ভূমিকা
কোরআনের ১৬:৬৬ নম্বর আয়াতে গবাদি পশুর স্তন্যদুগ্ধ সম্পর্কে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যা আধুনিক শারীরস্থান (Anatomy), শারীরবৃত্ত (Physiology) এবং প্রাণীবিজ্ঞানের (Zoology) আলোকে প্রাক-বৈজ্ঞানিক ও অসংগতিপূর্ণ। ওই আয়াতে বলা হয়েছে, পশুর পেটের ভেতর ‘ফারস’ ও রক্তের মধ্য থেকে বিশুদ্ধ দুধ পান করানো হয়। বাংলা অনুবাদে ‘ফারস’ শব্দটি প্রায়ই ‘গোবর’ হিসেবে অনূদিত হয়েছে; তবে বৈজ্ঞানিক আলোচনায় শব্দটিকে নির্গত গোবরের চেয়ে বিস্তৃত অর্থে—পরিপাকতন্ত্রের ভেতরের অর্ধপাচিত খাদ্যবস্তু বা বর্জ্যধর্মী উপাদান—হিসেবে বোঝাই অধিক যথাযথ। এই সতর্কতা রেখেও আয়াতটির বর্ণনা এবং প্রাচীন তাফসিরকারীদের ব্যাখ্যা আধুনিক শারীরবিদ্যার সঙ্গে মেলে না। আধুনিক জীববিজ্ঞান দেখায়, দুধ কোনো পরিপাকতন্ত্রীয় বর্জ্য বা রক্ত থেকে ছেঁকে নেওয়া তরল নয়; এটি স্তন্যগ্রন্থির (Mammary gland) বিশেষায়িত কোষে রক্তবাহিত পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে সংশ্লেষিত হয়। এই প্রবন্ধে রক্তসংবহন, পরিপাকতন্ত্র এবং স্তন্যগ্রন্থির কোষীয় কার্যাবলীর প্রেক্ষিতে কোরআনিক বর্ণনাটির বৈজ্ঞানিক অসারতা বিশ্লেষণ করা হবে।

শারীরস্থানিক বিভ্রান্তিঃ ‘ফারস ও রক্ত’ ধারণার ব্যবচ্ছেদ
কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতের ‘ফারস ও রক্তের মধ্যখান’ (مِنْ بَيْنِ فَرْثٍ وَدَمٍ — মিন বাইনি ফারথিন ওয়া দামিন) শব্দবন্ধটি একটি গুরুতর শারীরস্থানিক সমস্যাকে সামনে আনে। শারীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, পরিপাকতন্ত্রের ভেতরের অর্ধপাচিত খাদ্যবস্তু বা বর্জ্যধর্মী উপাদান একটি নালীপথে থাকে; অন্যদিকে রক্ত থাকে সংবহনতন্ত্রে, যা সারা শরীরে পুষ্টি, অক্সিজেন এবং নানা উপাদান বহন করে। এই দুই ব্যবস্থা আলাদা, তাদের কাজও আলাদা। দুধ উৎপাদন কোনো ‘পরিশোধন’ বা ছাঁকনি-প্রক্রিয়া নয় যেখানে ফারস ও রক্তের মাঝখান থেকে দুধ আলাদা করে নেওয়া হয়। বরং দুধ তৈরি হয় স্তন্যগ্রন্থির এলভিওলার কোষে (Alveolar cells), যেখানে রক্তবাহিত গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে নতুন জৈব-রাসায়নিক তরল তৈরি হয়। আয়াতের ভাষা এবং প্রাচীন তাফসিরগুলোর ব্যাখ্যা এমন এক প্রাক-বৈজ্ঞানিক ধারণার দিকে নির্দেশ করে, যেখানে পশুর পেটের ভেতরে খাদ্য, রক্ত, বর্জ্য ও দুধকে একই অভ্যন্তরীণ বণ্টন-প্রক্রিয়ার অংশ বলে কল্পনা করা হয়েছে [1]।

দুগ্ধ উৎপাদন ও বর্জ্য নিষ্কাশনের তুলনামূলক শারীরবৃত্তীয় ছক
| প্রক্রিয়ার ধাপ | সংশ্লিষ্ট অঙ্গ ও স্থান | উপাদানের প্রকৃতি | বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা |
| পরিপাক ও শোষণ | পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র | খাদ্যসার, অর্ধপাচিত খাদ্য ও অপাচ্য অংশ | খাদ্য ভেঙে পুষ্টি উপাদান অন্ত্রের প্রাচীর দিয়ে রক্তে শোষিত হয়; অপাচ্য অংশ বর্জ্যে পরিণত হয়। |
| পরিবহন | রক্তবাহিকা | অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ, ফ্যাটি অ্যাসিড | রক্ত দুধ বহন করে না; দুধ তৈরির কাঁচামাল বহন করে। |
| সংশ্লেষণ (Synthesis) | স্তন্যগ্রন্থি (Mammary Glands) | ল্যাকটোজ, কেসিন, মিল্ক ফ্যাট | স্তন্যগ্রন্থির কোষ রক্ত থেকে উপাদান নিয়ে দুধ তৈরি করে। |
| বর্জ্য নিষ্কাশন | পরিপাকতন্ত্র, বৃহদান্ত্র ও মলাশয় | অপাচ্য খাদ্য বা গোবর | এটি পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্য; দুধ তৈরির কাঁচামাল নয়। |
প্রাক-আধুনিক তাফসির এবং মধ্যযুগীয় শারীরস্থানিক ভ্রান্তি
কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় তাফসিরকারকগণ যে বিবরণ দিয়েছেন, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁরা এই বর্ণনাকে কেবল কাব্যিক রূপক হিসেবে নয়, বরং বাস্তব শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হিসেবেই বুঝেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ইবনে আব্বাসের নামে প্রচলিত ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে তাফসীরে জালালাইনে বলা হয়েছে, পশু যখন ঘাস খায়, তা পাকস্থলীতে জমা হয় এবং পাকস্থলী তা ‘সিদ্ধ’ বা পরিপাক করে। এরপর যকৃত এই মিশ্রণকে তিন ভাগে ভাগ করে: রক্ত যায় রগের দিকে, দুধ যায় স্তনের দিকে, আর অবশিষ্ট অংশ গোবর হিসেবে থেকে যায়। এই ব্যাখ্যা আধুনিক শারীরবিদ্যার দৃষ্টিতে সরাসরি ভুল।
এই ‘বণ্টন তত্ত্ব’ বা ‘Sorting Mechanism’ আধুনিক Physiology-র সম্পূর্ণ বিপরীত। যকৃত পুষ্টি বিপাক, গ্লাইকোজেন সঞ্চয়, প্লাজমা-প্রোটিন উৎপাদন, পিত্ত তৈরি ও detoxification-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে; কিন্তু এটি পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্যধর্মী উপাদান থেকে দুধ আলাদা করে স্তনে পাঠানোর কোনো ছাঁকনি নয়। দুধের মূল সংশ্লেষণ ঘটে স্তন্যগ্রন্থির কোষে। তাই তাফসিরকারীদের এই ব্যাখ্যা কোনো অলৌকিক বৈজ্ঞানিক সত্য নয়; এটি প্রাক-আধুনিক শারীরবিদ্যার সীমাবদ্ধতা ও ভুল অনুমানের দলিল।
| বিষয় | প্রাচীন তাফসিরের দাবি | আধুনিক বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা |
| উৎপাদন প্রক্রিয়া | পাকস্থলীতে খাদ্য সিদ্ধ/পরিপাক হওয়ার পর যকৃত দ্বারা পৃথকীকরণ। | স্তন্যগ্রন্থির এলভিওলার কোষে রক্তবাহিত পুষ্টি থেকে নতুন সংশ্লেষণ। |
| যকৃতের ভূমিকা | রক্ত, দুধ ও গোবরকে আলাদা আলাদা গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া। | বিপাকীয় কাজ, পুষ্টি-প্রক্রিয়াকরণ, পিত্ত উৎপাদন ও detoxification; দুধ পৃথকীকরণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। |
| দুধের উৎস | পাকস্থলীর ভেতরকার খাদ্য-মিশ্রণ থেকে আলাদা হওয়া। | স্তন্যগ্রন্থির কোষে জটিল জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদন। |
| ফারস/বর্জ্যের অবস্থান | দুধ ও রক্ত পৃথক হওয়ার পর অবশিষ্ট বর্জ্য। | অপাচ্য খাদ্য পরিপাকতন্ত্রে অগ্রসর হয়ে বৃহদান্ত্রে মল/গোবররূপে গঠিত হয়; দুধ তৈরির সরাসরি উপাদান নয়। |
আসুন কোরআনের আয়াতটি পড়ি [2] –
তোমাদের জন্য গবাদি পশুতেও অবশ্যই শিক্ষা নিহিত আছে। তোমাদেরকে পান করাই ওদের পেটের গোবর আর রক্তের মাঝ থেকে বিশুদ্ধ দুগ্ধ যা পানকারীদের জন্য খুবই উপাদেয়।
— Taisirul Quran
অবশ্যই (গৃহপালিত) চতুস্পদ জন্তুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে; ওগুলির উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য হতে তোমাদেরকে আমি পান করাই বিশুদ্ধ দুগ্ধ, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর নিশ্চয় চতুষ্পদ জন্তুতে রয়েছে তোমাদের জন্য শিক্ষা। তার পেটের ভেতরের গোবর ও রক্তের মধ্যখান থেকে তোমাদেরকে আমি দুধ পান করাই, যা খাঁটি এবং পানকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যকর।
— Rawai Al-bayan
আর নিশ্চয় গবাদি পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। তার পেটের গোবর ও রক্তের মধ্য থেকে [১] তোমাদেরকে পান করাই বিশুদ্ধ দুধ, যা পানকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যকর।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই বিষয়ে তাফসীরে জালালাইনে যা বলা আছে আসুন সেটি পড়ে নিই [3] –
গোবর ও রক্তের মাঝখান দিয়ে পরিষ্কার দুধ বের করা সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, জন্তুর ভক্ষিত ঘাস তার পাকস্থলীতে একত্রিত হলে পাকস্থলী তা সিদ্ধ করে। পাকস্থলীর এই ক্রিয়ার ফলে খাদ্যের বিষ্ঠা নিচে বসে যায় এবং দুধ উপরে থেকে যায়। দুধের উপরে থাকে রক্ত। এরপর যকৃত এই তিন প্রকার বস্তুকে পৃথকভাবে তাদের স্থানে ভাগ করে দেয়, রক্ত পৃথক করে রগের মধ্যে চলায় এবং দুধ পৃথক করে জন্তুর স্তনে পৌঁছে দেয়। এখন পাকস্থলীতে শুধু বিষ্ঠা থেকে যায়, যা গোবর হয়ে বের হয়ে আসে।

এবারে দেখে নেয়া যাক, তাফসীরে মাযহারীতে কী বলা হয়েছে, [4]
