ভূমিকা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি এবং তিনি কোথায় ও কীভাবে আছেন—এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে কোরআন ও হাদিসের বহু বর্ণনা জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত একটি বিবরণ হলো “নজুলে ইলাহি”: প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ এবং বান্দাদের প্রতি আহ্বান। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ প্রধান হাদিসগ্রন্থগুলোতে এই বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে বিষয়টি কোনো লোকমুখে প্রচলিত বিচ্ছিন্ন গল্পের অবস্থানে নেই; হাদিসের কর্তৃত্ব স্বীকার করা ধর্মীয় পরিসরে এটি আল্লাহ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সংবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট আসমানে অবতরণের এই বক্তব্যকে তাই তার নিজের ভাষা ও দাবির গুরুত্ব অনুযায়ী বিচার করতে হয়।
বর্ণনাটিতে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে: অবতরণকারী আল্লাহ; অবতরণের গন্তব্য দুনিয়ার বা নিকটবর্তী আসমান; সময় রাতের একটি নির্দিষ্ট অংশ; এবং সেই সময় বান্দাদের ডেকে প্রার্থনা, চাওয়া ও ক্ষমার আবেদন করতে বলা। এগুলো শুধু আবেগপূর্ণ ধর্মীয় শব্দ নয়। “কোথায়”, “কখন” এবং “কী করেন”—এই তিন প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়ার দাবি রয়েছে এর মধ্যে। কোনো সত্তা কোথাও অবতরণ করেন বলা হলে অবস্থান ও দিকের প্রশ্ন আসে; প্রতি রাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে করেন বলা হলে সময়ের প্রশ্ন আসে। অথচ সেই সত্তাকেই আবার অসীম, সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা এবং সৃষ্টির সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে বলে ঘোষণা করা হয়। সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে থাকার ঘোষণা এবং পৃথিবীর স্থানীয় রাতের সঙ্গে বাঁধা অবতরণ—এই দুই দাবির সম্পর্কই সমস্যার কেন্দ্র।
পৃথিবীর রাত কোনো একক বৈশ্বিক ঘটনা নয়, যা একই মুহূর্তে সবার জন্য শুরু ও শেষ হয়। পৃথিবী গোলাকার এবং নিজ অক্ষে ঘূর্ণনশীল। সেই ঘূর্ণনের কারণে এক অঞ্চলে যখন রাতের শেষভাগ, অন্য অঞ্চলে তখন সন্ধ্যা, সকাল অথবা দিন। বাংলাদেশের ফজর হয়ে গেলেই পৃথিবীর সব অঞ্চলের শেষ রাত শেষ হয়ে যায় না। আরও পশ্চিমের অঞ্চলে তখনও রাত চলতে পারে, এবং পর্যায়ক্রমে অন্য অঞ্চলেও শেষ তৃতীয়াংশ আসে। এই পার্থক্য মানুষের বানানো ঘড়ি বা প্রশাসনিক সময় অঞ্চলের কারণে তৈরি হয়নি; ঘড়ি না থাকলেও সূর্যালোক ও অন্ধকারের ভৌগোলিক পার্থক্য একইভাবে থাকত। ফলে “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” কথাটির অর্থ নির্ধারণ করতে হলে কোনো না কোনো স্থানের রাতকে ভিত্তি ধরতেই হয়।
এখানেই একটি স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন মহাজাগতিক ঘটনার ভাষায় প্রকাশ করার সমস্যা সামনে আসে। একটি জনপদে শেষ রাত এলে ঈশ্বর নামলেন এবং সেখানে ফজর হলে তাঁর আহ্বানের সেই পর্যায় শেষ হলো—এই ছবি স্থানীয় আকাশ ও স্থানীয় রাতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সহজে মিলে যায়। কিন্তু পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য একই দাবি কার্যকর করতে গেলে অবতরণের সময় আর একটি জনপদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন অঞ্চলের শেষ রাত পৃথিবীজুড়ে পর্যায়ক্রমে উপস্থিত হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, একবারের অবতরণ কীভাবে সব অঞ্চলের আলাদা সময়ে প্রযোজ্য হচ্ছে, আর অবতরণকে অঞ্চল অনুযায়ী আলাদা করে ধরলে একই মুহূর্তে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কী বলা হচ্ছে। “আল্লাহ পারেন” উচ্চারণ করা এসব সম্পর্কের ব্যাখ্যা দেয় না; সেটি ক্ষমতার আরেকটি দাবি যোগ করে।
প্রাচীন উল্লম্ব বিশ্বচিত্রে মানুষের মাথার ওপরে আকাশ, আকাশের আরও ওপরে দেবতা বা ঈশ্বরের আবাস, আর নিচে মানুষের পৃথিবী—এই বিন্যাসে দেবতার নামা ও মানুষের ওঠা কল্পনা করা সহজ। সমতল পৃথিবীর ওপর স্তরবিন্যস্ত আকাশের মডেলেও এমন দৃশ্য স্বাভাবিকভাবে বসে যায়। ইসলামি নজুলের বর্ণনায় সেই পরিচিত উপাদানগুলোই রয়েছে: ঊর্ধ্বস্থিত ঈশ্বর, নিম্নবর্তী আসমান, নিচে অবস্থানকারী মানুষ এবং মানুষের রাতের একটি নির্বাচিত সময়ে ঈশ্বরের অবতরণ। পূর্ববর্তী ধর্মীয় সাহিত্যের ঈশ্বর-অবতরণের কাহিনির সঙ্গেও এই উপাদানগুলোর মিল রয়েছে। এই কল্পচিত্রের স্বাভাবিকতা আসে মানুষের স্থানীয় আকাশ-দর্শন থেকে; পৃথিবীর বৈশ্বিক দিন–রাতের ব্যবস্থা তার মধ্যে নিজে থেকে ব্যাখ্যাত হয়ে যায় না।
কোনো বর্ণনা প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে আছে, বহু মানুষ বিশ্বাস করে কিংবা তার পক্ষে প্রভাবশালী আলেম বক্তব্য দিয়েছেন—এসব দিয়ে মহাবিশ্ব সম্পর্কে তার দাবি সত্য হয় না। পৃথিবীর আকৃতি ও দিন–রাতের বাস্তবতা ধর্মীয় অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে না। সেই বাস্তবতার সঙ্গে একটি আক্ষরিক অবতরণের বর্ণনার সামঞ্জস্য দেখাতে না পেরে প্রশ্ন করাই নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে জ্ঞানের কোনো অগ্রগতি ঘটে না; অমীমাংসিত দাবিটি শুধু কর্তৃত্বের সুরক্ষা পায়। পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের বদলে আনুগত্য দিয়ে মহাজাগতিক গল্পকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার এই পদ্ধতিই কুসংস্কারকে টিকিয়ে রাখে। একটি বিশ্বাসের প্রাচীনত্ব কিংবা পবিত্রতার ঘোষণা তাকে যুক্তিগত পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেয় না।

হাদিসের নির্ভুলতার দাবি: নবীর বক্তব্যকে ঐশী সত্যের মর্যাদা
ইসলামি আকিদায় মুহাম্মদের সত্যবাদিতা এবং তাঁর প্রচারিত ধর্মীয় সংবাদের কর্তৃত্ব মৌলিক গুরুত্ব বহন করে। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি ও অদৃশ্য জগত সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যকে সাধারণ মানুষের অনুমান হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না; সেগুলোকে ঐশী তত্ত্বাবধানে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই বিশ্বাসের মধ্যে নবীর বক্তব্যের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য নবীর নিজের ঘোষণাও ব্যবহৃত হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আমরের বর্ণনায় মুহাম্মদ তাঁর মুখ থেকে শুধু সত্য বের হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রাগ বা সন্তুষ্টির সময়েও তাঁর কথা লিখে রাখার নির্দেশ সেই ঘোষণার সঙ্গেই যুক্ত। ফলে বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের জায়গায় বক্তার সর্বব্যাপী সত্যবাদিতাকে অগ্রিম নিশ্চয়তা হিসেবে দাঁড় করানো হয়। [1]
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ قَالاَ حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ الأَخْنَسِ، عَنِ الْوَلِيدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُغِيثٍ، عَنْ يُوسُفَ بْنِ مَاهَكَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ كُنْتُ أَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ أَسْمَعُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أُرِيدُ حِفْظَهُ فَنَهَتْنِي قُرَيْشٌ وَقَالُوا أَتَكْتُبُ كُلَّ شَىْءٍ تَسْمَعُهُ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَشَرٌ يَتَكَلَّمُ فِي الْغَضَبِ وَالرِّضَا فَأَمْسَكْتُ عَنِ الْكِتَابِ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَوْمَأَ بِأُصْبُعِهِ إِلَى فِيهِ فَقَالَ «اكْتُبْ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلاَّ حَقٌّ».
বাংলা অনুবাদ:
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ শিক্ষা-বিদ্যা, (জ্ঞান-বিজ্ঞান)
পরিচ্ছেদঃ ৪১৭. ইলম লিপিবদ্ধ করা সম্পর্কে।
৩৬০৭. মুসাদ্দাদ ও আবু বকর ইবনে আবি শাইবা বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, ইয়াহইয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন, উবাইদুল্লাহ ইবনুল আখনাস থেকে, তিনি ওয়ালিদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবি মুগিস থেকে, তিনি ইউসুফ ইবনে মাহাক থেকে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে। তিনি বলেনঃ আমি যা কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে শ্রবণ করতাম, তা লিখে রাখতাম। আমি ইচ্ছা করতাম যে, আমি এর সবই সংরক্ষণ করি। কিন্তু কুরাইশরা আমাকে এরূপ করতে নিষেধ করে এবং বলেঃ তুমি যা কিছু শোন তার সবই লিখে রাখ, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, তিনি তো কোন সময় রাগান্বিত অবস্থায় কথাবার্তা বলেন এবং খুশীর অবস্থায়ও বলেন। একথা শুনে আমি লেখা বন্ধ করি এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবহিত করি। তখন তিনি তার আঙুল দিয়ে নিজের মুখের প্রতি ইশারা করে বলেনঃ তুমি লিখতে থাক, ঐ সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, যা কিছু এ মুখ হতে বের হয়, তা সবই সত্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)
এই বর্ণনার ঘটনাক্রমে সংশয়ের কারণ এবং সংশয় থামানোর পদ্ধতি—দুটিই স্পষ্ট। কুরাইশদের আপত্তির ভিত্তি ছিল মানুষের পরিচিত আচরণ: মানুষ রাগ করে, সন্তুষ্ট হয়, এবং সেই আবেগ তার কথার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আবদুল্লাহ সেই আপত্তি শুনে লেখা বন্ধ করেছিলেন। জবাবে মুহাম্মদ কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যের সত্যতার পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ হাজির করেননি; নিজের মুখের দিকে ইশারা করে সমস্ত বক্তব্যের জন্য একযোগে সত্যতার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিটি দাবি আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজনকে বক্তার নিজের ঘোষণা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যে ব্যক্তির কথার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন, সেই ব্যক্তিই নিজের কথার চূড়ান্ত সত্যতার জামিন হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।
এখানে যুক্তিগত সমস্যাটি সরাসরি। “আমার মুখ থেকে শুধু সত্য বের হয়”—এই বাক্যটি নিজেও বক্তার একটি বক্তব্য। সেটিকে প্রমাণহীনভাবে সত্য ধরে নিয়ে তাঁর অন্য সব বক্তব্য সত্য বলা হলে মূল দাবিটিকেই তার নিজের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অন্য কোনো ধর্মপ্রচারক, সাধু বা গুরু একই ঘোষণা দিলে শুধু ঘোষণার জোরে তাঁর মহাজাগতিক কাহিনিগুলো সত্য হয়ে যেত না। মুহাম্মদের ক্ষেত্রেও সত্যতার মানদণ্ড একই থাকবে। কোনো বাক্যের পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে; বক্তা নিজের নির্ভুলতা ঘোষণা করেছেন বলেই সেই বাক্যকে পর্যবেক্ষণের ঊর্ধ্বে তুলে দেওয়া যায় না।
এই ঘোষণাকে ধর্মীয় কর্তৃত্বের মধ্যে গ্রহণ করার পরে তার প্রভাব শুধু একটি হাদিসে সীমিত থাকে না। আল্লাহ কোথায় আছেন, কখন অবতরণ করেন, কোন আসমানে নামেন এবং কতক্ষণ আহ্বান করেন—এসব বক্তব্যও সেই পূর্বনির্ধারিত সত্যতার আওতায় চলে আসে। একজন বিশ্বাসীর কাছে তখন বর্ণনাটি সত্য কি না, সেই প্রশ্নের বদলে সেটিকে সত্য ধরে রেখে কীভাবে বোঝানো যায়, সেই প্রশ্ন প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সংঘর্ষ দেখা দিলে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই ধর্মীয় আনুগত্য একটি মহাজাগতিক দাবিকে যুক্তিগত পরীক্ষার বাইরে রাখার ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
কোরআনের সূরা নাজমেও মুহাম্মদের বক্তব্যকে প্রবৃত্তিনির্ভর কথার বদলে ওহি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ঘোষণার মাধ্যমে বক্তব্যের উৎসকে মানুষের সাধারণ জ্ঞান ও অনুমান থেকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়। ফলে আল্লাহ সম্পর্কে তাঁর সংবাদের পক্ষে যে সত্যতার দাবি তোলা হয়, তার শক্তিও অসাধারণ: বক্তব্যটি মানুষের তৈরি হলে যে ভুলের সম্ভাবনা স্বাভাবিক, ঐশী সংবাদ বলে গ্রহণ করার পরে সেই সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হয়। [2]
وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلْهَوَىٰٓ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْىٌ يُوحَىٰ
বাংলা অনুবাদ: তিনি প্রবৃত্তির বশে কথা বলেন না। তা তো কেবল ওহি, যা তাঁর কাছে পাঠানো হয়।
কিন্তু কোনো বক্তব্যকে ওহি বলা এবং সেই বক্তব্য সত্য হওয়া একই ঘটনা নয়। প্রথমটি উৎস সম্পর্কে ধর্মীয় দাবি; দ্বিতীয়টি বক্তব্যের যথার্থতার প্রশ্ন। দাবিকৃত উৎসের পরিচয় দিয়েই যথার্থতা প্রতিষ্ঠা করা হলে পরীক্ষা করার মতো আর কিছু থাকে না। তখন “আল্লাহ বলেছেন” প্রমাণের জায়গা নেয়, আর “নবী ভুল বলেন না” বিরোধী পর্যবেক্ষণ বাতিল করার নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে যেকোনো বিশ্বাস নিজের প্রতিষ্ঠাতাকে নির্ভুল ঘোষণা করে নিজেকে পরীক্ষার বাইরে রাখতে পারে। ধর্মীয় নিশ্চয়তার এমন ব্যবস্থা বাস্তবতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান উৎপন্ন করে না; পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকে অক্ষত রাখে।
হাদিসকে “সহিহ” বলা থেকেও পৃথিবীর আকৃতি, দিন–রাতের বিন্যাস বা আকাশের গঠন সম্পর্কে তার বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় না। বর্ণনাসূত্রকে গ্রহণযোগ্য বলা এবং বর্ণিত মহাজাগতিক ঘটনাকে পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠা করা পৃথক কাজ। কোনো কথা মুহাম্মদ বলেছেন বলে গ্রহণ করা হলেও সেই কথার বিষয়বস্তু পরীক্ষা করার প্রশ্ন থেকে যায়। একজন ব্যক্তি সত্যিই একটি দাবি করেছেন—এটি প্রতিষ্ঠিত হলে দাবিটির ইতিহাস জানা যায়; তার মাধ্যমে দাবিকৃত ঘটনাটির বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না। পৃথিবী কীভাবে ঘোরে কিংবা বিভিন্ন অঞ্চলে কখন শেষ রাত আসে, সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো বর্ণনাসূত্র দিতে পারে না।
আল্লাহর অবতরণের হাদিসের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই বর্ণনাকে একদিকে নির্ভুল ঐশী সংবাদ বলে বাধ্যতামূলক বিশ্বাসের বিষয় করা এবং অন্যদিকে তার সময়, অবস্থান ও অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই প্রশ্নকারীকে থামিয়ে দেওয়া একটি কর্তৃত্বনির্ভর ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থায় বর্ণনাটিকে ভুল প্রমাণ করার পথ আগেই বন্ধ করে রাখা হয়। অথচ সত্যতার দাবি যত বড়, তার পক্ষে প্রমাণের দায়ও তত বড়। সর্বজ্ঞ সত্তার কাছ থেকে আসা সংবাদ বলে কোনো বিবরণ প্রচারিত হলে তার অসামঞ্জস্যকে মানুষের সীমিত জ্ঞানের অজুহাতে ঢেকে দেওয়া সেই সংবাদকে নির্ভুল করে না। বিশ্বাসের নির্দেশ বাস্তবতার বিকল্প হতে পারে না।
হাদিসের মূল বিবরণ: কে নামেন, কোথায় নামেন এবং কখন নামেন
আল্লাহর অবতরণের বর্ণনায় অবতরণকারী, গন্তব্য এবং সময়—তিনটিই নির্দিষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনার আরবি শব্দ يَنْزِلُ অবতরণ বোঝায়; إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا সেই অবতরণের গন্তব্য নির্দেশ করে; আর كُلَّ لَيْلَةٍ ঘটনাটিকে প্রতি রাতের পুনরাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত করে। এরপর রাতের নির্দিষ্ট অংশের উল্লেখ করা হয়। এই শব্দগুলো একত্রে একটি ক্রিয়ার বিবরণ তৈরি করছে। সেই বিবরণে বক্তা কী দাবি করছেন, তা বোঝার ভিত্তি বর্ণনার নিজের ভাষা।
বুখারির বর্ণনা: প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশে অবতরণ
সহিহ বুখারির বর্ণনায় স্পষ্টভাবে “আমাদের রব” বলা হয়েছে এবং অবতরণের সময় হিসেবে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকার কথা এসেছে। এরপর একই কর্তার সঙ্গে ডাকে সাড়া দেওয়া, প্রার্থিত বস্তু দান করা এবং ক্ষমা করার ঘোষণা যুক্ত হয়েছে। অবতরণ ও আহ্বান এখানে একই বর্ণনার ধারাবাহিক ক্রিয়া। [3]
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، وَأَبِي عَبْدِ اللَّهِ الأَغَرِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ».
বাংলা অনুবাদ:
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৭২৮. রাতের শেষভাগে দু’আ করা ও সালাত আদায় করা। আল্লাহ্পাক ইরশাদ করেছেনঃ রাতের সামান্য পরিমাণ (সময়) তাঁরা নিদ্রারত থাকেন, শেষ রাতে তাঁরা ইসতিগ্ফর করেন। (সূরা আয্-যারিয়াতঃ ১৮)।
১০৭৯। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা মালিক থেকে, তিনি ইবনু শিহাব থেকে, তিনি আবু সালামা ও আবু আবদুল্লাহ আল-আগার থেকে, তাঁরা আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছ এমন যে, আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছ এমনে, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই পাঠে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ কোনো অলংকারমূলক বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। সেটি ঘটনাটি কখন ঘটে, তার উত্তর। “প্রতি রাতে” কথাটি পুনরাবৃত্তি নির্ধারণ করছে, আর “শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে” সেই পুনরাবৃত্তির ভেতরে সময়ের একটি সীমা নির্ধারণ করছে। কোনো ব্যক্তিকে দিনের যেকোনো সময় প্রার্থনা করার সাধারণ আহ্বান এবং নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর অবতরণের ঘোষণা ভিন্ন বক্তব্য। দ্বিতীয় বক্তব্যে বাড়তি একটি মহাজাগতিক ঘটনার দাবি রয়েছে। ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সেই বাড়তি দাবির প্রমাণের দায় বাদ দেওয়া যায় না।
আল-লুলু ওয়াল মারজান: একই ঘোষণার সংকলিত পাঠ
আল-লুলু ওয়াল মারজানের উদ্ধৃতিতেও রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, নিকটবর্তী আসমান এবং আল্লাহর সরাসরি আহ্বান একই সঙ্গে আছে। উদ্ধৃতির শেষে বুখারি ও মুসলিমের সূত্রও দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি মূল বর্ণনার প্রতিষ্ঠিত সংকলনগত অবস্থান দেখায়; একই সংবাদ পরবর্তী সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [4]
আল-লুলু ওয়াল মারজান
৬/ মুসাফির ব্যক্তির সালাত ও তা ক্বসর করার বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ৬/২৪. শেষ রাতে দুআ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং সে সময় কবূল হওয়া।
৪৩৪. আবূ হুরায়রাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ১৯ ; তাহাজ্জুদ, অধ্যায় ১৪, হাঃ ১১৪৫; মুসলিম, পর্ব ৬; মুসাফির ব্যক্তির সালাত ও তা কসর করার বর্ণনা, অধ্যায় ২৩, হাঃ ৭৫৮
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
“আমাকে ডাকবে”, “আমার নিকট চাইবে” এবং “আমার নিকট ক্ষমা চাইবে”—এই বাক্যগুলোতে বক্তার পরিচয়ও স্পষ্ট রাখা হয়েছে। যে সত্তার অবতরণের কথা বলা হচ্ছে, আহ্বান তাঁর নিজের নামে। তাই বর্ণনার ভাষা বিশ্লেষণে কর্তা বাদ দিয়ে কেবল প্রার্থনার আবেগটুকু রেখে দিলে ঘটনাটির মূল কাঠামোই বাদ পড়ে যায়। নিকটবর্তী আসমানে আগমন এবং মানুষের প্রতি আহ্বান—দুটিই এখানে ঘোষিত সংবাদটির অংশ।
তিরমিজির বর্ণনা: প্রথম তৃতীয়াংশের পরে অবতরণ এবং সংকলকের অগ্রাধিকার
তিরমিজির উদ্ধৃতিতে অবতরণের সূচনাকাল হিসেবে রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই উদ্ধৃতির শেষে তিরমিজি আবার শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকার পাঠকে সবচেয়ে সহিহ বর্ণনা বলেছেন। একটি সংকলনের একই আলোচনাতেই সংরক্ষিত পাঠ এবং সংকলকের নির্বাচিত অগ্রাধিকার পাশাপাশি রয়েছে। [5]
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২/ সালাত (নামায)
পরিচ্ছেদঃ প্রত্যেক রাতেই আল্লাহ্ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন।
৪৪৬. কুতায়বা ইয়াকুব ইবনে আবদুর রহমান আল-ইস্কান্দারানি থেকে, তিনি সুহাইল ইবনে আবি সালিহ থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে প্রত্যেক রাতেই আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেনঃ আমিই রাজধিরাক, যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাককে কবূল করি, যে আমার কাছে যাঞ্ছা করে আমি তাকে দেই, যে আমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে আমি তাকে ক্ষমা করে দেই। ফজরের আলো উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। - ইবনু মাজাহ ১৩৬৬, বুখারি ও মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৪৪৬ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই বিষয়ে আলী ইবনু আবূ তালিব, আবূ সাঈদ, রিফাআ আল-জুহানী, জুবায়র ইবনু মুতঈম, ইবনু মাসঊদ, আবূদ্ দারদা এবং উসমান ইবনু আবিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী (রহঃ) বলেনঃ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বহু সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ রাতের শেষ তৃতীয়াংশ যখন অবশিষ্ট থাকে, তখন আল্লাহ তা’আলা নেমে আসেন এই রিওয়ায়াতটই সবচেয়ে সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
প্রথম তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হওয়া এবং শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হওয়া একই সময় নয়। প্রথমটির পরে রাতের দুই-তৃতীয়াংশ বাকি থাকে; দ্বিতীয়টির পরে বাকি থাকে এক-তৃতীয়াংশ। রাত বারো ঘণ্টার হলে এই দুই সূচনাকালের ব্যবধান চার ঘণ্টা। ফলে সময়ের বর্ণনাভেদটি সামান্য শব্দবদল নয়; ঘোষিত ঘটনার সূচনাকাল এবং তার সঙ্গে যুক্ত বিশেষ প্রার্থনার সময়সীমায় বড় পার্থক্য তৈরি করে। তিরমিজি নিজে একটি পাঠকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এটিও স্পষ্ট হয় যে তাঁর কাছে সংরক্ষিত সব পাঠ একই মাত্রার নির্ভুল ও অভিন্ন বয়ান ছিল না।
মিশকাত ও আদাবুল মুফরাদ: অবতরণ, আহ্বান ও ভোরের সীমা
মিশকাতের উদ্ধৃতিতে মূল অবতরণের ঘোষণার সঙ্গে মুসলিমের আরেকটি বর্ণনার অতিরিক্ত বিবরণ দেওয়া হয়েছে: হাত প্রসারিত করা, করজ দেওয়ার আহ্বান এবং সকাল পর্যন্ত সেই বক্তব্য চালু থাকা। অর্থাৎ বর্ণনাটির মধ্যে শুধু একটি অস্পষ্ট নৈকট্যের ধারণা নেই; আহ্বানের বিষয়বস্তু ও তার সময়সীমাও সংরক্ষিত আছে। [6]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৪ঃ সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৩৩. প্রথম অনুচ্ছেদ - ক্বিয়ামুল লায়ল-এর প্রতি উৎসাহ দান
১২২৩-(৫) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ প্রতি রাত্রে শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বারাকাতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব।’ (বুখারী, মুসলিম)(1)
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, কে আছে যে এমন লোককে করয দেবে যিনি ফকীর নন, না অত্যাচারী এবং সকাল পর্যন্ত এ কথা বলতে থাকেন।
(1) সহীহ : বুখারী ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আদাবুল মুফরাদেও একই আবু হুরাইরার সূত্রে প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণের বর্ণনা রয়েছে। এখানে ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য একটি বিশেষ সময় চিহ্নিত করার সঙ্গে সেই সময়ের পক্ষে আল্লাহর একটি নির্দিষ্ট ক্রিয়াকে ভিত্তি করা হয়েছে। শেষ রাতে প্রার্থনার উৎসাহ এবং সেই উৎসাহের পক্ষে ব্যবহৃত মহাজাগতিক ব্যাখ্যা একই দাবির দুটি স্তর। [7]
আল-আদাবুল মুফরাদ
মেহমানদারি
পরিচ্ছেদঃ ৩২০- রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দোয়া করা।
৭৫৮। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমাদের বরকতময় মহামহিম প্রভু রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে প্রতি রাতে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দিবো? (কে আছে এমন, যে আমার কাছে দোয়া করবে এবং আমি তার দোয়া কবুল করবো)? কে আছে এমন, যে আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করবে এবং আমি তা দান করবো? কে আছে এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে এবং আমি তাকে ক্ষমা করবো। -(বুখারী, মুসলিম, দারিমী)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই সংকলনগুলোতে বর্ণনাটি থাকার ফলে ইসলামি সাহিত্যে তার বিস্তার বোঝা যায়। কিন্তু একটি উদ্ধৃতি বুখারিতে, একই সূত্রের বিবরণ আরেক সংকলনে এবং সেই গ্রন্থগুলোর ওপর নির্ভরশীল নির্বাচিত সংকলনে থাকা—এসবকে আলাদা আলাদা মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ বলা যায় না। এখানে বহু গ্রন্থে সংরক্ষিত ধর্মীয় সংবাদ রয়েছে। আল্লাহকে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করতে বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকেরা দেখেছেন—এমন কোনো পর্যবেক্ষণমূলক বিবরণ এই উদ্ধৃতিগুলো দিচ্ছে না।
সহিহ মুসলিমে সময়ের আরও দুইটি পূর্ণ বর্ণনা
সহিহ মুসলিমের ৭৫৮বি বর্ণনাতেও প্রথম তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হওয়ার পাঠ রয়েছে। এখানে “আমিই রাজা” বাক্যটি দুবার এসেছে এবং ফজরের আলো প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত আহ্বান চলার কথা বলা হয়েছে। ফলে শেষ রাতের বহুল প্রচারিত পাঠের পাশাপাশি প্রথম তৃতীয়াংশ-পরবর্তী পাঠটিও সহিহ মুসলিমে সংরক্ষিত। [8]
وَحَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ، - وَهُوَ ابْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْقَارِيُّ - عَنْ سُهَيْلِ بْنِ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ «يَنْزِلُ اللَّهُ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا كُلَّ لَيْلَةٍ حِينَ يَمْضِي ثُلُثُ اللَّيْلِ الأَوَّلُ فَيَقُولُ أَنَا الْمَلِكُ أَنَا الْمَلِكُ مَنْ ذَا الَّذِي يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ ذَا الَّذِي يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ ذَا الَّذِي يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ فَلاَ يَزَالُ كَذَلِكَ حَتَّى يُضِيءَ الْفَجْرُ».
বাংলা অনুবাদ: কুতাইবা ইবনে সাঈদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইয়াকুব, অর্থাৎ ইবনে আবদুর রহমান আল-কারি, আমাদের বর্ণনা করেছেন সুহাইল ইবনে আবি সালিহ থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আবু হুরাইরা থেকে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন: “প্রতি রাতে রাতের প্রথম তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। এরপর বলেন: আমিই রাজা, আমিই রাজা। কে আছে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব? কে আছে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব? ফজরের আলো প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই বলতে থাকেন।”
একই হাদিসের ৭৫৮সি বর্ণনায় অর্ধেক রাত অথবা দুই-তৃতীয়াংশ রাত অতিক্রান্ত হওয়ার কথা এসেছে। “অথবা” শব্দটিও পাঠের অংশ; সেটি মুছে দিয়ে বর্ণনাটিকে একটি মাত্র নির্দিষ্ট সময়ের বক্তব্যে পরিণত করলে সংরক্ষিত পাঠ বদলে যাবে। এখানে সময়ের উভয় বিকল্পসহ সম্পূর্ণ বক্তব্যই রয়েছে। [9]
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ مَنْصُورٍ، أَخْبَرَنَا أَبُو الْمُغِيرَةِ، حَدَّثَنَا الأَوْزَاعِيُّ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، حَدَّثَنَا أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «إِذَا مَضَى شَطْرُ اللَّيْلِ أَوْ ثُلُثَاهُ يَنْزِلُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ هَلْ مِنْ سَائِلٍ يُعْطَى هَلْ مِنْ دَاعٍ يُسْتَجَابُ لَهُ هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ يُغْفَرُ لَهُ حَتَّى يَنْفَجِرَ الصُّبْحُ».
