ভূমিকা
ইসলামি বয়ানে ইবলিশকে মানুষের পথভ্রষ্টতা, কুমন্ত্রণা ও পাপের প্রধান প্ররোচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আদমকে সিজদা করার নির্দেশ অমান্য করার পর তাকে অভিশপ্ত করা হয়, এরপর সে মানুষের সরল পথে ওত পেতে বসার ঘোষণা দেয়। এই পরিচিত কাহিনির ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়: ইবলিশ যখন নিজেই প্রথম পথভ্রষ্ট হলো, তখন তাকে কে পথভ্রষ্ট করেছিল? মানুষের পাপের ক্ষেত্রে শয়তানকে প্ররোচক হিসেবে হাজির করা সম্ভব; কিন্তু শয়তানের নিজের প্রথম অবাধ্যতার আগে তো আরেকটি শয়তান ছিল না, যাকে তার পথভ্রষ্টতার কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়।
কোরআনের বয়ান এই প্রশ্নটিকে আরও জটিল করে তোলে। ইবলিশ নিজের পথভ্রষ্টতাকে আল্লাহর কাজ হিসেবেই বর্ণনা করে—“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।” এটিকে শুধু ইবলিশের মিথ্যা অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও সহজ নয়, কারণ ধ্রুপদী তাফসির এবং সুন্নি আকীদার ব্যাখ্যাগুলোতে আল্লাহর হেদায়াত ও পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতাকে সরাসরি স্বীকার করা হয়েছে। এমনকি কিছু ধ্রুপদী তাফসিরে “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন” বাক্যের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে—আল্লাহ তার অন্তরে বিভ্রান্তি, অবাধ্যতা ও অহংকার ঘটিয়েছেন; আবার অন্য ব্যাখ্যায় সরাসরি “আপনি আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন” অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু ইবলিশের অভিযোগ কী ছিল তা নয়; ইসলামি উৎসগুলো সেই অভিযোগকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছে এবং সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে ইবলিশের নৈতিক দায় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিই মূল বিষয়।
ইবলিশের বক্তব্য: “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”
সূরা আরাফে আদমকে সিজদা করতে অস্বীকার করার পর ইবলিশকে অপমানিত অবস্থায় বের হয়ে যেতে বলা হয়। ইবলিশ পুনরুত্থান পর্যন্ত সময় চায় এবং সেই সময় পাওয়ার পর তার পরবর্তী বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে আল্লাহকে সরাসরি সম্বোধন করে নিজের পথভ্রষ্টতার কারণ আল্লাহর ওপর আরোপ করে বলে—“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”; এরপর ঘোষণা করে যে সেও মানুষের সরল পথে ওত পেতে বসবে। [1]
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ
বাংলা অনুবাদ:“সে বলল, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন; সে কারণে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে ওত পেতে বসে থাকব। তারপর আমি অবশ্যই তাদের কাছে আসব তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে; আর আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না।’”
এখানে আরবি শব্দটি হলো أَغْوَيْتَنِي—“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”। এটিকে এমনভাবে অনুবাদ করা যায় না যেন ইবলিশ শুধু বলছে, “আমি নিজে পথভ্রষ্ট হয়েছি।” ক্রিয়ার কর্তা এখানে আল্লাহ; ইবলিশ আল্লাহকেই সম্বোধন করছে। Islamweb-এ এই আয়াত নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল: ইবলিশ নিজেই তো সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল, তাহলে সে কেন বলছে আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন? Islamweb-এর উত্তর শুধু শব্দটির অর্থ “পথভ্রষ্ট করা ও দূরে সরিয়ে দেওয়া” বলেই থামেনি; তারা আল-কুরতুবির ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে বলেছে, এর অর্থ—আল্লাহ তার অন্তরে গোমরাহি, একগুঁয়েমি ও অহংকার ঘটিয়েছেন। এরপর আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইবলিশ এই কথা বলেছিল কারণ সে জানত পথভ্রষ্ট করা যেমন আল্লাহর হাতে, হেদায়াতও তেমনি আল্লাহর হাতে; এবং আহলুস সুন্নাহর আকীদার অংশই হলো আল্লাহ যাকে চান হেদায়াত দেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। [2]
فاعلم أولا أن الإغواء هو الإضلال والإبعاد، والشيطان اللعين خاطب الله سبحانه وتعالى بهذا الكلام، ومعنى قوله: فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي أي فبما أوقعت في قلبي من الغي والعناد والاستكبار كما قال القرطبي في تفسيره، وإبليس قال ذلك لعلمه أن الإضلال بيد الله تعالى كما أن الهداية بيده أيضا، فكما أن الله يهدي من يشاء فضلا منه تعالى فهو يضل كذلك من يشاء عدلا كما قال تعالى: قُلْ إِنَّ اللهَ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ أَنَابَ {الرعد:27} وكما قال تعالى: وَلَوْ شَاءَ اللهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَكِنْ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ {النحل:93} وكما قال تعالى: فَإِنَّ اللهَ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ إِنَّ اللهَ عَلِيمٌ بِمَا يَصْنَعُونَ {فاطر:8} وكما قال تعالى: مَنْ يَشَإِ اللهُ يُضْلِلْهُ وَمَنْ يَشَأْ يَجْعَلْهُ عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ {الأنعام:39} والآيات في هذا المعنى كثيرة في القرآن، فإبليس يعلم أن الله تعالى أضله لما في قلبه من الكبر والحسد والبغي، والله تعالى لا يضل إلا الفاسقين كما قال تعالى: وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الفَاسِقِينَ {البقرة:26} وإبليس فسق كما قال تعالى: إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ {الكهف:50} فاستحق الإغواء والإضلال جزاء وفاقا، ومن عقيدة أهل السنة والجماعة أن الله يهدي ويضل كما دل على ذلك القرآن والسنة بخلاف بعض الفرق المنحرفة الذين ينفون أفعال الله تعالى وينفون القدر.
বাংলা অনুবাদ:“প্রথমে জেনে রাখুন, ‘ইগওয়া’ অর্থ পথভ্রষ্ট করা ও দূরে সরিয়ে দেওয়া। অভিশপ্ত শয়তান এই কথার মাধ্যমে আল্লাহকে সম্বোধন করেছে। ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন’—এর অর্থ, যেমন কুরতুবি তাঁর তাফসিরে বলেছেন: ‘আপনি আমার অন্তরে গোমরাহি, একগুঁয়েমি ও অহংকার সৃষ্টি করেছেন।’ ইবলিশ এ কথা বলেছিল কারণ সে জানত, পথভ্রষ্ট করা আল্লাহর হাতে, যেমন হেদায়াতও তাঁর হাতে। আল্লাহ যেমন অনুগ্রহ করে যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন, তেমনি ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ বলেছেন: ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে তাঁর দিকে ফিরে আসে তাকে তিনি নিজের দিকে পথ দেখান’ [রা‘দ ১৩:২৭]। তিনি আরও বলেছেন: ‘আল্লাহ চাইলে তোমাদের এক জাতি করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন’ [নাহল ১৬:৯৩]। আরও বলেছেন: ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন’ [ফাতির ৩৫:৮] এবং ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথে স্থাপন করেন’ [আনআম ৬:৩৯]। কোরআনে এই অর্থের বহু আয়াত আছে। ইবলিশ জানত যে তার অন্তরের অহংকার, হিংসা ও সীমালঙ্ঘনের কারণে আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন। আল্লাহ শুধু ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন। ইবলিশও তার রবের আদেশ অমান্য করে ফাসিক হয়েছিল; ফলে সে প্রতিফল হিসেবে গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতার যোগ্য হয়েছিল। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদার অন্তর্ভুক্ত হলো—আল্লাহ হেদায়াত দেন এবং পথভ্রষ্টও করেন, যেমন কোরআন ও সুন্নাহ প্রমাণ করে; এর বিপরীতে কিছু বিচ্যুত দল আল্লাহর কর্ম ও তাকদীর অস্বীকার করে।”
Islamweb এখানে একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যাখ্যাও যোগ করেছে: আল্লাহ ইবলিশকে বিনা কারণে পথভ্রষ্ট করেননি; ইবলিশের অহংকার ও অবাধ্যতার প্রতিফল হিসেবে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা একটি পরবর্তী নৈতিক কারণ প্রস্তাব করে; আল্লাহই ইবলিশকে পথভ্রষ্ট করেছেন—এই মূল দাবিটি অস্বীকার করে না। বরং তারা স্পষ্টভাবে সেটিই স্বীকার করে এবং এটিকে আহলুস সুন্নাহর আকীদার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ফলে বিতর্কটি “আল্লাহ ইবলিশকে পথভ্রষ্ট করেছেন কি না”—এখানে নয়; তাদের নিজের উত্তর অনুযায়ী করেছেন। বিতর্ক হচ্ছে, সেই পথভ্রষ্টকরণের আগে ইবলিশের প্রথম অহংকার ও অবাধ্যতার কারণ কী ছিল এবং সেই প্রথম বিচ্যুতিকে আল্লাহর সর্বব্যাপী ইচ্ছা ও সৃষ্টির বাইরে রাখা যায় কি না।
ইবন কাসীরের তাফসিরও `أغويتني`-কে একই সরাসরি অর্থে ব্যাখ্যা করে। তিনি ইবন আব্বাসের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, এর অর্থ “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”; তারপর ব্যাখ্যা করেন, ইবলিশ বলছে সে আদমের সন্তানদের আল্লাহর সরল পথ থেকে সরাবে—“আপনি আমাকে যেভাবে পথভ্রষ্ট করেছেন, সেই কারণে”। [3]
يخبر تعالى أنه لما أنظر إبليس إلى يوم يبعثون واستوثق إبليس بذلك، أخذ في المعاندة والتمرد، فقال: فبما أغويتني لأقعدن لهم صراطك المستقيم أي: كما أغويتني. قال ابن عباس: كما أضللتني. وقال غيره: كما أهلكتني لأقعدن لعبادك – الذين تخلقهم من ذرية هذا الذي أبعدتني بسببه – على صراطك المستقيم، أي: طريق الحق وسبيل النجاة، ولأضلنهم عنها لئلا يعبدوك ولا يوحدوك بسبب إضلالك إياي. وقال بعض النحاة: الباء هاهنا قسمية، كأنه يقول: فبإغوائك إياي لأقعدن لهم صراطك المستقيم.
বাংলা অনুবাদ:“আল্লাহ জানান, ইবলিশকে পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত অবকাশ দেওয়া হলে এবং সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর বিদ্রোহ ও অবাধ্যতায় প্রবৃত্ত হলো এবং বলল, ‘আপনি আমাকে যেভাবে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব।’ ইবন আব্বাস বলেছেন: এর অর্থ, ‘আপনি যেমন আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।’ অন্যরা বলেছেন: ‘আপনি যেমন আমাকে ধ্বংস করেছেন, তেমনি আমি আপনার সেই বান্দাদের জন্য—যাদের আপনি এই আদমের বংশধর হিসেবে সৃষ্টি করবেন, যার কারণে আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন—আপনার সরল পথে বসে থাকব’; অর্থাৎ সত্যের পথ ও মুক্তির পথে। ‘আমি তাদের সেই পথ থেকে বিচ্যুত করব, যাতে তারা আপনার ইবাদত ও একত্ব স্বীকার না করে—কারণ আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।’ কিছু ব্যাকরণবিদ বলেছেন, এখানে ‘বা’ শপথের অর্থে; যেন সে বলছে, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন—এই শপথে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব।’”
আল-তাবারির ব্যাখ্যা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি শুধু ইবলিশের বক্তব্যকে আল্লাহর প্রতি পথভ্রষ্টকরণ আরোপ হিসেবে গ্রহণ করেননি; মুহাম্মদ ইবন কা‘ব আল-কুরাজির একটি বক্তব্যও সংরক্ষণ করেছেন যেখানে কাদরিয়াদের সমালোচনা করে বলা হয়—“ইবলিশ তাদের চেয়েও আল্লাহ সম্পর্কে বেশি জানত।” কারণ ইবলিশ অন্তত নিজের পথভ্রষ্টতাকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত করেছিল। তাবারি এরপর ইবলিশের ঘোষণার অর্থ করেন: সে মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য থেকে বিরত করবে এবং “আপনি আমাকে যেভাবে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের পথভ্রষ্ট করব; আপনি আমাকে যেভাবে বিপথে নিয়েছেন, আমিও তাদের বিপথে নেব।” [4]
أضاف ذلك إليه فقال: فبما أغويتني. وكذلك قال محمد بن كعب القرظي فيما حدثني موسى بن عبد الرحمن المسروقي قال، حدثنا زيد بن الحباب قال، حدثنا أبو مودود، سمعت محمد بن كعب القرظي يقول: قاتل الله القدرية، لإبليس أعلم بالله منهم! وأما قوله: لأقعدن لهم صراطك المستقيم، فإنه يقول: لأجلسن لبني آدم صراطك المستقيم، يعني: طريقك القويم، وذلك دين الله الحق، وهو الإسلام وشرائعه. وإنما معنى الكلام: لأصدن بني آدم عن عبادتك وطاعتك، ولأغوينهم كما أغويتني، ولأضلنهم كما أضللتني.
বাংলা অনুবাদ:“সে এই পথভ্রষ্টতাকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত করে বলল: ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।’ মুহাম্মদ ইবন কা‘ব আল-কুরাজি বলেছেন: ‘আল্লাহ কাদরিয়াদের ধ্বংস করুন; ইবলিশও তাদের চেয়ে আল্লাহ সম্পর্কে বেশি জানত!’ আর ‘আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব’—এর অর্থ হলো, আমি আদমসন্তানের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব; অর্থাৎ আপনার সঠিক পথ, যা আল্লাহর সত্য ধর্ম, ইসলাম ও তার বিধান। বক্তব্যটির অর্থ হলো: আমি আদমসন্তানকে আপনার ইবাদত ও আনুগত্য থেকে বাধা দেব; আপনি আমাকে যেভাবে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের পথভ্রষ্ট করব; এবং আপনি আমাকে যেভাবে বিপথে নিয়েছেন, আমিও তাদের বিপথে নেব।”
অতএব “শয়তান নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল, আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেননি”—এটি ধ্রুপদী সুন্নি তাফসিরের সরল পাঠ নয়। কোরআনে ইবলিশ নিজেই আল্লাহকে বলে, “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”; ইবন আব্বাসের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যায় এর অর্থ “আপনি আমাকে বিপথে নিয়েছেন”; ইবন কাসীর সেই অর্থ গ্রহণ করেন; তাবারি ইবলিশের পথভ্রষ্টতাকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত করেন; আর Islamweb স্পষ্টভাবে বলে, পথভ্রষ্ট করা আল্লাহর হাতে এবং আল্লাহ ইবলিশকে পথভ্রষ্ট করেছিলেন। তাদের আপত্তি পথভ্রষ্টকরণের ঘটনা নিয়ে নয়—তারা শুধু সেই ঐশ্বরিক পথভ্রষ্টকরণকে ইবলিশের পূর্ববর্তী অহংকার ও অবাধ্যতার ‘ন্যায্য প্রতিফল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু তখনও প্রথম কারণের প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে: যে অহংকার ও অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করলেন, সেই প্রথম অহংকার ও অবাধ্যতা কোথা থেকে এলো?
