Al-Anbya

আল-আম্বিয়া: 1

21:1
টেক্সট কপি
21 আল-আম্বিয়া Al-Anbya · 112 আয়াত الأنبياء

মূল আরবি

ٱقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِى غَفْلَةٍ مُّعْرِضُونَ

English Translations

Sahih International

[The time of] their account has approached for the people, while they are in heedlessness turning away.

Muhsin Khan

Draws near for mankind their reckoning, while they turn away in heedlessness.

Taqi Usmani

The reckoning of the people has drawn near to them, while they are in negligence, turning away (from its signs).

Abul Ala Maududi

The time of people's reckoning has drawn near, and yet they turn aside in heedlessness.

Pickthall

Their reckoning draweth nigh for mankind, while they turn away in heedlessness.

Yusuf Ali

Closer and closer to mankind comes their Reckoning: yet they heed not and they turn away.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

মানুষের হিসাব গ্রহণের কাল ক্রমশঃ ঘনিয়ে আসছে কিন্তু তারা গাফলতিতে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।

রাওয়াই আল-বায়ান

মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।

শাইখ মুজিবুর রহমান

মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

মানুষের হিসেব-নিকেশের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।

ফাতহুল মাজীদ

মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।

মুখতাসার

১. মানুষের আমলের হিসাবের দিন কিয়ামত তো তাদের খুবই কাছে। অথচ তারা গাফিল ও আখিরাত বিমুখ হয়ে আছে। তারা দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বানী ইসরাঈল, সূরায়ে কাহফ, সূরায়ে মারইয়াম, সূরায়ে তা-হা এবং সূরায়ে আম্বিয়া হলো প্রথম মনোনীত সূরাসমূহ এবং এগুলোই (আরবী)। ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর: মহামহিমান্বিত আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করছেন যে, কিয়ামত নিকটবর্তী হয়ে গেছে, অথচ মানুষ তা থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন রয়েছে। তারা ওর জন্যে এমন কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করছে না যা সেই দিন তাদের উপকারে আসবে। বরং তারা সম্পূর্ণরূপে দুনিয়ায় জড়িয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় তারা এমনভাবে লিপ্ত হয়ে পড়েছে যে, ভুলেও একবার কিয়ামতকে স্মরণ করে না।

অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ আসবেই; সুতরাং তোমরা ওকে ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না।” (১৬:১) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” (৫৪:১-২) কবি আবু নুওয়াসের এই অর্থেরই নিম্নরূপ একটি কবিতাংশ রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “মানুষ তাদের উদাসিনতায় ডুবে আছে, অথচ মৃত্যুর যাতা ঘুরতে রয়েছে। তখন তাকে প্রশ্ন করা হয়ঃ “কি থেকে এটা নেয়া হয়েছে? " উত্তরে সে বলেঃ আল্লাহ তাআলার এই উক্তি হতে।”বর্ণিত আছে যে, হযরত আমির ইবনু রাবীআহ (রাঃ) বড়িীতে একটি লোক অতিথিরূপে আগমন করে।

হযরত আমির (রাঃ) তার খুব খাতিরসম্মান করে তাকে বাড়ীতে রাখেন এবং তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথেও আলোচনা করেন। একদা এ অতিথি হযরত আমিরকে (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে অমুক উপত্যকা দান করেছেন। আমি চাই যে, ঐ উত্তম ভূ-খণ্ডের কিছু অংশ আপনার নামে করে দিই, যাতে আপনার অবস্থা স্বচ্ছল হয়।” উত্তরে হযরত আমির (রাঃ) বলেনঃ “ভাই, আমার এর কোন প্রয়োজন নেই। আজ এমন একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে যা দুনিয়াকে আমার কাছে তিক্ত করে তুলেছে।” অতঃপর তিনি (আরবী) এই আয়াতটিই পাঠ করেন।এরপর আল্লাহ তাআলা কুরায়েশ এবং তাদের মত অন্যান্য কাফিরদের সম্পর্কে বলেনঃ যখনই তাদের নিকট তাদের প্রতিপালকের কোন নতুন উপদেশ আসে তখন তারা তা শ্রবণ করে কৌতুকচ্ছলে।