বাংলা অনুবাদ: ইসহাক ইবনে মানসুর আমাদের বর্ণনা করেছেন। আবুল মুগিরা আমাদের জানিয়েছেন। আওজায়ি আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া আমাদের বর্ণনা করেছেন। আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান আমাদের বর্ণনা করেছেন আবু হুরাইরা থেকে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “রাতের অর্ধেক অথবা দুই-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে বরকতময় ও সুমহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। তিনি বলেন: কোনো প্রার্থনাকারী আছে কি, যাকে দেওয়া হবে? কোনো আহ্বানকারী আছে কি, যার ডাকে সাড়া দেওয়া হবে? কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি, যাকে ক্ষমা করা হবে? ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে।”
একটি বারো ঘণ্টার রাত ধরে সময়ের পার্থক্য সহজে বোঝা যায়। ধরা যাক, উদাহরণের স্থানীয় রাত সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত। রাতের প্রথম তৃতীয়াংশ শেষ হবে রাত দশটায়, অর্ধেক শেষ হবে রাত বারোটায়, আর দুই-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হবে রাত দুইটায়। এই ঘড়ির সময়গুলো উদাহরণের সুবিধার জন্য নেওয়া; বাস্তবে রাতের দৈর্ঘ্য স্থান ও ঋতুভেদে বদলায়। কিন্তু এক-তৃতীয়াংশ, অর্ধেক এবং দুই-তৃতীয়াংশের পার্থক্য একই থাকে।
| বর্ণনা | অবতরণ শুরুর উল্লেখ | বারো ঘণ্টার রাতের উদাহরণে |
|---|---|---|
| বুখারি ১১৪৫ | শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকলে | রাত দুইটা |
| তিরমিজি ৪৪৬-এর মূল বর্ণনা | প্রথম তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে | রাত দশটা |
| মুসলিম ৭৫৮বি | প্রথম তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে | রাত দশটা |
| মুসলিম ৭৫৮সি | অর্ধেক অথবা দুই-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে | রাত বারোটা অথবা রাত দুইটা |
| তিরমিজির অগ্রাধিকার দেওয়া পাঠ | শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকলে | রাত দুইটা |
এই পার্থক্য থেকে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়: প্রচলিত বর্ণনাগুলো অবতরণের সূচনাকাল সম্পর্কে একটি অভিন্ন বাক্য সংরক্ষণ করেনি। কোন পাঠকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে সংকলকের বিচারও উপস্থিত। “সহিহ হাদিসে আছে” উচ্চারণ করে সময়ের সব পাঠভেদ এক করে দিলে সেই বিচার এবং তার ফল দুটোই আড়াল হয়ে যায়। নির্ভুল ঐশী সংবাদ বলে ঘটনাটি গ্রহণ করতে বলা হলে তার সূচনাকাল নির্ধারণেও একই নির্ভুলতার দাবি প্রযোজ্য।
বর্ণনার শব্দগুলো কোন দাবিগুলো তৈরি করছে
| বর্ণনায় ব্যবহৃত ভাষা | ভাষাটির কাজ | যে প্রশ্ন তৈরি হয় |
|---|---|---|
| يَنْزِلُ — অবতরণ করেন | একটি ক্রিয়া ঘোষণা করে | এই ক্রিয়ার অর্থ ও বাস্তব ফল কী? |
| رَبُّنَا — আমাদের রব | ক্রিয়ার কর্তা নির্ধারণ করে | কর্তা হিসেবে কাকে সাব্যস্ত করা হচ্ছে? |
| إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا — নিকটবর্তী আসমানে | ক্রিয়ার গন্তব্য নির্ধারণ করে | এই আসমানের সঙ্গে পূর্ববর্তী অবস্থানের সম্পর্ক কী? |
| كُلَّ لَيْلَةٍ — প্রতি রাতে | পুনরাবৃত্তি নির্ধারণ করে | স্থানভেদে আলাদা রাতগুলোর সঙ্গে পুনরাবৃত্তির সম্পর্ক কী? |
| রাতের নির্দিষ্ট অংশ অবশিষ্ট থাকা বা অতিক্রান্ত হওয়া | ঘটনার সূচনাকাল নির্ধারণ করে | কোন স্থানের রাত সেই সময়ের ভিত্তি? |
| মুসলিমের পাঠে ফজর পর্যন্ত আহ্বান | আহ্বানের পর্যায়ের শেষসীমা নির্ধারণ করে | এক অঞ্চলের ফজর এবং অন্য অঞ্চলের শেষ রাত কীভাবে সম্পর্কিত? |
বর্ণনাগুলো শেষ রাতে প্রার্থনার সঙ্গে আল্লাহর একটি নির্দিষ্ট আসমানে অবতরণকে যুক্ত করেছে। শেষ রাতে প্রার্থনা করা মানুষের একটি কাজ; আল্লাহ সেই সময় একটি নির্দিষ্ট আসমানে অবতরণ করেন বলা মহাজাগতিক বাস্তবতা সম্পর্কে পৃথক দাবি। মানুষের কাজটি পালনযোগ্য হলেই দ্বিতীয় দাবিটি সত্য হয় না। অথচ হাদিসে দ্বিতীয় দাবিটিকে প্রথম কাজটির বিশেষ মর্যাদার ভিত্তি করা হয়েছে। সেই ভিত্তির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাই বর্ণনার বিষয়বস্তুর সরাসরি পরীক্ষা।
হাদিসের প্রতিষ্ঠিত মর্যাদা: মুতাওয়াতির ঘোষণা ও বাস্তব অবতরণের দাবি
আল্লাহর নজুলের বর্ণনা নিয়ে আলোচনা এমন কোনো কাহিনিকে ঘিরে নয়, যেটি সংশ্লিষ্ট আলেমরা নিজেরাই বাতিল করেছেন। বুখারি, মুসলিম ও অন্য সংকলনে এর উপস্থিতির পাশাপাশি ইবনে বায সরাসরি একে মুহাম্মদ থেকে বর্ণিত মুতাওয়াতির হাদিস বলেছেন। একই বক্তব্যে তিনি অবতরণকে আল্লাহর জন্য উপযুক্ত একটি গুণ হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং কিতাব–সুন্নাহয় বর্ণিত গুণগুলো গ্রহণ করা ওয়াজিব বলেন। ফলে তাঁর বক্তব্যে বর্ণনার সত্যতা এবং আকিদাগত বাধ্যবাধকতা একত্রে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। [10]
পৃষ্ঠা ৩১৪
মূল আরবি
وإذا تيسر للمؤمن أو المؤمنة الإيتار والتهجد آخر الليل كان ذلك أفضل لأن ذلك وقت نزول الله، ووقت إجابة الدعاء لما ثبت عن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - أنه قال: «ينزل ربنا إلى السماء الدنيا كل ليلة حين يبقى ثلث الليل الآخر، فيقول: من يدعوني فأستجيب له، من يسألني فأعطيه، من يستغفرني فأغفر له، حتى ينفجر الفجر (¬1) » وفي لفظ آخر: «يقول سبحانه: هل من سائل فيعطى سؤله، هل من مستغفر فيغفر له، هل من تائب فيتاب عليه (¬2) » وهذا الحديث العظيم متواتر عن رسول الله - صلى الله عليه وسلم -.
وهذا النزول يليق بالله لا يشابهه شيء من خلقه في جميع صفاته، لا بكيف ولا بمثل، كاستوائه على عرشه، وكسمعه وبصره، وغضبه ورضاه، ونحو ذلك، كلها صفات تليق بالله لا يشابه فيها خلقه سبحانه وتعالى، هكذا قال أهل السنة والجماعة: يجب إثبات صفات الله كما جاءت في الكتاب والسنة على وجه يليق به سبحانه وتعالى كما قال جل وعلا: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (¬3) وقال سبحانه: وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ (¬4)
(¬1) رواه البخاري في (الجمعة) برقم (1077) ، ومسلم في (صلاة المسافرين) برقم (1261) و (1265) ، والإمام أحمد في (باقي مسند المكثرين) برقم (7196) .
(¬2) رواه مسلم في (صلاة المسافرين) برقم (1263) و (1265) ، والإمام أحمد في (باقي مسند المكثرين) برقم (9220) .
(¬3) سورة الشورى الآية 11
(¬4) سورة الإخلاص الآية 4
বাংলা অনুবাদ:
মুমিন পুরুষ বা নারীর পক্ষে শেষ রাতে বিতর ও তাহাজ্জুদ পড়া সম্ভব হলে সেটিই উত্তম; কারণ সেটি আল্লাহর অবতরণের সময় এবং দোয়া কবুলের সময়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:
"আমাদের রব প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকে। তখন তিনি বলেন: কে আমাকে ডাকে যে আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চায় যে আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চায় যে আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? যতক্ষণ না ফজর উদিত হয়।"
(১)অন্য এক বর্ণনায় এসেছে: "তিনি (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন: কোনো প্রার্থনাকারী আছে কি, যাকে তার চাওয়া দেওয়া হবে? কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি, যাকে ক্ষমা করা হবে? কোনো তওবাকারী আছে কি, যার তওবা কবুল করা হবে?"
(২) আর এই মহান হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত।
আর এই অবতরণ (নুযূল) আল্লাহর জন্য মানানসই, তাঁর সৃষ্টির কোনো কিছুর সাথে তাঁর কোনো সাদৃশ্য নেই তাঁর সকল গুণাবলীতে। এর ধরন নির্দিষ্ট না করে এবং সাদৃশ্য আরোপ না করে তা গ্রহণ করতে হবে। যেমন তাঁর আরশের উপর ইস্তিওয়া (আরশের ওপর সমুন্নত অবস্থান), তাঁর শ্রবণ, তাঁর দর্শন, তাঁর ক্রোধ ও তাঁর সন্তুষ্টি—ইত্যাদি। এই সমস্ত গুণাবলী আল্লাহর জন্য মানানসই, যাতে তাঁর সৃষ্টির সাথে তাঁর কোনো সাদৃশ্য নেই, সুবহানাহু ওয়া তা'আলা।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের পণ্ডিতগণ এমনই বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার গুণাবলীকে কিতাব (কুরআন) ও সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে, সেভাবেই এমনভাবে সাব্যস্ত করা ওয়াজিব যা তাঁর জন্য মানানসই।
যেমন আল্লাহ জাল্লা ওয়া আলা বলেছেন: "তাঁর মতো কিছুই নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।"
(৩)এবং তিনি সুবহানাহু বলেছেন: "আর তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।"
(৪)
(১) বুখারী (জুমু'আহ) ১০৭৭, মুসলিম (সালাতুল মুসাফিরীন) ১২৬১ ও ১২৬৫, এবং ইমাম আহমাদ (বাকী মুসনাদিল মুকছিরীন) ৭১৯৬।
(২) মুসলিম (সালাতুল মুসাফিরীন) ১২৬৩ ও ১২৬৫, এবং ইমাম আহমাদ (বাকী মুসনাদিল মুকছিরীন) ৯২২০।
(৩) সূরা আশ-শূরা, আয়াত ১১।
(৪) সূরা আল-ইখলাস, আয়াত ৪।
একটি বর্ণনাকে মুতাওয়াতির বলার তাৎপর্য
হাদিসশাস্ত্রের পরিভাষায় মুতাওয়াতির বলতে এমন বর্ণনাকে বোঝানো হয়, যা এত বেশি বর্ণনাকারীর মাধ্যমে সংবাহিত হয়েছে যে তাঁদের সম্মিলিতভাবে মিথ্যা রচনায় একমত হওয়াকে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রীয় মানদণ্ডে অসম্ভব মনে করা হয়। তাই শব্দটির অর্থ শুধু “সনদে বিচ্ছিন্নতা নেই” নয়। অবিচ্ছিন্ন সনদ এবং বহু বর্ণনাকারীর মাধ্যমে সংবাহিত সংবাদ ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। ইবনে বায এই পরিভাষা ব্যবহার করে বর্ণনাটির ওপর সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিশ্চিততার দাবি আরোপ করছেন। তাঁর অবস্থানে এটি সন্দেহজনক কোনো প্রান্তিক বিবরণ নয়, আল্লাহর একটি প্রতিষ্ঠিত গুণের সংবাদ।
মুতাওয়াতির ঘোষণা করে এবং বিষয়বস্তুকে বিশ্বাসের বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে গ্রহণ করে ইবনে বায বর্ণনাটিকে প্রত্যাখ্যানের পথ নিজেই বন্ধ করছেন। তাঁর অবস্থানে এটি গ্রহণ বা বর্জনের স্বাধীনতাসম্পন্ন কোনো ঐচ্ছিক কাহিনি হয়ে থাকছে না। ফলে সময় ও অবস্থানসংক্রান্ত প্রশ্নগুলো নিশ্চিত ঘোষিত আকিদার বিষয়বস্তুর সঙ্গেই যুক্ত। একজন আলেম বর্ণনাটিকে যত দৃঢ়ভাবে সত্য ঘোষণা করেন, তার নির্দিষ্ট সময় ও গন্তব্য সম্পর্কে বক্তব্যের দায়ও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংবাদটি নিশ্চিত বলা এবং সেই সংবাদের নির্দিষ্ট দাবিগুলোকে অনির্ণেয় করে রাখা পরস্পরের বিকল্প হতে পারে না।
প্রার্থনার সময় থেকে আল্লাহর কর্মসূচি: ফতোয়ার ব্যবহারিক দাবি
ইবনে বাযের বক্তব্যে শেষ রাতের গুরুত্বের কারণও নির্দিষ্ট: সেটি আল্লাহর অবতরণ এবং দোয়া কবুলের সময়। অর্থাৎ বিশ্বাসটি উপাসনার বাস্তব সময় নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। কেন শেষ রাতে জাগা উত্তম—এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহর একটি সময়নির্ভর কাজকে ব্যাখ্যা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। ফলে তাঁর বক্তব্যে নজুল কোনো নিষ্ক্রিয় প্রতীক হয়ে থাকছে না; মানুষের ধর্মীয় অনুশীলন সংগঠিত করার জন্য ঘটনাটিকে সত্য ও কার্যকর ধরা হচ্ছে। মানুষের ঘুম, জাগরণ ও প্রার্থনার সময়কে মহাজাগতিক ঘটনার সঙ্গে এভাবে যুক্ত করলে সেই ঘটনার সময়ের ভিত্তিও ব্যাখ্যা করার দায় তৈরি হয়।
এই কাঠামোয় পৃথিবীর একটি স্থানীয় সময়ের বিশেষ মর্যাদা আল্লাহর কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়, আবার আল্লাহর সেই কাজের সময় নির্ধারিত হয় পৃথিবীর স্থানীয় রাত দিয়ে। মানুষের রাতকে ভিত্তি করে ঈশ্বরের অবতরণ, আর ঈশ্বরের অবতরণকে ভিত্তি করে মানুষের রাতের বিশেষ পবিত্রতা—এই পারস্পরিক নির্ভরতা ধর্মীয় সময়কে একটি অলৌকিক কর্মসূচির রূপ দেয়। কিন্তু কোনো মানুষের কাছে সময়টি পবিত্র মনে হওয়া সেই কর্মসূচির বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। বিশ্বাসীর অভিজ্ঞতা এবং আসমানে ঘোষিত ঘটনার সত্যতা একই জিনিস হয়ে যায় না।
অর্থপূর্ণ দাবি রেখে তার পরিণতি অজানা করে দেওয়া
উদ্ধৃত বক্তব্যে অবতরণ সাব্যস্ত করার সঙ্গে এর ধরন সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা না করার নির্দেশও রয়েছে। কিন্তু “অবতরণ ঘটে” বলার জন্য শব্দটির কিছু অর্থ স্বীকার করতেই হয়। যদি কোথাও কোনো পরিবর্তন, নৈকট্য, সম্পর্ক বা ক্রিয়ার পার্থক্যই না থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ে অবতরণের ঘোষণা দিয়ে অতিরিক্ত কী তথ্য দেওয়া হলো—সেই প্রশ্ন থাকে। আবার ক্রিয়ার কোনো বাস্তব পার্থক্য স্বীকার করলে সময়, গন্তব্য এবং অন্য অবস্থানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নও আসে। বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা দিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি হয় না।
আল্লাহর অবতরণ সৃষ্টির অবতরণের মতো নয়—এই ঘোষণা নিজে কোনো বিকল্প ব্যাখ্যার বিবরণ দেয় না। কোন অর্থে ক্রিয়াটি অবতরণ, কোন সম্পর্কের কারণে তাকে নিকটবর্তী আসমানের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে এবং সময়সীমার ভূমিকা কী—এসবের নির্দিষ্ট উত্তর এতে অনুপস্থিত। ফলে বর্ণনাটির বাস্তবতা জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, কিন্তু সেই বাস্তবতার সম্পর্কগুলো প্রশ্নের সামনে এলে অজানা বলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। দাবির প্রয়োজনীয় অর্থটুকু গ্রহণ করে তার ব্যাখ্যাগত দায় পরিত্যাগ করার এই পদ্ধতিতে নিশ্চিত জ্ঞানের ঘোষণা পাওয়া যায়; নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তি পাওয়া যায় না।
এখানে মূল বিরোধ বর্ণনার মর্যাদা নিয়ে নয়। ইবনে বাযের নিজের অবস্থানেই সংবাদটি নির্ভরযোগ্য এবং আল্লাহর নজুল সত্য। প্রশ্ন হলো, সেই সত্য ঘোষিত ঘটনাটি সম্পর্কে বর্ণনার নির্দিষ্ট সময় ও গন্তব্য কী অর্থ বহন করে। পৃথিবীর অঞ্চলভেদে রাতের পার্থক্য কোনো সনদের ত্রুটি নয়, যা একজন বর্ণনাকারীকে নির্ভরযোগ্য ঘোষণা করলেই দূর হবে। বর্ণনা যত গ্রহণযোগ্য বলা হোক, স্থানীয় রাতকে ভিত্তি করা ঘটনাটির ভৌগোলিক ও সময়গত সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার দায় একইভাবে থেকে যায়।
দুনিয়ার আসমান: নক্ষত্রসজ্জিত আকাশ ও আল্লাহর অবস্থান
হাদিসে আল্লাহ কোথায় অবতরণ করেন, সেটিও লক্ষ্য করার মতো। বলা হয়নি তিনি কেবল বান্দাদের “নিকটবর্তী হন”; বলা হয়েছে তিনি আস-সামা আদ-দুনিয়া—দুনিয়ার বা নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন। কোরআনিক বিশ্বচিত্রে এই “দুনিয়ার আসমান” একটি স্বতন্ত্র স্তর। সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬-এ বলা হয়েছে, “আমি নিকটবর্তী আসমানকে নক্ষত্ররাজির সৌন্দর্যে সজ্জিত করেছি”; সূরা আল-মুলক ৬৭:৫-এ একই নিকটবর্তী আসমানকে “প্রদীপসমূহ” দ্বারা সজ্জিত করার কথা বলা হয়েছে। কুরতুবী এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় কাওয়াকিব বা নক্ষত্রকে দুনিয়ার আসমানের অলংকার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। [11] [12] [13]
সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬
إِنَّا زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِزِينَةٍ الْكَوَاكِبِ
বাংলা অনুবাদ:
নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী আসমানকে নক্ষত্ররাজির সৌন্দর্যে সজ্জিত করেছি।
নিকটবর্তী আসমান একটি নির্দিষ্ট স্তর
“দুনিয়া” শব্দটি এখানে পৃথিবীর মাটি বোঝাচ্ছে না; “নিকটতর” অর্থে আসমানটির পরিচয় দিচ্ছে। আসমানগুলোর মধ্যে মানুষের জগতের নিকটবর্তী আসমানকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তার একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যও দেওয়া হচ্ছে: সেখানে নক্ষত্র বা প্রদীপসমূহের সজ্জা আছে। একই আয়াতে সেই সজ্জার সঙ্গে শয়তানের বিরুদ্ধে নিক্ষেপের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এই আসমান ধর্মীয় বিশ্বচিত্রে এমন একটি অঞ্চল, যার সঙ্গে দৃশ্যমান আকাশের আলোকবিন্দু এবং উল্কার ঘটনাকে যুক্ত করা হয়েছে। [14]
সূরা আল-মুলক ৬৭:৫
وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُومًا لِلشَّيَاطِينِ وَأَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابَ السَّعِيرِ
বাংলা অনুবাদ:
আমি অবশ্যই নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপসমূহ দ্বারা সজ্জিত করেছি এবং সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ করেছি; আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।
সাত আসমানের ধারণাটিও কোরআনে সরাসরি উপস্থিত। সূরা আল-মুলক ৬৭:৩-এ সাত আসমানকে “তিবাকান”—স্তরে স্তরে—সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। সূরা ফুসসিলাতে প্রতিটি আসমানের জন্য পৃথক নির্দেশ নির্ধারণ এবং নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপ দিয়ে সাজানো ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করার কথা একসঙ্গে এসেছে। এতে একটি বিন্যস্ত মহাজাগতিক মানচিত্র পাওয়া যায়: একাধিক আসমান, প্রত্যেকটির পৃথক পরিচয়, এবং সেগুলোর মধ্যে পৃথিবীর নিকটবর্তী একটি আসমান। নজুলের হাদিস সেই মানচিত্রের একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের নাম ব্যবহার করছে। [15] [16]
সূরা ফুসসিলাত ৪১:১২
فَقَضَاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ وَأَوْحَىٰ فِي كُلِّ سَمَاءٍ أَمْرَهَا وَزَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَحِفْظًا ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
বাংলা অনুবাদ:
অতঃপর তিনি দুই দিনে সেগুলোকে সাত আসমানে পরিণত করলেন এবং প্রত্যেক আসমানে তার নির্দেশ জানিয়ে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপসমূহ দ্বারা সজ্জিত করেছি এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছি। এ মহাপরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নির্ধারণ।
কুরতুবীর ব্যাখ্যা: নক্ষত্র, উল্কা ও আকাশের প্রহরা
কুরতুবীর ব্যাখ্যায় “প্রদীপ” বলতে কাওয়াকিবকেই বোঝানো হয়েছে; আলো দেওয়ার কারণে সেগুলোকে প্রদীপ বলা হয়। এরপর তিনি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে কয়েকটি মত তুলে ধরেছেন। এক ব্যাখ্যায় নক্ষত্র অক্ষত থাকে এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত শিহাব নিক্ষিপ্ত হয়; আরেকটিতে নক্ষত্র থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন হয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। উদ্ধৃত অংশে এই পার্থক্যগুলো পুরোপুরি উপস্থিত আছে। আসমানের সজ্জা, শয়তানের আড়ি পাতা এবং তাকে তাড়ানোর অস্ত্র—এই তিনটি ধারণা একই ব্যাখ্যার মধ্যে যুক্ত হয়েছে। [17]
قوله تعالى: ولقد زينا السماء الدنيا بمصابيح جمع مصباح وهو السراج. وتسمى الكواكب مصابيح لإضاءتها.
وجعلناها رجوما للشياطين أي جعلنا شهبها؛ فحذف المضاف. دليله: إلا من خطف الخطفة فأتبعه شهاب ثاقب. وعلى هذا فالمصابيح لا تزول ولا يرجم بها. وقيل: إن الضمير راجع إلى المصابيح على أن الرجم من أنفس الكواكب، ولا يسقط الكوكب نفسه إنما ينفصل منه شيء يرجم به من غير أن ينقص ضوءه ولا صورته. قاله أبو علي جوابا لمن قال: كيف تكون زينة وهي رجوم لا تبقى.
قال المهدوي: وهذا على أن يكون الاستراق من موضع الكواكب. والتقدير الأول على أن يكون الاستراق من الهوى الذي هو دون موضع الكواكب. القشيري: وأمثل من قول أبي علي أن نقول: هي زينة قبل أن يرجم بها الشياطين. والرجوم جمع رجم؛ وهو مصدر سمي به ما يرجم به. قال قتادة: خلق الله تعالى النجوم لثلاث: زينة للسماء، ورجوما للشياطين، وعلامات يهتدى بها في البر والبحر والأوقات. فمن تأول فيها غير ذلك فقد تكلف ما لا علم له به، وتعدى وظلم.
বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহর বাণী, “আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপসমূহ দ্বারা সজ্জিত করেছি”—“মাসাবিহ” হলো “মিসবাহ”-এর বহুবচন, যার অর্থ প্রদীপ। আলো দেওয়ার কারণে নক্ষত্রগুলোকে প্রদীপ বলা হয়।
“আর সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ করেছি”—অর্থাৎ সেগুলোর শিহাবকে করেছি; এখানে সম্বন্ধপদের একটি অংশ উহ্য রাখা হয়েছে। এর প্রমাণ, “তবে যে ছোঁ মেরে কিছু শুনে নেয়, একটি উজ্জ্বল শিহাব তার পিছু নেয়।” এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রদীপগুলো নিজেরা স্থানচ্যুত হয় না এবং সেগুলোকে নিক্ষেপ করা হয় না। আরও বলা হয়েছে, সর্বনামটি প্রদীপসমূহের দিকেই ফিরে যায়, অর্থাৎ নিক্ষেপের বস্তু নক্ষত্র থেকেই আসে। নক্ষত্রটি নিজে পড়ে যায় না; বরং তার থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন হয়ে নিক্ষিপ্ত হয়, এতে তার আলো বা আকৃতি কমে না। “এগুলো নিক্ষিপ্ত হয়ে আর না থাকলে অলংকার হয় কীভাবে?”—এই প্রশ্নের উত্তরে আবু আলী এ কথা বলেছেন।
মাহদাবী বলেছেন, এই ব্যাখ্যা তখনই প্রযোজ্য, যখন আড়ি পাতা হয় নক্ষত্রগুলোর অবস্থানস্থল থেকে। প্রথম ব্যাখ্যাটি হলো, আড়ি পাতা হয় নক্ষত্রগুলোর অবস্থানের নিচের আকাশমণ্ডল থেকে। কুশায়রী বলেছেন, আবু আলীর বক্তব্যের চেয়ে অধিক উপযুক্ত হলো বলা যে, শয়তানদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগে সেগুলো অলংকার। “রুজুম” হলো “রজম”-এর বহুবচন; এটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য, যা দিয়ে নিক্ষেপের বস্তুকে বোঝানো হয়েছে। কাতাদা বলেছেন, আল্লাহ নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন তিনটি উদ্দেশ্যে: আকাশের অলংকার, শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং স্থল, সমুদ্র ও সময় নির্ণয়ে পথনির্দেশক চিহ্ন হিসেবে। যে এগুলোর অন্য ব্যাখ্যা করে, সে এমন বিষয়ে নিজেকে জড়ায়, যার জ্ঞান তার নেই; সে সীমা লঙ্ঘন করে এবং অন্যায় করে।
এই ব্যাখ্যার আকাশ একটি প্রহরাবেষ্টিত রাজকীয় এলাকার মতো: সেখানে নিষিদ্ধ শ্রোতা প্রবেশের চেষ্টা করে, ওপরের সংবাদ শুনতে চায় এবং তাকে জ্বলন্ত বস্তু দিয়ে তাড়ানো হয়। দৃশ্যমান আলোকরেখার পেছনে অদৃশ্য প্রাণীর অনুপ্রবেশ ও প্রতিরোধের কাহিনি বসানো হয়েছে। নক্ষত্র ও উল্কার বাস্তব প্রকৃতি সম্পর্কে এর কোনো পরীক্ষিত ব্যাখ্যা নেই। বরং একটি পরিচিত আকাশীয় দৃশ্যকে অতিপ্রাকৃত সংঘর্ষের চিহ্ন হিসেবে পড়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক ঘটনাকে অদৃশ্য সত্তার কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করার এই রীতিই উপকথার বৈশিষ্ট্য।
নক্ষত্র হলো নিজস্ব ভৌত গঠন ও বিবর্তনসম্পন্ন বিপুল উত্তপ্ত গ্যাসের বস্তু; দীর্ঘ স্থিতিশীল পর্যায়ে তার কেন্দ্রের পারমাণবিক সংযোজন তাকে শক্তি জোগায়। উল্কা হলো মহাকাশের ছোট পাথর বা ধুলিকণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় তৈরি হওয়া আলোকঘটনা। আকাশে একটি উল্কার রেখা দেখা গেলে তার অর্থ দূরের একটি নক্ষত্র থেকে সদ্য বিচ্ছিন্ন আগুন শয়তানের পিছু ছুটছে—এমন নয়। নক্ষত্রের জীবনচক্র ও বায়ুমণ্ডলে উল্কার উৎপত্তি দুটিই পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও ভৌত প্রক্রিয়ার সাহায্যে ব্যাখ্যাত। উল্কাকে শয়তান তাড়ানোর অস্ত্র বলার পক্ষে সেই ধরনের প্রমাণ অনুপস্থিত। আকাশের প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যার জায়গায় অলৌকিক প্রহরার কাহিনি বসানো কুসংস্কার। [18] [19]
‘আল্লাহ কোথায়’: আকাশকে অবস্থান হিসেবে গ্রহণের হাদিস
আল্লাহর সঙ্গে আকাশের এই স্থানিক সম্পর্ক আরেকটি হাদিসেও সরাসরি এসেছে। মুয়াবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামির বর্ণনায় মুহাম্মদ একটি দাসীকে প্রশ্ন করেন, “আল্লাহ কোথায়?” সে উত্তর দেয়, “আকাশে।” এরপর মুহাম্মদ নিজের পরিচয় জানতে চান। দাসী তাঁকে আল্লাহর রাসুল হিসেবে শনাক্ত করলে তাকে মুমিন বলে মুক্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। নামাজে কথা বলা, গণকের কাছে যাওয়া, অশুভ লক্ষণ গ্রহণ এবং দাসীর ঘটনাটি একই বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত। [20]
حَدَّثَنَا أَبُو جَعْفَرٍ، مُحَمَّدُ بْنُ الصَّبَّاحِ وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ - وَتَقَارَبَا فِي لَفْظِ الْحَدِيثِ - قَالاَ حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ حَجَّاجٍ الصَّوَّافِ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ هِلاَلِ بْنِ أَبِي مَيْمُونَةَ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ السُّلَمِيِّ، قَالَ بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي، مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللَّهُ. فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ فَقُلْتُ وَاثُكْلَ أُمِّيَاهْ مَا شَأْنُكُمْ تَنْظُرُونَ إِلَىَّ. فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَاذِهِمْ فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِي لَكِنِّي سَكَتُّ فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَبِأَبِي هُوَ وَأُمِّي مَا رَأَيْتُ مُعَلِّمًا قَبْلَهُ وَلاَ بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ فَوَاللَّهِ مَا كَهَرَنِي وَلاَ ضَرَبَنِي وَلاَ شَتَمَنِي قَالَ «إِنَّ هَذِهِ الصَّلاَةَ لاَ يَصْلُحُ فِيهَا شَىْءٌ مِنْ كَلاَمِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ». أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ وَقَدْ جَاءَ اللَّهُ بِالإِسْلاَمِ وَإِنَّ مِنَّا رِجَالاً يَأْتُونَ الْكُهَّانَ. قَالَ «فَلاَ تَأْتِهِمْ». قَالَ وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُونَ. قَالَ «ذَاكَ شَىْءٌ يَجِدُونَهُ فِي صُدُورِهِمْ فَلاَ يَصُدَّنَّهُمْ». قَالَ ابْنُ الصَّبَّاحِ «فَلاَ يَصُدَّنَّكُمْ». قَالَ قُلْتُ وَمِنَّا رِجَالٌ يَخُطُّونَ. قَالَ «كَانَ نَبِيٌّ مِنَ الأَنْبِيَاءِ يَخُطُّ فَمَنْ وَافَقَ خَطَّهُ فَذَاكَ». قَالَ وَكَانَتْ لِي جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِي قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّيبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِهَا وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِي آدَمَ آسَفُ كَمَا يَأْسَفُونَ لَكِنِّي صَكَكْتُهَا صَكَّةً فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَىَّ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلاَ أُعْتِقُهَا قَالَ «ائْتِنِي بِهَا». فَأَتَيْتُهُ بِهَا فَقَالَ لَهَا «أَيْنَ اللَّهُ». قَالَتْ فِي السَّمَاءِ. قَالَ «مَنْ أَنَا». قَالَتْ أَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ. قَالَ «أَعْتِقْهَا فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ».
