ভূমিকা: ধর্মীয় বিধানের নামে অস্বাস্থ্যকর চর্চা
মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিবর্তন ঘটেছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে। কিন্তু মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কাঠামোতে অনেক সময়ই মানুষের বর্জ্য বা প্রাণীর রেচন পদার্থকে ‘অলৌকিক ঔষধ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে উটের মূত্র পানের বিষয়টি তেমনই একটি বিতর্কিত ও অবৈজ্ঞানিক বিধান, যা আজ একুশ শতকের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগেও একদল মানুষের কাছে ‘সুন্নাহ’ বা পবিত্র চিকিৎসা হিসেবে সমাদৃত। এই ধারণাটি কেবল হাস্যকরই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ইসলামি হাদিসের বর্ণনা অনুসারে, নবী মুহাম্মদ উকল ও উরায়না গোত্রের একদল অসুস্থ লোককে, যারা তাঁর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, সুস্থতার জন্য উটের দুধ ও মূত্র পান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক বর্ণনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে ফকিহ এবং আলেমগণ এমন একটি তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন, যার অনুসারে যেসব পশুর মাংস খাওয়া হালাল, তাদের মলমূত্রও শরিয়তের দৃষ্টিতে পবিত্র। অথচ ধর্মীয় পবিত্রতার ঘোষণা কোনো পদার্থের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা কিংবা স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার প্রমাণ নয়। মূত্র হলো দেহের বিপাকীয় বর্জ্য, অতিরিক্ত লবণ, ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন এবং অন্যান্য দ্রবীভূত পদার্থ বের করে দেওয়ার একটি জৈব-নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার ফল। এমন একটি প্রাণিজ বর্জ্যকে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে ‘শিফা’ বা আরোগ্য হিসেবে প্রচার করা কেবল যুক্তিবিরোধী নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক।
উটের দুধ ও মূত্র: নববী চিকিৎসা পদ্ধতি
আসুন এই সম্পর্কিত হাদিসগুলো পড়ে নেয়া যাক [1] [2] [3] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৬ঃ কিসাস (প্রতিশোধ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ – মুরতাদ এবং গোলযোগ সৃষ্টিকারীকে হত্যা করা প্রসঙ্গে
৩৫৩৯-(৭) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ‘উকল সম্প্রদায়ের কিছু লোক উপস্থিত হলো। অতঃপর তারা ইসলাম গ্রহণ করল। কিন্তু মাদীনার আবহাওয়া তাদের জন্য অনুপযোগী হলো। অতএব তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে সাদাকার উটনীর নিকট গিয়ে তার দুধ ও প্রস্রাব পানের নির্দেশ দিলেন। ফলে তারা নির্দেশ পালনার্থে সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু তারা সুস্থ হয়ে মুরতাদ হয়ে গেল এবং তারা রাখালদেরকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিল। তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ সংবাদ শুনে) তাদের পেছনে লোক পাঠালেন। অতঃপর তাদেরকে ধরে আনা হলে তাদের দু’ হাত ও দু’ পা কেটে ফেললেন এবং তাদের চোখ ফুঁড়ে দিলেন, তারপর তাদের রক্তক্ষরণস্থলে দাগালেন না, যাতে তারা মৃত্যুবরণ করে।
অপর বর্ণনাতে রয়েছে, লোকেরা তাদের চোখে লৌহ শলাকা দিয়ে মুছে দিল। অন্য বর্ণনাতে আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লৌহ শলাকা আনার হুকুম করলেন, যাকে গরম করা হলো এবং তাদের চোখের উপর মুছে দেয়া হলো। অতঃপর তাদেরকে উত্তপ্ত মাটিতে ফেলে রাখলেন। তারা পানি চাইল কিন্তু তাদেরকে পানি পান করানো হয়নি। পরিশেষে তারা এ করুণ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল। (বুখারী ও মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৩০১৮, ৬৮০২, মুসলিম ১৬৭১, আবূ দাঊদ ৪৩৬৪, নাসায়ী ৪০২৫, ইবনু মাজাহ ২৫৭৮, আহমাদ ১২৬৩৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৯/ ‘কাসামা’-(খুনের ব্যাপারে বিশেষ ধরনের হলফ করা), ‘মুহারিবীন’ (শত্রু সৈন্য), ‘কিসাস’ (খুনের বদলা) এবং ‘দিয়াত’ (খুনের শাস্তি স্বরূপ অর্থদন্ড)
পরিচ্ছেদঃ ২. শত্রু সৈন্য এবং মুরতাদের বিচার
৪২০৭। আবূ জাফর মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, “উকল” গোত্রের আট জনের একটি দল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করল। অতঃপর তারা ইসলামের ওপর বাইআত গ্রহণ করল। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া তাদের অনুকুলে না হওয়ায় তাদের শরীর অসুস্থ হায় গেল। তখন তারা এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আভিযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি আমাদের রাখালের সাথে-গমন করে উটের মূত্র ব্যবহার এবং দুধ পান করতে পারবে? তখন তারা বলল, জী হ্যাঁ। এরপর বের হয়ে গেল এবং তার মূত্র ব্যবহার ও দুধ পান করল। এতে তারা সুস্থ হয়ে গেল।
অতঃপর তারা রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এই সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। তাঁরা ধরা পড়ল এবং তাদেরকে নিয়ে আসা হল। তাদের প্রতি আদেশ জারি করা হল এবং তাদের হাত-পা কর্তন করা হল এবং তপ্ত লৌহ শলাকা চোখে প্রবেশ করানো হলো। এরপর তাদেরকে রৌদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। অবশেষে তারা মারা গেল।
ইবন সাব্বাহ (রহঃ) … এর বর্ণনা وَطَرَدُوا الإِبِل এর স্থলে وَاطَّرَدُوا النَّعَمَ উল্লেখ রয়েছে এবং তার বর্ণনায় وَسُمِّرَتْ أَعْيُنُهُمْ রয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৯। কাসামাহ্ (খুন অস্বীকার করলে হলফ নেয়া), মুহারিবীন (লড়াই), কিসাস (খুনের বদলা) এবং দিয়াত (খুনের শাস্তি স্বরূপ জরিমানা)
৪২৪৬-(১০/…) আবূ জাফার মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ) ….. আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, “উকল” গোত্রের আটজনের একটি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলো। তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ইসলামের উপর বাই’আত করল। অতঃপর মাদীনার আবহাওয়া তাদের প্রতিকূল হওয়ায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অভিযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি আমাদের রাখালের সাথে গমন করে উটের মূত্র এবং দুগ্ধ পান করতে পারবে? তখন তারা বলল, জী- হ্যাঁ। এরপর তারা বের হয়ে গেলে এবং এর (উটের) মূত্র ও দুগ্ধ পান করল। এতে তারা সুস্থ হয়ে গেল্ অতঃপর তারা রাখালকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেলে। এ সংবাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌছল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। তারা তাদেরকে পাকড়াও করে নিয়ে এল। তাদের প্রতি নির্দেশ জারি করা হল। তখন তাদের হাত-পা কৰ্তন করা হল এবং তপ্ত লৌহ শলাকা চোখে প্রবেশ করানো হলা। এরপর তাদেরকে রৌদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। অবশেষে তারা মারা গেল।
ইবনু সাব্বাহ (রহঃ) … বর্ণনা وَطَرَدُوا الإِبِلَ এর স্থলে وَاطَّرَدُوا النَّعَمَ উল্লেখ রয়েছে। রাবী বলেন, অতঃপর তাদের চোখগুলো উপড়ে ফেলা হল। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২০৭, ইসলামিক সেন্টার ৪২০৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
নববী চিকিৎসা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি
উটের মূত্রপানকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন হাদিসের বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল নয়। সহিহ বুখারির সংকলক মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি তাঁর গ্রন্থের চিকিৎসা অধ্যায়েই উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসার জন্য পৃথক পরিচ্ছেদ নির্ধারণ করেছেন। সহিহ বুখারির ৭৬ নম্বর কিতাবের নাম ‘কিতাবুত তিব্ব’ বা চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থ। এই কিতাবের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদের আরবি শিরোনাম باب الدواء بأبوال الإبل, অর্থাৎ ‘উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসা করার পরিচ্ছেদ’। সেখানে ৫৬৮৬ নম্বর হাদিসে আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে মুহাম্মদের উটের দুধ ও মূত্রপানের নির্দেশ সংরক্ষিত হয়েছে। এর অব্যবহিত আগের পঞ্চম পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘উটের দুধ দিয়ে চিকিৎসা’। অর্থাৎ বুখারি উটের দুধ এবং উটের মূত্রকে চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনার দুটি পৃথক শিরোনামে স্থান দিয়েছেন। ফলে উটের মূত্র এখানে নিছক একটি ঐতিহাসিক ঘটনার আনুষঙ্গিক বিবরণ নয়; বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে দেয়া নির্দেশনা নয়; চিকিৎসার একটি উপকরণ হিসেবেই হাদিস সংকলনের বিষয়বিন্যাসে স্বীকৃতি পেয়েছে। [4]
صحيح البخاري — كتاب الطب
باب الدواء بأبوال الإبل
حديث رقم: 5686
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ نَاسًا، اجْتَوَوْا فِي الْمَدِينَةِ فَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَنْ يَلْحَقُوا بِرَاعِيهِ ـ يَعْنِي الإِبِلَ ـ فَيَشْرَبُوا مِنْ أَلْبَانِهَا وَأَبْوَالِهَا، فَلَحِقُوا بِرَاعِيهِ فَشَرِبُوا مِنْ أَلْبَانِهَا وَأَبْوَالِهَا، حَتَّى صَلَحَتْ أَبْدَانُهُمْ فَقَتَلُوا الرَّاعِيَ وَسَاقُوا الإِبِلَ، فَبَلَغَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَبَعَثَ فِي طَلَبِهِمْ، فَجِيءَ بِهِمْ فَقَطَعَ أَيْدِيَهُمْ وَأَرْجُلَهُمْ، وَسَمَرَ أَعْيُنَهُمْ. قَالَ قَتَادَةُ فَحَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ سِيرِينَ أَنَّ ذَلِكَ كَانَ قَبْلَ أَنْ تَنْزِلَ الْحُدُودُ.
