ভূমিকা
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহকে ইসলামি ঐতিহ্যে কেবল একজন ‘সাধারণ সাহাবি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না; বরং তাঁকে একজন কুরাইশ বংশীয় শিক্ষিত ব্যক্তি এবং মুহাম্মদের ওহি লেখকদের একজন বলে চিহ্নিত করা হয়। এই পরিচয়ের মধ্যেই একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে: ওহি লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তি কেন ধর্মত্যাগ করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে সেই বাণী রচনায় নিজের অংশগ্রহণের অভিযোগ তুলবেন? তিনি যদি সত্যিই মুহাম্মদের নির্দেশে কোরআন লিখে থাকেন, তাহলে ওহি বলার, শোনার, লেখার এবং যাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকার কথা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই যখন তাঁর মনে সংশয় জন্মানোর বিবরণ পাওয়া যায়, তখন বিষয়টিকে শুধু একজন ব্যক্তির বিশ্বাস হারানো বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটি সরাসরি কোরআনের কথিত ঐশ্বরিক উৎস এবং সেই বাণী লিপিবদ্ধ করার প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
মুহাম্মদ যদি নিজে নিরক্ষর হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে নিশ্চিত হতেন যে, তাঁর ওহি লেখক ঠিক সেই শব্দগুলোই লিখছেন, যেগুলো তিনি বলেছেন? একজন নিরক্ষর ব্যক্তি অন্যের লেখা পড়ে যাচাই করতে পারেন না, কিন্তু লেখককে দিয়ে তা পড়ে শুনিয়ে যাচাই করতে পারেন। এখানেই প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে: লেখা কি নিয়মিত পড়ে শোনানো হতো? হলে পরিবর্তিত শব্দ ধরা পড়ত কীভাবে? আর পরিবর্তিত শব্দ পড়ে শোনানোর পরও যদি তা অনুমোদন করা হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যাটি শুধু লেখকের অসতর্কতা বা নবীর নিরক্ষরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি পৌঁছে যায় কোন শব্দকে ওহি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে এবং সেই গ্রহণের মানদণ্ড কী—এই মৌলিক প্রশ্নে। যে বাণীর প্রতিটি শব্দ আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে বলে দাবি করা হয়, তার শব্দ নির্বাচনে একজন লেখকের প্রস্তাব বা পরিবর্তন গ্রহণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
একাধিক প্রাচীন ইসলামি তাফসিরি ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে সচেতনভাবে শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ সংরক্ষিত আছে। কোনো বর্ণনায় আল্লাহর একটি গুণবাচক শব্দের জায়গায় অন্য গুণবাচক শব্দ লেখার কথা এসেছে; কোনো বর্ণনায় এসেছে, পরিবর্তিত লেখা মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর পর তিনি সেটিকে একই অর্থের বা গ্রহণযোগ্য বলে অনুমোদন করতেন। আবদুল্লাহ এই অভিজ্ঞতা থেকে দাবি করেছিলেন যে, মুহাম্মদের নামে প্রচারিত বাণীর মতো কথা তিনিও বলতে পারেন। এখানে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হলো: যদি ওহি সত্যিই নির্দিষ্ট শব্দে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে লেখকের নির্বাচিত বিকল্প শব্দ কীভাবে সেই ওহির সমপর্যায়ের হয়ে যায়? অর্থ কাছাকাছি হলেই কি দুটি ভিন্ন বাক্য একই ঐশ্বরিক বাণী হয়ে যায়? আর যদি লেখকের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে কোরআনের শব্দবিন্যাসে তাঁর ভূমিকা কোথায় শেষ এবং কথিত ঐশ্বরিক নির্দেশ কোথায় শুরু—সেই সীমারেখা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?
এর সঙ্গে যুক্ত হয় মুহাম্মদের স্মৃতি এবং কোরআনের আয়াত ভুলে যাওয়ার বিষয়ে ইসলামি বর্ণনাগুলো। কোনো বাণী মুখে বলা হলো, লেখক সেটি লিখলেন, পরে সেই লেখা আবার শুনিয়ে অনুমোদন নেওয়া হলো—এই পুরো ব্যবস্থাই মানুষের স্মৃতি, শ্রবণ, ভাষা বোঝার ক্ষমতা এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর নির্ভর করে। অথচ ধর্মীয় দাবিতে এই মানবিক প্রক্রিয়ার ফলাফলকে উপস্থাপন করা হয় ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা ঈশ্বরের অপরিবর্তিত বাণী হিসেবে। সেই দাবি যাচাই করতে হলে শুধু ‘আল্লাহ সংরক্ষণ করেছেন’ বলা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে কীভাবে সংরক্ষণ হয়েছে, কোন পরিবর্তন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কোনটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার প্রমাণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। আবদুল্লাহর অভিযোগ সত্য হলে বর্তমান পাঠের কোনো অংশে একজন ওহি লেখকের রচিত বা নির্বাচিত বাক্য রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে। আর অভিযোগটি মিথ্যা হলে, সেটি মিথ্যা প্রমাণ করার জন্যও ধর্মীয় আনুগত্যের বাইরে যাচাইযোগ্য কারণ প্রয়োজন।
আবদুল্লাহর সংশয় শুধু শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগে থেমে থাকেনি। সূরা মুমিনুনের একটি প্রশংসাবাক্য তাঁর নিজের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার পর সেটিকে ওহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করার বিবরণও ইসলামি গ্রন্থে পাওয়া যায়। এই বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল: মুহাম্মদের কাছে যদি প্রত্যাদেশ আসে, তাহলে একই কথা আমার মুখ থেকে বের হওয়াকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আর মুহাম্মদ যদি নিজেই এই বাণী রচনা করেন, তাহলে আমিও তো তাঁর মতো কথা বলতে পারছি। ফলে তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাকে মুহাম্মদের নবুয়তের দাবির বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকেন। এই প্রচার কি শুধু একজন ব্যক্তির বিদ্রোহ, নাকি ওহি লেখার দায়িত্বে থাকা একজন মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া ইসলামের জন্য গভীরভাবে অস্বস্তিকর একটি অভিযোগ? এই প্রবন্ধে সেই অভিযোগ, মক্কা বিজয়ের সময় তাঁকে হত্যার নির্দেশ, উসমানের মধ্যস্থতায় তাঁর প্রাণ রক্ষা এবং ঘটনাটি থেকে পরবর্তী ইসলামি আইনবিদদের টানা সিদ্ধান্তগুলো পরীক্ষা করা হবে। প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে আগে থেকেই সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী ধরে নেওয়ার নয়; প্রশ্নটি হলো, ধর্মীয় দাবির পক্ষে উপস্থাপিত ইতিহাস সেই দাবির পরীক্ষায় কতটা টিকে থাকে।
সূরা মুমিনুনঃ মানবিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের ধর্মত্যাগের সঙ্গে যুক্ত বহুল আলোচিত বর্ণনাগুলোর একটি হলো সূরা আল-মুমিনুনের ১২ থেকে ১৪ নম্বর আয়াত লিপিবদ্ধ করার ঘটনা। এখানে মানবসৃষ্টির বিবরণ দেওয়া হয়েছে ঈশ্বরের প্রথম পুরুষে—শুক্রবিন্দু, রক্তপিণ্ড, মাংসপিণ্ড, হাড়, মাংসের আবরণ এবং শেষে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। আরবি পাঠে এই কাজগুলোর বর্ণনায় ‘আমরা’ অর্থবোধক ক্রিয়ারূপ ব্যবহৃত হয়েছে; বাংলা অনুবাদগুলোর অনেকটিতে তা ‘আমি’ দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু আয়াতের শেষ বাক্যটি হলো: “অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!” এখানে নিজের সৃষ্টিকর্ম বর্ণনা করার ভাষা থেকে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করার ভাষায় পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যখন ইসলামি তাফসিরে সংরক্ষিত একজন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসাবাক্যের ঘটনা যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি কেবল ভাষার অলংকারের আলোচনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে বাক্যটির উৎস এবং ওহি হিসেবে গ্রহণের প্রশ্ন। [1]
বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ যখন মানবসৃষ্টির আয়াতগুলো আবদুল্লাহকে লিখতে বলছিলেন, আবদুল্লাহ সৃষ্টির বিবরণ শুনে মুগ্ধ হয়ে বলে ওঠেন, “ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন”—অর্থাৎ, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়। মুহাম্মদ তখন সেই বাক্যটিও তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে বলে জানান। তাফসীরে মাযহারীর বাংলা বিবরণে বাক্যটি লিপিবদ্ধ করার নির্দেশও রয়েছে। এই ঘটনার তাৎপর্য হলো, লেখকের নিজের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উচ্চারিত কথার সঙ্গে ওহির দাবিকৃত ভাষার মিল তাঁকেই সংশয়ের দিকে নিয়ে যায়। যে বাক্য একজন লেখক নিজের উপলব্ধি থেকে বলতে পারেন, সেই একই বাক্যের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ এবং মানুষের রচনা আলাদা করে চেনার মানদণ্ড কী? মুহাম্মদের ঘোষণা ছাড়া সেই উৎস যাচাই করার আর কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, বর্ণনাটি সেই প্রশ্ন সামনে আনে। [2]
সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১৪:
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
Then We made the sperm-drop into a clinging clot, and We made the clot into a lump [of flesh], and We made [from] the lump, bones, and We covered the bones with flesh; then We developed him into another creation. So blessed is Allāh, the best of creators.
— Saheeh International
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট বাঁধা রক্তে, অতঃপর মাংসপিন্ডকে পরিণত করি হাড্ডিতে, অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করি মাংস দিয়ে, অতঃপর তাকে এক নতুন সৃষ্টিতে উন্নীত করি। কাজেই সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান!
— Taisirul Quran
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর শুক্রকে আমি ‘আলাকায় পরিণত করি। তারপর ‘আলাকাকে গোশতপিন্ডে পরিণত করি। তারপর গোশতপিন্ডকে হাড়ে পরিণত করি। তারপর হাড়কে গোশ্ত দিয়ে আবৃত করি। অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!
