জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামে ভোগ্যপণ্য নারী: পুরুষের ভোগ, প্রজনন ও আনুগত্যের উপকরণ

প্রকাশিত: এপ্রিল 22, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন34 মিনিট পড়া

ভূমিকা: নারী ব্যক্তি, নাকি পুরুষের উপভোগের উপকরণ?

কোরআনের সূরা আরাফ ৭:১৮৯-এ নারীকে পুরুষের প্রশান্তির জন্য সৃষ্ট সঙ্গিনী বলা হয়েছে; সূরা বাকারা ২:২২৩-এ স্ত্রীকে পুরুষের শস্যক্ষেত্র; আর সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদ নেককার নারীকে দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ বলেছেন। এই তিনটি বক্তব্যে পুরুষ হচ্ছে প্রশান্তি ও ভোগের অধিকারী, নারী হচ্ছে সেই চাহিদা পূরণের মাধ্যম। সৃষ্টি, যৌনসম্পর্ক ও প্রজননের বিবরণে নারীর নিজস্ব ইচ্ছা ও স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা আড়াল করে পুরুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্রে বসানো হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমন দাম্পত্য বিধান, যেখানে স্ত্রী স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে ফেরেশতাদের অভিশাপ, আল্লাহর অসন্তোষ এবং ফিকহি ব্যাখ্যায় ভরণপোষণ হারানো ও প্রহারের বিধানের মুখোমুখি হন। নারীকে উপভোগের উপকরণ বলা তাই বিচ্ছিন্ন কোনো রূপক নয়; এই ধারণা ধর্মীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত এক অসম যৌন ও পারিবারিক ক্ষমতাবিন্যাসের অংশ।

একজন মানুষকে তাঁর নিজস্ব উদ্দেশ্য, পছন্দ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বদলে অন্যের লাভ, তৃপ্তি ও ব্যবহারের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা ব্যক্তির উপকরণায়ন। দার্শনিক মার্থা নুসবাউম এই উপকরণায়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যক্তিকে অন্যের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার করা এবং তাঁর স্বায়ত্তশাসন অগ্রাহ্য করার কথা আলোচনা করেছেন। বারবারা ফ্রেডরিকসন ও টমি-অ্যান রবার্টস নারীর শরীরকে অন্যের মূল্যায়নের বস্তুতে পরিণত করার সঙ্গে আত্ম-উপলব্ধি ও মানসিক অবস্থার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। ইসলামি সৃষ্টিকাহিনি, ‘শস্যক্ষেত্র’ উপমা, ‘সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ’ হাদিস এবং স্ত্রীর যৌন-আনুগত্যসংক্রান্ত বিধান নারীর মর্যাদাকে পুরুষের জন্য তার উপযোগিতার অধীন করার একটি ধারাবাহিক ধর্মীয় কাঠামো প্রকাশ করে। [1] [2]


নারীর সৃষ্টি: পুরুষকে প্রশান্তি দেওয়াই যখন উদ্দেশ্য

কোরআনের সূরা আরাফের ১৮৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে সেই ব্যক্তি তার কাছে প্রশান্তি লাভ করে। নারীর সৃষ্টির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যার কেন্দ্রে এভাবে পুরুষের প্রয়োজনকে রাখা হয়েছে। নারীকে পুরুষের প্রশান্তির মাধ্যম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার এই ভাষা তার স্বাধীন মানবিক সত্তার মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক; এখানে তার নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া বা সমান আত্মনিয়ন্ত্রণকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। যৌনমিলন ও গর্ভধারণের ধারাবাহিক বর্ণনা এই পুরুষকেন্দ্রিক সৃষ্টিকাহিনিকে আরও স্পষ্ট করে। [3]

هُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّاهَا حَمَلَتْ حَمْلًا خَفِيفًا فَمَرَّتْ بِهِ فَلَمَّا أَثْقَلَت دَّعَوَا اللَّهَ رَبَّهُمَا لَئِنْ آتَيْتَنَا صَالِحًا لَنَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ

বাংলা অনুবাদসমূহ:
তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন আর তাত্থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়। যখন সে স্ত্রীর সাথে সঙ্গত হয় তখন সে লঘু গর্ভধারণ করে আর তা নিয়ে চলাফেরা করে। গর্ভ যখন ভারী হয়ে যায় তখন উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ডেকে বলে, ‘যদি তুমি আমাদেরকে (গঠন ও স্বভাবে) ভাল সন্তান দান কর তাহলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।’
— Taisirul Quran
তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই ব্যক্তি হতেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যেন সে তার নিকট থেকে প্রশান্তি লাভ করতে পারে। অতঃপর যখন সে তার সাথে মিলনে প্রবৃত্ত হয় তখন সেই মহিলাটি এক গোপন ও লঘু গর্ভ ধারণ করে, আর ওটা নিয়ে চলাফেরা করতে থাকে। যখন তার গর্ভ গুরুভার হয় তখন তারা উভয়েই তাদের রবের কাছে প্রার্থনা করেঃ আপনি যদি আমাদেরকে সৎ সন্তান দান করেন তাহলে আমরা আপনার কৃতজ্ঞ বান্দা হব।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে। অতঃপর যখন সে তার সঙ্গিনীর সাথে মিলিত হল, তখন সে হালকা গর্ভ ধারণ করল এবং তা নিয়ে চলাফেরা করতে থাকল। অতঃপর যখন সে ভারী হল, তখন উভয়ে তাদের রব আল্লাহকে ডাকল, ‘যদি আপনি আমাদেরকে সুসন্তান দান করেন তবে অবশ্যই আমরা কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব’।
— Rawai Al-bayan
তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন যাতে সে তার কাছে শান্তি পায় [১]। তারপর যখন সে তার সাথে সংগত হয় তখন সে এক হালকা গর্ভধারণ করে এবং এটা নিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে। অতঃপর গর্ভ যখন ভারী হয়ে আসে তখন তারা উভয়ে তাদের রব আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, ‘যদি আপনি আমাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন তাহলে আপানার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সূরা আরাফের ১৮৯ নম্বর আয়াতে প্রথম ব্যক্তি, তার সঙ্গিনী, যৌনমিলন এবং গর্ভধারণকে একই ধারাবাহিকতার মধ্যে রাখা হয়েছে। বাক্যটির পুরুষবাচক কর্তা “সে” এবং “তার কাছে প্রশান্তি পায়” অংশটির দৃষ্টিকোণ গুরুত্বপূর্ণ: এখানে সঙ্গিনীকে সেই ব্যক্তির প্রশান্তির কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আয়াতটিতে নারীর নিজস্ব স্বপ্ন, স্বাধীন পরিচয় কিংবা সমানভাবে নির্ধারিত কোনো উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি। প্রসঙ্গটি কেবল পারস্পরিক স্নেহের কবিতামূলক বর্ণনা নয়; এটি ধর্মগ্রন্থের মানবসৃষ্টি-বিষয়ক বক্তব্য।


শানকিতি ও ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় হাওয়ার অবস্থান

মুহাম্মদ আল-আমিন আশ-শানকিতি তাঁর আদওয়াউল বায়ান গ্রন্থে আয়াতটির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন: হাওয়াকে আদম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে আদম তার কাছে সান্নিধ্য ও প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। ব্যাখ্যায় কেন্দ্রীয় উপকারভোগী আদম; হাওয়াকে সেই প্রয়োজন পূরণকারী সঙ্গিনী হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। [4]

ذَكَرَ فِي هَذِهِ الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ أَنَّهُ خَلَقَ حَوَّاءَ مِنْ آدَمَ لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا، أَيْ: لِيَأْلَفَهَا وَيَطْمَئِنَّ بِهَا، وَبَيَّنَ فِي مَوْضِعٍ آخَرَ أَنَّهُ جَعَلَ أَزْوَاجَ ذُرِّيَّتِهِ كَذَلِكَ، وَهُوَ قَوْلُهُ: وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً [الروم: ٢١].

বাংলা অনুবাদ: এই পবিত্র আয়াতে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আদম থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে আদম তাঁর কাছে প্রশান্তি লাভ করেন; অর্থাৎ তাঁর সান্নিধ্যে আপনভাব অনুভব করেন এবং তাঁকে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন। অন্য একটি স্থানেও আল্লাহ জানিয়েছেন যে, আদমের বংশধরদের জন্যও তিনি অনুরূপভাবে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন। সেটি হচ্ছে আল্লাহর এই বক্তব্য: “আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।” (সূরা রুম, ৩০:২১)

ইবনে কাসীর সূরা আরাফ ৭:১৮৯-এর ব্যাখ্যায় হাওয়ার সৃষ্টিকে আদমের সাহচর্য ও প্রশান্তি লাভের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় আদমের প্রয়োজন পূরণই হাওয়ার সৃষ্টির উদ্দেশ্য হিসেবে উঠে এসেছে। একই ব্যাখ্যায় সূরা রুম ৩০:২১ উদ্ধৃত করে দাম্পত্যের অন্তরঙ্গতার কথা বলা হলেও আলোচনার সূচনা হয়েছে পুরুষের প্রশান্তিকে কেন্দ্র করেই। [5]

وَقَالَ فِي هَذِهِ الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ: وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا أَيْ: لِيَأْلَفَهَا وَيَسْكُنَ بِهَا، كَمَا قَالَ تَعَالَى: وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً [الروم: ٢١]، فَلَا أُلْفَةَ بَيْنَ زَوْجَيْنِ أَعْظَمَ مِمَّا بَيْنَ الزَّوْجَيْنِ.

বাংলা অনুবাদ: এই পবিত্র আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “আর তিনি সেই ব্যক্তি থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করে।” অর্থাৎ সে তার স্ত্রীর সঙ্গে সান্নিধ্য ও অন্তরঙ্গতা লাভ করে এবং তার মাধ্যমে প্রশান্তি পায়। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।” (সূরা রুম, ৩০:২১)। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারস্পরিক অন্তরঙ্গতা ও সান্নিধ্যের চেয়ে অধিক ঘনিষ্ঠতা অন্য কোনো দম্পতির মধ্যে নেই।


হাওয়া: স্বাধীন সত্তা, না আদমের আনুষঙ্গিক সৃষ্টি?

ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব তাঁর নবীদের কাহিনী গ্রন্থে ফেরেশতাদের সিজদা কেবল আদমের উদ্দেশে হওয়া এবং আদমের পাঁজর থেকে হাওয়ার সৃষ্টি হওয়ার বর্ণনা থেকে নারীর অধীনতার সিদ্ধান্ত টেনেছেন। তাঁর ভাষায় হাওয়া “পৃথক কোন সৃষ্টি ছিলেন না”; এই বক্তব্যকে তিনি পুরুষের প্রতি নারীর অনুগামী হওয়ার প্রমাণ বলেছেন এবং সূরা নিসা ৪:৩৪-এর পুরুষের কর্তৃত্বসংক্রান্ত আয়াত উদ্ধৃত করেছেন। অর্থাৎ সৃষ্টি-আখ্যানটিকে সরাসরি নারীর সামাজিক অধীনতা প্রতিষ্ঠার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [6]

নারী জাতি পুরুষেরই অংশ এবং তার অনুগত:
সিজদা অনুষ্ঠানের পর আল্লাহ আদমের জুড়ি হিসাবে তার অবয়ব হ’তে একাংশ নিয়ে অর্থাৎ তার পাঁজর হ’তে তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন’ মাটি থেকে সৃষ্ট হওয়া আদমের নাম হ’ল ‘আদম’ এবং জীবন্ত আদমের পাঁজর হ’তে সৃষ্ট হওয়ায় তাঁর স্ত্রীর নাম হ’ল ‘হাওয়া’ (কুরতুবী)। অতঃপর তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বললেন, ‘তোমরা দু’জন জান্নাতে বসবাস কর ও সেখান থেকে যা খুশী খেয়ে বেড়াও। তবে সাবধান! এই গাছটির নিকটে যেয়ো না। তাহ’লে তোমরা সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (বাক্বারাহ ২/৩৫)।
এতে বুঝা যায় যে, ফেরেশতাগণের সিজদা কেবল আদমের জন্য ছিল, হাওয়ার জন্য নয়। দ্বিতীয়তঃ সিজদা অনুষ্ঠানের পরে আদমের অবয়ব থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়, পূর্বে নয়। তিনি পৃথক কোন সৃষ্টি ছিলেন না। এতে পুরুষের প্রতি নারীর অনুগামী হওয়া প্রমাণিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল’ (নিসা ৪/৩৪)। অতঃপর বহিষ্কৃত ইবলীস তার প্রথম টার্গেট হিসাবে আদম ও হাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতারণার জাল নিক্ষেপ করল। সেমতে সে প্রথমে তাদের খুব আপনজন বনে গেল এবং নানা কথায় তাদের ভুলাতে লাগল। এক পর্যায়ে সে বলল, ‘আল্লাহ যে তোমাদেরকে ঐ গাছটির নিকটে যেতে নিষেধ করেছেন, তার কারণ হ’ল এই যে, তোমরা তাহ’লে ফেরেশতা হয়ে যাবে কিংবা তোমরা এখানে চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাবে’ (আ’রাফ ৭/২০)। সে অতঃপর কসম খেয়ে বলল যে, আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাংখী’ (ঐ, ২১)। ‘এভাবেই সে আদম ও হাওয়াকে সম্মত করে ফেলল এবং তার প্রতারণার জালে আটকে গিয়ে তারা উক্ত নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল আস্বাদন করল। ফলে সাথে সাথে তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়ল এবং তারা তড়িঘড়ি গাছের পাতা সমূহ দিয়ে তা ঢাকতে লাগল। আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? (ঐ, ২২)

ভোগ্যপণ্য নারী

এই সৃষ্টিকাহিনির প্রশ্নটি শারীরিক উৎসের কল্পকাহিনিতেই সীমাবদ্ধ নয়। একই বিবরণ থেকে যখন নারী পুরুষের অধীন, তার জন্য সৃষ্ট বা তার প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম—এ ধরনের সামাজিক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তখন সৃষ্টির আখ্যানটি নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে খর্ব করার যুক্তিতে পরিণত হয়। ইসলামি হাদিসে নারীকে বাঁকা পাঁজরের সঙ্গে তুলনা করে তার কাছ থেকে উপভোগের কথাও পাওয়া যায়; সেই বর্ণনার পৃথক বিশ্লেষণ রয়েছে নবীর মতে নারীরা জন্মগতভাবেই বাঁকা প্রবন্ধে।

বাংলা তাফসিরে ইবনে কাসীর-এ সংকলিত সৃষ্টিকাহিনিতে আদম হাওয়াকে তাঁর সৃষ্টির কারণ জিজ্ঞাসা করলে হাওয়ার উত্তর হিসেবে লেখা হয়েছে, “আমার দ্বারা তৃপ্তি লাভের জন্য।” এই কথোপকথনের মাধ্যমে নারীকে পুরুষের সাহচর্য ও তৃপ্তির উদ্দেশ্যে সৃষ্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [7]

তাহাকে দেখিয়া তিনি তৃপ্ত হইলেন। আল্লাহ্ তা’আলা তাহাদিগকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিলেন। তাই তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করিলেন- হে আদম, তুমি সস্ত্রীক জান্নাতে বসবাস কর এবং সেখান হইতে যাহা খুশী খাও। তবে এই গাছটির কাছেও যাইও না। তাহা হইলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হইবে।
একদল বলেন, আদমের জান্নাতে প্রবেশের পর হাওয়াকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। যেমন আস্ সুদ্দী আবূ মালিক হইতে, তিনি আবু সালেহ হইতে, তিনি ইব্‌ন আব্বাস হইতে, তিনি মুব্রাহ্
হইতে, তিনি ইবন মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবা (রা) হইতে বর্ণনা করেন- ইবলীসকে জান্নাত
হইতে বহিষ্কার করা হইল এবং আদমকে জান্নাতে রাখা হইল। তিনি সেখানে নিঃসঙ্গ চলাফেরা করিতেন, সাহচর্য ও তৃপ্তি দানের জন্য কোন স্ত্রী ছিল না। একবার গভীর নিদ্রামগ্ন হইলেন এবং জাগিয়া তাঁহার মাথার পাশেই এক নারীকে বসা দেখিতে পাইলেন। তাহাকে আদমেরই পাঁজরের হাড় হইতে আল্লাহ্ তা’আলা সৃষ্টি করিয়াছেন। আদম (আ) তাহাকে প্রশ্ন করিলেন, তুমি কে? হাওয়া (আ) বলিলেন- নারী। আদম (আ) প্রশ্ন করিলেন- কেন তোমাকে সৃষ্টি করা হইল? হাওয়া (আ) বলিলেন- আমার দ্বারা তৃপ্তি লাভের জন্য।
যেসব ফেরেশতারা ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেছিলেন, তাহারা প্রশ্ন করিলেন- হে আদম! উহার নাম কি? তিনি বলিলেন- হাওয়া। তাহারা বলিলেন- হাওয়া কেন হইল? তিনি জবাব দিলেন-উহা (৫) জীবিত কিছু হইতে সৃষ্টি বিধায় এই নাম হইয়াছে।

ভোগ্যপণ্য নারী 1

স্ত্রীকে শস্যক্ষেত্র বলা: যৌনতা ও সন্তান উৎপাদনের রূপক

কোরআনের সূরা বাকারা ২২৩ নম্বর আয়াতে স্ত্রীকে শস্যক্ষেত্র বলা হয়েছে এবং পুরুষকে তার শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যৌনসম্পর্কের অনুমোদিত ভঙ্গির সীমা নিয়ে প্রাচীন তাফসিরে আলোচনা রয়েছে; কিন্তু এই উপমার কেন্দ্রে পুরুষ সক্রিয় ভোগকারী এবং নারী তার যৌনসুখ ও সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্র। এমন ভাষা নারীর ব্যক্তিসত্তাকে আড়াল করে তাকে পুরুষের প্রয়োজন পূরণের উপকরণ হিসেবে উপস্থাপন করে। নারীর যৌন অবজেক্টিফিকেশন বলতে বোঝায় একজন ব্যক্তিকে পূর্ণ মানবসত্তা হিসেবে বিবেচনা না করে প্রধানত তার যৌন ব্যবহার, শরীর বা অন্যের উপকারিতার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা। এই ধরনের ধারণা নারীকে পুরুষের অধীনস্থ ভাবার সামাজিক ও নৈতিক প্রবণতাকে শক্তিশালী করতে পারে। [8]

نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ وَقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ مُلَاقُوهُ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
বাংলা অনুবাদসমূহ:
তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যে প্রকারে ইচ্ছে গমন কর এবং নিজেদের জন্য ভবিষ্যতের বন্দোবস্ত কর এবং আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রেখ যে, তোমাদেরকে তাঁর কাছে হাজির হতে হবে। আর বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।
— Taisirul Quran
তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেত্র স্বরূপ; অতএব তোমরা যখন যেভাবে ইচ্ছা স্বীয় জীবনের জন্য ব্যবহার কর এবং নিজেদের আগামী দিনের জন্য ব্যবস্থা কর এবং আল্লাহকে ভয় কর ও জেনে রেখ, একদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হবে। আর বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে দাও।
— Sheikh Mujibur Rahman
তোমাদের স্ত্রী তোমাদের ফসলক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা তোমাদের ফসলক্ষেত্রে গমন কর, যেভাবে চাও। আর তোমরা নিজদের কল্যাণে উত্তম কাজ সামনে পাঠাও। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় তোমরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে । আর মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও।
— Rawai Al-bayan
তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছে [১] গমন করতে পার। আর তোমরা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য কিছু করো [২] এবং আল্লাহ্‌কে ভয় করো। এবং জেনে রেখো, তোমরা অবশ্যই আল্লাহ্‌র সম্মুখীন হবে। আর মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

“হারস” (حَرْث) শব্দটির আক্ষরিক ক্ষেত্র হলো চাষাবাদ, বীজ বপন ও উৎপাদন। ২:২২৩ আয়াতে স্ত্রীকে পুরুষের “শস্যক্ষেত্র” এবং যৌনমিলনকে সেই ক্ষেত্রের কাছে গমনের ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। এই উপমায় পুরুষ বীজ বপনের সক্রিয় পক্ষ, নারী উৎপাদনক্ষেত্র। ব্যক্তির সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক ইচ্ছার ভাষার পরিবর্তে কৃষি-উৎপাদনের একটি অসম ভূমিকাবিন্যাসকে দাম্পত্য সম্পর্কের বর্ণনায় ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধারণা কেবল আধুনিক সমালোচকের আরোপিত অর্থ নয়; ইসলামি তাফসিরকারেরাও নারীকে সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।


আবু ইসহাক আজ-জাজ্জাজ: সন্তান ও যৌনসুখের ক্ষেত্র

আরবি ভাষাবিদ ও তাফসিরকার আবু ইসহাক আজ-জাজ্জাজ মাআনিল কোরআন ওয়া ইরাবুহু গ্রন্থে আয়াতটির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে সন্তান উৎপাদনের পাশাপাশি যৌনসুখের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। ফলে “শস্যক্ষেত্র” কেবল সন্তান ধারণের নিঃস্পৃহ জীববৈজ্ঞানিক রূপক নয়; প্রাচীন ব্যাখ্যায় নারীর শরীর পুরুষের যৌনসুখ ও প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপিত। একই গ্রন্থের পাঠ শামেলা গ্রন্থাগারেও সংরক্ষিত। [9] [10]

وَالْقَوْلُ عِنْدِي فِيهِ أَنَّ مَعْنَاهُ أَنَّ نِسَاءَكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ؛ مِنْهُنَّ تَحْرُثُونَ الْوَلَدَ؛ وَاللَّذَّةَ. وَقَوْلُهُ – عَزَّ وَجَلَّ -: فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ؛ أَيْ: كَيْفَ شِئْتُمْ.

