ভূমিকা
একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা, বিচারব্যবস্থা, আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং সামরিক নেতৃত্ব—এসব দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিচারবুদ্ধি, সততা, দক্ষতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। একজন মানুষ নারী না পুরুষ, সেই জন্মগত পরিচয় তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক দক্ষতা কিংবা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষমতার কোনো নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড নয়। অথচ ইসলামি হাদিস ও ধ্রুপদী আইনশাস্ত্রে নারীর ওপর এমন কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত যোগ্যতা বিচার করার আগেই তাঁর নারী পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রতিবন্ধক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একজন নারী অসাধারণ মেধাবী, অভিজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ এবং জনগণের সমর্থনপ্রাপ্ত হলেও কেবল নারী হওয়ার কারণে রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক কিংবা উচ্চপর্যায়ের শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না—ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রধানধারায় প্রতিষ্ঠিত এমন বিধান ব্যক্তির অধিকার ও যোগ্যতার ওপর ধর্মীয় লিঙ্গবৈষম্যকে প্রাধান্য দেয়। এটি নারীর স্বাধীনতার ওপর আরোপিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, যার প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রয়োগ এবং সমাজে ক্ষমতা বণ্টনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে বিস্তৃত হতে পারে।
নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে সবচেয়ে পরিচিত ইসলামি বক্তব্যটি মুহাম্মদের একটি হাদিসে পাওয়া যায়। পারস্যের জনগণ কিসরার কন্যাকে শাসক নিযুক্ত করেছে—এই সংবাদ শুনে মুহাম্মদ বলেছিলেন, যে জাতি নিজেদের শাসনভার কোনো নারীর হাতে অর্পণ করে, সেই জাতি কখনো সফল হবে না। সহিহ বুখারির ৪৪২৫ ও ৭০৯৯ নম্বর হাদিসে আবু বকরার সূত্রে এই বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। একই বর্ণনায় আবু বকরা জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে আয়িশা যখন আলীর বিরুদ্ধে উষ্ট্রের যুদ্ধে অংশ নেন, তখন মুহাম্মদের ওই বক্তব্য স্মরণ করে তিনি আয়িশার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে উচ্চারিত বক্তব্যকে পরবর্তী একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মনে করা হয়েছিল। পরবর্তী ইসলামি আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যায় এই বক্তব্য আরও বিস্তৃত আইনগত তাৎপর্য লাভ করে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা নারীর জন্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বিচারিক ও অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের কর্তৃত্বপূর্ণ পদে নারীর নিয়োগ অস্বীকারের ভিত্তি হিসেবেও হাদিসটি ব্যবহৃত হয়েছে। একটি নারীর নেতৃত্বে কোনো জাতি সফল হবে না—এই ধারণাকে এভাবে কেবল রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে রেখে দেওয়া হয়নি; বরং নারীর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের অধিকার সীমিত করার ধর্মীয় যুক্তিতে পরিণত করা হয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয় ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিধানগুলোতে। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকে পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত রাখার পাশাপাশি বিচারকের পদেও পুরুষ হওয়াকে যোগ্যতার শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন বহু আইনজ্ঞ। আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দির আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা গ্রন্থে বিচারক নিয়োগের শর্তগুলোর প্রথমটিই হচ্ছে পুরুষ হওয়া। বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য আইন সম্পর্কে জ্ঞান, সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়নের দক্ষতা এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য প্রয়োজন। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তিকে এই দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হলে তাঁর প্রকৃত বিচারিক সক্ষমতা আদৌ পরীক্ষা করার সুযোগ থাকে না। একইভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে নারীর অযোগ্যতা ঘোষণা করা হলে কোনো নারী কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা কিংবা জনকল্যাণ পরিচালনা করতে পারবেন, তা মূল্যায়ন করার প্রয়োজনই অস্বীকার করা হয়। লিঙ্গ তখন ব্যক্তিগত যোগ্যতার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রবেশের পূর্বনির্ধারিত শর্ত হয়ে ওঠে।
ইসলামি বিধানে নারীর নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা শুধু রাষ্ট্রপ্রধানের পদে আবদ্ধ নেই। উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব, বিচারক নিয়োগ, সামরিক নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নারীর ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে ধ্রুপদী ফকিহদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কর্তৃত্ব পুরুষদের হাতে রাখার অবস্থান ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রধানধারায় সুপ্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে বিদ্যালয়, হাসপাতাল কিংবা অপেক্ষাকৃত সীমিত প্রশাসনিক দায়িত্বে নারীকে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এমন ফতোয়াও রয়েছে। এই শ্রেণিবিভাগে একটি মৌলিক বৈষম্য নিহিত: নারী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের সঙ্গে তাঁর প্রকৃত যোগ্যতার পাশাপাশি দায়িত্বটির ক্ষমতা ও মর্যাদা যুক্ত করে একটি ধর্মীয় সীমারেখা তৈরি করা হয়েছে। একজন নারী একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সক্ষম হতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁর জন্য নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হতে পারে। ফলে নারীর দক্ষতার স্বীকৃতি তাঁর সমান নেতৃত্বের অধিকার নিশ্চিত করে না; বরং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দেয়, তিনি কতদূর পর্যন্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।
নারীর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ধর্মীয় যুক্তির সঙ্গে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য সম্পর্কে ইসলামি বর্ণনারও সম্পর্ক রয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে নারীদের বুদ্ধি ও ধর্মীয় অনুশীলনে ঘাটতিসম্পন্ন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে দুজন নারীর সাক্ষ্যকে একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমতুল্য গণনা এবং ঋতুস্রাবের সময় নামাজ ও রোজা থেকে বিরত থাকার বিধানকে এই ঘাটতির ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সাক্ষ্যদানের একটি ধর্মীয় বিধান নিজে নারীর প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়। একইভাবে ঋতুস্রাব একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া; এর কারণে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালন থেকে বিরত থাকার বিধান একজন নারীর বিচারবুদ্ধি, প্রশাসনিক দক্ষতা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা কম প্রমাণ করে না। ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে আগে একটি পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করে পরে সেই পার্থক্যকেই নারীর স্বাভাবিক অক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিগতভাবে অসংগত। কোনো মানুষের নেতৃত্বের দক্ষতা নির্ধারণ করতে হলে তাঁর বাস্তব কাজ, সিদ্ধান্তের মান, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অর্জন পরীক্ষা করতে হয়; তাঁর লিঙ্গ কিংবা ধর্মীয় আচারের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ দিয়ে সেই দক্ষতার সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
নারীর নেতৃত্বে কোনো জাতি সফল হতে পারে না—এমন সর্বজনীন দাবি বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গেও অসংগত। ইতিহাসে নারীরা রাজ্য পরিচালনা করেছেন, সামরিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছেন, প্রশাসনিক সংস্কার করেছেন, অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করেছেন এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ সফল হয়েছেন, কেউ ব্যর্থ হয়েছেন; পুরুষ শাসকদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের উন্নয়ন কিংবা বিপর্যয়ের কারণ নির্ধারণ করতে হলে শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নীতি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যুদ্ধ, দুর্নীতি, জনসমর্থন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট শাসকের সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করতে হয়। শাসক নারী ছিলেন বলেই কোনো রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে, কিংবা পুরুষ ছিলেন বলেই সফল হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তের কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কোনো নির্দিষ্ট নারী শাসক ব্যর্থ হলেও সেই ব্যর্থতা থেকে সমগ্র নারীজাতির নেতৃত্বের অযোগ্যতা অনুসরণ করে না। একইভাবে কোনো পুরুষ শাসকের ব্যর্থতা থেকে সব পুরুষকে রাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্য ঘোষণা করা যায় না। ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতাকে পুরো একটি লিঙ্গের অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করা একটি অযৌক্তিক সাধারণীকরণ।
ইসলামি ইতিহাসের মধ্যেও নারীর বাস্তব নেতৃত্ব এবং নারীর ওপর আরোপিত আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি দেখা যায়। মুহাম্মদের প্রথম স্ত্রী খাদিজা ইসলামের আবির্ভাবের আগেই একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন এবং নিজের সম্পদ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। আয়িশা রাজনৈতিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর জ্ঞান ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ওপর পুরুষ সাহাবিদের নির্ভরতার নজিরও রয়েছে। মধ্যযুগের মুসলিম শাসনব্যবস্থায় রাজিয়া সুলতানা ও শাজারাতুদ দুরের মতো নারীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা নারীরা বাস্তবে নেতৃত্ব দিয়েছেন—এই সত্য প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু কোনো নারী নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেই তাঁর নেতৃত্বকে সমসাময়িক ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বৈধ মনে করেছিল, এমন সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে না। বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন এবং ধর্মীয় আইনে সেই ক্ষমতার স্বীকৃতি দুটি পৃথক বিষয়। ফলে মুসলিম ইতিহাসে নারী শাসকের উপস্থিতি যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি তাঁদের উপস্থিতিকে ব্যবহার করে ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রের নারী-বর্জনমূলক বিধানগুলোও অদৃশ্য করে দেওয়া যায় না।
নারীর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অধিকার কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি সমান নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অংশ। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের নিজের দেশের সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারীর সমান অংশগ্রহণ, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার, সরকারি নীতি নির্ধারণ এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা রয়েছে। এসব অধিকারের ভিত্তি হচ্ছে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা, লিঙ্গের ভিত্তিতে পূর্বনির্ধারিত সামাজিক অধস্তনতা নয়। রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, বিচারক কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে প্রবেশের সুযোগ কেবল পুরুষদের জন্য সংরক্ষণ করা হলে নারীরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমান নাগরিকের মর্যাদা হারান। এমন ব্যবস্থায় নারী রাষ্ট্রের আইন মানতে, কর দিতে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ফল বহন করতে বাধ্য থাকলেও সেই রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় তাঁর সমান প্রবেশাধিকার থাকে না। এটি রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক সমতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার ধর্মীয় বিধানগুলোর সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হচ্ছে, সেগুলো ব্যক্তির প্রকৃত যোগ্যতার পরিবর্তে জন্মগত পরিচয়কে অধিকার নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। এর ফলে একজন যোগ্য নারীও কেবল নারী হওয়ার কারণে সেই পদ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, যেখানে তুলনামূলকভাবে কম যোগ্য একজন পুরুষের প্রার্থী হওয়ার অধিকার অক্ষত থাকে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এই অসম বণ্টনকে ধর্মীয় কর্তব্য বা সামাজিক শৃঙ্খলার নামে প্রতিষ্ঠা করা হলে বৈষম্য শুধু ব্যক্তিগত পূর্বধারণা থাকে না; তা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে হাদিসের বক্তব্য, ধ্রুপদী ফিকহের বিধান, ধর্মীয় ফতোয়া এবং ইতিহাসে নারীর বাস্তব নেতৃত্বের ঘটনাগুলো একত্রে একটি গভীর অসংগতি প্রকাশ করে। মানুষের মেধা, ন্যায়বোধ ও শাসনক্ষমতা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলেও নারীকে সেই সামর্থ্য প্রদর্শনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার জন্য লিঙ্গকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার নৈতিক ভিত্তি সমান মানবমর্যাদা নয়, বরং পুরুষের জন্য সংরক্ষিত কর্তৃত্ব এবং নারীর ওপর আরোপিত ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা।
ইসলামের বর্ণনা: নারী নেতৃত্ব হারাম?
ইসলামে নারীর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হচ্ছে সহিহ বুখারিতে সংরক্ষিত মুহাম্মদের সেই বক্তব্য, যেখানে নারীর হাতে কোনো জাতির শাসনভার অর্পণ করলে সেই জাতি সফল হবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে। হাদিসটির প্রেক্ষাপট ছিল পারস্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর। পারস্যবাসীরা কিসরার কন্যাকে সিংহাসনে বসিয়েছে—এমন সংবাদ পাওয়ার পর মুহাম্মদ বলেন, لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمُ امْرَأَةً, অর্থাৎ যে জাতি নিজেদের শাসনভার কোনো নারীর হাতে অর্পণ করে, তারা কখনো সফল হবে না। বক্তব্যটিতে কোনো নির্দিষ্ট নারী শাসকের ব্যক্তিগত অযোগ্যতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যর্থতা কিংবা প্রশাসনিক অদক্ষতার উল্লেখ নেই। এখানে শাসক নারী হওয়াটিই ঘোষিত ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে কোনো নারী কতটা যোগ্যতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন, সেই বাস্তব প্রশ্নের পরিবর্তে শাসকের লিঙ্গকে জাতির সাফল্য বা ব্যর্থতার নির্ধারক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু পারস্যের একটি রাজপরিবারের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সহিহ বুখারির একই বর্ণনায় আবু বকরা জানিয়েছেন, বহু বছর পর আয়িশা যখন আলীর বিরুদ্ধে উষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, তখন মুহাম্মদের ওই বক্তব্য তাঁর মনে পড়ে এবং তিনি আয়িশার পক্ষের যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অর্থাৎ পারস্যের একজন নারীর রাজ্যশাসন সম্পর্কে উচ্চারিত বক্তব্যকে আবু বকরা মুসলিম সমাজের একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক মনে করেছিলেন। এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে শুধু মুহাম্মদের বক্তব্য নয়, তাঁর একজন সাহাবি সেই বক্তব্য কীভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার করেছিলেন, তারও বিবরণ রয়েছে। পরবর্তী ইসলামি ফিকহে নারীকে সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা থেকে বাদ দেওয়ার যে বিধান গড়ে ওঠে, তার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ভিত্তি হয়ে ওঠে এই হাদিস। হাদিসটিতে সরাসরি ‘নারীর শাসন হারাম’ শব্দবন্ধটি নেই; সেখানে নারীর হাতে শাসনভার অর্পণকারী জাতির ব্যর্থতা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামি আইনজ্ঞদের প্রধানধারার ব্যাখ্যায় এই ঘোষণাকে নারীর শাসনক্ষমতা গ্রহণের আইনগত নিষেধাজ্ঞা হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
হাদিসটির বাংলা অনুবাদ বিভিন্ন প্রকাশনায় পাওয়া যায়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহিহ বুখারি ৬৬১৮, তাওহীদ পাবলিকেশন্সের ৭০৯৯ এবং ৪৪২৫ নম্বর হাদিসে একই মূল ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এগুলো আবু বকরার একই বক্তব্যের পৃথক স্থানে সংরক্ষিত সংস্করণ; তিনজন স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর তিনটি পৃথক সাক্ষ্য নয়। তবে এই তিনটি উদ্ধৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে একই বর্ণনার বাংলা অনুবাদ, পারস্যের নারী শাসকের প্রসঙ্গ এবং উষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে আবু বকরার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সম্পর্ক একসঙ্গে পাওয়া যায়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদে বলা হয়েছে [1]—
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮১/ ফিতনা
পরিচ্ছদঃ ২৯৯৪. পরিচ্ছেদ নাই
৬৬১৮। উসমান ইবনু হায়সাম (রহঃ) … আবূ বাকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একটি কথা দ্বারা আল্লাহ তা’আলা জঙ্গে জামাল (উষ্ট্রের যুদ্ধ) এর সময় আমাকে বড়ই উপকৃত করেছেন। (সে কথাটি হল) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যখন এ সংবাদ পৌছলে যে, পারস্যের লোকেরা কিসরার কন্যাকে তাদের শাসক নিযুক্ত করেছে তখন তিনি বললেনঃ সে জাতি কখনই সফলকাম হবে না যারা তাদের শাসনভার কোন রমনীর হাতে অর্পণ করে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
একই বক্তব্য তাওহীদ পাবলিকেশন্সের অনুবাদেও রয়েছে। সেখানে হাদিসটির সঙ্গে সংযুক্ত ব্যাখ্যামূলক টীকায় মুসলমানদের সফলতা অর্জনের জন্য নারী নেতৃত্ব পরিহার করতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুহাম্মদের মূল বক্তব্য এবং অনুবাদকের সংযুক্ত ব্যাখ্যা এক নয়; তবে এই ব্যাখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বক্তব্যকে ধর্মীয় আচরণবিধান হিসেবে গ্রহণ করার পদ্ধতি স্পষ্ট হয়েছে। এখানে নারীর নেতৃত্বের বাস্তব ফলাফল পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি; বরং হাদিসের ভিত্তিতে আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে যে, সফলতা চাইলে নারী নেতৃত্ব বর্জন করতে হবে [2]—
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৯২/ ফিতনা
পরিচ্ছদঃ ৯২/১৮. পরিচ্ছেদ নাই।
৭০৯৯. আবূ বকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একটি কথা দিয়ে আল্লাহ্ জঙ্গে জামাল (উষ্ট্রের যুদ্ধ) এর সময় আমাকে বড়ই উপকৃত করেছেন। (তা হল) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যের লোকেরা কিসরার মেয়েকে তাদের শাসক নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি বললেনঃ সে জাতি কক্ষনো সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার কোন স্ত্রীলোকের হাতে অর্পণ করে।(1) (৪৪২৫) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৬০৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৬১৮)
(1) মুসলমানরা যদি সফলতা পেতে চায় তবে তাদেরকে অবশ্যই নারী নেতৃত্ব পরিহার করতে হবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহিহ বুখারির মাগাযী অধ্যায়ে সংরক্ষিত ৪৪২৫ নম্বর হাদিসে আবু বকরার রাজনৈতিক অবস্থান আরও বিস্তারিতভাবে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, উষ্ট্রের যুদ্ধের সময় আয়িশার পক্ষের লোকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করার কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু পারস্যের কন্যাশাসক সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য স্মরণ করে তিনি সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। এখানে আয়িশার ব্যক্তিগত জ্ঞান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কিংবা তাঁর উত্থাপিত দাবির ন্যায়সংগততা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়নি। আবু বকরা নিজের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেছেন নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে পূর্বে শোনা একটি ধর্মীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে। এর ফলে মুসলিম সমাজের একটি বাস্তব রাজনৈতিক সংঘাতে নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে মুহাম্মদের মন্তব্যের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় [3]—
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৪/ মাগাযী (যুদ্ধ)
পরিচ্ছদঃ ৬৪/৮৩. পারস্যের কিসরা ও রোমের অধিপতি কায়সারের কাছে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্র প্রেরণ।
৪৪২৫. আবূ বাকরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রুত একটি বাণীর দ্বারা আল্লাহ জঙ্গে জামালের (উষ্ট্রের যুদ্ধ) দিন আমার মহা উপকার করেছেন, যে সময় আমি সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে মিলিত হয়ে জামাল যুদ্ধে শারীক হতে প্রায় প্রস্তুত হয়েছিলাম। আবূ বাকরাহ (রাঃ) বলেন, সে বাণীটি হল, যখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যবাসী কিসরা কন্যাকে তাদের বাদশাহ মনোনীত করেছেন, তখনতিনি বললেন,সে জাতি কক্ষণো সফল হবে না স্ত্রীলোক যাদের প্রশাসক হয়। (৭০৯৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪০৭৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০৮০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আধুনিক আলেমদের বক্তব্য: নারী সম্পর্কে ইসলামিস্টদের মনোভাব
বাংলাদেশের কয়েকজন আলেমের বক্তব্যেও নারীর সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা ও অধিকার সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।
নারীর নেতৃত্বে জাতির ব্যর্থতা: হাদিসের দাবির যৌক্তিক ভিত্তি
হাদিসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে, এতে কোনো জাতির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সঙ্গে শাসকের নারী পরিচয়কে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। একটি রাষ্ট্রের সাফল্য বহু উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক উৎপাদন, প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক পরিস্থিতি এবং জনগণের জীবনমান—এসব বিষয় রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শাসক নারী হওয়ার ফলে এসব উপাদান কীভাবে অনিবার্যভাবে ব্যর্থ হবে, হাদিসে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। নারী হওয়ার কারণে একজন শাসকের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল হবে, বিচারবুদ্ধি কম হবে কিংবা প্রশাসন অকার্যকর হয়ে পড়বে—এমন কোনো কার্যকারণ সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ সিদ্ধান্তটি সর্বজনীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে: যে জাতি নারীর হাতে শাসনভার অর্পণ করবে, সেই জাতি সফল হবে না। একটি সর্বজনীন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার পক্ষে সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য প্রমাণ প্রয়োজন। কেবল ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে কোনো বক্তব্যকে সত্য ধরে নেওয়া সেই প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই বক্তব্যকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করলে নারী সম্পর্কে একটি অপ্রমাণিত সাধারণীকরণ সরাসরি নাগরিক অধিকারের বিধান হয়ে দাঁড়ায়। কোনো নারী শাসক ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতার কারণ তাঁর নীতিগত ভুল, দুর্নীতি কিংবা অযোগ্যতা হতে পারে। কিন্তু একই ধরনের ব্যর্থতা পুরুষ শাসকের ক্ষেত্রেও ঘটে। যুদ্ধের পরাজয়, অর্থনৈতিক ধ্বংস, স্বৈরশাসন, দুর্নীতি কিংবা প্রশাসনিক বিপর্যয়ের ইতিহাস পুরুষ শাসকদের ক্ষেত্রেও অসংখ্যবার ঘটেছে। এসব ঘটনার কারণে সমগ্র পুরুষজাতিকে নেতৃত্বের অযোগ্য ঘোষণা করা হয় না। তাহলে একজন শাসক নারী হলে তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতাকে পুরো নারীজাতির স্বাভাবিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই। একই মানদণ্ড যদি নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে শাসনক্ষমতার যোগ্যতা নির্ধারণে লিঙ্গ নয়, ব্যক্তির বাস্তব সামর্থ্য এবং কাজের ফলাফলই প্রাসঙ্গিক হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগত পার্থক্য রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনার পরিণতি সম্পর্কে মন্তব্য করা এবং সমগ্র নারীজাতির রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। পারস্যের কোনো নির্দিষ্ট শাসক অযোগ্য হতে পারেন, তাঁর রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হতে পারে কিংবা তাঁর শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হতে পারে। কিন্তু একটি বিশেষ রাজ্যের ব্যর্থতা থেকে সব যুগের সব নারী শাসকের অনিবার্য ব্যর্থতা অনুসরণ করে না। হাদিসটির সাধারণ ভাষাকে ভিত্তি করে পরবর্তী আইনজ্ঞরা নারীর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে একটি ঐতিহাসিক ঘটনাসংক্রান্ত বক্তব্যকে এমন একটি স্থায়ী আইনগত বিধানে রূপ দেওয়া হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সেই সব নারীর ওপরও, যাঁদের ব্যক্তিগত দক্ষতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার সামর্থ্য সম্পর্কে ওই ঘটনায় কোনো তথ্যই ছিল না। এভাবে ব্যক্তির যোগ্যতা মূল্যায়নের জায়গায় লিঙ্গভিত্তিক পূর্বনির্ধারিত অযোগ্যতা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকার
সহিহ বুখারির এই বক্তব্যকে ভিত্তি করে ইসলামি আইনশাস্ত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষমতা ও অধিকার বণ্টনের প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্রের শাসক আইন প্রয়োগ করেন, প্রশাসন পরিচালনা করেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন, বিচারব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন এবং জনগণের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। এসব সিদ্ধান্তের ফল নারী ও পুরুষ উভয়কেই বহন করতে হয়। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পদটি কেবল পুরুষের জন্য সংরক্ষিত হলে নারীরা সেই ক্ষমতা গ্রহণের সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। নারী নাগরিক রাষ্ট্রের আইন মেনে চলবেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রভাব বহন করবেন এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক দায়িত্ব পালন করবেন, কিন্তু নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জন্য সমানভাবে বিবেচিত হতে পারবেন না—এটি সমান নাগরিকত্বের নীতির সঙ্গে অসংগত।
ইসলামি বিধানে নারী নেতৃত্বের ওপর আরোপিত এই সীমাবদ্ধতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নারীকে অপেক্ষাকৃত সীমিত দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেওয়া হলেও বৃহৎ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর প্রবেশাধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। এখানে সমস্যাটি নারী কাজ করতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন, সেই সীমারেখা নির্ধারণে নিহিত। একজন নারী বিদ্যালয় বা হাসপাতাল পরিচালনায় দক্ষ বলে স্বীকৃতি পেতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা কিংবা বিচারিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে গেলে তাঁর লিঙ্গকে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে একজন ব্যক্তির কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করবে তাঁর দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োজন। কিন্তু ধর্মীয় লিঙ্গবিভাজনের ভিত্তিতে ক্ষমতা বণ্টন করলে নারীকে আগে থেকেই নির্দিষ্ট অবস্থানে সীমিত রাখা সম্ভব হয়, তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতা যত উচ্চস্তরেরই হোক না কেন।
নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধিকার অস্বীকার করার এই ব্যবস্থা পুরুষের কর্তৃত্বকে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধায় পরিণত করে। এখানে একজন অযোগ্য পুরুষও রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য লিঙ্গগত বাধার সম্মুখীন হন না, অথচ একজন যোগ্য নারী কেবল নারী হওয়ার কারণে সেই পদ থেকে বাদ পড়তে পারেন। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি শুরু থেকেই অসম হয়ে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্যতা প্রয়োজন, কিন্তু পুরুষ হওয়া নিজে কোনো রাজনৈতিক যোগ্যতা নয়। একইভাবে নারী হওয়া কোনো রাজনৈতিক অযোগ্যতা নয়। যে আইন ব্যক্তির মেধা, অভিজ্ঞতা এবং জনগণের আস্থার পরিবর্তে জন্মগত লিঙ্গকে ক্ষমতা লাভের শর্ত হিসেবে গ্রহণ করে, সেই আইন সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না; বরং একটি লিঙ্গের কর্তৃত্বকে অন্য লিঙ্গের ওপর প্রাধান্য দেয়। নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে মুহাম্মদের হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত নিষেধাজ্ঞার মৌলিক নৈতিক সমস্যা এখানেই: নারীর অধিকার ও যোগ্যতা বিচার করার আগেই তাঁর পরিচয়কে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপ্রধান, খলিফা ও সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতায় নারীর নিষেধাজ্ঞা
ইসলামি আইনশাস্ত্রে নারীর নেতৃত্বের ওপর আরোপিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধগুলোর একটি হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা। ধ্রুপদী ফিকহে এই সর্বোচ্চ শাসনকর্তৃত্বকে ইমামতে কুবরা বা বৃহৎ ইমামত এবং খিলাফত হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। এই পদ কেবল ধর্মীয় আচার পরিচালনার দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ, প্রশাসন পরিচালনা, বিচারক ও অন্যান্য কর্মকর্তা নিয়োগ, সামরিক অভিযান, নিরাপত্তা রক্ষা এবং জনগণের ওপর শাসনক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব এই পদে কেন্দ্রীভূত। ধ্রুপদী ইসলামি আইনজ্ঞদের প্রধানধারার অবস্থান অনুযায়ী, একজন নারী এই পদ গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক দক্ষতা কিংবা জনগণের আস্থা নয়, প্রথমেই তাঁর নারী পরিচয় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে নারীকে কেবল একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে না; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্জনের অধিকারই অস্বীকার করা হচ্ছে। একজন নারী আইনশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হতে পারেন, প্রশাসন পরিচালনায় দক্ষ হতে পারেন, যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং জনগণের বিপুল সমর্থন অর্জন করতে পারেন। কিন্তু তাঁর এসব যোগ্যতার কোনোটি রাষ্ট্রপ্রধানের পদে নারীর ওপর আরোপিত লিঙ্গগত নিষেধাজ্ঞা দূর করার জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হয় না। অন্যদিকে একজন পুরুষের ক্ষেত্রে একই জন্মগত প্রতিবন্ধকতা নেই। তাঁর যোগ্যতা, চরিত্র, বংশপরিচয় কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় শর্ত নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু পুরুষ হওয়ার কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অধিকার থেকে বাদ পড়েন না। এই পার্থক্য দেখায়, সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়াকে বিশেষ আইনগত সুবিধা এবং নারী হওয়াকে অযোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ইসলামি ফতোয়ায় সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার জন্য পুরুষ হওয়ার শর্ত
ইসলামওয়েবের ৩৯৩৫ নম্বর ফতোয়ায় নারীর শাসনকর্তৃত্ব এবং বিচারক হওয়ার বৈধতা সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল। ২০০১ সালের ২৪ এপ্রিল প্রকাশিত ফতোয়াটিতে নারীর সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা গ্রহণের বিষয়ে পুরুষ হওয়ার শর্তকে আলেমদের ঐকমত্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য সহিহ বুখারিতে আবু বকরার সূত্রে বর্ণিত মুহাম্মদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। ফতোয়াটিতে নারী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার প্রশ্নকে তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচার করা হয়নি; বরং নারীকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিকেই ধর্মীয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে [4]—
أجمع العلماء قاطبة على اشتراط الذكورة في الإمامة (الولاية العامة)؛ لقوله صلى الله عليه وسلم: لن يفلح قوم ولوا أمرهم امرأة.