‘ফী বুতুনিহী’ অর্থ তার বা তাদের উদরস্থিত। এখানে ‘তার’ বা ‘তাদের’ সর্বনামটি সম্পৃক্ত হয়েছে ‘মিম্মা’ কথাটির ‘মা’ অব্যয়ের সঙ্গে। এভাবে কথাটির অর্থ দাঁড়াবে তার বা তাদের উদরে যা আছে। সকল পশু থেকে দুধ পাওয়া যায় না। তাই এখানে মর্মার্থ হবে কিছু সংখ্যক পশুর উদরে। এমতো ক্ষেত্রে ‘তার উদরে’ কথাটির ‘তার’ সর্বনামটি হবে ঋণাত্মক এবং তা সম্পৃক্ত হবে ওই কিছু সংখ্যক দুগ্ধবতী পশুর সঙ্গে। আবার কারো কারো মতে আন’আম অর্থ পশু। আর সে পশু হচ্ছে জিন্সে আম বা এক শ্রেণীর পশু। যদি তাই হয়, তবে ‘তার উদরে’ কথাটির ‘তার’ সর্বনামটি সংশ্লিষ্ট হবে এক শ্রেণীর পশুর সঙ্গে।
‘ফরছ’ অর্থ ওই গলিত পদার্থ, যা সংশ্লিষ্ট থাকে নাড়িভুঁড়িতে। গোবররূপে যা বেরিয়ে আসে, তা কিন্তু ‘ফরছ’ নয়, বর্জ্য। ‘খলিসন্’ অর্থ বিশুদ্ধ। অর্থাৎ যা রক্ত ও পাকস্থলিস্থিত গলিত পদার্থের প্রভাব থেকে মুক্ত। অর্থাৎ দুগ্ধ। লক্ষণীয় যে, রক্ত ও পাকস্থলিস্থিত গলিত পদার্থ থেকে নিঃসৃত হলেও দুধের মধ্যে কিন্তু রক্তের রঙ অথবা ওই গলিত পদার্থের দুর্গন্ধ, কোনোটাই নেই।
‘সাইগান’ অর্থ সুপেয় বা সুস্বাদু, যা অনায়াসে গলাধঃকরণ করা যায়। বাগবী লিখেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, পশুরা ঘাস পাতা ইত্যাদি আহার করে। সেগুলো চলে যায় তাদের পাকস্থলিতে। সেখানে চলে পরিপাক কর্ম। পরিপাক ক্রিয়া সমাপনের পর খাদ্যের নির্যাস হয় ত্রিধাবিভক্ত। উপরের অংশ হয় রক্ত। মধ্যবর্তী অংশ হয় দুগ্ধ। আর তলদেশের অংশ হয় গোবর। অর্থাৎ দুগ্ধ বেরিয়ে আসে রক্ত ও গোবরের মাঝখান থেকে। দুগ্ধ নিঃসরণের এই কাজটি সম্পাদিত হয় যকৃতের তত্ত্বাবধানে। যকৃত রক্ত পরিচালন করে ধমনীতে এবং দুগ্ধ প্রবাহিত করে দুগ্ধাধারে বা ওলানে। আর গোবরকেও রাখে তার যথাস্থানে।
আল্লামা বায়যাবী বলেছেন, হজরত ইবনে আব্বাসের বক্তব্যের মর্মার্থ এই হতে পারে যে, দুধের উপাদান থাকে রক্ত ও গোবরের মাঝামাঝি। উপরের অংশে থাকে রক্ত। আর নিচের অংশে থাকে বর্জ্য। পাকস্থলিতে জারিত খাদ্যের প্রথম অংশ টেনে নেয় যকৃত। বর্জ্য পড়ে থাকে তার নির্দিষ্ট স্থানে। অতঃপর জারিত খাদ্যের প্রথম অংশ পুনরায় পরিপাক হয়। পরের পরিপাককৃত পদার্থকে বলে কিমুস। দেহের যাবতীয় উপাদান এতে বিদ্যমান থাকে। জলীয় অংশই থাকে অধিক। এই জলীয় অংশকে বলে এখলাত। এরপর যকৃত তার পৃথকীকরণ শক্তির প্রভাবে প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি ধমনীর মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয় বৃক্কে। অতঃপর এই মিশ্রণকে প্রয়োজনানুসারে পরিচালনা করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। এভাবেই মহাপ্রাজ্ঞ ও সর্বশক্তিধর আল্লাহর সুব্যবস্থাপনায় প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পায় তাদের প্রয়োজনীয় প্রাপ্য। পুরুষজাতীয় প্রাণীর স্বভাবে থাকে নমনীয়তার ও শীতলতার প্রাধান্য। তাই তাদের খাদ্যমিশ্রণ হয় প্রয়োজনাতিরিক্ত। স্ত্রীজাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অংশটুকু ভ্রূণের লালনপালনার্থে পরিচালিত হয় জরায়ুতে। সন্তান প্রসবের পর ওই অতিরিক্ত খাদ্য পরিচালিত হয় স্তনের দিকে। সেখানে তা জমা হয় দুধরূপে। তখন খাদ্যের নির্যাস পরিপাকতন্ত্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে। এভাবে উৎপাদিত দুগ্ধ, তার পরিমাণ, রঙ, প্রবাহ ইত্যাদি একটি জটিল প্রক্রিয়া বটে। তবে এটা সুনিশ্চিত যে, এর নেপথ্যে রয়েছে মহাকুশলী ও মহাজ্ঞানী আল্লাহর ত্রুটিহীন তত্ত্বাবধান ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনা। যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ অনুসন্ধিৎসা ও বিনয়ী অভিনিবেশ সহকারে বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করবে, সেই কেবল অবগত হতে পারবে এর অভিজ্ঞান। সে তখন মানুষের প্রতি আল্লাহ্পাকের বিপুল অনুগ্রহ ও অকৃপণ দানের কথা স্বীকার না করেই পারবে না।

