জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামে নারীর খৎনা: যৌনতা নিয়ন্ত্রণ, অঙ্গচ্ছেদ ও পুরুষতান্ত্রিক ধর্মীয় কর্তৃত্ব

প্রকাশিত: এপ্রিল 22, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন75 মিনিট পড়া

ভূমিকা

নারীর খৎনা বা নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ (Female Genital Mutilation—FGM) হলো চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়াই নারী ও কন্যাশিশুর বাহ্যিক যৌনাঙ্গের অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ অংশ কেটে ফেলা অথবা যৌনাঙ্গে অন্য কোনো ধরনের আঘাত সৃষ্টি করার প্রথা। এতে ভগাঙ্কুর বা ক্লিটোরিসের অংশবিশেষ অপসারণ থেকে শুরু করে যোনিমুখ সংকুচিত করার উদ্দেশ্যে যৌনাঙ্গের অংশ কেটে সেলাই করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই প্রথার শিকার প্রধানত শিশু ও কিশোরীরা, যাদের অধিকাংশের বয়স জন্মের পর থেকে পনেরো বছরের মধ্যে। যে বয়সে একটি শিশু নিজের শরীর, যৌনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত পরিণতি সম্পর্কে স্বাধীন ও অর্থবহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করেনি, সেই বয়সেই তার শরীরের একটি স্বাভাবিক ও সুস্থ অঙ্গের ওপর স্থায়ী পরিবর্তন ঘটানো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই। এটি নারী ও কন্যাশিশুর শারীরিক অখণ্ডতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং নির্যাতনমুক্ত থাকার অধিকারের লঙ্ঘন। [1]

এই প্রথার ব্যাপকতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের ২০২৪ সালের বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে জীবিত অন্তত ২৩ কোটি নারী ও কন্যাশিশু কোনো না কোনো ধরনের যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের শিকার হয়েছেন। ২০১৬ সালের হিসাবের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় তিন কোটি বেশি। আফ্রিকায় প্রায় সাড়ে চৌদ্দ কোটি, এশিয়ায় আট কোটির বেশি এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ষাট লাখ নারী ও কন্যাশিশু এই প্রথার শিকার। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের হিসাবে, শুধু ২০২৬ সালেই প্রায় ৪৫ লাখ কন্যাশিশু নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে, নারীর খৎনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা বিলুপ্তপ্রায় প্রথা নয়; বরং কোটি কোটি নারীর জীবন, স্বাস্থ্য এবং শারীরিক স্বাধীনতার ওপর প্রভাব বিস্তারকারী একটি চলমান বৈশ্বিক সমস্যা। [2] [3]

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ক্ষতি কেবল অস্ত্রোপচারের সময়কার যন্ত্রণায় সীমাবদ্ধ নয়। এর তাৎক্ষণিক পরিণতির মধ্যে প্রচণ্ড ব্যথা, রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, প্রস্রাবের সমস্যা, শক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে যৌনাঙ্গের সংবেদনশীলতা ও কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; যৌনমিলনে ব্যথা, মাসিকসংক্রান্ত জটিলতা, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, সন্তান প্রসবের সমস্যা এবং মানসিক আঘাত দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের মানব প্রজনন কর্মসূচির ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় প্রায় ত্রিশটি দেশের ৭৫টির বেশি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, FGM-এর শিকার নারীদের দীর্ঘায়িত বা বাধাগ্রস্ত প্রসব এবং প্রসবকালীন রক্তক্ষরণের ঝুঁকি দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত সমস্যার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি প্রায় ৪.৪ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই প্রমাণের বিপরীতে নারীর খৎনাকে স্বাস্থ্যসম্মত, উপকারী অথবা নারীর কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর। [4]

এই প্রথা টিকে থাকার পেছনে রয়েছে নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রণ, বিবাহের উপযুক্ততা নির্ধারণ, কুমারীত্ব সম্পর্কে সামাজিক ধারণা, পারিবারিক সম্মান এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আনুগত্যের মতো একাধিক বিষয়। যেসব সমাজে নারীর যৌন ইচ্ছাকে পুরুষের কর্তৃত্বের অধীনে রাখাকে নৈতিকতার অংশ মনে করা হয়, সেখানে নারীর যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তনকে শালীনতা, পবিত্রতা কিংবা যৌনসংযম নিশ্চিত করার পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কখনো নারীর বিবাহের পূর্বশর্ত হিসেবে, কখনো পরিবারের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করে, আবার কখনো ধর্মীয় কর্তব্যের নামে শিশুদের এই প্রথার শিকার করা হয়। এসব সামাজিক বিশ্বাসের কোনোটি সুস্থ যৌনাঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আঘাত সৃষ্টি করার চিকিৎসাগত প্রয়োজন প্রতিষ্ঠা করে না। চিকিৎসক দিয়ে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে অস্ত্রোপচার করালেও চিকিৎসাগত প্রয়োজনহীন অঙ্গচ্ছেদ স্বাস্থ্যসম্মত বা অধিকারসম্মত হয়ে যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসাকর্মীদের দ্বারা সম্পাদিত নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণেরও বিরোধিতা করে। [5] [6]

ইসলামি আইনশাস্ত্রে নারীর খৎনা কোনো অজ্ঞাত বা সম্পূর্ণ বহিরাগত বিষয় নয়। হাদিসগ্রন্থে নারীর খৎনা সম্পাদনকারিণীর উল্লেখ রয়েছে; নারীদের খৎনা করার পদ্ধতি সম্পর্কে মুহাম্মদের নির্দেশ হিসেবে বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে; আয়েশার ভ্রাতুষ্পুত্রীদের খৎনার ঘটনাও আল-আদাবুল মুফরাদে বর্ণিত হয়েছে। ধ্রুপদি ফিকহগ্রন্থে নারীর খৎনার বিধান, পদ্ধতি এবং বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রশ্নে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। শাফেয়ি মাযহাবের গুরুত্বপূর্ণ আইনজ্ঞ আল-মাওয়ারদি তাঁর আল-হাবিউল কাবির গ্রন্থে নারী ও পুরুষ উভয়ের খৎনাকে ফরজ বলেছেন। অন্যদিকে ইসলামকিউএর ৪৫৫২৮ নম্বর ফতোয়ায় পুরুষের খৎনাকে ওয়াজিব এবং নারীর খৎনাকে মুস্তাহাব বা সুপারিশকৃত আমল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইসলামওয়েবের ১২১৬৮১ নম্বর ফতোয়ায়ও নারীর খৎনাকে শরিয়তসম্মত বলে স্বীকার করে এর বাধ্যতামূলকতা নিয়ে ফকিহদের মতপার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইনগত অবস্থানগুলোতে মূল বিতর্ক নারী যৌনাঙ্গে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া হস্তক্ষেপের অধিকার নিয়ে নয়; বরং সেই হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলক, সুন্নত, নাকি সম্মানজনক আমল—তার শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে। [7] [8] [9]

নারীর খৎনার সঙ্গে যৌনতা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থেও সরাসরি স্বীকৃত হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়া গ্রন্থে নারীর খৎনার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নারীর যৌনকামনা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে খৎনা না করানো নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষাকে অতিরিক্ত বলে চিত্রিত করা হয়েছে এবং খৎনার মাত্রা এমনভাবে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, যাতে নারীর কামনা কমে, কিন্তু স্বামীর যৌনসন্তুষ্টি বাধাগ্রস্ত না হয়। ফলে এখানে নারীর খৎনা কেবল পরিচ্ছন্নতার বিধান নয়; নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা ও পুরুষের যৌন চাহিদার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। নারীর নিজের যৌন আনন্দ, তার শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা এবং নিজের যৌনাঙ্গ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এই যুক্তির নির্ধারক বিষয় নয়। [10]

নারীর যৌনাঙ্গের সুস্থ টিস্যু কেটে ফেলার মাধ্যমে তার কামনা নিয়ন্ত্রণের এই ধারণা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানবাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। নারী যৌনাঙ্গ কোনো পুরুষের যৌনসন্তুষ্টির উপযোগী করে পরিবর্তন করার বস্তু নয়। একটি মেয়ের শারীরিক অখণ্ডতা, যৌনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার মূল্য তার পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস, কোনো ফকিহের অনুমোদন কিংবা সম্ভাব্য স্বামীর পছন্দের ওপর নির্ভর করে না। ধর্মীয় বিধান হিসেবে কোনো প্রথাকে বৈধ বা প্রশংসনীয় ঘোষণা করা তার চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করে না; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পালন করাও তার ক্ষতি দূর করে না। নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু কতটুকু কাটা হবে, কত গভীর পর্যন্ত কাটা যাবে কিংবা কোন মাযহাবে কী মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কোনো চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়াই একটি শিশু বা নারীর সুস্থ যৌনাঙ্গে স্থায়ী আঘাত সৃষ্টি করার অধিকার ধর্মীয় কর্তৃত্ব বা সামাজিক প্রথা কোথা থেকে পায়।


নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের সংজ্ঞা ও চারটি প্রধান ধরন

নারীর খৎনা বলতে একটি নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রোপচার বোঝায় না। এর মধ্যে নারীর যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক ও সুস্থ অংশ কেটে ফেলা, ভগাঙ্কুর বা ক্লিটোরিসের দৃশ্যমান অংশ অপসারণ, যোনিদ্বারের চারপাশের চামড়া কেটে ফেলা, যোনিমুখ সংকুচিত করা এবং যৌনাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি করার বিভিন্ন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯৭ সালে এসব পদ্ধতিকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করে। পরবর্তীকালে প্রতিটি পদ্ধতির শারীরস্থানিক পার্থক্য নির্দিষ্ট করার জন্য আরও উপশ্রেণি যুক্ত করা হয়েছে। এই শ্রেণিবিন্যাসে অঙ্গচ্ছেদের ধরন, কোন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কতটুকু টিস্যু অপসারণ করা হচ্ছে, সেগুলো বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি পদ্ধতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়াই নারীর যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তন বা ক্ষতিগ্রস্ত করা। [11]

প্রথম ধরন—ক্লিটোরিডেক্টমি (Type I): এই পদ্ধতিতে নারীর ভগাঙ্কুর বা ক্লিটোরিসের দৃশ্যমান অগ্রভাগ, যাকে clitoral glans বলা হয়, আংশিক বা সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয় এবং/অথবা এর আবরণী চামড়া বা clitoral hood অপসারণ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পদ্ধতিকে দুটি উপশ্রেণিতে ভাগ করেছে। Type Ia-তে শুধু ক্লিটোরিসের আবরণী চামড়া অপসারণ করা হয়। Type Ib-তে ক্লিটোরিসের দৃশ্যমান অগ্রভাগের সঙ্গে আবরণী চামড়াও কেটে ফেলা হয়। ক্লিটোরিস নারীর যৌন অনুভূতি ও আনন্দের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। এর দৃশ্যমান অগ্রভাগে বিপুলসংখ্যক স্নায়ুর প্রান্ত রয়েছে এবং পুরো ক্লিটোরিসের একটি বড় অংশ শরীরের অভ্যন্তরে বিস্তৃত থাকে। ফলে দৃশ্যমান অংশ কেটে ফেলা এবং সম্পূর্ণ ক্লিটোরিস অপসারণ করা শারীরস্থানিকভাবে এক বিষয় নয়; কিন্তু ক্লিটোরিসের দৃশ্যমান অংশে অপ্রয়োজনীয় অঙ্গচ্ছেদ বা আঘাত সৃষ্টি করা উভয় ক্ষেত্রেই নারীর সুস্থ যৌনাঙ্গের ওপর হস্তক্ষেপ। যৌন আনন্দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গকে ধর্মীয় পরিচ্ছন্নতা, শালীনতা বা সামাজিক রীতির অজুহাতে কেটে ফেলার কোনো চিকিৎসাগত প্রয়োজন নেই। [12]

দ্বিতীয় ধরন—এক্সিশন (Type II): এই পদ্ধতিতে ক্লিটোরিসের দৃশ্যমান অগ্রভাগ এবং যোনিদ্বারের ভেতরের দুই পাশের চামড়া বা labia minora আংশিক বা সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাইরের দুই পাশের চামড়া বা labia majora-ও কেটে ফেলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে Type IIa-তে শুধু ল্যাবিয়া মাইনোরা, Type IIb-তে ক্লিটোরিসের দৃশ্যমান অগ্রভাগ ও ল্যাবিয়া মাইনোরা এবং Type IIc-তে এর সঙ্গে ল্যাবিয়া মেজোরাও অপসারণ করা হয়। নারীর যৌনাঙ্গের এসব অংশ স্বাভাবিক যৌন অনুভূতি, বাহ্যিক যৌনাঙ্গের সুরক্ষা এবং দৈনন্দিন শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একাধিক অঙ্গের টিস্যু কেটে ফেলার ফলে রক্তক্ষরণ, ক্ষতস্থানে সংক্রমণ, অস্বাভাবিক দাগ, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং যৌনমিলনের সময় যন্ত্রণার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক কর্তৃত্ব এই অঙ্গচ্ছেদকে উত্তম কিংবা পবিত্রতার কাজ বলে ঘোষণা করলেও তাতে শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনরুদ্ধার হয় না। [13]

তৃতীয় ধরন—ইনফিবুলেশন (Type III): নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের সবচেয়ে মারাত্মক ধরনের একটি হলো ইনফিবুলেশন। এই পদ্ধতিতে যোনিদ্বারের চারপাশের ভেতরের অথবা বাইরের চামড়া কেটে পুনর্বিন্যস্ত করে একটি আবরণ বা বন্ধন তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে যোনিমুখ অস্বাভাবিকভাবে সংকুচিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতস্থানের দুই পাশ সেলাই করে যুক্ত করা হয়। এতে প্রস্রাব ও ঋতুস্রাবের রক্ত বের হওয়ার জন্য অত্যন্ত ছোট পথ অবশিষ্ট থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা Type IIIa এবং Type IIIb নামে দুটি উপশ্রেণি নির্ধারণ করেছে; প্রথমটিতে ল্যাবিয়া মাইনোরা এবং দ্বিতীয়টিতে ল্যাবিয়া মেজোরা কেটে পুনর্বিন্যস্ত করে যোনিমুখ সংকুচিত করা হয়। ক্লিটোরিসের দৃশ্যমান অংশও এই প্রক্রিয়ায় অপসারিত হতে পারে। এর ফলে মেয়েদের স্বাভাবিক প্রস্রাব, মাসিক, যৌনমিলন ও সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে গুরুতর শারীরিক বাধা সৃষ্টি হতে পারে। যে যৌনাঙ্গ স্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত ও কার্যকর থাকার কথা, সেখানে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নারীর শারীরিক স্বাধীনতা ও যৌনজীবনের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। [14]

ইনফিবুলেশনের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি এতটাই গুরুতর হতে পারে যে পরবর্তীকালে চিকিৎসাগত কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া যোনিমুখ আবার উন্মুক্ত করতে হয়। এই চিকিৎসাপদ্ধতির নাম ডিইনফিবুলেশন (Deinfibulation)। যৌনমিলন, সন্তান প্রসব এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দূর করার জন্য কখনো এই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ শৈশবে ধর্মীয় বা সামাজিক প্রথার নামে যে স্বাভাবিক অঙ্গকে কৃত্রিমভাবে সংকুচিত করা হয়েছে, পরবর্তী জীবনে স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসকদের সেই বাধা অপসারণ করতে হয়। আরও ভয়াবহ হলো, কিছু সমাজে সন্তান প্রসবের জন্য যোনিমুখ উন্মুক্ত করার পরে আবার সেটি সংকুচিত করে সেলাই করার প্রথা রয়েছে, যাকে রিইনফিবুলেশন (Reinfibulation) বলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পুনরায় বন্ধ করার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছে এবং ২০২৫ সালের চিকিৎসা নির্দেশিকায় ইনফিবুলেশনের শিকার নারীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ডিইনফিবুলেশনের বিষয়ে পৃথক সুপারিশ দিয়েছে। একটি নারীর স্বাভাবিক যৌনাঙ্গকে বারবার কাটা, সেলাই করা এবং আবার উন্মুক্ত করার এই প্রক্রিয়া তার যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যকে দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। [15] [16]

চতুর্থ ধরন—অন্যান্য ক্ষতিকর পদ্ধতি (Type IV): নারীর যৌনাঙ্গে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া সুঁচ ফোটানো, ছিদ্র করা, অল্প কেটে দেওয়া, আঁচড় কাটা, টিস্যু চেঁছে ফেলা অথবা তাপের সাহায্যে পুড়িয়ে ক্ষত সৃষ্টি করা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এই শ্রেণিবিন্যাস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণকে অনেক সময় শুধু সম্পূর্ণ ক্লিটোরিস অপসারণ কিংবা যোনিমুখ সেলাই করার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। বাস্তবে নারীর সুস্থ যৌনাঙ্গে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্যে সামান্য ছেদন কিংবা ইচ্ছাকৃত ক্ষত সৃষ্টি করাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার FGM শ্রেণিবিন্যাসের অন্তর্ভুক্ত। ফলে ‘সামান্য কাটা’, ‘শুধু একটু রক্ত বের করা’ অথবা ‘পুরো অঙ্গ অপসারণ করা হয় না’—এসব বর্ণনা কোনো প্রক্রিয়াকে চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয় করে তোলে না। শারীরিক ক্ষতির মাত্রা পদ্ধতি অনুসারে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা হয় না। [17]

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই শ্রেণিবিন্যাস নারী যৌনাঙ্গের অঙ্গচ্ছেদকে তার প্রকৃত শারীরিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করে। কোনো সমাজে একে ‘খৎনা’, ‘খফদ’, ‘সুন্নত’, ‘সম্মানজনক কাজ’ কিংবা ‘পবিত্রতার বিধান’ বলা হলে অঙ্গচ্ছেদের প্রকৃতি বদলায় না। চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া সুস্থ অঙ্গের টিস্যু অপসারণ বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখানে নির্ণায়ক। ইসলামি ফিকহগ্রন্থে নারীর খৎনা সম্পর্কে বিধান নির্ধারণের সময় কতটুকু কাটতে হবে, কোন অংশ কাটতে হবে এবং কোন মাযহাবে তা কতটা বাধ্যতামূলক—এসব বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। এসব আলোচনার বিচার করতে গেলে প্রথমেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট বিধানটি নারীর যৌনাঙ্গের কোন অংশে হস্তক্ষেপের অনুমোদন দিচ্ছে এবং তার বাস্তব শারীরিক পরিণতি কী। ‘অল্প কাটা’ বা ‘বেশি গভীর করে না কাটা’ জাতীয় নির্দেশ কোনো প্রথার চিকিৎসাগত নিরাপত্তার প্রমাণ নয়; বরং এগুলো নারীর যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক টিস্যু কাটার পদ্ধতি ও মাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ।

২০২৫ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের সব ধরনই স্বাস্থ্যগত জটিলতার ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং অপেক্ষাকৃত গুরুতর অঙ্গচ্ছেদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গের পরিমাণের পাশাপাশি আঘাতের স্থান, রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, স্নায়ুর ক্ষতি এবং ক্ষত নিরাময়ের পর তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক টিস্যু নারীর পরবর্তী জীবনে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক গঠন কৃত্রিমভাবে পরিবর্তনের ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দেয়, তার সবকিছু প্রাথমিক ক্ষত শুকিয়ে গেলেই শেষ হয়ে যায় না। এই কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুধু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সম্পন্ন FGM নয়, চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত FGM-ও বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কোনো পদ্ধতিকে বৈধতা দেওয়ার শর্ত হলো তার বাস্তব চিকিৎসাগত প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য উপকার ও ক্ষতির প্রমাণ; ধর্মীয় অনুমোদন বা সামাজিক প্রচলন সেই শর্ত পূরণ করে না। [1] [18]


নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও শিশুর শারীরিক স্বাধীনতা

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ কেবল একটি ক্ষতিকর চিকিৎসাবহির্ভূত প্রথা নয়; এটি নারী ও কন্যাশিশুর শারীরিক অখণ্ডতা, স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত থাকার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। মানবাধিকারের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের নিজের শরীরের ওপর অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তি নারী বলে, শিশু বলে কিংবা একটি বিশেষ ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেছে বলে তার শরীরকে অন্যের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উপকরণে পরিণত করা যায় না। অথচ নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, স্থানীয় প্রথা কিংবা সামাজিক চাপের ভিত্তিতে মেয়েদের সুস্থ যৌনাঙ্গ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যে অঙ্গের কোনো রোগ নেই এবং যা অপসারণের চিকিৎসাগত প্রয়োজন নেই, সেই অঙ্গকে ধর্মীয় পবিত্রতা, শালীনতা, কুমারীত্ব কিংবা ভবিষ্যৎ স্বামীর যৌনসন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরিবর্তন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত নারীর শারীরিক প্রয়োজনের পরিবর্তে অন্যের বিশ্বাস ও প্রত্যাশাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের নির্দেশিকায় নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণকে নারী ও কন্যাশিশুর সমতা, শারীরিক ও মানসিক অখণ্ডতা এবং নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর আচরণ থেকে মুক্ত থাকার অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। [19]

শিশুদের ক্ষেত্রে এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা আরও গুরুতর। অধিকাংশ নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ শৈশব ও কৈশোরে সম্পন্ন হয়। একটি শিশুর যৌনাঙ্গ কেটে ফেলার সময় সে অস্ত্রোপচারের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি, যৌনস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কিংবা ভবিষ্যতে নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সম্পর্কে স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারে না। পরিবারের সম্মতি এবং শিশুর নিজের স্বাধীন সম্মতি এক বিষয় নয়। সন্তানকে চিকিৎসা করানোর জন্য অভিভাবকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে; কিন্তু কোনো রোগ নিরাময় বা স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন ছাড়াই তার সুস্থ যৌনাঙ্গের টিস্যু অপসারণ করা চিকিৎসা নয়। এই ধরনের স্থায়ী অঙ্গচ্ছেদ শিশুর ভবিষ্যৎ শারীরিক স্বাধীনতার ওপর এমন একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে সে আর সম্পূর্ণভাবে ফিরিয়ে নিতে পারে না। ফলে বিষয়টি কেবল অস্ত্রোপচারের সময় শিশু ব্যথা পেয়েছে কি না, সেখানে সংক্রমণ হয়েছে কি না অথবা ক্ষতস্থান শুকিয়েছে কি না—তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার শরীর সম্পর্কে ভবিষ্যতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও পূর্বেই ক্ষুণ্ণ করা হয়। [1]

১৯৮৯ সালে গৃহীত জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child)-এর ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুদের সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। বিশেষভাবে ২৪(৩) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগুলোকে শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ঐতিহ্যগত প্রথা বিলোপের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিধান সরাসরি নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের মতো প্রথার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো সমাজে বহু প্রজন্ম ধরে একটি প্রথা প্রচলিত রয়েছে, কিংবা সেই প্রথাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—এমন কোনো কারণ শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। শিশু অধিকার সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদেও অভিভাবকসহ যেকোনো ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় শিশুকে শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, আঘাত এবং নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পরিবারের ভেতরে সংঘটিত ক্ষতিকর অঙ্গচ্ছেদকে নিছক ব্যক্তিগত পারিবারিক ব্যাপার হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। [20]

States Parties shall take all effective and appropriate measures with a view to abolishing traditional practices prejudicial to the health of children.

