ভূমিকা
মানুষের ধর্মীয় আদি-কল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মহাজাগতিক স্থানিক বিন্যাস বা ‘Cosmic Mapping’। প্রায় প্রতিটি প্রাচীন ধর্মতত্ত্বেই নৈতিকতাকে একটি ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে—যেখানে পুণ্য বা স্বর্গ থাকে উচ্চে (আকাশে), আর পাপ বা নরক থাকে নিম্নে (পৃথিবীর গভীরে)। ইসলামী শাস্ত্রীয় বর্ণনা ও হাদিস-ভিত্তিক ব্যাখ্যাগুলোতে এই ‘নিচে’ থাকার ধারণাটি কেবল রূপক হিসেবে থাকেনি, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ভূ-তাত্ত্বিক দাবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে পাপিষ্ঠদের আমলনামা সংরক্ষণের স্থান ‘সিজ্জিন’-কে “সপ্তম জমিনেরও নিচে” বা “জমিনের সর্বনিম্নে” অবস্থিত বলে অভিহিত করা হয়েছে; আবার কিছু তাফসিরি বর্ণনায় এই সিজ্জিনকেই জাহান্নামের একটি গর্ত বা জাহান্নামের সঙ্গে যুক্ত নিম্নস্থানেরূপে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই অবস্থানগত দাবিটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের জন্ম দেয়। একদিকে রয়েছে মধ্যযুগীয় বা প্রাচীন স্তরীভূত বিশ্ব-ধারণা (Layered Worldview), যা পৃথিবীকে একটি অসীম গভীর বা বহুতল বিশিষ্ট মঞ্চ হিসেবে কল্পনা করত। অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূ-তত্ত্ব, যা পৃথিবীকে মহাকাশে ভাসমান একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের গোলক হিসেবে প্রমাণ করেছে। যখন জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা বা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় জাহান্নামকে আক্ষরিক অর্থেই “মাটির নিচে” স্থাপন করা হয়, তখন তা কেবল বিশ্বাসের বিষয় থাকে না—তা বিজ্ঞানের পরীক্ষিত বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব, কেন এই “পৃথিবীর নিচে জাহান্নাম” ধারণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে একটি বড় ধরণের ভৌগোলিক ও যৌক্তিক অসামঞ্জস্যতা এবং কীভাবে প্রাচীন বিশ্ব-চেতনা এই ধরণের স্থানিক উপকথা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।
কেন মানুষ উপকথা তৈরি করে?
সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জানা ছিল, মাটির অভ্যন্তরের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি। বিশেষভাবে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এবং লাভা সম্পর্কে প্রাচীনকালের মানুষের ধারণা ছিল। সেখান থেকেই আসলে প্রাচীন ধর্মগুলোতে পাতাললোকের উপকথাগুলো প্রচলিত হয়, যা নাকি অত্যন্ত উত্তপ্ত। মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো অজানা বিষয়ের একটি কারণ খুঁজে বের করা, আর তা কোনভাবেই বোঝা সম্ভব না হলে কল্পনা দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা। যখন প্রাচীনকালে মানুষের কাছে বিজ্ঞান বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না, তখন তারা প্রাকৃতিক বা জৈবিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য মানুষের আবেগ (রাগ, অভিশাপ, বিশ্বাসঘাতকতা) বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ব্যবহার করত। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Anthropomorphism’ বা প্রকৃতিকে মানুষের রূপ দান করা।
মানুষের মস্তিষ্ক সবসময় একটি প্যাটার্ন খোঁজে। যখন তারা দেখত হঠাৎ মেঘ ডাকছে বা সূর্য অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা এর পেছনে কোনো ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘শাস্তি’ খুঁজত। এই ধরণের উপকথাগুলো আসলে মানুষের আদিম কৌতূহল এবং ভয়ের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। নিচে বিভিন্ন সংস্কৃতির কিছু চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হলো:
সাত জমিনের নিচে ‘সিজ্জিন’ ধারণা
হাদিসে কুদসি হিসেবে প্রচলিত দীর্ঘ বর্ণনায়—বিশেষত বারা ইবনু আযেব (রা.)-এর সূত্রে—মৃত্যুর পর পাপিষ্ঠ/কাফের ব্যক্তির রূহকে আসমানে তোলা হলে তার জন্য আসমানের দরজা খোলা হয় না; এরপর নির্দেশ আসে: “তার আমলনামা জমিনের সর্বনিম্নে সিজ্জিনে লিখে রাখো।” এই বাক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে “সিজ্জিন” শুধু নৈতিক প্রতীক নয়—একটি ‘লোকেশন’ হিসেবে কাজ করছে, এবং সেটিও “জমিনের সর্বনিম্ন” স্তর হিসেবে উপস্থাপিত।
বহু আলেম ও ব্যাখ্যাকার (সালাফি ধারার বহু আলোচনায়ও) ‘ইল্লিয়্যিন বনাম সিজ্জিন’কে এক ধরনের উল্টো-সমান্তরাল মানচিত্রে সাজান: ইল্লিয়্যিন যদি সপ্তম আসমানের ‘উপরে’, তবে সিজ্জিন হবে সপ্তম জমিনের ‘নিচে’। এই তুলনামূলক কাঠামো থেকে প্রাপ্ত ইঙ্গিত হলো—জাহান্নাম/সিজ্জিনকে কোনো দূর গ্রহ বা ভিন্ন মহাবিশ্বে না রেখে, পৃথিবীকেন্দ্রিক “নিচে-পাথাল” ধারণার মধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখানে শাস্তি-লোকের ধারণা আধুনিক ‘কসমিক স্কেল’-এ নয়, বরং প্রাচীন ‘স্তরভিত্তিক পৃথিবী-ভূগোল’-এ বাঁধা।
হাদিসে কুদসির বর্ণনা
উল্লেখিত দীর্ঘ হাদিসটি সাধারণত “রূহ বের হওয়া, কবরের প্রশ্ন, এবং মুমিন-কাফেরের পরিণতি”—এই কাঠামোয় পড়ানো হয়। তবে এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো: বর্ণনাটি শুধু নৈতিক শিক্ষা দেয় না; একই সঙ্গে একটি কসমোলজিক্যাল ‘ডিরেকশন’ স্থির করে দেয়—মুমিনের দফতর ‘উপরে’ (ইল্লিয়্যিন), আর পাপিষ্ঠের দফতর ‘নিচে’ (সিজ্জিন)। এই উপর-নিচ বাইনারি প্রাচীন বিশ্বচিন্তায় খুবই পরিচিত: “উচ্চে পবিত্র/আলো”, “নিচে অন্ধকার/শাস্তি”—এটি নৈতিকতার ভাষা হলেও একইসাথে স্থান-ধারণার ভাষাও।
এই বর্ণনার ভেতরে “আসমানের দরজা খোলা/না খোলা”, “উর্ধ্বারোহণ”, “নিক্ষেপ”—এসব ক্রিয়া-শব্দও একই দিক-ধারণাকে পুনর্ব্যক্ত করে। ফলে, “সিজ্জিনে লিখে রাখো”—এখানে সিজ্জিন কেবল ‘রেকর্ডের নাম’ নয়; বরং ‘রেকর্ড রাখার নির্দিষ্ট জায়গা’ও বোঝায়—যা “জমিনের সর্বনিম্নে” অবস্থিত বলে দাবি করা হচ্ছে।
সহীহ হাদিসে কুদসি
১/ বিবিধ হাদিসসমূহ
পরিচ্ছেদঃ মুমূর্ষু হালত, রুহ বের হওয়া ও জীবন সায়ান্নে মুসলিম-কাফিরের অবস্থার বর্ণনাসহ মহান হাদিস
৬৬. বারা ইবনু আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জনৈক আনসারির জানাজায় বের হলাম, আমরা তার কবরে পৌঁছলাম, তখনো কবর খোঁড়া হয়নি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবসলেন আমরা তার চারপাশে বসলাম, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে, তার হাতে একটি লাকড়ি ছিল তিনি মাটি খুড়তে ছিলেন, অতঃপর মাথা উঠিয়ে বললেন: “তোমরা আল্লাহর নিকট কবরের আযাব থেকে পানাহ চাও, দুইবার অথবা তিনবার (বললেন)”। অতঃপর বললেন: “নিশ্চয় মুমিন বান্দা যখন দুনিয়া প্রস্থান ও আখেরাতে পা রাখার সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয় তার নিকট আসমান থেকে সাদা চেহারার ফেরেশতাগণ অবতরণ করেন, যেন তাদের চেহারা সূর্য। তাদের সাথে জান্নাতের কাফন ও জান্নাতের সুগন্ধি থাকে, অবশেষে তারা তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মালাকুল মউত আলাইহিস সালাম এসে তার মাথার নিকট বসেন, তিনি বলেন: হে পবিত্র রুহ তুমি আল্লাহর মাগফেরাত ও সন্তুষ্টির প্রতি বের হও”। তিনি বললেন: “ফলে রুহ বের হয় যেমন মটকা/কলসি থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। তিনি তা গ্রহণ করেন, যখন গ্রহণ করেন চোখের পলক পরিমাণ তিনি নিজ হাতে না রেখে তৎক্ষণাৎ তা সঙ্গে নিয়ে আসা কাফন ও সুগন্ধির মধ্যে রাখেন, তার থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘ্রাণ বের হয় যা দুনিয়াতে পাওয়া যায়”। তিনি বললেন: “অতঃপর তাকে নিয়ে তারা ওপরে ওঠে, তারা যখনই অতিক্রম করে তাকে সহ ফেরেশতাদের কোন দলের কাছ দিয়ে তখনই তারা বলে, এ পবিত্র রুহ কে? তারা বলে: অমুকের সন্তান অমুক, সবচেয়ে সুন্দর নামে ডাকে যে নামে দুনিয়াতে তাকে ডাকা হত, তাকে নিয়ে তারা দুনিয়ার আসমানে পৌঁছে, তার জন্য তারা আসমানের দরজা খোলার অনুরোধ করেন, তাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হয়, তাকে প্রত্যেক আসমানের নিকটবর্তীরা পরবর্তী আসমানে অভ্যর্থনা জানিয়ে পৌঁছে দেয়, এভাবে তাকে সপ্তম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়, অতঃপর আল্লাহ বলেন: আমার বান্দার দফতর ইল্লিয়্যিনে লিখ এবং তাকে জমিনে ফিরিয়ে দাও, কারণ আমি তা (মাটি) থেকে তাদেরকে সৃষ্টি করেছি, সেখানে তাদেরকে ফেরৎ দেব এবং সেখান থেকেই তাদেরকে পুনরায় উঠাব”। তিনি বলেন: “অতঃপর তার রুহ তার শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হয়, এরপর তার নিকট দু’জন ফেরেশতা আসবে, তারা তাকে বসাবে অতঃপর বলবে: তোমার রব কে? সে বলবে: আল্লাহ। অতঃপর তারা বলবে: তোমার দ্বীন কি? সে বলবে: আমার দ্বীন ইসলাম। অতঃপর বলবে: এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলবে: তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতঃপর তারা বলবে: কিভাবে জানলে? সে বলবে: আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, তাতে ঈমান এনেছি ও তা সত্য জ্ঞান করেছি। অতঃপর এক ঘোষণাকারী আসমানে ঘোষণা দিবে: আমার বান্দা সত্য বলেছে, অতএব তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও, তাকে জান্নাতের পোশাক পরিধান করাও এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। তিনি বলেন: ফলে তার কাছে জান্নাতের সুঘ্রাণ ও সুগন্ধি আসবে, তার জন্য তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত তার কবর প্রশস্ত করে দেয়া হবে। তিনি বলেন: তার নিকট সুদর্শন চেহারা, সুন্দর পোশাক ও সুঘ্রাণসহ এক ব্যক্তি আসবে, অতঃপর বলবে: সুসংবাদ গ্রহণ কর যা তোমাকে সন্তুষ্ট