— Rawai Al-bayan
ইংরেজি ও বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে আমরা দেখি, সৃষ্টিকর্মের বিবরণ প্রথম পুরুষে দেওয়া হলেও শেষ বাক্যে আল্লাহকে নাম ধরে প্রশংসা করা হয়েছে। ব্যাকরণিক পুরুষের এই পরিবর্তন এবং প্রকৃত বক্তা বদলে যাওয়া এক বিষয় নয়; একজন বক্তা নিজের নাম উল্লেখ করেও কথা বলতে পারেন। কিন্তু এই ভাষাগত পর্যবেক্ষণ দিয়ে আবদুল্লাহকে নিয়ে সংরক্ষিত ঘটনাটির নিষ্পত্তি হয় না। এখানে অভিযোগটি আরও নির্দিষ্ট: আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্যটি লেখক নিজের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উচ্চারণ করেছিলেন এবং মুহাম্মদ সেটিকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ বাক্য বলে চিহ্নিত করেছিলেন। সুতরাং প্রশ্নটি শুধু ‘আয়াতে তৃতীয় পুরুষ কেন’ নয়; প্রশ্নটি হলো, যে বাক্য মানুষের মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হচ্ছে, তার ঐশ্বরিক উৎসের দাবিকে কীভাবে যাচাই করা হবে? মানুষের উচ্চারণের সঙ্গে মিল থাকাকে অলৌকিক বলে ঘোষণা করলেই সেই মিলের কারণ প্রমাণিত হয় না।
তাফসীরে মাযহারীর বিবরণ
তাফসীরে মাযহারীর বাংলা অনুবাদে ঘটনাটির একটি বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেখানে আবদুল্লাহর শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ, মানবসৃষ্টির আয়াত শুনে তাঁর নিজের প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ, সেই বাক্য লিখে নেওয়ার নির্দেশ এবং এর ফলে তাঁর ধর্মত্যাগ—সবই একই আলোচনায় এসেছে। পরে তাঁর ইসলাম গ্রহণ, উসমানের সুপারিশ এবং শেষজীবনের ধর্মীয় মর্যাদার বিবরণও যুক্ত করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, গ্রন্থটি আবদুল্লাহর পরবর্তী জীবনের প্রশংসা করলেও ওহি লিপিবদ্ধ করার সময় তাঁর সংশয় জন্মানোর অস্বস্তিকর ঘটনাটি বাদ দেয়নি। ফলে তাঁর পরবর্তী বিশ্বাসের দাবি দিয়ে পূর্ববর্তী অভিযোগটির যুক্তিগত প্রশ্ন মুছে দেওয়া যায় না। কেউ পরে বিশ্বাসে ফিরে এসেছেন—এই তথ্য থেকে তাঁর আগের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কোন বক্তব্য সত্য বা মিথ্যা ছিল, তা নিজে থেকেই নির্ধারিত হয় না। [3]
এরপর বলা হয়েছে-‘এবং যে বলে ‘আল্লাহ্ যা অবতারণ করেছেন আমিও তার অনুরূপ অবতারণ করবো, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে? বাগবী বলেছেন, এই বাক্যটি অবতীর্ণ হয়েছে আবদুল্লাহ্ বিন আবী সারাহ্ সম্পর্কে।
আবদুল্লাহ্ ইসলাম গ্রহণ করলে রসুল স. তাকে কোরআন মজীদ লিপিবদ্ধ করার কাজে নিযুক্ত করলেন। কিন্তু সে বিশ্বাসভাজন ছিলো না। রসুল স. যখন বলতেন ‘সামিয়াম বাসিরান’। সে লিখতো আলীমান হাকিমান। আবার রসুল স. বলতেন, ‘আলীমান হাকিমান, ‘সে তখন লিখতো ‘গফুরার রহীমান।’ একদিন অবতীর্ণ হলো ‘ওয়ালাক্বদ খলাকুনাল ইনসানা মিন সুলালাতিম মিনি’ (আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে)। রসুল স. সদ্য অবতীর্ণ আয়াতটি লিখতে নির্দেশ দিলেন। মানব সৃষ্টি সম্পর্কিত এই আয়াতটি খুবই ভালো লাগলো আবদুল্লাহর। সে হঠাৎ বলে উঠলো-‘ফা তাবারাকাল্লহু আহসানাল খলিকিন’ (আল্লাহপাক কতোইনা সুন্দর স্রষ্টা)। রসুল স. বললেন, এ বাক্যটিও লিপিবদ্ধ করো। এই আয়াতটিও সদ্য অবতীর্ণ। এ কথা শুনে আবদুল্লাহ্ ভাবলো আশ্চর্য! আমার উপরেও তাহলে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়। এ রকম চিন্তার ফলে সে হয়ে গেলো ধর্মত্যাগী। মিশে গেলো মুশরিকদের দলে। হজরত ইকরামা, ইবনে জারীর এবং সুদ্দীও এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন। যথাস্থানে এর বিবরণ দেয়া হবে।
বাগবী উল্লেখ করেছেন, মক্কা বিজয়ের পূর্বে রসুল স. যখন মাররুজ জাহরান নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করলেন, তখন অনুতপ্ত আবদুল্লাহ্ এসে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করলেন। হাফেজ ফাহুদ্দীন ইবনে সাইয়্যেদিন্নাস তাঁর রচিত রসুল স. এর জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তখন আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী সারাহের জন্য সুপারিশ করেছিলেন হজরত ওসমান। রসুল স. হজরত ওসমানের সুপারিশ কবুল করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী সারাহ ছিলেন খাঁটী ইমানদার। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আর কেউ কোনো সন্দেহ করেননি। শেষে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন সেজদারত অবস্থায়।


ওয়াহিদীর বর্ণনাঃ লেখকের নিজের বাক্য থেকে সংশয়ের জন্ম
ওয়াহিদী তাঁর ‘আসবাবুন নুযুল’ গ্রন্থে সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের একটি অংশের ব্যাখ্যায় ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর সংরক্ষিত বর্ণনায় আবদুল্লাহর সংশয়ের যুক্তিটি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে: মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে একই কথা আমার মুখ থেকে বের হওয়ার অর্থ আমিও প্রত্যাদেশ পেয়েছি; আর তিনি মিথ্যাবাদী হলে আমিও তাঁর মতো কথা বলতে পেরেছি। এই বক্তব্যের গুরুত্ব হলো, আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগকে এখানে কেবল লোভ, শত্রুতা বা অকারণ অবাধ্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়নি; তাঁর সংশয়ের পেছনে ওহি লেখার সময়কার একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা যুক্ত করা হয়েছে। ওয়াহিদী এটিকে কালবীর মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংশ্লিষ্ট ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণটি পড়লে বোঝা যায়, মানবিক উচ্চারণ ও কথিত প্রত্যাদেশের মিলই এই কাহিনির কেন্দ্রীয় সমস্যা। [4]
মূল আরবি:
قَوْلُهُ تَعَالَى: (وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ). نَزَلَتْ فِي عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ، كَانَ قَدْ تَكَلَّمَ بِالْإِسْلَامِ، فَدَعَاهُ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – ذَاتَ يَوْمٍ يَكْتُبُ لَهُ شَيْئًا، فَلَمَّا نَزَلَتِ الْآيَةُ الَّتِي فِي الْمُؤْمِنُونَ: (وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ) أَمْلَاهَا عَلَيْهِ، فَلَمَّا انْتَهَى إِلَى قَوْلِهِ: (ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ) عَجِبَ عَبْدُ اللَّهِ فِي تَفْصِيلِ خَلْقِ الْإِنْسَانِ، فَقَالَ: تَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -: (هَكَذَا أُنْزِلَتْ عَلَيَّ)، فَشَكَّ عَبْدُ اللَّهِ حِينَئِذٍ وَقَالَ: لَئِنْ كَانَ مُحَمَّدٌ صَادِقًا لَقَدْ أُوحِيَ إِلَيَّ كَمَا أُوحِيَ إِلَيْهِ، وَلَئِنْ كَانَ كَذَّابًا لَقَدْ قُلْتُ كَمَا قَالَ، وَذَلِكَ قَوْلُهُ: (وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ) وَارْتَدَّ عَنِ الْإِسْلَامِ، وَهَذَا قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي رِوَايَةِ الْكَلْبِيِّ.
বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহর বক্তব্য: “এবং যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব।” এটি আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল। তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছিলেন। একদিন আল্লাহর রাসুল তাঁকে কিছু লিখে দেওয়ার জন্য ডাকলেন। সূরা মুমিনুনের “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি নির্যাস থেকে” আয়াতটি অবতীর্ণ হলে তিনি তাঁকে তা লিখতে বললেন। যখন তিনি “অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম” পর্যন্ত পৌঁছালেন, মানবসৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণ শুনে আবদুল্লাহ বিস্মিত হলেন এবং বললেন, “সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!” তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, “এভাবেই আমার কাছে অবতীর্ণ হয়েছে।” সেই সময় আবদুল্লাহ সংশয়ে পড়লেন এবং বললেন, “মুহাম্মদ যদি সত্যবাদী হন, তাহলে তাঁর কাছে যেমন প্রত্যাদেশ এসেছে, আমার কাছেও তেমন প্রত্যাদেশ এসেছে। আর তিনি যদি মিথ্যাবাদী হন, তাহলে তিনি যেমন বলেছেন, আমিও তেমন বলেছি।” এটিই “এবং যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব” বক্তব্যের অর্থ। তিনি ইসলাম ত্যাগ করেন। এটি কালবীর বর্ণনায় ইবনে আব্বাসের বক্তব্য।
ওয়াহিদীর বর্ণনায় মুহাম্মদের বক্তব্য হলো, “এভাবেই আমার কাছে অবতীর্ণ হয়েছে।” এই কথাটি থেকে তিনি বাক্যটি আবদুল্লাহর উচ্চারণের আগে পেয়েছিলেন, না পরে পেয়েছিলেন—তার নির্দিষ্ট সময় জানা যায় না। কিন্তু বর্ণনায় যে অভিজ্ঞতাটি আবদুল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়েছে, সেটি পরিষ্কার: তিনি নিজের উপলব্ধি থেকে একটি বাক্য বললেন এবং মুহাম্মদ সেই বাক্যকে প্রত্যাদেশের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করলেন। মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণযোগ্য কোনো বাক্যকে ঈশ্বরের বাণী বলার জন্য ঘোষণাকারীর দাবি ছাড়া কী প্রমাণ আছে—এই প্রশ্নের উত্তর ঘটনাটিতে পাওয়া যায় না। আবদুল্লাহর সংশয়ও ঠিক এখানেই: যদি একই বাক্য তাঁর নিজের মন থেকে আসতে পারে, তাহলে মুহাম্মদের মুখ থেকে আসা বাক্যের জন্য আলাদা একটি অতিপ্রাকৃত উৎস ধরে নেওয়া কেন বাধ্যতামূলক হবে? এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে মিলটিকে শুধু ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ বলে ব্যাখ্যা করলে চলবে না; কারণ সেই ব্যাখ্যাতেই যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও প্রত্যাদেশের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে, তা আগে থেকে ধরে নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে এই বর্ণনা আমাদের দুটি পৃথক দাবির মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। একটি হলো, কোনো বাক্য লেখকের নিজের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল; অন্যটি হলো, সেই বাক্য মানুষের তৈরি হওয়ায় কোরআনে ঢুকেছে। ওয়াহিদীর কাহিনি প্রথম ঘটনাটি বর্ণনা করে এবং তা থেকে আবদুল্লাহর দ্বিতীয় সংশয়টির জন্ম দেখায়। সেই সংশয়কে খণ্ডন করতে হলে তাঁর অভিজ্ঞতার একটি যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তাঁকে ধর্মত্যাগী বলা, তাঁর পরবর্তী ইসলাম গ্রহণের কথা বলা অথবা মুহাম্মদের ঘোষণাকে শুরুতেই সত্য ধরে নেওয়া—কোনোটিই বাক্যটির উৎস সম্পর্কে সেই ব্যাখ্যা দেয় না। ওহির দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব ওহির দাবিদারের; সংশয় প্রকাশকারী লেখককে নৈতিকভাবে নিন্দা করলেই সেই দায়িত্ব পালন হয়ে যায় না।
তাবারীর বর্ণনাঃ পরিবর্তিত পাঠ পড়ে শোনানোর পরও অনুমোদনের অভিযোগ
মানবিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নটি শুধু সূরা মুমিনুনের প্রশংসাবাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাবারী তাঁর ‘জামিউল বায়ান’-এ সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় ইকরিমার নামে এমন একটি বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে আবদুল্লাহর শব্দ পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত লেখা মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর কথা স্পষ্টভাবে রয়েছে। এখানে ‘আজিজুন হাকিম’ ধরনের গুণবাচক শব্দের জায়গায় ‘গাফুরুন রহিম’ লেখা এবং তা পড়ে শোনানোর পর “হ্যাঁ, একই” বলে অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। এই বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু ‘মুহাম্মদ নিরক্ষর ছিলেন বলে লেখা দেখতে পারেননি’—এই প্রশ্নের চেয়ে আরও এগিয়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিবর্তিত শব্দ তাঁর কানে পৌঁছেছিল এবং তারপরও তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। ফলে যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল কি না—তার পাশাপাশি যাচাইয়ের সময় কোন নীতিতে ভিন্ন শব্দকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। [5]
মূল আরবি:
١٣٥٥٥ – حدثنا القاسم قال: حدثنا الحسين، قال حدثني حجاج، عن ابن جريج، عن عكرمة قوله: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء»، قال: نزلت في مسيلمة أخي بني عدي بن حنيفة، فيما كان يسجع ويتكهن به. «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح، أخي بني عامر بن لؤي، كان كتب للنبي صلى الله عليه وسلم، وكان فيما يملى «عزيز حكيم» فيكتب «غفور رحيم» فيغيره، ثم يقرأ عليه «كذا وكذا» لما حول، فيقول: «نعم، سواء». فرجع عن الإسلام ولحق بقريش وقال لهم: لقد كان ينزل عليه «عزيز حكيم» فأحوله، ثم أقرأ ما كتبت، فيقول: «نعم سواء»! ثم رجع إلى الإسلام قبل فتح مكة، إذ نزل النبي صلى الله عليه وسلم بمر.