কোরআনের আয়াতে খুব স্পষ্টভাবেই কোনো জটিলতা না রেখে বলা আছে, আদমকে সৃষ্টির পরে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক আদমকে সিজদা না করায় আল্লাহ শয়তানকে অভিশাপ দিয়েছিল। এরপরেই সে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হলো। সেই অভিশাপ দেয়ার আগে শয়তান বলে কেউ ছিল না। তাহলে শয়তানকে কে কুমন্ত্রণা দিয়ে পথভ্রষ্ট করেছিল? [5] –
[Satan] said, “Because You have put me in error, I will surely sit in wait for them [i.e., mankind] on Your straight path.
— Saheeh International
(ইবলীস) বললঃ আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন এ কারণে আমিও শপথ করে বলছি – আমি আপনার সরল পথে অবশ্যই ওৎ পেতে বসে থাকব।
— Sheikh Mujibur Rahman
সে বলল, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সোজা পথে বসে থাকব।
— Rawai Al-bayan
সে বলল, ‘আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন, সে কারণে অবশ্যই অবশ্যই আমি আপনার সরল পথে মানুষের জন্য বসে থাকব [১]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন: শুধু অনুমতি নয়, সৃষ্টি ও নির্ধারণ
ইবলিশের “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন” বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ হিসেবে দেখলে পুরো ইসলামি তাকদীর-ব্যবস্থাটি ধরা পড়ে না। কোরআনের বহু আয়াতে হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতাকে সরাসরি আল্লাহর কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে—তিনি যাকে চান হেদায়াত দেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। সুন্নি আকীদার ব্যাখ্যাতেও এই বক্তব্যকে শুধু “আল্লাহ কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না” অর্থে নেওয়া হয়নি। Islamweb স্পষ্টভাবে বলেছে, হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা আল্লাহর হাতে; আল্লাহই হেদায়াতপ্রাপ্তকে হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং পথভ্রষ্টকে পথভ্রষ্ট করেন; মানুষের কাজও আল্লাহর সৃষ্টি; এবং মহাবিশ্বে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। [6]
فمعتقد أهل السنة والجماعة أن الهداية والإضلال بيد الله تعالى، وأنه سبحانه خالق أفعال العباد، وأنه هو الذي جعل المهتدي مهتديًا وجعل الضال ضالًّا، وأنه لا يقع شيء في هذا الكون إلا بمشيئته سبحانه، فمعنى يضل من يشاء ويهدي من يشاء: أنه يجعل من يشاء مهتديًا، ويجعل من يشاء ضالًّا، وليس معنى هذا نفي مسؤولية العبد عن أفعاله، بل العبد قد ضلّ بمشيئته واختياره وإرادته، ولكنه لم يفعل ذلك إلا بمشيئة الله واختياره، كما قال تعالى: لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ * وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ.
বাংলা অনুবাদ:“আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশ্বাস হলো, হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা আল্লাহর হাতে। আল্লাহই বান্দাদের কর্মের স্রষ্টা; তিনিই হেদায়াতপ্রাপ্তকে হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং পথভ্রষ্টকে পথভ্রষ্ট করেছেন; এবং এই মহাবিশ্বে তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। ‘তিনি যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হেদায়াত দেন’—এর অর্থ হলো, তিনি যাকে চান হেদায়াতপ্রাপ্ত করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। এর অর্থ বান্দার কর্মের দায় অস্বীকার করা নয়; বরং বান্দা নিজের ইচ্ছা, নির্বাচন ও সংকল্পে পথভ্রষ্ট হয়, কিন্তু সে তা করে কেবল আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্বাচনের মধ্যেই। যেমন আল্লাহ বলেছেন: ‘তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায় তার জন্য; আর তোমরা চাইতে পার না, যদি না বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ চান।’”
এই ব্যাখ্যায় দুটি বক্তব্য একসঙ্গে রাখা হয়েছে: বান্দা নিজের ইচ্ছায় পথভ্রষ্ট হয়, আবার সে সেই পথভ্রষ্টতা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে ঘটাতে পারে না এবং আল্লাহই তাকে পথভ্রষ্ট করেন। ফলে “ইবলিশ নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েছিল”—এ কথা বললেও ইসলামি তাকদীরের প্রশ্ন শেষ হয় না। কারণ সুন্নি কাঠামোর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী তার ইচ্ছা, তার কাজ এবং তার পথভ্রষ্ট হওয়া আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টির বাইরে স্বতন্ত্র কোনো ঘটনা নয়।
IslamQA এই অবস্থানকে আরও নির্দিষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করেছে। সেখানে প্রশ্ন ছিল—যদি সব মন্দের উৎস শয়তান হয়, তাহলে কোরআনে আল্লাহ নিজেকে কেন মানুষের পথভ্রষ্টকারী হিসেবে বর্ণনা করেন? উত্তরে IslamQA স্পষ্টভাবে দুটি ধরনের পথভ্রষ্টতার পার্থক্য করেছে। শয়তান মানুষের মধ্যে প্ররোচনা, কুমন্ত্রণা ও মন্দকে আকর্ষণীয় করে তোলে; কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে “পথভ্রষ্ট করা” অর্থ হলো পথভ্রষ্টতাকে মহাজাগতিকভাবে নির্ধারণ ও সৃষ্টি করা এবং মানুষের মধ্যে পথভ্রষ্টতার কারণসমূহ—কামনা, সংশয় ইত্যাদি—সৃষ্টি করা। [7]
كلما وجدت كلمة ( الإضلال ) منسوبة لله سبحانه ، فاعلم أنها بمعنى أن الله يقدر ذلك كونا ويخلقه في الناس ، ويخلق أسباب الضلال من شهوات وشبهات … أما إذا قصدت بكلمة ( الإضلال ) خلق فعل الضلال ، فهذا لا حرج في نسبته إلى الله سبحانه ، فالله عز وجل خلق أفعال العباد المتضمنة لجميع الحركات والسكنات ، سواء أدت إلى فعل الخير أم إلى فعل الشر … فالإضلال بمعنى الإرادة الكونية القدرية : أن يوجَدَ الضلال في الأرض … وأن يصيب الضلال بعض الناس بسبب فعل أنفسهم ، وما كسبته أيديهم.
বাংলা অনুবাদ:“যখনই ‘পথভ্রষ্ট করা’ শব্দটি আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত দেখতে পাবে, তখন বুঝবে এর অর্থ হলো—আল্লাহ মহাজাগতিকভাবে সেই পথভ্রষ্টতা নির্ধারণ করেন এবং মানুষের মধ্যে তা সৃষ্টি করেন; তিনি পথভ্রষ্টতার কারণসমূহও সৃষ্টি করেন, যেমন কামনা ও সংশয়। … আর ‘পথভ্রষ্ট করা’ বলতে যদি পথভ্রষ্টতার কাজটি সৃষ্টি করা বোঝানো হয়, তাহলে সেটি আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত করতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ আল্লাহ বান্দাদের সমস্ত কাজের স্রষ্টা—তাদের সব নড়াচড়া ও স্থিরতা, তা ভালো কাজের দিকে নিয়ে যাক বা মন্দ কাজের দিকে। … মহাজাগতিক ও তাকদীরগত ইচ্ছার অর্থে পথভ্রষ্ট করা হলো পৃথিবীতে পথভ্রষ্টতার অস্তিত্ব সৃষ্টি হওয়া … এবং কিছু মানুষ তাদের নিজেদের কাজ ও অর্জনের কারণে সেই পথভ্রষ্টতায় আক্রান্ত হওয়া।”
এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে আর শুধু “আল্লাহ জানতেন” বা “আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন” বলা হচ্ছে না। আল্লাহ পথভ্রষ্টতার কাজ সৃষ্টি করেন, পথভ্রষ্টতার কারণ সৃষ্টি করেন এবং মানুষের সমস্ত ভালো-মন্দ কাজের স্রষ্টা—IslamQA নিজেই এই ভাষা ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে তারা আবার মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও দায় বজায় রাখতে চায়। ফলে ইবলিশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়। যদি তার অহংকার, বিদ্রোহ, সিজদা প্রত্যাখ্যান এবং পরবর্তী পথভ্রষ্টতা—সবই বান্দার কাজের সেই সাধারণ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয় যার স্রষ্টা আল্লাহ, তাহলে “ইবলিশ নিজে বেছে নিয়েছিল” বলা কেবল কাজটির মানবীয় বা ব্যক্তিগত স্তরটি বর্ণনা করে; কাজটির কার্যকারণগত উৎসের প্রশ্নের জবাব দেয়না।
IslamQA-র নিজের সংক্ষিপ্তসার আরও স্পষ্ট: আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত পথভ্রষ্টতা হলো সৃষ্টি ও নির্ধারণ; শয়তানের দিকে সম্বন্ধিত পথভ্রষ্টতা হলো কুমন্ত্রণা, প্ররোচনা ও মন্দকে আকর্ষণীয় করা। অর্থাৎ মানুষের ক্ষেত্রে শয়তান মধ্যবর্তী প্ররোচক হতে পারে, কিন্তু সৃষ্টিগত স্তরে পথভ্রষ্টতার চূড়ান্ত নির্ধারণ ও সৃষ্টি আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত। এই কাঠামো ইবলিশের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সমস্যাজনক, কারণ ইবলিশের প্রথম বিচ্যুতির আগে তাকে প্ররোচিত করার জন্য আরেকজন শয়তানকে দাঁড় করানো যায় না।
ফলে কোরআন ও সুন্নি আকীদার সম্মিলিত বক্তব্যে ইবলিশের পথভ্রষ্টতা শুধু তার নিজের বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়। ইবলিশ নিজেই আল্লাহকে বলে, “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”; Islamweb বলে হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা আল্লাহর হাতে এবং আল্লাহই পথভ্রষ্টকে পথভ্রষ্ট করেন; IslamQA বলে আল্লাহ পথভ্রষ্টতা ও তার কারণ সৃষ্টি করেন এবং মানুষের ভালো-মন্দ সমস্ত কাজের স্রষ্টা। এরপরও যদি বলা হয় ইবলিশের পথভ্রষ্টতার সঙ্গে আল্লাহর কার্যকারণগত কোনো সম্পর্ক নেই, তা এই উৎসগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি অসঙ্গত।
“ইবলিশ আগে বেঁকে গিয়েছিল, তাই আল্লাহ পরে পথভ্রষ্ট করলেন”—প্রথম বিচ্যুতির সমস্যা
ধ্রুপদী সুন্নি ব্যাখ্যায় একটি পরিচিত উত্তর হলো—আল্লাহ কাউকে শুরুতেই বিনা কারণে পথভ্রষ্ট করেন না; ব্যক্তি আগে নিজে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, এরপর শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তার অন্তর আরও বেঁকিয়ে দেন, হেদায়াত থেকে বঞ্চিত করেন বা তার ওপর মোহর মেরে দেন। IslamQA এই নীতির পক্ষে সূরা সফের বক্তব্য উদ্ধৃত করে: “তারা যখন বেঁকে গেল, আল্লাহ তাদের অন্তর বেঁকিয়ে দিলেন।” তাদের ব্যাখ্যায় আল্লাহর পথভ্রষ্টকরণ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের পূর্ববর্তী স্বাধীন অবাধ্যতার শাস্তি। [8]
فالهداية الموجِبة للتوفيق وقبول الحق: لابد من توافر شروطها، وانتفاء موانعها؛ فقد أخبر الله سبحانه وتعالى بأن إضلاله لمن ضل وانحرف، إنما كان عقوبة له على أفعاله الصادرة منه باختياره وإرادته … قال تعالى: فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ … وفي القرآن ما يبين أن الطبع والختم والغشاوة لم يفعلها الله سبحانه وتعالى من أول وهلة، من حين أمر الله العبد بالإيمان، أو بينه له؛ وإنما فعله بعد تحقق الدعوة منه سبحانه، والتأكيد في البيان والإرشاد؛ ثم حصول الإعراض من المعرضين، والمبالغة في الكفر من الكافرين، جحدا، وعنادا؛ فحينئذ يطبع على قلوبهم ويختم عليها، فلا تقبل الهدى بعد ذلك.
বাংলা অনুবাদ:“যে হেদায়াত মানুষকে সত্য গ্রহণে সফল করে, তার কিছু শর্ত পূরণ এবং প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ জানিয়েছেন, যারা পথভ্রষ্ট ও বিচ্যুত হয়েছে তাদের তিনি যে পথভ্রষ্ট করেছেন, তা তাদের নিজেদের ইচ্ছা ও নির্বাচনে করা কাজের শাস্তি। … আল্লাহ বলেছেন: ‘তারা যখন বেঁকে গেল, আল্লাহ তাদের অন্তর বেঁকিয়ে দিলেন।’ … কোরআনে এমন বক্তব্য আছে যা দেখায়, আল্লাহ শুরুতেই—মানুষকে ঈমানের আদেশ দেওয়া বা সত্য বুঝিয়ে দেওয়ার মুহূর্তেই—তার অন্তরে মোহর, পর্দা বা বন্ধন আরোপ করেননি; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বান ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসার পর, মানুষ যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং কুফর, অস্বীকার ও একগুঁয়েমিতে বাড়াবাড়ি করে, তখন তিনি তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেন, ফলে তারা এরপর আর হেদায়াত গ্রহণ করে না।”
এই ব্যাখ্যা মানুষের দ্বিতীয় পর্যায়ের পথভ্রষ্টতার একটি কাঠামো দেয়: প্রথমে মানুষ নিজে বেঁকে যায়, তারপর আল্লাহ শাস্তি হিসেবে তাকে আরও পথভ্রষ্ট করেন। কিন্তু মানুষ এবং ইবলিশ উভয়ের ক্ষেত্রেই, প্রাথমিক বেঁকে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটার সময় কে পথভ্রষ্ট করেছিল, সেই প্রশ্ন চলে আসে। এক্ষেত্রে ঠিক এখানে আরো জটিল প্রশ্ন শুরু হয়, শেষ হয় না। যদি আল্লাহ তাকে পরে তার অহংকারের কারণে পথভ্রষ্ট করে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন হলো—সেই প্রথম অহংকার, হিংসা, বিদ্রোহ ও সিজদা প্রত্যাখ্যান কোথা থেকে এলো?
