মাদক, অপরাধ, ইতিহাস, ধর্ম ও সমাজ (Drugs, Crime, History, Religion and Society) খণ্ড ২: মাদক নিয়ন্ত্রণ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা
ভূমিকা
মানব সভ্যতার বিবর্তন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশের সাথে মনঃসক্রিয় পদার্থ (psychoactive substances) ব্যবহারের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাসায়নিক ও উদ্ভিজ্জ যৌগের মাধ্যমে মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র ও বোধের পরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন জৈবিক ঘটনা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতি (political economy), সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ (social control) ব্যবস্থার এক জটিল প্রতিফলন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বিভিন্ন মানবীয় সংস্কৃতিতে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার বিদ্যমান ছিল, যা পরবর্তীতে সংগঠিত ধর্মের উত্থানের সাথে সাথে আচারগত ও পুরোহিততান্ত্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে পরিণত হয়। নৃবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকদের বস্তুবাদী বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেখায় যে, প্রাকৃতিক উদ্ভিদের প্রতি তথাকথিত পবিত্রতা বা অপবিত্রতার ধারণা চাপিয়ে দেওয়া আসলে সমাজকে শাসন ও নৈতিকভাবে শৃৃঙ্খলিত করার প্রাচীন কৌশল। আধুনিক যুগে এই কৌশলটি রূপান্তরিত হয়ে আন্তর্জাতিক আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের রূপ ধারণ করেছে। উনিশ ও বিশ শতকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র (nation-state) ব্যবস্থার বিকাশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের কাঠামোগত রূপান্তরের ফলে উদ্ভিজ্জ উপাদানের উৎপাদন ও বিপণন সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং পুঁজিবাদী স্বার্থের সাথে যুক্ত হয়। ইতিহাসবিদ ডেভিড কোর্টরাইট তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে আফিম বা কোকার মতো উপাদান ঔপনিবেশিক বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের হাতিয়ার থেকে পরবর্তীতে রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারির আওতায় আসে।
মাদকের তথাকথিত বৈধতা ও অবৈধতার বিভাজন কখনোই কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক বা স্বাস্থ্যগত যুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং এটি মূলত ক্ষমতা কাঠামোর একটি সমাজতাত্ত্বিক বিনির্মাণ (sociological construction)। সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেনের তত্ত্ব অনুযায়ী, শাসকগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই পরিকল্পিত নৈতিক উন্মাদনা (moral panic) তৈরির মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের ব্যবহৃত পদার্থকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখে। এই প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মসমূহ সবসময়ই রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞাকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার কাজ করেছে, যেখানে জটিল স্নায়বিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ‘পাপ’ বা ‘নৈতিক স্খলন’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গড়ে ওঠা প্রাথমিক উদ্যোগগুলো এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত মাদক নিয়ন্ত্রণ (drug control) চুক্তিগুলো এই নৈতিকতাবাদী ও বৈষম্যমূলক ধারণাকেই বৈশ্বিক আইনে রূপ দিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক কাঠামো বিজ্ঞানসম্মত জনস্বাস্থ্য (public health) নীতির বদলে একটি দমনমূলক ও দণ্ডমূলক বিচারব্যবস্থা (punitive justice system) বিশ্বব্যাপী চাপিয়ে দেয়, যার পরিণতিতে স্বাস্থ্যগত সমস্যাটি একটি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার এই কঠোর নীতিমালার প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে জন্ম নিয়েছে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত সংঘবদ্ধ অপরাধ (organized crime) নেটওয়ার্ক। নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম ঘাটতি এবং অপরিসীম মুনাফার সুযোগ আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র, মাফিয়া সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়েছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল কিংবা গোল্ডেন ক্রিসেন্টের মতো অঞ্চলগুলোতে মাদক উৎপাদন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ কেবল কোনো সাধারণ আইনভঙ্গের ঘটনা নয়, এটি আন্তর্জাতিক কালোবাজার অর্থনীতি (illicit market economy) এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফলাফল। লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে মাদক চোরাচালানের এই প্রবাহ সরাসরি সহিংসতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ইন্ধন হিসেবে কাজ করছে। এই গ্রন্থে কোনো ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক অস্পষ্টতা, অপ্রমাণিত আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা কিংবা অন্ধ নৈতিকতাবাদী প্রচারণাকে বর্জন করে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ, ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবস্থা, অপরাধ অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পারস্পরিক সংঘাতকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। ক্ষমতা, পুঁজি এবং রাসায়নিক পদার্থের এই ত্রিমুখী সংযোগকে বস্তুনিষ্ঠভাবে উন্মোচন করাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।
মাদক নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক ইতিহাস (History of International Drug Control): নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক শাসন
মাদকের বৈধতা ও অবৈধতার বিতর্ক (Debates on Legality and Illegality of Drugs): নীতি ও দর্শন
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও দৈহিক সার্বভৌমত্ব (Libertarianism and Bodily Sovereignty)
মানুষ যখন কোনো রাসায়নিক পদার্থ নিজের শরীরে প্রবেশ করায়, তখন ঠিক কার ক্ষতি হয়? এই প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। তবে আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন ও আইনশাস্ত্রের কাছে এটা এক জটিল প্রশ্নের জন্ম দেয়। নিজের দেহের ওপর একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের অধিকার কতটুকু, তা নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক চলছে। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার ক্লাসিক গ্রন্থ অন লিবার্টি (On Liberty)-তে একটি বিশেষ সীমানা চিহ্নিত করেছিলেন। মিল যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সমাজের একমাত্র উদ্দেশ্য তখনই কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার পায়, যখন সেই ব্যক্তি অন্য কারও ক্ষতি করতে উদ্যত হয়। মিলের এই তত্ত্বটি দর্শনের জগতে “ক্ষতি নীতি (Harm Principle)” নামে পরিচিত লাভ করে। নিজের ভালো বা মন্দের বিবেচনায় কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করতে বাধ্য করা রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। মিলের মতে, নিজের শরীর ও মনের ওপর ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব প্রশ্নাতীত (Mill, 1859)।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ হলো আত্ম-মালিকানার ধারণা। বিশ শতকের রাজনৈতিক দার্শনিক রবার্ট নোজিক (Robert Nozick) ১৯৭৪ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ অ্যানার্কি, স্টেট অ্যান্ড ইউটোপিয়া (Anarchy, State, and Utopia)-তে এই ভাবনাকে আরও ধারালো রূপ দেন। নোজিকের মূল কথা ছিল আত্ম-মালিকানা (Self-Ownership)। অর্থাৎ, একজন মানুষ নিজেই নিজের শরীরের নিরঙ্কুশ মালিক। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের দেহের একমাত্র মালিক হয়, তবে সে সেই দেহে কী প্রবেশ করাবে আর কী করাবে না, তা নির্ধারণের অধিকার কেবল তারই। রাষ্ট্র যদি এসে বলে দেয় যে কোনো নির্দিষ্ট ভেষজ বা রাসায়নিক শরীরে নেওয়া অপরাধ, তবে পরোক্ষভাবে ধরে নেওয়া হয় যে নাগরিকের দেহের আসল মালিক রাষ্ট্র, ব্যক্তি নিজে নয়। নোজিক মনে করতেন, ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছায় কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে, তবে রাষ্ট্র সেখানে জোর করে অভিভাবকের ভূমিকা নিতে পারে না (Nozick, 1974)।
মাদক গ্রহণের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী চিন্তাবিদদের মতে, সচেতন মানুষের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তার স্বাধীনতার অংশ। মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও দার্শনিক থমাস সজাস (Thomas Szasz) তার ১৯৭৪ সালের গবেষণাগ্রন্থ সেরিমোনিয়াল কেমিস্ট্রি (Ceremonial Chemistry)-তে মাদকবিরোধী যুদ্ধকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। সজাস দেখিয়েছিলেন যে, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করে ব্যক্তির পছন্দের স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে। সজাসের মতে, খাদ্য গ্রহণের স্বাধীনতার মতোই ব্যক্তির নিজের শরীরে কোনো পদার্থ নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত (Szasz, 1974)। কোনো পদার্থ আনন্দ দেয় বলে বা চেতনাকে কিছুটা শিথিল করে বলেই রাষ্ট্র তাকে নিষিদ্ধ করতে পারে না। যদি একজন পর্বতারোহী জেনেশুনে বিপজ্জনক পাহাড়ে ওঠার স্বাধীনতা পায়, তবে একজন ব্যক্তি নিজের ঘরে বসে কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণের স্বাধীনতা কেন পাবে না? ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীরা মনে করেন, রাষ্ট্র যখন ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দকে অপরাধের তালিকায় ফেলে দেয়, তখন নাগরিকের মৌলিক মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ হয়।
অবশ্য এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী যুক্তির একটি গভীর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা অনেক গবেষক তুলে ধরেন। দার্শনিক জেরাল্ড ডোয়ার্কিন (Gerald Dworkin) দেখিয়েছেন যে, আসক্তি মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেই ধ্বংস করে দেয় (Dworkin, 1988)। যখন একজন ব্যক্তি কোনো তীব্র রাসায়নিকে চরমভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তার কাজগুলোকে আর মুক্ত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বলা চলে না। সে তখন রাসায়নিকের দাস হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মিল যে যুক্তিবাদী ও স্বাধীন মানুষের কল্পনা করেছিলেন, তীব্র আসক্তির শিকার মানুষ সেই সংজ্ঞার বাইরে চলে যায়। আসক্ত ব্যক্তি নিজের অজান্তেই ভবিষ্যৎ স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেয়। এই কারণে অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন, ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই কখনো কখনো রাষ্ট্রের তরফ থেকে কিছু মাদক নিষিদ্ধ করা দরকার। তবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীরা এর জবাবে বলেন, মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা না থাকলে তাকে আসলে কোনো স্বাধীনতাই দেওয়া হয় না।
হিতবাদ ও সামগ্রিক উপযোগিতার হিসাব (Utilitarianism and the Calculus of Public Good)
আইন ও দর্শনের আরেক শক্তিশালী ধারা হলো উপযোগিতাবাদ। এই দর্শনের প্রবক্তা জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham) ১৭৮৯ সালে তার গ্রন্থ অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য প্রিন্সিপলস অব মোরালস অ্যান্ড লেজিসলেশন (An Introduction to the Principles of Morals and Legislation)-এ দেখিয়েছিলেন যে, কোনো কাজের নৈতিকতা নির্ভর করে তা সমাজের সামগ্রিক আনন্দ বাড়াচ্ছে নাকি বেদনা তৈরি করছে তার ওপর (Bentham, 1789)। হিতবাদের মূল ভিত্তি হলো উপযোগিতাবাদ (Utilitarianism)। মাদকের বৈধতা বা অবৈধতার প্রশ্নটিকে হিতবাদীরা কোনো বিমূর্ত নৈতিকতার মোড়কে দেখেন না। তাদের কাছে এটা নিছক লাভ-ক্ষতির অঙ্ক। কোনো মাদক সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কতটা মঙ্গল করছে এবং তার বিপরীতে কতটা ক্ষতি ডেকে আনছে, আইনের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ঠিক সেই হিসেবের ওপর ভিত্তি করে।
মাদকের ব্যবহারে ব্যক্তি তাৎক্ষণিক আনন্দ বা তৃপ্তি পায়, যা বেন্থামের পরিভাষায় ইতিবাচক উপযোগিতা। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দের মূল্য হিসেবে সমাজকে প্রায়ই বড় ধরণের মূল্য চোকাতে হয়। স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং মাদকসেবীর পরিবারের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। ফলে সামগ্রিক উপযোগিতার পাল্লায় মাদকের বিস্তার সমাজের সুখ কমিয়ে দুঃখের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অর্থনীতিবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদরা দেখিয়েছেন, মাদক সেবন থেকে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবগুলো কেবল ব্যক্তির ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না (Kleiman, 1992)। একজন মানুষ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালালে পথচারীর জীবন বিপন্ন হয়। আবার কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে গেলে তা পুরো অর্থনীতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। উপযোগিতাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সামাজিক ক্ষতি রোধ করার জন্য রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ যুক্তিযুক্ত।
তবে উপযোগিতাবাদের যুক্তি ব্যবহার করেই কিন্তু মাদকের নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করা সম্ভব। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান (Milton Friedman) ১৯৯১ সালের এক আলোচনায় দেখিয়েছিলেন যে, মাদক নিষিদ্ধ করার ফলে সমাজে যে ক্ষতির সৃষ্টি হয়, তা মাদকের ক্ষতির চেয়েও অনেক গুণ বেশি (Friedman, 1991)। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সৃষ্টি হয় এক ভয়াবহ কালোবাজার। অবৈধ মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সশস্ত্র মাফিয়া চক্রের উত্থান ঘটে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে দুর্নীতি জেঁকে বসে এবং রাষ্ট্রকে কোটি কোটি অর্থ ব্যয় করতে হয় কারাগার ও পুলিশি ব্যবস্থার পেছনে। ফ্রিডম্যানের যুক্তি ছিল, মাদক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কারণে বিষাক্ত, ভেজাল রাসায়নিকের বিক্রি বাড়ে, যা ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যের আরও বেশি ক্ষতি করে। যদি মাদককে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বৈধ করা হতো, তবে সেই অর্থ অপরাধীদের পকেটে না গিয়ে রাষ্ট্রের রাজস্ব তহবিলে জমা হতো এবং জনস্বাস্থ্যে ব্যয় করা যেত।
সমসাময়িক নীতি দার্শনিক পিটার সিঙ্গার (Peter Singer) তার ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্রের আলোচনায় এই অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছেন (Singer, 2011)। সিঙ্গার মনে করেন, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের সময় অন্ধ কোনো সংস্কার দিয়ে চালিত হওয়া উচিত নয়। বরং বাস্তব ফলাফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যদি দেখা যায় যে শাস্তিমূলক আইন অপরাধীদের হিংস্র করে তুলছে এবং কারাগারে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের জীবন নষ্ট করছে, তবে সেই আইন সামগ্রিক সামাজিক উপযোগিতা হ্রাস করে। হিতবাদের চোখে তাই কোনো আইন চিরস্থায়ী নয়। যদি গাঁজা বা নির্দিষ্ট কিছু পদার্থের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে অপরাধ কমে, স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস পায় এবং সমাজের মোট আনন্দ বৃদ্ধি পায়, তবে হিতবাদী দর্শনে সেই নীতিই নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হবে।
আইনি নৈতিকতাবাদ ও সামাজিক সংহতি (Legal Moralism and Social Cohesion)
আইন কি সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য তৈরি, নাকি কেবল পারস্পরিক ক্ষতি আটকানোর জন্য? এই বিতর্কটি আইন দর্শনে বহুল আলোচিত। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আইনি নৈতিকতাবাদ (Legal Moralism)। এই মতবাদের প্রবক্তারা মনে করেন, সমাজের নিজস্ব কিছু সম্মিলিত নৈতিক ধারণা থাকে। কোনো কাজ যদি কারো সরাসরি ক্ষতি নাও করে, কিন্তু সমাজের সামগ্রিক নৈতিক মূল্যবোধকে আঘাত করে, তবে রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ করে তা বন্ধ করতে পারে। এই চিন্তার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হাজির করেছিলেন ব্রিটিশ বিচারক প্যাট্রিক ডেভলিন (Patrick Devlin)। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য এনফোর্সমেন্ট অব মোরালস (The Enforcement of Morals)-এ ডেভলিন দাবি করেন যে, একটি অভিন্ন নৈতিক কাঠামো ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না (Devlin, 1965)।
ডেভলিনের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সোজাসাপটা। কোনো সমাজ যেমন রাজনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা সহ্য করতে পারে না কারণ তা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে ধ্বংস করে, তেমনি নৈতিক অবক্ষয়কেও সমাজ সহ্য করতে পারে না। ডেভলিনের মতে, নৈতিকতার শিথিলতা ভেতর থেকে সমাজকাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এই ধারণাকে সমাজবিজ্ঞানে বলা হয় সামাজিক সংহতি তত্ত্ব (Social Cohesion Thesis)। মাদকাসক্তি মানুষের বিচারবুদ্ধি, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক শৃঙ্খলাকে নষ্ট করে। ফলে মাদকাসক্ত মানুষ সমাজের প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। আইনি নৈতিকতাবাদীদের দৃষ্টিতে, নেশাগ্রস্ত হওয়া কেবল একটি শারীরিক অবস্থা নয়, এটি নাগরিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী এক ধরণের বিভ্রান্তিকর চর্চা। সমাজ যদি মনে করে যে চেতনাশূন্য হয়ে থাকা একটি অনৈতিক আচরণ, তবে সেই আচরণকে দমন করার জন্য আইন প্রণয়ন করার পূর্ণ অধিকার সমাজের রয়েছে।
ডেভলিনের এই রক্ষণশীল মতবাদের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন বিশিষ্ট আইন দার্শনিক এইচ. এল. এ. হার্ট (H. L. A. Hart)। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তার যুগান্তকারী গ্রন্থ ল, লিবার্টি অ্যান্ড মোরালিটি (Law, Liberty, and Morality)-তে হার্ট দেখান যে, সমাজের সাধারণ মানুষের ঘৃণা বা বিতৃষ্ণাকে কখনোই আইন তৈরির মানদণ্ড করা যায় না (Hart, 1963)। হার্ট প্রশ্ন তোলেন, সমাজ কোনো আচরণকে খারাপ চোখে দেখে বলেই কি তা অপরাধ হয়ে যাবে? তিনি যুক্তি দেন যে নৈতিকতা কোনো স্থির বিষয় নয়, সময়ের সাথে সাথে তা পরিবর্তিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যদি ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। হার্টের মতে, ডেভলিন কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়াই ধরে নিয়েছিলেন যে ব্যক্তিগত অনৈতিক আচরণ বন্ধ না করলে পুরো সমাজ ভেঙে পড়বে। বাস্তবে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে মানুষ ঘরে বসে মাদক গ্রহণ করলে পরদিনই রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে।
আইনি নৈতিকতাবাদীরা অবশ্য আধুনিক সমাজেও তাদের যুক্তি চালিয়ে যাচ্ছেন। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim) তার ক্লাসিক সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় দেখিয়েছিলেন যে, যৌথ বিবেক বা কালেক্টিভ কনসায়েন্স দুর্বল হয়ে পড়লে সমাজে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন অ্যানোমি (Durkheim, 1893)। আইন যখন সমাজের প্রচলিত নৈতিকতাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে মাদকবিরোধী কঠোর আইনগুলো অনেক সময় অপরাধ দমনের জন্য নয়, বরং সমাজের যৌথ নৈতিকতাকে দৃশ্যমান রাখার জন্য টিকিয়ে রাখা হয়। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এই বার্তা দিতে চায় যে, নিয়ন্ত্রণহীন আনন্দ ও বাস্তবতা থেকে পলায়নকে সমাজ ভালো চোখে দেখে না। তবে হার্টের উত্তরসূরিরা আজও পাল্টা প্রশ্ন করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক সংস্কার রক্ষার জন্য রাষ্ট্র কি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন ধ্বংস করার অধিকার রাখে?
পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও আইনি অভিভাবকত্ব (Paternalism and the Guardian State)
একটি রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের অভিভাবক হতে পারে? বাবা-মা যেমন ছোট সন্তানকে আগুন ছুঁতে দেন না কারণ সন্তান আগুনের পরিণতি বোঝে না, রাষ্ট্র কি তেমনই পূর্ণবয়স্ক নাগরিকদের ক্ষতিকর জিনিস থেকে দূরে রাখবে? আইন দর্শনে এই ধারণাকে বলা হয় আইনি অভিভাবকত্ব (Legal Paternalism)। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সিটবেল্ট পরা বাধ্যতামূলক করা বা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কড়া ঘুমের ওষুধ কেনা নিষিদ্ধ করার পেছনে এই যুক্তি কাজ করে। রাষ্ট্র এখানে বিশ্বাস করে যে, মানুষ সবসময় নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অনেক সময় তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বশে বা মোহের কারণে মানুষ এমন সব কাজ করে ফেলে যা তার ভবিষ্যৎ জীবনকে পঙ্গু করে দেয়।
দার্শনিক জেরাল্ড ডোয়ার্কিন (Gerald Dworkin) ১৯৭২ সালে অভিভাবকত্বের দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে এক বিস্তৃত আলোচনা উপস্থাপন করেন। তিনি একে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন: কোমল অভিভাবকত্ব (Soft Paternalism) এবং কঠোর অভিভাবকত্ব (Hard Paternalism) (Dworkin, 1972)। কোমল অভিভাবকত্বের ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্র কেবল তখনই ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে যখন ব্যক্তি কোনো কাজ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত থাকে না বা তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট থাকে। ধরা যাক, একজন মানুষ বিষাক্ত জল পান করতে যাচ্ছে এই ভেবে যে ওটা সাধারণ পানীয় জল। রাষ্ট্র তাকে সেই জল পানে বাধা দেবে, কারণ সে সত্যটা জানে না। কিন্তু কঠোর অভিভাবকত্বের দাবি অনেক দূর পর্যন্ত যায়। সেখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির সম্পূর্ণ তথ্য জানা সত্ত্বেও তার পছন্দকে আটকে দেয়, শুধু এই যুক্তিতে যে কাজটি তার নিজের জন্য চরম ক্ষতিকর।
মাদক আইনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সাধারণত এই কঠোর অভিভাবকত্বের রূপটি গ্রহণ করে। যারা মাদকের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষপাতী, তারা বলেন যে মাদক সাধারণ কোনো ভোগ্যপণ্য নয়। এটি সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন ব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্নায়বিক প্রক্রিয়াকে বদলে দেয়। মাদকাসক্ত মানুষ যখন নেশাদ্রব্য বেছে নেয়, তখন সেই সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি তার নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত বলা কঠিন। মনোবিজ্ঞানী ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে দীর্ঘমেয়াদী মাদক ব্যবহার মানুষের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যা যুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী (Volkow et al., 2016)। এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে অভিভাবকত্ববাদী দার্শনিকরা যুক্তি দেন যে, আসক্ত মানুষকে তার নিজের ধ্বংসাত্মক প্রবণতা থেকে রক্ষা করার জন্যই রাষ্ট্রের আইন দরকার। রাষ্ট্র এখানে এক ধরণের অভিভাবক, যে নিজের নাগরিককে তার নিজের অজ্ঞতা ও দুর্বলতা থেকে বাঁচায়।
তবে রাষ্ট্রকে এমন অভিভাবকের আসন দেওয়া কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। রাষ্ট্র যখন একবার স্থির করে যে সে নাগরিকের চেয়ে নাগরিকের ভালো ভালো বোঝে, তখন সেই ক্ষমতা অন্য সব ব্যক্তিগত বিষয়েও প্রসারিত হতে পারে। রাষ্ট্র কাল বলতে পারে বেশি চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় পান করা যাবে না বা বিপজ্জনক কোনো খেলাধুলা করা যাবে না। দার্শনিক জোয়েল ফেইনবার্গ (Joel Feinberg) তার বহু খণ্ডে সমাপ্ত কাজ দ্য মোরাল লিমিটস অব দ্য ক্রিমিনাল ল (The Moral Limits of the Criminal Law)-এর তৃতীয় খণ্ডে কঠোর অভিভাবকত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন (Feinberg, 1986)। ফেইনবার্গ দেখিয়েছেন যে, একজন সচেতন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি জেনেশুনে নিজের ক্ষতি করতে চায়, তবে তার সেই কাজের অধিকার থাকা উচিত। মানুষের সার্বভৌমত্বের অর্থই হলো নিজের ভালো-মন্দ নিজে বোঝার স্বাধীনতা। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের শরীর ও মন পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়, তখন নাগরিককে চিরকালের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক করে রাখা হয়।
জনস্বাস্থ্য বনাম অপরাধতত্ত্বের বৈপরীত্য (Public Health versus Retributive Criminalization)
মাদকাসক্তি কি একটি ফৌজদারি অপরাধ, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্রনিক রোগ? বিশ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মাদক বিতর্কের সবচেয়ে বড় মোড়টি এখানেই ঘুরপাক খাচ্ছে। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে মাদক আইনগুলো পরিচালিত হয়েছে অপরাধ দমনের শাস্তিমূলক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে। মাদক বহন করা বা ব্যবহার করার জন্য মানুষকে সরাসরি কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার অসারতা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন আইন গবেষক ও দার্শনিক ডগলাস হুসাক (Douglas Husak)। ২০০৮ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ ওভারক্রিমিনালাইজেশন (Overcriminalization)-এ হুসাক দেখিয়েছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো কোনো পর্যাপ্ত নৈতিক ভিত্তি ছাড়াই অজস্র মানুষের ওপর শাস্তি চাপিয়ে দিচ্ছে (Husak, 2008)। হুসাক তার পূর্ববর্তী ১৯৯২ সালের বই ড্রাগস অ্যান্ড রাইটস (Drugs and Rights)-এও যুক্তি দিয়েছিলেন যে, নিছক নিজের দেহে কোনো পদার্থ গ্রহণের অপরাধে কাউকে কারাগারে পাঠানো কোনো ন্যায়সঙ্গত রাষ্ট্রীয় আচরণ হতে পারে না (Husak, 1992)।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিপরীতে ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করেছে ক্ষতি হ্রাস নীতি (Harm Reduction Policy)। এই দর্শনের মূল কথা হলো, মানবসমাজ থেকে মাদককে পুরোপুরি মুছে ফেলা এক অবাস্তব স্বপ্ন। অতীতে কোনো সমাজ মাদক পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। সুতরাং রাষ্ট্রের মূল কাজ হওয়া উচিত মাদক ব্যবহারকারীদের শাস্তি দেওয়া নয়, বরং এর ফলে যে স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক ক্ষতি হয় তা কমিয়ে আনা। ক্ষতি হ্রাস নীতির আওতায় নিরাপদ সূঁচ বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন, ওভারডোজ রোধে প্রতিষেধক ওষুধের সহজলভ্যতা এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করা হয়। দার্শনিক দিক থেকে এটি বিচারব্যবস্থার চোখ দিয়ে নয়, বরং মহামারি সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের চোখ দিয়ে সমস্যাটিকে দেখা।
বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্তুগালের উদাহরণটি আইন ও সমাজ দর্শনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০১ সালে পর্তুগাল এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সব ধরণের ব্যক্তিগত মাদক ব্যবহারকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেয়, যা আইনবিজ্ঞানে অপরাধমুক্তকরণ (Decriminalization) নামে পরিচিত। সেখানে মাদক গ্রহণকারীকে পুলিশের বদলে একটি সামাজিক স্বাস্থ্য কমিটির মুখোমুখি হতে হয়। গবেষক ক্যাটলিন এলিজাবেথ হিউজ (Caitlin Elizabeth Hughes) এবং অ্যালেক্স স্টিভেন্স (Alex Stevens) ২০১০ সালে একটি বিস্তারিত তুলনামূলক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এই নীতি পর্তুগালে মাদকের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়নি (Hughes & Stevens, 2010)। উল্টো মাদকজনিত মৃত্যুহার বহুলাংশে কমে গেছে, এইচআইভি সংক্রমণের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং চিকিৎসা গ্রহণকারীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধ বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে শাস্তির ভয় দেখিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব নয়।
জনস্বাস্থ্য মডেল বনাম ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার এই লড়াইয়ের ভেতর এক গভীর দার্শনিক সংঘাত লুকিয়ে রয়েছে। ফৌজদারি ব্যবস্থা প্রতিশোধমূলক ন্যায়বিচারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে; অর্থাৎ তুমি নিয়ম ভেঙেছ, তাই তোমাকে কষ্ট ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য মডেলটি দাঁড়িয়ে আছে সমানুভূতি, বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এবং উপযোগিতার ওপর। যখন কোনো অসুস্থ মানুষকে অপরাধীর পোশাক পরিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন সমাজ তার সুস্থ হওয়ার পথটি বন্ধ করে দেয়। তাকে চিরদিনের জন্য সমাজের এক কোণে ঠেলে দেওয়া হয়। এর ফলে তৈরি হয় এক অনন্ত অপরাধচক্র, যা থেকে বের হওয়া ওই ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই বিশ্বের বহু দেশের আইন বিশেষজ্ঞ আজ দাবি করছেন যে, মাদক সমস্যার সমাধান পুলিশ ব্যারাকে নেই, এর সমাধান আছে হাসপাতালের ওয়ার্ডে এবং সামাজিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার (Human Rights and the Right to Self-Determination)
মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পেছনে আন্তর্জাতিক আইনের যে বিশাল জাল বিছানো রয়েছে, তা অনেক সময় মৌলিক মানবাধিকারের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। জাতিসংঘের মাদক সংক্রান্ত কনভেনশনগুলো – বিশেষ করে ১৯৬১ সালের সিঙ্গেল কনভেনশন অন নারকোটিক ড্রাগস (Single Convention on Narcotic Drugs) – দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে সব দেশকে নির্দেশ দিয়ে আসছে মাদক কঠোর হাতে দমন করার জন্য। তবে সমকালীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গবেষক ডেমন ব্যারেট (Damon Barrett) এবং তার সহকর্মীরা দেখিয়েছেন যে, মাদক নিয়ন্ত্রণের এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো বিশ্বব্যাপী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ তৈরি করেছে (Barrett et al., 2008)। মাদক দমন অভিযানের নামে বহু রাষ্ট্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার, মাত্রাতিরিক্ত কারাদণ্ড এবং এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাদক আইনের এই কঠোর রূপটি অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হয়।
মাদকের ওপর আরোপিত বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার খর্ব করা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লাতিন আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার আদিবাসীরা কোকা পাতাকে তাদের দৈনন্দিন জীবন ও শারীরিক সহনশীলতার অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। একইভাবে উত্তর আমেরিকার অনেক আদিবাসী গোত্রে পেয়োটি ক্যাকটাস ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর পশ্চিমা আইন কাঠামো এই পদার্থগুলোকে কোনো সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই মাদকের তালিকায় ফেলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নৃতাত্ত্বিক এবং আইন দার্শনিকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, কোনো বৈশ্বিক সংস্থা কি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী চর্চাকে অপরাধ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার নৈতিক অধিকার রাখে? এটি স্পষ্টতই জাতিসংঘের ঘোষিত আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার (Right to Self-Determination)-এর ধারণার পরিপন্থী (Stavenhagen, 2007)।
মাদকের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক রূপটি আরও বিপজ্জনক। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাদক উৎপাদন বন্ধ করার জন্য প্রায়ই জঙ্গল ধ্বংস করা হয়, বিতর্কিত রাসায়নিক ছিটিয়ে ফসল নষ্ট করে দেওয়া হয়। এর শিকার হয় সেই সব দরিদ্র কৃষক, যাদের জীবিকার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাষ্ট্র তৈরি করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইন গবেষক পল গোসেপ (Paul Gootenberg) তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন কীভাবে বিশ্বায়িত পুঁজিবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো মাদকের বাজারকে একটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক খেলায় পরিণত করেছে (Gootenberg, 2008)। বিশ্বায়নের ফলে দুর্বল দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকেই কেড়ে নিয়েছে। কৃষক তার জীবিকা হারায়, অথচ আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা নিজেদের সুরক্ষিত রেখে বিপুল মুনাফা অর্জন করে যায়।
সব মিলিয়ে মাদকের বৈধতা ও অবৈধতার দর্শনটি কেবল ব্যক্তির পছন্দের সীমানায় আটকে নেই, এটি গিয়ে ঠেকেছে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব এবং মানবাধিকারের বৃহত্তর দর্শনে। আন্তর্জাতিক আইনের সংস্কারপন্থীরা এখন জোর দিচ্ছেন একটি মানবাধিকারসম্মত মাদকনীতির ওপর। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি বা রাষ্ট্রীয় নীতি এমন হতে পারে না যা জীবনের অধিকার, সুস্বাস্থ্যের অধিকার এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর আঘাত হানে। রাষ্ট্র যদি মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে, তবে তার আইন এমন হওয়া উচিত যা মানুষকে সুরক্ষা দেবে, ধ্বংস করবে না। মাদককে যখন কেবল একটি আইনি বা নৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখা বন্ধ করে একটি মানবিক ও সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে বিচার করা হবে, কেবল তখনই এই শতাব্দীপ্রাচীন বিতর্কের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
আফিমবিরোধী আন্দোলন (Anti-Opium Movements): যুক্তরাজ্য, চীন ও দক্ষিণ এশিয়া
চীনে আফিমের সামাজিক বিস্তার ও রাজকীয় প্রতিরোধ (Social Expansion of Opium in China and Imperial Resistance)
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীনের দিকে তাকালে দেখা যায় এক বিশাল সাম্রাজ্যের ভেতর ধীরে ধীরে জমতে থাকা অস্থিরতা। বেইজিংয়ের রাজদরবার তখন বাইরের পৃথিবীকে নিজেদের অধীনস্থ বা বর্বর বলেই ভাবতে ভালোবাসত। কিন্তু ক্যান্টন বন্দরের জলসীমায় নোঙর করা বিদেশি বাণিজ্য জাহাজগুলো অন্য এক বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছিল। ব্রিটিশ বণিকরা উপলব্ধি করেছিলেন যে চীনের রেশম, চীনামাটির বাসন আর বিশেষ করে চায়ের যে তীব্র চাহিদা ইউরোপে তৈরি হয়েছে, তার বিনিময়ে চীনারা ইউরোপীয় কোনো পণ্যই কিনতে চায় না। তারা চায় শুধু খাঁটি রূপো। এই বাণিজ্য ঘাটতি মেটানোর উপায় হিসেবে ব্রিটিশরা ভারতে উৎপাদিত আফিমকে বেছে নেয়। ধীরে ধীরে চীনের অভিজাত মহল থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আফিম সেবনের অভ্যাস সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাবে সাম্রাজ্যের ভেতরে রূপোর ঘাটতি দেখা দেয় এবং মুদ্রানীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় (Polachek, 1992)।
চীনের বাজারে ভারতীয় আফিমের প্রবেশ দিন দিন রূপোর দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিচ্ছিল। কারণ সাধারণ প্রজারা প্রতিদিনের লেনদেন করত তামার মুদ্রায়, কিন্তু রাজকোষে রাজস্ব জমা দিতে হতো খাঁটি রূপোয়। রূপোর দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের ওপর করের চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই অর্থনৈতিক সংকটের সাথে যুক্ত হয় এক তীব্র নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়। চিং সাম্রাজ্য (Qing Dynasty)-এর সেনাবাহিনী এবং সরকারি আমলাদের একটি বড় অংশ আফিমের নেশায় কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক পতনের এই দ্বৈত সংকট রাজদরবারে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। একদল মন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছিলেন আফিম বাণিজ্যকে বৈধ ঘোষণা করে তার ওপর শুল্ক বসাতে, যাতে রাজকোষের ক্ষতি কিছুটা পূরণ হয়। তবে কনফুসীয় নীতিশাস্ত্রে বিশ্বাসী কট্টরপন্থীরা এই প্রস্তাবকে চরম অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এই পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যের নৈতিক অবস্থান রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন সম্রাট তাওকুয়াং (Daoguang Emperor)। তিনি উপলব্ধি করেন যে আফিমের বিস্তার বন্ধ না হলে রাজকোষের রৌপ্য নিষ্ক্রমণ (Silver Outflow) ঠেকানো যাবে না এবং সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ভেঙে পড়বে। ১৮৩৮ সালের শেষভাগে তিনি হুনান ও হুবেই প্রদেশের গভর্নর লিন জেক্সু (Lin Zexu)-কে রাজদরবারে ডেকে পাঠান। লিন ছিলেন আপসহীন এবং কনফুসীয় দর্শনে গভীরভাবে আস্থাশীল এক প্রশাসক। তিনি সম্রাটকে স্পষ্টভাবে জানান যে আফিম বন্ধ করা না গেলে কয়েক দশকের মধ্যে চীনের আত্মরক্ষা করার মতো কোনো সৈন্য অবশিষ্ট থাকবে না, রাজস্ব হিসেবে আদায় করার মতো কোনো রূপোও পাওয়া যাবে না। সম্রাট লিনের যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে তাকে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন রাজকীয় কমিশনার হিসেবে ক্যান্টনে পাঠানোর নির্দেশ দেন (Brook & Wakabayashi, 2000)।
ক্যান্টনে পৌঁছে লিন স্থানীয় আফিমসেবী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর শুধু চড়াও হননি, তিনি সমস্যার মূলে আঘাত করার পথ বেছে নেন। তিনি জানতেন যে বিদেশি চোরাচালানকারীরাই এই বিষাক্ত বাণিজ্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। লিন ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়াকে উদ্দেশ্য করে এক খোলা চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তুলেছিলেন। লিন লিখেছিলেন যে ইংল্যান্ড নিজের দেশে আফিম সেবন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু তারা কোন যুক্তিতে চীনের নিরীহ প্রজাদের ধ্বংস করার জন্য এই বিষ জাহাজ বোঝাই করে পাঠায়? এই বিখ্যাত চিঠিটি যদিও শেষ পর্যন্ত রানীর হাতে পৌঁছায়নি, তবে এটা স্পষ্ট করে দেয় যে চীনের এই প্রতিরোধ ছিল নিছক কোনো প্রশাসনিক অভিযান নয়। এটা ছিল সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার এক ঐতিহাসিক নৈতিক লড়াই।
ক্যান্টন সংকট ও লিন জেক্সুর আফিম বিনাশ (The Canton Crisis and Lin Zexu’s Destruction of Opium)
ক্যান্টনে দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনার লিন কোনো প্রকার কালক্ষেপণ করেননি। ১৮৩৯ সালের মার্চ মাসে তিনি শহরের সমস্ত বিদেশি ব্যবসায়ীকে তাদের কাছে থাকা সমস্ত আফিমের চালান রাজকীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সমর্পণ করার নির্দেশ জারি করেন। ক্যান্টনের ঐতিহ্যবাহী ক্যান্টন বাণিজ্য ব্যবস্থা (Canton Trade System) অনুযায়ী বিদেশিরা শহরের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান করত, যা তেরো কারখানা এলাকা নামে পরিচিত ছিল। লিন সেই এলাকাকে চীনা সৈন্য দিয়ে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে অবৈধ আফিম জমা না দেওয়া পর্যন্ত কোনো বিদেশি বণিক শহর ত্যাগ করতে পারবে না। খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং স্থানীয় কর্মচারীদের তাদের কাজ ছেড়ে চলে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিদেশি বণিকদের জন্য এমন পদক্ষেপ ছিল অভাবনীয় (Waley, 1958)।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন চার্লস এলিয়ট (Charles Elliot) পরিস্থিতি শান্ত করতে হস্তক্ষেপ করেন। এলিয়ট অবরুদ্ধ ব্রিটিশ বণিকদের আশ্বস্ত করেন যে তারা যদি সমস্ত আফিম ব্রিটিশ সরকারের হেফাজতে হস্তান্তর করে, তবে ব্রিটিশ রাজকোষ থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা হবে। এলিয়টের এই নির্দেশনার ফলে ব্যবসায়ীরা প্রায় কুড়ি হাজার পেটি আফিম সমর্পণ করতে রাজি হয়। কিন্তু এলিয়ট যা আশা করেছিলেন, ঘটনা তার উল্টো দিকে মোড় নেয়। লিন বাজেয়াপ্ত করা এই বিপুল পরিমাণ মাদক বাজারে বিক্রি করে রাজকোষ ভরেননি। তিনি হুনানের হুমেন সমুদ্র সৈকতে বিশাল পরিখা খনন করান। সেখানে চুন, লবণ এবং সমুদ্রের জল মিশিয়ে সমস্ত আফিম গলিয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা ইতিহাসে হুমেন আফিম ধ্বংস (Destruction of Opium at Humen) নামে স্মরণীয় হয়ে আছে।
হুমেনের সৈকতে ধ্বংস করা এই বিপুল সম্পদের পরিমাণ ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। লিনের এই আপসহীন পদক্ষেপ সরাসরি আঘাত হানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে। এলিয়ট এই ঘটনাকে ব্রিটিশ নাগরিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর অন্যায় আক্রমণ এবং ব্রিটেনের জাতীয় সম্মানের অবমাননা হিসেবে লন্ডনে রিপোর্ট করেন। একই সাথে ক্যান্টন উপকূলে ব্রিটিশ নাবিকদের হাতে এক চীনা গ্রামবাসী নিহত হওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। লিন ঘাতক নাবিককে চীনা আদালতের কাছে বিচারের জন্য সোপর্দ করার দাবি জানান। এলিয়ট ভিনদেশীয় আইনের আওতায় ব্রিটিশ নাগরিকদের বিচার হতে দিতে অস্বীকার করেন। এর মধ্য দিয়েই মূলত আইনি সার্বভৌমত্বের সংঘাত প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে (Lovell, 2011)।
লন্ডনে তখন শিল্প বিপ্লবের নতুন জোয়ার বইছে। আফিম বাণিজ্যের সুরক্ষায় এবং চীনের বিশাল বাজারকে পশ্চিমা বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করতে ব্রিটিশ সংসদ ১৮৪০ সালে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। শুরু হয় প্রথম আফিম যুদ্ধ (First Opium War)। উন্নত কামান ও আধুনিক বাষ্পচালিত যুদ্ধজাহাজের সামনে ঐতিহ্যবাহী চিং সাম্রাজ্যের (Qing empire) সামরিক বাহিনী দ্রুত ভেঙে পড়ে। ১৮৪২ সালে নানকিং চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এই চুক্তি ছিল চীনের ইতিহাসের প্রথম অসম চুক্তি, যার মাধ্যমে হংকং ব্রিটিশদের হাতে চলে যায় এবং পাঁচটি বন্দর ইউরোপীয় বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া হয়। লিন জেক্সুকে সাম্রাজ্যের ব্যর্থতার বলির পাঁঠা বানিয়ে সুদূর জিনজিয়াংয়ে নির্বাসনে পাঠানো হলেও চীনের মানুষের কাছে তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় প্রতিরোধের প্রথম প্রতীক হিসেবে অমর হয়ে থাকেন।
যুক্তরাজ্যে নৈতিক আন্দোলন ও সমাজের বিভাজন (Moral Agitation and Social Division in the United Kingdom)
চীনের মাটিতে যখন বন্দুকের নল দিয়ে আফিম বাণিজ্য সুরক্ষিত করা হচ্ছিল, ঠিক তখন লন্ডনের বুকে একদল চিন্তাশীল মানুষ এই বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ রাজনীতি কেবল বাণিজ্যকামী পুঁজিপতিদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছিল না, সেখানে এক শক্তিশালী সংস্কারবাদী কণ্ঠস্বরও গড়ে উঠছিল। এই সংস্কারবাদীরা বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যে বাণিজ্যের ওপর দাঁড়িয়ে প্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার করছে, তা নীতিগতভাবে অত্যন্ত হীন। সংসদে এবং জনসভায় তারা দাবি তুলতে শুরু করেন যে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম কখনোই কোনো জাতির ধ্বংসসাধন হতে পারে না। এই আন্দোলনের একটি বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছিল কুয়েকার সম্প্রদায় এবং অন্যান্য মুক্তচিন্তার সংস্কারকদের মাধ্যমে (Berridge & Edwards, 1981)।
এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক লর্ড শ্যাফটসবারি (Lord Shaftesbury)। ১৮৪৩ সালে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আফিম বাণিজ্যের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিতর্ক উত্থাপন করেন। শ্যাফটসবারি যুক্তি দিয়েছিলেন যে প্রাচ্যে ব্রিটেনের আফিম একচেটিয়া বাণিজ্য সভ্য দুনিয়ার সমস্ত নীতিবোধকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। তিনি দেখান যে ভারতে আফিম উৎপাদন করে তা চোরাপথে চীনে পাচার করার এই ব্যবস্থা ব্রিটিশ জাতির আত্মাকে কলুষিত করছে। শ্যাফটসবারির এই জোরালো বক্তব্যের পর ব্রিটেনে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তরুণ পার্লামেন্ট সদস্য উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোন (William Gladstone) এই বাণিজ্যকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অন্যায় এবং কলঙ্কজনক কারবার বলে প্রকাশ্যে অভিহিত করেছিলেন। গ্ল্যাডস্টোন সরাসরি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এই রক্তমাখা মুনাফার কারণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় জবাবদিহি করতে হবে।
এই নৈতিক বিক্ষোভের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ঘটে ১৮৭৪ সালে, যখন লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয় সোসাইটি ফর দ্য সাপ্রেশন অব দ্য ওপিয়াম ট্রেড (Society for the Suppression of the Opium Trade)। এই সংস্থাটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী ছিল না। তারা একের পর এক পুস্তিকা প্রকাশ করে, সংবাদপত্রে কলাম লিখে এবং সভা-সমাবেশের আয়োজন করে ব্রিটিশ নাগরিকদের চোখ খুলে দিতে সচেষ্ট হয়। তারা ব্রিটিশ সমাজকে মনে করিয়ে দেয় যে প্রাচ্যের সঙ্গে তাদের পরিচয় কেবল বন্দুকের গুলি আর মাদক চালানের মাধ্যমে হতে পারে না। এই আন্দোলনের পেছনে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল তৎকালীন ভিক্টোরীয় নৈতিকতাবাদ (Victorian Moralism)। সমাজের সচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণি উপলব্ধি করতে শুরু করে যে বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশ আইনের শাসনের যে অহংকার প্রচার করা হয়, আফিম বাণিজ্য তার ঠিক বিপরীত চিত্র তুলে ধরে (Harding, 2008)।
তবে সংস্কারকদের এই লড়াই মোটেও সহজ ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীকালে ভারত সরকারের শক্তিশালী লবি। এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর যুক্তি ছিল নিছক অর্থনৈতিক। তারা ব্রিটিশ সরকারকে বোঝাতে চেয়েছিল যে আফিম থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বন্ধ হয়ে গেলে ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ ভারতীয় কোষাগারের আয়ের প্রায় দশ শতাংশই আসত এই মাদক বিক্রি থেকে। ফলে সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই নৈতিক আন্দোলনকে অবজ্ঞা করে আসছিল। তা সত্ত্বেও এই আন্দোলন ব্রিটিশ জনমতকে গভীরভাবে নাড়া দিতে সক্ষম হয়। ধীরে ধীরে বিষয়টি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে ব্রিটিশ সংসদের পক্ষে এই অনৈতিক বাণিজ্যের অর্থনৈতিক যুক্তির পেছনে নিজেদের লুকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও আফিম একচেটিয়া (Colonial Economy and the Opium Monopoly in British India)
ব্রিটিশ আফিম সাম্রাজ্যের মূল ইঞ্জিনটি স্থাপন করা হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে গাঙ্গেয় অববাহিকার উর্বর ভূমিতে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে রবার্ট ক্লাইভের বাংলা বিজয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (East India Company) এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক নাড়ির সন্ধান পায়। ১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় আফিম উৎপাদনের ওপর কোম্পানির একক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন। হেস্টিংসের যুক্তি ছিল খুব পরিষ্কার; মাদক ক্ষতিকর পণ্য, তাই এটি সবার জন্য উন্মুক্ত না রেখে সরকারের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। তবে বাস্তবে এই নিয়ন্ত্রণ জনস্বাস্থ্যের জন্য ছিল না, ছিল সর্বাধিক রাজস্ব লুটে নেওয়ার এক নিখুঁত ফাঁদ। এর ফলে ভারতে গড়ে ওঠে এক কঠোর ঔপনিবেশিক একচেটিয়া বাণিজ্য (Colonial Monopoly Trade), যা কৃষকের স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলেছিল (Richards, 2002)।
বিহার ও বেনারস অঞ্চলে কোম্পানি যে চাষাবাদ ব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তা পরিচালিত হতো ওপিয়াম এজেন্সির মাধ্যমে। এই ব্যবস্থার ভেতরে কৃষকদের দাদনের জালে আবদ্ধ করা হতো, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো আসামি ব্যবস্থা (Assami System)। কৃষকদের নগদ অগ্রিম টাকা দিয়ে আফিম চাষ করতে বাধ্য করা হতো। কৃষকের নিজের জমিতে ধান বা খাদ্যশস্য ফলানোর কোনো অধিকার থাকত না। একবার দাদন নিলে কৃষক সেই ঋণের ফাঁদ থেকে আর কোনোদিন বের হতে পারত না। সবচেয়ে নির্মম বিষয় ছিল এই যে, কৃষককে তার উৎপাদিত আফিমের পুরোটা কোম্পানির নির্ধারিত অত্যন্ত কম মূল্যে জমা দিতে হতো। খোলা বাজারে তা বিক্রি করার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে একসময়ের স্বয়ংসম্পূর্ণ ভারতীয় কৃষক নিজের জমিতেই কার্যত বাধ্যতামূলক বন্দি শ্রমিকের স্তরে নেমে আসে।
বাংলার এই একচেটিয়া কাঠামোর বাইরে মধ্য ও পশ্চিম ভারতে ছিল আরেক ধরণের উৎপাদন ধারা, যা পরিচিত ছিল মালওয়া আফিম (Malwa Opium) নামে। দেশীয় রাজ্যগুলোর আওতাধীন সিন্ধিয়া, হোলকার বা রাজপুতানার জমিতে এই আফিম তৈরি হতো। কোম্পানি সরাসরি এই অঞ্চলগুলো দখল করতে না পারলেও তারা বোম্বে বন্দর দিয়ে এই আফিম রপ্তানির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। ইতিহাসবিদ কার্ল এ. ট্রকি তার বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ ওপিয়াম, এম্পায়ার অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি (Opium, Empire and the Global Political Economy)-তে দেখিয়েছেন কীভাবে এই আফিম অর্থনীতি পুরো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের রক্ত সঞ্চালন করেছিল (Trocki, 1999)। এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আধিপত্য টিকিয়ে রাখার ব্যয় মেটানো হতো ভারতীয় কৃষকের ঘাম ও রক্তে ভেজা এই আফিমের লাভ থেকে।
এই মাদক অর্থনীতির সামাজিক প্রতিক্রিয়া ভারতের ভেতরেও ছিল মারাত্মক। যদিও কোম্পানির মূল লক্ষ্য ছিল সমস্ত আফিম চীনে পাচার করে রূপো ঘরে তোলা, কিন্তু এই বিষের কিছু অংশ স্থানীয় সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদক অঞ্চলগুলোর আশেপাশে চোরাই পথে আফিম বিক্রি বাড়তে থাকে। দারিদ্র্যপীড়িত কৃষক পরিবারগুলোর ভেতরেও এক ধরণের অবসাদগ্রস্ত নেশার বিস্তার ঘটে। কৃষিজমির বড় একটি অংশে খাদ্যশস্যের বদলে আফিম চাষ হওয়ায় বাংলায় ও বিহারে বারবার খাদ্য ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হতো। অথচ কোম্পানি সরকার এই সমস্ত সামাজিক বিপর্যয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল বছর শেষে হিসাবের খাতায় রূপোর মুনাফা গুনতে ব্যস্ত থাকত।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিরোধ ও সংস্কারের সূচনা (Beginnings of Resistance and Reform in South Asia)
ভারতের বুদ্ধিজীবী এবং সংস্কারকরা দীর্ঘকাল ধরে আফিম বাণিজ্যের এই আগ্রাসনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। উনিশ শতকের শেষভাগে যখন আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে, তখন আফিম অর্থনীতির অনৈতিক চরিত্রটি জনসমক্ষে উন্মোচিত হতে শুরু করে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক হিসেবে খ্যাত দাদাভাই নওরোজি (Dadabhai Naoroji) ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক শোষণের স্বরূপ উন্মোচন করেন। নওরোজি তার বিখ্যাত সম্পদ নিষ্কাশন তত্ত্ব (Drain of Wealth Theory)-তে প্রমাণ করেন কীভাবে ভারত থেকে সম্পদ ব্রিটেনে পাচার করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিলেন যে আফিম বাণিজ্যের মাধ্যমে ভারত যে অর্থ আয় করছে বলে ব্রিটিশরা দাবি করে, তা আসলে ভারতীয় কৃষকের শ্রম শোষণ এবং চীনের জনগণের নৈতিক বিনাশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ভয়াবহ প্রক্রিয়া (Naoroji, 1901)। ভারতীয় সমাজ সংস্কারকরা অনুভব করতে পেরেছিলেন যে এই অনৈতিক বাণিজ্যের কলঙ্ক পুরো জাতির ওপর এসে পড়ছে।
আফিমের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ভারতের যে অঞ্চলে প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল, তা হলো আসাম। ১৮২৬ সালে ইয়ান্দাবুর চুক্তির পর আসাম ব্রিটিশদের অধীনে আসে। তার আগেই আহোম রাজত্বের শেষভাগে সেখানে আফিমের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন কায়েম হওয়ার পর সরকার ঘরে ঘরে আফিম বিক্রির জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান বা কানিয়া কানি মেলা খুলে দেয়। স্বল্প মূল্যে সর্বত্র আফিম সহজলভ্য হওয়ায় আসামের প্রায় প্রতিটি পরিবারে আফিমাসক্তি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অসমিয়া সমাজে এটি পরিচিত ছিল কানি রোগ নামে। যুবসমাজ কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার স্থবির হয়ে যায়। আসামের জাতীয় জীবনের এই চরম বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করে প্রথম যে ব্যক্তিটি গর্জে উঠেছিলেন, তিনি হলেন বিপ্লবী ও সংস্কারক মণিরাম দেওয়ান (Maniram Dewan) (Guha, 1977)।
মণিরাম দেওয়ান ১৮৫৩ সালে ব্রিটিশ কমিশনার এ. জে. মফ্যাট মিলসের কাছে এক ঐতিহাসিক স্মারকলিপি জমা দেন। সেই স্মারকলিপিতে তিনি অত্যন্ত আবেগের সাথে উল্লেখ করেছিলেন যে আফিম ব্যবসা আসামের সাধারণ মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। তিনি সরকারের কাছে অবিলম্বে আফিম বিক্রি বন্ধ করার এবং দেশীয় ঐতিহ্যবাহী শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানান। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় মণিরাম দেওয়ান ব্রিটিশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলেন। তবে আসামে আফিমবিরোধী যে চেতনার বীজ তিনি বুনে গিয়েছিলেন, তা ম্লান হয়ে যায়নি। তার সমসাময়িক সমাজচিন্তক আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন (Anandaram Dhekial Phukan)-ও আসামের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে আফিমের বিস্তারকে দায়ী করেন এবং এর কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান।
উনিশ শতকের শেষভাগে আসামের সাধারণ কৃষকরা নিজেরাই এই মাদক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শুরু করে। গঠিত হয় বিভিন্ন গণসংগঠন, যার মধ্যে তেজপুর রায়ত সভা অন্যতম। স্থানীয় পঞ্চায়েতগুলোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে থাকে যে যারা আফিম সেবন করবে বা বিক্রি করবে, তাদের সামাজিকভাবে একঘরে করা হবে। ইতিহাসবিদ জয়া শর্মা তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন কীভাবে এই তৃণমূল আন্দোলনগুলো পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাদকবিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল (Sharma, 2009)। আসামের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছিল যে আফিম কোনো বিচ্ছিন্ন কৃষি পণ্য ছিল না। এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের এমন এক হাতিয়ার, যা একটি জাতির প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেতরে থেকে অসাড় করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আফিম বাণিজ্যের অবসানমুখী যাত্রা (International Treaties and the Twilight of the Opium Trade)
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে ব্রিটিশ সরকার দেশে ও বিদেশে আফিমবিরোধী আন্দোলনের তীব্র চাপের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে জনমতের তীব্র ক্ষোভ প্রশমিত করার লক্ষ্যে ১৮৯৩ সালে একটি রাজকীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি পরিচিত ছিল রয়্যাল কমিশন অন ওপিয়াম (Royal Commission on Opium) নামে। কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল ভারতে আফিম চাষ এবং এশিয়ায় তার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখা। ১৮৯৫ সালে কমিশন তাদের দীর্ঘ প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু সেই প্রতিবেদনটি ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থের পক্ষে এক নির্লজ্জ সাফাই। সরকারপন্থী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কমিশন দাবি করে যে আফিম প্রাচ্যের মানুষের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই, বরং এটি ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। ফলে এটি নিষিদ্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই (Lowes, 1966)।
কমিশনের এই বানোয়াট যুক্তি অবশ্য বিশ্বমঞ্চে ব্রিটেনের মুখ রক্ষা করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তখন নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইন দখলের পর সেখানে আফিমের বিধ্বংসী রূপ প্রত্যক্ষ করে এবং বিশ্বব্যাপী মাদক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে শুরু করে। একই সাথে চীনে জাতীয়তাবাদী জাগরণ আফিমবিরোধী আন্দোলনকে এক অপ্রতিরোধ্য গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়। চিং রাজদরবার ১৯০৬ সালে ঘোষণা করে যে পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে সাম্রাজ্য থেকে আফিম চাষ ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকারও উপলব্ধি করতে পারে যে এই অনৈতিক বাণিজ্য আর বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। ১৯০৭ সালে ব্রিটেন ও চীনের মধ্যে ঐতিহাসিক দশশালা চুক্তি (Ten-Year Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্ত ছিল খুব স্পষ্ট; চীন যেভাবে প্রতি বছর তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দশ শতাংশ হারে কমিয়ে আনবে, ব্রিটেনও সমপরিমাণে ভারত থেকে চীনে আফিম রপ্তানি হ্রাস করবে।
এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৯ সালে তেরোটি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক সাংহাই আফিম কমিশন (Shanghai Opium Commission)। এই কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একমত হয় যে আফিম একটি বৈশ্বিক সংকট এবং কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে এই বাণিজ্য দমন করা সম্ভব নয়। সাংহাইয়ের এই সম্মেলনই আধুনিক মাদক নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক পথ তৈরি করে দেয়, যা পরবর্তীকালে ১৯১২ সালের হেগ আন্তর্জাতিক আফিম কনভেনশনে রূপ নেয়। এই কনভেনশনের মাধ্যমে আফিমের ব্যবহারকে কেবল চিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয় (Meyer & Parssinen, 1998)।
এইভাবে প্রায় দেড় শতাব্দীর একটি কলঙ্কিত অধ্যায়ের অবসান ঘটে। যুক্তরাজ্য, চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের দীর্ঘ প্রতিরোধ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে আন্তর্জাতিক বিবেক জাগ্রত হয়েছিল, তা প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক লাভ কখনোই চিরস্থায়ী হতে পারে না যখন তার ভিত্তি থাকে মানবিক অবক্ষয়। যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একদা গোলার আঘাতে আফিমের বাজার তৈরি করেছিল, সেই শক্তিকেই শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিক প্রতিরোধের মুখে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রত্যাহার করে নিতে হয়। বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা এই প্রাথমিক আফিমবিরোধী আন্দোলনগুলোই আজকের আধুনিক আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (International Control System)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিল, যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।
প্রাথমিক আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ (Early International Drug Control Initiatives): সাংহাই, হেগ ও আসাম কমিশন
ফিলিপাইন সংকট ও মার্কিন উদ্যোগের সূত্রপাত (The Philippine Crisis and the Genesis of the American Initiative)
স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধের পর ১৮৯৮ সালে ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে, তখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক প্রশাসনিক সংকটের মুখে পড়েন। স্পেনীয় ঔপনিবেশিক শাসনামলে ফিলিপাইনে আফিম বিক্রির ওপর রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া অধিকার বহাল ছিল। সেখানে রাজস্ব আদায়ের একটি প্রধান উৎস ছিল সরকার নিয়ন্ত্রিত আফিমের দোকানগুলো। মার্কিন প্রশাসন ফিলিপাইনে তাদের তথাকথিত সভ্য করার মিশন পরিচালনার দাবি নিয়ে হাজির হয়েছিল। ফলে খ্রিষ্টীয় মতাদর্শের সংস্কারবাদী ও আমেরিকান রাজনীতিকদের কাছে একটি সরকারি মাদক কারবার চালু রাখা নৈতিকভাবে অস্বস্তিকর ঠেকতে শুরু করে। নতুন প্রশাসন বুঝতে পারে যে এশিয়ায় নিজেদের সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে মাদকের এই লাভজনক খাতটিকে হয় সংস্কার করতে হবে, নয়তো বন্ধের পথ খুঁজতে হবে (Musto, 1999)।