তারা আল্লাহর কালাম ও তাঁর ওয়াহীর দিকে কানই দেয় না। তারা এক কানে শুনে এবং অন্য কান দিয়ে উড়িয়ে দেয়। তাদের অন্তর হাসি-তামাশায় লিপ্ত থাকে।সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আহলে কিতাবদের কিতাবের কথা কিজ্ঞেস করা তোমাদের কি প্রয়োজন। তারা তো আল্লাহর কিতাবে বহু কিছু রদ-বদল করে দিয়েছে, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ফেলেছে। তোমাদের কাছে তো নতুনভাবে অবতারিত আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে। এতে কোন প্রকার পরিবর্তন ঘটে নাই। এলাকগুলি নিজেদের অন্তরকে এর ক্রিয়া থেকে শূন্য রাখতে চাচ্ছে।

তারা অন্যদেরকেও বিভ্রান্ত করছে এবং বলছেঃ “আমাদেরই মত একজন মানুষের তো আমরা অধীনতা স্বীকার করতে পারি না। তোমরা কেমন লোক যে, দেখে শুনে যদুিকে মেনে নি? এটা অসম্ভব যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের মতই মানুষকে রিসালাত ও ওয়াহী দ্বারা বিশিষ্ট করবেন। সুতরাং এটা বিস্ময়কর ব্যাপার যে, লোক বুঝে সুঝেও তার যাদুর মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। তাদের একথার জবাবে আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সাঃ) বলেনঃ তুমি বলঃ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কথাই আমার প্রতিপালক অবগত আছেন। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তিনি এই পাক কালাম কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন। এতে পূর্ব ও পরের সমস্ত খবর বিদ্যমান রয়েছে।

এটা একথাই প্রমাণ করে যে, এটা অবতীর্ণকারী হলেন আলেমুল গায়েব। তিনি তোমাদের সব কথাই শ্রবণ করেন এবং তিনি তোমাদের সমস্ত অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। সুতরাং তোমাদের তাঁকে ভয় করা উচিত।এরপর কাফিরদের ঔদ্ধত্যপনা ও হঠকারিতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তারা বলে এ সব অলীক কল্পনা হয় সে উদ্ভাবন করেছে, না হয় সে একজন কবি। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তারা নিজেরাই এ ব্যাপারে হয়রান পেরেশান রয়েছে। কোন এক কথার উপর তারা স্থির থাকতে পারছে না। তাই, তারা আল্লাহর কালামকে কখনো যাদু বলছে এবং কখনো কবিতা বলছে এবং কখনো আবার বিক্ষিপ্ত ও উদ্ভট কথা বলছে।

কখনো আবার তারা একথাও বলছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ওগুলি নিজেই বানিয়ে নিয়েছেন। মোট কথা, তাদের মুখে যা আসছে তাই তারা বলছে। কখনো তারা বলছেঃ যদি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সত্য নবী হন তবে হ্যরত সালেহের (আঃ) মত কোন উস্ত্রী আমাদের নিকট আনয়ন করুন, বা হযরত মূসার (আঃ) মত কোন মু'জিযা প্রদর্শন করুন অথবা হযরত ঈসার (আঃ) মত কোন মুজিযা প্রকাশ করুন না কেন? অবশ্যই আল্লাহ তাআলা এ সবের উপরপূর্ণ ক্ষমতাবান। কিন্তু যদি এগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং পরেও তারা ঈমান আনয়ন না করে তবে আল্লাহ তাআলার নীতি অনুযায়ী তারা তার শাস্তির কোপানলে পড়ে যাবে এবং তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে।

তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও একথাই বলেছিল এবং ঈমান আনয়ন করে নাই। ফলে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। অনুরূপভাবে এরাও মুজিযা দেখতে চাচ্ছে, কিন্তু তা প্রকাশিত হয়ে পড়লে তারা ঈমান আনবে না। সুতরাং পূর্ববর্তী লোকদের মত তারাও ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয় যাদের উপর তোমার প্রতিপালকের কথা বাস্তবায়িত হয়েছে তারা ঈমান আনয়ন করবেনা, যদিও তাদের কাছে সমস্ত নিদর্শন এসে যায়, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শস্তি অবলোকন করে। (১০:৯৬-৯৭)কিন্তু তখনকার ঈমান আনয়ন বৃথা। প্রকৃত ব্যাপার এটাই যে, তার ঈমান অনবেই না।

তাদের চোখের সামনে তো রাসলল্লাহর (সঃ) অসংখ্য মজিয়া বিদ্যমান ছিল। এমন কি তার মু'জিযাগুলি ছিল অন্যান্য নবীদের মু'জিযা গুলি অপেক্ষা বেশী প্রকাশমান।হযরত উবাদা ইবনু সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা আমরা মসজিদে অবস্থান করছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) কুরআন পাঠ করছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সাল মুনাফিক আগমন করে এবং নিজের গদী বিছিয়ে এবং বালিশে হেলান দিয়ে আঁকজমকের সাথে বসে পড়ে। সে খুব বাকপটুও ছিল। হযরত আবু বকরকে (রাঃ) সে বললোঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) বলুন যে, তিনি যেন আমাদের কাছে কোন নিদর্শন আনয়ন করেন যেমন তাঁর পূর্ববর্তী নবীরা (আঃ) নিদর্শন সমূহ আনয়ন করেছিলেন।