বাংলা অনুবাদ: রাষ্ট্রপক্ষগুলো শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ঐতিহ্যগত প্রথাগুলো বিলোপের উদ্দেশ্যে সব ধরনের কার্যকর ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। — জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, অনুচ্ছেদ ২৪(৩)।

নারীর খৎনার সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের সম্পর্কও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৯ সালে গৃহীত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination against Women—CEDAW)-এর ৫(ক) অনুচ্ছেদে নারী ও পুরুষ সম্পর্কে বৈষম্যমূলক ধারণা, লিঙ্গভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব-হীনম্মন্যতার বিশ্বাস এবং নারী-পুরুষের পূর্বনির্ধারিত ভূমিকার ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষতিকর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথা পরিবর্তনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের অন্যতম সামাজিক ভিত্তি হলো নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা, তাকে বিবাহের উপযুক্ত হিসেবে তৈরি করা এবং পুরুষের প্রত্যাশিত যৌন আচরণের অধীন রাখা। এই প্রথার মাধ্যমে নারীর শরীরকে তার নিজের স্বাধীন সত্তার অংশ হিসেবে নয়, বরং পরিবার ও স্বামীর সম্মান এবং যৌনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখা হয়। নারী ও পুরুষের যৌনতার জন্য ভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করে নারীর স্বাভাবিক যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদকে নৈতিক গুণে পরিণত করা এই বৈষম্যের একটি প্রত্যক্ষ প্রকাশ। [21]

আফ্রিকান ইউনিয়নের মাপুতো প্রটোকল (Maputo Protocol) নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিরুদ্ধে আরও সরাসরি আইনগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। ২০০৩ সালে গৃহীত নারীর অধিকারবিষয়ক এই আঞ্চলিক চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ক্ষতিকর প্রথা বিলোপের বিধান রয়েছে। সেখানে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি আইনগত শাস্তির ব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও মানসিক পুনর্বাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে এই অনুচ্ছেদে চিকিৎসাকর্মীদের মাধ্যমে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিষয়টিও নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এর আইনগত তাৎপর্য হলো, কোনো ক্ষতিকর অঙ্গচ্ছেদ চিকিৎসকের হাতে সম্পন্ন হলেই তার প্রকৃতি পরিবর্তিত হয় না। অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত হওয়া, ব্যথানাশক ব্যবহার করা কিংবা চিকিৎসক উপস্থিত থাকা নিজে থেকেই চিকিৎসাগত প্রয়োজন সৃষ্টি করে না। ক্ষতিকর প্রথাটি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তার বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতাও এই বিধানে স্বীকৃত হয়েছে। [22]

prohibition, through legislative measures backed by sanctions, of all forms of female genital mutilation, scarification, medicalisation and para-medicalisation of female genital mutilation

বাংলা অনুবাদ: শাস্তির বিধানসম্বলিত আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের সব ধরন, দেহে ক্ষতচিহ্ন সৃষ্টির প্রথা এবং চিকিৎসক বা আধা-চিকিৎসা পেশাজীবীদের মাধ্যমে পরিচালিত নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ নিষিদ্ধ করা। — মাপুতো প্রটোকল, অনুচ্ছেদ ৫(খ)।

ইউরোপীয় মানবাধিকার আইনের ক্ষেত্রেও নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণকে বিশেষভাবে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউরোপ কাউন্সিলের ইস্তাম্বুল কনভেনশন (Istanbul Convention)-এর ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে নারীর ক্লিটোরিস, ল্যাবিয়া মাইনোরা বা ল্যাবিয়া মেজোরার সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক অঙ্গচ্ছেদ, ইনফিবুলেশন এবং অন্যান্য ধরনের বিকৃতকরণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ রয়েছে। এই অনুচ্ছেদে কোনো নারীকে এমন অঙ্গচ্ছেদে বাধ্য করা, এর ব্যবস্থা করা এবং কোনো কন্যাশিশুকে এতে প্ররোচিত বা বাধ্য করার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত। ফলে অপরাধের দায় কেবল যিনি ছুরি দিয়ে অঙ্গচ্ছেদ সম্পন্ন করেন তাঁর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অঙ্গচ্ছেদ ঘটানোর জন্য অন্যকে বাধ্য করা অথবা শিশুকে এর শিকার করার ব্যবস্থাও আইনগত দায় তৈরি করতে পারে। একই কনভেনশনের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংস্কৃতি, প্রথা, ধর্ম, ঐতিহ্য কিংবা তথাকথিত সম্মান নারী নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধের যুক্তিসংগত অজুহাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। [23]

excising, infibulating or performing any other mutilation to the whole or any part of a woman’s labia majora, labia minora or clitoris

বাংলা অনুবাদ: কোনো নারীর ল্যাবিয়া মেজোরা, ল্যাবিয়া মাইনোরা বা ক্লিটোরিসের সম্পূর্ণ অংশ অথবা যেকোনো অংশ কেটে ফেলা, ইনফিবুলেশন করা কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে বিকৃত করা। — ইস্তাম্বুল কনভেনশন, অনুচ্ছেদ ৩৮(ক)।

এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধানগুলোর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, একটি শিশুর শরীর সম্পর্কে কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে এবং কোন উদ্দেশ্যে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কোনো শিশু বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেছে বলে তার যৌনাঙ্গে স্থায়ী অঙ্গচ্ছেদ করার অধিকার সেই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতৃত্বের হাতে চলে যায় না। একইভাবে অভিভাবক সন্তানের খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেন বলে সন্তানের সুস্থ যৌনাঙ্গকে ধর্মীয় বা সামাজিক উদ্দেশ্যে কেটে ফেলার সীমাহীন অধিকারও অর্জন করেন না। একটি শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের বিশ্বাস ও জীবনযাপন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং শৈশবেই তার শরীরে অপরিবর্তনীয় ক্ষতি সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটিতে ব্যক্তির ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা অক্ষত থাকে; দ্বিতীয়টিতে অন্যের বিশ্বাস ও সামাজিক প্রত্যাশার কারণে সেই স্বাধীনতার ওপর স্থায়ী শারীরিক হস্তক্ষেপ ঘটে। বিশেষ করে নারীর যৌন ইচ্ছা কমানো, কুমারীত্ব রক্ষা করা কিংবা স্বামীর যৌনসন্তুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে অঙ্গচ্ছেদ করার ধারণা নারীকে তার নিজের শরীরের স্বাধীন মালিক হিসেবে স্বীকার করার পরিবর্তে পুরুষ ও পরিবারের যৌননৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীন করে।

চিকিৎসকদের দিয়ে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ করানোর প্রবণতাও এই প্রথার মানবাধিকারবিরোধী প্রকৃতি পরিবর্তন করতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের নির্দেশিকার তথ্য অনুযায়ী, জীবিত আনুমানিক ৫ কোটি ২০ লাখ নারী ও কন্যাশিশুর যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যকর্মী সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ চিকিৎসাপেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের একটি অংশও এই ক্ষতিকর প্রথা বাস্তবায়নে জড়িত। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক লক্ষ্য হলো রোগ প্রতিরোধ, রোগ নিরাময়, স্বাস্থ্য রক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি প্রতিরোধ করা। একজন সুস্থ শিশুর যৌনাঙ্গে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করা এই উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। চিকিৎসকের দক্ষতা অস্ত্রোপচারের কিছু তাৎক্ষণিক ঝুঁকি পরিবর্তন করতে পারে; কিন্তু অপ্রয়োজনীয় অঙ্গচ্ছেদের জন্য কোনো স্বাস্থ্যগত উপকার সৃষ্টি করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত আচরণবিধি এবং নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। [24]

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের এই অবস্থান ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও ব্যক্তির শারীরিক অধিকারের মধ্যকার একটি মৌলিক সংঘাত প্রকাশ করে। ইসলামি ফিকহগ্রন্থে কোনো প্রক্রিয়াকে ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব কিংবা সম্মানজনক বলা হলে সেটি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিধানের শ্রেণিবিন্যাস নির্দেশ করে; কিন্তু এই শ্রেণিবিন্যাস কোনো অঙ্গচ্ছেদের চিকিৎসাগত প্রয়োজন বা মানবাধিকারসম্মত বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে না। আল্লাহর আদেশ, মুহাম্মদের অনুমোদন অথবা কোনো ফকিহের সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপিত একটি বিধানও তার বাস্তব ক্ষতি ও নৈতিক পরিণতি থেকে মুক্ত নয়। একটি শিশুর সুস্থ যৌনাঙ্গ কেটে ফেলার প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার পক্ষে স্বাধীন ও পরীক্ষাযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকতে হবে। নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ক্ষেত্রে সেই প্রমাণ অনুপস্থিত; বিপরীতে এর ক্ষতির পক্ষে ব্যাপক চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে এই অঙ্গচ্ছেদকে বৈধতা দেওয়া নারীর শারীরিক অখণ্ডতা ও শিশুর অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে একটি শিশু বা নারীর শরীর ধর্মীয় কর্তৃত্বের সম্পত্তি নয়; তার স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং শারীরিক স্বাধীনতা অন্যের বিশ্বাস বাস্তবায়নের উপকরণ হতে পারে না।


নারীর খৎনার বৈশ্বিক বিস্তার ও ধর্মীয়-সামাজিক প্রভাব

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত একটি প্রথা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, মানবাধিকার আইন এবং নারীশিক্ষার প্রসার সত্ত্বেও এই প্রথা বিলুপ্ত হয়নি। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর অন্তত ৯৪টি দেশে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি দেশের জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপের তথ্য ইউনিসেফ নিয়মিত বিশ্লেষণ করে। এসব জরিপ থেকে বোঝা যায়, কোথাও নারীর খৎনা প্রায় সর্বজনীন সামাজিক বাধ্যবাধকতা, আবার কোথাও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশ্বের মোট আক্রান্ত নারীর সংখ্যা এবং একটি দেশের নারীদের কত শতাংশ এই প্রথার শিকার—এই দুটি পরিসংখ্যানও পৃথক। জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে তুলনামূলক কম প্রচলনের দেশেও আক্রান্ত নারীর মোট সংখ্যা অনেক হতে পারে। একইভাবে অপেক্ষাকৃত কম জনসংখ্যার কোনো দেশে প্রায় সব নারী খৎনার শিকার হতে পারেন। [16] [25]

ইউনিসেফের ২০২৪ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের সবচেয়ে বেশি প্রচলন পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সোমালিয়া, গিনি, জিবুতি, মালি, মিশর ও সুদান। জরিপে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারী ও কন্যাদের মধ্যে সোমালিয়ায় প্রায় ৯৯ শতাংশ, গিনিতে ৯৫ শতাংশ, জিবুতিতে ৯০ শতাংশ, মালিতে ৮৯ শতাংশ এবং মিশর ও সুদানে প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের FGM-এর শিকার হয়েছেন। এর বিপরীতে কেনিয়ায় প্রায় ১৫ শতাংশ, ইরাকে ৭ শতাংশ এবং উগান্ডায় এক শতাংশেরও কম নারীর মধ্যে এই প্রথার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই পরিসংখ্যানগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের সর্বশেষ উপলব্ধ জাতীয় জরিপের ভিত্তিতে সংকলিত; সব দেশের জরিপ একই বছরে পরিচালিত হয়নি। পরিসংখ্যানগত এই পার্থক্য দেখায়, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ কেবল ব্যক্তিগত পরিবারের সিদ্ধান্তের ফল নয়। যেখানে এটি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং বিবাহ, সম্মান, ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিপুলসংখ্যক মেয়ে এই প্রথার শিকার হয়। [26] [27]

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিস্তার সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা হলো, এটি প্রধানত আফ্রিকার সমস্যা। বাস্তবে এশিয়াতেও বিপুলসংখ্যক নারী এই প্রথার শিকার। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে আট কোটির বেশি এশিয়ায় বসবাস করেন। বিশেষভাবে ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ নথিভুক্ত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ইউনিসেফের ২০২৬ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যানগত বিবরণে দেখা যায়, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারী ও কন্যাদের প্রায় ৫১ শতাংশ এই প্রথার শিকার। একই প্রতিবেদনে শূন্য থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে এই হার প্রায় ৫৫ শতাংশ দেখানো হয়েছে। দেশের ভেতরেও প্রচলনের হার সমান নয়। সুলাওয়েসিতে প্রায় ৮১ শতাংশ, কালিমানতানে ৭৩ শতাংশ এবং সুমাত্রায় ৭০ শতাংশ নারীর মধ্যে এই প্রথার প্রমাণ পাওয়া যায়; অন্যদিকে জাভা-বালি অঞ্চলে হার প্রায় ৩৯ শতাংশ। ফলে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণকে কেবল আফ্রিকার কোনো বিচ্ছিন্ন উপজাতীয় প্রথা হিসেবে ব্যাখ্যা করা বাস্তব পরিসংখ্যানের সঙ্গে অসংগত। [28] [26]

ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে নারীর খৎনার পক্ষে কেবল স্থানীয় সংস্কৃতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি ধর্মীয় কর্তৃত্বের সমর্থনও নথিভুক্ত রয়েছে। ২০০৮ সালের ৯এ নম্বর ফতোয়ায় ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ইসলামি আলেম পরিষদগুলোর একটি, মজেলিস উলামা ইন্দোনেশিয়া (Majelis Ulama Indonesia—MUI), নারী ও পুরুষের খৎনাকে ইসলামের ফিতরাত ও ধর্মীয় নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করে। নারী খৎনাকে সেখানে মাকরুমাহ বা সম্মানজনক কাজ এবং সুপারিশকৃত ইবাদত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নারী খৎনা নিষিদ্ধ করাকে ওই ফতোয়ায় শরিয়াহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হয়। ফলে এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব কেবল প্রচলিত একটি প্রথার ব্যাখ্যা দেয়নি; বরং প্রথাটি নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও ধর্মীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার আলেম পরিষদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত ব্যাখ্যায় ২০০৮ সালের ফতোয়াটির এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। [29] [30]

Khitan bagi laki-laki maupun perempuan termasuk fitrah (aturan) dan syiar Islam. Dan khitan terhadap perempuan adalah makrumah (kemuliaan).

বাংলা অনুবাদ: পুরুষ ও নারী উভয়ের খৎনা ইসলামের ফিতরাত বা বিধান এবং ধর্মীয় নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। আর নারীর খৎনা একটি সম্মানজনক কাজ।

ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৪ সালের সরকারি বিধি এবং ২০২৫ সালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিধানে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে ইউনিসেফের সাম্প্রতিক দেশভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এই অবস্থান এবং ২০০৮ সালের ইসলামি ফতোয়ার মধ্যে মৌলিক সংঘাত স্পষ্ট: জনস্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষার জন্য একটি প্রথা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, অথচ প্রভাবশালী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ সেটিকে ইসলামি নিদর্শন ও সম্মানজনক ইবাদত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞাকে শরিয়াহবিরোধী বলেছে। কোনো পরিবার যদি বিশ্বাস করে যে মেয়ের যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ করা ধর্মীয়ভাবে প্রশংসনীয়, আর তা নিষিদ্ধ করা ধর্মবিরোধী, তাহলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য জানার পরও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ধারণা প্রথাটি চালিয়ে যাওয়ার সামাজিক প্রণোদনা তৈরি করতে পারে। এটি ধর্মীয় বিশ্বাস কীভাবে ব্যক্তির শরীরসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, তার একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ। [31] [32]

নারীর খৎনা টিকে থাকার পেছনে সামাজিক চাপ একটি প্রধান কারণ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বহু সমাজে খৎনা না করানো মেয়েকে বিবাহের অনুপযুক্ত, অপরিচ্ছন্ন, অসংযমী অথবা পারিবারিক সম্মানের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো পরিবার মেয়ের খৎনা করাতে ব্যক্তিগতভাবে অনিচ্ছুক হলেও প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, সম্ভাব্য পাত্রের পরিবার এবং স্থানীয় ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রত্যাশার কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে। এতে একটি ক্ষতিকর প্রথা ব্যক্তির স্বাধীন পছন্দের বিষয় না থেকে সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়। বিশেষভাবে যেসব সমাজে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা বিবাহের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে খৎনাকে বিবাহের পূর্বশর্ত বানানো মেয়েদের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কার্যকর পদ্ধতি হয়ে ওঠে। পরিবারের সম্মান রক্ষা এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার নামে তার শারীরিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ করা হয়। এই ব্যবস্থায় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নারী হওয়ার জন্য তাকে নিজের সুস্থ যৌনাঙ্গের একটি অংশ বিসর্জন দিতে হয়। [16] [33]

নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যও এই প্রথার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক কার্যকারণ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিভিন্ন সমাজে বিশ্বাস করা হয় যে নারীর ক্লিটোরিস বা অন্যান্য যৌনাঙ্গের অংশ কেটে ফেলা হলে তার যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাবে, ফলে বিবাহের আগে কুমারীত্ব এবং বিবাহের পরে স্বামীর প্রতি যৌনবিশ্বস্ততা নিশ্চিত করা সহজ হবে। কোনো কোনো সমাজে পুরুষের যৌন আনন্দ বৃদ্ধির ধারণাও এর সঙ্গে যুক্ত। এখানে নারীর নিজের যৌনস্বাস্থ্য বা যৌন আনন্দকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না; বরং তার যৌনতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিবার ও পুরুষের প্রত্যাশিত আচরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একজন নারী নিজের যৌন ইচ্ছা কীভাবে প্রকাশ করবেন, তাঁর শরীর কোন ধরনের যৌন অনুভূতি লাভ করবে কিংবা তাঁর যৌনজীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত কার হাতে থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নারীর বদলে সামাজিক কর্তৃত্ব নির্ধারণ করছে। ফলে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণকে শুধু প্রচলিত সংস্কার বলে চিহ্নিত করলে এর লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক আড়াল হয়ে যায়। [34] [35]

এই সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস যুক্ত হলে প্রথাটির বৈধতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। কোনো স্থানীয় অভ্যাসকে যদি কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে পরিবার সেই ঐতিহ্য প্রত্যাখ্যান করতে পারে। কিন্তু একই অভ্যাসকে আল্লাহর নির্দেশ, নবীর সুন্নাহ, ধর্মীয় পবিত্রতা কিংবা সম্মানজনক ইবাদত হিসেবে প্রচার করা হলে তা প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে ধর্মীয় অপরাধবোধ এবং সামাজিক নিন্দার আশঙ্কাও যুক্ত হয়। ইসলামের হাদিস ও ফিকহগ্রন্থে নারীর খৎনা নিয়ে আলোচনা এবং সমকালীন আলেমদের ধর্মীয় অনুমোদন এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিশেষ করে নারীর খৎনার বিধানকে সুন্নত, ওয়াজিব অথবা মাকরুমাহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার মাধ্যমে একটি অপ্রয়োজনীয় শারীরিক হস্তক্ষেপকে ধর্মীয়ভাবে প্রশংসনীয় আচরণে পরিণত করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার আলেম পরিষদের ফতোয়া সেই প্রক্রিয়ার আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় কর্তৃত্বের এই অনুমোদনকে কেবল সংস্কৃতির নাম দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সংশ্লিষ্ট আলেম ও ফিকহগ্রন্থগুলোর প্রত্যক্ষ বক্তব্য উপেক্ষিত হয়।

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের প্রাচীনত্বও এর বর্তমান বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে না। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের আবির্ভাবের আগেও কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রথার অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ, কোনো ধর্মের আবির্ভাবের আগেই প্রথাটি প্রচলিত থাকতে পারে। কিন্তু একটি প্রথার প্রাথমিক উৎপত্তি এবং পরবর্তী সময়ে কোনো ধর্মীয় আইনব্যবস্থা সেটিকে গ্রহণ, অনুমোদন বা বাধ্যতামূলক করেছে কি না—এই দুটি পৃথক ঐতিহাসিক প্রশ্ন। ইসলামের আবির্ভাবের আগে প্রচলিত কোনো প্রথা পরবর্তীকালে ইসলামি ফিকহে স্বীকৃতি পেলে সেই স্বীকৃতির ধর্মীয় ও সামাজিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। বিশেষভাবে যখন আলেমরা শরিয়াহর দলিল দিয়ে তার পক্ষে বিধান প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেটি নিছক পূর্ববর্তী সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা থাকে না; ইসলামি আইনশাস্ত্রের মধ্যেও একটি স্বীকৃত অবস্থান অর্জন করে। নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ক্ষেত্রে ধ্রুপদি ও সমকালীন ইসলামি ফিকহে এই ধর্মীয় স্বীকৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। [36] [37]

