Al-Anbya
আল-আম্বিয়া: 98
21 আল-আম্বিয়া Al-Anbya · 112 আয়াত الأنبياء
মূল আরবি
إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمْ لَهَا وَٰرِدُونَ
English Translations
Indeed, you [disbelievers] and what you worship other than Allāh are the firewood of Hell. You will be coming to [enter] it.
Certainly! You (disbelievers) and that which you are worshipping now besides Allah, are (but) fuel for Hell! (Surely), you will enter it.
Surely, you and whatever you worship other than Allah are the fuel of Jahannam.. There you will have to arrive.
(They will be told): "Verily you and the gods you worshipped beside Allah are the fuel of Hell. All of you are bound to arrive there.
Lo! ye (idolaters) and that which ye worship beside Allah are fuel of hell. Thereunto ye will come.
Verily ye, (unbelievers), and the (false) gods that ye worship besides Allah, are (but) fuel for Hell! to it will ye (surely) come!
বাংলা অনুবাদ
তোমরা (কাফিররা) আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো জাহান্নামের জ্বালানী। তাতে তোমরা প্রবেশ করবে।
নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের পূজা কর, সেগুলো তো জাহান্নামের জ্বালানী। তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে।
তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদাত কর সেগুলিতো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সকলে তাতে প্রবেশ করবে।
৯৮. হে মুশরিকরা! নিশ্চয়ই আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যে মূর্তিগুলোর পূজা করছো আর মানুষ ও জিনদের যারা তোমাদের এমন ইবাদাতে সন্তুষ্ট তারা ও তোমরা সবাই জাহান্নামের ইন্ধন মাত্র। তোমরা ও তোমাদের মা’বূদরা সেখানে প্রবেশ করবে।
তাফসীর
৯৮-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসী কুরায়েশ মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা ও তোমাদের উপাস্য মূর্তিগুলি জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ওর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” হাবশী ভাষায় (আরবী) শব্দকে (আরবী) বলা হয়, যার অর্থ হলো ইন্ধন বা খড়ি। এমনকি একটি কিরআতে বা পঠনে (আরবী) এর স্থলে (আরবী) রয়েছে।মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো 'জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। তারা যদি মা'রূদ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করতো না।
তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে। সেথায় থাকবে তাদের আর্তনাদ। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “ সেথায় তাদের জন্যে থাকবে আর্তনাদ ও চীৎকার।" সেথায় তারা (এই আর্তনাদ ও চীৎকার ছাড়া) কিছুই শুনতে পাবে না। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন শুধু মুশরিকরাই জাহান্নামে রয়ে যাবে তখন তাদের আগুনের বাসে বন্দী করে দেয়া হবে। তাতে থাকবে আগুনের পেরেক। ওর মধ্যে অবস্থান করে প্রত্যেকেই মনে করবে যে, জাহান্নামে সে ছাড়া আর কেউ নেই।" অতঃপর তিনি- (আরবী) এই আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)(আরবী) দ্বারা করুণা ও সৌভাগ্য বুঝানো হয়েছে।
জাহান্নামীদের এবং তাদের বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ তাআলা এখন সৎ লোক ও তাদের পুরস্কারের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ যাদের জন্যে আমার নিকট হতে পূর্ব হতে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে ঐ জাহান্নাম হতে দূরে রাখা হবে। তাদের সৎ আমলের কারণে সৌভাগ্য তাদের অভ্যর্থনার জন্যে পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সৎকর্মশীলদের জন্যে উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রতিদানও বটে।" (১০:২৬) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “উত্তম কাজের জন্যে উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? (৫৫:৬০) তাদের দুনিয়ার আমল ছিল ভাল, তাই তারা আখেরাতে পুরস্কার ও উত্তম বিনিময় লাভ করলো।
