ভূমিকা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী এবং “কোথায়/কীভাবে” তিনি আছেন—এই প্রশ্নে কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা ও ব্যাখ্যা হাজির করা হয়। এই ধারার মধ্যেই সবচেয়ে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি বিবরণ হলো “নজুল-এ-ইলাহি”: প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ এবং বান্দাদের আহ্বান জানানো। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিমসহ প্রধান প্রধান হাদিসগ্রন্থে এই বর্ণনা “সহীহ” হিসেবে প্রচলিত থাকায় তা বহু মুসলিম সমাজে প্রশ্নাতীত সত্যের মর্যাদা পেয়েছে।
কিন্তু এই বর্ণনাকে সরল অর্থে (plain reading) নিলে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, পৃথিবীর গোলাকৃতি ও ঘূর্ণন-গতির বাস্তবতা, এবং সময়ভেদ (time zones)–এর সঙ্গে তা তীব্র যুক্তিগত সংঘর্ষে পড়ে। কারণ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সবসময়ই “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” চলমান—ফলে “অবতরণ”কে নির্দিষ্ট সময়-নির্ভর ঘটনা হিসেবে ধরলে আল্লাহর অবস্থান, গতি, এবং “আরশে সমাসীন” ধারণার সঙ্গে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য অনিবার্যভাবে তৈরি হয়। এই প্রবন্ধে আমরা ঠিক এই জায়গাটিকেই—অসীম সত্তার ধারণা বনাম স্থান-কাল-নির্ভর বর্ণনা—যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করব।

হাদিস সম্পর্কে ইসলামিক আকীদা
ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা আকীদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মুহাম্মদ-এর প্রতিটি কথা ও কাজকে পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করা। বিশুদ্ধ ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীর মুখ নিঃসৃত প্রতিটি শব্দই ঐশী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং তা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। এই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো—নবী মুহাম্মদ ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ বা খুশির বশবর্তী হয়ে এমন কিছু বলেন না যা অসত্য। ফলে, কোনো সহিহ হাদিসে যদি কোনো বাস্তব জীবনের বা বৈজ্ঞানিক বা মহাজাগতিক দাবি করা হয়, তবে একজন একনিষ্ঠ মুসলিমের কাছে সেটি পর্যবেক্ষণযোগ্য বিজ্ঞানের চেয়েও অধিকতর সত্য হিসেবে বিবেচিত হয় [1]
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আংগুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইাশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)
হাদিসের বিবরণঃ আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবরতণ
আসুন হাদিসটি বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে পড়ি [2] [3] [4] [5] [6] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৭২৮. রাতের শেষভাগে দু’আ করা ও সালাত আদায় করা। আল্লাহ্পাক ইরশাদ করেছেনঃ রাতের সামান্য পরিমাণ (সময়) তাঁরা নিদ্রারত থাকেন, শেষ রাতে তাঁরা ইসতিগ্ফর করেন। (সূরা আয্-যারিয়াতঃ ১৮)।
১০৭৯। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) … আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছ এমন যে, আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছ এমনে, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
আল-লুলু ওয়াল মারজান
৬/ মুসাফির ব্যক্তির সালাত ও তা ক্বসর করার বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ৬/২৪. শেষ রাতে দুআ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং সে সময় কবূল হওয়া।
৪৩৪. আবূ হুরায়রাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ১৯ ; তাহাজ্জুদ, অধ্যায় ১৪, হাঃ ১১৪৫; মুসলিম, পর্ব ৬; মুসাফির ব্যক্তির সালাত ও তা কসর করার বর্ণনা, অধ্যায় ২৩, হাঃ ৭৫৮
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২/ সালাত (নামায)
পরিচ্ছেদঃ প্রত্যেক রাতেই আল্লাহ্ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন।
৪৪৬. কুতায়বা (রহঃ) …. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে প্রত্যেক রাতেই আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেনঃ আমিই রাজধিরাক, যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাককে কবূল করি, যে আমার কাছে যাঞ্ছা করে আমি তাকে দেই, যে আমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে আমি তাকে ক্ষমা করে দেই। ফজরের আলো উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। – ইবনু মাজাহ ১৩৬৬, বুখারি ও মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৪৪৬ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই বিষয়ে আলী ইবনু আবূ তালিব, আবূ সাঈদ, রিফাআ আল-জুহানী, জুবায়র ইবনু মুতঈম, ইবনু মাসঊদ, আবূদ্ দারদা এবং উসমান ইবনু আবিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী (রহঃ) বলেনঃ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বহু সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ রাতের শেষ তৃতীয়াংশ যখন অবশিষ্ট থাকে, তখন আল্লাহ তা’আলা নেমে আসেন এই রিওয়ায়াতটই সবচেয়ে সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৪ঃ সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৩৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – ক্বিয়ামুল লায়ল-এর প্রতি উৎসাহ দান
১২২৩-(৫) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ প্রতি রাত্রে শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বারাকাতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব।’ (বুখারী, মুসলিম)(1)
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, কে আছে যে এমন লোককে করয দেবে যিনি ফকীর নন, না অত্যাচারী এবং সকাল পর্যন্ত এ কথা বলতে থাকেন।
(1) সহীহ : বুখারী ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আল-আদাবুল মুফরাদ
মেহমানদারি
পরিচ্ছেদঃ ৩২০- রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দোয়া করা।
৭৫৮। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমাদের বরকতময় মহামহিম প্রভু রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে প্রতি রাতে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দিবো? (কে আছে এমন, যে আমার কাছে দোয়া করবে এবং আমি তার দোয়া কবুল করবো)? কে আছে এমন, যে আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করবে এবং আমি তা দান করবো? কে আছে এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে এবং আমি তাকে ক্ষমা করবো। -(বুখারী, মুসলিম, দারিমী)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
হাদিসটি একক বা দুর্বল বর্ণনা নয়
এই আলোচনায় হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মূল সমস্যাটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুব কম। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম ছাড়াও বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে একই বক্তব্য একাধিক সূত্রে এসেছে। এমনকি আবদুল আযীয ইবন বায এই হাদিসকে শুধু সহিহ বলেই থামেননি; তিনি একে সরাসরি “রাসূলুল্লাহ থেকে মুতাওয়াতির হাদিস” বলে উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় তিনি বলেন, এই নজুল আল্লাহর এমন একটি বাস্তব সিফাত যা তাঁর জন্য উপযুক্ত পদ্ধতিতে ঘটে; এর কাইফিয়াত মানুষ জানে না। [7]
পৃষ্ঠা ৩১৪
মূল আরবি
الدعاء لما ثبت عن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – أنه قال: «ينزل ربنا إلى السماء الدنيا كل ليلة حين يبقى ثلث الليل الآخر، فيقول: من يدعوني فأستجيب له، من يسألني فأعطيه، من يستغفرني فأغفر له، حتى ينفجر الفجر (¬1) » وفي لفظ آخر: «يقول سبحانه: هل من سائل فيعطى سؤله، هل من مستغقر فيغفر له، هل من تائب فيتاب عليه (¬2) » وهذا الحديث العظيم متواتر عن رسول الله – صلى الله عليه وسلم -.
