জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

জাহান্নামের নি:শ্বাস – শীত গ্রীষ্ম হওয়ার ইসলামিক কারণ

প্রকাশিত: এপ্রিল 24, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন35 মিনিট পড়া

ভূমিকা

প্রকৃতির রহস্যময় এবং নিয়মিত পরিবর্তনগুলো আদিকাল থেকেই মানুষের মনে কৌতূহল ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন—বিশেষ করে হাড়কাঁপানো শীত এবং তীব্র দহনকাল বা গ্রীষ্ম—এমনই একটি পুনরাবৃত্ত প্রাকৃতিক ঘটনা। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ভূগোল ঋতুচক্রের কারণ ব্যাখ্যা করে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের হেলন, সূর্যের চারদিকে বার্ষিক পরিক্রমা, সূর্যরশ্মির আপতনকোণ এবং দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের মাধ্যমে। পৃথিবীর অক্ষ কক্ষপথের তলের ওপর অঙ্কিত লম্বের সঙ্গে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে আছে। বার্ষিক পরিক্রমার সময় এই হেলনের কারণে দুই গোলার্ধে সূর্যালোক গ্রহণের পরিমাণ বদলায়। এক গোলার্ধে গ্রীষ্ম চলার সময় অপর গোলার্ধে শীত হয়। পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হলেও দুই গোলার্ধের এই বিপরীত ঋতুচক্রের প্রধান কারণ সূর্য থেকে দূরত্বের পরিবর্তন নয়। পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও গণনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই কার্যকারণ সম্পর্ক আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তির অংশ।

ইসলামি হাদিসে তীব্র গরম ও শৈত্যের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণ হাজির করা হয়েছে। সেখানে জাহান্নাম তার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলার অভিযোগ করে এবং আল্লাহ তাকে বছরে দুটি শ্বাসের অনুমতি দেন—একটি শীতকালে, অন্যটি গ্রীষ্মকালে। মানুষের অনুভূত প্রচণ্ডতম উত্তাপ ও তীব্রতম ঠান্ডাকে সেই শ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারী, অনুমতিপ্রার্থী এবং শ্বাসগ্রহণকারী এই অগ্নিসত্তার ধারণা ধর্মীয় পাঠ ও ওয়াজের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। পৃথিবীর তাপমাত্রার পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় তখন সূর্যালোক, বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের শক্তি-বিনিময়ের সঙ্গে এক অদৃশ্য শাস্তিলোকের কার্যকলাপ জুড়ে দেওয়া হয়। ভূগোল ও আবহাওয়ার একটি অনুসন্ধানযোগ্য প্রশ্নকে ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন করার এই পদ্ধতি প্রমাণের বদলে বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করে।

প্রকৃতিকে মানুষের রাগ, অভিযোগ, ক্ষুধা বা শ্বাসের অনুকরণে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা বহু পুরোনো উপকথায় রয়েছে। জাহান্নামের ক্ষেত্রে সেই বৈশিষ্ট্যগুলো শাস্ত্রীয় বিবরণ এবং তার আক্ষরিক ব্যাখ্যার মধ্যে সংরক্ষিত। কোনো বক্তব্যকে ঐশী উৎসের বলে ঘোষণা করা তার ভৌত কার্যকারণের প্রমাণ নয়। পৃথিবীর উত্তাপ ও শৈত্যে জাহান্নামের শ্বাস কার্যকর হলে তার প্রভাব শনাক্ত করার স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রয়োজন। সেই প্রমাণের জায়গায় সহিহ গ্রন্থের মর্যাদা বা বক্তার ধর্মীয় কর্তৃত্ব বসালে অনুসন্ধানের পথ বন্ধ হয়। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সঙ্গে অবৈজ্ঞানিক অন্ধবিশ্বাসের সংঘাত এখানেই: প্রমাণ দিয়ে কারণ নির্ধারণের বদলে পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে সত্য ধরে প্রকৃতির ঘটনাকে তার অধীনে ব্যাখ্যা করা। এই কর্তৃত্বনির্ভর চিন্তা যুক্তিবাদী অনুসন্ধান এবং জ্ঞানগত অগ্রগতির পথে বৌদ্ধিক স্থবিরতা তৈরি করে।


কেন মানুষ উপকথা তৈরি করে?

মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো অজানা বিষয়ের একটি কারণ খুঁজে বের করা, আর তা কোনভাবেই বোঝা সম্ভব না হলে কল্পনা দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা। যখন প্রাচীনকালে মানুষের কাছে বিজ্ঞান বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না, তখন তারা প্রাকৃতিক বা জৈবিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য মানুষের আবেগ (রাগ, অভিশাপ, বিশ্বাসঘাতকতা) বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ব্যবহার করত। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Anthropomorphism’ বা প্রকৃতিকে মানুষের রূপ দান করা।

মানুষের মস্তিষ্ক সবসময় একটি প্যাটার্ন খোঁজে। যখন তারা দেখত হঠাৎ মেঘ ডাকছে বা সূর্য অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা এর পেছনে কোনো ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘শাস্তি’ খুঁজত। এই ধরণের উপকথাগুলো আসলে মানুষের আদিম কৌতূহল এবং ভয়ের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। নিচে বিভিন্ন সংস্কৃতির কিছু চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হলো:

🌞 সূর্যগ্রহণ: রাহু ও কেতু
পুরাণ কথা
হিন্দু উপকথা অনুযায়ী, রাহু নামক এক অসুর যখন কৌশলে অমৃত পান করে, তখন সূর্য ও চন্দ্র তা ভগবান বিষ্ণুকে বলে দেয়। রাগের চোটে রাহু সূর্য ও চন্দ্রকে গিলে ফেলে, যার ফলে গ্রহণ লাগে।
বৈজ্ঞানিক সত্য
এটি একটি মহাজাগতিক ছায়া। পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য যখন এক সরলরেখায় আসে, তখন একে অপরের ওপর ছায়া ফেলে। এখানে কোনো ‘গিলে ফেলা’র ঘটনা নেই।
🐦 কাকের গায়ের রঙ কেন কালো?
বাংলার উপকথা
একটি প্রচলিত মিথ হলো, কাক আগে ধবধবে সাদা ছিল। কিন্তু সে অমৃত চুরি করে পান করায় বা কোনো এক অপকর্মের সাক্ষী হিসেবে অভিশাপ পাওয়ায় তার গায়ের রঙ কালো হয়ে গেছে।
বৈজ্ঞানিক সত্য
কাকের গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারণ হলো তার পালকে থাকা ‘মেলানিন’ নামক রঞ্জক পদার্থ। এটি তাকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয় এবং পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
⚡ বজ্রপাত: দেবতা থর-এর হাতুড়ি
নর্স মিথোলজি
প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের বিশ্বাস ছিল, যখন দেবতা থর তাঁর বিশাল হাতুড়ি ‘মিওলনির’ দিয়ে দানবদের মারতেন, তখন আকাশে বিজলি চমকাত এবং হাতুড়ির আঘাতে বজ্রধ্বনির সৃষ্টি হতো।
বৈজ্ঞানিক সত্য
মেঘের কণাগুলোর মধ্যে ঘর্ষণের ফলে স্থির তড়িৎ বা ইলেকট্রোস্ট্যাটিক ডিসচার্জ তৈরি হয়। বায়ুমণ্ডলে এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে বায়ু হঠাত গরম হয়ে বিস্ফোরিত হয়, যা শব্দ ও আলো তৈরি করে।
❄️ শীতকাল কেন আসে?
গ্রিক মিথোলজি
পার্সেফোনি যখন পাতালপুরীর রাজার কাছে বন্দি থাকেন, তখন তাঁর মা দেবী ডিমিটার (শস্যের দেবী) দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে পৃথিবীকে বরফে ঢেকে দেন। এই বিচ্ছেদ থেকেই শীতকালের জন্ম।
বৈজ্ঞানিক সত্য
পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ কক্ষপথের তলের ওপর অঙ্কিত লম্বের সঙ্গে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে আছে; কক্ষপথের তলের সঙ্গে অক্ষের কোণ প্রায় ৬৬.৫ ডিগ্রি। সূর্যের চারদিকে বার্ষিক পরিক্রমার সময় এই হেলনের কারণে দুই গোলার্ধে সূর্যরশ্মির আপতনকোণ ও দিনের দৈর্ঘ্য বদলায়। ফলে এক গোলার্ধে গ্রীষ্ম চলার সময় অন্য গোলার্ধে শীত হয়।

শীতগ্রীষ্মের কারণ সম্পর্কে বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞান

পৃথিবীর ঋতুচক্রের মূল ভিত্তি হলো ঘূর্ণন অক্ষের হেলন এবং সূর্যের চারদিকে বার্ষিক পরিক্রমার ফলে সূর্যালোক গ্রহণের ঋতুভিত্তিক পরিবর্তন। অক্ষটি কক্ষপথের তলের ওপর অঙ্কিত লম্বের সঙ্গে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে আছে; কক্ষপথের তলের সঙ্গে অক্ষের কোণ প্রায় ৬৬.৫ ডিগ্রি। পৃথিবী প্রায় ২৪ ঘণ্টায় নিজ অক্ষে একবার ঘুরে দিন-রাত সৃষ্টি করে এবং সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে করতে বছরের বিভিন্ন সময়ে দুই গোলার্ধ ভিন্ন পরিমাণ সূর্যালোক পায়। কোথাও সূর্যরশ্মি বেশি খাড়াভাবে পড়ে, কোথাও বেশি তির্যকভাবে পড়ে; দিনের দৈর্ঘ্যও বদলায়। সূর্যালোকের এই বণ্টনই ঋতুচক্রের ভৌত ভিত্তি। [1] [2] [3] [4]

গ্রীষ্মকালে সংশ্লিষ্ট গোলার্ধ সূর্যের দিকে হেলে থাকে। সেখানে সূর্য আকাশে তুলনামূলক উঁচুতে ওঠে এবং দীর্ঘ সময় দিগন্তের ওপরে থাকে। শীতকালে একই গোলার্ধ সূর্যের দিক থেকে বিপরীত দিকে হেলে থাকে; সূর্যরশ্মি তির্যক হয় এবং দিন ছোট হয়। তির্যক রশ্মির শক্তি বৃহত্তর ক্ষেত্রফলে ছড়িয়ে পড়ায় একক ক্ষেত্রফলে প্রাপ্ত শক্তি কমে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের উত্তাপ ও শীতলতার সম্পর্ক সরাসরি। [5] [6]

পৃথিবীর পুরো কক্ষপথে সূর্য থেকে দূরত্বের পরিবর্তন ঘটে এবং সেই পরিবর্তন প্রাপ্ত সৌরশক্তির পরিমাণে প্রভাব ফেলে। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের বিপরীত ঋতুচক্রের প্রধান কারণ সেই দূরত্ব নয়। একই সময়ে পৃথিবীর দুই গোলার্ধ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, অথচ একটিতে গ্রীষ্ম এবং অন্যটিতে শীত চলছে। অক্ষের হেলন, রশ্মির আপতনকোণ ও দিনের দৈর্ঘ্য এই বিপরীত অবস্থার ব্যাখ্যা দেয়। ঋতু পরিবর্তনসম্পর্কিত ভিডিও:


দুই গোলার্ধের বিপরীত ঋতু ও সূর্যালোকের বণ্টন

উত্তর গোলার্ধের জুন মাসের গ্রীষ্মের সঙ্গে দক্ষিণ গোলার্ধের শীত মিলে যায়; ডিসেম্বরের কাছাকাছি এই সম্পর্ক উল্টে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া দপ্তর দুই গোলার্ধের অক্ষগত অবস্থান সম্পর্কে পুরো অনুচ্ছেদে বলেছে: [7]

For the Northern Hemisphere, the axis points most toward the sun in June (specifically around June 21), and away from the sun around December 21. This corresponds to the Winter and Summer Solstice (solstice is Latin for “the sun stands”). For the Southern Hemisphere, this is reversed.

