ভূমিকা
মানুষ যে পৃথিবীতে বসবাস করে, তার পায়ের নিচে কী রয়েছে? পৃথিবী কীসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? পৃথিবীর নিচে কি আরও পৃথিবী রয়েছে? থাকলে সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থান কী দিয়ে পূর্ণ? পৃথিবীকে ধারণ করে রেখেছে কী, আর ভূমিকম্পই বা কেন ঘটে? মানবসভ্যতার ইতিহাসে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ অসংখ্য কল্পকাহিনি, পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। আধুনিক ভূতত্ত্বের বিকাশের বহু আগে পৃথিবীকে কখনো বিশাল প্রাণীর পিঠে স্থাপিত একটি সমতল ভূমি, কখনো মহাজাগতিক সমুদ্রের ওপর ভাসমান বস্তু, আবার কখনো অতিপ্রাকৃত শক্তির সাহায্যে স্থির থাকা একটি কাঠামো হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে পর্যবেক্ষণভিত্তিক জ্ঞান না থাকার কারণে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে মানুষ প্রায়ই অদৃশ্য প্রাণী, অলৌকিক শক্তি এবং মহাজাগতিক স্তরবিন্যাসের আশ্রয় নিয়েছে। এসব ধারণার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও বাস্তব পৃথিবীর গঠন সম্পর্কে সেগুলো কতটা সত্য, তা নির্ধারণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হলো পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
ইসলামি বিশ্বাসে আল্লাহ মহাবিশ্বের স্রষ্টা এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ। এই বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবীর নিচে কী আছে, পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে কিংবা মহাবিশ্বের প্রকৃত কাঠামো কী, এসব বিষয়ে আল্লাহর অজ্ঞ থাকার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহিপ্রাপ্ত নবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে পৃথিবীর গঠন সম্পর্কে কোরআন বা মুহাম্মদের নামে প্রচারিত কোনো বক্তব্যকে যখন ঐশী জ্ঞানের প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেই বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সর্বজ্ঞ স্রষ্টার কাছ থেকে প্রাপ্ত নির্ভুল জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব জগতের পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্যের বিরোধ থাকার কথা নয়। কোনো বর্ণনাকে ধর্মীয়ভাবে পবিত্র, প্রাচীন কিংবা সম্মানিত মনে করা তার সত্যতার প্রমাণ নয়। বরং সেই বর্ণনায় পৃথিবীর যে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে সেই কাঠামোর অস্তিত্ব রয়েছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
ইসলামি তাফসির ও হাদিসের প্রাচীন সংকলনগুলোতে পৃথিবীর নিচের জগৎ সম্পর্কে এমন কিছু বিস্ময়কর বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে, যেগুলো আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব বর্ণনায় পাওয়া যায় সাতটি পৃথিবীর কথা, এক পৃথিবী থেকে আরেক পৃথিবীর মধ্যবর্তী পাঁচশ বছরের পথের দূরত্ব, পৃথিবীর নিচে পানি ও পাথরের স্তর, পৃথিবীকে ধারণকারী বিশাল মাছ, ফেরেশতা, বহু শিংবিশিষ্ট ষাঁড়, অন্ধকারের স্তর এবং বিভিন্ন পৃথিবীর সঙ্গে জাহান্নামের সম্পর্ক। কোনো কোনো বর্ণনায় পৃথিবীকে একটি বিশাল মাছের পিঠে স্থাপিত বলা হয়েছে; মাছটি নড়াচড়া করায় পৃথিবীতে কম্পন সৃষ্টি হয় এবং সেই কম্পন থামানোর জন্য পাহাড় স্থাপন করা হয়। এসব কাহিনি কেবল পরবর্তী যুগের লোকমুখে প্রচলিত বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; তাবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী ও বাগাভীর মতো প্রভাবশালী তাফসিরকারীদের সংকলনে সাহাবি, তাবেঈ এবং প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাকারীদের সূত্রে এগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনায় পৃথিবীকে ধারণকারী উপাদানগুলোর অবস্থান ও ক্রমে পার্থক্য থাকলেও সেগুলোতে পৃথিবীর নিচে বাস্তব ভৌত কাঠামো হিসেবে বিশাল প্রাণী, পানি, পাথর ও অতিপ্রাকৃত সত্তার উপস্থিতির ধারণা পাওয়া যায়। এসব বর্ণনা প্রাচীন ইসলামি বিশ্বতত্ত্বের বিকাশ এবং পৃথিবীর গঠন সম্পর্কে তৎকালীন ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার প্রকৃতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান।
অথচ বাস্তব পৃথিবী কোনো মাছের পিঠে দাঁড়িয়ে নেই, কোনো ফেরেশতা কিংবা ষাঁড় পৃথিবীর ভার বহন করছে না এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে একটির নিচে আরেকটি এমন সাতটি পৃথক পৃথিবীর অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। ভূকম্পন তরঙ্গের গতিবিধি, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ, ঘনত্ব, তাপপ্রবাহ, ভূচৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য এবং শিলার গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করেছেন। পৃথিবীর বাইরের দিকে রয়েছে তুলনামূলক পাতলা কঠিন ভূত্বক, তার নিচে বিশাল শিলাময় ম্যান্টল এবং আরও গভীরে প্রধানত লোহা ও নিকেলসমৃদ্ধ কেন্দ্র, যার বহিঃস্তর তরল এবং অন্তঃস্তর কঠিন। ভূমিকম্পও কোনো মহাজাগতিক মাছের নড়াচড়ার ফল নয়; পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তির আকস্মিক মুক্তি, শিলাস্তরের ভাঙন এবং ভূত্বকের গতিশীলতার সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এসব তথ্য ধর্মীয় অনুমান বা দার্শনিক কল্পনার ওপর নির্ভরশীল নয়; পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পরিমাপযোগ্য তথ্য ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এখানে মৌলিক সমস্যাটি কেবল প্রাচীনকালের মানুষের বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতা নয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও আধুনিক পর্যবেক্ষণযন্ত্রের অনুপস্থিতিতে মানুষের পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সেই ভুল ধারণাগুলো যখন সর্বজ্ঞ স্রষ্টার সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান, নবীর বক্তব্য কিংবা ধর্মীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যাখ্যা হিসেবে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়, তখন সেগুলোর জ্ঞানগত নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোনো বর্ণনা ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে উমর, কাব আল-আহবার কিংবা অন্য কোনো প্রাচীন ব্যক্তির নামে প্রচলিত হলেই তার বিষয়বস্তু সত্য হয়ে যায় না। আবার একই বর্ণনা একাধিক তাফসিরগ্রন্থে পাওয়া গেলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাধিক স্বাধীন প্রমাণে পরিণত হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো বর্ণনাটির প্রকৃত বক্তব্য, তার উৎস ও প্রচারের ইতিহাস এবং বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে তার দাবিগুলোর সত্যতা। ধর্মীয় গ্রন্থে সংরক্ষিত একটি কাহিনি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে, অথচ সেই কাহিনিতে বর্ণিত মহাজাগতিক কাঠামো সম্পূর্ণ কাল্পনিকও হতে পারে।
পৃথিবীর নিচে পানি, পাথর, ফেরেশতা, মাছ, ষাঁড় এবং সাত পৃথিবীর অবস্থানসংক্রান্ত এসব বর্ণনা প্রাচীন ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের একটি বিশেষ চিত্র তুলে ধরে। সেই চিত্রে পৃথিবীকে আধুনিক ভূবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত একটি গ্রহ হিসেবে নয়, বরং একের পর এক স্তর, বিশাল প্রাণী ও অতিপ্রাকৃত সত্তার সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত এক মহাজাগতিক কাঠামো হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। এই ধারণাগুলোর সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীর গঠনের বিরোধ কোনো সামান্য পরিভাষাগত পার্থক্য নয়; এটি বস্তুজগতের প্রকৃতি সম্পর্কে দুটি মৌলিকভাবে ভিন্ন বিবরণের সংঘাত। একদিকে রয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় বর্ণনায় সংরক্ষিত মহাজাগতিক কাঠামো, অন্যদিকে রয়েছে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর প্রকৃত অভ্যন্তরীণ গঠন। কোনো ধর্মীয় বর্ণনার ঐতিহাসিক মর্যাদা তার ভৌত দাবিকে সত্যে পরিণত করতে পারে না। পৃথিবীর নিচে বাস্তবে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হয় পৃথিবীর প্রকৃত গঠন দিয়ে, প্রাচীন কোনো কাহিনির ধর্মীয় মর্যাদা দিয়ে নয়।
সাত পৃথিবী: কোরআন, হাদিস ও প্রাচীন তাফসিরে পৃথিবীর স্তরবিন্যাস
মানুষ যে পৃথিবীতে বসবাস করে, তার নিচে কি আরও ছয়টি পৃথিবী রয়েছে? ইসলামি ধর্মগ্রন্থে সাত আসমানের পাশাপাশি সাত পৃথিবীর একটি ধারণাও পাওয়া যায়। এটি কেবল মধ্যযুগের কোনো বিচ্ছিন্ন লোককাহিনি নয়। কোরআনের আয়াত, মুহাম্মদের হাদিস এবং প্রাচীন তাফসিরগ্রন্থে সাত পৃথিবীর উল্লেখ রয়েছে। বিশেষত প্রাচীন তাফসিরকারীদের একটি প্রধান ব্যাখ্যায় পৃথিবীগুলোকে একটির নিচে আরেকটি অবস্থিত সাতটি পৃথক স্তর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই পৃথিবীগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব, সেগুলোর বাসিন্দা, আকার ও অবস্থান নিয়েও বিভিন্ন বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। ইসলামি বিশ্বতত্ত্বে পৃথিবীর নিচের জগৎ কীভাবে কল্পনা করা হয়েছিল, তা বুঝতে হলে প্রথমে সাত পৃথিবীর ধারণাটির ধর্মীয় ভিত্তি এবং প্রাচীন ব্যাখ্যাগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কোরআনে সাত পৃথিবীর ধারণা
কোরআনের সুরা আত-তালাকের ১২ নম্বর আয়াতে সাত আসমান সৃষ্টির কথা বলার পর পৃথিবীর ক্ষেত্রেও সেগুলোর অনুরূপ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। আয়াতটিতে সরাসরি পৃথিবীর সংখ্যা সাত বলা না হলেও সাত আসমানের অনুরূপ পৃথিবী সৃষ্টির বক্তব্যকে প্রাচীন ইসলামি তাফসিরকারীরা সাত পৃথিবীর অস্তিত্বের দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। একই আয়াতে এই আসমান ও পৃথিবীগুলোর মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ অবতীর্ণ হওয়ার কথাও রয়েছে। অর্থাৎ আয়াতটির বিষয়বস্তু কেবল মানুষের বসবাসযোগ্য পরিচিত ভূখণ্ড নয়; বরং সৃষ্টিজগতের একটি বৃহত্তর কাঠামো। [1]
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الْأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ। তাদের মধ্যে তাঁর নির্দেশ অবতীর্ণ হয়, যাতে তোমরা জানতে পারো যে আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান এবং আল্লাহ তাঁর জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছেন।
আয়াতটির গুরুত্বপূর্ণ শব্দবন্ধ হচ্ছে وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ, অর্থাৎ পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ। সাত আসমানের সঙ্গে পৃথিবীর এই তুলনা থেকেই সাত পৃথিবীর ব্যাখ্যা গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাত পৃথিবী বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সেই প্রশ্নে প্রাচীন তাফসিরকারীরা শুধু পৃথিবীর সাতটি অঞ্চল বা সাত ধরনের মাটির কথা বলেননি। তাঁদের বহু বর্ণনায় পৃথিবীগুলোকে পরস্পর পৃথক অস্তিত্বসম্পন্ন জগৎ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কোনো বর্ণনায় সেগুলো একটির নিচে আরেকটি অবস্থিত, কোনো বর্ণনায় প্রত্যেকটির মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব রয়েছে, আবার কোনো বর্ণনায় প্রত্যেক পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন সৃষ্টির বসবাসের কথাও পাওয়া যায়। ফলে সাত পৃথিবীর ধারণাটি কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি প্রাচীন ইসলামি মহাবিশ্বচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সহিহ বুখারীতে সাত পৃথিবী
সাত পৃথিবীর ধারণা যে কেবল পরবর্তী তাফসিরকারীদের নিজস্ব কল্পনা ছিল না, তা সহিহ বুখারীর হাদিস থেকেও স্পষ্ট হয়। সহিহ বুখারীর সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়ে সাত পৃথিবী সম্পর্কিত একটি পৃথক অনুচ্ছেদ রয়েছে, যার আরবি শিরোনাম بَاب مَا جَاءَ فِي سَبْعِ أَرَضِينَ, অর্থাৎ সাত পৃথিবী সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আয়েশার সূত্রে মুহাম্মদের এমন একটি বক্তব্য সংকলিত হয়েছে, যেখানে অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখল করার শাস্তিকে সাত পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। হাদিসটির প্রেক্ষাপটে আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমানের সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তির জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি আয়েশার কাছে বিষয়টি জানালে আয়েশা তাঁকে জমির ব্যাপারে সতর্ক করেন এবং মুহাম্মদের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। [2]
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، أَخْبَرَنَا ابْنُ عُلَيَّةَ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ الْمُبَارَكِ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ بْنِ الْحَارِثِ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أُنَاسٍ خُصُومَةٌ فِي أَرْضٍ، فَدَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ فَذَكَرَ لَهَا ذَلِكَ، فَقَالَتْ يَا أَبَا سَلَمَةَ اجْتَنِبِ الأَرْضَ، فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “مَنْ ظَلَمَ قِيدَ شِبْرٍ طُوِّقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ”.
বাংলা অনুবাদ: আলী ইবনে আবদুল্লাহ আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইবনে উলাইয়া আমাদের জানিয়েছেন, আলী ইবনে মুবারকের সূত্রে, ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসির বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম ইবনে হারিসের সূত্রে, আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত: তাঁর সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তির একটি জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। তিনি আয়েশার কাছে গিয়ে বিষয়টি উল্লেখ করলেন। আয়েশা বললেন, হে আবু সালামা, জমির ব্যাপারে সতর্ক থাকো। কারণ আল্লাহর রাসুল বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমি দখল করবে, তাকে সাত পৃথিবী থেকে সেই জমি তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।
একই অধ্যায়ের পরবর্তী হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের সূত্রে আরেকটি বক্তব্য পাওয়া যায়। সেখানে অন্যায়ভাবে জমি দখলকারীকে কিয়ামতের দিন সাত পৃথিবী পর্যন্ত ধসিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথম বর্ণনায় সাত পৃথিবী থেকে জমি গলায় বেড়ি হিসেবে পরানোর কথা রয়েছে, আর দ্বিতীয় বর্ণনায় সাত পৃথিবীর গভীরতা পর্যন্ত ধসিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। এই দ্বিতীয় বর্ণনায় সাত পৃথিবীর ধারণাটি ওপর থেকে নিচের দিকে বিস্তৃত একটি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। [3]
حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ مُحَمَّدٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ، عَنْ سَالِمٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم “مَنْ أَخَذَ شَيْئًا مِنَ الأَرْضِ بِغَيْرِ حَقِّهِ خُسِفَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ”.
বাংলা অনুবাদ: বিশর ইবনে মুহাম্মদ আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবদুল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন, মুসা ইবনে উকবার সূত্রে, সালিম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে নবী বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও জমির কোনো অংশ দখল করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সাত পৃথিবী পর্যন্ত ভূমির নিচে ধসিয়ে দেওয়া হবে।
সহিহ মুসলিমেও সাত পৃথিবীর উল্লেখ
সহিহ মুসলিমেও সাত পৃথিবীর কথা উল্লেখ করে মুহাম্মদের একটি বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। সাঈদ ইবনে যায়েদের সূত্রে বর্ণিত হাদিসটিতে অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখলকারীকে কিয়ামতের দিন সাত পৃথিবী থেকে তার গলায় বেড়ি পরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই বিশ্বাস বুখারী ও মুসলিম উভয় সংকলনেই স্থান পেয়েছে। এই বর্ণনাগুলো পৃথিবীর নিচে মাছ বা পাথর থাকার প্রমাণ নয়; কিন্তু সাত পৃথিবীর ধারণা মুহাম্মদের হাদিস হিসেবে প্রচলিত ছিল, তার প্রত্যক্ষ দলিল। [4]
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، وَقُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، وَعَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ، قَالُوا حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، – وَهُوَ ابْنُ جَعْفَرٍ – عَنِ الْعَلاَءِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ عَبَّاسِ بْنِ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ زَيْدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ نُفَيْلٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “مَنِ اقْتَطَعَ شِبْرًا مِنَ الأَرْضِ ظُلْمًا طَوَّقَهُ اللَّهُ إِيَّاهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ”.
বাংলা অনুবাদ: ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ুব, কুতাইবা ইবনে সাঈদ এবং আলী ইবনে হুজর আমাদের বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ইসমাঈল ইবনে জাফর আমাদের বর্ণনা করেছেন, আলা ইবনে আবদুর রহমানের সূত্রে, আব্বাস ইবনে সাহল ইবনে সাদ আস-সাঈদির সূত্রে, সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল থেকে বর্ণিত যে আল্লাহর রাসুল বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমি দখল করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন সাত পৃথিবী থেকে সেই জমি তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেবেন।
বুখারী ও মুসলিমের এসব বর্ণনায় সাত পৃথিবীকে বাস্তব জগতের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু এই হাদিসগুলো থেকে পৃথিবীগুলোর নির্দিষ্ট পুরুত্ব, মধ্যবর্তী দূরত্ব কিংবা প্রতিটি পৃথিবীর ভৌত গঠন নির্ধারণ করা যায় না। সেই বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় প্রাচীন তাফসির ও অন্যান্য হাদিসসংকলনে। বিশেষত কোরআনের সুরা আত-তালাকের ১২ নম্বর আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাবারী, ইবনে কাসীর ও কুরতুবী সাত পৃথিবী সম্পর্কে আরও বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এসব আলোচনায় সাত পৃথিবীর সংখ্যা ছাড়াও তাদের পারস্পরিক অবস্থান, পৃথক বাসিন্দা এবং পৃথিবীগুলোর মধ্যে দূরত্বের ধারণা পাওয়া যায়।
তাফসীরে তাবারীতে সাত পৃথিবী এবং প্রত্যেক পৃথিবীর সৃষ্টি
প্রাচীন ইসলামি তাফসিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকলন তাফসীরে তাবারীতে সুরা আত-তালাকের ১২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় সাত পৃথিবী সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণিত একটি বিবরণে প্রত্যেক পৃথিবীতে ইব্রাহিমের অনুরূপ ব্যক্তির এবং পৃথিবীতে বসবাসকারী সৃষ্টির অনুরূপ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে সাত পৃথিবীকে শুধু একাধিক মাটির স্তর হিসেবে নয়, বরং পৃথক সৃষ্টিসম্পন্ন জগৎ হিসেবেও কল্পনা করা হয়েছে। ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত এই বক্তব্যটি পৃথিবীর নিচে অন্য জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রাচীন ইসলামি ধারণার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। [5]
حدثني عمرو بن عليّ ومحمد بن المثنى، قالا ثنا محمد بن جعفر، قال: ثنا شعبة، عن عمرو بن مرّة، عن أَبي الضحى، عن ابن عباس، قال في هذه الآية: ( اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الأرْضِ مِثْلَهُنَّ ) قال عمرو: قال: في كل أرض مثل إبراهيم ونحو ما على الأرض من الخلق. وقال ابن المثنى: في كلّ سماء إبراهيم.
বাংলা অনুবাদ: আমর ইবনে আলী ও মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না আমাদের বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, মুহাম্মদ ইবনে জাফর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, শুবা আমাদের বর্ণনা করেছেন, আমর ইবনে মুররার সূত্রে, আবু দুহার সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন, ‘আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ।’ আমর বলেছেন, ইবনে আব্বাসের বক্তব্য ছিল, প্রত্যেক পৃথিবীতে ইব্রাহিমের মতো ব্যক্তি এবং এই পৃথিবীতে যা ধরনের সৃষ্টি রয়েছে, তার অনুরূপ সৃষ্টি রয়েছে। আর ইবনে মুসান্নার বর্ণনায় রয়েছে, প্রত্যেক আসমানে ইব্রাহিম রয়েছে।
একই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবারী ইবনে আব্বাসের নামে আরেকটি বর্ণনা সংকলন করেছেন। সেখানে ইবনে আব্বাসকে আয়াতটির ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলে তিনি এমন এক বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া জানান, যা থেকে বোঝা যায় সাত পৃথিবীর ব্যাখ্যাকে তিনি সাধারণ মানুষের প্রচলিত অভিজ্ঞতার বাইরে এক অস্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুসারে, তিনি এই আয়াতের প্রকৃত ব্যাখ্যা প্রকাশ করলে শ্রোতারা তা অবিশ্বাস করতে পারে। [6]
حدثنا عمرو بن عليّ، قال: ثنا وكيع، قال: ثنا الأعمش، عن إبراهيم بن مهاجر، عن مجاهد، عن ابن عباس، في قوله: ( اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الأرْضِ مِثْلَهُنَّ ) قال: لو حدثتكم بتفسيرها لكفرتم وكفركم تكذيبكم بها.
বাংলা অনুবাদ: আমর ইবনে আলী আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ওয়াকী আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাশ আমাদের বর্ণনা করেছেন, ইব্রাহিম ইবনে মুহাজিরের সূত্রে, মুজাহিদের সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। আল্লাহর বক্তব্য, ‘আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ’ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস বলেছেন, আমি যদি তোমাদের কাছে এর ব্যাখ্যা বর্ণনা করি, তাহলে তোমরা কুফরি করবে। আর তোমাদের সেই কুফরি হবে এর সত্যতা অস্বীকার করা।
তাবারী কাতাদার সূত্রেও সাত আসমান ও সাত পৃথিবীর ধারণা সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে প্রত্যেক আসমান ও প্রত্যেক পৃথিবীতে আল্লাহর পৃথক সৃষ্টি, নির্দেশ ও বিধানের কথা বলা হয়েছে। এই বক্তব্যে সাত পৃথিবীকে শুধু মৃত বা নিষ্প্রাণ শিলাস্তরের সমষ্টি হিসেবে দেখানো হয়নি। প্রত্যেক পৃথিবীকে আল্লাহর সৃষ্টিজগতের একটি পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। [7]
حدثنا بشر، قال: ثنا يزيد، قال: ثنا سعيد، عن قتادة، قوله: ( اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الأرْضِ مِثْلَهُنَّ ) خلق سبع سموات وسبع أرضين في كل سماء من سمائه، وأرض من أرضه، خلق من خلقه وأمر من أمره، وقضاء من قضائه.
বাংলা অনুবাদ: বিশর আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়াজিদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সাঈদ কাতাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে আল্লাহর বক্তব্য, ‘আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ’ সম্পর্কে কাতাদা বলেছেন, আল্লাহ সাত আসমান এবং সাত পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তাঁর প্রত্যেক আসমানে এবং প্রত্যেক পৃথিবীতে তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে সৃষ্টি রয়েছে, তাঁর নির্দেশের মধ্য থেকে নির্দেশ রয়েছে এবং তাঁর নির্ধারণের মধ্য থেকে নির্ধারণ রয়েছে।
এই তিনটি বর্ণনায় সাত পৃথিবীর ধারণার সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছে। প্রথমত, পৃথিবীগুলোকে পৃথক অস্তিত্বসম্পন্ন জগৎ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এসব পৃথিবীতে মানুষের পরিচিত জগতের অনুরূপ সৃষ্টির উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। তৃতীয়ত, পৃথিবীগুলোর সৃষ্টি ও পরিচালনাকে আল্লাহর পৃথক নির্দেশ ও বিধানের অধীন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পৃথিবীর নিচে কী আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে এভাবে পরিচিত পৃথিবীর বাইরে আরও একাধিক জগতের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যা: সাত পৃথিবী বলতে সাতটি ভূখণ্ড নয়
সাত পৃথিবী বলতে পৃথিবীর সাতটি অঞ্চল, সাতটি দেশ কিংবা সাতটি ভৌগোলিক বিভাগ বোঝানো হয়েছে—এমন ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ইবনে কাসীরের বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুরা আত-তালাকের ১২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি স্পষ্টভাবে সাত পৃথিবীর সংখ্যা স্বীকার করেছেন এবং বুখারী-মুসলিমের হাদিসকে তার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যাঁরা সাত পৃথিবীকে সাতটি ভৌগোলিক অঞ্চলের অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন, তাঁদের ব্যাখ্যাকে তিনি কোরআন ও হাদিসবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই আলোচনায় তিনি সাত পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং প্রত্যেক পৃথিবীর পুরুত্ব সম্পর্কেও বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। [8]
وقوله تعالى ( ومن الأرض مثلهن ) أي سبعا أيضا، كما ثبت في الصحيحين “من ظلم قيد شبر من الأرض طوقه من سبع أرضين” وفي صحيح البخاري “خسف به إلى سبع أرضين” وقد ذكرت طرقه وألفاظه وعزوه في أول “البداية والنهاية” عند ذكر خلق الأرض ولله الحمد والمنة.
ومن حمل ذلك على سبعة أقاليم فقد أبعد النجعة، وأغرق في النزع، وخالف القرآن، والحديث بلا مستند. وقد تقدم في سورة الحديد عند قوله: ( هو الأول والآخر والظاهر والباطن ) [ الآية : 3 ] ذكر الأرضين السبع، وبعد ما بينهن، وكثافة كل واحدة منهن خمسمائة عام، وهكذا قال ابن مسعود وغيره، وكذا في الحديث الآخر “ما السماوات السبع، وما فيهن، وما بينهن، والأرضون السبع، وما فيهن، وما بينهن في الكرسي إلا كحلقة ملقاة بأرض فلاة”.