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিরুদ্ধে প্রচার ও আইনগত ব্যবস্থা কিছু দেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। ইউনিসেফের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত তিন দশকে বুরকিনা ফাসো, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, লাইবেরিয়া, মালদ্বীপ ও সিয়েরা লিওনের মতো কয়েকটি দেশে প্রথাটির প্রচলন কমেছে। অন্যদিকে সোমালিয়া ও মালির মতো দেশে পরিবর্তনের গতি অনেক ধীর। ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের যৌথ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পর্যবেক্ষণাধীন দেশগুলোতে ১৫–১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে FGM-এর প্রচলন ১৯৯৩ সালের প্রায় ৪৭ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে প্রায় ৩৩ শতাংশে নেমেছে। এই পরিবর্তন দেখায়, প্রথাটির বিরুদ্ধে শিক্ষা, জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জাতিসংঘের যৌথ ঘোষণায় জানানো হয়েছে, শুধু ওই বছরেই প্রায় ৪৫ লাখ কন্যাশিশু এই অঙ্গচ্ছেদের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রচলনের হার কমার পরও জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অব্যাহত রয়েছে। [38] [39]

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়: এই প্রথা শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না; পরিবার, বিবাহপ্রথা, সামাজিক সম্মান, যৌননৈতিক বিধান এবং ধর্মীয় কর্তৃত্ব পরস্পরকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এর স্থায়িত্ব সৃষ্টি করে। একটি শিশুর যৌনাঙ্গে ছুরি চালানোর সিদ্ধান্তকে যদি পরিবারের সম্মান, সামাজিক স্বীকৃতি এবং পরকালের ধর্মীয় পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে শিশুর স্বাস্থ্য ও শারীরিক অধিকারের প্রশ্ন সেই কর্তৃত্বের নিচে চাপা পড়ে। ইসলামি ফিকহগ্রন্থে নারীর খৎনাকে বৈধ, প্রশংসনীয় বা বাধ্যতামূলক বলে শ্রেণিবদ্ধ করার তাৎপর্য এখানেই। প্রথাটির সামাজিক বিস্তার বোঝার পাশাপাশি কোন হাদিস, কোন ফকিহ এবং কোন ধর্মীয় বিধানের ভিত্তিতে নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তা নির্ধারণ করাও অপরিহার্য। কারণ কোনো প্রথাকে ধর্মীয় মর্যাদা প্রদান করার অর্থ শুধু তার অস্তিত্ব স্বীকার করা নয়; সেই প্রথা বজায় রাখার পক্ষে একটি শক্তিশালী সামাজিক ও নৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।


ইসলামে নারীর খৎনা: চার মাযহাবের বিধান ও ধ্রুপদি ফিকহগ্রন্থের দলিল

ইসলামি আইনশাস্ত্রে নারীর খৎনা একটি স্বীকৃত ধর্মীয় অনুশীলন, যার বিধান নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী আলোচনা হয়েছে। শাফেয়ি, হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাবের ফিকহগ্রন্থে নারীর খৎনাকে কখনো ফরজ বা বাধ্যতামূলক, কখনো সুন্নত বা সুপারিশকৃত এবং কখনো মাকরুমাহ বা সম্মানজনক কাজ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এসব শ্রেণিবিন্যাসের ধর্মীয় গুরুত্ব আলাদা। ফরজ ঘোষণা করা হলে তা পালন করা অবশ্যকর্তব্য; সুন্নত বা মুস্তাহাব বলা হলে তা পালনকে ধর্মীয়ভাবে প্রশংসনীয় মনে করা হয়; আর মাকরুমাহ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে অঙ্গচ্ছেদটিকে সম্মানজনক প্রথার মর্যাদা দেওয়া হয়। এই বিতর্কে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়: নারী যৌনাঙ্গের সুস্থ টিস্যু কেটে ফেলার চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করা সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোর ভিত্তি নয়। বরং কোরআনে ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসরণের নির্দেশ, খৎনাকে ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত করা হাদিস, নারী খৎনার ঐতিহাসিক প্রচলন এবং পূর্ববর্তী ধর্মীয় কর্তৃত্বের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে বিধানগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধর্মীয়ভাবে একটি প্রথাকে কতটা বাধ্যতামূলক করা হবে, সেই প্রশ্নই আইনগত আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করেছে।


শাফেয়ি মাযহাব: নারী ও পুরুষ উভয়ের খৎনা ফরজ

শাফেয়ি মাযহাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনজ্ঞ ইমাম নববী তাঁর আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব গ্রন্থে নারীর খৎনার বিধান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শাফেয়ি মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত ও প্রসিদ্ধ সিদ্ধান্ত হলো, নারী ও পুরুষ উভয়ের খৎনা ফরজ। তিনি এই সিদ্ধান্তকে শুধু নিজের ব্যক্তিগত মত হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং শাফেয়ির নির্ধারিত এবং মাযহাবের অধিকাংশ আইনজ্ঞের গৃহীত অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নববী আরও জানিয়েছেন, শাফেয়ি মাযহাবের ভেতরে পুরুষের জন্য খৎনা ফরজ কিন্তু নারীর জন্য সুন্নত—এমন বিকল্প মত থাকলেও সেটিকে তিনি অপ্রধান ও দুর্বল অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফলে শাফেয়ি মাযহাবের প্রচলিত বিধানে নারীর যৌনাঙ্গের নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলা ঐচ্ছিক সামাজিক প্রথা নয়; ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার অন্তর্ভুক্ত। [40]

الختان واجب على الرجال والنساء عندنا وبه قال كثيرون من السلف ، كذا حكاه الخطابي ، وممن أوجبه أحمد

বাংলা অনুবাদ: আমাদের মতে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য খৎনা ফরজ। পূর্ববর্তী বহু আলেমও এই মত পোষণ করেছেন বলে খাত্তাবি উল্লেখ করেছেন। যাঁরা খৎনাকে ফরজ বলেছেন, তাঁদের মধ্যে আহমদও রয়েছেন।

নববীর এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য হলো, নারী যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদকে কেবল অনুমোদিত নয়, বরং ধর্মীয় কর্তব্যের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। একটি মেয়ের শরীরের স্বাভাবিক অংশ অপসারণ করা হবে কি না, তা নির্ধারণে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, যৌনস্বাস্থ্য কিংবা চিকিৎসাগত প্রয়োজনকে চূড়ান্ত মানদণ্ড করা হয়নি। বরং ধর্মীয় বিধানটিই সিদ্ধান্তের ভিত্তি। খৎনাকে ফরজ ঘোষণা করার ফলে পরিবারের কাছে কন্যাশিশুর অঙ্গচ্ছেদ করানো ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই অবস্থান গ্রহণ করলে অঙ্গচ্ছেদ থেকে বিরত থাকাই শরিয়াহর বিধান অমান্য করার পর্যায়ে পড়ে। ফলে নারীর শরীরের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি প্রত্যক্ষ বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

নববী একই আলোচনায় নারীর খৎনার জন্য ঠিক কতটুকু কাটা হবে, সে বিষয়েও শাফেয়ি ফকিহদের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, নারীর যৌনাঙ্গের প্রস্রাবের পথের ওপরের দিকে অবস্থিত মোরগের ঝুঁটির মতো চামড়ার যে অংশকে খৎনার স্থান বলা হয়েছে, সেখান থেকে এমন পরিমাণ কাটতে হবে যাতে খৎনা করার বিধান সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য করা যায়। তিনি নারীর ক্ষেত্রে অল্প কাটার এবং অতিরিক্ত গভীরভাবে না কাটার সুপারিশের কথাও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ আইনশাস্ত্রের আলোচনায় কেবল খৎনা করা হবে কি না, তা নয়; অঙ্গচ্ছেদের স্থান ও পরিমাণও ধর্মীয় বিধানের অংশে পরিণত হয়েছে। একটি সুস্থ অঙ্গের টিস্যু কতটুকু কাটলে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন হবে, তা নিয়ে নিয়ম তৈরি করার অর্থই হলো সেই অঙ্গচ্ছেদকে ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত একটি কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। [41]


ইমাম মাওয়ারদি: ফরজ বিধান, অঙ্গচ্ছেদের সংজ্ঞা ও শাস্তিমূলক কর্তৃত্ব

শাফেয়ি মাযহাবের আরেক গুরুত্বপূর্ণ আইনজ্ঞ আল-মাওয়ারদি তাঁর আল-হাবিউল কাবির গ্রন্থে খৎনাকে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য ফরজ বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁর আলোচনায় নারী খৎনার আরবি পরিভাষা خفض বা খফদ ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি নারীর যৌনাঙ্গের কোন অংশকে খৎনার স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সে সম্পর্কে শারীরস্থানিক বিবরণ দিয়েছেন এবং সেই অংশের ওপরের চামড়া কাটার কথা বলেছেন। তাঁর আলোচনায় খৎনা সম্পন্ন করার সময়কালও নির্ধারণ করা হয়েছে। বয়ঃসন্ধির আগে তা সম্পন্ন করাকে সুপারিশ করা হয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে ফরজ হিসেবে পালনের কথা বলা হয়েছে। এমনকি শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে খৎনা করার বিষয়ে প্রচলিত বর্ণনাও তিনি উল্লেখ করেছেন। ফলে শাফেয়ি ফিকহের এই কাঠামোয় মেয়েদের যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ শৈশব থেকেই ধর্মীয় অনুশীলনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। [42] [43]

মাওয়ারদির গ্রন্থে আরও গুরুতর একটি আইনগত বিষয় পাওয়া যায়। তিনি ইমাম শাফেয়ির এমন একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে খৎনা না করানো পুরুষ অথবা খফদ না করানো নারীকে শাসক শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দিলে এবং সেই শাস্তির ফলে তাঁদের মৃত্যু ঘটলে শাসকের দায়ের প্রশ্ন আলোচনা করা হয়েছে। উদ্ধৃত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এমন মৃত্যুর জন্য শাসককে দায়ী করা হবে না, কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খৎনা করানোর দায়িত্ব ছিল। তবে প্রচণ্ড গরম বা অতিরিক্ত শীতের মতো এমন পরিস্থিতিতে শাস্তি দেওয়া হলে, যেখানে মৃত্যুর আশঙ্কা প্রবল, সেখানে ক্ষতিপূরণের দায়ের বিধানও উল্লেখ রয়েছে। এই বিবরণ দেখায়, খৎনাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করার ফল কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; কিছু ফিকহি আলোচনায় তা রাষ্ট্রীয় শাস্তি ও শাসকের দায়মুক্তির প্রশ্ন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। [44]

ولو كان رجل أغلف أو امرأة لم تخفض ، فأمر السلطان فعزرا فماتا ، لم يضمن السلطان : لأنه كان عليهما أن يفعلا

বাংলা অনুবাদ: কোনো পুরুষ খৎনাবিহীন অথবা কোনো নারীর খফদ করা না থাকলে, শাসক তাদের শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং সেই শাস্তির ফলে তারা মারা গেল—এমন ক্ষেত্রে শাসক দায়ী হবেন না; কারণ তাঁদের নিজেদেরই খৎনা করানো কর্তব্য ছিল।

এই বিধানে নারীর খৎনার বাধ্যবাধকতা একটি সুস্পষ্ট আইনগত পরিণতি লাভ করেছে। নারীর শরীরের ওপর অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার না করানোকে এমন একটি কর্তব্যভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যার জন্য শাসকের পক্ষ থেকে শাস্তি দেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে। আরও ভয়াবহ হলো, নির্ধারিত শর্তে সেই শাস্তির ফলে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও শাসককে দায়মুক্ত করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। নারীর শারীরিক স্বাধীনতার বিপরীতে ধর্মীয় কর্তৃত্বের অবস্থান কতটা কঠোর হতে পারে, এই ঐতিহাসিক ফিকহি বিবরণ তার প্রত্যক্ষ দলিল। এটি কেবল একটি অঙ্গচ্ছেদ অনুমোদনের ঘটনা নয়; নির্দিষ্ট আইনগত অবস্থানে অঙ্গচ্ছেদ না করানোর ওপর শাস্তিমূলক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘটনাও।

শাফেয়ি আইনজ্ঞ আহমদ ইবনে নাকিব আল-মিসরি রচিত উমদাতুস সালিক বা Reliance of the Traveller গ্রন্থেও নারী ও পুরুষ উভয়ের খৎনার বিধান রয়েছে। এই গ্রন্থটি শাফেয়ি আইনশাস্ত্রের একটি পরিচিত সংকলন, যেখানে খৎনাকে ধর্মীয় বিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। [45]

নারী পুরুষের খৎনা

হাম্বলি মাযহাব: ইবনে কুদামার আল-মুগনিতে নারীর খৎনা

হাম্বলি আইনশাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ইবনে কুদামার আল-মুগনি। এই গ্রন্থে খৎনার বিধান আলোচনা করতে গিয়ে তিনি পুরুষের ক্ষেত্রে খৎনাকে ওয়াজিব এবং নারীর ক্ষেত্রে মাকরুমাহ বা সম্মানজনক কাজ বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নারীদের জন্য খৎনা বাধ্যতামূলক নয়। একই আলোচনায় তিনি আহমদ ইবনে হাম্বলের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এবং নারীদের খৎনার প্রচলনের পক্ষে হাদিস ও পূর্ববর্তী বর্ণনা ব্যবহার করেছেন। ফলে হাম্বলি ফিকহের এই ব্যাখ্যায় নারীর খৎনা ফরজ না হলেও ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত ও সম্মানজনক কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। নারীর খৎনাকে মাকরুমাহ বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক মূল্যায়ন; এর মাধ্যমে সুস্থ যৌনাঙ্গের অঙ্গচ্ছেদকে অসম্মানজনক বা ক্ষতিকর কাজের পরিবর্তে মর্যাদাসম্পন্ন ধর্মীয় আচরণের শ্রেণিতে স্থাপন করা হয়েছে। [46]

فأما الختان فواجب على الرجال ، ومكرمة في حق النساء ، وليس بواجب عليهن . هذا قول كثير من أهل العلم

বাংলা অনুবাদ: খৎনা পুরুষদের জন্য ওয়াজিব এবং নারীদের ক্ষেত্রে সম্মানজনক কাজ; এটি নারীদের জন্য ওয়াজিব নয়। বহু আলেমের অভিমতও এমন।

ইবনে কুদামা তাঁর আলোচনায় নারীর খৎনা প্রচলিত থাকার পক্ষে «إِذَا الْتَقَى الْخِتَانَانِ وَجَبَ الْغُسْلُ»—অর্থাৎ দুই খৎনাস্থান মিলিত হলে গোসল ফরজ হয়—এই হাদিস ব্যবহার করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, হাদিসে নারী ও পুরুষের খৎনাস্থানের উল্লেখ থাকায় নারীদের মধ্যেও খৎনার প্রচলন ছিল। এ ছাড়া নারীর খৎনা করার সময় কিছু অংশ অবশিষ্ট রাখার নির্দেশসংক্রান্ত বর্ণনাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এই দলিলগুলোর ব্যবহার দেখায়, হাম্বলি ফিকহে নারীর খৎনাকে একটি অনুমোদিত ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নববী হাদিস এবং প্রাচীন মুসলিম সমাজের প্রচলনকে ভিত্তি করা হয়েছে। পুরুষের খৎনার সঙ্গে নারীর খৎনার বাধ্যবাধকতায় পার্থক্য করা হলেও নারীর যৌনাঙ্গে হস্তক্ষেপের ধর্মীয় বৈধতা এখানে অস্বীকার করা হয়নি। [47]


হানাফি মাযহাব: নারীর খৎনা ও পুরুষের জন্য মাকরুমাহ

হানাফি ফিকহগ্রন্থেও নারীর খৎনাকে শরিয়াহসম্মত অনুশীলন হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। হানাফি আইনজ্ঞ ইবনে আবিদীন তাঁর রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার গ্রন্থে নারীর খৎনা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, এটি সুন্নত নয়; বরং পুরুষদের জন্য মাকরুমাহ বা সম্মানজনক বিষয়। একই সঙ্গে এটিকে সুন্নত বলার মতও তিনি সংরক্ষণ করেছেন। এই বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সম্মানের ধারণাটি সরাসরি পুরুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ করা হচ্ছে, অথচ ধর্মীয় পরিভাষায় তার মর্যাদা নির্ধারিত হচ্ছে পুরুষের সম্পর্কিত একটি সম্মানজনক বিষয় হিসেবে। নারী খৎনার সামাজিক ও যৌননৈতিক উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে এই বক্তব্য একটি প্রত্যক্ষ প্রাথমিক উৎস। [48]

وختان المرأة ليس سنة بل مكرمة للرجال وقيل سنة

বাংলা অনুবাদ: নারীর খৎনা সুন্নত নয়; বরং এটি পুরুষদের জন্য সম্মানজনক একটি বিষয়। অবশ্য একে সুন্নতও বলা হয়েছে।

ইবনে আবিদীনের বক্তব্যে «مكرمة للرجال» শব্দবন্ধটির অর্থ ‘পুরুষদের জন্য সম্মানজনক বিষয়’। এটিকে ‘নারীর জন্য সম্মান’ হিসেবে অনুবাদ করলে উৎসের অর্থ বদলে যায়। নারী খৎনাকে পুরুষের সম্মানের সঙ্গে সম্পর্কিত করার এই ফিকহি বক্তব্যে নারীর যৌনাঙ্গকে পুরুষকেন্দ্রিক সামাজিক মূল্যবোধের অধীন করার ধারণা পাওয়া যায়। নারীর শরীরের কোন অংশ অক্ষত থাকবে, কতটুকু কাটা হবে কিংবা এই অঙ্গচ্ছেদের ফলে তার যৌনস্বাস্থ্য কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এসব প্রশ্নের পরিবর্তে প্রথাটির ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস ও সামাজিক মর্যাদা গুরুত্ব পেয়েছে। সুস্থ নারীর যৌনাঙ্গে অপ্রয়োজনীয় অঙ্গচ্ছেদকে পুরুষের জন্য সম্মানজনক হিসেবে বর্ণনা করাই এই প্রথার পুরুষকেন্দ্রিক আইনগত ভাষার একটি উদাহরণ।


সমকালীন ফতোয়া: নারী খৎনাকে শরিয়াহসম্মত ঘোষণার ধারাবাহিকতা

নারী খৎনার ধর্মীয় বৈধতার এই অবস্থান শুধু মধ্যযুগীয় ফিকহগ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। ইসলামওয়েবের ১২১৬৮১ নম্বর ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আলেমরা নারীর খৎনার শরিয়াহসম্মত বৈধতার বিষয়ে একমত হয়েছেন; তাঁদের মতপার্থক্য হলো এটি ওয়াজিব, মুস্তাহাব নাকি মাকরুমাহ। সেখানে সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির বক্তব্য উদ্ধৃত করে নারীর খৎনাকে সুন্নত ও মাকরুমাহ বলা হয়েছে। একই ফতোয়ায় আবদুল আজিজ ইবনে বায এবং মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিনের অবস্থান উল্লেখ করে নারীর খৎনাকে সুপারিশকৃত ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ ধ্রুপদি আইনশাস্ত্রের অঙ্গচ্ছেদ-সমর্থনকারী বিধান সমকালীন ফতোয়া ব্যবস্থাতেও ধর্মীয় বৈধতা পেয়েছে। [49]

وقد اتفق الأئمة على مشروعيته، وإن اختلفوا في كونه واجباً أو مستحباً أو مكرمة

বাংলা অনুবাদ: ইমামগণ খৎনার শরিয়াহসম্মত বৈধতার বিষয়ে একমত হয়েছেন, যদিও এটি ওয়াজিব, মুস্তাহাব নাকি সম্মানজনক কাজ—সে বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

ইসলামকিউএর ৬০৩১৪ নম্বর ফতোয়ায় আরও কঠোর ভাষায় নারী খৎনার ধর্মীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একজন প্রশ্নকারী চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে নারী খৎনার শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিষয়ে আপত্তির কথা উল্লেখ করলে ফতোয়ার উত্তরে প্রথাটিকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামাজিক অভ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করার বিরোধিতা করা হয়। বরং একে ঐশী শরিয়াহর অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং নারীর খৎনার পক্ষে হাদিস, শাফেয়ি ও হাম্বলি ফিকহের সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য আইনজ্ঞদের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়। ফতোয়াটিতে নারীর খৎনার বিধান নিয়ে তিনটি অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে: নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য ওয়াজিব; উভয়ের জন্য সুন্নত; এবং পুরুষের জন্য ওয়াজিব কিন্তু নারীর জন্য সম্মানজনক সুপারিশকৃত কাজ। এরপর চিকিৎসকদের আপত্তি নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এই ফতোয়া নারীর খৎনার ধর্মীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আপত্তিকে কীভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। [50]

ليس الختان عادة موروثة كما يدعي البعض ، وإنما هو شريعة ربانية اتفق على مشروعيتها العلماء

বাংলা অনুবাদ: কেউ কেউ যেমন দাবি করেন, খৎনা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কোনো প্রথা নয়; বরং এটি ঐশী শরিয়াহ, যার বৈধতা সম্পর্কে আলেমরা একমত হয়েছেন।

