জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

মুরতাদ ওহী লেখক আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারাহ এর ধর্মত্যাগের কারণ বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: এপ্রিল 23, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন96 মিনিট পড়া

ভূমিকা

আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহকে ইসলামি ঐতিহ্যে কেবল একজন ‘সাধারণ সাহাবি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না; বরং তাঁকে একজন কুরাইশ বংশীয় শিক্ষিত ব্যক্তি এবং মুহাম্মদের ওহি লেখকদের একজন বলে চিহ্নিত করা হয়। এই পরিচয়ের মধ্যেই একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে: ওহি লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তি কেন ধর্মত্যাগ করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে সেই বাণী রচনায় নিজের অংশগ্রহণের অভিযোগ তুলবেন? তিনি যদি সত্যিই মুহাম্মদের নির্দেশে কোরআন লিখে থাকেন, তাহলে ওহি বলার, শোনার, লেখার এবং যাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকার কথা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই যখন তাঁর মনে সংশয় জন্মানোর বিবরণ পাওয়া যায়, তখন বিষয়টিকে শুধু একজন ব্যক্তির বিশ্বাস হারানো বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটি সরাসরি কোরআনের কথিত ঐশ্বরিক উৎস এবং সেই বাণী লিপিবদ্ধ করার প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

মুহাম্মদ যদি নিজে নিরক্ষর হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে নিশ্চিত হতেন যে, তাঁর ওহি লেখক ঠিক সেই শব্দগুলোই লিখছেন, যেগুলো তিনি বলেছেন? একজন নিরক্ষর ব্যক্তি অন্যের লেখা পড়ে যাচাই করতে পারেন না, কিন্তু লেখককে দিয়ে তা পড়ে শুনিয়ে যাচাই করতে পারেন। এখানেই প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে: লেখা কি নিয়মিত পড়ে শোনানো হতো? হলে পরিবর্তিত শব্দ ধরা পড়ত কীভাবে? আর পরিবর্তিত শব্দ পড়ে শোনানোর পরও যদি তা অনুমোদন করা হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যাটি শুধু লেখকের অসতর্কতা বা নবীর নিরক্ষরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি পৌঁছে যায় কোন শব্দকে ওহি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে এবং সেই গ্রহণের মানদণ্ড কী—এই মৌলিক প্রশ্নে। যে বাণীর প্রতিটি শব্দ আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে বলে দাবি করা হয়, তার শব্দ নির্বাচনে একজন লেখকের প্রস্তাব বা পরিবর্তন গ্রহণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।

একাধিক প্রাচীন ইসলামি তাফসিরি ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে সচেতনভাবে শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ সংরক্ষিত আছে। কোনো বর্ণনায় আল্লাহর একটি গুণবাচক শব্দের জায়গায় অন্য গুণবাচক শব্দ লেখার কথা এসেছে; কোনো বর্ণনায় এসেছে, পরিবর্তিত লেখা মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর পর তিনি সেটিকে একই অর্থের বা গ্রহণযোগ্য বলে অনুমোদন করতেন। আবদুল্লাহ এই অভিজ্ঞতা থেকে দাবি করেছিলেন যে, মুহাম্মদের নামে প্রচারিত বাণীর মতো কথা তিনিও বলতে পারেন। এখানে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হলো: যদি ওহি সত্যিই নির্দিষ্ট শব্দে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে লেখকের নির্বাচিত বিকল্প শব্দ কীভাবে সেই ওহির সমপর্যায়ের হয়ে যায়? অর্থ কাছাকাছি হলেই কি দুটি ভিন্ন বাক্য একই ঐশ্বরিক বাণী হয়ে যায়? আর যদি লেখকের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে কোরআনের শব্দবিন্যাসে তাঁর ভূমিকা কোথায় শেষ এবং কথিত ঐশ্বরিক নির্দেশ কোথায় শুরু—সেই সীমারেখা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?

এর সঙ্গে যুক্ত হয় মুহাম্মদের স্মৃতি এবং কোরআনের আয়াত ভুলে যাওয়ার বিষয়ে ইসলামি বর্ণনাগুলো। কোনো বাণী মুখে বলা হলো, লেখক সেটি লিখলেন, পরে সেই লেখা আবার শুনিয়ে অনুমোদন নেওয়া হলো—এই পুরো ব্যবস্থাই মানুষের স্মৃতি, শ্রবণ, ভাষা বোঝার ক্ষমতা এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর নির্ভর করে। অথচ ধর্মীয় দাবিতে এই মানবিক প্রক্রিয়ার ফলাফলকে উপস্থাপন করা হয় ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা ঈশ্বরের অপরিবর্তিত বাণী হিসেবে। সেই দাবি যাচাই করতে হলে শুধু ‘আল্লাহ সংরক্ষণ করেছেন’ বলা যথেষ্ট নয়; বাস্তবে কীভাবে সংরক্ষণ হয়েছে, কোন পরিবর্তন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কোনটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার প্রমাণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। আবদুল্লাহর অভিযোগ সত্য হলে বর্তমান পাঠের কোনো অংশে একজন ওহি লেখকের রচিত বা নির্বাচিত বাক্য রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে। আর অভিযোগটি মিথ্যা হলে, সেটি মিথ্যা প্রমাণ করার জন্যও ধর্মীয় আনুগত্যের বাইরে যাচাইযোগ্য কারণ প্রয়োজন।

আবদুল্লাহর সংশয় শুধু শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগে থেমে থাকেনি। সূরা মুমিনুনের একটি প্রশংসাবাক্য তাঁর নিজের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার পর সেটিকে ওহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করার বিবরণও ইসলামি গ্রন্থে পাওয়া যায়। এই বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল: মুহাম্মদের কাছে যদি প্রত্যাদেশ আসে, তাহলে একই কথা আমার মুখ থেকে বের হওয়াকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আর মুহাম্মদ যদি নিজেই এই বাণী রচনা করেন, তাহলে আমিও তো তাঁর মতো কথা বলতে পারছি। ফলে তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাকে মুহাম্মদের নবুয়তের দাবির বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকেন। এই প্রচার কি শুধু একজন ব্যক্তির বিদ্রোহ, নাকি ওহি লেখার দায়িত্বে থাকা একজন মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া ইসলামের জন্য গভীরভাবে অস্বস্তিকর একটি অভিযোগ? প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে আগে থেকেই সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী ধরে নেওয়ার নয়; প্রশ্নটি হলো, ধর্মীয় দাবির পক্ষে উপস্থাপিত ইতিহাস সেই দাবির পরীক্ষায় কতটা টিকে থাকে।


সূরা মুমিনুনঃ মানবিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ

আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের ধর্মত্যাগের সঙ্গে যুক্ত বহুল আলোচিত বর্ণনাগুলোর একটি হলো সূরা আল-মুমিনুনের ১২ থেকে ১৪ নম্বর আয়াত লিপিবদ্ধ করার ঘটনা। এখানে মানবসৃষ্টির বিবরণ দেওয়া হয়েছে ঈশ্বরের প্রথম পুরুষে—শুক্রবিন্দু, রক্তপিণ্ড, মাংসপিণ্ড, হাড়, মাংসের আবরণ এবং শেষে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। আরবি পাঠে এই কাজগুলোর বর্ণনায় ‘আমরা’ অর্থবোধক ক্রিয়ারূপ ব্যবহৃত হয়েছে; বাংলা অনুবাদগুলোর অনেকটিতে তা ‘আমি’ দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু আয়াতের শেষ বাক্যটি হলো: “অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!” এখানে নিজের সৃষ্টিকর্ম বর্ণনা করার ভাষা থেকে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করার ভাষায় পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যখন ইসলামি তাফসিরে সংরক্ষিত একজন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসাবাক্যের ঘটনা যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি কেবল ভাষার অলংকারের আলোচনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে বাক্যটির উৎস এবং ওহি হিসেবে গ্রহণের প্রশ্ন। [1]

বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ যখন মানবসৃষ্টির আয়াতগুলো আবদুল্লাহকে লিখতে বলছিলেন, আবদুল্লাহ সৃষ্টির বিবরণ শুনে মুগ্ধ হয়ে বলে ওঠেন, “ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন”—অর্থাৎ, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়। মুহাম্মদ তখন সেই বাক্যটিও তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে বলে জানান। তাফসীরে মাযহারীর বাংলা বিবরণে বাক্যটি লিপিবদ্ধ করার নির্দেশও রয়েছে। এই ঘটনার তাৎপর্য হলো, লেখকের নিজের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উচ্চারিত কথার সঙ্গে ওহির দাবিকৃত ভাষার মিল তাঁকেই সংশয়ের দিকে নিয়ে যায়। যে বাক্য একজন লেখক নিজের উপলব্ধি থেকে বলতে পারেন, সেই একই বাক্যের ক্ষেত্রে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ এবং মানুষের রচনা আলাদা করে চেনার মানদণ্ড কী? মুহাম্মদের ঘোষণা ছাড়া সেই উৎস যাচাই করার আর কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, বর্ণনাটি সেই প্রশ্ন সামনে আনে। [2]

সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১৪:
ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ

Then We made the sperm-drop into a clinging clot, and We made the clot into a lump [of flesh], and We made [from] the lump, bones, and We covered the bones with flesh; then We developed him into another creation. So blessed is Allāh, the best of creators.
— Saheeh International

পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট বাঁধা রক্তে, অতঃপর মাংসপিন্ডকে পরিণত করি হাড্ডিতে, অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করি মাংস দিয়ে, অতঃপর তাকে এক নতুন সৃষ্টিতে উন্নীত করি। কাজেই সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান!
— Taisirul Quran

পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!
— Sheikh Mujibur Rahman

তারপর শুক্রকে আমি ‘আলাকায় পরিণত করি। তারপর ‘আলাকাকে গোশতপিন্ডে পরিণত করি। তারপর গোশতপিন্ডকে হাড়ে পরিণত করি। তারপর হাড়কে গোশ্ত দিয়ে আবৃত করি। অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!
— Rawai Al-bayan

ইংরেজি ও বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে আমরা দেখি, সৃষ্টিকর্মের বিবরণ প্রথম পুরুষে দেওয়া হলেও শেষ বাক্যে আল্লাহকে নাম ধরে প্রশংসা করা হয়েছে। ব্যাকরণিক পুরুষের এই পরিবর্তন এবং প্রকৃত বক্তা বদলে যাওয়া এক বিষয় নয়; একজন বক্তা নিজের নাম উল্লেখ করেও কথা বলতে পারেন। কিন্তু এই ভাষাগত পর্যবেক্ষণ দিয়ে আবদুল্লাহকে নিয়ে সংরক্ষিত ঘটনাটির নিষ্পত্তি হয় না। এখানে অভিযোগটি আরও নির্দিষ্ট: আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্যটি লেখক নিজের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উচ্চারণ করেছিলেন এবং মুহাম্মদ সেটিকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ বাক্য বলে চিহ্নিত করেছিলেন। সুতরাং প্রশ্নটি শুধু ‘আয়াতে তৃতীয় পুরুষ কেন’ নয়; প্রশ্নটি হলো, যে বাক্য মানুষের মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হচ্ছে, তার ঐশ্বরিক উৎসের দাবিকে কীভাবে যাচাই করা হবে? মানুষের উচ্চারণের সঙ্গে মিল থাকাকে অলৌকিক বলে ঘোষণা করলেই সেই মিলের কারণ প্রমাণিত হয় না।


তাফসীরে মাযহারীর বিবরণ

তাফসীরে মাযহারীর বাংলা অনুবাদে ঘটনাটির একটি বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেখানে আবদুল্লাহর শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ, মানবসৃষ্টির আয়াত শুনে তাঁর নিজের প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ, সেই বাক্য লিখে নেওয়ার নির্দেশ এবং এর ফলে তাঁর ধর্মত্যাগ—সবই একই আলোচনায় এসেছে। পরে তাঁর ইসলাম গ্রহণ, উসমানের সুপারিশ এবং শেষজীবনের ধর্মীয় মর্যাদার বিবরণও যুক্ত করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, গ্রন্থটি আবদুল্লাহর পরবর্তী জীবনের প্রশংসা করলেও ওহি লিপিবদ্ধ করার সময় তাঁর সংশয় জন্মানোর অস্বস্তিকর ঘটনাটি বাদ দেয়নি। ফলে তাঁর পরবর্তী বিশ্বাসের দাবি দিয়ে পূর্ববর্তী অভিযোগটির যুক্তিগত প্রশ্ন মুছে দেওয়া যায় না। কেউ পরে বিশ্বাসে ফিরে এসেছেন—এই তথ্য থেকে তাঁর আগের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কোন বক্তব্য সত্য বা মিথ্যা ছিল, তা নিজে থেকেই নির্ধারিত হয় না। [3]

এরপর বলা হয়েছে-‘এবং যে বলে ‘আল্লাহ্ যা অবতারণ করেছেন আমিও তার অনুরূপ অবতারণ করবো, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে? বাগবী বলেছেন, এই বাক্যটি অবতীর্ণ হয়েছে আবদুল্লাহ্ বিন আবী সারাহ্ সম্পর্কে।
আবদুল্লাহ্ ইসলাম গ্রহণ করলে রসুল স. তাকে কোরআন মজীদ লিপিবদ্ধ করার কাজে নিযুক্ত করলেন। কিন্তু সে বিশ্বাসভাজন ছিলো না। রসুল স. যখন বলতেন ‘সামিয়াম বাসিরান’। সে লিখতো আলীমান হাকিমান। আবার রসুল স. বলতেন, ‘আলীমান হাকিমান, ‘সে তখন লিখতো ‘গফুরার রহীমান।’ একদিন অবতীর্ণ হলো ‘ওয়ালাক্বদ খলাকুনাল ইনসানা মিন সুলালাতিম মিনি’ (আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে)। রসুল স. সদ্য অবতীর্ণ আয়াতটি লিখতে নির্দেশ দিলেন। মানব সৃষ্টি সম্পর্কিত এই আয়াতটি খুবই ভালো লাগলো আবদুল্লাহর। সে হঠাৎ বলে উঠলো-‘ফা তাবারাকাল্লহু আহসানাল খলিকিন’ (আল্লাহপাক কতোইনা সুন্দর স্রষ্টা)। রসুল স. বললেন, এ বাক্যটিও লিপিবদ্ধ করো। এই আয়াতটিও সদ্য অবতীর্ণ। এ কথা শুনে আবদুল্লাহ্ ভাবলো আশ্চর্য! আমার উপরেও তাহলে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়। এ রকম চিন্তার ফলে সে হয়ে গেলো ধর্মত্যাগী। মিশে গেলো মুশরিকদের দলে। হজরত ইকরামা, ইবনে জারীর এবং সুদ্দীও এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন। যথাস্থানে এর বিবরণ দেয়া হবে।
বাগবী উল্লেখ করেছেন, মক্কা বিজয়ের পূর্বে রসুল স. যখন মাররুজ জাহরান নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করলেন, তখন অনুতপ্ত আবদুল্লাহ্ এসে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করলেন। হাফেজ ফাহুদ্দীন ইবনে সাইয়্যেদিন্নাস তাঁর রচিত রসুল স. এর জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তখন আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী সারাহের জন্য সুপারিশ করেছিলেন হজরত ওসমান। রসুল স. হজরত ওসমানের সুপারিশ কবুল করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী সারাহ ছিলেন খাঁটী ইমানদার। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আর কেউ কোনো সন্দেহ করেননি। শেষে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন সেজদারত অবস্থায়।

আবদুল্লাহ
আবদুল্লাহ 1

ওয়াহিদীর বর্ণনাঃ লেখকের নিজের বাক্য থেকে সংশয়ের জন্ম

ওয়াহিদী তাঁর ‘আসবাবুন নুযুল’ গ্রন্থে সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের একটি অংশের ব্যাখ্যায় ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর সংরক্ষিত বর্ণনায় আবদুল্লাহর সংশয়ের যুক্তিটি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে: মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে একই কথা আমার মুখ থেকে বের হওয়ার অর্থ আমিও প্রত্যাদেশ পেয়েছি; আর তিনি মিথ্যাবাদী হলে আমিও তাঁর মতো কথা বলতে পেরেছি। এই বক্তব্যের গুরুত্ব হলো, আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগকে এখানে কেবল লোভ, শত্রুতা বা অকারণ অবাধ্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়নি; তাঁর সংশয়ের পেছনে ওহি লেখার সময়কার একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা যুক্ত করা হয়েছে। ওয়াহিদী এটিকে কালবীর মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংশ্লিষ্ট ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণটি পড়লে বোঝা যায়, মানবিক উচ্চারণ ও কথিত প্রত্যাদেশের মিলই এই কাহিনির কেন্দ্রীয় সমস্যা। [4]

মূল আরবি:
قَوْلُهُ تَعَالَى: (وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ). نَزَلَتْ فِي عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ، كَانَ قَدْ تَكَلَّمَ بِالْإِسْلَامِ، فَدَعَاهُ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – ذَاتَ يَوْمٍ يَكْتُبُ لَهُ شَيْئًا، فَلَمَّا نَزَلَتِ الْآيَةُ الَّتِي فِي الْمُؤْمِنُونَ: (وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ) أَمْلَاهَا عَلَيْهِ، فَلَمَّا انْتَهَى إِلَى قَوْلِهِ: (ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ) عَجِبَ عَبْدُ اللَّهِ فِي تَفْصِيلِ خَلْقِ الْإِنْسَانِ، فَقَالَ: تَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -: (هَكَذَا أُنْزِلَتْ عَلَيَّ)، فَشَكَّ عَبْدُ اللَّهِ حِينَئِذٍ وَقَالَ: لَئِنْ كَانَ مُحَمَّدٌ صَادِقًا لَقَدْ أُوحِيَ إِلَيَّ كَمَا أُوحِيَ إِلَيْهِ، وَلَئِنْ كَانَ كَذَّابًا لَقَدْ قُلْتُ كَمَا قَالَ، وَذَلِكَ قَوْلُهُ: (وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ) وَارْتَدَّ عَنِ الْإِسْلَامِ، وَهَذَا قَوْلُ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي رِوَايَةِ الْكَلْبِيِّ.

বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহর বক্তব্য: “এবং যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব।” এটি আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল। তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছিলেন। একদিন আল্লাহর রাসুল তাঁকে কিছু লিখে দেওয়ার জন্য ডাকলেন। সূরা মুমিনুনের “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি নির্যাস থেকে” আয়াতটি অবতীর্ণ হলে তিনি তাঁকে তা লিখতে বললেন। যখন তিনি “অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম” পর্যন্ত পৌঁছালেন, মানবসৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণ শুনে আবদুল্লাহ বিস্মিত হলেন এবং বললেন, “সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!” তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, “এভাবেই আমার কাছে অবতীর্ণ হয়েছে।” সেই সময় আবদুল্লাহ সংশয়ে পড়লেন এবং বললেন, “মুহাম্মদ যদি সত্যবাদী হন, তাহলে তাঁর কাছে যেমন প্রত্যাদেশ এসেছে, আমার কাছেও তেমন প্রত্যাদেশ এসেছে। আর তিনি যদি মিথ্যাবাদী হন, তাহলে তিনি যেমন বলেছেন, আমিও তেমন বলেছি।” এটিই “এবং যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব” বক্তব্যের অর্থ। তিনি ইসলাম ত্যাগ করেন। এটি কালবীর বর্ণনায় ইবনে আব্বাসের বক্তব্য।

ওয়াহিদীর বর্ণনায় মুহাম্মদের বক্তব্য হলো, “এভাবেই আমার কাছে অবতীর্ণ হয়েছে।” এই কথাটি থেকে তিনি বাক্যটি আবদুল্লাহর উচ্চারণের আগে পেয়েছিলেন, না পরে পেয়েছিলেন—তার নির্দিষ্ট সময় জানা যায় না। কিন্তু বর্ণনায় যে অভিজ্ঞতাটি আবদুল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়েছে, সেটি পরিষ্কার: তিনি নিজের উপলব্ধি থেকে একটি বাক্য বললেন এবং মুহাম্মদ সেই বাক্যকে প্রত্যাদেশের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করলেন। মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণযোগ্য কোনো বাক্যকে ঈশ্বরের বাণী বলার জন্য ঘোষণাকারীর দাবি ছাড়া কী প্রমাণ আছে—এই প্রশ্নের উত্তর ঘটনাটিতে পাওয়া যায় না। আবদুল্লাহর সংশয়ও ঠিক এখানেই: যদি একই বাক্য তাঁর নিজের মন থেকে আসতে পারে, তাহলে মুহাম্মদের মুখ থেকে আসা বাক্যের জন্য আলাদা একটি অতিপ্রাকৃত উৎস ধরে নেওয়া কেন বাধ্যতামূলক হবে? এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে মিলটিকে শুধু ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ বলে ব্যাখ্যা করলে চলবে না; কারণ সেই ব্যাখ্যাতেই যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও প্রত্যাদেশের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে, তা আগে থেকে ধরে নেওয়া হয়।

একই সঙ্গে এই বর্ণনা আমাদের দুটি পৃথক দাবির মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। একটি হলো, কোনো বাক্য লেখকের নিজের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল; অন্যটি হলো, সেই বাক্য মানুষের তৈরি হওয়ায় কোরআনে ঢুকেছে। ওয়াহিদীর কাহিনি প্রথম ঘটনাটি বর্ণনা করে এবং তা থেকে আবদুল্লাহর দ্বিতীয় সংশয়টির জন্ম দেখায়। সেই সংশয়কে খণ্ডন করতে হলে তাঁর অভিজ্ঞতার একটি যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তাঁকে ধর্মত্যাগী বলা, তাঁর পরবর্তী ইসলাম গ্রহণের কথা বলা অথবা মুহাম্মদের ঘোষণাকে শুরুতেই সত্য ধরে নেওয়া—কোনোটিই বাক্যটির উৎস সম্পর্কে সেই ব্যাখ্যা দেয় না। ওহির দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব ওহির দাবিদারের; সংশয় প্রকাশকারী লেখককে নৈতিকভাবে নিন্দা করলেই সেই দায়িত্ব পালন হয়ে যায় না।


তাবারীর বর্ণনাঃ পরিবর্তিত পাঠ পড়ে শোনানোর পরও অনুমোদনের অভিযোগ

মানবিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নটি শুধু সূরা মুমিনুনের প্রশংসাবাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাবারী তাঁর ‘জামিউল বায়ান’-এ সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় ইকরিমার নামে এমন একটি বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে আবদুল্লাহর শব্দ পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত লেখা মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর কথা স্পষ্টভাবে রয়েছে। এখানে ‘আজিজুন হাকিম’ ধরনের গুণবাচক শব্দের জায়গায় ‘গাফুরুন রহিম’ লেখা এবং তা পড়ে শোনানোর পর “হ্যাঁ, একই” বলে অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। এই বিবরণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু ‘মুহাম্মদ নিরক্ষর ছিলেন বলে লেখা দেখতে পারেননি’—এই প্রশ্নের চেয়ে আরও এগিয়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিবর্তিত শব্দ তাঁর কানে পৌঁছেছিল এবং তারপরও তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। ফলে যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল কি না—তার পাশাপাশি যাচাইয়ের সময় কোন নীতিতে ভিন্ন শব্দকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। [5]

মূল আরবি:
١٣٥٥٥ – حدثنا القاسم قال: حدثنا الحسين، قال حدثني حجاج، عن ابن جريج، عن عكرمة قوله: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء»، قال: نزلت في مسيلمة أخي بني عدي بن حنيفة، فيما كان يسجع ويتكهن به. «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح، أخي بني عامر بن لؤي، كان كتب للنبي صلى الله عليه وسلم، وكان فيما يملى «عزيز حكيم» فيكتب «غفور رحيم» فيغيره، ثم يقرأ عليه «كذا وكذا» لما حول، فيقول: «نعم، سواء». فرجع عن الإسلام ولحق بقريش وقال لهم: لقد كان ينزل عليه «عزيز حكيم» فأحوله، ثم أقرأ ما كتبت، فيقول: «نعم سواء»! ثم رجع إلى الإسلام قبل فتح مكة، إذ نزل النبي صلى الله عليه وسلم بمر.

বাংলা অনুবাদ:
১৩৫৫৫—কাসিম আমাদের বলেছেন: হুসাইন আমাদের বলেছেন; তিনি বলেছেন: হাজ্জাজ আমাকে বলেছেন, ইবনে জুরাইজের মাধ্যমে ইকরিমা থেকে। “যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা বলে, আমার কাছে প্রত্যাদেশ এসেছে, অথচ তার কাছে কোনো প্রত্যাদেশ আসেনি”—এই বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন: এটি বনি আদি ইবন হানিফার মুসায়লিমা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যে ছন্দময় কথা বলত এবং গণকের মতো বক্তব্য দিত। আর “যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব”—এটি বনি আমির ইবন লুআইয়ের আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি নবীর জন্য লিখতেন। তাঁকে যা লিখতে বলা হতো, তার মধ্যে “পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” থাকলে তিনি “ক্ষমাশীল, দয়ালু” লিখতেন এবং এভাবে পরিবর্তন করতেন। তারপর পরিবর্তিত অংশ তাঁকে পড়ে শোনাতেন; তিনি বলতেন, “হ্যাঁ, একই।” এরপর আবদুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দেন এবং তাঁদের বলেন: “তাঁর কাছে ‘পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ অবতীর্ণ হতো, আমি সেটি বদলে দিতাম। তারপর আমি যা লিখেছি, তা পড়ে শোনাতাম; তিনি বলতেন, ‘হ্যাঁ, একই!’” পরে মক্কা বিজয়ের আগে, নবী যখন মারর নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন, তিনি আবার ইসলাম গ্রহণ করেন।

তাবারীর পরবর্তী ১৩৫৫৬ নম্বর বর্ণনায় সুদ্দির সূত্রে একই অভিযোগের অন্য রূপ এবং আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগ-পরবর্তী কর্মকাণ্ডের অতিরিক্ত ঘটনা রয়েছে। এখানে ‘সামিআন আলিমান’ ও ‘আলিমান হাকিমান’ অদলবদল করার অভিযোগ এসেছে। এরপর তাঁর মাধ্যমে আম্মার ও জুবাইরের অবস্থান প্রকাশ, তাঁদের নির্যাতন এবং সূরা নাহল ১৬:১০৬-এর সঙ্গে ঘটনাটি যুক্ত করা হয়েছে। এই নির্যাতনের বিবরণ সুদ্দির নির্দিষ্ট বর্ণনার অংশ; তাবারীর ১৩৫৫৫ নম্বর ইকরিমা-সূত্রে এটি নেই। [6]

١٣٥٥٦ – حدثني محمد بن الحسين قال، حدثنا أحمد بن المفضل قال: حدثنا أسباط، عن السدي: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبًا أو قال أوحي إليّ ولم يوحَ إليه شيء» إلى قوله: «تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ». قال: نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح، أسلم، وكان يكتب للنبي صلى الله عليه وسلم، فكان إذا أملى عليه: «سميعًا عليمًا»، كتب هو: «عليمًا حكيمًا»، وإذا قال: «عليمًا حكيمًا» كتب: «سميعًا عليمًا»، فشكّ وكفر، وقال: إن كان محمد يوحى إليه فقد أوحي إليّ، وإن كان الله ينزله فقد أنزلت مثل ما أنزل الله! قال محمد: «سميعًا عليمًا» فقلت أنا: «عليمًا حكيمًا»! فلحق بالمشركين، ووشى بعمار وجبير عند ابن الحضرمي، أو لبني عبد الدار. فأخذوهم فعُذِّبوا حتى كفروا، وجُدِعت أذن عمار يومئذ. فانطلق عمار إلى النبي صلى الله عليه وسلم فأخبره بما لقي، والذي أعطاهم من الكفر، فأبى النبي صلى الله عليه وسلم أن يتولاه، فأنزل الله في شأن ابن أبي سرح وعمار وأصحابه: «مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا» [النحل: ١٠٦]، فالذي أكره: عمار وأصحابه، والذي شرح بالكفر صدرًا فهو ابن أبي سرح.