যেমন হযরত মুসা (আঃ) ফলক আনয়ন করেছিলেন, হযরত সালেহ (আঃ) এনেছিলেন উষ্ট্ৰী, হযরত দাউদ (আঃ) আনয়ন করেছিলেন যবুর এবং হযরত ঈসা (আঃ) আনয়ন করেছিলেন ইঞ্জীল ও আসমানী খাদ্য পূর্ণ খাঞ্চা।” তার একথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) কাঁদতে শুরু করেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আগমন করেন। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) অন্যান্য সাহাবীদেরকে বলেনঃ “রাসূলুল্লাহর (সঃ) সম্মানার্থে দাড়িয়ে যান এবং এই মুনাফিকের ফরিয়াদ তাঁর কাছে পৌছিয়ে দাও।" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ আমার জন্যে দাঁড়ানো চলবে না। দাঁড়াতে হবে শুধুমাত্র মহামহিমান্বিত আল্লাহর জন্যে। আমরা তখন বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)!

এই মুনাফিকের কারণে আমরা বড়ই কষ্ট পাচ্ছি।” তখন তিনি বললেনঃ “এখনই অমাির কাছে হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেছিলেন এবং আমাকে বললেনঃ “আপনি বাইরে গিয়ে জনগণের সামনে আল্লাহর ঐ নিয়ামত রাজির বর্ণনা দিন যা তিনি আপনাকে দান করেছেন এবং ঐ মর্যাদার কথা প্রকাশ করুন যা তিনি আপনাকে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি আমাকে সুসংবাদ দিলেন যে, আমাকে সারা দুনিয়ার জন্যে রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছে। আমাকে নিদর্শন দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন জ্বিনদের কাছেও আল্লাহর পয়গাম পৌঁছিয়ে দিই। মহান আল্লাহ আমাকে তার পবিত্র কিতাব (কুরআন) দান করেছেন, অথচ আমি সম্পূর্ণরূপে নিরক্ষর।

তিনি আমার পূর্বেও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। ফেরেশতাদের মাধ্যমে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন। আমার সামনে তিনি ভক্তি প্রযুক্ত ভয় রেখে দিয়েছেন। আমাকে হাওজে কাউসার দান করা হয়েছে যা কিয়ামতের দিন সমস্ত হাওজ অপেক্ষা বড় হবে। আমার সাথে তিনি মাকামে মাহমুদের ওয়াদা করেছেন যখন সমস্ত লোক উদ্বিগ্ন অবস্থায় মাথা নীচু করে থাকবে। তিনি আমাকে ঐ প্রথম দলভূক্ত করেছেন যারা লোকদের মধ্য হতে বের হবে। আমার শাফাআতের ফলে আমার উম্মতের মধ্য হতে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে। আমাকে বিজয় ও রাজ্য দান করা হয়েছে। আমাকে সুখময় জান্নাতের ঐ সুউচ্চ কক্ষ দান করা হবে যার মত উচ্চ মঞ্জিল আর কারো হবে না।

আমার উপর শুধুমাত্র ঐ ফেরেশতারা থাকবেন যারা আল্লাহর আরশ উঠিয়ে নিয়ে থাকবেন। আমার জন্যে ও আমার উম্মতের জন্যে গনীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধমাল) হালাল করা হয়েছে, অথচ আমার পূর্বে কারো জন্যে এটা হালাল ছিল না। "

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

মানুষের হিসেব-নিকেশের সময় আসন্ন [১], অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে [২]

১১২ আয়াত, মক্কী

[১] আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: বনী-ইসরাঈল, কাহ্ফ, মারইয়াম, ত্বা-হা ও আম্বিয়া- এগুলো আমার প্রাচীন সম্পদ ও উপার্জন ৷ [বুখারীঃ ৪৪৩১] এর থেকে বুঝা যায় যে, এ সূরাগুলো প্রাথমিক যুগে নাযিল হয়েছিল। এগুলোর প্রতি সাহাবায়ে কিরামের আলাদা দরদ ছিল। তাই আমাদেরও উচিত। এগুলোকে বেশি ভালবাসা এবং এগুলো থেকে হেদায়াত সংগ্ৰহ করা।