وهذا النزول يليق بالله لا يشابهه شيء من خلقه في جميع صفاته، لا بكيف ولا بمثل، كاستوائه على عرشه، وكسمعه وبصره، وغضبه ورضاه، ونحو ذلك، كلها صفات تليق بالله لا يشابه فيها خلقه سبحانه وتعالى، هكذا قال أهل السنة والجماعة: يجب إثبات صفات الله كما جاءت في الكتاب والسنة على وجه يليق به سبحانه وتعالى كما قال جل وعلا: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (¬3) وقال سبحانه: وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ (¬4)
(¬1) رواه البخاري في (الجمعة) برقم (1077) ، ومسلم في (صلاة المسافرين) برقم (1261) و (1265) ، والإمام أحمد في (باقي مسند المكثرين) برقم (7196) .
(¬2) رواه مسلم في (صلاة المسافرين) برقم (1263) و (1265) ، والإمام أحمد في (باقي مسند المكثرين) برقم (9220) .
(¬3) سورة الشورى الآية 11
(¬4) سورة الإخلاص الآية 4
বাংলা অনুবাদ
দু’আ (প্রার্থনা) সেই সময় যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:
“আমাদের রব প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকে। তখন তিনি বলেন: কে আমাকে ডাকে যে আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চায় যে আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চায় যে আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? যতক্ষণ না ফজর উদিত হয়।”
(১)অন্য এক বর্ণনায় এসেছে: **”তিনি (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন: কোনো প্রার্থনাকারী আছে কি, যাকে তার চাওয়া দেওয়া হবে? কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি, যাকে ক্ষমা করা হবে? কোনো তওবাকারী আছে কি, যার তওবা কবুল করা হবে?”
(২) আর এই মহান হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির (অবিচ্ছিন্ন) সূত্রে বর্ণিত।
আর এই অবতরণ (নুযূল) আল্লাহর জন্য মানানসই, তাঁর সৃষ্টির কোনো কিছুর সাথে তাঁর কোনো সাদৃশ্য নেই তাঁর সকল গুণাবলীতে। কোনো ‘কাইফ’ (ধরন/স্বরূপ) বা ‘মিছাল’ (তুলনা) দ্বারা নয়। যেমন তাঁর আরশের উপর ইস্তিওয়া (আরোহণ), তাঁর শ্রবণ, তাঁর দর্শন, তাঁর ক্রোধ ও তাঁর সন্তুষ্টি—ইত্যাদি। এই সমস্ত গুণাবলী আল্লাহর জন্য মানানসই, যাতে তাঁর সৃষ্টির সাথে তাঁর কোনো সাদৃশ্য নেই, সুবহানাহু ওয়া তা’আলা।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের পণ্ডিতগণ এমনই বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার গুণাবলীকে কিতাব (কুরআন) ও সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে, সেভাবেই এমনভাবে সাব্যস্ত করা ওয়াজিব যা তাঁর জন্য মানানসই।
যেমন আল্লাহ জাল্লা ওয়া আলা বলেছেন: “তাঁর মতো কিছুই নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
(৩)এবং তিনি সুবহানাহু বলেছেন: “আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।”
(৪)
(১) বুখারী (জুমু’আহ) ১০৭৭, মুসলিম (সালাতুল মুসাফিরীন) ১২৬১ ও ১২৬৫, এবং ইমাম আহমাদ (বাকী মুসনাদিল মুকছিরীন) ৭১৯৬।
(২) মুসলিম (সালাতুল মুসাফিরীন) ১২৬৩ ও ১২৬৫, এবং ইমাম আহমাদ (বাকী মুসনাদিল মুকছিরীন) ৯২২০।
(৩) সূরা আশ-শূরা, আয়াত ১১।
(৪) সূরা আল-ইখলাস, আয়াত ৪।
ফলে এখানে বিতর্কটি “হাদিসটি আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না” নিয়ে নয়। যে আকীদাগত ধারার বক্তব্য এই প্রবন্ধে পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেই ধারাই হাদিসটির সত্যতা ও আল্লাহর নজুল—দুটিই দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করছে। প্রশ্নটি তাই আরও নির্দিষ্ট: পৃথিবীর অঞ্চলভেদে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ ক্রমাগত পরিবর্তিত হওয়ার বাস্তবতার সঙ্গে এই স্বীকৃত নজুলের ধারণাটি কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়?