বাংলা অনুবাদ: আমার মতে এর অর্থ হলো, তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র; তাদের মাধ্যমে তোমরা সন্তান উৎপাদন করো এবং যৌনসুখ লাভ করো। আর মহান আল্লাহর বক্তব্য, “সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করো”—এর অর্থ হলো, যেভাবে ইচ্ছা।

আজ-জাজ্জাজ প্রথমে উল্লেখ করেছেন, আবু উবাইদা “তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র” বাক্যটিকে পরোক্ষ প্রকাশভঙ্গি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এরপর আজ-জাজ্জাজ নিজের ব্যাখ্যায় সন্তান উৎপাদনের পাশাপাশি যৌনসুখ লাভের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “যেভাবে ইচ্ছা” কথাটির অর্থ হলো, শস্য উৎপাদনের নির্ধারিত স্থানে যেভাবে ইচ্ছা যৌনমিলন করা। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ইহুদিদের মধ্যে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে, পুরুষ পেছনের দিক থেকে নারীর সঙ্গে যৌনমিলন করলে সন্তান ট্যারা হয়ে জন্মায়। এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে জানানো হয়েছে, যোনিপথে যৌনমিলন হলে যেকোনো ভঙ্গিতে তা বৈধ। এরপর “তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রিম পাঠাও এবং আল্লাহকে ভয় করো” অংশের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, যৌনমিলন ও ঋতুস্রাবসংক্রান্ত নির্ধারিত সীমা মেনে চলতে হবে। আল্লাহর নির্দেশ পালন ও আনুগত্যই নিজের জন্য কল্যাণ অগ্রিম পাঠানোর অর্থ।


কুরতুবি ও ইবনে কাসীর: শস্যক্ষেত্র বলতে নারীর প্রজননাঙ্গ

কুরতুবি সূরা বাকারা ২:২২৩-এর “শস্যক্ষেত্র” উপমা ব্যাখ্যা করতে স্ত্রীকে বংশধর উৎপাদনের ক্ষেত্র বলেছেন। তিনি “যেভাবে ইচ্ছা” বাক্যের অনুমতিকে যৌনমিলনের ভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত করে স্থান হিসেবে যোনিপথ নির্ধারণ করেছেন। এভাবে পুরুষকে সম্বোধন করে তাঁর যৌনকর্মের পদ্ধতি আলোচনা করা হচ্ছে, অথচ একই বাক্যে স্ত্রীর ইচ্ছা বা স্বতন্ত্র সম্মতি কোনো শর্ত হিসেবে উপস্থিত নয়। নারীর শরীরকে প্রজননের ক্ষেত্র এবং পুরুষকে সেই ক্ষেত্রের ব্যবহারকারী হিসেবে স্থাপন করাই উপমাটির কেন্দ্রীয় অর্থ। [11]

وَحَرْثٌ تَشْبِيهٌ؛ لِأَنَّهُنَّ مُزْدَرَعُ الذُّرِّيَّةِ، فَلَفْظُ الْحَرْثِ يُعْطِي أَنَّ الْإِبَاحَةَ لَمْ تَقَعْ إِلَّا فِي الْفَرْجِ خَاصَّةً إِذْ هُوَ الْمُزْدَرَعُ.

বাংলা অনুবাদ: “শস্যক্ষেত্র” একটি উপমা; কারণ নারীরা বংশধর উৎপাদনের ক্ষেত্র। ফলে “শস্যক্ষেত্র” শব্দটি নির্দেশ করে যে, যৌনমিলনের অনুমতি বিশেষভাবে যোনিপথের জন্যই প্রযোজ্য, কেননা সেটিই সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্র।

কুরতুবি তাঁর দ্বিতীয় আলোচনায় বলেন, সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, যৌনমিলন সন্তান উৎপাদনের নির্ধারিত স্থানে হলে বিভিন্ন অবস্থান ও ভঙ্গিতে তা বৈধ। পুরুষ পেছন থেকে, সামনে থেকে কিংবা নারীকে বিভিন্ন অবস্থায় রেখে যৌনমিলন করতে পারে। কিন্তু সন্তান উৎপাদনের নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য পথে যৌনমিলনকে তিনি বৈধ মনে করেন না। তাঁর ব্যাখ্যায় “শস্যক্ষেত্র” শব্দটিই এই সীমা নির্দেশ করে। নারীদের বংশধর উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করেই উপমাটির অর্থ নির্ধারিত হয়েছে।

এই ব্যাখ্যার সমর্থনে কুরতুবি সা’লাবের উদ্ধৃত একটি কবিতার উল্লেখ করেন, যেখানে নারীর জরায়ুকে চাষাবাদের জমি এবং পুরুষের ভূমিকাকে সেই জমিতে বীজ বপনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কবিতার বক্তব্য অনুযায়ী, বীজ বপন মানুষের কাজ এবং তার অঙ্কুরোদ্গম আল্লাহর হাতে। এরপর কুরতুবি উপমাটিকে আরও স্পষ্ট করেন: নারীর যোনিপথ জমির মতো, বীর্য বীজের মতো এবং সন্তান উৎপন্ন উদ্ভিদের মতো। সেই অর্থেই যৌনসম্পর্কের স্থানকে শস্যক্ষেত্র বলা হয়েছে।

পরবর্তী আলোচনায় তিনি ব্যাখ্যা করেন, “যেভাবে ইচ্ছা” বলতে অধিকাংশ সাহাবি, তাবেয়ি ও ফতোয়াদানকারী ইমামের মতে যৌনমিলনের ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সামনে বা পেছনের দিক থেকে মিলন করা যেতে পারে, কিন্তু সেটি যোনিপথেই হতে হবে।

ইবনে কাসীর ইবনে আব্বাসের নামে একই আয়াতের ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন: শস্যক্ষেত্র বলতে সন্তান জন্মানোর স্থান, আর মিলনের ভঙ্গি বিভিন্ন হতে পারে, তবে যৌনমিলনের পথ একটিই। ইবনে কাসীরের তাফসির শামেলার পৃথক সম্পাদিত সংস্করণেও রয়েছে। এই বর্ণনায় স্ত্রীকে উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার বিষয়টি অক্ষুণ্ণ থাকে। [12] [13]

وَقَوْلُهُ: (نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ) قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: الْحَرْثُ مَوْضِعُ الْوَلَدِ، (فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ) أَيْ: كَيْفَ شِئْتُمْ، مُقْبِلَةً وَمُدْبِرَةً فِي صِمَامٍ وَاحِدٍ، كَمَا ثَبَتَتْ بِذَلِكَ الْأَحَادِيثُ.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর বক্তব্য, “তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র”—এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস বলেছেন, শস্যক্ষেত্র বলতে সন্তান জন্মদানের স্থানকে বোঝানো হয়েছে। আর আল্লাহর বক্তব্য, “সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করো”—এর অর্থ হচ্ছে, তোমরা যেভাবে ইচ্ছা যৌনমিলন করতে পারো, নারী সামনের দিকে থাকুক কিংবা পেছনের দিকে থাকুক, তবে যৌনমিলন একই নির্ধারিত পথে, অর্থাৎ যোনিপথে হতে হবে। বিভিন্ন হাদিসেও এই ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতাকে বিবাহে নারী নির্বাচনের মানদণ্ড করা হয়েছে এমন হাদিসেও, যেখানে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীকে বিয়ে করার নির্দেশ পাওয়া যায়। নারীর প্রজননক্ষমতাকে পুরুষের পারিবারিক উদ্দেশ্য পূরণের কেন্দ্রে রাখার সেই ধারাবাহিকতা বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে ইসলাম অনুসারে বন্ধ্যা নারীদের বিয়ে করা নিষেধ প্রবন্ধে।


হাদিসে নারী: দুনিয়ার উত্তম উপভোগের উপকরণ

কোরআনে নারীকে পুরুষের প্রশান্তি লাভের মাধ্যম ও শস্যক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপনের পর মুহাম্মদের বক্তব্যে এই পুরুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও সরাসরি প্রকাশ পায়। সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে আমরের সূত্রে বর্ণিত হাদিসে দুনিয়াকে ‘মাতা’ (مَتَاعٌ)—অর্থাৎ উপভোগ ও উপকার লাভের উপকরণ—বলা হয়েছে এবং সেই উপকরণগুলোর মধ্যে ‘নেককার নারী’কে সর্বোত্তম স্থান দেওয়া হয়েছে। এখানে নারীর শ্রেষ্ঠত্বকে পুরুষের জীবনে তাঁর উপভোগযোগ্যতা ও ব্যবহারিক উপকারের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসূফের সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের ভিডিওটি এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। [14]

সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদের এই বক্তব্যের আরবি মূল এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা অনুবাদ একই অর্থ প্রকাশ করে। [15]

الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ

বাংলা অনুবাদ:
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১৮/ দুধপান
পরিচ্ছদঃ ৯. মহিলাদের সম্পর্কে ওসিয়ত
৩৫১২। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবন নুমায়র আল-হামদানী (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়া উপভোগের উপকরণ (ভোগ্যপণ্য) এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


