হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিতধর্ম

বৈদিক সাহিত্য, ধর্ম ও সমাজ (Vedic Literature, Religion and Society) – খণ্ড ১: সংহিতা, দেবতা, যজ্ঞ ও প্রাচীন বৈদিক সমাজ

ভূমিকা

প্রাচীন ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তন অনুধাবনের ক্ষেত্রে বৈদিক সাহিত্য (Vedic Literature) এক অপরিহার্য ও জটিল আকরগ্রন্থ। ধর্মতাত্ত্বিক বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার আলোকে বিচার করলে এই সুবিশাল পাঠসমগ্র কোনো অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক উৎস থেকে উৎসারিত নয়; বরং এটি ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগীয় দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানবসমাজের বস্তুগত জীবন, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রত্যক্ষ সাহিত্যিক দলিল। প্রথাগত ধর্মতত্ত্বে এই সাহিত্যকে শাশ্বত, অভ্রান্ত ও অপৌরুষেয় (Authorless/Apauruṣeyatva) বলে দাবি করা হলেও আধুনিক ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব (Historical Linguistics) এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, এই গ্রন্থাবলি বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে গড়ে ওঠা বহুস্তরীয় সংকলন। প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) কিংবা ঐতিহাসিক ডি. ডি. কোসাম্বীর (D. D. Kosambi) গবেষণা স্পষ্ট করে দেখিয়েছে যে, ইন্দো-ইউরোপীয় ও বিশেষত ইন্দো-ইরানীয় ভাষা পরিবার (Indo-Iranian Language Family) থেকে পৃথক হওয়া এক যাযাবর ও পশুপালক জনগোষ্ঠীর গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে অভিবাসন ও স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে সংমিশ্রণের পটভূমিতেই এই সাহিত্যের উন্মেষ ঘটেছিল।

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংহিতা সাহিত্যের প্রাচীনতম স্তরটির সাথে প্রাচীন পারস্যের আবেস্তার ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বিদ্যমান, যা এই পাঠগুলোর ঐতিহাসিক ও পার্থিব চরিত্রকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। ফলে এই সাহিত্য পর্যালোচনার মূল ভিত্তি কোনো আধিভৌতিক বিশ্বাস নয়, বরং বস্তুগত সংস্কৃতি (Material Culture) ও সমাজবিজ্ঞানের তুলনামূলক পদ্ধতি। প্রাচীন এই জনগোষ্ঠীর কাছে ভাষা ছিল নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং প্রাকৃতিক শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক প্রযুক্তি। তাদের তৈরি মৌখিক ঐতিহ্য (Oral Tradition) ও অত্যন্ত কঠোর ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics) ভিত্তিক পাঠরক্ষা পদ্ধতি ছিল মূলত কোনো অলৌকিক পবিত্রতার প্রমাণ নয়, বরং লিখনপদ্ধতিহীন একটি প্রাক-রাষ্ট্রীয় সমাজে নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও মতাদর্শ টিকিয়ে রাখার সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল। সংহিতা সাহিত্যকে বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ না করে তার পেছনে থাকা উৎপাদন পদ্ধতি (Mode of Production) – যা প্রধানত গবাদি পশুভিত্তিক পশুপালন থেকে ধীরে ধীরে স্থায়ী কৃষি ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের দিকে ধাবিত হচ্ছিল – তার আলোকে পাঠ করা প্রয়োজন।

এই সাহিত্যের মাধ্যমে সূচিত হওয়া মতাদর্শিক রূপান্তর কেবল দেব-দেবীর স্তুতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা তৎকালীন গোত্রভিত্তিক সমাজকে ভেঙে একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক স্তরবিন্যাস (Social Stratification) ও ক্ষমতার কেন্দ্রায়নের দিকে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। দেবতাদের তুষ্ট করার যে আকুলতা এখানে পরিলক্ষিত হয়, তা আদিম মানুষের প্রকৃতির অজানা বৈরী শক্তির প্রতি ভীতি এবং পার্থিব সম্পদ – বিশেষ করে পশু, খাদ্যশস্য, সন্তান ও দীর্ঘায়ু – লাভের এক তীব্র অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ফলে বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়নের আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা কোনো আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের মধ্যে নয়, বরং একটি প্রাচীন মানবগোষ্ঠী কীভাবে বস্তুগত অভাব ও প্রাকৃতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে তাদের ধর্মীয় বয়ান, আচার এবং সামাজিক আধিপত্যের কাঠামো তৈরি করেছিল – তার নির্মোহ ও ঐতিহাসিক ব্যবচ্ছেদের মধ্যেই নিহিত।

বৈদিক সাহিত্যের পরিচয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (Introduction and Historical Context of Vedic Literature): উৎস, কালক্রম, ভাষা ও পাঠপরম্পরা

বৈদিক সাহিত্যের পরিচয় (Introduction to Vedic Literature): ধারণা, পরিধি, বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণিবিন্যাস

বৈদিক সাহিত্যের উৎপত্তি ও মৌলিক ধারণা (Origin and Basic Concept of Vedic Literature)

প্রাচীন যুগের মানুষ যখন প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, তখন তাদের মনে ভয় আর বিস্ময় দুই-ই একসঙ্গে কাজ করত। ঝড়, বজ্রপাত, নদীর গতি কিংবা বনের দাবানল – এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তাদের জানা ছিল না। সেই না-জানা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় স্তুতি ও গান। বৈদিক সাহিত্যের সূচনা আসলে এই ধরনের পার্থিব প্রয়োজন ও মানবিক প্রতিক্রিয়া থেকে। সংস্কৃত ‘বিদ্ বা জানা’ ধাতু থেকে বেদ (Veda) শব্দের উৎপত্তি, যার সরাসরি অর্থ দাঁড়ায় জ্ঞান। প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিকরা এই সাহিত্যকে কোনো মানুষের রচনা বলে স্বীকার করতে চাননি। তাদের দাবি ছিল, এটা অপৌরুষেয়, কোনো মানবসন্তানের হাত দিয়ে এটা তৈরি হয়নি। তবে আধুনিক একাডেমিক গবেষণায় এই দাবির কোনো বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তি পাওয়া যায় না। ভাষাতত্ত্ববিদ মরিৎস উইন্টারনিৎস (Moriz Winternitz) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই সুবিশাল সাহিত্য কোনো একক গ্রন্থ নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুখে মুখে প্রচলিত থাকা এক বিশাল সাহিত্যধারা (Winternitz, 1907)।

যাযাবর ও পশুপালক জনগোষ্ঠীর যাজক এবং কবিরা নিজেদের গোত্রের স্বার্থে এই মন্ত্রগুলো তৈরি করেছিলেন। তারা যখন নতুন চারণভূমির সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন, তখন নিরাপত্তার জন্য দেবতার সাহায্য কল্পনা করতেন। এই সাহিত্যকে বুঝতে হলে সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে সামনে রাখতে হবে। সেখানে কোনো রহস্যময় আধ্যাত্মিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত সুস্থ শরীর, প্রচুর গবাদি পশু এবং শত্রু গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের আকাঙ্ক্ষা। গবেষক আর্থার অ্যান্টনি ম্যাকডোনেল (Arthur Anthony Macdonell) এই সাহিত্যের আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, প্রাচীনতম বৈদিক স্তোত্রগুলোর বড় অংশই আসলে প্রকৃতির বিভিন্ন রূপকে দেওয়া মানবিক রূপ ছাড়া আর কিছু নয় (Macdonell, 1900)। মানুষ যেভাবে নিজের চেয়ে শক্তিশালী কাউকে দেখলে উপহার দিয়ে খুশি করতে চায়, বৈদিক কবিরাও অগ্নির মাধ্যমে দেবতাদের উদ্দেশ্যে ঠিক সেভাবেই ঘৃত ও সোমরস নিবেদন করতেন।

প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যবাহী সমাজ এই সাহিত্যকে শ্রুতি (Śruti) নামে অভিহিত করে। এর অর্থ যা কানে শোনা হয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে এগুলো লিখে রাখা হয়নি, এক প্রজন্ম মুখে উচ্চারণ করত আর পরের প্রজন্ম তা শুনে শুনে মুখস্থ করে রাখত। জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলার (Max Müller) তার এ হিস্ট্রি অব অ্যানশিয়েন্ট সংস্কৃত লিটারেচার (A History of Ancient Sanskrit Literature) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ঠিক কীভাবে এই বিশাল মৌখিক ঐতিহ্য প্রাচীন ভারতীয় মনন গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল (Müller, 1859)। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই সাহিত্যকে চিরন্তন সত্য বলে দাবি করা হলেও, ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায় এটা নির্দিষ্ট এক ঐতিহাসিক সময়ের সমাজচিত্র। বিশেষ করে পিতৃতান্ত্রিক গোত্র ব্যবস্থার ভেতর দাঁড়িয়ে ক্ষমতা ও সম্পদ বণ্টনের যে তাগিদ তৈরি হয়েছিল, তার বয়ানই এই সাহিত্যের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে।

ফলে বৈদিক সাহিত্যের ধারণাটি কোনো আকাশ থেকে পড়া অলৌকিক বিষয় নয়। একে বুঝতে হয় একদল মানুষের টিকে থাকার লড়াই ও প্রকৃতির সাথে তাদের বোঝাপড়ার চেষ্টা হিসেবে। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা এই সাহিত্যকে প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিকাশের প্রাথমিক স্তর হিসেবে গণ্য করেন। গোড়ার দিকের এই রচনায় কোনো সুবিন্যস্ত মন্দির, মূর্তি বা মূর্তিপূজার ধারণা ছিল না। যা ছিল তা হলো খোলা আকাশের নিচে প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড এবং তাকে ঘিরে সমবেত হওয়া কিছু গোত্রপতি ও তাদের স্তোত্রপাঠ। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে বৈদিক সাহিত্যকে কেবল রহস্যময় অতিন্দ্রীয়বাদ দিয়ে বিচার করলে এর ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গুরুত্ব হারিয়ে যায়।

বৈদিক সাহিত্যের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পরিধি (Geographical and Historical Scope of Vedic Literature)

বৈদিক সাহিত্যের পরিধি স্থান ও কালের দিক থেকে বেশ বিস্তৃত। এর ভৌগোলিক পটভূমি শুরু হয়েছিল সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে, যা আধুনিককালের পূর্ব আফগানিস্তান, পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের ভূখণ্ডকে নির্দেশ করে। ঋগ্বেদের নদীস্তুতি অংশে যেসব নদীর নাম পাওয়া যায় – যেমন কুভা (কাবুল), সুবাস্তু (সোয়াত), সিন্ধু, বিতস্তা (ঝিলাম), অসিক্নী (চেনাব) এবং সরস্বতী – তা পাঠ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় রচয়িতারা কোন অঞ্চলে বিচরণ করতেন। প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) বৈদিক ভূগোলের পুঙ্খানুপুঙ্খ মানচিত্র তৈরি করে দেখিয়েছেন, সাহিত্যের কালক্রম যত এগিয়েছে, জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক অবস্থানও তত পূর্ব দিকে, অর্থাৎ গঙ্গা ও যমুনার দোয়াব অঞ্চলের দিকে সরে গেছে (Witzel, 1995)। ঋগ্বেদের একেবারে প্রাথমিক অংশে গঙ্গার উল্লেখ নামমাত্র, কিন্তু পরবর্তী সংহিতাগুলোতে গঙ্গা ও যমুনাই হয়ে উঠেছে প্রধান কেন্দ্র।

ঐতিহাসিক সময়কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈদিক সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে এক অমীমাংসিত বিতর্কের ক্ষেত্র। উনিশ শতকে ম্যাক্স মুলার এই সাহিত্যের প্রাচীনতম অংশকে আনুমানিক ১২০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বলে ধরে নিয়েছিলেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এই সময়সীমাকে আরো কিছুটা পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন, বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন স্তরের সূচনা আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং এর বিকাশকাল চলেছে প্রায় ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার (Romila Thapar) তার ফ্রম লিনিয়েজ টু স্টেট (From Lineage to State) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, এই দীর্ঘ সময়ে বৈদিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল (Thapar, 1984)। একটি যাযাবর পশুপালক সমাজ ধীরে ধীরে থিতু হয়ে স্থায়ী কৃষিজীবী সমাজে পরিণত হয়েছিল, আর সেই রূপান্তরের ছায়া সরাসরি পড়েছে সাহিত্যের ভৌগোলিক ও বিষয়গত পরিধিতে।

ভূগোলের এই পরিবর্তন কোনো শান্তিময় প্রক্রিয়ায় ঘটেনি। নতুন অঞ্চলে বসতি স্থাপনের সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে বৈদিক আর্যদের সংঘাতের বহু বিবরণ এই সাহিত্যে ছড়িয়ে আছে। দস্যু ও দাস হিসেবে যাদের উল্লেখ করা হয়েছে, তারা ছিলেন সেই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের সাথে এই সাহিত্যের বর্ণনা মেলাতে গিয়ে গবেষকরা উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্তরে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতি (Painted Grey Ware Culture) বা পিজিডব্লিউ-এর সন্ধান পেয়েছেন। প্রত্নতত্ত্ববিদ অ্যাস্কো পার্পোলা (Asko Parpola) ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সমন্বয় ঘটিয়ে দেখিয়েছেন, বৈদিক সাহিত্যের পরবর্তী স্তরের সাথে গাঙ্গেয় উপত্যকার এই নতুন মৃৎপাত্র সংস্কৃতির গভীর যোগাযোগ রয়েছে (Parpola, 2015)। ভৌগোলিক এই সম্প্রসারণ বৈদিক সাহিত্যকে শুধু নতুন স্থানই দেয়নি, নতুন নতুন জীবিকা ও উদ্ভিদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

সুতরাং ভৌগোলিক পরিধির বিস্তার কেবল মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, এটা ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার এক বড় বিবর্তন। সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে পশুচারণ ছিল অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি, কিন্তু পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে ধান ও গম চাষের প্রয়োজনীয়তা প্রধান হয়ে ওঠে। সাহিত্যের ভাষা ও বিষয়ের মধ্যেও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। প্রাথমিক স্তরের স্তোত্রগুলোতে যেখানে অশ্ব ও গাভীর জন্য প্রার্থনা বেশি, পরবর্তী সংহিতাগুলোতে সেখানে উর্বর জমি, বৃষ্টি এবং কৃষিজীবী প্রজার ওপর রাজার কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রার্থনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক ব্যাপ্তিটি না বুঝলে বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পরিবর্তনগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

পাঠের মৌখিক ঐতিহ্য ও সংরক্ষণ পদ্ধতি (Oral Tradition and Preservation Techniques of the Texts)

বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এর পাঠসংরক্ষণ পদ্ধতি। হাজার বছর ধরে একটি বিশাল সাহিত্য কেবল মানুষের কণ্ঠ ও স্মৃতির ওপর নির্ভর করে টিকে ছিল, এটা ভাবলে সাধারণ মানুষের অবাক লাগতেই পারে। প্রাচীন ভারতে লিখনপদ্ধতি জানা না-থাকা কিংবা লেখার উপকরণ সহজলভ্য না-হওয়ার কারণে এই স্মৃতিভিত্তিক পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল। তবে এর পেছনে কোনো অলৌকিক শক্তি কাজ করেনি, কাজ করেছিল কঠোর ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে বাঁধা ব্যাকরণ ও ধ্বনিতত্ত্ব। ফরাসি ভারততত্ত্ববিদ লুই রেনু (Louis Renou) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, বৈদিক পাঠের এই সংরক্ষণ পদ্ধতি মানব ইতিহাসের অন্যতম নিখুঁত মৌখিক ঐতিহ্য (Renou, 1953)। সামান্য একটি স্বর বা মাত্রার হেরফের যাতে না ঘটে, সেজন্য পুরোহিতরা অত্যন্ত কঠোর অনুশাসন তৈরি করেছিলেন।

এই পাঠপদ্ধতির প্রথম ধাপ ছিল সংহিতাপাঠ (Saṃhitāpāṭha), যেখানে বাক্যগুলো স্বাভাবিক সন্ধিবদ্ধ নিয়মে পরপর আবৃত্তি করা হতো। এরপর তৈরি করা হলো পদপাঠ (Padapāṭha), যার উদ্ভাবক ছিলেন প্রাচীন ব্যাকরণবিদ শাকল্য (Śākalya)। পদপাঠে প্রতিটি শব্দকে সন্ধিমুক্ত করে আলাদা করে ফেলা হতো, যাতে মূল শব্দের রূপটি চিনে নিতে কোনো অসুবিধা না হয়। তবে তারা এখানেই থেমে যাননি। পাঠের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্ভাবন করা হলো অত্যন্ত জটিল বিকৃতিপাঠ। এর মধ্যে ছিল ক্রমপাঠ (Kramapāṭha), যেখানে শব্দগুলোকে জোড়ায় জোড়ায় পড়া হতো – যেমন প্রথম ও দ্বিতীয় শব্দ, তারপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শব্দ। এছাড়া আরও জটিল পাঠরীতি ছিল, যেমন জটাপাঠ (Jaṭāpāṭha) এবং ঘনপাঠ (Ghanapāṭha)। ঘনপাঠে শব্দগুলোকে সামনে ও পেছনে নানাভাবে উল্টেপাল্টে আবৃত্তি করতে হতো, যার ফলে একটি বর্ণও স্থানচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না।

এই জটিল পদ্ধতির পেছনে শুধু সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা ছিল না, ছিল গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। জ্ঞানকে একটি নির্দিষ্ট যাজক শ্রেণির নিজস্ব সম্পত্তিতে পরিণত করার জন্য এই মৌখিক গোপনীয়তা খুব কার্যকর হাতিয়ার ছিল। ভারততত্ত্ববিদ ইয়োহানেস ব্রনখহর্স্ট (Johannes Bronkhorst) তার গ্রেটার মগধ (Greater Magadha) গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে বৈদিক সম্প্রদায় তাদের এই পাঠরীতিকে সামাজিক কর্তৃত্ব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখার কাজে ব্যবহার করত (Bronkhorst, 2007)। মুখস্থ করার এই প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং এর জন্য প্রয়োজন হতো বছরের পর বছর ধরে গুরুগৃহে অবস্থান। ফলে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে এই শিক্ষার নাগাল পাওয়া অসম্ভব ছিল।

পাঠসংরক্ষণের এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপটি টিকে ছিল বিভিন্ন শাখা (Śākhā) ও চরণের মাধ্যমে। প্রতিটি বৈদিক পরিবারের দায়িত্ব ছিল তাদের নির্দিষ্ট বংশের পাঠটি নিখুঁতভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে শিখিয়ে যাওয়া। এই নিয়মের ফলে আধুনিককালে যখন বৈদিক পাণ্ডুলিপিগুলো সংগ্রহ করে ছাপানো শুরু হলো, তখন দেখা গেল ভারতের কাশ্মীর থেকে কেরালা পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পাঠের মধ্যে সামান্যতম পার্থক্যও নেই। এই তথ্যটি কোনো ঐশ্বরিক মহিমা তুলে ধরে না, বরং এটা তুলে ধরে প্রাচীন মানুষের স্মৃতিশক্তি ও তাদের পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার অসাধারণ ক্ষমতা। ধর্মীয় গোঁড়ামির আবরণ সরিয়ে দেখলে এই পাঠপদ্ধতি মূলত মানব মস্তিষ্কের ক্ষমতা ও ভাষাগত নিয়ন্ত্রণের এক বাস্তব উদাহরণ।

বৈদিক সাহিত্যের ভাষাতাত্ত্বিক ও শৈলীগত বৈশিষ্ট্য (Linguistic and Stylistic Characteristics of Vedic Literature)

বৈদিক সাহিত্যের ভাষা ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত থেকে বেশ আলাদা। এই প্রাচীন ভাষাকে ভাষাতত্ত্ববিদরা বৈদিক সংস্কৃত বলে অভিহিত করেন। এটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের এক অত্যন্ত প্রাচীন শাখা। ভাষাবিজ্ঞানী টমাস বারো (Thomas Burrow) তার দ্য সংস্কৃত ল্যাঙ্গুয়েজ (The Sanskrit Language) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বৈদিক ভাষার ব্যাকরণিক রূপ ধ্রুপদী সংস্কৃতের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় ও জটিল ছিল (Burrow, 1955)। এতে এমন বহু শব্দরূপ ও প্রত্যয় পাওয়া যায়, যা পরবর্তীকালের পাণিনীয় ব্যাকরণে অপ্রচলিত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বৈদিক ক্রিয়াপদের রূপ ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। একটি মাত্র ধাতুর বহু রকমের অতীত ও বর্তমানের রূপ এখানে দেখা যায়, যা প্রমাণ করে ভাষাটি তখনো মানুষের মুখের ভাষায় সজীব ছিল এবং একটি কৃত্রিম মান্য রূপ লাভ করেনি।

বৈদিক ভাষার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বরভঙ্গি বা সুরের ব্যবহার। একে বলা হতো স্বর (Svara)। গ্রিক বা প্রাচীন লাতিনের মতো বৈদিক ভাষাতেও শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটত সুরের ওঠানামার ওপর ভিত্তি করে। প্রধান স্বর ছিল তিনটি – উদাত্ত (Udātta) বা উচ্চ সুর, অনুদাত্ত (Anudātta) বা নিম্ন সুর, এবং স্বরিত (Svarita) বা মধ্যবর্তী সুর। যজ্ঞের সময় ভুল সুরে মন্ত্র উচ্চারণ করলে ফল বিপরীত হতে পারে – এমন একটি বিশ্বাস সমাজে তৈরি করা হয়েছিল। এই বিশ্বাসের ফলে ভাষা তার ধ্বনিগত বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ইন্দো-ইউরোপীয় ধারণার বিশেষজ্ঞ কলিন রেনফ্রিউ (Colin Renfrew) ভাষার এই প্রাচীন রূপটিকে প্রাচীন গ্রিক ও আবেস্তান ভাষার সমান্তরাল এক গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Renfrew, 1987)। আবেস্তার গাথা অংশের ভাষার সাথে বৈদিক সংস্কৃতের মিল এত বেশি যে, কেবল ধ্বনি পরিবর্তনের কয়েকটি নিয়ম প্রয়োগ করলেই একটিকে অন্যটিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

বৈদিক কাব্যের শৈলী মূলত ছন্দোবদ্ধ। ছন্দের বাইরে কোনো মন্ত্র রচিত হতো না বললেই চলে। বৈদিক কবিরা প্রধানত তিনটি ছন্দ বেশি ব্যবহার করতেন – গায়ত্রী (Gāyatrī), ত্রিষ্টুপ (Triṣṭubh) এবং জগতী (Jagatī)। গায়ত্রী ছন্দে আটটি করে বর্ণ নিয়ে তিনটি চরণ গঠিত হতো, আর ত্রিষ্টুপ ছন্দে এগারোটি করে বর্ণের চারটি চরণ থাকত। এই ছন্দগুলো ছিল অত্যন্ত সুষম ও গীতিধর্মী। যজ্ঞের আগুনের সামনে বসে কবিরা যখন এই ছন্দোবদ্ধ স্তোত্র গাইতেন, তখন শব্দের ধ্বনি এক বিশেষ গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করত। কবিতার উপমাগুলো নেওয়া হতো তাদের চারপাশের চেনা জগৎ থেকে। সেখানে ভোরবেলাকে তুলনা করা হতো সুন্দর পোশাক পরা তরুণীর সাথে, আর দ্রুতগামী নদীকে তুলনা করা হতো বাঁধনভাঙা অশ্বের সাথে।

তবে বৈদিক ভাষা যে সম্পূর্ণ অমিশ্র ছিল, তা নয়। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, বৈদিক ভাষার গভীরে স্থানীয় দ্রাবিড় ও অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার কিছু প্রভাব রয়েছে। ভাষাটির মধ্যে বেশ কিছু মূর্ধন্য ধ্বনি (Retroflex Consonants) এবং এমন কিছু শব্দ রয়েছে যার কোনো ইন্দো-ইউরোপীয় উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে, ভারতে আসার পর স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে মেলামেশা ও ভাষা বিনিময়ের ফলেই এই উপাদানগুলো বৈদিক ভাষার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। এটি সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা দেখায় একটি অভিবাসী জনগোষ্ঠী কীভাবে ধীরে ধীরে স্থানীয় মাটির সাথে মিশে গিয়ে তাদের সাহিত্যভাষাকে গড়ে তুলেছিল।

চতুর্বেদ ও সংহিতার শ্রেণিবিন্যাস (Classification of the Four Vedas and Samhitas)

ঐতিহ্যগতভাবে বৈদিক সাহিত্য চার ভাগে বিভক্ত, যা চতুর্বেদ নামে পরিচিত। এই চারটি ভাগ হলো ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ। প্রতিটি বেদের মূল কাব্যিক বা মন্ত্রের অংশটিকে বলা হয় সংহিতা। ভারততত্ত্ববিদ জান গোন্দা (Jan Gonda) তার সুবিশাল গবেষণায় বৈদিক সংহিতাগুলোর এই শ্রেণিবিন্যাসকে কাজের সুবিধার জন্য গড়ে ওঠা এক ধর্মীয় শ্রমবিভাগ হিসেবে দেখেছেন (Gonda, 1975)। যজ্ঞের কাজ যখন দিন দিন জটিল হতে শুরু করল, তখন একজন পুরোহিতের পক্ষে সমস্ত দায়িত্ব সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সৃষ্টি হলো পৃথক দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্ব অনুযায়ী ভাগ হয়ে গেল গ্রন্থগুলো। এই বিভাজন প্রাচীন ভারতের সমাজকাঠামো ও পুরোহিততন্ত্রের পেশাগত বিভাজনের বাস্তব ইতিহাস প্রকাশ করে।

চারটি সংহিতার চরিত্র ও বিষয়বস্তু একে অপরের থেকে যথেষ্ট ভিন্ন:

  • ঋগ্বেদ সংহিতা (Ṛgveda Saṃhitā): বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতম অংশ। এতে দশটি মণ্ডলে মোট ১,০২৮টি সূক্ত রয়েছে। প্রধানত অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ ও সোম দেবতার উদ্দেশ্যে রচিত স্তোত্র দিয়ে এই গ্রন্থ সাজানো হয়েছে। যজ্ঞের সময় এই স্তোত্রগুলো আবৃত্তি করার দায়িত্ব ছিল হোতা (Hotṛ) নামের পুরোহিতের।
  • সামবেদ সংহিতা (Sāmaveda Saṃhitā): একে বলা যায় গানের সংকলন। এর প্রায় সব মন্ত্রই ঋগ্বেদ থেকে নেওয়া, কেবল সুর দিয়ে গাওয়ার উপযোগী করে সাজানো। যজ্ঞে সোমরস প্রস্তুত ও নিবেদনের সময় উদ্গাতা (Udgātṛ) পুরোহিত বিশেষ সুরে এই সামগান করতেন।
  • যজুর্বেদ সংহিতা (Yajurveda Saṃhitā): এটি যজ্ঞের ব্যবহারিক নির্দেশিকা। যজ্ঞের বেদি কীভাবে বানাতে হবে, পশুবলি কীভাবে দিতে হবে এবং কোন সময়ে কী মন্ত্র পড়তে হবে – তার গদ্যময় সূত্র এতে স্থান পেয়েছে। এই যজ্ঞ পরিচালনা করতেন অধ্বর্যু (Adhvaryu) নামের পুরোহিত। এটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত – কৃষ্ণ যজুর্বেদ ও শুক্ল যজুর্বেদ।
  • অথর্ববেদ সংহিতা (Atharvaveda Saṃhitā): অন্য তিন বেদের থেকে এর সুর সম্পূর্ণ আলাদা। এতে উচ্চমার্গের দেবতাদের স্তুতির চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের রোগব্যাধি, সাপের কামড়, শত্রুনাশ, প্রেম ও জাদুমন্ত্রের ছড়া বেশি দেখা যায়। এই বেদকে তদারকি করতেন প্রধান পুরোহিত, যার নাম ছিল ব্রহ্মা (Brahman)।

আমেরিকান ভারততত্ত্ববিদ মরিস ব্লুমফিল্ড (Maurice Bloomfield) অথর্ববেদের ওপর তার প্রামাণ্য গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রাচীন সমাজে এই বেদের স্থান দীর্ঘকাল ধরে অন্য তিন বেদের সমান ছিল না (Bloomfield, 1899)। বহু প্রাচীন গ্রন্থে কেবল প্রথম তিন বেদকে একসাথে ত্রয়ী (Trayī) বলা হয়েছে। এর কারণ ছিল সুস্পষ্ট; প্রথম তিনটি বেদ গড়ে উঠেছিল সমাজের উচ্চশ্রেণির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে, আর অথর্ববেদ যুক্ত ছিল সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বিশ্বাস ও জাদুবিদ্যার সাথে। পরবর্তীতে অথর্ববেদের অন্তর্ভুক্তি এটাই প্রমাণ করে যে, লোকজ সংস্কৃতিকে বৈদিক কাঠামোর ভেতর টেনে এনে এক বৃহত্তর সামাজিক সমঝোতা তৈরি করা তখন জরুরি হয়ে পড়েছিল।

এই শ্রেণিবিন্যাসের ভেতর দিয়ে বৈদিক পুরোহিতদের চার ধরনের কাজের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ স্পষ্ট হয়। যজ্ঞের কর্মকাণ্ড কেবল একটি ধর্মীয় বিষয় ছিল না, এর সাথে জড়িত ছিল প্রচুর পরিমাণে দক্ষিণার আদান-প্রদান। গরু, ঘোড়া, সোনা ও খাদ্যশস্যের এই পুনর্বণ্টন প্রাচীন অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চাকা ছিল। তাই সংহিতাগুলোর এই বিভাজন নিছক কোনো সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ নয়, বরং তা ছিল প্রাচীন সমাজের শ্রমবণ্টন ও ক্ষমতার বিন্যাস। চার বেদের এই নির্দিষ্ট ভূমিকাগুলো বৈদিক সমাজকে একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সাহায্য করেছিল।

যজ্ঞীয় কাঠামো, সমাজ ও উত্তর-সংহিতা সাহিত্য (Ritual Framework, Society, and Post-Samhita Literature)

সংহিতা সাহিত্য দিয়ে বৈদিক যুগের যে সূচনা হয়েছিল, তা সেখানেই থেমে থাকেনি। কালক্রমে এই সাহিত্য চারটি প্রধান স্তরে রূপ নেয় – সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদ। সংহিতার পরবর্তী স্তরের এই সাহিত্যগুলোকে বলা যায় উত্তর-সংহিতা সাহিত্য। সংহিতার মন্ত্রগুলো কীভাবে যজ্ঞে প্রয়োগ করতে হবে, তার ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু হলো ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) গ্রন্থে। এগুলো মূলত গদ্যে লেখা এবং এখানে যজ্ঞের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের এক ধরনের প্রতীকী ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়েছিল। ধর্মের এই প্রচণ্ড আনুষ্ঠানিকতা সমাজের সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী (Damodar Dharmanand Kosambi) দেখিয়েছেন, সংহিতা থেকে ব্রাহ্মণ সাহিত্যে রূপান্তরের এই পর্বটি আসলে লোহার ব্যবহারের বিস্তার এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত (Kosambi, 1956)।

যজ্ঞ কেবল পারিবারিক বা গোত্রীয় শান্তির জন্য হতো না, রাজন্যবর্গের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্যও বিরাট বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করা হতো। রাজসূয় (Rājasūya), অশ্বমেধ (Aśvamedha) এবং বাজপেয় (Vājapeya) যজ্ঞের মতো রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলো ছিল সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক মহড়া। সেখানে শত শত পশু বলি দেওয়া হতো এবং বিপুল সম্পদ পুরোহিতদের মধ্যে দান করা হতো। ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা (Ram Sharan Sharma) তার মেটেরিয়াল কালচার অ্যান্ড সোশ্যাল ফরমেশনস ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া (Material Culture and Social Formations in Ancient India) গ্রন্থে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন, কীভাবে এই যজ্ঞীয় কাঠামোর মাধ্যমে উদ্বৃত্ত ফসল ও সম্পদ একটি ক্ষুদ্র শাসক ও পুরোহিত শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হতো (Sharma, 1983)। এই সময়েই বৈদিক সমাজ তার আদিম সাম্যবাদী বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে এবং সমাজে চার বর্ণের স্তরবিন্যাস গভীরভাবে গেঁথে বসে।

যজ্ঞের এই যান্ত্রিক ও ব্যয়বহুল রূপ একসময় বুদ্ধিবৃত্তিক অসন্তোষের জন্ম দেয়। ব্রাহ্মণ সাহিত্যের অতি-আচারসর্বস্বতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বনের নির্জনতায় জন্ম নিল আরণ্যক (Āraṇyaka) সাহিত্য। আরণ্যকের চিন্তাবিদরা বাহ্যিক যজ্ঞের চেয়ে যজ্ঞের ভেতরের প্রতীকী অর্থ নিয়ে বেশি ভাবতে শুরু করলেন। সেই ভাবনারই চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল উপনিষদ (Upaniṣad) সাহিত্যে। গবেষক ব্রায়ান কে. স্মিথ (Brian K. Smith) তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা মূলত মহাবিশ্ব এবং মানবদেহের মধ্যে একটি কৃত্রিম সাদৃশ্য তৈরির চেষ্টা করেছিল (Smith, 1994)। উপনিষদে এসে সেই সাদৃশ্য এক চূড়ান্ত বিমূর্ত রূপ লাভ করে, যেখানে দেবতারা অপ্রধান হয়ে যায় এবং প্রধান হয়ে ওঠে আত্ম ও ব্রহ্মের ঐক্য সম্পর্কিত দার্শনিক বিতর্ক।

সব মিলিয়ে বৈদিক সাহিত্যের এই দীর্ঘ পথচলা প্রাচীন ভারতীয় সমাজের রাজনৈতিক রূপান্তরের এক জীবন্ত দলিল। একটি সাধারণ যাযাবর পশুপালক জনগোষ্ঠী কীভাবে গাঙ্গেয় উপত্যকায় এসে শক্তিশালী রাজতন্ত্র ও বর্ণাশ্রমভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলল, তার প্রতিটি ধাপ সংহিতা থেকে উপনিষদ পর্যন্ত সাহিত্যে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কোনোরকম আধ্যাত্মিক মোহ বা ভাবাবেগ ছাড়া যদি এই সাহিত্য পাঠ করা যায়, তবে দেখা যাবে এটি মানব ইতিহাসের এমন এক পর্যায়কে তুলে ধরে, যেখানে মানুষের টিকে থাকার আদিম লড়াই, ক্ষমতার লোভ, সামাজিক বৈষম্যের সূচনা এবং শেষ পর্যন্ত জগতের নিয়ম বোঝার দার্শনিক কৌতূহল মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

বৈদিক যুগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (Historical Context of the Vedic Age): ইন্দো-আর্য, বসতি ও সামাজিক রূপান্তর

ইন্দো-আর্য বিতর্ক ও ভাষাতাত্ত্বিক অভিপ্রয়াণ (Indo-Aryan Debate and Linguistic Migration)

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একদল মানুষের চলাচল ও তাদের মুখের ভাষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পণ্ডিতদের মধ্যে তুমুল তর্ক চলেছে। একসময় ধারণা করা হতো, বাইরে থেকে ঘোড়ায় চড়ে একদল যোদ্ধা এসে সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্টিমার হুইলার এই ধারণাকে সামনে এনেছিলেন এবং ইন্দ্রের বিরুদ্ধে হরপ্পা ধ্বংসের অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ভি. গর্ডন চাইল্ড (V. Gordon Childe) তার গবেষণায় দেখিয়েছিলেন যে, কোনো অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন কেবল আকস্মিক রক্তক্ষয়ী আক্রমণের মাধ্যমে ঘটে না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদী জনগোষ্ঠীর অভিপ্রয়াণ ও সাংস্কৃতিক মেলামেশা (Childe, 1926)। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব ও জিনতত্ত্ব এখন প্রমাণ করেছে যে কোনো সামরিক আগ্রাসনের ফলে হরপ্পা ধ্বংস হয়নি, বরং পরিবেশের পরিবর্তন এবং খরার কারণে তাদের নগরজীবন ভেঙে পড়েছিল।

এর ঠিক পরবর্তী সময়েই উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটি নতুন ভাষার মানুষের আগমন লক্ষ্য করা যায়, যাদের আমরা ইন্দো-আর্য বলে চিনি। মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে এদের যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে অধিকাংশ গবেষক মনে করেন। এই জনগোষ্ঠীর মানুষ ঘোড়া পোষ মানাতে পারত এবং চাকার সাথে স্পোক যুক্ত করে দ্রুতগামী রথ চালাতে পারত। ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক জে. পি. ম্যালরি (J. P. Mallory) তার ইন সার্চ অব দ্য ইন্দো-ইউরোপিয়ান্স (In Search of the Indo-Europeans) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ইউরেশিয়ার তৃণভূমি অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দল বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল (Mallory, 1989)। তাদের একটি শাখা চলে যায় ইউরোপের দিকে, আর আরেকটি শাখা ইরান হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রবেশদ্বারে এসে পৌঁছায়। এই গতিশীলতা কোনো সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর যাত্রা ছিল না, এটা ছিল পশুপালক দলগুলোর ধাপে ধাপে নতুন চারণভূমি খোঁজার চেষ্টা।

আন্দ্রোয়ানভো সংস্কৃতি ও সিনতাশতা সংস্কৃতির প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ পরীক্ষা করলে এই অভিপ্রয়াণের বস্তুগত চিহ্নগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষক ডেভিড ডব্লিউ. অ্যান্টনি (David W. Anthony) তার বিখ্যাত দ্য হর্স, দ্য হুইল অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ (The Horse, the Wheel, and Language) গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে ঘোড়া ও হালকা রথের উদ্ভাবন এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী দলগুলোকে বিশাল দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার সুবিধা দিয়েছিল (Anthony, 2007)। মধ্য এশিয়া থেকে ব্যাকট্রিয়া-মার্গিয়ানা প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল পার হয়ে যখন এই দলগুলো হিন্দুকুশ পর্বতমালা অতিক্রম করে, তখন তারা স্থানীয় বিভিন্ন উপজাতির সংস্পর্শে আসে। এই যোগাযোগের ফলে তাদের ভাষায় এবং জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে।

তবে এই অভিপ্রয়াণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিতর্কও কম হয়নি। ভারতীয় গবেষক এবং পশ্চিমের কিছু পণ্ডিতের মধ্যে এই নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা গেছে। একাডেমিক পরিসরে সেই বিতর্কগুলোকে সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করেছেন ভারততত্ত্ববিদ এডউইন ব্রায়ান্ট (Edwin Bryant)। তিনি তার দ্য কোয়েস্ট ফর দ্য অরিজিন্স অব বৈদিক কালচার (The Quest for the Origins of Vedic Culture) গ্রন্থে দেশীয় উৎস তত্ত্ব এবং অভিবাসন তত্ত্বের সমস্ত যুক্তি নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন (Bryant, 2001)। সমস্ত তথ্য-প্রমাণ বিচার করে দেখা যায়, ভাষাতাত্ত্বিক সাক্ষ্যগুলো এখনো উপমহাদেশের বাইরে থেকে ইন্দো-আর্য ভাষার আগমনের দিকেই সবচেয়ে জোরালো নির্দেশ করে। এই মানুষগুলো কোনো উচ্চতর রক্ত বা বিশেষ জাতির প্রতিনিধি ছিল না, তারা ছিল ব্রোঞ্জ যুগের সাধারণ পশুপালক, যাদের সাথে ছিল চলনক্ষম প্রযুক্তি ও একটি বিশেষ ভাষা।

প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতি ও বস্তুগত জীবনের রূপরেখা (Archaeological Cultures and Outline of Material Life)

মাটি খুঁড়ে যা পাওয়া যায়, তার সাথে প্রাচীন সাহিত্যের বর্ণনা মেলানো সবসময় সহজ কাজ নয়। বৈদিক সাহিত্যের পাঠকদের মনে হতে পারে, বৈদিক যুগ মানেই সোনার রথ আর বিশাল যজ্ঞবেদির সমাহার। বাস্তবে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে পাওয়া ছবিটা অনেক বেশি সাদামাটা এবং শ্রমসাধ্য জীবনের সাক্ষ্য দেয়। উত্তর-পশ্চিম ভারতের সোয়াত উপত্যকায় প্রাপ্ত গান্ধার সমাধি সংস্কৃতি (Gandhara Grave Culture) থেকে দেখা যায়, সেখানকার মানুষ পাথরের পাত্র, সাধারণ তামার জিনিসপত্র এবং মাটির তৈরি পাত্র ব্যবহার করত। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ ব্রজ বাসি লাল (B. B. Lal) হস্তিনাপুর ও কুরুক্ষেত্রের মতো বৈদিক স্থানগুলোতে খননকাজ চালিয়ে দেখিয়েছেন, প্রারম্ভিক বৈদিক স্তরে কোনো সুউচ্চ অট্টালিকা বা জটিল নাগরিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল না (Lal, 1955)। যা পাওয়া গেছে তা হলো কাদামাটি দিয়ে তৈরি দেওয়াল, খড়ের চাল আর বাঁশের খুঁটির চিহ্ন।

এই যুগের বসতিগুলোকে বুঝতে হলে মৃৎপাত্রের ধরন বোঝা দরকার। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বৈদিক সময়কালের সাথে মূলত দুটি প্রধান মৃৎপাত্র ধারাকে যুক্ত করেন – গেরুয়া রঙের মৃৎপাত্র বা গেরুয়াবর্ণ মৃৎপাত্র সংস্কৃতি (Ochre Coloured Pottery) এবং ধূসর রঙের ওপর কালো নকশা করা চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র (Painted Grey Ware)। ঐতিহাসিক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী (Dilip K. Chakrabarti) ভারতের প্রাচীন ধাতুপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে উত্তর ভারতে লোহার প্রবেশ এই চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতির সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত (Chakrabarti, 1992)। লোহার তৈরি কুঠার ও তিরের ফলা তাদের বনাঞ্চল পরিষ্কার করতে এবং কৃষিকাজকে আরও বিস্তৃত করতে সাহায্য করেছিল। এটি ছিল এমন এক প্রযুক্তিগত মোড়, যা মানববসতিকে চিরতরে যাযাবর অবস্থা থেকে স্থায়ী রূপ দিয়েছিল।

তবে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সাথে সাহিত্যের বিবরণের ফারাক নিয়ে একাডেমিক মহলে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন গবেষক জিম জি. শ্যাফার (Jim G. Shaffer)। তিনি তার বিভিন্ন প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট মৃৎপাত্রের ধারা পেলেই তাকে সরাসরি ‘আর্য’ বা নির্দিষ্ট কোনো ভাষাগত গোষ্ঠীর চিহ্ন বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক (Shaffer, 1984)। প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতিগুলো মূলত স্থানীয় প্রযুক্তির ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্তরে দেখা যায়, হরপ্পা-পরবর্তী আঞ্চলিক সংস্কৃতিগুলোর সাথে নতুন প্রযুক্তিগত উপাদান ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছিল। মানুষ মাটি পুড়িয়ে পাত্র তৈরি করত, তামার ছুরি ব্যবহার করত এবং কাদার মেঝেতে গর্ত করে রান্নার চুলো বসাত। তাদের জীবন ছিল সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ঋতুচক্রের ওপর নির্ভরশীল।

গ্রামের গঠনও ছিল বেশ অগোছালো। কোনো গ্রিড প্যাটার্ন বা পাকা ড্রেন ছিল না, যা হরপ্পার নগরগুলোতে দেখা যেত। বসতিগুলো গড়ে উঠত নদী বা প্রাকৃতিক জলাশয়ের কাছাকাছি, যাতে গবাদি পশুর জন্য জল পেতে কষ্ট না হয়। ঘরের দেওয়াল তৈরি হতো নলখাগড়া ও কাদা দিয়ে, যাকে বলা হতো ছাঁচ-দেওয়াল বা ওয়াটল-অ্যান্ড-ডব পদ্ধতি। আগুনের দুর্ঘটনা ছিল নিত্যদিনের বিষয়। খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ থেকে বার্লি, তিল ও পরবর্তী স্তরে ধানের পোড়া দানার প্রমাণ পাওয়া যায়। একই সাথে মহিষ, ভেড়া এবং শূকরের হাড়ের ওপর কাটা দাগ ইঙ্গিত দেয় যে মাংস ছিল তাদের প্রোটিনের বড় উৎস। ফলে রোমান্টিক কল্পনার চেয়ে বৈদিক মানুষের বস্তুগত জীবন ছিল অনেক বেশি রুক্ষ, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন মাটির সাথে লড়াই করতে হতো।

আদিবাসীদের সংঘাত ও সমন্বয়ের সামাজিক রূপ (Social Dynamics of Conflict and Integration with Indigenous Peoples)

নতুন ভূখণ্ডে এসে বৈদিক জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ জনশূন্য প্রান্তরের দেখা পায়নি। সেখানে আগে থেকেই বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করত। ঋগ্বেদের পাতায় এই স্থানীয় মানুষদের নানা নামে ডাকা হয়েছে – দাস, দস্যু এবং পণি। তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ভাষা ও উপাসনা পদ্ধতি নিয়ে বৈদিক কবিরা অনেক কটূক্তি করেছেন। বলা হয়েছে তারা ‘অনাস বা নাকহীন’ এবং তারা এমন দেবতাদের মানে যাদের কোনো রূপ নেই। ভাষাতাত্ত্বিক মাধব দেশপান্ডে (Madhav Deshpande) বৈদিক সংস্কৃতের ওপর স্থানীয় ভাষার প্রভাব নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন (Deshpande, 1995)। তিনি দেখিয়েছেন, বৈদিক সংহিতার মধ্যেই এমন বহু শব্দ ও ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ইন্দো-ইউরোপীয় উৎসের নয়। এটি নির্দেশ করে যে দুই দলের মধ্যে কেবল যুদ্ধই হয়নি, ভাষার আদান-প্রদানও ঘটেছিল সমান তালে।

ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে বর্ণিত বিখ্যাত দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ (Battle of the Ten Kings) বা দশ রাজার যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায়, সংঘাত কেবল বৈদিক বনাম অবৈদিক মানুষের মধ্যে ছিল না। ভরত গোত্রের রাজা সুদাস একদিকে ছিলেন, আর অন্যপক্ষে ছিল দশটি গোত্রের এক যৌথ বাহিনী, যার মধ্যে যেমন বৈদিক গোত্র ছিল, তেমনই ছিল অনার্য দলগুলোও। ভাষাবিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্কলিন সাউথওয়ার্থ (Franklin Southworth) প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার ভাষাগত স্তরবিন্যাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ইন্দো-আর্যরা যখন সিন্ধু ও গাঙ্গেয় অঞ্চলে প্রবেশ করে, তখন দ্রাবিড় ও অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের এক গভীর সমন্বিত যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল (Southworth, 2005)। এই যোগাযোগের ফলে স্থানীয় বহু শব্দ বৈদিক শব্দকোষে ঠাঁই পেয়েছিল, যেমন লাঙ্গল, ময়ূর কিংবা কুণ্ড।

দুই জনগোষ্ঠীর এই মেলামেশার প্রক্রিয়াটি সবসময় অহিংস ছিল না। পরাজিত স্থানীয় দলগুলোকে প্রায়ই দাস বা সেবকে পরিণত করা হতো। এই দাস শব্দটিই পরবর্তীতে অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন শ্রমিকের সমার্থক হয়ে ওঠে। কিন্তু একই সাথে সমঝোতার পথও খোলা ছিল। কিছু স্থানীয় গোত্রপতি নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য বৈদিক পুরোহিতদের মাধ্যমে যজ্ঞ করিয়ে বৈদিক সমাজকাঠামোয় জায়গা করে নিয়েছিলেন। ঋগ্বেদেই এমন কিছু রাজার নাম পাওয়া যায়, যেমন বলবুথ বা তরুক্শ, যাদের নাম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর অর্থ দাঁড়ায়, অভিজাত শ্রেণির মধ্যেও স্থানীয় রক্ত ও নেতৃত্বের সংমিশ্রণ ঘটছিল।

সংস্কৃতির এই সমন্বয় একতরফা ছিল না। স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, গাছপালা বা পশুর উপাসনা এবং উর্বরতার নানা আচার ধীরে ধীরে বৈদিক যজ্ঞসংস্কৃতির ভেতরে স্থান পেতে শুরু করে। বাইরে থেকে আসা যাযাবররা যেমন নিজেদের পশুপালন ও রথ চালনার কৌশল শিখিয়েছিল, তেমনই তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে শিখেছিল এই মাটির জলবায়ু ও বনজঙ্গলকে ব্যবহারের কায়দা। এই প্রক্রিয়াটি ছিল এক দীর্ঘমেয়াদী সংমিশ্রণ, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধ বা বিজয়ের ফল নয়। সংঘাতের ধুলো যখন থিতিয়ে এল, তখন দেখা গেল এক মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে, যা আদি বৈদিক সংস্কৃতির চেয়ে অনেকটাই পরিবর্তিত এবং স্থানীয় মাটির রসে জারিত।

যাযাবর পশুপালন থেকে স্থায়ী কৃষিতে উত্তরণ (Transition from Pastoral Nomadism to Settled Agriculture)

বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক রূপান্তরটি হলো পশুচারণ থেকে কৃষিকাজে রূপান্তর। প্রারম্ভিক বৈদিক সমাজে সম্পদ বলতে বোঝাত গরু আর ঘোড়া। মানুষের সমস্ত প্রার্থনা আবর্তিত হতো পশুর সংখ্যা বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে। এমনকি যুদ্ধ বোঝাতে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হতো, যেমন ‘গবিষ্টি বা গরুর অনুসন্ধান’ কিংবা ‘গবেষণা’, সেগুলোর মূল অর্থ ছিল গবাদি পশু ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই। মার্ক্সীয় ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব (Irfan Habib) তার প্রিহিস্ট্রি (Prehistory) এবং পরবর্তী গবেষণাগুলোতে তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদের অর্থনীতি ছিল প্রধানত একটি পশুপালক অর্থনীতি, যেখানে কৃষিকাজ ছিল গৌণ এবং সহায়ক জীবিকা মাত্র (Habib, 2002)। তারা এক জায়গায় বেশিদিন স্থায়ী হতো না; পশুর ঘাস ফুরিয়ে গেলে পুরো গোত্র তল্পিতল্পা গুটিয়ে অন্য চারণভূমির দিকে রওয়ানা দিত।

তবে শতাব্দীর ব্যবধানে এই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। শতপথ ব্রাহ্মণে বিদেঘ মাথবের একটি বিখ্যাত গল্প আছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিদেঘ মাথব অগ্নিকে অনুসরণ করে সরস্বতী নদী থেকে পূর্ব দিকে যাত্রা করেছিলেন এবং সদানীড়া (বর্তমান গণ্ডক) নদীর তীরে এসে থামেন। নদীর পূর্ব পাড়ের জমি ছিল কর্দমাক্ত ও অনাবাদী, যা অগ্নি স্পর্শ করতে পারেনি। এই রূপক গল্পটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসবিদ সুভীরা জয়সওয়াল (Suvira Jaiswal) তার বিভিন্ন প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, এই বিবরণটি আসলে বন পুড়িয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করা এবং পূর্ব গাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষিজমি তৈরির ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সাহিত্যিক রূপ (Jaiswal, 1981)। লোহার কুঠার আর আগুনের সাহায্যে গভীর জঙ্গল কেটে মানুষ যখন মাটি উন্মুক্ত করতে শুরু করল, তখন যাযাবর জীবনের দিন ফুরিয়ে এল।

জমিতে লাঙল চালানোর গুরুত্ব সংহিতাগুলোর পরবর্তী অংশে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাঠের লাঙলের জায়গায় জায়গা করে নেয় লোহা বাঁধানো ভারী লাঙল, যাকে টানার জন্য ছটি, আটটি বা বারোটি বলদের প্রয়োজন হতো। অথর্ববেদে কৃষিকাজের জন্য আলাদা মন্ত্র রচিত হতে থাকে – কীভাবে পোকা-মাকড় থেকে ফসল রক্ষা করা যায়, কীভাবে সঠিক সময়ে বৃষ্টি নামবে এবং শস্যের ফলন ভালো হবে। গবেষক শিরিন রত্ননগর (Shereen Ratnagar) যাযাবর ও স্থায়ী কৃষকদের মিথস্ক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, স্থায়ী কৃষি মানুষের সমাজকে ভূমির সাথে স্থায়ীভাবে বেঁধে ফেলে (Ratnagar, 1995)। এর ফলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পত্তির ধারণা জোরদার হতে শুরু করে, যা আগের যৌথ চারণভিত্তিক সমাজে ছিল না।

কৃষিকাজের এই প্রসারের ফলে সমাজে খাদ্যশস্যের উদ্বৃত্ত তৈরি হতে শুরু করে। উদ্বৃত্ত ছাড়া কোনো রাজ্য, সৈন্যদল বা পুরোহিত শ্রেণি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। মানুষ যখন এক মণ শস্য উৎপাদন করে নিজের পরিবারের খোরাকির বাইরেও কিছু শস্য বাঁচিয়ে রাখতে পারল, তখনই সেই উদ্বৃত্ত দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হলো। রাজন্য বা ক্ষত্রিয়ের কাজ হয়ে দাঁড়াল কৃষকের সেই উদ্বৃত্ত রক্ষা করা এবং বিনিময়ে তার একটি অংশ কর হিসেবে আদায় করা। অন্যদিকে পুরোহিতরা দাবি করলেন, তাদের যজ্ঞের কারণেই আকাশ থেকে বৃষ্টি নামে এবং শস্য ফলে, কাজেই সেই উদ্বৃত্তের ভাগ তাদেরও দিতে হবে। এইভাবে মাটির উর্বরতা প্রাচীন সমাজকে এক সম্পূর্ণ নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সামনে এনে দাঁড় করাল।

গোত্রভিত্তিক সমাজ ও প্রাথমিক রাজনৈতিক কাঠামোর বিন্যাস (Lineage-Based Society and Early Political Structures)

প্রাথমিক বৈদিক সমাজ পরিচালিত হতো সম্পূর্ণ রক্তের সম্পর্ক বা আত্মীয়তার ভিত্তিতে। সমাজকে ভাগ করা হয়েছিল কয়েকটি স্তরে – সবচেয়ে নিচে ছিল পরিবার বা কুল (Kula), কয়েকটি পরিবার মিলে হতো গ্রাম, কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হতো বিশ (Viś), আর সবশেষে ছিল বৃহত্তর গোত্র বা জন (Jana)। এই পর্যায়ে রাজা বলতে কোনো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সার্বভৌম শাসক ছিলেন না। রাজনৈতিক গবেষক চার্লস ড্রেকমিয়ার (Charles Drekmeier) তার কিংশিপ অ্যান্ড অথরিটি ইন আর্লি ইন্ডিয়া (Kingship and Authority in Early India) গ্রন্থে বিশদ আলোচনা করেছেন, কীভাবে আদি বৈদিক রাজা ছিলেন কেবল গোত্রের প্রধান বা সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম (Drekmeier, 1962)। তাকে বলা হতো ‘গোপতি’ বা গবাদি পশুর রক্ষক। তার প্রধান দায়িত্ব ছিল বহিরাগত আক্রমণের হাত থেকে গোত্রের পশুদের বাঁচানো এবং গোত্রীয় বিবাদের মীমাংসা করা।

রাজার ক্ষমতা একচ্ছত্র ছিল না, কারণ তাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিষদের কথা শুনে চলতে হতো – সভা (Sabhā) এবং সমিতি (Samiti)। সভা ছিল প্রধানত বয়োবৃদ্ধ ও অভিজাতদের একটি ছোট পরিষদ, যেখানে বিচারকাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারিত হতো। অন্যদিকে সমিতি ছিল সাধারণ মানুষের এক বৃহত্তর সমাবেশ, যেখানে গোত্রের যে-কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অংশ নিতে পারত। এমনকি ঋগ্বেদের প্রাথমিক স্তরে বিদথ (Vidatha) নামের আরেকটি পরিষদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে নারীরাও অংশগ্রহণ করত এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সেখানে সবার মধ্যে সমানভাবে বা প্রয়োজন অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হতো। ঐতিহাসিক হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী (Hemchandra Raychaudhuri) প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে এই পরিষদগুলোর গণতান্ত্রিক ও যৌথ চরিত্রের ওপর জোর দিয়েছেন (Raychaudhuri, 1923)।

কিন্তু যখন সমাজ স্থায়ী কৃষির দিকে এগোল এবং ভৌগোলিক অঞ্চলভিত্তিক রাজ্যের জন্ম হতে লাগল, তখন এই গোত্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে ভেঙে পড়তে শুরু করল। বিশ শতকের শেষভাগে গবেষক জঁ ব্রেরটন (Joel P. Brereton) বৈদিক সামাজিক সংগঠনের ভাষা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল হয়ে ভৌগোলিক আনুগত্য তৈরি হয়েছিল (Brereton, 1981)। রাজা তখন আর নিছক পশুর রক্ষক রইলেন না, তিনি হয়ে উঠলেন ‘ভূপতি’ বা মাটির মালিক। সাধারণ মানুষের পরিষদ সমিতি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাল, আর রাজার চারপাশে গড়ে উঠল স্তাবক, সেনাপতি ও পুরোহিতদের এক স্থায়ী দরবার। যজ্ঞের মাধ্যমে রাজাকে ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেওয়া শুরু হলো, যাতে সাধারণ প্রজা তার আদেশ অমান্য করার সাহস না পায়।

এই রাজনৈতিক বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলে। সেখানে বিভিন্ন ছোট ছোট জনপদ একত্রিত হয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছিল। কর ব্যবস্থা, যা আগে ছিল স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহার বা ‘বলি বা উপহার’, তা পরিণত হলো বাধ্যতামূলক খাজনায়। ভাগদুগ্ধ নামের এক নতুন রাজকর্মচারীর আবির্ভাব ঘটল, যার কাজ ছিল প্রজাদের কাছ থেকে শস্যের ভাগ আদায় করা। গোত্রের যে সাম্যবাদী চরিত্র একসময় মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল, তা হারিয়ে গিয়ে জন্ম নিল এক কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা। এই রাজনৈতিক উত্তরণ নিছক কোনো ব্যক্তির ক্ষমতার লোভ ছিল না, এটা ছিল জটিল হয়ে ওঠা একটি অর্থনৈতিক সমাজের স্বাভাবিক পরিণতি, যেখানে সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য লাঠিয়াল ও আইনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।

সামাজিক স্তরবিন্যাস ও পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Social Stratification and Institutionalization of the Patriarchal System)

আদি বৈদিক যুগে পেশা বা জন্মের ভিত্তিতে কোনো অনড় সমাজভেদ ছিল না। ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের একটি বিখ্যাত স্তোত্রে এক কবি খুব সহজ ভাষায় বলছেন, ‘আমি স্তোত্র রচনা করি, আমার বাবা চিকিৎসক এবং মা জাঁতায় গম পেষেন; আমরা সবাই ভিন্ন কাজ করে জীবিকা অর্জন করি’। এই উক্তিটি দেখায় সমাজ তখনো কতখানি নমনীয় ছিল। কিন্তু এই সারল্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সমাজবিজ্ঞানী ও নারীবাদী ঐতিহাসিক উমা চক্রবর্তী (Uma Chakravarti) তার মৌলিক গবেষণাগুলোতে তুলে ধরেছেন, কীভাবে শ্রমবিভাগ ও উদ্বৃত্ত সম্পদ নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা একাধারে জাতিভেদ ও পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলকে পোক্ত করেছিল (Chakravarti, 1993)। সামাজিক অসমতা যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে চাইল, তখন ধর্মের আশ্রয় নিয়ে তৈরি করা হলো সমাজতাত্ত্বিক অজুহাত।

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে সংযোজিত পুরুষসূক্ত (Puruṣasūkta) এই বিভাজনের এক কুখ্যাত স্মারক। সেখানে কল্পনা করা হলো এক আদিম মহাপুরুষের দেহ থেকে চার বর্ণের জন্ম হয়েছে – মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয় বা রাজন্য, ঊরু থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্র। বৈদিক ভাষা ও সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ স্টেফানি জ্যামিসন (Stephanie Jamison) বৈদিক সমাজে নারী ও বিভিন্ন বর্গের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পুরুষসূক্তের এই বিভাজন মূলত উত্তর-বৈদিক যুগের এক মতাদর্শিক বয়ান, যা পূর্ববর্তী শতকের নমনীয় সমাজকে অস্বীকার করে একটি অনড় স্তরবিন্যাসকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল (Jamison, 1996)। এর মাধ্যমে সমাজের উৎপাদনশীল শ্রেণিগুলোকে পদানত করে শীর্ষ দুই শ্রেণির ভোগদখলের পথ প্রশস্ত করা হলো।

একই সাথে পারিবারিক জীবনে পিতৃতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ দিন দিন কঠোর হয়ে উঠল। পরিবারে পুত্রসন্তানের জন্ম ছিল পরম কাঙ্ক্ষিত বিষয়, কারণ পুত্র যুদ্ধ করতে পারে, বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার রক্ষা করতে পারে এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। বিপরীতে কন্যাসন্তানের জন্মকে দেখা হতে লাগল এক ধরনের সামাজিক ও আর্থিক বোঝা হিসেবে। ঐতিহাসিক কুমকুম রায় (Kumkum Roy) বৈদিক সাহিত্য পাঠ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে নারীদের জনপরিসর ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থেকে ধীরে ধীরে বের করে দেওয়া হয়েছিল (Roy, 1994)। প্রাথমিক যুগে গার্গী বা মৈত্রেয়ীর মতো কিছু বিদুষী নারী দার্শনিক বিতর্কে অংশ নিলেও, সাধারণ নারীদের জীবন বাঁধা পড়েছিল কেবল গৃহস্থালি কাজ ও সন্তান উৎপাদনের গণ্ডিতে। সভা বা সমিতির মতো রাজনৈতিক পরিষদ থেকে নারীদের অংশগ্রহণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে গেল।

সম্পত্তির ওপর নারীর কোনো স্বত্ব রইল না। তাকে দেখা হতে লাগল পুরুষের অধীন এক সত্তা হিসেবে – প্রথমে বাবার, পরে স্বামীর এবং বার্ধক্যে পুত্রের। বিবাহ ব্যবস্থা হয়ে উঠল গোত্রের বাইরে রক্ত বিশুদ্ধ রাখার এক জটিল সামাজিক চুক্তি। গোত্র ব্যবস্থার কড়াকড়ি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাল যে একই গোত্রের ভেতরে বিবাহ নিষিদ্ধ হলো, যাতে সম্পত্তির বণ্টন ও সামাজিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। ধর্মের অনুশাসনগুলো এই পিতৃতান্ত্রিক শোষণকে এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে নারীরা একে নিজেদের প্রাকৃতিক কর্তব্য বলে মেনে নেয়। সব মিলিয়ে বৈদিক যুগের শেষ দিকে এসে আমরা যে সমাজকে দেখতে পাই, তা কোনো সরল শান্তিময় জগৎ নয়; বরং তা ছিল চার বর্ণের অনড় দেয়াল আর পিতৃতন্ত্রের নিশ্ছিদ্র জালে বন্দি এক কঠোর শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থা।

বৈদিক সাহিত্যের কালক্রম (Chronology of Vedic Literature): রচনাস্তর, কালনির্ণয় ও ঐতিহাসিক বিতর্ক

আপেক্ষিক ও পরম কালনির্ণয়ের তাত্ত্বিক পদ্ধতি (Theoretical Methods of Relative and Absolute Chronology)

প্রাচীন কোনো পাণ্ডুলিপি বা পাঠের বয়স নির্ধারণ করার সময় গবেষকরা সাধারণত দুটি প্রধান পথ বেছে নেন। একটি হলো আপেক্ষিক কালক্রম (Relative Chronology) এবং অন্যটি পরম কালক্রম (Absolute Chronology)। আপেক্ষিক কালক্রম মূলত বলে দেয় একটি পাঠের তুলনায় আরেকটি পাঠ কতটা প্রাচীন বা নতুন। অন্যদিকে পরম কালক্রম চেষ্টা করে নির্দিষ্ট সাল বা শতাব্দীর গায়ে একটি স্পষ্ট সিলমোহর বসিয়ে দিতে। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় কাজটি করা বেশ জটিল। প্রাচীন বৈদিক কবিরা তাদের রচনার কোথাও কোনো সন-তারিখ লিখে যাননি। তাদের কাছে সময়ের ধারণা ছিল ঋতুচক্রের মতো আবর্তিত এক বিষয়, যেখানে দিনপঞ্জিকা ধরে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কোনো তাগিদ ছিল না। ফলে গবেষকদের নির্ভর করতে হয় সাহিত্যের ভেতরের ভাষাগত রূপান্তর ও সামাজিক রীতিনীতির বিবর্তনের ওপর।

ভাষার অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন লক্ষ্য করে কালনির্ণয়ের পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর। ভাষা তো আর স্থির কোনো বস্তু নয়, নদীর জলের মতো তা প্রতিনিয়ত বদলায়। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে ক্রিয়াপদের রূপ, প্রত্যয়ের ব্যবহার এবং ব্যাকরণিক নিয়মের যে জটিলতা দেখা যায়, পরবর্তী স্তরের গ্রন্থগুলোতে তা ধীরে ধীরে সরল হয়ে এসেছে। জার্মান গবেষক হারমান ওল্ডেনবার্গ (Hermann Oldenberg) বৈদিক স্তোত্রগুলোর ছন্দ ও ছন্দের মাত্রা বিশ্লেষণ করে এই স্তরভেদটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন (Oldenberg, 1888)। তিনি দেখিয়েছিলেন, ঋগ্বেদের সব অংশ এক সময়ে তৈরি হয়নি। দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল পর্যন্ত অংশগুলো ভাষাগত দিক থেকে সবচেয়ে প্রাচীন, যা পারিবারিক মণ্ডল নামে পরিচিত। এর বিপরীতে প্রথম এবং দশম মণ্ডলের ভাষা অনেকটাই পরবর্তী বৈদিক ধারার কাছাকাছি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো পাঠের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও বস্তুগত তথ্যের তুলনামূলক বিচার। একটি সমাজে যখন তামা ব্যবহারের জায়গায় লোহার ব্যবহার শুরু হয়, কিংবা সাধারণ পশুপালনের বদলে সুসংগঠিত ধানচাষ প্রধান হয়ে ওঠে, তখন সাহিত্যের শব্দকোষেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে। এই বিষয়টিকে সামনে রেখে ভারততাত্ত্বিক জর্জ বুলার (Georg Bühler) বৈদিক আইনের উৎস ও সামাজিক প্রথাগুলোর ক্রমবিকাশ নিয়ে কাজ করার সময় দেখান যে, প্রাচীনতম স্তরে যেসব সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ পাওয়া যায় না, পরবর্তী স্তরে সেগুলোই বিধিবদ্ধ রূপ নিয়েছে (Bühler, 1894)। সুতরাং, আপেক্ষিক কালক্রম আমাদের নিশ্চিত করে যে সংহিতাগুলো ব্রাহ্মণের আগে রচিত হয়েছে, আর ব্রাহ্মণগুলোর পর এসেছে আরণ্যক ও উপনিষদ।

তবে কেবল অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য দিয়ে পরম কালক্রম বা নির্দিষ্ট শতাব্দী নির্ধারণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় সাহিত্যের বাইরের এমন কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নোঙর, যার সন-তারিখ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। তুলনামূলক ব্যাকরণের পথিকৃৎ ফ্রাঞ্জ বপ (Franz Bopp) ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান যে, বৈদিক সংস্কৃত একা একা বেড়ে ওঠেনি (Bopp, 1816)। প্রাচীন গ্রিক, লাতিন ও প্রাচীন আবেস্তান ভাষার সমান্তরাল বিকাশের গতি পর্যালোচনা করে তবেই বৈদিক সাহিত্যের একটি আনুমানিক সময়সীমা বের করা সম্ভব হয়। এভাবে ভাষা ও সমাজের স্তরবিন্যাস মিলিয়ে আধুনিক ঐতিহাসিকরা বৈদিক সাহিত্যকে কোনো একক শতাব্দীতে আটকে না রেখে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্তরে বিভক্ত করে পাঠ করেন।

মিতান্নি শিলালিপি ও বৈদিক ইতিহাসের প্রাচীনতম কালসীমা (Mitanni Inscriptions and the Earliest Horizon of Vedic History)

বৈদিক সাহিত্যের কালনির্ণয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চমক এসেছিল বর্তমান তুরস্কের বোগাজকোই নামক একটি প্রাচীন প্রত্নস্থল থেকে। ১৯০৭ সালে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ হুগো উইঙ্কলার সেখানে মাটির ফলকে খোদাই করা এক প্রাচীন আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্র আবিষ্কার করেন। এটি ছিল আনুমানিক ১৩৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি চুক্তি, যা সম্পাদিত হয়েছিল হিত্তাইট রাজা সুপ্পিলুলিউমা এবং মিতান্নি রাজা শাত্তিওয়াজার মধ্যে। চুক্তির বয়ানে সাক্ষী হিসেবে যেসকল দেবতার নাম আহ্বান করা হয়েছিল, সেগুলো আধুনিক গবেষকদের চোখ কপালে তুলে দেয়। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র এবং নাসত্যের নাম। এই নামগুলো ঋগ্বেদের অন্যতম প্রধান দেবতাদের নামের সাথে হুবহু মিলে যায়।

এই আবিষ্কার বৈদিক ইতিহাসের জন্য এক অসাধারণ ভিত্তি এনে দেয়। কারণ এই প্রথম বৈদিক দেবমণ্ডলীর নাম পাওয়া গেল এমন এক শিলালিপিতে, যার সময়কাল প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে সুনির্দিষ্ট। জার্মান ভারততত্ত্ববিদ পল থিমে (Paul Thieme) এই শিলালিপির ভাষা ও দেবতাদের চরিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে যুক্তি দেন যে, এই নামগুলো সাধারণ ইন্দো-ইরানীয় স্তরের নয়, বরং এগুলো সরাসরি প্রাক-বৈদিক বা আদি-ইন্দো-আর্য ভাষার রূপ (Thieme, 1960)। প্রাচীন পশ্চিম এশিয়ায় মিতান্নি নামক একটি ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠী সেই সময়ে শাসন করছিল, যাদের ব্যবহৃত অশ্বচালনা সংক্রান্ত পরিভাষাও ছিল বৈদিক সংস্কৃতের প্রায় সমরূপ। উদাহরণস্বরূপ, মিতান্নি অশ্বপ্রশিক্ষক কিক্কুলির একটি লিপিতে ‘ঐক’ (এক), ‘তের’ (তিন), ‘পঞ্চ’ (পাঁচ) এবং ‘সত্ত’ (সাত) শব্দগুলোর দেখা মেলে।

ভাষাতত্ত্ববিদ মানফ্রেড মায়রহফার (Manfred Mayrhofer) এই সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে দেখান যে, চতুর্দশ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পশ্চিম এশিয়ায় ইন্দো-আর্য ভাষার এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে সেই সময়ের আগেই মূল ইন্দো-আর্য দলটির ভাষা একটি নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছিল (Mayrhofer, 1966)। এর মানে দাঁড়ায়, ঋগ্বেদের দেবমণ্ডল ও স্তোত্র রচনার যে ঐতিহ্য, তা চতুর্দশ খ্রিস্টপূর্বাব্দের অনেক আগে থেকেই বিকাশ লাভ করতে শুরু করেছিল। পশ্চিম এশিয়ায় যদি এই দেবতারা পরিচিত হয়ে থাকেন, তবে তাদের স্মৃতিবাহী অন্য যে শাখাটি ভারতের দিকে এগিয়েছিল, তাদের সাহিত্য সৃষ্টির পটভূমি অন্তত এই সময়সীমার সমসাময়িক বা তার কিছু পূর্বের ঘটনা হওয়া যুক্তিসঙ্গত।

তবে এই লিপির অর্থ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমতও রয়েছে। কিছু পণ্ডিত মনে করেন, মিতান্নিরা কোনোভাবেই ভারত থেকে পশ্চিম এশিয়ায় যায়নি; বরং স্তেপ অঞ্চল থেকে অভিবাসনের পথে একটি দল পশ্চিম এশিয়ায় থেকে গিয়েছিল আর মূল দলটি চলে গিয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে। জার্মান গবেষক অ্যানেলিস কামেনহুবার (Annelies Kammenhuber) দেখান যে, মিতান্নি লিপির এই উপাদানগুলো সেখানে খুব দ্রুত স্থানীয় হুরিয়ান ভাষার সাথে মিশে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ভারতে এই ভাষা এক সুবিশাল সাহিত্যিক ধারাবাহিকতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল (Kammenhuber, 1968)। ফলে ঐতিহাসিক বিচারে মিতান্নি চুক্তিপত্রটি বৈদিক সাহিত্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসীমা বা নিশ্চিত কালসীমা নির্দেশ করে, যা প্রমাণ করে যে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশপাশেই বৈদিক স্তোত্র রচনার প্রাথমিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

ম্যাক্স মুলারের কালপদ্ধতি ও প্রারম্ভিক ভারততাত্ত্বিক বিতর্ক (Max Müller’s Chronological Model and Early Indological Debates)

উনিশ শতকে যখন বৈদিক সাহিত্যের কালনির্ণয় নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক আলোচনা শুরু হয়, তখন সবচেয়ে প্রভাবশালী কাঠামোটি তৈরি করেছিলেন ম্যাক্স মুলার (Max Müller)। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার ক্লাসিক্যাল গ্রন্থে তিনি সমগ্র বৈদিক সাহিত্যকে চারটি কালপর্বে বিভক্ত করেন। তার এই পদ্ধতিটি পরিচিত ছিল কালখণ্ড তত্ত্ব হিসেবে। তিনি সাহিত্যের চারটি স্তরকে পরপর সাজিয়েছিলেন – ছন্দ পর্ব (১২০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), মন্ত্র পর্ব (১০০০-৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), ব্রাহ্মণ পর্ব (৮০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এবং সূত্র পর্ব (৬০০-২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানকালকে আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ধরে তিনি পেছনের দিকে প্রতি পর্বের জন্য গড়ে দুইশত বছর করে সময় বরাদ্দ করেছিলেন।

ম্যাক্স মুলারের এই বিভাজন প্রাথমিক পাঠকদের কাছে বেশ চমৎকার ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল। তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে একটি নতুন সাহিত্যিক শৈলী গড়ে উঠতে এবং তা পুরো সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে অন্তত দুইশত বছর সময়ের প্রয়োজন। তবে এই পদ্ধতির দুর্বলতা নিয়ে স্বয়ং গবেষক মহলেই দ্রুত প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। আমেরিকান প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম ডোয়াইট হুইটনি (William Dwight Whitney) এই কৃত্রিম সময়সীমার কঠোর সমালোচনা করেন (Whitney, 1893)। তিনি যুক্তি দেন যে, কোনো সাহিত্যিক বা সামাজিক বিবর্তন ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক দুইশত বছর পরপর ঘটে না। মানুষের চিন্তার পরিবর্তন এক শতাব্দীতেও দ্রুত ঘটে যেতে পারে, আবার কোনো একটি স্তর চারশত বছর ধরেও অপরিবর্তিত থাকতে পারে। হুইটনির মতে, ম্যাক্স মুলারের এই সময়কাল নির্ধারণ ছিল নিছক এক কাল্পনিক ছক।

সমালোচনা যে কেবল বাইরে থেকেই আসছিল তা নয়, ম্যাক্স মুলার নিজেও পরবর্তীতে নিজের এই তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে বাধ্য হন। ১৮৯০ সালে প্রদত্ত তার গিফোর্ড বক্তৃতামালায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন যে, বৈদিক স্তোত্রগুলো ১০০০, ১৫০০ নাকি ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত হয়েছিল – তা পৃথিবীর কোনো পণ্ডিতই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না। তিনি লিখেছিলেন যে তার দেওয়া সময়কালটি ছিল কেবল ‘একটি ন্যূনতম প্রাক্কলন বা মিনিমাম এস্টিমেট’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পরবর্তীকালের বহু লেখক মুলারের সেই সতর্কতা ভুলে গিয়ে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দকে এক অনড় ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

জার্মান পণ্ডিত আলব্রেখট ওয়েবার (Albrecht Weber) বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ কালপরম্পরা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখান যে, এই সাহিত্য কোনো সরলরেখায় এগোয়নি (Weber, 1852)। বিভিন্ন শাখা ও চরণের মধ্যে বহু গ্রন্থ একই সময়ে সমান্তরালভাবে রচিত হয়েছিল। ফলে এক পর্বের জন্য দুইশত বছর বরাদ্দ করে যান্ত্রিকভাবে পেছনের দিকে যাওয়ার পদ্ধতিটি আধুনিক ঐতিহাসিকদের কাছে অচল হয়ে পড়ে। ম্যাক্স মুলারের অবদান ছিল মূলত বৈদিক সাহিত্যের স্তরগুলোকে চিহ্নিত করা, কিন্তু তার প্রস্তাবিত দিনপঞ্জি ছিল অনুমানের ওপর দাঁড় করানো এক প্রাথমিক চেষ্টা মাত্র।

জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক কালনির্ণয় ও বাল গঙ্গাধর তিলকের বিতর্ক (Astronomical Dating and the Controversy of Bal Gangadhar Tilak)

ভাষাতাত্ত্বিকদের এই আনুমানিক সময়সীমার বাইরে দাঁড়িয়ে একদল গবেষক সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন, যা হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক কালনির্ণয়। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের বহু জায়গায় নক্ষত্র, গ্রহণ এবং বিষুব সংক্রান্ত নানা মহাজাগতিক বিষয়ের রূপক বা সরাসরি বিবরণ পাওয়া যায়। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা ও পণ্ডিত বাল গঙ্গাধর তিলক (Bal Gangadhar Tilak) এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বৈদিক কালক্রমকে এক ধাক্কায় বহু হাজার বছর পেছনে ঠেলে দেন। ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত তার দি ওরিয়ন (The Orion) গ্রন্থে তিলক যুক্তি দেন যে, ঋগ্বেদের মৃগশিরা নক্ষত্রে বসন্ত বিষুবের যে উল্লেখ পাওয়া যায়, পৃথিবীর অক্ষের ঘূর্ণন বা অয়নচলনের গাণিতিক নিয়ম অনুযায়ী তা কেবল ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই ঘটা সম্ভব ছিল (Tilak, 1893)।

প্রায় একই সময়ে এবং স্বাধীনভাবে আরেকজন ইউরোপীয় গবেষকও প্রায় একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। তিনি ছিলেন জার্মান ভারততত্ত্ববিদ হারমান ইয়াকোবি (Hermann Jacobi)। ইয়াকোবি শতপথ ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য বৈদিক পাঠে কৃত্তিকা নক্ষত্রের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখান যে, এই পাঠগুলোর সময়কাল অন্তত ৩০০০ থেকে ৪৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে হওয়া উচিত (Jacobi, 1894)। তাদের এই তত্ত্বগুলো ঐতিহ্যবাদী ও জাতীয়তাবাদী মহলে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, কারণ এর মাধ্যমে বৈদিক সাহিত্যকে মেসোপটেমিয়া বা মিসরের প্রাচীন সাহিত্যের চেয়েও প্রাচীন বলে দাবি করার এক বৈজ্ঞানিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

তবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা এই পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসের প্রখ্যাত গবেষক ডেভিড পিংগ্রি (David Pingree) বৈদিক ও মেসোপটেমীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের তুলনামূলক বিচার করে দেখান যে, প্রাচীন বৈদিক গ্রন্থে যেসব তথাকথিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলো মূলত কাব্যিক ও পৌরাণিক উপমা, কোনো নিখুঁত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ নয় (Pingree, 1973)। প্রাচীন কবিরা যখন কোনো তারামণ্ডলের নাম নিতেন, তখন তাদের উদ্দেশ্য আধুনিক মানমন্দিরের মতো আকাশের স্থানাঙ্ক মেপে রাখা ছিল না। রূপক বর্ণনা থেকে গাণিতিক সমীকরণ বের করে হাজার হাজার বছর পেছনের কাল নির্ধারণ করাকে গবেষকরা এক ধরনের অতি-ব্যাখ্যা বলে মনে করেন।

তাছাড়া প্রাচীন পাঠের শব্দগুলোর অর্থ সব যুগে একরকম ছিল না। ঋগ্বেদে ব্যবহৃত নক্ষত্র বা বিষুব সংক্রান্ত শব্দগুলো পরবর্তীকালের সিদ্ধান্ত জ্যোতিষের সংজ্ঞার সাথে গুলিয়ে ফেললে মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। আধুনিক গবেষক সুকুমার রঞ্জন দাস (Sukumar Ranjan Das) বৈদিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন যে, সেই যুগে দিন গণনা ও ঋতু নির্ণয়ের যে প্রাথমিক পদ্ধতি ছিল, তা থেকে কোনো নির্ভুল শতাব্দী বের করা প্রায় অসম্ভব (Das, 1928)। ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাহায্যে বৈদিক সাহিত্যকে চার বা পাঁচ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে নিয়ে যাওয়ার দাবিটি একাডেমিক পরিসরে দুর্বল ও ভিত্তিহীন হিসেবেই গণ্য করা হয়।

সংহিতা থেকে উপনিষদ: ভাষাতাত্ত্বিক স্তরবিন্যাস (From Samhita to Upanishad: Linguistic Stratigraphy)

আধুনিক যুগে বৈদিক সাহিত্যের কালক্রম বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের স্তরবিন্যাস পদ্ধতি। বৈদিক সাহিত্যের ভাষা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল না, শতাব্দী ধরে তা রূপ পরিবর্তন করেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) বৈদিক সাহিত্যের ভৌগোলিক ও ভাষাতাত্ত্বিক স্তরগুলোকে পাঁচটি স্পষ্ট কালখণ্ডে বিভক্ত করেছেন (Witzel, 1989)। প্রথম স্তরটি হলো ঋগ্বেদিক ভাষা, যা সবচেয়ে প্রাচীন এবং ইন্দো-ইরানীয় ভাষার খুব কাছাকাছি। এই স্তরে ব্যাকরণের যে জটিল বৈচিত্র্য এবং সুরের ব্যবহার দেখা যায়, তা পরবর্তী কোনো স্তরে আর পুরোপুরি অবিকৃত থাকেনি।

দ্বিতীয় স্তরটিকে বলা হয় মন্ত্র ভাষা। এই স্তরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অথর্ববেদের প্রাচীন অংশ, সামবেদ সংহিতা এবং যজুর্বেদের পদ্য অংশগুলো। এই স্তরের ভাষা ঋগ্বেদের চেয়ে কিছুটা সরল, তবে ব্রাহ্মণের গদ্যের মতো পুরোপুরি কাঠামোবদ্ধ নয়। বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ আর্থার বারিয়েডেল কিথ (Arthur Berriedale Keith) তার ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদের অনুবাদ ও ভূমিকায় দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্রিয়াপদের বহু প্রাচীন রূপ এই দ্বিতীয় স্তরে এসে লোপ পেতে শুরু করে (Keith, 1925)। বিশেষ করে সাবজাঙ্কটিভ বা সম্ভাবক মেজাজের যে বহুল ব্যবহার ঋগ্বেদে ছিল, তা ধীরে ধীরে কমে গিয়ে ভাষা একটি নির্দিষ্ট নিয়মের দিকে এগোতে থাকে।

তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরটি মূলত গদ্যের যুগ। যজুর্বেদের সংহিতা গদ্য হলো তৃতীয় স্তর, আর বিভিন্ন বেদের ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলো হলো চতুর্থ স্তর। এই সময় এসে ভাষা হয়ে ওঠে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ও যাজকীয় ব্যাখ্যার বাহন। আমেরিকান ভাষাতত্ত্ববিদ হারল্ড বেন্ডার (Harold Bender) বৈদিক প্রত্যয় ও শব্দের রূপান্তরের ওপর পরিসংখ্যানগত গবেষণা করে দেখান যে, ব্রাহ্মণ সাহিত্যের ভাষা সংহিতার কবিতার চেয়ে কাঠামোগতভাবে একেবারেই আলাদা (Bender, 1921)। এই অংশে বহু নতুন শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং বাক্যের গঠন হয়ে পড়ে দীর্ঘ ও জটিল।

সর্বশেষ বা পঞ্চম স্তরটি হলো উপনিষদ, আরণ্যক এবং প্রাথমিক সূত্র সাহিত্যের ভাষা। এই স্তরে এসে বৈদিক সংস্কৃত প্রায় তার অন্তিম সীমায় পৌঁছায় এবং ব্যাকরণবিদ পাণিনির নির্ধারিত ধ্রুপদী সংস্কৃতের খুব কাছাকাছি চলে আসে। উইটজেলের এই ভাষাতাত্ত্বিক মানচিত্রটি দেখায় যে, সংহিতা থেকে উপনিষদ পর্যন্ত রূপান্তর কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সামাজিক ও ভাষাগত বিবর্তনের স্বাভাবিক ফসল। ভাষার এই ধাপে ধাপে রূপান্তরকে অস্বীকার করে পুরো সাহিত্যকে একই সময়ের ভাবা ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক সংশ্লেষণ ও সমকালীন ঐক্যমত্য (Modern Archaeological Synthesis and Contemporary Consensus)

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বৈদিক সাহিত্যের কালক্রম আর কোনো একক শাস্ত্রের বিষয় নয়। এখন ভাষাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সমন্বয়ে এক নতুন ঐক্যমত্য গড়ে উঠেছে। কেবল মাটির পাত্র দেখে বা কেবল একটি প্রাচীন শব্দ দেখে এখন আর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। ভারতীয় ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা (Ram Sharan Sharma) বৈদিক সাহিত্যের বিভিন্ন স্তরের সাথে প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে গিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতি এবং লোহার ব্যবহারের বিস্তৃতি সাহিত্যের পরবর্তী স্তরের কালকে নির্দিষ্ট করে (Sharma, 1996)। ঋগ্বেদে যে ‘অয়স’ শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়, তা শুরুতে ছিল তামা বা ব্রোঞ্জ, কিন্তু পরবর্তী বৈদিক সংহিতায় যখন ‘কৃষ্ণ অয়স’ বা কালো ধাতুর উল্লেখ আসে, তখন তা নিশ্চিতভাবেই লোহার যুগকে চিহ্নিত করে।

ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব (Irfan Habib) এবং বিজয় কুমার ঠাকুর (Vijay Kumar Thakur) তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, উত্তর ভারতে লোহার নিয়মিত ব্যবহার শুরু হয়েছিল আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে (Habib & Thakur, 2003)। এর মানে হলো, যেসব বৈদিক গ্রন্থে লোহার অস্ত্র ও কৃষিজ যন্ত্রপাতির স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো কোনোভাবেই ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগের হতে পারে না। এই প্রত্নতাত্ত্বিক সত্যটি যজুর্বেদ, অথর্ববেদ এবং ব্রাহ্মণ সাহিত্যকে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের প্রথমার্ধের ভেতরে সুদৃঢ়ভাবে নোঙর করে দেয়।

অন্যদিকে বুদ্ধের সময়কাল বৈদিক সাহিত্যের কালসীমার জন্য এক অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য শেষ সীমা বা টার্মিনাস আন্তে কুয়েম হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ ঘটেছিল আনুমানিক ৪৮০ থেকে ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ জর্জ এরডোসি (George Erdosy) গাঙ্গেয় উপত্যকার নগরায়ণ ও রাজনৈতিক রূপান্তর বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বুদ্ধের সময়ে যে দ্বিতীয় নগরায়ণ এবং ষোড়শ মহাজনপদের উত্থান ঘটেছিল, বৈদিক সাহিত্যের সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশে সেই ধরনের উন্নত নগরজীবনের কোনো চিহ্ন নেই (Erdosy, 1995)। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রধান প্রধান বৈদিক গ্রন্থগুলো বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের উন্মেষের আগেই রচিত হয়ে শেষ হয়েছিল।

এই সমস্ত বহুস্তরীয় প্রমাণের ভিত্তিতে বর্তমান আধুনিক একাডেমিক দুনিয়ায় একটি স্পষ্ট ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ঐক্যমত্য অনুসারে ঋগ্বেদের প্রধান অংশের রচনাকাল আনুমানিক ১৫০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। পরবর্তী সংহিতাগুলো – যেমন সাম, যজুঃ ও অথর্ববেদ – রচিত হয়েছিল আনুমানিক ১২০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। ব্রাহ্মণ ও প্রাচীন উপনিষদগুলোর রচনাকাল বিস্তৃত ছিল আনুমানিক ৯০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। কোনো অলৌকিক বা জাতীয়তাবাদী ভাবালুতা ছাড়াই এই কালানুক্রমটি আজ বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিক ও ভাষাতত্ত্ববিদদের কাছে সর্বাধিক বিজ্ঞানসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ কাঠামো হিসেবে স্বীকৃত।

বৈদিক সংস্কৃত ও সাহিত্যভাষা (Vedic Sanskrit and Literary Language): ভাষা, উপভাষা, ব্যাকরণ ও বিবর্তন

প্রাক-ধ্রুপদী বৈদিক ভাষার স্বরূপ ও ধ্বনিতাত্ত্বিক গঠন (Nature and Phonological Structure of Pre-Classical Vedic Language)

প্রাচীন যুগের যে-কোনো ভাষাকে বুঝতে হলে সেই ভাষার উচ্চারণের দিকে কান পাততে হয়। মানুষ যখন কথা বলত, তখন তার স্বরতন্ত্রী কীভাবে কাঁপত, বাতাসের ধাক্কায় মুখগহ্বরের কোথায় ধ্বনি তৈরি হতো – এসবের ওপর নির্ভর করেই একটি ভাষার চেহারা দাঁড়িয়ে যায়। বৈদিক সংস্কৃত এমন এক ভাষা, যা আধুনিক কালের ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। পরবর্তীকালের সংস্কৃত ব্যাকরণবিদরা ভাষাকে যে অনমনীয় কাঠামোর মধ্যে বেঁধে ফেলেছিলেন, সংহিতার যুগে সেই পাথর-বাঁধানো নিয়ম ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত, কিছুটা তরল এবং মানুষের প্রতিদিনের উচ্চারণের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার বহু আদিম বৈশিষ্ট্য এই ভাষায় খুব নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল, যা পরবর্তী কোনো ভারতীয় ভাষায় আর পাওয়া যায় না।

ধ্বনিতত্ত্বের দিক থেকে এই ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার স্বরধ্বনিগুলোর স্বাতন্ত্র্য। যেমন পরবর্তী সংস্কৃতে ‘এ’ এবং ‘ও’ ধ্বনি দুটিকে সাধারণ যৌগিক স্বরধ্বনি হিসেবে ধরা হলেও, আদি বৈদিক যুগে এগুলোর উচ্চারণ ছিল দ্বি-স্বর বা ডিপথং হিসেবে। অর্থাৎ এগুলো স্পষ্টভাবেই দুটি স্বতন্ত্র স্বরধ্বনির মিশ্রণ হিসেবে উচ্চারিত হতো। জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ জাকোব ওয়াকারনাগেল (Jacob Wackernagel) তার সুবিশাল ব্যাকরণগ্রন্থে বৈদিক ভাষার এই আদিম ধ্বনিগুলোর গঠন বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Wackernagel, 1896)। তিনি দেখান যে, স্বরধ্বনির দীর্ঘতা এবং হ্রস্বতার ওপর নির্ভর করে কেবল কাব্যের ছন্দই তৈরি হতো না, শব্দের মূল অর্থও পুরোপুরি বদলে যেত। বৈদিক কবিরা এই ধ্বনিগত সূক্ষ্মতাকে অত্যন্ত সচেতনভাবে কবিতার ভেতরে ব্যবহার করতেন।

ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রেও বৈদিক ভাষার নিজস্ব কিছু রূপ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, দুটি স্বরের মাঝখানে অবস্থান করলে ‘ড’ এবং ‘ঢ’ ধ্বনি দুটি বদলে গিয়ে যথাক্রমে বৈদিক ‘ळ’ (ল়) এবং ‘ळ্হ’ (ল়্হ) ধ্বনিতে পরিণত হতো। এই ধরনের উচ্চারণ পরবর্তী ধ্রুপদী সংস্কৃতে সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়, কিন্তু আধুনিক মারাঠি বা ওড়িয়া ভাষায় এখনো এর রেশ রয়ে গেছে। বৈদিক ছন্দের ইতিহাস নিয়ে কাজ করার সময় গবেষক এডওয়ার্ড ভার্নন আর্নল্ড (Edward Vernon Arnold) দেখিয়েছেন, সংহিতার পদগুলোকে যদি তাদের আদি বৈদিক উচ্চারণে পড়া না হয়, তবে ছন্দের মাত্রা কিছুতেই মেলে না (Arnold, 1905)। পরবর্তীকালের লিপিকাররা তাদের নিজেদের যুগের উচ্চারণের নিয়মে প্রাচীন পাঠগুলো লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে বহু জায়গায় ছন্দকে কিছুটা বিকৃত করেছিলেন।

এখান থেকে দেখা যায়, বৈদিক সাহিত্যকে বুঝতে হলে আমাদের আজকের সংস্কৃত উচ্চারণের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যজ্ঞের খোলা মাঠে সমবেত মানুষ যখন এই মন্ত্রগুলো উচ্চারণ করত, তখন তাদের ধ্বনি ছিল অনেক বেশি উন্মুক্ত ও গমগমে। মুখের তালু, দন্ত ও ওষ্ঠের প্রতিটি নড়াচড়া ছিল নিখুঁতভাবে হিসেব করা। শব্দগুলোর এই আদি রূপ প্রমাণ করে যে বৈদিক ভাষা কোনো কৃত্রিম বা যাজকীয় টেবিল-চেয়ারে বসে বানানো কোনো সাংকেতিক ভাষা ছিল না। বরং তা ছিল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের রক্তমাংসের মানুষের সজীব মুখের ভাষা, যার মধ্যে হাজার বছরের অভিবাসন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব মিশে ছিল।

বৈদিক সুরতরঙ্গ ও উচ্চারণরীতি (Vedic Pitch Accent and Pronunciation System)

আমরা যখন কথা বলি, তখন আমাদের কণ্ঠের সুর কখনো উঁচুতে ওঠে, কখনো নিচে নামে। আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলোতে আমরা কোনো শব্দের ওপর জোর দেওয়ার জন্য শ্বাসাঘাত বা স্ট্রেস ব্যবহার করি। কিন্তু প্রাচীন বৈদিক ভাষার নিয়ম ছিল সম্পূর্ণ আলাদা; সেখানে জোর দেওয়া হতো সুরের ওঠানামার ওপর। একে বলা হতো সুরতরঙ্গ (Pitch Accent)। প্রাচীন গ্রিক বা আধুনিক জাপানি ভাষার মতো বৈদিক সংস্কৃতও ছিল একটি সুরেলা বা পিচ-অ্যাকসেন্ট প্রধান ভাষা। একটি বাক্যে কেবল সুরের পরিবর্তনের কারণে একটি শব্দ তার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ ধারণ করতে পারত। ধর্মতাত্ত্বিকরা এই সুরের বিকৃতিকে যজ্ঞের জন্য অমঙ্গলজনক বলে ভয় পেতেন, কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিকদের কাছে এটা ছিল প্রাচীন ভাষার স্বাভাবিক নিয়ম।

বৈদিক ভাষায় সুরের তিনটি প্রধান রূপ দেখা যায়। প্রথমটি হলো উদাত্ত (Udātta), যার অর্থ উঁচুতে তোলা সুর। দ্বিতীয়টি হলো অনুদাত্ত (Anudātta), যা উচ্চারিত হতো নিচু সুরে বা স্বাভাবিক কণ্ঠের নিচের ধাপে। আর তৃতীয় রূপটি হলো স্বরিত (Svarita), যা মূলত এই দুই সুরের সন্ধিস্থল বা একটি সুর থেকে অন্য সুরে নেমে আসার সময়কার মিশ্র তরঙ্গ। বিশিষ্ট ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেন (Sukumar Sen) বৈদিক ভাষার ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, সুরের এই সূক্ষ্ম ব্যবহারের ওপরই বৈদিক রূপতত্ত্ব দাঁড়িয়ে ছিল (Sen, 1958)। একটি শব্দের মূল ধাতু কোথায় সুর গ্রহণ করছে, তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতো শব্দটি কর্তা নাকি কর্ম।

একটি সুপরিচিত উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করা যায়। যজ্ঞের একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘ইন্দ্রশত্রু’। যদি এই শব্দে ‘ইন্দ্র’ অংশের ওপর উদাত্ত সুর পড়ে, তবে বহুব্রীহি সমাস অনুযায়ী তার অর্থ দাঁড়ায় ‘ইন্দ্র যার শত্রু’। আবার যদি সুরটি সরে গিয়ে ‘শত্রু’ শব্দের শেষাংশে যুক্ত হয়, তবে তৎপুরুষ সমাস অনুযায়ী এর অর্থ হয়ে যায় ‘ইন্দ্রের শত্রু’। পৌরাণিক গল্পে এমন বিবরণও আছে যে, ভুল সুরে মন্ত্র পড়ার কারণে অসুররা ইন্দ্রকে হত্যা করার জন্য যজ্ঞ করেও শেষ পর্যন্ত নিজেরা ইন্দ্রের হাতে নিহত হয়েছিল। গল্প বাদ দিলেও, এই বিবরণী প্রমাণ করে যে প্রাচীন পুরোহিত ও কবিরা শব্দের ধ্বনিতাত্ত্বিক সুর নিয়ে কতটা সতর্ক থাকতেন।

বৈদিক বাক্যতত্ত্ব ও সুর নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষক হান্স হেনরিক হক (Hans Henrich Hock) উল্লেখ করেছেন, বৈদিক সুর কোনো ব্যক্তিগত আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, তা ছিল একটি কঠোর নিয়মবদ্ধ ব্যাকরণিক ব্যবস্থা (Hock, 1991)। পরবর্তীকালে যখন বৈদিক ভাষা মুখে বলা বন্ধ হয়ে গেল এবং ধ্রুপদী সংস্কৃত কেবল পণ্ডিতদের লেখার ভাষা হিসেবে টিকে রইল, তখন এই সুরেলা উচ্চারণরীতি সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে যায়। ধ্রুপদী সংস্কৃতে সুরের এই নিয়ম আর টিকে থাকেনি, সেখানে শ্লোক আবৃত্তির ছন্দ টিকে রইল কেবল সিলেবলের দৈর্ঘ্য বা মাত্রার ওপর নির্ভর করে। ফলে বৈদিক সাহিত্যের সুররীতি প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার সেই হারিয়ে যাওয়া ধ্বনিবৈচিত্র্যের এক দুর্লভ স্মারক হয়ে আমাদের সামনে রয়েছে।

রূপমূল ও ব্যাকরণিক কাঠামোর নমনীয়তা (Morphology and Flexibility of the Grammatical Structure)

ধ্রুপদী সংস্কৃত পাঠ করার সময় যেকোনো শিক্ষার্থীকে যে ব্যাকরণিক কঠোরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বৈদিক ভাষায় সেই অনমনীয়তা দেখা যায় না। পাণিনির ব্যাকরণে একটি ধাতুর রূপ বা একটি শব্দের রূপ নির্দিষ্ট কিছু ছকে বাঁধা থাকে। কিন্তু বৈদিক ভাষায় একই ব্যাকরণিক কার্যের জন্য বহু বিকল্প রূপ বিদ্যমান ছিল। এই ব্যাকরণিক নমনীয়তা প্রমাণ করে যে ভাষাটি তখনো নানা গোষ্ঠীর মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে পরিবর্তনশীল অবস্থায় ছিল। বিভিন্ন গোত্রের কবিরা তাদের নিজস্ব রীতি ও আঞ্চলিক পছন্দ অনুযায়ী শব্দের রূপ তৈরি করতেন, যা পুরো সাহিত্য জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

বিশেষ করে অসমাপিকা ক্রিয়া বা ইনফিনিটিভের ব্যবহারের দিকে তাকালে এই বৈচিত্র্য সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। ধ্রুপদী সংস্কৃতে কোনো কাজের উদ্দেশ্য বোঝাতে কেবল একটিমাত্র প্রত্যয় ব্যবহার করা হয়, যা হলো ‘তুমুন’ বা ‘-তুম’ (যেমন: গন্তুম – যাওয়ার জন্য)। অথচ বৈদিক সাহিত্যে গবেষকরা এক ডজনেরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন ইনফিনিটিভ প্রত্যয়ের সন্ধান পেয়েছেন। যেমন ‘-তবে’, ‘-তবৈ’, ‘-অধ্যৈ’ কিংবা ‘-সে’। ফরাসি ভাষাবিজ্ঞানী জুল ব্লখ (Jules Bloch) প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষার বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, বৈদিক ভাষার এই বহুবিধ রূপমূল আসলে নির্দেশ করে যে ভাষাটি তখনো একটি একক কৃত্রিম মানদণ্ডে এসে স্থির হয়নি (Bloch, 1965)। কবিরা তাদের ছন্দের চরণের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী যেকোনো একটি প্রত্যয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করতেন।

আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণিক বৈশিষ্ট্য হলো লেট (Subjunctive / Leṭ) বা সম্ভাবক রূপের উপস্থিতি। প্রাচীন গ্রিক বা লাতিন ভাষার মতো বৈদিক ভাষায়ও আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বা কোনো শর্ত প্রকাশ করার জন্য আলাদা করে সাবজাঙ্কটিভ মেজাজ ব্যবহার করা হতো। পরবর্তী ধ্রুপদী সংস্কৃতে এই রূপটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তার জায়গায় কেবল বিধিলিঙ বা অনুজ্ঞার সাধারণ রূপ স্থান পায়। প্রাচীন ব্যাকরণিক সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ হার্টমুত শার্ফে (Hartmut Scharfe) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদের সংহিতা অংশে সাবজাঙ্কটিভের যত বিপুল রূপ দেখা যায়, যজুর্বেদ বা ব্রাহ্মণ সাহিত্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা দ্রুত কমতে শুরু করে (Scharfe, 1977)। এর অর্থ দাঁড়ায়, চিন্তার প্রকাশের ক্ষেত্রে বৈদিক ভাষা যে সূক্ষ্ম তারতম্য করতে পারত, পরবর্তী সংস্কৃত সেই সক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছিল।

নামপদের বিভক্তির ক্ষেত্রেও বৈদিক ভাষার রূপ ছিল অনেক বেশি উন্মুক্ত। প্রথমা বিভক্তির বহুবচনে ‘-আসঃ’ এবং ‘-আঃ’ – এই দুই ধরনের রূপই সমান্তরালভাবে চলত (যেমন দেব শব্দটি থেকে দেবাসঃ কিংবা দেবাঃ)। কবিদের ছন্দের প্রয়োজনেই এই বিকল্পগুলো তৈরি হয়েছিল। এছাড়া দ্বিবচনের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত ব্যাপক এবং স্বাভাবিক। দুটি চোখ, দুটি হাত বা অশ্বিনীদের মতো জোড়া দেবতাদের ক্ষেত্রে দ্বিবচন রূপ এমনভাবে প্রযুক্ত হতো যা ভাষার ভারসাম্য বজায় রাখত। ব্যাকরণের এই উন্মুক্ততা ও বহুত্ব বৈদিক সাহিত্যকে এক বিশেষ শৈল্পিক মুক্তি দিয়েছিল, যা পাণিনির পরবর্তী কঠোর নিয়মের নিগড়ে বাঁধা সংস্কৃতে আর দেখা যায় না।

আঞ্চলিক উপভাষা ও ভৌগোলিক স্তরভেদ (Regional Dialects and Geographical Stratification)

প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যকে আপাতদৃষ্টিতে একটিমাত্র সমসত্ত্ব ভাষা বলে মনে হলেও, সূক্ষ্ম ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এর ভেতরে একাধিক উপভাষার অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এক বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা মানুষ সবাই এক রকমভাবে কথা বলত না। সিন্ধু নদের অববাহিকা থেকে শুরু করে পূর্বের গঙ্গা উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৈদিক জনগোষ্ঠীর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে তাদের মুখের ভাষার মধ্যেও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকট হতে শুরু করে। আধুনিক উপভাষাতত্ত্বের নিয়মে পরীক্ষা করলে দেখা যায়, বৈদিক সাহিত্যের বিভিন্ন সংহিতা ও শাখার পাঠে এই আঞ্চলিক উচ্চারণ ও ব্যাকরণিক পার্থক্যের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।

প্রাচীন ভারতীয় ভূগোলের সাথে ভাষার সম্পর্কের ওপর প্রথম বড় মাপের আলোকপাত করেছিলেন ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (Suniti Kumar Chatterji)। তিনি তার সুবিখ্যাত দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ (The Origin and Development of the Bengali Language) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বৈদিক যুগেই অন্তত তিনটি প্রধান উপভাষা অঞ্চল তৈরি হয়ে গিয়েছিল (Chatterji, 1926)। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের উপভাষা (যা পাঞ্জাব ও গান্ধার অঞ্চলে প্রচলিত ছিল), মধ্যদেশীয় উপভাষা (কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলের ভাষা) এবং প্রাচ্য উপভাষা (পূর্বের কোশল ও বিদেহ অঞ্চলের ভাষা)। এই তিন অঞ্চলের উচ্চারণের মধ্যে স্পষ্ট টানাপোড়েন ছিল, যা তৎকালীন মানুষের সামাজিক মূল্যায়নেও প্রভাব ফেলেছিল।

সবচেয়ে পরিচিত ধ্বনিতাত্ত্বিক পার্থক্যটি দেখা যায় ‘র’ এবং ‘ল’ ধ্বনির ব্যবহারে। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের ঋগ্বেদিক উপভাষায় ‘র’ ধ্বনির প্রাচুর্য ছিল অত্যন্ত বেশি, সেখানে ‘ল’ ধ্বনি ছিল প্রায় বিরল। কিন্তু জনগোষ্ঠী যত পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়েছে, ততই ‘র’-এর জায়গায় ‘ল’ উচ্চারণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন ঋগ্বেদে যে শব্দটিকে বলা হতো ‘রোচিত’, পরবর্তী বা পূর্বের পাঠে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘লোচিত’। ভারতের ভাষাতাত্ত্বিক জরিপের পথিকৃৎ জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন (George Abraham Grierson) প্রাচীন উপভাষাগুলোর এই মানচিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, পূর্ব অঞ্চলের এই ধ্বনিগত পরিবর্তনগুলোই পরবর্তীতে প্রাকৃত ভাষার মূল ভিত্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল (Grierson, 1927)। প্রাচ্য অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণকে মধ্যদেশের ব্রাহ্মণরা অবজ্ঞার চোখে দেখতেন এবং তাদের ভাষাকে অশুদ্ধ বা ‘ম্লেচ্ছ বা অস্পষ্ট’ বলে উপহাস করতেন।

শতপথ ব্রাহ্মণে একটি বিখ্যাত বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে প্রাচ্য অঞ্চলের অসুররা ‘হে অরয়ঃ’ (হে শত্রুরা) উচ্চারণ করতে গিয়ে ভুল করে ‘হে অলবঃ’ উচ্চারণ করেছিল এবং এর ফলেই তারা পরাজিত হয়েছিল। এই উপাখ্যানটি নিছক ধর্মীয় গল্প নয়, এটি হলো ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলের মানুষের এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। মধ্যদেশের মানুষ মনে করত তাদের উপভাষাই হলো মান্য বা শুদ্ধ বৈদিক ভাষা, আর পূর্ব দিকের মানুষ সঠিক উচ্চারণ জানে না। ভৌগোলিক বিস্তারের সাথে সাথে উপভাষার এই টানাপোড়েন প্রমাণ করে যে বৈদিক ভাষা স্থির ছিল না, ভূখণ্ডের দূরত্বের সাথে সাথে তা দ্রুত বদলে যাচ্ছিল এবং নতুন নতুন স্থানীয় রূপ গ্রহণ করছিল।

স্তর-ভাষা ও অনার্য ভাষার প্রভাব (Substratum and Non-Aryan Linguistic Influence)

কোনো জনগোষ্ঠী যখন নতুন কোনো ভূমিতে বসতি স্থাপন করে, তখন তারা সেখানকার স্থানীয় মানুষদের মুখের ভাষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল। একে আধুনিক সমাজভাষাতত্ত্বে বলা হয় স্তর-ভাষা (Substratum Language) এর প্রভাব। বৈদিক আর্যরা যখন ভারতে প্রবেশ করে, তখন এই ভূমিতে আগে থেকেই দ্রাবিড় এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক (মুণ্ডা) ভাষা পরিবারের মানুষ বাস করত। ইন্দো-আর্যরা নিজেদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও, দৈনন্দিন জীবন ও প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত শব্দগুলোর জন্য তাদের স্থানীয় ভাষার ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।

এই প্রভাব সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে ধরা পড়ে ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষার অনন্য ধ্বনিবৈশিষ্ট্য – অর্থাৎ মূর্ধন্য ধ্বনিগুলোর উদ্ভবের পেছনে। প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কোনো মূর্ধন্য ধ্বনি (ট, ঠ, ড, ঢ, ণ) ছিল না; প্রাচীন গ্রিক, লাতিন বা আবেস্তানেও এই ধরনের কোনো ধ্বনি পাওয়া যায় না। অথচ বৈদিক সংস্কৃতে এই মূর্ধন্য ধ্বনিগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান দখল করে আছে। আমেরিকান ভাষাবিজ্ঞানী মারে বার্নসন এমেনো (Murray Barnson Emeneau) তার বিখ্যাত তত্ত্বে ভারতকে একটি ‘ভাষাতাত্ত্বিক বলয় বা লিঙ্গুইস্টিক এরিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (Emeneau, 1956)। তিনি দেখান যে, ভিন্ন ভিন্ন ভাষা পরিবারের মানুষ দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাসের ফলে তাদের ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে। স্থানীয় দ্রাবিড় ভাষার সংস্পর্শে আসার ফলেই বৈদিক সংস্কৃতের জিহ্বা উল্টে তালুর পেছনের অংশ স্পর্শ করে মূর্ধন্য ধ্বনি উচ্চারণের এই রীতি চালু হয়েছিল।

কেবল ধ্বনিতেই এই প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল না, বৈদিক শব্দকোষের এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্থানীয় অনার্য শব্দের অনুপ্রবেশ। গাছপালা, পশুপাখি, কৃষিকাজ এবং রান্নার পাত্র সংক্রান্ত বহু শব্দের কোনো ইন্দো-ইউরোপীয় বুৎপত্তি পাওয়া যায় না। যেমন ‘উলূখল’ (উখলি বা শস্য কোটার পাত্র), ‘লাঙ্গল’ (মাটি চষার যন্ত্র), ‘খল’ (খামার), ‘ময়ূর’ কিংবা ‘পদ্ম’ – এই শব্দগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে এগুলো সরাসরি স্থানীয় অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা আদি-দ্রাবিড় ভাষা থেকে বৈদিক শব্দভাণ্ডারে ঢুকে পড়েছিল। ফিনিশ প্রাচ্যবিদ ক্লাউস কার্তুনেন (Klaus Karttunen) প্রাচীন ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার সাথে যুক্ত শব্দগুলোই সবচেয়ে দ্রুত বাইরে থেকে বৈদিক ভাষায় স্থান পেয়েছিল (Karttunen, 1989)।

এখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বৈদিক ভাষা কোনো সম্পূর্ণ আলাদা বা সুরক্ষিত দ্বীপের মতো ছিল না। যজ্ঞের স্তোত্র রচয়িতারা সচেতনভাবে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেও, বাস্তবের মাটিতে তাদের এই পরিবর্তনগুলো মেনে নিতে হয়েছিল। স্থানীয় নারীদের সাথে বিবাহ, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সাথে মেলামেশা এবং ভৌগোলিক পরিবেশের বাস্তবতাই ভাষার এই সংমিশ্রণকে অনিবার্য করে তুলেছিল। সুতরাং বৈদিক সাহিত্যকে কোনো একক বিশুদ্ধ আর্য সংস্কৃতির প্রকাশ হিসেবে না দেখে, একটি বহুভাষিক ও বহুমাত্রিক সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সাহিত্যিক ফসল হিসেবে দেখাই সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞানসম্মত ও ঐতিহাসিক।

পাণিনীয় সংস্কার ও বৈদিক ভাষার পরিসমাপ্তি (Pāṇinian Standardization and the End of Vedic Language)

ভাষার এই পরিবর্তনশীল ও কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল রূপ প্রাচীন ভারতের চিন্তাবিদদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছিল। তারা ভয় পেয়েছিলেন যে ভাষা যদি এভাবে নদীর মতো তার গতি বদলাতে থাকে, তবে তাদের পবিত্র স্তোত্রগুলোর অর্থ একসময় পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। এই উদ্বেগ থেকেই শুরু হয় ভাষা সংস্কার বা বিধিবদ্ধকরণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ব্যাকরণবিদ পাণিনির হাতে। পাণিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে উত্তর-পশ্চিম ভারতের শালাতুর অঞ্চলে বসে রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী (Aṣṭādhyāyī)। এই গ্রন্থের মাধ্যমেই বৈদিক ভাষার স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়।

পাণিনি তার ব্যাকরণে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করেছিলেন। তিনি সমকালীন শিক্ষিত ও শিষ্ট মানুষের মুখের মান্য ভাষাকে বলতেন ভাষা (Bhāṣā), আর বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন স্তরের ভাষাকে চিহ্নিত করেছিলেন ছান্দস (Chāndas) নামে। পাণিনির মূল মনোযোগ ছিল এই ‘ভাষা’কে একটি সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় গাণিতিক নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলা। আর বৈদিক ভাষার রূপগুলোকে তিনি সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম বা বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করতেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাতাত্ত্বিক পল কিপারস্কি (Paul Kiparsky) পাণিনির বৈচিত্র্য ও ব্যাকরণিক সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পাণিনি বৈদিক ভাষার রূপগুলোকে সম্পূর্ণ বর্জন করেননি, তবে সেগুলোকে কেবল অতীতের সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছিলেন (Kiparsky, 1979)।

পাণিনির এই অসাধারণ ব্যাকরণিক হস্তক্ষেপের ফলে জন্ম নিল এমন এক ভাষা, যাকে আমরা আজ ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত বলি। ‘সংস্কৃত’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো যা পরিমার্জিত বা সংস্কার করা হয়েছে। ব্যাকরণিক এই সংস্কার ভাষার ভেতর থেকে সমস্ত দ্ব্যর্থবোধকতা, বিকল্প রূপ এবং আঞ্চলিক শিথিলতা দূর করে দিল। এর একটি বড় ইতিবাচক দিক ছিল যে সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে পণ্ডিতদের যোগাযোগের জন্য একটি চিরস্থায়ী ও অভিন্ন মাধ্যম তৈরি হলো। কিন্তু এর একটি বড় ঐতিহাসিক মূল্যও চোকাতে হয়েছিল; ভাষাটি তার স্বাভাবিক পরিবর্তনশীলতা হারিয়ে ফেলে একটি অনড় ও কৃত্রিম মাধ্যমে পরিণত হলো। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে বৈদিক সংস্কৃতির যে স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল, তা এখানেই থেমে গেল এবং সাধারণ সমাজ দ্রুত পালি ও প্রাকৃতের মতো নতুন ভাষায় কথা বলতে শুরু করল।

পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের গবেষক বশিষ্ঠ নারায়ণ ঝা (V. N. Jha) বৈদিক দর্শনের ভাষাতাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, পাণিনীয় ব্যাকরণ মূলত বৈদিক সাহিত্যকে একটি অপরিবর্তনীয় প্রাচীন সংগ্রহশালায় রূপান্তর করেছিল (Jha, 1987)। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই ভাষা হয়ে উঠল কেবল পুরোহিত, রাজদরবারের কবি এবং অভিজাত পণ্ডিতদের বিশেষ সম্পত্তি। বৈদিক সাহিত্যের পাঠ ও আবৃত্তি তখন কেবল স্মৃতি রক্ষার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হলো, তার নতুন কোনো সাহিত্যিক সম্প্রসারণ আর সম্ভব রইল না। এইভাবে ভাষার অভ্যন্তরীণ বিবর্তন ও সচেতন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বৈদিক সাহিত্যভাষা তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রার সমাপ্তি টানে এবং ধ্রুপদী যুগের সূচনার পথ প্রশস্ত করে।

শ্রুতি, ঋষি ও বৈদিক প্রামাণ্যতা (Śruti, Ṛṣis and Vedic Authority): অপৌরুষেয়তা, ঋষিত্ব ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব

শ্রুতির ধারণা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রামাণ্যতার গঠন (Concept of Śruti and the Construction of Institutional Authority)

মানুষ যখন কোনো বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত করে তুলতে চায়, তখন সে বক্তব্যের পেছনে এমন এক কর্তৃত্ব জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যা মানুষের নাগালের বাইরে। বৈদিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই কাজটি করা হয়েছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। এই পাঠসমগ্রকে সংজ্ঞায়িত করা হলো শ্রুতি (Śruti) হিসেবে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো যা কানে শোনা গেছে। সাধারণ ভাষায় বললে, এই সাহিত্যকে মানুষের তৈরি কোনো সাধারণ কাব্য বা ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং এক আদিম মহাজাগতিক ধ্বনি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল। জার্মান ভারততাত্ত্বিক উইলহেম হালবফাস (Wilhelm Halbfass) তার ট্রেডিশন অ্যান্ড রিফ্লেকশন (Tradition and Reflection) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্যের পাঠকে সমাজের কাছে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এই ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক বর্ম তৈরি করা হয়েছিল (Halbfass, 1991)। শ্রুতি ধারণার মাধ্যমে পাঠের সমস্ত ঐতিহাসিক ও মানবিক শিকড়কে সচেতনভাবে আড়াল করা হয়েছিল।