‘দুনিয়ার আসমান’ কোনো অস্পষ্ট ধারণা নয়
হাদিসে আল্লাহ কোথায় অবতরণ করেন, সেটিও লক্ষ্য করার মতো। বলা হয়নি তিনি কেবল বান্দাদের “নিকটবর্তী হন”; বলা হয়েছে তিনি আস-সামা আদ-দুনিয়া—দুনিয়ার বা নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন। কোরআনিক বিশ্বচিত্রে এই “দুনিয়ার আসমান” একটি স্বতন্ত্র স্তর। সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬-এ বলা হয়েছে, “আমি নিকটবর্তী আসমানকে নক্ষত্ররাজির সৌন্দর্যে সজ্জিত করেছি”; সূরা আল-মুলক ৬৭:৫-এ একই নিকটবর্তী আসমানকে “প্রদীপসমূহ” দ্বারা সজ্জিত করার কথা বলা হয়েছে। কুরতুবী এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় কাওয়াকিব বা নক্ষত্রকে দুনিয়ার আসমানের অলংকার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। [8] [9]
অর্থাৎ এই ধর্মতাত্ত্বিক মানচিত্রে রয়েছে বহুস্তর আসমান, তাদের মধ্যে একটি “নিকটবর্তী আসমান”, আর তারও উপরে আরশে আল্লাহর অবস্থান। এরপর বলা হচ্ছে প্রতি রাতে নির্দিষ্ট সময়ে তিনি সেই নিম্ন আসমানে অবতরণ করেন। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও অঞ্চলভেদে পরিবর্তনশীল রাতের প্রশ্নটি হাদিসের ওপর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো আধুনিক ধারণা নয়; হাদিসের নিজস্ব স্থানিক ও সময়গত ভাষাই প্রশ্নটির জন্ম দেয়।
ঈশ্বরের ‘নেমে আসা’ ইসলামের আগের মোটিফ
“ঈশ্বর উপর থেকে নিচে নেমে মানুষের জগতের কাছে আসেন”—এই কল্পচিত্র ইসলামি হাদিসে প্রথম দেখা যায়নি। ইসলামের বহু শতাব্দী আগের হিব্রু বাইবেলেই একই ধরনের স্থানিক ভাষা পাওয়া যায়। Genesis 11:5-এ বাবেলের নগর ও টাওয়ারের কাহিনিতে বলা হয়েছে, প্রভু মানুষের নির্মিত নগর ও টাওয়ার দেখতে “নেমে এলেন”। Exodus 19:20-এ আরও সরাসরি বলা হয়েছে, প্রভু সিনাই পর্বতের চূড়ায় “অবতরণ করলেন”, এরপর মূসাকে উপরে ডাকলেন।
Genesis 11:5
New International Version
5 But the Lord came down to see the city and the tower the people were building.
Exodus 19-20
New International Version
At Mount Sinai
19.20 The Lord descended to the top of Mount Sinai and called Moses to the top of the mountain. So Moses went up 21 and the Lord said to him, “Go down and warn the people so they do not force their way through to see the Lord and many of them perish. 22 Even the priests, who approach the Lord, must consecrate themselves, or the Lord will break out against them.”
এখানেও বিশ্বচিত্রটি একই ধরনের উল্লম্ব বিন্যাসের ওপর দাঁড়ানো—ঈশ্বর উপরে, মানুষ নিচে; মানুষ ঈশ্বরের দিকে উপরে ওঠে এবং ঈশ্বর মানুষের দিকে নিচে নামেন। ইসলামের “আরশের উপরে আল্লাহ” এবং পরে “দুনিয়ার আসমানে নজুল” বর্ণনা সেই পুরনো আব্রাহামিক স্থানিক ঈশ্বর-ভাষার ধারাবাহিকতার মধ্যেই সহজে বোঝা যায়। এই প্রাচীন উল্লম্ব কসমোলজি আধুনিক গোলাকার, ঘূর্ণনশীল পৃথিবীর বৈশ্বিক সময়ব্যবস্থার মুখোমুখি হলেই নজুলের সময়গত সমস্যাটি প্রকট হয়ে ওঠে।
সমস্যাটি সমালোচকদের বানানো নয়: আলেমদের কাছেও একই প্রশ্ন উঠেছে
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর গোলাকৃতি ও বিভিন্ন অঞ্চলে রাতের সময় ভিন্ন হওয়ার কারণে যে সমস্যাটি তৈরি হয়, সেটি আধুনিক নাস্তিক বা সংশয়বাদীদের উদ্ভাবিত কোনো আপত্তি নয়। সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আবদুল আযীয ইবন বাযের কাছেই সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল: পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য রাতের শেষ তৃতীয়াংশ একই সময়ে আসে না; তাহলে আল্লাহ যদি শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন, বিষয়টি কীভাবে সম্ভব? অর্থাৎ ইসলামি আলেমদের নিজেদের ফতোয়া-সাহিত্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সময়ভেদের কারণে তৈরি এই সমস্যাটি স্বীকার করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। [10]
ইবন বাযের উত্তর আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেন যে, “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন হয়”। কিন্তু এরপর সমস্যাটির কোনো স্থানিক বা সময়গত ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, এটি আল্লাহর জন্য বিশেষ একটি বিষয়; তাঁর অবতরণ মানুষের অবতরণের মতো নয়; তিনি কীভাবে নেমে আসেন তা মানুষ জানে না; এবং অবতরণের সময়ও আরশ তাঁর থেকে খালি হয়ে যায় না। অর্থাৎ সমস্যাটির ভৌত সমাধান দেওয়া হয়নি—বরং “কাইফিয়াত অজানা” বলে প্রশ্নটিকে এমন একটি স্তরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে যেখানে দাবিটি আর পরীক্ষা বা ব্যাখ্যার আওতায় থাকে না।
যুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাঃ শুনবেন এবং মানবেন
আসুন মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমিন এর বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থে ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম গ্রন্থ থেকে পড়ি, [11]
“শেষ রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন’ এ কথার ব্যাখ্যা ।
প্রশ্নঃ (৪) আমরা জানি যে, রাত ভূপৃষ্ঠের উপরে ঘুর্ণায়মান। আর আল্লাহ রাতের তিন ভাগের এক ভাগ অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। এ হিসাবে আল্লাহ তাআ’লা রাতভর দুনিয়ার আকাশেই থাকেন। এর উত্তর কি?
