জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইবলিস কি মুহাম্মদের জন্ম ও নবুয়তের খবর জানত না? ইসলামি বর্ণনার স্ববিরোধিতা

প্রকাশিত: জানুয়ারি 24, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন60 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ইবলিসকে মানবজাতির প্রধান শত্রু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কোরআনের বর্ণনা অনুসারে, আদমকে সিজদা করতে অস্বীকার করার পর ইবলিস মানুষকে পথভ্রষ্ট করার সংকল্প করে এবং কিয়ামত পর্যন্ত নিজের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ লাভ করে। তার কাজ মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেওয়া, সত্য থেকে বিচ্যুত করা, মন্দ কাজের দিকে প্ররোচিত করা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেওয়া। কিন্তু ইসলামি বর্ণনায় ইবলিস একা এসব কাজ করে না। তার সন্তান, অনুসারী এবং একটি সংগঠিত শয়তানি বাহিনী রয়েছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে বলা হয়েছে, ইবলিস নিজের সিংহাসন থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে শয়তানের দল পাঠায়। আরও বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে একজন শয়তানি সঙ্গী নিযুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি ধর্মবিশ্বাসে মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং দৈনন্দিন আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি বিস্তৃত অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থা কাজ করে। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ইবলিস, যার নেতৃত্বে শয়তানরা মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কার্যক্রম পরিচালনা করে।

এই ধর্মীয় বিশ্বচিত্রের সঙ্গে মুহাম্মদের জন্ম, শৈশব এবং নবুয়তপ্রাপ্তির অলৌকিক বর্ণনাগুলো তুলনা করলে একটি অদ্ভুত অসংগতি সামনে আসে। ইসলামি সীরাত ও হাদিসসাহিত্যে মুহাম্মদকে সাধারণ কোনো মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করতে দেখা যায় না। তাঁর জন্মের আগেই তাঁর মায়ের কাছে বিশেষ সংবাদ পৌঁছানোর, গর্ভাবস্থায় অলৌকিক আলো দেখার, শৈশবে ফেরেশতা এসে তাঁর বুক চিরে হৃদপিণ্ড পরিষ্কার করার এবং তাঁর দেহ থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ করার বিবরণ রয়েছে। পরবর্তী নবিজীবনসংক্রান্ত বর্ণনাগুলোতেও তাঁর বিশেষ অবস্থান, অলৌকিক সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নবুয়তের পূর্বলক্ষণ সম্পর্কে নানা ঘটনা সংরক্ষিত হয়েছে। ইসলামি কাহিনি অনুসারে মুহাম্মদের জন্মের আগে থেকেই তাঁর জীবনে ফেরেশতা, আল্লাহর বিশেষ নির্দেশ এবং শয়তানের কার্যক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত অলৌকিক ঘটনাগুলো ঘটছিল। অথচ এই দীর্ঘ ঘটনাক্রমের পরও তিরমিজির হাদিসে ইবলিসকে মুহাম্মদের নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করতে দেখা যায়।

অথচ সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসে ইবলিসকে এমন এক অবস্থায় দেখা যায়, যখন সে পৃথিবীতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছে বলে অনুমান করতে পারলেও সেই ঘটনার পরিচয় জানে না। মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির পর জিনেরা আসমানের সংবাদ সংগ্রহের নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে বাধার সম্মুখীন হয়। তারা ইবলিসকে এই পরিবর্তনের কথা জানায়। ইবলিস তখন পৃথিবীতে নতুন কিছু ঘটেছে বলে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কারণ অনুসন্ধানের জন্য নিজের বাহিনী পাঠায়। বাহিনীর সদস্যরা মুহাম্মদকে নামাজরত অবস্থায় দেখতে পায়। ফিরে এসে তারা ইবলিসকে সংবাদ দিলে সে ঘটনাটির কারণ শনাক্ত করে। অর্থাৎ হাদিসটির বর্ণনায় ইবলিস মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ আগে থেকেই জানত না; তার অধীনস্থ জিনদের প্রতিবেদন ও পরবর্তী অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে হয়।

এখানেই প্রশ্ন তৈরি হয়, ইবলিসের বিশাল বাহিনী এতদিন কী করছিল? মানুষের মনে প্রবেশ করে কুমন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন শয়তানরা কি মুহাম্মদের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং তাঁর জীবনে সংঘটিত কথিত অলৌকিক ঘটনাগুলোর কোনো সংবাদ সংগ্রহ করেনি? জিবরাঈল এসে একটি শিশুর বুক চিরে তার হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ বের করে দিচ্ছেন—এমন একটি ঘটনা ইবলিসের নিজের কার্যক্রমের সঙ্গেই সম্পর্কিত। তাহলে এই ঘটনাও কি তার বাহিনীর কারও নজরে পড়েনি? মুহাম্মদ যদি জন্ম থেকেই বিশেষ ঐশী সুরক্ষার অধিকারী হয়ে থাকেন, তাহলে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারে নিয়োজিত শয়তানরা তাঁর ক্ষেত্রে সেই বিশেষত্ব লক্ষ করেনি কেন? আবার প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে শয়তান থাকার দাবি সত্য হলে মুহাম্মদের সঙ্গেও নিযুক্ত শয়তানের অবস্থান কী ছিল এবং সে ইবলিসকে কী সংবাদ দিয়েছিল? ইসলামি বর্ণনাগুলোকে একত্রে গ্রহণ করলে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ইসলামি ধর্মগ্রন্থে ইবলিসের অধীনে বিস্তৃত শয়তানি বাহিনী, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিন সঙ্গী এবং আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা বর্ণিত হয়েছে। এই বাহিনী মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করে, তাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করে এবং ফেরেশতাদের কাছ থেকে সংবাদ চুরি করে। অথচ ইসলামি নবিজীবনসাহিত্যে মুহাম্মদের জন্মের আগে থেকেই অলৌকিক পূর্বলক্ষণ, শৈশবে জিবরাঈলের হস্তক্ষেপ এবং নবুয়তের আগাম ঘোষণার অসংখ্য বিবরণ থাকা সত্ত্বেও তিরমিজির হাদিসে ইবলিসকে নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণ জানতে নতুন করে বাহিনী পাঠাতে হয়েছে। শয়তানদের কথিত বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা এবং তাদের নেতার এই বিলম্বিত অনুসন্ধান ইসলামি অতিপ্রাকৃত কাহিনিগুলোর অভ্যন্তরীণ অসংগতিকে প্রকাশ করে।


মুহাম্মদের জন্মের আগেই অলৌকিক ঘোষণা: ইবলিস তখন কী জানত?

মুহাম্মদের নবুয়তের পূর্বলক্ষণ নিয়ে ইসলামি সীরাতসাহিত্যে এমন কিছু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর সময়কাল তাঁর জন্মেরও আগে। ইবনে হিশামের আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সূত্রে মুহাম্মদের মা আমিনা বিনতে ওয়াহবের একটি অভিজ্ঞতার বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, আমিনা গর্ভবতী হওয়ার সময় তাঁকে জানানো হয়েছিল যে তিনি এই উম্মতের নেতাকে গর্ভে ধারণ করেছেন। সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তাঁকে বিশেষভাবে আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করতে এবং তাঁর নাম মুহাম্মদ রাখতে বলা হয়েছিল। একই বর্ণনায় আমিনা তাঁর গর্ভাবস্থায় এমন একটি আলো দেখার কথা বলেছেন, যার মাধ্যমে সিরিয়ার বুসরা অঞ্চলের প্রাসাদগুলো তাঁর সামনে দৃশ্যমান হয়েছিল। এখানে মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে ঘোষণা তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির বহু আগেই সংঘটিত হয়েছে বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই অলৌকিক ঘটনার কোনো স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। অথচ ইসলামি সীরাতেই দাবি করা হয়েছে, মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর ভবিষ্যৎ পরিচয় আমিনার কাছে প্রকাশিত হয়েছিল। এত আগাম ঘোষণা থাকার পরও ইবলিসের নেতৃত্বাধীন শয়তানি বাহিনীর কথিত সংবাদব্যবস্থা মুহাম্মদের নবুয়তের সময় কার্যকর পূর্বজ্ঞান প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে [1]

وَرَأَتْ حِينَ حَمَلَتْ بِهِ أَنَّهُ خَرَجَ مِنْهَا نُورٌ رَأَتْ بِهِ قُصُورَ بُصْرَى ، مِنْ أَرْضِ الشَّامِ

বাংলা অনুবাদ: তাঁকে গর্ভে ধারণ করার সময় আমিনা দেখেছিলেন, তাঁর শরীর থেকে এমন একটি আলো বেরিয়ে এসেছে, যার মাধ্যমে তিনি শাম অঞ্চলের বুসরার প্রাসাদগুলো দেখতে পেয়েছিলেন।

আমিনার এই অভিজ্ঞতার বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, মুহাম্মদের ভবিষ্যৎ ধর্মীয় অবস্থান তাঁর জন্মের আগেই নির্ধারিত ও ঘোষিত ছিল—এমন ধারণা এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, গর্ভাবস্থার সঙ্গে একটি বিশেষ অলৌকিক আলোকে যুক্ত করা হয়েছে, যার প্রভাব মক্কার সীমা অতিক্রম করে দূরবর্তী শাম অঞ্চলের প্রাসাদ পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বর্ণিত। তৃতীয়ত, এই সংবাদটি এমন একজন নারীর কাছে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে, যিনি তখনও ভবিষ্যতের নবীর মা মাত্র; মুহাম্মদের নবুয়ত তখনও শুরু হয়নি। ফলে ইসলামি সীরাতের এই বর্ণনায় মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। তাঁর জন্মের আগে থেকেই একটি অতিপ্রাকৃত কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বলে কাহিনিটি দাবি করছে। ইবনে কাসীরও আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে মুহাম্মদের জন্মবিষয়ক আলোচনায় আমিনার এই আলো দেখার বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। একই পূর্ববর্তী বর্ণনা পরবর্তী গ্রন্থে পুনরাবৃত্ত হওয়া অবশ্য স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক সাক্ষ্য নয়; এর গুরুত্ব হলো, ঘটনাটি ইসলামি নবিজীবনসাহিত্যে কীভাবে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছে। [2]

এই ঘটনাগুলোকে সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসের সঙ্গে তুলনা করলে ইবলিসের তথ্যপ্রাপ্তির প্রশ্নটি নতুন গুরুত্ব পায়। তিরমিজির বর্ণনায় ইবলিস আসমানের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পর জানতে পারে যে পৃথিবীতে নতুন কিছু ঘটেছে। অথচ ইবনে হিশামের সীরাত অনুসারে মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়েছিল এবং গর্ভাবস্থায় অলৌকিক আলো দেখার ঘটনা ঘটেছিল। তাহলে ইবলিসের বাহিনী কি এসব ঘটনার কোনো খবরই পায়নি? যদি পেয়ে থাকে, তাহলে মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির সময় আসমানের সংবাদ সংগ্রহ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে তাঁর পূর্ববর্তী বিশেষ পরিচয়ের সম্পর্ক শনাক্ত করতে ইবলিসের অসুবিধা হলো কেন? আর যদি এসব ঘটনার কোনো সংবাদ তাদের কাছে না পৌঁছে থাকে, তাহলে মানুষের জীবনে ব্যাপকভাবে সক্রিয় থাকার দাবিকৃত শয়তানি ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ ও যোগাযোগের ক্ষমতা আসলে কতটুকু ছিল? ইসলামি সীরাত অনুসারে মুহাম্মদের জন্মের আগে থেকেই একের পর এক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। অথচ তিরমিজির বর্ণনায় এত দীর্ঘ পূর্বলক্ষণের পরও ইবলিসকে নবুয়তের সময় নতুন ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে হচ্ছে। মানুষের জীবনে সর্বত্র সক্রিয় বলে বর্ণিত শয়তানি বাহিনীর তথ্য সংগ্রহ ও যোগাযোগের ক্ষমতার সঙ্গে এই ঘটনাক্রম অসংগতিপূর্ণ।

এই অসংগতি আরও প্রকট হয় যখন মুহাম্মদের শৈশবের বিশেষ সুরক্ষার কাহিনিগুলো সামনে আসে। ইসলামের নিজস্ব বর্ণনা অনুসারে, তিনি কেবল ভবিষ্যতে নবী হবেন বলে পূর্বঘোষিত ছিলেন না; তাঁর ওপর শয়তানের প্রভাব প্রতিরোধের জন্য বিশেষ অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। ইবনে হিশামের সীরাতে শিশু মুহাম্মদ সম্পর্কে আমিনার বক্তব্যে শয়তানের তাঁর ওপর কোনো কর্তৃত্ব নেই বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। আর সহিহ মুসলিমে জিবরাঈলের মাধ্যমে মুহাম্মদের বক্ষবিদারণ এবং তাঁর হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণের ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে। এই দুটি বর্ণনায় মুহাম্মদের সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক সরাসরি আলোচ্য বিষয়। তাই ইবলিসের বাহিনী মুহাম্মদ সম্পর্কে কী জানত, কখন জানত এবং কীভাবে জানত—এই প্রশ্ন কেবল তাঁর জন্মের অলৌকিক পূর্বলক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর শৈশবের কথিত ঘটনাগুলোর সঙ্গেও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে যায়।


শৈশবে জিবরাঈলের বক্ষবিদারণ: মুহাম্মদের হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণের ঘটনা ইবলিস জানত না?

মুহাম্মদের শৈশবের অলৌকিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো জিবরাঈলের মাধ্যমে তাঁর বক্ষবিদারণ এবং হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণের কাহিনি। সহিহ মুসলিমের ১৬২গ নম্বর হাদিসে আনাস ইবনে মালিকের বর্ণনায় বলা হয়েছে, শিশু মুহাম্মদ যখন অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিলেন, তখন জিবরাঈল এসে তাঁকে মাটিতে শুইয়ে দেন, তাঁর বুক চিরে হৃদপিণ্ড বের করেন এবং হৃদপিণ্ড থেকে একটি রক্তপিণ্ড অপসারণ করেন। জিবরাঈল সেই রক্তপিণ্ডকে মুহাম্মদের মধ্যে শয়তানের অংশ বলে শনাক্ত করেন। এরপর তিনি জমজমের পানি দিয়ে একটি স্বর্ণের পাত্রে হৃদপিণ্ড ধুয়ে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপন করেন। অন্য শিশুরা মুহাম্মদের ধাত্রীমায়ের কাছে গিয়ে জানায় যে মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। সবাই ছুটে এসে তাঁকে বিবর্ণ অবস্থায় দেখতে পায়। আনাস আরও বলেছেন, তিনি পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদের বুকে সেই সেলাইয়ের চিহ্ন দেখেছিলেন। সহিহ মুসলিমে সরাসরি বর্ণিত হয়েছে, জিবরাঈল শিশু মুহাম্মদের বুক চিরে হৃদপিণ্ড বের করেছেন, সেখান থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ করেছেন এবং হৃদপিণ্ড ধুয়ে পুনরায় স্থাপন করেছেন। ইসলামি বিশ্বাসে শয়তানের কার্যক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত এমন একটি অসাধারণ ঘটনা মুহাম্মদের শৈশবেই ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। [3]

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَتَاهُ جِبْرِيلُ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يَلْعَبُ مَعَ الْغِلْمَانِ فَأَخَذَهُ فَصَرَعَهُ فَشَقَّ عَنْ قَلْبِهِ فَاسْتَخْرَجَ الْقَلْبَ فَاسْتَخْرَجَ مِنْهُ عَلَقَةً فَقَالَ هَذَا حَظُّ الشَّيْطَانِ مِنْكَ ثُمَّ غَسَلَهُ فِي طَسْتٍ مِنْ ذَهَبٍ بِمَاءِ زَمْزَمَ ثُمَّ لأَمَهُ ثُمَّ أَعَادَهُ فِي مَكَانِهِ وَجَاءَ الْغِلْمَانُ يَسْعَوْنَ إِلَى أُمِّهِ – يَعْنِي ظِئْرَهُ – فَقَالُوا إِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ قُتِلَ فَاسْتَقْبَلُوهُ وَهُوَ مُنْتَقَعُ اللَّوْنِ قَالَ أَنَسٌ وَقَدْ كُنْتُ أَرَى أَثَرَ ذَلِكَ الْمِخْيَطِ فِي صَدْرِهِ

বাংলা অনুবাদ: আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ যখন অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিলেন, তখন জিবরাঈল তাঁর কাছে আসেন। তিনি মুহাম্মদকে ধরে মাটিতে শুইয়ে দেন, তাঁর বুক চিরে হৃদপিণ্ড বের করেন এবং সেখান থেকে একটি রক্তপিণ্ড বের করে বলেন, ‘এটি তোমার মধ্যে শয়তানের অংশ।’ এরপর তিনি একটি স্বর্ণের পাত্রে জমজমের পানি দিয়ে হৃদপিণ্ডটি ধুয়ে সেটি জোড়া লাগিয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন। শিশুরা দৌড়ে তাঁর মায়ের, অর্থাৎ ধাত্রীমায়ের কাছে গিয়ে বলে, মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। লোকেরা তাঁর কাছে এসে তাঁকে বিবর্ণ অবস্থায় দেখতে পায়। আনাস বলেন, আমি তাঁর বুকে সেই সেলাইয়ের চিহ্ন দেখতাম।

এই হাদিসের তাৎপর্য শুধু মুহাম্মদের শৈশবে একটি অলৌকিক চিকিৎসাসদৃশ ঘটনা ঘটার দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে সরাসরি শয়তানের অংশের কথা বলা হয়েছে এবং সেই অংশ অপসারণের জন্য জিবরাঈলের আগমনের বিবরণ রয়েছে। ইসলামি বিশ্বাসে ইবলিস মানুষকে পথভ্রষ্ট করার প্রধান প্রতিপক্ষ। মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়া এবং তাকে অন্যায়ের দিকে পরিচালিত করার সঙ্গে শয়তানের কার্যক্রম যুক্ত। সেই ধর্মীয় বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই একটি বিশেষ শিশুর হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ মুহাম্মদের সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ককে তাঁর শৈশবেই একটি অসাধারণ অতিপ্রাকৃত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে বলে বর্ণিত হচ্ছে। ইসলামি হাদিসে সাধারণ মানুষের ওপর শয়তানের প্রভাবের কথা বলা হয়েছে, অথচ মুহাম্মদের ক্ষেত্রে সেই প্রভাব প্রতিরোধ করতে স্বয়ং জিবরাঈলের হস্তক্ষেপের দাবি করা হয়েছে। ইবলিসের নিজের কার্যক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা মুহাম্মদের শৈশবেই ঘটেছে বলে বর্ণিত, অথচ তাঁর নবুয়তের সময় ইবলিসের অনুসন্ধানের কাহিনি সেই পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