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর বক্তব্য, ‘এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ’—এর অর্থ হলো সাতটি পৃথিবীও। যেমন সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে প্রমাণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমি দখল করবে, তাকে সাত পৃথিবী থেকে সেই জমি গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে। আর সহিহ বুখারীতে রয়েছে, তাকে সাত পৃথিবী পর্যন্ত ভূমির নিচে ধসিয়ে দেওয়া হবে। পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থের শুরুতে আমি এই হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনাপথ, শব্দবিন্যাস ও উৎস উল্লেখ করেছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
আর যে ব্যক্তি এর অর্থ সাতটি ভৌগোলিক অঞ্চল বলে গ্রহণ করেছে, সে সঠিক ব্যাখ্যা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, ব্যাখ্যায় অতিরঞ্জন করেছে এবং কোনো ভিত্তি ছাড়াই কোরআন ও হাদিসের বিরোধিতা করেছে। ইতিপূর্বে সুরা আল-হাদিদের ‘তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই অপ্রকাশ্য’ আয়াতের ব্যাখ্যায় সাত পৃথিবী, সেগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব এবং প্রত্যেক পৃথিবীর পাঁচশ বছরের পথের সমপরিমাণ পুরুত্বের কথা আলোচনা করা হয়েছে। ইবনে মাসউদসহ অন্যরাও এমন বলেছেন। একইভাবে আরেকটি হাদিসে রয়েছে, সাত আসমান, সেগুলোর মধ্যে যা আছে এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছু, আর সাত পৃথিবী, সেগুলোর মধ্যে যা আছে এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছু—কুরসির তুলনায় এমন, যেন একটি বিশাল প্রান্তরে ফেলে রাখা ছোট একটি আংটি।
ইবনে কাসীরের বক্তব্যে সাত পৃথিবীর ধারণাটি ব্যাখ্যার দিক থেকে আরও সুস্পষ্ট হয়েছে। তিনি সাত পৃথিবীকে পৃথিবীর সাতটি অঞ্চল হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় এগুলো সাতটি পৃথক পৃথিবী, যাদের প্রত্যেকটির পুরুত্ব রয়েছে এবং যাদের মধ্যে দূরত্ব রয়েছে। তিনি এই অবস্থান গ্রহণ করেছেন কোরআনের আয়াত, বুখারী-মুসলিমের হাদিস এবং ইবনে মাসউদের মতো প্রাচীন ব্যক্তিদের বর্ণনার ভিত্তিতে। ফলে সাত পৃথিবীকে কেবল প্রতীকী সাতটি অঞ্চল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইবনে কাসীরের নিজের অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ইবনে কাসীর একই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাসের নামে প্রত্যেক পৃথিবীতে পরিচিত নবীদের অনুরূপ ব্যক্তির উপস্থিতির একটি বিস্ময়কর বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন। সেখানে প্রত্যেক পৃথিবীতে আদম, নূহ, ইব্রাহিম ও ঈসার অনুরূপ ব্যক্তির কথা পাওয়া যায়। ইবনে কাসীর বায়হাকীর সূত্রে বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর বায়হাকীর মন্তব্যও সংরক্ষণ করেছেন। বায়হাকী বর্ণনাটির সনদকে ইবনে আব্বাস পর্যন্ত সহিহ বললেও এর বিষয়বস্তুকে অত্যন্ত বিচিত্র বলে চিহ্নিত করেছেন এবং আবু দুহার কোনো সমর্থনকারী বর্ণনাকারী পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ বর্ণনাটির উৎসগত মূল্যায়ন এবং এতে বর্ণিত জগতের বাস্তব অস্তিত্বের প্রশ্ন এক বিষয় নয়। [9]
وقد روى البيهقي في كتاب الأسماء والصفات هذا الأثر عن ابن عباس بأبسط من هذا السياق فقال: أنا أبو عبد الله الحافظ، حدثنا أحمد بن يعقوب، حدثنا عبيد بن غنام النخعي، أنا علي بن حكيم، حدثنا شريك، عن عطاء بن السائب، عن أبي الضحى، عن ابن عباس، قال ( الله الذي خلق سبع سماوات ومن الأرض مثلهن ) قال: سبع أرضين، في كل أرض نبي كنبيكم، وآدم كآدم، ونوح كنوح، وإبراهيم، كإبراهيم، وعيسى كعيسى.
ثم رواه البيهقي من حديث شعبة، عن عمرو بن مرة، عن أبي الضحى، عن ابن عباس، في قول الله عز وجل ( الله الذي خلق سبع سماوات ومن الأرض مثلهن ) قال في كل أرض نحو إبراهيم عليه السلام.
ثم قال البيهقي: إسناد هذا عن ابن عباس صحيح وهو شاذ بمرة، لا أعلم لأبي الضحى عليه متابعا، والله أعلم.
বাংলা অনুবাদ: বায়হাকী তাঁর ‘আল-আসমা ওয়াস-সিফাত’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের এই বর্ণনাটি আরও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আবু আবদুল্লাহ আল-হাফিজ আমাদের জানিয়েছেন, আহমদ ইবনে ইয়াকুব আমাদের বর্ণনা করেছেন, উবাইদ ইবনে গান্নাম আন-নাখাঈ আমাদের বর্ণনা করেছেন, আলী ইবনে হাকিম আমাদের জানিয়েছেন, শারিক আমাদের বর্ণনা করেছেন, আতা ইবনে সায়িবের সূত্রে, আবু দুহার সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। আল্লাহর বক্তব্য, ‘আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ’ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস বলেছেন, সাতটি পৃথিবী রয়েছে। প্রত্যেক পৃথিবীতে তোমাদের নবীর মতো একজন নবী, তোমাদের আদমের মতো একজন আদম, নূহের মতো একজন নূহ, ইব্রাহিমের মতো একজন ইব্রাহিম এবং ঈসার মতো একজন ঈসা রয়েছে।
এরপর বায়হাকী শুবার সূত্রে, আমর ইবনে মুররার সূত্রে, আবু দুহার সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর এই আয়াত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস বলেছেন, প্রত্যেক পৃথিবীতে ইব্রাহিমের মতো ব্যক্তি রয়েছে।
এরপর বায়হাকী বলেছেন, ইবনে আব্বাস পর্যন্ত এই বর্ণনার সনদ সহিহ, কিন্তু বর্ণনাটি অত্যন্ত বিচিত্র। আমি আবু দুহার পক্ষে এর কোনো সমর্থনকারী বর্ণনাকারী সম্পর্কে জানি না। আল্লাহই ভালো জানেন।
এখানে পৃথিবীর নিচে অবস্থিত অন্য পৃথিবীগুলোর বাসিন্দা সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বর্ণনাটি অনুযায়ী একাধিক পৃথিবীতে একই ধরনের নবী এবং পরিচিত মানবসমাজের অনুরূপ সৃষ্টির অস্তিত্ব রয়েছে। এটি পৃথিবীর ভূত্বক, ম্যান্টল বা কেন্দ্রের স্তরবিন্যাসের কোনো বিবরণ নয়। বরং পরিচিত মানবজগতের মতো আরও কয়েকটি পৃথক জগতের কল্পনা। এই ধরনের বর্ণনা প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে সাত পৃথিবীকে কী অর্থে বোঝা হয়েছিল, তার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। বর্ণনাটির বিচিত্রতা সম্পর্কে বায়হাকীর মন্তব্যও সংরক্ষিত রয়েছে; কিন্তু সেই মন্তব্য বর্ণনাটি প্রাচীন ইসলামি সাহিত্য ও তাফসিরচর্চায় প্রচলিত ছিল—এই ঐতিহাসিক তথ্যকে বাতিল করে না।
কুরতুবীর তাফসিরে একটির নিচে আরেকটি সাত পৃথিবী
কুরতুবী সুরা আত-তালাকের ১২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় সাত পৃথিবীর অবস্থান সম্পর্কে আরও স্পষ্ট আলোচনা করেছেন। তাঁর বিবরণ অনুসারে, অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারীর মত ছিল যে সাত পৃথিবী স্তরে স্তরে একটির নিচে আরেকটি অবস্থিত এবং প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মাঝখানে আসমানগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্বের অনুরূপ ব্যবধান রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, প্রত্যেক পৃথিবীতে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্য থেকে বাসিন্দা রয়েছে। একই সঙ্গে দাহহাকের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যাও সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে পৃথিবীগুলোকে একটির সঙ্গে আরেকটি সংলগ্ন স্তর হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। কুরতুবী প্রথম ব্যাখ্যাটিকে অধিকতর সঠিক বলে গ্রহণ করেছেন। [10]
قوله تعالى : الله الذي خلق سبع سماوات ومن الأرض مثلهن دل على كمال قدرته وأنه يقدر على البعث والمحاسبة . ولا خلاف في السموات أنها سبع بعضها فوق بعض ; دل على ذلك حديث الإسراء وغيره . ثم قال : ومن الأرض مثلهن يعني سبعا . واختلف فيهن على قولين : أحدهما : وهو قول الجمهور – أنها سبع أرضين طباقا بعضها فوق بعض ، بين كل أرض وأرض مسافة كما بين السماء والسماء ، وفي كل أرض سكان من خلق الله . وقال الضحاك : ومن الأرض مثلهن أي سبعا من الأرضين ، ولكنها مطبقة بعضها على بعض من غير فتوق بخلاف السموات .
والأول أصح ; لأن الأخبار دالة عليه في الترمذي والنسائي وغيرهما . وقد مضى ذلك مبينا في ” البقرة ” .
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর বক্তব্য, ‘আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ’ তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতার প্রমাণ এবং তিনি পুনরুত্থান ও হিসাব গ্রহণে সক্ষম—তারও দলিল। আসমান যে সাতটি এবং একটির ওপরে আরেকটি অবস্থিত, এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই। ইসরা সম্পর্কিত হাদিস ও অন্যান্য বর্ণনা এর প্রমাণ। এরপর তিনি বলেছেন, ‘এবং পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ’—এর অর্থ সাতটি পৃথিবী।
সাত পৃথিবী সম্পর্কে দুটি মত রয়েছে। প্রথম মতটি অধিকাংশ আলেমের। তাঁদের মতে, সাতটি পৃথিবী স্তরে স্তরে একটির ওপরে আরেকটি অবস্থিত। প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মধ্যে এমন দূরত্ব রয়েছে, যেমন দুটি আসমানের মধ্যে রয়েছে। প্রত্যেক পৃথিবীতে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্য থেকে বাসিন্দা রয়েছে। দাহহাক বলেছেন, ‘পৃথিবী থেকেও সেগুলোর অনুরূপ’ বলতে সাতটি পৃথিবী বোঝানো হয়েছে, কিন্তু সেগুলো আসমানগুলোর মতো ফাঁকযুক্ত নয়; বরং একটি আরেকটির সঙ্গে সংলগ্ন অবস্থায় স্তরে স্তরে রয়েছে।
প্রথম মতটিই অধিকতর সঠিক। কারণ তিরমিজি, নাসাঈ এবং অন্যান্য হাদিসগ্রন্থের বর্ণনা এই মতের পক্ষে প্রমাণ বহন করে। সুরা আল-বাকারার ব্যাখ্যায় ইতিপূর্বে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।
কুরতুবীর এই বিবরণে সাত পৃথিবীকে পরস্পর পৃথক এবং একটির নিচে আরেকটি অবস্থিত জগৎ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর গ্রহণযোগ্য বিবেচিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী পৃথিবীগুলোর মাঝখানে ফাঁকা ব্যবধান রয়েছে এবং প্রত্যেক পৃথিবীতে বাসিন্দাও রয়েছে। দাহহাকের বিকল্প ব্যাখ্যায় পৃথিবীগুলোর মাঝখানে ফাঁক নেই, কিন্তু সেখানেও সাতটি পৃথক স্তরের ধারণা অক্ষত রয়েছে। ফলে ব্যাখ্যাগত পার্থক্যটি মূলত পৃথিবীগুলোর মধ্যবর্তী ব্যবধান নিয়ে, সাত পৃথিবীর সংখ্যাগত অস্তিত্ব নিয়ে নয়। কুরতুবী এই বিষয়ে তিরমিজি ও নাসাঈর হাদিসকে প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করেছেন।
অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা, আকাশ ও আলোর উৎস
সাত পৃথিবীর ধারণা প্রাচীন ইসলামি চিন্তায় কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায় কুরতুবীর তাফসিরে মাওয়ার্দীর আলোচনা থেকে। যদি আমাদের পৃথিবীর নিচে আরও পৃথিবী থাকে এবং সেগুলোতে মানুষের মতো বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী বসবাস করে, তাহলে তাদের ওপর ইসলামের বিধান প্রযোজ্য কি না—এমন প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছিল। একই সঙ্গে নিচের পৃথিবীগুলোর বাসিন্দারা আকাশ দেখতে পায় কি না এবং তারা আলো পায় কোথা থেকে, সে প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। মাওয়ার্দীর বিবরণে পৃথিবী সমতল কিংবা গোলাকার হওয়ার ধারণার ভিত্তিতে বাসিন্দাদের আলোর উৎস সম্পর্কে পৃথক সম্ভাবনার কথাও পাওয়া যায়। [11]
قال الماوردي : وعلى أنها سبع أرضين بعضها فوق بعض تختص دعوة أهل الإسلام بأهل الأرض العليا ، ولا تلزم من في غيرها من الأرضين وإن كان فيها من يعقل من خلق مميز . وفي مشاهدتهم السماء واستمدادهم الضوء منها قولان : أحدهما : أنهم يشاهدون السماء من كل جانب من أرضهم ويستمدون الضياء منها . وهذا قول من جعل الأرض مبسوطة . والقول الثاني : أنهم لا يشاهدون السماء ، وأن الله تعالى خلق لهم ضياء يستمدونه . وهذا قول من جعل الأرض كالكرة .
বাংলা অনুবাদ: মাওয়ার্দী বলেছেন, যদি সাতটি পৃথিবী একটির ওপর আরেকটি অবস্থিত হয়, তাহলে ইসলামের আহ্বান বিশেষভাবে ওপরের পৃথিবীর বাসিন্দাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। অন্য পৃথিবীগুলোর বাসিন্দাদের জন্য তা বাধ্যতামূলক হবে না, যদিও সেখানে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্য থেকে বুদ্ধিসম্পন্ন ও বিচারবোধসম্পন্ন প্রাণী থাকে।
তারা আকাশ দেখতে পায় কি না এবং আকাশ থেকে আলো গ্রহণ করে কি না, সে বিষয়ে দুটি মত রয়েছে। প্রথম মত অনুযায়ী, তারা নিজেদের পৃথিবীর সব দিক থেকে আকাশ দেখতে পায় এবং আকাশ থেকে আলো গ্রহণ করে। এটি তাঁদের মত, যাঁরা পৃথিবীকে বিস্তৃত বা সমতল মনে করেন। দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, তারা আকাশ দেখতে পায় না; বরং আল্লাহ তাদের জন্য পৃথক আলো সৃষ্টি করেছেন, যা থেকে তারা আলোকিত হয়। এটি তাঁদের মত, যাঁরা পৃথিবীকে গোলাকার মনে করেন।
কুরতুবী একই আলোচনায় ইবনে আব্বাসের নামে আরেকটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন, যেখানে সাত পৃথিবীকে একটির নিচে আরেকটি নয়, বরং পাশাপাশি বিস্তৃত সাতটি পৃথক ভূখণ্ড হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় পৃথিবীগুলোর মধ্যে সমুদ্র রয়েছে এবং একই আকাশ তাদের সবাইকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। সেই ধারণার ভিত্তিতেও কুরতুবী আলোচনা করেছেন, এক পৃথিবীর বাসিন্দাদের সঙ্গে অন্য পৃথিবীর যোগাযোগ সম্ভব হলে ইসলামের বিধান তাদের ওপর প্রযোজ্য হবে কি না। [12]
وفي الآية قول ثالث حكاه الكلبي عن أبي صالح عن ابن عباس أنها سبع أرضين منبسطة ; ليس بعضها فوق بعض ، تفرق بينها البحار وتظل جميعهم السماء . فعلى هذا إن لم يكن لأحد من أهل الأرض وصول إلى أرض أخرى اختصت دعوة الإسلام بأهل هذه الأرض ، وإن كان لقوم منهم وصول إلى أرض أخرى احتمل أن تلزمهم دعوة الإسلام عند إمكان الوصول إليهم ; لأن فصل البحار إذا أمكن سلوكها لا يمنع من لزوم ما عم حكمه ، واحتمل ألا تلزمهم دعوة الإسلام لأنها لو لزمتهم لكان النص بها واردا ، ولكان صلى الله عليه وسلم بها مأمورا .
বাংলা অনুবাদ: এই আয়াত সম্পর্কে তৃতীয় একটি মতও রয়েছে, যা কালবী আবু সালিহের সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন। সেই মত অনুযায়ী সাতটি পৃথিবী বিস্তৃত অবস্থায় রয়েছে; একটি আরেকটির ওপরে নয়। সমুদ্রগুলো তাদের পৃথক করে রেখেছে এবং একই আকাশ তাদের সবাইকে আচ্ছাদিত করে রয়েছে।
এই ব্যাখ্যা অনুসারে, যদি এক পৃথিবীর বাসিন্দাদের পক্ষে অন্য পৃথিবীতে পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তাহলে ইসলামের আহ্বান এই পৃথিবীর বাসিন্দাদের জন্যই নির্দিষ্ট থাকবে। আর যদি তাদের মধ্যে কারও পক্ষে অন্য পৃথিবীতে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে সেখানে পৌঁছানোর সামর্থ্য থাকলে ইসলামের আহ্বান তাদের জন্যও বাধ্যতামূলক হতে পারে। কারণ সমুদ্রের দ্বারা পৃথক থাকা সত্ত্বেও যদি তা অতিক্রম করা সম্ভব হয়, তাহলে সাধারণভাবে প্রযোজ্য কোনো বিধান তাদের ওপর কার্যকর হওয়ায় সেই সমুদ্র বাধা সৃষ্টি করবে না। আবার এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে ইসলামের আহ্বান তাদের ওপর বাধ্যতামূলক হবে না। কারণ তা বাধ্যতামূলক হলে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধর্মীয় নির্দেশ আসত এবং নবীকেও সেই নির্দেশ দেওয়া হতো।
এই বর্ণনাগুলো থেকে প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে সাত পৃথিবী সম্পর্কে একাধিক ভৌগোলিক ও মহাজাগতিক কাঠামোর ধারণা পাওয়া যায়। একটি ব্যাখ্যায় সাত পৃথিবী একটির নিচে আরেকটি অবস্থিত এবং প্রত্যেকটির মধ্যে দীর্ঘ দূরত্ব রয়েছে। আরেকটি ব্যাখ্যায় সেগুলো পরস্পর সংলগ্ন স্তর। তৃতীয় ব্যাখ্যায় পৃথিবীগুলো পাশাপাশি বিস্তৃত, সমুদ্র দিয়ে পৃথক এবং একই আকাশের নিচে অবস্থিত। এসব ব্যাখ্যা পরস্পরের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পৃথিবীগুলো একই সঙ্গে স্তরে স্তরে একটির নিচে আরেকটি অবস্থিত এবং পাশাপাশি সমুদ্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন সাতটি ভূখণ্ড হতে পারে না। কুরতুবীর নিজের আলোচনাতেই প্রাচীন ইসলামি বিশ্বতত্ত্বের এই ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোগত ধারণা সংরক্ষিত হয়েছে।
সাত পৃথিবীর ধারণা এবং বাস্তব পৃথিবী
কোরআন, সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম এবং প্রাচীন তাফসিরগ্রন্থগুলোর এসব বক্তব্য একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে সাত পৃথিবীর ধারণাটি ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্বাস হিসেবে প্রচলিত ছিল। কোরআনে সাত আসমানের অনুরূপ পৃথিবী সৃষ্টির কথা রয়েছে। মুহাম্মদের হাদিসে সাত পৃথিবী পর্যন্ত ভূমির নিচে ধসিয়ে দেওয়া কিংবা সাত পৃথিবী থেকে জমি গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে। তাবারীর সংকলিত বর্ণনায় প্রত্যেক পৃথিবীতে পৃথক সৃষ্টির উপস্থিতির কথা পাওয়া যায়। ইবনে কাসীর সাত পৃথিবীকে সাতটি ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে ব্যাখ্যা করার বিরোধিতা করেছেন। কুরতুবী অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারীর মত হিসেবে একটির নিচে আরেকটি সাত পৃথিবীর অবস্থান এবং প্রত্যেক পৃথিবীতে বাসিন্দার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এই বর্ণনাগুলো শুধু একই শব্দের পুনরাবৃত্তি নয়; সাত পৃথিবীকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত মহাজাগতিক ধারণার বিকাশ ঘটেছিল।
আধুনিক ভূবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণে পৃথিবীর অভ্যন্তরে একটির নিচে আরেকটি পৃথক বাসিন্দাসম্পন্ন সাতটি পৃথিবী পাওয়া যায়নি। পৃথিবীর অভ্যন্তরে ভূত্বক, ম্যান্টল এবং কেন্দ্রের মতো ভৌত স্তর রয়েছে, যাদের গঠন, ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পরিমাপযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়। এসব স্তর একাধিক পৃথক পৃথিবী নয়। ভূত্বকের নিচে মানুষের বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী, তার নিচে আরও একটি পৃথিবী এবং এভাবে সাতটি পৃথক জগতের অস্তিত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। একইভাবে নিচের পৃথিবীগুলোতে পৃথক আদম, নূহ, ইব্রাহিম কিংবা ঈসার অনুরূপ ব্যক্তির উপস্থিতির দাবিও পর্যবেক্ষণভিত্তিক কোনো তথ্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয়।
সাত পৃথিবী সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সৃষ্টি করে। যদি পৃথিবীগুলো বাস্তব ভৌত কাঠামো হয়, তাহলে তাদের অবস্থান, পরস্পরের দূরত্ব, পুরুত্ব এবং মধ্যবর্তী পদার্থ সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য থাকার কথা। প্রাচীন ইসলামি সাহিত্যেও সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। বিশেষত তাবারী ও অন্যান্য হাদিসসংকলনে প্রত্যেক পৃথিবীর পুরুত্ব এবং দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বকে পাঁচশ বছরের পথের সমান বলা হয়েছে। কিছু বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজেই সাহাবিদের প্রশ্ন করেছেন, তাঁদের পায়ের নিচে কী রয়েছে, তারপর একের পর এক সাত পৃথিবীর বিবরণ দিয়েছেন। এসব বক্তব্যে সাত পৃথিবী আর কেবল একটি অস্পষ্ট ধর্মীয় ধারণা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; পৃথিবীর নিচে অবস্থিত জগতের নির্দিষ্ট স্তরবিন্যাস ও দূরত্বসম্পন্ন একটি মহাজাগতিক কাঠামোর রূপ লাভ করে।
সাত পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব ও পৃথিবীর পুরুত্ব: পাঁচশ বছরের পথ
সাত পৃথিবীর অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাগুলো শুধু পৃথিবীর সংখ্যা উল্লেখ করেই থেমে যায়নি। পৃথিবীগুলো একটির নিচে আরেকটি কত দূরে অবস্থিত, প্রত্যেক পৃথিবীর পুরুত্ব কত এবং সর্বনিম্ন পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে কত দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে, সেসব সম্পর্কেও নির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। বিশেষত পাঁচশ বছরের পথের দূরত্বের ধারণাটি বিভিন্ন হাদিস ও তাফসিরে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এই বর্ণনাগুলোতে আসমান ও পৃথিবীকে এমন এক মহাজাগতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে ওপরের দিকে সাত আসমান এবং নিচের দিকে সাত পৃথিবী রয়েছে। প্রত্যেক দুটি আসমান এবং প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্বের কথা বলা হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় প্রত্যেক আসমান ও পৃথিবীর নিজস্ব পুরুত্বও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এসব বিবরণে শুধু সাতটি পৃথক পৃথিবীর অস্তিত্ব নয়, বরং সেগুলোর একটি পরিমাপযোগ্য স্থানিক বিন্যাসের ধারণাও পাওয়া যায়।
তিরমিজির হাদিস: মানুষের পায়ের নিচে আরও ছয় পৃথিবী
জামে তিরমিজির ৩২৯৮ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রার সূত্রে মুহাম্মদের একটি দীর্ঘ বক্তব্য সংকলিত হয়েছে। বর্ণনাটির শুরুতে মুহাম্মদ সাহাবিদের সঙ্গে বসে ছিলেন। তাঁদের ওপর দিয়ে একটি মেঘ অতিক্রম করলে মুহাম্মদ মেঘটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। এরপর তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেন, তাঁদের মাথার ওপর কী রয়েছে। সাহাবিরা উত্তর দেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তখন মুহাম্মদ আসমানকে সংরক্ষিত ছাদ এবং আটকে রাখা তরঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর তিনি আসমান ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচশ বছরের পথের সমান বলে জানান। একের পর এক সাত আসমানের কথা উল্লেখ করে প্রত্যেক দুটি আসমানের মধ্যবর্তী দূরত্বও পাঁচশ বছরের পথের সমান বলে বর্ণনা করেন। সর্বোচ্চ আসমানের ওপরে আরশের অবস্থানের কথাও বলেন। এরপর একই ধরনের প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন। [13]
هَلْ تَدْرُونَ مَا الَّذِي تَحْتَ ذَلِكَ قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ فَإِنَّ تَحْتَهَا الأَرْضَ الأُخْرَى بَيْنَهُمَا مَسِيرَةُ خَمْسِمِائَةِ سَنَةٍ
বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, তোমরা কি জানো এর নিচে কী রয়েছে? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, এর নিচে আরেকটি পৃথিবী রয়েছে এবং এই দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচশ বছরের পথের সমান।
হাদিসটিতে মুহাম্মদ এখানেই থেমে যাননি। তিনি পর্যায়ক্রমে সাত পৃথিবী পর্যন্ত গণনা করেন এবং প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মাঝখানে পাঁচশ বছরের পথের দূরত্ব রয়েছে বলে জানান। এরপর তিনি শপথ করে বলেন, যদি একটি মানুষকে রশি দিয়ে সর্বনিম্ন পৃথিবী পর্যন্ত নামানো হয়, তাহলে সেই মানুষ আল্লাহর কাছে গিয়ে পৌঁছাবে। এই বক্তব্যের পর মুহাম্মদ সুরা আল-হাদিদের ৩ নম্বর আয়াত পাঠ করেন, যেখানে আল্লাহকে প্রথম, শেষ, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বলা হয়েছে। ফলে বর্ণনাটিতে ওপরের দিকে আসমানসমূহ ও আরশ এবং নিচের দিকে সাত পৃথিবী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি মহাজাগতিক কাঠামো পাওয়া যায়।
এই বর্ণনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, পৃথিবীগুলোকে কেবল সাতটি ভিন্ন নাম বা প্রতীকী স্তর হিসেবে দেখানো হয়নি। মুহাম্মদের প্রশ্ন, ‘তোমাদের নিচে কী রয়েছে?’ এবং তার উত্তরে ‘এর নিচে আরেকটি পৃথিবী রয়েছে’—এই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীগুলোকে ওপর-নিচে অবস্থিত পৃথক জগৎ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী পাঁচশ বছরের পথের দূরত্বও সেই অবস্থানগত সম্পর্কের অংশ। যদি পৃথিবীগুলো একই গ্রহের সংলগ্ন শিলাস্তর হতো, তাহলে তাদের মাঝখানে পাঁচশ বছরের পথের সমান পৃথক ব্যবধানের ধারণাটি এই বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো না।
তিরমিজি হাদিসটি সংকলনের পর একে গরিব বলেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, কয়েকজন বর্ণনাকারীর মতে হাসান বসরি আবু হুরায়রার কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শোনেননি। পরবর্তী হাদিসশাস্ত্রীয় মূল্যায়নেও বর্ণনাটি দুর্বল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে। এই সনদগত সমস্যা বর্ণনাটিকে মুহাম্মদের নিশ্চিত ঐতিহাসিক বক্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বাধা দেয়। কিন্তু এর ফলে বর্ণনাটি প্রাচীন ইসলামি বিশ্বতত্ত্বের ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে গুরুত্ব হারায় না। তিরমিজির সংকলনে এটি মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত একটি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক বিবরণ, যার মধ্যে সাত পৃথিবী এবং সেগুলোর মধ্যবর্তী পাঁচশ বছরের দূরত্বের ধারণা সংরক্ষিত রয়েছে। এই বিশ্বাসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় ইবনে মাসউদের নামে প্রচলিত বক্তব্যে, যেখানে শুধু পৃথিবীগুলোর দূরত্ব নয়, প্রত্যেকটির পুরুত্ব সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়েছে।
ইবনে মাসউদের বক্তব্য: প্রত্যেক পৃথিবীর পুরুত্বও পাঁচশ বছরের পথ
তাফসীরে তাবারীতে সুরা আত-তালাকের ১২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। ইবনে মাসউদ ছিলেন মুহাম্মদের অন্যতম পরিচিত সাহাবি এবং কোরআনের ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর নামে সংরক্ষিত এই বিবরণে সাত আসমান ও সাত পৃথিবীর একটি পরিমাপভিত্তিক কাঠামো পাওয়া যায়। প্রথমে সাত আসমানের কথা বলা হয়েছে। প্রত্যেক আসমানের পুরুত্ব পাঁচশ বছরের পথ এবং প্রত্যেক দুটি আসমানের মধ্যবর্তী দূরত্বও পাঁচশ বছরের পথ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তম আসমানের ওপরে পানি এবং সেই পানির ওপরে আল্লাহর অবস্থানের কথাও রয়েছে। এরপর পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে বলা হয়েছে যে পৃথিবী সাতটি, প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী ব্যবধান পাঁচশ বছরের পথ এবং প্রত্যেক পৃথিবীর নিজস্ব পুরুত্বও পাঁচশ বছরের পথের সমান। [14]
والأرض سبع، بين كلّ أرضين خمس مئة عام، وغلظ كلّ أرض خمس مئَة عام.