এই নৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে ছিলেন ম্যানিলার এপিসকোপাল বিশপ চার্লস ব্রেন্ট (Charles Brent)। বিশপ ব্রেন্ট ফিলিপাইনে মাদকাসক্তির ভয়াবহ বিস্তার দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি সাধারণ ফিলিপিনো ও চীনা অভিবাসী শ্রমিকদের ভেতর আফিমের প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তার উদ্যোগে ১৯০৩ সালে গঠিত হয় ফিলিপাইন আফিম তদন্ত কমিটি (Philippine Opium Investigation Committee)। এই কমিটির কাজ ছিল জাপান, বার্মা, জাভা এবং চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো ঘুরে দেখা যে তারা কীভাবে আফিম সমস্যার মোকাবেলা করছে। ব্রেন্ট উপলব্ধি করেছিলেন যে কেবল স্থানীয় স্তরে আফিম নিষিদ্ধ করলেই এই সংকট মিটবে না। অন্যান্য এশীয় অঞ্চলে ঔপনিবেশিক সরকারগুলো যেভাবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আফিম বিক্রি করে রাজস্ব তুলছে, তা বজায় থাকলে ফিলিপাইনে চোরাচালান বন্ধ করা অসম্ভব।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৎকালীন ফিলিপাইনের গভর্নর জেনারেল এবং পরবর্তীকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফ্ট (William Howard Taft) একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯০৫ সালে ফিলিপাইনে এক আইনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে আফিম আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়, যা ১৯০৮ সালের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। কিন্তু আমেরিকান কর্তৃপক্ষ দ্রুতই এক বাস্তব সত্য উপলব্ধি করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ বন্ধ না হলে কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আফিম নির্মূল করা যায় না। কারণ নিকটবর্তী ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সিঙ্গাপুর বা ভারত থেকে চোরাপথে আফিম সহজেই উপকূলে এসে নামত। এই সীমান্তহীন পাচার ব্যবস্থার মুখে স্থানীয় আইন ছিল প্রায় অর্থহীন (Foster, 2003)।
এই স্থানীয় অভিজ্ঞতা থেকেই বিশপ ব্রেন্ট ১৯০৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টকে একটি চিঠি লেখেন। ব্রেন্ট তার চিঠিতে উল্লেখ করেন যে এশিয়ায় আফিম ব্যবসা বন্ধ করতে হলে একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বরাজনীতিতে নতুন পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চাইছিল। ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছিল যে মাদকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ একদিকে তাদের মানবিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, অন্যদিকে চীনের বাজারে তাদের বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার সুগম করতে সাহায্য করবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চিরাচরিত ঔপনিবেশিক মাদকনীতি (Colonial Drug Policy)-কে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এই নৈতিক এজেন্ডাটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর এক কূটনৈতিক হাতিয়ার। এই প্রেক্ষাপট থেকেই আধুনিক বহুপাক্ষিক মাদক কূটনীতির যাত্রা শুরু হয়।
সাংহাই আফিম কমিশন ১৯০৯: বহুপাক্ষিক আলোচনার সূচনা (The Shanghai Opium Commission of 1909: Dawn of Multilateral Dialogue)
বিশপ ব্রেন্টের চিঠির সূত্র ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আহ্বানে ১৯০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চীনের সাংহাইয়ে বসে এক ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সেন্ট জনস বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক ইতিহাসে সাংহাই আফিম কমিশন (Shanghai Opium Commission) নামে সমাদৃত। এই সম্মেলনে তেরোটি দেশ তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, পর্তুগাল, রাশিয়া, সিয়াম, পারস্য এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর এভাবে এক টেবিলে বসা মানব ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা ছিল। এর আগে বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি হলেও মাদককে একটি বৈশ্বিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করে আলোচনা করার কোনো নজির ছিল না (Taylor, 1969)।
সম্মেলনে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশপ ব্রেন্ট এবং চিকিৎসক-কূটনীতিক হ্যামিল্টন রাইট (Hamilton Wright)। রাইট ছিলেন এক আপসহীন চরিত্র, যিনি আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের দ্রুত অবসান চেয়েছিলেন। তবে সাংহাই কমিশনের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। ব্রিটিশ প্রতিনিধিদলের প্রধান অ্যালজারনন সেসিল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে এই কমিশন কোনো বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন তৈরির ক্ষমতা রাখে না। এটি ছিল নিছক একটি অনুসন্ধানী ও পরামর্শমূলক সভা। ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা সচেষ্ট ছিলেন যাতে ভারত থেকে চীনে আফিম রপ্তানির মাধ্যমে তাদের রাজকোষ যে রাজস্ব পায়, তার ওপর কোনো আকস্মিক আঘাত না আসে। ব্রিটিশদের অবস্থান ছিল এমন যে আফিম উৎপাদন রাতারাতি বন্ধ করা অর্থনৈতিক দিক থেকে বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আলোচনায় চীন প্রতিনিধিরা তাদের দেশের গভীর মানবিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। চিং সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিরা দেখান যে বিদেশি শক্তির চাপিয়ে দেওয়া বাণিজ্যের কারণে তাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী কীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছে। নানা মতপার্থক্য সত্ত্বেও সাংহাই কমিশন নয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। প্রস্তাবগুলোতে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয় যে অপিয়াম স্মোকিং বা ধূমপান হিসেবে আফিম সেবন একটি ক্ষতিকর অভ্যাস, যা ধীরে ধীরে বন্ধ করা উচিত। এছাড়া সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে আফিমের অবাধ উৎপাদন ও বিতরণ সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়। কমিশন এটাও প্রস্তাব করে যে কোনো দেশ যেন অন্য কোনো দেশে এমন মাদক রপ্তানি না করে, যা আমদানিকারক দেশের আইনে নিষিদ্ধ (Walker, 1991)।
সাংহাই কমিশন কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি প্রণয়ন করতে না পারলেও এটি বৈশ্বিক মাদক শাসনের ধারণাগত ভিত্তি তৈরি করে দেয়। এই কমিশনের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জন্ম নেয় বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multilateral Diplomacy)-র একটি নতুন ধারা। এর আগে আফিম ছিল কেবল সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব রাজস্ব বা স্বাস্থ্যের বিষয়। সাংহাই কমিশনের পর এটি প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর সার্বজনীন উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়। হ্যামিল্টন রাইট এবং তার সহকর্মীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল উপদেশ দিয়ে মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা। ফলে সাংহাই সম্মেলনের সমাপ্তি আসলে কোনো শেষ ছিল না, এটি ছিল পরবর্তী এক বড় আইনি কাঠামোর প্রস্তুতি পর্ব।
প্রথম আন্তর্জাতিক আফিম কনভেনশন হেগ ১৯১২: বাধ্যবাধকতার আইনি রূপ (The First International Opium Convention at The Hague 1912: Legalizing Obligations)
সাংহাই কমিশনের পরামর্শমূলক প্রস্তাবগুলোকে একটি বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯১২ সালের ২৩ জানুয়ারি বারোটি দেশের প্রতিনিধির স্বাক্ষরে জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক আফিম কনভেনশন (International Opium Convention)। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে প্রথম বহুপাক্ষিক মাদক নিয়ন্ত্রণ চুক্তি। হেগ কনভেনশন মাদক নিয়ন্ত্রণের ধারণাকে সাধারণ আফিম থেকে প্রসারিত করে পরিশোধিত অ্যালকালয়েডগুলোর ওপরও সম্প্রসারিত করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বুঝতে পারছিল যে কাঁচা আফিমের চেয়ে আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল ল্যাবরেটরিতে তৈরি রাসায়নিকগুলো মানবদেহের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক (McAllister, 2000)।
হেগ কনভেনশনের অন্যতম প্রধান তাৎপর্য ছিল যে এটি কেবল কাঁচা আফিম বা ধূমপানের আফিমের মধ্যে আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। চুক্তির আওতায় আনা হয় মরফিন, কোকেন এবং তুলনামূলক নতুন মাদক হেরোইনকে। এর ফলে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফার্মাসিউটিক্যাল নিয়ন্ত্রণ (Pharmaceutical Control) ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। কনভেনশনের উদ্দেশ্য ছিল খুব স্পষ্ট; এই শক্তিশালী রাসায়নিকগুলোর উৎপাদন, বিক্রয় এবং ব্যবহারের সুযোগ কেবল চিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখা হবে। রাষ্ট্রগুলো প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা নিজস্ব জাতীয় আইন প্রণয়ন করে লাইসেন্সবিহীন মাদক উৎপাদন ও বিতরণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে।
তবে হেগ কনভেনশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় রাজনৈতিক ও আইনি বাধা ছিল। চুক্তিটিতে বলা হয়েছিল যে এটি তখনই সম্পূর্ণ কার্যকর হবে, যখন বিশ্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করবে। জার্মানি, যাদের বিশ্ববিখ্যাত রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান যেমন বায়ার বা মার্ক তখন বিশ্বজুড়ে মরফিন ও কোকেনের প্রধান উৎপাদক ছিল, তারা সহজে নিজেদের লাভজনক শিল্পকে শৃঙ্খলিত করতে চায়নি। লাতিন আমেরিকার কোকা উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং ইউরোপীয় শক্তিবর্গ বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এর পেছনে কাজ করছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব বনাম বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব। আন্তর্জাতিক গবেষক ডেভিড বেউলি-টেলর দেখিয়েছেন যে এই কনভেনশনটি শক্তিশালী দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা এবং মাদক দমনের নৈতিক দাবির এক জটিল আপসরফা ছিল (Bewley-Taylor, 1999)।
এই চুক্তির মাধ্যমে মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ নীতি (Supply Control Policy) প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। রাষ্ট্রগুলো সম্মত হয় যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালাতে হলে প্রতিটি চালানের জন্য সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র নিতে হবে। হেগ কনভেনশন নিখুঁত ছিল না, কারণ এতে কোনো কার্যকর কেন্দ্রীয় নজরদারি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছিল না। কোনো রাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করলে তাকে জবাবদিহি করানোর ক্ষমতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ছিল না। তা সত্ত্বেও এই কনভেনশন বৈশ্বিক মাদক আইনের রূপরেখা স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। পরবর্তীকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ সংঘাত এই প্রক্রিয়াকে সাময়িকভাবে স্থবির করলেও হেগ কনভেনশনের নীতিগুলো বিশ্বরাজনীতিতে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে।
দক্ষিণ এশিয়ায় আসাম কমিশনের পটভূমি ও গ্রামীণ সংকট (Background of the Assam Inquiry and Rural Crisis in South Asia)
আন্তর্জাতিক মঞ্চে যখন কূটনীতিবিদরা আফিম নিয়ন্ত্রণের বড় বড় সনদ তৈরি করছিলেন, ঠিক তখন ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা টিকিয়ে রেখেছিল। বিশেষ করে আসামের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত করুণ। ১৮৯৩ সালের রয়্যাল কমিশন অন ওপিয়াম ব্রিটিশ স্বার্থের অনুকূলে রিপোর্ট দিয়ে দাবি করেছিল যে এশিয়ার মানুষের জন্য আফিম কোনো ক্ষতিকর বস্তু নয়। ফলে আসামে ব্রিটিশ প্রশাসন তাদের লাভজনক আবগারি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখে। সরকারের লক্ষ্য ছিল আবগারি আফিম বিক্রির মাধ্যমে সর্বাধিক রাজস্ব আদায় করা। সরকারি লাইসেন্সধারী মহলগুলোর মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে কাঁচা আফিম বা কানি সরবরাহ করা হতো। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে আসামের গ্রামীণ সমাজের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক জীবনে এর এক অন্ধকার প্রভাব নেমে আসে (Guha, 1982)।
আসামের সাধারণ কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনে আফিম এক ভয়াবহ অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। অতিরিক্ত দাম দিয়ে আফিম কিনতে গিয়ে কৃষক পরিবারগুলো ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত। ঔপনিবেশিক সরকার প্রতি বছর আফিমের দাম বাড়িয়ে দাবি করত যে তারা দাম বাড়িয়ে মানুষের ব্যবহার কমাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে আফিমাসক্ত মানুষের পক্ষে হঠাৎ এটি ত্যাগ করা সম্ভব ছিল না। ফলে কৃষকরা নিজেদের স্থাবর সম্পত্তি, জমিজমা এবং গবাদিপশু বিক্রি করে সরকারি দোকান থেকে আফিম কিনত। সরকার রাজস্ব আদায়ের নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছিল, অথচ সেই অনুপাতে আসামের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ক্ষমতা কমছিল। এই অর্থনৈতিক শোষণের ফলে এক গভীর গ্রামীণ অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে।
এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে আসামের সচেতন নাগরিক সমাজ সোচ্চার হয়ে ওঠে। শিক্ষিত অসমিয়া মধ্যবিত্ত সমাজ বুঝতে পারে যে ঔপনিবেশিক সরকার রাজকোষ ভরার জন্য তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অসন্তোষ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় যখন ১৯২১ সালে আসামে অসহযোগ আন্দোলনের জোয়ার আসে। জাতীয়তাবাদী নেতারা বুঝতে পারেন যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আসামের ক্ষেত্রে এই লড়াইকে পরিণত করতে হবে আফিমের অভিশাপ থেকে মুক্তির সংগ্রামে। তরুণ রাজনীতিবিদ কুলধর চালিহা (Kuladhar Chaliha) আসাম আইন পরিষদে সরকারি আবগারি নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক প্রশ্ন তুলে সরকারকে কোণঠাসা করতে শুরু করেন (Saikia, 2011)।
এই প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় ১৯২৪ সালে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি একটি বেসরকারি তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়, যা ইতিহাসে আসাম আফিম অনুসন্ধান কমিটি (Assam Opium Enquiry Committee) নামে পরিচিত। এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন কুলধর চালিহা। তদন্ত প্রক্রিয়ায় কমিটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন প্রখ্যাত সমাজসেবক এবং মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ (Charles Freer Andrews)। অ্যান্ড্রুজ আসামের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ঘুরে ঘুরে আফিমাসক্ত মানুষের করুণ পরিণতি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেন। এই কমিশন গঠন ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে ছিল এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এটি ছিল ঔপনিবেশিক তথ্যব্যবস্থার বিপরীতে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি এক বিকল্প সত্য অনুসন্ধান। এর মাধ্যমে জনকল্যাণ বনাম ঔপনিবেশিক রাজস্ব (Public Welfare versus Colonial Revenue)-এর নির্মম দ্বন্দ্বটি সরাসরি জনসমক্ষে চলে আসে।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও আসামে মাদকবিরোধী জনমত (Nationalist Movement and Anti-Opium Public Opinion in Assam)
আসামে আফিমবিরোধী আন্দোলনের গতি প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে যায় ১৯২১ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (Mohandas Karamchand Gandhi)-র আসাম সফরের পর। গান্ধী যখন আসামের বিভিন্ন জেলায় জনসভা করেন, তখন তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে স্বরাজ অর্জনের প্রথম শর্ত হলো অন্তরের ও সমাজের শুদ্ধি। গান্ধীজীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আসামের হাজার হাজার তরুণ ছাত্র ও কংগ্রেস কর্মী মাঠে নেমে পড়ে। শুরু হয় সরকারি আফিমের দোকানগুলোর সামনে অহিংস পিকেটিং। এই আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল যে এতে সাধারণ নারীরা ব্যাপক সংখ্যায় অংশ নেন। যে পরিবারগুলোর পুরুষ সদস্যরা আফিমাসক্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল, সেই পরিবারের মা ও বোনেরা পিকেটিং লাইনে এসে দাঁড়িয়ে মাদক বিক্রিতে বাধা দিতে থাকেন (Sarkar, 1983)।
এই তৃণমূল আন্দোলনের ফলে সরকারি কোষাগারে আকস্মিক ধস নামে। সরকারের কাছে মাদক বিক্রি বন্ধ করা মানে ছিল আসামের মোট বাজেটের একটি বিশাল অংশ হাতছাড়া হওয়া। তাই ঔপনিবেশিক পুলিশ বাহিনী এই অহিংস পিকেটারদের ওপর চড়াও হয়। শত শত ছাত্র ও কর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তরুণ কুলধর চালিহাকেও কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। কিন্তু দমন-পীড়ন চালিয়ে এই গণজাগরণ থামানো সম্ভব হয়নি। মানুষের মধ্যে আফিম সেবনকে সামাজিক পাপ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। স্থানীয় পঞ্চায়েত ও সমাজপতিরা ঘোষণা করেন যে যারা সরকারি দোকান থেকে আফিম কিনবে, তাদের সমাজচ্যুত করা হবে। আন্দোলনটি পরিণত হয় এক সফল আবগারি বয়কট (Excise Boycott) কর্মসূচিতে।
১৯২৫ সালে চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ ও কুলধর চালিহার নেতৃত্বাধীন কমিটি তাদের ঐতিহাসিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয় যে সরকারি রাজস্বের লোভ কীভাবে আসামের বিভিন্ন জনজাতির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে স্থবির করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে আসামে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকার আফিম বিক্রি হয়, যার প্রায় পুরোটাই আসে চরম দরিদ্র রায়তদের পকেট থেকে। অ্যান্ড্রুজ এই রিপোর্টটি কেবল ভারতের জাতীয় নেতাদের হাতেই তুলে দেননি, তিনি এটি লন্ডনে এবং জেনেভায় আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের কাছেও পাঠিয়ে দেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে ব্রিটিশ সরকারের মাদকনীতি আবারও গভীর সমালোচনার মুখে পড়ে (Sharma, 2011)।
আসামের এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে সাম্রাজ্যিক অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে তৃণমূল সংহতি (Grassroots Solidarity)। ব্রিটিশ সরকার তীব্র জনমত ও আন্তর্জাতিক অস্বস্তির মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। আসাম আইন পরিষদে ১৯২৭ সালে একটি প্রস্তাব পাস হয়, যার মাধ্যমে আগামী দশ বছরের মধ্যে প্রদেশে আফিম সেবন সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার সরকারি নীতি গৃহীত হয়। রেজিস্টার্ড আফিমসেবীদের জন্য রেশনের পরিমাণ প্রতি বছর দশ শতাংশ করে কমানোর ব্যবস্থা চালু করা হয়। তৃণমূল স্তরের অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মাদক একচেটিয়া বাণিজ্যের ভিত্তি ভেঙে দেওয়ার এই ঘটনা ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসে এক বিরল ও অনন্য নজির হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
প্রাথমিক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক প্রভাব (Limitations and Global Legacy of Early Initiatives)
বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকে সাংহাই, হেগ এবং আসামে যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে আধুনিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আঁতুড়ঘর বলা চলে। তবে এই প্রাথমিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট ছিল। আন্তর্জাতিক আইনগুলো তৈরি হচ্ছিল মূলত পশ্চিমা বড় শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। সাংহাই বা হেগ কনভেনশনে উৎপাদক কৃষকদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তখনও এশিয়ায় তাদের মাদক রাজস্ব পুরোপুরি ছাড়তে প্রস্তুত ছিল না। ফলে আইন প্রণয়ন হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা ফাঁকফোকর থেকে গিয়েছিল। জাতীয় সার্বভৌমত্বের অজুহাতে অনেক দেশ তাদের নিজস্ব রাসায়নিক কারখানাগুলোর ওপর কার্যকর তদারকি চালাতে অস্বীকার করেছিল (Sinha, 2008)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে হেগ কনভেনশনের গতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে যুদ্ধের সমাপ্তি এই স্থবিরতাকে এক অভাবনীয় সুযোগে পরিণত করে। ১৯১৯ সালে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে বিজয়ী মিত্রশক্তিগুলো একটি যুগান্তকারী কৌশল অবলম্বন করে। শান্তির শর্ত হিসেবে প্রণীত ভার্সাই চুক্তি (Treaty of Versailles)-এর ২৯৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয় যে এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সমস্ত রাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৯১২ সালের হেগ আফিম কনভেনশনকে অনুমোদন করেছে বলে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে কোনো অতিরিক্ত আলোচনা ছাড়াই রাতারাতি বিশ্বের অধিকাংশ প্রধান রাষ্ট্র হেগ কনভেনশনের অংশীদারে পরিণত হয়। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের এক বিরল প্রয়োগ, যা মাদক নিয়ন্ত্রণকে বৈশ্বিক কূটনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপান্তর করে।
ভার্সাই চুক্তির পরপরই আন্তর্জাতিক মাদক তদারকির দায়িত্ব চলে যায় নবগঠিত জাতিপুঞ্জ (League of Nations)-এর কাঁধে। জাতিপুঞ্জের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় ওপিয়াম অ্যাডভাইজরি কমিটি। এর মাধ্যমে মাদক সমস্যাকে কোনো সাময়িক সংকটের বদলে একটি স্থায়ী বৈশ্বিক প্রশাসনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। হেগের আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আসামের মতো মাঠপর্যায়ের গণআন্দোলনের অভিঘাত আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বাধ্য করে এটি মেনে নিতে যে উন্মুক্ত বাজারে মাদকের বেচাকেনা কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়। মাদককে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ঘোষণা করে তাকে আইনি সীমানার কঠোর শৃঙ্খলে বাঁধার যে কাজ সাংহাইয়ে শুরু হয়েছিল, তা একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি লাভ করে (Knepper, 2011)।
এই প্রাথমিক পর্বটি ইতিহাসের শিক্ষা হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাংহাই থেকে হেগ, আর হেগ থেকে আসামের প্রত্যন্ত অঞ্চল – এই পুরো যাত্রাপথটি দেখায় যে আন্তর্জাতিক চুক্তি কেবল সম্মেলনের টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকলে তা কার্যকর হয় না। চুক্তি তখনই বাস্তবে রূপ নেয়, যখন মাঠপর্যায়ের সামাজিক প্রতিরোধ তার সাথে যুক্ত হয়। যদিও সেই প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো মাদক চোরাচালানকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি এবং তৈরি করেছিল নতুন ধরণের কালোবাজার, তবু তারা একটি বিষয়ে স্থায়ী মীমাংসা এনে দিয়েছিল। তা হলো, মাদক কোনো বৈধ বা স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পণ্য নয়। এই প্রাথমিক নীতিগত অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জাতিসংঘের আধুনিক এবং আরও বিস্তৃত মাদক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে ওঠে।
জেনেভা কনভেনশন ও মধ্যবর্তী সময়ের উদ্যোগ (Geneva Convention and Interwar Drug Control): আন্তর্জাতিক সমন্বয়
জাতিপুঞ্জের মাদক উপদেষ্টা কমিটি ও বৈশ্বিক তত্ত্বাবধান (The League’s Opium Advisory Committee and Global Supervision)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর মানচিত্র যখন নতুন করে আঁকা হচ্ছিল, তখন সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে গড়ে ওঠে এক নতুন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল। যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রগুলো উপলব্ধি করেছিল যে কিছু সমস্যা কোনো একক দেশের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিপুঞ্জ (League of Nations)-এর সনদের ২৩ নম্বর ধারার গ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে আফিম এবং অন্যান্য ক্ষতিকর মাদকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তদারকির সার্বিক দায়িত্ব এই নতুন সংস্থার ওপর ন্যস্ত থাকবে। এর মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি অতীতের অনিয়মিত কূটনৈতিক সম্মেলনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে (Hudson, 1931)। বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারছিল যে চোরাচালানের গতিবিধি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকে না।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে জাতিপুঞ্জ ১৯২০ সালে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। এটি পরিচিত ছিল আফিম ও অন্যান্য বিপজ্জনক মাদক পাচার বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটি (Advisory Committee on the Traffic in Opium and Other Dangerous Drugs) নামে। এই কমিটির প্রথম সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের মে মাসে। জেনেভার শান্ত লেকের ধারের কার্যালয়ে বিশ্বের প্রধান প্রধান দেশের কূটনীতিক এবং বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত আলোচনায় বসতে শুরু করেন। এই কমিটির প্রধান কাজ ছিল বিশ্বজুড়ে কোথায় কতটা মাদক উৎপাদিত হচ্ছে, কোন দেশ কতটা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করছে আর কতটা চোরাপথে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা। কমিটির প্রশাসনিক নেতৃত্বে ছিলেন সমাজসেবামূলক কাজের বিশেষজ্ঞ র্যাচেল ক্রাউডি (Rachel Crowdy), যার নিরলস পরিশ্রমে মাদক সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ব্যবস্থা গড়ে তোলার সূচনা হয়।
উপদেষ্টা কমিটির কার্যপদ্ধতি ছিল তৎকালীন কূটনৈতিক ঐতিহ্যের তুলনায় বেশ অভিনব। এর আগে বিভিন্ন দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বা উৎপাদনের তথ্য অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে জানাতে বাধ্য ছিল না। তবে জাতিপুঞ্জের এই কমিটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একটি বার্ষিক প্রশ্নমালার উত্তর দিতে বাধ্য করে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি বছর কোন দেশ কতটা আফিম চাষ করল, তাদের কারখানাগুলোতে কতটা মরফিন ও কোকেন তৈরি হলো এবং কতটা ওষুধ বিদেশে রপ্তানি হলো, তার নিখুঁত খতিয়ান জেনেভায় জমা হতে থাকে। সুইডিশ গবেষক ও আন্তর্জাতিক প্রশাসক বার্টল রেনবার্গ (Bertil Renborg) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই তথ্য সংগ্রহের কাজই পরবর্তীকালে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল (Renborg, 1947)।
তবে এই উপদেষ্টা কমিটির কার্যক্রমের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতও লুকিয়ে ছিল। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তখনও দূরপ্রাচ্যে তাদের উপনিবেশগুলোতে আফিম বিক্রির লাভজনক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে রাজি ছিল না। ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা বারবার দাবি করতেন যে এশিয়ার জলবায়ু এবং সেখানকার স্থানীয় শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় আফিম একটি সহনীয় উপাদান। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা জাতিপুঞ্জের আনুষ্ঠানিক সদস্য না হয়েও এই কমিটির কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছিল, তারা চাইছিল যে কোনো প্রকার আপস ছাড়া কাঁচা আফিম ও কোকা পাতার উৎপাদন শুরুতেই ধ্বংস করে দেওয়া হোক। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের দ্বন্দ্বেই উপদেষ্টা কমিটির প্রতিটি বৈঠক উত্তপ্ত হয়ে উঠত।
জেনেভা আফিম সম্মেলন ১৯২৪–১৯২৫: কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বিভক্তি (The Geneva Opium Conferences 1924–1925: Diplomatic Tensions and Division)
উপদেষ্টা কমিটির প্রাথমিক পর্যালোচনার পর এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে ১৯১২ সালের হেগ কনভেনশন বাস্তবায়নের জন্য আরও সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে ১৯২৪ সালের নভেম্বর মাসে জেনেভায় একটি নয়, বরং দুটি ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করা হয়। প্রথম সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল কেবলমাত্র সেই সব দেশ, যাদের এশীয় উপনিবেশগুলোতে সরকার নিয়ন্ত্রিত আফিম সেবনের একচেটিয়া অধিকার বহাল ছিল। এই তালিকায় ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, ভারত, জাপান, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল এবং সিয়াম। এই প্রথম সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সীমিত; কীভাবে দূরপ্রাচ্যে ধূমপানের আফিম ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে সমঝোতা করা। কিন্তু ঔপনিবেশিক সরকারগুলো রাজস্ব হারানোর ভয়ে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে (Willoughby, 1925)।
প্রথম সম্মেলনের এই অচলাবস্থার মাঝেই শুরু হয় দ্বিতীয় জেনেভা সম্মেলন, যার পরিধি ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত। এই অধিবেশনে বিশ্বের প্রায় চল্লিশটি দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হন। দ্বিতীয় সম্মেলনে কেবল কাঁচা আফিম নয়, বরং রাসায়নিকভাবে তৈরি মরফিন, হেরোইন এবং কোকেনের মতো বিপজ্জনক পদার্থের বিশ্বব্যাপী বিতরণ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের এজেন্ডা ঠিক করা হয়। এই সম্মেলনেই মিশরের প্রতিনিধি এল গুয়িন্দি দাবি তোলেন যে ভারতীয় শণ বা ক্যানাবিসকেও এই আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি যুক্তি দেখান যে তার দেশের সাধারণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে হাশিশ বা চরসের ভূমিকা মারাত্মক। ইউরোপীয় শক্তিগুলো প্রথমে অনিচ্ছুক থাকলেও শেষ পর্যন্ত ক্যানাবিসকে নিয়ন্ত্রিত পদার্থের তালিকায় যুক্ত করতে রাজি হয়।
তবে দ্বিতীয় সম্মেলনের মূল নাটকের অবতারণা ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মধ্যকার খোলামেলা সংঘাতে। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন কট্টর সংস্কারবাদী রাজনীতিক স্টিফেন জি. পোর্টার (Stephen G. Porter)। পোর্টার কঠোর অবস্থান নেন যে কেবল উৎপাদিত ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করলে চলবে না; কৃষক স্তরে গিয়ে পপি গাছের চাষ এবং কোকা পাতার উৎপাদন কোটা বেঁধে দিতে হবে। তার যুক্তি ছিল খুব সোজা – জলধারা যদি উৎস থেকেই শুকিয়ে দেওয়া না যায়, তবে মোহনায় বাঁধ দিয়ে বন্যা ঠেকানো অর্থহীন। ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল এর তীব্র বিরোধিতা করে। তারা পাল্টাযুক্তি দেয় যে কৃষকের ক্ষেত পাহারা দেওয়া কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাজ হতে পারে না এবং এটি প্রতিটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ এখতিয়ার (Moorhead, 1930)।
তীব্র বাদানুবাদ ও দীর্ঘ সপ্তাহব্যাপী অচলাবস্থার পর মার্কিন প্রতিনিধিদল বুঝতে পারে যে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের দাবিতে নতি স্বীকার করবে না। ১৯২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়ে পোর্টার সম্মেলন কক্ষ থেকে তার পুরো প্রতিনিধিদলকে প্রত্যাহার করে নেন। মার্কিনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চীনা প্রতিনিধি আলফ্রেড সজে (Alfred Sze)-ও সম্মেলন ত্যাগ করেন, কারণ বেইজিং সরকার মনে করেছিল যে তাদের ভূখণ্ডে বিদেশিদের মাদক পাচার রোধে এই সম্মেলন কোনো কার্যকর রক্ষাকবচ দিতে পারছে না। দুই প্রভাবশালী দেশের এই পদত্যাগ সত্ত্বেও বাকি দেশগুলো আলোচনা চালিয়ে যায় এবং ১৯২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক দ্বিতীয় জেনেভা আফিম কনভেনশন (Second Geneva Opium Convention)। এই চুক্তি ত্রুটিপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের নতুন এক অধ্যায় উন্মোচন করে।
পার্মানেন্ট সেন্ট্রাল ওপিয়াম বোর্ড: বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও হিসাবরক্ষণ (The Permanent Central Opium Board: Global Statistics and Accounting)`
১৯২৫ সালের জেনেভা কনভেনশনের সবচেয়ে কার্যকর উদ্ভাবন ছিল একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থার জন্ম দেওয়া। এই সংস্থাটির নাম রাখা হয় পার্মানেন্ট সেন্ট্রাল আফিম বোর্ড (Permanent Central Opium Board)। এই বোর্ডটি কোনো রাজনৈতিক কূটনীতিকদের দল ছিল না। এটি গঠিত হয়েছিল আটজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে, যাদের নিয়োগ দিত জাতিপুঞ্জের কাউন্সিল। এই বিশেষজ্ঞরা কোনো নির্দিষ্ট দেশের স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বাধীন পেশাদার হিসেবে কাজ করতেন। বোর্ডের প্রধান কাজ ছিল বিশ্বব্যাপী বৈধ মাদকের উৎপাদনের সাথে চাহিদার ভারসাম্য পরীক্ষা করা। কোনো রাষ্ট্র যাতে তাদের চিকিৎসাগত প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত মাদক জমা করে তা চোরাবাজারে ছেড়ে দিতে না পারে, তার ওপর কড়া নজরদারি রাখা ছিল তাদের মূল দায়িত্ব (Bailey, 1936)।
বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উদ্ভাবন করা হয় আমদানি ও রপ্তানি সনদপত্র ব্যবস্থা। এর নিয়ম ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। ধরা যাক, কোনো সুইস কোম্পানি ভারতে চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য মরফিন পাঠাতে চায়। সুইস সরকার ততক্ষণ পর্যন্ত রপ্তানির অনুমতি দেবে না, যতক্ষণ না ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক আমদানি সনদপত্র ইস্যু করে জানাচ্ছে যে এই চালানটি কেবল বৈধ চিকিৎসার কাজেই ব্যবহৃত হবে। এই দ্বিমুখী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে অজ্ঞাত বা বেনামী ক্রেতার কাছে মাদক বিক্রি করার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিটি চালানের গতিপথ নথিবদ্ধ হতে থাকে এবং সেই সমস্ত নথি জেনেভায় সেন্ট্রাল বোর্ডের কাছে নিয়মিত জমা পড়তে থাকে।
বোর্ডকে এক অভূতপূর্ব আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল। যদি সেন্ট্রাল বোর্ডের হিসাবরক্ষণে ধরা পড়ত যে কোনো নির্দিষ্ট দেশে অস্বাভাবিক পরিমাণে মাদক জমা হচ্ছে এবং সেই দেশ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হতো, তবে বোর্ড বিশ্বব্যাপী একটি সতর্কতা জারি করতে পারত। এমনকি চরম ক্ষেত্রে বোর্ড অন্য সমস্ত দেশকে সেই নির্দিষ্ট অপরাধী রাষ্ট্রে মাদক রপ্তানি বন্ধ করার সুপারিশ করার এখতিয়ার রাখত। এই নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা কোনো সামরিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এটি দাঁড়িয়ে ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বয়কট ও জনলজ্জার হুমকির ওপর। আমেরিকান গবেষক ও কূটনীতিক লুইস এলিজাবেথ সোয়াইন আইজেনলোর (Louise Elizabeth Swaine Eisenlohr) দেখিয়েছেন যে এই বোর্ডটি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রথম সফল তদারকি প্রতিষ্ঠান (Eisenlohr, 1934)।
এই আমলাতান্ত্রিক ও গাণিতিক নজরদারির সুফল দ্রুতই হাতেনাতে মিলতে শুরু করে। ইউরোপের কারখানাগুলো থেকে লাইসেন্সবিহীন উপায়ে টন কে টন মরফিন ও হেরোইন বাইরে পাচার হওয়ার যে ধারা বিশের দশকে প্রচলিত ছিল, তা এই ব্যবস্থার ফলে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে আসে। কারখানা মালিকরা আর বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে চোরাকারবারিদের কাছে মাল পাঠাতে পারছিলেন না। সেন্ট্রাল বোর্ডের এই নির্ভুল পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে মাদক নিয়ন্ত্রণে আবেগপূর্ণ ভাষণের চেয়ে নিখুঁত গাণিতিক হিসাব এবং কঠোর আমলাতান্ত্রিক সমন্বয় অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
১৯৩১ সালের উৎপাদন সীমাবদ্ধকরণ কনভেনশন: কোটা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ (The 1931 Limitation Convention: Quota System and Regulation)
১৯২৫ সালের জেনেভা কনভেনশন বাণিজ্যের পথ কিছুটা সংকুচিত করতে পেরেছিল বটে, তবে একটি মৌলিক গলদ তখনও রয়ে গিয়েছিল। কারখানাগুলো ঠিক কতটা ওষুধ তৈরি করতে পারবে, তার ওপর কোনো সরাসরি আইনি লাগাম ছিল না। ফলে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানাগুলো প্রতি বছর তাদের নিজস্ব ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ মাদক তৈরি করে যেত। কারখানা মালিকরা দাবি করতেন যে তারা ভবিষ্যতের চাহিদার কথা ভেবে এই মজুদ গড়ে তুলছেন। কিন্তু বাস্তবে এই বিপুল উদ্বৃত্ত মজুদের একটি বিরাট অংশ নানা চোরাপথে অন্ধকার বাজারে ঢুকে পড়ছিল। বিশের দশকের শেষভাগে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। এই সংকট সমাধানের জন্যই জেনেভায় ১৯৩১ সালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় (Wright, 1931)।
এই সম্মেলনের পরিণতি হিসেবে জন্ম নেয় ১৯৩১ সালের মাদকদ্রব্য প্রস্তুত সীমাবদ্ধকরণ ও বণ্টন নিয়ন্ত্রণ কনভেনশন (Convention for Limiting the Manufacture and Regulating the Distribution of Narcotic Drugs)। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্ব সম্প্রদায় কোনো একটি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক পণ্যের বৈশ্বিক উৎপাদনকে সরাসরি কোটা বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কনভেনশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে প্রতি বছর শেষ হওয়ার আগেই জেনেভায় একটি অগ্রিম হিসাব বা এস্টিমেট পাঠাতে হতো। সেই হিসাবে উল্লেখ করতে হতো যে আগামী এক বছরে তাদের দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও চিকিৎসার জন্য ঠিক কত গ্রাম বা কত কিলোগ্রাম মরফিন, কোকেন বা হেরোইনের প্রয়োজন হবে।
এই অগ্রিম চাহিদাপত্রগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য গঠিত হয় আরেকটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার নাম দেওয়া হয় ড্রাগ সুপারভাইজরি বডি (Drug Supervisory Body)। এই সংস্থার চারজন বিশেষজ্ঞ সদস্য প্রতিটি দেশের পাঠানো হিসাব চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। কোনো দেশ যদি তাদের জনসংখ্যার তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত চাহিদাপত্র পাঠাত, তবে সুপারভাইজরি বডি তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারত এবং সেই চাহিদার পরিমাণ কেটে কমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল এই যে, কোনো রাষ্ট্র যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের হিসাব পাঠাতে ব্যর্থ হতো, তবে সুপারভাইজরি বডি নিজেই সেই দেশের জন্য একটি বার্ষিক কোটা নির্ধারণ করে দিত। সেই হিসাব মেনেই বিশ্ব কারখানাগুলোকে উৎপাদন করতে হতো (Renborg, 1944)।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিকিৎসায় ব্যবহৃত সামগ্রিক মাদকের পরিমাণ বিশ্বব্যাপী কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসে। কারখানাগুলো আর নিজেদের মর্জিমাফিক ওষুধ তৈরি করতে পারত না। বিশ্বজুড়ে বৈধ মোট উৎপাদনকে বিশ্বের মোট বৈধ চাহিদার সমান রাখা নিশ্চিত করা হয়। অর্থনীতিবিদদের কাছে এই ব্যবস্থা ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি পরিকল্পিত অর্থনীতির বাস্তব রূপায়ণ। মুক্তবাজারের অর্থনীতির যুগে একটি নির্দিষ্ট পণ্যের উৎপাদন ও বণ্টনে এমন সর্বসম্মত আন্তর্জাতিক কোটা ব্যবস্থা চালু করা সত্যিই অকল্পনীয় এক প্রশাসনিক সাফল্য ছিল। এর ফলে বৈধ ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা থেকে অবৈধ বাজারে ওষুধের চোরাচালান প্রায় নব্বই শতাংশ কমে যায়।
১৯৩৬ সালের অবৈধ পাচার দমন কনভেনশন: প্রথম আন্তর্জাতিক ফৌজদারি সনদ (The 1936 Illicit Traffic Convention: First International Penal Charter)
বৈধ কারখানাগুলোর ওপর জেনেভার কড়াকড়ির এক অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া সমাজে দেখা দিতে শুরু করে। কারখানা থেকে যখন বৈধ ওষুধের চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেল, তখন অন্ধকার জগতের অপরাধী চক্রগুলো নিজেরাই বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। তারা নিজেরাই গোপন রাসায়নিক গবেষণাগার স্থাপন করে কাঁচা আফিম থেকে অবৈধভাবে মরফিন ও হেরোইন তৈরি করতে শুরু করে। ইউরোপের মার্সেই বা চীনের তিয়ানজিনের মতো বন্দর নগরীগুলোতে গড়ে ওঠে আধুনিক মাফিয়া সিন্ডিকেট। মাদক ব্যবসা আর নিছক কোনো বাণিজ্যের অনিয়ম থাকল না; এটি রূপ নিল সংগঠিত আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টারদের পেশাদার অপরাধে। ফলে জাতিপুঞ্জ বুঝতে পারে যে কেবল সিভিল ল বা বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং দিয়ে এই নতুন ধরণের অপরাধ দমন করা যাবে না। প্রয়োজন ফৌজদারি আইনের কঠোর প্রয়োগ (Starke, 1937)।
এই বাস্তবতা থেকেই ১৯৩৬ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি সম্মেলন, যা উপহার দেয় বিপজ্জনক মাদকদ্রব্যের অবৈধ পাচার দমন কনভেনশন (Convention for the Suppression of the Illicit Traffic in Dangerous Drugs)। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে প্রথম বহুপাক্ষিক কনভেনশন যা সরাসরি অপরাধ দমন ও ফৌজদারি বিচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এর আগে মাদক সংক্রান্ত অপরাধকে প্রতিটি দেশ তাদের স্থানীয় আইন অনুযায়ী লঘু বা গুরুদণ্ড দিত। কিন্তু ১৯৩৬ সালের কনভেনশন নির্দেশ দেয় যে মাদক পাচার, অর্থায়ন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্রকে প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইনে অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। একই সাথে অপরাধীদের কঠোর কারাদণ্ড ও অর্থনৈতিক জরিমানা নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়।
এই কনভেনশনের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল এর প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত নিয়মাবলী। অতীতে মাদক পাচারকারীরা এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে গিয়ে আইনের হাত থেকে রক্ষা পেত। এই কনভেনশন স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে নির্দেশ দেয় যেন তারা মাদক চোরাচালানকে প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ হিসেবে নিজেদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ অপরাধী যে দেশেই আশ্রয় নিক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। এছাড়া প্রতিটি দেশে একটি করে বিশেষায়িত কেন্দ্রীয় পুলিশ কার্যালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক স্তরে অন্যান্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সার্বক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে (Chatterjie, 1981)।
তবে ১৯৩৬ সালের এই চুক্তিতে কিছু দুর্বলতাও বিদ্যমান ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা বিশ্বের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মাদকবিরোধী নীতি অনুসরণ করছিল, তারা এই কনভেনশন অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়। তৎকালীন মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব নারকোটিকসের প্রধান হ্যারি জে. আনসলিঙ্গার মনে করেছিলেন যে কনভেনশনটি ইউরোপীয় আপসকামী শক্তির প্রভাবে খুব নরম হয়েছে। সেখানে ব্যক্তিগত মাদক সেবনকারীকে কঠোর সাজার আওতায় আনার স্পষ্ট বিধান ছিল না। তা সত্ত্বেও এই কনভেনশনটি আজকের আধুনিক ইন্টারপোল ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনের যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দেখতে পাই, তার সরাসরি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিল। অপরাধীদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মোকাবেলায় এটি ছিল রাষ্ট্রগুলোর যৌথ আইনি প্রতিরোধ।
আন্তঃযুদ্ধকালীন মাদক শাসনের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা (Achievements and Constraints of Interwar Drug Governance)
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী এই দুই দশকে জেনেভাকেন্দ্রিক যে বৈশ্বিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার সামগ্রিক মূল্যায়ন এক মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল এই যে, আন্তর্জাতিক সমাজ প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সীমানা পেরিয়েও যৌথ বৈশ্বিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সেন্ট্রাল বোর্ড এবং সুপারভাইজরি বডির মতো আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধের দামামার মধ্যেও বিশ্বজুড়ে কাজ চালিয়ে গিয়েছিল। তারা প্রমাণ করেছিল যে বিজ্ঞানসম্মত তথ্য, ধারাবাহিক হিসাবরক্ষণ এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মধ্যে বেঁধে রাখা যায়। ১৯৩১ সালের ব্যবস্থার ফলে উন্নত দেশগুলোতে বৈধ কারখানা থেকে ওষুধ পাচারের ঘটনা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল (Kingsberg, 2014)।
কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণের অন্ধকার দিকটিও ছিল অত্যন্ত করুণ। যখনই বৈধ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল, তখনই অর্থনৈতিক চাহিদার কারণে কালোবাজারের দাম বেড়ে গেল শতগুণ। এর ফলে জন্ম নিল ভয়াবহ সংগঠিত অপরাধী সিন্ডিকেট। চীনা উপকূলীয় শহরগুলোতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাফিয়াদের প্রভাব ফুলেফেঁপে উঠল। সবচেয়ে চরম উদাহরণটি সৃষ্টি হয়েছিল এশিয়ায়। জাপান যখন চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে মানচুকুও নামে এক পুতুল রাষ্ট্র কায়েম করে, তখন জাপানি সামরিক শাসকরা জেনেভার সমস্ত নিয়মকানুন পদদলিত করে সেখানে এক বিশাল সরকারি মাদক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তারা আফিম ও হেরোইনের মনোপলি থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তাদের যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক অভিযানের ব্যয় মেটাত। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে আন্তর্জাতিক আইনের এই অসহায় আত্মসমর্পণ আন্তঃযুদ্ধকালীন ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছিল (Jennings, 2005)।
তা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি ছিল। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে জাতিপুঞ্জের রাজনৈতিক পরিষদগুলো একে একে ভেঙে পড়ে। জেনেভা শহরটি কার্যত যুদ্ধরত ফ্যাসিবাদী শক্তির দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু সেন্ট্রাল আফিম বোর্ড এবং সুপারভাইজরি বডির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা তাদের নথিপত্র এবং পরিসংখ্যানের খাতাগুলো ধ্বংস হতে দেননি। তারা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে জেনেভা ত্যাগ করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় ও ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের গোপন বিকল্প দপ্তর স্থাপন করেন। যুদ্ধের ভয়াবহ অন্ধকারের ভেতরেও এই কর্মকর্তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যেতেন, যাতে যুদ্ধপরবর্তী বিশ্বের জন্য ওষুধ সরবরাহের শৃঙ্খল ভেঙে না পড়ে (Scheerer, 1997)।
আন্তঃযুদ্ধকালীন এই জেনেভা পর্বটি তাই আধুনিক মাদক রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই পর্বটি দেখিয়ে দিয়েছিল যে মাদক কেবল নৈতিক পাপ বা ব্যক্তিগত স্খলন নয়, এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতির একটি জটিল ক্ষেত্র। এখানে একাধারে জনস্বাস্থ্যের তাগিদ ছিল, আবার পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক লাভের হিসেবও ছিল। এই মধ্যবর্তী সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা, অর্জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাগুলোই পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর নবগঠিত জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল। যে জটিল আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি জেনেভায় তৈরি হয়েছিল, তারই ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সমকালীন বিশ্বের পুরো আন্তর্জাতিক মাদক নীতি।
জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (United Nations Drug Control Framework): ১৯৬১, ১৯৭১ ও ১৯৮৮ কনভেনশন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর রূপান্তর ও ১৯৬১ সালের একক কনভেনশন (Post-WWII Transition and the 1961 Single Convention)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যখন নতুন এক পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু জেনেভা থেকে সরে আটলান্টিকের ওপারে নিউ ইয়র্কে স্থানান্তরিত হয়। লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জের পতন ঘটলেও তার গড়ে তোলা বিভিন্ন তদারকি কাঠামো বিলীন হয়ে যায়নি। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রপুঞ্জ অনুধাবন করেছিল যে যুদ্ধপরবর্তী বিশ্বে মাদকের বিস্তার নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। ফলে ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় নারকোটিক ড্রাগস কমিশন (Commission on Narcotic Drugs)। এই নতুন কমিশনটির ওপর দায়িত্ব বর্তায় যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জটিল ও বিভ্রান্তিকর আন্তর্জাতিক মাদক আইনগুলোকে একটি একক ছাতার নিচে নিয়ে আসা (Bayer & Ghodse, 1999)।
সেই সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়টি ভিন্ন ভিন্ন বহুপাক্ষিক চুক্তি কার্যকর ছিল, যার শুরু হয়েছিল ১৯১২ সালের হেগ সম্মেলনের মাধ্যমে। এই বহুস্তরীয় নিয়মকানুনের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখা ছিল বেশ কঠিন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দূর করার লক্ষ্যে ১৯৫৮ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি সমন্বিত খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ কূটনৈতিক বিতর্ক ও আলোচনার পর ১৯৬১ সালের মার্চ মাসে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মত সম্মতিতে গৃহীত হয় একক কনভেনশন (Single Convention on Narcotic Drugs)। এই দলিলটি আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যা পূর্ববর্তী সমস্ত চুক্তিকে বাতিল করে একটি একক, সুসংহত ও বৈশ্বিক আইনি ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৬১ সালের একক কনভেনশনের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক সাফল্য ছিল দুটি প্রাচীন তদারকি সংস্থাকে একত্রিত করা। জাতিপুঞ্জের আমলের পার্মানেন্ট সেন্ট্রাল আফিম বোর্ড এবং ড্রাগ সুপারভাইজরি বডিকে একীভূত করে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড (International Narcotics Control Board)। এই বোর্ডটিকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় একটি আধা-বিচার বিভাগীয় কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়। বোর্ডের সদস্যরা কোনো দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত যোগ্যতায় নির্বাচিত হতেন। তাদের কাজ ছিল বিশ্বজুড়ে কোন দেশ কতটা মাদক উৎপাদন করছে, কতটা বৈধ বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, সেই তথ্যের নিয়মিত হিসাব রাখা। কোনো দেশ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে বোর্ড সেই দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারির অধিকার পেত।
তবে এই কনভেনশনের রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত অসম ও একপেশে। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও নীতি বিশ্লেষক জন কলিন্স (John Collins) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৬১ সালের একক কনভেনশনটি ছিল মূলত পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার এক সুচতুর কূটনৈতিক দলিল (Collins, 2020)। এই কনভেনশনে কাঁচা আফিম, কোকা পাতা এবং ক্যানাবিসের মতো প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন কৃষিজাত মাদকগুলোকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়, যা উৎপাদিত হতো প্রধানত এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকার ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানাগুলোতে উৎপাদিত কৃত্রিম ব্যথানাশক বা রাসায়নিক উপাদানগুলোকে তুলনামূলকভাবে শিথিল নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক মাদক শাসনের এই প্রাথমিক কাঠামোতেই উত্তর ও দক্ষিণের বৈষম্যের বীজটি রোপিত হয়ে গিয়েছিল।
তফসিল ব্যবস্থা ও সনাতন উদ্ভিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা (The Scheduling System and Prohibition of Traditional Plants)
১৯৬১ সালের একক কনভেনশনের মূল আইনি মেরুদণ্ড ছিল এর চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত তালিকা বা তফসিল ব্যবস্থা (Scheduling System)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন মাদক ও রাসায়নিক পদার্থকে তাদের ক্ষতিকর প্রভাব এবং চিকিৎসাগত উপযোগিতার ভিত্তিতে চারটি ভিন্ন ভিন্ন তফসিলে ভাগ করা হয়। প্রথম তফসিলে রাখা হয় এমন সব পদার্থ, যেগুলোর অপব্যবহারের ঝুঁকি প্রবল এবং যা সমাজের জন্য বিপজ্জনক, যেমন মরফিন, কোকেন ও হেরোইন। চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় সবচেয়ে মারাত্মক পদার্থগুলোকে, যেগুলোর চিকিৎসাগত ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত বা নেই বললেই চলে। এই শ্রেণিবিভাগ নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক দায়িত্ব দেওয়া হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে। তাদের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে নারকোটিক ড্রাগস কমিশন কোনো পদার্থকে এই তালিকায় যুক্ত বা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিত।
এই তফসিল ব্যবস্থার সবচেয়ে চরম আঘাতটি এসে পড়েছিল এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ওপর। কনভেনশনের মাধ্যমে কাঁচা আফিম, কোকা পাতা এবং ক্যানাবিসকে সরাসরি প্রথম এবং চতুর্থ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে সিদ্ধি বা ভাঙের যে সামাজিক ও আয়ুর্বেদিক ব্যবহার ছিল, কিংবা আন্দিজ পর্বতমালার আদিবাসীদের ক্লান্তি দূর করতে কোকা পাতা চিবানোর যে প্রথা ছিল, পশ্চিমা আইনের চোখে তা রাতারাতি আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায় (Bruun et al., 1975)। কনভেনশনে স্পষ্টভাবে আদেশ দেওয়া হয় যে চুক্তি স্বাক্ষরের পঁচিশ বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কোকা চিবানো এবং ক্যানাবিসের সমস্ত ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে সনাতন সমাজগুলোতে এক গভীর অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে। বলিভিয়া বা পেরুর একজন দরিদ্র কৃষক, যার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল কোকা চাষ, সে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এক চোরাকারবারিতে পরিণত হয়। একইভাবে নেপাল ও ভারতে সনাতন পদ্ধতিতে যারা বনজ ক্যানাবিস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত, তাদের জীবিকার পথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক আইন প্রণেতারা এই উদ্ভিদগুলোর ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান এবং তাদের সাংস্কৃতিক ব্যবহারের মধ্যে কোনো ফারাক করতে চাননি। সমাজতত্ত্ববিদরা দেখিয়েছেন যে এই ধরণের সার্বজনীন আইন স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র এবং অর্থনীতির ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে। পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যা ছিল কেবল আসক্তি, স্থানীয় মানুষের কাছে তা ছিল দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও লোকায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আন্তর্জাতিক গবেষক রবিন রুম (Robin Room) এবং তার সহকর্মীরা একটি বিস্তৃত গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে কীভাবে ক্যানাবিসকে বিজ্ঞানের বাস্তব প্রমাণের বাইরে গিয়ে একতরফাভাবে বিপজ্জনক মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল (Room et al., 2010)। তারা দেখিয়েছেন যে অ্যালকোহল বা তামাকের চেয়ে ক্যানাবিস কতটা ক্ষতিকর, তা নিয়ে তৎকালীন বিজ্ঞানীদের ভেতর তীব্র মতভেদ ছিল। তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র রাজনৈতিক চাপে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর কূটনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একে চতুর্থ তফসিলে হেরোইনের পাশাপাশি স্থান দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্যানাবিস নিয়ে কোনো ধরণের উদার নীতি গ্রহণের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়, যা এক কৃত্রিম অপরাধ জগতের জন্ম দেয়।
১৯৭১ সালের সাইকোট্রপিক কনভেনশন: সিন্থেটিক রাসায়নিকের নতুন ভূগোল (The 1971 Psychotropic Convention: New Geography of Synthetic Chemicals)
ষাটের দশকে এসে বৈশ্বিক মাদক পরিস্থিতির দৃশ্যপট সম্পূর্ণ নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের তরুণ সমাজের ভেতর এক নতুন সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ দেখা দেয়, যা যুক্ত ছিল ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম মাদকের অবাধ ব্যবহারের সাথে। এলএসডি, অ্যাম্ফিটামিন, বার্বিচুরেটস এবং ট্রাঙ্কুলাইজারের মতো রাসায়নিক পদার্থগুলো উন্মুক্ত বাজারে ওষুধ হিসেবে বিক্রি হলেও তরুণরা তা ব্যবহার করতে শুরু করে মানসিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে। এই সিন্থেটিক পদার্থগুলো ১৯৬১ সালের একক কনভেনশনের আওতায় ছিল না, কারণ সেই কনভেনশনটি তৈরি হয়েছিল মূলত প্রাকৃতিক উদ্ভিদের কথা মাথায় রেখে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইনপ্রণেতারা উপলব্ধি করেন যে কৃত্রিম রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই পটভূমিতে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হয় এক বৈশ্বিক সম্মেলন। এই সম্মেলনের ফসল হিসেবে স্বাক্ষরিত হয় সাইকোট্রপিক পদার্থ সংক্রান্ত কনভেনশন (Convention on Psychotropic Substances)। তবে এই সম্মেলনের আলোচনার টেবিলটি ছিল তীব্র বাণিজ্যিক লবিং এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক অদ্ভুত আখড়া। ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার শক্তিশালী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই কনভেনশনের খসড়া তৈরির সময় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। তারা কোনোভাবেই চাইছিল না যে তাদের কারখানায় উৎপাদিত লাভজনক ঘুমের ওষুধ বা অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্টগুলোর ওপর ১৯৬১ সালের কনভেনশনের মতো কঠোর কোটা ব্যবস্থা বা সরকারি হিসাবরক্ষণের বাধ্যবাধকতা চাপানো হোক।
ব্রিটিশ গবেষক সিন্ডি ফেজি (Cindy Fazey) তার গবেষণায় উন্মোচন করেছেন কীভাবে শিল্পোন্নত দেশগুলো এই কনভেনশনে দ্বিমুখী নীতি প্রয়োগ করেছিল (Fazey, 2003)। যখন তৃতীয় বিশ্বের কৃষকদের উৎপাদিত কোকা বা আফিম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এসেছিল, তখন পশ্চিমা বিশ্ব চরম কঠোরতার পক্ষে সওয়াল করেছিল। কিন্তু যখন নিজেদের দেশের বহুজাতিক কোম্পানির উৎপাদিত সিন্থেটিক পদার্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সময় এলো, তখন তারা নমনীয়তার নীতি বেছে নিল। ১৯৭১ সালের কনভেনশনে সাইকোট্রপিক পদার্থগুলোকে চারটি তফসিলে ভাগ করা হলেও প্রথম তফসিলের হ্যালুসিনোজেনিক পদার্থগুলো ছাড়া বাকি তিনটির ক্ষেত্রে উৎপাদন সীমা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হলো অত্যন্ত দুর্বল। এমনকি কোম্পানিগুলোকে তাদের বার্ষিক উৎপাদন কোটা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে জানাতে বাধ্যও করা হলো না।
সমাজবিজ্ঞানী টবি সেডন (Toby Seddon) দেখিয়েছেন যে ১৯৭১ সালের কনভেনশন আধুনিক মাদক ধারণাকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল (Seddon, 2014)। এটি এমন এক দ্বিচারিতা তৈরি করেছিল যেখানে উদ্ভিজ্জ মাদক গ্রহণকারীকে দেখা হতো নিকৃষ্ট অপরাধী হিসেবে, আর সিন্থেটিক ড্রাগ ব্যবহারকারীকে দেখা হতো আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার রোগী হিসেবে। এই কনভেনশনটি পশ্চিমা ওষুধ শিল্পের মুনাফা সুরক্ষিত রেখেছিল বটে, কিন্তু এটি কালোবাজারের বিস্তারকে ঠেকাতে পারেনি। কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবরেটরিগুলোতে এই সাইকোট্রপিক উপাদানগুলো অবৈধভাবে তৈরি হতে শুরু করে। ফলে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের এই নমনীয়তা পরবর্তীতে এক নতুন সিন্থেটিক মাদক মহামারির পথ প্রশস্ত করে দেয়।
১৯৭২ সালের প্রটোকল ও আইনি সংশোধনী (The 1972 Amending Protocol: Strengthening Extradition and Treatment)
সত্তরের দশকের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তন ঘটে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ ফেরত সৈন্যদের মধ্যে হেরোইনের বিস্তার এবং দেশের প্রধান শহরগুলোতে অপরাধের বৃদ্ধি দেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দেন। ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছিল যে ১৯৬১ সালের একক কনভেনশনের কাঠামো মাদক পাচার রোধে যথেষ্ট আক্রমণাত্মক নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার খোলসটি ভেঙে তাকে একটি বৈশ্বিক পুলিশি ব্যবস্থার রূপ দিতে। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য মার্কিন চাপে ১৯৭২ সালে জেনেভায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করা হয়, যার মাধ্যমে ১৯৬১ সালের কনভেনশনে ব্যাপক সংশোধনী আনা হয়।