বাংলা অনুবাদ:
সহিহ বুখারি, চিকিৎসা অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসা
হাদিস নম্বর: ৫৬৮৬
মূসা ইবনে ইসমাইল আমাদের বর্ণনা করেছেন। হাম্মাম আমাদের বর্ণনা করেছেন, কাতাদার সূত্রে, তিনি আনাস থেকে বর্ণনা করেন যে, কিছু লোক মদিনায় এসে সেখানকার আবহাওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন নবী তাদের তাঁর উটের রাখালের কাছে যেতে এবং উটগুলোর দুধ ও মূত্র পান করতে নির্দেশ দিলেন। তারা রাখালের কাছে গিয়ে উটের দুধ ও মূত্র পান করতে লাগল, যতক্ষণ না তাদের শরীর সুস্থ হয়ে উঠল। এরপর তারা রাখালকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেল। এই সংবাদ নবীর কাছে পৌঁছালে তিনি তাদের ধরার জন্য লোক পাঠালেন। তাদের ধরে আনা হলে তিনি তাদের হাত ও পা কেটে দিলেন এবং উত্তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে তাদের চোখ দাগিয়ে দিলেন। কাতাদা বলেন, মুহাম্মদ ইবনে সিরিন আমাকে জানিয়েছেন যে, ঘটনাটি হুদুদের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে ঘটেছিল।
হাদিসটির বক্তব্যে চিকিৎসার নির্দেশটি অত্যন্ত স্পষ্ট। অসুস্থ ব্যক্তিরা মদিনার আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে শারীরিক সমস্যায় পড়েছিল। মুহাম্মদ তাদের অসুস্থতার প্রতিকারে উটের রাখালের কাছে গিয়ে দুধ ও মূত্র পান করতে নির্দেশ দেন। এখানে উটের মূত্রপান কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণিত হয়নি; নির্দেশটি সরাসরি মুহাম্মদের কাছ থেকে এসেছে। হাদিসে ব্যবহৃত فَيَشْرَبُوا مِنْ أَلْبَانِهَا وَأَبْوَالِهَا বাক্যাংশের অর্থ, তারা যেন উটগুলোর দুধ ও মূত্র পান করে। পরবর্তী বাক্যে فَشَرِبُوا مِنْ أَلْبَانِهَا وَأَبْوَالِهَا বলে সেই নির্দেশ বাস্তবে পালন করার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ উটের মূত্র পান করার আদেশ এবং সেই আদেশ কার্যকর করা—উভয় ঘটনাই বর্ণনায় উপস্থিত। একই সঙ্গে حَتَّى صَلَحَتْ أَبْدَانُهُمْ বাক্যাংশে তাদের শরীর সুস্থ হয়ে ওঠার দাবি করা হয়েছে। ফলে হাদিসের ঘটনাক্রমে অসুস্থতা, নবীর নির্দেশ, মূত্রপান এবং সুস্থতার বিবরণ একটি কার্যকারণ সম্পর্কের আকারে উপস্থাপিত হয়েছে। এই বর্ণনাকেই বুখারি চিকিৎসাবিষয়ক পরিচ্ছেদের ভিত্তি করেছেন।
বুখারির এই শ্রেণিবিন্যাসের তাৎপর্য আরও গভীর। একই ঘটনা তাঁর গ্রন্থের অন্যান্য স্থানে অপরাধ, প্রতিশোধ ও শাস্তির বিবরণ হিসেবেও এসেছে। কিন্তু চিকিৎসা অধ্যায়ে ঘটনাটিকে স্থান দেওয়ার মাধ্যমে এর পৃথক চিকিৎসাগত ব্যবহারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষত উটের দুধের জন্য একটি পরিচ্ছেদ এবং উটের মূত্রের জন্য তার পরেই আরেকটি পরিচ্ছেদ নির্ধারণ করার অর্থ, মূত্রপানের বিষয়টি সংকলকের নজর এড়িয়ে যাওয়া কোনো অস্বস্তিকর অনুষঙ্গ ছিল না। তিনি সচেতনভাবে এটিকে চিকিৎসার আলোচ্য বিষয় করেছেন। হাদিসটির শেষাংশে রাখাল হত্যা, উট চুরি এবং অভিযুক্তদের হাত-পা কেটে উত্তপ্ত লোহা দিয়ে চোখ দাগিয়ে দেওয়ার নির্মম শাস্তির বিবরণ রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা অধ্যায়ে হাদিসটির স্থান নির্ধারণ করেছে প্রাথমিক ঘটনাটি—অসুস্থ ব্যক্তিদের উটের মূত্রপানের নির্দেশ। ফলে এই হাদিসের ধর্মীয় ব্যবহার শুধু অপরাধের শাস্তি বা কিসাসের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; মুসলিম চিকিৎসা-ঐতিহ্যের মধ্যেও এটি প্রত্যক্ষভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বুখারির বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার ইবনে হাজার আসকালানিও তাঁর ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থের দশম খণ্ডে ‘উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসা’ পরিচ্ছেদ ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে তিনি উরায়না গোত্রের ঘটনা উল্লেখ করার পাশাপাশি ইবনে মুনযিরের মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত আরেকটি বর্ণনাও উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে পেটের অসুখে উটের মূত্র উপকারী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ধ্রুপদি হাদিসব্যাখ্যার মধ্যেও উটের মূত্রকে চিকিৎসাগত উপকারী পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করার ঐতিহ্য উপস্থিত ছিল। ইবনে হাজারের উদ্ধৃত দ্বিতীয় বর্ণনাটির ঐতিহাসিক প্রমাণমূল্য সহিহ বুখারির মূল হাদিসের শ্রেণিবিভাগ থেকে স্বতন্ত্র; কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে সেটির উপস্থিতি দেখায়, উটের মূত্রপানের ঘটনা পরবর্তী চিকিৎসা-আলোচনার উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। [5]
قَوْلُهُ : ( بَابُ الدَّوَاءِ بِأَبْوَالِ الْإِبِلِ ) ذَكَرَ فِيهِ حَدِيثَ الْعُرَنِيِّينَ ، وَوَقَعَ فِي خُصُوصِ التَّدَاوِي بِأَبْوَالِ الْإِبِلِ حَدِيثٌ أَخْرَجَهُ ابْنُ الْمُنْذِرِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَفَعَهُ ” عَلَيْكُمْ بِأَبْوَالِ الْإِبِلِ فَإِنَّهَا نَافِعَةٌ لِلذَّرِبَةِ بُطُونِهِمْ ” وَالذَّرِبَةُ بِفَتْحِ الْمُعْجَمَةِ وَكَسْرِ الرَّاءِ جَمْعُ ذَرِبٍ ، وَالذَّرَبُ بِفَتْحَتَيْنِ فَسَادُ الْمَعِدَةِ .
বাংলা অনুবাদ: তাঁর বক্তব্য, ‘উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসা করার পরিচ্ছেদ’—এখানে তিনি উরায়না গোত্রের লোকদের হাদিস উল্লেখ করেছেন। বিশেষভাবে উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে ইবনে মুনযির ইবনে আব্বাস থেকে নবীর নামে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন: ‘তোমরা উটের মূত্র ব্যবহার করো; কারণ এটি যাদের পেটে অসুখ রয়েছে, তাদের জন্য উপকারী।’ এখানে ‘যারিবা’ শব্দটি ‘যারিব’-এর বহুবচন; আর ‘যারাব’ বলতে পাকস্থলীর অসুস্থতা বা বিকার বোঝায়।
উটের মূত্রের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা নিয়ে এই ধর্মীয় শাস্ত্রে যে ধরনের প্রমাণ হাজির করছে, তার মৌলিক সমস্যা হলো, কোনো ঘটনার বর্ণনায় রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছিল বললেই নির্দিষ্ট পদার্থটির চিকিৎসাগত কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বুখারির হাদিসে রোগীদের রোগ নির্ণয়, শারীরিক অবস্থার পরিমাপ, কত পরিমাণ মূত্র পান করানো হয়েছিল, কতদিন পান করানো হয়েছিল, অন্য কোনো খাবার বা চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়েছিল কি না—এসব তথ্য নেই। তাদের উটের দুধ ও মূত্র উভয়ই পান করানো হয়েছিল। ফলে বর্ণনায় উল্লিখিত সুস্থতার জন্য মূত্রের নিজস্ব কার্যকারিতা আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠার কোনো উপায়ও সেখানে নেই। রোগীর পরিবেশ পরিবর্তন, বিশ্রাম, খাদ্যগ্রহণ, অসুস্থতার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি কিংবা অন্য কোনো কারণের প্রভাব বাদ দেওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায় না। একটি ধর্মীয় বর্ণনায় সুস্থতার ফল উল্লেখ করা আর পরীক্ষামূলক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। প্রথমটি একটি ঐতিহাসিক দাবির উপস্থিতি দেখায়; দ্বিতীয়টির জন্য পর্যবেক্ষণযোগ্য, পুনরাবৃত্তিযোগ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
এই পার্থক্যটি মুছে দেওয়ার ফলেই একটি প্রাচীন চিকিৎসা-অনুশীলন পরবর্তী যুগে ধর্মীয় কর্তৃত্ব লাভ করেছে। মুহাম্মদ অসুস্থ ব্যক্তিদের উটের মূত্র পান করতে বলেছিলেন—এটি হাদিসের বক্তব্য। বুখারি সেই বক্তব্যকে উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসার পরিচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত করেছেন—এটি সংকলকের শ্রেণিবিন্যাস। ইবনে হাজারসহ পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা সেই চিকিৎসাগত ধারণাকে তাঁদের আলোচনায় সংরক্ষণ করেছেন—এটি হাদিসব্যাখ্যার ইতিহাস। কিন্তু এই তিনটি স্তরের কোনোটিই উটের মূত্রের চিকিৎসাগত কার্যকারিতার স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়। একটি নির্দেশের উৎস মুহাম্মদ হওয়া, সেটির সহিহ হাদিসে স্থান পাওয়া এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মীয় চিকিৎসার অংশ হিসেবে প্রচারিত হওয়া—এসব দিয়ে কোনো প্রাণিজ বর্জ্যের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং উটের মূত্রপানের ঘটনাটি দেখায়, কীভাবে একটি প্রাচীন চিকিৎসা-বিশ্বাস নবীর কর্তৃত্ব, হাদিস সংকলন এবং ধ্রুপদি ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় মর্যাদা অর্জন করেছে।
যাদুল মা’আদ: যে পশুর গোশত হালাল সে পশুর পেশাব পবিত্র
এবারে আসুন আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রচিত মুখতাসার যাদুল মা’আদ গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ক ইসলামিক বিধানটি জেনে নেয়া যাক [6] –
উরায়নার ঘটনা
আনাস বিন মালিক বলেন- একদা উরায়না কিংবা উল গোত্রের কিছু লোক নাবী এর কাছে আগমণ করল। মদীনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থের অনুকুল না হওয়ার কারণে তারা অসুস্থ হয়ে গেল। নাবী তাদেরকে দুগ্ধবতী উটের কাছে যেতে আদেশ করলেন এবং বললেন- তোমরা উটের দুধ এবং পেশাব পান কর। তারা তথায় চলে গেল। কিছু দিন পর সুস্থ হয়ে তারা নাবী এর রাখালকে হত্যা করল এবং পশুগুলো নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। দিবসের প্রথম ভাগে যখন নাবী এর নিকট এ সংবাদ আসল, তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার জন্য একদল সাহাবীকে প্রেরণ করলেন। দ্বিপ্রহরের সময় তাদেরকে পাকড়াও করে রসূল এর দরবারে নিয়ে আসা হল। নাবী এর আদেশে তাদের হাত-পা কেটে দেয়া হল এবং লোহার কাঠি গরম করে তাদের চক্ষুগুলো ছুঁড়ে দেয়া হল । তারপর তাদেরকে উত্তপ্ত বালুর উপর ফেলে রাখা হল। তারা পানির পিপাসায় কাতর হয়ে পানি চাইলেও তাদেরকে পানি দেয়া হল না।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- এই ঘটনা থেকে জানা গেল, (১) উটের পেশাব পান করা জায়েয।
(২) যে সমস্ত পশুর গোশত খাওয়া হালাল সে সমস্ত পশুর পেশাব পবিত্র।
(৩) আরও জানা গেল, যারা সন্ত্রাসী তাদেরকে হাত-পা কর্তন করসূহ হত্যা করা জায়েয।
(৪) সন্ত্রাসী কোন মানুষকে যেভাবে হত্যা করবে, তাকে সেভাবেই হত্যা করতে হবে। তারা নাবী এর রাখালের চোখে গরম কাঠি ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তাই কিসাস স্বরূপ তাদেরকে সেভাবেই শাস্তি দেয়া হয়েছে। এই ঘটনা থেকে একটি স্বতন্ত্র বিধান সাব্যস্ত হয়েছে। আর এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হুদুদ তথা দন্ডবিধির হুকুম-আহকাম নাযিল হওয়ার পূর্বে। তবে হুদুদের আহকাম নাযিল হওয়ার পর এই বিধান রহিত হয়ে যায়নি; বরং তাকে বহাল রেখেছে।

উটের মূত্র থেকে পশুর গোবর: ইসলামি ফিকহে মলমূত্রের পবিত্রতা
উটের মূত্রপানের হাদিস থেকে ইসলামি ফিকহে যে সিদ্ধান্তগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার পরিসর কেবল উটের মূত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মুহাম্মদের একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা-নির্দেশকে ভিত্তি করে একাধিক ফকিহ এমন একটি সাধারণ বিধান তৈরি করেছেন, যার অনুসারে যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া হালাল, সেসব প্রাণীর মূত্র ও মল উভয়ই শরিয়তের দৃষ্টিতে পবিত্র। এই বিধানের আওতায় উটের পাশাপাশি গরু, ছাগল, ভেড়া এবং অন্যান্য ভক্ষণযোগ্য প্রাণীও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এমনকি এই পবিত্রতার ধারণা কেবল কোনো পদার্থ পান করার অনুমতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নামাজের পোশাক, শরীর, ঘরের মেঝে এবং প্রার্থনার স্থানের পবিত্রতা নির্ধারণেও প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ, উটের মূত্রপানসংক্রান্ত একটি হাদিস থেকে মানুষের দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য একটি বিস্তৃত আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এই কাঠামোয় কোনো প্রাণীর মলমূত্র পবিত্র না অপবিত্র, তার প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রাণীটির মাংস খাওয়ার ধর্মীয় অনুমতি।
এই বিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুপদি উৎস হলো হাম্বলি ফকিহ ইবনে কুদামার ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থ। গ্রন্থটির নামাজসংক্রান্ত আলোচনায় তিনি ‘যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া যায়, তাদের মূত্র ও মল পবিত্র’ শিরোনামে পৃথক পরিচ্ছেদ রেখেছেন। সেখানে তিনি আতাসহ একাধিক প্রাচীন ফকিহের মত উল্লেখ করেছেন এবং মালিকের বক্তব্যও উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে কুদামা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে উরায়না গোত্রের লোকদের উটের মূত্রপানের হাদিস ব্যবহার করেছেন। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, উটের মূত্র অপবিত্র হলে মুহাম্মদ তা পান করতে নির্দেশ দিতেন না। একই সঙ্গে তিনি ভেড়ার থাকার স্থানে নামাজ পড়ার অনুমতিকেও পশুর মলমূত্রের পবিত্রতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এভাবে একটি চিকিৎসাবিষয়ক ঘটনা এবং একটি নামাজসংক্রান্ত বিধানকে একত্র করে ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মলমূত্রের সাধারণ পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। [7]
المغني لابن قدامة — كتاب الصلاة
فصل: بول ما يؤكل لحمه وروثه طاهر
وَبَوْلُ مَا يُؤْكَلُ لَحْمُهُ وَرَوْثُهُ طَاهِرٌ . وَهَذَا مَفْهُومُ كَلَامِ الْخِرَقِيِّ . وَهُوَ قَوْلُ عَطَاءٍ وَالنَّخَعِيِّ وَالثَّوْرِيِّ وَمَالِكٍ .