বাংলা অনুবাদ:
১৩৫৫৫—কাসিম আমাদের বলেছেন: হুসাইন আমাদের বলেছেন; তিনি বলেছেন: হাজ্জাজ আমাকে বলেছেন, ইবনে জুরাইজের মাধ্যমে ইকরিমা থেকে। “যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা বলে, আমার কাছে প্রত্যাদেশ এসেছে, অথচ তার কাছে কোনো প্রত্যাদেশ আসেনি”—এই বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন: এটি বনি আদি ইবন হানিফার মুসায়লিমা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যে ছন্দময় কথা বলত এবং গণকের মতো বক্তব্য দিত। আর “যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব”—এটি বনি আমির ইবন লুআইয়ের আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি নবীর জন্য লিখতেন। তাঁকে যা লিখতে বলা হতো, তার মধ্যে “পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” থাকলে তিনি “ক্ষমাশীল, দয়ালু” লিখতেন এবং এভাবে পরিবর্তন করতেন। তারপর পরিবর্তিত অংশ তাঁকে পড়ে শোনাতেন; তিনি বলতেন, “হ্যাঁ, একই।” এরপর আবদুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দেন এবং তাঁদের বলেন: “তাঁর কাছে ‘পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ অবতীর্ণ হতো, আমি সেটি বদলে দিতাম। তারপর আমি যা লিখেছি, তা পড়ে শোনাতাম; তিনি বলতেন, ‘হ্যাঁ, একই!’” পরে মক্কা বিজয়ের আগে, নবী যখন মারর নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন, তিনি আবার ইসলাম গ্রহণ করেন।
এখানে ব্যবহৃত দুটি শব্দজোড়া একই শব্দ নয় এবং তাদের অর্থও হুবহু এক নয়। ‘পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ এবং ‘ক্ষমাশীল, দয়ালু’—উভয়ই আল্লাহর গুণ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, কিন্তু একটি গুণবাচক বক্তব্যের পরিবর্তে অন্যটি বসালে বাক্যের বক্তব্য বদলে যায়। ধর্মীয় দৃষ্টিতে উভয় প্রশংসা গ্রহণযোগ্য হলেই নির্দিষ্ট আয়াতে উভয় শব্দজোড়া একইভাবে অবতীর্ণ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। যে পাঠকে আল্লাহর নির্দিষ্ট বাণী বলা হচ্ছে, তার ক্ষেত্রে কোন শব্দটি সত্যিই বলা হয়েছিল এবং কোনটি লেখক পরে বেছে নিয়েছিলেন, সেই পার্থক্য মৌলিক। অভিযোগটি সত্য হলে “হ্যাঁ, একই” অনুমোদন মানুষের নির্বাচিত বিকল্পকে ওহির মর্যাদা দেওয়ার সমস্যা তৈরি করে। আর অভিযোগটি মিথ্যা হলে, সেটি মিথ্যা বলার কারণও এই নির্দিষ্ট বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাতে হবে; শুধু কোরআন পরিবর্তিত হতে পারে না বলে শুরু করা যুক্তিগতভাবে একই দাবিকে তার নিজের প্রমাণ বানানো।
তাবারী এই অভিযোগগুলো সংরক্ষণ করলেও নিজের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহর দাবিকে মিথ্যা বলেছেন। অর্থাৎ, তাবারীর গ্রন্থে অভিযোগটি রয়েছে—এই তথ্য এবং তাবারী অভিযোগটিকে সত্য মনে করেছেন—এই দাবি এক নয়। কিন্তু তাঁর ধর্মীয় সিদ্ধান্ত থেকে অভিযোগের ঐতিহাসিক অসত্যতাও নিজে থেকেই প্রমাণিত হয় না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওহি লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে ওঠা এই চ্যালেঞ্জ ইসলামি তাফসিরি ঐতিহ্যের ভেতরেই সংরক্ষিত হয়েছে। এই বর্ণনাগুলোকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সংশয়ের বিষয় শুধু ‘কোনো লেখক কলম চালিয়ে শব্দ বদলাতে পারেন কি না’ ছিল না; সংশয়ের বিষয় ছিল, পরিবর্তিত বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত কথাকে নবী কোন ভিত্তিতে ওহির ভাষা হিসেবে অনুমোদন করছেন। [6]
মুহাম্মদের স্মৃতির প্রশ্নটিও এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। ইসলামি হাদিসে তাঁর কোরআনের কোনো কোনো আয়াত ভুলে যাওয়া এবং অন্যের তিলাওয়াত শুনে তা স্মরণ হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। একজন মানুষের স্মৃতি সীমিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু মানুষের স্মৃতিনির্ভর প্রক্রিয়াকে ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা সংরক্ষণ হিসেবে ঘোষণা করলে সেই নিশ্চয়তার প্রমাণ প্রয়োজন। আবদুল্লাহর অভিযোগে লেখা পরিবর্তন এবং পরে পড়ে শোনানোর বিষয়টি থাকার কারণে এই প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট হয়: ভিন্ন শব্দ শুনে অনুমোদন দেওয়া হলে সেটি কি পূর্বে শোনা বাণীর সঠিক স্মৃতির ভিত্তিতে দেওয়া অনুমোদন, নাকি অর্থ গ্রহণযোগ্য মনে হওয়ায় দেওয়া অনুমোদন? দুটি পদ্ধতির ফল এক নয়। প্রথমটি নির্দিষ্ট পাঠ সংরক্ষণের চেষ্টা; দ্বিতীয়টি মানুষের নির্বাচিত ভাষাকে গ্রহণের সুযোগ রাখে। এই বিষয়ে সংশয়ের ‘কোরআনের আয়াত ভুলে যেতেন মুহাম্মদ’ প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
সূরা আল-মুমিনুনের ১৪ নম্বর আয়াতে সৃষ্টিকর্মের বিবরণ প্রথম পুরুষে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষ বাক্যে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করা হয়েছে। এই ভাষাগত পরিবর্তনের সঙ্গে আবদুল্লাহর নিজের মুখে প্রশংসাবাক্য উচ্চারিত হওয়ার বর্ণনাটি মিলিয়ে পড়লে বাক্যটির উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে।
“অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি…” — এখানে নিজের সৃষ্টিকর্মের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে।
“অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!” — এখানে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করা হচ্ছে।
এই ভাষার পরিবর্তন একা মানবিক সংযোজন প্রমাণ করে না। প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: ইসলামি তাফসিরে একই প্রশংসাবাক্য আবদুল্লাহর নিজের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। সেই মানবিক প্রতিক্রিয়া এবং কথিত প্রত্যাদেশের মিল কীভাবে যাচাই করা হবে?
বর্ণনা অনুযায়ী, লেখক আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ মানবসৃষ্টির বিবরণ শুনে মুগ্ধ হয়ে বলেন, “ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন।” মুহাম্মদ জানান, তাঁর কাছেও এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে। যে বাক্য লেখক নিজের উপলব্ধি থেকে বলতে পারেন, তার ঐশ্বরিক উৎসের দাবির জন্য আলাদা কী প্রমাণ রয়েছে?
তাবারীর সংরক্ষিত বর্ণনায় শুধু লেখা বদলানোর অভিযোগ নেই; পরিবর্তিত লেখা মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর পর “হ্যাঁ, একই” বলে অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি লেখা দেখে যাচাই করতে না পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি হলো, শোনা বিকল্প শব্দকে কোন ভিত্তিতে ওহির ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে?
নির্দিষ্ট শব্দে অবতীর্ণ বাণীর দাবি এবং লেখকের নির্বাচিত বিকল্প শব্দ গ্রহণের অভিযোগের মধ্যে সরাসরি বিরোধ রয়েছে। অভিযোগ সত্য হলে পাঠে মানুষের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে হবে; অভিযোগ মিথ্যা হলে তার অসত্যতার প্রমাণ দিতে হবে। বাণী ঐশ্বরিক বলেই অভিযোগ মিথ্যা—এই যুক্তি দাবিটিকেই তার নিজের প্রমাণ বানায়।
পরবর্তী মুসলিম অলংকারবিদেরা ব্যাকরণিক পুরুষ ও সম্বোধনের এমন পরিবর্তনকে ‘ইলতিফাত’ নামে আলোচনা করেছেন। কিন্তু ভাষার একটি বৈশিষ্ট্যকে শ্রেণিবদ্ধ করা এবং কোনো নির্দিষ্ট বাক্যের ঐতিহাসিক উৎস নির্ধারণ করা আলাদা কাজ। ‘ইলতিফাত’ শব্দটি বলে দিতে পারে, আয়াতে ভাষার রূপ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে; এটি বলে দিতে পারে না, আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছিল কি না কিংবা তাঁর উচ্চারিত বাক্যকে ওহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল কি না। এখানে ইসলামি তাফসিরি ঐতিহ্য নিজেই একজন মানুষের মুখ থেকে একই বাক্য উচ্চারিত হওয়ার দাবি সংরক্ষণ করেছে। সেই দাবির উত্তর ভাষার অলংকারের নাম দিয়ে শেষ করা যায় না। কোরআনের বাক্য মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব কি না এবং মানুষের রচনার সঙ্গে কথিত ঐশ্বরিক বাণী আলাদা করে চেনার উপায় কী—আবদুল্লাহর সংশয় শেষ পর্যন্ত সেই মৌলিক প্রশ্নেই ফিরে আসে।
মক্কা বিজয়ঃ ব্যক্তিগত প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা
অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদ মক্কাবাসীদের সাধারণ নিরাপত্তা ও ক্ষমা প্রদান করেছিলেন বলে ইসলামি ঐতিহ্যে বারবার উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই ‘সাধারণ ক্ষমা’র নীতি সর্বজনীন ছিল না। ইবনে কাসীরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’য় স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে, নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির জন্য হত্যার নির্দেশ বহাল রাখা হয়েছিল এবং আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ তাঁদের অন্যতম ছিলেন। নির্দেশটির কঠোরতাও লক্ষণীয়: তাঁদের কাবার গিলাফের নিচে পাওয়া গেলেও হত্যা করতে হবে। অর্থাৎ, সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণা এবং পবিত্র স্থানে আশ্রয় নেওয়া—কোনোটিই এই ব্যক্তিদের প্রাণ রক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছিল না। একজন সাবেক ওহি লেখকের ক্ষেত্রে এমন নির্দেশের কারণ অনুসন্ধান করতে হলে তাঁর ধর্মত্যাগের পাশাপাশি মুহাম্মদের নবুয়ত ও ওহি সম্পর্কে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর দিকেও তাকাতে হয়। তিনি কেবল বিশ্বাস বদলাননি; ওহি লেখার অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে মুহাম্মদের দাবির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। [7]
এখানে হিন্দ বিনতে উতবার সঙ্গে তুলনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ইবনে ইসহাকের যুদ্ধবিবরণে উহুদের পর হামজার মৃতদেহ বিকৃত করা এবং হিন্দের তাঁর কলিজা চিবানোর কথা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে হিন্দের ইসলাম গ্রহণ ও মুহাম্মদের কাছে বাইআত করার বিবরণও ইসলামি সূত্রে সংরক্ষিত আছে। একই ঐতিহ্যে এমন প্রবল শত্রুতার অতীত অতিক্রম করে হিন্দের গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার সুযোগ পাওয়া যায়, অথচ আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে দেখা যায় পবিত্র স্থানে আশ্রয় নিলেও হত্যার নির্দেশ। এই তুলনা থেকে প্রশ্ন ওঠে: ক্ষমার সীমা নির্ধারণে কোন অপরাধকে সবচেয়ে বিপজ্জনক মনে করা হচ্ছিল? মানুষের ওপর সংঘটিত সহিংসতা, নাকি নবুয়তের মূল দাবির বিরুদ্ধে একজন অভিজ্ঞ লেখকের বক্তব্য? আবদুল্লাহর অভিযোগ মিথ্যা হয়ে থাকলেও সেটিকে যাচাই করে খণ্ডন করার পথ ছিল। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সংরক্ষিত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আমরা প্রথমেই দেখি প্রাণনাশের নির্দেশ। [8]
নির্দেশটি যদি আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বিধান হিসেবে কার্যকর করা হয়ে থাকে, তাহলে পরে ব্যক্তিগত সুপারিশে সেই নির্দেশ প্রত্যাহারের ভিত্তি কী? আর যদি মুহাম্মদ নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের কারণে ব্যক্তিগতভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে সেই সিদ্ধান্তকে সর্বজনীন ন্যায়বিচারের নমুনা হিসেবে দেখানোর কারণ কী? ইবনে আবি সারহের ঘটনায় এই প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ একই বিবরণে হত্যার নির্দেশ, প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়, দীর্ঘ নীরবতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণ রক্ষার অনুমতি—সবই রয়েছে। একজন মানুষের জীবন কোন অপরাধের প্রমাণে বিপন্ন হলো এবং কোন নিয়মে রক্ষা পেল, তা বোঝার জন্য ব্যক্তিগত সুপারিশের বাইরে একটি স্পষ্ট বিচারিক মানদণ্ড প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় সেই মানদণ্ডের বদলে সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত এবং উসমানের মধ্যস্থতা।
