্পনাশক্তির একটি দার্শনিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছিলেন।
গাজ্জালির বিচারে কোন তিন মত সরাসরি কুফর?
ইবনে সিনা ও ফারাবির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক রায় আসে আবু হামিদ আল-গাজ্জালির কাছ থেকে। তাহাফুত আল-ফালাসিফা-তে তিনি বিশটি দার্শনিক প্রশ্ন পরীক্ষা করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল, সব মত একই পর্যায়ের নয়: অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফালাসিফাদের অবস্থান বিদআত বা ভ্রান্তি, কিন্তু তিনটি বিষয়ে তাদের সঙ্গে ইসলামের বিরোধ এমন যে তাকফির করতে হবে। এই তিনটি হলো—জগতের অনাদিত্ব, আল্লাহর নির্দিষ্ট ঘটনা ও ব্যক্তিবিশেষ সম্পর্কে জ্ঞানের বিশেষ ব্যাখ্যা, এবং দেহগত পুনরুত্থানের অস্বীকৃতি [5]
تكفيرهم لا بد منه في ثلاث مسائل … قدم العالم … إن الله لا يحيط علماً بالجزئيات الحادثة من الأشخاص … إنكارهم بعث الأجساد وحشرها
বাংলা অনুবাদ: তিনটি বিষয়ে তাঁদের তাকফির করা আবশ্যক… জগতের অনাদিত্ব… ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তনশীল নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞানকে অস্বীকার… এবং দেহের পুনরুত্থান ও হাশর অস্বীকার।
আল-মুনকিয মিন আদ-দালাল-এ গাজ্জালি আরও সরাসরি ফারাবি ও ইবনে সিনার নাম উল্লেখ করেন। তিনি তাঁদের অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের প্রধান মুসলিম পরিবেশক হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, তিনটি মৌলিক মতের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে কুফরের রায় এবং বাকি সতেরো বিষয়ে বিদআতের রায় প্রযোজ্য। এর ফলে ইবনে সিনা-বিরোধী পরবর্তী সুন্নি ঐতিহ্যের জন্য একটি পরিষ্কার ধর্মতাত্ত্বিক ছক তৈরি হয় [11]
ولكن مجموع ما غلطوا فيه يرجع إلى عشرين أصلاً، يجب تكفيرهم في ثلاثة منها، وتبديعهم في سبعة عشر
বাংলা অনুবাদ: তাঁদের ভুলগুলোর সমষ্টি বিশটি মূল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ; এর তিনটিতে তাঁদের কাফের বলতে হবে এবং সতেরোটিতে বিদআতি বলতে হবে।
ইবনে সিনা সম্পর্কে ইসলামী আলেমদের অভিমত
ইবনে সিনার বিরুদ্ধে সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের আপত্তি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিগত মন্তব্য নয়। গাজ্জালির তিনটি কুফরি মতের শ্রেণিবিন্যাস পরবর্তী বহু আলেমের লেখায় পুনরাবৃত্ত হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে ভাষা আরও কঠোর হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক ক্রমটি পরিষ্কার রাখা জরুরি। ইবনে সিনা ৪২৮ হিজরি/১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান; গাজ্জালির দার্শনিক সমালোচনা তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পরে রচিত। ইবনে তাইমিয়্যাহহ, ইবনুল কাইয়্যিম, যাহাবি, ইবন হাজর ও ইবনে কাসীর আরও পরের শতাব্দীর মানুষ। ফলে “ইবনে সিনার সমসাময়িক সর্বোচ্চ আলেমেরা তাঁকে কাফের ঘোষণা করেছিলেন”—এ ভাষা প্রত্যক্ষ দলিলের চেয়ে বেশি দাবি করে। প্রমাণিত বিষয় হলো, পরবর্তী সুন্নি আকীদার বহু সর্বাধিক প্রভাবশালী কর্তৃপক্ষ তাঁর দর্শনের মৌলিক অংশকে ধারাবাহিকভাবে কুফর, ইলহাদ বা গুরুতর বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ইবনে তাইমিয়্যাহহ