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, নামাজ অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া যায়, তাদের মূত্র ও মল পবিত্র
যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া বৈধ, তাদের মূত্র ও মল পবিত্র। খিরাকির বক্তব্য থেকেও এই অর্থ বোঝা যায়। এটি আতা, নাখায়ি, সাওরি এবং মালিকের মত।
ইবনে কুদামার এই সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগত সম্প্রসারণ রয়েছে। মুহাম্মদের হাদিসে নির্দিষ্ট কয়েকজন অসুস্থ ব্যক্তিকে উটের দুধ ও মূত্র পান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে গরু, ছাগল, ভেড়া বা মুরগির মলমূত্রের পবিত্রতা সম্পর্কে কোনো সাধারণ ঘোষণা নেই। এমনকি উটের গোবর সম্পর্কেও ওই চিকিৎসা-নির্দেশে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু পরবর্তী ফকিহরা সেই নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে এমন একটি সর্বজনীন বিধান প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার আওতায় অসংখ্য প্রাণীর মূত্রের পাশাপাশি তাদের মলও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই সম্প্রসারণের ভিত্তি হলো ফিকহি অনুমান ও তুলনামূলক বিচার; মূল হাদিসে প্রত্যেক প্রাণীর মলমূত্র সম্পর্কে পৃথক নির্দেশ নয়। উটের মূত্র পান করতে বলা হয়েছিল—এই ঘটনার সঙ্গে গরুর মূত্র, ছাগলের মূত্র এবং ভেড়ার গোবরের পবিত্রতা সরাসরি এক কথা নয়। প্রথমটি একটি নির্দিষ্ট বর্ণনার বিষয়বস্তু; দ্বিতীয়টি সেই বর্ণনা এবং অন্যান্য ধর্মীয় বিধান থেকে ফকিহদের তৈরি সাধারণ আইন।
এই আইনগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ধ্রুপদি ইসলামি ফকিহদের মধ্যেই মতভেদ রয়েছে। ইবনে আবদুল বার তাঁর ‘আত-তামহিদ’ গ্রন্থে আবু হানিফা ও আবু ইউসুফের মত উল্লেখ করেছেন, যেখানে ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মূত্রকে নামাজের ক্ষেত্রে অপবিত্রতার আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং অধিক পরিমাণে উপস্থিত থাকলে নামাজের বৈধতা নিয়ে বিধান দেওয়া হয়েছে। একই গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে হাসান আশ-শায়বানির মত হিসেবে ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মূত্র পবিত্র হওয়ার বক্তব্য এবং শাফেয়ির মত হিসেবে তা অপবিত্র হওয়ার সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। অর্থাৎ, একটি প্রাণীর একই মূত্রকে একদল ফকিহ পবিত্র এবং অন্যদল অপবিত্র ঘোষণা করেছেন। এই মতভেদ শুধু পরিভাষার নয়; এর ভিত্তিতে নামাজের পোশাক পরিষ্কার করতে হবে কি না, মূত্র লাগা অবস্থায় নামাজ আদায় হবে কি না এবং সংশ্লিষ্ট পদার্থের ধর্মীয় অবস্থান কী হবে—এসব বাস্তব আইনগত প্রশ্নের উত্তর পরিবর্তিত হয়। [8]
التمهيد لما في الموطأ من المعاني والأسانيد — ابن عبد البر
الجزء الثاني والعشرون، صفحة 240
وذهب محمد بن الحسن إلى أن بول كل ما يؤكل لحمه طاهر كقول مالك ، وقال الشافعي : بول ما يؤكل لحمه نجس .
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে আবদুল বার, আত-তামহিদ, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২৪০
মুহাম্মদ ইবনে হাসান এই মত গ্রহণ করেছেন যে, যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া যায়, তাদের প্রত্যেকটির মূত্র পবিত্র; মালিকের মতও তাই। অন্যদিকে শাফেয়ি বলেছেন, যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া যায়, তাদের মূত্র অপবিত্র।
এই মতভেদ একটি মৌলিক সমস্যাকে প্রকাশ করে। মূত্রের রাসায়নিক গঠন কিংবা তাতে জীবাণুর উপস্থিতি কোনো ফকিহের সিদ্ধান্ত অনুসারে বদলে যায় না। একই উটের মূত্র একজন মালিকি ফকিহের বিধানে পবিত্র এবং একজন শাফেয়ি ফকিহের বিধানে অপবিত্র গণ্য হতে পারে; কিন্তু পদার্থটির জৈবিক বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থাকে। ফলে এখানে ‘পবিত্রতা’ বলতে বস্তুটির পরীক্ষাগারে যাচাইযোগ্য কোনো গুণ বোঝানো হচ্ছে না। এটি একটি ধর্মীয় আইনগত শ্রেণিবিন্যাস, যার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে হাদিসের ব্যাখ্যা এবং ফিকহি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। এই শ্রেণিবিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসাগত নিরাপত্তা দাবি করা হলে একটি আইনগত সংজ্ঞাকে ভুলভাবে বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত করা হয়। ধর্মীয় বিচারে কোনো পদার্থ পবিত্র হওয়া এবং সেটি জীবাণুমুক্ত, পানযোগ্য বা রোগ নিরাময়ে কার্যকর হওয়া সম্পূর্ণ পৃথক দাবি। প্রথমটির পক্ষে ফিকহি উদ্ধৃতি হাজির করা যায়; দ্বিতীয়টির জন্য পরীক্ষাগারের ফলাফল ও চিকিৎসাগত প্রমাণ প্রয়োজন।
আধুনিক যুগের ফতোয়া: ইসলামওয়েব
উটের মূত্রপানের বিষয়টি শুধু প্রাচীন হাদিসগ্রন্থ বা মধ্যযুগীয় ফিকহে সীমাবদ্ধ নেই; আধুনিক যুগের বিখ্যাত ইসলামি ফতোয়া-সাইটগুলোও এই ধারণাকে বৈধতা দিয়ে চলেছে। IslamWeb-এর Fatwa No. 93051, “The urine of camels as medicine” শিরোনামের ফতোয়াটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে প্রশ্নকারী নিজেই এক ধরনের অস্বস্তি প্রকাশ করে জানতে চেয়েছিল—উটের মূত্র চিকিৎসা হিসেবে পান করা মুসলমানদের জন্য বৈধ কি না; এমনকি সে তুলনা টেনেছিল হিন্দুদের গরুর মূত্রপানের সঙ্গে। অর্থাৎ প্রশ্নকারীর দৃষ্টিতেও প্রাণীর মূত্রপান একটি অস্বস্তিকর ও অপমানজনক তুলনা ছিল।
কিন্তু IslamWeb-এর উত্তরটি এই অস্বস্তিকে দূর করেনি; বরং ধর্মতাত্ত্বিকভাবে সেটিকে বৈধতা দিয়েছে। ফতোয়াটিতে বলা হয়, প্রশ্নে উল্লিখিত নবী-সংক্রান্ত বর্ণনাটি সহিহ; এটি বুখারি, মুসলিম এবং অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে এসেছে। এরপর ফতোয়াটি সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয় যে, এই বর্ণনা থেকে উটের মূত্র পান করার বৈধতা প্রমাণিত হয় এবং এটি চিকিৎসাগতভাবে উপকারী বলে গণ্য করা যায়। আরও বলা হয়, ইবনু সিনার আল-কানুন গ্রন্থেও এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ এখানে একটি সপ্তম শতকের হাদিস-বর্ণনাকে আধুনিক চিকিৎসা-দাবির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। [9] –
The urine of camels as medicine
Fatwa No: 93051
The Prophetic narration which you mentioned in the question is authentic and is reported by Al-Bukhari, Muslim and others may Allaah have mercy upon them.
The narration is proves the permissibility of drinking the urine of camels and that it is a beneficial medicine. Moreover, some doctors stated this fact as well, like Ibn Seenaa may Allaah have mercy upon him in his book entitled ”Al-Qaanoon (The Law (of medicine))”.
The urine of camels and that of cows is pure; and this is the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them.
Similarly, the urine and dung of animals which we are allowed to eat their meat, is pure as stated by the scholars may Allaah have mercy upon them.