…
উত্তরে আমরা বলব যে, এই প্রশ্নটি কোন ছাহাবী করেন নি। যদি প্রশ্নটি কোন মুসলিমের অন্তরে হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো, তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল অবশ্যই তা বর্ণনা করতেন। আমরা বলব পৃথিবীর কোন অংশে যতক্ষণ রাতের এক তৃতীয়াংশ থাকবে, ততক্ষণ সেখানে আল্লাহর অবতরণের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে। রাত শেষ হয়ে গেলে তা শেষ হয়ে যাবে। তবে আল্লাহর অবতরণের ধরণ আমরা জানিনা। তার সঠিক জ্ঞানও আমাদের কাছে নেই। আর আমরা জানি আল্লাহর মত আর কেউ নেই। আমাদের উচিৎ হবে আল্লাহর কিতাবের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং এ কথা বলা যে, আমরা শুনলাম এবং ঈমান আনয়ন করলাম ও অনুসরণ করলাম। এটাই আমাদের করণীয়।


আলেমদের বক্তব্যঃ এই নিয়ে চিন্তা করা নিষেধ
এবারে আসুন এই হাদিসটি সম্পর্কে বিশিষ্ট আলেম মতিউর রহমান মাদানি, আহমদুল্লাহ এবং মঞ্জুরে ইলাহীর বক্তব্য শুনে নিই,
মিথোলজিক্যাল ধারাবাহিকতা: “দেবতা-অবতরণ”-এর ছায়া
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখা যায়, “ঈশ্বর/দেবতা নির্দিষ্ট সময়ে আকাশ থেকে নেমে মানুষের নিকটবর্তী হন”—এটি শুধুই ইসলামী বয়ান নয়; প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় নানা ধর্ম-পুরাণে (পৌত্তলিক মিথোলজি সহ) দেবতা-অবতরণ/আগত হওয়ার মোটিফ খুব পরিচিত। কোথাও দেবতারা পৃথিবীতে “নেমে” মানুষের সঙ্গে মিশে যান, কোথাও দেবতার “আবির্ভাব” বা মানুষের দুনিয়ায় “নিকটবর্তী হওয়া”—এমন কল্পচিত্র বারবার এসেছে। একই ধরনের “উপরে-নিচে” ভাষা ও স্থানিক কল্পনা—আসলে এক ধরনের প্রাচীন কসমোলজিক্যাল মানস-মানচিত্রের ফল, যেখানে আসমান স্তরভাগে সাজানো, আর দেবতা/ঈশ্বর “উর্ধ্বলোকে” অবস্থান করেন।
সেই সূত্রগুলো একত্রিত করলে বোঝা যায়, ইসলামের আল্লাহ-ধারণা যে ঐতিহাসিকভাবে হঠাৎ জন্মায়নি—বরং প্রাচীন-মধ্য যুগের ধর্মীয় পরিবেশ, ভাষা, কসমোলজি, এবং পূর্ববর্তী আব্রাহামিক ও স্থানীয় আরবীয় ধারণার ভেতর দিয়েই নির্মিত, এক ধরণের সমন্বয়—এ কথা বিভিন্ন গবেষণায় ব্যাপকভাবে আলোচিত। ফলে “নজুল-এ-ইলাহি”–র মতো হাদিসে যখন বলা হয় আল্লাহ প্রতি রাতে “নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন” —যুক্তিবাদীরা এটাকে কেবল ধর্মীয় বিধান নয়, বরং পুরনো ‘দেবতা-নিকটে-আসা’ মোটিফের একটি ধারাবাহিকতা এবং সেগুলোর ইসলামিক ভার্শন বলেও মনে করেন।
কিন্তু সমস্যা হলো—এই ধরনের মোটিফ (অবতরণ/আরোহণ/দিকনির্ভর নড়াচড়া) ঈশ্বরকে স্থানিক ও সময়-নির্ভর ক্রিয়াকলাপের মধ্যে বসিয়ে দেয়, যা “অসীম, অতীন্দ্রিয়, স্থান-কাল-অতীত” সত্তার দাবির সঙ্গে মেলে না। ফলে যা বোঝা যায়, বর্ণনাটি হয়তো তার যুগের মহাবিশ্বের ধারণা ও ভাষার কাঠামো বহন করে—কিন্তু সেই কাঠামোকে “সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী আল্লাহর বৈশিষ্ট্য” হিসেবে ধরলে ভিতরে প্রবল কন্ট্রাডিকশন তৈরি হয়।
অসীমতা বনাম সীমাবদ্ধতা
ইসলামি আকীদার একটি প্রচলিত বয়ান হলো—আল্লাহ ‘আরশ’-এ সমাসীন, তিনি সৃষ্টিজগতের ঊর্ধ্বে এবং তাঁর সত্তা স্থান-কাল দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু একই সঙ্গে যখন হাদিসে বলা হয়, তিনি “নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন” কিংবা “উপরে আরোহণ করেন”—তখন ভাষার ভেতরেই একটি মৌলিক দার্শনিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। কারণ অসীম, অতীন্দ্রিয়, স্থান-কাল-অতীত সত্তার ক্ষেত্রে “যাওয়া-আসা”, “উপরে-নিচে”, “নিকটবর্তী-দূরবর্তী”—এই ধরনের ক্রিয়াপদ ও দিকনির্দেশক শব্দগুলো সাধারণত সসীম, অবস্থানধারী, গতিশীল সত্তার সাথে মানানসই। ফলে “নজুল”-এর বর্ণনাকে সরল অর্থে গ্রহণ করলে ঈশ্বর-ধারণার ভেতরেই সীমাবদ্ধতার ছাপ পড়ে।
এখানে “আল্লাহ তো সর্বত্রই আছেন”—এই উত্তর দিয়েও সমস্যাটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না, অন্তত সালাফি-আথারি আকীদার নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে। ইবন বায সরাসরি “আল্লাহ প্রত্যেক সময় ও প্রত্যেক স্থানে বিদ্যমান”—এই বক্তব্যকে ভ্রান্ত বলেছেন এবং তাঁর মতে সঠিক সুন্নি আকীদা হলো, আল্লাহ তাঁর সমস্ত সৃষ্টির উপরে এবং আরশের উপরে অবস্থান করেন। একই ফতোয়া-ঐতিহ্যে আবার ‘ইসতিওয়া’-কে আরশের ওপর উচ্চতা ও সমুন্নত অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করা হয়, এবং একই সঙ্গে প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে বাস্তব ‘নজুল’ বা অবতরণও স্বীকার করা হয়। [12]
পৃষ্ঠা ৩৪৩
মূল আরবি
وجل: إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ (¬1) وقال سبحانه: وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ (¬2) في آيات كثيرة من كتاب الله الكريم، صرح فيها سبحانه في العلو وذلك موافق لما دلت عليه آيات الاستواء، وبذلك يعلم أن قول أهل البدع إن الله سبحانه موجود في كل مكان – من أبطل الباطل، وهو مذهب الحلولية المبتدعة الضالة، بل هو كفر وضلال وتكذيب لله سبحانه، وتكذيب لرسوله صلى الله عليه وسلم فيما صح عنه من كون ربه في السماء، مثل قوله صلى الله عليه وسلم: «ألا تأمنوني وأنا أمين من في السماء (¬3) » وكما جاء في أحاديث الإسراء والمعراج.
فأرجو إذاعة هذه الرسالة في البرنامج الإذاعي في الوقت المذكور وفي أوقات أخرى، حتى يعلم ذلك من سمع المقال المشار إليه.
شكر الله سعيكم وبارك في جهودكم.
والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته.