বাংলা অনুবাদ: উত্তর গোলার্ধের ক্ষেত্রে অক্ষটি জুনে, বিশেষ করে ২১ জুনের কাছাকাছি, সূর্যের দিকে সবচেয়ে বেশি হেলে থাকে; আর ২১ ডিসেম্বরের কাছাকাছি সূর্যের দিক থেকে বিপরীত দিকে হেলে থাকে। এর সঙ্গে শীত ও গ্রীষ্মের অয়নান্তের সম্পর্ক রয়েছে; লাতিন ভাষায় সলস্টিস অর্থ “সূর্য স্থির থাকে”। দক্ষিণ গোলার্ধের ক্ষেত্রে সম্পর্কটি উল্টো।

এই ঋতুচক্রের সঙ্গে সূর্যের আকাশগত উচ্চতা ও দিনের দৈর্ঘ্য মিলিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। পৃথিবীর অক্ষের জ্যামিতিক অবস্থান থেকে গোলার্ধভেদে সূর্যালোকের পরিবর্তন নির্ণয় করা যায়। নিচের চিত্রে অক্ষের হেলন ও পরিক্রমার সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।

বিজ্ঞান

পৃথিবীর উত্তাপ: শক্তির প্রবেশ, বণ্টন ও নির্গমন

পৃথিবীর তাপমাত্রা ব্যাখ্যায় সূর্যালোকের পাশাপাশি শোষিত শক্তি, বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের মধ্যে তাপের বণ্টন এবং মহাকাশে তাপ নির্গমনের হিসাব প্রয়োজন। নাসার ব্যাখ্যায় জলবায়ু পরিচালনায় সৌরশক্তির ভূমিকা সরাসরি বলা হয়েছে। [8]

Solar power drives Earth’s climate. Energy from the Sun heats the surface, warms the atmosphere, and powers the ocean currents.

বাংলা অনুবাদ: সৌরশক্তি পৃথিবীর জলবায়ুকে চালিত করে। সূর্যের শক্তি ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে, বায়ুমণ্ডলকে উষ্ণ করে এবং সমুদ্রস্রোত চালানোর শক্তি জোগায়।

ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডল শক্তি শোষণের পাশাপাশি তাপীয় বিকিরণের মাধ্যমে শক্তি নির্গত করে। এই শক্তি-বিনিময় পর্যবেক্ষণ, উপগ্রহের পরিমাপ এবং ভৌত মডেলের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়। অক্ষের হেলন না থাকলে বর্তমানের মতো দুই গোলার্ধের বিপরীত ঋতুচক্র তৈরি হতো না। পৃথিবীর আবহাওয়া, তাপমাত্রা ও জীবনচক্রের সঙ্গে জড়িত এই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যায় ভৌত কারণগুলোর পরিমাণ ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা যায়।

জাহান্নামের শ্বাসকে পৃথিবীর তাপমাত্রার কার্যকর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার অবদানও শনাক্তযোগ্য হতে হবে। কোথা থেকে কত শক্তি আসছে বা বের হচ্ছে, কোন এলাকায় তার প্রভাব পড়ছে এবং পরিমাপের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্ন একটি কার্যকারণের দাবিরই অংশ। শাস্ত্রের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করলে সেই পরিমাপ পাওয়া যায় না। অদৃশ্য কারণের নাম দেওয়া এবং পর্যবেক্ষিত ঘটনার কারণ প্রমাণ করা পৃথক কাজ।


বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক থেকে

এবারে আসুন বাংলাদেশের একটি পাঠ্যপুস্তক থেকেও বিষয়টি দেখে নিই,

ভূগোল
মহাবিশ্ব
বিজ্ঞান 90
বিজ্ঞান 92

শীতগ্রীষ্মের কারণ সম্পর্কে ইসলামি কুসংস্কার

ইসলামি হাদিসে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ এবং শীতের তীব্র ঠান্ডাকে জাহান্নামের শ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আগুন অভিযোগ করছে, নিজের অংশগুলোর সংঘাতে কষ্ট পাচ্ছে, স্বস্তির জন্য অনুমতি চাইছে এবং অনুমতি পাওয়ার পরে শ্বাস নিচ্ছে—এই ধারাবাহিকতায় একটি অগ্নিসত্তার ওপর অনুভূতি, বক্তব্য ও কার্যক্ষমতা আরোপ করা হয়েছে। সেই সত্তার শ্বাসের ফল হিসেবে পৃথিবীর মানুষের অনুভূত গরম ও ঠান্ডাকে ব্যাখ্যা করা হয়। এ ধরনের দাবির পক্ষে পরিমাপযোগ্য তাপপ্রবাহ, শক্তি-বিনিময় বা বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়ার প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ধর্মীয় বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রকৃতির কারণ নির্ধারণের ভিত্তি বানানো হয়েছে। এই অন্ধবিশ্বাসকে আধুনিক আবহাওয়াবিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন ওঠে, পৃথিবীর কোন অঞ্চলে, কোন সময়ে এবং কী পরিমাণ তাপ বা শৈত্য সেই শ্বাস থেকে আসে। ধর্মীয় ওয়াজে হাদিসের এই দাবির প্রচার নিচের ভিডিওতে রয়েছে।

জাহান্নাম সম্পর্কে ধর্মীয় বর্ণনায় তার আকার, গর্জন, ক্রোধ, দৃষ্টিশক্তি, বক্তব্য এবং শ্বাসের উল্লেখ রয়েছে। সাধারণ আগুনের সঙ্গে মানুষের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে তৈরি হয়েছে শাস্তিদানকারী এক অগ্নিসত্তার চিত্র। অভিযোগ ও শ্বাসের হাদিস বুঝতে এই ধারণাটির গুরুত্ব সরাসরি: শ্বাসগ্রহণের অনুমতি চাওয়ার ঘটনা একটি উপলব্ধিসম্পন্ন ও কথা বলতে সক্ষম সত্তার কাহিনি হিসেবে উপস্থাপিত। জাহান্নামের আকৃতি ও চেতনা নিয়ে ধর্মীয় বক্তার বক্তব্য নিচের ভিডিওতে রয়েছে।


অভিযোগ ও উপলব্ধি: নববির আক্ষরিক ব্যাখ্যা

নববির সংকলিত কাজী ইয়াদের ব্যাখ্যায় আগুনের অভিযোগ, উত্তাপের বিস্তার এবং উপলব্ধি ও পার্থক্য করার ক্ষমতা স্পষ্টভাবে যুক্ত হয়েছে। [9]

قوله – صلى الله عليه وسلم – : ( اشتكت النار إلى ربها فقالت : يا رب أكل بعضي بعضا ، فأذن لها بنفسين ، نفس في الشتاء ونفس في الصيف ) قال القاضي : اختلف العلماء في معناه ، فقال بعضهم : هو على ظاهره ، واشتكت حقيقة ، وشدة الحر من وهجها وفيحها وجعل الله تعالى فيها إدراكا وتمييزا بحيث تكلمت بهذا .

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য: “আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলল, হে রব, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন তাকে দুটি শ্বাসের অনুমতি দেওয়া হলো—একটি শীতকালে, অন্যটি গ্রীষ্মকালে।” কাজী বলেছেন: এর অর্থ নিয়ে আলেমদের মতভেদ হয়েছে। কেউ বলেছেন, এটি আক্ষরিক অর্থেই প্রযোজ্য; আগুন বাস্তবেই অভিযোগ করেছে। প্রচণ্ড গরম তার উত্তাপ ও তাপের বিস্তার থেকে আসে। আল্লাহ তার মধ্যে উপলব্ধি ও পার্থক্য করার ক্ষমতা সৃষ্টি করেছেন, যার মাধ্যমে সে এই কথা বলেছে।

আক্ষরিক ও রূপক ব্যাখ্যার উল্লেখ করার পরে নববি নিজের সিদ্ধান্তে আক্ষরিক পাঠকেই সঠিক বলেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বক্তব্য ইসলামওয়েবের আলোচনাতেও উদ্ধৃত রয়েছে। [10]

قلت : والصواب الأول ؛ لأنه ظاهر الحديث ، ولا مانع من حمله على حقيقته ، فوجب الحكم بأنه على ظاهره . والله أعلم .

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি: প্রথম মতটিই সঠিক। কারণ সেটিই হাদিসের প্রকাশ্য অর্থ এবং একে প্রকৃত অর্থে গ্রহণে কোনো বাধা নেই। সুতরাং একে প্রকাশ্য অর্থেই গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত আবশ্যক। আল্লাহই ভালো জানেন।

এই ব্যাখ্যায় অভিযোগের ভাষা আগুনের বাস্তব উপলব্ধির প্রকাশ। নিজ অবস্থার অসুবিধা বুঝে তা জানানো এবং স্বস্তির ব্যবস্থা চাওয়ার ক্ষমতা তার আছে বলে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক ঘটনার কারণ নির্ধারণে এখানে পরীক্ষা বা পরিমাপের স্থান নিয়েছে একটি শাস্ত্রীয় বর্ণনার আক্ষরিক সত্যতা। হাদিসের ভাষাকে সত্য ধরে সত্তাটির উপলব্ধি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে; সেই উপলব্ধির স্বতন্ত্র প্রমাণ থেকে হাদিসের সত্যতা নির্ণয় করা হচ্ছে না। ফলে বিশ্বাসের ঘোষণাই দাবিটির গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

নববির সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ শব্দবন্ধ হলো “লা মানি‘”—প্রকৃত অর্থে গ্রহণে কোনো বাধা নেই। এই যুক্তি একটি ধর্মীয় বর্ণনা ব্যাখ্যা করার অনুমতি দেয়; আগুন বাস্তবে কথা বলেছে কিংবা তার শ্বাস পৃথিবীকে উত্তপ্ত করেছে, সেই ঘটনার প্রমাণ দেয় না। কোনো ঘটনা কল্পনা করা সম্ভব হওয়া এবং ঘটনাটি বাস্তবে ঘটা এক নয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আগুনকে কথা বলাতে পারেন—এই বিশ্বাস গ্রহণ করলেও নির্দিষ্ট আগুন কখন কথা বলেছে, কীভাবে তার বক্তব্য জানা গেল এবং সেই কথোপকথন থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রায় কী প্রভাব পড়ল, তা আলাদা প্রশ্ন হিসেবেই থাকে। ঈশ্বরের ক্ষমতার দাবি দিয়ে ঘটনার সাক্ষ্যের অভাব পূরণ করা যায় না। [11]

ইবনুল মুনাইয়িরও অভিযোগ, অনুমতি ও নির্দিষ্ট দুই শ্বাসের ধারাবাহিকতাকে আক্ষরিক ব্যাখ্যার পক্ষে যুক্তি করেছেন। ইসলামওয়েবে উদ্ধৃত তাঁর বক্তব্যটি হলো: [12]

وقال الزين ابن المنير: المختار حمله على الحقيقة لصلاحية القدرة لذلك، ولأن استعارة الكلام للحال وإن عهدت وسمعت لكن الشكوى وتفسيرها والتعليل له والإذن والقبول والتنفس وقصره على اثنين فقط بعيد عن المجاز خارج عما ألف من استعماله.