আর শাস্তি থেকে রক্ষা পেলো ও আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হলো। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এতো দূরে রাখা হবে যে,তারা ওর ক্ষীণতর শব্দও শুনবে না এবং জাহান্নামীদেরকে জ্বলতে পুড়তেও দেখতে পাবে না। পুলসিরাতের উপর দুখীদেরকে বিষাক্ত সাপে দংশন করবে এবং ওটা হিসৃহিস্ শব্দ করবে। জান্নাতীরা এই শব্দও শুনতে পাবে না। তাদেরকে কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখা হবে শুধু এটাই নয়, বরং সেখানে তারা তাদের মন যা চায় চিরকাল ভোগ করবে। বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) (আরবী) (যাদের জন্য আমার নিকট হতে পূর্ব থেকে কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা হতে (জাহান্নাম হতে) দূরে রাখা হবে) এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ “আমি, ওমর (রাঃ), উছমান (রাঃ) এই লোকদেরই অন্তর্ভুক্ত।” অথবা তিনি হযরত সা’দের (রাঃ) নাম নিয়েছিলেন।
এমন সময় নামাযের জন্যে তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি। (আরবী) এ উক্তিটি পাঠরত অবস্থায় স্বীয় চাদরখানা টানতে টানতে দাড়িয়ে যান। (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত উছমান (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলিই আল্লাহর বন্ধু। বিদ্যুত অপেক্ষাও দ্রুত গতিতে তারা পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে কাফিররা হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা ঐ বুযর্গ ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ভক্ত ছিলেন এবং মুশরিকদের প্রতি ছিলেন অসন্তুষ্ট।
কিন্তু তাদের পরবর্তী লোকেরা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পূজা শুরু করে দিয়েছিল। যেমন হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ), ফেরেশতা মণ্ডলী, সূর্য, চন্দ্র, হযরত মারইয়াম (আঃ) ইত্যাদি। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী নবীর (সঃ) নিকট আগমন করে এবং বলতে শুরু করেঃ “আপনি ধারণা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা (আরবী) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন। যদি এটা সত্য হয় তবে কি সূর্য, চন্দ্র, ফেরেশতা মণ্ডলী, হযরত উযায়ের (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি সবাই আমাদের মূর্তিগুলির সাথে জাহান্নামে চলে যাবে?” তার এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ তাআলা (আরবী) (৪৩:৫৭-৫৮) এই আয়াত দুটি অবতীর্ণ করেন।
এরপর তিনি (আরবী) এই আয়াত নাযিল করেন। (এটা আবুবকর ইবনু মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ননা করেছেন)একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) ওয়ালীদ ইবনু মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এমন সময় নায়র ইবনু হারিছ তথায় আগমন করে। ঐ সময় মসজিদে আরো বহু কুরায়েশও বিদ্যমান ছিল। নাহ্র ইবনু হারিছ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে কথা বলছিল। কিন্তু সে নিরুত্তর হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি পাঠ করেন। যখন তিনি ঐ মজলিস হতে উঠে চলে যান তখন আবদুল্লাহ ইবনু যাবআ’রী আগমন করে। লোকেরা তাকে বলেঃ আজ নাফর ইবনু হারিস রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছে কিন্ত শেষে একেবারে নিরুত্তর হয়ে গেছে।