এবারে দেখা যাক তাফসীরে ইবনে কাসীরে কী বলা হয়েছে, [5]
৬৬. অবশ্যই আন’আমের মধ্যে তোমাদিগের জন্য শিক্ষা আছে। উহাদিগের উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্যে হইতে তোমাদিগকে পান করাই বিশুদ্ধ দুগ্ধ যাহা পানকারীদিগের জন্য সুস্বাদু।
৬৭. এবং খর্জুর বৃক্ষের ফল ও আংগুর হইতে তোমরা মাদক ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করিয়া থাক, ইহাতে অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রহিয়াছে নিদর্শন।
তাফসীর: আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন হে মানব জাতি ! إِنَّ لَكُمْ فِي الْأَنْعَامِ
নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য চতুষ্পদ প্রাণীর মধ্যে- যেমন গরু উট ছাগল ইত্যাদির মধ্যে عبُرَةُ বড় উপদেশ রহিয়াছে। যে মহান সত্তা এই সকল চতুষ্পদ প্রাণী সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁহার শক্তি তাঁহার অনুগ্রহ ও দয়া বুঝিবার জন্য ইহাতে নিদর্শন রহিয়াছে। نُسْقِيكُمْ مِمَّا فِي بُطُونِهِ আয়াতাংশের بُطُونِ এর সর্বনামটি হয় এর অর্থের দিকে ফিরিয়াছে এই কারণে একবচন সর্বনাম ব্যবহার করা হইয়াছে কিংবা তা কে حَيْوَانٌ এর অর্থে বুঝাইয়া উহার প্রতি সর্বনাম ফিরান হইয়াছে। তখন ইবারত এইরূপ হইবে مما 0 2018 RICS نُسْقِيكُمْ مِمَّا فِي بُطُونِهِ هُذَا الْحَيَوَانُ এর فِي بُطُونِهَا উভয় প্রকার ব্যবহার আরবী ব্যাকরণ মাফিক বিশুদ্ধ। যেমন ইরশাদ হইয়াছে كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ উক্ত আয়াতে প্রথম সর্বনামটি এক বচন স্ত্রীলিংগ হিসাবে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং দ্বিতীয় সর্বনামটি এক বচন পুংলিঙ্গে ব্যবহৃত হইয়াছে অথচ উভয় সর্বনাম একই বস্তুর দিকে ফিরিয়াছে। وَإِنِّي مُرْسِلَةٌ إِلَيْهِمُ بِهَدَيَةٍ فَنَاظِرَةٌ بِمَا يَرْجِعُ الْمُرْسَلُونَ فَلَمَّا جَاءَ سُلَيْمَانَ অত্র আয়াতেও هَدِيَّة শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ এবং এর মধ্যে সর্বনামটি পুংলিঙ্গ ব্যবহৃত হইয়াছে। কারণ هَدِيَّة শব্দটি هَدْي অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং এই কারণে এর সর্বনামটি পুংলিঙ্গ ব্যবহৃত হওয়া বিশুদ্ধ হইয়াছে।
14 TO RECO FACE 1 قوله مِن بَيْنَ فَرْثٍ وَدَمٍ لَّبَنًا خَالِصًا তোমাদের পান করিবার জন্য বাহির করেন। অর্থাৎ চতুষ্পদ প্রাণীর উদরে যে রক্ত ও মল থাকে উহা হইতে আল্লাহ তা’আলা সাদা সুস্বাদু ও সুমিষ্ট দুধ পৃথক করিয়া স্তনে পৌঁছাইয়া দেন। রক্ত রগসমূহের মধ্যে প্রবেশ করে পেশাব মূত্রনালীতে এবং মল উহার আপন স্থানে পৌঁছিয়া যায়। অথচ ইহার কোনটি অপরটির সহিত মিশ্রিত হয় না এবং le لَبَنًا خَالِصًا سَائِعًا لِلشَّارِبِينَ ال 96 Gala aa wafice আল্লাহ তা’আলা এমন বিশুদ্ধ দুধ তোমাদের জন্য বাহির করেন যাহা চাবাইবার প্রয়োজন হয় না বরং মুখের মধ্যে প্রবেশ করিবার সাথে সাথেই হলকের নীচে চলিয়া যায়।
আল্লাহ তা’আলা দুধের আলোচনার পরপরই মদের আলোচনা করিয়াছেন যাহা
খেজুর ও আঙ্গুর হইতে প্রস্তুত করা হয়। দুধ পান করিবার মত ইহা পান করিতেও কোন কষ্ট হয় না। তবে মনে রাখিতে হইবে যে, এই আয়াত মদ হারাম হইবার পূর্বে অবতীর্ণ হইয়াছিল। এই কারণেই আল্লাহ তা’আলা এখানে ইহাকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে وَمِنْ ثَمَرَاتِ النَّخِيلِ وَالْأَعْنَابِ تَتَّخِذُونَ

এবারে বুখারীর বাংলা সংস্করণে সংযুক্ত একটি ব্যাখ্যা/টীকা দেখে নেওয়া যাক। এই উদ্ধৃতিটি বুখারীর মূল হাদিস নয়; বরং বাংলা সংস্করণে সংযুক্ত ব্যাখ্যা/টীকা অথবা মাআরেফুল কুরআনের বাংলা ব্যাখ্যা থেকে নেওয়া ব্যাখ্যামূলক অংশ।