প্রাথমিক পর্যায়ে যাযাবর চারণকবিরা যখন নিজেদের গোত্রপ্রধান বা রাজাদের উপস্থিতিতে স্তোত্র গাইতেন, তখন তারা জানতেন যে এই গানগুলো তাদের নিজেদেরই বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টি। ঋগ্বেদের প্রাচীন স্তোত্রগুলোতে কবিরা স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন যে তারা কাঠের রথ তৈরির মতোই যত্ন নিয়ে নিজেদের কবিতা তৈরি করেছেন। কিন্তু শতাব্দী গড়ানোর সাথে সাথে সমাজ যখন আরও জটিল হয়ে উঠল, তখন এই মানবিক স্বীকারোক্তি পুরোহিত শ্রেণির ক্ষমতার জন্য এক বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। যদি সবাই জানে যে অমুক ঋষি এই স্তোত্র নিজের প্রয়োজনে লিখেছিলেন, তবে তার সামাজিক বিধান বা যজ্ঞের আদেশ অমান্য করা খুব সহজ হয়ে যায়। এই সংকট কাটাতেই পরবর্তী বৈদিক তাত্ত্বিকরা কবিদের রচয়িতা থেকে সরিয়ে কেবল মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।

এই প্রক্রিয়ায় বৈদিক সাহিত্যকে ভাগ করা হলো দুটি ভিন্ন মাত্রার প্রামাণিকতায় – একটি শ্রুতি এবং অন্যটি স্মৃতি (Smṛti)। স্মৃতি হলো মানুষের স্মরণ করা ঐতিহ্য, যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক আইন, গৃহ্যসূত্র বা ইতিহাস-পুরাণ। স্মৃতিতে ভুল থাকতে পারে, মানুষের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু শ্রুতিতে কোনো ভুল থাকা সম্ভব নয় – এমন এক সর্বব্যাপী সামাজিক বিশ্বাস দাঁড় করানো হলো। প্রাচ্য দর্শনের গবেষক কে. সচ্চিদানন্দ মূর্তি (K. Satchidananda Murty) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ধর্মের ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ ও প্রশ্নহীন মানদণ্ড তৈরি করার তাগিদ থেকেই প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে শ্রুতিকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছিল (Murty, 1959)। যজ্ঞে পশুবলি কেন দিতে হবে বা পুরোহিতকে কেন স্বর্ণদান করতে হবে, এই পার্থিব প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে যখন কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যেত না, তখন শ্রুতির এই কাল্পনিক পবিত্রতাকেই রক্ষা কবচ হিসেবে হাজির করা হতো।

এখান থেকে দেখা যায়, শ্রুতির ধারণাটি নিছক কোনো ভক্তিমূলক আবেগ নয়, এটা ছিল প্রাচীন ভারতীয় সমাজকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ছাঁচে পরিচালনার প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার। মানুষের মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসা বাক্যগুলোকে যদি প্রাকৃতিক সত্য বা অপরিবর্তনীয় মহাজাগতিক ধ্বনি হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তবে সেই বাক্যের ধারক ও বাহকদের প্রতিপত্তিও চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। শ্রুতির এই প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ প্রাচীন ভারতের পুরোহিত শ্রেণিকে এমন এক সামাজিক ক্ষমতা দিয়েছিল, যার বৈধতা পরীক্ষা করার কোনো পার্থিব পথ সাধারণ মানুষের কাছে খোলা রাখা হয়নি।

অপৌরুষেয়তা তত্ত্ব ও মীমাংসা দর্শনের যুক্তিজাল (Doctrine of Apauruṣeyatva and the Dialectics of Mīmāṃsā Philosophy)

বৈদিক কর্তৃত্বকে সমস্ত সন্দেহের ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য সবচেয়ে জটিল ও দার্শনিক তত্ত্বটি তৈরি করেছিল পূর্ব মীমাংসা দর্শন। তারা যে ধারণাটি সামনে আনল, তা হলো অপৌরুষেয়তা (Apauruṣeyatva)। সহজ করে বললে, এর অর্থ হলো কোনো পুরুষ বা ব্যক্তি – তা সে সাধারণ মানুষই হোক কিংবা কোনো ঈশ্বর – এই সাহিত্য রচনা করেনি। মীমাংসকদের বক্তব্য ছিল বেশ সোজাসাপ্টা কিন্তু অত্যন্ত কৌশলী। তারা জানতেন, কোনো গ্রন্থের লেখক যদি মানুষ হন, তবে মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা – যেমন অজ্ঞতা, পক্ষপাত, কিংবা প্রতারণার ইচ্ছা – সেই রচনার মধ্যে ঢুকে পড়তে বাধ্য। আবার যদি বলা হয় কোনো ঈশ্বর এটা লিখেছেন, তবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের দায় তৈরি হয়, যা নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে। এই সমস্ত ঝামেলা এড়াতে মীমাংসা দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা জৈমিনি (Jaimini) এক চমকপ্রদ অবস্থান গ্রহণ করলেন; তিনি ঘোষণা করলেন বৈদিক শব্দরাশি চিরন্তন এবং অনাদি।

আমেরিকান তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ ফ্রান্সিস এক্স. ক্লুনি (Francis X. Clooney) মীমাংসা দর্শনের এই যুক্তিজাল পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Clooney, 1990)। তিনি দেখিয়েছেন, মীমাংসকদের মূল লক্ষ্য ছিল বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থাকে রক্ষা করা। জৈমিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে শব্দ এবং তার অর্থের মধ্যকার সম্পর্ক কোনো মানুষের তৈরি নয়, এটা প্রাকৃতিক এবং শাশ্বত। আমরা যখন ‘গরু’ শব্দটি উচ্চারণ করি, তখন সেই ধ্বনিটির সাথে একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর যে যোগাযোগ, তা সৃষ্টির শুরু থেকেই বিদ্যমান। ফলে বৈদিক সাহিত্যের প্রতিটি বাক্য কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ নয়, বরং তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকা কর্তব্যের নির্দেশ। এই দর্শনে কোনো ব্যক্তি ঈশ্বরের প্রয়োজনও অস্বীকার করা হয়েছিল, কারণ মীমাংসকদের কাছে বেদের চেয়ে বড় কোনো সত্তা হতে পারে না।

দার্শনিক বিশ্লেষক কার্ল এইচ. পটার (Karl H. Potter) ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, অপৌরুষেয়তা তত্ত্ব ছিল আসলে কর্তৃত্ববাদের এক চরম পরাকাষ্ঠা (Potter, 1981)। কোনো সাধারণ যুক্তিবাদী মানুষ যদি প্রশ্ন তোলে যে ঋগ্বেদে তো সুদাস বা দিবোদাসের মতো ঐতিহাসিক রাজাদের নাম পাওয়া যায়, তবে তারা কীভাবে অনাদি হতে পারে? মীমাংসকরা এই প্রশ্নের উত্তরে চমৎকার কূটতর্কের আশ্রয় নিতেন। তারা বলতেন, এই নামগুলো কোনো রক্তমাংসের ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম নয়, এগুলো আসলে অনন্ত প্রকৃতির বিশেষ বিশেষ শক্তির রূপক নাম মাত্র। এইভাবে তারা পাঠের সমস্ত ঐতিহাসিক প্রমাণকে অস্বীকার করে এক কাল্পনিক শাশ্বত জগতের ছবি তৈরি করেছিলেন।

অপৌরুষেয়তার এই তত্ত্ব সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়ার এক নিখুঁত আয়োজন ছিল। কোনো আইন যদি রাষ্ট্রপ্রধানের তৈরি হয়, তবে পরবর্তীকালে সেই আইন সংশোধন বা বাতিল করার সুযোগ থাকে। কিন্তু আইনটি যদি স্বয়ং প্রকৃতির নিয়মের মতো অনাদি ও অপৌরুষেয় বলে বিশ্বাস করানো যায়, তবে তার পরিবর্তন চাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ করা। বৈদিক সমাজকাঠামো, যজ্ঞের অনুশাসন এবং যাজকদের একচ্ছত্র ক্ষমতাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী চ্যালেঞ্জহীন রাখার জন্য এই অপৌরুষেয়তা তত্ত্ব এক অসাধারণ সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করেছিল।

কবি থেকে ঋষি: দর্শনের রূপান্তর ও ধী-এর ধারণা (From Poet to Seer: Transformation of Vision and the Concept of Dhī)

আজ আমরা যাদের ঋষি বলে ভাবি, প্রাচীন বৈদিক সমাজে তাদের ভূমিকা শুরুতে কিন্তু এইরকম গাম্ভীর্যপূর্ণ ছিল না। প্রারম্ভিক ঋগ্বেদে স্তোত্র রচয়িতাদের সাধারণত ডাকা হতো ‘কবি’, ‘কারু’ কিংবা ‘বিপ্র’ নামে। কারু শব্দের অর্থ যিনি কোনো কিছু তৈরি করেন বা কারিগর। সেই আদিম কবিরা নিজেদের যজ্ঞের কারিগর বলে মনে করতেন। তাদের কবিতা তৈরির পেছনে কাজ করত এক বিশেষ ধরনের মানসিক একাগ্রতা, যাকে প্রাচীন ভাষায় বলা হতো ধী (Visionary Insight / Dhī)। এটি ছিল কবিদের অন্তর্চক্ষু বা কাব্যিক অনুপ্রেরণা, যার মাধ্যমে তারা চারপাশের জগৎকে সাধারণের চেয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং তাকে ছন্দোবদ্ধ রূপ দিতেন।

ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসবিদ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (Surendranath Dasgupta) বৈদিক ভাবনার উন্মেষ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে এই সৃষ্টিশীল কবিরা পরবর্তীকালে ধ্যানে বসা তপস্বীতে রূপান্তরিত হলেন (Dasgupta, 1922)। আদি যুগে এই কবিরা ছিলেন সাধারণ মানুষের মতোই গৃহী, যারা নিজেদের পরিবারের জীবিকার জন্য গোত্রপতিদের গুণগান গাইতেন এবং বিনিময়ে গরু ও ঘোড়া দক্ষিণা পেতেন। বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, অঙ্গিরা বা ভরদ্বাজের মতো নামগুলো কোনো একাকী সাধকের নাম ছিল না, এগুলো ছিল কবিদের একেকটি বংশ বা পরিবারের পরিচয়। তাদের রচনার পেছনে থাকত তীব্র জাগতিক আকাঙ্ক্ষা এবং যুদ্ধজয়ের কামনা।

কিন্তু পরবর্তী যুগে এই কবিদের রূপান্তর ঘটানো হলো ঋষিতে। ‘ঋষি’ শব্দটির বুৎপত্তি নিয়ে বলা হলো, যিনি দেখেন তিনিই ঋষি (ঋষয়ঃ মন্ত্রদ্রষ্টারঃ)। অর্থাৎ ঋষিরা কোনো নতুন মন্ত্র তৈরি করেননি, তারা নাকি ধ্যানের গভীরে মহাবিশ্বে ভেসে থাকা চিরন্তন সত্যের দেখা পেয়েছিলেন। দার্শনিক জে. এন. মোহান্তি (J. N. Mohanty) ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্বের বিচার করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, রচয়িতা থেকে দ্রষ্টায় এই যে রূপান্তর, এটি ছিল একটি গভীর মতাদর্শিক পরিবর্তনের ফল (Mohanty, 1992)। একজন লেখক তার রচনার জন্য ভুলভ্রান্তির দায় বহন করেন, কিন্তু একজন দ্রষ্টা কেবল যা দেখেছেন তাই প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করলে তার ওপর কোনো দায় বর্তায় না।

এই কৌশলের মাধ্যমে কবিদের সাধারণ মানবিক ত্রুটিগুলোকে ধর্মীয় মহিমায় রূপান্তর করা হলো। তাদের বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থ, শত্রু গোত্রের প্রতি ঘৃণা বা হিংসা প্রকাশের স্তোত্রগুলোকে বলা হলো বিশ্বকল্যাণের মহাজাগতিক রূপক। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো যে ঋষিরা এমন এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন যা সাধারণ রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। এইভাবে কবিদের স্বাভাবিক সৃজনশীলতাকে হরণ করে তাদের এক কৃত্রিম অতিন্দ্রীয় জগতের দূত বানিয়ে তোলা হলো, যা ধর্মীয় কর্তৃত্বকে সমাজে স্থায়ী করতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল।

শব্দপ্রমাণ ও সামাজিক আধিপত্যের রাজনীতি (Śabdapramāṇa and the Politics of Social Hegemony)

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম বা উপায়কে বলা হতো প্রমাণ। বিভিন্ন দার্শনিক সম্প্রদায় প্রত্যক্ষ (ইন্দ্রিয়ানুভূতি), অনুমান (যুক্তি) এবং উপমানের মতো বিভিন্ন পথকে প্রমাণের মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু বৈদিক গোঁড়ামিকে রক্ষা করার জন্য যে মাধ্যমটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলো, তা হলো শব্দপ্রমাণ (Verbal Testimony / Śabdapramāṇa)। তবে সাধারণ মানুষের মুখের কথাকে তারা এই মর্যাদা দেয়নি; তাদের বক্তব্য ছিল কেবল বেদের বাক্যই হলো অভ্রান্ত শব্দপ্রমাণ। যুক্তি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণের সাহায্যে যা বোঝা যায় না – যেমন পুণ্য, পাপ, পরকাল কিংবা যজ্ঞের ফল – তা জানার একমাত্র উপায় হলো বৈদিক বাক্যকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক বিমল কৃষ্ণ মতিলাল (Bimal Krishna Matilal) তার পারসেপশন (Perception) গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের জ্ঞানতাত্ত্বিক সংঘাতগুলোর বিশদ ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Matilal, 1986)। তিনি দেখান যে, ন্যায় ও মীমাংসা দার্শনিকরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম যুক্তি তৈরি করেছিলেন এই শব্দপ্রমাণকে রক্ষা করার জন্য। তাদের দাবি ছিল, যেহেতু মানুষ নিজের চোখ দিয়ে পরকাল দেখতে পায় না, তাই প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখানে অচল। আবার কোনো প্রত্যক্ষ উদাহরণ ছাড়া যুক্তি বা অনুমানও কাজ করতে পারে না। অতএব, মানুষকে তার সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্য জানার জন্য একটি মাত্র উৎসের মুখাপেক্ষী হতে হবে, আর তা হলো শাস্ত্রীয় শব্দ।

এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার ভেতরে এক ভয়ংকর রাজনৈতিক চাল লুকিয়ে ছিল। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেলডন পোলক (Sheldon Pollock) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, কীভাবে সংস্কৃত ভাষা ও বৈদিক শব্দপ্রমাণকে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক অভিজাত শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতাকে ন্যায্যতা দিয়েছিল (Pollock, 2006)। যুক্তিকে যখন ধর্মের অধীন করে ফেলা হলো, তখন সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার তাত্ত্বিক রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেল। একজন শূদ্র বা দাস কেন সমাজে অধস্তন হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তরে যদি যুক্তি ব্যবহার করার অনুমতি থাকত, তবে বৈষম্যের ব্যবস্থাটি এক দিনও টিকত না। কিন্তু যখন বলা হলো বেদের শব্দপ্রমাণই চূড়ান্ত এবং বেদেই বলা হয়েছে চার বর্ণের অবস্থান ঈশ্বরের নিয়মে নির্ধারিত, তখন যুক্তি খোঁজাটাই মহাপাপ হিসেবে গণ্য হলো।

শব্দপ্রমাণের এই আধিপত্য আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। সমাজের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে শাস্ত্রের অর্থ করার একচেটিয়া অধিকার তুলে দেওয়া হলো। তারা যে শব্দের যে অর্থ করবেন, সেটাই সমাজকে শিরোধার্য করতে হতো। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বা মাটির বাস্তবতার কোনো মূল্য ছিল না এই শাস্ত্রীয় প্রমাণের কাছে। ফলে শব্দপ্রমাণ প্রাচীন ভারতে কেবল একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না, এটা ছিল শ্রমজীবী মানুষকে অন্ধ আনুগত্যে বেঁধে রাখার এক শক্তিশালী রাজনৈতিক যন্ত্র।

বেদবিরোধী প্রতিবাদী ধারা ও চার্বাক-বৌদ্ধ সংশয়বাদ (Anti-Vedic Dissident Traditions and Cārvāka-Buddhist Skepticism)

বৈদিক সাহিত্যের এই চাপিয়ে দেওয়া কর্তৃত্ব প্রাচীন ভারতে সবাই বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছিল – এমনটা ভাবলে মস্ত ভুল হবে। সমাজের ভেতর থেকেই এই যজ্ঞীয় শোষণ ও অপৌরুষেয়তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছিল। এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আপসহীন ছিল লোকায়ত বা চার্বাক (Lokāyata / Cārvāka) দর্শন। তারা সরাসরি বেদের অপৌরুষেয়তা ও ধর্মীয় প্রামাণ্যতাকে আক্রমণ করেছিল। চার্বাকরা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিল যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই হলো জ্ঞানের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ, যা চোখে দেখা যায় না তা নিয়ে কথা বলা সময় নষ্ট ছাড়া কিছু নয়।

ভারতের অন্যতম প্রধান মার্ক্সবাদী দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (Debiprasad Chattopadhyaya) তার ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ লোকায়ত (Lokāyata)-এ প্রাচীন বস্তুবাদের এই লড়াইকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন (Chattopadhyaya, 1959)। তিনি দেখান, কীভাবে চার্বাক চিন্তাবিদরা বৈদিক পুরোহিতদের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। মাধবাচার্যের সর্বদর্শনসংগ্রহে চার্বাকদের একটি বিখ্যাত শ্লোক উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে: বেদ তৈরি করেছে একদল ভণ্ড, ধূর্ত এবং নিশাচর মানুষ; বৈদিক গ্রন্থগুলো মিথ্যা, স্ববিরোধিতা এবং পুনরুক্তিতে ভরা। তারা ব্যঙ্গ করে বলত, যজ্ঞে বলি দেওয়া পশু যদি সরাসরি স্বর্গে যায়, তবে যজমান তার নিজের বৃদ্ধ পিতাকে যজ্ঞে কেটে স্বর্গে পাঠিয়ে দেয় না কেন?

শুধু চার্বাক নয়, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের মতো বড় বড় সামাজিক আন্দোলনগুলোও বেদের এই অলৌকিক কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেছিল। বৌদ্ধ দর্শনের অধ্যাপক রিচার্ড কিং (Richard King) প্রাচ্য দর্শনের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন, গৌতম বুদ্ধের দর্শনের কেন্দ্রীয় কথাই ছিল অন্ধ শাস্ত্রীয় বিশ্বাস থেকে মানুষকে মুক্ত করা (King, 1999)। বুদ্ধের মতে, কোনো কথা কেবল একটি প্রাচীন বইয়ে লেখা আছে বা কোনো বিখ্যাত ঋষি বলেছেন বলেই তা বিশ্বাস করা যাবে না; নিজের বুদ্ধি ও নৈতিকতা দিয়ে বিচার করে সত্য গ্রহণ করতে হবে। বৌদ্ধ দার্শনিক ধর্মকীর্তি পরবর্তীকালে বেদের প্রামাণ্যতাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করতে গিয়ে দেখান যে, যা মানুষের তৈরি নয় এমন কোনো অর্থপূর্ণ ভাষার অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব।

এই প্রতিবাদী ধারাগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে বৈদিক যুগেও মুক্তচিন্তা ও সংশয়বাদের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল। বৈদিক সাহিত্যের বাইরে থাকা বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষ, কৃষক ও কারিগররা পুরোহিতদের এই ব্যয়বহুল যজ্ঞের তামাশাকে ভালো চোখে দেখতেন না। প্রতিবাদীরা দেখিয়েছিলেন যে যাগযজ্ঞ ও পরকালের ভয় দেখিয়ে আসলে যাজকরা নিজেদের ভুরিভোজ ও দক্ষিণা আদায়ের ব্যবস্থা পোক্ত করেছিল। প্রাচীন এই প্রতিবাদগুলো পরবর্তীকালে গোঁড়া শাস্ত্রীয় পণ্ডিতদের হাতে নানাভাবে বিকৃত বা ধ্বংস করা হলেও, তাদের যুক্তিগুলোর সারবত্তা আজও বৈদিক আধিপত্যের দাবিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

স্মৃতির ওপর শ্রুতির কর্তৃত্ব ও শাস্ত্রীয় ক্ষমতার স্থায়ী রূপ (Authority of Śruti over Smṛti and the Consolidation of Shastric Power)

বৈদিক কর্তৃত্ববাদের চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় সমাজ শাসনকারী আইনগ্রন্থগুলোর মধ্যে। সংহিতা ও ব্রাহ্মণের যুগ পেরিয়ে যখন সমাজ রাষ্ট্র ও রাজতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ নিল, তখন প্রয়োজন হলো মানুষকে প্রতিদিনের জীবনে শাসন করার সুনির্দিষ্ট আইন। এই আইনগুলো লেখা হলো স্মৃতিসাহিত্যের আওতায়, যার শীর্ষে ছিল মনুস্মৃতি বা মানবধর্মশাস্ত্র। কিন্তু স্মৃতিকাররা ভালো করেই জানতেন যে তাদের লেখা গ্রন্থগুলোর প্রামাণিকতা শ্রুতির মতো অভ্রান্ত নয়। একারণে তারা এক বিশেষ আইনি নীতি চালু করলেন; তারা প্রচার করলেন যে স্মৃতির কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই, এর সমস্ত নিয়মের মূল ভিত্তি হলো বৈদিক শ্রুতি।

ভারততাত্ত্বিক জ্যান ই. এম. হুভেন (Jan E. M. Houben) সংস্কৃত ভাষা ও ক্ষমতার সামাজিক বিন্যাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে স্মৃতিগ্রন্থগুলো শ্রুতির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের আইনকে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় করে তুলেছিল (Houben, 1997)। নিয়মে বলা হলো, স্মৃতিতে এমন কোনো আইন যদি পাওয়া যায় যা সাধারণ চোখে অন্যায্য মনে হয়, তবুও তাকে মেনে নিতে হবে কারণ তার উৎস নাকি শ্রুতির কোনো এক হারিয়ে যাওয়া শাখায় লুকিয়ে আছে। আর যদি কখনো শ্রুতি ও স্মৃতির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তবে স্মৃতির নির্দেশ বাতিল হয়ে যাবে এবং শ্রুতির নির্দেশই বলবৎ থাকবে।

এই কৌশলের ফলে সমাজে পিতৃতন্ত্র ও জাতিভেদ এক দুর্ভেদ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করল। পরিবারের ভেতর নারীর কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করা হলো না; তাকে চিরকাল পুরুষের নজরদারিতে রাখার বিধান দেওয়া হলো বেদের দোহাই দিয়ে। শ্রমজীবী শূদ্রদের সমস্ত নাগরিক ও সামাজিক অধিকার কেড়ে নিয়ে বলা হলো এটি মহাজাগতিক সৃষ্টির আদিম নিয়ম। সমাজের উচ্চবর্ণের ক্ষমতাকে সুরক্ষিত করতে প্রতিটি স্তরে শ্রুতির কাল্পনিক পবিত্রতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হতে লাগল। এমনকি রাজা যদি কোনো নতুন আইন জারি করতে চাইতেন, তাকেও নিশ্চিত করতে হতো যে তার আইন বৈদিক শ্রুতির মূল কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

এইভাবে শ্রুতি, ঋষি এবং অপৌরুষেয়তার মিথগুলো মিলেমিশে প্রাচীন ভারতে এক নিশ্ছিদ্র আধিপত্যের বৃত্ত তৈরি করেছিল। ধর্মের এই আবরণ মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে এমনভাবে বেঁধে ফেলেছিল যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাকেই পাপ হিসেবে দেখা হতো। কোনো সমাজবিজ্ঞানী যখন নির্মোহভাবে এই ইতিহাসের দিকে তাকান, তখন তিনি সেখানে কোনো মহৎ আধ্যাত্মিক সত্যের জয় দেখতে পান না। যা চোখে পড়ে তা হলো কীভাবে শব্দের রাজনীতি, অলৌকিকতার ভীতি এবং দর্শনের চাতুর্যকে কাজে লাগিয়ে একটি শোষক শ্রেণি নিজেদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাকে শতাব্দী ধরে অপরিবর্তনীয় করে রেখেছিল।

মৌখিক ঐতিহ্য ও পাঠসংরক্ষণ (Oral Tradition and Textual Preservation): শাখা, আবৃত্তি ও পাঠপদ্ধতি

মৌখিক কাব্যতত্ত্ব ও স্মৃতিবিদ্যার সামাজিক গঠন (Oral Poetics and the Social Construction of Mnemonics)

মানুষ যখন কোনো তথ্য লিখে রাখার উপায় জানত না, তখন তার নিজের মস্তিষ্কই ছিল একমাত্র সংগ্রহশালা। আধুনিক যুগে বসে আমরা যা কল্পনাও করতে পারি না, প্রাচীন মানুষ তা প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করেছিল। মুখে মুখে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে কোনো পরিবর্তন ছাড়া হাজার হাজার শ্লোক পৌঁছে দেওয়া নিছক মুখস্থ বিদ্যার ব্যাপার ছিল না। এর পেছনে কাজ করত ভাষার বিশেষ ছন্দ, সুর এবং ধ্বনির সুনির্দিষ্ট গাণিতিক বিন্যাস। আমেরিকান লোকতত্ত্ববিদ আলবার্ট লর্ড (Albert Lord) তার ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ দ্য সিঙ্গার অব টেলস (The Singer of Tales)-এ দেখিয়েছেন, প্রাক-লৈখিক সমাজের চারণকবিরা কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু শব্দবন্ধ বা ফর্মুলার সাহায্যে দীর্ঘ আখ্যান মনে রাখতেন (Lord, 1960)। বৈদিক কবিরাও তাদের গান ও স্তোত্র রচনার ক্ষেত্রে এই মৌখিক কাব্যরীতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন।

এই ধরনের স্মৃতিভিত্তিক সংস্কৃতিতে ভাষার সাথে মানুষের শরীরের এক ধরনের জৈবিক সম্পর্ক তৈরি হয়। কেবল চোখ দিয়ে কোনো লেখা পড়া আর বুকভরে বাতাস টেনে কণ্ঠের ওঠা-নামার সাথে একটি স্তোত্র আবৃত্তি করার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। যোগাযোগ তাত্ত্বিক ওয়াল্টার ওং (Walter J. Ong) তার বিখ্যাত গবেষণায় মৌখিক সমাজের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, লিখনপদ্ধতিহীন সমাজে চিন্তা সবসময় ছন্দোবদ্ধ হতে বাধ্য (Ong, 1982)। কারণ ছন্দ ছাড়া কোনো দীর্ঘ বক্তব্য স্মৃতির গভীরে স্থায়ীভাবে ধরে রাখা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বৈদিক সাহিত্যের গায়ে যে কঠোর ছন্দোবদ্ধ কাঠামো দেখা যায় – যেমন আট অক্ষরের গায়ত্রী কিংবা এগারো অক্ষরের ত্রিষ্টুপ – তা কেবল সাহিত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তৈরি হয়নি; এটা ছিল পাঠকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার এক শক্তিশালী স্মৃতিপ্রযুক্তি।

যাযাবর জীবনের প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই স্মৃতিকে সচল রাখতে হয়েছিল। এক চারণভূমি থেকে অন্য চারণভূমিতে পশুর পাল নিয়ে যাওয়ার সময় কোনো ভারী গ্রন্থ বয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। মানুষের কণ্ঠই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ বাহন। সকালের আলো ফোটার আগে কিংবা যজ্ঞের আগুন জ্বলে ওঠার মুহূর্তে তরুণ শিষ্যরা গুরুর সামনে বৃত্তাকারে বসে যে আবৃত্তি করত, তা কোনো ব্যক্তিগত শখ ছিল না। এটি ছিল সমাজের ঐতিহ্য ও ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার এক বাধ্যতামূলক সামাজিক দায়িত্ব। কোনো একটি শব্দ যদি কোনো শিক্ষার্থী ভুল উচ্চারণ করত, তবে তাকে সাথে সাথে থামিয়ে দেওয়া হতো এবং যতক্ষণ না ধ্বনিটি নিখুঁত হচ্ছে, ততক্ষণ তাকে দিয়ে বারবার সেই অংশের পুনরাবৃত্তি করানো হতো।

এখান থেকে বোঝা যায়, বৈদিক মৌখিক ঐতিহ্য কোনো অলৌকিক ঈশ্বরপ্রদত্ত বর ছিল না। এটি ছিল মানুষের টিকে থাকার তাগিদে উদ্ভাবিত এক কঠোর সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা। হাজার বছর ধরে একটি জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের স্মৃতিকে একটি জীবন্ত গ্রন্থাগারে পরিণত করতে পারে, বৈদিক সাহিত্য তার বাস্তব প্রমাণ। ধর্মীয় ভাবালুতার খোলস সরিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, লেখার উপকরণের অভাবই প্রাচীন মানুষকে তাদের স্মৃতির সর্বোচ্চ ব্যবহারে বাধ্য করেছিল এবং সেই প্রয়োজনের তাগিদেই জন্ম নিয়েছিল এমন এক সংরক্ষণ পদ্ধতি, যা বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

বৈদিক শাখা ও চরণ ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার (Vedic Śākhās and the Institutional Expansion of the Caraṇa System)

কালক্রমে যখন বৈদিক জনগোষ্ঠী উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে গাঙ্গেয় উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল, তখন তাদের সেই একক মৌখিক ঐতিহ্য বিভিন্ন ভৌগোলিক কেন্দ্রে বিভক্ত হতে শুরু করে। এই আঞ্চলিক বিভাজনগুলোই প্রাচীন ভারতে শাখা (Recensional School / Śākhā) নামে পরিচিত লাভ করে। একটি মূল বেদের পাঠ বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে কিছুটা আলাদা উচ্চারণ, সামান্য ভিন্ন পদবিন্যাস কিংবা ভিন্ন যাগযজ্ঞের নিয়ম গ্রহণ করেছিল। যেমন ঋগ্বেদের একাধিক শাখা থাকার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কেবল শাকল শাখাই টিকে থাকতে পেরেছিল। অন্যদিকে কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয়, মৈত্রায়ণী বা কঠ শাখার মতো একাধিক ধারা বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছিল।

শাখা কেবল একটি পাঠের নাম ছিল না, এর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ছিল চরণ (Sect / Caraṇa) ব্যবস্থা। সহজ করে বললে, শাখা যদি হয় কোনো নির্দিষ্ট পাঠ বা সিলেবাস, তবে চরণ হলো সেই পাঠকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রদায়। নেদারল্যান্ডসের প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ জান সি. হেস্টারম্যান (Jan C. Heesterman) বৈদিক আচারের সমাজতত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, চরণগুলো কাজ করত প্রাচীন যুগের এক ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় গিল্ড হিসেবে (Heesterman, 1985)। প্রতিটি চরণের নিজস্ব শিক্ষক, নিজস্ব ছাত্র এবং যজ্ঞ করার নিজস্ব নিয়মাবলি ছিল। এই চরণগুলোর মধ্যে নিজেদের পাঠের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য প্রায়ই তীব্র প্রতিযোগিতা চলত।

এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। রাজা বা স্থানীয় গোত্রপতিরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য নির্দিষ্ট চরণের পণ্ডিতদের নিজেদের অঞ্চলে এনে নিষ্কর জমি দান করতেন। এই জমিগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত এক একটি বৈদিক শিক্ষাকেন্দ্র। কানাডীয় তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ হ্যারল্ড কাওয়ার্ড (Harold Coward) ধর্মগ্রন্থের মৌখিক চরিত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে মৌখিক পাঠ একটি সম্প্রদায়ের পরিচয় নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠত (Coward, 1988)। কোশল অঞ্চলের একজন পুরোহিত হয়তো মৈত্রায়ণী শাখার পাঠ নিয়ে গর্ববোধ করতেন, আবার বিদেহ অঞ্চলের পণ্ডিতরা হয়তো কাণ্ব বা মাধ্যন্দিন শাখার বিশুদ্ধতা নিয়ে লড়াই করতেন।

শাখাগুলোর এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বৈদিক পাঠের বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছিল। ওড়িশা ও গুজরাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেমন অথর্ববেদের পৈপ্পলাদ শাখা দীর্ঘকাল টিকে ছিল, অথচ উত্তর ভারতের মূল ভূখণ্ডে শৌনক শাখাই বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। চরণের এই প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করেছিল যে, রাজনৈতিক উত্থান-পতন বা যুদ্ধের কারণে কোনো একটি অঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেলেও অন্য অঞ্চলের চরণে সেই সাহিত্যের পাঠ যেন বেঁচে থাকে। ফলে বৈদিক সাহিত্যের টিকে থাকা কোনো দৈব ঘটনা ছিল না, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও বিকেন্দ্রীভূত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফল।

জটিল পাঠরীতি ও অষ্টবিকৃতির গাণিতিক বিন্যাস (Complex Recitation Styles and the Mathematical Structure of Aṣṭavikṛti)

বৈদিক পাঠ সংরক্ষণের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক বিস্ময় জাগায়, তা হলো এর বিভিন্ন বিকৃতিপাঠ। শব্দের স্বাভাবিক ক্রম বদলে দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল অত্যন্ত জটিল কিছু কৃত্রিম পাঠপদ্ধতি। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই – কোনো অবস্থাতেই যেন মূল পাঠের ভেতর কোনো একটি শব্দ বাদ পড়তে না পারে, নতুন কোনো শব্দ যুক্ত হতে না পারে এবং শব্দের মধ্যকার স্বর ও মাত্রার সামান্যতম হেরফেরও যেন সাথে সাথে ধরা পড়ে। এই পুরো ব্যবস্থাটিকে প্রাচীন বৈদিক ব্যাকরণবিদরা আটটি বিশেষ ভাগে সাজিয়েছিলেন, যা একত্রে অষ্টবিকৃতি (Eight Modified Modes of Recitation) নামে পরিচিত।

এই আটটি বিকৃতির রূপগুলো ছিল অত্যন্ত গাণিতিক। এদের নামগুলো হলো: জটা, মালা, শিখা, রেখা, ধ্বজ, দণ্ড, রথ এবং ঘন। একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে এই জটিলতা বোঝা যায়। ধরা যাক, মূল বাক্যে তিনটি শব্দ আছে – এক, দুই এবং তিন। স্বাভাবিক সংহিতাপাঠে শব্দগুলো উচ্চারিত হতো ১-২-৩ হিসেবে। কিন্তু বিকৃতিপাঠের অন্যতম প্রধান রূপ জটা (Jaṭā)-তে একে পড়া হতো এভাবে: ১-২, ২-১, ১-২; তারপর ২-৩, ৩-২, ২-৩। অর্থাৎ শব্দগুলোকে একবার সামনে নিয়ে যাওয়া হতো, আবার পেছনের দিকে ফিরিয়ে আনা হতো, এবং শেষে আবার সামনের দিকে উচ্চারণ করা হতো।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে চরম ও জটিল রূপটি ছিল ঘন (Ghana) পাঠ। ইন্দো-আমেরিকান গবেষক ফ্রাঙ্ক হাইডলার (Frits Staal) দক্ষিণ ভারতের বৈদিক আচার ও আবৃত্তি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন, এই ঘনপাঠের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ অ্যালগরিদম বা গাণিতিক সংকেত (Staal, 1986)। ঘনপাঠে শব্দগুলোকে সাজানো হতো এভাবে: ১-২, ২-১, ১-২-৩, ৩-২-১, ১-২-৩; তারপর আবার ২-৩, ৩-২, ২-৩-৪, ৪-৩-২, ২-৩-৪। একটি দীর্ঘ স্তোত্রকে যখন এই নিয়মে একটানা সুরে আবৃত্তি করা হতো, তখন আবৃত্তিকারের মস্তিষ্কে শব্দের বিন্যাস এমনভাবে খোদাই হয়ে যেত যে সেখানে কোনো ত্রুটি ঘটার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকত না।

বৈদিক ছন্দ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সংযোগ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রাচ্যবিদ বারেন্ড এ. ভ্যান নুটেন (Barend A. van Nooten) উল্লেখ করেছেন, প্রাচীন ভারতের এই পাঠরীতি আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের এরর-ডিটেকশন বা তথ্য সংরক্ষণের ত্রুটি ধরার ব্যবস্থার মতোই নিখুঁত ছিল (van Nooten, 1994)। এটি ছিল মূলত একটি মানব-কম্পিউটার ব্যবস্থা, যেখানে কোনো সফটওয়্যার ছাড়াই কেবল মুখ ও কানের সাহায্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তথ্যের অক্ষত অবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল। স্মৃতিকে এভাবে একটি জটিল গাণিতিক জালের ভেতর আটকে ফেলার এই প্রচেষ্টা তৎকালীন মানুষের মেধা ও কৌশলের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

প্রাতিশাখ্য সাহিত্য ও প্রাচীন ধ্বনিবিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ (Prātiśākhya Literature and the Regulation of Ancient Phonetics)

মুখের ভাষাকে অবিকৃত রাখতে হলে কেবল শব্দ মনে রাখলেই চলে না, প্রতিটি ধ্বনি মুখের কোন জায়গা থেকে কীভাবে বের হচ্ছে – তা নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের প্রাচীনতম ধ্বনিবিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থমালা, যা প্রাতিশাখ্য (Phonetic Treatises / Prātiśākhya) নামে পরিচিত। প্রতিটি বৈদিক শাখার জন্য আলাদা আলাদা প্রাতিশাখ্য রচিত হয়েছিল, যেমন ঋগ্বেদের জন্য ঋগ্বেদ-প্রাতিশাখ্য কিংবা কৃষ্ণ যজুর্বেদের জন্য তৈত্তিরীয়-প্রাতিশাখ্য। এই গ্রন্থগুলো কোনো ধর্মীয় গল্প ফাঁদেনি, বরং অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে মানব মুখগহ্বরের শারীরবৃত্তীয় কাঠামো বিশ্লেষণ করেছিল।

প্রাতিশাখ্য এবং তার সহযোগী শিক্ষা (Phonetics / Śikṣā) সাহিত্যে মানুষের বাগযন্ত্রকে নিখুঁতভাবে ভাগ করা হয়েছিল। সেখানে আলোচনা করা হতো ধ্বনি উচ্চারণের স্থান এবং প্রযত্ন নিয়ে। জিহ্বার ডগা দাঁত স্পর্শ করছে নাকি শক্ত তালুতে আঘাত করছে, বাতাস নাকের ভেতর দিয়ে বের হচ্ছে নাকি কেবল মুখ দিয়ে বের হচ্ছে – এসবের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছিল। ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের গবেষক সিদ্ধেশ্বর বর্মা (Siddheshwar Varma) প্রাচীন ভারতীয় ব্যাকরণবিদদের ধ্বনিতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিক ইউরোপীয় ধ্বনিবিজ্ঞানের বিকাশের বহু শতাব্দী আগেই প্রাচীন বৈদিক পণ্ডিতরা মানুষের উচ্চারণের সমস্ত সূক্ষ্ম নিয়ম আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন (Varma, 1929)।

প্রাতিশাখ্যগুলোর প্রধান দায়িত্ব ছিল সংহিতাপাঠ থেকে কীভাবে পদপাঠে যাওয়া যায় এবং পদপাঠ থেকে কীভাবে আবার সংহিতাপাঠ তৈরি করা যায় – তার ব্যাকরণিক ও ধ্বনিগত নিয়মগুলো তৈরি করা। দুটি শব্দ যখন সন্ধিবদ্ধ হয়, তখন তাদের মধ্যবর্তী স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনি কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তার প্রতিটি ব্যতিক্রমী নিয়ম এই গ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো পদের শেষে বিসর্গ থাকে এবং পরবর্তী শব্দটি একটি নির্দিষ্ট ব্যঞ্জন দিয়ে শুরু হয়, তবে সেই বিসর্গটি ‘শ’, ‘ষ’ নাকি ‘স’ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হবে – তার সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম সূত্রাকারে মুখস্থ করানো হতো।

এই কঠোর ধ্বনিতাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের কারণেই হাজার বছর ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও বৈদিক পাঠের উচ্চারণে মারাত্মক কোনো আঞ্চলিক বিকৃতি ঘটতে পারেনি। কাশীর একজন পণ্ডিত যেভাবে উচ্চারণ করতেন, সুদূর কাঞ্চিপুরমের একজন পণ্ডিতও ঠিক একই নিয়মে জিহ্বা পরিচালনা করতেন। মানুষের কণ্ঠস্বরকে এমন একটি কঠোর ও সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক কাঠামোর মধ্যে বেঁধে রাখার এই উদ্যোগ ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখায় যে বৈদিক ঐতিহ্য টিকে থাকার পেছনে কোনো জাদু ছিল না, ছিল নিখুঁত ধ্বনিতত্ত্বের সার্বক্ষণিক প্রয়োগ।

স্মৃতির অর্থনীতি ও জ্ঞানের শ্রেণিগত একচেটিয়াত্ব (The Economy of Memory and the Class Monopoly of Knowledge)

কোনো জ্ঞান যখন কেবল মানুষের স্মৃতিতে জমা থাকে এবং তা কোথাও লিখে রাখা হয় না, তখন সেই জ্ঞানের মালিকানা খুব সহজেই একদল নির্দিষ্ট মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। বৈদিক মৌখিক ঐতিহ্যের পেছনে এই সমাজতাত্ত্বিক রাজনীতিটি গভীরভাবে সক্রিয় ছিল। এই বিদ্যা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না; এটি ছিল কেবল সমাজের শীর্ষ স্তরের দ্বিজন পুরুষদের, বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের, একচেটিয়া সম্পত্তি। শূদ্র, তথাকথিত অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জন্য বৈদিক মন্ত্র শোনা বা উচ্চারণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। স্মৃতিকে এইভাবে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির সম্পত্তিতে রূপান্তর করার মাধ্যমে সমাজে এক দুর্ভেদ্য ক্ষমতার প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল।

ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী জ্যাক গুডি (Jack Goody) তার দ্য ইন্টারফেস বিটুইন দ্য রিটেন অ্যান্ড দ্য ওরাল (The Interface between the Written and the Oral) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জ্ঞান যখন কেবল মুখস্থ রাখার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়, তখন গুরু বা শিক্ষকের সামাজিক কর্তৃত্ব প্রায় সীমাহীন হয়ে ওঠে (Goody, 1987)। কারণ বই থাকলে একজন মানুষ নিজে নিজেই তা পড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু মৌখিক ঐতিহ্যে কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষে শিক্ষকের আনুগত্য স্বীকার না করে জ্ঞান অর্জন করার কোনো পথ থাকে না। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈদিক শিক্ষকরা শিষ্যদের ওপর তাদের মানসিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বজায় রাখতেন।

এই স্মৃতিবিদ্যার সাথে জড়িত ছিল বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ। তৎকালীন সমাজে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজকীয় আচার পরিচালনার জন্য বৈদিক মন্ত্র জানা ছিল অপরিহার্য। রাজারা বিশ্বাস করতেন যে সঠিক সুরে যজ্ঞ না করলে তাদের ক্ষমতা ও রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। আর সেই সঠিক সুর ও মন্ত্রের একমাত্র মালিক ছিল এই মৌখিক ঐতিহ্য বহনকারী পরিবারগুলো। ফলে যজ্ঞ পরিচালনা করার বিনিময়ে তারা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, শত শত গবাদি পশু এবং বিশাল বিশাল ভূসম্পত্তি দক্ষিণা হিসেবে দাবি করতে পারত। জ্ঞানকে যদি লিখিত আকারে সবার হাতে তুলে দেওয়া হতো, তবে এই পুরোহিততন্ত্রের অর্থনৈতিক একচেটিয়াত্ব এক মুহূর্তেই ধসে পড়ত।

ধর্মীয় আইনগ্রন্থগুলোতে তাই এই মৌখিক গোপনীয়তা ভঙ্গকারীদের জন্য চরম শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছিল। গৌতম ধর্মসূত্রের মতো প্রাচীন গ্রন্থে স্পষ্ট বিধান ছিল যে কোনো শূদ্র যদি বেদের মন্ত্র শুনে ফেলে, তবে তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া উচিত। এই ধরনের চরম বিধান এটাই প্রমাণ করে যে শাসক ও পুরোহিত শ্রেণি তাদের এই স্মৃতির অর্থনীতিকে কতটা মরিয়া হয়ে রক্ষা করতে চেয়েছিল। স্মৃতি সংরক্ষণ পদ্ধতিটি ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে যত চমৎকারই হোক না কেন, সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি ছিল একটি বৃহদংশ মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকারে বন্দি রেখে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার এক সামাজিক চক্রান্ত।

লিপির আগমন ও মৌখিকতার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ (The Advent of Script and the Persistent Resistance of Orality)

একটি মজার ঐতিহাসিক তথ্য হলো, ভারতীয় উপমহাদেশে লিখনপদ্ধতির প্রচলন কিন্তু হঠাৎ করে বৈদিক যুগের অনেক পরে ঘটেনি। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ বা তৃতীয় শতকের দিকেই সম্রাট অশোকের ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপিতে খোদাই করা বিশাল বিশাল অনুশাসন ছড়িয়ে পড়েছিল। অর্থাৎ সমাজ তখন পুরোপুরি লিখতে জানত এবং প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কাজে লেখার ব্যবহার পুরোদমে চালু ছিল। তাসত্ত্বেও বৈদিক সমাজ কয়েক শতাব্দী ধরে তাদের সাহিত্যকে লিখে রাখার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। লিখনপদ্ধতি জানা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো গ্রন্থকে কেবল মুখে মুখে বাঁচিয়ে রাখার এই ঘটনা সমাজবিজ্ঞানীদের গভীরভাবে কৌতূহলী করে তোলে।

এই দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের পেছনে মূলত মতাদর্শিক ও শ্রেণিগত কারণ ছিল। লিখিত শব্দ সবসময় কিছুটা গণতান্ত্রিক; একটি লেখা যে-কারোর হাতে পড়তে পারে এবং যার পড়ার ইচ্ছা আছে সে-ই তা পড়ে ফেলতে পারে। কিন্তু মুখে মুখে শেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষক ঠিক করতে পারেন তিনি কাকে শেখাবেন আর কাকে শেখাবেন না। প্রাচীন ব্যাকরণবিদ ও তাত্ত্বিকদের উদ্ধৃত করে প্রাচ্য গবেষক কে. কুঞ্জুন্নি রাজা (K. Kunjunni Raja) দেখিয়েছেন, ভারতীয় চিন্তায় উচ্চারিত জীবন্ত শব্দকেই আসল সত্তা বলে মনে করা হতো, আর লিখিত রূপকে দেখা হতো কেবল এক ধরনের নিষ্প্রাণ চিহ্ন হিসেবে (Raja, 1963)। তাদের বিশ্বাস ছিল, লেখার মধ্যে কোনো শব্দের সেই সুর ও প্রাণের স্পন্দন থাকে না যা মানুষের কণ্ঠে জীবন্ত থাকে।

এই কারণে প্রাচীন স্মৃতিগ্রন্থগুলোতে যারা বেদ লিখে রাখত বা লেখা দেখে বেদ পাঠ করত, তাদের অত্যন্ত হীন চোখে দেখা হতো। মহাভারতের অনুশাসন পর্বে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যারা বেদ বিক্রি করে, যারা বেদ লেখে এবং যারা বেদকে নষ্ট করে – তারা সবাই নরকে গমন করে। এই ধরনের অভিশাপ দেওয়ার প্রয়োজন তখনই পড়েছিল যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে লেখা দেখে বৈদিক সাহিত্য পড়ার প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করেছিল। পুরোহিত শ্রেণি প্রাণপণে চেষ্টা করেছিল যেন তাদের শত শত বছরের জমানো গোপন রহস্য ও ক্ষমতার ভাণ্ডার সাধারণ মানুষের লেখার পাণ্ডুলিপিতে পরিণত না হয়।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য এই অনড় অবস্থানের পরাজয় ঘটেছিল। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম যখন নিজেদের সমস্ত সাহিত্য পালি ও প্রাকৃত ভাষায় ব্যাপকভাবে লিখে জনগণের সামনে তুলে ধরতে শুরু করল, তখন বৈদিক ঐতিহ্যও আর শুধু মুখে মুখে নিজেকে রক্ষা করতে পারল না। খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এসে বৈদিক গ্রন্থগুলো ধীরে ধীরে ভূর্জপত্র ও তালপাতার পাণ্ডুলিপিতে রূপ নিতে বাধ্য হয়। তবে ততদিনে এই মৌখিক ঐতিহ্য তার ঐতিহাসিক কাজটি সম্পূর্ণ করে ফেলেছিল। এটি এক অসাধারণ মানবীয় প্রযুক্তি যার মাধ্যমে প্রাচীন যুগের শব্দরাশি কোনো আধুনিক কাগজ বা সার্ভার ছাড়াই শত শত বছর ধরে প্রায় অবিকৃতভাবে মহাকালের স্রোত পেরিয়ে আমাদের সামনে এসে পৌঁছেছে।

ঋগ্বেদ ও প্রাচীন বৈদিক জগৎ (Ṛgveda and the Early Vedic World): সূক্ত, দেবতা, সমাজ ও বিশ্বচিন্তা

ঋগ্বেদ সংহিতা (Ṛgveda Saṃhitā): মণ্ডল, সূক্ত, ঋষি ও রচনাস্তর

ঋগ্বেদ সংহিতার প্রাথমিক রূপরেখা ও সংগঠন (Basic Outline and Organization of the Rigveda Samhita)

প্রাচীন সাহিত্য নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলে প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে পড়ে, তা হলো সেগুলোর সংকলন প্রক্রিয়া। কোনো এক অলস দুপুরে বসে একজন মানুষ পুরো একটা সুবিশাল গ্রন্থ লিখে ফেলেছেন, ব্যাপারটা কখনোই এমন ছিল না। ঋগ্বেদ সংহিতা (Ṛgveda Saṃhitā) ঠিক তেমনই এক বহুমাত্রিক পাঠ, যা শত শত বছর ধরে বিভিন্ন গোত্র ও ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে রূপ পরিগ্রহ করেছে। সাধারণ মানুষের চোখে এটা একটা ধর্মীয় স্তোত্রসংগ্রহ মনে হতে পারে, তবে আধুনিক পাঠতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের কাছে এটা ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগের মধ্যবর্তী সময়ের একটি জটিল সামাজিক ও ভাষাতাত্ত্বিক দলিল। এই সংকলনের ভেতর ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য কবি ও পুরোহিতের কণ্ঠস্বর, যা তৎকালীন যাযাবর ও অর্ধ-কৃষিভিত্তিক পশুপালক সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংঘাতকে সরাসরি সামনে নিয়ে আসে।

সংহিতাটিকে সাধারণভাবে সাজানো হয়েছে দশটি খণ্ডে, যেগুলোকে বলা হয় মণ্ডল (Mandalas)। গোটা সংকলনে রয়েছে মোট ১,০২৮টি স্তোত্র বা সূক্ত (Suktas), যার মধ্যে ১,০১৭টি মূল সূক্ত এবং ১১টি পরিশিষ্ট হিসেবে পরিচিত, যেগুলোকে বলা হয় বালখিল্য (Vālakhilya) সূক্ত। এই বালখিল্য স্তোত্রগুলো মূলত অষ্টম মণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, পাঠের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং মুখস্থ রাখার সুবিধার্থে প্রাচীন সম্পাদকেরা এই দশ মণ্ডলের পাশাপাশি আরেকটি বিকল্প বিভাজন তৈরি করেছিলেন। সেই বিভাজনটি পরিচিত অষ্টক পদ্ধতি (Ashtaka System) নামে। সেখানে সমগ্র গ্রন্থটিকে আটটি ‘অষ্টক’-এ ভাগ করা হয়েছে, প্রতি অষ্টকে রয়েছে আটটি করে অধ্যায়, আর প্রতিটি অধ্যায় বিভক্ত হয়েছে ছোট ছোট ‘বর্গ’-এ (Macdonell, 1917)। মণ্ডল পদ্ধতিটি বিষয়বস্তু, ঐতিহাসিক স্তর ও বংশপরম্পরার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, আর অষ্টক পদ্ধতি তৈরি হয়েছিল কেবল পাঠ ও মুখস্থকরণের সুবিধার জন্য।

এই সুবিশাল কাঠামোর পেছনে রয়েছে এক কঠোর সম্পাদনার ইতিহাস। আধুনিক গবেষক হারমান ওল্ডেনবার্গ (Hermann Oldenberg) তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদের বর্তমান রূপটি কোনো এলোমেলো কবিতার স্তূপ নয়। বরং এর পেছনে অত্যন্ত সচেতন এক সম্পাদক দল বা ‘সংহিতাকার’-এর ভূমিকা ছিল, যারা অত্যন্ত কঠোর কিছু গাণিতিক ও ছন্দোবদ্ধ নিয়ম মেনে সূক্তগুলোকে সারিবদ্ধ করেছিলেন (Oldenberg, 1888)। এই সম্পাদনা হয়েছিল বৈদিক যুগের একেবারে শেষ প্রান্তে, আনুমানিক কৃষ্ণ যজুর্বেদ বা শতপথ ব্রাহ্মণের সংকলনকালে। সম্পাদকরা প্রতিটি সূক্তের অভ্যন্তরীণ পদবিন্যাস বা পদপাঠ (Padapāṭha) তৈরি করেছিলেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাষার একটি মাত্র ধ্বনিও যেন কালক্রমে হারিয়ে না যায়।

ঋগ্বেদের মোট পদ বা শ্লোকসংখ্যা প্রায় ১০,৫৫২টি। এই বিশাল সংখ্যা কেবল কোনো একক দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য উচ্চারিত হয়নি। এখানে দেবতার নাম ভাঙিয়ে আসলে ক্ষমতা, সম্পদ, গবাদিপশু এবং চারণভূমি দখলের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। বৈদিক আর্যরা যখন উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে প্রবেশ করছিল, তখন তাদের অভ্যন্তরীণ দলগত দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সংঘাতের বাস্তব চিত্র এই স্তোত্রগুলোর ভাঁজে ভাঁজে জমা হয়ে ছিল। ধর্ম এখানে সামাজিক বাস্তবতার বিকল্প কোনো জগৎ তৈরি করেনি, বরং যাযাবর জীবনের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সংগ্রামকেই ধর্মীয় ছাঁচে রূপান্তর করেছিল। ফলে এই সংহিতার সংগঠনকে বুঝতে হলে কেবল আধ্যাত্মিক চোখ দিয়ে দেখলে চলবে না, দেখতে হবে প্রাচীন সমাজের টিকে থাকার লড়াইয়ের দলিল হিসেবে।

বংশমণ্ডল বা পারিবারিক মণ্ডলসমূহের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস (Internal Arrangement of the Family Books)

ঋগ্বেদের দশটি মণ্ডলের মধ্যে দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল পর্যন্ত অংশটিকে গবেষকরা এক বাক্যে বলেন এর ‘নিউক্লিয়াস’ বা কেন্দ্রস্থল। এই ছয়টি মণ্ডলকে একত্রে বলা হয় বংশমণ্ডল (Family Books)। কারণটা বেশ সহজ। এই মণ্ডলগুলোর রচয়িতা বা সংরক্ষক ছিলেন নির্দিষ্ট কিছু কবি-পরিবার বা ঋষিকুল। দ্বিতীয় মণ্ডলটি এসেছে গৃৎসমদ (Gṛtsamada) বা ভৃগু বংশের হাত ধরে, তৃতীয় মণ্ডল বিশ্বামিত্র (Viśvāmitra) গোত্রের, চতুর্থ মণ্ডল বামদেব (Vāmadeva) বা গৌতম বংশের, পঞ্চম মণ্ডল অত্রি (Atri) পরিবারের, ষষ্ঠ মণ্ডল ভরদ্বাজ (Bharadvāja) বংশের এবং সপ্তম মণ্ডল এসেছে পুরোহিত বশিষ্ঠ (Vasiṣṭha) ও তার বংশধরদের মাধ্যম থেকে (Witzel, 1995)। এই পরিবারগুলো প্রাচীন যাযাবর গোষ্ঠীর বিভিন্ন রাজার পৃষ্ঠপোষকতা পেত এবং নিজেদের স্তোত্রগুলোকে অতি সতর্কতার সাথে গোপন সম্পদের মতো সংরক্ষণ করত।

এই পারিবারিক মণ্ডলগুলোর ভেতরের বিন্যাসের দিকে তাকালে ওল্ডেনবার্গের সেই বিখ্যাত গাণিতিক নিয়মের প্রমাণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিটি বংশমণ্ডলে স্তোত্রগুলোকে কোনো খেয়ালখুশি মতো বসিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রথমে স্থান পেয়েছে যজ্ঞাগ্নির স্তুতি, অর্থাৎ অগ্নি (Agni) দেবতার সূক্ত। অগ্নির পরেই এসেছে যুদ্ধ ও ঝড়ের দেবতা ইন্দ্র (Indra)-র সূক্ত। এর পেছনে বাস্তব কারণও ছিল। বৈদিক যজ্ঞের প্রধান মাধ্যম ছিলেন অগ্নি, আর যুদ্ধজয়ের মূল ভরসা ছিলেন ইন্দ্র। এই দুই প্রধান দেবতার পর স্থান পেয়েছে অন্যান্য অপ্রধান দেবতাদের সূক্ত, যেমন বিশ্বদেবগণ, মরুৎ বা মিত্র-বরুণ। দেবতাদের এই ক্রমের ভেতরেও আবার সূক্তগুলোকে সাজানো হয়েছে সেগুলোর শ্লোকসংখ্যার অধোগতি অনুসারে। যে সূক্তের শ্লোকসংখ্যা বেশি, সেটা আগে বসেছে; আর যেটার শ্লোকসংখ্যা কম, সেটা বসেছে পরে (Jamison & Brereton, 2014)।

শুধু শ্লোকসংখ্যাই নয়, ছন্দের দৈর্ঘ্যও এই বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দীর্ঘ ছন্দ যেমন ত্রিষ্টুভ (Triṣṭubh) বা জগতী (Jagatī) দিয়ে শুরু হওয়া সূক্তগুলো আগে রাখা হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত ছোট ছন্দ যেমন অনুষ্টুভ (Anuṣṭubh) বা গায়ত্রী (Gāyatrī) দিয়ে তৈরি সূক্তগুলোকে পরে স্থান দেওয়া হয়েছে। এই কঠোর শৃঙ্খলার একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেছে তখনই, যখন কোনো পরিবার তাদের নিজস্ব কোনো বিশেষ স্তোত্রকে বংশের প্রতীক হিসেবে বাড়তি গুরুত্ব দিতে চেয়েছে। যেমন তৃতীয় মণ্ডলে বিশ্বামিত্র বংশের বিখ্যাত স্তোত্রগুলো একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও আচারগত ঐতিহ্যকে নির্দেশ করে, যার মধ্যে সুবিখ্যাত গায়ত্রী মন্ত্রও অন্তর্ভুক্ত।

বংশমণ্ডলগুলোর এই অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা স্পষ্ট করে দেয় যে, ঋগ্বেদের যুগে কাব্যচর্চা কেবল আবেগের প্রকাশ ছিল না। এটা ছিল অত্যন্ত পেশাদার এক বিদ্যা। স্তোত্র রচনা ছিল এক ধরনের জটিল কারিগরি কাজ, যাকে প্রাচীন কবিরা কাঠের রথ তৈরির সাথে তুলনা করতেন। স্টেফানি জ্যামিসন (Stephanie Jamison) এবং জোয়েল ব্রেয়ারটন (Joel Brereton) তাদের অনুবাদ ও গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই পারিবারিক কবিগোষ্ঠীগুলো একে অপরের সাথে শুধু কাব্যরীতিতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত না, বরং কার স্তোত্র রাজাকে বেশি যুদ্ধজয় এনে দিতে পারে, তা নিয়েও এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলত (Jamison & Brereton, 2014)। এর ফলে প্রতিটি বংশমণ্ডলে ভাষার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য, বিশেষ উপমা এবং নির্দিষ্ট দেবতার প্রতি পক্ষপাত ফুটে উঠেছে।

সূক্তের গঠনরীতি ও স্তোত্রসংকলন (Structure of Suktas and Hymn Collections)

একটি ঋগ্বৈদিক সূক্ত কীভাবে গড়ে উঠত, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তার নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকরণিক ও সাহিত্যিক ছাঁচ রয়েছে। একেকটি সূক্ত মূলত কয়েকটি পদ্য বা শ্লোকের সমষ্টি, যা কোনো এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বা সোমরস নিবেদনের সময় আবৃত্তি করা হতো। সূক্তগুলোর সূচনা হতো সাধারণত দেবতার সরাসরি আহ্বানের মাধ্যমে। দেবতাকে তার অতীতের কোনো বীরত্বপূর্ণ কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো, যেমন ইন্দ্র কীভাবে জল আটকে রাখা দানবকে হত্যা করে নদী মুক্ত করেছিলেন, কিংবা অশ্বিনদ্বয় কীভাবে সমুদ্রে বিপদে পড়া নাবিককে রক্ষা করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত পার্থিব – স্তাবক বোঝাতে চাইতেন, তুমি অতীতে অমুককে সাহায্য করেছ, সুতরাং এখন আমাকেও সাহায্য করো (Gonda, 1975)।

সূক্তের দ্বিতীয় পর্বে থাকত দেবতার রূপ, শক্তি এবং তার পানীয়াসক্তির বর্ণনা। বিশেষ করে ইন্দ্র ও অগ্নির সূক্তগুলোতে এই ধরনের প্রশংসা অতি দীর্ঘ হতো। ইন্দ্রের ক্ষেত্রে সোমরস পানের আনন্দ এবং তার সোনালি দাড়ির বিবরণ যেমন থাকত, অগ্নির ক্ষেত্রে থাকত তার ঘৃতাহুতি গ্রহণের বর্ণনা এবং ধোঁয়ার শিখা নিয়ে আকাশে ওঠার চিত্র। এই প্রশংসা পর্বটি কোনো নিঃস্বার্থ ভক্তিমূলক ব্যাপার ছিল না। এটা ছিল দেবতার সাথে এক ধরনের আদান-প্রদানের চুক্তি। নৃতাত্ত্বিক পরিভাষায় যাকে বলা যায় পারস্পরিক উপহারের অর্থনীতি (Economy of Reciprocity)। কবি দেবতাকে স্তুতি ও সোমরস দিচ্ছেন, বিনিময়ে দেবতা দিচ্ছেন ঘোড়া, গরু, পুত্রসন্তান এবং দীর্ঘায়ু (Renou, 1956)।

সূক্তের শেষ অংশটি হতো চূড়ান্ত প্রার্থনার। এখানে কবি বা পুরোহিত তার নিজের এবং তার পৃষ্ঠপোষক রাজার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পার্থিব লাভ কামনা করতেন। এই অংশটিকে বলা হতো স্তুতির উপসংহার। অনেক ক্ষেত্রে এই শেষ অংশে যুক্ত হতো পৃষ্ঠপোষক রাজার প্রশংসাগীতি, যাকে সংহিতায় বলা হয়েছে দানস্তুতি (Dānastuti)। দানস্তুতিতে খোলাখুলি উল্লেখ থাকত অমুক রাজা যজ্ঞ শেষে পুরোহিতকে কত শত গরু, দাসী, ঘোড়া এবং স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিয়েছেন। গবেষক মরিস উইন্টারনিজ (Moriz Winternitz) উল্লেখ করেছেন, এই দানস্তুতিগুলো প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দলিল, যেখানে মিথোলজির খোলস ছাড়িয়ে বাস্তব সামাজিক লেনদেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে (Winternitz, 1907)।

তবে সব সূক্ত কেবল যজ্ঞের প্রয়োজনে তৈরি হয়নি। কিছু সূক্ত ছিল দার্শনিক জিজ্ঞাসায় ভরা, কিছু ছিল রূপকধর্মী আর কিছু ছিল নাটকীয় সংলাপের আকারে গঠিত। যেমন যম ও যমীর কথোপকথন, কিংবা পুরূরবা ও উর্বশীর নাটকীয় বিরহগাথা। এই সংলাপ-সূক্ত বা সংবাদ সূক্ত (Saṃvāda-sūkta) গুলোর ভাষা ও মেজাজ সাধারণ যজ্ঞীয় স্তোত্রের চেয়ে একেবারেই আলাদা। এখানে দেবতাদের পাশাপাশি রক্তমাংসের মানুষের জটিল সম্পর্কের টানাপোড়েন উঠে এসেছে। কবিরা ছন্দ নিয়ে খেলা করেছেন, একই সাথে শব্দের দ্ব্যর্থবোধক প্রয়োগ এবং গভীর উপমার মাধ্যমে পার্থিব সংকটগুলোকে একটা দৃশ্যমান রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

ঋষিকুল, কবি ও গীতিকারদের ভূমিকা (Role of Rshi Lineages, Poets, and Composers)

ঋগ্বেদের রচয়িতাদের সাধারণত ‘ঋষি’ বলা হলেও তারা আধুনিক অর্থে কোনো ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসী ছিলেন না। তারা ছিলেন প্রাচীন সমাজের অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় অংশ। সংস্কৃতে তাদের কবি, বিপ্র কিংবা কারু বলা হয়েছে। তাদের প্রধান পরিচয় ছিল তারা ছিলেন দক্ষ স্তোত্রকার এবং পুরোহিত। তাদের কাজ ছিল শক্তিশালী কবিতা রচনা করা, যা শত্রুকে ভীত করবে এবং রাজাকে রণক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস জোগাবে। এই কবিরা কোনো নিঃসঙ্গ তপস্বী ছিলেন না, বরং তারা গোত্রপ্রধান বা রাজাদের সাথে সামরিক অভিযানে যেতেন, রথে চড়তেন এবং বিজিত অঞ্চলের লুণ্ঠিত সম্পদের ভাগ নিতেন (Thapar, 2002)।

বংশপরম্পরায় এই কাব্যকলা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হতো। ঋগ্বেদের পাঠ থেকে জানা যায়, ভৃগু, অঙ্গিরস, অত্রি বা বশিষ্ঠরা নিজেদের পারিবারিক ধারার গোপন কাব্যকৌশল রক্ষা করতেন অত্যন্ত সাবধানে। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব কিছু পছন্দসই ছন্দ এবং পারিভাষিক শব্দ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, বশিষ্ঠ বংশীয়দের স্তোত্রগুলোতে এক ধরনের পরিশীলিত এবং সুরভিত ছন্দোবদ্ধ কাঠামো দেখা যায়, যা তাদের সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের তুলনায় আলাদা। এই পারিবারিক ধারাগুলোর ভেতর সামাজিক অবস্থান রক্ষার তীব্র লড়াই ছিল। কোনো রাজা কোন বংশের পুরোহিতকে তার প্রধান যাজক হিসেবে নিয়োগ করবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিখ্যাত দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ (Battle of the Ten Kings) বা দশ রাজার যুদ্ধের পেছনের কারণও কিন্তু জড়িয়ে ছিল এই ঋষিকুলীয় দ্বন্দ্বের সাথে, যেখানে রাজা সুদাস বিশ্বামিত্রকে সরিয়ে বশিষ্ঠকে তার প্রধান পুরোহিত মনোনীত করেছিলেন।

ঋগ্বেদের ঋষিদের তালিকায় যেমন পুরুষ কবিদের বিপুল আধিপত্য রয়েছে, তেমনি অল্প কয়েকজন নারীর নামও পাওয়া যায়, যাদের বৈদিক পরিভাষায় বলা হয় ঋষিকা (Ṛṣikās) বা ব্রহ্মবাদিনী। এদের মধ্যে লোপামুদ্রা, ঘোষা, অপালা এবং বিশ্ববারার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে ইতিহাসবিদদের সতর্ক থাকতে হবে রোমান্টিক কল্পনায় ভেসে না গিয়ে। ঋগ্বেদের মোট সূক্তসংখ্যার তুলনায় এই নারী কবিদের রচিত অংশের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সার্বিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই তারা এই সাহিত্যচর্চা করেছিলেন এবং তাদের স্তোত্রগুলোর মূল বিষয়ও অনেক সময় ছিল রোগমুক্তি, উপযুক্ত স্বামী লাভ কিংবা সন্তানহীনতার সংকট থেকে উত্তরণ (Jamison & Brereton, 2014)। ফলে ঋষিকুলের সামগ্রিক রূপটি ছিল স্পষ্টতই পিতৃতান্ত্রিক ও বংশানুক্রমিক ক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো।

এই কবিরা নিজেদের কেবল স্তবকারী মনে করতেন না, তারা নিজেদের মনে করতেন সত্যের রূপকার। বৈদিক ধারণায় ধী (Dhī) বা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাব্যভাবনা ছিল এক বিশেষ মানসিক ক্ষমতা, যা কবিকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করত। এই ধী প্রয়োগ করে তারা যে শ্লোক রচনা করতেন, তা দিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মহাজাগতিক নিয়ম বা ঋত (Ṛta)-কে স্থিতিশীল রাখা যেত বলে বিশ্বাস করা হতো। কবিরা নিজেদের এই দক্ষতাকে প্রকাশ্যেই পণ্য বা সেবামূলক পেশা হিসেবে দেখতেন। স্তোত্র নিবেদনের পর তারা রাজার কাছে স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, “আমি তোমার জন্য শক্তিশালী স্তব তৈরি করেছি, এবার আমাকে দক্ষিণা দাও”। প্রাচীন আর্য সমাজের এই বাস্তব অর্থনৈতিক ভিত্তিটি ঋষিদের সামাজিক অবস্থানকে টিকিয়ে রেখেছিল।

প্রথম, অষ্টম ও দশম মণ্ডলের সংযোজন ও রূপান্তর (Additions and Transformations of Mandalas 1, 8, and 10)

পারিবারিক মণ্ডলগুলোর বাইরে ঋগ্বেদের যে অংশগুলো রয়েছে, বিশেষ করে প্রথম, অষ্টম, নবম ও দশম মণ্ডল, সেগুলোর ইতিহাস ভিন্ন। এগুলো মূল ধারার সাথে অনেক পরে ধাপে ধাপে যুক্ত হয়েছে। প্রথম মণ্ডলটি আসলে একটি নয়, বরং দুটি ভিন্ন ভিন্ন সংকলনের জোড়াতালি। এর প্রথম অংশটি (১ থেকে ৫০ সূক্ত) এবং শেষের অংশটি (৫১ থেকে ১৯১ সূক্ত) স্পষ্টতই আলাদা ঐতিহাসিক সময়ে সংকলিত। প্রথম মণ্ডলে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবারের স্তোত্রগুলোকে একত্রিত করা হয়েছে, যার মধ্যে অগস্ত্য ও শূনঃশেপের মতো কবিদের সূক্তও রয়েছে। এই মণ্ডলের কবিতাগুলো পারিবারিক মণ্ডলগুলোর মতো সুসংগত কোনো নিয়ম পুরোপুরি মেনে চলে না, বরং এটি একটি মিশ্র সংকলন (Oldenberg, 1888)।

অষ্টম মণ্ডলটি ঋগ্বেদের অন্যতম জটিল অংশ। এটি মূলত কণ্ব (Kaṇva) পরিবারের স্তোত্র দিয়ে ভরা। এই মণ্ডলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ছন্দ। যেখানে বংশমণ্ডলগুলোতে ত্রিষ্টুভ ও জগতীর মতো বীরত্বব্যঞ্জক ছন্দের আধিপত্য দেখা যায়, সেখানে অষ্টম মণ্ডলে আধিপত্য বিস্তার করেছে প্রগাথ (Pragātha) ছন্দ, যা মূলত গীতধর্মী এবং সুর করে গাওয়ার জন্য উপযুক্ত। এর চেয়েও বড় কথা, অষ্টম মণ্ডলের ভৌগোলিক সীমানা পারিবারিক মণ্ডলগুলোর চেয়ে কিছুটা আলাদা। এখানে এমন কিছু নদীর নাম এবং ভূপ্রকৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও আফগানিস্তানের নিকটবর্তী অঞ্চলের দিকে নির্দেশ করে। গবেষকদের মতে, এটি সম্ভবত এমন এক অঞ্চলে প্রচলিত ছিল যা মূল কুরু বা পঞ্চাল ভূখণ্ডের কিছুটা বাইরে ছিল (Witzel, 1997)।

নবম মণ্ডলটি সংকলন করার পেছনে কাজ করেছিল সম্পূর্ণ এক ভিন্ন উদ্দেশ্য। ঋগ্বেদের সমস্ত মণ্ডলের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা সোমরস-সম্পর্কিত সমস্ত স্তোত্রকে এক জায়গায় এনে এই নবম মণ্ডল বা পবমান মণ্ডল (Pavamāna Mandala) তৈরি করা হয়েছিল। সম্পাদকরা যখন সমগ্র সংহিতা গুছিয়ে আনছিলেন, তখন তারা দেখলেন সোমরস নিবেদনের যে বিশেষ স্তোত্রগুলো রয়েছে, সেগুলোর মেজাজ ও আচারগত উপযোগিতা সাধারণ দেবস্তুতির চেয়ে আলাদা। তাই তারা বিভিন্ন ঋষিকুলের পারিবারিক গ্রন্থ থেকে সোমসূক্তগুলোকে তুলে এনে একটি একক মণ্ডলে সাজালেন (Macdonell, 1917)। ফলে নবম মণ্ডলে শুধু একজন দেবতাই বিরাজমান, তিনি হলেন সোমপবমান বা ফিল্টার দিয়ে গলে পড়া সোমরস। এটি সম্পূর্ণরূপে সোমযজ্ঞের বাস্তব ক্রিয়াকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিল।

সবশেষে আসে দশম মণ্ডল, যা গোটা সংহিতায় সবচেয়ে নবীন এবং বিষয়বস্তুর দিক থেকে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। দশম মণ্ডলের ভাষা, ব্যাকরণ এবং ভাবজগৎ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি বৈদিক যুগের একেবারে প্রান্তভাগে রচিত হয়েছিল, যখন আর্যরা গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং জটিল রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠছে। এখানে দেবতারা আর কেবল প্রাকৃতিক শক্তির রূপ নন, বরং সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গভীর দার্শনিক সংশয় দেখা দিচ্ছে। এই মণ্ডলেই রয়েছে সৃষ্টি সংক্রান্ত বিখ্যাত নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta), যেখানে ঈশ্বরকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। আবার এই দশম মণ্ডলেই রয়েছে বিতর্কিত পুরুষ সূক্ত (Puruṣa Sūkta), যেখানে বৈদিক সমাজের চার বর্ণের বিভাজনকে একটি মহাজাগতিক সৃষ্টির রূপক দিয়ে প্রথমবার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে (Keith, 1925)। এই সংযোজনগুলো প্রমাণ করে কীভাবে একটি সাধারণ স্তোত্রসংকলন কালক্রমে একটি সমন্বিত রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক সংহিতায় রূপান্তরিত হয়েছিল।

ভাষা ও কালানুক্রমিক স্তরবিন্যাস (Linguistic and Chronological Stratification)

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ঋগ্বেদ সংহিতা কোনো সমজাতীয় পাঠ নয়। এর ভেতরে প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতের একাধিক ঐতিহাসিক স্তর লুকিয়ে আছে। আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ঋগ্বেদের পাঠকে অন্তত তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করেছেন – আদি বৈদিক, মধ্য বৈদিক এবং অন্ত্য বা শেষ বৈদিক স্তর। এই স্তরবিন্যাস কোনো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ব্যাকরণিক রূপতত্ত্ব, ক্রিয়ার রূপ, বিভক্তি এবং শব্দকোষের পরিবর্তনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে (Macdonell, 1910)।

প্রথম স্তরে রয়েছে দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডলের অধিকাংশ সূক্ত। এই স্তরের ভাষায় ইন্দো-ইউরোপীয় এবং ইন্দো-ইরানীয় প্রাচীন রূপগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে এমন সব জটিল ক্রিয়াপদের রূপ পাওয়া যায়, যেমন বহুরূপী সাবজাঙ্কটিভ বা অনুজ্ঞাসূচক ক্রিয়া এবং জটিল প্রত্যয়, যা পরবর্তীকালের ধ্রুপদী সংস্কৃতে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এর বিপরীতে, দশম মণ্ডল এবং প্রথম মণ্ডলের একাংশের ভাষায় দেখা যায় ক্রিয়ার সেই জটিল রূপগুলো সংকুচিত হয়ে এসেছে এবং শব্দরূপের বৈচিত্র্য কমে একটি সরল কাঠামোর দিকে এগিয়েছে। যেমন, প্রাচীন বংশমণ্ডলগুলোতে যেখানে শব্দের দ্বিবচনে কিংবা বিশেষ বিভক্তির ক্ষেত্রে প্রাচীন রূপ প্রচলিত ছিল, দশম মণ্ডলে সেখানে পরবর্তী ব্রাহ্মণ সাহিত্যের মতো আধুনিক ব্যাকরণিক নিয়মের ছায়া স্পষ্ট (Witzel, 1995)।

ভাষার এই বিবর্তনের পাশাপাশি শব্দভাণ্ডারের পরিবর্তনও অত্যন্ত লক্ষণীয়। প্রাচীন মণ্ডলগুলোতে যে সমস্ত ভৌগোলিক শব্দ, নদীর নাম বা স্থানীয় অনার্য গোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়, পরবর্তী মণ্ডলগুলোতে সেগুলোর রূপ অনেকটাই বদলে গেছে। দশম মণ্ডলে এমন অনেক শব্দের আগমন ঘটেছে যা দ্রাবিড় বা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা থেকে ঋণ হিসেবে বৈদিক সংস্কৃতে প্রবেশ করেছিল। এটি নির্দেশ করে যে, বৈদিক জনগোষ্ঠী যখন পাঞ্জাব ও সপ্তসিন্ধু অঞ্চল ছেড়ে পূর্ব দিকে গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে বিস্তার লাভ করছিল, তখন স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে তাদের রক্ত ও ভাষার মিশ্রণ ঘটছিল। ভাষাতাত্ত্বিক মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) তার বিশদ কালানুক্রমিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, ঋগ্বেদের ভাষাগত স্তরগুলো ঠিক কীভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে শুরু করে কুরু রাজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার ইতিহাসকে পর্যায়ক্রমে অনুসরণ করে (Witzel, 1997)।

সুতরাং, ঋগ্বেদ সংহিতা কোনো আকাশ থেকে পড়া অপরিবর্তনীয় পাঠ নয়। এটি এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফসল। প্রথম দিকে যা ছিল বিভিন্ন যাজক পরিবারের মৌখিক স্তোত্র, তা রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত হওয়ার সাথে সাথে একটি নির্দিষ্ট সংহিতা আকারে সংকলিত হয়েছিল। এই সংকলনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষা, সমাজ, রাজনীতি এবং চিন্তার প্রাচীনতম রূপান্তরের ইতিহাস। মণ্ডল, সূক্ত আর ঋষির এই জটিল জাল কেবল স্তবগানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন সাহিত্যিক ও কাঠামোগত বিবর্তনের একটি জীবন্ত সাক্ষী।

ঋগ্বেদের দেবজগৎ (Pantheon of the Ṛgveda): ইন্দ্র, অগ্নি, সোম, বরুণ ও অন্যান্য দেবতা

বৈদিক দেবমণ্ডলীর সাধারণ প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক রূপক (General Nature and Natural Metaphors of the Vedic Pantheon)

প্রাচীন মানুষের আকাশ দেখার অনুভূতিটা ঠিক কেমন ছিল, সেটা আজকের দিনে বসে কল্পনা করা বেশ কঠিন। চারপাশে কোনো আধুনিক বাতি নেই, গভীর অন্ধকারে ঢাকা প্রান্তর, মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে অগণিত তারা। সেই আদিম অন্ধকার আর ঝড়ের গর্জন দেখে মানুষ নিশ্চয়ই ভয় পেত। ঋগ্বেদের দেবমণ্ডলী গড়ে ওঠার পেছনে এই প্রাকৃতিক বিস্ময় এবং ভীতির ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। বৈদিক স্তোত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানকার দেবতারা কোনো মন্দিরের গর্ভগৃহে বসে থাকা পাথরের মূর্তি নন। তারা হলেন সরাসরি প্রকৃতির নানা শক্তির জীবন্ত রূপায়ণ। ঝড়, আগুন, সূর্য, ভোর কিংবা উদ্ভিদের রস – এই সবকিছুকেই প্রাচীন কবিরা রক্তমাংসের চরিত্রের মতো কল্পনা করেছিলেন।

ধর্মতত্ত্বের দিক থেকে এই দেবমণ্ডলকে বোঝার জন্য গবেষকরা নানা ধরনের তত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছেন। ঊনবিংশ শতকে ভাষাতাত্ত্বিক ম্যাক্স মুলার (Max Müller) বৈদিক দেবতাদের এই রূপ দেখে একটি নতুন পরিভাষা তৈরি করেছিলেন, যার নাম হিনোথেইজম (Henotheism) বা কেথেনোথেইজম (Kathenotheism)। তার বক্তব্য ছিল, ঋগ্বেদের কবিরা যখন যে দেবতার স্তুতি করতেন, তখন তাকেই মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ও একক অধিপতি হিসেবে তুলে ধরতেন (Müller, 1878)। সকালে হয়তো অগ্নির স্তব করে বলা হলো তিনিই সব দেবতাদের পিতা, আবার বিকেলে ইন্দ্রের কাছে এসে একই ধরনের সর্বোচ্চ ক্ষমতার দাবি জুড়ে দেওয়া হলো। এটা কঠোর অর্থে একেশ্বরবাদ নয়, আবার পুরোপুরি সাধারণ বহুদেববাদ (Polytheism) হিসেবেও একে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। এটা ছিল পরিস্থিতির প্রয়োজনে দেবতাকে সবার ওপরে স্থান দেওয়ার এক বিশেষ কাব্যিক কৌশল।

অন্যদিকে ফরাসি তুলনামূলক পৌরাণিক তাত্ত্বিক জর্জেস দুমেযিল (Georges Dumézil) পুরো ব্যাপারটিকে দেখেছিলেন ইন্দো-ইউরোপীয় সমাজের কাঠামোর জায়গা থেকে। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন তার বিখ্যাত ত্রিপাক্ষিক তত্ত্ব (Trifunctional Hypothesis)। দুমেযিলের মতে, বৈদিক দেবমণ্ডলী মূলত প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় সমাজের তিনটি সামাজিক স্তরকে প্রতিফলিত করে। প্রথম স্তরে রয়েছে ধর্মীয় ও মহাজাগতিক সার্বভৌমত্ব, যার প্রতিনিধি বরুণ ও মিত্র। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে সামরিক শক্তি ও যুদ্ধ, যার প্রতিমূর্তি ইন্দ্র। আর তৃতীয় স্তরে রয়েছে উৎপাদনশীলতা, উর্বরতা ও স্বাস্থ্য, যার ভার পড়েছে অশ্বিনদ্বয়ের কাঁধে (Dumézil, 1958)। এই সামাজিক বিন্যাসটি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে প্রাচীন যাযাবর আর্যদের শ্রেণি ও পেশাগত বিভাজনের বাস্তবতাকেই পরিষ্কার করে তোলে।

তবে বৈদিক দেবতাদের কোনো স্থায়ী শারীরিক রূপ বা স্থায়ী আবাসস্থল নিয়ে স্তোত্রকাররা নিশ্চিত ছিলেন না। জার্মান ভারততত্ত্ববিদ টমাস ওবারলিজ (Thomas Oberlies) তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বৈদিক দেবতারা মূলত মানুষের প্রয়োজন মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন (Oberlies, 1998)। মানুষের গবাদিপশু রক্ষা করতে হবে, বৃষ্টি এনে ঘাস জন্মাতে হবে, আর যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে – এই সমস্ত বাস্তব প্রয়োজনেই দেবতাদের ডেকে আনা হতো। কোনো আধ্যাত্মিক মুক্তি বা পরকালের স্বর্গে অনন্তকাল বসবাসের আকাঙ্ক্ষা এখানে মুখ্য ছিল না। বৈদিক দেবতাদের সাথে মানুষের সম্পর্কটা ছিল অনেকটা লেনদেনের। মানুষ যজ্ঞের ধোঁয়া আর সোমরস পাঠাবে স্বর্গে, আর দেবতারা মর্ত্যে পাঠাবেন বৃষ্টি, সন্তান আর ধনসম্পদ।

ইন্দ্র: আধিপত্য, যুদ্ধ ও পৌরুষের প্রতিমূর্তি (Indra: Sovereignty, Warfare, and the Embodiment of Virility)

ঋগ্বেদে যদি সবচেয়ে প্রভাবশালী কোনো চরিত্রের সন্ধান করতে হয়, তবে চোখ বন্ধ করে ইন্দ্রের নাম বলতে হবে। পুরো সংহিতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ সূক্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াইশো স্তোত্র একা ইন্দ্রের নামেই উৎসর্গ করা হয়েছে। তাকে কল্পনা করা হয়েছে সোনালি দাড়িওয়ালা, বিশালাকার এক বলশালী যোদ্ধা হিসেবে। তিনি রথে চড়েন, যার রথ টানছে দুটি সোনালি ঘোড়া। হাতে রয়েছে তার প্রধান অস্ত্র বজ্র (Vajra), যা তৈরি করে দিয়েছিলেন কারিগর দেবতা ত্বষ্টা। ইন্দ্র কোনো শান্ত বা ধ্যানমগ্ন সত্তা নন, তিনি হলেন ক্ষিপ্র, রুদ্র এবং তীব্র আবেগে ভরপুর এক সেনাপতি। স্তোত্রগুলোতে দেখা যায়, তিনি প্রচুর পরিমাণে মাংস খান এবং সোমরসের পাত্রের পর পাত্র খালি করে ফেলেন। এই সোমরস পান করেই তিনি যুদ্ধের উন্মাদনা লাভ করেন।

ইন্দ্রের পুরাকথার কেন্দ্রে রয়েছে এক সংঘাতের গল্প, যা বৈদিক পুরাণের সবচেয়ে জনপ্রিয় আখ্যান। সেটা হলো বৃত্রসংহার (Vṛtrahatyā)। এক দানবীয় ড্রাগন বা সর্পিল সত্তা, যার নাম বৃত্র, সে মহাবিশ্বের সমস্ত জলকে পাহাড়ে বন্দি করে রেখেছিল। ফলে খরা ও তৃষ্ণায় চরাচর ফেটে যাচ্ছিল। ইন্দ্র সোমরস পান করে উন্মত্ত হলেন, হাতে তুলে নিলেন বজ্র, এবং বৃত্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি বৃত্রের চোয়াল চূর্ণ করে তাকে হত্যা করলেন এবং বন্দি নদীগুলোকে মুক্ত করে সাগরের দিকে বইয়ে দিলেন (Kuiper, 1992)। এই ঘটনাটি কেবল একটি পৌরাণিক রূপকথা নয়। এর ভেতরে শুষ্ক উত্তর-পশ্চিম ভারতের পরিবেশের সাথে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সংকেত রয়েছে। বর্ষার আগমন এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া নদীর জলপ্রবাহকে উন্মুক্ত করার প্রাকৃতিক ঘটনাটিকেই কবিরা ইন্দ্রের যুদ্ধজয়ের রূপকে সাজিয়েছিলেন।

কিন্তু ইন্দ্র কেবল প্রকৃতির ঝড়ের দেবতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন যাযাবর বৈদিক পশুপালকদের সামরিক নেতা। তৎকালীন সমাজে গবাদিপশু দখল নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত লড়াই হতো, যাকে বৈদিক ভাষায় বলা হতো গবিষ্টি (Gaviṣṭi), যার আক্ষরিক অর্থ ‘গরুর অন্বেষণ’। ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ব্রুস লিঙ্কন (Bruce Lincoln) দেখিয়েছেন, ইন্দো-ইউরোপীয় পশুপালক সমাজে গবাদিপশু লুণ্ঠন ছিল অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রধান উপায়, আর ইন্দ্রের চরিত্রটি ছিল সেই লুণ্ঠনকারী যাযাবর বীরের আদর্শ রূপ (Lincoln, 1981)। যুদ্ধের ময়দানে ইন্দ্র তার ভক্তদের শত্রুর কেল্লা বা ‘পুর’ ধ্বংস করতে সাহায্য করতেন, একারণে তার আরেক নাম ছিল পুরন্দর বা দুর্গ ধ্বংসকারী।

ইন্দ্রের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত মানবিক দোষগুণে ভরা। তিনি অহংকারী, প্রশংসাপ্রিয় এবং মাঝেমধ্যে বেশ স্বার্থপর। স্তোত্রগুলোতে কবিরা তাকে তোষামোদ করছেন যেন তিনি অন্য কোনো যজ্ঞে না গিয়ে তাদের যজ্ঞেই আগে আসেন। তিনি বেশি সোমরস ভালোবাসেন, তাই কবিরা তার জন্য সেরা পাত্রে রস সাজিয়ে রাখেন। ইন্দ্রের এই অতিরিক্ত মানবিক রূপটিই স্পষ্ট করে যে, প্রাচীন আর্যরা নিজেদের দলপতি বা রাজাদের যে গুণাবলি দেখতে চাইত, তারই একটি মহাজাগতিক সংস্করণ তারা তৈরি করেছিল ইন্দ্রের ভেতর। ইন্দ্র ছিলেন মূলত তাদের নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতার এক বিরাট ছায়া।

অগ্নি ও সোম: যজ্ঞবেদির মধ্যস্থতাকারী ও উদ্ভিজ্জ দেবতা (Agni and Soma: Mediators of the Sacrificial Altar and the Plant Deity)

ইন্দ্রের পরেই ঋগ্বেদে যার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন অগ্নি। সংহিতার একেবারে প্রথম সূক্তটিই শুরু হয়েছে অগ্নির বন্দনা দিয়ে। সেখানে অগ্নিকে বলা হয়েছে পুরোহিত, যজ্ঞের প্রধান ঋত্বিক এবং দেবতাদের আহ্বানকারী। প্রায় দুই শতাধিক সূক্তে অগ্নির প্রশংসা গাওয়া হয়েছে। আগুনের বাস্তব উপযোগিতা যাযাবর মানুষের জীবনে কতটা গভীর ছিল, তা বলাই বাহুল্য। আগুন তাদের রাতের হিংস্র পশুর হাত থেকে বাঁচাত, শীতের রাতে উষ্ণতা দিত এবং কাঁচা মাংস পুড়িয়ে খাওয়ার সুযোগ করে দিত। এই পার্থিব আগুনই যজ্ঞের বেদিতে রূপ নিল এক অলৌকিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশ্বাস করা হতো, যজ্ঞে যে ঘি আর খাবার ঢালা হচ্ছে, অগ্নি তার শিখা দিয়ে তা গ্রাস করছেন এবং ধোঁয়ার মাধ্যমে সেই খাবারের নির্যাস স্বর্গের দেবতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

অগ্নির জন্ম নিয়ে ঋগ্বেদে চমৎকার সব রূপক তৈরি করা হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে ত্রিমুখী বা তিন স্থানে জন্ম নেওয়া সত্তা। তিনি পৃথিবীতে জন্ম নেন শুকনো দুটি কাঠের ঘর্ষণে, অন্তরীক্ষে জন্ম নেন মেঘের ভেতর বিদ্যুতের ঝলক হিসেবে, আর আকাশে তিনি অবস্থান করেন সূর্যের রূপে। কাঠের টুকরো ঘষে আগুন জ্বালানোর প্রক্রিয়াটিকে কবিরা বর্ণনা করেছেন এক বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে। শুকনো দুটো অসাড় কাঠ থেকে যে লালবর্ণের শিশুটি জন্ম নেয়, সে জন্ম নিয়েই তার নিজের পিতামাতাকে, অর্থাৎ সেই কাঠ দুটিকে গ্রাস করতে শুরু করে। ভাষাতাত্ত্বিক তাতায়ানা এলিজারেনকোভা (Tatyana Elizarenkova) অগ্নির এই রূপক ভাষা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, বৈদিক কবিরা বাস্তব জাগতিক পর্যবেক্ষণকে কীভাবে সূক্ষ্ম কাব্যিক ধাঁধায় রূপান্তরিত করতেন (Elizarenkova, 1995)।

অগ্নির ঠিক পাশাপাশি যজ্ঞবেদির আরেক প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন সোম। সোম একই সাথে একজন দেবতা, একটি উদ্ভিদ এবং একটি মাদক পানীয়। এটি এমন এক বিশেষ উদ্ভিদ, যা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হতো। পাথরে পিষে এর রস বের করে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে দুধ বা দইয়ের সাথে মিশিয়ে সোনালি বা বাদামি রঙের এক পানীয় তৈরি করা হতো। এই পানীয়টি যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশে নিবেদন করা হতো এবং পুরোহিত ও যোদ্ধারা নিজেরাও পান করতেন। এই রস পানের পর মানুষের স্নায়বিক উত্তেজনা বাড়ত, মনে এক ধরনের অলৌকিক আনন্দ আর শক্তির জন্ম হতো। নবম মণ্ডলের পুরোটাই উৎসর্গ করা হয়েছে এই সোম দেবতার নামে।

ধর্মতত্ত্ববিদ ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger) তার অনুবাদ ও গবেষণায় সোমরসকে কেবল একটি নেশাদ্রব্য হিসেবে নয়, বরং বৈদিক চেতনার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে শনাক্ত করেছেন (Doniger, 1981)। প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় ঐতিহ্য থেকেই এই সোমের ধারণা এসেছে, যা আবেস্তায় ‘হোম’ নামে পরিচিত ছিল। সোম পান করে কবিরা নিজেদের অমর মনে করতেন, তারা ভাবতেন তারা আলোর জগতে প্রবেশ করেছেন। সোম যেন পার্থিব মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও সাধারণ দুঃখকষ্টের ঊর্ধ্বে তুলে নিয়ে যেত। অগ্নি যদি হন যজ্ঞের মুখ, তবে সোম ছিলেন যজ্ঞের প্রাণ। এই দুই মাধ্যম ছাড়া বৈদিক আচারের অস্তিত্বই কল্পনা করা যেত না।

বরুণ ও মিত্র: নৈতিক শাসন, ঋত ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলা (Varuna and Mitra: Moral Governance, Rta, and Cosmic Order)

ইন্দ্র যখন শক্তির দেবতা, তখন বরুণ হলেন নিয়মের দেবতা। ঋগ্বেদের দেবজগতে বরুণের আসনটি একেবারে আলাদা। তাকে কোনো উচ্ছ্বল বা মাতাল দেবতা হিসেবে কল্পনা করা হয়নি। তিনি গম্ভীর, দূরদর্শী এবং কঠোর এক মহাজাগতিক শাসক। বরুণকে সম্বোধন করা হয়েছে অসুর (Asura) হিসেবে। ঋগ্বেদের আদি স্তরে অসুর শব্দটি কোনো নেতিবাচক বা দানবীয় অর্থ বহন করত না, বরং এটি ছিল এক গভীর অতিন্দ্রীয় ও শাসনতান্ত্রিক শক্তির উপাধি। বরুণের প্রধান দায়িত্ব হলো মহাবিশ্বের চরম নিয়ম বা ঋত (Ṛta) রক্ষা করা। ঋত হলো সেই শৃঙ্খলা যার কারণে সূর্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ওঠে, ঋতুগুলো পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয় এবং নদীগুলো সমুদ্রে গিয়ে মেশে অথচ সমুদ্র কখনো উপচে পড়ে না (Dandekar, 1979)।

বরুণের চোখে ফাঁকি দেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কবিরা বর্ণনা করেছেন, আকাশে ওড়ার সময় পাখির গতিপথও তিনি জানেন, সাগরে চলা জাহাজের পথও তার চেনা। মহাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তার অগণিত গুপ্তচর বা ‘স্পশ’। দুজন মানুষ যখন গোপনে কোনো ষড়যন্ত্র করে, তখন তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে সেখানে বরুণ উপস্থিত থাকেন। নৈতিক স্খলন বা নিয়ম ভাঙলে বরুণ মানুষকে শাস্তি দেন। তার প্রধান অস্ত্র কোনো তলোয়ার বা বজ্র নয়, তার অস্ত্র হলো এক অদৃশ্য ফাঁস বা পাশ (Pāśa)। এই ফাঁসে তিনি অপরাধীকে বেঁধে ফেলেন, যার শারীরিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল শোথ বা জলোদর রোগের মাধ্যমে। তাই বরুণের সূক্তগুলোতে ইন্দ্রের মতো অহংকারের ভাষা পাওয়া যায় না, বরং সেখানে থাকে অপরাধবোধ, ক্ষমা প্রার্থনা এবং ভয়। মানুষ বরুণের কাছে কাঁদো কাঁদো গলায় প্রার্থনা করে, “হে বরুণ, আমি না জেনে যে পাপ করেছি, তার বাঁধন থেকে আমাকে মুক্ত করো”।

বরুণের সাথে প্রায়শই দ্বৈত দেবতা হিসেবে আবির্ভূত হন মিত্র। মিত্র হলেন চুক্তির দেবতা, সামাজিক সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের প্রতীক। পৌরাণিক বিশেষজ্ঞ মার্টিন এল. ওয়েস্ট (Martin L. West) ইন্দো-ইউরোপীয় দেবমণ্ডলীর তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে, মিত্র-বরুণ জুটি মূলত সমাজ ও মহাবিশ্বের দুটি দিককে তুলে ধরে (West, 2007)। মিত্র হলেন দিনের আলো, স্পষ্টতা এবং মানুষের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির রক্ষক। অন্যদিকে বরুণ হলেন অন্ধকার, গভীর রাত, গোপন সত্য এবং কঠোর নিয়মের শাসক। একজন শাসন করেন ভালোবাসায়, অন্যজন শাসন করেন এক ধরনের আতঙ্কের ভেতর দিয়ে।

পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে অবশ্য বরুণের এই মহিমান্বিত রূপটি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। ইন্দ্রের সামরিক আধিপত্য এবং পরবর্তীকালে প্রজাপতি ও রুদ্রের উত্থানের কাছে বরুণের নৈতিক কর্তৃত্ব গুরুত্ব হারাতে থাকে। তিনি ধীরে ধীরে নেমে আসেন কেবল জলের দেবতা হিসেবে, সাগরের এক কোণে তার সীমাবদ্ধ অবস্থান তৈরি হয়। কিন্তু আদি ঋগ্বেদে বরুণ ছিলেন নৈতিকতার এক দুর্লভ প্রতিচ্ছবি, যা প্রাচীন যাযাবর সমাজেও এক ধরনের শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার তীব্র প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে।

সৌর ও বায়বীয় দেববর্গ: সূর্য, সবিতৃ, বিষ্ণু, রুদ্র ও মরুৎগণ (Solar and Aerial Deities: Surya, Savitr, Vishnu, Rudra, and the Maruts)

ঋগ্বেদের আকাশের দিকে তাকালে আরো বেশ কিছু উজ্জ্বল মুখ চোখে পড়ে। এদের মধ্যে সূর্য দেবতার বিভিন্ন রূপ অন্যতম। সূর্যকে দেখা হয়েছে আলোর উৎস হিসেবে, যিনি অন্ধকারের দৈত্যদের তাড়িয়ে দিয়ে জগতকে কর্মচঞ্চল করেন। সূর্যেরই আরেকটি বিশেষ রূপ হলেন সবিতৃ। তিনি হলেন অনুপ্রেরণার দেবতা, যিনি ভোরবেলা মানুষকে যার যার কাজে উদ্দীপ্ত করেন। বিখ্যাত গায়ত্রী মন্ত্রটি এই সবিতৃ দেবতার উদ্দেশ্যেই রচিত। সেখানে প্রার্থনা করা হয়, সেই দেব সবিতৃর বরণীয় জ্যোতি যেন মানুষের বুদ্ধিকে সৎপথে পরিচালিত করে। সবিতৃর হাত সোনার তৈরি, তিনি স্বর্ণরথে চড়ে অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়ান এবং সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন।

এই দেবমণ্ডলে বিষ্ণুর অবস্থানটি বেশ কৌতূহলপূর্ণ। পরবর্তীকালের পৌরাণিক হিন্দুধর্মে বিষ্ণু পরম ঈশ্বর হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেও ঋগ্বেদে তিনি তুলনামূলকভাবে এক অপ্রধান দেবতা। সেখানে তার নামে হাতেগোনা কয়েকটি সূক্ত রয়েছে। তবে তার একটি বিশেষ কীর্তির কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, সেটা হলো তার তিন পদক্ষেপ বা ত্রিবিক্রম (Trivikrama)। বিষ্ণু তার তিনটি পদক্ষেপ দিয়ে পুরো মহাবিশ্ব মেপে নিয়েছিলেন। তার দুটি পদক্ষেপ মানুষের চোখে দৃশ্যমান – পৃথিবী ও আকাশ। কিন্তু তার তৃতীয় পদক্ষেপটি এত উঁচুতে, যা কোনো নশ্বর মানুষ বা পাখিও দেখতে পায় না। ভারততাত্ত্বিক জে. পি. ম্যালরি এবং ডি. কিউ. অ্যাডামস তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, বিষ্ণুর এই তিন পদক্ষেপ আসলে সূর্যের উদয়, মধ্যাহ্ন এবং অস্ত যাওয়ার মহাজাগতিক রূপক ছাড়া আর কিছু নয় (Mallory & Adams, 1997)। ইন্দ্রের সাথে বিষ্ণুর একটি সখ্য ছিল, তিনি ইন্দ্রকে বৃত্র বধের কাজে সাহায্য করেছিলেন।

অন্যদিকে রুদ্র ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের এক দেবতা। তিনি আকাশের নন, তিনি বনের, পর্বতের এবং ঝড়ের ধ্বংসাত্মক রূপ। রুদ্রের হাতে থাকে বিষাক্ত তির-ধনুক। তিনি যখন রেগে যান, তখন মানুষ ও গবাদিপশুর মধ্যে মহামারি ছড়িয়ে দেন। স্তবকারীরা রুদ্রের কাছে হাতজোড় করে আকুল প্রার্থনা জানাত যেন তিনি তার তির তাদের দিকে না ছোড়েন। তাকে বলা হয়েছে ভয়ংকর, আবার একই সাথে তাকে বলা হয়েছে ‘ভিষক’ বা বৈদ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কারণ যে দেবতা রোগ দেন, তিনিই আবার রোগ নিরাময়ের ভেষজ ওষুধের সন্ধান জানেন। ফিনিশ গবেষক আস্কো পারপোলা (Asko Parpola) রুদ্রের এই চরিত্রের ভেতর প্রাক-বৈদিক বা স্থানীয় সিন্ধু সভ্যতার কোনো পশুপতি-সদৃশ দেবতার সংমিশ্রণ দেখতে পেয়েছেন (Parpola, 2015)। পরবর্তীকালে এই রুদ্রই রূপ নিয়েছিলেন মহাদেব বা শিবের চরিত্রে।

রুদ্রের পুত্রদের বলা হতো মরুৎগণ। তারা হলেন ঝড়ের দেবতা, যুবক যোদ্ধাদের এক উচ্ছ্বল বাহিনী। তারা দল বেঁধে গান গাইতে গাইতে আকাশ চিরে ছুটে যেতেন, তাদের সোনালি বর্মের ঝলকানিতে বিদ্যুৎ চমকাত আর তাদের রথের চাকার শব্দে পাহাড় কেঁপে উঠত। মরুৎরা ছিলেন ইন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহচর। যুদ্ধে তারা ইন্দ্রকে সঙ্গ দিতেন এবং গান গেয়ে ইন্দ্রের সাহস বাড়িয়ে তুলতেন। এই তরুণ যোদ্ধাদের কল্পনা করা হয়েছিল তৎকালীন আর্য সমাজের তরুণ যুবকদের সামরিক দলের অনুকরণে, যাদের জীবন ছিল উচ্ছ্বলতা ও সমরাভিযানে ভরা।

দেবীসমূহ ও অন্ত্যবৈদিক দেবভাবনার রূপান্তর (Goddesses and the Transformation of Late Vedic Theism)

ঋগ্বেদের দেবজগতে পুরুষ দেবতাদের যে একচ্ছত্র দাপট দেখা যায়, তার তুলনায় নারী দেবীরা ছিলেন সংখ্যায় অনেক কম এবং ক্ষমতায় তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা প্রতিফলিত করছিল তৎকালীন পিতৃতান্ত্রিক পশুপালক সমাজের কাঠামোকে, যেখানে সামরিক নেতৃত্ব এবং সম্পদের মালিকানা ছিল পুরুষদের হাতে। তবে এই সীমাবদ্ধতার ভেতরেও কয়েকজন দেবী তাদের অপরূপ কাব্যিক বর্ণনায় চিরন্তন স্থান করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল হলেন উষা (Uṣas), ভোরের দেবী। উষাকে নিয়ে রচিত সূক্তগুলো ঋগ্বেদের শ্রেষ্ঠ কবিতার মর্যাদা পায়।

উষাকে কল্পনা করা হয়েছে এক রূপবতী তরুণী হিসেবে, যিনি আকাশের পূর্ব প্রান্তে হাসিমুখে দেখা দেন। তিনি অন্ধকারের কালো চাদর সরিয়ে সূর্যের জন্য পথ তৈরি করে দেন। কবিরা তার রূপের বর্ণনায় কোনো কৃপণতা করেননি। তাকে তুলনা করা হয়েছে স্নান সেরে বের হওয়া এক লজ্জাবতী বধূর সাথে, কিংবা এমন এক নৃত্যশিল্পীর সাথে যিনি নিজের রূপের মায়ায় জগতকে মোহিত করে রাখেন। তবে এই সৌন্দর্যের বর্ণনার নিচেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর বিষাদ। কবিরা বারবার স্মরণ করিয়ে দেন, উষা তো প্রতিদিন নতুন হয়ে ফিরে আসেন, কিন্তু তার প্রতিটি আগমনের সাথে সাথে নশ্বর মানুষের আয়ু এক দিন করে কমে যায় (Bhattacharji, 1970)।

উষা ছাড়া অন্যান্য দেবীদের মধ্যে ছিলেন অদিতি, যাকে কোনো নির্দিষ্ট রূপ দেওয়া হয়নি। তিনি হলেন বন্ধনহীনতা বা অসীমের প্রতীক। তিনি সমস্ত দেবীর মাতা। আবার ছিলেন সরস্বতী, যিনি প্রথমে ছিলেন এক প্রবল খরস্রোতা নদী, যার তীরে বসে আর্যরা যজ্ঞ করত। পরবর্তীকালে এই নদীদেবী রূপান্তরিত হতে থাকেন বাক বা ভাষার দেবীতে। দশম মণ্ডলে আমরা পাই বাক সূক্ত (Vāk Sūkta), যেখানে বাক দেবী নিজেকে মহাবিশ্বের চালিকাশক্তি হিসেবে ঘোষণা করছেন। তিনি বলছেন, তিনি যার ওপর কৃপা করেন তাকেই তিনি রুদ্র, ব্রহ্মা বা ঋষি বানিয়ে দেন।

বৈদিক যুগের শেষের দিকে এসে এই বহুদেববাদী ধারণায় এক বিরাট ভাঙন দেখা দেয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দেবতার আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। দশম মণ্ডলে এসে দেবতারা তাদের রক্তমাংসের রূপ হারাতে থাকেন এবং তাদের জায়গায় উঠে আসে বিমূর্ত দার্শনিক সত্তা। তৈরি হয় বিশ্বকর্মা (Viśvakarman) বা প্রজাপতি (Prajāpati)-র মতো নতুন স্রষ্টা দেবতার ধারণা। গবেষক ডরিস শ্রীনিবাসন (Doris Srinivasan) দেখিয়েছেন, কীভাবে বৈদিক যুগের দেবতারা রূপক ও প্রাকৃতিক উপমা ছেড়ে ধীরে ধীরে এক অখণ্ড মহাজাগতিক ধারণার দিকে রূপান্তরিত হয়েছিলেন (Srinivasan, 1997)। প্রথম মণ্ডলের একটি বিখ্যাত শ্লোকে কবি স্পষ্ট করেই বলে ওঠেন, “একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি”, অর্থাৎ সত্য বা সত্তা মূলত একটাই, জ্ঞানীরা তাকে ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ বা অগ্নি বলে নানা নামে ডাকেন। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই বৈদিক দেবজগৎ তার পৌরাণিক যুগ পার হয়ে পরবর্তী উপনিষদীয় দর্শনের প্রবেশদ্বারে পা রেখেছিল।

ঋগ্বেদের ধর্মীয় ধারণা (Religious Ideas of the Ṛgveda): ঋত, যজ্ঞ, প্রার্থনা ও দেব-মানব সম্পর্ক

ঋতের মহাজাগতিক ও নৈতিক ভিত্তি (Cosmic and Moral Foundations of Ṛta)

আকাশে প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠে, নির্দিষ্ট সময় পর আবার আলো নিভে গিয়ে রাত নামে। নদীর জল পাহাড় থেকে নেমে সাগরের দিকেই ধাবিত হয়, কখনো উল্টো দিকে ছোটে না। প্রাচীন মানুষের কাছে এই দৃশ্যগুলো শুধু প্রাকৃতিক নিয়ম ছিল না। তাদের মনে হয়েছিল, কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় পুরো মহাবিশ্ব বাঁধা রয়েছে। ঋগ্বেদে এই নিখুঁত নিয়মের একটি বিশেষ নাম দেওয়া হয়েছিল, যাকে বলা হয় ঋত (Ṛta)। ঋত হলো এমন এক মহাজাগতিক সত্য বা বিধান, যা দৃশ্যমান প্রকৃতির গতিবিধি থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন নৈতিক আচরণ পর্যন্ত সবকিছুকে পরিচালনা করে। ঋগ্বেদের ধর্মভাবনা বুঝতে গেলে এই ঋত ধারণার গভীরে প্রবেশ করা জরুরি, কারণ দেবতাদের ক্ষমতাও এই নিয়মের অধীন ছিল।

ভাষাতাত্ত্বিক ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে ঋত ধারণাটি কেবল ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব আবিষ্কার নয়। প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় ঐতিহ্য থেকে এই ধারণার উৎপত্তি হয়েছে। প্রাচীন ফারসি বা আবেস্তা ভাষায় এর একটি সমান্তরাল শব্দ পাওয়া যায়, যা হলো ‘অশ’ বা ‘অরত’। আবেস্তায় যেমন ভালো ও মন্দের লড়াইয়ে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার পক্ষে দাঁড়াতে হতো, ঋগ্বেদেও ঠিক তেমনি ঋত ছিল অন্ধকারের বিপরীতে এক নৈতিক আলোকবর্তিকা। জার্মান প্রাচ্যবিদ হাইনরিখ লুডার্স (Heinrich Lüders) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে, বৈদিক ঋত শব্দটি মূলত সত্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত (Lüders, 1951)। তার মতে, ঋত কোনো বায়বীয় কল্পনা নয়, বরং এটা হলো সত্য বাক্য এবং সঠিক জাগতিক কার্যকারিতার অবিভাজ্য মিলন। যখন কেউ মিথ্যা বলে বা প্রতিশ্রুতি ভাঙে, তখন সে কেবল কোনো ব্যক্তিকে ঠকায় না, বরং পুরো মহাজাগতিক শৃঙ্খলাকে আঘাত করে।

ঋতের বিপরীত ধারণাটিকে বলা হতো অনৃত (Anṛta), যার সহজ অর্থ মিথ্যা, বিশৃঙ্খলা বা নিয়মহীনতা। একজন সাধারণ যাযাবর পশুপালক যখন তার প্রতিবেশীর গরু চুরি করত, বা জুয়া খেলায় প্রতারণা করত, তখন ভাবা হতো সে অনৃতের পথ ধরেছে। প্রকৃতি যেমন নিয়মের বাইরে গিয়ে একদিনের জন্যও তার কাজ বন্ধ করে না, মানুষের সমাজকেও তেমনি ঋতের নিয়ম মেনে চলতে হবে। আমেরিকান ভারততত্ত্ববিদ ডাব্লিউ. নরম্যান ব্রাউন (W. Norman Brown) ঋগ্বেদের সৃষ্টিতত্ত্ব ও নৈতিকতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ঋগ্বৈদিক মানুষের কাছে সৃষ্টি মানেই ছিল বিশৃঙ্খলা বা ‘কেয়স’ থেকে শৃঙ্খলার দিকে যাত্রা (Brown, 1965)। বৃত্র যখন সমস্ত জল আটকে রেখেছিল, তখন মহাবিশ্ব ছিল অনৃতের কবলে। ইন্দ্র যখন বৃত্রকে আঘাত করে জলরাশিকে মুক্তি দিলেন, তখন মূলত ঋতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটল।

এই কারণে ঋগ্বেদের দেবতারা ঋতের স্রষ্টা নন, বরং তারা হলেন এর রক্ষক বা সংহিতার ভাষায় ‘ঋতস্য গোপ্তা’। বিশেষ করে বরুণ এবং মিত্রের মতো দেবতারা ঋতের পাহারা দেন। প্রকৃতি ও মানবসমাজের ভেতরে এই নিয়মের বিচ্যুতি ঘটলেই দেবতাদের রোষ নেমে আসত বলে বিশ্বাস করা হতো। ঋতের এই ধারণাটি প্রমাণ করে যে, ঋগ্বেদের ধর্মবিশ্বাস কোনো অন্ধ অলৌকিকতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। বরং প্রাচীন মানুষ তার চারপাশের ভৌত পরিবেশকে যেভাবে নিয়মানুবর্তী হতে দেখেছিল, নিজের সমাজ ও ধর্মবিশ্বাসের ভেতরেও ঠিক সেই নিয়মানুবর্তিতার একটি যৌক্তিক পরিকাঠামো দাঁড় করাতে চেয়েছিল। পরবর্তীকালে ভারতীয় দর্শনে যে ‘ধর্ম’ এবং ‘কর্ম’ তত্ত্বের বিকাশ ঘটেছিল, তার বীজ মূলত এই বৈদিক ঋতের ভেতরেই প্রোথিত ছিল।

বৈদিক যজ্ঞের সমাজতাত্ত্বিক ও আচারগত পরিকাঠামো (Sociological and Ritual Infrastructure of Vedic Yajña)

ঋগ্বেদের ধর্ম কোনো মন্দিরভিত্তিক বা ব্যক্তিগত ধ্যানের ধর্ম ছিল না। এর প্রকাশ ঘটত একটি সামাজিক ও আচারগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, যার নাম যজ্ঞ (Yajña)। সমতল কোনো খোলা মাঠে ঘাস কেটে যজ্ঞের বেদি তৈরি করা হতো। সেখানে তিন ধরনের পবিত্র আগুন জ্বালানো হতো – গার্হপত্য, আহবনীয় এবং দক্ষিণাগ্নি। কোনো স্থায়ী মূর্তি বা স্থাপত্যের উপস্থিতি সেখানে ছিল না। যজ্ঞ ছিল মূলত এমন এক উন্মুক্ত মহাযজ্ঞাগার, যেখানে নির্দিষ্ট গোত্রের মানুষ একত্র হতো এবং পুরোহিতদের মাধ্যমে দেবতাদের উদ্দেশে ঘি, যব, মাংস এবং সোমরস আগুনে আহুতি দেওয়া হতো।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে, বৈদিক যজ্ঞ কেবল আধ্যাত্মিক কোনো কাজ ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন যাযাবর ও কৃষিভিত্তিক সমাজে উদ্বৃত্ত সম্পদ পুনর্বণ্টনের একটি বড় মাধ্যম। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী মার্সেল মস (Marcel Mauss) তার ক্লাসিক তত্ত্বে প্রাচীন সমাজের উপহার আদান-প্রদানের যে রূপরেখা এঁকেছিলেন, বৈদিক যজ্ঞের সাথে তার মিল স্পষ্ট (Mauss, 1954)। যজ্ঞের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, যাকে বলা হতো ‘যজমান’, তিনি ছিলেন কোনো গোত্রপ্রধান বা রাজন। তিনি যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতাদের মূল্যবান পশু ও খাবার উপহার দিতেন, আর এর মধ্য দিয়ে সমাজে নিজের প্রতিপত্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন করতেন। যজ্ঞ শেষে পুরোহিতদের দেওয়া হতো বিপুল পরিমাণ গরু, ঘোড়া, অলংকার এবং বস্ত্র, যাকে বলা হতো দক্ষিণা। ফলে যজ্ঞ একই সাথে সামাজিক সংহতি তৈরি করত এবং অর্থনৈতিক আদান-প্রদানকে সচল রাখত।

আচারগত দিক থেকেও যজ্ঞের জটিলতা দিন দিন বাড়ছিল। ঋগ্বেদের আদি স্তরে গৃহস্থ নিজেই হয়তো ছোটখাটো আহুতি দিতে পারতেন। তবে ধীরে ধীরে যখন যজ্ঞের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ল, তখন দক্ষ পেশাদার পুরোহিতের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। যজ্ঞ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন দায়িত্বে ভাগ হওয়া পুরোহিতদের আবির্ভাব ঘটেছিল, যেমন স্তোত্র আবৃত্তিকারক হোতা, গান গাওয়ার জন্য উদ্গাতা, এবং ব্যবহারিক কাজের জন্য অধ্বর্যু। ডাচ ভারততত্ত্ববিদ ফ্রিৎস স্টাল (Frits Staal) বৈদিক আচারের গঠন বিশ্লেষণ করে যুক্তি দিয়েছেন যে, যজ্ঞের এই নিয়মকানুনগুলো কোনো অভ্যন্তরীণ অর্থ বহন করার চেয়েও বেশি একটি নিখুঁত ব্যাকরণিক কাঠামোর মতো কাজ করত (Staal, 1989)। সেখানে মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণ এবং আহুতি দেওয়ার শারীরিক ভঙ্গিমা সামান্যতম ভুল হলেও পুরো যজ্ঞ পণ্ড হয়ে যেত বলে বিশ্বাস ছিল।

এর ফলে যজ্ঞ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চেয়ে এক ধরনের পেশাদার বিশেষজ্ঞ শ্রেণির একচেটিয়া অধিকারে পরিণত হয়েছিল। যজ্ঞের মাধ্যমে গোত্রের সাধারণ মানুষের সাথে প্রধানদের সম্পর্কের দূরত্বও স্পষ্ট হচ্ছিল। সমাজের দুর্বল শ্রেণির মানুষরা যজ্ঞের বেদির চারপাশে জড়ো হতো এক ধরনের ভয় ও বিস্ময় নিয়ে। কারণ তারা বিশ্বাস করত, এই যজ্ঞশালার আগুন থেকেই গোটা পৃথিবীর বৃষ্টি আর উর্বরতা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে যজ্ঞ তৎকালীন সমাজের ক্ষমতার ভারসাম্যকে যেমন ধরে রাখত, তেমনি শাসক ও পুরোহিত শ্রেণির পারস্পরিক সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবেও কাজ করত।

প্রার্থনা, মন্ত্রের শক্তি ও বাচনিক চুক্তি (Prayer, the Power of Mantras, and Verbal Contracts)

বৈদিক ধর্মে প্রার্থনার স্থান ছিল অনন্য। স্তোত্রকাররা মনে করতেন, মানুষের মুখের কথার ভেতরে এক অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। এই বাচনিক ক্ষমতা বা স্তোত্রকেই সংহিতায় বলা হয়েছে ব্রহ্মন (Brahman)। পরবর্তী উপনিষদের যুগে ‘ব্রহ্ম’ বলতে যে সর্বব্যাপী পরমাত্মাকে বোঝানো হয়েছিল, ঋগ্বেদে কিন্তু সেই অর্থ ছিল না। আদি বৈদিক স্তরে ব্রহ্মন ছিল মূলত এক শক্তিশালী কাব্যিক প্রার্থনা বা রহস্যময় ছন্দোবদ্ধ মন্ত্র (Thieme, 1952)। কবিরা বিশ্বাস করতেন, তাদের উচ্চারিত শব্দের কম্পন দেবতাদের বাধ্য করতে পারে মর্ত্যে নেমে এসে যজ্ঞের ঘাসে বসতে।

এই প্রার্থনাগুলো কোনো অতিন্দ্রীয় মুক্তির জন্য ছিল না। এগুলোর ভাষা ছিল অত্যন্ত সরাসরি এবং জাগতিক চাহিদায় ভরপুর। স্তবকারী খোলাখুলি দেবতাদের বলতেন তাদের কী চাই – শত শত বলবান ঘোড়া, দুগ্ধবতী গাভী, বীর পুত্রসন্তান, যুদ্ধে শত্রুর বিনাশ এবং একশো বছর বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। জার্মান ভারততত্ত্ববিদ হান্স-পিটার শমিৎ (Hans-Peter Schmidt) বৈদিক দেবতাদের সাথে প্রার্থনাকারীর সম্পর্কের ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, স্তোত্রগুলো কাজ করত এক ধরনের মৌখিক চুক্তি বা বাচনিক চুক্তি (Verbal Contract) হিসেবে (Schmidt, 1968)। কবিরা দেবতার গুণগান গেয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতেন যেন দেবতারা তাদের প্রার্থিত বর দিতে এক প্রকার বাধ্য হন।

এখানেই দেখা যায় প্রাচীন মন্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি। পুরোহিতরা যখন গম্ভীর স্বরে ত্রিষ্টুভ বা গায়ত্রী ছন্দে শ্লোক আবৃত্তি করতেন, তখন তা সমবেত মানুষের মনে গভীর আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিত। যুদ্ধের আগে ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে পাঠ করা মন্ত্র যোদ্ধাদের মনে ভীতি দূর করত। মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হতো যে, একটি ধ্বনি বা স্বরের পরিবর্তন হলে প্রার্থনার ফল উল্টো হতে পারে বলে মনে করা হতো। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, ভাষা নিজেই ছিল এক ধরনের বস্তুগত শক্তি বা অস্ত্র। দশম মণ্ডলের বাক সূক্তে ভাষাকে এক সার্বভৌম দেবী হিসেবে বন্দনা করা হয়েছে, যা এই ধারণাকে আরো মজবুত করে।

ফলে বৈদিক প্রার্থনা কোনো নীরব বা নির্জন ধ্যানের রূপ ছিল না। এটা ছিল যৌথ কণ্ঠের উচ্চারণ, যেখানে সুর, ছন্দ এবং গতি এক হয়ে দেবতাদের আহ্বান জানাত। কবিরা নিজেদের তৈরি নতুন উপমা এবং ছন্দ নিয়ে গর্ব করতেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় দেবতাদের বলতেন, “আমি তোমার জন্য এমন এক নতুন স্তব তৈরি করেছি, যেমন এক দক্ষ ছুতার রাজার জন্য সুন্দর রথ তৈরি করে”। এই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের পার্থিব চাহিদাকে দেবতাদের কাছে পেশ করত এবং সেই দাবির পক্ষে যুক্তি সাজাত।

দেব-মানব সম্পর্ক: পারস্পরিক নির্ভরতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (Deity-Human Relations: Mutual Dependence and Economic Partnership)

ঋগ্বেদের পাতায় চোখ বোলালে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দেয়, তা হলো এর দেব-মানব সম্পর্কের প্রকৃতি। বিশ্বের অন্যান্য অনেক ধর্মে ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান, অগম্য এবং মানুষকে তার সামনে সম্পূর্ণ অসহায় ও দাস হিসেবে দেখা হয়। ঋগ্বেদে কিন্তু মানুষের অবস্থান এমন নতজানু ছিল না। মানুষ আর দেবতাদের সম্পর্ক ছিল অনেকটা অংশীদারিত্বের মতো, এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর যা টিকে ছিল। দেবতারা স্বর্গে বসে মানুষের তৈরি খাবারের জন্য অপেক্ষা করতেন, আর মানুষ পৃথিবীতে বসে দেবতাদের পাঠানো বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকত।

এই সম্পর্কের পেছনে কাজ করত প্রাচীন রোমান আইনের একটি সুবিখ্যাত সূত্র – “দো উত দেস” (Do ut des), যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় “আমি দিচ্ছি যেন তুমি দাও”। মানুষ দেবতাকে সোমরস পান করাচ্ছে, সুস্বাদু পশুর চর্বি আর যজ্ঞের পায়স দিচ্ছে। বিনিময়ে দেবতার দায়িত্ব হলো মানুষকে গো-সম্পদ ও সুরক্ষা দেওয়া। আমেরিকান ধর্মতত্ত্ববিদ ব্রায়ান কে. স্মিথ (Brian K. Smith) বৈদিক আচার ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা দাঁড়িয়ে ছিল এক জটিল সামঞ্জস্য ও সাদৃশ্যের ওপর (Smith, 1989)। যজ্ঞে যে আহুতি দেওয়া হচ্ছে, তা দেবতাদের শরীরে পুষ্টি ও শক্তি জোগায়। ইন্দ্র যদি সোমরস না পান, তবে তিনি দুর্বল হয়ে পড়বেন এবং বৃত্রকে বধ করার শক্তি পাবেন না। ফলে দেবতাদের টিকে থাকার পেছনেও মানুষের আহুতির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বাস্তব।

জার্মান ইতিহাসবিদ উইলহেম রাউ (Wilhelm Rau) বৈদিক যুগের রাজনৈতিক ও দৈনন্দিন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করেছেন (Rau, 1957)। তিনি দেখিয়েছেন, এই দেবতারা ছিলেন মূলত আর্য গোষ্ঠীর দলপতিদের মহাজাগতিক প্রতিচ্ছবি। একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে তার গোত্রপ্রধানকে কর বা উপহার দিয়ে নিরাপত্তা দাবি করত, ঠিক তেমনি দেবতাকে যজ্ঞে ভাগ দিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার আবেদন জানাত। দেবতারা যদি মানুষের ডাকে সাড়া না দিতেন, তবে স্তোত্রগুলোতে মাঝেমধ্যে ক্ষোভ ও অভিমানের সুরও শোনা যেত। কবি স্পষ্ট অভিযোগ করে বলতেন, “হে ইন্দ্র, আমি এত স্তব করা সত্ত্বেও কেন তুমি আমার শত্রুদের সম্পদ আমাকে পাইয়ে দিচ্ছ না?”

