সারসংক্ষেপ
ধ্রুপদী একেশ্বরবাদী ধর্মদর্শনে ঈশ্বরকে পরম, অমুখাপেক্ষী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়—এমন এক সত্তা, যার অস্তিত্ব, সত্তাগত পূর্ণতা বা অনাদি গুণ কোনো সৃষ্ট ব্যক্তি, সমাজ, ঘটনা বা প্রয়োজনের দ্বারা নির্ধারিত নয়। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে এই অমুখাপেক্ষিতাকে ‘গিনা’ বলা হয়। একই সঙ্গে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকীদায় কোরআনকে আল্লাহর কালাম, তাঁর অসৃষ্ট ও অনাদি সিফাত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কোরআনের প্রকৃত বিষয়বস্তু মানুষবিচ্ছিন্ন কোনো বিমূর্ত গুণ নয়; এর বিশাল অংশ মানুষের জন্য হিদায়াত, মানুষের প্রশ্নের উত্তর, মানুষের জন্য আইন, মানুষের অপরাধের শাস্তি, মানুষের বিবাহ-তালাক-উত্তরাধিকার, মানুষের যুদ্ধ ও সামাজিক বিরোধ, এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়া।
কোরআনের কোনো নির্দিষ্ট আয়াত যদি নির্দিষ্ট মানুষ, প্রশ্ন বা ঘটনার কারণে সেই রূপ ধারণ করে, তবে সেই আয়াতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানবীয় বাস্তবতা থেকে স্বাধীন নয়। আবু লাহাব না থাকলে তাকে উদ্দেশ করে বক্তব্য থাকত না; কোনো প্রশ্ন না করা হলে সেই প্রশ্নের উত্তর একইভাবে থাকত না; নির্দিষ্ট যুদ্ধ, বিবাহ, বিরোধ বা সামাজিক সমস্যা না ঘটলে সেগুলোর প্রতিক্রিয়ায় নাজিল হওয়া নির্দিষ্ট বক্তব্যও একই থাকত না। অর্থাৎ কোরআনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্ট মানুষ ও সৃষ্ট ইতিহাসের দ্বারা নির্ধারিত।
কোরআন যদি আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, আর সেই সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু যদি মানুষের অস্তিত্ব, মানুষের প্রশ্ন, মানুষের আচরণ ও মানবীয় ঘটনার ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে আল্লাহর একটি অনাদি সিফাত সৃষ্ট মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা কেবল তাঁর অস্তিত্বের কারণ নিয়ে করা একটি দাবি হয়ে থাকে; তাঁর অনাদি গুণের বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে সেই অমুখাপেক্ষিতা আর অক্ষত থাকে না। এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় যুক্তি এখানেই।
এই প্রবন্ধে ইসলামি সিফাৎ-তত্ত্ব, কোরআনের অনাদিত্বের দাবি এবং কোরআনের বাস্তব বিষয়বস্তুকে পাশাপাশি রাখা হবে। আল্লাহকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী সত্তা বলা এবং একই সঙ্গে মানুষ ও মানবীয় ঘটনার দ্বারা নির্ধারিত একটি কোরআনকে তাঁর অনাদি সিফাত বলা পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোরআনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষনির্ভর হলে সেই নির্ভরতা আল্লাহর অনাদি সিফাতের মধ্যেই প্রবেশ করে; আর সিফাত যদি আল্লাহর সত্তাগত গুণ হয়, তবে এই নির্ভরতাকে আল্লাহর থেকে আলাদা করে রাখা যায় না।
ভূমিকা: পরম সত্তা ও সম্পর্কের সংকট
ধর্মীয় দর্শনে ঈশ্বরের পরমত্বের সঙ্গে অমুখাপেক্ষিতা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। আল্লাহকে এমন এক সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়, যার অস্তিত্ব অন্য কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করে না; যিনি ‘ওয়াজিবুল ওয়াজুদ’—অর্থাৎ যাঁর অস্তিত্বের জন্য কোনো বাহ্যিক শর্ত, কারণ বা সৃষ্ট বাস্তবতা দরকার হয় না। ধ্রুপদী একেশ্বরবাদে অ্যাকুইনাস ও ইবন সিনার মতো দার্শনিকের কাজেও এই ধারণা কেন্দ্রীয়। এর অনিবার্য অর্থ হলো, সৃষ্টিজগৎ থাকুক বা না থাকুক, মানুষ সৃষ্টি হোক বা না হোক, মানুষের ইতিহাস যে রূপই ধারণ করুক—ঈশ্বরের সত্তাগত পূর্ণতা ও অনাদি গুণ কোনো সৃষ্ট বাস্তবতার দ্বারা নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়।
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে কোরআনকে আল্লাহর ‘কালাম’ বা বাণী এবং তাঁর অসৃষ্ট, অনাদি সিফাত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু কোরআন কোনো মানুষবিচ্ছিন্ন, বিষয়শূন্য বা কেবল বিমূর্ত “কথা বলার ক্ষমতা” নয়; আমাদের সামনে থাকা কোরআন একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর গ্রন্থ। এটি মানুষকে হিদায়াত দেয়, মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয়, মানুষের জন্য আইন ঘোষণা করে, মানুষের অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করে, মানুষের যুদ্ধ, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, দাসত্ব, পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক সমস্যার প্রতিক্রিয়া জানায়। অসংখ্য আয়াত নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে সেই ব্যক্তি বা ঘটনা বাদ দিলে আয়াতটির নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুও আর একই থাকে না।
যদি এই নির্দিষ্ট কোরআন আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, তবে কোরআনের মানুষনির্ভর বিষয়বস্তু আল্লাহর অনাদি সিফাতেরই বিষয়বস্তু। আর যে সিফাতের নির্দিষ্ট রূপ মানুষের অস্তিত্ব, প্রশ্ন, অপরাধ, যুদ্ধ ও সামাজিক ঘটনার ওপর নির্ভর করে, সেই সিফাতকে সৃষ্ট মানুষ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলা যায় না। এখানেই আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতার দাবির সঙ্গে কোরআনের অনাদিত্বের দাবির সংঘর্ষ।
Divine Aseity
আল্লাহ এমন এক সত্তা যিনি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অস্তিত্বের জন্য অন্য কারো বা কিছুর ওপর নির্ভরশীল নন।
Eternity of the Quran
ইসলামি আকীদা অনুযায়ী কোরআন আল্লাহর একটি অনাদি গুণ (সিফাত), যা কোনো সৃষ্টির মতো নশ্বর বা সৃজিত নয়।
কোরআন আদি অনন্ত শাশ্বত চিরন্তন (ভিডিও)
কোরআনকে সৃষ্টি নয়, বরং আল্লাহর কালাম ও অনাদি সিফাত হিসেবে যে আকীদা প্রচার করা হয়, তার কয়েকটি সরাসরি বক্তব্য শুরুতেই শোনা যাক। এই দাবিটিই পরবর্তী যুক্তির ভিত্তি, কারণ কোরআন যদি সৃষ্ট কোনো গ্রন্থ না হয়ে আল্লাহর নিজস্ব অনাদি গুণ হয়, তাহলে কোরআনের বিষয়বস্তুর নির্ভরতা সরাসরি সেই অনাদি গুণের নির্ভরতার প্রশ্নে পরিণত হয়।
কোরআন সচেতন সত্তা এবং সাক্ষ্যদাতা
হাদিসে কোরআনকে নিছক নিষ্ক্রিয় শব্দ, লিখিত অক্ষর বা বিষয়শূন্য কোনো বিমূর্ত ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না। কিয়ামতের দিনে কোরআন “আসবে”, পাঠকের পক্ষে “সুপারিশ করবে”, “হুজ্জত করবে”, আল্লাহকে সম্বোধন করে কথা বলবে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য আবেদন করবে এবং তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি চাইবে। কথা বলা, কোনো ব্যক্তির পক্ষে দাবি উত্থাপন করা, একটি ফল অর্জনের উদ্দেশ্যে আবেদন করা এবং সেই আবেদনের পরে আরও কিছু চাওয়া—এসব বর্ণনার মধ্যে সচেতন ও উদ্দেশ্যসম্পন্ন কার্যকারিতা রয়েছে। হাদিসের ঘটনাবর্ণনায় কোরআন তাই একটি কার্যক্ষম সত্তার ভূমিকায় উপস্থিত, যে মানুষের অবস্থা সম্পর্কে বক্তব্য দিতে পারে এবং আল্লাহর কাছে তার পক্ষে আবেদন করতে পারে।
তিরমিযীর বর্ণনাটিতে এই সচেতন কার্যকারিতা বিশেষভাবে স্পষ্ট। কোরআন প্রথমে বলে, “হে প্রভু! ওকে অলংকৃত করুন”; মানুষটিকে সম্মানের মুকুট পরানো হলে আবার বলে, “হে প্রভু! ওকে আরও অলংকার প্রদান করুন”; এরপর তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়। এখানে একই আবেদন যান্ত্রিকভাবে পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে না। একটি ফলের পরে আরেকটি ফল এবং শেষে সন্তুষ্টি চাওয়ার ধারাবাহিকতা বর্ণিত হয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা, তার জন্য পুরস্কার চাওয়া এবং পর্যায়ক্রমে আবেদন করা—এসবই ওই বর্ণনায় কোরআনের সচেতন ভূমিকার ভিত্তি। কোরআনকে এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হাদিসের নিজস্ব বক্তব্যই যথেষ্ট; এই সিদ্ধান্তের জন্য পাঠ্যের বাইরে থেকে কোনো নতুন চরিত্র কল্পনা করতে হচ্ছে না [3]।