করবে তার, এটা তোমার সেদিন যার ওয়াদা করা হত। সে তাকে বলবে: তুমি কে, তোমার এমন চেহারা যে শুধু কল্যাণই নিয়ে আসে? সে বলবে: আমি তোমার নেক আমল। সে বলবে: হে আমার রব, কিয়ামত কায়েম করুন, যেন আমি আমার পরিবার ও সম্পদের কাছে ফিরে যেতে পারি”। তিনি বলেন: “আর কাফের বান্দা যখন দুনিয়া থেকে প্রস্থান ও আখেরাতে যাত্রার সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়, তার নিকট আসমান থেকে কালো চেহারার ফেরেশতারা অবতরণ করে, তাদের সাথে থাকে ’মুসুহ’ (মোটা-পুরু কাপড়), অতঃপর তারা তার নিকট বসে তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত, অতঃপর মালাকুল মউত আসেন ও তার মাথার কাছে বসেন। অতঃপর বলেন: হে খবিস নফস, আল্লাহর গোস্বা ও গজবের জন্য বের হও। তিনি বলেন: ফলে সে তার শরীরে ছড়িয়ে যায়, অতঃপর সে তাকে টেনে বের করে যেমন ভেজা উল থেকে (লোহার) সিক বের করা হয়[1], অতঃপর সে তা গ্রহণ করে, আর যখন সে তা গ্রহণ করে চোখের পলকের মুহূর্ত হাতে না রেখে ফেরেশতারা তা ঐ ’মোটা-পুরু কাপড়ে রাখে, তার থেকে মৃত দেহের যত কঠিন দুর্গন্ধ দুনিয়াতে হতে পারে সে রকমের দুর্গন্ধ বের হয়। অতঃপর তাকে নিয়ে তারা ওপরে উঠে, তাকেসহ তারা যখনই ফেরেশতাদের কোন দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখনই তারা বলে, এ খবিস রুহ কে? তারা বলে: অমুকের সন্তান অমুক, সবচেয়ে নিকৃষ্ট নাম ধরে যার মাধ্যমে তাকে দুনিয়াতে ডাকা হত, এভাবে তাকে নিয়ে দুনিয়ার আসমানে যাওয়া হয়, তার জন্য দরজা খুলতে বলা হয়, কিন্তু তার জন্য দরজা খোলা হবে না”। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামতিলাওয়াত করেন:
﴿لَا تُفَتَّحُ لَهُمۡ أَبۡوَٰبُ ٱلسَّمَآءِ وَلَا يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ ٱلۡجَمَلُ فِي سَمِّ ٱلۡخِيَاطِۚ ٤٠﴾ [الاعراف: ٤٠]
“তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে”।[2] অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন: তার আমলনামা জমিনে সর্বনিম্নে সিজ্জিনে লিখ, অতঃপর তার রুহ সজোরে নিক্ষেপ করা হয়। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
﴿وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ ٱلسَّمَآءِ فَتَخۡطَفُهُ ٱلطَّيۡرُ أَوۡ تَهۡوِي بِهِ ٱلرِّيحُ فِي مَكَانٖ سَحِيقٖ ٣١﴾ [الحج : ٣١]
“আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিম্বা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল”।[3] তার রুহ তার শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর তার নিকট দু’জন ফেরেশতা আসে ও তাকে বসায়, তারা তাকে জিজ্ঞাসা করে: তোমার রব কে? সে বলে: হা হা আমি জানি না। অতঃপর তারা বলে: তোমার দ্বীন কি? সে বলে: হা হা আমি জানি না। অতঃপর তারা বলে: এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলে: হা হা আমি জানি না, অতঃপর আসমান থেকে এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে যে, সে মিথ্যা বলেছে, তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও, তার দরজা জাহান্নামের দিকে খুলে দাও, ফলে তার নিকট তার তাপ ও বিষ আসবে এবং তার ওপর তার কবর সংকীর্ণ করা হবে যে, তার পাঁজরের হাড় একটির মধ্যে অপরটি ঢুকে যাবে। অতঃপর তার নিকট বীভৎস চেহারা, খারাপ পোশাক ও দুর্গন্ধসহ এক ব্যক্তি আসবে, সে তাকে বলবে: তুমি সুসংবাদ গ্রহণ কর, যা তোমাকে দুঃখ দিবে, এ হচ্ছে তোমার সে দিন যার ওয়াদা করা হত। সে বলবে: তুমি কে, তোমার এমন চেহারা যে কেবল অনিষ্টই নিয়ে আসে? সে বলবে: আমি তোমার খবিস আমল। সে বলবে: হে রব কিয়ামত কায়েম কর না”। [আহমদ ও আবূ দাউদ] হাদিসটি সহিহ।
[1] কারণ ভেজা উল সাধারণত: লোহার সাথে লেগে থাকে। তখন তা ছাড়িয়ে নেয়া কষ্টকর হয়। [সম্পাদক]
[2] সূরা আরাফ: (৪০)
[3] সূরা হজ: (৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ইবনে কাসীরের তাফসীর
সিজ্জিনকে কেবল “পাপীদের আমলনামার একটি প্রতীকী নাম” হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ধ্রুপদী তাফসীরের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় সিজ্জিনকে সরাসরি স্থানগত কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে। তিনি একাধিক পুরনো মত উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে সিজ্জিনকে সপ্তম জমিনের নিচে অবস্থিত স্থান, সাত তবক জমিনের নিচের একটি সবুজ পাথর, এমনকি জাহান্নামের একটি গর্ত হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইবনে কাসীরের নিজের নির্বাচিত ব্যাখ্যাতেও “নিচের দিকে” যাওয়ার ধারণাটি বাদ যায়নি; বরং তাঁর মতে যত নিচে যাওয়া হয়, সৃষ্টিজগত তত সংকীর্ণ হয় এবং এই স্তরবিন্যাসের সর্বনিম্ন ও সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশই কাফির, মুশরিক ও পাপাচারীদের ঠিকানা।
অর্থাৎ এখানে “নিচে” কথাটি নিছক নৈতিক অবনতি বোঝানোর অলংকার নয়। আসমান উপরের দিকে ক্রমশ প্রশস্ত, জমিন নিচের দিকে ক্রমশ সংকীর্ণ, এবং সর্বনিম্ন সপ্তম জমিনের গভীরতম অংশে পাপীদের স্থান—এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্তরভিত্তিক কসমোলজিক্যাল মানচিত্র। আধুনিক গোলাকার পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এই ধারণার সংঘাত ঠিক এখানেই: ধ্রুপদী তাফসীর যে “সপ্তম জমিনের নিচে” বাস্তব নিম্নস্তর কল্পনা করছে, আধুনিক ভূ-তত্ত্ব সেখানে ভূত্বকের নিচে ম্যান্টেল, তরল বহিঃকোর ও কঠিন অন্তঃকোরের ভৌত কাঠামোই শনাক্ত করে; কোনো পৃথক “সপ্তম জমিন”, শাস্তি-লোক বা অতিরিক্ত পৃথিবীর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। [1]
وَمَا أَدْرَاكَ مَا سَجِينُ অর্থাৎ হে নবী! আপনি জানেন সিজ্জীন কি? অর্থাৎ ইহা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, স্থায়ী কারাগার ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
অনেকের মতে, এই সিজ্জীনের অবস্থান সপ্ত যমীনের নীচে। বারা ইব্ন আযিব (রা) কর্তৃক বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদীসে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ্ তা’আলা কাফিরদের রূহ সম্পর্কে বলেন, ইহার ‘আমলনামা সিজ্জীনে লিপিবদ্ধ কর। সিজ্জীন সপ্ত যমীনের নীচে অবস্থিত। কেহ কেহ বলেন: সিজ্জীন সাত তবক যমীনের নীচে অবস্থিত একটি সবুজ পাথরের নাম। কেহ বলেন, জাহান্নামের একটি কূপের নাম।
ইন্ন জারীর (র)…….. আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (সা) বলেন যে, “ফালাক, জাহান্নামের একটি গর্ত যাহার মুখ বন্ধ, আর সিজ্জীন জাহান্নামের একটি গর্ত যাহার মুখ উন্মুক্ত।”। তবে বিশুদ্ধ মত হইল এই যে, سجِيْنُ শব্দটি سجن হইতে গঠিত। যাহার অর্থ সংকীর্ণ স্থান। কারণ আল্লাহ্র সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে যাহা যত উপরে তাহা তত বেশী প্রশস্ত আর যাহা যত নীচে তাহা তত সংকীর্ণ। এই জন্য নীচের দিক হইতে উপরের দিকে এক আসমান হইতে আরেক আসমান বেশী প্রশস্ত। আর যমীনের উপর থেকে নীচের দিকে এক তবক হইতে আরেক তবক বেশী সংকীর্ণ। তাই সর্বাপেক্ষা বেশী প্রশস্ত হইল সপ্তম আকাশ সর্বাপেক্ষা বেশী সংকীর্ণ হইল সপ্তম যমীন। আর সপ্তম যমীনের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সংকীর্ণ হইল উহার মধ্যভাগ। উহাই হইল কাফির মুশরিক ও পাপাচারীদিগের ঠিকানা।

তাফসীরে কুরতুবী থেকে
কুরতুবীর তাফসীর এই স্থানগত ধারণাটিকে আরও স্পষ্ট করে, কারণ তিনি সিজ্জিন সম্পর্কে একাধিক প্রাচীন ব্যাখ্যা পাশাপাশি সংরক্ষণ করেছেন। মুজাহিদ, ইবনে আব্বাস, কাতাদাহ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, মুকাতিল, কাব, হাসান, আতা আল-খুরাসানি প্রমুখের নামে যে মতগুলো এসেছে, সেগুলোর বড় অংশে একটি সাধারণ ভৌগোলিক কাঠামো দেখা যায়: সিজ্জিন সপ্তম জমিনে, সপ্তম জমিনের নিচে, অথবা নিম্নতম পৃথিবীতে অবস্থিত। কোনো কোনো বর্ণনায় সেখানে কাফিরদের রূহ রাখা হয়; কোনো কোনো বর্ণনায় সেটিকে ইবলিসের অবস্থান বা তার কর্তৃত্বের শেষ সীমার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; আবার কোনো বর্ণনায় সরাসরি জাহান্নামের একটি গর্ত বলা হয়েছে।
এই মতগুলো পরস্পরের প্রতিটি খুঁটিনাটিতে এক নয়, কিন্তু তাদের মৌলিক কসমোলজিক্যাল কাঠামো একই—উপরের দিকে আসমান ও ইল্লিয়্যিন, নিচের দিকে বহুস্তর জমিন, এবং সেই নিম্নস্তরের চূড়ান্ত অংশে সিজ্জিন, কাফিরদের রূহ বা জাহান্নামের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থান। ফলে “সিজ্জিন” শব্দকে কেবল বিমূর্ত নৈতিক অবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করলে কুরতুবী যে বিস্তৃত তাফসীর-ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেছেন, তার প্রধান স্থানগত উপাদানটিই মুছে যায়। নিচের উদ্ধৃতিতে এই ধারণাগুলো আরবি মূলসহ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। [2] [3]
মূল আরবি
قَوْلُهُ تَعَالَى: (كَلَّا إِنَّ كِتابَ الفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ) قَالَ قَوْمٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ بِالْعَرَبِيَّةِ: كَلَّا رَدْعٌ وَتَنْبِيهٌ، أَيْ لَيْسَ الْأَمْرُ عَلَى مَا هُمْ عَلَيْهِ مِنْ تَطْفِيفِ الْكَيْلِ وَالْمِيزَانِ، أَوْ تَكْذِيبٍ بِالْآخِرَةِ، فَلْيَرْتَدِعُوا عَنْ ذَلِكَ. فَهِيَ كَلِمَةُ رَدْعٍ وَزَجْرٍ، ثُمَّ اسْتَأْنَفَ فَقَالَ: إِنَّ كِتابَ الفُجَّارِ. وَقَالَ الْحَسَنُ: كَلَّا بِمَعْنَى حَقًّا. وَرَوَى نَاسٌ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ كَلَّا قَالَ: أَلَا تُصَدِّقُونَ، فَعَلَى هَذَا: الْوَقْفُ” لِرَبِّ الْعَالَمِينَ.