বাংলা অনুবাদ:
আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে সাব্বাহ ও আবু বকর ইবনে আবি শাইবা বর্ণনা করেছেন—হাদিসের শব্দে তাঁদের বর্ণনা কাছাকাছি। তাঁরা বলেন, ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম হাজ্জাজ আস-সাওয়াফ থেকে, তিনি ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসির থেকে, তিনি হিলাল ইবনে আবি মাইমুনা থেকে, তিনি আতা ইবনে ইয়াসার থেকে, তিনি মুয়াবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামি থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে নামাজ পড়ছিলাম। এমন সময় লোকদের মধ্যে একজন হাঁচি দিল। আমি বললাম, “আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন।” লোকেরা আমার দিকে তাকাতে লাগল। আমি বললাম, “হায়, আমার মা আমাকে হারাক! তোমরা আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন?” তারা নিজেদের ঊরুতে হাত দিয়ে আঘাত করতে লাগল। যখন বুঝলাম তারা আমাকে চুপ করতে বলছে, তখন আমি চুপ করলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করলে—আমার পিতা-মাতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোন—তাঁর আগে বা পরে তাঁর চেয়ে উত্তম শিক্ষা দেন এমন কোনো শিক্ষক দেখিনি। আল্লাহর শপথ, তিনি আমাকে ধমক দেননি, মারেননি বা গালিও দেননি। তিনি বললেন, “এই নামাজের মধ্যে মানুষের সাধারণ কথাবার্তার কিছুই উপযুক্ত নয়; এতে রয়েছে তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন পাঠ।” অথবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রকম বলেছেন। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি অল্প কিছুদিন আগেও জাহেলিয়াতের মধ্যে ছিলাম। আল্লাহ ইসলাম এনেছেন। আমাদের মধ্যে কিছু লোক গণকদের কাছে যায়।” তিনি বললেন, “তুমি তাদের কাছে যেয়ো না।” আমি বললাম, “আমাদের মধ্যে কিছু লোক অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করে।” তিনি বললেন, “সেটি তাদের মনে উদয় হয়; তা যেন তাদের কাজ থেকে বিরত না রাখে।” ইবনে সাব্বাহর বর্ণনায় আছে, “তা যেন তোমাদের বিরত না রাখে।” আমি বললাম, “আমাদের মধ্যে কিছু লোক রেখা আঁকে।” তিনি বললেন, “নবীদের মধ্যে একজন নবী রেখা আঁকতেন; যার আঁকা রেখা তাঁর আঁকা রেখার সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সেটি ঠিক আছে।” তিনি বলেন, আমার একটি দাসী ছিল। সে উহুদ ও জাওয়ানিয়ার দিকে আমার ছাগল চরাত। একদিন দেখতে গিয়ে দেখি, নেকড়ে তার পাল থেকে একটি ছাগল নিয়ে গেছে। আমিও আদমসন্তানদের একজন; অন্যদের মতো আমিও ক্ষুব্ধ হই। আমি তাকে একটি চড় মারলাম। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলে তিনি আমার এই কাজকে গুরুতর বলে গণ্য করলেন। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি তাকে মুক্ত করে দেব?” তিনি বললেন, “তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।” আমি তাকে নিয়ে এলাম। তিনি তাকে বললেন, “আল্লাহ কোথায়?” সে বলল, “আকাশে।” তিনি বললেন, “আমি কে?” সে বলল, “আপনি আল্লাহর রাসুল।” তিনি বললেন, “তাকে মুক্ত করে দাও; সে মুমিন নারী।”
প্রশ্ন ও উত্তরের গঠন অত্যন্ত স্পষ্ট। “কোথায়” দিয়ে অবস্থান জিজ্ঞাসা করা হয়েছে এবং “আকাশে” দিয়ে তার জবাব দেওয়া হয়েছে। এরপর মুহাম্মদের রাসুল পরিচয় স্বীকারের প্রশ্ন এসেছে। এই দুই উত্তরের পর দাসীকে মুমিন বলা হয়েছে। বর্ণনাটির ধর্মীয় কার্যকারিতাও আছে: তার বিশ্বাসের পরিচয় যাচাই করে মুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ আকাশ-সম্পর্কিত উত্তরটি একটি বিশ্বাসগত পরীক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। আকাশের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক এই সূত্রে ধর্মবিশ্বাসের পরিচয় নির্ধারণের স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছে।
নজুলের হাদিসের সঙ্গে এই বর্ণনাটি মিলিয়ে পড়লে একই ধরনের ভাষাগত কাঠামো পাওয়া যায়। একটিতে আল্লাহর অবস্থান জানতে চেয়ে আকাশের কথা বলা হচ্ছে; অন্যটিতে বলা হচ্ছে তিনি নিকটবর্তী আসমানে নামেন। আকাশের সঙ্গে ঈশ্বরের এই সম্পর্ককে মানুষের প্রাচীন বিশ্বচিত্রের বাইরে কোনো যাচাইকৃত জ্ঞান বলে প্রতিষ্ঠা করার স্বতন্ত্র প্রমাণ নেই। মানুষের মাথার ওপর দৃশ্যমান আকাশকে দেবলোকের দিক হিসেবে কল্পনা করলে এ ধরনের ভাষার উৎপত্তি সহজেই ব্যাখ্যাত হয়। সেই পরিচিত কল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বর্ণনাকে প্রমাণ ছাড়াই মহাবিশ্বের বাস্তব মানচিত্রের মর্যাদা দেওয়া অযৌক্তিক।
আরশ, অবতরণের গন্তব্য ও পৃথিবীর স্থানীয় আকাশ
কোরআনে আরশের ওপর আল্লাহর ইস্তিওয়ার কথাও আছে। সূরা ত্ব-হা ২০:৫-এর সংক্ষিপ্ত বাক্যটি হলো: [21]
الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ
বাংলা অনুবাদ:
পরম দয়াময় আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন।
অর্থাৎ এই ধর্মতাত্ত্বিক মানচিত্রে রয়েছে বহুস্তর আসমান, তাদের মধ্যে একটি “নিকটবর্তী আসমান”, আর তারও উপরে আরশে আল্লাহর অবস্থান। এরপর বলা হচ্ছে প্রতি রাতে নির্দিষ্ট সময়ে তিনি সেই নিম্ন আসমানে অবতরণ করেন। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও অঞ্চলভেদে পরিবর্তনশীল রাতের প্রশ্নটি হাদিসের ওপর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো আধুনিক ধারণা নয়; হাদিসের নিজস্ব স্থানিক ও সময়গত ভাষাই প্রশ্নটির জন্ম দেয়।
পৃথিবীর একটি ছোট এলাকায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখলে সকলের মাথার ওপরে একই দিকে একটি বিস্তৃত ছাদ আছে বলে মনে হয়। কিন্তু গোলাকার পৃথিবীতে “মাথার ওপর” প্রত্যেক অবস্থানের জন্য পৃথক দিক নির্দেশ করে। পৃথিবীর বিপরীত পাশে দাঁড়ানো দুই ব্যক্তির মাথার ওপরের দিক পরস্পর বিপরীত। ফলে একটি নির্দিষ্ট স্থানের আকাশমুখী দিককে সমগ্র পৃথিবীর একক “উপর” ধরে নেওয়া ভুল। এক পৃষ্ঠের ওপর মানুষ, তাদের সবার ওপর একই আকাশ এবং আরও ওপরে দেবতার আবাস—এই পরিচিত সমতল জগতের ছবিতে উপর-নিচের ভাষা বিনা প্রশ্নে কাজ করে। গোলাকার পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে একই বর্ণনাকে প্রয়োগ করলে প্রত্যেক অঞ্চলের স্থানীয় দিক ও স্থানীয় রাতের হিসাব যুক্ত হয়।
এখানে ধর্মীয় মানচিত্রের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সংঘাতটি বাস্তব। নক্ষত্রকে নির্দিষ্ট আসমানের প্রদীপ এবং উল্কাকে অদৃশ্য অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; সেই নিকটবর্তী আসমানকেই আবার আল্লাহর অবতরণের গন্তব্য বলা হচ্ছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে নক্ষত্র ও উল্কার উৎপত্তি এবং অবস্থান সম্পূর্ণ পৃথক ভৌত প্রক্রিয়ায় ব্যাখ্যাত। ধর্মীয় বর্ণনায় ব্যবহৃত অলৌকিক প্রহরা ও স্তরবিন্যাসের পক্ষে পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ নেই। একটি প্রাচীন আকাশকল্পনাকে মহাবিশ্বের নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দৃশ্যমান প্রকৃতির জায়গায় বিশ্বাসের কাহিনি বসানো হয়েছে।
ঈশ্বরের অবতরণ: পূর্ববর্তী আব্রাহামিক সাহিত্যের মোটিফ
“ঈশ্বর ওপর থেকে নিচে নেমে মানুষের জগতের কাছে আসেন”—এই কল্পচিত্র ইসলামি হাদিসে প্রথম দেখা যায়নি। ইসলামের বহু শতাব্দী আগের হিব্রু বাইবেলেই একই ধরনের স্থানিক ভাষা পাওয়া যায়। Genesis 11:5-এ বাবেলের নগর ও টাওয়ারের কাহিনিতে বলা হয়েছে, প্রভু মানুষের নির্মিত নগর ও টাওয়ার দেখতে “নেমে এলেন”। Exodus 19:20-এ আরও সরাসরি বলা হয়েছে, প্রভু সিনাই পর্বতের চূড়ায় “অবতরণ করলেন”, এরপর মূসাকে ওপরে ডাকলেন। এই ঘটনাগুলোতে ঈশ্বর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছেন অবস্থানের পরিবর্তন ও কাছে আসার ভাষায়।
বাবেলের নগর: পরিদর্শন করতে ঈশ্বরের নেমে আসা
আদিপুস্তকের বাবেল-কাহিনিতে নগর ও টাওয়ার মানুষের নির্মাণ। সেটি দেখতে প্রভুর নেমে আসার বর্ণনা একটি শাসকের পরিদর্শনের মতো দৃশ্য তৈরি করে: নির্মাণ নিচে চলছে, আর ঈশ্বর ওপর থেকে এসে তা দেখছেন। মূল উদ্ধৃতিটির সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদসহ পাঠ হলো: [22]
Genesis 11:5
New International Version
5 But the Lord came down to see the city and the tower the people were building.
বাংলা অনুবাদ:
৫. কিন্তু লোকেরা যে নগর ও টাওয়ার নির্মাণ করছিল, তা দেখতে প্রভু নেমে এলেন।
একই গ্রন্থে সদোম ও গমোরার বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাইয়ের বর্ণনাতেও ঈশ্বরের নেমে আসার কথা আছে। অভিযোগের খবর তাঁর কাছে পৌঁছেছে; তারপর নিচে গিয়ে ঘটনাটি দেখার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। মানুষের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অভিযোগ পৌঁছানো, তদন্তে যাওয়া এবং দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে পরিচিত ধারাবাহিকতা, ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডও সেই রীতিতে বর্ণিত হয়েছে। [23]
Genesis 18:20–21
King James Version
20 And the Lord said, Because the cry of Sodom and Gomorrah is great, and because their sin is very grievous;
21 I will go down now, and see whether they have done altogether according to the cry of it, which is come unto me; and if not, I will know.
বাংলা অনুবাদ:
২০. আর প্রভু বললেন, সদোম ও গমোরার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রবল এবং তাদের পাপ অত্যন্ত গুরুতর।
২১. তাই এখন আমি নিচে গিয়ে দেখব, আমার কাছে যে অভিযোগ এসেছে, তারা সম্পূর্ণরূপে তার অনুরূপ কাজ করেছে কি না; আর তা না হলে আমি তা জানব।
এই কাহিনিতে মানুষের জগৎ ও ঈশ্বরের অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব কল্পনা করা হয়েছে। মানুষের জগতে কাজ ঘটে, সেই কাজের সংবাদ ঈশ্বরের কাছে যায় এবং ঈশ্বর নিচে এসে ঘটনাটি দেখেন। সর্বজ্ঞতার ধারণার সঙ্গে এই তদন্ত-দৃশ্যের অসংগতি স্পষ্ট: যা আগে থেকেই সম্পূর্ণ জানা, তা জানার জন্য পরিদর্শনের প্রয়োজন হয় না। এখানে ঈশ্বরের চরিত্র নির্মাণে মানুষের জ্ঞান অর্জন ও কর্তৃত্ব প্রয়োগের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। আকাশের ঈশ্বরের কাছে মানুষের সংবাদ পৌঁছানো এবং ঈশ্বরের মানুষের দিকে নেমে আসা—দুই ক্ষেত্রেই মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেবতার জগৎ নির্মাণের পরিচয় পাওয়া যায়।
সিনাই পর্বত: ঈশ্বর নিচে নামেন, মূসা ওপরে ওঠেন
যাত্রাপুস্তকের সিনাই-কাহিনিতে ওপর-নিচের সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান। ঈশ্বর পর্বতের চূড়ায় নামেন, মূসা চূড়ায় ওঠেন এবং নিচের মানুষদের সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করা হয়। এখানে উচ্চতা, সীমানা ও প্রবেশাধিকার একই ব্যবস্থার অংশ। ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো একটি নির্দিষ্ট স্থানের কাছে পৌঁছানোর মতো বর্ণিত হচ্ছে। যাত্রাপুস্তক ১৯:২০–২২-এ বলা হয়েছে: [24]
Exodus 19:20–22
New International Version
At Mount Sinai
20 The Lord descended to the top of Mount Sinai and called Moses to the top of the mountain. So Moses went up 21 and the Lord said to him, “Go down and warn the people so they do not force their way through to see the Lord and many of them perish. 22 Even the priests, who approach the Lord, must consecrate themselves, or the Lord will break out against them.”
বাংলা অনুবাদ:
সিনাই পর্বতে
২০. প্রভু সিনাই পর্বতের চূড়ায় অবতরণ করলেন এবং মূসাকে পর্বতের চূড়ায় ডাকলেন। তাই মূসা ওপরে উঠলেন। ২১. আর প্রভু তাঁকে বললেন, “নিচে গিয়ে লোকদের সতর্ক করো, যেন তারা প্রভুকে দেখার জন্য জোর করে সীমানা অতিক্রম না করে এবং তাদের অনেকে মারা না যায়। ২২. এমনকি যেসব যাজক প্রভুর কাছে আসে, তাদেরও নিজেদের পবিত্র করতে হবে; নইলে প্রভু তাদের ওপর আঘাত হানবেন।”
এই দৃশ্যে দেবতার সান্নিধ্য একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকার সান্নিধ্যের মতো। বিশেষ ব্যক্তি ওপরে যাওয়ার অনুমতি পান; সাধারণ মানুষ নিচে থাকে; সীমানা লঙ্ঘনের সঙ্গে মৃত্যুর হুমকি যুক্ত। আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বকে স্থাপত্য ও রাজদরবারের পরিচিত ভাষায় দৃশ্যমান করা হয়েছে: ওপরের আসন, নিচের প্রজা এবং অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারী। মূসার ওঠা ও ঈশ্বরের নামা পরস্পরের বিপরীতমুখী চলন হিসেবে কাজ করছে। একটি পাহাড়ের চূড়া দেবতা ও মানুষের সাক্ষাতের স্থান হয়ে উঠেছে।
ইসলামি নজুলের বর্ণনায় গন্তব্য সিনাই পর্বতের চূড়া থেকে নিকটবর্তী আসমানে বদলেছে এবং ঘটনাটি প্রতি রাতের নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ঈশ্বরের ওপরের অবস্থান থেকে মানুষের জগতের নিকটবর্তী স্তরে আসার দৃশ্যরীতি দুই ধারাতেই উপস্থিত। মানুষের আবেদন গ্রহণ, সাড়া দেওয়া এবং কাছে আসার ঘটনাকে উল্লম্ব যাতায়াতের ভাষায় সাজানো হচ্ছে। এই পরিচিত ধর্মীয় কল্পরীতির সঙ্গে নজুলের মিল স্পষ্ট; এর ভাষা বুঝতে মহাবিশ্ব সম্পর্কে কোনো অজানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রয়োজন পড়ে না। প্রাচীন আকাশকেন্দ্রিক দেবলোকের ধারণাই তার স্বাভাবিক ব্যাখ্যা দেয়।
মেঘের মধ্যে ঈশ্বরের আগমন
যাত্রাপুস্তকের আরেকটি বর্ণনায় ঈশ্বর মেঘের মধ্যে নেমে আসেন, সেখানে দাঁড়ান এবং নিজের পরিচয় ও গুণ ঘোষণা করেন। একই অনুচ্ছেদে ক্ষমা ও শাস্তির ঘোষণা রয়েছে। ঈশ্বরের উপস্থিতিকে এখানে মেঘ, অবস্থান গ্রহণ, সামনে দিয়ে অতিক্রম করা এবং কণ্ঠে ঘোষণার সাহায্যে দৃশ্যমান করা হয়েছে। [25]
Exodus 34:5–7
King James Version
5 And the Lord descended in the cloud, and stood with him there, and proclaimed the name of the Lord.
6 And the Lord passed by before him, and proclaimed, The Lord, The Lord God, merciful and gracious, longsuffering, and abundant in goodness and truth,
7 Keeping mercy for thousands, forgiving iniquity and transgression and sin, and that will by no means clear the guilty; visiting the iniquity of the fathers upon the children, and upon the children's children, unto the third and to the fourth generation.
বাংলা অনুবাদ:
৫. আর প্রভু মেঘের মধ্যে অবতরণ করলেন এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রভুর নাম ঘোষণা করলেন।
৬. আর প্রভু তাঁর সামনে দিয়ে অতিক্রম করে ঘোষণা করলেন, “প্রভু, প্রভু ঈশ্বর, করুণাময় ও অনুগ্রহশীল, ক্রোধে ধীর এবং মঙ্গল ও সত্যে পরিপূর্ণ;
৭. হাজার হাজার জনের প্রতি করুণা রক্ষা করেন, অন্যায়, অপরাধ ও পাপ ক্ষমা করেন; কিন্তু অপরাধীকে কোনোভাবেই নির্দোষ বলে ছেড়ে দেন না; পিতাদের অন্যায়ের শাস্তি সন্তানদের এবং তাদের সন্তানদের ওপর, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্ম পর্যন্ত প্রয়োগ করেন।”
কোরআনের সূরা আল-বাকারা ২:২১০-এও মেঘের ছায়ামণ্ডলের মধ্যে আল্লাহ ও ফেরেশতাদের আগমনের ভাষা আছে। আয়াতটিতে আগমন, আল্লাহ, মেঘ এবং ফেরেশতা একই দৃশ্যের উপাদান। আকাশীয় আবির্ভাবের পুরোনো আব্রাহামিক রীতির সঙ্গে এই উপাদানগুলোর মিল সুস্পষ্ট। [26]
هَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا أَنْ يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِنَ الْغَمَامِ وَالْمَلَائِكَةُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَإِلَى اللَّهِ تُرْجَعُ الْأُمُورُ
বাংলা অনুবাদ:
তারা কি শুধু এই অপেক্ষা করছে যে, মেঘের ছায়ামণ্ডলের মধ্যে আল্লাহ ও ফেরেশতারা তাদের কাছে আসবেন এবং বিষয়টির ফয়সালা হয়ে যাবে? আর সব বিষয় আল্লাহর কাছেই ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
মেঘের মধ্যে আবির্ভাব, ওপর থেকে নামা, দূতের উপস্থিতি এবং মানুষকে সম্বোধন—এসবের সমন্বয়ে দেবতার একটি পরিচিত আকাশীয় মঞ্চ তৈরি হয়। মানুষের চোখে আকাশ দূরবর্তী ও দুর্লভ; মেঘ আলো আড়াল করে, বজ্রধ্বনি শোনা যায়, ওপর থেকে বৃষ্টি নামে। এই অভিজ্ঞতার জগৎ দেবতার আবাস ও আবির্ভাবের ভাষা তৈরির উপাদান সরবরাহ করে। ধর্মীয় কাহিনি সেগুলোকে অদৃশ্য শাসকের কর্মকাণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করে। একই ধরনের দৃশ্য একাধিক ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যাওয়ায় দেবতার বিবরণগুলোকে সেই দীর্ঘস্থায়ী কল্পরীতির অংশ হিসেবেই শনাক্ত করা যায়।
একই উল্লম্ব বিশ্বচিত্রে দেবতা ও মানুষের সম্পর্ক
| উৎস ও ঘটনা | স্থান ও গতির বিবরণ | কাহিনির মধ্যে তার কাজ |
|---|---|---|
| আদিপুস্তক ১১:৫: বাবেলের নগর | ঈশ্বর নগর ও টাওয়ার দেখতে নিচে নামেন। | মানুষের নির্মাণকে ওপরের কর্তৃত্বের পরিদর্শনের বিষয় করা। |
| আদিপুস্তক ১৮:২০–২১: সদোম ও গমোরা | অভিযোগ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছায়; তিনি নিচে গিয়ে দেখার ঘোষণা দেন। | অভিযোগ শোনা, তদন্ত করা ও বিচার করার মানবীয় পদ্ধতিতে দেবতার কর্ম বর্ণনা। |
| যাত্রাপুস্তক ১৯:২০–২২: সিনাই | ঈশ্বর পর্বতের চূড়ায় নামেন; মূসা ওপরে ওঠেন; সাধারণ মানুষ নিচে থাকে। | পবিত্র এলাকা, অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারী ও নিষিদ্ধ প্রবেশের সীমানা নির্ধারণ। |
| যাত্রাপুস্তক ৩৪:৫–৭: মেঘে অবতরণ | ঈশ্বর মেঘের মধ্যে নামেন, অবস্থান নেন ও ঘোষণা দেন। | দেবতার উপস্থিতি ও কর্তৃত্বকে দৃশ্য ও কণ্ঠের সাহায্যে প্রকাশ। |
| কোরআন ২:২১০: আল্লাহ ও ফেরেশতাদের আগমন | মেঘের ছায়ামণ্ডলের মধ্যে আগমন এবং ফয়সালার ভাষা। | ঐশী বিচারকে আকাশীয় আবির্ভাবের দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন। |
| নজুলের হাদিস: প্রতি রাতের অবতরণ | আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে নামেন এবং প্রার্থনা, চাওয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান করেন। | মানুষের রাতের নির্দিষ্ট সময়কে দেবতার কাছে আসা ও সাড়া দেওয়ার বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা। |
এখানেও বিশ্বচিত্রটি একই ধরনের উল্লম্ব বিন্যাসের ওপর দাঁড়ানো—ঈশ্বর ওপরে, মানুষ নিচে; মানুষ ঈশ্বরের দিকে ওপরে ওঠে এবং ঈশ্বর মানুষের দিকে নিচে নামেন। ইসলামের “আরশের ওপরে আল্লাহ” এবং পরে “দুনিয়ার আসমানে নজুল” বর্ণনা সেই পুরোনো আব্রাহামিক স্থানিক ঈশ্বর-ভাষার ধারাবাহিকতার মধ্যেই সহজে বোঝা যায়। এই প্রাচীন উল্লম্ব বিশ্বচিত্র আধুনিক গোলাকার, ঘূর্ণনশীল পৃথিবীর বৈশ্বিক সময়ব্যবস্থার মুখোমুখি হলেই নজুলের সময়গত সমস্যাটি প্রকট হয়ে ওঠে।
এই কাহিনিগুলোর মিল ব্যাখ্যা করে কেন ঈশ্বরের আবাস ওপরের দিকে এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বারবার নামা-ওঠার ভাষায় আসে। মানুষের সমাজের শাসনব্যবস্থা, দূরত্বের অভিজ্ঞতা এবং মাথার ওপরের আকাশকে একত্র করে দেবতার একটি জগৎ নির্মিত হয়েছে। সেই জগতের কাহিনি ধর্মীয় আবেগ ও কর্তৃত্ব সৃষ্টি করতে পারে; তার মহাজাগতিক সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রয়োজন। প্রাচীন সাহিত্যে একই দৃশ্যের পুনরাবির্ভাব তার সাংস্কৃতিক পরিচয় দেখায়। তাকে অচিন্তনীয় ঐশী জ্ঞান বলে ঘোষণা করলে কোনো নতুন পর্যবেক্ষণ, ব্যাখ্যামূলক ক্ষমতা বা যাচাইযোগ্য তথ্য যুক্ত হয় না।
অঞ্চলভেদে রাত: আলেমদের ফতোয়ায় স্বীকৃত সমস্যা
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ ভিন্ন সময়ে আসে—এই বাস্তবতা ইসলামি ফতোয়া-সাহিত্যেই সরাসরি আলোচিত হয়েছে। সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাযকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, পৃথিবীর সব অধিবাসীর জন্য শেষ তৃতীয়াংশ একই সময়ে না হলে আল্লাহর অবতরণ এবং আরশে অবস্থানের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। প্রশ্নকারীর বক্তব্যে সময়ের ভিন্নতা এবং অবস্থান পরিবর্তনের পরিণতি একসঙ্গে এসেছে। ফলে সমস্যাটির উপস্থিতি শুধু বাইরের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; নজুলকে সত্য বলে গ্রহণকারী আলেমদের নিজেদের আলোচনাতেও তার সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে। [27]
س: كيف نرد على من قال: إنكم تقولون: إن الله ينزل إلى السماء الدنيا بالثلث الأخير من الليل وإن ذلك يقتضي تركه العرش؛ لأن ثلث الليل الأخير ليس في وقت واحد على أهل الأرض؟
বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্ন: যারা বলে যে, আপনারা বলেন আল্লাহ রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং এর দ্বারা আরশ ছেড়ে দেওয়া আবশ্যক হয়—কারণ পৃথিবীর সব অধিবাসীর জন্য রাতের শেষ তৃতীয়াংশ একই সময়ে হয় না—তাদের জবাবে আমরা কী বলব?
ইবনে বাযের উত্তরে স্বীকারোক্তি ও ব্যাখ্যার সীমা
ইবনে বাযের উত্তরে পৃথিবীর অঞ্চলভেদে শেষ তৃতীয়াংশের পার্থক্য স্বীকার করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য হলো, আল্লাহর অবতরণ তাঁর জন্য উপযুক্ত বিশেষ ধরনের অবতরণ; মানুষ তার পদ্ধতি জানে না; আর এই অবতরণের কারণে আরশ খালি হওয়া আবশ্যক নয়। ছাদ থেকে মানুষ নেমে এলে ছাদটি তার উপস্থিতি থেকে খালি হয়, গাড়ি থেকে নামলে গাড়িটিও খালি হয়—এই উদাহরণগুলো তিনি নিজেই দিয়েছেন এবং আল্লাহর ক্ষেত্রে সেই তুলনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু কোন অঞ্চলের রাতের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট অবতরণ কীভাবে সম্পর্কিত, পৃথক অঞ্চলের অবতরণগুলো পরস্পরের সঙ্গে কী সম্পর্ক বহন করে এবং একই ঘটনার শুরু ও শেষ কীভাবে নির্ধারিত হয়—এসবের নির্দিষ্ট বিবরণ তাঁর উত্তরে নেই। [28]
দুটি বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট: পৃথিবীর রাত অঞ্চলভেদে ভিন্ন সময়ে ঘটে—এটি নির্ধারণযোগ্য বাস্তব তথ্য; আল্লাহ সেই ভিন্ন সময়ের প্রত্যেকটিতে বিশেষ পদ্ধতিতে নামেন—এটি সেই তথ্যের সঙ্গে বিশ্বাসকে মানিয়ে নেওয়ার অতিরিক্ত দাবি। প্রথমটির পক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের সূর্যাস্ত ও ফজরের সময় মাপা যায়। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অবতরণের পদ্ধতি অজানা বলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে যাচাইযোগ্য তথ্যটি স্বীকার করার পর অবতরণের সম্পর্কটিকে এমন একটি বিশেষ ক্ষমতার ওপর নির্ভর করানো হচ্ছে, যার স্বাধীন প্রমাণ বা নির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়নি। অজানা পদ্ধতির ঘোষণা থেকে জানা সমাধান পাওয়া যায় না।
আরশ খালি হবে কি না, সেটিও মূল সময়গত প্রশ্নের সমার্থক নয়। আরশে অবস্থান বহাল রেখেও আল্লাহ নামেন বলে মেনে নিলে একই মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সময়ের পার্থক্য বহাল থাকে। একটি অঞ্চলে ফজর হয়ে যাওয়ার পর আরেকটি অঞ্চলে শেষ তৃতীয়াংশ চলতে পারে। তখনও কোন অঞ্চলের হিসাবে অবতরণ শেষ এবং কোন অঞ্চলের হিসাবে তা চলমান—এই সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হয়। আরশের অবস্থান সম্পর্কে একটি ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা পৃথিবীর এই সময়গত বিন্যাসের ব্যাখ্যা দেয় না।
ইবনে তাইমিয়ার আলোচনায় দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশ
ইবনে তাইমিয়া নজুলের আলোচনা করতে গিয়ে পূর্ব–পশ্চিমের সময়ভেদ এবং উত্তর–দক্ষিণে রাতের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন দুইটিই বিবেচনা করেছেন। পূর্বের কোনো অঞ্চলে শেষ তৃতীয়াংশ পশ্চিমের অঞ্চলের আগে আসে; উত্তরের অঞ্চলে শীতের রাত দীর্ঘ এবং গ্রীষ্মের রাত ছোট হয়। ফলে রাতের শেষ তৃতীয়াংশের শুরু, শেষ এবং স্থায়িত্ব স্থানভেদে বদলায়। তাঁর বক্তব্যে এই ভৌগোলিক প্রশ্নটি বিস্তারিতভাবে উপস্থিত। তিনি আল্লাহর নজুলকে স্বীকার করে মানুষের সাধারণ অবতরণের ধারণা প্রত্যাখ্যানের পক্ষে এই আলোচনা ব্যবহার করেছেন। [29]
وأما إذا كان لكل بلد ثلث غير الثلث الآخر، وأن أول كل بلد بعد الثلث الآخر يقدر ما بينهما، وكذلك آخر ثلث ليل البلد الشرقي ينقضي قبل انقضاء ثلث ليل البلد الغربي. وأيضا إن كانت مداخلة فلا بد أن يدوم النزول على كل بلد ثلث ليلهم إلى طلوع فجرهم؛ فيلزم من ذلك أن يقدر أثلاث بقدر عدد البلاد. وأيضا فكما أن ثلث الليل يختلف بطول البلد فهو يختلف بعرضها أيضا. فكلما كان البلد أدخل في الشمال كان ليله في الشتاء أطول وفي الصيف أقصر.
وما كان قريبا من خط الاستواء يكون ليله في الشتاء أقصر من ليل ذاك وليله في الصيف أطول من ليل ذاك؛ فيكون ليلهم ونهارهم أقرب إلى التساوي. وحينئذ فالنزول الإلهي لكل قوم هو مقدار ثلث ليلهم فيختلف مقداره بمقادير الليل في الشمال والجنوب كما اختلف في المشرق والمغرب. وأيضا فإنه إذا صار ثلث الليل عند قوم فبعده بلحظة ثلث الليل عند ما يقاربهم من البلاد؛ فيحصل النزول الإلهي الذي أخبر به الصادق المصدق أيضا عند أولئك إذا بقي ثلث ليلهم وهكذا إلى آخر العمارة.
فلو كان كما توهمه الجاهل من أنه يكون تحت العرش وتكون فوقه السماء وتحته السماء؛ لكان هذا ممتنعا من وجوه كثيرة. منها أنه لا يكون فوق العرش قط بل لا يزال تحته. ومنها أنه يجب على هذا التقدير أن يكون الزمان بقدر ما هو مرات كثيرة جدا ليقع كذلك. ومنها أنه مع دوام نزوله إلى سماء هؤلاء إلى طلوع فجرهم إن أمكن مع ذلك أن يكون قد نزل على غيرهم أيضا ممن ثلث ليلهم يخالف ثلث هؤلاء في التقديم والتأخير والطول والقصر.
فهذا خلاف ما تخيلوه فإنهم لا يمكنهم أن يتخيلوا نازلا كنزول العباد من يكون نازلا على سماء هؤلاء ثلث ليلهم وهو أيضا في تلك الساعة نازلا على سماء آخرين مع أنه يجب أن يتقدم على أولئك أو يتأخر عنهم أو يزيد أو يقصر.