উদ্ধৃত হাদিসগুলোতে এই ঘটনাকে রূপক বলে চিহ্নিত করা হয়নি। কোরআনের আগমন, সুপারিশ, আবেদন এবং আল্লাহর সাড়া দেওয়াকে কিয়ামতের ঘটনাবর্ণনার মধ্যেই রাখা হয়েছে। ফলে বর্ণনাটি বিশ্লেষণের শুরুতেই এসব কার্যকলাপকে নিছক অলংকার বলে সরিয়ে দেওয়ার পাঠ্যগত ভিত্তি এখানে নেই। বিশেষ করে যখন পুরস্কার, জান্নাত, জাহান্নাম ও আল্লাহর বিচারকে বাস্তব পরকালীন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তখন একই ঘটনাপ্রবাহে কোরআনের কথা বলা ও আবেদন করার বর্ণনাটিকেও তার প্রকাশিত অর্থে পরীক্ষা করতে হবে। এই হাদিসগুলোর বর্ণনার ভেতরে কোরআন একজন সচেতন আবেদনকারীর ভূমিকা পালন করছে—এটি পাঠ্যের সরাসরি বৈশিষ্ট্য।
এর ফলে আল্লাহ ও তাঁর সিফাতের সম্পর্ক নিয়ে একটি পৃথক প্রশ্ন তৈরি হয়। একদিকে কোরআনকে আল্লাহর নিজস্ব অনাদি ও অসৃষ্ট সিফাত বলা হচ্ছে; অন্যদিকে সেই কোরআনই আল্লাহকে “হে প্রভু” বলে সম্বোধন করছে এবং তৃতীয় একজন মানুষের পক্ষে আবেদন জানাচ্ছে। এই কথোপকথনে আল্লাহ আবেদন গ্রহণকারী ও পুরস্কারদাতা; কোরআন আবেদনকারী; মানুষ সেই আবেদনের সুবিধাভোগী। অর্থাৎ ঘটনাবর্ণনায় তিনটি পৃথক ভূমিকা রয়েছে। আল্লাহর নিজস্ব সিফাত কীভাবে তাঁর সামনে আবেদনকারী হিসেবে উপস্থিত হয়, কীভাবে তাঁকে সম্বোধন করে এবং কীভাবে তাঁর কাছে অন্য একজনের জন্য সিদ্ধান্ত চায়—সিফাতের পরিচয় নির্ধারণের সময় এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। “আল্লাহর অনাদি গুণ” বলা এবং “আল্লাহর কাছে আবেদনকারী সচেতন সত্তা” হিসেবে কার্যকলাপ বর্ণনা করা—এই দুই পরিচয়ের সত্তাগত সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা জরুরি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, হাদিসের এই সচেতন কার্যকারিতাও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোরআন যে ব্যক্তির জন্য আবেদন করছে, তার পরিচয় হচ্ছে কোরআন-পাঠকারী মানুষ; যে পুরস্কার চাওয়া হচ্ছে, তা ওই মানুষের পুরস্কার; যে সন্তুষ্টি চাওয়া হচ্ছে, তা ওই মানুষের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি। ফলে মানুষ এখানে শুধু কোরআনের বক্তব্যের শ্রোতা নয়, তার পরকালীন কর্মকাণ্ডেরও নির্দিষ্ট লক্ষ্য। গ্রন্থের হিদায়াতমূলক পরিচয় এবং হাদিসে বর্ণিত সুপারিশকারীর পরিচয়—উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক কোরআনের কার্যকারিতা নির্ধারণ করছে। এই সম্পর্ককে অনাদি সিফাতের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হচ্ছে, সেটিই পরবর্তী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নিচের হাদিসগুলোতে কোরআনের আগমন, সুপারিশ, মানুষের পক্ষে বক্তব্য এবং আল্লাহকে সম্বোধন করার বর্ণনা সরাসরি দেখা যায়।
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪১০) আবূ উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, কিয়ামতের দিন কুরআন, তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আগমন করবে।
(মুসলিম ১৯১০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ উমামাহ্ বাহিলী (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪১১) জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন এই কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে।
(ইবনে হিব্বান ১২৪, সহীহ তারগীব ১৪২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪১২) আবু উমামাহ বাহেলী (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে শুনেছি, তিনি বলেছেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে। তোমরা দুই জ্যোতির্ময় সূরা; বাক্বারাহ ও আ-লে ইমরান পাঠ কর। কারণ উভয়েই মেঘ অথবা উড়ন্ত পাখীর ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়ে তাদের পাঠকারীদের হয়ে (আল্লাহর নিকট) হুজ্জত করবে। তোমরা সূরা বাক্বারাহ পাঠ কর। কারণ তা গ্রহণ করায় বরকত এবং বর্জন করায় পরিতাপ আছে। আর বাতেলপন্থীরা এর মোকাবেলা করতে পারে না। মুআবিয়াহ বিন সাল্লাম বলেন, আমি শুনেছি যে, বাতেলপন্থীরা অর্থাৎ যাদুকরদল।
(মুসলিম ১৯১০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ উমামাহ্ বাহিলী (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪২৬) আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন কুরআন উপস্থিত হয়ে বলবে, হে প্রভু! ওকে (কুরআন পাঠকারীকে) অলংকৃত করুন। সুতরাং ওকে সম্মানের মুকুট পরানো হবে। পুনরায় কুরআন বলবে, হে প্রভু! ওকে আরো অলংকার প্রদান করুন। সুতরাং ওকে সম্মানের পোশাক পরানো হবে। অতঃপর বলবে, হে প্রভু! আপনি ওর উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। সুতরাং আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। অতঃপর তাকে বলা হবে, তুমি পাঠ করতে থাক আর মর্যাদায় উন্নীত হতে থাক। আর প্রত্যেকটি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে সওয়াব বৃদ্ধি করা হবে।
(তিরমিযী ২৯১৫, হাকেম ২০২৯, দারেমী ৩৩১১, সহীহুল জামে ৮০৩০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
কোরআন শাশ্বত ও চিরন্তন
তাফসীরে জালালাইনের উদ্ধৃত আলোচনায় কোরআনকে সৃষ্টি নয়; বরং চিরন্তন, শাশ্বত এবং আল্লাহর বাণী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে [4]। এই দাবির দার্শনিক গুরুত্ব খুব সরাসরি: কোরআন যদি আল্লাহর কালাম হিসেবে তাঁর অনাদি সিফাত হয়, তাহলে কোরআনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে আল্লাহর সিফাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল একটি বাহ্যিক, পরবর্তী সৃষ্টি হিসেবে দেখানো যায় না। মানুষের জন্য হিদায়াত, মানুষের জন্য আইন, নির্দিষ্ট মানুষের প্রতি তিরস্কার এবং নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়া—এসব তখন সেই অনাদি কালামেরই বিষয়বস্তু হিসেবে দাঁড়ায়।
কুরআন সৃষ্ট নয়; বরং চিরন্তন ও শাশ্বতঃ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আকিদা হলো, কুরআন সৃষ্ট নয়; বরং চিরন্তন ও শাশ্বত। কারণ, কুরআন আল্লাহর কালাম ও বাণী। আর আল্লাহর ন্যায় আল্লাহর বাণী কাদীম তথা চিরন্তন।
কিন্তু মুতাযিলা সম্প্রদায় বলে যে, কুরআন মাখলুক বা সৃষ্ট। তারা দলিল দিতে গিয়ে বলে, আল্লাহ পাক স্বয়ং কুরআনে বলেন:
“আমি একে (কুরআন) বানিয়েছি আরবি ভাষায়।”
তাদের ব্যাখ্যায়, যেহেতু আল্লাহ ‘বানিয়েছি’ বলেছেন, তাই কুরআন নতুন, মাখলুক ও সৃষ্ট বলে তারা দাবি করে।
তাদের এই দাবির জবাবে ইমাম রাযী (রহ.) বলেন:
“আল্লাহর কালাম বাস্তবিক অর্থে ও প্রকৃতগত দিক থেকে কাদীম ও চিরন্তন। অতএব, আল্লাহর বাণীকে সাধারণ শাব্দিক বা জাহেরী কথাবার্তার সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।”
আল্লামা আলূসী (রহ.) বলেন:
“উক্ত আয়াতে ‘বানিয়েছি’ শব্দের অর্থ কুরআনের সৃষ্ট হওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহ লওহে মাহফুযে কুরআনকে আরবি ভাষায় লিখেছেন। তাই মুতাযিলাদের উত্থাপিত প্রশ্ন সঠিক নয়।”
বর্ণিত আছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর নিকট এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন:
“আপনি বলুন, কুরআন কি আল্লাহর বাণী, নাকি আল্লাহর সৃষ্ট কোনো বস্তু?”