বাংলা অনুবাদ:
১৩৫৫৬—মুহাম্মদ ইবনে হুসাইন আমাকে বলেছেন; আহমদ ইবনে মুফাদ্দাল বলেছেন; আসবাত সুদ্দি থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে, অথবা বলে আমার কাছে ওহি এসেছে অথচ তাঁর কাছে কোনো ওহি আসেনি’ থেকে ‘তোমাদের লাঞ্ছনাকর শাস্তি দেওয়া হবে’ পর্যন্ত আয়াত সম্পর্কে সুদ্দি বলেন: এটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। তাঁকে ‘সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ লিখতে বলা হলে তিনি ‘সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ লিখতেন; আবার ‘সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ বলা হলে ‘সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ লিখতেন। এরপর তিনি সংশয়ে পড়ে অবিশ্বাসী হন এবং বলেন, ‘মুহাম্মদের কাছে ওহি এলে আমার কাছেও ওহি এসেছে; আল্লাহ যদি তা অবতীর্ণ করে থাকেন, তাহলে আমিও আল্লাহর অবতীর্ণ কথার মতো অবতীর্ণ করেছি! মুহাম্মদ বলেছেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ; আমি বলেছি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’

এরপর তিনি মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেন এবং আম্মার ও জুবাইরের বিরুদ্ধে ইবনে হাদরামির কাছে অথবা বনু আবদুদ্দারের কাছে তথ্য দেন। তাদের ধরে নির্যাতন করা হয়, যতক্ষণ না তারা অবিশ্বাসের কথা বলতে বাধ্য হন; সেদিন আম্মারের কানও কেটে বিকৃত করা হয়। আম্মার মুহাম্মদের কাছে গিয়ে নিজের ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও বাধ্য হয়ে বলা অবিশ্বাসের কথা জানান। মুহাম্মদ তাঁর পক্ষ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ইবনে আবি সারহ, আম্মার ও তাঁর সঙ্গীদের প্রসঙ্গে ‘যে ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করে—তবে যাকে বাধ্য করা হয়েছে এবং যার হৃদয় ঈমানে অবিচল, সে ছাড়া; কিন্তু যে স্বেচ্ছায় অবিশ্বাস গ্রহণ করে…’ (সূরা নাহল ১৬:১০৬) আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। সুদ্দি বলেন, যাঁদের বাধ্য করা হয়েছিল তাঁরা আম্মার ও তাঁর সঙ্গীরা; আর যে স্বেচ্ছায় অবিশ্বাস গ্রহণ করেছিল, সে ইবনে আবি সারহ।

দুটি তাবারি-বর্ণনার পার্থক্য নির্দিষ্ট: ১৩৫৫৫ নম্বরে ইকরিমার সূত্রে পরিবর্তিত লেখা পড়ে শোনানোর পরে ‘হ্যাঁ, একই’ অনুমোদনের অভিযোগ; ১৩৫৫৬ নম্বরে সুদ্দির সূত্রে ভিন্ন শব্দজোড়ার পরিবর্তন, ধর্মত্যাগ এবং নির্যাতনের একটি অতিরিক্ত ঘটনাক্রম। দ্বিতীয় বর্ণনাটি আবদুল্লাহকে ঘিরে প্রচলিত সংবাদের পরিসর বাড়ায়, কিন্তু তার অতিরিক্ত ঘটনাগুলোকে প্রথম বর্ণনার সমান বক্তব্য হিসেবে মিশিয়ে ফেলা যায় না।

এখানে ব্যবহৃত দুটি শব্দজোড়া একই শব্দ নয় এবং তাদের অর্থও হুবহু এক নয়। ‘পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ এবং ‘ক্ষমাশীল, দয়ালু’—উভয়ই আল্লাহর গুণ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, কিন্তু একটি গুণবাচক বক্তব্যের পরিবর্তে অন্যটি বসালে বাক্যের বক্তব্য বদলে যায়। ধর্মীয় দৃষ্টিতে উভয় প্রশংসা গ্রহণযোগ্য হলেই নির্দিষ্ট আয়াতে উভয় শব্দজোড়া একইভাবে অবতীর্ণ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। যে পাঠকে আল্লাহর নির্দিষ্ট বাণী বলা হচ্ছে, তার ক্ষেত্রে কোন শব্দটি সত্যিই বলা হয়েছিল এবং কোনটি লেখক পরে বেছে নিয়েছিলেন, সেই পার্থক্য মৌলিক। অভিযোগটি সত্য হলে “হ্যাঁ, একই” অনুমোদন মানুষের নির্বাচিত বিকল্পকে ওহির মর্যাদা দেওয়ার সমস্যা তৈরি করে। আর অভিযোগটি মিথ্যা হলে, সেটি মিথ্যা বলার কারণও এই নির্দিষ্ট বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাতে হবে; শুধু কোরআন পরিবর্তিত হতে পারে না বলে শুরু করা যুক্তিগতভাবে একই দাবিকে তার নিজের প্রমাণ বানানো।

তাবারী এই অভিযোগগুলো সংরক্ষণ করলেও নিজের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহর দাবিকে মিথ্যা বলেছেন। অর্থাৎ, তাবারীর গ্রন্থে অভিযোগটি রয়েছে—এই তথ্য এবং তাবারী অভিযোগটিকে সত্য মনে করেছেন—এই দাবি এক নয়। কিন্তু তাঁর ধর্মীয় সিদ্ধান্ত থেকে অভিযোগের ঐতিহাসিক অসত্যতাও নিজে থেকেই প্রমাণিত হয় না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওহি লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে ওঠা এই চ্যালেঞ্জ ইসলামি তাফসিরি ঐতিহ্যের ভেতরেই সংরক্ষিত হয়েছে। এই বর্ণনাগুলোকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সংশয়ের বিষয় শুধু ‘কোনো লেখক কলম চালিয়ে শব্দ বদলাতে পারেন কি না’ ছিল না; সংশয়ের বিষয় ছিল, পরিবর্তিত বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত কথাকে নবী কোন ভিত্তিতে ওহির ভাষা হিসেবে অনুমোদন করছেন। [7]

মুহাম্মদের স্মৃতির প্রশ্নটিও এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। ইসলামি হাদিসে তাঁর কোরআনের কোনো কোনো আয়াত ভুলে যাওয়া এবং অন্যের তিলাওয়াত শুনে তা স্মরণ হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। একজন মানুষের স্মৃতি সীমিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু মানুষের স্মৃতিনির্ভর প্রক্রিয়াকে ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা সংরক্ষণ হিসেবে ঘোষণা করলে সেই নিশ্চয়তার প্রমাণ প্রয়োজন। আবদুল্লাহর অভিযোগে লেখা পরিবর্তন এবং পরে পড়ে শোনানোর বিষয়টি থাকার কারণে এই প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট হয়: ভিন্ন শব্দ শুনে অনুমোদন দেওয়া হলে সেটি কি পূর্বে শোনা বাণীর সঠিক স্মৃতির ভিত্তিতে দেওয়া অনুমোদন, নাকি অর্থ গ্রহণযোগ্য মনে হওয়ায় দেওয়া অনুমোদন? দুটি পদ্ধতির ফল এক নয়। প্রথমটি নির্দিষ্ট পাঠ সংরক্ষণের চেষ্টা; দ্বিতীয়টি মানুষের নির্বাচিত ভাষাকে গ্রহণের সুযোগ রাখে। এই বিষয়ে সংশয়ের ‘কোরআনের আয়াত ভুলে যেতেন মুহাম্মদ’ প্রবন্ধে সংশ্লিষ্ট বর্ণনাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ভাষার পরিবর্তন: ‘আমরা’ থেকে ‘আল্লাহ’

সূরা আল-মুমিনুনের ১৪ নম্বর আয়াতে সৃষ্টিকর্মের বিবরণ প্রথম পুরুষে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষ বাক্যে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করা হয়েছে। এই ভাষাগত পরিবর্তনের সঙ্গে আবদুল্লাহর নিজের মুখে প্রশংসাবাক্য উচ্চারিত হওয়ার বর্ণনাটি মিলিয়ে পড়লে বাক্যটির উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে।

“অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি…” — এখানে নিজের সৃষ্টিকর্মের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে।
“অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!” — এখানে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করা হচ্ছে।

এই ভাষার পরিবর্তন একা মানবিক সংযোজন প্রমাণ করে না। প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: ইসলামি তাফসিরে একই প্রশংসাবাক্য আবদুল্লাহর নিজের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। সেই মানবিক প্রতিক্রিয়া এবং কথিত প্রত্যাদেশের মিল কীভাবে যাচাই করা হবে?

সূত্র: সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১৪; ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল; তাফসীরে মাযহারী
আবদুল্লাহর স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ

বর্ণনা অনুযায়ী, লেখক আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ মানবসৃষ্টির বিবরণ শুনে মুগ্ধ হয়ে বলেন, “ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন।” মুহাম্মদ জানান, তাঁর কাছেও এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে। যে বাক্য লেখক নিজের উপলব্ধি থেকে বলতে পারেন, তার ঐশ্বরিক উৎসের দাবির জন্য আলাদা কী প্রমাণ রয়েছে?

সূত্র: ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল; তাফসীরে মাযহারী
যাচাই ও অনুমোদনের প্রশ্ন

তাবারীর সংরক্ষিত বর্ণনায় শুধু লেখা বদলানোর অভিযোগ নেই; পরিবর্তিত লেখা মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর পর “হ্যাঁ, একই” বলে অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি লেখা দেখে যাচাই করতে না পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি হলো, শোনা বিকল্প শব্দকে কোন ভিত্তিতে ওহির ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে?

সূত্র: তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর ব্যাখ্যা, বর্ণনা ১৩৫৫৫
অপরিবর্তিত বাণীর দাবির পরীক্ষা

নির্দিষ্ট শব্দে অবতীর্ণ বাণীর দাবি এবং লেখকের নির্বাচিত বিকল্প শব্দ গ্রহণের অভিযোগের মধ্যে সরাসরি বিরোধ রয়েছে। অভিযোগ সত্য হলে পাঠে মানুষের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে হবে; অভিযোগ মিথ্যা হলে তার অসত্যতার প্রমাণ দিতে হবে। বাণী ঐশ্বরিক বলেই অভিযোগ মিথ্যা—এই যুক্তি দাবিটিকেই তার নিজের প্রমাণ বানায়।

পরবর্তী মুসলিম অলংকারবিদেরা ব্যাকরণিক পুরুষ ও সম্বোধনের এমন পরিবর্তনকে ‘ইলতিফাত’ নামে আলোচনা করেছেন। কিন্তু ভাষার একটি বৈশিষ্ট্যকে শ্রেণিবদ্ধ করা এবং কোনো নির্দিষ্ট বাক্যের ঐতিহাসিক উৎস নির্ধারণ করা আলাদা কাজ। ‘ইলতিফাত’ শব্দটি বলে দিতে পারে, আয়াতে ভাষার রূপ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে; এটি বলে দিতে পারে না, আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছিল কি না কিংবা তাঁর উচ্চারিত বাক্যকে ওহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল কি না। এখানে ইসলামি তাফসিরি ঐতিহ্য নিজেই একজন মানুষের মুখ থেকে একই বাক্য উচ্চারিত হওয়ার দাবি সংরক্ষণ করেছে। সেই দাবির উত্তর ভাষার অলংকারের নাম দিয়ে শেষ করা যায় না। কোরআনের বাক্য মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব কি না এবং মানুষের রচনার সঙ্গে কথিত ঐশ্বরিক বাণী আলাদা করে চেনার উপায় কী—আবদুল্লাহর সংশয় শেষ পর্যন্ত সেই মৌলিক প্রশ্নেই ফিরে আসে।


অন্যান্য ধ্রুপদি তাফসির ও বর্ণনাপথে ওহি পরিবর্তনের অভিযোগ

আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহের ওহি পরিবর্তনের অভিযোগ শুধু তাবারী বা ওয়াহিদীর একটি বিচ্ছিন্ন বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামি তাফসির, আসবাবুন নুযুল, জীবনী ও ঐতিহাসিক সংকলনের দীর্ঘ পরম্পরায় তাঁর ধর্মত্যাগের সঙ্গে ওহি লেখার অভিজ্ঞতার সম্পর্ক সংরক্ষিত রয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থে অভিযোগের মূল কাঠামো প্রায় একই: আবদুল্লাহ মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন, নির্ধারিত শব্দের জায়গায় অন্য শব্দ ব্যবহার করতেন অথবা নিজের উচ্চারিত বাক্যকে ওহির ভাষার সঙ্গে মিলে যেতে দেখেছিলেন, এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে মুহাম্মদের প্রত্যাদেশের উৎস সম্পর্কে সংশয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সব বর্ণনায় পরিবর্তিত শব্দ একই নয়, একই বাক্য উচ্চারণকারীর পরিচয়ও সর্বত্র এক নয়। এই পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো থেকে বোঝা যায়, অভিযোগটির একাধিক পাঠ ও সংবহনধারা ইসলামি সাহিত্যে প্রচলিত ছিল।

বিশেষত ইবনে আবি হাতিমের মতো প্রাচীন তাফসিরকারের সংকলনে আবু খালাফ আল-আমার সূত্রে আবদুল্লাহর নিজের ইচ্ছামতো কোরআন লেখার দাবি পাওয়া যায়। একই গ্রন্থে সুদ্দির সূত্রে নির্দিষ্ট শব্দবদলের অভিযোগও রয়েছে। পরবর্তী বাগাভী, কুরতুবী, রাযী, বায়দাবী, সুয়ূতী ও ইবনে আবদুল বার এই ঘটনা অথবা তার বিভিন্ন অংশ সংরক্ষণ করেছেন। শিয়া তাফসির আল-কুম্মীতেও অভিযোগটির পৃথক রূপ রয়েছে। ফলে এটি ইসলামি সাহিত্যের বাইরে থেকে পরে আরোপিত একটি অভিযোগ নয়; বরং ইসলামি গ্রন্থগুলোর মধ্যেই বহু শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক। কোন বর্ণনা আগের কোন সূত্রের ওপর নির্ভরশীল এবং কোনটি পৃথক বর্ণনাপথে এসেছে, সেই সম্পর্কও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়।


ইবনে আবি হাতিমের তাফসির: নিজের ইচ্ছামতো কোরআন লেখার দাবি

ইবনে আবি হাতিম আল-রাযী তাঁর ‘তাফসিরুল কুরআনিল আযীম’ গ্রন্থে সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের অধীনে আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগ এবং ওহি লেখার অভিযোগসংক্রান্ত একাধিক বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। ৭৬২৪ নম্বর বর্ণনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর বর্ণনাপথে রয়েছেন ইবনে আবি হাতিমের পিতা, ইবনে নুফাইল আল-হাররানি, মিসকিন ইবনে বুকাইর, মাআন ইবনে রিফাআ এবং আবু খালাফ আল-আমা। এই সংবাদে নির্দিষ্ট দুটি শব্দজোড়া পরিবর্তনের বিস্তারিত বিবরণ নেই; বরং মক্কাবাসীদের প্রশ্নের উত্তরে আবদুল্লাহর নিজের বক্তব্য হিসেবে আরও ব্যাপক একটি অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি মুহাম্মদের জন্য কোরআন কীভাবে লিখতেন। উত্তরে তিনি নিজের ইচ্ছামতো লেখার দাবি করেন। [8]

٧٦٢٤ – حَدَّثَنَا أَبِي، ثَنَا ابْنُ نُفَيْلٍ الْحَرَّانِيُّ، ثَنَا مِسْكِينُ بْنُ بُكَيْرٍ، عَنْ مُعَانِ بْنِ رِفَاعَةَ، قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا خَلَفٍ الْأَعْمَى، قَالَ: كَانَ ابْنُ أَبِي سَرْحٍ يَكْتُبُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْوَحْيَ، فَأَتَى أَهْلَ مَكَّةَ فَقَالُوا: يَا ابْنَ أَبِي السَّرْحِ، كَيْفَ كَتَبْتَ لِابْنِ أَبِي كَبْشَةَ الْقُرْآنَ؟ قَالَ: كُنْتُ أَكْتُبُ كَيْفَ شِئْتُ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: «وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا».

বাংলা অনুবাদ:
৭৬২৪—ইবনে আবি হাতিমের পিতা বর্ণনা করেছেন; ইবনে নুফাইল আল-হাররানি মিসকিন ইবনে বুকাইরের মাধ্যমে মাআন ইবনে রিফাআ থেকে বর্ণনা করেছেন। মাআন বলেন: আমি আবু খালাফ আল-আমাকে বলতে শুনেছি, ইবনে আবি সারহ মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন। এরপর তিনি মক্কাবাসীদের কাছে যান। তারা জিজ্ঞাসা করে, ‘হে ইবনে আবি সারহ, ইবনে আবি কাবশার জন্য তুমি কোরআন কীভাবে লিখতে?’ তিনি বলেন, ‘আমি যেভাবে ইচ্ছা লিখতাম।’ এরপর আল্লাহ ‘যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে?’ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।

এই বক্তব্যের গুরুত্ব তাবারীর ১৩৫৫৫ নম্বর বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়। তাবারীর ইকরিমা-সূত্রে নির্দিষ্ট পরিবর্তিত লেখা পড়ে শোনানোর পর মুহাম্মদের অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। ইবনে আবি হাতিমের আবু খালাফ-সূত্রে অভিযোগটির প্রকাশভঙ্গি আরও সাধারণ: লেখক দাবি করছেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো লিখতেন। এই দুটি বক্তব্য পরস্পরের হুবহু প্রতিলিপি নয়। প্রথমটি একটি নির্দিষ্ট যাচাই ও অনুমোদনের ঘটনা বর্ণনা করে; দ্বিতীয়টি লেখকের নিজের কাজের ওপর তাঁর কথিত নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলে ধরে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের প্রশ্ন আলাদা, কিন্তু ওহি লেখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে এ ধরনের বক্তব্য প্রাচীন তাফসিরে সংরক্ষিত থাকার তথ্যটি সুস্পষ্ট।

একই গ্রন্থের ৭৬২৬ নম্বর বর্ণনায় সুদ্দির সূত্রে আরেকটি বিস্তারিত ঘটনা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদের ওহি লেখার দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁকে ‘সামিআন আলিমান’ লিখতে বলা হলে তিনি ‘আলিমান হাকিমান’ লিখতেন; আবার উল্টো ক্ষেত্রেও শব্দ পরিবর্তন করতেন। এরপর তিনি সংশয়ে পড়ে দাবি করেন, মুহাম্মদ যদি প্রত্যাদেশ পান, তাহলে তিনিও প্রত্যাদেশ পেয়েছেন। ইবনে আবি হাতিম এই সংবাদটি আহমদ ইবনে মুফাদ্দাল ও আসবাতের মাধ্যমে সুদ্দি থেকে এনেছেন। তাবারীর ১৩৫৫৬ নম্বর বর্ণনাতেও আহমদ ইবনে মুফাদ্দাল, আসবাত ও সুদ্দির একই ধারাটি রয়েছে। ফলে এই দুটি গ্রন্থে সংবাদটির উপস্থিতি দুটি পৃথক সংকলনগত সাক্ষ্য হলেও একই সুদ্দি-সংবহনের পুনরুল্লেখ। [9] [10]

٧٦٢٦ – أَخْبَرَنَا أَحْمَدُ بْنُ عُثْمَانَ بْنِ حَكِيمٍ الْأَوْدِيُّ، فِيمَا كَتَبَ إِلَيَّ، ثَنَا أَحْمَدُ بْنُ الْمُفَضَّلِ، ثَنَا أَسْبَاطٌ، عَنِ السُّدِّيِّ، قَوْلَهُ: «وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ» قَالَ: نَزَلَتْ فِي عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ الْقُرَشِيِّ، أَسْلَمَ وَكَانَ يَكْتُبُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَكَانَ إِذَا أَمْلَى عَلَيْهِ سَمِيعًا عَلِيمًا كَتَبَ: عَلِيمًا حَكِيمًا، وَإِذَا قَالَ: عَلِيمًا حَكِيمًا كَتَبَ: سَمِيعًا عَلِيمًا، فَشَكَّ وَكَفَرَ: إِنْ كَانَ مُحَمَّدٌ يُوحَى إِلَيْهِ فَقَدْ أُوحِيَ إِلَيَّ.

বাংলা অনুবাদ:
৭৬২৬—আহমদ ইবনে উসমান ইবনে হাকিম আল-আওদি আমাকে লিখে জানিয়েছেন; আহমদ ইবনে মুফাদ্দাল আসবাতের মাধ্যমে সুদ্দি থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা বলে, আমার কাছে ওহি এসেছে অথচ তাঁর কাছে কিছুই অবতীর্ণ হয়নি’—এই বক্তব্য সম্পর্কে সুদ্দি বলেন: এটি কুরাইশ বংশীয় আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। তাঁকে ‘সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ লিখতে বলা হলে তিনি ‘সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ লিখতেন; আবার ‘সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ বলা হলে ‘সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ লিখতেন। তখন তিনি সংশয়ে পড়ে অবিশ্বাসী হন এবং বলেন, ‘মুহাম্মদের কাছে ওহি এলে আমার কাছেও ওহি এসেছে।’

এখানে শব্দের পরিবর্তন কেবল বানান বা উচ্চারণের পার্থক্য নয়। ‘সামি’ অর্থ শ্রবণকারী, ‘আলিম’ অর্থ জ্ঞানী এবং ‘হাকিম’ অর্থ প্রজ্ঞাময়। শব্দগুলো একই ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের গুণবাচক পরিচয় হতে পারে, কিন্তু তাদের অর্থ এক নয়। একটির পরিবর্তে অন্যটি লিখলে বাক্যের নির্দিষ্ট বক্তব্য পরিবর্তিত হয়। নির্দিষ্ট শব্দে আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ হওয়ার দাবির ক্ষেত্রে এই পার্থক্য মৌলিক। ইবনে আবি হাতিমের দুটি বর্ণনার মধ্যে তাই দুটি সম্পর্কিত কিন্তু পৃথক অভিযোগ পাওয়া যায়: নিজের ইচ্ছামতো লেখার দাবি এবং বাস্তবে নির্দিষ্ট শব্দজোড়া বদলানোর বিবরণ।


বাগাভীর তাফসির: শব্দ পরিবর্তন এবং লেখকের বাক্য লিখে নেওয়ার নির্দেশ

আল-বাগাভী তাঁর ‘মাআলিমুত তানযিল’ গ্রন্থে সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবদুল্লাহর ওহি লেখার ঘটনা, শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ এবং সূরা মুমিনুনের প্রশংসাবাক্য উচ্চারণের ঘটনাকে একই ধারাবাহিক বিবরণে এনেছেন। তাঁর পাঠ অনুযায়ী, মুহাম্মদ ‘সামিআন বাসিরান’ বললে আবদুল্লাহ ‘আলিমান হাকিমান’ লিখতেন এবং ‘আলিমান হাকিমান’ বলা হলে ‘গাফুরান রহিমান’ লিখতেন। অর্থাৎ, এখানে অন্তত তিন ধরনের গুণবাচক শব্দজোড়ার সম্পর্ক রয়েছে। তাবারীর ইকরিমা-সূত্র এবং সুদ্দি-সূত্রের শব্দজোড়ার সঙ্গে বাগাভীর পাঠের সম্পূর্ণ অভিন্নতা নেই। [11]

قوله تعالى: «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» قيل: نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح، وكان قد أسلم وكان يكتب للنبي صلى الله عليه وسلم، وكان إذ أملى عليه: سميعا بصيرا، كتب عليما حكيما، وإذا قال: عليما حكيما، كتب: غفورا رحيما، فلما نزلت: «ولقد خلقنا الإنسان من سلالة من طين» [المؤمنون: ١٢] أملاها عليه رسول الله صلى الله عليه وسلم، فعجب عبد الله من تفصيل خلق الإنسان، فقال: تبارك الله أحسن الخالقين، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: اكتبها فهكذا نزلت، فشك عبد الله، وقال: لئن كان محمد صادقا فقد أوحي إلي كما أوحي إليه، فارتد عن الإسلام ولحق بالمشركين، ثم رجع عبد الله إلى الإسلام قبل فتح مكة إذ نزل النبي صلى الله عليه وسلم بمر الظهران.

বাংলা অনুবাদ:
‘যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’—বলা হয়, আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। তাঁকে ‘সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ লিখতে বলা হলে তিনি ‘সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ লিখতেন; আর ‘সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ বলা হলে লিখতেন ‘অতিক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সূরা মুমিনুনের ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে’ আয়াত অবতীর্ণ হলে মুহাম্মদ সেটি তাঁকে লিখতে বলেন। মানুষের সৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণে আবদুল্লাহ বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!’ মুহাম্মদ বলেন, ‘এটি লিখে নাও; এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে।’ তখন আবদুল্লাহ সংশয়ে পড়ে বলেন, ‘মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে তাঁর কাছে যেমন ওহি এসেছে, আমার কাছেও তেমন ওহি এসেছে।’ এরপর তিনি ইসলাম ত্যাগ করে মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেন। মক্কা বিজয়ের আগে মুহাম্মদ মাররুয যাহরানে অবস্থান করলে আবদুল্লাহ আবার ইসলাম গ্রহণ করেন।

বাগাভীর বর্ণনা এখানেই শেষ হয়নি। এরপর তিনি সূরা মুমিনুনের মানবসৃষ্টির আয়াত লিখে নেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। মুহাম্মদ আয়াতটির বিবরণ আবদুল্লাহকে লিখতে বলছিলেন। মানবসৃষ্টির পর্যায়গুলো শুনে আবদুল্লাহ বিস্মিত হয়ে আল্লাহকে সর্বোত্তম স্রষ্টা বলে প্রশংসা করেন। তখন মুহাম্মদ তাঁকে সেই বাক্যও লিখতে বলেন এবং জানান, এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে। এই ঘটনার পরে আবদুল্লাহর মনে সংশয় জন্মানোর এবং তিনি মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার বিবরণ এসেছে। বাগাভী তাঁর ফিরে আসার সময় হিসেবে মক্কা বিজয়ের পূর্বে মাররুয যাহরানে মুহাম্মদের অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেছেন। ফলে এখানে একটি পূর্ণ ঘটনাক্রম রয়েছে: লেখকের দায়িত্ব, শব্দ পরিবর্তন, স্বতঃস্ফূর্ত বাক্য উচ্চারণ, সেটিকে ওহি হিসেবে চিহ্নিত করা, ধর্মত্যাগ এবং পরবর্তী প্রত্যাবর্তন।

বাগাভীর বিবরণে একটি বিশেষ সমস্যা স্পষ্ট: মুহাম্মদের মুখ থেকে উচ্চারিত নির্দিষ্ট বাক্য এবং লেখকের নির্বাচিত বিকল্প বাক্যের মধ্যকার পার্থক্য। দুটি শব্দজোড়াই আল্লাহর প্রশংসা করতে পারে—এটি এক কথা; কিন্তু দুটি শব্দজোড়াই নির্দিষ্ট স্থানে অবতীর্ণ হয়েছে—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। প্রথমটি শব্দের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা, দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট পাঠের ঐশ্বরিক উৎসের প্রশ্ন। বর্ণনায় লেখকের সংশয়ের ভিত্তি এই দ্বিতীয় প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।


কুরতুবীর তাফসির: একই প্রশংসাবাক্যের তিনজন কথিত উচ্চারণকারী

আল-কুরতুবীর ‘আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন’ গ্রন্থে আবদুল্লাহর ঘটনা দুটি পৃথক স্থানে গুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে। সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি আবদুল্লাহকে মুহাম্মদের ওহি লেখক হিসেবে শনাক্ত করেছেন এবং সূরা মুমিনুনের আয়াত লিখতে গিয়ে তাঁর বিস্ময় ও ধর্মত্যাগের বিবরণ উল্লেখ করেছেন। সেখানে কালবীর মাধ্যমে ইবনে আব্বাসের নামে প্রচলিত বর্ণনার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ইবনে ইসহাকের সূত্রে শুরাহবিল ইবনে সাদের সংবাদও উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগ, মক্কা বিজয়ের সময় তাঁকে হত্যার নির্দেশ এবং উসমানের মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভের বিবরণ রয়েছে। ফলে কুরতুবীর আলোচনায় ওহির উৎস নিয়ে অভিযোগ এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক ও শাস্তিমূলক ঘটনাক্রম একসঙ্গে উপস্থিত। [12]

قوله تعالى: «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» «من» في موضع خفض، أي ومن أظلم ممن قال سأنزل، والمراد عبد الله بن أبي سرح الذي كان يكتب الوحي لرسول الله صلى الله عليه وسلم ثم ارتد ولحق بالمشركين. وسبب ذلك فيما ذكر المفسرون أنه لما نزلت الآية التي في «المؤمنون»: «ولقد خلقنا الإنسان من سلالة من طين» دعاه النبي صلى الله عليه وسلم فأملاها عليه، فلما انتهى إلى قوله «ثم أنشأناه خلقا آخر» عجب عبد الله في تفصيل خلق الإنسان فقال: فتبارك الله أحسن الخالقين. فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: وهكذا أنزلت علي، فشك عبد الله حينئذ وقال: لئن كان محمد صادقا لقد أوحي إلي كما أوحي إليه، ولئن كان كاذبا لقد قلت كما قال. فارتد عن الإسلام ولحق بالمشركين، فذلك قوله: «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» رواه الكلبي عن ابن عباس. وذكره محمد بن إسحاق قال حدثني شرحبيل قال: نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» ارتد عن الإسلام، فلما دخل رسول الله صلى الله عليه وسلم مكة أمر بقتله وقتل عبد الله بن خطل ومقيس بن صبابة ولو وجدوا تحت أستار الكعبة، ففر عبد الله بن أبي سرح إلى عثمان رضي الله عنه، وكان أخاه من الرضاعة، أرضعت أمه عثمان، فغيبه عثمان حتى أتى به رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد ما اطمأن أهل مكة فاستأمنه له، فصمت رسول الله صلى الله عليه وسلم طويلا ثم قال: نعم.