বাংলা অনুবাদ:
আর যদি প্রত্যেক অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশ অন্য অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশ থেকে আলাদা হয় এবং দুই অঞ্চলের মধ্যকার ব্যবধান অনুসারে একটির শুরুর সময় অন্যটির তুলনায় পরে হয়; অনুরূপভাবে পূর্বের অঞ্চলের রাতের শেষ তৃতীয়াংশ পশ্চিমের অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশ শেষ হওয়ার আগে শেষ হয়। আবার সময়গুলো পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করলেও প্রত্যেক অঞ্চলে তাদের রাতের এক-তৃতীয়াংশ সময়, তাদের ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত অবতরণ অব্যাহত থাকা আবশ্যক হয়। ফলে অঞ্চলের সংখ্যা অনুযায়ী শেষ তৃতীয়াংশগুলো নির্ধারণ করতে হয়। রাতের শেষ তৃতীয়াংশ যেমন অঞ্চলের দ্রাঘিমা অনুসারে ভিন্ন হয়, তেমনি অক্ষাংশ অনুসারেও ভিন্ন হয়। কোনো অঞ্চল যত উত্তরে হয়, তার শীতের রাত তত দীর্ঘ এবং গ্রীষ্মের রাত তত ছোট হয়।
আর যে অঞ্চল বিষুবরেখার নিকটবর্তী, শীতে তার রাত ওই উত্তরের অঞ্চলের রাতের চেয়ে ছোট এবং গ্রীষ্মে তার রাত ওই অঞ্চলের রাতের চেয়ে দীর্ঘ হয়; ফলে তার রাত ও দিন সমতার অধিক নিকটবর্তী হয়। তখন প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর জন্য ঐশী অবতরণের সময় হলো তাদের রাতের এক-তৃতীয়াংশ। পূর্ব ও পশ্চিমে যেমন তার পরিমাণ ভিন্ন হয়, তেমনি উত্তর ও দক্ষিণেও রাতের পরিমাণ অনুসারে ভিন্ন হয়। আবার কোনো জনগোষ্ঠীর কাছে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হলে, তার অল্প পরেই পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হয়। তখন সত্যবাদী ও সত্যায়িত ব্যক্তি যে ঐশী অবতরণের সংবাদ দিয়েছেন, তাদের রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট হলে তাদের জন্যও তা ঘটে; এভাবে বসতিপূর্ণ এলাকার শেষ পর্যন্ত চলে।
সুতরাং অজ্ঞ ব্যক্তি যেমন কল্পনা করেছে যে তিনি আরশের নিচে থাকবেন এবং তাঁর ওপরে ও নিচে আসমান থাকবে—যদি বিষয়টি তেমন হতো, তাহলে বহু কারণে তা অসম্ভব হতো। এর একটি হলো, তিনি কখনোই আরশের ওপরে থাকতেন না, বরং সর্বদা নিচে থাকতেন। আরেকটি হলো, এভাবে তা ঘটতে হলে সময়কে তার বর্তমান পরিমাণের বহু গুণ হতে হতো। আরেকটি হলো, এই জনগোষ্ঠীর ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত তাদের আকাশে তাঁর অবতরণ অব্যাহত থাকার সঙ্গে একই সময়ে অন্য জনগোষ্ঠীর কাছেও তাঁর অবতরণ সম্ভব হয় কি না, যাদের শেষ তৃতীয়াংশ এই জনগোষ্ঠীর শেষ তৃতীয়াংশের তুলনায় আগে বা পরে এবং দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত।
এটি তাদের কল্পনার বিপরীত। কারণ মানুষের অবতরণের মতো এমন কোনো অবতরণকারী তারা কল্পনা করতে পারে না, যে এই জনগোষ্ঠীর আকাশে তাদের রাতের এক-তৃতীয়াংশ অবতরণরত এবং সেই একই সময়ে অন্য জনগোষ্ঠীর আকাশেও অবতরণরত, অথচ তাদের তুলনায় তাকে আগে বা পরে হতে হবে কিংবা সময় বাড়াতে বা কমাতে হবে।
এই বক্তব্যে সমস্যার মাত্রা শুধু ঘড়ির সময়ের পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিনটি পৃথক বিষয় এসেছে: শেষ তৃতীয়াংশ কখন শুরু হয়, কতক্ষণ স্থায়ী হয় এবং কখন শেষ হয়। পাশাপাশি অঞ্চলের সময়ের ব্যবধান অল্প হতে পারে; দূরের অঞ্চলের ব্যবধান অনেক বেশি হতে পারে; ঋতু বদলালে একই অঞ্চলের রাতের দৈর্ঘ্যও বদলায়। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট এলাকার রাতকে মহাজাগতিক ঘটনার সময়সূচি করা হলে সমগ্র পৃথিবীর জন্য সেই সময়সূচি নিজে থেকেই অভিন্ন থাকে না। ইবনে তাইমিয়ার আলোচনাই এই জটিলতাকে ইসলামি সাহিত্যের ভেতরে স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করেছে।
তাঁর সিদ্ধান্ত হলো, মানুষের অবতরণের মতো অবতরণ কল্পনা করলে এসব অসুবিধা আসে; তাই আল্লাহর অবতরণকে সেই রকম ধরা যাবে না। এখানে ব্যাখ্যার পরিবর্তে একটি ব্যতিক্রম নির্ধারিত হচ্ছে। স্থানভেদে সময়ের পার্থক্য নির্ণয় করা হচ্ছে পরিচিত হিসাব দিয়ে, কিন্তু সেই হিসাবের সঙ্গে ঈশ্বরের কাজের সম্পর্ক বিচার করতে গেলেই সাধারণ সম্পর্কগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। কোন নিয়মে তাঁর একটি কাজ একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তার নির্দিষ্ট বিকল্প বিবরণ পাওয়া যায় না। ভূগোলের প্রশ্নটি যথাযথভাবে চিহ্নিত করার পর তার উত্তর অজ্ঞাত বিশেষত্বের মধ্যে রেখে দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতার দাবি এবং একটি ঘটনার ব্যাখ্যা
ইসলামকিউএ-র একটি উত্তরে ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ ও ইবনে তাহিরের কথোপকথন উদ্ধৃত করে একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রথমে আরশ খালি না করে নামার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়; সেই ক্ষমতা স্বীকারের পর আলোচনা বন্ধ করতে বলা হয়। মূল কথোপকথনটি হলো: [30]
روى النجاد عن الإمام إسحاق بن راهويه أنه قال: «دخلت على ابن طاهر فقال: ما هذه الأحاديث؟ تروون أن الله ينزل إلى السماء الدنيا؟ قلت: نعم، رواها الثقات الذين يروون الأحكام، فقال: ينزل ويدع عرشه؟ فقلت: يقدر أن ينزل من غير أن يخلو منه العرش؟ قال: نعم، قلت: فلم تتكلم في هذا؟»
বাংলা অনুবাদ:
নাজ্জাদ ইমাম ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন, “আমি ইবনে তাহিরের কাছে প্রবেশ করলে তিনি বললেন, এই হাদিসগুলো কী? আপনারা বর্ণনা করেন যে আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে নামেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, যেসব নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি বিধিবিধানের বর্ণনা দেন, তাঁরাই এগুলো বর্ণনা করেছেন। তিনি বললেন, তিনি নামেন এবং তাঁর আরশ ছেড়ে দেন? আমি বললাম, আরশ তাঁর থেকে খালি না করেও কি তিনি নামতে সক্ষম? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে এ বিষয়ে কথা বলছেন কেন?”
একই উত্তরে এই যুক্তি স্থানীয় রাতের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে: প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর শেষ তৃতীয়াংশে কার্যকর হয় এমন একটি অবতরণ আল্লাহ ঘটাতে পারেন কি না—এই প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব থেকেই আলোচনা বন্ধ করার নির্দেশ তৈরি করা হয়। এখানে প্রশ্নের মধ্যে থাকা নির্দিষ্ট সম্পর্কটির সম্ভাবনাকেই আল্লাহর ক্ষমতার অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটি অবতরণকে প্রত্যেক অঞ্চলের আলাদা শুরু ও শেষের সঙ্গে যুক্ত করলে “একটি” কথাটির অর্থ কী থাকে, উত্তরটি তা নির্ধারণ করে না। একটি বিশ্বজনীন শুরু ও শেষ এবং প্রত্যেক অঞ্চলের পৃথক শুরু ও শেষ আলাদা সময়গত বিন্যাস। কোন বিন্যাসে অবতরণটি ঘটছে, তা অজ্ঞাত রেখে শুধু ক্ষমতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘোষণাটির সঙ্গে স্থানীয় সময়ের সম্পর্ক জানতে চাওয়ার যৌক্তিক প্রয়োজন থেকেই যায়।
| উত্থাপিত প্রশ্ন | উৎসে ব্যবহৃত জবাবের ধরন | যে সম্পর্কটি ব্যাখ্যাত থাকে না |
|---|---|---|
| ইবনে বাযের কাছে প্রশ্ন: শেষ তৃতীয়াংশ সবার জন্য এক সময়ে নয়। | আল্লাহর বিশেষ অবতরণ; পদ্ধতি অজানা; আরশ খালি হওয়া আবশ্যক নয়। | পৃথক অঞ্চলের সময়ের সঙ্গে একই অবতরণের শুরু, স্থায়িত্ব ও সমাপ্তির সম্পর্ক। |
| ইবনে তাইমিয়ার আলোচনা: পূর্ব–পশ্চিমের সময় এবং উত্তর–দক্ষিণে রাতের দৈর্ঘ্য বদলায়। | মানুষের অবতরণের মতো কল্পনা প্রত্যাখ্যান; প্রতিটি জনগোষ্ঠীর শেষ তৃতীয়াংশে ঐশী অবতরণ স্বীকার। | একই মুহূর্তে ভিন্ন শুরু ও শেষযুক্ত আঞ্চলিক ঘটনাগুলো কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। |
| ইসলামকিউএ-র প্রশ্ন: একটি অবতরণ সবার স্থানীয় শেষ তৃতীয়াংশে ঘটতে পারে কি না। | সর্বক্ষমতার অনুমান থেকে সম্ভাবনা মেনে নিয়ে আলোচনা বন্ধ করা। | কাজ করার ক্ষমতা এবং ঘটনাটির নির্দিষ্ট বাস্তব বিবরণের মধ্যে প্রমাণগত সংযোগ। |
যুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা: শুনবেন এবং মানবেন
মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিনের ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম গ্রন্থেও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শেষ তৃতীয়াংশের সময়ভেদ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। প্রশ্নটির ভিত্তি খুব সরল: পৃথিবীর এক অঞ্চলে যে সময় শেষ তৃতীয়াংশ চলছে, অন্য অঞ্চলে সেই সময় আগে বা পরে আসে; ফলে অবতরণকে প্রত্যেক অঞ্চলের স্থানীয় রাতের সঙ্গে যুক্ত করলে তার সামগ্রিক স্থায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। বাংলা সংস্করণে প্রশ্নটি এভাবে মুদ্রিত হয়েছে: [31]
“শেষ রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন”—এ কথার ব্যাখ্যা
প্রশ্ন: (৪) আমরা জানি যে, রাত ভূপৃষ্ঠের ওপরে ঘূর্ণায়মান। আর আল্লাহ রাতের তিন ভাগের এক ভাগ অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। এ হিসাবে আল্লাহ তাআলা রাতভর দুনিয়ার আকাশেই থাকেন। এর উত্তর কী?
উত্তরের শুরুতেই কেন এবং কীভাবে প্রশ্নের ওপর বাধা
উত্তরের শুরুতে উসাইমিন আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করেছেন। এরপর ওই গুণাবলি সম্পর্কে কেন ও কীভাবে প্রশ্ন করা এবং পদ্ধতি কল্পনা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে বলেছেন। ইস্তিওয়ার পদ্ধতি জানতে চাওয়ার জবাবে মালিকের নামে প্রচলিত বক্তব্যও এনেছেন: বিশ্বাস করা বাধ্যতামূলক এবং পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত। অর্থাৎ ভূগোলের প্রশ্নের উত্তর শুরু হচ্ছে অনুসন্ধানের অনুমোদিত সীমা নির্ধারণ দিয়ে। কোন তথ্যের মধ্যে কী সম্পর্ক আছে তা বিচার করার আগেই প্রশ্নের একটি শ্রেণিকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। [32]
এই পদ্ধতিতে প্রশ্নের সত্যতা বা যুক্তিগত বৈধতা বিচার করার বদলে প্রশ্ন করাটিই ধর্মীয় শৃঙ্খলার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ শেষ তৃতীয়াংশ একটি হিসাবযোগ্য সময়। কোন অঞ্চলে কখন তা শুরু হয় এবং কখন শেষ হয়, সেটি জানার জন্য আল্লাহর অজানা দৈহিক আকৃতি কল্পনা করার প্রয়োজন নেই। সূর্যাস্ত ও ফজরের ব্যবধান এবং বিভিন্ন স্থানের সময়ের পার্থক্য থেকেই প্রশ্নটি তৈরি হয়। সেই প্রশ্নকে অজ্ঞাত স্বরূপ নিয়ে অনধিকার কৌতূহল বলে চিহ্নিত করলে সময়ের বাস্তব হিসাব আড়াল করা হয়।
সাহাবিরা প্রশ্ন করেননি: নীরবতাকে যুক্তির মানদণ্ড করা
উত্তরের শেষ অনুচ্ছেদে উসাইমিন সাহাবিদের প্রশ্ন না করার দাবি, প্রত্যেক অঞ্চলে স্থানীয় সময় অনুযায়ী অবতরণ এবং আত্মসমর্পণের নির্দেশ একত্র করেছেন। বাংলা সংস্করণে তাঁর বক্তব্য হলো: [33]
উত্তরে আমরা বলব যে, এই প্রশ্নটি কোনো সাহাবি করেননি। যদি প্রশ্নটি কোনো মুসলিমের অন্তরে হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল অবশ্যই তা বর্ণনা করতেন। আমরা বলব, পৃথিবীর কোনো অংশে যতক্ষণ রাতের এক-তৃতীয়াংশ থাকবে, ততক্ষণ সেখানে আল্লাহর অবতরণের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে। রাত শেষ হয়ে গেলে তা শেষ হয়ে যাবে। তবে আল্লাহর অবতরণের ধরন আমরা জানি না। তার সঠিক জ্ঞানও আমাদের কাছে নেই। আর আমরা জানি, আল্লাহর মতো আর কেউ নেই। আমাদের উচিত হবে আল্লাহর কিতাবের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং এ কথা বলা যে, আমরা শুনলাম এবং ঈমান আনয়ন করলাম ও অনুসরণ করলাম। এটাই আমাদের করণীয়।


সাহাবিরা কোনো প্রশ্ন করেছিলেন কি না, সেটি ওই প্রশ্নের যৌক্তিক সত্যতা নির্ধারণ করে না। তাঁদের নামে সংরক্ষিত আলোচনায় কোনো প্রশ্ন না পাওয়া গেলে সেখান থেকে সর্বোচ্চ ওই নথিতে প্রশ্নটির অনুপস্থিতি জানা যায়। সেখান থেকে প্রশ্নটি অবৈধ, অপ্রয়োজনীয় বা যুক্তিহীন—এই সিদ্ধান্ত আসে না। কোনো পূর্বসূরি একটি সমস্যা নিয়ে কথা না বললে সমস্যাটির বাস্তব উপাদান বিলুপ্ত হয় না। পৃথিবীর অঞ্চলভেদে শেষ তৃতীয়াংশের পার্থক্য তাঁদের প্রশ্নের তালিকার ওপর নির্ভর করে না।
আর “এমন প্রশ্ন মুমিনের মনে আসার হলে আল্লাহ ও রাসুল তা ব্যাখ্যা করতেন”—এই যুক্তিতে সিদ্ধান্তটিই শুরুতে ধরে নেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় বর্ণনায় প্রয়োজনীয় সব ব্যাখ্যা আছে, এই বিশ্বাস সত্য ধরে নিয়ে অনুপস্থিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন অস্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব ব্যাখ্যা আছে কি না, প্রশ্নটি সেখানেই। ব্যাখ্যা না পাওয়াকে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই বলে ঘোষণা করা হলে কোনো অসম্পূর্ণ দাবিকেই আর অসম্পূর্ণ বলা যাবে না। যেকোনো অস্পষ্টতার ক্ষেত্রে একই নিয়মে বলা সম্ভব হবে, উত্তর দরকার হলে কর্তৃপক্ষ আগেই দিতেন। এতে অনুসন্ধানের পথ বন্ধ হয় এবং কর্তৃপক্ষের ঘোষণা যাচাইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যায়।
‘তিনি নামেন বলো, চুপ করো’: প্রশ্ন বন্ধ করার স্পষ্ট নির্দেশ
ইসলামকিউএ-তে উসাইমিনের মাজমু ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৪–২০৫ থেকে উদ্ধৃত বক্তব্যে আরশ খালি হওয়ার প্রশ্নকে অতিরঞ্জিত অনুসন্ধান হিসেবে তিরস্কার করা হয়েছে। প্রশ্নকারী সাহাবিদের চেয়ে বেশি আগ্রহী কি না, সেই তুলনা টেনে তাঁর প্রশ্নের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। এরপর সরাসরি নির্দেশ এসেছে: [34]
قُلْ يَنْزِلُ وَاسْكُتْ
বাংলা অনুবাদ:
বলো, তিনি নামেন; আর চুপ করো।
এই নির্দেশে গ্রহণযোগ্য আচরণটি স্পষ্ট: বর্ণনা পুনরাবৃত্তি করতে হবে এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্ন থামাতে হবে। “তিনি নামেন” বক্তব্যটি নিশ্চিতভাবে বলার অনুমোদন আছে; সেই নামার সঙ্গে আরশের অবস্থান কীভাবে সম্পর্কিত, তা জানতে চাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। একই বাক্যের ঘোষণা বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু তার অর্থের সম্পর্ক পরীক্ষা করতে গেলেই অনধিকারচর্চার অভিযোগ আসছে। এতে সমালোচনা মোকাবিলার মানদণ্ড প্রমাণ থেকে সরে আনুগত্যে স্থাপিত হয়।
ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত লিকাউল বাবিল মাফতুহ-এর ৬৭তম বৈঠকে উসাইমিনকে আরও নির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: এক শহর থেকে অন্য শহরে শেষ তৃতীয়াংশ বদলাতে বদলাতে যদি দিনের সব সময়েই কোথাও সেই সময় উপস্থিত থাকে, তাহলে অবতরণ কি স্থায়ী হয়ে যায়? তিনি উত্তরের শুরুতেই এমন বিষয়ে কথা না বলার আগের নির্দেশের কথা স্মরণ করান। এরপর স্থানীয় শেষ তৃতীয়াংশে অবতরণ স্বীকার করতে বলেন; নিজের অবস্থানস্থলে তখন দুপুরের আগের সময় বলে সেখানে অবতরণ নেই, অথচ অন্য অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশে অবতরণ আছে—এমন বিবরণ দেন। [35]
এই আঞ্চলিক বর্ণনায় সময়ের বাস্তব পার্থক্য স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নকারীর অনুসন্ধান ছিল পুরো পৃথিবীকে একসঙ্গে ধরে এই আঞ্চলিক বক্তব্যগুলোর সম্মিলিত অর্থ কী। প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য আলাদা করে একই বাক্য বলা সেই সম্মিলিত প্রশ্নের উত্তর দেয় না। একটি স্থানে কার্যকর এবং অন্য স্থানে কার্যকর নয় বলে স্থানীয় শর্ত পুনরাবৃত্তি করা যায়; সেখান থেকে সমগ্র পৃথিবীজুড়ে ঘটনাটির সময়গত রূপ নিজে থেকেই নির্ধারিত হয় না। আলোচনা বন্ধ করার নির্দেশ সেই অনির্ধারিত সম্পর্কটিকেই অনুসন্ধানের বাইরে রাখে।
ইবনে রজব: আপত্তির জবাবে শাস্তির অনুমোদন
ইবনে রজবের ফাদলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফ গ্রন্থে অঞ্চলভেদে রাতের প্রশ্নের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান পাওয়া যায়। তিনি এই আপত্তিকে ধর্মীয়ভাবে কুৎসিত বলেছেন এবং মুহাম্মদ বা খলিফারা এমন আপত্তি শুনলে বিতর্ক না করে প্রশ্নকারীকে শাস্তি দিতেন বলে নিজের মূল্যায়ন প্রকাশ করেছেন। পূর্ণ অনুচ্ছেদটি হলো: [36]
وقد اعترض بعض من كان يعرف هذا على حديث النزول ثلث الليل الآخر وقال ثلث الليل يختلف باختلاف البلدان فلا يمكن أن يكون النزول في وقت معين. ومعلوم بالضرورة من دين الإسلام قبح هذا الاعتراض. وأن الرسول صلى الله عليه وسلم أو خلفاءه الراشدين لو سمعوا من يعترض به لما ناظروه بل بادروا إلى عقوبته وإلحاقه بزمرة المخالفين المنافقين المكذبين.
বাংলা অনুবাদ:
এ সম্পর্কে জানতেন এমন কেউ কেউ রাতের শেষ তৃতীয়াংশে অবতরণের হাদিসের বিরুদ্ধে আপত্তি করেছেন। তাঁরা বলেছেন, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়; ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে অবতরণ হওয়া সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্ম থেকে অবধারিতভাবে জানা যায় যে এই আপত্তি কুৎসিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা তাঁর ন্যায়পথপ্রাপ্ত খলিফারা এমন আপত্তিকারীর কথা শুনলে তার সঙ্গে বিতর্ক করতেন না; বরং দ্রুত তাকে শাস্তি দিতেন এবং বিরোধী, মুনাফিক ও মিথ্যাপ্রতিপন্নকারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতেন।
এখানে প্রশ্নকারীর যুক্তি উদ্ধৃত করার পর তার জবাবে কোনো সময়ের হিসাব দেওয়া হয়নি। কোন ধাপে অনুমানটি ভুল, কোন তথ্য ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে অথবা কোন নিয়মে আঞ্চলিক সময়গুলো একটি অভিন্ন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে—এগুলোর পরিবর্তে এসেছে ধর্মীয় নিন্দা এবং শাস্তির অনুমোদন। প্রশ্নকারীর পরিচয় বদলে দেওয়া হচ্ছে: তিনি একটি যুক্তি তুলেছেন, কিন্তু তাঁকে বিরোধী, মুনাফিক ও মিথ্যাপ্রতিপন্নকারীর শ্রেণিতে রাখা হচ্ছে। একটি বক্তব্যের সত্যতা বিচার করার জায়গায় ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধর্মীয় আনুগত্যের বিচার বসানো হয়েছে।
শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা একটি যুক্তিকে খণ্ডন করে না। আপত্তিকারীকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যায়; পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সূর্যাস্ত ও ফজরের সময়ের পার্থক্য তাতে বদলায় না। ইবনে রজবের অনুমোদিত প্রতিক্রিয়া তাই জ্ঞানগত অনুসন্ধানের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ব প্রয়োগের উদাহরণ। তাঁর নিজের ভাষাতেই বিতর্কের বদলে শাস্তি অগ্রাধিকার পেয়েছে। এমন পদ্ধতিতে কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠিত থাকলে তার স্থায়িত্বকে সত্যতার প্রমাণ বলা যায় না; কারণ আপত্তি তোলার সুযোগই দমন করা হচ্ছে।
| পদ্ধতি | উৎসে তার প্রকাশ | যুক্তি যাচাইয়ের ওপর প্রভাব |
|---|---|---|
| পূর্বসূরির নীরবতাকে মানদণ্ড করা | উসাইমিনের বক্তব্য: সাহাবিরা এই প্রশ্ন করেননি। | বর্তমান প্রশ্নের তথ্য ও যুক্তি পরীক্ষা করার বদলে পুরোনো প্রশ্নের তালিকাকে সীমা করা। |
| কেন ও কীভাবে প্রশ্ন নিয়ন্ত্রণ | ফতোওয়া আরকানুল ইসলামে গুণাবলির পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ও চিন্তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ। | ঘটনার সময়গত সম্পর্কের অনুসন্ধানকে নিষিদ্ধ পদ্ধতি-অনুসন্ধানের সঙ্গে এক করে ফেলা। |
| সরাসরি নীরবতার নির্দেশ | উসাইমিনের উদ্ধৃত বাক্য: তিনি নামেন বলো, চুপ করো। | ঘোষণাটি গ্রহণ করতে দেওয়া, কিন্তু তার সম্পর্কিত প্রশ্ন থামিয়ে দেওয়া। |
| বিতর্কের বদলে শাস্তি | ইবনে রজবের মূল্যায়নে মুহাম্মদ বা খলিফাদের প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। | আপত্তির যৌক্তিক জবাবের স্থানে প্রশ্নকারীর বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও দমনমূলক প্রতিক্রিয়া অনুমোদন। |
এই অবস্থানগুলোর সামাজিক ফলও নির্দিষ্ট। অনুসারী জানতে শেখে কোন কথা পুনরাবৃত্তি করলে তার বিশ্বাসের স্বীকৃতি মিলবে এবং কোন প্রশ্ন তুললে তিরস্কার বা শাস্তির যোগ্য বলে গণ্য হতে হবে। তখন প্রকাশ্য সম্মতি থেকে স্বতঃস্ফূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতা অনুমান করা ভুল। বিশ্বাসের পরিবেশে প্রশ্নের মূল্য যদি হয় ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সন্দেহ, নিন্দা বা শাস্তির ভয়, তাহলে নীরবতা প্রতিষ্ঠিত মতের পক্ষে স্বাধীন সাক্ষ্য হয় না। নজুলের সময় নিয়ে এই আলোচনায় ভৌগোলিক সমস্যা স্বীকার, ব্যাখ্যাকে অজানা ঘোষণা এবং অনুসন্ধান বন্ধ করার নির্দেশ একত্রে কাজ করেছে।
আলেমদের বক্তব্য: নজুলের ব্যাখ্যা ও চিন্তার সীমানা
মতিউর রহমান মাদানি, আহমাদুল্লাহ ও মঞ্জুরে ইলাহীর নজুলসংক্রান্ত বক্তব্যের সংকলিত ভিডিওটি নিচে দেওয়া হলো। একই হাদিসের ধর্মীয় প্রচার, তার ব্যাখ্যা এবং এ বিষয়ে চিন্তার অনুমোদিত সীমা—এই তিনটি বিষয় আলেমদের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। একটি বক্তব্যের পক্ষে হাদিস উদ্ধৃত করা এবং সেই বক্তব্যের অর্থ নির্ধারণ করা পৃথক কাজ। বর্ণনা গ্রহণের পরও তার কর্তা, ক্রিয়া, গন্তব্য ও সময়ের অর্থ ঠিক করতে হয়। এই অর্থ নির্ধারণের জায়গাতেই ধ্রুপদি ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যে সুস্পষ্ট মতভেদ পাওয়া যায়।
নওয়াবির ভাষ্যে অর্থ নির্ধারণের দুই পথ
সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় নওয়াবি নজুলের হাদিসকে আল্লাহর গুণাবলিসংক্রান্ত হাদিসগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তার ব্যাখ্যায় দুইটি সুপরিচিত পথের উল্লেখ করেছেন। প্রথমটিতে আল্লাহর উপযোগী অর্থে বর্ণনাটি সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়, কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে পরিচিত প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয় বলে ধরা হয়; স্থানান্তর, চলাচল ও সৃষ্টির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও নাকচ করা হয়। দ্বিতীয়টিতে প্রসঙ্গ অনুসারে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। নওয়াবি সেই দ্বিতীয় ধারার মধ্যে রহমত, আদেশ ও ফেরেশতা নামার ব্যাখ্যা এবং প্রার্থনাকারীর প্রতি সাড়া ও অনুগ্রহের রূপক ব্যাখ্যা দুইটিই উল্লেখ করেছেন। তাঁর পূর্ণ প্রাসঙ্গিক আলোচনাটি হলো: [37]
قوله صلى الله عليه وسلم: «ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا فيقول: من يدعوني فأستجيب له» هذا الحديث من أحاديث الصفات، وفيه مذهبان مشهوران للعلماء سبق إيضاحهما في كتاب الإيمان ومختصرهما أن أحدهما وهو مذهب جمهور السلف وبعض المتكلمين: أنه يؤمن بأنها حق على ما يليق بالله تعالى، وأن ظاهرها المتعارف في حقنا غير مراد، ولا يتكلم في تأويلها مع اعتقاد تنزيه الله تعالى عن صفات المخلوق، وعن الانتقال والحركات وسائر سمات الخلق.
والثاني: مذهب أكثر المتكلمين وجماعات من السلف وهو محكي هنا عن مالك والأوزاعي: أنها تتأول على ما يليق بها بحسب مواطنها. فعلى هذا تأولوا هذا الحديث تأويلين أحدهما: تأويل مالك بن أنس وغيره معناه: تنزل رحمته وأمره وملائكته كما يقال: فعل السلطان كذا إذا فعله أتباعه بأمره. والثاني: أنه على الاستعارة، ومعناه: الإقبال على الداعين بالإجابة واللطف. والله أعلم.