وَفِي تَفْسِيرِ مُقَاتِلٍ: إِنَّ أَعْمَالَ الْفُجَّارِ. وَرَوَى نَاسٌ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: إِنَّ أَرْوَاحَ الْفُجَّارِ وَأَعْمَالَهُمْ لَفِي سِجِّينٍ. وَرَوَى ابْنُ أَبِي نجيج عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: سِجِّينٌ صَخْرَةٌ تَحْتَ الْأَرْضِ السَّابِعَةِ، تُقْلَبُ فَيُجْعَلُ كِتَابُ الْفُجَّارِ تَحْتَهَا. وَنَحْوَهُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ وَقَتَادَةَ وَسَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ وَمُقَاتِلٍ وَكَعْبٍ، قَالَ كَعْبٌ: تَحْتَهَا أَرْوَاحُ الْكُفَّارِ تَحْتَ خَدِّ إِبْلِيسَ. وَعَنْ كَعْبٍ أَيْضًا قَالَ: سِجِّينٌ صَخْرَةٌ سَوْدَاءُ تَحْتَ الْأَرْضِ السَّابِعَةِ، مَكْتُوبٌ فِيهَا اسْمُ كُلِّ شَيْطَانٍ، تُلْقَى أَنْفُسُ الْكُفَّارِ عِنْدَهَا.
وَقَالَ سَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ: سِجِّينٌ تَحْتَ خَدِّ إِبْلِيسَ. يَحْيَى بْنُ سَلَّامٍ: حَجَرٌ أَسْوَدُ تَحْتَ الْأَرْضِ، يُكْتَبُ فِيهِ أَرْوَاحُ الْكُفَّارِ. وَقَالَ عَطَاءٌ الْخُرَاسَانِيِّ: هِيَ الْأَرْضُ السَّابِعَةُ السُّفْلَى، وَفِيهَا إِبْلِيسُ وَذُرِّيَّتُهُ. وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: إِنَّ الْكَافِرَ يَحْضُرُهُ الْمَوْتُ، وَتَحْضُرُهُ رُسُلُ اللَّهِ، فَلَا يَسْتَطِيعُونَ لِبُغْضِ اللَّهِ لَهُ وَبُغْضِهِمْ إِيَّاهُ، أَنْ يؤخروه ولا يعجلوه حتى تجئ سَاعَتُهُ، فَإِذَا جَاءَتْ سَاعَتُهُ قَبَضُوا نَفْسَهُ، وَرَفَعُوهُ إِلَى مَلَائِكَةِ الْعَذَابِ، فَأَرَوْهُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يُرُوهُ مِنَ الشَّرِّ، ثُمَّ هَبَطُوا بِهِ إِلَى الْأَرْضِ السَّابِعَةِ، وَهِيَ سِجِّينٌ، وَهِيَ آخِرُ سُلْطَانِ إِبْلِيسَ، فَأَثْبَتُوا فِيهَا كِتَابَهُ.
وَعَنْ كَعْبِ الْأَحْبَارِ فِي هَذِهِ الْآيَةِ قَالَ: إِنَّ رُوحَ الْفَاجِرِ إِذَا قُبِضَتْ يُصْعَدُ بِهَا إِلَى السَّمَاءِ، فَتَأْبَى السَّمَاءُ أَنْ تَقْبَلَهَا، ثُمَّ يُهْبَطُ بِهَا إِلَى الْأَرْضِ، فَتَأْبَى الْأَرْضُ أَنْ تَقْبَلَهَا، فَتَدْخُلُ فِي سَبْعِ أَرَضِينَ، حَتَّى يُنْتَهَى بِهَا إِلَى سِجِّينٍ، وَهُوَ خَدُّ إِبْلِيسَ. فَيُخْرَجُ لَهَا مِنْ سِجِّينٍ مِنْ تَحْتِ خَدِّ إِبْلِيسَ رَقٌّ، فَيُرْقَمُ فَيُوضَعُ تَحْتَ خَدِّ إِبْلِيسَ. وَقَالَ الْحَسَنُ: سِجِّينٌ فِي الْأَرْضِ السَّابِعَةِ. وَقِيلَ: هُوَ ضَرْبُ مَثَلٍ وَإِشَارَةٌ إِلَى أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَرُدُّ أَعْمَالَهُمُ الَّتِي ظَنُّوا أَنَّهَا تَنْفَعُهُمْ.
قَالَ مُجَاهِدٌ: الْمَعْنَى عَمَلُهُمْ تَحْتَ الْأَرْضِ السَّابِعَةِ لَا يَصْعَدُ مِنْهَا شي. وقال:
বাংলা তাফসীর
মহান আল্লাহর বাণী: (কখনই নয়, নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা সিজ্জীনে রয়েছে)। আরবি ভাষাবিদগণের একদল বলেছেন: ‘কাল্লা’ (কখনই নয়) শব্দটি হলো ধমক ও সতর্কবার্তা। অর্থাৎ, মাপে ও ওজনে কম দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা যেভাবে লিপ্ত রয়েছে অথবা পরকালকে অস্বীকার করার বিষয়ে তারা যে অবস্থানে আছে, বিষয়টি আসলে সেরকম নয়। সুতরাং তাদের এসব থেকে নিবৃত্ত হওয়া উচিত। এটি একটি নিবৃত্তকারী ও ধমকসূচক শব্দ। এরপর নতুনভাবে শুরু করে বলা হয়েছে: ‘নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা…’। হাসান রহ. বলেছেন: ‘কাল্লা’ শব্দটি ‘সত্যিই’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু লোক ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ‘কাল্লা’র অর্থ করেছেন: ‘তোমরা কি বিশ্বাস করো না?’ এই মতানুসারে ‘রাব্বিল আলামীন’ শব্দের ওপর বিরতি (ওয়াকফ) হবে।
মুকাতিলের তাফসীরে আছে: (নিশ্চয়) পাপাচারীদের কর্মসমূহ। কিছু লোক ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: নিশ্চয় পাপাচারীদের রূহ এবং তাদের আমলসমূহ ‘সিজ্জীন’-এ রয়েছে। ইবনে আবি নাজীহ মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: ‘সিজ্জীন’ হলো সপ্তম জমিনের নিচে অবস্থিত একটি পাথর, যা উল্টে দেওয়া হয় এবং পাপাচারীদের আমলনামা তার নিচে রাখা হয়। ইবনে আব্বাস, কাতাদাহ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, মুকাতিল ও কাব থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। কাব বলেছেন: এর নিচে কাফেরদের রূহসমূহ অবস্থান করে, যা ইবলিসের গালের নিচে। কাব থেকে আরও বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন: ‘সিজ্জীন’ হলো সপ্তম জমিনের নিচের একটি কালো পাথর, যাতে প্রতিটি শয়তানের নাম লিপিবদ্ধ আছে; সেখানে কাফেরদের আত্মাগুলো নিক্ষেপ করা হয়।
সাঈদ ইবনে জুবায়ের রহ. বলেছেন: ‘সিজ্জীন’ হলো ইবলিসের গালের নিচে। ইয়াহইয়া ইবনে সাল্লাম বলেছেন: এটি জমিনের নিচে একটি কালো পাথর, যাতে কাফেরদের রূহসমূহের বিবরণ লেখা হয়। আতা আল-খুরাসানি বলেছেন: এটি হলো সপ্তম তথা সর্বনিম্ন জমিন, যাতে ইবলিস ও তার বংশধররা অবস্থান করে। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন কোনো কাফেরের মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতারা তার কাছে আসে, তখন আল্লাহর প্রতি তার ঘৃণা এবং ফেরেশতাদের প্রতি তার বিদ্বেষের কারণে তারা এক মুহূর্ত সময় বিলম্ব বা ত্বরান্বিত করতে পারে না যতক্ষণ না তার নির্ধারিত সময় আসে।
যখন তার সময় উপস্থিত হয়, তখন তারা তার প্রাণ কবজ করে এবং তাকে আজাবের ফেরেশতাদের কাছে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাকে যা দেখাতে চান তারা তাকে সেসব অনিষ্ট দেখায়। এরপর তারা তাকে নিয়ে সপ্তম জমিনে অবতরণ করে—আর সেটিই হলো ‘সিজ্জীন’, যা ইবলিসের কর্তৃত্বের শেষ সীমা। সেখানে তারা তার আমলনামা নথিবদ্ধ করে। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাব আল-আহবার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: পাপাচারীর আত্মা যখন কবজ করা হয়, তখন তা নিয়ে আকাশের দিকে ওড়া হয়; কিন্তু আকাশ তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এরপর তা নিয়ে জমিনের দিকে নামা হয়; কিন্তু জমিনও তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।
তখন তা সাত জমিন ভেদ করে ‘সিজ্জীন’-এ গিয়ে পৌঁছায়, যা ইবলিসের গাল। তখন সিজ্জীন থেকে তথা ইবলিসের গালের নিচ থেকে তার জন্য একটি চর্মপত্র বের করা হয়, যাতে মোহর মারা হয় এবং তা ইবলিসের গালের নিচেই রেখে দেওয়া হয়। হাসান রহ. বলেছেন: ‘সিজ্জীন’ হলো সপ্তম জমিনে। আরও বলা হয়েছে: এটি একটি উপমা এবং এই বিষয়ের প্রতি ইশারা যে, আল্লাহ তাআলা তাদের সেই আমলগুলো প্রত্যাখ্যান করবেন যেগুলোকে তারা তাদের জন্য উপকারী মনে করেছিল। মুজাহিদ রহ. বলেন: এর অর্থ হলো তাদের আমল সপ্তম জমিনের নিচে রয়ে গেছে, যেখান থেকে কিছুই উপরে উঠে আসে না। এবং তিনি বলেন:
পৃষ্ঠা ২৫৮
মূল আরবি
سِجِّينٌ صَخْرَةٌ فِي الْأَرْضِ السَّابِعَةِ. وَرَوَى أَبُو هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: (سِجِّينٌ جُبٌّ فِي جَهَنَّمَ وَهُوَ مَفْتُوحٌ) وَقَالَ فِي الْفَلَقِ: (إِنَّهُ جُبٌّ مُغَطًّى). وَقَالَ أَنَسٌ: هِيَ دَرَكَةٌ فِي الْأَرْضِ السُّفْلَى. وَقَالَ أَنَسٌ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: سِجِّينٌ أَسْفَلَ الْأَرْضِ السَّابِعَةِ (. وَقَالَ عِكْرِمَةُ:) سِجِّينٌ: خَسَارٌ وَضَلَالٌ، كَقَوْلِهِمْ لِمَنْ سَقَطَ قَدْرُهُ: قَدْ زَلِقَ بِالْحَضِيضِ. وَقَالَ أَبُو عُبَيْدَةَ وَالْأَخْفَشُ وَالزَّجَّاجُ: لَفِي سِجِّينٍ لَفِي حَبْسٍ وَضِيقٍ شَدِيدٍ، فِعِّيلٌ مِنَ السَّجْنِ، كَمَا يَقُولُ: فِسِّيقٌ وَشِرِّيبٌ، قَالَ ابْنُ مُقْبِلٍ:وَرُفْقَةٌ يَضْرِبُونَ الْبَيْضَ ضَاحِيَةً … ضَرْبًا تَوَاصَتْ بِهِ الْأَبْطَالُ سِجِّينًا «1»وَالْمَعْنَى: كِتَابُهُمْ فِي حَبْسٍ، جُعِلَ ذَلِكَ دَلِيلًا عَلَى خَسَاسَةِ مَنْزِلَتِهِمْ، أَوْ لِأَنَّهُ يَحِلُّ مِنَ الْإِعْرَاضِ عَنْهُ وَالْإِبْعَادِ لَهُ مَحَلَّ الزَّجْرِ وَالْهَوَانِ.