‘মাতা’ শব্দের অর্থ: নারীকে উপভোগযোগ্য বস্তু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা

হাদিসটির কেন্দ্রীয় শব্দ ‘مَتَاع’ (মাতা), যার অর্থ উপভোগ ও উপকার লাভের উপকরণ, জাগতিক ভোগসামগ্রী বা সাময়িক সুবিধা। প্রথম বাক্যে গোটা দুনিয়াকে ‘মাতা’ বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয় বাক্যে সেই উপকরণের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে নেককার নারীকে স্থান দেওয়া হয়েছে। নারী এখানে নিজে উপভোগকারী মানুষ হিসেবে নয়, অন্যের উপভোগ ও উপকারের উৎস হিসেবে চিহ্নিত। ‘ভোগ্যপণ্য’ শব্দে বাণিজ্যিক লেনদেনের অর্থও আসতে পারে; এই হাদিসের ‘উপভোগের উপকরণ’ অর্থটি নারীর প্রতি তার উপযোগকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

আবদুর রউফ আল-মুনাবি ফায়জুল কাদির গ্রন্থে ‘মাতা’ বলতে জাগতিক জীবনে উপকার ও উপভোগের উপাদান বুঝিয়েছেন। তিবি ও অন্যান্য ব্যাখ্যাকারদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন, একজন স্ত্রী পুরুষের জন্য আনন্দ, তৃপ্তি ও উপকারের উৎস; নেককার হলে সেই উপকার সর্বোত্তম বলে বিবেচিত। এই ব্যাখ্যায় নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নারী নিজে কী চান বা কী অর্জন করেন, তা নয়; পুরুষ তাঁর কাছ থেকে কী সুবিধা পান। [16]

একজন মানুষের আনন্দ, যৌনতা, শ্রম ও যত্ন অন্যের জীবনে উপকার আনতে পারে; সেই উপকারই যখন তাঁর মানবিক মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তিনি স্বাধীন ব্যক্তি থেকে উপকরণে পরিণত হন। এই হাদিসে ‘নেককার’ বিশেষণ নারীকে উপভোগের উপকরণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার পরিবর্তন ঘটায় না; বরং পুরুষের জন্য কোন ধরনের নারী সর্বোত্তম উপকরণ বলে বিবেচিত হবেন, সেই শর্ত নির্ধারণ করে।

‘সম্পদ’ বা ‘উপকার’ অনুবাদে নারীর উপকরণায়ন মুছে যায় না

আরবি مَتَاع শব্দের অর্থপরিসরে জাগতিক সম্পদ, ব্যবহার্য সামগ্রী, উপকার এবং উপভোগ—সবই রয়েছে। “দুনিয়া উপভোগের উপকরণ” এবং “দুনিয়ার উত্তম উপভোগের উপকরণ নেককার নারী”—এই দুই বাক্যে একই শব্দ দুবার ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম বাক্যটি একটি বৃহত্তর শ্রেণি তৈরি করেছে, দ্বিতীয় বাক্যটি সেই শ্রেণির উৎকৃষ্টতম উপাদান হিসেবে নারীকে স্থাপন করেছে। বাংলা অনুবাদে প্রথমবার “উপভোগের উপকরণ” এবং দ্বিতীয়বার “সম্পদ” লিখলেও আরবি বাক্যের এই শ্রেণিবিন্যাস বদলায় না। উপকার লাভের সামর্থ্য কোনো মানুষের নৈতিক মর্যাদা কমায় না; কিন্তু একজন মানুষকে অন্যের প্রাপ্ত উপকারের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ বলে সংজ্ঞায়িত করা তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে গৌণ করে।

সহিহ মুসলিমের এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি তাঁর আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখিসি কিতাবি মুসলিম গ্রন্থে ‘মাতা’ শব্দের অর্থ বলেছেন সাময়িকভাবে উপভোগ করার বস্তু। এরপর নেককার নারীর পরিচয় নির্ধারণ করতে তিনি স্বামীর গৃহস্থালির কল্যাণ, স্বামীকে আনন্দ দেওয়া, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাঁর আদেশ মানার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ধর্মীয় গুণের প্রশংসাটিও পুরুষের প্রাপ্ত সুবিধা ও স্ত্রীর আনুগত্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যাত হয়েছে। [17]

(قوله: الدنيا متاع) أي: شيء يتمتع به حينا ما، كما قال تعالى: قل متاع الدنيا قليل [النساء: 77]. و(المرأة الصالحة): هي الصالحة في دينها، ونفسها، والمصلحة لحال زوجها. وهذا كما قال في الحديث الآخر: (ألا أخبركم بخير ما يكنز المرء؟) قالوا: بلى. قال: (المرأة الصالحة؛ التي إذا نظر إليها سرته، وإذا غاب عنها حفظته، وإذا أمرها أطاعته).

বাংলা অনুবাদ: “দুনিয়া উপভোগের উপকরণ”—এর অর্থ এমন জিনিস, যা কিছু সময়ের জন্য উপভোগ করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “দুনিয়ার ভোগসামগ্রী সামান্য” (সূরা নিসা, ৪:৭৭)। আর “নেককার নারী” হচ্ছেন সেই নারী, যিনি ধর্মীয় জীবন ও নিজের আচরণে সৎ এবং স্বামীর অবস্থার উন্নতিসাধন করেন। যেমন অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, “আমি কি তোমাদের জানাব না, মানুষের সঞ্চিত সম্পদের মধ্যে উত্তম কী?” তাঁরা বললেন, “অবশ্যই।” তিনি বললেন, “নেককার নারী; স্বামী তাঁর দিকে তাকালে তিনি স্বামীকে আনন্দ দেন, স্বামী অনুপস্থিত থাকলে তাঁর স্বার্থ রক্ষা করেন এবং স্বামী আদেশ করলে তা পালন করেন।”

এখানে নারীর ধর্মীয় গুণকে তাঁর স্বামীর জন্য উপযোগিতার ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সুন্দর চেহারার পরিবর্তে ধর্মীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া নারীকে উপকরণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার সমস্যা দূর করে না; শুধু আদর্শ উপকরণের গুণাবলি নির্দিষ্ট করে। যৌনসুখ, অর্থনৈতিক সুবিধা, গৃহস্থালির সেবা ও সন্তান প্রতিপালনের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলোতে প্রত্যেকটির মূল্যায়ন পুরুষের লাভের দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হয়েছে। হাদিসের “নেককার” শব্দটি নারীর স্বতন্ত্র মানবিক মর্যাদা বা তাঁর যৌনসম্মতিকে এই মূল্যায়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসে না।


‘নেককার নারী’ কাকে বলে: আনুগত্যই যখন উপযোগিতার মানদণ্ড

হাদিসে ‘সালিহা’ শব্দটি নৈতিক গুণবিশিষ্ট নারীকে বোঝালেও প্রাচীন ব্যাখ্যাকাররা সেই গুণের বাস্তব প্রকাশ ব্যাখ্যা করতে প্রধানত স্বামীর সুবিধা ও অধিকারকে সামনে এনেছেন। মুনাবির ফায়জুল কাদির-এ তিবির নামে উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নারী সালিহা না হলে তিনি উত্তমের পরিবর্তে নিকৃষ্ট উপভোগের উপকরণ হয়ে ওঠেন। একই স্থানে ‘আকমাল’-এর ব্যাখ্যায় সৎ নারীর পরিচয় দেওয়া হয়েছে স্বামীর ঘরের অবস্থা ঠিক রাখা এবং স্বামীর আদেশ পালন করার মাধ্যমে। এই শ্রেণিবিন্যাসে নারী ব্যক্তি হিসেবে ভালো কি না—তার বিচার গিয়ে দাঁড়ায় তিনি স্বামীর জন্য কতটা অনুকূল ও বাধ্যগত। [18]

فَصَاحِبُهَا يَلْتَذُّ بِهَا مِنْ جِهَةِ تَنَعُّمِهِ، وَقُرَّةِ عَيْنِهِ بِهَا، وَمِنْ وُجْهَةِ إِيصَالِهَا لَهُ إِلَى مَرْضَاةِ رَبِّهِ، وَإِيصَالِهِ إِلَى لَذَّةٍ أَكْمَلَ مِنْهَا. قَالَ الطَّيِّبِيُّ: وَقَيَّدَ بِـ«الصَّالِحَةُ»؛ إِيذَانًا بِأَنَّهَا شَرُّ الْمَتَاعِ لَوْ لَمْ تَكُنْ صَالِحَةً؛ وَقَالَ الْأَكْمَلُ: الْمُرَادُ بِالصَّالِحَةِ: النَّقِيَّةُ الْمُصْلِحَةُ لِحَالِ زَوْجِهَا فِي بَيْتِهِ؛ الْمُطِيعَةُ لِأَمْرِهِ.

বাংলা অনুবাদ: ফলে এমন স্ত্রীর স্বামী তাঁর মাধ্যমে উপভোগ ও আনন্দ লাভ করেন। স্ত্রী তাঁর চোখের প্রশান্তির কারণ হন এবং তাঁর মাধ্যমে স্বামী নিজের প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন। স্ত্রী তাঁকে আরও উৎকৃষ্ট আনন্দ ও পুরস্কার লাভের পথে পৌঁছাতে সহায়তা করেন।

তিবি বলেছেন, হাদিসে নারীকে বিশেষভাবে “নেককার” বলে নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, নারী নেককার না হলে তিনি সর্বনিকৃষ্ট উপভোগের উপকরণে পরিণত হন।

আকমাল বলেছেন, এখানে নেককার নারী বলতে বোঝানো হয়েছে এমন পবিত্র নারীকে, যিনি নিজের স্বামীর পারিবারিক অবস্থা ও গৃহস্থালির ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখেন এবং স্বামীর আদেশ পালন করেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এখানে ‘উত্তম’ ও ‘নিকৃষ্ট’ শব্দদ্বয় নারীর নিজের স্বপ্ন, জ্ঞান, স্বাধীন সিদ্ধান্ত, সামাজিক অবদান বা মানসিক সুস্থতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে না। বিচারটি স্বামী কী পাচ্ছেন তার ওপর নির্ভরশীল। একজন নারী শিক্ষিত, কর্মক্ষম, সৃজনশীল, নীতিবান কিংবা সমাজের জন্য অত্যন্ত উপকারী হলেও তিনি স্বামীর নির্দেশ অমান্য করলে এই আনুগত্যভিত্তিক সংজ্ঞায় তাঁর ‘উত্তম উপকরণ’ হওয়ার যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এটি পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর মূল্য নির্ধারণের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। নারীকে প্রশংসা করা হচ্ছে—কিন্তু সেই প্রশংসার শর্তও পুরুষের অধীনস্থ অবস্থান।