এই বক্তব্যের সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবস্থানের সংঘাত মৌলিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের কোনো চিকিৎসাগত উপকারিতা স্বীকার করে না এবং এর সব ধরনের চর্চা বন্ধ করার আহ্বান জানায়। অন্যদিকে ইসলামকিউএর এই ফতোয়ায় প্রথাটিকে ঐশী শরিয়াহর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো কাজের পক্ষে ধর্মীয় বৈধতার দাবি এবং সেই কাজের চিকিৎসাগত উপকারিতা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। ধর্মীয় গ্রন্থে অঙ্গচ্ছেদের উল্লেখ পাওয়া গেলেও তা অঙ্গচ্ছেদের চিকিৎসাগত প্রয়োজন প্রমাণ করে না। একইভাবে প্রাচীন আলেমদের অনুমোদন একটি শিশুর শারীরিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ করার নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো কাজকে ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত করার পরে শুধু ঐশী বিধানের দাবি দিয়ে সেটিকে কল্যাণকর ঘোষণা করা যুক্তিগতভাবে অসংগত।

শাফেয়ি মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত বিধানে নারী খৎনা ফরজ; ইবনে কুদামার হাম্বলি ব্যাখ্যায় তা মাকরুমাহ; হানাফি ফিকহে সুন্নত ও মাকরুমাহর আলোচনা রয়েছে; আর সমকালীন ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অবস্থানের ভিত্তিতে নারী খৎনার ধর্মীয় বৈধতা স্বীকার করেছে। ফলে ইসলামে নারী খৎনাকে সম্পূর্ণ অননুমোদিত, ধর্মীয় ভিত্তিহীন অথবা নিছক বাইরের সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা ধ্রুপদি ফিকহগ্রন্থ ও সমকালীন ফতোয়ার তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই ধর্মীয় বিধানগুলোতে কতটুকু অঙ্গচ্ছেদ করা হবে, তা নিয়ে পার্থক্য থাকলেও নারী যৌনাঙ্গে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া অঙ্গচ্ছেদকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়ার বাস্তবতা অক্ষত থাকে। নারীর খৎনা যে কেবল সামাজিক অভ্যাস নয়, ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আলোচ্য বিধানও—নববী, মাওয়ারদি, ইবনে কুদামা, ইবনে আবিদীন এবং সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য একত্রে সেই ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠা করে।


হাদিসে নারীর খৎনা: ফিতরাত, দুই খৎনাস্থান ও আয়েশার পরিবারের ঘটনা

নারীর খৎনা সম্পর্কে ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিধানগুলো আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি। হাদিসগ্রন্থে খৎনাকে মানুষের ফিতরাত বা স্বভাবজাত ধর্মীয় আচরণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গের খৎনাস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং আয়েশার পরিবারের মেয়েদের খৎনা করানোর একটি ঘটনাও সংরক্ষিত রয়েছে। পরবর্তী যুগের ফকিহরা এসব বর্ণনাকে নারীর খৎনার ধর্মীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠার দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই দলিলগুলোর গুরুত্ব শুধু এই নয় যে প্রাচীন মুসলিম সমাজে নারীর খৎনার প্রচলন ছিল; বরং সেই প্রচলন ধর্মীয় ভাষা, পবিত্রতার বিধান এবং ফিকহি ব্যাখ্যার মাধ্যমে কীভাবে স্বীকৃত আচরণে পরিণত হয়েছে, তা-ও এসব উৎসে স্পষ্ট হয়। বিশেষভাবে الْخِتَان বা খৎনা, الْخِتَانَيْنِ বা দুই খৎনাস্থান এবং خِفَاض বা নারীর খৎনা—এই পরিভাষাগুলো ইসলামি উৎসে নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদের স্বীকৃত উপস্থিতি নির্দেশ করে।


খৎনা ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত: সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণিত হাদিসে মুহাম্মদ খৎনাকে পাঁচটি ফিতরাত বা স্বভাবজাত আচরণের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই তালিকায় খৎনার পাশাপাশি নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা এবং বগলের লোম অপসারণের নির্দেশ রয়েছে। ধর্মীয় পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত এসব কাজের তালিকায় খৎনাকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শরীরের স্বাভাবিক একটি অংশ কেটে ফেলাকে ধর্মীয় অনুশীলনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হাদিসটির মূল আরবি বক্তব্যে খৎনার জন্য الْخِتَانُ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী ফিকহগ্রন্থে এই সাধারণ নির্দেশের প্রয়োগ নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। [51] [52]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ الْفِطْرَةُ خَمْسٌ الْخِتَانُ، وَالاِسْتِحْدَادُ، وَقَصُّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ، وَنَتْفُ الآبَاطِ ‏”‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মুহাম্মদকে বলতে শুনেছি, পাঁচটি কাজ ফিতরাত বা স্বভাবজাত ধর্মীয় আচরণের অন্তর্ভুক্ত: খৎনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলা।

সুনানে নাসাঈর ৫০৪২, ৫০৪৩ ও ৫২২৪ নম্বর হাদিস, সুনানে ইবনে মাজাহর ২৯২ নম্বর হাদিস, রিয়াযুস সালেহিনের ১২১১ নম্বর হাদিস এবং মুওয়াত্তা মালিকের সংশ্লিষ্ট বর্ণনাতেও একই বক্তব্য পাওয়া যায়। এসব গ্রন্থে একই মৌলিক বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে—খৎনা ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত। একাধিক গ্রন্থে এই বক্তব্যের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে খৎনাকে ধর্মীয় আচরণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার ধারণাটি ইসলামি হাদিসসংকলনের বিস্তৃত অংশে রয়েছে। তবে একই আবু হুরায়রার বর্ণনা বিভিন্ন সংকলনে পুনরাবৃত্ত হওয়াকে পৃথক পৃথক ঐতিহাসিক ঘটনার প্রমাণ হিসেবে গণনা করা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যায় এই ধর্মীয় নির্দেশের পরিসর নারী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে।

ইসলামকিউএর ৮২৮৫৯ নম্বর ফতোয়ায় নারীর খৎনার পক্ষে এই ফিতরাতের হাদিসটি সরাসরি দলিল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফতোয়াটিতে বলা হয়েছে, খৎনাসংক্রান্ত সাধারণ নির্দেশ নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য, কেবল যেসব বিষয় পুরুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত—যেমন গোঁফ ছোট করা—সেগুলো বাদে। অর্থাৎ একটি হাদিসে নারী খৎনার পৃথক আদেশ না থাকলেও ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে সাধারণ খৎনাসংক্রান্ত নির্দেশকে নারী যৌনাঙ্গের অঙ্গচ্ছেদের পক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে। ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, নারীর খৎনা ফরজ নাকি সুপারিশকৃত—সে বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে; কিন্তু নারী খৎনাকে ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত আচরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [53]


দুই খৎনাস্থান মিলিত হলে: নারীর খৎনার প্রত্যক্ষ উল্লেখ

নারীর খৎনার ঐতিহাসিক উপস্থিতি সম্পর্কে আরও প্রত্যক্ষ দলিল পাওয়া যায় যৌনমিলনের পরে গোসল ফরজ হওয়ার বিধানসংক্রান্ত হাদিসগুলোতে। সহিহ মুসলিমের ৩৪৯ নম্বর হাদিসে আবু মুসা আশআরির বর্ণনায় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে একটি মতভেদের কথা রয়েছে। প্রশ্নটি ছিল, যৌনমিলনের পরে বীর্যপাত না হলেও গোসল ফরজ হবে কি না। এই বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য আবু মুসা আয়েশার কাছে গেলে তিনি মুহাম্মদের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। সেখানে পুরুষ ও নারীর খৎনাস্থানের সংস্পর্শের উল্লেখ করে গোসল ফরজ হওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। ফলে নারীর খৎনাস্থান এখানে কেবল সামাজিক প্রথার বিবরণ নয়; ইসলামি পবিত্রতা আইনের ভাষাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। [54]

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِذَا جَلَسَ بَيْنَ شُعَبِهَا الأَرْبَعِ وَمَسَّ الْخِتَانُ الْخِتَانَ فَقَدْ وَجَبَ الْغُسْلُ ‏”‏ ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ বলেছেন, যখন কোনো পুরুষ নারীর চার অঙ্গের মাঝখানে অবস্থান করে এবং একটি খৎনাস্থান অপর খৎনাস্থানের সংস্পর্শে আসে, তখন গোসল ফরজ হয়ে যায়। — সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৪৯।

একই বক্তব্য সুনানে ইবনে মাজাহর ৬০৮ নম্বর হাদিসে আয়েশার নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণসহ এসেছে। সেখানে তিনি বলেন, দুই খৎনাস্থান মিলিত হলে গোসল ফরজ হয় এবং মুহাম্মদের সঙ্গে তাঁর এমন ঘটনা ঘটেছে, যার পরে তাঁরা গোসল করেছেন। সুনানে তিরমিজীর ১০৮ নম্বর হাদিসেও এই বক্তব্যের একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। তিরমিজীর বর্ণনায় আয়েশার উক্তি হলো—«إِذَا جَاوَزَ الْخِتَانُ الْخِتَانَ فَقَدْ وَجَبَ الْغُسْلُ»। এই ভাষায় পুরুষ ও নারীর খৎনাস্থানকে পৃথক শারীরিক পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [55] [56]

عَنْ عَائِشَةَ، زَوْجِ النَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَتْ إِذَا الْتَقَى الْخِتَانَانِ فَقَدْ وَجَبَ الْغُسْلُ فَعَلْتُهُ أَنَا وَرَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَاغْتَسَلْنَا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদের স্ত্রী আয়েশা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন দুই খৎনাস্থান মিলিত হয়, তখন গোসল ফরজ হয়ে যায়। আমি এবং মুহাম্মদ এমনটি করেছি, তারপর আমরা গোসল করেছি। — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৬০৮।

এখানে অনুবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহর ৬১১ নম্বর হাদিসের একটি বাংলা অনুবাদে “দু বিপরীত লিঙ্গ পরস্পর মিলিত হলে” বলা হয়েছে। অথচ হাদিসটির আরবি মূলপাঠে স্পষ্টভাবে «إِذَا الْتَقَى الْخِتَانَانِ»—অর্থাৎ “যখন দুই খৎনাস্থান মিলিত হয়”—বাক্যটি রয়েছে। ইংরেজি অনুবাদেও “When the two circumcised parts meet” বলা হয়েছে। ‘দুই বিপরীত লিঙ্গ’ এবং ‘দুই খৎনাস্থান’ সমার্থক অভিব্যক্তি নয়। প্রথমটি সাধারণভাবে নারী-পুরুষের যৌনাঙ্গ বোঝায়; দ্বিতীয়টি বিশেষভাবে খৎনা-সম্পর্কিত শারীরিক অবস্থান নির্দেশ করে। বাংলায় খৎনাস্থানের উল্লেখ বাদ দেওয়ার ফলে হাদিসটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ মুছে গেছে। নারীর খৎনাসংক্রান্ত গবেষণায় এই ধরনের অনুবাদ মূল আরবি বক্তব্যের প্রমাণমূল্য আড়াল করে। [57] [58]

ধ্রুপদি ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থেও ‘দুই খৎনাস্থান’ পরিভাষাটির অর্থ সরাসরি নির্ধারণ করা হয়েছে। ইমাম নববী তাঁর শরহ সহিহ মুসলিম গ্রন্থে বলেছেন, এখানে খৎনাস্থানদ্বয়ের মিলন বলতে শারীরিকভাবে দুটি কাটা অংশের সরাসরি স্পর্শ বোঝানো হয়নি; বরং যৌনমিলনের সময় পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করার ফলে সংশ্লিষ্ট অংশদ্বয়ের কাছাকাছি অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নারীর খৎনাস্থানকে বাহ্যিক যৌনাঙ্গের ওপরের অংশ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। এই ব্যাখ্যা থেকে দুটি তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমত, হাদিসটির আইনগত বিষয় হলো যৌনমিলনের পরে গোসলের বাধ্যবাধকতা। দ্বিতীয়ত, সেই বিধানের ব্যাখ্যায় নারীর খৎনাস্থানকে স্বীকৃত শারীরিক পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। হাদিসের আরবি মূলপাঠে নারীর খৎনাস্থানের উল্লেখ রয়েছে এবং ধ্রুপদি মুসলিম আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যাতেও এই অর্থই স্বীকৃত হয়েছে। [59]

قَوْلُهُ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – : ( وَمَسَّ الْخِتَانُ الْخِتَانَ فَقَدْ وَجَبَ الْغُسْلُ ) قَالَ الْعُلَمَاءُ : مَعْنَاهُ غَيَّبْتَ ذَكَرَكَ فِي فَرْجِهَا وَلَيْسَ الْمُرَادُ حَقِيقَةَ الْمَسِّ

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদের “এক খৎনাস্থান অন্য খৎনাস্থান স্পর্শ করলে গোসল ফরজ হয়” বক্তব্যের অর্থ সম্পর্কে আলেমরা বলেছেন, এর দ্বারা পুরুষাঙ্গ নারীর যৌনাঙ্গে প্রবেশ করানো বোঝানো হয়েছে; এখানে প্রকৃত অর্থে সরাসরি স্পর্শ উদ্দেশ্য নয়।

ইমাম নববীর আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব গ্রন্থে একই বিষয় আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে পুরুষের খৎনাস্থান এবং নারীর খৎনাস্থানের অবস্থান আলাদাভাবে বর্ণিত হয়েছে। নারীর খৎনাস্থানের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গের ওপরের দিকে অবস্থিত নির্দিষ্ট চামড়া কাটার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করলে উভয়ের খৎনাস্থান পরস্পরের সমান্তরাল অবস্থানে আসে। এই ব্যাখ্যায় নারীর খৎনা একটি সুপরিচিত শারীরিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই সঙ্গে গোসলের বিধানের সঙ্গে তার সম্পর্কও নির্ধারণ করা হয়েছে। নারী খৎনার ঐতিহাসিক প্রচলন, ধর্মীয় পরিভাষা এবং পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যার মধ্যে এই যোগসূত্র সরাসরি পাওয়া যায়। [60]

হানাফি ব্যাখ্যাকার বদরুদ্দীন আইনি তাঁর উমদাতুল কারি শরহ সহিহ বুখারি গ্রন্থে আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, “দুই খৎনাস্থান” বলতে পুরুষের খৎনা এবং নারীর খফদ বোঝানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আরবদের মধ্যে নারীর খৎনার প্রচলনের কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে খৎনাস্থানের পরিভাষাটি শুধু একটি ধর্মীয় বিধানের ভাষা নয়; এটি প্রাচীন আরব সমাজে নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদের প্রচলনের সাক্ষ্য হিসেবেও পরবর্তী ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থে বিবেচিত হয়েছে। কোনো একটি হাদিসে নারীর খৎনাস্থানের উল্লেখ থাকলেই তা সব নারীর খৎনা বাধ্যতামূলক করার স্বতন্ত্র আদেশ হয়ে যায় না; কিন্তু সেই উল্লেখকে ভিত্তি করে ধর্মীয় আইনজ্ঞরা নারীর খৎনার প্রচলন ও বৈধতার পক্ষে যুক্তি নির্মাণ করেছেন—এটি তাঁদের গ্রন্থেই নথিভুক্ত রয়েছে। [61]


আয়েশার ভ্রাতুষ্পুত্রীদের খৎনা: আল-আদাবুল মুফরাদের প্রত্যক্ষ বিবরণ

নারী খৎনার ঐতিহাসিক প্রচলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাগুলোর একটি পাওয়া যায় ইমাম বুখারির আল-আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের খৎনাসংক্রান্ত অধ্যায়ে উম্মু আলকামার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদের স্ত্রী আয়েশার ভাইয়ের মেয়েদের খৎনা করানো হয়েছিল। এরপর তাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য একজন গায়ক ডাকার বিষয়ে আয়েশার সঙ্গে আলোচনা হয়। এই বর্ণনায় নারীর খৎনার কথা সরাসরি অতীতের সংঘটিত ঘটনা হিসেবে বলা হয়েছে; এখানে পরবর্তী কোনো ফকিহ কেবল সাধারণ হাদিস থেকে নারীর খৎনার সম্ভাবনা অনুমান করেননি। আয়েশার পরিবারের মেয়েদের খৎনার ঘটনাটি হাদিসের মূল বক্তব্যেই সংরক্ষিত। বাংলা প্রকাশনায় এই বর্ণনাটি ১২৫৯ নম্বরে উদ্ধৃত হয়েছে; Sunnah.com-এর আরবি-ইংরেজি সংস্করণে এটি আল-আদাবুল মুফরাদের ১২৪৭ নম্বর হাদিস, খৎনা অধ্যায়ের চতুর্থ বর্ণনা। [62] [63]

أَنَّ أُمَّ عَلْقَمَةَ أَخْبَرَتْهُ، أَنَّ بَنَاتَ أَخِي عَائِشَةَ اخْتُتِنَّ، فَقِيلَ لِعَائِشَةَ‏:‏ أَلاَ نَدْعُو لَهُنَّ مَنْ يُلْهِيهِنَّ‏؟‏ قَالَتْ‏:‏ بَلَى‏.‏ فَأَرْسَلْتُ إِلَى عَدِيٍّ فَأَتَاهُنَّ، فَمَرَّتْ عَائِشَةُ فِي الْبَيْتِ فَرَأَتْهُ يَتَغَنَّى وَيُحَرِّكُ رَأْسَهُ طَرَبًا، وَكَانَ ذَا شَعْرٍ كَثِيرٍ، فَقَالَتْ‏:‏ أُفٍّ، شَيْطَانٌ، أَخْرِجُوهُ، أَخْرِجُوهُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: উম্মু আলকামা বর্ণনা করেন, আয়েশার ভাইয়ের মেয়েদের খৎনা করানো হয়েছিল। তখন আয়েশাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য কাউকে ডাকা হবে কি? তিনি বললেন, অবশ্যই। এরপর আদি নামের একজনকে ডেকে আনা হলো। আয়েশা ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, সে গান গাইছে এবং আনন্দে মাথা নাড়াচ্ছে। তার মাথায় প্রচুর চুল ছিল। আয়েশা বললেন, উফ! এ তো শয়তান! একে বের করে দাও, একে বের করে দাও।

এই বিবরণে নারীর খৎনার ঘটনাটি পারিবারিক পরিবেশের একটি স্বাভাবিক ঘটনার মতো উপস্থাপিত হয়েছে। বর্ণনাটির পরবর্তী অংশে গায়ককে বের করে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে; কিন্তু মেয়েদের খৎনা করানোর বিরুদ্ধে আয়েশার কোনো আপত্তি উল্লেখ করা হয়নি। বর্ণনায় আয়েশার ভাইয়ের মেয়েদের খৎনা করানোর ঘটনা এবং এরপর তাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। খৎনার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে বর্ণনাটি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয় না। ধর্মীয় ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নারীর খৎনার প্রচলনকে কেবল পরবর্তী ফিকহি মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; প্রাথমিক মুসলিম পরিবারের একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনাতেও তার উপস্থিতি দেখায়।

ইমাম বুখারির আল-আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থের মুদ্রিত সংস্করণেও আয়েশার ভাইয়ের মেয়েদের খৎনার বিবরণ রয়েছে। ঘটনাটি হাদিসের আরবি মূলপাঠ এবং বাংলা প্রকাশনার সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা থেকে যাচাই করা যায়।

খৎনা

এই হাদিসের সামাজিক তাৎপর্য আরও গভীর। নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদের ঘটনাকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে খৎনার পরে মেয়েদের আনন্দ দেওয়া এবং ডেকে আনা গায়কের আচরণ। খৎনার প্রয়োজনীয়তা, মেয়েদের সম্মতি, যৌনাঙ্গের কোন অংশ কাটা হয়েছিল কিংবা ভবিষ্যতে তাঁদের কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে বর্ণনাটি তথ্য দেয় না। কিন্তু অঙ্গচ্ছেদটি সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে। সেই ঘটনা পরবর্তী ফিকহি আলোচনার বাইরে একটি বাস্তব সামাজিক অনুশীলনের বর্ণনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো ক্ষতিকর প্রথা সমাজে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলে তার শিকার ব্যক্তির শারীরিক অভিজ্ঞতার পরিবর্তে অনুষ্ঠান, পরিবার ও সামাজিক রীতিই প্রধান আলোচনায় পরিণত হতে পারে। আয়েশার পরিবারের মেয়েদের খৎনার বর্ণনায় সেই সামাজিক স্বাভাবিকীকরণের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায়।


হাদিস থেকে ফিকহে: নারীর খৎনার ধর্মীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠা

হাদিসের এই তিন ধরনের বক্তব্য—ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত খৎনা, নারী ও পুরুষের দুই খৎনাস্থানের উল্লেখ এবং আয়েশার পরিবারের মেয়েদের খৎনার ঘটনা—পরবর্তী ইসলামি আইনশাস্ত্রে নারীর খৎনার পক্ষে ব্যবহৃত দলিলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সহিহ বুখারির ফিতরাতের হাদিস খৎনাকে ধর্মীয় আচরণের মর্যাদা দিয়েছে; সহিহ মুসলিম, তিরমিজী ও ইবনে মাজাহর বর্ণনায় নারীর খৎনাস্থান ধর্মীয় পবিত্রতার বিধানের পরিভাষায় প্রবেশ করেছে; আর আল-আদাবুল মুফরাদের বর্ণনায় প্রাথমিক মুসলিম পরিবারের মেয়েদের খৎনার একটি নির্দিষ্ট ঘটনা সংরক্ষিত হয়েছে। এসব দলিলকে পরবর্তী ফকিহরা ধর্মীয় বিধান নির্মাণে ব্যবহার করেছেন। ইমাম নববী, ইবনে কুদামা, বদরুদ্দীন আইনি এবং সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আলোচনায় এই ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়।