বাংলা অনুবাদ:
‘যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’—এখানে ‘যে’ কথাটি আগের ‘তার চেয়ে বড় জালেম আর কে’ বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর দ্বারা আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহকে বোঝানো হয়েছে। তিনি মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন, পরে ধর্মত্যাগ করে মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেন। তাফসিরকারদের বিবরণে এর কারণ হলো, সূরা মুমিনুনের ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে’ আয়াত অবতীর্ণ হলে মুহাম্মদ তাঁকে ডেকে লিখতে বলেন। ‘অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম’ পর্যন্ত পৌঁছালে আবদুল্লাহ মানুষের সৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণে বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!’ মুহাম্মদ বলেন, ‘আমার কাছেও এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে।’ আবদুল্লাহ সংশয়ে পড়ে বলেন, ‘মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে আমার কাছেও তাঁর মতো ওহি এসেছে, আর তিনি মিথ্যাবাদী হলে আমিও তাঁর মতোই কথা বলেছি।’ এরপর তিনি ইসলাম ত্যাগ করে মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেন। কালবী ইবনে আব্বাস থেকে এ কথা বর্ণনা করেছেন।

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকও ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, শুরাহবিল আমাকে বলেছেন: ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’ আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ। তিনি ইসলাম ত্যাগ করেন। মুহাম্মদ মক্কায় প্রবেশের পর তাঁকে, আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল এবং মিকইস ইবনে সুবাবাকে কাবার গিলাফের নিচে পাওয়া গেলেও হত্যা করার নির্দেশ দেন। আবদুল্লাহ উসমানের কাছে পালিয়ে যান; উসমানের মা তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন বলে তিনি উসমানের দুধভাই ছিলেন। মক্কার লোকেরা শান্ত না হওয়া পর্যন্ত উসমান তাঁকে লুকিয়ে রাখেন। পরে উসমান তাঁকে মুহাম্মদের কাছে নিয়ে গিয়ে তাঁর নিরাপত্তা চান। মুহাম্মদ দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে শেষে বলেন, ‘হ্যাঁ।’

কুরতুবীর দ্বিতীয় এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি রয়েছে সূরা মুমিনুনের ১৪ নম্বর আয়াতে। সেখানে ‘ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন’ বাক্যটি প্রথম উচ্চারণের ঘটনা শুধু আবদুল্লাহর নামেই সংরক্ষিত হয়নি। কুরতুবী উমর ইবনে খাত্তাবের একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন: উমর আয়াতের প্রথম অংশ শুনে নিজেই আল্লাহকে সর্বোত্তম স্রষ্টা বলে প্রশংসা করেন এবং মুহাম্মদ জানান, এভাবেই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর কুরতুবী মুআজ ইবনে জাবালের নামেও একই বাক্য উচ্চারণের বর্ণনা উল্লেখ করেন। সবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহের নামেও সেই ঘটনাটির আরোপ এবং তার পরিণতিতে তাঁর ধর্মত্যাগের কথা বলেন। অর্থাৎ, একই প্রশংসাবাক্যের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ সম্পর্কে অন্তত তিনটি পৃথক ব্যক্তির নাম তাঁর তাফসিরে সংরক্ষিত হয়েছে। [13]

الرابعة: قوله تعالى: «فتبارك الله أحسن الخالقين» يروى أن عمر بن الخطاب لما سمع صدر الآية إلى قوله: «خلقا آخر» قال: فتبارك الله أحسن الخالقين؛ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: هكذا أنزلت. وفي مسند الطيالسي: ونزلت «ولقد خلقنا الإنسان من سلالة من طين» الآية؛ فلما نزلت قلت أنا: تبارك الله أحسن الخالقين؛ فنزلت «فتبارك الله أحسن الخالقين». ويروى أن قائل ذلك معاذ بن جبل. وروي أن قائل ذلك عبد الله بن أبي سرح، وبهذا السبب ارتد وقال: آتي بمثل ما يأتي محمد؛ وفيه نزل «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» على ما تقدم بيانه في «الأنعام».

বাংলা অনুবাদ:
চতুর্থ আলোচনা: ‘অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়’—বর্ণিত আছে, উমর ইবনে খাত্তাব আয়াতের প্রথম অংশ থেকে ‘অন্য এক সৃষ্টিরূপে’ পর্যন্ত শুনে বলেন, ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়।’ মুহাম্মদ বলেন, ‘এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে।’ মুসনাদে তায়ালিসির বর্ণনায় আছে, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে’ আয়াত অবতীর্ণ হলে আমি বলেছিলাম, ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়’; এরপর ‘অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়’ বাক্যটি অবতীর্ণ হয়। আরও বর্ণিত আছে, এই কথাটি বলেছিলেন মুআজ ইবনে জাবাল। আবার আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহও এই কথাটি বলেছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে। এরই কারণে তিনি ধর্মত্যাগ করে বলেছিলেন, ‘মুহাম্মদ যা আনেন, আমিও তার মতো আনতে পারি।’ তাঁর বিষয়ে ‘যে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা বলে, আমার কাছে ওহি এসেছে অথচ কিছুই অবতীর্ণ হয়নি, অথবা বলে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, যেমন সূরা আনআমের আলোচনায় আগে এসেছে।

এখানে তিনজন একই মুহূর্তে বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন—এমন কথা কুরতুবী বলেননি। তাঁর গ্রন্থে একই ঘটনার ভিন্ন ব্যক্তির নামে প্রচলিত বর্ণনাগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। এই পরিচয়গত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি ঘটনাটি আবদুল্লাহর সঙ্গে ঘটে থাকে, তাহলে তাঁর সংশয়ের যে ব্যক্তিগত কারণ ওয়াহিদী ও বাগাভী বর্ণনা করেছেন, সেটি সংশ্লিষ্ট বর্ণনার মূল অংশ। উমরের সঙ্গে ঘটে থাকলে একই বাক্য উচ্চারণ ধর্মত্যাগের কারণ হয়নি; বরং কোরআনের বাক্যের সঙ্গে তাঁর কথার মিল হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। মুআজের বর্ণনাতেও বাক্যটির মিলকে ধর্মত্যাগের ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়নি। একই ধরনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ব্যক্তির নামে ভিন্ন পরিণতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

ইবনে কাসীর সূরা মুমিনুনের এই অংশের আলোচনায় উমর ও মুআজের বর্ণনাও সংরক্ষণ করেছেন। মুআজের বর্ণনায় যায়েদ ইবনে সাবিতকে ওহি লিখতে দেখা যায়। ইবনে কাসীর এই সংবাদের কালানুক্রম নিয়ে নির্দিষ্ট আপত্তি জানিয়েছেন: সূরা মুমিনুন মক্কায় অবতীর্ণ, অথচ যায়েদের ওহি লেখার দায়িত্ব এবং মুআজের ইসলাম গ্রহণ মদিনার সময়ের সঙ্গে যুক্ত। তিনি এই সংবাদে জাবির আল-জুফির উপস্থিতি ও কালানুক্রমিক অসংগতির কথাও বলেছেন। ফলে মুআজের নামে ঘটনাটির যে রূপ প্রচলিত, তার ঐতিহাসিক ভিত্তিতে সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সেই সমস্যার কারণে কুরতুবীর সংরক্ষিত তিনটি ভিন্ন আরোপের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় না; বরং একই ঘটনার পরিচয় কীভাবে বিভিন্ন সূত্রে পরিবর্তিত হয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হয়। [14]


ফখরুদ্দীন রাযী: আবদুল্লাহর সংশয়কে কোরআনের আয়াতের সঙ্গে সংযুক্ত করা

ফখরুদ্দীন আল-রাযী তাঁর ‘মাফাতিহুল গায়ব’ গ্রন্থে সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় মিথ্যা প্রত্যাদেশের দাবি, মুহাম্মদের ওহির সমতুল্য বক্তব্য রচনার দাবি এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার বিষয়গুলো পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন। ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’ বক্তব্যের সঙ্গে তিনি নযর ইবনে হারিসের কোরআনের অনুরূপ বক্তব্য রচনার দাবির সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহের ঘটনাটিও একটি প্রচলিত বর্ণনা হিসেবে তুলে ধরেছেন। [15]

والنوع الثالث: قوله: «سأنزل مثل ما أنزل الله» قال المفسرون: المراد ما قاله النضر بن الحرث وهو قوله: «لو نشاء لقلنا مثل هذا» وقوله في القرآن: إنه من أساطير الأولين، وكل أحد يمكنه الإتيان بمثله، وحاصله: أن هذا القائل يدعي معارضة القرآن. وروي أيضا أن عبد الله بن سعد بن أبي سرح كان يكتب الوحي للرسول عليه الصلاة والسلام، فلما نزل قوله: «ولقد خلقنا الإنسان من سلالة من طين» أملاه الرسول عليه السلام، فلما انتهى إلى قوله: «ثم أنشأناه خلقا آخر» عجب عبد الله منه فقال: فتبارك الله أحسن الخالقين! فقال الرسول: هكذا أنزلت الآية، فسكت عبد الله وقال: إن كان محمد صادقا، فقد أوحي إلي، وإن كان كاذبا فقد عارضته، فهذا هو المراد من قوله: «سأنزل مثل ما أنزل».

বাংলা অনুবাদ:
তৃতীয় প্রকার হলো ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’ বক্তব্যটি। তাফসিরকাররা বলেছেন, এটি নযর ইবনে হারিসের কথার সঙ্গে সম্পর্কিত। সে বলেছিল, ‘আমরা চাইলে এর মতো কথা বলতে পারি’; কোরআনকে পূর্ববর্তীদের কাহিনি বলত এবং দাবি করত যে যেকোনো মানুষ এর অনুরূপ কিছু আনতে পারে। অর্থাৎ, বক্তা কোরআনের মোকাবিলা করার দাবি করছিল। আরও বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন। ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে’ আয়াতটি অবতীর্ণ হলে মুহাম্মদ তাঁকে তা লিখতে বলেন। ‘অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম’ পর্যন্ত পৌঁছালে আবদুল্লাহ বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!’ মুহাম্মদ বলেন, ‘এভাবেই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে।’ আবদুল্লাহ নীরব হয়ে ভাবেন: ‘মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে আমার কাছেও ওহি এসেছে; আর তিনি মিথ্যাবাদী হলে আমি তাঁর বক্তব্যের প্রতিদ্বন্দ্বী কথা বলেছি।’ ‘আমিও আল্লাহর অবতীর্ণ বাণীর অনুরূপ অবতীর্ণ করব’ বক্তব্যের দ্বারা এটাই বোঝানো হয়েছে।

রাযীর আলোচনায় আবদুল্লাহ সূরা মুমিনুনের মানবসৃষ্টির বিবরণ লিখছিলেন। ‘অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম’ পর্যন্ত পৌঁছালে তিনি বিস্মিত হয়ে আল্লাহকে সর্বোত্তম স্রষ্টা বলে প্রশংসা করেন। মুহাম্মদ জানান, আয়াতটি এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর আবদুল্লাহর সংশয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়: মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে তিনিও প্রত্যাদেশ পেয়েছেন, আর মুহাম্মদ মিথ্যাবাদী হলে তিনিও তাঁর মতো বক্তব্য রচনা করতে পেরেছেন। রাযী এই ঘটনাটিকে কোরআনের সমতুল্য বাণী আনার দাবির আলোচনায় স্থান দিয়েছেন।

রাযীর বিবরণে আবদুল্লাহর সংশয়ের যুক্তিগত কাঠামোটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি শুধু এই নয় যে, তিনি একটি সুন্দর ধর্মীয় বাক্য রচনা করতে পারেন। তিনি এমন একটি বাক্য বলেছেন, যেটিকে মুহাম্মদ নিজের কাছে অবতীর্ণ বক্তব্য হিসেবে শনাক্ত করেছেন—এটিই তাঁর অভিজ্ঞতার বিশেষত্ব। ফলে প্রশ্নটি মানুষের ভাষাগত দক্ষতার সীমা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি মানুষের স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন বাক্য এবং কথিত ঐশী প্রত্যাদেশকে আলাদা করে শনাক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে। রাযী সেই অভিযোগকে তাঁর তাফসিরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যদিও তাঁর ব্যাখ্যার সামগ্রিক ধর্মীয় অবস্থান অভিযোগটির সত্যতা গ্রহণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।


বায়দাবীর তাফসির: বাক্যটি লিখে নেওয়ার নির্দেশ

নাসিরুদ্দীন আল-বায়দাবীর ‘আনওয়ারুত তানযিল ওয়া আসরারুত তাবিল’ গ্রন্থেও সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহর ঘটনা রয়েছে। বায়দাবী তাঁকে মুহাম্মদের ওহি লেখক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বিবরণে সূরা মুমিনুনের মানবসৃষ্টির আয়াত পাঠের সময় আবদুল্লাহ প্রশংসাবাক্যটি উচ্চারণ করেন এবং মুহাম্মদ তাঁকে সেটি লিখতে বলেন। এখানে লিখে নেওয়ার নির্দেশটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘটনাটি কেবল কথোপকথনে সীমাবদ্ধ থাকে না; লেখকের মুখে উচ্চারিত বাক্যটি লিখিত ওহির অংশ হিসেবে স্থান পাওয়ার বিবরণও এতে যুক্ত হয়। [16]

«ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا» فزعم أنه بعثه نبيا كمسيلمة والأسود العنسي، أو اختلق عليه أحكاما كعمرو بن لحي ومتابعيه. «أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء» كعبد الله بن سعد بن أبي سرح (كان يكتب لرسول الله صلى الله عليه وسلم فلما نزلت «ولقد خلقنا الإنسان من سلالة من طين» فلما بلغ قوله: «ثم أنشأناه خلقا آخر» قال عبد الله «فتبارك الله أحسن الخالقين» تعجبا من تفصيل خلق الإنسان فقال عليه الصلاة والسلام: اكتبها فكذلك نزلت، فشك عبد الله وقال لئن كان محمد صادقا لقد أوحي إلي كما أوحي إليه ولئن كان كاذبا لقد قلت كما قال). «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» كالذين قالوا لو نشاء لقلنا مثل هذا.

বাংলা অনুবাদ:
‘যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে’—যেমন মুসায়লিমা ও আসওয়াদ আল-আনসির মতো ব্যক্তি, যারা দাবি করেছিল আল্লাহ তাদের নবী করে পাঠিয়েছেন; অথবা আমর ইবনে লুহাই ও তাঁর অনুসারীদের মতো ব্যক্তি, যারা আল্লাহর নামে বিধান উদ্ভাবন করত। ‘অথবা বলে, আমার কাছে ওহি এসেছে, অথচ তার কাছে কিছুই অবতীর্ণ হয়নি’—যেমন আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ। তিনি মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে’ আয়াত অবতীর্ণ হলে এবং ‘অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম’ পর্যন্ত পৌঁছালে মানুষের সৃষ্টির বিস্তারিত বিবরণে বিস্মিত হয়ে আবদুল্লাহ বলেন, ‘সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়।’ মুহাম্মদ বলেন, ‘এটি লিখে নাও; এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে।’ আবদুল্লাহ সংশয়ে পড়ে বলেন, ‘মুহাম্মদ সত্যবাদী হলে তাঁর কাছে যেমন ওহি এসেছে আমার কাছেও তেমন ওহি এসেছে; আর তিনি মিথ্যাবাদী হলে আমিও তাঁর মতো বলেছি।’ ‘আর যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’—যেমন তারা বলেছিল, ‘আমরা চাইলে এর মতোই বলতে পারি।’

বায়দাবীর এই বক্তব্যে লেখকের উচ্চারণ, মুহাম্মদের অনুমোদন এবং লিখে নেওয়ার নির্দেশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কোনো বাক্য মুহাম্মদের আগে থেকেই জানা ছিল কি না, সেটি বর্ণনাটিতে নির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু আবদুল্লাহর সামনে যে ঘটনাক্রম ঘটছে, সেখানে নিজের মুখে উচ্চারিত বাক্যকে ওহির অংশ বলে গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে। তিনি যে অভিজ্ঞতাকে নিজের ধর্মত্যাগের কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, বায়দাবীর বর্ণনা সেই অভিজ্ঞতার মূল কাঠামোই সংরক্ষণ করেছে। এই বিবরণ ওয়াহিদীর বক্তব্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত; তাই একে স্বতন্ত্র প্রত্যক্ষদর্শীর নতুন সাক্ষ্য বলা যায় না। এর গুরুত্ব প্রধানত ধ্রুপদি তাফসিরি সাহিত্যে অভিযোগটির সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রচলনে।


সুয়ূতীর আদ-দুররুল মানসুর: একাধিক পূর্ববর্তী সংকলন ও বর্ণনাপথ

জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী তাঁর ‘আদ-দুররুল মানসুর ফিত তাফসির বিল মাসুর’ গ্রন্থে সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের অধীনে একাধিক প্রাচীন সংকলক ও বর্ণনাকারীর সংবাদ একত্র করেছেন। তাঁর উদ্ধৃত উৎসের মধ্যে রয়েছেন হাকিম, ইবনে আবি হাতিম, আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে মুনযির, ইবনে জারির তাবারী ও আবু শায়খ। এখানে আবদুল্লাহ সম্পর্কে কয়েক ধরনের সংবাদ পাওয়া যায়: শুরাহবিল ইবনে সাদের মাধ্যমে তাঁর ধর্মত্যাগ ও উসমানের আশ্রয়, আবু খালাফ আল-আমার মাধ্যমে নিজের ইচ্ছামতো লেখার দাবি, সুদ্দির মাধ্যমে শব্দ পরিবর্তনের বিবরণ এবং ইকরিমার মাধ্যমে পরিবর্তিত লেখা পড়ে শোনানোর পর অনুমোদনের অভিযোগ। [17]

সুয়ূতীর সংকলনে ইবনে আবি হাতিম থেকে উদ্ধৃত আবু খালাফ আল-আমার বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মক্কাবাসীরা আবদুল্লাহকে প্রশ্ন করে, তিনি মুহাম্মদের জন্য কোরআন কীভাবে লিখতেন। আবদুল্লাহ দাবি করেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো লিখতেন। একই জায়গায় সুদ্দির সূত্রে গুণবাচক শব্দজোড়া পরিবর্তন এবং তা থেকে আবদুল্লাহর সংশয়ের বিবরণ রয়েছে। আবার ইকরিমার সূত্রে শব্দ পরিবর্তন করে মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর পর সম্মতি পাওয়ার অভিযোগ এসেছে। এভাবে একই গ্রন্থে একটি অভিযোগের অন্তত তিন ধরনের বর্ণনামূলক রূপ পাশাপাশি সংরক্ষিত হয়েছে।

أخرج الحاكم في المستدرك، عن شرحبيل بن سعد قال: نزلت في عبد الله بن أبي سرح: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء» الآية، فلما دخل رسول الله صلى الله عليه وسلم مكة فر إلى عثمان أخيه من الرضاعة، فغيبه عنده حتى اطمأن أهل مكة ثم استأمن له.

وأخرج ابن أبي حاتم، عن أبي خلف الأعمى قال: كان ابن أبي سرح يكتب للنبي صلى الله عليه وسلم الوحي، فأتى أهل مكة، فقالوا: يا ابن أبي سرح، كيف كتبت لابن أبي كبشة القرآن؟ قال: كنت أكتب كيف شئت، فأنزل الله «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا».

وأخرج ابن أبي حاتم، عن السدي في قوله: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء» قال: نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح القرشي، أسلم، وكان يكتب للنبي صلى الله عليه وسلم، فكان إذا أملى عليه «سميعا عليما» كتب «عليما حكيما» وإذا قال «عليما حكيما» كتب «سميعا عليما» فشك وكفر وقال: إن كان محمد يوحى إليه فقد أوحي إلي.

وأخرج عبد بن حميد، وابن المنذر، عن ابن جريج في قوله: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء» قال: نزلت في مسيلمة الكذاب ونحوه ممن دعا إلى مثل ما دعا إليه، «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» قال: نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح.

وأخرج عبد بن حميد وابن جرير وأبو الشيخ عن قتادة في قوله: «ومن أظلم» الآية، قال: ذكر لنا أن هذه الآية نزلت في مسيلمة.

وأخرج ابن جرير وأبو الشيخ عن عكرمة في قوله: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء» قال: نزلت في مسيلمة فيما كان يسجع ويتكهن به، «ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» قال: نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح، كان يكتب للنبي صلى الله عليه وسلم فكان فيما يملى: «عزيز حكيم» فيكتب: «غفور رحيم» فيغيره ثم يقرأ عليه كذا وكذا لما حول فيقول: نعم سواء، فرجع عن الإسلام ولحق بقريش.


বাংলা অনুবাদ:
হাকিম তাঁর মুস্তাদরাকে শুরাহবিল ইবনে সাদ থেকে বর্ণনা করেছেন: ‘যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে অথবা বলে, আমার কাছে ওহি এসেছে, অথচ কিছুই অবতীর্ণ হয়নি’—আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ। মুহাম্মদ মক্কায় প্রবেশ করলে আবদুল্লাহ তাঁর দুধভাই উসমানের কাছে পালিয়ে যান। মক্কাবাসী শান্ত হওয়া পর্যন্ত উসমান তাঁকে লুকিয়ে রাখেন; পরে তাঁর নিরাপত্তা চান।

ইবনে আবি হাতিম আবু খালাফ আল-আমা থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবনে আবি সারহ মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন। মক্কাবাসীরা জানতে চায়, তিনি মুহাম্মদের জন্য কোরআন কীভাবে লিখতেন। আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি যেভাবে ইচ্ছা লিখতাম।’ তারপর ‘যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে’ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।

ইবনে আবি হাতিম সুদ্দি থেকে বর্ণনা করেছেন: আয়াতটি কুরাইশ বংশীয় আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। ‘সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ লিখতে বলা হলে তিনি ‘সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ লিখতেন; আবার উল্টোটাও করতেন। এরপর সংশয়ে পড়ে অবিশ্বাসী হন এবং বলেন, ‘মুহাম্মদের কাছে ওহি এলে আমার কাছেও ওহি এসেছে।’

আবদ ইবনে হুমাইদ ও ইবনে মুনযির ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেছেন: আয়াতের প্রথম অংশ মুসায়লিমা ও তাঁর মতো নবুয়তের দাবিদারদের সম্পর্কে; ‘আমিও আল্লাহর অবতীর্ণ কথার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’ অংশটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ সম্পর্কে অবতীর্ণ।

আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে জারির ও আবু শায়খ কাতাদা থেকে বর্ণনা করেছেন: তাঁরা শুনেছেন, আয়াতটি মুসায়লিমা সম্পর্কে অবতীর্ণ।

ইবনে জারির ও আবু শায়খ ইকরিমা থেকে বর্ণনা করেছেন: আয়াতের প্রথম অংশ মুসায়লিমার ছন্দময় ও গণকসুলভ কথার প্রসঙ্গে; পরের ‘আমিও আল্লাহর অবতীর্ণ কথার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’ অংশটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ সম্পর্কে। তিনি মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। ‘পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ লেখার নির্দেশ থাকলে ‘ক্ষমাশীল, দয়ালু’ লিখতেন; পরে পরিবর্তিত লেখা পড়ে শোনালে মুহাম্মদ বলতেন, ‘হ্যাঁ, একই।’ এরপর আবদুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দেন।

সুয়ূতীর উদ্ধৃতিগুলোর উৎসগত সম্পর্কও স্পষ্ট। তাঁর গ্রন্থে ইবনে আবি হাতিমের সংবাদটি উদ্ধৃত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আবু খালাফের একই বক্তব্যের আরও একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়া গেছে। একইভাবে, ইবনে জারিরের ইকরিমা-সূত্র এবং সুদ্দি-সূত্র পরে অন্য সংকলনে উদ্ধৃত হলে সেগুলো পৃথক গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়, কিন্তু মূল বর্ণনাপথের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ে না। সুয়ূতীর সংকলনের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ ও বর্ণনাকারীদের পরিচয় এক জায়গায় সংরক্ষণ করেছেন। ফলে কোন অভিযোগ কোন সংকলনের মাধ্যমে প্রচলিত হয়েছিল, তার একটি উৎসগত মানচিত্র পাওয়া যায়।

এখানে আবু খালাফ, সুদ্দি ও ইকরিমার প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর পার্থক্যও লক্ষণীয়। আবু খালাফের সংবাদে রয়েছে লেখকের নিজের ইচ্ছামতো লেখার ঘোষণা। সুদ্দির সংবাদে রয়েছে নির্দিষ্ট শব্দজোড়া পরিবর্তন এবং তার ফলে সংশয়ের জন্ম। ইকরিমার সংবাদে রয়েছে পরিবর্তিত লেখা মুহাম্মদকে পড়ে শোনানো এবং তাঁর অনুমোদনের অভিযোগ। এগুলো একই মূল অভিযোগের সম্পর্কিত রূপ হলেও প্রতিটির তথ্যগত পরিসর আলাদা। প্রথমটি লেখকের দাবিকৃত স্বাধীনতা, দ্বিতীয়টি শব্দগত পরিবর্তনের উদাহরণ এবং তৃতীয়টি যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে।


ইবনে আবদুল বারের আল-ইস্তিআব: ‘আমি মুহাম্মদকে যেদিকে চাইতাম পরিচালিত করতাম’

ইবনে আবদুল বার তাঁর ‘আল-ইস্তিআব ফি মারিফাতিল আসহাব’ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহের জীবনীতে ওহি পরিবর্তনের অভিযোগটি সরাসরি সংরক্ষণ করেছেন। এই গ্রন্থটি তাফসির নয়; সাহাবিদের জীবনীসংক্রান্ত সংকলন। এতে আবদুল্লাহর বংশপরিচয়, ইসলাম গ্রহণ, ওহি লেখার দায়িত্ব, ধর্মত্যাগ, মক্কায় কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে হত্যার নির্দেশ থেকে উসমানের মাধ্যমে রক্ষা পাওয়ার বিবরণ রয়েছে। তাফসিরের বাইরে জীবনীগ্রন্থেও একই অভিযোগের উপস্থিতি এর সংবহন ও গ্রহণের পরিসর বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। [18]

أسلم قبل الفتح، وهاجر، وكان يكتب الوحي لرسول الله صلى الله عليه وسلم، ثم ارتد مشركا، وصار إلى قريش بمكة، فقال لهم: إني كنت أصرف محمدا حيث أريد، كان يملي علي: «عزيز حكيم» فأقول: أو «عليم حكيم»؟ فيقول: نعم، كل صواب. فلما كان يوم الفتح أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم بقتله، وقتل عبد الله بن خطل، ومقيس بن حبابة، ولو وجدوا تحت أستار الكعبة، ففر عبد الله بن سعد بن أبي السرح إلى عثمان، وكان أخاه من الرضاعة، أرضعت أمه عثمان، فغيبه عثمان حتى أتى به رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد ما اطمأن أهل مكة، فاستأمنه له، فصمت رسول الله صلى الله عليه وسلم طويلا، ثم قال: نعم. فلما انصرف عثمان قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لمن حوله: ما صمت إلا ليقوم إليه بعضكم فيضرب عنقه. وقال رجل من الأنصار: فهلا أومأت إلي يا رسول الله؟ فقال: إن النبي لا ينبغي أن يكون له خائنة الأعين. وأسلم عبد الله بن سعد بن أبي السرح أيام الفتح، فحسن إسلامه، فلم يظهر منه شيء ينكر عليه بعد ذلك، وهو أحد النجباء العقلاء الكرماء من قريش، ثم ولاه عثمان بعد ذلك مصر في سنة خمس وعشرين، وفتح على يديه إفريقية سنة سبع وعشرين.