আসুন ফতোয়াটির বাংলা অনুবাদ পড়ি,
উটের প্রস্রাব চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে ফতোয়া
ফতোয়া নং: ৯৩০৫১
প্রশ্নে উল্লিখিত নবীজির হাদীসটি সহীহ (বিশুদ্ধ), এবং এটি ইমাম আল-বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য বিশিষ্ট মুহাদ্দিসগণ (আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন) বর্ণনা করেছেন।
এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে উটের প্রস্রাব পান করা বৈধ, এবং এটি চিকিৎসার জন্য একটি উপকারী ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আরও বলা হয়েছে, কিছু প্রখ্যাত চিকিৎসকও এই বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করেছেন; যেমন—ইবনু সিনা (আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-কানুন ফিৎ তিব্ব (চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিধান)-এ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে উট ও গরুর প্রস্রাব পবিত্র (তাহির), এবং এ বিষয়ে অধিকাংশ আলেমের (আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন) মত একমত।
এছাড়াও, যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া হালাল, সেসব প্রাণীর মল-মূত্রও পবিত্র—এমনই অভিমত দিয়েছেন বহু ইসলামি আলেম (আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন)।
এই ফতোয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো পবিত্রতার ঘোষণা। IslamWeb শুধু উটের মূত্রপানকে চিকিৎসা হিসেবে বৈধ বলেনি; তারা আরও বলেছে, উট ও গরুর মূত্র পবিত্র, এবং অধিকাংশ আলেমের মতও তাই। একই যুক্তিতে, যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া জায়েজ, সেসব প্রাণীর মূত্র ও গোবরও পবিত্র। ফলে প্রশ্নকারী যে “আমরা তো হিন্দুদের মতো গরুর মূত্রপান করি না” ধরনের পার্থক্য টানতে চেয়েছিল, IslamWeb-এর ফতোয়া কার্যত সেই পার্থক্যটিকেই ভেঙে দেয়। কারণ ফতোয়ার যুক্তি অনুযায়ী, গরুর মূত্রও পবিত্র—যেহেতু গরু হালাল প্রাণী।
এখানেই বিষয়টির যৌক্তিক অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামি বক্তারা প্রায়ই অন্য ধর্মের প্রাণী-মূত্রপান বা অনুরূপ লোকাচারকে কুসংস্কার হিসেবে উপস্থাপন করেন; কিন্তু সহিহ হাদিস ও ফিকহের প্রশ্ন এলেই একই ধরনের বর্জ্য-পদার্থকে “পবিত্র”, “জায়েজ” এবং “চিকিৎসা” হিসেবে ঘোষণা করেন। অর্থাৎ বিচারবুদ্ধির মানদণ্ড বদলে যায় বিশ্বাসের পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে যা কুসংস্কার, নিজের ধর্মের ক্ষেত্রে তা হয়ে যায় সুন্নাহ-চিকিৎসা।
এই ফতোয়া দেখায়, সমস্যাটি কোনো বিচ্ছিন্ন লোকাচার নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত একটি ধারণা। যখন একটি বিখ্যাত ফতোয়া সাইট উটের মূত্রকে “beneficial medicine” এবং উট-গরুর মূত্রকে “pure” বলে ঘোষণা করে, তখন সাধারণ অনুসারীদের কাছে এটি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকে না; বরং ধর্মীয় কর্তৃত্ব দ্বারা বৈধতাপ্রাপ্ত চিকিৎসা-দাবিতে পরিণত হয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় জনস্বাস্থ্যঝুঁকি, রোগীর চিকিৎসা বিলম্ব, ভণ্ড-চিকিৎসার বাজার এবং বর্জ্য পদার্থের ধর্মীয় পবিত্রকরণ।
| IslamWeb ফতোয়ার দাবি | এর অর্থ |
|---|---|
| হাদিসটি সহিহ; বুখারি-মুসলিমে বর্ণিত | বিষয়টি ইসলামি উৎসের প্রান্তিক বা দুর্বল বর্ণনা নয় |
| উটের মূত্র পান করা বৈধ | প্রাণীর মূত্রপানকে শরিয়াহভিত্তিক অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে |
| উটের মূত্র উপকারী চিকিৎসা | চিকিৎসা-দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু clinical evidence দেওয়া হচ্ছে না |
| উট ও গরুর মূত্র পবিত্র | প্রশ্নকারীর “গরুর মূত্র” নিয়ে অস্বস্তিকর তুলনা উল্টো ভেঙে যাচ্ছে |
| হালাল প্রাণীর মূত্র ও গোবর পবিত্র | বিষয়টি শুধু উট নয়; বড় একটি ফিকহি নীতিতে পরিণত হচ্ছে |
আধুনিক যুগের আরও ফতোয়া: IslamQA
এই ধ্রুপদি বিধানের আধুনিক প্রয়োগ পাওয়া যায় ইসলামকিউএ-এর ১১১৭৮৬ নম্বর ফতোয়ায়। সেখানে একজন প্রশ্নকারী জানান, তাঁর মায়ের পোষা পাখিগুলো ঘরের বিভিন্ন স্থানে, কার্পেটে এবং পোশাকে মলত্যাগ করে। তিনি বিষয়টিকে নোংরা ও অপবিত্র মনে করেন এবং এর ধর্মীয় বিধান জানতে চান। উত্তরে ইসলামকিউএ জানায়, পাখিগুলো যদি মাংস খাওয়া বৈধ এমন প্রজাতির হয়, যেমন চড়ুই, মুরগি কিংবা হাঁস, তাহলে তাদের মল পবিত্র। একই বিধান ভেড়া, গরু, ঘোড়াসহ অন্যান্য ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে জানানো হয়। ফতোয়াটিতে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সরাসরি উটের মূত্রপানের হাদিস এবং ভেড়ার থাকার স্থানে নামাজ পড়ার অনুমতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, প্রশ্নকারীর কাপড়, শরীর কিংবা কার্পেটে ওই পাখির মল লাগলে শরিয়তের বিচারে তা ধুয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক নয় এবং সেই পোশাকে নামাজও আদায় করা যায় বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। [10]
بول وروث الحيوان الذي يؤكل لحمه طاهر
ضمن أهم الإجابات في
19/ذو الحجة/1428 الموافق 29/ديسمبر/2007
174,436
السؤال 111786
والدتي لديها طيور، وهذه الطيور تتبرز في كل مكان، على السجاد والملابس، أنا أجد هذا الأمر مقرفاً للغاية وأعتبره من النجاسة . أرجو أن تخبرني بالحكم في هذه الحالة
الجواب
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
أولاً : إذا كانت هذه الطيور مما يجوز أكل لحمها شرعاً ، كالعصافير والدجاج والبط …. إلخ فروثها طاهر ، وهكذا الحكم في كل حيوان يؤكل لحمه ، كالغنم والبقر والخيول …… إلخ .
وقد دل على طهارة بول وروث كل حيوان يؤكل لحمه أدلة كثيرة ، منها :
1- أن الأصل في الأشياء أنها طهارة ، ولم يأت دليل شرعي صحيح يدل على نجاسة هذه الأشياء .
2- أنه قد ثبت في الصحيحين أن النبي صلى الله عليه وسلم أمر جماعة قدموا إلى المدينة ومرضوا أن يشربوا من أبوال الإبل وألبانها ، ولو كانت أبوال الإبل نجسة لما أمرهم بشربها ، لأنه لا يجوز التداوي بشيء محرم .
3- أنه قد ثبت في صحيح مسلم أن النبي صلى الله عليه وسلم سئل عن الصلاة في مرابض الغنم ، فقال : (صلوا فيها ، فإنها بركة) ، ولم يأمر من يصلي فيها باجتناب بولها وروثها ، مع أن الغالب أنه سيصيبه شيء من ذلك .
وهناك أدلة أخرى كثيرة ، أطال البحث فيها شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله ، فانظرها في “مجموع الفتاوى” (21/542 – 586) .
وقال ابن قدامة رحمه الله في المغني (2/492) :
“وبول ما يؤكل لحمه وروثه طاهر … قال مالك : لا يرى أهل العلم أبوال ما أكل لحمه وشرب لبنه نجساً …. وقال ابن المنذر : أجمع كل من نحفظ عنه من أهل العلم على إباحة الصلاة في مرابض الغنم ، إلا الشافعي فإنه اشترط أن تكون سليمة من أبعارها وأبوالها” انتهى باختصار .
وجاء في “فتاوى اللجنة الدائمة” (6/414) :
“بول ما يؤكل لحمه طاهر ، فإذا استعمل في البدن لحاجة فلا حرج من الصلاة به” انتهى .
أما إذا كانت هذه الطيور مما لا يؤكل لحمه ، كذوات المخالب من الطيور ، كالصقر ، فإن روثها نجس ، بلا خلاف بين العلماء . انظر “المغني” (2/490) .
ثانياً :
إذا ثبت طهارة روث الطيور التي يؤكل لحمها ، فإنه لا يجب غسلها إذا أصابت الثوب أو البدن أو السجاد ، ولا حرج من الصلاة بهذا الثوب أو على تلك السجادة .
وينبغي نصح الوالدة أن تجعل لهذه الطيور مكاناً خاصاً بها حتى لا تؤذي أهل البيت ، لأن هذا الروث حتى وإن كان طاهراً ، فإنه مما يستقذره الناس .
والله أعلم
المصدر: الإسلام سؤال وجواب
বাংলা অনুবাদ:
যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া হালাল, তাদের মূত্র ও মল পবিত্র
তারিখ: ১৯ জিলহজ ১৪২৮ হিজরি, মোতাবেক ২৯ ডিসেম্বর ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ
প্রশ্ন নম্বর: ১১১৭৮৬
আমার মায়ের কিছু পোষা পাখি রয়েছে। এই পাখিগুলো ঘরের সর্বত্র মলত্যাগ করে—কার্পেটের ওপর, কাপড়চোপড়ে এবং অন্যান্য স্থানে। আমার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত ঘৃণ্য মনে হয় এবং আমি এগুলোকে অপবিত্র মনে করি। অনুগ্রহ করে এই পরিস্থিতিতে শরিয়তের বিধান কী, তা আমাকে জানাবেন।
উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর রাসুলের ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক। অতঃপর:
প্রথমত: যদি এসব পাখি এমন প্রজাতির হয়, যাদের মাংস শরিয়ত অনুযায়ী খাওয়া বৈধ, যেমন চড়ুই, মুরগি, হাঁস ইত্যাদি, তাহলে তাদের মল পবিত্র। একই বিধান প্রযোজ্য এমন প্রত্যেক প্রাণীর ক্ষেত্রে, যার মাংস খাওয়া বৈধ; যেমন ভেড়া, গরু, ঘোড়া ইত্যাদি।
যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া হালাল, তাদের মূত্র ও মল পবিত্র হওয়ার পক্ষে অনেক দলিল রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো:
১. শরিয়তের মূলনীতি হলো, সব বস্তু মূলত পবিত্র। এসব বস্তুকে অপবিত্র প্রমাণ করে এমন কোনো বিশুদ্ধ শরিয়তসম্মত দলিল পাওয়া যায়নি।
২. সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম—উভয় গ্রন্থেই প্রমাণিত হয়েছে যে, মদিনায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়া একদল লোককে নবী উটের মূত্র ও দুধ পান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদি উটের মূত্র অপবিত্র হতো, তাহলে তিনি তাদের তা পান করার নির্দেশ দিতেন না। কারণ হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা করা বৈধ নয়।
৩. সহিহ মুসলিমে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবীকে ভেড়ার থাকার স্থানে নামাজ আদায় করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “সেখানে নামাজ আদায় করো, কারণ তাতে বরকত রয়েছে।” অথচ তিনি সেখানে নামাজ আদায়কারীদের ভেড়ার মূত্র ও মল থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেননি, যদিও সাধারণত সেখানে নামাজ আদায় করলে এসব মলমূত্রের কিছু অংশ শরীরে বা কাপড়ে লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ বিষয়ে আরও অনেক দলিল রয়েছে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন) সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর “মাজমুউল ফাতাওয়া” গ্রন্থের ২১তম খণ্ডের ৫৪২ থেকে ৫৮৬ পৃষ্ঠা দেখুন।
ইবনে কুদামা (আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন) তাঁর “আল-মুগনি” গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ৪৯২ পৃষ্ঠায় বলেছেন:
“যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া বৈধ, তাদের মূত্র ও মল পবিত্র। … ইমাম মালিক বলেছেন, আলেমগণ যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া যায় এবং দুধ পান করা যায়, সেসব প্রাণীর মূত্রকে অপবিত্র মনে করেন না। … ইবনে মুনযির বলেছেন, আমাদের জানা সকল আলেম ভেড়ার থাকার স্থানে নামাজ আদায় করার বৈধতার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। কেবল ইমাম শাফেয়ি ব্যতিক্রম; তিনি শর্ত দিয়েছেন যে, সেই স্থান ভেড়ার মল ও মূত্র থেকে মুক্ত হতে হবে।”
সংক্ষেপিত উদ্ধৃতি সমাপ্ত।
“ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ” বা স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতোয়াসংকলনের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৪১৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে:
“যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া বৈধ, তাদের মূত্র পবিত্র। অতএব, প্রয়োজনের কারণে সেই মূত্র শরীরে ব্যবহার করা হলে তা শরীরে থাকা অবস্থায় নামাজ আদায় করতে কোনো অসুবিধা নেই।”
উদ্ধৃতি সমাপ্ত।
অন্যদিকে, এসব পাখি যদি এমন প্রজাতির হয়, যাদের মাংস খাওয়া বৈধ নয়, যেমন নখরবিশিষ্ট শিকারি পাখি—উদাহরণস্বরূপ বাজপাখি—তাহলে তাদের মল অপবিত্র। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। দেখুন, “আল-মুগনি”, ২য় খণ্ড, ৪৯০ পৃষ্ঠা।
দ্বিতীয়ত:
যদি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, যেসব পাখির মাংস খাওয়া বৈধ, তাদের মল পবিত্র, তাহলে সেই মল কাপড়ে, শরীরে বা কার্পেটে লাগলে তা ধুয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক নয়। সেই মল লাগা কাপড় পরে কিংবা সেই কার্পেটের ওপর নামাজ আদায় করতেও কোনো অসুবিধা নেই।
তবে আপনার মাকে পরামর্শ দেওয়া উচিত, তিনি যেন পাখিগুলোর জন্য আলাদা একটি নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করেন, যাতে সেগুলো পরিবারের সদস্যদের অসুবিধার কারণ না হয়। কারণ এসব মল শরিয়তের দৃষ্টিতে পবিত্র হলেও মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এগুলোকে ঘৃণ্য ও নোংরা মনে করে।
আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
উৎস: ইসলামকিউএ (الإسلام سؤال وجواب)