মুনাবির উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় যৌনচাহিদা, সেবা ও সন্তান উৎপাদন

মুনাবি ফায়জুল কাদির-এর অন্য একটি স্থানে কাজির বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে নেককার নারীকে সোনার চেয়েও অধিক উপকারী বলা হয়েছে। সেই উপকারিতার উদাহরণ হিসেবে নারীর দিকে তাকিয়ে পুরুষের আনন্দ পাওয়া, তার মাধ্যমে যৌনচাহিদা পূরণ, গোপন কথা সংরক্ষণ, নির্দেশ পালন, সম্পদ রক্ষা এবং সন্তান প্রতিপালনের কথা এসেছে। লক্ষণীয়, এই ব্যাখ্যায় নারীর মূল্যায়ন কার্যত একটি উপকারিতার হিসাব: পুরুষের যৌনপ্রয়োজন, ঘরের ব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির সুরক্ষা ও প্রজননের সেবা। এগুলোর কোনোটির ক্ষেত্রে নারীর নিজস্ব কামনা, জীবনলক্ষ্য বা পৃথক উপকারিতা মানদণ্ড হিসেবে আলোচিত নয়। [19]

تنظر إليها تسرك، وتقضي إليها عند الحاجة وطرك، وتشاورها فيما يعن لك فتحفظ سرك، وتستمد منها في حوائجك فتطع أمرك، وإذا غبت تحامي مالك، وترعى عيالك، ولو لم يكن إلا أنها تحفظ بذرك، وتربي زرعك: لكفى به فضلاً.

বাংলা অনুবাদ: তুমি তার দিকে তাকালে সে তোমাকে আনন্দ দেয়। প্রয়োজনের সময় তার মাধ্যমে তুমি নিজের যৌনকামনা পূরণ করো। তোমার সামনে কোনো বিষয় উপস্থিত হলে তুমি তার সঙ্গে পরামর্শ করো এবং সে তোমার গোপন কথা রক্ষা করে। নিজের প্রয়োজন পূরণে তুমি তার সাহায্য গ্রহণ করো এবং সে তোমার আদেশ পালন করে। তুমি অনুপস্থিত থাকলে সে তোমার সম্পদ রক্ষা করে এবং তোমার সন্তানদের দেখাশোনা করে। এমনকি তার আর কোনো গুণ না থাকলেও কেবল এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তোমার বীজ সংরক্ষণ করে এবং তোমার ফসল প্রতিপালন করে। এটুকুই তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

মুনাবির একই উদ্ধৃতিতে নারীকে পুরুষের ‘বীজ’ সংরক্ষণ এবং ‘ফসল’ প্রতিপালনের জন্যও মূল্যবান বলা হয়েছে। সূরা বাকারা ২:২২৩-এ স্ত্রীকে শস্যক্ষেত্র বলার সঙ্গে এই শব্দচয়নের সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ। নারী এখানে কেবল প্রিয় সঙ্গী নন; তিনি পুরুষের যৌনচাহিদা পূরণ, সন্তান উৎপাদন, পারিবারিক শ্রম এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যম। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মূল্য থাকলেও সহযোগীকে তার সেবার সমষ্টিতে নামিয়ে আনা এবং সেসব সেবার ভিত্তিতে তার শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা স্বাধীন মানবিক মর্যাদার ধারণাকে খর্ব করে। বিশেষত যৌনতার ক্ষেত্রে অন্যের প্রয়োজন পূরণ করতে পারা এবং তা পূরণ করার ব্যক্তিগত ইচ্ছা এক জিনিস নয়।


আধুনিক ব্যাখ্যাতেও পুরুষের তৃপ্তিই কেন্দ্রীয়

এই উপযোগিতাকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা কেবল প্রাচীন গ্রন্থে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন শরহু রিয়াদিস সালিহিন-এ নেককার স্ত্রীর শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যা করতে বলেছেন, তিনি স্বামীর গোপন বিষয়, সম্পদ ও সন্তান রক্ষা করেন, ঘর পরিচালনা করেন, তাঁর দিকে তাকালে স্বামী আনন্দ পান এবং দায়িত্ব দিলে বিশ্বাসভঙ্গ করেন না। ইসলামকিউএ এই ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছে। এসব গুণের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্নেহ অবশ্যই ভালো গুণ; সমস্যাটি হচ্ছে, নারীকে কেন সর্বোত্তম বলা হচ্ছে তার সমস্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে স্বামীর প্রাপ্ত সুবিধার ভাষায়। নারীর নিজের কল্যাণ, সমান সিদ্ধান্তের অধিকার কিংবা নিজের জীবনের লক্ষ্য এই সংজ্ঞার মাপকাঠি নয়। [20]

لأنها تحفظه في سره وماله وولده، وإذا كانت صالحة في العقل أيضاً فإنها تدبر له التدبير الحسن في بيته وفي تربية أولادها، إن نظر إليها سرته، وإن غاب عنها حفظته، وإن وكل إليها أمره لم تخنه، فهذه المرأة هي خير متاع الدنيا.

বাংলা অনুবাদ: কারণ সে স্বামীর গোপন বিষয়, সম্পদ ও সন্তান রক্ষা করে। সেই নারী যদি বুদ্ধিবিবেচনার দিক থেকেও যোগ্য হয়, তাহলে সে স্বামীর ঘর পরিচালনা এবং সন্তান প্রতিপালনের কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে। স্বামী তার দিকে তাকালে সে তাকে আনন্দ দেয়। স্বামী অনুপস্থিত থাকলে সে তার স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করে। স্বামী কোনো দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করলে সে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। এই ধরনের নারীই হচ্ছে দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ।

এখানে শ্রেষ্ঠ নারী কোনো স্বতন্ত্র মানবিক আদর্শের প্রতীক নন, প্রধানত ভালো স্ত্রী হিসেবে পুরুষের প্রাপ্ত কল্যাণের প্রতীক। স্বামীর আরাম, যৌনতৃপ্তি, সম্পদ ও পরিবার রক্ষায় নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু নারীকে এই কাজগুলোর ‘সর্বোত্তম উপকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার সঙ্গে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার গভীর পার্থক্য রয়েছে। একই বৈশিষ্ট্য পুরুষের মধ্যেও প্রত্যাশিত হতে পারে; অথচ হাদিসটির সরাসরি গঠন নারীকে পুরুষের উপকারের বস্তু হিসেবে উপস্থিত করে।


হাদিসের একমুখী ভাষা: পুরুষের জন্য নারী, নারীর জন্য কে?

এই ভাষার একমুখী চরিত্র ইসলামকিউএর একটি বিশেষ প্রশ্নোত্তরেও প্রকাশ পেয়েছে। ৪৫৯১৭৯ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্ন করা হয়েছিল: নেককার নারী যদি পুরুষের জন্য দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ হন, তাহলে নারীর জন্য সর্বোত্তম উপকরণ কি নেককার স্বামী? উত্তরে স্বীকার করা হয়েছে, হাদিসটির সরাসরি বক্তব্য পুরুষের জন্য নেককার নারী সর্বোত্তম। এরপর নারীর ক্ষেত্রে স্বামীর অনুরূপ অবস্থানকে হাদিসের শব্দ থেকে নয়, একটি অনুমিত সমতাসূত্র থেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। মূল হাদিসে নারীর জন্য পুরুষকে একইভাবে সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ বলা হয়নি। [21]

والذي يظهر، والله أعلم: أنه يمكن أن يؤخذ من مفهوم هذا الحديث أن خير متاع المرأة في هذه الدنيا: الزوج الصالح؛ وهذا لأمرين:

বাংলা অনুবাদ: যা প্রতীয়মান হয়, আর আল্লাহই অধিক জানেন, তা হলো—এই হাদিসের নিহিত অর্থ থেকে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, দুনিয়ায় নারীর জন্য সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ হচ্ছে নেককার স্বামী। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে দুটি যুক্তি রয়েছে।

ইসলামকিউএর প্রশ্নোত্তরে প্রথমে স্বীকার করা হয়েছে যে, সহিহ মুসলিমের হাদিসটি সরাসরি পুরুষের জন্য নেককার নারীকে সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ বলেছে। এরপর নারীর জন্য নেককার স্বামীকে অনুরূপ উপকরণ বিবেচনার পক্ষে দুটি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, নারী পুরুষের সমগোত্রীয়, তাই সমজাতীয় বিধান তাদের উভয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নেককার স্ত্রী পুরুষকে বৈধ উপায়ে যৌনচাহিদা পূরণ ও ধর্মীয় কর্তব্য পালনে সাহায্য করেন; একইভাবে নেককার স্বামীও স্ত্রীকে যৌনচাহিদা পূরণ ও ধর্মপালনে সাহায্য করতে পারেন। প্রশ্নোত্তরে সানআনির ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে পুরুষের জন্য নারীর যৌন আকর্ষণ, অবৈধ যৌনসম্পর্ক থেকে বিরত থাকার সুবিধা এবং স্ত্রীর মাধ্যমে ধর্মীয় কল্যাণ লাভের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হাদিসটির প্রত্যক্ষ পুরুষকেন্দ্রিক বক্তব্য এবং নারীর ক্ষেত্রে পরে প্রয়োগ করা অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্তের পার্থক্য স্পষ্ট থাকে।

ফতোয়াটির যুক্তি নিজেই হাদিসের ভাষাগত অসাম্য প্রকাশ করে: পুরুষের জন্য নারী উপভোগের উপকরণ—এ কথাটি সরাসরি বলা হয়েছে; নারীর জন্য পুরুষ একই ধরনের উপকরণ—এ সিদ্ধান্তটি পরে অনুমান করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অনুমিত এই সমতা মূল বক্তব্যের একমুখী চরিত্র পরিবর্তন করে না। বরং নারীকে পুরুষের উপকারের নিরিখে মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত ভাষাকে অপরিবর্তিত রেখেই তার সঙ্গে একটি পরবর্তী ব্যাখ্যা যোগ করা হয়েছে।