এখন এই ঘটনাটিকে ইবলিসের কথিত কার্যক্রমের সঙ্গে তুলনা করলে গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। ইবলিস ও তার অনুসারীরা যদি মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিতে পারে, মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে পারে, তাহলে শিশু মুহাম্মদের ওপর সংঘটিত এমন একটি বিশেষ ঘটনা তাদের নজরের বাইরে থাকল কীভাবে? এখানে সাধারণ কোনো শিশুর অসুস্থতা বা চিকিৎসার ঘটনা ঘটেনি। ইসলামি বর্ণনা অনুসারে স্বয়ং জিবরাঈল এসে একটি শিশুর শরীর থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ করেছেন। অর্থাৎ শয়তানি কার্যক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়েই সরাসরি অতিপ্রাকৃত হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। এই শিশুর পরিচয়, অবস্থান ও বিশেষ সুরক্ষা সম্পর্কে ইবলিসের বাহিনীর কোনো সদস্য তখন সংবাদ সংগ্রহ করেনি? তারা যদি ঘটনাটি জানতে পেরে থাকে, তাহলে সেই তথ্য তাদের নেতার কাছে পৌঁছায়নি কেন? আর যদি জানতে না পেরে থাকে, তাহলে মানুষের মধ্যে এত ব্যাপকভাবে সক্রিয় থাকার দাবিকৃত শয়তানি ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণক্ষমতা কতটা সীমিত ছিল?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মুহাম্মদের জন্মসংক্রান্ত অলৌকিক ঘোষণা এবং শৈশবের বক্ষবিদারণকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে তাদের পারস্পরিক তাৎপর্য হারিয়ে যায়। সীরাতের বর্ণনায় তাঁর মায়ের গর্ভাবস্থায় বিশেষ সংবাদ ও অলৌকিক আলো দেখার কথা রয়েছে। এরপর শৈশবে জিবরাঈল এসে তাঁর হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ করেছেন বলে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। দুটি ঘটনাই মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির বহু আগের। উভয় বর্ণনায় একটি শিশুর বিশেষ ধর্মীয় অবস্থান ও অতিপ্রাকৃত সুরক্ষার ধারণা উপস্থিত। অথচ তিরমিজি ৩৩২৪-এর ঘটনাক্রমে ইবলিস নবুয়তপ্রাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত আসমানের পরিবর্তনের কারণ বুঝতে পারে না এবং কারণ অনুসন্ধানে বাহিনী পাঠায়। এভাবে জন্মের পূর্বলক্ষণ, শৈশবের বিশেষ সুরক্ষা এবং পরবর্তী নবুয়তের ঘটনাকে একত্রে বিবেচনা করলে ইবলিসের অজ্ঞতা আর একটি বিচ্ছিন্ন তথ্যের অভাব হিসেবে থাকে না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত কথিত অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর সংবাদ তার নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থায় কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, সেই প্রশ্ন তৈরি হয়।

ইসলামি বিশ্বাসে মানুষের চিন্তা ও আচরণে হস্তক্ষেপকারী বিস্তৃত শয়তানি বাহিনীর কার্যক্ষেত্রের মধ্যেই মুহাম্মদের হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। নিজের প্রধান ধর্মীয় প্রতিপক্ষের শৈশবে এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটার পরও ইবলিসের বাহিনীর কথিত সংবাদব্যবস্থা নবুয়তের সময় তার নেতাকে নতুন অনুসন্ধান থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ইসলামি বর্ণনায় ইবলিসের অনুসারীরা মানুষের চিন্তা ও আচরণে সক্রিয়, মানুষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম এবং তাদের কার্যক্রম ইবলিসের নেতৃত্বের অধীন। সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অস্বাভাবিক ঘটনা মুহাম্মদের শৈশবেই সংঘটিত হওয়ার দাবি করা হচ্ছে। একজন সাধারণ শিশুর জীবন থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ করার মতো ঘটনা ইবলিসের বাহিনীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা, কারণ তাদের কথিত প্রধান কাজই মানুষের ওপর শয়তানি প্রভাব বিস্তার করা। যে শিশুকে পরবর্তী সময়ে ইসলামের শেষ নবী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাঁর ওপর শয়তানের প্রভাব প্রতিরোধের ঘটনা শৈশবেই ঘটেছে বলে বর্ণিত; অথচ ইবলিসকে নবুয়তের সময় সেই ব্যক্তির পরিচয়সংক্রান্ত পরিবর্তন শনাক্ত করতে নতুন করে বাহিনী পাঠাতে হয়েছে। এই ঘটনাক্রম ইসলামি অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও তথ্যপ্রবাহ সম্পর্কে একটি গুরুতর অসংগতি প্রকাশ করে।


প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে শয়তান: মুহাম্মদের সঙ্গী তার নেতাকে কী জানিয়েছিল?

ইসলামি হাদিসসাহিত্যে মানুষের সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক শুধু দূর থেকে কুমন্ত্রণা দেওয়া কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে উপস্থিত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সহিহ মুসলিমের ২৮১৪ক নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী নিযুক্ত রয়েছে। সাহাবিরা জানতে চান, মুহাম্মদের নিজের সঙ্গেও কি এমন সঙ্গী রয়েছে? মুহাম্মদ জানান, তাঁর সঙ্গেও রয়েছে। তবে আল্লাহ তাঁকে সেই সঙ্গীর বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন এবং সে তাঁকে ভালো ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশ দেয় না। এই বর্ণনা মানুষের সঙ্গে শয়তানি সত্তার একটি স্থায়ী সম্পর্কের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। শয়তান কেবল দূরের কোনো অদৃশ্য শক্তি নয়; প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গেই একটি জিন সঙ্গী যুক্ত রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সাধারণ নিয়ম থেকে মুহাম্মদ নিজেকেও বাদ দেননি। বরং তিনি নিজের ক্ষেত্রেও সেই সঙ্গীর উপস্থিতি স্বীকার করেছেন এবং তার প্রভাবের বিষয়ে বিশেষ ঐশী সাহায্য লাভের কথা বলেছেন। [4]

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ وُكِّلَ بِهِ قَرِينُهُ مِنَ الْجِنِّ» قَالُوا وَإِيَّاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ «وَإِيَّايَ إِلَّا أَنَّ اللَّهَ أَعَانَنِي عَلَيْهِ فَأَسْلَمَ فَلَا يَأْمُرُنِي إِلَّا بِخَيْرٍ»

বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, তোমাদের এমন কেউ নেই, যার সঙ্গে জিনদের মধ্য থেকে একজন সঙ্গী নিযুক্ত করা হয়নি। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সঙ্গেও, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, আমার সঙ্গেও। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে সে আমার অনুগত হয়েছে এবং আমাকে ভালো ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশ দেয় না।

আয়িশার বর্ণিত আরেকটি হাদিসে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে এসেছে। সহিহ মুসলিমের ২৮১৫ নম্বর হাদিসে আয়িশা বলেছেন, এক রাতে মুহাম্মদ তাঁর কাছ থেকে বাইরে গেলে তাঁর মনে ঈর্ষার সৃষ্টি হয়। মুহাম্মদ ফিরে এসে আয়িশার অবস্থা দেখে জানতে চান, তাঁর শয়তান কি তাঁর কাছে এসেছে? আয়িশা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন, তাঁর সঙ্গেও কি শয়তান রয়েছে? মুহাম্মদ হ্যাঁ বলেন। এরপর আয়িশা জানতে চান, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই কি শয়তান রয়েছে? মুহাম্মদ আবার হ্যাঁ বলেন। সর্বশেষ তিনি জানতে চান, মুহাম্মদের নিজের সঙ্গেও কি শয়তান রয়েছে? মুহাম্মদ জানান, তাঁর সঙ্গেও রয়েছে, তবে আল্লাহ তাঁকে সেই সঙ্গীর বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন। এখানে শয়তানের উপস্থিতির বিষয়টি কেবল সাধারণ ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের একটি নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থা—আয়িশার ঈর্ষাকে মুহাম্মদ তাঁর সঙ্গে থাকা শয়তানের কার্যকলাপের সম্ভাব্য ফল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ হাদিসটির বর্ণনায় মানুষের দৈনন্দিন আবেগ ও মানসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেও শয়তানের উপস্থিতি সরাসরি সম্পর্কিত। [5]

عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ مِنْ عِنْدِهَا لَيْلاً قَالَتْ فَغِرْتُ عَلَيْهِ فَجَاءَ فَرَأَى مَا أَصْنَعُ فَقَالَ «مَا لَكِ يَا عَائِشَةُ أَغِرْتِ» فَقُلْتُ وَمَا لِي لاَ يَغَارُ مِثْلِي عَلَى مِثْلِكَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «أَقَدْ جَاءَكِ شَيْطَانُكِ» قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَوَمَعِيَ شَيْطَانٌ قَالَ «نَعَمْ» قُلْتُ وَمَعَ كُلِّ إِنْسَانٍ قَالَ «نَعَمْ» قُلْتُ وَمَعَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ «نَعَمْ وَلَكِنْ رَبِّي أَعَانَنِي عَلَيْهِ حَتَّى أَسْلَمَ»

বাংলা অনুবাদ: আয়িশা বলেন, এক রাতে মুহাম্মদ তাঁর কাছ থেকে বাইরে গেলে তাঁর মনে ঈর্ষা জাগে। মুহাম্মদ ফিরে এসে তাঁর অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আয়িশা, তোমার কী হয়েছে? তুমি কি ঈর্ষা করছ? আয়িশা বলেন, আমার মতো নারী আপনার মতো স্বামীর প্রতি ঈর্ষা করবে না কেন? তখন মুহাম্মদ বলেন, তোমার শয়তান কি তোমার কাছে এসেছে? আয়িশা জিজ্ঞেস করেন, আমার সঙ্গেও কি শয়তান রয়েছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। আয়িশা প্রশ্ন করেন, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই কি শয়তান রয়েছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। আয়িশা আবার জিজ্ঞেস করেন, আপনার সঙ্গেও? তিনি বলেন, হ্যাঁ, তবে আমার প্রতিপালক তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে সে আমার অনুগত হয়েছে।

এই দুটি হাদিসকে মুহাম্মদের শৈশবের বক্ষবিদারণের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। শিশু মুহাম্মদের হৃদপিণ্ড থেকে জিবরাঈল শয়তানের অংশ অপসারণ করেছেন বলে সহিহ মুসলিম ১৬২গ-তে বর্ণিত হয়েছে। আবার সহিহ মুসলিম ২৮১৪ক ও ২৮১৫ অনুযায়ী মুহাম্মদের নিজের সঙ্গেও একজন শয়তানি সঙ্গী ছিল এবং সেই সঙ্গীর প্রভাব প্রতিরোধে আল্লাহ বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন। অর্থাৎ মুহাম্মদের ক্ষেত্রে শয়তানের প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক বিশেষ ঘটনা ইসলামি হাদিসে সংরক্ষিত রয়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে শয়তানের সম্পর্কের যে নিয়ম বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদের ক্ষেত্রে সেই নিয়মের ওপর বিশেষ ঐশী হস্তক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে। তাহলে তাঁর সঙ্গে থাকা শয়তানি সত্তা মুহাম্মদের এই ব্যতিক্রমী অবস্থান সম্পর্কে কী জানত? জিবরাঈলের কথিত বক্ষবিদারণ, শয়তানের অংশ অপসারণ কিংবা পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদের ওপর শয়তানি প্রভাব অকার্যকর হওয়ার ঘটনাগুলো তার কাছে কীভাবে প্রতিভাত হয়েছিল? তার উপস্থিতি স্বীকার করা হচ্ছে, আবার মুহাম্মদের বিশেষ সুরক্ষার কথাও বলা হচ্ছে; কিন্তু এই সঙ্গীর কাছ থেকে ইবলিসের কাছে কোনো তথ্য পৌঁছানোর বিবরণ পাওয়া যায় না।

ইবলিসের বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে সহিহ মুসলিমের ২৮১৩ক নম্বর হাদিস এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সেখানে জাবির থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ বলেছেন, ইবলিসের সিংহাসন সমুদ্রের ওপর অবস্থিত এবং সে মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন বাহিনী পাঠায়। তার কাছে সেই শয়তানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যে সবচেয়ে বেশি ফিতনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এই বর্ণনায় ইবলিসকে নিষ্ক্রিয় বা বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা হিসেবে দেখানো হয়নি। সে সক্রিয়ভাবে অধীনস্থ বাহিনী প্রেরণ করে এবং তাদের কাজের গুরুত্ব নির্ধারণ করে। মানুষের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি তার বাহিনীর সংগঠিত কার্যক্রমের অংশ। ফলে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে শয়তানের উপস্থিতির দাবি এবং ইবলিসের বাহিনী পরিচালনার দাবি একত্রে বিবেচনা করলে মানুষের জীবনে শয়তানি কার্যকলাপের একটি বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো পাওয়া যায়। [6]

عَنْ جَابِرٍ، قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ «إِنَّ عَرْشَ إِبْلِيسَ عَلَى الْبَحْرِ فَيَبْعَثُ سَرَايَاهُ فَيَفْتِنُونَ النَّاسَ فَأَعْظَمُهُمْ عِنْدَهُ أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً»

বাংলা অনুবাদ: জাবির বলেন, আমি মুহাম্মদকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই ইবলিসের সিংহাসন সমুদ্রের ওপর অবস্থিত। সে মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তার বাহিনী পাঠায়। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ফিতনা সৃষ্টি করে, সে-ই ইবলিসের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সহিহ মুসলিমে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে শয়তানি সঙ্গীর উপস্থিতি এবং ইবলিসের অধীনে সংগঠিত বাহিনীর কার্যক্রম বর্ণিত হয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে এত বিস্তৃতভাবে সক্রিয় এই বাহিনীর সদস্যরা মুহাম্মদের বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে কার্যকর সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেনি কেন, সেটিই শয়তানি ব্যবস্থার কথিত ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। প্রশ্নটি হলো, মুহাম্মদের মতো ব্যতিক্রমী একজন ব্যক্তির জীবন ও কর্মকাণ্ড এত দীর্ঘ সময় ধরে চলার পরও ইবলিসের নেতৃত্বাধীন কোনো শয়তানি সত্তা তাঁর বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেনি কেন? মুহাম্মদের জন্মের পূর্বলক্ষণ, শৈশবের বক্ষবিদারণ এবং শয়তানি প্রভাবের বিরুদ্ধে বিশেষ সুরক্ষার বর্ণনাগুলো সত্য হলে তাঁর জীবন শুরু থেকেই শয়তানি কার্যকলাপের সাধারণ নিয়ম থেকে আলাদা ছিল। মানুষের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের প্রভাবিত করার ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তাদের কাছে এই ব্যতিক্রমী অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। অথচ তিরমিজির বর্ণনায় ইবলিস নবুয়তপ্রাপ্তির সময় আসমানের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পরেই কারণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়।

ইসলামি বিশ্বাসে ইবলিসের সংগঠিত বাহিনী ও মানুষের সঙ্গে শয়তানি সঙ্গীর যে ক্ষমতা বর্ণিত হয়েছে, সেই ক্ষমতার সঙ্গে ইবলিসের বিলম্বিত তথ্যপ্রাপ্তির কাহিনি সংঘর্ষ তৈরি করে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত শয়তানি সঙ্গীরা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত; ইবলিসের বাহিনী মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত; আর মুহাম্মদের শৈশবেই শয়তানের অংশ অপসারণ এবং তাঁর বিশেষ সুরক্ষার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তারপরও তিরমিজি ৩৩২৪ অনুযায়ী নবুয়তপ্রাপ্তির পর আসমানে জিনদের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হলে ইবলিসকে নতুন করে পৃথিবীতে অনুসন্ধান চালাতে হয়। এত বিস্তৃত অতিপ্রাকৃত বাহিনী, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে শয়তানি সঙ্গীর উপস্থিতি এবং মুহাম্মদের ওপর দীর্ঘদিনের কথিত ঐশী সুরক্ষার বর্ণনা একত্রে গ্রহণ করলে ইবলিসের এই বিলম্বিত অনুসন্ধান একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করে: মানুষের জীবনে এত গভীরভাবে হস্তক্ষেপকারী শয়তানদের নেতা মুহাম্মদের বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে এতদিন কার্যকর কোনো সংবাদ পেল না কেন? মানুষের জীবনে এত বিস্তৃত হস্তক্ষেপের ক্ষমতাসম্পন্ন শয়তানি বাহিনী নিজের নেতাকে মুহাম্মদের বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে কার্যকর পূর্বসংবাদ দিতে ব্যর্থ হয়েছে—এই ঘটনাক্রম ইসলামি কাহিনির অভ্যন্তরীণ অসংগতিকে প্রকাশ করে।


নবুয়তের আগেই মুহাম্মদকে চিনেছিল পাথর, গাছ ও খ্রিস্টান সন্ন্যাসী: ইবলিস কেন চিনতে পারেনি?