বাংলা অনুবাদ: সর্বোচ্চ ইমামত বা সাধারণ শাসনকর্তৃত্বের পদে পুরুষ হওয়া আবশ্যক—এই শর্তের ব্যাপারে সকল আলেম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এর দলিল মুহাম্মদের সেই বক্তব্য: যে জাতি নিজেদের শাসনভার কোনো নারীর হাতে অর্পণ করে, তারা কখনো সফল হবে না।
এই ফতোয়ার যুক্তিতে সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা নারীর জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার মূল ভিত্তি হচ্ছে মুহাম্মদের বক্তব্য এবং তার ওপর প্রতিষ্ঠিত ফিকহি অবস্থান। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, একটি রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারণে যে বাস্তব বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক—প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক নীতি, আইনের শাসন, জনগণের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিংবা কূটনৈতিক সক্ষমতা—সেগুলোর কোনোটিকে নারী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। বরং একজন নারী সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা গ্রহণ করলে জাতির সফলতা অর্জিত হবে না—এমন ধর্মীয় বক্তব্যকে তাঁর অযোগ্যতার ভিত্তি বানানো হয়েছে। ফলে নারীর ব্যক্তিগত সামর্থ্য যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার আগেই তাঁর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে।
ফতোয়াটির পরবর্তী আলোচনায় নারীর শাসনক্ষমতা গ্রহণের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে আরও কয়েকটি যুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুতর; যুদ্ধ, শান্তি এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে যে সক্ষমতা প্রয়োজন, নারী সাধারণত তা বহন করতে পারেন না। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কঠিন হওয়া থেকে নারীর অযোগ্যতা অনুসরণ করে না। কঠিন দায়িত্ব পালনের জন্য উচ্চমাত্রার দক্ষতা প্রয়োজন, আর সেই দক্ষতা ব্যক্তিভেদে পৃথক হয়। একজন অযোগ্য পুরুষের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; একজন দক্ষ নারীর নেতৃত্বে রাষ্ট্র উপকৃতও হতে পারে। দায়িত্বের কঠিন প্রকৃতি নারীকে বাদ দেওয়ার যুক্তি নয়, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক প্রার্থীর বাস্তব যোগ্যতা পরীক্ষা করার যুক্তি। একটি গোটা লিঙ্গকে দায়িত্ব পালনে অক্ষম ধরে নেওয়া ব্যক্তিগত সামর্থ্য যাচাইয়ের পরিবর্তে অপ্রমাণিত সাধারণীকরণ প্রয়োগের সমতুল্য।
একই ফতোয়ায় কোরআনের সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াত এবং সূরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতও নারী নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞার সমর্থনে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম আয়াতে পুরুষের কর্তৃত্ব এবং দ্বিতীয় আয়াতে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের সাক্ষ্যসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের একটি ধর্মীয় কর্তৃত্বব্যবস্থা কিংবা আর্থিক চুক্তিতে সাক্ষ্যদানের শর্ত থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সব নারীর অনিবার্য অযোগ্যতা প্রমাণিত হয় না। কোনো ব্যক্তির প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা বা বিচারিক প্রজ্ঞা নির্ধারণের জন্য এসব বিধান কোনো বাস্তব পরীক্ষা নয়। একটি ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের অধিকার পৃথকভাবে নির্ধারণ করে পরে সেই পৃথকীকরণকেই নারীর স্বাভাবিক অক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিগতভাবে চক্রাকার। এখানে যে লিঙ্গভিত্তিক অধস্তনতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে, তার ভিত্তি হিসেবে আবার সেই অধস্তনতামূলক বিধানই ব্যবহার করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ শাসনকর্তৃত্ব থেকে বিচার, মন্ত্রিত্ব ও সামরিক নেতৃত্বে নিষেধাজ্ঞার বিস্তার
ইসলামি আইনশাস্ত্রে সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার ওপর নারীর নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেই ক্ষমতা থেকে রাষ্ট্রের অন্যান্য শাসনকর্তৃত্বপূর্ণ পদের বিধানও নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচারক, মন্ত্রী এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তী ফকিহদের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হচ্ছে, বিচারক ও মন্ত্রী রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে বা তাঁর অর্পিত ক্ষমতায় নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন। তাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা নারীর জন্য নিষিদ্ধ হলে তার অধীন গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্বপূর্ণ পদও নারীর জন্য নিষিদ্ধ হবে। এই যুক্তিতে একটি পদের ওপর প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গগত নিষেধাজ্ঞাকে অন্য পদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। ফলে নারীর রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার বিধান রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের আরও বিস্তৃত পরিসরে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে।
ইসলামওয়েবের ৫৯৯৫৭ নম্বর ফতোয়ায় নারীর বিচারক ও মন্ত্রী হওয়ার বিধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সেখানে অধিকাংশ ফকিহের মত হিসেবে নারীর বিচারক ও মন্ত্রী হওয়া নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আবু হানিফার নামে আর্থিক বিষয়ে নারী বিচারকের অনুমতি এবং মুহাম্মদ ইবনে হাসান ও ইবনে জারির তাবারির নামে আরও বিস্তৃত অনুমতির মতও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিচারিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের উপস্থিতি স্বীকার করেও ফতোয়াটিতে প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করা হয়েছে। ফতোয়ার শুরুতেই বলা হয়েছে [5]—
فقد ذهب جمهور العلماء إلى عدم جواز تولي المرأة القضاء والوزارة، وذهب أبو حنيفة إلى جواز توليها القضاء في الأموال دون القصاص والحدود.
বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ আলেম নারীর বিচারক ও মন্ত্রীর পদ গ্রহণকে অবৈধ বলেছেন। অন্যদিকে আবু হানিফা সম্পত্তি ও আর্থিক বিষয়ে নারীর বিচারক হওয়াকে বৈধ বলেছেন, কিন্তু কিসাস এবং হদ্দের শাস্তিসংক্রান্ত বিষয়ে সেই অনুমতি দেননি।
এখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বণ্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্যমূলক কাঠামো দেখা যায়। মন্ত্রী বা বিচারকের কাজের যোগ্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আইনগত জ্ঞান, বিচক্ষণতা এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা। কিন্তু প্রধানধারার এই ফিকহি বিধানে নারী এসব যোগ্যতা অর্জন করলেও তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর দরজা বন্ধ রাখা হয়েছে। আবু হানিফার নামে উদ্ধৃত অপেক্ষাকৃত সীমিত অনুমতিও নারীর বিচারিক ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ সমান মর্যাদা দেয় না; কিছু বিষয়ে তাঁর কর্তৃত্ব স্বীকার করে অন্য বিষয়ে সীমাবদ্ধ করে। ফলে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য ক্ষমতা ও দায়িত্বের প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন মাত্রায় কার্যকর করা হয়েছে। এই বৈষম্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নারীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা নয়, বরং নারী হিসেবে তাঁর ওপর আরোপিত ধর্মীয় আইনগত অবস্থানই কর্তৃত্বের সীমা নির্ধারণ করছে।
রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে বিচারক ও মন্ত্রীর পদে নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের পদ্ধতিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি পদে নারীর নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করার পর বলা হচ্ছে, অন্য পদগুলো সেই সর্বোচ্চ পদের অধীন। অতএব সেগুলোতেও নারীকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কিন্তু একটি প্রশাসনিক বা বিচারিক দায়িত্ব অন্য একটি পদের অধীন হওয়া থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য একই লিঙ্গগত শর্ত অপরিহার্য হয়ে যায় না। বিচারক হওয়ার যোগ্যতা বিচারিক দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত; মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পরিচালনার সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব দায়িত্বের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু সেই সম্পর্ক নারীর অক্ষমতার কোনো বাস্তব প্রমাণ নয়। এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্বের কাঠামো ব্যবহার করে নারীর অধিকার সীমিত করার বিধানকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক ও সেনাবাহিনীর প্রধান: সরাসরি নিষেধাজ্ঞার ফতোয়া
ইসলামওয়েবের ৪৩৪১৯ নম্বর ফতোয়ায় এই নিষেধাজ্ঞা আরও সরাসরি প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৪ সালের ২০ জানুয়ারি প্রকাশিত ফতোয়াটিতে প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, নারী রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক কিংবা সেনাবাহিনীর প্রধান হতে পারবেন কি না। উত্তরে এই তিন ধরনের পদ এবং অনুরূপ কর্তৃত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ নারীর জন্য নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্র—নির্বাহী কর্তৃত্ব, বিচারিক কর্তৃত্ব এবং সামরিক নেতৃত্ব—একই নিষেধাজ্ঞার অধীন করা হয়েছে। ফতোয়ার সিদ্ধান্ত হচ্ছে [6]—
فلا يجوز تولي المرأة للرئاسة أو القضاء أو قيادة الجيش أو نحو ذلك، وقد فصلنا هذا في الفتوى رقم:32047، والفتوى رقم: 10833.
বাংলা অনুবাদ: অতএব নারীর রাষ্ট্রপ্রধানের পদ, বিচারকের পদ, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব কিংবা অনুরূপ কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করা বৈধ নয়। এই বিষয়ে ৩২০৪৭ এবং ১০৮৩৩ নম্বর ফতোয়ায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একজন নারী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবেন না, বিচারিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারবেন না এবং সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্বও গ্রহণ করতে পারবেন না। অথচ তিনটি ক্ষেত্রেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা। একজন নারী দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতার অধিকারী হতে পারেন, দক্ষ বিচারক হতে পারেন কিংবা প্রশাসনিকভাবে অসাধারণ যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। কিন্তু এই বিধানের অধীনে তাঁর এসব সামর্থ্য সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ পদ গ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। পুরুষ প্রার্থীর যোগ্যতা বিচার করা হতে পারে, কিন্তু নারী প্রার্থীর ক্ষেত্রে তাঁর লিঙ্গই আগাম অযোগ্যতার কারণ হিসেবে কাজ করে।
এই ধরনের বিধানের সামাজিক পরিণতিও গুরুতর। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বস্থানীয় পদগুলো যদি প্রধানত পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত থাকে, তাহলে আইন প্রণয়ন, বিচারব্যবস্থা, সামরিক নীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নারীর সমান অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। নারীরা রাষ্ট্রের নীতি ও আইনের অধীন থাকবেন, অথচ সেই নীতি নির্ধারণ এবং আইন প্রয়োগের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় তাঁদের প্রবেশাধিকার থাকবে না—এটি ক্ষমতা ও দায়িত্বের অসম বণ্টন। নারীর ওপর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রভাব পুরুষের তুলনায় কম নয়; তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকারও তাঁর জন্য লিঙ্গের ভিত্তিতে কম হতে পারে না। নারীকে সিদ্ধান্তের ফল বহন করতে বাধ্য রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থেকে বাদ দেওয়া সমান নাগরিকত্বের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ধ্রুপদী খিলাফতব্যবস্থা এবং আধুনিক রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। আধুনিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, বিচারক ও সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বিভিন্ন সাংবিধানিক বিধানের মাধ্যমে পৃথকভাবে নির্ধারিত হয়। কিন্তু ইসলামী ফতোয়াগুলো যখন সরাসরি নারীর রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, বিচারক ও সামরিক নেতৃত্ব গ্রহণ নিষিদ্ধ করে, তখন নিষেধাজ্ঞার লিঙ্গভিত্তিক চরিত্র অস্পষ্ট থাকে না। আধুনিক পদগুলোর দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও নারীর ওপর আরোপিত বাধাটি একই ভিত্তিতে কার্যকর হচ্ছে: রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতা পুরুষের জন্য, নারী সেই ক্ষমতা গ্রহণের উপযুক্ত নন। এই অবস্থান একটি যোগ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা বণ্টনের পক্ষে দাঁড়ায়।
নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার বিধানগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে মৌলিক যুক্তি হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বের যোগ্যতা তাঁর নারী বা পুরুষ পরিচয় থেকে নির্ধারণ করা যায় না। রাষ্ট্র পরিচালনার সামর্থ্য অর্জিত হয় শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, বিচক্ষণতা এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। এই গুণাবলি নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই থাকতে পারে এবং উভয়ের মধ্যেই অনুপস্থিত থাকতে পারে। সুতরাং পুরুষ হওয়ার কারণে একজনকে নেতৃত্বের প্রার্থী হওয়ার অধিকার দেওয়া, কিন্তু নারী হওয়ার কারণে অন্যজনকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যুক্তিসঙ্গত যোগ্যতা নির্ধারণ নয়; এটি লিঙ্গের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈষম্যমূলক বণ্টন। ইসলামি আইনশাস্ত্রের আলোচিত নিষেধাজ্ঞাগুলো এই বৈষম্যকে ধর্মীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছে।
আয়িশার উষ্ট্রের যুদ্ধ এবং নারী নেতৃত্বের হাদিসের প্রয়োগ
নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রয়োগ বোঝার জন্য আয়িশার উষ্ট্রের যুদ্ধের ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আয়িশা আলীর বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং বসরার সংঘাতে তাঁর উপস্থিতি ছিল সেই পক্ষের অন্যতম কেন্দ্রীয় ঘটনা। সহিহ বুখারিতে আবু বকরা জানিয়েছেন, তিনি আয়িশার পক্ষের যুদ্ধে অংশগ্রহণের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। কিন্তু নারীর শাসন সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য স্মরণ করার পর তিনি সেই যুদ্ধে অংশ নেননি। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, নারীর নেতৃত্ব সম্পর্কে হাদিসের বক্তব্যকে অন্তত আবু বকরা একটি বাস্তব রাজনৈতিক সংঘাতে নিজের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। একজন নারীর রাজনৈতিক অবস্থানকে তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতার পরিবর্তে লিঙ্গসংক্রান্ত ধর্মীয় বক্তব্যের আলোকে বিচার করার নজির এখানে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে আয়িশার রাজনৈতিক তৎপরতা প্রমাণ করে, ইসলামি ইতিহাসে নারীর বাস্তব রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল না। কিন্তু সেই বাস্তব ভূমিকা এবং পরবর্তী ফিকহে সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা এক বিষয় নয়।
সুনান আত-তিরমিজির ২২৬২ নম্বর হাদিসে আবু বকরার বক্তব্যের সঙ্গে উষ্ট্রের যুদ্ধের সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে পারস্যের কন্যাশাসক সম্পর্কে মুহাম্মদের মন্তব্য এবং আয়িশার বসরায় আগমনের পর আবু বকরার সেই মন্তব্য স্মরণ করার ঘটনা একই বর্ণনায় এসেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, হাদিসটির রাজনৈতিক ব্যবহার কেবল পরবর্তী ফকিহদের গ্রন্থে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রাথমিক মুসলিম রাজনৈতিক সংঘাতের বিবরণেও তার উপস্থিতি রয়েছে। আবু বকরার ব্যক্তিগত অবস্থান সব সাহাবির অবস্থানের সমার্থক নয়, কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্ত নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতা এবং নারীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটি পরবর্তী ফিকহি নিষেধাজ্ঞার পটভূমি বুঝতে সহায়তা করে [7]।
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩১/ কলহ ও বিপর্যয়
পরিচ্ছেদঃ ৭৫. যে জাতি নিজেদের শাসক হিসাবে নারীকে নিয়োগ করে
২২৬২। আবূ বাকরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হতে শুনা একটি উক্তি দ্বারা আল্লাহ তা’আলা আমাকে (উষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ হতে) রক্ষা করেছেন। পারস্য সম্রাট কিসরা নিহত হওয়ার পর তিনি প্রশ্ন করেনঃ তারা কাকে শাসক হিসাবে নিয়োগ করেছে? সাহাবীগণ বলেন, তার কন্যাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃযে জাতি নিজেদের শাসক হিসাবে নারীকে নিয়োগ করে সে জাতির কখনো কল্যাণ হতে পারে না। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আইশা (রাঃ) বসরায় আসার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ বাণী আমার মনে পড়ে গেল। অতএব, এর মাধ্যমেই আল্লাহ তা’আলা আমাকে (আলীর বিরুদ্ধে অস্ত্ৰধারণ হতে) রক্ষা করেন।
সহীহ, ইরওয়া (২৪৫), বুখারী।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বাকরা (রাঃ)
সহিহ বুখারির এই হাদিসের ব্যাখ্যা সহজ নসরুল বারী শরহে বুখারী-তেও রয়েছে, [8]

উষ্ট্রের যুদ্ধে আয়িশার রাজনৈতিক ভূমিকা এবং আবু বকরার বক্তব্যের মধ্যে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত প্রকাশ পায়। আয়িশা নিজে একটি রাজনৈতিক পক্ষের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু আবু বকরা তাঁর পক্ষের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেছেন নারীর নেতৃত্ব সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্যের ভিত্তিতে। এখান থেকে আবু বকরার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্টভাবে জানা যায়। একই সঙ্গে এ ঘটনাও স্পষ্ট হয় যে, নারীর রাজনৈতিক ভূমিকা বাস্তবে উপস্থিত থাকলেও তার ধর্মীয় বৈধতা নিয়ে আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তী ইসলামি আইনশাস্ত্রে এই হাদিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিচারক, মন্ত্রী ও অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের কর্তৃত্বপূর্ণ পদেও একই বিধান প্রয়োগের যুক্তি গড়ে ওঠে। আয়িশার রাজনৈতিক তৎপরতা নারীরা নেতৃত্ব দিতে সক্ষম—এই বাস্তব সম্ভাবনার একটি ঐতিহাসিক নজির; কিন্তু ধর্মীয় আইনজ্ঞদের নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার বিধানের সঙ্গে সেই বাস্তবতা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নারীকে ক্ষমতা থেকে বাদ দেওয়ার ধর্মীয় যুক্তি আধুনিক ইসলামি আলোচনাতেও কীভাবে উপস্থাপিত হয়, তা নিচের বক্তব্যগুলোতে দেখা যায়।
ইসলামি বিচারব্যবস্থায় নারী বিচারক: লিঙ্গের ভিত্তিতে বিচারিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার বিধান
একটি রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আইনের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি, অপরাধের বিচার, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ। একজন বিচারকের জন্য আইন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়নের দক্ষতা, যুক্তিগত বিশ্লেষণ, সততা, নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রয়োজন। এসব যোগ্যতার কোনোটিই কেবল পুরুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়। নারী ও পুরুষ উভয়েই আইনশাস্ত্রে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, বিচারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন এবং দায়িত্বশীলভাবে বিচার পরিচালনা করতে পারেন। অথচ ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রধানধারায় বিচারকের পদে পুরুষ হওয়াকে যোগ্যতার অন্যতম শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিধানে একজন নারী যত উচ্চশিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও ন্যায়পরায়ণই হোন না কেন, তাঁর নারী পরিচয় বিচারিক কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিচারক হওয়ার প্রকৃত যোগ্যতার পাশাপাশি একটি অপ্রাসঙ্গিক জন্মগত বৈশিষ্ট্যকে আইনগত যোগ্যতার শর্তে পরিণত করা হয়েছে।
ইসলামি ফিকহে বিচারককে কাজি বলা হয়। কাজির দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিগত পরামর্শ দেওয়া বা ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়; তাঁর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মানুষের সম্পত্তি, পারিবারিক সম্পর্ক, দেওয়ানি বিরোধ, অপরাধের বিচার এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে শাস্তি নির্ধারিত হতে পারে। এ কারণে বিচারক হওয়া এবং ফতোয়া দেওয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। একজন নারী ধর্মীয় জ্ঞানে দক্ষ হয়ে অন্যদের শিক্ষা দিতে পারেন কিংবা ফতোয়া দিতে পারেন—এটি স্বীকার করলেও তাঁকে বিচারকের আইনগত কর্তৃত্ব গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে, এমন সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। ইসলামি ফিকহে অনেক ক্ষেত্রে নারীর জ্ঞানকে গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার সীমিত রাখা হয়েছে। এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি নারীর জ্ঞান অর্জনের সামর্থ্য নয়; বরং তাঁর ওপর আইনগত কর্তৃত্ব অর্পণ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তে নিহিত।
আল-মাওয়ার্দির বিধান: বিচারক হওয়ার প্রথম শর্ত পুরুষ হওয়া
একাদশ শতাব্দীর শাফেয়ি আইনজ্ঞ আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দির আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুপদী গ্রন্থ। এই গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায় باب السادس في ولاية القضاء, অর্থাৎ বিচারিক কর্তৃত্বের অধ্যায়ে বিচারক নিয়োগের শর্তগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। মাওয়ার্দি বিচারক হওয়ার জন্য সাতটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। এই শর্তগুলোর প্রথমটিই হচ্ছে পুরুষ হওয়া। তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং পুরুষ হওয়ার শর্তকে একত্রে আলোচনা করেছেন। এরপর নারীর বিচারিক কর্তৃত্বের প্রশ্নে বলেছেন, কর্তৃত্বপূর্ণ পদের মর্যাদায় নারীর ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আবু হানিফার নামে নির্দিষ্ট বিষয়ে নারীর বিচারক হওয়ার অনুমতির কথাও উল্লেখ করেছেন। মাওয়ার্দির বক্তব্য হচ্ছে [9]—