এই পারস্পরিক লেনদেনের সম্পর্কে কোনো অন্ধ ভক্তিবাদ ছিল না। মানুষ দেবতাদের সম্মান করত তাদের ক্ষমতার জন্য, কিন্তু সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চাইত নিজেদের জাগতিক সমৃদ্ধির জন্য। দেবতারা ছিলেন পার্থিব জীবনের মিত্র, রথের সহযাত্রী এবং যুদ্ধের সহযোগী। মানুষ নিজের অস্তিত্বকে কখনো পাপী বা হীন মনে করত না, বরং নিজেকে মনে করত দেবতাদের যোগ্য ভোজদাতা। এই মানসিকতা বৈদিক মানুষের আত্মবিশ্বাসী ও সংগ্রামশীল চরিত্রের এক বড় প্রমাণ।

পাপ, অনুতাপ ও বরুণের বন্ধন (Sin, Remorse, and the Fetters of Varuna)

ইন্দ্র বা অগ্নির কাছে মানুষ যেভাবে সাহসী ও দাবিদার হয়ে উঠত, বরুণের সামনে এসে সেই সুর পুরোপুরি বদলে যেত। বরুণের সাথে সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল মানুষের ভুলত্রুটি, নৈতিক বিচ্যুতি এবং ভীতি। ঋগ্বেদে ‘পাপ’ বা এনস (Enas) কোনো আদিম পাপ বা বংশানুক্রমিক পাপের ধারণা ছিল না। এটা ছিল মূলত কোনো নিয়ম ভাঙা, মিথ্যা বলা, মাতলামি করে কাউকে আঘাত করা, বা জুয়া খেলায় সর্বস্বান্ত হওয়া। মানুষ যখন নিজের দুর্বলতার কারণে কোনো ভুল করত, তখন সে বিশ্বাস করত বরুণের চোখ তাকে দেখে ফেলেছে।

জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক রডলফ অটো (Rudolf Otto) তার সুবিখ্যাত তত্ত্বে পবিত্রতার যে ‘ভয়ংকর ও মুগ্ধকর’ রূপের কথা বলেছিলেন, বৈদিক বরুণের চরিত্রটি তার নিখুঁত উদাহরণ (Otto, 1923)। বরুণ মানুষের মনে এক ধরনের অতিন্দ্রীয় ভীতি তৈরি করতেন। তার অস্ত্র ছিল অদৃশ্য বন্ধন বা পাশ (Pāśa)। কেউ কোনো অন্যায় করলে বরুণ তাকে অদৃশ্য ফাঁসে আটকে দিতেন। শারীরিক অসুস্থতা, বিশেষ করে শরীরে জল জমা বা জলোদর রোগকে ভাবা হতো বরুণের সরাসরি শাস্তি। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের সমস্ত অহংকার চূর্ণ হয়ে যেত এবং সে অনুতপ্ত চিত্তে বরুণের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করত।

ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে বশিষ্ঠের রচিত বরুণ-সূক্তগুলো এই অনুতাপের অপূর্ব নিদর্শন। সেখানে ঋষি বলছেন, “হে বরুণ, আমি মাতলামির কারণে, ক্রোধের কারণে, কিংবা পাশা খেলার মোহে হয়তো নিয়ম ভেঙেছি। আমার পূর্বপুরুষদের পাপও হয়তো আমার ওপর ভর করেছে। তুমি আমাকে তোমার বাঁধন থেকে মুক্ত করো”। ব্রিটিশ ভারততত্ত্ববিদ জুলিয়াস লিপনার (Julius Lipner) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, বরুণের এই স্তোত্রগুলোর ভেতরেই ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীনতম নৈতিক বিবেকের সন্ধান পাওয়া যায় (Lipner, 1994)। এখানে মানুষ নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে স্বীকার করছে এবং একজন উচ্চতর নৈতিক শাসকের কাছে মুক্তি চাইছে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ক্ষমা প্রার্থনার পেছনেও শেষ পর্যন্ত পার্থিব সুস্থতার কামনাই প্রধান ছিল। রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া এবং সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকার জন্যই বরুণের বাঁধন খোলার আকুল আবেদন জানানো হতো। অনুতাপের এই ধারণাটি পরবর্তীকালের ভক্তি আন্দোলনের মতো কোনো আত্মবিলোপকারী রূপ ধারণ করেনি। এটা ছিল সাময়িকভাবে নিয়ম ভাঙার ফলে সৃষ্ট সংকট থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার এক বাস্তবধর্মী মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। মানুষ জানত বরুণ যেমন কঠোর, তেমনি তার ভেতরে দয়াও রয়েছে, যদি মানুষ সত্য হৃদয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে।

মরণশীলতা, পিতৃপুরুষ ও লোকবিশ্বাসের আদি রূপ (Mortality, Ancestors, and Primitive Forms of Folk Belief)

ঋগ্বেদের মানুষের চোখ সব সময় নিবদ্ধ ছিল এই মর্ত্যলোকের মাটির ওপর। মৃত্যুর পর কী হবে, তা নিয়ে তারা দীর্ঘ দার্শনিক জটিলতায় সময় নষ্ট করতে খুব একটা পছন্দ করত না। তারা মৃত্যুকে দেখত জীবনের এক অনিবার্য শেষ হিসেবে, যাকে যত দূর সম্ভব পিছিয়ে দেওয়া যায় ততই মঙ্গল। তাদের সমস্ত প্রার্থনার মূল সুর ছিল একটাই – “আমরা যেন জরাগ্রস্ত না হয়ে পূর্ণ একশো বছর বাঁচতে পারি”। আত্মহত্যা বা ইচ্ছামৃত্যুর কোনো ইতিবাচক চিত্র এখানে ছিল না। মরণশীলতা ছিল এক কঠিন সত্য, যার অধিপতি ছিলেন যম (Yama)। যম ছিলেন প্রথম মানুষ যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং মৃত্যুর পর পরকালের পথটি খুঁজে বের করেছিলেন।

মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা কোথায় যেত, তা নিয়ে সংহিতায় খুব বেশি দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনা নেই। দশম মণ্ডলের অন্ত্যেষ্টি সূক্তগুলো থেকে বোঝা যায়, মৃতদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হতো, আবার ক্ষেত্রবিশেষে মাটিতে সমাহিতও করা হতো। আগুনের কাছে প্রার্থনা করা হতো যেন সে মৃত ব্যক্তির শরীরকে খুব বেশি পুড়িয়ে না ফেলে, বরং তাকে বহন করে নিয়ে যায় পিতৃপুরুষ বা পিতৃগণ (Pitṛs)-দের আবাসে। যমের রাজ্যে সেই পূর্বপুরুষরা সুস্বাদু খাবার আর পানীয় নিয়ে সুখে শান্তিতে বাস করছেন বলে কল্পনা করা হতো। সেখানে কোনো নরকের ভয়াবহ শাস্তির বিশদ বিবরণ আদি বৈদিক স্তরে অনুপস্থিত। যারা সৎ পথে চলত এবং যজ্ঞে দান করত, তারা সেই পিতৃলোকে স্থান পেত, আর যারা পাপী বা অনৃতের অনুসারী ছিল, তারা এক গভীর অন্ধকারে বা শূন্যতায় তলিয়ে যেত বলে বিশ্বাস ছিল।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্থার ল্যাভেলিন ব্যাশাম (Arthur Llewellyn Basham) তার ধ্রুপদী গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আদি ঋগ্বেদে আত্মার পুনর্জন্ম বা কর্মফলের ভিত্তিতে বারবার জন্ম নেওয়ার কোনো স্পষ্ট তত্ত্ব পাওয়া যায় না (Basham, 1954)। পুনর্জন্ম, জন্ম-মৃত্যুর চক্র বা সংসার (Saṃsāra) এবং তা থেকে মুক্তি বা মোক্ষ (Mokṣa)-র মতো ভারী দার্শনিক ধারণাগুলো বৈদিক চিন্তায় প্রবেশ করেছিল অনেক পরে, বিশেষ করে উপনিষদের যুগে। ঋগ্বৈদিক মানুষের কাছে মানুষের জীবন ছিল একটাই। সেই জীবনকে উৎসবের মতো যাপন করা, বংশবৃদ্ধি করা এবং মৃত্যুর পর পূর্বপুরুষদের কাতারে গিয়ে সামান্য শান্তির স্থান পাওয়া – এটুকুই ছিল তাদের প্রত্যাশা।

পূর্বপুরুষদের সাথে এই যোগাযোগ রক্ষা করা হতো নিয়মিত তর্পণ ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে। পরিবারে কোনো বড় উৎসব বা যজ্ঞ হলে পিতৃপুরুষদেরও সেখানে প্রতীকীভাবে আহ্বান জানানো হতো এবং কুশের আসনে বসতে দেওয়া হতো। আমেরিকান গবেষক ডেভিড এম. ক্নিপ (David M. Knipe) প্রাচীন ভারতীয় মৃত্যু সংস্কারের রূপরেখা দিতে গিয়ে দেখিয়েছেন, জীবিত মানুষ এবং মৃত পূর্বপুরুষদের মধ্যে এই যে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক, তা ছিল বংশপরম্পরা এবং গোত্রীয় ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখার প্রধান সামাজিক উপায় (Knipe, 1975)। পিতৃপুরুষরা ছিলেন বংশের অদৃশ্য অভিভাবক। ঋগ্বেদের ধর্মভাবনা এভাবে ইহলোক ও পরলোকের মাঝে কোনো গভীর বৈরাগ্যের প্রাচীর তৈরি করেনি, বরং মৃত্যুকে জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য এবং স্বাভাবিক সমাপ্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

সোম ও বৈদিক ধর্মসংস্কৃতি (Soma and Vedic Religious Culture): পানীয়, দেবতা, আচার ও প্রতীক

সোম উদ্ভিদের বোটানিক্যাল বিতর্ক ও ভৌগোলিক উৎস (Botanical Debate and Geographical Origin of the Soma Plant)

প্রাচীন বৈদিক মানুষদের প্রতিদিনের চিন্তা আর প্রার্থনার বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল একটি বিশেষ পাহাড়ি লতা। সেই লতা নিয়ে হাজার বছর ধরে পণ্ডিতদের মধ্যে যে পরিমাণ বিতর্ক হয়েছে, প্রাচীন দুনিয়ার আর কোনো উদ্ভিদ নিয়ে সম্ভবত তা হয়নি। এই উদ্ভিদটির নাম সোম। ঋগ্বেদে সোমের উপস্থিতি এত বেশি যে, স্তোত্রকারদের চোখ দিয়ে দেখলে মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই বুঝি সোমরস দিয়ে ধুয়ে যাচ্ছে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রত্নতত্ত্বের জন্য বড় সমস্যা হলো, এই গাছটি আসলে বোটানিক্যাল দিক থেকে কী ছিল, তা আজও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি। বৈদিক আর্যরা যখন পাঞ্জাব ও সংলগ্ন এলাকায় ছিল, তখন তারা উত্তর-পশ্চিমের উঁচু পাহাড় থেকে এই লতা সংগ্রহ করত। সংহিতায় বারবার ‘মুজবন্ত’ পর্বতের কথা বলা হয়েছে, যেখান থেকে সবচেয়ে ভালো জাতের সোম আসত।

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সোমের প্রকৃত পরিচয় খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা নানা ধরনের মতবাদ হাজির করেছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং একই সাথে বিতর্কিত তত্ত্বটি দিয়েছিলেন শৌখিন নৃতত্ত্ববিদ ও গবেষক আর. গর্ডন ওয়াসন (R. Gordon Wasson)। তিনি তার বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ সোমা: ডিভাইন মাশরুম অব ইমর্টালিটি (Soma: Divine Mushroom of Immortality)-তে দাবি করেন যে, সোম কোনো সাধারণ লতা ছিল না, এটা ছিল এক ধরনের বিশেষ রক্তিম মাশরুম, যার বৈজ্ঞানিক নাম Amanita muscaria (অ্যামানিটা মাসকারিয়া) (Wasson, 1968)। তার যুক্তি ছিল, ঋগ্বেদে সোমকে বারবার লালচে-বাদামি বা সোনালি রঙের বলা হয়েছে এবং এর কোনো শিকড়, পাতা বা ফুলের স্পষ্ট বিবরণ সংহিতায় নেই। তবে মূলধারার অনেক ভারততত্ত্ববিদ এই মাশরুম তত্ত্ব পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। কারণ মাশরুমকে পিষে তা থেকে প্রচুর পরিমাণ রস বের করার যে বর্ণনা ঋগ্বেদে পাওয়া যায়, তা মাশরুমের শারীরিক গঠনের সাথে খুব একটা মেলে না।

অন্য একদল গবেষক সোমকে চিহ্নিত করেছেন এফিমেরাল বা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ এফীড্রা (Ephedra) হিসেবে। জার্মান ভারততত্ত্ববিদ হ্যারি ফক (Harry Falk) ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, সোম হওয়ার সবচেয়ে জোরালো দাবিদার হলো এই এফীড্রা গাছ (Falk, 1989)। এফীড্রার ডালপালা থেকে সহজেই রস নিষ্কাশন করা যায় এবং এর ভেতর থাকে প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড ‘এফীড্রিন’, যা মানুষের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, ক্লান্তি দূর করে এবং দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে সাহায্য করে। প্রাচীন মধ্য এশিয়ার রুক্ষ পাহাড়গুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর এফীড্রা জন্মাত। যাযাবর আর্যরা যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করছিল, তখন এই উদ্ভিদের রস তাদের শরীরে এক অবিশ্বাস্য চাঙ্গাভাব এনে দিত।

এই বিতর্কের পালে নতুন হাওয়া লাগে মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তানে অবস্থিত ‘মার্গিয়ানা’ বা বিএমএসি সভ্যতার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের পর। বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ভিক্টর সারিয়ানিদি (Victor Sarianidi) গোবুর দেপে নামক স্থানে খনন করে চার হাজার বছর পুরোনো বেশ কিছু যজ্ঞকুণ্ড ও পাত্র আবিষ্কার করেন (Sarianidi, 2003)। রাসায়নিক পরীক্ষায় সেই পাত্রগুলোর তলানিতে এফীড্রা, গাঁজা এবং আফিমের মতো উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও এই আবিষ্কার নিয়ে পণ্ডিতদের ভেতর মতভেদ রয়েছে, তবুও এটা বেশ পরিষ্কার যে, প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগে মধ্য এশিয়া থেকে উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে এমন কিছু উদ্ভিদের রস ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো, যা মানুষের মনোজগতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারত। সোম ছিল সেই বিশেষ উদ্ভিদ সংস্কৃতিরই কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি।

ইন্দো-ইরানীয় পটভূমি ও সোম-হোম ঐতিহ্য (Indo-Iranian Background and the Soma-Haoma Tradition)

সোমের ইতিহাস কেবল ভারতের ভৌগোলিক সীমানার ভেতর আটকে নেই। এর শেকড় ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় অভিন্ন ঐতিহ্যের গভীরে। বৈদিক আর্য এবং প্রাচীন ইরানিরা যখন এক অবিভক্ত জনগোষ্ঠী হিসেবে মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলে বাস করত, তখনই তাদের আচার-অনুষ্ঠানে এই পবিত্র পানীয়ের প্রচলন হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যের সবচেয়ে বড় ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন ইরানি ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায়। আবেস্তায় যে পানীয়টিকে বলা হয়েছে ‘হোম’ বা হওমা (Haoma), ঋগ্বেদের সংহিতায় সেটাই হলো সোম। সংস্কৃত ভাষার ‘স’ ধ্বনি প্রাচীন ফারসিতে প্রায়শই ‘হ’ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হতো, যেমন ‘সিন্ধু’ হয়ে গিয়েছিল ‘হিন্দু’। ঠিক একইভাবে বৈদিক ‘সোম’ ইরানে পরিচিত হয়েছিল ‘হোম’ নামে।

উভয় ঐতিহ্যের আচারগত মিলগুলো চোখে পড়ার মতো। গবেষক ডেভিড ফ্ল্যাটারি (David Flattery) এবং মার্টিন শোয়ার্টজ (Martin Schwartz) তাদের যৌথ গবেষণায় দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদ ও আবেস্তা উভয়ের মধ্যেই এই গাছটিকে পাথরে পিষে রস বের করার কথা বলা হয়েছে (Flattery & Schwartz, 1989)। যজ্ঞের প্রধান পুরোহিতকে আবেস্তায় বলা হতো ‘জোতার’, যা বৈদিক ‘হোতা’র সমতুল্য। একইভাবে সোম পেষার পাথরকে সংস্কৃতে বলা হতো ‘গ্রাবান’, আর আবেস্তায় তার নাম ছিল ‘হাওয়ানা’। উভয় সাহিত্যেই বলা হয়েছে, এই পানীয় পান করলে দৃষ্টি পরিষ্কার হয়, শারীরিক শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায় এবং মানুষ নিজেকে এক ধরনের অমরত্বের অনুভূতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।

তবে ধর্মীয় রূপান্তরের সাথে সাথে এই দুই শাখায় কিছু পার্থক্যও তৈরি হয়েছিল। প্রাচীন ইরানে যখন জরথুস্ত্র তার নতুন ধর্মীয় সংস্কার শুরু করলেন, তখন তিনি উন্মত্ত হয়ে মাদক পান করার আদিম প্রথাকে কিছুটা নিরুৎসাহিত করেছিলেন বলে কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন। যদিও আবেস্তার পরবর্তী অংশে ‘হোম য়শ্‌ত’ নামক পুরো একটি স্তোত্রসংগ্রহ পাওয়া যায়, যা ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের সোমসূক্তগুলোর সাথে মেজাজের দিক থেকে প্রায় হুবহু মিলে যায়। ভাষাতাত্ত্বিক ইলিয়া গার্শেভিচ (Ilya Gershevitch) জোর দিয়ে বলেছেন, ইন্দো-ইরানীয় এই ঐতিহ্যটি কোনো প্রতীকী গল্প ছিল না (Gershevitch, 1974)। এটা ছিল এক বাস্তব সামাজিক ও ধর্মীয় অভ্যাস, যা ব্রোঞ্জযুগের গোত্রবদ্ধ সমাজগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে একটি প্রধান সাংস্কৃতিক আঠার মতো কাজ করত।

এই দুই ঐতিহ্যের মিল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বৈদিক ধর্ম কোনো শূন্য থেকে হঠাৎ জন্ম নেওয়া সংস্কৃতি নয়। ভারতভূমিতে আসার আগেই আর্যরা এমন এক জটিল উদ্ভিজ্জ ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচিত ছিল, যা তারা বংশপরম্পরায় মৌখিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল। পরবর্তীকালে ভারতে এসে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই সোমের উপলব্ধতা কমে যায়, ফলে আচারের রূপও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। তবুও আদি স্তরে সোম বা হোম ছিল ইন্দো-ইরানীয় সমাজের যৌথ আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সোমরস প্রস্তুতের আচার ও ব্যবহারিক পর্যায় (Ritual Preparation and Practical Stages of Soma Extraction)

যজ্ঞের মাঠে সোমরস তৈরি করার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল এক বিরাট কর্মযজ্ঞ। এটি কোনো রান্নাঘরের সাধারণ শরবত তৈরির মতো সহজ বিষয় ছিল না। এর প্রতিটি ধাপ ছিল জটিল মন্ত্র এবং সুনির্দিষ্ট শারীরিক কসরত দিয়ে বাঁধা। পুরো কাজটির নেতৃত্বে থাকতেন ‘অধ্বর্যু’ নামের যজ্ঞকর্মী। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে সোম প্রস্তুতের যে সচিত্র বিবরণ পাওয়া যায়, তা প্রাচীন ভারতীয় প্রযুক্তি ও কারিগরি ভাবনার এক চমৎকার দলিল। গাছটি সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে দেবতাদের পাত্রে ঢালা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি একটি মহাজাগতিক নাটকের রূপ নিত।

প্রথমেই আসত সোম কেনার পালা। যেহেতু সমতলভূমিতে এই গাছ জন্মাত না, তাই দূর পাহাড় থেকে আসা বণিকদের কাছ থেকে গরু বা কাপড়ের বিনিময়ে সোমের শুকনো ডালপালা কিনতে হতো। ডালগুলো শুকিয়ে গেলে সেগুলো ভেজানোর জন্য বিশেষ পাত্রে জল দিয়ে নরম করা হতো। এরপর শুরু হতো আসল কাজ, যার নাম ‘অভিষব’ বা সোম পেষণ। সমতল মাটির ওপর একটি চামড়া বিছিয়ে তার ওপর রাখা হতো দুটি ভারী পাথর, যাকে বৈদিক ভাষায় বলা হতো গ্রাবান (Grāvan)। পুরোহিতরা ছন্দ মিলিয়ে সেই পাথর দিয়ে ভেজা সোমলতার ওপর আঘাত করতেন। পাথরের সেই ঠোকাঠুকির শব্দকে কবিরা মেঘের গর্জন বা ঘোড়ার খুরের শব্দের সাথে তুলনা করেছেন। এমনকি ঋগ্বেদে এই পেষণকারী পাথরগুলোর প্রশংসাতেও আলাদা সূক্ত রচনা করা হয়েছে।

রস বের হয়ে আসার পর তা ছিল অত্যন্ত তিক্ত, কড়া এবং কিছুটা ঘোলাটে। তাই সেই রসকে পরিষ্কার করার জন্য মেষের পশম দিয়ে বোনা এক ধরনের বিশেষ ছাঁকনি ব্যবহার করা হতো, যার নাম ছিল পবিত্র (Pavitra)। ছাঁকনির ভেতর দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে লালচে-সোনালি সোমরস যখন নিচের কাঠের পাত্রে পড়ত, সেই দৃশ্যকে স্তোত্রকাররা বর্ণনা করেছেন আকাশ থেকে বৃষ্টির ধারা নেমে আসার মতো করে। ডাচ ভারততত্ত্ববিদ জ্যান ই. এম. হাউবেন (Jan E. M. Houben) বৈদিক সোমযজ্ঞের বাস্তব রূপরেখা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, এই ছাঁকনি দিয়ে রস পড়ার মুহূর্তটি ছিল সমগ্র যজ্ঞের সবচেয়ে নাটকীয় ক্ষণ (Houben, 2003)। এই পরিষ্কার হওয়া সোমকেই বলা হতো ‘পবমান সোম’।

ছাঁকার পরেও সোমরসের তীব্র ঝাঁজালো ও কষা স্বাদ কমানোর জন্য তার সাথে মেশানো হতো গরুর খাঁটি দুধ, দই কিংবা ভাজা যবের গুঁড়ো। দুধ মেশানো সোমকে বলা হতো ‘গবাশির’, দই মেশানো সোমকে ‘দধ্যাশীর’, আর যব মেশানো রূপকে বলা হতো ‘যবাশির’। এরপর এই মিশ্রণটিকে বিশেষ কাঠের পাত্র বা ‘গ্রহ’-তে ভরে প্রথমে অগ্নিকুণ্ডে দেবতাদের উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হতো, আর অবশিষ্ট অংশ পান করতেন যজ্ঞে উপস্থিত পুরোহিত এবং স্বয়ং যজমান। গবেষক ম্যাথিউ ক্লার্ক (Matthew Clark) তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, এই পানীয়টি খালি পেটে পান করার নিয়ম ছিল, যার ফলে এর মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলো খুব দ্রুত মানুষের রক্তে মিশে কাজ শুরু করত (Clark, 2017)। ফলে এটি কেবল একটি পূজার নৈবেদ্য ছিল না, বরং সমবেত সবার মধ্যে এক তাৎক্ষণিক শারীরিক উদ্দীপনা ছড়িয়ে দেওয়ার নিখুঁত ব্যবস্থা ছিল।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: বীরত্ব, উত্তেজনা ও কাব্যপ্রেরণা (Psychological Effects: Heroism, Excitation, and Poetic Inspiration)

সোমরস পানের পর মানুষের মনে ঠিক কেমন অনুভূতি হতো, তা ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এটি সাধারণ কোনো মদ্যপানের মাতলামি ছিল না। বৈদিক সমাজ সাধারণ অ্যালকোহল বা গেঁজিয়ে ওঠা মদকে বলত ‘সুরা’। সুরা পান করাকে খুব একটা সম্মানের চোখে দেখা হতো না; সুরা মানুষকে মাতাল করত, তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ বাঁধাত এবং বিবেকবুদ্ধি নষ্ট করত। অন্যদিকে সোমকে দেখা হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্তরে। সোম পানের পর যে অবস্থার সৃষ্টি হতো, তাকে বলা হতো মদ (Mada), যার অর্থ উন্মাদনা নয়, বরং এক ধরনের প্রবল তেজ, প্রফুল্লতা এবং ভয়হীনতার অনুভূতি।

ঋগ্বেদের অষ্টম মণ্ডলের ৪৮ নম্বর সূক্তের তৃতীয় শ্লোকটি এই প্রসঙ্গে পৃথিবীখ্যাত। সেখানে সোমপানকারী ঋষি চিৎকার করে গেয়ে ওঠেন, “অপাম সোমম অমৃতা অভূম অগন্ম জ্যোতির্ অবিদাম দেবান” – অর্থাৎ, “আমরা সোম পান করেছি, আমরা অমর হয়েছি, আমরা আলোর রাজ্যে পৌঁছেছি, আমরা দেবতাদের চিনেছি”। এই শ্লোকটির ভেতরে কোনো কৃত্রিম আধ্যাত্মিক ভণিতা নেই। এটি সোমের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় মানুষের মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া তীব্র আত্মবিশ্বাস এবং অলৌকিক আনন্দের সরাসরি বয়ান। সোম পান করলে মানুষের ভেতরের ক্ষুদ্রতা কেটে যেত, মনে হতো সে যেন সাধারণ মাটির পৃথিবী ছেড়ে আকাশে ডানা মেলে ভাসছে।

আমেরিকান গবেষক জর্জ থম্পসন (George Thompson) বৈদিক কাব্যভাষায় সোমের প্রভাব আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, স্তোত্রকারদের কাছে সোম ছিল কাব্য রচনার প্রধান অনুঘটক (Thompson, 2003)। কবিরা বিশ্বাস করতেন, সোমরস তাদের জিহ্বায় ভর করলেই কেবল তারা জটিল ছন্দ এবং গভীর সত্য দেখতে পান। তাদের স্তোত্র রচনার ক্ষমতা, যাকে তারা ‘ধী’ বলতেন, তা এই পানীয়ের উদ্দীপনায় তীব্র হয়ে উঠত। সোম পান না করলে কোনো কবি দেবতাদের মুগ্ধ করার মতো শক্তিশালী কবিতা তৈরি করতে পারতেন না। স্তোত্রগুলোতে সোমকে বলা হয়েছে ‘বিপ্র’ বা কবিদের জাগ্রতকারী।

যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এই পানীয়ের ভূমিকা ছিল আরো সরাসরি। ইন্দ্র যখন দানব বৃত্রের সাথে যুদ্ধ করতে যেতেন, তখন তিনি পাত্রের পর পাত্র সোমরস পান করতেন। কেন করতেন? কারণ এই রস তার পেশিতে বল জোগাত এবং যুদ্ধের ভয়কে দূর করে এক অদম্য আগ্রাসী শক্তির জন্ম দিত। সাধারণ মানব যোদ্ধারাও রণাঙ্গনে নামার আগে সোম পান করত বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শিল্পকলার ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রামরিশ (Stella Kramrisch) দেখিয়েছেন, প্রাচীন সমাজে এই ধরনের উদ্ভিজ্জ উদ্দীপক ব্যবহার করা হতো মানুষের সাধারণ জৈবিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য (Kramrisch, 1975)। ক্ষুধা, ক্লান্তি এবং মৃত্যুর ভীতিকে জয় করে একটি যাযাবর সম্প্রদায়কে রণমুখী রাখার পেছনে এই পানীয়টির মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বাস্তব।

সোমের দেবত্ব ও নবম মণ্ডলের কাব্যমহিমা (Divinity of Soma and the Poetic Splendor of the Ninth Mandala)

ঋগ্বেদের কাঠামোর দিকে তাকালে একটি চমকপ্রদ বিষয় চোখে পড়ে। সমগ্র সংহিতার নবম মণ্ডলটি, যাতে মোট ১১৪টি সূক্ত রয়েছে, তার একটিমাত্র শ্লোকও সোম ছাড়া অন্য কোনো দেবতার নামে নিবেদিত হয়নি। এটি বৈদিক সাহিত্যের এক অনন্য ঘটনা। একটি উদ্ভিদ কীভাবে একজন পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক দেবতায় রূপান্তরিত হয়েছিল, নবম মণ্ডল তারই এক দীর্ঘ আখ্যান। এখানে সোম আর কেবল পাথরে পেষা কোনো লতা নন, তিনি নিজেই এক সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, যিনি আলোকের পিতা, স্বর্গের স্তম্ভ এবং দেবতাদের সঞ্জীবনী শক্তি।

নবম মণ্ডলে সোমকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘পবমান’ নামে। পবমান অর্থ যা প্রবাহিত হচ্ছে, যা নিজেকে পবিত্র করছে। পশমের ছাঁকনি দিয়ে সোমরস গলে পড়ার দৃশ্যটিকে কবিরা মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করেছেন। সোম যখন পাত্রে শব্দ করে পড়ে, তখন তাকে বলা হয়েছে আকাশের গর্জন। কবিরা কল্পনা করেছেন, সোম হলেন এক বুনো সবুজ ঘোড়া, যাকে পুরোহিতরা সাজিয়ে দিচ্ছেন স্বর্গের দেবতাদের দিকে ছুটিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রত্ন-উদ্ভিদবিদ কর্নেলিস সি. বাকেলস (C. C. Bakels) প্রাচীন আচারের রূপক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, মানুষের দৃষ্টিতে যা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং দুর্লভ, তাকেই তারা পরম দেবত্বের আসনে বসিয়ে পূজা করত (Bakels, 2003)।

সোমের আরেকটি বড় পরিচয় হলো তিনি ‘বাচস্পতি’ বা বাক্যের অধিপতি। তিনি কবিদের মুখে বাণী জোগাতেন, তাই তিনি নিজেই ভাষার দেবতা। একই সাথে তিনি ‘ওষধিপতি’, অর্থাৎ সমস্ত ভেষজ উদ্ভিদের রাজা। মানুষের সমস্ত রোগব্যাধি দূর করার ক্ষমতাও তার ওপর আরোপ করা হয়েছিল। অন্ধকে দৃষ্টি দেওয়া, খোঁড়াকে হাঁটার শক্তি দেওয়া এবং বন্ধ্যা নারীকে সন্তান দেওয়ার ক্ষমতা সোমের রয়েছে বলে স্তোত্রকাররা দাবি করতেন। এই অতিরঞ্জিত প্রশংসার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয় যে, যাযাবর আর্যদের সমাজে একটি প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর মানুষ কতটা অন্ধভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

নবম মণ্ডলের কবিতাগুলোর ভাষা ও ছন্দের ব্যবহার অত্যন্ত পরিশীলিত এবং সঙ্গীতময়। এখানকার স্তোত্রগুলো মূলত সোমযজ্ঞের সময় টানা সুর করে গাওয়া হতো। গায়ত্রী, জগতী কিংবা ত্রিষ্টুভ ছন্দের দোলায় সোমরস ছাঁকার বাস্তব শব্দ যেন কবিতার ছন্দে মিশে যেত। ধর্ম এবং বাস্তব প্রক্রিয়ার এই যে নান্দনিক সংমিশ্রণ, তা ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলকে বিশ্বসাহিত্যের প্রাচীনতম রূপক কবিতার এক অনন্য সংকলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখানে দেবতা ও প্রার্থনাকারীর মাঝে কোনো কাল্পনিক দূরত্ব ছিল না, কারণ দেবতা নিজেই এক তরল রূপ নিয়ে মানুষের হাতের পাত্রে ধরা দিতেন।

সোমের প্রাপ্যতা সংকট ও পরবর্তী বৈদিক রূপান্তর (Scarcity of Soma and Late Vedic Substitutions)

কালক্রমে ঐতিহাসিক বাস্তবতা বদলে গেল। বৈদিক জনগোষ্ঠী তাদের আদি চারণভূমি, অর্থাৎ আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবের সীমান্ত অঞ্চল ছেড়ে ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরতে শুরু করল। তারা প্রবেশ করল হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ এবং গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলে। এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে তাদের ধর্মসংস্কৃতিতে এক বিশাল সংকট দেখা দিল। নতুন সমতল ও আর্দ্র অঞ্চলে সেই পাহাড়ি সোমলতা পাওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ল। পাহাড় থেকে বণিকদের মাধ্যমে শুকনো ডাল আনিয়ে কয়দিনই বা আর চালানো যায়? ফলে সোমযজ্ঞ চালু রাখা বৈদিক পুরোহিতদের জন্য এক বিরাট বাস্তব চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল।

এই সংকটের সমাধান করা হয়েছিল এক অভিনব উপায়ে, যার নাম প্রতিনিধি (Pratinidhi) বা বিকল্প উদ্ভিদের ব্যবহার। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য, বিশেষ করে শতপথ ব্রাহ্মণ এবং বিভিন্ন শ্রৌতসূত্রে দেখা যায়, সোম না পাওয়া গেলে তার বদলে কোন কোন উদ্ভিদ ব্যবহার করা যাবে, তার লম্বা তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সোম না পেলে ‘পূতিকা’ নামের এক ধরনের লতা ব্যবহার করা যেতে পারে, লাল রঙের ডালপালাওয়ালা কোনো বনলতা নেওয়া যেতে পারে, এমনকি সাধারণ দূর্বা ঘাস বা অন্য কোনো অম্ল স্বাদের গুল্ম দিয়েও কাজ চালানো যাবে (Mahony, 1998)। কিন্তু পুরোহিতরা জানতেন এই নকল উদ্ভিদগুলোতে আসল সোমের মতো কোনো তেজ বা উন্মাদনা ছিল না। ফলে পানীয় হিসেবে সোমের যে বাস্তব মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল।

বাস্তব উদ্ভিদটি যখন হারিয়ে গেল, তখন মানুষের মনে তৈরি হলো তার প্রতীকী রূপ। ঋগ্বেদের একেবারে শেষ স্তরে, অর্থাৎ দশম মণ্ডলে এসে সোমের এক নতুন রূপান্তর দেখা যায়। সেখানে সোমকে সরাসরি আকাশের চাঁদের সাথে এক করে ফেলা হলো। কবিরা বলতে শুরু করলেন, আকাশে যে চাঁদ ক্ষণে ক্ষণে বাড়ে এবং কমে, সেটাই হলো দেবতাদের আসল সোমের পাত্র। দেবতারা প্রতিদিন সেই পাত্র থেকে সোমরস পান করেন, তাই অমাবস্যার দিকে চাঁদ ছোট হয়ে যায়; আবার পূর্ণিমায় তা পূর্ণ হয়ে ওঠে। যে সোম একসময় ছিল মাটির লতা, তা পুরোপুরি রূপান্তরিত হয়ে গেল মহাজাগতিক ও পৌরাণিক এক প্রতীকে।

এই প্রতীকী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বৈদিক সমাজ তার একটি অত্যন্ত বাস্তব উপাদানকে বিমূর্ত ভাবনায় রূপ দিল। ব্রোঞ্জযুগের যাযাবর যোদ্ধারা পাহাড়ি লতার রস খেয়ে যে রক্ত গরম করা শক্তি পেত, পরবর্তীকালের কৃষিনির্ভর ও নগরমুখী সমাজে তার আর প্রয়োজন ছিল না। তাদের তখন দরকার ছিল স্থিতিশীল রাষ্ট্র, রাজকীয় অনুশাসন এবং বিমূর্ত দর্শন। ফলে সোম তার রক্তমাংসের উদ্দীপক শরীরটি হারিয়ে ফেলল এবং স্থান করে নিল পরবর্তী হিন্দু পুরাণের চন্দ্র দেবতার খোলসে। তবুও ঋগ্বেদের পাতায় সেই আদিম পাহাড়ি উদ্ভিদের সবুজ পাতার গন্ধ, পাথরের ঠোকাঠুকির শব্দ এবং এক ফোঁটা সোনালি পানীয়ের জন্য মানুষের অদম্য তৃষ্ণা আজও অক্ষয় হয়ে রয়েছে।

ঋগ্বেদের সমাজ ও রাজনৈতিক সংগঠন (Society and Political Organization in the Ṛgveda): পরিবার, জন, বিশ, সভা ও রাজন

পরিবার, কুল ও পিতৃতান্ত্রিক গৃহকাঠামো (Family, Kula, and Patriarchal Household Structure)

প্রাচীন বৈদিক জীবনের ভোরটা শুরু হতো কোনো বড় অট্টালিকায় নয়, খড় আর মাটি দিয়ে তৈরি ছোট ছোট কুটিরে। সেখানে একটি পরিবারের সবাই একসাথে থাকত। ঋগ্বেদের সমাজ ছিল স্পষ্টতই রক্তসম্পর্ক এবং পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের ওপর দাঁড়ানো। সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী একক ছিল পরিবার, যাকে কখনো ‘গৃহ’ আবার কখনো ‘কুল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিবারের প্রধান ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ, যাকে বলা হতো গৃহপতি (Gṛhapati) বা কুলপ (Kulapa)। ঘরের ভেতরে তার সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা। সন্তানের জন্ম, বিবাহ থেকে শুরু করে গবাদিপশুর তদারকি – সবকিছুর রাশ থাকত এই গৃহপতির হাতে। সমাজবিজ্ঞানের চোখে এটা ছিল একটি যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থা, যেখানে তিন বা চার প্রজন্মের মানুষ একই ছাদের নিচে বাস করত এবং যৌথ শ্রমের মাধ্যমে টিকে থাকত।

ঋগ্বেদের পারিবারিক কাঠামোয় পুত্রসন্তানের প্রতি তীব্র পক্ষপাত চোখে পড়ার মতো। স্তোত্রগুলোতে ঋষিরা দেবতাদের কাছে বারবার ‘বীর’ বা বলবান পুত্র কামনা করছেন, কিন্তু একটিবারের জন্যও কোনো স্তবকারী কন্যা চেয়ে যজ্ঞ করেছেন বলে দেখা যায় না। এর কারণ ছিল খুবই বাস্তব। যাযাবর পশুপালক সমাজে টিকে থাকার জন্য শারীরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। চারণভূমি পাহারা দেওয়া, অন্য দলের সাথে গবাদিপশু ছিনতাইয়ের লড়াইয়ে যাওয়া এবং গোত্রের সীমান্ত রক্ষা করার জন্য পুরুষের বাহুবল ছিল টিকে থাকার প্রধান শর্ত। ইতিহাসবিদ রাম শরণ শর্মা (Ram Sharan Sharma) তার প্রামাণ্য গ্রন্থ মেটেরিয়াল কালচার অ্যান্ড সোশ্যাল ফরমেশনস ইন অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়া (Material Culture and Social Formations in Ancient India)-তে দেখিয়েছেন, ঋগ্বৈদিক সমাজে শ্রমের বিভাজন এবং পশুপালন অর্থনীতির বাস্তব চাহিদাই এই পুত্রকেন্দ্রিক মানসিকতা তৈরি করেছিল (Sharma, 1983)। কন্যাকে হয়তো অবহেলা করা হতো না, কিন্তু গোত্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষায় পুত্রসন্তান ছিল অপরিহার্য।

নারীদের অবস্থান এই পরিবারে ছিল জটিল। বিবাহিত স্ত্রীকে বলা হতো ‘জায়া’ বা ‘পত্নী’, এবং তিনি গৃহের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পেতেন। যজ্ঞের আগুনে স্বামীর পাশে স্ত্রীর উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। তবে এই সম্মানজনক অবস্থানের নিচে পিতৃতান্ত্রিক শাসনের বাস্তবতা ঢাকা পড়ত না। বিয়ের পর নারীকে নিজের বাবার বাড়ি ছেড়ে স্বামীর পরিবারে গিয়ে উঠতে হতো, যাকে সমাজবিজ্ঞানে বলা হয় পিতৃবাসিক ব্যবস্থা (Patrilocal System)। সেখানে গিয়ে তাকে শাশুড়ি, ননদ এবং দেবরের সাথে মানিয়ে চলতে হতো। সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার ছিল না। গোত্রের মূল সম্পদ, অর্থাৎ গরু এবং ঘোড়ার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরুষদের হাতে।

গবেষক সুভীরা জয়সওয়াল (Suvira Jaiswal) বৈদিক সমাজের পরিবর্তনশীল রূপ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আদি বৈদিক পরিবারগুলো ছিল মূলত স্বনির্ভর অর্থনৈতিক উৎপাদন কেন্দ্র (Jaiswal, 1981)। পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলে পশু চরাত, দুধ দোয়াত, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করত এবং যব চাষ করত। গৃহপতির ক্ষমতা অনেক সময় চরম রূপ ধারণ করতে পারত। ঋগ্বেদে ঋজ্রাশ্বের একটি গল্প পাওয়া যায়, যেখানে পিতা তার নিজের পুত্রের চোখ অন্ধ করে দিয়েছিলেন, কারণ পুত্রটি গোত্রের একশো ভেড়া একটি ক্ষুধার্ত নেকড়েকে দান করে দিয়েছিল। এই চরম ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও এটা বুঝিয়ে দেয় যে, পরিবারের শৃঙ্খলা ও সম্পদের অপচয় রোধে কুলপতির কর্তৃত্ব কতখানি কঠোর হতে পারত। পারিবারিক এই শাসনব্যবস্থাই ছিল পরবর্তী বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তিপ্রস্তর।

গ্রাম, বিশ ও জন: সামাজিক স্তরবিন্যাসের সোপান (Grama, Vis, and Jana: Steps of Social Stratification)

পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে ঋগ্বৈদিক মানুষ যখন বৃহত্তর গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হতো, তখন গড়ে উঠত সম্পর্কের কয়েকটি পর্যায়ক্রমিক স্তর। পরিবারগুলোর সমষ্টি নিয়ে গঠিত হতো গ্রাম (Grāma)। তবে এই গ্রাম কিন্তু আজকের দিনের কোনো স্থায়ী কৃষিনির্ভর শান্ত পল্লী ছিল না। আদি বৈদিক যুগে গ্রাম ছিল মূলত একটি ভ্রাম্যমাণ পশুপালক দল বা যাযাবর তাঁবু। তারা গরু আর ঘোড়ার পিঠে নিজেদের মালপত্র চাপিয়ে এক চারণভূমি থেকে অন্য চারণভূমিতে ঘুরে বেড়াত। এই ভ্রাম্যমাণ দলের প্রধানকে বলা হতো গ্রামণী (Grāmaṇī)। গ্রামণী কেবল শান্তিকালীন দলপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সামরিক অধিনায়ক। যখন দুটি দলের মধ্যে চারণভূমি নিয়ে মারামারি লাগত, তখন গ্রামণী তার দলের যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিতেন।

কয়েকটি গ্রাম বা আত্মীয়তার সূত্রে বাঁধা কয়েকটি দল নিয়ে তৈরি হতো আরও বড় একটি গোষ্ঠী, যার নাম ছিল বিশ (Viś)। বিশ হলো মূলত এমন এক জনবসতি বা গোত্রীয় শাখা, যা সাধারণ মানুষকে ধারণ করত। এই বিশের প্রধানকে বলা হতো বিশপতি (Viśpati)। বিশের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন অনুভব করত এবং সাধারণ সিদ্ধান্তগুলো তারা দলবদ্ধভাবে গ্রহণ করত। পরবর্তীকালে এই বিশ শব্দটি থেকেই ‘বৈশ্য’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছিল, যা উৎপাদনকারী সাধারণ সম্প্রদায়কে নির্দেশ করে। বিশপতি যুদ্ধের সময় তার গোত্রীয় বাহিনীকে নিয়ে রাজনের পতাকাতলে গিয়ে দাঁড়াতেন।

এই সমগ্র সামাজিক পিরামিডের শীর্ষে ছিল জন (Jana) বা বৃহৎ উপজাতি। ঋগ্বেদে ‘জন’ শব্দটি প্রায় পৌনে তিনশো বার ব্যবহৃত হয়েছে, যা নির্দেশ করে তৎকালীন মানুষের আনুগত্য কোনো নির্দিষ্ট মাটির টুকরোর প্রতি ছিল না, বরং তাদের আনুগত্য ছিল তাদের উপজাতির প্রতি। উদাহরণস্বরূপ ভরত জন, যদু জন, পুরু জন বা অনু জনের কথা বলা যায়। ঐতিহাসিক দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী (Damodar Dharmananda Kosambi) তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি (An Introduction to the Study of Indian History)-তে উল্লেখ করেছেন, ঋগ্বেদের আর্যরা ছিলেন ভূখণ্ডহীন উপজাতীয় মানুষ (Kosambi, 1956)। তারা নিজেদের পরিচয় দিতেন রক্তের সম্পর্কে, কোনো ভৌগোলিক দেশের নামে নয়। জন-এর প্রধান যিনি হতেন, তাকে বলা হতো ‘গোপতি’ বা গবাদিপশুর রক্ষক, যার থেকে পরবর্তীতে রাজনৈতিক নেতার জন্ম হয়।

এই সামাজিক স্তরবিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রক্তের সম্পর্ক বা আত্মীয়তাই ছিল সমাজের মূল বাঁধন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চার্লস ড্রেকমেয়ার (Charles Drekmeier) দেখিয়েছেন, প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্রের উৎপত্তির আগে ক্ষমতা কাজ করত এই আত্মীয়তার নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে (Drekmeier, 1962)। পরিবার থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে বিশ, এবং বিশ থেকে জন – এই ধাপগুলো কোনো আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন দিয়ে পরিচালিত হতো না। এখানে নিয়ম চলত রক্তের প্রতি আনুগত্য, পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য এবং যৌথ বেঁচে থাকার তাগিদে। ফলে ব্যক্তিগত অপরাধ বা বিবাদকেও পুরো পরিবারের বা বিশের সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

রাজন ও আদিম রাজন্যপদ: নেতৃত্বের প্রকৃতি ও সীমাবদ্ধতা (The Rajan and Early Kingship: Nature and Limits of Leadership)

ঋগ্বেদের রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাকে বলা হতো রাজন (Rājan)। তবে রাজন শব্দটা শুনে যদি আধুনিক যুগের কোনো সিংহাসনে বসা প্রতাপশালী সম্রাটের কথা মনে হয়, তবে মস্ত ভুল হবে। ঋগ্বেদের রাজন ছিলেন মূলত একজন উপজাতীয় সর্দার বা যুদ্ধনেতা। তার কোনো সুরক্ষিত সুরম্য প্রাসাদ ছিল না, ছিল না কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী কিংবা লিখিত সংবিধান। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষেরই একজন, যিনি সাহসিকতা, শারীরিক সামর্থ্য এবং কৌশলগত বুদ্ধির কারণে নিজের গোত্রের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার পেয়েছিলেন।

রাজনের প্রধান দায়িত্ব ছিল দুটি। প্রথমত, নিজের গোত্রের গবাদিপশু এবং মানুষদের অন্যান্য আক্রমণকারী দল থেকে রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, সফলভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে শত্রুপক্ষের গরু ও সম্পদ ছিনিয়ে আনা। সংহিতায় রাজাকে বারবার ‘গোপা জনস্য’ বা জনের রক্ষক বলা হয়েছে। ইতিহাসবিদ কুমকুম রায় (Kumkum Roy) রাজন্যপদের বিবর্তন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আদি বৈদিক স্তরে রাজার ক্ষমতা নির্ভর করত তার ব্যক্তিগত বীরত্ব এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের ওপর (Roy, 1994)। রাজা যদি যুদ্ধে ব্যর্থ হতেন বা গোত্রকে পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপত্তা দিতে না পারতেন, তবে তাকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া খুব অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ছিল না।

শাসনকাজে রাজাকে সাহায্য করার জন্য খুব সীমিত আকারের একদল সহযোগী ছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন দুজন – পুরোহিত (Purohita) এবং সেনানী (Senānī)। সেনানী ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের প্রধান সহযোগী, আর পুরোহিত ছিলেন ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা। পুরোহিত কেবল যজ্ঞ করতেন না, তিনি রাজার রথের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের স্তোত্র পাঠ করে সেনাদের সাহস বাড়াতেন। এছাড়াও ছিলেন ‘দূত’, যারা বিভিন্ন জনের মধ্যে বার্তা নিয়ে যাতায়াত করত, এবং ‘স্পশ’ বা গুপ্তচর, যারা শত্রুর গতিবিধি নজরে রাখত। কিন্তু কোনো নিয়মিত কর আদায়কারী আমলা বা বিচারালয়ের বিচারক তখনো তৈরি হয়নি।

রাজনপদ বংশানুক্রমিক ছিল কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাসবিদ ইউ. এন. ঘোষাল (U. N. Ghoshal) তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো পিতার পর পুত্র রাজা হতো, কিন্তু তা কোনো প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ছিল না (Ghoshal, 1959)। অনেক স্তোত্রেই স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, গোত্রের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষরা মিলে রাজাকে নির্বাচন করতেন। রাজাকে আনুগত্য জানানোর আগে তাকে শপথ নিতে হতো যে তিনি গোত্রের মঙ্গল করবেন। যদি কোনো রাজা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতেন, তবে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা বা নির্বাসনে পাঠানোর ক্ষমতাও গোত্রীয় পরিষদের হাতে ছিল। ফলে ঋগ্বৈদিক রাজন্যপদ ছিল মূলত দায়িত্বভার, কোনো নিরঙ্কুশ শাসনক্ষমতা নয়।

রাজা চাইলেই নিজের খেয়ালখুশি মতো রাজ্য চালাতে পারতেন না, কারণ তার ক্ষমতার ওপর কড়া নজর রাখত কিছু শক্তিশালী জনপরিষদ। এই পরিষদগুলো ছিল আদিম উপজাতীয় গণতন্ত্রের অনন্য প্রকাশ। ঋগ্বেদে মূলত তিনটি পরিষদের নাম পাওয়া যায় – বিদথ, সভা এবং সমিতি। প্রাচীন ভারতে যে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র গড়ে ওঠার আগে এক ধরনের যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি ছিল, এই পরিষদগুলো তারই ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করে।

এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন এবং রহস্যময় প্রতিষ্ঠানটি হলো বিদথ (Vidatha)। বিদথ ছিল মূলত একটি যৌথ উপজাতীয় সমাবেশ, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি সামাজিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হতো। বিদথের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, এখানে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। নারীরা এই সমাবেশে কথা বলতেন, এমনকি স্তোত্র পাঠ করতেন। গবেষক কে. পি. জয়সোয়াল (K. P. Jayaswal) তার ধ্রুপদী গ্রন্থ হিন্দু পলিটি (Hindu Polity)-তে দাবি করেছিলেন যে, বিদথ ছিল আদিম আর্য সমাজের এক ধরনের লোকসংসদ (Jayaswal, 1924)। যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ কীভাবে সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে, তা নির্ধারিত হতো এই বিদথে বসে। এটি ছিল এক যৌথ সাম্যবাদী কাঠামোর স্মারক, যা পরবর্তী বৈদিক যুগে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি ছিল সভা (Sabhā)। সভা ছিল মূলত সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ, অভিজাত এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের একটি ক্ষুদ্র পরিষদ। এখানে সাধারণত সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত। সভার প্রধান কাজ ছিল বিচারকার্য পরিচালনা করা এবং জটিল আইনি বা সামাজিক বিরোধের মীমাংসা করা। সভার সদস্যদের বলা হতো ‘সভেয়’ বা সভার যোগ্য। তবে সভার পরিবেশ সব সময় খুব গম্ভীর থাকত না। সভার ঘরেই বসত জুয়া বা পাশা খেলার আসর, যা নিয়ে ঋগ্বেদের বিখ্যাত ‘অক্ষ সূক্তে’ এক জুয়াড়ির করুণ আত্মবিলাপ পাওয়া যায়। সেখানে জুয়াড়ি বলছে, জুয়ার নেশায় সে কীভাবে সভায় গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে।

সবশেষে ছিল সমিতি (Samiti), যা ছিল গোটা উপজাতির এক বিশাল সাধারণ সভা। বিশ বা সাধারণ প্রজারাই ছিল এই সমিতির প্রাণ। ইতিহাসবিদ অনন্ত সদাশিব আলতেকর (Anant Sadashiv Altekar) প্রমাণ করেছেন যে, সমিতির রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত গভীর, কারণ এই সমিতিতেই নতুন রাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হতো বা নির্বাচিত করা হতো (Altekar, 1949)। রাজা নিজে এই সমিতিতে উপস্থিত থাকতেন এবং সবার সাথে একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করতেন। ঋগ্বেদের শেষ সূক্তে যে ঐক্যের ডাক দেওয়া হয়েছে – “তোমাদের চিন্তা এক হোক, তোমাদের মন এক হোক, তোমাদের সমিতি হোক সর্বসম্মত” – তা ছিল মূলত এই রাজনৈতিক পরিষদের ভেতর বিভাজন দূর করার এক আন্তরিক প্রার্থনা।

অর্থনৈতিক লেনদেন, বলি ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টন (Economic Exchanges, Bali, and the Redistribution of War Booty)

একটি সমাজ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা বুঝতে হলে তার অর্থনৈতিক লেনদেনের পদ্ধতি বোঝা দরকার। ঋগ্বেদের সমাজে আজকের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট মুদ্রা বা বাণিজ্যিক বাজার ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ কেনাবেচা করত পণ্যের বিনিময়ে পণ্য দিয়ে, যাকে বলা হয় বার্টার বা বিনিময় প্রথা। এই বিনিময়ের প্রধান মানদণ্ড ছিল গরু। কোনো জিনিসের দাম নির্ধারণ করা হতো গরুর সংখ্যা দিয়ে। ঘোড়া এবং অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত সোনার পাত বা নিষ্ক (Niṣka) দিয়েও বড় ধরনের লেনদেন চলত, তবে সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ গো-কেন্দ্রিক।

এই সমাজে রাজাকে প্রজারা কোনো নিয়মিত বাধ্যতামূলক ‘ট্যাক্স’ বা খাজনা দিত না। রাজা যে অর্থ বা সম্পদ পেতেন, তা আসত এক ধরনের স্বেচ্ছাপ্রদত্ত উপহারের মাধ্যমে, যার নাম ছিল বলি (Bali)। প্রজারা খুশি হয়ে রাজাকে নিজের ফসলের বা পশুর একটি অংশ দিত, কারণ রাজা তাদের বহিরাগত শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতেন। যদি কোনো রাজা জোর করে বলি আদায় করতে যেতেন, তবে তা অনৈতিক বলে গণ্য হতো। ওলন্দাজ ভারততত্ত্ববিদ জে. সি. হেস্টারম্যান (J. C. Heesterman) বৈদিক রাজন্যপদ ও আচারের সংঘাত আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, বলি ছিল এক ধরনের সামাজিক সংহতির প্রতীক, কোনো অর্থনৈতিক শোষণ নয় (Heesterman, 1985)।

অর্থনীতির আরেকটি বড় উৎস ছিল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা ‘লুঠ’। বৈদিক আর্যরা যখন কোনো অবৈদিক অনার্য গোষ্ঠী বা অন্য কোনো আর্য দলের ওপর আক্রমণ চালাত, তখন বিজয়ী দল সমস্ত গবাদিপশু, ঘোড়া, শস্য এবং দাস-দাসী ছিনিয়ে নিয়ে আসত। এই লুণ্ঠিত সম্পদ রাজা একা নিজের পকেটে ভরতে পারতেন না। গোত্রীয় সমাবেশ বা বিদথে সেই সম্পদ সবার সামনে এনে ঢালা হতো। এরপর একটি প্রকাশ্য নিয়মের মাধ্যমে তা যোদ্ধা, পুরোহিত এবং সাধারণ পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। রাজাকে দেওয়া হতো একটু বড় ভাগ বা ‘জ্যেষ্ঠাংশ’, কিন্তু সাধারণ সদস্যদের বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ রাজার ছিল না।

নৃতত্ত্ববিদ মর্টন ক্লাস (Morton Klass) দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন অর্থনৈতিক বিন্যাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, আদি বৈদিক অর্থনীতি ছিল একটি পুনর্বণ্টনমূলক অর্থনীতি (Redistributive Economy) (Klass, 1980)। রাজা ছিলেন সম্পদের সংগ্রহকারী এবং সেই সম্পদ আবার বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যম। যজ্ঞের সময় রাজা যে বিপুল পরিমাণ দক্ষিণা পুরোহিতদের দান করতেন, কিংবা উৎসবের দিনে সাধারণ মানুষকে যে ভূরিভোজ করাতেন, তার মাধ্যমে সম্পদ সমাজের ওপরতলা থেকে নিচের তলায় নেমে আসত। সম্পদ জমিয়ে ব্যক্তিগত পুঁজি গড়ে তোলার কোনো উপায় তৎকালীন যাযাবর সমাজে ছিল না।

আইন, প্রথা ও সামাজিক সংঘাত: দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক রূপান্তর (Law, Custom, and Social Conflict: The Battle of the Ten Kings and Political Transformation)

ঋগ্বেদের সমাজে অপরাধ দমন বা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কোনো লিখিত আইনগ্রন্থ ছিল না। সমাজ চলত অলিখিত প্রথা এবং বংশীয় রীতির ওপর ভিত্তি করে। কেউ কারও ক্ষতি করলে বা কাউকে হত্যা করলে রক্তমূল্য বা বৈরদেয় (Vairadeya) দেওয়ার বিধান ছিল। এর অর্থ হলো, হত্যাকারীর পরিবারকে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে নির্দিষ্ট সংখ্যক গরু দিতে হতো ক্ষতিপূরণ হিসেবে। সাধারণত একশোটি গরুকে মানুষের জীবনের মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যদি ক্ষতিপূরণ না দেওয়া হতো, তবে দুই বংশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের খেলা শুরু হতো, যা বংশপরম্পরায় চলতে থাকত। চারণভূমি দখল, গরুর জল পানের ঘাট নিয়ে বিবাদ এবং সীমানা নিয়ে বিরোধ ছিল নিত্যদিনের চিত্র।

এই সমস্ত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংঘাতের সবচেয়ে চরম প্রকাশ ঘটেছিল ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে বর্ণিত ঐতিহাসিক এক ঘটনায়, যা পরিচিত দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ (Battle of the Ten Kings) বা দশ রাজার যুদ্ধ নামে। এই যুদ্ধটি রূপকথার কোনো লড়াই ছিল না, এটি ছিল পাঞ্জাবের মাটিতে সংঘটিত হওয়া ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নথিবদ্ধ রাজনৈতিক সংঘাত। এই যুদ্ধটি হয়েছিল পারুষ্ণী নদীর (বর্তমান রাভি নদী) তীরে। একদিকে ছিলেন ভরত (Bharata) এবং তৃৎসু (Tṛtsu) বংশের শক্তিশালী রাজা সুদাস (Sudās), যার উপদেষ্টা ছিলেন মহামতি বশিষ্ঠ। অন্যদিকে সুদাসকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য দশটি শক্তিশালী উপজাতির এক বিশাল মোর্চা গড়ে উঠেছিল, যার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আরেক বিখ্যাত পুরোহিত বিশ্বামিত্র। এই মোর্চায় কেবল আর্য গোত্রগুলোই ছিল না, ছিল বেশ কিছু অনার্য দলও, যেমন যদু, তুর্বশ, পুরু, অনু, দ্রুহ্যু, অজা এবং শিগ্রু (Thakur, 1989)।

যুদ্ধের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য এবং জলের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। বিপক্ষ দল পারুষ্ণী নদীর বাঁধ কেটে দিয়ে সুদাসের বাহিনীকে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সুদাস এক প্রচণ্ড যুদ্ধে দশ রাজার সম্মিলিত বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। হাজার হাজার যোদ্ধা নদীতে ডুবে বা তিরের আঘাতে মারা যায়। ইতিহাসবিদ বি. এন. এস. যাদব (B. N. S. Yadava) এই যুদ্ধের সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে দেখিয়েছেন, দাশরাজ্ঞ যুদ্ধ ছিল উপজাতীয় ঢিলেঢালা সঙ্ঘ থেকে একটি কেন্দ্রীভূত আঞ্চলিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে প্রথম বড় পদক্ষেপ (Yadava, 1973)। এই জয়ের মাধ্যমে ভরত বংশ পুরো উত্তর ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, এবং তাদের নাম অনুসারেই পরবর্তীকালে এই সমগ্র ভূখণ্ডের নাম হয় ‘ভারতবর্ষ’।

দাশরাজ্ঞ যুদ্ধের পর বৈদিক সমাজের রাজনৈতিক চরিত্র চিরতরে বদলে যেতে থাকে। ছোট ছোট যাযাবর জনগুলো ভেঙে গিয়ে একীভূত হতে শুরু করে। ভরত এবং পুরু বংশের মিলনে গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী নতুন রাজবংশ, যার নাম কুরু (Kuru)। এই কুরুদের হাত ধরেই বৈদিক সমাজ যাযাবর পশুপালন ছেড়ে ধীরে ধীরে স্থায়ী কৃষিনির্ভর সমাজে প্রবেশ করে। সভা ও সমিতির মতো গণতান্ত্রিক পরিষদগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাজার পদ হয়ে ওঠে বংশানুক্রমিক ও নিরঙ্কুশ। ফলে ঋগ্বেদের সমাজের যে মুক্ত, গণতান্ত্রিক এবং ভ্রাম্যমাণ চরিত্র ছিল, তা কালক্রমে রূপান্তরিত হয়ে এক জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থা ও কঠোর বর্ণভিত্তিক সমাজের দিকে এগিয়ে যায়।

ঋগ্বেদের অর্থনীতি ও বস্তুজীবন (Economy and Material Life in the Ṛgveda): পশুপালন, কৃষি, সম্পদ ও প্রযুক্তি

পশুপালন ও গো-সম্পদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা (Pastoralism and the Central Role of Cattle Wealth)

সূর্য ওঠার সাথে সাথে বৈদিক জনপদের দিন শুরু হতো গবাদিপশুর ডাক দিয়ে। ঋগ্বেদের পুরো পাতাজুড়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে, তা হলো গরু এবং ঘোড়াকে ঘিরে আবর্তিত মানুষের জীবন। এই সমাজের অর্থনীতি ছিল প্রধানত পশুপালননির্ভর। একটি পরিবারের সামাজিক মর্যাদা, সমৃদ্ধি এবং প্রভাব মাপা হতো তার গোয়ালে কতগুলো গরু আছে তা দেখে। সংহিতায় গরুকে ডাকা হয়েছে ‘রয়ি’ বা আসল সম্পদ হিসেবে। পশুপালক মানুষের প্রতিটি প্রার্থনায় দেব-দেবীদের কাছে একটাই মিনতি ছিল – আমাদের চারণভূমি বড় করে দাও, আমাদের গাভীগুলোকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করো এবং তাদের দুধে পাত্র ভরিয়ে দাও।

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পশুপালন সংস্কৃতি ঋগ্বৈদিক মানুষের ভাষাকে কতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সময়ের হিসাব, যুদ্ধের নাম এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক – সবকিছুর ভেতরেই ঢুকে পড়েছিল গরু। উদাহরণস্বরূপ, গোধূলি শব্দটি এসেছে গরু ঘরে ফেরার সময় ওড়া ধুলো থেকে, যা দিয়ে সন্ধ্যার সময়কে বোঝানো হতো। যুদ্ধকে বলা হতো গবিষ্টি (Gaviṣṭi), যার অর্থ গরুর অন্বেষণ বা গরুর জন্য লড়াই। এমনকি নিজের কন্যাকে ডাকা হতো ‘দুহিতা’, যার আক্ষরিক অর্থ যে গাভীর দুধ দোয়ায়। গরুকে সংহিতায় বলা হয়েছে অঘ্ন্যা (Aghnyā), অর্থাৎ যা বধযোগ্য নয়। এর কারণ কোনো অলৌকিক পবিত্রতা নয়, বরং এর পেছনে কাজ করত কঠোর অর্থনৈতিক উপযোগিতা। একটি জীবিত দুগ্ধবতী গাভী দুধ, মাখন, গোবর এবং ভবিষ্যৎ বলদ দিয়ে পরিবারকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখত, যা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জবাই করে খেয়ে ফেলার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান করে তুলেছিল।

ইতিহাসবিদ ডি. এন. ঝা (D. N. Jha) তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণাগ্রন্থ দ্য মিথ অব দ্য হোলি কাউ (The Myth of the Holy Cow)-তে বৈদিক মানুষের খাদ্যতালিকা ও পশুর ব্যবহার নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন (Jha, 2002)। তিনি দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ সামাজিক আচার, অতিথি আপ্যায়ন এবং বড় যজ্ঞের সময় ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী বলি দিয়ে মাংস খাওয়ার বাস্তব চল ঋগ্বৈদিক সমাজে প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ, গরুর প্রতি মানুষের মনোভাব ছিল মূলত বাস্তববাদী ও উপযোগিতাকেন্দ্রিক। দুধ থেকে তৈরি ঘি ছিল যজ্ঞাগ্নির প্রধান খাদ্য এবং মানুষের প্রোটিন ও ফ্যাটের বড় উৎস।

গরুর ঠিক পরেই যার স্থান ছিল, সে হলো ঘোড়া বা ‘অশ্ব’। পশুপালক যাযাবরদের দ্রুত গতিশীলতা এবং সামরিক অভিযানের জন্য ঘোড়া ছিল অপরিহার্য। ঘোড়া ছাড়া যুদ্ধের রথ চালানো অসম্ভব ছিল। এছাড়া ভেড়া এবং ছাগলও ব্যাপকভাবে লালন-পালন করা হতো। ভেড়ার লোম দিয়ে পোশাক তৈরি করা হতো, বিশেষ করে সিন্ধু নদ ও গান্ধার অঞ্চলের উন্নত জাতের ভেড়ার লোমের কথা সংহিতায় আলাদা করে উল্লেখ রয়েছে। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট পিগট (Stuart Piggott) তার প্রাচীন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদে প্রতিফলিত পশুপ্রেম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের ব্রোঞ্জযুগীয় পশুপালক ঐতিহ্যের এক নিখুঁত ধারাবাহিকতা (Piggott, 1950)। পশুচারণই ছিল তাদের বেঁচে থাকার মেরুদণ্ড, আর পশুই ছিল তাদের পার্থিব নিরাপত্তার প্রতীক।

কৃষিব্যবস্থা: ভূমিকর্ষণ, যব ও সেচপ্রযুক্তি (Agricultural System: Tillage, Barley, and Irrigation Technology)

পশুপালনের পাশাপাশি কৃষিকাজও ঋগ্বেদের মানুষের জীবনে উপস্থিত ছিল, তবে এর ভূমিকা ছিল দ্বিতীয় সারির। আদি বৈদিক স্তরে মানুষ যাযাবর পশুপালক হিসেবেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। তবে সময়ের সাথে সাথে এবং পাঞ্জাবের উর্বর নদী অববাহিকায় বসতি স্থাপনের পর চাষাবাদের গুরুত্ব ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। চতুর্থ মণ্ডলের ৫৭ নম্বর সূক্তটি সম্পূর্ণভাবে কৃষিকাজের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। সেখানে কৃষক লাঙল, বলদ এবং মাটির খাঁজের উদ্দেশে গান গেয়ে প্রার্থনা করছে যেন জমি নরম থাকে এবং শস্যে মাঠ ভরে ওঠে। মাটির সেই চাষ করা খাঁজকে দেবী হিসেবে কল্পনা করে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সীতা’, যা পরবর্তী রামায়ণের সীতা চরিত্রের রূপক উৎস।

বৈদিক লাঙলকে বলা হতো ‘লাঙ্গল’ বা ‘সীর’। এটি কোনো লোহার তৈরি ভারী ফাল ছিল না। মাটি খোঁড়ার জন্য তখন ব্যবহৃত হতো কাঠের তৈরি চোখা লাঙল, যার ডগায় শক্ত কাঠ বা ক্ষেত্রবিশেষে তামার পাত পরানো থাকত। এই লাঙল টানত জোড়া বলদ, কখনো কখনো ছয়, আট বা বারোটি বলদ একসাথে জোতার কথাও স্তোত্রে পাওয়া যায়। কৃষিকাজ ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এক কর্ম। বন কেটে বা পুড়িয়ে জমি পরিষ্কার করা হতো, তারপর লাঙল দিয়ে মাটি চষে বীজ ছিটানো হতো। কাস্তে দিয়ে পাকা শস্য কেটে তা খামারে এনে মাড়াই করা হতো বাতাসের উল্টো দিকে উড়িয়ে দিয়ে।

ঋগ্বেদে খাদ্যশস্য হিসেবে কেবল একটিমাত্র ফসলের স্পষ্ট এবং বারবার উল্লেখ পাওয়া যায়, তা হলো যব (Yava)। যব বলতে সাধারণত বার্লি বা এক ধরনের আদিম গমজাতীয় শস্যকে বোঝানো হতো। আজকের যুগের মতো চাল বা ধানের উল্লেখ ঋগ্বেদের প্রাচীন স্তরে প্রায় নেই বললেই চলে। ধান চাষের জন্য যে পরিমাণ স্থায়ী জলাভূমি এবং ব্যাপক সেচব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, তা প্রাথমিক বৈদিক সমাজে তৈরি হয়নি। যবের তৈরি পিঠা বা ‘পুরোডাশ’, ছাতু এবং দুধে সেদ্ধ করা যবের জাউ ছিল তাদের প্রধান শস্যজাতীয় খাবার।

সেচব্যবস্থার ক্ষেত্রে তারা মূলত বর্ষার বৃষ্টি এবং নদীর স্বাভাবিক বন্যার ওপর নির্ভর করত। তবে খরার সময় ফসল বাঁচানোর জন্য মানুষ কৃত্রিম সেচপ্রযুক্তিও তৈরি করেছিল। কুয়ো থেকে জল তোলার জন্য ব্যবহৃত হতো চামড়ার বালতি বা ‘কোশ’, যা দড়ি দিয়ে চাকার সাথে বেঁধে টেনে তোলা হতো। এই চাকাটিকে বলা হতো অশ্মচক্র (Aśmacakra) বা পাথরের তৈরি কপিকল। সংহিতায় ‘খনিত্রিম অপঃ’ বা খাল কেটে নদী থেকে জমিতে আনা জলের কথাও বলা হয়েছে। বিশিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক দম্পতি ব্রিজেট অলচিন (Bridget Allchin) ও রেমন্ড অলচিন (Raymond Allchin) দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতার উত্থান নিয়ে তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ঋগ্বৈদিক কৃষি ছিল মূলত নদীতীরবর্তী পলিমাটির ওপর দাঁড়ানো এক মৌসুমী ব্যবস্থা, যা বড় ধরনের স্থায়ী উদ্বৃত্ত উৎপাদনে তখনও সক্ষম হয়ে ওঠেনি (Allchin & Allchin, 1982)। ফলে পশুপালন ছেড়ে পুরোপুরি কৃষিজীবী হয়ে ওঠার মতো অর্থনৈতিক রূপান্তর তখনো ঘটেনি।

ধাতুবিদ্যা ও আয়স বিতর্ক (Metallurgy and the Ayas Debate)

ঋগ্বেদের বস্তুজীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যে শব্দটি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের সবচেয়ে বেশি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়, তা হলো অয়স (Ayas)। সংহিতায় এই ধাতুর তৈরি তলোয়ার, বর্শার ফলা, তিরের মুখ, কুঠার এবং সুরক্ষাবর্মের অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই ‘অয়স’ বলতে বৈদিক কবিরা ঠিক কোন ধাতুকে বুঝিয়েছেন? এটা কি লোহা, নাকি তামা ও ব্রোঞ্জ? ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অনেক জাতীয়তাবাদী পণ্ডিত দাবি করেছিলেন যে বৈদিক আর্যরা লোহার ব্যবহার জানত। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং ধাতববিদ্যার ইতিহাস এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে।

তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব দেখায় যে, ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার ‘হায়োস’ শব্দ থেকে সংস্কৃত ‘অয়স’, লাতিন ‘আয়েস’ (যার অর্থ তামা বা ব্রোঞ্জ) এবং প্রাচীন জার্মান ‘আইর’ বা ইংরেজি ‘ওর’ শব্দের জন্ম হয়েছে। ঋগ্বেদে অয়স বলতে স্পষ্টতই তামা বা ব্রোঞ্জকে বোঝানো হতো। এই ধাতুর রঙকে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে লালচে বা সোনালি হিসেবে, যা তামার প্রাকৃতিক রঙের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। পরবর্তীকালের অথর্ববেদ বা যজুর্বেদে যখন আসল লোহার আগমন ঘটল, তখন ভাষার ভেতরে এক পরিষ্কার বিভাজন তৈরি হয়েছিল। লোহাকে বলা হতে লাগল ‘শ্যাম অয়স’ বা ‘কৃষ্ণ অয়স’ (কালো ধাতু), আর তামাকে আলাদা করার জন্য নাম দেওয়া হলো ‘লোহিত অয়স’ (লাল ধাতু)। ঋগ্বেদের আদি স্তরে এই রঙের বিভাজন অনুপস্থিত, সেখানে অয়স কেবল একটি সাধারণ ধাতু হিসেবেই এসেছে (Chakrabarti, 1992)।

ধাতু গলানো এবং তা দিয়ে অস্ত্র ও পাত্র তৈরির কাজটি করত সমাজের এক বিশেষ কারিগর শ্রেণি, যাদের বলা হতো কর্মকার (Karmāra)। তারা ধমনী বা হাপর দিয়ে কাঠকয়লার আগুনে বাতাস দিয়ে ধাতব আকরিক গলাত। ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের একটি বিখ্যাত সূক্তে কর্মকারের চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, কামার শুকনো কাঠ জ্বালিয়ে পাখির পালক দিয়ে বাতাস দিচ্ছে এবং উজ্জ্বল ধাতু গলিয়ে ধনীদের জন্য অস্ত্র তৈরি করছে। কর্মকাররা কেবল অস্ত্র বানাত না, তারা গৃহস্থালির জন্য রান্নার পাত্র এবং যজ্ঞের বিভিন্ন সামগ্রীও তৈরি করত।

ভারতীয় উপমহাদেশের লোহার ব্যবহার নিয়ে প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী (Dilip Kumar Chakrabarti) তার আকর গ্রন্থ দ্য আর্লি ইউজ অব আয়রন ইন ইন্ডিয়া (The Early Use of Iron in India)-তে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদের মূল পর্বে উত্তর ভারতে লোহার প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ার কোনো জোরালো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই (Chakrabarti, 1992)। বৈদিক আর্যরা মূলত ব্রোঞ্জ ও তামার হাতিয়ার নিয়েই উপমহাদেশে এসেছিল। একই মত পোষণ করেছেন গবেষক বিভূতি ত্রিপাঠী (Vibhuti Tripathi), যিনি দক্ষিণ এশিয়ার লৌহযুগের সূচনা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, লোহার ব্যাপক প্রসার হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের দিকে, যা উত্তর-বৈদিক যুগের সূচনাকে চিহ্নিত করে (Tripathi, 2001)। ফলে ঋগ্বেদের প্রযুক্তিগত দুনিয়া ছিল স্পষ্টতই একটি তামা-ব্রোঞ্জভিত্তিক বস্তুজীবন।

কারুশিল্প, বস্ত্র ও পরিবহন প্রযুক্তি (Crafts, Textiles, and Transportation Technology)

একটি পশুপালক সমাজের বেঁচে থাকার জন্য কাঠের কাজ এবং পরিবহন প্রযুক্তির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে স্পর্শকাতর। এই সমাজে ছুতার বা কাঠমিস্ত্রিকে বলা হতো তক্ষণ (Takṣan) বা তষ্টা। তক্ষণের সামাজিক মর্যাদা ছিল খুবই উঁচুতে। তিনি কোনো সাধারণ দিনমজুর ছিলেন না, বরং তাকে দেখা হতো একজন শিল্পী বা স্থপতি হিসেবে। ঋগ্বেদের স্তোত্রকাররা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাব্যরচনাকে প্রায়ই একজন দক্ষ ছুতারের কাঠের রথ তৈরির কাজের সাথে তুলনা করতেন। ছুতাররা জঙ্গল থেকে সেরা মানের শক্ত কাঠ নির্বাচন করে নিয়ে আসতেন এবং তা দিয়ে তৈরি করতেন যুদ্ধের দ্রুতগামী রথ এবং মালামাল বহনের দুই চাকার বলদগাড়ি।

ঋগ্বৈদিক প্রযুক্তির সবচেয়ে জটিল ও উন্নত নিদর্শন ছিল রথ (Ratha)। এটি ছিল হালকা, দ্রুতগামী এবং অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ একটি দ্বিচক্রযান। এই রথের চাকা কোনো নিরেট গোল কাঠের টুকরো ছিল না। এতে ব্যবহৃত হতো স্পোক বা ‘অর’, যা চাকাকে হালকা অথচ প্রচণ্ড ঘাতসহনশীল করত। এই ধরনের স্পোকযুক্ত চাকার রথ তৈরি করতে কাঠের সূক্ষ্ম পরিমাপ এবং ধাতু দিয়ে চাকার বাইরের বেড় বাঁধানোর মতো উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হতো। ইতিহাসবিদ শিরিন রত্ননগর (Shereen Ratnagar) ব্রোঞ্জযুগের যুদ্ধরীতি ও প্রযুক্তির মিথস্ক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, স্পোকযুক্ত হালকা রথ ছিল ইউরেশীয় স্তেপ থেকে ছড়িয়ে পড়া যাযাবর সামরিক আধিপত্যের প্রধান চাবিকাঠি (Ratnagar, 2004)। সাধারণ পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো ভারী ‘অনস’ বা চার চাকার কাঠের গাড়ি, যা টানত বলদ।

বস্ত্রশিল্পেও বৈদিক মানুষের অগ্রগতি ছিল লক্ষণীয়। তারা সুতি ও পশমি – উভয় ধরনের পোশাক ব্যবহার করত। সুতো কাটার কাজকে বলা হতো ‘তন্তু’ এবং কাপড় বোনার কারিগরকে বলা হতো ‘বয়’। এই কাজে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। সংহিতায় রাত ও দিনকে দুই রূপবতী নারী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যারা মহাবিশ্বের বিশাল তাঁতে বসে আলোর সাদা সুতো আর অন্ধকারের কালো সুতো দিয়ে সময়ের কাপড় বুনে চলেছে। পোশাকের তিনটি প্রধান অংশ ছিল – নিচের অংশের কাপড় বা ‘বাস’, ওপরের চাদর বা ‘অধিবাস’, এবং শরীরের পেঁচানো বিশেষ উত্তরীয় বা ‘দ্রাপী’। ধনী ব্যক্তিরা জরি বা সোনা দিয়ে নকশা করা উজ্জ্বল পোশাক পরতেন, যাকে বলা হতো ‘পেশস’।

চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ বা ট্যানিং শিল্পও বেশ উন্নত ছিল। চর্মকার বা চামড়ার কারিগররা পশুর চামড়া ছাড়িয়ে তা তেল ও গাছের ছাল দিয়ে নরম করত। চামড়া দিয়ে তৈরি হতো জল বহনের থলে বা ‘দৃবৃতি’, ধনুকের ছিলা, ঘোড়ার লাগাম, চাবুক এবং সোমরস পেষার জন্য বিশেষ মাদুর। প্রত্নতত্ত্ববিদ গ্রেগরি পোশেল (Gregory Possehl) প্রাচীন ভারতীয় কারুশিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করে লিখেছেন, ঋগ্বেদের সমাজে কারিগররা অস্পৃশ্য বা নিচু জাতের ছিলেন না (Possehl, 2002)। তারা ছিলেন সমাজের প্রয়োজনীয় সদস্য, যাদের হাতের কাজের ওপর পুরো গোত্রের সামরিক ও দৈনন্দিন নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভর করত।

বিনিময় প্রথা, বাণিজ্য ও পণিবর্গ (Barter System, Trade, and the Panis)

ঋগ্বৈদিক সমাজে আধুনিক অর্থে কোনো কেনাবেচার বাজার বা শপিং ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করত সরাসরি বিনিময়ের মাধ্যমে। একজন হয়তো ছুতারকে এক পাত্র ঘি দিয়ে তার বদলে কাঠের বাটি বানিয়ে নিত, কিংবা পুরোহিতকে গরু দিয়ে যজ্ঞ করিয়ে নিত। এই বিনিময় ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গরু। একটি বিশেষ সূক্তে এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছে, “আমি মাত্র দশটি গরুর বিনিময়ে আমার তৈরি ইন্দ্রের মূর্তি বিক্রি করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কেউ তা কিনল না”। এই শ্লোকটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে গরু ছিল মূল্যের প্রধান পরিমাপক।

বড় ধরনের লেনদেন বা উপহারের ক্ষেত্রে আরেকটি জিনিস ব্যবহৃত হতো, যার নাম নিষ্ক (Niṣka)। নিষ্ক আসলে কোনো সরকারি সিলমোহরযুক্ত মুদ্রা বা কয়েন ছিল না। এটি ছিল মূলত খাঁটি সোনার তৈরি এক ধরনের গলার হার বা নির্দিষ্ট ওজনের ধাতব পাত। ধনী রাজারা পুরোহিতদের দক্ষিণা দেওয়ার সময় শত শত নিষ্ক দান করতেন। এই নিষ্ক প্রয়োজনে ভেঙে ওজন মেপে বাণিজ্যিক লেনদেনে ব্যবহার করা যেত। ধাতুর ওজন মেপে আদান-প্রদান করার এই পদ্ধতিটি প্রাচীন প্রাচ্যের বহু সমাজেই প্রচলিত ছিল। কোনো কেন্দ্রীয় রাজশক্তি না থাকায় মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে ওঠার কোনো বাস্তব পরিবেশ তখন তৈরি হয়নি।

বাণিজ্যের কথা উঠলেই ঋগ্বেদে একটি রহস্যময় এবং বৈরী জনগোষ্ঠীর নাম সামনে আসে, যাদের বলা হয়েছে পণি (Paṇi)। সংহিতায় পণিদের প্রতি চরম ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়েছে। স্তোত্রকাররা দেবতাদের কাছে বারবার প্রার্থনা করেছেন যেন পণিদের ধনসম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়। এই পণিরা আসলে কারা ছিল? তারা ছিল মূলত একদল বিত্তশালী বণিক গোষ্ঠী, যারা বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা এবং দেবতাদের বিশ্বাস করত না। তারা পুরোহিতদের কোনো দক্ষিণা দিত না এবং আর্যদের গবাদিপশু চুরি করে পাহাড়ি গুহায় লুকিয়ে রাখত বলে অভিযোগ ছিল। ঐতিহাসিক দেব রাজ চানানা (Dev Raj Chanana) প্রাচীন ভারতীয় দাসপ্রথা ও অর্থনীতির বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, পণিরা সম্ভবত ছিল স্থানীয় সিন্ধু সভ্যতার টিকে থাকা বণিক সম্প্রদায় কিংবা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী অবৈদিক আর্য গোষ্ঠী, যাদের ধনকেন্দ্রিক জীবনযাপন বৈদিক পশুপালকদের ক্ষোভের কারণ হয়েছিল (Chanana, 1960)।

বাণিজ্যিক যাতায়াত ছিল প্রধানত নদীপথ ও স্থলপথে। সংহিতায় ‘সমুদ্র’ শব্দের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়, যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন বৈদিক মানুষ আরব সাগরে বড় বড় পালতোলা জাহাজ নিয়ে দূরদেশে বাণিজ্য করত। তবে বিখ্যাত ঐতিহাসিক অমলেন্দু ঘোষ (A. Ghosh) প্রাচীন নগর ও বাণিজ্যের উত্থান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আদি ঋগ্বেদে সমুদ্র বলতে মূলত সিন্ধু নদের বিশাল জলরাশি এবং এর মোহনাকেই বোঝানো হয়েছে (Ghosh, 1973)। সমুদ্র শব্দের আক্ষরিক অর্থ ছিল বিপুল জলের আধার। সাধারণ মানুষ কাঠের ছোট নৌকায় বা চামড়ার ভেলায় নদী পারাপার করত। দূরপাল্লার সামুদ্রিক বাণিজ্যের কোনো বস্তুগত প্রমাণ আদি বৈদিক স্তরে পাওয়া যায় না; তাদের বাণিজ্য ছিল প্রধানত অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক।

বসতিবিন্যাস ও নগরহীন বস্তুজীবন (Settlement Patterns and Non-Urban Material Life)

ঋগ্বেদের যুগে মানুষ ঠিক কোথায় এবং কেমন ঘরে বাস করত, সেই চিত্রটি কয়েক শতাব্দী আগের পরিণত হরপ্পা সভ্যতার বিশাল ইটের শহরের চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। সিন্ধু সভ্যতার মতো পোড়ামাটির পাকা ড্রেন, বাঁধানো স্নানাগার বা দোতলা সারিবদ্ধ ইটের বাড়ি ঋগ্বেদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বৈদিক বস্তুজীবন ছিল সম্পূর্ণভাবে গ্রামীণ এবং নগরহীন। মানুষ বাস করত কাঁচা ঘরে, যা তৈরি হতো বাঁশ, খড়, কাদা এবং কাঠের খুঁটি দিয়ে। এই ধরনের কুটিরকে বলা হতো ‘শালা’ বা ‘হর্ম্য’। ঘরের চাল ছাওয়া হতো শুকনো ঘাস দিয়ে, আর দেওয়াল তৈরি হতো কঞ্চির চাটাইয়ের ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে।

সংহিতায় একটি শব্দ খুব ঘন ঘন আসে, তা হলো পুর (Pur)। অনেক আগের গবেষকরা মনে করতেন ‘পুর’ মানে হলো বড় বড় সুরম্য দুর্গ বা নগর। কিন্তু মাঠপর্যায়ের প্রত্নতত্ত্ব এই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ঋগ্বেদের পুর কোনো স্থায়ী পাথরের দুর্গ ছিল না। এগুলো ছিল মূলত জরুরি অবস্থায় আত্মরক্ষার জন্য মাটির তৈরি উঁচু ঢিবি বা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ঘেরা সাময়িক সুরক্ষিত সীমানা। যখন অন্য কোনো শত্রু দল গরু ছিনতাই করতে আসত, তখন গোত্রের মানুষ তাদের নারী ও গবাদিপশু নিয়ে সেই মাটির ঘেরাওয়ের ভেতর আশ্রয় নিত। খরা বা বন্যার সময়ও এই উঁচু মাটির ঢিবিগুলো পশুপালকদের সাময়িক নিরাপত্তা দিত। ইন্দ্রকে যে ‘পুরন্দর’ বা পুর ধ্বংসকারী বলা হয়েছে, তার অর্থ হলো তিনি শত্রুদের এই মাটির ও কাঠের অস্থায়ী প্রতিরক্ষা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন।

প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঋগ্বৈদিক বসতিগুলোকে হরিয়ানার ভগবানপুরা বা পাঞ্জাবের বিভিন্ন অঞ্চলে আবিষ্কৃত গেরুয়া রঙের মৃৎপাত্র সংস্কৃতি (Ochre Coloured Pottery) বা আদি চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র সংস্কৃতি (Painted Grey Ware)-র প্রথম স্তরের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়। বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক বি. বি. লাল (B. B. Lal) হস্তিনাপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলে খননকাজ পরিচালনা করে দেখিয়েছেন, এই স্তরের বসতিগুলো ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও স্বল্পস্থায়ী (Lal, 1955)। কোনো বড় ধরনের ইটের দেয়াল বা নগর পরিকল্পনার চিহ্ন সেখানে নেই। মানুষ মূলত নদী অববাহিকার উঁচু জায়গায় কয়েক বছর তাঁবু ফেলে বা কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকত, চারণভূমির ঘাস ফুরিয়ে গেলে বা নদীর গতিপথ বদলে গেলে তারা আবার নতুন জায়গায় চলে যেত।

হরিয়ানার প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্র নিয়ে কাজ করা প্রত্নতাত্ত্বিক সুরজ ভান (Suraj Bhan) দেখিয়েছেন, বৈদিক আর্যদের এই বস্তুজীবন ছিল একটি পরিবর্তনশীল এবং আংশিক যাযাবর জীবনযাত্রা (Bhan, 1975)। তারা কোনো মাটির স্থায়ী মায়ায় নিজেদের বন্দি করেনি। তাদের কাছে ভূমি বা জমি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না; জমির কোনো দলিল বা সীমানা প্রাচীর ছিল না। জমি ছিল মুক্ত, যার ওপর যে কেউ পশু চরাতে পারত। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলতে ছিল শুধু হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় এমন জীবন্ত পশু, ধাতুর অস্ত্র এবং পরনের বস্ত্র। এই সহজ, উন্মুক্ত অথচ কঠোর বস্তুজীবনের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছিল ঋগ্বেদের সমগ্র সাহিত্য ও সংস্কৃতি, যা পরবর্তীকালের স্থায়ী কৃষক সমাজ ও রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যগুলোর পথ তৈরি করে দিয়েছিল।

ঋগ্বেদের ভূগোল ও জনগোষ্ঠী (Geography and Peoples of the Ṛgveda): নদী, জনপদ, দাস ও দস্যু

সপ্তসিন্ধু ও নদীসূক্তের ভৌগোলিক বিস্তার (Sapta-Sindhu and the Geographical Horizon of the Nadistuti)

মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো একটি সভ্যতার বিস্তার বুঝতে হলে তার জলপথগুলোকে চেনা সবার আগে দরকার। ঋগ্বেদের কবিরা যখন তাদের স্তোত্র রচনা করছিলেন, তখন তাদের পৃথিবীটা ছিল নদী দিয়ে ঘেরা এক সুবিশাল অববাহিকা। এই ভৌগোলিক এলাকাকে সংহিতায় বলা হয়েছে সপ্তসিন্ধু (Sapta-Sindhu), যার সহজ অর্থ হলো সাত নদীর দেশ। এই সপ্তসিন্ধু কোনো কাল্পনিক স্বর্গরাজ্য নয়, বরং আজকের পূর্ব আফগানিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া, পুরো পাঞ্জাব এবং হরিয়ানার কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত ছিল সেই ভূখণ্ড। যাযাবর আর্যরা যখন ঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াত, তখন এই প্রমত্তা নদীগুলোই ছিল তাদের জীবনের সীমানা, পশুপালনের জল ও যাতায়াতের প্রধান পথ।

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৭৫ নম্বর সূক্তটি ইতিহাসের এক অসাধারণ দলিল, যা পরিচিত নদীসূক্ত (Nadīstuti Sūkta) নামে। এই সূক্তে কবি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত নদীগুলোর নাম সারিবদ্ধভাবে উল্লেখ করেছেন। কবি শুরু করেছেন গঙ্গা ও যমুনা দিয়ে, তারপর একে একে সরস্বতী, শুতুদ্রী (বর্তমান শতদ্রু বা সুতলেজ), বিপাশা (ব্যাস), পরুষ্ণী (রাভি), অসিক্নী (চেনাব), মরুদ্বৃধা, বিতস্তা (ঝিলাম), এবং শেষ পর্যন্ত সিন্ধুর নাম নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়ি নদীগুলোর কথাও স্তোত্রে নিখুঁতভাবে বলা হয়েছে – কূভা (কাবুল নদী), সুবাস্তু (সোয়াত নদী), ক্রুমু (কুররাম নদী) এবং গোমতী (গোমাল নদী)। ভৌগোলিক এই ধারাবাহিকতা দেখলে বোঝা যায় যে স্তোত্রকারদের এই সমগ্র অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও বাস্তব ধারণা ছিল (Bhargava, 1964)।

নদীসূক্তের এই ভৌগোলিক বিস্তার থেকে একটি চমৎকার ঐতিহাসিক দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই স্তোত্রে নদীগুলোর যে ক্রম সাজানো হয়েছে, তাতে পাঞ্জাবের কেন্দ্রীয় নদী সিন্ধু এবং তার পশ্চিমের শাখাগুলোর প্রতি বিশেষ দুর্বলতা দেখা যায়। সিন্ধুকে বলা হয়েছে সমস্ত নদীর মা, যিনি গর্জনে পাহাড়ি ষাঁড়ের মতো ছুটছেন এবং বিপুল জলরাশি নিয়ে সাগরের দিকে যাচ্ছেন। অন্যদিকে আজকের ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত নদী গঙ্গার নাম পুরো ঋগ্বেদে এসেছে মাত্র দু-একবার, এবং সেটাও এসেছে নদীসূক্তের তালিকার একেবারে শুরুতে একটি সাধারণ উল্লেখ হিসেবে। গবেষক এডউইন ব্রায়ান্ট (Edwin Bryant) বৈদিক আর্যদের উৎস ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিতর্ক নিয়ে আলোচনায় দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদের আদি কেন্দ্র ছিল বর্তমান পাকিস্তান ও সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম ভারতে (Bryant, 2001)। গাঙ্গেয় উপত্যকা তখনো বৈদিক সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি।

এই নদীগুলো কেবল জল দিত না, তারা ঋগ্বৈদিক গোত্রগুলোর রাজনৈতিক সীমানাও নির্ধারণ করত। নদীর পার ধরে গড়ে উঠত বিভিন্ন জনের শিবির। নদীর অগভীর ঘাটগুলো দিয়ে পারাপার হতো হাজার হাজার গরু ও ঘোড়া। যখন নদী ফুলেফেঁপে উঠত, তখন ঋগ্বৈদিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করত যেন নদী তাদের গবাদিপশু ভাসিয়ে না নিয়ে যায়। ফলে ঋগ্বেদের ভূগোল ছিল মূলত নদীকেন্দ্রিক এক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে মানুষের জীবন, পশুপালন এবং সামরিক গতিবিধি সবকিছুই নদীর গতিপথের সাথে ওতপ্রোতভাবে বাঁধা ছিল।

সরস্বতী নদী বিতর্ক ও জলবায়ুর পরিবর্তন (The Sarasvati River Debate and Climatic Shifts)

ঋগ্বেদের সমগ্র নদীব্যবস্থার মধ্যে একটি নদীকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা, কাব্য এবং আধুনিককালে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেই নদীটি হলো সরস্বতী (Sarasvatī)। সংহিতায় সরস্বতীর রূপ দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তাকে বলা হয়েছে ‘অম্বিতমে, নদীতমে, দেবীতমে’ – অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ মা, শ্রেষ্ঠ নদী এবং শ্রেষ্ঠ দেবী। কবিরা বর্ণনা করেছেন, তিনি পাহাড় চিরে প্রবল গর্জন করে সাগরে গিয়ে আছড়ে পড়ছেন এবং তার দুই তীরের শক্তিশালী রাজাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আধুনিক ভূগোল ঘাঁটলে দেখা যায়, আজকের হরিয়ানা বা রাজস্থানে এমন কোনো প্রমত্তা নদী সাগরে পড়ার মতো অবস্থায় নেই। তাহলে বৈদিক সরস্বতী আসলে কোথায় ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইতিহাসবিদ ও ভূবিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদল গবেষক মনে করেন, ঋগ্বেদের সরস্বতী হলো আজকের শুষ্ক হয়ে যাওয়া ঘগ্গর-হাকরা (Ghaggar-Hakra) নদী ব্যবস্থা, যা একসময় হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে হরিয়ানা ও রাজস্থানের মধ্য দিয়ে কচ্ছের রণে গিয়ে পড়ত। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক অরেল স্টাইন (Aurel Stein) বিশ শতকের প্রথমার্ধে রাজস্থান ও থর মরুভূমির শুকনো নদীখাত ধরে প্রথম সুপরিকল্পিত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালান (Stein, 1942)। তিনি দেখিয়েছেন, এই শুকনো নদীর অববাহিকা জুড়েই ব্রোঞ্জ যুগের শত শত প্রাচীন জনবসতির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে, যা প্রমাণ করে অতীতে এই অঞ্চলে এক বিরাট জলপ্রবাহ ছিল।

পরবর্তীকালে ভূবিজ্ঞানী কে. এস. ভালদিয়া (K. S. Valdiya) স্যাটেলাইট চিত্র এবং হাইড্রোলজিক্যাল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দাবি করেন যে, টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে শতদ্রু ও যমুনা নদী তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলেছিল (Valdiya, 2002)। শতদ্রু চলে যায় সিন্ধুর দিকে এবং যমুনা সরে যায় গঙ্গার দিকে। ফলে মধ্যবর্তী সরস্বতী নদী তার প্রধান জলের উৎস হারিয়ে ধীরে ধীরে মরুভূমিতে শুকিয়ে যায়। ঋগ্বেদের শেষ স্তরে এবং পরবর্তী পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণে সরস্বতীর এই শুকিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে, যেখানে নদীটি ‘বিনশন’ নামক স্থানে এসে মরুভূমির বালিতে হারিয়ে গেছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে অন্য একটি বিকল্প তত্ত্বও রয়েছে। কিছু ভাষাতাত্ত্বিক মনে করেন, ইন্দো-আর্যরা যখন আফগানিস্তানের হেলমান্দ অববাহিকায় ছিল, তখন সেখানে ‘হরহ্বইতি’ (হেলমান্দ নদী) নামের নদীটিকে তারা সরস্বতী বলত। পরে ভারতে এসে পাঞ্জাবের নতুন নদীকে তারা একই পবিত্র নাম দেয়। এই মতভেদ যাই থাকুক না কেন, পরিবেশগত দিক থেকে এটা পরিষ্কার যে, ঋগ্বেদের রচয়িতারা উত্তর ভারতের এক বড় জলবায়ুগত রূপান্তরের সাক্ষী ছিলেন। একটি খরস্রোতা নদীর শুকিয়ে যাওয়া যাযাবর সমাজগুলোকে ধীরে ধীরে তাদের আদি চারণভূমি ছেড়ে আরো পূর্ব দিকে সরে যেতে বাধ্য করেছিল।

পঞ্চজন ও প্রধান বৈদিক জনপদসমূহ (The Five Peoples and Major Vedic Tribes)

ঋগ্বেদের জনসমাজ কোনো একতাবদ্ধ জাতির সমাজ ছিল না। এটি ছিল রক্তসম্পর্কে সম্পর্কিত অসংখ্য স্বাধীন, যাযাবর ও প্রতিদ্বন্দ্বী উপজাতির এক জটিল সংমিশ্রণ। সংহিতায় খুব গুরুত্ব দিয়ে একটি সমষ্টিগত নাম বারবার নেওয়া হয়েছে, তা হলো পঞ্চজন (Pañcajanāḥ) বা ‘পাঁচটি জাতি’। এই পাঁচটি প্রধান জন বা উপজাতি ছিল – যদু (Yadu), তুর্বশ (Turvaśa), পুরু (Puru), অনু (Anu) এবং দ্রুহ্যু (Druhyu)। এই গোষ্ঠীগুলো কখনো নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তার সূত্রে জোট বাঁধত, আবার নিজেদের ভেতর সামান্য চারণভূমি বা গবাদিপশু নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

এই পাঁচ জনের পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী বংশের নাম ঋগ্বেদের পাতায় অত্যন্ত উজ্জ্বল, তারা হলো ভরত (Bharata) এবং তাদের সাথে সম্পর্কিত তৃৎসু (Tṛtsu) বংশ। এই ভরত বংশের মানুষরা সরস্বতী ও দৃশদ্বতী নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাস করত। তারা ছিল অত্যন্ত সামরিক শক্তিধর এবং উচ্চাভিলাষী। ভারততত্ত্ববিদ এইচ. সি. রায়চৌধুরী (H. C. Raychaudhuri) প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন, ভরতরাই ছিল আদি বৈদিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু (Raychaudhuri, 1953)। তাদের নেতা রাজা সুদাস পুরো সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করার জন্য অন্যান্য সমস্ত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

পাঞ্জাবের সমভূমি ছাড়িয়ে উত্তর ও পূর্বের সীমানাতেও কিছু কিছু জনের নাম সংহিতায় উঁকি মারে। যেমন মৎস্য জন (যারা আজকের রাজস্থানের জয়পুর অঞ্চলে ছিল), চেদি জন (যমুনা নদীর দক্ষিণ প্রান্তের অধিবাসী), এবং কৃবি জন। তবে এই জনপদগুলো তখনো পর্যন্ত কোনো স্থির ভূখণ্ড বা ‘রাজ্য’ হয়ে ওঠেনি। একটি জন যেখানে গিয়ে তাদের তাঁবু ফেলত, গরু চরাত এবং যজ্ঞের আগুন জ্বালাত, সেই স্থানটিই সাময়িকভাবে তাদের জনপদ বলে গণ্য হতো। ইতিহাসবিদ বি. কে. ঘোষ (B. K. Ghosh) বৈদিক সাহিত্যের নৃগোষ্ঠীগত ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, এই গোষ্ঠীগুলোর প্রধান পরিচয় ছিল তাদের গোত্রপ্রধান ও পূর্বপুরুষদের রক্তের ধারা (Ghosh, 1951)। মাটির চেয়ে মানুষের রক্তের বন্ধনই তখন তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল।

এই উপজাতিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল অবিরাম। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে কোনো এক শান্তিময় যৌথ জীবনের বদলে আমরা পাই তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা। ইন্দ্রের কাছে এক দল প্রার্থনা করছে যেন অন্য দলের গরু ছিনিয়ে নেওয়া যায়, আবার অন্য দল একই ইন্দ্রের কাছে গিয়ে শত্রুর ধ্বংস কামনা করছে। জনগুলোর এই পারস্পরিক যুদ্ধ ও বিভাজনই শেষ পর্যন্ত তাদের আরও বড় জোট তৈরিতে বাধ্য করেছিল, যার ফলে প্রাচীন ক্ষুদ্র জনগুলো একীভূত হয়ে পরবর্তী কুরু ও পাঞ্চাল রাজ্যের মতো বড় যৌথ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছিল।

দাস ও দস্যু: পরিচয়, সংঘাত ও বর্ণবাদের প্রত্নরূপ (Dasa and Dasyu: Identity, Conflict, and the Archaic Proto-forms of Racism/Caste)

ঋগ্বেদের পাতা উল্টালে সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং হিংসাত্মক যে সুরটি কানে বাজে, তা হলো দাস (Dāsa) এবং দস্যু (Dasyu)-দের বিরুদ্ধে স্তোত্রকারদের তীব্র ঘৃণা। এই মানুষদের বারবার সম্বোধন করা হয়েছে বৈদিক আর্যদের প্রধান শত্রু হিসেবে। তাদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত নেতিবাচক ভাষায়। সংহিতায় বলা হয়েছে, তারা হলো ‘অব্রত’ (যারা বৈদিক নিয়ম মানে না), ‘অযজ্বান’ (যারা বৈদিক যজ্ঞ করে না), ‘অকর্মণ’ (যাদের কোনো যজ্ঞীয় ক্রিয়াকর্ম নেই), এবং ‘অন্যব্রত’ (যাদের আচার সম্পূর্ণ আলাদা)। অর্থাৎ, সংঘাতের মূল জায়গাটি ছিল সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির ভিন্নতা।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা পণ্ডিতরা, বিশেষ করে যারা সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্ব তৈরি করছিলেন, তারা এই দাস-দস্যুদের সাথে আর্যদের সংঘাতকে পুরোপুরি একটি ‘জাতিগত’ বা চামড়ার রঙের যুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তারা ঋগ্বেদের কিছু বিশেষ শব্দ, যেমন কৃষ্ণত্বচ (Kṛṣṇa-tvac) বা কালো চামড়া এবং অনাস (Anās) শব্দটির ভুল অর্থ করে বলেছিলেন এরা ছিল চ্যাপ্টা নাকের আদিবাসী দ্রাবিড় বা অনার্য জাতি। তবে আধুনিক নৃবিজ্ঞান এবং পাঠতাত্ত্বিক গবেষণা এই সরল বর্ণবাদী তত্ত্বকে নাকচ করে দিয়েছে। ঐতিহাসিক থমাস আর. ট্রাউটম্যান (Thomas R. Trautmann) তার প্রামাণ্য গ্রন্থ এরিয়ানস অ্যান্ড ব্রিটিশ ইন্ডিয়া (Aryans and British India)-তে প্রমাণ করেছেন, কীভাবে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরা তাদের নিজস্ব বর্ণবাদী মানসিকতা বৈদিক সাহিত্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিল (Trautmann, 1997)। ‘অনাস’ শব্দটির অর্থ ‘নাকহীন’ নয়, বরং ভাষাতাত্ত্বিকভাবে এর অর্থ হলো ‘মুখহীন’ বা যাদের ভাষা আর্যদের কাছে দুর্বোধ্য ছিল।

তাহলে এই দাস ও দস্যুরা বাস্তবে কারা ছিল? প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ জর্জ এরডসি (George Erdosy) প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার ইন্দো-আর্যদের উপাদান বিশ্লেষণ করে এক ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন (Erdosy, 1995)। দাসরা ছিল সম্ভবত এমন এক মিশ্র জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে যেমন স্থানীয় হরপ্পা সভ্যতার টিকে থাকা মানুষরা ছিল, তেমনি ছিল ভারতভূমিতে প্রবেশ করা ইন্দো-ইরানীয় বা ইন্দো-আর্যদের আগের কোনো অভিবাসী দল। ব্যাকট্রিয়া-মার্গিয়ানা প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলের (BMAC) সাথে দাসদের এক গভীর যোগসূত্র পাওয়া যায়। এমনকি অনেক দাসের নামও ছিল পুরোপুরি ইন্দো-ইরানীয়, যেমন দিবোদাস বা ব্যূষ। তারা বড় বড় মাটির কেল্লা বা ‘পুর’-এ বাস করত এবং প্রচুর ধনসম্পদ ও গরুর মালিক ছিল, যা যাযাবর আর্যদের ঈর্ষার কারণ হয়েছিল।

যুদ্ধে পরাজিত দাসদের ভাগ্য ছিল অত্যন্ত করুণ। পুরুষদের প্রায়শই হত্যা করা হতো, আর তাদের নারী ও শিশুদের ধরে নিয়ে এসে বৈদিক পরিবারগুলোতে ক্রীতদাস হিসেবে খাটাতে বাধ্য করা হতো। ঋগ্বেদের শেষ স্তরে এসে তাই ‘দাস’ শব্দটি একটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর নাম থেকে বদলে গিয়ে স্থায়ীভাবে ‘গোলাম’ বা সেবকে পরিণত হয়। এই দাসদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণই পরবর্তীকালের বৈদিক বর্ণব্যবস্থার চতুর্থ বর্ণ বা ‘শূদ্র’ শ্রেণির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।

সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী ও বহিরাগতদের সাথে মিথস্ক্রিয়া (Frontier Communities and Interaction with Outsiders)

সপ্তসিন্ধুর মূল ভূখণ্ডের বাইরে রুক্ষ পাহাড় ও মরুভূমির প্রান্তে বাস করত বেশ কিছু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ঋগ্বেদের কবিরা তাদের খুব একটা সম্মানের চোখে দেখতেন না, কিন্তু বাস্তব প্রয়োজনেই তাদের নাম সংহিতায় উঠে এসেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গান্ধারী (Gāndhārī), পক্ত (Paktha), ভলানস (Bhalānas), অলিন (Alina), বিষাণিন (Viṣāṇin) এবং শিব (Śiva)। এই উপজাতিগুলো মূলত বাস করত আজকের পূর্ব ও দক্ষিণ আফগানিস্তান এবং উত্তর পাকিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকাগুলোতে।

গান্ধারীদের কথা ঋগ্বেদে এসেছে তাদের চমৎকার ভেড়ার লোমের জন্য। সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরের পাহাড়ি ঢালে তারা ভেড়া চরাত এবং তাদের পশমি চাদর সমতলের আর্যদের কাছে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে বিক্রি হতো। অন্যদিকে পক্তরা ছিল অত্যন্ত দুর্ধর্ষ পাহাড়ি যোদ্ধা। আধুনিক গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই পক্তরাই হলো আজকের পাখতুন বা পশতুন জনগোষ্ঠীর প্রাচীন পূর্বসূরি। ভলানসরা সম্ভবত বাস করত ঐতিহাসিক বোলান গিরিপথের আশেপাশে, যা প্রাচীনকাল থেকেই ইরান ও মধ্য এশিয়ার সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান যোগাযোগ পথ ছিল (Singh, 2008)।

দাশরাজ্ঞ যুদ্ধে আমরা দেখেছি, রাজা সুদাসের বিরুদ্ধে এই সীমান্তবর্তী উপজাতিগুলোও সমতলের পুরুদের সাথে এসে হাত মিলিয়েছিল। এর অর্থ হলো, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও আদান-প্রদান ছিল অত্যন্ত সচল। বিষাণিনদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, তারা মাথায় পশুর শিংওয়ালা শিরস্ত্রাণ পরত। শিব জাতির মানুষরা সম্ভবত এমন কোনো পশুপালক ছিল যারা পরবর্তীকালের শিব বা রুদ্রের আদিম কোনো রূপের উপাসনা করত। এই দলগুলো মূল বৈদিক সমাজের পুরোপুরি অংশ ছিল না, আবার তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও ছিল না। তারা সীমান্তের বাণিজ্যের পথ নিয়ন্ত্রণ করত এবং সমতলের রাজনীতিতে নিয়মিত নাক গলাত।

ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব (Irfan Habib) প্রাচীন ভারতের প্রাগৈতিহাসিক কালপর্বের আলোচনায় দেখিয়েছেন, আর্যদের আগমন কোনো একমুখী সামরিক আগ্রাসন ছিল না, এটি ছিল কয়েক শতাব্দী ধরে চলা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর এক জটিল পারস্পরিক অনুপ্রবেশ (Habib, 2002)। সীমান্তে থাকা এই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের সাথে ক্রমাগত মেলামেশার ফলেই বৈদিক ভাষায় এমন অনেক শব্দ, ধাতুর নাম এবং ধর্মীয় ধারণা প্রবেশ করেছিল, যা মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় ছিল না। রক্ত এবং সংস্কৃতির এই নিরন্তর মিশ্রণই প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক সমাজকে গড়ে তুলেছিল।