ইবনে তাইমিয়্যাহহ ইবনে সিনার দর্শনকে শুধু তিনটি বিচ্ছিন্ন ভুলে সীমাবদ্ধ করেননি; তাঁর মতে ইবনে সিনার সামগ্রিক দার্শনিক ব্যবস্থা গ্রিক দর্শন, জাহমি ও কালামি মত, ইসমাইলি-বাতিনি চিন্তা এবং কিছু সুফি ধারণার সংমিশ্রণ। তিনি বিশেষভাবে অভিযোগ করেন যে ইবনে সিনা ইলাহিয়াত, নবুয়ত, পরকাল ও শরিয়ত নিয়ে এমন দার্শনিক ব্যাখ্যা নির্মাণ করেছেন যা প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যেও ছিল না এবং মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ থেকে নেওয়া উপাদানকে ফালাসিফা-দর্শনের সঙ্গে মিশিয়েছে। এই বিচার তাঁর কাছে শুধু মতভেদের প্রশ্ন ছিল না; তিনি ইবনে সিনার পরিবার ও তাঁর দার্শনিক ধারাকে ইসমাইলি-বাতিনি ইলহাদের সঙ্গে যুক্ত করেন [12]
وابن سينا تكلم في أشياء من الإلهيات والنبوات والمعاد والشرائع لم يتكلم فيها سلفه ولا وصلت إليها عقولهم ولا بلغتها علومهم فإنه استفادها من المسلمين وإن كان إنما أخذ عن الملاحدة المنتسبين إلى المسلمين كالإسماعيلية وكان هو وأهل بيته وأتباعهم معروفين عند المسلمين بالإلحاد وأحسن ما يظهرون دين الرفض وهم في الباطن يبطنون الكفر المحض
وابن سينا أحدث فلسفة ركبها من كلام سلفه اليونان ومما أخذه من أهل الكلام المبتدعين الجهمية ونحوهم وسلك طريق الملاحدة الإسماعيلية في كثير من أمورهم العلمية والعملية ومزجه بشيء من كلام الصوفية
বাংলা অনুবাদ: ইবনে সিনা ইলাহিয়াত, নবুয়ত, পরকাল ও শরিয়ত সম্পর্কে এমনসব কথা বলেছেন যা তাঁর পূর্বসূরিরা বলেননি এবং তাঁদের জ্ঞান সেখানে পৌঁছেনি। তিনি এগুলোর কিছু মুসলিমদের কাছ থেকে নেন, তবে ইবনে তাইমিয়্যাহর ভাষ্যে তিনি বিশেষত মুসলিম-পরিচয়ধারী ইসমাইলি মুলহিদদের কাছ থেকে গ্রহণ করেন। ইবনে তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, ইবনে সিনা তাঁর গ্রিক পূর্বসূরিদের বক্তব্য, জাহমি ও অন্যান্য কালামি মত, ইসমাইলি ধারা এবং কিছু সুফি বক্তব্য মিশিয়ে একটি নতুন দর্শন নির্মাণ করেছিলেন।
ইবনে তাইমিয়্যাহর এই অভিযোগকে ইবনে সিনার নিজের আত্মজীবনীর সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। ইবনে সিনা পরিবারে ইসমাইলি প্রভাব স্বীকার করেছেন, কিন্তু নিজে সেই মত গ্রহণ করেননি বলে লিখেছেন। ইবনে তাইমিয়্যাহহ সেই একই পটভূমি থেকে আরও বিস্তৃত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে বাতিনি-ইলহাদি ধারার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাই “ইবনে সিনা নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি বাতিনি ছিলেন”—এ দাবি করা ভুল; সঠিকভাবে বলতে হবে, তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ইসমাইলি ছিল এবং পরবর্তী ইবনে তাইমিয়্যাহহ তাঁর দর্শনের একটি অংশকে সেই পরিবেশের ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইবনুল কাইয়্যিম