وَأَمَّا الْمَرْأَةُ فَلِنَقْصِ النِّسَاءِ عَنْ رُتَبِ الْوِلَايَاتِ وَإِنْ تَعَلَّقَ بِقَوْلِهِنَّ أَحْكَامٌ . وَقَالَ أَبُو حَنِيفَةَ : يَجُوزُ أَنْ تَقْضِيَ الْمَرْأَةُ فِيمَا تَصِحُّ فِيهَا شَهَادَتُهَا
বাংলা অনুবাদ: আর নারীর ক্ষেত্রে, কর্তৃত্বপূর্ণ পদগুলোর মর্যাদায় নারীদের ঘাটতি রয়েছে; যদিও তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতে কিছু আইনগত বিধান কার্যকর হতে পারে। আবু হানিফা বলেছেন, যেসব বিষয়ে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য, সেসব বিষয়ে নারী বিচারিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
মাওয়ার্দির বক্তব্যে নারীকে বিচারকের পদ থেকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত অযোগ্যতার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং নারীদের কর্তৃত্বপূর্ণ পদের মর্যাদায় ঘাটতি রয়েছে—এই পূর্বধারণাকে আইনগত শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। একজন নারী আইন সম্পর্কে কতটা জানেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ কত দক্ষতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে পারেন কিংবা জটিল বিরোধ নিষ্পত্তিতে কতটা ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন, তা এই নিষেধাজ্ঞার মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি নারী কি না। একজন পুরুষের ক্ষেত্রে বিচারক হওয়ার জন্য জ্ঞান ও অন্যান্য যোগ্যতার শর্ত পূরণের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু একজন নারী একই যোগ্যতা অর্জন করলেও লিঙ্গগত শর্তের কারণে বাদ পড়তে পারেন। এই বিধান বিচারব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের তুলনায় অধস্তন অবস্থানে স্থাপন করে।
মাওয়ার্দি তাঁর আলোচনায় আবু হানিফার অপেক্ষাকৃত সীমিত অনুমতির কথাও উল্লেখ করেছেন। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়: বিচারিক কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রশ্নে সব ইসলামি আইনজ্ঞ অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেননি। তবে মাওয়ার্দি নিজে প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেছেন। আরও লক্ষণীয়, তিনি এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতের পুরুষের কর্তৃত্বসংক্রান্ত বক্তব্য ব্যবহার করেছেন। পারিবারিক সম্পর্কের একটি ধর্মীয় কর্তৃত্বব্যবস্থাকে নারীর রাষ্ট্রীয় বিচারিক ক্ষমতার প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু পরিবারের অভ্যন্তরে পুরুষের কর্তৃত্ব নির্ধারণকারী কোনো বিধান একজন নারী আইনজ্ঞের বিচারিক সক্ষমতা কম প্রমাণ করে না। একটি পারিবারিক কর্তৃত্ববিধান থেকে বিচারিক দক্ষতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ভিন্ন দুটি বিষয়ের মধ্যে অপ্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক স্থাপনের সমতুল্য।
মাওয়ার্দির আলোচনার আরেকটি তাৎপর্য হচ্ছে, তিনি নারীর বিচারক হওয়ার অনুমতির পক্ষে তাবারির নামে প্রচলিত অবস্থানকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর আপত্তির একটি ভিত্তি ছিল এই দাবি যে, নারীর বিচারিক কর্তৃত্বের ব্যাপারে অনুমতির মত প্রতিষ্ঠিত ঐকমত্যের বিরোধী। কিন্তু কোনো বিষয়ে আইনজ্ঞদের ঐকমত্য দাবি করলেই সেই আইনগত অবস্থান ন্যায়সংগত প্রমাণিত হয় না। ন্যায়বিচারের মানদণ্ড হচ্ছে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করেছেন কি না, তাঁর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ রয়েছে কি না। একইভাবে বিচারক হওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হচ্ছে ব্যক্তির জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিচারিক সামর্থ্য। একজন নারী কেবল নারী হওয়ার কারণে বিচারকের দায়িত্ব পালনে অযোগ্য—এই দাবিকে সত্য প্রমাণ করার জন্য ধর্মীয় কর্তৃত্বের বাইরে বাস্তব প্রমাণ প্রয়োজন। মাওয়ার্দির লিঙ্গভিত্তিক শর্ত সেই প্রমাণ সরবরাহ করে না।
ইবনে রুশদের বিশ্লেষণ: বিচারক হওয়ার ক্ষেত্রে ফকিহদের মতপার্থক্য
দ্বাদশ শতাব্দীর আইনজ্ঞ ইবনে রুশদ তাঁর বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ গ্রন্থের বিচারব্যবস্থাসংক্রান্ত অধ্যায়ে নারী বিচারক হওয়ার বৈধতা নিয়ে ফকিহদের মতপার্থক্য সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বিচারিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়ার শর্তকে সর্বজনস্বীকৃত কোনো অবিতর্কিত বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞা, আবু হানিফার সীমিত অনুমতি এবং ইবনে জারির তাবারির নামে উদ্ধৃত বিস্তৃত অনুমতি পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নারীর বিচারিক কর্তৃত্বের সীমারেখা নির্ধারণে ধ্রুপদী ইসলামি আইনজ্ঞরাও একাধিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। ইবনে রুশদ লিখেছেন [10]—
اخْتَلَفُوا فِي اشْتِرَاطِ الذُّكُورَةِ ، فَقَالَ الْجُمْهُورُ : هِيَ شَرْطٌ فِي صِحَّةِ الْحُكْمِ ، وَقَالَ أَبُو حَنِيفَةَ : يَجُوزُ أَنْ تَكُونَ الْمَرْأَةُ قَاضِيًا فِي الْأَمْوَالِ
বাংলা অনুবাদ: বিচারক হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়ার শর্ত নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ ফকিহ বলেছেন, বিচারিক সিদ্ধান্ত বৈধ হওয়ার জন্য পুরুষ হওয়া শর্ত। অন্যদিকে আবু হানিফা বলেছেন, সম্পত্তি ও আর্থিক বিষয়ে নারী বিচারক হতে পারেন।
ইবনে রুশদ একই আলোচনায় তাবারির নামে এমন একটি মতও উল্লেখ করেছেন, যার ভিত্তিতে নারী সব ধরনের বিষয়ে বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তিনি এই মতগুলোর পেছনের যুক্তিও ব্যাখ্যা করেছেন। নারীর বিচারিক কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যানকারীরা বিচারকের পদকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শাসনকর্তৃত্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং নারীর সামাজিক মর্যাদাকে অধস্তন ধরে বিচারিক ক্ষমতা সীমিত করেছেন। আবু হানিফার সীমিত অনুমতির যুক্তি নারীর সাক্ষ্যদানের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে বিচারিক ক্ষমতার সম্পর্ক স্থাপন করে। অন্যদিকে তাবারির নামে উদ্ধৃত বিস্তৃত অনুমতির যুক্তি হচ্ছে, যিনি মানুষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সক্ষম, তাঁর বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হওয়ার মৌলিক ভিত্তি রয়েছে। এই বিভিন্ন যুক্তির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হচ্ছে, নারীকে বিচারক হওয়ার জন্য আগেই অযোগ্য ধরে নেওয়া হবে, নাকি তাঁর বাস্তব বিচারিক সামর্থ্যকে বিবেচনা করা হবে।
আবু হানিফার নামে উদ্ধৃত অবস্থানে নারী সম্পত্তি ও আর্থিক বিষয়ে বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে পারলেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁর কর্তৃত্ব সীমিত। ফলে এই অবস্থান প্রধানধারার সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থেকে পৃথক হলেও নারী ও পুরুষকে বিচারিক ক্ষমতায় সম্পূর্ণ সমান অধিকার দেয় না। একই ব্যক্তি যখন আর্থিক বিরোধে সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়ন করে আইনগত সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম, তখন কেবল তাঁর নারী পরিচয়ের কারণে অন্য বিষয়ে বিচারিক দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতা ধরে নেওয়ার জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। বিচারিক দায়িত্বের বিষয়ভিত্তিক সীমারেখা নারীর প্রকৃত সামর্থ্য নির্ধারণ করে না। যে ব্যক্তি একটি জটিল দেওয়ানি বিরোধের বিচার করতে সক্ষম, তিনি অন্য একটি বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অর্জন করলে বিচার করতে পারবেন না—এমন সিদ্ধান্ত তাঁর লিঙ্গ থেকে অনুসরণ করে না।
ইবনে রুশদের আলোচনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে, নারীর বিচারক হওয়ার অধিকার নিয়ে মতপার্থক্য ইসলামি আইনশাস্ত্রের নিজস্ব গ্রন্থেই সংরক্ষিত রয়েছে। সুতরাং নারী বিচারক হওয়ার প্রশ্নে সব ফকিহ একই অবস্থান নিয়েছিলেন—এমন দাবি সঠিক নয়। একই সঙ্গে এই মতপার্থক্য প্রধানধারার বৈষম্যমূলক অবস্থানকে বাতিলও করে না। অধিকাংশ আইনজ্ঞ বিচারিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়াকে শর্ত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, এবং সেই অবস্থান পরবর্তী ধর্মীয় বিধান ও ফতোয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রধানধারায় নারীর বিচারিক ক্ষমতা সংকুচিত করার বিধানই প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল।
নারী বিচারক সম্পর্কে ধ্রুপদী ফিকহের অবস্থান
ধ্রুপদী ফিকহে নারী বিচারকের বৈধতা ও বিচারিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার প্রশ্নে যে প্রধান অবস্থানগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো নিম্নরূপ। এই পার্থক্যগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বৈধ কি না এবং নিয়োগের পর বিচারিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কি না—দুটি পৃথক আইনগত প্রশ্ন। হানাফি আলোচনায় এদের মধ্যে পার্থক্যের নজিরও রয়েছে [11]।
| ফিকহি অবস্থান | নারীর বিচারক হওয়ার বিধান | বিধানের ভিত্তি ও সীমাবদ্ধতা |
|---|---|---|
| অধিকাংশ ধ্রুপদী ফকিহ | নারী বিচারক হওয়া নিষিদ্ধ | বিচারিক কর্তৃত্বে পুরুষ হওয়াকে শর্ত এবং বিচারক পদকে উচ্চ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। |
| আল-মাওয়ার্দি | বিচারক নিয়োগে পুরুষ হওয়া প্রথম শর্ত | নারীর কর্তৃত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্যতায় ঘাটতির ধারণা এবং সূরা নিসা ৪:৩৪-এর কর্তৃত্বসংক্রান্ত বিধান ব্যবহার করা হয়েছে। |
| আবু হানিফার নামে উদ্ধৃত মত | সম্পত্তি ও আর্থিক বিষয়ে নারী বিচারক হওয়ার অনুমতি | যেসব বিষয়ে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য, সেসব বিষয়ে বিচারিক দায়িত্বের অনুমতি; হদ্দ ও কিসাসের মতো ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা। |
| ইবনে জারির তাবারির নামে উদ্ধৃত মত | সব ধরনের বিষয়ে নারীর বিচারিক কর্তৃত্ব অনুমোদনের অবস্থান | বিরোধ নিষ্পত্তির বাস্তব সামর্থ্যকে বিচারিক যোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার যুক্তি; এই মতের আরোপ নিয়ে পরবর্তী আইনজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। |
| ইবনে হুমামের হানাফি আলোচনা | নিয়োগের বৈধতা ও বিচারিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন পৃথক | নারীকে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার আপত্তি থাকলেও তাঁর আইনসম্মত সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কি না, সেটিকে স্বতন্ত্র প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। |
এই তুলনা থেকে স্পষ্ট, ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রের মধ্যে নারীর বিচারিক কর্তৃত্ব সম্পর্কে ভিন্ন অবস্থান থাকলেও প্রধানধারার বিধানে নারীকে পুরুষের সমান বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কোনো অবস্থানে নারী সম্পূর্ণভাবে বিচারকের পদ থেকে বাদ পড়েছেন, কোনো অবস্থানে কেবল নির্দিষ্ট বিষয়ে বিচারিক দায়িত্বের অনুমতি পেয়েছেন, আবার অন্য একটি অবস্থানে তাঁর বিচারিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বিস্তৃত কর্তৃত্বের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। এই মতপার্থক্য দেখায়, নারীর বিচারক হওয়া প্রকৃতিগতভাবে অসম্ভব—এমন ধারণা ইসলামি আইনশাস্ত্রের মধ্যেও অবিতর্কিত ছিল না। বিচারিক ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও আইনগত পদ্ধতির পার্থক্য কাজ করেছে।
আধুনিক ফতোয়ায় নারী বিচারকের নিষেধাজ্ঞা
নারীর বিচারিক ক্ষমতা সম্পর্কে ধ্রুপদী ফিকহের প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞা আধুনিক ইসলামি ফতোয়াতেও বজায় রয়েছে। ইসলামওয়েবের ১১০৮৩৫ নম্বর ফতোয়ায় নারীর বিচারক হওয়া এবং ঋতুস্রাব চলাকালে বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে প্রথমেই বিচারক হওয়ার জন্য পুরুষ হওয়াকে আবশ্যক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব ও দায়িত্ব পুরুষদের হাতে থাকা উচিত। এই সিদ্ধান্তে একজন নারী বিচারিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম কি না, সেই প্রশ্নকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় করা হয়নি; বরং লিঙ্গগত শর্তের ভিত্তিতে নিয়োগের বৈধতা অস্বীকার করা হয়েছে। ফতোয়ায় লেখা হয়েছে [12]—
فلا يجوز للمرأة أن تتولى القضاء لأن من شروط القاضي الذكورة في قول جمهور أهل العلم
বাংলা অনুবাদ: নারীর বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করা বৈধ নয়। কারণ অধিকাংশ আলেমের মতে বিচারক হওয়ার শর্তগুলোর মধ্যে পুরুষ হওয়া অন্তর্ভুক্ত।
ফতোয়াটির পরবর্তী বক্তব্য অনুযায়ী, নারীকে বিচারকের পদে নিয়োগ দেওয়া হলে সেই নিয়োগকে বৈধ গণ্য করা হবে না এবং তাঁর বিচারিক সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে একজন নারী বিচারক কোনো বিষয়ে আইনসম্মত, যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত দিলেও তাঁর নিয়োগের বৈধতাকে লিঙ্গের ভিত্তিতে অস্বীকার করার সুযোগ তৈরি হয়। এখানে বিচারিক সিদ্ধান্তের গুণগত মানের পরিবর্তে সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ব্যক্তির পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বিচারব্যবস্থার মৌলিক লক্ষ্য যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে একজন বিচারক নারী না পুরুষ—এটি তাঁর রায়ের সত্যতা, যুক্তিসঙ্গততা এবং আইনসম্মততার নির্ধারক হতে পারে না। একই প্রমাণ ও একই আইন প্রয়োগ করে নারী ও পুরুষ বিচারক সমান সিদ্ধান্তে পৌঁছালে কেবল বিচারকের লিঙ্গের কারণে একটি সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করার কোনো ন্যায়সংগত ভিত্তি নেই।
নারীর বিচারবুদ্ধি, ধর্মীয় সাক্ষ্যবিধান এবং বিচারিক কর্তৃত্বের অসংগতি
নারী বিচারকের নিষেধাজ্ঞার পেছনে যে যুক্তিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তার মধ্যে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতির ধারণা এবং সাক্ষ্যদানে নারী-পুরুষের পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি হাদিসে নারীদের বুদ্ধিতে ঘাটতিসম্পন্ন বলা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সাক্ষ্যবিধানকে সেই ঘাটতির ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু একটি ধর্মীয় সাক্ষ্যবিধান নারীর প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়। দুজন নারীর সাক্ষ্যকে একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমতুল্য নির্ধারণ করা হলে সেটি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় আইনের একটি বিধান; সেই বিধান থেকে সব নারী কম বুদ্ধিমান কিংবা বিচার পরিচালনায় অক্ষম—এমন সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। এই পার্থক্য উপেক্ষা করে নারীর সাক্ষ্যসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতাকে বিচারিক অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে আগে প্রতিষ্ঠিত আইনগত বৈষম্যকেই আবার নতুন বৈষম্যের ভিত্তি বানানো হয়।
একই সমস্যা বিচারকের দায়িত্বের সঙ্গে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের তুলনা করার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। কোনো রাষ্ট্রে বিচারক সর্বোচ্চ শাসনকর্তার অধীন নিয়োগ পান বলে বিচারিক দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাষ্ট্রপ্রধানের সব শর্তের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যায় না। বিচারকের মূল দায়িত্ব আইন ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা একজন নারী অর্জন করতে পারবেন না—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ লিঙ্গভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার যুক্তিতে পাওয়া যায় না। অথচ রাষ্ট্রপ্রধানের পদে নারীর নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করে সেই নিষেধাজ্ঞাকে বিচারক ও অন্যান্য কর্তৃত্বপূর্ণ পদেও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। ফলে একটি লিঙ্গগত বাধা রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুনরুৎপাদিত হয়েছে।
ধ্রুপদী ফিকহের বিভিন্ন মতের উপস্থিতি সত্ত্বেও নারীর বিচারিক ক্ষমতা নিষিদ্ধ করার বিধানগুলোর কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য একই: একজন ব্যক্তিকে তাঁর বাস্তব সামর্থ্যের পরিবর্তে নারী পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচারিক কর্তৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া। বিচারকের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার অধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য স্বয়ংক্রিয় নয়; আইনগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সততা এবং প্রয়োজনীয় পেশাগত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। কিন্তু সেই যোগ্যতাগুলো পূরণ করার সুযোগ নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান হওয়া প্রয়োজন। একজন নারী প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা অর্জনের পরও শুধু নারী হওয়ার কারণে বিচারক হতে পারবেন না—এমন বিধান যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক লিঙ্গবৈষম্য। ইসলামি আইনশাস্ত্রে নারীর বিচারিক কর্তৃত্বের ওপর আরোপিত প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞা এই বৈষম্যকে ধর্মীয় বৈধতা দিয়েছে।
ইসলামি শাসনব্যবস্থায় নারীর মন্ত্রিত্ব, গভর্নর ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা কেবল সর্বোচ্চ শাসকের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। মন্ত্রী, গভর্নর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিচারিক কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ, জনসেবা পরিচালনা এবং অধস্তন কর্মচারীদের দায়িত্ব নির্ধারণের মাধ্যমে তাঁরা জনগণের জীবনের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেন। এসব দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিচারবুদ্ধি, সততা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা। কিন্তু ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিভিন্ন স্তরের জন্য নির্ধারিত শর্তগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীর নেতৃত্বের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কেবল খলিফা বা সর্বোচ্চ শাসকের পদেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা থেকে অন্যান্য কর্তৃত্বপূর্ণ পদের ক্ষমতা ও নিয়োগের শর্ত নির্ধারণের মাধ্যমে নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের পথও সংকুচিত করা হয়েছে।
এখানে মন্ত্রী বা প্রশাসক বলতে কোন ধরনের পদ বোঝানো হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ধ্রুপদী ইসলামি ফিকহে মন্ত্রিত্ব ও প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্বের বিভিন্ন ধরন ছিল। কোনো মন্ত্রী খলিফার অর্পিত বিস্তৃত ক্ষমতা নিয়ে বিচারব্যবস্থা, সামরিক কার্যক্রম, রাজস্ব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিচালনা করতেন। অন্য মন্ত্রীর দায়িত্ব ছিল প্রধানত শাসকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া। একইভাবে কোনো প্রাদেশিক গভর্নরের হাতে বিস্তৃত বিচারিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকত, আবার অন্য কোনো কর্মকর্তার ক্ষমতা নির্দিষ্ট কয়েকটি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। ফলে ধ্রুপদী ফিকহের এসব পদকে আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা প্রশাসনিক পদের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন মনে করা যায় না। কিন্তু যে পদের জন্য খলিফার যোগ্যতার শর্ত প্রয়োগ করা হয়েছে এবং খলিফা হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়াকে অপরিহার্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই পদে নারীর প্রবেশাধিকারের ওপরও লিঙ্গগত বাধা তৈরি হয়েছে।
আল-মাওয়ার্দির মন্ত্রিত্বের বিধান: পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রী ও সীমিত দায়িত্বের মন্ত্রী
আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দি তাঁর আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায় الباب الثاني في تقليد الوزارة, অর্থাৎ মন্ত্রী নিয়োগের অধ্যায়ে মন্ত্রিত্বকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। প্রথমটি وزارة التفويض বা পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রিত্ব এবং দ্বিতীয়টি وزارة التنفيذ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী মন্ত্রিত্ব। প্রথম ধরনের মন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের বিবেচনা ও আইনগত সিদ্ধান্ত প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করেন। তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, বিচারিক কর্তৃপক্ষ নিয়োগ, সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। দ্বিতীয় ধরনের মন্ত্রীর ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত; তিনি মূলত শাসকের নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া এবং অনুমোদিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন। এই দুই ধরনের মন্ত্রিত্বের মধ্যে ক্ষমতার পার্থক্য থাকলেও প্রথমটির ক্ষেত্রে মাওয়ার্দি খলিফার জন্য নির্ধারিত প্রায় সব যোগ্যতার শর্ত প্রয়োগ করেছেন।
পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রী নিয়োগের শর্ত আলোচনা করতে গিয়ে মাওয়ার্দি বলেন, বংশপরিচয়ের শর্ত ছাড়া ইমামত বা খিলাফতের অন্যান্য শর্ত এই মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ এই মন্ত্রী নিজস্ব বিচারবিবেচনা প্রয়োগ করেন এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। অর্থাৎ মন্ত্রীর দায়িত্ব যখন রাষ্ট্রপ্রধানের অর্পিত ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা, তখন তাঁর যোগ্যতার শর্তও রাষ্ট্রপ্রধানের শর্তের অনুরূপ নির্ধারিত হচ্ছে। মাওয়ার্দি লিখেছেন [13]—
ويعتبر في تقليد هذه الوزارة شروط الإمامة إلا النسب وحده لأنه ممضي الآراء ومنفذ الاجتهاد فاقتضى أن يكون على صفات المجتهدين.