وَقِيلَ: أَصْلُهُ سِجِّيلٌ، فَأُبْدِلَتِ اللَّامُ نُونًا. وَقَدْ تَقَدَّمَ ذَلِكَ «2». وَقَالَ زَيْدُ بْنُ أَسْلَمَ: سِجِّينٌ فِي الْأَرْضِ السَّافِلَةِ، وَسِجِّيلٌ فِي السَّمَاءِ الدُّنْيَا. الْقُشَيْرِيُّ: سِجِّينٌ: مَوْضِعٌ فِي السَّافِلِينَ، يُدْفَنُ فِيهِ كِتَابُ هَؤُلَاءِ، فَلَا يَظْهَرُ بَلْ يَكُونُ فِي ذَلِكَ الْمَوْضِعِ كَالْمَسْجُونِ. وَهَذَا دَلِيلٌ عَلَى خُبْثِ أَعْمَالِهِمْ، وَتَحْقِيرِ اللَّهِ إِيَّاهَا، وَلِهَذَا قَالَ فِي كِتَابِ الْأَبْرَارِ: يَشْهَدُهُ الْمُقَرَّبُونَ. وَما أَدْراكَ مَا سِجِّينٌ أَيْ لَيْسَ ذَلِكَ مِمَّا كُنْتَ تَعْلَمُهُ يَا مُحَمَّدُ أَنْتَ ولا قومك.
ثم فسره له فقال: (كِتابٌ مَرْقُومٌ) أَيْ مَكْتُوبٌ كَالرَّقْمِ فِي الثَّوْبِ، لَا يُنْسَى وَلَا يُمْحَى. وَقَالَ قَتَادَةُ: مَرْقُومٌ أَيْ مَكْتُوبٌ، رُقِمَ لَهُمْ بِشَرٍّ: لَا يُزَادُ فِيهِمْ أَحَدٌ وَلَا يَنْقُصُ مِنْهُمْ أَحَدٌ. وَقَالَ الضَّحَّاكُ: مَرْقُومٌ: مَخْتُومٌ، بِلُغَةِ حِمْيَرٍ، وَأَصْلُ الرَّقْمِ: الْكِتَابَةُ، قَالَ:سَأَرْقُمُ فِي الْمَاءِ الْقَرَاحِ «3» إِلَيْكُمُ … عَلَى بُعْدِكُمْ إِنْ كَانَ لِلْمَاءِ رَاقِمُوَلَيْسَ فِي قَوْلِهِ: (وَما أَدْراكَ مَا سِجِّينٌ) مَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ لَفْظَ سِجِّينٍ لَيْسَ عَرَبِيًّا كَمَا لَا يَدُلُّ فِي قَوْلِهِ: (الْقارِعَةُ مَا الْقارِعَةُ.
وَما أَدْراكَ مَا الْقارِعَةُ) بَلْ هُوَ تَعْظِيمٌ لِأَمْرِ سِجِّينٍ. وَقَدْ مَضَى فِي مُقَدِّمَةِ الْكِتَابِ- وَالْحَمْدُ لِلَّهِ- أَنَّهُ لَيْسَ فِي الْقُرْآنِ غير عربي. (وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ)(1). الذي في التاج نقلا عن الجوهري:ورجلة يضربون الهام عن عرض (2). راجع ج 1 ص 68.(3). القراح بوزن سحاب: الماء الذي لا ثقل به.
বাংলা তাফসীর
সিজ্জিন হলো সপ্তম জমিনের একটি শিলা। আবু হুরায়রা নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: “সিজ্জিন হলো জাহান্নামের একটি গর্ত এবং এটি উন্মুক্ত।” এবং আল-ফালাক সম্পর্কে তিনি বলেছেন: “এটি একটি ঢাকা গর্ত।” আনাস বলেছেন: এটি নিম্নতম জমিনের একটি স্তর। আনাস আরও বলেছেন যে, নবী (সা.) বলেছেন: “সিজ্জিন হলো সপ্তম জমিনের নিম্নতম অংশ।” ইকরিমাহ বলেছেন: সিজ্জিন হলো ক্ষতি ও পথভ্রষ্টতা; যেমনটি সেই ব্যক্তির জন্য বলা হয় যার মর্যাদা হরণ হয়েছে: ‘সে অতল গহ্বরে পিছলে পড়েছে’। আবু উবাইদাহ, আল-আখফাশ এবং আজ-জাজ্জাজ বলেছেন: ‘লাফি সিজ্জিন’ অর্থ হলো বন্দিদশা ও চরম সংকীর্ণতার মধ্যে।
এটি ‘সিজন’ (কারাগার) থেকে বিবর্তিত একটি রূপ, যেমন বলা হয় ‘ফিসসিক’ ও ‘শিররিব’। ইবনুল মুকবিল বলেছেন:এবং এক দল যারা দিনের আলোতে শিরস্ত্রাণে আঘাত করে … এমন এক আঘাত যা বীরদের মাধ্যমে চিরস্থায়ী বন্দিদশায় পরিণত হয়। «১»এর অর্থ হলো: তাদের আমলনামা একটি কারাগারে রয়েছে। একে তাদের মর্যাদার হীনতার প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, অথবা এজন্য যে এর প্রতি বিমুখতা ও একে দূরে রাখা অবজ্ঞা ও লাঞ্ছনার অন্তর্ভুক্ত। আর বলা হয়েছে: এর মূল শব্দ হলো ‘সিজ্জিল’, যা ‘লাম’ বর্ণটি ‘নুন’ দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে। এবং এটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে «২»।
যায়েদ ইবনে আসলাম বলেছেন: সিজ্জিন হলো নিম্নতম জমিনে, আর সিজ্জিল হলো দুনিয়ার আসমানে। আল-কুশাইরী বলেছেন: সিজ্জিন হলো নিম্নতম স্তরের একটি স্থান, যেখানে তাদের আমলনামা দাফন করা হয়, ফলে তা প্রকাশিত হয় না বরং সেই স্থানে কারারুদ্ধ অবস্থায় থাকে। এটি তাদের আমলের অপবিত্রতা এবং আল্লাহর নিকট সেগুলোর তুচ্ছতার প্রমাণ; একারণেই তিনি নেককারদের আমলনামা সম্পর্কে বলেছেন: “নৈকট্যপ্রাপ্তরা এটি প্রত্যক্ষ করবে।” “আপনি কি জানেন সিজ্জিন কী?” অর্থাৎ হে মুহাম্মদ! এটি এমন কিছু ছিল না যা আপনি বা আপনার কওম জানতেন। অতঃপর তিনি তাঁর জন্য এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন: “একটি চিহ্নিত আমলনামা”, অর্থাৎ কাপড়ের নকশার মতো লিখিত, যা ভুলে যাওয়া যায় না এবং মুছে ফেলা যায় না।
কাতাদাহ বলেছেন: ‘মারকুম’ অর্থ লিখিত। তাদের জন্য অকল্যাণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে; তাদের মধ্যে কেউ বৃদ্ধি পাবে না এবং কেউ কমবে না। আদ-দাহহাক বলেছেন: ‘মারকুম’ মানে মোহরকৃত, হিময়ার গোত্রের ভাষায়। আর ‘রাকম’ এর মূল অর্থ হলো লিখন। কবি বলেছেন:আমি আপনাদের জন্য স্বচ্ছ পানিতে লিখে দেব … আপনাদের দূরত্ব সত্ত্বেও, যদি পানিতে কেউ লিখতে পারে।এবং তাঁর বাণী: “আপনি কি জানেন সিজ্জিন কী?” এর মধ্যে এমন কিছু নেই যা প্রমাণ করে যে ‘সিজ্জিন’ শব্দটি আরবি নয়, যেমনটি তাঁর বাণী: “মহা বিপদ। মহা বিপদ কী? আপনি কি জানেন মহা বিপদ কী?” এও প্রমাণ করে না যে তা অনারবি।
বরং এটি সিজ্জিনের বিষয়টির গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। এবং কিতাবের ভূমিকায় ইতিপূর্বেই অতিক্রান্ত হয়েছে—সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য—যে, কুরআনে কোনো অনারবি শব্দ নেই। “সেদিন ধ্বংস অস্বীকারকারীদের জন্য।”(১) তাজ আল-আরুস গ্রন্থে আল-জাওহারী থেকে যা উদ্ধৃত হয়েছে:একদল পদাতিক যারা পাশ থেকে মস্তকে আঘাত করে (২). দ্রষ্টব্য: ১ম খণ্ড, ৬৮ পৃষ্ঠা।(৩). আল-কুরাহ: যা ‘সাহাব’ এর ওজনে, এমন পানি যাতে কোনো পঙ্কিলতা নেই।
মূল আরবি
لَقَدْ أَنْزَلْنا إِلَيْكُمْ كِتاباً فِيهِ ذِكْرُكُمْ «1» [الأنبياء: 10]، وقوله تعالى: وَإِنَّهُ لَذِكْرٌ لَكَ وَلِقَوْمِكَ [الزخرف: «2» [44)، ثُمَّ بَيَّنَ هَذَا الشَّرَفَ، فَقَالَ: رَسُولًا. وَالْأَكْثَرُ عَلَى أَنَّ الْمُرَادَ بِالرَّسُولِ هُنَا مُحَمَّدٌ صلى الله عليه وسلم. وَقَالَ الْكَلْبِيُّ: هُوَ جِبْرِيلُ، فيكونان جميعا منزلين. (يَتْلُوا عَلَيْكُمْ آياتِ اللَّهِ) نعت لرسول. وآياتِ اللَّهِ الْقُرْآنَ. (مُبَيِّناتٍ) قِرَاءَةُ الْعَامَّةِ بِفَتْحِ الْيَاءِ، أَيْ بَيَّنَهَا اللَّهُ. وَقَرَأَ ابْنُ عَامِرٍ وَحَفْصٌ وَحَمْزَةُ وَالْكِسَائِيُّ بِكَسْرِهَا، أَيْ يُبَيِّنُ لَكُمْ مَا تَحْتَاجُونَ إِلَيْهِ مِنَ الْأَحْكَامِ.