৪৯ গোবর ও রক্তের মাঝখান দিয়ে পরিষ্কার দুধ বের করা সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন: জন্তুর ভক্ষিত ঘাস তার পাকস্থলীতে একত্রিত হলে পাকস্থলী তা সিদ্ধ করে। পাকস্থলীর এই ক্রিয়ার ফলে খাদ্যের বিষ্ঠা নীচে বসে যায় এবং দুধ উপরে থেকে যায়। দুধের উপর থাকে রক্ত। এরপর যকৃত এই তিন প্রকার বস্তুকে পৃথকভাবে তাদের স্থানে ভাগ করে দেয়, রক্ত পৃথক করে রগের মধ্যে চালায় এবং দুধ পৃথক করে জন্তুর স্তনে পৌঁছে দেয়। এখন পাকস্থলীতে শুধু বিষ্ঠা থেকে যায়, যা গোবর হয়ে বের হয়ে আসে। (মাআরেফুল কুরআন বাংলা সংস্করণ পৃঃ ৭৪৬)

প্রাচীন এই ব্যাখ্যাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন মানুষ পশুর দেহে পরিপাকতন্ত্রের অর্ধপাচিত খাদ্য/বর্জ্য, রক্ত এবং ওলানে থাকা দুধ দেখতে পেত। এই দৃশ্যমান অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই ধারণা করা হয়েছিল যে, পবিত্র দুধ নিশ্চয়ই রক্ত ও বর্জ্যধর্মী উপাদানের মাঝখান থেকে কোনো বিশেষ প্রক্রিয়ায় আলাদা হয়। এই ধারণাটি মূলত পর্যবেক্ষণভিত্তিক ভুল কার্যকারণ অনুমান। আধুনিক অণুবীক্ষণিক জীববিজ্ঞান, কোষতত্ত্ব এবং স্তন্যগ্রন্থির শারীরবিদ্যার যুগে এই ধারণা অচল। সুতরাং, কোরআনিক আয়াতের ভাষা এবং মধ্যযুগীয় তাফসিরকারকদের আক্ষরিক ব্যাখ্যাগুলো প্রাক-আধুনিক মানুষের সীমিত শারীরবিদ্যাগত জ্ঞানের প্রতিফলন; এগুলো কোনোভাবেই আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দুগ্ধ উৎপাদনঃ প্রাচীন ছাঁকনি-ধারণা বনাম জৈব-রাসায়নিক সংশ্লেষণ
কোরআনের বর্ণনায় দুধকে ‘ফারস ও রক্তের মধ্যবর্তী’ অবস্থা থেকে আসা একটি বিশুদ্ধ পানীয় হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। প্রাচীন তাফসিরকারীরা এই ভাষাকে আরও স্পষ্ট করে এমন এক ‘পরিশোধন’ বা ‘বণ্টন’ ধারণায় রূপ দিয়েছেন, যেখানে খাদ্যনির্যাস, রক্ত, দুধ ও বর্জ্যকে আলাদা করে নির্দিষ্ট স্থানে পাঠানো হয়। কিন্তু আধুনিক প্রাণরসায়ন (Biochemistry) দেখায়, দুধ কোনো পূর্ব-প্রস্তুত তরল নয় যা শরীর কেবল রক্ত বা পরিপাকতন্ত্রীয় বর্জ্য থেকে ছেঁকে বের করে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর দুগ্ধ উৎপাদন প্রক্রিয়া বা Lactogenesis কোনো নিষ্ক্রিয় ছাঁকনি প্রক্রিয়া নয়; এটি স্তন্যগ্রন্থির এলভিওলার এপিথেলিয়াল কোষের ভেতরে ঘটা সক্রিয় সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া। রক্তপ্রবাহ এখানে কাঁচামাল—যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ, ফ্যাটি অ্যাসিড—সরবরাহ করে। দুধের প্রধান উপাদান, যেমন কেসিন (Casein) এবং ল্যাকটোজ (Lactose), রক্তে এই রূপে প্রস্তুত অবস্থায় থাকে না। স্তন্যগ্রন্থির কোষগুলো রক্ত থেকে আসা পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন রাসায়নিক গঠন তৈরি করে। অর্থাৎ, দুধ রক্ত বা পরিপাকতন্ত্রীয় বর্জ্যধর্মী উপাদানের কোনো মধ্যবর্তী নির্যাস নয়; এটি শরীরের একটি বিশেষায়িত অঙ্গের নিজস্ব উৎপাদন।
দুগ্ধ উৎপাদনে স্তন্যগ্রন্থির এই সক্রিয় ভূমিকা প্রাচীন বর্ণনাগুলোকে সরাসরি বাতিল করে। তাফসিরকারীরা যখন দাবি করেন যে যকৃত দুধকে পৃথক করে স্তনে পাঠিয়ে দেয়, তখন তারা কোষীয় পর্যায়ে ঘটে যাওয়া জৈব-রাসায়নিক সংশ্লেষণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ফারস বা পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্যধর্মী উপাদান অন্ত্রের ভেতরের বস্তু; আর দুধ হলো স্তন্যগ্রন্থির এপিথেলিয়াল টিস্যু থেকে নিঃসৃত একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাসায়নিক তরল। এদের মধ্যে দুধ-উৎপাদনগত কোনো সরাসরি সংস্থানগত সংযোগ নেই। ‘ফারস ও রক্তের মধ্যবর্তী স্থান’ বলে যদি কোনো বাস্তব শারীরস্থানিক উৎপাদন-অঞ্চল বোঝানো হয়, তাহলে এমন কোনো অঞ্চল পশুর দেহে নেই। এটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক অনুমাননির্ভর বর্ণনা, যা আধুনিক এনাটমি ও ফিজিওলজির সঙ্গে মেলে না।
যকৃতের ভূমিকা এবং প্রাচীন শারীরবিদ্যার ভ্রান্তি