বাংলা অনুবাদ: এই মন্ত্রিত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে ইমামতের শর্তগুলো বিবেচিত হবে, কেবল বংশপরিচয়ের শর্ত ছাড়া। কারণ মন্ত্রী সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন এবং বিচারবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। তাই তাঁর মধ্যে স্বাধীনভাবে আইনগত বিচারবিবেচনা প্রয়োগের যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য বোঝার জন্য মাওয়ার্দির রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের শর্তগুলোর সঙ্গে মন্ত্রিত্বের শর্ত মিলিয়ে দেখতে হয়। ধ্রুপদী ফিকহের প্রধানধারায় সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়াকে অপরিহার্য শর্ত ধরা হয়েছে। মাওয়ার্দি যখন পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রে কেবল বংশপরিচয়ের শর্ত বাদ দিয়ে বাকি ইমামতের শর্তগুলো প্রয়োগ করেন, তখন সেই ব্যবস্থায় নারীর জন্য উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের পথও সংকুচিত হয়। এই সিদ্ধান্ত সরাসরি মন্ত্রীর বাস্তব প্রশাসনিক দক্ষতা পরীক্ষা করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং একটি পূর্বনির্ধারিত পদমর্যাদার শর্ত অন্য একটি পদে স্থানান্তর করার মাধ্যমে নারীকে কর্তৃত্বের বাইরে রাখার আইনগত কাঠামো তৈরি হয়েছে।
মাওয়ার্দির আলোচনায় পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রীর কার্যক্রম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিচারিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, বিচারক নিয়োগ করতে পারেন, অন্যায়ের প্রতিকারের দায়িত্ব নিতে পারেন এবং সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারেন। রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে যেসব ক্ষমতা থাকে, তার উল্লেখযোগ্য অংশ এই মন্ত্রীর হাতে অর্পিত হয়। মাওয়ার্দি এমনকি রাষ্ট্রপ্রধান ও এই মন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকটি পার্থক্যও আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ পদটি কেবল নামমাত্র পরামর্শদাতার নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যখন এই উচ্চপর্যায়ের পদে প্রবেশের শর্ত রাষ্ট্রপ্রধানের শর্তের অনুসারী করা হয়, তখন সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতায় নারীর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মন্ত্রিত্বেও বিস্তৃত হয়।
এই বিধানের অন্তর্নিহিত সমস্যা হচ্ছে, প্রশাসনিক ক্ষমতার একটি বিশেষ স্তরে পৌঁছানোর পর নারী হওয়ার পরিচয়কে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা। একজন নারী অপেক্ষাকৃত সীমিত কোনো দপ্তরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, বহু কর্মচারী পরিচালনা করতে পারেন কিংবা একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু পূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের পরিবর্তে ধর্মীয় পদমর্যাদার শর্ত কার্যকর হয়। এভাবে একজন নারীর দক্ষতা স্বীকৃত হলেও তাঁর ক্ষমতার পরিধি পুরুষের সমান হতে দেওয়া হয় না।
প্রাদেশিক গভর্নর ও শাসনকর্তার পদে নারীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি ধ্রুপদী ইসলামি শাসনব্যবস্থায় প্রাদেশিক গভর্নর বা আমিরের পদও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গভর্নর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা প্রদেশের জনগণের ওপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতেন। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সরকারি কর্মকর্তা পরিচালনা, রাজস্বসংক্রান্ত কাজ, বিচারিক ব্যবস্থা এবং সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারত। মাওয়ার্দি তাঁর গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায় الباب الثالث في تقليد الإمارة على البلاد-এ প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্বের বিভিন্ন ধরন আলোচনা করেছেন। তিনি সাধারণ ও বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন গভর্নরের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করেছেন। সাধারণ কর্তৃত্বসম্পন্ন গভর্নরের হাতে একটি অঞ্চলের ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পিত হয়, আর বিশেষ কর্তৃত্বসম্পন্ন গভর্নরের দায়িত্ব নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
মাওয়ার্দির আলোচনায় পূর্ণ কর্তৃত্বসম্পন্ন প্রাদেশিক গভর্নরের শর্ত এবং পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রীর শর্তের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উভয় পদেই নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রয়োগের সুযোগ থাকায় যোগ্যতার শর্তগুলোও কাছাকাছি নির্ধারিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রাদেশিক গভর্নর শুধু উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মচারী নন; সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। মাওয়ার্দি লিখেছেন [14]—
فصارت شروط الإمارة العامة معتبرة بشروط وزارة التفويض لاشتراكهما في عموم النظر وإن اختلفا في خصوص العمل.
বাংলা অনুবাদ: ফলে সাধারণ প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্বের শর্তগুলো পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রিত্বের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। কারণ উভয় পদেরই ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, যদিও প্রত্যেকের দায়িত্বের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র পৃথক।
এখানে ক্ষমতার শর্ত নির্ধারণের একটি ধারাবাহিক পদ্ধতি দেখা যায়। প্রথমে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতার যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর সেই শর্তের অধিকাংশ পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। আবার প্রাদেশিক গভর্নরের বিস্তৃত ক্ষমতাসম্পন্ন পদের জন্য মন্ত্রিত্বের শর্ত অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গভিত্তিক বাধা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এটি নারীর প্রশাসনিক যোগ্যতা মূল্যায়নের স্বাধীন পদ্ধতি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিভিন্ন স্তরকে একটি পূর্বনির্ধারিত ধর্মীয় পদমর্যাদার কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করার পদ্ধতি।
একটি প্রদেশ পরিচালনার জন্য স্থানীয় অর্থনীতি, জনসংখ্যা, প্রশাসনিক কাঠামো, আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো এবং জনগণের প্রয়োজন সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি এসব বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। নারী হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি এসব দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েন—এমন সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। একজন নারী দক্ষ প্রশাসক হলে তিনি প্রদেশ পরিচালনায় সক্ষম হতে পারেন; একজন অযোগ্য পুরুষ হলে তাঁর নেতৃত্বে প্রশাসনিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। কাজেই গভর্নরের ক্ষমতার ব্যাপকতা বেশি হওয়া থেকে পুরুষ হওয়ার অপরিহার্যতা অনুসরণ করে না। ক্ষমতার পরিধি বড় হলে প্রয়োজনীয় দক্ষতার মানদণ্ড কঠোর হতে পারে, কিন্তু লিঙ্গকে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ধ্রুপদী ফিকহের প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্ব এবং আধুনিক রাষ্ট্রের জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার কিংবা স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদ অভিন্ন নয়। আধুনিক প্রশাসনিক পদগুলোর ক্ষমতা আইন ও সংবিধান দ্বারা পৃথকভাবে নির্ধারিত হয়। কিন্তু যে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বৃহৎ প্রশাসনিক ক্ষমতাকে পুরুষের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়, সেই নীতি আধুনিক রাষ্ট্রীয় পদে প্রয়োগ করলে নারীর সমান প্রশাসনিক অধিকারও সীমিত হতে পারে। এই বৈষম্যের বাস্তব ভিত্তি নারীর প্রশাসনিক অক্ষমতা নয়; বরং উচ্চপর্যায়ের কর্তৃত্বকে পুরুষের জন্য নির্ধারিত মনে করার ধর্মীয় অবস্থান।
আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নারী পরিচালক ও পুরুষ কর্মচারীদের ওপর নারীর কর্তৃত্ব
ইসলামি নেতৃত্ববিধির প্রভাব কেবল খলিফা, মন্ত্রী বা গভর্নরের মতো ঐতিহাসিক পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক কর্মক্ষেত্রে কোনো নারী পুরুষ কর্মচারীদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হতে পারবেন কি না, প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন কি না এবং নারী-পুরুষ উভয়ের উপস্থিতিতে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নেও ধর্মীয় ফতোয়া দেওয়া হয়েছে। ইসলামওয়েবের ৩২০৪৭ নম্বর ফতোয়া এ বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, নারী কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিচালক, প্রধান কিংবা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতে পারবেন কি না, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই কর্মরত। এমনকি সরাসরি সাক্ষাৎ বা নির্জন অবস্থায় পুরুষদের সঙ্গে অবস্থান না করে টেলিফোন বা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান করলেও তা বৈধ হবে কি না, সেই প্রশ্নও তিনি করেছিলেন। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু নারী-পুরুষের শারীরিক মেলামেশা নিয়ে ছিল না; একজন নারী পুরুষ কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারবেন কি না, সেটিও এর কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল।
২০০৩ সালের ১৪ মে প্রকাশিত এই ফতোয়ার উত্তরে উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব ও বৃহৎ দায়িত্ব যোগ্য পুরুষদের হাতে থাকা আবশ্যক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার ক্ষেত্রে পুরুষ হওয়ার শর্ত, বিচারকের পদে অধিকাংশ ফকিহের নিষেধাজ্ঞা এবং নারীর স্বাভাবিক সক্ষমতা সম্পর্কে কয়েকটি ধারণা উল্লেখ করা হয়েছে। ফতোয়ার যুক্তি অনুযায়ী, উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা, নির্জনে অবস্থান এবং নারীর স্বভাবের অনুপযুক্ত কঠিন কাজের সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে কর্মক্ষেত্রের নেতৃত্বকে নারীর দক্ষতা ও কাজের বাস্তব চাহিদার পরিবর্তে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত লিঙ্গগত আচরণের সীমার মধ্যে বিচার করা হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়েছে [15]—
فإن المناصب القيادية والمسؤوليات الكبرى يجب أن تكون بيد الرجال الأكفاء. ولهذا أجمع العلماء على اشتراط الذكورة في الإمامة الكبرى فلا تصح ولاية امرأة
বাংলা অনুবাদ: নেতৃত্বস্থানীয় পদ এবং বৃহৎ দায়িত্বগুলো যোগ্য পুরুষদের হাতে থাকা আবশ্যক। এ কারণেই আলেমরা সর্বোচ্চ ইমামতের জন্য পুরুষ হওয়াকে শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং কোনো নারীর এই শাসনকর্তৃত্ব বৈধ নয়।
এই ফতোয়ার পরবর্তী অংশে অপেক্ষাকৃত ছোট দায়িত্ব সম্পর্কে পৃথক বিধান দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিদ্যালয় বা হাসপাতালের পরিচালনার মতো কাজ নারীর পক্ষে দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন করা হয়েছে। কিন্তু সেই অনুমতির ক্ষেত্রেও নিষিদ্ধ নির্জনতা বা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ নারী-পুরুষের মেলামেশা না থাকার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। ফলে একজন নারী কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে সক্ষম—এই স্বীকৃতি তাঁর বৃহৎ নেতৃত্বের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। বরং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিচ্ছে, কোন দায়িত্ব যথেষ্ট ছোট, কোন ক্ষমতা যথেষ্ট সীমিত এবং কোন কর্মপরিবেশ নারীর জন্য অনুমোদনযোগ্য। একজন নারী নিজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কতদূর অগ্রসর হতে পারবেন, তার ওপর এভাবে একটি ধর্মীয় সীমারেখা আরোপ করা হয়েছে।
ফতোয়াটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে খাদিজার ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নকারীর উত্থাপিত যুক্তির জবাব। খাদিজা নিজের সম্পদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং মুহাম্মদ তাঁর ব্যবসায় কাজ করেছিলেন—এই ঘটনাকে নারী কর্তৃত্বের উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। উত্তরে বলা হয়েছে, ঘটনাটি মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির আগে সংঘটিত হয়েছিল এবং কোনো নারীর সম্পদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালিত হওয়া থেকে পুরুষের ওপর তাঁর প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বৈধতা প্রমাণিত হয় না। এখানে নারীর সম্পত্তির মালিকানা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং কর্মক্ষেত্রে কর্তৃত্ব প্রয়োগকে পৃথক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অস্তিত্ব স্বীকার করেও তাঁর নেতৃত্বের অধিকার সীমিত রাখার অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে।
এই পার্থক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া, কর্মচারী নিয়োগ করা, ব্যবসায়িক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাগত দায়িত্ব পালন করা বাস্তবে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু নারীকে সম্পত্তির মালিক হওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও সেই মালিকানা থেকে উদ্ভূত পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তাঁর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন নারী নিজের সম্পদের মালিক হবেন, কিন্তু পুরুষ কর্মচারীদের ওপর নির্দেশ প্রদানের অধিকার ধর্মীয় বিধানের দ্বারা সীমিত হবে—এমন অবস্থান সম্পত্তির অধিকার এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতার মধ্যে বৈষম্যমূলক পার্থক্য তৈরি করে।
ইসলামি ফিকহে নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতার স্তরভিত্তিক সীমাবদ্ধতা
উল্লিখিত ধ্রুপদী গ্রন্থ ও আধুনিক ফতোয়াগুলোর বিধান একত্রে বিবেচনা করলে নারীকে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ শাসনকর্তৃত্ব এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহৎ পদগুলোতে পুরুষ হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে সীমিত দায়িত্বপূর্ণ কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় নারীর সক্ষমতা স্বীকার করা হয়েছে। এসব বিধান সব মাজহাবের প্রতিটি পদে অভিন্ন নয়; কিন্তু উচ্চপর্যায়ের কর্তৃত্বকে পুরুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার অবস্থান প্রধানধারার ধর্মীয় ব্যাখ্যায় স্পষ্ট।
| নেতৃত্বের পদ বা দায়িত্ব | উদ্ধৃত ইসলামি বিধান | মূল উৎস |
|---|---|---|
| খলিফা বা সর্বোচ্চ শাসক | ধ্রুপদী প্রধানধারায় পুরুষ হওয়া আবশ্যক | সর্বোচ্চ ইমামতের শর্ত; ইসলামওয়েব ৩২০৪৭ |
| পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রী | বংশপরিচয় ছাড়া ইমামতের অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য | মাওয়ার্দি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, মন্ত্রিত্ব অধ্যায় |
| সীমিত দায়িত্বের মন্ত্রী | পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রীর শর্ত হুবহু প্রযোজ্য নয়; দায়িত্বের প্রকৃতি অনুসারে বিধান | মাওয়ার্দি, মন্ত্রিত্বের দুই শ্রেণির আলোচনা |
| বিস্তৃত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাদেশিক গভর্নর | পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রীর অনুরূপ যোগ্যতার শর্ত | মাওয়ার্দি, প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্ব অধ্যায় |
| বিচারক | অধিকাংশ ধ্রুপদী ফকিহের মতে নারী নিয়োগ নিষিদ্ধ; অন্য মতও রয়েছে | ইবনে রুশদ; ইসলামওয়েব ৩২০৪৭ |
| উচ্চপর্যায়ের কর্মক্ষেত্রের পরিচালক | ইসলামওয়েব ৩২০৪৭ অনুযায়ী বৃহৎ নেতৃত্ব ও দায়িত্ব যোগ্য পুরুষদের হাতে থাকা আবশ্যক | ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩২০৪৭ |
| বিদ্যালয় বা হাসপাতালের পরিচালক | দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারলে এবং নির্ধারিত ধর্মীয় শর্ত মানলে অনুমোদিত | ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩২০৪৭ ও ৯৬৪৩২ |
এই বিধানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পুরুষের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, কিন্তু সীমিত দায়িত্বপূর্ণ কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় নারীকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখানে নারীকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং নারীকে সমান ক্ষমতা দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একজন নারী বিদ্যালয় পরিচালনার অনুমতি পেলেও রাষ্ট্রের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ক্ষমতা গ্রহণের অধিকার পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। তিনি হাসপাতাল পরিচালনায় দক্ষ হতে পারেন, কিন্তু বৃহৎ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন পদে তাঁর প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হতে পারে। যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টনের পরিবর্তে ধর্মীয় পদমর্যাদার ভিত্তিতে নারীর ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করার ফলে তাঁর ব্যক্তিগত সামর্থ্য এবং আইনগত অধিকারের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত করার এসব বিধানের মূল সমস্যা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা এবং লিঙ্গের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক ধরে নেওয়া হয়েছে, যার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। প্রশাসনিক দায়িত্ব যত বড় হয়, তত বেশি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দায়িত্বের আকার বড় হওয়ার ফলে নারীর বুদ্ধিমত্তা কিংবা নেতৃত্বের ক্ষমতা হ্রাস পায় না। কোনো রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনায় অযোগ্য নারী যেমন থাকতে পারেন, অযোগ্য পুরুষও থাকতে পারেন। একইভাবে দক্ষ প্রশাসক নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই থাকতে পারেন। সুতরাং নেতৃত্বের পদে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে লিঙ্গকে পূর্বনির্ধারিত বাধা হিসেবে ব্যবহার করা প্রকৃত যোগ্যতার মূল্যায়ন নয়। ধ্রুপদী মন্ত্রিত্ব ও গভর্নর নিয়োগের বিধান এবং আধুনিক ফতোয়ায় কর্মক্ষেত্রের নেতৃত্বসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা একত্রে দেখায়, ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রধানধারায় নারীর ক্ষমতার ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত হয়েছে।
ইসলামে নারীর সামরিক নেতৃত্ব: সেনাপ্রধান হওয়ার নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক দায়িত্বের সীমাবদ্ধতা
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, সামরিক অভিযান এবং সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেনাবাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাহিনীর সদস্যদের নেতৃত্ব, প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণ, যুদ্ধের পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং জরুরি অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এসব দায়িত্বের জন্য প্রয়োজন সামরিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, কৌশলগত বিচারবুদ্ধি, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা। একজন ব্যক্তির এই সামর্থ্য নির্ধারণের জন্য তাঁর বাস্তব প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। নারী কিংবা পুরুষ হওয়া নিজে সামরিক দক্ষতা বা নেতৃত্বের ক্ষমতার নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড নয়। অথচ ইসলামি ফতোয়ায় রাষ্ট্রপ্রধান ও বিচারকের পদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীর ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
ইসলামওয়েবের ৪৩৪১৯ নম্বর ফতোয়া এই নিষেধাজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০০৪ সালের ২০ জানুয়ারি প্রকাশিত ফতোয়াটিতে প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, একজন নারী রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক, সেনাবাহিনীর প্রধান কিংবা অনুরূপ কোনো উচ্চপর্যায়ের পদ গ্রহণ করতে পারবেন কি না। উত্তরে এসব পদে নারীর নিয়োগকে সরাসরি অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফতোয়াটিতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা ও বিচারিক কর্তৃত্বের সঙ্গে একই শ্রেণির নিষেধাজ্ঞার অধীন রাখা হয়েছে। উত্তরদাতা নারীর সামরিক প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বা নেতৃত্বের দক্ষতা যাচাইয়ের কোনো শর্ত উল্লেখ করেননি। একজন নারী কতটা দক্ষতার সঙ্গে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন, তা পরীক্ষা করার পরিবর্তে তাঁকে নারী হওয়ার ভিত্তিতেই এই পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়েছে [6]—
فلا يجوز تولي المرأة للرئاسة أو القضاء أو قيادة الجيش أو نحو ذلك، وقد فصلنا هذا في الفتوى رقم:32047، والفتوى رقم: 10833.