বাংলা অনুবাদ: আর পৃথিবী সাতটি। প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মাঝখানে পাঁচশ বছরের পথের দূরত্ব রয়েছে এবং প্রত্যেক পৃথিবীর পুরুত্ব পাঁচশ বছরের পথের সমান।
এখানে দুটি পৃথক পরিমাপের কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রত্যেক পৃথিবীর নিজস্ব পুরুত্ব। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পৃথিবীর পুরুত্ব এবং তার নিচে অবস্থিত আরেকটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান একই বিষয় নয়। ইবনে মাসউদের নামে সংরক্ষিত বিবরণটি অনুসারে, সাতটি পৃথিবীর প্রত্যেকটির পুরুত্ব পাঁচশ বছরের পথের সমান। আবার একটি পৃথিবী থেকে তার নিচের পৃথিবীতে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী ব্যবধানও পাঁচশ বছরের পথের সমান। অর্থাৎ এই বিবরণে পৃথিবীর নিচে শুধু সাতটি সংলগ্ন স্তর নেই; বরং পৃথক পুরুত্বসম্পন্ন সাতটি পৃথিবী এবং তাদের মাঝখানে দীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে।
এই বিবরণের সংখ্যাগত কাঠামো বিবেচনা করলে সাতটি পৃথিবীর মোট পুরুত্ব দাঁড়ায় ৩৫০০ বছরের পথের সমান। সাত পৃথিবীর মধ্যে ছয়টি মধ্যবর্তী ব্যবধান রয়েছে। প্রতিটি ব্যবধান পাঁচশ বছরের পথ হলে সেগুলোর সম্মিলিত দূরত্ব দাঁড়ায় আরও ৩০০০ বছরের পথ। ফলে ইবনে মাসউদের এই বর্ণনার সরল স্তরবিন্যাস অনুযায়ী ওপরের পৃথিবীর ওপরের পৃষ্ঠ থেকে সর্বনিম্ন পৃথিবীর নিচের পৃষ্ঠ পর্যন্ত মোট বিস্তার দাঁড়ায় ৬৫০০ বছরের পথের সমান। এটি আধুনিক দৈর্ঘ্য পরিমাপের একক নয়, কারণ এখানে এক বছরে কত গতিতে যাত্রা করলে সেই দূরত্ব অতিক্রম করা যাবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। কিন্তু পৃথিবীর নিচে বিপুল পুরুত্ব ও ব্যবধানবিশিষ্ট একাধিক পৃথক জগতের ধারণাটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট।
আধুনিক ভূতত্ত্বে ভূত্বক, ম্যান্টল এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন উপস্তর চিহ্নিত করা হয় তাদের রাসায়নিক গঠন, ঘনত্ব, তাপমাত্রা, চাপ এবং ভূকম্পন তরঙ্গের গতিবিধির ভিত্তিতে। কোনো স্তরকে অপর স্তর থেকে পৃথক করার জন্য পাঁচশ বছরের পথের মতো অসংজ্ঞায়িত দূরত্ব ব্যবহার করা হয় না। ইবনে মাসউদের বর্ণনায় পৃথিবীর অভ্যন্তরকে যেভাবে পৃথক পৃথিবী, প্রতিটির নিজস্ব পুরুত্ব এবং তাদের মধ্যবর্তী ব্যবধান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, সেই কাঠামো পর্যবেক্ষণভিত্তিক পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠনের সঙ্গে মেলে না।
তাফসীরে তাবারীতে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে একই দূরত্বের বিবরণ
তাবারী একই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদার সূত্রে আরেকটি দীর্ঘ বর্ণনা সংকলন করেছেন। এই বর্ণনাটির সঙ্গে তিরমিজির হাদিসের বিষয়বস্তুর ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। এখানেও মুহাম্মদ সাহাবিদের সঙ্গে বসে থাকার সময় মেঘ দেখে প্রশ্ন করেন। এরপর আসমানকে সংরক্ষিত ছাদ এবং আটকে রাখা তরঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করেন। একের পর এক সাত আসমানের অস্তিত্ব এবং তাদের মধ্যবর্তী পাঁচশ বছরের দূরত্বের কথা বলা হয়। আসমানগুলোর ওপরে আরশের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পর মুহাম্মদ পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করেন। সাহাবিদের উত্তরের পর তিনি নিচে আরেকটি পৃথিবীর অস্তিত্বের কথা জানান এবং দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচশ বছরের পথ বলে বর্ণনা করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে সাত পৃথিবীর কথা উল্লেখ করা হয়। [15]
تَحْتَ ذِلكَ أَرْضٌ، قال: أَتَدْرُونَ كَمْ بَيْنَهُمَا؟ قَالُوا: الله وَرسوله أَعلم. قال: بَيْنَهُمَا مَسِيرَةُ خَمْسِ مِئَةِ سَنَةٍ، حتى عدّ سبع أرضين
বাংলা অনুবাদ: এর নিচে আরেকটি পৃথিবী রয়েছে। তিনি বললেন, তোমরা কি জানো এই দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব কত? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচশ বছরের পথের সমান। এভাবে তিনি সাতটি পৃথিবী পর্যন্ত গণনা করলেন।
তাবারীর বর্ণনাতেও সর্বনিম্ন পৃথিবীর অবস্থান সম্পর্কে একটি অতিরিক্ত বক্তব্য রয়েছে। সাত পৃথিবীর কথা বলার পর মুহাম্মদ শপথ করে বলেন, যদি একজন মানুষকে রশি দিয়ে সর্বনিম্ন সপ্তম পৃথিবীর নিচ পর্যন্ত নামানো হয়, তাহলে সে আল্লাহর কাছে গিয়ে পৌঁছাবে। এরপর সুরা আল-হাদিদের ৩ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়। ফলে পৃথিবীর নিচের কাঠামোকে এমন এক গভীরতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যার সর্বনিম্ন প্রান্তে পৌঁছানোর বিষয়টি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করে বর্ণিত হয়েছে। আসমানের ওপরে আরশের অবস্থান এবং সাত পৃথিবীর নিচে নামানো মানুষের আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর বক্তব্য একই মহাজাগতিক আলোচনায় এসেছে।
তবে তাবারীর এই বিবরণ এবং তিরমিজির ৩২৯৮ নম্বর হাদিসকে দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সাক্ষ্য গণনা করার সুযোগ নেই। দুটি বর্ণনার বিষয়বস্তু, প্রশ্নোত্তরের ক্রম এবং উপসংহারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। তিরমিজির বর্ণনাপথে কাতাদা থেকে হাসান বসরি এবং সেখান থেকে আবু হুরায়রার সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তাবারীর এই বর্ণনা কাতাদার বক্তব্যের মাধ্যমে সংকলিত হয়েছে, যেখানে প্রত্যক্ষ সাহাবি-সূত্র উল্লেখ নেই। অতএব দুটি সংকলনে একই ধরনের বিবরণ পাওয়া যাওয়ার অর্থ এই নয় যে দুটি স্বাধীন উৎস মুহাম্মদের বক্তব্যটি পৃথকভাবে নিশ্চিত করেছে। বরং এই মিল থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাধারায় আসমান ও পৃথিবীর পাঁচশ বছরের ব্যবধানসংক্রান্ত একটি সুসংগঠিত মহাজাগতিক বিবরণ প্রচলিত ছিল।
ইবনে কাসীরের সংকলনে পাঁচশ বছরের পরিবর্তে সাতশ বছরের দূরত্ব
প্রাচীন বর্ণনাগুলোর মধ্যে পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে সংখ্যাগত পার্থক্যও পাওয়া যায়। তাফসীরে ইবনে কাসীরে সুরা আল-হাদিদের ৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তিরমিজির পাঁচশ বছরের দূরত্বসংক্রান্ত হাদিসটি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ইবনে কাসীর জানিয়েছেন, আহমদ ইবনে হাম্বলের সংকলিত একই ধরনের একটি বর্ণনায় দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচশ বছরের পরিবর্তে সাতশ বছরের পথ বলা হয়েছে। এই সংস্করণেও সর্বনিম্ন সপ্তম পৃথিবীতে রশি দিয়ে কাউকে নামানো হলে সে আল্লাহর কাছে পৌঁছাবে বলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ দুটি বর্ণনার মূল মহাজাগতিক কাঠামো অনুরূপ হলেও নির্দিষ্ট দূরত্বের সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। [16]
وعنده بعد ما بين الأرضين مسيرة سبعمائة عام ، وقال : ” لو دليتم أحدكم بحبل إلى الأرض السفلى السابعة لهبط على الله “
বাংলা অনুবাদ: তাঁর বর্ণনায় দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সাতশ বছরের পথের সমান। তিনি আরও বলেছেন, যদি তোমাদের কাউকে রশি দিয়ে সর্বনিম্ন সপ্তম পৃথিবী পর্যন্ত নামানো হয়, তাহলে সে আল্লাহর কাছে গিয়ে পৌঁছাবে।
পাঁচশ বছরের পথ এবং সাতশ বছরের পথ এক দূরত্ব নয়। তিরমিজির সংকলিত বর্ণনায় দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচশ বছরের পথ, অথচ ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত আহমদের সংস্করণে সেই দূরত্ব সাতশ বছরের পথ। একই ধরনের মহাজাগতিক বর্ণনায় দুইশ বছরের পথের সমপরিমাণ পার্থক্য কোনো তুচ্ছ সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়। ছয়টি মধ্যবর্তী ব্যবধানের ক্ষেত্রে পাঁচশ বছরের হিসাব অনুযায়ী মোট দূরত্ব তিন হাজার বছরের পথ, আর সাতশ বছরের হিসাব অনুযায়ী তা চার হাজার দুইশ বছরের পথ। ব্যবধানের এই পার্থক্যই দেখায় যে প্রাচীন বর্ণনাগুলো পৃথিবীর নিচের কাঠামোর একটি অভিন্ন ও নির্ভুল পরিমাপ সংরক্ষণ করেনি।
ইবনে কাসীর একই আলোচনায় তিরমিজি, আহমদ, ইবনে আবি হাতিম, বাযযার এবং তাবারীর সূত্রে প্রচলিত বর্ণনাগুলোর সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাঁর বিবরণ অনুসারে, ইবনে আবি হাতিমের সংস্করণে সর্বনিম্ন পৃথিবীতে রশি দিয়ে মানুষ নামানোর অংশটি নেই, কিন্তু সাত পৃথিবী এবং প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী পাঁচশ বছরের দূরত্বের বিবরণ রয়েছে। তাবারীর সূত্রে কাতাদার বর্ণনাটি সাহাবি পর্যন্ত সংযুক্ত নয়। ইবনে কাসীর এই ধরনের বর্ণনার ক্ষেত্রে কাতাদার সূত্রে প্রচলিত বিচ্ছিন্ন বর্ণনাটিকেই সম্ভাব্যভাবে অধিক সংরক্ষিত রূপ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফলে তাঁর সংকলনে শুধু মহাজাগতিক দূরত্বের বিবরণই নেই; একই সঙ্গে সেই বিবরণের বিভিন্ন সংস্করণ ও বর্ণনাপথের অমিলও সংরক্ষিত হয়েছে।
এই পার্থক্যগুলো থেকে অন্তত দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাসাহিত্যে সাত পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বকে দীর্ঘ যাত্রাপথের মাধ্যমে নির্ধারণ করার একটি ধারণা প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয়ত, সেই দূরত্বের নির্দিষ্ট সংখ্যা সব বর্ণনায় এক ছিল না। পাঁচশ ও সাতশ বছরের পাঠভেদকে একই নির্ভুল পরিমাপের দুটি রূপ বলা যায় না। কোনো বর্ণনা ঐতিহাসিকভাবে মুহাম্মদ পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না, তা পৃথক অনুসন্ধানের বিষয়; কিন্তু সংকলিত বর্ণনাগুলোর মধ্যে সংখ্যাগত অমিলের অস্তিত্ব সরাসরি পাঠ থেকেই প্রতিষ্ঠিত।
পাঁচশ বছরের দূরত্ব কি বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য এই প্রাচীন বর্ণনাগুলোর সঙ্গে মৌলিকভাবে ভিন্ন। পৃথিবীর গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ৬৩৭১ কিলোমিটার এবং বিষুবীয় ব্যাস প্রায় ১২,৭৫৬ কিলোমিটার। পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত দূরত্ব কোনো অজানা কিংবা সীমাহীন গভীরতা নয়। ভূকম্পন তরঙ্গের গতি, মাধ্যাকর্ষণ, ঘনত্ব, তাপপ্রবাহ, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র এবং উচ্চচাপের পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ভূত্বক, ম্যান্টল, তরল বহিঃকেন্দ্র এবং কঠিন অন্তঃকেন্দ্র চিহ্নিত হয়েছে। পৃথিবীর নিচে একটির পর আরেকটি বসবাসযোগ্য পৃথিবী কিংবা তাদের মাঝখানে পাঁচশ বছরের পথের সমান পৃথক মহাজাগতিক ব্যবধান পাওয়া যায়নি। [17]
Earth is composed of four main layers, starting with an inner core at the planet’s center, enveloped by the outer core, mantle, and crust.
বাংলা অনুবাদ: পৃথিবী চারটি প্রধান স্তর নিয়ে গঠিত। গ্রহটির কেন্দ্রে রয়েছে অন্তঃকেন্দ্র; একে ঘিরে রয়েছে বহিঃকেন্দ্র, ম্যান্টল এবং ভূত্বক।
পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলোর একটি হচ্ছে ভূকম্পন তরঙ্গ। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের তরঙ্গ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে বিভিন্ন গতিতে অতিক্রম করে। এদের গতিপথ, প্রতিফলন, প্রতিসরণ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর সময় বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অভ্যন্তরীণ পদার্থের প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। বিশেষত কঠিন ও তরল পদার্থের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ভূকম্পন তরঙ্গের চলাচলের পার্থক্য থেকে পৃথিবীর তরল বহিঃকেন্দ্রের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পৃথিবীর নিচে যদি দীর্ঘ শূন্য ব্যবধান দ্বারা পৃথক সাতটি পৃথিবী থাকত, তাহলে তাদের সীমানা ও মধ্যবর্তী কাঠামোর প্রভাবও ভূকম্পন তরঙ্গের পরিমাপে প্রকাশিত হওয়ার কথা। পৃথিবীর পর্যবেক্ষিত অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় এমন কোনো স্তরবিন্যাস নেই। [18]
Scientists discovered that Earth’s outer core is liquid by observing seismic waves. P waves travel through solid and liquid, but S waves do not travel through liquid.
বাংলা অনুবাদ: ভূকম্পন তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্র তরল। পি-তরঙ্গ কঠিন ও তরল উভয় পদার্থের মধ্য দিয়ে চলতে পারে, কিন্তু এস-তরঙ্গ তরল পদার্থের মধ্য দিয়ে চলতে পারে না।
পাঁচশ বছরের পথের দূরত্বকে আধুনিক কিলোমিটারের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যা রয়েছে। এই বর্ণনাগুলোতে যাত্রার গতি নির্দিষ্ট করা হয়নি। পায়ে হাঁটা, উটে চড়া কিংবা অন্য কোনো গতির মাধ্যমে পাঁচশ বছরের পথ অতিক্রম করার কথা বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে শুধু পাঁচশ বছর সংখ্যাটি থেকে একটি নির্ভুল কিলোমিটার মান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই পরিমাপগত অস্পষ্টতা পৃথিবীর নিচে সাতটি পৃথক পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী বিশাল ব্যবধানের দাবিকে বৈজ্ঞানিক সত্যে পরিণত করে না। বর্ণনাগুলোর মৌলিক ভৌত দাবিই হচ্ছে, পরিচিত পৃথিবীর নিচে আরও পৃথিবী রয়েছে এবং সেগুলো দীর্ঘ ব্যবধান দ্বারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। আধুনিক ভূবিজ্ঞানে পৃথিবীর অভ্যন্তরে এ ধরনের কোনো কাঠামো পাওয়া যায়নি।
প্রাচীন ইসলামি বিশ্বতত্ত্বের এই বর্ণনাগুলোতে সাত পৃথিবীর অবস্থান সম্পর্কে শুধু একটি ধর্মীয় সংখ্যা নয়, বরং পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ভৌত ধারণা পাওয়া যায়। তিরমিজির বর্ণনায় ওপরের পৃথিবীর নিচে আরও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী পাঁচশ বছরের দূরত্ব রয়েছে। ইবনে মাসউদের নামে তাবারীর সংকলিত বক্তব্যে প্রত্যেক পৃথিবীর পুরুত্বও পাঁচশ বছরের পথের সমান। তাবারীর কাতাদার সূত্রে সংরক্ষিত বর্ণনায় পৃথিবীগুলোর সর্বনিম্ন প্রান্তে পৌঁছানোর সঙ্গে আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কিত বক্তব্য রয়েছে। আবার ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত অন্য সংস্করণে একই ধরনের ব্যবধান সাতশ বছরের পথ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিবরণে পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে একটি অভিন্ন ও নির্ভুল পরিমাপ পাওয়া যায় না; বরং পরস্পর সম্পর্কিত কিন্তু সংখ্যাগতভাবে ভিন্ন কয়েকটি মহাজাগতিক বর্ণনা পাওয়া যায়।
মানুষের পায়ের নিচে বাস্তবে রয়েছে পৃথিবীর কঠিন ভূত্বক, তার নিচে ম্যান্টল এবং আরও গভীরে ধাতব কেন্দ্র। সেখানে পাঁচশ বছরের দূরত্বে আরেকটি পৃথিবী, তার নিচে আরও একটি পৃথিবী এবং এভাবে সাতটি স্বতন্ত্র জগতের অস্তিত্ব নেই। প্রাচীন বর্ণনাগুলোতে যে মহাজাগতিক স্তরবিন্যাসের কথা বলা হয়েছে, তা পৃথিবীর প্রকৃত অভ্যন্তরীণ গঠনের সঙ্গে মেলে না। ধর্মীয় গ্রন্থে সংরক্ষিত হওয়া, সাহাবির নামে প্রচলিত হওয়া কিংবা প্রভাবশালী তাফসিরকারীর দ্বারা উদ্ধৃত হওয়া—কোনোটিই সেই ভৌত দাবিগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। বরং এসব বর্ণনা দেখায়, প্রাচীন ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে পৃথিবীর নিচের জগৎ সম্পর্কে এমন সব ধারণা প্রচলিত ছিল, যেগুলোর সঙ্গে আজকের পর্যবেক্ষণভিত্তিক ভূবিজ্ঞানের মৌলিক বিরোধ রয়েছে।
মাটির নিচে কী আছে: পানি, পাথর, ফেরেশতা, মাছ ও অন্ধকারের স্তরবিন্যাস
পৃথিবীর নিচে সাতটি পৃথক পৃথিবী রয়েছে এবং সেগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব শত শত বছরের পথের সমান—এমন বিশ্বাসের পাশাপাশি প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে পৃথিবীর নিচের জগতের উপাদান সম্পর্কেও বিস্ময়কর সব বিবরণ পাওয়া যায়। এসব বর্ণনায় মাটির নিচে একের পর এক পানি ও পৃথিবীর স্তর, বিশাল পাথর, পৃথিবীকে ধারণকারী ফেরেশতা, মহাজাগতিক মাছ, ষাঁড় এবং অন্ধকারের অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় মাছের মাথা ও লেজ আরশের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কোনো বর্ণনায় মাছের ওপর পাথর এবং পাথরের ওপর ফেরেশতার অবস্থান দেখানো হয়েছে। পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এসব বর্ণনাকারী এমন একটি মহাজাগতিক কাঠামোর বিবরণ দিয়েছেন, যার বিভিন্ন উপাদান পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই কাঠামোতে পৃথিবী কোনো স্বাধীনভাবে বিদ্যমান গ্রহ নয়; বরং পানি, পাথর, প্রাণী ও অতিপ্রাকৃত সত্তার সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত একটি বস্তু।
এই ধরনের বর্ণনাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো কোরআনের সেই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে আল্লাহর মালিকানাধীন সৃষ্টিজগতের পরিধি বোঝাতে আসমান, পৃথিবী এবং মাটির নিচের সবকিছুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা ত্বহার ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী ও বাগাভীর মতো প্রভাবশালী তাফসিরকারীরা পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে বিভিন্ন প্রাচীন বক্তব্য সংকলন করেছেন। এসব বক্তব্যের সবগুলো একই বর্ণনাপথ থেকে আসেনি এবং সবগুলোতে একই কাঠামোও পাওয়া যায় না। কিন্তু বর্ণনাগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য অভিন্ন: পৃথিবীর নিচের জগৎকে বাস্তব উপাদানের ওপর প্রতিষ্ঠিত একাধিক স্তরবিশিষ্ট কাঠামো হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
কোরআনের প্রশ্ন: মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে
কোরআনের সুরা ত্বহার ৬ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে আসমান, পৃথিবী, এদের মধ্যবর্তী স্থান এবং মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে, সবকিছু আল্লাহর। আয়াতটির শেষাংশে ব্যবহৃত হয়েছে وَمَا تَحْتَ الثَّرَىٰ—অর্থাৎ মাটির নিচে যা রয়েছে। আরবি ভাষায় ‘সারা’ বা ‘থারা’ শব্দটি সিক্ত মাটি কিংবা আর্দ্র মৃত্তিকা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে আয়াতটির সরাসরি বক্তব্য হচ্ছে, মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে, তার সবই আল্লাহর অধীন। এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রাচীন তাফসিরে পৃথিবীর নিচের বিভিন্ন স্তর এবং সেগুলোর অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা যুক্ত হয়েছে। [19]
لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَىٰ
বাংলা অনুবাদ: আসমানসমূহে যা কিছু আছে, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, এ দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে যা কিছু আছে এবং মাটির নিচে যা কিছু আছে—সবই তাঁর।
আয়াতটিতে সরাসরি কোনো মাছ, ষাঁড়, ফেরেশতা কিংবা পাথরের কথা বলা হয়নি। কিন্তু আয়াতের ‘মাটির নিচে’ কথাটির ব্যাখ্যায় প্রাচীন তাফসিরকারীরা এমন সব বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে এসব উপাদানের অবস্থান নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোরআনের সরাসরি বক্তব্য এবং তাফসিরে সংরক্ষিত প্রাচীন বিশ্বতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পৃথক হলেও তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক সুস্পষ্ট। তাফসিরকারীরা মাটির নিচের জগতের ধারণাকে এমনভাবে সম্প্রসারিত করেছেন, যেখানে সাত পৃথিবীর নিচে আরও বিভিন্ন স্তর ও সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে।
তাফসীরে তাবারী: সিক্ত মাটি এবং সপ্তম পৃথিবীর নিচের জগৎ
তাবারী সুরা ত্বহার ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রথমে ‘সারা’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ আলোচনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় শব্দটি সিক্ত মাটি বোঝায়। তিনি কাতাদার বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যে আর্দ্র বা ভেজা বস্তু বোঝাতেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এরপর দাহহাক ও মুহাম্মদ ইবনে কাবের সূত্রে সাত পৃথিবীর সঙ্গে আয়াতটির সম্পর্ক দেখিয়েছেন। বিশেষত দাহহাকের ব্যাখ্যায় মাটির নিচের অংশ বলতে সপ্তম পৃথিবীর নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত জগতের কথা বোঝানো হয়েছে। মুহাম্মদ ইবনে কাবের বর্ণনায় ‘সারা’ শব্দের সঙ্গে সাত পৃথিবীর ধারণাকে যুক্ত করা হয়েছে। [20]
وَيَعْنِي بِالثَّرَى: النَّدَى.