বাংলা অনুবাদ:
তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, “আমাদের রব প্রতি রাতে নিকটবর্তী আসমানে নামেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব?”—এই হাদিসটি গুণাবলিসংক্রান্ত হাদিসগুলোর একটি। এ বিষয়ে আলেমদের দুইটি সুপরিচিত মত রয়েছে, যা কিতাবুল ইমানে আগে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সংক্ষেপে প্রথমটি হলো অধিকাংশ সালাফ ও কিছু কালামপন্থীর মত: আল্লাহ তাআলার জন্য উপযুক্ত অর্থে এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করা হবে; আমাদের ক্ষেত্রে পরিচিত প্রকাশ্য অর্থ এখানে উদ্দেশ্য নয়; এগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে কথা বলা হবে না। একই সঙ্গে বিশ্বাস করা হবে যে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির গুণ, স্থানান্তর, চলাচল এবং সৃষ্টির অন্য সব বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত।
দ্বিতীয়টি অধিকাংশ কালামপন্থী ও সালাফের বিভিন্ন দলের মত; এখানে মালিক ও আওজায়ির নামেও তা বর্ণিত হয়েছে: এসব বক্তব্যকে নিজ নিজ প্রসঙ্গ অনুযায়ী উপযুক্ত অর্থে ব্যাখ্যা করা হবে। এই ভিত্তিতে তাঁরা হাদিসটির দুইটি ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথমটি মালিক ইবনে আনাস ও অন্যদের ব্যাখ্যা: এর অর্থ তাঁর রহমত, আদেশ ও ফেরেশতারা নামেন। যেমন শাসকের অনুসারীরা তাঁর আদেশে কোনো কাজ করলে বলা হয়, শাসক সেই কাজ করেছেন। দ্বিতীয়টি হলো, এটি রূপক; এর অর্থ প্রার্থনাকারীদের প্রতি সাড়া ও অনুগ্রহ নিয়ে মনোযোগ দেওয়া। আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।
এখানে মতভেদটি একটি শব্দের উচ্চারণ নিয়ে নয়; হাদিসে কী ঘটছে বলা হচ্ছে, তা নিয়েই। আল্লাহ নিজে একটি ক্রিয়া করছেন—এই অর্থ এবং তাঁর আদেশে ফেরেশতা নামছে—এই অর্থের কর্তা এক নয়। আবার প্রার্থনায় অনুগ্রহের সঙ্গে সাড়া দেওয়াকে রূপকভাবে অবতরণ বলা হলে কোনো সত্তার নিম্নতর আসমানে পৌঁছানোর ঘটনাই আর বিবরণের কেন্দ্র থাকে না। একই শব্দ থেকে ভিন্ন প্রকৃতির ঘটনা নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে হাদিসের শব্দ পাওয়া গেলেই তার অর্থ একটিমাত্র ও স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায়—এমন দাবি নওয়াবির সংরক্ষিত ব্যাখ্যাগুলোর সঙ্গে অসংগত।
প্রথম পথটিও কোনো ব্যাখ্যাহীন অবস্থান নয়। প্রকাশ্য পরিচিত অর্থ উদ্দেশ্য নয়, স্থানান্তর ও চলাচল নেই—এগুলো নিজেই অর্থসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। কিছু অর্থ গ্রহণ এবং কিছু অর্থ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বাসের সীমানা তৈরি করা হচ্ছে। কোন বৈশিষ্ট্যটি আল্লাহর জন্য অনুপযুক্ত এবং কোন অর্থটি গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণে ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাখ্যার কাজ চলছেই, এমনকি প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা নিয়ে কথা না বলার নীতির মধ্যেও।
এক ধারার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা অন্য ধারায় অর্থবিকৃতি
ইসলামকিউএ-র ২০০৮১ নম্বর ফতোয়ায় নজুলকে আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রকৃত ক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে আদেশ, রহমত বা ফেরেশতা নামার অর্থকে ভুল অর্থান্তর হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, হাদিসে অবতরণ সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত এবং সাধারণভাবে কোনো কাজ তার কর্তার দিকেই সম্বন্ধিত হয়। আরও বলা হয়, আদেশ ও রহমত সব সময়েই আসে, তাই শুধু রাতের এই সময় দিয়ে তাকে চিহ্নিত করার যথার্থতা থাকে না; ক্ষমা ও দানের আহ্বানের বক্তাও আল্লাহ। [38]
নওয়াবি যে ব্যাখ্যাগুলোকে সুপরিচিত আলেমদের একটি ধারা হিসেবে সংরক্ষণ করেছেন, এই ফতোয়ায় সেই ব্যাখ্যাগুলোকেই বর্ণনার অর্থ বদলে দেওয়া বলা হচ্ছে। বিরোধের বিষয়টি তাই ধর্মগ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সাধারণ ভাগ দিয়ে বোঝানো যায় না। একই হাদিস গ্রহণকারী ব্যক্তিরাও তার নির্দিষ্ট অর্থ নিয়ে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এক ধারায় সঠিক ব্যাখ্যা হিসেবে গৃহীত অর্থ অন্য ধারায় ভুল ব্যাখ্যা হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তব মতভেদ থাকা অবস্থায় কোনো একটি ধারার সিদ্ধান্তকে হাদিসের ব্যাখ্যাহীন, সরাসরি ও সকলের জন্য অনিবার্য অর্থ বলে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর।
এখানে অর্থ নির্বাচনের মূল্যও নির্দিষ্ট। আল্লাহ নিজে নিকটবর্তী আসমানে নামেন বললে তাঁর ক্রিয়ার সঙ্গে হাদিসের সময় ও গন্তব্যের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে হয়। ফেরেশতা নামেন বললে ঘটনাটির সরাসরি কর্তা বদলে যায় এবং সেই পরিবর্তনের পাঠগত ভিত্তি দেখাতে হয়। প্রার্থনায় সাড়া দেওয়ার রূপক বললে সময়ের বিশেষত্ব ও রূপক ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। প্রতিটি ব্যাখ্যার নিজস্ব দাবি আছে। শুধু একটি মতের অনুসারীর সংখ্যা বা প্রচারকের মর্যাদা দিয়ে সেই দাবিগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হয় না।
| ব্যাখ্যার ধরন | কী অর্থ গ্রহণ করা হচ্ছে | কোন সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যাকারী নিচ্ছেন |
|---|---|---|
| নওয়াবির বর্ণিত প্রথম পথ | আল্লাহর উপযুক্ত অর্থে সত্য; মানুষের পরিচিত অর্থ উদ্দেশ্য নয়। | স্থানান্তর ও চলাচল নাকচ করে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থেকে বিরত থাকা। |
| নওয়াবির বর্ণিত অর্থান্তর | রহমত, আদেশ বা ফেরেশতার অবতরণ। | হাদিসের ক্রিয়াকে আল্লাহর আদেশে সংঘটিত কাজ হিসেবে বোঝা। |
| নওয়াবির বর্ণিত রূপক ব্যাখ্যা | প্রার্থনাকারীর প্রতি সাড়া ও অনুগ্রহ নিয়ে মনোযোগ। | অবতরণকে একটি সম্পর্ক বা অনুগ্রহের প্রকাশ হিসেবে পড়া। |
| ইসলামকিউএ-র আক্ষরিক অর্থ গ্রহণকারী অবস্থান | আল্লাহর নিজের প্রকৃত অবতরণ, যার পদ্ধতি অজ্ঞাত। | আদেশ, রহমত বা ফেরেশতা নামার ব্যাখ্যাকে অর্থবিকৃতি বলা। |
ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার এবং প্রশ্ন করার অধিকার
ধর্মীয় বক্তা যখন বলেন কোনো শব্দের পরিচিত অর্থ এখানে উদ্দেশ্য নয়, তখন তিনি শব্দটির অর্থ সম্পর্কে একটি বিচার করছেন। আবার অন্য বক্তা যখন বলেন সেই শব্দ প্রকৃত অর্থেই গ্রহণ করতে হবে, তিনিও একটি বিচার করছেন। প্রথমজন প্রসঙ্গ ও আল্লাহ-সম্পর্কিত ধারণার সাহায্যে অর্থ নির্ধারণ করেন; দ্বিতীয়জন কর্তা ও ক্রিয়ার ভাষাগত সম্পর্কের ওপর জোর দেন। দুই ক্ষেত্রেই চিন্তা, তুলনা ও সিদ্ধান্ত কার্যকর। সুতরাং ব্যাখ্যাকারীর নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বৈধ অথচ সেই সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাওয়া অবৈধ—এই নিয়মে জ্ঞানের একটি অসম ব্যবস্থা তৈরি হয়। কর্তৃপক্ষ যুক্তি প্রয়োগ করবেন, অনুসারী সেই যুক্তি পরীক্ষা করতে পারবেন না।
এই অসমতার মধ্যে আলেমের ব্যাখ্যা ধর্মীয় ক্ষমতা পায়। হাদিসের কোনো শব্দ কী বোঝাবে, কোন অর্থ গ্রহণ করলে বিশ্বাস সঠিক গণ্য হবে এবং কোন প্রশ্ন করলে অনুসারী সীমা অতিক্রম করেছেন বলা হবে—এসব নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যাখ্যাকারীর হাতে থাকে। অথচ প্রামাণ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থেই যখন একাধিক অর্থ সংরক্ষিত, তখন একটি বিশেষ অর্থ গ্রহণের সিদ্ধান্ত মানুষের ব্যাখ্যাগত কাজ হিসেবেই দৃশ্যমান। সেই সিদ্ধান্তের সমালোচনাকে ধর্মের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে ব্যাখ্যাকারীর নিজস্ব মতকে ধর্মীয় অনুশাসনের আড়ালে সুরক্ষিত করা হয়।
নজুলের আলোচনায় তাই নিশ্চিত অর্থের দাবি এবং অর্থ নিয়ে প্রশ্ন নিষিদ্ধ করার নীতি পরস্পরকে শক্তি জোগায়। প্রথমে একটি ব্যাখ্যাকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য অর্থের মর্যাদা দেওয়া হয়; এরপর তার প্রয়োজনীয় সম্পর্কগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠলে অনুসারীর আনুগত্য যাচাই করা হয়। এতে ব্যাখ্যার ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ সংকুচিত হয়। যে দাবির গ্রহণযোগ্যতা তার পক্ষে প্রকাশ্য যুক্তি ও প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার কারণ পরীক্ষা করতে দেওয়াই স্বাভাবিক। পরীক্ষা বন্ধ রাখার ধর্মীয় নির্দেশ ব্যাখ্যাকারীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে; বক্তব্যের নির্ভুলতার প্রমাণ সরবরাহ করে না।
দেবতার অবতরণ: পুরোনো পুরাণের দৃশ্য ও ইসলামি নজুল
দেবতা আকাশ থেকে নিচে নামেন, মানুষের কাছে আসেন, কাউকে সম্বোধন করেন অথবা জগতের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে প্রবেশ করেন—এই দৃশ্য ইসলামের বহু আগের ধর্মীয় সাহিত্যেও আছে। প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় কাহিনিতে দেবতার আবাস, মানুষের বাসস্থান এবং মৃতদের জগৎ আলাদা অঞ্চল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। দেবতারা সেই অঞ্চলগুলোর মধ্যে যাতায়াত করেন। কোনো কাহিনিতে মানুষের আচরণে হস্তক্ষেপ করতে দেবী আকাশ থেকে নামেন, কোনো কাহিনিতে দেবী মৃতদের জগতে প্রবেশ করেন। এই বিবরণগুলোতে ধর্মীয় ক্ষমতাকে অবস্থান, দূরত্ব, সীমানা, প্রবেশ ও প্রত্যাবর্তনের পরিচিত ভাষায় দৃশ্যমান করা হয়।
ইলিয়াডে আকাশ থেকে দেবীর অবতরণ
হোমারের ইলিয়াড-এর প্রথম সর্গে আগামেমননের বিরুদ্ধে ক্রোধে উত্তেজিত অ্যাকিলিস তরবারি বের করতে উদ্যত হন। সেই মুহূর্তে দেবী অ্যাথেনা আকাশ থেকে নেমে তাঁকে নিবৃত্ত করতে আসেন। সামুয়েল বাটলারের ইংরেজি অনুবাদে অ্যাথেনার জন্য রোমান নাম “Minerva” এবং হেরার জন্য “Juno” ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ধৃত অনুচ্ছেদে দেবীর অবতরণ এবং শুধু নির্বাচিত ব্যক্তির কাছে দৃশ্যমান হওয়ার বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে আছে। [39]
The son of Peleus was furious, and his heart within his shaggy breast was divided whether to draw his sword, push the others aside, and kill the son of Atreus, or to restrain himself and check his anger. While he was thus in two minds, and was drawing his mighty sword from its scabbard, Minerva came down from heaven (for Juno had sent her in the love she bore to them both), and seized the son of Peleus by his yellow hair, visible to him alone, for of the others no man could see her.
বাংলা অনুবাদ:
পেলেউসের পুত্র ক্রুদ্ধ ছিলেন। তাঁর লোমশ বক্ষের ভেতরে মন দ্বিধাবিভক্ত ছিল—তিনি কি তরবারি বের করে অন্যদের সরিয়ে আত্রেউসের পুত্রকে হত্যা করবেন, নাকি নিজেকে সংযত করে ক্রোধ দমন করবেন? এই দ্বিধার মধ্যে তিনি যখন খাপ থেকে তাঁর বিশাল তরবারি বের করছিলেন, তখন মিনার্ভা আকাশ থেকে নেমে এলেন—জুনো তাঁদের উভয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে তাঁকে পাঠিয়েছিলেন—এবং পেলেউসের পুত্রের সোনালি চুল ধরে ফেললেন। কেবল তিনিই দেবীকে দেখতে পাচ্ছিলেন; অন্যদের কেউ তাঁকে দেখতে পাচ্ছিল না।
এই দৃশ্যে মানুষ নিচের জগতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, দেবী ওপরের জগৎ থেকে এসে সেই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করছেন। দেবতার ক্ষমতা প্রকাশ পাচ্ছে দূর থেকে মানুষের পরিস্থিতি জানা, নিচে পৌঁছানো এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। নির্বাচিত ব্যক্তি দেবীকে দেখেন, উপস্থিত অন্যরা দেখেন না। ফলে ধর্মীয় কাহিনির মধ্যে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকে বিশেষ অধিকার ও কর্তৃত্বের চিহ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ওপর থেকে আসা দেবতার উপস্থিতি মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বাইরের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
নজুলের বর্ণনাতেও ওপরের অবস্থান থেকে মানুষের জগতের নিকটবর্তী একটি স্তরে আসা এবং মানুষকে আহ্বান করার কাঠামো পাওয়া যায়। হাদিসের গন্তব্য নিকটবর্তী আসমান এবং সময় প্রতি রাতের একটি বিশেষ অংশ। ইলিয়াডের দৃশ্যের গন্তব্য মানুষের ঘটনাস্থল এবং কারণ একটি নির্দিষ্ট সংঘাত। উভয় কাহিনিতে দেবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বোঝানোর জন্য অবস্থান ও অবতরণের ভাষা কার্যকর। দেবতার নিকটবর্তী হওয়া মানুষের পরিচিত কাছে আসার ধারণা দিয়েই বোধগম্য করা হয়েছে। এই ভাষা ধর্মীয় কল্পনার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ।
ইশতারের পাতালে যাত্রা: স্তরবিভক্ত মহাজগতের আরেক ছবি
মেসোপটেমীয় ইশতার-কাহিনিতে অবতরণের গন্তব্য মৃতদের নিচের জগৎ। সেখানে দরজা, প্রহরী এবং প্রবেশের নিয়ম রয়েছে। মরিস জাস্ট্রোর ১৯১৫ সালের ইংরেজি অনুবাদের সূচনাংশে সেই জগতের পূর্ণ বর্ণনামূলক স্তবকটি হলো: [40]
To the land of no return, the land of darkness,
Ishtar, the daughter of Sin directed her thought,
Directed her thought, Ishtar, the daughter of Sin,
To the house of shadows, the dwelling, of Irkalla,
To the house without exit for him who enters therein,
To the road, whence there is no turning,
To the house without light for him who enters therein,
The place where dust is their nourishment, clay their food.
They have no light, in darkness they dwell.
Clothed like birds, with wings as garments,
Over door and bolt, dust has gathered.
বাংলা অনুবাদ:
ফিরে আসা যায় না যে দেশে, অন্ধকারের সেই দেশে,
সিনের কন্যা ইশতার তাঁর মন নিবদ্ধ করলেন;
মন নিবদ্ধ করলেন ইশতার, সিনের কন্যা,
ছায়ার গৃহে, ইরকাল্লার আবাসে;
সেই গৃহে, যেখানে প্রবেশকারীর বের হওয়ার পথ নেই;
সেই পথে, যেখান থেকে ফিরে আসা যায় না;
সেই গৃহে, যেখানে প্রবেশকারীর জন্য আলো নেই;
সেই স্থানে, যেখানে ধুলা তাদের আহার, কাদা তাদের খাদ্য।
তাদের আলো নেই; তারা অন্ধকারে বাস করে।
পাখির মতো আবৃত, ডানাই তাদের পোশাক;
দরজা ও অর্গলের ওপর ধুলা জমেছে।
এই বিশ্বচিত্রে নিচের জগৎ মানুষের ঘর, নগর ও প্রশাসনের অনুরূপ উপাদান দিয়ে নির্মিত। দরজা আছে বলে প্রবেশ ও প্রস্থান আছে; প্রহরী আছে বলে অনুমতি ও বাধা আছে; অন্ধকারের আবাস আছে বলে এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের পার্থক্য আছে। দেবী সেই সীমানা অতিক্রম করেন। ধর্মীয় জগতের বিন্যাস তাই মানুষের স্থানিক অভিজ্ঞতার সম্প্রসারণ। চোখের সামনে থাকা বসতবাড়ি, রাজপ্রাসাদ, দরজা ও প্রহরীর ধারণা অদৃশ্য অঞ্চলেও বসানো হয়েছে।
আকাশ থেকে মানুষের কাছে আসা এবং দেবলোক থেকে পাতালে যাওয়া ভিন্ন যাত্রা। কিন্তু দুই ধরনের কাহিনিতেই মহাজগৎকে অঞ্চল ও স্তরে বিভক্ত করে দেবতার চলাচল বর্ণনা করা হয়। ঈশ্বর বা দেবতার ক্ষমতার সঙ্গে অবস্থান ও সীমানা জড়িয়ে যায়। নজুলের আসমানও সেই ধরনের একটি চিহ্নিত গন্তব্য: তাকে অন্য আসমান থেকে পৃথক করা হয়েছে এবং সেখানে নামার একটি সময় বলা হয়েছে। এই স্তরবিন্যাস ও যাতায়াতের সাহায্যে ধর্মীয় কাহিনি এমন একটি জগৎ তৈরি করে, যা মানুষের পরিচিত ভূগোলের সম্প্রসারিত রূপ।
ইসলাম-পূর্ব আরবীয় আল্লাহ-ধারণা ও ধর্মীয় ধারাবাহিকতা
ইসলামের আল্লাহ-ধারণার পূর্ববর্তী আরবীয় পটভূমির সাক্ষ্য কোরআনের ভেতরেও আছে। মুহাম্মদের বিরোধীদের আসমান ও জমিনের স্রষ্টা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা “আল্লাহ” বলবে—এই বক্তব্য সূরা আল-আনকাবুতে এসেছে। অর্থাৎ কোরআনের নিজের বর্ণনাতেই “আল্লাহ” নাম এবং সৃষ্টিকর্তার ভূমিকা বিরোধীদের কাছে পরিচিত। নতুন ধর্মীয় আন্দোলন একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত দেবতার নাম প্রথম শেখাচ্ছে—এমন দৃশ্য এখানে পাওয়া যায় না। [41]
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ
বাংলা অনুবাদ:
আর তুমি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করো, কে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়োজিত করেছেন, তারা অবশ্যই বলবে, “আল্লাহ।” তাহলে তারা কীভাবে অন্যদিকে ফেরানো হচ্ছে?
নামটির পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তা, বৃষ্টিদাতা এবং মানুষের ভাগ্য ও প্রতিদানের সঙ্গে যুক্ত আল্লাহ-ধারণার প্রাক্-কোরআনিক উপস্থিতি নিয়েও গবেষণা আছে। নিকোলাই সিনাইয়ের Rain-Giver, Bone-Breaker, Score-Settler: Allāh in Pre-Quranic Poetry গ্রন্থে প্রাচীন আরবীয় শিলালিপি, কবিতা এবং কোরআনের বিরোধীদের নামে বর্ণিত বিশ্বাসের তুলনা করা হয়েছে। তাঁর আলোচনায় ইসলাম-পূর্ব আরবীয় আল্লাহ-ধারণা ও কোরআনিক ধর্মতত্ত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা উঠে আসে। এখানে আল্লাহ-ধারণার পরিচয় একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় পরিবেশের মধ্যে পাওয়া যায়। [42]
সেই পরিবেশে আরবীয় বিশ্বাস, ইহুদি-খ্রিষ্টীয় কাহিনি এবং আরও বিস্তৃত প্রাচীন ধর্মীয় দৃশ্যরীতি পাশাপাশি উপস্থিত ছিল। পরিচিত নাম, মহাজাগতিক শাসকের ধারণা, ওপরের জগৎ, দূত, আহ্বান এবং মানুষের প্রার্থনায় সাড়া দেওয়ার ভাষা—এসবের সাহায্যে ইসলামি বক্তব্যও বোধগম্য হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহ্যের উপাদান নতুন নিয়ম ও কর্তৃত্বের অধীনে বিন্যস্ত হওয়াকে ধর্মীয় ধারণার ঐতিহাসিক সমন্বয় হিসেবে বোঝা যায়। এখানে ধারাবাহিকতার ভিত্তি হলো নির্দিষ্ট নাম ও ভূমিকার সাক্ষ্য এবং বিভিন্ন সাহিত্যে উপস্থিত দৃশ্যের তুলনা।
আল্লাহ-ধারণাকে এই ইতিহাসের বাইরে রেখে একেবারে বিচ্ছিন্ন, পূর্বপরিচয়হীন জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করলে তার ভাষা ও ধারণার বাস্তব পটভূমি বাদ পড়ে। কোরআনের শ্রোতারা আসমান, সৃষ্টিকর্তা, সূর্য-চাঁদের নিয়ন্ত্রণ এবং আল্লাহ নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলেই সেই ভাষায় তাঁদের সম্বোধন করা সম্ভব হয়েছে। পরিচিত ধর্মীয় উপাদান নতুন মতবাদে ব্যবহৃত হওয়ার এই প্রক্রিয়া মানুষের ইতিহাসের মধ্যেই অনুসরণযোগ্য। নজুলের কাহিনিও তার স্থানিক ভাষা ও দেবতার কাছে আসার দৃশ্যরীতির কারণে সেই পুরোনো ধর্মীয় জগতের সঙ্গে যুক্ত।
তুলনায় যে মহাজাগতিক মানচিত্র পাওয়া যায়
| ঐতিহ্য বা সূত্র | যাত্রা বা অবস্থানের বিন্যাস | মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া উপাদান |
|---|---|---|
| ইলিয়াডের প্রথম সর্গ | দেবী আকাশ থেকে মানুষের ঘটনাস্থলে আসেন; নির্দিষ্ট ব্যক্তি তাঁকে দেখেন। | ওপর থেকে আগমন, কাছে পৌঁছানো, স্পর্শ এবং নির্বাচিত ব্যক্তিকে সম্বোধন। |
| ইশতারের নিম্নজগতে অবতরণ | দেবী মৃতদের অঞ্চলে প্রবেশ করেন; সে অঞ্চল অন্য জগৎ থেকে পৃথক। | দরজা, অর্গল, প্রহরী, অন্ধকারের আবাস এবং প্রবেশের সীমানা। |
| কোরআনে বিরোধীদের আল্লাহ-ধারণা | আল্লাহ আসমান-জমিনের স্রষ্টা এবং সূর্য-চাঁদের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। | আগে থেকে পরিচিত দেবনাম ও মহাজাগতিক কর্তৃত্বের ভাষা। |
| নজুলের হাদিস | প্রতি রাতের নির্দিষ্ট অংশে আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে নামেন এবং আহ্বান করেন। | আবাস ও গন্তব্য, কাছে আসা, সময় নির্ধারণ, আবেদন গ্রহণ ও সাড়া দেওয়ার দৃশ্য। |
এই সূত্রগুলোতে দেবতার ক্ষমতা বোঝাতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা মানুষের পরিচিত জগতের ভাষা: একজন আসেন, কোথাও পৌঁছান, নির্দিষ্ট সময়ে কথা বলেন, কারও আবেদন শোনেন বা একটি সীমা অতিক্রম করেন। মানুষের অনুভবযোগ্য সম্পর্কগুলোকে অতিমানবীয় মাত্রায় বড় করে দেবতার জগৎ তৈরি করা হয়েছে। ফলে নজুলের বিবরণও প্রাচীন দেবতার নিকটবর্তী হওয়ার মোটিফের একটি ইসলামি প্রকাশ হিসেবে পাঠযোগ্য। তার আকাশ, অবতরণ ও আহ্বানের বিন্যাস সেই দীর্ঘ ধর্মীয় কল্পনার সঙ্গে মিলে যায়।
একই সঙ্গে এই কল্পচিত্র দেবতাকে স্থানিক ও সময়নির্ভর কাজের মধ্যে স্থাপন করে। প্রকৃত অবস্থান পরিবর্তন বোঝালে আগের অবস্থান এবং পরের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে ক্রিয়াটি না ঘটলে এবং পরে ঘটলে সময়ের সঙ্গেও তার সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই একই সত্তাকে আবার স্থানিক অবস্থান ও কালগত পরিবর্তনের সব সম্পর্ক থেকে মুক্ত বলে সংজ্ঞায়িত করলে দুই বিবরণের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরিচিত যাতায়াতের ধারণা দিয়ে কাহিনি বোধগম্য করা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সেই সম্পর্কের অর্থ প্রত্যাহার করা একটি সুস্পষ্ট মহাজাগতিক বিবরণ তৈরি করে না।
এখানেই পুরাণের কাহিনি এবং মহাবিশ্বের যাচাইকৃত বিবরণের পার্থক্য। কাহিনি মানুষের ভাষা, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সাহায্যে একটি জগৎ নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু সেই জগৎ বাস্তবে আছে, তার স্তরগুলো ওইভাবেই বিন্যস্ত এবং কোনো সত্তা নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে যাতায়াত করে—এসব পৃথক বাস্তব দাবি। তাদের পক্ষে স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রয়োজন। কাহিনির ধর্মীয় মর্যাদা বা প্রাচীনতা সেই প্রমাণের বিকল্প নয়। নজুলের সময় ও গন্তব্যের দাবি যখন বাস্তব মহাবিশ্ব সম্পর্কে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে প্রচারিত হয়, তখন পুরোনো ধর্মীয় দৃশ্যরীতির ওপর সেই নিশ্চয়তার বোঝা চাপানো হয়।
অসীমতা বনাম সীমাবদ্ধতা: আরশ, অবস্থান ও অবতরণ
আল্লাহ আরশের ওপর অবস্থান করেন, তিনি সৃষ্টিজগতের ঊর্ধ্বে—এই বর্ণনার পাশাপাশি তাঁকে স্থান-কাল দ্বারা সীমাবদ্ধ নন বলেও অভিহিত করা হয়। আবার নজুলের হাদিসে বলা হচ্ছে, তিনি নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন। এই দাবিগুলোর মধ্যে স্থানিক সম্পর্কের প্রশ্ন সরাসরি উপস্থিত: আরশ কোথায়, নিকটবর্তী আসমান কোথায় এবং একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক কী? প্রকৃত অবস্থান পরিবর্তন বোঝালে আগে ও পরের অবস্থানের পার্থক্য স্বীকার করতে হয়। একই সত্তাকে সব ধরনের স্থানিক অবস্থান ও কালগত পরিবর্তনের সম্পর্ক থেকে মুক্ত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে সেই সংজ্ঞার সঙ্গে প্রকৃত অবস্থান পরিবর্তনের বর্ণনা সংঘর্ষে পড়ে।
“যাওয়া-আসা”, “ওপরে-নিচে”, “নিকটবর্তী-দূরবর্তী”—এসব শব্দের সাহায্যে একটি বোধগম্য ঘটনা বর্ণনা করা হচ্ছে। শব্দগুলো অর্থবহ থাকার কারণ হলো তাদের মধ্যে সম্পর্ক আছে। ওপরে ও নিচে আলাদা অবস্থান বোঝায়; কাছে ও দূরে কোনো কিছুর তুলনায় অবস্থান বোঝায়; যাওয়া ও আসা পরিবর্তন বোঝায়। ঈশ্বরের কাজকে এই ভাষায় বাস্তব ঘটনা বলা হলে ওই সম্পর্কগুলো কীভাবে প্রযোজ্য, তা নির্ধারণ করতে হয়। অসীম বা অতীন্দ্রিয় অভিধা ব্যবহার করলেই বর্ণনার মধ্যে তৈরি হওয়া সেই সম্পর্কের প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না।
ইবনে বায: সর্বত্র অবস্থানের ধারণাকে কুফর ঘোষণা
ইবনে বাযের আকিদায় আল্লাহর সত্তা প্রত্যেক স্থানে বিদ্যমান—এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যাত। তাঁর মতে আল্লাহ সৃষ্টির ঊর্ধ্বে, আরশের ওপরে অবস্থান করেন। একই সঙ্গে বাস্তব নজুলও তিনি স্বীকার করেন। ফলে তাঁর অবস্থানে সর্বত্র সমানভাবে উপস্থিত সত্তার কথা বলে অবতরণের গন্তব্যের প্রশ্ন বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর নিজের ভাষায় সর্বত্র অবস্থানের ধারণার বিরুদ্ধে কতটা কঠোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, তা উদ্ধৃত অংশে স্পষ্ট: [43]
পৃষ্ঠা ৩৪৩
মূল আরবি
وقال عز وجل: إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ (¬1) وقال سبحانه: وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ (¬2) في آيات كثيرة من كتاب الله الكريم، صرح فيها سبحانه في العلو وذلك موافق لما دلت عليه آيات الاستواء، وبذلك يعلم أن قول أهل البدع إن الله سبحانه موجود في كل مكان - من أبطل الباطل، وهو مذهب الحلولية المبتدعة الضالة، بل هو كفر وضلال وتكذيب لله سبحانه، وتكذيب لرسوله صلى الله عليه وسلم فيما صح عنه من كون ربه في السماء، مثل قوله صلى الله عليه وسلم: «ألا تأمنوني وأنا أمين من في السماء (¬3) » وكما جاء في أحاديث الإسراء والمعراج.
فأرجو إذاعة هذه الرسالة في البرنامج الإذاعي في الوقت المذكور وفي أوقات أخرى، حتى يعلم ذلك من سمع المقال المشار إليه.
شكر الله سعيكم وبارك في جهودكم.
والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته.
(¬1) سورة فاطر الآية 10
(¬2) سورة البقرة الآية 255
(¬3) صحيح البخاري المغازي (4351) ، صحيح مسلم الزكاة (1064) ، سنن أبو داود السنة (4764) ، مسند أحمد بن حنبل (3/5) .
বাংলা অনুবাদ:
মহান আল্লাহ বলেন: তাঁরই দিকে পবিত্র বাক্যসমূহ আরোহণ করে এবং সৎকর্ম তিনি উন্নীত করেন (১)
আর তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা বলেন: আর এ দুটির সংরক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান (২)
আল্লাহর সম্মানিত কিতাবের বহু আয়াতে তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা তাঁর উচ্চতার (আল-উলুও) বিষয়টি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। আর এটি ইস্তিওয়ার আয়াতসমূহ যা প্রমাণ করে, তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর মাধ্যমে জানা যায় যে, আহলুল বিদআতের এই উক্তি—যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা সব জায়গায় বিদ্যমান—তা সম্পূর্ণ বাতিল ও মিথ্যা। এটি পথভ্রষ্ট বিদআতী হুলুলিয়্যাহ (সর্বত্র বিরাজমানবাদী)-দের মতবাদ। বরং এটি কুফর ও গোমরাহী এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। আর তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, যা তাঁর থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, তাঁর রব আসমানে (ঊর্ধ্বলোকে) আছেন।
যেমন তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) এই বাণী: «তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করো না, অথচ যিনি আসমানে আছেন আমি তাঁর বিশ্বস্ত?» (৩) আর যেমন ইসরা ও মিরাজের হাদীসসমূহে এসেছে।
অতএব, আমি আশা করি যে, এই বার্তাটি উল্লেখিত সময়ে এবং অন্যান্য সময়েও রেডিও প্রোগ্রামে প্রচার করা হবে, যাতে যারা সেই প্রবন্ধটি শুনেছে তারা এই বিষয়টি জানতে পারে।
আল্লাহ আপনাদের প্রচেষ্টার উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনাদের কর্মে বরকত দান করুন। ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
পাদটীকা:
(১) সূরা ফাতির, আয়াত ১০।
(২) সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৫।
(৩) সহীহ বুখারী, মাগাযী (৪৩৫১); সহীহ মুসলিম, যাকাত (১০৬৪); সুনান আবু দাউদ, আস-সুন্নাহ (৪৭৬৪); মুসনাদ আহমাদ ইবনে হাম্বল (৩/৫)।
এই ফতোয়ায় অবস্থানের একটি বিশেষ বিন্যাস বিশ্বাসের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহ সৃষ্টির ওপরে থাকেন—এটি সঠিক; তিনি সব জায়গায় থাকেন—এটি বাতিল, এমনকি কুফর। অর্থাৎ অবস্থান সম্পর্কে ভিন্ন বক্তব্যের ওপর ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় পর্যন্ত নির্ভর করানো হয়েছে। সেই একই অবস্থানের সঙ্গে নিচের আসমানে অবতরণের সম্পর্ক জানতে চাওয়া তাই একটি অর্থপূর্ণ প্রশ্ন। একদিকে অবস্থানসংক্রান্ত বক্তব্যকে বিশ্বাসের মৌলিক মানদণ্ড করা এবং অন্যদিকে তার সম্পর্কিত প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক বলা জ্ঞানগতভাবে অসংগত।
ছয় দিক ধারণ করে না, অথচ সব কিছুর ওপরে: ব্যাখ্যার নির্দিষ্ট অর্থ
তাহাবির আকিদায় আল্লাহকে অন্য সৃষ্ট বস্তুর মতো ছয় দিক ধারণ করে না—এই বক্তব্য আছে। ইবনে আবিল ইজ তাঁর ব্যাখ্যায় এর অর্থ করেছেন, সৃষ্ট কোনো বস্তু আল্লাহকে বেষ্টন করে না; তিনি সব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী এবং সব কিছুর ওপরে। সুতরাং এই ব্যাখ্যায় কোনো সৃষ্ট পাত্র বা সীমানা দ্বারা আবদ্ধ না থাকা এবং জগতের সঙ্গে ঊর্ধ্বসম্পর্ক বজায় থাকা একসঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। পূর্ণ প্রাসঙ্গিক দুই অনুচ্ছেদ হলো: [44]
وقول الشيخ رحمه الله: «لا تحويه الجهات الست كسائر المبتدعات» هو حق، باعتبار أنه لا يحيط به شيء من مخلوقاته، بل هو محيط بكل شيء وفوقه. وهذا المعنى هو الذي أراده الشيخ رحمه الله، لما يأتي في كلامه: أنه تعالى محيط بكل شيء وفوقه.