স্থানিক রূপান্তর ও পূর্বমুখী বিস্তারের সূচনা (Spatial Transformation and the Beginnings of the Eastward Shift)

ঋগ্বেদের শুরু থেকে শেষের দিকে তাকালে মানুষের পদচিহ্নের এক নাটকীয় ভৌগোলিক সরণ লক্ষ্য করা যায়। আদি মণ্ডলগুলোতে স্তোত্রকারদের চোখ নিবদ্ধ ছিল খাইবার গিরিপথ, সোয়াত উপত্যকা এবং সিন্ধু নদের ওপর। কিন্তু দশম মণ্ডলে এসে আমরা দেখি মানচিত্রটি ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে ঝুঁকে পড়েছে। যাযাবর আর্যরা তাদের পাহাড়ি ও আধা-মরুভূমির শুষ্ক অঞ্চল ছেড়ে ভারতের ঘন জঙ্গল এবং বৃষ্টিবহুল আর্দ্র সমভূমির দিকে এগোতে শুরু করেছে। তারা হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র প্রান্তর পেরিয়ে যমুনা ও গঙ্গার উর্বর দোয়াব অঞ্চলের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।

এই পূর্বমুখী যাত্রার পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল পরিবেশ এবং পশুর জন্য ঘাসের অভাব। পাঞ্জাবের শুষ্ক অঞ্চলে অতিরিক্ত পশুচারণের ফলে চারণভূমিগুলোর ধারণক্ষমতা কমে আসছিল। তার ওপর সরস্বতীর মতো নদীগুলোর জলপ্রবাহ ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার কারণে দলগুলোকে নতুন জলের উৎসের সন্ধানে ছুটতে হয়েছিল। পূর্ব দিকের গাঙ্গেয় সমভূমি ছিল জল আর ঘাসে ভরা, কিন্তু সেখানে ঢোকার পথে বড় বাধা ছিল ঘন জঙ্গল। ঋগ্বেদের শেষ স্তরে তাই আমরা দেখি অগ্নির সাহায্য নিয়ে জঙ্গল জ্বালিয়ে পথ তৈরি করার রূপক বর্ণনা। আগুন কেবল যজ্ঞের দেবতা রইল না, সে হয়ে উঠল বনভূমি পরিষ্কার করে মানুষের বসবাসের উপযোগী জমি তৈরির প্রধান কারিগরি অস্ত্র।

গবেষক জেন ম্যাকিনটশ (Jane McIntosh) প্রাচীন সিন্ধু ও বৈদিক পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, এই পূর্বমুখী যাত্রা বৈদিক সমাজের মৌলিক রূপটিকেই বদলে দিয়েছিল (McIntosh, 2008)। পাহাড়ি খোলামেলা হাওয়ায় ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়ানো যাযাবর পশুপালকরা যখন দোয়াব অঞ্চলের জলাভূমি ও জঙ্গলে এসে পৌঁছাল, তখন তাদের পক্ষে আর আগের মতো বিশুদ্ধ যাযাবর থাকা সম্ভব হলো না। তাদের বসতি গড়তে হলো, নদী অববাহিকার নরম মাটিতে লাঙল দিয়ে কৃষিকাজ শুরু করতে হলো। তাদের রথের গুরুত্ব কিছুটা কমল এবং পদাতিক সৈন্য ও মাটির তৈরি কুটিরের গুরুত্ব বাড়ল।

ইতিহাসবিদ আর. সি. মজুমদার (R. C. Majumdar) সম্পাদিত দ্য বৈদিক এজ (The Vedic Age) গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ঋগ্বেদের সমাপ্তি মানেই হলো সপ্তসিন্ধুর আদিম যাযাবর পর্বের সমাপ্তি এবং ব্রহ্মাবর্ত ও আর্যাবর্তের স্থায়ী কৃষিভিত্তিক সভ্যতার সূচনা (Majumdar & Pusalker, 1951)। সিন্ধু নদ তার আধিপত্য হারিয়ে এক সময় পেছনের গল্প হয়ে গেল, আর ভারতীয় ইতিহাসের মূল রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠল গঙ্গা-যমুনার অববাহিকা। ঋগ্বেদের ভূগোল তাই কোনো স্থির পাথর নয়, এটি একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক নদীপ্রবাহের মতো, যা মধ্য এশিয়ার রুক্ষ পাহাড় থেকে যাত্রা শুরু করে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের উর্বর পলিমাটিতে এসে নিজের স্থায়ী নোঙর ফেলেছিল।

ঋগ্বেদের নারী ও পরিবার (Women and Family in the Ṛgveda): ঋষিকা, বিবাহ, পরিবার ও লিঙ্গসম্পর্ক

ঋগ্বেদীয় পরিবারের সামাজিক রূপরেখা ও গৃহব্যবস্থা (Social Structure of Family and Domestic Life in the Ṛgveda)

প্রাচীন বৈদিক জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পরিবার। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে সমাজকে কোনো বিমূর্ত কাঠামোর ভেতর দিয়ে দেখা হয়নি, বরং দেখা হয়েছে গৃহ, পশু এবং পারস্পরিক সম্পর্কের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায়। বৈদিক সমাজে পরিবারের মূল একককে বলা হতো গৃহ (Gṛha) বা কুল (Kula)। এই পরিবার কাঠামো ছিল যৌথ এবং স্পষ্টভাবেই পিতৃতান্ত্রিক। রক্তসম্পর্কিত বহু ব্যক্তি একই ছাউনির নিচে বসবাস করত, যেখানে বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ সদস্যের হাতে থাকত কর্তৃত্বের ভার। পরিবারের প্রধান কর্তাকে সম্বোধন করা হতো গৃহপতি (Gṛhapati) নামে। এই গৃহপতির ক্ষমতা গৃহের অভ্যন্তরীণ সম্পদ, গবাদিপশু এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর বিস্তৃত ছিল। তবে এই কর্তৃত্ব কেবল একতরফা আধিপত্য ছিল না, বরং গোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিল (Thapar, 2000)।

পরিবারের ভেতরে নারীর অবস্থান বুঝতে গেলে গৃহপতির সমান্তরালে গৃহপত্নী (Gṛhapatnī) পদবীটির দিকে তাকাতে হয়। বিবাহিত নারীকে গৃহের কর্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতো এবং ঋগ্বেদের একাধিক সূক্তে গৃহপত্নীকে পরিবারের শ্রী বা মঙ্গলের আধার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গৃহের অভ্যন্তরে দাস-দাসী, সন্তান এবং পশুর দেখভালের ক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। পশুপালনভিত্তিক যাযাবর ও আধা-কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে গৃহস্থালির প্রতিটি কাজ ছিল উৎপাদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুগ্ধ দোহন, শস্য পেষণ, বস্ত্র বয়ন এবং রান্নার মতো মৌলিক কাজগুলো নারীদের দ্বারাই সম্পন্ন হতো। ফলে পরিবারের দৈনন্দিন পরিচালনায় গৃহপত্নীর সক্রিয় উপস্থিতি সবসময় অনুভূত হতো, যা তাকে গৃহের ভেতরের পরিসরে এক ধরনের কার্যকরী ক্ষমতা প্রদান করেছিল (Jamison & Brereton, 2014)।

ঋগ্বেদের পারিবারিক কাঠামোতে সম্পর্কের জাল বেশ বিস্তৃত ছিল। পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগিনী ছাড়াও পিতামহ, পৌত্র এবং পুত্রবধূরা একই পরিবারে বাস করত। ঋগ্বেদের বহু সূক্তে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা একত্র হয়ে অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে বসে প্রার্থনা করছে। পরিবারের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি বজায় রাখা ছিল দলগত প্রচেষ্টা। বিশেষ করে যাযাবর জীবন থেকে ক্রমশ স্থায়ী বসতি গড়ে তোলার সময়ে পশুপালের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং চারণভূমির ওপর অধিকার টিকিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পারস্পরিক সংহতি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম শর্ত। পরিবারে জ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সুস্পষ্ট তাগিদ ঋগ্বেদের বিভিন্ন শ্লোকে লক্ষ্য করা যায় (Trautmann, 1981)।

তবে এই পারিবারিক ব্যবস্থায় লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন এবং ক্ষমতার বিন্যাস পুরোপুরি সমান্তরাল ছিল না। ক্ষমতা এবং বংশপরম্পরা রক্ষিত হতো পিতার ধারা অনুযায়ী। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে, বংশের পরিচয় নির্ণয়ে নারীর চেয়ে পুরুষের প্রাধান্য ছিল প্রশ্নাতীত। পুত্রসন্তানের মাধ্যমে বংশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং পিতৃপুরুষের উদ্দেশে পিণ্ডদানের ব্যবস্থা প্রাচীন ইন্দো-আর্য চিন্তায় গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। পরিবারে নারীর সম্মানজনক উপস্থিতি যেমন সত্য, তেমনই সেই উপস্থিতি পরিচালিত হতো একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ছকের অধীনে। গৃহপত্নী হিসেবে নারী যে মর্যাদা পেতেন, তা মূলত কার্যকর হতো স্বামীর সামাজিক অবস্থানের ভেতরে থেকেই, তার স্বতন্ত্র কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল না (Chakravarti, 1993)।

দাম্পত্য, বিবাহরীতি ও সূর্য্যা-সূক্ত (Conjugal Relations, Marriage Rituals and the Sūryā Hymn)

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের পঁচাশি সংখ্যক সূক্তটি বৈদিক বিবাহব্যবস্থা এবং দাম্পত্য দর্শনের এক অনন্য দলিল। এই সূক্তটিকে সচরাচর সূর্য্যা-সূক্ত (Sūryā Hymn) বলা হয়ে থাকে। এখানে সূর্য্যা অর্থাৎ সূর্যের কন্যার সঙ্গে সোমের রূপক বিবাহের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই সূক্তের ভেতর দিয়েই বৈদিক যুগের আদর্শ বিবাহরীতি এবং সামাজিক প্রত্যাশার ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিবাহ কেবল দুটি মানুষের জৈবিক মিলন ছিল না, এটা ছিল দুটি পরিবারের মধ্যে মৈত্রী এবং সামাজিক পুনর্বাসনের একটি চুক্তি। কন্যাকে তার পিতার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে বিদায় জানানোর সময় যেসব প্রার্থনা উচ্চারিত হতো, তাতে নতুন গৃহে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে (Jamison, 1996)।

সূর্য্যা-সূক্তে নববধূকে আশীর্বাদ করে বলা হয়েছে, সে যেন স্বামীর গৃহে গিয়ে সম্রাজ্ঞী (Samrājñī) হয়ে ওঠে। শ্বশুর, শাশুড়ি, দেবর এবং ননদের ওপর যেন তার প্রীতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রূপক বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, নতুন পরিবারে প্রবেশকারী নারীকে সম্পূর্ণ অধীনস্থ করার চেয়ে বরং তাকে যৌথ পরিবারের কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হিসেবে কল্পনা করা হতো। বিবাহিত যুগলকে নির্দেশ করা হতো জায়াপতী (Jāyāpatī) বা দম্পতী (Dampatī) শব্দ দিয়ে, যার অর্থ গৃহের যুগ্ম শাসক। অগ্নিকে সাক্ষী রেখে বর ও কন্যার হাত ধরার যে প্রথা, যা পাণিগ্রহণ (Pāṇigrahaṇa) নামে পরিচিত, তা ঋগ্বেদীয় যুগেই বিধিবদ্ধ রূপ লাভ করেছিল। অগ্নি ছিল গৃহের ও সাক্ষ্যের প্রতীক, যার উপস্থিতিতে নতুন দাম্পত্য চুক্তির বৈধতা নিশ্চিত হতো (Gonda, 1975)।

বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি বা পছন্দের অবকাশ কতটা ছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা বিতর্ক রয়েছে। ঋগ্বেদে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায় যেখানে যুবতীরা নিজেদের পছন্দের পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করত। বিশেষ করে সমনা (Samanā) নামক এক ধরনের উৎসবের কথা জানা যায়, যেখানে তরুণ-তরুণীরা একত্র হতো, নৃত্যগীত হতো এবং জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হতো। তবে এই ধরনের স্বাধীনতা সর্বজনীন ছিল কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের প্রবীণদের উদ্যোগেই বিবাহের যোগাযোগ সম্পন্ন হতো। বিবাহে পণ বা যৌতুক দেওয়ার এক ধরনের রূপরেখাও দেখা যায়, যাকে বলা হতো বহতু (Vahatu)। এটা বরের পরিবারকে দেওয়া কোনো বাধ্যবাধকতামূলক উৎকোচ ছিল না, বরং কনের সঙ্গে পিতার দেওয়া উপহারসামগ্রী, যার মধ্যে পোশাক, গবাদিপশু এবং অলঙ্কার অন্তর্ভুক্ত থাকত (Macdonell & Keith, 1912)।

দাম্পত্য সম্পর্কের আদর্শ হিসেবে পারস্পরিক বিশ্বস্ততা এবং সন্তান উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। দাম্পত্যের প্রাথমিক সামাজিক লক্ষ্য ছিল বংশরক্ষা এবং যজ্ঞকর্ম পরিচালনা। একগামী বিবাহই সমাজের সাধারণ রীতি ছিল, যদিও সমাজে বহুবিবাহের অস্তিত্বও অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতাধারী ব্যক্তি এবং উপজাতি প্রধানদের ক্ষেত্রে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের নজির বিভিন্ন সূক্তে ছড়িয়ে আছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কিন্তু একগামী দাম্পত্যের ভিত্তিই ছিল শক্তিশালী। ঋগ্বেদের কবিরা বারবার প্রার্থনা করেছেন যেন স্বামী-স্ত্রী বার্ধক্য পর্যন্ত একত্রে সুখে বসবাস করতে পারে এবং তাদের দাম্পত্যে কোনো ধরনের বিচ্ছেদ না ঘটে (Oberlies, 1998)।

ঋষিকা ও নারী স্তোত্রকারদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা (Ṛṣikās and the Intellectual Role of Women Hymnists)

ঋগ্বেদের সাহিত্যিক ও দার্শনিক গুরুত্বের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এতে নারী কবি ও চিন্তাবিদদের কণ্ঠের উপস্থিতি। প্রাচীন সাহিত্যে এই ধরনের নারীদের ঋষিকা (Ṛṣikā) বা ব্রহ্মবাদিনী (Brahmavādinī) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এঁরা কেবল যজ্ঞের সহযোগী ছিলেন না, বরং বৈদিক স্তোত্র রচনার সক্ষমতাও তাদের ছিল। পরবর্তী বৈদিক ঐতিহ্যে শৌনক তার বৃহদ্দেবতা (Bṛhaddevatā) গ্রন্থে প্রায় সাতাশ জন নারী স্তোত্রকারের তালিকা প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন লোপামুদ্রা, অপালা, ঘোষা, বিশ্ববারা, জুহু এবং সিকতা নিভাবরী। যদিও পুরুষ ঋষিদের তুলনায় নারী রচয়িতাদের সংখ্যা অনুপাতে বেশ কম, তবুও প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের এমন বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা স্পষ্টতই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে (Altekar, 1956)।

লোপামুদ্রার সূক্তটি ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের একশত উনআশি সংখ্যক সূক্তে সংরক্ষিত রয়েছে। এই সূক্তে ঋষি অগস্ত্যের সঙ্গে তার যে কথোপকথন লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ও আত্মসচেতন। দীর্ঘকাল ধরে অগস্ত্যের তপস্যা এবং কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে দাম্পত্য জীবন অবহেলিত হচ্ছিল। লোপামুদ্রা সেখানে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে তপস্যার পাশাপাশি গৃহস্থালি ও দাম্পত্য দায়িত্ব পালন করাও ধর্মেরই অংশ। নারীর শারীরিক ও মানসিক আকাঙ্ক্ষাকে তিনি অকপটে প্রকাশ করেছেন। একজন নারী প্রকাশ্যে তার অধিকার ও ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করছেন এবং তা পবিত্র বৈদিক সংহিতায় স্থান পাচ্ছে, এই ঘটনা প্রাচীন সমাজের মানসিক উন্মুক্ততার সাক্ষ্য বহন করে (Jamison, 1996)।

আরেকজন নারী স্তোত্রকার ঘোষার কাহিনিও ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ফুটে উঠেছে। ঘোষা ত্বকরোগ বা কুষ্ঠের মতো কোনো শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন, যার ফলে দীর্ঘদিন তিনি পিতার গৃহেই অবিবাহিত অবস্থায় বসবাস করতে বাধ্য হন। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ঊনচল্লিশ এবং চল্লিশ সংখ্যক সূক্ত দুটি ঘোষার নামে আরোপিত। এই স্তোত্রগুলোতে তিনি অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন আরোগ্যের জন্য এবং একজন উপযুক্ত জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য। তার রচনার ভাষা যেমন কাব্যময়, তেমনই তাতে রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত আর্তি। অশ্বিনীকুমাররা তাকে সুস্থ করে তোলেন এবং তিনি পরবর্তীতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে জ্ঞানচর্চা ও কাব্য রচনার এই ক্ষমতা বৈদিক যুগের নারীদের বৌদ্ধিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় (Parasher-Sen, 2004)।

বিশ্ববারা নামক আরেকজন নারী ঋষির কথা জানা যায় পঞ্চম মণ্ডলের আঠাশ সংখ্যক সূক্তে। তিনি কেবল মন্ত্র রচনাই করেননি, স্বহস্তে যজ্ঞাগ্নি প্রজ্জ্বলন করেছিলেন এবং পুরোহিতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বৈদিক যজ্ঞের নিয়মকানুন ছিল জটিল এবং সেখানে সঠিক উচ্চারণ ও ক্রিয়াবিধি জানা বাধ্যতামূলক ছিল। বিশ্ববারা এই নিয়ম আয়ত্ত করেছিলেন এবং যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতা পরিচালনা করেছিলেন। বিশ শতকের শুরুর দিকে কোনো কোনো জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ এই উদাহরণগুলোকে দেখিয়ে বৈদিক যুগকে নারীর জন্য এক কল্পিত ‘স্বর্ণযুগ‘ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন (Altekar, 1956)। তবে পরবর্তী নারীবাদী ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন যে এই অধিকারগুলো সমস্ত নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। এগুলো ছিল উচ্চ সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন অভিজাত পরিবারের কিছু বিশিষ্ট নারীর অভিজ্ঞতা, সাধারণ শ্রমজীবী নারীদের বাস্তব জীবন এর থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল (Chakravarti, 1993)।

আচার, যজ্ঞ ও প্রকাশ্য পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ (Women’s Participation in Rituals, Sacrifices and the Public Sphere)

বৈদিক ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্র ছিল যজ্ঞ। আর ঋগ্বেদের আচারব্যবস্থার অন্যতম শর্ত ছিল যজ্ঞকর্তার সঙ্গে তার স্ত্রীর উপস্থিতি। স্ত্রীকে বলা হতো পত্নী (Patnī), যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থই হলো যিনি যজ্ঞে পুরুষের সমকক্ষ অংশগ্রহণকারী। পত্নী ছাড়া কোনো গৃহী এককভাবে পূর্ণাঙ্গ যজ্ঞ সম্পাদন করতে পারতেন না। যজ্ঞের প্রতিটি পর্বে নারীর সুনির্দিষ্ট কিছু আচারগত দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল। বিশেষ করে সোমরস প্রস্তুতের সময় শিলাখণ্ড দিয়ে সোমলতা পেষণ করা, জল মিশ্রণ করা এবং সোমরস ছাঁকার কাজগুলো নারীদের হাত দিয়েই সম্পন্ন হতো। আচারানুষ্ঠানে এই সম্পৃক্ততা নারীকে পারিবারিক পরিসর পেরিয়ে একটি সামাজিক গুরুত্ব প্রদান করেছিল (Jamison, 1996)।

যজ্ঞের পাশাপাশি জনজীবনের প্রকাশ্য পরিসরে নারীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় ঋগ্বেদের বিদথ (Vidatha) নামক আদিম লোকপরিষদে। ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা দেখিয়েছেন যে বিদথ ছিল এমন এক প্রাচীন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। ঋগ্বেদের কিছু সূক্তে নারীদের এই বিদথে উপস্থিত থাকার এবং বক্তব্য রাখার উল্লেখ পাওয়া যায়। সূর্য্যা-সূক্তেও বধূকে আশীর্বাদ করে বলা হয়েছে যে সে যেন বিদথে গিয়ে প্রভাবশালী বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারে। এই বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয় যে প্রাক-রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উপজাতীয় সমাজে নারীদের প্রকাশ্য আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কার করা হয়নি (Sharma, 1983)।

তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে নারীর ভূমিকা কতখানি কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। বৈদিক যুগের দুটি প্রধান রাজনৈতিক সভা ছিল সভা (Sabhā) এবং সমিতি (Samiti)। এই সভাগুলোতে নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে একেবারেই অনুপস্থিত। প্রবীণ যোদ্ধা এবং প্রভাবশালী পুরুষরাই এই ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। যুদ্ধ পরিচালনা, লুটের মাল বণ্টন এবং উপজাতীয় সংঘাতের মীমাংসা পুরুষ যোদ্ধাদের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকত। ফলে বিদথে নারীর যে ধরনের অংশগ্রহণের ইঙ্গিত মেলে, তা হয়তো সমাজের আদিম সাম্যবাদী স্তরের অবশিষ্ট রূপ ছিল, যা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছিল (Roy, 1994)।

প্রকাশ্য উৎসবে অবশ্য নারীদের অবাধ বিচরণ দেখা যেত। আগেই উল্লেখিত সমনা (Samanā) উৎসবে তরুণী, বিবাহিত নারী এবং গণিকাদের অংশগ্রহণের প্রমাণ রয়েছে। সেখানে নারীরা সেজেগুজে যেতেন এবং তীরন্দাজি প্রতিযোগিতা বা ঘোড়াদৌড় উপভোগ করতেন। কবিরা এই দৃশ্যগুলোকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাদের স্তোত্রে। যেমন উষাদেবীর রূপ বর্ণনায় বলা হয়েছে, উষা যেন এক নৃত্যশিল্পী নারী, যিনি সমনা উৎসবের উদ্দেশ্যে নিজেকে অনাবৃত করছেন। এই ধরনের সামাজিক মেলামেশা নির্দেশ করে যে ঋগ্বেদের যুগে পরবর্তী কালের মতো কঠোর অন্তঃপুর প্রথা বা অবরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। নারীরা জনপরিসরে দৃশ্যমান ছিলেন, যদিও সেই দৃশ্যমানতা পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর সীমানাকে অতিক্রম করতে পারেনি (Macdonell & Keith, 1912)।

পুত্রসন্তানের প্রত্যাশা, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার (Desire for Sons, Inheritance and Property Rights)

ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সবচেয়ে স্পষ্ট এবং তীব্র বাসনাগুলোর একটি হলো পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা। দেব-দেবীদের কাছে ধন-সম্পদ, গাভী এবং অশ্বের পাশাপাশি যে বিষয়টি বারবার চাওয়া হয়েছে, তা হলো বীর (Vīra) বা বলবান পুত্র। এই প্রার্থনার পেছনে গভীর আর্থ-সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা কাজ করছিল। প্রাচীন বৈদিক সমাজ ছিল মূলত পশুপালনকারী এবং সংঘাতময় সমাজ। অন্য উপজাতি এবং অনার্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত চারণভূমি ও গবাদিপশু দখল নিয়ে যুদ্ধ চলত। এই পরিস্থিতিতে গোত্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল শারীরিক শক্তিসম্পন্ন যোদ্ধা। সেই কারণে পুত্রসন্তান ছিল পরিবারের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক সম্পদ (Trautmann, 1981)।

বিপরীতভাবে, কন্যাসন্তানের জন্মের জন্য সরাসরি কোনো প্রার্থনামূলক সূক্ত ঋগ্বেদে পাওয়া যায় না। তবে কন্যার জন্মের পর তার প্রতি কোনো সামাজিক ঘৃণা বা ভ্রূণহত্যার মতো নৃশংস মানসিকতার প্রমাণও এতে অনুপস্থিত। কন্যাকে স্নেহ দিয়ে বড় করা হতো এবং তাকে দুহিতা (Duhitā) বলা হতো, যার সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় যিনি গাভী দোহন করেন। এই নামকরণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পরিবারে কন্যার অর্থনৈতিক উপযোগিতা। কিন্তু বিবাহ হয়ে গেলে কন্যাকে অন্য গোত্রে পাঠিয়ে দিতে হতো, যেখানে পুত্র আজীবন পরিবারের সঙ্গেই থেকে যেত এবং পরিবারকে সেবা প্রদান করত। তাছাড়া পারলৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী পিতার আত্মার মুক্তির জন্যও পুত্রের উপস্থিতি আবশ্যিক বলে মনে করা হতে থাকে (Altekar, 1956)।

উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে বৈদিক সমাজ ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। স্থাবর বা অস্থাবর পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানা নারীর হাতে সরাসরি হস্তান্তরিত হতো না। পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো কেবল তার পুত্ররা। ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডলের ৩১ সংখ্যক সূক্তে উত্তরাধিকার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অন্যকে দান করার মতো কন্যাকে পিতা গ্রহণ করেন, কিন্তু পুত্র জন্ম নেয় পিতার নিজের রক্তের উত্তরাধিকারী হয়ে। কন্যারা উত্তরাধিকার পেত কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে, যখন কোনো পিতার কোনো পুত্রসন্তান থাকত না। এই ধরনের কন্যাকে বলা হতো পুত্রিকা (Putrikā)। এই ক্ষেত্রে কন্যা যে সন্তানের জন্ম দিত, সেই দৌহিত্র তার মাতামহের বংশধর ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হতো (Trautmann, 1981)।

যেসব কন্যার কোনো ভাই থাকত না, সমাজে তাদের অবস্থান নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ পরিলক্ষিত হয়। ঋগ্বেদে এই ধরনের নারীদের ক্ষেত্রে সম্পত্তি রক্ষার আইনি লড়াইয়ের কথা আছে, কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিতে তাদের অবহেলিত বা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকত। ভাইয়ের অনুপস্থিতি নারীকে অনেক সময় নিরাপত্তাহীন করে তুলত। বিবাহের সময় কনে যে অলঙ্কার, বস্ত্র এবং গৃহস্থালি সামগ্রী উপহার হিসেবে পেত, যা ছিল স্ত্রীধন (Strīdhana)-এর আদি রূপ, কেবল সেগুলোর ওপরই তার ব্যক্তিগত অধিকার বজায় থাকত। ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা তখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি, ফলে স্থাবর সম্পত্তির ওপর নারী কিংবা পুরুষ কারও একক আইনি অধিকার আধুনিক অর্থে দৃশ্যমান ছিল না, তবে গবাদিপশুর মালিকানা পুরুষদের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকত (Chakravarti, 1993)।

বিধবা, নিয়োগ প্রথা ও লিঙ্গসম্পর্কের সামাজিক গতিশীলতা (Widows, Niyoga and the Social Dynamics of Gender Relations)

ঋগ্বেদের যুগে নারীর সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তনশীলতা এবং জটিলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিধবাদের জীবন এবং লিঙ্গসম্পর্কের বিশ্লেষণে। পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে প্রচলিত সতীদাহ (Satī) বা সহমরণের মতো চরম অমানবিক প্রথা আদি ঋগ্বেদে অনুপস্থিত ছিল। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের আঠারো সংখ্যক সূক্তের সপ্তম ও অষ্টম ঋচায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা এই বিষয়ে অত্যন্ত জোরালো ঐতিহাসিক সাক্ষ্য। সেখানে দেখা যায়, মৃত স্বামীর চিতায় শোয়ানো স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, “হে নারী, ওঠো, জীবিতদের পৃথিবীতে ফিরে এসো। যার হাত তুমি ধরেছিলে, সেই পতির জীবন শেষ হয়েছে। এখন তুমি সেই ব্যক্তির গৃহিণী হও, যে তোমার পাণিগ্রহণ করতে প্রস্তুত” (Jamison & Brereton, 2014)।

এই আহ্বান থেকে দুটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, চিতার আগুনে নারীর আত্মাহুতি দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না, বরং তাকে জীবনের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ ছিল। দ্বিতীয়ত, এটি ইঙ্গিত করে প্রাচীন নিয়োগ (Niyoga) প্রথার প্রতি। বিধবা নারী যদি সন্তানহীনা হতেন, তবে বংশধারা রক্ষা করার জন্য তাকে মৃত স্বামীর ভাই অর্থাৎ দেবর কিংবা গোত্রের কোনো নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হতো। এই মিলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুত্রসন্তান লাভ করা, যা পরিবারের বংশ রক্ষা করত। দেবর শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থই ছিল দ্বিতীয় বর। বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ সমাজে নিন্দনীয় ছিল না, বরং একটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রয়োজন হিসেবে গৃহীত হতো (Witzel, 1995)।

ঋগ্বেদের সংলাপদলিলগুলোতে লিঙ্গসম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক দিকগুলো অত্যন্ত জটিলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। দশম মণ্ডলের দশ সংখ্যক সূক্তে যম এবং তার যমজ বোন যমীর কথোপকথন প্রাচীন সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনের একটি বড় নিদর্শন। যমী তার ভাই যমকে প্ররোচিত করছেন তাদের মিলনের মাধ্যমে মানবপ্রজন্মের বিস্তার ঘটাতে। কিন্তু যম নৈতিকতা এবং নিয়মের দোহাই দিয়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেন যে বরুণের নির্দেশিত প্রাকৃতিক ও সামাজিক আইন বা ঋত (Ṛta) অনুযায়ী ভাই-বোনের এমন সম্পর্ক নিষিদ্ধ। এই সূক্তটি অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তসম্পর্কের যৌনতা বর্জন করে সমাজ কীভাবে প্রাথমিক নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যৌন বিধিনিষেধ নির্মাণ করছিল, সেই রূপান্তরের চিহ্ন ধারণ করে (Oberlies, 1998)।

আরেকটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হলো পুরূরবা এবং উর্বশীর আখ্যান, যা রয়েছে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের পঁচানব্বই সংখ্যক সূক্তে। উর্বশী ছিলেন একজন অপ্সরা, যিনি রাজা পুরূরবার সঙ্গে কিছু শর্তে সহবাস করেছিলেন। শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় উর্বশী রাজাকে পরিত্যাগ করে চলে যান। বেদনার্ত পুরূরবা যখন উর্বশীর কাছে ফিরে আসার জন্য মিনতি করেন, তখন উর্বশীর উত্তর ছিল অত্যন্ত কঠোর ও নির্লিপ্ত। উর্বশী সেখানে রাজাকে স্পষ্টভাবে জানান যে নারীদের হৃদয়কে সহজে বশ করা যায় না এবং তাদের বন্ধুত্ব বা অনুরাগ স্থায়ী নাও হতে পারে। প্রাচীন একটি সাহিত্যে নারীর এমন আত্মমর্যাদা এবং স্বাধিকারের ঘোষণা পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার সমান্তরালে এক ধরনের স্বাধীন নারীসত্তার অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। সামগ্রিকভাবে দেখলে, ঋগ্বেদের নারী কেবল অন্ধভাবে শোষিত কোনো সত্তা ছিলেন না, আবার সমাজও নিখাদ সমতার স্বর্গে পরিণত হয়নি; বরং তা ছিল পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে নারী ও পুরুষের দরকষাকষির এক জীবন্ত ইতিহাস (Chakravarti, 1993)।

ঋগ্বেদের সৃষ্টি ও বিশ্বতত্ত্ব (Creation and Cosmology in the Ṛgveda): নাসদীয়, পুরুষ ও হিরণ্যগর্ভ

ঋগ্বেদের আদিম সৃষ্টিভাবনা ও কসমোলজিক্যাল প্রেক্ষাপট (Early Vedic Creation Thoughts and Cosmological Context)

মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকায়, তখন তার মনে বিস্ময় জাগে। চারপাশের রোদ, ঝড়, নদী আর অরণ্য তাকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে শেখায়। প্রাচীন বৈদিক কবিদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঋগ্বেদের প্রাচীনতম স্তরগুলোতে সৃষ্টিতত্ত্ব কোনো বাঁধাধরা ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে দেখা দেয় না। বরং সেখানে দেখা যায় প্রকৃতির শক্তির প্রতি মানুষের কৌতূহল এবং ভীতিমিশ্রিত শ্রদ্ধা। সেই সময়ে সৃষ্টিভাবনার প্রাথমিক রূপটি গড়ে উঠেছিল ভৌত জগতের দৃশ্যমান রূপকে পর্যবেক্ষণ করে। বৈদিক চিন্তায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছিল, যাকে বলা হতো ত্রিলোক (Triloka)। এই তিনটি স্তর হলো পৃথিবী, অন্তরীক্ষ অর্থাৎ বায়ুমণ্ডল এবং দ্যুলোক বা আকাশ। এই ত্রিমুখী বিভাজন থেকেই বৈদিক বিশ্বতত্ত্বের প্রথম কাঠামোটি দাঁড়িয়েছিল (Gonda, 1966)।

এই আদি চিন্তায় আকাশ এবং পৃথিবীকে দুটি পৃথক সত্তা কিন্তু পরস্পরের পরিপূরক জোড় হিসেবে কল্পনা করা হতো। ঋগ্বেদে তাদের যৌথভাবে ডাকা হয়েছে দ্যাবাপৃথিবী (Dyāvāpṛthivī) নামে। প্রাচীন কবিরা ভাবতেন, আকাশ হলো পিতা আর পৃথিবী হলো মাতা। তাদের এই মিলনের ফলেই জগতের যাবতীয় জীব ও উদ্ভিদের উৎপত্তি। তবে এই দুই পিতা-মাতা কীভাবে জন্ম নিলেন, তা নিয়েও কবিদের মনে দ্বিধার অন্ত ছিল না। ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের একশত পঁচাশি সংখ্যক সূক্তে স্পষ্ট প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এদের মধ্যে কে আগে জন্মেছিল আর কে পরে? প্রাচীন ঋষি নিজেই স্বীকার করছেন যে এই প্রশ্নের সমাধান করা অসম্ভব। কোনো কোনো সূক্তে আবার ভাবা হয়েছে, এককালে আকাশ ও পৃথিবী একত্রে লেপটে ছিল; পরবর্তীতে কোনো শক্তিশালী দেবতা তাদের ঠেলে আলাদা করে দিয়েছেন (Macdonell, 1897)।

আকাশ ও পৃথিবীকে আলাদা করে ধরে রাখার এই রূপকটি বৈদিক চিন্তায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ইন্দ্র বা বরুণের মতো পরাক্রমশালী দেবতাদের প্রশংসায় বলা হয়েছে, তারা আকাশকে স্তম্ভিত করে রেখেছেন, যেন তা পৃথিবীর ওপর ভেঙে না পড়ে। এখানে মহাজাগতিক স্তম্ভ বা স্কম্ভ (Skambha)-এর ধারণাটি উঁকি দেয়। প্রাচীন মানুষের গৃহনির্মাণের অভিজ্ঞতাই হয়তো মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে এভাবে প্রক্ষেপিত হয়েছিল। মাটির ওপর খুঁটি পুঁতে যেমন ঘরের ছাউনি ধরে রাখা হয়, ঠিক তেমনই দেবতারা আকাশকে শূন্যে ঝুলিয়ে রেখেছেন। এই ধরনের ভাবনায় সৃষ্টির কোনো দার্শনিক ব্যাখ্যা নেই, আছে কেবল আদিম মানুষের প্রযুক্তিগত ও চারপাশের বাস্তব অভিজ্ঞতার ছায়াপাত। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে তারা বলতেন ঋত (Ṛta), যা সূর্যকে আকাশে ধরে রাখে এবং ঋতুগুলোর চক্রাকার আবর্তন নিশ্চিত করে (Bloomfield, 1908)।

কালক্রমে এই সহজ-সরল রূপক বর্ণনাগুলো বৈদিক কবিদের আর সন্তুষ্ট করতে পারছিল না। যাজকীয় সমাজ যত জটিল হচ্ছিল, মানুষের চিন্তাও তত সূক্ষ্ম হতে শুরু করে। বহুদেবতার ভিড়ে জগতের আদি কারণকে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ কিংবা সোম – এদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সূক্তে জগতের স্রষ্টা হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন। কিন্তু একের পর এক দেবতাকে সর্বময় কর্তা বানানোর এই প্রবণতা একপর্যায়ে এক ধরনের দার্শনিক অতৃপ্তি তৈরি করে। এর ফলে ঋগ্বেদের শেষের দিকের স্তরগুলোতে, বিশেষ করে দশম মণ্ডলে এসে সৃষ্টিভাবনা সম্পূর্ণ নতুন মোড় নেয়। দেবতারা কীভাবে জগৎ তৈরি করলেন, সেই আলোচনার বদলে জিজ্ঞাসা শুরু হয় দেবতারা আসার আগে কী ছিল। এই প্রশ্ন থেকেই ঋগ্বেদের গভীরতম সৃষ্টিবিষয়ক সূক্তগুলোর জন্ম হয় (Maurer, 1986)।

নাসদীয় সূক্ত ও অস্তিত্বহীনতার দর্শন (Nāsadīya Sūkta and the Philosophy of Non-Existence)

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের একশত উনত্রিশ সংখ্যক সূক্তটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দলিল। সূক্তটির প্রথম শব্দ নাসৎ (Nāsad) থেকেই এর নাম হয়েছে নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta)। এখানে কোনো পৌরাণিক দেবতার বন্দনা নেই, কোনো যাগযজ্ঞের নিয়ম নেই, এমনকি কোনো নিশ্চিত বিশ্বাসের আশ্বাসও নেই। সূক্তটি শুরুই হয়েছে এক গভীর দার্শনিক ধাঁধা দিয়ে। সৃষ্টির আদিতে সৎ অর্থাৎ অস্তিত্ব ছিল না, আবার অসৎ অর্থাৎ অস্তিত্বহীনতাও ছিল না। বায়ু ছিল না, তার ওপারে যে মহাশূন্য তাও ছিল না। তখন সব কিছু কী দিয়ে ঢাকা ছিল? কার আশ্রয়ে ছিল সব? সেখানে কি অগাধ ও অতল জল ছিল? এই ধরনের ঋণাত্মক ভাষার মধ্য দিয়ে রচয়িতা এমন এক অবস্থার কথা বলতে চেয়েছেন, যা ভাষা বা সংজ্ঞার অতীত (Doniger, 1981)।

এই সূক্তের দ্বিতীয় ঋচায় বলা হয়েছে, তখন মৃত্যু ছিল না, অমৃত্যু বা অমরত্বও ছিল না। দিন এবং রাত্রির কোনো বিভাজনরেখা ছিল না। ছিল কেবল এক নিঃশব্দ শূন্যতা। সেই আদিম তমসাবৃত অবস্থায় সেই পরম একক সত্তা বাতাস ছাড়াই নিজস্ব শক্তিতে শ্বাস নিচ্ছিল। তাকে বলা হয়েছে তদেকম (Tadekam) বা ‘সেই এক’। এই এক কোনো ব্যক্তি-ঈশ্বর নয়, বরং এক অনির্দিষ্ট, নিরাকার আদিম অবস্থা। চারিদিকে কেবল আলোহীন অন্ধকার আর চিহ্নহীন জলরাশি বিরাজ করছিল। তারপর সেই আদি সত্তার মধ্যে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ তাপরূপ শক্তির স্ফুরণ ঘটে, যাকে বলা হয়েছে তপস (Tapas)। এই তপস কোনো ধর্মীয় কৃচ্ছ্রসাধন নয়, বরং সৃষ্টির প্রাথমিক প্রাণশক্তির ঘনীভবন বা উত্তাপ, যার মাধ্যমে শূন্যতার বুক চিরে প্রথম রূপান্তরের সূচনা হয় (Deussen, 1906)।

এরপর সূক্তের কবি সৃষ্টির মনস্তাত্ত্বিক স্তরে প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, সেই আদিম সত্তার ভেতর প্রথম জেগে উঠেছিল কাম (Kāma) বা ইচ্ছা। এই কাম হলো মনের আদিমতম বীজ। বৈদিক কবিরা অন্তরের প্রজ্ঞা দিয়ে অনুসন্ধান করে অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের মধ্যকার সেতুবন্ধন আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। শূন্য থেকে এই যে সৃষ্টি হলো, এর আড়ালে কোনো পূর্বপরিকল্পিত নকশা ছিল কি না, তা নিয়ে কবি নিশ্চিত নন। এক অদ্ভুত তির্যক রশ্মি যেন সেই আদিম অন্ধকারকে বিদীর্ণ করেছিল। কিন্তু সেই আলো কোথা থেকে এলো, কে উপরে ছিল আর কে নিচে ছিল, তা কেউ জানে না। সৃষ্টি কেবল কোনো বাহ্যিক কারিগরের তৈরি বস্তু নয়, এটা যেন এক অন্ধকার জলরাশির ভেতর থেকে আত্মপ্রকাশের আকুল চেষ্টা (Dasgupta, 1922)।

নাসদীয় সূক্তের সবচেয়ে বৈপ্লবিক অংশটি হলো এর শেষ দুটি শ্লোক। সেখানে প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার সংশয়বাদী রূপটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কবি জিজ্ঞাসা করছেন, “কো অদ্ধা বেদ ক ইহ প্র বোচৎ” বা কে নিশ্চিতভাবে এটা জানে আর কেই-বা তা বর্ণনা করতে পারে? কোথা থেকে এই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির জন্ম হলো? দেবতারা তো সৃষ্টির পর এসেছেন, তাহলে দেবতারাও বা কেমন করে জানবেন এর উৎস? সূক্তটির শেষ বাক্যটি আরও এক ধাপ এগিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করে। বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ আকাশে বসে যিনি এই বিশ্বসংসারকে তদারকি করছেন, হয়তো তিনি জানেন এর রহস্য, আবার হয়তো তিনিও তা জানেন না। কোনো প্রাচীন ধর্মীয় ধর্মগ্রন্থে স্রষ্টার সর্বজ্ঞাতাকে এভাবে খোলামেলা চ্যালেঞ্জ জানানোর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। এটি প্রমাণ করে যে বৈদিক যুগেও চিন্তার একটি ধারা ছিল যা অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে প্রশ্ন ও সংশয়কে গুরুত্ব দিত (Chattopadhyaya, 1959)।

পুরুষ সূক্ত: মহাজাগতিক নরবলি ও সামাজিক বিন্যাস (Puruṣa Sūkta: Cosmic Sacrifice and Social Stratification)

নাসদীয় সূক্তের সংশয়বাদী ও বিমূর্ত রূপের ঠিক বিপরীতে অবস্থান করছে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের নব্বই সংখ্যক সূক্তটি, যা পুরুষ সূক্ত (Puruṣa Sūkta) নামে সমধিক পরিচিত। এই সূক্তে সৃষ্টিকে একটি মহাজাগতিক যজ্ঞ বা নরবলির রূপকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে আদি সত্তাকে কোনো বিমূর্ত শক্তি হিসেবে না দেখে দেখা হয়েছে এক অতিকায় আদিম মানব বা পুরুষ (Puruṣa) হিসেবে। তার সহস্র মস্তক, সহস্র চোখ এবং সহস্র চরণ। তিনি সমগ্র বিশ্বজগৎকে সবদিক থেকে আবৃত করে দশ আঙুল পরিমাণ জায়গা ছাড়িয়ে অবস্থান করছেন। যা কিছু অতীতে ছিল এবং যা কিছু ভবিষ্যতে আসবে, সবই সেই পুরুষের রূপ। তিনি অমৃতত্বেরও অধিপতি (Brown, 1965)।

এই পুরুষ কিন্তু সম্পূর্ণভাবে জাগতিক নন। সূক্তে বলা হয়েছে, তার মাত্র এক-চতুর্থাংশ দিয়ে এই মর্ত্যলোক ও সমগ্র সৃষ্টি গঠিত হয়েছে, আর বাকি তিন-চতুর্থাংশ রয়েছে দ্যুলোকের অমৃতলোকে। সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয় যখন দেবতারা সেই পুরুষকে যজ্ঞের বলি বা হবি হিসেবে উৎসর্গ করেন। এই যজ্ঞের বিবরণ অত্যন্ত রূপকধর্মী। যজ্ঞে বসন্ত ঋতু ছিল ঘৃত বা মাখন, গ্রীষ্ম ছিল সমিধ বা জ্বালানি কাঠ, আর শরৎ ঋতু ছিল অর্ঘ্য। এই মহাজাগতিক আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে পুরুষের শরীর ছিন্নভিন্ন করা হয় এবং তার বিভিন্ন দেহাংশ থেকে জগতের দৃশ্যমান সব কিছুর জন্ম হয়। তার মন থেকে চাঁদের জন্ম হয়, চোখ থেকে সূর্যের জন্ম হয়, মুখ থেকে ইন্দ্র ও অগ্নির উৎপত্তি ঘটে এবং তার প্রাণবায়ু থেকে বায়ুদেবতার সৃষ্টি হয় (Oldenberg, 1988)।

পুরুষ সূক্ত কেবল মহাজাগতিক সৃষ্টির বিবরণ দিয়েই থেমে থাকেনি, এটা বৈদিক সমাজকাঠামোকে ধর্মের আবরণে স্থায়ী রূপ দেওয়ার কাজও করেছে। এই সূক্তের দ্বাদশ ঋচাতেই ভারতীয় সাহিত্যে প্রথমবারের মতো চারটি সামাজিক স্তরের বা বর্ণের সুস্পষ্ট উল্লেখ মেলে। সেখানে বলা হয়েছে, পুরুষের মুখ থেকে জন্ম নিয়েছে ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa), তার বাহুদ্বয় থেকে সৃষ্টি হয়েছে রাজন্য (Rājanya) বা ক্ষত্রিয়, তার ঊরুযুগল থেকে উৎপন্ন হয়েছে বৈশ্য (Vaiśya) এবং তার চরণযুগল থেকে এসেছে শূদ্র (Śūdra)। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই রূপকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জ্ঞান ও মন্ত্রোচ্চারণের অঙ্গ মুখ হওয়ায় পুরোহিতদের স্থান দেওয়া হলো শীর্ষে, শক্তি ও যুদ্ধের অঙ্গ বাহু হওয়ায় শাসকদের রাখা হলো দ্বিতীয় স্থানে, পুষ্টি ও শ্রমের ভিত্তি হিসেবে ঊরু থেকে এলো উৎপাদক শ্রেণি এবং সেবা ও অধস্তনতার প্রতীক হিসেবে পা থেকে তৈরি করা হলো শ্রমজীবী শূদ্রকে (Chakravarti, 1993)।

ঐতিহাসিকরা লক্ষ্য করেছেন যে এই সূক্তটি ঋগ্বেদের মূল ধারার অন্যান্য সূক্তের চেয়ে ভাষায় এবং সামাজিক বিন্যাসে অনেকটাই পরবর্তী কালের। যাযাবর ও পশুপালনকারী সমতাভিত্তিক উপজাতীয় সমাজ যখন ধীরে ধীরে একটি জটিল, শ্রমবিভাজিত ও শ্রেণিবিন্যস্ত কৃষিভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই এই ধরনের একটি মহাজাগতিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সামাজিক বৈষম্য এবং শ্রমশোষণকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সৃষ্টির এই রূপকটি ব্যবহার করা হয়েছিল। পুরুষ সূক্ত এইভাবে যজ্ঞকেন্দ্রিক পুরোহিততন্ত্রের রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো হিসেবে কাজ করেছিল, যা মানবসমাজ এবং মহাবিশ্বকে একটি একক শৃঙ্খলার অধীন বলে দাবি করত (Pande, 1972)।

হিরণ্যগর্ভ সূক্ত ও স্বর্ণডিম্বতত্ত্ব (Hiraṇyagarbha Sūkta and the Golden Embryo Concept)

দশম মণ্ডলের একশত একুশ সংখ্যক সূক্তটিতে সৃষ্টিতত্ত্বের আরেকটি অনন্য প্রতিরূপ পাওয়া যায়, যার নাম হিরণ্যগর্ভ সূক্ত (Hiraṇyagarbha Sūkta)। হিরণ্য শব্দের অর্থ সোনা বা দীপ্তিময় ধাতু এবং গর্ভ শব্দের অর্থ ভ্রূণ বা ডিম্ব। অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ মানে হলো এক জ্যোতির্ময় আদিম বীজ বা স্বর্ণডিম্ব। এই সূক্ত অনুসারে, সৃষ্টির আদিতে চারদিকে কেবল অন্ধকার আর অগাধ জলরাশি ব্যাপ্ত ছিল। সেই আদিম জলের ভেতর মহাজাগতিক উত্তাপের স্পর্শে একটি সোনালী ভ্রূণের উদয় ঘটে। তিনি জন্ম নিয়েই সমগ্র চরাচরের একমাত্র অধিপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি আকাশকে স্থির করলেন এবং মাটিকে দৃঢ় করলেন (Macdonell, 1897)।

হিরণ্যগর্ভের এই রূপকটি মূলত জীবনের জৈবিক উৎপত্তির ধারণার একটি মহাজাগতিক সম্প্রসারণ। পাখি বা সরীসৃপ যেমন ডিম্ব থেকে জন্ম নেয় এবং সেই ডিমের ভেতরই সমস্ত প্রাণের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, প্রাচীন ঋষি মহাবিশ্বকেও সেই দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। জল ছিল মাতৃত্বের প্রতীক এবং সেই জলের গর্ভে তেজ বা অগ্নির প্রবেশে ভ্রূণের স্ফুরণ ঘটেছিল। এই রূপকে জল ও অগ্নির যে দ্বন্দ্ব ও মিলন রয়েছে, তা বৈদিক পশুপালক ও কৃষকদের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জল ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব অসম্ভব, আবার তাপ বা সূর্য ছাড়া জীবনের বিকাশ ঘটতে পারে না। এই দুই উপাদানের সংশ্লেষেই হিরণ্যগর্ভের মহিমা কল্পনা করা হয়েছিল (Deussen, 1906)।

এই সূক্তটির গঠনশৈলী অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর মোট দশটি ঋচার প্রথম নয়টিরই শেষ চরণে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে – “কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম”। এর সহজ অর্থ হলো, আমরা কোন দেবতার উদ্দেশ্যে আমাদের এই হবি বা যজ্ঞের নৈবেদ্য উৎসর্গ করব? এই পুনরাবৃত্তি কবিদের ভেতরের এক গভীর অনুসন্ধিৎসাকে ফুটিয়ে তোলে। প্রচলিত বহু দেব-দেবীর ভিড়ে এমন কোনো একজন একক সত্তা আছেন কি, যিনি এই মহাবিশ্বের আদি উৎস হতে পারেন? যাকে স্তুতি করা হচ্ছে, তিনি বরফাবৃত পাহাড়গুলোকে ধারণ করেন, সমুদ্র যার দুই বাহু, সমস্ত শক্তি যার নির্দেশে চলে – তিনি আসলে কে? এই প্রশ্নটি প্রাচীন বৈদিক বহুদেবতাবাদের সীমানা ভেঙে একটি একক আদিম শক্তির সন্ধানের তীব্র ব্যাকুলতাকে প্রকাশ করে (Maurer, 1986)।

সূক্তের দশম ও চূড়ান্ত ঋচায় এসে এই প্রশ্নের আপাত সমাধান দেওয়া হয়। সেখানে সম্বোধন করা হয় প্রজাপতি (Prajāpati) নামক দেবতাকে। বলা হয়, হে প্রজাপতি, আপনি ছাড়া অন্য কেউ এই সমস্ত সৃষ্টিকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে পারে না। যে কামনায় আমরা আপনার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করছি, তা পূর্ণ হোক। তবে আধুনিক প্রাচ্যবিদদের অনেকেই মনে করেন, এই দশম শ্লোকটি মূল সূক্তের অনেক পরে প্রক্ষিপ্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। মূল রচয়িতা হয়তো একটি খোলামেলা প্রশ্নের আবহ তৈরি করতেই পছন্দ করেছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ‘কস্মৈ’ শব্দটিকেও একটি দেবতার রূপ ধরে নিয়ে পরবর্তীতে ‘ক’ নামক এক অদ্ভুত দেবতার কল্পনা করা হয়েছিল। যাই হোক না কেন, হিরণ্যগর্ভ সূক্ত বহুদেবতাবাদের কোলাহল থেকে ভারতীয় চিন্তাকে অদ্বৈত বা একত্ববাদী দর্শনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে (Doniger, 1981)।

বিশ্বকর্মা সূক্ত ও অন্যান্য সৃষ্টিতত্ত্বীয় রূপক (Viśvakarman Sūktas and Alternative Cosmogonic Metaphors)

ঋগ্বেদের সৃষ্টিবিষয়ক ধারণার বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়। দশম মণ্ডলের একাশি এবং বিরাশি সংখ্যক সূক্তে স্রষ্টাকে কল্পনা করা হয়েছে একজন দক্ষ কারিগর বা স্থপতিরূপে। এই দেবতার নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্বকর্মা (Viśvakarman), যার শাব্দিক অর্থ সমস্ত কর্মের সম্পাদনকারী বা নিখিল কারিগর। এখানে কোনো জৈবিক ভ্রূণ বা কোনো নরবলির দৃশ্য নেই, বরং আছে একজন ভাস্করের পরিশ্রম। তিনি পরম দ্রষ্টা, তিনি চোখ, মুখ, বাহু ও চরণের দ্বারা সমস্ত কিছু তৈরি করছেন। তিনি যখন পৃথিবী ও আকাশ নির্মাণ করেন, তখন তিনি ডানা ঝাপটানোর মতো করে তার হাত-পা চালান (Gonda, 1966)।

বিশ্বকর্মা সূক্তে এমন কিছু সরল কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে যা মানুষের ব্যবহারিক বুদ্ধির পরিচায়ক। একাশি সংখ্যক সূক্তের চতুর্থ ঋচায় ঋষি প্রশ্ন করছেন, সেই বনটি কী ছিল, আর সেই বৃক্ষটিই বা কী ছিল, যা কেটে দেবতারা এই আকাশ ও পৃথিবীকে নির্মাণ করেছিলেন? হে প্রজ্ঞাবান মানুষেরা, তোমরা মনের ভেতর অনুসন্ধান করে বলো, বিশ্বকর্মা কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এই ভুবনকে রূপ দিয়েছিলেন? অর্থাৎ একজন ছুতোর যেমন কাঠ কেটে আসবাব তৈরি করে, বিশ্বকর্মাও কি তেমনই কোনো উপাদান দিয়ে বিশ্ব নির্মাণ করেছেন? তাহলে সেই উপাদানটি কোথায় ছিল এবং বিশ্বকর্মা স্বয়ং কোথায় দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন? এই প্রশ্নগুলো দেখায় যে বৈদিক চিন্তাবিদরা শূন্য থেকে সৃষ্টি বা অস্তিত্বের উপাদানগত কারণ নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করছিলেন (Bloomfield, 1908)।

এর পাশাপাশি ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের একশত নব্বই সংখ্যক সূক্তে সৃষ্টিতত্ত্বের একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও বিমূর্ত রূপ পাওয়া যায়। একে বলা হয় অঘমর্ষণ সূক্ত। এখানে কোনো ব্যক্তিগত স্রষ্টার উল্লেখ নেই। সৃষ্টি এখানে শুরু হয় আলোড়িত অভ্যন্তরীণ উত্তাপ বা তপস (Tapas) থেকে। সেই আদিম তাপ থেকেই প্রথম জন্ম নিল সত্য এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলা বা ঋত। তার থেকে জন্ম নিল অন্ধকার রাত্রি, তারপর উত্থিত হলো তরঙ্গায়িত মহাসমুদ্র। সেই সমুদ্রের ভেতর থেকে কাল বা সময়ের চক্রের উৎপত্তি হলো, যা দিন ও রাত্রিকে আলাদা করল। এরপর ধাতা অর্থাৎ বিধানকর্তা পূর্বের কল্পের মতো করে সূর্য, চন্দ্র, স্বর্গ, পৃথিবী ও অন্তরীক্ষকে ক্রমানুসারে বিন্যস্ত করলেন। এখানে সৃষ্টি কোনো এক মুহূর্তের অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং তা প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে ঘটা এক সুনির্দিষ্ট বিবর্তন প্রক্রিয়া (Dasgupta, 1922)।

আরেকটি মজার রূপক দেখা যায় বৃহস্পতি বা ব্রহ্মণস্পতির সঙ্গে সম্পর্কিত সূক্তে (১০.৭২)। সেখানে বলা হয়েছে, দেবতাদের পূর্ববর্তী যুগে অসৎ থেকে সতের জন্ম হয়েছিল। সৃষ্টিকে তুলনা করা হয়েছে কর্মকারের কাজের সঙ্গে। একজন কামার যেমন হাপরে বাতাস দিয়ে আগুন জ্বালায় এবং লোহাকে পিটিয়ে বিভিন্ন রূপ দেয়, তেমনভাবেই ব্রহ্মণস্পতি জগৎকে গড়ে তুলেছিলেন। একই সূক্তে অদিতি (Aditi) ও দক্ষ (Dakṣa)-এর একটি পারস্পরিক জন্মের ধাঁধা উপস্থাপন করা হয়েছে – অদিতি থেকে দক্ষ জন্মেছেন, আবার দক্ষ থেকেও অদিতির জন্ম হয়েছে। এই ধরনের স্ববিরোধী বা বৃত্তাকার যুক্তি নির্দেশ করে যে প্রাচীন কবিরা সৃষ্টির আদি অন্তকে কোনো সরল রৈখিক ধারায় ফেলতে পারছিলেন না। তাদের কাছে সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি ছিল বহুমাত্রিক, যা কখনো কামারের হাপর, কখনো ছুতোরের বাটালি, আবার কখনো নারীর গর্ভধারণের সঙ্গে তুলনীয় ছিল (Brown, 1965)।

ঋগ্বেদীয় বিশ্বতত্ত্বের বস্তুবাদী ও তুলনামূলক পর্যালোচনা (Materialist and Comparative Appraisal of Rigvedic Cosmology)

ঋগ্বেদের সৃষ্টিতত্ত্বকে যখন প্রাচীন পৃথিবীর অন্যান্য সমসাময়িক সভ্যতার কসমোলজির সঙ্গে পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন এর সার্বজনীন রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলনীয় সৃষ্টিতত্ত্বের মহাকাব্য এনুমা এলিশ (Enūma Eliš)-এ দেখা যায়, সৃষ্টির আদিতে ছিল মিষ্টি জলের দেবতা আপসু এবং লোনা জলের দেবী তিয়ামাত। পরে তিয়ামাতের শরীরকে দ্বিখণ্ডিত করে আকাশ ও পৃথিবী বানানো হয়। এই ধারণার সঙ্গে ঋগ্বেদের আদিম অতল জলরাশি এবং পুরুষ সূক্তে পুরুষের দেহাংশ কেটে মহাবিশ্ব নির্মাণের আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে। প্রাচীন নর্স পুরাণেও দৈত্য ইমিরের (Ymir) শরীর কেটে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরির যে উপকথা পাওয়া যায়, তা পুরুষ সূক্তের মতো ইন্দো-ইউরোপীয় অভিন্ন উত্তরাধিকার বহন করে (Doniger, 1981)।

তবে ঋগ্বেদের সৃষ্টিতত্ত্বের সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য হলো এর মুক্ত ও অনুসন্ধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। অধিকাংশ প্রাচীন পৌরাণিক গাথায় সৃষ্টিকে কোনো ঈশ্বর বা দেবতার একক ইচ্ছা হিসেবে অকাট্য সত্য বলে প্রচার করা হয়েছে। ব্যাবিলন বা হিব্রু পুরাণে ঈশ্বরের বাক্যেই সব সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু ঋগ্বেদের কবিরা কোনো একক উত্তর চাপিয়ে দেননি। নাসদীয় সূক্তের মতো রচনায় স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়েও যে দ্বিধাহীন সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার এই নিরপেক্ষতা বস্তুবাদী এবং যুক্তিবাদী চিন্তার অঙ্কুরোদগমকে ত্বরান্বিত করেছিল। দেবতারা মহাবিশ্বের আদি কারণ নন, বরং প্রকৃতির নিয়মেরই অধীন – এই উপলব্ধি পরবর্তীতে উপনিষদের দার্শনিক অনুসন্ধান এবং সাংখ্য দর্শনের মতো প্রকৃতিবাদী দর্শনের পথ খুলে দিয়েছিল (Chattopadhyaya, 1959)।

বস্তুবাদী দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এই সৃষ্টিতত্ত্বগুলো ছিল তৎকালীন যাযাবর ও পরিবর্তনশীল কৃষি সমাজের উৎপাদন পদ্ধতিরই মননশীল প্রতিবিম্ব। মানুষ যখন প্রকৃতির অন্ধ শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল, তখন সে ভেবেছিল দেবতারা আকাশ ঠেলে তুলেছেন। যখন সমাজে পশু ও মানুষের শ্রমের ওপর ভিত্তি করে সম্পদ তৈরি হতে লাগল, তখন এলো মহাজাগতিক বলিদানের গল্প। আবার হস্তশিল্প ও কৃষিকাজের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ছুতোর বা কামারের শ্রম মহাবিশ্ব সৃষ্টির রূপক হিসেবে উঠে এলো। কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্যের বদলে মানুষের বেঁচে থাকার বৈষয়িক লড়াই এবং চারপাশের বস্তুজগতের প্রতিক্রিয়াই এই সূক্তগুলোর ভেতরে ভাষা পেয়েছিল (Pande, 1972)।

সব মিলিয়ে, ঋগ্বেদের সৃষ্টি ও বিশ্বতত্ত্ব কোনো একক ধর্মীয় বিশ্বাসের নিরেট কাঠামো নয়, বরং তা মানুষের আদিম জিজ্ঞাসার এক জীবন্ত নাট্যশালা। এখানে চরম ভক্তি যেমন আছে, তেমনই আছে তীক্ষ্ণ দার্শনিক সংশয়। এখানে যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে অস্তিত্বহীনতার রহস্যময় অন্ধকার। মহাবিশ্বের সূচনা কীভাবে হলো, এর কোনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক উত্তর সেই যুগের কবিদের জানা ছিল না এবং তারা ভানও করেননি যে তারা সব জানেন। এই না-জানার অকপট স্বীকারোক্তিই ঋগ্বেদীয় বিশ্বতত্ত্বকে এক চিরন্তন মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। প্রাচীন মানুষ অন্ধ আনুগত্যের দাস না হয়ে সত্যের সন্ধানে যে গভীর সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল, এই স্তোত্রগুলো তারই এক অমূল্য ঐতিহাসিক স্মারক (Oldenberg, 1988)।

ঋগ্বেদের মৃত্যু ও পরজীবন (Death and Afterlife in the Ṛgveda): যম, পিতৃ, অন্ত্যেষ্টি ও অমরত্ব

বৈদিক ভাবনায় মৃত্যুর ধারণা ও জাগতিক জীবনের মূল্য (Concept of Death and Value of Earthly Life in Vedic Thought)

মানুষের মনে মৃত্যুর চিন্তা কীভাবে দেখা দিয়েছিল, তা বুঝতে প্রাচীন বৈদিক স্তোত্রগুলোর চেয়ে ভালো উপাদান আর কিছু হতে পারে না। ঋগ্বেদের কবিরা ছিলেন মাটির পৃথিবীর মানুষ। তারা জীবনকে ভালোবেসেছিলেন, আলো ও বাতাসের স্পর্শকে উপভোগ করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী ভারতীয় দর্শনে যেমন সংসারকে দুঃখের আধার বা মায়ার বাঁধন হিসেবে দেখে তা থেকে মুক্তির আকুলতা তৈরি হয়েছিল, ঋগ্বেদের ভাবনায় কিন্তু তেমন কোনো বৈরাগ্য ছিল না। এখানে জীবনকে বর্জন করার কোনো তাগিদ নেই, বরং জীবনকে শতবর্ষ ধরে ভোগ করার প্রবল তৃষ্ণা প্রকাশ পেয়েছে। ঋগ্বেদের একটি পরিচিত প্রার্থনা হলো “শতং জীবেম শরদঃ” বা আমরা যেন একশত শরৎকাল বেঁচে থাকি। মৃত্যুর আলোচনা এসেছে জীবনের এই তীব্র আসক্তির সমান্তরালেই, এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা হিসেবে (Renou, 1953)।

বৈদিক চিন্তায় মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক জৈবিক সমাপ্তি ছিল না, বরং একে দেখা হতো এক ধরনের বিপর্যয় হিসেবে। অকালমৃত্যুকে প্রাচীন আর্যরা সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন। রোগব্যাধি, সাপের কামড়, খরা, শত্রুর আক্রমণ কিংবা নেকড়ের ভয় – এই সব কিছুর পেছনে তারা কোনো না কোনো ক্ষতিকর শক্তির হাত দেখতে পেতেন। মৃত্যুকে নির্দেশ করতে গিয়ে মৃত্যু (Mṛtyu) শব্দটির ব্যবহার শুরু থেকেই ছিল, তবে তা কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ভয়াল দেবতার রূপ নিয়ে বসেনি। মৃত্যু হলো এমন এক অবস্থা যা মানুষকে আলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্ধকারে নিক্ষেপ করে। এই কারণে ঋগ্বেদের বহু সূক্তে বারবার প্রার্থনা করা হয়েছে যেন যম বা মৃত্যুর দূতরা আয়ু শেষ হওয়ার আগেই মানুষকে তুলে নিয়ে না যায় (Winternitz, 1927)।

জীবনের ভিত্তি হিসেবে দুটি ধারণার উল্লেখ ঋগ্বেদে পাওয়া যায়, একটি হলো অসু (Asu) এবং অন্যটি মনস (Manas)। ‘অসু’ হলো শারীরিক প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তি, যা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। যতদিন দেহে অসু থাকে, ততদিন মানুষ কর্মক্ষম ও সচল থাকে। অন্যদিকে ‘মনস’ হলো চিন্তা, চেতনা ও স্মৃতির আধার। মৃত্যুর সময় মানুষের দেহ থেকে এই মনস বা চেতনা ছিটকে বেরিয়ে যায় বলে কল্পনা করা হতো। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের আটান্ন সংখ্যক সূক্তে এক মৃতপ্রায় মানুষের মনকে ফিরে আসার জন্য এক করুণ ও গভীর আহ্বান জানানো হয়েছে। তার মন যদি যমের রাজ্যে চলে গিয়ে থাকে, পাহাড়ে কিংবা সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়, তবে তাকে আবার জীবিত শরীরে ফিরে আসার অনুরোধ করা হচ্ছে। এই আর্তি জাগতিক অস্তিত্বের প্রতি তাদের অবিচল আকর্ষণের কথাই তুলে ধরে (Keith, 1925)।

প্রাচীন ঋগ্বেদীয় মানুষ দীর্ঘায়ুকে ধর্মের প্রধান পুরস্কার হিসেবে গণ্য করত। পুত্র-পৌত্র পরিবেষ্টিত হয়ে, গোশালা ভরা গরু আর শস্যাগার পূর্ণ অন্ন নিয়ে একটি পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করার পর বার্ধক্যে উপনীত হওয়া ছিল তাদের কাম্য। মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য তারা অগ্নির কাছে স্তুতি করত, জলদেবতাদের কাছে আরোগ্য প্রার্থনা করত। শারীরিক মৃত্যুর চেয়ে বড় কোনো ক্ষতি তাদের কাছে ছিল না। এ কারণে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তারা আশীর্বাদ হিসেবে দেখত। মৃত্যু যখন এসে পড়ত, তখন তাকে অস্বীকার করার উপায় থাকত না বটে, কিন্তু সেই প্রস্থানকে মেনে নেওয়ার মধ্যেও এক ধরনের বিষাদ আর প্রতিরোধের সুর সবসময় অনুরণিত হতো (Bhattacharji, 1970)।

যম: প্রথম মরণশীল মানব ও পরলোকের অধিপতি (Yama: The First Mortal and Lord of the Netherworld)

ঋগ্বেদের মৃত্যুর দেবতা হলেন যম (Yama)। তবে পরবর্তী পৌরাণিক সাহিত্যে যমের যে ভয়াল, দণ্ডধারী এবং মহিষবাহন রূপ দেখতে পাওয়া যায়, ঋগ্বেদের যম কিন্তু মোটেই সেরকম নন। এখানে যম কোনো নিষ্ঠুর বিচারক বা পাপীদের শাস্তিদানকারী জল্লাদ নন। বরং তিনি হলেন প্রথম মরণশীল মানুষ, যিনি মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন এবং পরলোকের পথ আবিষ্কার করেছিলেন। সূক্তে বলা হয়েছে, যম বিবস্বানের পুত্র। তিনি দুর্গম পথ অতিক্রম করে এমন এক রাজ্যে পৌঁছেছিলেন, যা মানবজাতির জন্য অজানা ছিল। তিনি অন্যান্য মানুষদের জন্য সেই অজানা পরলোকের পথটি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, যাতে মৃত্যুর পর সবাই সেখানে নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে পারে (Keith, 1925)।

দশম মণ্ডলের চতুর্দশ সূক্তে যমের মহিমা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে যমকে বলা হয়েছে মানুষের সমাবেশকারী বা সংগমন (Saṃgamana)। তিনি পিতৃপুরুষদের রাজা এবং পরলোকের দয়ালু অধিপতি। মৃত মানুষ যখন দেহত্যাগ করে, তখন সে যমের পথ ধরেই যাত্রা করে। যম সেই পরলোকে একটি সুশীতল ও ছায়াদার স্থান প্রস্তুত করে রেখেছেন। সেখানে একটি মনোরম বৃক্ষ রয়েছে, যার নিচে বসে যম দেবতাদের সঙ্গে সুরা ও সোমরস পান করেন এবং গান শোনেন। মৃত ব্যক্তি সেই বৃক্ষের ছায়ায় গিয়ে পৌঁছায় এবং তার পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মিলিত হয়। মৃত্যুর এই চিত্র কোনো ভীতির উদ্রেক করে না, বরং ফেলে আসা পৃথিবীর কষ্টের পর এক পরম বিশ্রামের আশ্রয় হিসেবে ধরা দেয় (Macdonell, 1897)।

যমের সঙ্গে দুটি চতুরক্ষ অর্থাৎ চার চোখবিশিষ্ট কুকুরের সংযোগ বৈদিক পুরাণের এক আকর্ষণীয় দিক। এই কুকুর দুটিকে বলা হয় শ্যাম (Śyāma) এবং শবল (Śabala)। এরা দেবশুনী সরমার বংশধর বা সারমেয়। এরা পরলোকের পথের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে এবং ঘুরে ঘুরে মরণশীল মানুষদের লক্ষ্য করে। অন্ত্যেষ্টির মন্ত্রে মৃতের উদ্দেশে প্রার্থনা করা হয়, সে যেন যমের এই চার চোখওয়ালা, পথরক্ষক কুকুর দুটিকে শান্তভাবে অতিক্রম করে দ্রুত পিতৃপুরুষদের রাজ্যে পৌঁছে যেতে পারে। কুকুর দুটিকে অনেক সময় অমঙ্গলজনক হিসেবে দেখা হলেও তাদের দায়িত্ব ছিল মৃত আত্মাকে সুরক্ষা দিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। প্রাচীন পারসিক জরাথুষ্ট্রীয় ধর্মেও মৃত্যুর পর চার চোখবিশিষ্ট কুকুরের উপস্থিতির যে বিশ্বাস রয়েছে, তার সাথে এই ধারণার ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক যোগাযোগ স্পষ্ট (Winternitz, 1927)।

যম এবং তার যমজ বোন যমীর মধ্যকার কথোপকথন ঋগ্বেদের অন্যতম জটিল দার্শনিক সূক্ত। সেখানে যমী যমকে প্ররোচিত করেছিল বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মিলিত হতে। কিন্তু যম সেই প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নৈতিক বিধানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে। যম নিয়ম ও শৃঙ্খলার প্রতীক। তিনি অন্ধ আবেগকে প্রশ্রয় দেননি, বরং মানুষের জন্য এক সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করেছেন। প্রথম মানুষ হিসেবে মৃত্যুবরণ করে তিনি মৃত্যুকে মানবজীবনের এক নিয়মতান্ত্রিক পরিণতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। ফলে ঋগ্বেদের যম ত্রাস সৃষ্টিকারী কোনো প্রেত নন, বরং তিনি পথপ্রদর্শক, যিনি মৃত্যুর অন্ধকার সুড়ঙ্গের ওপারে এক আলোকময় জগতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন (Bhattacharji, 1970)।

পিতৃলোক ও পূর্বপুরুষপূজা (Pitṛloka and Ancestor Worship)

মৃত ব্যক্তিরা মৃত্যুর পর কোথায় যায়, এই প্রশ্নের উত্তরে বৈদিক চিন্তায় যে জগতের ধারণা তৈরি হয়েছিল, তার নাম পিতৃলোক (Pitṛloka) বা পূর্বপুরুষদের জগৎ। ঋগ্বেদে দেবতাদের যেমন স্তুতি করা হয়েছে, প্রায় সমমর্যাদায় স্তুতি করা হয়েছে পিতৃপুরুষদের অর্থাৎ পিতৃগণ (Pitaraḥ)-এর। পিতৃগণ কোনো বিমূর্ত আত্মা নন, তারা হলেন পরিবারের এবং বংশের চিরন্তন অভিভাবক। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের পঞ্চদশ সূক্তটি সম্পূর্ণভাবে এই পিতৃপুরুষদের স্মরণে রচিত হয়েছে। সেখানে তাদের তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে – নিম্নবর্তী, মধ্যবর্তী এবং উচ্চবর্তী পিতৃপুরুষ, অর্থাৎ যারা অতি প্রাচীনকালে দেহ রেখেছেন এবং যারা সম্প্রতি পরলোকগমন করেছেন (Caland, 1896)।

পূর্বপুরুষপূজা বৈদিক পরিবারের ধারাবাহিকতার অন্যতম রক্ষাকবচ ছিল। ঋগ্বেদের ঋষিরা বিশ্বাস করতেন, পিতা-পিতামহরা মৃত্যুর পর অন্য লোকে চলে গেলেও তাদের বংশধরদের তারা ভুলে যান না। তারা বাতাস হয়ে, আলো হয়ে বংশের ওপর নজর রাখেন। যখন কোনো পরিবারে যজ্ঞ হতো, তখন দেবতাদের পাশাপাশি পিতৃপুরুষদেরও আহ্বান জানানো হতো। কুশঘাস বা বর্হিস (Barhis) বিছিয়ে তাদের জন্য বিশেষ আসন প্রস্তুত করা হতো। তাদের উদ্দেশে অর্পণ করা হতো সোমরস এবং বিশেষ খাদ্য, যাকে বলা হতো স্বধা (Svadhā)। দেবতারা গ্রহণ করতেন স্বাহা, আর পিতৃপুরুষরা গ্রহণ করতেন স্বধা। এই দুই আহুতির পার্থক্য থেকেই বোঝা যায় পূর্বপুরুষদের সঙ্গে জীবিতদের সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি ঘরোয়া ও অন্তরঙ্গ (Keith, 1925)।

পিতৃপুরুষদের কাছে জীবিত বংশধররা যে প্রার্থনাগুলো করতেন, তার বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তারা চাইতেন পিতৃপুরুষরা যেন তাদের রোগব্যাধি দূর করেন, গোশালায় গরু বৃদ্ধি করেন এবং তাদের বংশে যেন কোনো বীর সন্তানের অভাব না হয়। এর বিনিময়ে বংশধররা প্রতিজ্ঞা করত তারা নিয়মিত তর্পণ ও শ্রদ্ধার অনুষ্ঠান বজায় রাখবে। পূর্বপুরুষদের ক্রুদ্ধ হওয়ার ভয়ও ছিল। কোনো ভুলত্রুটি হলে বা তাদের যথাযথ সম্মান না দেখালে বংশের অমঙ্গল হতে পারে, এই আশঙ্কা বৈদিক মানুষের মনে ছিল। কিন্তু মোটের ওপর পিতৃপুরুষদের দেখা হতো করুণাময় ও কল্যাণকামী শক্তি হিসেবে, যারা যমের সঙ্গে সুখে বসবাস করেন এবং মাটির পৃথিবীর প্রিয়জনদের জন্য আশীর্বাদ বর্ষণ করেন (Smith, 1989)।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে পিতৃপূজা ছিল প্রাচীন পশুপালনকারী ও কৃষিভিত্তিক সমাজের গোত্রীয় সংহতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। মৃতরা বিস্মৃত হয়ে হারিয়ে যায় না, বরং তারা কুলের ইতিহাসে এক অদৃশ্য অথচ সক্রিয় অংশীদার হিসেবে থেকে যায়। এই বিশ্বাস একদিকে যেমন পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের কর্তৃত্বকে স্থায়ী করেছিল, তেমনই বংশের পবিত্রতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছিল। পিতৃলোকের এই কল্পনা জীবিত মানুষকে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা জোগাত। নিজের অনিবার্য মৃত্যুর কথা ভেবে মানুষ আতঙ্কিত হতো না, কারণ সে মনে করত মৃত্যুর পর সে একাকী শূন্যে মিলিয়ে যাবে না, বরং তার ফেলে যাওয়া পূর্বপুরুষদের উষ্ণ আলিঙ্গনে স্থান পাবে (Heesterman, 1985)।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও সৎকারের দ্বিবিধ পদ্ধতি (Funeral Rites and the Dual Modes of Disposal: Cremation and Burial)

ঋগ্বেদের যুগে মৃতদেহের সৎকারের জন্য প্রধানত দুটি পদ্ধতি প্রচলিত ছিল – দাহকরণ অর্থাৎ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা এবং সমাধিকরণ অর্থাৎ মাটির নিচে কবর দেওয়া। ঋগ্বেদের বিভিন্ন স্তোত্রে এই দুই পদ্ধতিরই সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। যারা অগ্নি দ্বারা সৎকার পেতেন তাদের বলা হতো অগ্নিদগ্ধ (Agnidagdha), আর যাদের মাটিতে সমাধিস্থ করা হতো তাদের বলা হতো অনগ্নিদগ্ধ (Anagnidagdha)। তবে কালক্রমে দাহকরণ পদ্ধতিটিই বৈদিক সমাজে অধিক জনপ্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এর প্রধান কারণ ছিল বৈদিক ধর্মে অগ্নির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা। অগ্নি যেমন যজ্ঞের হবি দেবতাদের কাছে পৌঁছে দেন, তেমনই তিনি মৃতদেহকেও পরলোকে পৌঁছে দেওয়ার বাহন হিসেবে কাজ করতেন (Caland, 1896)।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় অগ্নির রূপ কিন্তু দৈনন্দিন যজ্ঞের অগ্নির মতো কল্যাণময় থাকত না। মৃতদেহ গ্রাসকারী অগ্নিকে বলা হতো ক্রব্যাদ অগ্নি (Kravyād Agni), অর্থাৎ যিনি কাঁচা মাংস ভক্ষণ করেন। এই ক্রব্যাদ অগ্নি ছিল ভয়ঙ্কর ও অপবিত্র। অন্ত্যেষ্টিকাণ্ডে তাই ক্রব্যাদ রূপটিকে দূরে সরিয়ে রেখে অগ্নির পবিত্র ও পথপ্রদর্শক রূপ জাতবেদস (Jātavedas)-এর কাছে প্রার্থনা করা হতো। ঋষি অগ্নিকে অনুরোধ করতেন, “হে অগ্নি, এই মৃত ব্যক্তির শরীরকে পুরোপুরি ছাই করে দিও না, তাকে যন্ত্রণা দিও না; তার চামড়া বা মাংসকে নষ্ট করে দিও না। যখন তুমি একে পরিপক্ব করবে, তখন একে পিতৃপুরুষদের কাছে পাঠিয়ে দাও।” অগ্নি এখানে ভস্মকারী নন, বরং তিনি এক রূপান্তরকারী শক্তি, যিনি স্থূল শরীরকে পুড়িয়ে সূক্ষ্ম রূপ দেন, যাতে আত্মা পরলোকে প্রবেশ করতে পারে (Bodewitz, 1994)।

অন্যদিকে সমাহিত করার যে চিত্র ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের আঠারো সংখ্যক সূক্তে পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত মানবিক ও কাব্যিক স্পর্শে উজ্জ্বল। সেখানে মৃত ব্যক্তিকে কবরে নামিয়ে দেওয়ার সময় মাটিকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, “উপ সর্ব মাতরং ভূমিমেতাম” বা হে মৃত, এই প্রশস্ত ও কল্যাণময়ী মাতা পৃথিবীর কাছে যাও। মাটির কাছে মিনতি করা হয়েছে, “হে ধরিত্রী, তুমি উন্মুক্ত হও, এর ওপর ভার হয়ে চেপে বসো না; একে সহজে গ্রহণ করো। মা যেমন নিজের আঁচল দিয়ে সন্তানকে ঢেকে রাখেন, তুমিও তেমনই এই মৃত ব্যক্তিকে তোমার স্নেহে আবৃত করো।” কবরের ওপর মাটি যাতে সরাসরি না পড়ে, সেজন্য কাঠ বা পাথরের ফলক দিয়ে এক ধরনের খিলান তৈরি করা হতো। প্রকৃতির বুকে ফিরে যাওয়ার এই আর্তি মাটির সাথে মানুষের নাড়ির টানকে স্পষ্ট করে তোলে (Winternitz, 1927)।

অন্ত্যেষ্টির আরেকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল জীবিতদের সঙ্গে মৃতের সম্পর্কছেদের আনুষ্ঠানিকতা। অন্ত্যেষ্টি শেষ হওয়ার পর একটি পাথরের সীমা বা পরিধি (Paridhi) স্থাপন করা হতো। পুরোহিত ঘোষণা করতেন, এই পাথরের সীমা জীবিত এবং মৃতদের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়াক; মৃত্যু যেন এই সীমা পেরিয়ে জীবিতদের কাছে না আসে। এরপর সবাই স্নান করে নতুন পোশাক পরে গৃহের দিকে ফিরে আসত। এই আচারগুলো দেখায় যে বৈদিক সমাজ একদিকে যেমন মৃতের পরলৌকিক মঙ্গলের জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করত, তেমনই অন্যদিকে মৃত্যুকে জীবিতদের সংসার থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সতর্ক পাহারা বসাত। শোকের এক নির্দিষ্ট সীমানা ছিল, যার ওপারে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে আবার ফিরিয়ে আনাই ছিল সমাজের মূল লক্ষ্য (Heesterman, 1985)।

পরজীবনের ভূগোল ও অমরাবতীর রূপরেখা (Geography of the Afterlife and Imagery of Immortality)

মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় যায় এবং সেখানে তার অবস্থা কেমন হয়, এই নিয়ে ঋগ্বেদের কবিরা যে চিত্র এঁকেছেন, তা এক আলো ঝলমলে রূপকথার মতো। পরজীবন সম্পর্কে তাদের কোনো ভৌতিক বা মনমরা ধারণা ছিল না। তারা বিশ্বাস করতেন, পরলোক হলো এমন এক স্থান যা পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, বার্ধক্য ও রোগব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সেই রাজ্যটি অবস্থিত দ্যুলোকের সর্বোচ্চ স্তরে, যেখানে অক্ষয় আলো বিরাজ করে। সূর্য সেখানে কখনো অস্ত যায় না এবং সেখানে চিরন্তন আনন্দের প্রবাহ বইতে থাকে। এই স্থানটি বিষ্ণুর পরম পদের সঙ্গেও যুক্ত, যেখানে মধুর ফোয়ারা অবিরাম ঝরে পড়ে (Macdonell, 1897)।

পরলোকে পৌঁছানোর পর মানুষের কী হয়? বৈদিক বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তি সেখানে এক নতুন ও নিখুঁত শরীর লাভ করে। মাটির পৃথিবীতে মানুষের শরীরে যে অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ব বা অসুস্থতা থাকত, পরলোকে প্রবেশ করার সাথে সাথে সেই সমস্ত শারীরিক অপূর্ণতা দূর হয়ে যায়। সে সেখানে তার মাতা, পিতা, স্ত্রী এবং সন্তানদের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে পারে। তবে এই স্বর্গলাভের জন্য মানুষের কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন হতো। যারা যুদ্ধে বীরের মতো প্রাণ দিয়েছেন, যারা সৎ পথে চলেছেন এবং যারা প্রচুর দানধ্যান ও যজ্ঞ করেছেন, তারাই এই উজ্জ্বল জগতে প্রবেশের অধিকার পেতেন। এই ধারণাকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হতো ইষ্টাপূর্ত (Iṣṭāpūrta) শব্দটি, যার অর্থ যাগযজ্ঞের মাধ্যমে অর্জিত পুণ্য এবং সামাজিক জনকল্যাণমূলক কাজের ফল (Smith, 1989)।

সেই উজ্জ্বল জগতে জীবন কেমন ছিল? ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের একশত তেরো সংখ্যক সূক্তে অমরাবতীর এক উচ্ছ্বসিত বর্ণনা মেলে। সেখানে সোমদেবতার কাছে প্রার্থনা করে বলা হচ্ছে, “যেখানে আলো অফুরন্ত, যেখানে সূর্য প্রতিষ্ঠিত, সেই অমর ও অক্ষয় লোকে আমাকে নিয়ে চলো… যেখানে আনন্দ, উল্লাস, মোদ এবং প্রমোদ একাকার হয়ে থাকে, যেখানে সমস্ত কামনা পূর্ণ হয়, আমাকে সেই স্থানে অমর করে রাখো।” পরলোকের এই সুখ ছিল মূলত পার্থিব সুখেরই এক অসীম সম্প্রসারণ। সেখানে মধুর নদী বইত, দুগ্ধ ও ঘৃতের অভাব ছিল না, চারদিকে বাঁশি ও বীণার সুর বাজত। কোনো কৃচ্ছ্রসাধন বা ধ্যানমগ্ন নিস্তব্ধতা নয়, বরং এক অনন্ত উৎসবের মঞ্চ হিসেবে পরজীবনকে কল্পনা করা হয়েছিল (Bodewitz, 1994)।

অমরত্ব বা অমৃতত্ব (Amṛtatva) বলতে বৈদিক মানুষ কোনো বিমূর্ত নির্বাণ বুঝত না। তাদের কাছে অমরত্ব ছিল দেবতাদের সঙ্গে বসে সোমরস পানের সৌভাগ্য এবং মৃত্যুর হাত থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করা। জন্ম-মৃত্যুর কোনো অন্তহীন আবর্তের কথা তখনো তাদের চিন্তায় আসেনি। একবার যদি কেউ পিতৃলোকে বা স্বর্গে প্রবেশ করতে পারত, তবে তার আর মর্ত্যের দুঃখকষ্টের মধ্যে ফিরে আসার ভয় থাকত না। তবে এই অমৃতত্ব সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ কিংবা শত্রু অনার্যদের জন্য এই স্বর্গের দরজা কতটা খোলা ছিল, তা নিয়ে সূক্তগুলো নীরব। স্পষ্টতই, এই আলোকোজ্জ্বল পরজীবনের স্বপ্ন ছিল মূলত সেই সময়ের যাগযজ্ঞকারী অভিজাত ও যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষারই এক আদর্শ রূপ (Renou, 1953)।

নরকভাবনার ভ্রূণ ও কর্মবাদের পূর্বলক্ষণ (Embryonic Concepts of Hell and Precursors to Karman)

পরবর্তী হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে নরকের যে লোমহর্ষক এবং বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়, ঋগ্বেদের মূল ধারায় তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে তেল ফুটানো কড়াই, কাঁটাভরা গাছ কিংবা বৈতরণী নদীর মতো ভীতিকর নরকের বিস্তার অনুপস্থিত। তবে অসৎ ও অনিষ্টকারী মানুষদের জন্য যে কোনো ভালো স্থান বরাদ্দ ছিল না, তার ক্ষীণ ইঙ্গিত কিছু সূক্তে ছড়িয়ে আছে। ঋগ্বেদে একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে, তা হলো গর্ত (Garta) বা অতল গহ্বর। যারা অসত্য কথা বলে, যারা ঋত বা মহাজাগতিক নিয়মকে লঙ্ঘন করে, যারা দেবতাদের স্তুতি করে না এবং কৃপণতা করে ধন লুকিয়ে রাখে, তাদের সেই আলোহীন গভীর খাদের ভেতর ফেলে দেওয়া হয় বলে মনে করা হতো (Keith, 1925)।

এই অন্ধকার স্থানটিকে বর্ণনা করা হয়েছে অন্ধতমস (Andhatamasa) নামে। এটি কোনো পরিকল্পিত শাস্তিশালা নয়, বরং আলোর অনুপস্থিতি। ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলের একশত চার সংখ্যক সূক্তে ঋষি বশিষ্ঠ রাক্ষস, পিশাচ এবং অসৎ ব্যক্তিদের ধ্বংস কামনা করে ইন্দ্র ও সোমের কাছে প্রার্থনা করছেন। সেখানে বলা হয়েছে, এই অনিষ্টকারীদের যেন মাটির নিচের চিরন্তন অন্ধকারে নিক্ষেপ করা হয়, যেখান থেকে তারা আর কখনো উঠে আসতে না পারে। অর্থাৎ সৎ মানুষের জন্য ছিল ঊর্ধ্বলোকের অনন্ত আলো, আর অসৎ মানুষের জন্য ছিল পাতালে অবস্থিত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো অন্ধকার। কিন্তু সেখানে কোনো স্থায়ী শারীরিক নির্যাতনের চিত্র আঁকা হয়নি (Bhattacharji, 1970)।

এখানেই নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং কর্মফলের এক প্রাথমিক রূপরেখা উঁকি দেয়। তবে এটি পরবর্তী কালের সুসংহত কর্মবাদ (Doctrine of Karman) বা জন্মান্তরবাদ ছিল না। ঋগ্বেদে মানুষ একবারই জন্ম নেয় এবং মৃত্যুর পর সে পিতৃলোকে যায় অথবা অন্ধকারে হারিয়ে যায়। মানুষ মারা যাওয়ার পর তার কাজের হিসাব অনুযায়ী পশু বা কীট-পতঙ্গ হয়ে আবার মর্ত্যে ফিরে আসবে – এই ধরণের পুনর্জন্মের চক্র ঋগ্বেদের প্রাচীন ঋষিদের ভাবনার বাইরে ছিল। কিন্তু একজন মানুষের ইহজাগতিক আচরণই যে মৃত্যুর পর তার অবস্থান নির্ধারণ করবে, এই নৈতিক সচেতনতাটি সমাজে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। যাগযজ্ঞের নিয়ম রক্ষা করা যেমন জরুরি ছিল, তেমনই সামাজিক জীবনে সত্যবাদী হওয়া এবং গোত্রকে রক্ষা করাও আবশ্যক ছিল (Smith, 1989)।

পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে গিয়ে এই পরলোকভাবনা আরও জটিল রূপ ধারণ করে। সেখানে দেখা দেয় পুনর্মৃত্যু (Punarmṛtyu)-এর আতঙ্ক। মানুষ ভাবতে শুরু করে, স্বর্গে গেলেও কি পুণ্য শেষ হয়ে গেলে আবার মরতে হবে? এই প্রশ্নের উদ্বেগ থেকেই শেষ পর্যন্ত উপনিষদের যুগের জন্ম হয়, যেখানে স্বর্গ-নরকের সমস্ত কল্পনাকে পেছনে ফেলে মানুষ জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে সম্পূর্ণ মুক্তির পথ বা মোক্ষ খুঁজতে শুরু করেছিল। ঋগ্বেদের পরজীবন ভাবনা ছিল এই দীর্ঘ দার্শনিক যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। জীবনের প্রতি অবিচল ভালোবাসা, পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং মৃত্যুর ওপারের এক নিরাপদ আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা – এই সহজ অথচ গভীর মানবিক অনুভূতিগুলো দিয়েই ঋগ্বেদের মানুষ মৃত্যুকে মোকাবেলা করতে চেয়েছিল (Bodewitz, 1994)।

ঋগ্বেদের কাব্য ও নন্দনতত্ত্ব (Poetry and Aesthetics of the Ṛgveda): ছন্দ, উপমা, ধাঁধা ও প্রতীক

বৈদিক কাব্যের স্বরূপ ও মৌখিক কবিতার নন্দনতত্ত্ব (Nature of Vedic Poetry and Aesthetics of Oral Verse)

ঋগ্বেদকে সচরাচর কেবল ধর্মীয় স্তোত্রের সংকলন হিসেবে দেখা হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রাচীন পৃথিবীর অত্যন্ত সমৃদ্ধ এক কাব্যধারা। এই স্তোত্রগুলো কোনো নিঃসঙ্গ ঘরের কোণে বসে লেখা হয়নি, বরং এগুলো জন্ম নিয়েছিল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে, মানুষের সম্মিলিত উচ্চারণে এবং যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতায়। বৈদিক কবিরা নিজেদের কেবল পুরোহিত ভাবতেন না, তারা নিজেদের মনে করতেন দক্ষ কারিগর। কাঠ কেটে ছুতোর যেমন মজবুত রথ তৈরি করে, তেমনই শব্দের পর শব্দ নিখুঁতভাবে সাজিয়ে কবিরা কবিতা তৈরি করতেন। কবিতাকে তারা বলতেন ধী (Dhī), যার অর্থ অন্তর্দৃষ্টিপ্রসূত চিন্তা বা মননশীল রূপকল্প। সেই চিন্তাকে শিল্পিত ভাষায় প্রকাশ করার নাম ছিল কাব্য (Elizarenkova, 1995)।

এই কবিতার পেছনে কোনো লিখিত রূপ ছিল না, পুরো ঐতিহ্যটিই ছিল মৌখিক। উচ্চারিত ধ্বনির ওঠানামা, সুরের টান এবং শ্বাসের ছন্দ মিলিয়ে যে ধ্বনিসৌন্দর্য তৈরি হতো, সেটাই ছিল বৈদিক কবিতার প্রাণ। শব্দের এই অলৌকিক শক্তিকে প্রাচীন কবিরা নাম দিয়েছিলেন বাচ (Vāc) বা বাক্দেবী। কবিদের সম্বোধন করা হতো ঋষি (Ṛṣi), বিপ্র (Vipra) কিংবা কবি (Kavi) নামে। বিপ্র শব্দের মূল অর্থ হলো যিনি আবেগে বা অনুপ্রেরণায় কম্পিত হন। অর্থাৎ কবির ভেতরের আবেগ যখন ভাষা খুঁজে পেত, তখনই একটি নতুন ঋচার জন্ম হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, সুন্দর কবিতা দেবতাদের মন জয় করতে পারে, ঠিক যেমন সুন্দর উপহার একজন রাজাকে সন্তুষ্ট করে (Watkins, 1995)।

প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় কাব্যপরম্পরার বহু উপাদান ঋগ্বেদের কবিতার শরীরে ছড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ কিছু শব্দবন্ধ, উপাধি এবং অলঙ্কারের পুনরাবৃত্তি এই কবিতার চেনা রীতি ছিল। গ্রিক কবি হোমারের কাব্যে যেমন নির্দিষ্ট উপাধির ব্যবহার বারবার ফিরে আসে, ঋগ্বেদেও তেমনই দেব-দেবী এবং প্রাকৃতিক শক্তির জন্য স্থায়ী কিছু শব্দবন্ধ বরাদ্দ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, অগ্নিকে বলা হতো পুরোহিত (Purohita) বা জাতবেদস (Jātavedas), উষাকে বলা হতো সুভগা (Subhagā) বা সৌভাগ্যশালিনী। এই স্থায়ী শব্দবন্ধগুলো মৌখিক স্মৃতিকে ধরে রাখতে সাহায্য করত এবং আবৃত্তিকারের কাছে এক নির্ভরযোগ্য সূত্র হয়ে উঠত। কবিরা পরিচিত এই ছাঁচগুলো ব্যবহার করেই নতুন নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটাতেন (West, 2007)।

সৌন্দর্যের এই মৌখিক রূপটি গড়ে উঠেছিল সমকালীন মানুষের বাস্তব চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে। দেবতাকে খুশি করে জয় ছিনিয়ে আনা, বৃষ্টি প্রার্থনা করা কিংবা পশুপালের সুরক্ষা চাওয়া – উদ্দেশ্যগুলো আপাতদৃষ্টিতে বৈষয়িক মনে হলেও প্রকাশের ভাষা ছিল আশ্চর্যরকম কাব্যময়। সেখানে ছিল ধ্বনির সংঘাত এবং গতির সঞ্চার। কবিরা শব্দকে একটি তির্যক তীরের মতো ছুড়ে দিতেন, যা লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম। ঋগ্বেদের নন্দনতত্ত্ব তাই মাটির বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো কল্পনাবিলাস ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে সুর ও ছন্দে রূপ দেওয়ার এক সচেতন প্রয়াস (Elizarenkova, 1995)।

ছন্দের গঠন ও ধ্বনিপ্রকৌশল (Metrical Architecture and Sound Engineering: Gāyatrī, Triṣṭubh, and Jagatī)

বৈদিক কবিতার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল দিক হলো এর ছন্দব্যবস্থা। ঋগ্বেদের ছন্দ কোনো শিথিল বা এলোমেলো বিন্যাস ছিল না, বরং তা নিয়ন্ত্রিত হতো অক্ষরের কঠোর মাত্রাবৃত্ত নিয়মে। প্রাচীন গ্রিক বা লাতিন কাব্যের মতোই বৈদিক ছন্দ ছিল অক্ষরের মাত্রা বা স্বরদৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভরশীল। লঘু অর্থাৎ হ্রস্ব স্বর এবং গুরু অর্থাৎ দীর্ঘ স্বরের সুপরিকল্পিত বিন্যাস দিয়ে তৈরি হতো চরণের শেষ অংশ বা বৃত্ত (Vṛtta)। চরণের প্রথমাংশে কবির স্বাধীনতা কিছুটা বেশি থাকলেও চরণের শেষাংশে লঘু-গুরুর একটি নির্দিষ্ট ছন্দস্পন্দন রক্ষা করা আবশ্যিক ছিল। এই গাণিতিক নিয়মানুবর্তিতাই আবৃত্তিকে একটি অন্তর্নিহিত সংগীতময়তা এনে দিত (Arnold, 1905)।

ঋগ্বেদে মূলত সাতটি প্রধান ছন্দের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যার মধ্যে তিনটি ছন্দ সিংহভাগ স্থান দখল করে আছে। এগুলো হলো গায়ত্রী (Gāyatrī), ত্রিষ্টুপ (Triṣṭubh) এবং জগতী (Jagatī)। গায়ত্রী ছন্দে থাকে আটটি অক্ষরের তিনটি পদ বা চরণ, অর্থাৎ মোট চব্বিশটি অক্ষর। এর গতি হালকা, চটপলে এবং কিছুটা নাচের মতো চঞ্চল। ঋগ্বেদের বিখ্যাত সূর্যস্তুতি এই ছন্দেই রচিত। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় ছন্দটি হলো ত্রিষ্টুপ। এতে এগারোটি অক্ষরের চারটি পদ থাকে, অর্থাৎ মোট চুয়াল্লিশটি অক্ষর। এর সুর ভারী, বীরত্বব্যঞ্জক এবং গম্ভীর। ইন্দ্র বা মরুৎগণের মতো পরাক্রমশালী দেবতাদের যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবিরা এই ছন্দটিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন (West, 2007)।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ছন্দ হলো জগতী, যার প্রতিটি চরণে থাকে বারোটি করে অক্ষর এবং চারটি চরণে মোট আটচল্লিশটি অক্ষর দিয়ে একটি শ্লোক গঠিত হয়। এর চলন কিছুটা বিলম্বিত এবং বর্ণনামূলক। এ ছাড়া আট অক্ষরের চারটি পদের সমন্বয়ে গঠিত অনুষ্টুপ (Anuṣṭubh) ছন্দের ব্যবহারও ঋগ্বেদে পাওয়া যায়, যা পরবর্তীকালে ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যের প্রধানতম বাহন শ্লোক হিসেবে বিকাশ লাভ করেছিল। কবিরা দেবতার স্বভাব এবং সূক্তের বিষয়বস্তু অনুযায়ী ছন্দ বেছে নিতেন। যুদ্ধের দৃশ্য আঁকতে যেমন ত্রিষ্টুপ বেছে নেওয়া হতো, প্রার্থনার পেলব আবেগকে প্রকাশ করতে তেমনই ব্যবহৃত হতো গায়ত্রী বা জগতী (Arnold, 1905)।

ছন্দের এই কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়েছিল অত্যন্ত চতুর ধ্বনিপ্রকৌশল। একই ধ্বনির বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে কবিরা তৈরি করতেন অসাধারণ অনুপ্রাস (Anuprāsa) এবং ধ্বনিসাম্য। স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের পারস্পরিক বিন্যাস এমনভাবে করা হতো যাতে আবৃত্তির সময় একটি সম্মোহনী আবহ সৃষ্টি হয়। পদগুলোর মাঝে মিল বা অন্ত্যমিলের কোনো আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা ছিল না, কিন্তু বাক্যের ভেতর অন্তর্নিহিত মিল এবং প্রতিধ্বনির মতো অনুরণন সৃষ্টি করা হতো। কোনো কোনো স্তোত্রে একই ধাতুর বিভিন্ন রূপকে একের পর এক বসিয়ে এক ধরনের গতিময় ঘূর্ণি তৈরি করা হতো। এই ধ্বনিবিজ্ঞান কেবল শ্রুতিমধুরতাই আনত না, বরং শ্রোতার মনে এক গভীর আলোড়ন তুলতে সক্ষম হতো (Velankar, 1963)।

উপমা ও রূপকের চিত্রকল্প: দৃশ্যমান প্রকৃতি ও পশুপালন জীবন (Imagery of Similes and Metaphors: Visible Nature and Pastoral Life)

ঋগ্বেদের কাব্যজগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদান হলো এর উপমা। কবিরা উপমা আহরণ করতে কোনো অচেনা জগতের দিকে তাকাননি। তাদের চারপাশে যা কিছু ঘটত – মাঠে চরে বেড়ানো গাভী, যুদ্ধক্ষেত্রের দ্রুতগামী ঘোড়া, গৃহকোণে জ্বলে ওঠা আগুন, কিংবা বর্ষায় ফুঁসে ওঠা নদী – এই সমস্ত চেনা অভিজ্ঞতাই তাদের কাব্যের উপমান হয়ে উঠেছিল। সংস্কৃতে উপমা প্রকাশের জন্য সাধারণত ইব (Iva), ন (Na) কিংবা যথা (Yathā) শব্দগুলো ব্যবহৃত হতো। একটি স্তোত্রে বলা হয়েছে, ক্ষুধার্ত বাছুর যেমন ছুটে গিয়ে মায়ের বাঁট আঁকড়ে ধরে, আমার প্রার্থনাও তেমনই হে দেবতা, তোমার দিকে ব্যাকুল হয়ে ছুটে যাচ্ছে (Elizarenkova, 1995)।

পশুপালনভিত্তিক সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল গরু। ফলে বৈদিক কবিদের উপমায় গরুর উপস্থিতি প্রায় অপরিহার্য। নদীর প্রবাহমান জলধারাকে কবিরা দেখেছেন গোয়ালঘর থেকে বাঁধভাঙা আনন্দের সাথে ছুটে বের হওয়া গাভীর পালের মতো। আবার কখনো কখনো শান্ত নদীর দুই তীরকে তুলনা করা হয়েছে সেই গাভীর সাথে, যে পরম স্নেহে তার বাছুরকে লেহন করছে। ইন্দ্রের বজ্রাঘাতকে তুলনা করা হয়েছে কাঠুরের কুঠার দিয়ে গাছ কাটার সাথে। এই উপমাগুলো প্রমাণ করে যে ঋগ্বেদের কবিদের চোখ ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং তারা মাটির প্রকৃতির অতি সাধারণ নড়াচড়াকেও গভীর কাব্যিক সংবেদনশীলতায় রূপান্তর করতে পারতেন (Velankar, 1963)।

প্রকৃতির রূপবর্ণনায় ঋগ্বেদের কবিদের কল্পনা চরম শিখরে পৌঁছেছিল উষা সংক্রান্ত সূক্তগুলোতে। উষার বন্দনায় রচিত স্তোত্রগুলো প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতা হিসেবে স্বীকৃত। কবি উষাকে দেখছেন এক উজ্জ্বল তরুণী হিসেবে, যিনি আকাশের পূর্ব প্রান্তে দাঁড়িয়ে হাসছেন। ঋগ্বেদের পঞ্চম মণ্ডলের আশি সংখ্যক সূক্তে বলা হয়েছে, উষা যেন এক লাজুক অথচ প্রগলভ নারী, যিনি প্রেমিকের সামনে নিজের বক্ষদেশের আবরণ ধীরে ধীরে উন্মোচন করছেন। আবার কোথাও তিনি এক নর্তকী, যিনি উজ্জ্বল অলঙ্কার পরে প্রকাশ্য সভায় নৃত্য করছেন। অন্ধকারের বুক চিরে আলোর এই আগমন কেবল দিনের শুরু নয়, এটা জীবনের এক নতুন জাগরণ, যা মানুষকে কর্মের দিকে আহ্বান জানায় (Jamison & Brereton, 2014)।

যুদ্ধ এবং ধ্বংসের চিত্রও এই উপমার বলয় থেকে বাদ পড়েনি। মরুৎগণ বা ঝড়-বাতাসের দেবতাদের বর্ণনায় কবিরা লিখেছেন, তারা যখন বনে প্রবেশ করেন, তখন বনের বড় বড় গাছগুলো ভয়ে এমনভাবে নুয়ে পড়ে, যেন শত্রুর সামনে পরাজিত সৈন্যরা মাথা নত করছে। ইন্দ্রের রথের চাকার ঘূর্ণন তৈরি করে মেঘের গর্জন। সূর্যের তেজকে তুলনা করা হয়েছে সোনার পালকযুক্ত পাখির সাথে, যে আকাশ জুড়ে ডানা মেলে উড়ে চলেছে। এই রূপকগুলো কৃত্রিম অলঙ্কার ছিল না, বরং প্রকৃতি ও মানুষের জীবন যে এক অবিচ্ছেদ্য সুতোয় বাঁধা, সেই ধারণাটিরই শিল্পিত প্রকাশ ছিল (West, 2007)।

ধাঁধা ও ব্রহ্মোদ্য: প্রজ্ঞার সাহিত্যিক ক্রীড়া (Riddles and Brahmodya: The Literary Play of Wit)

বৈদিক কবিতার একটি বিশেষ এবং চিত্তাকর্ষক রূপ হলো ধাঁধা। যজ্ঞের দীর্ঘ অনুষ্ঠানের ফাঁকে পুরোহিতরা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক খেলায় মেতে উঠতেন, যাকে বলা হতো ব্রহ্মোদ্য (Brahmodya)। এটি ছিল দুই বা ততোধিক কবির মধ্যকার শ্লোক দিয়ে সাজানো বাকযুদ্ধ। একজন কবি একটি রূপকধর্মী ধাঁধা ছুড়ে দিতেন, আর অন্যজনকে তাত্ক্ষণিকভাবে ছন্দোবদ্ধ বাক্যে তার অন্তর্নিহিত অর্থ উন্মোচন করতে হতো। এই সাহিত্যিক প্রতিযোগিতা কেবল পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের ক্ষেত্র ছিল না, এটি ছিল বিশ্বজগতের রহস্যকে ভাষার ছদ্মবেশে প্রকাশ করার এক চমকপ্রদ কসরত (Thompson, 1997)।

ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের একশত চৌষট্টি সংখ্যক সূক্তটি এই ধারার এক অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। দীর্ঘতমা ঋষির রচিত এই সূক্তটি পুরোটিই সৃষ্টি, কাল এবং মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে রচিত জটিল ধাঁধায় পূর্ণ। একে বলা হয় অস্যবামস্য সূক্ত (Asyavāmasya Sūkta)। এই সূক্তের একটি বিখ্যাত শ্লোকে কালচক্র বা বছরকে তুলনা করা হয়েছে একটি বারো চাকার রথের সাথে। বলা হয়েছে, “দ্বাদশটি প্রান্তযুক্ত একটি রথের চাকা আকাশে অবিরাম ঘুরছে, কিন্তু তা কখনো পুরোনো হয় না। হে প্রজ্ঞাবান, বলো তো সেই চাকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাতশত কুড়িটি জোড়পুত্র কারা?” এখানে বারোটি প্রান্ত হলো বারোটি মাস এবং সাতশত কুড়িটি পুত্র হলো একটি সৌরবছরের তিনশত ষাটটি দিন ও তিনশত ষাটটি রাত (Bergaigne, 1973)।

এই সূক্তেই রয়েছে বিশ্বসাহিত্যের অত্যন্ত পরিচিত একটি রূপক, যা পরবর্তীকালে উপনিষদেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উদ্ধৃত হয়েছে। বলা হয়েছে, “দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া” বা দুটি সুন্দর ডানাবিশিষ্ট বন্ধু পাখি একই গাছে আশ্রয় নিয়ে বাস করছে। তাদের মধ্যে একটি পাখি গাছের সুস্বাদু ফল খাচ্ছে, আর অন্য পাখিটি কিছু না খেয়ে কেবল স্থির চোখে তাকিয়ে দেখছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি দুটি পাখির গল্প হলেও এর গভীরে রয়েছে মানবজীবনের এক জটিল মনস্তত্ত্ব। একটি পাখি হলো ভোগকারী পার্থিব সত্তা, আর অন্যটি হলো সাক্ষী বা নির্লিপ্ত চেতনা। একই দেহে অবস্থান করেও একজন কর্মের জালে জড়াচ্ছে আর অন্যজন দূর থেকে তা পর্যবেক্ষণ করছে (Elizarenkova, 1995)।

ধাঁধার এই কাব্যরীতি প্রমাণ করে যে বৈদিক যুগের কবিরা সোজা ভাষায় কথা বলার চেয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সংকেতের ভাষায় কথা বলতে বেশি ভালোবাসতেন। বৈদিক ব্রাহ্মণ সাহিত্যের একটি পরিচিত সূত্র হলো, দেবতারা পরোক্ষ বা ছদ্মবেশী বিষয় পছন্দ করেন, প্রত্যক্ষ বা স্পষ্ট কিছু তারা ভালোবাসেন না। কবিতাকে তাই ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা দুর্বোধ্য করে তোলা হতো, যাতে সাধারণ শ্রোতা তার ভেতর প্রবেশ করতে না পারে এবং কেবল দীক্ষিতরাই তার অর্থভেদ করতে সক্ষম হয়। ভাষার এই গোপন চাতুরী বৈদিক কাব্যকে এক ধরনের ধীশক্তি এবং গূঢ় শিল্পগুণের অধিকারী করেছিল (Thompson, 1997)।

প্রতীক ও সংকেতব্যবস্থা: সোম, ধেনু ও অশ্ব (Symbols and Semiotics: Soma, Cow, and Horse)

ঋগ্বেদের রূপকাশ্রয়ী কবিতার গভীরে প্রবেশ করতে হলে এর বহুল ব্যবহৃত প্রতীকগুলোর পাঠোদ্ধার করা জরুরি। বৈদিক কাব্যভাষায় কিছু বস্তু কেবল তাদের ভৌত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না, সেগুলো পরিণত হয়েছিল জটিল সংকেতে। এর মধ্যে তিনটি প্রধান প্রতীক হলো সোম, ধেনু অর্থাৎ গাভী এবং অশ্ব অর্থাৎ ঘোড়া। এই প্রতীকগুলো ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে স্তরবিন্যস্ত অর্থ তৈরি করত, যার একটি ছিল বাহ্যিক যজ্ঞের সাথে যুক্ত আর অন্যটি যুক্ত ছিল মহাজাগতিক ও মানসিক স্তরের সাথে (Bergaigne, 1973)।

সোম (Soma) শব্দটি একই সাথে একটি উদ্ভিদ, একটি পানীয়, একজন দেবতা এবং রাতের আকাশের চাঁদের প্রতীক। যজ্ঞের পাত্রে যখন সোমলতাকে পাথরের নোড়া দিয়ে পেষণ করা হতো, তখন সেই হলুদ রঙের রসকে ছাঁকনির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করা হতো। কবিরা এই পুরো দৃশ্যটিকে রূপক হিসেবে দেখেছেন মহাকাশের বৃষ্টিপাতের সাথে। আকাশ থেকে যেমন বৃষ্টির জলধারা মাটিতে নেমে আসে এবং শস্য উৎপন্ন করে, যজ্ঞের পাত্রেও তেমনই সোমের ধারা পতিত হয়। আবার এই সোমরস পান করার পর কবিরা যে মানসিক স্ফূর্তি এবং অনুপ্রেরণা অনুভব করতেন, তাকে তারা ভাবতেন দৈব প্রজ্ঞার আলো। সোম তাই পার্থিব মাদকতা পেরিয়ে মনের ভেতরের সৃজনশীল উন্মাদনার প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছিল (Gonda, 1959)।

গাভী বা ধেনু (Dhenu) বৈদিক কাব্যে কেবল দুধের জোগানদাতা কোনো প্রাণী ছিল না। এটি ছিল পুষ্টি, আলো এবং কবিতার স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতীক। ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণ যখন পূর্ব আকাশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কবিরা সেই কিরণগুলোকে দেখেছেন লাল রঙের গাভীর পালের মতো, যারা অন্ধকার রূপ গুহা থেকে মুক্তি পেয়ে চারণভূমির দিকে দৌড়ে আসছে। এমনকি স্বয়ং বাক্দেবী বা কাব্যকেও গাভীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। কবি যেন একজন রাখাল, যিনি মনের বন থেকে সুন্দর শব্দরূপ গাভীগুলোকে দোহন করে অমৃত বা কবিতা তৈরি করছেন। ফলে গাভী হয়ে উঠেছিল মানুষের সমস্ত সৃষ্টিশীল উৎপাদনশীলতার প্রধান সংকেত (Elizarenkova, 1995)।

অন্যদিকে অশ্ব (Aśva) বা ঘোড়া ছিল বলবীর্য, বেগ এবং সূর্যের প্রতীক। রথের দ্রুতগামী ঘোড়া যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ধূল উড়িয়ে শত্রুকে পদদলিত করে এগিয়ে যায়, সূর্যও তেমনই আকাশপথে অন্ধকারের সেনাদলকে চূর্ণ করে ছুটে চলে। ঋগ্বেদের চতুর্থ মণ্ডলে দধিক্রা নামক এক রূপক স্বর্গীয় ঘোড়ার বন্দনা রয়েছে, যার খুরের শব্দ এবং নিশ্বাস যুদ্ধের ময়দানকে প্রকম্পিত করে তোলে। ঘোড়া হলো সেই অদম্য পুরুষালি শক্তির প্রতীক যা সীমানা ভেঙে ফেলে এবং বিজয় ছিনিয়ে আনে। এই প্রতীকগুলো বারবার ব্যবহারের ফলে বৈদিক কবিতা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সংকেতব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যেখানে একটি শব্দের উচ্চারণে একঝাঁক সংশ্লিষ্ট ভাবচিত্র শ্রোতার কল্পনায় জেগে উঠত (Thompson, 1997)।

রস ও সাহিত্যিক আবেদন: প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের উৎসভূমি (Rasa and Literary Appeal: The Fountainhead of Classical Indian Literature)

পরবর্তীকালের ভারতীয় আলঙ্কারিকরা কাব্যের যে রস (Rasa) তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন, তার অনেকগুলো প্রাথমিক উপাদান ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোতে অত্যন্ত সজীবভাবে ছড়িয়ে ছিল। যদিও বৈদিক যুগে রসশাস্ত্রের বিধিবদ্ধ ব্যাকরণ গড়ে ওঠেনি, কিন্তু বিভিন্ন সূক্তে ভিন্ন ভিন্ন মানবিক অনুভূতির যে প্রকাশ ঘটেছে, তা ধ্রুপদী কাব্যের রসকেই আগাম ঘোষণা করে। বিশেষ করে ইন্দ্রের বীরত্বগাথায় পাওয়া যায় ওজস্বী বীররস (Vīra Rasa), উষার সূক্তগুলোতে ফুটে ওঠে মাধুর্যময় শৃঙ্গাররস (Śṛṅgāra Rasa), আর কিছু সংলাপদলিলে দেখা যায় গভীর নাটকীয় দ্বন্দ্বের ছায়াপাত (Velankar, 1963)।

ঋগ্বেদের কবিতায় কেবল দেবতাদের তোষামোদ ছিল না, সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং পতনের নিখাদ বাস্তব ছবিও স্থান পেয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো দশম মণ্ডলের চৌত্রিশ সংখ্যক সূক্তটি, যা অক্ষসূক্ত (Akṣa Sūkta) বা দ্যূতক্রীড়কের বিলাপ নামে পরিচিত। এটি কোনো দেববন্দনা নয়, এটি এক পরাজিত জুয়াড়ির তীব্র আত্মদহনের স্বীকারোক্তি। কবি বলছেন, সেই বাদামী রঙের পাশার ঘুঁটিগুলো যখন কাঠের তক্তার ওপর গড়িয়ে পড়ে, তখন তারা যেন এক অদৃশ্য জাদুতে মানুষকে সম্মোহিত করে। কবি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে তিনি দেখছেন তার স্নেহময়ী স্ত্রী তাকে পরিত্যাগ করেছে, শাশুড়ি তাকে ঘৃণাভরে তাড়িয়ে দিচ্ছে এবং কেউ তাকে এক পয়সা ধার দিতেও প্রস্তুত নয় (Winternitz, 1927)।

অক্ষসূক্তের ভাষায় কোনো কৃত্রিম ভাবালুতা নেই, আছে জীবনের উলঙ্গ সত্যের চাবুক। জুয়াড়ি দেখছেন অন্য পুরুষ তার ভালোবাসার স্ত্রীকে স্পর্শ করছে, আর তিনি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের হাত দুটোকে অভিশাপ দিচ্ছেন। সূক্তের শেষে এসে ইন্দ্রের কণ্ঠে নয়, জুয়াড়ির নিজের অনুশোচনার মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয় গভীর মানবিক শিক্ষা – পাশা খেলা ছেড়ে দাও, জমিতে লাঙ্গল চালাও এবং নিজের ফসলে সন্তুষ্ট থাকো। এই সূক্তটি প্রাচীন সমাজের এক রক্তমাংসের মানবিক দলিল, যা ঋগ্বেদের কাব্যপরিধিকে নিছক পুরোহিততন্ত্রের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে চিরন্তন সাহিত্যের আঙিনায় প্রতিষ্ঠিত করেছে (Elizarenkova, 1995)।