يُقَالُ لِلتُّرَابِ الرَّطْبِ الْمُبْتَلِّ: ثَرًى.
حَدَّثَنَا بِشْرٌ، قَالَ: ثَنَا يَزِيدُ، قَالَ: ثَنَا سَعِيدٌ، عَنْ قَتَادَةَ، قَوْلُهُ: (وَمَا تَحْتَ الثَّرَى) وَالثَّرَى: كُلُّ شَيْءٍ مُبْتَلٍّ.
حُدِّثْتُ عَنِ الْحُسَيْنِ بْنِ الْفَرَجِ، قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا مُعَاذٍ يَقُولُ: أَخْبَرَنَا عُبَيْدٌ، قَالَ: سَمِعْتُ الضَّحَّاكَ يَقُولُ فِي قَوْلِهِ: (وَمَا تَحْتَ الثَّرَى) مَا حُفِرَ مِنَ التُّرَابِ مُبْتَلًّا، وَإِنَّمَا عَنَى بِذَلِكَ: وَمَا تَحْتَ الْأَرَضِينَ السَّبْعِ.
كَالَّذِي حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ السُّلَمِيُّ الْمَعْرُوفُ بِابْنِ صَدْرَانَ، قَالَ: ثَنَا أَبُو عَاصِمٍ، قَالَ: ثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ رِفَاعَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ كَعْبٍ: (وَمَا تَحْتَ الثَّرَى) قَالَ: الثَّرَى: سَبْعُ أَرَضِينَ.
বাংলা অনুবাদ: এখানে ‘সারা’ বলতে সিক্ততা বোঝানো হয়েছে। সিক্ত ও ভেজা মাটিকে ‘সারা’ বলা হয়। বিশর আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, ইয়াজিদ আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, সাঈদ কাতাদার সূত্রে আল্লাহর বক্তব্য ‘আর মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে’ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে ‘সারা’ বলতে ভেজা বা সিক্ত সবকিছুকে বোঝানো হয়।
হুসাইন ইবনে ফারাজের সূত্রে আমার কাছে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমি আবু মুআজকে বলতে শুনেছি, উবাইদ আমাদের জানিয়েছেন, তিনি দাহহাককে আল্লাহর বক্তব্য ‘আর মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে’ সম্পর্কে বলতে শুনেছেন: এর অর্থ হচ্ছে সিক্ত মাটির নিচে যা রয়েছে। এর দ্বারা সাত পৃথিবীর নিচে যা রয়েছে, তা বোঝানো হয়েছে।
একইভাবে মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম আস-সুলামি, যিনি ইবনে সদরান নামে পরিচিত, আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আবু আসিম আমাদের বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, মুহাম্মদ ইবনে রিফাআ মুহাম্মদ ইবনে কাবের সূত্রে আল্লাহর বক্তব্য ‘আর মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে’ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে কাব বলেছেন, ‘সারা’ বলতে সাত পৃথিবী বোঝানো হয়েছে।
তাবারীর বর্ণনাগুলোতে মাটির নিচের জগতের ব্যাখ্যা দুটি পর্যায়ে পাওয়া যায়। প্রথম পর্যায়ে রয়েছে আরবি শব্দের স্বাভাবিক অর্থ—সিক্ত বা আর্দ্র মাটি। দ্বিতীয় পর্যায়ে সেই শব্দের সঙ্গে সাত পৃথিবী এবং সপ্তম পৃথিবীর নিচের অজানা জগতের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। দাহহাকের বক্তব্য অনুসারে, ‘মাটির নিচে’ বলতে কেবল পরিচিত ভূমির কয়েক ফুট বা কয়েকশ ফুট নিচের অংশ বোঝানো হয়নি; বরং সাত পৃথিবীরও নিচে যা রয়েছে, তা এই ধারণার অন্তর্ভুক্ত। এই ব্যাখ্যাই পরবর্তী তাফসিরগুলোতে পৃথিবীর নিচে পানি, পাথর, ফেরেশতা ও বিশাল মাছের অবস্থানসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর জন্য একটি বিস্তৃত মহাজাগতিক কাঠামো তৈরি করেছে।
ইবনে কাসীরের তাফসির: একের পর এক পৃথিবী ও পানির স্তর
তাফসীরে ইবনে কাসীরে সুরা ত্বহার ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় কাবের নামে একটি দীর্ঘ প্রশ্নোত্তরমূলক বর্ণনা পাওয়া যায়। আওযাঈ ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসিরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে কাবকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এই পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে। কাব উত্তর দেন, পানি। এরপর তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, পানির নিচে কী রয়েছে। তিনি উত্তর দেন, পৃথিবী। এভাবে প্রশ্ন চলতে থাকে এবং একের পর এক পানি ও পৃথিবীর স্তরের বিবরণ দেওয়া হয়। সর্বশেষ পৃথিবীর নিচে পাথর, পাথরের নিচে ফেরেশতা এবং ফেরেশতার নিচে বিশাল মাছের কথা বলা হয়। মাছটির দুই প্রান্ত আরশের সঙ্গে ঝুলন্ত বলে বর্ণিত হয়েছে। মাছের নিচে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে বাতাস ও অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে। তারও নিচে কী রয়েছে, সে বিষয়ে জ্ঞান শেষ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। [21]
وَقَوْلُهُ: (وَمَا تَحْتَ الثَّرَى) قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ كَعْبٍ: أَيْ مَا تَحْتَ الْأَرْضِ السَّابِعَةِ.
وَقَالَ الْأَوْزَاعِيُّ: إِنَّ يَحْيَى بْنَ أَبِي كَثِيرٍ حَدَّثَهُ أَنَّ كَعْبًا سُئِلَ فَقِيلَ لَهُ: مَا تَحْتَ هَذِهِ الْأَرْضِ؟ فَقَالَ: الْمَاءُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْمَاءِ؟ قَالَ: الْأَرْضُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْأَرْضِ؟ قَالَ: الْمَاءُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْمَاءِ؟ قَالَ: الْأَرْضُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْأَرْضِ؟ قَالَ: الْمَاءُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْمَاءِ؟ قَالَ: الْأَرْضُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْأَرْضِ؟ قَالَ: الْمَاءُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْمَاءِ؟ قَالَ: الْأَرْضُ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْأَرْضِ؟ قَالَ: صَخْرَةٌ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الصَّخْرَةِ؟ قَالَ: مَلَكٌ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْمَلَكِ؟ قَالَ: حُوتٌ مُعَلَّقٌ طَرَفَاهُ بِالْعَرْشِ. قِيلَ: وَمَا تَحْتَ الْحُوتِ؟ قَالَ: الْهَوَاءُ وَالظُّلْمَةُ وَانْقَطَعَ الْعِلْمُ.
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর বক্তব্য, ‘আর মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে’ সম্পর্কে মুহাম্মদ ইবনে কাব বলেছেন, এর অর্থ সপ্তম পৃথিবীর নিচে যা রয়েছে।
আওযাঈ বলেছেন, ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসির তাঁকে বর্ণনা করেছেন যে একবার কাবকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এই পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পানি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পানির নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পৃথিবী। তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পানি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পানির নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পৃথিবী। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পানি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পানির নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পৃথিবী। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পানি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পানির নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পৃথিবী।
এরপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, একটি পাথর। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, পাথরের নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, একজন ফেরেশতা। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ফেরেশতার নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, একটি বিশাল মাছ, যার দুই প্রান্ত আরশের সঙ্গে ঝুলন্ত। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, মাছের নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, বাতাস ও অন্ধকার। এরপর জ্ঞানের সমাপ্তি ঘটেছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত তাফসীরে ইবনে কাসীরের সপ্তম খণ্ডে সুরা ত্বহার ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় পৃথিবীর নিচে পানি, পাথর, ফেরেশতা, মাছ এবং সাত পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরে জাহান্নামের উপাদানগুলোর অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে কাবের নামে বর্ণিত পৃথিবীর নিচের স্তরবিন্যাসের পাশাপাশি ইবনে আবি হাতিমের সূত্রে মুহাম্মদের নামে প্রচলিত আরেকটি বর্ণনাও উল্লেখ করা হয়েছে। [22]
… তাঁহার ইচ্ছার অধিনস্ত, তিনি উহার সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনিই মালিক এবং তিনিই একমাত্র উপাস্য। তিনি ব্যতিত অন্য কোন উপাস্য নাই।
মহান আল্লাহর বাণী:
وَمَا تَحْتَ الثَّرَى মুহাম্মদ ইব্ন কা’ব (র( مَا تَحْتَ الثَّرَى এর অর্থ করেন, সপ্ত যমীন নিচের অবস্থিত বস্তু। ইমাম আওযাঈ (র) বলেন, ইয়াহইয়া ইব্ন আবূ কাসির (র) তাঁহার নিকট বর্ণনা করেন, একবার কা’ব (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, এই যমীনের নিচে কি আছে? তিনি বলিলেন, পানি। তাঁহাকে আবার জিজ্ঞাসা করা হইল, পানির নিচে কি? তিনি বলিলেন, মাটি। তাঁহাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হইল মাটির নিচে কি? তিনি বলিলেন মাটির নিচে পানি। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, ঐ পানির নিচে কি? তিনি বলিলেন পাথর। তাহাকে আবারও জিজ্ঞাসা করা হইল, পাথরের নিচে কি? তিনি বলিলেন, ফিরিস্তা। জিজ্ঞাসা করা হইল ফিরিস্তার নিচে কি? তিনি বলিলেন, উহার নিচে একটি মাছ, যাহার দুইপ্রান্ত আরশের সহিত ঝুলন্ত। জিজ্ঞাসা কর। হইল, মাছের নিচে কি? তিনি বলিলেন, উহার নিচে শূন্য ও অন্ধকার। উহার পরে কি তাহা আর জানা সম্ভব নয়।
ইব্ন আবূ হাতিম (র) বলেন, ইন্ন ওহব এর ভ্রাতুষ্পুত্র আবু উবায়দুল্লাহ্ (র)…….. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করিয়াছেন, প্রত্যেক যমীনের মাঝে পাঁচশত বৎসরের দূরত্ব এবং সর্বনিম্ন যমীন মাছের উপর অবস্থিত। মাছের দুইপ্রান্ত আসমনে অবস্থিত। মাছটি একটি পাথরের উপর এবং পাথরটি একজন ফিরিস্তার হাতে দ্বিতীয় যমীন বায়ু আবদ্ধ। তৃতীয় যমীনে জাহান্নামের পাথর, চতুর্থ যমীনে জাহান্নামের গন্ধক। পঞ্চম যমীনে জাহান্নামের সাপসমূহ, যষ্ঠ যমীনে জাহান্নামের বিচ্ছু। সপ্ত যমীনে জাহান্নাম এবং সেইখানে ইব্ল্লীস বন্দি অবস্থায় রহিয়াছে। তাহার এক হাত সামনে ও এক হাত পশ্চাতে বাধা। যখন আল্লাহর ইচ্ছা হয়, তাহাকে ছাড়িয়া দেন। হাদীসটি নিশ্চিত গারীব। ইহার মারফু’ হওয়াও বিবেচনা সাপেক্ষ।
হাফিয আবূ ইয়ালা (র) তাঁহার ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বলেন, আবূ মূসা হারভী (র)……. জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত নবী করীম (সা)-এর সহিত তাবুক যুদ্ধে শরীক ছিলাম। প্রত্যাবর্তনকালে আমরা ভীষণ গরমের কারণে দুই একজন করিয়া ছোটছোট দলে চলিতেছিলাম। আমি প্রথম দলে ছিলাম। হঠাৎ এক ব্যক্তি আমাদের সম্মুখে আসিয়া সালাম করিল এবং জিজ্ঞাসা করিল তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ (সা) কে? আমার সাথী সঙ্গীরা আমাকে ছাড়িয়া চলিয়া গেল এবং আমি তাহার সহিত দাঁড়াইয়া রহিলাম। এবং হঠাৎ রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেনাদলের মধ্যভাগে মাথা ঢাকিয়া একটি লাল উটের উপর আরোহণ করিয়া আগমন করিলেন। আমি তাহাকে …

এই বর্ণনাটিতে পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট অবস্থানগত ধারণা পাওয়া যায়। সর্বপ্রথম পরিচিত পৃথিবীর নিচে পানি রাখা হয়েছে। সেই পানির নিচে আরেকটি পৃথিবী। তারপর আবার পানি এবং আবার পৃথিবী। এভাবে একের পর এক পানি ও পৃথিবীর স্তর অতিক্রম করার পর একটি পাথরের অবস্থান বর্ণিত হয়েছে। পাথরের নিচে একজন ফেরেশতা এবং তার নিচে একটি মাছ। অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরকে ধরে রাখার জন্য একাধিক ভৌত ও অতিপ্রাকৃত উপাদানের একটি ক্রম তৈরি করা হয়েছে। মাছটির দুই প্রান্ত আরশের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকার বিবরণ এই কাঠামোকে পৃথিবীর নিচের সীমা ছাড়িয়ে আসমানের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এখানে কাবের নামে বর্ণিত বক্তব্যটি একটি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক বিন্যাসের বিবরণ। পানি ও পৃথিবীর স্তরগুলোকে ভূতাত্ত্বিক অর্থে ভূত্বক ও ম্যান্টলের সমার্থক বলে ধরে নেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই। বর্ণনায় পানি এবং পৃথিবীকে পর্যায়ক্রমে পৃথক স্তর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; সর্বনিম্ন অংশে রয়েছে পাথর, ফেরেশতা ও মাছ। আধুনিক ভূবিজ্ঞানে পৃথিবীর অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্তরের গঠন নির্ধারণ করা হয় শিলার রাসায়নিক সংমিশ্রণ, ঘনত্ব, চাপ, তাপমাত্রা এবং ভূকম্পন তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য থেকে। সেখানে এভাবে পর্যায়ক্রমিক সমুদ্র ও পৃথক পৃথিবীর নিচে মাছ কিংবা ফেরেশতার অবস্থানের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই বর্ণনাটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, সর্বনিম্ন অংশে পৌঁছে জ্ঞানের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাছের নিচে বাতাস ও অন্ধকারের কথা জানানো হলেও তারও নিচে কী রয়েছে, সে বিষয়ে আর কিছু জানা যায় না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন বিশ্বতাত্ত্বিক কল্পনায় এ ধরনের জ্ঞানের সীমারেখা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। পরিচিত পৃথিবীর নিচে আরও পৃথিবী, পানি, পাথর, ফেরেশতা ও মাছের অবস্থান সম্পর্কে অত্যন্ত নির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হচ্ছে, অথচ সেই কাঠামোর শেষ প্রান্তে পৌঁছে জ্ঞানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হচ্ছে। এই বিবরণগুলোর কোনো অংশই পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; এগুলো প্রাচীন ধর্মীয় বর্ণনাসাহিত্যে প্রচলিত মহাজাগতিক ধারণা হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে।
ইবনে আব্বাসের বর্ণনা: মাছের নিচে সমুদ্র, সবুজ পাথর ও ষাঁড়
তাফসীরে কুরতুবীতে একই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাসের নামে পৃথিবীর নিচের আরেকটি কাঠামোর বিবরণ পাওয়া যায়। এখানে পৃথিবীগুলোকে নুন নামক একটি মাছের ওপর স্থাপিত বলা হয়েছে। মাছটি সমুদ্রের ওপর অবস্থিত এবং মাছের মাথা ও লেজ আরশের নিচে মিলিত হয়েছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। মাছের নিচের সমুদ্র একটি সবুজ পাথরের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্ণনাটিতে সেই সবুজ পাথরের সঙ্গে আকাশের রঙের সম্পর্কও স্থাপন করা হয়েছে। পাথরটি একটি ষাঁড়ের শিংয়ের ওপর এবং ষাঁড়টি মাটির ওপর অবস্থিত। এরপর বলা হয়েছে, সেই মাটির নিচে কী রয়েছে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। [23]
لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَى يَرِيدُ مَا تَحْتَ الصَّخْرَةِ الَّتِي لَا يَعْلَمُ مَا تَحْتَهَا إِلَّا اللَّهُ تَعَالَى.
وَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ كَعْبٍ: يَعْنِي الْأَرْضَ السَّابِعَةَ.
ابْنُ عَبَّاسٍ: الْأَرْضُ عَلَى نُونٍ، وَالنُّونُ عَلَى الْبَحْرِ، وَأَنَّ طَرَفَيِ النُّونِ رَأْسَهُ وَذَنَبَهُ يَلْتَقِيَانِ تَحْتَ الْعَرْشِ، وَالْبَحْرُ عَلَى صَخْرَةٍ خَضْرَاءَ السَّمَاءُ مِنْهَا، وَهِيَ الَّتِي قَالَ اللَّهُ تَعَالَى فِيهَا: فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ، وَالصَّخْرَةُ عَلَى قَرْنِ ثَوْرٍ، وَالثَّوْرُ عَلَى الثَّرَى، وَمَا يَعْلَمُ مَا تَحْتَ الثَّرَى إِلَّا اللَّهُ تَعَالَى.
বাংলা অনুবাদ: ‘আসমানসমূহে যা কিছু আছে, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তাদের মধ্যবর্তী স্থানে যা কিছু আছে এবং মাটির নিচে যা কিছু আছে—সবই তাঁর’—এখানে সেই পাথরের নিচে যা রয়েছে, তা বোঝানো হয়েছে, যার নিচে কী আছে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।
মুহাম্মদ ইবনে কাব বলেছেন, এর দ্বারা সপ্তম পৃথিবী বোঝানো হয়েছে।
ইবনে আব্বাস বলেছেন, পৃথিবী নুন নামক একটি মাছের ওপর অবস্থিত। মাছটি সমুদ্রের ওপর রয়েছে। মাছটির দুই প্রান্ত, অর্থাৎ তার মাথা ও লেজ, আরশের নিচে মিলিত হয়েছে। সমুদ্রটি একটি সবুজ পাথরের ওপর অবস্থিত, যার সঙ্গে আকাশের সবুজাভ রঙের সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়েছে। এই পাথরটিই সেই পাথর, যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘তা যদি কোনো পাথরের মধ্যেও থাকে অথবা আসমানসমূহে কিংবা পৃথিবীতে থাকে।’ পাথরটি একটি ষাঁড়ের শিংয়ের ওপর অবস্থিত এবং ষাঁড়টি সিক্ত মাটির ওপর রয়েছে। সেই মাটির নিচে কী রয়েছে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।
এই বিবরণে পৃথিবীর নিচের কাঠামো ইবনে কাসীরের সংকলিত কাবের বর্ণনার তুলনায় ভিন্ন। কাবের বর্ণনায় একের পর এক পানি ও পৃথিবীর স্তরের নিচে পাথর, পাথরের নিচে ফেরেশতা এবং ফেরেশতার নিচে মাছ রয়েছে। কিন্তু কুরতুবীর সংকলিত ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় পৃথিবী সরাসরি মাছের ওপর, মাছ সমুদ্রের ওপর, সমুদ্র সবুজ পাথরের ওপর এবং পাথর ষাঁড়ের শিংয়ের ওপর অবস্থিত। প্রথম বিবরণে ফেরেশতা পৃথিবীর নিচের স্তরবিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; দ্বিতীয় বিবরণে সেই অবস্থানে ষাঁড়ের উপস্থিতি পাওয়া যায়। দুটি বর্ণনাতেই পৃথিবীর নিচে মাছ ও পাথরের অস্তিত্বের ধারণা রয়েছে, কিন্তু তাদের অবস্থানগত সম্পর্ক এক নয়।
কুরতুবীর বর্ণনায় আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এখানে কোরআনের সুরা লুকমানের ১৬ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত পাথরের সঙ্গে পৃথিবীর নিচে অবস্থিত সবুজ পাথরটির সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। সুরা লুকমানের আয়াতে একটি সরিষার দানা পরিমাণ বস্তুও যদি পাথরের মধ্যে, আসমানে কিংবা পৃথিবীতে থাকে, আল্লাহ তা উপস্থিত করতে সক্ষম—এই বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু প্রাচীন তাফসিরের আলোচনায় সেই পাথরকে পৃথিবীর নিচে সমুদ্র ও মাছকে ধারণকারী একটি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক পাথর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ নৈতিক উপদেশসংক্রান্ত একটি আয়াতের পাথরের উল্লেখকে পৃথিবীর ভৌত কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার একটি প্রচেষ্টা এখানে পাওয়া যায়।
তাফসীরে বাগাভী: সমুদ্রের পানি গিলে ফেলা মহাজাগতিক ষাঁড়
তাফসীরে বাগাভীতেও সুরা ত্বহার ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাসের নামে প্রায় একই ধরনের বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু বাগাভীর বিবরণে একটি অতিরিক্ত বিষয় রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবীর নিচে অবস্থিত ষাঁড়টির মুখ খোলা রয়েছে। আল্লাহ যখন সব সমুদ্রকে একটি সমুদ্রে পরিণত করবেন, তখন সেই পানি ষাঁড়টির মুখ দিয়ে তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করবে এবং সেখানে শুকিয়ে যাবে। ফলে এখানে পৃথিবীর নিচের ষাঁড়টি শুধু মহাজাগতিক কাঠামোর ভার বহনকারী প্রাণী নয়; সমুদ্রের পানির ভবিষ্যৎ অবস্থার সঙ্গেও তাকে যুক্ত করা হয়েছে। [24]
(لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا) يَعْنِي الْهَوَاءَ، (وَمَا تَحْتَ الثَّرَى) وَالثَّرَى هُوَ التُّرَابُ النَّدِيُّ. قَالَ الضَّحَّاكُ: يَعْنِي مَا وَرَاءَ الثَّرَى مِنْ شَيْءٍ.
وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: إِنَّ الْأَرَضِينَ عَلَى ظَهْرِ النُّونِ، وَالنُّونُ عَلَى بَحْرٍ، وَرَأْسُهُ وَذَنَبُهُ يَلْتَقِيَانِ تَحْتَ الْعَرْشِ، وَالْبَحْرُ عَلَى صَخْرَةٍ خَضْرَاءَ، خُضْرَةُ السَّمَاءِ مِنْهَا، وَهِيَ الصَّخْرَةُ الَّتِي ذَكَرَ اللَّهُ فِي قِصَّةِ لُقْمَانَ: (فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ)، وَالصَّخْرَةُ عَلَى قَرْنِ ثَوْرٍ، وَالثَّوْرُ عَلَى الثَّرَى، وَمَا تَحْتَ الثَّرَى لَا يَعْلَمُهُ إِلَّا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ، وَذَلِكَ الثَّوْرُ فَاتِحٌ فَاهُ، فَإِذَا جَعَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الْبِحَارَ بَحْرًا وَاحِدًا سَالَتْ فِي جَوْفِ ذَلِكَ الثَّوْرِ، فَإِذَا وَقَعَتْ فِي جَوْفِهِ يَبِسَتْ.