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় তাফসিরকারীরা কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যকৃতের (Liver) কার্যাবলী সম্পর্কে যে বিবরণ দিয়েছেন, তা তৎকালীন অপূর্ণ শারীরবিদ্যার দলিল। তাফসীরে মাযহারী এবং জালালাইনে ইবনে আব্বাসের সূত্রে দাবি করা হয়েছে যে, পাকস্থলীতে পরিপাক শেষে যকৃত একটি ‘বাছাইকারী যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করে, যা খাদ্যনির্যাসকে তিন ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয় [6]। তাদের মতে, যকৃত রক্তকে ধমনীতে এবং দুধকে ওলানে বা স্তনে প্রবাহিত করে, আর বর্জ্যকে তার নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেয় [7]। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা হেপাটোলজি (Hepatology) অনুযায়ী, যকৃতের এমন কোনো শারীরস্থানিক ক্ষমতা বা নালী নেই যা দুধ নামক কোনো প্রস্তুত তরল সরাসরি স্তন্যগ্রন্থিতে পাঠায়। যকৃত পুষ্টি বিপাক, গ্লাইকোজেন সঞ্চয়, প্লাজমা-প্রোটিন উৎপাদন, পিত্ত তৈরি ও detoxification-সহ বহু কাজ করে। এটি কোনোভাবেই পরিপাকতন্ত্রীয় বর্জ্যধর্মী উপাদান থেকে দুধ ছেঁকে আলাদা করার ফিল্টার নয়।
এই শারীরবৃত্তীয় অসংগতি আরও স্পষ্ট হয় পশুর সংবহনতন্ত্র দেখলে। যকৃত থেকে প্রস্তুত দুধ সরাসরি স্তন্যগ্রন্থিতে পৌঁছানোর কোনো ‘দুধবাহী নালী’ নেই। স্তন্যগ্রন্থি তার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সাধারণ রক্তপ্রবাহ থেকেই সংগ্রহ করে, যেমন শরীরের অন্যান্য অঙ্গ তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে। প্রাচীন তাফসিরকারীরা ‘ফারস ও রক্তের মধ্যবর্তী’ বলতে যা বুঝিয়েছেন, তা কোনো বাস্তব উৎপাদন-অঞ্চল নয়; বরং প্রাক-বৈজ্ঞানিক অনুমান। তাঁরা মনে করতেন, যেহেতু খাদ্যনির্যাস, বর্জ্য, রক্ত এবং দুধ দেহের ভেতরে দেখা যায়, তাই দুধ নিশ্চয়ই এদের কোনো অভ্যন্তরীণ বণ্টন-প্রক্রিয়ায় আলাদা হয় [8]। আধুনিক শারীরস্থান অনুযায়ী, পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্যধর্মী উপাদান এবং স্তন্যগ্রন্থির দুধ-উৎপাদন প্রক্রিয়া একই শারীরস্থানিক রেখায় ঘটে না। দুধ তৈরির স্থান হলো স্তন্যগ্রন্থির কোষ; যকৃত বা পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্যভাণ্ডার নয়।
পর্যবেক্ষণমূলক ভুল এবং প্রাক-আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা
কোরআনের বর্ণনায় যে ‘ফারস ও রক্তের মধ্যবর্তী’ থেকে দুধ আসার কথা বলা হয়েছে, তা প্রাক-আধুনিক মানুষের খালি চোখের পর্যবেক্ষণের একটি নগ্ন উদাহরণ। তৎকালীন মানুষের কাছে অণুবীক্ষণিক যন্ত্রপাতি, কোষতত্ত্ব (Cell Theory), অন্ত্রের শোষণপ্রক্রিয়া, রক্তসংবহন এবং স্তন্যগ্রন্থির কোষীয় সংশ্লেষণ সম্পর্কে কোনো আধুনিক জ্ঞান ছিল না। যখন একটি পশু জবাই করা হতো, তখন একজন পর্যবেক্ষক তিনটি জিনিস সরাসরি দেখতে পেতেন: পরিপাকতন্ত্রের ভেতরের অর্ধপাচিত খাদ্য/বর্জ্য, শরীরের রক্ত, এবং ওলানে থাকা দুধ। এই তিনটি দৃশ্যমান উপাদান দেখে তারা ভুল কার্যকারণ সম্পর্ক কল্পনা করেছিল। তাদের কাছে মনে হয়েছিল, দুধ নিশ্চয়ই রক্ত ও বর্জ্যধর্মী উপাদানের মধ্য থেকে কোনো বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ হয়ে বের হয় [9]। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক ভুল কার্যকারণ অনুমান।
এই ভুল ধারণা কেবল আরবের মরুভূমির কোনো বিচ্ছিন্ন লোকবিশ্বাস ছিল না; এটি প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয়, গ্রিক, ইহুদি-রাব্বানিক এবং পরবর্তী মধ্যযুগীয় চিকিৎসা-ধারণার বৃহত্তর পরিবারেই পড়ে। প্রাচীন গ্রিক শারীরবিদ্যায় খাদ্য, রক্ত, বীর্য, ঋতুরক্ত, দুধ—এসবকে শরীরের ভেতরকার একধরনের রূপান্তরিত পদার্থ হিসেবে দেখা হতো। এর কেন্দ্রে ছিল ‘coction’ বা শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপে খাদ্য ও রসের পাক/রূপান্তর ধারণা। এরিস্টটল সরাসরি বলেছিলেন, দুধ হলো “concocted blood”—অর্থাৎ দেহের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় পাকানো বা রূপান্তরিত রক্ত। তিনি এটিকে পুঁজ বলেননি, বরং রক্তের এক প্রক্রিয়াজাত রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ দুধকে রক্ত থেকে রূপান্তরিত তরল মনে করার ধারণা কোরআনের বহু আগেই গ্রিক জৈবতত্ত্বে উপস্থিত ছিল।