সব মিলিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ঋগ্বেদীয় কবিতা কোনো স্থবির বা আদিম অস্ফুট ভাষা ছিল না, বরং তা ছিল এক অত্যন্ত সচেতন, পরিণত এবং সংবেদনশীল সাহিত্যকীর্তি। ছন্দের গাণিতিক শৃঙ্খলা, চেনা পরিবেশ থেকে তুলে আনা জীবন্ত উপমা, বুদ্ধির দীপ্তিতে ভাস্বর ধাঁধা এবং গভীর প্রতীকের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বৈদিক কবিরা ভাষার যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা-ই পরবর্তী হাজার বছর ধরে ভারতীয় সাহিত্যের মূল স্রোতকে সিঞ্চিত করেছে। মেঘদূতের উপমা কিংবা মহাভারতের নাট্যদৃশ্যের যে আদি বীজ, তা কোনো না কোনোভাবে ঋগ্বেদের এই প্রাচীন কবিদের কাব্যশালার ভেতরেই অঙ্কুরিত হয়েছিল (West, 2007)।

সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ (Sāmaveda, Yajurveda and Atharvaveda): সংগীত, যজ্ঞ, মন্ত্র ও লোকজ ধর্ম

সামবেদ সংহিতা (Sāmaveda Saṃhitā): গঠন, উৎস, শাখা ও পাঠবিন্যাস

সামবেদের স্বরূপ ও বৈদিক যজ্ঞে এর ঐতিহাসিক অবস্থান (Nature of the Sāmaveda and Its Historical Position in Vedic Ritual)

প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের সংকলনগুলোর মধ্যে সামবেদ সংহিতা এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ঋগ্বেদকে যদি কবিতার আধার বলা হয়, তবে সামবেদ হলো সেই কবিতার সুরারোপিত রূপ। বৈদিক সাহিত্যে একটি বহুল প্রচলিত উক্তি রয়েছে – ঋক বা স্তোত্র হলো গানের শরীর, আর সেই শরীরের ওপর আরোপিত সুর হলো সাম। অর্থাৎ কোনো ঋগ্বেদীয় ঋচাকে যখন নির্দিষ্ট সুরে গাওয়া হতো, তখনই তা সাম (Sāman) নামে অভিহিত হতো। সুরহীন ছন্দোবদ্ধ চরণ কেবল পাঠের বিষয়, কিন্তু যখনই তাতে সুর, তাল ও স্বরের বিস্তার ঘটানো হতো, তখন তা রূপ নিত গানে। এই কারণে সামবেদ কোনো নতুন সাহিত্যিক রচনার সংকলন নয়, বরং এটি প্রাচীন ভারতীয় সংগীত এবং যজ্ঞের সুরসংগ্রহের এক জটিল সংকলন (Benfey, 1848)।

বৈদিক আচারব্যবস্থা বিশেষ করে সোমযাগের আনুষ্ঠানিকতায় সামবেদের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। সোমযাগ পরিচালনার জন্য চারটি প্রধান পুরোহিত শ্রেণির প্রয়োজন হতো – হোতা, অধ্বর্যু, ব্রহ্মা এবং উদ্গাতা (Udgātṛ)। এদের মধ্যে উদ্গাতার কাজই ছিল সামগান করা। হোতা ঋগ্বেদের মন্ত্র আবৃত্তি করতেন, অধ্বর্যু যজুর্বেদের নির্দেশ অনুযায়ী যজ্ঞের শরীর বা বাহ্যিক ক্রিয়াকর্ম পরিচালনা করতেন, আর উদ্গাতা তার সহকারীদের নিয়ে গম্ভীর সুরে সোমরস নিবেদন ও পেষণের সময় সামগান গাইতেন। অগ্নির শিখা যখন আকাশে উঠত এবং সোমলতার রস যখন পাথরে ছেঁচে বের করা হতো, তখন উদ্গাতার গাওয়া সুর যজ্ঞস্থলে এক ধরনের সম্মোহনী আবহ তৈরি করত। প্রাচীন আর্যরা বিশ্বাস করতেন যে সুরের মাধ্যমে উচ্চারিত মন্ত্র দেবতাদের বেশি আকৃষ্ট করে (Staal, 1983)।

ঐতিহাসিক বিবর্তনের দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, সামবেদ রচিত হয়েছিল একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবহারিক ও ধর্মীয় প্রয়োজন থেকে। ঋগ্বেদের যুগের শেষভাগে যখন পশুপালনকারী যাযাবর সমাজ ধীরে ধীরে স্থায়ী কৃষি ও জটিল বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন যজ্ঞের আচার-অনুষ্ঠানও অনেক বেশি বিস্তৃত ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। সেই সময় বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা গানগুলোকে একটি বিধিবদ্ধ রূপ দেওয়ার তাগিদ দেখা দেয়। উদ্গাতা পুরোহিতদের ব্যবহারের সুবিধার জন্য ঋগ্বেদের হাজার হাজার স্তোত্র থেকে বিশেষ বিশেষ ঋচা বাছাই করে একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে সাজানো হয়। এই বাছাইকরণ প্রক্রিয়ার ফসলই হলো সামবেদ সংহিতা। ফলে এটি নিছক পাঠ্যপুস্তক নয়, এটি ছিল যজ্ঞের মঞ্চে উদ্গাতার কার্যোপযোগী এক ব্যবহারিক সুরপুস্তিকা (van der Hoogt, 1929)।

সামবেদের আবেদন সাহিত্যের চেয়ে সংগীতের ইতিহাসে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন ভারতে সুরের যে সাতটি স্বর এবং স্বরগ্রামের ধারণা পরবর্তীকালে ভারতীয় মার্গসংগীতের জন্ম দিয়েছিল, তার প্রথম লিখিত ও সুসংহত দলিল এই সামবেদেই পাওয়া যায়। প্রাচীন সমাজে সুরের প্রভাব ছিল গভীর। সাধারণ কথা যেখানে শেষ হতো, সুর সেখান থেকেই মানুষের মনের অবচেতন ভাবকে প্রকাশ করত। দেবতাদের ক্রোধ শান্ত করা, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং যজ্ঞকর্মের সাফল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সামগানকে এক অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য করা হতো। ফলে সামবেদ বৈদিক ধর্মসংস্কৃতির এমন এক স্তরকে তুলে ধরে যেখানে ভাষা ও সংগীত পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল (Faddegon, 1927)।

সংহিতার দ্বিবিধ বিভাজন: আর্চিক ও গান (Dual Division of the Saṃhitā: Ārcika and Gāna)

সামবেদ সংহিতার অভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে গেলে এর একটি অদ্ভুত দ্বৈত রূপের মুখোমুখি হতে হয়। অন্যান্য সংহিতার মতো এটি কেবল শ্লোকের সমাহার নয়। সামবেদ আসলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু পরস্পরের পরিপূরক স্তরে বিভক্ত – একটি হলো আর্চিক (Ārcika) এবং অন্যটি হলো গান (Gāna)। আর্চিক অংশে সংরক্ষিত রয়েছে কেবল স্তোত্রগুলোর পাঠ্যরূপ বা গীতিকবিতা, যাকে সংগীতের ভাষায় বলা যায় গানের লিব্রেটো বা বাণী। অন্যদিকে গান অংশে সংরক্ষিত রয়েছে সেই স্তোত্রগুলোর প্রকৃত সুরবিন্যাস, সুরের ওঠানামার সংকেত এবং সংগীতের বাস্তব পরিবেশনপদ্ধতি (Howard, 1977)।

আর্চিক অংশে যেসব ঋচা সংকলিত হয়েছে, সেগুলোকে বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ ঋগ্বেদীয় ছন্দের মতোই মনে হয়। কিন্তু সেই একই ঋচা যখন গান অংশে প্রবেশ করে, তখন তার চেহারা আমূল বদলে যায়। সুরের প্রয়োজনে মূল কবিতার শব্দগুলোকে ভেঙে ফেলা হতো, স্বরগুলোকে দীর্ঘায়িত করা হতো এবং মাঝে মাঝে অতিরিক্ত কিছু অর্থহীন ধ্বনি যোগ করা হতো। এই অতিরিক্ত ধ্বনিগুলোকে বলা হতো স্তোভ (Stobha)। যেমন কোনো শব্দের মাঝে হঠাৎ জুড়ে দেওয়া হতো ‘হা-উ’, ‘হুবা’, ‘হো-ই’ কিংবা ‘হুম’-এর মতো ধ্বনিখণ্ড। এই ধ্বনিগুলো আধুনিক সংগীতের তানা বা বাদ্যযন্ত্রের বোলের মতো কাজ করত। ফলে সাধারণ আর্চিক পাঠ করে সামগান গাওয়া অসম্ভব ছিল; তার জন্য গান গ্রন্থের স্বরলিপি জানা আবশ্যক হতো (Burnell, 1876)।

গান অংশটিও আবার পরিবেশনের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। সাধারণ লোকালয়ে বা গ্রামে বসে যেসব গান গাওয়া যেত এবং শেখানো হতো, সেগুলোকে বলা হতো গ্রামগেয় গান (Grāmageya Gāna) বা বেয়গান। এর বাইরে কিছু গান ছিল যা অত্যন্ত গোপনীয় এবং বিপজ্জনক বলে গণ্য করা হতো। সেই গানগুলো কোনো জনপদে গাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, সেগুলোর চর্চা হতো গভীর অরণ্যে। এই গানগুলোকে বলা হতো আরণ্যগেয় গান (Āraṇyageya Gāna) বা অরণ্যগান। প্রাচীন পুরোহিতদের ধারণা ছিল, এই অরণ্যগানের ভেতরে এত প্রবল আদিম শক্তি লুকিয়ে আছে যে ভুল উচ্চারণে বা লোকালয়ে গাইলে তা মানুষের ক্ষতি করতে পারে (Parpola, 1968)।

এর পাশাপাশি আরও দুটি গানের স্তর পরবর্তীকালে যুক্ত হয়েছিল, যাদের নাম উহ গান (Ūha Gāna) এবং উহ্য গান (Ūhya Gāna)। যজ্ঞের বাস্তব পরিস্থিতিতে আর্চিকের মন্ত্রকে নির্দিষ্ট দিনের যজ্ঞের ছাঁচে ফেলে তাৎক্ষণিকভাবে যে পরিবর্তন করা হতো, তাকে নির্দেশ করত উহ গান। আর আরণ্যক স্তরের গানগুলোর ওপর ভিত্তি করে যে রূপান্তর ঘটত, তা ছিল উহ্য গান। এই চতুর্বিধ গানের পদ্ধতি এবং আর্চিকের দ্বিস্তরীয় কাঠামো প্রমাণ করে যে সামবেদ কোনো সাধারণ সাহিত্যগ্রন্থ ছিল না। এটি ছিল সুর ও শব্দের এক জটিল সংকেতব্যবস্থা, যা কেবল গুরু-শিষ্য পরম্পরায় কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হতো (van der Hoogt, 1929)।

পূর্বার্চিক ও উত্তরার্চিকের পাঠকাঠামো (Textual Architecture of Pūrvārcika and Uttarārcika)

সামবেদের লিখিত রূপ বা আর্চিক প্রধানত দুটি বড় খণ্ডে বিভক্ত হয়ে আমাদের সামনে আসে – পূর্বার্চিক (Pūrvārcika) এবং উত্তরার্চিক (Uttarārcika)। এই দুই খণ্ডের পাঠকাঠামো এবং বিন্যাসপদ্ধতি একে অপরের থেকে বেশ আলাদা। পূর্বার্চিক হলো মূলত সুরের প্রাথমিক পাঠশালা। একজন নতুন শিক্ষার্থী উদ্গাতাকে প্রথমে পূর্বার্চিকের স্তোত্রগুলো শিখতে হতো। এখানে বিভিন্ন দেবতার উদ্দেশে রচিত একক ঋচাগুলো সংকলিত রয়েছে, যেগুলোকে বলা হতো ছন্দোমুখ (Chandomukha)। প্রতিটি একক ঋচার ওপর ভিত্তি করে কীভাবে এক বা একাধিক সাম তৈরি করা যায়, তা শেখানোই ছিল এই অংশের মূল উদ্দেশ্য (Benfey, 1848)।

পূর্বার্চিক খণ্ডটি মোট ছয়টি প্রপাঠক বা অধ্যায়ে বিন্যস্ত। প্রতিটি প্রপাঠক আবার কয়েকটি দশতি অর্থাৎ দশটি করে শ্লোকের গুচ্ছে বিভক্ত। দেবতাদের নামানুসারে এই প্রপাঠকগুলোকে কয়েকটি কাণ্ডে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম প্রপাঠকটিকে বলা হয় আগ্নেয় কাণ্ড (Āgneya Kāṇḍa), যেখানে অগ্নির প্রশংসাসূচক স্তোত্র রয়েছে। এর পরের প্রপাঠকগুলোতে রয়েছে ইন্দ্রের বন্দনা, যাকে বলা হয় ঐন্দ্র কাণ্ড (Aindra Kāṇḍa)। এরপর রয়েছে সোমদেবতার স্তোত্রসমৃদ্ধ পবমান কাণ্ড (Pavamāna Kāṇḍa)। পূর্বার্চিকের পরিশিষ্ট হিসেবে যুক্ত থাকে আরণ্যক সংহিতা এবং মহামান্নী (Mahānāmnī) ঋচাগুলো। পুরো পূর্বার্চিকে মোট শ্লোকের সংখ্যা প্রায় ৫৮৫টি। এটি ছিল সুরের একটি সাধারণ অভিধানের মতো, যেখানে নির্দিষ্ট মন্ত্রের সঙ্গে নির্দিষ্ট সুরের যোগসূত্র স্থাপন করা শেখানো হতো (Faddegon, 1927)।

অন্যদিকে উত্তরার্চিক হলো যজ্ঞের বাস্তব প্রয়োগশালা। পূর্বার্চিকে যেখানে একক শ্লোক দিয়ে সুরের অনুশীলন হতো, উত্তরার্চিকে সেখানে তিনটি করে শ্লোকের গুচ্ছ বা তৃচ (Tṛca) তৈরি করে সাজানো হয়েছে। যজ্ঞের সময় কোনো একক শ্লোক গেয়ে সুর শেষ করা যেত না, একটি নির্দিষ্ট সুরকে কমপক্ষে তিনটি শ্লোকের ওপর বিস্তার করতে হতো। এই তিন শ্লোকের প্রথমটিকে বলা হতো যোনি (Yoni) অর্থাৎ উৎস শ্লোক, যার সুরে বাকি দুটি শ্লোককে মিলিয়ে গাওয়া হতো। যজ্ঞের বিভিন্ন দিনে, যেমন জ্যোতিষ্টোম বা অতিরাত্র যাগের কোন প্রহরে কোন তৃচ গাওয়া হবে, উত্তরার্চিকে সেই ক্রম অনুসারে শ্লোকগুলো সাজানো রয়েছে (Staal, 1983)।

উত্তরার্চিকে মোট নয়টি প্রপাঠক রয়েছে এবং এখানে শ্লোকের সংখ্যা প্রায় ১২২৫টি। পূর্বার্চিকের তুলনায় উত্তরার্চিকের কলেবর অনেক বড়। মজার ব্যাপার হলো, উত্তরার্চিকের অধিকাংশ শ্লোকের বীজ বা যোনি-শ্লোকটি পূর্বার্চিকের ভেতরেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ পূর্বার্চিকে সুরের যে প্রাথমিক ব্যাকরণ শেখানো হয়েছিল, উত্তরার্চিকে এসে তারই পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারিক প্রয়োগ রূপ পেয়েছে। এই পাঠকাঠামো থেকে বোঝা যায় যে প্রাচীন সংকলকরা অত্যন্ত নিখুঁত ও পদ্ধতিগত চিন্তাভাবনা করে সামবেদকে বিন্যস্ত করেছিলেন। একজন পুরোহিত যেন শিক্ষানবিস অবস্থা থেকে শুরু করে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজকীয় সোমযজ্ঞ পরিচালনার দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, সেই শিক্ষাক্রম মাথায় রেখেই এই দ্বিস্তরীয় কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল (Burnell, 1876)।

ঋগ্বেদের সঙ্গে সামবেদের পাঠগত সম্পর্ক ও উৎস (Textual Relationship and Source Transmission with the Ṛgveda)

সামবেদ সংহিতার মৌলিকত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ঋগ্বেদের সঙ্গে এর পাঠগত ঋণ স্বীকার করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। পাঠ্যবিষয়ের দিক থেকে সামবেদ প্রায় সম্পূর্ণভাবেই ঋগ্বেদের ওপর নির্ভরশীল। কৌথুম শাখার প্রচলিত সামবেদ সংহিতায় মোট শ্লোক সংখ্যা ১৮১০টি (কোনো কোনো গণনায় ১৮৭৫টি)। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক শ্লোকের মধ্যে মাত্র ৭৫টি শ্লোক এমন রয়েছে যা বর্তমান প্রচলিত ঋগ্বেদ সংহিতায় খুঁজে পাওয়া যায় না। বাকি সমস্ত শ্লোকই হুবহু বা সামান্য পরিবর্তিত রূপে ঋগ্বেদ থেকে ধার করা হয়েছে। অর্থাৎ সামবেদের শ্লোকগুলোর শতকরা প্রায় নিরানব্বই ভাগই ঋগ্বেদীয় উৎস থেকে গৃহীত (Benfey, 1848)।

ঋগ্বেদের কোন কোন অংশ থেকে সামবেদ তার উপাদান সংগ্রহ করেছে, তা লক্ষ্য করলে একটি আকর্ষণীয় নকশা চোখে পড়ে। ঋগ্বেদের দশটি মণ্ডলের মধ্যে অষ্টম ও নবম মণ্ডল থেকেই সামবেদের সিংহভাগ শ্লোক নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নবম মণ্ডলের পবমান সোম (Pavamāna Soma)-এর স্তোত্রগুলো সামবেদে ব্যাপকভাবে স্থান পেয়েছে। এর কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। সোমযাগের সময় সোমলতার রস নিংড়ানো এবং তা পাত্রে ঢালার মুহূর্তে যেসব স্তোত্র গাওয়া হতো, সেগুলোর সুরময়তা ছিল অসাধারণ। নবম মণ্ডলের স্তোত্রগুলো প্রাকৃতিকভাবেই ছিল সংগীতময় ও ললিত ছন্দে রচিত, যা সামগানের উপযোগী সুরারোপের জন্য ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত উপাদান (Parpola, 1968)।

তবে ঋগ্বেদ থেকে শ্লোক গ্রহণের সময় সামবেদের পাঠে কিছু রূপান্তর ঘটেছে। ভাষাভাষী পণ্ডিতরা লক্ষ্য করেছেন যে ঋগ্বেদের মূল পাঠের সাথে সামবেদে গৃহীত একই পাঠের মধ্যে কিছু ধ্বনিগত ও ব্যাকরণগত পার্থক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সামবেদের পাঠ ঋগ্বেদের চেয়েও বেশি প্রাচীন ও আঞ্চলিক উপভাষার রূপ ধারণ করে আছে। প্রাচ্যবিদ থিওডোর বেনফে তার বিখ্যাত সংস্করণে দেখিয়েছেন যে সামবেদ সংকলনের সময় হয়তো ঋগ্বেদের এমন কোনো মৌখিক শাখা বা পাঠপরম্পরা ব্যবহৃত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে প্রচলিত শাকল শাখার ঋগ্বেদে সংরক্ষিত হয়নি। সুরের প্রয়োজনে দীর্ঘ স্বরকে টেনে ছোট করা কিংবা হ্রস্ব স্বরকে টেনে দীর্ঘ করার মতো উচ্চারণগত বিবর্তনও এই পাঠপার্থক্য তৈরির পেছনে ভূমিকা রেখেছিল (Benfey, 1848)।

ঋগ্বেদের ওপর এতখানি নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও সামবেদকে প্রাচীন সমাজে কখনো ঋগ্বেদের অনুকরণ বা দ্বিতীয় শ্রেণির গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং বহু ক্ষেত্রে সামবেদকে ঋগ্বেদের চেয়েও বেশি পবিত্র ও ফলদায়ী বলে মনে করা হতো। সাহিত্যের দৃষ্টিতে এর নিজস্ব কাব্যিক মৌলিকতা কম থাকতে পারে, কিন্তু এর শক্তি ছিল তার সুরের ভেতর। একটি সাধারণ শ্লোক কেবল আবৃত্তি করলে যে প্রভাব পড়ত, সামের সুরে তা শতগুণ তীব্র হয়ে উঠত। সুর ছিল এক রূপান্তরকারী মাধ্যম, যা পার্থিব শব্দকে দেবলোকের ভাষায় উন্নীত করত। এই কারণেই ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, ঋগ্বেদ হলো পৃথিবী আর সামবেদ হলো স্বর্গ; ঋক যদি হয় বাক্য, তবে সাম হলো প্রাণ (van der Hoogt, 1929)।

সামবেদের শাখা ও ঐতিহ্যিক সম্প্রদায় (Śākhās and Traditional Schools of the Sāmaveda: Kauthuma, Rāṇāyanīya, and Jaiminīya)

প্রাচীন ভারতে বৈদিক সাহিত্যের সংরক্ষণ হয়েছিল বিভিন্ন গুরুকুল বা শাখার মাধ্যমে। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি তার গ্রন্থে সামবেদের বিপুল বিস্তারের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিলেন, “সহস্রবর্ত্মা সামবেদঃ” বা সামবেদ হলো সহস্র ধারায় বা পথে প্রবাহিত। অর্থাৎ এককালে সামবেদের প্রায় এক হাজার শাখা প্রচলিত ছিল বলে বিশ্বাস করা হতো। যাযাবর বৈদিক জনগোষ্ঠী যখন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন ভৌগোলিক দূরত্ব এবং স্থানীয় সংগীতরীতির প্রভাবে সামবেদের বহু আঞ্চলিক শাখার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু কালের নিয়মে সেই সহস্র শাখার অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। আজ মাত্র তিনটি শাখা তাদের পাঠপরম্পরা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে (Howard, 1977)।

এই টিকে থাকা তিনটি শাখা হলো কৌথুম (Kauthuma), রাণায়নীয় (Rāṇāyanīya) এবং জৈমিনীয় (Jaiminīya) বা তলবকার শাখা। এদের মধ্যে কৌথুম শাখাটিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও প্রভাবশালী। উত্তর ভারত, গুজরাট, রাজস্থান এবং বাংলার বৈদিক পণ্ডিতদের মধ্যে কৌথুম শাখার ঐতিহ্য এখনো প্রচলিত রয়েছে। আধুনিক যুগে সামবেদের যত মুদ্রিত সংস্করণ পাওয়া যায়, তার প্রায় সবই এই কৌথুম শাখার পুথির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রাণায়নীয় শাখার সঙ্গে কৌথুম শাখার পাঠগত অমিল খুবই সামান্য। মূলত মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু অঞ্চলে রাণায়নীয় শাখার সামগান আজও বেঁচে রয়েছে। এই দুই শাখার পাঠে শ্লোকের পার্থক্য তেমন নেই বললেই চলে, পার্থক্য কেবল সুরের কিছু টানে এবং উচ্চারণের ধরনে (Staal, 1983)।

তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখাটি হলো জৈমিনীয় শাখা। এই শাখাটি দীর্ঘদিন ধরে বহির্বিশ্বের কাছে প্রায় অজ্ঞাত ছিল। ভারতের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, বিশেষ করে কেরালার নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণদের এবং তামিলনাড়ুর কিছু পরিবারের ভেতর এই ঐতিহ্য অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তায় সংরক্ষিত ছিল। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গবেষকরা এই জৈমিনীয় শাখার পুথি ও তাদের গানের প্রাচীন রূপ রেকর্ড করতে সক্ষম হন। জৈমিনীয় শাখার পাঠ কৌথুম বা রাণায়নীয় শাখার চেয়ে যথেষ্ট আলাদা। এর শ্লোকসংখ্যা যেমন ভিন্ন, তেমনই এর গান গাওয়ার পদ্ধতি অনেক বেশি প্রাচীন, অমার্জিত এবং জটিল। বহু পণ্ডিতের মতে, জৈমিনীয় শাখাতেই সামগানের সবচেয়ে প্রাচীন রূপটি অবিকৃত অবস্থায় টিকে রয়েছে (Parpola, 1968)।

শাখাগুলোর এই বৈচিত্র্য আসলে সুরের আঞ্চলিক রূপান্তরেরই ইতিহাস। একটি স্তোত্র গুজরাটের কোনো পুরোহিত যেভাবে গাইতেন, তামিলনাড়ুর পুরোহিত ঠিক সেই সুরে গাইতেন না। সুরের বিস্তার, গলার কাঁপুনি বা কম্পন এবং স্তোভ ধ্বনির ব্যবহারে এই শাখাগুলোর মধ্যে স্পষ্ট স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠেছিল। প্রতিটি শাখার নিজস্ব ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, আরণ্যক এবং উপনিষদ তৈরি হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, বিখ্যাত ছান্দোগ্য উপনিষদ হলো কৌথুম শাখার অন্তর্গত, আর কেন উপনিষদ যুক্ত রয়েছে জৈমিনীয় শাখার সাথে। শাখাভেদের এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটি দেখায় যে প্রাচীন বৈদিক ধর্ম কোনো একক কেন্দ্রীভূত ধর্মের মতো ছিল না, বরং তা ছিল বহু স্থানীয় ধারা ও পরিবারের স্বাতন্ত্র্যকে ধারণ করে বেঁচে থাকা এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরম্পরা (Burnell, 1876)।

স্বরলিপি, সুরবিন্যাস ও পাঠরীতি (Notation, Melodic Structure, and Recitation Methods)

সামবেদের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর সুর সংরক্ষণের বিজ্ঞান। মুদ্রণযন্ত্র বা অডিও রেকর্ডিং আবিষ্কারের হাজার বছর আগে কীভাবে শত শত জটিল সুর অবিকৃতভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল? প্রাচীন বৈদিক সমাজ এর সমাধান করেছিল স্বরলিপি এবং হাতের মুদ্রা ব্যবহারের এক নিখুঁত পদ্ধতির মাধ্যমে। সামগানে যে স্বরগ্রাম ব্যবহার করা হতো, তা ছিল অধোগামী বা অবরোহী স্কেল, অর্থাৎ সুর উঁচু থেকে নিচের দিকে নামত। পরবর্তীকালের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে যেমন সা-রে-গা-মা স্বরগ্রাম নিচ থেকে ওপরে ওঠে, সামবেদীয় স্কেলটি ছিল তার ঠিক বিপরীত। এখানে সর্বোচ্চ স্বর থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে সর্বনিম্ন স্বরে নেমে আসার নিয়ম ছিল (Faddegon, 1927)।

সামবেদের সুর মূলত সাতটি মূল স্বরের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই স্বরগুলোকে প্রাচীন পারিভাষিক শব্দে ডাকা হতো – ক্রুষ্ট (Kruṣṭa), প্রথম (Prathama), দ্বিতীয় (Dvitīya), তৃতীয় (Tṛtīya), চতুর্থ (Caturtha), মন্দ্র (Mandra) এবং অতিস্বার্য (Atisvārya)। এই নামগুলো দেখলেই বোঝা যায় যে স্বরগুলোকে সংখ্যার ক্রম দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। আধুনিক স্কেলের সাথে তুলনা করলে কৃষ্ট হলো সবচেয়ে চড়া স্বর এবং অতিস্বার্য হলো খাদ বা নীচের স্বর। পুথির পাতায় যখন শ্লোক লেখা হতো, তখন অক্ষরের ওপরে এক, দুই, তিন ইত্যাদি সংখ্যা লিখে দেওয়া হতো, যাতে পাঠক বুঝতে পারে কোন অক্ষরে কোন স্বরটি লাগাতে হবে। এটিই হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম স্বরলিপি পদ্ধতির অন্যতম নিদর্শন (Howard, 1977)।

কেবল লিখিত স্বরলিপির ওপর ভরসা করে গান গাওয়া যেত না। এর সাথে যুক্ত ছিল শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা মুদ্রার ভাষা। উদ্গাতারা গান গাওয়ার সময় ডান হাতের আঙুলগুলোকে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে নাড়াতেন। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে তর্জনী, মধ্যমা বা অনামিকার নির্দিষ্ট পর্ব স্পর্শ করে তারা স্বরের অবস্থান ও মাত্রা নির্দেশ করতেন। এই পদ্ধতির নাম ছিল কাইরোনোমি (Cheironomy)। এমনকি মাথা ও শরীরের মৃদু দুলুনি দিয়েও স্বরের গভীরতা প্রকাশ পেত। গুরু যখন গান গাইতেন, শিষ্যরা তার মুখের সুর শোনার পাশাপাশি তার হাতের আঙুলের নড়াচড়া নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করত। এই দৃশ্যগত ও শ্রুতিগত যৌথ স্মৃতিনির্ভর ব্যবস্থার কারণেই শত শত বছর ধরে সুরের বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটেনি (Staal, 1983)।

সামগান পরিবেশনের এই পদ্ধতিটি আধুনিক মানুষের কাছে অত্যন্ত অদ্ভুত ও জটিল মনে হতে পারে। গানের ভেতর মূল শব্দগুলোকে টেনে টেনে এমনভাবে বিকৃত করা হতো যে সাধারণ কানে তা অর্থহীন সুরের কোলাহল বলে মনে হতো। কিন্তু প্রাচীন বৈদিক তাত্ত্বিকদের কাছে এই সুরের প্রতিটি তরঙ্গের ছিল সুনির্দিষ্ট মহাজাগতিক উপযোগিতা। সুরের সামান্য ভুল দেবতাদের রুষ্ট করতে পারে কিংবা যজ্ঞের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দিতে পারে, এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক পুরোহিতদের নিয়মের শৃঙ্খলে কঠোরভাবে বেঁধে রেখেছিল। সামবেদ তাই কেবল প্রাচীন সুরের সংকলন নয়, এটি মানব ইতিহাসের সেই আদিম অধ্যায়ের দলিল যেখানে মানুষ প্রকৃতির অজানা রহস্যকে জয় করার জন্য সুর, গণিত এবং দেহভঙ্গিকে এক সুতোয় গেঁথে এক অলৌকিক প্রাচীর তৈরি করতে চেয়েছিল (van der Hoogt, 1929)।

সামবেদ ও ঋগ্বেদের সম্পর্ক (Sāmaveda and the Ṛgveda): ঋচা, পুনর্বিন্যাস, স্বাতন্ত্র্য ও ব্যবহার

ঋক্ ও সামের তাত্ত্বিক সহাবস্থান: শরীর ও প্রাণের রূপক (Theoretical Coexistence of Ṛc and Sāman: Metaphor of Body and Breath)

প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক বুঝতে গেলে ঋগ্বেদ ও সামবেদের পারস্পরিক সংযোগকে বিশ্লেষণ করা দরকার। এই দুটি সংহিতা একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং যজ্ঞের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা দুটি পরিপূরক ধারা। বৈদিক চিন্তাবিদরা এই সম্পর্কটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য চমৎকার কিছু জৈবিক ও মহাজাগতিক রূপক ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তীকালের একাধিক ব্রাহ্মণ ও উপনিষদ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ঋক্ হলো বাক্য বা দেহ, আর সাম হলো সেই দেহের ভেতরে প্রবহমান প্রাণ (Prāṇa)। কথা ছাড়া যেমন সুরের কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয় থাকে না, সুর ছাড়াও তেমনই বাক্য কেবল সাধারণ পাঠে সীমাবদ্ধ থাকে। কবিতার শরীরে সুরের সঞ্চার ঘটলে তবেই তা পূর্ণাঙ্গ সাংগীতিক ও আচারিক মর্যাদা পায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, ঋগ্বেদের শ্লোকগুলোকে সুরের আশ্রয়ে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই সামবেদের পরিকল্পনা করা হয়েছিল (Weber, 1878)।

প্রাচীন ধর্মতাত্ত্বিক সাহিত্যে এই দুই ধারার মিলনকে অনেক সময় নারী ও পুরুষের দাম্পত্য সম্পর্কের রূপকেও উপস্থাপন করা হয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদের মতো প্রাচীন প্রজ্ঞামূলক পাঠে এমন চমৎকার কথোপকথন দেখা যায় যেখানে ঋক্ নিজেকে নারী এবং সাম নিজেকে পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করে। ঋক্ সুরের উদ্দেশ্যে বলে যে সুরের সাহচর্য ছাড়া যজ্ঞের বাক্য দেবলোক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বৈদিক যজ্ঞ কেবল অর্থপূর্ণ শব্দের উচ্চারণ ছিল না, এটা ছিল ধ্বনি ও সুরের এক সমন্বিত পরিবেশনা। সুর যখন ঋকের প্রতিটি অক্ষরের ওপর ভর করত, তখন তা সাধারণ কথ্য ভাষার স্তর পেরিয়ে এক সম্মোহনী শক্তিতে পরিণত হতো। ফলে ঋগ্বেদীয় পাঠকে বাদ দিয়ে সামবেদের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব প্রাচীন যাজ্ঞিকরা কল্পনা করতে পারতেন না (Minkowski, 1991)।

মহাজাগতিক স্তরে এই সম্পর্কটিকে পৃথিবী ও দ্যুলোকের চিরন্তন সম্পর্কের সাথে মেলানো হতো। ঋক্ যদি হয় দৃশ্যমান পৃথিবী, তবে সাম হলো অনন্ত আকাশ। মাটির পৃথিবী যেমন আকাশের বারিপাতের স্পর্শে শস্যশ্যামল হয়ে ওঠে, ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলোও তেমনই সামের সুরে সিঞ্চিত হয়ে যজ্ঞের বাঞ্ছিত ফল তৈরি করে। প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল, সাধারণ আবৃত্তির মাধ্যমে দেবতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যতটা সময়সাপেক্ষ, সুরের ডানায় ভর করে সেখানে পৌঁছানো তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। দেবতারা স্তোত্রের অর্থ বোঝার চেয়ে সুরের মাধুর্যে বেশি তৃপ্ত হন, এমন একটি ধারণা যজ্ঞীয় সমাজে প্রচলিত ছিল। এই বিশ্বাস থেকেই ঋগ্বেদের হাজার হাজার পদের মধ্য থেকে সুরের উপযোগী পদগুলোকে বেছে নেওয়ার সচেতন প্রেরণা কাজ করেছিল (Weber, 1878)।

তবে এই সহাবস্থানের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক সূক্ষ্ম ক্ষমতার ভারসাম্য। যজ্ঞের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরে ঋগ্বেদের পুরোহিত অর্থাৎ হোতার ভূমিকা ছিল বয়োজ্যেষ্ঠ শাস্ত্রজ্ঞের মতো। অন্যদিকে সুরের জাদুতে উপস্থিত সবাইকে আচ্ছন্ন করার ক্ষমতা থাকত উদ্গাতার হাতে। উদ্গাতা ঋগ্বেদের পদগুলোকে এমনভাবে ভেঙেচুরে গাইতেন যে মূল কবিতার চেনা রূপটি প্রায়শই হারিয়ে যেত। সাহিত্যের দিক থেকে সামবেদ ঋগ্বেদের কাছে পুরোপুরি ঋণী থাকলেও, যজ্ঞের সংবেদনশীল ও নান্দনিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে সামবেদ নিজের একটি স্বতন্ত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটিই প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের বিকাশকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সচল রেখেছিল (Minkowski, 1991)।

ঋগ্বেদীয় উপাদান ও চয়নপ্রক্রিয়া: অষ্টম ও নবম মণ্ডলের প্রাধান্য (Ṛgvedic Material and Selection Process: Prominence of Mandalas Eight and Nine)

সামবেদ সংকলকরা যখন ঋগ্বেদ থেকে উপাদান নির্বাচন করতে বসেছিলেন, তখন তারা পুরো ঋগ্বেদ থেকে নির্বিচারে বা সমান অনুপাতে শ্লোক গ্রহণ করেননি। এই চয়নপ্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দ্বারা পরিচালিত। ঋগ্বেদের মোট দশটি মণ্ডলের মধ্যে দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল পর্যন্ত অংশগুলোকে প্রাচীনতম স্তর বা পারিবারিক মণ্ডল হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, সামবেদের সংকলকরা এই পারিবারিক মণ্ডলগুলো থেকে তুলনামূলকভাবে কম উপাদান গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রধান মনোযোগ গিয়ে পড়েছিল মূলত অষ্টম এবং নবম মণ্ডলের ওপর। বিশেষ করে নবম মণ্ডলের প্রায় প্রতিটি স্তোত্রই কোনো না কোনোভাবে সামগানের কাঠামোয় তুলে নেওয়া হয়েছিল (Renou, 1947)।

এই বিশেষ নির্বাচনের পেছনে গভীর সংগীতিক ও ব্যবহারিক কারণ ছিল। ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলটি সম্পূর্ণভাবে সোমদেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। যজ্ঞে সোমলতার রস যখন পাথরের পাত্রে নিংড়ানো হতো এবং মেষলোমের ছাঁকনি দিয়ে তা কলসে পড়ত, সেই অবিরাম ধারার ভেতর এক ধরনের স্বাভাবিক ছন্দ ও গতি কাজ করত। নবম মণ্ডলের স্তোত্রগুলো রচনার দিক থেকেই ছিল অত্যন্ত লিরিক্যাল বা গীতিধর্মী। অন্যদিকে অষ্টম মণ্ডলে কণ্ব ও অঙ্গিরা বংশের ঋষিদের রচিত স্তোত্রগুলোতে এমন কিছু বিশেষ ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছিল, যা সুরের টানের সাথে সহজে মিশে যেত। এই ছন্দগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো প্রগাথ (Pragātha), যা বৃহতী ও সতোবৃহতী ছন্দের সুষম সংমিশ্রণে গঠিত হতো (Dandekar, 1979)।

প্রগাথ ছন্দের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস এমন ছিল যে তা সুরের বিস্তার, তান এবং একই চরণের পুনরাবৃত্তির জন্য আদর্শ সুযোগ করে দিত। একজন পেশাদার গায়কের পক্ষে সাধারণ ত্রিষ্টুপ বা জগতী ছন্দের কঠিন ও গম্ভীর গঠনের চেয়ে প্রগাথ ছন্দের নমনীয় কাঠামোর ওপর সুরের কাজ করা অনেক বেশি সহজ ছিল। বৈদিক সুরকাররা ভালোভাবেই জানতেন কোন ধরনের পদ সুরের ভার বহন করতে পারে এবং কোনগুলো দ্রুত সুরের সাথে ভেঙে পড়ে। ইন্দ্রের মহিমা এবং সোমরসের উজ্জ্বল মাদকতা – এই দুটি বিষয়ই সামগানের উদ্দাম সুরের সাথে সবচেয়ে বেশি মানানসই ছিল। ফলে দীর্ঘ আখ্যান বা জটিল রূপকের বদলে আবেগঘন ও বন্দনামূলক শ্লোকগুলোকেই সামবেদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল (Renou, 1947)।

বাছাইয়ের এই পদ্ধতি প্রমাণ করে যে সামবেদ সংকলন কোনো যান্ত্রিক অনুলিপি তৈরির কাজ ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন সংগীতজ্ঞদের এক অত্যন্ত দক্ষ ও রুচিশীল সম্পাদনা। কবিতার সুবিশাল ভাণ্ডার থেকে তারা কেবল সেই অংশগুলোকেই আলাদা করেছিলেন, যা দিয়ে একটি নিখুঁত সংগীতমালা গাঁথা সম্ভব। ঋগ্বেদের যে শ্লোকগুলোতে গভীর সৃষ্টিতত্ত্ব, সামাজিক সংঘাত বা জটিল ধাঁধা ছিল, সেগুলোকে সামবেদে সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলা হয়েছে। এর বদলে প্রাধান্য পেয়েছে সেই সব ঋচা, যার ধ্বনিপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত মসৃণ এবং যা গায়কের কণ্ঠস্বরকে নানা গ্রামে অবাধে বিচরণ করার সুযোগ করে দিত (Dandekar, 1979)।

পাঠের পুনর্বিন্যাস ও যাজ্ঞিক পুনর্গঠন (Textual Rearrangement and Ritual Reorganization)

ঋগ্বেদের যে শ্লোকগুলো সামবেদে স্থান পেয়েছে, সেগুলোর বিন্যাসপদ্ধতি মূল গ্রন্থ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ঋগ্বেদের বিন্যাস গড়ে উঠেছিল কবি-পরিবার এবং দেবতাদের গুরুত্বের ক্রম অনুসারে। সেখানে অগ্নির সূক্তগুলো দিয়ে মণ্ডল শুরু হয়েছে, তারপর এসেছে ইন্দ্রের স্তোত্র এবং সবশেষে অন্যান্য ছোটখাটো দেবতাদের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু সামবেদ সেই সাহিত্যিক ও বংশানুক্রমিক বিন্যাসকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলে। সামবেদে শ্লোকগুলোকে সাজানো হয়েছে যজ্ঞের ব্যবহারিক সময়সূচি এবং সুরের পাঠক্রম অনুসারে। এই রূপান্তরকে একটি কাব্যসংকলনকে যজ্ঞের মঞ্চে ব্যবহারের উপযোগী চিত্রনাট্যে পরিণত করার প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে (Hillebrandt, 1897)।

সামবেদের পূর্বার্চিক অংশে একক শ্লোক বা ছন্দোমুখ (Chandomukha) দিয়ে সুরের প্রাথমিক পাঠগুলো সাজানো হয়েছে। কিন্তু উত্তরার্চিকে গিয়ে এই বিন্যাস পুরোপুরি যজ্ঞের দিনের বাস্তব চাহিদার অনুগামী হয়ে পড়ে। সোমযাগের তিনটি প্রধান পর্ব থাকত – প্রাতঃসবন বা সকালের পর্ব, মাধ্যন্দিন সবন বা দুপুরের পর্ব এবং তৃতীয় সবন বা সন্ধ্যার পর্ব। প্রতিটি পর্বে যজ্ঞের বেদির সামনে কোন দেবতার উদ্দেশ্যে কোন সুরে গান গাওয়া হবে, উত্তরার্চিকের শ্লোকগুলো ঠিক সেই ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে। এর ফলে ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের একটি শ্লোকের পাশে অনায়াসে বসে গেছে প্রথম বা অষ্টম মণ্ডলের শ্লোক, কারণ যজ্ঞের বিশেষ সেই ক্ষণে তাদের সুরের প্রয়োজন ছিল অভিন্ন (Bhattacharyya, 1975)।

এই পুনর্গঠনের আরেকটি বড় কৌশল ছিল তৃচ (Tṛca) বা তিন চরণের শ্লোকগুচ্ছ তৈরি করা। ঋগ্বেদে বহু শ্লোক দীর্ঘ সূক্তের অংশ হিসেবে এককভাবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু সামবেদের উত্তরার্চিকে এসে সেগুলোকে তিনটি করে শ্লোকের একটি সংহত পরিবার হিসেবে সাজানো হলো। নিয়মানুযায়ী, প্রথম শ্লোকটিতে যে সুরটি বাঁধা হতো, তাকে বলা হতো মূল বা প্রসূতি। এরপর সেই সুরের ছাঁচেই বাকি দুটি শ্লোককে একে একে গেয়ে পুরো সাংগীতিক পর্বটি শেষ করা হতো। এই তৃচ ব্যবস্থার কারণে ঋগ্বেদের বিচ্ছিন্ন শ্লোকগুলো সামবেদে এসে এক সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ছন্দোময় সংহতি লাভ করেছিল (Hillebrandt, 1897)।

যাজ্ঞিক এই পুনর্বিন্যাসের কারণে শ্লোকগুলোর আদি সাহিত্যিক বা ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনেক ক্ষেত্রে আড়ালে চলে যেত। ঋগ্বেদে যে শ্লোকটি হয়তো কোনো ঐতিহাসিক যুদ্ধ, গবাদিপশু উদ্ধার বা কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের বিজয় উপলক্ষে রচিত হয়েছিল, সামবেদে এসে তা হয়ে উঠল সোমরস নিবেদনের এক সাধারণ সুরবাহক। কবিতার বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রাধান্য পেল তার যজ্ঞীয় উপযোগিতা। এই প্রক্রিয়াটি দেখায় যে বৈদিক সংস্কৃতির বিকাশের সাথে সাথে যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতা কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। সাহিত্য তখন আর কেবল প্রশংসাগীতি ছিল না, তা পরিণত হয়েছিল একটি জটিল পুরোহিততান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য উপাদানে (Bhattacharyya, 1975)।

পাঠভেদ ও ধ্বনিতাত্ত্বিক রূপান্তর (Textual Variants and Phonological Transformations)

ঋগ্বেদ এবং সামবেদের শ্লোকগুলোর তুলনামূলক পাঠ ভাষাতত্ত্বের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয়। একই শ্লোক উভয় সংহিতায় থাকা সত্ত্বেও তাদের পাঠ হুবহু এক নয়। বহু ক্ষেত্রে সামবেদের পাঠে এমন কিছু শব্দরূপ ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, যা ঋগ্বেদের প্রচলিত শাকল পাঠের চেয়েও বেশি প্রাচীন ও আঞ্চলিক উপভাষার চিহ্ন বহন করে। প্রাচ্যবিদরা ধারণা করেন, সামবেদ সংকলনের সময়ে হয়তো ঋগ্বেদের এমন কোনো প্রাচীন মৌখিক শাখা প্রচলিত ছিল, যা পরবর্তীতে ঋগ্বেদের প্রমিত সংহিতায় স্থান পায়নি। অর্থাৎ সামবেদ ঋগ্বেদের পাঠের একটি বিকল্প এবং সমান্তরাল ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করে (Renou, 1947)।

পাঠভেদের আরেকটি বড় কারণ হলো গানের স্বার্থে মূল শ্লোকের ধ্বনিকে ভেঙে ফেলা। কথ্য ভাষার ব্যাকরণ আর সংগীতের ব্যাকরণ কখনো এক হতে পারে না। গান গাওয়ার সময় স্বরবর্ণগুলোকে টেনে দীর্ঘ করার প্রয়োজন হতো, যাকে প্রাচীন বৈদিক ব্যাকরণে বলা হয়েছে প্লুতি (Pluti)। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুক্তব্যঞ্জনকে ভেঙে দুটি পৃথক অক্ষরে পরিণত করা হতো, যাতে উচ্চারণের সময় গলার স্বর আটকে না যায়। যেমন ঋগ্বেদের সহজ ‘অগ্নি’ শব্দটি সামগানে অনেক সময় ‘ওগ্নি’ বা ‘অগ্নায়ী’ রূপ ধারণ করত। শব্দের এই ধরনের সংগীতিক পরিবর্তনকে বলা হতো বিকার (Vikāra) বা সুরের প্রয়োজনে শব্দের রূপান্তর (Ghosh, 1938)।

কেবল শব্দের বিকৃতিই নয়, শব্দের অক্ষর বর্জন করা যাকে লোপ (Lopa) বলা হয়, কিংবা নতুন ধ্বনির সংযোজন যাকে আগম (Āgama) বলা হয়, সামগানে অহরহ ঘটত। ঋগ্বেদের যে চরণে হয়তো আটটি অক্ষর ছিল, সুরের টানে সেই চরণকে বারো বা চৌদ্দ অক্ষরের সমান দীর্ঘ করে তোলা হতো। এর ফলে কবিতার মূল ব্যাকরণগত বাঁধুনি অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়ত। পাণিনির মতো বৈয়াকরণরা এবং বিভিন্ন প্রাতিশাখ্য গ্রন্থের প্রণেতারা এই পরিবর্তনগুলোকে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তারা এগুলোকে কোনো অশুদ্ধি বা ভুল হিসেবে দেখেননি, বরং সংগীতের নিজস্ব নিয়ম বা ছন্দ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন (Ghosh, 1938)।

এই রূপান্তরগুলো পরিষ্কার করে দেয় যে সামবেদের পাঠ কেবল পড়ার বিষয় ছিল না, এটা ছিল পুরোপুরি শোনার বিষয়। লিখিত পুথির পাতায় সামবেদের যে রূপ দেখা যায়, তা আসলে সেই জীবন্ত সংগীতের একটি নির্দেশক সংকেতমাত্র। যজ্ঞের পুরোহিতরা যখন এই পাঠভেদগুলোকে কণ্ঠের সাহায্যে জীবন্ত করে তুলতেন, তখন তা ঋগ্বেদের পরিচিত শ্লোকগুলোকে এক অচেনা ও গম্ভীর মায়াজালে জড়িয়ে দিত। সুরের এই ধ্বনিতাত্ত্বিক স্বাধীনতা সামবেদকে ঋগ্বেদের কঠোর সাহিত্যিক শৃঙ্খলার ভেতর থেকেও এক নিজস্ব মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল (Renou, 1947)।

হোতা ও উদ্গাতার ভূমিকাভেদ এবং ব্যবহারিক স্বাতন্ত্র্য (Functional Differentiation of Hotṛ and Udgātṛ and Liturgical Independence)

বৈদিক যজ্ঞের বিশাল ও জটিল পরিসরে ঋগ্বেদ ও সামবেদের সম্পর্কটি জীবন্ত হয়ে উঠত দুজন প্রধান পুরোহিতের কাজের পার্থক্যের মধ্য দিয়ে। এই দুজন হলেন হোতা (Hotṛ) এবং উদ্গাতা (Udgātṛ)। এই দুই ব্যক্তিত্বের কাজের ক্ষেত্র, বসার স্থান এবং দায়িত্বের ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। হোতা ছিলেন ঋগ্বেদের প্রতিনিধি। তার দায়িত্ব ছিল দেবতাদের যজ্ঞে আহ্বান করা এবং নির্দিষ্ট ছন্দে তাদের স্তুতি আবৃত্তি করা। হোতার এই পাঠকে বলা হতো শস্ত্ৰ (Śastra)। শস্ত্র পাঠের নিয়ম ছিল তা সুরহীন কিন্তু গম্ভীর ও স্পষ্ট উচ্চারণে আবৃত্তি করতে হবে। হোতা কখনো গান গাইতেন না; তার কাজ ছিল শব্দের প্রতিটি ধ্বনিকে তার স্বাভাবিক ওজনে প্রকাশ করা (Minkowski, 1991)।

অন্যদিকে উদ্গাতা ছিলেন সামবেদের সর্বময় কর্তা। তার কাজের নাম ছিল স্তোত্র (Stotra) বা সামগান। উদ্গাতা একা কাজ করতেন না, তার সাথে থাকতেন আরও দুজন প্রধান সহযোগী – প্রাস্তোতা এবং প্রতিহর্তা। এই পুরো দলটি মিলে সমবেত কণ্ঠে বা কোরাসে গান গাইত। যজ্ঞের উত্তরবেদির পশ্চিমে হোতা যখন একা ধীরস্থিরভাবে বসে স্তোত্র আবৃত্তি করতেন, উদ্গাতারা তখন যজ্ঞশালার মধ্যবর্তী স্থান বা সদস নামক মণ্ডপে বসে সুরের জাল বুনতেন। স্তোত্র এবং শস্ত্রের এই যুগল মিলন ছাড়া কোনো বড় যজ্ঞ সফল হতে পারত না। সাধারণ নিয়ম ছিল, উদ্গাতারা প্রথমে স্তোত্র গাইবেন, আর সেই গানের শেষ সুর বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হোতা তার শস্ত্র পাঠ শুরু করবেন (Hillebrandt, 1897)।

এই ভূমিকাভেদ যজ্ঞে উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর দুই ধরনের সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলত। হোতার শস্ত্র পাঠ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্পষ্ট। সেখানে দেবতাদের যুদ্ধের কাহিনী, প্রাচীন ইতিহাস এবং যজমানের নির্দিষ্ট কামনার কথা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হতো। অন্যদিকে উদ্গাতার গান ছিল আবেগপূর্ণ এবং সম্মোহন সৃষ্টিকারী। গানের ভেতর স্তোভ ধ্বনির প্রাচুর্য এবং সুরের দীর্ঘ টান এক ধরনের অতিন্দ্রীয় আবহ তৈরি করত। যজ্ঞের জ্বলন্ত আগুন, সুগন্ধি ঘৃতের ধোঁয়া এবং সোমরসের আমেজের সাথে এই সামগান মিলেমিশে পরিবেশকে পার্থিব জগতের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেত (Bhattacharyya, 1975)।

ব্যবহারিক এই পার্থক্যের কারণে হোতা এবং উদ্গাতাদের সামাজিক ও শিক্ষাগত পরম্পরাও আলাদাভাবে গড়ে উঠেছিল। একজন দক্ষ হোতা চাইলেই উদ্গাতার দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না, কারণ তার জন্য প্রয়োজন হতো শৈশব থেকে কণ্ঠসাধনা, সুরের সূক্ষ্মতম তারতম্য বোঝার ক্ষমতা এবং আঙুলের মুদ্রার জটিল জ্ঞান। ঠিক তেমনই একজন উদ্গাতাও হোতার দায়িত্ব নিতেন না। এই সুনির্দিষ্ট শ্রমবিভাজন বৈদিক আচারব্যবস্থাকে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। ঋগ্বেদ ও সামবেদ তাই যজ্ঞের মঞ্চে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ ছিল না, বরং তারা ছিল একই নাটকের দুই প্রধান চরিত্র, যাদের একজনের দায়িত্ব ছিল সংলাপ প্রদান আর অন্যজনের কাজ ছিল সেই সংলাপে সুরের মূর্ছনা যোগ করা (Minkowski, 1991)।

মৌখিক ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যের মাত্রা: সাহিত্যিক নির্ভরতা বনাম সাংগীতিক সার্বভৌমত্ব (Oral Tradition and the Degree of Autonomy: Literary Dependence vs. Musical Sovereignty)

সামবেদ ও ঋগ্বেদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রাচীনকাল থেকেই পণ্ডিতদের আলোড়িত করেছে – সামবেদ কি কেবলি ঋগ্বেদের একটি পরজীবী শাখা, নাকি এর নিজস্ব কোনো শৈল্পিক সার্বভৌমত্ব আছে? ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, যে গ্রন্থের সিংহভাগ শ্লোক অন্য একটি সংকলন থেকে ধার করা, তার নিজস্ব গৌরব সীমিত। কিন্তু প্রাচীন বৈদিক তাত্ত্বিকদের দৃষ্টি দিয়ে দেখলে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়। সামবেদের স্বাতন্ত্র্য সাহিত্যের পাতায় নয়, তার স্বাতন্ত্র্য ছিল সংগীতের স্বশাসিত ভুবনে (Sharma, 1965)।

প্রাচীন ভারতীয় সংগীতশাস্ত্রে সুর বা সামের নিজস্ব নাম, কুল এবং চরিত্র কল্পনা করা হয়েছিল। এই সুরগুলোর নাম ছিল রথন্তর (Rathantara), বৃহৎ (Bṛhat), বৈরূপ (Vairūpa), বৈরাজ (Vairāja) ইত্যাদি। এই সুরগুলো ছিল একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সাংগীতিক সত্তা। বৈদিক পুরোহিতদের কাছে সুরটিই ছিল আসল উপাদান, আর শ্লোকটি ছিল সেই সুরকে ধারণ করার একটি আধার মাত্র। একটি নির্দিষ্ট সুরকে প্রয়োজন অনুসারে ঋগ্বেদের ভিন্ন ভিন্ন শ্লোকের ওপর বসিয়ে পরিবেশন করা যেত। সুরের এই স্বাধীনতা এবং স্থানান্তরযোগ্যতা পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয় যে সাম শ্লোকের অধীন ছিল না, বরং শ্লোকই সামের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো (Dandekar, 1979)।

মৌখিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণের দিক থেকেও সামবেদের ধারাটি ছিল ঋগ্বেদের চেয়ে অনেক বেশি শ্রমসাধ্য ও জটিল। ঋগ্বেদের পদপাঠ বা জটাপাঠের মাধ্যমে শব্দের অর্থ ও গঠনকে নিখুঁতভাবে রক্ষা করা যেত। কিন্তু সামবেদের ক্ষেত্রে সুরের অতি সূক্ষ্ম ওঠানামা, গলার কম্পন এবং সুরের শ্বাসপ্রশ্বাসকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছিল কোনো আধুনিক রেকর্ডিং ব্যবস্থা ছাড়াই। গুরু যখন শিষ্যের কানে মুখ রেখে সুরটি শিখিয়ে দিতেন, তখন তা ছিল এক অত্যন্ত গোপন ও পবিত্র কলাবিদ্যার আদান-প্রদান। কোনো কারণে সাহিত্যের পাঠ বিকৃত হলে তা অন্য শাখা দেখে মিলিয়ে নেওয়া যেত, কিন্তু একটি সুরের ঐতিহ্য একবার হারিয়ে গেলে তা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেত (Sharma, 1965)।

সব দিক মিলিয়ে দেখলে এটা পরিষ্কার হয় যে সামবেদ ও ঋগ্বেদের সম্পর্কটি ছিল সাহিত্যের সাথে সুরের এক ঐতিহাসিক বোঝাপড়া। ঋগ্বেদ যদি বৈদিক চিন্তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে থাকে, তবে সামবেদ সেই চিন্তাকে সুরের ডানায় ভাসিয়ে অনন্তের দিকে মেলে ধরেছিল। ঋগ্বেদের ভাষা ছিল মানুষের মনের সচেতন কাব্যিক রূপ, আর সামবেদের সুর ছিল সেই অনুভূতির প্রকাশ যা সাধারণ শব্দের সীমানায় পুরোপুরি ধরা দেয় না। এই দুটি ধারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেই প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার সংগীত ও সাহিত্যের মহীরূহকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, যেখানে সাহিত্যের বিষয়বস্তু এসে পরম নির্ভরতায় সমর্পণ করেছিল সুরের সার্বভৌম ক্ষমতার কাছে (Renou, 1947)।

সামগান ও বৈদিক সংগীত (Sāman Chant and Vedic Music): সুর, স্বর, স্তোভ ও গায়নপদ্ধতি

বৈদিক সংগীতে সামগানের স্থান ও ধ্বনিতত্ত্বের বিবর্তন (Place of Sāman Chant in Vedic Music and Evolution of Phonetics)

বৈদিক সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারায় সামগান নিছক কোনো ধর্মীয় সুর ছিল না, এটা ছিল প্রাচীন ভারতীয় সংগীততত্ত্বের প্রথম সুসংহত ভিত্তিপ্রস্তর। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলো যখন পাঠ করা হতো, তখন সেখানে সুরের চেয়ে উচ্চারণের স্বরভঙ্গি বা সুরবৈচিত্র্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই পাঠপদ্ধতি মূলত তিনটি ধ্বনিতাত্ত্বিক স্বরের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল – উদাত্ত (Udātta) বা উচ্চ স্বর, অনুদাত্ত (Anudātta) বা নিম্ন স্বর এবং স্বরিত (Svarita) বা মধ্যবর্তী মিশ্র স্বর। এই তিনটি স্বর কিন্তু আধুনিক সংগীতের সুরের স্কেল নয়, বরং এগুলো ছিল ব্যাকরণগত বা ভাষাতাত্ত্বিক স্বরাঘাত। মানুষের মুখের স্বাভাবিক কথার ভেতর যে স্বরের ওঠানামা থাকে, ঋগ্বেদের পাঠ ছিল তারই এক মার্জিত রূপ। কিন্তু যজ্ঞের আনুষ্ঠানিকতা যখন জটিল আকার ধারণ করল, তখন কেবল কথার এই তিন স্তরের ওঠানামা দিয়ে সুরের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না (Rowell, 1992)।

এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার প্রয়াস থেকেই সামগানের জন্ম। সামবেদের সুরকাররা ভাষার কথ্য স্বরাঘাতকে সংগীতের নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক বা পিচে রূপান্তর করার এক অসাধারণ কৌশল আবিষ্কার করলেন। কথার স্বর যেখানে ব্যাকরণের নিয়মে বাঁধা, গানের স্বর সেখানে সংগীতের নিজস্ব নিয়মে ডানা মেলতে শুরু করল। উদাত্ত, অনুদাত্ত এবং স্বরিতের এই ত্রিভুজ কাঠামো ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে বহুস্বরের এক সুশৃঙ্খল বিন্যাসে রূপ নিল। ভাষার প্রতিটি সিলেবল বা অক্ষরকে সুরের নির্দিষ্ট মাত্রায় ধরে রাখার পদ্ধতি চালু হলো। প্রাচীন ভারতে এই রূপান্তরটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই শব্দ তার নিছক অভিধানগত অর্থ ছাপিয়ে এক বিশুদ্ধ সাংগীতিক ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়েছিল (Lath, 1978)।

যজ্ঞের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট এই সাংগীতিক বিবর্তনকে আরও দ্রুততর করেছিল। খোলা আকাশের নিচে যজ্ঞকুণ্ডের পাশে শত শত মানুষের সমাগমে কেবল মন্ত্র পাঠ অনেক সময় তার গম্ভীর আবেদন হারিয়ে ফেলত। সেখানে প্রয়োজন ছিল এমন এক পরিবেশ যা মানুষের স্নায়ুকে আলোড়িত করতে পারে। সামগানের দীর্ঘ তান, সমবেত কণ্ঠের অনুরণন এবং সুরের বিস্তার যজ্ঞশালাকে সাধারণ জাগতিক প্রাঙ্গণ থেকে আলাদা করে এক অন্য জগতে রূপান্তরিত করত। প্রাচীন সংগীত বিশারদরা লক্ষ্য করেছিলেন যে সুরের একটি নির্দিষ্ট আকর্ষণ ক্ষমতা রয়েছে, যা অচেতনভাবেই মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। পুরোহিতরা এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি অনুধাবন করে সামগানকে যজ্ঞের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছিলেন (Nijenhuis, 1974)।

ধ্বনিতত্ত্বের বিচারে সামগান মানবকণ্ঠের সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। ফুসফুস থেকে বাতাস বের হয়ে কীভাবে কণ্ঠনালী, তালু, জিভ এবং ঠোঁটের সাহায্যে সুরের বিভিন্ন রূপ তৈরি করে, বৈদিক ঋষিরা তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সামগানের চর্চা শুরু হওয়ার সাথে সাথে উচ্চারণের স্পষ্টতা এবং সুরের শুদ্ধতার ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছিল, তা থেকেই পরবর্তীতে ভারতের প্রাচীন ধ্বনিবিজ্ঞান বা শিক্ষাগ্রন্থগুলোর জন্ম হয়েছিল। ভাষার ব্যাকরণ এবং সংগীতের সুর যে একে অপরের হাত ধরে বিকশিত হতে পারে, প্রাচীন বিশ্বে সামগানই ছিল তার সবচেয়ে চমৎকার ঐতিহাসিক নিদর্শন (Rowell, 1992)।

স্বর ও সপ্তস্বরের ধারণা: অবরোহী স্কেল ও স্বরগ্রাম (The Concepts of Svara and the Seven Notes: Descending Scale and Gamut)

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে সাতটি স্বর বা সপ্তস্বর (Saptasvara)-এর যে চেনা ধারণা আজ প্রচলিত রয়েছে, তার আদি উৎস লুকিয়ে আছে সামবেদের সুরপদ্ধতিতে। তবে আধুনিক ভারতীয় মার্গসংগীতের স্বরগ্রামের সাথে বৈদিক স্বরগ্রামের একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। আধুনিক রাগসংগীতের স্কেল হলো আরোহী বা নিচ থেকে ওপরের দিকে ওঠা, যা ষড়্‌জ বা ‘সা’ থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে তার সপ্তকের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু সামগানের স্বরগ্রামটি ছিল সম্পূর্ণভাবে অবরোহী বা ওপর থেকে নিচের দিকে নামা। অর্থাৎ গান শুরু হতো সর্বোচ্চ স্বর থেকে এবং ধাপে ধাপে তা খাদের বা নিচের স্বরের দিকে নেমে আসত। প্রাচীন পৃথিবীর বহু আদিম সংগীতধারাতেই এই অবরোহী পদ্ধতির প্রাধান্য দেখা যায়, যার পেছনে মানুষের স্বাভাবিক নিঃশ্বাস ত্যাগের শারীরবৃত্তীয় গতি যুক্ত ছিল (Kaufmann, 1975)।

সামগানের এই সাতটি স্বরের প্রাচীন নামগুলো ছিল সংখ্যামূলক এবং অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। সর্বোচ্চ স্বরটিকে বলা হতো কৃষ্ট (Kruṣṭa), যার অর্থ ছিল উচ্চকিত বা সবচেয়ে চড়া সুর। এরপর পর্যায়ক্রমে নিচে নেমে আসা স্বরগুলোর নাম ছিল প্রথম (Prathama), দ্বিতীয় (Dvitīya), তৃতীয় (Tṛtīya), চতুর্থ (Caturtha), মন্দ্র (Mandra) এবং সর্বনিম্ন স্বরটির নাম ছিল অতিস্বার্য (Atisvārya)। এই নামকরণের পদ্ধতি প্রমাণ করে যে সুরকে তখনো কোনো কাল্পনিক প্রাণীর ডাকের সাথে মেলানো হয়নি, বরং গাণিতিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিতে সুরের উচ্চতা ও অবস্থানকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। একজন দক্ষ সামগায়ক জানতেন কীভাবে কৃষ্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপ স্পর্শ করে ধীরে ধীরে অতিস্বার্যে নেমে আসতে হয় (Felber, 1912)।

পরবর্তীকালে সংগীতের তাত্ত্বিক বিকাশের যুগে এই বৈদিক স্বরগুলোর সাথে ধ্রুপদী সপ্তস্বরের এক ধরনের সমীকরণ তৈরি করা হয়েছিল। যেমন নারদীয় শিক্ষা নামক প্রাচীন সংগীতগ্রন্থে দাবি করা হয় যে সামবেদের প্রথম স্বরটিই হলো ধ্রুপদী সংগীতের মধ্যম, দ্বিতীয় স্বরটি গান্ধার, তৃতীয় স্বরটি ঋষভ, চতুর্থটি ষড়্‌জ, মন্দ্র হলো ধৈবত এবং অতিস্বার্য হলো নিষাদ। এই রূপান্তরটি নির্দেশ করে যে বৈদিক সুরপদ্ধতি কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিবর্তিত হয়ে শেষ পর্যন্ত মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ভারতীয় সংগীতের স্বরগ্রামে রূপ নিয়েছিল। তবে বৈদিক যুগে এই স্বরগুলো আধুনিক সুরের মতো একক কোনো বিন্দুতে স্থির থাকত না, বরং এগুলো ছিল এক ধরনের স্বরপরিসীমা বা সুরের ঢেউ (Nijenhuis, 1974)।

স্বরগ্রামের এই বিন্যাস রক্ষা করার জন্য গায়কদের বছরের পর বছর ধরে কঠিন কণ্ঠসাধনা করতে হতো। যজ্ঞের সময়ে সুরের স্কেল থেকে সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে তা গুরুতর ত্রুটি হিসেবে গণ্য হতো। বৈদিক শিক্ষানবিসরা সুরের এই সাতটি ধাপকে এমনভাবে কণ্ঠস্থ করতেন যাতে যে কোনো পরিস্থিতিতে তারা নিখুঁত কম্পাঙ্কে গান গাইতে পারেন। এই অবরোহী সুরপ্রবাহ যজ্ঞের গম্ভীর পরিবেশের সাথে এক অদ্ভুত সংগতি তৈরি করত। উঁচু থেকে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে নিচের দিকে নেমে আসা সুর মানুষের মনের ভেতরের অস্থিরতাকে প্রশমিত করে এক ধরনের নিস্তব্ধতা তৈরি করতে পারত, যা ছিল প্রাচীন বৈদিক ধ্যানধারণার সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ (Kaufmann, 1975)।

স্তোভ ও বাচনিক রূপান্তর: সুরের জন্য শব্দের পুনর্নির্মাণ (Stobha and Verbal Transformation: Reconstructing Words for Melody)

সামগানের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যটি হলো এর স্তোভ (Stobha) ব্যবস্থা। সাধারণ ভাষায় স্তোভ বলতে বোঝায় এমন কিছু অতিরিক্ত ধ্বনি বা শব্দাংশ, যা মূল ঋগ্বেদীয় কবিতায় ছিল না কিন্তু সুরের প্রয়োজনে গানের মধ্যে বাইরে থেকে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। সংগীতের ক্ষেত্রে কথার চেয়ে সুর যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন শব্দের কাঠামো ভেঙে নতুন ধ্বনির জন্ম দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আধুনিক জ্যাজ সংগীতে যেমন অর্থহীন সিলেবল দিয়ে স্কাট সিঙ্গিং করা হয়, প্রাচীন বৈদিক সামগানে স্তোভের ভূমিকা ছিল অনেকটা তেমনই। এগুলো ছিল সুরের সহায়ক তান এবং অলঙ্কার (Rowell, 1992)।

স্তোভের ধ্বনিগুলো বিচিত্র রূপ নিয়ে গানে প্রবেশ করত। যেমন কোনো শ্লোকের চরণের মাঝে হঠাৎ যুক্ত হতো “হা-উ”, “হো-ই”, “হুবা”, “হুম” কিংবা “আ-ই-ই”-এর মতো ধ্বনিখণ্ড। স্তোভগুলো কেবল অর্থহীন ধ্বনি ছিল না, অনেক ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবাহী শব্দ যেমন ‘সত্য’, ‘জ্যোতি’ কিংবা দেবতার নামকেও স্তোভ হিসেবে সুরের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দেওয়া হতো। এই স্তোভগুলোর প্রধান কাজ ছিল দুটি সুরের সংযোগ তৈরি করা, কোনো সুরকে দীর্ঘায়িত করার সময় গায়কের শ্বাস ধরে রাখতে সাহায্য করা এবং গানের ভেতর একটি নির্দিষ্ট ছন্দস্পন্দন তৈরি করা। স্তোভ ছাড়া জটিল সামগান পরিবেশন করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল (Simon, 1908)।

সুরের স্বার্থে কবিতার শব্দগুলোকে যে প্রক্রিয়ায় ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা হতো, প্রাচীন তাত্ত্বিকরা তাকে ছয়টি ভাগে ভাগ করে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথমত ছিল বিকার (Vikāra) বা শব্দের অক্ষরের পরিবর্তন, যেখানে ‘অগ্নি’ হয়ে যেত ‘ওগ্নায়ী’। দ্বিতীয়ত ছিল বিশ্লেষণ (Viśleṣaṇa) বা যুক্তবর্ণকে ভেঙে পৃথক করা, যেমন ‘জ্যোতি’ শব্দকে ভেঙে ‘জ্যো-ই-তি’ করা হতো। তৃতীয়ত ছিল বিকর্ষণ (Vikarṣaṇa) বা হ্রস্ব স্বরকে টেনে লম্বা করা। চতুর্থত ছিল অভ্যাস (Abhyāsa) বা একই পদের বারবার পুনরাবৃত্তি। পঞ্চমত ছিল বিরাম (Virāma) বা শব্দের মাঝখানে অযাচিতভাবে সুরের প্রয়োজনে থামা। এবং ষষ্ঠত ছিল এই স্তোভের সংযোজন (Rowell, 1992)।

এই ব্যাপক রূপান্তরের ফলে ঋগ্বেদের মূল স্তোত্রটি সামগানের ভেতর এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে যেত যে কোনো সাধারণ শ্রোতার পক্ষে সেই শ্লোকের মূল অর্থ উদ্ধার করা দুঃসাধ্য ছিল। কবিতার ব্যাকরণ এখানে সংগীতের প্রয়োজনের কাছে সম্পূর্ণ নতিস্বীকার করেছিল। ভাষাভাষী পণ্ডিতদের কাছে এটি মনে হতে পারে বিকৃতি, কিন্তু সংগীততত্ত্বের দৃষ্টিতে এটি ছিল ভাষার ওপর সুরের এক চরম সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা। শব্দ এখানে কোনো দার্শনিক বার্তার বাহক নয়, শব্দ এখানে সুরের তরঙ্গে দোলা লাগানোর এক নিছক উপাদান। বৈদিক সংগীতকাররা এইভাবে কবিতাকে সংগীতে রূপান্তর করার এক অভিনব পথ তৈরি করেছিলেন যা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে বিরল (Simon, 1908)।

সামগানের পঞ্চবিধ ও সপ্তবিধ বিভাগ: পরিবেশনশৈলীর স্থাপত্য (Fivefold and Sevenfold Divisions of Sāman: Architecture of Performance Practice)

একটি পূর্ণাঙ্গ সামগান পরিবেশনের কাঠামো ছিল অত্যন্ত স্থাপত্যসুলভ ও সুপরিকল্পিত। এটি কোনো একক শিল্পীর খেয়ালখুশিমতো গান ছিল না, বরং তা ছিল একাধিক পুরোহিতের দলগত এক সুসংহত পরিবেশনা। এই কাঠামোকে বলা হতো ভক্তি (Bhakti) বা বিভাগ। যজ্ঞের প্রকৃতি অনুযায়ী সামগানকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হতো, যাকে বলা হয় পঞ্চবিধ সাম (Pañcavidha Sāman)। আরও জটিল ও বৃহৎ যজ্ঞে এই পাঁচটি ভাগের সাথে আরও দুটি অতিরিক্ত অংশ যুক্ত হয়ে তৈরি হতো সপ্তবিধ সাম (Saptavidha Sāman)। এই কাঠামোগত শৃঙ্খলা গানের ভেতর এক ধরনের ভারসাম্য ও নাটকীয়তা এনে দিত (Simon, 1908)।

পঞ্চবিধ বিভাগের প্রথম অংশটিকে বলা হতো প্রস্তাব (Prastāva)। এটি ছিল গানের সূচনা বা ভূমিকা। এই অংশটি গাইতেন প্রাস্তোতা নামক সহকারী পুরোহিত। তিনি ‘হুম’ ধ্বনি দিয়ে অত্যন্ত ধীর ও মৃদু স্বরে গানটি শুরু করতেন এবং মূল সুরের একটি প্রাথমিক আভাস দিতেন। প্রস্তাব শেষ হওয়ার সাথে সাথে শুরু হতো দ্বিতীয় পর্ব, যার নাম উদ্গীথ (Udgītha)। এটি ছিল পুরো সামগানের প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উদ্গীথ পরিবেশন করতেন প্রধান পুরোহিত উদ্গাতা। তিনি পবিত্র ‘ওঁ’ বা প্রণব উচ্চারণ করে মূল সুরটিকে তার সমস্ত সৌন্দর্য ও শক্তি নিয়ে বিস্তার করতেন। উদ্গীথের সুর ছিল দীর্ঘ, গম্ভীর এবং স্বরগ্রামের সর্বোচ্চ স্তরগুলোকে স্পর্শকারী (Felber, 1912)।

উদ্গীথের পর আসত তৃতীয় পর্ব, যার নাম প্রতীহার (Pratihāra)। এই অংশটি গাইতেন প্রতিহর্তা নামক তৃতীয় পুরোহিত। প্রতীহার শব্দের অর্থ হলো পুনরায় ধারণ করা বা ফিরিয়ে আনা। উদ্গাতা যেখানে গান থামাতেন, প্রতিহর্তা সেখান থেকে সুরটি লুফে নিতেন এবং মধ্যম স্বরে গানটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতেন। চতুর্থ পর্বটির নাম ছিল উপদ্রব (Upadrava)। এই অংশে প্রধান উদ্গাতা পুনরায় দ্রুত লয়ে গান গাইতেন, যা সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করত। সর্বশেষ এবং পঞ্চম পর্বটিকে বলা হতো নিধন (Nidhana)। এটি ছিল গানের সমাপ্তি বা কোডা। নিধনের বিশেষত্ব হলো, এই অংশে প্রাস্তোতা, উদ্গাতা, প্রতিহর্তা এবং স্বয়ং যজমান একত্র হয়ে সমবেত কণ্ঠে একটি নির্দিষ্ট স্বরে সুরটি শেষ করতেন (Rowell, 1992)।

সপ্তবিধ সামে এই পাঁচটি মূল ভাগের সাথে শুরুতে যুক্ত হতো হিঙ্কার (Hiṅkāra) এবং উদ্গীথের ঠিক পূর্বে বসানো হতো প্রণব (Praṇava) বা ‘ওঁকার’। হিঙ্কার হলো একটি বিশেষ নাসিক্য ধ্বনি, যা গায়করা গলা খাঁকারির মতো করে সম্মিলিতভাবে উচ্চারণ করতেন সুর বাঁধার জন্য। এই পঞ্চবিধ বা সপ্তবিধ কাঠামোর দিকে তাকালে বোঝা যায় যে প্রাচীন সামগান আসলে ছিল এক ধরনের আদিম অর্কেস্ট্রা বা কোরাল মিউজিক। এককের সাথে সমবেতের যে চমৎকার আদান-প্রদান এখানে তৈরি হয়েছিল, তা সংগীত পরিবেশনাকে এক অবিশ্বাস্য গতিশীলতা দান করত। সুরের এই পরিকল্পিত বিন্যাস আধুনিক যুগের যেকোনো শাস্ত্রীয় সিম্ফনির কাঠামোগত জটিলতাকে স্মরণ করিয়ে দেয় (Felber, 1912)।

শারীরিক ভঙ্গি, স্বরলিপি ও হস্তমুদ্রার ব্যবহার (Bodily Gestures, Notation, and Use of Hand Mudrās)

প্রাচীন ভারতে যখন কোনো সাউন্ড রেকর্ডিং প্রযুক্তি ছিল না, তখন কীভাবে শত শত সুরের এই সূক্ষ্ম পার্থক্য যুগ যুগ ধরে অপরিবর্তিত রাখা সম্ভব হয়েছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সামগানের শারীরিক ও দৃষ্টিগ্রাহ্য কৌশলের ভেতর। সামগান কেবল কণ্ঠের অনুশীলন ছিল না, এর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিল শরীরের মুদ্রা ও হাতের আঙুলের সংকেত। এই পদ্ধতিকে আধুনিক সংগীতবিজ্ঞানে কাইরোনোমি (Cheironomy) বলা হয়। গানের প্রতিটি স্বরের উত্থান-পতনের সাথে সাথে গায়কের হাত ও আঙুলগুলো একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশায় নড়াচড়া করত, যা দেখে শিষ্যরা সুরের অবস্থান নির্ভুলভাবে বুঝতে পারত (Kaufmann, 1975)।

গান গাওয়ার সময় উদ্গাতারা সাধারণত তাদের ডান হাতটি ব্যবহার করতেন। হাতের চেটো সামনের দিকে মেলে ধরে বৃদ্ধাঙ্গুলির ডগা দিয়ে তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা বা কনিষ্ঠার বিভিন্ন পর্ব স্পর্শ করা হতো। প্রথম স্বরের জন্য তর্জনীর মধ্যভাগ, দ্বিতীয় স্বরের জন্য তর্জনীর ডগা, তৃতীয় স্বরের জন্য মধ্যমার ডগা – এভাবে প্রতিটি স্বরের জন্য সুনির্দিষ্ট স্পর্শবিন্দু নির্ধারিত ছিল। এর সাথে যুক্ত ছিল মাথা ও চোখের সূক্ষ্ম ভঙ্গি। স্বর যখন চড়ার দিকে উঠত, গায়কের হাত কিছুটা উপরে উঠত; স্বর যখন খাদে নামত, হাতও নেমে আসত নিচের দিকে। এই শারীরিক মুদ্রাগুলো আসলে ছিল বাতাসের বুকে সুরকে এঁকে দেওয়ার এক জীবন্ত দৃশ্যমান স্বরলিপি (Felber, 1912)।

এর পাশাপাশি পুথিপত্রে সুর সংরক্ষণের জন্য তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম সংখ্যাসূচক স্বরলিপি ব্যবস্থা। সামবেদের বিভিন্ন শাখার পুথিতে দেখা যায়, মূল শ্লোকের অক্ষরের ঠিক ওপরে এক, দুই, তিন, চার ইত্যাদি সংখ্যা ছোট করে লিখে দেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো দিয়ে স্বরের অবস্থান নির্দেশ করা হতো। কোথাও সংখ্যার পাশে কিছু বিশেষ চিহ্ন বা বর্ণ যেমন ‘র’ (হ্রস্ব বোঝাতে) বা ‘উ’ (উচ্চ বোঝাতে) যোগ করে সুরের গতি নির্দেশ করা হতো। তবে প্রাচীন শিক্ষকরা জানতেন যে কেবল কাগজের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে সংগীত বাঁচিয়ে রাখা যায় না। তাই তারা পুথির চেয়ে হাতের মুদ্রা এবং গুরুর সরাসরি কণ্ঠের অনুসরণের ওপরই বেশি জোর দিতেন (Rowell, 1992)।

স্মৃতিকে নিখুঁত রাখার এই যৌথ পদ্ধতি বৈদিক সমাজের এক অবিশ্বাস্য বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন ছিল। কান দিয়ে সুর শোনা এবং চোখ দিয়ে হাতের আঙুলের সংকেত দেখা – এই দ্বিমুখী সংবেদনশীলতার কারণে একজন শিষ্যের পক্ষে সুর ভুলে যাওয়া বা ভুল সুর লাগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। সুরের কোনো লিখিত নোটেশন যদি কোনোকালে নষ্টও হয়ে যেত, গায়কদের পেশির স্মৃতিতে সেই সুর অক্ষত থেকে যেত। মানবশরীরকে সংগীতের এক কার্যকর সংরক্ষক হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রাচীন পদ্ধতিটি দেখায় যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনুপস্থিতিতেও মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কতটা বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছিল (Kaufmann, 1975)।

ভারতীয় মার্গসংগীতের ভিত্তি হিসেবে সামগান: ঐতিহাসিক রূপরেখা (Sāman Chant as the Foundation of Indian Classical Music: Historical Outline)

সামগান বৈদিক যজ্ঞের গণ্ডির ভেতর চিরকাল আবদ্ধ থাকেনি। কালের বিবর্তনে এই যজ্ঞীয় সুরপ্রবাহই রূপান্তরিত হয়েছিল প্রাচীন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও নান্দনিক সংগীতের মূল ধারায়। বৈদিক যুগের শেষভাগে যখন যজ্ঞের কড়াকড়ি ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে, তখন সামগানের স্বর ও সুরপদ্ধতি লোকায়ত সংগীতের সাথে মিশে এক নতুন রূপ লাভ করে, যাকে বলা হতো গান্ধর্ব সংগীত (Gāndharva Music)। ভরত মুনির বিখ্যাত নাট্যশাস্ত্র (Nāṭyaśāstra) এবং দত্তিলেয়র দত্তিলম (Dattilam) গ্রন্থে যে সংগীততত্ত্বের বিবরণ পাওয়া যায়, তার নাড়ির টান সরাসরি এই সামবেদের সুরপরম্পরার সাথেই যুক্ত ছিল (Lath, 1978)।

সামগানের অবরোহী সপ্তস্বর থেকেই কালক্রমে জন্ম নিয়েছিল ভারতীয় সংগীতের মূল দুই গ্রাম – ষড়্‌জ গ্রাম এবং মধ্যম গ্রাম। বৈদিক সাহিত্যের অতিস্বার্য থেকে কৃষ্ট পর্যন্ত বিস্তৃত সুরগুলো ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়েছিল আমাদের পরিচিত সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-তে। প্রাচীন শাস্ত্রকাররা অকপটে স্বীকার করেছেন যে সংগীতের উপাদান সামবেদ থেকেই সংগৃহীত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নাট্যশাস্ত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে ব্রহ্মা ঋগ্বেদ থেকে পাঠ্য বা সংলাপ, সামবেদ থেকে গান বা সুর, যজুর্বেদ থেকে অভিনয় এবং অথর্ববেদ থেকে রস গ্রহণ করে নাট্যবেদ তৈরি করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সংগীতের আদি উৎস হিসেবে সামবেদের স্থান ছিল প্রশ্নাতীত (Widdess, 1995)।

কেবল স্বরগ্রামই নয়, সামগানের বিভিন্ন সুরকাঠামো বা সামগুলোর ভেতর থেকেই পরবর্তীতে প্রাথমিক রাগগুলোর আদি রূপ বা জাতির উন্মেষ ঘটেছিল। বৃহদ্দেশী গ্রন্থে মাতঙ্গ মুনি যখন লোকসংগীত ও মার্গসংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে রাগের আধুনিক সংজ্ঞায়ন করছিলেন, তখনও সামগানের সেই প্রাচীন সুরবিন্যাসগুলো এক ধরনের তাত্ত্বিক আদর্শ হিসেবে কাজ করেছিল। সামগানে যেভাবে নির্দিষ্ট কিছু অলঙ্কার, যেমন কম্পন, গিটকিরি বা তান ব্যবহৃত হতো, সেগুলোর পরিশীলিত রূপই পরবর্তীতে ধ্রুপদ ও খেয়াল সংগীতের গায়কীতে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল। সুরের ওপর তালের কঠোর শাসন এবং মাত্রার নিখুঁত হিসাবও সামগানের পরিবেশনপদ্ধতি থেকেই ধার করা হয়েছিল (Lath, 1978)।

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামগান ছিল ভারতীয় সংগীতের সেই আদি গঙ্গার মতো, যা হিমালয়ের যজ্ঞশালা থেকে নেমে এসে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমতলের সংস্কৃতিকে প্লাবিত করেছিল। এটি একদিকে যেমন মানুষের আধ্যাত্মিক ও যজ্ঞীয় আকাঙ্ক্ষাকে সুরে প্রকাশ করেছিল, তেমনই অন্যদিকে গড়ে তুলেছিল এক গভীর বিজ্ঞানসম্মত সংগীতপদ্ধতি। সুরের শুদ্ধতা রক্ষা করার যে কঠোর তপস্যা বৈদিক গায়করা শুরু করেছিলেন, সেই তপস্যার ফলই আজকের ভারতীয় মার্গসংগীতের বৈচিত্র্যময় বিস্তার। সামগান তাই কেবল একটি বিশেষ যুগের গান নয়, এটি সমগ্র ভারতীয় সংগীতের চেতনার এক অমর ও অক্ষয় ভিত্তি (Widdess, 1995)।

সামবেদের যজ্ঞ ও পুরোহিততন্ত্র (Ritual and Priesthood of the Sāmaveda): উদ্গাতা, সোমযাগ ও সংগীতানুষ্ঠান

উদ্গাতা ও সামবেদীয় পুরোহিতমণ্ডলীর সাংগঠনিক কাঠামো (Structural Hierarchy of Udgātṛ and the Sāmavedic Priesthood)

প্রাচীন বৈদিক শ্রৌতযজ্ঞ কোনো একক ব্যক্তির প্রার্থনা ছিল না, এটা ছিল শ্রম, দক্ষতা এবং সামাজিক মর্যাদার অত্যন্ত সুবিন্যস্ত এক যৌথ কর্মকাণ্ড। একটি পূর্ণাঙ্গ সোমযাগ পরিচালনা করার জন্য চারটি প্রধান পুরোহিত শ্রেণি মিলিয়ে মোট ষোলজন ঋত্বিকের প্রয়োজন হতো। এই ষোলজনের মধ্যে সামবেদের প্রতিনিধিত্ব করতেন যে চারজন পুরোহিত, তাদের পুরো দলটিকে প্রাচীন পরিভাষায় বলা হতো উদ্গাতৃবর্গ (Udgātṛvarga)। এই দলের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করতেন উদ্গাতা (Udgātṛ)। উদ্গাতা কোনো সাধারণ স্তোত্রপাঠক ছিলেন না, তিনি ছিলেন যজ্ঞশালার প্রধান সংগীত পরিচালক। ঋগ্বেদীয় হোতা যেখানে মন্ত্রের উচ্চারণের স্পষ্টতা এবং কাব্যিক শুদ্ধতার দিকে খেয়াল রাখতেন, উদ্গাতাকে সেখানে স্বরের বিস্তার, সুরের কম্পাঙ্ক এবং গভীর সংগীততাত্ত্বিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হতো। তার সামান্যতম সুরচ্যুতি পুরো যজ্ঞের আচারিক লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে যাজ্ঞিক সমাজে বিশ্বাস করা হতো (Thite, 1975)।

উদ্গাতা একা এই জটিল সংগীতানুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারতেন না, তার অধীনে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতেন তিনজন সহকারী পুরোহিত। এই তিনজনের প্রথমজন হলেন প্রাস্তোতা (Prastotṛ)। প্রাস্তোতার প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল প্রতিটি সামগানের সূচনা করা। তিনি ‘হুম’ ধ্বনি উচ্চারণ করে সংগীতের মুখবন্ধ রচনা করতেন এবং মূল সুরের একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করে দিতেন। যজ্ঞের ব্যস্ত মুহূর্তগুলোতে অধ্বর্যুর গতিবিধির সাথে তাল মিলিয়ে প্রাস্তোতাকে গানের মুহূর্ত নির্বাচন করতে হতো। যজ্ঞে ব্যবহৃত আগুনের উত্তাপ এবং ধোঁয়ার মধ্যেও নিজের গলার স্বরকে ঠিক রেখে সংগীতের ভিত্তি স্থাপন করার জন্য প্রাস্তোতাকে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিতে হতো। তিনি ছিলেন মূলত পুরো সংগীতানুষ্ঠানের সুরের প্রবেশদ্বার (Sen, 1978)।

সামবেদীয় দলের দ্বিতীয় সহকারী পুরোহিত ছিলেন প্রতিহর্তা (Pratihartṛ)। তার কাজের পরিধি ছিল আরও সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। প্রতিহর্তার দায়িত্ব ছিল গানের মধ্যবর্তী অংশ বা প্রতীহার পরিবেশন করা। উদ্গাতা যখন সুরের সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ করে শ্বাস নেওয়ার জন্য কিংবা পরবর্তী সুরের প্রস্তুতির জন্য ক্ষণিকের বিরতি নিতেন, প্রতিহর্তা ঠিক সেই শূন্যস্থানটিতে নিজের কণ্ঠ স্থাপন করতেন। সুরের ধারাবাহিকতা যাতে এক মুহূর্তের জন্যও ছিন্ন না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই ছিল তার প্রধান কাজ। প্রাচীন বৈদিক ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, প্রতিহর্তা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি যজ্ঞের সংগীতকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করেন। তার সতর্ক উপস্থিতি ছাড়া কোনো বহুকণ্ঠী সামগান সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল না (Caland & Henry, 1906)।

এই দলের চতুর্থ সদস্যটির ভূমিকা ছিল কিছুটা ভিন্নধর্মী এবং বেশ নাটকীয়। তাকে ডাকা হতো সুব্রহ্মণ্য (Subrahmaṇya) নামে। তিনি সরাসরি সদস মণ্ডপের ভেতরে বসে দলগত সংগীতে অংশ নিতেন না, বরং যজ্ঞশালার বাইরে এসে উদাত্ত কণ্ঠে দেবতাদের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাতেন। বিশেষ করে ইন্দ্রকে সোমপানের জন্য আহ্বান জানানোর সময় তিনি এক বিশেষ ছন্দোবদ্ধ গদ্যবাক্য উচ্চৈঃস্বরে উচ্চারণ করতেন, যাকে বলা হতো সুব্রহ্মণ্যা নিগদ। তার সেই দূরপ্রসারী কণ্ঠস্বর পুরো যজ্ঞপ্রাঙ্গণ পেরিয়ে চারণভূমিতে ছড়িয়ে পড়ত। এই চারজন পুরোহিতের পরস্পরের প্রতি নির্ভশীলতা এবং কঠোর পদমর্যাদাক্রম প্রমাণ করে যে সামবেদীয় পুরোহিততন্ত্র কোনো শিথিল ব্যবস্থা ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীন ভারতের এক অত্যন্ত সুসংগঠিত সংগীতিক প্রতিষ্ঠান (Thite, 1975)।

সোমযাগের মহাযজ্ঞশালা: সদস মণ্ডপ ও স্থানিক রাজনীতি (The Somayāga Sacrificial Arena: The Sadas Pavilion and Spatial Politics)

বৈদিক সোমযাগের স্থানিক বিন্যাস কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না, এর পেছনে কাজ করত কঠোর জ্যামিতিক নকশা এবং সামাজিক ক্ষমতার বিভাজন। পুরো যজ্ঞক্ষেত্রটিকে বলা হতো মহাবেদি (Mahāvedi)। এই মহাবেদির অভ্যন্তরে বিভিন্ন দলের জন্য আলাদা আলাদা কুটির ও মণ্ডপ তৈরি করা হতো। পূর্ব দিকে থাকত যজ্ঞের অগ্নি ও উত্তরবেদি, যেখানে পশুবলি ও ঘৃতাহুতি সম্পন্ন হতো। কিন্তু সামবেদের পুরোহিতদের আসল কাজের ক্ষেত্রটি ছিল পশ্চিম দিকে অবস্থিত একটি দীর্ঘায়ত ছাদযুক্ত কুটির, যার নাম সদস (Sadas)। সদস শব্দের অর্থ যেখানে পুরোহিতরা উপবেশন করেন। খড়, বাঁশ এবং মাদুর দিয়ে তৈরি এই মণ্ডপটি ছিল প্রাচীন ভারতীয় যজ্ঞের এক ধরনের বিশেষ সংরক্ষিত সংগীতকক্ষ (Malamoud, 1996)।

সদস মণ্ডপের ঠিক কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করা হতো ডুমুর কাঠ দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ স্তম্ভ, যাকে বলা হতো ঔদুম্বরী (Audumbarī)। এই স্তম্ভটির উচ্চতা নির্ধারিত হতো যজ্ঞের মূল পৃষ্ঠপোষক বা যজমানের শারীরিক উচ্চতার সমান করে। প্রাচীন যাজ্ঞিক ধারণায় ডুমুর গাছ ছিল উর্বরতা, রস এবং জাগতিক সমৃদ্ধির প্রতীক। প্রধান উদ্গাতা এই ঔদুম্বরী স্তম্ভটির গায়ে নিজের শরীর স্পর্শ করিয়ে কিংবা এর ঠিক পাশে কুশের আসনে বসে সামগান পরিবেশন করতেন। স্তম্ভটির সাথে শারীরিক সংযোগের পেছনে এক ধরনের প্রাচীন উপজাতীয় ধারণার প্রভাব কাজ করত। মনে করা হতো, মাটির গভীরে প্রোথিত গাছের গুঁড়ি যেমন ভূগর্ভস্থ জল ও রস শোষণ করে শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে দেয়, ঠিক তেমনই উদ্গাতার কণ্ঠের সুর এই স্তম্ভের মাধ্যমে পুরো যজ্ঞভূমিতে পরিব্যাপ্ত হবে (Caland & Henry, 1906)।

যজ্ঞভূমির ভেতরে কে কোথায় বসবেন এবং কার কতটুকু প্রবেশাধিকার থাকবে, তার ভেতর দিয়ে একটি স্পষ্ট স্থানিক রাজনীতি ফুটে উঠত। সদস মণ্ডপটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এক এলাকা। সেখানে কেবল দীক্ষিত পুরোহিত এবং স্বয়ং যজমান প্রবেশ করতে পারতেন। যে দাস ও শূদ্ররা যজ্ঞের কাঠ কাটত, জল বহন করত কিংবা চামড়ার পাত্র তৈরি করত, তাদের সদস মণ্ডপের ছায়াও মাড়াতে দেওয়া হতো না। এমনকি অন্যান্য পুরোহিতদের মধ্যেও বসার নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারিত ছিল। উত্তরবেদির পাশে দাঁড়িয়ে কর্ম পরিচালনা করতেন অধ্বর্যুরা, আর সদসের শীতল ছায়ায় বসে গানের সুর বিস্তার করতেন উদ্গাতারা। এই স্থানিক বিভাজন পুরোহিত শ্রেণির ভেতরকার অভ্যন্তরীণ শ্রমবিভাজনকেও স্পষ্ট করে তুলত (Malamoud, 1996)।

সদস মণ্ডপের আবদ্ধ পরিবেশটি সংগীতের ধ্বনিবিজ্ঞানের দিক থেকেও অত্যন্ত অর্থবহ ছিল। খোলা প্রান্তরে যেখানে সুর সহজে বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে, এই কুটিরের মাটির দেয়াল এবং খড়ের ছাউনি সেখানে এক ধরনের স্বাভাবিক অনুরণন তৈরি করত। বাইরের প্রাকৃতিক কোলাহলকে দূরে রেখে পুরোহিতরা একটি ঘনীভূত ও নিস্তব্ধ পরিবেশ তৈরি করতেন। সেখানে ধূপের ধোঁয়া, ঘৃতের সুবাস এবং সোমলতার তীব্র গন্ধের সাথে উদ্গাতার সমবেত গান মিলেমিশে এক সম্মোহনী প্রভাব ফেলত। স্থানকে এভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা পুরোহিততন্ত্রকে সমাজের সাধারণ মানুষের ওপর এক দুর্লঙ্ঘ্য মানসিক কর্তৃত্ব এনে দিয়েছিল (Lévi, 1898)।

স্তোত্রগান ও আনুষ্ঠানিক সোমরস নিষ্কাশন (Stotra Chanting and the Ritual Pressing of Soma)

সোমযাগের সমগ্র কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সোমলতাকে পাথরে পিষে তার থেকে সবুজ-হলুদ বর্ণের রস বের করা। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হতো অভিষব (Abhiṣava)। রস নিষ্কাশনের এই শ্রমসাধ্য কাজটি কোনো নীরস শারীরিক পরিশ্রম ছিল না, বরং এর প্রতিটি পর্যায় ঘড়ির কাঁটার মতো নিখুঁতভাবে সামবেদের স্তোত্র (Stotra) বা গানের সাথে ছন্দ মিলিয়ে সম্পন্ন হতো। দিনে মোট তিনবার সোমরস বের করার নিয়ম ছিল, যাকে বলা হতো ত্রিসবন – ভোরের প্রাতঃসবন, দুপুরের মাধ্যন্দিন সবন এবং সূর্যাস্তের প্রাক্কালের তৃতীয় সবন। প্রতিটি সবনের নিজস্ব সুর, গতি এবং মানসিক আবেদন নির্ধারিত থাকত (Hubert & Mauss, 1964)।

ভোরের প্রথম আলো ফোটার সময়ে অনুষ্ঠিত হতো প্রাতঃসবন। এই পর্বের সূচনা হতো অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর একটি গানের মাধ্যমে, যার নাম বহিঃপবমান স্তোত্র (Bahiṣpavamāna Stotra)। এই স্তোত্রটি গাইবার জন্য পুরোহিতদের যে আনুষ্ঠানিক পদযাত্রা করতে হতো, তা ছিল প্রাচীন বৈদিক আচারের এক অনন্য দৃশ্য। সদস মণ্ডপ থেকে বের হয়ে প্রধান উদ্গাতা, তার দুই সহকারী, ব্রহ্মা এবং যজমান একে অপরের কাপড়ের খুঁট ধরে এক সারিতে সাপের মতো এঁকেবেঁকে হবিধ্বান মণ্ডপের দিকে যেতেন। এই বিশেষ পদক্ষেপকে বলা হতো সর্পণ। পদযাত্রার সময় তাদের সম্পূর্ণ নীরব থাকতে হতো এবং দৃষ্টি মাটির দিকে রাখতে হতো। এরপর সোমরস ছাঁকার পাত্রের সামনে বৃত্তাকারে বসে তারা নিচু কিন্তু গভীর স্বরে গান গাইতেন, যা প্রত্যুষের নিস্তব্ধতাকে এক মায়াবী রূপ দিত (Caland & Henry, 1906)।

দুপুরের মাধ্যন্দিন সবনে এসে এই ধীরস্থির মেজাজ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যেত। দ্বিপ্রহরের তীব্র আলোয় যজ্ঞের গতি বাড়ত এবং সুরও হয়ে উঠত অত্যন্ত চড়া ও দ্রুত। এই পর্বের গানগুলো প্রধানত ইন্দ্রের সামরিক শক্তি ও অসুর দলনের প্রশংসায় নিবেদিত ছিল। পাথরের পেষণযন্ত্রগুলো যখন সোমলতার ওপর সশব্দে আঘাত করত, সেই ঠকঠক শব্দের সাথে সামগানের দ্রুত লয় মিশে এক তীব্র সংগীতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করত। মেষলোমের ছাঁকনি দিয়ে সোমরস যখন ফোঁটায় ফোঁটায় কাঠের পাত্রে পড়ত, উদ্গাতার কণ্ঠ তখন স্বরগ্রামের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করত। রস পড়ার ছন্দ এবং সুরের দোলা এখানে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠত (Thite, 1975)।

সন্ধ্যার তৃতীয় সবনে এসে ক্লান্তি এবং যজ্ঞ সমাপ্তির একটি বিষাদময় সুর ধ্বনিত হতো। সারা দিনের শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের পর এই পর্বে গাওয়া হতো আরভব পবমান স্তোত্র। এই স্তোত্রের সুর ছিল মন্থর, বিলম্বিত এবং বিদায়ঘেরা। দেবতাদের তুষ্ট করা শেষ হয়েছে, এখন যজ্ঞের অবশিষ্টাংশ গ্রহণের পালা। সুরের এই তিন পর্যায়ের বিবর্তন দেখায় যে প্রাচীন পুরোহিতরা সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মনস্তত্ত্ব কীভাবে বদলায়, সে বিষয়ে পূর্ণ সচেতন ছিলেন। ভোরের স্নিগ্ধতা, দুপুরের কর্মচাঞ্চল্য এবং সন্ধ্যার ক্লান্তি – এই তিনটি জৈবিক অনুভূতিকে সুরের কাঠামোর মধ্যে নিখুঁতভাবে বেঁধে ফেলাই ছিল স্তোত্রগানের প্রধান নান্দনিক লক্ষ্য (Lévi, 1898)।

জ্যোতিষ্টোম ও অন্যান্য সোমযাগে সামবেদের ভূমিকা (Role of the Sāmaveda in Jyotiṣṭoma and Other Soma Sacrifices)

বৈদিক আচারশাস্ত্রে সোমযাগের যে মৌলিক রূপটিকে সমস্ত যাগের আদর্শ বা প্রকৃতি বলে বিবেচনা করা হতো, তার নাম জ্যোতিষ্টোম (Jyotiṣṭoma)। আর এই জ্যোতিষ্টোমের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও প্রমিত রূপটি ছিল অগ্নিষ্টোম (Agniṣṭoma)। অগ্নিষ্টোম শব্দের অর্থ অগ্নির প্রশংসা হলেও, এর মূল শরীরটি গড়ে উঠেছিল সোমরস এবং সামবেদের সুরের ওপর ভিত্তি করে। একটি সাধারণ অগ্নিষ্টোমে সামবেদের নির্দিষ্ট বারোটি স্তোত্র গাওয়ার নিয়ম ছিল। এই বারোটি স্তোত্রের সাথে মিল রেখে ঋগ্বেদের হোতা বারোটি শস্ত্র পাঠ করতেন। সংগীত এবং পাঠের এই বারোটি জোড় ছিল যজ্ঞের এক অপরিবর্তনীয় ভিত্তি। শাস্ত্রকারদের মতে, এই বারোটি স্তোত্র সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে যজমানের সমস্ত ইহজাগতিক পাপ ধুয়ে যায় এবং তিনি পরলোকে স্বর্গের পথ নিশ্চিত করেন (Ranade, 1978)।

তবে সামবেদীয় পুরোহিতরা কেবল এই বারোটি স্তোত্রের সাধারণ অগ্নিষ্টোমে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। সমাজ যত ধনী হচ্ছিল এবং রাজন্যবর্গের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যত বাড়ছিল, যজ্ঞের আকারও তত প্রসারিত করা হচ্ছিল। অগ্নিষ্টোমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল এর বিভিন্ন রূপভেদ। যেমন উত্থ্য (Ukthya) যাগে স্তোত্রের সংখ্যা বারো থেকে বাড়িয়ে পনেরোটি করা হতো। এরপর আসত ষোড়শী (Ṣoḍaśī) যাগ, যেখানে স্তোত্রের সংখ্যা হতো ষোলটি এবং একটি বিশেষ অতিরিক্ত কাঠের বাটিতে সোমরস গ্রহণ করা হতো। যজ্ঞের আকার যত বাড়ত, পুরোহিতদের কাজের সময়সীমা তত দীর্ঘ হতো এবং তাদের সুরের জটিলতাও সমাজের চোখে অলৌকিক প্রতিভার মর্যাদা পেত (Sen, 1978)।

এই ধারার সবচেয়ে কঠিন ও শারীরিক সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা ছিল অতিরাত্র (Atirātra) নামক যজ্ঞ। সাধারণ যজ্ঞগুলো সূর্যাস্তের সাথে সাথে দিনের মতো স্থগিত করা হলেও, অতিরাত্র যাগ চলত পুরো রাত জুড়ে। সারা রাত ধরে যজ্ঞশালার আগুন দাউদাউ করে জ্বলত এবং উদ্গাতারা রাতের তিনটি প্রহরে পালা করে মোট উনত্রিশটি স্তোত্র গাইতেন। রাতের গাঢ় অন্ধকারের ভেতর নিদ্রাহীন চোখে ক্রমাগত সোমরস পান করে এবং স্তোভ ধ্বনি উচ্চারণ করে যে সংগীতিক পরিমণ্ডল তৈরি করা হতো, তা যজ্ঞে উপস্থিত মানুষদের এক তীব্র অতিন্দ্রীয় ঘোরের মধ্যে ফেলে দিত। আধুনিক নৃতাত্ত্বিকদের মতে, এই ধরনের নিশাচর অনুষ্ঠান মানুষের চেতনাকে স্বাভাবিক বাস্তবতার জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে পুরোহিতদের ক্ষমতার প্রতি পরম অনুগত করে তোলার এক কার্যকর সামাজিক উপায় ছিল (Caland & Henry, 1906)।

এর বাইরে আরও দীর্ঘমেয়াদী কিছু সোমযাগের প্রচলন ছিল, যেগুলোকে বলা হতো সত্র বা অহীন যাগ। যেমন বারো দিন ধরে চলা দ্বাদশরাত্র যাগ, কিংবা পুরো এক বছর ধরে চলা গবাময়ন নামক মহাযজ্ঞ। এই দীর্ঘস্থায়ী যজ্ঞগুলোতে সামবেদের শত শত ভিন্ন ভিন্ন সুরের সমাবেশ ঘটত। সুরের বৈচিত্র্য এবং গানের দীর্ঘ বিস্তার যজ্ঞকে এক বিশাল সাংগীতিক উৎসবে পরিণত করত। এই বড় মাপের অনুষ্ঠানগুলো পরিচালনা করার জন্য উদ্গাতাদের অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং দলগত শৃঙ্খলার প্রয়োজন হতো। ফলে সামবেদ কেবল ব্যক্তিগত কোনো পূজাপদ্ধতি ছিল না, এটা ছিল প্রাচীন ভারতের জটিলতম সাংস্কৃতিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের নাম (Ranade, 1978)।

বাদ্যযন্ত্রের সংগত ও সংগীতানুষ্ঠানের সামাজিক বিন্যাস (Instrumental Accompaniment and the Social Organization of the Musical Performance)

সামবেদের সংগীতানুষ্ঠান কেবল খালি গলার সমবেত গানে সীমাবদ্ধ থাকত না, এর সাথে যুক্ত ছিল বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের এক সুপরিকল্পিত সম্মিলন। বৈদিক যজ্ঞের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে নানা প্রকার তারের যন্ত্র, শুষির যন্ত্র বা বাঁশি এবং চামড়ায় ছাওয়া অবনদ্ধ বাদ্যযন্ত্রের বিস্তারিত উল্লেখ মেলে। কণ্ঠস্বরের পিচ বা সুরের সঠিক অবস্থান ধরে রাখার জন্য প্রধান অবলম্বন ছিল বিভিন্ন প্রকারের বীণা (Vīṇā)। বিশেষ করে মহাব্রত নামক এক বিশেষ সোমযাগের দিনে বাণ (Bāṇa) নামক এক অতিকায় বীণার ব্যবহারের বর্ণনা রয়েছে, যার কাঠামোর মধ্যে একশতটি মুঞ্জা ঘাসের তৈরি তার লাগানো থাকত। সেই তারে হরিণের শিং বা বিশেষ কাঠি দিয়ে আঘাত করে এক ধরনের গম্ভীর ও একঘেয়ে ড্রোন বা সুরের পর্দা তৈরি করা হতো (Krick, 1982)।

বীণার পাশাপাশি বাতাস দিয়ে বাজানো বাঁশি বা নলের ব্যবহারও যজ্ঞে প্রচলিত ছিল। এগুলোকে বলা হতো নাড়ী বা তূণব। সাধারণত নলখাগড়া, কাঠ বা পাখির ফাঁপা হাড় দিয়ে এই বাঁশিগুলো তৈরি হতো। এর পাশাপাশি যজ্ঞভূমির সীমানা চিহ্নিত করতে এবং গানের ছন্দকে স্পষ্ট করতে বাজানো হতো বিভিন্ন ধরনের ড্রাম বা দুন্দুভি (Dundubhi)। যুদ্ধক্ষেত্রের দুন্দুভির মতোই যজ্ঞের ড্রামগুলো ছিল বেশ বড় এবং পশুর চামড়া দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। আরও এক ধাপ এগিয়ে তৈরি করা হতো ভূমিদুন্দুভি (Bhūmidundubhi)। মাটিতে গভীর গর্ত খুঁড়ে তার ওপর একটা ভেজা গরুর চামড়া টানটান করে কাঠের খুঁটি দিয়ে আটকে দেওয়া হতো। তারপর একটি ভারী পশুর লেজ দিয়ে সেই চামড়ার ওপর আঘাত করা হতো। সেই ভূগর্ভস্থ গম্ভীর আওয়াজে পুরো যজ্ঞভূমি কেঁপে উঠত, যা উপস্থিত মানুষদের মনে এক ধরনের আদিম ভীতি ও শ্রদ্ধার সঞ্চার করত (Thite, 1975)।

এই সংগীতানুষ্ঠানের একটি বিশেষ দিক ছিল সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষের, বিশেষ করে নারীদের সীমিত কিন্তু সুনির্দিষ্ট অংশগ্রহণ। বৈদিক শ্রৌতযজ্ঞের প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ পুরুষ পুরোহিতদের একচেটিয়া দখলে থাকলেও, মহাব্রতের মতো কিছু উর্বরতাভিত্তিক যজ্ঞে যজমানের পত্নী এবং অন্যান্য নারীদের বাদ্যযন্ত্র বাজানোর বিধান ছিল। নারীরা সাধারণত পিচ্ছোরা বা অপঘাটলুকা নামক ছোট তারের যন্ত্র বাজাতেন। তারা যজ্ঞের একটি বিশেষ অগ্নিকুণ্ডের চারধারে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে জলভরা কলসি কাঁখে নিয়ে নাচতেন এবং গান গাইতেন। এই অংশটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে পুরোহিতদের কঠোর বৈদিক কাঠামোর নিচে তখনও পর্যন্ত প্রাচীন গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ও উর্বরতা পূজার উপাদানগুলো পুরোপুরি মুছে যায়নি (Krick, 1982)।

তবে এই বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ কোনো বিশৃঙ্খল কোলাহল ছিল না। কখন কোন বীণার তারে আঘাত করা হবে, কোন স্তোত্রের সমাপ্তিতে ড্রামে বাড়ি পড়বে, তা যজ্ঞীয় শাস্ত্রের অনুশাসনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ ছিল। সংগীতের এই বহুমাধ্যমীয় আয়োজন সাধারণ পশুপালক ও কৃষকদের চোখে ছিল এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিগত বিস্ময়। সুরের মাধুর্য, আগুনের লেলিহান শিখা, ড্রামের কম্পন এবং হাজার তারের বীণার ঝঙ্কার মিলেমিশে যজ্ঞকে একটি অতিবাস্তব নাট্যমঞ্চের রূপ দিত। পুরোহিতরা এই নান্দনিক জাদুকে ব্যবহার করতেন নিজেদের শ্রেণিগত অবস্থানকে অলঙ্ঘনীয় করে তোলার জন্য (Malamoud, 1996)।

দক্ষিণা, শ্রেণিপ্রতিপত্তি ও পুরোহিততন্ত্রের ক্ষমতা (Dakṣiṇā, Class Prestige, and the Power of the Priesthood)

সামবেদের এই সুবিশাল সংগীত ও আচারব্যবস্থা কোনো নিঃস্বার্থ পারলৌকিক সাধনা ছিল না, এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক বিনিময় এবং ক্ষমতার সামাজিক সমীকরণ। যজ্ঞ শেষ হওয়ার পর যজমান পুরোহিতদের যে পারিশ্রমিক দিতে বাধ্য থাকতেন, তাকে বলা হতো দক্ষিণা (Dakṣiṇā)। দক্ষিণা কোনো দয়া বা ঐচ্ছিক দান ছিল না, এটা ছিল পুরোহিত ও যজমানের মধ্যকার এক ধরনের অলিখিত আইনি চুক্তি। বৈদিক বিধানে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, দক্ষিণাহীন যজ্ঞ কেবল ব্যর্থই হয় না, বরং তা যজমানের আয়ু, পশু এবং সন্তানসন্ততিকে ধ্বংস করে ফেলে। সোমযাগের মতো বিশাল আয়োজনে এই দক্ষিণার পরিমাণ ছিল বিপুল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে (Hubert & Mauss, 1964)।

দক্ষিণা হিসেবে প্রধানত হস্তান্তরিত হতো সেই যুগের প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ – গবাদিপশু। একটি সাধারণ অগ্নিষ্টোম যজ্ঞেও কমপক্ষে একশত বারোটি দুধালো গাভী পুরোহিতদের মধ্যে বণ্টন করার নিয়ম ছিল। বড় বড় রাজকীয় যজ্ঞে এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেত। গাভী ছাড়াও ঘোড়া, সোনা, রূপা, বিশেষ ধরনের পোশাক, চর্বিযুক্ত খাদ্যশস্য এবং দাস-দাসী দক্ষিণা হিসেবে দেওয়া হতো। যজ্ঞের ষোলজন পুরোহিতের মধ্যে এই সম্পদ সমানভাবে ভাগ হতো না। চারজন প্রধান পুরোহিত, যার মধ্যে উদ্গাতাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, তারা পেতেন মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক। উদ্গাতার সংগীতিক দক্ষতা এবং স্মৃতিশক্তির মূল্য সমাজ নির্ধারণ করেছিল সর্বোচ্চ বৈষয়িক পারিতোষিকের মাধ্যমে (Malamoud, 1996)।

এই অর্থনৈতিক সুবিধার জোরেই সমাজে সামবেদীয় পুরোহিতদের একচ্ছত্র প্রতিপত্তি ও সামাজিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যে সমাজে সাধারণ কৃষক ও পশুপালকদের বেঁচে থাকার জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি করতে হতো, সেখানে কোনো শারীরিক কায়িক শ্রমে যুক্ত না হয়ে কেবল জটিল সুরের বিদ্যা এবং মন্ত্রের জোরে প্রভূত সম্পদের অধিকারী হওয়া ছিল এক অসামান্য শ্রেণিগত সুবিধা। উদ্গাতারা তাই এই সংগীতবিদ্যাকে বংশের ভেতর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোপন রাখতেন। সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই, এমনকি নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই সুর শেখা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জ্ঞানের ওপর এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছিল এক দুর্ভেদ্য সাংস্কৃতিক পুঁজিবাদ (Lévi, 1898)।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এটা পরিষ্কার যে সামবেদের যজ্ঞ ও সংগীতানুষ্ঠান ছিল প্রাচীন উত্তর ভারতে রাজতন্ত্রের উত্থান এবং শ্রেণিবিভক্ত বর্ণাশ্রম সমাজের অন্যতম প্রধান মতাদর্শিক হাতিয়ার। স্থানীয় উপজাতি প্রধান ও উদীয়মান রাজারা নিজেদের আধিপত্যকে প্রাকৃতিক ও দেবতার অনুমোদনপ্রাপ্ত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। রাজারা দিতেন বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক সুরক্ষা, আর উদ্গাতা পুরোহিতরা তাদের সুরের মোহিনী মায়াজালে সেই রাজকীয় ক্ষমতাকে পবিত্রতার চাদরে ঢেকে দিতেন। সামবেদের সুর তাই নিছক আধ্যাত্মিক সংগীত ছিল না, এটা ছিল ক্ষমতা, রাজনীতি, বৈষয়িক সম্পদ এবং ধ্বনিবিজ্ঞানের এক সুচতুর ঐতিহাসিক মেলবন্ধন, যা প্রাচীন ভারতীয় সমাজকাঠামোকে শত শত বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করেছিল (Hubert & Mauss, 1964)।

যজুর্বেদ সংহিতা (Yajurveda Saṃhitā): গঠন, যজুঃ, গদ্যমন্ত্র ও যজ্ঞ

যজুর্বেদ সংহিতার রূপরেখা ও ঐতিহাসিক পটভূমি (Overview and Historical Context of the Yajurveda Saṃhitā)

ঋগ্বেদের কাব্যময় স্তোত্রগুলো যখন ধীরে ধীরে যজ্ঞের ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডের সাথে পুরোপুরি যুক্ত হতে শুরু করল, তখনই মূলত যজ্ঞক্ষেত্রের বাস্তব প্রয়োজনে নতুন ধরনের পাঠের দরকার পড়েছিল। আর্য সমাজের বসতি বিস্তার তখন পাঞ্জাব বা সপ্তসিন্ধু অঞ্চল ছাড়িয়ে পূর্ব দিকে, বিশেষ করে কুরু-পাঞ্চাল ভূখণ্ড তথা গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল। এই নতুন ভৌগোলিক পরিবেশে যাযাবর পশুপালক জীবনযাত্রা রূপ নিচ্ছিল স্থায়ী কৃষিনির্ভর জনপদে। ফলে মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক চাহিদার মধ্যেও বড় ধরনের কাঠামোগত বদল ঘটে। দেবতাকে আহ্বান জানানোর চেয়ে যজ্ঞের প্রক্রিয়াটিকে ত্রুটিহীনভাবে সম্পন্ন করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণেই যজুর্বেদের সংকলন রূপ লাভ করে। ভারততাত্ত্বিক মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) তার গবেষণায় স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, কুরু রাজ্যের রাজনৈতিক কেন্দ্রীভবন এবং প্রথম বৈদিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে ওঠার সঙ্গে যজুর্বেদের আচার-পদ্ধতির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে (Witzel, 1995)।