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আমাদের সম্পর্কে একথা বলে উঠে গেছেন যে, আমরা এবং আমাদের এই উপাস্য দেবতারা সবাই জাহান্নামের আগুনের ইন্ধন হয়ে যাবো।” তাদের এই কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন যাবআ’রী বলেঃ “আমি থাকলে তাঁকে উত্তর দিতাম যে, আমরা ফেরেশতাদের পূজা করে থাকি, ইয়াহুদীরা উযায়েরের (আঃ) পূজা করে এবং খৃস্টানরা ঈসার (আঃ) পূজা করে। তাহলে এরা সবাই জাহান্নামে যাবেন। তার এই উত্তর সবারই খুব পছন্দ হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে এটা বর্ণনা করা হলে তিনি বলেনঃ “যে নিজের ইবাদত করিয়েছে সে ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে। কিন্তু এই বুযুর্গ ব্যক্তিরা নিজেদের ইবাদত করান নাই।
আসলে তো এই লোকগুলি তাঁদের নয়, বরং শয়তানদের পূজা করছে। শয়তানই তাদেরকে তাদের ইবাদতের পন্থা হিসেবে বাতলিয়ে দিয়েছে। তাঁর জবাবের সাথে সাথেই আল্লাহ তাআলা জবাব হিসাবে পরবর্তী আয়াত (আরবী) অবতীর্ণ করেন। সুতরাং অজ্ঞ লোকেরা যে সব সৎ লোকের উপাসনা করতো তাঁরা পৃথক হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মধ্যে যে বলেঃ তিনি (আল্লাহ) ছাড়া আমিই মাবুদ, তার প্রতিফল জাহান্নাম এবং এই ভাবেই আমি অত্যাচারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।” হযরত ঈসার (আঃ) ব্যাপারে তাদের তর্ক-বিতর্কের কারণে আল্লাহ তাআলা নিম্নের আয়াতগুলি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মারইয়াম তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমাদের সম্প্রদায় শোর গোল শুরু করে দেয়।
তারা বলেঃ আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা (আঃ)? এরা তো বাক বিতণ্ডার উদ্দেশ্যেই তোমাকে একথা বলে। বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়। সে তো ছিলে আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে করেছিলাম বানী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তোমাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হতো। ঈসা (আঃ) তো কিয়ামতরে নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩:৫৭-৬১)ইবনু যাবআ’রী বড়ই ভুল করেছিল। কেননা, এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে মক্কাবাসী কাফিরদেরকে এবং উক্তি করা হয়েছে তাদের প্রতিমা ও পাথরগুলি সম্পর্কে যেগুলির তারা আল্লাহকে ছেড়ে ইবাদত করতো।
এ উক্তি হযরত ঈসা (আঃ) প্রভৃতি পবিত্র ও একত্ববাদী লোকদের সম্পর্কে নয়। তাঁরা তো গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে মানুষকে বিরত রাখতেন!ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে যে (আরবী) শব্দটি রয়েছে তা আরবে নির্জীব ও বিবেকহীনদের জন্যে এসে থাকে। এই ইবনু যাবআ’রী এর পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। সে প্রসিদ্ধ কবিদের একজন ছিল। প্রথমতঃ সে মুসলমান হওয়ার পর সে বড়ই ক্ষমাপ্রার্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ মহা-ভীতি তাদেরকে বিষাদষ্টি করবে না। অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, শিঙ্গার ফুৎকারের আতংক, জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের ভীতি বিহবলতা এবং জান্নাতী ও জাহান্নামীদের মাঝে মৃত্যুকে যবাহ্ করে দেয়ার আতংক ইত্যাদি কিছুই তাদের থাকবে না।
তারা চিন্তা ও দুঃখ হতে বহু দূরে থাকবে। তারা হবে পুরোপুরি ভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত। অসন্তুষ্টির চিহ্নমাত্র তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না। ফেরেশতা মণ্ডলী তাদেরকে অভ্যর্থনা করে বলবেঃ এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।
নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদাত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে।
[সূরা আল-আম্বিয়া (২১): আয়াত ৯৮] পূর্ণ পৃষ্ঠা