এই ফতোয়ার বাস্তব তাৎপর্য অত্যন্ত স্পষ্ট। কোনো ব্যক্তির পোশাকে মুরগির বিষ্ঠা লেগেছে, ঘরের কার্পেটে হাঁস মলত্যাগ করেছে কিংবা শরীরে কোনো ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মল লেগেছে—এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধান অনুযায়ী নামাজের জন্য মল পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক নয়। এখানে মলমূত্রের উপস্থিতি অস্বীকার করা হচ্ছে না; বরং উপস্থিত মলমূত্রকেই ধর্মীয়ভাবে পবিত্র ঘোষণা করা হচ্ছে। ফতোয়াটিতে সাধারণ পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনে এসব বর্জ্য অপসারণের পরামর্শও রয়েছে, কিন্তু সেই পরামর্শ ধর্মীয় অপবিত্রতার বিধান থেকে পৃথক। অর্থাৎ একটি পদার্থ মানুষের কাছে দুর্গন্ধযুক্ত ও ঘৃণ্য হলেও সেটিকে শরিয়তের বিচারে পবিত্র গণ্য করা সম্ভব। এই পবিত্রতার বিধান কোনো জীবাণুপরীক্ষার ফল নয়; এর ভিত্তি প্রাণীর মাংস খাওয়ার অনুমতি এবং সেই অনুমতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ফিকহি সিদ্ধান্ত।
এই ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে আধুনিক সংক্রমণবিজ্ঞানের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) জানায়, মুরগি ও হাঁসের মতো গৃহপালিত পাখি সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন দেখালেও সালমোনেলাসহ রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু বহন করতে পারে। এসব পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে পরিবেশ ও বিভিন্ন বস্তু দূষিত হতে পারে। CDC পাখির বিষ্ঠা পরিষ্কারের সময় দস্তানা পরা, খালি হাতে বিষ্ঠা না ধরা, পাখি ও তাদের পরিবেশের সংস্পর্শের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং পাখির থাকার স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ ফিকহে যে মুরগি বা হাঁসের মলকে পবিত্র গণ্য করা হচ্ছে, সেই একই মল আধুনিক জনস্বাস্থ্যের বিচারে সংক্রমণের উৎস হতে পারে। এ জন্য ধর্মীয় পবিত্রতার ঘোষণা দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। [11]
এখানে ইসলামি ফিকহের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিটিও গুরুত্বপূর্ণ। উটের মূত্রপানের হাদিসকে ভিত্তি করে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর মূত্রের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এরপর সেই ঘটনার সঙ্গে অন্যান্য ধর্মীয় বিধান মিলিয়ে ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মূত্রের সাধারণ পবিত্রতা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে মূত্রের সঙ্গে মলও একই পবিত্রতার বিধানের আওতায় এসেছে। আবার সেই সাধারণ বিধান প্রয়োগ করে মুরগি, হাঁস, গরু ও ছাগলের মলমূত্র লাগা পোশাকে নামাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিটি পর্যায়ে সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু মূল উরায়না-হাদিসের নির্দিষ্ট ঘটনার চেয়ে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে বর্তমান ফতোয়াগুলো শুধু একটি প্রাচীন ঘটনার বিবরণ সংরক্ষণ করছে না; সেই ঘটনাকে একটি বিস্তৃত ধর্মীয় আইনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, ফকিহদের পারস্পরিক মতভেদ প্রমাণ করে যে, এসব সম্প্রসারিত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত কিংবা একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ছিল না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, কোনো প্রাণীর মাংস মানুষের জন্য ধর্মীয়ভাবে হালাল হওয়ার সঙ্গে সেই প্রাণীর মূত্র বা মলের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার সম্পর্ক কী? গরুর মাংস খাওয়া বৈধ বলে গরুর মূত্র জীবাণুমুক্ত হয়ে যায় না। ছাগলের মাংস খাওয়া বৈধ বলে ছাগলের গোবরের সংক্রমণঝুঁকি বিলুপ্ত হয় না। মুরগির মাংস খাওয়া বৈধ বলে মুরগির বিষ্ঠায় সালমোনেলা থাকার সম্ভাবনাও দূর হয় না। কোনো প্রাণীর মাংস রান্না করে খাওয়ার নিরাপত্তা এবং সেই প্রাণীর অপরিশোধিত বর্জ্যের সংস্পর্শে আসার নিরাপত্তা একই বিষয় নয়। একটি ক্ষেত্রে খাদ্যের উপযোগিতা ও যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ বিবেচ্য; অন্য ক্ষেত্রে বর্জ্যের জীবাণু, সংক্রমণের পথ এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচ্য। মাংস খাওয়ার ধর্মীয় অনুমতি থেকে মলমূত্রের চিকিৎসাগত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা তাই একটি ভিত্তিহীন সিদ্ধান্ত।
উটের মূত্রপানের হাদিস থেকে তৈরি এই ফিকহি কাঠামো ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। ফকিহরা একটি পদার্থের পবিত্রতা নির্ধারণ করেছেন কোরআন, হাদিস, তুলনামূলক বিচার এবং পূর্ববর্তী আলেমদের সিদ্ধান্ত অনুসারে। কিন্তু সেই পদ্ধতি কোনো পদার্থের জীবাণুগত নিরাপত্তা কিংবা রোগ নিরাময়ের কার্যকারিতা নির্ধারণ করতে পারে না। ইবনে কুদামার পবিত্রতার বিধান, ইবনে আবদুল বারের সংরক্ষিত মতভেদ এবং ইসলামকিউএ-এর আধুনিক ফতোয়া একত্রে দেখায়, প্রাণীর মলমূত্রের ধর্মীয় মর্যাদা নির্ধারণে মানুষের ব্যাখ্যা ও ফিকহি কর্তৃত্বই কার্যকর হয়েছে। একটি বর্জ্য পদার্থের ওপর ‘পবিত্র’ শব্দটি আরোপ করলে তার রাসায়নিক গঠন, রোগজীবাণু কিংবা সংক্রমণের ক্ষমতা পরিবর্তিত হয় না। ধর্মীয় অনুমোদনকে চিকিৎসাগত নিরাপত্তার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যেই এই পবিত্রকরণের সবচেয়ে বিপজ্জনক যৌক্তিক ত্রুটি নিহিত।
আলেমদের বক্তব্য: উটের প্রস্রাব হালাল ও পবিত্র
এবারে আসুন উটের মূত্রপান সম্পর্কে ড আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার দুইটি বক্তব্য শুনে নিই,
এবারে আসুন জাকির নায়েকের মুখ থেকে শুনি,
উটের মূত্রের ‘পবিত্রকরণ’ – একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ইসলামি শরিয়াহর বিধানে উটের মূত্র পানের বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সরাসরি নবী মুহাম্মদের নির্দেশিত একটি ‘চিকিৎসা’ হিসেবে স্বীকৃত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একাধিক বর্ণনা অনুসারে, ‘উকল’ ও ‘উরায়না’ গোত্রের একদল লোক মদিনায় আসার পর সেখানকার আবহাওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী তাদের সদকার উটের পালের কাছে গিয়ে উটের দুধ ও মূত্র পান করার নির্দেশ দেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই পানীয় সেবনের ফলে তারা সুস্থ হয়ে উঠেছিল। এই একটি ঐতিহাসিক বর্ণনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে ইসলামি ফকিহ ও আলেমগণ এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর ‘জাদুল মাআদ’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনা থেকে উটের পেশাব পান করা জায়েজ এবং যেসব পশুর গোশত খাওয়া হালাল, তাদের পেশাব পবিত্র হওয়ার বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়। ইবনে কুদামাসহ অন্যান্য ফকিহ এই পবিত্রতার বিধানকে ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মল পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেছেন। কিন্তু ধর্মীয়ভাবে কোনো পদার্থকে পবিত্র ঘোষণা করা এবং সেই পদার্থকে স্বাস্থ্যসম্মত বা উপকারী ওষুধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। মূত্রে দেহের বিপাকীয় বর্জ্য ও বিভিন্ন দ্রবীভূত পদার্থ থাকে; অপরিশোধিত প্রাণিজ মূত্রে রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুও থাকতে পারে। অথচ ইসলামি ফতোয়া ওয়েবসাইট ‘IslamWeb’ আজও প্রচার করে যে, উট বা গরুর প্রস্রাব পবিত্র এবং উটের মূত্র একটি উপকারী ওষুধ। এই চিকিৎসাগত দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য মানব-চিকিৎসা পরীক্ষার প্রমাণ হাজির করা হয়নি।
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ইসলামি প্রচারক ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া বা জাকির নায়েকের মতো ব্যক্তিরাও এই প্রাচীন ও অবৈজ্ঞানিক প্রথাকে আধুনিক যুগে সমর্থন করেন। তাঁরা হাদিসের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে উটের মূত্রের চিকিৎসাগত উপকারিতার ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু যে প্রাণিজ বর্জ্যের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত নয় এবং যার অপরিশোধিত অবস্থায় সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে, সেটিকে ‘পবিত্র’ বা ‘শিফা’ ঘোষণা করলেই তা মানুষের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধে পরিণত হয় না। ধর্মীয় বিশ্বাসকে চিকিৎসাগত প্রমাণের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যেই এই অবস্থানের মৌলিক যৌক্তিক ত্রুটি নিহিত। কোনো চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা নির্ধারণের মানদণ্ড নবীর মর্যাদা কিংবা হাদিসের ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ নয়; বরং পরীক্ষাযোগ্য ফলাফল, নিরাপত্তা এবং স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
উটের মূত্র: স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বর্জ্য পদার্থ সেবনের ভয়াবহতা
মূত্র হলো কিডনির মাধ্যমে তৈরি একটি তরল, যার অধিকাংশই পানি এবং যার মধ্যে ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ক্রিয়েটিনিন, বিভিন্ন লবণ ও বিপাকীয় বর্জ্য উপস্থিত থাকে। শরীর থেকে কোনো পদার্থ নির্গত হওয়া একাই তার বিষাক্ততার প্রমাণ নয়; কিন্তু সেই পদার্থকে পানযোগ্য কিংবা চিকিৎসার উপযোগী বলারও কোনো ভিত্তি তৈরি করে না। বিশেষ করে অপরিশোধিত প্রাণিজ মূত্রের ক্ষেত্রে রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুর সংক্রমণ একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। উটের মূত্রে বিভিন্ন লবণ ও নাইট্রোজেনজাত যৌগের উপস্থিতি পাওয়া যায়; কিন্তু এসব রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করা তার চিকিৎসাগত কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করে না। কোনো রোগের চিকিৎসায় উটের মূত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিয়ন্ত্রিত মানব-চিকিৎসা পরীক্ষায় কার্যকারিতা, উপযুক্ত মাত্রা এবং নিরাপত্তা প্রমাণ করতে হবে। প্রাণিজ মূত্রপানকে স্বাস্থ্যসম্মত বা উপকারী অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই [12]।
সবচেয়ে গুরুতর বিপদগুলোর একটি হলো জুনোটিক (Zoonotic) রোগের সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, উট হলো মার্স-কোভি (MERS-CoV) ভাইরাসের প্রধান প্রাণিজ উৎসগুলোর একটি। এই ভাইরাস মানুষের মধ্যে ‘মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম’ নামক মারাত্মক শ্বাসতন্ত্রের রোগ সৃষ্টি করতে পারে। WHO উটের কাঁচা দুধ ও মূত্র পান না করার পরামর্শ দিয়েছে, বিশেষত গুরুতর রোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য। অথচ ইসলামি স্কলাররা এবং ‘IslamQA’-এর মতো ফতোয়া ওয়েবসাইটগুলো উটের মূত্রকে চিকিৎসাগতভাবে উপকারী বলে প্রচার করে এসেছে [13]। ইসলামকিউএ-এর ৮৩৪২৩ নম্বর ফতোয়ায় উটের মূত্র দিয়ে ক্যান্সার, যকৃতের রোগ, চর্মরোগসহ নানা অসুখের চিকিৎসার দাবি করা হয়েছে এবং এসব উপকারিতা আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফতোয়াটির আরবি মূল সংস্করণ এখনও ইসলামকিউএ-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রয়েছে। এর পুরোনো ইংরেজি সংস্করণও ওয়েব আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সঙ্গে এসব দাবির বিরোধ থাকা সত্ত্বেও মূল ফতোয়ায় চিকিৎসাগত উপকারিতার দাবিগুলো বহাল রয়েছে [14] [15]। নিচে ফতোয়াটির সংরক্ষিত ইংরেজি সংস্করণ এবং তার বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো।
83423: The benefits of drinking camel urine
I hope that you can provide me with a scientific answer – if such knowledge is available – about the saheeh hadeeth about drinking camel’s urine. May Allaah reward you.
Praise be to Allaah.
The hadeeth referred to by the questioner is a saheeh hadeeth, in which it says that some people came to Madeenah and fell sick. The Prophet (peace and blessings of Allaah be upon him) told them to drink the milk and urine of camels, and they recovered and grew fat. In the story it also says that they apostatized and killed the camel-herder, then the Muslims caught them and executed them. Narrated by al-Bukhaari (2855) and Muslim (1671).
With regard to the health benefits of drinking the milk and urine of camels, they are many, and they are well known to the earlier generations of medical science and they have been proven by modern scientific research.
Ibn al-Qayyim said:
The author of al-Qanoon (the Canon) – i.e. the doctor Ibn Seena (Avicenna) – said:
The most beneficial of urine is the urine of Bedouin camels which are called najeeb. End quote.
Zaad al-Ma’aad (4/47, 48).