এই সংশোধনের ফলাফল হিসেবে স্বাক্ষরিত হয় ১৯৭২ সালের সংশোধনী প্রটোকল (Amending Protocol to the Single Convention)। এই প্রটোকলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ডের ক্ষমতা লক্ষণীয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে বোর্ড ছিল কেবল একটি নিষ্ক্রিয় হিসাবরক্ষক সংস্থা। নতুন সংশোধনীর ফলে বোর্ডকে ক্ষমতা দেওয়া হয় কোনো দেশ যদি আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের সন্দেহভাজন হয়, তবে সেই দেশের সম্মতি সাপেক্ষে তাদের ভূখণ্ডে গিয়ে সরাসরি তদন্ত করার। এছাড়া কোনো রাষ্ট্রের মাদক পরিস্থিতির তথ্য যাচাই করার জন্য জাতিসংঘের বাইরের বেসরকারি উৎস থেকেও তথ্য সংগ্রহের অধিকার বোর্ডকে প্রদান করা হয়, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর এক গভীর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৭২ সালের প্রটোকলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অপরাধীদের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে সহজ করা। আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা যাতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে গিয়ে আইনি সুবিধা না পায়, সেজন্য মাদক সংক্রান্ত অপরাধকে বাধ্যতামূলক প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়। তবে এই শাস্তিমূলক কঠোরতার পাশাপাশি এই প্রটোকলে প্রথমবার চিকিৎসার ধারণাও যুক্ত করা হয়। এতে বলা হয় যে রাষ্ট্র কেবল মাদকসেবীকে কারাগারে না পাঠিয়ে বিকল্প হিসেবে তার চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের এক বিরল নরম সুর, যদিও মাঠপর্যায়ে রাষ্ট্রগুলো পুনর্বাসনের চেয়ে শাস্তির পথটিই বেশি বেছে নিয়েছিল (Jelsma, 2003)।
আইন গবেষক রিক লাইনস (Rick Lines) তার বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৭২ সালের এই প্রটোকলটি আন্তর্জাতিক মাদক শাসনকে মার্কিন বৈদেশিক নীতির একটি সম্প্রসারিত হাতিয়ারে রূপান্তর করেছিল (Lines, 2017)। আমেরিকা তার আর্থিক অনুদানের শর্ত হিসেবে অন্যান্য দেশকে এই প্রটোকল অনুমোদনে বাধ্য করে। যেসব দেশ মার্কিন সাহায্য বা ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা নিজেদের দেশের আইনকে এই সংশোধনীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বাধ্য হয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে মাদক সমস্যাকে স্বাস্থ্যের চেয়ে নিরাপত্তার চোখে দেখার যে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি, তা আন্তর্জাতিক আইনের অবিচ্ছেদ্য নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
১৯৮৮ সালের ভিয়েনা কনভেনশন: অপরাধ দমন ও অর্থপাচারের আন্তর্জাতিকীকরণ (The 1988 Vienna Convention: Criminalization and Laundering Countermeasures)
আশির দশকে এসে আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের চরিত্র এক দানবীয় রূপ ধারণ করে। লাতিন আমেরিকায় মেডেলিন (স্প্যানিশে ‘মেদেইন’) ও ক্যালি কার্টেলের মতো সশস্ত্র সংগঠনের উত্থান ঘটে, যাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা বহু ছোট দেশের সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি ছিল। এই কার্টেলগুলো বিশ্বজুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের এক সমান্তরাল অর্থনীতি পরিচালনা করছিল। তাদের হাতে বিচারক, পুলিশ এবং রাজনীতিবিদরা খুন হচ্ছিলেন। প্রচলিত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো এই বহুজাতিক মাফিয়া চক্রকে দমন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছিল, কারণ আগের কনভেনশনগুলো ছিল মূলত বৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের দলিল। কিন্তু কার্টেলগুলোর সাথে বৈধ বাণিজ্যের কোনো সম্পর্কই ছিল না। এই ভয়াবহ বাস্তবতা মোকাবেলার জন্যই ১৯৮৮ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হয় এক নতুন যুগান্তকারী সম্মেলন।
১৯৮৮ সালের ২০ ডিসেম্বর গৃহীত হয় মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক পদার্থের অবৈধ পাচার বিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশন (United Nations Convention Against Illicit Traffic in Narcotic Drugs and Psychotropic Substances)। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠোর এবং বিস্তারিত ফৌজদারি সনদ। এই কনভেনশনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যে এটি মাদকের বাইরে গিয়ে মাদক অর্থনীতির মূল রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় আঘাত হানার পথ তৈরি করে। কনভেনশনে প্রথমবারের মতো অর্থপাচার (Money Laundering)-কে একটি স্বতন্ত্র এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয় তারা যেন মাদক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য কঠোর জাতীয় আইন প্রণয়ন করে।
আইন বিশেষজ্ঞ নিল বোয়েস্টার (Neil Boister) তার আকর গ্রন্থ পেনাল অ্যাসপেক্টস অব দ্য ইউএন ড্রাগ কনভেনশনস (Penal Aspects of the UN Drug Conventions)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ১৯৮৮ সালের চুক্তিটি প্রতিটি সার্বভৌম দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলেছিল (Boister, 2001)। এই কনভেনশন স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে বাধ্য করে তাদের অভ্যন্তরীণ আইনে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মাদক রাখাকেও বাধ্যতামূলকভাবে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে। অর্থাৎ একজন আসক্ত ব্যক্তি এবং একজন পেশাদার সশস্ত্র পাচারকারীর মধ্যকার আইনি সীমানাটি মুছে ফেলা হয়। এছাড়া প্রিকারসার কেমিক্যালস বা যে সমস্ত বৈধ শিল্প রাসায়নিক মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা হয়।
আর্থিক অপরাধ গবেষক উইলিয়াম সি. গিলমোর (William C. Gilmore) তুলে ধরেছেন যে কীভাবে ১৯৮৮ সালের কনভেনশন আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার গোপনীয়তার দেয়াল ভেঙে দিয়েছিল (Gilmore, 1995)। এই চুক্তির মাধ্যমে পাস হয় যে মাদক সংক্রান্ত তদন্তের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তাদের ক্লায়েন্টের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করার অজুহাত দিতে পারবে না। বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের জন্য চালু করা হয় নিয়ন্ত্রিত ডেলিভারি এবং যৌথ তদন্ত ব্যবস্থার মতো আধুনিক পুলিশি কৌশল। এই কনভেনশনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ বিজ্ঞানের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক বিশ্বে মাদক নিয়ন্ত্রণ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি বিশ্ব ব্যাংকিং, করপোরেট বাণিজ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড ও সমকালীন নজরদারি (The International Narcotics Control Board and Contemporary Oversight)
১৯৬১, ১৯৭১ এবং ১৯৮৮ সালের এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আজ জাতিসংঘের পুরো মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। এই ত্রয়ী সনদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে ভিয়েনাকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড। তেরো সদস্যের এই বোর্ডটি প্রতি বছর একটি বিস্তৃত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাদক পরিস্থিতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির চুলচেরা বিশ্লেষণ থাকে। বোর্ডের মূল দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যাতে কোনো দেশ এই তিনটি কনভেনশনের কোনো ধারা লঙ্ঘন না করে। কোনো দেশ যদি নিজস্ব নীতিতে কিছুটা শিথিলতা আনার চেষ্টা করে, তবে বোর্ড অবিলম্বে সেই দেশের সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে এবং তাদের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই জাতিসংঘ কাঠামোর সাথে বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের বাস্তব নীতির মধ্যে এক তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো সত্তর দশক থেকেই কার্যকরভাবে সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করে আসছিল। ডাচ সমাজবিজ্ঞানী ডার্ক জে. কর্ফ (Dirk J. Korf) দেখিয়েছেন কীভাবে ক্যানাবিস বিক্রির জন্য বিশেষায়িত কফি শপ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ডাচ সরকার এই নিয়ন্ত্রণের ফাঁকফোকর ব্যবহার করেছিল (Korf, 1995)। কিন্তু সম্প্রতি উরুগুয়ে, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু অঙ্গরাজ্যে বিনোদনের জন্য ক্যানাবিসকে সম্পূর্ণ বৈধ করার মাধ্যমে জাতিসংঘের ১৯৬১ সালের কনভেনশনটি সবচেয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড বারবার এই দেশগুলোকে চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে, কিন্তু সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো বোর্ডের এই কড়া শাসনকে তোয়াক্কা করছে না।
একই সাথে সংঘাত তৈরি হয়েছে মানবাধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে। আইন গবেষক এরিক ভ্যান রি (Erik van Ree) প্রশ্ন তুলেছেন যে আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলো যে কঠোর নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেয়, তা আসলে আধুনিক মানবাধিকারের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না (van Ree, 1999)। পর্তুগাল বা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো যখন অপরাধমুক্তকরণ এবং নিরাপদ সেবন কেন্দ্রের মতো ক্ষতি হ্রাস নীতি বাস্তবায়ন করছে, তখন তারা এই আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সীমানা অতিক্রম না করেও নিজেদের নাগরিকের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে এই ধরণের মানবকল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে, যার ফলে বৈশ্বিক শাসন কাঠামো এবং স্থানীয় বাস্তবতার দূরত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, জাতিসংঘের এই তিন কনভেনশন বিশ্বজুড়ে মাদক বাণিজ্যের বিস্তার রোধ করতে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরি করতে পেরেছে সত্য, কিন্তু এর কঠোরতা এবং অনমনীয়তা সমকালীন বিশ্বকে এক জটিল সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশ্বায়িত অপরাধ নেটওয়ার্কগুলো নতুন নতুন সিন্থেটিক রাসায়নিক ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রাচীন আইনের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ ভোগ করছে অন্ধ নিষেধাজ্ঞার নির্মম পরিণতি। জাতিসংঘের মাদক নীতি আজ তাই এক ঐতিহাসিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই কনভেনশনগুলোকে সংশোধন করা হবে, নাকি পুরনো ব্যর্থ নিষেধাজ্ঞার গোঁড়ামিকেই আঁকড়ে ধরে থাকা হবে – এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আগামী বিশ্বের সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ।
বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা ও সমকালীন শাসন (Global Programme of Action and Contemporary Governance): আন্তর্জাতিক নীতির বিকাশ
১৯৯০ সালের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন ও বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা (The 1990 UNGASS and the Global Programme of Action)
স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে পৃথিবীর ভূ-রাজনীতি যখন দ্রুত বদলে যাচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক মাদক কূটনীতিও এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়। আশির দশকের শেষ ভাগে এসে দেখা গেল, মাদক কেবল চোরাচালানকারীদের পকেট ভারী করছে না, এটি পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। মেডেলিন ও ক্যালি কার্টেলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রের বিচারক, মন্ত্রী ও সাংবাদিকদের প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করছিল। অন্যপ্রান্তে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের শহরগুলোতে ক্র্যাক কোকেন ও হেরোইনের বিস্তার সমাজকল্যাণমূলক কাঠামোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই পটভূমিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ উপলব্ধি করে যে মাদক সমস্যা নিয়ে কোনো সাধারণ বা গতানুগতিক আলোচনায় আর কাজ হবে না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার (Stares, 1996)।
এই জরুরি তাগিদ থেকেই ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের সপ্তদশ বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা হয়। এটি ছিল মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে সাধারণ পরিষদের ডাকা প্রথম বিশেষ অধিবেশন। এই অধিবেশন থেকেই অনুমোদিত হয় ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘোষণা এবং বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা (Global Programme of Action)। জাতিসংঘ ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়কে মাদক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ দশক হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মাদক দমন কূটনীতি এক নতুন উচ্চতায় আরোহণ করে। এর আগে মাদক নিয়ন্ত্রণকে মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মনে করা হতো। কিন্তু এই অধিবেশনের পর থেকে এটি রাষ্ট্রের শীর্ষ বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার তালিকায় জায়গা করে নেয়।
এই বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ধারণাগত স্তরে এক নতুন নীতিমালার স্বীকৃতি। সেটি হলো ভাগাভাগি করা দায়িত্ব (Shared Responsibility)-র দর্শন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মাদক উৎপাদনকারী উন্নয়নশীল দেশগুলো নালিশ করে আসছিল যে ধনী দেশগুলো সমস্যার মূল কারণকে এড়িয়ে যায়। পশ্চিমা বিশ্ব দাবি করত যে মাদক উৎপাদন বন্ধ হলেই সমাজ রক্ষা পাবে। অথচ তারা নিজেদের দেশের মধ্যকার তীব্র চাহিদার দিকে চোখ তুলে তাকাত না। ১৯৯০ সালের কর্মপরিকল্পনায় প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার করা হয় যে চাহিদা হ্রাস এবং সরবরাহ দমন – এই দুটি দিকই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ধনী ভোক্তা রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের নিজস্ব তরুণ সমাজের মধ্যকার মাদকের ক্ষুধা কমাতে না পারে, তবে দরিদ্র দেশগুলোর কৃষকদের ওপর বন্দুকের নল তাক করে ফসল পোড়ানো এক অর্থহীন আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই কর্মপরিকল্পনার আওতায় রাষ্ট্রগুলো আন্তঃদেশীয় আইনি সহযোগিতা বৃদ্ধি, আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়। তবে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের ওপর। ঘোষণা করা হয় বিকল্প উন্নয়ন (Alternative Development)-এর নীতি। এর উদ্দেশ্য ছিল আফিম পপি বা কোকা চাষের ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকার জন্য বিকল্প ফসল চাষে সহায়তা করা। ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন, কোনো বিকল্প অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা না দিয়ে কেবল দরিদ্র কৃষকের খেত পুড়িয়ে দিলে তারা আরও বেশি নিঃস্ব হয়ে পুনরায় অপরাধের দিকেই ঝুঁকে পড়ে (Youngers & Rosin, 2005)। কর্মপরিকল্পনায় উন্নয়ন সহায়তা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল।
তবে এই বৈশ্বিক পরিকল্পনার বাস্তব রূপায়ণ মোটেই সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক দলিলটিতে চমৎকার সব মানবিক অঙ্গীকার ব্যক্ত হলেও মাঠপর্যায়ে তহবিলের বরাদ্দ ছিল অপ্রতুল। পশ্চিমা ধনী দেশগুলো নিজেদের সীমানায় নিরাপত্তা জোরদার করতে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করতে দ্বিধা করেনি, অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষকদের সেচব্যবস্থা বা যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রতিশ্রুত আন্তর্জাতিক সাহায্য খুব সামান্যই পৌঁছেছিল। ফলে বহু প্রতিশ্রুতি কেবল আন্তর্জাতিক নথিপত্রের শোভা বাড়ায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুলিয়া বাক্সটন (Julia Buxton) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই পরিকল্পনাটি বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর বাস্তব অসমতাকে পুরোপুরি অতিক্রম করতে পারেনি (Buxton, 2006)। তা সত্ত্বেও এই অধিবেশন একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন এনেছিল। মাদক সমস্যা যে কোনো বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের রোগ নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা – এই উপলব্ধি আন্তর্জাতিক নীতিমালার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ইউএনওডিসির প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র (Creation of UNODC and Institutional Bureaucracy)
আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর পরিধি যত বাড়ছিল, জাতিসংঘের ভেতরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জাতিসংঘের মাদক সংক্রান্ত কার্যক্রম বিভক্ত ছিল কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরের অধীনে। ভিয়েনায় অবস্থিত ড্রাগ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম কাজ করত একভাবে, অন্যদিকে জেনেভার স্বাস্থ্য সংস্থা বা অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধ কেন্দ্র কাজ করত ভিন্ন ধারায়। এই বহুধা বিভক্ত কাঠামোর কারণে সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের সমন্বয়হীনতা ও পারস্পরিক মতবিরোধ নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান ১৯৯৭ সালে একটি বড় প্রশাসনিক সংস্কার হাতে নেন। এই সংস্কারের অংশ হিসেবে গঠিত হয় জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয় বা ইউএনওডিসি (United Nations Office on Drugs and Crime – UNODC)।
ভিয়েনায় সদর দপ্তর স্থাপন করে নতুন এই সংস্থাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মাদক শাসনের একক অভিভাবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক কূটনীতিক পিনো আরলাচ্চি। আরলাচ্চির অধীনে ভিয়েনাকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্রে এক আক্রমণাত্মক ও উচ্চাভিলাষী কর্মপ্রবাহ যুক্ত হয়। সংস্থাটির ওপর কেবল মাদকের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি; এর সাথে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং দুর্নীতির মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ তদন্তের সার্বিক সমন্বয়। এই আমলাতান্ত্রিক একত্রীকরণের ফলে মাদক সমস্যাটি সরাসরি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের সামরিকীকৃত ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে বাঁধা পড়ে যায় (Friesendorf, 2007)।
ইউএনওডিসি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তথ্যের একচেটিয়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে। প্রতি বছর নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা শুরু হয় বহুল আলোচিত বিশ্ব মাদক প্রতিবেদন (World Drug Report)। এই প্রকাশনায় স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে বিভিন্ন পাহাড়ি উপত্যকায় পপি ও কোকা চাষের নিখুঁত হিসাব, বিশ্বজুড়ে মাদক জব্দের পরিসংখ্যান এবং সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলে ধরা হয়। কিন্তু গবেষক রস কুম্বার (Ross Coomber) তার গবেষণায় যুক্তি দিয়েছেন যে এই ধরণের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান প্রায়ই পক্ষপাতহীন থাকে না (Coomber, 1998)। বৃহৎ দাতা দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে অনেক সময় মাঠের তথ্যের ব্যাখ্যা নির্ধারিত হতো। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাদক নীতির কারণে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্য সংকট বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অন্ধকার দিকগুলো অনেক সময় সরকারি সংখ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত।
একই সাথে ভিয়েনায় গড়ে ওঠা এই একক প্রতিষ্ঠানের সাথে জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার এক সূক্ষ্ম অথচ গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে মাদককে দেখার পক্ষপাতী ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণের চোখ দিয়ে, সেখানে ইউএনওডিসি দীর্ঘদিন ধরে কঠোর আইন প্রয়োগকারী মডেলকেই আঁকড়ে ধরে রাখে। তাদের কাছে মাদকাসক্ত মানুষটি ছিল মূলত আইনের চোখে এক অপরাধী। এই মানসিকতার প্রধান কারণ ছিল সংস্থাটির আর্থিক কাঠামোর দুর্বলতা। ইউএনওডিসির বাজেটের সিংহভাগ আসত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী দাতা দেশগুলোর স্বেচ্ছামূলক অনুদান থেকে। দাতা দেশগুলোর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কোনো স্বাধীন বা জনস্বাস্থ্যমুখী সংস্কার প্রস্তাব তোলা ভিয়েনার আমলাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
এই আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার সংহতকরণ শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক মাদক নীতিকে এক অনমনীয় শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলে। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব সমাজবাস্তবতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা স্বাস্থ্য সংকট বিবেচনা না করে ভিয়েনা থেকে জারি করা একমুখী প্রেসক্রিপশন সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বিপুল অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী করা হলেও সামাজিক পুনর্বাসন বা চিকিৎসার ক্ষেত্রগুলো অবহেলিত থেকে যায়। ফলে নব্বইয়ের দশকের শেষ প্রান্তে এসে মাদক শাসনের আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্র একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক পরিসরে অত্যন্ত ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে, অন্যদিকে তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট থেকে বহু দূরে সরে যায়।
১৯৯৮ সালের বিশেষ অধিবেশন ও “মাদকমুক্ত বিশ্ব”-এর কল্পনা (UNGASS 1998 and the Vision of a “Drug-Free World”)
জাতিসংঘের মাদক কূটনীতির পুরো ইতিহাসে ১৯৯৮ সালের জুন মাসে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের বিংশতম বিশেষ অধিবেশনটি ছিল সবচেয়ে নাটকীয়। সম্মেলন কক্ষে তখন উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের শীর্ষ নেতারা। ভিয়েনার আমলাতন্ত্রের আত্মবিশ্বাস তখন এমন এক চূড়ায় উঠেছিল যে তারা বাস্তবতার সমস্ত সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছিল: “একটি মাদকমুক্ত বিশ্ব – আমরা এটা করতে পারি!”। উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হয় যে মানবজাতি এবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং আগামী দশ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০০৮ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে সমস্ত অবৈধ মাদক সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হবে। এই ঘোষণাটি সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বাস্তবতাবিবর্জিত নীতি প্রণয়নের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে (Zirnite, 1998)।
এই অধিবেশনে বিশ্বনেতারা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন। ঠিক হয় যে ২০০৮ সালের মধ্যে কলম্বিয়া, বলিভিয়া, পেরু, আফগানিস্তান এবং মায়ানমারের মাটি থেকে কোকা গাছ ও পপি ফুলের চাষ সমূলে উৎপাটন করা হবে। পাশাপাশি সিন্থেটিক অ্যাম্ফিটামিন জাতীয় মাদকের ল্যাবরেটরিগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়। যুদ্ধবিমান থেকে জঙ্গল ও ফসলের ক্ষেতে রাসায়নিক বিষ স্প্রে করার মতো বিপজ্জনক পদক্ষেপকে উৎসাহিত করা হয়। নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে রাষ্ট্র যদি তার সমস্ত পুলিশি ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে, তবে যেকোনো অর্থনৈতিক চাহিদা ও সামাজিক আসক্তিকে জোর করে নির্মূল করে দেওয়া সম্ভব।
বাস্তবতা অবশ্য এই রাজনৈতিক ইউটোপিয়াকে মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। মাদক অর্থনীতি কোনো সাধারণ কারখানা নয় যে নোটিশ ঝুলিয়ে তালা বন্ধ করে দেওয়া যাবে। এটি পরিচালিত হয় বাজারের চাহিদা ও জোগানের গোপন সমীকরণে। অর্থনীতিবিদ ও অপরাধবিজ্ঞানী পিটার রয়টার (Peter Reuter) তার গবেষণায় এই ব্যর্থতার পেছনের গতিবিদ্যা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন বিখ্যাত বেলুন প্রভাব (Balloon Effect)-এর কথা (Reuter, 2009)। তিনি দেখান যে বাতাসভর্তি কোনো বেলুনের একপাশে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে বাতাস যেমন অন্যপাশে ফুলে ওঠে, মাদক উৎপাদনের প্রকৃতিও ঠিক তাই। কোনো একটি নির্দিষ্ট উপত্যকায় যখন হাজার হাজার সেনা নামিয়ে ফসল পুড়িয়ে দেওয়া হতো, তখনই চাষিরা কয়েক মাইল দূরে অন্য কোনো দুর্গম পাহাড়ে গিয়ে নতুন করে বীজ বুনত।
২০০৮ সাল যখন ঘনিয়ে এলো, তখন জাতিসংঘের নিজস্ব মূল্যায়নেই দেখা গেল যে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় কিছুই অর্জিত হয়নি। বিশ্বজুড়ে আফিম ও কোকার মোট উৎপাদন কমার বদলে অনেক অঞ্চলে উল্টো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে এই সামরিক অভিযানের প্রধান উদ্যোক্তা ছিল, তাদের নিজেদের শহরের বাজারেই মাদকের দাম কমছিল এবং বিশুদ্ধতা বাড়ছিল। অর্থাৎ সরবরাহ কমার কোনো লক্ষণই ছিল না। অথচ এই দশ বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অপচয় হয়েছিল, রাসায়নিক বিষে নষ্ট হয়েছিল হাজার হাজার হেক্টর বনাঞ্চল এবং খাদ্য শস্যের জমি, আর অগণিত দরিদ্র কৃষক তাদের বাস্তুচ্যুত হয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
১৯৯৮ সালের এই ব্যর্থতা বৈশ্বিক নীতি নির্ধারকদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরে। কঠোর বলপ্রয়োগের নীতি যে কার্যকর নয়, তা আর তাত্ত্বিক কোনো বিতর্ক রইল না; তা রূপান্তরিত হলো এক নির্মম বাস্তবতায়। একটি মাদকমুক্ত বিশ্বের রূপকথা আসলে সাধারণ মানুষের মন ভোলানোর এক রাজনৈতিক প্রচারণা ছিল। এই প্রচারণা কালোবাজারের গডফাদারদের বিপুল মুনাফা অর্জনের পথ আরও মসৃণ করেছিল, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল সমাজকে। এই ঐতিহাসিক বিপর্যয় পরবর্তী দশকগুলোতে বৈশ্বিক মাদক নীতির ভেতরে থাকা গভীর ফাটলগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে শুরু করে।
২০০৯ সালের রাজনৈতিক ঘোষণা ও ভিয়েনা ঐকমত্যের ফাটল (The 2009 Political Declaration and Fractures in the Vienna Consensus)
১৯৯৮ সালের অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার করুণ পরিণতির পর আন্তর্জাতিক মহলে এক ধরণের বিষণ্ণ আত্মোপলব্ধি তৈরি হয়। ২০০৯ সালের মার্চ মাসে ভিয়েনায় বসে নারকোটিক ড্রাগস কমিশনের ৫২তম অধিবেশন। এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল গত এক দশকের ব্যর্থতা পর্যালোচনা করা এবং পরবর্তী দশ বছরের জন্য নতুন একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর গৃহীত হয় ২০০৯ সালের রাজনৈতিক ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনা। এই নথিতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে মাদকের উৎপাদন, পাচার এবং অপব্যবহার পরিমাপযোগ্যভাবে কমানোর অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু এই আপাত ঐক্যের ভেতরে দীর্ঘদিনের তথাকথিত ভিয়েনা ঐকমত্যের দেয়ালটি ততদিনে কাঁপতে শুরু করেছিল (Babor et al., 2010)।
২০০৯ সালের আলোচনার টেবিলটি একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। শব্দটি হলো ক্ষতি হ্রাস (Harm Reduction)। সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, পর্তুগাল, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশ এবং লাতিন আমেরিকার কিছু রাষ্ট্র দাবি জানায় যে এই শব্দটি জাতিসংঘের নীতিতে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছিলেন যে মাদকসেবীদের জন্য জীবাণুমুক্ত সূঁচ সরবরাহ এবং মেথাডোন প্রতিস্থাপন থেরাপির ব্যবস্থা না করলে এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস সি-এর মতো মরণব্যাধি মহামারির আকার ধারণ করবে। কিন্তু এই বিজ্ঞানসম্মত ও মানবিক দাবির বিরুদ্ধে পাহাড়ের মতো প্রাচীর তুলে দাঁড়ায় একদল রক্ষণশীল দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র একাট্টা হয়ে ঘোষণা করে যে ক্ষতি হ্রাস শব্দটিকে মেনে নেওয়া মানে মাদকের ব্যবহারকে প্রকারান্তরে সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
কূটনৈতিক এই অচলাবস্থার কারণে সম্মেলনের ড্রাফটিং কমিটির ভেতরে বাক্য ও শব্দের কমা-সেমিকোলন নিয়ে দিনের পর দিন বাকযুদ্ধ চলে। শেষ পর্যন্ত একটি চরম আপসকামী ভাষা ব্যবহার করা হয়। ক্ষতি হ্রাস শব্দটি চূড়ান্ত খসড়া থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয় এবং তার বদলে কিছু অস্পষ্ট জনস্বাস্থ্য সহায়তার কথা যোগ করে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়। সমাজবিজ্ঞানী শেন ব্ল্যাকম্যান (Shane Blackman) তার পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক আমলাতন্ত্র কীভাবে বাস্তব প্রমাণ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানকে রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে বলি দিয়েছিল (Blackman, 2004)। কোটি কোটি আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার চেয়ে কয়েকটি ক্ষমতাধর দেশের অনড় সংস্কারকে টিকিয়ে রাখাই ভিয়েনার কূটনীতিতে প্রধান হয়ে উঠেছিল।
তবে এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব জেনে যায় যে আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের দিন শেষ হয়ে এসেছে। বিভিন্ন দেশ বুঝতে পারে যে ভিয়েনার অন্ধ নিষেধাজ্ঞার অপেক্ষা করতে গেলে তাদের নিজেদের নাগরিকরা অকালে মারা যাবে। ফলে আন্তর্জাতিক সনদের বাইরে গিয়ে স্থানীয়ভাবে নতুন পথ খোঁজার সাহস দেখাতে শুরু করে অনেক রাষ্ট্র। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো খোলাখুলি বলতে শুরু করে যে মার্কিন অগ্রাধিকারের বলি হয়ে তাদের সমাজ ধ্বংস হতে পারে না। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলো তাদের নিজস্ব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ক্ষতি হ্রাস নীতি জোরালোভাবে প্রয়োগ করতে থাকে, জাতিসংঘের নীরব অসন্তোষকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে।
২০০৯ সালের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক মাদক নীতি আর কোনো একক কাঠামোর নির্দেশে চলছে না। একদিকে ছিল শতাব্দীর প্রাচীন ভিয়েনা সনদের অনমনীয় রক্ষণশীলতা, অন্যদিকে ছিল মাঠপর্যায়ের মহামারি ও সহিংসতার বাস্তব চাপ। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের টানাপোড়েন প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক নীতিতে পরিবর্তন আসা কেবল সময়ের ব্যাপার। সেই পরিবর্তন যে আরও নাটকীয় হবে, তার স্পষ্ট পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল বিশ্বমঞ্চের কোণে কোণে।
২০১৬ সালের বিশেষ অধিবেশন: মানবাধিকার ও জনস্বাস্থ্যের মোড়বদল (UNGASS 2016: Pivot towards Human Rights and Public Health)
ভিয়েনার ধীরগতির আমলাতান্ত্রিক সংস্কার যখন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন লাতিন আমেরিকার মাটিতে জন্ম নেয় এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিদ্রোহ। বিশেষ করে মেক্সিকো, গুয়াতেমালা ও কলম্বিয়ায় মাদক যুদ্ধের নামে পরিচালিত অভিযানে সহিংসতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যা বহু গৃহযুদ্ধকেও হার মানায়। মেক্সিকোর শহরগুলোতে প্রতিদিন ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া যাচ্ছিল, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কার্টেলগুলোর ঘুষ ও অস্ত্রের সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছিল। পুরো অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছিল। এই রক্তপাতের মুখে দাঁড়িয়ে ২০১২ সালে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ফেলিপে কালদেরন এবং গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট অটো পেরেজ মলিনা এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেন।
তারা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একযোগে দাবি জানান যে ২০১৯ সালের জন্য নির্ধারিত মাদক বিষয়ক পরবর্তী বিশেষ অধিবেশনটি এগিয়ে এনে ২০১৬ সালেই আহ্বান করতে হবে। তাদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বেদনার্ত। তারা বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন যে পশ্চিমা বিশ্বের মাদকের নেশার মূল্য শোধ করতে হচ্ছে লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের রক্ত দিয়ে। তারা সতর্ক করে দেন যে প্রচলিত সামরিকায়ন নীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং অবিলম্বে নতুন বিকল্প পথ অন্বেষণ করতে হবে। এই অভূতপূর্ব কূটনৈতিক চাপের মুখে জাতিসংঘ বাধ্য হয় নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে নিউ ইয়র্কে সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করতে, যা সংক্ষেপে উনগাস ২০১৬ নামে পরিচিত লাভ করে।
এই ২০১৬ সালের অধিবেশনটি ছিল মাদক কূটনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। ভিয়েনার রুদ্ধদ্বার আমলাতান্ত্রিক বলয় ভেঙে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে সরব হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ, চিকিৎসাবিদ্যা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয় বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা জার্নাল ল্যানসেটের এক গভীর অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী জোয়ান সেতে (Joanne Csete) এবং তার সহ-গবেষকরা সেই নথিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেন যে অন্ধ মাদকবিরোধী যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর এক বিপর্যয়কর অভিঘাত সৃষ্টি করেছে (Csete et al., 2016)। তারা দেখান যে শাস্তিমূলক আইনের কারণে আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসা নিতে ভয় পায়, যা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের সংক্রমণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবেদনটি আহ্বান জানায় মাদক ব্যবহারকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সার্বজনীন জনস্বাস্থ্যের আওতায় নিয়ে আসার জন্য।
অধিবেশনের দীর্ঘ দরকষাকষির পর যে ফলাফল দলিলটি গৃহীত হয়, তা আন্তর্জাতিক মাদক নীতির ইতিহাসে এক বিরাট মোড় পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করে তোলে। যদিও পুরোনো কনভেনশনগুলোকে কাগজে-কলমে বহাল রাখা হয়, তবে অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এই প্রথম কোনো জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক মাদক সনদে মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা, শিশু অধিকার এবং জেন্ডার সমতার মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ক্ষুদ্র মাদক অপরাধের জন্য মাত্রাতিরিক্ত জেল-জুলুমের পরিবর্তে আনুপাতিক শাস্তির বিধান এবং বিকল্প সামাজিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। একই সাথে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ারে চিকিৎসাগত মরফিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়, যা এতকাল কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল (Trace, 2013)।
উনগাস ২০১৬ স্পষ্ট করে দেয় যে মাদকের প্রশ্নে বিশ্ব আর কখনো একমুখী পথে ফিরবে না। কানাডা এই সম্মেলনের মঞ্চ থেকেই ঘোষণা করে যে তারা খুব দ্রুত ক্যানাবিসকে জাতীয়ভাবে সম্পূর্ণ বৈধ ও বাণিজ্যিকীকরণের আওতায় নিয়ে আসছে। উরুগুয়ে ইতোমধ্যে সেই পথে হেঁটেছিল। অন্যদিকে কলম্বিয়া ও অন্যান্য দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে তারা নিজেদের কৃষকদের ওপর আর বিমান থেকে রাসায়নিক স্প্রে করবে না। যদিও রাশিয়া, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ তখনও মৃত্যুদণ্ড ও চরম শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পক্ষে অনড় অবস্থান বজায় রাখে, তবে বৈশ্বিক চিন্তার মূল ধারাটি নিশ্চিতভাবেই আইন প্রয়োগকারী মডেল থেকে সরে গিয়ে জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের দিকে মোড় নেয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও সমকালীন বহুপাক্ষিক শাসন (Sustainable Development Goals and Contemporary Multilateral Governance)
সমকালীন বিশ্বে মাদক নিয়ন্ত্রণের আলোচনাটি আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন আইনি বা পুলিশি সীমানায় বন্দি নেই। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি। এই সতেরোটি লক্ষ্যমাত্রার সাথে মাদক নীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্কটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক শাসনের অন্যতম প্রধান বিশ্লেষ্য বিষয়। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অন্ধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিচালিত মাদক দমন কর্মসূচিগুলো আসলে টেকসই উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি মৌলিক লক্ষ্যকে ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যখন কোনো অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালিয়ে বনভূমি ধ্বংস করে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটানো হয়, তখন তা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে, তা জলবায়ু ও পরিবেশ সংক্রান্ত লক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
একইভাবে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম তরুণ সদস্যকে সামান্য মাদক বহন করার অপরাধে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি রাখলে পুরো পরিবারটি অতল দারিদ্র্যের মুখে পতিত হয়। ফলে দারিদ্র্য নির্মূলের প্রথম লক্ষ্যটি মারাত্মকভাবে হোঁচট খায়। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার তিন নম্বর লক্ষ্য, যা সুস্বাস্থ্য ও সার্বজনীন কল্যাণের কথা বলে, তার সাড়ে তিন নম্বর অনুচ্ছেদে বিশেষভাবে মাদক ও ক্ষতিকর পদার্থের অপব্যবহার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি রাষ্ট্রগুলোকে মনে করিয়ে দেয় যে মাদক সমস্যার সমাধান করতে হবে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে, লাঠিচার্জ বা কারাগারের প্রাচীর তুলে নয়। একইভাবে ষোল নম্বর লক্ষ্য, যা ন্যায়বিচার, শান্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের কথা বলে, তা মাদক অর্থনীতি থেকে সৃষ্ট দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানায় (Keene, 2005)।
বর্তমান আন্তর্জাতিক মাদক শাসনব্যবস্থা তাই এক বহুমুখী ও গভীরভাবে খণ্ডিত রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো একক পরাশক্তি আর আগের মতো নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারছে না। সমকালীন বিশ্বের চিত্রটি এখন বহু মেরুতে বিভক্ত। একদিকে উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অংশ, ইউরোপের একাংশ এবং লাতিন আমেরিকার কিছু রাষ্ট্র ক্যানাবিসকে বৈধ করে একটি নিয়ন্ত্রিত ও করযুক্ত বাণিজ্যিক অর্থনীতি গড়ে তুলছে। তারা মাদকসেবীদের জন্য সেফ ইনজেকশন সাইট বা নিরাপদ সেবন কেন্দ্র তৈরি করছে, যেখানে নার্সদের উপস্থিতিতে মানুষ ওভারডোজ থেকে রক্ষা পাচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু রাষ্ট্রে ক্ষুদ্র মাদক অপরাধের জন্যও ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর রাখা হচ্ছে এবং চরম পুলিশি নজরদারি কায়েম রাখা হয়েছে।
এই দুই চরম বাস্তবতার সহাবস্থান জাতিসংঘের সনাতন তিন কনভেনশনের আইনি বিশ্বাসযোগ্যতাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভিয়েনায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড মাঝে মাঝে বিভিন্ন দেশকে চুক্তি লঙ্ঘনের নোটিশ পাঠায়, কিন্তু উরুগুয়ে বা কানাডার মতো দেশগুলো সেই চিঠিকে কোনো তোয়াক্কাই করে না। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারছেন যে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তৈরি হওয়া অনমনীয় আইনগুলো একবিংশ শতাব্দীর মুক্ত সমাজ ও পরিবর্তিত জনস্বাস্থ্যের দাবির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। চুক্তিগুলো হয় পুনর্লিখন করতে হবে, নয়তো রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ সুবিধামতো আন্তর্জাতিক নিয়ম উপেক্ষা করতেই থাকবে।
উপসংহারে বলা যায়, আন্তর্জাতিক মাদক নীতির বিবর্তনীয় ইতিহাস দেখায় যে কোনো সমাজকেই অন্ধ ভয় বা নিবর্তনমূলক আইন দিয়ে রক্ষা করা যায় না। মানুষকে বাদ দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদের ওপর যুদ্ধ ঘোষণা করার যে ভুল এক শতাব্দী আগে শুরু হয়েছিল, বিশ্ব আজ সেখান থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সমকালীন সুশাসন দাবি করে একটি বহুমাত্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমানুভূতিশীল নীতি, যেখানে অপরাধ চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে থাকবে কঠোর আর্থিক ও গোয়েন্দা নজরদারি, আর সাধারণ নাগরিকের জন্য থাকবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মর্যাদা এবং সামাজিক সুরক্ষার অবারিত সুযোগ। এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের ওপরই নির্ভর করছে আগামী পৃথিবীর ন্যায়বিচার ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ।
মাদক পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সংঘাত (Drug Trafficking, Organized Crime and Conflict): অবৈধ অর্থনীতি ও নিরাপত্তা
বৈশ্বিক মাদক উৎপাদন অঞ্চল (Major Drug-Producing Regions): গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট, গোল্ডেন ওয়েজ ও লাতিন আমেরিকা
গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল: ভূরাজনীতি, মেকং অববাহিকা ও আফিম সাম্রাজ্য (Golden Triangle: Geopolitics, Mekong Basin, and the Opium Empire)
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় যেখানে মায়ানমার, লাওস এবং থাইল্যান্ডের সীমান্ত মেকং নদীর ঘোলা জলে এসে মিশেছে, সেখানেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত মাদক উৎপাদন অঞ্চলগুলোর একটি। রুক্ষ পাহাড়, গহীন অরণ্য এবং কেন্দ্রীয় শাসনের অনুপস্থিতি এই ভূখণ্ডকে মাদক চোরাচালানের এক দুর্ভেদ্য স্বর্গে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই অঞ্চলটি পরিচিত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল (Golden Triangle) নামে। পাহাড়ি জনজাতিদের জুম চাষের চিরাচরিত আফিম পপি থেকে কীভাবে এই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক হেরোইন বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরিত হলো, সেই ইতিহাস কেবল অপরাধের নয়; তা জড়িয়ে আছে স্নায়ুযুদ্ধের জটিল ভূ-রাজনীতি এবং পরাশক্তিগুলোর গোপন কূটকৌশলের সাথে (McCoy, 2003)।
এই অঞ্চলের মাদক বাণিজ্যের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা হয় ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর। মাও সেতুংয়ের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে চীনা জাতীয়তাবাদী দল কুয়োমিনটাং (Kuomintang – KMT)-এর একটি বড় সৈন্যদল সীমান্ত পেরিয়ে বার্মার শান রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। জেনারেল লি মি-র নেতৃত্বাধীন এই সৈন্যরা চীনের মূল ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু কয়েক হাজার সৈন্যের রসদ ও অস্ত্রের যোগান দিতে তাদের প্রয়োজন ছিল বিপুল অর্থের। সেই অর্থের একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়ায় শান পাহাড়ের আদিবাসীদের উৎপাদিত আফিম। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এই বাহিনীকে কমিউনিস্টবিরোধী প্রতিরোধ হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে তাদের অস্ত্র সরবরাহ করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত আফিম বাণিজ্যের প্রতি চোখ বুজে থাকে। ঐতিহাসিক আলফ্রেড ডব্লিউ. ম্যাককয় (Alfred W. McCoy) তার ধ্রুপদী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার এই গোপন মদত কীভাবে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলকে একটি আন্তর্জাতিক মাদক পাইপলাইনে পরিণত করেছিল।
শান রাজ্যের এই আফিম সাম্রাজ্য পরবর্তী দশকগুলোতে বিভিন্ন যুদ্ধবাজ নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বর্ণময় চরিত্র ছিলেন চ্যাং শি-ফু, যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত লাভ করেন খুন সা (Khun Sa) বা আফিম রাজা নামে। খুন সা নিজের তৈরি শান ইউনাইটেড আর্মির মাধ্যমে পাহাড়ি উপত্যকাগুলোকে এক স্বাধীন মাদক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি গোপনে গড়ে তোলা শত শত রিফাইনারিতে কাঁচা আফিম প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হতো চার নম্বর গ্রেডের উচ্চ বিশুদ্ধতার হোয়াইট ট্রায়াঙ্গল হেরোইন। এই হেরোইন আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলোর মাধ্যমে পৌঁছে যেত ব্যাংকক ও হংকংয়ে, সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ত আমেরিকা ও ইউরোপের রাজপথে। সাংবাদিক ও গবেষক বার্টিল লিন্টনার (Bertil Lintner) তার গ্রন্থে তুলে ধরেছেন যে খুন সার মতো যুদ্ধবাজ নেতারা মাদক ব্যবসাকে শান জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার আন্দোলনের মোড়কে পরিচালনা করতেন, যা অপরাধ ও জাতিগত বিদ্রোহের সীমানাকে মুছে দিয়েছিল (Lintner, 1999)।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে খুন সা বার্মা সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলে মাদকের উৎপাদন থেমে যায়নি। বরং নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আরও শক্তিশালী এবং সংগঠিত গোষ্ঠীর হাতে, যার নাম ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (United Wa State Army – UWSA)। মায়ানমারের সীমান্তবর্তী ওয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে আজ তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী, নিজস্ব প্রশাসন এবং নিজস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যদিও থাইল্যান্ড তার ভূখণ্ডে কঠোর বিকল্প কৃষি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আফিম চাষ প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে, তবে মায়ানমারের অস্থিতিশীল পাহাড়ি সীমান্তগুলোতে মাদক অর্থনীতি আজও টিকে রয়েছে। স্থানীয় পাহাড়িদের জন্য আফিম কোনো বিলাসিতা নয়; বৈরী পরিবেশে বেঁচে থাকার এবং ঋণ পরিশোধের এটিই একমাত্র অর্থকরী ফসল।
গোল্ডেন ক্রিসেন্ট: রুক্ষ পাহাড়, আফগান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক হেরোইন (Golden Crescent: Rugged Mountains, Afghan Wars, and Global Heroin)
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত পর্বতবেষ্টিত রুক্ষ উপত্যকাটি বিশ্ব মাদক বাণিজ্যে চিহ্নিত হয়ে আছে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (Golden Crescent) নামে। এটি বিস্তৃত আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বালুচিস্তান এবং ইরানের পূর্ব সীমান্ত জুড়ে। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি যেন এক অর্ধচন্দ্রাকার ফাঁদ। শুষ্ক জলবায়ু, অনুর্বর পাথুরে মাটি এবং পানির তীব্র সংকট সত্ত্বেও এই রুক্ষ ভূমিতেই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মানের আফিম পপি জন্মায়। বিশেষ করে আফগানিস্তানের হেলমান্দ, কান্দাহার এবং নানগারহার প্রদেশ একাই বিশ্বের চাহিদার প্রায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ কাঁচা আফিম সরবরাহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে (Chouvy, 2009)।
গোল্ডেন ক্রিসেন্টের এই মাদক রূপান্তরের পেছনেও কাজ করেছে যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যিক আগ্রাসন। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তান আক্রমণ করে, তখন দেশটি এক অন্তহীন সংঘাতের আবর্তে নিমজ্জিত হয়। সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত মুজাহিদিন যোদ্ধাদের অস্ত্র কেনার জন্য অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা যখন বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তা পাঠাচ্ছিল, পাশাপাশি মুজাহিদিন কমান্ডাররা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কৃষকদের ব্যাপক হারে আফিম চাষের নির্দেশ দেন। আফিম হয়ে ওঠে যুদ্ধের অর্থনীতির প্রধান জ্বালানি। পাকিস্তানের উপজাতীয় অঞ্চলের গোপন ল্যাবরেটরিগুলোতে আফিম থেকে তৈরি হতে থাকে হেরোইন। এই মাদক ব্যবসা এতটাই সর্বগ্রাসী রূপ নেয় যে যুদ্ধের দশকে আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী সেচ খাল, ডালিম বাগান এবং গমখেতগুলো একে একে পপি ক্ষেতে পরিণত হয়।
গবেষক জোনাথন গুডহ্যান্ড (Jonathan Goodhand) আফগান আফিম অর্থনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন মানুষের টিকে থাকার চূড়ান্ত লড়াই হিসেবে (Goodhand, 2005)। চার দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আফগানিস্তানের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, শিল্প কারখানা চূর্ণ হয়ে গেছে। এমন এক চরম বাস্তবতায় দরিদ্র কৃষকের কাছে আফিম ছিল এক অলৌকিক ফসল। এটি খরা সহ্য করতে পারে, নষ্ট না হয়ে দীর্ঘদিন ঘরে জমা রাখা যায় এবং সবচেয়ে বড় কথা – ফসল কাটার আগেই স্থানীয় দালালদের কাছ থেকে নগদ অগ্রিম ঋণ পাওয়া যায়। তালেবান শাসনের বিভিন্ন পর্বে আফিম নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০০০ সালে তৎকালীন তালেবান নেতা মোল্লা ওমর আফিম চাষকে সম্পূর্ণ অনৈসলামিক ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করলে বিশ্ববাজারে আফিমের উৎপাদনে ধস নেমেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর তালেবানরা তাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য পুনরায় আফিম অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পপি চাষিদের কাছ থেকে সংগৃহীত উশর (Ushr) বা ধর্মীয় কর পরিণত হয় তাদের যুদ্ধ তহবিলের মূল ভিত্তিতে।
গোল্ডেন ক্রিসেন্ট থেকে উৎপাদিত মাদক প্রধানত তিনটি আন্তর্জাতিক রুটে ছড়িয়ে পড়ে। একটি হলো বলকান রুট, যা ইরান ও তুরস্ক হয়ে পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপে প্রবেশ করে। দ্বিতীয়টি হলো উত্তর রুট, যা মধ্য এশিয়ার সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো পেরিয়ে রাশিয়ায় পৌঁছে যায়। আর তৃতীয়টি হলো দক্ষিণ রুট, যা করাচি ও গোয়াদর বন্দর দিয়ে ভারত মহাসাগরের পথে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করে। ইরানের সরকার এই সীমান্তগুলোতে মাদক পাচারকারীদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে হাজার হাজার সীমান্তরক্ষী হারিয়েছে, দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেছে এবং গভীর পরিখা খনন করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কালোবাজারে আফিম ও হেরোইনের আকাশচুম্বী দাম এই রুক্ষ উপত্যকার চোরাকারবারিদের কোনো বাধাতেই থামতে দেয়নি।
গোল্ডেন ওয়েজ ও দক্ষিণ আমেরিকার কোকা বেল্ট: ভূগোল ও কৃষি অর্থনীতি (Golden Wedge and the South American Coca Belt: Geography and Agro-Economy)
পৃথিবীর সমস্ত কোকেন সরবরাহের উৎস একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা ঘেঁষা কলম্বিয়া, পেরু এবং বলিভিয়ার দুর্গম বনভূমিকে অপরাধবিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেন গোল্ডেন ওয়েজ (Golden Wedge) বা আন্দিয়ান কোকা বেল্ট হিসেবে। আন্দিজ পর্বতের পূর্ব ঢাল, যেখানে আমাজন অববাহিকার শুরু এবং স্থানীয়রা যাকে বলে সেজা দে সেলভা বা জঙ্গলের ভুরু, সেই আর্দ্র এবং উষ্ণ পাহাড়ি ঢালই কোকা গাছের প্রাকৃতিক আবাসভূমি। প্রাচীন ইনকা সভ্যতার সময় থেকেই স্থানীয় আদিবাসীরা তীব্র শীত, ক্ষুধা এবং উচ্চতাজনিত অবসাদ মোকাবেলার জন্য কোকা পাতা চিবিয়ে আসছে। কিন্তু বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পশ্চিমা রসায়নাগারগুলোতে যখন কোকা পাতার অ্যালকালয়েড বের করে কোকেন হাইড্রোক্লোরাইড তৈরির পদ্ধতি নিখুঁত করা হলো, তখন এই সনাতন ভেষজটি পরিণত হলো আন্তর্জাতিক অপরাধের সবচেয়ে লাভজনক পণ্যে (Clawson & Lee, 1998)।
আন্দিয়ান অঞ্চলের কোকা অর্থনীতির পেছনের কৃষি সমীকরণটি বোঝা জরুরি। কোকা গাছ এক অদ্ভুত সহনশীল উদ্ভিদ। এটি পাহাড়ি খাড়া ঢালে, অ্যাসিডিক ও পুষ্টিহীন মাটিতেও চমৎকারভাবে বেড়ে ওঠে, যেখানে কফি, কলা বা কোকোয়ার মতো বৈধ ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব। বছরে তিন থেকে চারবার এই গাছের পাতা তোলা যায়। ফলে একজন ক্ষুদ্র চাষি নিয়মিত নগদ অর্থের মুখ দেখতে পায়। পেরুর হুয়াল্লাগা উপত্যকা, বলিভিয়ার চাপারে ও ইউঙ্গাস অঞ্চল এবং কলম্বিয়ার পুতুমায়ো ও নারিনহো জেলায় লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক কৃষক এই অর্থনীতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকো ই. থোমি (Francisco E. Thoumi) তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রের কাঠামোগত অনুপস্থিতি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক বঞ্চনাই এই অঞ্চলে কোকা অর্থনীতির স্থায়ী আসন গড়ে দিয়েছে (Thoumi, 2003)।
উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভূগোলটি বেশ পরিকল্পিতভাবে বিভক্ত ছিল। আশির দশক পর্যন্ত পেরু ও বলিভিয়ার কৃষকরা কোকা পাতার চাষ করত এবং তা থেকে প্রাথমিক উপায়ে কোকা পেস্ট তৈরি করত। এরপর সেই পেস্ট ছোট বিমানে করে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হতো কলম্বিয়ার আমাজন জঙ্গলের গোপন রিফাইনারিগুলোতে। কলম্বিয়ার শক্তিশালী কার্টেলগুলো তাদের উন্নত ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পন্ন করে খাঁটি সাদা পাউডার কোকেন তৈরি করত। তবে নব্বইয়ের দশকের পর মার্কিন এবং স্থানীয় বাহিনীর কড়া বিমান নজরদারির কারণে এই ভূগোলে রূপান্তর ঘটে। কলম্বিয়া নিজেই পেরু ও বলিভিয়া থেকে উন্নত জাতের কোকার বীজ এনে নিজেদের মাটিতে ব্যাপক চাষ শুরু করে। ফলে কলম্বিয়া একাই বিশ্বের শীর্ষ কোকা উৎপাদক ও প্রক্রিয়াজাতকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
এই উৎপাদন বলয়টি ধ্বংস করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তথাকথিত প্ল্যান কলম্বিয়া (Plan Colombia) পরিচালনা করে। মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে শত শত হেক্টর কোকা ক্ষেতের ওপর গ্লাইফোসেট নামক বিষাক্ত আগাছানাশক ছিটানো হয়। এর প্রভাবে কোকা গাছ তো পুড়ে যেতই, পাশাপাশি ধ্বংস হতো সংলগ্ন নদীনালা, খাদ্য শস্যের জমি এবং দরিদ্র কৃষকের স্বাস্থ্য। কিন্তু এই আগ্রাসী নীতিও কোকা উৎপাদন কমাতে পারেনি। যখনই কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আকাশ থেকে বিষ ছিটানো হতো, কৃষকরা বন কেটে আমাজনের আরও গভীর জঙ্গলে গিয়ে নতুন করে কোকা রোপণ করত। আন্দিজ পর্বতের এই সবুজ উপত্যকাগুলো আজও পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক এবং রক্তমাখা মাদক শিল্পের ভিত্তি হিসেবে অটল দাঁড়িয়ে আছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়ন (Insurgent Groups, State Complicity, and Financing)
বিশ্বের প্রধান প্রধান মাদক উৎপাদন অঞ্চলের একটি অভিন্ন চরিত্র হলো যে সেখানে মাদক ব্যবসা এবং রাজনৈতিক বিদ্রোহ একে অপরের হাত ধরে চলে। এই ঘটনাটিকে অপরাধবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অভিহিত করেন মাদক-বিদ্রোহী মিথোজীবিতা (Narco-Insurgent Symbiosis) হিসেবে। যখন কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় মাদকের কালোবাজার। অন্যদিকে মাদক পাচারকারীরাও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় পুলিশের চেয়ে স্থানীয় সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ওপর বেশি ভরসা করে। ফলে এক ধরণের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার জন্ম হয়, যেখানে রাজনীতি ও অপরাধের সীমানা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায় (Felbab-Brown, 2010)।
এই মিথোজীবিতার সবচেয়ে ধ্রুপদী উদাহরণ তৈরি হয়েছিল কলম্বিয়ায়। দেশটির সবচেয়ে পুরনো বামপন্থী বিদ্রোহী সংগঠন রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া (Revolutionary Armed Forces of Colombia – FARC) প্রথমদিকে মাদক ব্যবসাকে পুঁজিবাদী অবক্ষয় বলে নিন্দা করত। কিন্তু আশির দশকে যখন সোভিয়েত ব্লকের পতন ঘটতে শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক অনুদান শুকিয়ে যায়, তখন ফার্ক তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের কোকা চাষিদের ওপর কর আরোপ করতে শুরু করে। একে বলা হতো গ্রামাজে কর। সময়ের সাথে সাথে বিদ্রোহীরা কেবল কর আদায়েই সন্তুষ্ট থাকেনি; তারা নিজেরাই কোকেন ল্যাবরেটরি স্থাপন করে, অস্ত্রের চালানের বিনিময়ে কোকেন বিনিময় করে এবং আন্তর্জাতিক মেক্সিকান কার্টেলগুলোর সাথে সরাসরি বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদন করে। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শের স্থান দখল করে নেয় এক নির্মম মাদক অর্থনীতি। পেরুতেও মাওবাদী গোষ্ঠী সেন্ডেরো লুমিনোসো (Sendero Luminoso) বা শাইনিং পাথ হুয়াল্লাগা উপত্যকার কোকা চাষিদের নিরাপত্তা দিয়ে তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধ তহবিল সংগ্রহ করত।
আফগানিস্তানের চিত্রটিও একই সমীকরণে পরিচালিত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল কেনেডি (Michael Kenney) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে আফগানিস্তানে সশস্ত্র নেটওয়ার্কগুলো কীভাবে মাদক অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা গ্রহণ করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিল (Kenney, 2007)। তালেবান বিদ্রোহীরা যখন ন্যাটো এবং মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালাচ্ছিল, তখন তাদের বার্ষিক আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসত পপি চাষের নিরাপত্তা দেওয়া, প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাবরেটরি পাহারা দেওয়া এবং পাকিস্তান সীমান্তে চালানের নির্বিঘ্ন পারাপার নিশ্চিত করার মাধ্যমে। আফগান কৃষকের কাছে তালেবানরা কেবল কোনো ধর্মীয় যোদ্ধা ছিল না; তারা ছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং সরকারি ফসল ধ্বংস অভিযানের বিরুদ্ধে তাদের একমাত্র সশস্ত্র সুরক্ষাকারী। ফলে মাদক উৎপাদন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ স্বভাবতই রাষ্ট্রের চেয়ে বিদ্রোহীদের প্রতি বেশি অনুগত হয়ে পড়ে।
মিয়ানমারের শান এবং কাচিন রাজ্যে এই সমীকরণ আরও জটিল। সেখানে বহু জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী প্রকাশ্যে বা গোপনে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে। অনেক ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা নিজেই স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনীকে তাদের এলাকায় আফিম ও মাদক ব্যবসার অবাধ সুযোগ দিয়ে আসছিল, শর্ত ছিল যে তারা জান্তাবিরোধী বড় বিদ্রোহীদের ওপর নজর রাখবে। রাষ্ট্র নিজেই যখন তার নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে মাদক অর্থনীতিকে ব্যবহার করে, তখন আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা এক চরম প্রহসনে রূপ নেয়। লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়ার পাহাড়ি উপত্যকা পর্যন্ত সমস্ত উৎপাদন অঞ্চলে এই সত্য স্পষ্ট যে, সশস্ত্র বিদ্রোহীদের নিরস্ত্রীকরণ এবং বিকল্প রাজনৈতিক মীমাংসা ছাড়া মাদক উৎপাদন বন্ধ করার স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সিন্থেটিক মাদকের উত্থান ও উৎপাদন অঞ্চলের ভৌগোলিক রূপান্তর (Rise of Synthetic Drugs and Geographic Shifts in Production)
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে বৈশ্বিক মাদক উৎপাদনের ঐতিহ্যবাহী ভূগোল এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। শতাব্দীপ্রাচীন কৃষিনির্ভর মাদকের স্থান দখল করে নিতে শুরু করে কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ বা সিন্থেটিক ড্রাগস। কোকা পাতা বা আফিম পপি চাষের জন্য বিস্তীর্ণ জমি, অনুকূল আবহাওয়া, প্রচুর কৃষি শ্রমিক এবং ফসলের পরিপক্ব হওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ফসলগুলো উপগ্রহ নজরদারি এবং সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে সহজেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু সিন্থেটিক মাদকের ক্ষেত্রে এই ধরণের কোনো ভৌগোলিক বা মৌসুমী সীমাবদ্ধতা নেই। এর জন্য কোনো খোলা আকাশের নিচে মাটির প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন কেবল কিছু প্রিকারসার রাসায়নিক এবং একটি বন্ধ ঘরের গোপন গবেষণাগার (Bagley, 2013)।
এই ভৌগোলিক রূপান্তরের সবচেয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণটি ঘটেছে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলে। মায়ানমারের শান রাজ্য এখন আর কেবল কাঁচা আফিমের জন্য পরিচিত নয়; এটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম মেথাম্ফেটামিন (Methamphetamine) উৎপাদন কেন্দ্রে। স্থানীয়ভাবে ইয়াবা নামে পরিচিত ক্যাফেইন মিশ্রিত মেথাম্ফেটামিন বড়ি এবং অতি উচ্চ বিশুদ্ধতার ক্রিস্টাল মেথ বা আইস এখন কারখানার স্তরে তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেশী চীন ও ভারত থেকে চোরাই পথে বা বৈধ বাণিজ্যিক ফাঁকফোকর গলিয়ে আনা এফেড্রিন ও সিউডোএফেড্রিনের মতো রাসায়নিক উপাদানগুলো ব্যবহার করে এই পাহাড়ি ল্যাবরেটরিগুলো দিনরাত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষক আলাঁ লাব্রুস (Alain Labrousse) দেখিয়েছেন কীভাবে প্রযুক্তি এবং শিল্পায়িত রসায়ন মাদক অর্থনীতির বৈশ্বিক কেন্দ্রগুলোকে পুরোপুরি পুনর্গঠন করেছে (Labrousse, 2005)। কৃষিজমির ওপর নির্ভরতা কেটে যাওয়ায় মিয়ানমারের পাহাড়ি জঙ্গল থেকে এখন অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং নিউজিল্যান্ডের বাজার পর্যন্ত সিন্থেটিক মাদকের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে।