যজুর্বেদ কেবল প্রার্থনার সংকলন নয়। এটা বৈদিক যজ্ঞ পরিচালনার একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা। প্রাচীন ভারতের যজ্ঞীয় ক্রিয়াকলাপ বোঝার জন্য এই টেক্সট সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে কাজ করে। বৈদিক ঐতিহ্য অনুযায়ী চার বেদের কাজের পরিধি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ঋগ্বেদের দায়িত্ব ছিল দেবতাকে স্তব করা, সামবেদ সেই স্তবগুলোকে বিশেষ সুরে রূপ দিত, আর যজুর্বেদের কাজ ছিল যজ্ঞের প্রতিটি শারীরিক ও ব্যবহারিক পদক্ষেপ পরিচালনা করা। যজ্ঞের আগুন কীভাবে জ্বালানো হবে, সেখানে কাঠের টুকরো কীভাবে রাখা হবে, চামচ বা শলাকা কীভাবে ধরা হবে – এই সব খুঁটিনাটি নিয়ম এই সংহিতায় স্থান পায়। ভাষাতাত্ত্বিক গবেষক লুই রেনু (Louis Renou) লক্ষ্য করেছিলেন যে, ঋগ্বেদের কবি যেখানে মুক্ত আকাশের নিচে প্রকৃতির রূপকে বন্দনা করতেন, যজুর্বেদে এসে সেই ভাবুক চরিত্র হারিয়ে গিয়ে তার স্থান নিয়েছে হিসাব-নিকাশ জানা একজন যজ্ঞ-কারিগর (Renou, 1957)।

এই সংহিতা সংকলনের পেছনে তৎকালীন অর্থনীতির একটা গভীর প্রভাব ছিল। কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলে উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য এবং গবাদি পশুর কেন্দ্রীভবন ঘটছিল স্থানীয় রাজন্যবর্গের হাতে। যজ্ঞ তখন শুধু আধ্যাত্মিক কোনো বিশ্বাস ছিল না, বরং এটা ছিল সম্পদ পুনর্বণ্টন এবং রাজনৈতিক বৈধতা প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। সাধারণ মানুষ এবং পরাজিত অনার্য গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে শাসকশ্রেণির একটি সুনির্দিষ্ট এবং নিয়মনিষ্ঠ আচার পদ্ধতির প্রয়োজন ছিল। যজুর্বেদের প্রতিটি মন্ত্র ও নির্দেশ ঠিক এই সামাজিক বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। এখানে প্রতিটি কাজের একটি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ফল দাবি করা হয়েছে।

যজুর্বেদের বিস্তার ও শাখা-প্রশাখার বিকাশ ঘটেছিল বিভিন্ন চরণ বা বৈদিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে। প্রাচীন ভারতে কোনো মুদ্রিত বই ছিল না। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মুখস্থ করে এই সুবিশাল গদ্য ও পদ্যের পাঠ শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে এই মুখস্থ রাখার প্রক্রিয়া এবং উচ্চারণে কিছু পার্থক্য দেখা দিত। এর ফলেই পরবর্তীকালে যজুর্বেদ দুটি প্রধান ধারায় ভাগ হয়ে যায়, যা কৃষ্ণ যজুর্বেদ এবং শুক্ল যজুর্বেদ নামে পরিচিত। ভারততাত্ত্বিক মরিস উইন্টারনিৎস (Maurice Winternitz) উল্লেখ করেছেন যে, যজুর্বেদকে বাদ দিয়ে প্রাচীন ভারতীয় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ বোঝা অসম্ভব, কারণ এখানেই বৈদিক ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটি প্রথম পোক্ত রূপ পায় (Winternitz, 1927)।

‘যজুঃ’ ধারণার অর্থ ও প্রায়োগিক বিস্তার (Meaning and Pragmatic Scope of the Concept of ‘Yajus’)

যজুর্বেদ শব্দটির উৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে এর ভেতরের মূল সুরটি ধরা পড়ে। সংস্কৃত ‘যজ্’ (Yaj) ধাতু থেকে ‘যজুঃ’ (Yajus) শব্দটির উৎপত্তি, যার সাধারণ অর্থ বলিদান করা, উৎসর্গ করা বা পূজা করা। কিন্তু পারিভাষিক অর্থে যজুঃ বলতে বোঝায় যজ্ঞে ব্যবহৃত এমন কিছু সূত্র বা মন্ত্র, যা কোনো নির্দিষ্ট ছন্দে বাঁধা নয়। জৈমিনি তার পূর্বমীমাংসা সূত্রে যজুঃ-র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্পষ্ট লিখেছিলেন – ‘শেষে যজুঃশব্দঃ’ (Śeṣe yajuḥśabdaḥ), অর্থাৎ যে মন্ত্রগুলো পদ্যের মতো ছন্দোবদ্ধ নয় এবং গানের মতো সুরযুক্ত নয়, সেগুলোই যজুঃ। অন্য কথায়, যজ্ঞের কর্মকাণ্ড চলার সময় যাজক বা পুরোহিত খুব নিচু গলায় যে বাক্যগুলো উচ্চারণ করতেন, তা-ই হলো যজুঃ।

যজুঃ মন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রায়োগিক উপযোগিতা। ঋগ্বেদের ঋচাগুলো যেমন নিজের কাব্যগুণেই স্বয়ংসম্পূর্ণ, যজুঃ কিন্তু একা একা অর্থহীন। এর অস্তিত্ব নির্ভর করে একটি বাস্তব শারীরিক ক্রিয়ার ওপর। উদাহরণস্বরূপ, পুরোহিত যখন যজ্ঞের জন্য কাঠ বা কুশ ঘাস কাটছেন, তখন তাকে একটি নির্দিষ্ট যজুঃ উচ্চারণ করতে হয়। যখন তিনি জল স্পর্শ করছেন, তখন আরেকটি যজুঃ বলতে হয়। গবেষক জন গন্ডা (Jan Gonda) বৈদিক মন্ত্রের শক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, যজুঃ হলো উচ্চারিত শব্দ এবং শারীরিক ভঙ্গির এক নিখুঁত মেলবন্ধন (Gonda, 1975)। শব্দ ও কর্ম এখানে একে অপরের পরিপূরক। শব্দ ছাড়া কাজটির কোনো পবিত্র মর্যাদা থাকে না, আবার কাজ ছাড়া শব্দের কোনো সার্থকতা থাকে না।

এই মন্ত্রগুলোর উচ্চারণের পদ্ধতিও ছিল বিশেষ ধরনের। ঋগ্বেদের স্তোত্র উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করা হতো এবং সামগান গাওয়া হতো তীব্র সুরে। কিন্তু যজুর্বেদের অধিকাংশ মন্ত্র পাঠ করতে হতো ‘উপাংশু’ (Upāṃśu) বা ফিসফিস করে, যাতে বাইরের কেউ তা স্পষ্টভাবে শুনতে না পায়। এই গোপনীয়তা বা অনুচ্চ স্বর যজুঃ মন্ত্রগুলোকে এক ধরনের বিশেষ কর্তৃত্ববাদী রূপ দিয়েছিল। সাধারণ মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে কেবল পুরোহিতের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি দেখতে পেত, কিন্তু তার ঠোঁটের ভেতর কী মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে তা তারা শুনতে পেত না। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে বিচার করলে এটা দেখা যায় যে, পুরোহিত সম্প্রদায় জ্ঞানের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এই অনুচ্চ উচ্চারণের প্রথা তৈরি করেছিল।

যজুঃ-র ভেতরে অনেক সময় মাত্র একটি বা দুটি শব্দের অস্তিত্ব দেখা যায়। যেমন ‘ইষে ত্বা’ (Iṣe tvā) – যার সরল অর্থ ‘তোমার খাদ্যের জন্য’। কোনো দীর্ঘ স্তুতি নয়, কোনো অলঙ্কার নয়, সোজাসুজি কাজের কথা। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি উচ্চারণের সাথে সাথে পুরোহিত একটি নির্দিষ্ট গাছের ডাল কেটে নিতেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ গদ্যময় তালিকা রয়েছে, যেখানে প্রকৃতি, ঋতু, বিভিন্ন পশু এবং সামাজিক শ্রেণির নাম পরপর সাজিয়ে উৎসর্গ করা হয়েছে। ভারততাত্ত্বিক স্টিফানি জ্যামিসন (Stephanie Jamison) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, যজুঃ মূলত বৈদিক মানুষের চোখ দিয়ে দেখা সমগ্র মহাবিশ্বকে একটি সুশৃঙ্খল ছকের মধ্যে বাঁধার ভাষাগত প্রচেষ্টা (Jamison & Brereton, 2014)। বিশ্বজগতের প্রতিটি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানকে যজ্ঞের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দেওয়াই ছিল এই সূত্রের উদ্দেশ্য।

প্রাচীন বৈদিক গদ্য ও গদ্যমন্ত্রের গঠনবৈশিষ্ট্য (Structure and Characteristics of Early Vedic Prose and Prose Mantras)

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে যজুর্বেদের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এখানেই প্রাচীনতম ধারাবাহিক গদ্যের নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে। ঋগ্বেদ পুরোটাই পদ্যে রচিত, কিন্তু যজুর্বেদেই প্রথম ইন্দো-আর্য ভাষার ব্যাকরণসম্মত গদ্য রূপের বিকাশ দেখা যায়। এই গদ্য কেবল সংবাদের আদান-প্রদান নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত জটিল, সংহত এবং পারিভাষিক গদ্য। বৈদিক সাহিত্যের পণ্ডিত আর্থার বারিয়েডেল কিথ (Arthur Berriedale Keith) তার বিখ্যাত অনুবাদগ্রন্থ দ্য বেদ অব দ্য ব্ল্যাক যজুস স্কুল: এনটাইটেল্ড তৈত্তিরীয় সংহিতা (The Veda of the Black Yajus School: Entitled Taittiriya Sanhita)-এর ভূমিকায় এই প্রাচীন গদ্যের রূপতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন (Keith, 1914)। তিনি দেখিয়েছেন যে, এই গদ্যের বাক্যগঠন সরল হলেও এর চিন্তা ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলিত।

যজুর্বেদের গদ্যমন্ত্রগুলোর বাক্যরীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে দীর্ঘ যৌগিক বাক্যের বদলে ছোট ছোট সমান্তরাল বাক্যের ব্যবহার বেশি। একটি ক্রিয়াপদের সাথে নামপদের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে দ্রুত বক্তব্য শেষ করা হতো। যেমন কোনো পাত্র স্পর্শ করার সময় বলা হতো, ‘তুমি অগ্নির অংশ, তুমি জলের গর্ভ’। এই সমান্তরাল বিন্যাস শুধু স্মৃতিতে রাখার সুবিধার জন্যই করা হয়নি, বরং যজ্ঞের নির্দিষ্ট শারীরিক ছন্দের সাথে তাল মেলানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। হাতের কাজ যেভাবে একটি নির্দিষ্ট গতিতে এগোত, মুখের বাক্যও ঠিক সেই তালে এগোত। এখানে ভাষার কাজ অলঙ্করণ তৈরি করা নয়, কর্মকে নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

এই গদ্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর পুনরাবৃত্তিমূলক কাঠামো। একই শব্দগুচ্ছ বারবার সামান্য পরিবর্তন করে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন রৌদ্র দেবতার উদ্দেশ্যে বা বিভিন্ন শক্তির উদ্দেশ্যে যখন আহুতি দেওয়া হচ্ছে, তখন প্রতিটি বাক্যের শেষে একই ধরনের প্রত্যয় বা নমস্কারসূচক শব্দ যোগ করা হয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে এটাকে বলা যায় এক ধরনের যান্ত্রিক বা সূত্রবদ্ধ ভাষা। যজুর্বেদে রূপক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একটি বিশেষ ভঙ্গি দেখা যায়। এখানে রূপকগুলো কাব্যিক সৌন্দর্যের জন্য আসেনি, এসেছে প্রতীকী সাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে। যেমন বলা হচ্ছে, চালের গুঁড়ো হলো মাংসের সমান, ঘি হলো শুক্রের সমান, আর যজ্ঞের আগুনের ধোঁয়া হলো বাতাসের পথ। এই সাদৃশ্যমূলক গদ্যরীতি পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের জটিল ব্যাখ্যার পথ তৈরি করে দিয়েছিল।

যজুর্বেদের গদ্যে ক্রিয়ার কাল এবং রূপের ব্যবহারেও স্পষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে। নির্দেশক ভাব বা আজ্ঞাসূচক ক্রিয়ার প্রাধান্য এখানে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পুরোহিত কী করবেন, সহকারীদের কী আদেশ দেবেন এবং যজমান কী ফল পাবেন – এই সবকিছুই সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণিক ছকে বাঁধা ছিল। ইন্দো-ইউরোপীয় তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের গবেষকরা যজুর্বেদের এই গদ্যকে গ্রিক বা লাতিন ভাষার প্রাচীনতম নথির চেয়েও সুসংহত এবং আদিম রূপের ধারক বলে মনে করেন। কারণ এখানে কথ্য ভাষার জীবন্ত রূপ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, আবার লিখিত ভাষার মতো একটি কৃত্তিম শৃঙ্খলাও এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যজ্ঞের ব্যবহারিক নির্দেশিকা ও পুরোহিততন্ত্র (Practical Ritual Manuals and the Priesthood)

যজুর্বেদ মূলত অধ্বর্যু (Adhvaryu) পুরোহিতের ম্যানুয়াল বা নির্দেশিকা। বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থায় চারজন প্রধান পুরোহিত থাকতেন – হোতা (Hotṛ), উদ্গাতা (Udgātṛ), অধ্বর্যু এবং ব্রহ্মা (Brahmā)। এর মধ্যে হোতার কাজ ছিল ঋগ্বেদের স্তোত্র পাঠ করে দেবতাদের আহ্বান জানানো, উদ্গাতার কাজ ছিল সামবেদের সুরে গান গাওয়া, আর ব্রহ্মার দায়িত্ব ছিল সমস্ত যজ্ঞটি নীরবভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো ভুল হলে তার প্রায়শ্চিত্ত করা। কিন্তু পুরো যজ্ঞের ময়দানি কাজ বা কায়িক শ্রমের ভার ছিল একমাত্র অধ্বর্যুর ওপর। যজ্ঞবেদী নির্মাণ থেকে শুরু করে পশু বলিদান এবং শেষ আহুতি দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি বাস্তব কাজ অধ্বর্যু এবং তার সহকারীদের করতে হতো। ফলে যজুর্বেদ সংহিতা তৈরিই হয়েছিল অধ্বর্যুর কাজের সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে।

অধ্বর্যুর কাজের পরিধি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বিস্তৃত। তাকে একই সাথে হতে হতো একজন সুদক্ষ স্থপতি, একজন কসাই, একজন পাচক এবং একজন নিপুণ মঞ্চ পরিচালক। যজ্ঞের জন্য নির্ধারিত ভূমি নির্বাচন করা, তা লাঙল দিয়ে চষা, সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক মাপে যজ্ঞশালা তৈরি করা এবং বিভিন্ন ধরনের ইঁট দিয়ে জটিল অগ্নিবেদী বা ‘চিতি’ (Citi) নির্মাণ করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল তার। অধ্বর্যু যদি ইঁট বসাতে গিয়ে এক আঙুল পরিমাণ ভুল করতেন, তবে বিশ্বাস করা হতো যে যজ্ঞের ফল নষ্ট হয়ে যাবে এবং যজমানের ক্ষতি হবে। তাই যজুর্বেদের নির্দেশগুলো ছিল নিখুঁত এবং কঠোর। ডাচ ভারততাত্ত্বিক ফ্র্রিটস স্টাল (Frits Staal) কেরালার বৈদিক অগ্নিচয়ন যজ্ঞের ওপর বিশদ ক্ষেত্রসমীক্ষা চালিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই যজ্ঞীয় নির্দেশগুলো কীভাবে হাজার বছর ধরে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ছাড়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কার্যকর রাখা হয়েছে (Staal, 1983)।

পুরোহিততন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ক্ষমতার বিন্যাসও যজুর্বেদের পাতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যজ্ঞে অধ্বর্যুর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে দৃশ্যমান। তিনি যজ্ঞশালার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতেন। তার হাতে থাকত কাঠের তৈরি বিভিন্ন চামচ যেমন ‘জুহু’ (Juhū), ‘উপভৃত’ (Upabhṛt) এবং ঘিয়ের পাত্র। তিনি যখন মঞ্চে নড়াচড়া করতেন, তখন পুরো যজ্ঞশালা তার শারীরিক উপস্থিতিতে মুখরিত থাকত। অন্য পুরোহিতরা যেখানে বসে বা দাঁড়িয়ে স্তব করতেন, অধ্বর্যুকে সেখানে অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে অনবরত হাঁটাহাঁটি করতে হতো। এই সক্রিয় কায়িক উপস্থিতির কারণে যজ্ঞের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় অধ্বর্যুর প্রভাব ছিল অনেক বেশি।

যজুর্বেদের আচার-পদ্ধতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি যজ্ঞকে প্রায় একটি বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির রূপ দিতে চেয়েছিল। এখানে দেবতার সন্তুষ্টির চেয়ে যজ্ঞের প্রক্রিয়ার নির্ভুলতা বেশি জরুরি ছিল। বিশ্বাস করা হতো, যদি সঠিক মন্ত্র উচ্চারণ করে সঠিক উপায়ে আগুনে মাখন বা সোমরস ঢালা যায়, তবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শক্তি সেই ফল দিতে বাধ্য। দেবতারাও এই নিয়মের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। দেবতাদের প্রায় যজ্ঞের অধীনস্থ একটি শক্তিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল। গবেষক আর্থার এলউইন লেভেলিন ব্যাশাম (Arthur Llewellyn Basham) তার ক্লাসিক গ্রন্থ দ্য ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া (The Wonder That Was India)-তে দেখিয়েছেন যে, এই পর্যায়ে এসে বৈদিক ধর্ম সম্পূর্ণভাবে একটি যান্ত্রিক পুরোহিততন্ত্রের রূপ ধারণ করে, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি গৌণ হয়ে গিয়ে ক্রিয়াকাণ্ডের নির্ভুলতাই প্রধান হয়ে ওঠে (Basham, 1954)।

কৃষ্ণ ও শুক্ল ধারার স্বাতন্ত্র্য ও সংহিতার বিন্যাসপদ্ধতি (Divergence of Kṛṣṇa and Śukla Traditions and Saṃhitā Structure)

যজুর্বেদের পাঠপরম্পরা আলোচনা করতে গেলে এর দুটি প্রধান রূপ – কৃষ্ণ যজুর্বেদ (Kṛṣṇa Yajurveda) এবং শুক্ল যজুর্বেদ (Śukla Yajurveda) – এর বিভাজন সামনে আসে। বৈদিক ঐতিহ্যের অন্য কোনো বেদে এই ধরনের মৌলিক বিভাজন দেখা যায় না। এই বিভাজনের মূলে রয়েছে পাঠ সংরক্ষণের বিন্যাসপদ্ধতি। কৃষ্ণ শব্দের অর্থ এখানে কালো বা অস্পষ্ট, আর শুক্ল শব্দের অর্থ সাদা বা স্পষ্ট। কিন্তু এই নামগুলোর পেছনে কোনো নৈতিক বা আধ্যাত্মিক বিচার নেই। এর ভিত্তি সম্পূর্ণ টেক্সট সংক্রান্ত। কৃষ্ণ যজুর্বেদে মূল যজ্ঞীয় মন্ত্র বা যজুঃ এবং তার ব্যাখ্যামূলক গদ্য বা ব্রাহ্মণ (Brāhmaṇa) অংশ একসাথে মেশানো রয়েছে। সেখানে কোনটা মূল মন্ত্র আর কোনটা সেই মন্ত্রের ব্যবহারিক ব্যাখ্যা, তা আলাদা করা কঠিন।

অন্যদিকে, শুক্ল যজুর্বেদ সম্পূর্ণ আলাদা একটি নীতি অনুসরণ করেছে। এখানে মূল মন্ত্রগুলোকে ব্যাখ্যামূলক অংশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র সংহিতা হিসেবে সংকলন করা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাজসনেয়ি সংহিতা’ (Vājasaneyi Saṃhitā)। আর এর সমস্ত ব্যাখ্যামূলক অংশকে সরিয়ে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিখ্যাত ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ (Śatapatha Brāhmaṇa)। শুক্ল যজুর্বেদের এই পরিচ্ছন্ন কাঠামোর কারণেই একে ‘শুক্ল’ বা উজ্জ্বল বলা হয়। ঐতিহাসিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, শুক্ল যজুর্বেদের এই রূপটি তুলনামূলকভাবে পরবর্তীকালের একটি সচেতন সম্পাদনার ফসল। প্রাচীন ধারার বিশৃঙ্খলা দূর করে মন্ত্রগুলোকে একটি কাঠামোগত শৃঙ্খলা দেওয়াই ছিল এই নতুন বিন্যাসের লক্ষ্য।

পৌরাণিক ঐতিহ্যে এই বিভাজনকে কেন্দ্র করে একটি বিখ্যাত আখ্যান প্রচলিত আছে। কথিত আছে, ঋষি বৈশম্পায়ন তার শিষ্য যাজ্ঞবল্ক্যের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে দেওয়া সমস্ত জ্ঞান ফিরিয়ে দিতে বলেন। ক্রুদ্ধ যাজ্ঞবল্ক্য তখন তার অর্জিত সমস্ত যজুঃ বমি করে উগরে দেন। অন্য শিষ্যরা তিতির পাখি হয়ে সেই উগরে দেওয়া মন্ত্রগুলো খেয়ে ফেলেন, যা থেকে তৈত্তিরীয় সংহিতা (Taittirīya Saṃhitā) বা কৃষ্ণ যজুর্বেদের উৎপত্তি হয়। এরপর যাজ্ঞবল্ক্য সূর্যের উপাসনা করে সম্পূর্ণ নতুন ও নির্ভেজাল যজুঃ লাভ করেন, যা শুক্ল যজুর্বেদ নামে পরিচিত হয়। এই রূপকের অন্তর্নিহিত সত্যটি হলো, দুটি ভিন্ন পুরোহিত গোষ্ঠীর মধ্যে আচার এবং পাঠের অধিকার নিয়ে গভীর মতভেদ ও বিভক্তি তৈরি হয়েছিল। ভারততাত্ত্বিক হপকিন্স (E. Washburn Hopkins) মনে করতেন যে, এই কাহিনি আসলে বৈদিক শাখাগুলোর মধ্যকার বৌদ্ধিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভৌগোলিক দূরত্বের প্রতিফলন (Hopkins, 1895)।

শাখাগুলোর ভৌগোলিক এবং কাঠামোগত বিন্যাসেও বড় ধরনের বৈচিত্র্য ছিল। কৃষ্ণ যজুর্বেদের প্রধান চারটি শাখা হলো – তৈত্তিরীয়, মৈত্রায়ণী (Maitrāyaṇī), কঠ (Kaṭha) এবং কপিষ্ঠল (Kapiṣṭhala)। এদের মধ্যে তৈত্তিরীয় শাখাটি দক্ষিণ ভারতে অত্যন্ত শক্তিশালী স্থান করে নিয়েছিল এবং আজও তা টিকে রয়েছে। অপরপক্ষে, শুক্ল যজুর্বেদের দুটি প্রধান শাখা ছিল – মাধ্যন্দিন (Mādhyandina) এবং কাণ্ব (Kāṇva)। মাধ্যন্দিন শাখা মূলত উত্তর ও পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে বিদেহ ও মগধ অঞ্চলের কাছাকাছি বিস্তার লাভ করেছিল। প্রতিটি শাখার সংহিতার বিন্যাসে যজ্ঞগুলোর ক্রমও ছিল কিছুটা আলাদা। যেমন দর্শপূর্ণমাস (অমাবস্যা ও পূর্ণিমার যজ্ঞ), সোমযাগ, বাজপেয় এবং রাজসূয় যজ্ঞের মন্ত্রগুলো বিভিন্ন শাখায় ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত ছিল। এই কাঠামোগত স্বাতন্ত্র্য প্রমাণ করে যে, বৈদিক সংকলনগুলো কোনো একক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো না, বরং বিভিন্ন আঞ্চলিক গুরুকুলের নিজস্ব চর্চার মধ্য দিয়েই এগুলো বিবর্তিত হয়েছিল।

সামাজিক ক্ষমতা, বলিদান ও যজ্ঞের স্থানিক রাজনীতি (Social Power, Sacrifice, and the Spatial Politics of the Ritual)

যজুর্বেদ সংহিতা কেবল আচার-অনুষ্ঠানের নথি নয়, এটি প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ক্ষমতা কাঠামো নির্মাণের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলিল। এই সংহিতায় যে সমাজকে দেখা যায়, তা ঋগ্বেদের তুলনামূলক সরল গোত্রভিত্তিক সমাজ নয়। এখানে স্পষ্ট চার স্তরের বর্ণব্যবস্থা নিজের স্থান শক্ত করে নিয়েছে। ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় বর্ণের মধ্যকার পারস্পরিক সমঝোতা এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি যজুর্বেদের প্রতিটি প্রধান যজ্ঞে দৃশ্যমান। যজ্ঞ এখানে আবির্ভূত হয়েছে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে, যার মাধ্যমে শাসকশ্রেণি প্রজাদের ওপর নিজের কর আদায়ের অধিকার এবং শাসনক্ষমতাকে বৈধতা দিত। সমাজবিজ্ঞানী ব্রুস লিংকন (Bruce Lincoln) তার ধর্ম ও ক্ষমতার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যেমন দেখিয়েছেন, আচার-অনুষ্ঠান মূলত বিদ্যমান সামাজিক স্তরবিন্যাসকে মহাজাগতিক নিয়মের অংশ হিসেবে হাজির করে প্রশ্নাতীত করে তোলে (Lincoln, 1989)। যজুর্বেদ ঠিক এই কাজটিই নিখুঁতভাবে করেছিল।

বলিদান বা উৎসর্গ ছিল এই যজ্ঞব্যবস্থার অন্যতম মূল ভিত্তি। শস্য, দুধ, ঘি ছাড়াও বিপুল সংখ্যক পশুর বলিদান যজুর্বেদের একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। বিশেষ করে অশ্বমেধ (Aśvamedha) এবং পুরুষমেধ (Puruṣamedha) যজ্ঞের মতো রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলোতে বলিদানের তালিকা দেখলে শিউরে উঠতে হয়। শত শত গৃহপালিত এবং বন্য পশুকে যজ্ঞের খুঁটিতে বা ‘যূপ’ (Yūpa)-এ বেঁধে একটি নির্দিষ্ট ক্রমে বলি দেওয়া হতো। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার (Romila Thapar) তার ফ্রম লিনিয়েজ টু স্টেট (From Lineage to State) গ্রন্থে বিস্তারিত দেখিয়েছেন যে, এই ধরনের বিশালাকার বলিদান উৎসবগুলো ছিল যাযাবর অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে রূপান্তরের সময় সম্পদ প্রদর্শনের এক চরম রাজনৈতিক কৌশল (Thapar, 1984)। যে রাজা যত বেশি পশু উৎসর্গ করতে পারতেন, তার রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং সার্বভৌমত্ব তত বেশি সুরক্ষিত হতো।

যজ্ঞশালার স্থানিক রাজনীতি বা স্থান নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিও গভীর অর্থবহ ছিল। যজুর্বেদে যজ্ঞবেদীর আকার, দিক এবং পরিমাপ অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সাধারণ মানুষ বা তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের যজ্ঞবেদীর সীমানায় প্রবেশের কোনো অধিকার ছিল না। বৈদিক পরিভাষায় যাকে ‘অরতি’ বা বিশৃঙ্খলা বলা হতো, সেই অনার্য ও অবাধ্য উপাদানগুলোকে যজ্ঞশালার বাইরে রাখার জন্য নানা ধরনের সুরক্ষামূলক মন্ত্রের বিধান ছিল। যজ্ঞের প্রতিটি স্থান একটি ক্ষুদ্র মহাবিশ্বের রূপ ধারণ করত, যেখানে কেন্দ্রস্থলে থাকতেন পুরোহিত এবং রাজা, আর প্রান্তিক জনসমষ্টি ছিল সম্পূর্ণ অদৃশ্য। জ্যাল হেস্টারম্যান তার বিখ্যাত তত্ত্ব ‘দ্য ব্রোকেন ওয়ার্ল্ড অব স্যাক্রিফাইস’ (The Broken World of Sacrifice)-এ উল্লেখ করেছেন যে, প্রাচীন বৈদিক বলিদান মূলত গোত্রগুলোর মধ্যকার সহিংস প্রতিযোগিতা দূর করে একটি সুশৃঙ্খল আনুষ্ঠানিক রীতির ভেতর দিয়ে ক্ষমতা সংহত করার প্রয়াস ছিল (Heesterman, 1993)।

যজুর্বেদের পাতা উল্টালে দেখা যায়, কীভাবে অর্থনৈতিক সম্পদ একমুখী প্রবাহে পুরোহিত এবং রাজন্যবর্গের হাতে জমা হতো। যজ্ঞ শেষ হলে যজমানকে প্রচুর ‘দক্ষিণা’ (Dakṣiṇā) দিতে হতো। এই দক্ষিণা কেবল স্বর্ণ বা মুদ্রা ছিল না, প্রধানত ছিল হাজার হাজার গরু, ঘোড়া, দাসী এবং বস্ত্র। দক্ষিণা না দিলে যজ্ঞ নিষ্ফল হতো বলে স্পষ্ট সতর্কবাণী দেওয়া ছিল। ফলে ধর্মীয় ভয়ের একটি বাতাবরণ তৈরি করে সাধারণ উৎপাদনকারী শ্রেণির উদ্বৃত্ত সম্পদকে টেনে নেওয়ার একটি আদর্শ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে, যজুর্বেদ হলো প্রাচীন উত্তর ভারতের সেই ক্রান্তিকালের টেক্সট, যেখানে ধর্ম, রাষ্ট্র এবং অর্থনীতি মিলেমিশে এমন একটি জটিল প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল যা পরবর্তী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় সমাজকাঠামোর গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

কৃষ্ণ যজুর্বেদ (Kṛṣṇa Yajurveda): তৈত্তিরীয়, মৈত্রায়ণী, কঠ ও কপিষ্ঠল শাখা

কৃষ্ণ যজুর্বেদের গঠনতাত্ত্বিক বিন্যাস ও সংমিশ্রণরীতি (Structural Arrangement and Synthesis of Kṛṣṇa Yajurveda)

প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের ধারায় কৃষ্ণ যজুর্বেদের অবস্থান বেশ স্বতন্ত্র এবং কিছুটা জটিল। সাধারণ পাঠকের চোখে এই টেক্সটটিকে প্রথম দেখায় বেশ এলোমেলো মনে হতে পারে। কারণ এখানে যজ্ঞের মূল পদ্য বা গদ্যময় মন্ত্রগুলোর সাথে সেগুলোর ব্যাখ্যামূলক গদ্য অংশ পাশাপাশি অবস্থান করছে। কোনো সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনে মন্ত্র আর ব্যাখ্যাকে আলাদা করে রাখা হয়নি। একটি নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক ক্রিয়ার জন্য নির্ধারিত মন্ত্রটি যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখান থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে সেই ক্রিয়ার পেছনের তাৎপর্য, পৌরাণিক উপাখ্যান এবং পুরোহিতের জন্য নির্দিষ্ট সতর্কবার্তা। এই মিশ্র বিন্যাসপদ্ধতিটি কোনো অসাবধানতার ফল ছিল না। প্রাচীন বৈদিক শিক্ষাব্যবস্থা বা চরণের ভেতরে গুরু ও শিষ্যের সরাসরি কথোপকথনের যে জীবন্ত রূপ ছিল, টেক্সটটিতে ঠিক সেই রূপটিই ধরে রাখা হয়েছে।

বৈদিক সংকলনগুলোর মধ্যে এই ধারাটিকেই সবচেয়ে প্রাচীন বলে গণ্য করা হয়। কারণ মানুষ যখন কোনো জটিল নিয়ম শেখে, তখন কাজের সাথে তার ব্যাখ্যাও একসঙ্গেই শেখে। আলাদা করে নিয়ম মুখস্থ করা এবং পরে তার ব্যাখ্যা পড়ার পদ্ধতিটি অনেক পরে বিকশিত হয়েছিল। ভারততাত্ত্বিক লিওপোল্ড ভন শ্রোয়েডার (Leopold von Schroeder) কৃষ্ণ যজুর্বেদের পাঠ সম্পাদনা করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছিলেন যে, এই সংহিতাগুলোর ভাষা ও ব্যাকরণ সরাসরি বৈদিক সমাজের মধ্যবর্তী স্তরের কথ্যরীতির সাক্ষ্য বহন করে (von Schroeder, 1881)। সেখানে পুরোহিত যখন যজ্ঞবেদীতে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন তিনি একই সাথে মন্ত্র উচ্চারণ করছেন এবং সহকারীদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন কেন চালের গুঁড়োকে একটি নির্দিষ্ট দিকে ছড়াতে হবে। এই যৌথ প্রকাশভঙ্গিই কৃষ্ণ যজুর্বেদের সবচেয়ে বড় গঠনগত পরিচয়।

এই সংমিশ্রণরীতির কারণে কৃষ্ণ যজুর্বেদের পাঠগুলোতে এক ধরনের গতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এখানে প্রতিটি অধ্যায় বা প্রপাঠক কোনো বিমূর্ত সাহিত্যকর্ম হিসেবে সাজানো হয়নি। বরং প্রতিটি অংশ সাজানো হয়েছে যজ্ঞের ব্যবহারিক অগ্রগতির সাথে মিল রেখে। দর্শপূর্ণমাস থেকে শুরু করে সোমযাগ, রাজসূয় বা অগ্নিচয়ন – প্রতিটি অনুষ্ঠানের প্রতিটি পদক্ষেপকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধরে রাখা হয়েছে। এই পদ্ধতিকে বৈদিক পরিভাষায় বলা হয় ‘সংহিতা-ব্রাহ্মণ সংমিশ্রণ’ (Saṃhitā-Brāhmaṇa Synthesis)। প্রাচীন ভারতে গ্রন্থ রচনার কোনো একক লিখিত কাঠামো ছিল না। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা গুরুকুলগুলো তাদের নিজস্ব পাঠদানের সুবিধার্থে এই টেক্সটগুলোকে বিন্যস্ত করেছিল।

কৃষ্ণ যজুর্বেদের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই পরবর্তীতে শুক্ল যজুর্বেদের জন্ম হয়েছিল। পরবর্তীকালের পণ্ডিতরা হয়তো অনুভব করেছিলেন যে, যজ্ঞের সময় মন্ত্র খোঁজা এবং তার দার্শনিক ব্যাখ্যা খোঁজা দুটি ভিন্ন মানসিক কাজ। কিন্তু কৃষ্ণ যজুর্বেদের গুরুকুলগুলো তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না করে রক্ষা করতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক ইয়োহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট (Johannes Bronkhorst) প্রাচীন উত্তর ভারতের ধর্মীয় ভূগোল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কৃষ্ণ যজুর্বেদের শাখাগুলো মূলত কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত রূপ নিয়ে টিকে ছিল (Bronkhorst, 2007)। এই স্থায়িত্বের কারণেই প্রাচীন ভারতের আচার-সংস্কৃতির আদি রূপটি এই সংহিতাগুলোতে অবিকৃত রয়ে গেছে।

তৈত্তিরীয় শাখা: বিন্যাস, ভৌগোলিক অবস্থান ও টিকে থাকার ইতিহাস (The Taittirīya Śākhā: Structure, Geography, and Survival)

কৃষ্ণ যজুর্বেদের যতগুলো শাখা টিকে রয়েছে, তার মধ্যে তৈত্তিরীয় শাখা (Taittirīya Śākhā) সবচেয়ে বিস্তৃত, সুসংগঠিত এবং ব্যাপকভাবে সংরক্ষিত। এই শাখার মূল সংকলনটি পরিচিত তৈত্তিরীয় সংহিতা (Taittirīya Saṃhitā) নামে। এটি সাতটি প্রধান খণ্ড বা ‘কাণ্ড’ (Kāṇḍa)-এ বিভক্ত। প্রতিটি কাণ্ড আবার কয়েকটি ‘প্রপাঠক’ (Prapāṭhaka) বা অধ্যায়ে বিভক্ত, এবং প্রতিটি প্রপাঠক বিভক্ত হয়েছে ছোট ছোট অনুবাকে। এই সুনির্দিষ্ট বিভাজনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন ভারতীয় যজ্ঞবিজ্ঞানের এক সুবিশাল মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার যজ্ঞ দিয়ে শুরু করে অশ্বমেধের মতো রাজকীয় আয়োজনের খুঁটিনাটি বিবরণ এই সাতটি কাণ্ডের ভেতরে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তৈত্তিরীয় সংহিতার পাঠরীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে একটি স্বতন্ত্র ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, একটি অরণ্যক এবং বিখ্যাত তৈত্তিরীয় উপনিষদ (Taittirīya Upaniṣad)। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের গবেষক চিদাম্বর গোপাল কাশিকার (C. G. Kashikar) তার বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, তৈত্তিরীয় ঐতিহ্যের বিশেষত্ব হলো এর ধারাবাহিকতা (Kashikar, 1968)। অন্যান্য অনেক বৈদিক শাখার মতো এর সংহিতা অংশ আলাদা হয়ে বিলুপ্ত হয়নি, বরং সংহিতা থেকে শুরু করে সূত্রসাহিত্য পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠপরম্পরা আজ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রয়েছে। বিশেষ করে বৌধায়ন শ্রৌতসূত্র (Baudhāyana Śrautasūtra) এবং আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র (Āpastamba Śrautasūtra) এই তৈত্তিরীয় শাখার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছিল। এই সূত্রগুলো যজুর্বেদের সংক্ষিপ্ত গদ্যের বাস্তব প্রয়োগবিধিকে আরও স্পষ্টভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

তৈত্তিরীয় শাখার ভৌগোলিক রূপান্তরের ইতিহাস বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলে এর উৎপত্তি হলেও কালক্রমে এই শাখার পণ্ডিতরা দক্ষিণ ভারতের দিকে পাড়ি জমান। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকেই অন্ধ্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণদের বসতি গড়ে ওঠে। গবেষক উইলেম কালান্ড (Willem Caland) বৌধায়ন সূত্রের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও আঞ্চলিক ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে মন্তব্য করেছিলেন যে, দক্ষিণ ভারতের রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে তৈত্তিরীয় শাখার এই বিপুল পাঠ হয়তো সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেত (Caland, 1903)। উত্তরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের মুখে এই টেক্সট দক্ষিণের শান্ত ও সংরক্ষিত গুরুকুলগুলোতে আশ্রয় পেয়েছিল।

দক্ষিণ ভারতে স্থানান্তরের ফলে এই শাখার উচ্চারণে এক ধরনের নিখুঁত শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল। আজও কেরল বা তামিলনাড়ুর বৈদিক পণ্ডিতরা যখন তৈত্তিরীয় সংহিতার কোনো অনুবাক আবৃত্তি করেন, তখন তার স্বর ও সুরের ওঠানামা প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের ধ্বনিতাত্ত্বিক রূপটিকে মনে করিয়ে দেয়। যজ্ঞের প্রতিটি আহুতির সাথে কীভাবে শরীরকে পরিচালনা করতে হবে, তৈত্তিরীয় পাঠে সেই নির্দেশনা এত স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত রয়েছে যে, কোনো আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকও এর পাতা উল্টে প্রাচীন যজ্ঞশালার একটি জীবন্ত নকশা এঁকে ফেলতে পারেন। এই শাখার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের পেছনে এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং সামাজিক কার্যকারিতাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

মৈত্রায়ণী শাখা: স্বরতত্ত্ব, আঞ্চলিক ভাষা ও সামাজিক চিত্র (The Maitrāyaṇī Śākhā: Phonology, Regional Dialect, and Social Picture)

কৃষ্ণ যজুর্বেদের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রূপটি হলো মৈত্রায়ণী শাখা (Maitrāyaṇī Śākhā), যার প্রধান টেক্সটটির নাম মৈত্রায়ণী সংহিতা (Maitrāyaṇī Saṃhitā)। গঠনগতভাবে এটি চারটি কাণ্ডে বিভক্ত। তৈত্তিরীয় শাখার সাথে এর প্রচুর সাদৃশ্য থাকলেও এর স্বরচিহ্ন, শব্দচয়ন এবং কিছু কিছু আচারগত নির্দেশে স্পষ্ট স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে। জার্মান ভারততাত্ত্বিক লিওপোল্ড ভন শ্রোয়েডার (Leopold von Schroeder) দীর্ঘ পরিশ্রম করে এই সংহিতার একটি প্রামাণ্য সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন (von Schroeder, 1881-1886)। তিনি দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, মৈত্রায়ণী সংহিতার ধ্বনিতত্ত্ব অন্যান্য বৈদিক শাখার চেয়ে অনেক বেশি প্রাচীন রূপ ধরে রেখেছে।

এই শাখার ভাষা বিশ্লেষণ করলে একটি বিশেষ আঞ্চলিক উপভাষার সন্ধান পাওয়া যায়। ভাষাটি বৈদিক সংস্কৃত হলেও এতে এমন কিছু ব্যাকরণগত ব্যতিক্রম দেখা যায়, যা অন্য সংহিতাগুলোতে বিরল। যেমন শব্দের শেষে নির্দিষ্ট কিছু ব্যঞ্জনবর্ণের রূপান্তর এবং স্বরের দীর্ঘতা বজায় রাখার বিশেষ কিছু নিয়ম এই সংহিতায় দেখা যায়। গবেষকদের মতে, এই শাখাটি কুরু অঞ্চলের ঠিক পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানায়, অর্থাৎ বর্তমান হরিয়ানা, রাজস্থান এবং গুজরাটের কিছু অংশে প্রচলিত ছিল। ফলে মধ্যদেশের মূল বৈদিক ভাষার ওপর সংলগ্ন মরু ও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের কথ্য ভাষার যে প্রভাব পড়েছিল, তার ছাপ এই সংহিতার পাতায় স্পষ্ট রয়ে গেছে।

মৈত্রায়ণী সংহিতার সামাজিক চিত্রটিও তৈত্তিরীয় শাখার চেয়ে কিছুটা আলাদা। এখানে রাজন্যবর্গের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, গবাদি পশু দখলের সংঘাত এবং স্থানীয় অনার্য জনগোষ্ঠীর সাথে আর্যদের মিথস্ক্রিয়ার চিত্র অনেক বেশি বাস্তববাদী ভঙ্গিতে চিত্রিত হয়েছে। ভারততাত্ত্বিক উইলহেম রাউ (Wilhelm Rau) প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর ওপর করা তার মৌলিক গবেষণায় মৈত্রায়ণী সংহিতার বহু অংশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন (Rau, 1957)। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, এই সংহিতায় রাজা বা শাসকের ক্ষমতা তখনও নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠেনি। তাকে প্রায়ই তার আত্মীয়স্বজন এবং অসন্তুষ্ট প্রজা বা ‘বিশ’ (Viś)-এর বিরোধিতার মুখে পড়তে হতো, এবং যজ্ঞের বিভিন্ন অংশের মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক সংকট দূর করার চেষ্টা করা হতো।

তাছাড়া, মৈত্রায়ণী সংহিতায় কিছু অনন্য পৌরাণিক উপাখ্যান পাওয়া যায় যা পরবর্তীকালে ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্যে বিস্তারিত রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন পশুর উৎসর্গীকরণ এবং প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির প্রতিকূলতাকে প্রশমিত করার জন্য যে মন্ত্রগুলো এখানে সাজানো হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশ সরাসরি একটি সুর লক্ষ্য করা যায়। এখানে দেবতাদের প্রতি কোনো স্তাবকতা নেই, বরং একটি পরিষ্কার লেনদেনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে – পুরোহিত ও যজমান দেবতাকে কাঙ্ক্ষিত বস্তু দিচ্ছেন, বিনিময়ে দেবতা তাদের শত্রুকে পরাস্ত করতে এবং গবাদি পশুর রোগবালাই দূর করতে সাহায্য করছেন। এই স্পষ্ট ও সরাসরি ভঙ্গিটিই মৈত্রায়ণী শাখাকে বৈদিক সাহিত্যের এক অনন্য উপাদানে পরিণত করেছে।

কঠ শাখা ও চারায়নীয় কাঠক পাঠপরম্পরা (The Kaṭha Śākhā and the Cārāyaṇīya-Kāṭhaka Tradition)

কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৃতীয় ঐতিহ্যটি হলো কঠ শাখা (Kaṭha Śākhā), যার প্রধান সংকলনটি পণ্ডিত মহলে পরিচিত কাঠক সংহিতা (Kāṭhaka Saṃhitā) নামে। প্রাচীন ভারতীয় ব্যাকরণবিদ ও ভাষ্যকারদের লেখায় এই শাখার বিপুল জনপ্রিয়তার উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের বিখ্যাত বৈদিক বৈয়াকরণ পতঞ্জলি তার মহাভাষ্যে সগর্বে উল্লেখ করেছিলেন – ‘গ্রামে গ্রামে কাঠকং কালাপকং চ প্রোচ্যতে’ (Grāme grāme kāṭhakaṃ kālāpakaṃ ca procyate), অর্থাৎ ভারতের প্রতিটি গ্রামে কাঠক এবং কালাপক পাঠ উচ্চারিত হচ্ছে। এই একটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য থেকেই বোঝা যায় যে, প্রাচীন ভারতের এক বিশাল ভূখণ্ডে এই কাঠক ঐতিহ্য কতটা প্রভাবশালী ছিল।

কাঠক সংহিতা পাঁচটি প্রধান অংশে বিভক্ত, যা ‘স্থানক’ (Sthānaka) নামে পরিচিত। এতে মোট চল্লিশটি স্থানক রয়েছে। এই শাখার বিস্তার ঘটেছিল মূলত ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে, বিশেষ করে পাঞ্জাব, কাশ্মীর এবং হিমাচলের পাহাড়ি অঞ্চলে। পর্বতঘেরা ভূগোলের মধ্যে দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকার কারণে এই সংহিতার একটি নিজস্ব চরিত্র গড়ে উঠেছিল। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মুখস্থ রাখার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণে এর পাঠ শত শত বছর ধরে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে সংরক্ষিত ছিল। ভারততাত্ত্বিক গবেষক বেরেন্ড এ. ভ্যান নুটেন (Barend A. van Nooten) কাঠক ঐতিহ্যের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই শাখার সাথে প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় সীমান্তের সাংস্কৃতিক মেলামেশার একটি সূক্ষ্ম যোগাযোগ লক্ষ্য করা যায় (van Nooten, 1980)।

কঠ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দার্শনিক রূপান্তর। সাধারণ মানুষের কাছে ‘কঠ’ নামটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার উপনিষদের কারণে। কঠ উপনিষদ (Kaṭha Upaniṣad), যেখানে বালক নচিকেতা এবং মৃত্যুর দেবতা যমের মধ্যকার সংলাপ স্থান পেয়েছে, তা মূলত এই কাঠক শাখারই অরণ্যক অংশের সমাপ্তি। ভারততাত্ত্বিক প্যাট্রিক অলিভেল (Patrick Olivelle) এই টেক্সটের অনুবাদ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে মন্তব্য করেছেন যে, কাঠক চিন্তাধারায় যজ্ঞের বাস্তবতাকে অতিক্রম করে জীবনের গভীর রহস্য খোঁজার যে প্রবণতা দেখা যায়, তার সূত্রপাত কাঠক সংহিতার রূপকধর্মী বাক্যগুলোর মধ্যেই নিহিত ছিল (Olivelle, 1998)। সংহিতার শুকনো যজ্ঞীয় নির্দেশের ভেতর থেকেই ধীরে ধীরে এক ধরনের দার্শনিক জিজ্ঞাসার জন্ম হয়েছিল।

চারায়নীয় নামে এই কাঠক ধারার আরেকটি উপশাখা ছিল, যা আজ প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। তবে প্রাচীন বিভিন্ন সংকলন ও টীকায় তাদের পাঠের বহু উদ্ধৃতি ছড়িয়ে রয়েছে। কাঠক সংহিতার রীতিনীতি তৈত্তিরীয় বা মৈত্রায়ণী সংহিতার চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর ছিল। বিশেষ করে অগ্নিচয়ন যজ্ঞের সময় যজ্ঞবেদী নির্মাণের জন্য যে ইট ব্যবহার করা হতো, সেগুলোর নামকরণ এবং সাজানোর ধারাক্রমে কাঠক ঐতিহ্যে নিজস্ব কিছু গাণিতিক ও জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য ছিল। এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাচীন ভারতের ফলিত গণিত এবং স্থানিক পরিকল্পনার বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

কপিষ্ঠল-কঠ শাখা: খণ্ডিত পাণ্ডুলিপির আবিষ্কার ও পুনর্নির্মাণ (The Kapiṣṭhala-Kaṭha Śākhā: Discovery and Reconstruction of Fragmentary Manuscripts)

কৃষ্ণ যজুর্বেদের চতুর্থ এবং সবচেয়ে দুর্লভ শাখাটির নাম কপিষ্ঠল-কঠ শাখা (Kapiṣṭhala-Kaṭha Śākhā)। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্তও আধুনিক গবেষকদের কাছে এই টেক্সটটি ছিল এক কিংবদন্তির মতো। প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে এর নাম পাওয়া যেত, পতঞ্জলির ব্যাকরণে কপিষ্ঠলদের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে এই সংহিতার কোনো পাণ্ডুলিপি কারও হাতে ছিল না। অনেক পণ্ডিত ধরেই নিয়েছিলেন যে এই ঐতিহ্যটি ইতিহাসের বুক থেকে চিরতরে মুছে গেছে। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় পাণ্ডুলিপির ইতিহাস প্রায়ই চমকপ্রদ হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এসে এই হারিয়ে যাওয়া টেক্সটের কিছু অংশ নাটকীয়ভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এবং পুনর্নির্মাণের মূল কৃতিত্ব ভারতীয় প্রাচ্যবিদ রঘু বীরা (Raghu Vira)-র। তিনি কাশ্মীরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে প্রাচীন ভোজপাতায় লেখা কিছু জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেন (Raghu Vira, 1932)। এই পাণ্ডুলিপিগুলো ছিল অত্যন্ত খণ্ডিত, পোকা-মাকড়ে কাটা এবং বহু জায়গায় পাঠোদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। রঘু বীরা অসামান্য ধৈর্য ও পাণ্ডিত্যের সাথে সেই টুকরোগুলোকে মেলাতে শুরু করেন এবং ১৯৩২ সালে প্রথমবারের মতো কপিষ্ঠল-কঠ সংহিতা (Kapiṣṭhala-Kaṭha-Saṃhitā)-র একটি সম্পাদিত রূপ মুদ্রণের আলো দেখে। যদিও এর বহু অংশ এখনও অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে, তবুও যেটুকু উদ্ধার হয়েছে তা বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমূল্য সংযোজন।

ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে ‘কপিষ্ঠল’ নামটি বর্তমান ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কাইথাল (Kaithal) অঞ্চলের সাথে যুক্ত। মহাভারতেও কপিষ্ঠল জনপদের উল্লেখ রয়েছে। পাণ্ডুলিপিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংহিতাটি মূল কাঠক সংহিতার অত্যন্ত নিকটাত্মীয়। কিছু কিছু পণ্ডিতের মতে, কপিষ্ঠলরা ছিল কাঠকদেরই একটি স্থানীয় বা আঞ্চলিক দল, যারা কুরুক্ষেত্রের উত্তর প্রান্তে নিজেদের মতো করে যজ্ঞের আচারগুলোকে সামান্য পরিবর্তন করে চর্চা করত। এই শাখার গদ্যের শৈলী কাঠক সংহিতার মতোই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং সরাসরি নির্দেশনামূলক।

কপিষ্ঠল সংহিতার উদ্ধার বৈদিক পাঠের তুলনামূলক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। গবেষকরা দেখতে পান যে, একটি মূল টেক্সট কীভাবে বিভিন্ন ভৌগোলিক পকেটে গিয়ে পরিবর্তিত রূপ ধারণ করত। কোনো নির্দিষ্ট যজ্ঞের আহুতির সময় কাঠক শাখায় যে দেবতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, কপিষ্ঠল পাঠে হয়তো সেখানে অগ্নির কোনো ভিন্ন রূপকে সামনে আনা হয়েছে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বৈদিক ধর্ম কোনো একক গ্রন্থ দ্বারা পরিচালিত কোনো নিথর ব্যবস্থা ছিল না। বরং এটি ছিল জীবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং স্থানীয় চাহিদার সাথে আপস করে গড়ে ওঠা একটি আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান। কপিষ্ঠল শাখার খণ্ডিত রূপটি সেই বৈচিত্র্যেরই এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।

শাখাগুলোর তুলনামূলক সমাজতাত্ত্বিক ও আচারগত বিশ্লেষণ (Comparative Sociological and Ritual Analysis of the Śākhās)

কৃষ্ণ যজুর্বেদের এই চারটি প্রধান শাখা – তৈত্তিরীয়, মৈত্রায়ণী, কঠ এবং কপিষ্ঠল – পাশাপাশি রেখে পাঠ করলে বৈদিক সমাজের রূপান্তরের একটি বহুস্তরীয় চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রথমত, এই শাখাগুলোর ভৌগোলিক বণ্টন লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় প্রাচীন আর্য সমাজের বিস্তার কীভাবে পশ্চিম থেকে পূর্বে এবং পরে দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছিল। প্রাচীন ভারততাত্ত্বিক হার্টমুট শার্ফে (Hartmut Scharfe) তার প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বৈদিক শাখাগুলো কেবল উপাসনার দল ছিল না, এগুলো ছিল তৎকালীন সমাজের প্রভাবশালী এক-একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ‘চরণ’ (Caraṇa) (Scharfe, 2002)। প্রতিটি চরণের নিজস্ব আইন, সমাজদৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল। এই শাখাগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা প্রায়ই প্রকাশ পেত নিজেদের যজ্ঞপদ্ধতিকে অন্য সবার চেয়ে বেশি কার্যকর হিসেবে জাহির করার মধ্য দিয়ে।

আচারগত পার্থক্যের দিক থেকেও শাখাগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজসূয় যজ্ঞের সময় রাজার রাজ্যাভিষেকের প্রক্রিয়ায় মৈত্রায়ণী সংহিতায় যে ধরনের স্থানীয় রীতিনীতি এবং পাশা খেলার উল্লেখ পাওয়া যায়, তৈত্তিরীয় শাখায় তা কিছুটা ভিন্নভাবে বিন্যস্ত। উইলহেম রাউ কৃষ্ণ যজুর্বেদের টেক্সটগুলো থেকে তৎকালীন বসতি এবং নগরব্যবস্থার আদি রূপ সন্ধান করতে গিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, এই সংহিতাগুলোতে ‘পুর’ (Pur) বা মাটির তৈরি দুর্গজাতীয় কাঠামোর উল্লেখ রয়েছে, যা যুদ্ধকালীন আশ্রয়ের জন্য ব্যবহৃত হতো (Rau, 1957)। তৈত্তিরীয় এবং কাঠক শাখায় এই পুরগুলোর বর্ণনা বা ধ্বংসের যে প্রতীকী আচার রয়েছে, তা বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক নিরাপত্তার বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে।

তাছাড়া, সমাজে বিভিন্ন বর্ণের অবস্থান নির্ধারণেও এই শাখাগুলোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। সাধারণ উৎপাদনকারী বা কৃষিজীবী শ্রেণি অর্থাৎ বৈশ্যদের কীভাবে যজ্ঞের অর্থনৈতিক জোগানদাতা হিসেবে ব্যবহার করা হবে, অথচ রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্ত থেকে দূরে রাখা হবে, তার বিস্তৃত ছক এই সংহিতাগুলোতে সাজানো ছিল। তৈত্তিরীয় সংহিতায় যেমন শূদ্রদের যজ্ঞস্থল থেকে দূরে রাখার বিধান অত্যন্ত কঠোর, কাঠক সংহিতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি নিয়ে তুলনামূলক কিছুটা নমনীয়তা চোখে পড়ে। এর কারণ সম্ভবত কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া আর্য বসতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। ফলে শাস্ত্রীয় বিধানকে বাস্তব সমাজপরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য হতে হয়েছিল।

পরিশেষে বলা যায়, কৃষ্ণ যজুর্বেদের এই চারটি শাখা কোনো একক ধর্মীয় মতবাদের প্রকাশ নয়। বরং এগুলো হলো প্রাচীন উত্তর ভারতের বিভিন্ন জনপদে ক্ষমতার বিকাশ, উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং মহাজাগতিক নিয়মের আশ্রয়ে পার্থিব কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার চার ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস। এই শাখাগুলোর সাহিত্যিক এবং সামাজিক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, বৈদিক সমাজ কোনো একমুখী ধারায় এগোয়নি। একদিকে তৈত্তিরীয় শাখার মাধ্যমে এই ঐতিহ্য দক্ষিণ ভারতের সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, অন্যদিকে মৈত্রায়ণী ও কাঠক শাখার মধ্য দিয়ে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের রূপান্তরের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়ে রইল। কৃষ্ণ যজুর্বেদের প্রতিটি পৃষ্ঠা তাই প্রাচীন ভারতের আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক।

শুক্ল যজুর্বেদ (Śukla Yajurveda): বাজসনেয়ি সংহিতা, মাধ্যন্দিন ও কাণ্ব শাখা

শুক্ল যজুর্বেদের উন্মেষ ও টেক্সট-বিভাজনের দর্শন (Emergence of the Śukla Yajurveda and the Philosophy of Textual Separation)

প্রাচীন ভারতের বৈদিক সংকলনগুলোর মধ্যে টেক্সট সম্পাদনার এক চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত দেখা যায় শুক্ল যজুর্বেদে। কৃষ্ণ যজুর্বেদের বিশৃঙ্খল কাঠামো যেখানে গবেষকদের প্রায়ই দ্বিধায় ফেলে দেয়, শুক্ল যজুর্বেদ সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সম্পাদনারীতি হাজির করে। এখানে একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন কাজ করেছে – যা মন্ত্র, তা থাকবে সংহিতায়; আর যা ব্যাখ্যা বা আলোচনা, তা চলে যাবে ব্রাহ্মণে। এই দ্ব্যর্থহীন বিভাজন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক গুরুকুলগুলোর ভেতরে গড়ে ওঠা এক গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক পর্যালোচনার ফসল। পুরোহিতদের মনে হয়তো এই প্রশ্নটি তীব্রভাবে দেখা দিয়েছিল যে, যজ্ঞের ময়দানে দাঁড়িয়ে দ্রুত কাজ করার সময় ব্যাখ্যামূলক দীর্ঘ গদ্যের বোঝা বয়ে বেড়ানো কতটা যৌক্তিক।

জার্মান ভারততাত্ত্বিক আলব্রেখট ওয়েবার (Albrecht Weber) উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই সংহিতার প্রথম আধুনিক ইউরোপীয় সংস্করণ প্রকাশের সময় লক্ষ্য করেছিলেন যে, শুক্ল যজুর্বেদ আসলে একটি অত্যন্ত সচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কারের নিদর্শন (Weber, 1852)। প্রাচীন ভারতে যখন মৌখিক সাহিত্যের পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তখন তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। কৃষ্ণ যজুর্বেদের ধারায় মন্ত্র ও ব্রাহ্মণের যে খিচুড়ি অবস্থা ছিল, শুক্ল যজুর্বেদের সংকলকরা সচেতনভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। তারা শুধু মূল যজ্ঞীয় শ্লোক ও গদ্যমন্ত্রগুলোকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র সংকলনের রূপ দেন।

এই টেক্সট-বিভাজনের পেছনে কাজ করেছিল একটি পরিষ্কার উপযোগিতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। যজ্ঞের জটিল মঞ্চে দাঁড়িয়ে অধ্বর্যু (Adhvaryu) পুরোহিতকে প্রতি মুহূর্তে সঠিক উচ্চারণ করতে হতো। সেই মুহূর্তে যজ্ঞের পেছনের রূপক গল্প বা দেবতাদের ঝগড়ার বিবরণ তার কাজের গতিকে শ্লথ করে দিত। তাই ব্যাখ্যামূলক অংশগুলোকে কেটে বের করে নিয়ে তৈরি করা হলো বিখ্যাত শতপথ ব্রাহ্মণ (Śatapatha Brāhmaṇa)। আর মূল সংহিতাটি সংরক্ষিত হলো সম্পূর্ণ নির্ভেজাল মন্ত্রসংগ্রহ হিসেবে। ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মুলার (Friedrich Max Müller) এই কাঠামোগত রূপান্তরকে প্রাচীন ভারতের টেক্সট বিন্যাসের ইতিহাসে সবচেয়ে পরিণত পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন (Müller, 1859)।

জ্ঞানতাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে এটা দেখায় যে, বৈদিক সমাজ তখন সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার স্বাতন্ত্র্য বুঝতে শিখছিল। উপাসনা বা আনুষ্ঠানিক ক্রিয়ার ভাষা আর সেই ক্রিয়ার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ভাষা যে এক নয়, এই সত্যটি শুক্ল যজুর্বেদের সংকলকরা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এর ফলে সংহিতা অংশটি পেল একটি তীক্ষ্ণ, গতিশীল রূপ এবং ব্রাহ্মণ অংশটি পেল স্বাধীনভাবে ধর্মতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব আলোচনার বিশাল পরিসর। প্রাচীন পৃথিবীর যেকোনো ধর্মগ্রন্থের ইতিহাসেই এই ধরনের পদ্ধতিগত বিচ্ছেদ অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।

বাজসনেয়ি সংহিতার গঠন ও যাজ্ঞবল্ক্য পরম্পরা (Structure of the Vājasaneyi Saṃhitā and the Yājñavalkya Tradition)

শুক্ল যজুর্বেদের মূল সংহিতাটি পরিচিত বাজসনেয়ি সংহিতা (Vājasaneyi Saṃhitā) নামে। বাজসনি নামের এক ঋষির পুত্র ছিলেন যাজ্ঞবল্ক্য, যার নামানুসারে এই সংহিতার এই নামকরণ করা হয়েছে। এই যাজ্ঞবল্ক্য বৈদিক সাহিত্যের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং বিতর্কিত চরিত্র। তিনি প্রচলিত আচারসর্বস্ব ধারার সাথে আপস করেননি। গুরু বৈশম্পায়নের সাথে বিরোধে জড়িয়ে তিনি সম্পূর্ণ নতুন এবং সংস্কারমুক্ত একটি ঐতিহ্যের সূচনা করেছিলেন বলে প্রাচীন আখ্যানে দাবি করা হয়। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই উপাখ্যানের অর্থ দাঁড়ায়, তৎকালীন উত্তর ভারতে প্রচলিত বৈদিক চিন্তার বিরুদ্ধে একদল তরুণ ও সংস্কারকামী পুরোহিত দাঁড়িয়েছিলেন, যারা পাঠের একটি স্বচ্ছ রূপ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

বাজসনেয়ি সংহিতা মোট চল্লিশটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই অধ্যায়গুলোর বিন্যাসের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে পুরো সংকলনটি এক দিনে তৈরি হয়নি। এর প্রথম পঁচিশটি অধ্যায়কে পণ্ডিতরা সবচেয়ে প্রাচীন স্তর বলে মনে করেন। এই অংশটিতে দৈনন্দিন এবং প্রধান প্রধান শ্রৌতযজ্ঞের মন্ত্রগুলো ক্রমানুসারে সাজানো রয়েছে। যেমন প্রথম দুই অধ্যায়ে রয়েছে দর্শপূর্ণমাস, অর্থাৎ অমাবস্যা ও পূর্ণিমার যজ্ঞের বিধান। এর পরের অধ্যায়গুলোতে রয়েছে অগ্নিহোত্র, সোমযাগ, বাজপেয় এবং রাজসূয় যজ্ঞের মন্ত্র। প্রতিটি অধ্যায়ের ভাষা অত্যন্ত সংহত এবং বাহুল্যবর্জিত।

ছাব্বিশ থেকে চল্লিশ নম্বর অধ্যায়গুলো বৈদিক গবেষকদের কাছে পরিচিত ‘খিল’ (Khila) বা পরিশিষ্ট হিসেবে। ভারততাত্ত্বিক পণ্ডিত জুলিয়াস এগেলিং (Julius Eggeling) শতপথ ব্রাহ্মণের ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, এই শেষাংশগুলো মূল সংহিতার সাথে পরবর্তীকালে কোনো এক ঐতিহাসিক পর্যায়ে যুক্ত করা হয়েছিল (Eggeling, 1882)। বিশেষ করে ত্রিশ নম্বর অধ্যায়ে রয়েছে বিখ্যাত পুরুষমেধ (Puruṣamedha) যজ্ঞের মন্ত্র, যেখানে সমাজের বিভিন্ন পেশা ও স্তরের মানুষের দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যায়। এই তালিকা তৎকালীন ভারতীয় শ্রমবিভাগ বোঝার জন্য সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে এক অমূল্য উপাদান।

বাজসনেয়ি সংহিতার সবচেয়ে বিস্ময়কর সমাপ্তি ঘটেছে এর চল্লিশতম অধ্যায়ে। এটি অন্য কোনো যজ্ঞের মন্ত্র নয়, বরং এটি সরাসরি ঈশাবাস্য উপনিষদ (Īśāvāsya Upaniṣad)। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসে এটি একমাত্র উদাহরণ যেখানে একটি প্রধান উপনিষদ কোনো সংহিতার সরাসরি অংশ হিসেবে টিকে রয়েছে। জার্মান দার্শনিক ও প্রাচ্যবিদ পল ডেউসেন (Paul Deussen) তার ভারতীয় দর্শন সংক্রান্ত গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে, শুক্ল যজুর্বেদ তার মন্ত্রগুলোর যজ্ঞীয় উপযোগিতা শেষ করে একেবারে চরম ভাববাদী দর্শনে গিয়ে নিজেকে সমর্পণ করেছে (Deussen, 1906)। এটি আচারসর্বস্ব কর্মকাণ্ড থেকে বিমূর্ত আত্মোপলব্ধির দিকে উত্তরণের এক নীরব ঐতিহাসিক সেতু।

মাধ্যন্দিন শাখা: বিন্যাস, ভৌগোলিক ক্ষেত্র ও সামাজিক বিস্তার (The Mādhyandina Śākhā: Arrangement, Geographical Domain, and Social Spread)

শুক্ল যজুর্বেদের দুটি প্রধান ধারার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং প্রভাবশালী রূপটি হলো মাধ্যন্দিন শাখা (Mādhyandina Śākhā)। এই শাখার নাম এসেছে ঋষি মাধ্যন্দিনের নাম থেকে, যাকে প্রাচীন ঐতিহ্যে যাজ্ঞবল্ক্যের অন্যতম প্রধান শিষ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সংস্কৃত ‘মধ্যন্দিন’ (Madhyandina) শব্দের অর্থ দ্বিপ্রহর বা দুপুরবেলা। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, এই শাখার পুরোহিতরা দ্বিপ্রহরের সময় সূর্যের উপাসনা করে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তবে রূপকের বাইরে বাস্তবিকভাবে এটি ছিল উত্তর ও পূর্ব ভারতের এক সুবিশাল পুরোহিত সম্প্রদায়ের নিজস্ব পাঠশালা।

মাধ্যন্দিন সংহিতায় মোট চল্লিশটি অধ্যায়ে এক হাজার নয়শত পঁচাত্তরটি কণ্ডিকা বা মন্ত্রখণ্ড রয়েছে। এই শাখার পাঠরীতি অন্যান্য বৈদিক পাঠের চেয়ে কিছুটা স্বতন্ত্র। বিশেষ করে এর ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে কিছু সুস্পষ্ট নিয়ম লক্ষ্য করা যায়। যেমন প্রাচীন ভারতে যখন এই সংহিতা আবৃত্তি করা হতো, তখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘য’ ধ্বনিকে ‘জ’ এবং মূর্ধন্য ‘ষ’ ধ্বনিকে ‘খ’ হিসেবে উচ্চারণ করার বিশেষ রীতি চালু ছিল। ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেন (Sukumar Sen) প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষার বিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই ধরনের ধ্বনিগত রূপান্তর মূলত প্রাচ্য বা পূর্ব ভারতের কথ্য উপভাষার প্রভাবের ফল (Sen, 1958)। বৈদিক সংস্কৃত যখন পূর্বের দিকে বিস্তার লাভ করছিল, তখন স্থানীয় ভাষার উচ্চারণভঙ্গি সংহিতার আবৃত্তির ভেতরেও প্রবেশ করেছিল।

ভৌগোলিক দিক থেকে মাধ্যন্দিন শাখার প্রভাব ছিল বিশাল। বর্তমান উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট এবং এমনকি বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই শাখার প্রাধান্য তৈরি হয়েছিল। কুরু-পাঞ্চাল ভূখণ্ডের সীমানা পেরিয়ে গঙ্গার ভাটির দিকে আর্য সংস্কৃতির যে বিস্তার ঘটেছিল, মাধ্যন্দিন শাখা ছিল তার প্রধান বাহক। সাধারণ সামাজিক আচার, শ্রাদ্ধ, বিবাহ এবং গৃহ্য অনুষ্ঠানে উত্তর ভারতের বেশিরভাগ উচ্চবর্ণের পরিবারে আজও মাধ্যন্দিন শাখার মন্ত্রই উচ্চারিত হয়। এই ঐতিহাসিক বিস্তার দেখায় যে, একটি সুশৃঙ্খল টেক্সট কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলের সামাজিক স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

তাছাড়া, মাধ্যন্দিন শাখার সাথে যুক্ত শতপথ ব্রাহ্মণের সংকলনটিও চৌদ্দটি কাণ্ডে সাজানো এবং এটি বৈদিক সাহিত্যের সর্ববৃহৎ গদ্যগ্রন্থ। এই সুবিশাল পাঠভাণ্ডার তৎকালীন সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র দত্ত (Romesh Chunder Dutt) প্রাচীন ভারতের সভ্যতা বিষয়ক আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, মাধ্যন্দিন ঐতিহ্যের বিবরণগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে আর্য সমাজ তখন উপজাতীয় স্তর পার হয়ে স্থায়ী কৃষিভিত্তিক নগর ও জনপদের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে (Dutt, 1889)। রাজা, রাজকর্মচারী, কর আদায়কারী এবং বিভিন্ন ধরনের কারিগরদের যে বিস্তারিত বিবরণ এই শাখায় পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো প্রাচীন সংহিতায় এত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধরা পড়েনি।

কাণ্ব শাখা: স্বতন্ত্র পাঠভেদ, লিপি ও আঞ্চলিক রূপান্তর (The Kāṇva Śākhā: Distinct Variant Readings, Script, and Regional Adaptation)

শুক্ল যজুর্বেদের দ্বিতীয় ধারাটি পরিচিত কাণ্ব শাখা (Kāṇva Śākhā) নামে। এটি ঋষি কণ্বের শিষ্যদের দ্বারা সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছিল। সাধারণ দৃষ্টিতে মাধ্যন্দিন এবং কাণ্ব শাখার মধ্যে মূল বিষয়ের কোনো পার্থক্য নেই, কারণ দুটি শাখাই একই যজ্ঞব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু পাঠের সূক্ষ্ম বিচার করলে দেখা যায়, এদের মধ্যে প্রচুর শব্দগত এবং গঠনগত পাঠভেদ রয়েছে। কাণ্ব সংহিতাতেও চল্লিশটি অধ্যায় রয়েছে, তবে এতে মন্ত্রখণ্ডের সংখ্যা দুই হাজার ছিয়াশিটি। অর্থাৎ মাধ্যন্দিন পাঠের চেয়ে এখানে মন্ত্রের সংখ্যা সামান্য বেশি।

এই দুটি শাখার মধ্যকার পাঠভেদ ভাষাতাত্ত্বিকদের জন্য এক দারুণ গবেষণার বিষয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাধ্যন্দিন শাখায় যে বাক্যটি গদ্যে রয়েছে, কাণ্ব শাখায় তা কিছুটা ছন্দোবদ্ধ পদ্যের রূপ নিয়েছে। আবার ব্যাকরণের রূপতত্ত্বেও স্পষ্ট ফারাক চোখে পড়ে। ভাষাতত্ত্ববিদ হ্যান্স হেনরিক হক (Hans Henrich Hock) বৈদিক সংস্কৃতের উপভাষাগত ভিন্নতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কাণ্ব এবং মাধ্যন্দিন শাখার ব্যাকরণিক পার্থক্যগুলো মূলত দুটি সমান্তরাল আঞ্চলিক ঐতিহ্যের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার ফল (Hock, 1991)। একই মূল উৎস থেকে জন্ম নেওয়া দুটি ধারা ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে গিয়ে নিজস্ব নিয়মে বিবর্তিত হয়েছিল।

কাণ্ব শাখার টিকে থাকার ভূগোলটিও বেশ চমকপ্রদ। উত্তর ভারতে মাধ্যন্দিন শাখার ব্যাপক আধিপত্যের মুখে কাণ্ব শাখা ধীরে ধীরে দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের দিকে সরে যায়। বিশেষ করে বর্তমান মহারাষ্ট্রের কিছু অংশ, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং ওড়িশায় কাণ্ব শাখার পাণ্ডুলিপি ও পুরোহিতদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ওড়িশার ব্রাহ্মণ সমাজের একটি বড় অংশ আজও কাণ্ব শাখার ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। দক্ষিণের লিপিমালা যেমন তেলুগু, কন্নড় বা গ্রন্থ লিপিতে কাণ্ব সংহিতার বহু প্রাচীন তালপাতার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে কাণ্ব শাখার এই সহাবস্থান বৈদিক সাহিত্যের বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে। উত্তরে যখন ক্রমাগত রাজনৈতিক ভাঙাগড়া চলছিল, তখন দক্ষিণের সুরক্ষিত পরিবেশে কাণ্ব পাঠটি তার নিজস্ব বিশুদ্ধতা নিয়ে বেঁচে ছিল। গবেষকরা যখন এই দুটি শাখার পাঠ পাশাপাশি রেখে তুলনা করেন, তখন তারা বুঝতে পারেন কীভাবে মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে একটি টেক্সট দুটি ভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়েও নিজেদের মূল সুরটি হাজার বছর ধরে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিল।

শুক্ল যজুর্বেদের যজ্ঞপ্রক্রিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন (Ritual Innovations and Structural Shifts in the Śukla Yajurveda)

শুক্ল যজুর্বেদের আবির্ভাবের ফলে বৈদিক যজ্ঞের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক কাঠামোতে কিছু গভীর পরিবর্তন ঘটেছিল। কৃষ্ণ যজুর্বেদে যেখানে যজ্ঞ ছিল অনেকটা ভীতিমিশ্রিত এবং রহস্যময় এক কায়িক প্রক্রিয়া, শুক্ল যজুর্বেদে এসে তা পরিণত হয় এক অত্যন্ত পরিশীলিত, গণিতসম্মত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনে। যজ্ঞবেদীর মাপজোখ, ইটের সংখ্যা এবং আহুতির সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক ধরনের জ্যামিতিক নির্ভুলতা দাবি করা শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া যজ্ঞকে অন্ধ বিশ্বাস থেকে সরিয়ে এক ধরনের তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রযুক্তির মর্যাদায় উন্নীত করেছিল।

এই সংহিতায় বর্ণিত অগ্নিচয়ন (Agnicayana) যজ্ঞের দিকে তাকালে এই পরিবর্তনটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এখানে পাখির আকৃতিতে তৈরি বিশাল অগ্নিবেদী নির্মাণের যে বিবরণ রয়েছে, তা এক বিশাল প্রকৌশল কর্মের মতো। পাঁচ স্তরে হাজার হাজার ইট সাজিয়ে এই বেদী তৈরি করা হতো। প্রতিটি স্তরের জন্য আলাদা আলাদা মন্ত্র নির্দিষ্ট ছিল। ভারততাত্ত্বিক মার্টিন হাউগ (Martin Haug) বৈদিক আচার পদ্ধতির বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে লক্ষ্য করেছিলেন যে, শুক্ল যজুর্বেদের পুরোহিতরা যজ্ঞকে মহাজাগতিক পুনর্বিন্যাসের একটি রূপক হিসেবে দেখতেন (Haug, 1863)। মানুষ যজ্ঞের মাধ্যমে যেন পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে নতুন করে তৈরি করছে – এই ধরনের এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক দাবি এই সংহিতার ছত্রে ছত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।

আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যায় বলিদানের ধারণার ভেতরে। শুক্ল যজুর্বেদে যজ্ঞীয় পশুর উৎসর্গকে অনেক বেশি প্রতীকী রূপ দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যদিও পশু বলিদান পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু শতপথ ব্রাহ্মণের ভাষ্যের সাথে মিলিয়ে পড়লে দেখা যায় যে, পুরোহিতরা ধীরে ধীরে শারীরিক বলিদানের চেয়ে মন্ত্রের আধ্যাত্মিক শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিলেন। বিশেষ করে সর্বমেধ (Sarvamedha) যজ্ঞের মতো অনুষ্ঠানে সবকিছু ত্যাগ করার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা বস্তুবাদী যজ্ঞ থেকে ত্যাগবাদী দর্শনের দিকে সমাজের রূপান্তরকে নির্দেশ করে।

তাছাড়া, যজ্ঞের মাধ্যমে সামাজিক বিভিন্ন বর্গের অন্তর্ভুক্তি ঘটানোর একটি চেষ্টাও এই সংহিতায় দেখা যায়। ঋগ্বেদের যুগে যারা ছিল প্রান্তিক, তাদের অনেককে কোনো না কোনোভাবে যজ্ঞের পরিধির ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছিল। যেমন রথ প্রস্তুতকারী বা ‘রথকার’ (Rathakāra), কামার বা ধাতুশিল্পী এবং বিভিন্ন শিকারী গোষ্ঠীকে যজ্ঞীয় প্রক্রিয়ার বিভিন্ন উপাদানের সাথে যুক্ত করা হয়। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক আচার আসলে কোনো মানবিক উদারতা থেকে আসেনি। বরং এটি ছিল দ্রুত বর্ধনশীল কৃষি ও হস্তশিল্পভিত্তিক সমাজে সমস্ত উৎপাদনকারী গোষ্ঠীকে ব্রাহ্মণীয় যজ্ঞকাঠামোর অনুগত রাখার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল।

বিদেহ রাজ্য, প্রাচ্য ভূখণ্ড ও পূর্বমুখী বৌদ্ধিক রূপান্তর (The Kingdom of Videha, Eastern Territories, and the Eastward Intellectual Shift)

শুক্ল যজুর্বেদের ইতিহাস মূলত প্রাচীন ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র পশ্চিম থেকে পূর্বে স্থানান্তরিত হওয়ার ইতিহাস। ঋগ্বেদের ভূগোল ছিল পাঞ্জাব কেন্দ্রিক, কৃষ্ণ যজুর্বেদ থিতু হয়েছিল হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশের কুরু-পাঞ্চাল অঞ্চলে। কিন্তু শুক্ল যজুর্বেদের মূল কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছিল আরও পূর্বে – বর্তমান উত্তর বিহার ও নেপাল সীমান্তের বিদেহ (Videha) রাজ্যে। বিদেহের রাজা জনক ছিলেন এই নতুন বৌদ্ধিক আন্দোলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। প্রাচীন কুরু অঞ্চলের গোঁড়া ও রক্ষণশীল পুরোহিততন্ত্রের বিপরীতে বিদেহ তখন হয়ে উঠেছিল এক মুক্তচিন্তা ও দার্শনিক বিতর্কের উর্বর ক্ষেত্র।

সমাজবিজ্ঞানী উমা চক্রবর্ত্তী (Uma Chakravarti) প্রাচীন বৌদ্ধ সমাজের পটভূমি আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, পূর্ব ভারত বা বৃহত্তর মগধ-বিদেহ অঞ্চলটি পশ্চিমের মতো কঠোর বর্ণাশ্রমের অধীনে ছিল না (Chakravarti, 1987)। এখানে ক্ষত্রিয় রাজারা এবং স্বাধীন ভাবুকরা সরাসরি ধর্মীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিলেন। শুক্ল যজুর্বেদের প্রধান ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য এই বিদেহ রাজসভারই মধ্যমণি ছিলেন। রাজা জনকের সভায় আয়োজিত বিখ্যাত শাস্ত্রার্থগুলোতে তিনি কুরু-পাঞ্চাল থেকে আসা প্রবীণ পুরোহিতদের তর্কে পরাস্ত করতেন। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট দেখায় যে, পশ্চিমের আধিপত্যকে ভেঙে পূর্ব ভারত তখন নিজস্ব একটি ধর্মীয় ও দার্শনিক বিকল্প তৈরি করছিল।

দার্শনিক গবেষক বেনি মাধব বড়ুয়া (Beni Madhab Barua) প্রাক-বৌদ্ধ ভারতীয় দর্শনের রূপরেখা টানতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে, যাজ্ঞবল্ক্যের চিন্তার মধ্য দিয়েই বৈদিক ধর্ম তার সবচেয়ে প্রগতিশীল রূপটি খুঁজে পেয়েছিল (Barua, 1921)। শুক্ল যজুর্বেদের ছায়ায় বসে যেসব বিতর্ক হচ্ছিল, তা কেবল যজ্ঞের ঘি বা চামচ নিয়ে ছিল না। সেখানে আত্মা কী, মৃত্যুর পর কী থাকে, এবং পরম সত্যের স্বরূপ কী – এই প্রশ্নগুলো সরাসরি উচ্চারিত হচ্ছিল। এই মুক্ত বাতাবরণই পরবর্তীতে উপনিষদের অদ্বৈতবাদী দর্শন এবং একই সাথে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মতো প্রতিবাদী আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।

শুক্ল যজুর্বেদ তাই কেবল একটি প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ নয়। এটি প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক রূপান্তর, ভাষা সংস্কৃতির সমন্বয় এবং একটি নতুন সামাজিক বিন্যাসের ঐতিহাসিক সাক্ষী। কুরু-পাঞ্চালের পুরনো যাযাবর কাঠামোর সমাপ্তি ঘটিয়ে বিদেহ-মগধের নতুন কৃষিভিত্তিক নগর সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর যখন স্থাপিত হচ্ছিল, শুক্ল যজুর্বেদ সেই রূপান্তরের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছে। এই সংহিতার মন্ত্রগুলো এবং তার সাথে যুক্ত শতপথ ব্রাহ্মণের বিবরণগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, কীভাবে প্রাচীন ভারত ধীরে ধীরে তার চিন্তার কেন্দ্রটিকে চিরতরে বদলে ফেলেছিল।

যজুর্বেদের যজ্ঞব্যবস্থা (Sacrificial System of the Yajurveda): অধ্বর্যু, অগ্নিহোত্র, দর্শপূর্ণমাস ও সোমযাগ

যজুর্বেদীয় যজ্ঞকাঠামো ও অধ্বর্যুর কর্মতৎপরতা (The Yajurvedic Sacrificial Structure and the Praxis of the Adhvaryu)

বৈদিক যজ্ঞের পুরো জগৎটাকে যদি একটি বিশাল নাট্যমঞ্চ হিসেবে কল্পনা করা যায়, তবে সেই মঞ্চের প্রধান নির্দেশক এবং একই সাথে সবচেয়ে ব্যস্ত অভিনেতা হলেন অধ্বর্যু (Adhvaryu)। যজুর্বেদের মন্ত্রগুলো পাঠ করলেই বোঝা যায় যে, এগুলো কোনো নিছক স্তোত্র নয়। এগুলো হলো মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনেতার মতো প্রতি পদক্ষেপে উচ্চারণ করার মতো সংলাপ। যজ্ঞের আগুন কীভাবে প্রস্তুত হবে, কাষ্ঠখণ্ড কীভাবে সাজানো হবে এবং চামচ দিয়ে কোন কোণে ঘি ঢালা হবে – প্রতিটি কাজের সাথে অধ্বর্যুর মুখ থেকে বের হতো একটি নির্দিষ্ট সূত্র। এই পুরোহিতের শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া পুরো বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থাই সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ত।

বৈদিক যজ্ঞকাঠামোকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। একটি হলো হবির্যজ্ঞ (Haviryajña), যেখানে মূলত দুধ, ঘি, শস্য এবং যব দিয়ে তৈরি পিঠা আহুতি দেওয়া হতো। অন্যটি হলো সোমযাগ (Somayāga), যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত সোমরসের নিবেদন এবং পশুবলি। এই দুই ধরনের আচারেই অধ্বর্যুকে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো না। অন্য পুরোহিতরা যখন এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতেন, অধ্বর্যুকে তখন যজ্ঞশালার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে বেড়াতে হতো। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক হেনরি হুবার্ট (Henri Hubert) এবং মার্সেল মস (Marcel Mauss) তাদের বলিদানের সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, যজ্ঞকারী এবং দেবতার মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য এমন একজন প্রায়োগিক মাধ্যমের প্রয়োজন হয় যিনি পবিত্র এবং অপবিত্র জগতের সীমানায় দাঁড়িয়ে ঝুঁকিহীনভাবে কাজ পরিচালনা করতে পারেন (Hubert & Mauss, 1899)। অধ্বর্যু ঠিক সেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন।

অধ্বর্যুর কাজের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং প্রযুক্তিগত। তিনি যজ্ঞের স্থান নির্বাচন করতেন এবং দড়ি দিয়ে মেপে বেদী তৈরি করতেন। কাঠের তৈরি অস্ত্র ‘স্ফ্য’ (Sphya) দিয়ে মাটি খুঁড়ে তিনি স্থানটিকে পবিত্র করতেন। যজুর্বেদে এমনও বিধান রয়েছে যে, অধ্বর্যু যদি কোনো পদক্ষেপে একটি ভুল শব্দ উচ্চারণ করেন বা ভুল হাতে কোনো পাত্র ধরেন, তবে পুরো যজ্ঞের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। ফরাসি প্রাচ্যবিদ সিলভ্যাঁ লেভি (Sylvain Lévi) বৈদিক ব্রাহ্মণের যজ্ঞতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই যান্ত্রিক মানসিকতার ওপর আলোকপাত করেছেন (Lévi, 1898)। তিনি দেখিয়েছেন যে, এই যজ্ঞগুলোতে দেবতার প্রতি কোনো ভক্তি বা ভালোবাসার জায়গা ছিল না। পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালিত হতো এক ধরনের যান্ত্রিক স্বয়ংক্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে – ঠিকমতো বোতাম চাপলে যেমন যন্ত্র চালু হয়, ঠিক তেমনি সঠিক মন্ত্র ও শারীরিক ক্রিয়ার সংযোগ ঘটলে মহাবিশ্বের শক্তি ফলাফল দিতে বাধ্য হতো।

এই পুরো প্রক্রিয়াটিতে অধ্বর্যুর সাথে কয়েকজন সহকারী থাকতেন, যাদের মধ্যে ‘প্রতিপ্রস্থাতা’ (Pratiprasthātṛ), ‘নেষ্টা’ (Neṣṭṛ) এবং ‘উন্নেতা’ (Unnetṛ) অন্যতম। এরা প্রত্যেকেই অধ্বর্যুর সরাসরি নির্দেশে কাজ করতেন। কোনো একজন সহকারী যখন কাঠের পাত্রে সোমরস ছাঁকতেন, অন্যজন তখন যজ্ঞের আগুনকে বাতাস দিয়ে প্রজ্জ্বলিত রাখতেন। অধ্বর্যুর কণ্ঠস্বর ছিল অনুচ্চ এবং মৃদু, যাকে বলা হতো ‘উপাংশু’ (Upāṃśu)। এই অনুচ্চ উচ্চারণ পুরো পরিবেশের মধ্যে এক ধরনের ভারী এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করত। সাধারণ যজমান পাশে দাঁড়িয়ে দেখতেন কীভাবে এই প্রশিক্ষিত দলটি তার পার্থিব সমৃদ্ধির জন্য মহাজাগতিক শক্তিকে বশ করার চেষ্টা করছে।

অগ্নিহোত্র: গার্হস্থ্য অগ্নি ও দৈনন্দিন আহুতির বিস্তার (Agnihotra: The Domestic Fire and the Scope of Daily Oblations)

বৈদিক গৃহস্থের জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রাত্যহিক যজ্ঞীয় দায়িত্বটি ছিল অগ্নিহোত্র (Agnihotra)। এটি কোনো রাজকীয় জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব ছিল না, বরং ছিল একজন ‘আহিতাগ্নি’ (Āhitāgni) বা পবিত্র অগ্নি স্থাপনকারী গৃহস্থের প্রতিদিনের রুটিন। কোনো ব্যক্তি যখন বিবাহ করে সংসারী হতেন, তখন তিনি তার ঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি পবিত্র আগুন স্থাপন করতেন। এরপর থেকে আমৃত্যু, প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার সময় এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় তাকে এই আগুনে দুধ বা ঘি আহুতি দিতে হতো। এই যজ্ঞকে কোনোভাবেই অবহেলা করার উপায় ছিল না। একদিনের জন্যও এই আহুতি বন্ধ হলে তাকে কঠোর প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো।

অগ্নিহোত্রের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তিনটি অগ্নিকুণ্ড, যা তৎকালীন সামাজিক ও মহাজাগতিক ধারণার একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। প্রথমটি হলো গার্হপত্য (Gārhapatya) অগ্নি, যার বেদীটি হতো বৃত্তাকার। এটি গৃহের নিজস্ব আগুন, যা থেকে অন্য সমস্ত আগুন প্রজ্বলিত করা হতো। দ্বিতীয়টি হলো আহবনীয় (Āhavanīya) অগ্নি, যা স্থাপন করা হতো পূর্ব দিকে এবং এর বেদীটি হতো চারকোনা। এটি ছিল দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত আগুন, যেখানে সমস্ত প্রধান আহুতি ঢালা হতো। তৃতীয় আগুনটি ছিল দক্ষিণাগ্নি (Dakṣiṇāgni), যা অর্ধচন্দ্রাকারে দক্ষিণ দিকে রাখা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল পূর্বপুরুষ বা পিতৃপুরুষদের তৃপ্ত করা এবং একই সাথে দক্ষিণ দিক থেকে আসা অশুভ শক্তি বা মৃত্যুকে প্রতিহত করা। ভারততাত্ত্বিক পণ্ডিত পি. ভি. কানে (P. V. Kane) তার সুবিশাল গ্রন্থ হিস্ট্রি অব ধর্মশাস্ত্র (History of Dharmaśāstra)-এ উল্লেখ করেছেন যে, এই তিন অগ্নির বিন্যাসই পরবর্তীকালের সমস্ত জটিল শ্রৌতযজ্ঞের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল (Kane, 1941)।

অগ্নিহোত্রের পুরো আচারটি খুব বেশি দীর্ঘ ছিল না, তবে এর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নিয়মমাফিক। গৃহস্থ বা তার নিযুক্ত অধ্বর্যু একটি মাটির পাত্রে গরুর দুধ গরম করতেন। দুধটি সঠিকভাবে ফুটে ওঠার পর তাতে কয়েকটি কুশ ঘাস বা জল ছিটিয়ে শান্ত করা হতো। এরপর কাঠের লম্বা চামচ বা ‘অগ্নিহোত্রহবণী’ (Agnihotrahavaṇī) দিয়ে সেই দুধ তুলে আহবনীয় আগুনে ঢেলে দেওয়া হতো। আহুতির সময় মন্ত্রে বলা হতো, সূর্য অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করছে এবং অগ্নি সূর্যের মধ্যে প্রবেশ করছে। এই আচারের মধ্য দিয়ে দিন ও রাতের পরিবর্তনকে মানুষের হাতের ক্রিয়ার সাথে বেঁধে ফেলার এক আদিম মনস্তাত্ত্বিক প্রয়াস দেখা যেত।

আধুনিক ধর্মতত্ত্ববিদ টিমোথি লুবার্স (Timothy Lubin) প্রাচীন ভারতীয় হোম এবং আচারের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, অগ্নিহোত্রের এই নিয়ন্ত্রিত দৈনন্দিন কাঠামোটিই পরবর্তীতে ভারতীয় সমাজের গৃহস্থ ধর্ম ও পারিবারিক শৃঙ্খলার মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল (Lubin, 2005)। মানুষ যাতে প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে নিজেকে সর্বদা সংযুক্ত মনে করে এবং একই সাথে পুরোহিততন্ত্রের নির্ধারিত নিয়মের বাইরে পা না বাড়ায়, অগ্নিহোত্র সেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত নীরবে কার্যকর করত। আগুন এখানে নিছক রান্নার মাধ্যম ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল পরিবারের অস্তিত্ব, বংশমর্যাদা এবং সামাজিক সম্মানের এক সার্বক্ষণিক সাক্ষী।

দর্শপূর্ণমাস: চন্দ্রচক্র, প্রকৃতি ও পাক্ষিক যজ্ঞের ব্যাকরণ (Darśapūrṇamāsa: Lunar Cycles, Nature, and the Grammar of Biweekly Rites)

যদি প্রশ্ন করা হয় যে বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থার মূল ব্যাকরণ বা আদর্শ ছাঁচ কোনটি, তবে উত্তর হবে দর্শপূর্ণমাস (Darśapūrṇamāsa)। যজুর্বেদের সাহিত্যের পরিভাষায় একে বলা হয় সমস্ত ইষ্টিযজ্ঞের ‘প্রকৃতি’ (Prakṛti) বা মূল মডেল। এর ওপর ভিত্তি করেই অন্যান্য সমস্ত জটিল হবির্যজ্ঞের নিয়মকানুন নির্ধারিত হতো। দর্শপূর্ণমাস মূলত দুটি যজ্ঞের একটি যৌথ রূপ। অমাবস্যার দিনে যে যজ্ঞটি করা হতো তার নাম ‘দর্শ’ (Darśa), আর পূর্ণিমার দিনে যা অনুষ্ঠিত হতো তার নাম ‘পূর্ণমাস’ (Pūrṇamāsa)। পাক্ষিক এই যজ্ঞটি একজন গৃহস্থের পক্ষে পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক ছিল এবং এটি সম্পন্ন হতে প্রায় দুই দিন সময় লাগত।

এই যজ্ঞের অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল ‘পুরোডাশ’ (Puroḍāśa) নামক এক বিশেষ ধরনের চালের পিঠা। পুরোডাশ তৈরির প্রক্রিয়াটি নিজেই একটি জটিল শিল্পকর্মের মতো ছিল। অধ্বর্যু অত্যন্ত যত্ন সহকারে ধানের খোসা ছাড়াতেন, পাথরের নোড়া দিয়ে তা পিষে গুঁড়ো করতেন এবং জল মিশিয়ে লেই তৈরি করতেন। এরপর সেই লেইকে মাটির বিশেষ পাত্রের ভাঙা টুকরো বা ‘কপাল’ (Kapāla)-এর ওপর সাজিয়ে রাখা হতো। পূর্ণমাসের যজ্ঞে সাধারণত আটটি কপালে সাজানো পুরোডাশ অগ্নির উদ্দেশ্যে এবং এগারোটি কপালে সাজানো পুরোডাশ অগ্নি ও সোমের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো। জার্মান বৈদিক গবেষক হেরমান ওল্ডেনবার্গ (Hermann Oldenberg) বৈদিক ধর্মের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধির প্রাকৃতিক চক্রের ওপর ভিত্তি করে বৈদিক সমাজ কীভাবে তাদের সামাজিক সময় এবং খাদ্য উৎপাদনের ছন্দকে সাজিয়ে নিয়েছিল, দর্শপূর্ণমাস তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ (Oldenberg, 1917)।

যজ্ঞের দ্বিতীয় দিন ভোরে শুরু হতো প্রধান আহুতির কাজ। যজ্ঞের চারজন পুরোহিত – হোতা, অধ্বর্যু, ব্রহ্মা এবং অগ্নীধ্র – তাদের নিজ নিজ আসনে বসে কাজ শুরু করতেন। অধ্বর্যু কাঠের চামচ ‘জুহু’ (Juhū) এবং ‘উপভৃত’ (Upabhṛt)-এর সাহায্যে গলিত ঘি তুলে আগুনে নিবেদন করতেন। দর্শ যজ্ঞে একটি অতিরিক্ত আচার যুক্ত হতো যাকে বলা হতো ‘সান্নায্য’ (Sānnāyya)। এটি হলো আগের দিন সন্ধ্যায় দোহন করা দুধ এবং পরদিন সকালে দোহন করা দুধের একটি বিশেষ মিশ্রণ, যা দইয়ের রূপ নিত। এই সান্নায্য মূলত ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো। প্রাচীন আর্যদের পশুপালন জীবনের গভীর প্রভাব এই উপাদানগুলোর নির্বাচনে খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

দর্শপূর্ণমাসের আরেকটি অদ্ভুত দিক হলো এর কঠোর পরিচ্ছন্নতা এবং ব্রত পালনের নিয়ম। যজ্ঞ শুরুর আগের দিন যজমান এবং তার স্ত্রীকে উপবাস থাকতে হতো, তাদের নখ ও চুল কাটতে হতো এবং স্বাভাবিক যৌনজীবন থেকে বিরত থাকতে হতো। আমেরিকান নৃতাত্ত্বিক ও গবেষক ডেভিড এম. নিপ (David M. Knipe) দক্ষিণ ভারতে টিকে থাকা বৈদিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রসমীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, দর্শপূর্ণমাসের এই নিয়মগুলো প্রাচীন যুগের মানুষের দেহ ও মনের ওপর যজ্ঞীয় পবিত্রতার এক নিশ্ছিদ্র আধিপত্য কায়েম করত (Knipe, 2015)। কোনো ব্যক্তি যখন মাসে দুবার এই ধরনের কঠোর আচারের মধ্য দিয়ে যেতেন, তখন তার সামাজিক পরিচয় পুরোপুরি বৈদিক ব্যবস্থার ছাঁচে তৈরি হয়ে যেত।

সোমযাগের স্তরবিন্যাস ও বহুমাত্রিক প্রস্তুতি (Stratification and Multidimensional Preparations of the Somayāga)

যজুর্বেদের যজ্ঞব্যবস্থার সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং বহুমাত্রিক রূপটি ছিল সোমযাগ। এই যজ্ঞগুলো কোনো একক ব্যক্তির সাধারণ গৃহস্থালির অনুষ্ঠান ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন হতো বিপুল সম্পদ, বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর এবং এক বিশাল পুরোহিত বাহিনী। সোমযাগের আদর্শ মডেলটিকে বলা হয় ‘অগ্নিষ্টোম’ (Agniṣṭoma)। এটি সাধারণত পাঁচ দিন ধরে চলত এবং এতে ষোলো জন পুরোহিতের সক্রিয় অংশগ্রহণ লাগত। যজ্ঞের প্রতিটি দিনের জন্য নির্ধারিত ছিল আলাদা আলাদা প্রস্তুতি, যার মধ্যে সোমলতা ক্রয় করা থেকে শুরু করে রস নিষ্কাশন এবং দেবতাদের পান করানোর সমস্ত নাটকীয় ধাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সোমলতা সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ রহস্যময় ও নাটুকে। সংহিতার বিবরণ থেকে জানা যায়, কোনো এক পাহাড়ি যাযাবর মানুষের কাছ থেকে এই লতাটি একটি নির্দিষ্ট মূল্যে, সাধারণত একটি গরুর বিনিময়ে কেনা হতো। এরপর সেই লতাকে একটি বিশেষ গরুর গাড়িতে করে পরম মর্যাদার সাথে যজ্ঞশালায় নিয়ে আসা হতো। ফিনিশ ভারততাত্ত্বিক আসকো পারপোলা (Asko Parpola) প্রাচীন আর্যদের ধর্ম ও প্রত্নতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, সোমযাগের এই পর্বগুলো মূলত মধ্য এশিয়ার প্রাচীন স্তেপ অঞ্চল থেকে ভারতে অনুপ্রবেশের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে ধারণ করে রেখেছে (Parpola, 2015)। এটি ছিল তাদের যাযাবর অতীতকে নতুন কৃষিপ্রধান ভৌগোলিক পরিবেশে প্রতি বছর নতুন করে স্মরণ করার একটি সামাজিক প্রক্রিয়া।

যজ্ঞের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটি ছিল পঞ্চম দিন, যাকে বলা হতো ‘সুত্যা’ (Sutyā)। এই দিনে তিন দফায় সোমরস নিষ্কাশন করা হতো – প্রাতঃসবন (সকালে), মাধ্যন্দিনসবন (দুপুরে) এবং তৃতীয়সবন (সন্ধ্যায়)। অধ্বর্যু এবং তার সহকারীরা পাথরের ওপর সোমলতা রেখে আরেকটি ভারী পাথর দিয়ে তা পিষতেন। এরপর সেই লতার ভেতর জল ঢেলে পশমের তৈরি একটি কাপড়ে ছেঁকে রস বের করা হতো। এই রস দেখতে হতো সোনালী বা হালকা বাদামী রঙের। এর সাথে মেশানো হতো দুধ, দই বা বার্লির ছাতু। প্রতিটি সবনের সময় আলাদা আলাদা দেবতাকে এই রস নিবেদন করা হতো এবং অবশিষ্ট সোমরস পুরোহিতরা এবং যজমান মিলে পান করতেন।

সোমযাগে সোমরসের পাশাপাশি একটি ছাগল বলি দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। পশুর বিভিন্ন অঙ্গ কেটে নির্দিষ্ট আগুনে আহুতি দেওয়া হতো। রোমানীয় ধর্মতত্ত্ববিদ মির্চা এলিয়াদে (Mircea Eliade) তার পৌরাণিক সময় সংক্রান্ত তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন যে, সোমযাগের মতো প্রাচীন অনুষ্ঠানগুলো মূলত মানব সমাজকে মহাজাগতিক সৃষ্টির আদিমতম মুহূর্তে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলন (Eliade, 1958)। সোমরসের উদ্দীপনা এবং তীব্র শারীরিক আচারের মধ্য দিয়ে যজমান কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে সাধারণ নশ্বর পৃথিবীর ঊর্ধ্বে উঠে দেবতাদের সমকক্ষ বলে অনুভব করতেন। এটি ছিল শাসকশ্রেণির জন্য নিজেদের দেবতুল্য প্রতিপত্তি প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় সামাজিক হাতিয়ার।

অগ্নি, বেদী ও যজ্ঞীয় বস্তুর স্থানিক প্রযুক্তি (Agni, Altars, and the Spatial Technology of Ritual Implements)

যজুর্বেদের কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি অত্যন্ত পরিশীলিত স্থানিক প্রযুক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। যজ্ঞ কোনো ফাঁকা মাঠে বিশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা হতো না। এর জন্য তৈরি হতো একটি বিশাল এলাকা যাকে বলা হতো ‘মহাবেদী’ (Mahāvedi)। এই মহাবেদীর আকার ছিল সমদ্বিবাহু ট্রাপিজয়েডের মতো, যার পশ্চিম দিক ছিল চওড়া এবং পূর্ব দিক ছিল কিছুটা সরু। ভূমির প্রতিটি অংশকে সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক সূত্রে ভাগ করা হতো। দড়ি এবং কাঠি দিয়ে মেপে এই ক্ষেত্রফল নির্ধারণ করা হতো, যা প্রাচীন ভারতের ফলিত জ্যামিতি এবং শুল্বসূত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

যজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত বিভিন্ন ধরনের কাঠের তৈরি পাত্র ও চামচ। এদের প্রত্যেকের নাম এবং আকার ছিল আলাদা। যেমন ‘স্রুক’ (Sruc) এবং ‘স্রুব’ (Sruva) হলো ঘিয়ের পাত্র ও চামচ। পুরোডাশ তোলার জন্য ছিল ‘জোহোত্র’। সোমরস রাখার জন্য ছিল মাটির বা কাঠের তৈরি নানা ধরনের গ্রহপাত্র। ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ আর্থার অ্যান্টনি ম্যাকডোনেল (Arthur Anthony Macdonell) বৈদিক পৌরাণিক চরিত্রগুলোর আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, যজ্ঞে ব্যবহৃত প্রতিটি কাঠের পাত্রকে কোনো না কোনো বৈদিক দেবতার প্রতীকী প্রতিরূপ হিসেবে কল্পনা করা হতো (Macdonell, 1897)। অশ্বত্থ, পলাশ বা খয়ের গাছ থেকে কাঠ সংগ্রহ করার সময়ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও মন্ত্র মেনে চলতে হতো। প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা সাধারণ কাঠ কীভাবে যজ্ঞীয় পরিসরে এসে পবিত্র যন্ত্রে রূপান্তরিত হতো, তা এই প্রযুক্তির এক চমৎকার দিক।

সোমযাগের মহাবেদীর ভেতরে পুরোহিতদের বসার জন্য তৈরি হতো ছোট ছোট আটটি চুল্লি বা ধিষ্ণ্য। যজ্ঞশালার ঠিক মাঝখানে পোঁতা হতো একটি কাঠের খুঁটি, যাকে বলা হতো ‘যূপ’ (Yūpa)। এই যূপের সাথেই বলির পশুকে বাঁধা হতো। অষ্টকোণ বিশিষ্ট এই যূপটি তৈরি করা হতো একটি আস্ত গাছ কেটে এবং এর মাথায় একটি কাঠের আংটা বা চষাল পরিয়ে দেওয়া হতো। এই যূপের স্থানিক অবস্থান নির্দেশ করত পৃথিবীর সাথে স্বর্গের সংযোগরেখা। পুরোহিতরা যখন এই যূপের চারপাশে ঘুরে ঘুরে মন্ত্র উচ্চারণ করতেন, তখন স্থানটি সাধারণ ভৌগোলিক এলাকা থেকে আলাদা হয়ে এক বিশেষ রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিত।

এই সমস্ত উপকরণের নির্ভুল অবস্থানের ওপর যজ্ঞের সাফল্য এত গভীরভাবে নির্ভর করত যে, কোনো একটি পাত্র যদি তার নির্দিষ্ট স্থান থেকে এক ইঞ্চিও সরে যেত, তবে পুরো যজ্ঞটিকে অপবিত্র বলে গণ্য করা হতো। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, এই ধরনের চরম স্থানিক শৃঙ্খলা আসলে তৎকালীন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকা কঠোর সামাজিক বর্ণভেদ এবং ক্ষমতার দূরত্বেরই একটি বস্তুগত প্রতিফলন। কে কোথায় বসবে, কে কোন পাত্র স্পর্শ করতে পারবে আর কে যজ্ঞসীমানার বাইরে থাকবে – এই সবকিছুর ফয়সালা হতো যজ্ঞশালার মাটির ওপর আঁকা এই দাগগুলোর মধ্য দিয়ে।

যজ্ঞের অর্থনীতি, দক্ষিণাব্যবস্থা ও সামাজিক ভারসাম্য (Ritual Economy, the Dakṣiṇā System, and Social Equilibrium)

বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থাকে নিছক ধর্মীয় উপাসনা হিসেবে দেখলে এর বাস্তব রূপটি পুরোপুরি অধরা থেকে যায়। এর মূলে ছিল এক বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একটি সোমযাগ বা বৃহৎ ইষ্টিযজ্ঞ পরিচালনা করার জন্য যে পরিমাণ চাল, বার্লি, তিল, ঘি এবং পশুর প্রয়োজন হতো, তা কেবল সমাজের অত্যন্ত বিত্তবান শাসকশ্রেণি বা ধনী রাজন্যবর্গের পক্ষেই জোগাড় করা সম্ভব ছিল। যজুর্বেদের পাতা উল্টালে দেখা যায়, যজমান যে যজ্ঞ করছেন তা কোনো নিঃস্বার্থ বা পারমার্থিক মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে নয়। প্রতিটি যজ্ঞের পেছনে স্পষ্ট পার্থিব কামনা ব্যক্ত করা হয়েছে – প্রচুর পুত্রসন্তান লাভ, শত্রুর বিনাশ, শতায়ু হওয়া এবং হাজার হাজার গরুর মালিক হওয়া।

এই যজ্ঞীয় অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং অপরিহার্য অংশটি ছিল ‘দক্ষিণা’ (Dakṣiṇā)। যজ্ঞ সমাপ্ত হওয়ার পর পুরোহিতদের পারিশ্রমিক হিসেবে এই দক্ষিণা দেওয়া হতো। যজুর্বেদে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে যে, দক্ষিণাহীন যজ্ঞ কেবল ব্যর্থই নয়, তা যজমানের বংশের বিনাশ ডেকে আনে। এই দক্ষিণা হিসেবে স্বর্ণ, রৌপ্য, বস্ত্র, অশ্ব এবং বিশেষ করে শত শত থেকে হাজার হাজার গাভী দান করা হতো। ভারতীয় সমাজতত্ত্বের গবেষক এম. আর. জোশী (J. R. Joshi) বৈদিক আচারের বিনিময় ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, দক্ষিণা আসলে কোনো স্বেচ্ছামূলক দান ছিল না, এটি ছিল শাসকশ্রেণি এবং বুদ্ধিজীবী পুরোহিতদের মধ্যকার একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক চুক্তি (Joshi, 1977)। রাজা দিতেন বস্তুগত সম্পদ, আর পুরোহিতরা সেই রাজাকে দিতেন ঐশ্বরিক বৈধতা এবং তার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার আশ্বাস।

এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজে একটি বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক চক্র সচল থাকত। সাধারণ কৃষি উৎপাদনকারী বা বৈশ্য শ্রেণির কাছ থেকে কর বা উপহার হিসেবে যে উদ্বৃত্ত খাদ্য ও পশু রাজার কোষাগারে জমা হতো, যজ্ঞের মাধ্যমে তা পুরোহিত সম্প্রদায়ের হাতে পুনর্বণ্টন করা হতো। আবার পুরোহিতরাও এই সম্পদের একটি অংশ বিভিন্ন কারিগর, কাঠমিস্ত্রি, মৃৎশিল্পী এবং সাহায্যকারীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন যারা যজ্ঞের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করত। রাশিয়ান গবেষক বোরিস ওগুইবেনিন (Boris Oguibénine) বৈদিক সংস্কৃতির বিনিময় তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, যজ্ঞ মূলত প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিতে সম্পদ সঞ্চয়ের বদলে সম্পদের একমুখী পুনঃসঞ্চালনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করত (Oguibénine, 1998)।

সব মিলিয়ে যজুর্বেদের যজ্ঞব্যবস্থা ছিল প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক প্রবাহ এবং মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের এক অসাধারণ জটিল সমন্বয়। অধ্বর্যুর হাতের প্রতিটি চালচলন, অগ্নিহোত্রের প্রাত্যহিক আগুন, দর্শপূর্ণমাসের চন্দ্রভিত্তিক হিসাব এবং সোমযাগের রাজকীয় আয়োজন – এই সবকিছু মিলে এমন একটি সমাজকাঠামো টিকিয়ে রেখেছিল যা শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষমতার ব্যাকরণকে নিয়ন্ত্রণ করে গেছে। ধর্ম এখানে কেবল বিশ্বাসের বিষয় ছিল না, এটি ছিল সমাজ পরিচালনার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দৃশ্যমান প্রযুক্তি।

রাজকীয় ও বৃহৎ বৈদিক যজ্ঞ (Royal and Solemn Vedic Sacrifices): রাজসূয়, বাজপেয়, অশ্বমেধ ও পুরুষমেধ

রাজকীয় বৈদিক যাগের রাজনৈতিক রূপরেখা ও সার্বভৌমত্বের মহড়া (Political Contours of Royal Vedic Sacrifices and the Rehearsal of Sovereignty)

প্রাচীন ভারতে যাযাবর পশুপালক গোষ্ঠীগুলো যখন ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডভিত্তিক স্থায়ী জনপদে থিতু হচ্ছিল, তখন দলপতির চরিত্রও বদলে যেতে শুরু করে। গোত্রপ্রধান বা ক্ষুদ্র দলের নেতা থেকে একজন সার্বভৌম শাসকে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটি খুব সহজ ছিল না। তরবারির জোর দিয়ে হয়তো প্রজাদের দাবিয়ে রাখা যেত, কিন্তু তাদের আনুগত্য পাওয়ার জন্য প্রয়োজন হতো ধর্মীয় ও সামাজিক বৈধতা। রাজকীয় বৈদিক যজ্ঞগুলো মূলত ছিল সেই বৈধতা প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য রাজনৈতিক ক্ষেত্র। এগুলো কোনো নিভৃত প্রার্থনাসভা ছিল না, বরং ছিল হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে নিজেদের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বকে নাটকীয়ভাবে ঘোষণা করার মঞ্চ।

এই রূপান্তরকে বুঝতে হলে বৈদিক সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। আমেরিকান ধর্মতত্ত্ববিদ ব্রায়ান কে. স্মিথ (Brian K. Smith) বৈদিক আচার ও সামাজিক শ্রেণিবিভাগের আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বৈদিক যজ্ঞ আসলে সমাজের বিদ্যমান বাস্তবতাকে মহাজাগতিক নিয়মের ছাঁচে ফেলে প্রশ্নাতীত করার এক নিখুঁত কৌশল (Smith, 1989)। সাধারণ মানুষ যাতে রাজার আধিপত্যকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে মেনে নেয়, সেই উদ্দেশ্যে যজ্ঞের দৃশ্যপট তৈরি করা হতো। পুরোহিত ও রাজার যৌথ স্বার্থ এখানে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠত। পুরোহিত রাজার ক্ষমতাকে ঐশ্বরিক রূপ দিতেন, আর রাজা তার বিনিময়ে পুরোহিত সম্প্রদায়কে দিতেন ভূমি, গবাদি পশু এবং সমাজের শীর্ষস্থান।

এই ধরনের মহাযজ্ঞগুলোকে নিছক ধর্মীয় উৎসব না বলে তৎকালীন রাষ্ট্রের নাট্যরূপ বা প্রকাশ্য প্রদর্শনী হিসেবে দেখা বেশি সংগত। নৃতাত্ত্বিক ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ (Clifford Geertz) ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘নাট্য রাষ্ট্র’ (Theatre State) ধারণার অবতারণা করেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান কাজই হয়ে দাঁড়ায় জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতার মহিমা প্রদর্শন করা (Geertz, 1980)। বৈদিক ভারতে রাজসূয়, বাজপেয় বা অশ্বমেধের মতো যজ্ঞগুলো ঠিক এই নাট্য রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করত। এখানে প্রতিটি শারীরিক ভঙ্গি, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি উপহারের পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা থাকত।

এই যজ্ঞগুলোর মাধ্যমে তৎকালীন উৎপাদন ব্যবস্থার উদ্বৃত্ত সম্পদ সরাসরি রাজকোষ এবং পুরোহিতদের হাতে কেন্দ্রীভূত হতো। কৃষক ও পশুপালকদের কাছ থেকে কর হিসেবে সংগৃহীত সম্পদ এক নিমেষে যজ্ঞের আগুনে পুড়িয়ে কিংবা দক্ষিণা হিসেবে দান করে রাজন্যবর্গ দেখাতেন যে তারা সম্পদের অভাবকে পরোয়া করেন না। ক্ষতি স্বীকার করার এই সামর্থ্যই তাদের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠিত করত। ফলে এই বৃহৎ আনুষ্ঠানিক আচারগুলো ছিল প্রাক-রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক রাজনৈতিক হাতিয়ার।

রাজসূয়: রাজ্যাভিষেক, রত্নী-উপহার ও পাশাখেলার স্থানিক রাজনীতি (Rājasūya: Consecration, Gifts to Ratnins, and the Spatial Politics of the Dice Game)

রাজকীয় যজ্ঞগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক এবং সরাসরি ক্ষমতা হস্তান্তরের উৎসব ছিল রাজসূয় (Rājasūya)। এটি ছিল কোনো নতুন রাজার আনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান। সাধারণ কোনো অভিষেকের মতো এটি একদিনে শেষ হতো না। এর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগত। রাজসূয়ের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টি ছিল ‘রত্নহবীংষি’ (Ratnahavīṃṣi)। এখানে রাজাকে তার রাজ্যের বারোজন প্রধান ব্যক্তি বা ‘রত্নী’ (Ratnin)-দের বাড়িতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আহুতি দিতে হতো। এই রত্নীদের মধ্যে থাকতেন সেনাপতি, রথচালক বা সুত, গ্রামপ্রধান বা গ্রামণী, রাজমহিষী এবং এমনকি রাজকীয় কোষাগারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা।

রত্নীদের গৃহে রাজার এই সফরটি রাজনৈতিক কূটনীতির দিক থেকে গভীর অর্থবহ ছিল। ঐতিহাসিক রোনাল্ড ইন্ডেন (Ronald Inden) প্রাচীন ভারতীয় রাজতন্ত্রের আচার বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে দেখিয়েছেন যে, রাজার এই পদচারণা ছিল মূলত রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনুগত্য নিশ্চিত করার একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি (Inden, 1990)। রাজা যদি তাদের সমর্থন না পেতেন, তবে তার সিংহাসন যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারত। তাই যজ্ঞের শুরুতে রাজা তাদের ঘরে গিয়ে তাদের গুরুত্বকে স্বীকার করতেন এবং বিনিময়ে তারা রাজাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিতেন। এটি ছিল প্রাথমিক ভারতীয় আমলাতন্ত্র এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার এক চতুর সামাজিক প্রক্রিয়া।