In the Emirati newspaper al-Ittihaad (issue no. 11172, Sunday 6 Muharram 1427 AH/5 February 2006) it says:
One of the most important things for which camels are raised is their milk, which is efficacious in treating many illnesses, including hepatitis, and the digestive system in general, various types of cancer and other diseases.
In an article by Dr Ahlaam al-‘Awadi, which was published in al-Da’wah magazine, issue no. 1938, 25 Safar 1425 AH/15 April 2004 CE, about the diseases which can be treated with camel’s milk, as proven by experience, it says that there are many benefits in camel’s milk. There follows some of what was said in the article by Dr. Ahlaam:
Camel’s urine is efficacious in the treatment of skin diseases such as ringworm, tinea and abscesses, sores that may appear on the body and hair, and dry and wet ulcers. Camel’s urine brings the secondary benefits of making the hair lustrous and thick, and removing dandruff from the scalp. Camel’s milk is also beneficial in treating hepatitis, even if it has reached an advanced stage where medicine is unable to treat it. End quote.
In the al-Jazeerah al-Sa’oodiyyah newspaper (issue no. 10132, Rabee’ al-Awwal 1421 AH) there is a quotation from the book Al-Ibl Asraar wa i’jaaz (The camel: secrets and wonders) by Darmaan ibn ‘Abd al-‘Azeez Aal Darmaan and Sanad ibn Mutlaq al-Subay’i:
As for camel’s urine, the book suggests that it has numerous uses which are beneficial for man. This is indicated by the Prophetic texts and confirmed by modern science … Scientific experiments have proven that camel’s urine has a lethal effect on the germs that cause many diseases.
Among the uses of camel’s urine, many women use it to wash their hair, to make it longer, and to make it lighter and more lustrous. Camel’s urine is also efficacious in the treatment of swelling of the liver and other diseases such as abscesses, sores that appear on the body and toothache, and for washing eyes. End quote.
Prof. Dr. ‘Abd al-Fattaah Mahmoud Idrees says: With regard to the benefits of camel’s urine in treating disease, Ibn Seena said in his Qanoon: The most beneficial of urine is the urine of the Bedouin camels known as najeeb. Camel’s urine is beneficial in treating al-hazaaz, and it was said that al-hazzaz is a pain in the heart caused by anger and so on. Camel’s urine, especially the urine of a young she-camel – is used as a cleansing substance to wash wounds and sores, to make the hair grow, to strengthen and thicken it and to prevent it falling out, and it is used to treat diseases of the scalp and dandruff. In a Master’s thesis by an engineer in applied chemistry, Muhammad Awhaaj Muhammad, that was submitted to the faculty of applied chemistry in the al-Jazeerah university in Sudan, and approved by the Dean of science and postgraduate studies in the university in November 1998 CE, entitled A Study of the Chemical Composition and Some Medical Uses of the Urine of Arabian Camels, Muhammad Awhaaj says:
Laboratory tests indicate that camel’s urine contains high levels of potassium, albuminous proteins, and small amounts of uric acid, sodium and creatine.
In this study, he explained that what prompted him to study the medicinal properties of camel’s urine was what he had seen of some tribesmen drinking this urine whenever they suffered digestion problems. He sought the help of some doctors in studying camel’s urine. They brought a number of patients and prescribed this urine for them, for a period of two months. Their bodies recovered from what they had been suffering from, which proves the efficacy of camel’s urine in treating some diseases of the digestive system.
It also proves that this urine is useful in preventing hair loss. He says:
Camel’s urine acts as a slow-acting diuretic, but it does not deplete potassium and other salts as other diuretics do, because camel’s urine contains a high level of potassium and proteins. It has also been proven to be effective against some types of bacteria and viruses. It brought about an improvement in the condition of twenty-five patients who used camel’s urine for dropsy, without disrupting their potassium levels. Two of them were cured of liver pain, and their liver function was restored to normal levels, as well as the tissue of the liver being improved. One of the medicines used to treat blood clots is a compound called Fibrinoltics which works by changing a substance in the body from its inactive form, Plasminogen, to its active form, Plasmin, in order to dissolve the substance that causes clotting, Fibrin. One of the components of this compound is called Urokinase, which is produced by the kidneys or from the urine, as indicated by the name “uro”.
The dean of the Faculty of Medical Science in the Sudanese al-Jazeerah university, Professor Ahmad ‘Abd-Allaah Ahmadaani, has discovered a practical way of using camel’s urine to treat dropsy and swelling in the liver. Its success has been proven in treating those who are affected by these diseases. He said in a seminar organized by the al-Jazeerah University:
The experiment began by giving each patient a daily dose of camel’s urine mixed with camel’s milk to make it palatable. Fifteen days after the beginning of the experiment, the patients’ stomachs grew smaller and went back to their normal size.
He said that he examined the patients’ livers with ultrasound before the study began, and he found out that the livers of fifteen out of the twenty-five were in a cirrhotic state, and some of them had developed cirrhosis of the liver as the result of bilharzia. All of the patients responded to treatment with camel’s urine, and some of them continued, by their own choice, to drink a dose of camel’s urine every day for a further two months. At the end of that time, they were all found to have been cured of cirrhosis of the liver. He said: Camel’s urine contains a large amount of potassium, as well as albumen and magnesium, because the camel only drinks four times during the summer and once during the winter, which makes it retain water in its body so as to preserve the sodium, and the sodium causes it not to urinate a great deal, because it keeps the water in its body.
He explained that dropsy results from a deficiency of albumen or potassium, and the urine of camels in rich in both of these.
He suggested that the best type of camels for using the urine as a remedy are young camels.
Dr. Ahlaam al-‘Awadi, a specialist in microbiology in the Kingdom of Saudi Arabia, supervised some scientific papers that dealt with her discoveries in the usage of camel’s urine for medical treatment, such as the papers by ‘Awaatif al-Jadeedi and Manaal al-Qattaan. During her supervision of the paper by Manaal al-Qattaan, she succeeded in confirming the effectiveness of using a preparation made from camel’s urine which was the first antibiotic produced in this manner anywhere in the world. Concerning the features of this new product, Dr. Ahlaam said:
It is not costly, and it is easy to manufacture. It can be used to treat skin diseases such as eczema, allergies, sores, burns, acne, nail infections, cancer, hepatitis and dropsy with no harmful side effects.
And she said:
Camel’s urine contains a number of healing factors such as antibiotics (bacteria that are present in it, salts and urea). The camel possesses an immune system that is highly equipped to combat funguses, bacteria and viruses, because it contains antibodies. It may also be used to treat blood clots and fibrinolytics may be derived from it, and it may be used to treat dropsy (which is caused by a deficiency in albumen and potassium, as camel’s urine is rich in both). Camel’s urine may also provide a remedy for abdominal complaints, especially those of the stomach and intestines, as well as asthma and shortness of breath. It caused a noticeable reduction in patients’ sugar levels. It is a remedy for low libido, and it aids in bone growth in children and in strengthening the heart muscles. It may be used as a cleansing agent for cleaning wounds and sores, especially the urine of young she-camels. It also helps the hair to grow and become strong and thick, and it helps to prevent hair loss and baldness, and can be used to treat dandruff. Camel’s urine may also be used to combat disease by using bacteria extracted from it. It was used to treat a girl who was suffering from an infection behind the ear, that was accompanied by pus weeping from it and painful cracks and sores. It was also used to treat a girl who was unable to extend the fingers of her hands because of the presence of so many cracks and sores, and whose face was almost black with pimples. Dr. Ahlaam said:
Camel’s urine may also be used to treat the digestive system and to treat some cases of cancer. She stated that the research that she had undertaken on camel’s urine proved that it was effective in destroying micro-organisms such as fungus, yeast and bacteria.
Dr. Rahmah al-‘Ulyaani, who is also from Saudi Arabia, carried out tests on rabbits infected with bacteria in the colon. She treated each group of rabbits with a different kind of medicine, including camel’s urine. There was a noticeable regression in the rabbits that were treated with other medicines, except for camel’s urine, which brought about a clear improvement.
Majallat al-Jundi al-Muslim, issue no. 118, 20 Dhu’l-Qa’dah 1425 AH; 1 January 2005 CE.
Allaah calls upon us to ponder the creation of the camel, as He says (interpretation of the meaning):
“Do they not look at the camels, how they are created?”
[al-Ghaashiyah 88:17]
This pondering is not limited to the outward form of the camel, or even to the inner workings of its body, rather it also includes that which we have discussed here, which is the benefits of the urine and milk of the camel. Modern scientific research is still discovering for us many of the wonders of this creature.
And Allaah knows best.
এবারে আসুন এর বাংলা অনুবাদ পড়ি,
৮৩৪২৩: উটের মূত্র পান করার উপকারিতা
আমি আশা করি, উটের মূত্র পান করা সম্পর্কিত সহিহ হাদিসটি সম্পর্কে—যদি এ বিষয়ে জ্ঞান পাওয়া যায়—আপনারা আমাকে একটি বৈজ্ঞানিক উত্তর দিতে পারবেন। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
প্রশ্নকারী যে হাদিসটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, সেটি একটি সহিহ হাদিস। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু লোক মদিনায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উটের দুধ ও মূত্র পান করতে বলেন। এরপর তারা সুস্থ হয়ে ওঠে এবং শরীরে মেদ/সবলতা ফিরে পায়। ঘটনাটিতে আরও বলা হয়েছে, পরে তারা ধর্মত্যাগ করে, উটের রাখালকে হত্যা করে; এরপর মুসলিমরা তাদের ধরে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আল-বুখারি (২৮৫৫) এবং মুসলিম (১৬৭১)।