বাংলা অনুবাদ: ‘আসমানসমূহে যা কিছু আছে, পৃথিবীতে যা কিছু আছে এবং তাদের মধ্যবর্তী স্থানে যা কিছু আছে’—এখানে মধ্যবর্তী স্থান বলতে বাতাসকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘মাটির নিচে যা কিছু আছে’—এখানে ‘সারা’ বলতে সিক্ত মাটি বোঝানো হয়েছে। দাহহাক বলেছেন, এর দ্বারা মাটির নিচে যা কিছু রয়েছে, তা বোঝানো হয়েছে।
ইবনে আব্বাস বলেছেন, পৃথিবীগুলো নুন নামক মাছের পিঠের ওপর অবস্থিত। মাছটি একটি সমুদ্রের ওপর রয়েছে। মাছটির মাথা ও লেজ আরশের নিচে মিলিত হয়েছে। সমুদ্রটি একটি সবুজ পাথরের ওপর অবস্থিত এবং আকাশের সবুজাভ রং সেই পাথর থেকে এসেছে। এই পাথরটিই সেই পাথর, যার উল্লেখ আল্লাহ লুকমানের ঘটনায় করেছেন: ‘তা যদি কোনো পাথরের মধ্যেও থাকে।’ পাথরটি একটি ষাঁড়ের শিংয়ের ওপর রয়েছে এবং ষাঁড়টি সিক্ত মাটির ওপর অবস্থিত। সেই মাটির নিচে কী রয়েছে, তা মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।
ওই ষাঁড়টির মুখ খোলা রয়েছে। আল্লাহ যখন সব সমুদ্রকে একটি সমুদ্রে পরিণত করবেন, তখন সেই সমুদ্রের পানি ষাঁড়টির পেটের ভেতর প্রবাহিত হবে। পানি তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করলে শুকিয়ে যাবে।
বাগাভী ও কুরতুবীর বর্ণনায় পৃথিবীর নিচের কাঠামো প্রায় অভিন্ন। উভয় ক্ষেত্রেই মাছ, সমুদ্র, সবুজ পাথর এবং ষাঁড়ের অবস্থান একই ক্রমে বর্ণিত হয়েছে। ফলে এগুলোকে দুটি স্বাধীন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য হিসেবে গণনা করার ভিত্তি নেই; বরং একই ধরনের প্রাচীন বর্ণনা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তাফসিরগ্রন্থে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছে। বাগাভীর বর্ণনায় ষাঁড়ের মুখ দিয়ে সমুদ্রের পানি প্রবেশ করে শুকিয়ে যাওয়ার অতিরিক্ত বিবরণটি এই মহাজাগতিক প্রাণীকে প্রাকৃতিক জলরাশির অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত করেছে।
এই বর্ণনার ভৌত দাবিগুলো বাস্তব পৃথিবীর গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পৃথিবীর সমুদ্রগুলো কোনো বিশাল মাছ বা ষাঁড়ের ওপর স্থাপিত পাথর দ্বারা ধারণ করা হয় না। মহাসাগরের পানি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের কারণে ভূত্বকের নিম্নভূমিতে অবস্থান করে। সমুদ্রের পানির অবস্থান, প্রবাহ, বাষ্পীভবন, ঘনীভবন এবং জলচক্রের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণযোগ্য ভৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। পৃথিবীর নিচে একটি বিশাল ষাঁড় তার মুখ খুলে সমুদ্রের পানি গ্রহণ করছে কিংবা ভবিষ্যতে সব সমুদ্রের পানি তার পেটে প্রবেশ করে শুকিয়ে যাবে—এই ধারণার কোনো ভূতাত্ত্বিক বা পদার্থবৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহ: সাত পৃথিবীর মাঝখানে সমুদ্র এবং নিচে জাহান্নাম
কুরতুবী একই আয়াতের ব্যাখ্যায় ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর নামে আরও একটি বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। এই বর্ণনায় পৃথিবীর নিচের কাঠামো মাছ ও ষাঁড়ের পরিবর্তে সমুদ্র, জাহান্নাম, বাতাস ও অন্ধকারের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ওয়াহবের বক্তব্য অনুসারে, পৃথিবীর ওপর সাতটি সমুদ্র রয়েছে এবং পৃথিবীও সাতটি। প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মধ্যে একটি করে সমুদ্র রয়েছে। সর্বনিম্ন সমুদ্রটি জাহান্নামের কিনারা ঘিরে রেখেছে। সেই সমুদ্রের বিপুল পানির পরিমাণ ও শীতলতার কারণে জাহান্নামের আগুন পৃথিবীর ওপরের সবকিছুকে পুড়িয়ে ফেলতে পারে না। জাহান্নাম নিজে বাতাসের ওপর এবং বাতাস অন্ধকারের একটি বিশাল আবরণের ওপর অবস্থিত। সর্বশেষ সেই অন্ধকারের আবরণ মাটির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। [25]
وَقَالَ وَهْبُ بْنُ مُنَبِّهٍ: عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ، وَالْأَرَضُونَ سَبْعٌ، بَيْنَ كُلِّ أَرْضَيْنِ بَحْرٌ، فَالْبَحْرُ الْأَسْفَلُ مُطْبِقٌ عَلَى شَفِيرِ جَهَنَّمَ، وَلَوْلَا عِظَمُهُ وَكَثْرَةُ مَائِهِ وَبَرْدُهُ لَأَحْرَقَتْ جَهَنَّمُ كُلَّ مَنْ عَلَيْهَا، قَالَ: وَجَهَنَّمُ عَلَى مَتْنِ الرِّيحِ، وَمَتْنُ الرِّيحِ عَلَى حِجَابٍ مِنَ الظُّلْمَةِ، لَا يَعْلَمُ عِظَمَهُ إِلَّا اللَّهُ تَعَالَى، وَذَلِكَ الْحِجَابُ عَلَى الثَّرَى، وَإِلَى الثَّرَى انْتَهَى عِلْمُ الْخَلَائِقِ.
বাংলা অনুবাদ: ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহ বলেছেন, পৃথিবীর পৃষ্ঠে সাতটি সমুদ্র রয়েছে এবং পৃথিবী সাতটি। প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মাঝখানে একটি করে সমুদ্র রয়েছে। সর্বনিম্ন সমুদ্রটি জাহান্নামের কিনারা ঘিরে রেখেছে। যদি সেই সমুদ্রের বিশালতা, বিপুল পানির পরিমাণ এবং শীতলতা না থাকত, তাহলে জাহান্নামের আগুন তার ওপরে যা কিছু রয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে ফেলত।
তিনি আরও বলেছেন, জাহান্নাম বাতাসের ওপর অবস্থিত এবং সেই বাতাস অন্ধকারের একটি আবরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই অন্ধকারের আবরণ কত বিশাল, তা মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। অন্ধকারের আবরণটি সিক্ত মাটির ওপর অবস্থিত এবং সেই মাটি পর্যন্তই সৃষ্টির জ্ঞানের সীমা পৌঁছেছে।
ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর এই বিবরণে একটি বিশেষ ধরনের মহাজাগতিক কার্যকারণ সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে। জাহান্নামের আগুন পৃথিবীর নিচে অবস্থিত, কিন্তু তার ওপরে একটি বিশাল সমুদ্র রয়েছে। সেই সমুদ্রের পানির পরিমাণ ও শীতলতা জাহান্নামের তাপ থেকে ওপরের জগতকে রক্ষা করছে। অর্থাৎ পৃথিবীর নিচে সমুদ্রের অস্তিত্বকে কেবল ভৌগোলিক স্তরবিন্যাস হিসেবে নয়, জাহান্নামের আগুনের প্রভাব প্রতিরোধকারী একটি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্ণনাটি অনুসারে, সমুদ্রের এই প্রতিরোধক্ষমতা না থাকলে জাহান্নামের আগুন ওপরের সবকিছু ধ্বংস করে দিত।
এই ধারণার সঙ্গে পৃথিবীর প্রকৃত তাপীয় গঠনের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরে তাপমাত্রা গভীরতার সঙ্গে বৃদ্ধি পায় এবং কেন্দ্রের তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে। কিন্তু সেই তাপের উৎস পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ শক্তি, গ্রহের গঠনকাল থেকে অবশিষ্ট তাপ এবং তেজস্ক্রিয় মৌলগুলোর ক্ষয়সহ বিভিন্ন ভৌত প্রক্রিয়া। পৃথিবীর নিচে জাহান্নামের আগুনকে ঠান্ডা রাখার জন্য কোনো মহাজাগতিক সমুদ্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপ সঞ্চালন, ভূত্বকের তাপপ্রবাহ, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এবং ম্যান্টলের গতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করে যে কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার সঙ্গে ওয়াহবের বর্ণিত জাহান্নাম-সমুদ্র-বাতাস-অন্ধকারের স্তরবিন্যাসের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
ইবনে আবি হাতিমের বর্ণনা: মাছের ওপর সর্বোচ্চ পৃথিবী এবং নিচের স্তরগুলোতে জাহান্নামের উপাদান
ইবনে কাসীর একই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আবি হাতিমের সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে আমরের নামে মুহাম্মদের একটি বিস্তারিত বক্তব্য সংকলন করেছেন। এখানে পৃথিবীর নিচের সাতটি স্তরের প্রতিটির জন্য পৃথক বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। বর্ণনা অনুসারে, প্রত্যেক দুটি পৃথিবীর মধ্যে পাঁচশ বছরের পথের দূরত্ব রয়েছে। সর্বোচ্চ পৃথিবীটি একটি বিশাল মাছের পিঠের ওপর অবস্থিত। মাছটির দুই প্রান্ত আসমানে মিলিত হয়েছে। মাছটি একটি পাথরের ওপর এবং সেই পাথর একজন ফেরেশতার হাতে রয়েছে। দ্বিতীয় পৃথিবীকে বাতাসের বন্দিশালা বলা হয়েছে। তৃতীয় পৃথিবীতে জাহান্নামের পাথর, চতুর্থ পৃথিবীতে জাহান্নামের গন্ধক, পঞ্চম পৃথিবীতে জাহান্নামের সাপ এবং ষষ্ঠ পৃথিবীতে জাহান্নামের বিচ্ছুর অবস্থান বর্ণিত হয়েছে। সপ্তম পৃথিবীতে রয়েছে সাকার নামক জাহান্নাম এবং সেখানে ইবলিসকে লোহার শিকলে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে। [26]
وَقَالَ ابْنُ أَبِي حَاتِمٍ: حَدَّثَنَا أَبُو عُبَيْدِ اللَّهِ ابْنُ أَخِي ابْنِ وَهْبٍ، حَدَّثَنَا عَمِّي، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَيَّاشٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سُلَيْمَانَ عَنْ دَرَّاجٍ، عَنْ عِيسَى بْنِ هِلَالٍ الصَّدَفِيِّ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “إِنَّ الْأَرَضِينَ بَيْنَ كُلِّ أَرْضٍ وَالَّتِي تَلِيهَا مَسِيرَةُ خَمْسِمِائَةِ عَامٍ، وَالْعُلْيَا مِنْهَا عَلَى ظَهْرِ حُوتٍ، قَدِ الْتَقَى طَرَفَاهُ فِي السَّمَاءِ، وَالْحُوتُ عَلَى صَخْرَةٍ، وَالصَّخْرَةُ بِيَدِ الْمَلَكِ، وَالثَّانِيَةُ سِجْنُ الرِّيحِ، وَالثَّالِثَةُ فِيهَا حِجَارَةُ جَهَنَّمَ، وَالرَّابِعَةُ فِيهَا كِبْرِيتُ جَهَنَّمَ، وَالْخَامِسَةُ فِيهَا حَيَّاتُ جَهَنَّمَ، وَالسَّادِسَةُ فِيهَا عَقَارِبُ جَهَنَّمَ، وَالسَّابِعَةُ فِيهَا سَقَرُ، وَفِيهَا إِبْلِيسُ مُصَفَّدٌ بِالْحَدِيدِ، يَدٌ أَمَامَهُ وَيَدٌ خَلْفَهُ، فَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ أَنْ يُطْلِقَهُ لِمَا يَشَاءُ أَطْلَقَهُ”.
هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ جِدًّا وَرَفْعُهُ فِيهِ نَظَرٌ.
বাংলা অনুবাদ: ইবনে আবি হাতিম বলেছেন, আবু উবাইদুল্লাহ ইবনে আবি ওয়াহবের ভ্রাতুষ্পুত্র আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমার চাচা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে আইয়াশ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে সুলাইমান দাররাজের সূত্রে, দাররাজ ঈসা ইবনে হিলাল আস-সাদাফির সূত্রে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর বলেছেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন:
প্রত্যেক পৃথিবী এবং তার পরবর্তী পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচশ বছরের পথের সমান। এগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পৃথিবীটি একটি মাছের পিঠের ওপর অবস্থিত। মাছটির দুই প্রান্ত আসমানে মিলিত হয়েছে। মাছটি একটি পাথরের ওপর রয়েছে এবং পাথরটি একজন ফেরেশতার হাতে রয়েছে।
দ্বিতীয় পৃথিবীটি বাতাসের বন্দিশালা। তৃতীয় পৃথিবীতে রয়েছে জাহান্নামের পাথরসমূহ। চতুর্থ পৃথিবীতে রয়েছে জাহান্নামের গন্ধক। পঞ্চম পৃথিবীতে রয়েছে জাহান্নামের সাপসমূহ। ষষ্ঠ পৃথিবীতে রয়েছে জাহান্নামের বিচ্ছুসমূহ। সপ্তম পৃথিবীতে রয়েছে সাকার, এবং সেখানে ইবলিসকে লোহার শিকলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তার একটি হাত সামনে এবং একটি হাত পেছনে বাঁধা রয়েছে। আল্লাহ যখন কোনো উদ্দেশ্যে তাকে মুক্ত করতে চান, তখন তাকে মুক্ত করে দেন।
ইবনে কাসীর বলেছেন, এই হাদিসটি অত্যন্ত গরিব এবং এটিকে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ।
এই বর্ণনায় পৃথিবীর নিচের কাঠামোর সঙ্গে জাহান্নাম এবং ইবলিসের অবস্থানকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্তর যেন জাহান্নামের বিভিন্ন উপাদানের জন্য পৃথক স্থান হিসেবে নির্ধারিত। তৃতীয় পৃথিবীতে পাথর, চতুর্থ পৃথিবীতে গন্ধক, পঞ্চম পৃথিবীতে সাপ এবং ষষ্ঠ পৃথিবীতে বিচ্ছু—এই বিন্যাসে জাহান্নামের শাস্তিমূলক উপাদানগুলোকে বাস্তব স্থানিক অবস্থান দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ সপ্তম পৃথিবীতে সাকার ও ইবলিসের বন্দিত্বের কথা উল্লেখ করে পৃথিবীর নিচের জগৎকে জাহান্নামের অবস্থানের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।
এখানে ইবনে কাসীরের মূল আরবি পাঠের সঙ্গে প্রচলিত বাংলা অনুবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আরবি বর্ণনায় وَالْعُلْيَا مِنْهَا عَلَى ظَهْرِ حُوتٍ বলা হয়েছে। এর অর্থ, পৃথিবীগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পৃথিবীটি মাছের পিঠের ওপর অবস্থিত। ‘সর্বনিম্ন পৃথিবীটি মাছের ওপর অবস্থিত’—এমন অনুবাদ মূল আরবি বক্তব্যের বিপরীত। একইভাবে মূল আরবিতে বর্ণনাকারীর নাম عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو, অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে আমর। তাঁকে আবদুল্লাহ ইবনে উমর হিসেবে চিহ্নিত করলে বর্ণনাকারীর পরিচয় পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই দুটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি পৃথিবীর স্তরবিন্যাসের অবস্থান বদলে দেয় এবং অন্যটি বর্ণনার উৎসপরিচয় পরিবর্তন করে।
ইবনে কাসীর বর্ণনাটিকে অত্যন্ত গরিব বলেছেন এবং মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে এর সংযুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এটি বর্ণনার ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন। ফলে বর্ণনাটিকে মুহাম্মদের নিশ্চিত ঐতিহাসিক বক্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই। কিন্তু ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে কাসীরের সংকলনে এই বিবরণের উপস্থিতি দেখায়, প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাসাহিত্যে সাত পৃথিবীর নিচের কাঠামো, মাছ, ফেরেশতা এবং জাহান্নামের বিভিন্ন উপাদানের অবস্থান সম্পর্কে কতটা বিস্তারিত ধারণা প্রচলিত ছিল। এসব বর্ণনার ভৌত দাবিগুলো বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে মাছের পিঠে পৃথিবী, ফেরেশতার হাতে পাথর কিংবা পৃথক ভূগর্ভস্থ পৃথিবীতে সাপ, বিচ্ছু ও জাহান্নামের অবস্থান—কোনোটিরই ভূতাত্ত্বিক ভিত্তি পাওয়া যায় না।
পৃথিবীর নিচে কী আছে: মুহাম্মদ ও জিবরাইলের প্রশ্নোত্তরের আরেক বর্ণনা
তাফসীরে ইবনে কাসীরের একই আলোচনায় আবু ইয়ালার মুসনাদ থেকে জাবির ইবনে আবদুল্লাহর সূত্রে আরেকটি দীর্ঘ বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। বর্ণনাটি অনুযায়ী, তাবুক অভিযান থেকে ফেরার সময় এক ব্যক্তি মুহাম্মদের কাছে এসে এমন কয়েকটি প্রশ্ন করেন, যেগুলোর উত্তর সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়। প্রশ্নগুলোর মধ্যে নবীর ঘুম, সন্তানের সঙ্গে পিতা-মাতার সাদৃশ্য এবং পৃথিবীর নিচের কাঠামোর বিষয় ছিল। পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদ প্রথমে সৃষ্টি, তারপর পৃথিবী, পানি, অন্ধকার, বাতাস এবং সিক্ত মাটির কথা বলেন। সর্বশেষ সেই মাটির নিচে কী রয়েছে, প্রশ্ন করা হলে মুহাম্মদের চোখে পানি এসে যায় এবং তিনি বলেন, স্রষ্টার জ্ঞানের কাছে সৃষ্টির জ্ঞানের সীমা শেষ হয়ে গেছে। বর্ণনার শেষে প্রশ্নকারীকে জিবরাইল হিসেবে পরিচয় করানো হয়। [27]
ثُمَّ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ، مَا تَحْتَ هَذِهِ؟ يَعْنِي الْأَرْضَ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “خَلْقٌ”. فَقَالَ: فَمَا تَحْتَهُمْ؟ قَالَ: “أَرْضٌ”. قَالَ: فَمَا تَحْتَ الْأَرْضِ؟ قَالَ: “الْمَاءُ”. قَالَ: فَمَا تَحْتَ الْمَاءِ؟ قَالَ: “ظُلْمَةٌ”. قَالَ: فَمَا تَحْتَ الظُّلْمَةِ؟ قَالَ: “الْهَوَاءُ”. قَالَ: فَمَا تَحْتَ الْهَوَاءِ؟ قَالَ: “الثَّرَى”. قَالَ: فَمَا تَحْتَ الثَّرَى؟ فَفَاضَتْ عَيْنَا رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْبُكَاءِ، وَقَالَ: “انْقَطَعَ عِلْمُ الْمَخْلُوقِينَ عِنْدَ عِلْمِ الْخَالِقِ، أَيُّهَا السَّائِلُ، مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ”.
قَالَ: فَقَالَ: صَدَقْتَ، أَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “أَيُّهَا النَّاسُ، هَلْ تَدْرُونَ مَنْ هَذَا؟” قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: “هَذَا جِبْرِيلُ”.
বাংলা অনুবাদ: এরপর লোকটি বলল, হে মুহাম্মদ, এই পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে? আল্লাহর রাসুল বললেন, সৃষ্টি রয়েছে। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, তাদের নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পৃথিবী। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, পানি। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, পানির নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, অন্ধকার। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, অন্ধকারের নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, বাতাস। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, বাতাসের নিচে কী রয়েছে? তিনি বললেন, সিক্ত মাটি।
লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, সিক্ত মাটির নিচে কী রয়েছে? তখন আল্লাহর রাসুলের দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, স্রষ্টার জ্ঞানের কাছে এসে সৃষ্টির জ্ঞানের সীমা শেষ হয়ে গেছে। হে প্রশ্নকারী, এই প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে যাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।
লোকটি বলল, আপনি সত্য বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আল্লাহর রাসুল। তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, হে লোকসকল, তোমরা কি জানো এই ব্যক্তি কে? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, এই ব্যক্তি জিবরাইল।
ইবনে কাসীর এই বর্ণনাটিকে অত্যন্ত গরিব এবং এর ঘটনাপ্রবাহকে অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, কাসিম ইবনে আবদুর রহমান এককভাবে এই বর্ণনাটি প্রচার করেছেন এবং তাঁর সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আবু হাতিম রাজী ও ইবনে আদির নেতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে। ইবনে কাসীর আরও মন্তব্য করেছেন, বর্ণনাটির মধ্যে বিভিন্ন বক্তব্য ও হাদিস পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে; এটি বর্ণনাকারীর ভুলের কারণে অথবা ইচ্ছাকৃত সংযোজনের মাধ্যমে ঘটতে পারে। ফলে এই বিশেষ প্রশ্নোত্তরকে মুহাম্মদ ও জিবরাইলের মধ্যে সংঘটিত একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঘটনা বলা যায় না। কিন্তু প্রাচীন হাদিস ও তাফসিরসাহিত্যে পৃথিবীর নিচের স্তর সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার আরেকটি রূপ এখানে সংরক্ষিত হয়েছে। [28]
هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ جِدًّا، وَسِيَاقٌ عَجِيبٌ، تَفَرَّدَ بِهِ الْقَاسِمُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ هَذَا، وَقَدْ قَالَ فِيهِ يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ: “لَيْسَ يُسَاوِي شَيْئًا”، وَضَعَّفَهُ أَبُو حَاتِمٍ الرَّازِيُّ، وَقَالَ ابْنُ عَدِيٍّ: لَا يُعْرَفُ.
قُلْتُ: وَقَدْ خَلَطَ فِي هَذَا الْحَدِيثِ، وَدَخَلَ عَلَيْهِ شَيْءٌ فِي شَيْءٍ، وَحَدِيثٌ فِي حَدِيثٍ. وَقَدْ يُحْتَمَلُ أَنَّهُ تَعَمَّدَ ذَلِكَ، أَوْ أُدْخِلَ عَلَيْهِ فِيهِ، فَاللَّهُ أَعْلَمُ.