ইসলামকিউএর ৮২৮৫৯ নম্বর ফতোয়ায় নারী খৎনার পক্ষে ব্যবহৃত দলিলগুলোর মধ্যে ফিতরাতের হাদিস, দুই খৎনাস্থানের হাদিস এবং উম্মু আতিয়্যার মাধ্যমে বর্ণিত নারী খৎনার পদ্ধতিসংক্রান্ত হাদিস একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ফতোয়ায় নারীর খৎনাকে শরিয়াহসম্মত বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এসব উৎস ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ, আধুনিক ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানেও নারী খৎনার বৈধতা প্রমাণের সময় এসব হাদিস কার্যকর ধর্মীয় দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অঙ্গচ্ছেদের পক্ষে ধর্মীয় অনুমোদন প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়ায় ঐতিহাসিক বর্ণনা, পবিত্রতার বিধান এবং শরিয়াহর নির্দেশ একত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। [64]

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের চিকিৎসাগত ক্ষতি এবং ধর্মীয় অনুমোদনের মধ্যে সংঘাত এখানেই স্পষ্ট। একটি সুস্থ শিশুর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ করা হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর চিকিৎসাগত প্রয়োজন, শারীরিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তির অধিকারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু ইসলামি ফিকহের আলোচনায় নারীর খৎনার পক্ষে প্রধান যুক্তি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে খৎনাকে ফিতরাতের অংশ বলে বর্ণিত হাদিস, নারীর খৎনাস্থানের ঐতিহাসিক উল্লেখ এবং পূর্ববর্তী মুসলিম পরিবার ও সমাজে প্রচলিত অনুশীলন। এসব উৎস নারী খৎনার ধর্মীয় ইতিহাস ও আইনগত স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করে; অঙ্গচ্ছেদের কোনো স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন প্রমাণ করে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষায় কোনো উপকার পাওয়া না গেলেও ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে অঙ্গচ্ছেদকে সম্মানজনক, সুন্নত বা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার এই প্রবণতা নারীর শারীরিক স্বাধীনতা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।


নারীর খৎনায় কতটুকু কাটতে হবে: মুহাম্মদের নির্দেশ ও স্বামীর যৌনসন্তুষ্টি

ইসলামে নারীর খৎনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো উম্মু আতিয়্যা আনসারির সূত্রে বর্ণিত হাদিস। সুনানে আবু দাউদের ৫২৭১ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, মদিনায় একজন নারী মেয়েদের খৎনা করতেন। মুহাম্মদ তাঁকে নির্দেশ দেন, খৎনার সময় যেন অতিরিক্ত গভীর করে কাটা না হয়। এই নির্দেশের কারণ হিসেবেও বর্ণনায় নারীর অবস্থা এবং স্বামীর যৌনসন্তুষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে শুধু নারী খৎনার সামাজিক প্রচলনের বিবরণ পাওয়া যায় না; খৎনা করার পদ্ধতি এবং তা কতটুকু করা হবে, সে সম্পর্কে মুহাম্মদের নির্দেশ হিসেবে একটি বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। এই বর্ণনায় নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ করার বিষয়টিকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে অঙ্গচ্ছেদের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই মাত্রা নির্ধারণের আলোচনায় সম্ভাব্য স্বামীর পছন্দকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [65]

أَنَّ امْرَأَةً كَانَتْ تَخْتِنُ بِالْمَدِينَةِ فَقَالَ لَهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لاَ تُنْهِكِي فَإِنَّ ذَلِكَ أَحْظَى لِلْمَرْأَةِ وَأَحَبُّ إِلَى الْبَعْلِ ‏”

বাংলা অনুবাদ: উম্মু আতিয়্যা আনসারি থেকে বর্ণিত, মদিনায় একজন নারী খৎনা করতেন। মুহাম্মদ তাঁকে বললেন, তুমি অতিরিক্ত গভীরভাবে কেটো না। কারণ এভাবে করা নারীর জন্য অধিক উপযোগী এবং স্বামীর কাছে অধিক পছন্দনীয়। — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫২৭১।

হাদিসটির আরবি শব্দচয়ন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। «لَا تُنْهِكِي» অর্থ অতিরিক্ত কেটে ফেলো না বা কাটার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সীমা পর্যন্ত যেয়ো না। «أَحْظَى لِلْمَرْأَةِ» দ্বারা নারীর জন্য অধিক উপযোগী বা সুবিধাজনক হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর «أَحَبُّ إِلَى الْبَعْلِ» অর্থ স্বামীর কাছে অধিক পছন্দনীয়। এখানে স্বামীর পছন্দের উল্লেখ কোনো আধুনিক ব্যাখ্যাকারীর সংযোজন নয়; এটি হাদিসের মূল আরবি বাক্যের অংশ। একজন নারীর যৌনাঙ্গের কতটুকু অংশ কেটে ফেলা হবে, সেই আলোচনায় তার স্বামীর যৌনসন্তুষ্টিকে প্রাসঙ্গিক বিবেচনা হিসেবে আনা হয়েছে। অঙ্গচ্ছেদটি নারীর শরীরে ঘটবে, কিন্তু এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পুরুষের যৌনপছন্দকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সুনানে আবু দাউদের এই হাদিসের দুটি বাংলা অনুবাদেও নারীর খৎনার মাত্রা এবং স্বামীর পছন্দের বিষয়টি রয়েছে। আল্লামা আলবানি একাডেমির সংস্করণে ৫২৭১ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গভীর করে না কাটলে তা নারীর জন্য আরামদায়ক এবং স্বামীর জন্য অধিক পছন্দনীয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংস্করণে ৫১৮১ নম্বর হাদিসে নারীর যৌনাঙ্গের অংশকে পুরুষের কাছে প্রিয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দুটি বাংলা অনুবাদের শব্দচয়ন কিছুটা পৃথক হলেও মূল বক্তব্য একই: নারী খৎনা করার সময় অতিরিক্ত অঙ্গচ্ছেদ না করার নির্দেশ এবং তার সঙ্গে স্বামীর পছন্দের সম্পর্ক। [66] [67]

নারীর খৎনা
খৎনা 3

হাদিসটির সনদ ও পরবর্তী আলেমদের গ্রহণযোগ্যতার বিচার

উম্মু আতিয়্যার এই বর্ণনাটির সনদ সম্পর্কে ইসলামি হাদিসবিশারদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সুনানে আবু দাউদের মূল পাঠেই আবু দাউদ উল্লেখ করেছেন, বর্ণনাটি শক্তিশালী নয়; এটি মুরসাল সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে এবং এর একজন বর্ণনাকারী মুহাম্মদ ইবনে হাসসান অপরিচিত বা মাজহুল। তিনি হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন। অন্যদিকে মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানি হাদিসটিকে সহিহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। এই দুই মূল্যায়ন একই হাদিসের সংকলিত পাঠের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং Sunnah.com-এর সংস্করণেও পাশাপাশি সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে হাদিসটির প্রাচীন সনদগত দুর্বলতা এবং পরবর্তী যুগে আলবানির গ্রহণযোগ্যতার সিদ্ধান্ত—দুটিই ঐতিহাসিক তথ্য। সনদের এই মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বর্ণনাটি ইসলামি ফিকহ ও হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থে নারীর খৎনার পদ্ধতি নির্ধারণের দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। [68]

ইসলামকিউএর ৬০৩১৪ নম্বর ফতোয়াতেও এই মতপার্থক্য সরাসরি স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, কিছু আলেম হাদিসটিকে দুর্বল এবং অন্যরা গ্রহণযোগ্য বলেছেন; আলবানি এটিকে সহিহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। একই ফতোয়ায় নারীর খৎনার ধর্মীয় বৈধতার পক্ষে ফিতরাতের হাদিস ও দুই খৎনাস্থানের হাদিসও ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ফতোয়া প্রতিষ্ঠান নারীর খৎনার অনুমোদনকে শুধু উম্মু আতিয়্যার বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল রাখেনি। ইসলামকিউএর ৮২৮৫৯ নম্বর ফতোয়ায় আরও সরাসরি বলা হয়েছে, মদিনায় খৎনাকারিণী নারীকে মুহাম্মদ প্রশংসনীয় খৎনার পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন। এই ভাষা প্রমাণ করে, সমকালীন ফতোয়া ব্যবস্থায় বর্ণনাটিকে নারীর খৎনা করার পদ্ধতিগত নির্দেশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। [69] [70]

ধর্মীয় উৎসে একটি বর্ণনার সনদকে দুর্বল বলা এবং সেই বর্ণনার বক্তব্যের সামাজিক ও আইনগত প্রভাব থাকা পরস্পরবিরোধী নয়। কোনো বর্ণনা মুহাম্মদের জীবনের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও পরবর্তী ইসলামি আলেমরা যদি সেই বর্ণনাকে গ্রহণ করেন, ব্যাখ্যা করেন এবং শরিয়াহর বিধান প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করেন, তাহলে সেই বর্ণনার ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব একটি পৃথক বাস্তবতা। উম্মু আতিয়্যার হাদিসের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। আবু দাউদের দুর্বলতার মন্তব্যের পরও বাগাভি, আলি আল-কারি, ইবনে তাইমিয়া এবং সমকালীন ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এই বক্তব্যের অর্থ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ফলে নারীর খৎনার পক্ষে এর ব্যবহার ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে নথিভুক্ত একটি বিষয়।


বাগাভি ও আলি আল-কারির ব্যাখ্যা: কাটার সীমা এবং যৌন আনন্দ

হাদিসটির ব্যাখ্যায় ইমাম বাগাভি তাঁর শরহুস সুন্নাহ গ্রন্থে খৎনা সম্পর্কে একটি পৃথক অধ্যায় সংকলন করেছেন। সেখানে তিনি উম্মু আতিয়্যার সূত্রে নারীর খৎনার বর্ণনা উল্লেখ করার পরে «لَا تُنْهِكِي» বাক্যটির অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় বেশি গভীর করে না কাটার নির্দেশটি «أَشِمِّي» শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ কাটার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ না করা। এই ব্যাখ্যা নারীর খৎনা নিষিদ্ধ করার কোনো বক্তব্য নয়; বরং খৎনা করার সময় কতটুকু কাটা হবে, তার সীমা নির্ধারণের আলোচনা। একই গ্রন্থে পূর্ববর্তী আলেমদের নারীর খৎনা বিষয়ে বক্তব্যও সংরক্ষিত রয়েছে। নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদের ধর্মীয় বৈধতা স্বীকার করে অঙ্গচ্ছেদের পরিমাণ নির্ধারণ করার এই পদ্ধতি পরবর্তী ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতেও পাওয়া যায়। [71]

মোল্লা আলি আল-কারি তাঁর মিরকাতুল মাফাতিহ শরহ মিশকাতুল মাসাবিহ গ্রন্থে এই হাদিসটির আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মদিনার নারী খৎনাকারিণীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, এখানে মেয়েদের খৎনা করার কথা বলা হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায় অতিরিক্ত গভীর করে কাটতে নিষেধ করার অর্থ হলো, খৎনাস্থানের সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ না করে কিছু অংশ অবশিষ্ট রাখা। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন, হাদিসের «أَحَبُّ إِلَى الْبَعْلِ» কথাটির সঙ্গে স্বামীর যৌন আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত কাটলে নারী ও পুরুষ—উভয়ের যৌন আনন্দ ব্যাহত হওয়ার কথা তাঁর ব্যাখ্যায় এসেছে। আলি আল-কারির ব্যাখ্যায় নারীর খৎনার মাত্রাকে স্বামীর যৌন আনন্দের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নারীর যৌনাঙ্গে কতটুকু অঙ্গচ্ছেদ করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে পুরুষের যৌনসন্তুষ্টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। [72]

أَيْ لَا تُبَالِغِي فِي قَطْعِ مَوْضِعِ الْخِتَانِ ، بَلِ اتْرُكِي بَعْضَ ذَلِكَ الْمَوْضِعِ

বাংলা অনুবাদ: অর্থাৎ খৎনাস্থান কাটার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত করবে না; বরং সেই স্থানের কিছু অংশ অবশিষ্ট রাখবে।

আলি আল-কারির ব্যাখ্যায় এই অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কাটা হবে কি না—সেই প্রশ্নের পরিবর্তে কতটুকু কাটা হবে—সেটি নির্ধারণ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত অঙ্গচ্ছেদ করলে যৌন আনন্দের সমস্যা তৈরি হতে পারে, এই ধারণা গ্রহণ করেও অঙ্গচ্ছেদ সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং যৌনাঙ্গের কিছু অংশ রেখে দেওয়ার নির্দেশের মাধ্যমে খৎনার একটি নির্দিষ্ট মাত্রাকে গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। এর ফলে নারীর যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক গঠন ও শারীরিক অখণ্ডতার পরিবর্তে একটি ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত অঙ্গচ্ছেদের সীমা নির্ধারণই মুখ্য হয়ে ওঠে।


ইবনে তাইমিয়া: নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমানোই খৎনার উদ্দেশ্য

নারীর খৎনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায় ইবনে তাইমিয়ার মাজমুউল ফাতাওয়া গ্রন্থে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নারীর খৎনা করতে হবে কি না। উত্তরে তিনি বলেছেন, নারীর খৎনা করতে হবে এবং নির্দিষ্ট অংশের ওপরের চামড়া কেটে তা সম্পন্ন করতে হবে। এরপর উম্মু আতিয়্যার হাদিসের একটি পাঠ উদ্ধৃত করে অতিরিক্ত গভীরভাবে না কাটার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, নারী খৎনার উদ্দেশ্য নির্ধারণ। ইবনে তাইমিয়া পুরুষের খৎনার উদ্দেশ্য হিসেবে পরিচ্ছন্নতার কথা বলেছেন; নারীর খৎনার উদ্দেশ্য হিসেবে বলেছেন যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা বা পরিমিত করা। তাঁর মতে, খৎনাবিহীন নারীর যৌনকামনা বেশি থাকে এবং অতিরিক্ত খৎনা করলে নারীর কামনা এতটাই কমে যায় যে পুরুষের যৌনসন্তুষ্টি সম্পূর্ণ হয় না। ফলে তিনি এমন মাত্রায় কাটার কথা বলেছেন, যাতে নারীর যৌনকামনা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং পুরুষের যৌনসন্তুষ্টিও বজায় থাকে। [73]

وَالْمَقْصُودُ مِنْ خِتَانِ الْمَرْأَةِ تَعْدِيلُ شَهْوَتِهَا فَإِنَّهَا إذَا كَانَتْ قَلْفَاءَ كَانَتْ مُغْتَلِمَةً شَدِيدَةَ الشَّهْوَةِ

বাংলা অনুবাদ: নারীর খৎনার উদ্দেশ্য হলো তার যৌনকামনাকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিমিত করা। কারণ নারী খৎনাবিহীন থাকলে তার যৌনকামনা প্রবল হয় এবং সে অত্যধিক যৌন আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন হয়ে ওঠে।

ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্যে নারীর খৎনার সঙ্গে যৌনতা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক আর অনুমানের পর্যায়ে থাকে না। তিনি সরাসরি নারীর যৌনকামনা নিয়ন্ত্রণকে খৎনার উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় খৎনাবিহীন নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষাকে অতিরিক্ত হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে এবং তাকে নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নারীর কামনা অত্যধিক কমে গেলে পুরুষের যৌনসন্তুষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে কাটার মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কাঠামোয় নারীকে নিজের যৌন ইচ্ছার স্বাধীন অধিকারী হিসেবে বিবেচনা না করে তার কামনাকে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই নিয়ন্ত্রণের গ্রহণযোগ্য সীমাও নির্ধারিত হচ্ছে পুরুষের যৌনসন্তুষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর নৈতিক সমস্যা রয়েছে। একটি মেয়ের যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ করা হবে, কারণ ভবিষ্যতে তার যৌন আকাঙ্ক্ষা কতটা থাকবে তা অন্যরা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তার যৌন অনুভূতির স্বাভাবিক বিকাশ, নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং যৌনসুখের স্বাধীনতা এই সিদ্ধান্তের প্রধান বিবেচনা নয়। বরং ধরে নেওয়া হচ্ছে, নারীর কামনা কমানো একটি ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য এবং সেই উদ্দেশ্যে তার সুস্থ যৌনাঙ্গে ছুরি চালানো যেতে পারে। একই সঙ্গে কাটার মাত্রা এমনভাবে নির্ধারণের চেষ্টা হচ্ছে যাতে সম্ভাব্য স্বামীর যৌনস্বার্থ বজায় থাকে। নারীর ওপর পুরুষকেন্দ্রিক যৌননৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি প্রত্যক্ষ দলিল এই ফিকহি ব্যাখ্যা।


ধর্মীয় ফতোয়ায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের আপত্তি প্রত্যাখ্যান

সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যেও নারী খৎনার ধর্মীয় অনুমোদন এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মধ্যে সংঘাত স্পষ্ট। ইসলামকিউএর ৬০৩১৪ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্নকারী উল্লেখ করেছিলেন, অনেক চিকিৎসক মেয়েদের খৎনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর বলেছেন। উত্তরে চিকিৎসকদের এই আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে খৎনাকে ঐশী শরিয়াহর অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, কোনো বিধান মুহাম্মদের কাছ থেকে প্রমাণিত হলেই মুসলমানদের তা মেনে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট, এবং সেটিকে উপকারী ও ক্ষতিহীন বলে বিশ্বাস করতে হবে। এই যুক্তিতে কোনো প্রক্রিয়ার বাস্তব স্বাস্থ্যগত পরিণতি পরীক্ষার পরিবর্তে ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবিকে তার উপকারিতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [69]

وَنَحْنُ – الْمُسْلِمِينَ – يَكْفِينَا ثُبُوتُ الشَّيْءِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى نَمْتَثِلَهُ ، وَنُوقِنَ بِفَائِدَتِهِ وَعَدَمِ ضَرَرِهِ

বাংলা অনুবাদ: আর আমাদের মুসলমানদের জন্য কোনো বিষয় নবীর কাছ থেকে প্রমাণিত হওয়াই তা পালন করার এবং এর উপকারিতা ও ক্ষতিহীনতার ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখার জন্য যথেষ্ট।

এই ফতোয়ার বক্তব্য একটি বৃত্তাকার যুক্তির উদাহরণ। ধর্মীয় বিধানকে সত্য ও কল্যাণকর ধরে নিয়ে বলা হচ্ছে, সেটি ধর্মীয়ভাবে প্রমাণিত হলেই তার উপকারিতা ও ক্ষতিহীনতা নিশ্চিত। অথচ কোনো চিকিৎসাগত প্রক্রিয়া উপকারী কি না, তা নির্ধারণ করার পদ্ধতি হলো চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষতির তথ্য বিশ্লেষণ। কোনো প্রক্রিয়াকে ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত ঘোষণা করলেই সেই প্রক্রিয়ার ফলে রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কিংবা যৌনস্বাস্থ্যের ক্ষতি ঘটবে না—এমন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা পাওয়া যায়নি; বরং সব ধরনের FGM-এর সঙ্গে ক্ষতির ঝুঁকি যুক্ত রয়েছে। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে অঙ্গচ্ছেদকে ক্ষতিহীন বলে ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিকল্প নয়। [74]

আলবানির ফাতাওয়ায়ে আলবানি গ্রন্থের বাংলা সংস্করণের ১৭৪ নম্বর পৃষ্ঠায় নারীর খৎনা সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য রয়েছে। সেখানে তিনি শীতপ্রধান ও উষ্ণপ্রধান অঞ্চলের নারীদের জন্য খৎনার প্রয়োজনীয়তায় পার্থক্য করেছেন এবং যৌনাঙ্গের নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলার পক্ষে মত দিয়েছেন। হাদিসটিকে আলবানির সহিহ হিসেবে মূল্যায়ন এবং নারীর খৎনা বিষয়ে সমকালীন ইসলামি আলেমদের অবস্থান একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ধ্রুপদি উৎসের ওপর ভিত্তি করে নারী খৎনার অনুমোদন বর্তমান সময়ের ধর্মীয় আলোচনাতেও অব্যাহত রয়েছে। [75]

প্রশ্ন ১৫০: মহিলাদের খতনা করার বিধান কী?
জবাব: দেশ ভিন্নতায় এর বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়। শীতপ্রধান এলাকায় সচরাচর মহিলাদের খতনা করার প্রয়োজন পড়ে না। এর বিপরীতে উষ্ণপ্রধান এলাকায় তাদের খতনা করার প্রয়োজন দেখা যায়। মহিলাদের খতনা সচরাচর করা হয় নারী-অঙ্গে। তাদের যৌনাঙ্গে এক টুকরো মাংস থাকে। সেই মাংস কখনো সামান্য হয় আবার কখনো বড়ো হয়। শীতপ্রধান এলাকায় তা বড়ো হয় না কিন্তু উষ্ণপ্রধান এলাকায় তা বড়ো হয়। এ কারণে উষ্ণপ্রধান এলাকার মহিলারা খতনা করে। হিজাযে রাসূলুল্লাহ-কে যামানায় এমনটাই হতো। কোনো কোনো সহীহ হাদীসে এসেছে, এক মহিলা খতনা করত। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, যখন তুমি খাতনা করবে তখন গভীর করে কাটবে না। অর্থাৎ সেই কোমলাস্থি বা মাংস-টুকরো বেশি করে কাটবে না। কারণ, তা চেহারাকে সমুজ্জ্বল করে এবং যা কি না স্বামীর জন্য খুব তৃপ্তিদায়ক। অতএব, দেশ ভিন্নতায় মহিলাদের খতনার বিধান ভিন্ন ভিন্ন।
কিন্তু সকল পুরুষের খতনার প্রয়োজন হয়। তবে হাতেগোনা এমন কিছু পুরুষ রয়েছে যারা খতনা করা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল। আর নবী-কে ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, তিনি খতনা করা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন। সনদের দিক থেকে এ হাদীস সহীহ নয়। তা ছাড়া এটি কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। তাই একে নবী-এর কারামত হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কারণ, কোনো কোনো কাফিরও খতনা করা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে; তাই এটি কোনো কারামত নয়।
মোদ্দাকথা, পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগে যে চামড়া থাকে তা অধিকাংশ পুরুষের কাটা অত্যাবশ্যক হয়। আর উষ্ণপ্রধান এলাকার অধিকাংশ মহিলার ঐ অংশটুকু কাটা আবশ্যক হলেও শীতপ্রধান এলাকার মহিলাদের সেটা কাটা আবশ্যক হয় না। এটাই হচ্ছে খতনার বিধান। ৩৪০