বাংলা অনুবাদ: যাইন ইবনুল মুনাইয়ির বলেছেন: নির্বাচিত মত হলো একে প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করা; কারণ ঐশী ক্ষমতার পক্ষে তা সম্ভব। কোনো অবস্থাকে কথার মাধ্যমে রূপকভাবে প্রকাশ করার ব্যবহার পরিচিত ও প্রচলিত হলেও এখানে অভিযোগ, তার ব্যাখ্যা, তার কারণ দেখানো, অনুমতি, তা গ্রহণ, শ্বাস নেওয়া এবং তাকে কেবল দুটিতে সীমাবদ্ধ করা—এসব রূপক থেকে দূরবর্তী এবং তার পরিচিত ব্যবহারের বাইরে।

এখানে আক্ষরিক পাঠের পক্ষে যুক্তিটি কাহিনির ভেতরের বিশদ বিবরণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু একটি কাহিনি যত বিস্তারিতই হোক, সেই বিবরণ তার বাইরের বাস্তবতার সাক্ষ্য হয়ে যায় না। অভিযোগের বিষয়, অনুমতির ধরন ও শ্বাসের সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকা বর্ণনাটিকে সুনির্দিষ্ট করে; সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ সরবরাহ করে না। রাহু কীভাবে সূর্য গিলে ফেলে কিংবা কোনো দেবতা কীভাবে বজ্র সৃষ্টি করে, সেই কাহিনিতে আরও ধাপ যোগ করলেও গ্রহণ বা বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক কারণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। জাহান্নামের ক্ষেত্রে গ্রন্থের মর্যাদা সেই একই প্রমাণগত ঘাটতি ঢেকে রাখছে।

এই কাহিনির ঘটনাক্রমে আরও একটি অস্বস্তিকর সম্পর্ক রয়েছে। আগুন নিজের এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলার অভিযোগ করে; তার প্রতিকার হিসেবে তাকে শ্বাসের অনুমতি দেওয়া হয়; আর সেই শ্বাসের ফল হয় মানুষের অনুভূত প্রচণ্ডতম উত্তাপ ও তীব্রতম শৈত্য। অর্থাৎ আগুনের অবস্থার প্রতিকারের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের দুর্ভোগকে যুক্ত করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তাপ ও শৈত্যের কষ্ট শুধু প্রকৃতির ঘটনা থাকে না; তা আল্লাহর অনুমোদিত ব্যবস্থার ফলও হয়ে যায়। বর্ণিত স্রষ্টার সিদ্ধান্ত এবং মানুষের ভোগান্তির মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তার নৈতিক দায় “অনুমতি” শব্দটির আড়ালে হারিয়ে যায় না।

ধর্মীয় বক্তব্যকে প্রকৃতির ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষতিটি এখানেই নির্দিষ্ট। একটি গ্রন্থে অভিযোগের কাহিনি আছে বলে আগুনের উপলব্ধি মেনে নেওয়া হয়; সেই আগুন শ্বাস নেয় বলে তাপ ও শৈত্যের কারণও নির্ধারিত হয়। অথচ আগুনের সঙ্গে কথোপকথন কিংবা সেই শ্বাসের প্রভাব—কোনোটিই স্বাধীনভাবে শনাক্ত করা হয়নি। বর্ণনার প্রতিটি অযাচাইকৃত ধাপকে পরের ধাপের ভিত্তি বানালে দাবির সংখ্যা বাড়ে, প্রমাণ বাড়ে না। ঐশী ক্ষমতার উল্লেখ সেই শূন্যস্থান পূরণ করে না; কেবল বিশ্বাসের পরিধি আরও বিস্তৃত করে।


কোরআনে জাহান্নামের দেখা, ক্রোধ ও কথা বলা

ফুরকান ২৫:১২-এ আগুনের দূর থেকে মানুষকে দেখার কথা রয়েছে। তার ক্রোধ ও গর্জন মানুষের কাছে শ্রবণযোগ্য হিসেবেও বর্ণিত। এখানে দৃষ্টিশক্তি, আবেগ এবং শব্দ প্রকাশ একই অগ্নিসত্তার সঙ্গে যুক্ত। [13]

إِذَا رَأَتْهُمْ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا

বাংলা অনুবাদ: যখন তা দূর থেকে তাদের দেখবে, তখন তারা তার ক্রোধ ও গর্জন শুনতে পাবে।

মুলক ৬৭:৭–৮-এ আগুনের গর্জন ও ফুটতে থাকার সঙ্গে ক্রোধে প্রায় বিদীর্ণ হয়ে যাওয়ার বিবরণ আছে। শাস্তির স্থানকে এমন আবেগময় প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে, যা দণ্ডিত ব্যক্তিদের উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। [14]

إِذَا أُلْقُوا فِيهَا سَمِعُوا لَهَا شَهِيقًا وَهِيَ تَفُورُ ۝ تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ كُلَّمَا أُلْقِيَ فِيهَا فَوْجٌ سَأَلَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ

বাংলা অনুবাদ: যখন তাদের তাতে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা তার গর্জন শুনবে, আর তা ফুটতে থাকবে। ক্রোধে তা প্রায় বিদীর্ণ হয়ে যাবে। যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তার প্রহরীরা তাদের জিজ্ঞাসা করবে: তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?

কাফ ৫০:৩০-এ জাহান্নামকে প্রশ্ন করা এবং তার উত্তর দেওয়ার বিবরণ আরও সরাসরি। জাহান্নাম কথোপকথনের অংশগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। [15]

يَوْمَ نَقُولُ لِجَهَنَّمَ هَلِ امْتَلَأْتِ وَتَقُولُ هَلْ مِنْ مَزِيدٍ

বাংলা অনুবাদ: যেদিন আমরা জাহান্নামকে বলব, তুমি কি পূর্ণ হয়েছ? আর সে বলবে, আরও আছে কি?

এই বর্ণনাগুলো একটি দণ্ডস্থানের মধ্যে মানুষের মতো দেখা, ক্রুদ্ধ হওয়া, গর্জন করা এবং উত্তর দেওয়ার বৈশিষ্ট্য স্থাপন করে। জাহান্নামের শ্বাসের কাহিনি সেই একই সত্তা-কল্পনার মধ্যে কাজ করছে। প্রকৃতির তাপ ও শৈত্যকে ব্যাখ্যা করার সময় শাস্তিদানকারী এই সত্তার অনুভূতি ও আচরণকে ভৌত কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধর্মীয় সাহিত্যের একটি অদৃশ্য চরিত্র তখন পৃথিবীর বাস্তব তাপমাত্রার কারণ নির্ধারণের ক্ষমতা পায়।


আগুনের গ্রীবা: চোখ, কান ও কথা বলার জিহ্বা

আবু হুরায়রার সূত্রে তিরমিজির বর্ণনায় আগুন থেকে বের হওয়া গ্রীবার চোখ, কান ও জিহ্বার উল্লেখ আছে। বর্ণনার মূল বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে নিচে দেওয়া হলো। [16]

يَخْرُجُ عُنُقٌ مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَهُ عَيْنَانِ تُبْصِرَانِ وَأُذُنَانِ تَسْمَعَانِ وَلِسَانٌ يَنْطِقُ يَقُولُ إِنِّي وُكِّلْتُ بِثَلَاثَةٍ بِكُلِّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ وَبِكُلِّ مَنْ دَعَا مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَبِالْمُصَوِّرِينَ

বাংলা অনুবাদ: কিয়ামতের দিন আগুন থেকে একটি গ্রীবা বের হবে। তার দুটি চোখ থাকবে, যা দেখবে; দুটি কান থাকবে, যা শুনবে; এবং একটি জিহ্বা থাকবে, যা কথা বলবে। সেটি বলবে: আমাকে তিন ধরনের মানুষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—প্রত্যেক উদ্ধত জবরদস্তিকারী, প্রত্যেকে যে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডেকেছে এবং চিত্রনির্মাতারা।

এখানে ইন্দ্রিয়যুক্ত আগুন নিজের দায়িত্ব ঘোষণা করছে এবং শাস্তির লক্ষ্য নির্দিষ্ট করছে। আগুনকে মানুষের বৈশিষ্ট্যে কল্পনা করার এই পদ্ধতিই অভিযোগ, ক্রোধ ও শ্বাসের বিবরণকে একই ধর্মীয় কাঠামোয় যুক্ত করে।


জান্নাতের সঙ্গে জাহান্নামের বিতর্ক

জাহান্নামের কথোপকথন কেবল নিজের যন্ত্রণার অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। সহিহ মুসলিমে জান্নাত ও জাহান্নাম নিজেদের অধিবাসীদের নিয়ে বিতর্ক করে। দুটিই প্রথম পুরুষে কথা বলে, নিজেদের মধ্যে কারা প্রবেশ করবে তা উল্লেখ করে এবং আল্লাহ তাদের বক্তব্যের উত্তর দেন। আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণিত বক্তব্যটি হলো: [17]

احْتَجَّتِ النَّارُ وَالْجَنَّةُ فَقَالَتْ هَذِهِ يَدْخُلُنِي الْجَبَّارُونَ وَالْمُتَكَبِّرُونَ . وَقَالَتْ هَذِهِ يَدْخُلُنِي الضُّعَفَاءُ وَالْمَسَاكِينُ فَقَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لِهَذِهِ أَنْتِ عَذَابِي أُعَذِّبُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ – وَرُبَّمَا قَالَ أُصِيبُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ – وَقَالَ لِهَذِهِ أَنْتِ رَحْمَتِي أَرْحَمُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ وَلِكُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْكُمَا مِلْؤُهَا .