তাবারাণী আলী ইব্ন সাঈদ রাযী ইব্ন আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: আল্লাহ্ যে দিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন সে দিন থেকে এ শহরকে ‘হারম’ করেছেন। এবং যে দিন তিনি সূর্য ও চন্দ্র স্থাপন করেন সে দিনই এ শহর স্থাপন করেন। এ শহরের সমান্তরালে অবস্থিত আকাশকেও তিনি হারম করেছেন। আমার পূর্বে কখনও এ শহর কারও জন্যে হালাল করা হয়নি। কেবল আমার ক্ষেত্রে দিবসের স্বল্পক্ষণের জন্যে হালাল করা হয়েছে। এবং স্বল্পক্ষণ পরেই পূর্বের ন্যায় আবার এর হুরমত বহাল করা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জানান হল যে, এই তো খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন? রাসূলুল্লাহ (সা) তখন একজনকে ডেকে বললেন: তুমি যাও খালিদকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বল। লোকটি এসে খালিদকে বললো: নবী করীম (সা) বলেছেন, যাকেই নাগালের মধ্যে পাও তাকেই হত্যা করতে থাক। খালিদ সেদিন সত্তর জন ব্যক্তিকে হত্যা করেন। লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে এ সংবাদ তাঁকে জানায়। তখন তিনি খালিদকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করেন, আমি কি তোমাকে নর হত্যা করতে নিষেধ করিনি? খালিদ জবাব দিলেন, অমুক ব্যক্তি আমাকে গিয়ে বলেছে-যাকেই আমি নাগালে পাই তাকেই যেন হত্যা করি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সে লোকটিকে ডেকে এনে বললেন: আমি কি তোমাকে যুদ্ধ বন্ধ করার হুকুম দিইনি? লোকটি বললো: আপনি এক প্রকার চেয়েছেন, আর আল্লাহ্ চেয়েছেন অন্য প্রকার। আপনার ইচ্ছার উপর আল্লাহর ইচ্ছাই বলবত হয়েছে। তাই যা হওয়ার ছিল তার অন্যথা আমি করতে পারিনি। তার জবাব শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা)
নীরব থাকলেন এবং তাকে কিছুই বললেন না।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সেনাধ্যক্ষদের নিকট থেকে এই মর্মে অংগীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসা লোকদের ব্যতীত অন্য কারও সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না। তবে তিনি নাম উল্লেখ করে বিশেষ কিছু লোককে হত্যার আদেশ
দিয়েছিলেন। এমনকি যদি তাদেরকে কা’বার গিলাফের নীচেও পাওয়া যায় তবু। তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ্ ইবন সা’দ ইব্ন আবু সারাহ্ ছিল অন্যতম। সে বাহ্যত: ইসলাম গ্রহণ করে ও ওহী লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু পরে সে মুরতাদ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় প্রবেশ করে তাকে হত্যার ঘোষণা দিলে সে পালিয়ে উছমান (রা)-এর কাছে আশ্রয় নেয়। সে ছিল উছমানের দুধভাই। উছমান তাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিয়ে আসেন। তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ উছমানের সাথে তার ফিরে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) উপস্থিত সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমাদের মধ্যে এমন একজন সুবুদ্ধিসম্পন্ন লোকও কি ছিল না, যে আমার নীরব থাকা অবস্থায় তাকে হত্যা করে দিত। সাহাবীগণ বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদেরকে একটু ইংগিত দিলেন না কেন? তিনি বললেন, ইংগিত দিয়ে কাউকে হত্যা করান নবীর জন্যে শোভনীয় নয়। অন্য একটি বর্ণনায় আছে- তিনি তখন বলেছিলেন: কোন নবী চোখের খিয়ানত করতে পারেন না।

ইবনে কাসীরের সংকলনে উদ্ধৃত ইবনে ইসহাকের বক্তব্যে দেখা যায়, মুহাম্মদ তাঁর সেনাধ্যক্ষদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করবে, শুধু তাদের সঙ্গেই যুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে কয়েকজনকে নাম ধরে সেই নিরাপত্তার বাইরে রাখা হয়েছিল। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মরক্ষা বা চলমান সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে কোথাও পাওয়া গেলে হত্যা করার নির্দেশ তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ও পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। ওহি লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে “আমিও একই রকম কথা বলতে পারি” দাবি করা নবুয়তের জন্য একটি গুরুতর বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ। সেই বক্তব্য বিশ্বাসীদের মনে সংশয় তৈরি করতে পারত, কারণ অভিযোগকারী নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন বাণী লিপিবদ্ধ করার কাজে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে। তাঁকে হত্যা করা হলে অভিযোগের মুখপাত্রকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো প্রমাণ তৈরি হয় না। অভিযোগকারীর মৃত্যু একটি বক্তব্যের খণ্ডন নয়।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন ওঠে: আবদুল্লাহর অভিযোগ মিথ্যা হলে প্রকাশ্যে তাঁর বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখানো হলো কোথায়? তিনি কোন শব্দ বদলেছিলেন, মুহাম্মদ কী বলেছিলেন, সেই সময়ে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না এবং তাঁর লেখা অন্য লেখকদের পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল কি না—এসব অনুসন্ধান করা যেত। এখানে উদ্ধৃত হত্যার নির্দেশ ও মধ্যস্থতার বিবরণে এমন অনুসন্ধানের বদলে পাওয়া যায় তাঁকে হত্যা করা এবং পরে বিশেষ সুপারিশে নিরাপত্তা দেওয়ার ঘটনা। ফলে প্রাণ রক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে তাঁর অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা—কোনোটিই নিষ্পত্তি হয় না। প্রকাশ্য বিতর্কে তাঁর বক্তব্য আরও মানুষকে প্রভাবিত করতে পারত কি না, সেই সন্দেহও থেকে যায়। নিজের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলা একজন লেখকের প্রতি এই কঠোর প্রতিক্রিয়া একজন সর্বজনীন করুণার নবীর দাবির সঙ্গে কীভাবে মেলে, তা পাঠকের বিচার্য।
মক্কা বিজয়ের ‘সাধারণ ক্ষমা’কে তাই ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে মূল্যায়ন করা যায় না। একটি ক্ষমা ঘোষণার নৈতিক মূল্য নির্ভর করে তার আওতা, ব্যতিক্রম এবং ব্যতিক্রম নির্ধারণের কারণের ওপর। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে সাধারণ নিরাপত্তার বাইরে রাখা, কাবার আশ্রয়েও হত্যার নির্দেশ এবং পরে উসমানের সুপারিশে প্রাণ রক্ষা—এই ধারাবাহিকতা দেখায়, তাঁর জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও শাসকের সম্মতি কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিই হত্যার অনুমতি ও ক্ষমার সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন—এই ব্যবস্থায় অভিযোগের নিরপেক্ষ পরীক্ষা কোথায়? আর সমান অপরাধে অভিযুক্ত দুজন মানুষের একজন প্রভাবশালী সুপারিশকারী পেলে বাঁচবেন এবং অন্যজন সেই সুযোগ না পেলে নিহত হবেন—এমন ব্যবস্থা ইনসাফের দাবি পূরণ করে কীভাবে?
উসমানের মধ্যস্থতা এবং ‘চোখের খিয়ানত’
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ উসমান ইবন আফফানের দুধভাই ছিলেন। প্রাণের ভয়ে তিনি উসমানের কাছে আশ্রয় নেন এবং উসমান তাঁকে নিয়ে মুহাম্মদের সামনে হাজির হন। এই সম্পর্ক ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ: হত্যার নির্দেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের জন্য এমন একজন মধ্যস্থতাকারী পেয়েছিলেন, যিনি মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সুনান আবু দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী, উসমান আবদুল্লাহর বাইআত গ্রহণের অনুরোধ করেন। মুহাম্মদ তিনবার তাঁর দিকে তাকিয়ে প্রতিবার তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরে বাইআত গ্রহণ করেন। এরপর সাহাবিদের কাছে তিনি জানতে চান, তাঁর বাইআত গ্রহণ না করার সময় উপস্থিত কেউ আবদুল্লাহকে হত্যা করল না কেন। ফলে দীর্ঘ নীরবতা ও প্রত্যাখ্যানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান করার প্রয়োজন পড়ে না; বর্ণনাতেই মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য হিসেবে হত্যার প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছে। [9]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ২১. ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার আগে, কোন বিধর্মী বন্দীকে হত্যা করা।
২৬৭৪. ’উসমান ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন ও দুইজন মহিলা ব্যতীত অন্যান্য সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং তিনি তাদের নামও ঘোষণা করেন। আর ইবন আবূ সারাহ্ … এরপর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাবী সা’দ বলেনঃ ইবন রাবী সারাহ্ ’উছমান (রাঃ) এর নিকট আত্মগোপন করে থাকেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বায়াত গ্রহণের জন্য সকলকে আহ্বান জানান, তখন উছমান (রাঃ) তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দাঁড় করে দেন এবং বলেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি ’আবদুল্লাহকে বায়াত করান। তিনি তাঁর মাথা উঠান এবং তিনবার তার দিকে তাকান এবং প্রত্যক বারই বায়াত করাতে অস্বীকার করেন।
তৃতীয় বারের পর তিনি তাকে বায়াত করান, পরে তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ তোমাদের মাঝে এমন কোন চালাক লোক কি ছিল না, যখন সে আমাকে দেখল যে, আমি তাকে বায়াত করাচ্ছি না, তখন কেন সে তাকে হত্যা করল না? তাঁরা (সাহাবীরা) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা তো আপনার অন্তরের কথা বুঝতে পারিনি। আপনি (এ ব্যাপারে) চোখ দিয়ে কেন আমাদেরকে ইশারা করলেন না? তিনি বললেনঃ কোন নবীর জন্য এ উচিত নয় যে, সে চোরা দৃষ্টিতে তাকাবে।
আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেনঃ আবদুল্লাহ্ ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর দুধ ভাই এবং ওয়ালীদ ইবন ’উকবা ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর বৈমাত্রেয় ভাই। উছমান (রাঃ) তাঁর শাসনামলে মদ্যপানের অভিযোগে তাকে শাস্তি দেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
ঘটনাটি সুনান আবু দাউদের ৪৩৫৯ নম্বর বর্ণনাতেও সম্পূর্ণ কথোপকথনসহ রয়েছে। সেখানে আত্মগোপন, উসমানের অনুরোধ, তিনবার বাইআত প্রত্যাখ্যান, পরে বাইআত গ্রহণ এবং উপস্থিতদের কাছে হত্যার প্রত্যাশা প্রকাশ—এই ধারাবাহিকতা পরিষ্কার। হত্যার প্রত্যাশাটি ছিল বাইআত গ্রহণের আগে, যখন মুহাম্মদ তাঁর হাত বাড়াচ্ছিলেন না। বাইআত গ্রহণের পর সাহাবিদের কাছে বলা কথায় তিনি সেই আগের সময়ের কথা উল্লেখ করেন। এই ঘটনাক্রমেই নৈতিক প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুতর: নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা চাইতে আসা একজন মানুষের সামনে তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে অন্য কেউ তাঁকে হত্যা করবে বলে অপেক্ষা করা হচ্ছিল। আবদুল্লাহ তখন উসমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন; তাঁর আবেদন বিবেচিত হওয়ার সময়ই তাঁর জীবন অন্যের উদ্যোগে শেষ হয়ে যেতে পারত। [10]
মূল আরবি:
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ الْمُفَضَّلِ، حَدَّثَنَا أَسْبَاطُ بْنُ نَصْرٍ، قَالَ زَعَمَ السُّدِّيُّ عَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ سَعْدٍ، قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمُ فَتْحِ مَكَّةَ اخْتَبَأَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ عِنْدَ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ فَجَاءَ بِهِ حَتَّى أَوْقَفَهُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ بَايِعْ عَبْدَ اللَّهِ. فَرَفَعَ رَأْسَهُ فَنَظَرَ إِلَيْهِ ثَلَاثًا كُلُّ ذَلِكَ يَأْبَى فَبَايَعَهُ بَعْدَ ثَلَاثٍ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ «أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلَهُ». فَقَالُوا مَا نَدْرِي يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا فِي نَفْسِكَ أَلَا أَوْمَأْتَ إِلَيْنَا بِعَيْنِكَ قَالَ «إِنَّهُ لَا يَنْبَغِي لِنَبِيٍّ أَنْ تَكُونَ لَهُ خَائِنَةُ الْأَعْيُنِ».