হাদিসের প্রশংসা থেকে নারীর আনুগত্যের বিধান

নারীকে উত্তম উপভোগের উপকরণ হিসেবে দেখার ধারণাটি পরবর্তী ইসলামি আলোচনায় আনুগত্যের বিধানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া বিবাহের পর স্বামীর কর্তৃত্ব পিতামাতার কর্তৃত্বের চেয়েও বেশি এবং স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য অধিক বাধ্যতামূলক—এমন আলোচনা করতে গিয়ে এই হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন। ইসলামকিউএ তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়া থেকে বক্তব্যটি সংকলন করেছে। অর্থাৎ এটি কেবল সৌজন্যমূলক প্রশংসাবাক্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; স্বামীর অধিকারের শ্রেষ্ঠত্ব এবং স্ত্রীর আনুগত্যের ধর্মীয় যুক্তির মধ্যেও হাদিসটির স্থান রয়েছে। [22]

الْمَرْأَةُ إذَا تَزَوَّجَتْ كَانَ زَوْجُهَا أَمْلَكَ بِهَا مِنْ أَبَوَيْهَا وَطَاعَةُ زَوْجِهَا عَلَيْهَا أَوْجَبُ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى : { فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ }

বাংলা অনুবাদ: নারী বিবাহিত হলে তার ওপর স্বামীর কর্তৃত্ব তার পিতামাতার কর্তৃত্বের চেয়েও অধিক হয় এবং স্বামীর আনুগত্য পালন করা তার জন্য অধিক বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, “সুতরাং নেককার নারীরা অনুগত এবং আল্লাহ যা রক্ষা করতে বলেছেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তা রক্ষা করে।”

ইবনে তাইমিয়া এই বক্তব্যের অব্যবহিত পরেই “দুনিয়া উপভোগের উপকরণ এবং তার সর্বোত্তম উপকরণ নেককার নারী” হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত বর্ণনায় আদর্শ স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বামী তাকালে তাকে আনন্দ দেওয়া, আদেশ করলে তা পালন করা এবং অনুপস্থিতিতে নিজের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদ রক্ষার কথা রয়েছে। তিনি আরও একটি হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে নারীর নামাজ, রোজা, সতীত্ব রক্ষা এবং স্বামীর আনুগত্যকে জান্নাতে প্রবেশের শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী ঘর থেকে বের হতে পারবেন না, এমনকি পিতামাতা নির্দেশ দিলেও নয়। এর ফলে নেককার নারীকে পুরুষের সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ বলার বক্তব্যটি তাঁর আলোচনায় স্বামীর আনুগত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।


নারীর মানবিক মর্যাদার সঙ্গে এই বক্তব্যের মৌলিক সংঘাত

‘দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ’ হিসেবে নারীকে শ্রেণিবদ্ধ করার মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে গৌণ করার সমস্যা নিহিত। একজন মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, অনুভূতি, সিদ্ধান্ত ও মর্যাদা তাঁকে অন্যের জন্য কতটা উপকারী করে তোলে, তার ওপর নির্ভর করে না। অথচ হাদিসটির মূল্যায়নের কেন্দ্র পুরুষ নারী থেকে কী পান। নারী নিজে কী চান, যৌনসম্পর্কে সম্মতি দেন কি না, নিজের শরীর ও জীবনের ওপর তাঁর সিদ্ধান্তের কতখানি অধিকার রয়েছে—এসব এখানে শ্রেষ্ঠত্বের কোনো মানদণ্ড নয়। পুরুষের প্রাপ্ত সুবিধাকে নারীর নৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করা তাই একজন স্বাধীন মানুষকে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে নামিয়ে আনার চিন্তার সঙ্গে যুক্ত।

মুনাবির উদ্ধৃত ব্যাখ্যায় যৌনচাহিদা পূরণ ও আদেশ পালন; আল-উসাইমিনের ব্যাখ্যায় ঘর-সন্তান-সম্পদ রক্ষা; ইবনে তাইমিয়ার ব্যাখ্যায় স্বামীর উচ্চতর কর্তৃত্ব—এসব পৃথক সূত্র পরস্পরের সঙ্গে মিলে একই পুরুষকেন্দ্রিক সামাজিক আদর্শ প্রকাশ করে। এখানে ‘নেককার’ নারীর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বাধীন নৈতিক ব্যক্তিত্বের বদলে আনুগত্য, যৌনপ্রাপ্যতা ও পারিবারিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একজন মানুষকে ভালোবাসার যোগ্য ব্যক্তি না ভেবে অন্যের জীবনের উত্তম ভোগসামগ্রী হিসেবে বর্ণনা করা নৈতিকভাবে অবমাননাকর। ধর্মীয় মর্যাদায় এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করলে সেই অবমাননাকর শ্রেণিবিন্যাস নৈতিক আদর্শের রূপ পায়।

সহিহ মুসলিমের হাদিসে নারীকে সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ বলা হয়েছে। প্রথাগত ব্যাখ্যাকাররা তাঁর ‘উত্তম’ হওয়ার মানদণ্ড হিসেবে পুরুষের যৌনতৃপ্তি, আনুগত্য, সম্পদ রক্ষা ও সন্তান প্রতিপালনের ব্যবহারিক লাভকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পুরুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নারীর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের এই দৃষ্টিভঙ্গি সমান স্বায়ত্তশাসনসম্পন্ন মানুষের ধারণার সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। কোরআনে স্ত্রীকে পুরুষের ‘শস্যক্ষেত্র’ বলার ভাষার সঙ্গেও এর প্রত্যক্ষ সামঞ্জস্য রয়েছে: উভয় ক্ষেত্রেই নারীর শরীর ও শ্রম পুরুষের উপকারের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়িত।


রূপক থেকে বিধান: স্বামীর যৌনচাহিদা এবং স্ত্রীর প্রত্যাখ্যান

নারীকে উপভোগের উপকরণ বলার সমস্যা আরও প্রকট হয়, যখন দাম্পত্য যৌনতাকে পরিচালনাকারী বিধানগুলো দেখা হয়। একদিকে পুরুষের ইচ্ছা ও অনুমোদিত যৌনপদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে; অন্যদিকে স্ত্রী সেই যৌনসম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করলে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় ভীতি এবং শাস্তির কাঠামো গড়ে উঠেছে। যৌনসম্মতির মৌলিক অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের শরীর সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেবেন এবং কোনো সময়ে অনিচ্ছুক হলে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন। শুধুমাত্র বিবাহ সম্পন্ন হওয়া ভবিষ্যতের প্রতিটি যৌনকর্মে স্থায়ী সম্মতির সমার্থক নয়।


স্বামীর ডাকে না এলে ফেরেশতাদের অভিশাপ

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণিত আছে, স্বামী স্ত্রীকে শয্যায় আহ্বান করলে এবং স্ত্রী প্রত্যাখ্যান করায় স্বামী অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটালে ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত স্ত্রীকে অভিশাপ দেয়। এখানে স্ত্রীর অনিচ্ছাকে স্বামীর অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত করে অতিপ্রাকৃত শাস্তির ভয় সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই বর্ণনার বিধানগত আলোচনা ইসলামে বৈবাহিক ধর্ষণের অনুমোদন প্রবন্ধের বিষয়। [23] [24]

সহিহ বুখারির ৩২৩৭ নম্বর হাদিসে স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যানের পর তাঁর রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটানোর কথা রয়েছে। একই গ্রন্থের ৫১৯৩ নম্বর হাদিসে ফেরেশতাদের অভিশাপের বিধানটি স্বামীর রাগান্বিত হওয়ার শর্ত উল্লেখ না করেই বর্ণিত হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ১৪৩৬গ নম্বর হাদিসে আরও বলা হয়েছে, স্ত্রী স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে স্বামী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন। তিনটি বর্ণনাতেই স্ত্রীর যৌনসম্পর্ক প্রত্যাখ্যানকে ধর্মীয় অসন্তোষ বা অভিশাপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [23] [25] [26]

সহিহ বুখারি ৩২৩৭:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلاَئِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ

বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে নিজের শয্যায় আহ্বান করলে স্ত্রী যদি তা প্রত্যাখ্যান করে এবং স্বামী তার প্রতি রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তাহলে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা ওই স্ত্রীকে অভিশাপ দিতে থাকে।

সহিহ বুখারি ৫১৯৩:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ أَنْ تَجِيءَ لَعَنَتْهَا الْمَلاَئِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ

বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে নিজের শয্যায় আহ্বান করলে স্ত্রী যদি আসতে অস্বীকার করে, তাহলে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।

সহিহ মুসলিম ১৪৩৬গ:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا فَتَأْبَى عَلَيْهِ إِلاَّ كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا

বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! কোনো পুরুষ যখন তার স্ত্রীকে শয্যায় আহ্বান করে এবং স্ত্রী তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন আসমানে যিনি রয়েছেন তিনি সেই স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যতক্ষণ না তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়।


ইসলামওয়েব: স্ত্রীর নিজের যৌনইচ্ছা না থাকাও অজুহাত নয়

ইসলামওয়েবের ৭৪৪০৯ নম্বর ফতোয়ায় সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্ত্রী বর্তমানে যৌনইচ্ছা বা যৌনসম্পর্কের প্রয়োজন অনুভব না করলে স্বামীর সঙ্গে যৌনমিলন প্রত্যাখ্যান করতে পারেন কি না। জবাবে প্রথমে আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণিত ফেরেশতাদের অভিশাপসংক্রান্ত হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফার বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, স্ত্রী স্বামীর অধিকার সম্পূর্ণ আদায় না করলে আল্লাহর অধিকারও পূর্ণভাবে আদায় করেন না; এমনকি উটের পিঠের আসনে থাকা অবস্থায় স্বামী যৌনসম্পর্ক চাইলে স্ত্রী তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবেন না। আরও উদ্ধৃত হয়েছে তিরমিজির ১১৬০ নম্বর হাদিস, যেখানে স্ত্রী চুলায় রুটি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকলেও স্বামীর যৌন আহ্বানে সাড়া দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

ফতোয়ায় মুবারকফুরির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চুলায় রুটি তৈরি এমন একটি ব্যস্ততাপূর্ণ কাজ, যা সাধারণত শেষ না করে অন্য কাজে যাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও হাদিসে স্বামীর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এরপর মুনাবির ব্যাখ্যার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য ধর্মীয় ওজর না থাকলে স্ত্রীর অবিলম্বে সাড়া দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। সবশেষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, স্ত্রীর নিজের যৌনইচ্ছা না থাকা প্রত্যাখ্যানের গ্রহণযোগ্য কারণ নয়; শারীরিকভাবে সক্ষম থাকলে তাঁকে স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিতে হবে। [27] [28]

জামে আত-তিরমিজি ১১৬০ — ফতোয়ায় উদ্ধৃত হাদিস:
إِذَا الرَّجُلُ دَعَا زَوْجَتَهُ لِحَاجَتِهِ فَلْتَأْتِهِ وَإِنْ كَانَتْ عَلَى التَّنُّورِ

বাংলা অনুবাদ: তালক ইবনে আলি থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য আহ্বান করলে স্ত্রী যেন তার কাছে আসে, এমনকি সে চুলার কাছে রুটি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকলেও।

ইসলামওয়েবের ফতোয়া ৭৪৪০৯ — চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
وليس ما ذكر في السؤال من عدم شهوتها ونحو ذلك عذرا للامتناع لأنها قادرة على إجابته، وما دامت قادرة فلا تعذر.