“সে নিজেই অহংকার করেছিল”—এটি ঘটনার বর্ণনা, কার্যকারণগত উত্তর নয়। কারণ সুন্নি তাকদীরের নিজের নীতি অনুযায়ী বান্দার কাজ আল্লাহর সৃষ্টি এবং কোনো কিছুই তাঁর ইচ্ছার বাইরে ঘটে না। Islamweb সরাসরি বলেছে, আল্লাহ বান্দাদের কাজের স্রষ্টা, আল্লাহই পথভ্রষ্টকে পথভ্রষ্ট করেন এবং বান্দা নিজের ইচ্ছায় পথভ্রষ্ট হলেও সেই কাজ আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্বাচনের বাইরে ঘটে না। [6]
فمعتقد أهل السنة والجماعة أن الهداية والإضلال بيد الله تعالى، وأنه سبحانه خالق أفعال العباد، وأنه هو الذي جعل المهتدي مهتديًا وجعل الضال ضالًّا، وأنه لا يقع شيء في هذا الكون إلا بمشيئته سبحانه … بل العبد قد ضلّ بمشيئته واختياره وإرادته، ولكنه لم يفعل ذلك إلا بمشيئة الله واختياره.
বাংলা অনুবাদ:“আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশ্বাস হলো, হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা আল্লাহর হাতে; তিনি বান্দাদের কাজের স্রষ্টা; তিনিই হেদায়াতপ্রাপ্তকে হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং পথভ্রষ্টকে পথভ্রষ্ট করেন; এবং এই মহাবিশ্বে তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। … বান্দা নিজের ইচ্ছা, নির্বাচন ও সংকল্পে পথভ্রষ্ট হয়, কিন্তু সে তা করে কেবল আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্বাচনের মধ্যেই।”
অতএব “আল্লাহ ইবলিশকে তার আগের পাপের শাস্তি হিসেবে পথভ্রষ্ট করেছেন” বললে সমস্যাটি কেবল এক ধাপ পেছনে সরে যায়। যদি তার প্রথম অহংকারও বান্দার কাজের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে সুন্নি আকীদা অনুযায়ী সেই অহংকারও আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর ইচ্ছার বাইরে নয়। এরপর বলা হচ্ছে সেই আল্লাহ-সৃষ্ট ও আল্লাহর ইচ্ছার মধ্যে সংঘটিত অহংকারের জন্য শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাকে আরও পথভ্রষ্ট করেছেন। এতে দ্বিতীয় পথভ্রষ্টতার কারণ বলা হয়, কিন্তু প্রথম বিচ্যুতির স্বাধীন উৎস প্রতিষ্ঠিত হয় না।
IslamQA-র আরেকটি ব্যাখ্যায় এই কার্যকারণ আরও খোলামেলা। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ পথভ্রষ্টতাকে শুধু সৃষ্টি করেন না, পথভ্রষ্টতার কারণসমূহ—কামনা ও সংশয়ও সৃষ্টি করেন; একই সঙ্গে মানুষের ভালো-মন্দ সমস্ত কাজও তাঁর সৃষ্টি। [7] এই বক্তব্য গ্রহণ করলে ইবলিশের প্রথম অহংকারের ক্ষেত্রে “সে নিজে থেকেই শুরু করেছিল”—এই উত্তর আরও দুর্বল হয়। কারণ তার অন্তরের প্রবণতা, তার কাজ এবং সেই কাজের কারণসমূহ যদি সৃষ্টিগতভাবে আল্লাহর অধীন হয়, তাহলে প্রথম বিচ্যুতিকে আল্লাহর কার্যকারণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বজায় রাখতে হবে। এসব উৎস কোথাও বলে না যে ইবলিশকে বাহ্যিক জোর প্রয়োগ করে সিজদা অস্বীকার করানো হয়েছিল। তারা বরং তার ইচ্ছা ও নির্বাচনকে স্বীকার করে। কিন্তু বাহ্যিক জবরদস্তি না থাকা এবং স্বাধীন চূড়ান্ত উৎস হওয়া এক বিষয় নয়। যদি তার ইচ্ছা, কাজ, অন্তরের প্রবণতা এবং সেই কাজ বাস্তব হওয়ার সমস্ত কারণ আল্লাহর সৃষ্টি ও ইচ্ছার অধীন হয়, তাহলে “সে নিজের ইচ্ছায় করেছে” বললে কেবল কার্যপ্রক্রিয়ার মধ্যবর্তী স্তরটি বলা হয়; তার ইচ্ছা ও অহংকারের চূড়ান্ত উৎসের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
এখানেই ইবলিশের ঘটনা মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সাধারণ “শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়েছে” ব্যাখ্যাকে ভেঙে দেয়। মানুষের পাপের ক্ষেত্রে বলা যায়, শয়তান তাকে প্ররোচিত করেছে। কিন্তু শয়তানের প্রথম বিদ্রোহের আগে এমন কোনো শয়তান নেই যে তাকে প্ররোচিত করেছিল। তখন ইসলামি তাকদীরের নিজের কাঠামোই সামনে আসে: আল্লাহই সমস্ত কাজের স্রষ্টা, পথভ্রষ্টতা ও তার কারণ সৃষ্টি করেন, তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছু ঘটে না, এবং ইবলিশ নিজেই বলে—“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।”
সুতরাং “ইবলিশ আগে নিজে বেঁকে গিয়েছিল, পরে আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”—এই উত্তর দ্বিতীয় পর্যায়ের পথভ্রষ্টতা ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু প্রথম বিচ্যুতির সমস্যা সমাধান করে না। বরং সুন্নি তাকদীরের নীতি মেনে চললে প্রশ্নটি আরও ধারালো হয়: যে প্রথম অহংকারের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ ইবলিশকে পথভ্রষ্ট করলেন, সেই অহংকার যদি আল্লাহর সৃষ্টি, ইচ্ছা ও নির্ধারণের বাইরে না হয়ে থাকে, তাহলে ইবলিশের প্রথম পথভ্রষ্টতার চূড়ান্ত কার্যকারণগত উৎস কে?
আহমদ আল-গাজ্জালি: “ইবলিশের কাছ থেকে তাওহীদ না শিখলে সে জিন্দিক”
ইবলিশের অবাধ্যতা ও পথভ্রষ্টতার প্রশ্ন ইসলামি চিন্তার ইতিহাসে শুধু কাদরিয়া, জাবরিয়া বা কালামের বিতর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কিছু প্রভাবশালী সুফি চিন্তক সমস্যাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক থেকে দেখেছিলেন। আবু হামিদ আল-গাজ্জালির ছোট ভাই, প্রসিদ্ধ সুফি বক্তা ও লেখক আহমদ আল-গাজ্জালি ইবলিশকে নিছক অহংকারী বিদ্রোহী হিসেবে না দেখে এমন এক চরম একত্ববাদী প্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে সিজদা করতে রাজি হয়নি। তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্য এতটাই স্পষ্ট যে ইবলিশকেই তিনি তাওহীদের শিক্ষক হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
এটি কোনো আধুনিক গবেষকের অনুমানমাত্র নয়। ইবন আল-জাওযি আহমদ আল-গাজ্জালির মৃত্যুবিবরণে সরাসরি লিখেছেন যে তিনি ইবলিশের পক্ষ নিতেন এবং তার জন্য অজুহাত পেশ করতেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই প্রসঙ্গে আল-গাজ্জালি ইবলিশের অবস্থাকে সরাসরি কাযা ও কদর বা ঐশী ফয়সালা ও তাকদীরের ভাষায় ব্যাখ্যা করেছিলেন। ইবন আল-জাওযি তাঁর আল-মুনতাযাম ফি তারীখ আল-মুলূক ওয়াল উমাম-এ আবুল ফুতূহ আহমদ আল-গাজ্জালির জীবনীতে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে সমসাময়িক আলেমদের অভিযোগ এবং বিশেষভাবে ইবলিশের পক্ষে তাঁর বক্তব্যগুলো সংরক্ষণ করেছেন [9]
ذكر من توفي في هذه السنة من الأكابر
٣٩٣٩ – أحمد بن محمد بن محمد، أبو الفتوح الغزالي الطوسي:
أخو أبي حامد، كان متصوفا متزهدا في أول أمره، ثم وعظ فكان متفوها وقبله العوام. وجلس في بغداد في التاجية ورباط بهروز، وجلس في دار السلطان محمود فأعطاه ألف دينار، فلما خرج رأى فرس الوزير في دهليز الدار بمركب ذهب وقلائد وطوق فركبه ومضى فأخبر الوزير، فقال: لا يتبعه أحد ولا يعاد إلى الفرس، وخرج يوما إلى ناعورة فسمعها تئن، فرمى طيلسانه عليها، وكان له نكت لطيفة إلا أن الغالب على كلامه التخليط ورواية الأحاديث الموضوعة والحكايات الفارغة والمعاني الفاسدة، وقد علق عنه كثير من ذلك، وقد رأينا من كلامه الذي علق عنه وعليه خطه إقرار بأنه كلامه.
فمن ذلك أنه قال: قال موسى رب أرني أنظر إليك، قيل له: لن تراني، فقال:
هذا شأنك تصطفي آدم ثم تسود وجهه وتخرجه من الجنة، وتدعوني إلى الطور ثم تشمت بي الأعداء، هذا عملك بالأخيار، كيف تصنع بالأعداء؟
وقال: نزل إسرافيل بمفاتيح الكنوز على رسول الله صلى الله عليه وسلم وجبريل جالس عنده فاصفر وجه جبريل، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: يا إسرافيل هل نقص مما عنده شيئا، قال: لا، قال: ما لا ينقص الواهب ما أريده.
وقال: دخل يهودي إلى الشيخ أبي سعيد، فقال أريد أن أسلم، فقال له: لا ترد، فقال الناس: يا شيخ تمنعه من الإسلام، فقال له: تريد ولا بد، قال: نعم، قال: برئت من نفسك ومالك، قال: نعم، قال: هذا الإسلام عندي احملوه الآن إلى الشيخ أبي حامد حتى يعلمه لا – لا المنافقين يعني لا إله إلا الله – قال أحمد الغزالي: الذي يقول لا إله إلا الله غير مقبول ظنوا أن قول لا إله إلا الله منشور ولايته أفنسوا عزله.
وحكى عنه القاضي أبو يعلى أنه صعد المنبر يوما، فقال: معاشر المسلمين كنت دائما أدعوكم إلى الله فأنا اليوم أحذركم منه، والله ما شدت الزنانير إلا من حبه، ولا أديت الجزية إلا في عشقه.
وأنبأنا محمد بن ناصر الحافظ، عن محمد بن طاهر المقدسي قال: كان أحمد الغزالي آية من آيات الله تعالى في الكذب، توصل إلى الدنيا بالوعظ، سمعته يوما بهمذان يقول: رأيت إبليس في وسط هذا الرباط يسجد لي فقال له: ويحك، إنه الله عز وجل أمره بالسجود لآدم فأبى. فقال: والله لقد سجد لي أكثر من سبعين مرة. فعلمت أنه لا يرجع إلى دين ومعتقد.
قال: وكان يزعم أنه يرى رسول الله صلى الله عليه وسلم عيانا في يقظته لا في نومه، وكان يذكر على المنبر أنه كلما أشكل عليه أمر رأى رسول الله صلى الله عليه وسلم فسأله على ذلك المشكل فدله على الصواب.
قال: وسمعته يوما يحكي عن بعض المشايخ، فلما نزل سألته عنها فقال: أنا وضعتها في الوقت.
قال: وله من هذه الجهالات والحماقات ما لا يحصى.
قال مؤلف الكتاب: وكان أحمد الغزالي يتعصب لإبليس ويعذره، حتى قال يوما: لم يدر ذاك المسكين أن أظافر القضاء إذا حكت أدمت وقسي القدر إذا رمت أصمت. ثم أنشد:
وكنا وليلى في صعود من الهوى
فلما توافينا ثبت وزلت
وقال: التقى موسى وإبليس عند عقبة الطور، فقال: يا إبليس لم لم تسجد لآدم؟ فقال: كلا، ما كنت لأسجد لبشر. يا موسى ادعيت التوحيد وأنا موحد، ثم التفت إلى غيره، وأنت قلت أرني فنظرت إلى الجبل، فأنا أصدق منك في التوحيد.
قال: أسجد للغير؟ ما سجدت. من لم يتعلم التوحيد من إبليس فهو زنديق.
يا موسى، كلما ازداد محبة لغيري ازددت له عشقا.
قال المصنف: لقد عجبت من هذا الهذيان الذي قد صار عن جاهل بالحال، فإنه لو كان إبليس غار لله محبة ما حرض الناس على المعاصي، ولقد أدهشني نفاق هذا الهذيان في بغداد وهي دار العلم، ولقد حضر مجلسه يوسف الهمذاني، فقال: مدد كلام هذا شيطاني لا رباني، ذهب دينه والدنيا لا تبقى له.
وشاع عن أحمد الغزالي أنه كان يقول بالشاهد، وينظر إلى المردان ويجالسهم، حتى حدثني أبو الحسين بن يوسف أنه كتب إليه في حق مملوك له تركي، فقرأ الرقعة ثم صاح باسمه، فقام إليه وصعد المنبر فقبل بين عينيه، وقال: هذا جواب الرقعة.
توفي أبو الفتوح في هذه السنة.