বাংলা অনুবাদ:
মক্কা বিজয়ের আগে তিনি ইসলাম গ্রহণ ও হিজরত করেন। মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন; পরে ইসলাম ত্যাগ করে মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দেন। তিনি তাদের বলেন, ‘আমি মুহাম্মদকে যেদিকে চাইতাম পরিচালিত করতাম। তিনি আমাকে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় লিখতে বলতেন; আমি বলতাম, সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় লিখলে হবে? তিনি বলতেন, হ্যাঁ, সবই সঠিক।’

মক্কা বিজয়ের দিন মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল ও মিকইস ইবনে হুবাবাকে কাবার গিলাফের নিচে পাওয়া গেলেও হত্যার নির্দেশ দেন। আবদুল্লাহ উসমানের কাছে পালান; উসমানের মা তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন বলে তাঁরা দুধভাই ছিলেন। উসমান তাঁকে লুকিয়ে রাখেন। মক্কার পরিস্থিতি শান্ত হলে উসমান তাঁকে মুহাম্মদের কাছে নিয়ে গিয়ে নিরাপত্তা চান। মুহাম্মদ দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে শেষে সম্মতি দেন। উসমান চলে গেলে মুহাম্মদ উপস্থিতদের বলেন, ‘আমি নীরব ছিলাম যেন তোমাদের কেউ উঠে তাঁর গর্দান কাটে।’ একজন আনসারি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি আমাকে চোখের ইশারা করলেন না কেন?’ তিনি বলেন, ‘নবীর জন্য চোখের খিয়ানত শোভনীয় নয়।’

মক্কা বিজয়ের সময় আবদুল্লাহ আবার ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর ইসলাম গ্রহণ ভালো হয় এবং তাঁর কাছ থেকে আপত্তিকর কিছু দেখা যায়নি। তিনি কুরাইশের বিচক্ষণ, সম্ভ্রান্ত ও উদার ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। উসমান পরে ২৫ হিজরিতে তাঁকে মিসরের শাসক নিযুক্ত করেন। ২৭ হিজরিতে তাঁর নেতৃত্বে আফ্রিকার কিছু অঞ্চল জয় হয়।

এই বিবরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তাবারীর ইকরিমা-সূত্রে আবদুল্লাহ পরিবর্তিত শব্দ লিখে সেটি মুহাম্মদকে পড়ে শোনানোর পরে অনুমোদন পাওয়ার দাবি করেছেন। ইবনে আবদুল বারের জীবনীতে তিনি বিকল্প শব্দের প্রস্তাব দেন এবং মুহাম্মদ সেই বিকল্পকে সঠিক বলেন—এমন বক্তব্য রয়েছে। অর্থাৎ, এক বর্ণনায় লেখকের একতরফা পরিবর্তনের পরে অনুমোদন, অন্যটিতে পরিবর্তনের প্রস্তাবের পর মৌখিক সম্মতির অভিযোগ রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্নটি নির্দিষ্ট শব্দের অপরিবর্তনীয়তা নিয়ে।

ইবনে আবদুল বারের জীবনীতে এর পরেই আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে মক্কা বিজয়ের সময় হত্যার নির্দেশ, কাবার গিলাফের নিচেও তাঁকে হত্যা করার অনুমতি, উসমানের আশ্রয়, দীর্ঘ নীরবতা এবং শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা দেওয়ার ঘটনাক্রম এসেছে। ফলে তিনি আবদুল্লাহর ওহি পরিবর্তনের অভিযোগকে তাঁর পরবর্তী ধর্মত্যাগ ও শাস্তির ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। তবে জীবনীতে একটি অভিযোগ সংরক্ষিত হওয়া এবং লেখক সেই অভিযোগের প্রতিটি বক্তব্য সত্য বলে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। এখানে নির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হলো, আবদুল্লাহর নামে ‘আমি মুহাম্মদকে যেদিকে চাইতাম পরিচালিত করতাম’ বক্তব্যটি ধ্রুপদি সাহাবি-জীবনী সাহিত্যের অংশ হয়ে রয়েছে।


তাফসির আল-কুম্মী: শিয়া বর্ণনাপরম্পরায় শব্দ পরিবর্তন ও মুহাম্মদের অনুমোদনের অভিযোগ

শিয়া তাফসিরি সাহিত্যের ‘তাফসির আল-কুম্মী’ গ্রন্থেও আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে ওহি পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় গ্রন্থটির সংরক্ষিত বর্ণনায় আলী ইবনে ইবরাহিম আল-কুম্মীর পিতা, সাফওয়ান, ইবনে মিসকান ও আবু বাসিরের মাধ্যমে আবু আবদুল্লাহর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে আবদুল্লাহকে উসমানের দুধভাই, সুন্দর হস্তাক্ষরের অধিকারী এবং মুহাম্মদের জন্য ওহি লেখার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনে তাঁর মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণের কথা রয়েছে; অন্য জীবনীতে মক্কায় তাঁর লেখকজীবনের যে বিবরণ আছে, তার সঙ্গে এই স্থানসংক্রান্ত তথ্যের পার্থক্যও স্পষ্ট। [19]

قوله: «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا أو قال أوحي إلي ولم يوح إليه شيء ومن قال سأنزل مثل ما أنزل الله» فإنها نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح وكان أخا عثمان بن عفان من الرضاعة، حدثني أبي عن صفوان عن ابن مسكان عن أبي بصير عن أبي عبد الله عليه السلام قال: إن عبد الله بن سعد بن أبي سرح أخا عثمان بن عفان من الرضاعة قدم المدينة وأسلم وكان له خط حسن وكان إذا نزل الوحي على رسول الله صلى الله عليه وآله دعاه فكتب ما يمليه عليه رسول الله صلى الله عليه وآله من الوحي وكان إذا قال له رسول الله صلى الله عليه وآله سميع بصير يكتب سميع عليم وإذا قال والله بما تعملون خبير يكتب بصير، ويفرق بين التاء والياء وكان رسول الله صلى الله عليه وآله يقول هو واحد، فارتد كافرا ورجع إلى مكة وقال لقريش والله ما يدري محمد ما يقول أنا أقول مثل ما يقول فلا ينكر علي ذلك فأنا أنزل مثل ما أنزل الله فأنزل الله على نبيه صلى الله عليه وآله في ذلك «ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا» الخ فلما فتح رسول الله صلى الله عليه وآله مكة أمر رسول الله صلى الله عليه وآله بقتله، فجاء به عثمان قد أخذ بيده ورسول الله صلى الله عليه وآله في المسجد فقال يا رسول الله اعف عنه فسكت رسول الله صلى الله عليه وآله ثم أعاد فسكت رسول الله صلى الله عليه وآله ثم أعاد فقال هو لك، فلما مر قال رسول الله لأصحابه ألم أقل من رآه فليقتله، فقال رجل كانت عيني إليك يا رسول الله أن تشير إلي فأقتله، فقال رسول الله صلى الله عليه وآله إن الأنبياء لا يقتلون بالإشارة، فكان من الطلقاء.

বাংলা অনুবাদ:
‘যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা বলে, আমার কাছে ওহি এসেছে অথচ কিছুই অবতীর্ণ হয়নি, অথবা বলে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’—এই আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে। তিনি উসমানের দুধভাই ছিলেন। আল-কুম্মীর পিতা সাফওয়ান, ইবনে মিসকান ও আবু বাসিরের মাধ্যমে আবু আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: আবদুল্লাহ মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর হাতের লেখা সুন্দর ছিল। মুহাম্মদের কাছে ওহি এলে তাঁকে ডেকে লিখতে বলতেন। তিনি ‘সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ বললে আবদুল্লাহ ‘সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ লিখতেন। আবার ‘তোমরা যা করো, আল্লাহ তা সম্পর্কে অবহিত’ বলা হলে তিনি ‘সর্বদ্রষ্টা’ লিখতেন। তিনি তা ও ইয়া অক্ষরও অদলবদল করতেন। মুহাম্মদ বলতেন, ‘একই কথা।’

এরপর আবদুল্লাহ অবিশ্বাসী হয়ে ইসলাম ত্যাগ করেন, মক্কায় ফিরে গিয়ে কুরাইশদের বলেন, ‘আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ নিজেই জানেন না তিনি কী বলেন। আমি তাঁর মতোই কথা বলি, তিনি আপত্তি করেন না। আমিও আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তার অনুরূপ অবতীর্ণ করি।’ এরপর তাঁর বিষয়ে ‘যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে’ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মুহাম্মদ মক্কা জয় করলে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেন। উসমান আবদুল্লাহর হাত ধরে মসজিদে মুহাম্মদের কাছে এনে বলেন, ‘তাঁকে ক্ষমা করুন।’ মুহাম্মদ নীরব থাকেন। উসমান আবার বলেন; মুহাম্মদ নীরব থাকেন। তৃতীয়বার বললে মুহাম্মদ বলেন, ‘তাকে তোমার কাছে ছেড়ে দিলাম।’ তিনি চলে যাওয়ার পরে মুহাম্মদ সাহাবিদের বলেন, ‘আমি কি বলিনি, যে তাঁকে দেখবে, হত্যা করবে?’ একজন বলেন, ‘আমি আপনার চোখের ইশারার অপেক্ষায় ছিলাম।’ মুহাম্মদ বলেন, ‘নবীরা ইশারায় হত্যা করেন না।’ এরপর আবদুল্লাহ সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হন।

আল-কুম্মীর বর্ণনায় শুধু গুণবাচক শব্দ পরিবর্তন নয়, লিখিত শব্দের অক্ষররূপে তা ও ইয়া পরিবর্তনের কথাও এসেছে। এরপর বলা হয়েছে, মুহাম্মদ এসব পরিবর্তনকে একই বলে গ্রহণ করতেন। এই বিবরণে আবদুল্লাহর সংশয়ের প্রকাশও তীব্র। তিনি মক্কায় ফিরে কুরাইশদের কাছে অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ কী বলছেন তা নিজেই জানেন না; আবদুল্লাহ তাঁর মতো কথা বললেও তিনি আপত্তি করেন না। এরপর সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের সঙ্গে তাঁর বক্তব্য যুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী অংশে মক্কা বিজয়ের সময় হত্যার নির্দেশ, উসমানের মধ্যস্থতা, মুহাম্মদের নীরবতা এবং চোখের ইশারা সম্পর্কিত ঘটনাও সংরক্ষিত হয়েছে।

এই বর্ণনা সুন্নি তাফসিরে সংরক্ষিত সংবাদগুলোর সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিলে যায়: আবদুল্লাহর ওহি লেখার দায়িত্ব, সচেতনভাবে শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ, মুহাম্মদের অনুমোদনের দাবি, ধর্মত্যাগ, মক্কায় প্রত্যাবর্তন এবং উসমানের মধ্যস্থতায় প্রাণরক্ষা। কিন্তু পরিবর্তিত শব্দের উদাহরণ এবং আবদুল্লাহর ইসলাম গ্রহণ ও লেখার স্থানসংক্রান্ত বিবরণ সর্বত্র একই নয়। আল-কুম্মীর বর্ণনায় সুন্নি গ্রন্থগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনাক্রম শিয়া বর্ণনাপরম্পরায়ও পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ভিন্ন শব্দ ও ঘটনাবিন্যাস দেখায় যে, সব পরবর্তী পাঠ একটিমাত্র অবিকল বিবরণের অনুলিপি নয়। আল-কুম্মীর সূত্রের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা নির্ধারণের জন্য তার নিজস্ব সংবহন এবং সুন্নি সূত্রের সঙ্গে পাঠগত সম্পর্কও বিবেচ্য।


বর্ণনাগুলোর মিল, অমিল এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য

আবদুল্লাহ ইবনে সাদকে ঘিরে সংরক্ষিত সংবাদগুলো পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি পৃথক স্তর পাওয়া যায়। প্রথম স্তরে তাঁর ওহি লেখক হওয়ার পরিচয় রয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ, যা সব সূত্রে একই শব্দ দিয়ে বর্ণিত হয়নি। তৃতীয় স্তরে রয়েছে লেখকের নিজের বক্তব্য বা প্রস্তাবকে মুহাম্মদের অনুমোদন দেওয়ার দাবি। চতুর্থ স্তরে রয়েছে সূরা মুমিনুনের প্রশংসাবাক্যের ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংশয়কে যুক্ত করা। পঞ্চম স্তরে রয়েছে ধর্মত্যাগ, মক্কায় যোগ দেওয়া, হত্যার নির্দেশ এবং পরে উসমানের মধ্যস্থতায় প্রাণরক্ষা। একেকটি বর্ণনা এই স্তরগুলোর এক বা একাধিক অংশ সংরক্ষণ করেছে। ফলে সব গ্রন্থকে একই বক্তব্যের অভিন্ন সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করলে উৎসগুলোর প্রকৃত পার্থক্য হারিয়ে যায়।

সূরা আনআম ৬:৯৩-এর আয়াতটি নির্দিষ্টভাবে আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগ উপলক্ষে অবতীর্ণ হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ইবনে আশুর কালানুক্রমিক আপত্তি তুলেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো: সূরা আনআম সাধারণভাবে মক্কি; অন্যদিকে আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগ করে মক্কায় প্রত্যাবর্তন হিজরতের পরের ঘটনা। ফলে এই নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মক্কি আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দাবি কালানুক্রমের সঙ্গে সরাসরি মেলে না। ইবনে আশুর আয়াতের অর্থকে কোনো এক ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ না রেখে এ ধরনের বক্তব্য প্রদানকারীদের সামগ্রিক শ্রেণিতে প্রয়োগ করেছেন। এই আপত্তি আয়াতের নাযিলের কারণ নিয়ে; আবদুল্লাহর ওহি লেখার দায়িত্ব, ধর্মত্যাগ কিংবা তাঁর নামে সংরক্ষিত শব্দবদলের অভিযোগগুলো এ আপত্তির বিষয় নয়। [20]

وأما «من قال سأنزل مثل ما أنزل الله»، فقال الواحدي في «أسباب النزول»، عن ابن عباس وعكرمة: أنها نزلت في عبد الله بن سعد بن أبي سرح العامري وكان قد أسلم بمكة، وكان يكتب الوحي للنبيء صلى الله عليه وسلم ثم ارتد وقال: أنا أقول مثل ما أنزل الله، استهزاء، وهذا أيضا لا ينثلج له الصدر لأن عبد الله بن أبي سرح ارتد بعد الهجرة ولحق بمكة وهذه السورة مكية. وذكر القرطبي عن عكرمة، وابن عطية عن الزهراوي والمهدوي أنها نزلت في النضر بن الحارث كان يقول: أنا أعارض القرآن. وحفظوا له أقوالا، وذلك على سبيل الاستهزاء. وقد رووا أن أحدا من المشركين قال: إنما هو قول شاعر وإني سأنزل مثله؛ وكان هذا قد تكرر من المشركين كما أشار إليه القرآن، فالوجه أن المراد بالموصول العموم ليشمل كل من صدر منه هذا القول ومن يتابعهم عليه في المستقبل.

বাংলা অনুবাদ:
‘যে বলে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ অবতীর্ণ করব’—এ সম্পর্কে ওয়াহিদী তাঁর আসবাবুন নুযুল গ্রন্থে ইবনে আব্বাস ও ইকরিমা থেকে বলেছেন, আয়াতটি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ সম্পর্কে অবতীর্ণ। তিনি মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন, মুহাম্মদের জন্য ওহি লিখতেন, পরে ধর্মত্যাগ করে বিদ্রূপের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, আমিও তার অনুরূপ বলতে পারি।’ কিন্তু এই বক্তব্যও সন্তোষজনক নয়; কারণ আবদুল্লাহ হিজরতের পরে ধর্মত্যাগ করে মক্কায় ফিরে যান, অথচ এই সূরা মক্কি। কুরতুবী ইকরিমা থেকে এবং ইবনে আতিয়্যা যাহরাবি ও মাহদাবি থেকে উল্লেখ করেছেন, আয়াতটি নযর ইবনে হারিস সম্পর্কে অবতীর্ণ; তিনি বলতেন, ‘আমি কোরআনের মোকাবিলা করতে পারি।’ তাঁর কিছু বিদ্রূপাত্মক বক্তব্যও সংরক্ষিত হয়েছে। আরও বর্ণিত আছে, কোনো মুশরিক বলেছিল, ‘এ তো কবির কথা; আমিও এর অনুরূপ অবতীর্ণ করব।’ কোরআনেও এ ধরনের কথা মুশরিকদের মুখে বারবার আসার ইঙ্গিত রয়েছে। তাই আয়াতের বক্তব্যটি ব্যাপক অর্থে নেওয়া অধিক যথাযথ—এতে ওই কথা বলা প্রত্যেকে এবং ভবিষ্যতে তাদের অনুসরণকারীরাও অন্তর্ভুক্ত।

গ্রন্থ ও বর্ণনাপথসংরক্ষিত অভিযোগ বা বিশেষ তথ্যউৎসগত সম্পর্ক
তাবারী ১৩৫৫৫ — ইকরিমা‘আজিজুন হাকিম’ পরিবর্তন করে ‘গাফুরুন রহিম’ লেখা; পরিবর্তিত লেখা পড়ে শোনানোর পরে অনুমোদনের অভিযোগনির্দিষ্ট ইকরিমা-সূত্র
তাবারী ১৩৫৫৬ — সুদ্দি‘সামিআন আলিমান’ ও ‘আলিমান হাকিমান’ অদলবদল; সংশয় ও ধর্মত্যাগ; আম্মারদের নির্যাতনের অতিরিক্ত বিবরণসুদ্দি–আসবাত সংবহন
ইবনে আবি হাতিম ৭৬২৪ — আবু খালাফমক্কাবাসীদের প্রশ্নের উত্তরে নিজের ইচ্ছামতো কোরআন লেখার দাবিমাআন ইবনে রিফাআ–আবু খালাফ-সূত্র; সুদ্দি-সূত্র থেকে পৃথক
ইবনে আবি হাতিম ৭৬২৬ — সুদ্দিনির্দিষ্ট গুণবাচক শব্দ পরিবর্তন এবং লেখকের সংশয়তাবারী ১৩৫৫৬-এর সঙ্গে একই সুদ্দি–আসবাত ধারা
বাগাভী — আনআম ৬:৯৩একাধিক শব্দজোড়ার পরিবর্তন এবং মুমিনুন ২৩:১৪-এর বাক্য লিখে নেওয়ার নির্দেশপূর্ববর্তী তাফসিরি বিবরণের সংকলিত রূপ
ওয়াহিদী — আনআম ৬:৯৩আবদুল্লাহর নিজের উচ্চারিত বাক্য থেকে সংশয় এবং ধর্মত্যাগকালবী–ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত পাঠ
কুরতুবী — আনআম ৬:৯৩ ও মুমিনুন ২৩:১৪আবদুল্লাহর ধর্মত্যাগ; একই প্রশংসাবাক্য উমর, মুআজ ও আবদুল্লাহর নামে প্রচলিতএকাধিক পূর্ববর্তী বর্ণনা ও ব্যাখ্যার সংকলন
রাযী ও বায়দাবীমানবসৃষ্টির আয়াত, লেখকের উচ্চারণ এবং সেটিকে প্রত্যাদেশের ভাষা হিসেবে শনাক্ত করার বিবরণপূর্বপ্রচলিত তাফসিরি কাহিনির পুনর্বিবরণ
সুয়ূতী — আদ-দুররুল মানসুরআবু খালাফ, সুদ্দি, ইকরিমা ও শুরাহবিল-সংক্রান্ত পূর্ববর্তী সংবাদ একত্রএকাধিক পুরোনো সংকলনের উৎসনির্দেশসহ পুনরুল্লেখ
ইবনে আবদুল বার — আল-ইস্তিআববিকল্প শব্দের প্রস্তাবে ‘সবই সঠিক’ অনুমোদনের অভিযোগ; পরবর্তী হত্যার নির্দেশজীবনীমূলক সংকলনে সংরক্ষিত বিবরণ
তাফসির আল-কুম্মীভিন্ন গুণবাচক শব্দ ও অক্ষররূপ পরিবর্তন, অনুমোদনের দাবি এবং মক্কা বিজয়ের ঘটনাক্রমশিয়া তাফসিরি বর্ণনাপরম্পরা

এই তথ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, অভিযোগের ব্যাপক সংরক্ষণ এবং অভিযোগের ঐতিহাসিক সত্যতা এক প্রশ্ন নয়। তাবারীর ইকরিমা-সূত্র, ইবনে আবি হাতিমের আবু খালাফ-সূত্র এবং সুদ্দির বর্ণনায় অভিযোগের ভাষা ও ঘটনাবিন্যাস পৃথক। আবার বাগাভী, কুরতুবী, রাযী, বায়দাবী ও সুয়ূতীর মতো পরবর্তী লেখকরা পূর্বপ্রচলিত সংবাদ সংরক্ষণ করেছেন। এর মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, মুসলিমদের নিজস্ব গ্রন্থে আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ শুধু সংরক্ষিতই হয়নি, বরং তাফসির, জীবনী এবং আইনগত আলোচনার অংশ হিসেবেও বিস্তার লাভ করেছে। অভিযোগটির প্রত্যেকটি বিস্তারিত ঘটনা বাস্তবে ঘটেছিল—এই সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট বর্ণনাপথ ও ঐতিহাসিক সাক্ষ্যের অতিরিক্ত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কিন্তু এই উৎসগত সীমারেখা কোরআনের প্রত্যাদেশ সম্পর্কে উত্থাপিত প্রশ্নকে অকার্যকর করে না। একজন ওহি লেখক নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দাবি করেছেন, তিনি নির্দিষ্ট শব্দ পরিবর্তন করতেন, বিকল্প প্রস্তাব দিতেন এবং সেই পরিবর্তন অনুমোদিত হতো। আরেক ধারায় তাঁর নিজের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণকে মুহাম্মদের কাছে অবতীর্ণ বাক্যের সঙ্গে অভিন্ন বলে চিহ্নিত করার বিবরণ রয়েছে। অভিযোগগুলোকে মিথ্যা বলা সম্ভব; কিন্তু মিথ্যা বলার জন্য তাদের বিপরীতে প্রমাণ প্রয়োজন। কেবল মুহাম্মদ নবী ছিলেন এবং কোরআন আল্লাহর বাণী—এই ধর্মীয় দাবির ভিত্তিতে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করলে যে দাবির সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে, সেটিকেই আবার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ধ্রুপদি ইসলামি সাহিত্যে এই ঘটনাগুলোর সংরক্ষণ তাই দুটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রথমত, আবদুল্লাহ ইবনে সাদের ওহি লেখার দায়িত্ব এবং তাঁর ধর্মত্যাগ ইসলামের প্রাচীন বর্ণনাসমষ্টির পরিচিত অংশ। দ্বিতীয়ত, তাঁর ধর্মত্যাগের সঙ্গে মুহাম্মদের প্রত্যাদেশের নির্দিষ্ট শব্দ, লেখকের ভূমিকা এবং কথিত ঐশী বাণী শনাক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর অভিযোগও সেই সাহিত্যে সংরক্ষিত। একই ঘটনার ভিন্ন পাঠ, ভিন্ন ব্যক্তি-আরোপ এবং পরবর্তী গ্রহণ-বর্জনের ইতিহাস দেখায়, এ বিতর্ক ইসলামি ঐতিহ্যের নিজের ভেতরেই উপস্থিত ছিল। যে গ্রন্থের প্রতিটি শব্দ আল্লাহর নির্ধারিত বলে দাবি করা হয়, তার লিখন ও অনুমোদনের সঙ্গে একজন মানুষের শব্দনির্বাচনের অভিযোগ যুক্ত হলে সেই দাবির নির্ভরযোগ্যতা স্বাধীন ঐতিহাসিক পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মীয় মর্যাদা বা অভিযোগকারীর পরবর্তী জীবন সেই পরীক্ষার বিকল্প নয়।


অন্য একজন ওহি লেখকের ধর্মত্যাগ ও মুহাম্মদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ

আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহই একমাত্র ব্যক্তি নন, যাঁর ওহি লেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মুহাম্মদের প্রত্যাদেশের উৎস সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মুসনাদে আহমদ এবং অন্যান্য ধ্রুপদি হাদিসগ্রন্থে আরও একজন লেখকের বিবরণ সংরক্ষিত আছে, যিনি প্রথমে খ্রিষ্টান ছিলেন, পরে ইসলাম গ্রহণ করেন, মুহাম্মদের জন্য লিখতেন এবং শেষ পর্যন্ত ইসলাম ত্যাগ করে আবার পূর্ববর্তী ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগ দেন। এই ব্যক্তির অভিযোগ ছিল, মুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া বক্তব্য ছাড়া কিছুই জানতেন না। মুসনাদে আহমদের বিস্তারিত বর্ণনায় তাঁর নির্দিষ্ট শব্দ পরিবর্তন এবং মুহাম্মদের সেই পরিবর্তন অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু একজন লেখকের ধর্মত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়; ওহি লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা থেকে বাণীর উৎস, শব্দনির্বাচন এবং মুহাম্মদের অনুমোদন সম্পর্কে কী ধরনের সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের পরিচয় ছিল কুরাইশ বংশীয় একজন লেখক, যিনি ধর্মত্যাগের পর মক্কায় ফিরে যান এবং মক্কা বিজয়ের সময় উসমানের মধ্যস্থতায় প্রাণ রক্ষা করেন। অন্যদিকে বুখারি ও মুসলিমের এই লেখকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। মুসলিমের বর্ণনায় তাঁকে বনু নাজ্জারের সদস্য বলা হয়েছে এবং তাঁর মৃত্যুর পর মৃতদেহ বারবার কবরের বাইরে পাওয়া যাওয়ার কাহিনি রয়েছে। দুই ব্যক্তির জীবনের পরিণতি পৃথক। কিন্তু তাঁদের অভিযোগের বিষয়বস্তুতে একটি মৌলিক মিল রয়েছে: দুজনের ক্ষেত্রেই ওহি লেখার দায়িত্বের সঙ্গে মুহাম্মদের প্রচারিত বাণীতে লেখকের নিজের ভূমিকার প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে।


সহিহ বুখারি ৩৬১৭: মুহাম্মদ আমার লিখে দেওয়া ছাড়া কিছুই জানেন না

সহিহ বুখারির ‘কিতাবুল মানাকিব’-এ নবুয়তের নিদর্শনসংক্রান্ত অধ্যায়ে আনাস ইবন মালিকের সূত্রে এই খ্রিষ্টান লেখকের ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ব্যক্তি প্রথমে খ্রিষ্টান ছিলেন, পরে ইসলাম গ্রহণ করে সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পড়েছিলেন এবং মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। এরপর তিনি আবার খ্রিষ্টধর্মে ফিরে যান। তাঁর ধর্মত্যাগের পর প্রকাশিত বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: মুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া ছাড়া কিছুই জানেন না। বর্ণনায় এই অভিযোগের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের কোনো প্রকাশ্য যুক্তি বা সংশ্লিষ্ট লেখার তুলনামূলক যাচাইয়ের বিবরণ নেই। পরিবর্তে রয়েছে অভিযোগকারীর মৃত্যু এবং তাঁর মৃতদেহ মাটি গ্রহণ না করার একটি অলৌকিক কাহিনি। ঘটনাটি তিনবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার পরে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা মৃতদেহটি আর দাফন না করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে বর্ণিত হয়েছে। [21]