[সূরা আল-আম্বিয়া (২১): আয়াত ৯৮]নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত করতে, সেগুলো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা তাতে প্রবেশ করবে। (৯৮)এতে চারটি মাসয়ালা (আলোচ্য বিষয়) রয়েছে: প্রথমত: মহান আল্লাহর বাণী: "নিশ্চয়ই তোমরা এবং তোমরা যা কিছু ইবাদত করতে..." ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: এটি এমন একটি আয়াত যা সম্পর্কে মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করে না! আমি জানি না তারা কি এটি বুঝতে পেরেছে তাই জিজ্ঞেস করে না, নাকি তারা এ সম্পর্কে অজ্ঞ (১) তাই জিজ্ঞেস করে না। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: সেই আয়াতটি কোনটি? তিনি বললেন: "নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত করতে, সেগুলো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা তাতে প্রবেশ করবে।" যখন এই আয়াত নাজিল হলো, তখন কুরাইশ কাফেরদের নিকট এটি অত্যন্ত কঠিন মনে হলো।
তারা বলল: তিনি (রাসূল ﷺ) আমাদের উপাস্যদের গালি দিয়েছেন। তারা ইবনুল জিবারার কাছে গিয়ে তাকে বিষয়টি জানাল। সে বলল: আমি যদি তাঁর সামনে উপস্থিত থাকতাম তবে অবশ্যই এর প্রতিউত্তর দিতাম। তারা বলল: তুমি তাঁকে কী বলতে? সে বলল: আমি তাঁকে বলতাম—এই যে মাসীহ (ঈসা আ.), তাঁর ইবাদত করা হয়; ইহুদিরা উযাইরের ইবাদত করে; তবে কি তারাও জাহান্নামের ইন্ধন হবে? কুরাইশরা তার এই কথায় অত্যন্ত চমৎকার বোধ করল এবং তারা মনে করল যে মুহাম্মদ (ﷺ) তর্কে পরাজিত হয়েছেন। তখন মহান আল্লাহ নাজিল করলেন: "নিশ্চয়ই যাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে পূর্বেই কল্যাণ নির্ধারিত হয়েছে, তাদেরকে তা (জাহান্নাম) থেকে দূরে রাখা হবে" [আল-আম্বিয়া: ১০১]।
আর এই প্রেক্ষাপটেই নাজিল হয়েছে: "যখন মরিয়ম-তনয়ের উদাহরণ পেশ করা হলো" [আয-যুখরুফ: ৫৭], অর্থাৎ ইবনুল (২) জিবারার তর্কের প্রেক্ষিতে, "তখন তোমার সম্প্রদায় উল্লাসে শোরগোল শুরু করে দিল" [আয-যুখরুফ: ৫৭], এখানে ‘ইয়াসিদদুন’ শব্দটি সোয়াদ বর্ণে কাসরা (জের) যোগে পঠিত, যার অর্থ—তারা শোরগোল বা হইচই করছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত সামনে আসবে (৩)। দ্বিতীয়ত: এই আয়াতটি শব্দের ব্যাপকার্থকতার (উমুম) স্বপক্ষে এবং এর জন্য নির্দিষ্ট রূপ বা গঠন থাকার বিষয়ে একটি মৌলিক দলিল। যারা মনে করেন যে ব্যাপকার্থক শব্দ বুঝানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভাষাগত রূপ নেই, তাদের মত এই আয়াত ও অন্যান্য প্রমাণ দ্বারা অসার প্রমাণিত হয়।
কেননা, এই আব্দুল্লাহ ইবনুল জিবারা তার জাহেলি অবস্থাতেও ‘মা’ (যা কিছু) শব্দটি দ্বারা ইবাদতকৃত সকলকেই (বস্তু ও ব্যক্তি) বুঝেছিলেন এবং কুরাইশরা—যারা বিশুদ্ধ ও অলংকারপূর্ণ আরবি ভাষায় পারদর্শী ছিল—তারাও তার এই বুঝের সাথে একমত হয়েছিল। যদি শব্দটি ব্যাপকার্থক না হতো, তবে তা থেকে কাউকে ব্যতিক্রম করা সঠিক হতো না। যেহেতু এখানে ব্যতিক্রম (ইস্তিসনা) করা হয়েছে, তাই প্রমাণিত হয় যে এটি ব্যাপকার্থক শব্দ; আর এটি অত্যন্ত স্পষ্ট। তৃতীয়ত: সাধারণ পাঠরীতিতে শব্দটি ‘হসাব’ অর্থাৎ সোয়াদ বর্ণ দিয়ে পঠিত। এর অর্থ হলো—হে কাফের সম্প্রদায়, তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যেসব মূর্তির পূজা করতে, সেগুলো জাহান্নামের জ্বালানি।
ইবনে আব্বাস (রা.) এরূপ বলেছেন। মুজাহিদ, ইকরিমা ও কাতাদা (র.) বলেন: এর অর্থ জাহান্নামের কাঠ বা ইন্ধন। আলী ইবনে আবি তালিব ও আয়েশা (রা.) শব্দটি ‘হাতাব’ অর্থাৎ ত’ বর্ণ দিয়ে পাঠ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) ‘হদাব’ অর্থাৎ দ্বদ বর্ণ দিয়েও পাঠ করেছেন। আল-ফাররা বলেন: এর দ্বারা ‘হসাব’ (জ্বালানি)-ই উদ্দেশ্য। তিনি বলেন: আমাদের নিকট বর্ণিত হয়েছে যে, ‘হদাব’ শব্দটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের অধিবাসীদের ভাষায়...(১). পাণ্ডুলিপি ‘ত্ব’ এবং ‘কাফ’-এ এভাবেই ‘জাহিলুহা’ (তারা এ সম্পর্কে অজ্ঞ) এসেছে। অন্যগুলোতে ‘জাহিলু’ রয়েছে।(২). পাণ্ডুলিপি ‘কাফ’-এ এসেছে: ‘হে ইবনুল জিবারা’।(৩).