বাংলা অনুবাদ:
এই বছরে মৃত্যুবরণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিবরণ
৩৯৩৯ — আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ, আবুল ফুতূহ আল-গাজ্জালি আল-তূসি:
তিনি আবু হামিদের ভাই। জীবনের শুরুতে তিনি সুফি ও সংসারবিমুখ ছিলেন। পরে ওয়াজ করা শুরু করেন এবং অত্যন্ত বাকপটু বক্তা হয়ে ওঠেন; সাধারণ মানুষও তাঁকে গ্রহণ করেছিল। বাগদাদে তিনি তাজিয়্যা এবং রিবাত বাহরূযে বসতেন। তিনি সুলতান মাহমুদের প্রাসাদেও বসেছিলেন; সুলতান তাঁকে এক হাজার দিনার দেন। বের হওয়ার সময় তিনি বাড়ির প্রবেশপথে মন্ত্রীর একটি ঘোড়া দেখতে পান, যার জিন ছিল সোনার এবং তাতে মালা ও গলার অলংকার ছিল। তিনি সেটিতে উঠে চলে যান। বিষয়টি মন্ত্রীকে জানানো হলে মন্ত্রী বলেন, “কেউ যেন তার পেছনে না যায় এবং ঘোড়াটি ফেরত চাইতেও না যায়।”
একদিন তিনি একটি পানিচক্রের কাছে গেলেন এবং সেটির গোঙানির মতো শব্দ শুনলেন। তখন নিজের চাদরটি তার ওপর ছুড়ে দিলেন। তাঁর কিছু সূক্ষ্ম ও চমৎকার কথাও ছিল; কিন্তু তাঁর বক্তব্যে যা বেশি দেখা যেত তা হলো বিশৃঙ্খল কথা, জাল হাদিস বর্ণনা, অর্থহীন কাহিনি এবং ভ্রান্ত অর্থ। তাঁর কাছ থেকে এ ধরনের বহু কথা লিখে রাখা হয়েছে। তাঁর যেসব বক্তব্য লিখে রাখা হয়েছিল তার মধ্যে এমন লেখাও আমরা দেখেছি, যার ওপর তাঁর নিজের হাতের লেখা রয়েছে এবং যেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে কথাগুলো তাঁরই।
এর মধ্যে একটি হলো, তিনি বলেন: মূসা বলেছিলেন, “হে আমার রব, আমাকে দেখান, আমি আপনার দিকে তাকাব।” তাঁকে বলা হলো, “তুমি আমাকে দেখতে পারবে না।” তখন তিনি বললেন:
“এই তো আপনার আচরণ! আপনি আদমকে নির্বাচিত করেন, তারপর তার মুখ কালো করেন এবং তাকে জান্নাত থেকে বের করে দেন। আমাকে তূর পাহাড়ে ডাকেন, তারপর শত্রুদের আমার দুর্দশায় আনন্দ করার সুযোগ দেন। নেককারদের সঙ্গেই যদি আপনার আচরণ এমন হয়, তাহলে শত্রুদের সঙ্গে কী করেন?”
তিনি আরও বলেন: ইসরাফিল ধনভাণ্ডারের চাবিগুলো নিয়ে রাসুলের কাছে নেমে এলেন। জিবরিল তখন তাঁর পাশে বসেছিলেন। জিবরিলের মুখ হলুদ হয়ে গেল। রাসুল বললেন, “হে ইসরাফিল, এতে কি তাঁর কাছে যা আছে তা থেকে কিছু কমে যায়?” তিনি বললেন, “না।” রাসুল বললেন, “যা দাতার সম্পদ কমায় না, তা আমার প্রয়োজন নেই।”
তিনি আরও বলেন: এক ইহুদি শায়খ আবু সাঈদের কাছে এসে বলল, “আমি ইসলাম গ্রহণ করতে চাই।” তিনি বললেন, “তাকে ফিরিয়ে দিও না।” লোকেরা বলল, “হে শায়খ, আপনি কি তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধা দিচ্ছেন?” তিনি তাকে বললেন, “তুমি অবশ্যই এটি চাও?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “তুমি কি নিজের সত্তা ও সম্পদ থেকে মুক্ত হয়েছ?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “আমার কাছে এটাই ইসলাম। এখন তাকে শায়খ আবু হামিদের কাছে নিয়ে যাও, যাতে তিনি তাকে ‘লা’—মুনাফিকদের ‘লা’—শিক্ষা দেন”; অর্থাৎ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। আহমদ আল-গাজ্জালি বলেন: “যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে, সে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা মনে করেছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা তার কর্তৃত্বের ফরমান; অথচ তারা তার অপসারণ ভুলে গেছে।”
কাজি আবু ইয়ালা তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে একদিন তিনি মিম্বরে উঠে বলেছিলেন: “হে মুসলিম সমাজ! আমি এতদিন সবসময় তোমাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছি; আজ আমি তোমাদের তাঁর ব্যাপারে সতর্ক করছি। আল্লাহর কসম, তাঁর ভালোবাসা ছাড়া কোমরে যুন্নার বাঁধা হয়নি এবং তাঁর প্রেম ছাড়া জিজিয়াও দেওয়া হয়নি।”
হাফিজ মুহাম্মদ ইবন নাসির আমাদের জানিয়েছেন, মুহাম্মদ ইবন তাহির আল-মাকদিসি বলেছেন: “আহমদ আল-গাজ্জালি মিথ্যার ক্ষেত্রে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি ছিলেন। ওয়াজের মাধ্যমে তিনি দুনিয়াবি সুবিধা অর্জন করেছিলেন। একদিন হামাদানে তাঁকে বলতে শুনলাম: ‘এই রিবাতের মাঝখানে আমি ইবলিশকে আমার সামনে সিজদা করতে দেখেছি।’ তখন তাকে বলা হলো: ‘ধ্বংস হও! আল্লাহ তাকে আদমের সামনে সিজদা করার আদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু সে অস্বীকার করেছিল।’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহর কসম! সে আমাকে সত্তরেরও বেশি বার সিজদা করেছে।’ তখন আমি বুঝলাম, সে আর কোনো ধর্ম ও বিশ্বাসের দিকে ফিরে আসবে না।”
তিনি আরও বলেন: আহমদ আল-গাজ্জালি দাবি করতেন যে তিনি স্বপ্নে নয়, জাগ্রত অবস্থায় নিজের চোখে রাসুলকে দেখেন। তিনি মিম্বরে বলতেন, যখনই কোনো বিষয়ে তাঁর সমস্যা দেখা দেয়, তিনি রাসুলকে দেখেন এবং সেই সমস্যার বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন; তখন রাসুল তাঁকে সঠিক পথ দেখান।
তিনি বলেন: একদিন তাঁকে কোনো এক শায়খের নামে একটি ঘটনা বলতে শুনলাম। তিনি মিম্বর থেকে নামার পর আমি তাঁকে সেই ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন: “আমি এইমাত্র এটি বানিয়েছি।”
তিনি বলেন: তাঁর এ ধরনের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার ঘটনা গণনা করে শেষ করা যায় না।
গ্রন্থকার বলেন: “আহমদ আল-গাজ্জালি ইবলিশের পক্ষ নিতেন এবং তার জন্য অজুহাত পেশ করতেন। এমনকি একদিন তিনি বলেছিলেন: ‘সেই বেচারা জানত না—ঐশী ফয়সালার নখ যখন আঁচড় দেয়, তখন রক্তাক্ত করে; আর তাকদীরের ধনুক যখন তীর ছোড়ে, তখন স্তব্ধ করে দেয়।’”
তারপর তিনি কবিতা আবৃত্তি করেন:
“আমি আর লায়লা প্রেমের ঊর্ধ্বপথে উঠছিলাম;
যখন আমরা মুখোমুখি হলাম, আমি স্থির রইলাম আর সে পিছলে পড়ল।”
তিনি আরও বলেন: “তূর পাহাড়ের পথে মূসা ও ইবলিশের সাক্ষাৎ হলো। মূসা বললেন, ‘হে ইবলিশ, তুমি আদমকে সিজদা করলে না কেন?’ ইবলিশ বলল, ‘কখনোই নয়; আমি কোনো মানুষের সামনে সিজদা করতাম না। হে মূসা, তুমি তাওহীদের দাবি করেছ, আর আমি একজন প্রকৃত একত্ববাদী। তারপরও তুমি তাঁকে ছেড়ে অন্যের দিকে দৃষ্টি ফেরালে। তুমি বলেছিলে, “আমাকে দেখান”, তারপর পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিলে। অতএব তাওহীদের ক্ষেত্রে আমি তোমার চেয়ে অধিক সত্যনিষ্ঠ।’”
তিনি বলেন: “আমি কি অন্য কাউকে সিজদা করব? আমি করিনি। যে ব্যক্তি ইবলিশের কাছ থেকে তাওহীদ শেখেনি, সে জিন্দিক।”
“হে মূসা, সে আমার ছাড়া অন্যের প্রতি যত বেশি ভালোবাসা বাড়িয়েছে, আমি তার প্রতি তত বেশি প্রেম বাড়িয়েছি।”
গ্রন্থকার বলেন: “আমি এই প্রলাপ দেখে বিস্মিত হয়েছি, যা এমন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে যে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ। ইবলিশ যদি সত্যিই আল্লাহর ভালোবাসার কারণে তাঁর জন্য ঈর্ষান্বিত হতো, তাহলে সে মানুষকে পাপকাজে উৎসাহিত করত না। আরও যে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে তা হলো—জ্ঞানচর্চার নগরী বাগদাদে এই প্রলাপের এত প্রসার। ইউসুফ আল-হামাদানি তাঁর এক মজলিসে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন: ‘এই কথার উৎস শয়তানি, রব্বানি নয়। তার ধর্ম চলে গেছে এবং দুনিয়াও তার জন্য স্থায়ী হবে না।’”
আহমদ আল-গাজ্জালি সম্পর্কে আরও প্রসিদ্ধ ছিল যে তিনি “শাহিদ”-এর মত বা প্রথার কথা বলতেন এবং দাড়িহীন তরুণদের দিকে তাকাতেন ও তাদের সঙ্গে বসতেন। এমনকি আবুল হুসাইন ইবন ইউসুফ আমাকে বলেছেন যে তাঁর একটি তুর্কি দাসের বিষয়ে তিনি আহমদ আল-গাজ্জালির কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তিনি চিঠিটি পড়লেন, তারপর সেই দাসের নাম ধরে ডাকলেন। ছেলেটি তাঁর কাছে গেলে তিনি তাকে নিয়ে মিম্বরে উঠলেন, তার দুই চোখের মাঝখানে চুমু দিলেন এবং বললেন: “এই হলো তোমার চিঠির উত্তর।”
আবুল ফুতূহ এই বছর মৃত্যুবরণ করেন।
মূল বিবরণে এর পরেই তাকদীরের ধনুকের উপমাও এসেছে—ঐশী তাকদীরের তীর যখন ছোড়া হয়, তা লক্ষ্যভেদ করে। অর্থাৎ আল-গাজ্জালির কাছে ইবলিশের পতনকে শুধু তার বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়নি; তার ট্র্যাজেডির পেছনে ঐশী ফয়সালা ও তাকদীরের অনিবার্যতা উপস্থিত। এখানে আগের পরিচ্ছেদগুলোর প্রশ্নটি নতুনভাবে ফিরে আসে: ইবলিশ যদি আল্লাহর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের ভাগ্য তৈরি করে থাকে, তাহলে তাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কাযা ও কদরের আঘাতের উপমা কেন?
ইবন আল-জাওযির আল-কুসসাস ওয়াল-মুযাক্কিরীন গ্রন্থেও আহমদ আল-গাজ্জালির ইবলিশ-বিষয়ক একই বক্তব্য আরও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। এখানে ইবলিশ ও মূসার কথোপকথনে ইবলিশকে তাওহীদের ক্ষেত্রে মূসার চেয়েও অধিক সত্যনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আহমদ আল-গাজ্জালির নামে সরাসরি বলা হয়েছে—“যে ইবলিশের কাছ থেকে তাওহীদ শেখেনি, সে জিন্দিক।” [10]
المحال! فإنّ رسول اللّه لمّا ردّ تلك المرأة لم يعاتب، ولا جاء جبريل، ولا جرى من هذا شئ. والعجب كيف يجري هذا ببغداد وهي دار العلم؟!
وقدم إلى بغداد أحمد الغزّالي فوعظ، ونفق. وكتب كلامه فنظرت فيما كتب عنه وقد كتب على الجزء بخطّه: هذا كلامي.
فكان فيه من العجائب أنّه التقى إبليس بموسى في عقبة الطور فقال: يا إبليس! لم لم تسجد لآدم؟ قال: كلّا ما كنت لأسجد لبشر. يا موسى! ادّعيت التوحيد وأنا موحّد. لم ألتفت إلى غيره وقلت أنت: أرني! فنظرت إلى الجبل. أنا أصدق منك في التوحيد.
قال: اسجد للغير. ما سجدت وأنت التفت.
قال الغزّاليّ: من لم يتعلّم التوحيد من إبليس فهو زنديق!
قال له موسى: قد غيّرت لبستك من الملائكة إلى الشيطنة.
فقال: ذلك حال يحول وسيتغيّر يا موسى! كلّما ازداد محبة لغيري ازددت عشقا له.
فقال له:
هامش
(1) انظر حديث المرأة التي دخل عليها رسول اللّه ورأى بها برصا في «مسند أحمد» 3 / 493 و«سنن البيهقي» 7 / 214 و«زاد المعاد» 5 / 180 طبعة دمشق.
(2) هو أحمد بن محمد الغزالي الطوسي أخو الامام أبي حامد، درّس بالنظامية بعد أن ترك أخوه التدريس فيها. توفي بقزوين سنة 520 هـ وقد أورد المصنف هنا طائفة كافية من أقواله وجملة من أحواله تعرّفه وتكشفه. وانظر في ترجمته: «شذرات الذهب» 4 / 60 و«طبقات الشافعية» 6 / 60 و«وفيات الأعيان» 1 / 97 و«البداية والنهاية» 12 / 196 و«العبر» 4 / 45 وقال الذهبي: كان رقيق الديانة متكلما في عقيدته. و«لسان الميزان» 1 / 293 و«الميزان» 1 / 150 و«المنتظم» 9 / 260.
(3) في الأصل: لا. والتصويب من «المنتظم» 9 / 261.
(4) أقول: قرأت في مجلة (المسلمون) اللندنية (العدد 32 تاريخ 12 / 8 / 1402 الموافق 4 / 6 / 1982) ص 20 أن هذا الكلام الآثم القبيح المنحرف يقوله صادق جلال العظم في كتابه «نقد الفكر الديني» مستهزئا بالدين مدعيا أنه كلامه. فتأمل وأعجب واحمد اللّه على العافية. ربنا لا تزغ قلوبنا بعد إذ هديتنا وهب لنا من لدنك رحمة إنك أنت الوهاب.
(5) كذا في الأصل، ولعلها: الملائكية.
বাংলা অনুবাদ:
“এটি অসম্ভব! কারণ রাসুল যখন ওই নারীকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে তিরস্কার করা হয়নি, জিবরিলও আসেননি এবং এরকম কিছুই ঘটেনি। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—জ্ঞানচর্চার নগরী বাগদাদে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে!”
আহমদ আল-গাজ্জালি বাগদাদে এলেন। তিনি ওয়াজ করলেন এবং তাঁর প্রচার ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেল। তাঁর বক্তব্যগুলো লিখে রাখা হতো। তাঁর নামে লিখিত কথাগুলো আমি পরীক্ষা করে দেখেছি; এমনকি সেই পাণ্ডুলিপির ওপর তাঁর নিজের হাতের লেখায় লেখা ছিল: “এগুলো আমার কথা।”
সেসব বিস্ময়কর বক্তব্যের মধ্যে একটি ছিল—তূর পাহাড়ের পথে ইবলিশের সঙ্গে মূসার সাক্ষাৎ হলো। মূসা বললেন, “হে ইবলিশ! তুমি আদমকে সিজদা করলে না কেন?” ইবলিশ বলল, “কখনোই নয়; আমি কোনো মানুষের সামনে সিজদা করতাম না। হে মূসা! তুমি তাওহীদের দাবি করেছ, আর আমি একজন প্রকৃত একত্ববাদী। আমি তাঁকে ছেড়ে অন্য কারও দিকে দৃষ্টি ফেরাইনি। অথচ তুমি বলেছিলে, ‘আমাকে দেখান!’ তারপর তুমি পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিলে। তাওহীদের ক্ষেত্রে আমি তোমার চেয়ে বেশি সত্যনিষ্ঠ।”
সে বলল: “আমি কি অন্য কারও সামনে সিজদা করব? আমি সিজদা করিনি; অথচ তুমি অন্যের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছিলে।”
আল-গাজ্জালি বলেন: “যে ব্যক্তি ইবলিশের কাছ থেকে তাওহীদ শেখেনি, সে জিন্দিক!”