حَدَّثَنَا أَبُو مَعْمَرٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ كَانَ رَجُلٌ نَصْرَانِيًّا فَأَسْلَمَ وَقَرَأَ الْبَقَرَةَ وَآلَ عِمْرَانَ، فَكَانَ يَكْتُبُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، فَعَادَ نَصْرَانِيًّا فَكَانَ يَقُولُ مَا يَدْرِي مُحَمَّدٌ إِلاَّ مَا كَتَبْتُ لَهُ، فَأَمَاتَهُ اللَّهُ فَدَفَنُوهُ، فَأَصْبَحَ وَقَدْ لَفَظَتْهُ الأَرْضُ فَقَالُوا هَذَا فِعْلُ مُحَمَّدٍ وَأَصْحَابِهِ، لَمَّا هَرَبَ مِنْهُمْ نَبَشُوا عَنْ صَاحِبِنَا‏.‏ فَأَلْقَوْهُ فَحَفَرُوا لَهُ فَأَعْمَقُوا، فَأَصْبَحَ وَقَدْ لَفَظَتْهُ الأَرْضُ، فَقَالُوا هَذَا فِعْلُ مُحَمَّدٍ وَأَصْحَابِهِ نَبَشُوا عَنْ صَاحِبِنَا لَمَّا هَرَبَ مِنْهُمْ‏.‏ فَأَلْقَوْهُ فَحَفَرُوا لَهُ، وَأَعْمَقُوا لَهُ فِي الأَرْضِ مَا اسْتَطَاعُوا، فَأَصْبَحَ قَدْ لَفَظَتْهُ الأَرْضُ، فَعَلِمُوا أَنَّهُ لَيْسَ مِنَ النَّاسِ فَأَلْقَوْهُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
আবু মামার আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবদুল ওয়ারিস আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবদুল আজিজ আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন। আনাস বলেন: একজন ব্যক্তি খ্রিষ্টান ছিলেন। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পড়েন। তিনি নবীর জন্য লিখতেন। এরপর তিনি আবার খ্রিষ্টান হয়ে যান এবং বলতে থাকেন, “মুহাম্মদ আমার লিখে দেওয়া ছাড়া কিছুই জানেন না।”
এরপর আল্লাহ তাঁর মৃত্যু ঘটান। লোকেরা তাঁকে দাফন করে। কিন্তু সকালে দেখা গেল, মাটি তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। লোকেরা বলল, “এটি মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের কাজ। আমাদের লোকটি তাঁদের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে বলে তাঁরা তাঁর কবর খুঁড়ে মৃতদেহটি বের করে ফেলে দিয়েছেন।”
এরপর তাঁরা আবার তাঁর জন্য কবর খুঁড়লেন এবং সেটি গভীর করলেন। কিন্তু পরদিন সকালেও দেখা গেল, মাটি তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তাঁরা আবার বললেন, “এটি মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের কাজ। আমাদের লোকটি তাঁদের কাছ থেকে পালিয়ে আসায় তাঁরা তাঁর কবর খুঁড়ে মৃতদেহটি বের করে ফেলে দিয়েছেন।”
এরপর তাঁরা যতটা সম্ভব গভীর করে আরেকটি কবর খুঁড়লেন। কিন্তু পরদিন সকালেও দেখা গেল, মাটি তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তাঁরা বুঝলেন, এটি মানুষের কাজ নয়। ফলে তাঁরা মৃতদেহটিকে সেভাবেই ফেলে রাখলেন।

বুখারির বর্ণনায় লেখকের অভিযোগের ভাষা লক্ষণীয়। তিনি বলেননি যে, মুহাম্মদ শুধু তাঁর কাছ থেকে লিখতে শিখেছিলেন কিংবা তিনি কেবল একজন সাধারণ লেখক ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, মুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া ছাড়া কিছুই জানতেন না। এই দাবি মুহাম্মদের প্রচারিত বাণীর উৎস ও বিষয়বস্তুর সঙ্গে নিজের লেখার সম্পর্ক নির্দেশ করে। একজন লেখক মুহাম্মদের বক্তব্য শুনে তা লিপিবদ্ধ করলে তাঁর ভূমিকা মূলত লিখিত সংরক্ষণে সীমিত থাকে। কিন্তু এই ব্যক্তির অভিযোগে সেই সম্পর্ক বিপরীত দিকে চলে গেছে: মুহাম্মদের জ্ঞান ও প্রচারিত বক্তব্যই নাকি লেখকের লিখে দেওয়া বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। অভিযোগটি সত্য হলে বাণীর বিষয়বস্তু নির্ধারণে লেখকের ভূমিকার প্রশ্ন তৈরি হয়। আর এই অভিযোগের অসত্যতা প্রমাণ করতে হলে লেখক কী লিখতেন, মুহাম্মদ কী বলতেন এবং তাঁদের মধ্যে বক্তব্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া কেমন ছিল—সেই তথ্য প্রয়োজন।

হাদিসটির দ্বিতীয় অংশে অভিযোগের বদলে মৃতদেহের অলৌকিক পরিণতি কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে। লোকেরা প্রথম দুইবার মৃতদেহ কবরের বাইরে পাওয়ার কারণ হিসেবে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কবর খোঁড়ার অভিযোগ করে। তৃতীয়বারের পরে তারা মানুষের হস্তক্ষেপের ধারণা ত্যাগ করে বলে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কবর থেকে মৃতদেহ বেরিয়ে আসার কাহিনিটি সত্য হলেও তা ওই ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় মুহাম্মদের জন্য কী লিখতেন, সেই প্রশ্নের উত্তর নয়। তাঁর মৃতদেহের অবস্থান থেকে তাঁর পূর্ববর্তী অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারিত হয় না। একটি দাবির সঙ্গে দাবিদারের পরবর্তী দুর্ভাগ্য কিংবা অলৌকিক শাস্তির গল্প যুক্ত করা হলে সেই গল্প নিজে থেকে মূল দাবির খণ্ডন হয়ে যায় না।


সহিহ মুসলিম ২৭৮১: বনু নাজ্জারের ওহি লেখক এবং তাঁর ধর্মত্যাগ

সহিহ মুসলিমে একই ঘটনার আরেকটি বর্ণনা রয়েছে। এখানে লেখককে বনু নাজ্জারের ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তিনি সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পড়েছিলেন এবং মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। এরপর পালিয়ে আহলে কিতাবের সঙ্গে যোগ দেন। মুসলিমের পাঠে তাঁর নতুন আশ্রয়দাতারা বিশেষভাবে আনন্দিত হয়েছিলেন, কারণ তাঁদের কাছে একজন সাবেক ওহি লেখক এসে পৌঁছেছিলেন। তাঁরা প্রকাশ্যে তাঁর পরিচয় দিতেন—এই ব্যক্তি মুহাম্মদের জন্য লিখতেন। বর্ণনাটি দেখায়, তাঁর লেখক-পরিচয় নতুন সম্প্রদায়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি শুধু একজন সাধারণ ধর্মত্যাগী হিসেবে নন, মুহাম্মদের লিখনকাজে যুক্ত থাকার কারণে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন বলে হাদিসে বলা হয়েছে। [22]

حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ، حَدَّثَنَا أَبُو النَّضْرِ، حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ، – وَهُوَ ابْنُ الْمُغِيرَةِ – عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ كَانَ مِنَّا رَجُلٌ مِنْ بَنِي النَّجَّارِ قَدْ قَرَأَ الْبَقَرَةَ وَآلَ عِمْرَانَ وَكَانَ يَكْتُبُ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَانْطَلَقَ هَارِبًا حَتَّى لَحِقَ بِأَهْلِ الْكِتَابِ – قَالَ – فَرَفَعُوهُ قَالُوا هَذَا قَدْ كَانَ يَكْتُبُ لِمُحَمَّدٍ فَأُعْجِبُوا بِهِ فَمَا لَبِثَ أَنْ قَصَمَ اللَّهُ عُنُقَهُ فِيهِمْ فَحَفَرُوا لَهُ فَوَارَوْهُ فَأَصْبَحَتِ الأَرْضُ قَدْ نَبَذَتْهُ عَلَى وَجْهِهَا ثُمَّ عَادُوا فَحَفَرُوا لَهُ فَوَارَوْهُ فَأَصْبَحَتِ الأَرْضُ قَدْ نَبَذَتْهُ عَلَى وَجْهِهَا ثُمَّ عَادُوا فَحَفَرُوا لَهُ فَوَارَوْهُ فَأَصْبَحَتِ الأَرْضُ قَدْ نَبَذَتْهُ عَلَى وَجْهِهَا فَتَرَكُوهُ مَنْبُوذًا ‏.‏

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবনে রাফি আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবু নযর আমাদের বর্ণনা করেছেন; সুলাইমান ইবনে মুগিরা সাবিতের মাধ্যমে আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন। আনাস বলেন: আমাদের মধ্যে বনু নাজ্জারের একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পড়েছিলেন এবং আল্লাহর রাসুলের জন্য লিখতেন। এরপর তিনি পালিয়ে গিয়ে আহলে কিতাবের সঙ্গে যোগ দেন।
তারা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দেয় এবং বলে, “এই ব্যক্তি মুহাম্মদের জন্য লিখতেন।” এতে তারা তাঁকে নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়।
কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহ তাদের মধ্যে তাঁর মৃত্যু ঘটান। তারা তাঁর জন্য কবর খুঁড়ে তাঁকে দাফন করে। কিন্তু সকালে দেখা যায়, মাটি তাঁকে নিজের ওপরিভাগে নিক্ষেপ করেছে। এরপর তারা আবার কবর খুঁড়ে তাঁকে দাফন করে। কিন্তু পরদিন সকালেও মাটি তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। এরপর তারা তৃতীয়বার কবর খুঁড়ে তাঁকে দাফন করে। পরদিন সকালেও মাটি তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। শেষে তারা তাঁকে সেই অবস্থায় ফেলে রাখে।

মুসলিমের এই বর্ণনায় একটি অতিরিক্ত সামাজিক তথ্য পাওয়া যায়: সাবেক ওহি লেখকের পরিচয় তাঁর নতুন সম্প্রদায়ের কাছে মর্যাদার কারণ হয়েছিল। একজন ব্যক্তি কোনো ধর্মীয় আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ লিখনকাজে যুক্ত ছিলেন এবং পরে সেই আন্দোলন ত্যাগ করেছেন—এটি তাঁর নতুন আশ্রয়দাতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার পরিচয়। মুহাম্মদের কাছে কোন বক্তব্য আসত, কীভাবে সেগুলো লিপিবদ্ধ হতো এবং লেখকের দায়িত্ব কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল—এসব সম্পর্কে তিনি সাধারণ অনুসারীর তুলনায় বেশি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। মুসলিমের বর্ণনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের নির্দিষ্ট বাক্যটি উদ্ধৃত হয়নি, কিন্তু তাঁর লেখক-পরিচয়ের কারণে নতুন সম্প্রদায়ের বিশেষ আগ্রহ ও আনন্দের কথা স্পষ্টভাবে রয়েছে।

বুখারি ও মুসলিমের পাঠে কয়েকটি পার্থক্যও রয়েছে। বুখারিতে প্রথমে খ্রিষ্টান থাকা, ইসলাম গ্রহণ এবং পুনরায় খ্রিষ্টধর্মে ফিরে যাওয়ার কথা স্পষ্ট; মুসলিমে বনু নাজ্জারের পরিচয় এবং আহলে কিতাবের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বুখারিতে লেখকের অভিযোগ সরাসরি উদ্ধৃত হয়েছে; মুসলিমে তাঁর নতুন সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া বিস্তারিত। উভয় বর্ণনায় সূরা বাকারা ও আলে ইমরান পাঠ করা, মুহাম্মদের জন্য লেখা, ধর্মত্যাগ এবং মৃতদেহ বারবার কবরের বাইরে পাওয়া যাওয়ার ঘটনাক্রম অভিন্ন। এই দুটি হাদিসের মূল সাহাবি-বর্ণনাকারী আনাস ইবনে মালিক হলেও পরবর্তী সংবহনপথ পৃথক: বুখারির পাঠ এসেছে আবদুল আজিজ ইবনে সুহাইবের মাধ্যমে, মুসলিমের পাঠ এসেছে সাবিত আল-বুনানির মাধ্যমে। একই আনাস-সূত্রের দুটি বর্ণনাপথে ঘটনাটির পৃথক বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে।


মুসনাদে আহমদ ১২২১৫: লেখককে নিজের ইচ্ছামতো শব্দ লিখতে দেওয়ার অভিযোগ

মুসনাদে আহমদের ১২২১৫ নম্বর হাদিসে এই লেখকের ঘটনা আরও বিস্তারিতভাবে এসেছে। এই বর্ণনায় সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পড়ার পরিচয়, মুহাম্মদের জন্য লেখার দায়িত্ব, ধর্মত্যাগ এবং মৃতদেহ মাটি গ্রহণ না করার ঘটনাগুলো বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু এখানে একটি অতিরিক্ত তথ্য রয়েছে, যা অভিযোগটিকে আরও গুরুতর করে: মুহাম্মদ নির্দিষ্ট গুণবাচক শব্দ লিখতে বললেও লেখক অন্য শব্দ লিখতেন বা লিখতে চাইতেন, আর মুহাম্মদ তাঁকে নিজের ইচ্ছামতো লিখতে বলতেন। ফলে বুখারির সংক্ষিপ্ত অভিযোগের বিপরীতে আহমদের বর্ণনায় লেখক কীভাবে বক্তব্যের শব্দ পরিবর্তন করতেন, তার নির্দিষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। [23]

حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا حُمَيْدٌ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلًا كَانَ يَكْتُبُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَدْ كَانَ قَرَأَ الْبَقَرَةَ، وَآلَ عِمْرَانَ، وَكَانَ الرَّجُلُ إِذَا قَرَأَ الْبَقَرَةَ، وَآلَ عِمْرَانَ جَدَّ فِينَا يَعْنِي عَظُمَ، فَكَانَ النَّبِيُّ عَلَيْهِ الصَّلَاة وَالسَّلَامُ يُمْلِي عَلَيْهِ غَفُورًا رَحِيمًا، فَيَكْتُبُ عَلِيمًا حَكِيمًا، فَيَقُولُ لَهُ النَّبِيُّ عَلَيْهِ الصَّلَاة وَالسَّلَامُ: “اكْتُبْ كَذَا وَكَذَا، اكْتُبْ كَيْفَ شِئْتَ”، وَيُمْلِي عَلَيْهِ عَلِيمًا حَكِيمًا، فَيَقُولُ: أَكْتُبُ سَمِيعًا بَصِيرًا؟، فَيَقُولُ: “اكْتُبْ اكْتُبْ كَيْفَ شِئْتَ”، فَارْتَدَّ ذَلِكَ الرَّجُلُ عَنِ الْإِسْلَامِ، فَلَحِقَ بِالْمُشْرِكِينَ، وَقَالَ: أَنَا أَعْلَمُكُمْ بِمُحَمَّدٍ، إِنْ كُنْتُ لَأَكْتُبُ مَا شِئْتُ، فَمَاتَ ذَلِكَ الرَّجُلُ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “إِنَّ الْأَرْضَ لَمْ تَقْبَلْهُ”، وقَالَ أَنَسٌ: فَحَدَّثَنِي أَبُو طَلْحَةَ أَنَّهُ أَتَى الْأَرْضَ الَّتِي مَاتَ فِيهَا ذَلِكَ الرَّجُلُ، فَوَجَدَهُ مَنْبُوذًا، فَقَالَ أَبُو طَلْحَةَ: مَا شَأْنُ هَذَا الرَّجُلِ؟، قَالُوا: قَدْ دَفَنَّاهُ مِرَارًا، فَلَمْ تَقْبَلْهُ الْأَرْضُ.

বাংলা অনুবাদ:
ইয়াজিদ ইবনে হারুন আমাদের বর্ণনা করেছেন; হুমাইদ আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন। আনাস বলেন: একজন ব্যক্তি নবীর জন্য লিখতেন। তিনি সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পড়েছিলেন। আমাদের মধ্যে কেউ এই দুটি সূরা পড়তে পারলে তাঁকে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন মনে করা হতো।
নবী তাঁকে ‘গাফুরান রহিমান’—অতিক্ষমাশীল, পরম দয়ালু—লিখতে বলতেন; কিন্তু তিনি ‘আলিমান হাকিমান’—সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়—লিখতেন। তখন নবী তাঁকে বলতেন, “এভাবে বা ওভাবে লেখো, যেভাবে ইচ্ছা লেখো।”
আবার নবী তাঁকে ‘আলিমান হাকিমান’ লিখতে বললে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “আমি কি ‘সামিআন বাসিরান’—সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা—লিখব?” তখন নবী তাঁকে বলতেন, “লেখো, যেভাবে ইচ্ছা লেখো।”
এরপর সেই ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করে মুশরিকদের সঙ্গে যোগ দেন এবং বলেন, “মুহাম্মদ সম্পর্কে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি জানি। আমি তাঁর সামনে যা ইচ্ছা লিখতাম।”
পরে সেই ব্যক্তি মারা যান। নবী বলেন, “মাটি তাঁকে গ্রহণ করেনি।” আনাস বলেন: আবু তালহা আমাকে জানিয়েছেন, তিনি সেই ব্যক্তির মৃত্যুর স্থানে গিয়ে তাঁকে বাইরে পড়ে থাকতে দেখেন। আবু তালহা জিজ্ঞেস করেন, “এই ব্যক্তির কী হয়েছে?” লোকেরা বলে, “আমরা তাঁকে কয়েকবার দাফন করেছি, কিন্তু মাটি তাঁকে গ্রহণ করে না।”

এই হাদিসে দুবার ‘যেভাবে ইচ্ছা লেখো’ বক্তব্যটি এসেছে। প্রথমবার ‘গাফুরান রহিমান’-এর পরিবর্তে ‘আলিমান হাকিমান’ লেখার প্রসঙ্গে, দ্বিতীয়বার ‘আলিমান হাকিমান’-এর পরিবর্তে ‘সামিআন বাসিরান’ লেখার প্রস্তাবের উত্তরে। এগুলো পরস্পরের সমার্থক শব্দজোড়া নয়। একটি ক্ষমা ও দয়ার পরিচয়, দ্বিতীয়টি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয়, তৃতীয়টি শ্রবণ ও দর্শনের পরিচয়। নির্দিষ্ট বক্তব্যের অর্থ পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এই বর্ণনার অভিযোগ সত্য হলে সমস্যাটি সাধারণ বানানভুল, আরবি উচ্চারণের পার্থক্য অথবা একই বাক্যের লিখনরীতির ভিন্নতা নয়; বরং নির্দিষ্ট শব্দের পরিবর্তে অন্য অর্থবোধক শব্দ গ্রহণের বিষয়।

আহমদের বর্ণনায় লেখকের ধর্মত্যাগের পরে প্রকাশিত বক্তব্যও তাবারীর আবদুল্লাহ-সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। একজন বলছেন, মুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া ছাড়া কিছু জানতেন না; অন্য বর্ণনায় বলা হচ্ছে, লেখক যা ইচ্ছা লিখতেন এবং মুহাম্মদ তাতে সম্মতি দিতেন। উভয় অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে লেখকের নিজের ভাষাগত সিদ্ধান্ত এবং সেটিকে মুহাম্মদের গ্রহণ করার প্রশ্ন। একজন লেখক শুধু নির্দেশিত বাণী লিখে রাখলে তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের শব্দের প্রাসঙ্গিকতা থাকার কথা নয়। কিন্তু এখানে তাঁর নির্বাচিত বিকল্প শব্দ এবং তা অনুমোদনের বিবরণই ধর্মত্যাগের ঘটনাটির প্রধান অংশ।

আহমদের পরের ১২২১৬ নম্বর হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে বকর আস-সাহমীর মাধ্যমে হুমাইদ থেকে একই ঘটনার আরেকটি বর্ণনাপথ রয়েছে। সেখানে সূরা বাকারা ও আলে ইমরান পড়া লেখকের পরিচয় দিয়ে আগের হাদিসের অনুরূপ বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি বর্ণনার মূল উৎস হুমাইদের মাধ্যমে আনাস হলেও ইয়াজিদ ইবনে হারুন ও আবদুল্লাহ ইবনে বকরের পৃথক সংবহন রয়েছে। ফলে আহমদের সংকলনেই এই ঘটনার একাধিক বর্ণনাপথ সংরক্ষিত হয়েছে। [24]


তাহাবীর শরহু মুশকিলিল আসার: শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ এবং তার ব্যাখ্যা

আবু জাফর আত-তাহাবী তাঁর ‘শরহু মুশকিলিল আসার’ গ্রন্থে এই লেখক সম্পর্কে দুটি পৃথক অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। প্রথম অধ্যায়ের শিরোনামেই তিনি এমন ব্যক্তির ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যাকে মুহাম্মদ ‘গাফুরান রহিমান’ লিখতে বলতেন, অথচ তিনি ‘আলিমান হাকিমান’ লিখতেন এবং নিজের পছন্দমতো শব্দ লেখার অনুমতি পেতেন। তাহাবী ৩২১১ নম্বর বর্ণনায় হুমাইদের মাধ্যমে আনাসের একই ঘটনাক্রম উল্লেখ করেছেন। তাঁর ৩২১২ নম্বর বর্ণনায় ইবনে ওয়াহব, ইবনে আইয়ুব ও হুমাইদের মাধ্যমে আনাস থেকে অনুরূপ সংবাদ রয়েছে। ফলে এই অভিযোগটি শুধু পরবর্তী তাফসিরের অস্পষ্ট একটি কাহিনি নয়; মুহাম্মদের কথিত শব্দ অনুমোদনের বিষয়টি নিয়ে প্রাচীন হাদিসবিশারদ তাহাবী আলাদা অধ্যায় তৈরি করে আলোচনা করেছেন। [25]

তাহাবীর আলোচনায় প্রশ্ন উঠেছে, নির্দিষ্ট শব্দে কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার দাবি এবং লেখকের ইচ্ছামতো শব্দ পরিবর্তনের অনুমতি কীভাবে একই সঙ্গে গ্রহণ করা যায়। কারণ কোরআনকে সাত আহরুফে পাঠের অনুমতির ব্যাখ্যায় তিনি নির্দিষ্ট শব্দ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সেখানে তিনি বর্তমান স্বীকৃত মুসহাফের পাঠ থেকে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে কোরআন পড়াকে অনুমোদন করেননি, যদিও বিকল্প শব্দের অর্থ কাছাকাছি হতে পারে। অথচ লেখকের বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজেই একাধিক শব্দজোড়ার পরিবর্তন গ্রহণ করছেন। তাহাবী তাঁর ব্যাখ্যায় সম্ভাবনা দিয়েছেন যে, লেখককে লিখিয়ে দেওয়া বিষয়গুলো কোরআনের আয়াত নয়, বরং অন্য লোকদের কাছে প্রেরিত ধর্মীয় আহ্বান বা চিঠি হতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাটি বর্ণনায় নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়; এটি তাহাবীর নিজের ব্যাখ্যা। তাঁর বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক অংশ হলো: [26]

وَفِي هَذَا الْحَدِيثِ مَا يُخَالِفُ ذَلِكَ، وَيَرُدُّ الْأُمُورَ إِلَى الْمَعَانِي الَّتِي فِي الْحَقِيقَةِ إِلَى مَا قَدْ قِيلَتْ عَلَيْهِ، وَإِنِ اخْتَلَفَتِ الْأَلْفَاظُ بِهَا مَعَ اسْتِوَاءِ الْمَعَانِي فِيهَا.

فَكَانَ جَوَابُنَا لَهُ فِي ذَلِكَ بِتَوْفِيقِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَعَوْنِهِ: أَنَّ الَّذِي فِي هَذَا الْحَدِيثِ لَيْسَ مِنْ ذَلِكَ الْمَعْنَى الَّذِي ذَكَرْنَاهُ فِي ذَلِكَ الْبَابِ، وَذَلِكَ أَنَّ الْمَعْنَى الَّذِي ذَكَرْنَاهُ فِي ذَلِكَ الْبَابِ هُوَ فِي الْقُرْآنِ لَا فِي غَيْرِهِ، وَالَّذِي فِي الْحَدِيثِ الَّذِي ذَكَرْنَاهُ فِي هَذَا الْبَابِ قَدْ يَحْتَمِلُ أَنْ يَكُونَ فِيمَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُمْلِيهِ عَلَى ذَلِكَ الْكَاتِبِ مِنْ كُتُبِهِ إِلَى النَّاسِ فِي دُعَائِهِ إِيَّاهُمْ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَفِي وَصْفِهِمْ لَهُ مَا هُوَ جَلَّ وَعَزَّ عَلَيْهِ مِنَ الْأَشْيَاءِ الَّتِي كَانَ يَأْمُرُ ذَلِكَ الْكَاتِبَ بِهَا، وَيَكْتُبُ الْكَاتِبُ خِلَافَهَا مِمَّا مَعْنَاهَا مَعْنَاهَا، إِذْ كَانَتْ كُلُّهَا مِنْ صِفَاتِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.


বাংলা অনুবাদ:
এই হাদিসে এমন বিষয় রয়েছে, যা ওই বক্তব্যের বিপরীত এবং শব্দ পৃথক হলেও অর্থ সমান থাকলে বিষয়টিকে অর্থের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।
এ বিষয়ে আল্লাহর সাহায্যে আমাদের উত্তর হলো, এই হাদিসে যা রয়েছে, তা আগের অধ্যায়ে আলোচিত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ আগের অধ্যায়ে আমরা যা আলোচনা করেছি, তা কোরআন সম্পর্কে; অন্য বিষয়ে নয়। আর এখানে উল্লেখিত হাদিসে এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল ওই লেখককে যা লিখতে বলতেন, সেগুলো মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার জন্য পাঠানো তাঁর চিঠিপত্রের অংশ ছিল। সেখানে আল্লাহর গুণাবলি বর্ণনার সময় একটি বক্তব্যের পরিবর্তে লেখক একই অর্থের অন্য বক্তব্য লিখতেন, কারণ সবগুলোই আল্লাহর গুণবাচক পরিচয়।

তাহাবীর ব্যাখ্যার কেন্দ্রীয় শব্দ হলো ‘কাদ ইয়াহতামিল’—অর্থাৎ, ‘এমন সম্ভাবনা রয়েছে’। এই সম্ভাবনা দিয়ে তিনি নির্দিষ্ট শব্দ পরিবর্তনের ঘটনাটিকে কোরআনের বাইরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হাদিসে যে ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তিনি সূরা বাকারা ও আলে ইমরান পাঠ করতেন, মুহাম্মদের জন্য লিখতেন এবং পরে নিজের ইচ্ছামতো লেখার অভিজ্ঞতার দাবি করেছেন। তাহাবীর সম্ভাবনামূলক ব্যাখ্যায় সেই নির্দিষ্ট লেখাগুলো চিঠিপত্র ছিল বলে কোনো নতুন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগের বিপরীতে তিনি নির্দিষ্ট কোনো চিঠির পাঠ, প্রাপক, সময় অথবা সংরক্ষিত নথি উপস্থিত করেননি। ফলে তাঁর ব্যাখ্যা ঘটনাটি কোরআনের বাইরে ঘটার একটি সম্ভাবনা উত্থাপন করে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে পরিণত করে না।

তাহাবীর পরের অধ্যায়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তিনি এই লেখকের পরিচয় নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং বুখারিতে সংরক্ষিত খ্রিষ্টান লেখকের ঘটনাটি উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর ৩২২৬ নম্বর বর্ণনায় একইভাবে খ্রিষ্টধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ, সূরা বাকারা ও আলে ইমরান পাঠ, মুহাম্মদের জন্য লেখা, আবার খ্রিষ্টধর্মে প্রত্যাবর্তন এবং মৃতদেহ কবরের বাইরে পাওয়া যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। এই বর্ণনার ভিত্তিতে তাহাবী লেখককে কুরাইশ বা আনসারদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেননি। অন্যদিকে মুসলিমের ২৭৮১ নম্বর বর্ণনায় তাঁকে বনু নাজ্জারের লোক বলা হয়েছে। পরিচয় সম্পর্কে এই পার্থক্যও সংরক্ষিত সূত্রগুলোর মধ্যেই রয়েছে। [27]

তাহাবীর দ্বিতীয় আলোচনায়ও তিনি লেখকের বক্তব্যকে কোরআনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিবর্তে কোরআনের বাইরের লিখিত উপকরণ হওয়ার সম্ভাবনা উত্থাপন করেছেন। কিন্তু একই ব্যক্তির লেখক-পরিচয়, নিজের ইচ্ছামতো লেখার অভিযোগ এবং ধর্মত্যাগের ঘটনাকে এই ব্যাখ্যা অস্বীকার করেনি। তাহাবীর আলোচনার অস্তিত্ব নিজেই প্রমাণ করে, প্রাচীন ইসলামি হাদিসচর্চায় এই শব্দবদলের বর্ণনাটি এমন একটি প্রশ্ন তৈরি করেছিল, যার নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ব্যাখ্যামূলক অধ্যায়ের প্রয়োজন হয়েছিল।


বায়হাকীর দালাইলুন নুবুওয়াহ ও ইবনে হাজারের ফাতহুল বারি

বায়হাকী তাঁর ‘দালাইলুন নুবুওয়াহ’ গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডে এই লেখকের কাহিনি সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে ইসমাঈলী ও আবু ইয়ালার সূত্রে আবদুল ওয়ারিস এবং আবদুল আজিজের মাধ্যমে আনাসের সংবাদ রয়েছে। লেখকের অভিযোগের ভাষা সেখানে বুখারির পাঠ থেকে কিছুটা আলাদা: তিনি বলতেন, মুহাম্মদ তাঁর লিখে দেওয়া ছাড়া ভালোভাবে কিছু বলতে পারেন না। বায়হাকী হুমাইদ আত-তাওয়িলের মাধ্যমে আনাসের আরেকটি বর্ণনার কথাও উল্লেখ করেছেন, যাতে মৃতদেহসংক্রান্ত ঘটনার সঙ্গে আবু তালহার অনুসন্ধানের অতিরিক্ত বিবরণ রয়েছে। [28]

وَرَوَاهُ حُمَيْدٌ الطَّوِيلُ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ بِمَعْنَاهُ يَزِيدُ وَيَنْقُصُ، وَمِمَّا زَادَ: فَقَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَقْبَلُهُ الْأَرْضُ، فَذُكِرَ أَنَّ أَبَا طَلْحَةَ أَتَى الْأَرْضَ الَّتِي مَاتَ فِيهَا، فَوَجَدَهُ مَنْبُوذًا فَقَالَ: مَا بَالُ هَذَا؟ قَالُوا: دَفَنَّاهُ مِرَارًا، فَلَمْ تَقْبَلْهُ الْأَرْضُ.