বাংলা অনুবাদ:
উসমান ইবন আবি শায়বা আমাদের বলেছেন; আহমদ ইবন মুফাদ্দাল আমাদের বলেছেন; আসবাত ইবন নাসর আমাদের বলেছেন। তিনি বলেন, সুদ্দী মুসআব ইবন সাদের মাধ্যমে সাদ থেকে বর্ণনা করেছেন। সাদ বলেন: মক্কা বিজয়ের দিন আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ উসমান ইবন আফফানের কাছে আত্মগোপন করেন। উসমান তাঁকে নিয়ে এসে নবীর সামনে দাঁড় করান এবং বলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আবদুল্লাহর বাইআত গ্রহণ করুন।” তিনি মাথা তুলে তাঁর দিকে তিনবার তাকালেন এবং প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনবারের পর তাঁর বাইআত গ্রহণ করলেন। তারপর সাহাবিদের দিকে ফিরে বললেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি কি ছিল না, যে আমাকে তাঁর বাইআত গ্রহণ থেকে হাত বিরত রাখতে দেখে উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করত?” তাঁরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনার মনে কী আছে, আমরা জানতাম না। আপনি আমাদের চোখ দিয়ে ইশারা করলেন না কেন?” তিনি বললেন, “কোনো নবীর জন্য চোখের খিয়ানত থাকা শোভনীয় নয়।”
সাহাবিদের উত্তরটিও লক্ষণীয়: “আপনার মনে কী আছে, আমরা জানতাম না।” অর্থাৎ, তাঁদের সামনে থাকা ব্যক্তি সম্পর্কে মুহাম্মদের তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা তাঁরা বুঝতে পারেননি। তাঁরা এমন একটি ইশারার কথা বললেন, যা সেই প্রত্যাশা প্রকাশ করতে পারত। মুহাম্মদ চোখের ইশারাকে নবীর জন্য অশোভন বললেন, কিন্তু তাঁর আগের বক্তব্যে উপস্থিত কারও উদ্যোগে আবদুল্লাহকে হত্যা করার প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছিল। এখানেই নৈতিক দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট: একটি গোপন ইশারার পদ্ধতি অশোভন গণ্য হচ্ছে, অথচ নিজের নীরবতা ও বাইআত প্রত্যাখ্যান দেখে অন্য কেউ হত্যার সিদ্ধান্ত নেবে—এই প্রত্যাশা প্রকাশ করা হচ্ছে। নৈতিক বিচার যদি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে শুধু সংকেত দেওয়ার পদ্ধতি বিচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রত্যাশিত কাজটিকেও বিচার করতে হয়। চোখের ইশারা না করার দাবি হত্যার প্রত্যাশার নৈতিক প্রশ্নটির উত্তর দেয় না।
হত্যার মানত এবং তা পূরণের অপেক্ষা
ইবনে তাইমিয়্যাহ তাঁর ‘আস-সারিমুল মাসলুল’ গ্রন্থে ঘটনাটির এমন একটি বিবরণ ব্যবহার করেছেন, যেখানে একজন মুসলিম আবদুল্লাহকে হত্যার মানত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উসমান আবদুল্লাহকে কয়েক দিন লুকিয়ে রাখেন, মক্কাবাসীরা শান্ত হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে আসেন এবং আবদুল্লাহ তওবা করে বাইআত ও নিরাপত্তা চাইতে উপস্থিত হন। মুহাম্মদের দীর্ঘ নীরবতাকে ইবনে তাইমিয়্যাহ ব্যাখ্যা করেছেন এই প্রত্যাশা দিয়ে যে, মানতকারী অথবা অন্য কেউ উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করবে। ফলে এখানে হত্যার আকাঙ্ক্ষা শুধু অস্পষ্ট মানসিক অনুমান হিসেবে উপস্থিত নয়; একটি নির্দিষ্ট হত্যার মানত এবং সেটি পূরণের অপেক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ইবনে কাসীরের সংকলনেও একজন আনসারির মানত এবং তাঁকে উদ্দেশ করে “তোমার মানত পূরণের জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম” বক্তব্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। [11]
মূল আরবি:
الطريقة الحادية عشرة: أن عبد الله بن سعد بن أبي سرح كان قد ارتد وافترى على النبي صلى الله عليه وسلم أنه يلقنه الوحي ويكتب له ما يريد فأهدر النبي صلى الله عليه وسلم دمه ونذر رجل من المسلمين ليقتلنه ثم حبسه عثمان أياما حتى اطمأن أهل مكة ثم جاء تائبا ليبايع النبي عليه الصلاة والسلام ويؤمنه فصمت رسول الله صلى الله عليه وسلم طويلا رجاء أن يقوم إليه الناذر أو غيره فيقتله ويوفي بنذره.
ففي هذا دلالة على أن المفتري على النبي صلى الله عليه وسلم الطاعن عليه قد كان له أن يقتله وأن دمه مباح وإن جاء تائبا من كفره وفريته لأن قتله لو كان حراما لم يقل النبي صلى الله عليه وسلم ما قال ولا قال للرجل: هلا وفيت بنذرك بقتله.
বাংলা অনুবাদ:
একাদশ যুক্তি: আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ ধর্মত্যাগ করেছিলেন এবং নবীর বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন যে, তিনি নবীকে ওহি শিখিয়ে দেন এবং নিজের ইচ্ছামতো তাঁর জন্য লিখে দেন। ফলে নবী তাঁর রক্তপাতের অনুমতি দেন। একজন মুসলিম তাঁকে হত্যার মানত করেন। এরপর উসমান তাঁকে কয়েক দিন লুকিয়ে রাখেন, যতক্ষণ না মক্কাবাসীরা শান্ত হন। তারপর তিনি তওবা করে নবীর বাইআত গ্রহণ এবং তাঁর কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসেন। আল্লাহর রাসুল দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকেন এই আশায় যে, মানতকারী অথবা অন্য কেউ উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করবে এবং মানত পূরণ করবে।
এতে প্রমাণ রয়েছে যে, নবীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগকারী ও তাঁর সমালোচনাকারীকে হত্যা করার অধিকার তাঁর ছিল এবং সেই ব্যক্তির রক্তপাত বৈধ ছিল, যদিও তিনি নিজের অবিশ্বাস ও মিথ্যা অভিযোগ থেকে তওবা করে আসেন। কারণ তাঁকে হত্যা করা নিষিদ্ধ হলে নবী ওই কথা বলতেন না এবং সেই ব্যক্তিকে বলতেন না, “তুমি তাঁকে হত্যা করে তোমার মানত পূরণ করলে না কেন?”
ইবনে তাইমিয়্যাহ আবদুল্লাহর অভিযোগকে মিথ্যা বলে চিহ্নিত করেছেন এবং তাঁর আলোচনার উদ্দেশ্য হলো নবীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর হত্যার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এই আইনি ব্যাখ্যায় যে ঘটনাক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, তা আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে: আবদুল্লাহ তওবা করে ফিরে আসার পরও তাঁর মৃত্যু প্রত্যাশিত ছিল। অর্থাৎ, বিশ্বাসে ফিরে আসার ঘোষণা তাঁকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়নি। তাঁকে বাঁচতে হয়েছে ব্যক্তিগত মধ্যস্থতা ও ক্ষমার মাধ্যমে। পরবর্তী বর্ণনায় তাঁকে ‘খাঁটি ঈমানদার’ বলা হলে প্রশ্ন ওঠে, সেই সম্ভাবনাটি তখন হত্যার অপেক্ষার মধ্যে কীভাবে বিবেচিত হচ্ছিল? একজন মানুষের পরিবর্তিত অবস্থান মূল্যায়নের আগে তাঁকে হত্যা করে ফেললে তাঁর তওবা বা ভবিষ্যৎ জীবন যাচাই করার সুযোগই শেষ হয়ে যায়। ইবনে তাইমিয়্যাহ এই ঘটনাকে যে আইনি নীতির প্রমাণ করেছেন, সেখানে অভিযুক্তের প্রাণ রক্ষার জন্য তওবার পাশাপাশি অন্য একটি ক্ষমতার সম্মতি প্রয়োজন হচ্ছে।
হত্যার মানতের বিষয়টিও নিজস্ব নৈতিক সমস্যা তৈরি করে। একজন ব্যক্তি আরেকজনকে হত্যা করার অঙ্গীকার করেছেন—এটি নিজে থেকে হত্যাকে ন্যায়সংগত করে না। মানতের আগে যেমন অপরাধ, প্রমাণ, শাস্তির প্রয়োজনীয়তা ও অভিযুক্তের অধিকার পরীক্ষা করা দরকার, মানতের পরও সেই দায়িত্ব থাকে। অথচ এখানে মানত পূরণ না হওয়ার কথা এমনভাবে উপস্থিত হয়েছে, যেন হত্যার উদ্যোগ না নেওয়াটিই ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয় বিষয়। নিরাপত্তা চাইতে আসা একজন মানুষকে হত্যা করার অঙ্গীকার এবং ধর্মীয় আনুগত্য একই ঘটনার মধ্যে যুক্ত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য যদি কারও প্রাণনাশের প্রস্তুতিকে উৎসাহিত করে, তাহলে সেই আনুগত্যকে নৈতিকতার মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করার যুক্তি কী? কোনো কাজ ধর্মীয় মানতের বিষয় হয়েছে বলেই সেটি ন্যায়বিচারে পরিণত হয় না।
উসমানের মধ্যস্থতার ফলাফলও তাই গুরুত্বপূর্ণ। আবদুল্লাহ শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান, কিন্তু তাঁর প্রাণ রক্ষার ঘটনাটি সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো নিয়ম দেখায় না। তাঁর পাশে ছিলেন উসমান; সেই সম্পর্কের কারণে তিনি আত্মগোপনের জায়গা এবং সরাসরি সুপারিশ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। একই অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য কেউ এমন আশ্রয় ও মধ্যস্থতা না পেলে তাঁর পরিণতি কী হতো? ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ক্ষমা করা এবং প্রত্যেক অভিযুক্তকে নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা, বক্তব্য রাখার সুযোগ ও বিচার দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই ঘটনায় ক্ষমা ঘোষণার প্রশংসা করার আগে সেই পার্থক্যটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ জীবনরক্ষার অধিকার যদি প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার ন্যায্যতা শুধু একজনের বেঁচে যাওয়ার ঘটনা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
‘চোখের খিয়ানত’ না করার বক্তব্যকে নৈতিক উচ্চতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরলেও হত্যার প্রত্যাশা, মানত পূরণের অপেক্ষা এবং তওবার পরও প্রাণের অনিশ্চয়তা একই বর্ণনার অংশ থেকে যায়। মুহাম্মদ চোখ দিয়ে ইশারা করেননি—এই বক্তব্যের পাশে রাখতে হয় তাঁর সেই প্রশ্নটিও: কেউ উঠে গিয়ে আবদুল্লাহকে হত্যা করল না কেন? একজন সংশয়বাদী পাঠকের কাছে নৈতিক মূল্যায়নের বিষয় পুরো ঘটনাটি। যে ব্যক্তি ওহির উৎস নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর বক্তব্যের প্রকাশ্য পরীক্ষা, তাঁর নিরাপত্তা এবং তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তির ভিত্তি—এসবের উত্তর ছাড়া কেবল একটি ইশারা প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে নবীর নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা যায় না। এই বর্ণনায় প্রকাশিত ক্ষমতা, ব্যক্তিগত মধ্যস্থতা ও হত্যার প্রত্যাশা নবুয়তের দাবির সঙ্গে যুক্ত ইনসাফ এবং সর্বজনীন করুণার দাবিকে কঠোর পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।
ইবনে তাইমিয়্যাহর ব্যাখ্যা
ইবনে তাইমিয়্যাহ আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের ঘটনাকে ব্যবহার করেছেন নবীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীকে হত্যার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর ব্যাখ্যায়, ওহি বিকৃতির অভিযোগ তোলা নবীকে অবমাননা করার অন্তর্ভুক্ত; ফলে অভিযোগকারী তওবা করে আবার ইসলাম গ্রহণ করলেও তাঁর প্রাণ রক্ষার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এই ব্যাখ্যা ঘটনাটির তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। একজন লেখক ওহি লিপিবদ্ধ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিযোগ করেছেন, তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশে তাঁর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে—এই ঘটনাক্রমকে ইবনে তাইমিয়্যাহ পরবর্তী অভিযুক্তদের জীবন-মৃত্যু নির্ধারণের নীতিতে পরিণত করেছেন। ফলে আলোচনাটি শুধু মুহাম্মদ ও আবদুল্লাহর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পৌঁছে যায় ধর্মীয় দাবির সমালোচনা করার অধিকার, অভিযুক্তের নিরাপত্তা এবং ক্ষমা দেওয়ার কর্তৃত্বের প্রশ্নে।
তাঁর বক্তব্যের মধ্যে দুটি বিষয় পাশাপাশি রয়েছে। প্রথমত, তিনি আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ওহি পরিবর্তনের অভিযোগ সংরক্ষণ করেছেন, কিন্তু সেই অভিযোগকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। দ্বিতীয়ত, সেই অভিযোগ প্রকাশের ঘটনাকেই নবীর বিরুদ্ধে কটূক্তি ও হত্যাযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এখানে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগকারীকে শাস্তি দেওয়ার ভিত্তি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কোনো বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণ করা এক কাজ; সেই বক্তব্য প্রকাশের কারণে বক্তার প্রাণ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া আরেক কাজ। ইবনে তাইমিয়্যাহর আলোচনায় দ্বিতীয় বিষয়টি স্পষ্ট আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থিত। তাঁর গ্রন্থের বাংলা অনুবাদে সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ বিবরণটি রয়েছে। [12]
নবম হাদীস
ঘটনাটা ইবনে আবি সারহের। এই ঘটনার ব্যাপারে আহলুল ইলমগণ একমত। বিষয়টা তাদের কাছে এতটাই প্রসিদ্ধ যে, এটি এক ব্যক্তির বর্ণনা হওয়ার সুযোগই নেই।
ঘটনাটা হলো-
মক্কা বিজয়ের দিন আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট লুকিয়ে থাকেন। কোনোমতে তাকে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত করেন তিনি এবং বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আব্দুল্লাহকে (ইসলামের ওপর) বাইয়াত করান।’ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকান। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। আর প্রত্যেকবারই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনবারের পর তাকে বাইয়াত করে নেন। তারপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন,
أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلُهُ
‘কী ব্যাপার! তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো চৌকস লোক নেই, যে আমাকে যখন দেখল আমি তার দিকে হাত বাড়াইনি, তখনই তার গর্দান উড়িয়ে দিত?’