ইবনুল কাইয়্যিমের ভাষা আরও কঠোর। তিনি ইবনে সিনাকে কারামিতা-বাতিনিয়া ধারার সঙ্গে যুক্ত করে তাঁর ঈশ্বর, নবুয়ত ও পরকাল-সংক্রান্ত দর্শনকে ইসলামী বিশ্বাসের বিপরীত হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর লেখায় ইবনে সিনা কেবল একটি বিশেষ মতের ভুলকারী নন; বরং এমন এক দার্শনিক যাঁর সামগ্রিক অধিবিদ্যাগত ব্যবস্থা ও নবুয়ত-পরকালতত্ত্বকে তিনি ইলহাদি ঐতিহ্যের অংশ বলে বিবেচনা করেছেন [13]
وكان ابن سينا كما أخبر عن نفسه قال: أنا وأبي من أهل دعوة الحاكم فكان من القرامطة الباطنية الذين لا يؤمنون بمبدأ ولا معاد ولا رب ولا رسول مبعوث جاء من عند الله تعالى
বাংলা অনুবাদ: ইবনুল কাইয়্যিমের ভাষ্যে, ইবনে সিনা নিজের সম্পর্কে বলেছেন: ‘আমি ও আমার পিতা হাকিমের দাওয়াতের লোক ছিলাম’; এরপর তিনি তাঁকে কারামিতা-বাতিনিয়া ধারার অন্তর্ভুক্ত করেন, যাদের সম্পর্কে তিনি বলেন তারা সৃষ্টি, পরকাল, রব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূলে বিশ্বাস করে না।
যাহাবি ও ইবন হাজর
যাহাবির জীবনীগ্রন্থগুলোতে ইবনে সিনার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা স্বীকার করা হলেও তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সিয়ার আ’লাম আন-নুবালা-তে তিনি ইবনে সিনার আশ-শিফাসহ এমন কিছু রচনার কথা বলেন যা তাঁর মতে গ্রহণযোগ্য নয় এবং উল্লেখ করেন যে গাজ্জালি ইবনে সিনা ও ফারাবিকে কাফের বলেছেন। মিজান আল-ই’তিদাল-এ তাঁর দার্শনিক মতকে “ভ্রান্ত” বলা হয়। ইবন হাজর লিসান আল-মিজান-এ এই ধারাটি আরও বিস্তৃত করেন এবং জগতের অনাদিত্ব, দেহগত পুনরুত্থান অস্বীকার ও আল্লাহর নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে কুল্লি জ্ঞানের তত্ত্বকে তাঁর বিরুদ্ধে আলেমদের কুফরের রায়ের কারণ হিসেবে উদ্ধৃত করেন [14]
هو رأس الفلاسفة الإسلامية، لم يأت بعد الفارابي مثله
বাংলা অনুবাদ: তিনি ইসলামী দার্শনিকদের প্রধান; ফারাবির পরে তাঁর মতো আর কেউ আসেনি।
এই উৎসটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যাহাবির বক্তব্যকে অনেক সময় এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন তিনি ইবনে সিনাকে ধর্মতাত্ত্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুসলিম দার্শনিক হিসেবে অনুমোদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনীমূলক প্রশংসা ও ধর্মতাত্ত্বিক মূল্যায়ন এক নয়। তিনি ইবনে সিনার বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুত্ব স্বীকার করেছেন, একই সঙ্গে গাজ্জালির তাকফির উল্লেখ করেছেন এবং অন্য গ্রন্থে তাঁর দর্শনকে ভ্রান্ত বলেছেন। ইতিহাসের এই দ্বৈততা আধুনিক “বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী = ইসলামী আকীদার প্রতিনিধি” সমীকরণকে দুর্বল করে।
ইবনে কাসীর
ইবনে কাসীর ইবনে সিনার জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে গাজ্জালির বিশটি আপত্তির সারাংশ পুনরাবৃত্তি করেন। তাঁর বিবরণে তিনটি মত আলাদা করে কুফরের কারণ হিসেবে আসে—জগতের অনাদিত্ব, দেহগত পুনরুত্থান অস্বীকার এবং আল্লাহর নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানের প্রশ্ন—আর বাকি বিষয়গুলোতে বিদআতের রায়। অর্থাৎ গাজ্জালির তৈরি ধর্মতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস কয়েক শতাব্দী পরও সুন্নি ইতিহাসচর্চার মধ্যে সক্রিয় ছিল [15]