[১] অর্থাৎ মানুষের কাছ থেকে তাদের কৃতকর্মের হিসাব নেয়ার দিন অর্থাৎ কেয়ামতের দিন ঘনিয়ে এসেছে। এখানে পৃথিবীর বিগত বয়সের অনুপাতে ঘনিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। লোকদের নিজেদের কাজের হিসেব দেবার জন্য তাদের রবের সামনে হাজির হবার সময় আর দূরে নেই। মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমন একথারই আলামত যে, মানব জাতির ইতিহাস বর্তমানে তার শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এখন সে তার সূচনাকালের পরিবর্তে পরিণামের বেশী নিকটবর্তী হয়ে গেছে। সূচনা ও মধ্যবর্তীকালীন পর্যায় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং এবার শেষ পর্যায়ে শুরু হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর একটি হাদীসে একথাই বলেছেন।

তিনি নিজের হাতের দুটি আঙ্গুল পাশাপাশি রেখে বলেনঃ “আমার আগমন এমন সময়ে ঘটেছে যখন আমি ও কেয়ামত এ দু'টি আঙ্গুলের মতো অবস্থান করছি।” [বুখারীঃ ৪৯৯৫] অর্থাৎ আমার পরে শুধু কেয়ামতই আছে, মাঝখানে অন্য কোন নবীর আগমনের অবকাশ নেই। যদি সংশোধিত হয়ে যেতে চাও তাহলে আমার দাওয়াত গ্ৰহণ করে সংশোধিত হও।

[২] অর্থাৎ কোন সতর্কসংকেত ও সর্তকবাণীর প্রতি দৃষ্টি দেয় না। দুনিয়া নিয়ে তারা এতই মগ্ন যে, আখেরাতের কথা ভুলে গেছে। আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে যে আল্লাহর উপর ঈমান, তাঁর ফরায়েযগুলো আদায় করতে হয়, নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে দূরে থাকতে হয় সেটার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে না। [ফাতহুল কাদীর] আর যে নবী তাদেরকে সর্তক করার চেষ্টা করছেন তার কথাও শোনে না। তাদের রাসূলের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ওহী এসেছে তারা সেটার প্রতি দৃষ্টি দেয় না। এ নির্দেশটি প্রাথমিকভাবে কুরাইশ ও তাদের মত যারা কাফের তাদেরকে করা হচ্ছে। [ইবন কাসীর]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা আল-আম্বিয়া (২১): আয়াত ১ থেকে ৩] পূর্ণ পৃষ্ঠা

'আস-সিরাত আস-সুওয়া' শব্দটি 'ওয়াও' বর্ণে তাশদিদ এবং এরপর 'ফু'লা' ওজনে হামযা ব্যতীত স্ত্রীলিঙ্গবাচক আলিফ যোগে গঠিত। 'সিরাত' শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার বিরল ও ব্যতিক্রমী। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন" [আল-ফাতিহা: ৬]; এখানে এবং অন্য সব স্থানে এটি পুংলিঙ্গ হিসেবে এসেছে। আবু হাতিম এটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন: যদি এটি 'সু' (মন্দ) থেকে নির্গত হতো তবে 'আস-সুওয়া' (হামযা সহ) বলা ওয়াজিব ছিল, আর যদি এটি 'সাওয়া' (সমতা) থেকে হতো তবে 'আস-সিয়্যা' বলা ওয়াজিব ছিল, যার মূল রূপ 'সিউওয়া'। আল-যামাখশারী বলেন: এটি 'আস-সাওয়া' কিরাআতেও পাঠ করা হয়েছে, যার অর্থ মধ্যবর্তী ও ন্যায়বিচার অথবা সমতল।

আন-নাহহাস বলেন: ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার এবং আল-জাহদারীর কিরাআতটি জায়েজ হওয়ার ভিত্তি হলো, এর মূল সম্ভবত ছিল 'আস-সুওয়া' (হামযা সহ); আর সুকুন কোনো দুর্ভেদ্য বাধা নয়, ফলে তিনি হামযাকে পেশে রূপান্তরিত করেছেন এবং তার পরিবর্তে 'ওয়াও' নিয়ে এসেছেন, যেমন পূর্বের বর্ণে জবর থাকলে হামজার পরিবর্তে আলিফ আনা হয়। সমাপ্ত হলো, সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। ‌‌[সূরা আল-আম্বিয়া]সূরা আল-আম্বিয়া সকলের মতে মক্কী সূরা এবং এটি একশত বারোটি আয়াত বিশিষ্ট। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। ‌‌[সূরা আল-আম্বিয়া (২১): আয়াত ১ থেকে ৩]পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী হয়েছে, অথচ তারা উদাসীনতায় বিমুখ হয়ে আছে।