একই রকম চিত্র দেখা যাচ্ছে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার সংযোগস্থলে। মেক্সিকোর সিনালোয়া এবং জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল সনাতন মারিজুয়ানা এবং মেক্সিকান ব্ল্যাক টার হেরোইনের ব্যবসা প্রায় গুটিয়ে এনে ঝুঁকছে অত্যন্ত শক্তিশালী সিন্থেটিক অপিওয়েড ফেন্টানিল (Fentanyl) তৈরির দিকে। ফেন্টানিল মরফিনের চেয়ে পঞ্চাশ থেকে একশো গুণ বেশি শক্তিশালী। ফলে মাত্র কয়েক কিলোগ্রাম ফেন্টানিল লক্ষ লক্ষ মানুষের সেবনের জন্য যথেষ্ট। এই ক্ষুদ্র পরিমাণের কারণে সীমান্ত দিয়ে এটি চোরাচালান করা অবিশ্বাস্যরকম সহজ হয়ে উঠেছে। মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দরগুলো দিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে রাসায়নিক কাঁচামাল আমদানি করা হয় এবং তা মেক্সিকোর গোপন ল্যাবগুলোতে তৈরি হয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হয়ে যায়।
সিন্থেটিক মাদকের এই আগ্রাসন পুরো আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দিশেহারা করে দিয়েছে। অতীতে স্যাটেলাইটে পপি খেত চিহ্নিত করে বোমা ফেলে তা জ্বালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্ট বা কন্টেইনারের ভেতরে লুকিয়ে রাখা রাসায়নিক ল্যাবরেটরিকে মহাকাশ থেকে চিহ্নিত করার কোনো প্রযুক্তি নেই। কৃষকদের বুঝিয়ে বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিকল্প চাষে উৎসাহিত করার যে সনাতন বিকল্প উন্নয়ন কৌশল, তা সিন্থেটিক মাদকের যুগে সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে। কারণ এখানে কোনো প্রান্তিক কৃষকের অস্তিত্বই নেই; পুরো উৎপাদন শৃঙ্খলটি পরিচালিত হয় কয়েকজন পেশাদার রসায়নবিদ এবং অপরাধ সিন্ডিকেটের সদস্যদের দ্বারা। মাদক উৎপাদনের ভূগোল তাই কোনো নির্দিষ্ট উর্বর উপত্যকা থেকে সরে গিয়ে আজ বিশ্ব বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক রাসায়নিক সাপ্লাই চেইনের অদৃশ্য অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: উৎপাদন অঞ্চলের টিকে থাকা ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া (Comparative Analysis: Resilience of Production Hubs and Global Responses)
গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট কিংবা আন্দিজের গোল্ডেন ওয়েজ – এই উৎপাদন অঞ্চলগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি অভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেন এই নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাদক অর্থনীতি শিকড় গেড়ে বসে আছে এবং বিশ্বের সমস্ত উন্নত প্রযুক্তি ও সামরিক অভিযান সত্ত্বেও টিকে থাকছে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এর মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাঠামোগত ভঙ্গুরতা এবং প্রান্তিক অঞ্চলের ভূগোলের মধ্যে। এই অঞ্চলগুলো প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে শত শত মাইল দূরে অবস্থিত দুর্গম সীমান্ত এলাকা। এখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি কেবল পুলিশি নিপীড়ন বা কর আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা যোগাযোগের কোনো টেকসই অবকাঠামো রাষ্ট্র কখনোই সেখানে গড়ে তোলেনি। ফলে এই ঐতিহাসিক শূন্যতার সুযোগটি স্বাভাবিকভাবেই দখল করে নিয়েছে অবৈধ মাদক নেটওয়ার্ক (Manger, 2001)।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়েছে সামরিক শক্তি প্রয়োগের একমুখী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে। আকাশ থেকে রাসায়নিক স্প্রে করা, ফসল কেটে ফেলা, গবেষণাগার ধ্বংস করা এবং দরিদ্র কৃষকদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এই ধরণের সরবরাহ হ্রাসকরণ অভিযান বারবার সেই পুরনো বেলুন এফেক্টের জন্ম দিয়েছে। কলম্বিয়ায় যখন কড়াকড়ি বেড়েছে, তখন পেরুতে উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। আফগানিস্তানে যখন একটি প্রদেশে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়েছে, পাশের প্রদেশটিতে আফিম চাষের নতুন জোয়ার এসেছে। কৃষকের পেটের ক্ষুধা এবং বিশ্ববাজারের অপরিবর্তিত চাহিদার কথা বিবেচনা না করে কেবল ফসলের ওপর আঘাত হানার নীতি যে এক ব্যর্থ বৃত্তের পুনরাবৃত্তি মাত্র, তা আন্তর্জাতিক গবেষকরা বারবার তথ্য-উপাত্ত দিয়ে নিশ্চিত করেছেন।
তা সত্ত্বেও এই অঞ্চলগুলোর ভেতরে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। থাইল্যান্ডের মতো দেশ প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে পাহাড়ি আদিবাসীদের বিকল্প জীবিকা গড়ে দিয়ে আফিম চাষ প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। থাই রাজকীয় প্রকল্পের মাধ্যমে আফিম চাষিদের কফি, স্ট্রবেরি ও চা চাষের উন্নত প্রযুক্তি, সেচ সুবিধা এবং নিশ্চিত বাজারদর উপহার দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়াই কৃষকরা নিজেরাই আফিম চাষ ত্যাগ করে। কিন্তু মিয়ানমার বা আফগানিস্তানে এই ধরণের উন্নয়ন সম্ভব হয়নি, কারণ সেখানে রাষ্ট্র নিজেই চরম রাজনৈতিক বৈধতাহীনতা এবং দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত। যেখানে শান্তি ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান নেই, সেখানে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি কার্যকর হতে পারে না।
সব মিলিয়ে এটি সুস্পষ্ট যে, বৈশ্বিক মাদক উৎপাদন অঞ্চলগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধীদের আখড়া নয়; এগুলো হলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অসমতা, অপশাসন এবং পরাশক্তিগুলোর দীর্ঘ ভূ-রাজনৈতিক খেলার শিকার হওয়া অঞ্চল। যতক্ষণ পর্যন্ত ধনী দেশগুলোর ভেতরের মাদকের তীব্র চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা না যাবে, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত এই প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার একটি সম্মানজনক ও টেকসই অর্থনৈতিক বিকল্প নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সামরিক অভিযান দিয়েই এই পাহাড়ি উপত্যকাগুলোকে মাদক অর্থনীতির হাত থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। বিশ্ব মাদক বাণিজ্যের ইতিহাস আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে সমস্যার শিকড় মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা উদ্ভিদে নয়, বরং মানব সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার গভীরে প্রোথিত।
আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্ক (International Drug Trafficking Networks): সরবরাহ ও বিতরণ
নেটওয়ার্ক তত্ত্ব ও আধুনিক মাদক পাচারের কাঠামো (Network Theory and the Structure of Modern Drug Trafficking)
আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের সাংগঠনিক রূপটি কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধতত্ত্ববিদরা দীর্ঘকাল ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। সাধারণ মানুষের ধারণায় মাদক কার্টেল বলতে হয়তো কোনো একক শক্তিশালী নেতার কঠোর নির্দেশনায় পরিচালিত এক পিরামিড সদৃশ মাফিয়া সাম্রাজ্যকে বোঝায়। তবে আধুনিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মাদক সরবরাহ ব্যবস্থা কোনো কেন্দ্রীভূত একক প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে না। এটি পরিচালিত হয় বহু স্বাধীন, পরিবর্তনশীল এবং পরস্পরের সাথে আলগাভাবে যুক্ত ক্ষুদ্র কোষ বা নোডের সমন্বয়ে। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনকে সমাজবিজ্ঞানী মানুয়েল কাস্টেলজ (Manuel Castells) তার বিখ্যাত ট্রিলজির শেষ খণ্ডে সংজ্ঞায়িত করেছেন নেটওয়ার্ক সমাজ তত্ত্ব (Network Society Theory)-র আলোকে (Castells, 2000)। কাস্তেলজ দেখিয়েছেন যে বিশ্বায়নের যুগে অপরাধ জগৎ রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করে এমন এক তরল নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে কোনো স্থায়ী কেন্দ্র নেই।
প্রচলিত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে এই নেটওয়ার্কগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের অবিশ্বাস্য অভিযোজন ক্ষমতা। একজন শীর্ষ গডফাদারকে হত্যা করলে বা গ্রেপ্তার করলে পুরো নেটওয়ার্ক কখনো ভেঙে পড়ে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ গবেষক ফিল উইলিয়ামস (Phil Williams) এই ধরণের প্রতিরোধী কাঠামোকে বিশ্লেষণ করেছেন নোডাল নেটওয়ার্ক (Nodal Network) হিসেবে (Williams, 2001)। উইলিয়ামস দেখিয়েছেন যে মাদক পাচার নেটওয়ার্কগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট চেইনের ওপর নির্ভর করে না; বরং এগুলো মাকড়সার জালের মতো কাজ করে। যদি কোনো একটি সুতো বা যোগাযোগ পথ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে বাকি অংশগুলো তৎক্ষণাৎ নিজেদের মধ্যে বিকল্প যোগাযোগ তৈরি করে সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখে। এই বিকেন্দ্রীভূত চরিত্রই মাদক নেটওয়ার্ককে আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত নজরদারির মুখেও টিকিয়ে রেখেছে।
এই নেটওয়ার্কগুলোর ভেতরে তথ্য ও নির্দেশনার প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম গোপনীয়তার সাথে। প্রতিটি দল কেবল তার আগের এবং পরের দলের সাথে যোগাযোগ রাখে, পুরো যাত্রাপথের সামগ্রিক চিত্র কারোর কাছেই স্পষ্ট থাকে না। কলম্বিয়ার গভীর জঙ্গলে যিনি কোকা প্রক্রিয়াজাত করছেন, তিনি জানেন না মেক্সিকোর কোন চালক ট্রাকটি ড্রাইভ করে টেক্সাস সীমান্তে নিয়ে যাবে। একইভাবে যে মেক্সিকান চালক সীমান্ত পার করছে, সে জানে না নিউ ইয়র্কের কোন আন্ডারগ্রাউন্ড ডিলারের হাতে চালানটি তুলে দেওয়া হবে। এই খণ্ড খণ্ড তথ্য কাঠামোর কারণে পুলিশ যখন কোনো একটি স্তরের পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে, তখন তার কাছ থেকে কেবল স্থানীয় তথ্যই পাওয়া যায়; আন্তর্জাতিক মূল চক্রের সন্ধান পাওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
বাজারের চাহিদার সাথে সাথে এই নেটওয়ার্কগুলো নিজেদের আকার ও প্রযুক্তি বদলে ফেলে। আধুনিক মাদক নেটওয়ার্কগুলো কোনো স্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মচারী রাখে না; তারা বিভিন্ন কাজের জন্য চুক্তিতে বিশেষজ্ঞদের ভাড়া করে। রসায়নবিদ, পাইলট, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার এবং আইনজীবীদের মতো পেশাদার ব্যক্তিরা বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তিতে এই নেটওয়ার্কের জন্য কাজ করে থাকে। কাজ শেষে তারা আবার নিজেদের মূলধারার জীবনে ফিরে যায়। ফলে এই ব্যবস্থাটি কোনো সনাতন অপরাধী দলের চেয়ে আধুনিক বহুজাতিক বিনিয়োগকারী সংস্থার মতো আচরণ করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা আন্তর্জাতিক মাদক সরবরাহকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্ভেদ্য এবং গতিশীল অংশে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক পরিবহণ ও লজিস্টিকস: আকাশ, সমুদ্র ও সুড়ঙ্গ (International Transport and Logistics: Air, Sea, and Subterranean Routes)
মাদক পাচারের আসল খেলাটি লুকিয়ে থাকে এর পরিবহণ ও লজিস্টিকসের প্রকৌশলগত দক্ষতার মধ্যে। হাজার হাজার টন অবৈধ মাদককে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে পাচারকারীরা যে ধরণের প্রযুক্তি ও রুট ব্যবহার করে, তা অনেক সময় বৈধ আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকেও বিস্মিত করে। সমুদ্রপথ হলো বিপুল পরিমাণ মাদক একবারে সরিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অর্থনৈতিক মাধ্যম। আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যে প্রতিদিন কোটি কোটি কন্টেইনার যাতায়াত করে। এই বিশাল ভিড়ের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা বৈধ পণ্যের ভেতরে মাদক লুকিয়ে রাখে। রটারডাম, অ্যান্টওয়ার্প বা বাল্টিমোরের মতো বিশালাকার বন্দরগুলোতে মোট কন্টেইনারের দুই থেকে তিন শতাংশের বেশি তল্লাশি করা প্রযুক্তিগতভাবেই অসম্ভব। এই ফাঁক গলে প্রতি বছর টন কে টন কোকেন ও হেরোইন উন্নত দেশগুলোর বাজারে প্রবেশ করে (Glenny, 2008)।
সমুদ্রের তলদেশে পাচারকারীদের আরেকটি চাঞ্চল্যকর উদ্ভাবন হলো আধা-নিমজ্জিত জলযান (Semi-Submersible Vessel) বা তথাকথিত নারকো-সাবমেরিন। কলম্বিয়া বা ইকুয়েডরের দুর্গম উপকূলীয় খাঁড়িতে ফাইবারগ্লাস ও কাঠ দিয়ে এই ডুবোযানগুলো স্থানীয় কারিগররা গোপনে তৈরি করে। এগুলো জলের পৃষ্ঠের ঠিক নিচে চলাচল করে, যার ফলে উপকূলরক্ষী বাহিনীর সাধারণ রাডার বা উপগ্রহ নজরদারিতে এদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিটি আধা-নিমজ্জিত জাহাজে চার থেকে দশ টন পর্যন্ত খাঁটি কোকেন বহন করা যায়। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে মধ্য আমেরিকা বা মেক্সিকোর উপকূলে চালান নামিয়ে দেওয়ার পর পাচারকারীরা জাহাজটিকে সাগরের জলেই ডুবিয়ে দেয়, যাতে কোনো প্রমাণ অবশিষ্ট না থাকে। এই ধরণের একটি ট্রিপ সফল হলেই শত শত কোটি ডলারের লাভ ঘরে তোলা সম্ভব হয়।
স্থলপথে পরিবহণের ক্ষেত্রে মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী সীমান্তটি এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আইন গবেষক পিটার আন্দ্রেয়াস (Peter Andreas) তার গবেষণায় এই সীমান্ত নিরাপত্তাকে বর্ণনা করেছেন সীমান্ত খেলা তত্ত্ব (Border Games Theory) হিসেবে (Andreas, 2009)। আন্দ্রেয়াস দেখিয়েছেন যে সীমান্ত পাহারা যত কঠোর ও প্রযুক্তি নির্ভর হয়েছে, পাচারকারীদের উদ্ভাবনী শক্তিও তত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সীমান্ত খেলার সবচেয়ে প্রকৌশলগত বিস্ময় হলো মাটির গভীর দিয়ে খনন করা গোপন সুড়ঙ্গ। এই সুড়ঙ্গগুলো কেবল সাধারণ গর্ত নয়; এগুলোর ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ, রেললাইন এবং হাইড্রোলিক লিফট পর্যন্ত স্থাপন করা হয়। মেক্সিকোর তিহুয়ানা শহরের একটি গুদাম থেকে শুরু হয়ে সুড়ঙ্গটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর কোনো বাণিজ্যিক কারখানার মেঝেতে গিয়ে উন্মুক্ত হয়।
এর পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীবাহী বিমান, বেসরকারি চার্টার্ড ফ্লাইট এবং আন্তর্জাতিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্গম জঙ্গল থেকে ছোট ছোট সেসনা বিমানে করে মাদক উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মধ্য আমেরিকার গোপন এয়ারস্ট্রিপগুলোতে। আবার সীমান্ত এলাকায় ছোট ড্রোন ব্যবহার করে কাঁটাতারের ওপর দিয়ে কয়েক কেজি করে মাদকের প্যাকেট নির্দিষ্ট জিপিএস লোকেশনে ফেলে দেওয়া হয়। পাচারকারীরা পরিবহণের কোনো একক মাধ্যমের ওপর স্থায়ী নির্ভরতা তৈরি করে না। যখন কোনো সমুদ্র রুটে পাহারা কড়া হয়, তখন চালান চলে যায় আকাশে; আবার আকাশসীমা বন্ধ হলে তৈরি হয় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ। এই চিরন্তন লজিস্টিক রূপান্তর (Logistical Transformation)-এর কারণে কোনো রাষ্ট্রই তাদের সীমান্তকে মাদকের বিরুদ্ধে পুরোপুরি সিলগালা করতে সক্ষম হয় না।
পাইকারি বাজার ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা (The Wholesale Market and the Role of Middlemen)
আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে রহস্যময় এবং প্রভাবশালী স্তরটি হলো পাইকারি বাজার। উৎপাদনকারী ও তৃণমূলের খুচরা বিক্রেতাদের মাঝে যে বিশাল অর্থনৈতিক দূরত্ব থাকে, তা পূরণ করে একদল অত্যন্ত প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী বা ব্রোকার। এই পাইকাররা সাধারণত নিজেরা সরাসরি অস্ত্র হাতে সহিংসতায় জড়ায় না; তারা পর্দার আড়ালে বসে বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে যোগাযোগের সাঁকো হিসেবে কাজ করে। ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী লেটৎসিয়া পাওলি (Letizia Paoli) ইউরোপীয় অবৈধ মাদক বাজারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এই পাইকারি স্তরটি কোনো মনোপলি বা একক ব্যক্তির অধীনে পরিচালিত হয় না (Paoli, 2002)। বরং এটি পরিচালিত হয় বহু স্বাধীন ব্রোকারের মাধ্যমে, যারা বাজারে পণ্যের তারল্য এবং সরবরাহ নিশ্চিত করে।
এই পাইকারি স্তরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সুনাম। যেহেতু এটি একটি অবৈধ বাজার, তাই কোনো চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে পাচারকারীরা আদালতে গিয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে না। ফলে এখানে ব্যবসা চলে এক অলিখিত সামাজিক চুক্তির ওপর ভিত্তি করে। কানাডীয় অপরাধবিজ্ঞানী কার্লো মরসেলি (Carlo Morselli) তার গবেষণায় অপরাধ নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ গতিবিদ্যা তুলে ধরতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ব্রোকাররা তাদের সামাজিক মূলধন (Social Capital) ব্যবহার করে বাজারে টিকে থাকে (Morselli, 2009)। মরসেলি দেখান যে যারা বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন অপরাধী চক্রের মাঝে সংযোগকারী হিসেবে কাজ করে, তারাই বাজারে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা ও মুনাফা অর্জন করে। এদের বলা হয় কাঠামোগত ছিদ্র পূরণকারী বা স্ট্রাকচারাল হোল ফিলার।
পাইকারি বাজারে পণ্য হাতবদলের সময় বিপুল অঙ্কের লেনদেন সম্পন্ন হয় ধারের ভিত্তিতে। ল্যাটিন আমেরিকার উৎপাদকরা প্রায়ই ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার পাইকারদের কাছে নগদ অর্থ ছাড়া কেবল প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি ডলারের মাদক চালান পাঠিয়ে দেয়। পাইকাররা সেই চালান গ্রহণ করে তা ভেঙে অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে স্থানীয় আঞ্চলিক সিন্ডিকেটগুলোর কাছে বিক্রি করে। এরপর যখন স্থানীয় বাজার থেকে নগদ অর্থ সংগৃহীত হয়, তখন সেই অর্থ পেছনের চেইন ধরে আবার উৎপাদকের কাছে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঋণ ব্যবস্থার কারণে যদি কোনো চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে, তবে বাজারে এক তীব্র অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। অনেক সময় এই দেনা-পাওনার হিসাব মেলানোর ব্যর্থতাই অন্ধকার জগতে চরম হত্যাকাণ্ডের জন্ম দেয়।
পাইকারদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পণ্যের বিশুদ্ধতা বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং ভেজাল মেশানোর মাত্রা নির্ধারণ করা। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে যখন নব্বই থেকে পঁচানব্বই শতাংশ খাঁটি মাদক পাইকারের হাতে আসে, তখন পাইকাররা স্থানীয় বাজারের চাহিদা ও সামর্থ্য বিবেচনা করে তাতে বিভিন্ন রাসায়নিক ভেজাল মেশায়। এর ফলে চালানের ওজন ও আয়তন প্রায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পাইকারি স্তরে সবচেয়ে বড় মুনাফাটি তৈরি হয়। তারা পণ্যের ঝুঁকি নিজের কাঁধে নেয় এবং সেই ঝুঁকির বিনিময়ে বিপুল অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত নিজেদের পকেটে পুরে নেয়। এই পাইকারি মধ্যস্থতাকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত কেবল সাধারণ মাদক বহনকারীদের গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন দুর্বল করা যায় না।
রাস্তার বাজার ও তৃণমূল বিতরণ ব্যবস্থা (Street-Level Markets and Grassroots Distribution)
আন্তর্জাতিক পাইকারদের হাত ঘুরে মাদক যখন চূড়ান্ত ভোক্তাদের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন শুরু হয় এর তৃণমূল বা খুচরা বিতরণ ব্যবস্থা। এই স্তরটি সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান এবং সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী জিওফ্রে পিয়ারসন (Geoffrey Pearson) এবং ডিক হব্স (Dick Hobbs) যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ মাদক বিতরণ ব্যবস্থার ওপর এক ক্লাসিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মধ্যম স্তরের পাইকার থেকে কীভাবে পণ্যটি পাড়ার মোড়ে মোড়ে ছড়িয়ে পড়ে (Pearson & Hobbs, 2001)। তৃণমূলের এই বাজারে পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি থাকে এবং এখানেই সাধারণ মানুষ সরাসরি অপরাধের শিকার হয়।
তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণ ব্যবস্থা সাধারণত দুই ধরণের রূপ ধারণ করে। একটি হলো উন্মুক্ত রাস্তার বাজার, যেখানে নির্দিষ্ট কোনো পার্ক, গলির মুখ বা বস্তি এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করা হয়। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই জানে কোথায় গেলে মাল পাওয়া যাবে। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পুলিশি প্রযুক্তির উন্নতির কারণে উন্মুক্ত বাজারগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে এসেছে এবং জায়গা করে নিয়েছে বন্ধ বাজার বা মোবাইল নেটওয়ার্ক। আমেরিকান গবেষক রিক কার্টিস (Ric Curtis) এবং টিম ওয়েন্ডেল নিউ ইয়র্কের মাদক বাজারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে এই খুচরা বাজার বিবর্তন (Retail Market Evolution)-এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন (Curtis & Wendel, 2007)। তারা দেখান যে পাচারকারীরা এখন আর নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে মাদক বিক্রি করে না; বরং তারা মোবাইল ফোন, মেসেজিং অ্যাপ এবং হোম ডেলিভারি সার্ভিসের মাধ্যমে গোপনে পণ্য গ্রাহকের দরজায় পৌঁছে দেয়।
এই বিতরণ শৃঙ্খলের একেবারে নিচের ধাপে অবস্থান করে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এদের স্থানীয় ভাষায় রানার, পুশার বা মাদক বহনকারী বলা হয়। এই স্তরে কাজ করে মূলত বস্তির বেকার তরুণ, পথশিশু এবং চরম আসক্ত ব্যক্তিরা, যাদের পেটের ক্ষুধা মেটাতে বা নিজের নেশার খরচ জোগাড় করতে এই বিপজ্জনক কাজে নামতে হয়। এরা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে বা এক ডোজ মাদকের লোভে নিজেদের পকেটে বা পেটের ভেতরে মাদক লুকিয়ে রেখে পুলিশের গুলির মুখে দাঁড়ায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন অভিযান চালায়, তখন কারাগারগুলো ভরে ওঠে এই হতভাগা প্রান্তিক মানুষদের দিয়ে। অথচ মূল মাদক সম্রাটরা থাকে সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে।
খুচরা বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন স্থানীয় গ্যাংদের মধ্যে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বাঁধে। শহরের কোন রাস্তা বা কোন পাড়া কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নির্ধারিত হয় বুলেটের শক্তিতে। এই গ্যাংগুলো অনেক সময় বহুজাতিক নেটওয়ার্কের ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তারা কেবল একে অপরকে হত্যা করে না; তারা নিরীহ পথচারীদের ওপরও চাঁদাবাজি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। রাস্তার এই সহিংসতাই মূলত সমাজকে ভেতরে থেকে পঙ্গু করে দেয় এবং একটি পুরো প্রজন্মের তরুণকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। তৃণমূলের এই চাহিদা ও বিতরণ নেটওয়ার্ক টিকে থাকে সামাজিক দারিদ্র্য, শিক্ষাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের উর্বর ভূমিতে।
কালো টাকার প্রবাহ ও আর্থিক লন্ডারিং নেটওয়ার্ক (Flow of Illicit Capital and Financial Laundering Networks)
মাদক ব্যবসা কেবল রাসায়নিক পদার্থের চালান নয়; এটি সমান্তরালভাবে টাকার এক সুবিশাল আন্তর্জাতিক সমুদ্র। পণ্য যখন পশ্চিমের শহরগুলোর রাজপথে বিক্রি হয়ে নগদ ডলারে বা ইউরোতে রূপান্তরিত হয়, তখন পাচারকারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এই কাগজের নোটের পাহাড় কীভাবে সামলানো যাবে। কয়েক ট্রাক বোঝাই নগদ নোংরা অর্থ সরাসরি ব্যাংকে জমা দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ সমস্ত আধুনিক ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি থাকে। ফলে মাদক অর্থনীতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সমান্তরালভাবে গড়ে উঠেছে এক পরিশীলিত অর্থপাচার নেটওয়ার্ক। কানাডীয় অর্থনীতিবিদ আর. টি. নেলর (R. T. Naylor) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ওয়েজেস অব ক্রাইম (Wages of Crime)-এ দেখিয়েছেন যে কীভাবে অপরাধের মুনাফা আধুনিক অর্থনীতির নাড়িতে প্রবেশ করে (Naylor, 2002)।
এই কালো টাকা সাদা করার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী অথচ কার্যকর কৌশলগুলোর একটি হলো বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার (Trade-Based Money Laundering – TBML)। লাতিন আমেরিকায় এটি বহুল পরিচিত ব্ল্যাক মার্কেট পেসো এক্সচেঞ্জ নামে। এই ব্যবস্থায় কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি টাকা স্থানান্তর করা হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন বিক্রির নগদ ডলার দিয়ে পাচারকারীরা সেখানকার মুক্ত বাজার থেকে বৈধ ভোগ্যপণ্য যেমন কম্পিউটার, সুগন্ধি, কাপড় বা গৃহস্থালি সামগ্রী কিনে ফেলে। এরপর সেই পণ্যগুলো কন্টেইনারে করে কলম্বিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানকার স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করে নগদ স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক গোয়েন্দারা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন খুঁজে পায় না; অথচ মাদকের লাভ সফলভাবে উৎপাদকদের পকেটে পৌঁছে যায়।
ডাচ গবেষক পেত্রাস সি. ভ্যান ডাইন (Petrus C. van Duyne) অপরাধলব্ধ অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তুলে ধরেছেন যে আধুনিক অর্থপাচারকারীরা কীভাবে আন্তর্জাতিক কর ফাঁকির স্বর্গ বা অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাহায্য নেয় (van Duyne & Levi, 2005)। পানামা, কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ বা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো দেশগুলোতে তৈরি করা হয় শত শত নামসর্বস্ব শেল কোম্পানি। এই কোম্পানিগুলোর কোনো বাস্তব কারখানা বা অফিস থাকে না; কেবল কাগজের ওপর এদের অস্তিত্ব বজায় থাকে। স্তরে স্তরে জটিল ভুয়া চালান, কাল্পনিক সেবা ফি এবং কৃত্রিম ঋণের জাল তৈরি করে মাদকলব্ধ অর্থ এমনভাবে এই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ঘোরানো হয় যে তার আসল উৎস বা মূল মালিককে খুঁজে বের করা বিশ্বের যেকোনো আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এর বাইরে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আজও ব্যাপকভাবে সক্রিয় রয়েছে ঐতিহ্যবাহী হুন্ডি বা হাওয়ালা ব্যবস্থা। এই অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা কোনো ব্যাংক নথির ওপর নির্ভর করে না; এটি চলে পারিবারিক ও সামাজিক বিশ্বাসের ওপর। একজন ব্যবসায়ী দুবাই বা লন্ডনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে নগদ অর্থ জমা দিলে কয়েক মিনিটের মধ্যে করাচি বা ঢাকার কোনো এজেন্ট সেই সমপরিমাণ অর্থ প্রাপকের হাতে তুলে দেয়। এই লেনদেনের কোনো ডিজিটাল ট্রেইল থাকে না। মাদক বাণিজ্যের লাভ এভাবেই আন্তর্জাতিক রিয়েল এস্টেট, বিলাসবহুল হোটেল ব্যবসা, শেয়ারবাজার এবং নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ হয়ে মূলধারার অর্থনীতিতে মিশে যায়। ফলে সমাজের উঁচুতলার কর্পোরেট দুনিয়াও অনেক সময় নিজের অজান্তেই অথবা জেনেশুনে মাদক অর্থনীতির এক নীরব অংশীদারে পরিণত হয়।
ডিজিটাল পাচার: ডার্কনেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সাইবার বিতরণ (Digital Trafficking: Darknet, Cryptocurrencies, and Cyber Distribution)
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব মাদক পাচারের চিরকালীন ব্যাকরণকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছে। অপরাধীরা এখন আর কেবল অন্ধকার গলির মোড়ে বা সমুদ্রের জাহাজে চালানের জন্য অপেক্ষা করে না; তাদের একটি বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছে ইন্টারনেটের গভীরে লুকানো ডার্কনেট (Darknet)-এর জগতে। এনক্রিপ্ট করা টর ব্রাউজারের মাধ্যমে সাধারণ নজরদারির বাইরে থাকা এই গোপন ওয়েবসাইটগুলো পরিণত হয়েছে অবৈধ মাদকের উন্মুক্ত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে। ২০১১ সালে আত্মপ্রকাশ করা কুখ্যাত সিল্ক রোড ছিল এই ডিজিটাল অপরাধের পথিকৃৎ। যদিও এফবিআই পরবর্তীতে সিল্ক রোড এবং তার প্রতিষ্ঠাতা রস উলব্রিকটকে আইনের আওতায় নিয়ে আসে, কিন্তু সেই শূন্যস্থানে মুহূর্তের মধ্যে জন্ম নিয়েছে শত শত নতুন ক্রিপ্টো-মার্কেট (Aldridge & Décary-Hétu, 2014)।
ব্রিটিশ গবেষক জুডিথ অলড্রিজ (Judith Aldridge) এবং ডেভিড ডেকারি-হেতু তাদের যুগান্তকারী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ডার্কনেট কীভাবে মাদক বাণিজ্যে এক নতুন যুগান্তকারী রূপান্তর সৃষ্টি করেছে, যাকে তারা সংজ্ঞায়িত করেছেন ক্রিপ্টোমারকেট প্যারাডাইম (Cryptomarket Paradigm) হিসেবে (Aldridge & Décary-Hétu, 2014)। প্রচলিত মাদক বাজারে ক্রেতাকে সবসময় সহিংসতা, ছিনতাই বা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় তাড়া করে ফিরত। কিন্তু ক্রিপ্টোবাজারে লেনদেন হয় সম্পূর্ণ বেনামে। এখানে অ্যামাজন বা ইবের মতো গ্রাহক পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকে, যেখানে ক্রেতারা মাদকের বিশুদ্ধতা এবং প্যাকিংয়ের গুণমান দেখে বিক্রেতাকে রেটিং দেয়। ফলে বিক্রেতারাও ভালো রিভিউ পাওয়ার আশায় উচ্চমানের পণ্য সরবরাহ করতে বাধ্য হয়।
এই ডিজিটাল লেনদেনের মূল জ্বালানি হলো বিকেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টোকারেন্সি। বিটকয়েন দিয়ে এই যাত্রার সূচনা হলেও আধুনিক পাচারকারীরা এখন বেশি ব্যবহার করে মোনেরো বা জেক্যাশের মতো প্রাইভেসি কয়েন। এই ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর ব্লকচেইন এমনভাবে এনক্রিপ্ট করা থাকে যে কে কার কাছে টাকা পাঠাচ্ছে, তার কোনো ডিজিটাল সূত্র বের করা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। ক্রেতা তার ঘরে বসে কম্পিউটার স্ক্রিনে কয়েক ক্লিকে পণ্যের অর্ডার দেয় এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য পরিশোধ করে। এরপর শুরু হয় লজিস্টিকসের শেষ পর্ব, যাকে বলা হয় ডাক সরবরাহ বিকেন্দ্রীকরণ (Postal Delivery Decentralization)।
পাচারকারীরা আর বড় কন্টেইনারে পণ্য পাঠায় না; তারা মাদকের পরিমাণকে ছোট ছোট খামে বিভক্ত করে সাধারণ আন্তর্জাতিক ডাক ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়। বিশেষ রাসায়নিক প্রতিরোধক প্যাকেজিং ব্যবহার করা হয়, যাতে কুকুর বা স্ক্যানার মেশিনে তা ধরা না পড়ে। শত শত কোটি চিঠির ভিড়ে সাধারণ চিঠির মতো করে কয়েক গ্রাম মেথাম্ফেটামিন বা এলএসডি সরাসরি গ্রাহকের লেটারবক্সে এসে পড়ে। ফলে সনাতন সীমান্ত নিরাপত্তা বা পুলিশি ব্যারিকেড সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। মাদক পাচারের এই সাইবারায়ন প্রমাণ করে যে ইন্টারনেটের যুগে বিতরণ ব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নেই। এটি এখন প্রযুক্তির এমন এক মহাশূন্যে বিস্তার লাভ করেছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আইনের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার ফরেনসিকের সম্পূর্ণ নতুন হাতিয়ার নিয়ে মাঠে নামতে হবে।
মাফিয়া, সিন্ডিকেট ও মাদক অর্থনীতি (Mafia, Syndicates and Drug Economy): সংগঠিত অপরাধের ভূমিকা
সংগঠিত অপরাধের সংজ্ঞা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি (Definition and Economic Foundations of Organized Crime)
অপরাধ জগতের দিকে তাকালে দেখা যায় সাধারণ ছিঁচকে চুরি বা ছিনতাইয়ের সাথে পেশাদার মাফিয়া চক্রের এক বিরাট গুণগত পার্থক্য রয়েছে। একজন সাধারণ অপরাধী কোনো পরিকল্পনা ছাড়া আকস্মিক উত্তেজনার বশে আইন ভাঙে। কিন্তু একটি মাফিয়া সংগঠন পরিচালিত হয় দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক লক্ষ্য, কঠোর অভ্যন্তরীণ অনুশাসন এবং ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুনির্দিষ্ট কৌশলের মাধ্যমে। অর্থনীতিবিদ থমাস শেলিং (Thomas Schelling) ১৯৭১ সালে প্রকাশিত তার যুগান্তকারী তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন যে সংগঠিত অপরাধের আসল লক্ষ্য কেবল পণ্য বা সেবা বিক্রি করা নয়; এর মূল লক্ষ্য হলো বলপ্রয়োগের সামর্থ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ বাজারের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব স্থাপন করা (Schelling, 1971)। শেলিংয়ের এই ভাবনা অপরাধবিজ্ঞানে অবৈধ বাজারের একচেটিয়া তত্ত্ব (Monopoly Theory of Illegal Markets) হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
সংগঠিত অপরাধ মূলত এমন এক শূন্যতায় জন্ম নেয় যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, অথচ সমাজে সেই পণ্যের বিপুল অর্থনৈতিক চাহিদা বহাল থাকে। রাষ্ট্র যখন কোনো ভেষজ বা রাসায়নিক উপাদানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তখন সেই পণ্যের বাজার আপনাআপনি মিলিয়ে যায় না। বরং আইনগত সুরক্ষার অভাবের কারণে সেই বাজারে পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত ঝুঁকিই অবৈধ পণ্যের দামকে সাধারণ দামের চেয়ে শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। মার্কিন অপরাধবিজ্ঞানী জেমস ও. ফিনকেনয়ার (James O. Finckenauer) তার গবেষণায় সংগঠিত অপরাধের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে সহিংসতা ব্যবহারের ক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্বই একটি সাধারণ অপরাধী চক্রকে খাঁটি সংগঠিত অপরাধ (Organized Crime)-এ রূপান্তর করে (Finckenauer, 2005)।
এই অবৈধ অর্থনীতির ভেতরে মাফিয়া চক্রগুলো নিজেদের জন্য এমন এক ভূমিকা তৈরি করে নেয়, যা পুঁজিবাদী বাজারের যেকোনো বৃহৎ বহুজাতিক কর্পোরেশনের সাথে তুলনীয়। তারা বাজার গবেষণা করে, নতুন গ্রাহক তৈরি করে এবং কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য সরবরাহ চেইন গড়ে তোলে। তবে কর্পোরেট দুনিয়ার সাথে তাদের প্রধান পার্থক্য হলো চুক্তির প্রয়োগে। বৈধ বাজারে দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তারা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে। কিন্তু মাদক বাজারে কোনো পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে পাওনাদার পুলিশের কাছে যেতে পারে না। এখানে লেনদেনের চুক্তি কার্যকর করার একমাত্র মাধ্যম হলো সহিংসতার হুমকি। যে সংগঠন যত বেশি নির্মমভাবে এই সহিংসতা প্রয়োগ করতে পারে, বাজারে তার নিয়ন্ত্রণ তত বেশি পোক্ত হয়।
সুতরাং মাদক অর্থনীতি সংগঠিত অপরাধের জন্য কেবল আয়ের আরেকটি উৎস নয়; এটি তাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে লাভজনক ভিত্তি। জুয়া, পতিতাবৃত্তি বা সাধারণ চাঁদাবাজির মতো সনাতন অপরাধের মাধ্যমে যে পরিমাণ মুনাফা অর্জন সম্ভব, মাদক বাণিজ্যের অতি-মুনাফা তার সমস্ত সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল অর্থপ্রবাহের কারণে মাফিয়া সিন্ডিকেটগুলো ক্ষুদ্র স্থানীয় স্তর পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে। তারা রাষ্ট্রের ভেতর তৈরি করে আরেক বিকল্প সমান্তরাল রাষ্ট্র, যার নিজস্ব নিয়মকানুন ও বিচারব্যবস্থা থাকে। এই সমান্তরাল শাসনব্যবস্থাই আধুনিক বিশ্বের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে নীরব অথচ ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী মাফিয়া ও সুরক্ষার বাণিজ্য (Traditional Mafia and the Business of Protection)
মাফিয়া ধারণার ঐতিহাসিক আঁতুড়ঘর হলো ইতালির সিসিলি দ্বীপ। উনিশ শতকে যখন ইতালির একীকরণ ঘটছিল, তখন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সিসিলির প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সেখানে একদল সশস্ত্র মধ্যস্বত্বভোগীর উত্থান ঘটে, যারা স্থানীয় জমিদার ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আদায় করতে শুরু করে। সমাজবিজ্ঞানী ডিয়েগো গ্যাম্বেটা (Diego Gambetta) ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সিসিলিয়ান মাফিয়া (The Sicilian Mafia)-তে এই প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন ব্যক্তিগত সুরক্ষার তত্ত্ব (Theory of Private Protection)-এর মাধ্যমে (Gambetta, 1993)। গ্যাম্বেটা দেখিয়েছেন যে মাফিয়া কোনো সাধারণ অপরাধী চক্র নয়; তারা মূলত সুরক্ষার এক বেসরকারি ব্যবসায়ী।
ঐতিহ্যবাহী সিসিলিয়ান মাফিয়া, যা নিজেদের জগতে কোজ়া নস্ট্রা (Cosa Nostra) বা আমাদের বিষয় নামে পরিচিত, তারা প্রাথমিক পর্বে পরিচালিত হতো পারিবারিক বিশ্বস্ততা, আঞ্চলিক পরিচিতি এবং নীরবতার কঠোর বিধান বা ওমার্তার ওপর ভিত্তি করে। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই ঐতিহ্যবাহী সিসিলিয়ান মাফিয়া তাদের সুরক্ষার ব্যবসাটিকে আন্তর্জাতিক মাদক অর্থনীতির সাথে যুক্ত করে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের পারিবারিক ও ভৌগোলিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সিসিলির মাফিয়ারা আন্তর্জাতিক হেরোইন বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। তারা ফ্রান্সের মার্সেইয়ের গোপন ল্যাব থেকে প্রক্রিয়াজাত হেরোইন এনে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় পৌঁছে দেওয়ার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত, যা অপরাধের ইতিহাসে ফ্রেঞ্চ কানেকশন নামে খ্যাতি পায়।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের আরেক কুখ্যাত অপরাধ সংগঠন ক্যালাব্রিয়ার দ্রাঙ্গেতা সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি হিংস্র ও ধূর্তভাবে আন্তর্জাতিক মাদক বাজারে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। গবেষক ফেদেরিকো ভারেসে (Federico Varese) অপরাধ চক্রগুলোর ভৌগোলিক বিস্তার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে মাফিয়া সংগঠনগুলো নতুন নতুন অঞ্চলে তাদের কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত করে (Varese, 2011)। ভারেসে দেখান যে দ্রাঙ্গেতা তাদের নিশ্ছিদ্র পারিবারিক রক্তের সম্পর্কের কারণে অন্যান্য মাফিয়ার চেয়ে বেশি গোপনীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এই পারিবারিক কাঠামোর কারণে তাদের দলের মধ্যে পুলিশের পক্ষে কোনো অনুপ্রবেশকারী বা তথ্যদাতা ঢোকানো প্রায় অসম্ভব ছিল। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই ক্যালাব্রিয়ান মাফিয়া পুরো ইউরোপের কোকেন বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়। তারা সরাসরি ল্যাটিন আমেরিকার উৎপাদকদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে ইউরোপের বন্দরগুলোতে কন্টেইনার বোঝাই কোকেন নামিয়ে দেয়।
মাফিয়াদের এই মাদক রূপান্তর তাদের সনাতন সংস্কৃতির মধ্যেও গভীর পরিবর্তন এনেছে। আগে মাফিয়া কর্তারা সমাজের অভিভাবক হিসেবে এক ধরণের নকল আভিজাত্য বজায় রাখতেন। কিন্তু মাদকের ট্রিলিয়ন ডলারের মুনাফা তাদের ভেতরের সমস্ত সংযম ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মাফিয়া পরিবারগুলোর মধ্যে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, যা ইতালির সিসিলিতে আশির দশকে শত শত লাশের পাহাড় তৈরি করেছিল। বিচারক জোভান্নি ফ্যালকোনে এবং পাওলো বোরসেলিনোর মতো সাহসী রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলিদের বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মাফিয়ারা প্রমাণ করেছিল যে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বাঁচাতে তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করতেও পিছপা হয় না। ঐতিহ্যবাহী মাফিয়া এভাবেই গ্রামীণ লাঠিয়াল বাহিনী থেকে রূপান্তরিত হয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক কর্পোরেশনে।
ল্যাটিন আমেরিকান কার্টেল: সহিংসতা ও রাষ্ট্র দখল (Latin American Cartels: Violence and State Capture)
সিসিলির মাফিয়ারা যখন পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করতে পছন্দ করত, ল্যাটিন আমেরিকার মাদক কার্টেলগুলো তখন বেছে নিয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক রণকৌশল। তারা নিজেদের সামরিক শক্তিকে খোলামেলাভাবে প্রদর্শন করে রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আশির দশকে কলম্বিয়ার পাবলো এসকোবারের মেডেলিন কার্টেল এই ভয়াবহ ধারার সূচনা করেছিল। এসকোবারের কুখ্যাত নীতি ছিল “প্লাতা ও প্লোমো (Plata o Plomo বা রূপো নয়তো সীসা)”। অর্থাৎ হয় সরকারি কর্মকর্তারা কার্টেলের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করবে, নয়তো তাদের কপালে জুটবে একে-৪৭ রাইফেলের গুলি। এই নির্মম নীতি কলম্বিয়ার পুলিশ, বিচারক এবং এমনকি রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদেরও একে একে হত্যা করার মাধ্যমে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
মেডেলিন ও ক্যালি কার্টেলের পতনের পর আন্তর্জাতিক মাদক অর্থনীতির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র স্থানান্তরিত হয় মেক্সিকোর মাটিতে। মেক্সিকান সিন্ডিকেটগুলো কলম্বিয়ানদের নিছক পরিবহণকারী হিসেবে কাজ শুরু করলেও খুব দ্রুতই তারা পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের একক আধিপত্য দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক ইয়োয়ান গ্রিলো (Ioan Grillo) তার গবেষণায় এই মেক্সিকান মাদক যুদ্ধকে নিছক গ্যাং সংঘাত হিসেবে দেখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন; তিনি একে সংজ্ঞায়িত করেছেন অপরাধী বিদ্রোহ (Criminal Insurgency) হিসেবে (Grillo, 2011)। সিনালোয়া কার্টেল বা লস জেতাসের মতো সংগঠনগুলো সাধারণ মাফিয়ার মতো কাজ করে না; তারা কাজ করে আধুনিক ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সুপ্রশিক্ষিত প্যারামিলিটারি বা আধা-সামরিক বাহিনীর মতো।
মেক্সিকোর মাদক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ভৌগোলিক অবস্থান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম মাদক উপভোক্তা বাজারের প্রবেশদ্বার। এই সীমান্ত পারাপারের প্রতিটি করিডোরকে অপরাধ জগতে বলা হয় প্লাজা। গবেষক পিটার এ. লুপশা (Peter A. Lupsha) ল্যাটিন আমেরিকান অপরাধ চক্রগুলোর বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই গ্রুপগুলো পরজীবী স্তর পেরিয়ে শিকারী এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সমকক্ষ স্তরে উন্নীত হয় (Lupsha, 1996)। লুপশার বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে প্লাজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Plaza Control System) দখল করার জন্যই মেক্সিকোর বিভিন্ন কার্টেলের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে, যার বলি হয়েছে লক্ষাধিক সাধারণ নাগরিক।
কার্টেলগুলো তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় মেয়র থেকে শুরু করে রাজ্য গভর্নর পর্যন্ত নিজেদের ইচ্ছামতো বসায় এবং নামায়। কোনো সৎ পুলিশ কর্মকর্তা বা সাংবাদিক তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে লাশ ব্রিজের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয়। লস জেতাসের মতো চরমপন্থী গ্রুপগুলো তৈরি হয়েছিল মেক্সিকান সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো ইউনিটের দলছুট সদস্যদের নিয়ে। ফলে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কৌশলগুলোকেই অপরাধের কাজে প্রয়োগ করতে শুরু করে। সামরিক ড্রোন, রকেট চালিত গ্রেনেড এবং সাঁজোয়া গাড়ির ব্যবহারে মেক্সিকোর বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের হাতছাড়া হয়ে গেছে। কার্টেলগুলো এভাবেই নিছক চোরাকারবারি থেকে পরিণত হয়েছে একেকটি সমান্তরাল সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে।
এশীয় ট্রায়াড, ইয়াকুজা ও বংশানুক্রমিক সিন্ডিকেট (Asian Triads, Yakuza, and Kinship Syndicates)
এশিয়ার সংগঠিত অপরাধ জগতের ইতিহাস পশ্চিমা মাফিয়াদের চেয়েও প্রাচীন এবং জটিল। চীনের শতবর্ষ প্রাচীন গোপন সমাজ বা ট্রায়াড এবং জাপানের ঐতিহ্যবাহী ইয়াকুজা গোষ্ঠীগুলো মাদক অর্থনীতিতে তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। ট্রায়াডের সূচনা হয়েছিল মূলত সপ্তদশ শতাব্দীতে চিং রাজবংশের (Qing dynasty) বিরুদ্ধে মিং রাজবংশের সমর্থকদের গোপন প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্যের মৃত্যু ঘটার পর এই গোপন সমিতিগুলো ধীরে ধীরে চোরাচালান, জুয়া এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধ চক্রে রূপান্তরিত হয়। অপরাধবিজ্ঞানী কো-লিন চিন (Ko-Lin Chin) নিউ ইয়র্ক এবং হংকংয়ের চীনা গ্যাংগুলোর ওপর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই দলগুলো কীভাবে কাজ করে (Chin, 1996)।
চিন দেখিয়েছেন যে এশীয় অপরাধ চক্রগুলো পরিচালিত হয় অত্যন্ত জটিল গুয়াংসি সামাজিক সম্পর্ক (Guanxi Social Relations) এবং বংশানুক্রমিক অপরাধ চক্র (Kinship Crime Network)-এর মিথোজীবিতার ওপর ভিত্তি করে। রক্তের সম্পর্ক, পারিবারিক গ্রাম এবং অভিন্ন উপভাষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে বহিরাগত কারও প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। চৌদ্দ কে বা সান ই অন-এর মতো হংকং ও তাইওয়ানকেন্দ্রিক ট্রায়াডগুলো বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের আফিম ও হেরোইন বাণিজ্যের প্রধান বিতরণকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়। মিয়ানমারের পাহাড়ি জঙ্গল থেকে ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া উচ্চ বিশুদ্ধতার হেরোইন এই ট্রায়াডগুলোর হাত ধরেই হংকং বন্দর হয়ে উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছাত।
জাপানের ইয়াকুজাদের সাংগঠনিক রূপটি আবার ট্রায়াড বা মাফিয়াদের চেয়ে ভিন্ন। ইয়াকুজারা জাপানি সমাজে কোনো পুরোপুরি গোপন সংগঠন হিসেবে কাজ করত না; অনেক সময় তাদের প্রকাশ্য অফিস, বিজনেস কার্ড এবং নিজস্ব প্রতীক থাকত। গবেষক মাইকেল ডি. লাইম্যান এবং গ্যারি ডব্লিউ. পটার তাদের গ্রন্থে ইয়াকুজার অভ্যন্তরীণ হায়ারার্কি ব্যাখ্যা করেছেন (Lyman & Potter, 2007)। সেখানে পিতৃতুল্য নেতার প্রতি সন্তানের মতো আনুগত্য প্রকাশের এক চরম সামন্ততান্ত্রিক অনুশাসন চালু থাকে, যাকে বলা হয় ওয়াবুন-কোবুন সম্পর্ক। ইয়াকুজারা ঐতিহ্যগতভাবে জাপানের ভেতরে মেথাম্ফেটামিন বা স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় শাবু, সেই সিন্থেটিক মাদকের কালোবাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে।
যদিও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জাপান সরকারের কঠোর আইনি পদক্ষেপের কারণে ইয়াকুজার সদস্য সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু চীনা ট্রায়াডগুলো বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে নিজেদের কার্যক্রম বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তারা কেবল কাঁচা আফিম বা হেরোইনে সীমাবদ্ধ নেই; সমকালীন বিশ্বে সিন্থেটিক ড্রাগ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রিকারসার কেমিক্যালস বা কাঁচামাল সরবরাহের আন্তর্জাতিক চেইনটি আজ প্রধানত এই এশীয় সিন্ডিকেটগুলোর নিয়ন্ত্রণে। চীনের সাংহাই বা গুয়াংডংয়ের রাসায়নিক কারখানা থেকে আইনি বা বেআইনি উপায়ে কাঁচামাল সংগ্রহ করে তা মেক্সিকোর কার্টেলগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করছে এই ট্রায়াড নেটওয়ার্কগুলো। শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শপথ আর আধুনিক ডিজিটাল বাণিজ্যের সমন্বয়ে এশীয় সিন্ডিকেটগুলো আজ বৈশ্বিক মাদক অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী অনুঘটক।
পোস্ট-সোভিয়েত সংঘাত ও ছায়া অর্থনীতির মাফিয়া (Post-Soviet Transition and Shadow Economy Mafias)
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকস্মিক পতন মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন রাতারাতি ভেঙে পড়ে এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির কোনো সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি পরিকাঠামো ছাড়াই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বেসরকারিকরণ শুরু হয়, তখন সেই শূন্যতার সুযোগ নেয় সাবেক সোভিয়েত আন্ডারগ্রাউন্ড অপরাধীরা। রাশিয়ান সমাজবিজ্ঞানী ভাদিম ভলকভ (Vadim Volkov) এই নাটকীয় রূপান্তরকে তার ক্লাসিক গবেষণায় বর্ণনা করেছেন সহিংস উদ্যোক্তাতত্ত্ব (Violent Entrepreneurship) হিসেবে (Volkov, 2002)। ভলকভ দেখিয়েছেন যে নতুন পুঁজিপতি ও ব্যাংকগুলো যখন রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার কাছ থেকে কোনো সুরক্ষা পাচ্ছিল না, তখন তারা সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা, আফগান যুদ্ধফেরত প্যারাট্রুপার এবং অপরাধী গ্যাংদের ভাড়া করতে শুরু করে নিজেদের পাওনা আদায় ও ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য।
এই চরম নৈরাজ্যের ভেতর থেকে নতুন রূপ ধারণ করে রাশিয়ার শতাব্দীর প্রাচীন অপরাধী অভিজাত শ্রেণি, যারা পরিচিত ছিল ভোরি ভি জকোনে (Vory v Zakone) বা আইনের চোর নামে। জারের আমল এবং সোভিয়েত গুলাগ বা বন্দিশিবিরে এই চোরদের নিজস্ব কঠোর নৈতিক অনুশাসন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নতুন প্রজন্মের রাশিয়ান মাফিয়া বা ব্রাতভা এই প্রাচীন আদর্শ ছুঁড়ে ফেলে বিপুল সম্পদের লোভে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তারা রাষ্ট্রীয় তেল, গ্যাস, অ্যালুমিনিয়াম এবং অস্ত্র ব্যবসার সাথে সমান্তরালভাবে মাদক চোরাচালানের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
মধ্য এশিয়ার সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো – যেমন তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তান – রাতারাতি পরিণত হয় আফগান হেরোইন পাচারের প্রধান করিডোরে। আফগানিস্তানের গোল্ডেন ক্রিসেন্ট থেকে উৎপাদিত মাদক উত্তর রুট দিয়ে এই দুর্বল সীমানা পেরিয়ে রাশিয়ার মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রবেশ করতে থাকে। সেখান থেকে সেই চালান চলে যেত পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপে। অপরাধবিজ্ঞানী রাইমন্দো কাতানজারো মাফিয়ার সামাজিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিলুপ্তি কীভাবে অপরাধী চক্রগুলোকে বিকল্প প্রশাসন গড়ে তোলার সুযোগ দেয় (Catanzaro, 1992)। মধ্য এশিয়ার দুর্নীতিগ্রস্ত সীমান্তরক্ষী এবং উচ্চপদস্থ সরকারি আমলারা এই মাদক ট্রাফিকের প্রত্যক্ষ অংশীদারে পরিণত হয়।
পোস্ট-সোভিয়েত মাফিয়ারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পায় তাদের চরম বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার কারণে। তাদের সাথে যুক্ত ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া সাবেক রসায়নবিদ, গণিতবিদ ও কম্পিউটার প্রকৌশলীরা। ফলে তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থা হ্যাকিং, ডিজিটাল মানি লন্ডারিং এবং সাবমেরিনের মতো জটিল সামরিক সরঞ্জাম কেনাবেচায় ল্যাটিন আমেরিকার কার্টেলগুলোর চেয়েও একধাপ এগিয়ে ছিল। এমনকি নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে রাশিয়ান মাফিয়ারা কলম্বিয়ার মেডেলিন কার্টেলের কাছে একটি সাবেক সোভিয়েত ডিজেল চালিত সাবমেরিন বিক্রি করার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এই পোস্ট-সোভিয়েত সিন্ডিকেটগুলো প্রমাণ করে যে একটি পারমাণবিক পরাশক্তির পতনের ধ্বংসস্তূপ কীভাবে আন্তর্জাতিক মাদক অর্থনীতিকে আরও বেশি হিংস্র ও প্রযুক্তিগতভাবে অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ ও মাদক অর্থনীতির রাজনৈতিক অর্থনীতি (Institutional Infiltration and the Political Economy of Drug Wealth)
মাফিয়া এবং মাদক সিন্ডিকেটগুলোর সবচেয়ে বিপজ্জনক সাফল্য কোনো সামরিক বিজয়ে অর্জিত হয় না; এটি ঘটে সমাজের মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে তাদের নীরব অনুপ্রবেশের মাধ্যমে। যখন কোনো অপরাধ চক্রের হাতে ট্রিলিয়ন ডলারের নগদ অর্থ জমা হয়, তখন সেই অর্থ কেবল তাদের ভোগবিলাসের জন্য রাখা যায় না। সেই মূলধনকে বিনিয়োগ করতে হয়, পুনরায় বাজারে খাটাতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাদক অর্থনীতি মূলধারার রাজনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রিয়েল এস্টেট এবং বিচারব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থের অনুকূলে কিনে নিতে শুরু করে। ইতালীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক রবার্তো সাভিয়ানো (Roberto Saviano) ২০০৬ সালে প্রকাশিত তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ গোমোরাহ (Gomorrah)-তে নেপলসের কামোরা মাফিয়ার এই সর্বগ্রাসী অনুপ্রবেশ উন্মোচন করেছিলেন (Saviano, 2006)।
সাভিয়ানো দেখিয়েছেন যে কামোরার কোকেন থেকে উপার্জিত অর্থ কোনো অন্ধকার ড্রয়ারে পড়ে থাকে না। সেই অর্থ বিনিয়োগ হয় ইউরোপের হাই-স্পিড রেললাইন নির্মাণে, মহাসড়ক সংস্কারের সরকারি টেন্ডারে, মিলানের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এবং এমনকি বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য অপসারণের মতো জটিল পৌর ব্যবসায়। অপরাধ এবং বৈধ বাণিজ্যের সীমানাটি সেখানে পুরোপুরি মুছে যায়। মাফিয়া সিন্ডিকেটগুলো বৈধ ব্যবসায় প্রবেশ করার পর অনুগত নেতাদের নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা ঢেলে তাদের বিজয় নিশ্চিত করে। ফলে যারা সংসদে বসে আইন তৈরি করে, তারা প্রকারান্তরে পরিণত হয় এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলোর নীরব সহযোগীতে।
সমাজবিজ্ঞানী ভিনসেঞ্জো রুগেরো (Vincenzo Ruggiero) অপরাধ ও বাজারের মিথোজীবিতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই জটিল সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন (Ruggiero, 2000)। রুগেরো দেখান যে আধুনিক অর্থনীতিতে অপরাধ কোনো সমাজের বাইরের বিচ্যুতি নয়; এটি অর্থনৈতিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ চাহিদা থেকেই পুনরুৎপাদিত হয়। তিনি একে সংজ্ঞায়িত করেছেন পণ্য-অপরাধ মিথোজীবিতা (Commodity-Crime Symbiosis) এবং ধূসর অর্থনীতি (Grey Economy)-র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটগুলোর সময় দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বড় বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যখন নগদ তারল্যের সংকটে দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়েছিল, তখন মাদক সিন্ডিকেটগুলোর কোটি কোটি ডলারের অবৈধ নগদ জমার কারণেই বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান টিকে যেতে পেরেছিল।
এই প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশের ফলে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতিটি হয় সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের। যখন একজন সাধারণ নাগরিক দেখে যে তার ভোট দেওয়া প্রতিনিধিরা মাদক মাফিয়াদের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে, এলাকার পুলিশ প্রশাসন কার্টেলের নির্দেশে কাজ করছে এবং আদালত অপরাধীদের সাজা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন আইনের শাসনের ওপর থেকে তাদের শেষ আস্থাটুকু উবে যায়। মাদক অর্থনীতি এভাবেই সমাজের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বুননকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। সংগঠিত অপরাধ কেবল রাস্তার কোণে নেশার বিষ ছড়ায় না; এটি রাষ্ট্রের স্নায়ুকেন্দ্রে প্রবেশ করে পুরো শাসনব্যবস্থাকে এক নীরব অপরাধী রাষ্ট্রে পরিণত করার নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে ধ্বংস না করে কেবল সীমান্ত পাহারা দিয়ে এই দানবীয় মাদক অর্থনীতিকে রুখে দেওয়া মানবজাতির পক্ষে এক অসম্ভব স্বপ্ন।
মাদক অর্থ, বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদ (Drug Money, Insurgency and Terrorism): সহিংসতার অর্থায়ন
অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের সংযোগসূত্র: তাত্ত্বিক বিতর্ক (The Crime-Terror Continuum: Theoretical Debates)
স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় সশস্ত্র বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী দলগুলোর অর্থায়নের উৎস ছিল স্পষ্ট। কোনো না কোনো পরাশক্তি বা তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলো মতাদর্শের নামে এই দলগুলোকে অর্থ, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করত। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির চিত্রপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রায় রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সামনে টিকে থাকার অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়। ঠিক এই সংকটময় সন্ধিক্ষণেই অপরাধ জগৎ এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ গবেষক তামারা মাকারেঙ্কো (Tamara Makarenko) ২০০৪ সালে এই রূপান্তরকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছিলেন তার বহুল আলোচিত অপরাধ-সন্ত্রাস অবিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব (Crime-Terror Continuum Theory)-এর মাধ্যমে (Makarenko, 2004)।
মাকারেঙ্কোর তত্ত্বের মূল কথা হলো, অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদকে আর দুটি পৃথক দ্বীপে বাস করা সত্তা হিসেবে দেখা যায় না। এক প্রান্তে অবস্থান করে নিখাদ সংগঠিত অপরাধ চক্র, যাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে আর্থিক মুনাফা অর্জন। অন্য প্রান্তে থাকে বিশুদ্ধ মতাদর্শিক সন্ত্রাসী দল, যাদের লক্ষ্য রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ক্ষমতার পরিবর্তন। অতীতে এই দুই দল একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখত। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের মধ্যে প্রথমে কৌশলগত মৈত্রী তৈরি হয়। সন্ত্রাসীদের অর্থের প্রয়োজন ছিল, আর অপরাধীদের প্রয়োজন ছিল অস্ত্রের বল এবং সামরিক সুরক্ষা। মাকারেঙ্কো দেখান যে এই সহযোগিতা ধীরে ধীরে এমন এক স্তরে পৌঁছায় যাকে বলা হয় রূপান্তর। অর্থাৎ একসময় সন্ত্রাসী দলটি নিজেই মাদক চোরাচালানের সিন্ডিকেটে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিক আদর্শ কেবল তাদের বাহ্যিক প্রচারণার মুখোশ হিসেবে অবশিষ্ট থাকে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষক ক্রিস ডিশম্যান (Chris Dishman) এই রূপান্তরকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন (Dishman, 2001)। ডিশম্যান দেখান যে কীভাবে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের মূল লক্ষ্যও বদলে যায়। একে তিনি সংজ্ঞায়িত করেছেন মতাদর্শিক রূপান্তর (Ideological Transformation) হিসেবে। পুরোনো দিনের আদর্শবাদী নেতারা যখন সামরিক অভিযানে নিহত বা গ্রেপ্তার হন, তখন দলের ভেতরে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসে সেই সব কমান্ডার যারা মাঠে থেকে লজিস্টিকস এবং মাদক অর্থায়ন পরিচালনা করত। এই নতুন প্রজন্মের নেতাদের কাছে বিপ্লব বা স্বাধীনতার স্বপ্ন গৌণ হয়ে পড়ে; প্রধান হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জীবন এবং মাদক সাম্রাজ্যের কোটি কোটি ডলারের ভাগ নিশ্চিত করা।
এই অপরাধ-সন্ত্রাস মিথোজীবিতা আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। প্রচলিত সামরিক কৌশল দিয়ে এই সংকর ধরণের হুমকি মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র বুঝতে পারে না সে কি কোনো রাজনৈতিক বিরোধীদের সাথে যুদ্ধ করছে, নাকি কোনো আন্তর্জাতিক ড্রাগ কার্টেলের মোকাবেলা করছে। রাজনৈতিক দাবি মেনে নিলেও এরা যুদ্ধ বন্ধ করতে চায় না, কারণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে এই লাভজনক অবৈধ মাদক বাণিজ্যের মৃত্যু ঘটবে। ফলে এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা পুরো সংঘাতকে এক অন্তহীন সহিংসতার ফাঁদে বন্দি করে ফেলে, যা সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিঃশেষ করে দেয়।
গৃহযুদ্ধের অর্থনীতি: লোভ বনাম ক্ষোভের বিতর্ক (Economics of Civil War: The Greed versus Grievance Debate)
কেন মানুষ নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়? মানুষ কি সামাজিক অন্যায়, বৈষম্য এবং বঞ্চনার ক্ষোভ থেকে বিদ্রোহ করে, নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে লুটপাটের অর্থনৈতিক সুযোগ পেয়ে অপরাধের পথে নামে? এই মৌলিক প্রশ্নটি নিয়ে বিশ শতকের শেষে উন্নয়ন অর্থনীতিতে এক তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ পল কোলিয়ার (Paul Collier) এবং আঙ্কে হোয়েফলার ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাংকের এক বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে হাজির করেন তাদের যুগান্তকারী স্বার্থপরতা বনাম ক্ষোভ তত্ত্ব (Greed versus Grievance Theory) (Collier & Hoeffler, 2004)। কোলিয়ার তার গবেষণায় যুক্তি দেন যে গৃহযুদ্ধের শুরু বা টিকে থাকার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষোভ বা বঞ্চনার চেয়েও অনেক বেশি ভূমিকা পালন করে বিদ্রোহীদের অর্থনৈতিক সুযোগ বা লোভ।
কোলিয়ারের মতে, যে সমস্ত অঞ্চলে সহজেই লুটপাট বা কর আদায় করা যায় এমন প্রাকৃতিক সম্পদ থাকে – যেমন হীরা, কাঠ বা অবৈধ মাদক – সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। কোকা পাতা বা আফিম পপি হলো এই ধরণের সবচেয়ে আদর্শ পণ্য। কারণ এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপন্ন হয়, পরিবহন করা সহজ এবং আন্তর্জাতিক কালোবাজারে এর দাম থাকে অবিশ্বাস্যরকম বেশি। বিদ্রোহীরা যখন এই মাদক অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তখন তাদের আর সাধারণ জনগণের কাছ থেকে চাঁদা তোলার ওপর নির্ভর করতে হয় না। তারা পপি চাষি এবং চোরাকারবারিদের ওপর কর বসিয়ে নিজেরাই এক স্বয়ংসম্পূর্ণ যুদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেরেমি এম. ওয়াইনস্টাইন (Jeremy M. Weinstein) ২০০৭ সালে প্রকাশিত তার মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ ইনসাইড রিবেলিয়ন (Inside Rebellion)-এ এই বিদ্রোহী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন (Weinstein, 2007)। ওয়াইনস্টাইন দেখিয়েছেন যে তহবিলের উৎস কীভাবে একটি বিদ্রোহী দলের পুরো মানসিকতা গড়ে দেয়। যেসব দল নিজেদের টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় জনগণের স্বেচ্ছা অনুদান এবং সামাজিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করে, তারা তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খল থাকে এবং সাধারণ মানুষের ওপর কম অত্যাচার চালায়। কিন্তু যে দলগুলোর হাতে মাদক অর্থনীতির মতো সহজ নগদ অর্থের প্রবাহ চলে আসে, তারা খুব দ্রুত পরিণত হয় সুবিধাবাদী বিদ্রোহ (Opportunist Rebellion)-এ।