দেখুন ১৬শ খণ্ড, ২০১ পৃষ্ঠা।
আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারীর এবং আবুশ শায়খ কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী সে কিয়ামতের দিন তার সম্প্রদায়ের আগে আগে থাকবে
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ফিরআউন তার সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে পথ চলবে, এমনকি সে তাদের নিয়ে জাহান্নামে গিয়ে পড়বে।আবদুর রাজ্জাক, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী অতঃপর সে তাদের জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছাবে
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ‘উরুূদ’ অর্থ হলো প্রবেশ করা।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কুরআনে ‘উরুূদ’ শব্দটি চারটি স্থানে (প্রবেশ করা অর্থে) এসেছে—সূরা হুদে আর সেটি কতই না মন্দ গন্তব্য যেখানে তারা পৌঁছাবে
; সূরা মারইয়ামে তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে তা অতিক্রম করতে হবে না
(সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭১); এবং সেই সূরায় আরও রয়েছে আর আমি অপরাধীদের পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব
(সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৮৬); এবং সূরা আল-আম্বিয়ায় তোমরা জাহান্নামের ইন্ধন, তোমরাই তাতে প্রবেশ করবে
(সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯৮)।
তিনি বলেন: এই সবগুলোর অর্থই হলো প্রবেশ করা।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন— আর এ দুনিয়ায় তাদের পেছনে লানত লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কিয়ামতের দিনও (তা অব্যাহত থাকবে)
; এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: তাদের এক লানতের সাথে আরও এক লানত যুক্ত করা হয়েছে, ফলে তা হলো দ্বিগুণ লানত। কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে
; অর্থাৎ লানতের পিঠে লানত।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে
প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এটি হলো দুনিয়া ও আখিরাতের লানত।ইবনে আবি হাতিম সুদ্দী (রা.) থেকে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ফিরআউনের পরে এমন কোনো নবী প্রেরিত হননি যিনি তার জবানিতে ফিরআউনকে অভিশাপ দেননি এবং কিয়ামতের দিন জাহান্নামে তার জন্য আরও একটি লানত বৃদ্ধি করা হবে।ইবনুল আনবারী ‘আল-ওয়াকফ ওয়াল ইবতিদা’ গ্রন্থে এবং তুসতি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন—নাফি ইবনুল আযরাক তাকে বললেন: মহান আল্লাহর বাণী কতই না মন্দ সেই পুরস্কার যা তাদের দেওয়া হয়েছে
সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন।
তিনি বললেন: এর অর্থ হলো অভিশাপের পর নিকৃষ্ট অভিশাপ।তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আরবরা কি এই অর্থ সম্পর্কে অবগত? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তুমি কি বনু যুবইয়ানের নাবিগাহর উক্তিটি শোননি যেখানে সে বলেছে: ‘এমন এক শক্তির মোকাবিলা করো না যার কোনো তুলনা নেই, কারণ শত্রুরা তো সাহায্যের (রিফদ) মাধ্যমেই পর্যুদস্ত হয়।’আয়াত ১০০
সৃষ্টিজগতের ওপর এমন এক গ্রীবা বা গর্দান প্রকাশিত হবে যার দেখার মতো দুটি চোখ এবং একটি বাকপটু জিহ্বা থাকবে। সে বলবে: "আমাকে তোমাদের মধ্য হতে তিন শ্রেণির জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে: প্রত্যেক উদ্ধত ও অবাধ্য স্বৈরাচারীর জন্য।" অতঃপর সে কাতারসমূহ থেকে তাদেরকে সেভাবে ছোঁ মেরে তুলে নেবে যেভাবে পাখি তিলের দানা তুলে নেয় এবং তাদেরকে জাহান্নামে বন্দি করবে। এরপর সে দ্বিতীয়বার বের হয়ে বলবে: "আমাকে তোমাদের মধ্য হতে ঐ ব্যক্তির জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে যে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।" অতঃপর সে তাদেরকে কাতারসমূহ থেকে সেভাবে ছোঁ মেরে তুলে নেবে যেভাবে পাখি তিলের দানা তুলে নেয় এবং তাদেরকে জাহান্নামে বন্দি করবে।