বাংলা অনুবাদ: সুতরাং নারীর রাষ্ট্রপ্রধানের পদ, বিচারকের পদ, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব কিংবা অনুরূপ কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করা বৈধ নয়। এই বিষয়ে ৩২০৪৭ এবং ১০৮৩৩ নম্বর ফতোয়ায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এই ফতোয়ার বিশেষ তাৎপর্য হচ্ছে, এখানে নারীর সেনাবাহিনীতে চাকরি করার প্রশ্ন নয়, সরাসরি সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণের প্রশ্নে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একজন নারী সামরিক বাহিনীতে কর্মরত থাকতে পারেন কি না এবং তিনি সেই বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারবেন কি না, দুটি পৃথক প্রশ্ন। প্রথমটি সামরিক পেশায় অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে, দ্বিতীয়টি সেই পেশায় দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর অধিকার নিয়ে। কোনো নারীকে সামরিক বাহিনীতে সীমিত দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁকে সেনাপ্রধান হতে নিষেধ করা হলে তাঁর সামরিক পেশায় অগ্রগতির ওপর একটি লিঙ্গভিত্তিক সীমারেখা আরোপ করা হয়। এর ফলে একজন নারী দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন করলেও কেবল নারী হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ সামরিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
নারীর সামরিক পেশায় অংশগ্রহণ: শর্তসাপেক্ষ অনুমতি ও নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা
ইসলামওয়েবের ৪২৯৮৭ নম্বর ফতোয়ায় নারীর সামরিক পেশায় কাজ করার বিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পাওয়া যায়। সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সামরিক বাহিনীতে কর্মরত একজন নারীকে পুরুষের অনুকরণকারী হিসেবে গণ্য করা হবে কি না। উত্তরে বলা হয়েছে, কেবল সামরিক পেশায় কাজ করার কারণে নারীকে পুরুষের অনুকরণকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না। কিন্তু এই অনুমতির সঙ্গে পর্দা, নারী-পুরুষের মেলামেশা, পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরিহার এবং নির্জন অবস্থায় পুরুষের সঙ্গে অবস্থান না করার মতো শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সামরিক পেশায় নারীর অংশগ্রহণকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করেও তাঁর কাজের পরিবেশ, পোশাক এবং পেশাগত আচরণের ওপর ধর্মীয় শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়েছে [16]—
فمجرد عمل المرأة في المجال العسكري لا يُعد تشبها بالرجال، بشرط أن تلتزم المرأة بالحجاب الشرعي، وألا تختلط بالرجال الاختلاط المعهود الآن
বাংলা অনুবাদ: কেবল সামরিক ক্ষেত্রে নারীর কাজ করাকে পুরুষের অনুকরণ হিসেবে গণ্য করা হবে না। তবে শর্ত হচ্ছে, নারীকে শরিয়তসম্মত পর্দা পালন করতে হবে এবং বর্তমানে প্রচলিত ধরনের নারী-পুরুষের মেলামেশা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, নারী পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরবেন না এবং ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ নির্জনতা ও সাজসজ্জার প্রদর্শন থেকে বিরত থাকবেন। এখানে সামরিক পেশাকে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি, কিন্তু সেই পেশায় অংশগ্রহণের স্বাধীনতাকে একাধিক ধর্মীয় শর্তের অধীন করা হয়েছে। আধুনিক সামরিক বাহিনীতে নারী ও পুরুষ একই প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ, দায়িত্ব পালন, অভিযান পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় করতে পারেন। সামরিক কার্যক্রমের প্রকৃতি অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে সমন্বয় ও যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে। এই বাস্তব পেশাগত প্রয়োজনের ওপর ধর্মীয় মেলামেশা ও পোশাকসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা হলে নারীর দায়িত্ব পালনের সুযোগ ও কর্মক্ষেত্র সীমিত হতে পারে।
একই ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের এই দুটি ফতোয়া একত্রে বিবেচনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়। প্রথম ফতোয়ায় নারীর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ফতোয়ায় সামরিক পেশায় নারীর অংশগ্রহণকে কিছু শর্তের অধীনে অনুমোদন করা হয়েছে। অর্থাৎ সামরিক বাহিনীতে নারীর উপস্থিতি এবং সামরিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে তাঁর অধিষ্ঠিত হওয়া সমানভাবে অনুমোদিত নয়। একজন নারী সামরিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, কিন্তু সেই বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না—এমন ব্যবস্থা তাঁর পেশাগত যোগ্যতার সঙ্গে অধিকার ও ক্ষমতার একটি অসামঞ্জস্য তৈরি করে। কাজ করার অনুমতি থাকলেও নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমান সুযোগ না থাকলে পেশাগত সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
সামরিক নেতৃত্বের যোগ্যতা এবং লিঙ্গভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার অসংগতি
সামরিক নেতৃত্বে নারীর নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, সামরিক ক্ষমতা প্রয়োগের যোগ্যতার সঙ্গে নারী হওয়ার পরিচয়ের কোনো অনিবার্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একজন সেনাপ্রধানকে সব সামরিক দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে সম্পাদন করতে হয় না। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে উপযুক্ত সামরিক পরিকল্পনা অনুমোদন, দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও সমন্বয়, তথ্য বিশ্লেষণ, বাহিনীর সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এসব কাজের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। নারী হওয়ার কারণে এসব দক্ষতা অর্জন অসম্ভব হয়ে যায় না। অন্যদিকে পুরুষ হওয়ার কারণে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ সেনাপ্রধান হয়ে ওঠেন না। সামরিক ইতিহাসে পুরুষদের নেতৃত্বে বিপর্যয়কর পরাজয়, অদক্ষ সিদ্ধান্ত এবং অকারণ প্রাণহানির ঘটনা রয়েছে। এসব ব্যর্থতা থেকে সমগ্র পুরুষজাতির সামরিক অযোগ্যতা অনুসরণ করে না। একই যুক্তিতে কোনো নারীর সামরিক ব্যর্থতাও সমগ্র নারীজাতির সামরিক নেতৃত্বের অযোগ্যতার প্রমাণ হতে পারে না।
সামরিক বাহিনীর কোনো দায়িত্বে শারীরিক সক্ষমতা অপরিহার্য হলে সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য প্রাসঙ্গিক শারীরিক পরীক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায়। যাঁরা সেই মানদণ্ড পূরণ করবেন, তাঁরা দায়িত্ব পালনের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন। কিন্তু নির্দিষ্ট কাজের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী সক্ষমতা পরীক্ষা করা এবং নারী হওয়ার কারণে সব নারীকে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। প্রথমটি ব্যক্তিগত সামর্থ্যের পরীক্ষা, দ্বিতীয়টি জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আগাম অযোগ্যতা ঘোষণা। রাষ্ট্রীয় সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীকে নিষিদ্ধ করার বিধান এই দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে। ফলে সামরিক দক্ষতার পরিবর্তে ধর্মীয় লিঙ্গবিভাজন ক্ষমতায় প্রবেশের সীমারেখা নির্ধারণ করে।
নামাজের ইমামতিতে নারীর নেতৃত্ব: পুরুষদের নামাজ পরিচালনার নিষেধাজ্ঞা
ইসলামে নারী নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা কেবল রাষ্ট্রীয় শাসন, প্রশাসন ও সামরিক ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় আচার পরিচালনার ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের নেতৃত্বের অধিকার পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। জামাতে নামাজ পরিচালনাকারী ব্যক্তিকে ইমাম বলা হয়। ইমামের দায়িত্ব হচ্ছে নামাজের বিভিন্ন ধাপ পরিচালনা করা, কোরআন তিলাওয়াত করা এবং জামাতের সদস্যদের নামাজে নেতৃত্ব দেওয়া। এই দায়িত্ব পালনের জন্য ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে জ্ঞান, কোরআন পাঠের দক্ষতা এবং নামাজ পরিচালনার সক্ষমতা প্রয়োজন। কিন্তু ধ্রুপদী ইসলামি ফিকহের প্রধানধারায় পুরুষদের নামাজে একজন নারী ইমাম হতে পারবেন না বলে বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে একজন নারী কোরআন পাঠে অধিক দক্ষ কিংবা ধর্মীয় জ্ঞানে অধিক পারদর্শী হলেও কেবল নারী হওয়ার কারণে পুরুষদের নামাজ পরিচালনার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এই নিষেধাজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের উপযুক্ততা নির্ধারণে প্রকৃত দক্ষতার পাশাপাশি ইমামের লিঙ্গকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। একজন পুরুষের ধর্মীয় জ্ঞান সীমিত হলেও তিনি প্রয়োজনীয় ন্যূনতম শর্ত পূরণ করে পুরুষদের জামাতে ইমামতি করতে পারেন। কিন্তু একজন নারী তাঁর তুলনায় বেশি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করলেও প্রধানধারার ফিকহি বিধানে পুরুষদের জামাতে ইমামতি করার অনুমতি পান না। ফলে নামাজ পরিচালনার যে দক্ষতা ব্যক্তিগত শিক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জিত হয়, সেই দক্ষতার পূর্ণ স্বীকৃতি নারীর ক্ষেত্রে দেওয়া হয় না। ধর্মীয় নেতৃত্বেও পুরুষের কর্তৃত্বকে নারীর তুলনায় উচ্চতর অবস্থানে রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় নারী নেতৃত্বের হাদিস দিয়ে নামাজের ইমামতি নিষিদ্ধ করার যুক্তি
ইসলামওয়েবের ৬০৩২৮ নম্বর ফতোয়ায় নারীর নামাজের ইমামতি, আজান দেওয়া এবং শুক্রবারের খুতবা প্রদানের বিধান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ২০০৫ সালের ২৭ মার্চ প্রকাশিত ফতোয়াটিতে প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, নারীর পুরুষদের নামাজে ইমামতি করা বৈধ কি না। তিনি ইমাম আহমদের নামে বর্ণিত কিছু অনুমতির মত এবং উম্মে ওয়ারাকার হাদিসের বিষয়েও প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে প্রথমেই নারীর পুরুষদের নামাজে ইমামতি অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সহিহ বুখারিতে আবু বকরার সূত্রে বর্ণিত সেই হাদিসটি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে পারস্যের নারী শাসকের প্রসঙ্গে মুহাম্মদ বলেছিলেন, যে জাতি নারীর হাতে শাসনভার অর্পণ করে, তারা সফল হবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতার প্রসঙ্গে উচ্চারিত বক্তব্যকে নামাজ পরিচালনার ধর্মীয় কর্তৃত্বের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়েছে [17]—
فلا يجوز ولا يصح أن تؤم المرأة الرجال في الصلاة لما رواه البخاري عن أبي بكرة قال: لقد نفعني الله بكلمة أيام الجمل
বাংলা অনুবাদ: কোনো নারীর জন্য পুরুষদের নামাজে ইমামতি করা বৈধ নয় এবং এভাবে পরিচালিত নামাজও শুদ্ধ নয়। এর দলিল হিসেবে বুখারি আবু বকরার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছিলেন: উষ্ট্রের যুদ্ধের সময় একটি বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে উপকৃত করেছেন।
ফতোয়াটিতে এরপর পারস্যের নারী শাসক সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে এবং নামাজের ইমামতিকে এক ধরনের কর্তৃত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই যুক্তির কাঠামো হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতায় নারীর নেতৃত্ব নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান ধর্মীয় আচার পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, কারণ নামাজের ইমামতিও নেতৃত্বের একটি রূপ। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা এবং একটি জামাতে নামাজ পরিচালনা করা পৃথক দায়িত্ব। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন, প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় রয়েছে। নামাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ধর্মীয় বিধান ও কোরআন পাঠের দক্ষতা। এই দুই দায়িত্বে নেতৃত্বের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় শাসনসংক্রান্ত একটি বক্তব্য থেকে নারীর নামাজ পরিচালনার অক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, একজন নারী নামাজের বিধান সম্পর্কে জানেন কি না এবং কোরআন যথাযথভাবে তিলাওয়াত করতে পারেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁর লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একজন নারী ধর্মীয় জ্ঞানে দক্ষ হলে তিনি নামাজ পরিচালনার প্রয়োজনীয় জ্ঞানও অর্জন করতে পারেন। ফলে নামাজের ইমামতি থেকে নারীকে বাদ দেওয়ার জন্য তাঁর প্রকৃত ধর্মীয় অযোগ্যতা প্রমাণ করা প্রয়োজন। কিন্তু এই ফতোয়ায় ব্যক্তিগত অযোগ্যতার পরিবর্তে নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে একটি সাধারণ ধর্মীয় বক্তব্য এবং নারী-পুরুষের মেলামেশাসংক্রান্ত বিধান ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ধর্মীয় যোগ্যতার মূল্যায়নের পরিবর্তে লিঙ্গভিত্তিক কর্তৃত্বের নিয়মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
উম্মে ওয়ারাকার হাদিস: মুহাম্মদের নির্দেশে নারীর নামাজ পরিচালনা
নারীর নামাজের ইমামতির বিষয়ে সুনান আবু দাউদের ৫৯২ নম্বর হাদিস বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উম্মে ওয়ারাকা নামের এক নারীর কথা বলা হয়েছে, যাঁকে মুহাম্মদ নিজের পরিবারের সদস্যদের নামাজে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্ণনায় আরও রয়েছে, তাঁর জন্য একজন মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং সেই মুয়াজ্জিন ছিলেন একজন বৃদ্ধ পুরুষ। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে একজন নারীকে নামাজ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রাথমিক ইসলামি বর্ণনায় নারীর ইমামতি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল না। বরং মুহাম্মদের সরাসরি নির্দেশে একজন নারীর নিজ পরিবারের নামাজ পরিচালনার দৃষ্টান্ত রয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে [18]—
وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَزُورُهَا فِي بَيْتِهَا وَجَعَلَ لَهَا مُؤَذِّنًا يُؤَذِّنُ لَهَا وَأَمَرَهَا أَنْ تَؤُمَّ أَهْلَ دَارِهَا
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর রাসুল তাঁর বাড়িতে যাতায়াত করতেন। তিনি তাঁর জন্য একজন মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেছিলেন, যিনি তাঁর জন্য আজান দিতেন। আর তিনি তাঁকে নিজের পরিবারের সদস্যদের নামাজে ইমামতি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এই হাদিস থেকে একটি বিষয় সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয়: মুহাম্মদের নির্দেশে উম্মে ওয়ারাকা নিজের পরিবারের সদস্যদের নামাজ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। বর্ণনায় বৃদ্ধ পুরুষ মুয়াজ্জিনের উপস্থিতির উল্লেখ থাকলেও তিনি উম্মে ওয়ারাকার পেছনে নামাজ আদায় করেছিলেন কি না, সেই তথ্য এই নির্দিষ্ট পাঠে সরাসরি বলা হয়নি। কিন্তু বর্ণনাটি নারীর ইমামতির বৈধতা নিয়ে ধ্রুপদী আইনজ্ঞদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিছু আইনজ্ঞ এই ঘটনাকে নারীর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুরুষদেরও নামাজ পরিচালনার অনুমতির দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে প্রধানধারার ফকিহরা এর প্রয়োগ সীমিত করেছেন কিংবা পুরুষদের ইমামতির প্রশ্নে অন্য দলিলকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এই মতপার্থক্য দেখায়, নারীর নামাজের ইমামতির প্রশ্নেও একটি সর্বসম্মত ও অবিতর্কিত ব্যাখ্যা বিদ্যমান ছিল না।
আবু দাউদের হাদিসটির তাৎপর্য আরও একটি জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো নারীকে তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামাজ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে নারীর ধর্মীয় জ্ঞান ও নামাজ পরিচালনার সামর্থ্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না। প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞার প্রশ্ন তখন নারীর নামাজ পরিচালনার প্রকৃত সামর্থ্য নয়; বরং তাঁর নেতৃত্বের অধীনে কোন শ্রেণির মানুষ নামাজ আদায় করতে পারবেন, সেই আইনগত সীমারেখা। একজন নারীর ধর্মীয় দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে তাঁর কর্তৃত্ব গ্রহণ করা হবে না—এটি ধর্মীয় ক্ষমতা বণ্টনে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যের প্রকাশ।
আয়িশা ও উম্মে সালামার ইমামতি: নারীদের নেতৃত্বের ঐতিহাসিক নজির
নারীদের নামাজে নারী ইমামের উপস্থিতির বিষয়ে আয়িশা এবং উম্মে সালামার ঘটনাও ধ্রুপদী ফিকহি গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। হানাফি আইনজ্ঞ আলাউদ্দিন আল-কাসানি তাঁর বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থে নারীর নামাজের ইমামতির যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি নারীদের নামাজে নারী ইমামের উপস্থিতির অনুমতি উল্লেখ করেছেন এবং আয়িশা ও উম্মে সালামার নিজ নিজ নারীদের জামাতে ইমামতি করার বিবরণ এনেছেন। এই ঘটনাগুলো দেখায়, নারীকে নামাজ পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সর্বক্ষেত্রে বাদ দেওয়া হয়নি; বরং তাঁর নেতৃত্বের অধীনে কারা নামাজ আদায় করবেন, সেই ভিত্তিতে বিধান পৃথক করা হয়েছে। কাসানি লিখেছেন [19]—
وكذا المرأة تصلح للإمامة في الجملة ، حتى لو أمت النساء جاز ، وينبغي أن تقوم وسطهن لما روي عن عائشة رضي الله عنها
বাংলা অনুবাদ: একইভাবে একজন নারীও নির্দিষ্ট পরিসরে ইমামতির যোগ্য। তিনি নারীদের নামাজে ইমামতি করলে তা বৈধ হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁর নারীদের সারির মাঝখানে দাঁড়ানো উচিত। এ বিষয়ে আয়িশা থেকে বর্ণনা রয়েছে।
কাসানি একই আলোচনায় আয়িশার নারীদের আসরের নামাজে এবং উম্মে সালামার নারীদের জামাতে ইমামতি করার বিবরণ উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, হানাফি অবস্থানে নারীদের পৃথক জামাতকে অপছন্দনীয় গণ্য করা হলেও শাফেয়ি অবস্থানে তা উৎসাহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ নারীর নিজ লিঙ্গের মানুষের নামাজ পরিচালনার ক্ষেত্রেও ফকিহদের অবস্থান সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। নারীদের জামাতের ইমাম সামনে দাঁড়াবেন, না নারীদের সারির মাঝখানে দাঁড়াবেন—সেই বিষয়েও বিশেষ বিধান রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো থেকে বোঝা যায়, নামাজের ইমামতি শুধু ধর্মীয় দক্ষতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; নারী ও পুরুষের সামাজিক অবস্থান এবং লিঙ্গভিত্তিক ধর্মীয় শৃঙ্খলার ধারণাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
পুরুষদের নামাজে নারী ইমাম: ধ্রুপদী ফিকহে অনুমতির সীমিত মত
নারীর পুরুষদের নামাজে ইমামতি সম্পর্কে ইসলামওয়েবের ৬০৩২৮ নম্বর ফতোয়ায় হাম্বলি মাজহাবের কয়েকটি মত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কিছু অবস্থানে নারীর নফল নামাজে, বিশেষত তারাবির নামাজে পুরুষদের ইমামতি করার অনুমতির কথা আলোচনা করা হয়েছে। মাওয়ার্দি, মিরদাবি এবং অন্যান্য ফকিহের আলোচনায় এই অনুমতির সঙ্গে নির্দিষ্ট শর্তও যুক্ত ছিল। কোনো কোনো ব্যাখ্যায় নারী ইমামের কোরআন পাঠে বিশেষ দক্ষতা এবং পুরুষ অনুসারীদের অজ্ঞতা বা অক্ষমতার বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে নারীর পুরুষদের নামাজে ইমামতি সব ফকিহ সর্বাবস্থায় অবৈধ বলেছেন—এমন দাবি নির্ভুল নয়। তবে প্রধানধারার নিষেধাজ্ঞার তুলনায় এই অনুমতির মত সীমিত অবস্থানে ছিল এবং তার প্রয়োগের ক্ষেত্রও শর্তযুক্ত ছিল।
এই মতপার্থক্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, নারীর ধর্মীয় নেতৃত্বকে প্রকৃতিগতভাবে অসম্ভব বিবেচনা করার ধারণা ধ্রুপদী আইনশাস্ত্রের মধ্যেও সর্বজনস্বীকৃত ছিল না। কিছু আইনজ্ঞ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নারীকে পুরুষদের নামাজ পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন। অন্যদিকে অধিকাংশ ফকিহ সেই অনুমতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞার সীমারেখা নির্ধারণে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও আইনগত পদ্ধতির পার্থক্য কাজ করেছে। কোনো নারী কোরআন পাঠে অধিক দক্ষ হলেও কেবল নারী হওয়ার কারণে তাঁর ইমামতি প্রত্যাখ্যান করা হলে সেই সিদ্ধান্ত তাঁর দক্ষতার মূল্যায়ন নয়; বরং ধর্মীয় কর্তৃত্বে নারী ও পুরুষের জন্য ভিন্ন অধিকার নির্ধারণ।
রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা এবং নামাজের ইমামতি এক ধরনের দায়িত্ব নয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রে নারীর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একই হাদিস প্রয়োগ করার নজির পাওয়া যায়। পারস্যের নারী শাসক সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য থেকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, আবার সেই বক্তব্যকে ব্যবহার করে নারীর পুরুষদের নামাজ পরিচালনার অধিকারও অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় বক্তব্য বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতা ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয়েছে। এর পরিণতিতে নারীর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি ধর্মীয় আচার পরিচালনার ক্ষেত্রেও পুরুষের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নারীর সামরিক নেতৃত্ব ও নামাজের ইমামতির বিধানগুলো একত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্যমূলক কাঠামো প্রকাশ করে। সামরিক পেশায় নারীর শর্তসাপেক্ষ উপস্থিতি অনুমোদিত হলেও সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নারীদের নামাজে নারীর ইমামতির নজির ও অনুমতি থাকলেও পুরুষদের নামাজে তাঁর নেতৃত্ব প্রধানধারার ফিকহে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর নির্দিষ্ট কাজ করার সক্ষমতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়নি; কিন্তু পুরুষদের ওপর কিংবা বৃহৎ ক্ষমতার কাঠামোয় তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই বিধানগুলোর কেন্দ্রীয় সমস্যা নারীর সক্ষমতার অভাব নয়, বরং ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁর নারী পরিচয়কে প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যবহার করা। ব্যক্তি হিসেবে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে বিচার করলে নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারিত হবে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য দিয়ে; নারী বা পুরুষ হওয়ার পরিচয় দিয়ে নয়।
ইসলাম অনুসারে নারীরা স্বল্পবুদ্ধির? বুদ্ধিবৃত্তিক অযোগ্যতার ধর্মীয় ধারণা
নারীকে রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্তৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামি আইনশাস্ত্রে যেসব যুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তার সঙ্গে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্যের সম্পর্ক রয়েছে। সহিহ মুসলিম ও সহিহ বুখারির একাধিক বর্ণনায় নারীদের বুদ্ধি ও ধর্মীয় অনুশীলনে ঘাটতিসম্পন্ন বলা হয়েছে। এসব বক্তব্যে নারীকে কেবল পুরুষের তুলনায় পৃথক ধর্মীয় দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং তাঁদের বুদ্ধির ঘাটতির কথাও সরাসরি বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ১৪৫ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ নারীদের উদ্দেশে বলেছেন, বুদ্ধি ও ধর্মীয় অনুশীলনে ঘাটতিসম্পন্ন হয়েও তাঁরা বিচক্ষণ পুরুষদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। একজন নারী এই বক্তব্যের কারণ জানতে চাইলে মুহাম্মদ দুজন নারীর সাক্ষ্যকে একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমতুল্য গণনার বিধান এবং ঋতুস্রাবের সময় নামাজ ও রোজা থেকে বিরত থাকার বিষয়কে সেই ঘাটতির ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। একজন মানুষের প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে আইনগত সাক্ষ্যবিধান ও ধর্মীয় আচার পালনের পার্থক্য ব্যবহার করা হয়েছে।
এই বক্তব্যের মধ্যে একটি মৌলিক যুক্তিগত সমস্যা রয়েছে। কোনো ধর্মীয় আইন যদি নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনে দুজন নারীর সাক্ষ্যকে একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমতুল্য নির্ধারণ করে, তাহলে সেই আইনের অস্তিত্ব থেকে নারীরা প্রকৃতিগতভাবে পুরুষের অর্ধেক বুদ্ধিমান—এমন সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। সাক্ষ্যদানের বিধান একটি আইনগত নিয়ম; মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্ধারণের পরীক্ষা নয়। একজন ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি, যুক্তিবোধ, শিক্ষাগত দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য এবং অভিজ্ঞতা পরিমাপের জন্য বাস্তব তথ্য প্রয়োজন। কোরআনের সূরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতে নির্দিষ্ট ঋণসংক্রান্ত লেনদেনে সাক্ষীর যে বিন্যাস দেওয়া হয়েছে, তা কোনো নারী বিচারক, রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা প্রশাসকের ব্যক্তিগত দক্ষতা পরীক্ষার ফলাফল নয়। অথচ সেই ধর্মীয় বিধানকে নারীর বুদ্ধিগত ঘাটতির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে আইনগতভাবে আগে নির্ধারিত অসম অবস্থানকে নারীর প্রকৃতিগত অযোগ্যতার যুক্তিতে পরিণত করা হয়।