বাংলা অনুবাদ: আগুন ও জান্নাত বিতর্ক করল। এদের একটি বলল: আমার মধ্যে জবরদস্তিকারী ও অহংকারীরা প্রবেশ করে। অপরটি বলল: আমার মধ্যে দুর্বল ও দরিদ্ররা প্রবেশ করে। তখন আল্লাহ আগুনকে বললেন: তুমি আমার শাস্তি; তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিই—বর্ণনায় কখনো “তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা আক্রান্ত করি” কথাটিও এসেছে। আর জান্নাতকে বললেন: তুমি আমার রহমত; তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা দয়া করি। তোমাদের প্রত্যেককে পূর্ণ করা হবে।

বিতর্কের জন্য বক্তব্য বোঝা, নিজের অবস্থা প্রকাশ করা এবং অপর পক্ষের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষমতা প্রয়োজন। বর্ণনার আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করলে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে সেই ক্ষমতাগুলোও স্বীকার করতে হয়। শাস্তির স্থান এখানে নিজের অধিবাসীদের পরিচয় সম্পর্কে বক্তব্য রাখছে এবং আল্লাহর সম্বোধনের পক্ষ হচ্ছে। এটি মানুষের অনুভূতিকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করার সাধারণ অলংকারের চেয়ে অনেক নির্দিষ্ট একটি সত্তা-কল্পনা: স্থানটিকেই বক্তার ভূমিকায় বসানো হয়েছে।


সত্তর হাজার লাগাম দিয়ে জাহান্নামকে টেনে আনা

সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে টেনে আনার কথা আছে। তার সত্তর হাজার লাগাম থাকবে এবং প্রতিটি লাগামের সঙ্গে সত্তর হাজার ফেরেশতা থাকবে। এখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা মোট সংখ্যা নয়; প্রতিটি লাগামের জন্য আলাদা করে সেই সংখ্যা বলা হয়েছে। [18]

يُؤْتَى بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لَهَا سَبْعُونَ أَلْفَ زِمَامٍ مَعَ كُلِّ زِمَامٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ يَجُرُّونَهَا

বাংলা অনুবাদ: সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে। তার সত্তর হাজার লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের সঙ্গে সত্তর হাজার ফেরেশতা থাকবে, যারা তাকে টেনে আনবে।

লাগাম, টেনে আনা এবং অসংখ্য ফেরেশতার সম্মিলিত শক্তির এই চিত্র জাহান্নামকে স্থানান্তরযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণাধীন এক বিশাল সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। আগের বর্ণনাগুলো তার বক্তব্য ও উপলব্ধির বৈশিষ্ট্য দেয়; এই বর্ণনা যোগ করে দৃশ্যমান উপস্থিতি ও স্থানান্তরের কল্পনা। অভিযোগকারী আগুনের সঙ্গে এই বর্ণনাগুলো মিলিয়ে যে ধর্মীয় চিত্র গড়ে ওঠে, তাতে জাহান্নাম একই সঙ্গে শাস্তির স্থান এবং সক্রিয় আচরণের অধিকারী এক ভয়ংকর চরিত্র। সেই চরিত্রের শ্বাসকে পৃথিবীর তাপমাত্রার কারণ বলা হলে পৌরাণিক জগতের সঙ্গে বাস্তব প্রকৃতির একটি কার্যকারণ সংযোগও দাবি করা হয়।


হাদিস সম্পর্কে ইসলামিক আকীদা

ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা আকীদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মুহাম্মদ-এর প্রতিটি কথা ও কাজকে পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করা। বিশুদ্ধ ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীর মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দই ঐশী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং তা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। এই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো—নবী মুহাম্মদ ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ বা খুশির বশবর্তী হয়ে এমন কিছু বলেন না যা অসত্য। ফলে, কোনো সহিহ হাদিসে যদি কোনো বাস্তব জীবনের বা বৈজ্ঞানিক বা মহাজাগতিক দাবি করা হয়, তবে একজন একনিষ্ঠ মুসলিমের কাছে সেটি পর্যবেক্ষণযোগ্য বিজ্ঞানের চেয়েও অধিকতর সত্য হিসেবে বিবেচিত হয় [19]

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইাশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)


ভূগর্ভে জাহান্নাম: সাত পৃথিবী, সাত সমুদ্র ও সিজ্জিন

জাহান্নামকে পৃথিবীর নিচে অবস্থিত বলে চিহ্নিত করার বক্তব্য ইসলামি গ্রন্থে স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। ইসলামকিউএর “জান্নাত ও জাহান্নাম কোথায়?” শীর্ষক উত্তরে আবদুল্লাহ ইবন সালামের নামে বর্ণিত বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে: জান্নাত আকাশে, আর আগুন পৃথিবীতে। সেখানে হাকিমের সংকলনের ৮৬৯৮ নম্বর বর্ণনার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, হাকিম এটিকে সহিহ বলেছেন এবং যাহাবি তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছেন। [20]

إِنَّ الْجَنَّةَ فِي السَّمَاءِ، وَإِنَّ النَّارَ فِي الْأَرْضِ

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয়ই জান্নাত আকাশে এবং আগুন পৃথিবীতে।

ইবন রজবের “আত-তাখউইফ মিনান নার” গ্রন্থের ৬২–৬৩ পৃষ্ঠা থেকে একই উত্তরে একাধিক বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে। এর মধ্যে মুজাহিদের প্রশ্নের উত্তরে ইবন আব্বাসের নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে জাহান্নামের অবস্থান সাতটি স্তরবদ্ধ সমুদ্রের নিচে নির্ধারিত হয়েছে। উদ্ধৃত অনুচ্ছেদটি হলো: [21]

وخرج ابن مندة، من حديث أبي يحيى القتات عن مجاهد، قال: قلت لابن عباس: أين الجنة؟ قال: فوق سبع سموات، قلت: فأين النار؟ قال: تحت سبعة أبحر مطبقة.

বাংলা অনুবাদ: ইবন মানদাহ আবু ইয়াহইয়া আল-কাত্তাতের সূত্রে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি ইবন আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম, জান্নাত কোথায়? তিনি বললেন: সাত আকাশের ওপরে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে আগুন কোথায়? তিনি বললেন: স্তরে স্তরে অবস্থিত সাতটি সমুদ্রের নিচে।

ইসলামওয়েবেও ইবন কাইয়িমের “হাদিল আরওয়াহ” থেকে ইবন আব্বাসের নামে জান্নাতকে সপ্তম আকাশে এবং জাহান্নামকে সপ্তম পৃথিবীতে স্থাপনের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় ইবন মানদাহর আরেক বর্ণনায় বর্তমান অবস্থান ও কিয়ামতের দিনের অবস্থান আলাদা করে বলা হয়েছে। [22]

وروى ابن منده عن عبد الله قال: “الجنة في السماء الرابعة، فإذا كان يوم القيامة جعلها الله حيث يشاء، والنار في الأرض السابعة، فإذا كان يوم القيامة جعلها الله حيث يشاء”.

বাংলা অনুবাদ: ইবন মানদাহ আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: জান্নাত চতুর্থ আকাশে; কিয়ামতের দিন হলে আল্লাহ তাকে যেখানে ইচ্ছা স্থাপন করবেন। আর আগুন সপ্তম পৃথিবীতে; কিয়ামতের দিন হলে আল্লাহ তাকে যেখানে ইচ্ছা স্থাপন করবেন।

সপ্তম পৃথিবী ও তার নিচে আগুন স্থাপনের এই বর্ণনাগুলো একটি উল্লম্ব বিশ্ববিন্যাস প্রকাশ করে: ওপরের দিকে আকাশ ও জান্নাত, নিচের দিকে পৃথিবীর স্তর, সমুদ্র ও জাহান্নাম। পৃথিবীর ওপরের মানুষের সঙ্গে নিচের শাস্তিলোকের ভৌত সম্পর্ক কল্পনা করার জন্য এই বিন্যাস কার্যকর। জাহান্নামের উত্তাপ ওপরের মানুষের কাছে পৌঁছায়—এই বিশ্বাসের পাশে ভূগর্ভের এই অবস্থান একটি স্থানিক কাঠামো সরবরাহ করে।


সিজ্জিন: আমলনামার উল্লেখ থেকে নিম্নজগতের অবস্থান

সূরা মুতাফফিফিনের ৭–৯ আয়াতে পাপীদের কিতাব বা আমলনামা সিজ্জিনে থাকার কথা বলা হয়েছে। [23]

كَلَّا إِنَّ كِتَابَ الْفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ ۝ وَمَا أَدْرَاكَ مَا سِجِّينٌ ۝ كِتَابٌ مَرْقُومٌ

বাংলা অনুবাদ: কখনো নয়! নিশ্চয়ই পাপীদের আমলনামা সিজ্জিনে রয়েছে। আর কীসে তোমাকে জানাবে সিজ্জিন কী? একটি লিখিত নথি।

ইবন কাসিরের তাফসিরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সপ্তম পৃথিবীর নিচে সিজ্জিনের অবস্থানের মত উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর উল্লেখ করা বিকল্পগুলোর মধ্যে সপ্তম পৃথিবীর নিচে একটি সবুজ পাথর এবং জাহান্নামের একটি কূপও আছে। সংশ্লিষ্ট বক্তব্যটি একটানা হলো: [24]

ثم قد قال قائلون هي تحت الأرض السابعة وقد تقدم في حديث البراء بن عازب في حديثه الطويل يقول الله عز وجل في روح الكافر اكتبوا كتابه في سجين وسجين هي تحت الأرض السابعة وقيل صخرة تحت السابعة خضراء وقيل بئر في جهنم

বাংলা অনুবাদ: কেউ কেউ বলেছেন, এটি সপ্তম পৃথিবীর নিচে। আল-বারা ইবন আযিবের দীর্ঘ হাদিসে আগেই এসেছে যে কাফিরের রূহ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন: তার আমলনামা সিজ্জিনে লিখে রাখো। আর সিজ্জিন সপ্তম পৃথিবীর নিচে। বলা হয়েছে, এটি সপ্তম পৃথিবীর নিচে একটি সবুজ পাথর; আরও বলা হয়েছে, এটি জাহান্নামের একটি কূপ।

ইবন কাসির পরের ব্যাখ্যায় ওপরের স্তরের বিস্তৃতি এবং নিচের স্তরের সংকীর্ণতার কথা বলে সপ্তম পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত একটি স্তরবিন্যাস তুলে ধরেন। পাপীদের গন্তব্য জাহান্নামকে তিনি সর্বনিম্ন অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেন। ফলে সিজ্জিনের ব্যাখ্যা তাঁর তাফসিরে মহাবিশ্বের গঠন ও শাস্তিলোকের অবস্থানসংক্রান্ত একটি ধারণার সঙ্গে মিশে যায়। [25]

ইবন উসাইমিনও জাহান্নামের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সিজ্জিনকে নিচের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর “ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব” এবং “আশ-শারহুল মুমতি” থেকে ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত বক্তব্যে আগুনকে পৃথিবীতে স্থাপন করা হয়েছে। সমুদ্র কিংবা পৃথিবীর অভ্যন্তর—এই অবস্থানগুলোর উল্লেখ করে তিনি নির্দিষ্ট স্থান অজানা বলেছেন; পৃথিবীতে অবস্থানের সিদ্ধান্তটি বহাল রেখেছেন। [26]

এই ব্যাখ্যাপরম্পরায় পরকালের শাস্তিলোককে পৃথিবীর নিচের স্তরগুলোর মধ্যে বসানো হয়েছে। ফলে “জাহান্নামের উত্তাপ” কথাটির পাশে পৃথিবীর অভ্যন্তরের একটি ধর্মীয় ভূগোলও উপস্থিত থাকে। স্থান নির্ধারণের ভিত্তি এখানে ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান নয়; আয়াতের ব্যাখ্যা ও বর্ণনাপরম্পরা। পৃথিবীর গভীরে কোনো স্থানের অস্তিত্ব এবং সেখান থেকে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রায় প্রভাব—দুটিই প্রকৃতি সম্পর্কে দাবি; ধর্মীয় গ্রন্থে অবস্থান নির্ধারণ করলেই তার ভৌত অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। সিজ্জিন, জাহান্নাম ও ভূগর্ভসংক্রান্ত আরও তাফসির ও উদ্ধৃতি রয়েছে “ইসলাম অনুসারে জাহান্নাম ও সিজ্জিন কি মাটির অভ্যন্তরে অবস্থিত?” প্রবন্ধে।

“পৃথিবীর নিচে” কথাটি কোনো বিমূর্ত নৈতিক অবস্থা নির্দেশ করছে না। সপ্তম পৃথিবী, তার নিচে সমুদ্র, নির্দিষ্ট গভীরে সিজ্জিন এবং আগুনের অবস্থান—এসবের মাধ্যমে বস্তু, স্থান ও স্তরের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। ওপর-নিচের এই বিন্যাসকে পৃথিবীর গঠন সম্পর্কে বক্তব্য হিসেবে হাজির করার পর তার সত্যতা নির্ধারণেও পৃথিবী সম্পর্কে প্রমাণ প্রয়োজন। গ্রন্থে স্থানের নাম থাকা এবং পৃথিবীতে সেই স্থান থাকা এক নয়। একইভাবে একটি ভূগর্ভস্থ স্থানকে বহু ব্যাখ্যাকারী মেনে নেওয়া তার অস্তিত্বের ভূতাত্ত্বিক সাক্ষ্য হয়ে ওঠে না।


সাত সমুদ্রের ঠান্ডা পানি জাহান্নামের আগুন ঠেকিয়ে রাখে

কুরতুবি সূরা ত্বহা ২০:৬-এর ব্যাখ্যায় ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহর নামে একটি ভূগর্ভস্থ অগ্নি-নিয়ন্ত্রণের বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর নামে উদ্ধৃত সম্পূর্ণ বক্তব্যটি হলো: [27]

وقال وهب بن منبه على وجه الأرض سبعة أبحر ، والأرضون سبع ، بين كل أرضين بحر ، فالبحر الأسفل مطبق على شفير جهنم ، ولولا عظمه وكثرة مائه وبرده لأحرقت جهنم كل من عليها ، قال : وجهنم على متن الريح ، ومتن الريح على حجاب من الظلمة ، لا يعلم عظمه إلا الله تعالى وذلك الحجاب على الثرى ، وإلى الثرى انتهى علم الخلائق .