মুহাম্মদের নবুয়তের পূর্বলক্ষণ সম্পর্কে ইসলামি বর্ণনাগুলো শুধু তাঁর জন্ম ও শৈশবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নবুয়তপ্রাপ্তির আগেও তাঁর বিশেষ পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার একাধিক অলৌকিক ঘটনা হাদিস ও সীরাতসাহিত্যে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব বর্ণনায় কখনো পাথর মুহাম্মদকে সালাম দিয়েছে, কখনো গাছ তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছে, কখনো মেঘ তাঁকে ছায়া দিয়েছে, আবার কখনো একজন খ্রিস্টান সন্ন্যাসী তাঁর শরীরের বিশেষ চিহ্ন ও অলৌকিক লক্ষণ দেখে ভবিষ্যৎ নবী হিসেবে শনাক্ত করেছেন। এসব ঘটনা ইসলামি নবিজীবনসাহিত্যে মুহাম্মদের বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু একই বর্ণনাগুলো ইবলিসের কথিত অজ্ঞতার প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ মুহাম্মদের পরিচয় সম্পর্কে যদি প্রকৃতির জড়বস্তু পর্যন্ত বিশেষভাবে সচেতন হয়ে থাকে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও কেউ কেউ তাঁর ভবিষ্যৎ নবুয়ত শনাক্ত করতে পেরে থাকেন, তাহলে মানুষের জীবনে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপকারী ইবলিসের বিশাল শয়তানি বাহিনী এতদিন কীভাবে তাঁর বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে গেল?

সহিহ মুসলিমের ২২৭৭ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ নিজের নবুয়তপ্রাপ্তির আগের একটি অস্বাভাবিক ঘটনার কথা বলেছেন। জাবির ইবনে সামুরা থেকে বর্ণিত এই হাদিসে মুহাম্মদ জানান, মক্কায় এমন একটি পাথর ছিল, যা তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই তাঁকে সালাম দিত। তিনি পরবর্তী সময়েও সেই পাথর চিনতে পারতেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, পাথরটির এই আচরণ মুহাম্মদের নবুয়ত ঘোষণার পর শুরু হয়েছে বলে বর্ণিত হয়নি। বরং মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য অনুসারে, তিনি নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার আগেই পাথরটি তাঁকে বিশেষভাবে অভিবাদন জানাত। ইসলামি বিশ্বাসের এই কাহিনিতে একটি সাধারণ জড়বস্তুকে ভবিষ্যৎ নবীর বিশেষ পরিচয় শনাক্ত করার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাথরের সচেতনতা কিংবা কথা বলার ক্ষমতার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। অথচ সহিহ মুসলিমে দাবি করা হয়েছে, মুহাম্মদের নবুয়তের আগেই একটি পাথর তাঁর বিশেষ পরিচয় শনাক্ত করে তাঁকে সালাম দিত। একটি পাথর পর্যন্ত ভবিষ্যৎ নবীকে চিনতে পেরেছে বলে ইসলামি হাদিসে বর্ণিত, অথচ ইবলিসের সংগঠিত বাহিনীকে নবুয়তের সময় নতুন অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। [7]

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «إِنِّي لأَعْرِفُ حَجَرًا بِمَكَّةَ كَانَ يُسَلِّمُ عَلَىَّ قَبْلَ أَنْ أُبْعَثَ إِنِّي لأَعْرِفُهُ الآنَ»

বাংলা অনুবাদ: জাবির ইবনে সামুরা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, মক্কায় এমন একটি পাথর আমি চিনি, যা আমাকে নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার আগেই সালাম দিত। আমি এখনো সেই পাথরটি চিনি।

পাথরের সালাম দেওয়ার ঘটনাটি মুহাম্মদের নবুয়তের পূর্বলক্ষণসংক্রান্ত বৃহত্তর কাহিনির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর জন্মের আগে আমিনার কাছে বিশেষ সংবাদ পৌঁছানো, গর্ভাবস্থায় অলৌকিক আলো দেখা এবং শৈশবে জিবরাঈলের মাধ্যমে বক্ষবিদারণের পর এখন এমন একটি পাথরের বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে, যা মুহাম্মদকে নবুয়তের আগেই বিশেষভাবে অভিবাদন জানাত। এই ধারাবাহিক বর্ণনায় মুহাম্মদের বিশেষ অবস্থান কোনো গোপন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। বরং তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষ, ফেরেশতা এবং জড়প্রকৃতির মাধ্যমে সেই বিশেষ অবস্থানের প্রকাশ ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাহলে ইবলিসের অনুসারীদের কাছে এর কোনো সংবাদ পৌঁছানোর কথা নয় কেন? মানুষের মনের গোপন প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে যে শয়তানদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তাদের পক্ষে মুহাম্মদের চারপাশে সংঘটিত কথিত অলৌকিক ঘটনাগুলোর কোনোটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি? ইসলামি বিশ্বাসে জড় পাথরও মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় চিনতে পেরেছে, অথচ মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন শয়তানি বাহিনীর নেতা তাঁর নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণ শনাক্ত করতে নতুন অনুসন্ধান চালিয়েছে। এই ঘটনাক্রম শয়তানদের কথিত পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ সংগ্রহের ক্ষমতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে মানুষের আগাম জ্ঞানের আরও বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় খ্রিস্টান সন্ন্যাসী বাহিরার কাহিনিতে। জামে তিরমিজির ৩৬২০ নম্বর হাদিসে আবু মুসা আশআরির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ শৈশবে তাঁর চাচা আবু তালিবের সঙ্গে শাম অঞ্চলে বাণিজ্যিক সফরে গিয়েছিলেন। সফরকারীরা একজন সন্ন্যাসীর কাছে পৌঁছালে তিনি তাঁদের মধ্যে মুহাম্মদকে শনাক্ত করেন। বর্ণনা অনুসারে, সন্ন্যাসী মুহাম্মদের হাত ধরে তাঁকে সমগ্র জগতের নেতা এবং জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসুল হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, মুহাম্মদকে মানুষ ও জিনদের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হবে। উপস্থিত কুরাইশ নেতারা তাঁর এই পরিচয় জানার কারণ জানতে চাইলে সন্ন্যাসী জানান, তাঁদের আগমনের সময় গাছ ও পাথর সিজদায় পড়ে গিয়েছিল এবং এ ধরনের ঘটনা কেবল একজন নবীর জন্যই ঘটে। তিনি মুহাম্মদের কাঁধের নিচে নবুয়তের বিশেষ চিহ্ন থাকার কথাও বলেন। এরপর বর্ণনায় মুহাম্মদকে মেঘের ছায়া দেওয়ার এবং গাছের ছায়া তাঁর দিকে সরে আসার ঘটনা রয়েছে। [8]

هَذَا سَيِّدُ الْعَالَمِينَ هَذَا رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ يَبْعَثُهُ اللَّهُ رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

বাংলা অনুবাদ: ইনি জগতসমূহের নেতা। ইনি জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসুল। আল্লাহ তাঁকে জগতসমূহের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করবেন।

বাহিরার কাহিনিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রোম অঞ্চল থেকে সাতজন ব্যক্তি মুহাম্মদের অনুসন্ধানে এসেছিল। তাদের বক্তব্য অনুসারে, সেই মাসে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটার সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছেছিল এবং তাঁকে খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন পথে লোক পাঠানো হয়েছিল। অর্থাৎ এই বর্ণনায় শুধু একজন নির্জনবাসী সন্ন্যাসীই মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় জানতে পেরেছিলেন, এমন নয়; দূরবর্তী অঞ্চলের আরও কিছু মানুষও তাঁর ভবিষ্যৎ নবুয়ত সম্পর্কে সংবাদ পেয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। মুহাম্মদ তখনও প্রকাশ্যে নবুয়ত দাবি করেননি। অথচ তাঁর ভবিষ্যৎ পরিচয় সম্পর্কে সংবাদ ছড়িয়ে পড়া, তাঁকে শনাক্ত করার চেষ্টা এবং তাঁকে নিয়ে বিশেষ আশঙ্কার একটি বিস্তৃত ঘটনাক্রম এখানে উপস্থিত। বর্ণনাটির কিছু অংশের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে হাদিসবিশারদদের মতভেদ রয়েছে; তিরমিজি একে হাসান গরিব বলেছেন এবং পরবর্তী মূল্যায়নে দুর্বলও বলা হয়েছে। বিশেষত ঘটনাটিতে আবু বকর ও বিলালের উল্লেখ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। ফলে এটিকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু ইসলামি নবিজীবনসাহিত্যে মুহাম্মদের আগাম পরিচয় কীভাবে অলৌকিকভাবে প্রচারিত হয়েছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ এই কাহিনি।

এই কাহিনির সঙ্গে ইবলিসের অবস্থান তুলনা করলে একটি বিশেষ অসংগতি দেখা যায়। বাহিরার বর্ণনা অনুসারে, একজন খ্রিস্টান সন্ন্যাসী মুহাম্মদের শরীরের চিহ্ন, গাছপাথরের আচরণ এবং অন্যান্য লক্ষণ দেখে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিচয় শনাক্ত করেছেন। দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের কাছেও একজন নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে সংবাদ পৌঁছেছে। অথচ তিরমিজি ৩৩২৪-এর বর্ণনায় ইবলিস মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির পরেও আসমানের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণ জানার জন্য বাহিনী পাঠিয়েছে। পৃথিবীর মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাই যার প্রধান কাজ, সেই ইবলিসের বাহিনী কি মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে এতদিন কোনো সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেনি? একজন সন্ন্যাসী ভবিষ্যৎ নবীর পরিচয় শনাক্ত করতে পারলেও শয়তানদের নেতা কেন তাঁর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসংবাদ লাভ করল না? বিশেষ করে ইসলামি বিশ্বাসে মুহাম্মদের ধর্মীয় আহ্বানই ইবলিসের মানুষের পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থিত। ফলে মুহাম্মদের আবির্ভাব ইবলিসের জন্য সাধারণ কোনো অপ্রাসঙ্গিক ঘটনা নয়; তার নিজের ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি ঘটনা।

মুহাম্মদের জন্ম, শৈশব, বক্ষবিদারণ, পাথরের সালাম এবং বাহিরার কাহিনিকে একত্রে বিবেচনা করলে ইসলামি নবিজীবনসাহিত্যে তাঁর নবুয়তের আগে দীর্ঘ একটি অলৌকিক ঘটনাক্রম পাওয়া যায়। সেই ঘটনাক্রমের বিভিন্ন অংশে মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় আলাদা আলাদা উপায়ে প্রকাশিত হয়েছে বলে বর্ণিত। অন্যদিকে ইবলিসের অবস্থান সম্পর্কে তিরমিজির বর্ণনায় দেখা যায়, নবুয়তের সময় আসমানে জিনদের পূর্ববর্তী কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পরেই সে পৃথিবীতে নতুন কিছু ঘটেছে বলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মানুষের জীবনে সক্রিয় শয়তানি বাহিনীর নেতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পরিবর্তনের কারণ বুঝতে এত দেরি করছে, অথচ একই ধর্মীয় সাহিত্যে সেই পরিবর্তনের পূর্বলক্ষণ বহু বছর আগে থেকেই প্রকাশিত হচ্ছিল—এই দুই ধরনের বর্ণনা একটি সুসংগত অতিপ্রাকৃত তথ্যব্যবস্থার চিত্র প্রদান করে না। মুহাম্মদের আগাম পরিচয় সম্পর্কে যত বেশি অলৌকিক বিবরণ যুক্ত হয়, ইবলিসের বিলম্বিত অনুসন্ধানের ঘটনাটি তত বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়।


নবুয়তপ্রাপ্তির পর আসমানে বাধা: ইবলিস কেন পৃথিবীতে অনুসন্ধান চালাতে বাধ্য হলো?

ইবলিসের অজ্ঞতার প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ বর্ণনাটি সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসে সংরক্ষিত রয়েছে। ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণিত এই হাদিস অনুসারে, জিনেরা আগে আসমানের দিকে উঠে অদৃশ্য জগতের সংবাদ শোনার চেষ্টা করত। তারা একটি সত্য সংবাদ শুনতে পেলে তার সঙ্গে নিজেদের তৈরি আরও নয়টি মিথ্যা কথা যুক্ত করত। অর্থাৎ বর্ণনায় জিনদের এমন একটি সংবাদ সংগ্রহব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা আসমানের খবর সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ব্যবহার করতে পারত। মুহাম্মদ নবুয়তপ্রাপ্ত হওয়ার পর এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। জিনেরা নিজেদের পূর্ববর্তী অবস্থানে বসে সংবাদ শুনতে বাধার সম্মুখীন হয় এবং তাদের দিকে উজ্জ্বল অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণ তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না। তারা বিষয়টি ইবলিসকে জানায়। তখন ইবলিস পৃথিবীতে নতুন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে অনুমান করে এবং সেই ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য বাহিনী পাঠায়। বাহিনীর সদস্যরা মুহাম্মদকে দুই পাহাড়ের মাঝখানে নামাজরত অবস্থায় দেখতে পায়। তারা ফিরে এসে ইবলিসকে সংবাদ দিলে সে এই ঘটনাকেই আসমানের পরিবর্তনের কারণ হিসেবে শনাক্ত করে। [9]

সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৪/ তাফসীরুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ ৭০. সূরা আল-জিন্ন
৩৩২৪। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উর্ধ্ব জগতে জিনেরা যাতায়াত করত আকাশের সংবাদ সংগ্রহের জন্য। একটি কথা শুনতে পেলে তার সঙ্গে তারা নিজেদের পক্ষ হতে আরো নয়টি কথা সংযুক্ত করত। যার কারণে সেই একটি কথা সত্য হত এবং বাকি নয়টি কথা হত মিথ্যা। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াতপ্রাপ্ত হলে উর্ধ্ব জগতে তাদের উপবেশনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। সুতরাং (জিনেরা) এ ব্যাপারটি তারা ইবলিসকে অবহিত করে। আর ইতোপূর্বে কখনো তাদের প্রতি উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়নি।
ইবলীস তাদেরকে বলল, পৃথিবীতে অবশ্যই নতুন কিছু ঘটেছে, যার কারণে এই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং ইবলীস তার দলকে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তারা দু’টি পাহাড়ের মাঝামাঝিতে নামায আদায় করতে দেখে। (ইমাম তিরমিয়ী বলেন,) আমার ধারণা হয় মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া বলেছেন, মক্কায় (নামায আদায় করতে দেখে)। তারপর তারা ইবলীসের সঙ্গে দেখা করে তাকে ব্যাপারটি জানায়। সে বলল, সেই নতুন ঘটনা এটাই যা দুনিয়াতে ঘটেছে।
সহীহ।
আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

এই হাদিসে ইবলিসের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে আসমানে জিনদের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ বন্ধ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জিনেরা বিষয়টি নিজেরা ব্যাখ্যা করতে না পেরে ইবলিসকে জানিয়েছে। তৃতীয়ত, ইবলিস পৃথিবীতে নতুন কিছু ঘটেছে বলে অনুমান করেছে, কিন্তু ঘটনাটির নির্দিষ্ট পরিচয় তখনও জানত না। চতুর্থত, সে নিজের বাহিনীকে অনুসন্ধানে পাঠিয়েছে। পঞ্চমত, বাহিনীর সদস্যরা মুহাম্মদকে নামাজরত অবস্থায় দেখে ফিরে এসেছে। সর্বশেষ ইবলিস এই সংবাদকে আসমানে সংঘটিত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ঘটনাটির বর্ণনায় ইবলিসের পূর্বজ্ঞান নয়, বরং অজ্ঞতা থেকে অনুসন্ধানের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। তিরমিজির হাদিসে ইবলিস পৃথিবীতে নতুন ঘটনা ঘটেছে বলে অনুমান করে এবং সেই ঘটনার কারণ জানতে বাহিনী পাঠায়। অথচ ইসলামি সীরাতের অন্য বর্ণনায় সে মুহাম্মদের জন্মের দিনই তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে জেনেছিল। এই দুই ঘটনাক্রম ইবলিসের পূর্বজ্ঞান ও পরবর্তী অনুসন্ধানের মধ্যে গুরুতর অসংগতি তৈরি করে।

সহিহ বুখারির ৪৯২১ নম্বর হাদিসেও আসমানে জিনদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পর পৃথিবীতে অনুসন্ধান চালানোর বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ কয়েকজন সাহাবিকে নিয়ে উকাজের বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। এই সময় শয়তানদের সঙ্গে আসমানের সংবাদপ্রাপ্তির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তাদের দিকে অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয়। শয়তানরা ফিরে এসে নিজেদের সঙ্গীদের পরিবর্তনের কথা জানায়। তখন তাদের বলা হয়, পৃথিবীতে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছে; তাই পূর্ব ও পশ্চিমের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে সেই ঘটনার অনুসন্ধান করতে হবে। অনুসন্ধানকারী শয়তানদের একটি দল তিহামা অঞ্চলের নাখলা নামক স্থানে মুহাম্মদকে সাহাবিদের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করতে দেখে। তারা কোরআন পাঠ শুনে বুঝতে পারে, এই ঘটনাই আসমানের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এরপর তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে নতুন শোনা কোরআনের সংবাদ জানায়। [10]

فَاضْرِبُوا مَشَارِقَ الأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا فَانْظُرُوا مَا هَذَا الأَمْرُ الَّذِي حَدَثَ

বাংলা অনুবাদ: তোমরা পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ো এবং অনুসন্ধান করে দেখো, নতুন কী ঘটনা ঘটেছে।

বুখারির এই বর্ণনা তিরমিজির হাদিসটির মূল সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে। তিরমিজির বর্ণনায় ইবলিস নিজে অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে; বুখারির বর্ণনায় শয়তানদের মধ্যেই পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমে অনুসন্ধান চালানোর সিদ্ধান্তের কথা এসেছে। কিন্তু উভয় বর্ণনার কেন্দ্রীয় পরিস্থিতি একই ধরনের: আসমানে পূর্ববর্তী সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পর শয়তানরা পৃথিবীতে নতুন ঘটনার সন্ধান করছে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে কুমন্ত্রণা দেওয়া ও তাদের জীবনকে প্রভাবিত করার কাজে নিয়োজিত এই সত্তাদের কাছে মুহাম্মদের নবুয়তের সংবাদ এমনভাবে উপস্থিত হয়নি যে তারা সঙ্গে সঙ্গে আসমানের পরিবর্তনের কারণ শনাক্ত করতে পেরেছে। তাদের নতুন করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। যে মুহাম্মদকে ইসলামি সীরাত ও হাদিসে জন্মের আগে থেকেই বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁর হৃদপিণ্ড থেকে শৈশবে শয়তানের অংশ অপসারণ করা হয়েছে, যাঁকে পাথর সালাম দিয়েছে এবং যাঁকে একজন সন্ন্যাসী ভবিষ্যৎ নবী হিসেবে শনাক্ত করেছেন বলে বর্ণিত, সেই ব্যক্তির নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ শনাক্ত করতে শয়তানদের এমন অনুসন্ধান চালানোর প্রয়োজন কেন হলো?