বাংলা অনুবাদ: এই হাদিসটি অত্যন্ত গরিব এবং এর ঘটনাপ্রবাহও বিস্ময়কর। কাসিম ইবনে আবদুর রহমান এককভাবে এটি বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, তিনি কোনো মূল্যই রাখেন না। আবু হাতিম রাজী তাঁকে দুর্বল বলেছেন এবং ইবনে আদি বলেছেন, তিনি পরিচিত নন।
ইবনে কাসীর বলেছেন, এই হাদিসে তিনি বিভিন্ন বিষয় মিশিয়ে ফেলেছেন। এক বক্তব্যের সঙ্গে আরেক বক্তব্য এবং এক হাদিসের সঙ্গে আরেক হাদিস মিশে গেছে। এমনও হতে পারে যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন করেছেন অথবা তাঁর বর্ণনার মধ্যে অন্য কিছু প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
জাবিরের নামে প্রচলিত এই প্রশ্নোত্তর এবং কাবের নামে সংরক্ষিত বর্ণনার মধ্যে মিল ও পার্থক্য উভয়ই রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই পৃথিবীর নিচে পানি, অন্ধকার এবং জ্ঞানের সর্বশেষ সীমার কথা পাওয়া যায়। কিন্তু কাবের বর্ণনায় একের পর এক পানি ও পৃথিবীর স্তরের পরে পাথর, ফেরেশতা ও মাছ রয়েছে; জাবিরের নামে প্রচলিত বর্ণনায় পৃথিবীর নিচে সৃষ্টি, পৃথিবী, পানি, অন্ধকার, বাতাস ও সিক্ত মাটির ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। এই অবস্থানগত পার্থক্যগুলো দেখায়, পৃথিবীর নিচের জগৎ সম্পর্কে প্রাচীন বর্ণনাসাহিত্যে একটি অপরিবর্তনীয় ও সর্বসম্মত কাঠামো সংরক্ষিত হয়নি। বরং বিভিন্ন বর্ণনায় পৃথিবীর নিচের উপাদানগুলোর তালিকা এবং অবস্থানের ক্রম পরিবর্তিত হয়েছে।
পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে বর্ণনাগুলোর পারস্পরিক অসংগতি
তাবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী ও বাগাভীর সংকলিত বর্ণনাগুলো পাশাপাশি রাখলে পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে কয়েকটি পৃথক ধারণা পাওয়া যায়। কাবের বক্তব্যে একের পর এক পানি ও পৃথিবীর স্তরের পরে পাথর, ফেরেশতা ও মাছ রয়েছে। ইবনে আব্বাসের নামে কুরতুবী ও বাগাভীর বর্ণনায় পৃথিবী মাছের ওপর, মাছ সমুদ্রের ওপর, সমুদ্র সবুজ পাথরের ওপর এবং পাথর ষাঁড়ের শিংয়ের ওপর রয়েছে। ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর বক্তব্যে সাত পৃথিবীর মাঝখানে সমুদ্র এবং সর্বনিম্ন সমুদ্রের নিচে জাহান্নাম রয়েছে; জাহান্নাম বাতাস ও অন্ধকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইবনে আবি হাতিমের সূত্রে সংকলিত হাদিসে সর্বোচ্চ পৃথিবী মাছের ওপর, মাছ পাথরের ওপর এবং পাথর ফেরেশতার হাতে রয়েছে। আর জাবিরের নামে প্রচলিত প্রশ্নোত্তরে পৃথিবীর নিচে পানি, অন্ধকার, বাতাস ও সিক্ত মাটির ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়।
এসব বিবরণ একই ধরনের প্রাচীন বিশ্বতাত্ত্বিক কল্পনার অংশ হলেও তাদের অবস্থানগত দাবিগুলো এক নয়। এক বর্ণনায় পাথরের নিচে ফেরেশতা এবং ফেরেশতার নিচে মাছ; অন্য বর্ণনায় মাছের নিচে পাথর এবং পাথর ফেরেশতার হাতে। আরেক বর্ণনায় মাছের নিচে সমুদ্র, সমুদ্রের নিচে পাথর এবং পাথরের নিচে ষাঁড়। কিছু বর্ণনায় পৃথিবীগুলোর মাঝখানে পানি রয়েছে, অন্য বর্ণনায় প্রতিটি পৃথিবীকে জাহান্নামের পৃথক উপাদানের অবস্থান হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই ভৌত কাঠামোর একই অংশ সম্পর্কে এসব পরস্পরবিরোধী অবস্থানগত বিবরণ একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।
বর্ণনাগুলোর মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, পৃথিবীর নিচের কাঠামোকে ধারণ করার জন্য একের পর এক বাহক প্রয়োজন হয়েছে। পৃথিবী মাছের ওপর, মাছ সমুদ্রের ওপর, সমুদ্র পাথরের ওপর, পাথর ষাঁড়ের ওপর এবং ষাঁড় মাটির ওপর—এভাবে প্রতিটি স্তরকে আরেকটি স্তরের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত দেখানো হয়েছে। আবার কাবের বর্ণনায় পাথরের নিচে ফেরেশতা এবং ফেরেশতার নিচে মাছ। এই ধরনের কাঠামোতে কোনো বস্তুকে ধরে রাখার জন্য আরেকটি বস্তুর প্রয়োজন হওয়ার ধারণা ক্রমাগত নিচের দিকে সম্প্রসারিত হয়েছে। সর্বশেষ কোনো এক পর্যায়ে অন্ধকার, বাতাস কিংবা অজ্ঞাত সীমানার উল্লেখ করে সেই ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর স্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করার জন্য এ ধরনের বাহক-পরম্পরার প্রয়োজন নেই।
পৃথিবী একটি মহাকর্ষীয়ভাবে আবদ্ধ গ্রহ। এর বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ স্তর পদার্থের ঘনত্ব, চাপ, তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গঠনের ভিত্তিতে বিন্যস্ত। পৃথিবীকে কোনো বিশাল প্রাণীর পিঠে কিংবা অতিপ্রাকৃত সত্তার হাতে স্থাপন করার প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর পৃষ্ঠে বস্তু নিচের দিকে পতিত হয় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের কারণে। পৃথিবীর অভ্যন্তরে পদার্থের চাপ ও মাধ্যাকর্ষণীয় ভারসাম্য তার গঠন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে পৃথিবীর নিচে পানি, পাথর, মাছ ও ফেরেশতার একের পর এক বাহক থাকার ধারণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর কাঠামোর সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে সংরক্ষিত এসব বর্ণনা থেকে পৃথিবীর প্রকৃত ভূতাত্ত্বিক কাঠামো জানা যায় না। কিন্তু এসব বর্ণনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য প্রকাশ করে: পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে প্রাচীন ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে পানি, পৃথক পৃথিবী, পাথর, ফেরেশতা, বিশাল মাছ, ষাঁড়, জাহান্নাম, বাতাস এবং অন্ধকারের সমন্বয়ে বিভিন্ন মহাজাগতিক কাঠামো প্রচলিত ছিল। সেগুলো শুধু অলংকারমূলক উপমা হিসেবে সংকলিত হয়নি; বরং বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুহাম্মদের হাদিস হিসেবে পৃথিবীর নিচের বাস্তব অবস্থান সম্পর্কে বিবরণ আকারে উপস্থাপিত হয়েছে। একই সঙ্গে এসব বিবরণের মধ্যে অবস্থানগত অসংগতি এবং বর্ণনাপথের নির্ভরযোগ্যতার পার্থক্যও সংকলনকারীদের গ্রন্থেই সংরক্ষিত রয়েছে। পৃথিবীর প্রকৃত গঠন সম্পর্কে আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এসব মহাজাগতিক কাঠামোর কোনো বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পায়নি।
মাছের পিঠে পৃথিবী: মাছের নড়াচড়া, পৃথিবীর কম্পন এবং পাহাড় দিয়ে পৃথিবীকে স্থির করার বিশ্বাস
পৃথিবীর নিচে বিশাল মাছ, পাথর, ফেরেশতা ও ষাঁড়ের অবস্থান সম্পর্কে প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাগুলোতে শুধু এসব উপাদানের অস্তিত্বের কথাই বলা হয়নি; পৃথিবী কীভাবে স্থির অবস্থায় রয়েছে এবং একসময় কেন কেঁপে উঠেছিল, তারও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিশেষত ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত একাধিক বর্ণনায় পৃথিবীকে নুন নামক একটি বিশাল মাছের পিঠে স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। মাছটি নড়াচড়া করলে তার পিঠে অবস্থিত পৃথিবীও কেঁপে ওঠে। এরপর আল্লাহ পাহাড় সৃষ্টি করে পৃথিবীর ওপর স্থাপন করেন, যার ফলে পৃথিবীর কম্পন বন্ধ হয় এবং পৃথিবী স্থির হয়ে যায়। এই কাহিনিতে পৃথিবীর সৃষ্টি, মাছের অবস্থান, ভূকম্পন এবং পাহাড়ের ভূমিকা পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রাচীন ইসলামি তাফসিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকলন তাফসীরে তাবারীতে এই বিবরণের একাধিক বর্ণনাপথ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ইবনে কাসীর, কুরতুবী ও বাগাভীর মতো তাফসিরকারীরাও কাহিনিটি সংকলন করেছেন।
এই বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এখানে পৃথিবীর কম্পনকে কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে নয়, বরং পৃথিবীকে বহনকারী একটি বিশাল প্রাণীর নড়াচড়ার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একইভাবে পাহাড়কেও ভূত্বকের গতিশীলতার ফলে গঠিত ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং পৃথিবীর নড়াচড়া বন্ধ করার জন্য স্থাপিত ভারসাম্যরক্ষাকারী বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ধারণার সঙ্গে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের সম্পর্কও স্থাপন করেছেন প্রাচীন তাফসিরকারীরা। বিশেষত সুরা আল-কলমের প্রথম আয়াতের ‘নুন’ শব্দ এবং সুরা আন-নাহলের ১৫ নম্বর আয়াতে পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীর আন্দোলন প্রতিরোধের বক্তব্যকে এই মহাজাগতিক কাহিনির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
কোরআনের ‘নুন’ এবং পৃথিবী বহনকারী মহাজাগতিক মাছ
কোরআনের সুরা আল-কলম শুরু হয়েছে আরবি বর্ণ ‘নুন’ দিয়ে। এর পরেই কলম এবং লেখার শপথ করা হয়েছে। আয়াতটির সরাসরি পাঠে মাছ কিংবা পৃথিবীর নিচে অবস্থিত কোনো প্রাণীর উল্লেখ নেই। কিন্তু প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে ‘নুন’ শব্দটির একটি ব্যাখ্যা হিসেবে পৃথিবী বহনকারী বিশাল মাছের ধারণা পাওয়া যায়। তাবারী, বাগাভী ও কুরতুবী এই ব্যাখ্যাটি ইবনে আব্বাস এবং আরও কয়েকজন প্রাচীন ব্যক্তির নামে সংরক্ষণ করেছেন। তাঁদের বর্ণনায় ‘নুন’ কেবল একটি আরবি বর্ণ নয়; এটি সেই বিশাল মাছের নাম, যার পিঠের ওপর পৃথিবী স্থাপন করা হয়েছিল। [29]
نٓ ۚ وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ
বাংলা অনুবাদ: নুন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার।
তাফসীরে তাবারীতে এই আয়াতের ব্যাখ্যার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রাচীন ব্যাখ্যাকারীদের একদল ‘নুন’ বলতে সেই মাছকে বুঝিয়েছেন, যার ওপর পৃথিবীগুলো অবস্থিত। এরপর তাবারী ইবনে আব্বাসের সূত্রে বিভিন্ন বর্ণনা সংকলন করেছেন। একই আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘নুন’ শব্দকে কালির দোয়াত, বিচ্ছিন্ন আরবি বর্ণ, আল্লাহর নামের অংশ এবং শপথের উপাদান হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ তাবারীর সংকলনে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু মাছসংক্রান্ত ব্যাখ্যাটি কোনো আধুনিক অনুমান নয়; এটি ইবনে আব্বাসের নামে প্রচলিত বিস্তারিত সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাচীন ব্যাখ্যা। [30]
القول في تأويل قوله تعالى : ن وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ (1)
اختلف أهل التأويل في تأويل قوله: ( ن ) فقال بعضهم: هو الحوت الذي عليه الأرَضُون.
ذكر من قال ذلك:
حدثنا محمد بن المثنى، قال: ثنا ابن أبى عديّ، عن شعبة، عن سليمان، عن أبي ظَبْيان، عن ابن عباس، قال: أوّل ما خلق الله من شيء القلم، فجرى بما هو كائن، ثم رفع بخار الماء، فخلقت منه السماوات، ثم خلق النون فبسطت الأرض على ظهر النون، فتحرّكت الأرض فمادت، فأثبت بالجبال، فإن الجبال لتفخر على الأرض، قال: وقرأ: ( ن وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ ).
বাংলা অনুবাদ: মহান আল্লাহর বক্তব্য ‘নুন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার’—এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে তাবারী বলেছেন, ‘নুন’ শব্দটির অর্থ সম্পর্কে ব্যাখ্যাকারীরা মতভেদ করেছেন। তাঁদের একদল বলেছেন, এটি সেই মাছ, যার ওপর পৃথিবীগুলো অবস্থিত।
যাঁরা এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাঁদের বক্তব্যের বিবরণ হচ্ছে: মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইবনে আবি আদী আমাদের বর্ণনা করেছেন, শুবার সূত্রে, সুলাইমানের সূত্রে, আবু যাবিয়ানের সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন। কলম ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে তা লিখতে থাকে। এরপর পানির বাষ্প ওপরের দিকে ওঠে এবং সেই বাষ্প থেকে আসমানসমূহ সৃষ্টি করা হয়। তারপর আল্লাহ নুন নামক মাছ সৃষ্টি করেন এবং মাছটির পিঠের ওপর পৃথিবী বিস্তৃত করেন। এরপর পৃথিবী নড়াচড়া করতে থাকে এবং কেঁপে ওঠে। তখন আল্লাহ পাহাড়ের সাহায্যে পৃথিবীকে স্থির করে দেন। ফলে পাহাড়গুলো পৃথিবীর ওপর গর্ব করে। এরপর ইবনে আব্বাস পাঠ করেন, ‘নুন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার।’
এখানে পৃথিবীর কম্পন এবং পাহাড় সৃষ্টির মধ্যে একটি সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। বর্ণনাটির ক্রম অনুসারে প্রথমে কলম সৃষ্টি করা হয়, তারপর আসমানসমূহ এবং এরপর নুন নামক মাছ সৃষ্টি করা হয়। মাছের পিঠে পৃথিবী বিস্তৃত করার পর পৃথিবী নড়াচড়া করতে থাকে। সেই নড়াচড়া বন্ধ করার জন্য পাহাড় স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ পাহাড়ের অস্তিত্বকে পৃথিবীর স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্ণনাটির শেষাংশে পাহাড়ের পৃথিবীর ওপর গর্ব করার কথাও রয়েছে, যা পাহাড়কে পৃথিবীর স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করে।
তাবারী একই ঘটনার আরেকটি বর্ণনাপথও সংকলন করেছেন, যেখানে মাছটির নড়াচড়াকে আরও সরাসরি পৃথিবীর কম্পনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে প্রথম কলম সৃষ্টি এবং ভাগ্যলিপি লেখার ঘটনা বর্ণিত হওয়ার পর নুন সৃষ্টি, পানির বাষ্প থেকে আসমান সৃষ্টি এবং মাছের পিঠে পৃথিবী বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। এরপর মাছটি নড়াচড়া করলে পৃথিবী কেঁপে ওঠে এবং পাহাড়ের সাহায্যে তাকে স্থির করা হয়। [31]
حدثنا ابن بشار، قال: ثنا يحيى، قال: ثنا سفيان، قال: ثني سليمان، عن أبي ظبيان، عن ابن عباس، قال: أوّل ما خلق الله القلم، قال: اكتب، قال: ما أكتب؟ قال: اكتب القدر، قال: فجرى بما يكون من ذلك اليوم إلى قيام الساعة، ثم خلق النون، ورفع بخار الماء، ففُتِقت منه السماء و بُسِطت الأرض على ظهر النون، فاضطرب النون، فمادت الأرض، فأثبتت بالجبال، فإنها لتفخر على الأرض.
বাংলা অনুবাদ: ইবনে বাশশার আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়াহইয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সুফিয়ান আমাদের বর্ণনা করেছেন, সুলাইমানের সূত্রে, আবু যাবিয়ানের সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন। আল্লাহ কলমকে বললেন, লেখো। কলম জিজ্ঞাসা করল, আমি কী লিখব? আল্লাহ বললেন, ভাগ্যলিপি লেখো। তখন কলম সেই দিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লিখতে থাকে।
এরপর আল্লাহ নুন নামক মাছ সৃষ্টি করেন এবং পানির বাষ্প ওপরে ওঠান। সেই বাষ্প থেকে আসমানকে পৃথক করে সৃষ্টি করা হয় এবং নুন নামক মাছটির পিঠের ওপর পৃথিবী বিস্তৃত করা হয়। এরপর মাছটি নড়াচড়া করতে থাকে। ফলে পৃথিবীও কেঁপে ওঠে। তখন পাহাড়ের সাহায্যে পৃথিবীকে স্থির করা হয়। এ কারণে পাহাড়গুলো পৃথিবীর ওপর গর্ব করে।
এই দুটি বর্ণনার মধ্যে ঘটনাগত মিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। উভয় বর্ণনায় একই ধরনের সৃষ্টি-ক্রম, নুন নামক মাছ, মাছের পিঠে পৃথিবী এবং পাহাড় দিয়ে পৃথিবী স্থির করার ঘটনা রয়েছে। বিশেষত দ্বিতীয় বর্ণনার فَاضْطَرَبَ النُّونُ، فَمَادَتِ الْأَرْضُ বাক্যাংশে মাছটির নড়াচড়া এবং পৃথিবীর আন্দোলনকে পরপর উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাছের নড়াচড়া ও পৃথিবীর কম্পনের সম্পর্কটি বর্ণনার নিজস্ব অংশ; এটি পরবর্তী কোনো সমালোচকের তৈরি ব্যাখ্যা নয়।
তাফসীরে তাবারী: মাছ, পানি, পাথর, ফেরেশতা এবং ভূমিকম্পের পূর্ণ সৃষ্টিকাহিনি
তাবারীর সুরা আল-বাকারার ২৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত একটি বিবরণ রয়েছে। এখানে সুদ্দীর সূত্রে আবু মালিক, আবু সালিহ, ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ এবং আরও কয়েকজন সাহাবির নামে একটি যৌথ বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে। এই বিবরণে পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে সাত পৃথিবীর উৎপত্তি, মাছের পিঠে পৃথিবী স্থাপন, মাছের নিচে পানি ও পাথরের অবস্থান এবং মাছের নড়াচড়ায় পৃথিবীর কম্পনের ঘটনা একত্রে বর্ণিত হয়েছে। পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে অন্যান্য তাফসিরে যে বিচ্ছিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়, এখানে সেগুলো একটি সুসংগঠিত সৃষ্টিতত্ত্বের রূপ পেয়েছে। [32]
591- فحدثني موسى بن هارون, قال: حدثنا عمرو بن حماد, قال: حدثنا أسباط، عن السُّدّيّ في خبر ذكره، عن أبي مالك, وعن أبي صالح, عن ابن عباس – وعن مُرَّة, عن ابن مسعود, وعن ناس من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم: ” هو الذي خلقَ لكم ما في الأرض جميعًا ثم استوى إلى السماء فسواهن سبع سموات “. قال: إن الله تبارك وتعالى كان عرشه على الماء, ولم يخلق شيئًا غير ما خلق قبل الماء. فلما أراد أن يخلق الخلق، أخرج من الماء دخانًا, فارتفع فوق الماء فسما عليه, فسماه سماء.
ثم أيبس الماء فجعله أرضًا واحدة, ثم فتقها فجعل سبع أرضين في يومين – في الأحد والاثنين, فخلق الأرض على حوت, والحوتُ هو النون الذي ذكره الله في القرآن: ن وَالْقَلَمِ ، والحوت في الماء، والماء على ظهر صفاة, والصفاةُ على ظهر ملَك, والملك على صخرة, والصخرة في الريح – وهي الصخرة التي ذكر لقمان – ليست في السماء ولا في الأرض: فتحرك الحوت فاضطرب, فتزلزت الأرض, فأرسى عليها الجبال فقرّت, فالجبال تخر على الأرض, فذلك قوله: وَأَلْقَى فِي الأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ [سورة النحل: 15].
وخلق الجبالَ فيها، وأقواتَ أهلها وشجرها وما ينبغي لها في يومين، في الثلاثاء والأربعاء, وذلك حين يقول: أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا ذَلِكَ رَبُّ الْعَالَمِينَ * وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا يقول: أنبت شجرها وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا يقول: أقواتها لأهلها فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ يقول: قل لمن يسألك: هكذا الأمر.
বাংলা অনুবাদ: মুসা ইবনে হারুন আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমর ইবনে হাম্মাদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আসবাত সুদ্দীর সূত্রে একটি বর্ণনা আমাদের জানিয়েছেন। সুদ্দী আবু মালিক ও আবু সালিহের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস থেকে, মুররার মাধ্যমে ইবনে মাসউদ থেকে এবং মুহাম্মদের আরও কয়েকজন সাহাবির সূত্রে আল্লাহর এই বক্তব্য সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন: ‘তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে সব সৃষ্টি করেছেন, তারপর আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেছেন এবং সেগুলোকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেছেন।’
বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল। পানির আগে তিনি যা সৃষ্টি করেছিলেন, তার বাইরে আর কিছু সৃষ্টি করেননি। এরপর আল্লাহ যখন সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করলেন, তখন পানি থেকে ধোঁয়া বের করলেন। সেই ধোঁয়া পানির ওপরে উঠে গেল এবং তাকে আসমান বলা হলো।
এরপর আল্লাহ পানি শুকিয়ে সেটিকে একটি পৃথিবীতে পরিণত করলেন। তারপর সেই পৃথিবীকে বিভক্ত করে সাতটি পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। এই কাজটি দুই দিনে, রবিবার ও সোমবার সম্পন্ন হলো। এরপর আল্লাহ পৃথিবীকে একটি মাছের ওপর সৃষ্টি করলেন। মাছটি হচ্ছে সেই নুন, যার উল্লেখ আল্লাহ কোরআনে করেছেন: ‘নুন। শপথ কলমের।’ মাছটি পানির মধ্যে রয়েছে। পানি একটি সমতল পাথরের ওপর রয়েছে। পাথরটি একজন ফেরেশতার পিঠের ওপর রয়েছে। ফেরেশতা আরেকটি পাথরের ওপর রয়েছে এবং সেই পাথর বাতাসের মধ্যে অবস্থিত। এটিই সেই পাথর, যার উল্লেখ লুকমানের ঘটনায় করা হয়েছে। পাথরটি আসমানেও নেই, পৃথিবীতেও নেই।
এরপর মাছটি নড়াচড়া করে এবং আন্দোলিত হয়। ফলে পৃথিবী কেঁপে ওঠে। তখন আল্লাহ পৃথিবীর ওপর পাহাড় স্থাপন করে তাকে স্থির করেন। ফলে পাহাড়গুলো পৃথিবীর ওপর গর্ব করে। আল্লাহর এই বক্তব্য দ্বারা সেটিই বোঝানো হয়েছে: ‘আর তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়।’ এটি সুরা আন-নাহলের ১৫ নম্বর আয়াত।
এরপর আল্লাহ মঙ্গল ও বুধবার—এই দুই দিনে পৃথিবীতে পাহাড়, পৃথিবীর বাসিন্দাদের জীবিকা, গাছপালা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করেন। আল্লাহর বক্তব্য, ‘তোমরা কি সেই সত্তাকে অস্বীকার করছ, যিনি দুই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর সমকক্ষ স্থাপন করছ? তিনিই সমস্ত জগতের প্রতিপালক। তিনি পৃথিবীর ওপর সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, পৃথিবীতে বরকত দিয়েছেন এবং সেখানে জীবিকার ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন’—এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, তিনি পৃথিবীতে গাছপালা উৎপন্ন করেছেন এবং পৃথিবীর বাসিন্দাদের জীবিকা নির্ধারণ করেছেন। এসব কাজ চার দিনে সম্পন্ন হয়েছে। যারা এ সম্পর্কে জানতে চায়, তাদের বলে দাও, বিষয়টি এভাবেই সংঘটিত হয়েছে।
এই বর্ণনাটি পৃথিবীর সৃষ্টি ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকারণ কাঠামো উপস্থাপন করে। প্রথমে পানি থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে, তারপর পৃথিবীকে সাত ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। পৃথিবী একটি বিশাল মাছের ওপর স্থাপিত। মাছটি পানিতে অবস্থান করছে এবং সেই পানির নিচে রয়েছে পাথর। পাথরটিকে ধারণ করছে একজন ফেরেশতা, ফেরেশতা রয়েছে আরেকটি পাথরের ওপর এবং সর্বশেষ পাথরটি বাতাসের মধ্যে অবস্থিত। অর্থাৎ পৃথিবীর স্থিতিশীলতা সম্পর্কে এখানে একের পর এক বাহক ও আশ্রয়স্থলের একটি ব্যবস্থা কল্পনা করা হয়েছে।
বর্ণনার দ্বিতীয় অংশে পৃথিবীর কম্পনের কারণও সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। মাছটি নড়াচড়া করায় পৃথিবী কেঁপে ওঠে। তারপর পাহাড় স্থাপনের মাধ্যমে সেই কম্পন বন্ধ করা হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ আরবি শব্দ হচ্ছে فَتَزَلْزَلَتِ الْأَرْضُ, যার অর্থ পৃথিবী কেঁপে ওঠে বা ভূকম্পিত হয়। ফলে মাছের নড়াচড়া এবং পৃথিবীর ভূকম্পনের মধ্যে সম্পর্কটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এটি শুধু পৃথিবীর ভারসাম্য সম্পর্কে একটি অস্পষ্ট উপমা নয়; মাছের নড়াচড়াকে পৃথিবীর কম্পনের কারণ এবং পাহাড়কে সেই কম্পন প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বর্ণনায় সুরা আন-নাহলের ১৫ নম্বর আয়াতকে মাছের নড়াচড়ার ঘটনা এবং পাহাড় দিয়ে পৃথিবীকে স্থির করার ব্যাখ্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। কোরআনের আয়াতটিতে মাছের নাম নেই, কিন্তু সুদ্দীর মাধ্যমে প্রচলিত এই ব্যাখ্যায় আয়াতটির পাহাড়সংক্রান্ত বক্তব্যকে মাছের পিঠে পৃথিবীর কাহিনির পরিণতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে কোরআনের পাহাড়সংক্রান্ত বক্তব্য এবং প্রাচীন ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বের মাছসংক্রান্ত বিবরণের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ ব্যাখ্যাগত সংযোগ পাওয়া যায়।
ইবনে কাসীর: মাছের পিঠে পৃথিবী এবং পাহাড় দিয়ে কম্পন বন্ধ
ইবনে কাসীর সুরা আল-কলমের প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় নুন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি প্রথমে বিচ্ছিন্ন আরবি বর্ণ হিসেবে ‘নুন’-এর ব্যাখ্যা উল্লেখ করেন। এরপর আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নুন হচ্ছে বিশাল সমুদ্রের পানিতে অবস্থানকারী সেই মাছ, যা সাত পৃথিবী বহন করে। এই ব্যাখ্যার সমর্থনে ইবনে কাসীর তাবারীর সূত্রে ইবনে আব্বাসের দীর্ঘ বিবরণ উল্লেখ করেছেন। সেখানে মাছের পিঠে পৃথিবী বিস্তৃত করা, মাছের নড়াচড়া এবং পাহাড় দিয়ে পৃথিবী স্থির করার বক্তব্য রয়েছে। তিনি আরও জানান, একই বর্ণনা ইবনে আবি হাতিম এবং অন্যান্য বর্ণনাকারীর সূত্রেও সংকলিত হয়েছে। [33]
قد تقدم الكلام على حروف الهجاء في أول ” سورة البقرة ” ، وأن قوله : ( ن ) كقوله : ( ص ) ) ق ) ونحو ذلك من الحروف المقطعة في أوائل السور ، وتحرير القول في ذلك بما أغنى عن إعادته .
وقيل : المراد بقوله : ( ن ) حوت عظيم على تيار الماء العظيم المحيط ، وهو حامل للأرضين السبع ، كما قال الإمام أبو جعفر بن جرير :
حدثنا ابن بشار ، حدثنا يحيى ، حدثنا سفيان – هو الثوري – حدثنا سليمان – هو الأعمش – عن أبي ظبيان ، عن ابن عباس قال : أول ما خلق الله القلم قال : اكتب . قال : وما أكتب ؟ قال : اكتب القدر . فجرى بما يكون من ذلك اليوم إلى يوم قيام الساعة . ثم خلق ” النون ” ورفع بخار الماء ، ففتقت منه السماء ، وبسطت الأرض على ظهر النون ، فاضطرب النون فمادت الأرض ، فأثبتت بالجبال ، فإنها لتفخر على الأرض .
وكذا رواه ابن أبي حاتم ، عن أحمد بن سنان ، عن أبي معاوية ، عن الأعمش به . وهكذا رواه شعبة ، ومحمد بن فضيل ، ووكيع ، عن الأعمش ، به . وزاد شعبة في روايته : ثم قرأ : ( ن والقلم وما يسطرون ) وقد رواه شريك ، عن الأعمش ، عن أبي ظبيان – أو مجاهد ، – عن ابن عباس فذكر نحوه .