গ্যালেনীয় চিকিৎসাতত্ত্ব এই ভুল কাঠামোকে আরও পদ্ধতিগত করে তোলে। গ্যালেনের মতে, খাদ্য দেহে প্রবেশ করে রূপান্তরিত হয়, রক্ত দেহের প্রধান পুষ্টিবাহী পদার্থ হিসেবে কাজ করে, এবং যকৃত খাদ্য-রস, রক্ত ও শরীরের রসসমূহের প্রক্রিয়াকরণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। গ্যালেনীয় ও হিউমোরাল চিকিৎসায় যকৃতকে রক্ত-উৎপাদন ও পুষ্টি-বণ্টনের প্রধান অঙ্গ হিসেবে দেখা হতো; শরীরের নানা অঙ্গ যেন রক্ত ও খাদ্যরস থেকে নিজেদের উপযোগী পদার্থ তৈরি বা গ্রহণ করে—এমন ধারণা ছিল প্রচলিত। গ্যালেনের লেখায় খাদ্য রক্তে রূপান্তরিত হওয়ার ধারণা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়; এই ধরনের শারীরবিদ্যা আধুনিক রক্তসংবহন, অন্ত্রের শোষণ, কোষীয় বিপাক এবং স্তন্যগ্রন্থির সংশ্লেষণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
ইহুদি-রাব্বানিক ঐতিহ্যেও একই ধরনের রক্ত-দুধ রূপান্তর ধারণা দেখা যায়। তালমুদে এমন আলোচনা আছে যেখানে দুধকে রক্ত থেকে উৎপন্ন বা রূপান্তরিত পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে; এমনকি গর্ভধারণ ও স্তন্যদানের প্রসঙ্গে ঋতুরক্ত বন্ধ হয়ে দুধে রূপান্তরিত হয়—এই ধারণাও সেখানে দেখা যায়। অর্থাৎ দুধকে দেহের রক্তজাত বা রসজাত রূপান্তর হিসেবে দেখার বিশ্বাস গ্রিক চিকিৎসাতত্ত্বে যেমন ছিল, তেমনি ইহুদি ধর্মীয়-আইনি আলোচনাতেও ছিল।
এইসব প্রাচীন ধারণা পরে সিরিয়াক, পারসিক ও আরবি জ্ঞানজগতে আরও প্রবাহিত হয়। গ্যালেনের বহু রচনা গ্রিক থেকে সিরিয়াকে অনূদিত হয়েছিল, এবং সিরিয়াকভাষী খ্রিস্টান পণ্ডিতরা গ্রিক চিকিৎসা-ধারণা পূর্বাঞ্চলীয় জগতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিলেন। ষষ্ঠ শতাব্দীতেই গ্যালেনীয় চিকিৎসা সিরিয়াক বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল; পরে আব্বাসীয় যুগে তা আরবিতে বিশাল আকারে অনূদিত ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়। কোরআনের সময়কার আরব সমাজ কোনো জ্ঞান-শূন্য দ্বীপ ছিল না; বাইজান্টাইন, সিরিয়াক-খ্রিস্টান, ইহুদি, পারসিক ও গ্রিক-প্রভাবিত চিকিৎসা-ধারণা আরব উপদ্বীপের চারপাশের জ্ঞানজগতে প্রবাহিত ছিল। তাই কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতকে কোনো অলৌকিক আধুনিক জীববিজ্ঞান নয়, বরং সেই প্রাক-আধুনিক late antique জ্ঞানতাত্ত্বিক আবহের ভাষা হিসেবে পড়াই যুক্তিসঙ্গত।
এখানে সরাসরি কোনো একক গ্রিক বই থেকে শব্দে-শব্দে নকল প্রমাণ করা জরুরি নয়। আসল বিষয় হলো ধারণাগত সাদৃশ্য। গ্রিকরা বলেছিল দুধ রক্তের রূপান্তর; গ্যালেনীয় চিকিৎসা বলেছিল খাদ্য-রস, রক্ত ও যকৃতের মধ্য দিয়ে শরীরের পুষ্টি-বণ্টন ঘটে; রাব্বানিক ঐতিহ্য দুধকে রক্তজাত পদার্থ হিসেবে দেখেছিল; আর কোরআন বলছে, পশুর উদরের ভেতর ফারস ও রক্তের মধ্য থেকে বিশুদ্ধ দুধ আসে। এই সব ধারণার কেন্দ্রে একই ভুল: দুধকে স্তন্যগ্রন্থির কোষীয় সংশ্লেষণ হিসেবে না দেখে দেহের ভেতরকার খাদ্যরস, রক্ত, বর্জ্য ও যকৃত-নিয়ন্ত্রিত বণ্টনের ফল হিসেবে কল্পনা করা। কোরআন এই ভুল প্রাক-বৈজ্ঞানিক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেনি; বরং একই জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার ভেতরেই কথা বলেছে।
এই প্রাক-বৈজ্ঞানিক ধারণাটি ‘পবিত্রতা বনাম অপবিত্রতা’ ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক বিস্ময় তৈরি করেছে। তাফসিরগুলোতে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে যে, রক্ত ও গোবরের মতো রঙ, গন্ধ ও প্রকৃতিতে ভিন্ন বস্তুর মাঝখান থেকে কীভাবে ‘বিশুদ্ধ’ দুধ বেরিয়ে আসে, তা একটি নিদর্শন [10]। ইবনে কাসীরের ইংরেজি তাফসিরেও একই কাঠামো দেখা যায়: খাদ্য পাকস্থলীতে হজম হওয়ার পরে রক্ত শিরায় যায়, দুধ ওলানে যায়, মল তার পথে যায়—এমন এক বণ্টনধর্মী ব্যাখ্যা। এটি ঠিক সেই পুরনো শারীরবিদ্যাগত ভুল, যেখানে খাদ্য, রক্ত, দুধ ও বর্জ্যকে একই অভ্যন্তরীণ ছাঁকনি/বণ্টন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