(¬1) سورة فاطر الآية 10
(¬2) سورة البقرة الآية 255
(¬3) صحيح البخاري المغازي (4351) ، صحيح مسلم الزكاة (1064) ، سنن أبو داود السنة (4764) ، مسند أحمد بن حنبل (3/5) .
বাংলা অনুবাদ
মহান আল্লাহ বলেন: তাঁরই দিকে পবিত্র বাক্যসমূহ আরোহণ করে এবং সৎকর্ম তিনি উন্নীত করেন (১)
আর তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা বলেন: আর এ দুটির সংরক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান (২)
আল্লাহর সম্মানিত কিতাবের বহু আয়াতে তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা তাঁর উচ্চতার (আল-উলুও) বিষয়টি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। আর এটি ইস্তিওয়ার আয়াতসমূহ যা প্রমাণ করে, তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর মাধ্যমে জানা যায় যে, আহলুল বিদআতের এই উক্তি—যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা সব জায়গায় বিদ্যমান—তা সম্পূর্ণ বাতিল ও মিথ্যা। এটি পথভ্রষ্ট বিদআতী হুলুলিয়্যাহ (সর্বত্র বিরাজমানবাদী)-দের মতবাদ। বরং এটি কুফর ও গোমরাহী এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। আর তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, যা তাঁর থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, তাঁর রব আসমানে (ঊর্ধ্বলোকে) আছেন।
যেমন তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) এই বাণী: «তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করো না, অথচ যিনি আসমানে আছেন আমি তাঁর বিশ্বস্ত?» (৩) আর যেমন ইসরা ও মিরাজের হাদীসসমূহে এসেছে।
অতএব, আমি আশা করি যে, এই বার্তাটি উল্লেখিত সময়ে এবং অন্যান্য সময়েও রেডিও প্রোগ্রামে প্রচার করা হবে, যাতে যারা সেই প্রবন্ধটি শুনেছে তারা এই বিষয়টি জানতে পারে।
আল্লাহ আপনাদের প্রচেষ্টার উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনাদের কর্মে বরকত দান করুন। ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
পাদটীকা:
(১) সূরা ফাতির, আয়াত ১০।
(২) সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৫।
(৩) সহীহ বুখারী, মাগাযী (৪৩৫১); সহীহ মুসলিম, যাকাত (১০৬৪); সুনান আবু দাউদ, আস-সুন্নাহ (৪৭৬৪); মুসনাদ আহমাদ ইবনে হাম্বল (৩/৫)।
ফলে যুক্তিগত প্রশ্নটি আরও সরল হয়ে যায়। যদি আল্লাহ সর্বত্র সমভাবে উপস্থিত না থেকে আরশের উপরে থাকেন, এবং ‘নজুল’ও বাস্তব একটি গুণ হয়, তাহলে “দুনিয়ার আসমানে নেমে আসা” কথাটি সম্পূর্ণ অর্থশূন্য স্থানিক ভাষা হতে পারে না। অথচ সেই অবতরণের সময় নির্ধারিত হচ্ছে পৃথিবীর স্থানীয় রাত দিয়ে—যে স্থানীয় রাত পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চল থেকে অঞ্চলে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। এখানে একদিকে বাস্তব ঊর্ধ্বস্থান, অন্যদিকে বাস্তব অবতরণ, আবার তৃতীয়দিকে পৃথিবীর অঞ্চলভেদে পরিবর্তনশীল সময়—এই তিনটিই একসঙ্গে ধরে রাখলে সমস্যাটি অদৃশ্য হয় না; বরং আরও স্পষ্ট হয়।
সমস্যাটি খুব সহজ: পৃথিবীতে একই সময়ে সবার রাত নয়
এই সমস্যাটি বোঝার জন্য আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, জটিল পদার্থবিজ্ঞান কিংবা কোনো উচ্চতর গণিতের প্রয়োজন নেই। শুধু একটি গোলাকার ও ঘূর্ণনশীল পৃথিবীর কথা মনে রাখলেই যথেষ্ট। পৃথিবীর একটি অংশ যখন সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে, সেখানে রাত; একই সময়ে অন্য অংশ সূর্যের দিকে থাকায় সেখানে দিন। পৃথিবী ঘুরতে থাকার কারণে রাতও পৃথিবীর পৃষ্ঠের ওপর ক্রমাগত পশ্চিমদিকে অগ্রসর হতে থাকে। ফলে এক অঞ্চলে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ শেষ হচ্ছে, অন্য একটি অঞ্চলে তখন সেটি শুরু হচ্ছে।
এখন হাদিসের দাবিটি ধরুন: প্রতি রাতে যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত সেখানে আহ্বান করেন। প্রশ্ন হলো—কোন অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশ? যদি বাংলাদেশের সময় ধরা হয়, তখন পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে দুপুর বা সন্ধ্যা থাকতে পারে। বাংলাদেশের ফজর হয়ে গেলে আরও পশ্চিমের কোনো অঞ্চলে নতুন করে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হবে; সেখানে ফজর হলে তারও পশ্চিমে আরেক অঞ্চলে একই সময় আসবে। অর্থাৎ পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে “শেষ তৃতীয়াংশ” অঞ্চলটি পৃথিবীকে ঘিরে ক্রমাগত চলতেই থাকে।
তাহলে মাত্র দুটি সম্ভাবনা থাকে। প্রথমত, আল্লাহ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশে অবতরণ করেন—তাহলে হাদিসটি অন্য অঞ্চলের মানুষের ক্ষেত্রে একই সময়ে সত্য হয় না। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক অঞ্চলের স্থানীয় শেষ তৃতীয়াংশ অনুযায়ী অবতরণ ঘটে—তাহলে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রায় সবসময়ই এই সময় উপস্থিত থাকায় “প্রতি রাতে নেমে আসা এবং ফজরে শেষ হওয়া” একটি নির্দিষ্ট দৈনিক অবতরণ আর থাকে না; কার্যত অবতরণের সময় পৃথিবীজুড়ে ক্রমাগত চলমান থাকে। ইবন বায নিজেই স্বীকার করেছেন যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শেষ তৃতীয়াংশ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হয়; তাঁর উত্তর হলো শুধু—আল্লাহ কীভাবে করেন তা আমরা জানি না। [13]
পৃষ্ঠা ৩৯৯
মূল আরবি
104 – نزول الله تعالى
إلى السماء الدنيا في الثلث الأخير من الليل
س: كيف نرد على من قال: إنكم تقولون: إن الله ينزل إلى السماء الدنيا بالثلث الأخير من الليل وإن ذلك يقتضي تركه العرش؛ لأن ثلث الليل الأخير ليس في وقت واحد على أهل الأرض؟ (¬1)
ج: هذا كلام رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو القائل عليه الصلاة والسلام: «ينزل ربنا تبارك وتعالى إلى السماء الدنيا كل ليلة حين يبقى ثلث الليل الآخر فيقول: من يدعوني فأستجيب له، من يسألني فأعطيه، من يستغفرني فأغفر له، حتى ينفجر الفجر (¬2) » . متفق على صحته، وقد بين العلماء أنه نزول يليق بالله وليس مثل نزولنا، لا يعلم كيفيته إلا هو سبحانه وتعالى، فهو ينزل كما يشاء ولا يلزم من ذلك خلو العرش فهو نزول يليق
(¬1) نشر في مجلة الدعوة، العدد 1655، بتاريخ 28 ربيع الآخر 1419 هـ.