রাজসূয়ের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী অংশটি ছিল ‘অভিষেক’ (Abhiṣeka)। সতেরোটি ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে জল সংগ্রহ করে তা একটি পাত্রে রাখা হতো। এর মধ্যে থাকত নদীর জল, সমুদ্রের জল, বৃষ্টির জল, এমনকি স্থির জলাশয়ের জলও। অধ্বর্যু পুরোহিত সেই জল রাজার মাথায় ঢেলে তাকে পার্থিব সমস্ত তরলের প্রভু হিসেবে ঘোষণা করতেন। এই জলসেচনের মধ্য দিয়ে রাজা রূপক অর্থে সাধারণ নশ্বর মানুষ থেকে এক নতুন মহাজাগতিক সত্তায় পুনর্জন্ম লাভ করতেন।

এরপর শুরু হতো এক অদ্ভুত স্থানিক রাজনীতির মহড়া – আনুষ্ঠানিক পাশাখেলা। যজ্ঞের মঞ্চে রাজার সাথে একদল আত্মীয় ও পরিষদ সদস্য পাশা খেলায় বসতেন। ডাচ প্রাচ্যবিদ ফ্র্যাঙ্ক কুইপার (F. B. J. Kuiper) বৈদিক যুগের মহাজাগতিক রূপক ও পাশাখেলা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই খেলাটি মোটেও ভাগ্যনির্ভর ছিল না, এটি ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত এবং পূর্বনির্ধারিত একটি নাট্য (Kuiper, 1979)। চাল এমনভাবে দেওয়া হতো যাতে রাজা সবকটি দান জিতে যান এবং সবশেষে তিনি চিৎকার করে বলতেন যে তিনি মহাবিশ্বের চারদিক জয় করেছেন। পাশার এই সাজানো জয় দিয়ে প্রজাদের বুঝিয়ে দেওয়া হতো যে, রাজা কেবল যুদ্ধেই অজেয় নন, বিশ্বজগতের অনিশ্চিত ভাগ্যকেও তিনি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখেন।

বাজপেয়: রথদৌড়, বিজয়ের পানীয় ও সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব (Vājapeya: Chariot Race, the Drink of Strength, and Social Preeminence)

রাজসূয়ের তুলনায় বাজপেয় (Vājapeya) যজ্ঞের চরিত্রটি ছিল কিছুটা ভিন্ন এবং এতে শারীরিক শক্তির প্রদর্শনী অনেক বেশি প্রাধান্য পেত। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘শক্তির পানীয়’ বা ‘খাদ্যের পানীয়’। এই যজ্ঞটি যেমন একজন রাজা করতে পারতেন, তেমনি একজন প্রভাবশালী ব্রাহ্মণও পরিচালনা করতে পারতেন। বাজপেয় যজ্ঞের লক্ষ্য ছিল সমাজে নিজের শারীরিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা। এর সময়সীমা ছিল সাধারণত সতেরো দিন। সতেরো সংখ্যাটি এই যজ্ঞে বারবার ঘুরেফিরে আসত, কারণ প্রজাপতি দেবতার সাথে এই সংখ্যার একটি প্রতীকী সংযোগ কল্পনা করা হতো।

বাজপেয়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আকর্ষণ ছিল আনুষ্ঠানিক রথদৌড়। সতেরোটি রথ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। এর মধ্যে যজমানের রথটি থাকত ঠিক মাঝখানে। প্রতিযোগিতার নিয়ম এমনভাবে সাজানো হতো যাতে যজমানের রথটিই সবার আগে নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করে। কোনো কাকতালীয় পরাজয় এড়াতে প্রতিপক্ষ রথচালকদের আগেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো। ফরাসি প্রাচ্যবিদ চার্লস মালামুদ (Charles Malamoud) বৈদিক আচার ও চিন্তার ওপর লেখা তার বিখ্যাত গ্রন্থ কুকিং দ্য ওয়ার্ল্ড: রিচুয়াল অ্যান্ড থট ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া (Cooking the World: Ritual and Thought in Ancient India)-তে দেখিয়েছেন যে, এই রথদৌড় ছিল আসলে যুদ্ধ না করে যুদ্ধের ফলাফল নিশ্চিত করার একটি সুপরিকল্পিত মহড়া (Malamoud, 1996)। বিজয়ী হওয়ার পর যজমানকে উচ্চকণ্ঠে শক্তির আধার হিসেবে অভিবাদন জানানো হতো।

রথদৌড় শেষ হওয়ার পর যজমান তার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে যজ্ঞশালায় পোঁতা সুউচ্চ যূপ বা যজ্ঞীয় খুঁটিতে চড়তেন। খুঁটির মাথায় থাকত গমের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ চাকা। যজমান সেই চূড়ায় পা রেখে চিৎকার করে বলতেন, “আমরা স্বর্গে পৌঁছে গেছি, আমরা অমর হয়েছি”। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা প্রজারা তখন যজমানের দিকে তিলের পিঠা ছুড়ে দিতেন। এই দৃশ্যটি স্পষ্টতই সাধারণ মানুষের ওপর শাসকের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক উচ্চতা তুলে ধরার এক চমকপ্রদ রাজনৈতিক কৌশল ছিল। শাসক যে মাটির সাধারণ স্তরের অনেক উপরে অবস্থান করছেন, এই আচারের মাধ্যমে তা সরাসরি দৃশ্যমান হতো।

বাজপেয় যজ্ঞের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল সুরা (Surā) নামক এক ধরনের গাঁজানো মদ্যপানীয়ের ব্যবহার। বৈদিক ধর্মে সাধারণত সোমরসকে পবিত্র ও দেবতাদের পানীয় হিসেবে দেখা হতো এবং সুরাকে মনে করা হতো পার্থিব মানুষের কিছুটা নিকৃষ্ট পানীয়। কিন্তু বাজপেয়ে এই দুই পানীয় পাশাপাশি ব্যবহৃত হতো। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক ও তুলনামূলক পৌরাণিক গবেষক জর্জ দুমেসিল (Georges Dumézil) ইন্দো-ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের ত্রিপক্ষীয় তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, বাজপেয় যজ্ঞের মাধ্যমে শাসকশ্রেণি একই সাথে পবিত্র আধ্যাত্মিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষের উগ্র শক্তির মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে চাইত (Dumézil, 1958)। সোম নিশ্চিত করত তার আধ্যাত্মিক পবিত্রতা, আর সুরা নির্দেশ করত সাধারণ সামাজিক বন্ধন ও পার্থিব ক্ষমতার দৃঢ়তা।

অশ্বমেধ: আঞ্চলিক বিস্তার, অশ্বের ভ্রমণ ও রানির আনুষ্ঠানিক আচার (Aśvamedha: Territorial Expansion, the Horse’s Wandering, and the Queen’s Ritual Rites)

প্রাচীন ভারতের সমস্ত রাজকীয় যজ্ঞের চূড়ান্তে অবস্থান করত অশ্বমেধ (Aśvamedha) যজ্ঞ। কোনো রাজার পক্ষে এই যজ্ঞ পরিচালনা করা ছিল চূড়ান্ত আঞ্চলিক আধিপত্যের দাবি। কেবল একজন শক্তিশালী সার্বভৌম শাসকই এই ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ যজ্ঞের আয়োজন করার সাহস পেতেন। এই যজ্ঞের মূল চরিত্র ছিল একটি বিশেষ লক্ষণযুক্ত রাজকীয় ঘোড়া। ঘোড়াটিকে সমস্ত বন্ধনমুক্ত করে এক বছরের জন্য যেকোনো দিকে ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা দেওয়া হতো। ঘোড়াটির পেছনে থাকত চারশত সশস্ত্র যোদ্ধা, যাদের মধ্যে থাকতেন রাজপুত্র ও বীর সেনারা। ঘোড়াটি যে যে রাজ্যের সীমানায় প্রবেশ করত, সেই রাজ্যের রাজাকে হয় ঘোড়াটির বশ্যতা স্বীকার করতে হতো, নতুবা তার রক্ষকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হতো।

এক বছর ধরে অশ্বের এই পরিভ্রমণ ছিল মূলত একটি উন্মুক্ত সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক জরিপ। ঘোড়াটি যদি নির্বিঘ্নে ফিরে আসত, তবে ধরে নেওয়া হতো যে সংশ্লিষ্ট সমস্ত অঞ্চল রাজার সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছে। এরপর শুরু হতো মূল যজ্ঞের তিন দিনব্যাপী চূড়ান্ত পর্ব। শত শত পশুকে যজ্ঞের বিভিন্ন খুঁটিতে বাঁধা হতো। ভারততাত্ত্বিক ঐতিহাসিক দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বী (Damodar Dharmananda Kosambi) তার সুবিশাল ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, অশ্বমেধের মধ্যে প্রাক-শ্রেণিভিত্তিক প্রাচীন কৃষি ও পশুপালক সমাজের উর্বরতা আচারের বহু আদিম উপাদান বেঁচে ছিল (Kosambi, 1956)। এটি কেবল সাম্রাজ্য বিস্তার ছিল না, বরং জমির উর্বরতা এবং পশুর উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির এক প্রাচীন আদিম আকাঙ্ক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

যজ্ঞের দ্বিতীয় দিনে ঘোড়াটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হতো। এরপর শুরু হতো যজ্ঞের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত পর্ব। রাজার প্রধান মহিষী বা মহিষী (Mahiṣī)-কে নিহত অশ্বের পাশে একটি চাদরের নিচে শুয়ে থাকতে হতো। এটি ছিল মৃত অশ্বের শক্তি ও উর্বরতা রূপক অর্থে রানির গর্ভে ধারণ করার এক আদিম প্রতীকী প্রক্রিয়া। এই সময় পুরোহিত এবং রাজপ্রাসাদের অন্যান্য নারীদের মধ্যে অত্যন্ত অশ্লীলার্থক এবং তীব্র যৌন ইঙ্গিতবাহী শ্লোক বিনিময় হতো, যা বৈদিক সাহিত্যের পরিভাষায় পরিচিত ‘ব্রহ্মোদ্যা’ (Brahmodyā) নামে।

আমেরিকান তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger O’Flaherty) বৈদিক সমাজের রূপক ও যৌনতা সংক্রান্ত বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, রানির এই আনুষ্ঠানিক আচারটি ছিল মূলত রাজবংশের বংশবৃদ্ধি এবং পুরো রাজ্যের সার্বিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার একটি প্রকাশ্য যাদুবিশ্বাসনির্ভর প্রক্রিয়া (Doniger O’Flaherty, 1980)। নিহত পশুর বীরত্ব ও জীবনীশক্তিকে রাজবংশের ভেতরে টেনে নিয়ে আসাই ছিল এই আচারের উদ্দেশ্য। অশ্বমেধের মতো যজ্ঞ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র যত আধুনিক ও সংগঠিত রূপই নিক না কেন, তার ক্ষমতার শিকড় প্রোথিত ছিল অতি প্রাচীন জৈবিক উর্বরতা ও পশু সংস্কৃতির গভীর সংস্কারের ভেতরে।

পুরুষমেধ: নরবলির বাস্তবতা, সামাজিক বর্গ ও প্রতীকী রূপান্তর (Puruṣamedha: The Reality of Human Sacrifice, Social Categories, and Symbolic Transformation)

বৈদিক সাহিত্যের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং রহস্যময় অনুষ্ঠান হলো পুরুষমেধ (Puruṣamedha) বা আনুষ্ঠানিক নরবলি যজ্ঞ। শুক্ল যজুর্বেদের বাজসনেয়ি সংহিতার ত্রিশ নম্বর অধ্যায়ে এবং তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এই যজ্ঞের একটি বিশাল বিবরণ পাওয়া যায়। বিবরণটি এতই বিস্তারিত এবং চমকপ্রদ যে গবেষকরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিতর্ক করে আসছেন – এই যজ্ঞটি কি প্রাচীন ভারতে সত্যিই শারীরিকভাবে সম্পন্ন হতো, নাকি এটি ছিল কেবল পুরোহিতদের একটি বিমূর্ত সাহিত্যিক কল্পনা? সংহিতায় একশত চুরাশি জন মানুষকে যজ্ঞীয় খুঁটিতে বাঁধার কথা বলা হয়েছে, যাদের প্রত্যেকে সমাজের একেকটি সুনির্দিষ্ট পেশা, শারীরিক ত্রুটি বা সামাজিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধি।

পুরুষমেধের এই তালিকাটি প্রাচীন ভারতীয় শ্রমবিভাগ এবং বর্ণকাঠামোর এক জীবন্ত মানচিত্র। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পাশাপাশি সেখানে কামার, তাঁতি, রথকার, জেলে, বাদ্যযন্ত্রশিল্পী, চোর, জুয়াড়ি, এমনকি কুষ্ঠরোগী বা অতিরিক্ত লম্বা মানুষকেও বিভিন্ন দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার কথা বলা হয়েছে। ডাচ পণ্ডিত ইয়ান ব্রেমার (Jan N. Bremmer) বিভিন্ন ইন্দো-ইউরোপীয় সমাজে মানব বলিদানের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কোনো জটিল সমাজ যখন নিজেকে মহাজাগতিক শৃঙ্খলার সাথে মেলাতে চায়, তখন তারা সমগ্র সমাজদেহকে বলির পাত্র হিসেবে কল্পনা করে (Bremmer, 2007)। পুরুষমেধ ছিল ঠিক সেই পুরো সমাজকে একটি বেদীর ওপর এনে হাজির করার এক চরম রূপক প্রয়াস।

বেশিরভাগ আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, পুরুষমেধ ঐতিহাসিকভাবে বাস্তবে মানুষ হত্যার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হতো না। অন্তত বৈদিক যুগের শেষ ভাগে এসে এটি একটি প্রতীকী আচারে পরিণত হয়েছিল। শতপথ ব্রাহ্মণের বর্ণনা অনুযায়ী, পুরোহিতরা যখন সমস্ত মানুষকে যূপকাষ্ঠে বেঁধে আগুন নিয়ে তাদের চারদিকে প্রদক্ষিণ করতেন, তখনই একটি দৈববাণী হতো যা তাদের ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিত। এরপর সেই মানুষদের মুক্ত করে দিয়ে সাধারণ পশুর মাধ্যমে যজ্ঞ সম্পন্ন করা হতো। সুইডিশ প্রাচ্যবিদ জ্যাকব চার্পেন্তিয়ে (Jarl Charpentier) বৈদিক দীক্ষা ও আচার পর্যালোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে, পুরুষমেধ আসলে ঋগ্বেদের পুরুষসূক্তের সেই আদিম সৃষ্টির রূপকটিকে যজ্ঞের মাঠে অভিনয় করে দেখানোর একটি তাত্ত্বিক চেষ্টা ছিল (Charpentier, 1927)।

বাস্তবে শারীরিকভাবে নরবলি হোক বা না হোক, এই টেক্সটের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল অবিশ্বাস্য। রাজা যে সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রাখেন – তিনি কাকে রক্ষা করবেন এবং কাকে যজ্ঞের কাঠে বাঁধবেন সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে রাষ্ট্রের হাতে – পুরুষমেধের এই তাত্ত্বিক নকশাটি সেই চরম কর্তৃত্ববাদের সাক্ষ্য বহন করে। প্রান্তিক ও উৎপাদনকারী শ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব যে কেবল উচ্চবর্ণের রাজনৈতিক সমৃদ্ধি টিকিয়ে রাখার জন্যই প্রাসঙ্গিক, এই নির্মম সত্যটি এই যজ্ঞের তালিকার প্রতিটি ছত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রাজকীয় যজ্ঞের নাট্যরূপ, অর্থনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য (Theatricality, Economy, and the Power Balance of Royal Sacrifices)

এই সমস্ত রাজকীয় ও বৃহৎ বৈদিক যজ্ঞের সামগ্রিক চিত্রটি বিচার করলে দেখা যায় যে, এগুলো মূলত তৎকালীন উত্তর ভারতীয় সমাজের প্রধান দুটি উচ্চবর্ণ – ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের – মধ্যকার এক জটিল ক্ষমতার ভারসাম্যের দলিল। একা ক্ষত্রিয় রাজা শাসন করতে পারতেন না, কারণ তার ক্ষমতার নৈতিক ও ধর্মীয় ভিত্তি ছিল দুর্বল। আবার একা ব্রাহ্মণ পুরোহিতও বেঁচে থাকতে পারতেন না, কারণ তার হাতে কোনো সেনা বা সরাসরি কর আদায়ের ব্যবস্থা ছিল না। ঐতিহাসিক থমাস ট্রটম্যান (Thomas R. Trautmann) প্রাচীন ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্ম ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই মহাযজ্ঞগুলো ছিল মূলত ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের পারস্পরিক নির্ভরতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি অর্থনৈতিক বিনিময় ব্যবস্থা (Trautmann, 1971)।

অর্থনৈতিক দিক থেকে এই যজ্ঞগুলো ছিল অভাবনীয় রকমের ব্যয়বহুল। হাজার হাজার গরু, মণ কে মণ সোনা, রূপা এবং বস্ত্র এই যজ্ঞগুলোতে দক্ষিণা হিসেবে পুরোহিতদের দান করা হতো। শতপথ ব্রাহ্মণে এমনও উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে রাজা তার পুরো রাজ্য পুরোহিতদের দান করে দিতে উদ্যত হচ্ছেন, এবং পরবর্তীতে পুরোহিতরা দয়া করে রাজাকে সেই রাজ্য ফিরিয়ে দিচ্ছেন কেবল শাসনকার্য পরিচালনার জন্য। এই ধরনের নাটকীয় বিবরণ তৎকালীন সমাজে পুরোহিততন্ত্রের বৌদ্ধিক আধিপত্যের চরম সীমাকে নির্দেশ করে। উৎপাদনহীন একটি বুদ্ধিজীবী শ্রেণি কীভাবে উৎপাদনশীল সমাজের পুরো উদ্বৃত্ত সম্পদকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসত, যজ্ঞীয় ব্যবস্থা তার সবচেয়ে কার্যকর অর্থনৈতিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিল।

একই সাথে সাধারণ প্রজা এবং অধীনস্থ অনার্য দলগুলোর কাছে এই যজ্ঞগুলো ছিল ভীতি ও বিস্ময় সৃষ্টির হাতিয়ার। শত শত অগ্নিকুণ্ড থেকে ওঠা ধোঁয়া, হাজার হাজার পুরোহিতের সম্মিলিত মন্ত্রোচ্চারণ, যুদ্ধঘোড়ার পদধ্বনি এবং বলিদানের পশুর রক্তের গন্ধ – এই সবকিছু মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি করত যা সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে অবশ করে দিত। রাষ্ট্রের আইন বা পুলিশি ব্যবস্থা যখন শৈশবাবস্থায় ছিল, তখন এই ধর্মীয় মনস্তাত্ত্বিক চাপই আইনশৃঙ্খলার বিকল্প হিসেবে কাজ করত। মানুষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হতো যে, রাজার বিরোধিতা করা মানে বিশ্বজগতের নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করা।

সব মিলিয়ে রাজসূয়, বাজপেয়, অশ্বমেধ এবং পুরুষমেধের মতো রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলো প্রাচীন ভারতে কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় আচার ছিল না। এগুলো ছিল একটি উদীয়মান কৃষিভিত্তিক রাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তরবারি যেখানে সীমান্ত পাহারা দিত, যজ্ঞ সেখানে পাহারা দিত মানুষের আনুগত্য। এই মহাযজ্ঞগুলোর মধ্য দিয়েই প্রাচীন ভারত তার উপজাতীয় সরলতা থেকে এক জটিল, স্তরবিন্যস্ত এবং নির্মম রাষ্ট্রকাঠামোর যুগে প্রবেশ করেছিল। যজুর্বেদের পাতাগুলোতে এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের প্রতিটি পদক্ষেপ নিখুঁতভাবে খোদাই করা রয়েছে।

অথর্ববেদ সংহিতা (Atharvaveda Saṃhitā): গঠন, কাণ্ড, শৌনক ও পৈপ্পলাদ শাখা

অথর্ববেদ সংহিতার স্বাতন্ত্র্য ও চতুর্বেদ ধারণার ঐতিহাসিক বিতর্ক (Distinctiveness of the Atharvaveda Saṃhitā and the Historical Debate over the ‘Caturveda’ Concept)

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের সুবিশাল জগতের দিকে তাকালে অথর্ববেদকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি দ্বীপের মতো মনে হয়। ঋগ্বেদ, সামবেদ এবং যজুর্বেদ – এই তিন সংহিতা গড়ে উঠেছিল উচ্চবর্গের যজ্ঞশালাকে কেন্দ্র করে। সেখানে পুরোহিতরা দেবতাদের স্তুতি করতেন, সুর দিয়ে গান গাইতেন এবং অত্যন্ত নিখুঁত জ্যামিতিক নিয়মে তৈরি বেদীতে আহুতি দিতেন। সেই যজ্ঞগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বর্গলাভ, শত্রুজয় কিংবা রাজ্যবিস্তারের মতো কিছু সামাজিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু অথর্ববেদ হঠাৎ করেই এই সমস্ত আড়ম্বরপূর্ণ যজ্ঞশালার পরিধি ভেঙে বেরিয়ে আসে। এই গ্রন্থটি দৃষ্টি দেয় সাধারণ মানুষের কুঁড়েঘরের দিকে। মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের দুঃখ, কষ্ট, রোগবালাই, পারিবারিক ঈর্ষা আর বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা নিয়েই এই বেদের কারবার। এই কারণে বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসে অথর্ববেদের মর্যাদা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক গভীর বিতর্ক চলেছিল।

প্রাচীনতম বৈদিক টেক্সটগুলোতে কান পাতলে সবসময় শোনা যায় ‘ত্রয়ী বিদ্যা’ (Trayī Vidyā) কথাটি। ত্রয়ী বিদ্যা বলতে কেবল ঋক, সাম এবং যজুঃ – এই তিন বেদের সমষ্টিকে বোঝানো হতো। সেখানে অথর্ববেদের কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যেত না। সমাজের উচ্চস্তরের যাজ্ঞিক পুরোহিতরা এই সংকলনটিকে তাদের পবিত্র ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তীব্র অনীহা দেখাতেন। কারণ তাদের চোখে যজ্ঞের সুশৃঙ্খল নিয়মের বাইরে গিয়ে রোগ নিরাময়ের ভেষজ লতা কিংবা শত্রু নিপাতের মন্ত্র উচ্চারণ করাটা কিছুটা অমার্জিত ও লোকায়ত ব্যাপার ছিল। শ্রৌত সাহিত্যের কঠোর অনুশাসনের সামনে অথর্ববেদের এই প্রাত্যহিক আবেদন যেন এক ভিন্ন বাস্তবতাকে তুলে ধরত। ফলে সমাজের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিরা দীর্ঘকাল ধরে এই টেক্সটটিকে রাষ্ট্রীয় যজ্ঞের বাইরে এক পাশে সরিয়ে রেখেছিলেন।

সমাজবিজ্ঞানী ও ভারততাত্ত্বিক পণ্ডিত মরিস ব্লুমফিল্ড (Maurice Bloomfield) অথর্ববেদের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই টেক্সটটির গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের লড়াইটি ছিল মূলত প্রাচীন ভারতীয় সমাজকাঠামোর ভেতরের ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস (Bloomfield, 1899)। যজ্ঞের ময়দানে কেবল দেবতাকে সন্তুষ্ট করলেই চলত না, কারণ মানুষের জীবন কোনো সরল রেখায় চলে না। বাস্তব জীবনে পদে পদে দেখা দিত সাপের কামড়, ফসলের রোগ, প্রতিবেশীর হিংসা আর হঠাৎ আক্রমণ। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছিল যে, কোনো দূরবর্তী স্বর্গের দেবতার চেয়ে তাদের ঘরের কাছের বিপদগুলো দূর করা অনেক বেশি জরুরি। ধীরে ধীরে শাসকশ্রেণি এবং পুরোহিত সমাজ এই সত্য উপলব্ধি করতে বাধ্য হয় যে, জনজীবনের এই বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে বাইরে রেখে কোনো টেক্সটই সমাজের সর্বজনীন কর্তৃত্ব দাবি করতে পারে না।

ঠিক এই ঐতিহাসিক সংকট মেটাতেই উদ্ভব ঘটেছিল চতুর্থ পুরোহিত বা ‘ব্রহ্মা’ (Brahmā)-র ধারণার। বৈদিক যজ্ঞে হোতা, উদ্গাতা এবং অধ্বর্যু যখন শারীরিক ও মৌখিক ক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকতেন, তখন কোনো একটি ছোটখাটো ভুল পুরো যজ্ঞের উদ্দেশ্যকে নষ্ট করে দিতে পারত। বিশ্বাস করা হতো যে, কেবল অথর্ববেদের জ্ঞানে পারদর্শী একজন পুরোহিতই সেই ক্ষতি বা অপবিত্রতা দূর করতে পারেন। ভারতীয় গবেষক এন. জে. শেন্ডে (N. J. Shende) তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদকে যখন ব্রহ্মা পুরোহিতের বেদ হিসেবে যজ্ঞব্যবস্থার শীর্ষাসনে বসিয়ে দেওয়া হলো, তখনই ত্রয়ী বিদ্যার প্রাচীন গণ্ডি ভেঙে প্রতিষ্ঠিত হলো চতুর্বেদের আধুনিক ধারণা (Shende, 1952)। লোকায়ত জ্ঞান এভাবেই একদিন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ভেতরে নিজের অপরিহার্য আসন তৈরি করে নিয়েছিল।

শৌনকীয় সংহিতার সামগ্রিক রূপরেখা ও কাণ্ডভিত্তিক বিন্যাস (General Overview and Kāṇḍa-wise Arrangement of the Śaunaka Saṃhitā)

বর্তমানে বৈদিক গবেষণায় এবং সাধারণ পাঠকদের কাছে অথর্ববেদের যে সংস্করণটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তা হলো শৌনক শাখা (Śaunaka Śākhā)। এই শাখার সংহিতাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং গাণিতিক একটি বিন্যাস অনুসরণ করে রচিত হয়েছে। পুরো গ্রন্থটি বিশটি প্রধান কাণ্ড বা খণ্ডে বিভক্ত। এতে রয়েছে প্রায় সাতশত ত্রিশটি সূক্ত এবং প্রায় ছয় হাজার পদ্য ও গদ্যময় মন্ত্র। ঋগ্বেদের মতো এটি কোনো একক কাব্যিক ধারায় বাঁধা নয়, আবার যজুর্বেদের মতো এটি শুধুই যজ্ঞের ব্যবহারিক নির্দেশিকাও নয়। এখানে কবিতা, ভেষজবিদ্যা, জাদুবিশ্বাস এবং মহাজাগতিক দর্শন একে অপরের গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।

আমেরিকান ভাষাতাত্ত্বিক উইলিয়াম ডোয়াইট হুইটনি (William Dwight Whitney) এবং পণ্ডিত চার্লস রকওয়েল ল্যানম্যান (Charles Rockwell Lanman) অথর্ববেদ সংহিতার এই বিশটি কাণ্ডের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস বিশ্লেষণ করে এক চমৎকার কাঠামো উন্মোচন করেছেন (Whitney & Lanman, 1905)। তারা দেখিয়েছেন যে, এই সংহিতার প্রথম সাতটি কাণ্ড তৈরি হয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ছকে। প্রথম কাণ্ডের সূক্তগুলোতে সাধারণত চারটি করে মন্ত্র থাকে। দ্বিতীয় কাণ্ডে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় পাঁচটি, তৃতীয় কাণ্ডে ছয়টি এবং এভাবে সপ্তম কাণ্ড পর্যন্ত মন্ত্রের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এই প্রথম অংশের বিষয়বস্তু একান্তই মানুষের শরীর ও ঘরের নিরাপত্তা। মাথায় যন্ত্রণা দূর করা, রক্তক্ষরণ বন্ধ করা, যুদ্ধক্ষেত্রে ধনুর ছিলাকে মজবুত রাখা এবং ভালোবাসার মানুষের মন পাওয়ার মতো হাজারো পার্থিব আকাঙ্ক্ষা এই অংশটিতে ছন্দোবদ্ধ হয়ে আছে।

অষ্টম কাণ্ড থেকে দ্বাদশ কাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করলে টেক্সটের সুর একদম বদলে যায়। এখানে সূক্তগুলো আর ছোট ছোট সূত্রের মতো নয়, বরং একেকটি দীর্ঘ ও চিন্তাশীল সৃষ্টিতাত্ত্বিক রূপকে পরিণত হয়েছে। এই কাণ্ডগুলোতে এমন সব ধারণার অবতারণা করা হয়েছে যা পরবর্তীকালের উপনিষদীয় দর্শনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। যেমন পরম সত্তা হিসেবে ‘স্কম্ভ’ (Skambha) বা বিশ্বস্তম্ভের রূপক, জীবনশক্তি হিসেবে ‘প্রাণ’ (Prāṇa)-এর বন্দনা, কিংবা মহাবিশ্বের আধার হিসেবে যজ্ঞাবশেষ বা ‘উচ্ছিষ্ট’ (Ucchiṣṭa)-র ধারণা এই অংশেই বিস্তারিতভাবে ফুটে উঠেছে। ঘরের দাওয়ায় বসে শিকড়-বাকল নিয়ে কাজ করা মানুষটি কীভাবে একই সাথে পুরো মহাবিশ্বের পরম সত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিল, এই কাণ্ডগুলো তার ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।

ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ কাণ্ড পর্যন্ত অংশটি নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক বিষয়ের ওপর নিবেদিত। ত্রয়োদশ কাণ্ডে সূর্যের তেজকে ‘রোহিত’ (Rohita) নামে মহিমান্বিত করা হয়েছে। চতুর্দশ কাণ্ডে তৎকালীন সমাজের বিবাহ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিধান ও আনন্দ-বেদনার গান লিপিবদ্ধ রয়েছে। পঞ্চদশ কাণ্ডে রয়েছে ব্রাত্য সংস্কৃতির চিত্র, আর অষ্টাদশ কাণ্ডে সাজানো হয়েছে পরলোক এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুপুঙ্খ বিবরণ। সংহিতার শেষ দুটি কাণ্ড, অর্থাৎ উনবিংশ এবং বিংশ কাণ্ডকে আধুনিক গবেষকরা পরবর্তীকালের সংযোজন হিসেবে দেখেন। জার্মান ভারততাত্ত্বিক রুডলফ ভন রথ (Rudolf von Roth) এবং হুইটনি যৌথভাবে এই পাঠ পরীক্ষা করে মন্তব্য করেছিলেন যে, বিংশ কাণ্ডটি মূলত ঋগ্বেদ থেকে সরাসরি তুলে নেওয়া হয়েছে যাতে অথর্ববেদের পুরোহিতরা সোমযাগের অনুষ্ঠানে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন (Roth & Whitney, 1856)।

পৈপ্পলাদ শাখা: কাশ্মীর ও ওড়িশার পাণ্ডুলিপির রোমাঞ্চকর আবিষ্কার (The Paippalāda Śākhā: The Thrilling Discovery of Kashmir and Odisha Manuscripts)

অথর্ববেদের নয়টি শাখার নাম প্রাচীন ব্যাকরণ গ্রন্থে পাওয়া গেলেও বাস্তব জগতে দীর্ঘকাল ধরে কেবল শৌনক শাখাই গবেষকদের নাগালে ছিল। দ্বিতীয় প্রধান শাখা, অর্থাৎ পৈপ্পলাদ শাখা (Paippalāda Śākhā) পণ্ডিত মহলে একসময় সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়া এক কিংবদন্তি বলে গণ্য হতো। সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে এই পাঠটি কালের গর্ভে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ ভাগে এসে ঘটেছিল এক চমকপ্রদ ঘটনা। ১৮৭৫ সালে প্রাচ্যবিদ গেয়র্গ ব্যুলার জানতে পারেন যে কাশ্মীরের মহারাজার তোষাখানায় একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি রয়েছে যা শারদা লিপিতে ভোজপাতায় লেখা। তিনি বহু কষ্টে সেই পাণ্ডুলিপিটি সংগ্রহ করে জার্মানিতে রথের কাছে পাঠান।

কাশ্মীরের সেই একটিমাত্র পাণ্ডুলিপি দিয়ে বৈদিক গবেষণার জগতে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও বাস্তবে তা কোনো স্বস্তি দিতে পারেনি। কারণ ভোজপাতাগুলো ছিল শত শত বছরের পুরনো, বহু জায়গায় ভেঙে যাওয়া, ছত্রাকে আক্রান্ত এবং লিপিকরদের ভুলে ভরা। ফলে পাঠোদ্ধার করা একরকম অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পাঠের অসংখ্য ফাঁকা জায়গা অনুমান দিয়ে পূরণ করতে গিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ বাড়তেই থাকে। মনে হচ্ছিল পৈপ্পলাদ সংহিতা তার গোপন দরজা কখনোই পুরোপুরি খুলবে না। কিন্তু মানুষের অধ্যবসায় যে কত দূর যেতে পারে, তার প্রমাণ মিলল বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে।

ভারতীয় পণ্ডিত দুর্গামোহন ভট্টাচার্য ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে এক অবিশ্বাস্য অনুসন্ধানে নামেন। তিনি প্রাচীন কিছু সূত্রের সূত্র ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ ওড়িশা, দক্ষিণ বিহার এবং সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। সেখানে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন যে একদল ব্রাহ্মণ পরিবার এখনও টিকে রয়েছেন যারা নিজেদের পৈপ্পলাদী অথর্ববেদী বলে পরিচয় দেন। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, তারা কেবল মুখে মুখেই এই পাঠ মুখস্থ রাখেননি, তাদের ঘরের সিন্দুকে অত্যন্ত যত্নের সাথে রক্ষিত ছিল উড়িয়া লিপিতে তালপাতায় লেখা বহু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। শতাব্দী প্রাচীন গাছের পাতার সেই পুথিগুলোই ছিল পৈপ্পলাদ শাখার আসল প্রাণভোমরা।

দুর্গামোহন ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর তার ছেলে ভারততাত্ত্বিক পণ্ডিত দীপক ভট্টাচার্য (Dipak Bhattacharya) এই মহাযজ্ঞের হাল ধরেন। তিনি ওড়িশার গ্রামগুলো থেকে সংগ্রহ করা পুথিগুলোর পাঠ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মিলিয়ে ১৯৯৭ সালে পৈপ্পলাদ সংহিতার প্রথম আধুনিক বৈজ্ঞানিক সংস্করণ প্রকাশ করেন (Bhattacharya, 1997)। পরবর্তীকালে ডাচ গবেষক আর্লো গ্রিফিথস (Arlo Griffiths) এই পাঠের ওপর আরও গবেষণা চালান এবং এর বহু কাণ্ডের অনুবাদ সম্পন্ন করেন (Griffiths, 2009)। এই আবিষ্কার দেখিয়ে দিল যে, উত্তর-পশ্চিমের কাশ্মীর থেকে শুরু করে পূর্ব ভারতের ওড়িশা পর্যন্ত হাজার হাজার মাইল ব্যবধানে ছড়িয়ে থেকেও একটি প্রাচীন পাঠ কীভাবে প্রায় অবিকৃত অবস্থায় মানুষের স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকতে পেরেছিল।

শৌনক ও পৈপ্পলাদ পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও ভাষাতাত্ত্বিক স্তর (Comparative Analysis and Linguistic Strata of Śaunaka and Paippalāda Recensions)

পৈপ্পলাদ সংহিতার আধুনিক আবিষ্কার বৈদিক ভাষাতত্ত্বের আলোচনাকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। এই দুটি সংস্করণকে যখন পাশাপাশি রাখা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে অথর্ববেদ কোনো স্থবির বা হিমায়িত টেক্সট ছিল না। পৈপ্পলাদ সংহিতাতেও শৌনকের মতো বিশটি কাণ্ড রয়েছে, তবে তাদের অভ্যন্তরীণ সজ্জা ও ক্রম সম্পূর্ণ আলাদা। শৌনক শাখায় যে মন্ত্রটি প্রথম কাণ্ডে পাওয়া যায়, পৈপ্পলাদ পাঠে তা হয়তো দেখা যাচ্ছে চতুর্থ বা পঞ্চম কাণ্ডে। সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পৈপ্পলাদ সংহিতায় এমন শত শত মন্ত্র এবং বহু স্বাধীন সূক্ত রয়েছে যার কোনো চিহ্নই শৌনকীয় পাঠের ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায় না।

ভাষাগত দিক থেকে বিচার করলে পৈপ্পলাদ পাঠের ভেতরে অনেক বেশি প্রাচীনতার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। বিশিষ্ট ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার লুবোতস্কি (Alexander Lubotsky) পৈপ্পলাদ সংহিতার ব্যাকরণ ও ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন (Lubotsky, 2002)। তিনি প্রমাণ দেখিয়েছেন যে, পৈপ্পলাদ পাঠে ব্যবহৃত কিছু ক্রিয়াপদের রূপ এবং নামপদের বিভক্তি ঋগ্বেদের সবচেয়ে প্রাচীন স্তরের বৈদিক ভাষার সাথে হুবহু মিলে যায়। শৌনক পাঠে যেখানে পরবর্তীকালের ধ্রুপদী সংস্কৃতের মতো করে শব্দগুলোকে কিছুটা মসৃণ ও পরিমার্জিত করার প্রবণতা ছিল, পৈপ্পলাদ শাখা সেই আদিম কর্কশ কিন্তু শক্তিশালী ব্যাকরণিক রূপটিকে অবিকৃতভাবে ধরে রেখেছে। এটি দেখায় যে পৈপ্পলাদ ধারাটি হয়তো এমন কোনো অঞ্চলে চর্চিত হতো যা মূল ধারার বৈদিক বৈয়াকরণদের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত ছিল।

তাছাড়া, দুটি শাখার ভেষজ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত মন্ত্রগুলোর মধ্যেও পরিবেশগত পার্থক্য ফুটে ওঠে। একই ধরনের জ্বর বা চর্মরোগ সারানোর জন্য শৌনক শাখায় যে উদ্ভিদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, পৈপ্পলাদ শাখায় সেখানে প্রায়ই ভিন্ন একটি স্থানীয় গাছের নাম পাওয়া যায়। রোগ নিরাময়ের এই মন্ত্রগুলো কোনো গবেষণাগারে বসে তৈরি হয়নি, তৈরি হয়েছিল বনাঞ্চলে থাকা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতায়। পুরোহিত বা ভেষজবিদরা যখন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে পূর্বের গাঙ্গেয় উপত্যকা বা ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চলে গিয়েছেন, তখন স্থানীয় বনের লতাপাতার নামগুলো স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রার্থনার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের শাখাগুলো ছিল একেকটি স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান। শৌনক শাখা হয়তো পশ্চিমের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে কিছুটা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল, যার কারণে তার ভাষা কিছুটা পরিশীলিত হয়েছিল। অন্যদিকে পৈপ্পলাদ শাখাটি জনপদের সাধারণ প্রান্তিক মানুষের লোকায়ত ঐতিহ্যের অনেক গভীরে প্রবেশ করেছিল। ফলে এই দুটি শাখার বৈচিত্র্য প্রাচীন ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক রূপকেই পাঠকদের চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে।

অথর্ব ও আঙ্গিরস পরম্পরা: দ্বৈত নাম ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য (The Atharvan and Āṅgirasa Traditions: Dual Names and Psychological Significance)

প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যে অথর্ববেদকে কেবল একক নামে ডাকা হতো না, এর সবচেয়ে প্রাচীন এবং পারিভাষিক নামটি ছিল ‘অথর্বাঙ্গিরস’ (Atharvāṅgirasaḥ)। এই যৌথ নামটি কোনো সাধারণ শব্দযুগল নয়। এটি নির্দেশ করে দুটি প্রাচীন ঋষিকুল এবং তাদের পরিচালিত দুটি বিপরীতমুখী মনস্তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারাকে। একজন মানুষের অস্তিত্ব যেমন আলো ও অন্ধকার দুই নিয়েই তৈরি, অথর্বাঙ্গিরস নামটিও মানুষের সেই শুভ ও অশুভ উভয় বাস্তবতার সমাহার। প্রাচীন ব্যাখ্যায় এই দুই ধারাকে পরিষ্কারভাবে ভাগ করে দেখানো হয়েছে – একটি হলো অথর্বন ধারা, আর অন্যটি হলো আঙ্গিরস ধারা।

প্রথম অংশটি, অর্থাৎ ‘অথর্বন’ ধারাটির মূল সুর হলো ‘শান্ত’ (Śānta) বা কল্যাণকর। প্রাচীন বৈদিক পণ্ডিতরা একে ‘ভেষজ’ (Bheṣaja) রূপ বলেও ডাকতেন। এই ধারার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের শরীর ও মনের ক্ষত নিরাময় করা, আয়ু বৃদ্ধি করা, গৃহপালিত গবাদি পশুর রোগ প্রতিরোধ করা এবং সমাজে শান্তি স্থাপন করা। এখানে পুরোহিত মূলত একজন সহানুভূতিশীল চিকিৎসক ও হিতৈষী। তিনি বিভিন্ন গাছের শিকড় রোগীর শরীরে বেঁধে দিচ্ছেন, জলের স্পর্শ দিয়ে তার উত্তাপ কমাচ্ছেন এবং আশ্বস্ত করছেন যে কোনো অশুভ শক্তি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। এটি মানুষের বেঁচে থাকার সহজাত ইচ্ছা এবং নিরাপত্তাবোধের এক ইতিবাচক প্রতিফলন।

বিপরীতপক্ষে, দ্বিতীয় অংশটি অর্থাৎ ‘আঙ্গিরস’ ধারাটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক জগতের প্রতিনিধি। একে বলা হতো ‘ঘোর’ (Ghora) বা ‘অভিচার’ (Abhicāra)। প্রাচীন সমাজ সবসময় শান্ত থাকত না, সেখানে ক্ষমতার লোভ, হিংসা, রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। আঙ্গিরস ধারার কাজ ছিল সেই সংঘাতের ভেতর নিজেকে রক্ষা করা এবং শত্রুকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করা। সুইস গবেষক থোমাস যেসার (Thomas Zehnder) অথর্ববেদের অভিচারমূলক মন্ত্রগুলো বিশদভাবে পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, এই মন্ত্রগুলো কীভাবে তৎকালীন মানুষের তীব্র ভয় এবং ক্রোধকে সংহত রূপ দিত (Zehnder, 1999)। কাউকে অভিশাপ দেওয়া, প্রতিপক্ষের বাকশক্তি রোধ করা কিংবা শত্রু সৈন্যের মনে ভীতি সঞ্চার করার মতো তীব্র আক্রমণাত্মক উপাদান এই অংশে সংরক্ষিত রয়েছে।

ইতিহাসবিদ ডি. সি. সরকার (D. C. Sircar) প্রাচীন ভারতীয় ধর্মবিশ্বাসের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি আলোচনা প্রসঙ্গে দেখিয়েছেন যে, মানুষ একা কেবল শান্ত মন্ত্র দিয়ে পৃথিবীতে টিকতে পারে না (Sircar, 1971)। জীবনের প্রতিকূলতার মুখে তাকে অনেক সময় নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিধ্বংসী শক্তিরও আশ্রয় নিতে হয়। অথর্বাঙ্গিরস ধারাটি মানুষের সেই গোপন নিরাপত্তাহীনতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। রোগ নিরাময়ের শান্ত আশ্বাস আর শত্রুদমনের ভয়ংকর শক্তির এই যৌথ উপস্থিতিই অথর্ববেদের পুরোহিতদের সাধারণ মানুষের কাছে একই সাথে পরম আশ্রয়দাতা এবং ভয়ের পাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

লোকজীবন, ব্রাত্য সংস্কৃতি ও অথর্ববেদের প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা (Folk Life, Vrātya Culture, and the Institutional Canonization of the Atharvaveda)

অথর্ববেদ সংহিতার পাতা ওল্টালে প্রাচীন ভারতের যে ছবিটি ভেসে ওঠে, তা ঋগ্বেদের সোমরস পানের উজ্জ্বল উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি রক্তমাংসের এবং মানবিক। এখানে একজন সাধারণ কৃষক কীভাবে বৃষ্টির জন্য আকাশপানে তাকিয়ে থাকে, কীভাবে পঙ্গপালের আক্রমণ থেকে তার যবের ক্ষেত বাঁচানোর চেষ্টা করে, সেই দৃশ্যগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে। একজন ছোট ব্যবসায়ী যখন দূর দেশে বাণিজ্যে যাচ্ছেন, তখন তিনি পথের চোর-ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মন্ত্র পাঠ করছেন এবং তার বাণিজ্যে যেন প্রচুর লাভ হয় সেই প্রার্থনা জানাচ্ছেন। এমনকি একটি সাধারণ মাটির ঘর তৈরির সময় তার প্রতিটি কাঠের খুঁটি এবং খড়ের ছাউনিকে জীবন্ত সত্তার মতো সম্বোধন করে বলা হচ্ছে যে এই ঘর যেন পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘকাল আশ্রয় দেয়। মাটির প্রতি, প্রকৃতির প্রতি মানুষের এই তীব্র ভালোবাসা এবং নির্ভরতাই হলো অথর্ববেদের মূল ভিত্তি।

এই সাধারণ জীবনের পাশাপাশি সংহিতার পঞ্চদশ কাণ্ডে উঠে এসেছে এক অত্যন্ত বিস্ময়কর সামাজিক চিত্র, যা বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসে ‘ব্রাত্য’ (Vrātya) সংস্কৃতি নামে পরিচিত। ব্রাত্যরা ছিল এমন এক দল মানুষ যারা তৎকালীন গোঁড়া কুরু-পাঞ্চাল সমাজব্যবস্থার বাইরে বাস করত। তারা প্রচলিত বৈদিক যজ্ঞ করত না, কৃষিকাজ করত না, তাদের পোশাক ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তারা পাগড়ি পরে ও বিশেষ ধরনের রথে চড়ে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াত। মূল বৈদিক সমাজ তাদের সন্দেহ ও ঘৃণার চোখে দেখত। কিন্তু অথর্ববেদ এই ব্রাত্যদের পরিত্যাগ করার বদলে তাদের মহিমান্বিত করেছে। সংহিতায় ব্রাত্যকে এক সর্বশক্তিমান মহাজাগতিক পরিব্রাজক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার উপস্থিতিতে প্রকৃতি ও সমাজ আলোকিত হয়ে ওঠে।

ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন (George Abraham Grierson) ভারতীয় ভাষার ঐতিহাসিক সমীক্ষায় লক্ষ্য করেছিলেন যে, ব্রাত্য সংস্কৃতি মূলত পূর্ব ভারতের সেই সমস্ত স্বাধীন জনগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে যারা বৈদিক উচ্চবর্গের কঠোর বর্ণনিয়ম মানতে চায়নি (Grierson, 1903)। অথর্ববেদ এই বিদ্রোহী এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোকে তার সাহিত্যের ভেতরে ঠাঁই দিয়ে প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক বিশাল ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না, বরং ছিল এক রাজনৈতিক বাস্তবতা। তৎকালীন উদীয়মান নগর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

তাছাড়া, রাজনৈতিক দিক থেকেও অথর্ববেদের পুরোহিত অর্থাৎ ‘পুরোহিত’ (Purohita) রাজার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হয়ে উঠছিলেন। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতির তরবারির পাশাপাশি রাজার প্রয়োজন হতো মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাস এবং গোপন সুরক্ষার আশ্বাস। অথর্ববেদের মন্ত্রগুলো রাজাকে সেই আশ্বাস দিত। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, অথর্ববেদ কেবল জাদুবিদ্যা বা ভেষজের কোনো অগোছালো খাতা নয়। এটি প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রগঠন, লোকসংস্কৃতি, মানব মনস্তত্ত্ব এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের চিরন্তন বোঝাপড়ার এক অসাধারণ সামাজিক দলিল। ঋগ্বেদের কাব্য এবং যজুর্বেদের আচার যেখানে শেষ হয়েছে, অথর্ববেদ যেন সেখান থেকেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আসল লড়াইকে শুরু করেছে।

অথর্ববেদের জাদু ও অভিচার (Magic and Sorcery in the Atharvaveda): মন্ত্র, প্রতিরক্ষা, শত্রুদমন ও অভিচার

জাদুবিশ্বাসের নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও অথর্বসংহিতা (Anthropological Background of Magic and the Atharvasaṃhitā)

মানুষের আদিম ভয়ের ইতিহাস খুব দীর্ঘ। প্রকৃতির অনিয়মিত আচরণ, হঠাৎ রোগব্যাধি কিংবা চোখের সামনের শত্রুর হিংস্রতা প্রাচীন মানুষের মনে সবসময় এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করত। এই অনিশ্চয়তা সামাল দিতে মানুষ যেসব উপায় বের করেছিল, তার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল জাদুবিশ্বাস। বৈদিক সাহিত্যের বিশাল পরিসরে ঋগ্বেদ যখন দেবতাদের উদ্দেশ্যে স্তুতি আর যজ্ঞের ঘিয়ে নিবেদিত, তখন অথর্ববেদ মানুষের একেবারে মাটির কাছাকাছি থাকা ভয় ও বাসনার কথা বলে। গবেষক মরিস ব্লুমফিল্ড (Maurice Bloomfield) তার ধ্রুপদী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, অথর্ববেদীয় সাহিত্য আসলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকট মোকাবেলার সংকলন (Bloomfield, 1899)। এখানে উচ্চমার্গের দার্শনিক তত্ত্বের চেয়ে রোগ তাড়ানো, ডাইনি বা রাক্ষস থেকে পরিবার বাঁচানো এবং শত্রুকে কাবু করার তাগিদ অনেক বেশি তীব্র। প্রাচীন মানুষ যখন দেখত যুক্তিতে বা শারীরিক শক্তিতে কোনো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, তখন সে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সাহায্য চাইত। শব্দ ও আচারের সমন্বয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করা হতো, যা মানুষকে মানসিক স্বস্তি দিত।

নৃতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখলে জাদু এবং ধর্মের সীমারেখা এখানে প্রায়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়। নৃবিজ্ঞানী জেমস জর্জ ফ্রেজার (James George Frazer) জাদুর কার্যপদ্ধতিকে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করেছিলেন, যার একটি সংক্রামক জাদু এবং অন্যটি সাদৃশ্যমূলক জাদু (Frazer, 1922)। অথর্ববেদের বহু সূক্তে এই দুটি রীতির সুস্পষ্ট প্রয়োগ চোখে পড়ে। যেমন, শত্রুর পায়ের নিচের মাটি তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ মিশিয়ে মন্ত্র পড়লে শত্রু দুর্বল হয়ে পড়বে – এমন বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। এটা সরাসরি সংক্রামক জাদুর দৃষ্টান্ত। আবার কোনো পুতুল তৈরি করে তাতে কাঁটা ফুটিয়ে শত্রুর বিনাশ কল্পনা করা সাদৃশ্যমূলক জাদুর উদাহরণ। অথর্ববেদের সংকলকরা এই মানসিক ক্রিয়াকে চমৎকারভাবে বিন্যস্ত করেছিলেন। আদিম সমাজ মনে করত, জগতের প্রতিটি বস্তুর ভেতরে একটি গোপন জীবনীশক্তি কাজ করে। উপযুক্ত শব্দ বা মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে সেই শক্তিকে নিজের স্বার্থে পরিচালনা করা সম্ভব।

অথর্ববেদের এই জাদুবিশ্বাসকে বৈদিক সমাজের মূলধারার ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা সবসময় খুব স্বস্তির চোখে দেখতেন না। তিন বেদের বা ত্রয়ী (Trayī) ধারণার ভেতরে বহু শতাব্দী ধরে অথর্ববেদকে বাইরে রাখা হয়েছিল, কারণ এর বিষয়বস্তু ছিল অতিমাত্রায় লৌকিক ও বিপজ্জনক। ভারততত্ত্ববিদ আর্থার অ্যান্থনি ম্যাকডোনেল (Arthur Anthony Macdonell) উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদের উপাদানগুলো ঋগ্বেদের চেয়ে প্রাচীনতর লোকবিশ্বাসের সাক্ষ্য বহন করে, যদিও এর সংকলনকাল তুলনামূলকভাবে পরবর্তী সময়ের (Macdonell, 1900)। রাজদরবারের ঋত্বিকরা যখন সোমযাগ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, গ্রামের মানুষ তখন কোনো এক পোকা বা অদৃশ্য প্রেতের উপদ্রব থেকে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে অথর্ববেদের পুরোহিতের কাছে ছুটে যেত। ফলে এই সাহিত্যের ভাষা ও রূপক ঋগ্বেদের মতো কাব্যময় বা রাজকীয় নয়, বরং সরাসরি নির্দেশনামূলক এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ংকর।

সংহিতাটির প্রাচীন নাম ছিল অথর্বাঙ্গিরস (Atharvāṅgirasa), যা এর দ্বৈত চরিত্রকে প্রকাশ করে। এই নামের প্রথম অংশ ‘অথর্ব’ শান্ত ও কল্যাণকর কর্মের প্রতীক, আর দ্বিতীয় অংশ ‘অঙ্গিরস’ নির্দেশ করে ভয়ংকর বা ধ্বংসাত্মক অভিচারকে। ইতিহাসবিদ মাইকেল উইটজেল (Michael Witzel) আলোচনা করেছেন কীভাবে কুরু রাজ্যের রাজনৈতিক সংহতির যুগে এই প্রান্তিক লোকবিশ্বাসগুলোকে একটি প্রামাণ্য বৈদিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল (Witzel, 1997)। অর্থাৎ সমাজের নিচুতলার শক্তিশালী বিশ্বাসকে অস্বীকার করার উপায় ছিল না। তাই একে বৈদিক ধারার অন্তর্ভুক্ত করে নাম দেওয়া হলো চতুর্থ বেদ। এর ফলে সাধারণ মানুষের জাদুটোনা, তুকতাক ও কবিরাজি চিকিৎসা শাস্ত্রীয় মর্যাদা পেয়ে গেল। সমাজে বেঁচে থাকার যে মৌলিক লড়াই, যেখানে রোগ, হিংসা ও ঈর্ষা প্রতিদিনের সঙ্গী, অথর্ববেদ ঠিক সেই জায়গাটিতে আলো ফেলে।

শান্তি ও পৌষ্টিক মন্ত্র: আত্মরক্ষা, প্রাত্যহিক কল্যাণ ও তাবিজ-প্রথা (Śānti and Pauṣṭika Rites: Self-Protection, Well-being and Amulet Practices)

অথর্ববেদের জাদুচিন্তার প্রথম এবং প্রধান দিকটি হলো সুরক্ষা ও প্রাত্যহিক জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা। এই শ্রেণির আচারগুলোকে বলা হতো শান্তিকর্ম (Śāntikarma) এবং পৌষ্টিককর্ম (Pauṣṭikakarma)। শান্তিকর্মের উদ্দেশ্য ছিল অমঙ্গল বা অশুভ প্রভাব দূর করা, আর পৌষ্টিককর্মের লক্ষ্য ছিল গৃহ, পরিবার, গবাদি পশু এবং ফসলের সমৃদ্ধি ঘটানো। প্রাচ্যবিদ লরি এল. প্যাটন (Laurie L. Patton) দেখিয়েছেন যে, এই সূক্তগুলো বৈদিক গৃহস্থের মানসিক উদ্বেগকে নিরাময় করার এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করত (Patton, 2005)। কোনো পরিবারে যখন একটার পর একটা বিপর্যয় ঘটত, তখন তারা মনে করত বাস্তু বা কোনো অদৃশ্য অশুভ শক্তির কুদৃষ্টি পড়েছে। তখন অথর্ববেদের পুরোহিত বিশেষ কিছু মন্ত্র পড়ে জল ছিটিয়ে দিতেন, কিংবা নির্দিষ্ট কিছু কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি মাদুলি পরিয়ে দিতেন। এর পেছনে ভাবনা ছিল খুবই সরল – কোনো অশুভ শক্তি যদি ঘরে ঢোকার চেষ্টা করে, মন্ত্রপুত জল বা প্রতিরক্ষামূলক বস্তু তাকে বাধা দেবে।

এই আত্মরক্ষামূলক আচারের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল তাবিজ বা মণির ব্যবহার। অথর্ববেদে মণিকে কোনো সাধারণ রত্ন হিসেবে দেখা হতো না, বরং একে মনে করা হতো জীবন্ত শক্তির আধার। গবেষক কেনাথ জিস্ক (Kenneth Zysk) বৈদিক চিকিৎসা ও প্রতিরক্ষামূলক আচারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে তাবিজ ধারণের সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ যুক্ত ছিল (Zysk, 1998)। উদাহরণস্বরূপ, জঙ্গিদমণি (Jaṅgiḍa Amulet) নামক এক ধরণের উদ্ভিদের অংশ দিয়ে তৈরি কবচ শরীরের বিভিন্ন ব্যাধি এবং ডাইনিদের আক্রমণ থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য হাতে বা গলায় বেঁধে দেওয়া হতো। মন্ত্রে এই মণিকে সরাসরি সম্বোধন করে বলা হতো, “হে মণি, তুমি সহস্র চোখের মতো পাহারা দাও এবং সমস্ত অশুভকে দূরে ঠেলে দাও”। মানুষ যখন এই কাঠের টুকরো বা পাথর শরীরে ধারণ করত, তখন তার ভেতরে এক ধরণের গভীর আত্মবিশ্বাস জন্ম নিত।

প্রাত্যহিক কল্যাণের আরেকটি দিক ছিল পারিবারিক নিরাপত্তা। নতুন বাড়ি তৈরি করার সময়, গরু গোয়ালে ঢোকানোর মুহূর্তে, কিংবা মাঠে প্রথম বীজ বপন করার দিনে নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্র উচ্চারণ বাধ্যতামূলক ছিল। অথর্ববেদে গৃহনির্মাণের সূক্তগুলোতে দেখা যায়, ঘরের খুঁটিগুলোকে স্থির থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এবং আগুন বা চোর থেকে রক্ষার জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে। গবেষক ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) বৈদিক আচারের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, প্রাচীন ভারতবাসীর কাছে মন্ত্র ছিল বাস্তব পরিবর্তন আনার একটি হাতিয়ার (Gonda, 1980)। তারা বিশ্বাস করত, কোনো বস্তুর নাম উচ্চারণ করে তার গুণ বর্ণনা করলেই সেই বস্তু বশীভূত হয়। ফলে গরুর দুধ বাড়ানো, নতুন জমিতে খরা ঠেকানো বা পথচলার সময় সাপের কামড় থেকে বাঁচার জন্য অথর্ববেদের পদগুলো দৈনন্দিন প্রার্থনার মতো পঠিত হতো।

একই সাথে সমাজে সামাজিক মর্যাদাবৃদ্ধি এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষার জন্যও শান্তি আচারের শরণাপন্ন হতে হতো। যাকে বলা হতো সংমনস্য (Saṃmanasya) সূক্ত, তার কাজ ছিল পরিবারের ভাইদের মধ্যে বিবাদ মেটানো কিংবা স্বামী-স্ত্রীর কলহ দূর করা। অথর্ববেদের একটি বিখ্যাত সূক্তে বলা হচ্ছে, “তোমরা একই উদ্দেশ্যে কথা বলো, তোমাদের মন এক হোক, যেমন প্রাচীন দেবতারা অবিরোধে তাদের ভাগ গ্রহণ করতেন”। এখানে কোনো রক্তক্ষয়ী যজ্ঞ নেই, নেই কোনো পশুবলি। মানুষের মনের ভেতরের হিংসা ও দূরত্বকে দূর করার জন্য সুর এবং শব্দের অনুরণন ব্যবহার করা হতো। এই পৌষ্টিক প্রক্রিয়াগুলো মূলত গ্রামীণ জীবনের জটিলতাহীন অথচ গভীর মানবিক বন্ধনকে টিকিয়ে রাখার একটি সমাজতাত্ত্বিক কৌশল ছিল।

অভিচার ও ঘোর প্রয়োগ: শত্রুদমন, ধ্বংস ও বৈদিক ব্ল্যাক ম্যাজিক (Abhicāra and Ghora Practices: Subjugation, Destruction and Vedic Black Magic)

সুরক্ষার বিপরীতে অথর্ববেদের আরেকটি দিক ছিল অত্যন্ত আগ্রাসী এবং ধ্বংসাত্মক, যাকে বলা হতো ঘোরকর্ম (Ghorakarma) বা প্রচলিত অর্থে অভিচার (Abhicāra)। এই প্রক্রিয়া আধুনিক পরিভাষায় ব্ল্যাক ম্যাজিক বা অমঙ্গলকর জাদু হিসেবে পরিচিত। ভারততাত্ত্বিক হুইটনি ও ল্যানম্যান (William Dwight Whitney & Charles Rockwell Lanman) তাদের অনুবাদের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদের ষষ্ঠ ও সপ্তম কাণ্ডে শত্রুদমন এবং অনিষ্ট সাধনের এমন সব মন্ত্র সংকলিত হয়েছে যা বৈদিক সাহিত্যের অন্য কোথাও মেলে না (Whitney & Lanman, 1905)। সমাজে যখন দ্বন্দ্ব চরম রূপ নিত, সম্পদ বা ক্ষমতা নিয়ে যখন প্রতিবেশীদের মধ্যে তীব্র ঈর্ষা দেখা দিত, তখন মানুষ শত্রুর বিনাশ চেয়ে এই তুকতাকের সাহায্য নিত। এই আচারগুলো দিনের আলোয় সবার সামনে করা হতো না, বরং গভীর রাতে কোনো নির্জন স্থানে বা শ্মশানের কাছে পুরোহিতরা গোপনে সম্পন্ন করতেন।

অভিচারের মূল দর্শন ছিল ধ্বংসের প্রতিরূপ তৈরি করা। কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি হত্যা না করে তার শারীরিক ও মানসিক পতন ঘটানোর জন্য প্রতীকী হিংসা ব্যবহার করা হতো। এর একটি বহুল প্রচলিত রূপ ছিল শত্রুর নামে কুশ বা কাদা দিয়ে পুতুল বানিয়ে তাতে বিশেষ তেল ঢেলে পোড়ানো। কৌশিক সূত্র (Kauśika Sūtra) গ্রন্থে অথর্ববেদের মন্ত্রগুলোর প্রয়োগপদ্ধতি বিস্তারিত লিপিবদ্ধ আছে, যেখানে বলা হয়েছে কীভাবে একটি নির্দিষ্ট মন্ত্র পড়ে শত্রুর ছায়া মাড়িয়ে যেতে হবে বা তার ফেলে দেওয়া চুল বা নখ দিয়ে ধ্বংসাত্মক ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নৃবিজ্ঞানী ব্রোনিস্লভ ম্যালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski) যেমনটা দেখিয়েছেন, মানুষের তীব্র হতাশা এবং অপরকে আঘাত করার প্রবল বাসনা যখন বাস্তব উপায়ে পূরণ হয় না, তখন জাদু সেই হিংস্রতাকে প্রকাশ করার মাধ্যম হয়ে ওঠে (Malinowski, 1948)। বৈদিক যুগের অভিচার মন্ত্রগুলো সেই আদিম হিংসার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিচ্ছবি।

অথর্ববেদে শত্রুকে শুধু শারীরিকভাবে বিনাশ করার কথাই বলা হয়নি, তার সামাজিক ও বংশগত ভিত্তি ধ্বংস করারও পরিকল্পনা ছিল। একটি সূক্তে শত্রুর পুরুষত্ব নষ্ট করে তাকে নপুংসক বানিয়ে দেওয়ার জন্য এক ধরণের লতার সাহায্য নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। মন্ত্রে বলা হচ্ছে, “শত্রুর পুরুষত্ব যেন পাথরের আঘাতে ভেঙে যায়, সে যেন নারীদের কাছে অকেজো হয়ে পড়ে”। অন্য একটি সূক্তে শত্রুর চোখ অন্ধ করে দেওয়ার, তার জিহ্বা অসাড় করে দেওয়ার কিংবা তার ঘরে অগ্নিসংযোগের জন্য অদৃশ্য দানবদের প্রেরণের বিবরণ রয়েছে। গবেষক স্টেফানি জ্যামিসন ও জোয়েল ব্রেরেটন (Stephanie Jamison & Joel Brereton) প্রাচীন বৈদিক মানসিকতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, শত্রুকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হতো না, তাকে মনে করা হতো সমগ্র অস্তিত্বের জন্য হুমকি (Jamison & Brereton, 2014)। তাই তাকে ধ্বংস করতে কোনো নৈতিক বাধার পরোয়া করা হতো না।

এ ধরনের ক্ষতিকর আচারে বিভিন্ন দানবীয় সত্তাকে আহ্বান জানানো হতো। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল যাতুধান (Yātudhāna), কিমীদিন (Kimīdin) এবং পিশাচ (Piśāca)। অথর্ববেদের বহু সূক্ত এই সত্তাগুলোর বিরুদ্ধে আবার কিছু সূক্ত এদেরকে শত্রুর পেছনে লেলিয়ে দেওয়ার জন্য রচিত। পুরোহিত মন্ত্রের মাধ্যমে এই অশুভ আত্মাদের নির্দেশ দিতেন শত্রুর রক্ত পান করতে এবং তার পরিবারের মাংস ছিঁড়ে খেতে। এ ধরণের ভয়ংকর ভাষার পেছনে গভীর সামাজিক আক্রোশ লুকিয়ে থাকত। এই ঘোর প্রয়োগগুলোর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে প্রাচীন বৈদিক মানুষ কোনো কাল্পনিক বা সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক জগতে বাস করত না, বরং তাদের ভেতরে সম্পদ, জমি ও প্রতিপত্তি দখলের যে নির্মম প্রতিযোগিতা ছিল, অভিচার ছিল তারই একটি ব্যবহারিক ও অশুভ প্রকাশ।

উদ্ভিজ্জ শক্তি ও রক্ষাকবচ: মণি, বনস্পতি ও বস্তুভিত্তিক জাদু (Herbal Potency and Amulets: Maṇi, Plants and Material Magic)

অথর্ববেদের জাদুর জগতে উদ্ভিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীয়। প্রাচীন মানুষ গাছপালাকে কেবল জ্বালানি বা খাবার হিসেবে দেখত না, তাদের বিশ্বাস ছিল উদ্ভিদের মধ্যে গোপন এক চৈতন্য বা ঐশ্বরিক শক্তি বাস করে। এই ধারণাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল ভেষজ জাদু। ইতিহাসবিদ মির্চা এলিয়াদে (Mircea Eliade) তার তুলনামূলক ধর্মীয় গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, আদিম মানুষ প্রাকৃতিক বস্তুর মধ্যে এমন এক অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করত, যা সাধারণ পার্থিব সীমাকে অতিক্রম করে যেত (Eliade, 1958)। অথর্ববেদে গাছপালাকে সরাসরি কথা বলা মানুষ বা দেবতার মতো বিবেচনা করা হয়েছে। যেকোনো ওষধি তোলার আগে পুরোহিত বা বৈদ্যকে বিশেষ প্রার্থনা করতে হতো, যাতে সেই উদ্ভিদের ভেতরের নিরাময়কারী বা প্রতিরক্ষামূলক শক্তি ক্ষুণ্ণ না হয়।

এমন একটি বিশেষ উদ্ভিদ ছিল অপামার্গ (Apāmārga)। এই গাছটির নাম থেকেই বোঝা যায় এর কাজ, অর্থাৎ যা সমস্ত খারাপ কিছুকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার বা অপমার্জন করে দেয়। অথর্ববেদের বহু সূক্তে অপামার্গকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, যেন সে মানুষের শরীর থেকে রোগ, পাপ এবং শত্রুর পাঠানো কুদৃষ্টিকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। গবেষক হেনরিক জিমার (Heinrich Zimmer) প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাতত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, উদ্ভিদের ওষধি গুণ এবং তার জাদুকরী ক্ষমতাকে তখন আলাদা করে দেখা হতো না (Zimmer, 1948)। অপামার্গ গাছের শিকড় তুলে বিশেষ মন্ত্রপূত করে হাতে বেঁধে দিলে তা যেমন ত্বকের রোগ সারাত, তেমনই মানুষের বিশ্বাস ছিল এটি কোনো ডাইনি বা পিশাচকে কাছে ঘেঁষতে দেবে না। বস্তু এবং ধারণার এই মিশ্রণই ছিল বৈদিক বস্তুভিত্তিক জাদুর মূল ভিত্তি।

গাছপালা ছাড়াও বিভিন্ন ধাতু ও প্রাণিজ বস্তুর সমন্বয়ে তৈরি রক্ষাকবচ বা মণির প্রয়োগ ছিল ব্যাপক। যেমন শঙ্খমণি (Śaṅkha Amulet), যা সাগরের শঙ্খ বা ঝিনুক থেকে তৈরি হতো। অথর্ববেদে বলা হচ্ছে, সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে আসা এই শঙ্খ মানুষের আয়ু বাড়িয়ে দেয় এবং অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে। জলের সঙ্গে জীবনের যে গভীর সংযোগ, সেই ভাবনা থেকেই এই শঙ্খের শক্তি কল্পিত হয়েছিল। একইভাবে অঞ্জন (Añjana) বা সুরমা জাতীয় এক ধরণের খনিজ পদার্থ চোখে দেওয়ার পাশাপাশি কবচ হিসেবে ব্যবহারের বিধান ছিল, যা মানুষের দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি শত্রুর পাঠানো বাণকে ফিরিয়ে দিতে পারত। এই সমস্ত বস্তু ব্যবহারের পেছনে কাজ করত প্রতীকী মানসিকতা। মানুষ মনে করত, যে বস্তুটি দৃঢ় বা চকচকে, তার মধ্যে অশুভকে প্রতিহত করার ক্ষমতাও তত বেশি।

বনস্পতি ও উদ্ভিদের মাধ্যমে শত্রুর বিষক্রিয়া নষ্ট করার ধারণাও অথর্ববেদে বিস্তৃত। সাপে কাটলে বা কোনো বিষাক্ত পোকা কামড়ালে নির্দিষ্ট গাছের পাতার রস খাওয়ানোর পাশাপাশি জোরে জোরে মন্ত্র পড়ে বিষকে নিচে নামিয়ে আনার আদেশ দেওয়া হতো। পুরোহিত বলতেন, “বিষের তেজ যেন জলে মিশে যায়, পর্বতের গায়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে”। এখানে কেবল রাসায়নিক ক্রিয়াকে ভরসা করা হচ্ছে না, শব্দের কম্পন দিয়ে বিষের আত্মাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোকে অন্ধবিশ্বাস মনে হতে পারে, কিন্তু সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, তখন এই বস্তুভিত্তিক ও মানসিক প্রতিরক্ষাই মানুষকে বাঁচার প্রেরণা দিত।

যজ্ঞ বনাম জাদু: ঋগ্বেদীয় সোমযাগ ও অথর্ববেদীয় ব্যবহারিক তুকতাক (Sacrifice versus Magic: Ṛgvedic Ritualism and Atharvan Pragmatism)

বৈদিক সাহিত্যের গবেষকদের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক রয়েছে যজ্ঞ এবং জাদুর পার্থক্য নিয়ে। ঋগ্বেদ এবং যজুর্বেদের যজ্ঞব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত বিধিবদ্ধ, ব্যয়বহুল এবং জটিল। সেখানে অগ্নিহোত্র (Agnihotra) বা সোমযাগ (Somayāga) করার জন্য বিপুল পরিমাণ সম্পদ, একাধিক দক্ষ পুরোহিত এবং কয়েক দিনের প্রস্তুতি লাগত। রাজা বা প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি ছাড়া এমন যজ্ঞ করার ক্ষমতা কারও ছিল না। ভারততত্ত্ববিদ ইয়োহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট (Johannes Bronkhorst) দেখিয়েছেন যে, বৃহত্তর বৈদিক যজ্ঞব্যবস্থা ছিল মূলত সামাজিক মর্যাদা ও মহাজাগতিক নিয়ম বা ঋত রক্ষা করার একটি রাজকীয় আয়োজন (Bronkhorst, 2007)। এর বিপরীতে অথর্ববেদের আচারগুলো ছিল দ্রুত ফলদায়ী, সস্তা এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। এখানে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল না, মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সংকট সমাধান করা।

এই কারণে ঋগ্বেদীয় পুরোহিতরা অথর্ববেদীয় রীতিনীতিকে কিছুটা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতেন। ঋগ্বেদে দেবতাকে তোষামোদ করা হতো, স্তুতি গেয়ে তাদের প্রসন্ন করে বর প্রার্থনা করা হতো। সেখানে মানুষ ছিল ভিখারি আর দেবতারা ছিলেন দাতা। কিন্তু অথর্ববেদের জাদুতে দেবতার অবস্থান নেমে এসেছে মানুষের সমতলে, ক্ষেত্রবিশেষে নিচে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) প্রাচীন ধর্মের রূপান্তরের আলোচনায় উল্লেখ করেছিলেন যে, ধর্মে যেখানে দেবতাদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করা হয়, জাদুতে সেখানে অতিপ্রাকৃতিক শক্তিকে বাধ্য করা হয় মানুষের ইচ্ছাপূরণ করতে (Weber, 1922)। অথর্ববেদের মন্ত্রে দেবতাকে অনুরোধ করার চেয়ে আদেশ দেওয়ার সুর অনেক বেশি। বলা হয়, অগ্নি যেন এখনই গিয়ে অমুক শত্রুকে পুড়িয়ে মারে, কিংবা ইন্দ্র যেন এখনই অমুক ডাইনিকে বজ্র দিয়ে চূর্ণ করে দেয়। দেবতার কোনো স্বাধীনতা এখানে রাখা হয়নি, মন্ত্রের শক্তিতে তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

যজ্ঞ এবং জাদুর এই পার্থক্য তাদের আচারিক উপকরণের দিকে তাকালেও বোঝা যায়। সোমযাগের প্রধান উপাদান ছিল পবিত্র সোমরস, ঘি, দুধ এবং নির্দিষ্ট পশু। অন্যদিকে অথর্ববেদের তুকতাকে ব্যবহার হতো শ্মশানের ছাই, ভাঙা মাটির হাঁড়ি, পশুর হাড়, রক্ত, কটু তেল কিংবা বিষাক্ত লতাপাতা। এই উপকরণগুলোই বলে দেয় যে যজ্ঞ ছিল পরিচ্ছন্ন ও প্রাতিষ্ঠানিক, আর জাদু ছিল প্রাত্যহিক জীবনের অন্ধকার ও অস্বস্তিকর অংশের মুখোমুখি হওয়া। গবেষক ফ্র্রিৎস স্টাল (Frits Staal) বৈদিক আচারের গঠন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, বৈদিক যজ্ঞ কোনো অর্থপূর্ণ ব্যবহারিক লক্ষ্যের চেয়ে নিয়মের বিশুদ্ধতার ওপর বেশি দাঁড়িয়ে ছিল, অথচ অথর্ববেদের আচার ছিল পুরোপুরি লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকারণমুখী (Staal, 1989)। অথর্ববেদের পাঠক বা যজমানের একটাই চাহিদা ছিল – কাজ হতে হবে, তা যেভাবেই হোক।

তবে এই দুই ধারার মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগও ছিল। পরবর্তীতে বৈদিক যজ্ঞের মধ্যেও অথর্ববেদের পুরোহিত অর্থাৎ ব্রহ্মা (Brahmā)-র উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। যজ্ঞ চলাকালীন কোনো ভুলত্রুটি হলে বা কোনো অশুভ লক্ষণ দেখা দিলে তা সংশোধন করার দায়িত্ব ছিল এই ব্রহ্মা পুরোহিতের, যিনি ছিলেন অথর্ববেদের জ্ঞানে পারদর্শী। এর মানে দাঁড়ায়, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম যতই জাদুকে দূরে ঠেলে দিতে চাক না কেন, নিজের নিরাপত্তার জন্যই শেষ পর্যন্ত তাকে জাদুর সাহায্য নিতে হয়েছিল। বড় বড় রাজকীয় যজ্ঞের ফাঁকফোকর দিয়ে যে অনিশ্চয়তা উঁকি দিত, অথর্ববেদীয় তুকতাক সেই শূন্যস্থান পূরণ করত। উচ্চাঙ্গের যজ্ঞ ও মাটির জাদুর এই সহাবস্থানই বৈদিক সমাজকে একটি ভারসাম্য দিয়েছিল।

সমাজতাত্ত্বিক মনস্তত্ত্ব: ভীতি, আধিপত্য ও প্রাচীন ক্ষমতার রাজনীতি (Sociological Psychology: Fear, Hegemony and Ancient Power Politics)

অথর্ববেদের জাদুকরী মন্ত্রগুলোকে শুধুমাত্র প্রাচীন কুসংস্কার হিসেবে দেখলে এর ভেতরের গভীর সমাজতাত্ত্বিক দিকটি হাতছাড়া হয়ে যায়। এই মন্ত্রগুলোর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ও অনার্য সমাজের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানসিক চাপ। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার (R. C. Majumdar) তার প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে ইঙ্গিত করেছেন যে, আর্যরা যখন গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে এগোচ্ছিল, তখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের কেবল যুদ্ধই হয়নি, সাংস্কৃতিক সংঘাত ও আত্তীকরণও ঘটেছিল (Majumdar, 1951)। স্থানীয় অনার্য উপজাতিদের বিভিন্ন লোকবিশ্বাস, প্রেততত্ত্ব এবং ভয়ংকর আচারগুলো খুব দ্রুত বৈদিক সমাজের ভেতরে প্রবেশ করেছিল। উচ্চবর্ণের মানুষেরা এই লোকবিশ্বাসগুলোকে ভয় পেত এবং একই সাথে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে এগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত।

ক্ষমতার রাজনীতিতে জাদুর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রকট। রাজার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, প্রজাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাদের মনে ভীতি তৈরি করার জন্য অথর্ববেদের সূক্তগুলো নিয়মিত ব্যবহৃত হতো। অথর্ববেদে এমন কিছু মন্ত্র রয়েছে যা যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি বা রাজার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গাওয়া হতো। ঢোলের ওপর মন্ত্র পড়ে বলা হতো, এই ঢোলের শব্দ শুনে শত্রুর হৃদপিণ্ড যেন কেঁপে ওঠে, তাদের মলমূত্র যেন ত্যাগ হয়ে যায়। এটি ছিল এক ধরনের প্রাচীন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। শত্রুর শারীরিক শক্তির চেয়ে তার মনোবল ভেঙে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। পুরোহিতরা রাজাকে বোঝাতেন যে তার সঙ্গে এমন কিছু গোপন মারণশক্তি রয়েছে যা দূর থেকেই প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই প্রক্রিয়ায় জাদুকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও এই সাহিত্যের পাতায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বহুবিবাহের যুগে সতীনদের মধ্যকার হিংসা দূর করার জন্য অথর্ববেদে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। এক নারী অন্য নারীর ক্ষতি করার জন্য বা স্বামীর মন নিজের দিকে টানার জন্য বিশেষ এক ধরনের শিকড় মাটিতে পুঁতে রাখত এবং মন্ত্র পড়ত, “আমি যেমন এই শিকড় মাড়িয়ে যাচ্ছি, আমার সতীনও যেন আমার পায়ের নিচে পিষ্ট হয়”। এটি দেখায় যে প্রাচীন সমাজের পারিবারিক কাঠামোতে নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কতটা সীমিত ছিল এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের কতটা মানসিক চাপে থাকতে হতো। সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা যখন অন্যের মর্জির ওপর নির্ভর করে, তখন জাদুটোনাই হয়ে দাঁড়ায় নারীর একমাত্র আত্মরক্ষার অস্ত্র।

সব মিলিয়ে অথর্ববেদের জাদু ও অভিচার আসলে প্রাচীন মানুষের অসহায়ত্ব এবং সেই অসহায়ত্বকে জয় করার মরিয়া চেষ্টার দলিল। রোগ, মৃত্যু, সামাজিক অবিচার ও শত্রুতার মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ নিস্ক্রিয় বসে থাকেনি। সে ভাষা দিয়ে, ভেষজ দিয়ে এবং প্রতীকের শক্তি দিয়ে লড়াই করতে চেয়েছে। এই সাহিত্য প্রমাণ করে যে বৈদিক সভ্যতা কোনো বিমূর্ত স্বর্গের কল্পনা ছিল না, বরং তা ছিল রক্তমাংসের মানুষের জটিল এক পৃথিবী। মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তি – রাগ, ভয়, কাম ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা – অথর্ববেদের মন্ত্রে কোনো রাখঢাক ছাড়াই উন্মোচিত হয়েছে। ধর্মের নামে যে নৈতিক আবরণ তৈরি করা হয়, তার নিচে মানুষের যে আদিম মনস্তত্ত্ব সবসময় সক্রিয় থাকে, অথর্ববেদ তারই এক নির্ভুল ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক দলিল।

অথর্ববেদের রোগ ও নিরাময় (Disease and Healing in the Atharvaveda): রোগধারণা, ঔষধি, মন্ত্র ও চিকিৎসা

বৈদিক রোগতত্ত্ব ও অতিলৌকিক কারণসূত্র (Vedic Etiology and Demonic Pathology): তক্মন, যক্ষ্মা ও অদৃশ্য আক্রমণ

মানুষের রোগভোগের ইতিহাস তার অস্তিত্বের মতোই পুরনো। শরীর যখন স্বাভাবিক ছন্দ হারায়, তখন প্রাচীন মানুষ তার কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকাত। চারপাশের দৃশ্যমান জগত যখন কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারত না, তখন তারা রোগের পেছনে অদৃশ্য শক্তির হাত দেখতে পেত। অথর্ববেদের যুগে রোগকে কোনো স্বাভাবিক শারীরিক বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখার সুযোগ কম ছিল। গবেষক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (Debiprasad Chattopadhyaya) প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, বৈদিক সমাজের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগব্যাধিকে মনে করা হতো দেবতাদের ক্রোধ বা অশুভ অপদেবতার শরীর দখল করার পরিণতি (Chattopadhyaya, 1977)। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, তীব্র কাঁপুনি বা চামড়ার ক্ষতের পেছনে কোনো শারীরবৃত্তীয় কারণ খোঁজার চেয়ে মানুষ ভাবত কোনো অদৃশ্য অপশক্তি শরীরে বাসা বেঁধেছে।

অথর্বসংহিতায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং আতঙ্কজনক রোগের নাম ছিল তক্মন (Takman)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একে ম্যালেরিয়া বা বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক জ্বরের সঙ্গে তুলনা করা হয়। রোগটি ছিল ঋতুভিত্তিক, বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎকালে এর প্রাদুর্ভাব বাড়ত। অথর্ববেদে তক্মনকে কোনো বিমূর্ত লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়নি, বরং তাকে রক্তমাংসের এক হিংস্র ও চঞ্চল সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। সে মানুষকে হলুদ বা লালচে রঙের করে দেয়, হাড়ের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয় এবং এক দিন বা দুই দিন পরপর ফিরে আসে। গবেষক জেরিট জান ম্যুলেনবেল্ড (Gerrit Jan Meulenbeld) তার চিকিৎসা সাহিত্যের ইতিহাসে দেখিয়েছেন যে, অথর্ববেদের ঋষিরা তক্মনকে সম্বোধন করে বলতেন যেন সে অন্য কোনো দূরবর্তী জনপদে চলে যায় (Meulenbeld, 1999)। মন্ত্রে বলা হতো, “হে তক্মন, তুমি মুজবন্ত বা বল্হিক দেশে যাও, শুদ্র বা দাস রমণীকে গিয়ে ধরো, আমাদের ছেড়ে দাও”। রোগের এই ভৌগোলিক নির্বাসনপ্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন মানুষ রোগকে শরীর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া যায় এমন একটি জীবন্ত উপদ্রব ভাবত।

তক্মনের পাশাপাশি আরেকটি ধ্বংসাত্মক ব্যাধি ছিল যক্ষ্মা (Yakṣmā)। এই শব্দটি পরবর্তীকালে ক্ষয়রোগ বা টিউবারকিউলোসিস অর্থে ব্যবহৃত হলেও, অথর্ববেদের যুগে যক্ষ্মা বলতে বোঝাত শরীরের ভেতরের ক্ষয়কারী যেকোনো রোগ। সূক্তগুলোতে যক্ষ্মাকে বলা হয়েছে সর্বাঙ্গীণ এক বিনাশী শক্তি, যা মানুষের অস্থিমজ্জা, ফুসফুস, চোখ এবং সন্ধিস্থলকে ভেতর থেকে শুকিয়ে ফেলে। এই রোগের পেছনে দেবতাদের অসন্তোষ, বিশেষ করে বরুণ দেবের পাপের দণ্ড দেওয়ার ধারণাকে যুক্ত করা হতো। ভারততত্ত্ববিদ জুলিয়াস জলি (Julius Jolly) বৈদিক চিকিৎসা অধ্যয়নে দেখিয়েছেন যে, নৈতিক স্খলন বা শপথভঙ্গের ফলে শরীরে যে জল জমে যেত, যাকে আজ আমরা ড্রপসি বা শোথ বলি, তাও যক্ষ্মার রূপভেদ হিসেবে গণ্য হতো (Jolly, 1951)। রোগীকে বাঁচানোর জন্য প্রার্থনায় বলা হতো, সে যেন জ্ঞাত বা অজ্ঞাত সব পাপ থেকে মুক্তি পায়, কারণ পাপমুক্ত না হলে রোগের অসুর শরীর ছাড়বে না।

রোগসৃষ্টিকারী এই অপদেবতাদের নানা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে অপ্সরস (Apsaras) ও গন্ধর্ব (Gandharva) যেমন ছিল, তেমনই ছিল রক্তপিপাসু রাক্ষস (Rākṣasa) ও পিশাচ (Piśāca)। উন্মাদনা বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার পেছনে অপ্সরা বা গন্ধর্বদের ভর করার বিশ্বাস ছিল অত্যন্ত প্রবল। কোনো মানুষ যখন হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করত, চিৎকার করত বা আপনজনদের চিনতে অস্বীকার করত, তখন ধরে নেওয়া হতো তার চিত্ত অন্য কোনো অস্তিত্ব দ্বারা অপহৃত হয়েছে। এই মনোদৈহিক ব্যাখ্যাটি সেই সময়ের সমাজকে অন্তত একটা সান্ত্বনা দিত। তারা রোগের কোনো বস্তুনিষ্ঠ জৈবিক কারণ না জানলেও একটি কাল্পনিক কারণ দাঁড় করাতে পারত। ফলে চিকিৎসাও হয়ে উঠেছিল সেই কাল্পনিক কারণটিকে শরীর থেকে বিতাড়ন করার প্রক্রিয়া।

কৃমি ও জীবাণুর আদি ধারণা (Primitive Concepts of Helminths and Microbes): দৃশ্য-অদৃশ্য পরজীবী ও শরীরতত্ত্ব

প্রাচীন মানুষ খালি চোখে জীবাণু দেখতে পেত না, তবে তারা পচা মাংস, নষ্ট ফল বা মানবদেহের ক্ষতে পোকা বা কৃমির উপস্থিতি লক্ষ্য করত। সেখান থেকেই রোগসৃষ্টিকারী অদৃশ্য পোকার এক চমকপ্রদ ধারণা অথর্ববেদে গড়ে ওঠে। যাকে বলা হতো কৃমি (Kṛmi) সূক্ত, সেখানে অন্ত্রের কৃমি থেকে শুরু করে শরীরের সূক্ষ্মতম কোষে ঢুকে পড়া ক্ষতিকর কীটদের বিনাশের জন্য মন্ত্র পাঠ করা হতো। চিকিৎসা ইতিহাসবিদ ডমিনিক ভুজাস্তিক (Dominik Wujastyk) দেখিয়েছেন যে, দৃশ্যমান পোকার পর্যবেক্ষণ থেকেই প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় এমন কিছু সূক্ষ্ম কৃমির কল্পনা করা হয়েছিল যা খালি চোখে দেখা যায় না কিন্তু শরীরের ক্ষতি করে (Wujastyk, 2003)। অথর্ববেদের কবিরা স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, কিছু কৃমি পর্বতে বাস করে, কিছু বনে, কিছু ওষধির ভেতর আর কিছু কৃমি সরাসরি মানুষের রক্ত ও অন্ত্রে বংশবৃদ্ধি করে।

অথর্ববেদের দ্বিতীয় কাণ্ডের বত্রিশতম সূক্তে কৃমির আকার ও প্রকারভেদের একটি চমৎকার বিবরণ মেলে। সেখানে সাদা কৃমি, কালো কৃমি, শিংওয়ালা কৃমি এবং কানওয়ালা কৃমির কথা বলা হয়েছে। এমনকি কৃমির পরিবার ও আত্মীয়স্বজনেরও উল্লেখ আছে। বলা হচ্ছে, “আমি কৃমির রাজাকে ধ্বংস করছি, তার প্রধান অমাত্যকে হত্যা করছি, তার স্ত্রী-সন্তান ও প্রতিবেশীদের সমূলে বিনাশ করছি”। এই কাব্যিক আক্রোশের পেছনে কাজ করত শরীরকে কীটমুক্ত করার তীব্র আরোগ্যচেতনা। শিশুদের পেটের কৃমির ক্ষেত্রে এই মন্ত্রগুলো বেশি ব্যবহৃত হতো। চিকিৎসাকারী বৈদ্য বা পুরোহিত একটি পাথর হাতে নিয়ে অন্য পাথরের ওপর কৃমির প্রতীকী রূপ তৈরি করে পিষে ফেলতেন। এই প্রতীকী ধ্বংসের মাধ্যমে রোগীর মনস্তাত্ত্বিক বল ফিরিয়ে আনা হতো।

সূর্যরশ্মির মাধ্যমে কৃমি ধ্বংসের একটি বিশেষ ধারণা অথর্ববেদে পাওয়া যায়। প্রাচীন ঋষিরা লক্ষ্য করেছিলেন যে রোদ বা তাপ দিলে অনেক কীট মারা যায় এবং ক্ষত শুকিয়ে আসে। অথর্ববেদের বহু মন্ত্রে উদীয়মান সূর্যকে আহ্বান জানানো হয়েছে শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা কীটদের ভস্মীভূত করার জন্য। গবেষক রাহুল পিটার দাস (Rahul Peter Das) প্রাচীন শরীরতাত্ত্বিক ধারণার বিকাশের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে প্রাকৃতিক উপাদান ও শারীরবৃত্তীয় পর্যবেক্ষণের একটি মিশ্র রূপ বৈদিক সাহিত্যে ফুটে উঠেছিল (Das, 2003)। সূর্যকে মনে করা হতো সর্বদ্রষ্টা এক চিকিৎসক, যার আলো শরীরের অন্ধকারের গভীরে প্রবেশ করে রোগবাহী পোকাদের হত্যা করতে পারে। একে প্রাচীন জীবাণুনাশক চিন্তার একটি অত্যন্ত প্রাথমিক রূপ বলা যেতে পারে।

তবে কৃমি ধারণার সঙ্গে রক্ত ও চোখের সংযোগও ছিল বেশ গভীর। অথর্ববেদে এমন কিছু কৃমির উল্লেখ আছে যা চোখের পলকে বা দাঁতের মাড়িতে বাস করে বলে ভাবা হতো। দাঁতের ব্যথার জন্য দাঁতের কৃমিকে দায়ী করার প্রাচীন বৈশ্বিক বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি এখানেও স্পষ্ট। চোখ জ্বালা করা বা লাল হয়ে যাওয়ার পেছনেও অদৃশ্য কীটদের আক্রমণকে চিহ্নিত করা হতো। শরীরের বিভিন্ন রন্ধ্র দিয়ে এই পরজীবীরা ভেতরে ঢোকে বলে বিশ্বাস ছিল। তাই চিকিৎসার অংশে কেবল মন্ত্রোচ্চারণ নয়, বিভিন্ন ঝাঁঝালো উদ্ভিদের ধোঁয়া দিয়ে রোগীর শরীরকে বাষ্পায়িত করার বিধান ছিল। ধোঁয়ার ঝাঁঝে কৃমি মারা যাবে বা পালিয়ে যাবে – এই সরল প্রত্যক্ষজ্ঞানই চিকিৎসাপদ্ধতিকে একটি প্রায়োগিক ভিত্তি দিচ্ছিল।

বনৌষধি ও উদ্ভিদভিত্তিক নিরাময়পদ্ধতি (Medicinal Flora and Herbal Therapy): কুষ্ঠ, লাক্ষা ও অরুন্ধতীর প্রয়োগ

অথর্ববেদের চিকিৎসাব্যবস্থা কেবল শূন্যে মন্ত্র আওড়ানো ছিল না, এর একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভেষজ বা বস্তুগত ভিত্তি ছিল। গাছপালাকে প্রাচীন মানুষ কেবল খাদ্য বা জ্বালানি ভাবেনি, ভাবত রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাক্ষাৎ সেনাপতি। বিভিন্ন লতাপাতাকে সরাসরি দেবীর মর্যাদায় আসীন করে সম্বোধন করা হতো। এদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ভেষজ ছিল কুষ্ঠ (Kuṣṭha) নামক সুগন্ধি উদ্ভিদটি। একে হিমালয় পর্বতের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রাচ্যবিদ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (Surendranath Dasgupta) তার চিকিৎসাদর্শন সংক্রান্ত আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদের ওষধিবিদ্যা ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ ভেষজজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মীয় ভাবাবেগের এক অভিনব সমাহার (Dasgupta, 1922)। কুষ্ঠ গাছকে তক্মন বা জ্বরের প্রধান প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বিশ্বাস ছিল, হিমালয়ের বরফগলা জলে যে গাছের জন্ম, তার শীতল স্পর্শ রোগীর উত্তপ্ত শরীরকে জুড়িয়ে দিতে সক্ষম।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উপাদান ছিল লাক্ষা (Lākṣā) বা যাকে অথর্ববেদে বলা হয়েছে অরুন্ধতী (Arundhatī)। এটি এক ধরণের আঠালো রজন, যা গাছের ডালে বিশেষ পোকার নিঃসরণ থেকে তৈরি হতো। এর মূল কাজ ছিল ক্ষতস্থান জোড়া লাগানো এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করা। অরুন্ধতীকে বর্ণনা করা হয়েছে রাতের কন্যা বা লাক্ষার রক্তিম রূপ হিসেবে। অথর্ববেদের পঞ্চম কাণ্ডের পঞ্চম সূক্তে অরুন্ধতীর প্রশংসা করে বলা হচ্ছে, “তুমি গাছে গাছে আরোহণ করো, তুমি সব কিছুকে সংযুক্ত করো, তোমার স্পর্শে ভাঙা হাড় আবার জোড়া লেগে যাক”। প্রাচীন বৈদ্যরা গভীর ক্ষতে এই রজন গরম করে প্রলেপ দিতেন। রজনের অ্যান্টিসেপটিক গুণ এবং বাতাস প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ক্ষতকে দ্রুত শুকাতে সাহায্য করত। এই ব্যবহারিক প্রয়োগের পাশে যখন ভেষজটির বন্দনা করে শ্লোক গাওয়া হতো, তখন রোগীর মনে এক ধরণের পরম আস্থা তৈরি হতো।

চর্মরোগ ও কুষ্ঠ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট উদ্ভিদের ব্যবহারের বিশদ উল্লেখ রয়েছে। শরীরের সাদা দাগ বা গলিত কুষ্ঠকে বলা হতো শ্বিত্র (Śvitra) বা কিলস (Kilāsa)। এই রোগের চিকিৎসার জন্য রজনী (Rajanī) বা হলুদ এবং হরিদ্রা (Haridrā) জাতীয় রঞ্জক উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করা হতো। মন্ত্রে স্পষ্ট বলা হচ্ছে, উদ্ভিদের স্বাভাবিক কৃষ্ণবর্ণ বা রক্তবর্ণ যেন রোগীর চর্মের বিবর্ণতাকে দূর করে দেয়। সাদৃশ্যমূলক ভাবনার ওপর দাঁড়িয়ে চিকিৎসাটি চলত – অর্থাৎ যে গাছের গাঢ় রঙ আছে, সে শরীরের ফ্যাকাশে দাগ দূর করে স্বাভাবিক রঙ ফিরিয়ে আনতে পারবে। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুক্তির ভিত্তি যাই হোক না কেন, ভেষজগুলোর প্রকৃত রাসায়নিক গুণ অনেক সময় ত্বকের সংক্রমণ সারাতে কাজে আসত।

সুগন্ধি রজন গুগগুলু (Guggulu) এবং পিলী (Pīlā) উদ্ভিদের ব্যবহারও রোগ নিরাময়ে নিয়মিত দেখা যেত। গুগগুলুর ধোঁয়া দিয়ে বসতঘর জীবাণুমুক্ত করার রীতি প্রচলিত ছিল, যা আজকের দিনের ধূপধুনো ব্যবহারের পূর্বসূরি। অথর্ববেদে বলা হচ্ছে, যে স্থানে গুগগুলুর গন্ধ পৌঁছায়, সেখান থেকে রোগব্যাধি বহু দূরে পালিয়ে যায়। বৈদ্যরা ভালো করেই জানতেন যে দুর্গন্ধময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ রোগ বাড়ায়। তাই সুগন্ধি উদ্ভিদের ধোঁয়া দিয়ে পরিবেশকে সতেজ রাখার চেষ্টা করা হতো। ফলে ওষধির এই প্রয়োগ একদিকে ছিল শারীরবৃত্তীয়, অন্যদিকে পরিবেশগত। উদ্ভিদকে জীবনশক্তির ধারক মেনে প্রাচীন মানুষ প্রকৃতির উপাদান দিয়েই প্রকৃতির রুদ্র রূপকে শান্ত করতে চেয়েছিল।

শল্যচিকিৎসা, অস্থিসন্ধান ও ক্ষতের প্রতিষেধক (Surgery, Bone-setting and Wound Healing): প্রায়োগিক বৈদিক চিকিৎসা

সাধারণত বৈদিক যুগকে শুধু যাগযজ্ঞের কাল মনে করা হলেও অথর্ববেদে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত শল্য ও অস্থিচিকিৎসার প্রাথমিক রূপ সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত একটি পশুপালক ও কৃষিভিত্তিক সমাজের জন্য হাড় ভাঙা, মাংস কেটে যাওয়া বা তীরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়েই অস্ত্রোপচার বা জোড়াতালির কৌশল শিখতে হয়েছিল। গবেষক কেনেথ জি. জিস্ক (Kenneth G. Zysk) প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা বিষয়ে বিশদ গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, পরবর্তীকালের সুশ্রুত সংহিতার মতো উচ্চমার্গের শল্যবিদ্যার মূল ভিত্তিটি প্রোথিত ছিল অথর্ববেদের এই লোকজ অভিজ্ঞতার ভেতরেই (Zysk, 1991)। আঘাতপ্রাপ্ত বা ভেঙে যাওয়া অঙ্গকে স্থির রাখা এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ তরল নিষ্কাশনের আদিম কৌশলগুলো এখানে সরাসরি বর্ণিত হয়েছে।

অথর্ববেদের চতুর্থ কাণ্ডের বারোতম সূক্তটি অস্থিসন্ধানের এক অবিস্মরণীয় দলিল হিসেবে স্বীকৃত। সেখানে হাড় ভেঙে যাওয়া বা সন্ধিচ্যুত হওয়ার পর কীভাবে চিকিৎসা করতে হবে তার বিবরণ রয়েছে। বৈদ্য ভাঙা হাড়ের ওপর ওষধির প্রলেপ দিয়ে শক্ত করে কাপড় বা গাছের ছাল পেঁচিয়ে দিতেন। চিকিৎসাকালে আবৃত্তি করা হতো, “মজ্জা যেন মজ্জার সাথে জোড়া লাগে, অস্থির সাথে যেন অস্থি মিলিত হয়, মাংসের সাথে মাংস আর চামড়ার সাথে চামড়া যুক্ত হয়ে যাক”। এই মন্ত্রটি কেবল কথার কথা ছিল না, এর সাথে অঙ্গটিকে নড়াচড়া না করিয়ে সোজা রাখার একটি নিখুঁত পদ্ধতি জড়িত ছিল। আধুনিক যুগে যাকে আমরা ফ্র্যাকচার ইমোবিলাইজেশন বা প্লাস্টার বলি, তার আদিম রূপ ছিল এই গাছের ছাল ও আঠার শক্ত বাঁধন।

শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বা আটকে থাকা রক্ত বের করার ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। ফোড়া বা বিষাক্ত ক্ষত পেকে উঠলে তা চিরে পুঁজ বের করার ইঙ্গিত বিভিন্ন সূক্তে পাওয়া যায়। বিশেষ করে মূত্রনালীর অবরোধ বা প্রস্রাব আটকে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে চিকিৎসার কথা অথর্ববেদের প্রথম কাণ্ডের তৃতীয় সূক্তে বলা হয়েছে, তা রীতিমতো চমকপ্রদ। তলপেটে চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি একটি ফাঁপা নল বা শলাকা প্রবেশ করিয়ে প্রস্রাব নামিয়ে আনার পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। মন্ত্রে বলা হচ্ছে, “বাঁধ ভেঙে গেলে যেভাবে জলের স্রোত উপচে পড়ে, সেভাবে তোমার মূত্র নির্গত হোক”। এটি প্রাচীন মূত্রনিষ্কাশন নল বা ক্যাথেটার ব্যবহারের প্রাথমিক ও বাস্তব প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত।

যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষত নিরাময়ের জন্যও বিশেষ ধুলো, ভেষজের গুঁড়ো এবং জল ছিটিয়ে চিকিৎসা করা হতো। সাপের কামড় বা বিষাক্ত তীরের বিষ নিষ্কাশনের জন্য মুখের সাহায্যে বিষ টেনে বের করা কিংবা ক্ষতস্থান কেটে বিষাক্ত রক্ত ঝরিয়ে ফেলার ইঙ্গিতও অথর্ববেদের নির্দেশনায় লক্ষ্য করা যায়। এই কাজগুলো কোনো অলৌকিক দেবতায় বিশ্বাস রেখে ফেলে রাখা হতো না, তাৎক্ষণিক শারীরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতো। এই প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যে, বৈদিক মানুষ জীবন ও মৃত্যুর টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে নিষ্ক্রিয় প্রার্থনাকারী ছিল না। যেখানে ছুরি চালানো দরকার, সেখানে তারা ছুরি চালিয়েছে; যেখানে জোড়া লাগানো দরকার, সেখানে তারা লতাপাতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধেছে।

শরীর, জল ও প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতিবিধান (Hydrotherapy and Elemental Balancing): জলচিকিৎসা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য

অথর্ববেদের চিকিৎসাভাবনায় জলের স্থান ছিল অত্যন্ত উঁচুতে। জলকে শুধু পিপাসা মেটানোর বস্তু হিসেবে নয়, একে দেখা হতো সর্বশ্রেষ্ঠ ভেষজ বা ভেষজরাজ (Bheṣajarāja) হিসেবে। সংহিতার বহু সূক্ত সরাসরি জলকে উৎসর্গ করে রচিত হয়েছে, যাকে বলা হতো অপাং সূক্ত (Apāṃ Sūkta)। ইতিহাসবিদ মার্থা অ্যান সেলবি (Martha Ann Selby) বৈদিক সাহিত্যের রোগ ও রূপক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, জল ছিল প্রাচীন মানুষের কাছে শুদ্ধি ও তাপ হরণের প্রধানতম প্রাকৃতিক প্রতীক (Selby, 2005)। উচ্চ জ্বরে শরীর যখন পুড়ে যেত, তখন নদীর ঠাণ্ডা জলে অবগাহন বা মাথায় জলের ধারা দেওয়া ছিল সবচেয়ে কার্যকর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা। সেই শারীরিক প্রশান্তি থেকেই জলকে রোগহরণকারী জীবন্ত শক্তি ভাবা শুরু হয়।

অথর্ববেদের ঋষিরা বিশ্বাস করতেন জল সমস্ত রোগের মূল উৎপাটন করতে পারে। প্রবাহিত নদীর জল, বৃষ্টির জল এবং শিশিরবিন্দুর মধ্যে আলাদা আলাদা ওষধি গুণ কল্পনা করা হতো। বিশেষ করে প্রবহমান জলকে জীবাণু ও অপবিত্রতা দূর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করা হতো। মন্ত্রে উচ্চারিত হতো, “জলই সমস্ত ওষধির সার, জল রোগ নিবারণ করে, জল আমাদের শরীর থেকে সমস্ত গ্লানি ধুয়ে নিয়ে যাক”। কুষ্ঠরোগী বা ত্বকের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কিছু নদীর ঘাটে স্নান করানোর বিধান ছিল। জল দিয়ে ধুয়ে ফেলার এই সরল চিকিৎসায় রোগী মানসিক দিক থেকেও নিজেকে হালকা ও পবিত্র মনে করত, যা তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পরোক্ষ ভূমিকা রাখত।

জলের পাশাপাশি বাতাসের শুদ্ধতা এবং শরীরের ভেতরের বায়ুর ভারসাম্য রক্ষার ধারণাও এই সময়ে গড়ে উঠছিল। শরীর যে পঞ্চভূতের সমন্বয়ে গঠিত এবং প্রকৃতির মৌল উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হলে যে রোগ দেখা দেয়, সেই দর্শনের প্রাথমিক বীজ অথর্ববেদেই নিহিত। গবেষক অ্যান্থনি চেরুলি (Anthony Cerulli) প্রাচীন ভারতীয় নিরাময় সংস্কৃতির প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন কীভাবে রোগীকে কেবল ওষুধ না দিয়ে তার চারপাশের আলো, বাতাস ও তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটানো হতো (Cerulli, 2012)। অসুস্থ ব্যক্তিকে খোলা আকাশের নিচে রাখা হতো বা রোদ পোহাতে দেওয়া হতো। সূর্যরশ্মির তাপ এবং সকালের নির্মল হাওয়াকে শরীরের বিষাক্ত উপাদান বের করে দেওয়ার সহায়ক শক্তি ভাবা হতো।

প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে মাটির ব্যবহারও উপেক্ষিত ছিল না। সাপের কামড় বা পোকামাকড়ের বিষে আক্রান্ত স্থানে উইপোকার ঢিবির মাটি বা বিশেষ কাদামাটি মেখে দেওয়ার প্রচলন ছিল। উইপোকার মাটিকে মনে করা হতো গভীর মাটির নির্যাস, যা বিষের উত্তাপ টেনে নিতে পারে। শীতল মাটি ক্ষতের জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করত। অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর বাহ্যিক গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ করে সেগুলোকে মানবদেহের নির্দিষ্ট ব্যাধির উপশমে ব্যবহার করার যে পদ্ধতি, তা অথর্ববেদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে কেবল একটি জাদুটোনার জগৎ থেকে বের করে একটি বাস্তবমুখী পরিবেশগত চিকিৎসাতত্ত্বে রূপান্তর করেছিল।

জাদুমন্ত্র থেকে যুক্তিগ্রাহ্য ভেষজবিদ্যা (From Magic Charms to Rational Medicine): আদি-আয়ুর্বেদের রূপান্তরপ্রক্রিয়া

অথর্ববেদের সামগ্রিক চিকিৎসাপদ্ধতিকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে মানব ইতিহাসের এক বিরাট জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরণের পথরেখা চোখে পড়ে। এটা ছিল অতিপ্রাকৃতিক জাদুবিশ্বাস থেকে ধীরে ধীরে কার্যকারণভিত্তিক যুক্তিগ্রাহ্য বিজ্ঞানের দিকে পা বাড়ানোর যুগ। বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ব্রোনিস্লভ ম্যালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski) তার ধ্রুপদী তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, কোনো আদিম সমাজই কেবল জাদুর ওপর ভর করে বাঁচে না; যেখানে মানুষের প্রায়োগিক জ্ঞান শেষ হয়, সেখানেই জাদুর শুরু হয় (Malinowski, 1948)। অথর্ববেদেও এই দুটি ধারা সমান্তরালে চলেছে। রোগীর জ্বর হলে বৈদ্য যেমন কুষ্ঠ গাছের শিকড়ের ক্বাথ খাওয়াচ্ছেন, তেমনি সেই শিকড় যাতে কাজ করে সেজন্য বরুণ বা অগ্নির কাছে মন্ত্রও পড়ছেন। এই দ্বৈততাই ছিল তৎকালীন বিজ্ঞানচেতনার স্তর।

এই ক্রান্তিকালের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো অথর্ববেদের সংকলক এবং চিকিৎসকদের ভূমিকা। ঋগ্বেদের যুগে যে চিকিৎসক বা ভিষক (Bhiṣaj) সমাজ থেকে আলাদা কেউ ছিলেন না, অথর্ববেদের যুগে এসে তিনি একটি স্বতন্ত্র পেশাদার পরিচয় পেতে শুরু করেন। যদিও প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য সমাজের গোঁড়া অংশ চিকিৎসকদের রক্তের সংস্পর্শে আসার কারণে কিছুটা অপবিত্র ভাবত, কিন্তু সাধারণ সমাজে তাদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। গবেষক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (Debiprasad Chattopadhyaya) তার গবেষণায় জোরালো যুক্তি দিয়েছেন যে, ভারতের মূলধারার বস্তুবাদী চিকিৎসাবিজ্ঞান গড়ে উঠেছিল এই অপাংক্তেয় লোকায়ত চিকিৎসকদের হাত ধরেই, যারা বৈদিক ধর্মের যজ্ঞবেদীর চেয়ে মাঠের ভেষজ ও মানুষের যন্ত্রণাকে বেশি সত্য মনে করতেন (Chattopadhyaya, 1977)।

পরবর্তীকালে সংকলিত ক্লাসিক্যাল আয়ুর্বেদ গ্রন্থ, যেমন চরক সংহিতা বা সুশ্রুত সংহিতা, তাদের শাস্ত্রীয় প্রামাণ্যতা পাওয়ার জন্য অথর্ববেদকে নিজেদের মূল ভিত্তি বা উপবেদ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর কারণ রাজনৈতিক ও সামাজিক। লোকজ চিকিৎসা যখন একটি সংগঠিত দর্শনের রূপ নিচ্ছিল, তখন তাকে বৈদিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রমাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসাতাত্ত্বিক জেরিট জান ম্যুলেনবেল্ড (Gerrit Jan Meulenbeld) উল্লেখ করেছেন যে, চরক সংহিতায় চিকিৎসাকে স্পষ্টতই দুটি ধারায় ভাগ করা হয়েছে – একটি দৈবব্যপাশ্রয় বা দৈবনির্ভর, অন্যটি যুক্তিব্যপাশ্রয় বা যুক্তি ও ভেষজনির্ভর (Meulenbeld, 1999)। অথর্ববেদ ছিল মূলত এই দৈবব্যপাশ্রয় থেকে যুক্তিব্যপাশ্রয়ে পদার্পণের সেতু।

পরিশেষে বলা যায়, অথর্ববেদের রোগ ও নিরাময়ের জগৎ কোনো অলৌকিক কাহিনীর ভাণ্ডার নয়, বরং প্রাচীন মানুষের বাঁচার তীব্র আকুতির প্রামাণ্য ইতিহাস। রোগব্যাধি যখন সমাজকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করাত, তখন মানুষ অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেনি। সে নিজের বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে রোগকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছে। মন্ত্রোচ্চারণের রহস্যময় সুরের নিচে কাজ করত ভেষজের আসল রাসায়নিক ক্ষমতা। মানুষের এই আদিম অথচ সাহসী লড়াইয়ের ফলেই পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হতে পেরেছিল। অন্ধবিশ্বাসের ঘন কুয়াশার ভেতরেও যে মানবীয় যুক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনের প্রথম প্রদীপটি জ্বলে উঠেছিল, অথর্ববেদের নিরাময়তত্ত্ব তারই এক কালজয়ী ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।

অথর্ববেদের গৃহজীবন ও সামাজিক জগৎ (Domestic and Social Life in the Atharvaveda): প্রেম, বিবাহ, পরিবার ও দৈনন্দিন আকাঙ্ক্ষা

প্রণয়, কাম ও আকর্ষণমূলক আচার (Love, Desire and Erotic Spells): বশীকরণ, কামচেতনা ও রোমান্টিক আকুলতা

মানুষের মনের ভেতরের গভীরতম অনুভূতির একটি হলো প্রেম এবং অন্যকে নিজের করে পাওয়ার তীব্র বাসনা। ঋগ্বেদের উদাত্ত স্তোত্রে যখন দেবতাদের কাছে যুদ্ধজয়ের প্রার্থনা করা হচ্ছে, অথর্ববেদ তখন কথা বলে একান্তে জেগে থাকা এক তরুণের গোপন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। প্রাচীন বৈদিক সমাজে ভালোবাসার প্রকাশ সবসময় শান্ত বা সংযত ছিল না, সেখানে কাম এবং পাওয়ার আকুলতা ছিল ভীষণ খোলামেলা। গবেষক ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger) প্রাচীন ভারতীয় যৌনতা ও কামনার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, অথর্ববেদের প্রেমমূলক সূক্তগুলোতে মানসিক আকর্ষণ এবং শারীরিক অধিকারের সীমারেখা প্রায়ই মিশে গেছে (Doniger, 1999)। কাউকে ভালো লাগলে তাকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য নানা ধরনের তুকতাক এবং ভেষজ প্রয়োগ করা হতো, যার নাম ছিল সম্মনন (Saṃmanana) বা বশীকরণ।

অথর্ববেদের তৃতীয় ও ষষ্ঠ কাণ্ডে এমন অনেক মন্ত্র রয়েছে, যা একজন প্রেমিক বা প্রেমিকা অন্যজনের মন পাওয়ার জন্য গোপনে উচ্চারণ করত। একটি সূক্তে প্রেমিক বলছে, “কামদেবের বাণ যেন তোমার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে, তোমার বুক যেন শুকিয়ে যায়, আমার কথা না ভেবে তুমি যেন এক মুহূর্তও স্থির থাকতে না পারো”। এখানে কেবল রোমান্টিক ভালোলাগা প্রকাশ পাচ্ছে না, কাজ করছে এক ধরণের মানসিক জবরদস্তি। কোনো বিশেষ লতাপাতার শিকড় বেটে প্রেমিকার বাড়ির উঠোনে পুঁতে রাখা হতো, যাতে সেই পথে হাঁটার সময় তার মনে কামনার আগুন জ্বলে ওঠে। গবেষক সুকুমারী ভট্টাচার্য (Sukumari Bhattacharji) বৈদিক সাহিত্যের সামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে মন্তব্য করেছেন যে, সাধারণ গৃহস্থ মানুষের বাস্তব কামচেতনা এবং সম্পর্কের দ্বন্দ্বগুলো অথর্ববেদ ছাড়া অন্য কোনো বৈদিক সংহিতায় এত জীবন্তভাবে ধরা পড়েনি (Bhattacharji, 1987)।

প্রেমের এই প্রকাশে নারী এবং পুরুষ – উভয় পক্ষের দিক থেকেই সক্রিয়তা চোখে পড়ে। কোনো তরুণী যখন দেখত তার পছন্দের পুরুষ অন্য কারো প্রতি ঝুঁকে পড়ছে, তখন সেও নিশ্চুপ বসে থাকত না। সে বিশেষ এক ওষধির সাহায্য নিয়ে মন্ত্র পড়ত, যাতে সেই পুরুষ অন্য সব নারীকে ভুলে কেবল তার প্রতিই অন্ধ হয়ে থাকে। সূক্তে বলা হতো, “আমি যেমন এই ওষধি দিয়ে তোমার মন বেঁধে ফেলছি, তুমি তেমন আমার বাহুবন্ধনে বাঁধা থাকো, আমার দিকেই তোমার চোখ স্থির হোক”। এই ব্যাকুলতার ভেতরে প্রাচীন গ্রামীণ জীবনের এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ফুটে ওঠে। কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয় মানুষকে মন্ত্র ও ভেষজের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলেছিল। আধুনিক চোখে একে কুসংস্কার মনে হলেও সেই সময়ের সমাজমানসে এটি ছিল আবেগের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ।

ভালোবাসার এই আচারের সাথে ঘুমের ওষুধ বা মোহাচ্ছন্ন করার কৌশলের সংযোগও ছিল। প্রেমিক রাতে গোপনে প্রেমিকার ঘরে ঢোকার জন্য বাড়ির সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার মন্ত্র পাঠ করত। সেখানে বলা হতো, কুকুর যেন না ডাকে, বাড়ির দাস-দাসী এবং অভিভাবকরা যেন গভীর ঘুমে অচেতন থাকে, কেবল প্রেমিকা যেন জেগে থাকে তার জন্য। ইতিহাসবিদ আর্থার লিউয়েলেন বাশাম (Arthur Llewellyn Basham) তার ধ্রুপদী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বৈদিক সমাজের প্রাথমিক স্তরে প্রেমের স্বাধীনতা এবং যৌনতার ক্ষেত্রে এক ধরনের আদিম অকপটতা ছিল, যা পরবর্তীকালের কঠোর ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল (Basham, 1954)। অথর্ববেদের এই প্রণয়সূক্তগুলো সেই সহজ অথচ তীব্র মানবীয় আকর্ষণের জীবন্ত দলিল।

বৈদিক বিবাহব্যবস্থা ও দাম্পত্য সম্পর্ক (Vedic Marriage and Conjugal Life): চতুর্দশ কাণ্ড, যৌথগৃহ ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতা

অথর্ববেদের চতুর্দশ কাণ্ডটি বৈদিক বিবাহব্যবস্থার এক প্রামাণ্য সমাজতাত্ত্বিক আলেখ্য। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের সূর্য ও সোমের প্রতীকী বিবাহের যে রূপ আমরা দেখি, অথর্ববেদে তা সাধারণ রক্তমাংসের মানুষের ঘরে নেমে এসেছে। বিবাহ এখানে কেবল দুটি দেহের মিলন ছিল না, এটা ছিল দুটি গোত্রের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চুক্তির মতো। গবেষক স্টেফানি জ্যামিসন (Stephanie Jamison) বৈদিক সমাজে নারীর অবস্থান ও আচার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বিবাহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কনে তার পিতার গোত্র ত্যাগ করে বরের গোত্রের সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্ত হতো (Jamison, 1996)। এই রূপান্তরটি ছিল অত্যন্ত মানসিক চাপের, কারণ তরুণীটিকে এক অপরিচিত পরিবেশে গিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে হতো।