وَالْأَوْلَى قِرَاءَةُ ابْنِ عَبَّاسٍ وَاخْتِيَارِ أَبِي عُبَيْدٍ وَأَبِي حَاتِمٍ، لِقَوْلِهِ تَعَالَى: قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآياتِ [الحديد: 17]. (لِيُخْرِجَ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحاتِ) أَيْ مَنْ سَبَقَ لَهُ ذَلِكَ فِي عِلْمِ اللَّهِ. (مِنَ الظُّلُماتِ) أَيْ مِنَ الْكُفْرِ. (إِلَى النُّورِ) الْهُدَى وَالْإِيمَانِ. قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: نَزَلَتْ فِي مُؤْمِنِي أَهْلِ الْكِتَابِ. وَأَضَافَ الْإِخْرَاجَ إِلَى الرَّسُولِ لِأَنَّ الْإِيمَانَ يَحْصُلُ مِنْهُ بِطَاعَتِهِ. قَوْلُهُ تَعَالَى: (وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ وَيَعْمَلْ صالِحاً يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهارُ).
قَرَأَ نَافِعٌ وَابْنُ عَامِرٍ بِالنُّونِ، وَالْبَاقُونَ بِالْيَاءِ. (قَدْ أَحْسَنَ اللَّهُ لَهُ رِزْقاً) أَيْ وَسَّعَ اللَّهُ لَهُ فِي الْجَنَّاتِ. [سورة الطلاق (65): آية 12]اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَماواتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الْأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْماً (12)قَوْلُهُ تَعَالَى: (اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَماواتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ) دَلَّ عَلَى كَمَالِ قُدْرَتِهِ وَأَنَّهُ يَقْدِرُ عَلَى الْبَعْثِ وَالْمُحَاسَبَةِ.
وَلَا خِلَافَ فِي السَّمَوَاتِ أَنَّهَا سَبْعٌ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ، دَلَّ عَلَى ذَلِكَ حَدِيثُ الْإِسْرَاءِ «3» وَغَيْرُهُ. ثُمَّ قَالَ: وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَعْنِي سَبْعًا. وَاخْتُلِفَ فِيهِنَّ عَلَى قَوْلَيْنِ: أَحَدُهُمَا- وَهُوَ قَوْلُ الْجُمْهُورِ- أَنَّهَا سَبْعُ أَرَضِينَ طباقا بعضها فوق بعض،(1). راجع ج 11 ص 273….. . راجع ج 16 ص 39.(3). راجع ج 10 ص 205
বাংলা তাফসীর
নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে এমন এক কিতাব নাযিল করেছি যাতে তোমাদের মর্যাদা রয়েছে «১» [আম্বিয়া: ১০], এবং মহান আল্লাহর বাণী: আর নিশ্চয়ই এটি তোমার ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্য এক সম্মান [যুখরুফ: «২» ৪৪]। অতঃপর তিনি এই সম্মানের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন এবং বলেছেন: ‘একজন রসূল’। অধিকাংশ আলিমের মতে এখানে রসূল বলতে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বোঝানো হয়েছে। কালবী বলেন: তিনি হলেন জিবরাঈল; এমতাবস্থায় কিতাব ও রসূল উভয়ই অবতীর্ণ। (যিনি তোমাদের কাছে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করেন) এটি ‘রসূল’-এর একটি গুণবাচক বিশেষণ। আর ‘আল্লাহর আয়াতসমূহ’ হলো কুরআন।
(সুস্পষ্ট) জনসাধারণের পাঠরীতি অনুযায়ী এটি ‘ইয়া’ অক্ষরে ফাতহ (যবর) সহকারে, অর্থাৎ আল্লাহ সেগুলো স্পষ্ট করেছেন। ইবন আমির, হাফস, হামযাহ ও আল-কিসাঈ এটি কাসরা (যের) সহকারে পাঠ করেছেন, অর্থাৎ তিনি তোমাদের কাছে প্রয়োজনীয় বিধিবিধানগুলো স্পষ্ট করেন। ইবন আব্বাসের পাঠরীতি এবং আবু উবাইদ ও আবু হাতিমের পছন্দকৃত অভিমতটিই অগ্রগণ্য, মহান আল্লাহর এই বাণীর কারণে: ‘আমি তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্ট করেছি’ [হাদীদ: ১৭]। (যাতে তিনি বের করে আনেন তাদের যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে) অর্থাৎ যাদের জন্য আল্লাহর ইলমে পূর্ব থেকেই তা নির্ধারিত ছিল।
(অন্ধকার হতে) অর্থাৎ কুফর হতে। (আলোর দিকে) হিদায়াত ও ঈমানের দিকে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: এটি আহলে কিতাবের মুমিনদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আর এই বের করে আনার কাজের সম্বন্ধ রসূলের দিকে করা হয়েছে কারণ তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই ঈমান হাসিল হয়। মহান আল্লাহর বাণী: (আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, তিনি তাকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত)। নাফি ও ইবনে আমির ‘নুন’ দিয়ে (আমরা প্রবেশ করাব) পাঠ করেছেন এবং অবশিষ্টরা ‘ইয়া’ দিয়ে (তিনি প্রবেশ করাবেন) পাঠ করেছেন। (আল্লাহ তার জন্য উত্তম রিযিকের ব্যবস্থা করেছেন) অর্থাৎ আল্লাহ জান্নাতে তার জন্য রিযিক প্রশস্ত করেছেন।
[সূরা আত-তালাক (৬৫): আয়াত ১২]আল্লাহই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন সাতটি আসমান এবং পৃথিবীও তাদের অনুরূপ; তাদের মাঝে নির্দেশ অবতীর্ণ হয়, যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান এবং আল্লাহ তাঁর জ্ঞান দিয়ে সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছেন (১২)মহান আল্লাহর বাণী: (আল্লাহই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন সাতটি আসমান এবং পৃথিবীও তাদের অনুরূপ) এটি তাঁর কুদরতের পূর্ণতার প্রমাণ এবং তিনি যে পুনরুত্থান ও হিসাব গ্রহণে সক্ষম তার ওপর প্রমাণ। আসমানসমূহ যে সাতটি এবং সেগুলো একটির ওপর অন্যটি অবস্থিত—এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই; মিরাজের হাদীস ও অন্যান্য বর্ণনা এর প্রমাণ দান করে।
অতঃপর তিনি বলেছেন: (এবং পৃথিবীও তদ্রূপ) অর্থাৎ সাতটি। এগুলোর ব্যাপারে দুটি অভিমত রয়েছে: প্রথমটি—যা জমহুর বা অধিকাংশের অভিমত—তা হলো সাতটি পৃথিবী স্তরে স্তরে সাজানো, একটির ওপর অন্যটি,(১). দেখুন ১১ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৩। ….. . দেখুন ১৬ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯।(৩). দেখুন ১০ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৫।
পৃষ্ঠা ১৭৫
মূল আরবি
بَيْنَ كُلِّ أَرْضٍ وَأَرْضٍ مَسَافَةٌ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالسَّمَاءِ، وَفِي كُلِّ أَرْضٍ سُكَّانٌ مِنْ خَلْقِ اللَّهِ. وَقَالَ الضَّحَّاكُ: وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ أَيْ سَبْعًا مِنَ الْأَرَضِينَ، وَلَكِنَّهَا مُطْبَقَةٌ بَعْضُهَا عَلَى بَعْضٍ مِنْ غَيْرِ فُتُوقٍ بِخِلَافِ السَّمَوَاتِ. وَالْأَوَّلُ أَصَحُّ، لِأَنَّ الْأَخْبَارَ دَالَّةٌ عَلَيْهِ فِي التِّرْمِذِيِّ وَالنَّسَائِيِّ وَغَيْرِهِمَا. وَقَدْ مَضَى ذَلِكَ مُبَيَّنًا فِي” الْبَقَرَةِ” «1». وَقَدْ خَرَّجَ أَبُو نُعَيْمٍ قَالَ: حدثنا محمد ابن عَلِيِّ بْنِ حُبَيْشٍ قَالَ: حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِسْحَاقَ السَّرَّاجُ، (ح) «2» وَحَدَّثَنَا أَبُو مُحَمَّدِ «3» بْنُ حِبَّانَ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ نَاجِيَةَ قَالَ: حَدَّثَنَا سُوَيْدُ بْنُ سَعِيدٍ قال حدثنا حفص ابن مَيْسَرَةَ عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي مَرْوَانَ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ كَعْبًا حَلَفَ لَهُ بِالَّذِي فَلَقَ الْبَحْرَ لِمُوسَى أَنَّ صُهَيْبًا حَدَّثَهُ أَنَّ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم لَمْ يَرَ قَرْيَةً يُرِيدُ دُخُولَهَا إِلَّا قَالَ حِينَ يَرَاهَا: (اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعِ وَمَا أَظْلَلْنَ وَرَبَّ الْأَرَضِينَ السَّبْعِ وَمَا أَقْلَلْنَ وَرَبَّ الشَّيَاطِينِ وَمَا أَضْلَلْنَ وَرَبَّ الرِّيَاحِ وَمَا أَذْرَيْنَ إِنَّا نَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ الْقَرْيَةِ وَخَيْرَ أَهْلِهَا وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ أَهْلِهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا (.