فإذا جمع بين كلاميه، وهو قوله: «لا تحويه الجهات الست كسائر المبتدعات» وقوله: «محيط بكل شيء وفوقه» علم أن مراده أن الله تعالى لا يحويه شيء، ولا يحيط به شيء، كما يكون لغيره من المخلوقات، وأنه تعالى هو المحيط بكل شيء، العالي عن كل شيء.
বাংলা অনুবাদ:
শায়খ রহিমাহুল্লাহর বক্তব্য, “অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর মতো ছয় দিক তাঁকে ধারণ করে না”—এটি সত্য, এই অর্থে যে তাঁর সৃষ্ট কোনো বস্তু তাঁকে বেষ্টন করে না; বরং তিনি সব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী এবং সব কিছুর ওপরে। শায়খ রহিমাহুল্লাহ এই অর্থই চেয়েছেন, কারণ পরবর্তী বক্তব্যে এসেছে যে আল্লাহ তাআলা সব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী এবং সব কিছুর ওপরে।
তাঁর দুই বক্তব্য—“অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর মতো ছয় দিক তাঁকে ধারণ করে না” এবং “সব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী ও সব কিছুর ওপরে”—একত্র করলে জানা যায়, তাঁর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলাকে কোনো কিছু ধারণ বা বেষ্টন করে না, যেমন অন্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে ঘটে; এবং তিনি তাআলাই সব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী, সব কিছুর ঊর্ধ্বে।
এই ব্যাখ্যার নিষেধ ও স্বীকৃতি আলাদা। নিষেধটি হলো কোনো সৃষ্টি আল্লাহকে ঘিরে রাখে না; স্বীকৃতিটি হলো তিনি সব কিছুর ওপরে। প্রথমটি থেকে সমস্ত স্থানিক সম্পর্ক বাতিল হয় না, কারণ দ্বিতীয়টিতে একটি সম্পর্ক সরাসরি বজায় রাখা হয়েছে। “সৃষ্টির মধ্যে আবদ্ধ নন” এবং “ওপর, নিচ, গন্তব্য বা অবস্থানের কোনো সম্পর্কই নেই”—এগুলো ভিন্ন দাবি। ইবনে আবিল ইজের ব্যাখ্যায় প্রথম দাবিটি রয়েছে এবং ঊর্ধ্বসম্পর্কটিও রয়েছে। ফলে এই ব্যাখ্যাকে সব ধরনের অবস্থানগত প্রশ্নের অবসান হিসেবে ব্যবহার করা তার নির্দিষ্ট অর্থের বাইরে চলে যায়।
এখানে “অসীমতা” শব্দের আড়ালে সম্পর্কগুলো অস্পষ্ট রাখা হয়। আল্লাহ কোনো সৃষ্ট বস্তুতে আবদ্ধ নন—এই ঘোষণার পরও আরশের ওপরে থাকা এবং নিকটবর্তী আসমানে নামার ভাষা কার্যকর থাকে। তখন আরশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কীভাবে বদলায়, অবতরণের গন্তব্যের সঙ্গে কী নতুন সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সেই সম্পর্ক কোন সময়ে ঘটে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। একটি সীমানা অস্বীকার করার বক্তব্য থেকে সব ধরনের অবস্থান ও পরিবর্তনের প্রশ্ন অস্বীকার করার অধিকার পাওয়া যায় না।
চলাচল আছে কি না এবং আরশ খালি হয় কি না: দুইটি পৃথক বিরোধ
ইবনে তাইমিয়া আহমদ ইবনে হাম্বলের অনুসারী ও সুন্নাহ-হাদিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত আলেমদের মধ্যে চলাচল ও স্থানান্তরের শব্দ ব্যবহার করা নিয়ে তিনটি মত নথিবদ্ধ করেছেন। কেউ তা স্বীকার করেছেন, কেউ অস্বীকার করেছেন এবং কেউ স্বীকার-অস্বীকার দুইটি থেকেই বিরত থেকেছেন। অর্থাৎ বাস্তব নজুলের সঙ্গে চলাচলের সম্পর্ক নিয়েও তাঁদের মধ্যে অভিন্ন ভাষা ও সিদ্ধান্ত ছিল না। [45]
واختلف أصحاب أحمد وغيرهم من المنتسبين إلى السنة والحديث: في النزول والإتيان والمجيء وغير ذلك. هل يقال إنه بحركة وانتقال؟ أم يقال بغير حركة وانتقال؟ أم يمسك عن الإثبات والنفي؟ على ثلاثة أقوال ذكرها القاضي أبو يعلى في كتاب «اختلاف الروايتين والوجهين». فالأول قول أبي عبد الله بن حامد وغيره. والثاني: قول أبي الحسن التميمي وأهل بيته. والثالث: قول أبي عبد الله بن بطة وغيره.
বাংলা অনুবাদ:
আহমদের অনুসারী এবং সুন্নাহ ও হাদিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যদের মধ্যে নজুল, আগমন ও অনুরূপ বিষয় নিয়ে মতভেদ হয়েছে। এগুলো চলাচল ও স্থানান্তরের মাধ্যমে ঘটে বলা হবে, নাকি চলাচল ও স্থানান্তর ছাড়া বলা হবে, নাকি স্বীকার ও অস্বীকার দুইটি থেকেই বিরত থাকা হবে? এ বিষয়ে তিনটি মত আছে, যা কাজি আবু ইয়ালা তাঁর “ইখতিলাফুর রিওয়ায়াতাইনি ওয়াল ওয়াজহাইন” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি আবু আবদুল্লাহ ইবনে হামিদ ও অন্যদের মত। দ্বিতীয়টি আবুল হাসান আত-তামিমি ও তাঁর পরিবারের মত। তৃতীয়টি আবু আবদুল্লাহ ইবনে বাত্তা ও অন্যদের মত।
আরশ খালি হওয়ার বিষয়ে মতভেদ আরেকটি। ইবনে তাইমিয়া এখানে তিন ধরনের অবস্থান উল্লেখ করেছেন: আরশ খালি হয় বলা, খালি হয় না বলা এবং এই দুই বক্তব্যের কোনোটি নির্ধারণ না করা। তিনি নিজে আরশ খালি হয় না—এই অবস্থান গ্রহণ করেছেন। সংশ্লিষ্ট পূর্ণ অনুচ্ছেদগুলোতে মতভেদের পাশাপাশি নীরবতার কারণও এসেছে: [46]
والمقصود هنا: الكلام على من يقول ينزل ولا يخلو منه العرش وإن أهل الحديث في هذا على ثلاثة أقوال: منهم من ينكر أن يقال: يخلو أو لا يخلو كما يقول ذلك الحافظ عبد الغني وغيره. ومنهم من يقول: بل يخلو منه العرش وقد صنف عبد الرحمن بن منده مصنفا في الإنكار على من قال: لا يخلو من العرش أو لا يخلو منه العرش كما تقدم بعض كلامه. وكثير من أهل الحديث يتوقف عن أن يقول يخلو أو لا يخلو. وجمهورهم على أنه لا يخلو منه العرش.
وكثير منهم يتوقف عن أن يقال: يخلو أو لا يخلو لشكهم في ذلك وأنهم لم يتبين لهم جواب أحد الأمرين وأما مع كون الواحد منهم قد ترجح عنده أحد الأمرين لكن يمسك في ذلك لكونه ليس في الحديث ولما يخاف من الإنكار عليه.
وأما الجزم بخلو العرش فلم يبلغنا إلا عن طائفة قليلة منهم. والقول الثالث وهو الصواب وهو المأثور عن سلف الأمة وأئمتها أنه لا يزال فوق العرش ولا يخلو العرش منه مع دنوه ونزوله إلى السماء الدنيا ولا يكون العرش فوقه. وكذلك يوم القيامة كما جاء به الكتاب والسنة وليس نزوله كنزول أجسام بني آدم من السطح إلى الأرض بحيث يبقى السقف فوقهم بل الله منزه عن ذلك وسنتكلم عليه إن شاء الله وهذه المسألة تحتاج إلى بسط.
বাংলা অনুবাদ:
এখানে উদ্দেশ্য হলো, তিনি নামেন কিন্তু আরশ তাঁর থেকে খালি হয় না—এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁদের বিষয়ে আলোচনা করা। এ বিষয়ে আহলুল হাদিসের তিনটি মত আছে। কেউ আরশ খালি হয় বা খালি হয় না—এ দুই ধরনের বক্তব্যই প্রত্যাখ্যান করেন; হাফিজ আবদুল গনি ও অন্যরা এ কথা বলেন। কেউ বলেন, বরং আরশ তাঁর থেকে খালি হয়। আবদুর রহমান ইবনে মানদা যাঁরা বলেন তিনি আরশ থেকে খালি হন না অথবা আরশ তাঁর থেকে খালি হয় না, তাঁদের বিরুদ্ধে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন; তাঁর কিছু বক্তব্য আগে এসেছে। আহলুল হাদিসের অনেকে আরশ খালি হয় বা হয় না বলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকেন। তাঁদের অধিকাংশের মত, আরশ তাঁর থেকে খালি হয় না।
তাঁদের অনেকে আরশ খালি হয় বা হয় না বলার ব্যাপারে বিরত থাকেন, কারণ এ বিষয়ে তাঁদের সন্দেহ আছে এবং দুইটির কোনো একটির জবাব তাঁদের কাছে স্পষ্ট হয়নি। আবার কারও কাছে একটি মত প্রাধান্য পেলেও তিনি কথা বলা থেকে বিরত থাকেন, কারণ তা হাদিসে নেই এবং তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তি ওঠার আশঙ্কা থাকে।
আর আরশ খালি হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত বক্তব্য তাঁদের অল্প কয়েকজনের কাছ থেকেই আমাদের কাছে পৌঁছেছে। তৃতীয় মতটি সঠিক এবং উম্মতের সালাফ ও ইমামদের থেকে বর্ণিত: তিনি সর্বদা আরশের ওপরে থাকেন এবং তাঁর নিকটবর্তী হওয়া ও নিকটবর্তী আসমানে অবতরণের সময়ও আরশ তাঁর থেকে খালি হয় না; আরশও তাঁর ওপরে হয় না। কিয়ামতের দিনও অনুরূপ, যেমন কিতাব ও সুন্নাহয় এসেছে। তাঁর অবতরণ মানুষের দেহের ছাদ থেকে মাটিতে নামার মতো নয়, যাতে ছাদ তাদের ওপরে থেকে যায়। আল্লাহ এ থেকে মুক্ত। আল্লাহ চাইলে এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করব; বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এই বিবরণে নীরবতার একাধিক কারণ পাওয়া যায়। কারও কাছে উত্তর পরিষ্কার নয়; কেউ সিদ্ধান্তে পৌঁছেও হাদিসে নেই বলে কথা বলেন না; কারও ক্ষেত্রে আপত্তির আশঙ্কাও কাজ করে। ফলে আলেমদের কোনো প্রশ্নে কথা না বলা থেকে ওই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর তাঁদের সবার জানা ছিল—এমন সিদ্ধান্ত আসে না। তাঁদের সংরক্ষিত বক্তব্যেই অনিশ্চয়তা, ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং প্রকাশ্য বক্তব্যে সংযমের পৃথক কারণ নথিবদ্ধ আছে। ধর্মীয় প্রচারে যে বিষয়কে এক বাক্যে নিশ্চিত আকিদা বলা হয়, তার ব্যাখ্যাগত ইতিহাস এতটাই বিভক্ত।
চলাচল, স্থানান্তর এবং আরশের উপস্থিতি নিয়ে এই বিরোধ দেখায়, “প্রকৃত নজুল” বললেই তার প্রয়োজনীয় সম্পর্কগুলো স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায় না। কোথায় থাকা ও কোথায় নামার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলেমরা নিজেদের ধারণাগত সিদ্ধান্ত যোগ করেছেন। কেউ একটি সম্পর্ক গ্রহণ করেছেন, কেউ সেই সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন, কেউ সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। অথচ প্রত্যেক অবস্থানেই একই হাদিসকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে। বর্ণনার ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা তার মহাজাগতিক অর্থের নির্ভুল ব্যাখ্যা নিশ্চিত করছে না।
সর্বশ্রোতার কাছে প্রার্থনা: নৈকট্যের দৃশ্যটি কী কাজ করে
হাদিসে অবতরণের সঙ্গে আহ্বান যুক্ত: কে ডাকবে, কে চাইবে, কে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এতে মানুষের পরিচিত সাক্ষাৎ ও আবেদন গ্রহণের দৃশ্য তৈরি হয়। কোনো শাসক বিশেষ সময়ে মানুষের কাছে আসেন, তাদের কথা শোনেন এবং দান বা ক্ষমা করেন—এই অভিজ্ঞতা দিয়ে বক্তব্যটি সহজে বোঝা যায়। কিন্তু সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ সত্তার ক্ষেত্রে দূরত্বের কারণে কারও কথা অজানা থাকা বা শোনার জন্য কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজন থাকে না। ফলে অবতরণের এই দৃশ্য শ্রবণ ও জ্ঞানলাভের কোনো ভৌত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছে না; মানুষের পরিচিত নৈকট্যের ভাষায় অনুগ্রহের একটি সময়কে দৃশ্যমান করছে।
প্রার্থনার একটি বিশেষ সময়ের ধর্মীয় গুরুত্ব ঘোষণা করা এবং সেই সময় সত্যিই একটি সত্তা আসমানের নির্দিষ্ট স্তরে নামেন বলা পৃথক দাবি। প্রথমটি ধর্মাচরণের সময় নির্ধারণ করে; দ্বিতীয়টি মহাবিশ্বে একটি ঘটনার সংবাদ দেয়। দ্বিতীয় দাবিটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে তার অবস্থান ও সময়ের সম্পর্ক যাচাইয়ের প্রশ্নও আসে। সর্বজ্ঞতা দিয়ে প্রার্থনা সম্পর্কে জ্ঞান ব্যাখ্যা করার পর অবতরণের ঘোষণাটি একটি অতিরিক্ত মহাজাগতিক দাবি হয়ে থাকে। সেই অতিরিক্ত ঘটনার পক্ষে প্রমাণের জায়গায় মানুষের কাছে আসা ও আবেদন শোনার পরিচিত দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
পৃথিবীতে একই সময়ে সবার রাত নয়: স্থানীয় সময় ও অবতরণের সময়সীমা
এই সমস্যাটি বোঝার জন্য আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বা উচ্চতর গণিতের প্রয়োজন নেই। পৃথিবী গোলাকার এবং সূর্যের তুলনায় প্রায় চব্বিশ ঘণ্টায় একটি দিন-রাতের চক্র সম্পন্ন করে। যে দিক সূর্যালোকের সামনে থাকে সেখানে দিন, আর আলো থেকে ফিরিয়ে থাকা দিকে রাত। পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘোরার ফলে রাতের বিভিন্ন পর্যায় ভূপৃষ্ঠের ওপর পশ্চিমমুখে সরে যেতে দেখা যায়। একটি অঞ্চলে শেষ তৃতীয়াংশ শেষ হলে আরও পশ্চিমের অঞ্চলে সেই সময় পরে আসে। নাসা ও ইউরোপীয় দক্ষিণ মানমন্দিরের দিন-রাতের ব্যাখ্যাও এই ঘূর্ণন ও স্থানীয় সূর্যসময়ের সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত। [47] [48]
এখন হাদিসের নির্দিষ্ট শর্তগুলো হলো: প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় অবতরণ এবং ফজর পর্যন্ত আহ্বান। বাংলাদেশের কোনো স্থানে ফজর হয়ে গেলেও আরও পশ্চিমের অঞ্চলে ফজর হতে সময় বাকি থাকে। সেখানে শেষ তৃতীয়াংশ শেষ হলে তারও পশ্চিমে অন্য অঞ্চলের একই পর্যায় চলতে পারে। অর্থাৎ শেষ তৃতীয়াংশকে একটি নির্দিষ্ট ঘড়ির সময় ধরে সমগ্র পৃথিবীর ওপর একসঙ্গে বসানো যায় না। অঞ্চল বদলালে সেই সময়ের শুরু ও শেষও বদলায়।
সূর্যাস্ত থেকে ফজর: শেষ তৃতীয়াংশের হিসাব
এই গণনায় রাতের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয় সূর্যাস্ত থেকে ফজর পর্যন্ত ব্যবধান দিয়ে। ইসলামওয়েবের সময় গণনাসংক্রান্ত ফতোয়াতেও এই সীমা দেওয়া হয়েছে। ওই সময়কে তিন ভাগ করলে শেষ ভাগটিই শেষ তৃতীয়াংশ। ফজর সূর্যোদয়ের আগে হয়; ফলে এই হিসাবে রাতের সমাপ্তি হিসেবে সূর্যোদয় বসালে গণনা বদলে যাবে। [49]
ধরা যাক, কোনো স্থানে একটি দিনে সূর্যাস্ত সন্ধ্যা ৬টায় এবং পরদিন ফজর ভোর ৫টায়। রাতের দৈর্ঘ্য ১১ ঘণ্টা। তার এক-তৃতীয়াংশ ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। ফজরের সময় থেকে সেই পরিমাণ পিছিয়ে গেলে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হয় রাত ১টা ২০ মিনিটে। এখানে শুরু ও শেষ দুইটিই স্থানীয় সূর্যাস্ত ও ফজরের ওপর নির্ভর করছে।
| হিসাবের ধাপ | সময় বা ফল |
|---|---|
| সূর্যাস্ত | সন্ধ্যা ৬টা |
| ফজর | পরদিন ভোর ৫টা |
| সূর্যাস্ত থেকে ফজর | ১১ ঘণ্টা |
| রাতের এক-তৃতীয়াংশ | ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট |
| শেষ তৃতীয়াংশের শুরু | রাত ১টা ২০ মিনিট |
| শেষ তৃতীয়াংশের শেষ | ভোর ৫টায় ফজর |
রাতের দৈর্ঘ্য বদলালে ফলও বদলাবে। কোনো স্থানে রাত ৯ ঘণ্টা হলে শেষ তৃতীয়াংশ ৩ ঘণ্টা, রাত ১২ ঘণ্টা হলে ৪ ঘণ্টা। একই অঞ্চলেও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে এই সময়ের দৈর্ঘ্য বদলায়। সুতরাং অবতরণকে স্থানীয় শেষ তৃতীয়াংশের সঙ্গে যুক্ত করলে কেবল শুরুর মুহূর্ত নয়, ঘটনাটির নির্ধারিত স্থায়িত্বও স্থান ও ঋতু অনুসারে বদলে যায়।
একই মানসময়ে আটটি স্থানের উদাহরণ
এবার একই অক্ষাংশ বরাবর পশ্চিমমুখে ৪৫ ডিগ্রি অন্তর আটটি কাল্পনিক স্থান ধরা যাক। সহজ মডেলে প্রতিটি ধাপে সূর্যঘড়ির সময় প্রায় ৩ ঘণ্টা করে পিছিয়ে যায়। সব স্থানের রাতের দৈর্ঘ্য আগের উদাহরণের মতো ১১ ঘণ্টা ধরা হয়েছে। সব ঘড়ি একটি অভিন্ন মানসময়ে লেখা হয়েছে। এটি বাস্তব শহরের কোনো নির্দিষ্ট দিনের সময়সূচি নয়; একই রাতের পর্যায় অঞ্চল বদলে কীভাবে সরে যায়, তার গাণিতিক উদাহরণ। [50]
| কাল্পনিক স্থান | সূর্যাস্ত | ফজর | শেষ তৃতীয়াংশের শুরু | শেষ তৃতীয়াংশের শেষ |
|---|---|---|---|---|
| ক: ভিত্তিস্থান | ১৮:০০ | ০৫:০০ | ০১:২০ | ০৫:০০ |
| খ: ক-এর ৪৫° পশ্চিমে | ২১:০০ | ০৮:০০ | ০৪:২০ | ০৮:০০ |
| গ: ক-এর ৯০° পশ্চিমে | ০০:০০ | ১১:০০ | ০৭:২০ | ১১:০০ |
| ঘ: ক-এর ১৩৫° পশ্চিমে | ০৩:০০ | ১৪:০০ | ১০:২০ | ১৪:০০ |
| ঙ: ক-এর ১৮০° দূরে | ০৬:০০ | ১৭:০০ | ১৩:২০ | ১৭:০০ |
| চ: আরও ৪৫° পশ্চিমে | ০৯:০০ | ২০:০০ | ১৬:২০ | ২০:০০ |
| ছ: আরও ৪৫° পশ্চিমে | ১২:০০ | ২৩:০০ | ১৯:২০ | ২৩:০০ |
| জ: আরও ৪৫° পশ্চিমে | ১৫:০০ | ০২:০০ | ২২:২০ | ০২:০০ |
টেবিলের কোনো সারিতে শেষের ঘড়ির সংখ্যা ছোট হলে সেখানে মধ্যরাত পেরিয়েছে। যেমন ক-তে সন্ধ্যা ১৮:০০-এর পরের দিনের ফজর ০৫:০০, আর জ-তে রাত ২২:২০ থেকে পরের দিনের ০২:০০ পর্যন্ত শেষ তৃতীয়াংশ। প্রতিটি স্থানের শেষ তৃতীয়াংশ ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট স্থায়ী, কিন্তু পরের স্থানে সেটি শুরু হচ্ছে ৩ ঘণ্টা পরে। ফলে পাশাপাশি দুই স্থানের সময়ের মধ্যে ৪০ মিনিট করে মিল রয়েছে। আটটি সারি একত্রে ধরলে চব্বিশ ঘণ্টার কোনো অংশই সবগুলো স্থানের শেষ তৃতীয়াংশের বাইরে পড়ে না।
উদাহরণটি শুধু আটটি স্থান ব্যবহার করেছে। বাস্তবে এই স্থানগুলোর মধ্যেও অসংখ্য দ্রাঘিমায় সূর্যাস্ত ও ফজরের সময় ধাপে ধাপে বদলায়। ফলে রাতের পর্যায়গুলো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি খণ্ডের মতো লাফ দেয় না; পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে ক্রমাগত স্থানান্তরিত হয়। একটি স্থানে ফজর উদিত হওয়া সেই স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের সমাপ্তি। সেটি সমগ্র পৃথিবীর জন্য রাতের শেষ তৃতীয়াংশের একযোগে সমাপ্তি নয়।
ইবনে বাযের পূর্ণ সংরক্ষিত বক্তব্য: সময়ভেদ স্বীকার, পদ্ধতি অজানা
ইবনে বাযের কাছে উত্থাপিত প্রশ্নের ভিত্তিও এই সময়ভেদ। তাঁর বক্তব্যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে শেষ তৃতীয়াংশ ভিন্ন হওয়া স্বীকার করা হয়েছে এবং আল্লাহর অবতরণকে সৃষ্টির অবতরণ থেকে পৃথক বলা হয়েছে। আরশ থেকে মানুষ নেমে আসার মতো অর্থ গ্রহণ করা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। মূল বিবরণে সংরক্ষিত পৃষ্ঠা ৩৯৯–৪০১-এর আরবি ও বাংলা পাঠ নিচে রয়েছে; শেষ বাক্যের ধারাবাহিক অংশ পরের পৃষ্ঠায় আছে। [51]
পৃষ্ঠা ৩৯৯
মূল আরবি
104 - نزول الله تعالى
إلى السماء الدنيا في الثلث الأخير من الليل
س: كيف نرد على من قال: إنكم تقولون: إن الله ينزل إلى السماء الدنيا بالثلث الأخير من الليل وإن ذلك يقتضي تركه العرش؛ لأن ثلث الليل الأخير ليس في وقت واحد على أهل الأرض؟ (¬1)
ج: هذا كلام رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو القائل عليه الصلاة والسلام: «ينزل ربنا تبارك وتعالى إلى السماء الدنيا كل ليلة حين يبقى ثلث الليل الآخر فيقول: من يدعوني فأستجيب له، من يسألني فأعطيه، من يستغفرني فأغفر له، حتى ينفجر الفجر (¬2) » . متفق على صحته، وقد بين العلماء أنه نزول يليق بالله وليس مثل نزولنا، لا يعلم كيفيته إلا هو سبحانه وتعالى، فهو ينزل كما يشاء ولا يلزم من ذلك خلو العرش فهو نزول يليق
(¬1) نشر في مجلة الدعوة، العدد 1655، بتاريخ 28 ربيع الآخر 1419 هـ.
(¬2) أخرجه البخاري في كتاب الجمعة، باب الدعاء في الصلاة من آخر الليل، برقم 1145، ومسلم في كتاب صلاة المسافرين وقصرها، باب الترغيب في الدعاء والذكر في آخر الليل والإجابة، برقم 758.
বাংলা অনুবাদ:
১০৪ - রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলার সর্বনিম্ন আসমানে অবতরণ
প্রশ্ন: যারা বলে যে, আপনারা বলেন আল্লাহ রাতের শেষ তৃতীয়াংশে সর্বনিম্ন আসমানে অবতরণ করেন এবং এর দ্বারা আরশ ছেড়ে দেওয়া আবশ্যক হয়— কারণ পৃথিবীর সকল অধিবাসীর জন্য রাতের শেষ তৃতীয়াংশ একই সময়ে হয় না— তাদের জবাবে আমরা কী বলব? (১)
উত্তর: এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। তিনিই বলেছেন, তাঁর উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক:
“প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আমাদের রব, বরকতময় ও সুমহান আল্লাহ সর্বনিম্ন আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন: ‘কে আমাকে ডাকবে যে আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে যে আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে যে আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’ এভাবে ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।” (২)
হাদিসটি সহীহ হিসেবে সর্বসম্মত (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
আর উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এটি এমন অবতরণ যা আল্লাহর জন্য শোভনীয়। এটি আমাদের অবতরণের মতো নয়। এর ধরণ (কাইফিয়াত) একমাত্র তিনিই জানেন, সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তিনি যেভাবে ইচ্ছা অবতরণ করেন। এর দ্বারা আরশ খালি হয়ে যাওয়া আবশ্যক হয় না। এটি এমন অবতরণ যা তাঁর জন্য শোভনীয়।
(১) মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ, সংখ্যা ১৬৫৫, তারিখ ২৮ রবিউস সানী ১৪১৯ হি. তে প্রকাশিত।
(২) বুখারী, কিতাবুল জুমুআহ, বাব: রাতের শেষভাগে সালাতে দুআ করা, হা/১১৪৫। মুসলিম, কিতাবু সালাতিল মুসাফিরীন ওয়া কাসরুহা, বাব: রাতের শেষভাগে দুআ ও যিকিরের প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং তার জবাব, হা/৭৫৮।
পৃষ্ঠা ৪০০
মূল আরবি
به جل جلاله، والثلث يختلف في أنحاء الدنيا وهذا شيء يختص به تعالى لا يشابه خلقه في شيء من صفاته كما قال سبحانه: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (¬1) وقال جل وعلا: يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا (¬2) وقال عز وجل في آية الكرسي: وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ (¬3) والآيات في هذا المعنى كثيرة وهو سبحانه أعلم بكيفية نزوله، فعلينا أن نثبت النزول على الوجه الذي يليق بالله، ومع كونه استوى على العرش، فهو ينزل كما يليق به عز وجل ليس كنزولنا، إذا نزل فلان من السطح خلا منه السطح، وإذا نزل من السيارة خلت منه السيارة، فهذا قياس فاسد له؛ لأنه سبحانه لا يقاس بخلقه، ولا يشبه خلقه في شيء من صفاته.
كما أننا نقول: استوى على العرش على الوجه الذي يليق به سبحانه ولا نعلم كيفية استوائه، فلا نشبهه بالخلق ولا نمثله وإنما نقول: استوى استواء يليق بجلاله وعظمته.
(¬1) سورة الشورى الآية 11
(¬2) سورة طه الآية 110
(¬3) سورة البقرة الآية 255
বাংলা অনুবাদ:
তাঁর মহিমা সুমহান। আর (রাতের শেষ) তৃতীয়াংশ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন হয়। এটি এমন একটি বিষয় যা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্দিষ্ট। তিনি তাঁর কোনো গুণাবলীতেই তাঁর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন: তাঁর মতো কিছুই নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (১)
আর তিনি জাল্লা ওয়া আলা বলেছেন: তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, তিনি তা জানেন, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। (২) আর তিনি আযযা ওয়া জাল্লা আয়াতুল কুরসীতে বলেছেন: আর তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা আয়ত্ত করতে পারে না, তবে তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন। (৩) এই অর্থে আয়াতসমূহ অনেক রয়েছে। আর তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর অবতরণের পদ্ধতি সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত।
সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, এমনভাবে অবতরণকে সাব্যস্ত করা যা আল্লাহর জন্য শোভনীয়। আর আরশের উপর তাঁর সমুন্নত হওয়া সত্ত্বেও তিনি এমনভাবে অবতরণ করেন যা তাঁর আযযা ওয়া জাল্লা-এর জন্য মানানসই, যা আমাদের অবতরণের মতো নয়। যখন কোনো ব্যক্তি ছাদ থেকে নিচে নামে, তখন ছাদটি তার থেকে শূন্য হয়ে যায়। আর যখন সে গাড়ি থেকে নামে, তখন গাড়িটি তার থেকে শূন্য হয়ে যায়। আল্লাহর ক্ষেত্রে এটি একটি ভ্রান্ত তুলনা (কিয়াস ফাসিদ); কারণ তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নন, আর তিনি তাঁর কোনো গুণাবলীতেই সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন।
যেমন আমরা বলি: তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরশের উপর এমনভাবে সমুন্নত হয়েছেন যা তাঁর জন্য শোভনীয়, আর আমরা তাঁর সমুন্নত হওয়ার পদ্ধতি জানি না। সুতরাং আমরা তাঁকে সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেই না এবং তাঁর কোনো দৃষ্টান্তও স্থাপন করি না। বরং আমরা বলি: তিনি এমনভাবে সমুন্নত হয়েছেন যা তাঁর মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে মানানসই।
(১) সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১
(২) সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১০
(৩) সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৫
পৃষ্ঠা ৪০১ এবং শেষ বাক্যের ধারাবাহিক অংশ পৃষ্ঠা ৪০২
মূল আরবি
ولما خاض المتكلمون في هذا المقام بغير حق حصل لهم بذلك حيرة عظيمة، حتى آل بهم الكلام إلى إنكار الله بالكلية، حتى قالوا: لا داخل العالم ولا خارج العالم ولا كذا ولا كذا، حتى وصفوه بصفات معناها العدم وإنكار وجوده سبحانه بالكلية، ولهذا ذهب أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم وأهل السنة والجماعة تبعا لهم فأقروا بما جاءت به النصوص من الكتاب والسنة، وقالوا: لا يعلم كيفية صفاته إلا هو سبحانه، ومن هذا ما قاله مالك رحمه الله:الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والإيمان به واجب والسؤال عنه بدعةيعني: عن الكيفية ومثل ذلك ما يروى عن أم سلمة رضي الله عنها وعن ربيعة بن أبي عبد الرحمن شيخ مالك رحمهما الله:الاستواء غير مجهول، والكيف غير معقول والإيمان بذلك واجبومن التزم بهذا الأمر سلم من شبهات كثيرة، ومن اعتقادات لأهل الباطل كثيرة عديدة وحسبنا أن نثبت ما جاء في النصوص وألا نزيد على ذلك.