খৎনা 5

নারীর খৎনার পক্ষে সমকালীন ধর্মীয় প্রচারেও একই ধরনের অবস্থান পাওয়া যায়। বাংলাদেশের ধর্মীয় বক্তা আহমদুল্লাহর বক্তব্যেও নারীর খৎনাকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি সমকালীন বাংলাদেশে নারী খৎনার পক্ষে ধর্মীয় প্রচারের একটি উদাহরণ।

উম্মু আতিয়্যার হাদিস, বাগাভি ও আলি আল-কারির ব্যাখ্যা, ইবনে তাইমিয়ার ফতোয়া এবং সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য একত্রে নারীর খৎনার একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও যৌননৈতিক কাঠামো প্রকাশ করে। প্রথমে নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদকে ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত করা হয়েছে। এরপর কতটুকু কাটা হবে, তা নিয়ে বিধান ও ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। এই মাত্রা নির্ধারণে নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা কমানো এবং স্বামীর যৌনসন্তুষ্টি বজায় রাখার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীর নিজের শরীরের ওপর কর্তৃত্বের পরিবর্তে ধর্মীয় বিধান ও পুরুষের যৌনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একটি সুস্থ অঙ্গকে কেটে ফেলার পরিমাণ নিয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা তৈরি করা সেই অঙ্গচ্ছেদকে চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয় করে তোলে না। নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ক্ষেত্রে এই ধর্মীয় অনুমোদন, যৌনতা নিয়ন্ত্রণ এবং শারীরিক ক্ষতির সমন্বয়ই প্রথাটির গভীর নৈতিক ও মানবাধিকারগত সমস্যাকে প্রকাশ করে।


নারীর খৎনার উৎপত্তি: সারার প্রতিশোধ ও হাজেরার অঙ্গচ্ছেদের ইসলামি বিবরণ

ইসলামি ইতিহাস ও ধর্মীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থে নারীর খৎনার উৎপত্তি সম্পর্কে একটি উল্লেখযোগ্য কাহিনি সংরক্ষিত রয়েছে। এই কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র ইব্রাহিম, তাঁর স্ত্রী সারা এবং সারার দাসী হাজেরা। ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে আসীরের আল-কামিল ফিত তারিখ, ইবনে কাইয়্যিমের তুহফাতুল মাওদুদ এবং অন্যান্য ইসলামি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, ইব্রাহিমের সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সারার ঈর্ষার শিকার হন হাজেরা। সারা তাঁর দাসী হাজেরার শরীরের তিনটি অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করার শপথ করেন। ইব্রাহিম সেই শপথ পালনের জন্য হাজেরার কান ছিদ্র করা এবং যৌনাঙ্গে খৎনা করার পরামর্শ দেন বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী ইসলামি লেখকরা হাজেরাকেই নারীদের মধ্যে প্রথম খৎনাকৃত নারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই বিবরণের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। নারীর খৎনার একটি ধর্মীয় ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় প্রথাটির সূচনা কোনো রোগ প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা কিংবা নারীর স্বাস্থ্যরক্ষার প্রয়োজনে হয়নি; বরং একজন দাসী নারীর বিরুদ্ধে তাঁর মালিকানাধীন পরিবারের একজন নারীর ঈর্ষা, শাস্তির হুমকি এবং শারীরিক অঙ্গচ্ছেদের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। [76] [77]


ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: তিনটি অঙ্গ কাটার শপথ

ইবনে কাসীর তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে ইব্রাহিম ও হাজেরার কাহিনি আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে উল্লেখ করেছেন, সারা সন্তান জন্ম দিতে পারছিলেন না। তিনি নিজের দাসী হাজেরাকে ইব্রাহিমের কাছে সমর্পণ করেন। ইব্রাহিমের সন্তান ইসমাইলের জন্মের পর সারার মধ্যে তীব্র ঈর্ষা সৃষ্টি হয়। ইবনে কাসীরের বিবরণে হাজেরাকে ইব্রাহিমের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি মালিকি আইনজ্ঞ আবু মুহাম্মদ ইবনে আবি যায়েদের আন-নাওয়াদির গ্রন্থের একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, সারা হাজেরার ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর তিনটি অঙ্গ কেটে ফেলার শপথ করেন। ইব্রাহিম তখন সারাকে হাজেরার কান ছিদ্র করা এবং নারীর খৎনা বা খফদ করানোর নির্দেশ দেন, যাতে শপথ পূরণ করা যায়। এর পরপরই ইবনে কাসীর সুহাইলির বক্তব্য উল্লেখ করেছেন যে, হাজেরাই ছিলেন প্রথম খৎনাকৃত নারী এবং প্রথম কান ছিদ্র করানো নারী। [78]

أن سارة تغضبت على هاجر فحلفت لتقطعن ثلاثة أعضاء منها ، فأمرها الخليل أن تثقب أذنيها وأن تخفضها فتبر قسمها

বাংলা অনুবাদ: সারা হাজেরার ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর শরীরের তিনটি অঙ্গ কেটে ফেলার শপথ করেন। তখন ইব্রাহিম সারাকে হাজেরার দুই কান ছিদ্র করতে এবং তাঁর খৎনা করতে নির্দেশ দেন, যাতে সারা নিজের শপথ পূরণ করতে পারেন।

ইবনে কাসীরের বর্ণনার পরবর্তী অংশে সুহাইলিকে উদ্ধৃত করে হাজেরাকে নারীদের মধ্যে প্রথম খৎনাকৃত এবং প্রথম কান ছিদ্র করানো নারী বলা হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত «تَخْفِضَهَا» শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আরবি خفض বা খফদ নারী খৎনার একটি প্রচলিত পরিভাষা। ফলে এই বিবরণে হাজেরার কান ছিদ্র করার পাশাপাশি তাঁর যৌনাঙ্গে খৎনার কথাও সরাসরি বলা হয়েছে। শুধু কান ছিদ্র করার ঘটনা উদ্ধৃত করে নারী খৎনার অংশটি বাদ দিলে মূল ইসলামি উৎসের অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একই সঙ্গে ঘটনাটির কারণও স্পষ্ট: সারার শপথ এবং সেই শপথ বাস্তবায়নের জন্য হাজেরার শরীরে হস্তক্ষেপ। অর্থাৎ বর্ণনাটির মধ্যেই নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ একটি শাস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে উপস্থিত।

ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থের বাংলা অনুবাদের প্রথম খণ্ডের ৩৪৯–৩৫০ নম্বর পৃষ্ঠায় সারা ও হাজেরার ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। [79] [80]

হাাজেরার গর্ভে ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম হলে সারাহ্ ঈর্ষা পায়। তিনি হযরত ইবরাহীম (আ)-এর নিকট আবেদন জানান, যাতে হাজেরাকে তার চোখের আড়াল করে দেন। সুতরাং ইবরাহীম (আ) হাজেরা ও তাঁর পুত্রকে নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং মক্কায় নিয়ে রাখেন। বলা হয়ে থাকে যে, ইসমাঈল (আ) তখন দুধের শিশু ছিলেন। ইবরাহীম (আ) যখন তাদেরকে সেখানে রেখে ফিরে আসার জন্যে উদ্যত হলেন, তখন হাজেরা উঠে তার কাপড় জড়িয়ে ধরে বললেন, হে ইবরাহীম! আমাদেরকে এখানে খাদ্য-রসদহীন অবস্থায় রেখে কোথায় যাচ্ছেন? ইবরাহীম (আ) কোন উত্তর দিলেন না, বারবার পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও তিনি যখন জওয়াব দিলেন না, তখন হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন: ‘আল্লাহ কি এরূপ করতে আপনাকে আদেশ করেছেন?’ ইবরাহীম (আ) বললেন, ‘হ্যাঁ’। হাজেরা বললেন: ‘তাহলে আর কোন ভয় নেই। তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।’ শায়খ আবু মুহাম্মদ ইব্‌ন আবী যায়দ (র) ‘নাওয়াদির’
কিতাবে লিখেছেন: সারাহ্ হাজেরার উপর ক্রুদ্ধ হয়ে কসম করলেন যে, তিনি তাঁর তিনটি অঙ্গ ছেদন করবেন। ইবরাহীম (আ) বললেন, দু’টি কান ছিদ্র করে দাও ও খাৎনা করিয়ে দাও এবং কসম থেকে মুক্ত হয়ে যাও। সুহায়লী বলেছেন: ‘এই হাজেরাই সর্বপ্রথম নারী যার খাৎনা করা হয়েছিল, সর্বপ্রথম যার উভয় কান ছিদ্র করা হয় এবং তিনিই সর্বপ্রথম দীর্ঘ আঁচল ব্যবহার করেন।’

ইবনে কাসীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় সারা, হাজেরা এবং নারী খৎনার উৎপত্তিসংক্রান্ত বিবরণ

এই কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বৈশিষ্ট্য হলো হাজেরার অবস্থান। ইসলামি ঐতিহাসিক বিবরণে হাজেরা সারার দাসী ছিলেন। সারা তাঁকে ইব্রাহিমের কাছে সমর্পণ করেছিলেন এবং ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর যৌনসম্পর্ক ও সন্তান জন্মদানের পরে সারার ঈর্ষা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ কাহিনির তিনটি চরিত্রের সামাজিক ক্ষমতা সমান নয়। সারা ছিলেন স্বাধীন স্ত্রী এবং হাজেরা ছিলেন অধীনস্থ দাসী। নিজের অবস্থানের কারণে হাজেরা সারার ক্রোধ ও প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। তাঁর শরীরের তিনটি অঙ্গ কাটার হুমকি দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই হুমকির বিকল্প বাস্তবায়ন হিসেবে কান ছিদ্র ও যৌনাঙ্গে খৎনার কথা আসে। হাজেরার সম্মতি নেওয়া হয়েছিল, তাঁর নিজের শরীর সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত ছিল অথবা তিনি এই অঙ্গচ্ছেদ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পেয়েছিলেন—এমন কোনো তথ্য বর্ণনায় নেই। ঘটনাটির সিদ্ধান্তদাতা সারা ও ইব্রাহিম; শারীরিক হস্তক্ষেপের শিকার হাজেরা।


ইবনে আসীরের আল-কামিল: সারার ঈর্ষা থেকে নারীর খৎনার প্রচলন

ইবনে কাসীরের বাইরেও প্রখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক ইবনে আসীর তাঁর আল-কামিল ফিত তারিখ গ্রন্থে একই ঘটনাকে নারীর খৎনার উৎপত্তির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর বিবরণে বলা হয়েছে, ইসমাইল জন্মগ্রহণের পরে সারা হাজেরার ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন; পরে ফিরিয়ে আনলেও পুনরায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে বের করে দেন। এরপর সারা হাজেরার শরীরের একটি অংশ কাটার শপথ করেন। তিনি হাজেরার নাক ও কান কেটে বিকৃত করতে চাননি; পরিবর্তে তাঁর খৎনা করেন। ইবনে আসীর এই ঘটনার পরে সরাসরি বলেছেন, এভাবেই নারীদের খৎনার প্রচলন শুরু হয়। এই বিবরণে ইব্রাহিমের নির্দেশের চেয়ে সারার নিজের শাস্তিমূলক কাজটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্ণনাভেদে ঘটনাটির উপস্থাপনায় এই পার্থক্য থাকলেও নারীর খৎনার উৎপত্তিকে সারার ঈর্ষা এবং হাজেরার শরীরে আঘাতের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি উভয় গ্রন্থেই রয়েছে। [81]

وحلفت لتقطعن منها بضعة ، فتركت أنفها وأذنها لئلا تشينها ، ثم خفضتها ، فمن ثم خفض النساء

বাংলা অনুবাদ: সারা হাজেরার শরীরের একটি অংশ কেটে ফেলার শপথ করেন। তাঁকে বিকৃত করা হবে বলে নাক ও কান কাটা থেকে বিরত থাকেন। এরপর তিনি হাজেরার খৎনা করেন। সেখান থেকেই নারীদের খৎনার প্রচলন শুরু হয়।

ইবনে আসীরের বর্ণনায় শাস্তির একটি পদ্ধতির পরিবর্তে আরেকটি পদ্ধতি নির্বাচন করার বিষয়টি স্পষ্ট। নাক ও কান কেটে দিলে হাজেরার চেহারা বিকৃত হবে বলে তা থেকে বিরত থাকা হয়েছে; কিন্তু যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে নারী যৌনাঙ্গের ওপর সহিংসতাকে এমন একটি উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শপথও পূরণ হবে এবং মুখমণ্ডলের দৃশ্যমান বিকৃতিও এড়ানো যাবে। নারী যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদ এই বিবরণে কোনো স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনের ফল নয়। এটি শাস্তি প্রয়োগের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি। শাস্তির লক্ষ্যবস্তু একজন দাসী নারী, যার সন্তান জন্মদানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর ওপর ক্ষমতাবান পরিবারের ক্রোধ নেমে এসেছে। এই বর্ণনাটির সামাজিক তাৎপর্য নারী খৎনার উৎপত্তি সম্পর্কে প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে একটি কঠোর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়: ঈর্ষা ও প্রতিশোধ থেকে সংঘটিত অঙ্গচ্ছেদ কীভাবে পরবর্তীকালে সম্মানজনক ধর্মীয় অনুশীলনের মর্যাদা পেল?


ইবনে কাইয়্যিম: শাস্তিমূলক অঙ্গচ্ছেদ থেকে ধর্মীয় সুন্নতে রূপান্তর

সারা ও হাজেরার কাহিনিকে নারী খৎনার ধর্মীয় বৈধতার সঙ্গে সম্পর্কিত করার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি পাওয়া যায় ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যার তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলুদ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে খৎনার উদ্দেশ্য, উপকারিতা ও বিধান নিয়ে আলোচনার সময় ইবনে কাইয়্যিম সারার ঈর্ষা এবং হাজেরার খৎনার ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় সারা হাজেরার শরীরের তিনটি অঙ্গ কাটার শপথ করলে ইব্রাহিম তাঁকে হাজেরার কান ছিদ্র ও খৎনা করার পরামর্শ দেন। কিন্তু ইবনে কাইয়্যিম শুধু ঘটনাটি বর্ণনা করেই থেমে যাননি। তিনি বলেছেন, এর পর থেকে নারীদের মধ্যে এটি সুন্নত হয়ে যায়। এরপর এই প্রথার উৎপত্তিকে তিনি হাজেরার সাফা-মারওয়ার মধ্যে দৌড়ানোর ঘটনা থেকে হজের সাঈ এবং ইসমাইলকে কেন্দ্র করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর যুক্তির কাঠামোয় কোনো প্রাচীন ঘটনার স্মৃতিকে পরবর্তী ধর্মীয় অনুশীলনে রূপান্তরের ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। [82]

فأمرها بثقب أذنيها وختانها وَصَارَ ذَلِك سنة فِي النِّسَاء بعد وَلَا يُنكر هَذَا كَمَا كَانَ مبدأ السَّعْي سعي هَاجر بَين جبلين

বাংলা অনুবাদ: তিনি সারাকে হাজেরার কান ছিদ্র করা এবং খৎনা করার নির্দেশ দেন। এর পর থেকে এটি নারীদের মধ্যে সুন্নত হয়ে যায়। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই; যেমন সাঈর সূচনা হয়েছিল হাজেরার দুই পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ানোর ঘটনা থেকে।

ইবনে কাইয়্যিমের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ঘটেছে। যে ঘটনার সূচনায় রয়েছে সারার ঈর্ষা, দাসী হাজেরাকে শাস্তি দেওয়ার হুমকি এবং তাঁর শরীরের অঙ্গচ্ছেদ, সেই ঘটনাকে পরবর্তী নারীদের জন্য সুন্নতের উৎপত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি খৎনার উৎপত্তির কাহিনিকে হজের সাঈর মতো স্বীকৃত ধর্মীয় আচার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক নজিরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই তুলনার নৈতিক সমস্যা সুস্পষ্ট। হাজেরার সাফা-মারওয়ার মধ্যে চলাচলের বিবরণে একজন মা সন্তানের জন্য পানি অনুসন্ধান করছেন; অন্যদিকে নারীর খৎনার আলোচ্য কাহিনিতে একজন দাসী নারীর শরীরে তাঁর মালিকানাধীন পরিবারের ঈর্ষা ও প্রতিশোধের কারণে আঘাত করা হচ্ছে। দুটি ঘটনার কার্যকারণ, অংশগ্রহণকারীদের অবস্থান এবং ক্ষতির প্রকৃতি এক নয়। অথচ ইবনে কাইয়্যিমের তুলনায় উভয়ই পরবর্তী ধর্মীয় অনুশীলনের উৎপত্তি ব্যাখ্যার উপাদান হয়ে উঠেছে। ফলে শাস্তিমূলক অঙ্গচ্ছেদের একটি কাহিনিকে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি তাঁর নিজের লেখাতেই নথিভুক্ত রয়েছে।

ইবনে কাইয়্যিমের আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি খৎনাকে যৌনকামনা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তাঁর গ্রন্থে খৎনার উপকারিতাসংক্রান্ত আলোচনা এবং হাজেরার খৎনার উৎপত্তির কাহিনি একই বৃহত্তর অধ্যায়ে উপস্থিত। এর ফলে নারী খৎনার ধর্মীয় যুক্তির দুটি পৃথক স্তর পাওয়া যায়। একদিকে একটি প্রাচীন কাহিনির মাধ্যমে প্রথাটির ধর্মীয় উৎপত্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে; অন্যদিকে নারীর যৌনকামনা ও শরীর নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যকে খৎনার উপকারিতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর নিজের স্বাধীন শারীরিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রাধান্য পেয়েছে। যে প্রথার সূচনাকাহিনিতে একটি অধীনস্থ নারীর ওপর বলপ্রয়োগ রয়েছে, সেই প্রথার পরবর্তী ব্যাখ্যায় নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রণকে কল্যাণকর হিসেবে উপস্থাপন করার মধ্যে একটি ধারাবাহিক ক্ষমতাগত সম্পর্ক পাওয়া যায়। [83]


ইসলামওয়েব ও ইসলামকিউএ: কাহিনির ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং ধর্মীয় প্রচলন

সারা ও হাজেরার কাহিনিটি শুধু প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থেই সীমাবদ্ধ নেই। সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর আলোচনা রয়েছে। ইসলামওয়েবের ২৮৩২২২ নম্বর ফতোয়ায় ইবনে আবি যায়েদ, ইবনে আবদুল বার, সুয়ুতি, ইবনে কাসীর, ইবনে কাইয়্যিম এবং ইবনে হাজারের গ্রন্থে এই কাহিনির উল্লেখ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফতোয়াটিতে সারা হাজেরার ওপর ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর শরীরের তিনটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করার শপথ করেছিলেন এবং ইব্রাহিম খৎনা ও কান ছিদ্র করার পরামর্শ দিয়েছিলেন—এমন বর্ণনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামকিউএর ২৩৯১৭৪ নম্বর ফতোয়াতেও একই বিষয়ে আলি ইবনে আবি তালিবের সূত্রে বর্ণিত একটি বিবরণ, ইবনে আবদুল হাকাম, বায়হাকি ও ইবনে আসাকিরের সূত্র এবং ওয়াকিদির মাধ্যমে প্রচারিত আরেকটি বিবরণ আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ হাজেরার খৎনার কাহিনিটি ইসলামি ইতিহাস ও ফতোয়া সাহিত্যে একটি পরিচিত এবং দীর্ঘকাল ধরে উদ্ধৃত বিবরণ। [84] [85]

এই কাহিনির ঐতিহাসিক প্রমাণের শক্তি সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট সমস্যা রয়েছে। ইসলামকিউএর ২৩৯১৭৪ নম্বর ফতোয়ায় আবু ইসহাকের সূত্রে আলি ইবনে আবি তালিব পর্যন্ত পৌঁছানো বর্ণনার সনদে তাদলিসজনিত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াকিদির মাধ্যমে প্রচারিত অন্য বর্ণনাটিকেও সেখানে অত্যন্ত দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফতোয়াটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইবনে কাসীর ও ইবনে কাইয়্যিমসহ প্রাচীন লেখকেরা ঘটনাটি উদ্ধৃত করলেও এর ঐতিহাসিক সংঘটন নিশ্চিত করার মতো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে হাজেরাই পৃথিবীর প্রথম খৎনাকৃত নারী ছিলেন—এই দাবিকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করার ভিত্তি নেই। একই কাহিনি বহু গ্রন্থে পুনরাবৃত্ত হওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহু স্বাধীন সাক্ষ্যের সমতুল্য নয়। কিন্তু কাহিনিটির ঐতিহাসিক সংঘটন অনিশ্চিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে এর গুরুত্ব নেই। ইবনে কাসীর এটি ইতিহাসে সংরক্ষণ করেছেন, ইবনে আসীর নারীর খৎনার প্রচলনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আর ইবনে কাইয়্যিম একে নারীদের সুন্নতের উৎপত্তির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। প্রাচীন ঘটনার সত্যতা এবং পরবর্তী ধর্মীয় লেখকেরা সেই কাহিনিকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন—এ দুটি পৃথক বিষয়। [86]