قد حصر الغزالي كلامه في “مقاصد الفلاسفة” ثم رد عليه في “تهافت الفلاسفة” في عشرين مجلساً له، كفره في ثلاث منها، هي: قوله بقدم العالم وعدم المعاد الجسماني وأن الله لا يعلم الجزئيات وبدَّعه في البواقي ويقال أنه تاب عند الموت والله أعلم
বাংলা অনুবাদ: গাজ্জালি ‘মাকাসিদ আল-ফালাসিফা’-তে তাঁদের মতগুলো সংকলন করেন এবং পরে ‘তাহাফুত আল-ফালাসিফা’-তে বিশটি আলোচনায় তার জবাব দেন। এর তিনটিতে তিনি কুফরের রায় দেন: জগতের অনাদিত্ব, দেহগত পুনরুত্থান না থাকা এবং আল্লাহ নির্দিষ্ট বিষয়গুলো জানেন না—এই মতগুলোতে; বাকি বিষয়গুলোতে তিনি বিদআতের রায় দেন। বলা হয়, মৃত্যুর সময় তিনি তওবা করেছিলেন; আল্লাহই ভালো জানেন।
ইবনুল ইমাদ, ইবনুস সালাহ ও আনওয়ার শাহ কাশ্মিরীর আরও কঠোর ভাষা
পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্যে ইবনে সিনাকে নিয়ে ভাষা শুধু “ভুল দার্শনিক” পর্যায়ে থাকেনি। ইবনুল ইমাদের নামে সংরক্ষিত উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ আলেম তাঁর কুফর ও যিন্দিক হওয়ার রায় দিয়েছেন এবং গাজ্জালির ফারাবি-ইবনে সিনা সম্পর্কিত তাকফির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। ইবনুস সালাহর নামে প্রচলিত উদ্ধৃতিতে তাঁকে “মানুষের শয়তানদের একজন” বলা হয়। আনওয়ার শাহ কাশ্মিরীর ফয়য আল-বারি-র উদ্ধৃতিতে তাঁকে মুলহিদ, যিন্দিক ও কারামতি বলা হয়েছে। এগুলো ইবনে সিনার নিজের মতের প্রাথমিক উৎস নয়; এগুলো পরবর্তী ইসলামী আলেমদের তাঁর প্রতি মনোভাবের দলিল। এই পার্থক্যটি বজায় রেখেই উদ্ধৃতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক মুসলিম গৌরব-বয়ানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ধর্মতাত্ত্বিক গ্রহণযোগ্যতার ব্যবধান এগুলো স্পষ্ট করে [16]
أكثر العلماء على كفره وزندقته
বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ আলেম তাঁর কুফর ও যিন্দিক হওয়ার রায় দিয়েছেন।
ইবনুস সালাহ এবং আনোয়ার শাহ কাশ্মীরীর বক্তব্য [17]
كان شيطاناً من شياطين الإنس
ابن سينا الملحد الزنديق القرمطي غدا مدى شرك الردى وشريطة الشيطان
বাংলা অনুবাদ: সে ছিল মানুষের শয়তানদের একজন।
ইবনে সিনাকে এখানে মুলহিদ, যিন্দিক ও কারামতি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তাঁকে শিরক ও শয়তানের সঙ্গে যুক্ত করে নিন্দা করা হয়েছে।
ইসলামওয়েব: আধুনিক ফতোয়ায় একই ঐতিহাসিক রায়ের পুনরাবৃত্তি
ইবনে সিনার বিরুদ্ধে কুফরের ঐতিহাসিক রায় শুধু মধ্যযুগীয় গ্রন্থে পড়ে নেই; আধুনিক ইসলামি ফতোয়া-ব্যবস্থায়ও তা সক্রিয়ভাবে পুনরাবৃত্ত হচ্ছে। ইসলামওয়েবের “ইবনে সিনা ফিল মিযান” ফতোয়ায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, সত্যিই কি বহু আলেম ইবনে সিনাকে কাফের বলেছেন। উত্তরে তাঁর কারামিতা-বাতিনিয়া সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, দার্শনিক ইলহাদি মত, ইবনে তাইমিয়্যাহহ ও ইবনুল কাইয়্যিমের কঠোর বিচার এবং আরও কয়েকজন ঐতিহাসিক লেখকের বক্তব্য একত্রিত করা হয়েছে [18]