মূসা তাকে বললেন: “তোমার অবস্থা তো পরিবর্তিত হয়েছে—ফেরেশতাদের অবস্থান থেকে শয়তানি অবস্থায় চলে গেছ।”
ইবলিশ বলল: “ওটা এমন একটি অবস্থা যা পরিবর্তিত হয় এবং আবার পরিবর্তিত হবে। হে মূসা! সে আমার ছাড়া অন্যের প্রতি যত বেশি ভালোবাসা বাড়িয়েছে, আমি তার প্রতি তত বেশি প্রেম বাড়িয়েছি।”
তারপর সে তাকে বলল:
পাদটীকা
(১) সেই নারীর হাদিস দেখুন, যার কাছে রাসুল প্রবেশ করেছিলেন এবং তার শরীরে শ্বেতকুষ্ঠ দেখতে পেয়েছিলেন: মুসনাদ আহমদ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৯৩; সুনান আল-বায়হাকি, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২১৪; এবং যাদ আল-মা‘আদ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৮০, দামেস্ক সংস্করণ।
(২) তিনি আহমদ ইবন মুহাম্মদ আল-গাজ্জালি আল-তূসি, ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালির ভাই। তাঁর ভাই নিজামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন। তিনি ৫২০ হিজরিতে কাজভিনে মৃত্যুবরণ করেন। গ্রন্থকার এখানে তাঁর এমন পর্যাপ্তসংখ্যক বক্তব্য এবং তাঁর জীবনের কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো তাঁর পরিচয় ও প্রকৃতি প্রকাশ করে। তাঁর জীবনী সম্পর্কে দেখুন: শাযারাত আল-যাহাব, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬০; তাবাকাত আল-শাফিয়্যাহ, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৬০; ওয়াফায়াত আল-আ‘ইয়ান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৭; আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৯৬; আল-ইবার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৫। আল-যাহাবি বলেছেন: “ধর্মীয়তায় তিনি দুর্বল ছিলেন এবং তাঁর আকীদা নিয়ে কথা ছিল।” আরও দেখুন: লিসান আল-মিজান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৩; আল-মিজান, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫০; আল-মুনতাযাম, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৬০।
(৩) মূল পাণ্ডুলিপিতে আছে: “لا”। আল-মুনতাযাম, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৬১ অনুসারে এটিকে সংশোধন করা হয়েছে।
(৪) আমি বলছি: লন্ডন থেকে প্রকাশিত আল-মুসলিমুন পত্রিকার ৩২ নম্বর সংখ্যায়, ১২/৮/১৪০২ হিজরি—সমতুল্য ৪/৬/১৯৮২—পৃষ্ঠা ২০-এ আমি পড়েছি যে এই পাপপূর্ণ, কুৎসিত ও বিচ্যুত বক্তব্যটি সাদিক জালাল আল-আজম তাঁর নাকদ আল-ফিকর আল-দিনি গ্রন্থে ধর্মকে উপহাস করতে গিয়ে বলেছেন এবং দাবি করেছেন এটি তাঁর নিজের বক্তব্য। বিষয়টি চিন্তা করুন, বিস্মিত হোন এবং সুস্থতার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করুন। “হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হেদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তর বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করুন; নিশ্চয়ই আপনিই মহাদাতা।”
(৫) মূল পাঠে এভাবেই আছে; সম্ভবত সঠিক শব্দটি হবে: الملائكية—“ফেরেশতাসুলভ অবস্থা” বা “ফেরেশতাদের অবস্থান”।
ইবন আবি আল-হাদিদের শারহ নাহজ আল-বালাগাহ-তেও একই অবস্থানের স্বাধীন পরবর্তী সংরক্ষণ পাওয়া যায়। সেখানে আহমদ আল-গাজ্জালিকে এমন একজন বক্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যিনি ইবলিশকে “সাইয়্যিদ আল-মুওয়াহহিদিন”—অর্থাৎ তাওহীদবাদীদের নেতা—বলতেন এবং মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, যে ইবলিশের কাছ থেকে তাওহীদ শেখে না সে জিন্দিক; কারণ ইবলিশকে তার প্রভু ছাড়া অন্যের সামনে সিজদা করতে বলা হয়েছিল এবং সে অস্বীকার করেছিল। [11]
এই পুনর্ব্যাখ্যায় ইবলিশের অপরাধটিই উল্টে যায়। প্রচলিত ব্যাখ্যায় সে অহংকারের কারণে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে; আল-গাজ্জালির সুফি ব্যাখ্যায় একই সিজদা-অস্বীকৃতি হয়ে ওঠে একনিষ্ঠ তাওহীদ—আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা না নোয়ানোর প্রমাণ। আধুনিক গবেষণায় আহমদ আল-গাজ্জালির এই অবস্থানকে তাঁর প্রেমতত্ত্বের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর মাজালিস এবং জীবনীগ্রন্থে সংরক্ষিত বয়ানগুলোতে ইবলিশকে এমন এক প্রেমিক ও তাওহীদবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেও আল্লাহর গভীরতর ইচ্ছার প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। [12]
Satan’s refusal to bow down before God’s creation, Adam, signifies that Satan alone manifests the purest devotion to God’s oneness and is thus the unrivalled champion of tawhid.
বাংলা অনুবাদ:“আহমদ আল-গাজ্জালির ব্যাখ্যায় আদমের সামনে ইবলিশের সিজদা প্রত্যাখ্যান আল্লাহর একত্বের প্রতি তার সবচেয়ে বিশুদ্ধ আনুগত্যের প্রকাশ; ফলে ইবলিশকে তাওহীদের অতুলনীয় প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।”
আল-গাজ্জালির ব্যাখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু ইবলিশের প্রশংসা নয়; বরং আল্লাহর প্রকাশ্য আদেশ এবং আল্লাহর গভীরতর ইচ্ছাকে দুই আলাদা স্তরে স্থাপন করা। প্রকাশ্য আদেশ ছিল—আদমকে সিজদা করো। কিন্তু আল-গাজ্জালির ইবলিশ সেই আদেশ অমান্য করে এমন একটি ভূমিকা পালন করছে যা শেষ পর্যন্ত ঐশী পরিকল্পনারই অংশ। সে অভিশপ্ত হয়, মানুষের প্রলোভনকারী হয়, কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ পায় এবং সেই ভূমিকাই পালন করতে থাকে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগত ফল দাঁড়ায়। যদি ইবলিশের অস্বীকৃতি আল্লাহর গভীরতর ইচ্ছা ও তাকদীরের বিরুদ্ধে সত্যিকারের স্বাধীন বিদ্রোহ হতো, তাহলে সে ঐশী পরিকল্পনা ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু যদি তার বিদ্রোহও সেই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়—যেমন আল-গাজ্জালির তাকদীরভিত্তিক ভাষা ইঙ্গিত করে—তাহলে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেও ইবলিশ আল্লাহর নির্ধারিত ভূমিকার বাইরে যায়নি। অর্থাৎ আদেশ অমান্য করা এবং ঐশী ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা একই ঘটনায় একসঙ্গে ঘটতে পারে।
এই কারণেই আহমদ আল-গাজ্জালির ইবলিশ-ব্যাখ্যা বর্তমান সমস্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি “ইবলিশকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেছিলেন কি না” প্রশ্নকে অস্বীকার করে এড়িয়ে যাননি; বরং আরও মৌলিক স্তরে গিয়ে ইবলিশের পতনকেই ঐশী কাযা-কদর, তাওহীদ এবং প্রেমের নাটকের অংশ হিসেবে পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বয়ানে ইবলিশ একই সঙ্গে অবাধ্য, অভিশপ্ত এবং তবু ঐশী পরিকল্পনার বাইরে নয়।
আল-হাল্লাজ: আল্লাহর আদেশ অমান্য করেও কি আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হয়েছিল?
আহমদ আল-গাজ্জালির আগে সুফি চিন্তায় ইবলিশের এই পুনর্ব্যাখ্যার সবচেয়ে বিখ্যাত রূপ পাওয়া যায় হুসাইন ইবন মানসুর আল-হাল্লাজের কিতাব আল-তাওয়াসীন-এ। আল-হাল্লাজ ইবলিশকে নিছক পাপের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং তাকে তাওহীদ, প্রেম, ঐশী আদেশ এবং ঐশী ইচ্ছার দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত করেছিলেন। তাঁর তাসীন আল-আজল ওয়াল-ইলতিবাস-এ ইবলিশকে এমন এক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে আদমের সামনে সিজদা না করেও নিজের একত্ববাদী দাবিতে অটল থাকে।
আল-হাল্লাজের তাওয়াসীন-এর “তাসীন আল-আযাল ওয়াল-ইলতিবাস” অংশে ইবলিশ ও মুহাম্মদকে পাশাপাশি রেখে একটি ব্যতিক্রমী তুলনা করা হয়েছে। ইবলিশকে আদমকে সিজদার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, আর মুহাম্মদকে দৃষ্টি ফেরানোর প্রসঙ্গ এসেছে; আল-হাল্লাজের ভাষ্যে উভয়েই নিজ নিজ দাবিতে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাননি। [13]
حيوانه، والمطموس شأنه، والمدروس عيانه، والعروس بستانه، والطموس بنيانه.
٣٨. أربابه مهربى، أركانه مرهبى، إرادته مشربى، أعوانه متربى، إخوانه محربى، حواليه همد، تواليه رمد.
٣٩. مقالته ركز، هذا فحسب وما دونه فغضب ثمّ باللّه التوفيق.
٦ ـ طاسين الأزل والالتباس في فهم الفهم، في صحّة الدعاوى به عكس العكس
قال العالم السيّد الغريب أو المغيث حسين بن منصور الحلاج، أحسن اللّه مثواه، قدّس اللّه روحه:
١. ما صحّت الدعاوى لأحد إلّا لإبليس وأحمد، غير أنّ إبليس سقط عن العين، وأحمد كشف له عن عين العين.
٢. قيل لإبليس: «اسجد»، ولأحمد: «انظر». هذا ما سجد، وأحمد ما نظر، ما التفت يمينا ولا شمالا.
﴿مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى﴾
الهوامش:
(١) مطموس: اسم مفعول، محوشده، تباهشده، ناپديدشده، گمگشته، دورشده.
(٢) مدروس: اسم مفعول، كهنه، كهن، قديم، جامهء كهنه، بىرونق، فرسوده، ناپديدشده، ديوانه.
(٣) عيان: ظاهر، آشكار، ديدار با چشم، ذات.
(٤) عروس: هر چيز زيبا و آراسته، بسيار محجوب، پرده، چرخ، دنياى بىبقا، جهان فانى، عدن، ماه، ستاره، كوكب، هر چيز تازه و نو.
(٥) طموس: ناپديد كردن، ناپيدا كردن، هلاك كردن، ناپيدا شدن، دور نگريستن، دورى گزيدن، رفتن همهء صفات بشريت در صفات انوار ربوبيت.
(٦) مهربى: محل فرار، گريزگاه، جمع مهارب.
(٧) مرهب: از رهبة: بهت، ترس، خوف، بيم، هراس، وحشت.
(٨) اخوان: به معناى پيروان، دوستان، برادران.
(٩) همد: آرامش، خاموشى.
(١٠) ركز: به زمين فرو بردن، ثابت كردن، بپاى كردن.
(١١) عين: ديده، جمع اعيان، عيون، چشمه، ذات هر چيز، نفس شىء؛ در اصطلاح عقل و روح و سرّ و ظاهر، اشاره است به ذات چيزى كه اشياء به آن پيدا و آشكار شود.
(١٢) عين العين: سرچشمههاى حقيقت هستى.
(١٣) سورة النجم، الآية: ١٧.