ধর্মীয় অনুশীলনের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় প্রাচীন কাহিনির ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রথার সূচনাকে একজন নবী বা নবীর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করা হলে সেই প্রথা সাধারণ সামাজিক রীতির বাইরে ধর্মীয় মর্যাদা অর্জন করতে পারে। হাজেরার খৎনার বিবরণেও এই প্রক্রিয়া পাওয়া যায়। সারার ঈর্ষা থেকে সংঘটিত বলে বর্ণিত একটি অঙ্গচ্ছেদের ঘটনাকে ইব্রাহিমের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; পরে একে নারীদের মধ্যে প্রথম খৎনা এবং সুন্নতের উৎপত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে দাসী নারীর ওপর ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের একটি কাহিনি ধর্মীয় অনুশীলনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে। ইবনে কাইয়্যিম যখন ঘটনাটিকে হজের সাঈর উৎপত্তির সঙ্গে তুলনা করেন, তখন সেই ধর্মীয় মর্যাদাদানের প্রক্রিয়াটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বক্তব্যগুলোর সমালোচনার জন্য কাহিনিটিকে প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; ইসলামি লেখকদের নিজেদের উপস্থাপনায় সহিংসতার কাহিনি কীভাবে ধর্মীয় প্রথার পক্ষে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

নারী খৎনার ধর্মীয় ইতিহাসে হাজেরার কাহিনি তাই দুটি গুরুতর বিষয় প্রকাশ করে। প্রথমত, ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থে নারীর খৎনার একটি উৎপত্তিকাহিনি সংরক্ষিত রয়েছে, যার কেন্দ্রীয় ঘটনা একজন অধীনস্থ নারীর শরীরের ওপর শাস্তিমূলক অঙ্গচ্ছেদ। দ্বিতীয়ত, পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সেই ঘটনাকে নারীদের সুন্নতের উৎপত্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রথাটির পক্ষে চিকিৎসাগত প্রয়োজনের প্রমাণ না থাকলেও নবী ইব্রাহিমের পরিবারের সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধর্মীয় বৈধতার ভাষা তৈরি হয়েছে। যে নারী নিজের শরীরে কী করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রেই নেই, তাঁর ওপর সংঘটিত অঙ্গচ্ছেদের কাহিনি পরবর্তী নারীদের জন্য ধর্মীয় অনুশীলনের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রক্রিয়া নারীর শরীরের ওপর কর্তৃত্ব, দাসত্বের ক্ষমতাগত সম্পর্ক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের নামে অঙ্গচ্ছেদকে স্বাভাবিক করে তোলার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ।


নারীর খৎনা পুরুষের জন্য সুন্নত, নারীর জন্য সম্মান: হাদিস ও ফিকহি ব্যাখ্যা

নারীর খৎনার ধর্মীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামি সাহিত্যে বহুল উদ্ধৃত একটি বক্তব্য হলো, “খৎনা পুরুষের জন্য সুন্নত এবং নারীর জন্য সম্মানজনক কাজ।” আরবি ভাষায় বক্তব্যটি হলো «الْخِتَانُ سُنَّةٌ لِلرِّجَالِ، مَكْرُمَةٌ لِلنِّسَاءِ»। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মুসনাদ গ্রন্থে এটি মুহাম্মদের হাদিস হিসেবে সংকলিত হয়েছে। বাইহাকি তাঁর আস-সুনানুল কুবরা গ্রন্থে একই বক্তব্যের বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। বাগাভির শরহুস সুন্নাহ, কুরতুবির তাফসির এবং পরবর্তী ফিকহি আলোচনাতেও বক্তব্যটি উদ্ধৃত হয়েছে। এর বিশেষত্ব হলো, এখানে নারী খৎনাকে কেবল একটি প্রচলিত আচরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি; বরং মাকরুমাহ বা সম্মানজনক কাজের ধর্মীয় মূল্যায়ন দেওয়া হয়েছে। এই শব্দের মাধ্যমে নারী যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদকে একটি ইতিবাচক সামাজিক ও ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।


মুসনাদে আহমদ: পুরুষের জন্য সুন্নত, নারীর জন্য মাকরুমাহ

ইমাম আহমদের মুসনাদ গ্রন্থে উসামা আল-হুযালির সূত্রে এই বক্তব্য পাওয়া যায়। বর্ণনাপথে সুরাইজ, আব্বাদ ইবনে আল-আওয়াম, হাজ্জাজ ইবনে আরতাত এবং আবু আল-মালিহ ইবনে উসামার নাম রয়েছে। আবু আল-মালিহ তাঁর পিতা থেকে মুহাম্মদের বক্তব্যটি বর্ণনা করেছেন। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত মুসনাদের সংস্করণে হাদিসটির নম্বর ২০১৯৫ এবং মুদ্রিত পঞ্চম খণ্ডের ৭৫ নম্বর পৃষ্ঠা উল্লেখ রয়েছে। অন্যান্য সংস্করণে নম্বর ২০৭১৯ কিংবা ১৯৭৯৪ হিসেবেও পাওয়া যায়। হাদিসটির মূল বক্তব্যে নারী ও পুরুষের খৎনার জন্য দুটি পৃথক ধর্মীয় মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরুষের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে সুন্নত এবং নারীর জন্য মাকরুমাহ। [87]

عَنِ الْحَجَّاجِ عَنْ أَبِي الْمَلِيحِ بْنِ أُسَامَةَ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْخِتَانُ سُنَّةٌ لِلرِّجَالِ مَكْرُمَةٌ لِلنِّسَاءِ

বাংলা অনুবাদ: হাজ্জাজ থেকে, তিনি আবু আল-মালিহ ইবনে উসামা থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, মুহাম্মদ বলেছেন: খৎনা পুরুষদের জন্য সুন্নত এবং নারীদের জন্য সম্মানজনক কাজ।

এই বক্তব্যে নারী খৎনাকে নিষিদ্ধ বা অনুচিত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে খৎনার মর্যাদায় পার্থক্য করা হয়েছে। এখানে মাকরুমাহ শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শব্দটির সাধারণ অর্থ মর্যাদাপূর্ণ বা সম্মানজনক বিষয়। মুহাম্মদের বক্তব্যের ব্যাখ্যাকার সিন্ধি তাঁর হাশিয়াতু মুসনাদিল ইমাম আহমদ গ্রন্থে সরাসরি বলেছেন, মাকরুমাহ শব্দটির অর্থ কারামাহ বা সম্মান। ফলে এটি নিছক কোনো শারীরিক প্রক্রিয়ার নাম নয়; সংশ্লিষ্ট আচরণের ইতিবাচক মূল্যায়নও বহন করে। [88]

ইসলামি আইনশাস্ত্রে সুন্নত শব্দটি কখনো নবীর অনুসৃত ধর্মীয় রীতি এবং কখনো ফরজের বিপরীতে সুপারিশকৃত আমল বোঝায়। অন্যদিকে মাকরুমাহ শব্দটি এখানে নারীর খৎনাকে সম্মানজনক আচরণের মর্যাদা দিয়েছে। এই শব্দগুলোর আইনগত প্রয়োগ ও বাধ্যতামূলকতার মাত্রা নিয়ে পরবর্তী ফকিহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু নারীর খৎনাকে ইতিবাচক ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বক্তব্যটির মূল বৈশিষ্ট্য।


বাইহাকির সনদগত আপত্তি: হাজ্জাজ ইবনে আরতাতের বর্ণনা

হাদিসটির প্রামাণিকতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বাইহাকির আস-সুনানুল কুবরা গ্রন্থে। বাইহাকি খৎনাসংক্রান্ত অধ্যায়ে আবু আল-মালিহ ইবনে উসামার পিতার সূত্রে একই বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর বর্ণনাপথে হাফস ইবনে গিয়াসের মাধ্যমে হাজ্জাজ ইবনে আরতাতের নাম এসেছে। কিন্তু বর্ণনাটি উদ্ধৃত করার পরপরই বাইহাকি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হাজ্জাজ ইবনে আরতাতের বর্ণনাকে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। অর্থাৎ বাইহাকি হাদিসটি সংকলন করেছেন, কিন্তু তার সনদের দুর্বলতাও পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। [89]

عَنِ الْحَجَّاجِ، عَنْ أَبِي مَلِيحِ بْنِ أُسَامَةَ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – : “الْخِتَانُ سُنَّةٌ لِلرِّجَالِ، وَمَكْرُمَةٌ لِلنِّسَاءِ”.

বাংলা অনুবাদ: হাজ্জাজ, আবু আল-মালিহ ইবনে উসামার মাধ্যমে তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, মুহাম্মদ বলেছেন: খৎনা পুরুষদের জন্য সুন্নত এবং নারীদের জন্য সম্মানজনক কাজ।

এই বর্ণনার ঠিক পরেই বাইহাকির মন্তব্য: «الْحَجَّاجُ بْنُ أَرْطَاةَ لَا يُحْتَجُّ بِهِ»—অর্থাৎ হাজ্জাজ ইবনে আরতাতকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। হাজ্জাজের বিরুদ্ধে হাদিসশাস্ত্রে দুর্বল স্মৃতিশক্তি, বর্ণনায় অসংগতি এবং তাদলিসের অভিযোগ রয়েছে। এই হাদিসটিও তাঁর মাধ্যমে একাধিক বর্ণনাপথে প্রচারিত হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়ে পার্থক্য পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় আবু আল-মালিহ তাঁর পিতা থেকে বক্তব্যটি বর্ণনা করেছেন; অন্য বর্ণনায় শাদ্দাদ ইবনে আওসের নাম যুক্ত হয়েছে। মাকহুলের মাধ্যমে আবু আইয়ুবের সূত্রে প্রচারিত একটি বর্ণনাও রয়েছে। ফলে একই বক্তব্যের বিভিন্ন সূত্র পাওয়া গেলেও সেগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাধিক স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে গণনা করা যায় না।

কুরতুবি তাঁর আল-জামি লি আহকামিল কুরআন তাফসিরে সূরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় এই হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। সেখানে ইব্রাহিমের খৎনা এবং খৎনার ধর্মীয় বিধান নিয়ে আলোচনার সময় তিনি বলেছেন, কিছু মালিকি আইনজ্ঞ হাজ্জাজ ইবনে আরতাতের মাধ্যমে শাদ্দাদ ইবনে আওসের নামে বর্ণিত এই বক্তব্যকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এরপর কুরতুবি নিজেই জানিয়েছেন, হাজ্জাজ নির্ভরযোগ্য দলিল হওয়ার উপযুক্ত নন। কুরতুবির বক্তব্যে তাই দুটি পৃথক বিষয় নথিভুক্ত রয়েছে: হাদিসটি ফিকহি যুক্তিতে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং তার বর্ণনাপথের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তিও ছিল। [90]

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : الختان سنة للرجال مكرمة للنساء . والحجاج ليس ممن يحتج به .

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ বলেছেন: খৎনা পুরুষদের জন্য সুন্নত এবং নারীদের জন্য সম্মানজনক কাজ। কিন্তু হাজ্জাজ এমন ব্যক্তি নন, যাঁর বর্ণনাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায়।

এই সনদগত দুর্বলতার কারণে বক্তব্যটিকে মুহাম্মদের নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। কিন্তু হাদিসটির সনদ দুর্বল হওয়া এবং নারী খৎনার ধর্মীয় ইতিহাসে এর ব্যবহার—দুটি পৃথক প্রশ্ন। বাইহাকি ও কুরতুবির বক্তব্য থেকেই প্রমাণিত হয়, দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও এই হাদিস ইসলামি গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে এবং খৎনাসংক্রান্ত আইনগত আলোচনায় ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী ফকিহদের কাছে একটি বক্তব্যের ধর্মীয় ও আইনগত প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়েছিল, তা নির্ধারণের জন্য শুধু বর্ণনার সনদ নয়, সেই বক্তব্যের পরবর্তী ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।


বাগাভির শরহুস সুন্নাহ: নারীর খৎনা, পবিত্রতা ও শৈশবের বয়স

ইমাম বাগাভি তাঁর শরহুস সুন্নাহ গ্রন্থের খৎনা অধ্যায়ে নারীর খৎনা সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। তিনি প্রথমে ফিতরাতের হাদিস উদ্ধৃত করে খৎনা ফরজ কি না, তা নিয়ে ফকিহদের মতপার্থক্য আলোচনা করেছেন। এরপর হাসান বসরির বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, পুরুষের জন্য খৎনা সুন্নত এবং নারীর জন্য এটি পবিত্রতার কাজ। একই আলোচনায় মাকহুলের সূত্রে মুহাম্মদের নামে “খৎনা পুরুষদের জন্য সুন্নত, নারীদের জন্য মাকরুমাহ” বক্তব্যটিও উদ্ধৃত হয়েছে। ফলে এখানে নারী খৎনার জন্য সম্মান ও পবিত্রতা—দুটি ধর্মীয় মূল্যায়ন পাশাপাশি পাওয়া যায়। [91]

قال الحسن في الختان: هو للرجال سنة، وللنساء طهرة. وروي عن مكحول، أن النبي صلى الله عليه وسلم، قال: “الختان سنة للرجال، مكرمة للنساء”.

বাংলা অনুবাদ: হাসান বসরি খৎনা সম্পর্কে বলেছেন: এটি পুরুষদের জন্য সুন্নত এবং নারীদের জন্য পবিত্রতার কাজ। মাকহুল থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ বলেছেন: খৎনা পুরুষদের জন্য সুন্নত এবং নারীদের জন্য সম্মানজনক কাজ।

বাগাভির একই অধ্যায়ে নারী খৎনা করানোর বয়স সম্পর্কেও একটি উল্লেখযোগ্য প্রশ্নোত্তর সংরক্ষিত রয়েছে। যায়েদ ইবনে আসলামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, একটি মেয়ের খফদ বা খৎনা কত বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া যায়। উত্তরে তিনি আট বছর বয়সের কথা বলেছেন। এটি মুহাম্মদের কোনো সরাসরি আদেশ নয়; বরং প্রাথমিক যুগের একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামে সংরক্ষিত মতামত। কিন্তু এই বিবরণ দেখায়, খৎনাকে নারীর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং অল্পবয়সী মেয়েদের শরীরে সম্পন্ন করার একটি প্রচলিত আচরণ হিসেবে আলোচনা করা হচ্ছিল। এখানে প্রশ্নটি অঙ্গচ্ছেদ করা হবে কি না, সেটি নয়; কোন বয়সে তা করা হবে। [92]

وسئل زيد بن أسلم عن خفض الجارية إلى متى يؤخر؟ قال: إلى ثمان سنين.

বাংলা অনুবাদ: যায়েদ ইবনে আসলামকে জিজ্ঞেস করা হলো, মেয়েশিশুর খৎনা কত বয়স পর্যন্ত বিলম্বিত করা যায়? তিনি বললেন: আট বছর বয়স পর্যন্ত।

এই প্রশ্নোত্তরের তাৎপর্য খৎনার বয়সসংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক মতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি মেয়ের যৌনাঙ্গে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া অঙ্গচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই অন্যদের হাতে নেওয়ার সামাজিক রীতির পরিচয়ও এতে পাওয়া যায়। যে বয়সে নিজের যৌনাঙ্গের স্থায়ী পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সম্পর্কে স্বাধীন ও অর্থবহ সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা একটি শিশুর নেই, সেই বয়সকেই এখানে ধর্মীয় অনুশীলনের উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। খৎনাকে পবিত্রতা বা সম্মানের ভাষায় বর্ণনা করার সামাজিক ফল হলো, একটি অঙ্গচ্ছেদকে শিশুর কল্যাণ ও ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া।


মালিকি ফিকহে মাকরুমাহ: কারাফির আয-যাখিরা

মালিকি মাযহাবের গুরুত্বপূর্ণ আইনজ্ঞ শিহাবুদ্দিন আল-কারাফি তাঁর আয-যাখিরা গ্রন্থে খৎনাকে ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত কাজ হিসেবে আলোচনা করেছেন। সেখানে আল-জাওয়াহির গ্রন্থের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি পুরুষের খৎনাকে সুন্নত এবং নারীর খৎনাকে মাকরুমাহ বলেছেন। এরপর মালিকি আইনশাস্ত্রে খৎনার বাধ্যতামূলকতা নিয়ে বিভিন্ন যুক্তি এবং অন্য মাযহাবের মতের সঙ্গে পার্থক্য আলোচনা করেছেন। তাঁর আলোচনায় ফিতরাতের হাদিস, ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসরণের নির্দেশ এবং খৎনাসংক্রান্ত অন্যান্য বর্ণনার ভিত্তিতে বিধান নির্ধারণের পদ্ধতি দেখা যায়। ফলে মাকরুমাহ ধারণাটি শুধু কোনো একটি হাদিসের শব্দ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; মালিকি ফিকহের বিধানগত ভাষাতেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। [93]

وَالْخِتَانُ، وَهُوَ سُنَّةٌ فِي الرِّجَالِ مَكَرُمَةٌ فِي النِّسَاءِ، وَيُسْتَحَبُّ خِتَانُ الصَّبِيِّ إِذَا أُمِرَ بِالصَّلَاةِ مِنَ السَّبْعِ إِلَى الْعَشْرِ

বাংলা অনুবাদ: খৎনা পুরুষদের জন্য সুন্নত এবং নারীদের জন্য সম্মানজনক কাজ। ছেলেশিশুকে যখন সাত থেকে দশ বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন তার খৎনা করানো সুপারিশকৃত।

কারাফির আলোচনায় নারীর খৎনাকে পুরুষের খৎনা থেকে পৃথক মর্যাদা দেওয়ার অর্থ নারীর খৎনা প্রত্যাখ্যান করা নয়। বরং নারী ও পুরুষের জন্য ধর্মীয় বিধানের শ্রেণি আলাদা করা হয়েছে। তিনি খৎনার বিধান ফরজ কি না, তা নির্ধারণে ফিকহি যুক্তি আলোচনা করেছেন এবং এই প্রসঙ্গে নারীর খৎনার ধর্মীয় স্বীকৃতি বহাল রেখেছেন। আগে আলোচিত শাফেয়ি মাযহাবে নারী খৎনাকে ফরজ বলা হয়েছে, অন্যদিকে এখানে মালিকি ফিকহে মাকরুমাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পার্থক্য ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার মাত্রায়; নারীর খৎনাকে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য একটি আচরণ হিসেবে বিবেচনা করার প্রশ্নে নয়।


মাকরুমাহ শব্দের প্রকৃত অর্থ: ইসলামওয়েবের সরাসরি ব্যাখ্যা

হাদিসটির মাকরুমাহ শব্দের অর্থ সম্পর্কে ইসলামওয়েবের ৫৬৮৯১ নম্বর ফতোয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। একজন প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, নারীর খৎনাকে মাকরুমাহ বলার অর্থ কী এবং এই শব্দের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে ইসলাম নারীদের সম্মান দিয়েছে—এমন অর্থ বোঝানো যায় কি না। ইসলামওয়েব উত্তরে জানিয়েছে, হাদিসটির সনদ দুর্বল। এরপর মাকরুমাহ শব্দটির ফিকহি অর্থ ব্যাখ্যা করে বলেছে, এর অর্থ একটি মুস্তাহাব বা সুপারিশকৃত কাজ। অর্থাৎ সম্মানজনক বলা হচ্ছে খৎনা করার আচরণটিকেই। কোনো নারীর সাধারণ মানবিক মর্যাদা কিংবা ইসলামে নারীর অবস্থান সম্পর্কে এটি একটি সামগ্রিক ঘোষণা নয়। [94]

أما كلمة مكرمة فقد فسرها أهل العلم بمستحبة، أي خصلة مستحبة

বাংলা অনুবাদ: মাকরুমাহ শব্দটিকে আলেমরা মুস্তাহাব অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন, অর্থাৎ একটি সুপারিশকৃত বা প্রশংসনীয় কাজ।

একই ফতোয়ায় প্রশ্নকারীর প্রস্তাবিত বিকল্প অর্থও ইসলামওয়েব প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, মাকরুমাহ বলতে সামগ্রিকভাবে ইসলাম নারীদের সম্মান দিয়েছে—এমন ব্যাখ্যা কোনো আলেমের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। সেই ব্যাখ্যাকে তারা অযৌক্তিক ও কষ্টকল্পিত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে হাদিসটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থগত বিতর্ক ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানটির নিজের বক্তব্যেই নিষ্পত্তি হয়েছে। এখানে নারীর খৎনাকে সম্মানজনক বলা হয়েছে; নারীর খৎনার পরিবর্তে নারীর সাধারণ সম্মানকে নির্দেশ করা হয়নি। [95]

وما ذكره السائل من أن معنى مكرمة أن الإسلام كرم المرأة .. فلم نطلع على من قال بهذا المعنى من أهل العلم

বাংলা অনুবাদ: প্রশ্নকারী মাকরুমাহ শব্দের অর্থ হিসেবে ইসলাম নারীকে সম্মান দিয়েছে বলে যা উল্লেখ করেছেন, আলেমদের মধ্যে কেউ এই অর্থ করেছেন বলে আমরা জানতে পারিনি।

এই ফতোয়ায় আরও একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। হাদিসটির সনদ দুর্বল বলে স্বীকার করার পরও নারীর খৎনাকে সুপারিশকৃত আচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী ফকিহদের বিধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইসলামকিউএর ৪২৭ নম্বর ফতোয়াতেও একই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মতপার্থক্যের কথা বলা হয়েছে এবং আলবানির সিলসিলাতুল আহাদিস আদ-দায়িফাহ গ্রন্থের ১৯৩৫ নম্বর বর্ণনার দিকে নির্দেশ করা হয়েছে। কিন্তু সেই ফতোয়ায় ইবনে কুদামার মাকরুমাহ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ব্যবহার করে নারীদের খৎনা বাধ্যতামূলক নয় বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট হাদিসটির প্রামাণিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ফিকহি অনুমোদনের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। [96]