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো জানি না আপনার মনের চাওয়া কী ছিল। আপনি আমাদেরকে কেন চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন না?’ তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমরা কী জানো না যে, কোনো নবীর জন্য চোখের খেয়ানত সমীচীন নয়?]
[৭১] আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৬৮৫; নাসাঈ, আস-সুনান: ৪০৬৭; সনদ সহীহ।
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তার রক্ত মূল্যহীন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুধভাই ছিল। তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে তার জন্য সুপারিশ করেছিলেন, ফলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।
কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণের পর ফের মুরতাদ হয়ে মুশরিকদের দল ভারি করে। অথচ সে ইসলাম গ্রহণের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওহি-লেখকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর সে মুশরিকদের দলে ভিড়ে প্রচার করতে থাকে, ‘আমি যেভাবে চাইতাম সেভাবেই কুরআনকে পরিবর্তন করতাম, কেননা তিনি আমাকে কিছু (ওহি) লিখার আদেশ দিতেন। আমি তাকে বলতাম, ‘এমন অথবা এমন লিখলে হবে?’ তিনি বলতেন, ‘হাঁ, হবে।’ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন ‘আলেমুন হাকিম’ লেখো। সে বলত, ‘আযিযুন হাকিম’ লিখলে হবে কি? তিনি বলতেন, হ্যাঁ! দুটো তো একই। [২]
বলা হয় যে, এই আয়াতটি তার ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল-৩
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ….
ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম কে হতে পারে, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে কিংবা বলে-আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তার প্রতি কিছুই অবতীর্ণ হয়নি অথবা বলে আল্লাহ যেমন নাযিল করেছেন, ওমন আমিও অচিরেই ওহি নাযিল করব।
এই হাদীস থেকে জানা যায়, সে নবীর ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং মানুষের মাঝে বানোয়াট কথা ছড়াতে থাকে যে, তিনি তাকে ওহি লেখতে বলতেন, তার যা ইচ্ছা হত, তাই লিখত আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকেই বহাল রাখতেন। নিশ্চয় এ মিথ্যাচারও নবীর নামে একপ্রকারের কটূক্তি। ওহি বিকৃতকরণের দাবি সে ছাড়াও আরেকজন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করেন। তার মৃত্যুর পর লোকেরা তাকে যেখানেই দাফন করে মাটি তাকে উগড়ে দেয়। আর এটাই হচ্ছে
[৭২] ইবনে হিশাম, আস-সিরাত: ২/৪০৯
[৭৩] তাবারি, জামিউল বায়ান: ৫/২৬৮; ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল: ২৪৫ পৃ.।
[৭৪] সূরা আনয়াম, ৬: ৯৩
[৭৫] বিস্তারিত-বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মানাকিব: ৩৬১৭।
সুস্পষ্ট দলিল যে, যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করবে আল্লাহ তাআলা তার থেকে প্রতিশোধ নিবেন, তাকে শায়েস্তা করবেন। সুতরাং তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের পরও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহের রক্ত বৈধ হওয়া, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে ‘কেন তোমরা তাকে হত্যা করোনি?’-এ কথা বলা, এরপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এসব প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে হত্যা করতে পারেন, চাইলে ক্ষমাও করতে পারেন।
আবার এটাও প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে তিনি তাকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন, যদিও সে তাওবা করে ইসলামের দিকে ফিরে আসে।
বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে, ইবনে আবি সারহ মক্কা-বিজয়ের আগেই ইসলামে ফিরে আসে। সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে, ‘আমি সত্যিই অনেক বড় অপরাধ করেছি। এখন আমি তাওবা করে আবার ফিরে এসেছি।’ তারপর লোকজন যখন একটু স্থিমিত ও প্রশান্ত হয় তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিয়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে মনে চাইছিলেন যেন মুসলমানরা তাকে হত্যা করে ফেলে। এ জন্য তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করেন, এরই মধ্যে কেউ তাকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে কি না এ জন্যে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাবছিলেন, হয়তো কেউ তাকে শীঘ্র হত্যা করে ফেলবে। … এই যে এতকিছু ঘটল, এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহ এবং আরেকজন খ্রিষ্টান ওহি-লেখক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যে মিথ্যা অভিযোগ করে বলে, তাদের ওহি-বিকৃতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতেন (কিন্তু কিছুই বলতেন না, বরং সমর্থন করতেন)-এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইটাই লেখাতেন যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করতেন, ওইটাকেই ঠিক রাখতে বলতেন যেটাকে আল্লাহ তাআলা ঠিক রাখতে বলেছেন। নিজের ইচ্ছামাফিক কোনো রদবদল করতেন না। বরং আল্লাহ তাআলা যেভাবে চাইতেন সেভাবেই তিনি লিপিবদ্ধ করাতেন।



ঘটনার ধারাবাহিকতা হলো: আবদুল্লাহ প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে ওহি লেখার দায়িত্বে যুক্ত হন, পরে ধর্মত্যাগ করে অভিযোগ প্রকাশ করেন এবং মক্কা বিজয়ের সময় উসমানের মধ্যস্থতায় আবার গ্রহণযোগ্যতা পান। উদ্ধৃতিতে ধর্মত্যাগ ও অভিযোগের যে বিবরণ এসেছে, সেটি ক্ষমা পাওয়ার আগের ঘটনা। ইবনে তাইমিয়্যাহ এই ইতিহাস থেকে যে সিদ্ধান্ত টেনেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে তওবার পরও হত্যার অনুমতি। তিনি আবদুল্লাহর অভিযোগকে মিথ্যা বলেছেন, কিন্তু অভিযোগ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় হত্যার বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং সেটিকেই নিজের আইনি যুক্তির অংশ করেছেন। ফলে তাঁর ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেও এই প্রশ্ন থেকে যায়: কোনো ধর্মীয় নেতার বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রকাশ কি বক্তার জীবন নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে?
ইবনে তাইমিয়্যাহর শেষ বক্তব্যে অভিযোগের অসত্যতার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ আল্লাহর অবতীর্ণ বাণীই লিখতে বলতেন এবং আল্লাহর নির্দেশেই পাঠ বহাল রাখতেন। কিন্তু মুহাম্মদের বাণী সত্যিই আল্লাহর কাছ থেকে আসছিল কি না—আবদুল্লাহর অভিযোগে সেই দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তরে দাবিটিকে আবার সত্য বলে ঘোষণা করলে স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায় না। “তিনি ওহি পরিবর্তন করতেন না, কারণ তিনি আল্লাহর কথাই লিখতে বলতেন”—এই যুক্তি কার্যকর হতে হলে আগে দেখাতে হবে, কোন বাণী আল্লাহর এবং সেটি চেনার যাচাইযোগ্য উপায় কী। যে দাবির সত্যতা পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেই দাবিকেই তার নিজের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা বৃত্তাকার যুক্তি। আবদুল্লাহর অভিজ্ঞতার অভিযোগের উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো পরীক্ষা করতে হবে; নবুয়তের সত্যতা আগে থেকেই ধরে নিলে সেই পরীক্ষা সম্পন্ন হয় না।
তওবায় পাপ মোচন, ব্যক্তিগত ক্ষমায় প্রাণ রক্ষা
ইবনে তাইমিয়্যাহর ব্যাখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তওবা এবং প্রাণ রক্ষার মধ্যে তাঁর তৈরি করা পার্থক্য। ‘আস-সারিমুল মাসলুল’-এর ৩৪০–৩৪১ পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহর রক্তপাত নিষিদ্ধ হয়েছিল মুহাম্মদের ক্ষমার কারণে; শুধু তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণে নয়। ইসলাম গ্রহণ ও তওবার মাধ্যমে পাপ মুছে গেছে, কিন্তু প্রাণ রক্ষা হয়েছে আলাদা একটি ক্ষমার মাধ্যমে। এই বিভাজন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি নিজের আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করে বিশ্বাসে ফিরে এলেও তাঁকে হত্যা করা বৈধ থাকতে পারে। ফলে তওবাকে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে স্বীকার করা এবং সেই পরিবর্তনকারী মানুষটিকে বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া দুটি পৃথক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। একই ব্যক্তির পাপ মোচন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, অথচ তাঁর প্রাণ নেওয়ার অনুমতিও বহাল রাখা হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় শাস্তির উদ্দেশ্য এবং তওবার বাস্তব মূল্য কী, সেই প্রশ্ন অনিবার্য। [13]
মূল আরবি:
وأيضا فإن عبد الله بن سعد بن أبي سرح لما طعن عليه وافترى افتراء عابه به بعد أن أسلم أهدر دمه وامتنع عن مبايعته وقد تقدم تقرير الدلالة منه على أن الساب يقتل وإن أسلم وذكرنا أنه كان قد جاءه مسلما تائبا قد أسلم قبل أن يجيء إليه كما رويناه عن غير واحد أو قد جاء يريد الإسلام وقد علم النبي صلى الله عليه وسلم أنه قد جاء يريد الإسلام ثم كف عنه انتظار أن يقوم إليه رجل فيقتله.
وهذا نص في أن مثل هذا المرتد الطاعن لا يجب قبول توبته بل يجوز قتله وإن جاء تائبا وإن تاب وقد قررنا هذا فيما مضى وهنا من وجوه أخرى أن الذي عصم دمه عفو رسول الله صلى الله عليه وسلم عنه لا مجرد إسلامه وأن بالإسلام والتوبة انمحى الإثم وبعفو رسول الله صلى الله عليه وسلم احتقن الدم والعفو بطل بموته صلى الله عليه وسلم وليس للأمة أن يعفوا عن حقه وامتناعه من بيعته حتى يقوم إليه بعض القوم فيقتله نص في جواز قتله وإن جاء تائبا.