বাংলা অনুবাদ:
তার প্রাণময় সত্তা; যার অবস্থা মুছে দেওয়া হয়েছে; যার প্রত্যক্ষ রূপ ক্ষয়প্রাপ্ত; যার বাগান নববধূসদৃশ; আর বিলুপ্তিই যার কাঠামো।
৩৮. তার প্রভুরাই তার আশ্রয়স্থল; তার স্তম্ভগুলো ভয়ের স্থান; তার ইচ্ছাই তার পানপাত্র; তার সহায়কেরা ধূলিধূসর; তার সঙ্গীরা যুদ্ধরত; তার চারপাশে নীরবতা এবং তার পরিণতিতে যন্ত্রণা।
৩৯. তার বক্তব্য দৃঢ়ভাবে স্থাপিত; এটুকুই যথেষ্ট, এর নিচে যা কিছু তা ক্রোধের বিষয়। এরপর আল্লাহর কাছেই সাফল্য।
৬ — অনাদি কাল ও উপলব্ধির বিভ্রান্তির তাসীন: দাবির সত্যতা এবং বিপরীতের বিপরীত
আলেম, সাইয়্যিদ, অপরিচিত বা সাহায্যপ্রার্থী হুসাইন ইবন মানসুর আল-হাল্লাজ বলেছেন:
১. “ইবলিশ এবং আহমদ [মুহাম্মদ] ছাড়া আর কারও দাবি সত্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে ইবলিশ দৃষ্টির ক্ষেত্র থেকে পতিত হয়েছিল, আর আহমদের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল ‘দৃষ্টিরও দৃষ্টি’—বাস্তবতার গভীরতম উৎস।”
২. “ইবলিশকে বলা হয়েছিল, ‘সিজদা কর’; আর আহমদকে বলা হয়েছিল, ‘দেখ’। ইবলিশ সিজদা করেনি, আর আহমদও তাকায়নি; সে ডানেও দৃষ্টি ফেরায়নি, বামেও নয়।”
“দৃষ্টি বিচ্যুত হয়নি এবং সীমাও অতিক্রম করেনি।” — সূরা আন-নাজম ৫৩:১৭
পাদটীকা:
(১) মাতমূস: মুছে দেওয়া, বিনষ্ট, অদৃশ্য, হারিয়ে যাওয়া বা দূরে সরিয়ে দেওয়া।
(২) মাদরূস: পুরোনো, জীর্ণ, ক্ষয়প্রাপ্ত, বিবর্ণ, বিলুপ্ত; কোনো কোনো ব্যবহারে উন্মাদ।
(৩) ইয়ান: প্রকাশ্য, দৃশ্যমান, চোখে দেখা; কোনো বস্তুর স্বরূপ বা সত্তা।
(৪) আরূস: সুন্দর ও অলংকৃত বস্তু; গভীরভাবে আবৃত; পর্দা; আকাশচক্র; ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী; বিলীয়মান জগৎ; আদন; চাঁদ, তারা বা নক্ষত্র; যেকোনো নতুন ও সতেজ বস্তু।
(৫) তুমূস: মুছে দেওয়া, অদৃশ্য করা, ধ্বংস করা, হারিয়ে যাওয়া, দূরে সরে যাওয়া; সুফি পরিভাষায় রব্বানি আলোর গুণাবলির মধ্যে মানবীয় গুণাবলির বিলীন হয়ে যাওয়া।
(৬) মাহরাবি: পালানোর স্থান, আশ্রয় বা পলায়নের পথ।
(৭) মারহাব: রাহবা থেকে—বিস্ময়, ভয়, আতঙ্ক, শঙ্কা বা ভীতি।
(৮) ইখওয়ান: অনুসারী, বন্ধু বা ভাই।
(৯) হামদ: প্রশান্তি, স্থিরতা বা নীরবতা।
(১০) রাকয: মাটিতে গেঁথে দেওয়া, দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা বা প্রতিষ্ঠিত করা।
(১১) আইন: চোখ; এর বহুবচন আ‘ইয়ান ও উয়ূন; ঝরনা; কোনো কিছুর সত্তা বা স্বয়ং সেই বস্তু। পরিভাষায় এটি বুদ্ধি, আত্মা, অন্তর্গত রহস্য ও প্রকাশ্য রূপ বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়; অর্থাৎ সেই সত্তা যার মাধ্যমে বস্তু প্রকাশিত ও দৃশ্যমান হয়।
(১২) আইন আল-আইন: অস্তিত্বের সত্যতার উৎসসমূহ বা বাস্তবতার গভীরতম উৎস।
(১৩) সূরা আন-নাজম, আয়াত ১৭।
আল-হাল্লাজের তাসীন আল-আযাল ওয়াল-ইলতিবাস-এর এই অংশে ইবলিশকে নিজের “সঙ্গী ও শিক্ষক” বলা হয়েছে। ইবলিশের সিজদা প্রত্যাখ্যানকে প্রেম, পূর্বজ্ঞান ও ঐশী নির্বাচনের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল-হাল্লাজ এমন বক্তব্যও ইবলিশের মুখে দিয়েছেন—“সমস্ত নির্বাচনই তোমার; আমার নির্বাচনও তোমারই জন্য” এবং “তুমি যদি আমাকে তার সামনে সিজদা করতে বাধা দিয়ে থাকো, তবে তুমিই প্রতিরোধকারী।” [14]
[ ٦ ] طاسين الأزل والالتباس
٢٢ – وقال إبليس: أنا خير منه [١] حين لم ير غيره غيرا، فرعون: ما علمت لكم من إله غيري [٢] حين لم يعرف في قومه من يميز بين الحق والباطل.
٢٣ – وقلت أنا: «إن لم تعرفوه فاعرفوا أثره، وأنا ذلك الأثر، وأنا الحق لأني ما زلت أبدا بالحق حقا».
٢٤ – فصاحبي وأستاذي إبليس وفرعون، وإبليس هدد بالنار وما رجع عن دعواه، وفرعون أغرق في اليم؛ وما رجع عن دعواه ولم يقر بالواسطة إليه لكنه قال: آمنت أنه لا إله إلا الذي آمنت به بنوا إسرائيل [٣] ألا ترى أن الله سبحانه عارض جبريل في بابه فقال: «لم حشوت فاه رملا».
٢٥ – وأنا إن قتلت وقطعت يداي ورجلاي ما رجعت عن دعواي.
٢٦ – اشتق اسم «إبليس» من اسمه: فعين عزازيل لعلو همته، والزاي لازدياد الزيادة في زيادته والألف آراؤه في ألفته، والزاي الثانية لزهده في رتبته والياء حين يأوي إلى علم سابقته واللام لمجادلته في بليته.
٢٧ – قال له: «لم لا تسجد يا أيها المهين؟»
قال: «أنا محب والمحب مهين» إنك تقول «مهين» وأنا قرأت في كتاب مبين ما يجري علي يا ذا القوة المتين. كيف أذل وقد خلقتني من نار وخلقته من طين [٤] وهما ضدان لا يتوافقان وإني في الخدمة أقدم، وفي الفضل أعظم، وفي العلم أعلم، وفي العمر أتم.
٢٨ – قال له الحق سبحانه: «الاختيار لي لا لك» قال: «الاختيارات كلها واختياري لك، قد اخترت لي يا بديع. وإن منعتني عن سجوده، فأنت المنيع، وإن أخطأت في المقال، فلا تهجرني فأنت السميع. وإن أردت أن أسجد له فأنا المطيع، لا أعرف في العارفين أعرف بك مني».
٢٩ – وقال:
لا تلمني، فاللوم مني بعيد
وأجر سيدي، فإني وحيد
إن في الوعد، وعدك الحق حقا
إن في البدء، بدء أمري شديد
من أراد الكتاب هذا خطابي
فاقرؤوا واعلموا بأني شهيد
٣٠ – يا أخي، سمي «عزازيل» لأنه عزل وكان «معزولا» في ولايته، ما رجع من بدايته إلى نهايته لأنه ما خرج من نهايته.
الهوامش:
(١) الأعراف: ١١.
(٢) القصص: ٣٨.
(٣) يونس: ٩.
(٤) الأعراف: ١٢.
বাংলা অনুবাদ:
[৬] অনাদি কাল ও উপলব্ধির বিভ্রান্তির তাসীন
২২ — ইবলিশ বলেছিল: “আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ” [১]—কারণ সে তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রকৃত ‘অন্য’ হিসেবে দেখেনি। আর ফেরাউন বলেছিল: “আমি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাস্য আছে বলে আমি জানি না” [২]—কারণ তার জাতির মধ্যে এমন কাউকে সে চিনত না, যে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।
২৩ — আর আমি বলেছি: “তোমরা যদি তাঁকে চিনতে না পারো, তবে তাঁর নিদর্শনকে চিনো। আমিই সেই নিদর্শন। আর আমিই ‘আল-হক’—কারণ চিরকাল সত্যের মাধ্যমে আমি সত্য হয়েই রয়েছি।”
২৪ — “অতএব আমার সঙ্গী ও আমার শিক্ষক হলো ইবলিশ ও ফেরাউন। ইবলিশকে আগুনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে নিজের দাবি থেকে ফিরে যায়নি। ফেরাউনকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবুও সে নিজের দাবি থেকে ফিরে যায়নি এবং তাঁর দিকে পৌঁছানোর জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীকেও স্বীকার করেনি। বরং সে বলেছিল: ‘আমি বিশ্বাস করলাম যে, বনি ইসরাইল যাঁর প্রতি বিশ্বাস করেছে তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।’ [৩] তুমি কি দেখ না যে মহান আল্লাহ এ বিষয়ে জিবরিলকে আপত্তি করে বলেছিলেন: ‘তুমি কেন তার মুখ বালি দিয়ে ভরে দিয়েছিলে?’”
২৫ — “আমাকে হত্যা করা হলেও এবং আমার দুই হাত ও দুই পা কেটে দেওয়া হলেও আমি আমার দাবি থেকে ফিরে আসব না।”
২৬ — “ইবলিশ” নামটি তার নাম থেকে উদ্ভূত করা হয়েছে। ‘আজাজিল’-এর ‘আইন’ তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার উচ্চতার জন্য; ‘যা’ তার বৃদ্ধির মধ্যে আরও বৃদ্ধির জন্য; ‘আলিফ’ তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে তার উপলব্ধির জন্য; দ্বিতীয় ‘যা’ তার মর্যাদার প্রতি অনাসক্তির জন্য; ‘ইয়া’ তখন, যখন সে নিজের পূর্বনির্ধারিত অবস্থার জ্ঞানের আশ্রয় নেয়; এবং ‘লাম’ তার পরীক্ষার মধ্যে তার বিতর্কের জন্য।
২৭ — তাকে বলা হলো: “হে অপমানিত! তুমি কেন সিজদা করছ না?”
সে বলল: “আমি একজন প্রেমিক, আর প্রেমিক অপমানিত। তুমি আমাকে ‘অপমানিত’ বলছ; অথচ হে মহাশক্তিধর, সুদৃঢ় ক্ষমতার অধিকারী, আমার ওপর কী ঘটবে তা আমি স্পষ্ট কিতাবে আগেই পড়েছি। আমি কীভাবে নিজেকে হীন করব, যখন তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ এবং তাকে সৃষ্টি করেছ মাটি থেকে? [৪] এ দুটি পরস্পরবিরোধী এবং একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেবার ক্ষেত্রে আমি তার চেয়ে প্রাচীন, মর্যাদায় অধিক, জ্ঞানে অধিক জ্ঞানী এবং বয়সেও অধিক পূর্ণ।”
২৮ — মহান সত্য তাকে বললেন: “নির্বাচনের অধিকার আমার, তোমার নয়।” সে বলল: “সমস্ত নির্বাচন তোমার, আর আমার নির্বাচনও তোমারই জন্য। হে অনুপম স্রষ্টা, তুমিই আমার জন্য নির্বাচন করেছ। যদি তুমি আমাকে তার সামনে সিজদা করা থেকে বাধা দিয়ে থাকো, তবে তুমিই সেই প্রতিরোধকারী। আর যদি কথায় আমি ভুল করে থাকি, তবে আমাকে পরিত্যাগ করো না—কারণ তুমিই সর্বশ্রোতা। আর তুমি যদি চাও যে আমি তাকে সিজদা করি, তবে আমি অনুগত। আরিফদের মধ্যে আমার চেয়ে তোমাকে অধিক জানে—এমন কাউকে আমি চিনি না।”
২৯ — সে আরও বলল:
“আমাকে দোষ দিও না—দোষ আমার থেকে বহু দূরে;
হে আমার প্রভু, আমাকে পুরস্কৃত করো, কারণ আমি একাকী।
প্রতিশ্রুতির মধ্যে তোমার সত্য প্রতিশ্রুতিই সত্য;
আর সূচনাতেই আমার ভাগ্যের সূচনা ছিল কঠিন।
যে এই কিতাব চায়—এটাই আমার বক্তব্য;
অতএব পড়ো এবং জেনে রাখো, আমি একজন সাক্ষী।”
৩০ — “হে আমার ভাই, তাকে ‘আজাজিল’ বলা হয়েছিল কারণ তাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল; তার ঘনিষ্ঠ অবস্থানের মধ্যেই সে ছিল ‘বিচ্ছিন্ন’। সে তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান থেকে ফিরে যায়নি, কারণ সে কখনো নিজের চূড়ান্ত পরিণতির বাইরে যেতে পারেনি।”
পাদটীকা:
(১) সূরা আল-আরাফ: ১১।
(২) সূরা আল-কাসাস: ৩৮।
(৩) উৎসে দেওয়া হয়েছে: সূরা ইউনুস: ৯।
(৪) সূরা আল-আরাফ: ১২।
এটি মূলধারার ইসলামি ইবলিশ-বয়ানের বিপরীত একটি সুফি পুনর্ব্যাখ্যা। কিন্তু বর্তমান আলোচনার জন্য এর মূল্য অন্য জায়গায়। আল-হাল্লাজের ব্যাখ্যায় ইবলিশ এমন একটি দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যেখানে আল্লাহর আদেশ তাকে আদমকে সিজদা করতে বলে, কিন্তু তার উপলব্ধ ঐশী ইচ্ছা ও তাওহীদের দাবি তাকে অন্য কারও সামনে মাথা নোয়াতে দেয় না। ফলে আল্লাহর আদেশ অমান্য করাই এমন এক ঐশী পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে যার বাইরে ইবলিশ যেতে পারে না।
এই পার্থক্য—আল্লাহ কী আদেশ করেন এবং আল্লাহ বাস্তবে কী ঘটতে চান বা নির্ধারণ করেন—পরবর্তী সুন্নি ধর্মতত্ত্বের শরিয়তগত ইচ্ছা ও সৃষ্টিগত ইচ্ছার পার্থক্যের সঙ্গেও কাঠামোগতভাবে সম্পর্কিত। আল্লাহ ধর্মীয়ভাবে কুফর, অবাধ্যতা বা পাপ আদেশ করেন না; কিন্তু সৃষ্টিগতভাবে এসব তাঁর ইচ্ছা ও তাকদীরের বাইরে ঘটে না। ইবলিশের কাহিনিতে এই সমস্যা সবচেয়ে নাটকীয়: আল্লাহ তাকে সিজদার আদেশ দিলেন, অথচ এমন এক জগৎ ও তাকদীর সৃষ্টি করলেন যেখানে ইবলিশ সিজদা না করে শয়তানের ভূমিকায় প্রবেশ করে এবং মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার জন্য কিয়ামত পর্যন্ত সময় পায়।
আহমদ আল-গাজ্জালির বয়ান এবং আল-হাল্লাজের তাওয়াসীন-এর মধ্যে এই মিল নিয়ে আধুনিক গবেষণাও আলোচনা করেছে। গবেষক ঘোরবান এলমি দেখিয়েছেন, আল-গাজ্জালির ইবলিশ-চিত্রে আল-হাল্লাজি ধারার প্রভাব স্পষ্ট; তবে আল-গাজ্জালি সরাসরি তাওয়াসীন পাঠ করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। একই কাহিনি মৌখিক সুফি ধারার মাধ্যমেও তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারে। [15]
ফলে এখানে আল-হাল্লাজ ও আল-গাজ্জালিকে মূলধারার সুন্নি আকীদার প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবহার করার প্রশ্ন নেই। বরং তাদের গুরুত্ব হলো, ইবলিশের কাহিনির ভেতরের কার্যকারণগত সমস্যাটি তারা চিনতে পেরেছিলেন এবং প্রচলিত “অহংকার করেছিল, তাই শাস্তি পেয়েছে” ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে ঐশী ইচ্ছা ও আদেশের দ্বন্দ্ব হিসেবে পুনর্ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাদের সমাধান গ্রহণযোগ্য কি না সেটি আলাদা প্রশ্ন; কিন্তু তারা যে সমস্যাটি ধরেছিলেন সেটি বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রীয় সমস্যারই অন্য রূপ।
কোরআনে ইবলিশ আল্লাহকে বলে, “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”। সুন্নি তাফসিরে স্বীকার করা হয় আল্লাহই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন; সুন্নি আকীদায় বলা হয় আল্লাহই মানুষের কাজ ও পথভ্রষ্টতার কারণসমূহ সৃষ্টি করেন; আর সুফি ধারার আল-হাল্লাজ ও আহমদ আল-গাজ্জালি আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—ইবলিশের তথাকথিত অবাধ্যতাই যদি তার জন্য নির্ধারিত ঐশী ভূমিকা হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর প্রকাশ্য আদেশ অমান্য করেও কি সে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়ন করছিল না?