বাংলা অনুবাদ: ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহ বলেছেন: পৃথিবীর পৃষ্ঠে সাতটি সমুদ্র রয়েছে এবং পৃথিবী সাতটি; প্রতি দুই পৃথিবীর মধ্যে একটি সমুদ্র রয়েছে। সবচেয়ে নিচের সমুদ্র জাহান্নামের কিনারাকে ঢেকে রেখেছে। তার বিশালতা, প্রচুর পানি ও ঠান্ডা না থাকলে জাহান্নাম তার ওপরের সবাইকে পুড়িয়ে ফেলত। তিনি বলেন: জাহান্নাম বাতাসের পিঠে, বাতাসের পিঠ অন্ধকারের একটি পর্দার ওপর; তার বিশালতা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সেই পর্দা সিক্ত মাটির ওপর, আর সিক্ত মাটি পর্যন্তই সৃষ্টিকুলের জ্ঞান পৌঁছেছে।

এখানে ভূগর্ভের কাল্পনিক সমুদ্রকে আগুনের তাপ থেকে রক্ষা করার কাজে বসানো হয়েছে। জল যে আগুন নেভাতে পারে এবং ঠান্ডা জল যে উত্তাপ কমায়—দৈনন্দিন জীবনের এই পরিচিত অভিজ্ঞতাকে মহাবিশ্বের গভীরে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। পরিচিত বস্তুর পরিচিত গুণ ব্যবহার করলেই সেই বস্তুগুলোর কাল্পনিক অবস্থান সত্য হয়ে যায় না। সাত সমুদ্র কোথায়, কোন গভীরতায় কত পানি রয়েছে এবং তার সঙ্গে আগুনের সংযোগ কোথায়—এসবের কোনো পর্যবেক্ষণ এই বর্ণনা সরবরাহ করে না।

সমুদ্রের বিশালতা ও শীতলতাকে রক্ষাকবচ করার সঙ্গে একটি বাস্তব ভৌত সমস্যাও আসে: ঠান্ডা পানিতে তাপ প্রবেশ করলে পানি নিজেই উষ্ণ হয়। পানির বিপুল পরিমাণ তার উষ্ণ হওয়ার গতি কমাতে পারে; অনন্তকাল তাপ সরিয়ে দেওয়ার বিকল্প হতে পারে না। অবিরাম উত্তাপ গ্রহণকারী কোনো ব্যবস্থাকে শীতল রাখতে হলে সেই তাপ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে এবং কী হারে যাচ্ছে—তার হিসাব প্রয়োজন। জাহান্নাম, পানি, বাতাস ও অন্ধকারকে একটির নিচে আরেকটি সাজিয়ে দিলে সেই শক্তি-বিনিময়ের হিসাব পাওয়া যায় না। কাহিনি প্রশ্নটিকে গভীরতর স্তরে ঠেলে দেয়, সমাধান করে না।

ওয়াহবের নামে সংরক্ষিত এই বিবরণে ভয় দেখানোর পদ্ধতিটিও স্পষ্ট: পৃথিবীর ওপরের জীবন এক ধ্বংসাত্মক আগুনের নাগালের মধ্যে; মাঝের বাধা সরে গেলে সবাই পুড়ে যাবে। মানুষের নিরাপত্তা তখন প্রকৃতির অনুসন্ধানযোগ্য অবস্থার বদলে এক অদৃশ্য শাস্তিলোক ও তার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল বলে উপস্থাপিত হয়। এর সামাজিক ফল হলো ভয়কে প্রকৃতিবিষয়ক জ্ঞানের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। আগুনের কথা মানার সঙ্গে পৃথিবীর নিচের অদেখা বিন্যাসও বিশ্বাসের বিষয় হয়ে ওঠে। পৃথিবীর নিচে মাছ, পাথর, সমুদ্র ও অন্যান্য স্তরের বর্ণনা নিয়ে আরও আলোচনা রয়েছে “ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে মাছের ওপর পৃথিবী অবস্থিত” প্রবন্ধে।


ভূমিকম্পের তরঙ্গের সামনে পৌরাণিক ভূগর্ভ

পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে জ্ঞান শুধু মানুষ কত গভীরে গর্ত খুঁড়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না। ভূমিকম্পের তরঙ্গ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে চলার সময় তার গতি ও পথ বদলায়। বিভিন্ন পদার্থের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ধরনের তরঙ্গ চলতে পারে কি না, সেই পার্থক্য থেকে অভ্যন্তরের স্তর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বহিঃকেন্দ্রের তরল অবস্থা শনাক্ত করার ভিত্তি ব্যাখ্যা করেছে: [28]

P-wave and S-wave paths through the earth. Scientists discovered that Earth’s outer core is liquid by observing seismic waves. P waves travel through solid and liquid, but S waves do not travel through liquid.

বাংলা অনুবাদ: পৃথিবীর মধ্য দিয়ে পি-তরঙ্গ ও এস-তরঙ্গের পথ। ভূমিকম্পের তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্র তরল। পি-তরঙ্গ কঠিন ও তরল উভয় পদার্থের মধ্য দিয়ে চলে, কিন্তু এস-তরঙ্গ তরলের মধ্য দিয়ে চলে না।

পৃথিবীর গুরুমণ্ডলও সাতটি সমুদ্রের মধ্যে ঝুলে থাকা পৃথিবীগুলোর সমষ্টি নয়। ইউএসজিএসের ব্যাখ্যায় গুরুমণ্ডলের শিলা স্বল্প সময়ের হিসাবে কঠিন পদার্থের মতো আচরণ করে; দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে তা ধীরে প্রবাহিত হতে পারে। কিছু স্থানে আংশিক গলন আছে, আর সম্পূর্ণ তরল প্রধান স্তর হলো বহিঃকেন্দ্র। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে তরঙ্গের আচরণ মিলিয়ে দেখা হয়। [29]

সাত পৃথিবী ও তাদের মধ্যবর্তী সমুদ্রের বিন্যাস এই পর্যবেক্ষণভিত্তিক ভূগঠনের সঙ্গে মেলে না। একটি বিশাল জলস্তরকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে স্থাপন করলে তরঙ্গের গতিপথে তার প্রভাব থাকার কথা; কেবল তাফসিরে বর্ণিত হওয়া সেই প্রভাবের বিকল্প নয়। ধর্মীয় নামকরণ দিয়ে কোনো কাল্পনিক ভূগর্ভকে বাস্তব পৃথিবীর ওপর বসিয়ে দেওয়া যায় না। ভূমিকম্পের তরঙ্গ দিয়ে পরীক্ষা করা যায় এমন পৃথিবী এবং বর্ণনাকারীর সংবাদ দিয়ে সাজানো পাতাললোক—দুটির প্রমাণের ভিত্তিই আলাদা। প্রথমটির গঠন প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া থেকে নির্ণীত হয়; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে গ্রন্থের বক্তব্যকেই কাঠামোর নিশ্চয়তা বানানো হয়।


শীতগ্রীষ্মের কারণ সম্পর্কে হাদিস

আবু হুরায়রার সূত্রে সংরক্ষিত বর্ণনাগুলোতে আগুনের অভিযোগ, আল্লাহর অনুমতি এবং মানুষের অনুভূত গরম ও ঠান্ডার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। মুসলিমের দুইটি বাংলা সংস্করণের বিদ্যমান উদ্ধৃতি নিচে রয়েছে।

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫। মাসজিদ ও সলাতের স্থানসমূহ
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩২. জামাআতে রওনাকারীর জন্য পথিমধ্যে তীব্র গ্রীষ্মের সময় তাপ ঠাণ্ডা হয়ে আসলে যুহর আদায় করা মুস্তাহাব
১২৯০-(১৮৭/…) হারমালাহ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ….. আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জাহান্নাম অভিযোগ করে আল্লাহর কাছে বলল, হে আমার প্রভু! আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছে। সুতরাং আমাকে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের অনুমতি দিন। তাই আল্লাহ তা’আলা তাকে দু’বার শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুমতি দান করলেন। একবার শীত মৌসুমে আরেকবার গ্রীষ্ম মৌসুমে। তোমরা শীতকালে যে ঠাণ্ডা অনুভব করে থাকো তা জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে। আবার যে গরমে বা প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভব করে থাকো তাও জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১২৭৭, ইসলামীক সেন্টার ১২৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ মসজিদ ও সালাতের স্থান
পরিচ্ছেদঃ ৩২. তীব্র গ্রীষ্মের সময় তাপ কমে আসলে যোহর আদায় করা মুস্তাহাব
১২৭৯। হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নাম বলল, হে রব! আমার একাংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলল। আমাকে শ্বাস নেয়ার অনুমতি দিন। তখন তাকে দুটি শ্বাসের অনুমতি দিলেন। একটি শীতকালে এবং আর একটি গ্রীষ্মকালে। অতএব, তোমরা যে শীত অনুভব কর, তা জাহান্নামের শ্বাস; আর যে গ্রীষ্ম অনুভব কর, তাও জাহান্নামের শ্বাস।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


বুখারির আরবি পাঠ: অভিযোগ, অনুমতি ও দুই শ্বাস

বুখারির সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়ে একই বক্তব্য রয়েছে। বর্ণনাটিতে প্রচণ্ডতম গরম ও তীব্রতম ঠান্ডাকে অনুমোদিত দুই শ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [30]

اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا، فَقَالَتْ رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا، فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ، فَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ فِي الْحَرِّ، وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الزَّمْهَرِيرِ

বাংলা অনুবাদ: আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলল: হে রব, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন তাকে দুটি শ্বাসের অনুমতি দেওয়া হলো—একটি শীতকালে এবং একটি গ্রীষ্মকালে। তোমরা গরমের মধ্যে যে প্রচণ্ডতম উত্তাপ পাও এবং যে তীব্রতম শৈত্য পাও, তা সেই শ্বাসের ফল।