বাংলা অনুবাদ:
এ ছাড়া আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ ইসলাম গ্রহণের পর নবীর সমালোচনা করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা অভিযোগ করেন, যার দ্বারা তাঁকে দোষারোপ করা হয়। তখন নবী তাঁর রক্তপাতের অনুমতি দেন এবং তাঁর বাইআত গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। এই ঘটনা থেকে ইসলাম গ্রহণের পরও অবমাননাকারীকে হত্যার যে প্রমাণ পাওয়া যায়, তা আগে আলোচনা করা হয়েছে। আমরা উল্লেখ করেছি, তিনি মুসলিম ও তওবাকারী হিসেবে এসেছিলেন; তাঁর কাছে আসার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যেমন আমরা একাধিক ব্যক্তির বর্ণনায় উল্লেখ করেছি। অথবা তিনি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন এবং নবী জানতেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যেই এসেছেন। এরপরও নবী অপেক্ষা করেছিলেন, যেন কেউ উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করে।
এটি স্পষ্ট বক্তব্য যে, এ ধরনের ধর্মত্যাগী সমালোচনাকারীর তওবা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং তিনি তওবা করে এলেও এবং তওবা করলেও তাঁকে হত্যা করা বৈধ। আমরা আগে বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করেছি; এখানেও অন্য কয়েকটি দিক থেকে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিল আল্লাহর রাসুলের ক্ষমা, শুধু তাঁর ইসলাম গ্রহণ নয়। ইসলাম গ্রহণ ও তওবার মাধ্যমে পাপ মুছে গিয়েছিল এবং আল্লাহর রাসুলের ক্ষমার মাধ্যমে তাঁর রক্তপাত বন্ধ হয়েছিল। রাসুলের মৃত্যুর সঙ্গে সেই ক্ষমা দেওয়ার সুযোগ শেষ হয়েছে এবং তাঁর অধিকারের বিষয়ে ক্ষমা করার অধিকার উম্মতের নেই। উপস্থিত কারও হাতে তাঁকে হত্যা করা হবে বলে তাঁর বাইআত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, তওবা করে এলেও তাঁকে হত্যা করা বৈধ।
এখানে ‘মৃত্যুর সঙ্গে ক্ষমা দেওয়ার সুযোগ শেষ হয়েছে’ কথাটি আবদুল্লাহকে দেওয়া পূর্ববর্তী ক্ষমা বাতিল হয়ে যাওয়ার দাবি নয়। ইবনে তাইমিয়্যাহর সিদ্ধান্তটি পরবর্তী অভিযুক্তদের জন্য: মুহাম্মদ জীবিত থাকাকালে নিজের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে কাউকে ক্ষমা করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর উম্মত তাঁর অধিকারের বিষয়ে সেই ক্ষমা দিতে পারে না। এই ব্যাখ্যার ফল অত্যন্ত কঠোর। আবদুল্লাহ যে ব্যক্তিগত ক্ষমার মাধ্যমে বেঁচেছিলেন, পরবর্তী সময়ে একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত মানুষ সেই পথ পাবেন না। ইতিহাসের একটি ক্ষমার ঘটনাকে সাধারণ ক্ষমাশীলতার নজির হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তাই এই ব্যাখ্যাতেই সংকুচিত হয়ে যায়। একজন ব্যক্তি বেঁচেছিলেন বলে পরবর্তীদের বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না; তাঁর বেঁচে যাওয়াকে ব্যতিক্রম হিসেবে ব্যবহার করে পরবর্তীদের ক্ষমার সুযোগ বন্ধ করা হচ্ছে।
এর নৈতিক অসংগতি স্পষ্ট। অপরাধের ধরন একই হলেও অভিযুক্ত কোন সময়ে জন্মেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কথিত অপরাধের অধিকারী জীবিত আছেন কি না—এই পার্থক্যে প্রাণ রক্ষার সুযোগ বদলে যাচ্ছে। মুহাম্মদের জীবদ্দশায় কেউ ব্যক্তিগত সুপারিশ ও ক্ষমা পেতে পারেন, কিন্তু পরবর্তী ব্যক্তি একই তওবা করেও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ক্ষমা করার অধিকার মৃত ব্যক্তির নামে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রেখে জীবিত সমাজকে সেই অধিকার প্রয়োগে অক্ষম বলা হলে সংশোধন, অনুতাপ ও পুনর্বিবেচনার পথও সীমিত হয়। একজন মৃত ধর্মীয় নেতার সম্মান রক্ষার নামে জীবিত মানুষের জীবন নেওয়ার অনুমতি ন্যায়বিচারের দাবি পূরণ করে কীভাবে? বক্তব্যে কেউ আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ থাকলেও সেই অভিযোগের প্রতিকার হিসেবে হত্যা প্রয়োজন—এই সিদ্ধান্তের জন্য ধর্মীয় কর্তৃত্বের বাইরে যুক্তি প্রয়োজন।
সমসাময়িক ফতোয়ায় একই বর্ণনার ভিন্ন ব্যবহার
ইসলামকিউএর ১৬৮৭৭৩ নম্বর উত্তরে ওহি পরিবর্তনের দাবি আবদুল্লাহর পরিবর্তে নামহীন খ্রিষ্টান লেখকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং আবদুল্লাহ এমন দাবি করেননি বলা হয়েছে। অথচ ২১৭১৫৩ নম্বর উত্তরে তাঁর বিরুদ্ধেই সেই অভিযোগ প্রকাশের বর্ণনা উদ্ধৃত করে হত্যার আইনি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ২২৮৬৭৫ নম্বর উত্তরেও সংশ্লিষ্ট কাহিনির ব্যাপক প্রচলন স্বীকার করে সনদের আপত্তি তোলা হয়েছে। এখানে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাইয়ে যে বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করা হচ্ছে, হত্যার কারণ ব্যাখ্যায় সেটি কোন প্রমাণমূল্যে ব্যবহার করা হচ্ছে? [14]
ইবনে তাইমিয়্যাহর উদ্ধৃতিতে যে খ্রিষ্টান লেখকের কথা এসেছে, তিনি আবদুল্লাহর থেকে পৃথক ব্যক্তি। কিন্তু তাঁরা পৃথক ব্যক্তি হওয়ার তথ্য থেকে আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত অভিযোগের বর্ণনাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় না। একটি বর্ণনার সত্যতা প্রত্যাখ্যান করা এবং সেই বর্ণনা বা অভিযোগ কখনো ছিল না বলা আলাদা দাবি। তাবারী, ওয়াহিদী ও ইবনে তাইমিয়্যাহর আলোচনায় আবদুল্লাহর নামে অভিযোগটি সংরক্ষিত আছে। সুতরাং অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণ করতে হলে তার অসত্যতা দেখাতে হবে; অন্য একজন লেখকের একই ধরনের অভিযোগ ছিল বলে আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত বক্তব্যকে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিভ্রান্তি হিসেবে সরিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়।
ইসলামকিউএর ২১৭১৫৩ নম্বর উত্তরে অপরাধের দুটি ভিত্তি আলাদা করা হয়েছে: ধর্মত্যাগ এবং নবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ। সেখানে তওবায় প্রথমটির শাস্তি রহিত হওয়া এবং ব্যক্তিগত ক্ষমায় দ্বিতীয়টির শাস্তি রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা রয়েছে। এই ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহর ফিরে আসা হত্যার বৈধতাকে সর্বজনীনভাবে বাতিল করে না। বরং ইবনে তাইমিয়্যাহর ব্যক্তিগত ক্ষমার নীতিই পুনর্ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রাচীন ঘটনাটি বর্তমান মানুষের মতপ্রকাশের নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত থাকে। [15]
হত্যার নির্দেশ থেকে মিসরের শাসনক্ষমতা
আবদুল্লাহর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ও এই ঘটনার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাননি; পরে ইসলামি রাষ্ট্রের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন এবং উসমানের শাসনামলে মিসরের শাসক হন। নওয়বী তাঁর ‘তাহযিবুল আসমা ওয়াল লুগাত’ গ্রন্থে এই নিয়োগের সময় ২৫ হিজরি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিবরণে উত্তর আফ্রিকা, নুবিয়া এবং রোমানদের বিরুদ্ধে নৌঅভিযানের কথাও রয়েছে। ফলে যে ব্যক্তি একসময় নবুয়তের দাবির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করে হত্যার নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তিনিই পরে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সামরিক শক্তির অংশ হয়ে ওঠেন। এই পরিবর্তন তাঁর পূর্ববর্তী অভিযোগের সত্যতা নিষ্পত্তি করে না; বরং ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর সামাজিক মর্যাদা কীভাবে বদলেছে, সেই প্রশ্ন সামনে আনে। [16]
মূল আরবি:
ثم أسلم ذلك اليوم عبد الله بن سعد بن أبى سرح، وحَسن إسلامه، ولم يظهر منه بعده ما يُنكر، وهو أحد العقلاء والكرماء من قريش، ثم ولاه عثمان مصر سنة خمس وعشرين، ففتح الله على يديه إفريقية، وكان فتحًا عظيمًا بلغ سهم الفارس ثلاثة آلاف مثقالٍ ذهبًا، وشهد معه هذا الفتح عبد الله بن عمر، وعبد الله بن عمرو بن العاص، وعبد الله بن الزبير، وكان عبد الله بن سعد هذا فارس بني عامر بن لؤى، وغزا بعدَ إفريقية الأساودَ من أرض النوبة، سنة إحدى وثلاثين، وغزا غزوة الصواري في البحر إلى الروم.
وحين قُتل عثمان بن عفان اعتزل عبد الله بن سعد بن أبي سرح الفتنة، فأقام بعسقلان، وقيل: بالرملة، وكان دعا بأن يختم عمره بالصلاة، فسلَّم من صلاة الصبح التسليمة الأولى، ثم همَّ بالتسليمة الثانية عن يساره، فتوفى سنة ست وثلاثين.
বাংলা অনুবাদ:
সেদিন আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর ইসলাম সুন্দর হয়। এরপর তাঁর কাছ থেকে আপত্তিকর কিছু প্রকাশ পায়নি। তিনি কুরাইশদের বিচক্ষণ ও দানশীল ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। এরপর উসমান তাঁকে ২৫ হিজরিতে মিসরের শাসক নিযুক্ত করেন। তাঁর হাতে আল্লাহ আফ্রিকা জয় করান। এটি ছিল একটি বড় বিজয়; অশ্বারোহীর অংশ তিন হাজার মিসকাল সোনা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এই অভিযানে তাঁর সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবন উমর, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস এবং আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর অংশ নিয়েছিলেন। এই আবদুল্লাহ ইবন সাদ ছিলেন বনি আমির ইবন লুআইয়ের অশ্বারোহী যোদ্ধা। আফ্রিকার পর তিনি ৩১ হিজরিতে নুবিয়া অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন এবং সমুদ্রে রোমানদের বিরুদ্ধে যাতুস সাওয়ারির অভিযানে অংশ নেন।
উসমান ইবন আফফান নিহত হলে আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ সংঘাত থেকে সরে যান। তিনি আসকালানে অবস্থান করেন; অন্য বর্ণনায় রামলার কথা বলা হয়েছে। তিনি প্রার্থনা করেছিলেন, যেন নামাজের মাধ্যমে তাঁর জীবনের সমাপ্তি হয়। ফজরের নামাজে প্রথম সালাম দেওয়ার পর বামদিকে দ্বিতীয় সালাম দেওয়ার উদ্যোগ নেন এবং তখন ৩৬ হিজরিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
যাহাবীর ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’য় তাঁর আগে উমরের অধীনে মিসরের সাঈদ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন এবং পরে উসমানের অধীনে সমগ্র মিসরের শাসনভার পাওয়ার বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর রাজনৈতিক পুনর্বাসন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ। উসমান তাঁর দুধভাই, প্রাণ রক্ষার মধ্যস্থতাকারী এবং পরবর্তী নিয়োগদাতা—এই তিনটি সম্পর্ক একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোন নিয়োগ কতটা যোগ্যতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অথবা ব্যক্তিগত আস্থার ভিত্তিতে হয়েছিল, তা পৃথক অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু তাঁর পরবর্তী পদপ্রাপ্তি ও সামরিক সাফল্য দিয়ে আগের ওহিসংক্রান্ত অভিযোগের অসত্যতা প্রমাণ করা যায় না। রাষ্ট্রের একজন সফল কর্মকর্তা হয়ে ওঠা এবং পূর্বে বর্ণিত একটি ঘটনার সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ সম্পূর্ণ আলাদা বিচার। [17]
‘খাঁটি ঈমান’ ও পুণ্যময় মৃত্যুর বিবরণ
পরবর্তী ইসলামি জীবনীতে আবদুল্লাহর ইসলাম গ্রহণ সুন্দর হয়েছিল এবং তাঁর কাছ থেকে আর আপত্তিকর কিছু প্রকাশ পায়নি—এমন বক্তব্য বারবার এসেছে। এই মূল্যায়নের সঙ্গে তাঁর নামাজরত অবস্থায় মৃত্যুর কাহিনিও যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর বিস্তারিত বিবরণ একরকম নয়। তাফসীরে মাযহারীর উদ্ধৃত অংশে সেজদারত অবস্থায় মৃত্যুর কথা আছে; নওয়বীর বিবরণে প্রথম সালামের পর দ্বিতীয় সালাম দেওয়ার সময় মৃত্যু হয়েছে। যাহাবীও নামাজের সালামের সময় মৃত্যুর বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। মৃত্যুর স্থান হিসেবে আসকালান ও রামলা এবং সাল হিসেবে ৩৬ ও ৫৯ হিজরির ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। যাহাবী ৫৯ হিজরির মত উল্লেখ করে আলীর শাসনামলে মৃত্যুর মতটিকে অধিক সঠিক বলেছেন। [18]
মূল আরবি:
سعيد بن أبي أيوب: حدثني يزيد بن أبي حبيب، قال: لما احتضر ابن أبي سرح وهو بالرملة، وكان خرج إليها فارا من الفتنة، فجعل يقول من الليل: آصبحتم؟ فيقولون: لا. فلما كان عند الصبح، قال: يا هشام! إني لأجد برد الصبح فانظر. ثم قال: اللهم اجعل خاتمة عملي الصبح، فتوضأ، ثم صلى، فقرأ في الأولى بأم القرآن والعاديات، وفي الأخرى بأم القرآن وسورة وسلم عن يمينه، وذهب يسلم عن يساره فقبض رضي الله عنه. ومر أنه توفي سنة تسع وخمسين والأصح وفاته في خلافة علي رضي الله عنه.