এই অজ্ঞতার বর্ণনা শুধু হাদিসে সীমাবদ্ধ নয়। কোরআনের সূরা আল-জিন্নের ৮–১০ নম্বর আয়াতেও জিনদের মুখে অনুরূপ বক্তব্য পাওয়া যায়। সেখানে জিনেরা বলেছে, তারা আসমানের সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করে সেখানে কঠোর প্রহরা ও অগ্নিশিখা দেখতে পেয়েছে। আগে তারা নির্দিষ্ট স্থানে বসে সংবাদ শুনতে পারত, কিন্তু এখন যে শুনতে যায় তার জন্য অগ্নিশিখা অপেক্ষা করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে যে পৃথিবীবাসীর জন্য অমঙ্গল চাওয়া হয়েছে, নাকি তাদের প্রতিপালক কল্যাণের ব্যবস্থা করেছেন—সেটি তারা জানে না। অর্থাৎ আসমানের পরিবর্তন শনাক্ত করার পরও সেই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিনেরা অজ্ঞ ছিল। এখানে শুধু ঘটনার স্থান বা পদ্ধতি নয়, ঘটনার ধর্মীয় তাৎপর্যও তাদের কাছে অজানা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। [11]

وَأَنَّا لَا نَدْرِي أَشَرٌّ أُرِيدَ بِمَنْ فِي الْأَرْضِ أَمْ أَرَادَ بِهِمْ رَبُّهُمْ رَشَدًا

বাংলা অনুবাদ: আর আমরা জানি না, পৃথিবীবাসীর জন্য অমঙ্গল চাওয়া হয়েছে, নাকি তাদের প্রতিপালক তাদের জন্য সঠিক পথের ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন।

সূরা আল-জিন্নের এই বক্তব্য, বুখারি ৪৯২১ এবং তিরমিজি ৩৩২৪ একত্রে বিবেচনা করলে একটি বিস্তৃত ঘটনাক্রম পাওয়া যায়। জিনেরা আগে আসমানে সংবাদ সংগ্রহ করত। মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের পর তারা সেই সুযোগ হারায়। পরিবর্তনের কারণ ও তাৎপর্য তাদের কাছে অস্পষ্ট ছিল। তারা পৃথিবীতে অনুসন্ধান চালায়, মুহাম্মদের কোরআন পাঠ শোনে এবং এরপর নতুন ধর্মীয় ঘটনার পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারে। এই ঘটনাক্রমে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি অতিপ্রাকৃত সম্প্রদায়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যারা নিজেদের সংবাদ সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হওয়ার পরও তার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারছে না। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আসমানের সংবাদ সংগ্রহে তাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীতে সংঘটিত নতুন ধর্মীয় ঘটনার পরিচয় জানতে তাদের স্থানীয় অনুসন্ধানের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

সহিহ মুসলিমে ইবলিসের সংগঠিত বাহিনী পাঠানো এবং প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিন সঙ্গী থাকার কথা বলা হয়েছে। ইসলামের এই অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থায় শয়তানরা মানুষের জীবনে ব্যাপকভাবে সক্রিয় বলে বর্ণিত। সেই ধর্মীয় বিশ্বব্যবস্থায় মুহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেছেন, শৈশবে অলৌকিক সুরক্ষা লাভ করেছেন, নবুয়তের আগে তাঁর পরিচয় সম্পর্কে নানা লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তিনি প্রকাশ্যে ধর্মীয় প্রচার শুরু করেছেন। অথচ আসমানের সংবাদ সংগ্রহ বন্ধ হওয়ার পর ইবলিস বা শয়তানদের অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে হচ্ছে পৃথিবীতে কী ঘটেছে। ইসলামি বিশ্বাসে শয়তানদের এই বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতার সঙ্গে তাদের নেতার অজ্ঞতার সরাসরি সংঘাত হলো: যে শয়তানি ব্যবস্থাকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, সেই ব্যবস্থার অধীনস্থ সত্তারা মুহাম্মদের দীর্ঘদিনের বিশেষ অবস্থান ও নবুয়তের আবির্ভাব সম্পর্কে কার্যকর তথ্য সংগ্রহ করতে এতটা ব্যর্থ হলো কেন?

কোরআনের সূরা আল-আহকাফের ২৯–৩২ নম্বর আয়াতেও জিনদের কোরআন শোনা এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে সেই সংবাদ প্রচারের বিবরণ রয়েছে। সেখানে জিনেরা কোরআন শুনে নিজেদের মধ্যে নীরব থাকতে বলে এবং পাঠ শেষ হওয়ার পর নিজ সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারী হিসেবে ফিরে যায়। তারা ঘোষণা করে, মুসার পর অবতীর্ণ একটি কিতাব শুনেছে, যা সত্য ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে। এই বর্ণনা জিনদের নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় সংবাদ প্রচার ও যোগাযোগের ক্ষমতার আরেকটি উদাহরণ। তারা নতুন সংবাদ সংগ্রহ করছে, সেই সংবাদ বুঝছে এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে ইসলামি উৎসে জিনদের তথ্য আদানপ্রদানের ধারণা অনুপস্থিত নয়। বরং এই ক্ষমতা বারবার বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদের নবুয়তসংক্রান্ত ঘটনাগুলো সম্পর্কে ইবলিসের আগে থেকে কী সংবাদ ছিল এবং তার বাহিনী কেন পরিবর্তনের কারণ জানতে অনুসন্ধান চালাতে বাধ্য হয়েছিল, সেই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট সমাধান এসব বর্ণনায় পাওয়া যায় না। [12]

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি ঘটনাগুলোর সময়ক্রম ও তথ্যপ্রবাহে। ইসলামি বর্ণনায় মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় জন্মের আগেই ঘোষিত, শৈশবে ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁর ওপর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, নবুয়তের আগে তাঁর সম্পর্কে অলৌকিক লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে শয়তানি সঙ্গী থাকার কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে নবুয়তপ্রাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত আসমানের পরিবর্তনের কারণ বুঝতে ইবলিসকে বাহিনী পাঠিয়ে অনুসন্ধান করতে হয়েছে। মানুষের অন্তরের গোপন প্ররোচনা পর্যন্ত পরিচালনা করতে সক্ষম বলে বর্ণিত শয়তানি ব্যবস্থা নিজের প্রধান ধর্মীয় প্রতিপক্ষের দীর্ঘদিনের বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে কার্যকর সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেনি—এই চিত্র ইসলামি অলৌকিক কাহিনিগুলোর পারস্পরিক সামঞ্জস্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যে কাহিনিগুলো পৃথকভাবে মুহাম্মদের বিশেষত্ব ও ইবলিসের শক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো একত্রে বিবেচনা করলে একটি সুসংগত অতিপ্রাকৃত কার্যব্যবস্থার পরিবর্তে পরস্পরের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ক্ষমতা, অজ্ঞতা ও তথ্যপ্রাপ্তির বিবরণ সামনে আসে।


ফেরেশতাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতের সংবাদ চুরি করত শয়তানরা: মুহাম্মদের নবুয়তের খবর কোথায় হারিয়ে গেল?

ইবলিসের বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা সম্পর্কে ইসলামি হাদিসসাহিত্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ রয়েছে। সহিহ বুখারির ৩২৮৮ নম্বর হাদিসে আয়িশার সূত্রে মুহাম্মদ বলেছেন, ফেরেশতারা মেঘমণ্ডলীতে পৃথিবীতে ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। শয়তানরা সেই আলোচনা থেকে একটি কথা শুনে নেয় এবং তা গণকদের কানে পৌঁছে দেয়। এরপর সেই সত্য কথাটির সঙ্গে আরও একশটি মিথ্যা কথা যুক্ত করে। এই হাদিসে শয়তানদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা মানুষের সাধারণ পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। তাদের এমন এক অতিপ্রাকৃত সংবাদব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়ার আগেই কোনো ঘটনার সংবাদ ফেরেশতাদের আলোচনার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ ইসলামি বর্ণনায় শয়তানরা শুধু মানুষের বর্তমান আচরণ পর্যবেক্ষণ করে না; আসমান থেকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ঘটনাসংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টাও করে। এই ক্ষমতার বিবরণ ইবলিসের মুহাম্মদ সম্পর্কে অজ্ঞতার প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। [13]

عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ «الْمَلاَئِكَةُ تَتَحَدَّثُ فِي الْعَنَانِ ـ وَالْعَنَانُ الْغَمَامُ ـ بِالأَمْرِ يَكُونُ فِي الأَرْضِ، فَتَسْمَعُ الشَّيَاطِينُ الْكَلِمَةَ، فَتَقُرُّهَا فِي أُذُنِ الْكَاهِنِ، كَمَا تُقَرُّ الْقَارُورَةَ، فَيَزِيدُونَ مَعَهَا مِائَةَ كَذِبَةٍ»

বাংলা অনুবাদ: আয়িশা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন, ফেরেশতারা মেঘমণ্ডলীতে পৃথিবীতে সংঘটিত হতে যাওয়া কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। শয়তানরা সেই আলোচনার একটি কথা শুনে ফেলে এবং তা গণকের কানে এমনভাবে পৌঁছে দেয়, যেমন পাত্রে কিছু ঢালা হয়। এরপর তারা সেই কথার সঙ্গে আরও একশটি মিথ্যা কথা যুক্ত করে।

এই বর্ণনাটির সঙ্গে মুহাম্মদের জন্মের আগের অলৌকিক ঘোষণা, শৈশবের বক্ষবিদারণ এবং নবুয়তপ্রাপ্তির ঘটনাকে তুলনা করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়। ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে মুহাম্মদের নবুয়ত আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ। সীরাতের বর্ণনায় তাঁর জন্মের আগেই তাঁর বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। শৈশবে জিবরাঈল এসে তাঁর হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ করেছেন বলেও হাদিসে রয়েছে। নবুয়তের আগেই পাথর তাঁকে সালাম দিয়েছে এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নবুয়তের লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে সহিহ বুখারি বলছে, শয়তানরা ফেরেশতাদের কাছ থেকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে সক্ষম ছিল। তাহলে মুহাম্মদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আবির্ভাব এবং তাঁর জীবনের বিশেষ ঘটনাগুলো সম্পর্কে কোনো সংবাদই কি ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে শয়তানদের কাছে পৌঁছায়নি? ইসলামি বিশ্বাসে ফেরেশতাদের কাছ থেকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ চুরি করতে সক্ষম শয়তানরা মুহাম্মদের নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিরমিজির হাদিসে বর্ণিত। মুহাম্মদের জন্মের আগে থেকেই অলৌকিক পূর্বঘোষণা এবং তাঁর বিশেষ পরিচয় প্রকাশের এত কাহিনি থাকা সত্ত্বেও শয়তানদের এই ব্যর্থতা তাদের কথিত সংবাদ সংগ্রহব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সহিহ বুখারির ৭৫৬১ নম্বর হাদিসেও গণকদের কাছে শয়তানদের সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। সেখানে আয়িশার বর্ণনায় কিছু মানুষ মুহাম্মদকে গণকদের সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। মুহাম্মদ প্রথমে গণকদের কথাকে গুরুত্বহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন। প্রশ্নকারীরা তখন জানান, গণকদের কিছু কথা সত্য হয়। জবাবে মুহাম্মদ বলেন, জিনেরা আসমান থেকে একটি সত্য কথা চুরি করে গণকদের কানে পৌঁছে দেয় এবং গণকেরা সেই কথার সঙ্গে শতাধিক মিথ্যা কথা মিশিয়ে দেয়। এখানে গণকের সত্য সংবাদ পাওয়ার কারণ হিসেবে মানুষের পর্যবেক্ষণ, গণনা কিংবা সাধারণ অনুমানের বদলে জিনদের অতিপ্রাকৃত সংবাদ সংগ্রহকে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি বর্ণনা অনুসারে, পৃথিবীর সাধারণ গণকের কাছেও আসমান থেকে চুরি করা সংবাদ পৌঁছানোর একটি ব্যবস্থা ছিল। [14]

قَالَتْ عَائِشَةُ ـ رضى الله عنها ـ سَأَلَ أُنَاسٌ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَنِ الْكُهَّانِ فَقَالَ «إِنَّهُمْ لَيْسُوا بِشَىْءٍ» فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ فَإِنَّهُمْ يُحَدِّثُونَ بِالشَّىْءِ يَكُونُ حَقًّا. قَالَ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «تِلْكَ الْكَلِمَةُ مِنَ الْحَقِّ يَخْطَفُهَا الْجِنِّيُّ فَيُقَرْقِرُهَا فِي أُذُنِ وَلِيِّهِ كَقَرْقَرَةِ الدَّجَاجَةِ، فَيَخْلِطُونَ فِيهِ أَكْثَرَ مِنْ مِائَةِ كَذْبَةٍ»

বাংলা অনুবাদ: আয়িশা থেকে বর্ণিত, কিছু মানুষ মুহাম্মদকে গণকদের সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন, তাদের কোনো মূল্য নেই। তাঁরা বললেন, কিন্তু গণকেরা কখনো এমন কথা বলে, যা সত্য হয়। তখন মুহাম্মদ বললেন, সেই সত্য কথাটি জিন আসমান থেকে চুরি করে এবং মুরগির ডাকের মতো শব্দ করে তার সহযোগীর কানে পৌঁছে দেয়। এরপর তারা সেই কথার সঙ্গে একশটিরও বেশি মিথ্যা কথা মিশিয়ে দেয়।

এই বর্ণনায় শয়তানদের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে একটি বিশেষ দিক প্রকাশিত হয়। আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহের পর জিনেরা সেই সংবাদ পৃথিবীর নির্দিষ্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। অর্থাৎ সংবাদ সংগ্রহ এবং তা অন্যের কাছে সরবরাহ করার দুটি পৃথক কার্যক্রম তাদের পক্ষে সম্ভব বলে বর্ণিত হয়েছে। তাহলে মুহাম্মদের জীবনের কথিত অলৌকিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে সংবাদ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একই ক্ষমতা কার্যকর হয়নি কেন? একজন সাধারণ গণক কোনো ঘটনার ভবিষ্যৎ সংবাদ পেতে পারে, অথচ ইবলিসের মতো শয়তানদের নেতা মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ জানতে আসমানে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পর নিজের বাহিনী পাঠায়। ইসলামি বিশ্বাসে শয়তানরা মানুষের কাছে ভবিষ্যতের সংবাদ পৌঁছে দিতে সক্ষম, অথচ তাদের নেতা মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ জানতে নতুন করে অনুসন্ধান চালিয়েছে। এই বিপরীতমুখী বর্ণনা শয়তানদের কথিত তথ্য সংগ্রহ ও যোগাযোগব্যবস্থার গুরুতর অসংগতি প্রকাশ করে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ইবলিসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, সে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায়। মুহাম্মদকে ইসলামের শেষ রাসুল হিসেবে গ্রহণ করলে তাঁর প্রচারিত ধর্মীয় আহ্বান ইবলিসের ওই উদ্দেশ্যের প্রধান প্রতিপক্ষ। তাঁর মাধ্যমে কোরআন অবতীর্ণ হচ্ছে, মানুষের ধর্মীয় আচরণ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মানুষকে শয়তানের অনুসরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ফলে মুহাম্মদের আবির্ভাব ইবলিসের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি ঘটনা। সাধারণ মানুষের গোপন প্রবৃত্তি ও ভবিষ্যৎ ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে শয়তানদের এত ক্ষমতা থাকলেও তাদের নিজেদের ঘোষিত উদ্দেশ্যের প্রধান প্রতিপক্ষ সম্পর্কে পূর্বপ্রস্তুতি কিংবা কার্যকর তথ্যপ্রাপ্তির কোনো বিবরণ তিরমিজির ঘটনাক্রমে পাওয়া যায় না। সেখানে ইবলিস আসমানে বাধার সংবাদ পেয়ে পৃথিবীতে নতুন ঘটনা ঘটেছে বলে অনুমান করছে, তারপর অনুসন্ধান চালিয়ে মুহাম্মদের অবস্থান জানতে পারছে।

অর্থাৎ ইসলামি বর্ণনায় শয়তানরা মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে, ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে ভবিষ্যতের সংবাদ চুরি করতে পারে এবং সেই সংবাদ গণকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে; কিন্তু মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ জানতে তাদের নেতাকে নতুন অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। এই ঘটনাগুলো একত্রে এমন একটি অতিপ্রাকৃত তথ্যব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যার ক্ষমতা প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো অত্যন্ত বিস্তৃত, আবার কখনো আশ্চর্যজনকভাবে সীমিত। এত বিস্তৃত সংবাদ সংগ্রহের ক্ষমতার দাবি এবং মুহাম্মদের নবুয়তের সময় ইবলিসের এই অজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। ইসলামি কাহিনিতে শয়তানদের ক্ষমতা কখনো ভবিষ্যতের সংবাদ সংগ্রহ পর্যন্ত বিস্তৃত, আবার নিজেদের প্রধান ধর্মীয় প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সেই সংবাদব্যবস্থাই ব্যর্থ।


নবুয়তের পর আসমানে নতুন প্রহরা ও অগ্নিশিখা: উল্কাপাতের বাস্তবতা এবং হাদিসের অসংগতি

ইবলিসের মুহাম্মদের নবুয়ত সম্পর্কে সংবাদ লাভের ঘটনাটির সঙ্গে আসমানে একটি বিশেষ পরিবর্তনের দাবি যুক্ত রয়েছে। সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ নবুয়তপ্রাপ্ত হওয়ার পর জিনেরা আসমানে নিজেদের পূর্ববর্তী সংবাদ সংগ্রহের স্থানগুলোতে বাধার সম্মুখীন হয় এবং তাদের দিকে নক্ষত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আরবি মূল পাঠে উল্লেখ রয়েছে, এর আগে তাদের দিকে এভাবে নক্ষত্র নিক্ষেপ করা হতো না। ফলে জিনেরা পরিবর্তনটিকে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করে এবং ইবলিসকে জানায়। ইবলিস আসমানের এই পরিবর্তনের সঙ্গে পৃথিবীতে নতুন কোনো ঘটনা ঘটার সম্পর্ক অনুমান করে। অর্থাৎ মুহাম্মদের নবুয়তের খবর অনুসন্ধানের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে আসমানে নতুন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। [15]