কিন্তু শারীরবৃত্তীয়ভাবে দুধ রক্ত ও বর্জ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় না। রক্ত দুধের কাঁচামাল বহন করে, ঠিক যেমন শরীরের অন্য কোষে পুষ্টি বহন করে। চোখের পানি, ঘাম বা লালাও রক্তবাহিত উপাদান ব্যবহার করে তৈরি হয়; কিন্তু কেউ বলে না যে চোখের পানি রক্ত ও ফারসের মাঝখান থেকে আসে। কোরআনের এই নির্দিষ্ট বর্ণনা এবং প্রাচীন তাফসিরগুলোর আক্ষরিক ব্যাখ্যা প্রমাণ করে, দুধ উৎপাদন সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল বাহ্যিক পর্যবেক্ষণনির্ভর, প্রাচীন রসতত্ত্ব ও গ্যালেনীয়-ধাঁচের ভুল শারীরবিদ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং কোষীয় জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সরাসরি ভুল।
উপসংহারঃ বৈজ্ঞানিক সত্যের বিজয় ও বিশ্বাসের সংকট
সার্বিক বিশ্লেষণের পর দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, গবাদি পশুর দুগ্ধ উৎপাদন সম্পর্কে কোরআনের বর্ণনাটি কোনো অলৌকিক বা গূঢ় বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। এটি প্রাক-আধুনিক মানুষের স্থূল পর্যবেক্ষণ এবং সীমিত শারীরবিদ্যাগত ধারণার লিখিত রূপ। আধুনিক জীববিজ্ঞান স্তন্যগ্রন্থির কোষীয় কার্যকলাপ, হরমোনের প্রভাব, রক্তবাহিত পুষ্টি এবং প্রোটিন সংশ্লেষণের ধাপগুলো স্পষ্ট করেছে। সেই জ্ঞানের আলোকে ‘ফারস ও রক্তের মধ্যবর্তী’ থেকে দুধ আসার ধারণাটি শারীরস্থানিক রূপকথা ছাড়া কিছু নয়। দুধ কোনো পরিশোধিত বর্জ্য নয়; এটি রক্তবাহিত পুষ্টি উপাদানকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে স্তন্যগ্রন্থির বিশেষায়িত কোষে তৈরি হওয়া জৈব-রাসায়নিক পণ্য। এই প্রক্রিয়ায় পরিপাকতন্ত্রের বর্জ্যধর্মী উপাদান দুধের কাঁচামাল নয়, এবং যকৃত দুধকে ছেঁকে স্তনে পাঠায় না।
পরিশেষে বলা যায়, অন্ধ বিশ্বাস প্রমাণভিত্তিক চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং মানুষকে প্রাচীন ভুল ধারণার বৃত্তে আটকে রাখে। কোরআনের ১৬:৬৬ আয়াতের প্রাক-বৈজ্ঞানিক বর্ণনা এবং তার প্রাচীন তাফসিরগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মগ্রন্থগুলো তাদের সময়ের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা বহন করে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যখন এই ধরনের দাবিগুলো ভেঙে পড়ে, তখন সেগুলো রক্ষার জন্য পরবর্তী ব্যাখ্যাগত অজুহাত বানানো নয়, বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই যুক্তিবাদিতার পরিচয়। জ্ঞান স্থির নয়; জ্ঞান প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়। আর সেই প্রমাণের দাড়িপাল্লায় কোরআনের এই শারীরবৃত্তীয় বর্ণনাটি আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে একটি স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক অসংগতি।
তথ্যসূত্রঃ
- কোরআন, সূরা নাহল, আয়াত ৬৬ ↩︎
- সূরা নাহল, আয়াত ৬৬ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ৩য় খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৯৫ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫৪১, ৫৪২ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২, ১২৩ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ৩য় খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৯৫ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫৪১-৫৪২ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২-১২৩ ↩︎
- সূরা নাহল, আয়াত ৬৬ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩ ↩︎