তিনি (রা.) উত্তরে বললেন:
“এটা আল্লাহর বাণী। তুমি কি শুননি, আল্লাহ নিজেই বলেছেন…”
লোকটি আবার বলল:
“আপনি কি আল্লাহর বাণীর মধ্যে ‘লা ইসা কমিসলিহি শাইউন’ অর্থাৎ ‘তার মতো কিছুই নেই’— এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করেননি?”
ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন:
“এখানে কুরআনের অর্থ আল্লাহর কালাম, যা লওহে মাহফুযে আরবি ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।”
— [তাফসীরে রূহুল মা’আনী]

অস্তিত্ববিদ্যার দৃষ্টিতে কোরআন: সিফাত ও উদ্দেশ্যের দ্বন্দ্ব
এখানে আলোচিত দাবিটি হচ্ছে, কোরআন আল্লাহর কালাম এবং তাঁর অনাদি ও অসৃষ্ট সিফাত। এই দাবি গ্রহণ করলে কোরআনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করা শুধু একটি ধর্মগ্রন্থের সাহিত্যিক বিশ্লেষণ থাকে না; তা আল্লাহর সঙ্গে আরোপিত একটি অনাদি সিফাতের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে পরিণত হয়। কোরআনের ভেতরে যে মানুষ, প্রশ্ন, যুদ্ধ, বিবাহ, তালাক, অপরাধ, শাস্তি, প্রশংসা, অভিশাপ ও নির্দিষ্ট ঘটনাপ্রতিক্রিয়া রয়েছে—সেগুলো তখন কেবল পৃথিবীতে পরে তৈরি হওয়া একটি বইয়ের বিষয় নয়; সেগুলো সেই কালামের নিজস্ব বিষয়বস্তু। অতএব অনাদিত্বের দাবিটি পরীক্ষা করতে হলে কোরআনের এই নির্দিষ্ট বক্তব্যগুলোকেই পরীক্ষা করতে হবে। বিষয়বস্তু বাদ দিয়ে কেবল “অনাদি কালাম” নামটি ধরে রাখলে পরীক্ষার বিষয়টিই বদলে যায়।
কোরআন একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থ, যার পরিচয় তার বক্তব্যগুলোর সমষ্টি, বিন্যাস ও অর্থের সঙ্গে যুক্ত। আবু লাহাব সম্পর্কে বক্তব্য, উত্তরাধিকারের বিধান, যুদ্ধের নির্দেশ, বিবাহ ও তালাকের আলোচনা—এসব বাদ দিয়ে কোনো বিষয়শূন্য কথনক্ষমতাকে এই একই কোরআন বলা যায় না। কথা বলার ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতার মাধ্যমে বলা নির্দিষ্ট বক্তব্যও এক বস্তু নয়। একজন বক্তার কথা বলার ক্ষমতা আগে থেকে থাকলেও তার প্রতিটি বক্তব্য আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে না। ফলে “আল্লাহ অনাদিকাল থেকে কথা বলতে সক্ষম” এবং “এই নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর সম্পূর্ণ কোরআন অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান”—এই দুই দাবি পৃথক। এই প্রবন্ধে দ্বিতীয় দাবিটিই পরীক্ষা করা হচ্ছে: মানুষের হাতে থাকা কোরআনের নির্দিষ্ট বক্তব্যসমষ্টিকে আল্লাহর অনাদি সিফাত হিসেবে গ্রহণ করলে কী সমস্যা তৈরি হয়?
সম্পূর্ণ গ্রন্থের অনাদিত্ব দাবি করলে তার গঠনকারী বক্তব্যগুলোর অবস্থানও নির্ধারণ করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য যদি পরে প্রথমবার অস্তিত্ব লাভ করে এবং সেই সময়ে গ্রন্থের অংশ হয়, তাহলে ওই বক্তব্যসহ সম্পূর্ণ গ্রন্থটিও তার আগে একই পূর্ণ রূপে বিদ্যমান ছিল না। অনাদি কোনো কথনক্ষমতা থেকে পরে বক্তব্য প্রকাশিত হতে পারে; কিন্তু সেই কারণে পরে উৎপন্ন বক্তব্যসমষ্টিকে অনাদি গ্রন্থ বলা যায় না। যে সম্পূর্ণ গ্রন্থের কোনো গঠনকারী বক্তব্যের সূচনা আছে, সেই বক্তব্যসহ গ্রন্থটির পূর্ণ রূপেরও সূচনা আছে। অতএব কোরআনের সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে অনাদি বলা এবং তার কোনো অংশের বিষয়বস্তু পরে প্রথমবার গঠিত হয়েছে বলা একসঙ্গে সত্য হতে পারে না। প্রকাশের সময় এবং বক্তব্যের প্রথম অস্তিত্বের সময় আলাদা করে দেখাতে হলে সেই পার্থক্যও নির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এখানে সময়ের উল্লেখ থাকা এবং সময়ের মধ্যে নতুন বক্তব্যের জন্ম হওয়ার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বক্তব্য একটি ঘটনার কথা বলে—এতটুকু থেকে বক্তব্যটি সেই ঘটনার পরে তৈরি হয়েছে প্রমাণিত হয় না। কিন্তু কোনো বক্তব্যকে যদি বাস্তব প্রশ্নের উত্তর, বাস্তব ঘটনার প্রতিক্রিয়া অথবা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সমস্যার কারণে দেওয়া নির্দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে: ওই প্রশ্ন, ঘটনা বা সমস্যার ভূমিকা কী? ঘটনাটি কি শুধু আগে থেকেই সম্পূর্ণ নির্ধারিত বক্তব্যের প্রকাশের উপলক্ষ, নাকি বক্তব্যটির নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নির্ধারণের কারণ? প্রথম অবস্থায় নির্দিষ্ট বক্তব্যের অনাদিত্বের দাবি বহাল রেখে তার সঙ্গে ইতিহাসের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে হবে; দ্বিতীয় অবস্থায় বক্তব্যের বিষয়বস্তু সৃষ্ট ইতিহাসের দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। এই পার্থক্য নির্ধারণের জন্যই নির্দিষ্ট আয়াত, তার সম্বোধন এবং ঘটনাপ্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা জরুরি।
কোরআনের বিষয়বস্তুর একটি বড় অংশ মৌলিকভাবে সাপেক্ষ ও সম্পর্কনির্ভর। “মানুষের জন্য হিদায়াত” মানেই এমন হিদায়াত যার লক্ষ্য মানুষ; “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে” মানেই প্রশ্নকারী মানুষ, সম্বোধিত ব্যক্তি এবং প্রশ্নের একটি নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ; বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার বা শাস্তির বিধান মানেই এমন সামাজিক সম্পর্ক যার বাস্তব প্রয়োগ মানুষ ও মানবসমাজের সঙ্গে যুক্ত। এখানে মানুষ কেবল গ্রন্থের বাইরের পাঠক নয়; বহু বক্তব্যের নির্দিষ্ট অর্থ ও পরিচয়ের মধ্যেই মানুষ এবং তার ইতিহাস উপস্থিত। আবু লাহাবকে উদ্দেশ করে তিরস্কার এবং উত্তরাধিকার সম্পর্কে বিধান একই বক্তব্য নয়—তাদের বিষয়বস্তু পৃথক করে যে ব্যক্তি, কাজ ও সামাজিক সম্পর্ক, সেগুলো সৃষ্ট বাস্তবতার অন্তর্গত। তাই কোরআনকে অনাদি সিফাত বলা হলে এই সম্পর্কসমৃদ্ধ নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুও সেই সিফাতের অন্তর্গত হয়ে যায়।
অমুখাপেক্ষিতার সঙ্গে সংঘর্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য এই শেষ সংযোগটিই কেন্দ্রীয়: আল্লাহর অনাদি সত্তাগত গুণের নির্দিষ্ট রূপ যদি সৃষ্ট ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে দাবি করা হয়, অথচ সেই গুণের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্ট মানুষ ও ঘটনার দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে দুই দাবি পরস্পরবিরোধী। কারণ একই বিষয়বস্তুকে একই অর্থে সৃষ্টি-স্বাধীন এবং সৃষ্টি-নির্ধারিত বলা হচ্ছে। কোরআন আল্লাহর সিফাত—এই পরিচয় বহাল রেখে তার নিজস্ব বিষয়বস্তুকে পরীক্ষার বাইরে রাখা যায় না। অনাদিত্বের দাবি সম্পূর্ণ গ্রন্থের হলে পরীক্ষা করতে হবে সম্পূর্ণ গ্রন্থের নির্দিষ্ট বক্তব্যকে; আর অমুখাপেক্ষিতার দাবি সত্তাগত গুণের নির্দিষ্ট রূপ পর্যন্ত বিস্তৃত হলে সেই রূপের ইতিহাসনির্ভর নির্ধারণও পরীক্ষার অন্তর্গত।