فإن ابن سينا اتهم بأنه كان من القرامطة الباطنية، وكانت عنده أفكار فلسفية إلحادية
বাংলা অনুবাদ: ইবনে সিনার বিরুদ্ধে কারামিতা-বাতিনিয়া ধারার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ ছিল এবং তাঁর মধ্যে নাস্তিক্যবাদী দার্শনিক চিন্তা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আরেকটি ইসলামওয়েব ফতোয়া “ইবনে সিনার আকীদা সম্পর্কে চূড়ান্ত বক্তব্য” শিরোনামে যাহাবি, ইবন হাজর ও অন্যান্য উৎস একত্রিত করে। সেখানে ইবনে সিনার রচনায় স্পষ্ট কুফরি মত থাকার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তবে তাঁর মৃত্যুর সময় তওবা হয়েছিল কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করা হয় না। এই পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ: আকীদাগত মতের মূল্যায়নকে তারা নিশ্চিত ভাষায় বললেও ব্যক্তির শেষ পরিণতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা স্বীকার করে [19]
وله كتاب الشفاء، وغيره، وأشياء لا تحتمل، وقد كفره الغزالي
বাংলা অনুবাদ: তাঁর ‘আশ-শিফা’ এবং অন্যান্য গ্রন্থ আছে, আর এমন কিছু বিষয়ও আছে যা সহ্যযোগ্য নয়; গাজ্জালি তাঁকে কাফের বলেছেন।
ইসলামকিউএ: আলেমেরা কেন ইবনে সিনাকে কাফের বলেছেন?
ইসলামকিউএ-র একটি পূর্ণ উত্তর সরাসরি “আলেমেরা কেন ইবনে সিনাকে কাফের বলেছেন” প্রশ্নের জন্য নিবেদিত। সেখানে ইবন হাজরের লিসান আল-মিজান থেকে জগতের অনাদিত্ব, দেহগত পুনরুত্থান অস্বীকার এবং আল্লাহর কুল্লি জ্ঞানের মত উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে এসব বিশ্বাসকে ইসলামের প্রচলিত আকীদার বিরোধী মনে করে তাঁর ও ফারাবির বিরুদ্ধে কুফরের রায় দেওয়া হয়েছিল। একই উত্তরে গাজ্জালি ও ইবনে কাসীরের বক্তব্যও পুনরাবৃত্ত হয় [20]
وكان من القرامطة الباطنية، وله مقالات كفرية مشهورة، ولهذا كفره جمع من العلماء، وحكيت توبته قبل موته
বাংলা অনুবাদ: তাঁকে কারামিতা-বাতিনিয়া ধারার অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে এবং তাঁর বিখ্যাত কিছু কুফরি বক্তব্য ছিল; এ কারণে একদল আলেম তাঁকে কাফের বলেছেন। মৃত্যুর আগে তাঁর তওবার কথাও বর্ণিত হয়েছে।
আরেকটি ইসলামকিউএ উত্তর এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক রূপটি সরাসরি সামনে আনে: ইসলাম যদি চিকিৎসা, গণিত ও অন্যান্য পার্থিব বিজ্ঞানকে উৎসাহ দেয়, তাহলে ইবনে সিনা ও ফারাবির মতো বিজ্ঞানী-দার্শনিককে কেন কাফের বলা হয়? ইসলামকিউএ-র উত্তর অত্যন্ত পরিষ্কার—বৈজ্ঞানিক দক্ষতা এবং ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান আলাদা; ইবনে সিনাকে চিকিৎসার জন্য নয়, আকীদাগত বক্তব্যের জন্য কাফের বলা হয়েছে। এই স্বীকারোক্তি আধুনিক “ইবনে সিনার বিজ্ঞান = ইসলামের আকীদাগত কৃতিত্ব” সমীকরণকে সরাসরি ভেঙে দেয় [21]
لم يكفروه من أجل علمه بالطب
বাংলা অনুবাদ: তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞানের কারণে তাঁকে কাফের বলা হয়নি।