বাংলা অনুবাদ:
হুমাইদ আত-তাওয়িল আনাস ইবনে মালিক থেকে একই অর্থে কিছু সংযোজন ও বিয়োজনসহ বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণনার অতিরিক্ত অংশের মধ্যে রয়েছে: আল্লাহর নবী বলেছিলেন, “মাটি তাঁকে গ্রহণ করবে না।” আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আবু তালহা সেই ব্যক্তির মৃত্যুর স্থানে গিয়ে তাঁকে বাইরে পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তাঁর কী হয়েছে?” লোকেরা বলে, “আমরা তাঁকে কয়েকবার দাফন করেছি, কিন্তু মাটি তাঁকে গ্রহণ করেনি।”

এই অতিরিক্ত বর্ণনায় আবু তালহার দেখা এবং স্থানীয় লোকদের বক্তব্য দুটি পৃথক সাক্ষ্যস্তর। আবু তালহা ব্যক্তিকে বাইরে পড়ে থাকতে দেখেছেন বলে বর্ণিত হয়েছে; মৃতদেহটি বারবার দাফনের পর কীভাবে বাইরে এসেছে, সেই বিবরণ তিনি স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে শুনেছেন। ফলে বাইরের অবস্থায় মৃতদেহ দেখা এবং মাটি অলৌকিকভাবে মৃতদেহ প্রত্যাখ্যান করেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া এক ঘটনা নয়। তা ছাড়া, বায়হাকীর উদ্ধৃত এই সংবাদের সঙ্গেও সেই ব্যক্তির ওহি লেখার সময়কার অভিযোগের স্বাধীন পরীক্ষা যুক্ত হয়নি।

ইবনে হাজার আল-আসকালানী তাঁর ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে বুখারি ৩৬১৭-এর ব্যাখ্যায় এই ব্যক্তির পরিচয় ও বর্ণনার বিভিন্ন পাঠ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, ব্যক্তির নাম তাঁর জানা নেই। এরপর মুসলিমের বনু নাজ্জার-সংক্রান্ত পরিচয়, ইসমাঈলীর বর্ণনায় অভিযোগের ভিন্ন ভাষা এবং ইবনে হিব্বানের আবু হুরায়রা-সূত্রে অনুরূপ সংবাদ সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে হাজারের আলোচনায় স্পষ্ট হয়, ঘটনাটির পাঠভেদ শুধু বুখারি ও মুসলিমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; অন্য হাদিসসংকলনেও ভিন্ন ভাষায় অভিযোগটি প্রচলিত ছিল। [29]

الْحَدِيثُ التَّاسِعُ وَالثَّلَاثُونَ حَدِيثُ أَنَسٍ فِي الَّذِي أَسْلَمَ ثُمَّ ارْتَدَّ فَدُفِنَ فَلَفَظَتْهُ الْأَرْضُ.
قَوْلُهُ: (كَانَ رَجُلٌ نَصْرَانِيًّا) لَمْ أَقِفْ عَلَى اسْمِهِ، لَكِنْ فِي رِوَايَةِ مُسْلِمٍ مِنْ طَرِيقِ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ “كَانَ مِنَّا رَجُلٌ مِنْ بَنِي النَّجَّارِ”.
قَوْلُهُ: (فَعَادَ نَصْرَانِيًّا) فِي رِوَايَةِ ثَابِتٍ: “فَانْطَلَقَ هَارِبًا حَتَّى لَحِقَ بِأَهْلِ الْكِتَابِ فَرَفَعُوهُ”.
قَوْلُهُ: (مَا يَدْرِي مُحَمَّدٌ إِلَّا مَا كَتَبْتُ لَهُ) فِي رِوَايَةِ الْإِسْمَاعِيلِيِّ “وَكَانَ يَقُولُ مَا أَرَى يُحْسِنُ مُحَمَّدٌ إِلَّا مَا كُنْتُ أَكْتُبُ لَهُ” وَرَوَى ابْنُ حِبَّانَ مِنْ طَرِيقِ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرٍو عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ نَحْوَهُ.


বাংলা অনুবাদ:
ঊনচল্লিশতম হাদিস হলো আনাসের বর্ণিত সেই ব্যক্তির ঘটনা, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর ধর্মত্যাগ করেন এবং মৃত্যুর পরে দাফন করা হলে মাটি তাঁকে বাইরে নিক্ষেপ করে।
‘একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তি ছিলেন’—এই বক্তব্য সম্পর্কে বলছি, আমি তাঁর নাম পাইনি। তবে মুসলিমের বর্ণনায় সাবিতের মাধ্যমে আনাস থেকে এসেছে, ‘আমাদের মধ্যে বনু নাজ্জারের একজন ব্যক্তি ছিলেন।’
‘তিনি আবার খ্রিষ্টান হয়ে গেলেন’—এই বক্তব্যের পরিবর্তে সাবিতের বর্ণনায় এসেছে, ‘তিনি পালিয়ে আহলে কিতাবের সঙ্গে যোগ দেন এবং তারা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দেয়।’
‘মুহাম্মদ আমার লিখে দেওয়া ছাড়া কিছু জানেন না’—এই বক্তব্যের পরিবর্তে ইসমাঈলীর বর্ণনায় এসেছে, ‘আমি মনে করি না, মুহাম্মদ আমার লিখে দেওয়া ছাড়া ভালোভাবে কিছু বলতে পারেন।’ ইবনে হিব্বানও মুহাম্মদ ইবনে আমর, আবু সালামা ও আবু হুরায়রার মাধ্যমে অনুরূপ বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন।

ইবনে হাজারের এই বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব হলো, তিনি লেখকের নাম অজ্ঞাত থাকার কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন। তাঁর আলোচনায় আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের সঙ্গে এই ব্যক্তির পরিচয় অভিন্ন বলে কোনো সিদ্ধান্ত নেই। আবার ইসমাঈলী ও ইবনে হিব্বানের অতিরিক্ত সূত্রগুলোর উল্লেখ দেখায়, খ্রিষ্টান লেখকের কাহিনি আনাসের একটি মাত্র মুদ্রিত হাদিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে অবশ্য একই সংবাদ ভিন্ন গ্রন্থে উদ্ধৃত হওয়া এবং সত্যিকারের পৃথক বর্ণনাপথ পাওয়া—এই দুটি বিষয় পৃথক। ইবনে হিব্বানের ক্ষেত্রে আবু হুরায়রা-সূত্রের উল্লেখ দ্বিতীয় সাহাবি-সংবহনের দাবি বহন করে; আর বুখারি, মুসলিম ও আহমদের আলোচিত প্রধান বর্ণনাগুলো আনাসের বিভিন্ন সংবহনপথ।


দুই ওহি লেখকের অভিযোগের ঐতিহাসিক সম্পর্ক

আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের ঘটনা এবং খ্রিষ্টান লেখকের ঘটনা পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, উভয় ব্যক্তিই মুহাম্মদের জন্য লিখতেন বলে ইসলামি সূত্রে সংরক্ষিত। দ্বিতীয়ত, দুজনের ধর্মত্যাগের সঙ্গে লেখার কাজে তাঁদের নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট গুণবাচক শব্দ পরিবর্তনের বিবরণ উভয় ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনাপরম্পরায় পাওয়া যায়। তাবারীর আবদুল্লাহ-সংক্রান্ত বর্ণনায় ‘আজিজুন হাকিম’ ও ‘গাফুরুন রহিম’ পরিবর্তন করে পড়ে শোনানোর পর অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আহমদের অজ্ঞাত লেখক-সংক্রান্ত বর্ণনায় ‘গাফুরান রহিমান’, ‘আলিমান হাকিমান’ এবং ‘সামিআন বাসিরান’ পরিবর্তনের উদাহরণ রয়েছে। এই শব্দজোড়ার সাদৃশ্য প্রশ্ন তোলে, ওহি লেখার সময় বিকল্প গুণবাচক শব্দ গ্রহণের অভিযোগটি কীভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির ঘটনার সঙ্গে সংরক্ষিত হয়েছে।

তবে দুই ব্যক্তির জীবনের পরিণতি এক নয়। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে মক্কা বিজয়ের সময় হত্যার নির্দেশ, উসমানের মধ্যস্থতা, পুনরায় ইসলাম গ্রহণ এবং পরবর্তী শাসনক্ষমতার ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টান লেখকের ক্ষেত্রে ইসলাম ত্যাগের পর অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবাস, মৃত্যু এবং অলৌকিক কবর-সংক্রান্ত কাহিনি রয়েছে। এই পৃথক পরিণতির কারণে দুটি জীবনীকে এক ব্যক্তির জীবনী হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। বরং বিভিন্ন সূত্রে দুই পৃথক লেখককে ঘিরে সম্পর্কিত অভিযোগের প্রচলন পাওয়া যায়। একই ধরনের শব্দ পরিবর্তনের বিবরণ কেন একাধিক লেখকের নামে এসেছে, সেটি নিজেও বর্ণনাগুলোর উৎস, সংবহন ও পরবর্তী বিকাশ সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, লেখকের বক্তব্য খণ্ডনের পরিবর্তে ইসলামি বর্ণনাগুলোতে তাঁর ধর্মত্যাগের পরিণতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে সংরক্ষিত প্রতিক্রিয়ায় হত্যার নির্দেশ রয়েছে। খ্রিষ্টান লেখকের ঘটনায় রয়েছে মৃত্যুর পর মাটি মৃতদেহ গ্রহণ না করার বর্ণনা। দুটি পরিণতি পৃথক হলেও একটির মধ্যেও অভিযোগকারী জীবিত অবস্থায় ঠিক কোন লেখা পরিবর্তন করেছিলেন এবং সেই পরিবর্তন কীভাবে শনাক্ত ও সংশোধন করা হয়েছিল, তার পূর্ণ যাচাইযোগ্য নথি পাওয়া যায় না। লেখককে ধর্মত্যাগী বলে চিহ্নিত করা, তাঁর মৃত্যুকে অলৌকিক শাস্তি হিসেবে উপস্থাপন করা অথবা পরবর্তী জীবনের ধর্মীয় পরিণতি বর্ণনা করা—কোনোটিই তাঁর ওহি লেখার সময়কার নির্দিষ্ট অভিযোগের স্বতন্ত্র খণ্ডন নয়।

বুখারি, মুসলিম ও আহমদের বর্ণনাগুলোর প্রধান উৎস আনাস ইবনে মালিক। এর ফলে একাধিক গ্রন্থে উপস্থিত থাকা সংবাদটিকে অসংখ্য স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য বলা যাবে না। কিন্তু আহমদের বর্ণনায় অতিরিক্ত শব্দবদলের বিবরণ এবং তাহাবীর সেই বিবরণকে কেন্দ্র করে পৃথক আলোচনার অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো প্রমাণ করে, লেখকের অভিযোগের মধ্যে কেবল অস্পষ্টভাবে ‘মুহাম্মদ আমার লেখা জানতেন’ কথাই ছিল না; প্রাচীন হাদিসসাহিত্যের একটি বর্ণনাধারায় নির্দিষ্ট শব্দের বিকল্প নির্বাচন এবং মুহাম্মদের অনুমোদনের অভিযোগও সংরক্ষিত হয়েছিল।

নির্দিষ্ট শব্দে অবতীর্ণ অপরিবর্তনীয় ঐশী বাণীর দাবি এবং লেখকের নির্বাচিত শব্দকে ‘যেভাবে ইচ্ছা লেখো’ বলে অনুমোদনের অভিযোগের মধ্যে মৌলিক সংঘাত রয়েছে। একটি বাক্যের শব্দ আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন বলে দাবি করা হলে সেই নির্দিষ্ট শব্দের পরিবর্তে অন্য শব্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা লেখকের থাকার কথা নয়। অর্থের মিল বা ধর্মীয়ভাবে উভয় শব্দের গ্রহণযোগ্যতা নির্দিষ্ট ঐশী বাক্যের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠা করে না। ফলে আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ এবং অজ্ঞাত খ্রিষ্টান লেখকের ঘটনাগুলো একই মৌলিক প্রশ্নে এসে মিলিত হয়: মুহাম্মদের নামে প্রচারিত নির্দিষ্ট বাক্যের কোন অংশ বক্তার, কোন অংশ লেখকের এবং কোন অংশের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য ঐশী উৎসের প্রমাণ রয়েছে?

এই অভিযোগগুলোর ঐতিহাসিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামবিরোধী কোনো পরবর্তী রচনা বা আধুনিক প্রচারণার প্রয়োজন নেই। বুখারি ৩৬১৭, মুসলিম ২৭৮১, আহমদ ১২২১৫–১২২১৬, তাহাবী ৩২১১–৩২১২ এবং ৩২২৬, বায়হাকীর দালাইলুন নুবুওয়াহ এবং ইবনে হাজারের ফাতহুল বারি—সবই ইসলামি সাহিত্যেই সংরক্ষিত গ্রন্থ ও বর্ণনা। ধর্মত্যাগী লেখকদের অভিযোগ সত্য ছিল কি না, সেটি পৃথক ঐতিহাসিক প্রশ্ন; কিন্তু অভিযোগগুলো ইসলামি গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে এবং বিশেষত শব্দবদলের অভিযোগ প্রাচীন হাদিসসাহিত্যের মধ্যেই উপস্থিত—এই তথ্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শুধু অভিযোগকারীকে মিথ্যাবাদী বলা কিংবা তাঁর পরিণতিকে অলৌকিক শাস্তি হিসেবে উপস্থাপন করা দিয়ে বাণীর উৎস ও শব্দনির্ধারণের প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয় না।


মক্কা বিজয়: ব্যক্তিগত প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা

অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদ মক্কাবাসীদের সাধারণ নিরাপত্তা ও ক্ষমা প্রদান করেছিলেন বলে ইসলামি ঐতিহ্যে বারবার উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই ‘সাধারণ ক্ষমা’র নীতি সর্বজনীন ছিল না। ইবনে কাসীরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’য় স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে, নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির জন্য হত্যার নির্দেশ বহাল রাখা হয়েছিল এবং আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ তাঁদের অন্যতম ছিলেন। নির্দেশটির কঠোরতাও লক্ষণীয়: তাঁদের কাবার গিলাফের নিচে পাওয়া গেলেও হত্যা করতে হবে। অর্থাৎ, সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণা এবং পবিত্র স্থানে আশ্রয় নেওয়া—কোনোটিই এই ব্যক্তিদের প্রাণ রক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছিল না। একজন সাবেক ওহি লেখকের ক্ষেত্রে এমন নির্দেশের কারণ অনুসন্ধান করতে হলে তাঁর ধর্মত্যাগের পাশাপাশি মুহাম্মদের নবুয়ত ও ওহি সম্পর্কে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর দিকেও তাকাতে হয়। তিনি কেবল বিশ্বাস বদলাননি; ওহি লেখার অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে মুহাম্মদের দাবির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। [30]

এখানে হিন্দ বিনতে উতবার সঙ্গে তুলনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ইবনে ইসহাকের যুদ্ধবিবরণে উহুদের পর হামজার মৃতদেহ বিকৃত করা এবং হিন্দের তাঁর কলিজা চিবানোর কথা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে হিন্দের ইসলাম গ্রহণ ও মুহাম্মদের কাছে বাইআত করার বিবরণও ইসলামি সূত্রে সংরক্ষিত আছে। একই ঐতিহ্যে এমন প্রবল শত্রুতার অতীত অতিক্রম করে হিন্দের গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার সুযোগ পাওয়া যায়, অথচ আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে দেখা যায় পবিত্র স্থানে আশ্রয় নিলেও হত্যার নির্দেশ। এই তুলনা থেকে প্রশ্ন ওঠে: ক্ষমার সীমা নির্ধারণে কোন অপরাধকে সবচেয়ে বিপজ্জনক মনে করা হচ্ছিল? মানুষের ওপর সংঘটিত সহিংসতা, নাকি নবুয়তের মূল দাবির বিরুদ্ধে একজন অভিজ্ঞ লেখকের বক্তব্য? আবদুল্লাহর অভিযোগ মিথ্যা হয়ে থাকলেও সেটিকে যাচাই করে খণ্ডন করার পথ ছিল। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সংরক্ষিত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আমরা প্রথমেই দেখি প্রাণনাশের নির্দেশ। [31]

নির্দেশটি যদি আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বিধান হিসেবে কার্যকর করা হয়ে থাকে, তাহলে পরে ব্যক্তিগত সুপারিশে সেই নির্দেশ প্রত্যাহারের ভিত্তি কী? আর যদি মুহাম্মদ নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের কারণে ব্যক্তিগতভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে সেই সিদ্ধান্তকে সর্বজনীন ন্যায়বিচারের নমুনা হিসেবে দেখানোর কারণ কী? ইবনে আবি সারহের ঘটনায় এই প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ একই বিবরণে হত্যার নির্দেশ, প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়, দীর্ঘ নীরবতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণ রক্ষার অনুমতি—সবই রয়েছে। একজন মানুষের জীবন কোন অপরাধের প্রমাণে বিপন্ন হলো এবং কোন নিয়মে রক্ষা পেল, তা বোঝার জন্য ব্যক্তিগত সুপারিশের বাইরে একটি স্পষ্ট বিচারিক মানদণ্ড প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় সেই মানদণ্ডের বদলে সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত এবং উসমানের মধ্যস্থতা।

তাবারাণী আলী ইব্‌ন সাঈদ রাযী ইব্‌ন আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: আল্লাহ্ যে দিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন সে দিন থেকে এ শহরকে ‘হারম’ করেছেন। এবং যে দিন তিনি সূর্য ও চন্দ্র স্থাপন করেন সে দিনই এ শহর স্থাপন করেন। এ শহরের সমান্তরালে অবস্থিত আকাশকেও তিনি হারম করেছেন। আমার পূর্বে কখনও এ শহর কারও জন্যে হালাল করা হয়নি। কেবল আমার ক্ষেত্রে দিবসের স্বল্পক্ষণের জন্যে হালাল করা হয়েছে। এবং স্বল্পক্ষণ পরেই পূর্বের ন্যায় আবার এর হুরমত বহাল করা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জানান হল যে, এই তো খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন? রাসূলুল্লাহ (সা) তখন একজনকে ডেকে বললেন: তুমি যাও খালিদকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বল। লোকটি এসে খালিদকে বললো: নবী করীম (সা) বলেছেন, যাকেই নাগালের মধ্যে পাও তাকেই হত্যা করতে থাক। খালিদ সেদিন সত্তর জন ব্যক্তিকে হত্যা করেন। লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে এ সংবাদ তাঁকে জানায়। তখন তিনি খালিদকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করেন, আমি কি তোমাকে নর হত্যা করতে নিষেধ করিনি? খালিদ জবাব দিলেন, অমুক ব্যক্তি আমাকে গিয়ে বলেছে-যাকেই আমি নাগালে পাই তাকেই যেন হত্যা করি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সে লোকটিকে ডেকে এনে বললেন: আমি কি তোমাকে যুদ্ধ বন্ধ করার হুকুম দিইনি? লোকটি বললো: আপনি এক প্রকার চেয়েছেন, আর আল্লাহ্ চেয়েছেন অন্য প্রকার। আপনার ইচ্ছার উপর আল্লাহর ইচ্ছাই বলবত হয়েছে। তাই যা হওয়ার ছিল তার অন্যথা আমি করতে পারিনি। তার জবাব শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা)
নীরব থাকলেন এবং তাকে কিছুই বললেন না।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সেনাধ্যক্ষদের নিকট থেকে এই মর্মে অংগীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসা লোকদের ব্যতীত অন্য কারও সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না। তবে তিনি নাম উল্লেখ করে বিশেষ কিছু লোককে হত্যার আদেশ
দিয়েছিলেন। এমনকি যদি তাদেরকে কা’বার গিলাফের নীচেও পাওয়া যায় তবু। তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ্ ইবন সা’দ ইব্‌ন আবু সারাহ্ ছিল অন্যতম। সে বাহ্যত: ইসলাম গ্রহণ করে ও ওহী লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু পরে সে মুরতাদ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় প্রবেশ করে তাকে হত্যার ঘোষণা দিলে সে পালিয়ে উছমান (রা)-এর কাছে আশ্রয় নেয়। সে ছিল উছমানের দুধভাই। উছমান তাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিয়ে আসেন। তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ উছমানের সাথে তার ফিরে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) উপস্থিত সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমাদের মধ্যে এমন একজন সুবুদ্ধিসম্পন্ন লোকও কি ছিল না, যে আমার নীরব থাকা অবস্থায় তাকে হত্যা করে দিত। সাহাবীগণ বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদেরকে একটু ইংগিত দিলেন না কেন? তিনি বললেন, ইংগিত দিয়ে কাউকে হত্যা করান নবীর জন্যে শোভনীয় নয়। অন্য একটি বর্ণনায় আছে- তিনি তখন বলেছিলেন: কোন নবী চোখের খিয়ানত করতে পারেন না।

আবদুল্লাহ 3

ইবনে কাসীরের সংকলনে উদ্ধৃত ইবনে ইসহাকের বক্তব্যে দেখা যায়, মুহাম্মদ তাঁর সেনাধ্যক্ষদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করবে, শুধু তাদের সঙ্গেই যুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে কয়েকজনকে নাম ধরে সেই নিরাপত্তার বাইরে রাখা হয়েছিল। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মরক্ষা বা চলমান সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে কোথাও পাওয়া গেলে হত্যা করার নির্দেশ তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ও পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। ওহি লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে “আমিও একই রকম কথা বলতে পারি” দাবি করা নবুয়তের জন্য একটি গুরুতর বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ। সেই বক্তব্য বিশ্বাসীদের মনে সংশয় তৈরি করতে পারত, কারণ অভিযোগকারী নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন বাণী লিপিবদ্ধ করার কাজে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে। তাঁকে হত্যা করা হলে অভিযোগের মুখপাত্রকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো প্রমাণ তৈরি হয় না। অভিযোগকারীর মৃত্যু একটি বক্তব্যের খণ্ডন নয়।

এখানে আরও একটি প্রশ্ন ওঠে: আবদুল্লাহর অভিযোগ মিথ্যা হলে প্রকাশ্যে তাঁর বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখানো হলো কোথায়? তিনি কোন শব্দ বদলেছিলেন, মুহাম্মদ কী বলেছিলেন, সেই সময়ে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না এবং তাঁর লেখা অন্য লেখকদের পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল কি না—এসব অনুসন্ধান করা যেত। এখানে উদ্ধৃত হত্যার নির্দেশ ও মধ্যস্থতার বিবরণে এমন অনুসন্ধানের বদলে পাওয়া যায় তাঁকে হত্যা করা এবং পরে বিশেষ সুপারিশে নিরাপত্তা দেওয়ার ঘটনা। ফলে প্রাণ রক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে তাঁর অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা—কোনোটিই নিষ্পত্তি হয় না। প্রকাশ্য বিতর্কে তাঁর বক্তব্য আরও মানুষকে প্রভাবিত করতে পারত কি না, সেই সন্দেহও থেকে যায়। নিজের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলা একজন লেখকের প্রতি এই কঠোর প্রতিক্রিয়া একজন সর্বজনীন করুণার নবীর দাবির সঙ্গে কীভাবে মেলে, তা পাঠকের বিচার্য।

মক্কা বিজয়ের ‘সাধারণ ক্ষমা’কে তাই ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে মূল্যায়ন করা যায় না। একটি ক্ষমা ঘোষণার নৈতিক মূল্য নির্ভর করে তার আওতা, ব্যতিক্রম এবং ব্যতিক্রম নির্ধারণের কারণের ওপর। আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে সাধারণ নিরাপত্তার বাইরে রাখা, কাবার আশ্রয়েও হত্যার নির্দেশ এবং পরে উসমানের সুপারিশে প্রাণ রক্ষা—এই ধারাবাহিকতা দেখায়, তাঁর জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও শাসকের সম্মতি কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিই হত্যার অনুমতি ও ক্ষমার সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন—এই ব্যবস্থায় অভিযোগের নিরপেক্ষ পরীক্ষা কোথায়? আর সমান অপরাধে অভিযুক্ত দুজন মানুষের একজন প্রভাবশালী সুপারিশকারী পেলে বাঁচবেন এবং অন্যজন সেই সুযোগ না পেলে নিহত হবেন—এমন ব্যবস্থা ইনসাফের দাবি পূরণ করে কীভাবে?


উসমানের মধ্যস্থতা এবং ‘চোখের খিয়ানত’

আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ উসমান ইবন আফফানের দুধভাই ছিলেন। প্রাণের ভয়ে তিনি উসমানের কাছে আশ্রয় নেন এবং উসমান তাঁকে নিয়ে মুহাম্মদের সামনে হাজির হন। এই সম্পর্ক ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ: হত্যার নির্দেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের জন্য এমন একজন মধ্যস্থতাকারী পেয়েছিলেন, যিনি মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সুনান আবু দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী, উসমান আবদুল্লাহর বাইআত গ্রহণের অনুরোধ করেন। মুহাম্মদ তিনবার তাঁর দিকে তাকিয়ে প্রতিবার তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরে বাইআত গ্রহণ করেন। এরপর সাহাবিদের কাছে তিনি জানতে চান, তাঁর বাইআত গ্রহণ না করার সময় উপস্থিত কেউ আবদুল্লাহকে হত্যা করল না কেন। ফলে দীর্ঘ নীরবতা ও প্রত্যাখ্যানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান করার প্রয়োজন পড়ে না; বর্ণনাতেই মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য হিসেবে হত্যার প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছে। [32]

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ২১. ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার আগে, কোন বিধর্মী বন্দীকে হত্যা করা।
২৬৭৪. ’উসমান ইবন আবূ শায়বা (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন ও দুইজন মহিলা ব্যতীত অন্যান্য সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং তিনি তাদের নামও ঘোষণা করেন। আর ইবন আবূ সারাহ্ … এরপর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাবী সা’দ বলেনঃ ইবন রাবী সারাহ্ ’উছমান (রাঃ) এর নিকট আত্মগোপন করে থাকেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বায়াত গ্রহণের জন্য সকলকে আহ্বান জানান, তখন উছমান (রাঃ) তাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে দাঁড় করে দেন এবং বলেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি ’আবদুল্লাহকে বায়াত করান। তিনি তাঁর মাথা উঠান এবং তিনবার তার দিকে তাকান এবং প্রত্যক বারই বায়াত করাতে অস্বীকার করেন।
তৃতীয় বারের পর তিনি তাকে বায়াত করান, পরে তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে বলেনঃ তোমাদের মাঝে এমন কোন চালাক লোক কি ছিল না, যখন সে আমাকে দেখল যে, আমি তাকে বায়াত করাচ্ছি না, তখন কেন সে তাকে হত্যা করল না? তাঁরা (সাহাবীরা) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা তো আপনার অন্তরের কথা বুঝতে পারিনি। আপনি (এ ব্যাপারে) চোখ দিয়ে কেন আমাদেরকে ইশারা করলেন না? তিনি বললেনঃ কোন নবীর জন্য এ উচিত নয় যে, সে চোরা দৃষ্টিতে তাকাবে।
আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেনঃ
আবদুল্লাহ্ ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর দুধ ভাই এবং ওয়ালীদ ইবন ’উকবা ছিলেন ’উছমান (রাঃ) এর বৈমাত্রেয় ভাই। উছমান (রাঃ) তাঁর শাসনামলে মদ্যপানের অভিযোগে তাকে শাস্তি দেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)

ঘটনাটি সুনান আবু দাউদের ৪৩৫৯ নম্বর বর্ণনাতেও সম্পূর্ণ কথোপকথনসহ রয়েছে। সেখানে আত্মগোপন, উসমানের অনুরোধ, তিনবার বাইআত প্রত্যাখ্যান, পরে বাইআত গ্রহণ এবং উপস্থিতদের কাছে হত্যার প্রত্যাশা প্রকাশ—এই ধারাবাহিকতা পরিষ্কার। হত্যার প্রত্যাশাটি ছিল বাইআত গ্রহণের আগে, যখন মুহাম্মদ তাঁর হাত বাড়াচ্ছিলেন না। বাইআত গ্রহণের পর সাহাবিদের কাছে বলা কথায় তিনি সেই আগের সময়ের কথা উল্লেখ করেন। এই ঘটনাক্রমেই নৈতিক প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুতর: নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা চাইতে আসা একজন মানুষের সামনে তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে অন্য কেউ তাঁকে হত্যা করবে বলে অপেক্ষা করা হচ্ছিল। আবদুল্লাহ তখন উসমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন; তাঁর আবেদন বিবেচিত হওয়ার সময়ই তাঁর জীবন অন্যের উদ্যোগে শেষ হয়ে যেতে পারত। [33]

মূল আরবি:
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ الْمُفَضَّلِ، حَدَّثَنَا أَسْبَاطُ بْنُ نَصْرٍ، قَالَ زَعَمَ السُّدِّيُّ عَنْ مُصْعَبِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ سَعْدٍ، قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمُ فَتْحِ مَكَّةَ اخْتَبَأَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ عِنْدَ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ فَجَاءَ بِهِ حَتَّى أَوْقَفَهُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ بَايِعْ عَبْدَ اللَّهِ. فَرَفَعَ رَأْسَهُ فَنَظَرَ إِلَيْهِ ثَلَاثًا كُلُّ ذَلِكَ يَأْبَى فَبَايَعَهُ بَعْدَ ثَلَاثٍ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ «أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلَهُ». فَقَالُوا مَا نَدْرِي يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا فِي نَفْسِكَ أَلَا أَوْمَأْتَ إِلَيْنَا بِعَيْنِكَ قَالَ «إِنَّهُ لَا يَنْبَغِي لِنَبِيٍّ أَنْ تَكُونَ لَهُ خَائِنَةُ الْأَعْيُنِ».