ওয়াইনস্টাইনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাদক অর্থে পুষ্ট এই সুবিধাবাদী বিদ্রোহী দলগুলোতে আদর্শবান বিপ্লবীদের বদলে ভিড় জমায় সমাজের সুবিধাবাদী অপরাধী, বেকার গুণ্ডা এবং অর্থলোভী যুবকেরা। এদের নিয়ন্ত্রণে কোনো নৈতিক অনুশাসন থাকে না। তারা ক্ষমতার লোভে যেকোনো ধরণের বর্বরতা চালাতে প্রস্তুত থাকে। ফলে মাদক অর্থায়নে পরিচালিত গৃহযুদ্ধগুলোতে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা অনেক বেশি ঘটে। বিদ্রোহের মূল রাজনৈতিক বক্তব্য হারিয়ে গিয়ে পুরো আন্দোলনটি পরিণত হয় অস্ত্রের মুখে মাদক বাণিজ্য পরিচালনার এক হিংস্র কর্পোরেশনে। অর্থনীতি এভাবেই একটি আদর্শিক লড়াইয়ের আত্মাকে গ্রাস করে ফেলে।
মাদক অর্থায়ন ও নতুন যুদ্ধ: রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতা (Drug Financing and New Wars: State Fragility)
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সমাজবিজ্ঞানী মেরি কালডোর (Mary Kaldor) বিংশ শতাব্দীর শেষের সংঘাতগুলোকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাজির করেন তার বিখ্যাত নতুন যুদ্ধ তত্ত্ব (New Wars Theory) (Kaldor, 2012)। কালডোর দেখিয়েছেন যে অতীতের পুরনো যুদ্ধগুলো পরিচালিত হতো দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়মিত সেনাবাহিনীর মধ্যে, যেখানে নির্দিষ্ট রণাঙ্গন থাকত এবং লক্ষ্য থাকত ভূখণ্ড দখল। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধোত্তর যুগে যে নতুন যুদ্ধগুলো শুরু হয়েছে, তা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধগুলো পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক মিলিশিয়া, ভাড়াটে সৈন্য এবং স্থানীয় গ্যাংগুলোর মধ্যে এক জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নতুন যুদ্ধের প্রধান জ্বালানি হলো রাষ্ট্রের ওপর বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ভেঙে যাওয়া এবং একটি হিংস্র সমান্তরাল যুদ্ধ অর্থনীতির বিকাশ।
মাদক অর্থায়ন হলো এই নতুন যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে নিখুঁত মাধ্যম। যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, সেখানেই এই সংঘাতের বিস্তার ঘটে। সুইডিশ নিরাপত্তা গবেষক সভান্তে ই. কর্নেল (Svante E. Cornell) ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার সংঘাতগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে মাদক বাণিজ্য কীভাবে যুদ্ধের সময়কালকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয় (Cornell, 2007)। কর্নেল একে চিহ্নিত করেছেন সংঘাত প্রলম্বন গতিবিদ্যা (Conflict Prolongation Dynamics) হিসেবে। কোনো শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সব যুদ্ধবাজ কমান্ডাররা, যারা যুদ্ধের অরাজকতার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকার মাদক চালান পরিচালনা করছিল। ফলে যখনই শান্তি আলোচনার কোনো সুযোগ তৈরি হয়, এই কমান্ডাররা কোনো না কোনো উস্কানিমূলক হামলা চালিয়ে পুনরায় যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়।
এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রটি ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী, সীমান্তরক্ষী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিদ্রোহীদের অস্ত্রের ভয়ে নয়, বরং মাদক চক্রের দেওয়া ঘুষের লোভে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। একসময় যে রাষ্ট্রটি বিদ্রোহ দমনের দায়িত্বে ছিল, সেই রাষ্ট্রের সেনাপতিরাই পরোক্ষভাবে মাদক রুটগুলো পাহারা দিতে শুরু করে। ফলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং এক চিরস্থায়ী নৈরাজ্যের জন্ম হয়। আফগানিস্তান, সোমালিয়া বা গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোতে আমরা এই ধরণের সংঘাতের অনন্ত চক্র দেখতে পাই।
নতুন যুদ্ধের এই অর্থনীতি সাধারণ সমাজকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়। খাদ্য শস্যের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, সাধারণ মানুষ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অথচ সংঘাতের মূল কুশীলবরা – সেই যুদ্ধবাজ বিদ্রোহী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত জেনারেলরা – আন্তর্জাতিক মাদক পাইপলাইন থেকে আসা মুনাফায় নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সমৃদ্ধ করে চলে। সহিংসতা সেখানে কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সংকট থাকে না; এটি পরিণত হয় একটি লাভজনক পেশায়, যার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট সমস্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীর একমাত্র অভিন্ন উদ্দেশ্য।
আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্ক ও মাদক বাণিজ্যের অর্থায়ন (International Jihadist Networks and Financing via the Drug Trade)
মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে গত কয়েক দশকে যেসব চরমপন্থী ধর্মীয় সশস্ত্র নেটওয়ার্কের উত্থান ঘটেছে, তাদের আর্থিক খতিয়ান পরীক্ষা করলে এক চরম দ্বিচারিতা চোখে পড়ে। প্রকাশ্য বক্তৃতায় এই দলগুলো মাদক সেবন ও কারবারকে চরম পাপ ও অনৈতিক কাজ বলে তীব্র ভাষায় নিন্দা করে থাকে। কিন্তু পর্দার আড়ালে নিজেদের অস্ত্র কেনার তহবিল সংগ্রহের জন্য তারা এই মাদক বাণিজ্যের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে। মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক গ্রেচেন পিটার্স (Gretchen Peters) ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ সিডস অব টেরর (Seeds of Terror)-এ আফগানিস্তানের যুদ্ধের গভীরে প্রবেশ করে এই তথ্য উন্মোচন করেছিলেন (Peters, 2009)।
পিটার্স তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে তালেবান এবং আল-কায়েদার নেতৃত্ব আফিম পপি চাষের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন সন্ত্রাসবাদী অর্থায়ন ব্যবস্থা (Terrorist Financing System) হিসেবে। তালেবানরা কেবল চাষিদের কাছ থেকে ফসলের ওপর ধর্মীয় কর আদায় করত না; তারা সরাসরি কাঁচা আফিম থেকে হেরোইন তৈরির ল্যাবরেটরিগুলো পাহারা দিত এবং কাফেলাগুলোকে নিরাপদ পথ তৈরি করে পাকিস্তান ও ইরান সীমান্তে পৌঁছে দিত। পিটার্স হিসেব করে দেখিয়েছেন যে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তালেবানদের বার্ষিক আয়ের একটি বিশাল অংশ আসত এই মাদক পাইপলাইন থেকে। মাদকের অর্থ ছাড়া তাদের পক্ষে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে দুই দশক ধরে এত বড় পরিসরে আধুনিক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।
একই রকম চিত্র দেখা যায় আফ্রিকার বিশাল সাহেল অঞ্চলে। সাহারা মরুভূমির সংলগ্ন এই দুর্গম এলাকায় আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব বা আকিম এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো গড়ে তুলেছে এক অদ্ভুত লাভজনক ব্যবসা। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে সমুদ্রপথে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে নেমে আসা শত শত টন কোকেন মরুভূমির ওপর দিয়ে উত্তর আফ্রিকা হয়ে ইউরোপে পাচার হয়। এই রুটের নাম দেওয়া হয়েছে হাইওয়ে টেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাটস বার্ডাল এবং ডেভিড এম. ম্যালোন তাদের সম্পাদিত গ্রন্থে যুদ্ধকালীন ছায়া অর্থনীতির এই বহুমুখী চরিত্রটি তুলে ধরেছেন (Berdal & Malone, 2000)।
সাহেল অঞ্চলের চরমপন্থীরা কোনো কোকেন চাষ করে না; তারা এই বিশাল মরুভূমির ওপর দিয়ে মাদক পারাপার করা আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলোর কনভয়কে সামরিক এসকর্ট বা সুরক্ষা প্রদান করে। একে বলা হয় সাহেল ট্রানজিট অর্থনীতি (Sahel Transit Economy)। প্রতিটি লরি পার করে দেওয়ার বিনিময়ে তারা কোটি কোটি ডলারের কর আদায় করে। সেই অর্থ দিয়ে তারা বিশ্ববাজার থেকে বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নাইট-ভিশন গগলস এবং ভারী অস্ত্র কিনে থাকে। নিজেদের ধর্মীয় বিশুদ্ধতার দাবিদার এই যোদ্ধারা এভাবেই লাতিন আমেরিকান ড্রাগ মাফিয়াদের বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। মতাদর্শিক চরমপন্থা এবং অপরাধের এমন আত্মঘাতী মেলবন্ধন পুরো আফ্রিকা মহাদেশের নিরাপত্তাকে এক চরম অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও লেভান্ট: হিজবুল্লাহ এবং ক্যাপ্টাগন যুদ্ধ (The Middle East and the Levant: Hezbollah and the Captagon Wars)
লেভান্ট বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দিকে তাকালে মাদক ও আধুনিক ছায়াযুদ্ধের আরেক ভয়াবহ রূপ দৃশ্যমান হয়। লেবাননের রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিজবুল্লাহ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে পরিচিত নয়; মার্কিন ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে তাদের একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অপরাধ শাখা রয়েছে। নিরাপত্তা গবেষক ম্যাথিউ লেভিট (Matthew Levitt) ২০১৩ সালে প্রকাশিত তার বিশদ গবেষণাগ্রন্থে হিজবুল্লাহর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের আর্থিক কাঠামোর স্বরূপ উন্মোচন করেন (Levitt, 2013)। লেভিট দেখিয়েছেন যে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং প্যারাগুয়ের সীমান্তে অবস্থিত কুখ্যাত ত্রি-সীমান্ত অঞ্চল (Tri-Border Area – TBA)-এ হিজবুল্লাহর অর্থায়ন নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
হিজবুল্লাহর বৈদেশিক নিরাপত্তা শাখা বা ইউনিট ৯১০ ল্যাটিন আমেরিকার কোকেন পাচারকারীদের সাথে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের এক বিশাল ব্যবস্থা তৈরি করে। তারা কলম্বিয়ান ও মেক্সিকান কার্টেলগুলোর শত শত কোটি নোংরা ডলার মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের রিয়েল এস্টেট এবং গাড়ি আমদানির ব্যবসার মাধ্যমে সাদা করে দিত। এই অর্থপাচারের সেবার বিনিময়ে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক তহবিলের জন্য বিপুল কমিশন পেত। গবেষক স্টিভেন হাচিনসন এবং প্যাট ও’ম্যালি সন্ত্রাসবাদ ও অপরাধের এই গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে কীভাবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি টিকিয়ে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মাদক রুটের সুবিধা নেয় (Hutchinson & O’Maley, 2007)।
তবে সমকালীন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে রক্তাক্ত মাদক নাটকের মঞ্চ হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া। ২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ যখন আসাদ সরকারের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয় এবং তাদের ওপর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে, তখন দামেস্ক প্রশাসন বেঁচে থাকার জন্য এক অবিশ্বাস্য পথ বেছে নেয়। সিরিয়া রাতারাতি রূপান্তরিত হয় পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নারকো-রাষ্ট্র (Narco-State)-এ। আর তাদের উৎপাদিত প্রধান পণ্য হয়ে ওঠে ফেনইথাইলিন ভিত্তিক সিন্থেটিক মাদক, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত লাভ করে ক্যাপ্টাগন নামে। একে অনেক সময় জিহাদি মাদকও বলা হয়, কারণ এটি সেবন করলে মানুষের ভয়, ক্লান্তি ও ক্ষুধার অনুভূতি সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায়।
সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর বিশেষ চতুর্থ ডিভিশন, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ভাই মাহের আল-আসাদ, তারা সরাসরি এই রাসায়নিক ট্যাবলেট তৈরির শত শত ল্যাবরেটরি স্থাপন করে। সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে কোটি কোটি ক্যাপ্টাগন বড়ি গোপনে রফতানি হতে থাকে সমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এই ক্যাপ্টাগন বাণিজ্য (Captagon Trade) থেকে অর্জিত হাজার হাজার কোটি ডলার সরাসরি আসাদ সরকারের যুদ্ধযন্ত্রকে সচল রেখেছিল। সিরিয়ার অর্থনীতিতে আজ বৈধ বাণিজ্যের চেয়ে ক্যাপ্টাগন বিক্রির অর্থ অনেক গুণ বেশি। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যখন নিজেরাই আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটের মতো আচরণ করে, তখন আন্তর্জাতিক আইনের সমস্ত প্রচলিত সংজ্ঞা অকেজো হয়ে পড়ে।
প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও সংঘাত উত্তর শান্তি বিনির্মাণে মাদক অর্থের অভিঘাত (Institutional Decay and the Impact of Drug Money on Post-Conflict Peacebuilding)
যুদ্ধ যখন শেষ হয়, তখনও মাদক অর্থনীতির বিষাক্ত ছোবল থেকে কোনো সমাজ সহজে মুক্তি পায় না। সংঘাত পরবর্তী শান্তি বিনির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় এই যুদ্ধকালীন মাদক নেটওয়ার্কগুলো। জাতিসংঘের শান্তি মিশনগুলো যখন কোনো দেশে অস্ত্রবিরতি কার্যকর করতে যায় এবং যোদ্ধাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নেয়, তখন তারা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। একজন সাবেক গেরিলা যোদ্ধা, যে মাদক পাহারা দিয়ে মাসে হাজার হাজার ডলার উপার্জন করত, সে সরকারের শান্তি প্রকল্পের সামান্য বেতনের কৃষিকাজ বা দিনমজুরির জীবনে ফিরে যেতে চায় না। ফলে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও মাঠপর্যায়ে অপরাধের কোনো সমাপ্তি ঘটে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ গবেষক লুইস আই. শেলি (Louise I. Shelley) ২০১৪ সালে প্রকাশিত তার আকর গ্রন্থ ডার্টি এনট্যাঙ্গেলমেন্টস (Dirty Entanglements)-এ সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ এবং দুর্নীতির এই ত্রিমুখী সংঘাত চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Shelley, 2014)। শেলি দেখান যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কীভাবে সাবেক বিদ্রোহীরা রাতারাতি রূপান্তরিত হয় পেশাদার অপরাধী সিন্ডিকেটে। এরা শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার জন্য কাজ করে, যাদের শান্তি বিনির্মাণের তত্ত্বে বলা হয় শান্তি বিনষ্টকারী (Spoilers of Peace)। কলম্বিয়ায় ২০১৬ সালে সরকারের সাথে ফার্কের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে। দলের মূল নেতৃত্ব অস্ত্র সমর্পণ করলেও মাঠপর্যায়ের শত শত কমান্ডার দল ত্যাগ করে গড়ে তোলে ফার্ক ডিসিডেন্ট গ্রুপ, যারা আজ নতুন করে আমাজনের কোকা উপত্যকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
এর সাথে যুক্ত হয় অস্ত্র ও মাদক মিথোজীবিতা (Arms-Drugs Nexus)-এর এক অনন্ত চক্র। সংঘাতের সময় সীমান্ত দিয়ে যেসব চোরাই অস্ত্র প্রবেশ করেছিল, যুদ্ধ শেষে সেগুলো জমা পড়ে না। বরং সেই ভারী অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয় মাদক রুটগুলো পাহারা দিতে। মাদক অর্থায়নের ফলে স্থানীয় পুলিশ, বিচারক এবং নবগঠিত বেসামরিক প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতি এমন এক স্তরে পৌঁছে যায় যে আইনের শাসন কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমস্ত উন্নয়ন অনুদান এই অদৃশ্য দুর্নীতির গর্ভে হারিয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে এবং পুনরায় কোনো নতুন সশস্ত্র নেতার পতাকাতলে আশ্রয় খোঁজে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, মাদক অর্থ কেবল একটি যুদ্ধের রসদ জোগায় না; এটি যুদ্ধের বীজকে সমাজের মাটির নিচে চিরকালের জন্য পুঁতে রেখে যায়। যে সমাজ একবার মাদক নির্ভর যুদ্ধ অর্থনীতির স্বাদ পায়, সেই সমাজের ক্ষত শুকাতে কয়েক প্রজন্ম পার হয়ে যায়। সহিংসতা ও মাদকের এই দুষ্টচক্র ভেঙে বের হতে হলে কেবল বিদ্রোহীদের নিরস্ত্র করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই জটিল আন্তর্জাতিক আর্থিক চেইন ধ্বংস করা যা এই অন্ধকার অর্থকে বৈধ অর্থনীতিতে প্রবেশ করায়। যতক্ষণ পর্যন্ত সংঘাত কবলিত অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জন্য টেকসই, নিরাপদ এবং লাভজনক বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বুলেট আর মাদকের এই সর্বগ্রাসী মৈত্রী বিশ্বজুড়ে একের পর এক সমাজকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতেই থাকবে।
আইন, বিচার ও আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা (Law, Justice and Regional Experiences): দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা
বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী মাদক বাজার (Cross-Border Drug Market in Bangladesh): চোরাচালান ও নিরাপত্তা
ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্ত অরক্ষিততার প্রেক্ষাপট (Geographical Location and Border Vulnerability)
মানচিত্রের দিকে তাকালে দক্ষিণ এশিয়ার এক জটিল ভূখণ্ডের রূপ চোখে পড়ে। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের এক জটিল সমীকরণে জড়িয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক মাদক অর্থনীতির দুই প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র – দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল (Golden Triangle) এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (Golden Crescent) – এর ঠিক মাঝামাঝি এই ভূখণ্ডের অবস্থান। আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের গতিপথ সবসময় সহজ ও অপেক্ষাকৃত কম নজরদারির পথ খোঁজে। যখন কোনো ভৌগোলিক অঞ্চল দুটি বিশালাকার উৎপাদন ও বিতরণ বলয়ের মাঝে অবস্থান করে, তখন সেই অঞ্চলটি ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। বাংলাদেশের সীমান্ত কেবল রাজনৈতিক সীমারেখা নয়, বরং তা ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরা এক সংবেদনশীল অঞ্চল।
বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলসীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ। এই সীমান্তের বড় অংশ নদী, নিচু জলাভূমি, ঘন জঙ্গল ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ওপর দিয়ে গেছে। ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী উইলেম ভ্যান শেনডেল (Willem van Schendel) তার সীমান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার আন্তর্জাতিক সীমানাগুলো কেবল ভৌগোলিক বিভাজন নয়, এগুলো এক ধরনের সীমান্তাঞ্চল (Borderlands) তৈরি করেছে যেখানে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সবসময় পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না (Van Schendel, 2005)। এই অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় আইনের চেয়ে স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক বেশি কার্যকর থাকে। মানুষ এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে হেঁটে চলে যায়, যার একদিকে এক দেশের পতাকা ওড়ে, অন্যদিকে আরেক দেশের। ফলে পাহাড়ি পথ আর নদীর জল যেখানে সীমানা মুছে দেয়, সেখানে চোরাচালান কেবল একটি অবৈধ কাজ থাকে না, বরং এক ধরনের বিকল্প জীবনব্যবস্থায় পরিণত হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মিয়ানমারের সাথে প্রায় ২৭১ কিলোমিটারের সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নাফ নদীর জলরাশি আর আরাকানের রুক্ষ পাহাড়ি ঢাল আন্তর্জাতিক নজরদারির বাইরে এক ধরনের ধূসর অঞ্চল তৈরি করে রেখেছে। সীমান্ত নিরাপত্তার তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে দেখলে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নির্ভর করে নজরদারির প্রযুক্তি ও সীমান্তরক্ষীদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতির ওপর। কিন্তু যখন প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি এমন হয় যে কয়েক কিলোমিটারের পাহাড়ি খাঁদ বা জলমগ্ন প্যারাবন নজরদারির বাইরে থেকে যায়, তখন সেখানে সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ভৌগোলিক ভঙ্গুরতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রগুলো বাংলাদেশকে প্রথমে ট্রানজিট করিডোর হিসেবে ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়।
পরবর্তীতে এই ট্রানজিট চরিত্রটি ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ ভোগ বা অভ্যন্তরীণ বাজারের রূপ নিতে থাকে। ফরাসি গবেষক পিয়ের-আর্নো চৌভি (Pierre-Arnaud Chouvy) সম্পাদিত গ্রন্থ অ্যান অ্যাটলাস অব ট্রাফিকিং ইন সাউথইস্ট এশিয়া (An Atlas of Trafficking in Southeast Asia)-তে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অবৈধ বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, কোনো অঞ্চল যখন আন্তর্জাতিক পাচারের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সেখানে মাদকের স্পিলওভার প্রভাব (Spillover Effect) তৈরি হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি থাকে (Chouvy, 2013)। যে পথ দিয়ে পণ্য অন্য দেশে যায়, সেই পথের আশেপাশে কিছু পণ্য স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় ক্রেতা তৈরি করে। বাংলাদেশ একসময় আফিম বা হেরোইনের ট্রানজিট পথ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, সময়ের ব্যবধানে বিপুল জনসংখ্যার ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি নিজেই মাদকের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ ভোক্তাবাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও প্রাকৃতিক অরক্ষিততা এই বাজার সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।
ভারত সীমান্ত ও ফেনসিডিল চোরাচালানের গতিপ্রকৃতি (India Border and Dynamics of Phensedyl Smuggling)
বাংলাদেশের পশ্চিম ও উত্তর সীমান্ত দিয়ে মাদকের যে রূপটি কয়েক দশক ধরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, তা হলো কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ বা ফেনসিডিল। আশির দশকের শেষের দিকে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশে অ্যালকোহল ও অন্যান্য প্রচলিত নেশাদ্রব্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ হওয়ার পর এই কাশির সিরাপের চাহিদা নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। ভারতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওষুধ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে মূলত বৈধভাবে উৎপাদিত হলেও, সীমান্তের ওপারে এর এক বিশাল সমান্তরাল বাজার গড়ে ওঠে। দুই দেশের মধ্যকার মূল্যের পার্থক্য এবং অবৈধ চাহিদার চাপ একটি সাধারণ প্রেসক্রিপশন ওষুধকে চোরাচালানের প্রধান পণ্যে রূপান্তর করেছে। সীমান্তের দুই পারের চাহিদার এই বৈপরীত্য এক জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সমতল ভূমিতে ফেনসিডিল পাচারের পদ্ধতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় গ্রামগুলোতে গড়ে ওঠে ছোট ছোট গোপন গুদাম। সেখান থেকে স্থানীয় চোরাকারবারিরা, যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘রাখওয়াল‘ বা বাহক বলা হয়, মাথায় করে বা সাইকেলের ফ্রেমে লুকিয়ে চালান নিয়ে আসে। অনেক সময় কাঁটাতারের বেড়ার ওপর দিয়ে বিশেষ কায়দায় বোতলভর্তি বস্তা ছুড়ে দেওয়া হয়। বর্ষাকালে নদী ও খালের জল বেড়ে গেলে এই চোরাচালান জলপথে রূপ নেয়। কলাগাছের ভেলায় বা মাছ ধরার নৌকার তলায় বিশেষ প্রকোষ্ঠ বানিয়ে শত শত বোতল চালান করা হয়। সীমান্তবর্তী গ্রামীণ সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের এই কাজে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কারণ তাদের ক্ষেত্রে ধরা পড়ার ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত কম থাকে।
এই আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের পেছনে কাজ করে সীমান্তবর্তী অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক প্রণোদনা। সীমান্তবর্তী এলাকায় কৃষিকাজের চেয়ে মাদক পরিবহনে দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এই অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ে। যেখানে রাষ্ট্র নিয়মিত কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেখানে অবৈধ সীমান্ত বাণিজ্য এক ধরণের বিকল্প অর্থনৈতিক আশ্রয় তৈরি করে। এর ফলে সীমান্ত পাহারায় নিযুক্ত বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য গড়ে ওঠে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী, চোরাচালানের অর্থলগ্নিকারী এবং সীমান্তের দুই পারের অপরাধী চক্র।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর ২০২৩ সালে প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হেরোইন, ইয়াবা এবং কাশির সিরাপ ফেনসিডিলসহ অন্যান্য ওপিওড জাতীয় ওষুধের আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানের ফলে দেশ থেকে গড়ে বার্ষিক প্রায় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বহির্মুখী অবৈধ অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়েছে (UNODC, 2023)। এই প্রতিবেদনে আরও দেখা যায় যে, বহির্মুখী অবৈধ অর্থপ্রবাহের সবচেয়ে বড় অংশটি যুক্ত ছিল ফেনসিডিল আমদানির সাথে। সীমান্ত জেলাগুলো যেমন যশোর, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এই তরল মাদক রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে পৌঁছানোর জন্য শক্তিশালী পরিবহন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। দূরপাল্লার বাস, ট্রাকের পণ্যবাহী পাটাতন কিংবা ট্রেনের বগির গোপন কুঠুরিতে করে নিয়মিত চালান সরবরাহ হতে থাকে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার জন্য স্থায়ী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিয়ানমার সীমান্ত, নাফ নদী ও ইয়াবার বিস্তার (Myanmar Border, Naf River and Expansion of Yaba)
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশের মাদক বাজারে এক বিধ্বংসী পরিবর্তন আসে মেথঅ্যাম্ফেটাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি গোলাপি রঙের ছোট ট্যাবলেট ইয়াবার আগমনের মাধ্যমে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত এই মেথঅ্যাম্ফেটাইন দেশের ভেতরে উৎপাদিত হয় না, বরং তা প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে প্রবেশ করে (UNODC, 2023)। মিয়ানমারের শান রাজ্যসহ সংঘাতবিক্ষুব্ধ পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী গবেষণাগারগুলোতে উৎপাদিত এই ট্যাবলেট পাহাড়ি পথ ধরে পৌঁছে যায় রাখাইন রাজ্যে, আর রাখাইন থেকে নাফ নদী পেরিয়ে তা প্রবেশ করে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্তে।
টেকনাফ ও কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান ইয়াবা পাচারের জন্য প্রায় নিখুঁত এক প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। নাফ নদীর জলভাগ এবং বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত মোহনা পাচারকারীদের অবাধ চলাচলের সুযোগ দেয়। রাতের অন্ধকারে ছোট ছোট কাঠের ট্রলারে করে মিয়ানমারের উপকূল থেকে ইয়াবার প্যাকেট তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশি নৌকার মাঝিদের হাতে। এই ট্যাবলেটগুলো ওজনে হালকা এবং আকারে ছোট হওয়ায় লাখ লাখ পিস ইয়াবা খুব সহজেই ছোট ব্যাগে বা মাছের পেটে লুকিয়ে পরিবহন করা যায়। সিন্থেটিক মাদকের উৎপাদন কৃষিনির্ভর মাদকের মতো নির্দিষ্ট ঋতু বা আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং কাঁচামাল ও পরীক্ষাগার থাকলে সারা বছরই এর সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব।
ফার্মাকোলজিক্যাল দিক থেকে মেথঅ্যাম্ফেটাইন হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে তীব্রভাবে উত্তেজিতকারী এক কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ। গবেষণায় দেখা যায় যে, মেথঅ্যাম্ফেটাইন মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা দ্রুত মানসিক নির্ভরতা তৈরি করে এবং এর অপব্যবহার মারাত্মক শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে (National Institute on Drug Abuse [NIDA], 2019)। আসক্তির এই তীব্রতার কারণে খুব অল্প সময়ে এই মাদক বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফেনসিডিল বহন করা যেখানে কষ্টসাধ্য ও ভারী ছিল, সেখানে ইয়াবা পকেটে নিয়ে নির্বিঘ্নে দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে থাকে।
এই মাদকের বাণিজ্যিক প্রসারের ফলে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার এবং কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়ক পরিণত হয় দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল চোরাচালান করিডোরে। পরিবহন খাতে কর্মরত কিছু কর্মী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এই পরিবহনে কুরিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে। নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকি ফাঁকি দিতে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন কৌশল আবিষ্কৃত হতে থাকে। এই বিপুল অর্থনৈতিক প্রবাহ স্থানীয় মুদ্রাবাজারেও বিরূপ প্রভাব ফেলে, যেখানে মাদক বাণিজ্যের মাধ্যমে তৈরি হওয়া কালো টাকা স্থানীয় অর্থনীতিকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করে।
রোহিঙ্গা সংকট, ক্যাম্প নেটওয়ার্ক ও সীমান্ত অপরাধ অর্থনীতি (Rohingya Crisis, Camp Networks and Border Crime Economy)
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংস দমনপীড়নের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, তখন সীমান্ত নিরাপত্তার সমীকরণ আরও জটিল হয়ে ওঠে। উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি ঢালে গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবিরগুলো পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মানবিক সংকটের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘাতের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ পল কলিয়ার (Paul Collier) তার বিখ্যাত প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন যে, সংঘাত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কীভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সুযোগ ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি করে (Collier, 2000)। কলিয়ারের তত্ত্ব মূলত গৃহযুদ্ধ ও বিদ্রোহী দলগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে হলেও, দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয় ও রাষ্ট্রহীনতার ক্ষেত্রে এই অর্থনৈতিক সুযোগসন্ধানী চরিত্রটি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
ক্যাম্পের ভেতরে থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষদের কোনো আনুষ্ঠানিক কাজের আইনি সুযোগ নেই। তাদের জীবন প্রধানত নির্ভর করে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার ওপর। এই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিক অধিকারহীনতার সুযোগ গ্রহণ করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলো। ক্যাম্পের কিছু তরুণ ও চরম সংকটে থাকা মানুষকে অর্থের বিনিময়ে ইয়াবা বহনের কাজে প্রলুব্ধ করা হয়। শিবিরের কাঁটাতারের বেষ্টনী পেরিয়ে মিয়ানমারের ওপারে টিকে থাকা পারিবারিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগকে পাচারকারীরা অনেক সময় চোরাচালানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে।
ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও মাদক বাণিজ্যের প্রভাবের কারণে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধী চক্র ও গোষ্ঠী শিবিরের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং চোরাচালানের পথের ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। শিবিরের সরু গলিগুলোতে রাতের বেলা নিয়মিত সংঘাত ও অপহরণের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংঘাত কেবল ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ শান্তি বিনষ্ট করছে না, বরং আশপাশের স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে উপার্জিত অবৈধ অর্থ অনেক সময় অবৈধ অস্ত্রের বাজারেও প্রবেশ করে। যখন কোনো সীমান্ত অঞ্চলে মাদক ও অস্ত্রের অবৈধ অর্থনীতি পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়, তখন তা সাধারণ অপরাধের গণ্ডি পেরিয়ে সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগে পরিণত হয়। রাষ্ট্রহীন মানুষদের এই ভঙ্গুরতাকে অপরাধ চক্রগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করায় মানবিক সংকটের সমাধানের পথ যেমন জটিল হচ্ছে, তেমনই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়োজিত বাহিনীগুলোর দায়িত্বও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি ও নিরাপত্তার কাঠামোগত দুর্বলতা (Law Enforcement Surveillance and Structural Weaknesses of Security)
বাংলাদেশের সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণে একাধিক সরকারি সংস্থা নিয়োজিত রয়েছে। সীমান্ত পাহারায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, উপকূলীয় এলাকায় কোস্ট গার্ড এবং অভ্যন্তরে পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটেলিয়ন (পূর্বে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কাজ করে। তবে সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাব এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সবসময়ই মাদক দমনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দেয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্যারি বুজান (Barry Buzan) এবং তার সহগবেষকরা তাদের সিকিউরিটাইজেশন তত্ত্ব (Securitization Theory)-এ ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোনো বিষয়কে যখন রাষ্ট্র অস্তিত্বের সংকট বা জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে ফ্রেম করে, তখন তার পক্ষে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিশেষ বা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ন্যায্যতা তৈরি হয় (Buzan et al., 1998)। তবে বুজানের তত্ত্ব কোনো স্বয়ংক্রিয় পরিণতি নির্দেশ করে না; এটি দেখায় কীভাবে রাষ্ট্রীয় বয়ান নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে।
২০১৮ সালের মে মাসে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) ২০১৯ সালে প্রকাশিত তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করে যে, মাদকবিরোধী যুদ্ধের নামে চালানো এই অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে (Amnesty International, 2019)। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কারণ মাঠপর্যায়ের বাহকদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও বড় মাপের অর্থলগ্নিকারীরা প্রায়শই আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে অভিযানের প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর মাদক বাজার আবারও সচল হয়ে ওঠে।
নিরাপত্তা কাঠামোর আরেকটি দুর্বলতা হলো সীমান্ত নজরদারির ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। বিশাল সীমান্ত পাহারা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ড্রোন, নাইট-ভিশন সেন্সর, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং রাডার ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথাগত শারীরিক টহল বা স্থানীয় তথ্যদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু মাদক সিন্ডিকেটগুলোর বিপুল আর্থিক ক্ষমতা অনেক সময় মাঠপর্যায়ের নজরদারি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকলে পুরো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার সংকটও এখানে স্পষ্ট। লোকবল, আধুনিক সরঞ্জাম ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে তাদের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আদালতগুলোতে মাদকের মামলার জট এত বিপুল যে বছরের পর বছর ধরে বিচার সম্পন্ন হয় না। উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব এবং তদন্তের ত্রুটির কারণে অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তি সহজেই জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও পুরনো ব্যবসায় ফিরে যায়। অর্থপাচার আইনের সঠিক ও সমন্বিত প্রয়োগ না থাকায় মাদকের অবৈধ মুনাফা উদ্ধার বা বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হয় না। এই সব কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সীমান্ত রক্ষার কঠোর ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
জননিরাপত্তা, মাদকাসক্তি ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব (Public Safety, Substance Abuse and Long-Term Impacts on Social Protection)
সীমান্তবর্তী মাদক বাজারের বিস্তার বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, সামাজিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। মাদকের আগ্রাসন কেবল ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, তা একটি গোটা পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেয়। ঘরে ঘরে পারিবারিক কলহ, চুরি, ছিনতাই এবং সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে এই মাদকের ভূমিকা স্পষ্ট। মেথঅ্যাম্ফেটাইনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ফলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র মানসিক ভারসাম্যহীনতা, স্নায়বিক ক্ষতি এবং আক্রমণাত্মক আচরণ লক্ষ্য করা যায় (NIDA, 2019)। এটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তার বায়োপলিটিক্স (Biopolitics) তত্ত্বে আলোচনা করেছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্র কীভাবে তার নাগরিকদের জীবন, স্বাস্থ্য, শ্রমক্ষমতা ও জনসংখ্যাকে পরিচালনা করে (Foucault, 1978)। ফুকোর এই ধারণা কোনো নির্দিষ্ট দেশের পুনর্বাসন ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ সমীক্ষা নয়; বরং এটি আমাদের দেখায় যে নাগরিকের স্বাস্থ্য ও শরীর কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। মাদকের ব্যাপক বিস্তার রাষ্ট্রের এই জনসংখ্যা পরিচালনার সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। যখন বিপুল সংখ্যক মানুষ মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে স্বাস্থ্যসেবা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিপুল পরিমাণ অনুৎপাদনশীল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
বাংলাদেশে সরকারি পুনর্বাসন সুবিধার অপ্রতুলতার কারণে অসংখ্য বেসরকারি কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসা পদ্ধতি, পেশাদার জনবল এবং মানবাধিকারের মান নিয়ে জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মধ্যে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আসক্ত ব্যক্তিদের আটকে রাখা হয়, যা তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার বদলে আরও ট্রমাগ্রস্ত করে তোলে। বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আসক্তি নিরাময়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
জননিরাপত্তার এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচলিত ক্ষতি হ্রাস নীতি (Harm Reduction Policy) বা জনস্বাস্থ্য মডেলের কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন। মাদকাসক্তদের কেবল অপরাধী হিসেবে না দেখে রোগী হিসেবে বিবেচনা করা এবং তাদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কেবল সীমান্ত পাহারা দিয়ে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চাহিদা ও সরবরাহের এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সীমান্ত অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মাদকাসক্তি প্রতিরোধে বহুমুখী সামাজিক উদ্যোগ। সামগ্রিক সুরক্ষার সামাজিক জালকে শক্তিশালী না করলে সীমান্তবর্তী এই মাদক বাজার দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
বাংলাদেশের মাদকবিরোধী আইন (Anti-Narcotics and Money Laundering Laws in Bangladesh): আইনগত কাঠামো
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে আধুনিক সংবিধিবদ্ধ আইন: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ঐতিহাসিক বিবর্তন (From Colonial Legacy to Modern Statutory Law: Historical Evolution of Narcotics Control Framework)
আইন কখনোই কোনো শূন্য সামাজিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতায় রচিত হয় না। প্রতিটি আইনি ব্যবস্থার পেছনে কাজ করে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিঘাত, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সার্বভৌম ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক দর্শন। বাংলাদেশের সমকালীন মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শিকড় সন্ধান করতে গেলে অবধারিতভাবেই ফিরে তাকাতে হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আইনি দলিলাদির দিকে। উনিশ শতকে প্রণীত ঔপনিবেশিক আইনগুলোতে মাদককে কোনো নৈতিক স্খলন বা জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি; বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক রাজকোষের জন্য একটি নিশ্চিত রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্র। ব্রিটিশ প্রশাসন প্রবর্তন করেছিল দ্য আফিম আইন, ১৮৭৮ (The Opium Act, 1878) এবং পরবর্তীতে প্রণীত হয়েছিল দ্য বেঙ্গল এক্সাইজ অ্যাক্ট, ১৯০৯ (The Bengal Excise Act, 1909)। এই আইনগুলোর কেন্দ্রীয় দর্শন ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে আফিম ও গাঁজার চাষ, পরিবহন এবং বিক্রি থেকে সর্বোচ্চ আবগারি শুল্ক নিশ্চিত করা। যারা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন বা শুল্ক পরিশোধ ব্যতীত নিজস্ব উদ্যোগে চাষাবাদ বা বাণিজ্য পরিচালনা করত, সংবিধিবদ্ধ বিধানে মূলত তাদের ওপরই শাস্তির খড়্গ চাপিয়ে দেওয়া হতো।
পরবর্তীতে বিশ শতকের গোড়ার দিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে মাদকের নিয়ন্ত্রক দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তর শুরু হলে প্রণীত হয় দ্য ডেঞ্জারাস ড্রাগস অ্যাক্ট, ১৯৩০ (The Dangerous Drugs Act, 1930)। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র এই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইনগুলোকেই কোনো মৌলিক গুণগত পরিবর্তন ছাড়াই নিজেদের আইনি কাঠামোয় অঙ্গীভূত করে নেয়। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও প্রথম প্রায় দুই দশক ধরে এই ঔপনিবেশিক আইনগুলোই কার্যকর ছিল। তবে সমাজ ও আন্তর্জাতিক অপরাধের গতিপ্রকৃতি যে দ্রুততায় পরিবর্তিত হচ্ছিল, উনিশ শতকীয় সেই রাজস্বকেন্দ্রিক ও খণ্ডিত আইনগুলো দিয়ে সেই গতি সামাল দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। সত্তরের দশকের শেষভাগে ও আশির দশকে বিশ্বজুড়ে হেরোইন এবং বিভিন্ন সাইকোট্রোপিক ওষুধের অবৈধ বাণিজ্য নাটকীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সনদের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর একটি সমন্বিত জাতীয় আইন প্রণয়নের তাগিদ দিতে শুরু করে।
এই ঐতিহাসিক ও নীতিগত বাধ্যবাধকতার মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সরকার পুরোনো ঔপনিবেশিক আইনগুলোকে রদ ও রহিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে জাতীয় সংসদে পাস হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০ (Narcotics Control Act, 1990)। এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মাদকের অপরাধ দমন, লাইসেন্সিং নিয়ন্ত্রণ, এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের একটি সংহত আইনি কাঠামো গড়ে তোলার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। একই সাথে প্রশাসনিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে গঠিত হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এই নতুন সংবিধিবদ্ধ আইনে মাদকের অপব্যবহারকে কেবল রাজস্ব ফাঁকির অপরাধ হিসেবে না দেখে একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে অবৈধ উৎপাদন, চোরাচালান ও সেবনকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
তবে ১৯৯০ সালের আইনটির বাস্তবায়ন পর্বে কিছু গভীর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইনটির মূল মনোযোগ ছিল মূলত ঐতিহ্যবাহী ভেষজ বা উদ্ভিজ্জ মাদকের ওপর, যার মধ্যে প্রধান ছিল আফিম, গাঁজা ও উদ্ভিজ্জ উপজাত হিসেবে তৈরি হেরোইন। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দক্ষিণ এশিয়ার মাদক বাজারে সিন্থেটিক বা কৃত্রিম মাদকের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। মেথঅ্যাম্ফেটাইন ট্যাবলেট বা ইয়াবা, কৃত্রিম ওপিওড এবং প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে যার যথাযথ রাসায়নিক ও প্রযুক্তিগত সংজ্ঞা ১৯৯০ সালের আইনে অনুপস্থিত ছিল। ফলে তদন্ত কর্মকর্তা এবং বিচারিক আদালতগুলো জটিল সব আইনি শূন্যতার মুখোমুখি হতে থাকে। এই ঘাটতিগুলোর সুযোগ নিয়ে অনেক সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের মধ্যস্বত্বভোগীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যেত। এই রূপান্তরই পরবর্তীতে একটি অধিকতর কঠোর ও বিস্তৃত আইন প্রণয়নের পথ তৈরি করে দেয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮: তফশিলভুক্ত শ্রেণিবিভাগ, সারণি ও দণ্ডব্যবস্থার বিশ্লেষণ (Narcotics Control Act 2018: Analysis of Scheduled Classification, Penal Table and Sentencing Framework)
সময়ের ব্যবধানে যখন অপরাধের রাসায়নিক রূপ আমূল বদলে যায়, তখন রাষ্ট্রীয় দণ্ডনীতিও নিজের কঠোরতা বাড়িয়ে সেই রূপান্তরকে সংজ্ঞায়িত করতে চায়। বাংলাদেশে মেথঅ্যাম্ফেটাইন বা ইয়াবা এবং নানা ধরনের কৃত্রিম সাইকোট্রপিক পদার্থের সর্বগ্রাসী বিস্তার ঠেকাতে ২০১৮ সালের শেষভাগে জাতীয় সংসদ পূর্ববর্তী ১৯৯০ সালের আইনটি সম্পূর্ণ বাতিল করে প্রণয়ন করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (Narcotics Control Act, 2018)। পরবর্তীতে ২০২০ সালে এতে কিছু পদ্ধতিগত সংশোধন আনা হয়। এই নতুন আইনের অন্যতম প্রধান দিক হলো মাদকদ্রব্যের সংজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সংগতি রেখে ব্যাপক পরিসরে বিস্তৃত করা। আধুনিক পরীক্ষাগারে উদ্ভাবিত কোনো নতুন রাসায়নিক উপাদান যাতে আইনি সংজ্ঞার বাইরে থাকতে না পারে, সেজন্য আইনের সঙ্গে তফশিল যুক্ত করে মাদকগুলোকে ‘ক’, ‘খ’ এবং ‘গ’ – এই তিনটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়। ‘ক’ শ্রেণির মাদকের মধ্যে স্থান পায় সবচেয়ে মারাত্মক সাইকোট্রোপিক পদার্থগুলো, যেমন হেরোইন, কোকেন, মেথঅ্যাম্ফেটাইন এবং বিভিন্ন সিন্থেটিক ওপিওড।
এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর অংশটি সন্নিবেশিত হয়েছে এর ৩৬ ধারায়, যেখানে একটি দীর্ঘ দণ্ডসারণির মাধ্যমে অপরাধের ধরন ও মাদকের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরাধবিজ্ঞানী সিজার বেকারিয়া (Cesare Beccaria) তার বিখ্যাত গ্রন্থ অন ক্রাইমস অ্যান্ড পানিশমেন্টস অ্যান্ড আদার রাইটিংস (On Crimes and Punishments and Other Writings)-এ অপরাধের শাস্তির কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিবারণ তত্ত্ব (Deterrence Theory) উপস্থাপন করেছিলেন (Beccaria, 1764/1995)। বেকারিয়া দেখিয়েছিলেন যে, শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করে অপরাধ কমানোর একটি প্রথাগত প্রবণতা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবসময়ই থাকে, যদিও শাস্তির তীব্রতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চিত প্রয়োগই অপরাধ প্রতিরোধে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ২০১৮ সালের আইনের ৩৬ ধারার দণ্ডসারণি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে অপরাধ দমনে চরম শাস্তির ভয়কে অন্যতম প্রধান নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
৩৬ ধারার দণ্ডসারণির সংশ্লিষ্ট ক্রমিকগুলো পর্যালোচনা করলে পরিমাণের স্তরবিন্যাসটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, মেথঅ্যাম্ফেটাইনযুক্ত উপাদান বা ইয়াবার ক্ষেত্রে সারণির সংশ্লিষ্ট ক্রমিকে বলা হয়েছে যে, উদ্ধারকৃত পরিমাণ যদি ২০০ গ্রাম বা মিলিলিটার পর্যন্ত হয়, তবে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। পরিমাণ যদি ২০০ গ্রাম বা মিলিলিটারের বেশি কিন্তু ৪০০ গ্রাম বা মিলিলিটারের নিচে হয়, তবে পাঁচ থেকে দশ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রযোজ্য হবে। কিন্তু উদ্ধারকৃত পরিমাণ যদি ৪০০ গ্রাম বা মিলিলিটারের ঊর্ধ্বে চলে যায়, তবে আইনে চরম দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আইনটিতে কোনো একক বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের বিধান চাপিয়ে দেওয়া হয়নি; বরং সারণিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই অপরাধের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এর সাথে যুক্ত হবে অর্থদণ্ড। অর্থাৎ আদালত পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড – এই দুইয়ের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার বিচারিক এখতিয়ার সংরক্ষণ করে।
তবে দণ্ডসারণির এই কঠোরতা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি সংকট তৈরি করে। আইনটিতে মাদক সেবনকারী, প্রান্তিক বাহক এবং মূল আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের মধ্যে অপরাধের মাত্রাগত স্পষ্ট পার্থক্য থাকলেও, সারণির কঠোরতা অনেক সময় মাঠপর্যায়ে কেবল বাহকদের ওপরেই নির্মমভাবে কার্যকর হয়। পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো দরিদ্র কিশোর বা নারীদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে। যখন এই বাহকরা বিপুল পরিমাণ ট্যাবলেটসহ ধরা পড়ে, তখন আইনের দৃষ্টিতে উদ্ধারকৃত পরিমাণ ৪০০ গ্রামের ঊর্ধ্বে হওয়ায় তারা সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হয়। অথচ মূল বিনিয়োগকারী বা গডফাদাররা কোনো চালানের সাথে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকায় প্রায়শই এই কঠোর সারণির পরিধি থেকে দূরে থেকে যায়। ফলে চরম শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও তা আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ভেঙে দিতে কতটা সফল হচ্ছে, তা নিয়ে নীতিমহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
অনুসন্ধান, পরোয়ানাবিহীন তল্লাশি ও প্রয়োগকারী সংস্থার এখতিয়ার (Search, Warrantless Seizure and Jurisdictional Mandates of Enforcement Agencies)
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অপরাধ দমনের তাগিদ এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আইনের শাসনের প্রধান শর্ত। মাদক সংক্রান্ত অপরাধের গোপনীয়তা ও তাৎক্ষণিকতার যুক্তিতে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষমতাটি কোনো লাগামহীন অধিকার নয়; আইনের বিধানগুলো গভীরভাবে পাঠ করলে দেখা যায় যে এতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াগত শর্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের স্পষ্ট সীমারেখা টানা হয়েছে। আইনের ২৩ ধারায় পরোয়ানা ব্যতীত প্রবেশ, তল্লাশি, আটক ও গ্রেপ্তারের যে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।
আইনের ২৩ ধারাটি সতর্কভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, যেকোনো সাধারণ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে যেকোনো কর্মকর্তা যেকোনো স্থানে প্রবেশ করতে পারেন না। ধারার ১ উপধারায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কেবল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তা, অথবা পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, কোস্ট গার্ড বা অন্যান্য অনুমোদিত বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর বা সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাদের এই ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার রয়েছে। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হলো, কর্মকর্তার যদি যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং তল্লাশির পরোয়ানা সংগ্রহ করতে গেলে অপরাধী পালিয়ে যাওয়ার বা আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তবে তাকে তল্লাশি চালানোর পূর্বে তার সেই ‘বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ’ করতে হবে। লিখিতভাবে কারণ নথিভুক্ত না করে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত না করে এই ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ সংবিধিবদ্ধ বিধানে সীমিত করা হয়েছে। অন্যদিকে আইনের ২২ ধারায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়িক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে ভিন্ন শর্ত প্রযোজ্য।
প্রয়োগকারী সংস্থার এই ব্যতিক্রমী ক্ষমতার সাথে নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের এক নিরবচ্ছিন্ন টানাপোড়েন বিদ্যমান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনের আশ্রয়লাভের অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ৩৫ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে ন্যায্য ও প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকার। যখন মাঠপর্যায়ের অভিযানে তল্লাশির আইনি আনুষ্ঠানিকতাগুলো যথাযথভাবে মানা হয় না – যেমন নিরপেক্ষ স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত না করা কিংবা বিশ্বাসের কারণ আগেই লিখে না রাখা – তখন তা কেবল ব্যক্তিস্বাধীনতাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং পরবর্তীতে আদালতে পুরো বিচার প্রক্রিয়ার সাক্ষ্যমূল্যকে দুর্বল করে তোলে।
ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক জর্জিও আগামবেন (Giorgio Agamben) তার বিখ্যাত তত্ত্বে ব্যতিক্রমী অবস্থা (State of Exception)-র যে রূপরেখা বিশ্লেষণ করেছিলেন, আধুনিক আইনি গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিশেষ ক্ষমতার বিশ্লেষণে সেই ধারণাটি একটি তাত্ত্বিক আয়না হিসেবে ব্যবহৃত হয় (Agamben, 2005)। রাষ্ট্র যখন কোনো বিশেষ সংকটকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে ঘোষণা করে, তখন কার্যনির্বাহী শাখা স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াকে কিছুটা শিথিল করে নিজের প্রয়োগিক কর্তৃত্বের পরিধি বাড়াতে চায়। তবে আগামবেনের এই তাত্ত্বিক পাঠ কোনো নির্দিষ্ট দেশের বাস্তব গবেষণা নয়; বরং এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসাধারণ ক্ষমতা এবং নাগরিক সুরক্ষার মধ্যকার চিরন্তন সংকটকে উপলব্ধি করার একটি দার্শনিক কাঠামো মাত্র। বাংলাদেশেও মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতার এই বিস্তার যেন কোনোভাবেই নাগরিকের সাংবিধানিক সুরক্ষার সীমা অতিক্রম না করে, সে বিষয়ে উচ্চ আদালত বারবার বিভিন্ন নির্দেশনার মাধ্যমে ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন।
বিচারিক প্রক্রিয়া, বিশেষ আদালত ও প্রমাণের দায় (Judicial Process, Special Tribunals and the Burden of Proof)
আইনের কঠোরতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে আদালতের এজলাসে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তি কতটা মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর। ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বিচার আদালতের এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনটির প্রাথমিক সংস্করণের ৪৪ ধারায় বলা হয়েছিল যে, সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা এই আইনের অধীন অপরাধগুলোর দ্রুত বিচারের জন্য এক বা একাধিক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন সম্ভব না হওয়ায় আদালতগুলোতে বিচারিক স্থবিরতা তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় ২০২০ সালে আইনে সংশোধনী এনে নিয়মিত দায়রা আদালত, অতিরিক্ত দায়রা আদালত কিংবা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোকে নির্দিষ্ট এখতিয়ার অনুযায়ী মাদক অপরাধের বিচার পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইনবিজ্ঞানী হার্বার্ট প্যাকার (Herbert Packer) তার ধ্রুপদী গ্রন্থ দ্য লিমিটস অব দ্য ক্রিমিনাল স্যাংকশন (The Limits of the Criminal Sanction)-এ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধারার কথা তুলে ধরেছিলেন (Packer, 1968)। একটি হলো ক্রাইম কন্ট্রোল মডেল (Crime Control Model), যা অপরাধের দ্রুত অবদমন, দক্ষ শাস্তি এবং জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়; অন্যটি হলো ডিউ প্রসেস মডেল (Due Process Model), যা আনুষ্ঠানিক আইনি সুরক্ষা, অভিযুক্তের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের কঠোর প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেয়। বাংলাদেশের মাদক আইনের বিচারিক রূপরেখাটি স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আইনপ্রণেতারা অপরাধ দমনের স্বার্থে ক্রাইম কন্ট্রোল মডেলের ধারণার দিকে কিছুটা বেশি ঝুঁকেছেন।
এই মডেলের একটি বড় প্রতিফলন দেখা যায় প্রমাণের দায় বা আইনি অনুমানের ক্ষেত্রে। সাধারণ ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের সর্বজনীন নীতি হলো – একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ ধরে নিতে হবে, এবং তার অপরাধ সন্দেহের অতীত প্রমাণ করার সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্রপক্ষের। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিশেষ বিধানগুলোতে প্রমাণের এই সাধারণ নিয়মটি কিছুটা সংকুচিত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির হেফাজত বা নিয়ন্ত্রণে যদি কোনো অবৈধ মাদক পাওয়া যায়, তবে আদালত প্রাথমিকভাবে ধরে নিতে পারে যে সেই ব্যক্তি অপরাধ করার উদ্দেশ্যেই তা বহন করছিল, যতক্ষণ না অভিযুক্ত ব্যক্তি বিপরীত কিছু প্রমাণ করতে পারে। এই ধরনের সীমিত বিপরীত প্রমাণের দায় অভিযুক্তের ওপর এক ধরনের মানসিক ও আইনি চাপ তৈরি করে। তবে আদালতগুলো স্পষ্ট করেছে যে, এই অনুমান কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত হলো রাষ্ট্রপক্ষকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে উদ্ধারকৃত বস্তুটি আসলেই ওই ব্যক্তির শারীরিক নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বিচার প্রক্রিয়ার আরেকটি বাস্তব সংকট হলো তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার সময়সীমা। আইনের ৩১ ধারায় তদন্ত সমাপ্তির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ধারায় বলা হয়েছে, আসামি হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলে ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ষাট কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে, যা যুক্তিসঙ্গত কারণে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আরও কিছুটা বর্ধিত করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেশে পর্যাপ্ত সরকারি রাসায়নিক পরীক্ষাগারের অভাব এবং দক্ষ বিশ্লেষকের ঘাটতির কারণে রাসায়নিক প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। জব্দকৃত পাউডার বা ট্যাবলেট আসলে মাদক কি না, তার সরকারি সনদ সময়মতো না আসলে বিচারক চার্জ গঠন করতে পারেন না। তদুপরি, তল্লাশির সময় স্থানীয় স্বাধীন সাক্ষী পাওয়া না গেলে এবং আদালতে কেবল পুলিশ সদস্যদের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করতে হলে অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়। ফলে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার পর অনেক দুর্বলভাবে তদন্তকৃত মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়, যা সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
জামিনের আইনি শর্ত ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা (Legal Conditions for Bail and Procedural Complexities)
বাংলাদেশের মাদক সংক্রান্ত বিচারিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি আইনি বিতর্ক ও আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয় জামিনের প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে। সাধারণ আইনে জামিন হলো আদালতের একটি বিচারিক সুবিবেচনামূলক ক্ষমতা, কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৭ ধারা জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইনি শর্ত আরোপ করেছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই আইনের ৩১ ধারাটি জামিন সংক্রান্ত নয়; ৩১ ধারাটি মূলত তদন্তের সময়সীমা এবং তদন্ত সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। জামিনের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ আইনি শর্তাবলি সন্নিবেশিত হয়েছে আইনের ৪৭ ধারায়, যা বিচারিক আদালতের জামিন বিবেচনা করার ক্ষমতাকে কঠোরভাবে সীমিত করেছে।
৪৭ ধারার বিধানাবলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি জামিনযোগ্য অপরাধ ব্যতীত অন্যান্য সব গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে একটি উচ্চ আইনি প্রাচীর তৈরি করেছে। এই ধারার স্পষ্ট নির্দেশনা হলো – যখন কোনো ব্যক্তি এমন কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হন যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা পাঁচ বছরের অধিক কারাদণ্ড, তখন আদালত তাকে জামিনে মুক্তি দেবে না যদি না দুটি বাধ্যতামূলক শর্ত যুগপৎভাবে পূরণ হয়। প্রথম শর্তটি হলো, জামিনের আবেদনের শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ বা প্রসিকিউশনকে বিরোধিতার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে কঠোর শর্তটি হলো, আদালতকে পারিপার্শ্বিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হতে হবে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি যে উক্ত অপরাধে দোষী নন, তা বিশ্বাস করার মতো ‘যুক্তিসঙ্গত কারণ’ রয়েছে এবং তিনি জামিনে মুক্তি পেলে পুনরায় কোনো অপরাধ করবেন না।