এই প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু “ইবলিশ অহংকারী ছিল” বলা যথেষ্ট নয়। অহংকার তার মানসিক অবস্থা বর্ণনা করে; সেই অহংকার, তার সিদ্ধান্ত এবং তার নির্ধারিত শয়তানি ভূমিকার চূড়ান্ত উৎস ব্যাখ্যা করে না। আল-হাল্লাজ ও আহমদ আল-গাজ্জালির বিতর্কিত পুনর্ব্যাখ্যা অন্তত সেই গভীরতর সমস্যাটিকে সামনে আনে: ঐশী আদেশ এবং সর্বব্যাপী ঐশী ইচ্ছা যদি একই ঘটনায় বিপরীত দিকে দেখা যায়, তাহলে ইবলিশ আসলে কোনটির বাইরে যেতে পেরেছিল?
আল্লাহ নিজেই শয়তানদের অবিশ্বাসীদের ওপর প্রেরণ করেন
ইসলামি বয়ানে শয়তান সাধারণত আল্লাহর বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থিত হলেও কোরআনের কয়েকটি আয়াতে তার কার্যক্রমকে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন কোনো বিদ্রোহ হিসেবে দেখানো হয়নি। সূরা মারইয়ামে বক্তব্যটি আরও সরাসরি: আল্লাহ নিজেই বলেন, তিনি অবিশ্বাসীদের ওপর শয়তানদের পাঠিয়েছেন, যারা তাদের ক্রমাগত উত্তেজিত ও প্ররোচিত করে। [16]
أَلَمْ تَرَ أَنَّا أَرْسَلْنَا الشَّيَاطِينَ عَلَى الْكَافِرِينَ تَؤُزُّهُمْ أَزًّا فَلَا تَعْجَلْ عَلَيْهِمْ إِنَّمَا نَعُدُّ لَهُمْ عَدًّا
বাংলা অনুবাদ:“তুমি কি দেখ না যে, আমিই অবিশ্বাসীদের ওপর শয়তানদের পাঠিয়েছি, যারা তাদের প্রবলভাবে উত্তেজিত ও প্ররোচিত করে? অতএব তাদের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করো না; আমি কেবল তাদের জন্য [সময় ও কর্ম] গণনা করছি।”
এখানে ব্যবহৃত ক্রিয়া أَرْسَلْنَا—“আমরা পাঠিয়েছি।” অর্থাৎ শয়তানদের উপস্থিতি ও প্ররোচনাকে কোরআন এমনভাবে বর্ণনা করছে না যে তারা আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেরাই মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাবারি আয়াতটির ব্যাখ্যায় আরও স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, আল্লাহ শয়তানদের অবিশ্বাসীদের ওপর পাঠান এবং তারা তাদের পথভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তির মাধ্যমে নাড়া দেয়, আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেয় এবং পাপকে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে—যতক্ষণ না তারা তাতে লিপ্ত হয়। [17]
يقول تعالى ذكره لنبيه محمد: ألم تر يا محمد أنا أرسلنا الشياطين على أهل الكفر بالله، تؤزهم، يقول: تحركهم بالإغواء والإضلال، فتزعجهم إلى معاصي الله، وتغريهم بها حتى يواقعوها، أزا: إزعاجا وإغواء.
বাংলা অনুবাদ:“আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মদকে বলছেন: হে মুহাম্মদ, তুমি কি দেখ না যে আমিই আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসীদের ওপর শয়তানদের পাঠিয়েছি? ‘তারা তাদের প্রবলভাবে প্ররোচিত করে’—অর্থাৎ তারা পথভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তির মাধ্যমে তাদের নাড়া দেয়, আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেয় এবং সেই অবাধ্যতার প্রতি তাদের প্রলুব্ধ করে, যতক্ষণ না তারা তাতে লিপ্ত হয়। ‘প্রবলভাবে প্ররোচিত করে’ অর্থ—তাদের উত্তেজিত ও পথভ্রষ্ট করে।”
তাবারি একই স্থানে ইবন আব্বাস, কাতাদা ও ইবন যায়েদের ব্যাখ্যাও সংরক্ষণ করেছেন। ইবন আব্বাসের নামে বর্ণিত ব্যাখ্যায় শয়তানরা অবিশ্বাসীদের শিরকের দিকে প্ররোচিত করে—“চল, চল, এই পথেই চল”—যতক্ষণ না তাদের আগুনে ফেলতে পারে। কাতাদার ব্যাখ্যায় তারা মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে জোরে ঠেলে দেয়। আর ইবন যায়েদ একই আয়াতের সঙ্গে সূরা যুখরুফের “আমরা তার জন্য একটি শয়তান নির্ধারণ করি, অতঃপর সে তার সঙ্গী হয়” আয়াতকে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ ধ্রুপদী তাফসিরে শয়তানের প্ররোচনা স্বীকৃত, কিন্তু সেই শয়তানকে অবিশ্বাসীদের ওপর পাঠানোর কর্তা হিসেবে আল্লাহকেই বর্ণনা করা হয়েছে।
এই কাঠামোতে একটি অস্বস্তিকর কার্যকারণ তৈরি হয়। প্রথমে মানুষ অবিশ্বাসী বা অবাধ্য; এরপর আল্লাহ তাদের ওপর এমন সত্তাদের পাঠান, যাদের কাজই হলো তাদের আরও অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেওয়া এবং পাপকে আকর্ষণীয় করে তোলা। তারপর সেই মানুষকেই আরও গভীর অবাধ্যতার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়। এটি শয়তানকে আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বাধীন শক্তি হিসেবে নয়, বরং অন্তত এই পর্যায়ে ঐশী শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সক্রিয় যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করে।
তাবারির পরের আয়াতের ব্যাখ্যাও এই দিকটি আরও কঠোর করে। সূরা মারইয়াম ১৯:৮৪ সম্পর্কে তিনি বলেন, তাদের ধ্বংস বিলম্বিত করা হচ্ছে যাতে তারা আরও পাপ বৃদ্ধি করে; তাদের সমস্ত কাজ এমনকি নিঃশ্বাস পর্যন্ত গণনা করা হচ্ছে। [18]
فإنما نؤخر إهلاكهم ليزدادوا إثما، ونحن نعد أعمالهم كلها ونحصيها حتى أنفاسهم لنجازيهم على جميعها.
বাংলা অনুবাদ:“আমি তাদের ধ্বংস বিলম্বিত করি যাতে তারা আরও পাপ বৃদ্ধি করে; আর আমি তাদের সমস্ত কাজ গণনা ও হিসাব করি—এমনকি তাদের নিঃশ্বাসও—যাতে তাদের সবকিছুর প্রতিফল দেওয়া যায়।”
ফলে এখানে শুধু “মানুষ পাপ করে, শয়তান তাকে উৎসাহ দেয়” এতটুকু বলা হচ্ছে না। কোরআনের বক্তব্য হলো, আল্লাহ শয়তানদের তাদের ওপর পাঠান; তাবারির ব্যাখ্যায় সেই শয়তানরা তাদের বিভ্রান্তি ও অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেয়, পাপকে আকর্ষণীয় করে এবং তাতে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে। এরপর তাদের সময় দেওয়া হয় যাতে পাপ আরও বৃদ্ধি পায় এবং পরে সেই কাজগুলোর জন্য শাস্তি দেওয়া হয়। শয়তানের পথভ্রষ্টকারী ভূমিকা এখানে ঐশী ব্যবস্থার বাইরে নয়; বরং সেই ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করছে।
আল্লাহই শয়তানকে মানুষের সঙ্গী করে দেন
সূরা যুখরুফে একই কাঠামো আরও নির্দিষ্ট ভাষায় এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যে রহমানের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আল্লাহ তার জন্য একটি শয়তান নির্ধারণ করেন এবং সেই শয়তান তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়ে যায়। পরের আয়াতেই বলা হয়েছে, এই শয়তানরা তাদের সত্যপথ থেকে বাধা দেয়, অথচ মানুষ মনে করে সে সঠিক পথেই আছে। [19]
وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ حَتَّىٰ إِذَا جَاءَنَا قَالَ يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمَشْرِقَيْنِ فَبِئْسَ الْقَرِينُ
বাংলা অনুবাদ:“যে রহমানের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য একটি শয়তান নির্ধারণ করি; অতঃপর সে তার সঙ্গী হয়ে যায়। আর তারা তাদের পথ থেকে বাধা দেয়, অথচ তারা মনে করে যে তারা সঠিক পথেই আছে। অবশেষে যখন সে আমার কাছে আসবে, তখন সে বলবে, ‘হায়! আমার এবং তোমার মধ্যে যদি পূর্ব ও পশ্চিমের সমান দূরত্ব থাকত!’ কত নিকৃষ্ট সেই সঙ্গী।”
ইবন কাসীর এই আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি হেদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ তার জন্য এমন একটি শয়তান নির্ধারণ করেন যে তাকে পথভ্রষ্ট করে এবং জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে। তিনি একই সঙ্গে সূরা সফের “তারা বেঁকে গেলে আল্লাহ তাদের অন্তর বেঁকিয়ে দিলেন” এবং সূরা ফুসসিলাতের “আমি তাদের জন্য সঙ্গী নির্ধারণ করেছিলাম” আয়াতও উল্লেখ করেন। [20]
هذا الذي تغافل عن الهدى نقيض له من الشياطين من يضله، ويهديه إلى صراط الجحيم … ولكن الله يهدي من يشاء، ويضل من يشاء.
বাংলা অনুবাদ:“যে ব্যক্তি হেদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য শয়তানদের মধ্য থেকে এমন একজনকে নির্ধারণ করি যে তাকে পথভ্রষ্ট করে এবং জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে। … আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন এবং যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন।”
এখানেও ধ্রুপদী ব্যাখ্যার কাঠামো হলো: মানুষের প্রাথমিক বিমুখতার পর তাকে আরও পথভ্রষ্ট করার জন্য শয়তানকে সঙ্গী করে দেওয়া হয়। ফলে আগের প্রথম-কারণ প্রশ্নটি এখানেও অমীমাংসিত থাকে; কিন্তু একটি দ্বিতীয় বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়—পরবর্তী পথভ্রষ্টতার জন্য ব্যবহৃত শয়তানটিকেও আল্লাহই নির্ধারণ করেন। ইবন কাসীরের ভাষায়, সেই নির্ধারিত শয়তান মানুষকে সত্যপথ থেকে সরিয়ে “জাহান্নামের পথে” নিয়ে যায়।
শুধু অবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রেই নয়, সহিহ মুসলিমে আরও বিস্তৃত একটি ধারণা পাওয়া যায়। ইবন মাসউদের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেন, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই জিনদের মধ্য থেকে একটি ক্বারীন বা সঙ্গী নিযুক্ত রয়েছে। সাহাবারা জিজ্ঞেস করেন, মুহাম্মদের সঙ্গেও কি? তিনি বলেন, তাঁর সঙ্গেও; তবে আল্লাহ তাঁর বিরুদ্ধে তাঁকে সাহায্য করেছেন। [21]
ما منكم من أحد إلا وقد وكل به قرينه من الجن. قالوا: وإياك يا رسول الله؟ قال: وإياي، إلا أن الله أعانني عليه، فأسلم، فلا يأمرني إلا بخير.
বাংলা অনুবাদ:“তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার সঙ্গে জিনদের মধ্য থেকে তার ক্বারীন নিযুক্ত করা হয়নি।” তারা বলল, “আপনার সঙ্গেও, হে আল্লাহর রাসুল?” তিনি বললেন, “আমার সঙ্গেও; তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে সে আত্মসমর্পণ করেছে/মুসলিম হয়েছে এবং আমাকে কেবল ভালো কাজেরই নির্দেশ দেয়।”
আল-নওয়াবি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এর মধ্যে ক্বারীনের ফিতনা, কুমন্ত্রণা ও পথভ্রষ্টতা থেকে সতর্ক থাকার নির্দেশ রয়েছে; মানুষকে জানানো হয়েছে যে এই সঙ্গী তার সঙ্গে রয়েছে, যাতে সে তার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকে। [22]
وفي هذا الحديث إشارة إلى التحذير من فتنة القرين ووسوسته وإغوائه، فأعلمنا بأنه معنا لنحترز منه بحسب الإمكان.
বাংলা অনুবাদ:“এই হাদিসে ক্বারীনের ফিতনা, তার কুমন্ত্রণা এবং তার পথভ্রষ্টকরণ থেকে সতর্ক থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। আমাদের জানানো হয়েছে যে সে আমাদের সঙ্গে রয়েছে, যাতে যতটা সম্ভব তার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে পারি।”
এখানে একটি পার্থক্য জরুরি। সূরা যুখরুফে শয়তানি সঙ্গী নির্ধারণকে রহমানের স্মরণ থেকে বিমুখতার পরিণতি হিসেবে বলা হয়েছে; আর সহিহ মুসলিমের হাদিসে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গেই জিনের ক্বারীন থাকার সাধারণ দাবি করা হয়েছে। দুটি উৎস একই দাবি করছে না। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই শয়তানি প্ররোচনাকে মানুষের বাইরে থেকে আসা এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার উপস্থিতি ইসলামি বিশ্বদৃষ্টিতে ঐশী ব্যবস্থার বাইরে নয়।
ফলে শয়তানের ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত সরল চিত্র—আল্লাহ মানুষকে ভালো পথে ডাকছেন আর একটি স্বাধীন বিদ্রোহী শয়তান বিপরীত দিক থেকে সেই পরিকল্পনা নষ্ট করার চেষ্টা করছে—কোরআন ও ধ্রুপদী ব্যাখ্যার পূর্ণ চিত্র নয়। কোরআনে আল্লাহ শয়তানদের অবিশ্বাসীদের ওপর পাঠান, রহমানের স্মরণ থেকে বিমুখ ব্যক্তির জন্য শয়তান নির্ধারণ করেন, সেই শয়তান তাকে পথ থেকে বাধা দেয়; আর হাদিসে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে একটি জিন-ক্বারীনের উপস্থিতির কথা বলা হয়। অর্থাৎ শয়তানি প্ররোচনার ব্যবস্থাটিও ইসলামি বয়ানের ভেতরে ঐশী নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণের বাইরে স্বাধীন কোনো ব্যবস্থা নয়।
ইবলিশের বিদ্রোহও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়
ইবলিশকে যদি আল্লাহর পরিকল্পনার বিপরীতে দাঁড়ানো স্বাধীন এক অশুভ শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে কোরআনের কাহিনির আরেকটি অংশের সঙ্গে সেই ধারণা মেলে না। আদমকে সিজদা করতে অস্বীকার করার পর ইবলিশকে অভিশপ্ত করা হয়; কিন্তু এরপর সে যখন পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত অবকাশ চায়, আল্লাহ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন না। বরং তাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। [23]
قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ قَالَ رَبِّ فَأَنْظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ
বাংলা অনুবাদ:“তিনি বললেন, ‘তাহলে এখান থেকে বের হয়ে যাও; নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত। বিচার দিবস পর্যন্ত তোমার ওপর অভিশাপ থাকবে।’ সে বলল, ‘হে আমার রব, যেদিন তাদের পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন।’ তিনি বললেন, ‘তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত—নির্ধারিত সময়ের দিন পর্যন্ত।’”
অর্থাৎ মানুষের বিরুদ্ধে ইবলিশের পরবর্তী দীর্ঘ কার্যক্রম এমন কিছু নয় যা আল্লাহ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কোরআনের নিজের বয়ানে তার অস্তিত্বের মেয়াদই আল্লাহ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এরপর ইবলিশ আবার আল্লাহকেই বলে—“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”—এবং ঘোষণা করে যে সে মানুষের জন্য পাপকে আকর্ষণীয় করবে ও তাদের পথভ্রষ্ট করবে। ইবন কাসীর এই বাক্যের একটি অর্থ সরাসরি দিয়েছেন: “আপনি আমাকে যেভাবে পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী করেছেন”; এরপর ইবলিশ বলছে, সে আদমসন্তানদের কাছে পাপকে প্রিয় করে তুলবে এবং তাদের সেই দিকে ঠেলে দেবে। [24]
يقول تعالى مخبرا عن إبليس وتمرده وعتوه أنه قال للرب: بِمَا أَغْوَيْتَنِي … ويحتمل أنه بسبب ما أغويتني وأضللتني لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ أي: لذرية آدم في الأرض، أي: أحبب إليهم المعاصي وأرغبهم فيها، وأؤزهم إليها، وأزعجهم إزعاجا، وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أي: كما أغويتني.