(¬2) أخرجه البخاري في كتاب الجمعة، باب الدعاء في الصلاة من آخر الليل، برقم 1145، ومسلم في كتاب صلاة المسافرين وقصرها، باب الترغيب في الدعاء والذكر في آخر الليل والإجابة، برقم 758.
বাংলা অনুবাদ
১০৪ – রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলার সর্বনিম্ন আসমানে অবতরণ
প্রশ্ন: যারা বলে যে, আপনারা বলেন আল্লাহ রাতের শেষ তৃতীয়াংশে সর্বনিম্ন আসমানে অবতরণ করেন এবং এর দ্বারা আরশ ছেড়ে দেওয়া আবশ্যক হয়— কারণ পৃথিবীর সকল অধিবাসীর জন্য রাতের শেষ তৃতীয়াংশ একই সময়ে হয় না— তাদের জবাবে আমরা কী বলব? (১)
উত্তর: এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। তিনিই বলেছেন, তাঁর উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক:
“প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আমাদের রব, বরকতময় ও সুমহান আল্লাহ সর্বনিম্ন আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন: ‘কে আমাকে ডাকবে যে আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে যে আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে যে আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’ এভাবে ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।” (২)
হাদিসটি সহীহ হিসেবে সর্বসম্মত (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
আর উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এটি এমন অবতরণ যা আল্লাহর জন্য শোভনীয়। এটি আমাদের অবতরণের মতো নয়। এর ধরণ (কাইফিয়াত) একমাত্র তিনিই জানেন, সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তিনি যেভাবে ইচ্ছা অবতরণ করেন। এর দ্বারা আরশ খালি হয়ে যাওয়া আবশ্যক হয় না। এটি এমন অবতরণ যা তাঁর জন্য শোভনীয়।
(১) মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ, সংখ্যা ১৬৫৫, তারিখ ২৮ রবিউস সানী ১৪১৯ হি. তে প্রকাশিত।
(২) বুখারী, কিতাবুল জুমুআহ, বাব: আসরের শেষভাগে সালাতে দুআ করা, হা/১১৪৫। মুসলিম, কিতাবু সালাতিল মুসাফিরীন ওয়া কাসরুহা, বাব: রাতের শেষভাগে দুআ ও যিকিরের প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং তার জবাব, হা/৭৫৮।
পৃষ্ঠা ৪০০
মূল আরবি
به جل جلاله، والثلث يختلف في أنحاء الدنيا وهذا شيء يختص به تعالى لا يشابه خلقه في شيء من صفاته كما قال سبحانه: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (¬1) وقال جل وعلا: يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا (¬2) وقال عز وجل في آية الكرسي: وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ (¬3) والآيات في هذا المعنى كثيرة وهو سبحانه أعلم بكيفية نزوله، فعلينا أن نثبت النزول على الوجه الذي يليق بالله، ومع كونه استوى على العرش، فهو ينزل كما يليق به عز وجل ليس كنزولنا، إذا نزل فلان من السطح خلا منه السطح، وإذا نزل من السيارة خلت منه السيارة، فهذا قياس فاسد له؛ لأنه سبحانه لا يقاس بخلقه، ولا يشبه خلقه في شيء من صفاته.
كما أننا نقول: استوى على العرش على الوجه الذي يليق به سبحانه ولا نعلم كيفية استوائه، فلا نشبهه بالخلق ولا نمثله وإنما نقول: استوى استواء يليق بجلاله وعظمته.
(¬1) سورة الشورى الآية 11
(¬2) سورة طه الآية 110
(¬3) سورة البقرة الآية 255
বাংলা অনুবাদ
তাঁর মহিমা সুমহান। আর (রাতের শেষ) তৃতীয়াংশ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন হয়। এটি এমন একটি বিষয় যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্দিষ্ট। তিনি তাঁর কোনো গুণাবলীতেই তাঁর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন: তাঁর মতো কিছুই নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (১)
আর তিনি জাল্লা ওয়া আলা বলেছেন: তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, তিনি তা জানেন, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। (২) আর তিনি আযযা ওয়া জাল্লা আয়াতুল কুরসীতে বলেছেন: আর তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা আয়ত্ত করতে পারে না, তবে তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন। (৩) এই অর্থে আয়াতসমূহ অনেক রয়েছে। আর তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর অবতরণের পদ্ধতি সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত।
সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, এমনভাবে অবতরণকে সাব্যস্ত করা যা আল্লাহর জন্য শোভনীয়। আর আরশের উপর তাঁর সমুন্নত হওয়া সত্ত্বেও তিনি এমনভাবে অবতরণ করেন যা তাঁর আযযা ওয়া জাল্লা-এর জন্য মানানসই, যা আমাদের অবতরণের মতো নয়। যখন কোনো ব্যক্তি ছাদ থেকে নিচে নামে, তখন ছাদটি তার থেকে শূন্য হয়ে যায়। আর যখন সে গাড়ি থেকে নামে, তখন গাড়িটি তার থেকে শূন্য হয়ে যায়। আল্লাহর ক্ষেত্রে এটি একটি ভ্রান্ত তুলনা (কিয়াস ফাসিদ); কারণ তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নন, আর তিনি তাঁর কোনো গুণাবলীতেই সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন।
যেমন আমরা বলি: তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরশের উপর এমনভাবে সমুন্নত হয়েছেন যা তাঁর জন্য শোভনীয়, আর আমরা তাঁর সমুন্নত হওয়ার পদ্ধতি জানি না। সুতরাং আমরা তাঁকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেই না এবং তাঁর কোনো দৃষ্টান্তও স্থাপন করি না। বরং আমরা বলি: তিনি এমনভাবে সমুন্নত হয়েছেন যা তাঁর মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে মানানসই।
(১) সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১
(২) সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১০
(৩) সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫
পৃষ্ঠা ৪০১
মূল আরবি
ولما خاض المتكلمون في هذا المقام بغير حق حصل لهم بذلك حيرة عظيمة، حتى آل بهم الكلام إلى إنكار الله بالكلية، حتى قالوا: لا داخل العالم ولا خارج العالم ولا كذا ولا كذا، حتى وصفوه بصفات معناها العدم وإنكار وجوده سبحانه بالكلية، ولهذا ذهب أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم وأهل السنة والجماعة تبعا لهم فأقروا بما جاءت به النصوص من الكتاب والسنة، وقالوا: لا يعلم كيفية صفاته إلا هو سبحانه، ومن هذا ما قاله مالك رحمه الله:الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والإيمان به واجب والسؤال عنه بدعةيعني: عن الكيفية ومثل ذلك ما يروى عن أم سلمة رضي الله عنها وعن ربيعة بن أبي عبد الرحمن شيخ مالك رحمهما الله:الاستواء غير مجهول، والكيف غير معقول والإيمان بذلك واجبومن التزم بهذا الأمر سلم من شبهات كثيرة، ومن اعتقادات لأهل الباطل كثيرة عديدة وحسبنا أن نثبت ما جاء في النصوص وألا نزيد على ذلك.