সাধারণ ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন কোনো মামলায় একজন অভিযুক্ত প্রাথমিক পর্যায়েই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার দায়ে আবদ্ধ থাকে না। কিন্তু ৪৭ ধারার ভাষা এমন এক আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে যেখানে মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে, অর্থাৎ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই আদালতকে বিশ্বাস করতে হয় যে ব্যক্তিটি দোষী নন। একজন আসামির হেফাজত থেকে যদি বাণিজ্যিকভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদক জব্দ দেখানো হয়, তবে পুলিশের এজাহার ও জব্দতালিকা দেখে প্রাথমিক স্তরেই আদালত কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে তিনি দোষী নন? এই আইনি ভাষার জটিলতার কারণেই ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারিক আদালতগুলোর পক্ষে এই ধারার অধীন জামিন প্রদান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আসামিকে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর বিচারহীন অবস্থায় কারাগারে আটক থাকতে হয়।
এই দীর্ঘায়িত প্রাক-বিচার আটকের ফলে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ ছাড়িয়ে গেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই মাদক মামলার বিচারাধীন আসামি। উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বিভিন্ন রায়ে সাংবিধানিক ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে এই ধারার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন। উচ্চ আদালত দেখিয়েছেন যে, যখন কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া বছরের পর বছর ধরে বিচার সম্পন্ন হয় না, এবং রাষ্ট্রপক্ষ সময়মতো সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়, তখন কেবল ৪৭ ধারার কঠোরতার অজুহাতে একজন নাগরিককে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী হতে পারে। ফলে দীর্ঘ বিচারহীনতা, অসুস্থতা বা পদ্ধতিগত ত্রুটির ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত প্রায়শই বিশেষ বিবেচনায় জামিন মঞ্জুর করে থাকেন। তবে নিচতলার আদালতে ৪৭ ধারার অনমনীয় প্রয়োগ সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের জন্য এক প্রকাণ্ড চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান।
অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন ও মাদক অর্থনীতির অবৈধ অর্থপ্রবাহ (Money Laundering Prevention Act and Illicit Financial Flows of Drug Economy)
মাদক পাচার কেবল কোনো সাধারণ চোরাচালান নয়; এর চূড়ান্ত রূপ হলো বিপুল পরিমাণ অবৈধ মূলধনের সৃষ্টি এবং সেই অর্থকে অর্থনীতির মূলধারায় প্রবেশ করানোর একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। মাদক বাণিজ্যের অপরাধবিজ্ঞান বুঝতে হলে এর পেছনে থাকা অর্থপ্রবাহের চরিত্র উন্মোচন করা অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার (Gary Becker) তার যুগান্তকারী তত্ত্বে অপরাধের অর্থনৈতিক চরিত্র ব্যাখ্যা করে যুক্তিবাদী পছন্দ তত্ত্ব (Rational Choice Theory) উপস্থাপন করেছিলেন (Becker, 1968)। বেকার যুক্তি দিয়েছিলেন যে, অপরাধী কোনো ব্যক্তি কেবল অপরাধের শারীরিক শাস্তির ভয় দেখে পিছপা হয় না; সে পরিমাপ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং অবৈধ মুনাফার অনুপাত। মাদক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লাভের অঙ্ক এত বিশাল যে কঠোরতম শারীরিক শাস্তির ঝুঁকি নিয়েও অপরাধীরা এতে পুঁজি বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করে না। এই কারণেই কেবল মাদক বাজেয়াপ্ত করে বা বাহককে শাস্তি দিয়ে এই চক্র ভাঙা যায় না; আঘাত করতে হয় এর আর্থিক উৎসে।
এই অর্থনৈতিক জাল ছিন্ন করার জন্য বাংলাদেশের প্রধান আইনি হাতিয়ার হলো মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (Money Laundering Prevention Act, 2012)। এই আইনের আইনি অবস্থান নিয়ে একটি প্রচলিত বিভ্রান্তি রয়েছে যে এটি কোনো সাধারণ তফসিলে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সংবিধিবদ্ধ আইনপাঠ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, এই আইনের ২ ধারার দফা (শ)-এর উপদফা (৮)-এ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের অবৈধ পাচারকে স্পষ্টভাবে একটি অন্যতম প্রধান ‘সম্পৃক্ত অপরাধ’ বা প্রেডিকেট অফেন্স হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধগুলোর মাধ্যমে যদি কোনো অর্থ, সম্পত্তি বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অর্জিত হয়, তবে সেই অর্থ রূপান্তর, স্থানান্তর বা গোপন করার প্রতিটি পদক্ষেপ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আইনের কাঠামোগত সুরক্ষার কারণে এই অবৈধ অর্থ অনুসন্ধান করার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে থাকা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (Bangladesh Financial Intelligence Unit বা BFIU) কোনো সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করতে পারে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে থাকা হিসাব স্থগিত করার আদেশ দিতে পারে। এর পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন এই আর্থিক অপরাধগুলোর পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান চালায়। আইনের ১৪ ও ১৭ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র চাইলে মামলার বিচার চলাকালীন অপরাধলব্ধ সম্পত্তি সাময়িকভাবে ক্রোক করতে পারে এবং বিচার শেষে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত সেই সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে স্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু মাদক অর্থনীতির এক বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রিত হয় প্রথাগত ব্যাংকিং চ্যানেলের সম্পূর্ণ বাইরে, অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি ও নগদ লেনদেনের মাধ্যমে, যা এই প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের আওতায় আনা অত্যন্ত দুরূহ।
আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রেও এই দ্বৈত আইন কার্যকর করা একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। ১৯৮৮ সালের জাতিসংঘের মাদক চোরাচালান বিরোধী সনদ এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে চলার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ আইনকে শক্তিশালী করা আবশ্যক। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ আব্রাম চয়েস (Abram Chayes) এবং অ্যান্টোনিয়া হ্যান্ডলার চয়েস (Antonia Handler Chayes) তাদের গুরুত্বপূর্ণ যৌথ গবেষণা প্রবন্ধে কমপ্লায়েন্স তত্ত্ব (Compliance Theory) আলোচনা করেছিলেন (Chayes & Chayes, 1993)। চয়েস ও চয়েস দেখিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সনদের প্রতি রাষ্ট্রগুলোর আনুগত্য কেবল শাস্তির ভয়ে নির্ধারিত হয় না; এটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে তাল মিলিয়ে মানি লন্ডারিং ও মাদক আইনকে যুক্ত করেছে। তবে মাঠপর্যায়ে কেবল মাদক উদ্ধারের সাধারণ ফৌজদারি মামলার বাইরে গিয়ে মানি লন্ডারিং আইনের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ নিশ্চিত না করা গেলে মাদক বাণিজ্যের মূল গডফাদারদের অর্থনৈতিক শক্তি কখনোই খর্ব করা সম্ভব হবে না।
ভারতের মাদকনীতি (Drug Policies in India): চিকিৎসা, নিষেধাজ্ঞা ও আইন
ঐতিহাসিক পটভূমি ও ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ: গাঁজা ও আফিমের ব্যবস্থাপনা (Historical Context and Colonial Control: Management of Cannabis and Opium)
ভারতবর্ষে মাদকদ্রব্যের ইতিহাস কোনো আকস্মিক আধুনিক সংকট নয়, বরং শতবর্ষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক জটিল বিন্যাস। আধুনিক সংবিধিবদ্ধ আইনের আবির্ভাবের পূর্বে এই ভূখণ্ডে আফিম ও গাঁজার ব্যবহার সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে ছিল। গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ শারীরিক ক্লান্তি নিবারণ, লোকউৎসবের সামাজিক মেলামেশা এবং কবিরাজি বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাপদ্ধতির অঙ্গ হিসেবে ভেষজ উপাদানের প্রচলন দীর্ঘকালের। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ জেমস মিলস (James H. Mills) তার গবেষণাগ্রন্থ ম্যাডনেস, ক্যানাবিস অ্যান্ড কলোনিয়ালিজম (Madness, Cannabis and Colonialism)-এ দেখিয়েছেন যে, উনিশ শতকে ব্রিটিশ প্রশাসন কীভাবে ভারতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ভেষজ ব্যবহারকে এক ধরনের মানসিক ব্যাধি ও নৈতিক স্খলনের সাথে যুক্ত করে দেখতে শুরু করেছিল (Mills, 2000)। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারের মূল উদ্দেশ্য কোনো সমাজকল্যাণ বা নৈতিক শুদ্ধি ছিল না; তাদের নজর ছিল এই বিপুল দেশীয় ব্যবহারের ওপর একচ্ছত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে নিশ্চিত রাজস্ব আদায় করা।
ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে মাদকের উৎপাদন ও বণ্টনকে কেন্দ্রীভূত করার প্রক্রিয়াটি উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে গতি লাভ করে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অভ্যন্তরীণ নীতিগত বিতর্ক এবং সংস্কারবাদী দলগুলোর চাপের মুখে ঔপনিবেশিক সরকার দুটি প্রধান আনুষ্ঠানিক কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। একটি ছিল ১৮৯৩ সালের রয়্যাল কমিশন অন ওপিয়াম এবং অন্যটি ১৮৯৩ থেকে ১৮৯৪ সালে পরিচালিত ইন্ডিয়ান হেম্প ড্রাগস কমিশন (Indian Hemp Drugs Commission)। গবেষক ওয়েন হল (Wayne Hall) তার ঐতিহাসিক মূল্যায়নে হেম্প ড্রাগস কমিশনের প্রতিবেদনের তাৎপর্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Hall, 2019)। হল দেখান যে, তৎকালীন সাত খণ্ডের সেই বিশদ অনুসন্ধানে কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে ভেষজ ক্যানাবিসের পরিমিত ব্যবহার মানুষের শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কোনো মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে না। কমিশন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিল যে, শত শত বছর ধরে প্রচলিত এই ব্যবহারে আকস্মিক পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা সমাজে চরম অসন্তোষের জন্ম দেবে এবং মানুষকে আরও বিপজ্জনক বিকল্পের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ প্রশাসন এক চরম বাস্তববাদী ও অর্থনৈতিক স্বার্থনির্ভর পথ অবলম্বন করে। দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham) তাঁর রাষ্ট্রদর্শনে উপযোগবাদ (Utilitarianism)-এর মাধ্যমে নীতি ও সিদ্ধান্তের ফলাফল এবং সামগ্রিক কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যদিও ঔপনিবেশিক শাসকদের অর্থনৈতিক কৌশল সরাসরি বেন্থামের দর্শন থেকে উদ্ভূত হয়নি, তবু প্রশাসনিক সুবিধা, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সাম্রাজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নীতিতে একধরনের ফলাফলকেন্দ্রিক বাস্তববাদ প্রতিফলিত হয়েছিল। তারা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার নৈতিক অবস্থান পরিহার করে রাজস্ব আহরণের কৌশল বেছে নেয়। আফিমের চাষকে সরকারের কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থার অধীন আনা হয়, সরকারি গুদামে প্রক্রিয়াজাতকরণ বাধ্যতামূলক করা হয় এবং গাঁজা বিক্রির ওপর বসানো হয় বিশেষ আবগারি শুল্ক। আইন প্রণয়নের পেছনে কাজ করছিল রাজস্ব ফাঁকি রোধের তাগিদ; নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোনো গভীর মানবিক দায় সেখানে দৃশ্যমান ছিল না।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও দীর্ঘ তিন দশক ধরে এই ঔপনিবেশিক কাঠামোর মূল নীতিগুলো কার্যকর থাকে। ভারতের সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির ৪৭ অনুচ্ছেদে জনস্বার্থের অংশ হিসেবে ক্ষতিকর নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের একটি সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কঠোর ফৌজদারি নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটেনি। বিভিন্ন রাজ্য সরকার নিজস্ব আবগারি শুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে গাঁজা ও আফিমের সীমিত সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করত। সাধারণ মানুষ তাদের চিরাচরিত উৎস থেকে এই ভেষজ সংগ্রহ করত এবং কোনো ধরনের বড় আকারের অপরাধ চক্র সেখানে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভূদৃশ্যের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই আপেক্ষিক স্থায়িত্ব এক চরম সংকটের মুখে পড়ে।
এনডিপিএস আইন ১৯৮৫: কঠোর নিষেধাজ্ঞার সূচনা ও আইনি বিবর্তন (The NDPS Act 1985: Genesis of Strict Prohibition and Statutory Evolution)
ভারতের মাদকনীতির গতিপথ আমূল বদলে যায় ১৯৮৫ সালে, যখন ভারতের পার্লামেন্টে পাস হয় নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস আইন, ১৯৮৫ (Narcotic Drugs and Psychotropic Substances Act, 1985), যা আইনি মহলে এনডিপিএস আইন (NDPS Act) নামে সমধিক পরিচিত। এই আইন প্রণয়নের পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি ছিল আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত বৈশ্বিক মাদকযুদ্ধ এবং ১৯৬১ সালের জাতিসংঘের একক সনদের আওতায় থাকা পঁচিশ বছরের সময়সীমা শেষ হয়ে আসায় ভারত সরকার কঠোরতম আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়। অপরাধবিজ্ঞানী টবি সেডন (Toby Seddon) তার বিখ্যাত গ্রন্থ এ হিস্ট্রি অব ড্রাগস (A History of Drugs)-এ দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক চুক্তির অভিন্ন বাধ্যবাধকতা অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী চর্চাকে উপেক্ষা করে এক কৃত্রিম নিষেধাজ্ঞামূলক পরিবেশ চাপিয়ে দেয় (Seddon, 2010)।
এনডিপিএস আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে শত শত বছরের ভেষজ ব্যবহারের সামাজিক স্বীকৃতি এক নিমেষে অপরাধে পরিণত হয়। আইনের প্রাথমিক কাঠামোয় মাদক সংক্রান্ত বাণিজ্যিক অপরাধ ও পাচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়। তবে প্রাথমিক আইনে সব অপরাধে নির্বিচারে দশ বছরের কারাদণ্ড ছিল – এমন ধারণা সঠিক নয়; বরং বাণিজ্যিক ও গুরুতর চোরাচালানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ রুপি অর্থদণ্ডের বিধান থাকলেও ব্যক্তিগত ভোগের জন্য স্বল্প পরিমাণ মাদক বহনের ক্ষেত্রে তৎকালীন ২৭ ধারার অধীনে তুলনামূলক লঘু সাজার সুযোগ ছিল। গবেষক মলি চার্লস (Molly Charles) এবং তার সহলেখকরা বেকলি ফাউন্ডেশনের নীতিপত্রে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে এই কঠোর আইনের ফলে ঐতিহ্যবাহী ও কম ক্ষতিকর ভেষজ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নষ্ট হয় এবং বাজারে বিপজ্জনক ভেজাল রাসায়নিকের প্রবেশ ঘটে (Charles et al., 2005)।
১৯৮৯ সালে এই আইনে আরও একটি চরম কঠোর সংশোধনী আনা হয়। আইনের ৩১এ ধারার মাধ্যমে পুনরাবৃত্ত অপরাধের জন্য বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংযোজন করা হয়। তবে এই মৃত্যুদণ্ড সব পুনরাবৃত্ত অপরাধে নির্বিচারে প্রযোজ্য ছিল না; এটি নির্দিষ্ট কিছু গুরুতর পূর্বদণ্ড থাকা সাপেক্ষে নির্দিষ্ট শ্রেণির মাদকের বড় বাণিজ্যিক পরিমাণের পরবর্তী অপরাধের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই আইনের অন্ধ কঠোরতার কারণে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার পাহাড় জমতে থাকে এবং কারাগারগুলো উপচে পড়ে। এই সংকটের মুখে ২০০১ সালে আইনে একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত সংশোধনী আনা হয়। সংশোধনীতে মাদকের পরিমাণের ভিত্তিতে সাজার একটি ত্রিস্তরীয় বিভাজন তৈরি করা হয় – ‘স্বল্প পরিমাণ’ (Small Quantity), ‘মধ্যবর্তী পরিমাণ’ (Intermediate Quantity) এবং ‘বাণিজ্যিক পরিমাণ’ (Commercial Quantity)। এর ফলে ব্যক্তিগত ব্যবহারকারী বা প্রান্তিক বাহকদের চরম সাজার হাত থেকে কিছুটা আইনি সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালের সংশোধনীতে ভারতের মাদক আইন আরও কিছু ইতিবাচক রূপান্তর প্রত্যক্ষ করে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ক্যানসার ও অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধির উপশমকারী চিকিৎসার স্বার্থে মরফিনের মতো প্রয়োজনীয় ওপিওডের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে আইনে যুক্ত করা হয় অপরিহার্য মাদকদ্রব্য (Essential Narcotic Drugs) ধারণাটি। এর ফলে রাজ্যগুলোর পৃথক শুল্ক অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা দূর করে কেন্দ্রীয়ভাবে চিকিৎসার জন্য ওপিওড সংগ্রহের পথ প্রশস্ত হয়। একই সাথে ৩১এ ধারার বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের অনমনীয় বিধানটিকে আদালতের বিচারিক বিবেচনার অধীনে আনা হয়, যেখানে ৩১ ধারার নির্ধারিত দণ্ডবিধির আলোকে বিকল্প কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এই আইনি বিবর্তন দেখায় যে, অন্ধ নিষেধাজ্ঞার পথ ধরে শুরু হলেও সময়ের প্রয়োজনে ভারতকে বাস্তবমুখী সংস্কারের দিকে অগ্রসর হতে হয়েছে।
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা, প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রক্রিয়াগত রক্ষাকবচ (Criminal Justice System, Enforcement Agencies and Procedural Safeguards)
একটি কঠোর আইন কতটা কার্যকর হবে তা নির্ভর করে তার প্রয়োগকারী কাঠামোর সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ওপর। ভারতে এনডিপিএস আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রধান দায়িত্ব পালন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (Narcotics Control Bureau বা NCB)। এর পাশাপাশি রাজ্য পুলিশ এবং রাজ্য আবগারি বিভাগও এই আইনের অধীনে তদন্ত ও গ্রেপ্তারের সমান্তরাল ক্ষমতা চর্চা করে। আইন বিশেষজ্ঞ তৃপ্তি তান্দন (Tripti Tandon) তার গবেষণা প্রতিবেদনে ভারতের মাদক আইন প্রয়োগের কাঠামোগত দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বিপুল ক্ষমতার অধিকারী এই প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজর প্রায়শই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলার বদলে মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক মানুষের ওপর বেশি নিবদ্ধ থাকে (Tandon, 2015)।
এনডিপিএস আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও কঠোর দিকগুলোর একটি হলো এর ৩৭ ধারায় বর্ণিত জামিনের কঠিন শর্তাবলি। বাণিজ্যিক পরিমাণের মাদক সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালত জামিন দিতে পারে না যদি না দুটি বাধ্যতামূলক শর্ত যুগপৎভাবে পূরণ হয়। প্রথমত, সরকারি কৌঁসুলিকে জামিন আবেদনের বিরোধিতা করার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আদালতকে নথিপত্রের ভিত্তিতে যুক্তিসঙ্গতভাবে নিশ্চিত হতে হবে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি উক্ত অপরাধে দোষী নন এবং জামিনে মুক্তি পেলে তার পুনরায় অপরাধে জড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। স্বাভাবিক ফৌজদারি আইনে যেখানে অভিযুক্তকে নির্দোষ ধরে নেওয়া হয়, সেখানে ৩৭ ধারার প্রভাব এমন এক আইনি প্রাচীর তৈরি করে যার কারণে সাক্ষ্যপ্রমাণ শুরুর আগেই একজন অভিযুক্তকে দীর্ঘকাল কারাগারে আটকে রাখা প্রায় স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।
তবে আইনপ্রণেতারা প্রয়োগকারী সংস্থার লাগামহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি রক্ষাকবচও রেখেছিলেন, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের ৫০ ধারা। অনেক সময় মনে করা হয় যে ৫০ ধারার শর্ত সব ধরনের তল্লাশিতেই প্রযোজ্য, কিন্তু সংবিধিবদ্ধ বিধান ও উচ্চ আদালতের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ৫০ ধারাটি একান্তভাবেই কোনো ব্যক্তির শারীরিক তল্লাশি বা ‘দেহতল্লাশি’-র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো ব্যক্তির শরীর তল্লাশি করার পূর্বে তাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে তার অধিকার রয়েছে একজন গেজেটেড কর্মকর্তা বা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তল্লাশি করানোর। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি এই অধিকার দাবি করে, তবে কোনো সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা একা তার দেহতল্লাশি চালাতে পারেন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে ৫০ ধারার এই প্রক্রিয়াগত শর্ত অমান্য করে ব্যক্তির শরীর থেকে মাদক উদ্ধার দেখালে সেই সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতের চোখে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায়।
বাস্তব বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এই প্রক্রিয়াগত জটিলতাকে আরও গভীর করে তোলে। বিশেষ আদালতগুলোতে বিচারকের ঘাটতি, নিয়মিত সাক্ষীদের অনুপস্থিতি এবং সবচেয়ে বড় কথা – সরকারি পরীক্ষাগার থেকে রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে মাসের পর মাস বিলম্ব ঘটার কারণে বিচার প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। জব্দের সময় নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র সাক্ষীর অভাব থাকলে উচ্চ আদালতগুলোতে বছরের পর বছর জেল খাটার পর বহু আসামি কেবল প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে খালাস পেয়ে যায়। কিন্তু এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে একজন নাগরিকের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বছরগুলো কারাগারের অন্ধকারেই বিনষ্ট হয়, যা সামগ্রিক ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার উপযোগিতাকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
চিকিৎসা বনাম অপরাধীকরণ: জনস্বাস্থ্য নীতি ও ক্ষতি হ্রাস ব্যবস্থা (Treatment versus Criminalization: Harm Reduction and Public Health Policy)
মাদকাসক্তি কি শুধুই একটি সামাজিক অপরাধ, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসাযোগ্য ব্যাধি – এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখনো কোনো একক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। এনডিপিএস আইনের ৬৪এ ধারায় চিকিৎসার মাধ্যমে অপরাধ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে এই বিধানটি যেকোনো মাদক কারবারির জন্য উন্মুক্ত নয়। বিধানটি স্পষ্টভাবে বলে যে, কোনো ব্যক্তি যদি কেবল ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ মাদক রাখা বা গ্রহণের অভিযোগে (বিশেষ করে ২৭ ধারার অধীনে) অভিযুক্ত হন, এবং তিনি যদি স্বেচ্ছায় কোনো সরকার-অনুমোদিত চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়ে মাদকাসক্তি নিরাময়ের চিকিৎসা গ্রহণ করতে রাজি হন এবং সেই চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করেন, তবেই আদালত তাকে ফৌজদারি মামলা ও শাস্তি থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদান করতে পারে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এই ধারার ব্যবহার নগণ্য, কারণ মাঠপর্যায়ে পুলিশ আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিকল্প না দিয়ে সরাসরি আদালতের এজলাসে চালান করে দেয়।
অপরাধ দমনের এই কঠোর কাঠামোর বিপরীতে আশির দশকের শেষভাগে ভারতে জনস্বাস্থ্যের একটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী প্যারাডাইম বা ধারার জন্ম হয়, যাকে বলা হয় ক্ষতি হ্রাস নীতি (Harm Reduction Policy)। উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পরবর্তীতে দেশের বড় শহরগুলোতে যখন ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস ভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দেয়, তখন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুঝতে পারে যে কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই মানবিক বিপর্যয় থামানো যাবে না। জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা ন্যাশনাল এইডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (National AIDS Control Organisation বা NACO) দেশজুড়ে চালু করে বহুমুখী লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি।
এই কর্মসূচির দুটি প্রধান ভিত্তি ছিল জীবাণুমুক্ত সুচ ও সিরিঞ্জ বিনিময় এবং চিকিৎসাগতভাবে নিয়ন্ত্রিত বিকল্প ওষুধ থেরাপি, যা ওপিওড সাবস্টিটিউশন থেরাপি (Opioid Substitution Therapy বা OST) নামে পরিচিত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র রাও (Ravindra Rao) ভারতে ওএসটি কর্মসূচির ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রা ও চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, বিউপ্রেনরফিন ও মেথাডন ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত এই বিকল্প চিকিৎসা কীভাবে হাজার হাজার ইনজেকশন ব্যবহারকারীর জীবন বাঁচিয়েছে এবং রক্তবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমিয়ে এনেছে। তবে রাও একই সাথে তুলে ধরেছেন যে, এই চিকিৎসা সম্প্রসারণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সরকারি বরাদ্দের স্বল্পতা, ওষুধ বিতরণের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে স্বাস্থ্যকর্মীদের টানাপোড়েন।
তদুপরি, দেশজুড়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মান ও ব্যবস্থাপনায় এক ভয়াবহ শূন্যতা বিরাজ করছে। ভারতে মানসম্মত ও আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন সরকারি কেন্দ্রের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। এই সুযোগে বেসরকারি খাতে হাজার হাজার অননুমোদিত নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যাদের বেশিরভাগেরই কোনো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রটোকল বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই। রোগীদের আটকে রাখা, অমানবিক আচরণ করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ঘটনা প্রায়শই প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা এবং মানসিক পুনর্বাসনের অভাব যতদিন থাকবে, ততদিন পর্যন্ত কেবল শাস্তিমূলক আইন দিয়ে মাদকাসক্তির মতো গভীর জৈব-মনস্তাত্ত্বিক সংকট দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আঞ্চলিক মাদক গতিপ্রকৃতি: সীমান্ত সংলগ্ন বাস্তবতা ও নজরদারির সংকট (Regional Drug Dynamics: Border Realities and Surveillance Crises)
ভারতের সুবিশাল ভৌগোলিক অবয়বের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদক সমস্যার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক চোরাচালানের দুই প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র – পশ্চিমে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং পূর্বে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল – এর মাঝখানে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত ঐতিহাসিকভাবে ট্রানজিট ও অভ্যন্তরীণ বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের মধ্যে দুটি সীমান্ত অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে সংবেদনশীল সংকট তৈরি করে রেখেছে – উত্তর-পশ্চিমের পাঞ্জাব করিডোর এবং পূর্বাঞ্চলের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো।
পাঞ্জাব সীমান্ত পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে যুক্ত হলেও সেখানে মাদক চোরাচালানের গতিপ্রকৃতি এক মারাত্মক রূপ নিয়েছে। আফগানিস্তান থেকে আসা হেরোইন এবং রাসায়নিক উপাদান সীমান্ত পেরিয়ে প্রবেশ করে পাঞ্জাবের অভ্যন্তরীণ বাজারে। স্থানীয়ভাবে এই মাদক ভেজাল মিশ্রিত হয়ে পরিচিতি পেয়েছে ‘চিট্টা‘ নামে। পাঞ্জাবের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষিকাজের অনিশ্চয়তা এবং তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থানের অভাব এই মাদকের বিস্তারে এক উর্বর সামাজিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর শারীরিক নজরদারি ফাঁকি দিতে পাচারকারীরা সম্প্রতি ব্যবহার করছে আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন ছোট আকারের জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন। রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই ড্রোনের মাধ্যমে ফসলের ক্ষেতে মাদকের প্যাকেট ফেলে দেওয়া হয়, যা প্রথাগত সীমান্ত পাহারার সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
অন্যদিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে বিশেষ করে মণিপুর, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে, যার বিস্তীর্ণ অংশ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চল দিয়ে খাঁটি হেরোইনের প্রবেশ ঘটত, যা স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের ভয়াবহ বিস্তার ঘটিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই উদ্ভিজ্জ মাদকের পাশাপাশি যোগ হয়েছে বিপুল পরিমাণ মেথঅ্যাম্ফেটাইন ট্যাবলেট বা ইয়াবা। মায়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান রাজনৈতিক সংঘাত ও সামরিক জান্তার উপস্থিতির কারণে সীমান্ত নজরদারি ভেঙে পড়েছে। এর সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও চোরাচালানিরা এই মাদক বাণিজ্যকে নিজেদের অস্ত্র কেনার অর্থের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করে আসছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য স্থায়ী হুমকি তৈরি করেছে।
কেবল স্থল সীমান্তই নয়, ভারতের দীর্ঘ উপকূলরেখা দিয়ে সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক কার্টেলগুলোর মাদক পাচারের ঝুঁকিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের উপকূলীয় জলসীমায় মাঝে মাঝেই শত শত কেজি ওপিওডের চালান আটক হচ্ছে। একই সাথে অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ – যেমন ট্রামাডল, কাশির সিরাপ এবং শিরাপথে ব্যবহারের ওপিওড ইনজেকশনের অননুমোদিত বিপণন এক নীরব মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ বন্ধ করার জন্য যে ধরনের আধুনিক প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা নজরদারি ও যৌথ আন্তঃরাজ্য সমন্বয় প্রয়োজন, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
আইনি সংজ্ঞা, ক্যানাবিস নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ মাদকনীতির রূপরেখা (Legal Definitions, Cannabis Regulation and Future Contours of Drug Policy)
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে ভারতের মাদকনীতি সংক্রান্ত সবচেয়ে প্রাণবন্ত আলোচনাটি আবর্তিত হচ্ছে ক্যানাবিসের আইনি সংজ্ঞা এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ভবিষ্যৎকে ঘিরে। এনডিপিএস আইনের ২(iii) ধারায় ক্যানাবিস বা শণের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা গভীরভাবে পাঠ করলে এক চমকপ্রদ আইনি বিভাজন চোখে পড়ে। আইনে ‘চরস‘ (উদ্ভিদ থেকে আলাদা করা রজন) এবং ‘গাঁজা‘ (উদ্ভিদের ফুল ও ফলন্ত শীর্ষভাগ)-কে স্পষ্টভাবে কঠোর অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু যদি কোনো মিশ্রণে ফুল বা ফলন্ত শীর্ষভাগ ছাড়া কেবল পাতা বা বীজ ব্যবহৃত হয়, তবে তা কেন্দ্রীয় আইনের সংজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। এই সংজ্ঞাগত ব্যতিক্রমের সুযোগেই পাতা থেকে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ‘ভাং’ (Bhang) কেন্দ্রীয় এনডিপিএস আইনের কঠোর শাস্তির বাইরে থাকে।
তবে এর মানে এই নয় যে ভাং সারা ভারতে নিঃশর্তভাবে সর্বত্র অবাধে বৈধ। কারণ সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে মাদক ও মদ্যপানের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা রাজ্যগুলোর আবগারি বিভাগের হাতেও ন্যস্ত। ফলে বিভিন্ন রাজ্য নিজস্ব আবগারি বিধিমালার মাধ্যমে ভাং বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেয়, কঠোর শুল্ক আদায় করে কিংবা কোনো কোনো রাজ্য তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই দ্বৈত আইনি অবস্থানের কারণে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে – একই উদ্ভিদের ফুল নিজের কাছে রাখলে দীর্ঘ কারাদণ্ড হতে পারে, অথচ সেই উদ্ভিদেরই পাতা দিয়ে তৈরি পণ্য সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি হতে পারে। নাগরিক সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এই কৃত্রিম ও অবৈজ্ঞানিক পার্থক্যের অবসান দাবি করে আসছে।
বিশ্বজুড়ে যখন উরুগুয়ে, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু অঙ্গরাজ্য ক্যানাবিসকে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের জন্য আইনি কাঠামোয় নিয়ে আসছে, তখন ভারতেও আইন সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। ইতিপূর্বে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্য সীমিত মাত্রার টিএইচসিযুক্ত (THC) ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেম্প বা ঔদ্যোগিক গাঁজা চাষকে কঠোর লাইসেন্সিং বিধির আওতায় বৈধতা দিয়েছে, যাতে বস্ত্র, কাগজ ও জৈবপণ্য উৎপাদনে এর ব্যবহার সম্ভব হয়। একই সাথে আয়ুর্বেদিক ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা এবং ক্যানসার রোগীদের তীব্র ব্যথা প্রশমনে ক্যানাবিনয়েডের নির্যাস ব্যবহারের পক্ষে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ইতিবাচক মতামত দিচ্ছেন। অপ্রয়োজনীয় ফৌজদারি মামলার বোঝা কমিয়ে কর নিয়ন্ত্রিত বাজারের প্রবর্তন অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অধিকতর লাভজনক হতে পারে বলে গবেষকদের একাংশ যুক্তি দিচ্ছেন।
ভারতের ভবিষ্যৎ মাদকনীতিকে যদি সফল হতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই বিগত চার দশকের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। অন্ধ সামরিকায়িত দমননীতি যে জটিল রাসায়নিক পদার্থের সমান্তরাল বাজার বন্ধ করতে পারে না, তা আজ প্রমাণিত। ভবিষ্যৎ নীতির মূল ভিত্তি হতে হবে বিজ্ঞানের সত্যতা ও জনস্বাস্থ্যের সমতা। ছোটখাটো মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের অপরাধী বানিয়ে কারাগারে না পাঠিয়ে তাদের সার্বজনীন চিকিৎসার আওতায় আনা এবং আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের মূল অর্থনৈতিক শেকড় উপড়ে ফেলার জন্য আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করাই হতে পারে একমাত্র টেকসই সমাধান। দমনমূলক মানসিকতার অচলায়তন ভেঙে একটি বিজ্ঞানমনস্ক, সহানুভূতিশীল এবং নাগরিক অধিকার-বান্ধব মাদকনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভবিষ্যতের ভারতের জন্য সবচেয়ে জরুরি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
পাকিস্তানের মাদকনীতি (Drug Policies in Pakistan): ধর্ম, রাজনীতি ও আফগান যুদ্ধ
আফগান যুদ্ধ ও মাদকের উত্থান: সোভিয়েত আগ্রাসন পরবর্তী সমীকরণ (The Afghan War and the Rise of Narcotics: Post-Soviet Invasion Dynamics)
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সমাজ ও অর্থনীতি কীভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ফলে বদলে যেতে পারে, তার এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো পাকিস্তান। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত পাকিস্তানে আধুনিক রাসায়নিক মাদক বা প্রক্রিয়াজাত হেরোইনের কোনো ব্যাপক বিস্তার ছিল না। গ্রামীণ সমাজে সীমিত পরিসরে প্রথাগত আফিম বা চরসের ব্যবহার ছিল বটে, কিন্তু তা কোনো জাতীয় নিরাপত্তা সংকট বা বিশাল সংগঠিত অপরাধের রূপ ধারণ করেনি। তবে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন প্রতিবেশী আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায়, তখন সমগ্র দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ক্ষমতার সমীকরণ এক রাতের ব্যবধানে ওলটপালট হয়ে যায়। আফগানিস্তান পরিণত হয় দুই পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধের রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে, আর পাকিস্তান রূপান্তরিত হয় সেই যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখসারির সামরিক ও রাজনৈতিক ঘাঁটিতে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে সীমান্তে অস্ত্র, অর্থ এবং রসদের যে বিপুল সমান্তরাল প্রবাহ তৈরি হয়, তা মাদক অর্থনীতির বিকাশে এক অভূতপূর্ব অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আধুনিক মাদক ইতিহাসের গবেষক আলফ্রেড ডব্লিউ. ম্যাককয় (Alfred W. McCoy) তার সুপরিচিত গবেষণাগ্রন্থ দ্য পলিটিক্স অব হেরোইন (The Politics of Heroin)-এ স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মাদক ও গোয়েন্দা কূটনীতির যোগসূত্র বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (McCoy, 2003)। ম্যাককয় দেখান কীভাবে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের রণকৌশলে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সহযোগী প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মাদক বাণিজ্যের প্রতি অনেক ক্ষেত্রে কৌশলগত নীরবতা পালন করেছিল বা তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে চোখ বুজে ছিল। আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকায় পপি চাষ সম্প্রসারিত হতে থাকে, কিন্তু কেবল কাঁচা আফিম উৎপাদন যুদ্ধের বিশাল রসদ জোগানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। কাঁচা আফিমকে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর করতে প্রয়োজন ছিল রাসায়নিক পরীক্ষাগার।
ঠিক এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে পাকিস্তানের তৎকালীন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (বর্তমান খাইবার পাখতুনখাওয়া) এবং কেন্দ্রশাসিত উপজাতীয় এলাকাগুলোতে গোপন রাসায়নিক গবেষণাগার গড়ে ওঠে। সীমান্ত অঞ্চলের সমাজবিজ্ঞানী আমির জাদা আসাদ (Amir Zada Asad) ও রবার্ট হ্যারিস (Robert Harris) তাদের গবেষণাগ্রন্থ দ্য পলিটিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স অব ড্রাগ প্রোডাকশন অন দ্য পাকিস্তান-আফগানিস্তান বর্ডার (The Politics and Economics of Drug Production on the Pakistan-Afghanistan Border)-এ এই রূপান্তরের স্থানীয় কারণগুলো তুলে ধরেছেন (Asad & Harris, 2003)। তারা দেখান কীভাবে উপজাতীয় অঞ্চলের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধকালীন অস্ত্রের সহজলভ্যতা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে আফিম প্রক্রিয়াকরণ ও হেরোইন তৈরির কারখানায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছিল। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানিকৃত রাসায়নিক উপাদান সীমান্ত পেরিয়ে এই গোপন কারখানাগুলোতে পৌঁছাত এবং সেখান থেকে উৎপাদিত হতো উচ্চ ঘনত্বের সাদা ও বাদামি হেরোইন।
এর ফলে বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যের মানচিত্রে পাকিস্তান একটি অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়াকরণ ও ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই অঞ্চলটি পরিচিতি লাভ করে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (Golden Crescent) নামে, যার ভৌগোলিক বিস্তার ছিল পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং পূর্ব ইরানের সীমান্ত জুড়ে। যেসব পথ ও বাহন দিয়ে আফগান সীমান্তের দিকে সামরিক রসদ ও অস্ত্র পরিবহন করা হতো, সেই একই পরিবহন নেটওয়ার্কের একটি অংশ ব্যবহার করে হেরোইনের চালান নেমে আসত কোয়েটা, পেশোয়ার এবং করাচির মতো বৃহৎ বাণিজ্যিক নগরীতে। করাচি বন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার করে এই চালান ছড়িয়ে পড়ত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে। পাকিস্তান কেবল সামরিক ট্রানজিট হয়েই রইল না, নিজের অজান্তেই আন্তর্জাতিক মাদক শৃঙ্খলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হলো।
জিয়াউল হকের শাসনামল ও ধর্মীয় রাজনীতির আইনি রূপ (The Zia-ul-Haq Regime and Legal Enactment of Religious Politics)
একদিকে যখন দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে ইতিহাসের বৃহত্তম মাদক অর্থনীতির বিস্তার ঘটছিল, ঠিক তখনই পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্রে চলছিল অভ্যন্তরীণ আইনের কঠোর ধর্মীয়করণের প্রক্রিয়া। জেনারেল জিয়াউল হক ১৯৭৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার পর নিজের অগণতান্ত্রিক শাসনকে টিকিয়ে রাখতে সমাজ ও আইনের ইসলামীকরণের এক ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি জারি করেন বিতর্কিত হুদুদ অধ্যাদেশ, যার একটি অন্যতম প্রধান শাখা ছিল প্রহিবিশন (এনফোর্সমেন্ট অব হাদ্দ) অর্ডার, ১৯৭৯ (Prohibition (Enforcement of Hadd) Order, 1979)। এই আইনের মাধ্যমে অ্যালকোহল এবং অন্যান্য নেশাদ্রব্য উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রয় ও সেবনকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং এর জন্য বেত্রাঘাত, দীর্ঘমেয়াদী সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার কঠোর দণ্ড চালু করা হয়।
আইনটিতে সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের জন্য সব ধরনের অ্যালকোহল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং অমুসলিম সংখ্যালঘু ও বিদেশি নাগরিকদের জন্য বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে সীমিত কোটার ব্যবস্থা রাখা হয়। তবে প্রহিবিশন অর্ডারের মতো কঠোর বিধিমালার সাথে মাঠপর্যায়ের মাদক বাস্তবতার এক গভীর বৈপরীত্য তৈরি হয়। সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইয়ুর্গেন হেবারমাস (Jürgen Habermas) তার তাত্ত্বিক কাঠামোয় বৈধতাকরণ সংকট (Legitimation Crisis) ধারণায় ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে নিজস্ব শাসনব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি মেটাতে কৃত্রিম নৈতিক বা ঐতিহ্যবাহী অনুশাসনের ওপর নির্ভর করে (Habermas, 1975)। বিশ্লেষকদের মতে, হেবারমাসের এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিটি জিয়া সরকারের সেই নীতিকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে, যেখানে রাষ্ট্র একদিকে ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল, অথচ অন্যদিকে আফগান যুদ্ধের স্বার্থে সীমান্তবর্তী আফিম ও হেরোইনের বিপুল প্রবাহের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণে দৃশ্যমান দ্বিধায় ভুগছিল।
ইতিহাসবিদ ও নীতি গবেষক ইকরামুল হক (Ikramul Haq) তার দীর্ঘ গবেষণায় পাকিস্তান-আফগান মাদক বাণিজ্যের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন (Haq, 1996)। হক দেখান যে, জিয়ার শাসনামলে ঘোষিত কঠোর নৈতিক ও ধর্মীয় আইনগুলো বাস্তবে সাধারণ অপরাধীদের ওপরেই বেশি কার্যকর হতো, অথচ আফগান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রয়োজনে সীমান্ত দিয়ে আসা টন কে টন মাদকের চালানের মূল পৃষ্ঠপোষকরা আইনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যেত। এই আইনগুলো পরিচালনার জন্য বিশেষ আদালত ও শরীয়াহ বেঞ্চ গঠিত হলেও সেগুলো আধুনিক সংঘবদ্ধ অপরাধের জটিল আর্থিক ও আন্তঃসীমান্ত তদন্ত পরিচালনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
এই আইনি অসঙ্গতির সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমাজকে। মাদক নির্মূলের চেয়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন ও শাসনতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেশি ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যে রাষ্ট্র নিজেকে আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুশাসনের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছিল, সেই রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছিল কালো টাকার প্রভাব। ফাঁপা নৈতিকতার বুলি যে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আধুনিক সীমান্ত নজরদারির বিকল্প হতে পারে না, পাকিস্তানের সেই শাসনামল তার এক স্পষ্ট ঐতিহাসিক পাঠ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
নিয়ন্ত্রক আইনি কাঠামো: সিএনএসএ ১৯৯৭ ও এএনএফ-এর প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা (Regulatory Legal Framework: CNSA 1997 and Institutional Role of ANF)
আফগান যুদ্ধের অবসানের পর ১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মাদক বিস্তার কেবল আন্তর্জাতিক পাচারের বিষয় ছিল না, তা দেশের ভেতরেও আইনশৃঙ্খলার জন্য এক প্রকাণ্ড হুমকি হয়ে দেখা দেয়। এই পরিস্থিতির মুখে পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক ও খণ্ডবিখণ্ড আইনগুলোকে একীভূত করে ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট পাস করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন, যার নাম কন্ট্রোল অব নারকোটিক সাবস্ট্যান্সেস আইন, ১৯৯৭ (Control of Narcotic Substances Act, 1997), যা আইনি অঙ্গনে সংক্ষেপে সিএনএসএ (CNSA) নামে পরিচিত। এই আইনে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠন, কঠোর তদন্তপদ্ধতি এবং অপরাধলব্ধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়।
আইনটির শাস্তি সংক্রান্ত বিধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। মূল ১৯৯৭ সালের আইনের ৯ ধারার অধীনে নির্দিষ্ট পরিমাণ (এক কেজির অধিক) মাদক উৎপাদন, পরিবহন বা পাচারের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। তবে সমকালীন যুগে এসে পাকিস্তানের এই দণ্ডনীতিতে এক বড় আইনি সংস্কার সাধিত হয়। দ্য কন্ট্রোল অব নারকোটিক সাবস্ট্যান্সেস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৩-এর মাধ্যমে পাকিস্তানের আইনসভা ৯ ধারার অধীন দণ্ডসারণি সংশোধন করে সেখান থেকে ‘মৃত্যুদণ্ড’ শব্দটি সম্পূর্ণ বাদ দেয় এবং তার পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও বিভিন্ন মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান প্রতিস্থাপন করে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সাথে সংগতি রেখে মাদক অপরাধে চরম দণ্ড থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের দিকে তাদের আইনি দর্শনকে পুনর্বিন্যাস করে।
এই সংবিধিবদ্ধ আইনটি কার্যকর করার প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ন্যস্ত হয় একটি বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর, যার নাম অ্যান্টি-নারকোটিক্স ফোর্স (Anti-Narcotics Force বা ANF)। সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, যখন পাকিস্তান নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ড (PNCB) এবং ১৯৯৩ সালে গঠিত অ্যান্টি-নারকোটিক্স টাস্ক ফোর্স (ANTF) একীভূত হয়। এএনএফ মূলত মাদক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের (পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়) অধীন একটি সংযুক্ত দপ্তর হিসেবে কাজ করে। প্রশাসনিকভাবে এই বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে প্রায়শই প্রেষণে আসা সামরিক কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়, যার ফলে এর পরিচালনা ও অভিযানে এক ধরনের সামরিক ধাঁচের কঠোর শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এএনএফ-কে সীমান্ত পাহারা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে বিশেষ নজরদারি এবং তদন্তের জন্য বিস্তৃত ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
তবে বিশেষায়িত বাহিনী থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের বিচারিক বাস্তবতায় মাদক মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নানা কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা যায়। বিশেষ মাদক আদালতগুলোতে বছরের পর বছর বিচারাধীন মামলার জট জমে থাকে। উদ্ধারকৃত আলামতের যথাযথ হেফাজত বা চেইন অব কাস্টডি বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং রাসায়নিক প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে বহু মামলায় উচ্চ আদালত থেকে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। তদুপরি, মাঠপর্যায়ের অভিযানে ক্ষুদ্র বা মাঝারি বাহকদের আটক করা যতোটা সহজ হয়, জটিল আর্থিক নেটওয়ার্কের পেছনে থাকা মূল পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা ততোটাই দুরূহ প্রমাণিত হয়।
সংঘাতের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সীমান্ত চোরাচালান নেটওয়ার্ক (Political Economy of Conflict and Border Smuggling Networks)
মাদক ব্যবসা কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি বিস্তীর্ণ সমান্তরাল অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুদ্ধ ও সংঘাতপীড়িত সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষক জোনাথন গুডহ্যান্ড (Jonathan Goodhand) আফগান আফিম বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী যুদ্ধ অর্থনীতি (Borderland War Economy)-র গতিপ্রকৃতি বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Goodhand, 2005)। গুডহ্যান্ডের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেখায় যে, সংঘাতপীড়িত প্রত্যন্ত সীমান্তাঞ্চলগুলোতে যেখানে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল বা অনুপস্থিত, সেখানে অবৈধ চোরাচালান ও সমান্তরাল বাণিজ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে টিকে থাকার এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কাছে ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়। আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ঠিক এই ধরনের এক স্বায়ত্তশাসিত অপরাধ অর্থনীতি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
এই চোরাচালান শৃঙ্খলটির পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অন্ধকার দিক নিয়ে বিশদ তথ্য তুলে ধরেছেন পাকিস্তানি অনুসন্ধানী সাংবাদিক আহমেদ রশিদ (Ahmed Rashid) তার সুপরিচিত গ্রন্থ তালিবান (Taliban)-এ (Rashid, 2000)। রশিদ দেখান কীভাবে আফগান ট্রানজিট বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে এবং দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত পথের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন চোরাচালান চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বড় বড় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং পণ্যবাহী যানবাহনের দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে সীমান্ত থেকে করাচি বন্দর পর্যন্ত মাদকের চালান পৌঁছে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর খবর সামনে আসে। দুর্গম বেলুচিস্তানের মরুভূমি ও উপজাতীয় পাহাড়ি পথগুলো ব্যবহার করে এই পণ্য নিরাপদে উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হতো।
মাদকের এই সুবিশাল বাণিজ্যের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল প্রথাগত অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন বা হাওয়ালা (Hawala) ব্যবস্থা। যেহেতু মাদক চোরাচালানিরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ লেনদেন করতে পারত না, তাই শত শত কোটি রুপির অবৈধ পুঁজি স্থানান্তরিত হতো সীমান্তবর্তী এই গোপন হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকার একটি বড় অংশ বিনিয়োগ করা হতো পরিবহন খাত, আবাসন ব্যবসা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক খাতে। ফলে অর্থনীতির মূলধারার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সমান্তরাল অর্থনীতির জন্ম হয়, যা স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করত।
এই অপরাধ অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি সীমান্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করেছে। স্থানীয় গোত্রপতি, অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে গড়ে ওঠা পারস্পরিক সমঝোতা এমন এক জটিল ব্যবস্থা তৈরি করেছিল যা সাধারণ পুলিশি নজরদারির মাধ্যমে ভেঙে ফেলা প্রায় অসম্ভব ছিল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখনই কোনো একটি সরবরাহ পথ বন্ধ করতে গেছে, পাচারকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প পাহাড়ি খাঁদ বা মরুভূমির নতুন পথ তৈরি করে নিয়েছে। সংঘাতের এই অর্থনৈতিক চরিত্রটি পাকিস্তানের মাদক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাধা হিসেবে কাজ করেছে।
অভ্যন্তরীণ জনস্বাস্থ্য সংকট ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা (Domestic Public Health Crisis and Limitations of Treatment Systems)
মাদকের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার যে চরম ঐতিহাসিক মূল্য একটি দেশকে দিতে হয়, পাকিস্তানের জনস্বাস্থ্য সংকট তার এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। ১৯৭৯ সালের আগে পাকিস্তানে নথিভুক্ত হেরোইন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু আফগান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশে যখন প্রক্রিয়াজাত হেরোইনের প্লাবন শুরু হয়, তখন সেই পণ্যের একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ বাজারে অত্যন্ত সস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এক দশকের মধ্যেই দেশটির বহু তরুণ এই মারাত্মক পদার্থের ওপর শারীরিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
পাকিস্তানের এই অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য সংকটের পরিধি উঠে আসে একটি ঐতিহাসিক জাতীয় সমীক্ষায়। ২০১৩ সালে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC) এবং পাকিস্তান সরকারের মাদক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পরিচালনা করে এক বিশদ জাতীয় সমীক্ষা (UNODC, 2013)। এই সমীক্ষায় দেখা যায় যে, দেশটিতে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে পূর্ববর্তী এক বছরে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক গ্রহণ করেছিলেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৪২.৫ লাখ ব্যক্তি গুরুতর মাদক ব্যবহারজনিত ব্যাধিতে (Drug Use Disorders) আক্রান্ত ছিলেন, যাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। এটি ছিল কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক প্রকাণ্ড চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক বোঝা।
ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের প্রবণতা দেশটির জনস্বাস্থ্যে আরেকটি মারাত্মক সংকটের জন্ম দেয়। একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি বারবার ব্যবহার করার ফলে করাচি, পেশোয়ার ও কোয়েটার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে রক্তবাহিত রোগ, বিশেষ করে এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংঘাত ও অবৈধ অর্থনীতির নিরাপত্তা গবেষক ভান্ডা ফেলবাব-ব্রাউন (Vanda Felbab-Brown) তার গবেষণাগ্রন্থ শুটিং আপ: কাউন্টারইনসার্জেন্সি অ্যান্ড দ্য ওয়ার অন ড্রাগস (Shooting Up: Counterinsurgency and the War on Drugs)-এ মাদক সংকট মোকাবেলার বিভিন্ন কৌশল বিশ্লেষণ করেছেন (Felbab-Brown, 2010)। ফেলবাব-ব্রাউন দেখান যে, কোনো রাষ্ট্র যখন মাদককে কেবল একটি ফৌজদারি বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে এবং তার জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার দিকটিকে অবহেলা করে, তখন আসক্তির মূল শিকড় উপড়ে ফেলা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য কাঠামো স্থায়ী ঝুঁকির মধ্যে নিমজ্জিত হয়।
এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের বিপরীতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত অপ্রতুল। দেশজুড়ে সরকারি ডি-অ্যাডিকশন বা নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য এবং সেখানে আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও সীমিত। এই সুযোগে দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠে শত শত অননুমোদিত বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আস্তানা। অনেক বেসরকারি কেন্দ্রে আসক্ত ব্যক্তিদের শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো অমানবিক আচরণ করার খবর নিয়মিত প্রকাশিত হয়। আধুনিক ক্ষতি হ্রাস নীতি, নিরাপদ সুই-সিরিঞ্জ কর্মসূচি এবং ওপিওড সাবস্টিটিউশন থেরাপির মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগে প্রশাসনিক অনীহা ও সামাজিক রক্ষণশীলতা সংকটকে আরও গভীর করে রেখেছে।
সমকালীন সীমান্ত বাস্তবতা, তালেবান আফিম নিষেধাজ্ঞা ও সিন্থেটিক মাদক (Contemporary Border Realities, Taliban Opium Ban and Synthetic Narcotics)
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে পাকিস্তানের সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক পরিস্থিতি এক নতুন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার প্রায় দুই হাজার ছয় শ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রিটিশ আমলের ডুরান্ড লাইন ঐতিহাসিকভাবেই দুর্গম ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। পাকিস্তান সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং তল্লাশি চৌকি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিলেও রুক্ষ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে পুরো সীমান্ত সম্পূর্ণরূপে সিল করা প্রায় অসম্ভব এক কাজ। তোখরাম ও চমন সীমান্তের মতো প্রধান বাণিজ্যিক পথগুলোর পাশাপাশি শত শত গোপন পাহাড়ি গিরিপথ দিয়ে চোরাচালানের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২২ সালের এপ্রিলে আফিম চাষ ও মাদক বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের ২০২৩ সালের বার্ষিক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আফগানিস্তানে পপি চাষ এবং কাঁচা আফিম উৎপাদনে প্রায় ৯৫ শতাংশ ব্যাপক পতন ঘটে। তবে উৎপাদনের এই নাটকীয় পতন সত্ত্বেও সীমান্ত পেরিয়ে মাদকের চোরাচালান একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। কারণ অতীতের বিপুল মজুত এবং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে থাকা প্রক্রিয়াজাত হেরোইনের চালান পুরনো পাইপলাইনগুলো দিয়ে এখনো আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ করছে।
এর পাশাপাশি মাদক বাজারে আরেকটি বিপজ্জনক রূপান্তর ঘটেছে, আর তা হলো মেথঅ্যাম্ফেটাইন বা ক্রিস্টাল মেথের ব্যাপক বিস্তার, যা স্থানীয়ভাবে ‘আইস’ (Ice) নামে পরিচিত। যদিও মেথঅ্যাম্ফেটাইন হেরোইনের স্থান সম্পূর্ণ দখল করে নিয়েছে – এমন দাবি করা যায় না, তবে এটি আফিমজাত মাদকের সমান্তরালে এক মারাত্মক কৃত্রিম হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আফগানিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলে বুনোভাবে জন্মানো ‘এফিড্রা‘ উদ্ভিদ ব্যবহার করে অত্যন্ত কম খরচে এই মেথঅ্যাম্ফেটাইন তৈরি করা হচ্ছে। ওজনে হালকা ও বহনে সহজ হওয়ায় এই সিন্থেটিক মাদক চমন ও বেলুচিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহুরে মধ্যবিত্তের আড্ডায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
একই সাথে বেলুচিস্তানের দীর্ঘ ও জনবিরল মাকরান উপকূল হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র চোরাচালানের অন্যতম প্রধান পথ। স্পিডবোট ও মাছ ধরার ট্রলারে করে সিন্থেটিক মাদক ও হেরোইন ওমান উপসাগর পেরিয়ে পূর্ব আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে পাচার করা হচ্ছে। ড্রোনের ব্যবহার এবং সমুদ্রপথে আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে পাচারকারীরা সীমান্ত নজরদারিকে নিয়মিত ফাঁকি দিচ্ছে। পাকিস্তানের মাদক নিয়ন্ত্রণের এই দীর্ঘ ইতিহাস দেখায় যে, কেবল সীমান্ত পাহারা বা কঠোর পুলিশি অভিযান দিয়ে চাহিদা ও সরবরাহের এই জটিল চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছ আন্তঃসীমান্ত কূটনৈতিক সহযোগিতা এবং সবচেয়ে বড় কথা – মাদকাসক্ত মানুষদের অপরাধীর বদলে চিকিৎসার মুখাপেক্ষী রোগী হিসেবে বিবেচনা করে একটি বিজ্ঞানমনস্ক জনস্বাস্থ্য নীতি গ্রহণ করা।
দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক মাদক নিয়ন্ত্রণ (Comparative Drug Control in South Asia): নীতি ও অভিজ্ঞতা
আইনি দর্শনের তুলনামূলক রূপরেখা: শাস্তিমূলক কাঠামো ও অধিকারের দ্বন্দ্ব (Comparative Outlines of Legal Philosophy: Punitive Frameworks and Rights Contradictions)
দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে – এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক সীমানা, ঔপনিবেশিক স্মৃতি ও সংস্কৃতির দিক থেকে পরস্পরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। একই সাথে তারা অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দর্শনে এক অভিন্ন কঠোর নিষেধাজ্ঞামূলক মনোভাব লালন করে আসছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপাল – প্রায় প্রতিটি দেশেই মাদক সংক্রান্ত আইনগুলোর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে ভীতি সৃষ্টির ধারণার ওপর। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অঞ্চলের দেশগুলো স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের রাজস্বভিত্তিক মাদক আইন থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক সনদের প্রভাবে এক দমনমূলক আইনি কাঠামো গ্রহণ করে। আইন গবেষক রিক লাইন্স (Rick Lines) তার গবেষণাগ্রন্থ ড্রাগ কন্ট্রোল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ইন ইন্টারন্যাশনাল ল (Drug Control and Human Rights in International Law)-এ আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ সনদের সাথে মানবাধিকারের টানাপোড়েন বিশ্লেষণ করেছেন (Lines, 2017)। লাইন্স দেখান যে, কীভাবে আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্তাবলি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বহু উন্নয়নশীল দেশ এমন সব অভ্যন্তরীণ দণ্ডবিধি প্রণয়ন করেছে যা নাগরিকের মৌলিক ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায্য বিচারলাভের সুরক্ষাকে সংকুচিত করে তোলে।