উটের দুধ ও মূত্র পান করার স্বাস্থ্যগত উপকারিতার বিষয়ে বলা যায়, এর উপকারিতা অনেক; পূর্ববর্তী যুগের চিকিৎসাবিদ্যার লোকদের কাছে তা সুপরিচিত ছিল এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও তা প্রমাণিত হয়েছে।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন:
আল-কানুন গ্রন্থের লেখক—অর্থাৎ চিকিৎসক ইবনু সিনা—বলেছেন:
সবচেয়ে উপকারী মূত্র হলো বেদুইন উটের মূত্র, যাকে নাজীব বলা হয়। উদ্ধৃতি শেষ।
যাদুল মাআদ, ৪/৪৭–৪৮।
আমিরাতি পত্রিকা আল-ইত্তিহাদে—সংখ্যা ১১১৭২, রবিবার, ৬ মুহাররম ১৪২৭ হিজরি / ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৬—বলা হয়েছে:
উট পালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো তার দুধ। এটি বহু রোগের চিকিৎসায় কার্যকর, যার মধ্যে রয়েছে হেপাটাইটিস, সাধারণভাবে পরিপাকতন্ত্রের রোগ, বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগ।
ড. আহলাম আল-আওয়াদি কর্তৃক লেখা একটি প্রবন্ধে—যা আদ-দাওয়াহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়, সংখ্যা ১৯৩৮, ২৫ সফর ১৪২৫ হিজরি / ১৫ এপ্রিল ২০০৪—উটের দুধ দ্বারা যেসব রোগের চিকিৎসা করা যায়, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেসব বিষয়ে বলা হয়েছে যে, উটের দুধের বহু উপকারিতা আছে। ড. আহলামের প্রবন্ধে যা বলা হয়েছে, তার কিছু অংশ নিচে দেওয়া হলো:
উটের মূত্র চর্মরোগের চিকিৎসায় কার্যকর, যেমন দাদ, টিনিয়া, ফোঁড়া, শরীর ও চুলে দেখা দেওয়া ঘা, এবং শুকনো ও ভেজা আলসার। উটের মূত্রের গৌণ উপকারিতার মধ্যে রয়েছে চুলকে উজ্জ্বল ও ঘন করা, এবং মাথার ত্বক থেকে খুশকি দূর করা। উটের দুধ হেপাটাইটিসের চিকিৎসাতেও উপকারী, এমনকি তা এমন অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও, যেখানে প্রচলিত ওষুধ চিকিৎসা করতে অক্ষম। উদ্ধৃতি শেষ।
সৌদি আল-জাজিরাহ পত্রিকায়—সংখ্যা ১০১৩২, রবিউল আউয়াল ১৪২১ হিজরি—দারমান ইবনে আবদুল আজিজ আল দারমান এবং সানাদ ইবনে মুতলাক আস-সুবাইয়ির লেখা “আল-ইবল আসরার ওয়া ই’জায” অর্থাৎ “উট: রহস্য ও বিস্ময়” বই থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে:
উটের মূত্রের বিষয়ে বইটি বলছে যে, মানুষের জন্য এর বহু উপকারী ব্যবহার আছে। নববী পাঠ্যসমূহ এদিকে ইঙ্গিত করে এবং আধুনিক বিজ্ঞানও তা নিশ্চিত করেছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রমাণ করেছে যে, বহু রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর ওপর উটের মূত্রের প্রাণঘাতী প্রভাব আছে।
উটের মূত্রের ব্যবহারগুলোর মধ্যে রয়েছে—অনেক নারী চুল ধোয়ার জন্য এটি ব্যবহার করেন, যাতে চুল লম্বা, হালকা/নরম এবং আরও উজ্জ্বল হয়। উটের মূত্র যকৃতের ফোলা এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসায়ও কার্যকর, যেমন ফোঁড়া, শরীরে দেখা দেওয়া ঘা, দাঁতের ব্যথা, এবং চোখ ধোয়ার কাজেও। উদ্ধৃতি শেষ।
প্রফেসর ড. আবদুল ফাত্তাহ মাহমুদ ইদরিস বলেন: রোগের চিকিৎসায় উটের মূত্রের উপকারিতা সম্পর্কে ইবনু সিনা তাঁর আল-কানুন গ্রন্থে বলেছেন: সবচেয়ে উপকারী মূত্র হলো নাজীব নামে পরিচিত বেদুইন উটের মূত্র। উটের মূত্র আল-হাজাজ চিকিৎসায় উপকারী। বলা হয়েছে, আল-হাজাজ হলো রাগ ইত্যাদির কারণে হৃদয়ে সৃষ্ট এক ধরনের ব্যথা। উটের মূত্র—বিশেষ করে অল্পবয়সী মাদি উটের মূত্র—ক্ষত ও ঘা ধোয়ার জন্য পরিষ্কারক পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়; চুল গজানো, চুল শক্ত ও ঘন করা, চুল পড়া প্রতিরোধ করা, মাথার ত্বকের রোগ ও খুশকি চিকিৎসার জন্যও ব্যবহৃত হয়।
সুদানের আল-জাজিরাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন অনুষদে জমা দেওয়া একটি মাস্টার্স থিসিসে—যা ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন বিভাগের ডিন অনুমোদন করেন—প্রকৌশলী মুহাম্মদ আওহাজ মুহাম্মদ “আরবীয় উটের মূত্রের রাসায়নিক গঠন ও কিছু চিকিৎসাগত ব্যবহার বিষয়ে একটি গবেষণা” শিরোনামে লেখেন:
ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ইঙ্গিত করে যে, উটের মূত্রে উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম, অ্যালবুমিনজাত প্রোটিন, এবং অল্প পরিমাণে ইউরিক অ্যাসিড, সোডিয়াম ও ক্রিয়েটিন থাকে।
এই গবেষণায় তিনি ব্যাখ্যা করেন, উটের মূত্রের চিকিৎসাগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করতে তাঁকে যা উদ্বুদ্ধ করেছিল, তা হলো—তিনি দেখেছিলেন কিছু উপজাতীয় মানুষ হজমের সমস্যা হলেই এই মূত্র পান করত। উটের মূত্র নিয়ে গবেষণায় তিনি কিছু চিকিৎসকের সাহায্য নেন। তারা কয়েকজন রোগী নিয়ে আসেন এবং দুই মাসের জন্য তাদের এই মূত্র সেবনের পরামর্শ দেন। রোগীরা যেসব সমস্যায় ভুগছিল, সেসব থেকে তাদের শরীর সুস্থ হয়ে ওঠে, যা পরিপাকতন্ত্রের কিছু রোগের চিকিৎসায় উটের মূত্রের কার্যকারিতা প্রমাণ করে।
এটি আরও প্রমাণ করে যে, এই মূত্র চুল পড়া প্রতিরোধে উপকারী। তিনি বলেন:
উটের মূত্র ধীরে কাজ করে এমন একটি মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে, কিন্তু অন্যান্য মূত্রবর্ধকের মতো এটি পটাশিয়াম ও অন্যান্য লবণ কমিয়ে দেয় না, কারণ উটের মূত্রে উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম ও প্রোটিন থাকে। এটিও প্রমাণিত হয়েছে যে, কিছু ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে এটি কার্যকর। জলশোথের জন্য উটের মূত্র ব্যবহারকারী পঁচিশজন রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তাদের পটাশিয়ামের মাত্রা বিঘ্নিত না করেই। তাদের মধ্যে দুইজন যকৃতের ব্যথা থেকে আরোগ্য লাভ করে এবং তাদের যকৃতের কার্যকারিতা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে; পাশাপাশি যকৃতের টিস্যুরও উন্নতি হয়।
রক্ত জমাট বাঁধার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর একটি হলো ফাইব্রিনোলাইটিক্স নামের একটি যৌগ। এটি শরীরের একটি পদার্থকে তার নিষ্ক্রিয় রূপ প্লাজমিনোজেন থেকে সক্রিয় রূপ প্লাজমিনে পরিবর্তন করে, যাতে জমাট বাঁধার কারণ ফাইব্রিন দ্রবীভূত হয়। এই যৌগের একটি উপাদানের নাম ইউরোকিনেজ, যা কিডনি থেকে বা মূত্র থেকে উৎপন্ন হয়; নামের “ইউরো” অংশটিও এদিকে ইঙ্গিত করে।
সুদানের আল-জাজিরাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সায়েন্স অনুষদের ডিন প্রফেসর আহমদ আবদুল্লাহ আহমাদানি জলশোথ ও যকৃতের ফোলা চিকিৎসায় উটের মূত্র ব্যবহারের একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এই রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসায় এর সফলতা প্রমাণিত হয়েছে। আল-জাজিরাহ বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন:
প্রতিটি রোগীকে প্রতিদিন উটের মূত্রের একটি ডোজ দেওয়া দিয়ে পরীক্ষা শুরু হয়, যা পানযোগ্য করতে উটের দুধের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষা শুরুর পনের দিন পর রোগীদের পেট ছোট হয়ে আসে এবং স্বাভাবিক আকারে ফিরে যায়।
তিনি বলেন, গবেষণা শুরুর আগে তিনি আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে রোগীদের যকৃত পরীক্ষা করেন এবং দেখেন, পঁচিশজনের মধ্যে পনেরজনের যকৃত সিরোসিস অবস্থায় ছিল; তাদের কারও কারও বিলহারজিয়ার কারণে যকৃতের সিরোসিস হয়েছিল। সব রোগী উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসায় সাড়া দেয়; তাদের কেউ কেউ নিজের পছন্দে আরও দুই মাস প্রতিদিন উটের মূত্রের একটি ডোজ পান চালিয়ে যায়। সেই সময় শেষে দেখা যায়, তারা সবাই যকৃতের সিরোসিস থেকে আরোগ্য লাভ করেছে।
তিনি বলেন: উটের মূত্রে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে, পাশাপাশি অ্যালবুমিন ও ম্যাগনেশিয়ামও থাকে। কারণ উট গ্রীষ্মকালে মাত্র চারবার এবং শীতকালে একবার পানি পান করে, যার ফলে শরীরের পানি ধরে রাখতে সে সোডিয়াম সংরক্ষণ করে; আর সোডিয়ামের কারণে সে বেশি প্রস্রাব করে না, কারণ এটি শরীরের ভেতরে পানি ধরে রাখে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, জলশোথ অ্যালবুমিন বা পটাশিয়ামের ঘাটতির ফলে হয়, আর উটের মূত্র এ দুটিতেই সমৃদ্ধ।
তিনি পরামর্শ দেন যে, চিকিৎসার জন্য মূত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উট হলো অল্পবয়সী উট।
সৌদি আরবের মাইক্রোবায়োলজি বিশেষজ্ঞ ড. আহলাম আল-আওয়াদি উটের মূত্রের চিকিৎসাগত ব্যবহার বিষয়ে তাঁর আবিষ্কারসমূহ নিয়ে কিছু বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ তত্ত্বাবধান করেন; যেমন আওয়াতিফ আল-জাদিদি এবং মানাল আল-কাত্তানের প্রবন্ধ। মানাল আল-কাত্তানের প্রবন্ধ তত্ত্বাবধানের সময় তিনি উটের মূত্র থেকে তৈরি একটি প্রস্তুতির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সফল হন, যা এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত বিশ্বের প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক ছিল। এই নতুন পণ্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ড. আহলাম বলেন:
এটি ব্যয়বহুল নয় এবং তৈরি করা সহজ। এটি কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই একজিমা, অ্যালার্জি, ঘা, পোড়া, ব্রণ, নখের সংক্রমণ, ক্যান্সার, হেপাটাইটিস ও জলশোথের মতো চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়।
তিনি আরও বলেন:
উটের মূত্রে কিছু আরোগ্যদায়ক উপাদান আছে, যেমন অ্যান্টিবায়োটিক—এর মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া, লবণ ও ইউরিয়া। উটের শরীরে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে, কারণ এতে অ্যান্টিবডি থাকে। এটি রক্ত জমাট বাঁধার চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হতে পারে এবং এর থেকে ফাইব্রিনোলাইটিক্স উৎপন্ন করা যেতে পারে। এটি জলশোথ চিকিৎসায় ব্যবহার করা যেতে পারে, যা অ্যালবুমিন ও পটাশিয়ামের ঘাটতির কারণে হয়; কারণ উটের মূত্র এ দুটিতেই সমৃদ্ধ।
উটের মূত্র পেটের সমস্যা, বিশেষত পাকস্থলী ও অন্ত্রের রোগ, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের চিকিৎসাতেও উপকারী হতে পারে। এটি রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রায় দৃশ্যমান হ্রাস ঘটিয়েছে। এটি যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়ার চিকিৎসা, শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধি এবং হৃদপেশি শক্তিশালী করতে সহায়ক। এটি ক্ষত ও ঘা পরিষ্কার করার জন্য পরিষ্কারক পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, বিশেষ করে অল্পবয়সী মাদি উটের মূত্র। এটি চুল গজাতে, চুল শক্ত ও ঘন করতে সাহায্য করে; চুল পড়া ও টাক প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং খুশকি চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায়।
উটের মূত্র থেকে নিষ্কাশিত ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করেও রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করা যেতে পারে। এটি এক মেয়ের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়েছিল, যার কানের পেছনে সংক্রমণ ছিল; সেই সংক্রমণের সঙ্গে পুঁজ বের হওয়া, যন্ত্রণাদায়ক ফাটল ও ঘা ছিল। আরও এক মেয়ের চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা হয়েছিল, যে হাতে এত বেশি ফাটল ও ঘায়ের কারণে আঙুল সোজা করতে পারত না, এবং যার মুখ ব্রণে প্রায় কালো হয়ে গিয়েছিল।
ড. আহলাম বলেন:
উটের মূত্র পরিপাকতন্ত্রের চিকিৎসা এবং কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, উটের মূত্র নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, এটি ছত্রাক, ইস্ট ও ব্যাকটেরিয়ার মতো অণুজীব ধ্বংসে কার্যকর।
সৌদি আরবের ড. রহমা আল-উলয়ানি কোলনে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত খরগোশের ওপর পরীক্ষা চালান। তিনি প্রতিটি খরগোশ-গোষ্ঠীকে ভিন্ন ধরনের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করেন, যার মধ্যে উটের মূত্রও ছিল। অন্যান্য ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা খরগোশগুলোর অবস্থায় স্পষ্ট অবনতি দেখা যায়; কিন্তু উটের মূত্র দেওয়া গোষ্ঠীতে পরিষ্কার উন্নতি দেখা যায়।
মাজাল্লাত আল-জুন্দি আল-মুসলিম, সংখ্যা ১১৮, ২০ যুলকাদাহ ১৪২৫ হিজরি / ১ জানুয়ারি ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ।
আল্লাহ আমাদের উটের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করেছেন। তিনি বলেন, যার অর্থ:
“তারা কি উটের দিকে তাকায় না—কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে?”