হিদায়াতের অস্তিত্বগত নির্ভরতা
কোনো সত্তাকে পরম ও অমুখাপেক্ষী বলা হলে তার অনাদি সত্তাগত গুণের নির্দিষ্ট রূপও কোনো সৃষ্ট বাস্তবতার দ্বারা নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। এখানে “নির্ভরতা” বলতে শুধু অস্তিত্বের কারণ বোঝানো হচ্ছে না; কোনো গুণের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু যদি বাহ্যিক সৃষ্ট বাস্তবতা বদলালে বদলে যায়, তাহলেও সেই বিষয়বস্তু সৃষ্ট বাস্তবতা থেকে স্বাধীন নয়। কোরআনের ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় নির্ভরতাই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি তত্ত্বে কোরআন আল্লাহর সিফাতুল কালাম; আবার কোরআন নিজের পরিচয় দেয়—‘হুদাল্লিন্ নাস’ [5], অর্থাৎ মানুষের জন্য পথনির্দেশ। এই “মানুষের জন্য” অংশটি কোনো অলংকার নয়; কোরআনের আইন, আদেশ, নিষেধ, সতর্কীকরণ, পুরস্কার, শাস্তি ও প্রশ্নোত্তরের কাঠামো জুড়েই মানুষ লক্ষ্যবস্তু।
হিদায়াত একটি সম্পর্কনির্ভর কার্য। কোনো বাক্য আলাদাভাবে একটি অর্থ প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু “মানুষকে হিদায়াত দেওয়া” পরিচয়টি মানুষ ছাড়া পূর্ণ হয় না; কারণ এখানে মানুষ কেবল শ্রোতা নয়, হিদায়াতের লক্ষ্যবস্তুরই অংশ।
কোরআনের হিদায়াত, তার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু এবং আল্লাহর অনাদি সিফাতের দাবি একত্রে নিচের সম্পর্কটি তৈরি করে:
| সম্পর্কের দিক | উপাদানের পরিচয় |
|---|---|
| সত্তা | সত্তা (Allah) |
| গুণ | গুণ (Quran = Guidance) |
| লক্ষ্যবস্তু | লক্ষ্যবস্তু (Human beings) |
এই সম্পর্কের কেন্দ্রে যে নির্ভরতাটি তৈরি হয় তা হলো—
যদি আল্লাহর অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষের অস্তিত্ব, প্রশ্ন ও ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই সিফাত সৃষ্ট মানুষ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়; আর এমন সিফাতের অধিকারী সত্তাকে নিঃশর্তভাবে “সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী” বলা যায় না।
নির্দেশনার প্রকৃতি: হিদায়াত একটি সম্পর্কনির্ভর ধারণা
মানব-নির্দেশনা, নৈতিক আইন, শাস্তির ঘোষণা, প্রশ্নের উত্তর কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সম্বোধন—এসবই সম্পর্কনির্ভর ধারণা। একটি বাক্য বিমূর্তভাবে কোনো বক্তব্য প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু “হিদায়াত”, “আদেশ”, “নিষেধ”, “উত্তর” বা “তিরস্কার” হিসেবে তার নির্দিষ্ট পরিচয় বক্তা, বার্তা, লক্ষ্যবস্তু এবং প্রসঙ্গের সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
| নির্দেশনার উপাদান | পরিচয় |
|---|---|
| উৎস | বক্তা (Speaker) — আল্লাহ |
| মাধ্যম | বার্তা (Message) — কোরআন |
| লক্ষ্যবস্তু | গ্রহীতা (Recipient) — মানুষ |
এই তিনটির মধ্যে কোনো একটি অনুপস্থিত হলে “হিদায়াত” হিসেবে সম্পর্কটি পূর্ণ হয় না। বিশেষ করে গ্রহীতা অনুপস্থিত হলে বাক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেটি কোনো বাস্তব গ্রহীতাকে হিদায়াত দেওয়ার কার্য হিসেবে সম্পন্ন হয় না। কোরআনের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোরআন কেবল কিছু সত্যবাক্যের সমষ্টি হিসেবে নিজের পরিচয় দেয় না; এটি নিজেকে মানুষের জন্য হিদায়াত, আইন, সতর্কতা ও সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করে।
হিদায়াতের পরিচয় গ্রহীতানির্ভর। গ্রহীতা ছাড়া কোনো বাক্য তার সব অর্থ হারায়—এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই; কিন্তু গ্রহীতা ছাড়া সেই বাক্য “অমুককে হিদায়াত”, “অমুকের প্রশ্নের উত্তর” বা “অমুকের জন্য আইন” হিসেবে একই সম্পর্কগত পরিচয় ধরে রাখতে পারে না।
মূল অসঙ্গতি “গ্রহীতা না থাকলে কোনো অর্থই নেই” এই দাবিতে নয়। যে অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট পরিচয়ই মানুষের জন্য হিদায়াত, মানুষের প্রশ্নের উত্তর, মানুষের আইন ও মানুষের ইতিহাসের প্রতিক্রিয়া, সেই সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষ ও মানবীয় বাস্তবতা থেকে স্বাধীন নয়।
বিকল্প ইতিহাসের পরীক্ষা: মানুষ বদলালে কোরআনের বিষয়বস্তুও বদলায়
কোরআনের মানুষনির্ভরতা বোঝার জন্য মানব-ইতিহাসকে অন্যভাবে কল্পনা করলেই নির্ভরতাটি স্পষ্ট হয়। আবু লাহাব যদি জন্মই না নিত, অথবা মুহাম্মদের বিরোধিতা না করত, তাকে উদ্দেশ করে নিন্দামূলক বক্তব্যের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু একই থাকত না। কোনো সাহাবি যদি নির্দিষ্ট প্রশ্নটি না করত, “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে” দিয়ে শুরু হওয়া সেই উত্তরের একই প্রসঙ্গ থাকত না। কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ না ঘটলে যুদ্ধ-পরবর্তী তিরস্কার, নির্দেশ বা মূল্যায়নের একই বিষয়বস্তু থাকত না। মুহাম্মদের পারিবারিক বা সামাজিক কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা অন্যরকম হলে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নির্দেশনাও অন্যরকম হতো।
এখানে নির্ভরতা শুধু ব্যবহারিক নয়; এটি বিষয়বস্তুর নির্ভরতা। মানুষ কোরআন পড়বে কি না, মানবে কি না—সেই প্রশ্ন আলাদা। প্রশ্ন হচ্ছে, কোরআনের নির্দিষ্ট বক্তব্যটি কেন এই বক্তব্য এবং অন্য কোনো বক্তব্য নয়? বহু ক্ষেত্রে উত্তরটি কোরআনের বাইরের সৃষ্ট ইতিহাসে রয়েছে: কারণ অমুক ব্যক্তি এমন কাজ করেছে, অমুক প্রশ্ন করা হয়েছে, অমুক যুদ্ধ ঘটেছে, অমুক সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ সৃষ্ট ঘটনা কোরআনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর পার্থক্য নির্ধারণ করছে।
সৃষ্ট ইতিহাস অন্যরকম হলে যদি আল্লাহর অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুও অন্যরকম হতো, তবে সেই নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্টি থেকে স্বাধীন নয়। আর কোরআন যদি সেই অনাদি সিফাতই হয়, তাহলে এই নির্ভরতাকে আল্লাহর সিফাতের বাইরে সরিয়ে দেওয়া যায় না।
সময়-নির্ভরতা সংকট: ঘটনার সাথে বাঁধা আয়াত
কোরআনের অসংখ্য আয়াত নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, ব্যক্তি ও ঘটনার সঙ্গে বাঁধা। এগুলো শুধু সাধারণ নীতি নয়; অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতি সরাসরি প্রতিক্রিয়া:
| প্রসঙ্গ | বক্তব্যের উদাহরণ |
|---|---|
| প্রশ্নোত্তর | “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে…” |
| যুদ্ধ | “যখন উহুদের যুদ্ধে…” |
| তালাক | “তোমরা যদি স্ত্রীদের তালাক দাও…” |