সংবিধিবদ্ধ শাস্তির তুলনামূলক পর্যালোচনায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কিছু মাত্রাগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬ ধারার দণ্ডসারণিতে নির্দিষ্ট কিছু মাদক, যেমন বাণিজ্যিক পরিমাণের মেথঅ্যাম্ফেটাইন বা হেরোইনের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় বিষাক্ত আফিম ও ক্ষতিকর ড্রাগস অর্ডিন্যান্সের অধীনে নির্দিষ্ট ওজনের হেরোইন বা মরফিন চোরাচালানের জন্য সংবিধিবদ্ধ আইনে মৃত্যুদণ্ডের সুযোগ বিদ্যমান। ভারতে এনডিপিএস আইন, ১৯৮৫-তে বাণিজ্যিক পরিমাণের জন্য বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড রাখা হলেও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি ছিল নির্দিষ্ট শর্তাধীন। সেখানে ৩১এ ধারায় কেবল নির্দিষ্ট পূর্বদণ্ড থাকা সাপেক্ষে নির্দিষ্ট গুরুতর মাদকের পরবর্তী অপরাধের ক্ষেত্রে চরম দণ্ডের বিধান করা হয়েছিল, যা ২০১৪ সালের সংশোধনীতে আদালতের বিচারিক সুবিবেচনার অধীনে নিয়ে আসা হয়। অন্যদিকে, পাকিস্তানে ১৯৯৭ সালের কন্ট্রোল অব নারকোটিক সাবস্ট্যান্সেস আইনের ৯ ধারায় ঐতিহাসিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও, ২০২৩ সালের সংবিধিবদ্ধ সংশোধনীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দণ্ডসারণি থেকে ‘মৃত্যুদণ্ড’ শব্দটি বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
আইন দর্শনের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার মাদক নীতি প্রধানত দণ্ডমূলক ন্যায়বিচার (Retributive Justice) ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে অপরাধীকে কঠোরতম শারীরিক বা মানসিক দুর্ভোগের মুখোমুখি করাকেই অপরাধ দমনের প্রাথমিক উপায় মনে করা হয়। তবে এই কঠোরতার বিপরীতে সমাজবিজ্ঞানে আলোচিত পুনর্গঠনমূলক ন্যায়বিচার (Restorative Justice)-এর ধারণাকে চিকিৎসার ধারণার সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। পুনর্গঠনমূলক ন্যায়বিচার মূলত কোনো অপরাধের ফলে সমাজে যে ক্ষতি সৃষ্টি হয়েছে তা মেরামত করা, অপরাধীর নিজস্ব দায় স্বীকার এবং ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের যৌথ অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার মাদক আইনি কাঠামোতে এই ধরনের প্রক্রিয়ার উপস্থিতি অত্যন্ত বিরল। এমনকি কোনো কোনো দেশে স্বল্প পরিমাণ গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে চিকিৎসায় পাঠানোর যে সীমিত সুযোগ আইনে রাখা হয়েছে, তা মূলত সংশোধনের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া; এটি নিজে থেকেই পুনর্গঠনমূলক ন্যায়বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হয়ে ওঠে না।
এই কঠোর আইনগুলোর বাস্তব প্রয়োগ দক্ষিণ এশিয়ার ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার ওপর এক বিপুল চাপ সৃষ্টি করেছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার মন্থর গতির কারণে নিম্ন আদালতগুলোতে মাদক সংক্রান্ত মামলার জট জমে থাকে এবং কারাগারগুলো বিচারাধীন বন্দিদের দ্বারা উপচে পড়ে। আইনের প্রয়োগিক খড়্গ প্রায়শই নেমে আসে সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মাদক বাহকদের ওপর, যারা সামান্য অর্থের লোভে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের মূল অর্থলগ্নিকারী ও নিয়ন্ত্রকরা আড়ালে থেকে যায়। ফলে কঠোর আইনের অস্তিত্ব সত্ত্বেও তা মাদকের অবৈধ অর্থনৈতিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে সক্ষম হচ্ছে না।
প্রয়োগকারী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: সামরিকীকরণ ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ (Enforcement Institutional Frameworks: Militarization and Civilian Control)
মাদক আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের দিকে তাকালে সামরিক ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের একটি বৈচিত্র্যময় রূপ চোখে পড়ে। মাদক চোরাচালানকে কেবল প্রথাগত আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার সংকট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা বিভিন্ন দেশের প্রয়োগকারী সংস্থার কাঠামোয় প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক মাদকনীতি বিশ্লেষক ডেভিড আর. বেউলি-টেইলর (David R. Bewley-Taylor) তার গবেষণাগ্রন্থ ইন্টারন্যাশনাল ড্রাগ কন্ট্রোল: কনসেনসাস ফ্র্যাকচার্ড (International Drug Control: Consensus Fractured)-এ বৈশ্বিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিবর্তন আলোচনা করেছেন (Bewley-Taylor, 1999)। বেউলি-টেইলর দেখান কীভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা বয়ান বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মাদক প্রয়োগকারী সংস্থাকে এক ধরনের আক্রমণাত্মক পরিচালন পদ্ধতির দিকে পরিচালিত করেছে।
পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক মডেলটি এই ক্ষেত্রে একটি আধা-সামরিকায়িত কাঠামোর উদাহরণ উপস্থাপন করে। সেখানে মাদক নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে অ্যান্টি-নারকোটিক্স ফোর্স বা এএনএফ-এর ওপর। সংস্থাটি স্বরাষ্ট্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের একটি সংযুক্ত দপ্তর হিসেবে কাজ করলেও এর শীর্ষ নেতৃত্বে প্রায়শই সামরিক বাহিনী থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়। ফলে তাদের প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিযানে এক ধরনের সামরিক ধাঁচের কমান্ড বজায় থাকে। অন্যদিকে, ভারতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রধান সংস্থা হলো নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো বা এনসিবি, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি বেসামরিক গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থা হিসেবে কাজ করে এবং এর নেতৃত্বে থাকেন ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তবে ভারত তার দীর্ঘ সীমান্ত পাহারার জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী বা আসাম রাইফেলসের মতো আধা-সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।
বাংলাদেশে প্রয়োগকারী কাঠামোর রূপটি বহুমুখী সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত। এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নামে একটি বেসামরিক বিশেষায়িত দপ্তর থাকলেও তাদের লজিস্টিকস ও অস্ত্রবলের সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত পুলিশ এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটেলিয়ন (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের) মতো এলিট ফোর্সের ওপর অভিযানের বড় অংশ নির্ভর করে। একই সাথে সীমান্ত অঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং উপকূলীয় এলাকায় কোস্ট গার্ড মাদক অনুপ্রবেশ রোধে নিয়মিত টহল পরিচালনা করে। শ্রীলঙ্কায় পুলিশ নারকোটিক্স ব্যুরোর পাশাপাশি দেশটির নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরের জলসীমায় মাদক জব্দের জন্য সামরিক নজরদারি বজায় রাখে। একইভাবে মালদ্বীপের মতো দ্বীপরাষ্ট্রেও পুলিশের পাশাপাশি কোস্ট গার্ডের মেরিন শাখা সমুদ্রপথে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে তৎপর থাকে।
এই বহুমাত্রিক কাঠামোর একটি বড় প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা হলো সংস্থাগুলোর ভেতরের সমন্বয়হীনতা ও তথ্যের প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন। অনেক সময় বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম থাকে না, যার ফলে এক সংস্থার নজরদারিতে থাকা অপরাধী অন্য সংস্থার অগোচরে থেকে যায়। তদুপরি, সামরিক ধাঁচের অভিযানের মাধ্যমে রাজপথে মাদক জব্দের তাৎক্ষণিক সাফল্য প্রদর্শনের যে তাগিদ থাকে, তার ভিড়ে চোরাচালানের জটিল আর্থিক তদন্ত বা মানি লন্ডারিং অনুসন্ধানের বিষয়টি অবহেলিত থেকে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও আধুনিক গোয়েন্দা পদ্ধতির সমন্বয় না থাকলে কেবল শারীরিক বলপ্রয়োগ দিয়ে এই আধুনিক আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন করা সম্ভব হয় না।
জনস্বাস্থ্য বনাম নিরাপত্তা: ক্ষতি হ্রাস কৌশলের বহুমাত্রিক বাস্তবতা (Public Health versus Security: Multidimensional Realities of Harm Reduction)
দক্ষিণ এশিয়ায় মাদকের অপব্যবহার যখন একটি নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে আলোচনা করা হয়, তখন তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত থাকে মারাত্মক জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিরাপদ সুচ ব্যবহারের ফলে রক্তবাহিত রোগ, বিশেষ করে এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস সি-এর সংক্রমণ এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক স্থায়ী সংকট তৈরি করেছে। মাদকাসক্তিকে কেবল নৈতিক স্খলন বা অপরাধ হিসেবে দেখার যে চিরাচরিত মানসিকতা সমাজে কাজ করে, তা আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা গ্রহণের পথকে কঠিন করে তোলে।
জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের আধুনিক রূপরেখা এই দ্বন্দ্বের একটি সমন্বিত সমাধান প্রস্তাব করে। প্রখ্যাত গবেষক থমাস এফ. বাবর (Thomas F. Babor) এবং তার সহলেখকরা তাদের সুপরিচিত গ্রন্থ ড্রাগ পলিসি অ্যান্ড দ্য পাবলিক গুড (Drug Policy and the Public Good)-এ মাদকনীতির বিভিন্ন মাত্রার ওপর বিশদ গবেষণা পরিচালনা করেছেন (Babor et al., 2010)। বাবর ও তার দল দেখিয়েছেন যে, মাদক সমস্যা নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য এবং আইন প্রয়োগকে পরস্পরের বিপরীত মেরু হিসেবে দেখার প্রবণতাটি ত্রুটিপূর্ণ। কোনো একটিমাত্র ব্যবস্থা এককভাবে সফল হতে পারে না; বরং চিকিৎসা, প্রতিরোধ এবং উপযুক্ত আইন প্রয়োগের এক সুসংহত মেলবন্ধনই পারে সমাজের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে। জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ আইন প্রয়োগকে অস্বীকার করা নয়, বরং দণ্ডবিধির অন্ধ প্রয়োগের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সমাজকে রক্ষা করা।
এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ক্ষতি হ্রাস নীতি (Harm Reduction Policy)-র বাস্তবায়ন শুরু হয়। ভারত এই ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য কাঠামোর ভেতর দিয়ে বেশ কিছু দূর এগিয়েছে। দেশটির ন্যাশনাল এইডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন বা নাকো-র অধীনে ব্যাপকভাবে নিডল-সিরিঞ্জ বিনিময় কর্মসূচি এবং ওপিওড সাবস্টিটিউশন থেরাপি চালু করা হয়েছে, যা বিউপ্রেনরফিন ও মেথাডন ব্যবহারের মাধ্যমে ইনজেকশন ব্যবহারকারীদের এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে নেপাল নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই দক্ষিণ এশিয়ায় মেথাডন রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির সূচনা করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
তবে অঞ্চলের অন্যান্য দেশে ক্ষতি হ্রাস ব্যবস্থার বিস্তার সমানভাবে এগোতে পারেনি। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে কিছু ড্রপ-ইন সেন্টার ও বিকল্প চিকিৎসা পরিচালিত হলেও জাতীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে এর সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি ঘটেনি। সামাজিক কুসংস্কার এবং আইনি বাধার কারণে মাদক ব্যবহারকারীরা প্রকাশ্যে সেবা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। শ্রীলঙ্কায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা অন্যান্য সূচকে উন্নত হলেও মাদক ব্যবহারকারীদের জন্য ক্ষতি হ্রাস পরিষেবার পরিধি তুলনামূলকভাবে সীমিত। জনস্বাস্থ্য নীতিকে যদি সংবিধিবদ্ধ আইনের দমনমূলক কৌশলের সাথে কার্যকরভাবে যুক্ত করা না যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য সংকট আরও জটিল রূপ ধারণ করবে।
দ্বীপ ও পর্বতের মাদক বাস্তবতা: শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপের অভিজ্ঞতা (Island and Mountain Drug Realities: Experiences of Sri Lanka, Nepal and Maldives)
দক্ষিণ এশিয়ার মাদক রাজনীতি আলোচনায় ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো বৃহৎ জনসংখ্যার দেশগুলোর ওপর বেশি আলো ফেলা হলেও, এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং মালদ্বীপ – এই তিন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক গঠন তাদের আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের সাথে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় যুক্ত করেছে। অর্থনীতিবিদ ও অপরাধবিজ্ঞানী পিটার রয়টার (Peter Reuter) এবং ফ্রাঞ্জ ট্রাউটমান (Franz Trautmann) সম্পাদিত ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিবেদন এ রিপোর্ট অন গ্লোবাল ইলিসিট ড্রাগ মার্কেটস ১৯৯৮–২০০৭ (A Report on Global Illicit Drug Markets 1998–2007)-এ আন্তর্জাতিক মাদক বাজারের গতিশীলতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে (Reuter & Trautmann, 2009)। রয়টার ও ট্রাউটমান দেখান যে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যেসব দেশ আন্তর্জাতিক চোরাচালানের ট্রানজিট পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তারা সময়ের সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ আসক্তির মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।
শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে প্রধান সংকট তৈরি করেছে ভারত মহাসাগরের উন্মুক্ত সমুদ্রপথ। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া থেকে জলপথে আসা হেরোইনের চালান আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাওয়ার পথে শ্রীলঙ্কার উপকূলে প্রবেশ করে। কলম্বো বন্দরের সুবিশাল কন্টেইনার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রগুলো তাদের পণ্য লুকানোর চেষ্টা করে। দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর এই উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার করা দেশটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারেও নিম্নমানের হেরোইনের ব্যবহার যুবসমাজের একটি অংশের মধ্যে সামাজিক সংকট সৃষ্টি করেছে, যা রোধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মাঝে মাঝেই কঠোর শাস্তির রাজনৈতিক দাবি উচ্চারিত হতে দেখা যায়।
হিমালয়ের কোলে অবস্থিত নেপালের চিত্রটি পর্বতের ভূপ্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত। বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে কাঠমান্ডু ছিল বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক হিপ্পি পরিব্রাজকদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখানে প্রাকৃতিক গাঁজা উন্মুক্তভাবে বিক্রি হতো। কিন্তু ১৯৭৬ সালে নেপাল সরকার কঠোর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করে গাঁজা চাষ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে ভারতের সাথে খোলা সীমান্তের কারণে নেপালের মাদক পরিস্থিতির চরিত্র বদলে যায়। স্থানীয় উদ্ভিজ্জ মাদকের পরিবর্তে ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল বাজার থেকে আসা বিভিন্ন ওপিওড ইনজেকশন এবং কাশির সিরাপের একটি সমান্তরাল প্রবাহ নেপালের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। পাহাড়ি দুর্গম পথ ও উন্মুক্ত সীমান্ত এই নজরদারির ক্ষেত্রে স্থায়ী চ্যালেঞ্জ তৈরি করে রেখেছে।
অন্যদিকে, প্রবাল দ্বীপপুঞ্জের দেশ মালদ্বীপ তার পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি এক গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী মালের তীব্র ঘনবসতি এবং তরুণদের বেকারত্ব সেখানে আফিমজাত মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেখানে কোনো স্থায়ী চিকিৎসার সুযোগ নেই – এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মালদ্বীপের ন্যাশনাল ড্রাগ এজেন্সির অধীনে ১৯৯৭ সালের ২৬ জুন হিম্মাফুশি দ্বীপে প্রথম ড্রাগ ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য অঞ্চলেও সীমিত পরিসরে ডিটক্স সেন্টার এবং মালেতে বহির্বিভাগীয় সেবা চালু করা হয়েছে। কিন্তু দ্বীপরাষ্ট্রের শত শত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে এই সেবাগুলোর নিয়মিত সম্প্রসারণ ঘটানো লজিস্টিকস ও অর্থনৈতিক কারণে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ক্ষুদ্র এই রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে যে ভৌগোলিক রূপ যেমনই হোক, আন্তর্জাতিক মাদক অর্থনীতির জটিল চক্র থেকে কোনো দেশই সুরক্ষিত নয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতার সংকট ও সার্ক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা (Crisis of Regional Cooperation and Limitations of the SAARC Institutional Framework)
মাদক বাণিজ্য একটি সহজাত আন্তঃসীমান্ত অপরাধ হওয়ায় কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে নিজস্ব সীমানার ভেতর থেকে একে সমূলে নির্মূল করা সম্ভব নয়। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে ১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসে স্বাক্ষর করেছিল সার্ক কনভেনশন অন নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস (SAARC Convention on Narcotic Drugs and Psychotropic Substances, 1990)। এই বহুপাক্ষিক সনদের লক্ষ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
এই কনভেনশনের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয় সার্ক ড্রাগ অফেন্সেস মনিটরিং ডেস্ক বা এসডিওএম (SDOM)। এটি কোনো কাগুজে পরিকল্পনা ছিল না, বরং একটি কার্যকর নজরদারি ডেস্ক হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠার পর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এই প্রতিষ্ঠানটি তার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যাপক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল ডেটাবেজ ব্যবস্থার অভাব, নিয়মিত তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত না হওয়া এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঠপর্যায়ের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে রিয়েল-টাইম সংযোগের ঘাটতি এই ডেস্কটিকে একটি নিষ্ক্রিয় সংস্থায় পরিণত করেছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভেতরে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক জন এইচ. হার্জ (John H. Herz) যাকে নিরাপত্তা দ্বিধা (Security Dilemma) বলে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা ঠিক সেই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের খাঁচায় বন্দি (Herz, 1950)। হার্জের এই তাত্ত্বিক ধারণা কোনো অঞ্চলের বর্তমান কূটনীতির প্রত্যক্ষ সমীক্ষা নয়, তবে এটি পরিষ্কার করে যে কীভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহাসিক শত্রুতা তাদের নিরাপত্তা সংস্থাকে একে অপরের প্রতি চিরন্তন সন্দেহের মধ্যে রাখে। ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বৈরিতার কারণে সার্কের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ দীর্ঘকাল ধরে স্থবির হয়ে আছে। ২০১৪ সালের ২৬-২৭ নভেম্বর কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সার্কের আর কোনো আনুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই দীর্ঘ অচলাবস্থা স্বাভাবিকভাবেই মাদকবিরোধী যৌথ সহযোগিতাকে স্থবির করে রেখেছে।
এর ফলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি বা অপরাধী প্রত্যর্পণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এক দেশের মাদক চোরাচালানি অন্য দেশে আশ্রয় নিলে বা সম্পদ স্থানান্তর করলে রাজনৈতিক দূরত্বের কারণে তাকে বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর মধ্যে নিয়মিত পতাকা বৈঠক হলেও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলোর আর্থিক নেটওয়ার্ক ভাঙার জন্য যে ধরনের সমন্বিত যৌথ অভিযান প্রয়োজন, তার কোনো শক্তিশালী রূপ দৃশ্যমান নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতার এই দৃশ্যমান ঘাটতির সুযোগটি পুরোমাত্রায় গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক মাদক মাফিয়া চক্রগুলো।
নীতি সংস্কারের ভবিষ্যৎ: আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও সমন্বিত আঞ্চলিক রূপকল্প (Future of Policy Reform: International Conventions and Integrated Regional Vision)
বিগত চার দশকের আঞ্চলিক অভিজ্ঞতার নির্মোহ পর্যালোচনা দেখাচ্ছে যে, কেবল কঠোর শাস্তিমূলক আইন ও কারাগার নির্ভর নীতি দিয়ে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়নি। বাজারের গতিপ্রকৃতি আরও জটিল হয়েছে এবং উদ্ভিজ্জ মাদকের পাশাপাশি কৃত্রিম সিন্থেটিক রাসায়নিকের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মাদকনীতির তাত্ত্বিক রূপরেখায় মৌলিক সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী রবিন রুম (Robin Room) এবং পিটার রয়টার (Peter Reuter) তাদের যৌথ গবেষণায় আন্তর্জাতিক চুক্তির সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেছেন (Room & Reuter, 2012)। রুম ও রয়টার দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক মাদক কনভেনশনগুলো মূলত জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার কথা বলে গৃহীত হলেও, অনেক ক্ষেত্রে তাদের অনমনীয় কাঠামো সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বাস্তবমুখী স্বাস্থ্যসম্মত সংস্কার গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। সনদের এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক জাতীয় নীতি প্রণয়ন করাই এখন নীতি নির্ধারকদের মূল চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যতের মাদকনীতির অন্যতম প্রধান দাবি হলো মাদক সেবনকারী বা আসক্ত ব্যক্তিদের ফৌজদারি ব্যবস্থার বাইরে নিয়ে আসা। সাধারণ ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ মেয়াদে কারাগারে আটকে রাখলে তাদের মানসিক ও সামাজিক পুনর্গঠন অসম্ভব হয়ে পড়ে, এবং তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অনুৎপাদনশীল চাপ সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এখন সুপারিশ করছে যে ব্যক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফৌজদারি সাজার বদলে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক পুনর্বাসনের পথ বেছে নেওয়া উচিত। এটি একদিকে আদালতের ওপর থেকে লক্ষ লক্ষ মামলার বোঝা কমাবে, অন্যদিকে পুলিশকে সুযোগ করে দেবে সংগঠিত অপরাধের মূল পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে।
একই সাথে গোয়েন্দা নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুকে পরিবর্তন করতে হবে। রাস্তার সাধারণ বিক্রেতাদের পেছনে সমস্ত শক্তি ব্যয় না করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দৃষ্টি দিতে হবে মাদকের অর্থপাচার এবং আর্থিক নেটওয়ার্কের দিকে। ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে পরিচালিত সমান্তরাল হুন্ডি ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন শনাক্ত করার জন্য আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ফরেনসিক আর্থিক তদন্তের প্রসার ঘটাতে হবে। অপরাধের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াই হলো চোরাচালান চক্র পঙ্গু করার সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়।
সর্বোপরি, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে তাদের সংকীর্ণ ভূরাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে মাদক সমস্যাকে একটি অভিন্ন মানবিক ও আঞ্চলিক সংকট হিসেবে স্বীকার করতে হবে। ইন্টারপোল বা ইউরোপোলের মতো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি পেশাদার, নির্দলীয় ও প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা সময়ের দাবি। অন্ধ দমননীতির মানসিকতা পরিহার করে বিজ্ঞানমনস্ক জনস্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চল একটি নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও মাদক (Religion, Spirituality and Psychoactive Substances): আচার, চেতনা, সংস্কৃতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ
ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ও মনঃসক্রিয় পদার্থের নৃতত্ত্ব (Anthropology of Religion and Psychoactive Substances): পবিত্রতা, পরিবর্তিত চেতনাবস্থা ও আচারগত ব্যবহার
পবিত্র ও অপবিত্রের নৃবিজ্ঞান এবং উদ্ভিদের সামাজিক স্থান (Anthropology of the Sacred and Profane and Social Placement of Plants)
মানব সমাজের সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং সাংস্কৃতিক বিন্যাসের সাথে গাছপালার সংযোগ অতি প্রাচীন। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম (Émile Durkheim) তার প্রভাবশালী গবেষণাগ্রন্থ দি এলিমেন্টারি ফর্মস অব দ্য রিলিজিয়াস লাইফ (The Elementary Forms of the Religious Life)-এ দেখিয়েছেন যে মানব চিন্তার কেন্দ্রীয় ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে দুটি বিপরীত ধারণার ওপর, যার একটি হলো পবিত্র (sacred) এবং অন্যটি অপবিত্র (profane) (Durkheim, 1912)। এই বিভাজন কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্য নয়, বরং সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখার এক কার্যকর সামাজিক চুক্তি। আদিম সমাজ যখন চারপাশের উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের দিকে তাকাত, তখন তারা প্রতিটি উপাদানকে নিজেদের টিকে থাকার লড়াইয়ের নিরিখে ভাগ করে নিত। যেসব বনস্পতি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত বা অবশ করত, সেগুলোকে সাধারণ ঘাসলতা থেকে আলাদা মর্যাদায় বসানো হতো। উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদানের কারণে মস্তিষ্কে যে তোলপাড় সৃষ্টি হতো, বিজ্ঞানহীন প্রাচীন মানুষ সেই অভিজ্ঞতাকে মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণকারী কোনো শক্তির স্পর্শ বলে ব্যাখ্যা করত।
গাছপালাকে এই বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়ার সামাজিক কার্যকারণ বুঝতে নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত স্পষ্ট পথ দেখায়। নৃতাত্ত্বিক মেরি ডগলাস (Mary Douglas) তার ধ্রুপদী তাত্ত্বিক গ্রন্থ পিউরিটি অ্যান্ড ডেঞ্জার (Purity and Danger)-এ প্রতিষ্ঠা করেন যে কোনো বস্তু প্রকৃতিগতভাবে দূষিত বা বিশুদ্ধ নয়, বরং সমাজের প্রতীকী কাঠামোই নির্ধারণ করে কোন উপাদান কোন স্তরে থাকবে (Douglas, 1966)। যখন কোনো উদ্ভিদকে সমাজ ‘পবিত্র’ বলে আখ্যা দেয়, তখন তার ব্যবহার আর সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় থাকে না। ভেষজটি তখন নির্দিষ্ট কিছু আচার ও পুরোহিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সাধারণ মানুষের জন্য সেই উপাদান গ্রহণ করা পরিণত হয় ‘ট্যাবু বা অলঙ্ঘনীয় সামাজিক নিষেধাজ্ঞা’ নামক অপরাধে। এই নিয়মের বাইরে গিয়ে কেউ যদি উপাদানটি স্পর্শ বা ভোগ করত, তবে তাকে সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। ডগলাসের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ট্যাবু বা অপবিত্রতার ধারণা মূলত গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখার এক অদৃশ্য রাজনৈতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করত।
নৃতাত্ত্বিক ক্লদ লেভি-স্ট্রস (Claude Lévi-Strauss) তার প্রখ্যাত কাঠামোবাদ (structuralism) তত্ত্বে বিষয়টি আরও বিশদভাবে তুলে ধরেছেন (Lévi-Strauss, 1962)। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে প্রাকৃতিক জগতকে মানুষ কেবল পেট ভরানোর মাধ্যম হিসেবে দেখে না, বরং চিন্তার হাতিয়ার হিসেবেও গ্রহণ করে। মনঃসক্রিয় গুণসম্পন্ন লতাপাতা তাই প্রাচীন মানুষের কাছে কেবল ভেষজ ছিল না, বরং তাদের সামাজিক চিন্তা কাঠামোর প্রতীকী রূপ হয়ে উঠেছিল। যে ভেষজ সেবন করলে ইন্দ্রিয়ের বোধ পাল্টে যায় বা সময়ের অনুভূতি লোপ পায়, তাকে সমাজ দৈনন্দিন উৎপাদনমূলক কাজের বিরোধী হিসেবে দেখত। ফলে সাধারণ দিনে এই উদ্ভিদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হতো, কিন্তু বিশেষ সামাজিক সংকটে একে উপশমের উপায় ভাবা হতো। এর পেছনে কোনো আধ্যাত্মিক রহস্যের বাস্তবতা ছিল না। আসল কারণ হলো, উদ্ভিদের মধ্যকার অ্যালকালয়েড মানব মস্তিষ্কের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনত, আর সমাজ সেই স্নায়বিক বিভ্রমকে নিজেদের সামাজিক নিয়মের ছাঁচে ফেলে পাঠ করত।
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার (Max Weber) সমাজের এই ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে তার সমাজতাত্ত্বিক কর্তৃত্ব তত্ত্ব (theory of sociological authority) আলোচনা করতে গিয়ে ক্যারিশমা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার মধ্যকার সংঘাতের কথা বলেছেন (Weber, 1922)। বিশেষ কিছু উদ্ভিদের সংবেদন যখন একজন মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ তৈরি করত, তখন তা অন্যদের চোখে ব্যক্তিটিকে এক ধরনের সাময়িক প্রভাব ও কর্তৃত্ব এনে দিত। ভেবারের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে কোনো সমাজের প্রভাবশালী মহল এমন অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত প্রভাব পছন্দ করে না। এ কারণে উদ্ভিদের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে ব্যক্তি থেকে ছিনিয়ে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধের অধীনে বাঁধা হয়েছিল। সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে উদ্ভিদের এই গুণ কোনো সাধারণ রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এক অদৃশ্য মহাজাগতিক বিধানের প্রকাশ। উদ্ভিদের প্রাকৃতিক রসায়নকে এভাবে এক অলীক অতিপ্রাকৃতিক আখ্যানের অংশ বানিয়ে শাসক ও পুরোহিতরা নিজেদের কর্তৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী করার সামাজিক ভিত্তি তৈরি করত।
পরিবর্তিত চেতনাবস্থা ও মানবীয় সংজ্ঞান (Altered States of Consciousness and Human Cognition)
নৃবিজ্ঞানের ইতিহাসে মানুষের মানসিক পরিবর্তন ও চেতনার রূপান্তরকে বোঝা একটি জরুরি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নৃতাত্ত্বিক এরিকা বুর্গিনিয়ন (Erika Bourguignon) বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচশত আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক চর্চা গভীরভাবে পরীক্ষা করে এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেন (Bourguignon, 1973)। তিনি দেখতে পান যে বিশ্বের শতকরা প্রায় নব্বই ভাগ সমাজেই চেতনার স্বাভাবিক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পথ খোলা রাখা হয়েছিল। এই পরিবর্তনকে নৃবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পরিবর্তিত চেতনাবস্থা (altered states of consciousness)। বুর্গিনিয়নের কাজ এটা প্রমাণ করে যে চেতনার রূপান্তর কোনো বিশেষ অলৌকিক আলোকপ্রাপ্তি নয়, বরং এটি মানুষের জৈবিক স্নায়ুতন্ত্রের এক সার্বজনীন শারীরবৃত্তীয় সক্ষমতা। মানুষ যখন উপবাস করত, একা গভীর অরণ্যে থাকত বা বিশেষ উদ্ভিদের রস পান করত, তখন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়ে এক নতুন সংবেদন তৈরি হতো। নৃবিজ্ঞান এই অনুভূতির ভেতরে কোনো দেব-দেবীর খোঁজ করে না, বরং মানুষ কীভাবে সেই জৈবিক অবস্থাকে নিজের সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা করত, তা বিশ্লেষণ করে।
মনস্তাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী মাইকেল উইঙ্কেলম্যান (Michael Winkelman) এই জৈবিক প্রক্রিয়াকে সংজ্ঞায়িত করতে সাইকোইন্টিগ্রেশন তত্ত্ব (theory of psychointegration) প্রস্তাব করেন (Winkelman, 2010)। উইঙ্কেলম্যান দেখান যে মনঃসক্রিয় উদ্ভিদের অ্যালকালয়েড মানব মস্তিষ্কের কর্টেক্স অঞ্চলের স্বাভাবিক বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে শিথিল করে দেয়। এর ফলে মস্তিষ্কের গভীরে থাকা আদিম ও আবেগীয় অংশগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রাচীন মানুষ যখন এই অবস্থায় প্রবেশ করত, তখন সে নিজের পরিচিত জগতকে অচেনা দৃষ্টিতে দেখত। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে এই অনুভূতি কোনো অদৃশ্য লোকে ভ্রমণের ঘটনা নয়, বরং সেরোটোনিন রিসেপ্টরে রাসায়নিক উপাদানের কৃত্রিম উদ্দীপনার ফল। আদিম সমাজ এই স্নায়বিক ধাক্কাকে ব্যাখ্যা করতে প্রচলিত পুরাণ ও লোকগাথার আশ্রয় নিত। উইঙ্কেলম্যানের মতে, গোষ্ঠীগত জীবনে এই উদ্ভিজ্জ অভিজ্ঞতা মানুষের জৈব-মনস্তাত্ত্বিক সংকট সামাল দিতে সহায়তা করত, কারণ মানুষ মনে করত সে হয়তো জীবনের কোনো বড় সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছে, যদিও বাস্তবে তা ছিল রাসায়নিকভাবে তৈরি ক্ষণস্থায়ী বিভ্রম মাত্র।
জ্ঞানীয় বা সংজ্ঞানাত্মক নৃবিজ্ঞান (cognitive anthropology) এই প্রক্রিয়াকে আরও নিবিড়ভাবে ব্যাখ্যা করেছে। নৃতাত্ত্বিক প্যাসকাল বোয়ার (Pascal Boyer) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রিলিজিয়ন এক্সপ্লেইন্ড (Religion Explained)-এ পরিষ্কার করে বলেছেন যে মানব মস্তিষ্ক সব সময় পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলির পেছনে সচেতন কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য খুঁজতে চায় (Boyer, 2001)। বোয়ার এই প্রবণতাকে মস্তিষ্কের একটি বিবর্তনমূলক কৌশল হিসেবে দেখিয়েছেন। যখন বিষাক্ত বা মনঃসক্রিয় উদ্ভিদ সেবনের ফলে মানুষের কান বা চোখ বিভ্রান্ত হয়ে অলীক দৃশ্য বা শব্দ তৈরি করত, তখন মস্তিষ্ক সেই ভ্রান্তিকে কোনো অদৃশ্য শক্তির কাজ বলে সিদ্ধান্ত নিত। মানুষ ভাবত বাতাসে কেউ কথা বলছে বা চারপাশে অদৃশ্য সত্তা ঘোরাফেরা করছে। বোয়ারের বিশ্লেষণ এটা তুলে ধরে যে তথাকথিত আধ্যাত্মিক দর্শনের কোনো স্বাধীন সত্যতা নেই; এটি মূলত জৈবিক ও রাসায়নিক সংঘাতের মুখে মানুষের সচেতন বিচারবুদ্ধির ভুল পাঠ বা ভ্রান্ত অনুমানের এক স্বাভাবিক প্রকাশ।
সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিক লুইস কারমেন ভিলোলদো (Luis Carman Villoldo) আমাজন অববাহিকায় মাঠপর্যায়ের কাজের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজ মানুষের এই স্নায়বিক বিভ্রমকে আগে থেকেই একটি ছাঁচে ফেলে দেয় (Villoldo, 2000)। ভিলোলদোর পর্যবেক্ষণ দেখায় যে উদ্ভিদ গ্রহণের পর একজন মানুষ কী দেখবে বা কী অনুভব করবে, তা কোনো মহাজাগতিক শক্তি ঠিক করে দেয় না। বরং ব্যক্তি যে সমাজে বড় হয়েছে, সেই সমাজের রূপকথা, সামাজিক ভয় এবং শিক্ষাই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নৃবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সেট অ্যান্ড সেটিং বা মানসিক প্রস্তুতি ও পরিবেশ’। একজন মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে বিশেষ বনস্পতি খেলে বনদেবীর দেখা মিলবে, তবে রাসায়নিক প্রভাবে অবচেতন মনের সেই কল্পনাই তার চোখে সত্য বলে প্রতিভাত হয়। এর ফলে দেখা যায়, মনঃসক্রিয় উদ্ভিদের প্রভাবে মানুষ কখনো নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় পৌঁছায় না, বরং নিজের মাথার ভেতর সঞ্চিত সামাজিক সংস্কারগুলোকেই এক অচেনা রাসায়নিক বিভ্রান্তির ভেতর নতুন করে দেখতে পায়।
আচার, যৌথ উত্তেজনা ও সংহতি সৃষ্টি (Ritual, Collective Effervescence and Social Cohesion)
আদিম দলবদ্ধ মানুষের টিকে থাকার পেছনে দলগত আচারের ভূমিকা সমাজবিজ্ঞানে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। একক ব্যক্তির চেয়ে দল বড় – এই ধারণা টিকিয়ে রাখতে প্রাচীন সমাজগুলোকে নানা উদ্ভাবনী কৌশলের আশ্রয় নিতে হতো। সমাজতাত্ত্বিক ডুরখেইম তার সমাজতত্ত্বে দেখান যে সমাজের সদস্যরা যখন একসাথে কোনো আচার পালন করে, তখন তাদের ভেতর এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়, যাকে তিনি নাম দেন যৌথ উত্তেজনা (collective effervescence) (Durkheim, 1912)। যখন একটি পুরো দল একই সাথে নির্দিষ্ট কোনো উদ্ভিদের রস পান করত বা তার ধোঁয়া নাকে টেনে নিত, তখন সবার মস্তিষ্কে প্রায় একই ধরনের জৈব রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতো। মানুষ নিজের ব্যক্তিগত চিন্তা বা স্বার্থ ভুলে দলের অংশ হিসেবে নিজেকে অনুভব করতে শুরু করত। ডুরখেইমের মতে, এই যৌথ উন্মাদনা আসলে সমাজকেই উপাসনার বস্তু বানিয়ে ফেলার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ঈশ্বর থাকে না, থাকে কেবল সমাজের অখণ্ড অস্তিত্বের প্রকাশ।
নৃতাত্ত্বিক ভিক্টর টার্নার (Victor Turner) তার বিখ্যাত তাত্ত্বিক বই দ্য রিচুয়াল প্রসেস (The Ritual Process)-এ এই আচারিক রূপান্তরের এক গভীর ব্যবচ্ছেদ হাজির করেন (Turner, 1969)। টার্নার দেখান যে যে-কোনো সামাজিক আচারের একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় থাকে, যার নাম লিমিনালিটি (liminality) বা ক্রান্তিকালীন অবস্থা। এই দশায় একজন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন পরিচয়, জাত বা পদমর্যাদা হারিয়ে এক বিশেষ অনির্দিষ্ট জগতে প্রবেশ করে। টার্নার এই দশায় জন্ম নেওয়া গভীর সামষ্টিক বন্ধনকে “কমিউনিটাস বা সামষ্টিক নৈকট্য” হিসেবে অভিহিত করেন। মনঃসক্রিয় উদ্ভিদ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত আচারে এই লিমিনাল অবস্থা সবচেয়ে তীব্র হতো। যখন সবাই মিলে ভেষজ সেবন করে বমি করত, কাঁপত কিংবা সম্মিলিতভাবে নাচল, তখন তাদের মধ্যে শ্রেণি বা বয়সের বিভেদ ক্ষণিকের জন্য মুছে যেত। টার্নারের গবেষণা স্পষ্ট করে যে এই সাময়িক সমতা মানুষকে সমাজের স্থায়ী অসম নিয়মগুলো মেনে নিতে বাধ্য করার এক চমৎকার মানসিক নিরাময় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
বাস্তুসংস্থান ও মানব আচরণের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা নৃতাত্ত্বিক রয় র্যাপাপোর্ট (Roy Rappaport) তার বই রিচুয়াল অ্যান্ড রিলিজিয়ন ইন দ্য মেকিং অব হিউম্যানিটি (Ritual and Religion in the Making of Humanity)-এ আচারের পেছনের জৈবিক শৃঙ্খলা ব্যাখ্যা করেন (Rappaport, 1999)। র্যাপাপোর্ট দেখান যে আদিম মানুষের কাছে কেবল মুখে বলা সামাজিক নিয়মের কোনো শক্ত ভিত্তি ছিল না। লিখিত আইন না থাকায় মানুষকে দিয়ে কথা রক্ষা করানোর জন্য প্রয়োজন হতো কঠোর শারীরিক সংকেতের। মনঃসক্রিয় উপাদান সেবনের ফলে শরীরে যে ক্লান্তি, ঘাম ও মানসিক ধকল যেত, তা মানুষের কাছে আচারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতির তাৎপর্য অনেক বাড়িয়ে দিত। মানুষ ভাবত, যে কাজের জন্য এত শারীরিক মূল্য দিতে হলো, তা নিশ্চয়ই কোনো অলঙ্ঘনীয় সত্য। র্যাপাপোর্ট এই পরিস্থিতিকে সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার এক জৈব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন, যার সাথে কোনো অলৌকিক আশীবার্দের দূরতম সম্পর্কও ছিল না।
সামাজিক সংঘাত মীমাংসার ক্ষেত্রেও এই সম্মিলিত উদ্ভিজ্জ আচারের একটি প্রচ্ছন্ন কার্যকারিতা ছিল। আদিবাসী সমাজে সম্পদ, শিকার কিংবা যৌনসঙ্গী নির্বাচন নিয়ে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ কলহ তৈরি হতো। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়িয়ে দলের ভেতরের এই বৈরিতা কাটানোর জন্য পর্যায়ক্রমিক উদ্ভিজ্জ আচার আয়োজন করা হতো। নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তীব্র শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়ার পর যখন ব্যক্তিরা শান্ত হতো, তখন তাদের অভ্যন্তরীণ ক্রোধ অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়ত। সমাজ এই শান্ত পরিবেশকে দেবতাদের কৃপা হিসেবে প্রচার করত। তবে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে দেখা যায়, রাসায়নিক ক্লান্তি এবং সমবেত বিভ্রম মানুষকে সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মতো শারীরিক শক্তি থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত করত। ফলে প্রচলিত শাসন ব্যবস্থা কোনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছাড়াই টিকে থাকার এক স্বস্তিদায়ক পথ পেয়ে যেত।
শামানীয় চর্চা ও ক্ষমতা কাঠামোর বিস্তার (Shamanic Practices and Extension of Power Structures)
আদিম মানব সমাজের ক্ষমতার বিন্যাসকে বুঝতে হলে শামান এবং তার আচারগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করা অনিবার্য। নৃতাত্ত্বিক সাহিত্যের একটি বড় অংশে শামানকে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের কল্যাণকামী আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রচার করার প্রবণতা ছিল। তবে ক্রিটিক্যাল নৃবিজ্ঞানী আইওন লুইস (Ioan Lewis) তার ধ্রুপদী গ্রন্থ একস্ট্যাটিক রিলিজিয়ন (Ecstatic Religion)-এ এই ভাবালুতাকে নাকচ করে দেন (Lewis, 1971)। লুইস তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখান যে শামানদের কথিত ভর হওয়া বা স্বর্গে ভ্রমণের নাটক আসলে প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদ কিংবা সুযোগসন্ধানী নেতাদের ক্ষমতা দখলের কৌশল। মনঃসক্রিয় উদ্ভিদের সঠিক মাত্রা এবং প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে গোত্রের কেবল নির্দিষ্ট কিছু লোকেরই ধারণা থাকত। উদ্ভিদের এই ভেষজ জ্ঞানকে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতি সতর্কতায় লুকিয়ে রাখত। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করত শামান কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে রোগ সারাচ্ছেন বা ভবিষ্যৎ বলে দিচ্ছেন, যা শামানের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলত।
ইতিহাস ও ধর্মের গবেষক মিরচিয়া এলিয়াদ (Mircea Eliade) শামানবাদ নিয়ে তার প্রভাবশালী গ্রন্থ শামানিজম: আর্কাইক টেকনিকস অব একস্ট্যাসি (Shamanism: Archaic Techniques of Ecstasy)-তে এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছিলেন (Eliade, 1951)। এলিয়াদ দাবি করেছিলেন যে আদিম শামানরা কোনো ধরনের উদ্ভিজ্জ মাদক ছাড়াই বিশুদ্ধ ধ্যানের মাধ্যমে চেতনার গভীরে যেতেন এবং পরবর্তীকালে মনঃসক্রিয় ভেষজের ব্যবহার হলো এই ঐতিহ্যের এক ধরনের অবক্ষয়। কিন্তু এলিয়াদের এই অনুমান পরবর্তী গবেষণায় পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নৃবিজ্ঞানী মাইকেল হার্নার (Michael Harner) তার সংকলিত গ্রন্থ দ্য হ্যালুসিনোজেনস অ্যান্ড শামানিজম (The Hallucinogens and Shamanism)-এ মাঠপর্যায়ের বিস্তৃত প্রমাণ দিয়ে তুলে ধরেন যে উদ্ভিদ ছাড়া শামানবাদের অস্তিত্ব চিন্তাই করা যায় না (Harner, 1973)। হার্নার দেখান যে জুতোর তলায় মাখানো ধুতুরার রস কিংবা বিশেষ মাশরুমের প্রভাব ছাড়া শামানদের তথাকথিত শূন্যে ওড়ার অনুভূতি কখনোই সম্ভব হতো না। এটি ছিল সম্পূর্ণ জৈব রাসায়নিক খেলা, যাকে আধ্যাত্মিক সাধনার চাদর পরিয়ে রাখা হয়েছিল।
সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিউ (Pierre Bourdieu) ক্ষমতার যে সমাজতাত্ত্বিক কাঠামো ব্যাখ্যা করেছেন, তা শামানীয় ক্ষমতা বুঝতে দারুণ সাহায্য করে (Bourdieu, 1986)। বুর্দিউ তার তত্ত্বে দেখান যে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদই নয়, বরং প্রতীকী জ্ঞানও ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস, যাকে তিনি বলেন প্রতীকী পুঁজি (symbolic capital)। শামানদের হাতে থাকা উদ্ভিদের জ্ঞান ছিল এমন এক প্রতীকী পুঁজি, যা সাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। বনের কোন লতা মানুষের হৃৎস্পন্দন কমিয়ে দেয় আর কোন লতা চোখের মণি প্রসারিত করে বিভ্রম আনে, সেই গোপন রহস্যকে শামানরা স্বর্গীয় ভাষা বলে বিক্রি করত। বুর্দিউয়ের ধারণা প্রয়োগ করলে বোঝা যায় যে শামানরা এই মনঃসক্রিয় উদ্ভিদগুলোকে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। মানুষ তাদের ভয় পেত এবং খাদ্য ও শিকারের সেরা অংশটি শামানের পদতলে সমর্পণ করত।
রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শামান হলেন পরবর্তীকালের রাজকীয় পুরোহিত বা রাজনৈতিক শাসকের এক আদিম রূপ। শিকারী-সংগ্রাহক সমাজে যখন খাদ্য সংগ্রহের অনিশ্চয়তা দেখা দিত, তখন গোত্রের মানুষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শামানের কাছে যেত। শামান নির্দিষ্ট উদ্ভিদের বিষক্রিয়া নিজের দেহে গ্রহণ করে অচেতন হয়ে নানা অসংলগ্ন প্রলাপ বকতেন। গোত্রের প্রবীণরা সেই প্রলাপকে নিজেদের পছন্দমতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ছাঁচে সাজিয়ে নিত। এর মানে দাঁড়ায়, কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত দায় এড়ানোর জন্য সমাজ এই উদ্ভিজ্জ প্রলাপকে মহাজাগতিক বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত। সুতরাং শামানের চর্চা কোনো আধ্যাত্মিক সত্যের সন্ধান ছিল না; বরং তা ছিল অনিশ্চিত প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষের ভয়কে পুঁজি করে সমাজের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুপ্রাচীন এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।
ধর্মীয় প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাচীন উদ্ভিজ্জ ব্যবহার (Archaeology of Religion and Ancient Plant Utilization)
ধর্ম ও আচারের ইতিহাস কোনো আকাশচুম্বী ভাববাদী কল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং তার শেকড় মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে প্রোথিত। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ অ্যান্ড্রু শেরাট (Andrew Sherratt) প্রাচীন মানব সংস্কৃতিতে মনঃসক্রিয় পদার্থের ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা পরিচালনা করেন (Sherratt, 1995)। শেরাট দেখান যে নব্যপ্রস্তর যুগে যখন মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে কৃষিভিত্তিক স্থায়ী সমাজ গড়ে তুলতে শুরু করে, তখন ভেষজ উপাদান প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তি অভাবনীয় গতি পায়। গম বা বার্লি থেকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় অ্যালকোহল তৈরি এবং আফিম বা ক্যানাবিসের পরিকল্পিত চাষ ধর্মীয় আচারের অংশ হয়ে ওঠে। কৃষিজীবী সমাজের কঠোর কায়িক শ্রম এবং ঋতুভিত্তিক একঘেয়েমির মানসিক চাপ সামাল দিতে মানুষ এই উপাদানগুলোর আশ্রয় নিয়েছিল। শেরাটের মতে, প্রাচীন সমাধিসৌধ বা মন্দিরে এই উদ্ভিদের অবশেষ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে মানুষ সেখানে ঈশ্বরের সাথে কথা বলত; এর অর্থ হলো এই পদার্থগুলো ছিল সে যুগের সবচেয়ে মূল্যবান বাণিজ্য ও উপশমের পণ্য।
নৃতাত্ত্বিক ওয়েস্টন লা বার (Weston La Barre) উত্তর ও মধ্য আমেরিকার প্রাচীন উপজাতিগুলোর ওপর বিশদ গবেষণা চালান (La Barre, 1938)। লা বার তার ধ্রুপদী গবেষণায় তুলে ধরেন যে মেসোআমেরিকান সংস্কৃতিতে মেসক্যালিনসমৃদ্ধ পেয়োটি ক্যাকটাসের ব্যবহার ছিল কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এক প্রতিষ্ঠিত সামাজিক প্রথা। এদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া গুহাচিত্রের রহস্যভেদ করতে গিয়ে প্রত্ন-নৃতাত্ত্বিক ডেভিড লুইস-উইলিয়ামস (David Lewis-Williams) এক চমকপ্রদ ব্যাখ্যা দাঁড় করান (Lewis-Williams, 2002)। তিনি প্রমাণ করেন যে প্রাচীন গুহার দেয়ালে আঁকা জ্যামিতিক নকশা, আঁকাবাঁকা রেখা এবং অবাস্তব জীবজন্তুর রূপগুলো কোনো শিল্পীর স্বাধীন কল্পনা বা অতীন্দ্রিয় দর্শন ছিল না। মনঃসক্রিয় উপাদান সেবনের পর মানব চোখের অপটিক্যাল স্নায়ু যখন উত্তেজিত হয়, তখন দৃষ্টিসীমানায় কিছু নির্দিষ্ট প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। আদিম শিকারীরা পাথরের গায়ে সেই রাসায়নিক বিভ্রমকেই এঁকে রেখেছিল, যা পরবর্তী প্রজন্ম দেবালয়ের পবিত্র চিহ্ন হিসেবে পূজা করতে শুরু করে।
প্রাচীন বিশ্বের ধর্মীয় পানীয়ের রহস্যও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠভাবে উন্মোচিত হয়েছে। প্রত্ন-উদ্ভিদবিজ্ঞানী জর্জিও সামোরিনি (Giorgio Samorini) সাহারা মরুভূমির তা সিলি এন আজের অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের পুরোনো গুহাচিত্র পরীক্ষা করে স্পষ্ট প্রমাণ পান যে প্রাচীন মানুষেরা সাইলোসাইবিনযুক্ত মাশরুম ব্যবহার করত (Samorini, 1992)। একইভাবে মধ্য এশিয়ার মার্গিয়ানা প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে মাটি খুঁড়ে যেসব পাত্র পাওয়া গেছে, সেগুলোর ভেতরে এফেড্রা, গাঁজা এবং আফিমের রাসায়নিক অণু শনাক্ত হয়েছে। এই আবিষ্কার প্রাচীন ভারতীয় ও ইরানি ধর্মীয় সাহিত্যে উল্লেখিত তথাকথিত অমরত্বের পানীয় সোম বা হাওমার রহস্য ধূলিসাৎ করে দেয়। বিজ্ঞান স্পষ্ট দেখিয়েছে যে দেবতাদের উদ্দেশে নিবেদিত পানীয় ছিল মূলত শক্তিশালী উদ্ভিজ্জ অ্যালকালয়েডের তীব্র এক ককটেল। এই পানীয় গ্রহণের পর হৃদযন্ত্রের গতি বেড়ে যেত এবং রক্তচাপ বাড়ত, যাকে অজ্ঞ মানুষ আধ্যাত্মিক শক্তি বলে ভুল করত।
প্রত্নতাত্ত্বিক এই তথ্যপ্রমাণগুলো ঐতিহ্যের ভাববাদী ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং এর উৎপত্তি ও বিকাশকে বস্তুগত, সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার আলোকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ সৃষ্টি করে। ধর্ম কোনো অলৌকিক অনুপ্রেরণা থেকে জন্ম নেয়নি; বরং বাস্তব জীবনে টিকে থাকার জন্য বনজ সম্পদের ওপর মানুষের যে নির্ভরতা ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই আচারগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল। প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপরিপক্কতা এবং রোগ নিরাময়ের অক্ষমতার কারণে মানুষ এই উদ্ভিদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিল। কোনো ভেষজ খেলে ব্যথা কমত বা রোগী ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ত, আর প্রাচীন মানুষ সেই জৈবিক আরোগ্যকে ঈশ্বরের অলৌকিক কৃপা মনে করত। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রাচীন মানুষের এই সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব সংগ্রামকে উন্মোচন করে দেখায় যে পবিত্রতার মুখোশের আড়ালে আসলে লুকিয়ে ছিল প্রকৃতির জৈব রসায়নকে বশ মানানোর আদিম এক লড়াই।
প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও দমননীতি (Institutionalization, Patriarchal Control and Prohibition)
সমাজ যখন ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা গোত্র কাঠামোর গণ্ডি পেরিয়ে বিশালায়তন রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হলো, তখন মনঃসক্রিয় উদ্ভিদের সামাজিক অবস্থানে এক গভীর মোড় নিল। নৃবিজ্ঞানী ব্রায়ান হেডেন (Brian Hayden) দেখান যে আদিম সমাজের খোলামেলা আচারগুলো যখন কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিক পুরোহিতদের অধীনে চলে যায়, তখন ভেষজের অবাধ ব্যবহারের ওপর তীব্র আঘাত আসে (Hayden, 2003)। হেডেনের মতে, সংগঠিত ধর্মের মূল ভিত্তি হলো মধ্যস্থতাকারী পুরোহিত শ্রেণি। কোনো সাধারণ নাগরিক যদি জঙ্গল থেকে একটি লতা ছিঁড়ে খেয়ে নিজেই তথাকথিত আধ্যাত্মিক জগতের স্বাদ পেয়ে যায়, তবে সমাজের মন্দিরে যাওয়ার বা পুরোহিতকে প্রণামী দেওয়ার কোনো অর্থনৈতিক তাগিদ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে উদীয়মান রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ও আয়ের পথ সুগম রাখতে বনৌষধি ব্যবহারের স্বাধীন চর্চাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দমননীতির সাথে লৈঙ্গিক রাজনীতির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। নারীবাদী চিন্তক ও সমাজতাত্ত্বিক সিলভিয়া ফেডেরিচি (Silvia Federici) তার ইতিহাস-কাঁপানো গবেষণা ক্যালিবান অ্যান্ড দ্য উইচ (Caliban and the Witch)-এ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের এই চরিত্র উন্মোচন করেছেন (Federici, 2004)। ফেডেরিচি দেখান যে মধ্যযুগীয় ইউরোপে যেসব নারীকে ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, তাদের অপরাধ কোনো অতিপ্রাকৃতিক অপশক্তির উপাসনা ছিল না। তাদের প্রকৃত অপরাধ ছিল, তারা ছিলেন গ্রামীণ সমাজের দক্ষ ভেষজবিদ, ধাত্রী এবং প্রাকৃতিক উদ্ভিদের সফল ব্যবহারকারী। উদীয়মান পিতৃতান্ত্রিক (patriarchal) চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং চার্চের যাজক শ্রেণি সাধারণ মানুষের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করতে গিয়ে নারীর এই চিরাচরিত উদ্ভিজ্জ জ্ঞানকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। ফেডেরিচির মতে, নারীদের এই চিকিৎসাজ্ঞান বিলোপের মাধ্যমে সমাজব্যবস্থাকে এক চরম পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়েছিল।
দার্শনিক ও সামাজিক তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তার বিখ্যাত গবেষণা ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ (Discipline and Punish)-এ শরীরের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির তত্ত্ব দিয়েছেন (Foucault, 1975)। ফুকো দেখান কীভাবে আধুনিক যুগে এসে রাষ্ট্র মানুষের জৈবিক শরীর ও মানসিক উপলব্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। এই নজরদারির সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে ঔপনিবেশিক যুগে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যখন লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা বা এশিয়ায় তাদের শাসন কায়েম করে, তখন তারা স্থানীয় আদিবাসীদের প্রচলিত ভেষজ আচারগুলোকে ‘অসভ্য’ কিংবা ‘পৌত্তলিক’ আচরণ বলে নিষিদ্ধ করে দেয়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সেই ঔপনিবেশিক প্রভুরাই আবার আফিম বা তামাকের মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর উপাদান নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে পুরো দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিল। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্ত্বিক স্বায়ত্তশাসনকে চূর্ণ করে তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক শ্রমদাসে পরিণত করাই ছিল এই কৃত্রিম নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
আধুনিক যুগে মাদকের বিরুদ্ধে যে আইনি যুদ্ধ দেখা যায়, সমাজবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড বেকার (Howard S. Becker) তার বিখ্যাত লেবেলিং তত্ত্ব (labeling theory) দিয়ে সেটির আসল চেহারা তুলে ধরেছেন (Becker, 1963)। বেকার তার আউটসাইডার্স (Outsiders) গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন যে কোনো কাজ নিজ থেকে বিচ্যুতি নয়, বরং ক্ষমতাবান গোষ্ঠী যাকে বিচ্যুতি বলে তকমা দেয়, সেটাই সমাজে অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। প্রাচীন যুগে পুরোহিতরা যে কাজটি ধর্মের নাম ভাঙিয়ে করত, আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র সেই একই কাজ করছে জনস্বাস্থ্যের একপাক্ষিক সংজ্ঞা ব্যবহার করে। বিশেষ কিছু কর্পোরেট অ্যালকোহল বা সিনথেটিক ওষুধকে বৈধতা দিয়ে হাজার বছরের প্রাচীন ভেষজগুলোকে অপরাধের তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই পর্যালোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মনঃসক্রিয় উদ্ভিদের সামাজিক ইতিহাস মূলত ক্ষমতা, শ্রেণিশোষণ এবং মানুষের জৈবিক শরীরকে শাসন করার এক সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যে মাদক ও চেতনাবদল (Psychoactive Substances in Ancient Religious Traditions): সোম, হাওমা, এলেউসিনীয় রহস্যানুষ্ঠান ও শামানিক সংস্কৃতি
বৈদিক সোমরস: উদ্ভিদবিজ্ঞানীয় বিতর্ক ও পুরোহিততান্ত্রিক আচার (Vedic Soma: Botanical Debates and Priestly Rituals)
বৈদিক সাহিত্যে ঋগ্বেদের মণ্ডলে প্রায় একশত বিশটি সূক্ত উৎসর্গ করা হয়েছে একটি বিশেষ পানীয়ের উদ্দেশ্যে, যার নাম সোম। ঋগ্বেদে এই পানীয়কে সাধারণ কোনো রস হিসেবে দেখা হয়নি, ভাবা হতো এটা এক স্বর্গীয় চালিকাশক্তি। আধুনিক ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় এই উদ্ভিজ্জ উপাদানের পেছনের প্রাকৃতিক ও জৈব রাসায়নিক ভিত্তি উন্মোচিত হয়েছে। নৃতত্ত্ববিদ আর. গর্ডন ওয়াসন (R. Gordon Wasson) তার সাড়াজাগানো গবেষণাগ্রন্থ সোমা: ডিভাইন মাশরুম অব ইমর্টালিটি (Soma: Divine Mushroom of Immortality)-এ প্রস্তাব করেন যে বৈদিক সোম আসলে লাল রঙের আমানিতা মাসকারিয়া (Amanita muscaria) নামক মাশরুম (Wasson, 1968)। ওয়াসনের এই পর্যবেক্ষণ গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্কের সূচনা করে। বৈদিক স্তোত্রে এই উদ্ভিদের কোনো শিকড়, ফুল বা পাতার বিবরণ না থাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে এর প্রাপ্তির উল্লেখ ওয়াসনের অনুমানকে কিছুটা ভিত্তি দিয়েছিল।
মাশরুম সংক্রান্ত ধারণার বিপরীতে উদ্ভিদবিজ্ঞানী এবং প্রাচ্যতাত্ত্বিক গবেষকেরা অন্যান্য ভেষজের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। ভারততাত্ত্বিক জান হাউবেন (Jan Houben) সোম সংক্রান্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক পাঠ পর্যালোচনা করে দেখান যে এটা কোনো একক উদ্ভিদ নাও হতে পারে, বরং অঞ্চল ও ঋতুভেদে পরিবর্তিত এক ভেষজ মিশ্রণ ছিল (Houben, 2003)। মধ্য এশিয়ার শুষ্ক পর্বতমালা ও সিন্ধু অববাহিকার সংযোগস্থলে পাওয়া এফেড্রা (Ephedra) বা সোমলতা এই বিতর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রার্থী হিসেবে গণ্য হয়। এফেড্রা উদ্ভিদের মধ্যে থাকা সক্রিয় অ্যালকালয়েড এফিড্রিন (ephedrine) মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে, রক্তচাপ বাড়ায় এবং ক্লান্তি দূর করে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা যাগযজ্ঞে পুরোহিতদের বিনিদ্র ও সজাগ রাখার জন্য এই উদ্ভিদের প্রভাব কার্যকর ভূমিকা রাখত।
বৈদিক যাগযজ্ঞের বিস্তারিত কার্যপদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সোম নিষ্কাশনের পুরো ব্যবস্থাটি ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। ইতিহাসবিদ ওয়েন্ডি ডনিগার (Wendy Doniger) বৈদিক যুগের উত্তর পর্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে সোমের এই কাঠামোগত রূপান্তর ব্যাখ্যা করেছেন (Doniger O’Flaherty, 1968)। দুটি পাথরের মাঝে ভেষজ পিষে রস বের করা, ভেড়ার পশমের তৈরি ছাঁকনি দিয়ে তা ছেঁকে নেওয়া এবং পরে দুধ, বার্লি বা মধুর সাথে মেশানোর সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। এই শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে তৈরি করা অসম্ভব ছিল। ডনিগারের বিশ্লেষণ এটা স্পষ্ট করে যে সোম কোনো সর্বজনীন পানীয় ছিল না, বরং যজ্ঞের বেদি ও সামাজিক কর্তৃত্ব ধরে রাখার স্বার্থে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা এই ভেষজ তৈরির প্রণালী নিজেদের গোপনীয় নিয়ন্ত্রণে রাখতেন।
সোমপানের পর যাজ্ঞিকরা যে উদ্দীপনা অনুভব করতেন, বৈদিক শ্লোকে তাকে এক তীব্র মানসিক মুক্তি হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে পানকারী নিজেকে অমর ভাবতেন। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে এই অনুভূতির পেছনে কোনো অলৌকিক যোগাযোগ ছিল না, বরং এটা ছিল উদ্ভিজ্জ অ্যালকালয়েডের কারণে ঘটা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া। যজ্ঞের দীর্ঘ ধোঁয়া, ছন্দবদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ এবং উপবাসের ক্লান্তির সাথে যখন এফিড্রিনের তীব্র রাসায়নিক প্রভাব যুক্ত হতো, তখন মস্তিষ্কে দৃষ্টিভ্রম ও অসংলগ্ন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ছিল। যাজক সম্প্রদায় মানুষের এই জৈবিক পরিবর্তনকে দেবতাদের সান্নিধ্য লাভের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করত। এর ফলে যাগযজ্ঞের ওপর তাদের একচ্ছত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘকাল প্রশ্নাতীত হয়ে থাকত।
আবেস্তার হাওমা ও প্রাচীন ইরানি ধর্মানুষ্ঠান (Avestan Haoma and Ancient Iranian Religious Rites)
প্রাচীন ইরানি ঐতিহ্যে সোমের প্রায় অভিন্ন এক সমান্তরাল রূপ পাওয়া যায়, যার নাম হাওমা। জরথুস্ত্রীয় ধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ আবেস্তার ‘ইয়সনা’ অংশে এই ভেষজ পানীয়কে কেন্দ্র করে বিস্তারিত আচার ও স্তুতি লিপিবদ্ধ রয়েছে। ইন্দো-ইরানীয় জনগোষ্ঠীর অভিন্ন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সোম ও হাওমা যে একই উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে এসেছিল, ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে তা আজ প্রতিষ্ঠিত। গবেষক ডেভিড ফ্ল্যাটরি (David Flattery) এবং ভাষাতত্ত্ববিদ মার্টিন শোয়ার্টজ (Martin Schwartz) তাদের যৌথ গবেষণাগ্রন্থ হাওমা অ্যান্ড হারমালাইন (Haoma and Harmaline)-এ এই পানীয়ের প্রকৃত উদ্ভিজ্জ চরিত্র নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন (Flattery & Schwartz, 1989)। তারা যুক্তি দেন যে হাওমা তৈরি হতো মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের বুনো ইসফান্দ বা পেগানাম হারমালা (Peganum harmala) থেকে, যার সক্রিয় উপাদান হারমিন (harmine) ও হারমালাইন (harmaline) মানব মস্তিষ্কের সংবেদনে গভীর পরিবর্তন আনে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য এই উদ্ভিদ সংক্রান্ত বিতর্ককে অনুমানের বাইরে এনে বাস্তব প্রমাণের ওপর দাঁড় করিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ভিক্টর সারিয়ানিদি (Viktor Sarianidi) মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তানে অবস্থিত ব্রোঞ্জ যুগের ব্যাকট্রিয়া-মার্গিয়ানা প্রত্নতাত্ত্বিক কমপ্লেক্সে খনন চালিয়ে প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপত্যের সন্ধান পান (Sarianidi, 1998)। সারিয়ানিদি গোনুর দেপে অঞ্চলের মন্দিরে ব্যবহৃত প্রাচীন মৃৎপাত্র ও পাথরের হামানদিস্তায় সংরক্ষিত উদ্ভিদের আণবিক অবশেষ পরীক্ষা করেন। রাসায়নিক বিশ্লেষণে সেখানে এফেড্রা, ক্যানাবিস এবং পপির রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত হয়। এই প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার দেখায় যে প্রাচীনকালে পুরোহিতরা চেতনার কৃত্রিম পরিবর্তন ঘটাতে একাধিক সক্রিয় উপাদানের সংমিশ্রণ তৈরি করতেন। ধর্মগ্রন্থে একক পবিত্র ভেষজ হিসেবে যাকে বর্ণনা করা হয়েছে, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তা বহু উদ্ভিদের এক শক্তিশালী রাসায়নিক ককটেল হিসেবে ধরা পড়ে।