قَالَ أَبُو نُعَيْمٍ: هَذَا حديث ثابت من حديث موسى ابن عُقْبَةَ تَفَرَّدَ بِهِ عَنْ عَطَاءٍ. رَوَى عَنْهُ ابْنُ أَبِي الزِّنَادِ وَغَيْرُهُ. وَفِي صَحِيحِ مُسْلِمٍ عن سعيد ابن زَيْدٍ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: (مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ ظُلْمًا فَإِنَّهُ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ) وَمِثْلُهُ حَدِيثُ عَائِشَةَ، وَأَبْيَنُ مِنْهُمَا حَدِيثِ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: (لَا يَأْخُذُ أَحَدٌ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ بِغَيْرِ حَقِّهِ إِلَّا طَوَّقَهُ اللَّهُ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ).
قَالَ الْمَاوَرْدِيُّ: وَعَلَى أَنَّهَا سَبْعُ أَرَضِينَ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ تَخْتَصُّ دَعْوَةُ أَهْلِ الْإِسْلَامِ بِأَهْلِ الْأَرْضِ الْعُلْيَا، وَلَا تَلْزَمُ مَنْ فِي «4» غَيْرِهَا مِنَ الْأَرَضِينَ وَإِنْ كَانَ فِيهَا مَنْ يَعْقِلُ مِنْ خَلْقٍ مُمَيِّزٍ. وَفِي مُشَاهَدَتِهِمُ السَّمَاءَ وَاسْتِمْدَادِهِمُ الضَّوْءَ مِنْهَا قَوْلَانِ: أَحَدُهُمَا- أَنَّهُمْ يُشَاهِدُونَ السَّمَاءَ مِنْ كُلِّ جَانِبٍ مِنْ أَرْضِهِمْ وَيَسْتَمِدُّونَ الضِّيَاءَ مِنْهَا. وَهَذَا قَوْلُ مَنْ جَعَلَ الْأَرْضَ مَبْسُوطَةً. وَالْقَوْلُ الثَّانِي- أنهم لا يشاهدون السماء،(1).
راجع ج 1 ص (258)(2). جرت عادة المحدثين أنه إذا كان للحديث إسنادان أو أكثر، كتبوا عند الانتقال من إسناد إلى إسناد” ح” وهى حاء مهملة مفردة، (راجع مقدمة النووي على صحيح مسلم).(3). في ح، س” وحدثنا محمد … “.(4). في ا، ح، س، ط، هـ:” فيمن”.
বাংলা তাফসীর
প্রতিটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব আসমানসমূহের মধ্যবর্তী দূরত্বের ন্যায় এবং প্রতিটি পৃথিবীতে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্য থেকে অধিবাসী রয়েছে। দাহহাক (রহ.) বলেন: ‘পৃথিবীর ক্ষেত্রেও তদ্রূপ’ অর্থাৎ সাতটি পৃথিবী, তবে সেগুলো আসমানসমূহের বিপরীতে কোনো প্রকার ফাঁক বা বিচ্ছিন্নতা ছাড়াই একে অপরের ওপর স্তরভূত অবস্থায় রয়েছে। প্রথম মতটিই অধিক বিশুদ্ধ, কারণ তিরমিজি, নাসায়ি এবং অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত হাদিসসমূহ এরই স্বপক্ষে প্রমাণ পেশ করে। সূরা ‘আল-বাকারাহ’ এর ব্যাখ্যায় এটি ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে (১)। আবু নুআয়ম (রহ.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুবায়শ, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন ইসমাইল ইবনে ইসহাক আস-সাররাজ, (হা) (২) এবং আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আবু মুহাম্মাদ ইবনে হিব্বান, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে নাজিয়াহ, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন সুওয়াইদ ইবনে সাঈদ, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন হাফস ইবনে মায়সারা, মূসা ইবনে উকবা থেকে, তিনি আতা ইবনে আবি মারওয়ান থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, কাব (রাজি.) সেই সত্তার কসম খেয়েছেন যিনি মূসা (আ.)-এর জন্য সমুদ্র বিদীর্ণ করেছিলেন, নিশ্চয়ই সুহাইব (রাজি.) তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখনই কোনো জনপদ দেখতেন যাতে তিনি প্রবেশ করতে ইচ্ছা পোষণ করতেন, তখন তিনি তা দেখে বলতেন: (হে আল্লাহ, সাত আসমান এবং তা যা কিছুর ওপর ছায়া বিস্তার করে আছে তার রব!
সাত জমিন এবং তা যা কিছু ধারণ করে আছে তার রব! শয়তানসমূহ এবং তারা যাদের পথভ্রষ্ট করে তাদের রব! এবং বায়ুমণ্ডল ও তা যা কিছু উড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তার রব! নিশ্চয়ই আমরা আপনার নিকট এই জনপদের কল্যাণ, এর অধিবাসীদের কল্যাণ এবং এর ভেতরে যা রয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর আমরা আপনার নিকট এর অনিষ্ট, এর অধিবাসীদের অনিষ্ট এবং এর ভেতরে যা রয়েছে তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।) আবু নুআয়ম (রহ.) বলেন: এটি মূসা ইবনে উকবার সূত্রে একটি সুসাব্যস্ত হাদিস যা তিনি আতা থেকে এককভাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে ইবনে আবিয যিনাদ ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন।
সহিহ মুসলিমে সাঈদ ইবনে যায়েদ (রাজি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি: (যে ব্যক্তি জুলুম করে জমিনের এক বিঘত পরিমাণ দখল করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।) আয়েশা (রাজি.) থেকেও তদ্রূপ বর্ণিত হয়েছে। তবে এ দুটির চেয়েও সুস্পষ্ট হলো আবু হুরায়রা (রাজি.) বর্ণিত হাদিসটি, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে জমিনের এক বিঘত পরিমাণ গ্রহণ করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে সাত তবক জমিন পর্যন্ত ধসিয়ে দিয়ে বেড়ি পরিয়ে দেবেন)।
মাওয়ার্দি (রহ.) বলেন: পৃথিবী সাতটি এবং একটির ওপর অন্যটি অবস্থিত—এই মতানুসারে ইসলামের দাওয়াত কেবল উপরিভাগের পৃথিবীর অধিবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে এবং অন্য পৃথিবীগুলোতে (৪) বসবাসকারীদের জন্য তা আবশ্যক হবে না, যদিও সেখানে বিবেকসম্পন্ন ও বিচারবুদ্ধিমান কোনো সৃষ্টি থেকে থাকে। তাদের আকাশ অবলোকন করা এবং তা থেকে আলো গ্রহণ করা প্রসঙ্গে দুটি অভিমত রয়েছে: প্রথমত—তারা তাদের পৃথিবীর প্রতি প্রান্ত থেকে আকাশ দেখতে পায় এবং তা থেকে আলো লাভ করে। এটি তাদের অভিমত যারা পৃথিবীকে সমতল মনে করেন। দ্বিতীয় অভিমতটি হলো—তারা আকাশ দেখতে পায় না,(১).
দ্রষ্টব্য: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৮।(২). মুহাদ্দিসগণের রীতি হলো যে, যখন কোনো হাদিসের দুই বা ততোধিক সনদ থাকে, তখন এক সনদ থেকে অন্য সনদে যাওয়ার সময় তারা ‘হা’ (ح) লিখে থাকেন, যা একটি একক ‘হা’ বর্ণ। (দ্রষ্টব্য: সহিহ মুসলিমের ওপর নববী (রহ.)-এর ভূমিকা)।(৩). ‘হা’ (ح) ও ‘সিন’ (س) পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে: “এবং আমাদের নিকট মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন…”।(৪). ‘আলিফ’ (ا), ‘হা’ (ح), ‘সিন’ (س), ‘তা’ (ط) ও ‘হা’ (هـ) পাণ্ডুলিপিতে “ফীমান” (যাদের মধ্যে) পাঠটি রয়েছে।
তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর থেকে
আদ-দুররুল মানসূর-এর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এখানে একক কোনো তাফসীরকারের মত নয়; বিভিন্ন প্রাথমিক সূত্র, সাহাবি-তাবেঈন ও পুরনো মুফাসসিরদের নামে প্রচলিত বহু বর্ণনা একত্রে সংরক্ষিত হয়েছে। এসব বর্ণনায় বারবার সিজ্জিনকে “সর্বনিম্ন জমিন”, “সপ্তম জমিনের নিচে”, “সপ্তম জমিনের সর্বনিম্ন অংশ” এবং “জাহান্নামে সপ্তম জমিনের নিচের শিলা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাফিরদের রূহ ও মন্দ আমলকে এই নিম্নস্থানে রাখার ধারণাও পুনরাবৃত্ত হয়েছে। ফলে এটি কোনো একক ব্যাখ্যাকারীর বিচ্ছিন্ন কল্পনা নয়; প্রাচীন তাফসীর-ঐতিহ্যের ভেতরে বহুল প্রচলিত একটি স্তরভিত্তিক কসমোলজিক্যাল ধারণা ছিল।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, একই তাফসীর-সাহিত্যে “সাত জমিন”কে শুধু ভাষার অলংকার হিসেবে নয়, একটির নিচে আরেকটি বাস্তব স্তর হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। কোথাও সপ্তম জমিনের নিচে শিলা, তার নিচে মাছ, পানি, অন্ধকার, বায়ু ও সিক্ত মাটির ধারাবাহিক স্তর বর্ণিত হয়েছে; আবার কুরতুবী জমহুরের মত হিসেবে সাতটি পৃথিবীকে একটির ওপর আরেকটি স্তরে অবস্থিত বলেছেন এবং প্রতিটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বের কথাও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সিজ্জিনের ধারণাটি বিচ্ছিন্ন নয়; এটি এমন একটি বৃহত্তর বিশ্ব-মানচিত্রের অংশ, যেখানে আসমান ওপরে স্তরে স্তরে এবং পৃথিবীগুলো নিচে স্তরে স্তরে সাজানো। আধুনিক ভূ-তত্ত্বের সঙ্গে সংঘর্ষটি তাই শুধু “সিজ্জিন কোথায়” প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; সংঘর্ষটি গোটা কসমোলজিক্যাল কাঠামোর সঙ্গে। [4] [5]
মূল আরবি
وَأخرج سعيد بن مَنْصُور وَابْن الْمُنْذر عَن مُحَمَّد بن كَعْب رضي الله عنه فِي الْآيَة قَالَ: قد رقم الله على الْفجار مَا هم عاملون فِي سِجِّين فَهُوَ أَسْفَل والفجار مُنْتَهُونَ إِلَى مَا قد رقم الله عَلَيْهِم ورقم على الْأَبْرَار مَا هم عاملون فِي عليين وهم فَوق فهم مُنْتَهُونَ إِلَى مَا قد رقم الله عَلَيْهِم
وَأخرج ابْن أبي حَاتِم عَن ابْن عَبَّاس رضي الله عنهما قَالَ: سِجِّين أَسْفَل الْأَرْضين
وَأخرج ابْن جرير عَن أبي هُرَيْرَة رضي الله عنه عَن النَّبِي صلى الله عليه وسلم قَالَ: الفلق جب فِي جَهَنَّم مغطى وَأما سِجِّين فمفتوح
وَأخرج عبد بن حميد وَابْن الْمُنْذر عَن مُجَاهِد رضي الله عنه فِي قَوْله: كلا إِن كتاب الْفجار لفي سِجِّين قَالَ: عَمَلهم فِي الأَرْض السَّابِعَة لَا يصعد