وهكذا نقول: يسمع ويتكلم ويبصر ويغضب ويرضى على وجه يليق به سبحانه ولا يعلم كيفية صفاته إلا هو، وهذا هو طريق
বাংলা অনুবাদ
যখন কালামপন্থীরা (দার্শনিক ধর্মতাত্ত্বিকগণ) এই বিষয়ে অন্যায়ভাবে (বিনা দলিলে) প্রবেশ করল, তখন তারা চরম বিভ্রান্তির শিকার হলো। এমনকি তাদের আলোচনা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহকে অস্বীকার করার দিকে নিয়ে গেল। তারা বলতে শুরু করল: তিনি জগতের ভেতরেও নন, জগতের বাইরেও নন, এমনও নন, তেমনও নন। এমনকি তারা আল্লাহকে এমন সব গুণে গুণান্বিত করল যার অর্থ হলো অস্তিত্বহীনতা এবং সম্পূর্ণরূপে তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।
এই কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ এবং তাঁদের অনুসারী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (সুন্নাহ ও জামাআতের অনুসারীরা) কিতাব ও সুন্নাহর মাধ্যমে যা এসেছে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন: তাঁর (সুবহানাহু) গুণাবলীর স্বরূপ (কাইফিয়াত) একমাত্র তিনিই জানেন।
এর অন্তর্ভুক্ত হলো ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ-এর সেই উক্তি: ‘আল-ইসতিওয়া (আল্লাহর আরশের উপর সমুন্নত হওয়া) জানা বিষয়, কিন্তু এর স্বরূপ (কাইফ) অজানা। এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।’ অর্থাৎ, এর স্বরূপ (কাইফিয়াত) সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত।
অনুরূপভাবে, উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ-এর শিক্ষক রাবীআহ ইবনু আবী আব্দুর রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকেও বর্ণিত আছে: ‘আল-ইসতিওয়া অজানা নয়, কিন্তু এর স্বরূপ (কাইফ) বোধগম্য নয় (অকল্পনীয়), আর এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব।’
যে ব্যক্তি এই নীতিতে অটল থাকবে, সে অসংখ্য সংশয় এবং বাতিলপন্থীদের বহুবিধ ভ্রান্ত আকীদা থেকে নিরাপদ থাকবে। আমাদের জন্য যথেষ্ট হলো, যা নসসমূহে (প্রমাণিক টেক্সটসমূহে) এসেছে তা সাব্যস্ত করা এবং এর অতিরিক্ত কিছু না বলা।
অনুরূপভাবে আমরা বলি: তিনি শোনেন, কথা বলেন, দেখেন, রাগ করেন এবং সন্তুষ্ট হন—এমনভাবে যা তাঁর (সুবহানাহু) জন্য শোভনীয়। আর তাঁর গুণাবলীর স্বরূপ (কাইফিয়াত) একমাত্র তিনিই জানেন। আর এটাই হলো (আহলুস সুন্নাহর) পথ।
সারকথা, এই হাদিসের বৈজ্ঞানিক অসারতা শুধু একটি ভুল নয়—এটি সপ্তম শতাব্দীর ভূ-কেন্দ্রিক, সমতল-পৃথিবী ধারণার স্পষ্ট ছাপ। আধুনিক বিজ্ঞানের নির্মম আলোয় এই বর্ণনা আর টিকে থাকতে পারে না; এটি শুধু অবৈজ্ঞানিক নয়, বরং ঈশ্বরের অসীমত্বের দাবিকে একেবারে ধুলিসাৎ করে দেয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভূ-কেন্দ্রিক ধারণা (Geocentrism)
এই হাদিসগুলোর ভাষা ও কল্পচিত্র—“নিকটবর্তী আসমান”, “নেমে আসা”, “উপরে ওঠা”, “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ”—মূলত এমন এক মহাবিশ্ব-ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে, যা সপ্তম শতাব্দীর মানুষের সাধারণ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সে সময়কার প্রচলিত কসমোলজিতে পৃথিবীকে প্রায়শই স্থির কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হতো; আকাশকে ভাবা হতো স্তরভাগে সাজানো এক ধরনের গম্বুজ/স্তরিত “উর্ধ্বলোকে”, যেখানে “নিচের আসমান” থেকে “উচ্চতর আসমান”—এভাবে একটি উল্লম্ব বিন্যাস স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। এই ভূ-কেন্দ্রিক কল্পনায় “রাতের শেষ প্রহর” মানে ছিল একটি নির্দিষ্ট জনপদের একই ধরনের স্থির সময়-অভিজ্ঞতা, যেখানে আকাশের “উপরে” ও পৃথিবীর “নিচে” সম্পর্কে এক ধরনের স্বজ্ঞাত (intuitive) ধারণা কাজ করত।
কিন্তু আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান ও ভূ-বিজ্ঞানের আলোকে এই ভাষা ও ধারণাগত কাঠামো একাধিক জায়গায় সমস্যায় পড়ে। প্রথমত, সময় অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত; ফলে “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” কোনো একক বৈশ্বিক সময় নয়। দ্বিতীয়ত, “উপরে-নিচে” বা “নেমে আসা-উঠে যাওয়া”—এগুলো পৃথিবী-কেন্দ্রিক দিকবোধের ফল; মহাজাগতিক পরিসরে “নিচে” বা “উপরে” বলে কোনো সর্বজনীন ধ্রুব দিক নেই—দিক নির্ধারিত হয় পর্যবেক্ষকের অবস্থান, মহাকর্ষক্ষেত্র, এবং স্থানীয় ফ্রেম অব রেফারেন্সের ভিত্তিতে। ফলে হাদিসের বর্ণনাটি ঐতিহাসিকভাবে বোধগম্য হলেও, আধুনিক বিশ্বচিত্রে সেটাকে আক্ষরিক ও সার্বজনীন ভৌত ঘটনা হিসেবে দাঁড় করাতে গেলে ব্যাখ্যার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে—এবং সেই চাপই বহু ক্ষেত্রে বর্ণনাটিকে যুক্তিগতভাবে টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তোলে।