| মুনাফিকদের বক্তব্য | “মুনাফিকরা বলে…” |
| প্রত্যাবর্তনের দিন | “যে দিন তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে…” |
এগুলো সবই ঘটনানির্ভর ও প্রসঙ্গনির্ভর। “আজ”, “যখন”, “তারা জিজ্ঞেস করে”, “তোমরা পিছু হটেছিলে”—এই ধরনের বক্তব্যের নির্দিষ্ট নির্দেশক ও লক্ষ্যবস্তু সৃষ্ট সময়রেখার ভেতরেই নির্ধারিত হয়।
সময়-সূচক বক্তব্যের নির্দিষ্ট নির্দেশক সৃষ্টি-ইতিহাসনির্ভর। “আজ”, “তখন”, “তারা”, “তোমরা”—এসব শব্দের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কোন সময়, কোন ব্যক্তি ও কোন ঘটনার কথা বলা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে।
কোরআনকে আল্লাহর অনাদি সিফাত বলা হলে তাই নিচের প্রশ্নগুলো অনিবার্য হয়ে ওঠে:
| প্রসঙ্গ | অনাদিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন |
|---|---|
| উহুদ | উহুদ কি অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান ছিল? |
| মুহাম্মদের বিবাহ | মুহাম্মাদের বিবাহ কি অনন্তকাল ধরে ঘটমান ছিল? |
| সাহাবিদের প্রশ্ন | সাহাবিদের প্রশ্ন কি অনাদিকাল থেকেই সেই সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ছিল? |
| মুনাফিকদের সম্বোধন | মুনাফিকরা কি সৃষ্টির আগেই সেই নির্দিষ্ট সম্বোধনের বাস্তব লক্ষ্যবস্তু ছিল? |
এখানে মূল দ্বন্দ্ব ঘটনাটি “আগে জানা” সম্ভব কি না—সেটি নয়। ঘটনার নির্দিষ্ট রূপ যদি বক্তব্যের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে, তবে সেই বিষয়বস্তু ঘটনাটি থেকে স্বাধীন নয়। আর সেই বক্তব্য যদি আল্লাহর অনাদি সিফাতের অংশ হয়, তবে অনাদি সিফাতের বিষয়বস্তুর মধ্যেই সৃষ্ট ইতিহাসের নির্ধারণ ঢুকে পড়ে।
কালাম নফসি বনাম কালাম লাফজি: একটি অসমাধেয় দ্বন্দ্ব
ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি ব্যাখ্যায় “কালাম নফসি” ও “কালাম লাফজি” আলাদা করা হয়। সেখানে শব্দ-অক্ষরের প্রকাশ এবং অন্তর্নিহিত অর্থকে পৃথক করে দেখা হয়:
| কালামের দিক | পরিচয় ও ব্যাখ্যা |
|---|---|
| অন্তর্নিহিত অর্থ | কালাম নফসি — অর্থ-রূপী, শব্দবিহীন “অনন্ত বাণী” |
| ভাষাগত প্রকাশ | কালাম লাফজি — মানুষের কাছে পৌঁছানো শব্দ, অক্ষর, উচ্চারণ |
শব্দ ও অক্ষরকে আলাদা স্তরে রাখলেও নির্ভরতার সমস্যাটি অদৃশ্য হয় না। কারণ মূল প্রশ্ন শব্দের ধ্বনি নিয়ে নয়; মূল প্রশ্ন নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে। আবু লাহাব, নির্দিষ্ট প্রশ্ন, যুদ্ধ, বিবাহ, আইন বা সামাজিক ঘটনার যে নির্দিষ্ট অর্থ কোরআনের বক্তব্যকে অন্য বক্তব্য থেকে পৃথক করে, সেই অর্থই মানবীয় ইতিহাসের সঙ্গে বাঁধা।
অন্তর্নিহিত অর্থকেই অনাদি ধরা হলেও একই নির্ভরতা থেকে যায়—
কোরআনের নির্দিষ্ট অর্থের একটি বড় অংশ সম্পর্কনির্ভর। “অমুককে সতর্ক করা”, “অমুক প্রশ্নের উত্তর”, “অমুক ঘটনার পর নির্দেশ” বা “মানুষের জন্য হিদায়াত”—এসব অর্থ থেকে মানুষ ও মানবীয় প্রসঙ্গ বাদ দিলে সেই নির্দিষ্ট অর্থ একই থাকে না।
অতএব শব্দ ও অর্থ আলাদা করলেও দুইটি বিষয় অক্ষত থাকে:
| বিশ্লেষণের দিক | বক্তব্য |
|---|---|
| প্রকাশের সময় | শব্দের প্রকাশকে পরে ঘটেছে বলা হলেও নির্দিষ্ট অর্থের মানুষনির্ভরতা দূর হয় না |
| অর্থ ও সম্বোধনের পরিচয় | মানুষ ও মানবীয় ইতিহাস বদলালে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট অর্থ ও সম্বোধনও বদলে যায় |
“অনাদি অন্তর্নিহিত অর্থ” বললেও একই অস্তিত্বগত সংকট থাকে—সেই অনাদি অর্থের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ভবিষ্যতে সৃষ্ট মানুষের পরিচয়, প্রশ্ন, কাজ ও ইতিহাস দ্বারা পৃথক ও নির্ধারিত হচ্ছে। নাম বদলেছে; নির্ভরতা বদলায়নি।
শব্দকে সৃষ্ট এবং অর্থকে অনাদি বললেও মানুষনির্ভর নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু অনাদি সিফাতের মধ্যেই থেকে যায়। ফলে মানুষনির্ভরতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না; সেটিকে কেবল শব্দের স্তর থেকে অর্থের স্তরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
গ্রহীতাহীন হিদায়াতের সংকট: ঈশ্বরতত্ত্বের কেন্দ্রীয় সমস্যা
এখানে “Null Recipient Problem” বলতে যে সংকটটি বোঝানো হচ্ছে তা কোনো বাক্যের সব অর্থ গ্রহীতা ছাড়া বিলীন হয়ে যায়—এমন দাবি নয়। সংকটটি আরও নির্দিষ্ট: হিদায়াত, আদেশ, নিষেধ, প্রশ্নের উত্তর, শাস্তির ঘোষণা ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সম্বোধন—এসবের পরিচয়ই গ্রহীতা ও প্রসঙ্গনির্ভর। মানুষকে বাদ দিলে “মানুষের জন্য হিদায়াত” আর একই সম্পর্কগত গুণ থাকে না; নির্দিষ্ট প্রশ্নকারীকে বাদ দিলে “তার প্রশ্নের উত্তর” একই নির্দিষ্ট উত্তর হিসেবে থাকে না।
কিন্তু কোরআন নিজেই ঘোষণা করে যে এটি:
| কার্যকারিতার ক্ষেত্র | মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক |
|---|---|
| পথনির্দেশ | মানুষের জন্য নির্দেশনা |
| প্রশ্নোত্তর | মানুষের প্রশ্নের সমাধান |
| সতর্কীকরণ | মানুষকে হুঁশিয়ারি |
| আইন | মানুষের জন্য আইন |
| বিরোধ নিষ্পত্তি | মানুষের মধ্যে বিবাদ মীমাংসা |
সুতরাং কোরআনের হিদায়াত, আইন, সতর্কতা, প্রশ্নোত্তর এবং বহু নির্দিষ্ট সম্বোধনের পরিচয় মানব-সাপেক্ষ। এই মানব-সাপেক্ষতা কোনো পরবর্তী ব্যবহারমাত্র নয়; বহু আয়াতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কী হবে সেটিই মানুষ ও মানবীয় ঘটনার দ্বারা নির্ধারিত।
মানুষ ছাড়া “মানুষের জন্য হিদায়াত” একই সম্পর্কগত গুণ নয়; আর মানুষ ও মানবীয় ঘটনার দ্বারা নির্ধারিত নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু যদি আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, তবে সেই অনাদি সিফাত মানুষ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়।
এটাই এখানে আলোচিত Null Recipient Problem-এর মূল রূপ: অনাদি বলে দাবি করা একটি সিফাতের নির্দিষ্ট হিদায়াতমূলক ও প্রতিক্রিয়ামূলক বিষয়বস্তু এমন সৃষ্ট মানুষের ওপর নির্ভর করছে, যারা নিজেরাই অনাদি নয়। কোরআনকে যত বেশি আল্লাহর সত্তাগত অনাদি গুণ হিসেবে ধরা হবে, এই মানুষনির্ভরতা তত বেশি সরাসরি আল্লাহর সিফাতের মধ্যে গিয়ে পড়বে।
সময়নির্ভর আয়াতগুলোর যৌক্তিক সংঘর্ষ
কোরআনের অনাদিত্বের দাবির সঙ্গে এর বাস্তব বিষয়বস্তুর সংঘর্ষ বিভিন্ন স্তরে দেখা যায়। একদিকে কোরআনকে আল্লাহর অনাদি সিফাত বলা হচ্ছে; অন্যদিকে এর বহু নির্দিষ্ট বক্তব্যের পরিচয় নির্ভর করছে নির্দিষ্ট মানুষ, প্রশ্ন, সময়, ঘটনা ও সামাজিক অবস্থার ওপর। নিচের সারণিতে সেই নির্ভরতাগুলো পাশাপাশি রাখা হলো:
| দাবি (Claim) | বাস্তবতা (Reality) | ফলাফল (Logical Outcome) |
|---|---|---|