فَلَمَّا بُعِثَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُنِعُوا مَقَاعِدَهُمْ فَذَكَرُوا ذَلِكَ لإِبْلِيسَ وَلَمْ تَكُنِ النُّجُومُ يُرْمَى بِهَا قَبْلَ ذَلِكَ فَقَالَ لَهُمْ إِبْلِيسُ مَا هَذَا إِلاَّ مِنْ أَمْرٍ قَدْ حَدَثَ فِي الأَرْضِ فَبَعَثَ جُنُودَهُ فَوَجَدُوا رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَائِمًا يُصَلِّي بَيْنَ جَبَلَيْنِ

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার পর জিনদের আসমানের পূর্ববর্তী অবস্থানগুলোতে যেতে বাধা দেওয়া হলো। তারা বিষয়টি ইবলিসকে জানাল। এর আগে তাদের দিকে এভাবে নক্ষত্র নিক্ষেপ করা হতো না। ইবলিস বলল, নিশ্চয়ই পৃথিবীতে নতুন কোনো ঘটনা ঘটেছে। এরপর সে নিজের বাহিনী পাঠাল এবং তারা মুহাম্মদকে দুই পাহাড়ের মাঝখানে নামাজরত অবস্থায় দেখতে পেল।

কোরআনের সূরা আল-জিন্নের ৮–৯ নম্বর আয়াতেও আসমানের সংবাদ সংগ্রহের স্থানগুলোতে নতুন প্রহরা এবং অগ্নিশিখার উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। সেখানে জিনেরা নিজেদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য তুলে ধরে বলেছে, আগে তারা আসমানে সংবাদ শোনার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে বসত; এখন কেউ সেখানে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করলে তার জন্য অগ্নিশিখা অপেক্ষা করে। এই বর্ণনায় আসমানের প্রহরাব্যবস্থাকে জিনদের সংবাদ সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সূরা আল-মুলকের ৫ নম্বর আয়াতে নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপ দিয়ে সুশোভিত করা এবং সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপযোগ্য বস্তু হিসেবে ব্যবহারের ঘোষণা রয়েছে। অর্থাৎ শয়তানদের আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহ বন্ধ করার ধারণার সঙ্গে দৃশ্যমান আকাশের আলোকোজ্জ্বল বস্তু ও অগ্নিশিখাকে যুক্ত করা হয়েছে। [16]

وَأَنَّا لَمَسْنَا السَّمَاءَ فَوَجَدْنَاهَا مُلِئَتْ حَرَسًا شَدِيدًا وَشُهُبًا ۝ وَأَنَّا كُنَّا نَقْعُدُ مِنْهَا مَقَاعِدَ لِلسَّمْعِ فَمَنْ يَسْتَمِعِ الْآنَ يَجِدْ لَهُ شِهَابًا رَصَدًا

বাংলা অনুবাদ: আমরা আসমানের সন্ধান নিতে গিয়ে দেখলাম, তা কঠোর প্রহরী ও অগ্নিশিখায় পূর্ণ। আগে আমরা সেখানে সংবাদ শোনার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে বসতাম। কিন্তু এখন কেউ সেখানে আড়ি পাততে গেলে তার জন্য একটি অগ্নিশিখা অপেক্ষা করতে দেখতে পায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সমস্যা রয়েছে। তিরমিজির বর্ণনায় মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির পর জিনদের দিকে নক্ষত্র নিক্ষেপের নতুন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সহিহ মুসলিমের ২২২৯ক নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ নিজেই ইসলাম-পূর্ব যুগে উল্কাপাত দেখা সম্পর্কে সাহাবিদের প্রশ্ন করেছেন। সেখানে একটি উজ্জ্বল উল্কাপাতের ঘটনা ঘটে এবং মুহাম্মদ উপস্থিত ব্যক্তিদের জিজ্ঞেস করেন, জাহেলি যুগে তাঁরা এ ধরনের ঘটনা দেখলে কী বলতেন। তাঁরা জানান, এমন ঘটনা ঘটলে তাঁরা মনে করতেন, সেই রাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্ম হয়েছে অথবা মৃত্যু ঘটেছে। মুহাম্মদ এই ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, উল্কা কোনো মানুষের জন্ম বা মৃত্যুর কারণে নিক্ষিপ্ত হয় না। এরপর তিনি ফেরেশতাদের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশসংক্রান্ত সংবাদ আদানপ্রদান এবং জিনদের সেই সংবাদ চুরি করার বর্ণনা দেন। এই হাদিস থেকে পরিষ্কার, মুহাম্মদের নবুয়তের আগে উল্কাপাতের ঘটনা মানুষের কাছে পরিচিত ছিল এবং তা নিয়ে সামাজিক বিশ্বাসও প্রচলিত ছিল। [17]

أَنَّهُمْ بَيْنَمَا هُمْ جُلُوسٌ لَيْلَةً مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رُمِيَ بِنَجْمٍ فَاسْتَنَارَ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «مَاذَا كُنْتُمْ تَقُولُونَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ إِذَا رُمِيَ بِمِثْلِ هَذَا» قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ كُنَّا نَقُولُ وُلِدَ اللَّيْلَةَ رَجُلٌ عَظِيمٌ وَمَاتَ رَجُلٌ عَظِيمٌ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «فَإِنَّهَا لاَ يُرْمَى بِهَا لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ»

বাংলা অনুবাদ: এক রাতে তাঁরা মুহাম্মদের সঙ্গে বসে ছিলেন। তখন একটি উজ্জ্বল উল্কাপাতের ঘটনা ঘটল। মুহাম্মদ তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, জাহেলি যুগে তোমরা এ ধরনের নক্ষত্র নিক্ষেপের ঘটনা দেখলে কী বলতে? তাঁরা বললেন, আমরা মনে করতাম, সেই রাতে কোনো মহান ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন কিংবা কোনো মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন। মুহাম্মদ বললেন, এগুলো কোনো ব্যক্তির মৃত্যু কিংবা জন্মের কারণে নিক্ষিপ্ত হয় না।

সহিহ মুসলিমে স্পষ্টভাবে ইসলাম-পূর্ব যুগেও উল্কাপাত ঘটার বিবরণ রয়েছে। অথচ তিরমিজির বর্ণনায় মুহাম্মদের নবুয়তের পর জিনদের আসমানি সংবাদ সংগ্রহে বাধা এবং তাদের দিকে নক্ষত্র নিক্ষেপকে নতুন ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামি বর্ণনায় উল্কাপাতের এই অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য ভিত্তি নেই। ফলে মুহাম্মদের নবুয়তের পরেই পৃথিবীতে প্রথম উল্কাপাত শুরু হয়েছিল—এমন দাবি সহিহ মুসলিমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিরমিজির বর্ণনাকে শুধু জিনদের ওপর নতুন ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার দাবি হিসেবে গ্রহণ করলেও সেই ব্যবস্থার বাস্তব অস্তিত্ব, আসমানে জিনদের অবস্থান এবং নিক্ষিপ্ত অগ্নিশিখার সঙ্গে জিনদের কার্যকলাপের সম্পর্ক স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। একই দৃশ্যমান প্রাকৃতিক ঘটনাকে অতিপ্রাকৃত সংবাদ চুরি প্রতিরোধের অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করার জন্য কেবল ধর্মীয় বর্ণনা যথেষ্ট নয়।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে, উল্কা হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উচ্চগতিতে প্রবেশ করা ক্ষুদ্র মহাজাগতিক বস্তু দ্বারা সৃষ্ট আলোকোজ্জ্বল ঘটনা। মহাকাশে থাকা অবস্থায় এসব বস্তুকে উল্কাপিণ্ডীয় বস্তু বলা হয়; পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে উত্তপ্ত হয়ে উজ্জ্বল রেখা তৈরি করলে তাকে উল্কা বলা হয়। এই বস্তুগুলো গ্রহাণু, ধূমকেতু কিংবা অন্যান্য মহাজাগতিক উৎস থেকে আসতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবী ধূমকেতুর রেখে যাওয়া ধূলিকণার প্রবাহ অতিক্রম করলে উল্কাবৃষ্টির ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনার গতিপথ, গতি, আলোকপ্রভাব এবং উপাদান পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করা সম্ভব। কিন্তু উল্কার সঙ্গে আসমানে আড়ি পাততে যাওয়া জিনের অবস্থান কিংবা তাকে আঘাত করার কোনো পর্যবেক্ষণযোগ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জিনদের ওপর অগ্নিশিখা নিক্ষেপকে উল্কাপাতের বাস্তব বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে গ্রহণ করার ভিত্তি নেই। [18]

When meteoroids enter Earth’s atmosphere (or that of another planet, like Mars) at high speed and burn up, the fireballs, or “shooting stars,” are called meteors.

বাংলা অনুবাদ: উল্কাপিণ্ডীয় বস্তু উচ্চগতিতে পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে জ্বলে উঠলে যে উজ্জ্বল আলোকপ্রপঞ্চ তৈরি হয়, তাকে উল্কা বলা হয়।

ইবলিসের অজ্ঞতার সমস্যার সঙ্গে এই আসমানি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দাবির সম্পর্ক সরাসরি। তিরমিজির বর্ণনায় ইবলিস মুহাম্মদের নবুয়ত সম্পর্কে কোনো পূর্বসংবাদ অনুসরণ করে অনুসন্ধান শুরু করেনি। বরং তার অধীনস্থ জিনেরা আসমানে নিজেদের পূর্ববর্তী কার্যক্রম চালাতে না পারার কথা জানালে সে পৃথিবীতে নতুন কিছু ঘটেছে বলে অনুমান করেছে। অর্থাৎ নিজের বাহিনীর কাজের ক্ষেত্রে আকস্মিক প্রতিবন্ধকতাই তার অনুসন্ধানের সূচনা করেছে। এখানে শয়তানদের আগে থেকে আসমানের সংবাদ সংগ্রহের ক্ষমতা ছিল, পৃথিবীতে তাদের বিস্তৃত কার্যক্রম ছিল এবং মানুষের জীবনে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার কথাও অন্য ইসলামি উৎসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এই সব ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদের নেতার কাছে মুহাম্মদের নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কার্যকর সংবাদ পৌঁছানোর জন্য প্রথমে আসমানের সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা ব্যাহত হতে হয়েছে।

একদিকে শয়তানদের এমন একটি বাহিনী হিসেবে ইসলামি বিশ্বাসে বর্ণনা করা হয়েছে, যারা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করে, ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করে এবং সেই সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে তাদের নেতাকে মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ বুঝতে বাহিনী পাঠিয়ে নতুন অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। এই পরস্পরসম্পর্কিত বর্ণনাগুলো শয়তানদের কথিত ক্ষমতা, সংবাদপ্রবাহ এবং ইবলিসের অজ্ঞতার মধ্যে মৌলিক অসামঞ্জস্য প্রকাশ করে। আসমানে জিনদের প্রবেশ, সংবাদ চুরি, অগ্নিশিখা নিক্ষেপ এবং ইবলিসের অনুসন্ধান—এসব ঘটনার বাস্তব অস্তিত্বেরও কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। ফলে কাহিনিগুলো একদিকে নিজেদের মধ্যে ব্যাখ্যাগত সমস্যা তৈরি করে, অন্যদিকে বাস্তব জগতের ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয় প্রমাণ থেকেও বঞ্চিত থাকে।


পূর্ববর্তী নবীরাও মুহাম্মদের আগমনের সংবাদ জানতেন: ইবলিসের কাছে সেই সংবাদ পৌঁছায়নি কেন?

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদের নবুয়তকে কোনো আকস্মিক বা পূর্বপরিকল্পনাহীন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং কোরআনে দাবি করা হয়েছে, তাঁর আগমনের সংবাদ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোতেও সংরক্ষিত ছিল এবং পূর্ববর্তী নবীরা তাঁর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এই ধারণা অনুযায়ী মুহাম্মদের আবির্ভাব পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি ধর্মীয় ঘটনা, যার সংবাদ তাঁর জন্মের বহু শতাব্দী আগেই মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। কোরআনের সূরা আস-সাফের ৬ নম্বর আয়াতে সরাসরি দাবি করা হয়েছে, ঈসা ইসরায়েলিদের কাছে তাঁর পরে আগত একজন রাসুলের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, যার নাম আহমদ। ইসলামি ব্যাখ্যায় এই আহমদকে মুহাম্মদ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ফলে কোরআনের নিজস্ব বর্ণনায় মুহাম্মদের আগমন সম্পর্কে সংবাদ তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির অনেক আগে থেকেই প্রচারিত হয়েছিল। অথচ সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসে ইবলিস মুহাম্মদের নবুয়তের পর আসমানে জিনদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণ জানতে নতুন করে অনুসন্ধান চালায়। এই দুটি বর্ণনা একত্রে বিবেচনা করলে ইবলিসের তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা এবং তাঁর বাহিনীর কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। [19]

وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ

বাংলা অনুবাদ: স্মরণ করো, যখন মরিয়মপুত্র ঈসা বলেছিলেন, হে ইসরায়েলি বংশধরেরা, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল। আমার আগে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা নিশ্চিত করছি এবং আমার পরে একজন রাসুল আসবেন, যাঁর নাম আহমদ—তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিচ্ছি। অতঃপর তিনি যখন তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ এলেন, তারা বলল, এটি স্পষ্ট জাদু।

আয়াতটির বক্তব্য অনুসারে, মুহাম্মদের আগমন সম্পর্কে সংবাদ শুধু তাঁর মা আমিনার গর্ভাবস্থার অলৌকিক অভিজ্ঞতা কিংবা শৈশবে কোনো সন্ন্যাসীর ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঈসার মতো একজন পূর্ববর্তী নবীর বক্তব্যেও তাঁর আগমনের সংবাদ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ঈসার মুখে মুহাম্মদের আগমনের এই ভবিষ্যদ্বাণীর স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। অথচ কোরআনের দাবি অনুযায়ী মুহাম্মদের আবির্ভাবের সংবাদ তাঁর জন্মের বহু শতাব্দী আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। এত প্রাচীন পূর্বঘোষণা থাকার পরও ইবলিসের বিলম্বিত অনুসন্ধানের কাহিনি ইসলামি বর্ণনাগুলোর পারস্পরিক অসংগতি প্রকাশ করে। সেই বিশ্বব্যবস্থায় ইবলিস বহু প্রজন্ম ধরে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কাজে সক্রিয় রয়েছে। তার বাহিনী মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে কুমন্ত্রণা দেয়, ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কাজ করে। তাহলে একজন ভবিষ্যৎ রাসুলের আগমনের সংবাদ বহু শতাব্দী আগে প্রচারিত হওয়ার দাবি থাকলেও ইবলিসের কাছে সেই সংবাদ পৌঁছানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না কেন? ইবলিসের অনুগত শয়তানরা কি ঈসার যুগে সক্রিয় ছিল না? মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণকে প্রভাবিত করার জন্য নিয়োজিত সত্তারা কি এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় ঘোষণার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি?

কোরআনের সূরা আল-আরাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতে বিষয়টি আরও সরাসরি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উম্মি নবীর পরিচয় তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়। আয়াতটিতে ভবিষ্যৎ নবীর পরিচয়কে এমন একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের অনুসারীদের কাছে শনাক্তযোগ্য ছিল। এখানে শুধু একজন রাসুল আসবেন বলে সাধারণ কোনো ঘোষণা নেই; তাঁর পরিচয় ও কার্যক্রমের বিবরণ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোতে উপস্থিত থাকার দাবি রয়েছে। অর্থাৎ কোরআন অনুসারে মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির আগে থেকেই তাঁর পরিচয় জানার একটি ধর্মীয় ভিত্তি বিদ্যমান ছিল। কোরআন সরাসরি দাবি করেছে, মুহাম্মদের পরিচয় পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থেই লিখিত ছিল। ইসলামি বিশ্বাসের এই প্রাচীন পূর্বঘোষণার সঙ্গে তিরমিজিতে বর্ণিত ইবলিসের বিলম্বিত অনুসন্ধানের কাহিনি অসংগতিপূর্ণ। [20]

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

বাংলা অনুবাদ: যারা সেই রাসুল, উম্মি নবীর অনুসরণ করে, যার বিবরণ তারা নিজেদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়, তিনি তাদের সৎকাজের নির্দেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, উত্তম বিষয়গুলো তাদের জন্য বৈধ এবং অপবিত্র বিষয়গুলো অবৈধ ঘোষণা করেন। তিনি তাদের বোঝা ও তাদের ওপর আরোপিত বন্ধন দূর করেন। অতএব যারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাঁকে সম্মান ও সাহায্য করে এবং তাঁর সঙ্গে অবতীর্ণ আলোর অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।

এই বক্তব্যের তাৎপর্য ইবলিসের কার্যক্রমের সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ইবলিসের প্রধান কাজ মানুষকে আল্লাহর নির্দেশ থেকে বিচ্যুত করা। পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের অনুসারীরাও তার এই কার্যক্রমের বাইরে ছিলেন—এমন কোনো বক্তব্য কোরআনে নেই। ফলে ইবলিসের কথিত প্রভাব কেবল মুহাম্মদের সমসাময়িক আরবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; মানবজাতির ধর্মীয় ইতিহাসজুড়েই তার শত্রুতা বিস্তৃত বলে বর্ণিত হয়েছে। সেই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যেই যদি মুহাম্মদের আগমনের সংবাদ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে লেখা থাকে, তাহলে ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রভাবিত করার কাজে নিয়োজিত শয়তানদের কাছে এই সংবাদ অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার কারণ নেই। তারা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে, অথচ মানুষের ধর্মীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীর সংবাদ তাদের নেতৃত্বের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছেছে কি না, তার কোনো বিবরণ নেই। তিরমিজির ঘটনাক্রমে ইবলিসকে বরং নতুন ঘটনার কারণ শনাক্ত করতে বাহিনী পাঠাতে দেখা যায়।