অতঃপর সে তৃতীয়বার বের হয়ে বলবে: "আমাকে প্রতিকৃতি বা ছবি নির্মাণকারীদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে।" অতঃপর সে তাদেরকে কাতারসমূহ থেকে সেভাবে ছোঁ মেরে তুলে নেবে যেভাবে পাখি তিলের দানা তুলে নেয় এবং তাদেরকে জাহান্নামে বন্দি করবে। যখন এই তিন শ্রেণি এবং ঐ তিন শ্রেণিকে পাকড়াও করা শেষ হবে, তখন আমলনামাসমূহ উন্মুক্ত করা হবে, মিযান স্থাপন করা হবে এবং সৃষ্টিজগতকে হিসাবের জন্য ডাকা হবে।আহমদ, আবদ বিন হুমাইদ, হাকীম তিরমিযী, ইবনুল মুনযির, ইবনু আবি হাতিম, হাকীম (যিনি একে সহীহ বলেছেন), ইবনু মারদুওয়াইহ এবং বায়হাকী 'আল-বা'স' গ্রন্থে আবু সুমাইয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: 'উরুূদ' (আগমন বা প্রবেশ) প্রসঙ্গে আমাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল।
আমাদের কেউ কেউ বলল: কোনো মুমিন এতে প্রবেশ করবে না। আবার কেউ কেউ বলল: তারা সকলেই এতে প্রবেশ করবে। [আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:] "অতঃপর আমি মুত্তাকীদের মুক্তি দেব।" এরপর আমি জাবির বিন আবদুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি তাঁকে জানালাম। তিনি নিজের দুই কানের দিকে ইশারা করে বললেন: এই কান দুটি বধির হয়ে যাক যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে না শুনে থাকি যে: "কোনো পুণ্যবান বা পাপাচারী বাকি থাকবে না যে এতে প্রবেশ করবে না। তবে মুমিনের জন্য এটি এমন শীতল ও শান্তিপূর্ণ হবে যেমনটি ইব্রাহীমের জন্য হয়েছিল; এমনকি মুমিনদের শীতলতার আধিক্যের কারণে জাহান্নামের আগুন আর্তনাদ করে উঠবে।
অতঃপর আমি আল্লাহভীরুদের নাজাত দেব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।"আবদুর রাজ্জাক, সাঈদ বিন মানসূর, হান্নাদ, আবদ বিন হুমাইদ, ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনু আবি হাতিম এবং বায়হাকী 'আল-বা'স' গ্রন্থে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নাফে' বিন আল-আযরাক ইবনে আব্বাসের সাথে তর্কে লিপ্ত হলেন। ইবনে আব্বাস বললেন: 'উরুূদ' অর্থ হলো প্রবেশ করা। নাফে' বললেন: না।তখন ইবনে আব্বাস পাঠ করলেন— "নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা করো, তারা জাহান্নামের ইন্ধন। তোমরা তাতে প্রবেশ করবে।" (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯৮)।
তিনি বললেন: তারা প্রবেশ করেছে কি করেনি? অতঃপর তিনি পাঠ করলেন— "কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদেরকে আগুনে প্রবেশ করাবে।" (সূরা হুদ, আয়াত: ৯৮)। তারা প্রবেশ করেছে কি করেনি? আর আমি ও আপনি তো এতে প্রবেশ করবই, এখন দেখুন আমরা তা থেকে বের হতে পারি কি না।আবদ বিন হুমাইদ এবং ইবনু আবি হাতিম "তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে সেখানে পৌঁছাবে না" (সূরা মারইয়াম: ৭১) আল্লাহর এই বাণীর ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: পুণ্যবান এবং পাপাচারী সকলেই সেখানে প্রবেশ করবে।আপনি কি আল্লাহর এই বাণী শোনেননি: "অতঃপর তিনি তাদেরকে আগুনে প্রবেশ করালেন, আর যেখানে প্রবেশ করানো হলো তা কতই না নিকৃষ্ট স্থান।" (সূরা হুদ, আয়াত: ৯৮)।
এবং তাঁর বাণী: "আর আমি অপরাধীদেরকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব।" (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৮৬)।