বাংলা অনুবাদ:
সাঈদ ইবন আবি আইয়ুব বলেন: ইয়াযিদ ইবন আবি হাবিব আমাকে বলেছেন, ইবনে আবি সারহ যখন রামলায় মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছান—তিনি সংঘাত থেকে পালিয়ে সেখানে এসেছিলেন—তখন রাতের বেলায় বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন, “সকাল হয়েছে কি?” তাঁরা বলছিলেন, “না।” সকাল হওয়ার সময় তিনি বললেন, “হে হিশাম, আমি সকালের শীতলতা অনুভব করছি, তুমি দেখে নাও।” তারপর বললেন, “হে আল্লাহ, আমার শেষ কাজ ফজরের নামাজ করে দাও।” তিনি অজু করলেন এবং নামাজ পড়লেন। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহা ও সূরা আদিয়াত এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা ও আরেকটি সূরা পড়লেন। ডানদিকে সালাম দেওয়ার পর বামদিকে সালাম দিতে গেলেন এবং তখন তাঁর মৃত্যু হলো। আগে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ৫৯ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন; তবে অধিক সঠিক মত হলো, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল আলীর খিলাফতের সময়।
এসব বর্ণনায় তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়কে পুণ্যময় পরিণতির মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু একটি মৃত্যুর দৃশ্য কতটা ধর্মীয় মর্যাদা বহন করে, তা থেকে ওহি লেখার সময়কার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হয় না। তিনি সত্যিই বিশ্বাসে ফিরে এসে নামাজ পড়তে পড়তে মারা গেলেও তাঁর পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্নগুলো থেকে যায়। আবার পরবর্তী ইতিহাসকাররা তাঁর জীবনকে ‘সুসমাপ্তি’র কাঠামোয় উপস্থাপন করে থাকলে সেই উপস্থাপনার প্রমাণও আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে। সেজদা, সালাম, স্থান ও মৃত্যুসালের ভিন্নতা দেখায়, প্রচলিত কাহিনির একটি সংস্করণকে অবিকল ইতিহাস বলে ঘোষণা করার আগে সূত্রগুলো মিলিয়ে দেখা জরুরি। পুণ্যময় মৃত্যুর গল্প কোনো ঐতিহাসিক অভিযোগের খণ্ডন নয়; সেটি একজন ব্যক্তির পরবর্তী জীবনের মূল্যায়ন। এই দুই বিষয় গুলিয়ে ফেললে মূল প্রশ্ন আড়াল হয়ে যায়।
উপসংহার
আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের কাহিনি কোনো সাধারণ ‘ধর্মত্যাগী সাহাবি’র গল্প নয়। এটি ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরে সংরক্ষিত এমন একটি অস্বস্তিকর ঘটনা, যেখানে ওহি লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নবুয়তের দাবির বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরিবর্তিত শব্দ অনুমোদনের বিবরণ এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণের সঙ্গে কথিত প্রত্যাদেশের মিল—সবই উপস্থিত। একজন লেখকের মুখ থেকে বের হওয়া প্রশংসাবাক্যকে ওহির ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সেই বাক্যের ঐশ্বরিক উৎস যাচাইয়ের প্রশ্ন ওঠে। পরিবর্তিত শব্দ পড়ে শোনানোর পরও অনুমোদনের অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়: নির্দিষ্ট শব্দে অবতীর্ণ বাণী এবং মানুষের নির্বাচিত বিকল্প ভাষার সীমারেখা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ধর্মীয় ঘোষণার বাইরে বাণী লিপিবদ্ধ ও যাচাই করার বাস্তব পদ্ধতির প্রমাণ প্রয়োজন।
এখানে আলোচিত তাফসির, হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থগুলো পরবর্তী সময়ে সংকলিত; ঘটনাটির সমসাময়িক স্বাধীন সাক্ষ্য এই আলোচনায় পাওয়া যায়নি। ফলে কোন বর্ণনার কোন বিস্তারিত অংশ বাস্তবে ঘটেছিল, তা নির্ধারণের জন্য ঐতিহাসিক প্রমাণের প্রয়োজন থেকেই যায়। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা ওহির দাবিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য করে দেয় না। বরং ইসলামি উৎসের মধ্যেই সংরক্ষিত অভিযোগগুলো দেখায়, বাণীর উৎস ও শব্দ নির্বাচন নিয়ে সংশয় ঐতিহ্যের বাইরের কোনো নতুন প্রশ্নমাত্র নয়। এই প্রশ্নগুলো ওহি লেখকের পরিচয় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেই সংরক্ষিত হয়েছে। কোরআন সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক, নির্ভুল এবং মানুষের রচনাগত ভূমিকা থেকে মুক্ত—এই দাবির পক্ষে যারা দাঁড়ান, তাঁদের এসব অভিযোগের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে হবে। দাবিটিকে শুরুতেই সত্য ধরে নিয়ে অভিযোগকারীকে মিথ্যাবাদী বলা সেই উত্তর নয়।
মক্কা বিজয়ের সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণার পাশে আবদুল্লাহকে হত্যার নির্দেশ, কাবার আশ্রয়েও তাঁর প্রাণ রক্ষার সুযোগ না থাকা এবং বাইআত গ্রহণের আগে উপস্থিত কারও হাতে তাঁর মৃত্যু প্রত্যাশা করার বিবরণ একটি পৃথক নৈতিক সংকট তৈরি করে। একজন অভিযোগকারীর বক্তব্য পরীক্ষা করে খণ্ডন করার বদলে তাঁর জীবন বিপন্ন করা হলে অভিযোগটির সত্যতা নিষ্পত্তি হয় না। ‘চোখের খিয়ানত’ না করার বক্তব্যও হত্যার প্রত্যাশার প্রশ্নটি মুছে দেয় না। নৈতিক বিচার করতে হলে চোখের ইশারার পদ্ধতি, নীরবতার অর্থ, অভিযুক্তের নিরাপত্তা এবং প্রত্যাশিত হত্যাকাণ্ড—পুরো ঘটনাটি বিবেচনা করতে হবে। ওহির উৎস সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় এমন প্রাণনাশের নির্দেশ সর্বজনীন করুণা ও ইনসাফের দাবিকে কঠোর পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।
ইবনে তাইমিয়্যাহর আইনি ব্যাখ্যা সমস্যাটিকে আরও বিস্তৃত করেছে। তাঁর মতে, তওবার মাধ্যমে পাপ মোচন হলেও ব্যক্তিগত ক্ষমা ছাড়া প্রাণ রক্ষার নিশ্চয়তা নেই; মুহাম্মদের মৃত্যুর পর সেই ক্ষমা দেওয়ার অধিকারও উম্মতের নেই। ফলে আবদুল্লাহ যে পথ ধরে বেঁচেছিলেন, পরবর্তী অভিযুক্ত সেই পথ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই ধরনের অভিযোগে একজনের জন্য ক্ষমার সুযোগ এবং অন্যজনের জন্য সেই সুযোগ বন্ধ থাকা জন্মকাল ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নিরাপত্তার বৈষম্য তৈরি করে। উসমানের আশ্রয় ও সুপারিশ আবদুল্লাহকে বাঁচিয়েছে, কিন্তু সেটি প্রত্যেক অভিযুক্তের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি। মানুষের জীবন যদি প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী এবং ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত সম্মতির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের দাবি পূরণ করে কীভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
পরবর্তী সময়ে আবদুল্লাহকে ‘খাঁটি ঈমানদার’, সফল শাসক অথবা নামাজরত অবস্থায় মৃত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ও পুণ্যময় মৃত্যুর বিবরণ তাঁর আগের অভিযোগের সত্য-মিথ্যার পরীক্ষা সম্পন্ন করে না। বিশ্বাসে ফিরে আসা মানুষের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা মুছে দেয় না, রাষ্ট্রীয় পদপ্রাপ্তি কোনো বাণীর ঐশ্বরিক উৎস প্রমাণ করে না এবং মৃত্যুর ধর্মীয় দৃশ্য কোনো অভিযোগের খণ্ডন নয়। শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ এমন একটি প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছেন, যাকে ‘ইলতিফাত’, ‘মিথ্যাবাদী মুরতাদ’ অথবা পরবর্তী জীবনের প্রশংসা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্নটি রয়ে যায়: ওহির দাবিকে যাচাই করার জন্য কী স্বাধীন প্রমাণ রয়েছে, আর সেই দাবি নিয়ে সংশয় প্রকাশকারী মানুষটির বক্তব্যের জবাবে হত্যার অনুমতি দেওয়ার নৈতিক ভিত্তি কী?
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১২–১৪ ↩︎
- ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল, সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের আলোচনা; একই বর্ণনার উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২২৮৬৭৫ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬০–২৬১ ↩︎
- ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল, ‘ওয়া মান কালা সাউনযিলু মিসলা মা আনযালাল্লাহ’ আয়াতাংশের আলোচনা; পৃষ্ঠা ২২০-এর উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২২৮৬৭৫ ↩︎
- তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর ব্যাখ্যা, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫৩৩–৫৩৪, বর্ণনা ১৩৫৫৫ ↩︎
- তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর ব্যাখ্যায় বর্ণনাগুলোর পর তাবারীর নিজস্ব মন্তব্য ↩︎
- ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, বাংলা অনুবাদ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১১; মূল আরবি আলোচনা: মক্কা বিজয় ও মুহাম্মদের মক্কায় প্রবেশের বিবরণ ↩︎
- ইবনে ইসহাক, সিরাত, পৃষ্ঠা ৩৩৩-এর উদ্ধৃতি এবং হিন্দের পরবর্তী ইসলাম গ্রহণের সূত্র: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২০২৩৬০ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২৬৭৪; ঘটনার আরেকটি পূর্ণ বর্ণনা: সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৫৯ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৫৯, ধর্মত্যাগীর বিধানসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
- ইবনে তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪০৮; ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, মক্কা বিজয়ের বিবরণ ↩︎
- আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, লেখক: ইবনে তাইমিয়্যাহ, নুসুস পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৫২–৫৪ ↩︎
- ইবনে তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৩৪০ এবং পৃষ্ঠা ৩৪১ ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৬৮৭৭৩; প্রশ্ন ২১৭১৫৩; প্রশ্ন ২২৮৬৭৫ ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২১৭১৫৩, আবদুল্লাহকে ক্ষমা ও ধর্মত্যাগের শাস্তির পার্থক্যসংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
- নওয়বী, তাহযিবুল আসমা ওয়াল লুগাত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭০; সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২১৭১৫৩ ↩︎
- যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৩–৩৫, আবদুল্লাহ ইবন সাদের জীবনী ↩︎
- যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৪–৩৫; নওয়বীর উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২১৭১৫৩ ↩︎