সহিহ বুখারির ৭ নম্বর হাদিসে বাইজেন্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে আবু সুফিয়ানের কথোপকথনের বিবরণ এই আলোচনায় আরেকটি মাত্রা যুক্ত করে। সেখানে হিরাক্লিয়াস মুহাম্মদের বংশপরিচয়, সত্যবাদিতা, অনুসারীদের অবস্থা এবং ধর্মীয় নির্দেশনা সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান করেন। বর্ণনা অনুসারে, তিনি আগে থেকেই ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে একজন নবীর আগমনের কথা জানতেন; তবে সেই নবী আরবদের মধ্য থেকে আসবেন বলে ধারণা করেননি। সহিহ বুখারি অনুসারে, নবুয়ত ঘোষণার পর হিরাক্লিয়াস পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান এবং আবু সুফিয়ানের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে মুহাম্মদের পরিচয় যাচাই করেছিলেন। ইসলামি হাদিসে একজন মানুষের পক্ষেও পূর্ববর্তী ধর্মীয় জ্ঞান থেকে মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় শনাক্ত করার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অথচ ইবলিসের বিশাল শয়তানি বাহিনীর কথিত ক্ষমতার সঙ্গে তার নেতার বিলম্বিত অনুসন্ধানের কাহিনি অসংগতিপূর্ণ। সেখানে একজন শাসক ধর্মীয় তথ্য, মানুষের সাক্ষ্য এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য সামাজিক পরিস্থিতি মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। [21]

ফলে ইসলামি উৎসগুলোতে মুহাম্মদের পূর্বপরিচয় সম্পর্কে তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। কোরআনে ঈসার মাধ্যমে আহমদের আগমনের সুসংবাদ এবং তাওরাত ও ইনজিলে তাঁর পরিচয় লিখিত থাকার দাবি রয়েছে। সীরাতসাহিত্যে জন্মের আগে ও শৈশবে তাঁর বিশেষ পরিচয়ের অলৌকিক প্রকাশের বিবরণ রয়েছে। আবার হাদিসে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান ব্যবহার করে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করার ঘটনাও রয়েছে। এই দীর্ঘ ঘটনাক্রমের বিপরীতে তিরমিজির বর্ণনায় ইবলিস মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত আসমানি পরিবর্তনের কারণ জানতে নিজের বাহিনী পাঠাচ্ছে। যে রাসুলের আগমনের সংবাদ ইসলামি দাবি অনুসারে কয়েক শতাব্দী আগেই প্রচারিত হয়েছিল, যাঁর বিশেষ পরিচয় জন্মের আগে থেকেই প্রকাশিত হচ্ছিল এবং যাঁর শৈশবে শয়তানের অংশ অপসারণের মতো ঘটনা ঘটেছিল, সেই ব্যক্তির নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণ ইবলিসের কাছে এতদিন অজ্ঞাত থাকার বিষয়টি তার বাহিনীর কথিত বিস্তৃত কার্যক্রমের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। একটি ধর্মীয় কাহিনিতে পূর্বঘোষণার বিস্তার যত ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়, একই কাহিনিবিশ্বের সংগঠিত প্রতিপক্ষের বিলম্বিত তথ্যপ্রাপ্তি তত বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।


আদমের বংশধরকে পথভ্রষ্ট করার শপথ: ইবলিস নিজের প্রধান প্রতিপক্ষ সম্পর্কে এতদিন উদাসীন ছিল কেন?

ইবলিসের অজ্ঞতার প্রশ্নটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন কোরআনে বর্ণিত তার নিজের উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারের সঙ্গে মুহাম্মদের নবুয়তের ঘটনাকে তুলনা করা হয়। সূরা আল-হিজরের ৩৯–৪০ নম্বর আয়াতে ইবলিস ঘোষণা করেছে, সে পৃথিবীতে মানুষের কাছে মন্দ কাজকে আকর্ষণীয় করে তুলবে এবং আল্লাহর নির্বাচিত বান্দাদের ছাড়া সবাইকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবে। এখানে ইবলিসের কার্যক্রম কোনো নির্দিষ্ট জাতি, সময় কিংবা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ঘোষিত লক্ষ্য সমগ্র মানবজাতি। এই শপথ অনুসারে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক আচরণ এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার প্রশ্নে ইবলিসের একটি স্থায়ী বিরোধী অবস্থান রয়েছে। মানুষের জীবনে মন্দকে আকর্ষণীয় করে তোলা তার উদ্দেশ্যের কেন্দ্রীয় অংশ। ফলে মুহাম্মদের মতো একজন রাসুলের আবির্ভাব ইবলিসের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদ মানুষকে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করতে এবং শয়তানের প্ররোচনা প্রত্যাখ্যান করতে আহ্বান করেছেন। তাঁর নবুয়ত ইবলিসের ঘোষিত উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ঘটনা। [22]

قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ۝ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ

বাংলা অনুবাদ: ইবলিস বলল, হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছ বলে আমি পৃথিবীতে তাদের কাছে মন্দ কাজকে আকর্ষণীয় করে তুলব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব, তবে তাদের মধ্য থেকে তোমার নির্বাচিত বান্দারা ছাড়া।

এই শপথের সঙ্গে মুহাম্মদের শৈশবে জিবরাঈলের বক্ষবিদারণের ঘটনাটিকে যুক্ত করলে একটি বিশেষ প্রশ্ন তৈরি হয়। সহিহ মুসলিম ১৬২গ অনুযায়ী শিশু মুহাম্মদের হৃদপিণ্ড থেকে জিবরাঈল শয়তানের অংশ অপসারণ করেছিলেন। অন্যদিকে সহিহ মুসলিম ২৮১৪ক এবং ২৮১৫ অনুসারে প্রত্যেক মানুষের মতো মুহাম্মদের সঙ্গেও একজন শয়তানি সঙ্গী ছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সেই সঙ্গীর বিরুদ্ধে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন। অর্থাৎ ইসলামি বর্ণনায় মুহাম্মদের ক্ষেত্রে শয়তানের প্রভাব প্রতিরোধের একাধিক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা পাওয়া যায়। ইবলিসের ঘোষিত উদ্দেশ্য মানুষকে পথভ্রষ্ট করা হলে তার বাহিনীর কার্যক্রমে এমন একজন ব্যক্তির অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কথা, যাঁর ওপর শয়তানের স্বাভাবিক প্রভাব কার্যকর থাকছে না বলে দাবি করা হয়েছে। এই ব্যতিক্রমী অবস্থার কারণ অনুসন্ধান কিংবা এর সঙ্গে ব্যক্তিটির ভবিষ্যৎ ভূমিকার সম্পর্ক শনাক্ত করার বিষয়টি ইবলিসের ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গেই যুক্ত। কিন্তু ইসলামি বর্ণনায় মুহাম্মদের শৈশবে এসব ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর ইবলিস বা তার বাহিনীর কোনো প্রতিক্রিয়ার বিবরণ পাওয়া যায় না।

সূরা আল-ইসরার ৬২ নম্বর আয়াতে ইবলিস আদমের বংশধরদের অধিকাংশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার সংকল্প প্রকাশ করেছে। পরবর্তী ৬৪ নম্বর আয়াতে তাকে নিজের কণ্ঠস্বর দিয়ে মানুষকে প্ররোচিত করা, অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো এবং তাদের সম্পদ ও সন্তানদের বিষয়ে অংশীদার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বর্ণনায় ইবলিসের কার্যক্রমকে একটি বিস্তৃত সংঘাতের ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর, বাহিনী, অনুসারী এবং মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের ক্ষমতার কথা রয়েছে। হাদিসে ইবলিসের সিংহাসন ও অধীনস্থ বাহিনী পাঠানোর বর্ণনার সঙ্গে এই আয়াতগুলোর সম্পর্ক সরাসরি। ইসলামি অতিপ্রাকৃত বিশ্বব্যবস্থায় ইবলিস মানুষের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের নেতা হিসেবে উপস্থিত। [23]

قَالَ أَرَأَيْتَكَ هَذَا الَّذِي كَرَّمْتَ عَلَيَّ لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًا

বাংলা অনুবাদ: ইবলিস বলল, তুমি কি দেখেছ, এই ব্যক্তিকে তুমি আমার ওপর মর্যাদা দিয়েছ? তুমি যদি কিয়ামত পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দাও, তাহলে অল্প কয়েকজন ছাড়া তার বংশধরদের অবশ্যই আমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসব।

وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ وَأَجْلِبْ عَلَيْهِمْ بِخَيْلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكْهُمْ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ وَعِدْهُمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا

বাংলা অনুবাদ: তোমার কণ্ঠস্বর দিয়ে তাদের মধ্য থেকে যাকে পারো প্ররোচিত করো, তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালাও, তাদের সম্পদ ও সন্তানদের বিষয়ে অংশীদার হও এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দাও। কিন্তু শয়তান তাদের প্রতারণা ছাড়া আর কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।

আয়াতগুলোর ভাষা অনুযায়ী ইবলিসের লক্ষ্য হলো মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করা। সে মানুষকে শুধু একবার বিভ্রান্ত করে সরে যায় না; তার কার্যক্রমকে একটি চলমান ও বিস্তৃত প্ররোচনামূলক অভিযানের রূপ দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় মুহাম্মদের মতো একজন ব্যক্তির আবির্ভাব ইবলিসের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা, তা অনুমান করা কঠিন নয়। ইসলামি বিশ্বাসে মুহাম্মদ শেষ রাসুল; তাঁর ধর্মীয় প্রচারের লক্ষ্য মানুষকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে ফিরিয়ে আল্লাহর আনুগত্যে নিয়ে আসা। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও শৈশব থেকেই বিশেষ সুরক্ষার অধীনে ছিল বলে হাদিসে দাবি করা হয়েছে। ফলে ইবলিসের নিজের ঘোষিত উদ্দেশ্য এবং মুহাম্মদের ধর্মীয় ভূমিকা পরস্পরবিরোধী। এমন একজন ব্যক্তির জীবনে সংঘটিত বিশেষ ঘটনাগুলো সম্পর্কে ইবলিসের বাহিনী কোনো কার্যকর সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেনি কেন, এই প্রশ্ন সরাসরি ইবলিসের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমের বর্ণনা থেকেই তৈরি হয়।

এই অসংগতি সবচেয়ে স্পষ্ট হয় তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসের ঘটনাক্রমে। সেখানে ইবলিস নিজের ঘোষিত প্রধান প্রতিপক্ষের আবির্ভাবসংক্রান্ত পরিবর্তনের সংবাদ আগে থেকে কাজে লাগিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তার অধীনস্থ জিনেরা আসমানে পূর্ববর্তী সংবাদ সংগ্রহের স্থানে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কথা জানালে সে পৃথিবীতে নতুন কিছু ঘটেছে বলে অনুমান করে। এরপর নিজের বাহিনীকে অনুসন্ধানে পাঠায় এবং বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে মুহাম্মদের নামাজরত অবস্থার সংবাদ পাওয়ার পর ঘটনাটির কারণ শনাক্ত করে। অর্থাৎ তার অনুসন্ধান শুরু হয়েছে নিজের বাহিনীর কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার পর। অথচ ইসলামি নবিজীবনসাহিত্যে মুহাম্মদের জন্মের আগে থেকেই বিশেষ ঘোষণা, শৈশবে ফেরেশতার হস্তক্ষেপ, নবুয়তের পূর্বলক্ষণ এবং শয়তানের প্রভাবের বিরুদ্ধে সুরক্ষার কথা রয়েছে। ইবলিসের উদ্দেশ্যের সঙ্গে এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকলেও তার পক্ষ থেকে পূর্ববর্তী কোনো অনুসন্ধান বা প্রতিক্রিয়ার তথ্য ওই বর্ণনাগুলোতে পাওয়া যায় না।

আরও একটি প্রশ্ন হলো, মুহাম্মদের ক্ষেত্রে শয়তানি প্রভাবের ব্যতিক্রমী অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকলে তা কি তার সঙ্গে নিযুক্ত শয়তানি সঙ্গীর কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়নি? ইসলামি হাদিসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে শয়তানের সঙ্গীর উপস্থিতি ঘোষণা করা হয়েছে এবং মুহাম্মদের ক্ষেত্রেও সেই সঙ্গীর উপস্থিতি স্বীকার করা হয়েছে। মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহর সাহায্যে সেই সঙ্গীর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তিনি নিরাপদ ছিলেন। তাহলে তাঁর সঙ্গীর কার্যক্রমে এই বিশেষ পরিবর্তন ইবলিসের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার কাছে কোনো তাৎপর্য বহন করল না কেন? মানুষের মনে ঈর্ষা, সন্দেহ ও মন্দ চিন্তা সৃষ্টির সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক স্থাপন করা হচ্ছে, অথচ মুহাম্মদের মতো একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই প্রভাব ব্যতিক্রমীভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ঘটনাকে তার প্রধান শত্রু শনাক্ত করার সূত্র হিসেবে ব্যবহার করার কোনো বিবরণ নেই। এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদকে এমন একজন রাসুল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাঁর মাধ্যমে মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত ধর্মীয় নির্দেশনা পৌঁছেছে।

কোরআনে ইবলিসের বংশধরের কথাও উল্লেখ রয়েছে। সূরা আল-কাহফের ৫০ নম্বর আয়াতে আদমকে সিজদা করতে অস্বীকারকারী ইবলিস সম্পর্কে বলা হয়েছে, সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত এবং মানুষকে তার ও তার বংশধরদের সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। ফলে ইবলিসের কার্যক্রমের ধারণা একক ব্যক্তির প্রতারণামূলক উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তার বংশধর ও অনুসারীদের মাধ্যমে মানুষের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত বিরোধী শক্তির ধারণা তৈরি হয়েছে। সেই শক্তির সদস্যরা বিভিন্ন মানুষের জীবনে সক্রিয়, আর তাদের নেতা মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করার দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকার করেছে। এই অবস্থায় মুহাম্মদের মতো ব্যক্তির জীবন ও নবুয়তের ঘটনাকে তাদের কার্যক্রমের বাইরে থাকা সাধারণ কোনো স্থানীয় ঘটনা হিসেবে গণ্য করার ভিত্তি নেই। [24]

ইবলিসের ঘোষিত উদ্দেশ্য সমগ্র মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করা; তার বাহিনী মানুষের জীবনে সক্রিয়; শয়তানরা আসমানের সংবাদ সংগ্রহ করতে পারে; প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিন সঙ্গী থাকার কথাও হাদিসে রয়েছে। অন্যদিকে মুহাম্মদের জন্ম, শৈশব ও নবুয়তের পূর্বলক্ষণ সম্পর্কে ইসলামি উৎসে একাধিক বিশেষ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। এই দীর্ঘ ঘটনাক্রমের পরও ইবলিসকে মুহাম্মদের নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ জানতে বাহিনী পাঠাতে হয়েছে। তার ঘোষিত উদ্দেশ্য, সংগঠিত কার্যক্রম এবং তথ্য সংগ্রহের কথিত ক্ষমতার সঙ্গে এই বিলম্বিত অনুসন্ধানের একটি সুসংগত সম্পর্ক ইসলামি বর্ণনাগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মানুষের ওপর শয়তানের প্রভাবকে যত ব্যাপক ও কার্যকর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, মুহাম্মদের বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে ইবলিসের তথ্যপ্রাপ্তির এই ঘাটতি তত বেশি অসংগতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


মুহাম্মদের জন্মের দিনই ইবলিস তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা জেনেছিল: ইসলামি সীরাতের পরস্পরবিরোধী বর্ণনা

মুহাম্মদের নবুয়ত সম্পর্কে ইবলিসের অজ্ঞতার প্রশ্নে ইসলামি সীরাতসাহিত্যে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির পর আসমানে জিনদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হলে ইবলিসকে সেই পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধানে বাহিনী পাঠাতে দেখা যায়। অথচ ইসলামি ইতিহাস ও সীরাতের অন্য কয়েকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইবলিস মুহাম্মদের জন্মের দিনই তাঁর বিশেষ পরিচয় জানতে পেরেছিল এবং তাঁর আবির্ভাবে আতঙ্কিত হয়েছিল। এমনকি একটি বর্ণনায় ইবলিসকে নবজাতক মুহাম্মদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে সরাসরি তাঁর কাছে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এই বর্ণনাগুলো ইবলিসের তথ্যপ্রাপ্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তৈরি করে। এক বর্ণনায় ইবলিস নবুয়তপ্রাপ্তির পর আসমানে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণ জানতে অনুসন্ধান চালাচ্ছে, অন্য বর্ণনায় মুহাম্মদের জন্মের মুহূর্তেই সে তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে জানে এবং প্রতিরোধের চেষ্টা করে।

ইবনে কাসীর তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে মুহাম্মদের জন্মরাত্রির অলৌকিক ঘটনাবলি আলোচনা করতে গিয়ে সুহাইলির মাধ্যমে বাকী ইবনে মাখলাদের তাফসির থেকে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ইবলিস চারটি ঘটনায় আর্তচিৎকার করেছিল: অভিশপ্ত হওয়ার সময়, পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়ার সময়, মুহাম্মদের জন্মের সময় এবং সূরা আল-ফাতিহা অবতীর্ণ হওয়ার সময়। এখানে মুহাম্মদের জন্মকে সরাসরি ইবলিসের জন্য একটি বিপর্যয়কর ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইবলিস শুধু শিশুটির জন্ম সম্পর্কে জানতে পেরেছিল, এমন নয়; জন্মের ঘটনাটির বিশেষ তাৎপর্য বুঝে সে শোক ও হতাশায় চিৎকার করেছিল—বর্ণনাটির বক্তব্য এমনই। অর্থাৎ মুহাম্মদের আবির্ভাব কেন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেই ধারণাও ইবলিসের ছিল বলে এই কাহিনিতে প্রকাশ পেয়েছে। [25]

أَنَّ إِبْلِيسَ رَنَّ أَرْبَعَ رَنَّاتٍ; حِينَ لُعِنَ، وَحِينَ أُهْبِطَ، وَحِينَ وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، وَحِينَ أُنْزِلَتِ الْفَاتِحَةُ.