ধর্মীয় চিন্তায় যুক্তিবাদের অভাব ও সামাজিক প্রভাব
এই হাদিসের মতো বর্ণনায় যখন আধুনিক বিজ্ঞান ও সাধারণ যুক্তির সঙ্গে খোলা অসামঞ্জস্য সামনে আসে, তখন বহু ধর্মীয় স্কলার সাধারণত একটি পরিচিত আশ্রয়ে যান—“কীভাবে হয়, আমরা জানি না”, “আল্লাহর ধরণ অজানা”, বা “এগুলো নিয়ে চিন্তা করা ঠিক নয়” ধরনের জবাব। ফতোওয়া আরকানুল ইসলামের উদ্ধৃতিতেও এই মানসিক কাঠামো স্পষ্ট: প্রশ্নকে বৈধ অনুসন্ধান হিসেবে না দেখে, তাকে প্রায় “অপ্রয়োজনীয়/অবাঞ্ছিত” কৌতূহল হিসেবে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই উত্তরগুলো বাস্তবে কোনো যুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়—এগুলো মূলত একটি এপিস্টেমিক এক্সিট: সমস্যার সমাধান নয়, সমস্যাটিকে চিন্তার বাইরে সরিয়ে রাখা।
এর সামাজিক পরিণতি গুরুত্বপূর্ণ। যখন শিক্ষিত সমাজও স্পষ্ট অসংগতিকে “অলৌকিকতা” বলে নির্বিচারে অনুমোদন করে, তখন সমালোচনামূলক চিন্তা (critical thinking) ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ এখানে শেখানো হয়—বিরোধ, ফাঁকফোকর, বা প্রশ্ন দেখা দিলেই অনুসন্ধান নয়; বরং “মেনে নেওয়া”ই নৈতিক কর্তব্য। ফলাফল হিসেবে গড়ে ওঠে এমন এক সংস্কৃতি যেখানে প্রমাণ, যুক্তি, ও যাচাই নয়—আবেগ, কর্তৃত্ব, ও আনুগত্য বেশি শক্তিশালী মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে; বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার সাথে ধর্মীয় চিন্তার মধ্যে একটি স্থায়ী ফাটল তৈরি করে—যেখানে প্রশ্ন করা “শিক্ষা” নয়, বরং “অপরাধ” হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।
উপসংহার
পরিণামে দেখা যায়, “প্রতি রাতে আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন” — এই বর্ণনাকে যদি সরল ও আক্ষরিক অর্থে ধরা হয়, তবে তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূ-বিজ্ঞান এবং দর্শনগত ঈশ্বর-ধারণার সঙ্গে একাধিক স্তরে সংঘর্ষে পড়ে। পৃথিবীর গোলাকৃতি, নিজ অক্ষে ঘূর্ণন, সময় অঞ্চলের বৈচিত্র্য, এবং একই মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” বিদ্যমান থাকার বাস্তবতা—সব মিলিয়ে এই হাদিসের সময়-নির্ভর কাঠামোকে ভৌত-বাস্তব ঘটনা হিসেবে দাঁড় করানো কঠিন হয়ে যায়। উপরন্তু, “অবতরণ/আরোহণ” ধরনের স্থানগত ক্রিয়া ঈশ্বরকে লোকেশন-নির্ভর ও গতিশীল সত্তায় নামিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করে—যা “অসীম, অতীন্দ্রিয়, স্থান-কাল-অতীত” সত্তার দাবির সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
তাই এখানে মূল প্রশ্নটি ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদণ্ডের: কোনো দাবি “নির্ভরযোগ্য” বলে প্রচলিত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তিসঙ্গত হয়ে যায় না। সত্য অনুসন্ধান মানে কেবল বিশ্বাসকে রক্ষা করা নয়; বরং বিশ্বাসের দাবিগুলোকে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, প্রমাণ, এবং অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য—এইসব মানদণ্ডে যাচাই করা। বিজ্ঞানের যুগে প্রাচীন কসমোলজি ও ভূ-কেন্দ্রিক কল্পনার উপর দাঁড়ানো ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করা, তাদের ব্যাখ্যাকে পরীক্ষার মুখে দাঁড় করানো, এবং প্রয়োজন হলে পুনর্মূল্যায়ন করা—এটাই জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক দাবি।
তথ্যসূত্রঃ
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৬০৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১০৭৯ ↩︎
- আল-লুলু ওয়াল মারজান, হাদিসঃ ৪৩৪ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৬ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১২২৩ ↩︎
- আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিসঃ ৭৫৮ ↩︎
- ইবনু বাযের ফতোয়া, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩১১–৩১৫ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৬১–৬৫ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ২০৬–২১০ ↩︎
- ইবনু বাযের ফতোয়া, খণ্ড ২৮, পৃষ্ঠা ৩৯৮–৪০২, নিচে বিস্তারিত ↩︎
- ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম, মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন, পৃষ্ঠা ৮০, ৮১ ↩︎
- ইবনু বাযের ফতোয়া, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৪১–৩৪৫ ↩︎
- ইবনু বাযের ফতোয়া, খণ্ড ২৮, পৃষ্ঠা ৩৯৮–৪০২ ↩︎