وهكذا نقول: يسمع ويتكلم ويبصر ويغضب ويرضى على وجه يليق به سبحانه ولا يعلم كيفية صفاته إلا هو، وهذا هو طريق السلامة وطريق النجاة وطريق العلم وهو مذهب السلف الصالح.
বাংলা অনুবাদ:
যখন কালামপন্থীরা (দার্শনিক ধর্মতাত্ত্বিকগণ) এই বিষয়ে অন্যায়ভাবে (বিনা দলিলে) প্রবেশ করল, তখন তারা চরম বিভ্রান্তির শিকার হলো। এমনকি তাদের আলোচনা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহকে অস্বীকার করার দিকে নিয়ে গেল। তারা বলতে শুরু করল: তিনি জগতের ভেতরেও নন, জগতের বাইরেও নন, এমনও নন, তেমনও নন। এমনকি তারা আল্লাহকে এমন সব গুণে গুণান্বিত করল যার অর্থ হলো অস্তিত্বহীনতা এবং সম্পূর্ণরূপে তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।
এই কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ এবং তাঁদের অনুসারী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (সুন্নাহ ও জামাআতের অনুসারীরা) কিতাব ও সুন্নাহর মাধ্যমে যা এসেছে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন: তাঁর (সুবহানাহু) গুণাবলীর স্বরূপ (কাইফিয়াত) একমাত্র তিনিই জানেন।
এর অন্তর্ভুক্ত হলো ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ-এর সেই উক্তি: ‘আল-ইসতিওয়া (আল্লাহর আরশের উপর সমুন্নত হওয়া) জানা বিষয়, কিন্তু এর স্বরূপ (কাইফ) অজানা। এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।’ অর্থাৎ, এর স্বরূপ (কাইফিয়াত) সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত।
অনুরূপভাবে, উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ-এর শিক্ষক রাবীআহ ইবনু আবী আব্দুর রহমান রহিমাহুল্লাহ থেকেও বর্ণিত আছে: ‘আল-ইসতিওয়া অজানা নয়, কিন্তু এর স্বরূপ (কাইফ) বোধগম্য নয় (অকল্পনীয়), আর এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব।’
যে ব্যক্তি এই নীতিতে অটল থাকবে, সে অসংখ্য সংশয় এবং বাতিলপন্থীদের বহুবিধ ভ্রান্ত আকীদা থেকে নিরাপদ থাকবে। আমাদের জন্য যথেষ্ট হলো, যা নসসমূহে (প্রমাণিক টেক্সটসমূহে) এসেছে তা সাব্যস্ত করা এবং এর অতিরিক্ত কিছু না বলা।
অনুরূপভাবে আমরা বলি: তিনি শোনেন, কথা বলেন, দেখেন, রাগ করেন এবং সন্তুষ্ট হন—এমনভাবে যা তাঁর (সুবহানাহু) জন্য শোভনীয়। আর তাঁর গুণাবলীর স্বরূপ (কাইফিয়াত) একমাত্র তিনিই জানেন। আর এটাই নিরাপত্তা, মুক্তি ও জ্ঞানের পথ; এটিই নেককার পূর্বসূরিদের পদ্ধতি।
এই উত্তরে প্রার্থনার আহ্বানসংক্রান্ত হাদিস পুনরায় বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সময়ভেদ স্বীকার করা হয়েছে এবং অবতরণের পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান আল্লাহর কাছে রাখা হয়েছে। ফলে স্থানীয় সময়ের তথ্যটি গৃহীত, কিন্তু সেই তথ্যকে ভিত্তি করে একটি একক বিশ্বজনীন অবতরণের শুরু ও শেষ নির্ধারণ করা হয়নি। কীভাবে ঘটনাটি ঘটে জানা নেই বলার পরও ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত রাখা হয়েছে। এখানে বিশ্বাসের নিশ্চয়তা এবং ঘটনার নির্দিষ্ট বিবরণ সম্পর্কে জ্ঞানের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট।
তাঁর উত্তরে আলোচনার একটি বড় অংশ চলে গেছে গ্রহণযোগ্য বিশ্বাস এবং অগ্রহণযোগ্য ধর্মতাত্ত্বিক বক্তব্য নির্ধারণে। কারা বিভ্রান্ত হয়েছেন, কোন সূত্রে বিশ্বাস রাখতে হবে এবং কোন প্রশ্ন বিদআত—এসব বলা হয়েছে। কিন্তু আটটি স্থানের টেবিলের মতো একটি অভিন্ন সময়রেখায় স্থানীয় সময়গুলো সাজালে অবতরণের সম্মিলিত সময়সীমা কী হয়, তার কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। ধর্মীয় গ্রহণ-বর্জনের মানদণ্ড দিয়ে পৃথিবীর সময়রেখার এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হয় না।
প্রত্যেক অঞ্চলের অবতরণ ও সমগ্র পৃথিবীর সময়রেখা
সৌদি স্থায়ী ফতোয়া কমিটির একটি উত্তরে প্রত্যেক অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশে অবতরণ এবং আরশে অবস্থানের মধ্যে বিরোধ নেই বলা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে সৃষ্টির সঙ্গে আল্লাহর তুলনা প্রত্যাখ্যান এবং নজুল ও ইস্তিওয়ার পদ্ধতি অজ্ঞাত থাকার নীতি ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামকিউএ-তে উদ্ধৃত ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৮৬-এর এই উত্তরও প্রতিটি অঞ্চলের স্থানীয় সময়কে প্রযোজ্য ধরেছে। [52]
এই আঞ্চলিক প্রয়োগকে সময়রেখায় বসালে ফল নির্দিষ্ট: এক অঞ্চলের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই অন্য অঞ্চলের সময়সীমা শুরু হয়। স্থানীয় অবতরণের সময়গুলো পরস্পরকে আচ্ছাদিত করে। ফলে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য শর্তযুক্ত ক্রিয়া স্বীকার করা এবং সমগ্র পৃথিবীর জন্য একটি অভিন্ন কয়েক ঘণ্টার অবতরণ নির্ধারণ করা আলাদা বিবরণ। প্রথমটির সময়গুলোকে একত্র করলে পৃথিবীজুড়ে ধারাবাহিক প্রযোজ্যতার চিত্র পাওয়া যায়; দ্বিতীয়টিতে এমন একটি সময় প্রয়োজন, যখন ঘটনাটি সবার জন্য একসঙ্গে শুরু বা শেষ হয়। স্থানীয় ফজর সেই বিশ্বজনীন সীমা সরবরাহ করে না।
একটি বিশেষ অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশকে বিশ্বজনীন সময় বানালে অন্য অঞ্চলের নিজের শেষ তৃতীয়াংশের সঙ্গে তার মিল থাকে না। আবার প্রত্যেক অঞ্চলের নিজের সময়কে গ্রহণ করলে বিশ্বজনীন কার্যকারিতার সময় কয়েক ঘণ্টায় আটকে থাকে না। “কোন অঞ্চলের শেষ তৃতীয়াংশ?” প্রশ্নটির বাস্তব গুরুত্ব এখানেই। প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য আলাদা সময় বলা যায়; কিন্তু তাতে পৃথিবীর সব অঞ্চলের জন্য একটি অভিন্ন রাত বা অভিন্ন ফজর তৈরি হয় না।
দীর্ঘ মেরুদিনে স্থানীয় রাতের শর্ত
মেরু অঞ্চলের দীর্ঘ দিন ও দীর্ঘ রাত এই স্থানীয় সময়নির্ভরতার আরও একটি দিক প্রকাশ করে। পৃথিবীর অক্ষের হেলনের কারণে কোনো কোনো অঞ্চলে বছরের একটি সময়ে সূর্য টানা দিগন্তের ওপরে থাকে। সেই সময় প্রতিদিনের স্বাভাবিক সূর্যাস্ত ও ফজরের চক্র পাওয়া যায় না। সূর্যাস্ত থেকে পরের ফজর পর্যন্ত রাতকে তিন ভাগ করার যে নিয়ম, প্রতিদিনের ওই দুইটি সীমা অনুপস্থিত হলে সেই নিয়মে স্থানীয় শেষ তৃতীয়াংশ নির্ধারণের উপাত্তও অনুপস্থিত থাকে। [53]
মানুষের ধর্মাচরণের জন্য বিকল্প সময়সূচি তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু মানুষের গৃহীত সময়সূচি এবং মহাবিশ্বে আল্লাহর কোনো কাজের প্রকৃত সময় একই বিষয় নয়। শেষ তৃতীয়াংশকে একটি বাস্তব আঞ্চলিক ঘটনার শর্ত বলা হলে সেই শর্তের বাস্তব সূর্যাস্ত ও ফজরের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হয়। দৈনন্দিন আরবীয় রাতের অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি একটি সময়বর্ণনা সমগ্র পৃথিবীতে প্রয়োগ করার সময় এই ভৌগোলিক পার্থক্যগুলোরও হিসাব প্রয়োজন।
একটি ভূখণ্ডের অভিজ্ঞতায় রাত শুরু হয়, শেষ তৃতীয়াংশ আসে এবং ফজরে তা শেষ হয়। সমগ্র পৃথিবীর ক্ষেত্রে একই সময় অন্য অঞ্চলে রাতের ভিন্ন পর্যায় চলতে থাকে। স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে পৃথিবীর জন্য একটি অভিন্ন দৈনিক অবতরণের সময় ধরে নেওয়া ভুল। নজুলের বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত আসমান, ঊর্ধ্বাবস্থান, কাছে আসা ও আহ্বানের দৃশ্য প্রাচীন দেবতা-অবতরণের পরিচিত বিশ্বচিত্র বহন করে। তাকে আধুনিক পৃথিবীর নির্ভুল মহাজাগতিক বিবরণ বলা হলে পর্যবেক্ষণযোগ্য সময়ব্যবস্থার সঙ্গে তার সম্পর্ক দেখাতে হয়। অজানা পদ্ধতি, বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা এবং প্রশ্ন নিষিদ্ধ করার নির্দেশ সেই সম্পর্কের প্রমাণ দেয় না।
প্রাচীন বিশ্বচিত্র: ভূকেন্দ্রিক আকাশ, সমতল ভূমি ও স্থানীয় দিকবোধ
নজুলের বর্ণনায় আকাশ ও পৃথিবীর সম্পর্ক একটি উল্লম্ব বিন্যাসে প্রকাশিত হয়েছে: মানুষ নিচে, আসমান ওপরে, আর আল্লাহ ওপর থেকে নিকটবর্তী আসমানে নামেন। এই দৃশ্যের সঙ্গে একটি জনপদের পরিচিত অভিজ্ঞতার মিল সরাসরি। মাটিতে দাঁড়ানো মানুষের মাথার ওপর আকাশ দেখা যায়; সূর্য দিগন্তে ওঠে, মাথার ওপর দিয়ে চলে এবং অন্য দিগন্তে অস্ত যায়। মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতিতে নিজের জমি স্থির থাকে, আকাশের বস্তুগুলো চলতে থাকে। এই দৃশ্যমান অভিজ্ঞতাকে মহাবিশ্বের প্রকৃত গঠন বলে গ্রহণ করলেই পৃথিবীকে স্থির ভিত্তি এবং আকাশকে তার ওপর সাজানো ঊর্ধ্বলোক হিসেবে কল্পনা করা সহজ হয়। দেবতার নিচে নামা সেই মানচিত্রে মানুষের আবাসের দিকে এগিয়ে আসার একটি পরিচিত ক্রিয়া।
প্রাচীন ভূকেন্দ্রিক জ্যোতির্বিদ্যায় পৃথিবীকে মহাবিশ্বের স্থির কেন্দ্রে রেখে সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের গতি ব্যাখ্যা করা হতো। টলেমির ব্যবস্থায় এই ধারণাকে জ্যামিতিক মডেলে সাজানো হয়েছিল। নাসার জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসবিষয়ক বিবরণেও তাঁর ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কেন্দ্রে অবস্থিত স্থির পৃথিবীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আকাশের দৈনিক আপাত গতিকে পৃথিবীর চারপাশের প্রকৃত গতি ধরে নেওয়ার এই কাঠামোতে একজন স্থলবাসীর দৃষ্টিভঙ্গিই মহাবিশ্বের কেন্দ্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা এবং মহাজাগতিক বাস্তবতার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি আড়াল হয়ে যায়। [54]
জালালাইনের ব্যাখ্যা: পৃথিবী সমতল, গোলক নয়
ধ্রুপদি তাফসিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তে পৃথিবীর সমতলতার দাবি সরাসরি লেখা আছে। সূরা গাশিয়ার ২০ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে জালালাইন শুধু ভূমি বিস্তৃত হওয়ার কথা বলেনি; পৃথিবীকে গোলক বলার বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। সেখানে শরিয়তের আলেমদের অভিমত এবং জ্যোতির্বিদদের অভিমত আলাদা করে দেখানো হয়েছে। ফলে বক্তব্যটির বিষয় কোনো ছোট এলাকার সমান জমি নয়; পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে দুইটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণা। পূর্ণ আয়াত-ব্যাখ্যাটি হলো: [55]
وإلى الأرض كيف سطحت أي: بسطت فيستدلون بها على قدرة الله تعالى ووحدانيته وصدرت بالإبل لأنهم أشد ملابسة لها من غيرها، وقوله سطحت ظاهر في أن الأرض سطح وعليه علماء الشرع لا كرة كما قاله أهل الهيئة وإن لم ينقض ركنا من أركان الشرع.
বাংলা অনুবাদ:
“আর পৃথিবীর দিকে—কীভাবে তাকে সমতল করা হয়েছে”; অর্থাৎ বিস্তৃত করা হয়েছে, যাতে তারা এর মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমতা ও একত্বের প্রমাণ পায়। উটের উল্লেখ প্রথমে করা হয়েছে, কারণ অন্যগুলোর তুলনায় তাদের সঙ্গে উটের সংশ্লিষ্টতা বেশি। ‘সমতল করা হয়েছে’ কথাটির প্রকাশ্য অর্থ হলো, পৃথিবী একটি সমতল ভূমি; শরিয়তের আলেমদের অভিমতও এটাই—জ্যোতির্বিদদের বক্তব্যের মতো গোলক নয়, যদিও গোলক হওয়ার বক্তব্য শরিয়তের কোনো মৌলিক স্তম্ভ ভঙ্গ করে না।
এই ব্যাখ্যার শেষাংশে গোলাকৃতির ধারণাকে শরিয়তের কোনো মৌলিক স্তম্ভের ধ্বংস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। কিন্তু পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে ব্যাখ্যাকারীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত দ্ব্যর্থহীন: পৃথিবী সমতল, গোলক নয়। অর্থাৎ ধর্মতাত্ত্বিক সহনীয়তা এবং কোনো বক্তব্যের বাস্তব সত্যতা এখানে পৃথক বিষয়। গোল পৃথিবীর কথা বললে ধর্মের একটি স্তম্ভ ভাঙে কি না, তা দিয়ে পৃথিবীর আকৃতি নির্ধারিত হয় না। আকার নির্ধারণের প্রশ্নে জালালাইনের এই সিদ্ধান্ত ভুল। ‘আলেমদের অভিমত’ হিসেবে উপস্থাপিত হওয়াও ভুল সিদ্ধান্তটিকে সঠিক করে না।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, জ্যোতির্বিদদের গোল পৃথিবীর ধারণাটি ব্যাখ্যাকারীর অজানা ছিল না। তিনি সেই ধারণার উল্লেখ করেছেন এবং তার বিপরীতে নিজের তাফসিরি সিদ্ধান্ত রেখেছেন। এখানে জ্ঞানের অনুপস্থিতির চেয়ে ব্যাখ্যার কর্তৃত্বের সমস্যা বেশি স্পষ্ট: পৃথিবীর গঠন সম্পর্কে বিশেষায়িত অনুসন্ধানের একটি সিদ্ধান্তকে ধর্মগ্রন্থের শব্দের প্রকাশ্য অর্থ এবং শরিয়তের আলেমদের অবস্থানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামানো হয়েছে। পৃথিবী কেমন, তার উত্তর খোঁজার জায়গায় আয়াতের কোন পাঠকে কর্তৃত্ব দেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারক হয়ে উঠেছে।
একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা কীভাবে প্রাচীন বিশ্বচিত্র ধরে রাখতে পারে, এই অনুচ্ছেদ তার নির্দিষ্ট দলিল। এখানে সমতলতার অর্থ সমালোচককে বাইরে থেকে বসাতে হচ্ছে না; ব্যাখ্যাকারী নিজেই ‘গোলক নয়’ বলে নিজের অর্থ স্থির করেছেন। ফলে পৃথিবীর ওপর দাঁড়ালে জমি সমান মনে হয়—এমন দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে সমগ্র গ্রহের আকৃতি হিসেবে গ্রহণ করার ভুলটি তাঁর বক্তব্যেই ধরা পড়ে। স্থানীয় দৃষ্টিকে বিশ্বজনীন ভূগোল বানানোর বিপদ এভাবেই ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যে সংরক্ষিত থাকে।
পৃথিবীর আকৃতি, গতি ও কেন্দ্রীয় অবস্থান: তিনটি পৃথক প্রশ্ন
পৃথিবী গোল কি না, পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘোরে কি না এবং পৃথিবী মহাবিশ্বের স্থির কেন্দ্র কি না—এই তিনটি প্রশ্নের বিষয় আলাদা। আকৃতির প্রশ্নের উত্তর থেকে গতির প্রশ্নের উত্তর নিজে থেকে পাওয়া যায় না। একটি গোল বস্তুকে স্থির কল্পনা করা সম্ভব; আবার কোনো বস্তুর ঘূর্ণন মানেই তাকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র ধরে নেওয়া নয়। একইভাবে নিজের চারপাশের দিক নির্ধারণ করতে পৃথিবীকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া এবং পৃথিবীকে সমগ্র মহাবিশ্বের স্থির কেন্দ্র ঘোষণা করা পৃথক কাজ। প্রথমটি পর্যবেক্ষণের সুবিধাজনক অবস্থান নির্ধারণ; দ্বিতীয়টি মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে একটি দাবি।
এই পার্থক্যগুলো নজুলের বর্ণনায় ব্যবহৃত মহাজাগতিক ধারণাগুলোর নির্দিষ্ট সীমা চিহ্নিত করে। ‘আল্লাহ নিচে নামেন’ কথাটিতে একটি ঊর্ধ্ব–অধো সম্পর্ক আছে। ‘রাতের শেষ তৃতীয়াংশে’ কথাটিতে স্থানীয় সময়ের শর্ত আছে। পৃথিবীকে সমতল ঘোষণা করার বক্তব্য আবার জালালাইনের উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় সরাসরি আছে। প্রতিটি দাবির দলিল এবং তার ভৌত তাৎপর্য নিজস্ব। একটির জায়গায় অন্যটি বসালে প্রকৃত অসংগতি ধরা পড়ে না; বরং কোন উৎসে কোন ভুল ধারণা রয়েছে, সেটি অস্পষ্ট হয়ে যায়।
| ধারণা | কী দাবি করা হচ্ছে | কোন প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন |
|---|---|---|
| সমতল পৃথিবী | পৃথিবীর সামগ্রিক আকৃতি গোলক নয়; একটি বিস্তৃত সমতল ভূমি। | পৃথিবীর বক্রতা, ভিন্ন স্থান থেকে আকাশ দেখার পার্থক্য এবং সমগ্র গ্রহের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দাবিটি মেলে কি না। |
| স্থির পৃথিবী | পৃথিবীর নিজ অক্ষের ঘূর্ণন বা সূর্যকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ নেই। | পৃথিবীর প্রকৃত গতির পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের সঙ্গে দাবিটি মেলে কি না। |
| ভূকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব | পৃথিবী স্থির কেন্দ্রে; অন্য মহাজাগতিক বস্তু তাকে ঘিরে চলে। | গ্রহগুলোর প্রকৃত কক্ষপথ ও গতির সম্পর্ক এই বিন্যাসে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় কি না। |
| স্তরবিভক্ত ধর্মীয় আকাশ | পৃথিবীর ওপর একাধিক আসমান এবং অবতরণের জন্য নির্দিষ্ট নিকটবর্তী আসমান আছে। | এই স্তরগুলোর অস্তিত্ব, সীমা ও পারস্পরিক অবস্থানের স্বাধীন প্রমাণ কী। |
| স্থানীয় রাতনির্ভর অবতরণ | পৃথিবীর মানুষের রাতের একটি নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে আল্লাহর কাজের সময় যুক্ত। | পৃথক অঞ্চলের পৃথক সময়ের সঙ্গে সেই ঘটনার সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত হয়। |
আধুনিক পৃথিবীর বর্ণনায় গ্রহটির প্রায় গোলাকার আকৃতি, নিজের অক্ষের ঘূর্ণন এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ পরস্পর সম্পর্কিত হলেও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর অক্ষের হেলন আবার ঋতু এবং দিন–রাতের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। এই বাস্তব বিশ্বচিত্রে মানুষের পায়ের নিচের ভূমি স্থির মনে হওয়া থেকে গ্রহটির প্রকৃত স্থিরতা অনুসরণ করে না। দৃশ্যমান আকাশকে নিজের চারপাশে ঘুরতে দেখা থেকেও সমগ্র মহাবিশ্ব পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে—এমন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। [56]
একজনের মাথার ওপরের দিক সবার জন্য একই দিক নয়
একটি গোল পৃথিবীতে ‘উপরে’ এবং ‘নিচে’ স্থানীয় দিক। ভূমিতে দাঁড়ানো মানুষের কাছে নিচের দিক পৃথিবীর কেন্দ্রের অভিমুখে এবং ওপরের দিক তার বিপরীত অভিমুখে। গ্রহের বিপরীত পৃষ্ঠে দাঁড়ানো আরেকজনের স্থানীয় ওপরের দিক প্রথম ব্যক্তির স্থানীয় ওপরের দিকের বিপরীত। দুইজনের কেউই উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে নেই; দুইজনই নিজের এলাকার ভূমিতে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পার্থক্যটি তাদের অবস্থানের। ফলে একটি জনপদের মাথার ওপরের দিককে সমগ্র পৃথিবীর জন্য একই মহাজাগতিক ঊর্ধ্বদিক ধরে নেওয়া ভুল।
সাধারণ ভাষায় আকাশের দিকে তাকানো বা নিচে নামার কথা বললে বক্তা ও শ্রোতার স্থানীয় অবস্থান থেকেই অর্থ পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের স্থানীয় অবস্থানের বাইরে একটি সত্তার অবস্থান, নির্দিষ্ট আসমানে তার গমন এবং সমগ্র পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্কের দাবি অনেক বেশি নির্দিষ্ট। তখন ‘ওপরে’ কোন অবস্থানের সাপেক্ষে, ‘নিকটবর্তী’ কোন কেন্দ্র থেকে এবং ‘নামা’ কোন দুই অবস্থানের সম্পর্ক—এসব শব্দের অর্থ নির্ধারিত হতে হয়। একটি এলাকার পরিচিত দিকবোধ দিয়ে পৃথিবীর বিপরীত পৃষ্ঠের মানুষ এবং সমগ্র মহাকাশের জন্য একই অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না।
স্তরবিভক্ত আসমানের দৃশ্য পৃথিবীর চারপাশে ঘেরা আবরণ হিসেবেও কল্পনা করা যায়। সেই কল্পনায় ওপর–নিচের অর্থ হবে কেন্দ্র থেকে দূরে বা কেন্দ্রের দিকে। কিন্তু কোনো জ্যামিতিক ছবি আঁকা এবং সেই ছবির বস্তুগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করা পৃথক কাজ। পৃথিবীকে ঘিরে সাতটি আসমান, তার বাইরে আরশ এবং তাদের মধ্যে আল্লাহর অবতরণকে বাস্তব মহাজাগতিক বিন্যাস বলা হলে সেই স্তর ও অবস্থানগুলোর পক্ষে প্রত্যক্ষ বা স্বাধীন পরোক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন। কল্পনাটি গুছিয়ে আঁকা গেলেই তা মহাকাশের আবিষ্কৃত মানচিত্র হয়ে যায় না।
নজুলের বর্ণনার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য এখানেই: মানুষের আবাস নিচে, দেবতার আবাস ঊর্ধ্বলোকে, আর নৈকট্য প্রকাশিত হচ্ছে নেমে আসার মাধ্যমে। এই উল্লম্ব দৃশ্যের প্রতিটি উপাদান প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বচিত্রে পরিচিত। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের নির্ভুল বিবরণ হিসেবে তাকে গ্রহণের ভিত্তি সেই পরিচিতি থেকে পাওয়া যায় না। পুরোনো ধর্মীয় মানচিত্রকে অপরিবর্তনীয় সত্য ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে তার বাস্তব অস্তিত্ব এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার দায়ও তৈরি হয়।
যুক্তিকে আনুগত্যের অধীন করা: বিশ্বাসের শিক্ষা ও সামাজিক প্রভাব
নজুলের আলোচনায় ‘কীভাবে ঘটে, জানা নেই’ কথাটির সঙ্গে যখন প্রশ্ন থামানোর নির্দেশ যুক্ত হয়, তখন অজানা তথ্য চিহ্নিত করার কাজ ছাড়িয়ে একটি জ্ঞানগত নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়। অজানা পদ্ধতি সম্পর্কে নতুন তথ্যের দরজা খোলা থাকার বদলে নির্ধারিত বিশ্বাসে স্থির থাকাই কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এই ব্যবস্থায় সমস্যার অস্তিত্ব মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু সমস্যাটি বিশ্বাসের সত্যতা পুনর্বিচারের কারণ হতে পারে না। অনুসন্ধানের ফল আগে থেকেই বেঁধে দেওয়া হয়: গ্রহণযোগ্য উত্তরকে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের সঙ্গে মিলতে হবে।
এ ধরনের অবস্থানে ‘জানি না’ কথাটি জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সৎ স্বীকারোক্তির ভূমিকা হারায়। কারণ একই সঙ্গে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা বহাল রাখা হয় এবং তার সম্পর্ক বিচার করার প্রশ্নকে অবাঞ্ছিত বলা হয়। পৃথিবীর রাতের মতো নির্ণয়যোগ্য বিষয়ের সঙ্গে একটি ধর্মীয় ঘটনার সময় যুক্ত করার পরে সেই সম্পর্কের পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা অনুসন্ধান থেকে সরে যাওয়ার কৌশল। কোন বক্তব্য সত্য, সেই বিচার থেকে মনোযোগ সরিয়ে কে কতটা অনুগত, সেই বিচারকে সামনে আনা হয়।
ইবনে আবিল ইয্য: আপত্তিহীন আত্মসমর্পণকে বিশ্বাসের শর্ত করা
আকিদার একটি বহুলপঠিত ভাষ্যে আনুগত্যের এই সম্পর্ক স্পষ্ট ভাষায় নির্ধারিত হয়েছে। তাহাবির ‘ইসলামের পা আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের ভিত্তি ছাড়া স্থির হয় না’ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ইবনে আবিল ইয্য বলেন, ওহির পাঠের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং নিজের মত, বিচারবুদ্ধি ও তুলনামূলক যুক্তি দিয়ে তার বিরোধিতা করা চলবে না। এখানে শুধু কোনো নির্দিষ্ট ভুল আপত্তি খণ্ডন করা হয়নি; কোন কর্তৃত্বের অধীনে বিচারবুদ্ধি কাজ করবে, সেই নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও তার পূর্ণ ব্যাখ্যা: [57]
قوله: «ولا تثبت قدم الإسلام إلا على ظهر التسليم والاستسلام».
ش: هذا من باب الاستعارة، إذ القدم الحسي لا تثبت إلا على ظهر شيء. أي لا يثبت إسلام من لم يسلم لنصوص الوحيين، وينقاد إليها، ولا يعترض عليها ولا يعارضها برأيه ومعقوله وقياسه. روى البخاري عن الإمام محمد بن شهاب الزهري رحمه الله أنه قال: من الله الرسالة، ومن الرسول البلاغ، وعلينا التسليم. وهذا كلام جامع نافع.
বাংলা অনুবাদ:
তাঁর বক্তব্য: “ইসলামের পা আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের ভিত্তি ছাড়া স্থির হয় না।”
ব্যাখ্যা: এটি রূপক ভাষা; কারণ বাস্তব পা কোনো কিছুর ওপর ভিত্তি করেই স্থির থাকে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুই ওহির পাঠের কাছে আত্মসমর্পণ করে না, সেগুলোর অনুগত হয় না এবং নিজের মত, বিচারবুদ্ধি ও তুলনামূলক যুক্তি দিয়ে সেগুলোর বিরুদ্ধে আপত্তি ও বিরোধিতা থেকে বিরত থাকে না, তার ইসলাম স্থির হয় না। বুখারি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে শিহাব আয-যুহরির বক্তব্য বর্ণনা করেছেন: আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তা, রাসুলের দায়িত্ব পৌঁছে দেওয়া এবং আমাদের দায়িত্ব আত্মসমর্পণ করা। এটি একটি ব্যাপক অর্থবহ ও উপকারী বক্তব্য।
এই বিধানে একটি দাবির যৌক্তিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যক্তির ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা একসঙ্গে বাঁধা হয়েছে। কেউ অবতরণের সময় ও অবস্থানের সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি তুললে তার বক্তব্যের প্রমাণমূল্য বিচার করার পাশাপাশি তার আনুগত্যও বিচারের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রশ্নের খরচ বাড়ে। ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আশঙ্কার সঙ্গে ধর্মীয় অবস্থান হারানোর আশঙ্কা যুক্ত হয়। একটি অনুসন্ধানী প্রশ্ন তখন শুধু জ্ঞানের প্রশ্ন থাকে না; তা নিজের পরিচয়, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ধর্মীয় স্বীকৃতির প্রশ্নেও পরিণত হয়।
এই পদ্ধতিতে সমালোচনামূলক চিন্তার জায়গা সংকুচিত হওয়ার কারণ নির্দিষ্ট। বিচারবুদ্ধিকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর অধিকার দেওয়া হচ্ছে না; তার বৈধতা নির্ধারিত হচ্ছে আগে থেকে মান্য পাঠের সঙ্গে সঙ্গতি দিয়ে। কোনো আপত্তি সত্যিই ভুল হলে তার যুক্তি খণ্ডন করা সম্ভব। কিন্তু আপত্তি তোলার কাজটিকেই আনুগত্যের ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করলে বিচার শুরু হওয়ার আগেই একটি পক্ষকে অতিরিক্ত দায় বহন করতে হয়। ধর্মীয় পাঠ সিদ্ধান্তের অধীন পরীক্ষ্য বিষয় হওয়ার বদলে পরীক্ষার অনুমতিদাতা হয়ে বসে।
বিচারবুদ্ধিকে অনুসারী বানানোর উপমা
ইবনে আবিল ইয্য এই অধীনতাকে বোঝাতে একটি দীর্ঘ উপমা দিয়েছেন। একজন সাধারণ মানুষ অন্য একজনকে মুফতির কাছে নিয়ে গেল; পরে পথপ্রদর্শক ও মুফতির মধ্যে মতভেদ হলে অনুসন্ধানকারী মুফতিকে মানবে। এই সম্পর্কের সঙ্গে ধর্মীয় পাঠ ও বিচারবুদ্ধির সম্পর্ক তুলনা করা হয়েছে। উপমাটির পূর্ণ ধারাবাহিক অনুচ্ছেদ দুইটি হলো: [58]
وما أحسن المثل المضروب للنقل مع العقل، وهو: أن العقل مع النقل كالعامي المقلد مع العالم المجتهد، بل هو دون ذلك بكثير، فإن العامي يمكنه أن يصير عالما، ولا يمكن للعالم أن يصير نبيا رسولا، فإذا عرف العامي المقلد عالما، فدل عليه عاميا آخر.