নারীর খৎনাকে মাকরুমাহ বলার ধর্মীয় তাৎপর্য এখানেই। একটি আচরণকে বাধ্যতামূলক না বলেও তাকে প্রশংসনীয়, সুপারিশকৃত বা সম্মানজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। এর ফলে ধর্মীয় কর্তৃত্ব সরাসরি শাস্তির বিধান ছাড়াই একটি প্রথাকে সামাজিক স্বীকৃতি দিতে পারে। কোনো পরিবার যদি মনে করে মেয়ের খৎনা করানো ধর্মীয়ভাবে সম্মানজনক এবং আলেমদের অনুমোদিত, তাহলে মেয়ের শরীরে অঙ্গচ্ছেদ করানোর পক্ষে ইতিবাচক ধর্মীয় প্রণোদনা তৈরি হয়। প্রথাটিকে ফরজ না বলার কারণে সেই প্রণোদনা বিলুপ্ত হয় না। বরং বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে ধর্মীয় প্রশংসা ও সম্মানের ভাষা ব্যবহার করে একই আচরণের গ্রহণযোগ্যতা বজায় থাকে।

মুসনাদে আহমদের বর্ণনা, বাইহাকির সনদগত আপত্তি, বাগাভির পবিত্রতাসংক্রান্ত ব্যাখ্যা, কারাফির মালিকি ফিকহ এবং ইসলামওয়েবের মাকরুমাহ শব্দের অর্থ নির্ধারণ একত্রে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া প্রকাশ করে। মুহাম্মদের নামে প্রচারিত একটি দুর্বল সনদের বক্তব্য পরবর্তী ধর্মীয় আলোচনায় নারীর খৎনাকে সম্মানজনক আচরণ হিসেবে বর্ণনার উপাদান হয়েছে। এর সঙ্গে অন্য হাদিস ও ফিকহি যুক্তি যুক্ত হয়ে নারী খৎনার অনুমোদন বিভিন্ন মাযহাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাদিসটির প্রামাণিকতা এবং এর সামাজিক প্রভাব একই বিষয় নয়। বর্ণনাটি মুহাম্মদের নির্ভরযোগ্য বক্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও ইসলামি ধর্মীয় সাহিত্যে সেটির ব্যবহার ও প্রভাব নথিভুক্ত রয়েছে। কোনো প্রথাকে ধর্মীয় সম্মানের মর্যাদা দেওয়া সেই প্রথার শারীরিক প্রকৃতি পরিবর্তন করে না। নারীর খৎনার ক্ষেত্রে মাকরুমাহ শব্দটি অপ্রয়োজনীয় যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদের ওপর ইতিবাচক ধর্মীয় মূল্যায়ন আরোপ করেছে; সেই মূল্যায়ন অঙ্গচ্ছেদটির চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা বা নৈতিক বৈধতার প্রমাণ নয়।


উপসংহার

নারীর খৎনা বা নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণকে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কহীন, নিছক স্থানীয় সংস্কৃতি কিংবা ধর্মীয় ভিত্তিহীন একটি প্রথা হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামি হাদিস, ইতিহাস ও আইনশাস্ত্রের সংরক্ষিত দলিলের সঙ্গে অসংগত। সহিহ হাদিসে নারীর খৎনাস্থানের উল্লেখ রয়েছে, আয়েশার পরিবারের মেয়েদের খৎনার ঘটনা সংরক্ষিত হয়েছে এবং মুহাম্মদের নামে নারীর খৎনা করার পদ্ধতি ও মর্যাদা সম্পর্কে পৃথক বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব বর্ণনার সবগুলোর প্রামাণিকতা সমান নয়। বিশেষত নারীর খৎনাকে মাকরুমাহ বা সম্মানজনক কাজ ঘোষণাকারী হাদিসটির সনদগত দুর্বলতা ধ্রুপদি হাদিসবিশারদরাই চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট হাদিসের সনদ দুর্বল হওয়ার কারণে ইসলামি আইনশাস্ত্রে নারীর খৎনার দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্বীকৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায় না। শাফেয়ি মাযহাবে নারী খৎনাকে ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে; হাম্বলি, হানাফি ও মালিকি ফিকহে এর ধর্মীয় মর্যাদা ও বিধান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সমকালীন ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশও এই প্রথাকে শরিয়াহসম্মত, সুপারিশকৃত কিংবা সম্মানজনক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে ইসলামের ধর্মীয় সাহিত্য ও আইনগত ঐতিহ্যে নারীর খৎনার অবস্থান একটি নথিভুক্ত ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

এই ধর্মীয় স্বীকৃতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নারীর যৌনাঙ্গে অঙ্গচ্ছেদকে শুধু অনুমোদন দেওয়াই হয়নি, বরং তার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং গ্রহণযোগ্য মাত্রাও ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। উম্মু আতিয়্যার নামে প্রচারিত হাদিসে অতিরিক্ত গভীরভাবে না কাটার নির্দেশের সঙ্গে স্বামীর পছন্দের সম্পর্ক রয়েছে। ইবনে তাইমিয়া নারীর যৌনকামনা নিয়ন্ত্রণকে খৎনার উদ্দেশ্য হিসেবে সরাসরি চিহ্নিত করেছেন। হানাফি ফিকহের একটি বক্তব্যে নারীর খৎনাকে পুরুষের জন্য সম্মানজনক বিষয় বলা হয়েছে। এসব বক্তব্যে নারীর যৌনাঙ্গকে তার নিজের শারীরিক ও যৌন স্বাধীনতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে ধর্মীয় বিধান, সামাজিক সম্মান এবং পুরুষের যৌনস্বার্থের অধীন করা হয়েছে। আরও গুরুতর হলো, মাওয়ারদির সংরক্ষিত শাফেয়ি আইনগত আলোচনায় খৎনা না করানোর জন্য শাস্তি এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই শাস্তির ফলে মৃত্যুর পরও শাসকের দায়মুক্তির বিধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ কিছু ফিকহি অবস্থানে নারী খৎনা ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনের সীমা অতিক্রম করে শাস্তিমূলক কর্তৃত্বের প্রশ্নেও প্রবেশ করেছে।

সারা ও হাজেরার কাহিনি এই ধর্মীয় ঐতিহ্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক প্রকাশ করে। ইসলামি ইতিহাসগ্রন্থে সংরক্ষিত একটি উৎপত্তিকাহিনিতে নারীর খৎনার সূচনা ঘটেছে একজন দাসী নারীর বিরুদ্ধে ঈর্ষা ও প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে শারীরিক অঙ্গচ্ছেদের মাধ্যমে। কাহিনিটির ঐতিহাসিক সংঘটন নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; কিন্তু ইবনে আসীর সেই ঘটনাকে নারীর খৎনার প্রচলনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং ইবনে কাইয়্যিম তাকে পরবর্তী নারীদের সুন্নতের উৎপত্তির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একটি অধীনস্থ নারীর ওপর শাস্তিমূলক অঙ্গচ্ছেদের কাহিনি এভাবে ধর্মীয় অনুশীলনের উৎপত্তি ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়েছে। এই রূপান্তরের নৈতিক সমস্যা সুস্পষ্ট: একটি কাজের উৎপত্তি সম্পর্কে সহিংসতার বিবরণ সংরক্ষণ করেও সেই কাজকে পরবর্তী নারীদের জন্য ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রথার প্রাচীনত্ব কিংবা কোনো নবীর পরিবারের সঙ্গে তার কথিত সম্পর্ক অঙ্গচ্ছেদের নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে না।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ এই ধর্মীয় মূল্যায়নের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া নারী যৌনাঙ্গের সুস্থ টিস্যু অপসারণ বা ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই। বরং এর বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক এবং মানসিক জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে। অঙ্গচ্ছেদের পরিমাণ কমানো, জীবাণুমুক্ত যন্ত্র ব্যবহার করা কিংবা চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা এর চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করে না। একইভাবে একটি প্রক্রিয়াকে সুন্নত, মাকরুমাহ, মুস্তাহাব কিংবা ফরজ ঘোষণা করাও তার স্বাস্থ্যগত উপকারের প্রমাণ নয়। ইসলামকিউএর আলোচিত ফতোয়ায় কোনো বিধান মুহাম্মদের কাছ থেকে প্রমাণিত হলেই তার উপকারিতা ও ক্ষতিহীনতায় বিশ্বাস করার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মৌলিক পদ্ধতির বিপরীত। একটি শারীরিক প্রক্রিয়ার ক্ষতি ও উপকার নির্ধারিত হয় পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের ঘোষণায় নয়।

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মৌলিক নৈতিক প্রশ্নটি হলো একজন মানুষের শরীরের সুস্থ অংশ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অন্য কারও আছে কি না। বিশেষত একটি কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুতর, কারণ সে নিজের যৌনাঙ্গের স্থায়ী পরিবর্তনের বিষয়ে স্বাধীন ও অর্থবহ সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেনি। অভিভাবকের ধর্মবিশ্বাস, সমাজের প্রচলিত রীতি, কোনো আলেমের ফতোয়া কিংবা সম্ভাব্য স্বামীর যৌনপছন্দ শিশুটির শারীরিক অখণ্ডতার অধিকার বাতিল করতে পারে না। ধর্মীয় স্বাধীনতার অর্থ নিজের বিশ্বাস পালন করার অধিকার; অন্যের শরীরে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া স্থায়ী আঘাত সৃষ্টি করার সীমাহীন অধিকার নয়। যে সিদ্ধান্ত শিশুটির ভবিষ্যৎ যৌনস্বাস্থ্য ও শারীরিক স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই সিদ্ধান্ত তার নিজের অংশগ্রহণ ও সম্মতির সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই অন্যরা গ্রহণ করছে। ধর্মীয় সম্মানের ভাষা ব্যবহার করে এই ক্ষমতাগত অসমতা দূর করা যায় না।

নারীর খৎনার ইতিহাস তাই শুধু একটি প্রাচীন ধর্মীয় প্রথার ইতিহাস নয়; এটি নারীর শরীরের ওপর সামাজিক, যৌননৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও। ধ্রুপদি ফিকহে অঙ্গচ্ছেদকে বাধ্যতামূলক বা প্রশংসনীয় করা হয়েছে, ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নারীর যৌনকামনা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য স্বীকৃত হয়েছে এবং সমকালীন কিছু ফতোয়ায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের আপত্তির বিপরীতেও এর ধর্মীয় বৈধতা বজায় রাখার চেষ্টা হয়েছে। এসব দলিলের সম্মিলিত তাৎপর্য হলো, নারী খৎনার সঙ্গে ইসলামি আইনশাস্ত্রের সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সেই সম্পর্কের অস্তিত্ব প্রথাটির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। কোনো ধর্মীয় বিধান মানুষের শারীরিক ক্ষতি করার অনুমোদন দিলে, সেই বিধানের ধর্মীয় পরিচয় তার ক্ষতিকে কল্যাণে পরিণত করে না। নারীর যৌনাঙ্গে অপ্রয়োজনীয় অঙ্গচ্ছেদকে সম্মানজনক ঘোষণা করলেও সেটি অঙ্গচ্ছেদই থাকে; ধর্মীয় কর্তৃত্ব দিয়ে তাকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োজনীয় কিংবা নৈতিকভাবে ন্যায়সংগত প্রমাণ করা যায় না।



তথ্যসূত্রঃ
  1. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Female Genital Mutilation, ৩১ জানুয়ারি ২০২৫ 1 2 3
  2. ইউনিসেফ, What Is Female Genital Mutilation? ↩︎
  3. জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, Female Genital Mutilation, ২০২৬ ↩︎
  4. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, New Study Highlights Multiple Long-Term Health Complications from Female Genital Mutilation, ১৪ এপ্রিল ২০২৫ ↩︎
  5. জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, Female Genital Mutilation ↩︎
  6. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Sexual and Reproductive Health Research: Female Genital Mutilation ↩︎
  7. আল-মাওয়ারদি, আল-হাবিউল কাবির, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৪৩১, খৎনার বিধান ↩︎
  8. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৪৫৫২৮, الفوائد الطبية من ختان البنات ↩︎
  9. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১২১৬৮১, القول الراجح في حكم ختان النساء ↩︎
  10. ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১১৪, مسألة المرأة هل تختتن; ইসলামওয়েব ↩︎
  11. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Types of Female Genital Mutilation ↩︎
  12. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Type I Female Genital Mutilation এবং উপশ্রেণি Ia ও Ib ↩︎
  13. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Type II Female Genital Mutilation এবং উপশ্রেণি IIa, IIb ও IIc ↩︎
  14. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Type III Female Genital Mutilation: Infibulation ↩︎
  15. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, WHO Guideline on the Prevention of Female Genital Mutilation and Clinical Management of Complications, ২৮ এপ্রিল ২০২৫ ↩︎
  16. জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, Female Genital Mutilation: Frequently Asked Questions 1 2 3
  17. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Type IV Female Genital Mutilation ↩︎
  18. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, FGM প্রতিরোধ ও জটিলতার চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশিকা, ২০২৫ ↩︎
  19. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, WHO Guideline on the Prevention of Female Genital Mutilation and Clinical Management of Complications, ২০২৫ ↩︎
  20. জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, অনুচ্ছেদ ১৯ ও ২৪, ইউনিসেফ ↩︎
  21. CEDAW, অনুচ্ছেদ ৫(ক), জার্মান ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস ↩︎
  22. আফ্রিকান কমিশন অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস, মাপুতো প্রটোকল, অনুচ্ছেদ ৫: Elimination of Harmful Practices ↩︎
  23. ইউরোপ কাউন্সিল, Istanbul Convention, অনুচ্ছেদ ৩৮ ও ৪২ ↩︎
  24. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, WHO Guideline on the Prevention of Female Genital Mutilation and Clinical Management of Complications, Executive Summary, ২০২৫ ↩︎
  25. ইউনিসেফ, Female Genital Mutilation Country Profiles, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ↩︎
  26. ইউনিসেফ, Female Genital Mutilation: A Global Concern, ২০২৪ 1 2
  27. ইউনিসেফ, ৩১টি দেশের নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণসংক্রান্ত পরিসংখ্যান, ২০২৬ ↩︎
  28. ইউনিসেফ, A Statistical Overview of Female Genital Mutilation in Indonesia, ২০২৬, পৃষ্ঠা ১ ↩︎
  29. Majelis Ulama Indonesia, Apa Hukum dan Kajian tentang Sunat bagi Perempuan, ৯ ডিসেম্বর ২০২১ ↩︎
  30. Majelis Ulama Indonesia, Fatwa No. 9A Tahun 2008, Hukum Pelarangan Khitan Terhadap Perempuan ↩︎
  31. ইউনিসেফ, ইন্দোনেশিয়ার নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণসংক্রান্ত আইন ও পরিসংখ্যান, ২০২৬ ↩︎
  32. ইন্দোনেশিয়ার আলেম পরিষদ, নারী খৎনা নিষিদ্ধকরণ বিষয়ে ফতোয়া ↩︎
  33. জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, Female Genital Mutilation: Causes and Social Norms ↩︎
  34. জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, Harmful Norms: Female Genital Mutilation ↩︎
  35. জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, FGM-এর সামাজিক ও যৌননৈতিক কারণসমূহ ↩︎
  36. জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও সামাজিক কারণ ↩︎
  37. ইন্দোনেশিয়ার আলেম পরিষদ, নারী খৎনার ইসলামি বিধানসংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
  38. ইউনিসেফ–ইউএনএফপিএ, ২০২৪ সালের যৌথ কর্মসূচির বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৫ ↩︎
  39. জাতিসংঘের যৌথ বিবৃতি, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ↩︎
  40. ইমাম নববী, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৯, ইসলামওয়েব ↩︎
  41. ইমাম নববী, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৯–৩৫০ ↩︎
  42. আল-মাওয়ারদি, আল-হাবিউল কাবির, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৪৩০–৪৩২ ↩︎
  43. আল-মাওয়ারদি, আল-হাবিউল কাবির, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৪৩৩–৪৩৪ ↩︎
  44. আল-মাওয়ারদি, আল-হাবিউল কাবির, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৪৩০–৪৩১, ইমাম শাফেয়ির বক্তব্য ↩︎
  45. উমদাতুস সালিক, Reliance of the Traveller, মূল পোস্টে ব্যবহৃত গ্রন্থের অনলাইন কপি ↩︎
  46. ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩–৬৪, খৎনার বিধান, ইসলামওয়েব ↩︎
  47. ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, খৎনার বিধানসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
  48. ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৫১–৭৫২, ইসলামওয়েব ↩︎
  49. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ১২১৬৮১, القول الراجح في حكم ختان النساء, ১১ মে ২০০৯ ↩︎
  50. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৬০৩১৪, ختان البنات وإنكار بعض الأطباء له, ২৪ আগস্ট ২০০৫ ↩︎
  51. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৮৯১ ↩︎
  52. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭ ↩︎
  53. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৮২৮৫৯, هل ورد حديث صحيح في ختان الإناث, ১৪ মে ২০০৬ ↩︎
  54. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৪৯, যৌনমিলনের পরে গোসলের বিধান ↩︎
  55. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৬০৮ ↩︎
  56. সুনানে তিরমিজী, হাদিস ১০৮ ↩︎
  57. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৬১১, মূল আরবি ও ইংরেজি অনুবাদ ↩︎
  58. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৬১১, বাংলা অনুবাদ ↩︎
  59. ইমাম নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, খণ্ড ৪, দুই খৎনাস্থান মিলিত হলে গোসলের বিধান ↩︎
  60. ইমাম নববী, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৮–১৪৯ ↩︎
  61. বদরুদ্দীন আইনি, উমদাতুল কারি শরহ সহিহ বুখারি, ‘দুই খৎনাস্থান মিলিত হলে’ অধ্যায়ের ব্যাখ্যা ↩︎
  62. আল-আদাবুল মুফরাদ, খৎনা অধ্যায়, উম্মু আলকামার বর্ণনা, Sunnah.com ↩︎
  63. আল-আদাবুল মুফরাদ, আহসান পাবলিকেশন, হাদিস ১২৫৯ ↩︎
  64. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৮২৮৫৯, নারী খৎনার পক্ষে হাদিসের দলিল ↩︎
  65. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫২৭১, খৎনাসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
  66. সুনান আবু দাউদ, আল্লামা আলবানি একাডেমি, হাদিস ৫২৭১ ↩︎
  67. সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৫১৮১ ↩︎
  68. সুনানে আবু দাউদ ৫২৭১: আবু দাউদের মন্তব্য ও আলবানির শ্রেণিবিন্যাস ↩︎
  69. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৬০৩১৪, ختان البنات وإنكار بعض الأطباء له 1 2
  70. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৮২৮৫৯, هل ورد حديث صحيح في ختان الإناث ↩︎
  71. ইমাম বাগাভি, শরহুস সুন্নাহ, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১১০–১১২, খৎনা অধ্যায় ↩︎
  72. মোল্লা আলি আল-কারি, মিরকাতুল মাফাতিহ, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৮৩৪, হাদিস ৪৪৬৪-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  73. ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১১৪, مسألة المرأة هل تختتن ↩︎
  74. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, Female Genital Mutilation: No Health Benefits, Only Harm, ২০২৫ ↩︎
  75. ফাতাওয়ায়ে আলবানি, মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানি, বাংলা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ১৭৪ ↩︎
  76. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসমাইলের জন্ম ও হাজেরার বিবরণ, ইসলামওয়েব ↩︎
  77. ইবনে আসীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, ইসমাইলের জন্ম ও মক্কায় আগমনের বিবরণ ↩︎
  78. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫৪–৩৫৬, ইসলামওয়েবের সংস্করণ ↩︎
  79. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর, প্রথম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৩৪৯–৩৫০ ↩︎
  80. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, আরবি মূল, ইসলামওয়েব ↩︎
  81. ইবনে আসীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯২–৯৩, ذكر ولادة إسماعيل وحمله إلى مكة ↩︎
  82. ইবনে কাইয়্যিম, তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলুদ, খৎনার উদ্দেশ্য ও উপকারিতাসংক্রান্ত অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৮৯ ↩︎
  83. ইবনে কাইয়্যিম, তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলুদ, খৎনার উপকারিতা ও হাজেরার খৎনাসংক্রান্ত বিবরণ ↩︎
  84. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২৮৩২২২, قصة ثقب سارة أذن هاجر ↩︎
  85. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২৩৯১৭৪, হাজেরা প্রথম খৎনাকৃত নারী ছিলেন কি না ↩︎
  86. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২৩৯১৭৪, কাহিনিটির সনদ ও ঐতিহাসিক প্রামাণিকতার মূল্যায়ন ↩︎
  87. মুসনাদে আহমদ, উসামা আল-হুযালির বর্ণনা, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৫; ইসলামওয়েব ↩︎
  88. সিন্ধি, হাশিয়াতু মুসনাদিল ইমাম আহমদ, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ২৪৬, উসামা আল-হুযালির হাদিসের ব্যাখ্যা ↩︎
  89. বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩২৫, খৎনাসংক্রান্ত অধ্যায়, বর্ণনা ১৭০১০ ↩︎
  90. কুরতুবি, আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, সূরা বাকারা ২:১২৪-এর তাফসির, খৎনা বিষয়ে পঞ্চম আলোচনা ↩︎
  91. বাগাভি, শরহুস সুন্নাহ, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১১০–১১২, باب الختان ↩︎
  92. বাগাভি, শরহুস সুন্নাহ, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১১১, যায়েদ ইবনে আসলামের বক্তব্য ↩︎
  93. আল-কারাফি, আয-যাখিরা, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ২৭৯–২৮০, النوع السابع: الفطرة ↩︎
  94. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৫৬৮৯১, ختان الإناث وتكريم الإسلام للمرأة, ১৫ ডিসেম্বর ২০০৪ ↩︎
  95. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৫৬৮৯১, মাকরুমাহ শব্দের অর্থ ও প্রশ্নকারীর ব্যাখ্যার জবাব ↩︎
  96. ইসলামকিউএ, ফতোয়া ৪২৭, ختان الإناث ليس بواجب, ৪ আগস্ট ১৯৯৯ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.