বাংলা অনুবাদ:
উসমান ইবন আবি শায়বা আমাদের বলেছেন; আহমদ ইবন মুফাদ্দাল আমাদের বলেছেন; আসবাত ইবন নাসর আমাদের বলেছেন। তিনি বলেন, সুদ্দী মুসআব ইবন সাদের মাধ্যমে সাদ থেকে বর্ণনা করেছেন। সাদ বলেন: মক্কা বিজয়ের দিন আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ উসমান ইবন আফফানের কাছে আত্মগোপন করেন। উসমান তাঁকে নিয়ে এসে নবীর সামনে দাঁড় করান এবং বলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আবদুল্লাহর বাইআত গ্রহণ করুন।” তিনি মাথা তুলে তাঁর দিকে তিনবার তাকালেন এবং প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনবারের পর তাঁর বাইআত গ্রহণ করলেন। তারপর সাহাবিদের দিকে ফিরে বললেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি কি ছিল না, যে আমাকে তাঁর বাইআত গ্রহণ থেকে হাত বিরত রাখতে দেখে উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করত?” তাঁরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনার মনে কী আছে, আমরা জানতাম না। আপনি আমাদের চোখ দিয়ে ইশারা করলেন না কেন?” তিনি বললেন, “কোনো নবীর জন্য চোখের খিয়ানত থাকা শোভনীয় নয়।”

সাহাবিদের উত্তরটিও লক্ষণীয়: “আপনার মনে কী আছে, আমরা জানতাম না।” অর্থাৎ, তাঁদের সামনে থাকা ব্যক্তি সম্পর্কে মুহাম্মদের তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা তাঁরা বুঝতে পারেননি। তাঁরা এমন একটি ইশারার কথা বললেন, যা সেই প্রত্যাশা প্রকাশ করতে পারত। মুহাম্মদ চোখের ইশারাকে নবীর জন্য অশোভন বললেন, কিন্তু তাঁর আগের বক্তব্যে উপস্থিত কারও উদ্যোগে আবদুল্লাহকে হত্যা করার প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছিল। এখানেই নৈতিক দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট: একটি গোপন ইশারার পদ্ধতি অশোভন গণ্য হচ্ছে, অথচ নিজের নীরবতা ও বাইআত প্রত্যাখ্যান দেখে অন্য কেউ হত্যার সিদ্ধান্ত নেবে—এই প্রত্যাশা প্রকাশ করা হচ্ছে। নৈতিক বিচার যদি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে শুধু সংকেত দেওয়ার পদ্ধতি বিচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রত্যাশিত কাজটিকেও বিচার করতে হয়। চোখের ইশারা না করার দাবি হত্যার প্রত্যাশার নৈতিক প্রশ্নটির উত্তর দেয় না।


হত্যার মানত এবং তা পূরণের অপেক্ষা

ইবনে তাইমিয়্যাহ তাঁর ‘আস-সারিমুল মাসলুল’ গ্রন্থে ঘটনাটির এমন একটি বিবরণ ব্যবহার করেছেন, যেখানে একজন মুসলিম আবদুল্লাহকে হত্যার মানত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উসমান আবদুল্লাহকে কয়েক দিন লুকিয়ে রাখেন, মক্কাবাসীরা শান্ত হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে আসেন এবং আবদুল্লাহ তওবা করে বাইআত ও নিরাপত্তা চাইতে উপস্থিত হন। মুহাম্মদের দীর্ঘ নীরবতাকে ইবনে তাইমিয়্যাহ ব্যাখ্যা করেছেন এই প্রত্যাশা দিয়ে যে, মানতকারী অথবা অন্য কেউ উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করবে। ফলে এখানে হত্যার আকাঙ্ক্ষা শুধু অস্পষ্ট মানসিক অনুমান হিসেবে উপস্থিত নয়; একটি নির্দিষ্ট হত্যার মানত এবং সেটি পূরণের অপেক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ইবনে কাসীরের সংকলনেও একজন আনসারির মানত এবং তাঁকে উদ্দেশ করে “তোমার মানত পূরণের জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম” বক্তব্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। [34]

মূল আরবি:
الطريقة الحادية عشرة: أن عبد الله بن سعد بن أبي سرح كان قد ارتد وافترى على النبي صلى الله عليه وسلم أنه يلقنه الوحي ويكتب له ما يريد فأهدر النبي صلى الله عليه وسلم دمه ونذر رجل من المسلمين ليقتلنه ثم حبسه عثمان أياما حتى اطمأن أهل مكة ثم جاء تائبا ليبايع النبي عليه الصلاة والسلام ويؤمنه فصمت رسول الله صلى الله عليه وسلم طويلا رجاء أن يقوم إليه الناذر أو غيره فيقتله ويوفي بنذره.
ففي هذا دلالة على أن المفتري على النبي صلى الله عليه وسلم الطاعن عليه قد كان له أن يقتله وأن دمه مباح وإن جاء تائبا من كفره وفريته لأن قتله لو كان حراما لم يقل النبي صلى الله عليه وسلم ما قال ولا قال للرجل: هلا وفيت بنذرك بقتله.


বাংলা অনুবাদ:
একাদশ যুক্তি: আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ ধর্মত্যাগ করেছিলেন এবং নবীর বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন যে, তিনি নবীকে ওহি শিখিয়ে দেন এবং নিজের ইচ্ছামতো তাঁর জন্য লিখে দেন। ফলে নবী তাঁর রক্তপাতের অনুমতি দেন। একজন মুসলিম তাঁকে হত্যার মানত করেন। এরপর উসমান তাঁকে কয়েক দিন লুকিয়ে রাখেন, যতক্ষণ না মক্কাবাসীরা শান্ত হন। তারপর তিনি তওবা করে নবীর বাইআত গ্রহণ এবং তাঁর কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসেন। আল্লাহর রাসুল দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকেন এই আশায় যে, মানতকারী অথবা অন্য কেউ উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করবে এবং মানত পূরণ করবে।
এতে প্রমাণ রয়েছে যে, নবীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগকারী ও তাঁর সমালোচনাকারীকে হত্যা করার অধিকার তাঁর ছিল এবং সেই ব্যক্তির রক্তপাত বৈধ ছিল, যদিও তিনি নিজের অবিশ্বাস ও মিথ্যা অভিযোগ থেকে তওবা করে আসেন। কারণ তাঁকে হত্যা করা নিষিদ্ধ হলে নবী ওই কথা বলতেন না এবং সেই ব্যক্তিকে বলতেন না, “তুমি তাঁকে হত্যা করে তোমার মানত পূরণ করলে না কেন?”

ইবনে তাইমিয়্যাহ আবদুল্লাহর অভিযোগকে মিথ্যা বলে চিহ্নিত করেছেন এবং তাঁর আলোচনার উদ্দেশ্য হলো নবীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর হত্যার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এই আইনি ব্যাখ্যায় যে ঘটনাক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, তা আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে: আবদুল্লাহ তওবা করে ফিরে আসার পরও তাঁর মৃত্যু প্রত্যাশিত ছিল। অর্থাৎ, বিশ্বাসে ফিরে আসার ঘোষণা তাঁকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়নি। তাঁকে বাঁচতে হয়েছে ব্যক্তিগত মধ্যস্থতা ও ক্ষমার মাধ্যমে। পরবর্তী বর্ণনায় তাঁকে ‘খাঁটি ঈমানদার’ বলা হলে প্রশ্ন ওঠে, সেই সম্ভাবনাটি তখন হত্যার অপেক্ষার মধ্যে কীভাবে বিবেচিত হচ্ছিল? একজন মানুষের পরিবর্তিত অবস্থান মূল্যায়নের আগে তাঁকে হত্যা করে ফেললে তাঁর তওবা বা ভবিষ্যৎ জীবন যাচাই করার সুযোগই শেষ হয়ে যায়। ইবনে তাইমিয়্যাহ এই ঘটনাকে যে আইনি নীতির প্রমাণ করেছেন, সেখানে অভিযুক্তের প্রাণ রক্ষার জন্য তওবার পাশাপাশি অন্য একটি ক্ষমতার সম্মতি প্রয়োজন হচ্ছে।

হত্যার মানতের বিষয়টিও নিজস্ব নৈতিক সমস্যা তৈরি করে। একজন ব্যক্তি আরেকজনকে হত্যা করার অঙ্গীকার করেছেন—এটি নিজে থেকে হত্যাকে ন্যায়সংগত করে না। মানতের আগে যেমন অপরাধ, প্রমাণ, শাস্তির প্রয়োজনীয়তা ও অভিযুক্তের অধিকার পরীক্ষা করা দরকার, মানতের পরও সেই দায়িত্ব থাকে। অথচ এখানে মানত পূরণ না হওয়ার কথা এমনভাবে উপস্থিত হয়েছে, যেন হত্যার উদ্যোগ না নেওয়াটিই ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয় বিষয়। নিরাপত্তা চাইতে আসা একজন মানুষকে হত্যা করার অঙ্গীকার এবং ধর্মীয় আনুগত্য একই ঘটনার মধ্যে যুক্ত হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য যদি কারও প্রাণনাশের প্রস্তুতিকে উৎসাহিত করে, তাহলে সেই আনুগত্যকে নৈতিকতার মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করার যুক্তি কী? কোনো কাজ ধর্মীয় মানতের বিষয় হয়েছে বলেই সেটি ন্যায়বিচারে পরিণত হয় না।

উসমানের মধ্যস্থতার ফলাফলও তাই গুরুত্বপূর্ণ। আবদুল্লাহ শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান, কিন্তু তাঁর প্রাণ রক্ষার ঘটনাটি সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো নিয়ম দেখায় না। তাঁর পাশে ছিলেন উসমান; সেই সম্পর্কের কারণে তিনি আত্মগোপনের জায়গা এবং সরাসরি সুপারিশ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। একই অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য কেউ এমন আশ্রয় ও মধ্যস্থতা না পেলে তাঁর পরিণতি কী হতো? ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ক্ষমা করা এবং প্রত্যেক অভিযুক্তকে নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা, বক্তব্য রাখার সুযোগ ও বিচার দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই ঘটনায় ক্ষমা ঘোষণার প্রশংসা করার আগে সেই পার্থক্যটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ জীবনরক্ষার অধিকার যদি প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার ন্যায্যতা শুধু একজনের বেঁচে যাওয়ার ঘটনা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

‘চোখের খিয়ানত’ না করার বক্তব্যকে নৈতিক উচ্চতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরলেও হত্যার প্রত্যাশা, মানত পূরণের অপেক্ষা এবং তওবার পরও প্রাণের অনিশ্চয়তা একই বর্ণনার অংশ থেকে যায়। মুহাম্মদ চোখ দিয়ে ইশারা করেননি—এই বক্তব্যের পাশে রাখতে হয় তাঁর সেই প্রশ্নটিও: কেউ উঠে গিয়ে আবদুল্লাহকে হত্যা করল না কেন? একজন সংশয়বাদী পাঠকের কাছে নৈতিক মূল্যায়নের বিষয় পুরো ঘটনাটি। যে ব্যক্তি ওহির উৎস নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর বক্তব্যের প্রকাশ্য পরীক্ষা, তাঁর নিরাপত্তা এবং তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তির ভিত্তি—এসবের উত্তর ছাড়া কেবল একটি ইশারা প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে নবীর নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা যায় না। এই বর্ণনায় প্রকাশিত ক্ষমতা, ব্যক্তিগত মধ্যস্থতা ও হত্যার প্রত্যাশা নবুয়তের দাবির সঙ্গে যুক্ত ইনসাফ এবং সর্বজনীন করুণার দাবিকে কঠোর পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।


ইবনে তাইমিয়্যাহর ব্যাখ্যা

ইবনে তাইমিয়্যাহ আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের ঘটনাকে ব্যবহার করেছেন নবীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীকে হত্যার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর ব্যাখ্যায়, ওহি বিকৃতির অভিযোগ তোলা নবীকে অবমাননা করার অন্তর্ভুক্ত; ফলে অভিযোগকারী তওবা করে আবার ইসলাম গ্রহণ করলেও তাঁর প্রাণ রক্ষার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এই ব্যাখ্যা ঘটনাটির তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। একজন লেখক ওহি লিপিবদ্ধ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিযোগ করেছেন, তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশে তাঁর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে—এই ঘটনাক্রমকে ইবনে তাইমিয়্যাহ পরবর্তী অভিযুক্তদের জীবন-মৃত্যু নির্ধারণের নীতিতে পরিণত করেছেন। ফলে আলোচনাটি শুধু মুহাম্মদ ও আবদুল্লাহর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পৌঁছে যায় ধর্মীয় দাবির সমালোচনা করার অধিকার, অভিযুক্তের নিরাপত্তা এবং ক্ষমা দেওয়ার কর্তৃত্বের প্রশ্নে।

তাঁর বক্তব্যের মধ্যে দুটি বিষয় পাশাপাশি রয়েছে। প্রথমত, তিনি আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ওহি পরিবর্তনের অভিযোগ সংরক্ষণ করেছেন, কিন্তু সেই অভিযোগকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। দ্বিতীয়ত, সেই অভিযোগ প্রকাশের ঘটনাকেই নবীর বিরুদ্ধে কটূক্তি ও হত্যাযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এখানে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগকারীকে শাস্তি দেওয়ার ভিত্তি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কোনো বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণ করা এক কাজ; সেই বক্তব্য প্রকাশের কারণে বক্তার প্রাণ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া আরেক কাজ। ইবনে তাইমিয়্যাহর আলোচনায় দ্বিতীয় বিষয়টি স্পষ্ট আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থিত। তাঁর গ্রন্থের বাংলা অনুবাদে সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ বিবরণটি রয়েছে। [35]

নবম হাদীস
ঘটনাটা ইবনে আবি সারহের। এই ঘটনার ব্যাপারে আহলুল ইলমগণ একমত। বিষয়টা তাদের কাছে এতটাই প্রসিদ্ধ যে, এটি এক ব্যক্তির বর্ণনা হওয়ার সুযোগই নেই।
ঘটনাটা হলো-
মক্কা বিজয়ের দিন আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট লুকিয়ে থাকেন। কোনোমতে তাকে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত করেন তিনি এবং বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আব্দুল্লাহকে (ইসলামের ওপর) বাইয়াত করান।’ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা উঠিয়ে তার দিকে তাকান। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। আর প্রত্যেকবারই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনবারের পর তাকে বাইয়াত করে নেন। তারপর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের বললেন,
أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ فَيَقْتُلُهُ
‘কী ব্যাপার! তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনো চৌকস লোক নেই, যে আমাকে যখন দেখল আমি তার দিকে হাত বাড়াইনি, তখনই তার গর্দান উড়িয়ে দিত?’
সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো জানি না আপনার মনের চাওয়া কী ছিল। আপনি আমাদেরকে কেন চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করলেন না?’ তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমরা কী জানো না যে, কোনো নবীর জন্য চোখের খেয়ানত সমীচীন নয়?]
[৭১] আবু দাউদ, আস-সুনান: ২৬৮৫; নাসাঈ, আস-সুনান: ৪০৬৭; সনদ সহীহ।
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো তার রক্ত মূল্যহীন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুধভাই ছিল। তাই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে তার জন্য সুপারিশ করেছিলেন, ফলে তিনি তাকে মাফ করে দেন।
কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণের পর ফের মুরতাদ হয়ে মুশরিকদের দল ভারি করে। অথচ সে ইসলাম গ্রহণের পর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওহি-লেখকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর সে মুশরিকদের দলে ভিড়ে প্রচার করতে থাকে, ‘আমি যেভাবে চাইতাম সেভাবেই কুরআনকে পরিবর্তন করতাম, কেননা তিনি আমাকে কিছু (ওহি) লিখার আদেশ দিতেন। আমি তাকে বলতাম, ‘এমন অথবা এমন লিখলে হবে?’ তিনি বলতেন, ‘হাঁ, হবে।’ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতেন ‘আলেমুন হাকিম’ লেখো। সে বলত, ‘আযিযুন হাকিম’ লিখলে হবে কি? তিনি বলতেন, হ্যাঁ! দুটো তো একই। [২]
বলা হয় যে, এই আয়াতটি তার ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল-৩
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ ….
ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম কে হতে পারে, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে কিংবা বলে-আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, অথচ তার প্রতি কিছুই অবতীর্ণ হয়নি অথবা বলে আল্লাহ যেমন নাযিল করেছেন, ওমন আমিও অচিরেই ওহি নাযিল করব।
এই হাদীস থেকে জানা যায়, সে নবীর ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং মানুষের মাঝে বানোয়াট কথা ছড়াতে থাকে যে, তিনি তাকে ওহি লেখতে বলতেন, তার যা ইচ্ছা হত, তাই লিখত আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকেই বহাল রাখতেন। নিশ্চয় এ মিথ্যাচারও নবীর নামে একপ্রকারের কটূক্তি। ওহি বিকৃতকরণের দাবি সে ছাড়াও আরেকজন করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করেন। তার মৃত্যুর পর লোকেরা তাকে যেখানেই দাফন করে মাটি তাকে উগড়ে দেয়। আর এটাই হচ্ছে
[৭২] ইবনে হিশাম, আস-সিরাত: ২/৪০৯
[৭৩] তাবারি, জামিউল বায়ান: ৫/২৬৮; ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল: ২৪৫ পৃ.।
[৭৪] সূরা আনয়াম, ৬: ৯৩
[৭৫] বিস্তারিত-বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মানাকিব: ৩৬১৭।
সুস্পষ্ট দলিল যে, যে বা যারাই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করবে আল্লাহ তাআলা তার থেকে প্রতিশোধ নিবেন, তাকে শায়েস্তা করবেন। সুতরাং তাওবা করে ইসলাম গ্রহণের পরও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহের রক্ত বৈধ হওয়া, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে ‘কেন তোমরা তাকে হত্যা করোনি?’-এ কথা বলা, এরপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এসব প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইলে তাকে হত্যা করতে পারেন, চাইলে ক্ষমাও করতে পারেন।
আবার এটাও প্রমাণ হয় যে, যে ব্যক্তি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালমন্দ করবে তিনি তাকে হত্যা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন, যদিও সে তাওবা করে ইসলামের দিকে ফিরে আসে।
বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে, ইবনে আবি সারহ মক্কা-বিজয়ের আগেই ইসলামে ফিরে আসে। সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে, ‘আমি সত্যিই অনেক বড় অপরাধ করেছি। এখন আমি তাওবা করে আবার ফিরে এসেছি।’ তারপর লোকজন যখন একটু স্থিমিত ও প্রশান্ত হয় তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিয়ে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে মনে চাইছিলেন যেন মুসলমানরা তাকে হত্যা করে ফেলে। এ জন্য তিনি বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করেন, এরই মধ্যে কেউ তাকে স্বেচ্ছায় হত্যা করে কি না এ জন্যে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাবছিলেন, হয়তো কেউ তাকে শীঘ্র হত্যা করে ফেলবে। … এই যে এতকিছু ঘটল, এগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলাম গ্রহণের পরও তাকে হত্যা করা বৈধ ছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারহ এবং আরেকজন খ্রিষ্টান ওহি-লেখক নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যে মিথ্যা অভিযোগ করে বলে, তাদের ওহি-বিকৃতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতেন (কিন্তু কিছুই বলতেন না, বরং সমর্থন করতেন)-এটা ডাহা মিথ্যা কথা। কেননা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইটাই লেখাতেন যেটা আল্লাহ তাআলা নাযিল করতেন, ওইটাকেই ঠিক রাখতে বলতেন যেটাকে আল্লাহ তাআলা ঠিক রাখতে বলেছেন। নিজের ইচ্ছামাফিক কোনো রদবদল করতেন না। বরং আল্লাহ তাআলা যেভাবে চাইতেন সেভাবেই তিনি লিপিবদ্ধ করাতেন।

আবদুল্লাহ 5
আবদুল্লাহ 7
আবদুল্লাহ 9

ঘটনার ধারাবাহিকতা হলো: আবদুল্লাহ প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে ওহি লেখার দায়িত্বে যুক্ত হন, পরে ধর্মত্যাগ করে অভিযোগ প্রকাশ করেন এবং মক্কা বিজয়ের সময় উসমানের মধ্যস্থতায় আবার গ্রহণযোগ্যতা পান। উদ্ধৃতিতে ধর্মত্যাগ ও অভিযোগের যে বিবরণ এসেছে, সেটি ক্ষমা পাওয়ার আগের ঘটনা। ইবনে তাইমিয়্যাহ এই ইতিহাস থেকে যে সিদ্ধান্ত টেনেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে তওবার পরও হত্যার অনুমতি। তিনি আবদুল্লাহর অভিযোগকে মিথ্যা বলেছেন, কিন্তু অভিযোগ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় হত্যার বৈধতাকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং সেটিকেই নিজের আইনি যুক্তির অংশ করেছেন। ফলে তাঁর ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেও এই প্রশ্ন থেকে যায়: কোনো ধর্মীয় নেতার বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রকাশ কি বক্তার জীবন নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে?

ইবনে তাইমিয়্যাহর শেষ বক্তব্যে অভিযোগের অসত্যতার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ আল্লাহর অবতীর্ণ বাণীই লিখতে বলতেন এবং আল্লাহর নির্দেশেই পাঠ বহাল রাখতেন। কিন্তু মুহাম্মদের বাণী সত্যিই আল্লাহর কাছ থেকে আসছিল কি না—আবদুল্লাহর অভিযোগে সেই দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তরে দাবিটিকে আবার সত্য বলে ঘোষণা করলে স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায় না। “তিনি ওহি পরিবর্তন করতেন না, কারণ তিনি আল্লাহর কথাই লিখতে বলতেন”—এই যুক্তি কার্যকর হতে হলে আগে দেখাতে হবে, কোন বাণী আল্লাহর এবং সেটি চেনার যাচাইযোগ্য উপায় কী। যে দাবির সত্যতা পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেই দাবিকেই তার নিজের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা বৃত্তাকার যুক্তি। আবদুল্লাহর অভিজ্ঞতার অভিযোগের উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো পরীক্ষা করতে হবে; নবুয়তের সত্যতা আগে থেকেই ধরে নিলে সেই পরীক্ষা সম্পন্ন হয় না।


তওবায় পাপ মোচন, ব্যক্তিগত ক্ষমায় প্রাণ রক্ষা

ইবনে তাইমিয়্যাহর ব্যাখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তওবা এবং প্রাণ রক্ষার মধ্যে তাঁর তৈরি করা পার্থক্য। ‘আস-সারিমুল মাসলুল’-এর ৩৪০–৩৪১ পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহর রক্তপাত নিষিদ্ধ হয়েছিল মুহাম্মদের ক্ষমার কারণে; শুধু তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণে নয়। ইসলাম গ্রহণ ও তওবার মাধ্যমে পাপ মুছে গেছে, কিন্তু প্রাণ রক্ষা হয়েছে আলাদা একটি ক্ষমার মাধ্যমে। এই বিভাজন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি নিজের আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করে বিশ্বাসে ফিরে এলেও তাঁকে হত্যা করা বৈধ থাকতে পারে। ফলে তওবাকে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে স্বীকার করা এবং সেই পরিবর্তনকারী মানুষটিকে বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া দুটি পৃথক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। একই ব্যক্তির পাপ মোচন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, অথচ তাঁর প্রাণ নেওয়ার অনুমতিও বহাল রাখা হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় শাস্তির উদ্দেশ্য এবং তওবার বাস্তব মূল্য কী, সেই প্রশ্ন অনিবার্য। [36]

মূল আরবি:
وأيضا فإن عبد الله بن سعد بن أبي سرح لما طعن عليه وافترى افتراء عابه به بعد أن أسلم أهدر دمه وامتنع عن مبايعته وقد تقدم تقرير الدلالة منه على أن الساب يقتل وإن أسلم وذكرنا أنه كان قد جاءه مسلما تائبا قد أسلم قبل أن يجيء إليه كما رويناه عن غير واحد أو قد جاء يريد الإسلام وقد علم النبي صلى الله عليه وسلم أنه قد جاء يريد الإسلام ثم كف عنه انتظار أن يقوم إليه رجل فيقتله.
وهذا نص في أن مثل هذا المرتد الطاعن لا يجب قبول توبته بل يجوز قتله وإن جاء تائبا وإن تاب وقد قررنا هذا فيما مضى وهنا من وجوه أخرى أن الذي عصم دمه عفو رسول الله صلى الله عليه وسلم عنه لا مجرد إسلامه وأن بالإسلام والتوبة انمحى الإثم وبعفو رسول الله صلى الله عليه وسلم احتقن الدم والعفو بطل بموته صلى الله عليه وسلم وليس للأمة أن يعفوا عن حقه وامتناعه من بيعته حتى يقوم إليه بعض القوم فيقتله نص في جواز قتله وإن جاء تائبا.