বাংলা অনুবাদ: ইবলিস চারবার আর্তচিৎকার করেছিল: যখন তাকে অভিশপ্ত করা হয়, যখন তাকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়, যখন মুহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন এবং যখন সূরা আল-ফাতিহা অবতীর্ণ হয়।

এর চেয়েও সরাসরি একটি বর্ণনা সংরক্ষিত রয়েছে সালিহি শামির সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ গ্রন্থে। সেখানে ইবনে আবি হাতিমের সূত্রে ইকরিমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদের জন্মের পর ইবলিস ঘোষণা করেছিল যে সেই রাতে এমন একটি শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, যে তাদের কার্যক্রম নষ্ট করে দেবে। ইবলিসের বাহিনীর সদস্যরা তখন তাকে শিশুটির কাছে গিয়ে ক্ষতি করার পরামর্শ দেয়। ইবলিস মুহাম্মদের কাছে এগিয়ে গেলে আল্লাহ জিবরাঈলকে পাঠান। জিবরাঈল ইবলিসকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দেন এবং সে আদেন অঞ্চলে গিয়ে পড়ে। এই কাহিনিতে ইবলিসের অজ্ঞতার কোনো চিত্র নেই। বরং মুহাম্মদের জন্ম, তাঁর ভবিষ্যৎ ধর্মীয় ভূমিকা, ইবলিসের নিজের স্বার্থের ওপর সেই ভূমিকার সম্ভাব্য প্রভাব এবং শিশুটিকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা—সবকিছু একই ঘটনাক্রমের মধ্যে উপস্থিত। [26]

قَالَ إِبْلِيسُ لَمَّا وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: لَقَدْ وُلِدَ اللَّيْلَةَ وَلَدٌ يُفْسِدُ عَلَيْنَا أَمْرَنَا

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদের জন্মের সময় ইবলিস বলেছিল, নিশ্চয়ই আজ রাতে এমন একটি শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, যে আমাদের সমস্ত কার্যক্রম নষ্ট করে দেবে।

এই বর্ণনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে ইবলিস শুধু মুহাম্মদের জন্মের সংবাদ পেয়েছে বলে দাবি করা হয়নি। সে শিশুটির ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিজের উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে যাবে বলেও বুঝতে পেরেছিল। কোরআনে ইবলিস সমগ্র মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার শপথ করেছে। সেই উদ্দেশ্যের পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদের জন্মকে সে নিজের কার্যক্রমের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে শনাক্ত করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নিতে গিয়েছে। জিবরাঈল এসে তাকে বাধা দিয়েছেন বলেও বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি সীরাতের এই ঘটনাক্রম অনুসারে, মুহাম্মদ ও ইবলিসের মধ্যকার সংঘাত তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির বহু আগেই শুরু হয়েছিল। এই তথ্যের সঙ্গে তিরমিজি ৩৩২৪-এর বর্ণনা তুলনা করলে প্রশ্ন তৈরি হয়, জন্মের দিনই যে শিশুকে নিজের কার্যক্রমের জন্য বিপজ্জনক বলে চিনেছিল এবং যার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল, সেই ব্যক্তির নবুয়তপ্রাপ্তির সময় ইবলিসকে নতুন ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বাহিনী পাঠাতে হলো কেন? মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে আগে থেকেই জ্ঞান থাকা এবং পরবর্তী সময়ে সেই একই ব্যক্তির নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করার বর্ণনাগুলোর মধ্যে একটি গুরুতর ব্যাখ্যাগত অসংগতি রয়েছে।

ইবলিসের আসমানে প্রবেশাধিকার সম্পর্কেও একই গ্রন্থে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। সালিহি শামি যুবাইর ইবনে বাক্কার ও ইবনে আসাকিরের সূত্রে মারুফ ইবনে খারবুযের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ইবলিস আগে সাত আসমানে প্রবেশ করতে পারত। ঈসার জন্মের পর তাকে তিনটি আসমান থেকে বাধা দেওয়া হয় এবং বাকি চারটিতে প্রবেশের সুযোগ থাকে। কিন্তু মুহাম্মদের জন্মের পর তাকে সাত আসমান থেকেই বাধা দেওয়া হয়। এই বর্ণনা অনুসারে আসমানে ইবলিসের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার ঘটনাটি মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির সময় নয়; তাঁর জন্মের সময় ঘটেছিল। অথচ তিরমিজি ৩৩২৪-এ মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির পর জিনদের আসমানে সংবাদ সংগ্রহের স্থানগুলোতে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ আসমানে শয়তানদের চলাচল বন্ধ হওয়ার সময় সম্পর্কেই ইসলামি বর্ণনায় পৃথক ঘটনাক্রম পাওয়া যাচ্ছে। [27]

ইবলিসের এই জন্মকালীন জ্ঞান এবং পরবর্তী অনুসন্ধানের কাহিনির মধ্যে অসংগতি এতটাই স্পষ্ট যে ইসলামি সীরাতকার আলি আল-হালাবি তাঁর আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ গ্রন্থে সমস্যাটি সরাসরি আলোচনা করেছেন। তিনি ইকরিমার বর্ণনা উল্লেখ করে বলেছেন, মুহাম্মদের জন্মের সময় নক্ষত্র নিক্ষেপের ঘটনা ইবলিসের কাছে তাঁর আবির্ভাবের লক্ষণ হয়ে উঠেছিল। এরপর তিনি অন্য বর্ণনার সঙ্গে এর সমস্যার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে শয়তানরা আসমানে সংবাদ সংগ্রহের স্থান থেকে বিতাড়িত হয়ে ইবলিসের কাছে অভিযোগ করে এবং ইবলিস নতুন ঘটনার অনুসন্ধানে বাহিনী পাঠায়। আল-হালাবির আলোচনায় জন্মের সময় এবং নবুয়তপ্রাপ্তির সময়—উভয় ধরনের বর্ণনার উপস্থিতি স্বীকৃত হয়েছে। তিনি বর্ণনাকারীদের মধ্যে ঘটনার সময় নিয়ে বিভ্রান্তি ঘটে থাকতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন। ফলে এই অসংগতি আধুনিক সমালোচকের তৈরি কোনো কাল্পনিক আপত্তি নয়; ইসলামি সীরাতসাহিত্যের মধ্যেই ঘটনাগুলোর সময়ক্রম নিয়ে সমস্যা শনাক্ত করা হয়েছে। [28]

আরও একটি পার্থক্য পাওয়া যায় মুজাহিদের সূত্রে সংরক্ষিত ইবলিসের চারবার আর্তচিৎকারের বর্ণনায়। ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত সংস্করণে মুহাম্মদের জন্মের সময় ইবলিসের আর্তচিৎকারের কথা থাকলেও মুজাহিদের একটি বর্ণনায় মুহাম্মদ নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার সময় আর্তচিৎকারের কথা রয়েছে। ইসলামQA-এর ৩৮৩১৬৮ নম্বর আলোচনায় আবু নুয়াইম ও আবু শাইখের সংরক্ষিত এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, বর্ণনাটি মুজাহিদ পর্যন্ত সংরক্ষিত হলেও মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে এর নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনাসূত্র প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে ইবলিসের আর্তচিৎকারের সময় নিয়েও পৃথক বর্ণনার উপস্থিতি রয়েছে: কোথাও মুহাম্মদের জন্ম, কোথাও তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তি। [29]

رَنَّ إِبْلِيسُ أَرْبَعًا حِينَ لُعِنَ، وَحِينَ أُهْبِطَ، وَحِينَ بُعِثَ مُحَمَّدٌ

বাংলা অনুবাদ: ইবলিস চারবার আর্তচিৎকার করেছিল: যখন তাকে অভিশপ্ত করা হয়, যখন তাকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং যখন মুহাম্মদ নবী হিসেবে প্রেরিত হন।

ইবলিসের জন্মকালীন আর্তচিৎকার, নবজাতক মুহাম্মদের ক্ষতি করার চেষ্টা এবং আসমানে প্রবেশাধিকার হারানোর ঘটনাগুলো বিভিন্ন ইসলামি সীরাত ও ব্যাখ্যাগ্রন্থে সংরক্ষিত। এসব অলৌকিক ঘটনার স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। একই সঙ্গে ইসলামি গ্রন্থগুলোতে ইবলিসের পূর্বজ্ঞান, মুহাম্মদের জন্ম এবং নবুয়তের সময় আসমানে প্রবেশাধিকার বন্ধ হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে পরস্পর অসংগতিপূর্ণ বর্ণনা প্রচারিত হয়েছে। ইবনে কাসীর, সালিহি শামি, আল-হালাবি ও অন্যান্য সংকলকের গ্রন্থে এই ঘটনাগুলো পাওয়া যায়। তাই ইসলামি নবিজীবনসাহিত্যে ইবলিস সম্পর্কে একটিমাত্র অভিন্ন ঘটনাক্রম রয়েছে বলে দাবি করা যায় না। একই ব্যক্তির জন্ম ও নবুয়তসংক্রান্ত ঘটনাগুলো নিয়ে ইবলিস কখন কী জেনেছিল, কখন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল এবং কখন আসমানে তার প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়েছিল—এসব বিষয়ে ভিন্ন বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে।

ইসলামি সীরাতের একাধিক বর্ণনা অনুসারে, ইবলিস মুহাম্মদের জন্মের দিনই তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে জানত এবং তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অথচ তিরমিজি ৩৩২৪-এর বর্ণনায় মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির পর আসমানে সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হলে ইবলিসকে সেই পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করতে দেখা যায়। দুটি বর্ণনায় ইবলিসের পূর্বজ্ঞান এবং তার অনুসন্ধানের সময়ক্রম গুরুতরভাবে অসংগতিপূর্ণ। যদি ইবলিস জন্মের দিনই মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় বুঝতে পেরে থাকে, তাহলে নবুয়তের সময় নতুন পরিবর্তনের সঙ্গে সেই পূর্বপরিচয়ের সম্পর্ক শনাক্ত করতে তার এত অনুসন্ধান প্রয়োজন হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। আর যদি সে মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে আগেই না জেনে থাকে, তাহলে জন্মের সময় তার আর্তচিৎকার, শিশুটিকে নিজের কার্যক্রমের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে শনাক্ত করা এবং তাঁকে ক্ষতি করার চেষ্টার বর্ণনাগুলো কীভাবে সত্য হয়? এর সঙ্গে আসমানে প্রবেশাধিকার বন্ধ হওয়ার সময় নিয়ে পৃথক বর্ণনা যুক্ত হলে ঘটনাগুলোর কালানুক্রমিক অসংগতি আরও স্পষ্ট হয়। ধর্মীয় সাহিত্য একই অতিপ্রাকৃত সত্তার কার্যকলাপ সম্পর্কে একাধিক কাহিনি সংরক্ষণ করেছে, কিন্তু সেই কাহিনিগুলোর পারস্পরিক সামঞ্জস্য কিংবা বাস্তব ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠার স্বাধীন প্রমাণ প্রদান করেনি।


নবুয়তের আগেই শয়তানরা গণকদের মুহাম্মদের সংবাদ দিত: ইবলিস তখন কী জানত?

মুহাম্মদের নবুয়তের আগেই শয়তানরা তাঁর আগমনের সংবাদ সংগ্রহ করে আরব গণকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল বলে ইসলামি সীরাতসাহিত্যে বর্ণিত হয়েছে। আলি আল-হালাবির আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সূত্রে এই সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই ইহুদি ধর্মীয় পণ্ডিত, খ্রিস্টান সন্ন্যাসী এবং আরব গণকেরা তাঁর আবির্ভাব সম্পর্কে আলোচনা করতেন। ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মীয় ব্যক্তিরা নিজেদের ধর্মগ্রন্থ থেকে তাঁর পরিচয় ও আবির্ভাবের সময় সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আরব গণকদের কাছে মুহাম্মদের আগমনের সংবাদ পৌঁছানোর উৎস হিসেবে সরাসরি শয়তানদের উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি সীরাতের এই বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই শয়তানরা তাঁর আগমনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল। [30]

وَأَمَّا الْكُهَّانُ مِنَ الْعَرَبِ، فَجَاءَهُمْ بِهِ الشَّيَاطِينُ فِيمَا تَسْتَرِقُ بِهِ مِنَ السَّمْعِ

বাংলা অনুবাদ: আর আরবদের গণকদের কাছে তাঁর সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিল শয়তানরা, আসমানে আড়ি পেতে যেসব সংবাদ তারা সংগ্রহ করত, সেগুলোর মাধ্যমে।

এই বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শয়তানরা শুধু আসমানে কী ঘটছে, তা শোনার চেষ্টা করছে—এমন সাধারণ বিবরণ নেই। মুহাম্মদের আবির্ভাব সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করে সেই সংবাদ আরব গণকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথাই সরাসরি বলা হয়েছে। অর্থাৎ শয়তানরা মুহাম্মদসংক্রান্ত পূর্বসংবাদ সম্পর্কে জানত এবং মানুষের কাছে তা প্রচার করত—এমন বর্ণনা ইসলামি সীরাতেই সংরক্ষিত রয়েছে। অথচ সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসে নবুয়তপ্রাপ্তির পর আসমানে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলে জিনেরা ইবলিসকে সেই পরিবর্তনের কথা জানায়। ইবলিস পৃথিবীতে নতুন কিছু ঘটেছে বলে অনুমান করে এবং কারণ অনুসন্ধানের জন্য বাহিনী পাঠায়। এখন প্রশ্ন হলো, যে শয়তানরা নবুয়তের আগেই মুহাম্মদের আবির্ভাবের সংবাদ আরব গণকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল, তারা সেই সংবাদ নিজেদের নেতার কাছে পৌঁছে দেয়নি কেন? মানুষের গণকেরা শয়তানদের কাছ থেকে মুহাম্মদের আগমনের পূর্বসংবাদ পেয়েছিল বলে ইসলামি সীরাতে বর্ণিত। অথচ তিরমিজির হাদিসে সেই শয়তানদের নেতাকেই নবুয়তের পর নতুন ঘটনার কারণ জানতে অনুসন্ধান চালাতে হচ্ছে। একই সংবাদব্যবস্থার এই বিপরীতমুখী কার্যকারিতা ইসলামি কাহিনিগুলোর অভ্যন্তরীণ অসংগতিকে আরও স্পষ্ট করে।

আল-হালাবি বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। ইবনে ইসহাকের বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর তিনি উল্লেখ করেছেন, এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে মুহাম্মদের জন্মের আগেই ফেরেশতারা আসমানে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করতেন। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, মুহাম্মদের আবির্ভাবের সংবাদ শুধু পৃথিবীর ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; আসমানের ফেরেশতাদের আলোচনাতেও সেই সংবাদ উপস্থিত ছিল। আবার ইসলামি হাদিসে বলা হয়েছে, শয়তানরা ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে পারত। ফলে মুহাম্মদের আবির্ভাব সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহের একটি নির্দিষ্ট পথ ইসলামি বর্ণনার মধ্যেই উপস্থিত রয়েছে। বিষয়টি ইবলিসের অজ্ঞতার প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ মানুষের জীবনে শয়তানদের কার্যক্রমের পাশাপাশি আসমান থেকেও মুহাম্মদের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল বলে এই কাহিনিগুলো দাবি করছে। [31]

وَهَذَا فِيهِ تَصْرِيحٌ بِأَنَّ الْمَلَائِكَةَ كَانَتْ تَذْكُرُهُ فِي السَّمَاءِ قَبْلَ وُجُودِهِ

বাংলা অনুবাদ: এর মধ্যে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে যে তাঁর অস্তিত্বের আগেই ফেরেশতারা আসমানে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করতেন।

এই তথ্যের সঙ্গে সহিহ বুখারির ৩২৮৮ এবং ৭৫৬১ নম্বর হাদিসের সম্পর্ক সরাসরি। ওই হাদিসগুলোতে মুহাম্মদ বলেছেন, শয়তানরা ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে পৃথিবীতে সংঘটিতব্য ঘটনার সত্য সংবাদ চুরি করে গণকদের কাছে পৌঁছে দেয়। আল-হালাবির সংরক্ষিত ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এই সাধারণ সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট প্রয়োগ পাওয়া যাচ্ছে: মুহাম্মদের আগমনসংক্রান্ত সংবাদ শয়তানদের মাধ্যমে আরব গণকদের কাছে পৌঁছানো। ফলে ইসলামি বর্ণনাগুলোতে শয়তানদের তথ্য সংগ্রহের সামর্থ্য সম্পর্কে শুধু একটি বিমূর্ত দাবি নেই; মুহাম্মদের নিজের আবির্ভাবসংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিরমিজির হাদিসে ইবলিসকে নবুয়তপ্রাপ্তির পর পৃথিবীতে নতুন ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বাহিনী পাঠাতে দেখা যাচ্ছে। এই দুটি বিবরণ মিলিয়ে ইবলিসের নেতৃত্বাধীন সংবাদব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। [32] [33]

ইবলিসের পূর্বজ্ঞান সম্পর্কে জন্মকালীন সীরাতের বর্ণনাগুলো যুক্ত করলে অসংগতিটি আরও বিস্তৃত হয়। একটি বর্ণনায় মুহাম্মদের জন্মের সময় ইবলিস আর্তচিৎকার করেছে। আরেকটি বর্ণনায় সে জন্মের দিনই বুঝতে পেরেছিল যে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, যে তার কার্যক্রম নষ্ট করে দেবে। সেখানে ইবলিসকে সেই শিশুর ক্ষতি করার চেষ্টা করতেও দেখা যায়। অন্যদিকে ইবনে ইসহাকের সূত্রে আল-হালাবি এমন একটি সংবাদব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে শয়তানরাই মুহাম্মদের আগমনের খবর গণকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল। অর্থাৎ ইসলামি সীরাতসাহিত্যে ইবলিসের নিজের পূর্বজ্ঞান এবং তার বাহিনীর পূর্বসংবাদ সংগ্রহ—উভয় ধরনের বর্ণনাই রয়েছে। এই অবস্থায় তিরমিজি ৩৩২৪-এর অনুসন্ধানকে শুধু নতুন একটি ঘটনার খবর জানার সাধারণ প্রয়াস হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি ঢাকা পড়ে যায়। মুহাম্মদের আবির্ভাব সম্পর্কে এত পূর্বসংবাদ ও জন্মকালীন প্রতিক্রিয়ার কাহিনি থাকার পর নবুয়তের সময় ইবলিসের কেন আবার ঘটনার কারণ শনাক্ত করতে হলো, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