ঋতুস্রাবের কারণে ধর্মীয় অনুশীলনে ঘাটতির ব্যাখ্যাটিও একইভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ঋতুস্রাব নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। ইসলামি বিধানে ঋতুস্রাবের সময় নারীকে নামাজ থেকে বিরত থাকতে এবং রোজা স্থগিত করতে বলা হয়েছে। এই বিরতি নারীর নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে অনিচ্ছা কিংবা অযোগ্যতার প্রমাণ নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিধান অনুসরণের ফল। ধর্মীয় আইন নিজেই কোনো কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে সেই বিরতিকে নারীর ধর্মীয় ঘাটতির পরিচায়ক হিসেবে উপস্থাপন করলে ব্যক্তি তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং সেই বৈশিষ্ট্যসংক্রান্ত ধর্মীয় বিধানের কারণে অধস্তন মর্যাদায় স্থাপিত হন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ঋতুস্রাবের সময় নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালন না করা থেকে নারীর রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য, গবেষণা, শিক্ষা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অযোগ্যতা কোনোভাবেই অনুসরণ করে না।
নারীর বুদ্ধিগত ঘাটতির ধারণা যখন নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বৈষম্য একটি বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। প্রথমে নারীকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পুরুষের তুলনায় ঘাটতিসম্পন্ন হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এরপর রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারিক কর্তৃত্ব কিংবা বৃহৎ প্রশাসনিক দায়িত্বের জন্য বিশেষ বিচক্ষণতা প্রয়োজন—এই যুক্তি ব্যবহার করে নারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের দুটি ধাপের কোনোটিই সব নারীর নেতৃত্বের অযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। একজন নারী কতটা বিচক্ষণ, তা তাঁর ব্যক্তিগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য পরীক্ষা করে নির্ধারণ করতে হয়। নারী হওয়ার কারণে তাঁর বিচারবুদ্ধি অনিবার্যভাবে কম—এমন কোনো সর্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে একজন পুরুষের জন্মগত পরিচয় তাঁর বিচক্ষণতা বা ন্যায়বোধের নিশ্চয়তা দেয় না। যে ব্যবস্থায় নারীর অযোগ্যতা আগে থেকেই ধরে নিয়ে তাঁকে নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হয় না, সেই ব্যবস্থা তাঁর যোগ্যতার নিরপেক্ষ মূল্যায়নও করে না।
সহিহ বুখারির ১৪৬২ নম্বর হাদিসেও নারীদের বুদ্ধি ও ধর্মীয় অনুশীলনে অপরিপূর্ণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে নারীদের জাহান্নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার বক্তব্যের সঙ্গে স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা, অভিশাপ দেওয়া এবং বুদ্ধিগত ঘাটতির অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। একই বর্ণনার পরবর্তী অংশে একজন নারী নিজের সম্পদ থেকে দান করার বিষয়ে মুহাম্মদের কাছে প্রশ্ন করেছেন। এই বর্ণনায় নারীর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ধর্মীয় প্রশ্ন উত্থাপনের বাস্তব উপস্থিতিও পাওয়া যায়। ফলে নারীদের বুদ্ধিগত ঘাটতি সম্পর্কে সাধারণ বক্তব্য এবং নারীদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঐতিহাসিক উপস্থিতি একই ধর্মীয় বর্ণনাসমষ্টির মধ্যে বিদ্যমান। কোনো একটি লিঙ্গের সব সদস্য সম্পর্কে বুদ্ধিগত অযোগ্যতার সাধারণ ঘোষণা তাঁদের প্রত্যেকের বাস্তব সামর্থ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত প্রদান করে না।
মানুষের বুদ্ধিমত্তা, বিচারক্ষমতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা ব্যক্তিভেদে পৃথক। একজন যোগ্য নারী একজন অযোগ্য পুরুষের চেয়ে অধিক বিচক্ষণ হতে পারেন; একইভাবে একজন যোগ্য পুরুষও একজন অযোগ্য নারীর চেয়ে বেশি দক্ষ হতে পারেন। এই পার্থক্য ব্যক্তিগত সামর্থ্যের, লিঙ্গের অনিবার্য শ্রেষ্ঠত্ব বা অধস্তনতার নয়। কিন্তু নারীদের সামগ্রিকভাবে বুদ্ধিতে ঘাটতিসম্পন্ন গণ্য করে সেই ধারণাকে রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় ক্ষমতায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করলে নারীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা অস্বীকার করার একটি স্থায়ী ভিত্তি তৈরি হয়। এমন বিধান নারীর প্রকৃত সামর্থ্য পরীক্ষা করে না; বরং নারী হওয়ার পরিচয় থেকেই তাঁর সক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। এই কারণে বুদ্ধিগত ঘাটতিসংক্রান্ত হাদিসের বক্তব্য এবং তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নারীর অধস্তনতার ধারণা সমান মানবমর্যাদা, যুক্তিসঙ্গত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং বৈষম্যহীন নেতৃত্বের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক [20] [21]।
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছদঃ ৩৪. ইবাদতের ত্রুটিতে ঈমান হ্রাস পাওয়া এবং কুফর শব্দটি আল্লাহর সাথে কুফুরী ছাড়া নিয়ামত ও হুকুম অস্বীকার করার বেলায়ও প্রযোজ্য
১৪৫। মুহাম্মাদ ইবনু রুম্হ ইবনু মুহাজির আল মিসরি (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ হে রমনীগন! তোমরা দান-খয়রাত করতে থাক এবং বেশি করে ইস্তিগফার কর। কেননা আমি দেখেছি যে, জাহান্নামের অধিবাসীদের অধিকাংশই নারী। জনৈকা বুদ্ধিমতী মহিলা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! জাহান্নামে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণ কি? বললেন, তোমরা বেশি বেশি অভিসম্পাত করে থাকো এবং স্বামীর প্রতি (অকৃতজ্ঞতা) প্রকাশ করে থাকো। আর দ্বীন ও জ্ঞান-বুদ্ধিতে ক্রটিপূর্ণ কোন সম্প্রদায়, জ্ঞানীদের উপর তোমাদের চেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী আর কাউকে আমি দেখিনি।
প্রশ্নকারিনী জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! জ্ঞান-বুদ্ধি ও দ্বীনে আমাদের কমতি কিসে? তিনি বললেনঃ তোমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির ক্রটি হলো দু-জন স্ত্রীলোকের সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান; এটাই তোমাদের বুদ্ধির ক্রটির প্রমাণ। স্ত্রীলোক (প্রতিমাসে) কয়েকদিন সালাত (নামায/নামাজ) থেকে বিরত থাকে আর রমযান মাসে রোযা ভঙ্গ করে; (ঋতুমতী হওয়ার কারণে) এটাই দ্বীনের ক্রটি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ২৪/ যাকাত
পরিচ্ছদঃ ২৪/৪৪. নিকটাত্মীয়দেরকে যাকাত দেয়া।
১৪৬২. আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ঈদুল আযহা বা ঈদুল ফিত্রের দিনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহে গেলেন এবং সালাত শেষ করলেন। পরে লোকদের উপদেশ দিলেন এবং তাদের সদাকাহ দেয়ার নির্দেশ দিলেন আর বললেনঃ লোক সকল! তোমরা সদাকাহ দিবে। অতঃপর মহিলাগণের নিকট গিয়ে বললেনঃ মহিলাগণ! তোমরা সদাকাহ দাও। আমাকে জাহান্নামে তোমাদেরকে অধিক সংখ্যক দেখানো হয়েছে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এর কারণ কী? তিনি বললেনঃ তোমরা বেশি অভিশাপ দিয়ে থাক এবং স্বামীর অকৃতজ্ঞ হয়ে থাক।হে মহিলাগণ! জ্ঞান ও দ্বীনে অপরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দৃঢ়চেতা পুরুষের বুদ্ধি হরণকারিণী তোমাদের মত কাউকে দেখিনি। যখন তিনি ফিরে এসে ঘরে পৌঁছলেন, তখন ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ)-এর স্ত্রী যায়নাব (রাযি.) তাঁর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! যায়নাব এসেছেন। তিনি বললেন, কোন্ যায়নাব? বলা হলো, ইবনু মাস‘ঊদের স্ত্রী। তিনি বললেনঃ হাঁ, তাকে আসতে দাও। তাকে অনুমতি দেয়া হলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ আপনি সদাকাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার অলংকার আছে। আমি তা সদাকাহ করার ইচ্ছা করেছি। ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) মনে করেন, আমার এ সদাকায় তাঁর এবং তাঁর সন্তানদেরই হক বেশি। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) ঠিক বলেছে। তোমার স্বামী ও সন্তানই তোমার এ সদাকাহর অধিক হাক্দার। (৩০৪, মুসলিম ১২/২, হাঃ ৯৮২, আহমাদ ৭২৯৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৬৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৩৭৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মানবাধিকারের দৃষ্টিতে নারী নেতৃত্ব: সমান নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকার
একটি রাষ্ট্রে বসবাসকারী নারী ও পুরুষ উভয়েই সেই রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নীতি, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব বহন করেন। রাষ্ট্রের আইন প্রত্যেক নাগরিকের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে; করব্যবস্থা প্রত্যেকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও জনকল্যাণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নারী ও পুরুষ উভয়ের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতায় প্রবেশাধিকারও সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। একজন নারী রাষ্ট্রের সব আইন মেনে চলবেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবেন এবং শাসনব্যবস্থার সিদ্ধান্তের পরিণতি বহন করবেন, কিন্তু কেবল নারী হওয়ার কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পদ গ্রহণের সুযোগ পাবেন না—এমন ব্যবস্থা তাঁর নাগরিক মর্যাদাকে পুরুষের তুলনায় অধস্তন করে। নারীর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অধিকার কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি রাজনৈতিক সমতা এবং বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের মৌলিক অংশ।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশগ্রহণের অধিকারকে ব্যক্তির মৌলিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পদ পাওয়ার অধিকারী নন; কিন্তু সেই পদের জন্য উপযুক্ত যোগ্যতা অর্জন ও আইনগত শর্ত পূরণ করলে লিঙ্গের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থেকে বাদ পড়বেন না। রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক, মন্ত্রী, প্রশাসক কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সততা, পেশাগত দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট সাংবিধানিক যোগ্যতা প্রয়োজন হতে পারে। এসব শর্ত সংশ্লিষ্ট কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু একজন ব্যক্তি নারী হওয়ার কারণে তাঁর জন্য পদটি আগেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে তাঁর যোগ্যতা পরীক্ষার সুযোগই থাকে না। এটি যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বণ্টনে লিঙ্গভিত্তিক বাধা প্রতিষ্ঠা।
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা: রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ ও সরকারি পদে সমান প্রবেশাধিকার
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদের প্রথম অংশে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের দেশের সরকার পরিচালনায় সরাসরি অথবা স্বাধীনভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অংশগ্রহণের অধিকার বলা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে সরকারি চাকরি ও সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান প্রবেশাধিকারের কথা রয়েছে। তৃতীয় অংশে জনগণের ইচ্ছাকে সরকারের কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেই ইচ্ছা প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট বিরতিতে প্রকৃত নির্বাচন, সর্বজনীন ও সমান ভোটাধিকার এবং গোপন ভোটদানের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ কেবল শাসকের অনুগ্রহের বিষয় নয়; নাগরিকের অধিকার এবং জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। অনুচ্ছেদটির দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে [22]—
Everyone has the right of equal access to public service in his country.
বাংলা অনুবাদ: প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের দেশে সরকারি দায়িত্ব ও সরকারি চাকরিতে সমানভাবে প্রবেশের অধিকার রয়েছে।
এই বিধানের তাৎপর্য বিচারক, মন্ত্রী, প্রশাসক এবং রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পদে প্রবেশাধিকার সমান হওয়া বলতে সবাইকে একই পদে নিয়োগ দিতে হবে, এমন বোঝায় না। এর অর্থ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পদের জন্য প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিসঙ্গত যোগ্যতার শর্ত পূরণের সুযোগ সবার জন্য সমান থাকতে হবে। একজন নারী প্রয়োজনীয় শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করার পরও কেবল নারী হওয়ার কারণে সরকারি পদে আবেদন কিংবা নিয়োগের সুযোগ না পেলে তাঁর এই সমান প্রবেশাধিকার লঙ্ঘিত হয়। রাষ্ট্রপ্রধান বা বিচারকের পদ কেবল পুরুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিধান এই নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ একজন পুরুষ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করলে সংশ্লিষ্ট পদে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান, কিন্তু একই যোগ্যতার একজন নারী আগেই অযোগ্য ঘোষিত হন।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব জনগণের ইচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নীতির সঙ্গেও নারী নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞার বিরোধ রয়েছে। একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যদি কোনো নারীকে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত মনে করেন এবং তাঁকে নির্বাচিত করতে চান, তাহলে কেবল তাঁর নারী পরিচয়ের কারণে সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা অস্বীকার করা জনগণের রাজনৈতিক পছন্দের ওপর একটি ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ পুরুষ কিংবা নারী—উভয় ধরনের যোগ্য প্রার্থীর মধ্য থেকে নিজের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার রাখেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা শুধুমাত্র পুরুষের জন্য সংরক্ষিত হলে ভোটারদের সামনে যোগ্য প্রার্থীর একটি সম্পূর্ণ শ্রেণিকে আগেই বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে নারী শুধু নিজে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন না; জনগণেরও একজন যোগ্য নারীকে নির্বাচন করার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।
নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ: রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারীর সমান অধিকার
১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘে গৃহীত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ নারীর রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি। এই সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোকে রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদটিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, নারীর সব ধরনের নির্বাচন ও গণভোটে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচিত হওয়ার সমান অধিকার। দ্বিতীয়ত, সরকারি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের সব স্তরে সরকারি পদ গ্রহণ ও দায়িত্ব পালনের অধিকার। তৃতীয়ত, দেশের রাজনৈতিক ও জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বেসরকারি সংগঠন ও সমিতিতে অংশগ্রহণের অধিকার। এসব অধিকার নারীকে কেবল ভোটার হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক, নির্বাচিত প্রতিনিধি, প্রশাসক এবং জনজীবনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে সমান মর্যাদা দেয়। সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় সরকারি পদ গ্রহণ ও রাষ্ট্রের সব স্তরে দায়িত্ব পালনের অধিকার নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে [23]—
to hold public office and perform all public functions at all levels of government
বাংলা অনুবাদ: সরকারি পদ গ্রহণ করা এবং সরকারের সব স্তরে সব ধরনের সরকারি দায়িত্ব পালন করা।
সনদের এই বিধান ইসলামি আইনশাস্ত্রে নারীর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। ধ্রুপদী প্রধানধারার ফিকহে নারীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মাওয়ার্দির মন্ত্রিত্ব ও প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্বের বিধানে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পদের শর্ত সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিচারকের পদেও বহু ফকিহ পুরুষ হওয়াকে যোগ্যতার শর্ত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আধুনিক ইসলামি ফতোয়ায় রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক, মন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর প্রধানের মতো পদে নারীকে নিষিদ্ধ করার বক্তব্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ সরকারি কর্তৃত্বের সব স্তরে নারীর সমান অংশগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য কেবল কোনো বিশেষ পদে নিয়োগের শর্ত নিয়ে নয়; ক্ষমতায় প্রবেশের ক্ষেত্রে নারীকে সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না, সেই মৌলিক প্রশ্নে।
সনদের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে নারীর আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে। সেখানে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোকে নারী ও পুরুষের সমান শর্তে এবং বৈষম্য ছাড়া নারীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনের কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের পক্ষে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই বিধান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা প্রকাশ করে: রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে, তাঁর নারী পরিচয়ের ওপর নয়। কোনো নারী কূটনৈতিকভাবে দক্ষ, আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হলেও শুধু নারী হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া হলে তা সমান রাজনৈতিক অধিকারের নীতির বিরোধী।
নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নারী ও পুরুষের সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত পূর্বধারণা দূর করার দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে একটি লিঙ্গ অন্যটির তুলনায় স্বভাবগতভাবে শ্রেষ্ঠ কিংবা অধস্তন—এমন ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণ পরিবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা রয়েছে। এই বিধানের সঙ্গে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। নারীরা প্রকৃতিগতভাবে দুর্বল, তাঁদের বুদ্ধি কম, তাঁরা বড় দায়িত্ব বহন করতে পারেন না কিংবা তাঁদের স্বাভাবিক অবস্থান পুরুষের অধীন—এসব ধারণা নারীকে উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতা থেকে বাদ দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু কোনো গোটা লিঙ্গের ওপর অযোগ্যতার ধারণা আরোপ করা ব্যক্তির প্রকৃত সামর্থ্য পরীক্ষা করার বিকল্প নয়। নারীর নেতৃত্বের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য শুধু আইনি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার যথেষ্ট নয়; নারীকে অযোগ্য বা অধস্তন হিসেবে গণ্য করার সামাজিক পূর্বধারণাও বৈষম্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি: রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান অংশগ্রহণ
১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকদের অংশগ্রহণের অধিকার আরও নির্দিষ্টভাবে স্বীকৃত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক অযৌক্তিক বিধিনিষেধ ও বৈষম্য ছাড়া সরাসরি বা স্বাধীনভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। তাঁদের প্রকৃত ও নিয়মিত নির্বাচনে ভোট দেওয়া এবং নির্বাচিত হওয়ার অধিকার থাকবে। পাশাপাশি সরকারি দায়িত্ব ও সরকারি চাকরিতে সমানভাবে প্রবেশের অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে। অনুচ্ছেদটির সূচনায় বলা হয়েছে [24]—
Every citizen shall have the right and the opportunity, without any of the distinctions mentioned in article 2 and without unreasonable restrictions
বাংলা অনুবাদ: প্রত্যেক নাগরিকের এই অধিকার ও সুযোগ থাকবে, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে উল্লিখিত কোনো বৈষম্য এবং অযৌক্তিক বিধিনিষেধ ছাড়াই।
এই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে যেসব বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তার মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও রয়েছে। ফলে ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধিকারগুলো নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। এই নীতির অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় পদে প্রবেশের জন্য বয়স, পেশাগত অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য শর্ত নির্ধারণ করা যেতে পারে; কিন্তু সেই শর্তগুলো যুক্তিসঙ্গত ও বৈষম্যহীন হতে হবে। একজন নারী বিচারক হওয়ার প্রয়োজনীয় আইনগত যোগ্যতা অর্জন করেছেন, কিন্তু নারী হওয়ার কারণে তাঁর নিয়োগ নিষিদ্ধ—এমন ব্যবস্থা ব্যক্তিগত যোগ্যতার পরিবর্তে লিঙ্গকে অযোগ্যতার শর্তে পরিণত করে। একইভাবে একজন নারী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাংবিধানিক যোগ্যতা পূরণ করলেও ধর্মীয় বিধানের কারণে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সুযোগ না দেওয়া হলে তাঁর সমান রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশগ্রহণের অধিকার কেবল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইন প্রণয়ন, সরকারি নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিচারিক দায়িত্ব পালন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার সুযোগও রাজনৈতিক ও জনজীবনের সমতার অংশ। একজন নারী ভোট দিতে পারবেন কিন্তু নিজে রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবেন না—এমন ব্যবস্থা সমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পূর্ণ স্বীকৃতি নয়। একইভাবে তিনি সরকারি নীতি মেনে চলবেন কিন্তু সেই নীতি প্রণয়নের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না—এমন বিধান তাঁকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধস্তন অবস্থানে রাখে। নাগরিক হিসেবে নারী ও পুরুষের দায়িত্ব সমানভাবে কার্যকর হলে ক্ষমতায় প্রবেশের সুযোগও অযৌক্তিক লিঙ্গগত বাধামুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
যোগ্যতা ও লিঙ্গের পার্থক্য: নেতৃত্বের অধিকার নির্ধারণের নৈতিক ভিত্তি
নারী নেতৃত্বের ওপর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কঠিন প্রকৃতি, নারীর শারীরিক দুর্বলতা, ঋতুস্রাব, মাতৃত্ব কিংবা পুরুষের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে মেলামেশার প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এসব বিষয় থেকে সব নারীর নেতৃত্বের অযোগ্যতা প্রমাণিত হয় না। কোনো দায়িত্বে বিশেষ শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন হলে সেই সক্ষমতার বাস্তব মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায়। কোনো পদে বিশেষ আইনগত জ্ঞান প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট শিক্ষা ও পরীক্ষার শর্ত আরোপ করা যায়। প্রশাসনিক দায়িত্বে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হলে সেই অভিজ্ঞতা যাচাই করা যায়। এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির যোগ্যতা কাজের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা সম্ভব। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে সব নারীকে আগেই বাদ দেওয়া হলে তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সামর্থ্য সম্পর্কে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই একটি সাধারণ অযোগ্যতার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মাতৃত্ব কিংবা ঋতুস্রাবের মতো শারীরিক বাস্তবতাকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অযোগ্যতার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে নারীর স্বাভাবিক জৈবিক বৈশিষ্ট্যকেই অধিকার সংকোচনের ভিত্তিতে পরিণত করা হয়। অথচ রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক কিংবা প্রশাসকের দায়িত্বের মধ্যে এমন অসংখ্য কাজ রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে এসব শারীরিক প্রক্রিয়ার কোনো অনিবার্য বিরোধ নেই। গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মদানের সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ছুটি এবং দায়িত্ব বণ্টনের ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু সম্ভাব্য মাতৃত্বের কারণে সব নারীকে স্থায়ীভাবে উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া যৌক্তিক নয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও অসুস্থতা, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব থাকতে পারে। এসব কারণে সমগ্র পুরুষজাতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্য ঘোষণা করা হয় না। নারী ও পুরুষের জন্য সমান মানদণ্ড প্রয়োগ করলে দায়িত্ব পালনের ব্যক্তিগত সামর্থ্যই প্রাসঙ্গিক হবে, কোনো গোটা লিঙ্গের ওপর আরোপিত পূর্বধারণা নয়।
ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে নারীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বাদ দেওয়ার আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত একটি ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাস প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রের আইন ও নীতি নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর কার্যকর, কিন্তু সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা শুধু পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত হলে নারী সমান রাজনৈতিক অধিকার হারান। একইভাবে বিচারিক ক্ষমতা শুধু পুরুষের জন্য নির্ধারিত হলে একজন নারী আইনশাস্ত্রে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেও বিচারক হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এই বিধানগুলোতে নারীর ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করছেন ধর্মীয় আইনজ্ঞ বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ; সংশ্লিষ্ট নারীর প্রকৃত যোগ্যতা কিংবা জনগণের রাজনৈতিক পছন্দ সেই সীমারেখা অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট নয়। এর ফলে নাগরিক অধিকারের ওপর ধর্মীয় লিঙ্গবিভাজনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
নারী নেতৃত্বের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক নীতি হচ্ছে, কোনো ব্যক্তিকে তাঁর পরিচয়ের কারণে আগেই অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে না। প্রত্যেক প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা এবং দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একজন নারী দুর্নীতিগ্রস্ত, অযোগ্য কিংবা স্বৈরাচারী হলে তাঁর সমালোচনা ও অপসারণের ন্যায়সংগত ভিত্তি থাকতে পারে; একই মানদণ্ড পুরুষ শাসকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু একজন নারী কেবল নারী হওয়ার কারণে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না—এমন বিধান তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। এটি সমগ্র নারীজাতিকে একটি পূর্বনির্ধারিত অধস্তন শ্রেণিতে স্থাপন করে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ এই ধরনের লিঙ্গগত বাধার বিপরীতে সমান নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো লিঙ্গের জন্মগত সম্পত্তি নয়। একজন ব্যক্তি নারী বা পুরুষ হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের স্বাভাবিক অধিকারী কিংবা স্বাভাবিকভাবে অযোগ্য হয়ে ওঠেন না। নেতৃত্বের পদে নিয়োগ ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত ভিত্তি হচ্ছে যোগ্যতা, আইনসম্মত শর্ত এবং জনগণের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। ইসলামি হাদিসের নারী নেতৃত্বে জাতির ব্যর্থতার ঘোষণা এবং তার ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রধানধারার ফিকহি নিষেধাজ্ঞা এই নীতির বিরোধী। সেখানে একজন নারীর যোগ্যতা মূল্যায়নের আগেই তাঁর নারী পরিচয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রবেশের বাধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি শুধু নারীর ব্যক্তিগত সম্ভাবনা সীমিত করে না; রাষ্ট্র ও সমাজকে যোগ্য ব্যক্তিদের একটি বৃহৎ অংশের নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করার ব্যবস্থাও তৈরি করে। লিঙ্গের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অসম বণ্টন মানুষের সমান মর্যাদা, বৈষম্যহীন নাগরিকত্ব এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে নারীর বাস্তব নেতৃত্ব ও সক্ষমতা
নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ইসলামি হাদিস ও ফিকহি বিধানে যে নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার মৌলিক ভিত্তি নারীকে উচ্চপর্যায়ের কর্তৃত্ব গ্রহণের জন্য অনুপযুক্ত মনে করা। নারীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য, বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য সম্পর্কে ধর্মীয় ধারণা, পুরুষের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে মেলামেশা এবং বৃহৎ দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন ফতোয়ায় আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা কেবল পুরুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়। এসব গুণ অর্জিত হয় শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। নারী হওয়ার কারণে একজন মানুষের এসব দক্ষতা অর্জন অসম্ভব হয়ে যায় না। একইভাবে পুরুষ হওয়ার কারণে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক, মন্ত্রী কিংবা সেনাপ্রধান হয়ে ওঠেন না। যে বিধান ব্যক্তির যোগ্যতা পরীক্ষার পরিবর্তে তাঁর লিঙ্গকে অযোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে, সেটি বাস্তব সক্ষমতার মূল্যায়ন নয়; বরং ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট অংশকে পুরুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা।
আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীরা বৃহৎ রাষ্ট্র, জটিল প্রশাসন এবং গুরুতর রাজনৈতিক সংকট পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো এবং বাংলাদেশের খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হয় তাঁদের বাস্তব সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে। তাঁদের নারী পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের গুণগত মান নির্ধারণ করা যায় না। নারীদের বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস অন্তত এটুকু স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করে যে, নারী হওয়া রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ ও শাসনক্ষমতা প্রয়োগের স্বয়ংক্রিয় প্রতিবন্ধক নয়।
কোনো নারী শাসক ব্যর্থ হয়েছেন বলে সব নারীকে নেতৃত্বের অযোগ্য ঘোষণা করা হলে একই যুক্তিতে অসংখ্য ব্যর্থ পুরুষ শাসকের কারণে সমগ্র পুরুষজাতিকেও নেতৃত্বের অযোগ্য ঘোষণা করতে হয়। অথচ বাস্তবে এমন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয় না। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামরিক পরাজয়, দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস কিংবা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের দায় সংশ্লিষ্ট শাসক ও শাসনব্যবস্থার ওপর বর্তায়। নারীর ক্ষেত্রে সেই দায়কে সমগ্র লিঙ্গের অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা একই বিষয়ে দ্বৈত মানদণ্ড প্রয়োগের সমতুল্য। রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে পারে বাস্তব ফলাফল এবং দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা; নারী বা পুরুষ হওয়ার পরিচয় নয়।
ইসলামি ফতোয়ায় নারীর ক্ষমতার সীমারেখা এবং সামাজিক পরিণতি
নারীর নেতৃত্বসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শুধু ধ্রুপদী আইনশাস্ত্রের গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক ইসলামি ফতোয়াতেও রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, বিচারক এবং অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের পদে নারীর নিয়োগ অস্বীকার করা হয়েছে। ইসলামওয়েবের ৯৬৪৩২ নম্বর ফতোয়া এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২০০৭ সালের ২৯ মে প্রকাশিত এই ফতোয়ায় প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, যে জাতি নারীর হাতে শাসনভার অর্পণ করে তারা সফল হবে না—মুহাম্মদের এই বক্তব্যের অর্থ কী। উত্তরে সরাসরি বলা হয়েছে, নারীর জন্য বৃহৎ দায়িত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদ গ্রহণ করা বৈধ নয়। রাষ্ট্রের শাসক, মন্ত্রী ও বিচারকের মতো পদকে এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা, নির্জনে অবস্থানের সম্ভাবনা এবং নারীর প্রকৃতির অনুপযুক্ত বৃহৎ দায়িত্ব পালনের ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ফতোয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, নারীর জন্য বড় ও ছোট দায়িত্বের মধ্যে একটি ধর্মীয় সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যালয় বা হাসপাতাল পরিচালনার মতো দায়িত্ব নারীর পক্ষে পালন করা সম্ভব বলে স্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের শাসক, মন্ত্রী কিংবা বিচারকের পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ নারী প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম—এই বাস্তব সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়নি; বরং সেই সক্ষমতার স্বীকৃতিকে ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে দেওয়া হয়েছে। একজন নারী একটি প্রতিষ্ঠান দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবেন, কিন্তু বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর নারী পরিচয় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এতে ব্যক্তিগত যোগ্যতার চেয়ে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার সীমাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফতোয়াটির সম্পূর্ণ বক্তব্য নিম্নরূপ [25]—
People who appoint a woman as their leader will never succeed
Fatwa No: 96432
Fatwa Date:29-5-2007 – Jumaadaa Al-Oula 13, 1428
Question
What does the Messenger of God (saas) mean when he says, “Any community ruled by a woman will never succeed?” Jazaakum Allahu Khairan.
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ) is His slave and Messenger.
The Prophet sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ) said: “A people who appoint a woman as their leader will never succeed.” (Al-Bukhari). This narration means that it is not permissible for a woman to lead positions of great responsibility, like being a Muslim ruler, a minister, or a judge and the like, as this leads her to mix and be in seclusion with men, and bear great responsibilities which does not befit the nature of a woman.
As regards the small positions which a woman can efficiently run and bear, and in which her responsibility is limited, then it is permissible for her to hold these positions, like running a hospital or a school. For instance ‘Umar may Allaah be pleased with him appointed Ash-Shifaa’ bint ‘Abdullaah Al-‘Adawiyyah may Allaah be pleased with her as an accountant for Al-Madeenah market. Ibn Hajar may Allaah have mercy upon him reported this in a biography about Ash-Shifaa’ may Allaah be pleased with her and ‘Aa’ishah may Allaah be pleased with her was appointed to take care of orphans.
Allaah Knows best.
বাংলা অনুবাদ: যে জাতি নারীকে নিজেদের শাসক নিযুক্ত করে, তারা কখনো সফল হবে না।
ফতোয়া নম্বর: ৯৬৪৩২। তারিখ: ২৯ মে ২০০৭।
প্রশ্ন: আল্লাহর রাসুল যখন বলেছেন, ‘যে জাতি নারীর শাসনাধীন হয়, তারা কখনো সফল হবে না’, তখন তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল। মুহাম্মদ বলেছেন, ‘যে জাতি কোনো নারীকে নিজেদের নেতা নিযুক্ত করে, তারা কখনো সফল হবে না।’ বুখারি এই হাদিস বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনার অর্থ হচ্ছে, নারীর জন্য বৃহৎ দায়িত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদ গ্রহণ করা বৈধ নয়; যেমন মুসলিম শাসক, মন্ত্রী, বিচারক কিংবা অনুরূপ পদ। কারণ এসব দায়িত্ব পালনের ফলে তাঁকে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়, তাঁদের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করতে হতে পারে এবং এমন গুরুতর দায়িত্ব বহন করতে হয়, যা নারীর প্রকৃতির উপযুক্ত নয়। তবে যেসব অপেক্ষাকৃত ছোট দায়িত্ব একজন নারী দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা ও বহন করতে পারেন এবং যেখানে তাঁর দায়িত্ব সীমিত, সেসব পদ গ্রহণ তাঁর জন্য বৈধ। যেমন হাসপাতাল বা বিদ্যালয় পরিচালনা করা। উদাহরণস্বরূপ, উমর শিফা বিনতে আবদুল্লাহ আল-আদাবিয়্যাকে মদিনার বাজারের হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ইবনে হাজার শিফার জীবনীতে এই ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আয়িশাকেও এতিমদের দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
ফতোয়ার মূল বক্তব্যে নারীর প্রতি বৈষম্য কোনো অস্পষ্ট ইঙ্গিত নয়। সেখানে সরাসরি বলা হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব নারীর প্রকৃতির উপযুক্ত নয় এবং তাই তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী বা বিচারক হতে পারবেন না। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে একজন নারী প্রয়োজনীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করলেও তাঁর যোগ্যতা যাচাইয়ের আগেই সংশ্লিষ্ট পদ গ্রহণের অধিকার অস্বীকার করা হয়। একই প্রতিষ্ঠানে একজন নারী অপেক্ষাকৃত ছোট দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, কিন্তু আরও বৃহৎ ক্ষমতা ও দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর পথ বন্ধ হতে পারে। নারী নেতৃত্বের এই বিধান ক্ষমতার একটি স্তর পর্যন্ত নারীর উপস্থিতিকে অনুমোদন করে, কিন্তু ক্ষমতার উচ্চতর স্তরকে পুরুষের জন্য সংরক্ষিত রাখে।
এই ধরনের ফতোয়া বাস্তব আইন ও প্রশাসনে প্রয়োগ করা হলে নারীর রাজনৈতিক ও পেশাগত অগ্রগতির ওপর সরাসরি বাধা তৈরি হতে পারে। একজন নারী মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন, বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করেও বাদ পড়তে পারেন কিংবা উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বের জন্য বিবেচিত না হতে পারেন। এর ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট নারীর ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না; রাষ্ট্রও তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ হারায়। নারীর জন্য নির্ধারিত অপেক্ষাকৃত সীমিত দায়িত্বকে তাঁর স্বাভাবিক উপযুক্ততা বলে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এই ক্ষমতার অসম বণ্টনকে স্থায়ী সামাজিক নিয়মে পরিণত করা সম্ভব হয়।
ইসলামি ইতিহাসে নারীর নেতৃত্ব: বাস্তব ঘটনা ও ধর্মীয় বিধানের সংঘাত
ইসলামের ইতিহাসে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। এই ঘটনাগুলো থেকে দুটি পৃথক বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমত, নারীরা বাস্তবে সম্পদ পরিচালনা করেছেন, জ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, রাজনৈতিক সংঘাতে অংশ নিয়েছেন এবং কোনো কোনো সময়ে রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতাও গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, এসব ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে বলেই প্রতিটি ঘটনা ধ্রুপদী ইসলামি আইনশাস্ত্রে অনুমোদিত ছিল, এমন সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে না। বাস্তবে কোনো কাজ সংঘটিত হওয়া এবং ধর্মীয় বিধানে সেই কাজের বৈধতা স্বীকৃত হওয়া পৃথক প্রশ্ন। নারীর নেতৃত্বসংক্রান্ত বিতর্কে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইতিহাসে নারীর বাস্তব সক্ষমতার নজির থাকা সত্ত্বেও প্রধানধারার ফিকহে তাঁদের উচ্চপর্যায়ের কর্তৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
খাদিজার ব্যবসায়িক সাফল্য: ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী নারীর অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব
খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই মক্কার একজন প্রতিষ্ঠিত ও সম্পদশালী ব্যবসায়ী ছিলেন। ইসলামের প্রাথমিক জীবনীবিষয়ক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি নিজের অর্থ ও সম্পদ দিয়ে বাণিজ্য পরিচালনা করতেন এবং বাণিজ্যিক কাজে পুরুষদের নিয়োগ দিতেন। মুহাম্মদও নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে তাঁর ব্যবসার কাজে যুক্ত ছিলেন। এই তথ্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্য হচ্ছে, ইসলামের প্রচারের আগে মক্কার সামাজিক বাস্তবতায় অন্তত কিছু নারী সম্পদের মালিকানা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। খাদিজার সাফল্যকে ইসলামের প্রতিষ্ঠিত নারীবিষয়ক বিধানের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না, কারণ তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠা ইসলাম প্রচারের আগেই ঘটেছিল। তাঁর সম্পদ, বাণিজ্যিক পরিচিতি এবং পুরুষ কর্মী নিয়োগের ক্ষমতা সেই পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক অবস্থানের অংশ ছিল।
খাদিজার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, ইসলামের আবির্ভাবের আগেও নারীর সম্পদ পরিচালনা, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পুরুষ কর্মী নিয়োগের বাস্তব নজির ছিল। ফলে নারীর অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব কিংবা ব্যবসায়িক নেতৃত্ব ইসলাম প্রথমবারের মতো সৃষ্টি করেছে—এমন সাধারণ দাবি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
খাদিজার ব্যবসায়িক নেতৃত্বের সঙ্গে পরবর্তী ফিকহে নারীর উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বের নিষেধাজ্ঞা তুলনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। একজন নারী নিজের সম্পদ বিনিয়োগ করতে পারেন, ব্যবসার জন্য লোক নিয়োগ করতে পারেন এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু বৃহৎ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর নারী পরিচয়কে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যবসার মালিকানা এবং রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা অভিন্ন নয়, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও মানুষের কাজ সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। ব্যক্তিগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ক্ষমতার স্তর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে নারীর জন্য নতুন লিঙ্গগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তার ভিত্তি নারীর বাস্তব সক্ষমতা নয়, বরং ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত কর্তৃত্বের সীমারেখা।
আয়িশার উষ্ট্রের যুদ্ধ: রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আবু বকরার আপত্তি ও পরবর্তী অনুশোচনা
৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দের উষ্ট্রের যুদ্ধে আয়িশা আলীর বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি ও রাজনৈতিক ভূমিকা মুসলিম ইতিহাসে নারীর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি সুপরিচিত ঘটনা। একই সময়ে আবু বকরা তাঁর পক্ষের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেছেন মুহাম্মদের সেই বক্তব্যের মাধ্যমে, যেখানে নারীর হাতে শাসনভার অর্পণকারী জাতির ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে। সহিহ বুখারি ৪৪২৫ ও ৭০৯৯ এবং সুনান আত-তিরমিজি ২২৬২-এ আবু বকরার এই অবস্থান সংরক্ষিত রয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আয়িশার রাজনৈতিক ভূমিকা বাস্তবে সংঘটিত হলেও নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বক্তব্য সেই যুগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
আয়িশার পরবর্তী অনুশোচনার বিবরণও ইসলামি ঐতিহাসিক গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। হাকিমের আল-মুস্তাদরাক-এ আয়িশার নামে এমন বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, ইবনে যুবাইরের সঙ্গে সেই অভিযানে না গিয়ে হারিস ইবনে হিশামের মতো দশ সন্তান হারানোও তাঁর কাছে শ্রেয় হতো। ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক অভিযানে অংশগ্রহণ সম্পর্কে গভীর অনুশোচনার সাক্ষ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এই বর্ণনা পরবর্তী ইসলামি ঐতিহাসিক আলোচনাতেও উদ্ধৃত হয়েছে [26]।
আয়িশার অনুশোচনার ঘটনা তাঁর নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়নের জন্য প্রাসঙ্গিক। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করা এবং সব নারীকে সব ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। একইভাবে আবু বকরার সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে; সেটিকে সব সাহাবির অভিন্ন অবস্থান হিসেবে গণ্য করা যায় না। এখানে বাস্তব ঐতিহাসিক তথ্য হচ্ছে, আয়িশা রাজনৈতিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, আবু বকরা নারী নেতৃত্বসংক্রান্ত হাদিস স্মরণ করে তাঁর পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেননি এবং পরবর্তী বর্ণনায় আয়িশার অনুশোচনার কথা পাওয়া যায়। এই ঘটনাগুলো নারীর বাস্তব রাজনৈতিক ভূমিকা ও ধর্মীয় নেতৃত্ববিধানের মধ্যকার সংঘাত প্রকাশ করে।
শিফা বিনতে আবদুল্লাহ: বাজার তদারকির দায়িত্ব এবং ঐতিহাসিক বর্ণনার সীমা
উমরের শাসনামলে শিফা বিনতে আবদুল্লাহর বাজারসংক্রান্ত দায়িত্বের বিবরণ নারীর প্রশাসনিক ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইসলামওয়েবের ৯৬৪৩২ নম্বর ফতোয়ায় বলা হয়েছে, উমর তাঁকে মদিনার বাজারের হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইসলামওয়েবের ৫১৯০১ নম্বর ফতোয়ায় তাহজিবুল কামাল, তাহজিবুত তাহজিব এবং আল-ইসাবা গ্রন্থের জীবনীসংক্রান্ত তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, উমর শিফার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন, তাঁকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং সম্ভবত বাজারের কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। এই বিবরণে নিয়োগের সম্ভাবনার উল্লেখ আছে, কিন্তু তার দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট পরিধি সম্পর্কে একই মাত্রার নিশ্চিত তথ্য নেই। তাই শিফাকে আধুনিক অর্থে পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন বাজার কমিশনার কিংবা রাষ্ট্রীয় বিচারক হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ইসলামওয়েব নিজেই শিফার বাজারসংক্রান্ত দায়িত্বের ঐতিহাসিক বর্ণনা স্বীকার করেও সেটিকে নারীর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বা বিচারিক কর্তৃত্বের বৈধতার দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। ৫১৯০১ নম্বর ফতোয়ায় বলা হয়েছে, শিফার বাজারসংক্রান্ত দায়িত্বের ঘটনা জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত থাকলেও তা নারীকে বৃহৎ শাসনকর্তৃত্ব বা বিচারকের পদ দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট দলিল নয়। এরপর আবার সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার জন্য পুরুষ হওয়ার শর্ত এবং অধিকাংশ ফকিহের বিচারিক নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করা হয়েছে [27]।
অর্থাৎ শিফার বাজারসংক্রান্ত ভূমিকা স্বীকার করলেও উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নারীর প্রবেশাধিকার স্বীকার করা হয়নি। এর মাধ্যমে ধর্মীয় কর্তৃত্বের স্তরভিত্তিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। একজন নারী নির্দিষ্ট প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন, কিন্তু বৃহৎ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব গ্রহণের জন্য পুরুষ হওয়াকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বজায় রাখা হয়। শিফা উমরের একই গোত্রের সদস্য ছিলেন—এ তথ্য থেকে তাঁর নিয়োগের কারণ আত্মীয়তা ছিল, এমন সিদ্ধান্তও প্রতিষ্ঠিত হয় না। সেই উদ্দেশ্য বা কারণের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রয়োজন। শিফার ঘটনাটির প্রকৃত গুরুত্ব তাঁর সম্ভাব্য প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্বের সীমা নির্ধারণে পরবর্তী ফকিহদের অবস্থানের মধ্যে নিহিত।
কোরআনে সাবার নারী শাসক: রাজনৈতিক পরামর্শ, সামরিক মূল্যায়ন ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত
নারীর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রশ্নে কোরআনের সূরা নামলের ২৩ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত সাবার নারী শাসকের ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই নারী শাসককে পরবর্তী ইসলামি বর্ণনায় বিলকিস নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোরআনের ২৭:২৩ আয়াতে তাঁকে একটি জাতির শাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাঁর বিপুল সম্পদ ও বিশাল সিংহাসন ছিল। পরবর্তী আয়াতগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিবরণ রয়েছে। সুলাইমানের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর তিনি নিজের সভাসদদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ২৭:৩২ আয়াতে তিনি জানান, সভাসদদের উপস্থিতি ও পরামর্শ ছাড়া তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না। ২৭:৩৩ আয়াতে সভাসদরা নিজেদের সামরিক শক্তির কথা উল্লেখ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব তাঁর হাতে ন্যস্ত করেন। ২৭:৩৪ আয়াতে তিনি সামরিক আক্রমণের ধ্বংসাত্মক পরিণতি মূল্যায়ন করেন এবং ২৭:৩৫ আয়াতে দূত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে কোরআনের বিবরণেই একজন নারী শাসকের রাজনৈতিক পরামর্শ গ্রহণ, সামরিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের নজির পাওয়া যায় [28]।
এই বিবরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি রয়েছে। সহিহ বুখারিতে নারীর হাতে শাসনভার অর্পণকারী জাতির ব্যর্থতা ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে কোরআনের নিজস্ব বিবরণে একজন নারী শাসককে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, সভাসদদের পরামর্শ গ্রহণকারী এবং সামরিক সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নারী শাসক হওয়ার কারণে তাঁর রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি অনিবার্যভাবে ব্যর্থ হবে—এমন ধারণার সমর্থন কোরআনের এই বিবরণে নেই। বরং নারী হওয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অনিবার্য বিরোধ নেই, এই সম্ভাবনা কোরআনের বর্ণনার মধ্যেই উপস্থিত।
সাবার নারী শাসকের ঘটনা ইসলামে নারী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার একটি স্পষ্ট আইনগত অনুমোদন কি না, সেটি পৃথক ফিকহি প্রশ্ন। একটি ঘটনার কোরআনিক বিবরণ এবং পরবর্তী আইনগত অনুমোদন অভিন্ন নয়। কিন্তু ঘটনাটিকে বাদ দিয়ে নারী শাসন সম্পর্কে কেবল ব্যর্থতার সর্বজনীন ঘোষণাকে উপস্থাপন করলে কোরআনের নিজস্ব নারী শাসকের বিবরণ আলোচনার বাইরে থেকে যায়। এখানে মূল যুক্তিগত প্রশ্ন হচ্ছে, নারীর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যে প্রকৃতিগত অযোগ্যতার ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে, তা এই নারী শাসকের পরামর্শভিত্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিবরণের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মুসলিম ইতিহাসে নারী শাসক: রাজিয়া সুলতানা ও শাজারাতুদ দুর
মুসলিম ইতিহাসেও নারীর সরাসরি রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা গ্রহণের নজির রয়েছে। দিল্লি সালতানাতের রাজিয়া সুলতানা ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি শুধু কোনো শাসকের স্ত্রী বা রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেননি; নিজেই দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে অভিজাত গোষ্ঠীর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক নিয়োগ এবং বিদ্রোহের মতো রাজনৈতিক সংঘাত ঘটেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে নারীর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃতিগত অযোগ্যতা অনুসরণ করে না। রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও অভিজাত গোষ্ঠীর ক্ষমতার সংঘাত পুরুষ শাসকদের ক্ষেত্রেও ঘটে। রাজিয়ার শাসনকাল প্রমাণ করে, মুসলিম ইতিহাসে একজন নারী সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বাস্তবে গ্রহণ করেছিলেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার শাসক হিসেবে কাজ করেছিলেন [29]।
মিসরের শাজারাতুদ দুরের ঘটনাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডের সামরিক সংকট ও আইয়ুবি শাসনব্যবস্থার ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন। ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মিসরের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং স্বল্প সময়ের জন্য সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি পান। তাঁর শাসনকাল দীর্ঘ ছিল না; ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং শাসনক্ষমতার বৈধতা নিয়ে আপত্তির ফলে তাঁকে সিংহাসন ছাড়তে হয়। কিন্তু এই ঘটনা থেকে নারীর রাষ্ট্র পরিচালনার অনিবার্য অক্ষমতা প্রমাণিত হয় না। বরং মুসলিম রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই একজন নারী সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছিলেন, যদিও সেই ক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল [30]।
রাজিয়া সুলতানা ও শাজারাতুদ দুর রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার মধ্যেও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের শাসনকাল নারী হওয়ার কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার সামর্থ্য অনিবার্যভাবে অনুপস্থিত—এমন দাবির বিপরীত ঐতিহাসিক নজির। নারী শাসকদের সাফল্য বা ব্যর্থতা তাঁদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে। তাঁদের নারী পরিচয় নিজে কোনো রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার ব্যাখ্যা নয়।
আধুনিক ইসলামি ফতোয়ার পরস্পরবিরোধী অবস্থান
নারীর নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার ধ্রুপদী প্রধানধারার অবস্থানের পাশাপাশি আধুনিক ইসলামি আইনগত ব্যাখ্যায় ভিন্ন সিদ্ধান্তও পাওয়া যায়। মিসরের দারুল ইফতার ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত ৫২৫০ নম্বর ফতোয়ায় নারীর নেতৃত্বস্থানীয় পদ গ্রহণকে শরিয়তসম্মত ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষ পরিচয়ের পরিবর্তে ব্যক্তির দক্ষতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের সামর্থ্যকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য আলোচনায় নারীর বিচারিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের পক্ষে ধ্রুপদী আইনজ্ঞদের অনুমতিমূলক মত এবং মুসলিম ইতিহাসের নারী শাসকদের নজিরও ব্যবহার করা হয়েছে [31]।
এই অবস্থানের সঙ্গে ইসলামওয়েবের ৯৬৪৩২, ৪৩৪১৯ ও ৩২০৪৭ নম্বর ফতোয়ার সিদ্ধান্তের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ইসলামওয়েব উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয়, বিচারিক ও সামরিক নেতৃত্ব পুরুষদের হাতে সংরক্ষিত রাখার বিধান দিয়েছে। অন্যদিকে দারুল ইফতার ৫২৫০ নম্বর ফতোয়ায় নেতৃত্বের যোগ্যতা নির্ধারণে ব্যক্তিগত সক্ষমতাকে গ্রহণ করা হয়েছে। উভয় পক্ষই ইসলামি উৎস ও আইনগত ব্যাখ্যা ব্যবহার করছে, কিন্তু নারীর ক্ষমতার অধিকার নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত এক নয়। ফলে নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে আধুনিক ইসলামি কর্তৃপক্ষগুলোর অবস্থান অভিন্ন নয়। ধর্মীয় উৎসের ওপর প্রতিষ্ঠিত আইনগত সিদ্ধান্ত যে ব্যাখ্যাগতভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, এই বিরোধ তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
এই মতপার্থক্য ধ্রুপদী প্রধানধারার নারী-বর্জনমূলক বিধানগুলোর অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। মাওয়ার্দির বিচারক ও মন্ত্রিত্বের শর্ত, নারীর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রধানধারার ফিকহি নিষেধাজ্ঞা এবং ইসলামওয়েবের ফতোয়াগুলোতে লিঙ্গের ভিত্তিতে ক্ষমতা সীমিত করার অবস্থান সুস্পষ্ট। আধুনিক কোনো ফতোয়ায় নারী নেতৃত্ব অনুমোদিত হওয়ার ফলে অতীতের এসব বিধান বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বরং দুটি অবস্থান একত্রে ধর্মীয় আইনগত কর্তৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা প্রকাশ করে: একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের অধীনে নারীর রাজনৈতিক অধিকার এক ব্যাখ্যায় নিষিদ্ধ এবং অন্য ব্যাখ্যায় অনুমোদিত হতে পারে। ফলে ব্যক্তির সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এখানে সমান নাগরিকত্বের নীতির সঙ্গে ধর্মীয় বিধানের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট। সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে একজন নারী রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক বা মন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করলে তাঁর লিঙ্গ সেই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাধা হতে পারে না। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাখ্যাভিত্তিক ব্যবস্থায় একই নারী এক কর্তৃপক্ষের মতে উপযুক্ত পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, অন্য কর্তৃপক্ষের মতে কেবল নারী হওয়ার কারণে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন না। ব্যক্তির প্রকৃত সামর্থ্য অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও তাঁর অধিকার ধর্মীয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এটি অধিকারকে ব্যক্তির সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নয়, বরং ধর্মীয় অনুমোদনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করার ফল।
আধুনিক বিশ্বে নারীর নেতৃত্ব এবং লিঙ্গবৈষম্যের বাস্তব পরিণতি
আধুনিক বিশ্বে নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা, ব্যবসা, প্রযুক্তি এবং সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই বাস্তবতা নারী হওয়ার কারণে নেতৃত্বের সামর্থ্য অনিবার্যভাবে অনুপস্থিত—এমন ধারণার সঙ্গে অসংগত। একজন নারী প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে দক্ষ বিচারক হতে পারেন, রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনা করতে পারেন, বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের মান নির্ধারণ করে তাঁর প্রকৃত দক্ষতা ও সিদ্ধান্তের ফলাফল। শাসকের লিঙ্গকে জাতির সাফল্য বা ব্যর্থতার স্থায়ী নির্ধারক হিসেবে গণ্য করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
নারীকে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার সামাজিক পরিণতিও ব্যক্তিগত অধিকারহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পুরুষের জন্য সংরক্ষিত থাকে, তখন নারীর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সমানভাবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ পায় না। নারী নাগরিকদের জীবন, সম্পত্তি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। এর ফলে ক্ষমতা বণ্টনের কাঠামোতে একটি স্থায়ী অসমতা তৈরি হয়। এই অসমতা ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে নারীকে অধস্তন অবস্থানে রাখা শুধু সামাজিক পূর্বধারণা থাকে না; আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা লাভ করে।
নারীর স্বাধীনতা ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব হচ্ছে, একজন নারী যোগ্য হওয়ার পরও নিজের যোগ্যতা প্রদর্শনের সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। যে ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনা বা বিচারিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা অর্জন করেছেন, তাঁকে কেবল জন্মগত পরিচয়ের কারণে বাদ দেওয়া হলে প্রকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ নষ্ট হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে যে দক্ষতা নেতৃত্বের যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়, নারীর ক্ষেত্রেও সেই একই দক্ষতাকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। নেতৃত্বের অধিকার নির্ধারণে লিঙ্গ নয়, ব্যক্তির সামর্থ্য এবং দায়িত্ব পালনের বাস্তব যোগ্যতাই প্রাসঙ্গিক। এই নীতির বিপরীতে ধর্মীয় লিঙ্গবিভাজনের ভিত্তিতে ক্ষমতা বণ্টন করা নারীর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করে।
উপসংহার
ইসলামি হাদিস, ধ্রুপদী ফিকহ এবং আধুনিক ধর্মীয় ফতোয়ায় নারীর নেতৃত্বের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে: ব্যক্তির প্রকৃত যোগ্যতা মূল্যায়নের পরিবর্তে তাঁর নারী পরিচয়কে রাষ্ট্রীয়, বিচারিক, প্রশাসনিক কিংবা ধর্মীয় কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সহিহ বুখারিতে নারীর শাসনাধীন জাতির ব্যর্থতার যে বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে, তা পরবর্তী ইসলামি আইনশাস্ত্রে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা নারীর জন্য নিষিদ্ধ করার অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বিচারক নিয়োগ, উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিত্ব, প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্ব এবং সামরিক নেতৃত্বের বিধানেও পাওয়া যায়। ধর্মীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পুরুষদের নামাজে নারীর ইমামতি নিষিদ্ধ করার প্রধানধারার অবস্থান একই ধরনের লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার বিভাজন প্রকাশ করে। ফলে নারীর নেতৃত্বের ওপর সীমাবদ্ধতা কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ফতোয়া বা বিশেষ পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রধানধারায় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বণ্টনের বিস্তৃত কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে।
এই কাঠামোর বৈষম্যমূলক চরিত্র ধ্রুপদী আইনজ্ঞদের বক্তব্যে স্পষ্ট। মাওয়ার্দি বিচারক হওয়ার শর্তগুলোর প্রথমেই পুরুষ হওয়াকে স্থান দিয়েছেন এবং নারীর কর্তৃত্বপূর্ণ পদের মর্যাদায় ঘাটতির ধারণা ব্যবহার করেছেন। পূর্ণ ক্ষমতা অর্পিত মন্ত্রীর শর্ত নির্ধারণে সর্বোচ্চ ইমামতের শর্ত প্রয়োগ করেছেন এবং প্রাদেশিক শাসনকর্তৃত্বের শর্তকে সেই মন্ত্রিত্বের শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। এভাবে একটি পদে প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গভিত্তিক সীমাবদ্ধতার প্রভাব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যান্য স্তরেও বিস্তৃত হয়েছে। ইবনে রুশদের আলোচনায় নারী বিচারক হওয়ার প্রশ্নে বিভিন্ন ফকিহের মতপার্থক্য সংরক্ষিত থাকলেও অধিকাংশ ধ্রুপদী আইনজ্ঞের অবস্থান ছিল নিষেধাজ্ঞামূলক। ইসলামওয়েবের আধুনিক ফতোয়াগুলোয়ও রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, বিচারক এবং সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এসব বিধানের ফলে একজন যোগ্য নারীও কেবল নারী হওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার পদ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
নারীর নেতৃত্ব নিষিদ্ধ করার পক্ষে ব্যবহৃত যুক্তিগুলোর মধ্যে বুদ্ধিগত ঘাটতি, ঋতুস্রাব, শারীরিক দুর্বলতা, পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা এবং বৃহৎ দায়িত্ব পালনের অনুপযুক্ততার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো ধর্মীয় সাক্ষ্যবিধান নারীর প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের পরীক্ষা নয়। ঋতুস্রাবের কারণে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালন থেকে বিরত থাকার বিধান নারীর বিচারবুদ্ধি বা প্রশাসনিক সামর্থ্যের ঘাটতি প্রমাণ করে না। একইভাবে পুরুষের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগের প্রয়োজন কিংবা কোনো দায়িত্বের কঠিন প্রকৃতি থেকে নারীর অনিবার্য অযোগ্যতা অনুসরণ করে না। জটিল দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ব্যক্তিভেদে পৃথক হয়। একজন নারী যোগ্য হতে পারেন, অন্যজন অযোগ্য হতে পারেন; পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। তাই ব্যক্তিগত সক্ষমতা পরীক্ষা না করে একটি গোটা লিঙ্গকে নেতৃত্বের অযোগ্য ঘোষণা করা যুক্তিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
ইতিহাসেও নারী নেতৃত্বের অনিবার্য ব্যর্থতার দাবির পক্ষে কোনো সর্বজনীন ভিত্তি পাওয়া যায় না। খাদিজা ইসলামের আবির্ভাবের আগেই নিজের সম্পদ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। আয়িশা মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংঘাতে অংশ নিয়েছেন এবং ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। শিফা বিনতে আবদুল্লাহর বাজারসংক্রান্ত দায়িত্বের বিবরণ ধ্রুপদী জীবনীগ্রন্থে পাওয়া যায়। কোরআনে সাবার নারী শাসককে রাজনৈতিক পরামর্শ গ্রহণ, সামরিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেখা যায়। মধ্যযুগে রাজিয়া সুলতানা ও শাজারাতুদ দুর মুসলিম রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। আধুনিক বিশ্বে বহু নারী রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, বিচারক, মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব ঘটনা নারী হওয়ার কারণে নেতৃত্ব গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সামর্থ্য অনিবার্যভাবে অনুপস্থিত—এমন ধারণার বিপরীত ঐতিহাসিক প্রমাণ।
নারীর বাস্তব নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় আইনগত অনুমোদনের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা ইসলামি ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে। আয়িশার উষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ বাস্তব রাজনৈতিক তৎপরতার নজির, কিন্তু আবু বকরা নারী নেতৃত্বসংক্রান্ত হাদিস স্মরণ করে সেই সংঘাতে তাঁর পক্ষে অংশ নেননি। শিফার বাজারসংক্রান্ত ভূমিকা কিছু প্রশাসনিক দায়িত্বের সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠা করলেও তা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতার সমতুল্য ছিল না। রাজিয়া সুলতানা ও শাজারাতুদ দুরের শাসনক্ষমতা গ্রহণও তাঁদের সমসাময়িক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সর্বসম্মত অনুমোদনের প্রমাণ নয়। এই ঘটনাগুলোতে নারীর বাস্তব ক্ষমতা এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আরোপিত সীমাবদ্ধতার মধ্যে সংঘাত প্রকাশ পেয়েছে।
আধুনিক ইসলামি ফতোয়ার মধ্যকার পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত এই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে। ইসলামওয়েবের ফতোয়ায় উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নারীর জন্য নিষিদ্ধ করা হলেও মিসরের দারুল ইফতার ফতোয়ায় নেতৃত্বের জন্য ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও দক্ষতাকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের অধীনে নারীর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকার এক কর্তৃপক্ষের মতে নিষিদ্ধ এবং অন্য কর্তৃপক্ষের মতে বৈধ হতে পারে। এই মতপার্থক্য প্রধানধারার ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে অস্বীকার করে না; বরং দেখায়, নারীর অধিকার সম্পর্কে ধর্মীয় আইনগত সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। একজন নারীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও তাঁর নেতৃত্বের অধিকার ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে অধিকার নির্ধারণের সঙ্গে এই ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ, নির্বাচিত হওয়া এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকারের নীতি প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রীয় পদে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রাসঙ্গিক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত নির্ধারণ করা যায়; কিন্তু একজন প্রার্থী নারী হওয়ার কারণে তাঁকে আগেই বাদ দেওয়া হলে সেই সমান প্রবেশাধিকার লঙ্ঘিত হয়। রাষ্ট্রের আইন ও নীতি নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর কার্যকর, অথচ সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পুরুষের জন্য সংরক্ষিত থাকলে নারীর সমান নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
নারীর নেতৃত্বের অধিকার অস্বীকার করার সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি হচ্ছে, একজন মানুষের প্রকৃত সামর্থ্য প্রদর্শনের সুযোগ তাঁর জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বন্ধ করে দেওয়া। একজন নারী রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ হলে তাঁর দক্ষতা মূল্যায়িত হওয়ার অধিকার রয়েছে; অযোগ্য হলে তাঁর অযোগ্যতা সমালোচিত হতে পারে। একই নিয়ম পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু একজন নারী যত যোগ্যই হোন, কেবল নারী হওয়ার কারণে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক বা উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক নেতা হতে পারবেন না—এমন বিধান ন্যায়সংগত যোগ্যতা নির্ধারণ নয়। এটি পুরুষের জন্য ক্ষমতার একটি বিশেষ সুবিধা এবং নারীর জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারকার্য, প্রশাসনিক নেতৃত্ব কিংবা ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সামর্থ্য কোনো লিঙ্গের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। একজন ব্যক্তির নেতৃত্বের উপযুক্ততা তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সততা, বিচক্ষণতা এবং দায়িত্ব পালনের বাস্তব সক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হয়। নারীকে সেই মূল্যায়নের সুযোগ না দিয়ে লিঙ্গের ভিত্তিতে অযোগ্য ঘোষণা করা তাঁর মেধা ও যোগ্যতার প্রতি অবমাননা এবং সমান অধিকারের অস্বীকৃতি। ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রধানধারায় নারীর ওপর প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একজন নারীকে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তাঁর অযোগ্যতার প্রমাণ প্রয়োজন; নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করাই তাঁর অযোগ্যতার প্রমাণ নয়।
তথ্যসূত্রঃ
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৬৬১৮ ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস ৭০৯৯ ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস ৪৪২৫ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩৯৩৫, إسناد القضاء والولاية العامة للمرأة لا يجوز, ২৪ এপ্রিল ২০০১ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৫৯৯৫৭, حكم تولي المرأة القضاء والوزارة, ১৫ মার্চ ২০০৫ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৪৩৪১৯, حكم تولي المرأة الرئاسة أو القضاء أو قيادة الجيش, ২০ জানুয়ারি ২০০৪ 1 2
- সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ২২৬২ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী শরহে বুখারী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩৭৮ ↩︎
- আল-মাওয়ার্দি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃষ্ঠা ৮২–৮৩, الباب السادس في ولاية القضاء ↩︎
- ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ, কিতাবুল আকদিয়া, বিচারক হওয়ার যোগ্যতা ↩︎
- ইবনে হুমাম, ফাতহুল কাদির, فصل في قضاء المرأة ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১১০৮৩৫, اشتراط الذكورة في القاضي, ২৮ জুলাই ২০০৮ ↩︎
- আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫–২৬, الباب الثاني في تقليد الوزارة ↩︎
- আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮–৩৯, الباب الثالث في تقليد الإمارة على البلاد ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩২০৪৭, حكم تولي المرأة المناصب الصغرى والكبرى, ১৪ মে ২০০৩ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৪২৯৮৭, حكم عمل المرأة في المجال العسكري, ১৩ জানুয়ারি ২০০৪ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৬০৩২৮, إمامة المرأة وأذانها وكونها خطيبة للجمعة, ২৭ মার্চ ২০০৫ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫৯২, باب إمامة النساء ↩︎
- আলাউদ্দিন আল-কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ১, كتاب الصلاة, فصل بيان من يصلح للإمامة في الجملة ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ১৪৫ ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস ১৪৬২ ↩︎
- জাতিসংঘ, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, ১৯৪৮, অনুচ্ছেদ ২১ ↩︎
- Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination against Women, Article 7 ↩︎
- International Covenant on Civil and Political Rights, Article 25 ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৯৬৪৩২, People who appoint a woman as their leader will never succeed, ২৯ মে ২০০৭ ↩︎
- আল-হাকিমের আল-মুস্তাদরাক, ৩/১১৯-এ উদ্ধৃত আয়িশার অনুশোচনার বর্ণনা; শামেলা, নدم عائشة رضي الله عنها على خروجها ودلالته ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৫১৯০১, قصة الشفاء ليست حجة في تولية المرأة الولايات العامة, ৯ আগস্ট ২০০৪ ↩︎
- কোরআন, সূরা নামল ২৭:২৩–৩৫ ↩︎
- দিল্লি সরকারের ঐতিহাসিক বিবরণ, Razia Sultan, 1236–1240 ↩︎
- World History Encyclopedia, Shajara al-Durr ↩︎
- মিসরের দারুল ইফতা, ফতোয়া ৫২৫০, حكم تولي المرأة المناصب القيادية, ২৯ ডিসেম্বর ২০২০ ↩︎