এই উত্তরটি প্রবন্ধের মূল প্রশ্নের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক মুসলিম বক্তৃতায় ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যাকে প্রায়ই ইসলামের জ্ঞানবিজ্ঞানসম্মত মহত্ত্বের উদাহরণ হিসেবে হাজির করা হয়; কিন্তু ইসলামকিউএ-র নিজের শ্রেণিবিন্যাস বলছে, তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজ এবং তাঁর ইসলামী আকীদা দুইটি আলাদা বিষয়। যদি তাঁর আকীদা এতটাই বিচ্যুত হয় যে একই ধর্মীয় ঐতিহ্য তাঁকে কাফের বলে, তাহলে তাঁর চিকিৎসাবিদ্যাকে সেই আকীদার সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যৌক্তিকভাবে চলে না। তাঁর বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব তখন মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসের অংশ হতে পারে, কিন্তু তা ধ্রুপদী আকীদার ফল—এই অতিরিক্ত সিদ্ধান্তের জন্য আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।
ইবনে সিনার নামে প্রতিষ্ঠান: সালেহ আল-ফাওযানের আধুনিক রায়
এই ঐতিহাসিক তাকফির আধুনিক সালাফি আলোচনায় শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; ইবনে সিনার নাম ব্যবহার নিয়েও ফতোয়া দেওয়া হয়েছে। সালেহ আল-ফাওযানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্কুল, ফার্মেসি বা কোম্পানির নাম ইবনে সিনা বা ফারাবির নামে রাখায় শরিয়তগত আপত্তি আছে কি না। তাঁর উত্তর ছিল, এমন নামকরণ তাঁদের সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বৈধ নয়। একই সঙ্গে তিনি ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যার দক্ষতা অস্বীকার করেননি; বরং চিকিৎসক হিসেবে তাঁর দক্ষতা স্বীকার করেই ধর্মীয় সম্মান প্রদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই উত্তর আধুনিক ধর্মীয় গৌরবের দ্বৈততাটিকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে: চিকিৎসা গ্রহণযোগ্য, চিকিৎসকের আকীদা নয় [22]
لا يجوز، تعظيم لهم
বাংলা অনুবাদ: এটি বৈধ নয়; কারণ এতে তাঁদের সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
ফলে আধুনিক দৃশ্যটি পরিষ্কার। একই ব্যক্তির আল-কানুন ফিত-তিব ও চিকিৎসাবিদ্যার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব মুসলিম সভ্যতার গৌরব হিসেবে প্রচারিত হতে পারে, অথচ একই ধর্মীয় পরিসরের আকীদাগত কর্তৃপক্ষ তাঁর দর্শনকে কুফর বলে এবং তাঁর নামে প্রতিষ্ঠান নামকরণকেও আপত্তিকর বলে গণ্য করতে পারে। দ্বন্দ্বটি ইবনে সিনার ব্যক্তিগত প্রতিভার মধ্যে নয়; দ্বন্দ্বটি তৈরি হয় যখন তাঁর বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব থেকে ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়।
উপসংহার