আল-হালাবি নিজেও এই ঘটনাগুলোর সময় ও পরিচয় নির্ধারণে ভিন্ন বর্ণনার কথা আলোচনা করেছেন। তাঁর গ্রন্থে এমন বর্ণনা রয়েছে, যেখানে মুহাম্মদের জন্মের সময়ই ইবলিস আসমানি পরিবর্তনের কারণ বুঝতে পেরেছিল। আবার নবুয়তপ্রাপ্তির সময় জিনদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পর অনুসন্ধানের কথাও রয়েছে। কোনো বর্ণনায় ইবলিস নিজেই বিভিন্ন অঞ্চলে অনুসন্ধান চালাচ্ছে, কোথাও বাহিনী পাঠাচ্ছে, আবার কোথাও মাটি পরীক্ষা করে ঘটনার অঞ্চল শনাক্ত করার কথা পাওয়া যায়। আল-হালাবি ঘটনাগুলোর সময় নিয়ে বর্ণনাকারীদের বিভ্রান্তির সম্ভাবনাও উল্লেখ করেছেন। তিনি কোনো কোনো বর্ণনায় ইবলিস মুহাম্মদের নির্দিষ্ট পরিচয় ও অবস্থান জানত না বলে আলোচনা করেছেন। কিন্তু এসব বিবরণ থেকে পরিষ্কার হয়, একই ঘটনার সময়, ইবলিসের পূর্বজ্ঞান এবং মুহাম্মদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ইসলামি সীরাতসাহিত্যে একটি অভিন্ন ঘটনাক্রম সংরক্ষিত হয়নি। [34]

ইবনে ইসহাকের বক্তব্য পরবর্তী সীরাতকার আল-হালাবির গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে; এটি কোনো সমসাময়িক প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নয়। ইবলিসের জন্মকালীন আর্তচিৎকার, মুহাম্মদকে ক্ষতি করার চেষ্টা কিংবা আসমানের সংবাদ চুরি করার অলৌকিক ঘটনাগুলোরও স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তার ওপর ইসলামি সীরাতের এক কাহিনিতে শয়তানরা মুহাম্মদের নবুয়তের আগেই তাঁর সংবাদ সংগ্রহ করছে, আরেক কাহিনিতে ইবলিস তাঁর জন্মের দিনই বিশেষ পরিচয় শনাক্ত করছে, অথচ তিরমিজির বর্ণনায় নবুয়তের পর সেই ইবলিসকে নতুন ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে হচ্ছে। এসব বর্ণনা একই অতিপ্রাকৃত ব্যবস্থার পরস্পর অসংগতিপূর্ণ ইতিহাস তৈরি করেছে। ইসলামি সীরাতের এক বর্ণনায় মুহাম্মদের জন্মের আগেই ফেরেশতারা তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করতেন এবং শয়তানরা সেই সংবাদ গণকদের কাছে পৌঁছে দিত। অন্য বর্ণনায় ইবলিস মুহাম্মদের জন্মের দিনই তাঁর আবির্ভাবের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। অথচ তিরমিজির হাদিসে নবুয়তের পর আসমানে বাধা সৃষ্টি হলে ইবলিসকে পৃথিবীতে নতুন ঘটনার কারণ জানতে অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। এই ঘটনাক্রমগুলো ইবলিসের তথ্যপ্রাপ্তি ও তার বাহিনীর কার্যক্ষমতা সম্পর্কে পরস্পরের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ চিত্র তৈরি করে।


উপসংহার

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ইবলিসকে মানবজাতির প্রধান শত্রু এবং একটি বিস্তৃত শয়তানি বাহিনীর নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কোরআনে সে আদমের বংশধরদের পথভ্রষ্ট করার শপথ করেছে। সহিহ মুসলিমে তার অধীনস্থ বাহিনী মানুষের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য কাজ করে বলে উল্লেখ রয়েছে। একই হাদিসগ্রন্থে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে একজন শয়তানি সঙ্গী নিযুক্ত থাকার কথাও বলা হয়েছে। সহিহ বুখারিতে শয়তানদের ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ এবং সেই সংবাদ গণকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি বিশ্বাসে শয়তানদের ক্ষমতা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের সংগঠিত কার্যক্রম, আসমানি সংবাদ সংগ্রহ এবং মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা রয়েছে।

অন্যদিকে মুহাম্মদের জীবন সম্পর্কে ইসলামি হাদিস ও সীরাতসাহিত্যে জন্মের আগে থেকেই একাধিক অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। তাঁর মা আমিনার কাছে বিশেষ সংবাদ পৌঁছানো, গর্ভাবস্থায় অলৌকিক আলো দেখা, শৈশবে জিবরাঈলের মাধ্যমে বক্ষবিদারণ, হৃদপিণ্ড থেকে শয়তানের অংশ অপসারণ, নবুয়তের আগে পাথরের সালাম এবং পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে তাঁর আগমনের সংবাদ থাকার দাবি ইসলামি সাহিত্যে সংরক্ষিত হয়েছে। এসব বর্ণনা সত্য হলে মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় ও অবস্থান তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির বহু আগেই বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশিত হয়েছিল। শুধু মানুষের কাছে নয়, সীরাতের একটি বর্ণনায় ফেরেশতাদের মধ্যেও তাঁর আবির্ভাব সম্পর্কে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইবনে ইসহাকের সূত্রে এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়, যেখানে শয়তানরাই মুহাম্মদের আগমনের সংবাদ আরব গণকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল। ফলে ইসলামি বর্ণনাগুলোর নিজস্ব ঘটনাক্রমে মুহাম্মদের বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে পূর্বসংবাদের কোনো অভাব ছিল না।

এই বিস্তৃত পূর্বসংবাদের বিপরীতে সুনান আত-তিরমিজির ৩৩২৪ নম্বর হাদিসে ইবলিসের অবস্থান বিস্ময়কর। মুহাম্মদ নবুয়তপ্রাপ্ত হওয়ার পর জিনেরা আসমানে সংবাদ সংগ্রহের পূর্ববর্তী সুযোগ হারায়। তারা ইবলিসকে বিষয়টি জানালে সে পৃথিবীতে নতুন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে অনুমান করে এবং নিজের বাহিনী পাঠিয়ে অনুসন্ধান চালায়। বাহিনীর সদস্যরা মুহাম্মদকে নামাজরত অবস্থায় দেখে ফিরে এসে সংবাদ দেয়। তখন ইবলিস আসমানে সংঘটিত পরিবর্তনের কারণ শনাক্ত করে। সহিহ বুখারির ৪৯২১ নম্বর হাদিসেও শয়তানদের পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমে অনুসন্ধান চালিয়ে মুহাম্মদের কোরআন পাঠের সংবাদ সংগ্রহের বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি হাদিসে নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণ শনাক্ত করার জন্য শয়তানদের নতুন অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়েছিল বলে বর্ণিত হয়েছে। অথচ অন্য ইসলামি বর্ণনায় মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর সংবাদ শয়তানদের কাছে পৌঁছানোর, জন্মের সময় ইবলিসের প্রতিক্রিয়া এবং তাঁর বিশেষ পরিচয় সম্পর্কে আগাম জ্ঞানের কথা রয়েছে।

এখানেই ইসলামি বর্ণনাগুলোর মৌলিক অসংগতি। যে শয়তানরা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব বিস্তার করে, ফেরেশতাদের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করে এবং মুহাম্মদের আগমনের সংবাদও গণকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বলে ইসলামি সীরাতে বর্ণিত হয়েছে, সেই শয়তানদের নেতাকে মুহাম্মদের নবুয়তপ্রাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণ জানতে নতুন করে অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। জন্মের দিনই মুহাম্মদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা বুঝে ইবলিস তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল—এমন বর্ণনাও রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু একজন অতিপ্রাকৃত সত্তার সীমিত জ্ঞান নিয়ে নয়; একই ধর্মীয় সাহিত্যে তার পূর্বজ্ঞান, কার্যক্ষমতা, সংবাদ সংগ্রহ এবং পরবর্তী অনুসন্ধানের পরস্পরবিরোধী ঘটনাক্রম নিয়ে। ইসলামি বিশ্বাসে ইবলিসের বাহিনী মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয় এবং ফেরেশতাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতের সংবাদ চুরি করে। অথচ সেই বাহিনীর নেতাকেই মুহাম্মদের নবুয়তসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণ জানতে নতুন করে অনুসন্ধান চালাতে হয়েছে। শয়তানদের কথিত ব্যাপক ক্ষমতার সঙ্গে ইবলিসের এই বিলম্বিত অনুসন্ধানের কাহিনি গুরুতরভাবে অসংগতিপূর্ণ।

ইবলিস কখন মুহাম্মদের জন্মের সংবাদ পেয়েছিল, কখন তাঁর বিশেষ পরিচয় শনাক্ত করেছিল এবং কখন আসমানে শয়তানদের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়েছিল—এসব বিষয়েও ইসলামি সীরাতসাহিত্যে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। কোথাও ঘটনাগুলো মুহাম্মদের জন্মের সঙ্গে যুক্ত, কোথাও নবুয়তপ্রাপ্তির সঙ্গে। আল-হালাবির মতো ধ্রুপদি সীরাতকারের আলোচনাতেও এই সময়গত পার্থক্য এবং বর্ণনাকারীদের বিভ্রান্তির সম্ভাবনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব বর্ণনার একাধিক সংস্করণ সংরক্ষিত থাকলেও ঘটনাগুলোর বাস্তব ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইবলিসের অস্তিত্ব, তার বাহিনীর কার্যক্রম, মানুষের সঙ্গে শয়তানি সঙ্গীর উপস্থিতি, ফেরেশতাদের সংবাদ চুরি কিংবা আসমানে জিনদের বিরুদ্ধে অগ্নিশিখা নিক্ষেপের কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণও নেই। ফলে এসব কাহিনির সমস্যা শুধু অভ্যন্তরীণ অসংগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাস্তব ঘটনা হিসেবে তাদের সত্যতা প্রতিষ্ঠার মৌলিক প্রমাণেরও অভাব রয়েছে।

ইসলামি বিশ্বাসে ইবলিসকে মানুষের অন্তরে প্রভাব বিস্তারকারী, সংগঠিত বাহিনীর পরিচালক এবং অতিপ্রাকৃত সংবাদ সংগ্রহব্যবস্থার অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ মুহাম্মদের জন্ম, শৈশব ও নবুয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাগুলোতে সেই একই ইবলিসের পূর্বজ্ঞান এবং অজ্ঞতার পরস্পর অসংগতিপূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায়। একটি ধর্মীয় কাহিনিতে ইবলিস মুহাম্মদের জন্মের দিনই তাঁর ভবিষ্যৎ গুরুত্ব বুঝতে পারে, অন্য কাহিনিতে শয়তানরা নবুয়তের আগেই তাঁর সংবাদ প্রচার করে, আবার তিরমিজির বর্ণনায় ইবলিসকে নবুয়তের পর ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে হয়। ইবলিস ও শয়তানদের কার্যকলাপ সম্পর্কে ইসলামি ধর্মসাহিত্যের এসব কাহিনি পরস্পর অসংগতিপূর্ণ; এগুলো কোনো নির্ভরযোগ্য, সুসংগত অতিপ্রাকৃত ইতিহাস নয়। ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং অলৌকিক বর্ণনার পুনরাবৃত্তি কোনো ঘটনার সত্যতার স্বাধীন প্রমাণ নয়। ইবলিসের কথিত ক্ষমতা, মুহাম্মদের অলৌকিক পূর্বলক্ষণ এবং শয়তানদের সংবাদ সংগ্রহের গল্পগুলো শেষ পর্যন্ত অপ্রমাণিত অতিপ্রাকৃত দাবির সমষ্টি, যেগুলোর পারস্পরিক অসংগতি ইসলামি কাহিনিগুলোর ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ইবনে হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৮: গর্ভাবস্থায় আমিনাকে দেওয়া সংবাদ এবং বুসরার প্রাসাদ পর্যন্ত আলো দেখার বিবরণ ↩︎
  2. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মুহাম্মদের জন্মসংক্রান্ত অলৌকিক বর্ণনার আলোচনা ↩︎
  3. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদিস ১৬২গ: শিশু মুহাম্মদের বক্ষবিদারণ এবং শয়তানের অংশ অপসারণ ↩︎
  4. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮১৪ক: প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিন সঙ্গীর উপস্থিতি ↩︎
  5. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮১৫: আয়িশার সঙ্গে শয়তান এবং প্রত্যেক মানুষের শয়তানি সঙ্গী ↩︎
  6. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮১৩ক: ইবলিসের সিংহাসন ও মানুষের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাহিনী প্রেরণ ↩︎
  7. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়িল, হাদিস ২২৭৭: নবুয়তের আগে মুহাম্মদকে পাথরের সালাম দেওয়ার বিবরণ ↩︎
  8. জামে তিরমিজি, কিতাবুল মানাকিব, হাদিস ৩৬২০: সন্ন্যাসী বাহিরার মুহাম্মদকে শনাক্ত করার বিবরণ ↩︎
  9. সুনান আত-তিরমিজি, কিতাবুত তাফসির, সূরা আল-জিন্নের ব্যাখ্যা, হাদিস ৩৩২৪ ↩︎
  10. সহিহ বুখারি, কিতাবুত তাফসির, হাদিস ৪৯২১: আসমানের সংবাদ বন্ধ হওয়ার পর শয়তানদের পৃথিবীতে অনুসন্ধান ↩︎
  11. আল কোরআন, সূরা আল-জিন্ন, আয়াত ৮–১০: আসমানে প্রহরা এবং জিনদের অজ্ঞতার বিবরণ ↩︎
  12. আল কোরআন, সূরা আল-আহকাফ, আয়াত ২৯–৩২: জিনদের কোরআন শ্রবণ ও নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছে সংবাদ প্রচার ↩︎
  13. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৮৮: ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে শয়তানদের পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ ↩︎
  14. সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৫৬১: জিনদের আসমান থেকে সত্য সংবাদ চুরি করে গণকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিবরণ ↩︎
  15. সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৩২৪: নবুয়তের পর জিনদের সংবাদ সংগ্রহে বাধা এবং নক্ষত্র নিক্ষেপ ↩︎
  16. সূরা আল-জিন্ন, আয়াত ৮–৯: আসমানে প্রহরা ও অগ্নিশিখা ↩︎
  17. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২২৯ক: ইসলাম-পূর্ব যুগে উল্কাপাত দেখা এবং তার কারণ সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য ↩︎
  18. NASA, Meteors and Meteorites: উল্কার উৎপত্তি, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ ও আলোকোজ্জ্বল হওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ↩︎
  19. আল কোরআন, সূরা আস-সাফ, আয়াত ৬: ঈসার মাধ্যমে আহমদ নামের রাসুলের আগমনের সুসংবাদ ↩︎
  20. আল কোরআন, সূরা আল-আরাফ, আয়াত ১৫৭: তাওরাত ও ইনজিলে উম্মি নবীর বিবরণ থাকার দাবি ↩︎
  21. সহিহ বুখারি, হাদিস ৭: হিরাক্লিয়াস ও আবু সুফিয়ানের কথোপকথন এবং পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে নবীর আগমনের সংবাদ ↩︎
  22. আল কোরআন, সূরা আল-হিজর, আয়াত ৩৯–৪০: মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার ইবলিসের শপথ ↩︎
  23. আল কোরআন, সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৬২–৬৫: ইবলিসের মানবজাতির বিরুদ্ধে শপথ ও বাহিনী ব্যবহারের বিবরণ ↩︎
  24. আল কোরআন, সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৫০: ইবলিসের জিন-পরিচয় ও তার বংশধরের উল্লেখ ↩︎
  25. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, তৃতীয় খণ্ড, মুহাম্মদের জন্মরাত্রির অলৌকিক ঘটনাবলি: ইবলিসের চারবার আর্তচিৎকারের বর্ণনা ↩︎
  26. সালিহি শামি, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, প্রথম খণ্ড, দশম অধ্যায়: মুহাম্মদের জন্মের সময় ইবলিসের দুঃখ, আসমানে বাধা এবং জিবরাঈলের হস্তক্ষেপ ↩︎
  27. সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, প্রথম খণ্ড, দশম অধ্যায়: ঈসা ও মুহাম্মদের জন্মের সঙ্গে ইবলিসের আসমানে প্রবেশাধিকার পরিবর্তনের বিবরণ ↩︎
  28. আলি আল-হালাবি, আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ, মুহাম্মদের জন্মের অধ্যায়: ইবলিসের জন্মকালীন জ্ঞান ও আসমানে বাধা সৃষ্টির বর্ণনার অসংগতি ↩︎
  29. ইসলামQA, প্রশ্ন ৩৮৩১৬৮: মুজাহিদের সূত্রে ইবলিসের চারবার আর্তচিৎকারের বর্ণনা ও তার সংবহন ↩︎
  30. আলি আল-হালাবি, আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ, নবুয়তের আগে ইহুদি পণ্ডিত, খ্রিস্টান সন্ন্যাসী ও আরব গণকদের কাছে মুহাম্মদের আগমনের সংবাদ পৌঁছানোর বিবরণ ↩︎
  31. আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ, একই অধ্যায়: মুহাম্মদের জন্মের আগেই ফেরেশতাদের তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করার বিবরণ ↩︎
  32. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৮৮: ফেরেশতাদের আলোচনা থেকে শয়তানদের ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ ↩︎
  33. সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৫৬১: গণকদের কাছে জিনদের সংবাদ পৌঁছে দেওয়া ↩︎
  34. আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ, একই অধ্যায়: আসমানে শয়তানদের বাধা, ইবলিসের অনুসন্ধান এবং ঘটনাক্রমের ভিন্ন বর্ণনা ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.