বাংলা অনুবাদ:
এ ছাড়া আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ ইসলাম গ্রহণের পর নবীর সমালোচনা করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা অভিযোগ করেন, যার দ্বারা তাঁকে দোষারোপ করা হয়। তখন নবী তাঁর রক্তপাতের অনুমতি দেন এবং তাঁর বাইআত গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। এই ঘটনা থেকে ইসলাম গ্রহণের পরও অবমাননাকারীকে হত্যার যে প্রমাণ পাওয়া যায়, তা আগে আলোচনা করা হয়েছে। আমরা উল্লেখ করেছি, তিনি মুসলিম ও তওবাকারী হিসেবে এসেছিলেন; তাঁর কাছে আসার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যেমন আমরা একাধিক ব্যক্তির বর্ণনায় উল্লেখ করেছি। অথবা তিনি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন এবং নবী জানতেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যেই এসেছেন। এরপরও নবী অপেক্ষা করেছিলেন, যেন কেউ উঠে গিয়ে তাঁকে হত্যা করে।
এটি স্পষ্ট বক্তব্য যে, এ ধরনের ধর্মত্যাগী সমালোচনাকারীর তওবা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং তিনি তওবা করে এলেও এবং তওবা করলেও তাঁকে হত্যা করা বৈধ। আমরা আগে বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করেছি; এখানেও অন্য কয়েকটি দিক থেকে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিল আল্লাহর রাসুলের ক্ষমা, শুধু তাঁর ইসলাম গ্রহণ নয়। ইসলাম গ্রহণ ও তওবার মাধ্যমে পাপ মুছে গিয়েছিল এবং আল্লাহর রাসুলের ক্ষমার মাধ্যমে তাঁর রক্তপাত বন্ধ হয়েছিল। রাসুলের মৃত্যুর সঙ্গে সেই ক্ষমা দেওয়ার সুযোগ শেষ হয়েছে এবং তাঁর অধিকারের বিষয়ে ক্ষমা করার অধিকার উম্মতের নেই। উপস্থিত কারও হাতে তাঁকে হত্যা করা হবে বলে তাঁর বাইআত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, তওবা করে এলেও তাঁকে হত্যা করা বৈধ।

এখানে ‘মৃত্যুর সঙ্গে ক্ষমা দেওয়ার সুযোগ শেষ হয়েছে’ কথাটি আবদুল্লাহকে দেওয়া পূর্ববর্তী ক্ষমা বাতিল হয়ে যাওয়ার দাবি নয়। ইবনে তাইমিয়্যাহর সিদ্ধান্তটি পরবর্তী অভিযুক্তদের জন্য: মুহাম্মদ জীবিত থাকাকালে নিজের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে কাউকে ক্ষমা করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর উম্মত তাঁর অধিকারের বিষয়ে সেই ক্ষমা দিতে পারে না। এই ব্যাখ্যার ফল অত্যন্ত কঠোর। আবদুল্লাহ যে ব্যক্তিগত ক্ষমার মাধ্যমে বেঁচেছিলেন, পরবর্তী সময়ে একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত মানুষ সেই পথ পাবেন না। ইতিহাসের একটি ক্ষমার ঘটনাকে সাধারণ ক্ষমাশীলতার নজির হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তাই এই ব্যাখ্যাতেই সংকুচিত হয়ে যায়। একজন ব্যক্তি বেঁচেছিলেন বলে পরবর্তীদের বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না; তাঁর বেঁচে যাওয়াকে ব্যতিক্রম হিসেবে ব্যবহার করে পরবর্তীদের ক্ষমার সুযোগ বন্ধ করা হচ্ছে।

এর নৈতিক অসংগতি স্পষ্ট। অপরাধের ধরন একই হলেও অভিযুক্ত কোন সময়ে জন্মেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কথিত অপরাধের অধিকারী জীবিত আছেন কি না—এই পার্থক্যে প্রাণ রক্ষার সুযোগ বদলে যাচ্ছে। মুহাম্মদের জীবদ্দশায় কেউ ব্যক্তিগত সুপারিশ ও ক্ষমা পেতে পারেন, কিন্তু পরবর্তী ব্যক্তি একই তওবা করেও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ক্ষমা করার অধিকার মৃত ব্যক্তির নামে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রেখে জীবিত সমাজকে সেই অধিকার প্রয়োগে অক্ষম বলা হলে সংশোধন, অনুতাপ ও পুনর্বিবেচনার পথও সীমিত হয়। একজন মৃত ধর্মীয় নেতার সম্মান রক্ষার নামে জীবিত মানুষের জীবন নেওয়ার অনুমতি ন্যায়বিচারের দাবি পূরণ করে কীভাবে? বক্তব্যে কেউ আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ থাকলেও সেই অভিযোগের প্রতিকার হিসেবে হত্যা প্রয়োজন—এই সিদ্ধান্তের জন্য ধর্মীয় কর্তৃত্বের বাইরে যুক্তি প্রয়োজন।


সমসাময়িক ফতোয়ায় একই বর্ণনার ভিন্ন ব্যবহার

ইসলামকিউএর ১৬৮৭৭৩ নম্বর উত্তরে ওহি পরিবর্তনের দাবি আবদুল্লাহর পরিবর্তে নামহীন খ্রিষ্টান লেখকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং আবদুল্লাহ এমন দাবি করেননি বলা হয়েছে। অথচ ২১৭১৫৩ নম্বর উত্তরে তাঁর বিরুদ্ধেই সেই অভিযোগ প্রকাশের বর্ণনা উদ্ধৃত করে হত্যার আইনি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ২২৮৬৭৫ নম্বর উত্তরেও সংশ্লিষ্ট কাহিনির ব্যাপক প্রচলন স্বীকার করে সনদের আপত্তি তোলা হয়েছে। এখানে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাইয়ে যে বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করা হচ্ছে, হত্যার কারণ ব্যাখ্যায় সেটি কোন প্রমাণমূল্যে ব্যবহার করা হচ্ছে? [37]

ইবনে তাইমিয়্যাহর উদ্ধৃতিতে যে খ্রিষ্টান লেখকের কথা এসেছে, তিনি আবদুল্লাহর থেকে পৃথক ব্যক্তি। কিন্তু তাঁরা পৃথক ব্যক্তি হওয়ার তথ্য থেকে আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত অভিযোগের বর্ণনাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় না। একটি বর্ণনার সত্যতা প্রত্যাখ্যান করা এবং সেই বর্ণনা বা অভিযোগ কখনো ছিল না বলা আলাদা দাবি। তাবারী, ওয়াহিদী ও ইবনে তাইমিয়্যাহর আলোচনায় আবদুল্লাহর নামে অভিযোগটি সংরক্ষিত আছে। সুতরাং অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণ করতে হলে তার অসত্যতা দেখাতে হবে; অন্য একজন লেখকের একই ধরনের অভিযোগ ছিল বলে আবদুল্লাহর নামে সংরক্ষিত বক্তব্যকে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিভ্রান্তি হিসেবে সরিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়।

ইসলামকিউএর ২১৭১৫৩ নম্বর উত্তরে অপরাধের দুটি ভিত্তি আলাদা করা হয়েছে: ধর্মত্যাগ এবং নবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ। সেখানে তওবায় প্রথমটির শাস্তি রহিত হওয়া এবং ব্যক্তিগত ক্ষমায় দ্বিতীয়টির শাস্তি রহিত হওয়ার ব্যাখ্যা রয়েছে। এই ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহর ফিরে আসা হত্যার বৈধতাকে সর্বজনীনভাবে বাতিল করে না। বরং ইবনে তাইমিয়্যাহর ব্যক্তিগত ক্ষমার নীতিই পুনর্ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রাচীন ঘটনাটি বর্তমান মানুষের মতপ্রকাশের নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত থাকে। [38]


হত্যার নির্দেশ থেকে মিসরের শাসনক্ষমতা

আবদুল্লাহর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ও এই ঘটনার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাননি; পরে ইসলামি রাষ্ট্রের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন এবং উসমানের শাসনামলে মিসরের শাসক হন। নওয়বী তাঁর ‘তাহযিবুল আসমা ওয়াল লুগাত’ গ্রন্থে এই নিয়োগের সময় ২৫ হিজরি উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিবরণে উত্তর আফ্রিকা, নুবিয়া এবং রোমানদের বিরুদ্ধে নৌঅভিযানের কথাও রয়েছে। ফলে যে ব্যক্তি একসময় নবুয়তের দাবির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করে হত্যার নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তিনিই পরে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সামরিক শক্তির অংশ হয়ে ওঠেন। এই পরিবর্তন তাঁর পূর্ববর্তী অভিযোগের সত্যতা নিষ্পত্তি করে না; বরং ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর সামাজিক মর্যাদা কীভাবে বদলেছে, সেই প্রশ্ন সামনে আনে। [39]

মূল আরবি:
ثم أسلم ذلك اليوم عبد الله بن سعد بن أبى سرح، وحَسن إسلامه، ولم يظهر منه بعده ما يُنكر، وهو أحد العقلاء والكرماء من قريش، ثم ولاه عثمان مصر سنة خمس وعشرين، ففتح الله على يديه إفريقية، وكان فتحًا عظيمًا بلغ سهم الفارس ثلاثة آلاف مثقالٍ ذهبًا، وشهد معه هذا الفتح عبد الله بن عمر، وعبد الله بن عمرو بن العاص، وعبد الله بن الزبير، وكان عبد الله بن سعد هذا فارس بني عامر بن لؤى، وغزا بعدَ إفريقية الأساودَ من أرض النوبة، سنة إحدى وثلاثين، وغزا غزوة الصواري في البحر إلى الروم.
وحين قُتل عثمان بن عفان اعتزل عبد الله بن سعد بن أبي سرح الفتنة، فأقام بعسقلان، وقيل: بالرملة، وكان دعا بأن يختم عمره بالصلاة، فسلَّم من صلاة الصبح التسليمة الأولى، ثم همَّ بالتسليمة الثانية عن يساره، فتوفى سنة ست وثلاثين.


বাংলা অনুবাদ:
সেদিন আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর ইসলাম সুন্দর হয়। এরপর তাঁর কাছ থেকে আপত্তিকর কিছু প্রকাশ পায়নি। তিনি কুরাইশদের বিচক্ষণ ও দানশীল ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। এরপর উসমান তাঁকে ২৫ হিজরিতে মিসরের শাসক নিযুক্ত করেন। তাঁর হাতে আল্লাহ আফ্রিকা জয় করান। এটি ছিল একটি বড় বিজয়; অশ্বারোহীর অংশ তিন হাজার মিসকাল সোনা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এই অভিযানে তাঁর সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবন উমর, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস এবং আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর অংশ নিয়েছিলেন। এই আবদুল্লাহ ইবন সাদ ছিলেন বনি আমির ইবন লুআইয়ের অশ্বারোহী যোদ্ধা। আফ্রিকার পর তিনি ৩১ হিজরিতে নুবিয়া অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন এবং সমুদ্রে রোমানদের বিরুদ্ধে যাতুস সাওয়ারির অভিযানে অংশ নেন।
উসমান ইবন আফফান নিহত হলে আবদুল্লাহ ইবন সাদ ইবন আবি সারহ সংঘাত থেকে সরে যান। তিনি আসকালানে অবস্থান করেন; অন্য বর্ণনায় রামলার কথা বলা হয়েছে। তিনি প্রার্থনা করেছিলেন, যেন নামাজের মাধ্যমে তাঁর জীবনের সমাপ্তি হয়। ফজরের নামাজে প্রথম সালাম দেওয়ার পর বামদিকে দ্বিতীয় সালাম দেওয়ার উদ্যোগ নেন এবং তখন ৩৬ হিজরিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

যাহাবীর ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’য় তাঁর আগে উমরের অধীনে মিসরের সাঈদ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন এবং পরে উসমানের অধীনে সমগ্র মিসরের শাসনভার পাওয়ার বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর রাজনৈতিক পুনর্বাসন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ। উসমান তাঁর দুধভাই, প্রাণ রক্ষার মধ্যস্থতাকারী এবং পরবর্তী নিয়োগদাতা—এই তিনটি সম্পর্ক একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোন নিয়োগ কতটা যোগ্যতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অথবা ব্যক্তিগত আস্থার ভিত্তিতে হয়েছিল, তা পৃথক অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু তাঁর পরবর্তী পদপ্রাপ্তি ও সামরিক সাফল্য দিয়ে আগের ওহিসংক্রান্ত অভিযোগের অসত্যতা প্রমাণ করা যায় না। রাষ্ট্রের একজন সফল কর্মকর্তা হয়ে ওঠা এবং পূর্বে বর্ণিত একটি ঘটনার সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ সম্পূর্ণ আলাদা বিচার। [40]


‘খাঁটি ঈমান’ ও পুণ্যময় মৃত্যুর বিবরণ

পরবর্তী ইসলামি জীবনীতে আবদুল্লাহর ইসলাম গ্রহণ সুন্দর হয়েছিল এবং তাঁর কাছ থেকে আর আপত্তিকর কিছু প্রকাশ পায়নি—এমন বক্তব্য বারবার এসেছে। এই মূল্যায়নের সঙ্গে তাঁর নামাজরত অবস্থায় মৃত্যুর কাহিনিও যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর বিস্তারিত বিবরণ একরকম নয়। তাফসীরে মাযহারীর উদ্ধৃত অংশে সেজদারত অবস্থায় মৃত্যুর কথা আছে; নওয়বীর বিবরণে প্রথম সালামের পর দ্বিতীয় সালাম দেওয়ার সময় মৃত্যু হয়েছে। যাহাবীও নামাজের সালামের সময় মৃত্যুর বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন। মৃত্যুর স্থান হিসেবে আসকালান ও রামলা এবং সাল হিসেবে ৩৬ ও ৫৯ হিজরির ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। যাহাবী ৫৯ হিজরির মত উল্লেখ করে আলীর শাসনামলে মৃত্যুর মতটিকে অধিক সঠিক বলেছেন। [41]

মূল আরবি:
سعيد بن أبي أيوب: حدثني يزيد بن أبي حبيب، قال: لما احتضر ابن أبي سرح وهو بالرملة، وكان خرج إليها فارا من الفتنة، فجعل يقول من الليل: آصبحتم؟ فيقولون: لا. فلما كان عند الصبح، قال: يا هشام! إني لأجد برد الصبح فانظر. ثم قال: اللهم اجعل خاتمة عملي الصبح، فتوضأ، ثم صلى، فقرأ في الأولى بأم القرآن والعاديات، وفي الأخرى بأم القرآن وسورة وسلم عن يمينه، وذهب يسلم عن يساره فقبض رضي الله عنه. ومر أنه توفي سنة تسع وخمسين والأصح وفاته في خلافة علي رضي الله عنه.

বাংলা অনুবাদ:
সাঈদ ইবন আবি আইয়ুব বলেন: ইয়াযিদ ইবন আবি হাবিব আমাকে বলেছেন, ইবনে আবি সারহ যখন রামলায় মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছান—তিনি সংঘাত থেকে পালিয়ে সেখানে এসেছিলেন—তখন রাতের বেলায় বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন, “সকাল হয়েছে কি?” তাঁরা বলছিলেন, “না।” সকাল হওয়ার সময় তিনি বললেন, “হে হিশাম, আমি সকালের শীতলতা অনুভব করছি, তুমি দেখে নাও।” তারপর বললেন, “হে আল্লাহ, আমার শেষ কাজ ফজরের নামাজ করে দাও।” তিনি অজু করলেন এবং নামাজ পড়লেন। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহা ও সূরা আদিয়াত এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা ও আরেকটি সূরা পড়লেন। ডানদিকে সালাম দেওয়ার পর বামদিকে সালাম দিতে গেলেন এবং তখন তাঁর মৃত্যু হলো। আগে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ৫৯ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন; তবে অধিক সঠিক মত হলো, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল আলীর খিলাফতের সময়।

এসব বর্ণনায় তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়কে পুণ্যময় পরিণতির মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু একটি মৃত্যুর দৃশ্য কতটা ধর্মীয় মর্যাদা বহন করে, তা থেকে ওহি লেখার সময়কার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হয় না। তিনি সত্যিই বিশ্বাসে ফিরে এসে নামাজ পড়তে পড়তে মারা গেলেও তাঁর পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্নগুলো থেকে যায়। আবার পরবর্তী ইতিহাসকাররা তাঁর জীবনকে ‘সুসমাপ্তি’র কাঠামোয় উপস্থাপন করে থাকলে সেই উপস্থাপনার প্রমাণও আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে। সেজদা, সালাম, স্থান ও মৃত্যুসালের ভিন্নতা দেখায়, প্রচলিত কাহিনির একটি সংস্করণকে অবিকল ইতিহাস বলে ঘোষণা করার আগে সূত্রগুলো মিলিয়ে দেখা জরুরি। পুণ্যময় মৃত্যুর গল্প কোনো ঐতিহাসিক অভিযোগের খণ্ডন নয়; সেটি একজন ব্যক্তির পরবর্তী জীবনের মূল্যায়ন। এই দুই বিষয় গুলিয়ে ফেললে মূল প্রশ্ন আড়াল হয়ে যায়।


উপসংহার

আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহের কাহিনি কোনো সাধারণ ‘ধর্মত্যাগী সাহাবি’র গল্প নয়। এটি ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরে সংরক্ষিত এমন একটি অস্বস্তিকর ঘটনা, যেখানে ওহি লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নবুয়তের দাবির বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরিবর্তিত শব্দ অনুমোদনের বিবরণ এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণের সঙ্গে কথিত প্রত্যাদেশের মিল—সবই উপস্থিত। একজন লেখকের মুখ থেকে বের হওয়া প্রশংসাবাক্যকে ওহির ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সেই বাক্যের ঐশ্বরিক উৎস যাচাইয়ের প্রশ্ন ওঠে। পরিবর্তিত শব্দ পড়ে শোনানোর পরও অনুমোদনের অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়: নির্দিষ্ট শব্দে অবতীর্ণ বাণী এবং মানুষের নির্বাচিত বিকল্প ভাষার সীমারেখা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ধর্মীয় ঘোষণার বাইরে বাণী লিপিবদ্ধ ও যাচাই করার বাস্তব পদ্ধতির প্রমাণ প্রয়োজন।

এখানে আলোচিত তাফসির, হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থগুলো পরবর্তী সময়ে সংকলিত; ঘটনাটির সমসাময়িক স্বাধীন সাক্ষ্য এই আলোচনায় পাওয়া যায়নি। ফলে কোন বর্ণনার কোন বিস্তারিত অংশ বাস্তবে ঘটেছিল, তা নির্ধারণের জন্য ঐতিহাসিক প্রমাণের প্রয়োজন থেকেই যায়। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা ওহির দাবিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য করে দেয় না। বরং ইসলামি উৎসের মধ্যেই সংরক্ষিত অভিযোগগুলো দেখায়, বাণীর উৎস ও শব্দ নির্বাচন নিয়ে সংশয় ঐতিহ্যের বাইরের কোনো নতুন প্রশ্নমাত্র নয়। এই প্রশ্নগুলো ওহি লেখকের পরিচয় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেই সংরক্ষিত হয়েছে। কোরআন সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক, নির্ভুল এবং মানুষের রচনাগত ভূমিকা থেকে মুক্ত—এই দাবির পক্ষে যারা দাঁড়ান, তাঁদের এসব অভিযোগের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে হবে। দাবিটিকে শুরুতেই সত্য ধরে নিয়ে অভিযোগকারীকে মিথ্যাবাদী বলা সেই উত্তর নয়।

মক্কা বিজয়ের সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণার পাশে আবদুল্লাহকে হত্যার নির্দেশ, কাবার আশ্রয়েও তাঁর প্রাণ রক্ষার সুযোগ না থাকা এবং বাইআত গ্রহণের আগে উপস্থিত কারও হাতে তাঁর মৃত্যু প্রত্যাশা করার বিবরণ একটি পৃথক নৈতিক সংকট তৈরি করে। একজন অভিযোগকারীর বক্তব্য পরীক্ষা করে খণ্ডন করার বদলে তাঁর জীবন বিপন্ন করা হলে অভিযোগটির সত্যতা নিষ্পত্তি হয় না। ‘চোখের খিয়ানত’ না করার বক্তব্যও হত্যার প্রত্যাশার প্রশ্নটি মুছে দেয় না। নৈতিক বিচার করতে হলে চোখের ইশারার পদ্ধতি, নীরবতার অর্থ, অভিযুক্তের নিরাপত্তা এবং প্রত্যাশিত হত্যাকাণ্ড—পুরো ঘটনাটি বিবেচনা করতে হবে। ওহির উৎস সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় এমন প্রাণনাশের নির্দেশ সর্বজনীন করুণা ও ইনসাফের দাবিকে কঠোর পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।

ইবনে তাইমিয়্যাহর আইনি ব্যাখ্যা সমস্যাটিকে আরও বিস্তৃত করেছে। তাঁর মতে, তওবার মাধ্যমে পাপ মোচন হলেও ব্যক্তিগত ক্ষমা ছাড়া প্রাণ রক্ষার নিশ্চয়তা নেই; মুহাম্মদের মৃত্যুর পর সেই ক্ষমা দেওয়ার অধিকারও উম্মতের নেই। ফলে আবদুল্লাহ যে পথ ধরে বেঁচেছিলেন, পরবর্তী অভিযুক্ত সেই পথ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই ধরনের অভিযোগে একজনের জন্য ক্ষমার সুযোগ এবং অন্যজনের জন্য সেই সুযোগ বন্ধ থাকা জন্মকাল ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নিরাপত্তার বৈষম্য তৈরি করে। উসমানের আশ্রয় ও সুপারিশ আবদুল্লাহকে বাঁচিয়েছে, কিন্তু সেটি প্রত্যেক অভিযুক্তের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি। মানুষের জীবন যদি প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী এবং ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত সম্মতির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের দাবি পূরণ করে কীভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

পরবর্তী সময়ে আবদুল্লাহকে ‘খাঁটি ঈমানদার’, সফল শাসক অথবা নামাজরত অবস্থায় মৃত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ও পুণ্যময় মৃত্যুর বিবরণ তাঁর আগের অভিযোগের সত্য-মিথ্যার পরীক্ষা সম্পন্ন করে না। বিশ্বাসে ফিরে আসা মানুষের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা মুছে দেয় না, রাষ্ট্রীয় পদপ্রাপ্তি কোনো বাণীর ঐশ্বরিক উৎস প্রমাণ করে না এবং মৃত্যুর ধর্মীয় দৃশ্য কোনো অভিযোগের খণ্ডন নয়। শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ ইবন আবি সারহ এমন একটি প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছেন, যাকে ‘ইলতিফাত’, ‘মিথ্যাবাদী মুরতাদ’ অথবা পরবর্তী জীবনের প্রশংসা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্নটি রয়ে যায়: ওহির দাবিকে যাচাই করার জন্য কী স্বাধীন প্রমাণ রয়েছে, আর সেই দাবি নিয়ে সংশয় প্রকাশকারী মানুষটির বক্তব্যের জবাবে হত্যার অনুমতি দেওয়ার নৈতিক ভিত্তি কী?


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১২–১৪ ↩︎
  2. ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল, সূরা আনআমের ৯৩ নম্বর আয়াতের আলোচনা; একই বর্ণনার উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২২৮৬৭৫ ↩︎
  3. তাফসীরে মাযহারী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬০–২৬১ ↩︎
  4. ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল, ‘ওয়া মান কালা সাউনযিলু মিসলা মা আনযালাল্লাহ’ আয়াতাংশের আলোচনা; পৃষ্ঠা ২২০-এর উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২২৮৬৭৫ ↩︎
  5. তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর ব্যাখ্যা, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫৩৩–৫৩৪, বর্ণনা ১৩৫৫৫ ↩︎
  6. তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:৯৩, বর্ণনা ১৩৫৫৬ ↩︎
  7. তাবারী, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর ব্যাখ্যায় বর্ণনাগুলোর পর তাবারীর নিজস্ব মন্তব্য ↩︎
  8. ইবনে আবি হাতিম, তাফসিরুল কুরআনিল আযীম, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৩৪৬–১৩৪৭, বর্ণনা ৭৬২৪ ↩︎
  9. ইবনে আবি হাতিম, তাফসির, বর্ণনা ৭৬২৬ ↩︎
  10. তাবারী, জামিউল বায়ান, বর্ণনা ১৩৫৫৬ ↩︎
  11. আল-বাগাভী, মাআলিমুত তানযিল, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর তাফসির ↩︎
  12. আল-কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, সূরা আনআম ৬:৯৩ ↩︎
  13. আল-কুরতুবী, সূরা মুমিনুন ২৩:১৪-এর তাফসির, চতুর্থ মাসআলা ↩︎
  14. ইবনে কাসীর, তাফসিরুল কুরআনিল আযীম, সূরা মুমিনুন ২৩:১৪-এর তাফসির ↩︎
  15. ফখরুদ্দীন আল-রাযী, মাফাতিহুল গায়ব, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর তাফসির ↩︎
  16. আল-বায়দাবী, আনওয়ারুত তানযিল, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৩, সূরা আনআম ৬:৯৩ ↩︎
  17. জালালুদ্দীন সুয়ূতী, আদ-দুররুল মানসুর, সূরা আনআম ৬:৯৩ ↩︎
  18. ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তিআব ফি মারিফাতিল আসহাব, খণ্ড ৩, আবদুল্লাহ ইবনে সাদের জীবনী, ক্রমিক ১৫৫৩ ↩︎
  19. আলী ইবনে ইবরাহিম আল-কুম্মী, তাফসির আল-কুম্মী, সূরা আনআম ৬:৯৩ ↩︎
  20. ইবনে আশুর, আত-তাহরীর ওয়াত-তানবীর, সূরা আনআম ৬:৯৩-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  21. সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬১৭; কিতাবুল মানাকিব, পরিচ্ছেদ: ইসলামে নবুয়তের নিদর্শন ↩︎
  22. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৮১; কিতাবু সিফাতিল মুনাফিকিন ওয়া আহকামিহিম ↩︎
  23. মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, হাদিস ১২২১৫; আনাস ইবনে মালিকের মুসনাদ ↩︎
  24. মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১২২১৬ ↩︎
  25. তাহাবী, শরহু মুশকিলিল আসার, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৩৯–২৪১, অধ্যায় ৫১১, বর্ণনা ৩২১১–৩২১২ ↩︎
  26. তাহাবী, শরহু মুশকিলিল আসার, ৮/২৪০–২৪১ ↩︎
  27. তাহাবী, শরহু মুশকিলিল আসার, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৫৯–২৬১, অধ্যায় ৫১৫, বর্ণনা ৩২২৬ ↩︎
  28. বায়হাকী, দালাইলুন নুবুওয়াহ, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২৭ ↩︎
  29. ইবনে হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারি, খণ্ড ৬, নবুয়তের নিদর্শন অধ্যায়, বুখারি ৩৬১৭-এর ব্যাখ্যা ↩︎
  30. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, বাংলা অনুবাদ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১১; মূল আরবি আলোচনা: মক্কা বিজয় ও মুহাম্মদের মক্কায় প্রবেশের বিবরণ ↩︎
  31. ইবনে ইসহাক, সিরাত, পৃষ্ঠা ৩৩৩-এর উদ্ধৃতি এবং হিন্দের পরবর্তী ইসলাম গ্রহণের সূত্র: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২০২৩৬০ ↩︎
  32. সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২৬৭৪; ঘটনার আরেকটি পূর্ণ বর্ণনা: সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৫৯ ↩︎
  33. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৫৯, ধর্মত্যাগীর বিধানসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
  34. ইবনে তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪০৮; ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, মক্কা বিজয়ের বিবরণ ↩︎
  35. আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, লেখক: ইবনে তাইমিয়্যাহ, নুসুস পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৫২–৫৪ ↩︎
  36. ইবনে তাইমিয়্যাহ, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৩৪০ এবং পৃষ্ঠা ৩৪১ ↩︎
  37. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৬৮৭৭৩; প্রশ্ন ২১৭১৫৩; প্রশ্ন ২২৮৬৭৫ ↩︎
  38. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২১৭১৫৩, আবদুল্লাহকে ক্ষমা ও ধর্মত্যাগের শাস্তির পার্থক্যসংক্রান্ত আলোচনা ↩︎
  39. নওয়বী, তাহযিবুল আসমা ওয়াল লুগাত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭০; সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২১৭১৫৩ ↩︎
  40. যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৩–৩৫, আবদুল্লাহ ইবন সাদের জীবনী ↩︎
  41. যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৪–৩৫; নওয়বীর উদ্ধৃতি: ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২১৭১৫৩ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Quran Compilation Critique, Scribe-of-Revelation Analysis, Islamic Historiography, Hadith-Based Character Review, and Revelation-Process Criticism

Epistemic Position: Scientific Skepticism, Secular Humanism, Historical Criticism, Textual Criticism, Burden-of-Proof Analysis, and Anti-Apologetic Reasoning

This article examines the story of Abdullah ibn Abi Sarh, a former scribe of Muhammad, and the claim that he altered or contributed wording during the process of Quranic dictation.

The central argument is that if a human scribe's spontaneous phrase could be accepted as revelation, and if a former revelation-scribe could credibly claim that he changed wording without immediate correction, then the Quran's purely divine and perfectly controlled transmission becomes historically and logically vulnerable.

The article also discusses Surah al-Mu'minun 23:14, the shift from first-person divine speech to third-person praise, later tafsir reports, the order to kill Abdullah during the conquest of Mecca, Uthman's intervention, the “treacherous glance” episode, and Ibn Taymiyyah's legal-theological interpretation of the case.

This article should be evaluated through source criticism, textual consistency, hadith evidence, historiography, political context, moral accountability, and logical scrutiny—not through devotional assumptions, prophetic immunity, post-hoc apologetics, selective saint-making, or the demand that the Quranic revelation process be protected from historical questioning.

Leave a comment

Your email will not be published.