ইবনে সিনার ইতিহাস থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো—বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব, সভ্যতাগত পরিচয় এবং ধর্মতাত্ত্বিক আনুগত্য এক জিনিস নয়। ইবনে সিনা মুসলিম-অধ্যুষিত সমাজে জন্ম নেওয়া একজন অসাধারণ চিকিৎসক ও দার্শনিক ছিলেন এবং তাঁর জ্ঞান ইউরোপ ও এশিয়ার বহু শতাব্দীর চিকিৎসা ও দর্শনচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু সেখান থেকে এই সিদ্ধান্ত আসে না যে তাঁর অধিবিদ্যা ধ্রুপদী ইসলামী আকীদার প্রতিফলন ছিল। বরং তাঁর দর্শনের কয়েকটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত—জগতের সময়গত সূচনা, আল্লাহর নির্দিষ্ট ব্যক্তি-ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞানের ধরন, দেহগত পুনরুত্থান এবং ওহির প্রকৃতি—প্রচলিত সুন্নি ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে মৌলিক সংঘাতে গিয়েছিল।
ইবনে সিনাকে আধুনিক অর্থে নাস্তিক বলাও সঠিক নয়। তাঁর দর্শনে অপরিহার্য প্রথম সত্তা আছে, আত্মা আছে, মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব আছে এবং নবুয়তেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে। কিন্তু তিনি এসব ধারণাকে এমন এক দার্শনিক ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাখ্যা করেছেন, যা প্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিক ভাষ্যকে গভীরভাবে বদলে দেয়। তাঁর জগৎ আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হলেও সময়গতভাবে অনাদি; তাঁর ঈশ্বরের জ্ঞান অপরিবর্তনীয় ও কুল্লি পদ্ধতিতে ব্যাখ্যাত; তাঁর পরকাল আত্মিক ধারাবাহিকতাকে স্বীকার করলেও দেহগত পুনরুত্থানকে প্রচলিত অর্থে গ্রহণ করে না; তাঁর নবুয়ত-তত্ত্ব সক্রিয় বুদ্ধি, পবিত্র অন্তর্দৃষ্টি ও কল্পনাশক্তির মাধ্যমে ওহিকে ব্যাখ্যা করে। ফলে তাঁকে ধ্রুপদী সুন্নি আকীদার সাধারণ প্রতিনিধি বলা ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না।
মুতাজিলাদের প্রশ্নটিও একইভাবে নির্দিষ্ট। ইবনে সিনা মুতাজিলা ছিলেন—এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু আল্লাহর গুণাবলি, সত্তা-গুণের সম্পর্ক এবং কার্যকারণের কিছু প্রশ্নে ফালাসিফাদের সঙ্গে মুতাজিলাদের মতগত সাদৃশ্য গাজ্জালি নিজেই চিহ্নিত করেছিলেন। এর সঙ্গে ইসমাইলি পারিবারিক পরিবেশ, গ্রিক-আরবি দর্শন, নব্য-প্লেটোনিক উদ্ভবতত্ত্ব এবং সমকালীন কালামের বিতর্ক যুক্ত হলে যে চিত্রটি পাওয়া যায় তা একক “বিশুদ্ধ ইসলামী বিজ্ঞান”-এর নয়; বরং বহু প্রতিদ্বন্দ্বী চিন্তাধারার সংঘর্ষ, ধারগ্রহণ, অনুবাদ, পুনর্গঠন ও বিতর্কের ইতিহাস। মুসলিম সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্যকে বুঝতে হলে এই বৈচিত্র্যকে স্বীকার করতেই হবে।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি আধুনিক ধর্মীয় গৌরবের ভাষায়। আজ ইবনে সিনার নাম হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফার্মেসি ও সভ্যতাগত প্রচারণায় মুসলিম কৃতিত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ যে সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে একই সঙ্গে “বিশুদ্ধ আকীদা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেই ঐতিহ্যের গাজ্জালি থেকে ইবনে তাইমিয়্যাহহ, ইবনুল কাইয়্যিম, যাহাবি, ইবন হাজর ও ইবনে কাসীর পর্যন্ত বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তাঁর মৌলিক দার্শনিক মতকে