[আল-গাশিয়াহ ৮৮:১৭]
এই চিন্তা শুধু উটের বাহ্যিক আকৃতি বা তার শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এতে সেই বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত, যা আমরা এখানে আলোচনা করেছি—অর্থাৎ উটের মূত্র ও দুধের উপকারিতা। আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো আমাদের সামনে এই প্রাণীর বহু বিস্ময় উন্মোচন করছে।
আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সপ্তম শতকে আরবের মরুভূমিতে কোনো উন্নত চিকিৎসা বা ঔষধের অভাব ছিল। সেই সময়কার একটি লোকজ প্রতিকারকে যখন ‘ঐশ্বরিক বিধান’ হিসেবে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া হয়, তখন তা একুশ শতকের উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে একটি হাস্যকর ও বিপজ্জনক অপবিশ্বাসে পরিণত হয়। জাকির নায়েক বা ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার মতো ব্যক্তিবর্গ যখন আধুনিক গবেষণাগারের পরিবর্তে হাজার বছরের পুরনো হাদিসের ওপর ভিত্তি করে মূত্র পানের সাফাই গান, তখন তারা মূলত সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন। কোনো পবিত্রতা বা ধর্মীয় আবেগের দোহাই দিয়ে মূত্রের মতো একটি টক্সিক বর্জ্যকে ঔষধ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং এটি একটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড।
হাদিস থেকে বাজারে: বোতলজাত উটের মূত্রের অর্থনীতি
উটের মূত্রপানের বিষয়টি কেবল হাদিসগ্রন্থ, ফতোয়া ওয়েবসাইট বা আলেমদের বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আরব সমাজের কিছু অংশে এটি বাস্তব বাজার ও বাণিজ্যের রূপও পেয়েছে। ধর্মীয়ভাবে “পবিত্র” ও “চিকিৎসা” হিসেবে বৈধতা দেওয়ার ফলে একটি রেচন-বর্জ্য পদার্থকে কিছু মানুষ ঔষধ, সুন্নাহ-চিকিৎসা বা নববী চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এর ফলে অসুস্থ, হতাশ ও চিকিৎসায় ব্যর্থ মানুষদের লক্ষ্য করে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর বিকল্প-চিকিৎসা বাজার তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের পত্রিকা Al-Madina ২০২১ সালে রিপোর্ট করে যে, উটের মূত্র বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে; আধা লিটারের একটি বোতল ৪০–৫০ সৌদি রিয়ালে বিক্রি হচ্ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, কেউ কেউ এটি পান করার জন্য কিনছে, কেউ শরীরের অংশে মাখার জন্য ব্যবহার করছে, আবার কিছু জনপ্রিয় হারবাল/আতার দোকান “উটের মূত্রের তেল” বা অনুরূপ পণ্য প্রচার করছে—ক্যান্সার, পাকস্থলীর রোগ, চুল, ত্বক, এমনকি যৌনক্ষমতা বাড়ানোর দাবিতেও। একই প্রতিবেদনে সৌদি Food and Drug Authority-র অবস্থান উদ্ধৃত হয়—উটের মূত্র বা উটের মূত্রের তেলজাত পণ্য তাদের কাছে নিবন্ধিত নয়, তাই এগুলো অনুমোদিত নয়; এগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা অজানা, কারণ অনিবন্ধিত পণ্য নিয়ন্ত্রক মূল্যায়ন বা পর্যবেক্ষণের অধীনে থাকে না [16]।
আরেকটি সৌদি উৎস Al-Bilad-এ বর্ণনা করা হয়েছে, উটের রাখালরা উটের মূত্র পাত্রে সংগ্রহ করে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পানির বোতলে ভরে রোগীদের কাছে উচ্চ দামে বিক্রি করত। লেখক উল্লেখ করেন, এই বাণিজ্য সুদান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রচলিত ছিল এবং অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা-অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঝুঁকি তৈরি করছিল। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, “উটের মূত্র” শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়; এটি বাস্তবে রোগী-নির্ভর লোকচিকিৎসা অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে [17]।
এই বাজারের পেছনে ধর্মীয় বৈধতা বড় ভূমিকা রাখে। সৌদি আরবের প্রভাবশালী আলেম আবদুল আজিজ বিন বাযের অফিসিয়াল ফতোয়া সাইটে উটের মূত্র ও দুধ দিয়ে চিকিৎসা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বলা হয়—এতে সমস্যা নেই; এটি চিকিৎসার জন্য পবিত্র; এবং যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া যায়, তাদের মূত্রও পবিত্র, যেমন উট, গরু ও ছাগল। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ যখন উটের মূত্রকে ঔষধ হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তারা শুধু লোকবিশ্বাস অনুসরণ করছে না; তারা প্রভাবশালী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও পাচ্ছে [18]।
সৌদি চিকিৎসা-প্রেক্ষাপটেও এই বিশ্বাসের ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়। WHO Eastern Mediterranean Health Journal-এ প্রকাশিত সৌদি গবেষণায় ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে উটের মূত্র ব্যবহারের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় বলা হয়, সৌদি আরবে complementary/alternative medicine ব্যবহারের মধ্যে উটের মূত্র একা বা উটের দুধের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করার প্রচলন আছে এবং এই চর্চা অস্পষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা সমর্থিত। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষিত ২০ জন ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে কোনো clinical benefit পাওয়া যায়নি; দুইজনের brucellosis হয়েছিল; এবং গবেষকদের উপসংহার ছিল—উটের মূত্রকে ঐতিহ্যিক চিকিৎসা হিসেবে প্রচার বন্ধ করা উচিত, কারণ এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই [19]।
জনস্বাস্থ্যের দিক থেকেও বিষয়টি বিপজ্জনক। WHO MERS-CoV প্রসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের উটের সংস্পর্শে সতর্ক থাকতে এবং কাঁচা উটের দুধ বা উটের মূত্র পান না করতে বলেছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও MERS-CoV প্রসঙ্গে উট-সম্পর্কিত সংক্রমণঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কাঁচা উটের দুধ বা মূত্র পান না করার পরামর্শ দিয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক জনস্বাস্থ্য যেখানে কাঁচা প্রাণিজ পণ্য ও প্রাণীর রেচন পদার্থ থেকে দূরে থাকতে বলছে, সেখানে ধর্মীয় ফতোয়া ও “নববী চিকিৎসা”র নামে সেই একই বর্জ্য পদার্থকে চিকিৎসা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
এখানে মূল সমস্যা শুধু “কে কী পান করছে” নয়; মূল সমস্যা হলো, ধর্মীয় কর্তৃত্ব একটি বর্জ্য পদার্থকে পবিত্র ও চিকিৎসাগতভাবে উপকারী বলে বৈধতা দিলে তা বাজারে প্রতারণা, ভণ্ড-চিকিৎসা, রোগীর চিকিৎসা বিলম্ব, সংক্রমণঝুঁকি এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। একটি সহিহ হাদিসের বর্ণনা থেকে শুরু হয়ে বিষয়টি যখন বোতলজাত পণ্য, হারবাল দোকান, ক্যান্সার-চিকিৎসার দাবি, সামাজিক মাধ্যমের প্রচার এবং রোগীর অসহায়ত্বের অর্থনৈতিক শোষণে গিয়ে পৌঁছায়, তখন সেটি আর নিছক ধর্মীয় বিশ্বাস থাকে না; সেটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতার সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় [20] [21] ।
উপসংহার: অন্ধবিশ্বাস বনাম আধুনিক বিচারবুদ্ধির লড়াই
সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি স্পষ্ট যে, ইসলামি ধর্মতত্ত্বে উটের মূত্রকে ‘পবিত্র ঔষধ’ হিসেবে গণ্য করার ধারণাটি একটি প্রাচীন চিকিৎসা-কুসংস্কারের ধর্মীয় অনুমোদন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে কোনো চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষানিরীক্ষা এবং যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে, সেখানে একটি প্রাণিজ বর্জ্যকে কেবল ধর্মীয় কর্তৃত্বের কারণে ‘শিফা’ বা আরোগ্য হিসেবে প্রচার করা অবৈজ্ঞানিক ও বিপজ্জনক। উটের মূত্রপানের হাদিস, পরবর্তী ফকিহদের সিদ্ধান্ত এবং আধুনিক ফতোয়াগুলোর ধারাবাহিকতা দেখায়, কীভাবে একটি প্রাচীন লোকজ চিকিৎসা-অনুশীলন ধর্মীয় বিধান ও বিশ্বাসের মর্যাদা অর্জন করেছে। অথচ সেই চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আজও অনুপস্থিত।
জাকির নায়েক বা ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার মতো ধর্মীয় প্রচারকরা যখন উটের মূত্রপানের পক্ষে হাদিসের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন তাঁরা চিকিৎসাগত কার্যকারিতা নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের পরিবর্তে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেন। এই অবস্থানের বিপদ শুধু ভুল চিকিৎসা-ধারণা প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উটের কাঁচা মূত্র ও দুধ পান না করার পরামর্শ দিয়েছে; অন্যদিকে ক্যান্সার রোগীদের ওপর প্রকাশিত পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় উটের মূত্র সেবনের কোনো চিকিৎসাগত উপকার পাওয়া যায়নি এবং সংক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে এমন একটি অপরিশোধিত প্রাণিজ বর্জ্যকে আরোগ্যের উপায় হিসেবে প্রচার করা রোগীদের অকার্যকর চিকিৎসার দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং কার্যকর চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব ঘটাতে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে চিকিৎসার প্রমাণ প্রত্যাখ্যান করার এই প্রবণতা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি মানুষের বিচারবুদ্ধিকে এতটাই আচ্ছন্ন করতে পারে যে, সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণিজ বর্জ্যের মধ্যেও সে অলৌকিক আরোগ্য ও পবিত্রতা খুঁজে পায়। কোনো পদার্থের ওপর ‘হালাল’, ‘পবিত্র’ কিংবা ‘সুন্নাহ’র মর্যাদা আরোপ করলেই তার রাসায়নিক গঠন, জীবাণুগত বৈশিষ্ট্য কিংবা চিকিৎসাগত কার্যকারিতা পরিবর্তিত হয় না। সুস্থ ও আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে এ ধরনের অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা-বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। জীবন রক্ষার প্রশ্নে ধর্মীয় কর্তৃত্ব নয়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রামাণ্য তথ্যই নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। মানুষের স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সামনে ধর্মীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত এই প্রাচীন চিকিৎসা-কুসংস্কারের কোনো যুক্তিসংগত ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না।
তথ্যসূত্রঃ
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩৫৩৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪২০৭ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাঃ একাডেমী, হাদিসঃ ৪২৪৬ ↩︎
- সহিহ বুখারি, কিতাবুত তিব্ব, পরিচ্ছেদ ৬: উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসা, হাদিস ৫৬৮৬ ↩︎
- ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারী শরহ সহিহ বুখারি, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৪৯–১৫০, উটের মূত্র দিয়ে চিকিৎসা পরিচ্ছেদ ↩︎
- মুখতাসার যাদুল মা’আদ, আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী, পৃষ্ঠা ৩০৩, ৩০৪ ↩︎
- ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, কিতাবুস সালাত, পরিচ্ছেদ: ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মূত্র ও মল পবিত্র; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে আবদুল বার, আত-তামহিদ লিমা ফিল মুয়াত্তা মিনাল মাআনি ওয়াল আসানিদ, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২৪০; ইসলামওয়েব ↩︎
- The urine of camels as medicine ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১১১৭৮৬: بول وروث الحيوان الذي يؤكل لحمه طاهر — ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মূত্র ও মল পবিত্র ↩︎
- Centers for Disease Control and Prevention (CDC), Backyard Poultry: Healthy Pets, Healthy People ↩︎
- Are There Health Benefits to Drinking Urine?, WebMD ↩︎
- WHO Fact Sheet: Middle East respiratory syndrome coronavirus (MERS-CoV) ↩︎
- IslamQA, Fatwa 83423: فوائد شرب أبوال الإبل ↩︎
- The benefits of drinking camel urine — Archived English Version ↩︎
- الأبل.. 80 ريالا للبول .. و40 للحليب.. والشوكولاتة والصابون من منتجاته ↩︎
- ما رأي وزارة الصحة في بول الإبل كعلاج؟ ↩︎
- ما حكم التداوي بأبوال الإبل وألبانها؟ ↩︎
- Use of camel urine is of no benefit to cancer patients: observational study and literature review, Eastern Mediterranean Health Journal, 2023, 29(8), 657–663 ↩︎
- Middle East respiratory syndrome coronavirus – Saudi Arabia ↩︎
- Coronavirus (MERS-CoV) ↩︎


আবু বকর জাকারিয়া যে ভিডিওটি দিয়েছেন সেখানে তালাক বিষয়ে হারাম না হালাল সেই ব্যাপারে কথা বলা হয়েছে উটের মূত্র ব্যাপারে কিছুই নেই প্লিজ ভিডিওটি একবার দেখুন।
হালাল হারামের ভিডিওর পরে উটের মূত্র বিষয়ক ভিডিও রয়েছে। প্রথম ভিডিওটি এই বিষয়ে যে, ধ্রুপদী ইসলামী বিধান অনুসারে সকল হালালই উৎকৃষ্ট, হালালের মধ্যে কোন নিকৃষ্ট কিছু থাকতে পারে না। সালাফীদের এটি খুব শক্তিশালী মত।