وَأخرج عبد بن حميد عَن مُجَاهِد رضي الله عنه فِي قَوْله: كلا إِن كتاب الْفجار لفي سِجِّين قَالَ: تَحت الأَرْض السُّفْلى فِيهَا أَرْوَاح الْكفَّار وأعمالهم أَعمال السوء
وَأخرج أَبُو الشَّيْخ فِي العظمة والمحاملي فِي أَمَالِيهِ عَن مُجَاهِد رضي الله عنه قَالَ: سِجِّين صَخْرَة تَحت الأَرْض السَّابِعَة فِي جَهَنَّم تقلب فَيجْعَل كتاب الْفجار تحتهَا
وَأخرج عبد بن حميد عَن فرقد كلا إِن كتاب الْفجار لفي سِجِّين قَالَ: تَحت الأَرْض السُّفْلى
وَأخرج عبد بن حميد وَعبد الرَّزَّاق عَن قَتَادَة كلا إِن كتاب الْفجار لفي سِجِّين قَالَ: هُوَ أَسْفَل الأَرْض السَّابِعَة كتاب مرقوم قَالَ: مَكْتُوب
قَالَ قَتَادَة: ذكر لنا أَن عبد الله بن عمر كَانَ يَقُول: الأَرْض السُّفْلى فِيهَا أَرْوَاح الْكفَّار وأعمالهم السوء
وَأخرج ابْن مرْدَوَيْه عَن عَائِشَة عَن النَّبِي صلى الله عليه وسلم قَالَ: سِجِّين الأَرْض السَّابِعَة السُّفْلى
وَأخرج عبد بن حميد عَن عبد الله بن عَمْرو قَالَ: الأَرْض السُّفْلى فِيهَا أَرْوَاح الْكفَّار وأعمالهم أَعمال السوء
وَأخرج ابْن الْمُبَارك عَن ابْن جريج قَالَ: بَلغنِي أَن سِجِّين الأَرْض السلفى وَفِي قَوْله: مرقوم قَالَ: مَكْتُوب
وَأخرج عبد بن حميد عَن قَتَادَة كتاب مرقوم قَالَ: رقم لَهُم بشر
বাংলা তাফসীর
সাঈদ ইবনে মানসুর এবং ইবনুল মুনজির মুহাম্মাদ ইবনে কাব (রা.) থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা পাপাচারীদের কৃতকর্ম সিজ্জিনে লিপিবদ্ধ করেছেন, যা সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থিত। পাপাচারীরা যা কিছু করেছে তা আল্লাহ তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। আর তিনি পুণ্যবানদের কৃতকর্ম ইল্লিয়্যিনে লিপিবদ্ধ করেছেন যা উচ্চস্থানে অবস্থিত। তারা যা কিছু করেছে আল্লাহ তাদের জন্য তা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সিজ্জিন হলো জমিনের সর্বনিম্ন স্তর।ইবনে জারির আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: ফালাক হলো জাহান্নামের একটি আবৃত কূয়াবিশেষ, আর সিজ্জিন হলো উন্মুক্ত।আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনুল মুনজির মুজাহিদ (রা.) থেকে আল্লাহর বাণী: কখনোই নয়, পাপাচারীদের আমলনামা অবশ্যই সিজ্জিনে রয়েছে এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তাদের আমল সপ্তম জমিনে থাকে, যা উপরে আরোহণ করে না।আবদ ইবনে হুমাইদ মুজাহিদ (রা.) থেকে আল্লাহর বাণী: কখনোই নয়, পাপাচারীদের আমলনামা অবশ্যই সিজ্জিনে রয়েছে এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি সর্বনিম্ন জমিনের নিচে অবস্থিত, সেখানে কাফেরদের রূহ এবং তাদের মন্দ আমলসমূহ থাকে।আবুশ শায়খ ‘আল-আজমাহ’ গ্রন্থে এবং মাহামিলি তার ‘আমালি’ গ্রন্থে মুজাহিদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সিজ্জিন হলো সপ্তম জমিনের নিচে জাহান্নামে অবস্থিত একটি শিলাখণ্ড, যা উল্টে দেওয়া হয় এবং পাপাচারীদের আমলনামা তার নিচে রাখা হয়।আবদ ইবনে হুমাইদ ফারকাদ থেকে আল্লাহর বাণী কখনোই নয়, পাপাচারীদের আমলনামা অবশ্যই সিজ্জিনে রয়েছে এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি সর্বনিম্ন জমিনের নিচে।আবদ ইবনে হুমাইদ এবং আবদুর রাজ্জাক কাতাদাহ (রা.) থেকে কখনোই নয়, পাপাচারীদের আমলনামা অবশ্যই সিজ্জিনে রয়েছে এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি হলো সপ্তম জমিনের সর্বনিম্ন অংশ।
আর লিখিত কিতাব এর অর্থ হলো: লিপিবদ্ধ।কাতাদাহ বলেন: আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলতেন: সর্বনিম্ন জমিনে কাফেরদের রূহ এবং তাদের মন্দ আমলসমূহ রয়েছে।ইবনে মারদুওয়াইহ আয়েশা (রা.) সূত্রে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: সিজ্জিন হলো সপ্তম নিম্নতম জমিন।আবদ ইবনে হুমাইদ আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সর্বনিম্ন জমিনে কাফেরদের রূহ এবং তাদের মন্দ আমলসমূহ রয়েছে।ইবনুল মুবারক ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমার কাছে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, সিজ্জিন হলো নিম্নতম জমিন।
আর আল্লাহর বাণী লিখিত সম্পর্কে তিনি বলেন: লিপিবদ্ধ।আবদ ইবনে হুমাইদ কাতাদাহ (রা.) থেকে লিখিত কিতাব এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তাদের জন্য অকল্যাণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
মূল আরবি
وَأخرج ابْن أبي حَاتِم عَن قَتَادَة مَا أنزلنَا عَلَيْك الْقُرْآن لتشقى يَا رجل مَا أنزلنَا عَلَيْك الْقُرْآن لتشقى لَا وَالله مَا جعله الله شقياً وَلَكِن جعله الله رَحْمَة ونوراً ودليلاً إِلَى الْجنَّة إِلَّا تذكرة لمن يخْشَى قَالَ: إِن الله أنزل كِتَابه وَبعث رسله رَحْمَة رحم بهَا الْعباد لِيذْكُر ذَاكر وَينْتَفع رجل بِمَا سمع من كتاب الله وَهُوَ ذكر أنزلهُ الله فِيهِ حَلَاله وَحرمه
وَأخرج ابْن أبي حَاتِم عَن مُحَمَّد بن كَعْب وَمَا تَحت الثرى مَا تَحت سبع أَرضين
وَأخرج ابْن أبي حَاتِم عَن ثتادة قَالَ: الثرى كل شَيْء مبتل
وَأخرج ابْن أبي حَاتِم عَن السّديّ: وَمَا تَحت الثرى قَالَ: هِيَ الصَّخْرَة الَّتِي تَحت الأَرْض السَّابِعَة وَهِي صَخْرَة خضراء وَهُوَ سِجِّين الَّذِي فِيهِ كتاب الْكفَّار
وَأخرج ابْن أبي حَاتِم عَن الضَّحَّاك قَالَ: الثرى مَا حفر من التُّرَاب مبتلاً
وَأخرج أَبُو يعلى عَن جَابر بن عبد الله: أَن النَّبِي صلى الله عليه وسلم سُئِلَ مَا تَحت هَذِه الأَرْض قَالَ: المَاء
قيل: فَمَا تَحت المَاء قَالَ: ظلمَة
قيل: فَمَا تَحت الظلمَة قَالَ: الْهَوَاء
قيل: فَمَا تَحت الْهَوَاء قَالَ: الثرى
قيل: فَمَا تَحت الثرى قَالَ: انْقَطع علم المخلوقين عِنْد علم الْخَالِق
وَأخرج ابْن مرْدَوَيْه عَن جَابر بن عبد اللله قَالَ: كنت مَعَ رَسُول الله صلى الله عليه وسلم فِي غَزْوَة تَبُوك إِذْ عَارَضنَا رجل مترجب – يَعْنِي طَويلا فَدَنَا من النَّبِي صلى الله عليه وسلم فَأخذ بِخِطَام رَاحِلَته فَقَالَ: أَنْت مُحَمَّد قَالَ: نعم
قَالَ: إِنِّي أُرِيد أَن أَسأَلك عَن خِصَال لَا يعلمهَا أحد من أهل الأَرْض إِلَّا رجل أَو رجلَانِ فَقَالَ: سل عَمَّا شِئْت
قَالَ: يَا مُحَمَّد مَا تَحت هَذِه – يَعْنِي الأَرْض – قَالَ: خلق
قَالَ: فَمَا تَحْتهم قَالَ: أَرض
قَالَ: فَمَا تحتهَا قَالَ: خلق قَالَ: فَمَا تَحْتهم قَالَ: أَرض حَتَّى انْتهى إِلَى السَّابِعَة
قَالَ: فَمَا تَحت السَّابِعَة قَالَ: صَخْرَة
قَالَ: فَمَا تَحت الصَّخْرَة قَالَ: الْحُوت
قَالَ: فَمَا تَحت الْحُوت قَالَ: المَاء
قَالَ: فَمَا تَحت المَاء قَالَ: الظلمَة
قَالَ: فَمَا تَحت الظلمَة قَالَ: الْهَوَاء
قَالَ: فَمَا تَحت الْهَوَاء قَالَ: الثرى
قَالَ: فَمَا تَحت الثرى فَفَاضَتْ عينا رَسُول الله صلى الله عليه وسلم بالبكاء فَقَالَ: انْقَطع علم المخلوقين
বাংলা তাফসীর
ইবনে আবি হাতিম কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন: আমরা আপনার প্রতি এই কুরআন অবতীর্ণ করিনি আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য হে ব্যক্তি, আমরা আপনার প্রতি এই কুরআন অবতীর্ণ করিনি আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আল্লাহর কসম, আল্লাহ একে কষ্টের কারণ করেননি, বরং আল্লাহ একে রহমত, নূর এবং জান্নাতের পথপ্রদর্শক হিসেবে নির্ধারণ করেছেন কেবল তাদের জন্য উপদেশ হিসেবে যারা ভয় করে। তিনি বলেন: আল্লাহ তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং তাঁর রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন দয়ার বশবর্তী হয়ে, যাতে এর মাধ্যমে তিনি বান্দাদের প্রতি দয়া করেন, যেন কোনো স্মরণকারী তা স্মরণ করে এবং কোনো ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে যা শুনেছে তা দ্বারা উপকৃত হতে পারে।
আর এটি এমন এক উপদেশ যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তাঁর হালাল ও হারাম বিধৃত রয়েছে।ইবনে আবি হাতিম মুহাম্মদ বিন কাব থেকে বর্ণনা করেছেন: এবং যা মাটির নিচে রয়েছে এর অর্থ হলো যা সাত স্তরের জমিনের নিচে রয়েছে।ইবনে আবি হাতিম কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সিক্ত মাটি হলো প্রতিটি আর্দ্র বস্তু।ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী থেকে বর্ণনা করেছেন: এবং যা মাটির নিচে রয়েছে প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এটি হলো সেই শিলা যা সপ্তম জমিনের নিচে অবস্থিত। এটি একটি সবুজ রঙের শিলা এবং এটিই হলো ‘সিজ্জিন’ যেখানে কাফিরদের আমলনামা সংরক্ষিত থাকে।ইবনে আবি হাতিম দাহহাক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ‘সিক্ত মাটি’ (আস-সারা) হলো খননকৃত সেই মাটি যা আর্দ্র।আবু ইয়ালা জাবির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন: নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই জমিনের নিচে কী আছে?