বর্ণনার ঘটনাক্রমে প্রথমে আগুন নিজের অবস্থার অভিযোগ জানায়, এরপর অনুমতি আসে এবং সেই অনুমতির পরে শ্বাসের সঙ্গে পৃথিবীর তাপ ও শৈত্যের সম্পর্ক ঘোষিত হয়। একটি অভিযোগকারী সত্তার দুরবস্থা থেকে মানুষের আবহাওয়াগত অভিজ্ঞতা পর্যন্ত কার্যকারণের শৃঙ্খল তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ, শ্রবণ, অনুমোদন এবং শ্বাস—প্রতিটি ধাপই কাহিনির মধ্যে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।


মুসলিমের আরবি পাঠে প্রচণ্ডতম গরম ও জমহরির

মুসলিমের আরবি পাঠে শেষাংশে “আশাদ্দু”—সবচেয়ে তীব্র—শব্দটি গরম ও জমহরিরের সঙ্গে এসেছে। বক্তব্যের মূল পাঠ সম্পূর্ণভাবে উদ্ধৃত করা হলো। [31]

اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا فَقَالَتْ يَا رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا . فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ فَهُوَ أَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْحَرِّ وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الزَّمْهَرِيرِ

বাংলা অনুবাদ: আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলল: হে রব, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন তাকে দুটি শ্বাসের অনুমতি দেওয়া হলো—একটি শীতকালে এবং একটি গ্রীষ্মকালে। সেটিই তোমাদের অনুভূত প্রচণ্ডতম গরম এবং তোমাদের অনুভূত তীব্রতম শৈত্য।

আরবি পাঠ তীব্র উত্তাপ ও শৈত্যকে নরকের কার্যকলাপের ফল হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই কারণগত দাবির প্রমাণ হিসেবে বর্ণনাকারীর সংবাদ এবং গ্রন্থের ধর্মীয় মর্যাদা সামনে আসে। পৃথিবীর কোন তাপপ্রবাহ ওই শ্বাস থেকে এসেছে, তার স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ এই বক্তব্যে নেই। আগুনের অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়ার পরে পৃথিবীর অনুভূত তাপমাত্রাকে তার ফল বলা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে কার্যকারণ নির্ধারণের জন্য যে পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ প্রয়োজন, তার জায়গা এই বিশ্বাসনির্ভর ধারাবাহিকতা পূরণ করে না।


দুই গোলার্ধের বিপরীত ঋতু: দুই শ্বাসের ব্যাখ্যার সমস্যা

পৃথিবীতে শীত ও গ্রীষ্ম একই সময়ে দুই গোলার্ধে বিপরীতভাবে ঘটে। জুনের কাছাকাছি উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি হেলে থাকে, ডিসেম্বরের কাছাকাছি দক্ষিণ গোলার্ধ। ফলে উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে শীত চলে; উত্তর গোলার্ধের শীতকালে সেখানে গ্রীষ্ম চলে। “শীতকালে একটি” ও “গ্রীষ্মকালে একটি” বললে তাই কোন অঞ্চলের শীত ও গ্রীষ্ম বোঝানো হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আসে। পৃথিবীর ঋতুচক্র কোনো এক অঞ্চলের দিনপঞ্জি মেনে বিশ্বজুড়ে একযোগে বদলায় না। [32]

দুটি শ্বাস দিয়ে অঞ্চলভেদে তাপ ও শৈত্যের ব্যাখ্যা করতে গেলে শ্বাসের সময়, বিস্তারের পথ এবং কোন এলাকায় কী প্রভাব পড়ে—এসব সম্পর্কও নির্ধারণ করতে হয়। একই সময়ে এক এলাকায় তাপপ্রবাহ এবং অন্য এলাকায় তীব্র শৈত্য ঘটলে কোনটি কোন শ্বাসের ফল, তা জানার পদ্ধতি প্রয়োজন। ভৌত ব্যাখ্যায় সূর্যের অবস্থান, দিনের দৈর্ঘ্য, বায়ুপ্রবাহ ও স্থানীয় পরিবেশের তথ্য ব্যবহার করা যায়। জাহান্নামের ব্যাখ্যায় এই পর্যবেক্ষণগুলোর সঙ্গে মেলানোর মতো স্বতন্ত্র তথ্য দেওয়া হয়নি। গরমের নামের পাশে গরম শ্বাস এবং ঠান্ডার পাশে ঠান্ডা শ্বাস বসানো ঘটনার নামান্তর; তার ভৌগোলিক বণ্টনের ব্যাখ্যা নয়।

এই সমস্যাটি ইসলামওয়েবের ১২৫৮৮১ নম্বর ফতোয়ার প্রশ্নেও উঠেছে। উত্তরে সূর্যের মাধ্যমে জাহান্নামের তাপ আসা এবং বৃষ্টি বা শীতল বায়ুপ্রবাহে তার প্রভাব কমার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। [33]

এই ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষিত আবহাওয়ার প্রতিটি অবস্থার জন্য পরে একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা বসানো যায়। গরম হলে অগ্নির প্রভাব, গরম কম হলে সেই প্রভাবের প্রতিবন্ধক—কিন্তু প্রভাব ও প্রতিবন্ধকের পরিমাণ নির্ণয়ের কোনো স্বতন্ত্র নিয়ম নেই। কোন জায়গায় তাপ বাড়বে এবং কোথায় কমবে, তা এই ধারণা থেকে আগে নির্ণয় করা যায় না। ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পরে তার সঙ্গে একটি অদৃশ্য কারণ মিলিয়ে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে বিশ্বাস অক্ষত থাকে, প্রকৃতি সম্পর্কে পরীক্ষাযোগ্য জ্ঞান বাড়ে না।


ইবন উসাইমিনের সমন্বয়: ভৌত কারণের পেছনে অদৃশ্য কারণ

ইসলামওয়েবে উদ্ধৃত ইবন উসাইমিনের ব্যাখ্যায় সূর্যরশ্মির অবস্থানগত প্রভাব স্বীকার করে তার পেছনে ওহিতে জানা একটি ধর্মীয় কারণ বসানো হয়েছে। জাহান্নামের শ্বাস উত্তাপ বাড়ায় এবং তার শৈত্য আবহাওয়াকে ঠান্ডা করে—এভাবে তিনি দুই কারণ মিলিয়েছেন। তাঁর সিদ্ধান্তের বাক্যটি হলো: [34]

فيجتمع في هذا: السبب الشرعي المدرك بالوحي، والسبب الحسي ، المدرك بالحس .

বাংলা অনুবাদ: এভাবে ওহিলব্ধ ধর্মীয় কারণ ও ইন্দ্রিয়লব্ধ ভৌত কারণ একত্র হয়।

এই সমন্বয়ে জাহান্নামের দাবির পক্ষে নতুন প্রমাণ যোগ হয় না। সূর্যের প্রভাব সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ ভৌত কারণটির প্রমাণ দেয়; সেই পর্যবেক্ষণকে অদৃশ্য আগুনের শ্বাসের প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা যায় না। সূর্যালোকের শক্তি ও তাপমাত্রার সম্পর্ক মাপা গেলেই তার সঙ্গে যুক্ত করা প্রতিটি অতিপ্রাকৃত দাবিও সত্য হয়ে যায় না। পর্যবেক্ষিত কারণের পেছনে আরেকটি কারণের নাম বসানোর স্বাধীনতা এবং সেই কারণ প্রতিষ্ঠার প্রমাণ এক নয়।

জাহান্নামের প্রভাব বাস্তব তাপমাত্রা বাড়ালে কতটা বাড়ায়, কখন বাড়ায় এবং সূর্যালোক ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়ার হিসাব থেকে সেই অবদান কীভাবে আলাদা করা যায়—এসব নির্ধারণযোগ্য প্রশ্ন। একইভাবে ঠান্ডা বাড়ানোর দাবি থাকলে তাপ অপসারণ বা শক্তি-বিনিময়ের প্রভাবও নির্ণয়ের বিষয়। “ওহিতে জানা” পরিচয়টি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় না। দাবিটি পৃথিবীর বাস্তব তাপমাত্রায় হস্তক্ষেপের; তার প্রমাণকে পুরোপুরি বিশ্বাসের মধ্যে সরিয়ে নিলে ভৌত প্রভাব দাবি করা হয়, অথচ সেই প্রভাব যাচাইয়ের দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়।

এই ব্যাখ্যার একটি বৃত্তাকার নির্ভরতাও রয়েছে। হাদিসকে সত্য ধরে অদৃশ্য কারণটি গ্রহণ করা হচ্ছে; পরে সেই কারণকে ভৌত ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষা করা হচ্ছে। মিলিয়ে দেওয়ার সাফল্য নির্ভর করছে প্রথমেই বিতর্কিত দাবিটি মেনে নেওয়ার ওপর। কোনো বক্তব্যকে প্রকৃতির পরিচিত ঘটনার সঙ্গে অসংঘর্ষী করে কল্পনা করা তার সত্যতার স্বাধীন সাক্ষ্য নয়। সেই কল্পনার পক্ষে পৃথক প্রমাণ না থাকলে সমন্বয়ের নাম দিয়ে প্রমাণহীন দাবিকে প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের মর্যাদা দেওয়া হয়।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সংশোধনযোগ্য থাকে, কারণ নতুন পরিমাপ তার ভুল প্রকাশ করতে পারে। অদৃশ্য কারণ যোগ করার এই পদ্ধতিতে বিপরীত ফলও একই বিশ্বাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। গরম বাড়া, কমা অথবা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হওয়া—প্রতিটি ফলের পরেই অদৃশ্য প্রভাবের ধরন বদলে ব্যাখ্যা বসানো যায়। কোন পর্যবেক্ষণ হলে ব্যাখ্যাটি ভুল বলে গণ্য হবে, তা অনির্দিষ্ট থাকে। ফলে এটি প্রকৃতির পরীক্ষা থেকে পাওয়া সিদ্ধান্তের বদলে পরীক্ষার ফল থেকে সুরক্ষিত রাখা একটি ধর্মীয় দাবি হিসেবে কাজ করে।


বছরে দুই শ্বাস এবং যোহরের নামাজ বিলম্বিত করার নির্দেশ

মুসলিমের আরেক বর্ণনায় তীব্র গরমে নামাজ বিলম্বিত করার নির্দেশের সঙ্গে জাহান্নামের উত্তাপের সম্পর্ক বলা হয়েছে। একই বর্ণনায় “ফি কুল্লি আম”—প্রতি বছরে—শব্দবন্ধও আছে। [35]

إِذَا كَانَ الْحَرُّ فَأَبْرِدُوا عَنِ الصَّلاَةِ فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ . وَذَكَرَ أَنَّ النَّارَ اشْتَكَتْ إِلَى رَبِّهَا فَأَذِنَ لَهَا فِي كُلِّ عَامٍ بِنَفَسَيْنِ نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ

বাংলা অনুবাদ: গরম পড়লে গরম কিছুটা কমে আসা পর্যন্ত নামাজ বিলম্বিত করো; কারণ প্রচণ্ড গরম জাহান্নামের তাপের বিস্তার থেকে আসে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করেছিল। তখন তাকে প্রতি বছরে দুটি শ্বাসের অনুমতি দেওয়া হয়—একটি শীতকালে এবং একটি গ্রীষ্মকালে।

বুখারিতেও যোহর বিলম্বিত করার নির্দেশ ও জাহান্নামের উত্তাপের একই সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে নামাজের নির্দেশের পরেই অভিযোগ ও দুই শ্বাসের বর্ণনা এসেছে। [36]