কুফর, ইলহাদ বা গুরুতর বিচ্যুতি হিসেবে বিচার করেছেন। আধুনিক ইসলামওয়েব ও ইসলামকিউএ এখনও সেই রায় পুনরাবৃত্তি করে; সালেহ আল-ফাওযানের মতো সমকালীন সালাফি আলেম তাঁর চিকিৎসাগত দক্ষতা স্বীকার করেও তাঁর নামে প্রতিষ্ঠান নামকরণকে সম্মান প্রদর্শন হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সুতরাং ইবনে সিনার বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বকে স্বীকার করতে তাঁকে কৃত্রিমভাবে ধ্রুপদী আকীদার প্রতিনিধি বানানোর প্রয়োজন নেই। তাঁর চিকিৎসাবিদ্যা মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডারের অংশ; তাঁর দর্শনও মানববুদ্ধির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভাকে ইসলামী আকীদার সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা এবং একই সঙ্গে তাঁর প্রকৃত ধর্মতাত্ত্বিক মত ও সেই মতের বিরুদ্ধে ইসলামী ঐতিহ্যের কঠোর রায় আড়াল করা ইতিহাসের নির্বাচিত ব্যবহার। ইবনে সিনার প্রকৃত ইতিহাস বরং উল্টো শিক্ষা দেয়: মুসলিম সভ্যতার জ্ঞানচর্চার শক্তি কেবল ধর্মীয় আনুগত্যে ছিল না; তা গড়ে উঠেছিল অনুবাদ, দর্শন, মতবিরোধ, বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘর্ষ এবং প্রতিষ্ঠিত ধর্মতাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করে নতুন প্রশ্ন করার ক্ষমতার মধ্য দিয়ে।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামকিউএ — কীভাবে ইসলাম পার্থিব বিজ্ঞানকে উৎসাহ দেয়, আবার ইবনে সিনা ও ফারাবিকে কাফের বলে? ↩︎
- ইসলামওয়েব — ইসলামী সভ্যতার চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান ↩︎
- Islamweb — Claims about Ibn Sina being an atheist or Kafir ↩︎
- ইবনে সিনার আত্মজীবনী — সীরাতুশ শাইখ আর-রঈস ↩︎
- মাকতাবা শামেলা — গাজ্জালি, তাহাফুত আল-ফালাসিফা 1 2
- মাকতাবা শামেলা — তাহাফুত আল-ফালাসিফা, জগতের অনাদিত্ব প্রসঙ্গ ↩︎
- মাকতাবা শামেলা — ইবন হাজর, লিসান আল-মিজান ↩︎
- ইসলামওয়েব — শুধু আত্মার পুনরুত্থান মানার হুকুম ↩︎
- Stanford Encyclopedia of Philosophy — Ibn Sina ↩︎
- Oxford Academic — Revelation and Religious Experience in the Islamic Tradition ↩︎
- মাকতাবা শামেলা — গাজ্জালি, আল-মুনকিয মিন আদ-দালাল ↩︎
- মাকতাবা শামেলা — ইবনে তাইমিয়্যাহহ, মাজমু আল-ফাতাওয়া ↩︎
- মাকতাবা শামেলা — ইবনুল কাইয়্যিম, ইগাসাত আল-লাহফান ↩︎
- ইসলামওয়েব — ইবনে সিনার আকীদা সম্পর্কে যাহাবি ও ইবন হাজরের উদ্ধৃতি ↩︎
- মাকতাবা শামেলা — ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ↩︎
- শাযারাত আল-যাহাব থেকে ইবনুল ইমাদের উদ্ধৃতি ↩︎
- আল-মাকতাবা — ইবনুস সালাহ ও আনওয়ার শাহ কাশ্মিরীর উদ্ধৃতি ↩︎
- ইসলামওয়েব — ইবনে সিনা ফিল মিযান ↩︎
- ইসলামওয়েব — আল-কাওল আশ-শাফি ফি আকীদাত ইবনে সিনা ↩︎
- ইসলামকিউএ — আলেমদের ইবনে সিনাকে কাফের বলার কারণ ↩︎
- ইসলামকিউএ — বিজ্ঞানকে উৎসাহ দেওয়া ও ইবনে সিনার তাকফিরের মধ্যে কি বিরোধ আছে? ↩︎
- সালেহ আল-ফাওযান — ইবনে সিনা বা ফারাবির নামে স্কুল, ফার্মেসি বা কোম্পানি নামকরণের প্রশ্ন ↩︎