বাংলা অনুবাদ: সুরা আল-বাকারার শুরুতে বিচ্ছিন্ন আরবি বর্ণগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘নুন’ হচ্ছে ‘সাদ’, ‘কাফ’ এবং বিভিন্ন সুরার শুরুতে থাকা অন্যান্য বিচ্ছিন্ন বর্ণের অনুরূপ। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ইতিপূর্বে করা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, ‘নুন’ বলতে সেই বিশাল মাছকে বোঝানো হয়েছে, যা বিপুল বেষ্টনকারী পানির প্রবাহে অবস্থান করে এবং সাত পৃথিবী বহন করে। যেমন ইমাম আবু জাফর ইবনে জারির তাবারী বর্ণনা করেছেন:
ইবনে বাশশার আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়াহইয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সুফিয়ান সাওরী আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সুলাইমান আমাশ আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবু যাবিয়ানের সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন। তিনি কলমকে বললেন, লেখো। কলম বলল, আমি কী লিখব? আল্লাহ বললেন, ভাগ্যলিপি লেখো। তখন কলম সেই দিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে সব লিখতে থাকে।
এরপর আল্লাহ নুন নামক মাছ সৃষ্টি করেন এবং পানির বাষ্প ওপরে ওঠান। সেই বাষ্প থেকে আসমান সৃষ্টি করা হয়। তারপর মাছটির পিঠের ওপর পৃথিবী বিস্তৃত করা হয়। মাছটি নড়াচড়া করলে পৃথিবীও আন্দোলিত হয়। এরপর পাহাড় দিয়ে পৃথিবীকে স্থির করা হয়। ফলে পাহাড়গুলো পৃথিবীর ওপর গর্ব করে।
ইবনে আবি হাতিমও আহমদ ইবনে সিনানের সূত্রে, আবু মুআবিয়ার সূত্রে, আমাশ থেকে একই বিবরণ সংকলন করেছেন। একইভাবে শুবা, মুহাম্মদ ইবনে ফুযাইল এবং ওয়াকীও আমাশের সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন। শুবার বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে যে ইবনে আব্বাস এরপর ‘নুন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার’ আয়াতটি পাঠ করেন। শারিকও আমাশের সূত্রে, আবু যাবিয়ান অথবা মুজাহিদের সূত্রে, ইবনে আব্বাস থেকে অনুরূপ বক্তব্য বর্ণনা করেছেন।
ইবনে কাসীরের এই আলোচনা থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমত, তাঁর সময়েও নুনকে পৃথিবী বহনকারী বিশাল মাছ হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রাচীন বর্ণনাটি সংরক্ষিত ছিল। দ্বিতীয়ত, তিনি শুধু মাছের অস্তিত্বসংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বক্তব্য উল্লেখ করেননি; মাছের নড়াচড়ার ফলে পৃথিবীর কম্পন এবং পাহাড়ের মাধ্যমে সেই কম্পন বন্ধ হওয়ার সম্পূর্ণ কাহিনিটিও উদ্ধৃত করেছেন। তবে ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত বিভিন্ন বর্ণনাপথের একটি বড় অংশ আমাশ ও আবু যাবিয়ানের মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের কাছে পৌঁছেছে। ফলে একাধিক গ্রন্থ ও বর্ণনাকারীর উল্লেখকে সম্পূর্ণ স্বাধীন সাক্ষ্যের সমষ্টি হিসেবে গণনা করা যায় না। বরং একই মূল বর্ণনা বিভিন্ন ইসলামি সংকলনে কীভাবে সংরক্ষিত ও সম্প্রসারিত হয়েছে, তা এখানে স্পষ্ট।
তাফসীরে বাগাভী: পৃথিবীর ভার বহনকারী ফেরেশতা, চল্লিশ হাজার শিংয়ের ষাঁড় ও বিশাল মাছ
তাফসীরে বাগাভীতে সুরা আল-কলমের প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় পৃথিবীর নিচের মহাজাগতিক কাঠামোর আরও বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। বাগাভী প্রথমে ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, মুকাতিল, সুদ্দী ও কালবীর নামে নুনকে পৃথিবী বহনকারী মাছ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি একটি দীর্ঘ সৃষ্টিকাহিনি সংকলন করেছেন, যেখানে সাত পৃথিবীকে একজন বিশাল ফেরেশতার কাঁধে স্থাপন করা হয়েছে। ফেরেশতার পা রাখার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে চল্লিশ হাজার শিং ও চল্লিশ হাজার পা-ওয়ালা একটি ষাঁড়। ষাঁড়ের নিচে বিশাল পাথর এবং সেই পাথরের নিচে রয়েছে নুন নামক মাছ। মাছ সমুদ্রের ওপর, সমুদ্র বাতাসের ওপর এবং বাতাস আল্লাহর ক্ষমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। [34]
( ن ) اختلفوا فيه فقال ابن عباس : هو الحوت الذي على ظهره الأرض . وهو قول مجاهد ومقاتل والسدي والكلبي .
وروى أبو ظبيان عن ابن عباس قال : أول ما خلق الله القلم ، فجرى بما هو كائن إلى يوم القيامة ، ثم خلق النون فبسط الأرض على ظهره فتحرك النون فمادت الأرض ، فأثبتت بالجبال وإن الجبال لتفخر على الأرض ثم قرأ ابن عباس : ( ن والقلم وما يسطرون ) .
واختلفوا في اسمه ، فقال الكلبي ومقاتل : اسمه يهموت . وقال الواقدي : ليوثا . وقال كعب : لويثا . وعن علي : اسمه بلهوث .
وقالت الرواة : لما خلق الله الأرض وفتقها بعث من تحت العرش ملكا فهبط إلى الأرض حتى دخل تحت الأرضين السبع فوضعها على عاتقه ، إحدى يديه بالمشرق والأخرى بالمغرب ، باسطتين قابضتين على الأرضين السبع ، حتى ضبطها فلم يكن لقدميه موضع قرار ، فأهبط الله – عز وجل – من الفردوس ثورا له أربعون ألف قرن وأربعون ألف قائمة ، وجعل قرار قدمي الملك على سنامه ، فلم تستقر قدماه فأخذ الله ياقوتة خضراء من أعلى درجة في الفردوس غلظها مسيرة خمسمائة عام فوضعها بين سنام الثور إلى أذنه فاستقرت عليها قدماه ، وقرون ذلك الثور خارجة من أقطار الأرض ، ومنخراه في البحر فهو يتنفس كل يوم نفسا فإذا تنفس مد البحر وإذا [ رد ] نفسه جزر البحر فلم يكن لقوائم الثور موضع قرار [ فخلق ] الله تعالى صخرة كغلظ سبع سماوات وسبع أرضين فاستقرت قوائم الثور عليها وهي الصخرة التي قال لقمان لابنه ” [ يا بني إنها إن تك مثقال حبة من خردل ] فتكن في صخرة ” ولم يكن للصخرة مستقر ، فخلق الله نونا وهو الحوت العظيم ، فوضع الصخرة على ظهره وسائر جسده خال والحوت على البحر ، والبحر على متن الريح ، والريح على القدرة .
يقال : فكل الدنيا كلها بما عليها حرفان قال لها الجبار : [ جل جلاله ] كوني فكانت .
বাংলা অনুবাদ: ‘নুন’ সম্পর্কে ব্যাখ্যাকারীরা মতভেদ করেছেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন, এটি সেই মাছ, যার পিঠের ওপর পৃথিবী অবস্থিত। মুজাহিদ, মুকাতিল, সুদ্দী ও কালবীও এই মত পোষণ করেছেন।
আবু যাবিয়ান ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন। কলম কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লিখতে থাকে। এরপর আল্লাহ নুন নামক মাছ সৃষ্টি করেন এবং তার পিঠের ওপর পৃথিবী বিস্তৃত করেন। মাছটি নড়াচড়া করলে পৃথিবীও আন্দোলিত হয়। এরপর পাহাড় দিয়ে পৃথিবীকে স্থির করা হয়। ফলে পাহাড়গুলো পৃথিবীর ওপর গর্ব করে। এরপর ইবনে আব্বাস ‘নুন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার’ আয়াতটি পাঠ করেন।
মাছটির নাম সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে। কালবী ও মুকাতিল বলেছেন, এর নাম ইয়াহমুত। ওয়াকিদী বলেছেন, লিওথা। কাব বলেছেন, লুওয়াইথা। আলীর নামেও বর্ণিত হয়েছে, এর নাম বালহুথ।
বর্ণনাকারীরা বলেছেন, আল্লাহ যখন পৃথিবী সৃষ্টি করে তাকে বিভক্ত করলেন, তখন আরশের নিচ থেকে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। সেই ফেরেশতা পৃথিবীর নিচে নেমে সাত পৃথিবীরও নিচে প্রবেশ করলেন এবং সাত পৃথিবীকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তাঁর একটি হাত পূর্বদিকে এবং অন্য হাত পশ্চিমদিকে বিস্তৃত ছিল। তিনি দুটি হাত দিয়ে সাত পৃথিবীকে ধারণ করলেন এবং সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেন। কিন্তু তাঁর পা রাখার কোনো স্থিতিশীল জায়গা ছিল না।
তখন আল্লাহ জান্নাতুল ফিরদাউস থেকে একটি ষাঁড় নামালেন। ষাঁড়টির চল্লিশ হাজার শিং এবং চল্লিশ হাজার পা ছিল। আল্লাহ ফেরেশতার পা রাখার স্থান হিসেবে ষাঁড়টির কুঁজ নির্ধারণ করলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর পা স্থির হলো না। তখন আল্লাহ জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ স্তর থেকে একটি সবুজ ইয়াকুত পাথর আনলেন। সেই পাথরের পুরুত্ব পাঁচশ বছরের পথের সমান। আল্লাহ পাথরটি ষাঁড়ের কুঁজ থেকে তার কান পর্যন্ত স্থাপন করলেন। এরপর ফেরেশতার পা সেখানে স্থির হলো।
ষাঁড়টির শিং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে ছিল। তার নাসারন্ধ্র সমুদ্রের মধ্যে অবস্থান করছিল। ষাঁড়টি প্রতিদিন শ্বাসপ্রশ্বাস নিত। যখন সে শ্বাস ছাড়ত, তখন সমুদ্রের পানি বেড়ে যেত। আর যখন সে শ্বাস ভেতরে টেনে নিত, তখন সমুদ্রের পানি কমে যেত।
কিন্তু ষাঁড়টির পা রাখারও কোনো স্থিতিশীল জায়গা ছিল না। তখন আল্লাহ এমন একটি বিশাল পাথর সৃষ্টি করলেন, যার পুরুত্ব সাত আসমান ও সাত পৃথিবীর সমান। ষাঁড়টির পা সেই পাথরের ওপর স্থির হলো। এটিই সেই পাথর, যার সম্পর্কে লুকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, ‘হে আমার পুত্র, কোনো বস্তু যদি সরিষার দানার সমপরিমাণও হয় এবং তা কোনো পাথরের মধ্যে থাকে।’
কিন্তু সেই পাথরটিরও কোনো আশ্রয়স্থল ছিল না। তখন আল্লাহ নুন নামক একটি বিশাল মাছ সৃষ্টি করলেন এবং পাথরটিকে মাছটির পিঠের ওপর স্থাপন করলেন। মাছটির শরীরের বাকি অংশ অন্য কোনো বোঝা বহন করছিল না। মাছটি সমুদ্রের ওপর অবস্থান করছিল, সমুদ্র বাতাসের ওপর এবং বাতাস আল্লাহর ক্ষমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
বলা হয়েছে, সমগ্র পৃথিবী এবং তার ওপর যা কিছু রয়েছে, সেগুলোর সৃষ্টি আল্লাহর দুটি বর্ণের আদেশের মাধ্যমে হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘হও’, আর তা হয়ে গেছে।
এই বিবরণটি পৃথিবীর নিচের মহাজাগতিক কাঠামো সম্পর্কে অত্যন্ত বিস্তারিত একটি কল্পচিত্র তুলে ধরে। প্রথমে সাত পৃথিবী বহনকারী ফেরেশতা, এরপর ফেরেশতার পায়ের নিচে চল্লিশ হাজার শিং ও চল্লিশ হাজার পা-ওয়ালা ষাঁড়, ষাঁড়ের নিচে বিশাল পাথর এবং সেই পাথরের নিচে মাছ—এভাবে পৃথিবীর ভার বহনের একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি উপাদানকে স্থির রাখার জন্য আরেকটি উপাদানের প্রয়োজন হয়েছে। সর্বশেষ মাছ, সমুদ্র ও বাতাসের ধারাবাহিকতার পর আল্লাহর ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে সেই বাহক-পরম্পরার সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।
এই কাহিনির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ব্যাখ্যা। ষাঁড়টির নাসারন্ধ্র সমুদ্রের মধ্যে রয়েছে এবং তার শ্বাসপ্রশ্বাসের ফলে সমুদ্রের পানি বাড়ে ও কমে—এমন বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়। অর্থাৎ একই মহাজাগতিক প্রাণীকে একদিকে পৃথিবীর ভার বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সমুদ্রের পানির ওঠানামার কারণ হিসেবেও দেখানো হয়েছে। বাস্তবে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার প্রধান কারণ চাঁদ ও সূর্যের মাধ্যাকর্ষণীয় প্রভাব এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন ও সংশ্লিষ্ট জলগতিবিদ্যা। কোনো মহাজাগতিক ষাঁড়ের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার সম্পর্ক নেই।
বাগাভীর এই বিশদ কাহিনিতে ‘বর্ণনাকারীরা বলেছেন’ বলে একটি সম্মিলিত বর্ণনার উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ চল্লিশ হাজার শিংয়ের ষাঁড় ও ফেরেশতার কাহিনিটি সরাসরি মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। তবে ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, মুকাতিল ও অন্যান্য প্রাচীন ব্যাখ্যাকারীর নামে মাছের পিঠে পৃথিবী থাকার যে ধারণা সংরক্ষিত হয়েছে, দীর্ঘ কাহিনিটি সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত একটি মহাজাগতিক কাঠামোয় রূপ দিয়েছে।
ইবলিসের প্ররোচনায় পৃথিবী ফেলে দিতে উদ্যত মাছ
তাফসীরে বাগাভীর একই আলোচনায় কাব আল-আহবারের নামে আরেকটি বিস্ময়কর বর্ণনা রয়েছে। এখানে পৃথিবী বহনকারী মাছটির সঙ্গে ইবলিসের একটি ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। কাবের বক্তব্য অনুসারে, ইবলিস মাছটির কাছে গিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে তার পিঠে অসংখ্য মানুষ, প্রাণী, গাছপালা ও পাহাড় রয়েছে। মাছটি চাইলে একবার শরীর ঝাঁকিয়ে তাদের সবাইকে পিঠ থেকে ফেলে দিতে পারে। এই প্ররোচনায় মাছটি পৃথিবীকে ঝেড়ে ফেলার কথা চিন্তা করে। তখন আল্লাহ একটি প্রাণী পাঠান, যেটি মাছের নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করে তার মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এতে মাছটি কষ্ট পেয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং আল্লাহর অনুমতিতে প্রাণীটি বেরিয়ে আসে। এরপর প্রাণীটি মাছের সামনে নজরদারি করতে থাকে, যাতে মাছ আবার পৃথিবীকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে বাধা দিতে পারে। [35]
قال كعب الأحبار : إن إبليس تغلغل إلى الحوت الذي على ظهره الأرض فوسوس إليه ، فقال له : أتدري ما على ظهرك يا لويثا من الأمم والدواب والشجر والجبال لو نفضتهم ألقيتهم عن ظهرك ، فهم لويثا أن يفعل ذلك فبعث الله دابة فدخلت منخره فوصلت إلى دماغه فعج الحوت إلى الله منها فأذن لها الله فخرجت . قال كعب : فوالذي نفسي بيده إنه لينظر إليها وتنظر إليه إن هم بشيء من ذلك عادت كما كانت .
বাংলা অনুবাদ: কাব আল-আহবার বলেছেন, ইবলিস সেই মাছটির কাছে প্রবেশ করল, যার পিঠের ওপর পৃথিবী রয়েছে। সে মাছটিকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, হে লুওয়াইথা, তুমি কি জানো তোমার পিঠের ওপর কত জাতি, কত প্রাণী, কত গাছপালা এবং কত পাহাড় রয়েছে? তুমি যদি তাদের একবার ঝেড়ে ফেলো, তাহলে সবাই তোমার পিঠ থেকে পড়ে যাবে।
তখন লুওয়াইথা মাছটি এমন কাজ করার কথা চিন্তা করল। এরপর আল্লাহ একটি প্রাণী পাঠালেন। সেই প্রাণী মাছটির নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করে তার মস্তিষ্কে পৌঁছে গেল। এতে মাছটি যন্ত্রণায় আল্লাহর কাছে আর্তনাদ করতে লাগল। এরপর আল্লাহ প্রাণীটিকে বেরিয়ে আসার অনুমতি দিলেন এবং সেটি বেরিয়ে এল।
কাব বলেছেন, যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি, মাছটি সেই প্রাণীর দিকে তাকিয়ে থাকে এবং প্রাণীটিও মাছটির দিকে তাকিয়ে থাকে। মাছটি আবার এমন কিছু করার কথা চিন্তা করলে প্রাণীটি আগের মতোই তার মধ্যে প্রবেশ করবে।
এই বর্ণনায় পৃথিবীর স্থিতিশীলতাকে আরও এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। পৃথিবী বহনকারী মাছটি কেবল নিজের অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়ায় পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয় না; ইবলিসের প্ররোচনায় ইচ্ছাকৃতভাবে পৃথিবীকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার কথাও চিন্তা করতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবীর অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতা একটি বিশাল প্রাণীর আচরণের ওপর নির্ভরশীল বলে কল্পনা করা হয়েছে। সেই প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আবার আরেকটি প্রাণী পাঠানোর প্রয়োজন হয়েছে। এখানে ভূতাত্ত্বিক কোনো প্রক্রিয়ার আলোচনা নেই; পৃথিবীর স্থিতিশীলতাকে প্রাণীর ইচ্ছা, শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং অতিপ্রাকৃত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তাফসীরে কুরতুবীতেও সুরা আল-কলমের প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় কাবের নামে এই কাহিনিটি সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে মাছের নামের একাধিক রূপ পাওয়া যায় এবং ইবলিসের প্ররোচনা ও মাছের নাসারন্ধ্রে প্রবেশকারী প্রাণীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। বাগাভী ও কুরতুবীর এই বর্ণনাগুলোর মূল কাহিনি একই। ফলে একই বিবরণ দুই গ্রন্থে পাওয়া যাওয়ার অর্থ দুটি স্বাধীন ঘটনা নয়; বরং প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে কাহিনিটির প্রচার ও গ্রহণের সাক্ষ্য। [36]
কোরআনে পাহাড় দিয়ে পৃথিবীর আন্দোলন প্রতিরোধের বক্তব্য
মাছের নড়াচড়ার কারণে পৃথিবীর কম্পন এবং পাহাড় দিয়ে সেই কম্পন বন্ধ করার কাহিনির সঙ্গে কোরআনের পাহাড়সংক্রান্ত আয়াতগুলোর একটি প্রত্যক্ষ ব্যাখ্যাগত সম্পর্ক রয়েছে। সুরা আন-নাহলের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী মানুষকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়। একই আয়াতে নদী ও পথ সৃষ্টির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে পাহাড় স্থাপনের একটি উদ্দেশ্য হিসেবে পৃথিবীর আন্দোলন প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। [37]
وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَأَنْهَارًا وَسُبُلًا لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
বাংলা অনুবাদ: আর তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়। তিনি নদী ও পথও সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা পথ খুঁজে পেতে পারো।
একই ধরনের বক্তব্য সুরা আল-আম্বিয়ার ৩১ নম্বর আয়াতেও রয়েছে। সেখানে পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে, যাতে পৃথিবী মানুষকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়। এই আয়াতেও পাহাড়ের সঙ্গে পৃথিবীর স্থিতিশীলতার সম্পর্ক সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। [38]
وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِهِمْ وَجَعَلْنَا فِيهَا فِجَاجًا سُبُلًا لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ
বাংলা অনুবাদ: আর আমরা পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছি, যাতে পৃথিবী তাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়। আমরা সেখানে প্রশস্ত পথ সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা পথ খুঁজে পায়।
এই আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত تَمِيدَ শব্দের অর্থ দুলতে থাকা, আন্দোলিত হওয়া বা অস্থিরভাবে নড়াচড়া করা। তাবারী এই শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীকে স্থির করেছেন, যাতে পৃথিবী তার ওপর বসবাসকারী সৃষ্টিকে নিয়ে দুলতে না থাকে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, পাহাড় স্থাপনের আগে পৃথিবী আন্দোলিত অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ তাবারীর ব্যাখ্যায় পাহাড় পৃথিবীর স্থিতিশীলতার একটি প্রত্যক্ষ কারণ। [39]
يقول تعالى ذكره: ومن نعمه عليكم أيها الناس أيضا، أن ألقى في الأرض رواسي، وهي جمع راسية، وهي الثوابت في الأرض من الجبال. وقوله ( أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ ) يعني: أن لا تميد بكم، وذلك كقوله يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَنْ تَضِلُّوا والمعنى: أن لا تضلوا. وذلك أنه جلّ ثناؤه أرسى الأرض بالجبال لئلا يميد خلقه الذي على ظهرها، بل وقد كانت مائدة قبل أن تُرْسَى بها.
كما حدثنا بشر ، قال: ثنا يزيد، قال: ثنا سعيد، عن قتادة، عن الحسن، عن قيس بن عباد: أن الله تبارك وتعالى لما خلق الأرض جعلت تمور ، قالت الملائكة. ما هذه بمقرّة على ظهرها أحدا ، فأصبحت صبحا وفيها رواسيها.
حدثني المثنى، قال: ثنا الحجاج بن المنهال ، قال: ثنا حماد، عن عطاء بن السائب، عن عبد الله بن حبيب، عن عليّ بن أبي طالب، قال: لما خلق الله الأرض قمصت، وقالت: أي ربّ أتجعل عليّ بني آدم يعملون عليّ الخطايا ويجعلون عليّ الخبث ، قال: فأرسى الله عليها من الجبال ما ترون وما لا ترون، فكان قرارها كاللحم يترجرج ، والميد: هو الاضطراب والتكفؤ، يقال: مادت السفينة تميد ميدا: إذا تكفأت بأهلها ومالت، ومنه الميد الذي يعتري راكب البحر، وهو الدوار.
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ বলেছেন, হে মানুষ, তোমাদের প্রতি তাঁর আরও একটি অনুগ্রহ হচ্ছে, তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন। ‘রাওয়াসি’ শব্দটি ‘রাসিয়া’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ পৃথিবীতে স্থিরভাবে প্রতিষ্ঠিত পাহাড়। আর ‘যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়’—এর অর্থ হচ্ছে, পৃথিবী যেন তোমাদের নিয়ে দুলতে না থাকে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা পথভ্রষ্ট না হও’—অর্থাৎ তোমরা যেন পথভ্রষ্ট না হও।
আল্লাহ পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীকে স্থির করেছেন, যাতে পৃথিবী তার পিঠে বসবাসকারী সৃষ্টিকে নিয়ে দুলতে না থাকে। বরং পাহাড় দিয়ে স্থির করার আগে পৃথিবী আন্দোলিত অবস্থায় ছিল।
বিশর আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়াজিদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সাঈদ কাতাদার সূত্রে, কাতাদা হাসানের সূত্রে, হাসান কায়েস ইবনে আব্বাদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে আল্লাহ যখন পৃথিবী সৃষ্টি করেন, তখন পৃথিবী আন্দোলিত হতে থাকে। ফেরেশতারা বললেন, এর পিঠের ওপর কেউ স্থিরভাবে অবস্থান করতে পারবে না। এরপর সকাল হলে দেখা গেল, পৃথিবীতে সুদৃঢ় পাহাড় সৃষ্টি করা হয়েছে।
মুসান্না আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, হাজ্জাজ ইবনে মিনহাল আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, হাম্মাদ আতা ইবনে সায়িবের সূত্রে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে হাবিবের সূত্রে, আলী ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণনা করেছেন। আলী বলেছেন, আল্লাহ যখন পৃথিবী সৃষ্টি করেন, তখন পৃথিবী লাফিয়ে ওঠে এবং বলে, হে আমার প্রতিপালক, আপনি কি আমার ওপর আদমসন্তানদের বসবাস করাবেন, যারা আমার ওপর পাপ করবে এবং অপবিত্র কাজ করবে? তখন আল্লাহ পৃথিবীতে এমন সব পাহাড় স্থাপন করেন, যেগুলোর কিছু তোমরা দেখতে পাও এবং কিছু দেখতে পাও না। এর ফলে পৃথিবী স্থির হয়, যদিও তার স্থিতিশীলতা ছিল কাঁপতে থাকা মাংসের মতো।
‘মাইদ’ শব্দের অর্থ আন্দোলিত হওয়া এবং একদিকে হেলে পড়া। যেমন বলা হয়, জাহাজ দুলছে, যখন জাহাজ তার যাত্রীদের নিয়ে একদিকে হেলে পড়ে। সমুদ্রযাত্রীর মাথা ঘোরার অবস্থাকেও এই শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়।
তাবারীর এই ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয়, পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীর স্থিতিশীলতা সম্পর্কে প্রাচীন ইসলামি ধারণাটি শুধু মাছের কাহিনির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। মাছের উল্লেখ ছাড়াও পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর তার আন্দোলন এবং পাহাড় স্থাপনের মাধ্যমে সেই আন্দোলন বন্ধ হওয়ার একটি পৃথক বর্ণনাধারা প্রচলিত ছিল। কায়েস ইবনে আব্বাদের সূত্রে সংরক্ষিত বক্তব্যে ফেরেশতারা পৃথিবীর অস্থিরতা দেখে মন্তব্য করেছেন, এখানে কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে না। আলীর নামে বর্ণনায় পৃথিবী নিজেই নড়াচড়া করে এবং মানুষের পাপের বিষয়ে অভিযোগ করে। তারপর পাহাড় স্থাপন করে তাকে স্থির করা হয়। এই বর্ণনাগুলোতে পৃথিবীর আন্দোলন, পাহাড় সৃষ্টি এবং বসবাসযোগ্য স্থিতিশীলতা অর্জনের একটি অভিন্ন ধারণা পাওয়া যায়, যদিও পৃথিবীর অস্থিরতার কারণ সম্পর্কে বিবরণগুলো এক নয়।
তিরমিজির হাদিস: পৃথিবী কাঁপতে থাকায় আল্লাহ পাহাড় সৃষ্টি করেন
জামে তিরমিজির ৩৩৬৯ নম্বর হাদিসে আনাস ইবনে মালিকের সূত্রে মুহাম্মদের একটি বক্তব্য সংকলিত হয়েছে, যেখানে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর তার নড়াচড়া এবং পাহাড় দিয়ে সেই নড়াচড়া বন্ধ করার ঘটনা সরাসরি বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি অনুসারে, আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টি করলে পৃথিবী আন্দোলিত হতে থাকে। তখন আল্লাহ পাহাড় সৃষ্টি করে পৃথিবীতে স্থাপন করেন এবং পৃথিবী স্থির হয়ে যায়। পাহাড়ের শক্তি দেখে ফেরেশতারা বিস্মিত হন। এরপর তাঁরা আল্লাহকে প্রশ্ন করেন, পাহাড়ের চেয়েও শক্তিশালী কোনো সৃষ্টি আছে কি না। এই প্রশ্নের উত্তরে লোহা, আগুন, পানি, বাতাস এবং গোপনে দানকারী মানুষের শক্তির তুলনামূলক বিবরণ দেওয়া হয়েছে। [40]
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، حَدَّثَنَا الْعَوَّامُ بْنُ حَوْشَبٍ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ أَبِي سُلَيْمَانَ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الأَرْضَ جَعَلَتْ تَمِيدُ فَخَلَقَ الْجِبَالَ فَعَادَ بِهَا عَلَيْهَا فَاسْتَقَرَّتْ فَعَجِبَتِ الْمَلاَئِكَةُ مِنْ شِدَّةِ الْجِبَالِ قَالُوا يَا رَبِّ هَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الْجِبَالِ قَالَ نَعَمِ الْحَدِيدُ . قَالُوا يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الْحَدِيدِ قَالَ نَعَمِ النَّارُ . فَقَالُوا يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ النَّارِ قَالَ نَعَمِ الْمَاءُ . قَالُوا يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الْمَاءِ قَالَ نَعَمْ الرِّيحُ قَالُوا يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الرِّيحِ قَالَ نَعَمِ ابْنُ آدَمَ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ بِيَمِينِهِ يُخْفِيهَا مِنْ شِمَالِهِ ” . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ مَرْفُوعًا إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ .
বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে বাশশার আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়াজিদ ইবনে হারুন আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আওয়াম ইবনে হাওশাব আমাদের বর্ণনা করেছেন, সুলাইমান ইবনে আবি সুলাইমানের সূত্রে, আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত। আনাস বলেছেন, নবী বলেছেন:
আল্লাহ যখন পৃথিবী সৃষ্টি করলেন, তখন পৃথিবী নড়াচড়া করতে লাগল। এরপর আল্লাহ পাহাড় সৃষ্টি করলেন এবং সেগুলো পৃথিবীর ওপর স্থাপন করলেন। ফলে পৃথিবী স্থির হয়ে গেল। পাহাড়গুলোর শক্তি দেখে ফেরেশতারা বিস্মিত হয়ে গেলেন। তাঁরা বললেন, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার সৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের চেয়েও শক্তিশালী কিছু আছে কি?
আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, লোহা।
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে প্রতিপালক, আপনার সৃষ্টির মধ্যে লোহার চেয়েও শক্তিশালী কিছু আছে কি?
আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, আগুন।
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, আগুনের চেয়েও শক্তিশালী কিছু আছে কি?
আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, পানি।
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, পানির চেয়েও শক্তিশালী কিছু আছে কি?
আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, বাতাস।
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, বাতাসের চেয়েও শক্তিশালী কিছু আছে কি?
আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, আদমসন্তান, যে নিজের ডান হাত দিয়ে এমনভাবে দান করে যে তার বাম হাতও তা জানতে পারে না।
তিরমিজি বলেছেন, এই হাদিসটি গরিব। আমরা এই বর্ণনাপথ ছাড়া অন্য কোনো পথে এটিকে নবীর বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হতে জানি না।
এই হাদিসের সঙ্গে তাফসীরে তাবারীতে সংরক্ষিত মাছের পিঠে পৃথিবী থাকার বর্ণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাবারীর মাছসংক্রান্ত কাহিনিতে পৃথিবীর আন্দোলনের কারণ হিসেবে মাছের নড়াচড়ার কথা বলা হয়েছে। তিরমিজির এই হাদিসে মাছের উল্লেখ নেই, কিন্তু পৃথিবীর আন্দোলন এবং পাহাড় দিয়ে পৃথিবীকে স্থির করার একই ঘটনাক্রম পাওয়া যায়। এখানে পাহাড় সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে অত্যন্ত সরাসরি উপস্থাপন করা হয়েছে: পৃথিবী অস্থির ছিল, পাহাড় সৃষ্টি করার পর স্থির হয়ে যায়। হাদিসটির শেষাংশে শক্তিশালী সৃষ্টিগুলোর তুলনা থাকলেও পৃথিবী ও পাহাড় সম্পর্কে প্রথম অংশটি একটি পৃথক ভৌত দাবি বহন করে।
তিরমিজি বর্ণনাটিকে গরিব বলেছেন এবং একটিমাত্র বর্ণনাপথের কথা উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী হাদিস মূল্যায়নকারীদের মধ্যেও এর শ্রেণিবিন্যাসে পার্থক্য রয়েছে। Sunnah.com-এ দারুসসালামের মূল্যায়নে হাদিসটি হাসান হিসেবে চিহ্নিত, আর আলবানীর মূল্যায়নে এটি দুর্বল। এই শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্য বর্ণনাটির ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু পাঠে পাহাড়ের ভূমিকা সম্পর্কে যে বক্তব্য রয়েছে, তা অস্পষ্ট নয়। পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর নড়াচড়া করছিল এবং পাহাড় স্থাপন করায় স্থির হয়েছিল—এটিই বর্ণনার সরাসরি বক্তব্য।
পাহাড় কি সত্যিই ভূমিকম্প প্রতিরোধ করে?
পৃথিবীকে বহনকারী মাছের নড়াচড়া এবং পাহাড় দিয়ে পৃথিবীর কম্পন বন্ধ করার প্রাচীন ইসলামি ব্যাখ্যাগুলোর সঙ্গে আধুনিক ভূবিজ্ঞানের মৌলিক বিরোধ রয়েছে। আধুনিক ভূবিজ্ঞানে ভূমিকম্পকে পৃথিবীর অভ্যন্তরের শিলাস্তরে সঞ্চিত চাপ ও শক্তির আকস্মিক মুক্তির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পৃথিবীর বাইরের কঠিন অংশ একাধিক টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো ধীরে ধীরে চলতে থাকে এবং তাদের সীমানায় কিংবা অভ্যন্তরের ভূতাত্ত্বিক চ্যুতিতে বিপুল চাপ সৃষ্টি হতে পারে। শিলাস্তরের কোনো অংশে জমে থাকা চাপ ঘর্ষণজনিত বাধা অতিক্রম করলে হঠাৎ সরণ ঘটে এবং সঞ্চিত শক্তি ভূকম্পন তরঙ্গের আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই তরঙ্গ পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছালে ভূকম্পন অনুভূত হয়। [41]
An earthquake is caused by a sudden slip on a fault. The tectonic plates are always slowly moving, but they get stuck at their edges due to friction.
বাংলা অনুবাদ: ভূতাত্ত্বিক চ্যুতিতে আকস্মিক সরণের কারণে ভূমিকম্প ঘটে। টেকটোনিক প্লেটগুলো সবসময় ধীরে ধীরে চলতে থাকে, কিন্তু ঘর্ষণের কারণে তাদের সীমানার অংশগুলো আটকে যেতে পারে।
পাহাড়ের গঠনও টেকটোনিক প্লেটের গতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষত বৃহৎ পর্বতমালাগুলোর অনেকগুলো মহাদেশীয় প্লেটের সংঘর্ষ, ভূত্বকের সংকোচন, শিলাস্তরের ভাঁজ এবং ভূত্বকের উত্থানের ফলে গঠিত হয়েছে। ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি তার সবচেয়ে সুপরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি বছর আগে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষের ফলে ভূত্বকের বিপুল অংশ উত্থিত হয়ে হিমালয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই সংঘর্ষ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং ওই অঞ্চলে বিপুল টেকটোনিক চাপ ও ভূমিকম্প সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ পর্বতমালা এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ভূমিকম্পের প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। [42]
Among the most dramatic and visible creations of plate-tectonic forces are the lofty Himalayas, which stretch 2,900 km along the border between India and Tibet.
বাংলা অনুবাদ: টেকটোনিক প্লেটের শক্তির ফলে সৃষ্ট সবচেয়ে নাটকীয় ও দৃশ্যমান ভূতাত্ত্বিক কাঠামোগুলোর মধ্যে রয়েছে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা, যা ভারত ও তিব্বতের সীমান্ত বরাবর প্রায় ২৯০০ কিলোমিটার বিস্তৃত।
হিমালয় অঞ্চলের ভূমিকম্প নিয়ে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার গবেষণায় ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষকে ভূমিকম্পের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্লেট দুটি বছরে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার হারে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতীয় প্লেটের ইউরেশীয় প্লেটের নিচে প্রবেশের প্রবণতা, ভূত্বকের সংকোচন এবং সংশ্লিষ্ট চ্যুতিগুলোর গতিশীলতা ওই অঞ্চলে নিয়মিত ভূমিকম্প সৃষ্টি করছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি এই হিমালয় অঞ্চল। [43]
Seismicity in the Himalaya region predominantly results from the collision of the India and Eurasia continental plates, which are converging at a relative rate of 40–50 mm/yr.
বাংলা অনুবাদ: হিমালয় অঞ্চলে ভূমিকম্প প্রধানত ভারতীয় ও ইউরেশীয় মহাদেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলে ঘটে। প্লেট দুটি বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার আপেক্ষিক গতিতে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এই তথ্যগুলো পাহাড় দিয়ে পৃথিবীর ভূকম্পন বন্ধ হওয়ার প্রাচীন ধারণার বিপরীত একটি বাস্তবতা প্রকাশ করে। পাহাড় পৃথিবীর ওপর এমন কোনো ভারী বস্তু নয়, যা স্থাপন করে সম্পূর্ণ গ্রহের নড়াচড়া থামিয়ে দেওয়া যায়। পর্বতমালা নিজেই ভূত্বকের অংশ এবং অনেক পর্বতমালা দীর্ঘস্থায়ী টেকটোনিক চাপ ও গতিশীলতার ফল। পাহাড়ি অঞ্চলগুলো ভূমিকম্প থেকে মুক্ত নয়; বরং সক্রিয় প্লেট-সীমানার সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পর্বতমালা অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। হিমালয়, হিন্দুকুশ, পামির এবং অন্যান্য সক্রিয় পর্বতাঞ্চলে সংঘটিত ভূমিকম্প এই বাস্তবতার প্রত্যক্ষ উদাহরণ।
এখানে পাহাড়ের দৃঢ়তা এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধের ক্ষমতা এক বিষয় নয়। পাহাড় শিলা দ্বারা গঠিত দৃঢ় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হতে পারে, কিন্তু তার উপস্থিতি টেকটোনিক প্লেটের গতিশীলতা কিংবা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতিতে সঞ্চিত শক্তির আকস্মিক মুক্তি বন্ধ করে না। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস, শিলাস্তরের ভাঙন এবং ভূমিকম্পের ফলে ব্যাপক ভূমিরূপ পরিবর্তনও ঘটতে পারে। ফলে পাহাড়কে পৃথিবীর কম্পন বন্ধ করার জন্য স্থাপিত এক ধরনের স্থিরকারী ভার হিসেবে কল্পনা করা বাস্তব ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার যথাযথ ব্যাখ্যা নয়।
মাছের নড়াচড়া এবং ভূমিকম্প: প্রাচীন বিশ্বতত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত
তাফসীরে তাবারী, ইবনে কাসীর, বাগাভী ও কুরতুবীর সংকলিত বিবরণগুলো পৃথিবীর সৃষ্টি ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে প্রাচীন ইসলামি চিন্তায় প্রচলিত একটি বিশেষ কাঠামো প্রকাশ করে। এই কাঠামোয় পৃথিবী একটি বিশাল মাছের পিঠে অবস্থিত। মাছের নড়াচড়ায় পৃথিবী কেঁপে ওঠে এবং পাহাড় স্থাপনের ফলে সেই কম্পন বন্ধ হয়। কোনো বর্ণনায় মাছের নিচে পানি, পাথর ও ফেরেশতা রয়েছে। অন্য বর্ণনায় মাছের ওপরে পাথর, ষাঁড় ও পৃথিবী বহনকারী ফেরেশতা রয়েছে। এমনকি মাছটি ইবলিসের প্ররোচনায় পৃথিবীকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার কথা চিন্তা করেছিল বলেও বর্ণনা রয়েছে। ফলে পৃথিবীর স্থিতিশীলতাকে একটি বিশাল প্রাণীর অবস্থান, আচরণ ও গতিবিধির ওপর নির্ভরশীল হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
এই বর্ণনাগুলোর সঙ্গে কোরআনের পাহাড়সংক্রান্ত আয়াতগুলোর সম্পর্কও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের সুরা আন-নাহল ও সুরা আল-আম্বিয়ায় পাহাড় স্থাপনের উদ্দেশ্য হিসেবে পৃথিবীর আন্দোলন প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। তাবারীর সংকলিত ব্যাখ্যায় সেই বক্তব্যকে মাছের পিঠে পৃথিবী স্থাপন এবং মাছের নড়াচড়ায় পৃথিবী কেঁপে ওঠার কাহিনির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে তিরমিজির হাদিসে মাছের কথা ছাড়াই পৃথিবীর আন্দোলন এবং পাহাড়ের সাহায্যে পৃথিবী স্থির হওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এভাবে কোরআন, হাদিস ও প্রাচীন তাফসিরে পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীর স্থিতিশীলতা সম্পর্কে পরস্পর সম্পর্কিত কয়েকটি বক্তব্য পাওয়া যায়।
বাস্তবে পৃথিবী কোনো মাছের পিঠে অবস্থিত নয়। পৃথিবীর নিচে সমুদ্রের ওপর ভাসমান এমন কোনো বিশাল প্রাণী নেই, যার নড়াচড়ায় গ্রহটি কেঁপে ওঠে। পৃথিবীর ভূমিকম্পের কারণ ভূতাত্ত্বিক চ্যুতিতে আকস্মিক সরণ, টেকটোনিক প্লেটের গতিশীলতা এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণযোগ্য ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। পৃথিবীর পর্বতমালাও কোনো মহাজাগতিক প্রাণীর নড়াচড়া প্রতিরোধের জন্য স্থাপিত বাহ্যিক ভার নয়; সেগুলো পৃথিবীর নিজস্ব ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও গতিশীলতার অংশ।
প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে মাছের পিঠে পৃথিবীর ধারণা এবং পাহাড় দিয়ে পৃথিবীর কম্পন বন্ধ হওয়ার কাহিনির গুরুত্ব এখানেই যে এগুলো ধর্মীয় ব্যাখ্যার ইতিহাসে প্রকৃতির ঘটনা সম্পর্কে প্রচলিত ভৌত ধারণার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। তাবারীর বর্ণনায় মাছের নড়াচড়া ও পৃথিবীর কম্পনের কার্যকারণ সম্পর্ক স্পষ্ট। ইবনে কাসীর সেই বিবরণ সংকলন করেছেন। বাগাভী এর সঙ্গে ফেরেশতা, ষাঁড়, বিশাল পাথর এবং মাছের বিস্তৃত মহাজাগতিক কাঠামো যুক্ত করেছেন। তিরমিজির হাদিসে পৃথিবীর আন্দোলন বন্ধ করতে পাহাড় সৃষ্টির পৃথক বর্ণনা পাওয়া যায়। অথচ ভূমিকম্পের প্রকৃত কারণ এবং পাহাড়ের গঠন সম্পর্কে আধুনিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এই প্রাচীন ধারণাগুলোর ভৌত ভিত্তিকে সমর্থন করে না। পৃথিবীর কম্পন কোনো মাছের নড়াচড়ার ফল নয় এবং পাহাড়ও পৃথিবীকে ভূমিকম্পমুক্ত রাখার জন্য স্থাপিত কোনো মহাজাগতিক ভারসাম্যরক্ষাকারী বস্তু নয়।
উপসংহার
পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে প্রাচীন ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে যে বিবরণগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো আধুনিক ভূবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর গঠনের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআনে সাত আসমানের অনুরূপ পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে সাত পৃথিবীর উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন তাফসিরকারীরা এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে একটির নিচে আরেকটি সাত পৃথিবী, সেগুলোর মধ্যবর্তী পাঁচশ বছরের পথের দূরত্ব, প্রত্যেক পৃথিবীর নিজস্ব পুরুত্ব এবং বিভিন্ন পৃথিবীতে পৃথক সৃষ্টির অস্তিত্বের বিবরণ দিয়েছেন। পৃথিবীর নিচে পানি, পাথর, ফেরেশতা, বিশাল মাছ, ষাঁড়, অন্ধকার এবং জাহান্নামের অবস্থান সম্পর্কেও বিস্তারিত বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। এগুলো প্রাচীন ইসলামি বিশ্বতত্ত্বে পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল।
এই বর্ণনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে বিশাল মাছের পিঠে পৃথিবীর অবস্থান এবং মাছটির নড়াচড়ার ফলে পৃথিবী কেঁপে ওঠার কাহিনি। তাবারী, ইবনে কাসীর ও বাগাভীর মতো প্রভাবশালী তাফসিরকারীদের গ্রন্থে ইবনে আব্বাসসহ বিভিন্ন প্রাচীন ব্যক্তির নামে এই বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে মাছের নড়াচড়ায় পৃথিবীর কম্পন এবং পাহাড় স্থাপনের মাধ্যমে সেই কম্পন বন্ধ হওয়ার একটি সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক পাওয়া যায়। কোরআনেও পাহাড় স্থাপনের উদ্দেশ্য হিসেবে পৃথিবীর আন্দোলন প্রতিরোধের কথা রয়েছে। অথচ বাস্তবে পাহাড় টেকটোনিক গতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত ভূতাত্ত্বিক কাঠামো এবং অনেক বৃহৎ পর্বতমালাই সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথিবীর ভূমিকম্প কোনো মাছের নড়াচড়ার ফল নয় এবং পাহাড়ও ভূমিকম্প বন্ধ করার ব্যবস্থা নয়।
প্রাচীন বর্ণনাগুলোর মধ্যেও পৃথিবীর নিচের কাঠামো সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী বিবরণ পাওয়া যায়। কোথাও পাথরের নিচে ফেরেশতা এবং ফেরেশতার নিচে মাছ, কোথাও মাছের নিচে সমুদ্র, সমুদ্রের নিচে পাথর এবং পাথরের নিচে ষাঁড়। পৃথিবীগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্বও সব বর্ণনায় অভিন্ন নয়। এই পার্থক্যগুলো প্রমাণ করে যে প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাসাহিত্যে পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে একটি নির্ভুল ও সুসংগত কাঠামো সংরক্ষিত হয়নি। এসব বক্তব্যের কিছু সাহাবি ও তাবেঈদের নামে প্রচলিত, কিছু মুহাম্মদের হাদিস হিসেবে সংকলিত এবং কিছু পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের মাধ্যমে সম্প্রসারিত। কিন্তু কোনো বিবরণ প্রাচীন কিংবা ধর্মীয়ভাবে সম্মানিত উৎসে সংরক্ষিত হলেই তার ভৌত দাবিগুলো সত্য হয়ে যায় না।
পৃথিবীর প্রকৃত অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এসেছে ভূকম্পন তরঙ্গ, মাধ্যাকর্ষণ, শিলার বৈশিষ্ট্য, তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রাকৃতিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান থেকে। এই অনুসন্ধানে পৃথিবীর ভূত্বক, ম্যান্টল, তরল বহিঃকেন্দ্র এবং কঠিন অন্তঃকেন্দ্রের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে একটির নিচে আরেকটি বসবাসযোগ্য সাত পৃথিবী, পৃথিবী বহনকারী মহাজাগতিক মাছ, চল্লিশ হাজার শিংয়ের ষাঁড় কিংবা ফেরেশতার হাতে স্থাপিত পাথরের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত কল্পিত মহাজাগতিক কাঠামোকে বাস্তব পৃথিবীর গঠন হিসেবে গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
সর্বজ্ঞ স্রষ্টার কাছ থেকে প্রাপ্ত নির্ভুল জ্ঞানের দাবি এবং বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে প্রচলিত এসব ভুল ধারণার মধ্যে একটি মৌলিক জ্ঞানগত সমস্যা রয়েছে। প্রাচীন মানুষের অজ্ঞতা ব্যাখ্যাযোগ্য; কিন্তু সেই অজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মহাজাগতিক ধারণাকে ঐশী সত্যের মর্যাদা দেওয়া যৌক্তিক নয়। তাবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী ও বাগাভীর সংকলিত বিবরণগুলো প্রাচীন ইসলামি বিশ্বতত্ত্বের ইতিহাস বুঝতে মূল্যবান, পৃথিবীর প্রকৃত গঠন নির্ধারণে নয়। পৃথিবীর নিচে কী রয়েছে, তার উত্তর ধর্মীয় কর্তৃত্ব, প্রাচীন কল্পকাহিনি কিংবা অলৌকিক প্রাণীর বর্ণনায় নয়; পাওয়া গেছে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পরীক্ষাযোগ্য প্রমাণে।
তথ্যসূত্রঃ
- আল-কোরআন, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২ ↩︎
- সহিহ বুখারী, হাদিস ৩১৯৫, সৃষ্টির সূচনা অধ্যায় ↩︎
- সহিহ বুখারী, হাদিস ৩১৯৬, সৃষ্টির সূচনা অধ্যায় ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬১০ক, অন্যায়ভাবে জমি দখল নিষিদ্ধকরণ অধ্যায় ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২ ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২, ইবনে আব্বাসের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২, কাতাদার বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২, ইবনে আব্বাসের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২ ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২, মাওয়ার্দীর আলোচনা ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২, সাত পৃথিবীর বিকল্প অবস্থানসংক্রান্ত বর্ণনা ↩︎
- জামে তিরমিজি, হাদিস ৩২৯৮, কিতাবুত তাফসির, সুরা আল-হাদিদের ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আত-তালাক ৬৫:১২, কাতাদার সূত্রে বর্ণিত মহাজাগতিক বিবরণ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা আল-হাদিদ ৫৭:৩, মুসনাদে আহমদের বিকল্প বর্ণনার উল্লেখ ↩︎
- NASA Science — Facts About Earth, Structure ↩︎
- United States Geological Survey — P-wave and S-wave Paths Through the Earth ↩︎
- আল-কোরআন, সুরা ত্বহা ২০:৬ ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা ত্বহা ২০:৬ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা ত্বহা ২০:৬, কাবের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪৫ ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, সুরা ত্বহা ২০:৬, ইবনে আব্বাসের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে বাগাভী, সুরা ত্বহা ২০:৬ ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, সুরা ত্বহা ২০:৬, ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা ত্বহা ২০:৬, ইবনে আবি হাতিমের সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে আমরের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা ত্বহা ২০:৬, মুসনাদে আবু ইয়ালা থেকে জাবির ইবনে আবদুল্লাহর বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা ত্বহা ২০:৬, জাবিরের বর্ণনা সম্পর্কে ইবনে কাসীরের মূল্যায়ন ↩︎
- আল-কোরআন, সুরা আল-কলম ৬৮:১ ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আল-কলম ৬৮:১ ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আল-কলম ৬৮:১, ইবনে আব্বাসের সূত্রে সুফিয়ান সাওরীর বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আল-বাকারা ২:২৯, বর্ণনা ৫৯১ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা আল-কলম ৬৮:১ ↩︎
- তাফসীরে বাগাভী, সুরা আল-কলম ৬৮:১ ↩︎
- তাফসীরে বাগাভী, সুরা আল-কলম ৬৮:১, কাব আল-আহবারের বর্ণনা ↩︎
- তাফসীরে কুরতুবী, সুরা আল-কলম ৬৮:১ ↩︎
- আল-কোরআন, সুরা আন-নাহল ১৬:১৫ ↩︎
- আল-কোরআন, সুরা আল-আম্বিয়া ২১:৩১ ↩︎
- তাফসীরে তাবারী, সুরা আন-নাহল ১৬:১৫ ↩︎
- জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৩৬৯, কিতাবুত তাফসির ↩︎
- United States Geological Survey — What is an earthquake and what causes them to happen? ↩︎
- United States Geological Survey — The Himalayas: Two Continents Collide ↩︎
- USGS, Seismicity of the Earth 1900–2010: Himalaya and Vicinity, Open-File Report 2010–1083-J ↩︎


ভাই এইটা তো জাল হাদিসে আছে। তাছাড়া তাফসীর ইবনে কাসীর তো ইসলামিক গ্রন্থ না
ও আচ্ছা, তাফসীর ইবনে কাসীর তাহলে নাস্তিকদের লিখিত গ্রন্থ! বিষয়টি জানাবার জন্য ধন্যবাদ।