| কোরআন চিরন্তন, অনাদি এবং আদি থেকে বিদ্যমান | কোরআনের বহু আয়াত নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রশ্ন, যুদ্ধ, সামাজিক ঘটনা ও আইনগত পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া | অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্ট ইতিহাস দ্বারা নির্ধারিত → সৃষ্টি-স্বাধীনতার দাবি ক্ষতিগ্রস্ত |
| কোরআন মানুষের জন্য হিদায়াত | মানুষ নশ্বর ও পরবর্তীকালে সৃষ্টি; “মানুষের জন্য হিদায়াত” পরিচয়টি মানুষ ও তার হিদায়াতের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত | হিদায়াতের নির্দিষ্ট সম্পর্ক ও বিষয়বস্তু মানবনির্ভর → অনাদি সিফাতের মধ্যে মানবনির্ভরতা |
| কোরআন আল্লাহর অনন্ত গুণ (Sifat) | এই গুণের উদ্দেশ্য (Guidance, Law, Warning) মানুষের ওপর নির্ভরশীল | আল্লাহর একটি অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষের ওপর নির্ভরশীল → অমুখাপেক্ষিতা ভঙ্গ |
| কোরআনের বিধান অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান | বিবাহ, তালাক, চুরি, যুদ্ধ, দাসত্ব, সামাজিক বিবাদ—এসব আইন ও ঘটনা সবই creation–এর পরে | আইনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানবসমাজ ও মানবীয় ঘটনার দ্বারা নির্ধারিত → মানুষনির্ভরতা |
| কোরআন timeless (সময়ের বাইরে) | কোরআনে “আজ”, “যখন”, “যে দিন”, “তারা জিজ্ঞেস করে” ইত্যাদি time-indexed বাক্য সর্বত্র | সময়-সূচক বক্তব্যের নির্দিষ্ট নির্দেশক সৃষ্ট সময়রেখার ওপর নির্ভরশীল → ইতিহাসনির্ভর বিষয়বস্তু |
| কোরআন একটি সম্পূর্ণ, সর্বকালীন হিদায়াত | অসংখ্য আয়াত নির্দিষ্ট মুহূর্তে উপস্থিত ঘটনাবলীর জন্য ad hoc ভাবে নাজিল | নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বদলালে নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়াও বদলাত → বিষয়বস্তুর সাপেক্ষতা |
| কোরআন একটি অনন্ত জ্ঞানসমষ্টি | এতে স্থান–বিশেষ, কাল–বিশেষ, ব্যক্তি–বিশেষ ও সমাজ–বিশেষ সম্পর্কিত প্রসঙ্গ গুচ্ছ | প্রসঙ্গনির্ভর বিষয়বস্তু সৃষ্ট ব্যক্তি ও সমাজ দ্বারা পৃথক ও নির্ধারিত → অনাদি সিফাতের সৃষ্টি-নির্ভরতা |
এই সারণি দেখায়—কোরআনের বাস্তব বিষয়বস্তু একটি ইতিহাসনির্ভর, মানুষ-সম্বোধিত, আইনি ও সামাজিক বক্তব্যসমষ্টি। এর বহু নির্দিষ্ট অংশ সৃষ্ট মানুষের পরিচয়, প্রশ্ন ও ঘটনার দ্বারা পৃথক হয়। সেই একই নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে যদি আল্লাহর অনাদি সিফাতের বিষয়বস্তু বলা হয়, তবে অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট রূপ সৃষ্ট ইতিহাস থেকে স্বাধীন থাকে না।
যে কোরআনের নির্দিষ্ট বক্তব্য মানুষ, প্রশ্ন ও ঘটনার দ্বারা নির্ধারিত, সেই নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে আল্লাহর অনাদি সিফাতের অবিচ্ছেদ্য বিষয়বস্তু বলা হলে সৃষ্ট ইতিহাস আল্লাহর অনাদি গুণকে নির্ধারণ করতে শুরু করে। এই অবস্থায় “সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী” আল্লাহর দাবি অক্ষত থাকে না।
ঈশ্বরতত্ত্বের তিন ভিত্তি বনাম কোরআনের অনন্তত্ব
ধ্রুপদী একেশ্বরবাদে ঈশ্বরের পরমত্বকে বোঝাতে অমুখাপেক্ষিতা, অবিভাজ্যতা এবং সময়াতীততার মতো ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রবন্ধের মূল আঘাত অমুখাপেক্ষিতার ওপর; তবে কোরআনের অনাদিত্বের দাবি অন্য দুই ধারণার সঙ্গেও অতিরিক্ত সমস্যা তৈরি করে:
| দার্শনিক ভিত্তি | সংজ্ঞা ও দাবি |
|---|---|
| অমুখাপেক্ষিতা | অমুখাপেক্ষিতা — ঈশ্বর স্বয়ংসম্পূর্ণ; তিনি কোনো সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নন |
| অবিভাজ্যতা | ঈশ্বরের অবিভাজ্যতা — ঈশ্বরকে খণ্ডিত বা অংশবিশিষ্ট ধরা হয় না; তাঁর গুণাবলী তাঁর সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্বতন্ত্র সৃষ্টি নয় |
| সময়াতীততা | সময়াতীততা — ঈশ্বরের ওপর সৃষ্ট সময়ের প্রবাহ প্রযোজ্য নয় বলে ধরা হয় |
কোরআনের মানুষনির্ভর ও ইতিহাসনির্ভর নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে অনাদি সিফাত বলা হলে প্রথম ও প্রধান সংঘর্ষটি অমুখাপেক্ষিতার সঙ্গে; পাশাপাশি অবিভাজ্যতা ও সময়াতীততার দাবির সঙ্গেও টানাপোড়েন তৈরি হয়।
অমুখাপেক্ষিতা বনাম হিদায়াতের নির্ভরতা
অমুখাপেক্ষিতা মানে শুধু এই নয় যে আল্লাহকে কেউ সৃষ্টি করেনি; এর দাবি আরও বিস্তৃত—আল্লাহর সত্তাগত পূর্ণতা ও অনাদি গুণ কোনো সৃষ্ট ব্যক্তি, ঘটনা বা প্রয়োজনের দ্বারা নির্ধারিত নয়। তিনি Ghaniyyun ‘anil ‘aalameen—সকল জগত থেকে অমুখাপেক্ষী; কারো প্রয়োজন তাঁর নেই। যদি তাঁর অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্ট মানুষের ইতিহাস বদলালে বদলে যায়, তবে এই অমুখাপেক্ষিতার দাবি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কোরআনকে আল্লাহর একটি অনাদি সিফাত ধরা হলে সমস্যাটি আরও তীব্র হয়, কারণ কোরআনের নিজের বিষয়বস্তু হচ্ছে—
| বিষয়বস্তুর ক্ষেত্র | মানুষকেন্দ্রিক পরিচয় |
|---|---|
| হিদায়াত | এটি মানুষের জন্য হিদায়াত |
| প্রশ্নোত্তর | মানুষের প্রশ্নের উত্তর |
| বিরোধ নিষ্পত্তি | মানুষের বিবাদ মীমাংসা |
| আইন ও শাস্তি | মানুষের জন্য আইন ও শাস্তি |
অর্থাৎ এই সিফাতের বহু নির্দিষ্ট বক্তব্যের লক্ষ্য, প্রসঙ্গ ও বিষয়বস্তু নির্ভর করছে মানুষ নামক সৃষ্ট সত্তার উপস্থিতি, জিজ্ঞাসা, বিভ্রান্তি, অপরাধ, সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর। মানবীয় বাস্তবতা অন্যরকম হলে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট বক্তব্যও অন্যরকম হতো।
একটি অনাদি গুণের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু যদি সৃষ্ট মানুষের প্রশ্ন, কাজ ও ইতিহাসের দ্বারা নির্ধারিত হয়, তবে সেই গুণকে সৃষ্ট মানুষ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলা যায় না। আর সেই গুণ আল্লাহর সিফাত হলে আল্লাহর পরম অমুখাপেক্ষিতার দাবিও অক্ষত থাকে না।
কোরআন যদি সত্যিই আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, তবে এটি ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না যে—
| বিশ্লেষণের দিক | বক্তব্য |
|---|---|
| বিষয়বস্তুর পরিচয় | আল্লাহর অনাদি সিফাতের মধ্যে এমন নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আছে, যার পরিচয় মানুষ ও মানবীয় ঘটনার দ্বারা পৃথক হয় |
| বিকল্প ইতিহাসের প্রভাব | মানুষ ও মানবীয় ইতিহাস অন্যরকম হলে সেই সিফাতের নির্দিষ্ট হিদায়াত, উত্তর, তিরস্কার ও আইনের বিষয়বস্তুও অন্যরকম হতো |