(১) তাদের নিকট তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে যখনই কোনো নতুন উপদেশ আসে, তারা তা কৌতুকচ্ছলে শ্রবণ করে। (২) তাদের অন্তর থাকে অন্যমনস্ক। আর জালিমরা গোপনে পরামর্শ করে যে, এ তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ মাত্র। তবে কি তোমরা দেখে-শুনে জাদুর কবলে পড়বে? (৩)মহান আল্লাহর বাণী: (মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী হয়েছে) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: সূরা আল-কাহফ, মারইয়াম, ত্বহা এবং আল-আম্বিয়া হলো প্রাচীন যুগের শ্রেষ্ঠ সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলো আমার প্রাচীন সম্পদ; এর দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন যে এগুলো কুরআনের সেই অংশ যা তিনি ইসলামের শুরুর দিকে অর্জন করেছেন এবং মুখস্থ রেখেছেন, যেমন প্রাচীন উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদকে 'মাল তিলাদ' বলা হয়।

বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে এক ব্যক্তি একটি দেয়াল নির্মাণ করছিলেন। এই সূরাটি নাযিল হওয়ার দিন অপর এক ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেয়াল নির্মাণকারী ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন: আজ কুরআনের কী নাযিল হয়েছে? অপরজন বললেন: "মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় নিকটবর্তী হয়েছে, অথচ তারা উদাসীনতায় বিমুখ হয়ে আছে" নাযিল হয়েছে। তখন তিনি নির্মাণের কাজ থেকে হাত ঝেড়ে ফেললেন এবং বললেন: আল্লাহর কসম, আমি আর কখনোই দেয়াল নির্মাণ করব না যখন হিসাব নিকটবর্তী হয়েছে। 'ইকতারাযা' শব্দের অর্থ হলো সময় নিকটবর্তী হওয়া।(১).

দেখুন খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৬ এবং পরবর্তী অংশ।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা

ইবনে আল-মুনজির এবং ইবনে আবি হাতিম কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন (মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে) (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১) নাজিল হলো, তখন কিছু লোক বলল: ‘নিশ্চয়ই কিয়ামত ঘনিয়ে এসেছে।’ ফলে তারা মন্দ কাজ থেকে বিরত হলো। তারা অল্পকাল বিরত থাকল, তারপর পুনরায় তাদের মন্দ কর্মে লিপ্ত হলো। তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন (আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে, সুতরাং তোমরা তা ত্বরান্বিত করতে চেও না) (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১)। তখন বিভ্রান্ত লোকেরা বলল: ‘এই তো আল্লাহর নির্দেশ এসে পড়েছে।’ ফলে তারা পুনরায় বিরত হলো, অতঃপর আবার তাদের মন্দ চক্রান্তে ফিরে গেল।

তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াতটি নাজিল করলেন: আর যদি আমি তাদের থেকে আজাব একটি নির্ধারিত উম্মত (সময়) পর্যন্ত পিছিয়ে দিই।ইবনে জারির এবং ইবনে আল-মুনজির ‘নির্ধারিত উম্মত’ শব্দের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, এর অর্থ হলো: একটি নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত।ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শায়খ কাতাদাহ (রা.) থেকে তারা অবশ্যই বলবে যে, কিসে একে আটকে রেখেছে? আয়াত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: তারা এটি অস্বীকার করার জন্য এবং একে তুচ্ছ জ্ঞান করে বলত।ইবনে আবি হাতিম আস-সুদ্দী (রা.) থেকে আল্লাহর এই বাণী তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা-ই তাদের ওপর আপতিত হলো প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: তারা যে আজাব নিয়ে উপহাস করত, সেই আজাবই তাদের ওপর আপতিত হয়েছে।ইবনে জারির এবং আবুশ শায়খ ইবনে জুরাইজ (রা.) থেকে আল্লাহর এই বাণী আর যদি আমি মানুষকে আমার পক্ষ থেকে রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই... আয়াতাংশ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন।তিনি বলেন: হে আদম সন্তান!

যখন তোমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সচ্ছলতা, নিরাপত্তা এবং সুস্থতার কোনো নেয়ামত থাকে, তখন তুমি তার প্রতি অকৃতজ্ঞ হও। আর যখন তা তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন তুমি অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়ো।