বাংলা অনুবাদ: প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্ত্রীর যৌনইচ্ছা নেই বা এ ধরনের অন্য কোনো অবস্থা রয়েছে। কিন্তু এগুলো যৌনসম্পর্ক প্রত্যাখ্যানের গ্রহণযোগ্য অজুহাত নয়। কারণ স্ত্রী স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিতে সক্ষম। আর যতক্ষণ তিনি সক্ষম থাকবেন, ততক্ষণ তাঁর প্রত্যাখ্যানের অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না।


ইসলামকিউএ: প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে ভরণপোষণ ও শাস্তির সম্পর্ক

ইসলামকিউএর ৩৩৫৯৭ নম্বর ফতোয়ার শিরোনামই “স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে যৌনমিলনে বাধ্য করা” প্রসঙ্গে। সেখানে বলা হয়েছে, স্বামী আহ্বান করলে স্ত্রীকে সাড়া দিতে হবে, ক্ষতি বা অনুমোদিত ওজর না থাকলে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। অকারণে প্রত্যাখ্যান করলে স্ত্রীকে অবাধ্য গণ্য করে ভরণপোষণ ও পোশাকের অধিকার হারানোর কথা এবং শারীরিক শাস্তির অনুমতির কথাও আলোচিত হয়েছে। ফতোয়াটি ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করে এই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ যৌনসম্পর্কে নারীর অনিচ্ছাকে কেবল পারিবারিক মতভেদ নয়, অর্থনৈতিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অধীন করা হচ্ছে। [29]

فَإِنِ امْتَنَعَتْ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ كَانَتْ عَاصِيَةً نَاشِزًا، تَسْقُطُ نَفَقَتُهَا وَكِسْوَتُهَا. وَعَلَى الزَّوْجِ أَنْ يَعِظَهَا وَيُخَوِّفَهَا مِنْ عِقَابِ اللَّهِ، وَيَهْجُرَهَا فِي الْمَضْجَعِ، وَلَهُ أَنْ يَضْرِبَهَا ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ.

বাংলা অনুবাদ: স্ত্রী যদি গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ ছাড়া স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হতে অস্বীকার করেন, তাহলে তিনি অবাধ্য ও নাশিজা হিসেবে গণ্য হবেন। এর ফলে তাঁর ভরণপোষণ ও পোশাকের প্রাপ্যতা বাতিল হয়ে যাবে। স্বামী তাঁকে উপদেশ দেবেন এবং আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখাবেন। এরপর স্বামী তাঁকে শয্যায় পরিত্যাগ করতে পারবেন। স্বামীর জন্য স্ত্রীকে এমনভাবে প্রহার করারও অনুমতি রয়েছে, যাতে গুরুতর আঘাত না লাগে।

এই বিধানের শক্তি শুধু ধর্মীয় ভীতিতে নয়, পারিবারিক ক্ষমতাবিন্যাসেও নিহিত। স্ত্রী নিজের যৌনইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দিলে তিনি আর্থিক অধিকার হারানোর আশঙ্কায় পড়বেন—এমন ব্যবস্থা স্বাধীন যৌনসম্মতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংশ্লিষ্ট শাস্তিমূলক বিধান ও তার ফিকহি প্রমাণ বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে ইসলামে স্ত্রী প্রহারের বৈধতা প্রবন্ধে। এ প্রসঙ্গে স্বামীর উচ্চতর আনুগত্য দাবি এবং স্ত্রীর অধস্তন অবস্থানের আলাদা প্রমাণ রয়েছে ইসলামে স্বামী প্রায় সিজদার উপযুক্ত প্রবন্ধে।


বিবাহ, দেনমোহর এবং নারীর যৌনাঙ্গে প্রবেশাধিকারের আইনি ভাষা

কোরআনের “শস্যক্ষেত্র” এবং হাদিসের “উপভোগের উপকরণ” উপমার সঙ্গে ইসলামি বিবাহ ও দেনমোহরসংক্রান্ত আইনি ভাষার একটি যোগসূত্র রয়েছে। হাদিসের নির্দিষ্ট বর্ণনায় যৌনমিলনের অধিকার লাভকে দেনমোহরের বিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সহিহ বুখারিতে লিআনের পর স্বামীর দেনমোহর ফেরত চাওয়ার প্রসঙ্গে নবীর সিদ্ধান্তে যৌনমিলনের অধিকারকে অর্থ দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই আইনগত বিনিময়-ভাবনার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে দেনমোহর: নারীর লজ্জাস্থানের মূল্য প্রবন্ধে। [30]

حِسَابُكُمَا عَلَى اللَّهِ أَحَدُكُمَا كَاذِبٌ، لَا سَبِيلَ لَكَ عَلَيْهَا. قَالَ: مَالِي؟ قَالَ: لَا مَالَ لَكَ، إِنْ كُنْتَ صَدَقْتَ عَلَيْهَا، فَهْوَ بِمَا اسْتَحْلَلْتَ مِنْ فَرْجِهَا، وَإِنْ كُنْتَ كَذَبْتَ عَلَيْهَا، فَذَاكَ أَبْعَدُ لَكَ.

বাংলা অনুবাদ: সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণিত, তিনি ইবনে উমরকে লিআনকারী স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ইবনে উমর জানান, মুহাম্মদ সেই স্বামী-স্ত্রীকে বলেছিলেন, “তোমাদের উভয়ের হিসাব আল্লাহর কাছে। তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী। এই নারীর ওপর তোমার আর কোনো অধিকার নেই।”

তখন স্বামী প্রশ্ন করলেন, “আমার সম্পদের কী হবে?” অর্থাৎ স্ত্রীকে দেওয়া দেনমোহরের অর্থ তিনি ফেরত পাবেন কি না। মুহাম্মদ বললেন, “তুমি তোমার সম্পদ ফেরত পাবে না। যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগ সত্য হয়, তাহলেও সেই অর্থ ছিল তার যৌনাঙ্গ তোমার জন্য বৈধ করার বিনিময়ে। আর যদি তুমি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে থাকো, তাহলে সেই সম্পদ ফেরত পাওয়ার অধিকার থেকে তুমি আরও বেশি দূরে রয়েছ।”

সহিহ বুখারি ৫৩১২-এর ভাষায় দেনমোহরের অর্থ স্ত্রীর যৌনাঙ্গ স্বামীর জন্য বৈধ করার বিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত। অর্থপ্রদান ও যৌনপ্রাপ্যতাকে এভাবে একই আইনি বিনিময়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় নারীর শরীরে প্রবেশাধিকার বৈবাহিক অধিকার হিসেবে বর্ণিত হয়, অথচ কোনো অর্থপ্রদান ভবিষ্যতের প্রতিটি যৌনকর্মে নারীর স্বাধীন সম্মতি নিশ্চিত করে না। যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতি প্রত্যেকবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত; বৈবাহিক চুক্তি বা অর্থের বিনিময় তাকে স্থায়ীভাবে অন্যের অধীনে সমর্পণ করার নৈতিক ভিত্তি হতে পারে না।


সাহিত্যিক উপমা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও নারীর যৌনস্বাধীনতা

কোনো ব্যক্তিকে প্রিয়জনের “শান্তি”, “ধন” কিংবা “সম্পদ” বলা সাহিত্যিক মূল্যায়ন হতে পারে। এই শব্দগুলোর তাৎপর্য নির্ধারিত হয় বক্তব্যের বিষয়, বক্তার অবস্থান এবং সম্পর্কের ধরন দিয়ে। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতায় ব্যক্তিগত প্রশান্তির অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে; সেটি নারীদের দাম্পত্য আনুগত্যের বিধান নয়। রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী গল্পে “সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ” কথাটিতে তো সম্পত্তির সম্পর্কটি স্পষ্টভাবেই অস্বীকার করা হয়েছে। বিপরীতে ধর্মীয় বিধানসংবলিত পাঠে নারীকে “উপভোগের উপকরণ” বলার অর্থ ওই বক্তব্যের সামাজিক ও আইনগত প্রয়োগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সহিহ মুসলিমের হাদিসটির ব্যাখ্যায় স্বামীর যৌনচাহিদা পূরণ, আনুগত্য, গৃহস্থালির সেবা ও সন্তান প্রতিপালনকে শ্রেষ্ঠ স্ত্রীর গুণ হিসেবে নির্ধারণ করার কারণে শব্দটি কেবল আবেগপূর্ণ সম্বোধন হয়ে থাকে না। [31]


নৈতিক সহযোগিতার ঘোষণা দাম্পত্যে সমান কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে না

কোরআনের সূরা তাওবা ৯:৭১-এ বিশ্বাসী নারী ও পুরুষকে পরস্পরের মিত্র ও সহযোগী বলা হয়েছে। আয়াতটি তাদের সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজ থেকে নিষেধ, নামাজ, জাকাত এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের কথা বলেছে। এই ধর্মীয় সহযোগিতার ঘোষণার সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে কার যৌনইচ্ছা অগ্রাধিকার পাবে, যৌনসম্পর্কে অনিচ্ছা প্রকাশের কী পরিণতি হবে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর ক্ষমতা কতটা সমান—এসব আলাদা প্রশ্ন। সহিহ বুখারি-মুসলিমের প্রত্যাখ্যানসংক্রান্ত বর্ণনা এবং ইসলামি ফিকহে নুশুজের বিধানগুলো সেই প্রশ্নে পুরুষের কর্তৃত্ব ও স্ত্রীর বাধ্যবাধকতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে ধর্মীয় সহযোগিতার ভাষা থাকলেও যৌনসম্মতি ও দাম্পত্য ক্ষমতার অসমতা অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে। [32] [23] [33]