إِذَا اشْتَدَّ الْحَرُّ فَأَبْرِدُوا بِالصَّلاَةِ، فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ . وَاشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا فَقَالَتْ يَا رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا . فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ، وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ، فَهُوَ أَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْحَرِّ، وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الزَّمْهَرِيرِ

বাংলা অনুবাদ: গরম তীব্র হলে গরম কিছুটা কমে আসা পর্যন্ত নামাজ বিলম্বিত করো; কারণ প্রচণ্ড গরম জাহান্নামের তাপের বিস্তার থেকে আসে। আগুন তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলেছিল: হে রব, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন তাকে দুটি শ্বাসের অনুমতি দেওয়া হয়—একটি শীতকালে এবং একটি গ্রীষ্মকালে। সেটিই তোমাদের অনুভূত প্রচণ্ডতম গরম এবং তোমাদের অনুভূত তীব্রতম শৈত্য।

গরম কমার পরে নামাজ আদায়ের ব্যবহারিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে এখানে একটি অতিপ্রাকৃত কারণ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বাস্তব উত্তাপের অভিজ্ঞতাকে জাহান্নামের তাপ বলে চিহ্নিত করার মাধ্যমে ধর্মীয় শাস্তিলোক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কারণব্যবস্থায় প্রবেশ করছে। তাপমাত্রা বেশি থাকার ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করা যায়; সেই তাপ জাহান্নাম থেকে এসেছে—এই অতিরিক্ত দাবির জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। হাদিসে দুটিকে একই নির্দেশের মধ্যে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

জাহান্নামের শ্বাসের এই বিশ্বাসের পক্ষে স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রকৃতির ঘটনাকে অভিযোগকারী ও শ্বাসগ্রহণকারী অদৃশ্য সত্তার আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা একটি প্রমাণহীন অতিপ্রাকৃত কার্যকারণ দাবি। গ্রন্থের মর্যাদাকে প্রমাণের বিকল্প বানালে যুক্তিবাদী অনুসন্ধান দমিত হয় এবং অজ্ঞতা টিকে থাকার সুযোগ পায়। বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজে এই কুসংস্কারের মোকাবিলায় পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ এবং যাচাইযোগ্য ভৌত ব্যাখ্যার মানদণ্ডই কার্যকর।


জাহান্নামসংক্রান্ত দলিল ও দাবির সমন্বিত চিত্র

অভিযোগকারী আগুন, কথোপকথনকারী শাস্তিলোক, ভূগর্ভে তার অবস্থান এবং পৃথিবীর আবহাওয়ায় তার প্রভাব—এই ধারণাগুলো কোরআন, হাদিস ও পরবর্তী ব্যাখ্যাগ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। সেগুলোর মধ্যে ধর্মগ্রন্থের ভাষ্য, মুহাম্মদের নামে বর্ণিত বক্তব্য, সাহাবিদের নামে সংরক্ষিত সংবাদ এবং ব্যাখ্যাকারীদের সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রত্যেকটির পরিচয় তার নিজস্ব স্তরেই নির্দিষ্ট।

বিষয়উৎস ও বক্তব্যের পরিচয়উৎসে সংরক্ষিত বক্তব্যসমালোচনার নির্দিষ্ট ভিত্তি
অভিযোগ ও কথা বলাসহিহ মুসলিম ৬১৭ক; মুহাম্মদের নামে বর্ণিত বক্তব্যআগুন নিজের এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলার অভিযোগ করে; এরপর দুটি শ্বাসের অনুমতি পায়।আগুনের উপলব্ধি, বক্তব্য ও শ্বাসকে ঘটনার বাস্তব উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতি বছরে দুই শ্বাসসহিহ মুসলিম ৬১৭খ; মুহাম্মদের নামে বর্ণিত বক্তব্যপ্রতি বছরে শীত ও গ্রীষ্মে দুটি শ্বাসের অনুমতির উল্লেখ আছে।একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক ব্যবস্থাকে মানুষের তাপ ও শৈত্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
নামাজের সময় ও জাহান্নামের উত্তাপসহিহ বুখারি ৫৩৬–৫৩৭; মুহাম্মদের নামে বর্ণিত বক্তব্যপ্রচণ্ড গরমে নামাজ বিলম্বিত করার কারণ হিসেবে জাহান্নামের তাপের বিস্তার বলা হয়েছে।বাস্তব আবহাওয়ার ভিত্তিতে নেওয়া ব্যবহারিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে অতিপ্রাকৃত কার্যকারণ জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
দেখা, ক্রোধ ও গর্জনকোরআন ২৫:১২ ও ৬৭:৭–৮আগুন মানুষকে দেখে; তার ক্রোধ ও গর্জন শোনা যায়; তা ক্রোধে প্রায় বিদীর্ণ হয়।শাস্তিস্থানের ওপর দৃষ্টি ও আবেগের বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে।
প্রশ্নের উত্তর দেওয়াকোরআন ৫০:৩০জাহান্নাম পূর্ণ হয়েছে কি না জিজ্ঞাসা করা হলে সে আরও আছে কি না জানতে চায়।জাহান্নামকে কথোপকথনের অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে।
চোখ, কান ও জিহ্বাজামে তিরমিজি ২৫৭৪; মুহাম্মদের নামে বর্ণিত বক্তব্যআগুন থেকে বের হওয়া গ্রীবার দেখার চোখ, শোনার কান ও কথা বলার জিহ্বা থাকে।আগুন থেকে বের হওয়া অংশটিকে ইন্দ্রিয় ও বক্তব্যের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
জান্নাতের সঙ্গে বিতর্কসহিহ মুসলিম ২৮৪৬ক; মুহাম্মদের নামে বর্ণিত বক্তব্যজান্নাত ও আগুন নিজেদের অধিবাসীদের নিয়ে বিতর্ক করে; আল্লাহ তাদের উত্তর দেন।দুটি স্থানকে নিজ অবস্থা সম্পর্কে বক্তব্য রাখা সত্তার ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
লাগাম দিয়ে টেনে আনাসহিহ মুসলিম ২৮৪২; মুহাম্মদের নামে বর্ণিত বক্তব্যজাহান্নামের সত্তর হাজার লাগাম; প্রতিটি লাগামে সত্তর হাজার ফেরেশতা তাকে টেনে আনে।জাহান্নামকে স্থানান্তরযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণাধীন এক বিশাল সত্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আক্ষরিক ব্যাখ্যা গ্রহণনববি, শরহ সহিহ মুসলিম, ৫/২৬২–২৬৩নববি আক্ষরিক অর্থকে সঠিক বলেন; তাঁর উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় আগুনের উপলব্ধি ও পার্থক্য করার ক্ষমতা আছে।ব্যাখ্যাকারীর সিদ্ধান্তকে আগুনের চেতনা ও ভৌত প্রভাবের স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
পৃথিবীতে ও সাত সমুদ্রের নিচে অবস্থানইসলামকিউএ ২১৫০১১; আবদুল্লাহ ইবন সালাম ও ইবন আব্বাসের নামে বক্তব্য, ইবন রজবের সংকলনআগুন পৃথিবীতে এবং স্তরবদ্ধ সাত সমুদ্রের নিচে অবস্থিত—এমন বর্ণনা সংরক্ষিত আছে।ধর্মীয় বর্ণনার মধ্যে ভূগর্ভের একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
শীতল সমুদ্রের রক্ষাকবচতাফসির কুরতুবি, ত্বহা ২০:৬; ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহর নামে বক্তব্যনিচের সমুদ্রের বিশালতা, পানি ও ঠান্ডা না থাকলে জাহান্নাম ওপরের সবাইকে পুড়িয়ে ফেলত।কাল্পনিক ভূগর্ভের সঙ্গে তাপ নিয়ন্ত্রণের একটি অযাচাইকৃত ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।
ভৌত কারণের সঙ্গে অদৃশ্য কারণ যোগইসলামওয়েব ১২৫৮৮১; ইবন উসাইমিনের ব্যাখ্যাসূর্যের প্রভাবের সঙ্গে জাহান্নামের শ্বাসের ধর্মীয় কারণ মিলিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।ভৌত কারণের প্রমাণ অদৃশ্য অতিরিক্ত কারণটির প্রমাণ হয়ে যায় না।

অভিযোগ, ক্রোধ, উত্তর দেওয়া ও বিতর্কের বর্ণনাগুলো জাহান্নামের সক্রিয় সত্তারূপ নির্মাণ করে। শ্বাসের হাদিস সেই সত্তার কাজকে পৃথিবীর অনুভূত তাপ ও শৈত্যের কারণ বলে। ভূগর্ভের বিবরণগুলো তাকে একটি স্থানিক কাঠামো দেয়; পরবর্তী সমন্বয়গুলো পরিচিত ভৌত কারণের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। এগুলো মিলিয়ে একটি বিস্তৃত ধর্মীয় ধারণাব্যবস্থা পাওয়া যায়। সেই ধারণাব্যবস্থা ধর্মীয় সাহিত্যে বিদ্যমান থাকার প্রমাণ এবং তার প্রতিটি দাবি বাস্তব প্রকৃতিতে সত্য হওয়ার প্রমাণ সম্পূর্ণ আলাদা।


উপসংহার

পৃথিবীর ঋতুচক্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং জাহান্নামের শ্বাসের ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অক্ষের হেলন, বার্ষিক পরিক্রমা, সূর্যরশ্মির আপতনকোণ ও দিনের দৈর্ঘ্যের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ ও গণনার মাধ্যমে পরীক্ষা করা যায়। একই সময়ে দুই গোলার্ধে বিপরীত ঋতু হওয়ার কারণও সেই সম্পর্ক থেকে নির্ণীত হয়। এই জ্ঞান কোনো গ্রন্থকে অভ্রান্ত ধরে নেওয়ার ওপর নির্ভর করে না; তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে পরিমাপের সঙ্গে ব্যাখ্যার মিলের ওপর। নতুন তথ্য ব্যাখ্যার ভুল ধরিয়ে দিলে সংশোধনের পথও খোলা থাকে।

জাহান্নামের শ্বাসের বর্ণনায় আগুন অভিযোগ করে, অনুমতি পায় এবং তার শ্বাসের সঙ্গে মানুষের অনুভূত প্রচণ্ড উত্তাপ ও শৈত্যকে যুক্ত করা হয়। কোরআন ও হাদিসের অন্যান্য বিবরণে শাস্তিলোকের দেখা, ক্রোধ, কথোপকথন ও বিতর্কের বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। নববির নির্বাচিত আক্ষরিক ব্যাখ্যায় আগুনের অভিযোগ ও উপলব্ধি বাস্তব ঘটনা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ফলে এখানে একটি অদৃশ্য অগ্নিসত্তার আচরণ দিয়ে প্রকৃতির ঘটনা ব্যাখ্যা করার দাবি উপস্থিত। সেই দাবির পক্ষে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা রয়েছে; স্বতন্ত্রভাবে শনাক্ত করা শ্বাস, তার বিস্তারের পথ কিংবা তাপমাত্রায় তার অবদানের পরিমাপ নেই।