এর মানে দাঁড়ায়—আল্লাহর একটি অনাদি গুণের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষের অস্তিত্ব ও মানবীয় ইতিহাস দ্বারা শর্তাধীন। এই শর্তাধীনতাই অমুখাপেক্ষিতার দাবির বিপরীত: যে সত্তার অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট রূপ সৃষ্ট মানুষের দ্বারা নির্ধারিত, তাকে সেই অর্থে সম্পূর্ণ সৃষ্টি-স্বাধীন বলা যায় না।
ঈশ্বরের অবিভাজ্যতা বনাম কোরআনের খণ্ডিত বিষয়বস্তু
ঈশ্বরের অবিভাজ্যতা অনুযায়ী ঈশ্বরকে এমন কোনো সমষ্টি হিসেবে ধরা হয় না, যার সত্তাগত বাস্তবতা বহু বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র অংশ জোড়া দিয়ে গঠিত। কিন্তু কোরআনের বিষয়বস্তু বাস্তবে গভীরভাবে বহুবিধ: এক আয়াত অন্য আয়াত নয়, এক আইন অন্য আইন নয়, এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ করা বক্তব্য অন্য ব্যক্তিকে উদ্দেশ করা বক্তব্য নয়।
কিন্তু কোরআনের বাস্তব কাঠামো দেখলে আমরা পাই—
| গ্রন্থের কাঠামোর দিক | বিবরণ |
|---|---|
| সূরার সংখ্যা | ১১৪টি সূরা |
| আয়াতের সংখ্যা | হাজার হাজার আয়াত |
| বিষয়বৈচিত্র্য | অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন টপিক—আক্বীদা, ফিকহ, দাসত্ব, যুদ্ধ, বিয়ে, তালাক, লুৎ জাতি, নূহ, মূসা, ইত্যাদি |
| বক্তব্যের ধরন | কখনো গল্প, কখনো আইন, কখনো উপদেশ, কখনো অভিশাপ, কখনো প্রশংসা |
অর্থাৎ কোরআন একটি বহুস্তর, বহু-বিষয় ও স্পষ্টভাবে বিভাজ্য বক্তব্যসমষ্টি—সূরা, আয়াত, আইন, গল্প, প্রশ্নোত্তর ও পৃথক সম্বোধনে যার নির্দিষ্ট অংশগুলো অর্থগতভাবে একে অন্যের থেকে পৃথক।
যদি এই পৃথক ও বহুস্তর বিষয়বস্তুর কোরআনই আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, তবে সেই অনাদি সিফাতের মধ্যে বাস্তব অর্থগত বহুত্ব স্বীকার করতে হয়—আবু লাহাবের প্রসঙ্গ উত্তরাধিকার আইনের প্রসঙ্গ নয়, যুদ্ধের নির্দেশ তালাকের বিধান নয়। ফলে “অবিভাজ্য” ঈশ্বরের সঙ্গে এমন বহু পৃথক অনাদি বিষয়বস্তুর সম্পর্ক নিজেই একটি অতিরিক্ত দার্শনিক চাপ সৃষ্টি করে।
অন্যভাবে বললে, দুইটি বিপরীত দাবিকে একসঙ্গে দাঁড় করানো হয়—
| পরীক্ষাধীন দাবি | বক্তব্য |
|---|---|
| সত্তার অবিভাজ্যতা | একদিকে বলা হচ্ছে—আল্লাহ খণ্ডিত নন; তাঁর সত্তাগত বাস্তবতা অবিভাজ্য |
| সিফাতের অর্থগত বহুত্ব | অন্যদিকে বলা হচ্ছে—আল্লাহর একটি অনাদি গুণের মধ্যে সূরা, আয়াত, প্রসঙ্গ, ব্যক্তি, আইন ও ইতিহাসভিত্তিক বহু পৃথক অর্থগত বিষয়বস্তু রয়েছে |
এই দুই দাবির সমন্বয় একটি গুরুতর দার্শনিক সমস্যা সৃষ্টি করে: বহুবিধ ও পৃথক বিষয়বস্তু যদি সত্যিই সত্তাগত অনাদি সিফাতের ভেতর থাকে, তবে সেই বহুত্বকে “অবিভাজ্য” সত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা কঠিন।
সময়াতীততা বনাম কোরআনের সময়-সূচক আয়াত
সময়াতীততার ধারণায় ঈশ্বরকে সৃষ্ট সময়ের প্রবাহের অধীন ধরা হয় না। কিন্তু কোরআনের বহু বাক্যের নির্দিষ্ট নির্দেশক সৃষ্ট সময়রেখার মধ্যেই অর্থ পায়—“আজ”, “যখন”, “যেদিন”, “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে” ইত্যাদি শব্দ নির্দিষ্ট সময়, ব্যক্তি ও ঘটনার দিকে নির্দেশ করে।
কোরআনের ভেতর এমন বহু সময়-সূচক ও প্রসঙ্গ-সূচক বাক্য রয়েছে:
| সময় বা প্রসঙ্গের নির্দেশ | বক্তব্যের উদাহরণ |
|---|---|
| আজ | “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম…” [6] |
| যখন | “যখন তোমরা উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিঠ ফিরিয়ে পালিয়ে গেলে…” [7] |
| যেদিন | “যেদিন তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে…” |
| জিজ্ঞাসা ও সম্বোধন | “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে পাহাড়সমূহ সম্পর্কে…” |
এই বাক্যগুলোর নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সময় ও ঘটনার সাপেক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। “আজ” কোন দিন, “তারা” কারা, “তোমাকে” কাকে, “যখন” কোন ঘটনাকে নির্দেশ করছে—এসব নির্ধারিত হচ্ছে সৃষ্ট ইতিহাসের নির্দিষ্ট বিন্দু দ্বারা।
সময়-সূচক বিষয়বস্তুর নির্দিষ্ট নির্দেশক সৃষ্ট সময়রেখার প্রতি নির্ভরশীল। “আজ”, “যখন”, “যে দিন”—এসব শব্দ কোন সময়কে নির্দেশ করবে তা সৃষ্ট ঘটনার বাস্তব ক্রম ছাড়া নির্ধারিত হয় না।
কোরআনের কোনো “সময়াতীত অন্তর্নিহিত রূপ” আলাদা করে ধরা হলেও নির্ভরতাটি থেকেই যায়:
| পরীক্ষাধীন শর্ত | নির্ভরতার বিশ্লেষণ |
|---|---|
| নির্দেশক পরে ভাষায় যুক্ত হওয়া | যদি অন্তর্নিহিত অর্থ সময়াতীত হয় কিন্তু “আজ”, “তোমরা”, “তারা” ও নির্দিষ্ট ঘটনার নির্দেশ পরে ভাষায় যুক্ত হয়, তাহলে মানুষের হাতে থাকা নির্দিষ্ট কোরআনের এই অংশগুলোর পরিচয় সৃষ্ট ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল |
এতে নির্ভরতা দূর হয় না; কেবল দুই স্তরে ভাগ হয়। একদিকে একটি কথিত সময়াতীত অন্তর্নিহিত অর্থ, অন্যদিকে মানুষের কাছে পরিচিত নির্দিষ্ট শব্দ, সম্বোধন ও ইতিহাসনির্ভর বক্তব্য। কিন্তু প্রবন্ধের প্রশ্ন যেহেতু কোরআনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে, সেই বিষয়বস্তু তখনও সৃষ্ট ইতিহাসের দ্বারা নির্ধারিত।
অর্থাৎ:
| আলোচনার স্তর | পরিচয় |
|---|---|
| অন্তর্নিহিত অর্থ | অন্তর্নিহিত কালাম = সময়াতীত বলে দাবি করা অর্থ |
| নির্দিষ্ট কোরআনিক বক্তব্য | মানুষের পরিচিত কোরআন = সময়-সূচক, ঘটনা-নির্ভর ও ইতিহাসনির্ভর নির্দিষ্ট বক্তব্য |
মানুষের হাতে থাকা কোরআনের নির্দিষ্ট বক্তব্য তাই সৃষ্ট সময়রেখা থেকে স্বাধীন নয়। তার বহু শব্দের নির্দেশক, বহু আইনের উপলক্ষ এবং বহু সম্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে ঘটমান মানব-ইতিহাসের মধ্যে। এই বিষয়বস্তুকেই অনাদি সিফাতের বিষয়বস্তু বলা হলে সময়নির্ভর সৃষ্ট ইতিহাস অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট রূপে প্রবেশ করে।
সময়াতীত ঈশ্বরের অনাদি সিফাত যদি সৃষ্ট সময়রেখার “আজ”, “তখন”, “তারা” ও নির্দিষ্ট ঘটনার দ্বারা নির্ধারিত বিষয়বস্তু ধারণ করে, তবে সেই সিফাতকে সৃষ্ট সময় থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলা যায় না।
অনুসিদ্ধান্ত: স্বয়ংসম্পূর্ণতার পতন
আলোচনার প্রতিটি স্তরে একই কেন্দ্রীয় নির্ভরতা ফিরে এসেছে—কোরআনকে আল্লাহর অনাদি সিফাত বলা হচ্ছে, অথচ কোরআনের বহু নির্দিষ্ট বক্তব্যের বিষয়বস্তু মানুষ, মানুষের প্রশ্ন, মানবসমাজ এবং সৃষ্ট ইতিহাসের দ্বারা নির্ধারিত। অমুখাপেক্ষিতার সঙ্গে এই সংঘর্ষই প্রধান; অবিভাজ্যতা ও সময়াতীততার প্রশ্নগুলো সেই মূল সংকটকে আরও তীব্র করে।
এই যুক্তির ধারাবাহিক রূপটি হলো:
| যুক্তির ধাপ | পূর্ণ বক্তব্য |
|---|---|
| অমুখাপেক্ষিতা | স্বীকার্য ১: আল্লাহ সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী; কোনো সৃষ্ট সত্তা, ঘটনা বা ইতিহাস তাঁর অনাদি সত্তাগত গুণের নির্দিষ্ট রূপ নির্ধারণ করার কথা নয়। |