ثم اختلف المفتي والدال، فإن المستفتي يجب عليه قبول قول المفتي، دون الدال، فلو قال الدال: الصواب معي دون المفتي، لأني أنا الأصل في علمك بأنه مفت، فإذا قدمت قوله على قولي قدحت في الأصل الذي به عرفت أنه مفت، فلزم القدح في فرعه! فيقول له المستفتي: أنت لما شهدت له بأنه مفت، ودللت عليه، شهدت له بوجوب تقليده دونك، فموافقتي لك في هذا العلم المعين، لا تستلزم موافقتك في كل مسألة، وخطؤك فيما خالفت فيه المفتي الذي هو أعلم منك، لا يستلزم خطأك في علمك بأنه مفت، هذا مع علمه أن ذلك المفتي قد يخطئ.
বাংলা অনুবাদ:
বর্ণিত ধর্মীয় পাঠ ও বিচারবুদ্ধির সম্পর্ক বোঝাতে দেওয়া উপমাটি কতই না সুন্দর! তা হলো: ধর্মীয় পাঠের তুলনায় বিচারবুদ্ধির অবস্থান একজন বিজ্ঞ মুজতাহিদের তুলনায় একজন অনুসরণকারী সাধারণ মানুষের মতো; বরং তার চেয়েও অনেক নিচে। কারণ একজন সাধারণ মানুষ আলেম হতে পারে, কিন্তু একজন আলেম নবী-রাসুল হতে পারে না। একজন অনুসরণকারী সাধারণ মানুষ কোনো আলেমকে চিনল এবং আরেকজন সাধারণ মানুষকে তাঁর কাছে যাওয়ার পথ দেখাল।
এরপর মুফতি ও পথপ্রদর্শকের মধ্যে মতভেদ হলে প্রশ্নকারীকে পথপ্রদর্শকের বদলে মুফতির বক্তব্যই গ্রহণ করতে হবে। পথপ্রদর্শক যদি বলে, মুফতির বদলে আমিই সঠিক; কারণ তিনিই যে মুফতি, সে বিষয়ে তোমার জ্ঞানের মূল ভিত্তি আমি; তুমি আমার কথার ওপর তাঁর কথাকে অগ্রাধিকার দিলে যে ভিত্তির মাধ্যমে তাঁকে মুফতি বলে জেনেছ, সেটিকেই আঘাত করবে, ফলে তার ওপর প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্তও আঘাতপ্রাপ্ত হবে! তখন প্রশ্নকারী তাকে বলবে: তুমি যখন তাঁকে মুফতি বলে সাক্ষ্য দিয়েছ এবং তাঁর কাছে যাওয়ার পথ দেখিয়েছ, তখন তোমার বদলে তাঁকেই অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তার সাক্ষ্য দিয়েছ। এই নির্দিষ্ট বিষয়ে তোমার সঙ্গে একমত হওয়া থেকে প্রত্যেক বিষয়ে তোমার সঙ্গে একমত হওয়া আবশ্যক হয় না। তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী মুফতির বিরোধিতার ক্ষেত্রে তোমার ভুল হওয়া থেকে তাঁকে মুফতি বলে চেনার ক্ষেত্রেও তোমার ভুল হওয়া আবশ্যক হয় না। অথচ প্রশ্নকারী জানে যে সেই মুফতিও ভুল করতে পারেন।
উপমাটি একটি সীমিত সিদ্ধান্ত দেখায়: কোনো ব্যক্তির কাছে অন্য একজনের পরিচয় পাওয়া মানেই প্রথম ব্যক্তির সব মত গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তির সব দাবি প্রশ্নাতীত হয়ে যায় না। উপমার শেষ বাক্যেই মুফতির ভুল করার সম্ভাবনা স্বীকার করা হয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার যৌক্তিকতা এবং বিশেষজ্ঞের প্রতিটি বক্তব্যের অভ্রান্ততা পৃথক সিদ্ধান্ত। প্রথম সিদ্ধান্ত দিয়ে দ্বিতীয়টি প্রতিষ্ঠা করতে গেলে যে অতিরিক্ত প্রমাণ প্রয়োজন, উপমাটি তা সরবরাহ করে না।
এরপরের অনুচ্ছেদে ইবনে আবিল ইয্য নবীর আল্লাহসম্পর্কিত সংবাদকে নির্ভুল ধরে তাঁর বক্তব্যের কাছে আত্মসমর্পণ আবশ্যক করেছেন। ফলে উপমাটি নিজে এই নির্ভুলতা প্রমাণ করছে না; নির্ভুলতার পূর্বস্বীকৃতির ওপরই বিচারবুদ্ধির অধীনতার সিদ্ধান্ত দাঁড় করানো হচ্ছে। নজুলের সত্যতা নিয়ে অনুসন্ধানের সময় সেই একই পূর্বস্বীকৃতিকে চূড়ান্ত উত্তর করলে প্রশ্নের বিষয়টিকেই বিচারের আগেই সত্য ধরে নিতে হয়। দাবিটির নির্ভুলতা যে অনুসন্ধানের বিষয়, সেই অনুসন্ধানে দাবিটির পূর্বনির্ধারিত নির্ভুলতা স্বাধীন প্রমাণের কাজ করতে পারে না।
কারও জ্ঞান ও দক্ষতা সম্পর্কে আস্থা তৈরি হয় তার বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা, কাজের ফল এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য যোগ্যতার ভিত্তিতে। নতুন কোনো বক্তব্য আগের প্রমাণের সঙ্গে বিরোধে পড়লে সেই বক্তব্য পরীক্ষা করার সুযোগও থাকে। ‘আপনি একসময় তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন’ বলে পরবর্তী সব বক্তব্যের বিচার বন্ধ করা হলে জ্ঞানভিত্তিক আস্থা ব্যক্তিনির্ভর বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়। নজুলের মতো দাবিতে এই উপমা প্রয়োগ করার অর্থ হবে, একবার ধর্মীয় কর্তৃত্ব গ্রহণ করার পর পৃথিবীর ভূগোল ও সময়ব্যবস্থা সম্পর্কে তার বক্তব্য আর স্বাধীনভাবে বিচার করা যাবে না। তখন বিচারবুদ্ধি সত্য নির্ধারণের যন্ত্র থেকে কর্তৃত্বের অনুমোদনকারী যন্ত্রে পরিণত হয়।
গাযালির নির্দেশনা: প্রমাণের আগে বিশ্বাস শেখানো
বিশ্বাস কীভাবে মানুষের মনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তার একটি স্পষ্ট বিবরণ গাযালির আকিদাশিক্ষার নির্দেশনায় পাওয়া যায়। সেখানে শিশুকে প্রথমে বিশ্বাসের বক্তব্য মুখস্থ করানো, পরে তার অর্থ বোঝানো এবং এরপর বিশ্বাস ও নিশ্চয়তা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। প্রমাণ ছাড়াই শিশুর মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি হতে পারে—এ কথাও সরাসরি রয়েছে। মুরতাদা আয-যাবিদির ব্যাখ্যাগ্রন্থে সংরক্ষিত গাযালির মূল অনুচ্ছেদ দুইটি: [59]
اعلم أن ما ذكرناه في ترجمة العقيدة ينبغي أن يقدم إلى الصبي في أول نشوء ليحفظه حفظا ثم لا يزال ينكشف له معناه في كبره شيئا فشيئا فابتداؤه الحفظ ثم الفهم ثم الاعتقاد والإيقان والتصديق به وذلك مما يحصل في الصبي بغير برهان.
فمن فضل الله سبحانه على قلب الإنسان أن شرحه في أول نشوء للإيمان من غير حاجة إلى حجة وبرهان وكيف ينكر ذلك وجميع عقائد العوام مباديها التلقين المجرد والتقليد المحض نعم، يكون الاعتقاد الحاصل بمجرد التقليد غير خال عن نوع من الضعف في الابتداء على معنى أنه يقبل الإزالة بنقيضه لو ألقي إليه، فلا بد من تقويته وإثباته في نفس الصبي والعامي حتى يترسخ ولا يتزلزل.
বাংলা অনুবাদ:
জেনে রাখো, আকিদার বিবরণে আমরা যা উল্লেখ করেছি, তা শিশুর বিকাশের শুরুতেই তার সামনে পেশ করা প্রয়োজন, যাতে সে তা ভালোভাবে মুখস্থ করে। পরে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে তার কাছে এর অর্থ প্রকাশিত হতে থাকবে। সুতরাং শুরুতে মুখস্থ করা, এরপর বোঝা, এরপর বিশ্বাস, নিশ্চয়তা এবং তাকে সত্য বলে গ্রহণ করা। আর এটি শিশুর মধ্যে প্রমাণ ছাড়াই ঘটে থাকে।
মানুষের অন্তরের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ হলো, বিকাশের শুরুতেই তিনি তাকে যুক্তি ও প্রমাণের প্রয়োজন ছাড়াই ঈমানের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এটি অস্বীকার করা যায় কীভাবে, যখন সাধারণ মানুষের সব বিশ্বাসের সূচনা নিছক শেখানো কথা গ্রহণ এবং খাঁটি অনুকরণের মাধ্যমে? হ্যাঁ, কেবল অনুকরণ থেকে অর্জিত বিশ্বাস শুরুতে এক ধরনের দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকে না; অর্থাৎ এর বিপরীত ধারণা তার সামনে পেশ করা হলে তা অপসারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং শিশু ও সাধারণ মানুষের মনে সেই বিশ্বাসকে শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন, যাতে তা গভীরভাবে প্রোথিত হয় এবং টলে না যায়।
এখানে শিক্ষার ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সামনে প্রথমে কোনো খোলা প্রশ্ন রাখা হচ্ছে না, যার উত্তর প্রমাণ পরীক্ষা করে সে নির্ধারণ করবে। প্রথমে নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করানো হচ্ছে; পরে সেই উত্তরের অর্থ বোঝানো হচ্ছে; এরপর তাকে নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুরুতেই নির্ধারিত। বড় হওয়ার অর্থ সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিচারের স্বাধীনতা অর্জন নয়; আগে শেখানো সিদ্ধান্তের প্রতি আরও দৃঢ় হওয়া।
গাযালি যে দুর্বলতার কথা বলেছেন, তার সংজ্ঞাও লক্ষণীয়: বিপরীত ধারণা সামনে এলে প্রাথমিক বিশ্বাসটি বদলে যেতে পারে। অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে নতুন যুক্তি বা তথ্য পেয়ে আগের মত বদলাতে পারা একটি প্রয়োজনীয় সামর্থ্য। উদ্ধৃত শিক্ষানির্দেশনায় বিশ্বাস বদলে যাওয়ার এই সম্ভাবনাই এমন দুর্বলতা, যা কাটিয়ে বিশ্বাসকে অনড় করতে হবে। ফলে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে দাবির প্রমাণমূল্যের তুলনায় দাবিটির স্থায়িত্ব অগ্রাধিকার পায়। একটি বক্তব্য কতটা যাচাই করা হয়েছে এবং সেটি কতটা গভীরভাবে মনে বসানো হয়েছে—দুইয়ের মধ্যে যে পার্থক্য, এই নির্দেশনায় তা অত্যন্ত স্পষ্ট।
শৈশবে মুখস্থ শেখানো অবতরণের গল্প পরে শুধু একটি তথ্যবাক্য হিসেবে থাকে না; তার সঙ্গে ইবাদত, পরিচিত শিক্ষক, পরিবারের ধর্মীয় শিক্ষা এবং নিজের বিশ্বাসী পরিচয় যুক্ত হতে পারে। তখন বক্তব্যটি যাচাইয়ের প্রশ্ন ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি ভারী হয়ে ওঠে। একজন মানুষকে একই সঙ্গে দুইটি কাজ করতে হয়: দাবিটির সত্যতা পরীক্ষা করা এবং বহুদিনের পরিচিত বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক পুনর্বিচার করা। আগেই সিদ্ধান্ত বসিয়ে পরে তার পক্ষে নিশ্চয়তা তৈরি করার পদ্ধতি এই বাড়তি বাধা সৃষ্টি করে।
বিশ্বাস দৃঢ় করার পাঠচক্র এবং তার সামাজিক মূল্য
আগে শেখানো বিশ্বাস দৃঢ় করার পদ্ধতি সম্পর্কেও গাযালি নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। শিশু ও সাধারণ মানুষকে বিতর্ক ও কালামশাস্ত্র শেখানোর পরিবর্তে কোরআন, তাফসির এবং হাদিসের পাঠে নিয়োজিত রাখার কথা এসেছে। সংশ্লিষ্ট পূর্ণ অনুচ্ছেদটি হলো: [60]
وليس الطريق في تقويته وإثباته أن يعلم صنعة الجدل والكلام بل يشتغل بتلاوة القرآن وتفسيره وقراءة الحديث ومعانيه.
বাংলা অনুবাদ:
এই বিশ্বাসকে শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত করার পদ্ধতি হলো তাকে বিতর্ক ও কালামশাস্ত্র না শেখানো; বরং সে কোরআন তিলাওয়াত ও তার তাফসির এবং হাদিস ও তার অর্থ পাঠে নিয়োজিত থাকবে।
এই নির্দিষ্ট শিক্ষাপদ্ধতিতে শুরুতে যে উৎস থেকে বিশ্বাস শেখানো হয়েছে, পরে সেই উৎসের পুনঃপাঠের মাধ্যমেই বিশ্বাসকে স্থায়ী করার ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থী একই কর্তৃত্বের বক্তব্য শোনে, তার অনুমোদিত অর্থ শেখে এবং সেই অর্থের প্রতি দৃঢ়তাকে অর্জন হিসেবে গ্রহণ করে। কোনো ধারণার পক্ষে স্বাধীন প্রমাণের বৈচিত্র্য এবং একই ধারণার অনুমোদিত পাঠের পুনরাবৃত্তি এক জিনিস নয়। দ্বিতীয়টি পরিচিতি ও আস্থা বাড়াতে পারে; তা নিজে থেকে প্রথমটির কাজ সম্পন্ন করে না। নজুলের বর্ণনা বহুবার পাঠ করা থেকে তার অবতরণের গন্তব্য বা সময়ের বিশ্বজনীন সম্পর্ক সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায় না।
সামাজিক সমস্যাটি তাই একটি অদ্ভুত মহাজাগতিক গল্পে বিশ্বাস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বড় প্রশ্ন হলো, কোনো প্রচলিত বক্তব্য প্রশ্নের মুখে পড়লে শিক্ষার্থী কী অভ্যাস ব্যবহার করবে। প্রমাণের সঙ্গে দাবির তুলনা করবে, নাকি নিজের সন্দেহকে আনুগত্যের ত্রুটি হিসেবে দেখবে? সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের বদলে সিদ্ধান্ত রক্ষার অভ্যাস প্রতিষ্ঠিত হলে সেই অভ্যাস অন্য দাবির বিচারেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ধর্মীয় বক্তা, শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা তখন বক্তব্যের প্রমাণমূল্যের বিকল্প হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়।
জ্ঞানচর্চায় ভুল ধরা পড়া সংশোধনের উপাত্ত। আনুগত্যকেন্দ্রিক পাঠচক্রে একই ঘটনা বিশ্বাস রক্ষার সংকট হিসেবে ধরা হয়। ফলে যে ব্যক্তি প্রশ্নটি তুলেছে, তার উদ্দেশ্য, ঈমান বা আচরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে, অথচ প্রশ্নের মূল সম্পর্কটি অমীমাংসিত থেকে যায়। নজুলের ক্ষেত্রে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও স্থানীয় রাত নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর প্রশ্নকারীর নীরবতাকে সমাধান হিসেবে চাওয়া এই স্থানান্তরেরই উদাহরণ: একটি মহাজাগতিক দাবির পরীক্ষা বদলে যায় প্রশ্নকারীর আত্মসমর্পণের পরীক্ষায়।
সমালোচনামূলক চিন্তার ভিত্তি হলো, গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত প্রমাণের শক্তি অনুসারে বদলাতে পারবে। পূর্বনির্ধারিত ধর্মীয় সিদ্ধান্তের কাছে বিচারবুদ্ধির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এই সুযোগ বন্ধ করে। বিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করার কাজের বদলে বিশ্বাসে স্থির থাকাকেই সাফল্য বানানো হলে সংশোধনের পথ সংকুচিত হয়। পৃথিবী ও আকাশের বাস্তব সম্পর্ক সম্পর্কে কোনো দাবি ভুল বা প্রমাণহীন হলে তার ধর্মীয় মর্যাদা সেই ত্রুটি দূর করে না। প্রশ্নকারীর আনুগত্য আদায় করে একটি বক্তব্য প্রচলিত রাখা যায়; তার সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রমাণই প্রয়োজন।
উপসংহার
আল্লাহর রাত্রিকালীন অবতরণের বর্ণনা মানুষের একটি পরিচিত স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে মহাজাগতিক ঘটনার সময়সূচির সঙ্গে যুক্ত করে: রাত গভীর হয়, শেষ তৃতীয়াংশ আসে, আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে নামেন এবং ফজর পর্যন্ত আহ্বান করেন। কিন্তু ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর জন্য কোনো একক বিশ্বজনীন রাত নেই। একটি স্থানের শেষ তৃতীয়াংশ শেষ হওয়ার সময় অন্য স্থানে সেই পর্যায় চলতে থাকে; ঋতু ও অক্ষাংশ বদলালে রাতের দৈর্ঘ্যও বদলায়। ফলে একটি জনপদের রাতের অভিজ্ঞতাকে সমগ্র পৃথিবীর জন্য একই শুরু ও শেষসম্পন্ন দৈনিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করা ভুল। প্রত্যেক অঞ্চলের নিজস্ব সময় গ্রহণ করলে ঘটনাটির প্রযোজ্যতার একটি চলমান বৈশ্বিক চিত্র পাওয়া যায়; একটি অঞ্চলের সময়কে সবার জন্য স্থির করলে অন্য অঞ্চলের স্থানীয় রাত তার সঙ্গে মেলে না। এই সময়গত সম্পর্কের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার জায়গায় ‘আল্লাহ জানেন’, ‘তাঁর জন্য উপযুক্ত পদ্ধতিতে’ কিংবা ‘প্রশ্ন বন্ধ করো’ বসালে সমস্যার কোনো সমাধান পাওয়া যায় না।
আসমান, আরশ, ঊর্ধ্বাবস্থান এবং নিচে নামার ভাষাও সত্তার অবস্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে। অবতরণকে বাস্তব অবস্থানগত ক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করলে উৎসস্থান, গন্তব্য এবং তাদের সম্পর্কের অর্থ থাকে। সেই অর্থে আল্লাহর কাজ পৃথিবীর স্থানীয় সময় ও একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। আবার তাঁকে স্থান-কাল-অতীত ঘোষণা করে অবস্থানগত সম্পর্ক প্রত্যাহার করলে ‘নামা’ কথাটির অর্থ কী থাকে, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়। একই বর্ণনাকে বাস্তব অবতরণ বলে প্রতিষ্ঠা করা এবং তার অর্থ বিচার করতে গেলেই সময়, অবস্থান ও গতির পরিচিত সম্পর্ক অগ্রাহ্য করা দাবিটিকে প্রমাণ করে না। বাস্তব ঘটনার মর্যাদা দাবি করার সঙ্গে তার সম্পর্কে অর্থপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার দায়ও যুক্ত থাকে।
ঊর্ধ্বলোকে দেবতার অবস্থান এবং মানুষের জগতে তাঁর অবতরণ প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্যের পরিচিত মোটিফ। নজুলের দৃশ্যও সেই স্তরবিভক্ত বিশ্বচিত্রের ভাষা বহন করে। ধ্রুপদি তাফসিরে পৃথিবীকে সমতল বলে গোলাকৃতি প্রত্যাখ্যানের সুস্পষ্ট বক্তব্যও সংরক্ষিত আছে। এসব দলিল দেখায়, ধর্মীয় ব্যাখ্যার মহাজাগতিক মানচিত্র মানুষের যুগগত ধারণা থেকে মুক্ত ছিল না। কোনো বর্ণনা পুরোনো, বহুলপ্রচলিত বা মর্যাদাপূর্ণ হলেই তা আধুনিক মহাকাশের নির্ভুল বিবরণ হয়ে যায় না। প্রাচীন কল্পচিত্রকে অপরিবর্তনীয় ঐশী জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন; উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কর্তৃত্ব সেই প্রমাণের বিকল্প নয়।
নজুলের অর্থ নিয়েও ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারীরা এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। আল্লাহ নিজে নামেন, তাঁর রহমত নামে, ফেরেশতা নামে, আরশ খালি হয় কি না, চলাচলের কথা বলা যাবে কি না—এসব প্রশ্নে পৃথক অবস্থান রয়েছে। অথচ প্রতিটি অবস্থানের সমর্থকেরাই ধর্মীয় পাঠ ও পূর্বসূরিদের কর্তৃত্ব ব্যবহার করেন। এই মতভেদের বাস্তব অস্তিত্বের মধ্যেই ব্যাখ্যার মানবীয় ভূমিকা স্পষ্ট। কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে প্রশ্নাতীত ঘোষণা করা মানে সেই ব্যাখ্যাকারীর সিদ্ধান্তকেও প্রশ্নাতীত ক্ষমতা দেওয়া। তখন সমস্যাটি শুধু ঈশ্বরের অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ঈশ্বর সম্পর্কে কোন বক্তব্য মানুষ বলতে পারবে এবং কোন প্রশ্ন করলে তাকে দোষী করা হবে, সেই ক্ষমতার প্রশ্নও সামনে আসে।
সবচেয়ে ক্ষতিকর পদক্ষেপ হলো, এই জ্ঞানগত প্রশ্নকে আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা। একটি বক্তব্যের অসংগতি ধরিয়ে দেওয়া হলে তার উত্তর যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে দিতে হয়। প্রশ্নকারীর ঈমান, নিয়ত বা আত্মসমর্পণ নিয়ে বিচার শুরু করলে মূল দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। শৈশবে বিশ্বাস মুখস্থ করানো, পরে সেই বিশ্বাস অনড় করার পাঠচক্র চালানো এবং বিপরীত বিচারকে ধর্মীয় বিপদ হিসেবে দেখানো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সিদ্ধান্ত সংশোধনের চেয়ে সিদ্ধান্ত রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পদ্ধতি মানুষের প্রশ্ন করার সামর্থ্যকে কর্তৃত্বের অনুমতির অধীন করে। গ্রহণযোগ্যতার শর্ত হিসেবে নীরবতা আদায় করা জ্ঞানের বিকাশের সরাসরি বাধা।
কোনো হাদিসকে সহিহ বা মুতাওয়াতির বলা তার ধর্মীয় বর্ণনাপরম্পরায় মর্যাদার পরিচয় দেয়। পৃথিবীর গঠন সম্পর্কে কোনো বক্তব্য সত্য কি না, আসমানের কথিত স্তরগুলো বাস্তবে আছে কি না কিংবা একটি অতিপ্রাকৃত অবতরণ ঘটে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সেই শ্রেণিবিন্যাস থেকে পাওয়া যায় না। নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো বক্তব্য কারও নামে প্রচলিত হওয়া এবং বক্তব্যটির বিষয়বস্তু বাস্তবে সত্য হওয়া পৃথক দাবি। একটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্যের গ্রহণযোগ্যতার নিয়মকে সমগ্র মহাবিশ্ব সম্পর্কে সত্য নির্ধারণের চূড়ান্ত মানদণ্ড বানালে যাচাইয়ের জায়গা দখল করে বিশ্বাসের কর্তৃত্ব।
রাত্রিকালীন অবতরণকে বাস্তব মহাজাগতিক সত্য হিসেবে গ্রহণের স্বাধীন প্রমাণ নেই; অথচ তাকে বিশ্বাস করার বাধ্যবাধকতা এবং প্রশ্ন থামানোর নির্দেশ রয়েছে। এই অবস্থায় দাবিটির যথার্থ পরিচয় একটি প্রমাণহীন ধর্মীয় বিশ্বাস। তাকে পৃথিবী ও আকাশ সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান হিসেবে শেখানো বিভ্রান্তিকর, আর যাচাই থেকে রক্ষার জন্য অলৌকিকতার ঘোষণা দিয়ে বাধ্যতামূলক বিশ্বাসে পরিণত করা কুসংস্কারের চর্চা। কুসংস্কার হিসেবে এই দাবিকে পরিত্যাগের ভিত্তি হলো তার প্রমাণহীনতা এবং তাকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত প্রশ্নবিরোধী পদ্ধতি। কোনো ধর্মীয় পরিচয়, প্রাচীন গ্রন্থ বা আলেমের মর্যাদা সত্য যাচাইয়ের ঊর্ধ্বে নয়। দাবির পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে; প্রমাণের অভাব পূরণ করতে মানুষের আনুগত্য দাবি করা জ্ঞান নয়।
তথ্যসূত্রঃ
- সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৬০৭; প্রচলিত আন্তর্জাতিক নম্বর ৩৬৪৬; পূর্ণ আরবি বর্ণনা ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নাজম ৫৩:৩–৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ১০৭৯; প্রচলিত আন্তর্জাতিক নম্বর ১১৪৫; পূর্ণ আরবি বর্ণনা ↩︎
- আল-লুলু ওয়াল মারজান, হাদিস ৪৩৪ ↩︎
- সুনান তিরমিজি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৪৪৬; জামি আত-তিরমিজি ৪৪৬; আরবি পাঠ ও সংকলকের মন্তব্য ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস ১২২৩; মিশকাত ১২২৩-এর সমান্তরাল পাঠ ↩︎
- আল-আদাবুল মুফরাদ, বাংলা সংস্করণ, হাদিস ৭৫৮; প্রচলিত আন্তর্জাতিক নম্বর ৭৫৩ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৫৮বি ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৫৮সি ↩︎
- ইবনে বাযের ফতোয়া, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩১১–৩১৫; ইবনে বাযের নিজস্ব ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট ফতোয়া: শেষ রাতে বিতর উত্তম ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৬১–৬৫ ↩︎
- তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ২০৬–২১০ ↩︎
- কোরআন, আস-সাফফাত ৩৭:৬ ↩︎
- কোরআন, আল-মুলক ৬৭:৫ ↩︎
- কোরআন, আল-মুলক ৬৭:৩ ↩︎
- কোরআন, ফুসসিলাত ৪১:১২ ↩︎
- কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কোরআন, আল-মুলক ৬৭:৫-এর ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
- নাসা, নক্ষত্রের গঠন ও জীবনচক্র ↩︎
- নাসা, উল্কা ও উল্কাপিণ্ড ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৩৭ক ↩︎
- কোরআন, ত্ব-হা ২০:৫ ↩︎
- বাইবেল, আদিপুস্তক ১১:৫; New International Version ↩︎
- বাইবেল, আদিপুস্তক ১৮:২০–২১; King James Version ↩︎
- বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ১৯:২০–২২; New International Version ↩︎
- বাইবেল, যাত্রাপুস্তক ৩৪:৫–৭; King James Version ↩︎
- কোরআন, আল-বাকারা ২:২১০ ↩︎
- ইবনে বায, মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওয়িআ, খণ্ড ২৮, পৃষ্ঠা ৩৯৯; ফতোয়া ১০৪ ↩︎
- ইবনে বায, মাজমু ফাতাওয়া, খণ্ড ২৮, পৃষ্ঠা ৩৯৯–৪০২ ↩︎
- ইবনে তাইমিয়া, মাজমু আল-ফাতাওয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৭৫–৪৭৬; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২৫৪৪৬৫; ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহের নামে উদ্ধৃত কথোপকথন ↩︎
- উসাইমিন, ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম, বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৮০–৮১; আরবি পূর্ণ গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন ৪১ ↩︎
- উসাইমিন, ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম, প্রশ্ন ৪১; বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৮০–৮১ ↩︎
- উসাইমিন, ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম, বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৮০–৮১; উত্তরের শেষ অনুচ্ছেদ ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১২২৯০; উসাইমিনের মাজমু ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৪–২০৫ ↩︎
- ইসলামওয়েব, লিকাউল বাবিল মাফতুহ, বৈঠক ৬৭; অঞ্চলভেদে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ ও নজুলসংক্রান্ত প্রশ্ন ↩︎
- ইবনে রজব, ফাদলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফ; অঞ্চলভেদে রাতের শেষ তৃতীয়াংশসংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ↩︎
- নওয়াবি, আল-মিনহাজ শরহু সহিহি মুসলিম, হাদিস ৭৫৮-এর ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২০০৮১: আল্লাহর নজুলের গুণ সাব্যস্তকরণ ↩︎
- হোমার, ইলিয়াড, প্রথম সর্গ; সামুয়েল বাটলারের ইংরেজি অনুবাদ, ১৮৯৮; প্রজেক্ট গুটেনবার্গ ↩︎
- ইশতারের নিম্নজগতে অবতরণ; মরিস জাস্ট্রো, The Civilization of Babylonia and Assyria, ১৯১৫ থেকে অনুবাদ ↩︎
- কোরআন, আল-আনকাবুত ২৯:৬১ ↩︎
- নিকোলাই সিনাই, Rain-Giver, Bone-Breaker, Score-Settler: Allāh in Pre-Quranic Poetry, American Oriental Society, ২০১৯, পৃষ্ঠা ৩–৪; বিশদ আলোচনা পৃষ্ঠা ১৫–১৮ ও ৫৭–৬৪ ↩︎
- ইবনে বায, মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওয়িআ, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৪১–৩৪৫; উদ্ধৃত অংশ পৃষ্ঠা ৩৪৩ ↩︎
- ইবনে আবিল ইজ, শরহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা; “ছয় দিক তাঁকে ধারণ করে না” বক্তব্যের ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে তাইমিয়া, মাজমু আল-ফাতাওয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪০২–৪০৩; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে তাইমিয়া, মাজমু আল-ফাতাওয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪১৪–৪১৫; ইসলামওয়েব ↩︎
- নাসা, পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং দিন-রাতের কারণ ↩︎
- ইউরোপীয় দক্ষিণ মানমন্দির, দিন ও রাতের কারণ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১৬৮৬৭৫: রাতের সময়সীমা ও মধ্যরাত গণনা ↩︎
- নাসা, সময়ের নির্দেশক কাঠামো ও পৃথিবীর ঘূর্ণন ↩︎
- ইবনে বায, মাজমু ফাতাওয়া, খণ্ড ২৮, পৃষ্ঠা ৩৯৮–৪০২; ফতোয়া ১০৪ ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২৩৬০৬৬; স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতোয়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৮৬ ↩︎
- নাসা, দিন-রাতের কারণ এবং মেরু অঞ্চলে একটানা আলো বা অন্ধকার ↩︎
- নাসা, Orbits and Kepler’s Laws: টলেমির স্থির পৃথিবীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা ↩︎
- তাফসিরে জালালাইন, সূরা আল-গাশিয়া ৮৮:২০; ইসলামওয়েব ↩︎
- নাসা, পৃথিবীর আকৃতি, অক্ষীয় ঘূর্ণন, পরিক্রমণ ও অক্ষের হেলন ↩︎
- ইবনে আবিল ইয্য, শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, ‘যুক্তি ও বর্ণিত ধর্মীয় পাঠের সম্পর্ক’, পৃষ্ঠা ২৩১; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে আবিল ইয্য, শারহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, পৃষ্ঠা ২৩১–২৩২; ইসলামওয়েব ↩︎
- গাযালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, কিতাবু কাওয়াইদিল আকাইদ; ইত্তিহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন-এ উদ্ধৃত মূল পাঠ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২; ইসলামওয়েব ↩︎
- গাযালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, বিশ্বাসের স্তরবিন্যাসের আলোচনা; ইত্তিহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন-এ উদ্ধৃত মূল পাঠ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২; ইসলামওয়েব ↩︎