বিবাহের সূক্তগুলোতে নববধূর প্রতি শ্বশুরালয়ে আধিপত্য বিস্তারের আশীবার্দ দেওয়া হতো। বলা হতো, “তুমি শ্বশুর-শাশুড়ির ওপর সম্রাজ্ঞীর মতো হও, ননদ ও দেবরদের ওপর তোমার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক”। এই আশীর্বাদের ভাষা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, প্রাচীন যৌথ পরিবারে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি নতুন পরিবারে গিয়ে নববধূ যদি নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে না পারত, তবে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকত। তাই তাকে কেবল নম্র বধূ নয়, গৃহের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতো। পরিবারের গবাদি পশু, ভৃত্য এবং সামগ্রিক সম্পদের সুরক্ষার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত হতো।

দাম্পত্য জীবনের আরেকটি বড় অনুষঙ্গ ছিল একনিষ্ঠতা এবং আনুগত্য রক্ষার ব্যাকুলতা। বহুবিবাহের চল থাকায় দাম্পত্য সম্পর্কে সবসময় এক ধরণের ঈর্ষা ও সংশয় কাজ করত। অথর্ববেদে এমন অনেক আচার রয়েছে যেখানে স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়া ঠেকানোর জন্য নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতো। স্বামী যাতে অন্য কোনো নারীর রূপ দেখে প্রলুব্ধ না হয়, সেজন্য স্ত্রী গোপনে বিশেষ ওষধির প্রলেপ স্বামীর পোশাকে লাগিয়ে দিত। আবার স্বামী দূর দেশে বাণিজ্যে বা যুদ্ধে যাওয়ার সময় স্ত্রীর বিশ্বস্ততা নিশ্চিত করতে বিশেষ শপথবাক্য পাঠ করানো হতো। সমাজতাত্ত্বিক প্যাট্রিক অলিভেল (Patrick Olivelle) আশ্রমব্যবস্থা ও গৃহস্থজীবনের বিকাশ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, বৈদিক গার্হস্থ্য ধর্ম টিকে ছিল যৌন বিশ্বস্ততা এবং উৎপাদনের শৃঙ্খলার ওপর (Olivelle, 1993)। দাম্পত্যের এই টানাপোড়েন দেখায় যে প্রাচীন মানুষের পারিবারিক সুখ কোনো স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার ছিল না, তা প্রতিনিয়ত রক্ষা করার চেষ্টা করতে হতো।

বিবাহের আচারের সমাপ্তি ঘটত নবদম্পতির দীর্ঘায়ু এবং যৌথ প্রগতির কামনার মধ্য দিয়ে। অগ্নিকে সাক্ষী রেখে বর-কনে একসঙ্গে পাথরের ওপর পা রাখত, যা ছিল তাদের দাম্পত্যের দৃঢ়তার প্রতীক। বলা হতো, “পাথরের মতো অটল হও, বিপদে ভেঙে পড়ো না”। এরপর তারা একই পাত্র থেকে খাবার গ্রহণ করত, যা ছিল সামাজিক ও শারীরিক ঐক্যের নিদর্শন। অথর্ববেদের এই দাম্পত্যচিন্তায় রোমান্টিক কল্পনার চেয়ে বাস্তব জীবনের লড়াইয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার অঙ্গীকার অনেক বেশি গুরুত্ব পেত।

পিতৃতান্ত্রিক পরিবারকাঠামো ও নারীর সামাজিক অবস্থান (Patriarchal Family Structure and Women’s Social Status): সন্তানকামনা, অধিকার ও পারিবারিক টানাপোড়েন

অথর্ববেদের পাতা ওল্টালে যে সমাজটি ভেসে ওঠে, তা ছিল এক দৃঢ় পিতৃতন্ত্র (Patriarchy)-র ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবস্থা। এই পরিবারে পিতার বা গৃহপতির কর্তৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। পরিবারের সমস্ত জমি, গবাদি পশু এবং দাস-দাসীর মালিকানা থাকত পুরুষের হাতে। ঐতিহাসিক উমা চক্রবর্তী (Uma Chakravarti) প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ্য পিতৃতন্ত্রের উদ্ভব পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বংশপরম্পরা রক্ষা এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার জন্য পুত্রসন্তানের জন্ম দেওয়াকে সমাজের সবচেয়ে জরুরি কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো (Chakravarti, 1993)। অথর্ববেদে তাই কন্যাসন্তান কামনার কোনো সুস্পষ্ট মন্ত্র প্রায় চোখেই পড়ে না, বরং বারবার পুত্রসন্তান লাভের জন্য ব্যাকুল প্রার্থনা করা হয়েছে।

পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য রচিত সূক্তগুলোকে বলা হতো পুংসবন (Puṃsavana)। গর্ভবতী নারীর পেটে যাতে ছেলেসন্তান রূপ নেয়, সেজন্য নানা ভেষজ রস খাওয়ানো হতো এবং অশুভ আত্মাদের তাড়ানোর মন্ত্র পড়া হতো। একটি সূক্তে সরাসরি বলা হয়েছে, “অন্য নারীর গর্ভে কন্যা জন্ম নিক, কিন্তু আমার এই স্ত্রীর গর্ভে যেন বলবান বীর পুত্র আসে”। এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা স্পষ্ট করে দেয় যে, কৃষি ও পশুপালনের যুগে শারীরিক শ্রম এবং যুদ্ধের প্রয়োজনে পুরুষ সদস্যের মূল্য অনেক বেশি ছিল। যে নারী একের পর এক কন্যাসন্তান জন্ম দিত, পরিবারে তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যেত। ফলে পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল না, নারীর নিজের সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও ছিল।

তবে এর মানে এই নয় যে সমাজে নারীদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। পরিবারে গৃহিণী বা পত্নী হিসেবে নারীর দায়িত্ব ছিল বিপুল। গৃহস্থের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেমন শস্য পেষা, দুধ দোয়ানো, কাপড় বোনা এবং পশুর যত্ন নেওয়ার কাজে নারীরা প্রধান ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু এই শ্রমের স্বীকৃতি থাকলেও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতায় তাদের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত। ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা (R. S. Sharma) বৈদিক বস্তুগত সংস্কৃতির রূপান্তরের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, উত্তর-বৈদিক পর্বে যখন সমাজ যাযাবর অবস্থা থেকে স্থায়ী কৃষিজীবী হয়ে উঠল, তখন নারীর উৎপাদনশীল ভূমিকার চেয়ে তার প্রজনন ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা জোরালো হয়েছিল (Sharma, 1983)। অথর্ববেদ সেই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণকে নিখুঁতভাবে ধারণ করে রেখেছে।

পারিবারিক কলহ এবং সতীনদের পারস্পরিক বিদ্বেষ দূর করার জন্য অথর্ববেদে যে বিপুল সংখ্যক শ্লোক রয়েছে, তা এই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরের ক্ষতগুলোকে উন্মোচিত করে। এক স্বামী একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে সংসারে যে অশান্তি অনিবার্য হয়ে উঠত, তা সামাল দিতে নারীরা বিভিন্ন গোপন আচারের আশ্রয় নিত। একটি মন্ত্রে সতীনকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে, “আমি বন থেকে এই শক্তিশালী ওষধি তুলে এনেছি, যা দিয়ে আমি সতীনকে বশীভূত করব এবং স্বামীকে আমার একার করে নেব”। এই ধরনের আত্মরক্ষা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকাশ প্রমাণ করে যে প্রাচীন নারীরা কেবল নীরব শিকার ছিলেন না, নিজেদের সীমিত ক্ষমতার ভেতরে থেকেও তারা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন।

গৃহনির্মাণ, বাস্তু ও গার্হস্থ্য নিরাপত্তা (House Building, Homestead and Domestic Safety): শালা-নির্মাণ ও প্রাত্যহিক বাস্তুচিন্তা

যাযাবর জীবন পেছনে ফেলে মানুষ যখন মাটিতে খুঁটি পুঁতে স্থায়ী ঘর বাঁধতে শিখল, তখন তার আশ্রয়ের ধারণায় এক বিশাল পরিবর্তন এলো। অথর্ববেদের নবম কাণ্ডের তৃতীয় সূক্তে নতুন ঘর বা শালা (Śālā) নির্মাণের যে বিবরণ রয়েছে, তা প্রাচীন গৃহনির্মাণরীতির এক অপূর্ব নিদর্শন। একটি নতুন ঘর কেবল কাঠ, বাঁশ আর খড়ের কাঠামো ছিল না, একে দেখা হতো এক জীবন্ত আশ্রয় হিসেবে। প্রাচ্যবিদ ব্রায়ান কে. স্মিথ (Brian K. Smith) বৈদিক শ্রেণিবিন্যাস ও বিশ্বতত্ত্বের আলোকে দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন আর্যরা নিজেদের বাসগৃহকে ক্ষুদ্র এক মহাবিশ্বের প্রতিরূপ মনে করত (Smith, 1994)। তাই ঘরের মূল খুঁটি পোঁতার আগে মাটিকে শান্ত করা এবং অমঙ্গল দূর করার আচার ছিল বাধ্যতামূলক।

গৃহনির্মাণের সময় ঘরের মধ্যবর্তী খুঁটিকে বলা হতো মিতি (Miti) বা স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি স্থাপন করার সময় প্রার্থনা করা হতো, “হে শালা, তুমি এই ভূমিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকো, বাতাসে যেন তোমার বন্ধন না দোলে, আগুনের শিখা যেন তোমাকে গ্রাস না করে”। ঘরের ছাদকে তুলনা করা হতো পাখির ডানার সাথে, যা তার ছানাদের রোদ-বৃষ্টি থেকে আগলে রাখে। অথর্ববেদের কবিরা ঘরকে কোনো প্রাণহীন বস্তু না ভেবে সম্বোধন করতেন এমন এক মাতা হিসেবে, যে তার সন্তানদের দুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। ঘরে নতুন গৃহপ্রবেশের দিনে ঘি ও দুধ দিয়ে হোম করা হতো, যাতে ঘরে অন্নের অভাব না ঘটে এবং পশুপাল সমৃদ্ধ হয়।

ঘরের বাস্তু সুরক্ষার জন্য ভয়ংকর সব অশুভ শক্তিকে ঠেকানোর বিধান ছিল। সেই যুগে অন্ধকার রাতে হিংস্র জন্তু, বিষাক্ত সাপ এবং চোরের আক্রমণ ছিল নিত্যদিনের শঙ্কা। তাই ঘরের চৌকাঠ ও প্রবেশদ্বারে বিশেষ ওষধির রস ছিটিয়ে দেওয়া হতো। বিশ্বাস ছিল, চৌকাঠে মন্ত্রপূত জল বা তেল দেওয়া থাকলে কোনো প্রেত বা তস্কর ঘরে পা রাখতে পারবে না। ইতিহাসবিদ কুমকুম রায় (Kumkum Roy) প্রাচীন ভারতের ক্ষমতা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, গৃহস্থের এই বাস্তুচিন্তা আসলে বাইরের অরাজক প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিজের সুরক্ষিত পরিধি গড়ে তোলার এক মৌলিক প্রচেষ্টা ছিল (Roy, 1994)। ঘর ছিল বনের অনিশ্চয়তার বিপরীতে মানুষের সভ্যতার ক্ষুদ্র দুর্গ।

গৃহের ভেতরে গবাদি পশুর স্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোয়ালঘরকে মানুষ তাদের শোবার ঘরের মতোই যত্ন করত। গরুর যাতে কোনো মড়ক না লাগে, গরুর বাঁট থেকে যেন পর্যাপ্ত দুধ পাওয়া যায়, সেজন্য প্রতিদিন সন্ধ্যায় ধূপ জ্বালানো হতো। গরুকে মনে করা হতো সাক্ষাৎ লক্ষ্মী বা পরিবারের প্রাণ। অথর্ববেদের বহু সূক্তে বলা হয়েছে, “গরু যেন আমার ঘরে ফিরে আসে, তারা যেন আনন্দে হাম্বা রব তোলে, তাদের ক্ষুরের শব্দে ঘর মুখরিত হোক”। গৃহের এই নিরাপত্তাকেন্দ্রীক ভাবনাগুলো প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষের কাছে জীবন ছিল বড় বেশি মাটির কাছাকাছি, যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই ছিল এক বিরাট যুদ্ধ।

অর্থনৈতিক লেনদেন, বাণিজ্য ও সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা (Economic Transactions, Trade and Prosperity): পণ্যবিনিময়, ঋণ ও সৌভাগ্যকামনা

অথর্ববেদের গৃহস্থরা কেবল ঘরের চার দেয়ালে বন্দি ছিলেন না, তারা যুক্ত ছিলেন জটিল অর্থনৈতিক লেনদেনের সাথে। কৃষি এবং পশুপালনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি বিকাশমান ধারা এই সংহিতায় স্পষ্ট। যারা দূরদেশে বাণিজ্যে যেতেন, তাদেরকে বলা হতো বণিক (Vaṇik)। তাদের পথচলা সহজ ছিল না, কারণ দুর্গম পথ, নদী পারাপার এবং দস্যুদের আক্রমণ ছিল সাধারণ ঘটনা। গবেষক ইয়ান গোন্ডা (Jan Gonda) বৈদিক অর্থনৈতিক জীবনের আচার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বণিকরা যাত্রা শুরু করার আগে ইন্দ্র এবং ব্যবসায়ের দেবতা হিসেবে পরিচিত পুষার কাছে মুনাফা ও নিরাপত্তার প্রার্থনা করতেন (Gonda, 1980)। অথর্ববেদের তৃতীয় কাণ্ডের পনেরোতম সূক্তটি মূলত সফল বাণিজ্যের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা।

সেই সূক্তে বণিক প্রার্থনা করছে, “হে ইন্দ্র, তুমি আমাদের এই পণ্যের বিনিময়ে প্রচুর ধন দাও, আমাদের এই যাত্রা যেন লাভজনক হয়, শত পথ দিয়ে ধন যেন আমার ঘরে প্রবেশ করে”। মুদ্রা ব্যবস্থার তখনো ব্যাপক বিস্তার ঘটেনি, ফলে পণ্যবিনিময় বা বার্টার প্রথাই ছিল প্রধান। গরুকে বিনিময়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হতো। তবে সোনা বা তামার নির্দিষ্ট ওজনের তাল, যাকে নিষ্ক (Niṣka) বলা হতো, তাও বড় লেনদেনে ব্যবহৃত হতো। বণিকরা ঘরে ফিরে আসার পর লাভের একটি অংশ দিয়ে যজ্ঞ করতেন বা পুরোহিতকে দান করতেন, যাতে পরবর্তী বাণিজ্যেও দেবতারা সহায় থাকেন।

অর্থনৈতিক জীবনের আরেকটি কালো দিক ছিল ঋণগ্রস্ততা। ফসলের ক্ষতি হলে বা গবাদি পশু মারা গেলে মানুষ বাধ্য হয়ে ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঋণ নিত। ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া ছিল চরম সামাজিক অপমানের কারণ। অথর্ববেদের বহু মন্ত্রে ঋণ থেকে মুক্তির আকুল আর্তি পাওয়া যায়। ঋণী ব্যক্তি প্রার্থনা করত, “আমি বা আমার পিতা যে ঋণ গ্রহণ করেছিলাম, ইহলোকে বা পরলোকে সেই ঋণের বোঝা যেন আমার শরীর থেকে খসে পড়ে”। ঋণকে কোনো সাধারণ আর্থিক দেনা হিসেবে দেখা হতো না, একে দেখা হতো এক ধরণের পাপ বা শৃঙ্খল হিসেবে, যা মৃত্যুর পরও আত্মাকে বন্দি করে রাখতে পারে। তাই ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে মানুষ অলৌকিক শক্তির শরণাপন্ন হয়ে সেই বন্ধন কাটানোর চেষ্টা করত।

কৃষিকাজের সমৃদ্ধি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ। জমিতে লাঙল চালানোর সময়, বীজ বোনার দিনে এবং ফসল কাটার মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ করা হতো। খরা ও অতিরিক্ত বৃষ্টি ছিল ফসলের প্রধান শত্রু। পঙ্গপাল বা ইঁদুরের উপদ্রব থেকে ধান ও যব রক্ষার জন্য কৃষকরা নির্দিষ্ট তুকতাক করত। মাঠের এক কোণে কাঁচা দুধ ঢেলে ইঁদুরের উদ্দেশ্যে বলা হতো, “তোমরা যেন আমার এই শস্যে মুখ না দাও, বনে গিয়ে ঘাস খাও”। এই অর্থনৈতিক আর্তিগুলো কোনো উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক সাধনা নয়, বরং পেটের ক্ষুধা নিবারণ এবং পরিবারের দারিদ্র্য দূর করার অতি বাস্তব সামাজিক সংগ্রাম।

সামাজিক সংহতি, সভা-সমিতি ও যৌথ জীবন (Social Cohesion, Assemblies and Communal Life): জনপদ, বিতর্ক ও গ্রামীণ ঐক্য

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বাইরে অথর্ববেদের মানুষ একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল। প্রাচীন আর্য সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্র ছিল দুটি প্রতিষ্ঠান – সভা (Sabhā) এবং সমিতি (Samiti)। সভা ছিল বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মিলনস্থল, আর সমিতি ছিল সমগ্র জনগোষ্ঠীর সাধারণ পরিষদ। অথর্ববেদে এই দুই প্রতিষ্ঠানকে প্রজাপতি দেবতার দুই কন্যা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। প্রাচ্যবিদ মরিস ব্লুমফিল্ড (Maurice Bloomfield) এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, সভায় নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা এবং বিতর্কে জয়ী হওয়া ছিল সামাজিক সম্মানের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি (Bloomfield, 1899)। একজন সাধারণ মানুষ যখন সভায় কথা বলতে উঠত, তখন তার বুক ধড়ফড় করত।

বিতর্কে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার জন্য অথর্ববেদে বিশেষ কিছু মন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। বক্তা সভায় যাওয়ার আগে বিশেষ এক ভেষজের মূল মুখে রাখত এবং মন্ত্র পড়ত, “আমি যেন এই সভায় সবার চেয়ে মিষ্টিভাষী হই, অন্য সবাই যেন আমার কথায় সায় দেয়, আমার প্রতিপক্ষের মুখের কথা যেন স্তব্ধ হয়ে যায়”। এই মানসিক প্রস্তুতি প্রমাণ করে যে সেই সমাজে বাকপটুতা এবং যুক্তির শক্তি কতটা সমীহ আদায় করত। শারীরিক শক্তির চেয়ে জনসমক্ষে সঠিক কথা দিয়ে মানুষকে বশ করার ক্ষমতাকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মনে করা হতো। মানুষ সমাজে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাইত, আর সেই সম্মানের মঞ্চ ছিল এই সভাগুলো।

সামাজিক সংহতি রক্ষার তাগিদও অথর্ববেদে গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে। যখনই কোনো গোষ্ঠীর ভেতরে বিভেদ দেখা দিত, গোত্রের সদস্যরা একত্রিত হয়ে সংমনস্য বা একাত্মতার মন্ত্র পাঠ করত। তৃতীয় কাণ্ডের ত্রিশতম সূক্তে গ্রামীণ ঐক্যের যে অপূর্ব আহ্বান জানানো হয়েছে, তা যেকোনো মানবতাবাদী সাহিত্যের সমতুল্য। সেখানে বলা হচ্ছে, “তোমাদের মন এক হোক, তোমাদের সংকল্প এক হোক, মা যেমন বাছুরকে ভালোবাসে, তোমরাও একে অপরকে সেভাবে ভালোবাসো”। যৌথ কৃষিকাজ এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তাই হিংসা ও রেষারেষি দূর করার জন্য এই সামাজিক গানগুলো যৌথভাবে গাওয়া হতো।

গ্রামের যৌথ জীবনে বিনোদনের অংশ হিসেবে পাশাখেলা বা দ্যূতক্রীড়ার প্রচলন ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। কিন্তু এই খেলা বহু মানুষের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনত। মানুষ জমি, গরু এমনকি নিজেকে বাজি রেখেও নিঃস্ব হয়ে যেত। অথর্ববেদে পাশাখেলার নেশা ছাড়ানোর জন্য যেমন মন্ত্র আছে, তেমনই জুয়াড়ির জেতার জন্য চতুর তুকতাকের বিবরণও রয়েছে। এক জুয়াড়ি মন্ত্র পড়ছে যাতে তার হাতের পাশাটি সঠিক চালে পড়ে এবং সে প্রতিপক্ষের সব ধন জিতে নিতে পারে। এটি প্রাচীন মানুষের নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং প্রলোভনের দ্বৈত রূপটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

সব মিলিয়ে অথর্ববেদের গৃহজীবন ও সামাজিক জগৎ কোনো স্বর্গীয় বিমূর্ততার গল্প নয়, বরং মাটির পৃথিবীর রক্তমাংসের মানুষের জটিল ও বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেখানে প্রেম আছে, কাম আছে, ঈর্ষা আর সতীনবিদ্বেষ আছে; একই সাথে আছে সন্তানকে বড় করে তোলার মমতা এবং জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রম। মানুষের প্রতিদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা এবং অস্তিত্ব রক্ষার যে অবিরত লড়াই, অথর্ববেদ তাকে কোনো আড়াল ছাড়াই অকপটে লিপিবদ্ধ করেছে। প্রাচীন ভারতের সামাজিক ইতিহাসকে নিচুতলা থেকে বুঝতে হলে অথর্ববেদের এই প্রাত্যহিক ও পারিবারিক জগতের চেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল আর দ্বিতীয়টি নেই।

অথর্ববেদে রাজত্ব ও রাজনৈতিক আচার (Kingship and Political Ritual in the Atharvaveda): রাজা, ক্ষমতা, অভিষেক ও সুরক্ষা

রাজকীয় ক্ষমতার আদি উৎস ও ঐশ্বরিক বৈধতাকরণ (Origins of Royal Power and Divine Legitimation): ইন্দ্রের প্রতিরূপ ও সার্বভৌমত্ব

ক্ষমতার প্রকৃতি সবসময়ই জটিল। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে অন্য বহু মানুষের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠে, সেই প্রশ্ন মানব ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই ছিল। প্রাচীন বৈদিক সমাজে যখন গোত্রভিত্তিক কাঠামো ভেঙে স্থায়ী ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক আধিপত্যের সূচনা হচ্ছিল, তখন রাজার পদটি কেবল শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারত না। তার জন্য প্রয়োজন হতো এক ধরনের মানসিক বৈধতা, যা প্রজাদের মনে প্রশ্নাতীত আনুগত্য তৈরি করতে পারে। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার (Romila Thapar) উত্তর ভারতের আদি রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, উত্তর-বৈদিক যুগে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ভিত্তিক সমাজ থেকে ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্রে উত্তরণের সময় শাসকের জন্য ধর্মীয় ও আচারিক বৈধতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল (Thapar, 1984)। অথর্ববেদ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণের রাজনৈতিক সাহিত্য, যেখানে রাজাকে আর দশজন মানুষের চেয়ে আলাদা করে এক বিশেষ শক্তির আধার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই বৈধতাকরণের সবচেয়ে প্রচলিত উপায় ছিল রাজাকে দেবতাদের সাথে সম্পর্কিত করা, বিশেষ করে দেবরাজ ইন্দ্র (Indra)-র সাথে। অথর্ববেদের বহু সূক্তে রাজাকে ইন্দ্রের পার্থিব রূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। সংহিতার চতুর্থ কাণ্ডের অষ্টম সূক্তে বলা হচ্ছে, ইন্দ্র যেভাবে স্বর্গের অসুরদের পরাজিত করে দেবতাদের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এই মানব রাজাও তেমনি তার রাজ্যের সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে পদানত করবেন। গবেষক চার্লস ড্রেকমেয়ার (Charles Drekmeier) প্রাচীন ভারতের রাজত্ব ও সমাজের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, রাজাকে কোনো সাধারণ প্রশাসক হিসেবে নয়, মহাজাগতিক শৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমেই রাজার ক্ষমতার প্রতি সামাজিক সম্মতি আদায় করা হতো (Drekmeier, 1962)। প্রজারা যেন মনে করে রাজার আদেশ অমান্য করা মানে আসলে প্রাকৃতিক নিয়ম বা দেবতাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করা।

তবে এই ঐশ্বরিক ভাবমূর্তি নিছক কল্পনায় আটকে ছিল না, একে রূপ দেওয়া হতো জটিল ভাষা ও প্রতীকের মাধ্যমে। রাজাকে বলা হতো রাজা (Rājan), কিন্তু তার ক্ষমতার পরিধি বোঝাতে ব্যবহৃত হতো বিরাজ (Virāj) বা সম্রাট (Samrāṭ)-এর মতো ভারী শব্দ। অথর্ববেদের মন্ত্রে রাজাকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানের এক অটল স্তম্ভের সাথে তুলনা করা হতো। বলা হতো, পর্বত যেমন ঝড়েও নড়ে না, রাজা যেন তেমনি নিজের সিংহাসনে অবিচল থাকেন। এই তুলনাগুলো কোনো কবিত্ব ছিল না, এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়। সেই যুগে রাজাদের পদচ্যুতি বা অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এত বেশি ঘটত যে, প্রজাদের সামনে রাজার স্থায়িত্বের একটি বিশ্বাসযোগ্য ছবি তুলে ধরা পুরোহিতদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।

একই সাথে রাজাকে অগ্নির দীপ্তি এবং সূর্যের তেজের সাথে তুলনা করা হতো। দিনের আলো যেমন অন্ধকার তাড়িয়ে দেয়, রাজার উপস্থিতি তেমনি রাজ্যের ভেতরের চোর, ডাকাত ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ভয় পাইয়ে দেবে – এমন ধারণাই প্রচার করা হতো। ইতিহাসবিদ আর্থার বেরিডেল কিথ (Arthur Berriedale Keith) বৈদিক ধর্ম ও দর্শনের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদের রাজনৈতিক সূক্তগুলোতে দেবতার মাহাত্ম্য বর্ণনার চেয়ে সেই মাহাত্ম্যকে রাজার শরীরে সঞ্চারিত করার রাজনৈতিক কৌশল অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ছিল (Keith, 1925)। শাসক এবং দেবতার এই সমীকরণ আসলে ক্ষমতার এক অত্যন্ত কার্যকর মতাদর্শিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত, যা প্রজাদের মনে ভয় ও শ্রদ্ধার এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি করত।

রাজ্যাভিষেক ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তর (Royal Consecration and Power Investiture): সংসব ও রাষ্ট্রভার গ্রহণের আচার

রাজা হওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, এর পেছনে থাকত দীর্ঘ এবং সুপরিকল্পিত আনুষ্ঠানিকতা। ক্ষমতা গ্রহণের এই মহড়া প্রজাদের চোখে রাজাকে সাধারণ মানুষ থেকে রূপান্তর করত এক অনন্য শাসকে। যজুর্বেদে যেখানে রাজসূয় (Rājasūya) যজ্ঞের মাধ্যমে এক বিশাল ও ব্যয়বহুল রাজকীয় উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়, অথর্ববেদে তার চেয়ে কিছুটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর কিছু অভিষেকমূলক আচারের কথা বলা হয়েছে। যাকে বলা হতো সংসব (Saṃsava) বা অভিষেক পর্ব, সেখানে জলের ব্যবহার ছিল প্রধান। ভারততত্ত্ববিদ ইয়োহানেস সি. হেস্টারম্যান (Jan C. Heesterman) রাজকীয় অভিষেকের আচারকাঠামো নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, অভিষেক আসলে শাসকের প্রতীকী পুনর্জন্মের এক ধর্মীয় রূপক (Heesterman, 1957)। পুরনো অস্তিত্ব মুছে ফেলে শাসক এক নতুন পবিত্র শরীরে প্রবেশ করছেন – এই বার্তাই দেওয়া হতো সবাইকে।

অথর্ববেদের চতুর্থ কাণ্ডের অষ্টম সূক্তে এই অভিষেকের একটি বিস্তারিত রূপরেখা পাওয়া যায়। সেখানে বিভিন্ন পবিত্র নদী ও জলাশয় থেকে আনা জল দিয়ে রাজাকে স্নান করানো হতো। প্রতিটি পাত্রের জলের সাথে যুক্ত থাকত নির্দিষ্ট শক্তি। মন্ত্রে বলা হতো, “এই জল তোমাকে সিংহের তেজ দিক, বাঘের পরাক্রম দিক, এবং বাতাসের গতি এনে দিক”। পুরোহিত যখন রাজার মাথায় এই পবিত্র জল ঢালতেন, তখন সেখানে উপস্থিত সেনাপতি, গ্রামপ্রধান এবং পরিবারের সদস্যরা তা প্রত্যক্ষ করতেন। ক্ষমতার এই প্রকাশ্য প্রদর্শনীর একটি গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। দৃশ্যমান আচারের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাকে সমাজের চোখে বাস্তব ও বৈধ করে তোলা হতো, যাতে কারও মনে শাসকের অধিকার নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।

অভিষেকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাঘের চামড়ার ওপর রাজার আরোহণ। বাঘ ছিল বনের হিংস্রতম ও অপরাজেয় শক্তির প্রতীক। বাঘের চামড়ায় পা দিয়ে রাজা ঘোষণা করতেন যে তিনি রাজ্যের সমস্ত হিংস্র শক্তিকে বশ করেছেন। ইতিহাসবিদ উইলহেম রাউ (Wilhelm Rau) প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্র ও সমাজ সংক্রান্ত পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, সিংহাসন বা পশুচর্মের ওপর আরোহণের এই রীতি আসলে পশুর প্রাকৃতিক হিংস্রতাকে শাসকের নিজস্ব শক্তিতে রূপান্তরিত করার আদিম প্রতীক ছিল (Rau, 1957)। রাজাকে শুধু ধার্মিক হলে চলত না, তার ভেতরে এমন এক ভয়ংকর শক্তি থাকতে হতো যা বাইরের শত্রুকে দূরে রাখতে পারে।

অভিষেক শেষ হতো রাজাকে রাজদণ্ড ও ধনুর্বাণ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। রাজা এই অস্ত্র হাতে নিয়ে চারদিকে দৃষ্টিপাত করতেন, যা চারদিকের ভূখণ্ডের ওপর তার সার্বভৌমত্বের প্রতীক ছিল। এরপর প্রজারা ও পারিষদরা রাজার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত। অথর্ববেদের পদগুলোতে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র তোমাকে গ্রহণ করেছে, তুমি স্থির হও, সমস্ত প্রজা যেন তোমার বশীভূত থাকে”। এই গোটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তিকে ক্ষমতার এমন এক শিখরে বসিয়ে দেওয়া হতো, যেখানে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত আইনের মর্যাদা পেত। আনুষ্ঠানিকতার এই চাদর না থাকলে প্রাচীন সমাজের বিশৃঙ্খল জনতাকে একটি রাজনৈতিক শৃঙ্খলায় বেঁধে রাখা অসম্ভব হতো।

নির্বাসিত রাজার প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা (Restoration of Exiled Kings and Political Turmoil): ক্ষমতাচ্যুতি ও পুনরুদ্ধার

প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস কোনো সরল শান্তির গল্প নয়। সিংহাসন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, বিদ্রোহ এবং রাজার দেশত্যাগের ঘটনা ছিল নিয়মিত বিষয়। অথর্ববেদ আমাদের এমন এক বাস্তব সমাজের মুখোমুখি দাঁড় করায় যেখানে রাজা যেকোনো মুহূর্তে তার ক্ষমতা হারাতে পারতেন। প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো রাজপুত্র, শক্তিশালী সেনাপতি কিংবা প্রজাদের ক্ষোভের মুখে পড়ে রাজাকে প্রায়ই রাজ্য ছেড়ে বনে বা দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে আশ্রয় নিতে হতো। ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মা (R. S. Sharma) প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, উত্তর-বৈদিক যুগে রাজার পদ তখনও পুরোপুরি বংশানুক্রমিক বা স্থায়ী হয়ে ওঠেনি (Sharma, 1991)। সিংহাসন রক্ষা করার জন্য রাজাকে প্রতিনিয়ত সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চালিয়ে যেতে হতো।

অথর্ববেদের তৃতীয় কাণ্ডের তৃতীয় এবং চতুর্থ সূক্ত দুটি বিশেষভাবে রচিত হয়েছে নির্বাসিত রাজাকে পুনরায় সিংহাসনে ফিরিয়ে আনার জন্য। এই সূক্তগুলোর ভাষা অত্যন্ত তীব্র ও সংবেদনশীল। নির্বাসিত রাজার অসহায়ত্ব দূর করার জন্য পুরোহিত বিশেষ এক যাগের আয়োজন করতেন, যার নাম ছিল পুনঃপ্রতিষ্ঠা (Punaḥpratiṣṭhā)। মন্ত্রে অগ্নি এবং ইন্দ্রকে আহ্বান জানিয়ে বলা হতো, “যে রাজাকে তার জ্ঞাতিরা তাড়িয়ে দিয়েছে, যে আজ গৃহহীন হয়ে বনে ঘুরছে, তাকে আবার তার আপন রাজ্যে ফিরিয়ে আনো”। এখানে কেবল দেবতার স্তুতি নেই, কাজ করছে রাজনৈতিক নির্বাসনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা। রাজাকে আশ্বস্ত করা হতো যে তার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে যায়নি, সঠিক আচার ও শক্তির মাধ্যমে তা ফিরে পাওয়া সম্ভব।

প্রত্যাবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় নির্বাসিত রাজার পক্ষে জনমত তৈরির একটি সামাজিক কৌশলও কাজ করত। পুরোহিতরা প্রচার করতেন যে রাজা চলে যাওয়ার কারণেই রাজ্যে খরা দেখা দিয়েছে, ফসল নষ্ট হচ্ছে কিংবা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রজাদের মনে এক ধরণের অপরাধবোধ তৈরি হতো। অথর্ববেদে বলা হচ্ছে, “তোমার প্রজা তোমাকে ডাকছে, তোমার অশ্ব ও হস্তী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, তুমি ফিরে এসে আবার এই রাষ্ট্রের লাগাম ধরো”। এটি ছিল ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের এক চতুর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব। প্রজাদের বোঝানো হতো যে রাজার অনুপস্থিতি আসলে পুরো সমাজের জন্যই এক মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে।

যখন কোনো রাজা সফলভাবে তার হারানো সিংহাসন ফিরে পেতেন, তখন তাকে দিয়ে বিশেষ কিছু শাস্তিমূলক আচার করানো হতো। যারা তাকে বিতাড়িত করেছিল, সেই সব বিদ্রোহী সামন্ত ও শত্রুদের কঠোরভাবে দমন করার নির্দেশ রয়েছে সূক্তগুলোতে। বলা হচ্ছে, বিরোধীদের যেন শিকড়সমেত উপড়ে ফেলা হয়, তাদের সম্পদ যেন বাজেয়াপ্ত করা হয়। গবেষক জন ডব্লিউ. স্পেলম্যান (J. W. Spellman) প্রাচীন ভারতীয় রাজত্বতত্ত্ব বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, নির্বাসন থেকে ফিরে আসা শাসকের প্রধান কাজই ছিল নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভীতি প্রদর্শন করে ভবিষ্যৎ বিদ্রোহের পথ বন্ধ করা (Spellman, 1964)। অথর্ববেদের এই মন্ত্রগুলো ক্ষমতা হারানো এবং তা ফিরে পাওয়ার যে নির্মম লড়াই, তাকে খুব নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।

রাজপুরোহিত ও রাজার সম্পর্ক: প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার দ্বৈততা (The Purohita and the King: Dual Structures of Authority): সুরক্ষা ও বশ্যতা

বৈদিক রাষ্ট্রকাঠামোতে রাজার পাশে সবসময় একজন ব্যক্তির ছায়া দেখা যেত, তিনি হলেন রাজপুরোহিত (Rājapurohita)। আধুনিক চোখে একে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান উপদেষ্টার এক মিশ্র রূপ বলা যেতে পারে। কিন্তু তার ভূমিকা ছিল আরও গভীর ও রহস্যময়। রাজাকে অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করতে হতো, আর পুরোহিতকে লড়তে হতো অদৃশ্য জগতের সাথে। অথর্ববেদের সাহিত্য এই রাজপুরোহিতের গুরুত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইতিহাসবিদ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী (H. C. Raychaudhuri) প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, বৈদিক রাজতন্ত্রে সামরিক বাহুবল এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের এক অবিচ্ছেদ্য মৈত্রী গড়ে উঠেছিল এই রাজা ও পুরোহিতের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে (Raychaudhuri, 1953)। একজন ছাড়া অন্যজন ছিলেন অপূর্ণ।

অথর্ববেদে পুরোহিতকে রাজার প্রকৃত রক্ষক বা রাষ্ট্রগোপ (Rāṣṭragopa) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে রক্ষা করার আসল দায়িত্ব রাজার নয়, পুরোহিতের। পুরোহিত দাবি করতেন যে তার মন্ত্রের শক্তি রাজার তলোয়ারের চেয়েও ধারালো। তৃতীয় কাণ্ডের উনবিংশতম সূক্তে এক রাজপুরোহিত দম্ভভরে বলছেন, “আমি আমার রাজার বাহিনীকে অপরাজেয় করে তুলেছি, আমার প্রার্থনায় তার তীরগুলো শত্রুর বুকে গিয়ে বিঁধবে, আমার মন্ত্র শত্রুর অস্ত্রকে ভোঁতা করে দেবে”। এই আত্মবিশ্বাস কোনো আধ্যাত্মিক বিনয় নয়, বরং নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করার এক প্রকাশ্য ঘোষণা। রাজা যাতে পুরোহিতকে তুচ্ছ ভাবতে না পারেন, সেজন্য তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেওয়া হতো যে পুরোহিতের সমর্থন ছাড়া তার সিংহাসন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

ক্ষমতার এই দ্বৈততায় স্পষ্টতই এক ধরনের মানসিক লড়াই লুকিয়ে ছিল। রাজাকে বোঝানো হতো যে তিনি যত বড় বীরই হোন না কেন, গোপন বিষপ্রয়োগ, ডাইনিদের আক্রমণ বা শত্রুরাজার অভিচার থেকে বাঁচতে হলে পুরোহিতের সাহায্য ছাড়া কোনো গতি নেই। পুরোহিত রাজার জন্য রক্ষাকবচ বা মণি তৈরি করে দিতেন, রাজার খাবারের সুরক্ষার জন্য মন্ত্র পড়তেন এবং রাজার শয়নকক্ষকে প্রেতাত্মা থেকে মুক্ত রাখতেন। ভারততত্ত্ববিদ হার্টমুট শার্ফে (Hartmut Scharfe) প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, পুরোহিত মূলত রাজার নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করে নিজের অবস্থানকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলতেন (Scharfe, 1989)। রাজা ছিলেন দৃশ্যমান ক্ষমতার প্রতীক, আর পুরোহিত ছিলেন সেই ক্ষমতার পেছনে থাকা অদৃশ্য পরিচালক।

তবে এই মৈত্রী সবসময় মসৃণ ছিল না। রাজপুরোহিত যদি কোনো কারণে রাজার ওপর অসন্তুষ্ট হতেন, তবে তিনি রাজার ধ্বংস চেয়েও ঘোর অভিচার করতে পারতেন। অথর্ববেদে ব্রাহ্মণদের ওপর অত্যাচার বা তাদের গাভী হরণ করার বিরুদ্ধে এমন সব ভয়ংকর অভিশাপ রয়েছে, যা শুনলে যেকোনো শাসকের বুক কেঁপে উঠত। বলা হতো, যে রাজা ব্রাহ্মণের ধন হরণ করে, তার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়, তার সন্তানরা অকালে মারা যায় এবং তার বংশে বাতি দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। এই ভীতিপ্রদর্শন আসলে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক চরম হাতিয়ার ছিল। রাজা যাতে স্বৈরাচারী হয়ে পুরোহিতশ্রেণিকে অবহেলা না করেন, সেজন্য এই ধর্মীয় ভয়ের প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়েছিল।

যুদ্ধকালীন আচার, রণবাদ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয় (Battlefield Rituals, War Drums and Psychological Warfare): দুন্দুভি ও শত্রুদমন

যুদ্ধ কেবল পেশীশক্তি আর তলোয়ারের লড়াই নয়, যুদ্ধ বহুলাংশে মনের লড়াই। যে পক্ষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও তারা পরাজিত হয়। প্রাচীন মানুষ এই সত্যটি খুব ভালো করেই বুঝত। অথর্ববেদের পঞ্চম কাণ্ডের বিশতম এবং একুশতম সূক্তে যুদ্ধকালীন এক অসাধারণ আচারের বিবরণ পাওয়া যায়, যার কেন্দ্রে রয়েছে যুদ্ধের বিশাল ঢোল বা দুন্দুভি (Dundubhi)। এই রণবাদ্যটিকে সাধারণ কাঠের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে দেখা হতো না, তাকে মনে করা হতো এক গর্জনকারী জীবন্ত দানব। গবেষক আর্থার বেরিডেল কিথ (Arthur Berriedale Keith) প্রাচীন বৈদিক যুদ্ধরীতির ওপর আলোকপাত করে বলেছেন যে, দুন্দুভির উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের সৈন্যদের মধ্যে উন্মাদনা সৃষ্টি করা এবং শত্রুর মনে চরম ভীতি সঞ্চার করা (Keith, 1925)। এটি ছিল প্রাচীন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের এক চমৎকার উদাহরণ।

যুদ্ধের আগে দুন্দুভিকে বিশেষভাবে সাজানো হতো এবং তার গায়ে মন্ত্রপুত তেল মাখানো হতো। পুরোহিত ঢাকের ওপর আঘাত করে উচ্চকণ্ঠে প্রার্থনা করতেন, “হে দুন্দুভি, তুমি স্বর্গের বজ্রের মতো গর্জন করো, তোমার শব্দ শুনে শত্রুরা যেন আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ে, তাদের হাত থেকে যেন ধনুর্বাণ খসে পড়ে”। বনের হরিণ যেমন বাঘের ডাক শুনে ভয়ে ছুটতে থাকে, শত্রুপক্ষের সেনারা যেন রণবাদ্যের আওয়াজে তেমনি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায় – এমন কল্পনাই করা হতো। এই মন্ত্রোচ্চারণ এবং অবিরাম ঢাকের আওয়াজ সৈন্যদের অ্যাড্রেনালিন বাড়িয়ে দিত। ফলে যুদ্ধের ময়দানে নামার আগেই প্রতিপক্ষের মানসিক মনোবল অর্ধেক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলত।

রণক্ষেত্রের অন্যান্য অস্ত্রের ওপরও নির্দিষ্ট জাদুক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো। তীরের ফলায় বিষ মাখানোর পাশাপাশি তার ওপর মৃত্যুর মন্ত্র পড়ে দেওয়া হতো, যাকে বলা হতো ইষু (Iṣu) সংস্কার। বলা হতো, এই তীর যেন শত্রুর রক্ত পান না করে ফিরে না আসে। রাজার রথকে সাজানো হতো বিশেষ লতাপাতা ও কবচ দিয়ে, যাতে কোনো প্রতিকূল শক্তি রথের চাকা মাটিতে আটকে দিতে না পারে। ঐতিহাসিক অনন্ত সদাশিব আলতেকর (A. S. Altekar) প্রাচীন ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, বৈদিক যুগে যুদ্ধের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করত সৈন্যদের অন্ধ আত্মবিশ্বাস ও শত্রুর দুর্বল মনোবলের ওপর (Altekar, 1958)। আচারের মাধ্যমে এই আত্মবিশ্বাস কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হতো।

শুধু তাই নয়, শত্রুর সৈন্যদলের মধ্যে মহামারী বা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যও বিশেষ কিছু তুকতাক করা হতো। পচা মাংস বা বিষাক্ত ধোঁয়া শত্রুর শিবিরের দিকে বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হতো এবং সাথে সাথে পিশাচদের আহ্বান জানিয়ে মন্ত্র পড়া হতো। দাবি করা হতো যে এই মন্ত্রের প্রভাবে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা নিজেদের মধ্যেই মারামারি শুরু করবে এবং তাদের সেনাপতি অন্ধ হয়ে যাবে। এই কৌশলগুলো প্রমাণ করে যে প্রাচীন যুদ্ধনীতিতে কোনো কাল্পনিক বীরত্ব বা নিষ্কলঙ্ক নৈতিকতা সবসময় কাজ করত না। জয়ী হওয়াই ছিল একমাত্র লক্ষ্য, আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তব সামরিক কৌশলের সাথে আদিম মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাসকে পুরোপুরি মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বলি, করব্যবস্থা ও প্রজা-সার্বভৌমত্ব ভারসাম্য (Tribute, Taxation and the Ruler-Subject Dynamic): বিশের সম্মতি ও রাজনৈতিক আনুগত্য

একটি রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য অর্থনৈতিক ভিত্তির প্রয়োজন হয়। রাজাকে সৈন্যবাহিনী পুষতে হতো, রাজদরবারের খরচ চালাতে হতো এবং যাগযজ্ঞের ব্যয় মেটাতে হতো। কিন্তু এই সম্পদ কোথা থেকে আসত? অথর্ববেদে করব্যবস্থা ও রাজস্ব আদায়ের প্রাথমিক রূপটি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আদি বৈদিক যুগে কর কোনো বাধ্যতামূলক বা নির্দিষ্ট বিষয় ছিল না, প্রজারা স্বেচ্ছায় রাজাকে যে উপহার দিত তাকে বলা হতো বলি (Bali)। কিন্তু সমাজ যখন স্থায়ী হতে শুরু করল, তখন এই স্বেচ্ছাপ্রদত্ত উপহার ধীরে ধীরে বাধ্যতামূলক খাজনায় রূপান্তরিত হতে লাগল। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার (Romila Thapar) দেখিয়েছেন যে, উত্তর-বৈদিক পর্বে এই বলি শব্দটি তার আদি অর্থ হারিয়ে কৃষকদের উদ্বৃত্ত শস্যের ওপর রাজার প্রাতিষ্ঠানিক দাবিতে পরিণত হয়েছিল (Thapar, 1984)।

অথর্ববেদের তৃতীয় কাণ্ডের চতুর্থ সূক্তে রাজাকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে প্রজাদের কাছ থেকে সঠিকভাবে কর আদায় করার জন্য। বলা হচ্ছে, “তুমি প্রজাদের থেকে তোমার অংশ বা বলি গ্রহণ করো, ইন্দ্র যেমন আকাশ থেকে বৃষ্টির জল নিয়ে আসেন, তুমি তেমনি ধন সংগ্রহ করে দেশকে সমৃদ্ধ করো”। তবে এই কর আদায় সবসময় সহজ ছিল না। প্রজারা বা বিশ (Viś) যদি মনে করত রাজা অতিরিক্ত কর নিচ্ছেন বা তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছেন না, তবে তারা খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিত বা বিদ্রোহ করত। তাই কর আদায়ের বৈধতা প্রমাণের জন্য পুরোহিতরা মন্ত্র পড়তেন, যাতে প্রজাদের মন নরম হয় এবং তারা কোনো আপত্তি ছাড়াই তাদের ফসলের ষোড়শ অংশ বা নির্দিষ্ট পশু রাজার ভাণ্ডারে জমা দিয়ে যায়।

শাসক এবং প্রজাসাধারণের সম্পর্ক ছিল এক ধরণের পারস্পরিক স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাজাকে মনে করা হতো প্রজাদের সুরক্ষাদাতা। তিনি যদি বাহ্যিক আক্রমণ থেকে কৃষকদের খেত এবং পশুপাল রক্ষা করতে না পারতেন, তবে প্রজারা তার আনুগত্য অস্বীকার করত। গবেষক চার্লস ড্রেকমেয়ার (Charles Drekmeier) উল্লেখ করেছেন যে, প্রাচীন বৈদিক রাজতন্ত্র ছিল এক ধরনের অঘোষিত সামাজিক চুক্তি, যেখানে সুরক্ষার বিনিময়ে কর দেওয়া হতো (Drekmeier, 1962)। অথর্ববেদে এমন অনেক মন্ত্র রয়েছে যেখানে রাজা প্রজাদের ভালোবাসার পাত্র হওয়ার জন্য প্রার্থনা করছেন। বলা হতো, “বিশ যেন তোমাকে চায়, বিশ যেন কখনো তোমাকে ত্যাগ না করে”। রাজার এই আকুলতা প্রমাণ করে যে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রজাদের সমর্থন ছাড়া কোনো সিংহাসনই নিরাপদ ছিল না।

গ্রামের স্থানীয় প্রশাসন এবং সভা-সমিতির মতামতও রাজাকে মাথায় রাখতে হতো। গ্রামপ্রধান বা গ্রামণী (Grāmaṇī) এবং রথচালক বা সূত (Sūta) ছিলেন সেই সময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি, যাদের সমর্থন ছাড়া রাজা রাজ্য চালাতে পারতেন না। অথর্ববেদের বহু সূক্তে এই রাজপুরুষদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য আচারিক বিধান রয়েছে। রাজাকে সতর্ক করে দেওয়া হতো যেন তিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে না যান। কর আদায়ের ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতা দেখালে প্রজাদের ক্ষোভ যে রাজার পতনের কারণ হতে পারে, সেই বাস্তব রাজনৈতিক বোধ এই সংহিতার সমাজচেতনার ভেতরে কাজ করত। ফলে ক্ষমতা, শোষণের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রজা-সম্মতির এই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছিল প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রকাঠামো।

অথর্ববেদের বিশ্বতত্ত্ব ও দার্শনিক চিন্তা (Cosmology and Philosophy in the Atharvaveda): স্কম্ভ, প্রাণ, কাল ও বিশ্ব

বিশ্বতাত্ত্বিক রূপান্তর ও অথর্ববেদীয় মহাজাগতিক জিজ্ঞাসা (Cosmological Transition and Atharvan Metaphysical Inquiries): বহুদেবতা থেকে একেশ্বরবাদী সূত্রের সন্ধান

মানুষের চিন্তার বিকাশ সবসময় এক সরলরেখায় এগোয় না। কখনো তা মাটির ধুলোবালি, রোগবালাই আর জাদুটোনায় নিমজ্জিত থাকে, আবার কখনো হঠাৎ করেই সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে আকাশের অসীমতার দিকে চোখ তুলে তাকায়। অথর্ববেদের সংকলনটি লক্ষ্য করলে এই বৈপরীত্য সবচেয়ে তীব্রভাবে চোখে পড়ে। যে সংহিতায় একটু আগেই ক্ষতিকর পোকা মারার বা প্রতিবেশীকে বশ করার তুকতাক নিয়ে কথা হচ্ছিল, সেখানেই হঠাৎ মহাবিশ্বের আদি উৎস এবং পরম সত্তা নিয়ে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন (Sarvepalli Radhakrishnan) ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, অথর্ববেদীয় চিন্তা বহুদেবতার প্রথাগত রূপকে অতিক্রম করে এমন এক অখণ্ড মৌল উপাদানের সন্ধানে নেমেছিল, যা সমস্ত দৃশ্যমান জগতের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে (Radhakrishnan, 1923)। এই রূপান্তরটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং দেবতাদের মানবিক রূপ নিয়ে সংশয় থেকেই এই দার্শনিক জিজ্ঞাসার জন্ম হয়েছিল।

ঋগ্বেদের শেষ ভাগে নাসদীয় সূক্ত (Nāsadīya Sūkta) বা হিরণ্যগর্ভ ধারণার মাধ্যমে যে দার্শনিক সংশয়বাদের সূচনা হয়েছিল, অথর্ববেদে এসে তা আরও বেশি বস্তুমুখী ও বিমূর্ত রূপ লাভ করে। এখানে ইন্দ্র, অগ্নি বা বরুণের মতো স্বতন্ত্র দেবতাদের পেছনে ফেলে এমন এক সত্তাকে খোঁজা হয়েছে যা পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। চিন্তাবিদ ওয়াল্টার রুবেন (Walter Ruben) বৈদিক ও উপনিষদিক দর্শনের বিকাশের ধারা বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ কাণ্ডের মহাজাগতিক সূক্তগুলো প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার বস্তুনিষ্ঠ বিশ্বতত্ত্বের প্রথম স্পষ্ট পদক্ষেপ (Ruben, 1954)। বিশ্ব কীভাবে টিকে আছে, দিন ও রাতের এই চক্রকে কে ঘোরাচ্ছে, এবং মানুষের নিশ্বাসের সাথে মহাবিশ্বের বাতাসের কী সম্পর্ক – এই প্রশ্নগুলো প্রাচীন কবিদের নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল।

এই চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে কাজ করছিল এক ধরণের পর্যবেক্ষণমূলক যুক্তি। মানুষ দেখছিল যে দেবতারা পরিবর্তনশীল, মানুষের তৈরি প্রার্থনায় তারা তৃপ্ত হন এবং তাদের ক্ষমতাও কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সূর্য প্রতিদিন নিয়ম করে উঠছে, গাছপালা মরছে আবার জন্মাচ্ছে, নদী সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। এই যে অবিরাম প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা, তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো একটি একক চালিকাশক্তি রয়েছে। গবেষক ফ্রাঙ্কলিন এডগারটন (Franklin Edgerton) তার প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের সংকলনে দেখিয়েছেন যে, অথর্ববেদের দার্শনিকরা কোনো একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরের চেয়ে একটি নিরপেক্ষ মহাজাগতিক নিয়মকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন (Edgerton, 1965)। ফলে আধ্যাত্মিক ভক্তির চেয়ে বিশ্ব পরিচালনার বৈজ্ঞানিক ও বস্তুগত ভিত্তি খোঁজার একটি আদিম প্রয়াস এই সূক্তগুলোতে লক্ষ্য করা যায়।

প্রশ্ন করার এই স্বাধীনতা অথর্ববেদের ভাবুকদের এক অনন্য স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। তারা কোনো আপ্তবাক্যকে শেষ সত্য বলে মেনে নেননি। একটি সূক্তে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, “কে এই পৃথিবীকে স্থির রেখেছে? কে আকাশকে উপরে তুলে ধরেছে? এই মহাবিশ্ব কার ভেতরে আশ্রয় নিয়ে আছে?”। এই প্রশ্নগুলো কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের বয়ান নয়, এগুলো হলো বিশুদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক জিজ্ঞাসা। মানুষ যখন তার টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে কিছুটা অবসরে যেত, তখন রাতের আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নগুলো তুলত। অথর্ববেদের দার্শনিক স্তরটি সেই আদিম মানুষের বিস্ময়বোধ এবং বিশ্বকে বোঝার এক অক্লান্ত বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রা।

স্কম্ভ সূক্ত: বিশ্বস্তম্ভ, ব্রহ্ম ও মহাজাগতিক অবলম্বন (The Skambha Hymn: The Cosmic Fulcrum, Brahman and Universal Support)

অথর্ববেদের দর্শনের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং চমকপ্রদ সৃষ্টি হলো স্কম্ভ (Skambha) ধারণা। দশম কাণ্ডের সপ্তম এবং অষ্টম সূক্তে এই মহাজাগতিক স্তম্ভের বন্দনা রয়েছে। সাধারণ অর্থে স্কম্ভ মানে কোনো ঘরের খুঁটি বা অবলম্বন, যার ওপর পুরো ছাদটি দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু অথর্ববেদের ঋষিরা এই পরিচিত পার্থিব বস্তুকে এক বিশাল মহাজাগতিক রূপকে রূপান্তর করেছিলেন। জার্মান প্রাচ্যবিদ পল ডয়সেন (Paul Deussen) উপনিষদের দর্শনের পূর্বসূরি হিসেবে অথর্ববেদের স্কম্ভ সূক্তকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং একে পরম ব্রহ্মের ধারণার সরাসরি পূর্বাভাস বলে চিহ্নিত করেছেন (Deussen, 1906)। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শূন্যে ভেঙে পড়ছে না কেন – এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রাচীন ঋষিরা কল্পনা করেছিলেন এক অদৃশ্য মহাজাগতিক স্তম্ভের, যা আকাশ ও পৃথিবীকে ধারণ করে আছে।

স্কম্ভ সূক্তে এই স্তম্ভকে কোনো পাথরের বা কাঠের খুঁটি বলা হয়নি, একে বলা হয়েছে সমগ্র অস্তিত্বের আধার। মন্ত্রে বলা হচ্ছে, “স্কম্ভের ভেতরেই তপস্যা বাস করে, স্কম্ভের ভেতরেই ঋত বা সত্য প্রতিষ্ঠিত, এই স্কম্ভের মধ্যেই সমস্ত দেবতারা শাখার মতো ঝুলে আছেন”। দেবতাদেরও এখানে স্বাধীন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। ইন্দ্র, অগ্নি বা প্রজাপতি – সবাই এই বিরাট মহাজাগতিক খুঁটির একেকটি অঙ্গে আশ্রিত। গবেষক রাইমন পানিক্কর (Raimon Panikkar) বৈদিক অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, স্কম্ভের ধারণা দিয়ে আসলে বহুদেবতাবাদকে ভেঙে একটি একক মহাজাগতিক অবকাঠামো দাঁড় করানো হয়েছিল (Panikkar, 1977)। জগতের যাবতীয় পদার্থ, নৈতিক নিয়ম এবং মহাজাগতিক ঘটনা এই এক স্তম্ভের শরীরের ভেতর সমন্বিত।

এই সূক্তের চিন্তায় এক ধরণের চমকপ্রদ শরীরতত্ত্ব ও মহাজাগতিকতার মেলবন্ধন ঘটেছিল। স্কম্ভের চোখ হলো সূর্য, তার শ্বাস হলো বাতাস, এবং পৃথিবী হলো তার পায়ের পাতা। এই যে বিশ্বকে একটি বিশাল মানবদেহের সাথে মেলানো, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ম্যাক্রোকসম এবং মাইক্রোকসমের ঐক্য বলা হয়, তা স্কম্ভের রূপকে পূর্ণতা পেয়েছে। অথর্ববেদের কবি গভীর বিস্ময়ে জানতে চান, “স্কম্ভের কতটুকু অংশ এই দৃশ্যমান জগতের ভেতরে প্রবেশ করেছে, আর কতটুকুই বা এর বাইরে রয়ে গেছে?”। এই প্রশ্নটি দেখায় যে প্রাচীন ভাবুকরা জানতেন মানুষের ইন্দ্রিয়গোচর পৃথিবীই সব নয়, এর বাইরেও অস্তিত্বের এক সুবিশাল বিস্তার থাকতে পারে যা আমাদের জানার অতীত।

পরবর্তীকালে উপনিষদে যে ব্রহ্ম (Brahman) তত্ত্ব পুরো ভারতীয় দর্শনকে আচ্ছন্ন করেছিল, তার বীজ এই স্কম্ভ চিন্তার ভেতরেই পোঁতা ছিল। দশম কাণ্ডের একটি মন্ত্রে সরাসরি বলা হয়েছে, স্কম্ভ এবং ব্রহ্ম আসলে অভিন্ন। যিনি স্কম্ভের ভেতরের সত্যকে জানেন, তিনি আসলে পরম রহস্যকেই জেনে ফেলেন। ইতিহাসবিদ এরিখ ফ্রাউওয়ালনার (Erich Frauwallner) ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদের স্কম্ভ সূক্ত হলো বস্তুবাদী বা প্রকৃতিবাদী মহাজাগতিকতা থেকে ভাববাদী দর্শনের দিকে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ধাপ (Frauwallner, 1973)। কোনো পৌরাণিক গল্প না বানিয়ে সম্পূর্ণ যুক্তিবোধের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বকে একটি সংহত নিয়মে বাঁধার এই চেষ্টা সত্যিই অসাধারণ।

প্রাণতত্ত্ব ও সর্বব্যাপী জীবনীশক্তি (The Doctrine of Prāṇa: Vital Breath and the Dynamic Life-Force)

মহাবিশ্বকে বাইরে থেকে দেখার পর অথর্ববেদের ঋষিদের নজর ঘুরে গিয়েছিল নিজের শরীরের দিকে। মানুষ বাইরে যা দেখে, ভেতরেও তো তারই প্রতিচ্ছবি আছে। শরীর কীভাবে নড়াচড়া করে? চোখ কীভাবে দেখে? আর এই মানুষটিই যখন মারা যায়, তখন ঠিক কোন জিনিসটা শরীর থেকে উবে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করলেন প্রাণ (Prāṇa)-কে। একাদশ কাণ্ডের চতুর্থ সূক্তটি পুরোপুরি এই প্রাণের প্রশংসায় নিবেদিত। ভারতীয় চিন্তার গবেষক বিমল কৃষ্ণ মতিলাল (Bimal Krishna Matilal) প্রাচীন জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, আদি ভারতীয় ভাবুকরা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সত্য হিসেবে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসকে গ্রহণ করেছিলেন (Matilal, 1986)। প্রাণ না থাকলে ইন্দ্রিয়গুলো যে অন্ধ ও বধির পাথরের মতো হয়ে যায়, এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই প্রাণতত্ত্বের জন্ম হয়েছিল।

অথর্ববেদে প্রাণ কেবল মানুষের ফুসফুসের বাতাস নয়, একে দেখা হয়েছে সমগ্র মহাবিশ্বের স্পন্দন বা জীবনীশক্তি হিসেবে। যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন বলা হয় প্রাণ পৃথিবীতে জল ঢালছে। যখন বাতাস বয়, তখন তা মহাবিশ্বের নিশ্বাস। সূক্তে বলা হচ্ছে, “প্রাণ যখন পৃথিবীতে বর্ষণ করে, তখন সমস্ত উদ্ভিদ আনন্দে মেতে ওঠে, তারা গর্ভবতী হয়ে ওঠে”। প্রাণের এই সর্বব্যাপী চরিত্র প্রমাণ করে যে প্রাচীন মানুষ জড় এবং জীবের মধ্যে কোনো অনতিক্রম্য প্রাচীর তৈরি করেনি। তাদের কাছে পাথরের মধ্যেও এক ধরণের সুপ্ত স্থবিরতা ছিল, আর চলমান সবকিছুতেই ছিল প্রাণের প্রত্যক্ষ খেলা।

প্রাণকে এখানে সমস্ত সৃষ্টির পিতা এবং মাতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, ইন্দ্রিয়গুলো যখন কাজ বন্ধ করে দেয়, তখনও শরীরের ভেতরে এক অতন্দ্র প্রহরী জেগে থাকে – সে হলো প্রাণ। সূক্তের ভাষায়, “সবাই যখন নিদ্রিত, প্রাণ তখন জেগে পাহারা দেয়, প্রাণ কখনো ক্লান্ত হয় না”। এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত বাস্তব। ঘুমের মধ্যে হৃদয়স্পন্দন বা শ্বাসের অবিরাম চলা মানুষকে গভীরভাবে আলোড়িত করত। তারা বুঝতে পেরেছিল যে সচেতন মনের বাইরেও শরীরের ভেতরে একটি স্বয়ংক্রিয় চালিকাশক্তি কাজ করে যাচ্ছে, যা মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না।

দার্শনিক দয়া কৃষ্ণ (Daya Krishna) প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, প্রাণতত্ত্ব ছিল মূলত এক ধরণের জৈবিক গতিশীলতাবাদ, যা মহাবিশ্বকে একটি স্থির কাঠামোর বদলে চিরচঞ্চল ও জীবন্ত প্রক্রিয়া হিসেবে কল্পনা করেছিল (Krishna, 1991)। এই প্রাণ যখন শরীরে থাকে তখন মানুষ জীবিত, আর প্রাণ যখন শরীর ছেড়ে চলে যায় তখন শরীর ধূলিসাৎ হয়। সূর্য প্রতিদিন সকালে উঠছে কারণ প্রাণের গতি তাকে চালিত করছে। প্রাণের এই সার্বিক আধিপত্য ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে অথর্ববেদ জীবনের জৈবিক সত্যকে দেবতাদের কাল্পনিক শক্তির চেয়ে অনেক বেশি সম্মান দিয়েছিল।

কালতত্ত্ব: সময়, গতি ও মহাজাগতিক নিয়তি (The Philosophy of Kāla: Time, Motion and Universal Becoming)

অথর্ববেদের দর্শনের আরেকটি অনন্য ও আধুনিক ভাবনা হলো কাল (Kāla) বা সময়ের ধারণা। উনবিংশ কাণ্ডের তিপ্পান্ন এবং চুয়ান্ন নম্বর সূক্ত দুটিতে সময়ের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্ব সাহিত্যের প্রাচীনতম দার্শনিক কবিতাগুলোর অন্যতম। সাধারণত আমরা সময়কে একটি বিমূর্ত মাপকাঠি ভাবি। কিন্তু অথর্ববেদের ঋষি সময়কে দেখেছেন এক অপ্রতিরোধ্য ও চলমান শক্তিরূপে। ভারততত্ত্ববিদ উইলহেম হাল্বফাস (Wilhelm Halbfass) ভারতীয় ঐতিহ্যে সময়ের ধারণা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, অথর্ববেদের কাল সূক্তটি পরবর্তী ভারতীয় দর্শনের কার্যকারণতত্ত্ব এবং পরিণামবাদের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল (Halbfass, 1991)। সবকিছু সময়ের ভেতরে জন্মায়, সময়ের ভেতরে বাড়ে এবং সময়ের পেটের ভেতরেই একদিন হারিয়ে যায়।

সূক্তের শুরুতেই এক চমৎকার রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। সময়কে কল্পনা করা হয়েছে সাতটি লাগামযুক্ত এবং সহস্র চোখবিশিষ্ট এক অপরাজেয় অশ্ব হিসেবে, যা অনন্তকাল ধরে অবিরাম ছুটে চলেছে। বলা হচ্ছে, “কাল হলো এক অশ্ব, যা জরাহীন ও পূর্ণশক্তিমান, জ্ঞানী ব্যক্তিরা সেই অশ্বের পিঠে আরোহণ করেন, আর সাধারণ মানুষ তার চাকার তলায় পিষ্ট হয়”। এই রূপকটির পেছনে কাজ করছে মানুষের নশ্বরতার চরম অনুভূতি। মানুষ যা-ই করুক না কেন, সিংহাসন বানাক বা বিশাল অট্টালিকা তৈরি করুক, সময়ের দাঁত সবকিছুকে ধীরে ধীরে চিবিয়ে ফেলে। সময়ের এই অবিরাম প্রবাহকে কোনো রাজা বা দেবতাও আটকাতে পারে না।

অথর্ববেদে কালকে কেবল ধ্বংসের কারণ বলা হয়নি, তাকে বলা হয়েছে সমস্ত সৃষ্টির পরম পিতা। বলা হচ্ছে, কাল থেকেই আকাশ তৈরি হয়েছে, কাল থেকেই পৃথিবী এসেছে, এমনকি যে প্রজাপতি দেবতাকে সৃষ্টির আদি কারণ ভাবা হয়, তিনিও এই সময়ের গর্ভ থেকেই উৎপন্ন হয়েছেন। সূক্তে ঋষি ঘোষণা করছেন, “কালেই সমস্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত, কালই পরম সত্য, কাল ছাড়া কোনো কিছুরই কোনো স্থান নেই”। এই ভাবনাটি সেই যুগের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বৈপ্লবিক। কোনো অলৌকিক ঈশ্বরের সৃষ্টিতত্ত্বকে পাশে সরিয়ে সময়কে সবকিছুর আদি কারণ ঘোষণা করা স্পষ্টতই এক ধরণের প্রাকৃতিক নিয়তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বতত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত করে।

দার্শনিক টি. এম. পি. মহাদেবন (T. M. P. Mahadevan) বৈদিক বিশ্বচেতনার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদের কালতত্ত্ব ছিল অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং মহাজাগতিক রূপান্তরের এক গভীর কাব্যিক প্রকাশ (Mahadevan, 1960)। ঋতুগুলোর একের পর এক আগমন, মানুষের শৈশব থেকে বার্ধক্যে পৌঁছানো, এবং সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন – এই সবই কালের চাকার নীরব ঘূর্ণন। সময়কে বুঝতে পারা মানেই অস্তিত্বের মূল সত্যকে উপলব্ধি করা। এই বাস্তবমুখী সময়চেতনা মানুষকে শিখিয়েছিল যে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, পরিবর্তনই এই মহাবিশ্বের একমাত্র অটল নিয়ম।

রোহিত ও সূর্যকেন্দ্রিক মহাজাগতিকতা (Rohita and Solar Cosmology: The Creative Radiance and Evolutionary Energy)

অথর্ববেদের ত্রয়োদশ কাণ্ডটি প্রায় পুরোটাই নিবেদিত হয়েছে এক বিশেষ সত্তার উদ্দেশ্যে, যার নাম রোহিত (Rohita)। রোহিত শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো রক্তিম বা লালবর্ণ, যা সরাসরি উদীয়মান সূর্যের রূপকে প্রকাশ করে। কিন্তু এই সংহিতায় রোহিত কেবল আকাশের একটি জ্বলন্ত গোলক নয়, একে দেখা হয়েছে সৃষ্টির আলোকময় উৎস এবং বিবর্তনমূলক শক্তির প্রতীক হিসেবে। গবেষক ফ্রাঙ্কলিন এডগারটন (Franklin Edgerton) উল্লেখ করেছেন যে, অথর্ববেদে রোহিত ধারণার মধ্য দিয়ে সূর্যকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত সৌর বিশ্বতত্ত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল (Edgerton, 1965)। আলো কীভাবে অন্ধকারের বুক চিরে জীবনের সূচনা করে এবং সেই আলোই কীভাবে বিভিন্ন রূপে ছড়িয়ে পড়ে, এই কাণ্ডে তারই বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে।

রোহিত সূক্তে বলা হচ্ছে, এই রক্তিম সূর্যই নিজের তেজে আকাশ ও পৃথিবীকে আলাদা করে রেখেছে এবং তাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেছে। একটি পদে বলা হয়েছে, “রোহিত থেকেই সমস্ত কিছুর জন্ম হয়েছে, সে নিজের শরীর দিয়ে এই মহাবিশ্ব তৈরি করেছে এবং আবার নিজের ভেতরেই তাকে গুটিয়ে নেয়”। আলো এবং তাপ ছাড়া যে পৃথিবীতে কোনো জীবনের অস্তিত্ব সম্ভব নয়, এই জৈবিক সত্যটি প্রাচীন ঋষিদের ভাবনায় রোহিতের রূপ ধরে প্রকাশ পেয়েছিল। তারা লক্ষ্য করেছিলেন যে সূর্য উঠলে কেবল গাছপালাই জাগে না, মানুষের মন এবং কর্মচঞ্চলতাও আলোর সাথে সাথে জেগে ওঠে। ফলে সূর্যকে কেবল পূজা করার দেবতা না ভেবে সমস্ত সৃজনশীল শক্তির মৌল উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।

এই সৌর দর্শনে রোহিতকে রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথেও মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজাকে বলা হতো পার্থিব রোহিত, যে নিজের জ্যোতি দিয়ে প্রজাদের শাসন করবে। ইতিহাসবিদ ওয়াল্টার রুবেন (Walter Ruben) দেখিয়েছেন যে, উত্তর-বৈদিক যুগের রাজ্যগুলোর বিস্তার এবং রাজার কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার উত্থানের সাথে এই সূর্যকেন্দ্রিক দর্শনের গভীর সামাজিক যোগাযোগ ছিল (Ruben, 1954)। সূর্যের যেমন কোনো বিকল্প নেই, সে যেমন সব জায়গায় আলো দেয় কিন্তু কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তেমনি রাজ্যের ভেতরেও একজন কেন্দ্রীয় সার্বভৌম শাসকের প্রয়োজন রয়েছে – এই রাজনৈতিক দর্শন রোহিতের মহাজাগতিক রূপের আড়ালে প্রচার করা হতো।

তবে রাজনৈতিক রূপকের বাইরেও রোহিত সূক্তে আলোর দার্শনিক দ্বন্দ্বটি ফুটে উঠেছে। আলো এবং অন্ধকারের লড়াই হলো সৃষ্টির আদি দ্বন্দ্ব। রোহিত যখন আকাশে ওঠে, তখন রাতের অন্ধকার ও সমস্ত অশুভ শক্তি পালিয়ে যায়। কিন্তু সূর্য যখন ডোবে, তখন আবার মহাবিশ্ব এক আদিম রহস্যে ডুবে যায়। এই অনন্ত আসা-যাওয়ার খেলাই হলো জগতের জীবনচক্র। অথর্ববেদের কবিরা রোহিতের মধ্যে এমন এক শক্তি প্রত্যক্ষ করেছিলেন যা ক্ষয়ে যায় না, যা প্রতিদিন নতুন হয়ে ফিরে আসে। নশ্বর মানুষের জীবনে এই অবিনশ্বর আলোর উপস্থিতি এক পরম ভরসার জায়গা হিসেবে কাজ করত।

উপনিষদিক দর্শনের পূর্বাভাস ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সেতু (Anticipations of Upaniṣadic Philosophy and Epistemological Bridges): আত্মানুসন্ধান ও একত্ববাদ

অথর্ববেদের বিশ্বতত্ত্ব ও দর্শনের আলোচনা অপূর্ণ থেকে যাবে যদি না এর সাথে পরবর্তী উপনিষদিক চিন্তার ঐতিহাসিক সংযোগটি বোঝা যায়। বৈদিক সাহিত্য সাধারণত দুটি ভাগে পরিচিত – কর্মকাণ্ড এবং জ্ঞানকাণ্ড। সংহিতাগুলোকে সাধারণত কর্মকাণ্ডের আচার হিসেবে দেখা হয়, আর উপনিষদকে ভাবা হয় বিশুদ্ধ জ্ঞানকাণ্ড। কিন্তু অথর্ববেদ এই দুটি প্রান্তের মাঝখানে এক মজবুত সাঁকো হিসেবে কাজ করেছে। দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন (Sarvepalli Radhakrishnan) স্পষ্ট করে বলেছেন যে, উপনিষদের অদ্বৈতবাদী দর্শন আকাশ থেকে হঠাৎ নেমে আসেনি, তার মূল ধারণাগুলো অথর্ববেদের স্কম্ভ, প্রাণ এবং আত্মার ধারণার ভেতরেই ধীরে ধীরে পরিপক্ব হয়েছিল (Radhakrishnan, 1923)। এই সংহিতাতেই মানুষ প্রথম বাহ্যিক যাগযজ্ঞ ছেড়ে নিজের ভেতরের সত্তাকে খুঁজতে শুরু করেছিল।

দশম কাণ্ডের অষ্টম সূক্তে মানুষের শরীরকে এক অপূর্ব রূপকে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মানুষের শরীর হলো একটি নয়টি দরজাবিশিষ্ট নগরী, যাকে বলা হয় পুরী (Purī)। এই নগরীটি সোনালী পদ্ম দিয়ে তৈরি এবং এর ভেতরে এক পরম রহস্যময় সত্তা বাস করে, যাকে বলা হয় আত্মা (Ātman)। সূক্তে ঋষি বিস্মিত হয়ে বলছেন, “যিনি এই শান্ত, জরাহীন ও অমৃতময় আত্মাকে জানেন, তিনি আর মৃত্যুকে ভয় পান না”। উপনিষদে যে আত্মজ্ঞানের কথা বারবার বলা হয়েছে, তার এমন নিখুঁত ও আদিম প্রকাশ আর কোথাও মেলে না। নিজের ভেতরের চৈতন্যকে মহাবিশ্বের চৈতন্যের সাথে এক করে দেখার যে অদ্বৈত অনুভূতি, তা অথর্ববেদের এই মরমী চিন্তাতেই প্রথম ভাষা পেয়েছিল।

এই জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরণটি প্রাচীন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছিল। যে মানুষ দেবতাদের কৃপা পাওয়ার জন্য পশু বলি দিত বা যজ্ঞের আগুনে ঘি ঢালত, সে হঠাৎ বুঝতে পারল যে সবচেয়ে বড় যজ্ঞটি চলছে তার নিজের শরীরের ভেতরেই। নিশ্বাস হলো হোম, ইন্দ্রিয়গুলো হলো ঋত্বিক এবং ভেতরের চৈতন্যই হলো পরম দেবতা। গবেষক পল ডয়সেন (Paul Deussen) তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে অথর্ববেদ বহিরাগত ধর্মীয় আচারকে একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করেছিল (Deussen, 1906)। এই রূপান্তরের ফলেই পরবর্তীকালে মুণ্ডক বা মাণ্ডূক্যের মতো গভীর দার্শনিক উপনিষদগুলো এই অথর্ববেদের শাখা থেকেই জন্ম নিতে পেরেছিল।

সব মিলিয়ে অথর্ববেদের বিশ্বতত্ত্ব ও দার্শনিক চিন্তা মানব সভ্যতার চিন্তার ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। এই দর্শন কোনো শুষ্ক তত্ত্বকথা ছিল না, এটা ছিল অস্তিত্বের সংকটে থাকা মানুষের চারপাশকে বোঝার এক সাহসী প্রয়াস। মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা জানত, সে জানত রোগ, জরা ও মৃত্যু তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করছে। কিন্তু সেই ভয়ের কাছে সে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেনি। স্কম্ভের মহাজাগতিকতায় সে খুঁজেছিল নির্ভরতা, প্রাণের চঞ্চলতায় সে দেখেছিল জীবনের ছন্দ, আর কালের প্রবাহে সে চিনেছিল মহাবিশ্বের অনিবার্য পরিবর্তনকে। মাটির জাদুটোনা থেকে আকাশের অসীম তত্ত্ব পর্যন্ত অথর্ববেদের এই যে বুদ্ধিবৃত্তিক বিস্তার, তা প্রাচীন ভারতের মানুষের মননশীলতাকে এক অভূতপূর্ব ও বাস্তবসম্মত মহিমা দান করেছে।

উপসংহার

সমগ্র বৈদিক সাহিত্যের সংহিতা পর্যায়কে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই বিপুল পাঠভাণ্ডার কোনো অপরিবর্তনীয় স্বর্গীয় বাণী নয়, বরং প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের একটি সুনির্দিষ্ট কালপর্বের জটিল আর্থ-সামাজিক ও মতাদর্শিক রূপান্তরের বাস্তব দর্পণ। ঋগ্বেদের মুক্তাঙ্গন পশুপালক সমাজের গতিশীল স্তোত্র থেকে শুরু করে যজুর্বেদের জটিল ও অতি-নিয়ন্ত্রিত যাগযজ্ঞ এবং অথর্ববেদের দৈনন্দিন লোকজ ও যাদুমূলক বিশ্বাস পর্যন্ত যে বিস্তার, তা মানবচেতনার তথাকথিত আধ্যাত্মিক বিকাশ নয়; বরং তা ছিল ক্রমবর্ধমান সামাজিক জটিলতা (Social Complexity) এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক স্তরগুলোর অপরিহার্য উপজাত। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার (Romila Thapar) যেমন উল্লেখ করেছেন, বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান ও সংহিতাগুলোর বিবর্তন মূলত রক্তসম্পর্কভিত্তিক সমাজ বা বংশানুক্রমিক সমাজ (Lineage Society) থেকে রাজন্য-চালিত ও রাজস্ব-নির্ভর একটি শ্রেণিবিভক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণের মতাদর্শিক বয়ান রচনা করেছিল।

এই সংহিতাগুলোতে দৃশ্যমান ধর্ম ও দেবজগৎ কোনো বিমূর্ত পরমার্থিক সত্যের অন্বেষণ ছিল না, বরং তা ছিল মূলত একটি সুসংগঠিত যজ্ঞীয় অর্থনীতি (Sacrificial Economy)। যেখানে সম্পদ ধ্বংস ও পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে পুরোহিত বা যাজক শ্রেণি (Priestly Class) এবং যুদ্ধবাজ অভিজাতদের মধ্যে এক পারস্পরিক স্বার্থের লেনদেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। ধর্মের ছদ্মাবরণে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা পরবর্তীতে সমাজে কঠোর সামাজিক ও শ্রম বিভাজন চাপিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। একদিকে যেমন ইন্দ্র বা অগ্নির মতো দেবচরিত্রের নির্মাণ করা হয়েছিল যুদ্ধজয় ও পশুপালনের সাফল্য নিশ্চিত করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, অন্যদিকে সংহিতা সাহিত্যের অন্তিম পর্বে এসে বিভিন্ন লোকজ ঐতিহ্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ-আকাঙ্ক্ষাকে সমন্বয় করে একটি সামগ্রিক আধিপত্য বিস্তার করা হয়েছিল। একই সাথে নারীর সামাজিক অবস্থানের ক্রমাবনতি এবং আদিবাসীদের প্রান্তিকীকরণের প্রক্রিয়াটিও এই সাহিত্যধারার স্তরভিত্তিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট ধরা পড়ে।

অতএব, আধুনিক ইতিহাসচেতনা ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদিতার নিরীখে বৈদিক সংহিতাগুলোর বিচার হওয়া প্রয়োজন সমস্ত পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক অতিকথন মুক্ত করে। এটি কোনো স্বর্ণযুগের মহাকাব্য নয়, বরং শ্রেণিভেদহীন আদিম সাম্যবাদী কাঠামো ভেঙে কীভাবে শ্রেণি, বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক একটি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো (Patriarchal Structure) স্থায়ী রূপ নিয়েছিল – তারই গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রমাণ। এই গ্রন্থগুলোর প্রকৃত মূল্য এদের তথাকথিত পবিত্রতায় নয়, বরং এদের ঐতিহাসিক বাস্তবতায়। মানবজাতির প্রাচীন বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস, ক্ষমতার মিথস্ক্রিয়া এবং বস্তুগত জীবনের টানাপোড়েন বুঝতে হলে এই সাহিত্যকে একটি জটিল কিন্তু সম্পূর্ণ মানবিক ও ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ব্যবচ্ছেদ করাই বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত পথ।

তথ্যসূত্র

  • Allchin, B., & Allchin, R. (1982). The Rise of Civilization in India and Pakistan. Cambridge University Press.
  • Altekar, A. S. (1949). State and Government in Ancient India. Motilal Banarsidass.
  • Altekar, A. S. (1956). The Position of Women in Hindu Civilization: From Prehistoric Times to the Present Day (2nd ed.). Motilal Banarsidass.
  • Altekar, A. S. (1958). State and Government in Ancient India (3rd ed.). Motilal Banarsidass.
  • Anthony, D. W. (2007). The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World. Princeton University Press.
  • Arnold, E. V. (1905). Vedic Metre in its Historical Development. Cambridge University Press.
  • Ayyangar, R. R. (1972). History of South Indian (Carnatic) Music: From Vedic Times to the Present. Published by author.
  • Bakels, C. C. (2003). The Contents of Ceramic Vessels in the Gonur Sanctuary: Evidence for Plant Extracts. Antiquity, 77(296), 282–289.
  • Barua, B. M. (1921). A History of Pre-Buddhistic Indian Philosophy. University of Calcutta.
  • Basham, A. L. (1954). The Wonder That Was India: A Survey of the Culture of the Indian Sub-Continent Before the Coming of the Muslims. Sidgwick & Jackson.
  • Bender, H. H. (1921). The Suffix -ka- in Skt., Avestan and Old Persian. Princeton University Press.
  • Benfey, T. (1848). Die Hymnen des Sâma-Veda. F. A. Brockhaus.
  • Bergaigne, A. (1973). Vedic Religion According to the Hymns of the Rigveda (V. G. Paranjpe, Trans.; 4 vols.). Motilal Banarsidass.
  • Bhan, S. (1975). Excavations at Mitathal (1968) and Other Explorations in the Sutlej-Yamuna Divide. Kurukshetra University.
  • Bhargava, M. L. (1964). The Geography of Ṛgvedic India: A Physical Geography of the Country as Depicted in the Ṛgveda. The Upper India Publishing House.
  • Bhattacharji, S. (1970). The Indian Theogony: A Comparative Study of Indian Mythology from the Vedas to the Purāṇas. Cambridge University Press.
  • Bhattacharji, S. (1987). Literature in the Vedic Age (Vol. 1). K. P. Bagchi & Company.
  • Bhattacharya, D. (1997). The Paippalādasaṃhitā of the Atharvaveda: Volume One, Consisting of the First Fifteen Kāṇḍas. The Asiatic Society.
  • Bhattacharyya, N. N. (1975). Ancient Indian Rituals and Their Social Contents. Manohar Book Service.
  • Bloch, J. (1965). Indo-Aryan: From the Vedas to Modern Times (A. Master, Trans.). Librairie Adrien-Maisonneuve.
  • Bloomfield, M. (1899). The Atharvaveda and the Gopatha-Brāhmaṇa. Verlag von Karl J. Trübner.
  • Bloomfield, M. (1908). The Religion of the Veda: The Ancient Religion of India (From Rig-Veda to Upanishads). G. P. Putnam’s Sons.
  • Bodewitz, H. W. (1994). Life After Death in the Ṛgveda Saṃhitā. Wiener Zeitschrift für die Kunde Südasiens, 38, 23–41.
  • Bopp, F. (1816). Über das Conjugationssystem der Sanskritsprache in Vergleichung mit jenem der griechischen, lateinischen, persischen und germanischen Sprache. Andreäischen Buchhandlung.
  • Bremmer, J. N. (2007). The Strange World of Human Sacrifice. In J. N. Bremmer (Ed.), The Strange World of Human Sacrifice (pp. 1–9). Peeters Publishers.
  • Brereton, J. P. (1981). The Ṛgvedic Ādityas. American Oriental Society.
  • Bronkhorst, J. (2007). Greater Magadha: Studies in the Culture of Early India. Brill.
  • Brown, W. N. (1965). Theories of Creation in the Rig Veda. Journal of the American Oriental Society, 85(1), 23–34.
  • Bryant, E. (2001). The Quest for the Origins of Vedic Culture: The Indo-Aryan Migration Debate. Oxford University Press.
  • Bühler, G. (1894). The Roots of the Āpastamba-Dharmasūtra. The Indian Antiquary, 23, 241–249.
  • Burnell, A. C. (1876). The Ārsheyabrāhmaṇa: Being the Fourth Brāhmaṇa of the Sāma Veda. Basel Mission Press.
  • Burrow, T. (1955). The Sanskrit Language. Faber and Faber.
  • Caland, W. (1896). Die altindischen Todten- und Bestattungsgebräuche. Verhandelingen der Koninklijke Akademie van Wetenschappen.
  • Caland, W. (1903). Über das rituelle Sūtra des Baudhāyana. F. A. Brockhaus.
  • Caland, W., & Henry, V. (1906). L’Agniṣṭoma: Description complète de la forme normale du sacrifice de Soma dans le culte védique (2 vols.). Ernest Leroux.
  • Cerulli, A. (2012). Somatic Lessons: Narrating Patienthood and Illness in Indian Medical Literature. State University of New York Press.
  • Chakrabarti, D. K. (1992). The Early Use of Iron in India. Oxford University Press.
  • Chakravarti, U. (1987). The Social Dimensions of Early Buddhism. Oxford University Press.
  • Chakravarti, U. (1993). Conceptualising Brahmanical Patriarchy in Early India: Gender, Caste, Class and State. Economic and Political Weekly, 28(14), 579–585.
  • Chanana, D. R. (1960). Slavery in Ancient India: As Depicted in Sanskrit and Pali Texts. People’s Publishing House.
  • Charpentier, J. (1927). The Meaning and Origin of the Vedic Dīkṣā. Bulletin of the School of Oriental Studies, 4(3), 547–565.
  • Chatterji, S. K. (1926). The Origin and Development of the Bengali Language. Calcutta University Press.
  • Chattopadhyaya, D. (1959). Lokāyata: A Study in Ancient Indian Materialism. People’s Publishing House.
  • Chattopadhyaya, D. (1977). Science and Society in Ancient India. Research India Publications.
  • Childe, V. G. (1926). The Aryans: A Study of Indo-European Origins. Kegan Paul, Trench, Trubner & Co.
  • Clark, M. (2017). The Tawny One: Soma, Haoma and Ayahuasca. Muswell Hill Press.
  • Clooney, F. X. (1990). Thinking Ritualistically: Rediscovering the Pūrva Mīmāṃsā of Jaimini. E. Forsten.
  • Coward, H. (1988). Sacred Word and Sacred Text: Scripture in World Religions. Orbis Books.
  • Dandekar, R. N. (1979a). Vedic Mythological Studies. Ajanta Publications.
  • Dandekar, R. N. (1979b). Vedic Mythological Tracts. Ajanta Publications.
  • Das, R. P. (2003). The Origin of the Life of a Human Being: Conception and the Female According to Ancient Indian Medical and Sexological Literature. Motilal Banarsidass.
  • Das, S. R. (1928). The Seasonal Feast of the Ancient Aryans and the Age of the Rigveda. The Indian Historical Quarterly, 4(2), 275–285.
  • Dasgupta, S. (1922). A History of Indian Philosophy (Vols. 1–2). Cambridge University Press.
  • Deshpande, M. M. (1995). Vedic Aryans, Non-Vedic Aryans, and Non-Aryans: Judging the Linguistic Evidence of the Ṛgveda. In G. Erdosy (Ed.), The Indo-Aryans of Ancient South Asia: Language, Material Culture and Ethnicity (pp. 67–84). Walter de Gruyter.
  • Deussen, P. (1906). The Philosophy of the Upanishads (A. S. Geden, Trans.). T. & T. Clark.
  • Doniger, W. (1981). The Rig Veda: An Anthology. Penguin Books.
  • Doniger, W. (1999). Splitting the Difference: Gender and Myth in Ancient Greece and India. University of Chicago Press.
  • Doniger O’Flaherty, W. (1980). Women, Androgynes, and Other Mythical Beasts. University of Chicago Press.
  • Drekmeier, C. (1962). Kingship and Community in Early India. Stanford University Press.
  • Dumézil, G. (1958). L’Idéologie tripartie des Indo-Européens. Latomus.
  • Dutt, R. C. (1889). A History of Civilization in Ancient India: Based on Sanscrit Literature (Vol. 1). Thacker, Spink and Co.
  • Edgerton, F. (1965). The Beginnings of Indian Philosophy: Selections from the Rig Veda, Atharva Veda, Upanisads, and Mahabharata. Harvard University Press.
  • Eggeling, J. (1882). The Śatapatha-Brāhmaṇa: According to the Text of the Mādhyandina School (Sacred Books of the East, Vol. 12). Clarendon Press.
  • Eliade, M. (1958). Patterns in Comparative Religion (R. Sheed, Trans.). Sheed & Ward.
  • Elizarenkova, T. Y. (1995). Language and Style of the Vedic Ṛṣis (W. Doniger, Ed.). State University of New York Press.
  • Emeneau, M. B. (1956). India as a Linguistic Area. Language, 32(1), 3–16.
  • Erdosy, G. (1995). The Prelude to Urbanization: Ethnicity and the Rise of Late Vedic Chiefdoms. In F. R. Allchin (Ed.), The Archaeology of Early Historic South Asia: The Emergence of Cities and States (pp. 75–98). Cambridge University Press.
  • Erdosy, G. (Ed.). (1995). The Indo-Aryans of Ancient South Asia: Language, Material Culture and Ethnicity. Walter de Gruyter.
  • Faddegon, B. (1927). The Musical Scales of the Gāṇa-Veda. Verhandelingen der Koninklijke Akademie van Wetenschappen.
  • Falk, H. (1989). Soma I and II. Bulletin of the School of Oriental and African Studies, 52(1), 77–90.
  • Felber, E. (1912). Die indische Musik der vedischen und der klassischen Zeit. Alfred Hölder.
  • Flattery, D. S., & Schwartz, M. (1989). Haoma and Harmaline: The Botanical Identity of the Indo-Iranian Sacred Hallucinogen, “Soma” and its Legacy in Religion, Language, and Middle Eastern Folklore. University of California Press.
  • Frauwallner, E. (1973). History of Indian Philosophy: The Philosophy of the Veda and of the Epic and the Buddha and the Jina (Vol. 1; V. M. Bedekar, Trans.). Motilal Banarsidass.
  • Frazer, J. G. (1922). The Golden Bough: A Study in Magic and Religion. Macmillan and Co.
  • Geertz, C. (1980). Negara: The Theatre State in Nineteenth-Century Bali. Princeton University Press.
  • Gershevitch, I. (1974). An Iranianist’s View of the Soma Controversy. In P. Gignoux & A. Tafazzoli (Eds.), Mémorial Jean de Menasce (pp. 45–75). Imprimerie Orientaliste.
  • Ghosh, A. (1973). The City in Early Historical India. Indian Institute of Advanced Study.
  • Ghosh, B. K. (1951). The Aryan Problem. In R. C. Majumdar & A. D. Pusalker (Eds.), The History and Culture of the Indian People: The Vedic Age (Vol. 1, pp. 201–217). George Allen & Unwin.
  • Ghosh, M. (1938). Pāṇinīya Śikṣā: Or The Śikṣā-Vedāṅga Ascribed to Pāṇini. University of Calcutta.
  • Ghoshal, U. N. (1959). A History of Indian Political Ideas: The Ancient Period and the Period of Transition to the Middle Ages. Oxford University Press.
  • Gonda, J. (1959). Stylistic Repetition in the Veda. N.V. Noord-Hollandsche Uitgevers Maatschappij.
  • Gonda, J. (1966). Loka: World and Heaven in the Veda. N.V. Noord-Hollandsche Uitgevers Maatschappij.
  • Gonda, J. (1975). Vedic Literature: (Saṃhitās and Brāhmaṇas) (A History of Indian Literature, Vol. 1, Fasc. 1). Otto Harrassowitz Verlag.
  • Gonda, J. (1980). Vedic Ritual: The Non-Solemn Rites. E. J. Brill.
  • Goody, J. (1987). The Interface Between the Written and the Oral. Cambridge University Press.
  • Grierson, G. A. (1903). Linguistic Survey of India: Vol. V. Indo-Aryan Family, Eastern Group. Office of the Superintendent of Government Printing.
  • Grierson, G. A. (1927). Linguistic Survey of India: Vol. 1, Part 1. Introductory. Government of India Central Publication Branch.
  • Griffiths, A. (2009). The Paippalādasaṃhitā of the Atharvaveda: Kāṇḍas 6 and 7. Brill.
  • Habib, I. (2002). The Indus Civilization: Including Other Copper Age Cultures and the History of Language Change till 1500 B.C. (A People’s History of India, Vol. 2). Tulika Books.
  • Habib, I., & Thakur, V. K. (2003). The Vedic Age: And the Coming of Iron, c. 1500–700 BC. Tulika Books.
  • Halbfass, W. (1991). Tradition and Reflection: Explorations in Indian Thought. State University of New York Press.
  • Haug, M. (1863). The Aitareya Brahmanam of the Rigveda: Containing the Earliest Speculations of the Brahmans on the Meaning of the Sacrificial Prayers (Vol. 1). Government Central Book Depot.
  • Heesterman, J. C. (1957). The Ancient Indian Royal Consecration: The Rājasūya According to the Yajuṣ Texts. Mouton & Co.
  • Heesterman, J. C. (1985). The Inner Conflict of Tradition: Essays on Indian Ritual, Kingship, and Society. University of Chicago Press.
  • Heesterman, J. C. (1993). The Broken World of Sacrifice: An Essay in Ancient Indian Ritual. University of Chicago Press.
  • Hillebrandt, A. (1897). Ritual-Litteratur: Vedische Opfer und Zauber. Karl J. Trübner.
  • Hock, H. H. (1991). Principles of Historical Linguistics (2nd ed.). Mouton de Gruyter.
  • Hopkins, E. W. (1895). The Religions of India. Ginn & Company.
  • Houben, J. E. M. (2003). The Soma-Haoma Problem: Introductory Overview and Observations on the Discussion. Electronic Journal of Vedic Studies, 9(1), 1–16.
  • Houben, J. E. M. (Ed.). (1997). The Ideology and Status of Sanskrit: Contributions to the History of the Sanskrit Language. E. J. Brill.
  • Howard, W. (1977). Samavedic Chant. Yale University Press.
  • Hubert, H., & Mauss, M. (1899). Essai sur la nature et la fonction du sacrifice. L’Année Sociologique, 2, 29–138.
  • Hubert, H., & Mauss, M. (1964). Sacrifice: Its Nature and Function (W. D. Halls, Trans.). University of Chicago Press.
  • Inden, R. (1990). Imagining India. Basil Blackwell.
  • Jacobi, H. (1894). On the Date of the Ṛgveda. The Indian Antiquary, 23, 154–159.
  • Jaiswal, S. (1981a). Caste: Origin, Function and Dimensions of Change. Manohar Publications.
  • Jaiswal, S. (1981b). Women in Early India: Problems and Perspectives. Proceedings of the Indian History Congress, 42, 54–60.
  • Jamison, S. W. (1996). Sacrificed Wife / Sacrificer’s Wife: Women, Ritual, and Hospitality in Ancient India. Oxford University Press.
  • Jamison, S. W., & Brereton, J. P. (2014). The Rigveda: The Earliest Religious Poetry of India (3 vols.). Oxford University Press.
  • Jayaswal, K. P. (1924). Hindu Polity: A Constitutional History of India in Hindu Times. Butterworth & Co.
  • Jha, D. N. (2002). The Myth of the Holy Cow. Verso Books.
  • Jha, V. N. (1987). Studies in Language, Logic and Epistemology. Pratibha Prakashan.
  • Jolly, J. (1951). Indian Medicine (C. G. Kashikar, Trans.). Munshiram Manoharlal.
  • Joshi, J. R. (1977). Some Minor Divinities in Vedic Mythology and Ritual. Deccan College Postgraduate and Research Institute.
  • Kammenhuber, A. (1968). Die Arier im Vorderen Orient. Carl Winter Universitätsverlag.
  • Kane, P. V. (1941). History of Dharmaśāstra: Ancient and Mediaeval Religious and Civil Law (Vol. 2, Pt. 2). Bhandarkar Oriental Research Institute.
  • Karttunen, K. (1989). India in Early Greek Literature. Finnish Oriental Society.
  • Kashikar, C. G. (1968). A Survey of the Śrautasūtras. University of Bombay.
  • Kaufmann, W. (1975). The Musical Notations of the Orient: Including Africa, the East and Pacific. Indiana University Press.
  • Keith, A. B. (1914). The Veda of the Black Yajus School: Entitled Taittiriya Sanhita (Harvard Oriental Series, Vols. 18 & 19). Harvard University Press.
  • Keith, A. B. (1925). The Religion and Philosophy of the Veda and Upanishads (Harvard Oriental Series, Vols. 31 & 32). Harvard University Press.
  • King, R. (1999). Indian Philosophy: An Introduction to Hindu and Buddhist Thought. Edinburgh University Press.
  • Kiparsky, P. (1979). Pāṇini as a Variationist. MIT Press.
  • Klass, M. (1980). Caste: The Emergence of the South Asian Social System. Institute for the Study of Human Issues.
  • Knipe, D. M. (1975). In the Path of the Field: An Investigation into the Ancient Indian Ritual of Ancestors. Walter de Gruyter.
  • Knipe, D. M. (2015). Vedic Voices: Intimate Narratives of a Living Andhra Tradition. Oxford University Press.
  • Kosambi, D. D. (1956). An Introduction to the Study of Indian History. Popular Book Depot.
  • Kramrisch, S. (1975). The Mahāvīra Vessel and the Plant Soma. The Journal of the American Oriental Society, 95(2), 222–235.
  • Krick, H. (1982). Das Ritual der Feuergründung (Agnyādheya) (G. Oberhammer, Ed.). Verlag der Österreichischen Akademie der Wissenschaften.
  • Krishna, D. (1991). Indian Philosophy: A Counter Perspective. Oxford University Press.
  • Kuiper, F. B. J. (1979). Varuṇa and Vidūṣaka: On the Origin of the Sanskrit Drama. North-Holland Publishing Company.
  • Kuiper, F. B. J. (1992). Aryans in the Rigveda. Rodopi.
  • Lal, B. B. (1955). Excavation at Hastināpura and Other Explorations in the Upper Gaṅgā and Sutlej Basins 1950–52. Ancient India, 10–11, 5–151.
  • Lath, M. (1978). A Study of Dattilam: A Treatise on the Sacred Music of Ancient India. Impex India.
  • Lévi, S. (1898). La doctrine du sacrifice dans les Brāhmaṇas. Ernest Leroux.
  • Lincoln, B. (1981). Priests, Warriors, and Cattle: A Study in the Ecology of Religions. University of California Press.
  • Lincoln, B. (1989). Discourse and the Construction of Society: Comparative Studies of Myth, Ritual, and Classification. Oxford University Press.
  • Lipner, J. (1994). Hindus: Their Religious Beliefs and Practices. Routledge.
  • Lord, A. B. (1960). The Singer of Tales. Harvard University Press.
  • Lubin, T. (2005). The Vedic Homa and the Standardization of Hindu Pūjā. Topics in Indological Studies, 6, 143–158.
  • Lubotsky, A. (2002). The Atharvaveda (Paippalāda) and Vedic Linguistics. International Institute for Asian Studies.
  • Lüders, H. (1951). Varuṇa I: Varuṇa und die Wasser. Vandenhoeck & Ruprecht.
  • Macdonell, A. A. (1897). Vedic Mythology. Karl J. Trübner.
  • Macdonell, A. A. (1900). A History of Sanskrit Literature. William Heinemann.
  • Macdonell, A. A. (1910). Vedic Grammar. Karl J. Trübner.
  • Macdonell, A. A. (1917). A Vedic Reader for Students. Oxford University Press.
  • Macdonell, A. A., & Keith, A. B. (1912). Vedic Index of Names and Subjects (2 vols.). John Murray.
  • Mahadevan, T. M. P. (1960). Outlines of Hinduism. Chetana.
  • Mahony, W. K. (1998). The Artful Universe: An Introduction to the Vedic Religious Imagination. State University of New York Press.
  • Majumdar, R. C. (1951). The Vedic Age: The History and Culture of the Indian People (Vol. 1). George Allen & Unwin.
  • Majumdar, R. C., & Pusalker, A. D. (Eds.). (1951). The History and Culture of the Indian People: The Vedic Age (Vol. 1). George Allen & Unwin.
  • Malamoud, C. (1996). Cooking the World: Ritual and Thought in Ancient India (D. White, Trans.). Oxford University Press.
  • Malinowski, B. (1948). Magic, Science and Religion and Other Essays. The Free Press.
  • Mallory, J. P. (1989). In Search of the Indo-Europeans: Language, Archaeology and Myth. Thames and Hudson.
  • Mallory, J. P., & Adams, D. Q. (1997). Encyclopedia of Indo-European Culture. Fitzroy Dearborn Publishers.
  • Matilal, B. K. (1986). Perception: An Essay on Classical Indian Theories of Knowledge. Oxford University Press.
  • Maurer, W. H. (1986). Pinnacles of India’s Past: Selections from the Ṛgveda. John Benjamins Publishing Company.
  • Mauss, M. (1954). The Gift: Forms and Functions of Exchange in Archaic Societies (I. Cunnison, Trans.). Cohen & West.
  • Mayrhofer, M. (1966). Die Indo-Arier im alten Vorderasien. Otto Harrassowitz Verlag.
  • McIntosh, J. (2008). The Ancient Indus Valley: New Perspectives. ABC-CLIO.
  • Meulenbeld, G. J. (1999). A History of Indian Medical Literature (Vol. IA). Egbert Forsten.
  • Minkowski, C. Z. (1991). Priesthood in Ancient India: A Study of the Maitrāvaruṇa Priest. De Nobili Research Library.
  • Mohanty, J. N. (1992). Reason and Tradition in Indian Thought: An Essay on the Mind of Indian Thinking. Oxford University Press.
  • Müller, F. M. (1859). A History of Ancient Sanskrit Literature So Far as It Illustrates the Primitive Religion of the Brahmans. Williams and Norgate.
  • Müller, F. M. (1878). Lectures on the Origin and Growth of Religion as Illustrated by the Religions of India. Longmans, Green, and Co.
  • Murty, K. S. (1959). Revelation and Reason in Advaita Vedānta. Columbia University Press.
  • Nijenhuis, E. te. (1974). Indian Music: History and Structure. E. J. Brill.
  • Oberlies, T. (1998). Die Religion des Ṛgveda: Das religiöse System des Ṛgveda. De Nobili Research Library.
  • Oguibénine, B. (1998). Essays on Vedic and Indo-European Culture. Motilal Banarsidass.
  • Oldenberg, H. (1888). Metrische und textgeschichtliche Prolegomena zu einer kritischen Rigveda-Ausgabe. Wilhelm Hertz / Weidmannsche Buchhandlung.
  • Oldenberg, H. (1917). Die Religion des Veda (2nd ed.). J. G. Cotta’sche Buchhandlung Nachfolger.
  • Oldenberg, H. (1988). The Religion of the Veda (S. B. Shrotri, Trans.). Motilal Banarsidass.
  • Olivelle, P. (1993). The Āśrama System: The History and Hermeneutics of a Religious Institution. Oxford University Press.
  • Olivelle, P. (1998). The Early Upaniṣads: Annotated Text and Translation. Oxford University Press.
  • Ong, W. J. (1982). Orality and Literacy: The Technologizing of the Word. Methuen.
  • Otto, R. (1923). The Idea of the Holy: An Inquiry into the Non-Rational Factor in the Idea of the Divine and its Relation to the Rational (J. W. Harvey, Trans.). Oxford University Press.
  • Pande, G. C. (1972). Studies in the Origins of Buddhism (2nd ed.). Motilal Banarsidass.
  • Panikkar, R. (1977). The Vedic Experience: Mantramañjarī: An Anthology of the Vedas for Modern Man and Contemporary Celebration. University of California Press.
  • Parasher-Sen, A. (Ed.). (2004). Subordinate and Marginal Groups in Early India. Oxford University Press.
  • Parpola, A. (1968). The Śrautasūtras of Lāṭyāyana and Drāhyāyaṇa and Their Commentaries: An Investigation into the Sāma Veda Traditions. Societas Scientiarum Fennica.
  • Parpola, A. (2015). The Roots of Hinduism: The Early Aryans and the Indus Civilization. Oxford University Press.
  • Patton, L. L. (2005). Bringing the Gods to Mind: Mantra and Ritual in Early Indian Sacrifice. University of California Press.
  • Piggott, S. (1950). Prehistoric India to 1000 B.C. Penguin Books.
  • Pingree, D. (1973). The Mesopotamian Origin of Early Indian Mathematical Astronomy. Journal for the History of Astronomy, 4(1), 1–12.
  • Pollock, S. (2006). The Language of the Gods in the World of Men: Sanskrit, Culture, and Power in Premodern India. University of California Press.
  • Possehl, G. L. (2002). The Indus Civilization: A Contemporary Perspective. AltaMira Press.
  • Potter, K. H. (Ed.). (1981). Encyclopedia of Indian Philosophies: Vol. 3. Advaita Vedānta up to Śaṃkara and His Pupils. Princeton University Press.
  • Radhakrishnan, S. (1923). Indian Philosophy (Vol. 1). George Allen & Unwin.
  • Raghu Vira. (1932). Kapiṣṭhala-Kaṭha-Saṃhitā: A Text of the Black Yajurveda. Meharchand Lachhmandas.
  • Raja, K. K. (1963). Indian Theories of Meaning. Adyar Library and Research Centre.
  • Ranade, H. G. (1978). Kātyāyana Śrautasūtra: Rules for the Vedic Sacrifices. H. G. Ranade.
  • Ratnagar, S. (1995). Archaeological Perspectives on Early Indian Societies. In R. Thapar (Ed.), Recent Perspectives of Early Indian History (pp. 1–44). Popular Prakashan.
  • Ratnagar, S. (2004). Trading Encounters: From the Euphrates to the Indus in the Bronze Age. Oxford University Press.
  • Rau, W. (1957). Staat und Gesellschaft im alten Indien: Nach den Brāhmaṇa-Texten dargestellt. Kommissionsverlag Franz Steiner / Alfred Töpelmann.
  • Raychaudhuri, H. C. (1953). Political History of Ancient India: From the Accession of Parikshit to the Extinction of the Gupta Dynasty (6th ed.). University of Calcutta.
  • Renfrew, C. (1987). Archaeology and Language: The Puzzle of Indo-European Origins. Jonathan Cape.
  • Renou, L. (1947). Les écoles védiques et la formation du Veda. Imprimerie Nationale.
  • Renou, L. (1953). Religions of Ancient India. Athlone Press.
  • Renou, L. (1956). Hymnes spéculatifs du Véda. Gallimard.
  • Renou, L. (1957). Vedic India (P. Spratt, Trans.). Susil Gupta.
  • Roth, R., & Whitney, W. D. (1856). Atharva Veda Sanhita (Vol. 1). Ferd. Dümmler’s Verlagsbuchhandlung.
  • Rowell, L. (1992). Music and Musical Thought in Early India. University of Chicago Press.
  • Roy, K. (1994). The Emergence of Monarchy in North India, Eighth-Fourth Centuries B.C.: As Reflected in the Brahmanical Tradition. Oxford University Press.
  • Ruben, W. (1954). Die Philosophie der Upanishaden. A. Francke AG Verlag.
  • Sarianidi, V. (2003). Margiana and Soma-Haoma. Electronic Journal of Vedic Studies, 9(1), 53–73.
  • Scharfe, H. (1977). Grammatical Literature (A History of Indian Literature, Vol. 5, Fasc. 2). Otto Harrassowitz Verlag.
  • Scharfe, H. (1989). The State in Indian Tradition. E. J. Brill.
  • Scharfe, H. (2002). Education in Ancient India. Brill.
  • Schmidt, H.-P. (1968). Bṛhaspati und Indra: Untersuchungen zur indogermanischen Mythologie und zum Rigveda. Otto Harrassowitz.
  • Selby, M. A. (2005). Representations of the Contagious Disease in the Atharvaveda. In K. G. Zysk (Ed.), Medical Literature from India, Sri Lanka and Tibet (pp. 45–62). Brill.
  • Sen, C. (1978). A Dictionary of the Vedic Rituals: Based on the Śrauta and Gṛhya Sūtras. Concept Publishing Company.
  • Sen, S. (1958). History and Pre-History of Sanskrit. University of Calcutta / University of Mysore.
  • Shaffer, J. G. (1984). The Indo-Aryan Invasions: Cultural Myth and Archaeological Reality. In J. R. Lukacs (Ed.), The People of South Asia: The Biological Anthropology of India, Pakistan, and Nepal (pp. 77–112). Plenum Press.
  • Sharma, B. R. (Ed.). (1965). Sāmavidhāna Brāhmaṇa: With the Commentaries of Sāyaṇa and Bharatasvāmin. Kendriya Sanskrit Vidyapeetha.
  • Sharma, R. S. (1983a). Aspects of Political Ideas and Institutions in Ancient India (3rd ed.). Motilal Banarsidass.
  • Sharma, R. S. (1983b). Material Culture and Social Formations in Ancient India. Macmillan India.
  • Sharma, R. S. (1991). Aspects of Political Ideas and Institutions in Ancient India (3rd ed.). Motilal Banarsidass.
  • Sharma, R. S. (1996). The State and Varna Formation in the Mid-Ganga Plains: An Ethnoarchaeological View. Manohar Publishers.
  • Shende, N. J. (1952). The Religion and Philosophy of the Atharvaveda. Bhandarkar Oriental Research Institute.
  • Simon, R. (1908). Das Pañcavidhasūtra. Otto Harrassowitz.
  • Singh, U. (2008). A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century. Pearson Longman.
  • Sircar, D. C. (1971). Studies in the Religious Life of Ancient and Medieval India. Motilal Banarsidass.
  • Smith, B. K. (1989). Reflections on Resemblance, Ritual, and Religion. Oxford University Press.
  • Smith, B. K. (1994). Classifying the Universe: The Ancient Indian Varṇa System and the Origins of Caste. Oxford University Press.
  • Southworth, F. C. (2005). Linguistic Archaeology of South Asia. RoutledgeCurzon.
  • Spellman, J. W. (1964). Political Theory of Ancient India: A Study of Kingship from the Earliest Times to Circa A.D. 300. Clarendon Press.
  • Srinivasan, D. (1997). Many Heads, Arms, and Eyes: Origin, Meaning, and Form of Multiplicity in Indian Art. Brill.
  • Staal, F. (1983). Agni: The Vedic Ritual of the Fire Altar (Vols. 1–2). Asian Humanities Press.
  • Staal, F. (1986). The Fidelity of Oral Tradition and the Origins of Science. North-Holland Publishing Company.
  • Staal, F. (1989). Rules Without Meaning: Ritual, Mantras and the Human Sciences. Peter Lang.
  • Stein, A. (1942). A Survey of Ancient Sites Along the “Lost” Sarasvati River. The Geographical Journal, 99(4), 173–182.
  • Thakur, V. K. (1989). Social Dimensions of Technology: Iron in Early India. People’s Book House.
  • Thapar, R. (1984). From Lineage to State: Social Formations in the Mid-First Millennium B.C. in the Ganga Valley. Oxford University Press.
  • Thapar, R. (2000). From Lineage to State: Social Formations in the Mid-First Millennium B.C. in the Ganga Valley (2nd ed.). Oxford University Press.
  • Thapar, R. (2002). Early India: From the Origins to AD 1300. University of California Press.
  • Thieme, P. (1952). Bráhman: Untersuchungen zum Problem des Schöpferischen im Rigveda. Otto Harrassowitz.
  • Thieme, P. (1960). The ‘Aryan’ Gods of the Mitanni Treaties. Journal of the American Oriental Society, 80(4), 301–317.
  • Thite, G. U. (1975). Sacrifice in the Brāhmaṇa-Texts. University of Poona.
  • Thompson, G. (1997). The Brahmodya and Vedic Discourse. Journal of the American Oriental Society, 117(1), 13–37.
  • Thompson, G. (2003). Soma and Ecstasy in the Ṛgveda. Electronic Journal of Vedic Studies, 9(1), 74–92.
  • Tilak, B. G. (1893). The Orion, or, Researches into the Antiquity of the Vedas. Mrs. Radhabai Atmaram Sagoon.
  • Trautmann, T. R. (1971). Kauṭilya and the Arthaśāstra: A Statistical Investigation of the Authorship and Evolution of the Text. E. J. Brill.
  • Trautmann, T. R. (1981). Dravidian Kinship. Cambridge University Press.
  • Trautmann, T. R. (1997). Aryans and British India. University of California Press.
  • Tripathi, V. (2001). The Age of Iron in South Asia: Legacy and Tradition. Aryan Books International.
  • Valdiya, K. S. (2002). Saraswati: The River That Disappeared. Universities Press.
  • van der Hoogt, J. M. (1929). The Vedic Chant Studied in its Textual and Melodic Form. H. J. Paris.
  • van Nooten, B. A. (1980). The Structure of the Kāṭhaka Saṃhitā. Journal of the American Oriental Society, 100(3), 329–335.
  • van Nooten, B. A. (1994). Origin and Development of the Vedic Metrical System. Electronic Journal of Vedic Studies, 1(1), 1–18.
  • Varma, S. (1929). Critical Studies in the Phonetic Observations of Indian Grammarians. The Royal Asiatic Society.
  • Velankar, H. D. (1963). Ṛksūktaśatī: Selected Hymns from the Ṛgveda with English Translation and Critical Notes. Bharatiya Vidya Bhavan.
  • von Schroeder, L. (1881–1886). Maitrāyaṇī Saṃhitā (Vols. 1–4). F. A. Brockhaus.
  • Wackernagel, J. (1896). Altindische Grammatik: Lautlehre (Band 1). Vandenhoeck & Ruprecht.
  • Wasson, R. G. (1968). Soma: Divine Mushroom of Immortality. Harcourt Brace Jovanovich.
  • Watkins, C. (1995). How to Kill a Dragon: Aspects of Indo-European Poetics. Oxford University Press.
  • Weber, A. (1852a). Akademische Vorlesungen über indische Literaturgeschichte. Ferd. Dümmler’s Verlagsbuchhandlung.
  • Weber, A. (1852b). The Vājasaneyi-Sanhitā in the Mādhyandina- and the Kāṇva-Śākhā with the Commentary of Mahīdhara. Ferd. Dümmler’s Verlagsbuchhandlung.
  • Weber, A. (1878). The History of Indian Literature (J. Mann & T. Zachariae, Trans.). Trübner & Co.
  • Weber, M. (1922). Religionssoziologie (The Sociology of Religion). J. C. B. Mohr.
  • West, M. L. (2007). Indo-European Poetry and Myth. Oxford University Press.
  • Whitney, W. D. (1893). On the Date of the Rig-Veda. Journal of the American Oriental Society, 16, lxxxii–xc.
  • Whitney, W. D., & Lanman, C. R. (1905). Atharva-Veda Samhitā: Translated with a Critical and Exegetical Commentary (Harvard Oriental Series, Vols. 7 & 8). Harvard University Press.
  • Widdess, R. (1995). The Rāgas of Early Indian Music: Modes, Melodies and Musical Notations from the Gupta Period to c. 1250. Oxford University Press.
  • Winternitz, M. (1907). Geschichte der indischen Litteratur (Band 1). C. F. Amelangs Verlag.
  • Winternitz, M. (1927). A History of Indian Literature: Introduction, Veda, National Epics, Purāṇas, and Tantras (S. Ketkar, Trans.; Vol. 1). University of Calcutta.
  • Witzel, M. (1989). Tracing the Vedic Dialects. In C. Caillat (Ed.), Dialectes dans les littératures indo-aryennes (pp. 97–265). Institut de Civilisation Indienne.
  • Witzel, M. (1995). Early Sanskritization: Origins and Development of the Kuru State. Electronic Journal of Vedic Studies, 1(4), 1–26.
  • Witzel, M. (1997). The Development of the Vedic Canon and its Schools: The Social and Political Milieu. In M. Witzel (Ed.), Inside the Texts, Beyond the Texts: New Approaches to the Study of the Vedas (Harvard Oriental Series, Opera Minora, Vol. 2, pp. 257–345). Department of Sanskrit and Indian Studies, Harvard University.
  • Wujastyk, D. (2003). The Roots of Ayurveda: Selections from Sanskrit Medical Writings. Penguin Books.
  • Yadava, B. N. S. (1973). Society and Culture in Northern India in the Twelfth Century. Central Book Depot.
  • Zehnder, T. (1999). Zur Kṛtyā im Atharvaveda: Ein Beitrag zur Erforschung des altindischen Zaubers. Peter Lang.
  • Zimmer, H. (1948). Hindu Medicine. Johns Hopkins Press.
  • Zysk, K. G. (1991). Asceticism and Healing in Ancient India: Medicine in the Buddhist Monastery. Oxford University Press.
  • Zysk, K. G. (1998). Medicine in the Veda: Religious Healing in the Veda. Motilal Banarsidass.

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.