| অনাদি সিফাত | স্বীকার্য ২: কোরআন আল্লাহর সিফাতুল কালাম—অসৃষ্ট ও অনাদি সিফাত হিসেবে দাবি করা হয়। |
| মানুষকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু | স্বীকার্য ৩: কোরআনের হিদায়াত, আদেশ-নিষেধ, সামাজিক আইন, প্রশ্নোত্তর, তিরস্কার ও বহু নির্দিষ্ট বক্তব্য মানুষ ও মানবীয় ঘটনার প্রতি নির্দেশিত। |
| সৃষ্ট ইতিহাস | স্বীকার্য ৪: মানুষ ও মানবীয় ইতিহাস অনাদি নয়; এবং বহু কোরআনিক বক্তব্যের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু এই সৃষ্ট মানুষ ও সৃষ্ট ঘটনার রূপ অনুযায়ী পৃথক হয়েছে। |
| দ্বন্দ্ব | দ্বন্দ্ব: কোরআন যদি আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, তবে সেই সিফাতের নির্দিষ্ট মানুষকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু সৃষ্ট মানুষ ও ইতিহাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। |
| ফলাফল | ফলাফল: আল্লাহর একটি অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্ট সত্তার দ্বারা নির্ধারিত হলে আল্লাহর পরম অমুখাপেক্ষিতা ভেঙে পড়ে; কারণ সৃষ্ট ইতিহাস তখন তাঁর সত্তাগত গুণের নির্দিষ্ট রূপের নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। |
| উপসংহার | উপসংহার: মানুষনির্ভর নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর কোরআনকে আল্লাহর অনাদি সিফাত বলা হলে আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতার দাবি অক্ষত থাকে না। কোরআনের মানুষনির্ভরতা তখন কোনো বাহ্যিক সম্পর্ক নয়; তা আল্লাহর অনাদি সিফাতের বিষয়বস্তুর মধ্যেই অবস্থান করে। |
দুইটি দাবি একসঙ্গে অক্ষত রাখা যায় না: (১) আল্লাহর অনাদি সত্তাগত গুণ সৃষ্ট বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন; (২) সেই অনাদি গুণের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষ, মানুষের প্রশ্ন ও মানবীয় ইতিহাসের দ্বারা নির্ধারিত।
শব্দ ও অর্থকে আলাদা করা, কোনো অন্তর্নিহিত সময়াতীত অর্থের কথা বলা, কিংবা ঘটনাগুলো আগে থেকেই জানা ছিল বলা—কোনোটিই এই নির্দিষ্ট নির্ভরতাকে দূর করে না। প্রশ্নটি আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানতেন কি না নয়; প্রশ্নটি হলো কোরআনের নির্দিষ্ট বক্তব্যটি কেন সেই নির্দিষ্ট বক্তব্য। যখন তার উত্তর সৃষ্ট মানুষ, প্রশ্ন ও ঘটনার মধ্যে পাওয়া যায়, তখন সেই বিষয়বস্তু সৃষ্টি-স্বাধীন থাকে না।
শেষ কথা
কোরআনকে আল্লাহর অনাদি ও অসৃষ্ট সিফাত বলা ইসলামী আকীদার একটি কেন্দ্রীয় দাবি। কিন্তু এই দাবির সঙ্গে কোরআনের বাস্তব বিষয়বস্তু পাশাপাশি রাখলে একটি গভীর স্ববিরোধিতা স্পষ্ট হয়। কোরআন মানুষের জন্য হিদায়াত, মানুষের জন্য আইন, মানুষের প্রশ্নের উত্তর, মানুষের অপরাধের বিচার, মানুষের যুদ্ধ ও সামাজিক বিরোধের প্রতিক্রিয়া; আবার বহু স্থানে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি সরাসরি সম্বোধন। অর্থাৎ যে গ্রন্থকে অনাদি সিফাত বলা হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর একটি বড় অংশই সৃষ্ট মানবীয় বাস্তবতা দ্বারা পৃথক ও নির্ধারিত।
কোরআনের হিদায়াত, আদেশ-নিষেধ, আইন, সামাজিক বিধান, প্রশ্নোত্তর ও ব্যক্তিক ঘটনা-প্রতিক্রিয়া মানুষের অস্তিত্ব ও মানবীয় ইতিহাসের সঙ্গে বাঁধা। মানুষ ও ঘটনাগুলো অন্যরকম হলে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট বক্তব্যও অন্যরকম হতো। তাই কোরআনকে আল্লাহর অনাদি সিফাত বলা মানে এমন একটি অনাদি সত্তাগত গুণ স্বীকার করা, যার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্ট মানুষের অস্তিত্ব ও ইতিহাস দ্বারা নির্ধারিত। এই নির্ভরতাকে কোরআন থেকে আলাদা করা যায় না, কারণ সেটিই কোরআনের বাস্তব বিষয়বস্তুর অংশ; আর কোরআনকে যদি আল্লাহর সিফাত বলা হয়, সেই নির্ভরতাকে আল্লাহর সিফাত থেকেও আলাদা করা যায় না।
একটি অনাদি সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু যদি সৃষ্ট মানুষের দ্বারা নির্ধারিত হয়, তবে সেই সিফাত মানুষনির্ভর; আর সেই সিফাত যদি আল্লাহর সত্তাগত গুণ হয়, তবে আল্লাহর পরম অমুখাপেক্ষিতার দাবি ভেঙে পড়ে।
দুই বিপরীত দাবি এখানে মুখোমুখি দাঁড়ায়:
| পরীক্ষাধীন অবস্থান | পূর্ণ বক্তব্য |
|---|---|
| অমুখাপেক্ষিতা বহাল রাখা | আল্লাহ সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী—তাহলে তাঁর অনাদি সত্তাগত গুণের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সৃষ্ট মানুষ ও সৃষ্ট ইতিহাস দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না। অথবা |
| ইতিহাসনির্ভর বিষয়বস্তুকে অনাদি সিফাত বলা | মানুষ, মানুষের প্রশ্ন, আইন, যুদ্ধ ও ইতিহাসনির্ভর নির্দিষ্ট কোরআনই যদি আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, তাহলে আল্লাহর অনাদি সিফাত মানুষের ওপর নির্ভরশীল ও শর্তাধীন। |
উভয় দাবি একই সঙ্গে সত্য হতে পারে না। “অনাদি সিফাত” বলেই কোনো গুণকে সৃষ্টি-স্বাধীন ঘোষণা করা যায় না, যদি সেই সিফাতের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কী হবে তা সৃষ্ট মানুষের ইতিহাস নির্ধারণ করে।
এই কারণে কোরআনের অনাদিত্বের দাবি আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতার ধারণার সঙ্গে মৌলিক সংঘর্ষ তৈরি করে। এটি কোনো ক্ষুদ্র পরিভাষাগত সমস্যা নয়। প্রশ্নটি ঈশ্বরের সত্তা সম্পর্কে সবচেয়ে মৌলিক দাবির প্রশ্ন: আল্লাহ কি সত্যিই এমন এক সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তা, যার অনাদি গুণ সৃষ্ট মানুষের দ্বারা নির্ধারিত নয়, নাকি তাঁর অনাদি বলে দাবি করা কালামের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু মানুষের প্রশ্ন, আচরণ, সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে বদলে যায়? দ্বিতীয়টি সত্য হলে আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা আর পরম থাকে না।
কোরআন = আল্লাহর অনাদি সিফাত। কোরআনের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু = মানুষ ও মানবীয় ইতিহাসনির্ভর। অতএব আল্লাহর একটি অনাদি সিফাত = মানুষ ও মানবীয় ইতিহাসনির্ভর। এখানেই পরম অমুখাপেক্ষী আল্লাহর ধারণার পতন।
তথ্যসূত্রঃ
- Thomas Aquinas, Summa Theologica, Part 1, Question 3; Ibn Sina, Al-Shifa, Book 8, Chapter 6 ↩︎
- Inspired by Aristotelian logic and modern modal logic; see Plantinga, ‘The Nature of Necessity’, 1974 ↩︎
- জামি আত-তিরমিযী, ২৯১৫; সংশ্লিষ্ট আরবি পাঠ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২১ ↩︎
- Quran 2:185 ↩︎
- Quran 5:3 ↩︎
- Quran 3:153 ↩︎