বাংলা অনুবাদ:“আল্লাহ ইবলিশের বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার কথা জানিয়ে বলেন, সে তার রবকে বলেছিল: ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।’ এর অর্থ এমনও হতে পারে: ‘আপনি আমাকে যেভাবে পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী করেছেন, তার কারণে আমি আদমের সন্তানদের জন্য পৃথিবীতে [পাপ] সুশোভিত করব’; অর্থাৎ তাদের কাছে পাপকাজকে প্রিয় করে তুলব, তাদের তাতে আগ্রহী করব, সেই দিকে উত্তেজিত ও প্রবলভাবে ঠেলে দেব। আর ‘আমি অবশ্যই তাদের পথভ্রষ্ট করব’ অর্থ—‘আপনি আমাকে যেভাবে পথভ্রষ্ট করেছেন, সেভাবে।’”
কিন্তু এই ক্ষমতাও সীমাহীন নয়। একই ধারাবাহিকতায় আল্লাহ বলেন, তাঁর নির্বাচিত বা নিষ্ঠাবান বান্দাদের ওপর ইবলিশের কর্তৃত্ব থাকবে না; তার অনুসরণকারী পথভ্রষ্টদের ক্ষেত্রেই তার কার্যকর প্রভাব থাকবে। Islamweb-ও এই আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছে, শয়তানের এমন কোনো সর্বময় ক্ষমতা নেই যার দ্বারা সে কাউকে জোর করে পাপ করাতে পারে; তার ভূমিকা প্ররোচনা, কুমন্ত্রণা ও পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা। [25]
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ
বাংলা অনুবাদ:“নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব নেই; তবে পথভ্রষ্টদের মধ্যে যারা তোমাকে অনুসরণ করে তারা ছাড়া।”
এই সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি আগের কার্যকারণগত প্রশ্ন বাতিল করে না। ইবলিশ মানুষকে জোর করে পাপ করায় না—এটি এক দাবি; আর ইবলিশ নিজে কীভাবে প্রথম পথভ্রষ্ট হলো এবং তার পরবর্তী শয়তানি ভূমিকা কে অনুমোদন, নির্ধারণ ও সীমাবদ্ধ করল—এটি অন্য প্রশ্ন। কোরআনের বয়ান দ্বিতীয় প্রশ্নে আল্লাহকে ঘটনাটির বাইরে রাখে না: আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে অবকাশ দেন, তার কার্যক্ষেত্র সীমাবদ্ধ করেন, কিছু মানুষের ওপর শয়তান পাঠান এবং কিছু মানুষের জন্য শয়তানি সঙ্গী নির্ধারণ করেন।
শয়তান কি সত্যিই আল্লাহর স্বাধীন প্রতিপক্ষ?
ইসলামি কাহিনিতে শয়তান আল্লাহর সমশক্তিশালী প্রতিপক্ষ নয়। সে আল্লাহর সৃষ্ট সত্তা; তার জীবনকাল আল্লাহর অনুমোদিত; তার কর্মক্ষমতা সীমিত; তার পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন; এবং সুন্নি তাকদীরের নীতি অনুযায়ী তার নিজের কাজও আল্লাহর সৃষ্টি ও ইচ্ছার বাইরে নয়। ফলে তাকে এমন একটি স্বাধীন অশুভ শক্তি হিসেবে দেখানো যায় না, যে আল্লাহর পরিকল্পনা ভেঙে দিয়ে নিজের আলাদা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
এই কারণেই ইবলিশের ঘটনা সাধারণ মানুষের পাপের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ক্ষেত্রে বলা যায়—শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়েছে। কিন্তু শয়তানের নিজের প্রথম অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সেই উত্তর আর ব্যবহার করা যায় না। সেখানে ফিরে আসতে হয় ইবলিশের নিজের বক্তব্যে: “আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।” ধ্রুপদী তাফসিরও এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে বাতিল করেনি; বরং ইবন আব্বাস, তাবারি, ইবন কাসীর এবং পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যায় আল্লাহর পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা স্বীকার করা হয়েছে। Islamweb ও IslamQA আরও স্পষ্টভাবে বলেছে যে আল্লাহ হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতার স্রষ্টা, মানুষের কাজের স্রষ্টা এবং পথভ্রষ্টতার কারণসমূহও তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত।
এরপর সাধারণ প্রতিরক্ষা হলো—ইবলিশ আগে নিজে অহংকার করেছে, তারপর আল্লাহ তাকে শাস্তিস্বরূপ পথভ্রষ্ট করেছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা প্রথম অহংকারের উৎসের প্রশ্ন সমাধান করে না। যদি সেই অহংকারও ইবলিশের একটি কাজ হয়, এবং যদি সুন্নি তাকদীর অনুযায়ী বান্দার সমস্ত কাজ আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর ইচ্ছার অধীন হয়, তাহলে প্রথম বিচ্যুতিকে আল্লাহর কার্যকারণগত কাঠামোর বাইরে সরিয়ে নেওয়া যায় না। “ইবলিশ নিজের ইচ্ছায় করেছে” এবং “তার ইচ্ছা ও কাজ আল্লাহর সৃষ্টি ও সর্বব্যাপী ইচ্ছার বাইরে নয়”—দুটি দাবিই একই আকীদায় একসঙ্গে রাখা হয়; সমস্যা ঠিক এই দুই দাবির সম্পর্কেই।
আহমদ আল-গাজ্জালি ও আল-হাল্লাজের বিতর্কিত ইবলিশ-ব্যাখ্যা এই দ্বন্দ্বকে অন্যভাবে সামনে এনেছিল। তারা ইবলিশকে মূলধারার মতো শুধু অহংকারী বিদ্রোহী হিসেবে রেখে দেননি; বরং প্রশ্ন তুলেছেন, আল্লাহর প্রকাশ্য আদেশ অমান্য করলেও ইবলিশ কি শেষ পর্যন্ত তার জন্য নির্ধারিত ঐশী ভূমিকারই বাইরে যেতে পেরেছিল? আল-হাল্লাজের ইবলিশের ভাষায়, “নির্বাচনের অধিকার আমার নয়, তোমার”; আহমদ আল-গাজ্জালির ভাষায়, ইবলিশের ওপর ছিল “কাযা” ও “কদর”-এর আঘাত। এসব ব্যাখ্যা মূলধারার সুন্নি আকীদা নয়, কিন্তু এগুলো একই কার্যকারণগত সমস্যার একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
উপসংহার
“শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করে”—এই পরিচিত বক্তব্যটি সমস্যাটিকে মানুষের পর্যায়ে থামিয়ে দেয়। কিন্তু প্রশ্নটি এক ধাপ পেছনে নিলেই দেখা যায়: শয়তানকে কে পথভ্রষ্ট করেছিল? কোরআনের ইবলিশ নিজেই এর উত্তর দেয়—“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন।”
এরপর পুরো বয়ানটি একই দিকে এগোয়। ইবলিশের অস্তিত্ব ও কর্মক্ষমতা স্বাধীন নয়; তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাঁচতে দেওয়া হয়েছে, মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং তার ক্ষমতার সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু মানুষের ওপর শয়তান পাঠানোর কথাও কোরআনে আছে; কিছু মানুষের জন্য শয়তানি সঙ্গী নির্ধারণের কথাও আছে। একই সঙ্গে সুন্নি তাকদীর বলে, কোনো ঘটনাই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে ঘটে না এবং বান্দার কাজও তাঁর সৃষ্টি।
তাই সমস্যাটি শুধু এই নয় যে ইবলিশ মানুষকে পাপে প্ররোচিত করে। আরও মৌলিক সমস্যা হলো—ইবলিশের নিজের প্রথম বিদ্রোহ, তার অহংকার, তার পথভ্রষ্টতা এবং তারপর অন্যদের পথভ্রষ্ট করার দীর্ঘ ভূমিকা—সবকিছুকে যদি আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান, ইচ্ছা, সৃষ্টি ও তাকদীরের ভেতরেই রাখতে হয়, তাহলে শয়তানকে এই ব্যবস্থার স্বাধীন উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
“ইবলিশ নিজের ইচ্ছায় করেছে” বললেও এই সমস্যা শেষ হয় না। কারণ তখন পরের প্রশ্ন হলো—তার সেই ইচ্ছার চূড়ান্ত উৎস কী? যদি সেই ইচ্ছাও সৃষ্ট, পূর্বনির্ধারিত এবং আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে অকার্যকর হয়, তাহলে ইবলিশ সর্বশেষ কারণ নয়; সে কার্যকারণ-শৃঙ্খলের মধ্যবর্তী একটি সত্তা। আর যদি তার ইচ্ছাকে আল্লাহর নির্ধারণ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা হয়, তাহলে সর্বব্যাপী তাকদীর ও ঐশী ইচ্ছার দাবিই সীমিত হয়ে যায়।
ইসলামি ধর্মতত্ত্ব সাধারণত মানুষের দায়, ইবলিশের দায় এবং আল্লাহর সর্বময় নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটিই একসঙ্গে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু ইবলিশের ঘটনা এই তিন দাবির সংযোগস্থলেই সবচেয়ে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি করে। মানুষের পাপের জন্য শয়তানকে দায়ী করা সম্ভব; কিন্তু শয়তানের প্রথম পথভ্রষ্টতার জন্য আরেক শয়তান নেই। তখন কার্যকারণের রেখাটি শেষ পর্যন্ত সেই সত্তার কাছেই ফিরে যায়, যার সম্পর্কে একই আকীদা বলে—তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা আল-আরাফ ৭:১৬–১৭ ↩︎
- إسلام ويب — تفسير قوله تعالى: فبما أغويتني ↩︎
- তাফসীর ইবন কাসীর — সূরা আল-আরাফ ৭:১৬–১৭ ↩︎
- তাফসীর আল-তাবারি — সূরা আল-আরাফ ৭:১৬ ↩︎
- সূরা আরাফ, আয়াত ১৬ ↩︎
- إسلام ويب — معنى قوله تعالى: يضل من يشاء 1 2
- الإسلام سؤال وجواب — في بيان وتوضيح معنى الإضلال في النصوص الشرعية 1 2
- الإسلام سؤال وجواب — كيف يكون إرسال الرسل حجة على الناس رغم أن الهداية من الله؟ ↩︎
- ইবন আল-জাওযি — আল-মুনতাযাম ফি তারীখ আল-মুলূক ওয়াল উমাম, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২৩৮–২৪০; জীবনী নং ৩৯৩৯: আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ, আবুল ফুতূহ আল-গাজ্জালি আল-তূসি ↩︎
- ইবন আল-জাওযি — আল-কুসসাস ওয়াল-মুযাক্কিরীন, পৃষ্ঠা ৩১৩ ↩︎
- ইবন আবি আল-হাদিদ, শারহ নাহজ আল-বালাগাহ — আহমদ আল-গাজ্জালি ও ইবলিশের তাওহীদ ↩︎
- Ghorban Elmi, “Ahmad Ghazali’s Satan,” HTS Theological Studies 75(3) ↩︎
- হুসাইন ইবন মানসুর আল-হাল্লাজ — মাজমু‘আত আছার আল-হাল্লাজ, তাওয়াসীন, পৃষ্ঠা ৫০ ↩︎
- হুসাইন ইবন মানসুর আল-হাল্লাজ — দিওয়ান আল-হাল্লাজ, তাসীন আল-আযাল ওয়াল-ইলতিবাস, পৃষ্ঠা ১০৪ ↩︎
- Ghorban Elmi, “Ahmad Ghazali’s Satan” — Hallaj and Ghazali traditions ↩︎
- সূরা মারইয়াম ১৯:৮৩–৮৪ ↩︎
- তাফসীর আল-তাবারি — সূরা মারইয়াম ১৯:৮৩–৮৪ ↩︎
- তাফসীর আল-তাবারি — সূরা মারইয়াম ১৯:৮৪ ↩︎
- সূরা যুখরুফ ৪৩:৩৬–৩৯ ↩︎
- তাফসীর ইবন কাসীর — সূরা যুখরুফ ৪৩:৩৬–৪০ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮১৪; শারহ আল-নওয়াবি — প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জিনের ক্বারীন ↩︎
- আল-নওয়াবি, শারহ সহিহ মুসলিম — ক্বারীনের কুমন্ত্রণা ও পথভ্রষ্টতা ↩︎
- তাফসীর ইবন কাসীর — সূরা আল-হিজর ১৫:৩৪–৩৮ ↩︎
- তাফসীর ইবন কাসীর — সূরা আল-হিজর ১৫:৩৯–৪৪ ↩︎
- Islamweb — تفسير إن عبادي ليس لك عليهم سلطان ↩︎