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَٰئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ: বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারীরা একে অন্যের মিত্র ও সহযোগী। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা তাওবা, ৯:৭১)

একইভাবে কোরআনের সূরা নিসা ৪:১৯-এ নারীদের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হয়েছে এবং ৪:২২-এ পিতার বিবাহিত স্ত্রীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ হয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট সামাজিক প্রথা নিষিদ্ধ করার বিধান। কিন্তু একটি প্রথার নিষেধাজ্ঞা একই ধর্মীয় ব্যবস্থায় বিদ্যমান অন্য বৈষম্যমূলক বিধানকে বাতিল করে না। কোনো সমাজে নারীর কয়েকটি অধিকার স্বীকৃত হলেই তিনি বৈবাহিক যৌনসম্পর্কে সমান সিদ্ধান্তের অধিকারী হয়ে যান না। সেই অধিকার নির্ধারিত হয় তাঁর সম্মতি প্রত্যাহারের স্বাধীনতা এবং প্রত্যাখ্যানের পরিণতি দিয়ে। স্বামীর যৌন আহ্বান প্রত্যাখ্যানের কারণে অভিশাপ, ধর্মীয় অসন্তোষ, ভরণপোষণ বন্ধ ও প্রহারের বিধান স্বীকৃত থাকলে নারীকে সমান স্বায়ত্তশাসনসম্পন্ন দাম্পত্যসঙ্গী হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি যৌক্তিকভাবে টেকে না। [34] [35] [27]


নারীর অবজেক্টিফিকেশনের সামাজিক ও নৈতিক পরিণতি

নারীর সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশন সমাজে লিঙ্গ বৈষম্যকেও স্থায়ী করে, কারণ এটি এই ধারণাটিকে শক্তিশালী করে যে নারীরা পুরুষদের থেকে নিকৃষ্ট এবং শুধুমাত্র তাদের যৌনকর্ম ও বাচ্চা উৎপাদনের জন্য মূল্যবান। অধিকন্তু, নারীদের সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশন লিঙ্গ স্টিরিওটাইপগুলিকেও শক্তিশালী করে, যেমন এই ধারণার জন্ম দেয় যে, নারী হচ্ছে পুরুষের বশ্যতা স্বীকার করবে এবং এটিই তাদের ভবিতব্য। এবং এই ধারণাটিকে শক্তিশালী করে যে মহিলারা শুধুমাত্র কিছু বিশেষ কাজের জন্য উপযুক্ত, যা তাদের শিক্ষাদীক্ষা, পেশা নির্বাচন, স্বাধীন জীবনযাপন ইত্যাদির সুযোগ সীমিত করতে পারে। নারীর অবজেক্টিফিকেশন একটি ক্ষতিকর সামাজিক সমস্যা যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই সুদূরপ্রসারী পরিণতি বহন করে। এই সমস্যাটি মোকাবেলা করার জন্য, সর্বক্ষেত্রে নারীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সম্মানজনক সমাজ তৈরি করতে হবে, যেখানে নারীরা কেবল তাদের শরীর নয়, মানুষ হিসেবেই সম্মান ও আত্মমর্যাদা নিয়ে জীবন যাপন করতে পারবে [8]

অবজেক্টিফিকেশন ব্যক্তি-সম্পর্কের সমস্যা হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্নও। নারীকে মূলত পুরুষের শরীরী চাহিদা পূরণ, সন্তানধারণ এবং অনুগত দাম্পত্যসঙ্গীর ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করে বর্ণনা করা হলে তার শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় গৌণ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নারী নিজের জন্য কী জীবন চান—তার চেয়ে পুরুষ তার কাছে কী দাবি করতে পারেন—সেই প্রশ্ন কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। এটি নৈতিকভাবে সমস্যাজনক, কারণ কোনো মানুষকে কেবল আরেকজনের উপকারিতা দিয়ে মূল্যায়ন করলে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও প্রত্যাখ্যানের অধিকার সমান মর্যাদা পায় না।

নারীর শরীরকে অন্যের মূল্যায়নের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা তাঁর আত্মমূল্যায়ন, উদ্বেগ ও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে—ফ্রেডরিকসন ও রবার্টসের অবজেক্টিফিকেশন তত্ত্বে এই প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উপরে উদ্ধৃত আয়াত, তাফসির, হাদিস ও ফতোয়াগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর: নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিপরীতে পুরুষের যৌনপ্রয়োজন ও কর্তৃত্বকে ধর্মীয় নিয়মের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি-সম্পর্কের বৈষম্য যখন অলৌকিক শাস্তির ভয়, ভরণপোষণ বন্ধের হুমকি এবং বৈবাহিক আনুগত্যের বিধান দিয়ে সমর্থিত হয়, তখন নারীর আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর চাপ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। [36]


উপসংহার

সূরা আরাফ ৭:১৮৯-এ নারী পুরুষের প্রশান্তির জন্য সৃষ্ট সঙ্গিনী; সূরা বাকারা ২:২২৩-এ স্ত্রী পুরুষের শস্যক্ষেত্র; সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় নেককার নারী দুনিয়ার সর্বোত্তম উপভোগের উপকরণ। ইবনে কাসীর, শানকিতি, জাজ্জাজ ও কুরতুবির ব্যাখ্যায় এসব বাক্যের সৃষ্টিগত, প্রজননগত এবং যৌনসুখকেন্দ্রিক অর্থ আরও স্পষ্ট হয়েছে। স্ত্রীর যৌনসম্পর্ক প্রত্যাখ্যান নিয়ে সহিহ বুখারি-মুসলিমের অভিশাপের বর্ণনা এবং ইসলামওয়েব ও ইসলামকিউএর ফতোয়া দেখায়, এই উপযোগকেন্দ্রিক ভাষা ধর্মীয় ও আইনগত কর্তব্যের সঙ্গেও যুক্ত। ধর্মীয় গ্রন্থের ভাষা আর পরবর্তী ফিকহি সিদ্ধান্ত পৃথক উৎসস্তর হলেও তাদের মিলিত ফল হচ্ছে এক অসম দাম্পত্য ক্ষমতাকাঠামো।

নারীকে সন্তানধারণের সক্ষমতা, পুরুষের তৃপ্তি কিংবা স্বামীর নির্দেশ মানার যোগ্যতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা তার মানবিক মর্যাদার যথার্থ স্বীকৃতি নয়। নারী একজন স্বতন্ত্র মানুষ; তার শরীর, যৌনইচ্ছা, ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও অনিচ্ছার অধিকার অন্য কারও সম্পত্তি নয়। স্বামীর দাবি পূরণের ক্ষমতা দিয়ে নারীর সম্মান মাপার ব্যবস্থাকে মানবিক সমতা বলা যায় না। ইসলামি মূলপাঠ, প্রাচীন তাফসির এবং সমসাময়িক ফতোয়ার নির্দিষ্ট দলিলগুলো সেই বৈষম্যমূলক ধারণার সুস্পষ্ট নথি।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Martha C. Nussbaum, Objectification (1995) ↩︎
  2. Fredrickson & Roberts, Objectification Theory (1997) ↩︎
  3. সূরা আরাফ, আয়াত ১৮৯ ↩︎
  4. আদওয়াউল বায়ান, সূরা আরাফ ৭:১৮৯, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬ ↩︎
  5. তাফসির ইবনে কাসীর, সূরা আরাফ ৭:১৮৯ ↩︎
  6. নবীদের কাহিনী–১, ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, পৃষ্ঠা ১৯ ↩︎
  7. তাফসিরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৯ ↩︎
  8. সূরা বাকারা, আয়াত ২২৩ 1 2
  9. আজ-জাজ্জাজ, মাআনিল কোরআন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৮ ↩︎
  10. শামেলা: মাআনিল কোরআন ওয়া ইরাবুহু ↩︎
  11. তাফসির আল-কুরতুবি, সূরা বাকারা ২:২২৩ ↩︎
  12. তাফসির ইবনে কাসীর, সূরা বাকারা ২:২২৩ ↩︎
  13. শামেলা: তাফসির ইবনে কাসীর, তাহকিক সামি আস-সালামা ↩︎
  14. সহিহ মুসলিম, ৭১৫ক; প্রচলিত আরবি নম্বর ১৪৬৭ ↩︎
  15. সহিহ মুসলিম (ইফা), হাদিস ৩৫১২ ↩︎
  16. আল-মুনাবি, ফায়জুল কাদির, হাদিস ৪২৭৯, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৪৮–৫৪৯ ↩︎
  17. আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি, আল-মুফহিম, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২১; সহিহ মুসলিম ১৪৬৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  18. আল-মুনাবি, ফায়জুল কাদির, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৪৯; তিবি ও আকমালের ব্যাখ্যা ↩︎
  19. আল-মুনাবি, ফায়জুল কাদির, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৫; কাজির বক্তব্য ↩︎
  20. আল-উসাইমিন, শরহু রিয়াদিস সালিহিন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৭–১২৮; ইসলামকিউএ, ফতোয়া ১০৯১৯০ ↩︎
  21. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৪৫৯১৭৯, ৬ জুলাই ২০২৩ ↩︎
  22. ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩২, পৃষ্ঠা ২৬২–২৬৩; ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৩১৭০০০ ↩︎
  23. সহিহ বুখারি ৩২৩৭ 1 2 3
  24. সহিহ মুসলিম ১৪৩৬ঘ ↩︎
  25. সহিহ বুখারি ৫১৯৩ ↩︎
  26. সহিহ মুসলিম ১৪৩৬গ ↩︎
  27. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৭৪৪০৯ 1 2
  28. জামে আত-তিরমিজি ১১৬০ ↩︎
  29. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৩৩৫৯৭, ১ জানুয়ারি ২০০৩ ↩︎
  30. সহিহ বুখারি ৫৩১২, লিআনসংক্রান্ত বিবরণ ↩︎
  31. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হৈমন্তী, গল্পগুচ্ছ ↩︎
  32. সূরা তাওবা ৯:৭১ ↩︎
  33. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৩৩৫৯৭ ↩︎
  34. সূরা নিসা ৪:১৯ ↩︎
  35. সূরা নিসা ৪:২২ ↩︎
  36. Fredrickson & Roberts, 1997 ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.