তিনি বললেন: পানি।জিজ্ঞেস করা হলো: পানির নিচে কী আছে? তিনি বললেন: অন্ধকার।জিজ্ঞেস করা হলো: অন্ধকারের নিচে কী আছে? তিনি বললেন: বায়ু।জিজ্ঞেস করা হলো: বায়ুর নিচে কী আছে? তিনি বললেন: সিক্ত মাটি।জিজ্ঞেস করা হলো: সিক্ত মাটির নিচে কী আছে? তিনি বললেন: সৃষ্টির জ্ঞান স্রষ্টার জ্ঞানের কাছে এসে শেষ হয়ে গেছে।ইবনে মারদুওয়াইহ জাবির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে তাবুক যুদ্ধে ছিলাম। এমতাবস্থায় একজন দীর্ঘদেহী লোক আমাদের সামনে আসলেন এবং নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকটবর্তী হয়ে তাঁর উটের লাগাম ধরে বললেন: আপনি কি মুহাম্মদ?
তিনি বললেন: হ্যাঁ।তিনি বললেন: আমি আপনাকে এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে চাই যা পৃথিবীবাসীর মধ্যে মাত্র এক বা দুইজন ছাড়া কেউ জানে না। তিনি বললেন: যা ইচ্ছা জিজ্ঞাসা কর।সে বলল: হে মুহাম্মদ, এই জমিনের নিচে কী আছে? তিনি বললেন: সৃষ্টিজগত।সে বলল: তাদের নিচে কী আছে? তিনি বললেন: জমিন।সে বলল: তার নিচে কী আছে? তিনি বললেন: সৃষ্টিজগত। সে বলল: তাদের নিচে কী আছে? তিনি বললেন: জমিন—এভাবে তিনি সপ্তম জমিন পর্যন্ত পৌঁছালেন।সে বলল: সপ্তম জমিনের নিচে কী আছে? তিনি বললেন: একটি শিলা।সে বলল: শিলার নিচে কী আছে? তিনি বললেন: মাছ।সে বলল: মাছের নিচে কী আছে?
তিনি বললেন: পানি।সে বলল: পানির নিচে কী আছে? তিনি বললেন: অন্ধকার।সে বলল: অন্ধকারের নিচে কী আছে? তিনি বললেন: বায়ু।সে বলল: বায়ুর নিচে কী আছে? তিনি বললেন: সিক্ত মাটি।সে বলল: সিক্ত মাটির নিচে কী আছে? তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হলো এবং তিনি বললেন: সৃষ্টির জ্ঞান এখানেই শেষ হয়ে গেছে।
মতিউর রহমান মাদানির বক্তব্য
ওয়াজ/ব্যাখ্যায় (যেমন মতিউর রহমান মাদানির আলোচনায়) জাহান্নামকে “মাটির নিচে” হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা যায়। এই ধরনের বক্তৃতা ধর্মীয় বর্ণনাকে আক্ষরিক ভূগোলের সাথে জুড়ে দেয়—যেন ‘জাহান্নাম’ কোনো বিমূর্ত নৈতিক-অবস্থা নয়, বরং পৃথিবীর তলদেশে অবস্থিত বাস্তব শাস্তি-কারাগার। এতে সাধারণ শ্রোতার কাছে ধারণাটি আরও “কংক্রিট” হয়, কিন্তু একই সাথে এটি বৈজ্ঞানিক ও ভৌত বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষের ক্ষেত্রও তৈরি করে। আসুন একটি ওয়াজ শুনি,
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূ-তত্ত্বের সাথে সংঘর্ষ
আধুনিক ভূ-তত্ত্ব পৃথিবীর অভ্যন্তরকে “ফাঁকা পাতাল” হিসেবে দেখে না; বরং এটি স্তরভিত্তিক ঘন পদার্থের এক জটিল কাঠামো: ভূত্বক (Crust), ম্যান্টেল (Mantle), এবং কেন্দ্রে কোর (Core)—যেখানে তাপমাত্রা, চাপ ও পদার্থের অবস্থা (কঠিন/তরল) অত্যন্ত চরম। পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭০ কিলোমিটার—এটি কোনো অসীম গভীর খাদ নয়, সীমিত পরিসরের এক গোলক। আর জ্যোতির্বিজ্ঞান দেখায়—পৃথিবী মহাকাশে ভাসমান অসংখ্য জ্যোতিষ্কের মধ্যে একটি; এখানে “উপর/নিচ” কোনো সার্বজনীন দিক নয়, বরং পর্যবেক্ষকের অবস্থানভিত্তিক আপেক্ষিক নির্দেশ।
এই প্রেক্ষিতে “জাহান্নাম পৃথিবীর নিচে” ধারণা ধরে নিলে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে:
যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি: ধারণার উৎস কোথায়
সংশয়বাদী/যুক্তিবাদী পাঠে এই বর্ণনাগুলোকে দেখা হয় একটি ঐতিহাসিক জ্ঞান-কাঠামোর ভেতর থেকে: প্রাচীন মানুষের কাছে আকাশ ছিল “উপরের ছাদ”, পৃথিবী ছিল “নিচের মঞ্চ”, এবং “নিচে” ছিল অন্ধকার পাতাল—যেখানে ভয়, শাস্তি ও অজানা জগত কল্পনা করা হতো। ফলে ‘উপরে পুরস্কার’ এবং ‘নিচে শাস্তি’—এটি ধর্মীয় নৈতিকতার সাথে জড়ালেও, একই সাথে সে যুগের সীমিত মহাবিশ্ব-চিন্তার স্বাভাবিক উপজাত।
কিন্তু আধুনিক কসমোলজি—গোলকীয় পৃথিবী, আপেক্ষিক দিক-ধারণা, এবং মহাবিশ্বের বিশাল স্কেল—এই কাঠামোকে ভেঙে দেয়। তাই একই বর্ণনাকে আজ আক্ষরিক ভূগোল হিসেবে ধরে রাখতে গেলে তা বিজ্ঞানভিত্তিক বাস্তবতার সাথে দ্বন্দ্বে পড়ে; আর যদি প্রতীকী/রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে আবার প্রশ্ন আসে—প্রাথমিক বর্ণনায় কেন এত “লোকেশনাল ভাষা” (জমিনের সর্বনিম্ন, দরজা খোলা, উর্ধ্বারোহণ, নিক্ষেপ) ব্যবহৃত হচ্ছে?
উপসংহার
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাহান্নাম বা সিজ্জিনকে আক্ষরিক অর্থেই “সপ্তম জমিনের নিচে” বা “পৃথিবীর অভ্যন্তরে” স্থাপন করার দাবিটি একটি প্রাক-আধুনিক বিশ্ব-চেতনার প্রতিফলন। প্রাচীন মানুষের কাছে পৃথিবী ছিল স্থির এবং মহাবিশ্বের ভিত্তি; তাই তাদের পক্ষে ‘নিচে’ বলতে পৃথিবীর গভীরতাকে কল্পনা করা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণ—যেমন পৃথিবীর গোলকীয় আকৃতি, মহাকাশে এর আপেক্ষিক অবস্থান এবং অভ্যন্তরের কঠিন ও তরল ধাতব স্তরের বিন্যাস—এই প্রাচীন মানচিত্রকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়।
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ যেহেতু মাত্র , তাই এখানে অসীম কোনো ‘নিচ’ বা ‘পাতাল’ থাকার ভৌত অবকাশ নেই। তাছাড়া, মহাজাগতিক স্কেলে ‘অ্যাবসলিউট ডাউন’ বা ধ্রুব কোনো নিম্নমুখী দিক না থাকায়, পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের জন্য যা ‘নিচে’, অন্য প্রান্তের মানুষের জন্য তা ‘উপরে’। ফলে সিজ্জিন বা জাহান্নামকে এই গোলকের ভেতরে আক্ষরিক কোনো জায়গায় খুঁজে পাওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।
যৌক্তিকভাবে এটি স্পষ্ট যে, এই বর্ণনাগুলো মূলত একটি নৈতিক বার্তাকে স্থানিক রূপক (Spatial Metaphor) দেওয়ার চেষ্টা ছিল। পরাধীন বা আদিম সমাজগুলোতে ভয় ও আনুগত্য তৈরির জন্য শাস্তির স্থানকে ‘অন্ধকার পাতাল’ হিসেবে কল্পনা করা হতো। কিন্তু আজকের দিনে যখন আমরা জানি যে পৃথিবীর অভ্যন্তরে কোনো ফাঁপা শাস্তির জগত নেই; রয়েছে প্রধানত কঠিন ও উচ্চচাপের ম্যান্টলীয় শিলা, তরল বহিঃকোর এবং কঠিন অন্তঃকোর, তখন এই বর্ণনাগুলোকে আক্ষরিক ভূগোল হিসেবে আঁকড়ে ধরা এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা ছাড়া আর কিছু নয়। পরিশেষে বলা যায়, এই অবস্থান-ভিত্তিক ধর্মতাত্ত্বিক দাবিগুলো মূলত প্রাচীন মানুষের সীমিত ভৌগোলিক জ্ঞানের ফসল, যা আধুনিক কসমোলজির বিশালতার সামনে তার ভৌত প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৪৪৩ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী: খণ্ড ১৯ পৃষ্ঠা ২৫৬-২৬০ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী: খণ্ড ১৮ পৃষ্ঠা ১৭১-১৭৫ ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর: খণ্ড ৮ পৃষ্ঠা ৪৪৪-৪৪৭ ↩︎
- তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর: খণ্ড ৫ পৃষ্ঠা ৫৫১-৫৫৫ ↩︎