ভূগর্ভে জাহান্নামের অবস্থানসংক্রান্ত বর্ণনাগুলো একই ধারণার পাশে একটি পৌরাণিক ভূগোল নির্মাণ করেছে। সপ্তম পৃথিবী, স্তরবদ্ধ সমুদ্র এবং সিজ্জিনের অবস্থান ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। কুরতুবির সংরক্ষিত ওয়াহবের বর্ণনায় বিপুল শীতল পানি জাহান্নামের আগুন ঠেকিয়ে রাখে; তার নিচে বাতাস ও অন্ধকারের স্তরও বসানো হয়েছে। মানুষের পরিচিত আগুন, পানি, ঠান্ডা ও বাতাসের গুণ নিয়ে একটি অদেখা ভূগর্ভ সাজানো হয়েছে। পৃথিবীর বাস্তব গঠন নির্ণয়ে ব্যবহৃত ভূমিকম্পের তরঙ্গ ও পদার্থের বৈশিষ্ট্যের পর্যবেক্ষণ সেই বিন্যাসের সমর্থন দেয় না। ধর্মীয় সাহিত্যে একটি ভূগোলের উপস্থিতি পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের প্রমাণ নয়।

পরিচিত ভৌত কারণের পেছনে অদৃশ্য ধর্মীয় কারণ যোগ করলেও এই প্রমাণগত ঘাটতি দূর হয় না। সূর্যের প্রভাব মাপা গেলে তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া জাহান্নামের শ্বাসও প্রমাণিত হয়ে যায় না। কোনো কাহিনিকে প্রকৃতির পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকা এবং সেই কাহিনির সত্যতার প্রমাণ থাকা এক নয়। দাবিটির জন্য যে স্বতন্ত্র সাক্ষ্য প্রয়োজন, গ্রন্থের মর্যাদা, ব্যাখ্যাকারীর খ্যাতি অথবা ঐশী ক্ষমতার ঘোষণা তার বিকল্প হতে পারে না। প্রাকৃতিক ঘটনা সম্পর্কে অজ্ঞতার জায়গায় অতিপ্রাকৃত চরিত্রের কাজ বসিয়ে দিলে কৌতূহলের একটি উত্তর পাওয়া যায়; পরীক্ষিত জ্ঞান পাওয়া যায় না।

সমস্যাটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমানা ছাড়িয়ে শিক্ষা ও চিন্তার স্বাধীনতায় পৌঁছায়। কোনো শিক্ষাব্যবস্থা যখন পর্যবেক্ষণযোগ্য কারণের চেয়ে শাস্ত্রের প্রমাণহীন দাবিকে অধিকতর সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়, তখন শিক্ষার্থীকে একই বিষয়ে দুই ধরনের মানদণ্ড মানতে হয়। বিজ্ঞান পাঠে তাকে প্রমাণ চাইতে বলা হয়; ধর্মীয় কর্তৃত্বের সামনে সেই দাবি প্রত্যাহার করতে বলা হয়। এই অভ্যাস সমালোচনামূলক চিন্তাকে দুর্বল করে এবং ভুল সংশোধনের বদলে বিশ্বাস রক্ষার জন্য ব্যাখ্যা তৈরি করতে উৎসাহ দেয়। প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর আগেই গ্রন্থে চূড়ান্ত হয়ে আছে বলে ধরে নিলে অনুসন্ধানের ফলও সেই সিদ্ধান্তের অধীন হয়ে পড়ে।

সত্যের দাবির গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণসাপেক্ষ। কোনো বক্তব্যের ধর্মীয় মর্যাদা তাকে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে মুক্ত করে না, আর প্রাচীনতার কারণে কোনো কল্পকাহিনি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সমান অধিকার পায় না। গ্রহণ, বজ্রপাত কিংবা ঋতুচক্রের ব্যাখ্যায় অতিপ্রাকৃত চরিত্রের জায়গায় পর্যবেক্ষণযোগ্য ভৌত কারণ প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানুষের জ্ঞানগত অগ্রগতি। জাহান্নামের শ্বাসের কুসংস্কার সেই একই যাচাইয়ের বাইরে থাকার কোনো বিশেষ অধিকার রাখে না। মানুষের সম্মান বা ধর্মীয় পরিচয় প্রকৃতির কার্যকারণ নির্ধারণ করে না; নির্ধারক হলো দাবিটির পক্ষে পাওয়া প্রমাণ।

বৈজ্ঞানিক শিক্ষার শক্তি হলো কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা, ভুল শনাক্ত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত বদলানোর স্বাধীনতা। অদৃশ্য শাস্তিলোকের ভয় দিয়ে আবহাওয়া ব্যাখ্যা করার অভ্যাস সেই স্বাধীনতার বিপরীতে দাঁড়ায়। আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজে প্রকৃতিবিষয়ক জ্ঞানের ভিত্তি হবে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও যুক্তি। পৃথিবীর উত্তাপ ও শৈত্যকে কোনো অভিযোগকারী আগুনের শ্বাস বলে ঘোষণা করলে প্রকৃতির নিয়ম বদলায় না; কেবল মানুষের বোঝার পথে একটি প্রমাণহীন কাহিনি দাঁড় করানো হয়।



তথ্যসূত্রঃ
  1. What Causes the Seasons? ↩︎
  2. Reasons for the Seasons; Earth Science Facts to Make their Day ↩︎
  3. Seasons and Earth’s Tilt | Explanation and Review ↩︎
  4. A season is a period of the year that is distinguished by special climate conditions ↩︎
  5. Why Do We have Seasons? ↩︎
  6. Why Do We Have Seasons? ↩︎
  7. যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর: Why Do We Have Seasons? ↩︎
  8. নাসা: Climate and Earth’s Energy Budget ↩︎
  9. নববি, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৬২–২৬৩; মুসলিম ৬১৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  10. ইসলামওয়েব ২৫৮০৬; নববির নির্বাচিত আক্ষরিক ব্যাখ্যা ↩︎
  11. নববি, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৬২–২৬৩; আক্ষরিক অর্থ গ্রহণের পক্ষে সিদ্ধান্ত ↩︎
  12. ইবনুল মুনাইয়িরের বক্তব্য; ইসলামওয়েব ২৫৮০৬-এ উদ্ধৃত ↩︎
  13. কোরআন, সূরা ফুরকান ২৫:১২ ↩︎
  14. কোরআন, সূরা মুলক ৬৭:৭–৮ ↩︎
  15. কোরআন, সূরা কাফ ৫০:৩০ ↩︎
  16. জামে তিরমিজি ২৫৭৪; আগুনের গ্রীবার ইন্দ্রিয় ও বক্তব্য ↩︎
  17. সহিহ মুসলিম ২৮৪৬ক; জান্নাত ও জাহান্নামের বিতর্ক ↩︎
  18. সহিহ মুসলিম ২৮৪২; জাহান্নামের লাগাম ও তাকে টেনে আনা ↩︎
  19. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৬০৭ ↩︎
  20. ইসলামকিউএ ২১৫০১১; আবদুল্লাহ ইবন সালামের বক্তব্য ↩︎
  21. ইবন রজব, আত-তাখউইফ মিনান নার, পৃষ্ঠা ৬২–৬৩; ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত ↩︎
  22. ইসলামওয়েব ৩১৪৫৩৩; ইবন কাইয়িমের হাদিল আরওয়াহ থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  23. কোরআন, সূরা মুতাফফিফিন ৮৩:৭–৯ ↩︎
  24. তাফসির ইবন কাসির, সূরা মুতাফফিফিন ৮৩:৮ ↩︎
  25. তাফসির ইবন কাসির, মুতাফফিফিন ৮৩:৮; নিম্নস্তর ও সপ্তম পৃথিবীর কেন্দ্রসংক্রান্ত ব্যাখ্যা ↩︎
  26. ইবন উসাইমিন: ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব ৪/২ ও আশ-শারহুল মুমতি ৩/১৭৪–১৭৫; ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত ↩︎
  27. তাফসির কুরতুবি, সূরা ত্বহা ২০:৬; ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহর বর্ণনা ↩︎
  28. ইউএসজিএস: পৃথিবীর মধ্য দিয়ে পি-তরঙ্গ ও এস-তরঙ্গের পথ ↩︎
  29. ইউএসজিএস: গুরুমণ্ডলের কঠিন শিলা, আংশিক গলন ও তরল বহিঃকেন্দ্র ↩︎
  30. সহিহ বুখারি ৩২৬০; জাহান্নামের অভিযোগ ও শীত–গ্রীষ্মের দুই শ্বাস ↩︎
  31. সহিহ মুসলিম ৬১৭ক; অভিযোগ ও তাপ–শৈত্যের আরবি পাঠ ↩︎
  32. যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর: দুই গোলার্ধের বিপরীত ঋতুচক্র ↩︎
  33. ইসলামওয়েব ১২৫৮৮১: বিপরীত ঋতু ও অঞ্চলভেদে তাপমাত্রার প্রশ্নের উত্তর ↩︎
  34. ইবন উসাইমিনের শরহ সহিহ মুসলিম থেকে উদ্ধৃত ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ১২৫৮৮১ ↩︎
  35. সহিহ মুসলিম ৬১৭খ; প্রতি বছরে দুই শ্বাস ও নামাজ বিলম্বের নির্দেশ ↩︎
  36. সহিহ বুখারি ৫৩৬–৫৩৭; প্রচণ্ড গরমে নামাজ বিলম্বের কারণ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis, Critique of Religious Cosmology, Hadith and Tafsir Analysis, Philosophy of Science, and Science Education

Epistemic Position: Scientific Skepticism, Secular Humanism, Source Criticism, Logical Analysis, and Evidence-Based Examination of Religious Claims

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com. It critically examines Islamic accounts attributing extreme heat and cold to the breaths of Hell, alongside Quranic descriptions of Hell's perception, anger and speech, and classical accounts locating it beneath the earth.

The central argument is that a religious explanation of an observable natural phenomenon requires independent evidence for the causal relationship it asserts. Scriptural authority, a hadith's canonical status, and appeals to divine power do not establish that Hell's breaths affect terrestrial temperatures. Combining an established physical explanation with an unverified supernatural cause does not transfer the physical explanation's evidential support to that additional claim.

The textual analysis examines the complaint of the Fire, permission for two annual breaths, the attribution of extreme heat and cold to those breaths, and the instruction to delay prayer during intense heat. It also addresses descriptions of Hell seeing people, raging, answering questions, disputing with Paradise, producing a neck with eyes, ears and a speaking tongue, and being dragged by angels using seventy thousand bridles.

The theological analysis considers al-Nawawi's preference for a literal interpretation, accounts collected by Ibn Rajab, Ibn Kathir's discussion of Sijjin, and al-Qurtubi's preservation of a cosmological account attributed to Wahb ibn Munabbih. That account places seas between seven earths and describes the lowest sea's water and cold as a barrier against Hell's destructive heat. The article also examines explanations published by Islamweb and IslamQA, including Ibn Uthaymin's combination of observable physical causes with a religious cause known through revelation.

The scientific discussion addresses axial tilt, solar illumination, day length, opposite seasons in the two hemispheres, Earth's energy exchanges, and seismic evidence concerning its internal structure. These provide concrete grounds for examining claims about the timing, geographical distribution and physical effects of Hell's breaths, as well as the subterranean arrangements described in religious literature.

The educational critique examines the consequences of granting religious authority priority over observable evidence in explanations of nature. The assessment rests on accurate quotation, explicit attribution, empirical testability, causal reasoning and logical consistency. Scriptural statements, transmitted reports, later interpretations and the author's critical conclusions retain their distinct evidential roles.

Leave a comment

Your email will not be published.