প্রাচীন পারস্যে জরথুস্ত্রীয় মতাদর্শের বিকাশের সাথে সাথে হাওমার আচারিক অবস্থানে কিছু পরিবর্তন এসেছিল। প্রাচীন উপজাতীয় সমাজে প্রচলিত অনিয়ন্ত্রিত মাদকীয় উন্মাদনাকে কিছুটা স্তিমিত করে জরথুস্ত্রীয় যাজকেরা হাওমাকে একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন। হাওমা প্রস্তুত করার জন্য নির্দিষ্ট পাথরের পাত্র ব্যবহার এবং বিশেষ ছন্দে মন্ত্রোচ্চারণ বাধ্যতামূলক করা হয়। গবেষক রিচার্ড রুডগলে (Richard Rudgley) তার বই দি অ্যালকেমি অব কালচার (The Alchemy of Culture)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে লোকায়ত উন্মুক্ত ভেষজ ব্যবহার ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে (Rudgley, 1993)। রুডগলে তুলে ধরেন যে আচারের এই কঠোর বিধিনিষেধ আসলে ভেষজ গ্রহণের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে পুরোহিতদের অনুশাসনে বাঁধার একটি কার্যকর মাধ্যম ছিল।
জরথুস্ত্রীয় ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে হাওমা পান করলে স্বাস্থ্য, সন্তান এবং যুদ্ধের ময়দানে সাহস বৃদ্ধি পায়। যাযাবর ও সংঘাতময় সমাজে ভয় দূর করা এবং দীর্ঘ অভিযানের ক্লান্তি দূর করার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য স্নায়বিক উদ্দীপকের প্রয়োজন ছিল। পুরোহিতরা এই জৈবিক প্রয়োজনকে ব্যবহার করে উদ্ভিদের রাসায়নিক ক্ষমতাকে ঐশ্বরিক বরদান হিসেবে প্রচার করতেন। সাধারণ মানুষ যখন এই নির্যাস পান করে তাদের শারীরিক দুর্বলতা সাময়িকভাবে কেটে যেতে দেখত, তখন তারা গাছটিকে নিরাময়কারী সত্ত্বা বলে ভুল করত। এভাবেই একটি প্রাকৃতিক উদ্ভিদের জৈব রসায়নকে ব্যবহার করে প্রাচীন পারস্যের সামাজিক স্তরবিন্যাস ও রাজনৈতিক আনুগত্য সুদৃঢ় করা হয়েছিল।
এলেউসিনীয় রহস্যানুষ্ঠান ও কাইকিয়নের রসায়ন (Eleusinian Mysteries and the Chemistry of Kykeon)
প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সের অদূরে এলেউসিস নামক স্থানে প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে উদযাপিত হয়েছিল এক প্রভাবশালী ধারা, যা এলেউসিনীয় রহস্যানুষ্ঠান (Eleusinian Mysteries) নামে পরিচিত। শস্যের দেবী দিমিতার এবং তার কন্যা পার্সিফোনের পাতালপুরী থেকে ফিরে আসার পৌরাণিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে এই গোপন আচারের আয়োজন হতো। গ্রিক সমাজের প্রায় সকল স্তরের মানুষ এই আচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত, তবে শর্ত ছিল ভেতরের অভিজ্ঞতা কখনো প্রকাশ করা যাবে না। ইতিহাসবিদ কার্ল কেরেনেই (Karl Kerenyi) তার গ্রন্থে এই উৎসবের সামগ্রিক কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করেছেন (Kerenyi, 1967)। কেরেনেই তার এলেউসিস: আর্কিটাইপাল ইমেজ অব মাদার অ্যান্ড ডটার (Eleusis: Archetypal Image of Mother and Daughter) গ্রন্থে দেখান যে কয়েক দিনব্যাপী উপবাস ও দীর্ঘ পদযাত্রার পর দীক্ষার্থীরা যখন মূল অন্ধকার কক্ষে সমবেত হতো, তখন তাদের পান করতে দেওয়া হতো “কাইকিয়ন বা মিশ্র যবপানীয়”।
কাইকিয়ন পানীয়ের উপাদান এবং মানুষের ওপর তার প্রভাব আধুনিক গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান (Albert Hofmann), নৃতত্ত্ববিদ আর. গর্ডন ওয়াসন এবং গবেষক কার্ল রাক (Carl Ruck) তাদের যৌথ গবেষণাগ্রন্থ দ্য রোড টু এলেউসিস (The Road to Eleusis)-এ এই পানীয়ের রাসায়নিক রহস্য উন্মোচন করেন (Wasson et al., 1978)। গবেষকেরা দেখান যে যবের শিষের ওপর জন্ম নেওয়া এক ধরনের পরজীবী ছত্রাক, যার নাম ক্ল্যাভিসেপস পারপুরিয়া (Claviceps purpurea) বা এরগট, এই পানীয়ের মূল উৎস ছিল। হফম্যান প্রমাণ করেন যে এরগট থেকে জলে দ্রবণীয় অ্যালকালয়েড, যেমন এরগোনোভিন (ergonovine) এবং লাইসার্জিক অ্যাসিড অ্যামাইড (lysergic acid amide বা এলএসএ) সহজেই পৃথক করা যেত। এই রাসায়নিক যৌগগুলো মানব মস্তিষ্কে প্রবেশ করলে তীব্র দৃষ্টিভ্রম এবং বাহ্যিক জগতের সাথে সংযোগের পরিবর্তন ঘটায়। হফম্যানের এই আবিষ্কার দেখায় যে প্রাচীন গ্রিসের গোপন দর্শনের পেছনে কাজ করছিল এক শক্তিশালী প্রাকৃতিক সাইকেডেলিক রাসায়ন।
ধ্রুপদী সাহিত্যের গবেষক জর্জ মাইলনাস (George Mylonas) এলেউসিসের আচারের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত দিক নিয়ে কাজ করেছেন (Mylonas, 1961)। মাইলনাস তার এলেউসিস অ্যান্ড দ্য এলেউসিনিয়ান মিস্ট্রিজ (Eleusis and the Eleusinian Mysteries) গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে শত শত বছর ধরে হাজার হাজার দীক্ষার্থী দাবি করেছিল তারা এলেউসিসের রাতে মৃত্যুর ভয় অতিক্রম করেছে। দীর্ঘ উপবাসের পর যখন এই রাসায়নিক নির্যাস মানুষের দেহে প্রবেশ করত, তখন দুর্বল ও সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত বিভ্রম তৈরি করত। সেই ঘোরলাগা অবস্থায় হঠাৎ উজ্জ্বল মশাল জ্বালিয়ে পুরোহিতরা যখন নাট্যরূপ উপস্থাপন করতেন, তখন অংশগ্রহণকারীরা সেটিকে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অলৌকিক দৃশ্য মনে করত। সংজ্ঞানাত্মক স্নায়ুবিজ্ঞান প্রমাণ করে যে অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং হ্যালুসিনোজেনের যৌথ প্রভাবে মানুষের স্মৃতিতে এমন তীব্র অনুভূতির ছাপ তৈরি হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
এলেউসিসের এই গোপন আচারের সামাজিক গুরুত্বও ছিল অপরিসীম। এথেন্সের শাসকেরা এই অনুষ্ঠানকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও সামাজিক সংহতি রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহার করত। দীক্ষার্থীদের একটি অভিন্ন মানসিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নিয়ে গিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য তৈরি করা হতো। পুরোহিতরা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংবেদনশীলতাকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রেখেছিলেন। ছত্রাকের জৈবিক বিষক্রিয়াকে একটি পবিত্র রূপান্তরের আখ্যান বানিয়ে সমাজকে নিয়ন্ত্রিত রাখা হতো। ফলে তথাকথিত এই রহস্যের পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্য ছিল না, ছিল মানুষের জৈবিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষার এক প্রাচীন সামাজিক নকশা।
ইউরেশীয় ও সাইবেরীয় শামানবাদে আমানিতা মাশরুম (Amanita Muscaria in Eurasian and Siberian Shamanism)
উত্তর এশিয়া এবং সাইবেরিয়ার বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলের আদিবাসী সমাজগুলোতে চেতনার পরিবর্তনের ইতিহাস নৃতাত্ত্বিক গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চুকচি, কোরিয়াক এবং তুঙ্গুস জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে যে এই অঞ্চলের যাযাবর মানুষেরা আমানিতা মাসকারিয়া নামক মাশরুমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নৃতত্ত্ববিদ ভালদেমার বোগোরাস (Waldemar Bogoras) তার ধ্রুপদী এথনোগ্রাফি দ্য চুকচি (The Chukchee)-তে এই অঞ্চলের মানুষের মাশরুম ব্যবহারের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন (Bogoras, 1909)। বোগোরাস বর্ণনা করেন যে চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার তাগিদে সাইবেরিয়ার বল্গা হরিণ শিকারীরা কীভাবে বার্চ গাছের নিচে জন্মানো এই রঙিন মাশরুম সংগ্রহ করে শুকিয়ে রাখত এবং শিকার বা দীর্ঘ যাত্রার আগে তা চিবিয়ে খেত।
সাইবেরিয়ার এই শামানিক রীতির মনস্তাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক দিক পর্যালোচনা করেছিলেন গবেষক মারিয়া চাপলিৎস্কা (Maria Czaplicka) (Czaplicka, 1914)। চাপলিৎস্কা তার প্রভাবশালী গ্রন্থ অ্যাবঅরিজিনাল সাইবেরিয়া (Aboriginal Siberia)-তে শামানদের উন্মাদনাময় আচরণের সাথে মাশরুমের বিষক্রিয়ার সম্পর্ক দেখান। তিনি স্থানীয় মানসিক অস্থিরতাকে সংজ্ঞায়িত করতে ‘আর্কটিক হিস্টিরিয়া বা মেরু অঞ্চলের মানসিক অস্থিরতা’ ধারণাটি ব্যবহার করেন। এই মাশরুমের প্রধান সক্রিয় উপাদান হলো ইবোটেনিক অ্যাসিড (ibotenic acid) এবং মাস্কিমল (muscimol)। এই উপাদানগুলো মানুষের মস্তিষ্কের গাবা রিসেপ্টরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বদলে দিয়ে শরীরে অস্বাভাবিক কম্পন, দৃষ্টিভ্রম এবং নিজের শরীরকে অস্বাভাবিক বড় মনে হওয়ার অনুভূতি তৈরি করে। চাপলিৎস্কার তথ্য স্পষ্ট করে দেয় যে শামানদের কথিত আত্মিক উড়াল কোনো অতিলৌকিক ঘটনা ছিল না, বরং স্নায়ুতন্ত্রে রাসায়নিক বিষক্রিয়ার ফলে তৈরি হওয়া বিভ্রম মাত্র।
সাইবেরীয় মাশরুম সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল মূত্র পুনর্ব্যবহারের প্রথা। বোগোরাসের মাঠপর্যায়ের বিবরণী থেকে জানা যায়, কোনো শামান বা প্রভাবশালী ব্যক্তি মাশরুম খাওয়ার পর সাধারণ লোকেরা তার মূত্র সংগ্রহ করে পান করত। চিকিৎসা নৃতত্ত্ব এবং প্রাণরসায়ন এই সামাজিক আচরণের পেছনের বৈজ্ঞানিক সত্য ব্যাখ্যা করেছে। মানবদেহে প্রবেশের পর ইবোটেনিক অ্যাসিড বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় মাস্কিমলে রূপান্তরিত হয়, যার একটি বড় অংশ শরীর থেকে অপরিবর্তিত অবস্থায় মূত্রের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। ফলে এই মূত্র পান করলে মাশরুমের পেটের পীড়াদায়ক উপাদানগুলো এড়িয়ে সরাসরি স্নায়বিক প্রভাবটি লাভ করা যেত। স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে ভেষজের স্বল্পতা দূর করার এটা ছিল এক প্রাচীন জৈব-প্রযুক্তি, যার পেছনে কোনো মহাজাগতিক রহস্য ছিল না।
শামানরা এই উদ্ভিজ্জ প্রভাবকে সমাজে নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখার প্রধান মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছিলেন। প্রতিকূল প্রকৃতির মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ যাযাবর মানুষ যখন দিকভ্রান্ত হতো, তখন শামানরা এই মাশরুম খেয়ে অচেতন হয়ে বিড়বিড় করতেন। সেই অর্থহীন প্রলাপগুলোকে গোত্রের মানুষ অদৃশ্য আত্মার নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করত। রাজনৈতিক নৃতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখা যায়, বল্গা হরিণের পাল কোথায় চরাতে হবে কিংবা অন্য গোত্রের সাথে যুদ্ধ হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তগুলো শামানরা এই রাসায়নিক আচ্ছন্নতার আড়ালে গ্রহণ করতেন। সুতরাং সাইবেরিয়ার এই সংস্কৃতি কোনো পবিত্র আধ্যাত্মিক পথ ছিল না, বরং তা ছিল প্রকৃতির কঠোরতার মুখে ভেষজ বিষের বিভ্রান্তিকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা আদিম সামাজিক নিয়ন্ত্রণের এক সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা।
প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় ও নিকট প্রাচ্যের ক্যানাবিস ও আফিম ঐতিহ্য (Cannabis and Opium Traditions in the Ancient Mediterranean and Near East)
প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং নিকট প্রাচ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো পরীক্ষা করলে দেখা যায় সেখানে আফিম ও ক্যানাবিসের মতো উপাদানের ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এই পদার্থগুলো প্রাচীন সমাজের উপশম এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। প্রত্নতত্ত্ববিদ এলিসা গুয়েরা-দোচে (Elisa Guerra-Doce) প্রাচীন বিশ্বে মনঃসক্রিয় উদ্ভিদের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ওপর এক বিস্তৃত গবেষণা পরিচালনা করেন (Guerra-Doce, 2015)। গুয়েরা-দোচে দেখান যে ব্রোঞ্জ যুগের ক্রিট, সাইপ্রাস এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পপি উদ্ভিদের চাষ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে করা হতো। ক্রিটের গাজি অঞ্চলে মাটি খুঁড়ে খ্রিস্টপূর্ব চৌদ্দ শতকের এক টেরাকোটা মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে, যার মাথার মুকুটে তিনটি চিরা আফিম পপির ফল যুক্ত রয়েছে। প্রত্নতত্ত্বের জগতে এটা তথাকথিত ‘পপি দেবী’ নামে পরিচিত।
প্রাচীন এই অঞ্চলে আফিমের ব্যবহার যে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসে আবদ্ধ ছিল না, বরং চিকিৎসাগত ও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে পরিচালিত হতো, তা প্রত্ন-নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় স্পষ্ট। গবেষক মার্ক মার্লিন (Mark Merlin) প্রাচীন বিশ্বের মাদক ব্যবহারের ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন (Merlin, 2003)। মার্লিন তার গবেষণায় উল্লেখ করেন যে ব্রোঞ্জ যুগের সাইপ্রাসে তৈরি বিশেষ ধরনের মাটির পাত্রগুলোর বাহ্যিক আকৃতি ছিল অবিকল উল্টো করে রাখা আফিম পপির ফলের মতো। রাসায়নিক পরীক্ষায় এসব পাত্রের গায়ে মরফিন (morphine) এবং কোডিন (codeine) অ্যালকালয়েডের অবশিষ্টাংশ শনাক্ত হয়েছে। প্রাচীন মন্দিরে আসা যন্ত্রণাকাতর মানুষদের এই উদ্ভিজ্জ নির্যাস খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হতো। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে ব্যথানাশক এই উপশমকে সাধারণ মানুষ ঈশ্বরের আরোগ্যকারী স্পর্শ মনে করে মন্দিরে প্রণামী দিত।
ইউরেশিয়ার স্তেপ অঞ্চল এবং কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূলে বসবাসকারী সিথিয়ান যাযাবরদের মধ্যেও ক্যানাবিস বা গাঁজার ব্যবহারের জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাচীন ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস লিখেছিলেন যে সিথিয়ানরা তাঁবুর ভেতরে উত্তপ্ত পাথরের ওপর গাঁজার বীজ ফেলে ধোঁয়া তৈরি করত এবং সেই ধোঁয়া গ্রহণ করে আনন্দ প্রকাশ করত। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকেরা রাশিয়ার পাজিরিক সমাধি থেকে তুষারাবৃত অবস্থায় কাঠের তৈরি তাঁবুর কাঠামো, ব্রোঞ্জের পাত্র এবং পোড়া গাঁজার বীজ অক্ষত উদ্ধার করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক এই প্রমাণ হেরোডোটাসের ঐতিহাসিক বর্ণনার বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। সিথিয়ানরা যুদ্ধের পর মানসিক অবসাদ দূর করতে এবং দলবদ্ধ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শোক প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে এই ধোঁয়াবান আয়োজন করত, যা ছিল তাদের যৌথ সামাজিক সংহতির অংশ।
নিকট প্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় এই ঐতিহ্যগুলোর পেছনে কোনো অতীন্দ্রিয় বাস্তবতা ছিল না, ছিল বস্তুগত জীবনের সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক চাহিদা। আধুনিক চেতনানাশক ও ব্যথানাশক ওষুধের অভাবে প্রাচীন মানুষ প্রাকৃতিক উদ্ভিদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। মন্দির এবং ধর্মীয় স্থানগুলোর পুরোহিতরা ভেষজের এই ফার্মাকোলজিক্যাল প্রভাবকে নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতার পরিচায়ক হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করতেন। উদ্ভিদের রাসায়নিক ক্রিয়ায় পাওয়া শারীরিক স্বস্তিকে দেবতার কৃপা হিসেবে প্রচার করা হতো। ফলে এই বনস্পতিগুলো সাধারণ বিজ্ঞান হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি, বরং পুরোহিতদের ক্ষমতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখার একটি লাভজনক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
চেতনার প্রাচীন ব্যবহার থেকে আধুনিক উপলব্ধির ব্যবচ্ছেদ (Dissecting Ancient Consciousness Alteration from a Modern Perspective)
প্রাচীন যুগের এই বিচিত্র উদ্ভিজ্জ আচার ও তথাকথিত আত্মিক রূপান্তরের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ব্যবচ্ছেদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কিছু গবেষক এই ধরনের ভেষজ অভিজ্ঞতাকে ধর্মতাত্ত্বিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। গবেষক কার্ল রাক এবং তার সহযোগীরা ১৯৭৯ সালে একটি নতুন শব্দের প্রস্তাব করেন, যার নাম ‘এনথিওজেন বা ভেতরের ঈশ্বরকে জাগ্রতকারী’ (Ruck et al., 1979)। তারা দাবি করেছিলেন যে এই উদ্ভিদগুলো সেবন করলে মানুষের ভেতরের ঐশ্বরিক সত্তা জাগ্রত হয়। নৃতত্ত্ব এবং সংজ্ঞানাত্মক স্নায়ুবিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠ অগ্রগতি প্রমাণ করে যে এই পরিভাষাটি বিজ্ঞানসম্মত নয়, বরং এটি এক ধরনের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণবিহীন ধারণার পুনরুৎপাদন। উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান মানুষের নিউরোট্রান্সমিটারের সাথে যুক্ত হয়ে যে জৈবিক বিভ্রান্তি ঘটায়, তাকে ঐশ্বরিক মিলন আখ্যা দেওয়া বিজ্ঞানের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হতে পারে না।
নৃ-উদ্ভিদবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান রাটশ (Christian Rätsch) তার আকর গ্রন্থ দি এনসাইক্লোপিডিয়া অব সাইকোঅ্যাকটিভ প্ল্যান্টস (The Encyclopedia of Psychoactive Plants)-এ প্রাচীন ও আধুনিক বিশ্বে ব্যবহৃত ভেষজগুলোর ওপর আলোকপাত করেছেন (Rätsch, 2005)। রাটশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরে যে মানব মনের চেতনা কোনো বায়বীয় বা ভৌতিক ব্যাপার নয়, বরং এটা মস্তিষ্কের জটিল জৈব রাসায়নিক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। ডোপামিন, সেরোটোনিন কিংবা গাবার মতো নিউরোট্রান্সমিটারের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতিতে যখন উদ্ভিজ্জ অ্যালকালয়েড প্রবেশ করে কৃত্রিম উদ্দীপনা তৈরি করে, তখনই মানুষ দৃষ্টি ও শ্রবণের বিভ্রান্তি অনুভব করে। এই সামগ্রিক অনুভূতি নিউরনের বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক যোগাযোগের একটি সাময়িক বিঘ্ন মাত্র, যার সাথে কোনো মহাজাগতিক শক্তির অস্তিত্বের সম্পর্ক নেই।
প্রাচীন সমাজগুলোতে এই উদ্ভিজ্জ প্রভাবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ক্ষমতা কাঠামোকে নৃবিজ্ঞানীরা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের এক প্রাচীন কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেন। বৈদিক যাগযজ্ঞ থেকে শুরু করে এলেউসিসের গোপন আস্তানায় সর্বত্র একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল – সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করা। ভেষজের সঠিক সংগ্রহ ও প্রয়োগপদ্ধতি সমাজপতিরা কঠোর গোপনীয়তায় আবদ্ধ রাখতেন। সাধারণ মানুষের কাছে ভেষজের প্রভাবকে উপস্থাপন করা হতো অমোচনীয় ধর্মীয় বিধান হিসেবে। এই সামাজিক ব্যবস্থার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল সমাজে উৎপাদন ও উদ্বৃত্তের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখা। পুরোহিতরা খুব ভালো করেই জানতেন যে উদ্ভিদের এই প্রভাবকে যদি সাধারণ ভেষজ প্রতিক্রিয়া হিসেবে মানুষ জেনে যায়, তবে ধর্মীয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের উপযোগিতা হারিয়ে যাবে।
সামগ্রিক আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সোম, হাওমা, কাইকিয়ন বা আমানিতা মাশরুম কোনোটিই অতিপ্রাকৃতিক যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। এগুলো ছিল প্রকৃতির সাধারণ কিছু জৈব রাসায়নিক উপাদান, যা মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে তীব্র সংবেদনশীলতা তৈরি করত। প্রাচীন মানুষ বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণ বোঝার অক্ষমতার কারণে এই প্রাকৃতিক প্রভাবকে দেবতার আশীর্বাদ বা অভিশাপ বলে ভুল ব্যাখ্যা করেছিল। আধুনিক বস্তুবাদী নৃতত্ত্ব ও স্নায়ুবিজ্ঞানের কাজ হলো সেই ভুল বিশ্বাসের আবরণ ভেঙে দেওয়া। প্রাচীন ঐতিহ্যের ভেতরে কোনো অলৌকিক তাৎপর্য খোঁজার বদলে সেগুলোকে মানুষের জৈবিক সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতা এবং সামাজিক শোষণের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে পাঠ করাই একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি।
বিশ্বধর্মে মাদকের ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা ও নৈতিকতা (Drug Use, Prohibition and Morality in World Religions): হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলামের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
হিন্দুধর্মে মাদকের ব্যবহার ও বর্ণের অনুশাসন (Drug Use and Caste Codes in Hinduism)
প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় দর্শনে মাদক ও নেশাজাতীয় পানীয়ের মূল্যায়ন সরলরৈখিক ছিল না। বৈদিক যাগযজ্ঞের বাইরে যখন শাস্ত্রীয় স্মৃতিসাহিত্যের যুগ শুরু হয়, তখন নেশার ওপর বিধিনিষেধকে সরাসরি সমাজ কাঠামোর সাথে যুক্ত করা হয়। প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ প্যাট্রিক অলিভেল (Patrick Olivelle) তার সম্পাদিত ও অনূদিত গ্রন্থ মনুস কোড অব ল (Manu’s Code of Law)-এ মনুস্মৃতির সামাজিক বিধানগুলোর বিশদ অনুবাদ ও ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Olivelle, 2005)। অলিভেল দেখান যে মনুর বিধানে পানীয়কে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল, যেমন খাদ্যশস্য থেকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি সুরা, গুড় বা মধু থেকে তৈরি মাধ্বী এবং ফুল বা ফল থেকে তৈরি মৈরেয়। এই পানীয়গুলোর ব্যবহার সবার জন্য সমান পাপ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো না, বরং ব্যক্তির জন্মসূত্রে নির্ধারিত জাতিবর্ণের ওপর ভিত্তি করে শাস্তির তারতম্য নির্ধারিত হতো।
ধর্মীয় আইন প্রণেতারা উচ্চবর্ণের ওপর কঠোর মানসিক নিয়ন্ত্রণের অনুশাসন চাপিয়ে দিয়েছিলেন। সমাজতাত্ত্বিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ ব্রায়ান কে. স্মিথ (Brian K. Smith) তার গবেষণাগ্রন্থ ক্লাসিফাইং দ্য ইউনিভার্স (Classifying the Universe)-এ প্রাচীন ভারতের বর্ণব্যবস্থা ও সামাজিক বিভাজনের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন (Smith, 1994)। স্মিথ দেখান যে ব্রাহ্মণ বর্ণের জন্য সুরাপান ছিল অন্যতম গুরুতর পাপ বা ‘মহাপাতক’। বিধান ছিল, কোনো ব্রাহ্মণ স্বেচ্ছায় সুরাপান করলে তাকে ফুটন্ত তরল পান করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, যার নিশ্চিত পরিণতি ছিল মৃত্যু। তবে একই সাথে ক্ষত্রিয় বা যোদ্ধাশ্রেণির জন্য সুরা পানের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ অনেকটাই শিথিল ছিল, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে ভয় দূর করা ও উদ্দীপনা বজায় রাখার জন্য তাদের ক্ষেত্রে একে সামাজিক শৃঙ্খলার বরখেলাপ বলে ভাবা হতো না। এর মানে দাঁড়ায়, মাদক সেবনের নৈতিকতা কোনো সার্বজনীন মানবতার নিয়মে নয়, সমাজের স্তরবিন্যাস টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে নির্মিত হয়েছিল।
ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনের সমান্তরালে হিন্দু ঐতিহ্যের ভেতরেই আবার শিবপূজা ও তান্ত্রিক ধারার এক শক্তিশালী বিপরীত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। শৈব ঐতিহ্যে গাঁজা ও ভাঙ সেবনের একটি বিশিষ্ট স্থান তৈরি হয়, যেখানে উদ্ভিদটিকে দেবতা শিবের সাথে যুক্ত এক ভেষজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায়, সমাজের প্রচলিত গোঁড়ামির বাইরে থাকা তান্ত্রিক সাধকেরা এই ভেষজ সেবনকে সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ এবং আত্মিক উপলব্ধির বিকল্প উপায় হিসেবে ব্যবহার করতেন। তবে শাস্ত্রীয় অনুশাসন এই লোকায়ত ব্যবহারকে কখনো পুরো সমাজের জন্য আদর্শ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ভেষজ গ্রহণের এই আচরণকে এক বিশেষ ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল যাতে তা সমাজের বৃহত্তর উৎপাদনশীল কৃষক বা শ্রমজীবী শ্রেণির স্বাভাবিক দায়িত্বকে ব্যাহত না করে।
প্রাচীন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাশাস্ত্রে ক্যানাবিস এবং অন্যান্য উপাদানের প্রয়োগ ছিল সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ও পথ্যভিত্তিক। চরক ও সুশ্রুত সংহিতায় বিভিন্ন উদ্ভিদের ব্যথা উপশমকারী, পাচন সহায়ক এবং নিদ্রাকর্ষক গুণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যবহার ছিল চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রিত মাত্রার ওপর নির্ভরশীল। শাস্ত্রকাররা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করেছিলেন যে অবাধ মাদকাসক্তি সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারিবারিক উৎপাদন কাঠামোর ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারে। ফলস্বরূপ, হিন্দু ঐতিহ্যে মাদকের প্রতি মনোভাব হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক জটিল আপস। একদিকে উচ্চবর্ণের সামাজিক মর্যাদা ও তথাকথিত বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য কঠোর মদ্যবিরোধিতার প্রচার চলত, অন্যদিকে সামাজিক উৎসব ও ধর্মীয় উপদলে ভেষজের সীমিত উপস্থিতি সহ্য করে নেওয়া হতো।
বৌদ্ধ দর্শনে পঞ্চশীল ও সচেতনতার নীতি (The Five Precepts and Mindful Ethics in Buddhist Philosophy)
বৌদ্ধ ধর্ম দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষের মন এবং তার সচেতনতার প্রশ্ন। বুদ্ধের নির্দেশিত নৈতিক আচরণের মৌলিক ভিত্তি হলো গৃহী ও সন্ন্যাসী উভয়ের জন্য নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি। বৌদ্ধ নীতিশাস্ত্রের গবেষক ডেমিয়েন কিওন (Damien Keown) তার বই দ্য নেচার অব বুদ্ধিস্ট এথিকস (The Nature of Buddhist Ethics)-এ বৌদ্ধ দর্শনের নৈতিক কাঠামো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Keown, 2001)। কিওন দেখান যে বৌদ্ধদের দৈনন্দিন আচরণের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত পঞ্চশীলের পঞ্চম নিয়মটি সরাসরি নেশাজাতীয় পানীয় ও পদার্থ বর্জনের সাথে যুক্ত। পালি ভাষায় এই শীলটিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এমন এক অঙ্গীকার হিসেবে, যা মানুষকে সুরা ও মৈরেয় পানের মাধ্যমে তৈরি হওয়া অসচেতনতা ও প্রমাদ থেকে দূরে রাখে।
বৌদ্ধ ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো মনের মোহ দূর করে জগতের বাস্তবতাকে নির্লিপ্তভাবে পর্যবেক্ষণ করা, যাকে বলা হয় প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞা অর্জনের প্রধান শর্ত হলো সচেতনতা (mindfulness) বা স্মৃতি রক্ষা করা। ইতিহাসবিদ ও ভারততত্ত্ববিদ রিচার্ড গমব্রিচ (Richard Gombrich) তার ধ্রুপদী গবেষণা থেরবাদ বুদ্ধিজম (Theravada Buddhism)-এ প্রাচীন বৌদ্ধ সমাজের কাঠামো আলোচনা করেছেন (Gombrich, 2006)। গমব্রিচ উল্লেখ করেন যে মাদকের ব্যবহার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করে এবং মনের ভেতর ‘প্রমাদ বা আত্মবিস্মৃতি’ তৈরি করে। একজন মানুষ মাতাল অবস্থায় পঞ্চশীলের বাকি চারটি নিয়ম – প্রাণী হত্যা না করা, চুরি না করা, মিথ্যা না বলা ও ব্যভিচার না করা – খুব সহজেই ভেঙে ফেলতে পারে। এ কারণে বৌদ্ধ নীতিশাস্ত্রে মাদক গ্রহণকে কোনো ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না, বরং সংজ্ঞানাত্মক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এক ক্ষতিকর আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সাধারণ গৃহীদের জন্য মাদক বর্জনের এই নিয়ম ছিল পরামর্শমূলক নৈতিকতা, কিন্তু সংঘের সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে এটা ছিল অলঙ্ঘনীয় আইন। বিনয় পিটকে সন্ন্যাসীদের জন্য মাদক গ্রহণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কোনো ভিক্ষু যদি সামান্য পরিমাণ সুরা গ্রহণ করতেন, তবে তাকে সংঘের সামনে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। তবে পরবর্তীতে গড়ে ওঠা বজ্রযান ধারা ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে এই অনুশাসনের কিছু ব্যতিক্রমী রূপান্তর ঘটেছিল। তান্ত্রিক আচারগুলোতে প্রতীকী অর্থে পঞ্চামৃত বা মদ্যের ব্যবহার দেখা যায়, যাকে তারা মনের সংস্কার ভাঙার একটি অনুশীলন বলে দাবি করত। তবে অধিকাংশ মূলধারার থেরবাদী দার্শনিক এই তান্ত্রিক প্রয়োগকে সার্বজনীন পথের অংশ বলে মানতেন না এবং একে সাধারণ অনুশাসন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হিসেবে বিবেচনা করতেন।
বৌদ্ধ দর্শনের এই বিশ্লেষণ সমাজের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথেও গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তৎকালীন উত্তর ভারতে যখন দ্রুত নগরায়ণ ও বাণিজ্যিক শ্রেণির বিকাশ ঘটছিল, তখন পরিবার এবং ব্যক্তিগত সম্পদের সুরক্ষার জন্য স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকের প্রয়োজন ছিল। বুদ্ধের বহু উপদেশে দেখা যায় তিনি মাতলামিকে অর্থ অপচয়, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক দুর্নামের কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। ধর্মীয় কোনো অলৌকিক ভয় দেখানোর পরিবর্তে বুদ্ধ জোর দিয়েছিলেন বাস্তব পার্থিব ক্ষতির ওপর। এ কারণে বৌদ্ধ নৈতিকতায় মাদক নিষেধাজ্ঞা কোনো আকাশ থেকে আসা আদেশ নয়, বরং সমাজকে সুশৃঙ্খল ও উৎপাদনশীল রাখার এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে কাজ করেছিল।
ইহুদি ধর্মগ্রন্থে দ্রাক্ষারস, আচার ও হালাখা বিধান (Wine, Rituals, and Halakhic Codes in Judaism)
প্রাচীন সেমিটিক ধর্মীয় ঐতিহ্যে উদ্ভিজ্জ মদ বা দ্রাক্ষারসের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক এবং অবিচ্ছেদ্য। হিব্রু বাইবেল বা তানাখে দ্রাক্ষারসের উল্লেখ পাওয়া যায় অসংখ্যবার। ইহুদি ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে মদকে পুরোপুরি অপবিত্র বা ক্ষতিকর সৃষ্টি বলে বর্জন করা হয়নি, বরং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইহুদি আইন ও ঐতিহ্যের গবেষক বি. ব্যারি লেভি (B. Barry Levy) তার বই ড্রিঙ্ক অ্যান্ড বি মেরি: ওয়াইন অ্যান্ড অ্যালকোহল ইন জিউইশ ট্র্যাডিশন (Drink and Be Merry: Wine and Alcohol in Jewish Tradition)-এ বিষয়টি পর্যালোচনা করেছেন (Levy, 1990)। লেভি দেখান যে বাইবেলের আখ্যান অনুযায়ী মহাপ্লাবনের পর নোয়া প্রথম একটি দ্রাক্ষাক্ষেত রোপণ করেছিলেন এবং দ্রাক্ষারস পান করে মাতাল হয়ে বিবস্ত্র অবস্থায় তাঁবুতে পড়ে ছিলেন। এই কাহিনী প্রাচীন ইহুদি সমাজে মদের আনন্দদায়ক শক্তি এবং অতিরিক্ত পানের বিপদ – উভয় দিকের প্রতিই ইঙ্গিত করে।
ইহুদি ধর্মীয় আচারে দ্রাক্ষারসের একটি বাধ্যতামূলক ও আনুষ্ঠানিক স্থান রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে বিশ্রামবার বা সাবাথ শুরু করার সময় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে ‘কিদুশ বা পবিত্রকরণ’ প্রার্থনার মাধ্যমে এক পাত্র দ্রাক্ষারস পান করার রীতি রয়েছে। তালমুদের ভাষ্যকারেরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে দ্রাক্ষারসের মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করা সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর সমতুল্য। তবে এই পানের উদ্দেশ্য কখনোই বিশৃঙ্খল মাতলামি তৈরি করা ছিল না, বরং পরিমিতি রক্ষা করাই ছিল মূল শিক্ষা। হিতোপদেশ বা প্রবাদগ্রন্থে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে অতিরিক্ত সুরাপান মানুষের ধনসম্পদ নষ্ট করে এবং ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে। ইহুদি নীতিশাস্ত্র পরিমিত পানকে স্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিত আসক্তিকে অবক্ষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।
ইহুদি ধর্মীয় অনুশাসনের ইতিহাসে একমাত্র ব্যতিক্রমী উৎসব হলো পুরিম। তালমুদের এক বিশেষ বিধানে বলা হয়েছে যে পুরিমের দিনে একজন মানুষকে এতটা পান করার অবকাশ দেওয়া হয় যাতে সে শত্রুর অভিশাপ এবং বন্ধুর আশীর্বাদের মধ্যকার পার্থক্য ভুলে যায়। ইহুদি আইন বা হালাখার পণ্ডিতেরা এই আপাত অদ্ভুত বিধানের নানা সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। অনেকে যুক্তি দিয়েছেন যে এটা কেবল রূপক অর্থে বলা হয়েছে, আবার অনেকে একে সামাজিক চাপমুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক দিন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে এই অনিয়ন্ত্রিত পানের সামাজিক অনুমোদন আসলে সারাবছর ধরে চলা কঠোর ধর্মীয় শৃঙ্খলার মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করার একটি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত।
পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যাভ্যাসের কশরুত বা কোশার নিয়মাবলি দ্রাক্ষারস উৎপাদনের ক্ষেত্রেও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হতো। প্রাচীন যুগে বহুঈশ্বরবাদীদের প্রতিমা পূজায় ব্যবহৃত দ্রাক্ষারসের সাথে যাতে কোনো মিশ্রণ না ঘটে, সেজন্য ইহুদিদের জন্য শুধুমাত্র নিজেদের তত্ত্বাবধানে তৈরি দ্রাক্ষারস পানের বিধান দেওয়া হয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিকরা এই বিধিনিষেধকে একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয় ও সীমানা রক্ষার সামাজিক নকশা হিসেবে দেখেন। এর মানে দাঁড়ায়, দ্রাক্ষারসের নিয়ন্ত্রণ কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বিষয় ছিল না, বরং বহিরাগত জনগোষ্ঠীর প্রভাব থেকে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা এবং ধর্মীয় ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
খ্রিষ্টধর্মের ধর্মতত্ত্ব: ইউক্যারিস্ট বনাম মদ্যবিরোধ আন্দোলন (Christian Theology: The Eucharist versus the Temperance Movement)
খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে দ্রাক্ষারসের এক গভীর আচারগত রূপান্তর। নতুন নিয়ম বা নিউ টেস্টামেন্টের বর্ণনায় দেখা যায় যিশুর প্রথম অলৌকিক কাজ ছিল কানার বিবাহ উৎসবে জলকে দ্রাক্ষারসে পরিণত করা। পরবর্তীকালে শেষ নৈশভোজে তিনি রুটি ও দ্রাক্ষারস ভাগ করে দিয়ে সেগুলোকে নিজের রক্ত ও মাংসের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। ঐতিহাসিক টমাস ব্রেনান (Thomas Brennan) তার গবেষণাধর্মী বই পাবলিক ড্রিঙ্কিং অ্যান্ড পপুলার কালচার (Public Drinking and Popular Culture)-এ ইউরোপীয় জনসংস্কৃতিতে অ্যালকোহলের স্থান পর্যালোচনা করেছেন (Brennan, 1988)। ব্রেনান দেখান যে মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক চার্চে এই আচারটি ‘ইউক্যারিস্ট বা প্রভুর ভোজ’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। চার্চ মনে করত যে ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে দ্রাক্ষারস যিশুর রক্তে রূপান্তরিত হয়, ফলে মদ্যজাতীয় এই পানীয়ের প্রতি প্রাথমিক খ্রিষ্টধর্মের কোনো নৈতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
মধ্যযুগে ইউরোপের মঠগুলো ছিল উন্নত মানের মদ ও বিয়ার উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। বিভিন্ন সন্ন্যাসী সম্প্রদায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে উন্নত মানের ওয়াইন এবং বিয়ার তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন। পানীয় জলের অভাব এবং দূষিত জলের কারণে রোগবালাই ছড়ানোর যুগে হালকা অ্যালকোহলযুক্ত এই পানীয় ছিল মানুষের দৈনন্দিন পুষ্টি ও তরল গ্রহণের প্রধান উৎস। খ্রিষ্টধর্মের প্রাথমিক যুগের অন্যতম প্রচারক ও ধর্মতাত্ত্বিক পল (Paul the Apostle) তার চিঠিতে পরিমিত দ্রাক্ষারস পানের পরামর্শ দিয়েছিলেন শারীরিক সুস্থতার জন্য, তবে সতর্ক করেছিলেন মাতাল না হওয়ার বিষয়ে। খ্রিষ্টীয় নীতিশাস্ত্র মাতলামিকে সাতটি মারাত্মক পাপের একটি, অর্থাৎ পেটুকপনা বা অসংযমের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ফলে পরিমিত পানকে আশীর্বাদ এবং অতিরিক্ত নেশাকে আত্মিক পতন হিসেবে চিত্রিত করার মধ্য দিয়ে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা হতো।
উনবিংশ শতাব্দীতে এসে এই ঐতিহ্যবাহী মনোভাবের এক আমূল রূপান্তর ঘটে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে। শিল্প বিপ্লবের ফলে যখন কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের সস্তা অ্যালকোহল আসক্তি মারাত্মক রূপ নেয়, তখন প্রটেস্ট্যান্ট চার্চগুলোর ভেতর থেকে জন্ম নেয় মদ্যবিরোধ আন্দোলন (Temperance Movement)। ইতিহাসবিদ নরম্যান এইচ. ক্লার্ক (Norman H. Clark) তার বই ডেলিভার আস ফ্রম ইভিল (Deliver Us from Evil)-এ এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন (Clark, 1976)। ক্লার্ক দেখান যে ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টানরা মদকে সমস্ত সামাজিক পাপ, পারিবারিক সহিংসতা এবং দারিদ্র্যের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা দাবি করতে শুরু করে যে যিশু যে দ্রাক্ষারস পান করেছিলেন তা ছিল ফারমেন্টেশনহীন আঙুরের মিষ্টি রস। চার্চের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে তারা গির্জার বেদিতে ওয়াইনের বদলে পাস্তুরিত আঙুরের রস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে তোলে।
এই মদ্যবিরোধ আন্দোলন কেবল চার্চের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটা পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন নিয়ন্ত্রণের এক উন্মাদনায়। ধর্মীয় নেতারা রাজনৈতিক শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে ১৯২০ সালে আমেরিকায় জাতীয় মাদক নিষেধাজ্ঞা আইন পাস করায়। ক্লার্কের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে খ্রিষ্টান নীতিবাদীরা বিশ্বাস করত আইনের মাধ্যমে মদ নিষিদ্ধ করলেই সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে এর ফলে জন্ম নিয়েছিল ভয়াবহ কালোবাজারি, মাফিয়া চক্র এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় কীভাবে একটি ধর্মীয় দর্শন নিজের প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে সরে এসে কৃত্রিম নৈতিক বিশুদ্ধতার নামে আধুনিক রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেছিল এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে খামর ও নেশাদ্রব্যের বিধিনিষেধ (Khamr and the Jurisprudence of Intoxicants in Islamic Law)
ইসলামি ঐতিহ্য ও আইনের ইতিহাসে নেশাজাতীয় দ্রব্যের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে, তা অন্যান্য বিশ্বধর্মের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কঠোর ও সুস্পষ্ট। কুরআনের আয়াতে মদ্যপান নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটেনি, বরং কয়েক ধাপে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছিল। গবেষক ক্যাথরিন কুয়েনি (Kathryn Kueny) তার বই দ্য রেটোরিক অব সোব্রাইটি (The Rhetoric of Sobriety)-এ প্রাথমিক ইসলামে মদ্যপানের ধারণাগত রূপান্তর বিশদভাবে দেখিয়েছেন (Kueny, 2001)। কুয়েনি উল্লেখ করেন যে প্রথমদিকে বলা হয়েছিল মদের মধ্যে উপকার ও ক্ষতি দুটোই আছে কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এরপর মাতাল অবস্থায় নামাজে দাঁড়াতে নিষেধ করা হয় এবং সবশেষে মদকে পুরোপুরি বর্জনীয় অপবিত্র কাজ বলে ঘোষণা করা হয়। এই পানীয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল ‘খামর’ শব্দ দিয়ে, যার মূল অর্থ যা মানব বুদ্ধিকে ঢেকে ফেলে বা আচ্ছন্ন করে।
প্রখ্যাত আইনতাত্ত্বিক ওয়ায়েল বি. হাল্লাক (Wael B. Hallaq) তার ক্লাসিক্যাল গবেষণাগ্রন্থ আ হিস্ট্রি অব ইসলামিক লিগ্যাল থিওরিজ (A History of Islamic Legal Theories)-এ ইসলামি আইনশাস্ত্রের পদ্ধতিগত বিকাশ ব্যাখ্যা করেছেন (Hallaq, 1997)। হাল্লাক দেখান কীভাবে মুসলিম আইনবিদেরা পদ্ধতিগত অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নতুন নতুন মাদকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, যাকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় কিয়াস (analogical reasoning)। ধর্মীয় সূত্রে বলা হয়েছিল যে প্রতিটি নেশাজাতীয় বস্তুই খামরের সমতুল্য, এবং যা বেশি পরিমাণে খেলে নেশা হয় তার সামান্য পরিমাণ সেবনও নিষিদ্ধ। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মাযহাবের পণ্ডিতেরা কেবল আঙুর বা খেজুরের মদ নয়, বরং শস্য থেকে তৈরি অন্যান্য অ্যালকোহলজাতীয় পানীয়ের ওপরেও নিষেধাজ্ঞার পরিধি বিস্তৃত করেন।
মধ্যযুগে ইসলামি বিশ্বে যখন নতুন মনঃসক্রিয় পদার্থের আবির্ভাব ঘটে, বিশেষ করে আফিম ও হাশিশ, তখন আইনশাস্ত্রে নতুন আইনি বিতর্কের সূচনা হয়। ইতিহাসবিদ ফ্রাঞ্জ রোজেনথাল (Franz Rosenthal) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য হার্ব: হাশিশ ভার্সেস মেডিভাল মুসলিম সোসাইটি (The Herb: Hashish versus Medieval Muslim Society)-এ এই ঐতিহাসিক সংঘাত নথিভুক্ত করেছেন (Rosenthal, 1971)। রোজেনথাল দেখান যে ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে সুফি সাধকদের একটি অংশ যখন ধ্যানের সহায়ক হিসেবে হাশিশ সেবন শুরু করে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিত সমাজ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শাস্ত্রীয় পণ্ডিতেরা যুক্তি দেন যে যদিও ধর্মগ্রন্থে সরাসরি হাশিশের নাম নেই, তবুও এর বুদ্ধিভ্রষ্টকারী বৈশিষ্ট্যের কারণে এটা খামরের মতোই নিষিদ্ধ। রোজেনথালের গবেষণা প্রমাণ করে যে এই নিষেধাজ্ঞা কেবল নৈতিক ছিল না, বরং সুফিদের বিকল্প সম্প্রদায় ও তাদের প্রভাবকে খর্ব করে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি প্রয়াস ছিল।
অপরাধ ও শাস্তির ক্ষেত্রে ইসলামি আইনে মদ্যপানকে একটি নির্দিষ্ট দণ্ডনীয় অপরাধ বা হদ (fixed punishment) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। মদ্যপায়ীর জন্য চাবুকের শাস্তির বিধান প্রয়োগের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল রাষ্ট্রের বিচারক এবং সামাজিক শৃঙ্খলা তদারককারী কর্মকর্তাদের ওপর। আইনজ্ঞরা মাতলামিকে দেখতেন সামাজিক সংহতি বিনষ্টকারী এবং ধর্মীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে। আধুনিক মুসলিম বিশ্বের বেশ কিছু রাষ্ট্রে এই ঐতিহাসিক আইনি কাঠামোর সরাসরি প্রয়োগ দেখা যায়। কিছু দেশে প্রাচীন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে আজও অ্যালকোহল ও মাদকের জন্য কঠোর শারীরিক শাস্তি ও কারাদণ্ড কার্যকর রয়েছে। ফলে ইসলামের মাদকনীতি কোনো বিমূর্ত উপদেশ নয়, বরং ব্যক্তির আচরণ ও রাষ্ট্রের আনুগত্যকে সুনির্দিষ্ট অনুশাসনে বাঁধার একটি আইনি কাঠামো।
ধর্মীয় নৈতিকতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক রাষ্ট্রের রূপান্তর (Religious Morality, Social Control and the Transformation of Modern States)
বিশ্বধর্মগুলোর এই তুলনামূলক পাঠ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মাদকের ব্যবহার বা নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নটি কখনো নিছক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের কোনো নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত ছিল না। এটা ছিল মানুষের শরীর ও সামাজিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম। সমাজবিজ্ঞানী ব্রায়ান এস. টার্নার (Bryan S. Turner) তার মৌলিক গ্রন্থ দ্য বডি অ্যান্ড সোসাইটি (The Body and Society)-এ মানবদেহের ওপর ধর্ম ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা তুলে ধরেছেন (Turner, 1984)। টার্নার যুক্তি দেন যে প্রতিটি সংগঠিত ধর্মই মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তির ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মানুষের ইন্দ্রিয় এবং চেতনার স্বাধীন বিচরণকে তারা সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি মনে করত। যে মানুষ নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাকে কোনো অর্থনৈতিক দায়িত্বে বা রাষ্ট্রীয় আনুগত্যে শৃঙ্খলিত করা কঠিন। এ কারণে ধর্মগুলো চেতনার রূপান্তরকারী বস্তুর অবাধ ব্যবহারকে নৈতিক স্খলনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
ধর্মীয় এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কীভাবে সমাজকে একটি আরোপিত বিশ্বাসের ঘেরাটোপে আটকে রাখত, তা আলোচনা করেছেন সমাজতাত্ত্বিক পিটার বার্গার (Peter Berger) (Berger, 1967)। বার্গার তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য স্যাক্রেড ক্যানোপি (The Sacred Canopy)-তে ধর্মকে মানুষের তৈরি এক সামাজিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। বার্গারের মতে, সমাজ যখন নির্দিষ্ট কিছু পদার্থের ব্যবহারকে অপবিত্র বা নিষিদ্ধ বলে দাগিয়ে দেয়, তখন তারা মূলত সমাজের নিজস্ব সামাজিক সীমানা চিহ্নিত করে। হিন্দুধর্মে জাতপাতের বিশুদ্ধতা রক্ষা, ইহুদিধর্মে খাদ্যের পবিত্রতা বিধান, কিংবা ইসলামে বৈধ-অবৈধের বিভাজন – সবকিছুই ছিল এই প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা পাহারার অংশ। এই কাঠামো ব্যক্তিকে সর্বদা মনে করিয়ে দিত যে নির্ধারিত নিয়ম ভাঙলে সমাজের সদস্যপদ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের আবির্ভাবের পর প্রাচীন এই ধর্মীয় অনুশাসনগুলো সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, বরং তারা ধর্মনিরপেক্ষ আইনের ভাষা ধারণ করেছে। মনোবিজ্ঞানী ও সামাজিক সমালোচক টমাস জাস (Thomas Szasz) তার গবেষণাগ্রন্থ সেরিমোনিয়াল কেমিস্ট্রি (Ceremonial Chemistry)-তে এই রূপান্তরের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন (Szasz, 1974)। জাস প্রমাণ করেন যে অতীতে ধর্মীয় আদালত যেভাবে ধর্মদ্রোহীদের দমন করত, আধুনিক রাষ্ট্র চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নিরাপত্তার অজুহাতে মাদক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ঠিক একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করছে। অতীতের ‘পাপ’ শব্দটি আধুনিক যুগে রূপান্তরিত হয়েছে ‘আসক্তি’ এবং ‘অপরাধ’ শব্দে। কিন্তু এর ভেতরের অন্তর্নিহিত কর্তৃত্ববাদী কাঠামোটি একই রয়ে গেছে। রাষ্ট্র নিজেকে পরম নৈতিক অভিভাবক ঘোষণা করে নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগকে বেআইনি ঘোষণা করছে এবং শাস্তি কার্যকর করছে।
সামগ্রিক বিচারে দেখা যায়, বিশ্বধর্মগুলোর নৈতিক বিধান কোনো শাশ্বত মহাজাগতিক আদেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এগুলো বিভিন্ন যুগে সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংহতি এবং পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর প্রয়োজনে নির্মিত হয়েছে। যেখানে মদ্যপান বা ভেষজের ব্যবহার সমাজের অভিজাতদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অনুকূলে ছিল, সেখানে তাকে ধর্মীয় অনুমোদন বা উৎসবের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; আর যেখানে তা শ্রম উৎপাদনশীলতা বা রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে তাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আধুনিক মুক্তমনা ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দাবি হলো মাদকের এই ধর্মীয় ও নৈতিক কুয়াশা দূর করা। রাসায়নিক উপাদানের প্রকৃত প্রভাবকে অন্ধ পাপবোধের চশমা দিয়ে না দেখে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান, যুক্তি এবং জনস্বাস্থ্যের মানদণ্ডে বিচার করাই একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত পথ।
মরমিবাদ, শামানবাদ ও আধ্যাত্মিক চর্চায় মাদক (Mysticism, Shamanism and Psychoactive Practices): সুফিবাদ, তন্ত্র, আদিবাসী আচার ও চেতনাবদলের অভিজ্ঞতা
সুফি ঐতিহ্যে হাশিশ ও বিচ্যুত দরবেশ সম্প্রদায় (Hashish and Antinomian Dervish Orders in Sufi Tradition)
মধ্যযুগীয় ইসলামি সমাজের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মরমীবাদের বিকাশ এক বিচিত্র রূপ ধারণ করেছিল। মূলধারার শাস্ত্রীয় অনুশাসনের বাইরে কিছু প্রান্তিক দরবেশ সম্প্রদায় আত্মিক মুক্তির অন্বেষণে প্রচলিত সামাজিক বিধিনিষেধ ভেঙে ফেলার পথ বেছে নিয়েছিল। ইতিহাসবিদ আহমেত টি. কারামুস্তফা (Ahmet T. Karamustafa) তার বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ গডস আনরুলি ফ্রেন্ডস (God’s Unruly Friends)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে কলন্দরিয়া, হায়দারিয়া এবং আবদালান-ই রুমের মতো বিচ্যুত দরবেশ গোষ্ঠীগুলো গড়ে উঠেছিল (Karamustafa, 1994)। এই গোষ্ঠীগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচলিত শরিয়া আইনের প্রতি প্রকাশ্য উদাসীনতা এবং সমাজস্বীকৃত ভদ্রতার মুখোশ খুলে ফেলার প্রবণতা, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় আইনবিরোধিতা (antinomianism) বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এই দরবেশরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশ হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং নিজেদের সমাজচ্যুত যাযাবর হিসেবে টিকিয়ে রেখেছিলেন।
এই বিচ্যুত সুফি ধারায় ক্যানাবিস বা হাশিশের ব্যবহার একটি বিশেষ আচারিক মাত্রা লাভ করেছিল। ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, হায়দারিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা কুতব আল-দীন হায়দার দ্বাদশ শতাব্দীতে ইরানের নিশাপুরে নির্জনবাসের সময় প্রথম বুনো গাঁজার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব লক্ষ্য করেন। পরবর্তীকালে তার অনুসারীরা হাশিশকে ধ্যান ও একাগ্রতার সহায়ক উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে। দরবেশরা দাবি করতেন যে এই উদ্ভিজ্জ নির্যাস তাদের পার্থিব ক্ষুধা ও বাসনাকে স্তিমিত করে এবং আত্মিক বিনাশ বা ‘ফানা বা আত্মবিলুপ্তি’ অর্জনে সহায়তা করে। তবে নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাশিশ গ্রহণের এই অভ্যাস কোনো ঐশ্বরিক যোগাযোগের পথ ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘ উপবাস ও নিদ্রাহীনতার কারণে শরীর ও মনের ওপর তৈরি হওয়া চরম ক্লান্তি সামাল দেওয়ার এক কৃত্রিম জৈবিক কৌশল।
দরবেশদের এই ভেষজ চর্চা সমাজের তৎকালীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে তীব্র সংঘাত তৈরি করেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক আলেম সমাজ এবং নগর অভিজাতরা হাশিশ ব্যবহারকারী দরবেশদের সমাজের নৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখত। আইনতাত্ত্বিকেরা হাশিশকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। কারামুস্তফার বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে দরবেশদের এই মাদক গ্রহণ কেবল নিছক আসক্তি ছিল না; এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতীকী প্রতিবাদের ভাষা। সাধারণ মানুষ যখন রাষ্ট্রীয় কর এবং আলেমদের কঠোর শাসনের চাপে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন দরবেশদের এই সামাজিক বন্ধনহীন জীবনযাত্রা তাদের কাছে এক অদ্ভুত বিকল্পের বার্তা নিয়ে হাজির হতো।
স্নায়ুবিজ্ঞানের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, হাশিশের সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান মানব মস্তিষ্কের ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টরে উদ্দীপনা জাগিয়ে স্থান ও কালের বোধ শিথিল করে দেয়। দরবেশরা যখন নিঃসঙ্গ খানকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমবেত জিকির ও নাচের সাথে এই ভেষজের ধোঁয়া গ্রহণ করতেন, তখন তাদের মস্তিষ্কে শব্দ ও অনুভূতির এক অতিসংবেদনশীল মিশ্রণ তৈরি হতো। এই শারীরিক ও জৈব রাসায়নিক প্রতিক্রিয়াকে তারা ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের প্রমাণ হিসেবে কল্পনা করে নিতেন। অথচ এর পেছনে কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্যের অস্তিত্ব ছিল না। বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠ পাঠ উন্মোচন করে যে এটি ছিল রাসায়নিক উপায়ে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক জ্ঞানীয় প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করে অর্জিত এক ক্ষণস্থায়ী সংবেদনশীল বিভ্রান্তি, যা দরবেশরা নিজেদের আধ্যাত্মিক মতাদর্শ প্রমাণের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন।
তান্ত্রিক আচার, পঞ্চমকার ও নিষিদ্ধ ভেষজ (Tantric Rituals, the Five M’s, and Forbidden Plants)
ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় দর্শনের ইতিহাসে তন্ত্র সাধনা এক অনন্য ও বিতর্কিত অধ্যায় রচনা করেছে। প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য বর্ণব্যবস্থা যখন সমাজে কঠোর পবিত্রতা ও অপবিত্রতার অনুশাসন চাপিয়ে দিয়েছিল, তখন তার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে তান্ত্রিক ধারার বিকাশ ঘটে। প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ ডেভিড গর্ডন হোয়াইট (David Gordon White) তার সাড়াজাগানো গবেষণাগ্রন্থ কিস অব দ্য যোগিনী (Kiss of the Yoginī)-এ মধ্যযুগীয় তান্ত্রিক আচারের সামাজিক ও শারীরিক দিকগুলো ব্যবচ্ছেদ করেছেন (White, 2003)। হোয়াইট দেখান যে বিশেষ করে কৌল ও কাপালিক সম্প্রদায়ের সাধকেরা সমাজের প্রচলিত নৈতিকতাকে চূর্ণ করার জন্য সচেতনভাবে নিষিদ্ধ উপাদানের ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তন্ত্রের এই ধারাটিকে বলা হতো বামাচার (vamachara), যেখানে মোক্ষ লাভের মাধ্যম হিসেবে সমাজের চোখে নিন্দনীয় বিষয়গুলোকে আচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।
বামাচারী তন্ত্রের কেন্দ্রীয় আচারিক অনুশীলন হলো পঞ্চতত্ত্ব সাধনা, যা সাধারণভাবে পঞ্চমকার (panchamakara) নামে পরিচিত। এই পাঁচটি উপাদানের মধ্যে প্রথম ও প্রধান উপাদানটি ছিল মদ্য (madya) বা উত্তেজক পানীয়। এর পাশাপাশি গাঁজা এবং ধুতুরার মতো ভয়ংকর বিষাক্ত ও সংজ্ঞালোপকারী উদ্ভিদের ব্যবহার তান্ত্রিক মণ্ডলে স্বাভাবিক বিষয় ছিল। গবেষক হিউ বি. আরবান (Hugh B. Urban) তার বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ তন্ত্র: সেক্স, সিক্রেসি, পলিটিক্স, অ্যান্ড পাওয়ার (Tantra: Sex, Secrecy, Politics, and Power)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে এই নিষিদ্ধ উপাদানগুলোর ব্যবহার আসলে সামাজিক ক্ষমতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখার কৌশল ছিল (Urban, 2003)। আরবান উল্লেখ করেন যে উচ্চবর্ণের যাজকেরা যে জিনিসগুলোকে অপবিত্র বলে ঘৃণা করত, তান্ত্রিকেরা সেই জিনিসগুলোকেই পূজার উপাদান বানিয়ে প্রমাণ করতে চাইতেন যে তাদের ক্ষমতা প্রচলিত সমাজের কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করে না।
ভেষজ হিসেবে ধুতুরা ও গাঁজার রাসায়নিক প্রভাব তান্ত্রিক চেতনার রূপান্তরে মুখ্য ভূমিকা রাখত। চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী রোনাল্ড এল. ব্যারেট (Ronald L. Barrett) উত্তর ভারতের অঘোরী সাধকদের ওপর দীর্ঘ নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেন (Barrett, 2008)। ব্যারেট তার অঘোর মেডিসিন (Aghor Medicine) গ্রন্থে দেখান কীভাবে শ্মশানবাসী অঘোরীরা মৃত্যু ও ক্ষয়ের ভয় কাটাতে ক্যানাবিস এবং ধুতুরা ব্যবহার করে নিজেদের সংবেদনশীলতাকে অবশ করে রাখতেন। ধুতুরায় থাকা অ্যালকালয়েড যেমন স্কোপোলামিন এবং অ্যাট্রোপিন মানুষের সংজ্ঞানাত্মক ব্যবস্থায় তীব্র প্রলাপ ও দৃষ্টিভ্রম তৈরি করে। অঘোরীরা এই ভয়ানক বিষক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে নিজেদের মানসিক ভীতি দূর করার দাবি করতেন এবং একে শিবের সংহার রূপের সাথে একাত্মতা বলে প্রচার করতেন। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল স্নায়বিক অনুভূতির ওপর তীব্র রাসায়নিক আক্রমণ, যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের পার্থিব অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত।
তান্ত্রিক সাহিত্যে দাবি করা হয়েছে যে এই আচারগুলোর লক্ষ্য হলো চেতনার দ্বৈততা মুছে দিয়ে অদ্বৈত ভাব (non-dualism) বা পরম একত্ব অর্জন করা। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এই দ্বৈততা ভাঙার ধারণাটি মূলত সমাজসৃষ্ট জাতপাত ও শুচিতার কৃত্রিম নিয়মগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার এক মরিয়া চেষ্টা ছিল। তবে উদ্ভিজ্জ মাদকের মাধ্যমে সেই সামাজিক বাস্তবতাকে বাস্তবে পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না। সমাজপতিদের শোষণের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিবর্তে তান্ত্রিকেরা নিজেদের দেহের ওপর রাসায়নিক অত্যাচার চালিয়ে এক কাল্পনিক মুক্তির সুখ খুঁজতেন। ফলে বামাচারী তন্ত্র কোনো বৈজ্ঞানিক বা সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে পারেনি, বরং তা শেষ পর্যন্ত গোপনীয়তা ও ভেষজ বিষের বিভ্রান্তিতে ঘেরা এক অবক্ষয়ী সামাজিক উপদলে পরিণত হয়েছিল।
আমাজনীয় ভেজেতালিজমো ও আয়াহুয়াস্কার নৃতত্ত্ব (Amazonian Vegetalismo and the Anthropology of Ayahuasca)
দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকায় বসবাসকারী আদিবাসী ও মিশ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে চেতনার রূপান্তরের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম হলো আয়াহুয়াস্কা নামক এক জটিল ভেষজ ক্বাথ। নৃতাত্ত্বিক সাহিত্যে এই ঐতিহ্যটিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ভেজেতালিজমো হিসেবে। নৃতত্ত্ববিদ মার্লিন ডবকিন ডি রিওস (Marlene Dobkin de Rios) পেরুর আমাজন তীরবর্তী বসতিতে মাঠপর্যায়ের বিস্তৃত গবেষণা চালান (Dobkin de Rios, 1972)। ডবকিন ডি রিওস তার ধ্রুপদী গ্রন্থ ভিশনারি ভাইন (Visionary Vine)-এ তুলে ধরেন কীভাবে স্থানীয় রোগ নিরাময়কারীরা মানসিক চাপ, দারিদ্র্য এবং সামাজিক কলহ নিরসনের জন্য এই উদ্ভিজ্জ নির্যাসের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতেন। তিনি দেখান যে প্রতিকূল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যে আধুনিক চিকিৎসা ও নিরাপত্তার অভাব পূরণ করতে স্থানীয় মানুষ এই ভেষজ পানীয়কে সকল সমস্যার নিদান ভাবত।
আয়াহুয়াস্কা তৈরির পেছনের ফার্মাকোলজিক্যাল কৌশলটি রাসায়নিক দিক থেকে অত্যন্ত জটিল ও বিস্ময়কর। এই পানীয় তৈরিতে মূলত দুটি ভিন্ন উদ্ভিদ একসাথে ফুটিয়ে ক্বাথ তৈরি করা হয়। একটি হলো বানিস্তেরিওপসিস ক্যাপাই নামক লতা এবং অন্যটি সাইকোট্রিয়া ভিরিডিস নামক গুল্মের পাতা। আধুনিক বায়োকেমিস্ট্রি প্রমাণ করেছে যে সাইকোট্রিয়া ভিরিডিসের পাতায় থাকে শক্তিশালী সাইকেডেলিক উপাদান ডাইমিথাইলট্রিপটামিন বা ডিএমটি, যা সাধারণভাবে মুখে খেলে পাকস্থলীর এনজাইম মনোঅ্যামিন অক্সিডেজ দ্বারা ভেঙে গিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু অন্য লতাটিতে থাকা হারমিন ও হারমালাইনের মতো অ্যালকালয়েডগুলো সেই এনজাইমকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয়, যার ফলে ডিএমটি নির্বিঘ্নে মানব মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে। আদিবাসী চিকিৎসকেরা বিজ্ঞান না জেনেও শত শত বছরের ভেষজ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এই রাসায়নিক সংযোগটি আবিষ্কার করেছিল, যাকে তারা বলত ‘প্ল্যান্ট টিচার বা শিক্ষক উদ্ভিদ’।
প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী জেরার্ডো রেইকেল-ডলমাটফ (Gerardo Reichel-Dolmatoff) কলম্বিয়ার টুকানো আদিবাসীদের ওপর গবেষণা করে এই আচারের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক বিন্যাস উন্মোচন করেছেন (Reichel-Dolmatoff, 1975)। রেইকেল-ডলমাটফ তার গ্রন্থ দ্য শামান অ্যান্ড দ্য জাগুয়ার (The Shaman and the Jaguar)-এ দেখান যে টুকানো জনগোষ্ঠীর মানুষ যখন আয়াহুয়াস্কা পান করত, তখন তারা প্রায় সবাই সাপ বা জাগুয়ারের মতো হিংস্র প্রাণীর রূপ দেখত। রেইকেল-ডলমাটফ প্রমাণ করেন যে এই দৃশ্যগুলো কোনো অপার্থিব জগত থেকে আসত না, বরং এগুলো ছিল তাদের অরণ্য জীবনের প্রতিনিয়ত ভয় ও কিংবদন্তির সাংস্কৃতিক প্রকাশ। মস্তিষ্কের দৃষ্টি ও স্মৃতি নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো ডিএমটির তীব্র উদ্দীপনায় যখন আলোড়িত হতো, তখন অবচেতন মনের জমে থাকা বন্য ভীতির স্মৃতিগুলোই জীবন্ত ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠত।
নৃতাত্ত্বিক লুইস এদুয়ার্দো লুনা (Luis Eduardo Luna) আমাজনের মিশ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসকদের গান এবং আচারের ভাষা বিশ্লেষণ করেছেন (Luna, 1986)। লুনা তার ভেজেতালিজমো (Vegetalismo) গ্রন্থে দেখান কীভাবে শামানরা সুনির্দিষ্ট সুর ও শিস বাজিয়ে যাকে তারা ‘ইকারো‘ বলত, রোগীর রাসায়নিক ঘোরকে নিয়ন্ত্রণ করত। শামানরা দাবি করতেন যে তারা এই গানের মাধ্যমে উদ্ভিদের আত্মার সাথে কথা বলে রোগীকে নিরাময় করছেন। তবে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এটি ছিল আধুনিক সাইকোথেরাপির এক আদিম রূপ, যেখানে তীব্র হ্যালুসিনেশনের ভেতর থাকা একটি ভীত মানুষকে গানের ছন্দের মাধ্যমে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করা হতো। রোগ বা সামাজিক সংকটের বাস্তব কারণ দূর করার অক্ষমতা থেকেই এই আদিম সমাজগুলো রাসায়নিক বিভ্রম এবং পৌরাণিক আখ্যানের এক মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে নিজেদের মানসিক ভারসাম্য টিকিয়ে রাখত।
মেসোআমেরিকান মাশরুম ও মারিয়া সাবিনার আরোগ্য রীতি (Mesoamerican Mushrooms and the Healing Rites of María Sabina)
মেক্সিকোর ওহাকা অঞ্চলের মাজাতেক উপজাতিদের মধ্যে সাইলোসাইবিনযুক্ত মাশরুম ব্যবহারের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী প্রাচীন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই আদিবাসী আচারটি আধুনিক বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে এক স্থানীয় নারী নিরাময়কারীর মাধ্যমে। ইতিহাস ও নৃতত্ত্বের গবেষক আলভারো এস্ত্রাদা (Álvaro Estrada) এই গ্রামীণ চিকিৎসকের জীবন ও আচারের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন (Estrada, 1981)। এস্ত্রাদা তার সংকলিত গ্রন্থ মারিয়া সাবিনা: হার লাইফ অ্যান্ড চ্যান্টস (María Sabina: Her Life and Chants)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে মারিয়া সাবিনা নামক এক দরিদ্র নিরক্ষর নারী অসুস্থ মানুষের আরোগ্যের উদ্দেশ্যে রাতের বেলা মাশরুম সেবনের বিশেষ আচার পরিচালনা করতেন, যার স্থানীয় নাম ছিল ভেলাদা (velada)। সাবিনা বিশ্বাস করতেন যে মাশরুম হলো এক পবিত্র বস্তু যা মানুষের মনের ভেতরের লুকানো কষ্ট এবং রোগকে বাইরে বের করে আনে।
মাজাতেক সংস্কৃতির এই আচারের কাঠামোগত দিকটি ছিল সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও ঐতিহ্যবাহী। সম্পূর্ণ অন্ধকার ঘরে জ্বলন্ত মোমবাতি এবং সুগন্ধি রজন জ্বালিয়ে গভীর রাতে এই আচার শুরু হতো। নিরাময়কারী এবং রোগী উভয়েই নির্দিষ্ট সংখ্যক মাশরুম গ্রহণ করতেন। নৃতাত্ত্বিক পিটার টি. ফার্স্ট (Peter T. Furst) মেসোআমেরিকান হ্যালুসিনোজেনের ব্যবহার নিয়ে তার বিখ্যাত সংকলন ফ্লেশ অব দ্য গডস (Flesh of the Gods)-এ এই ধরনের আচারের প্রতীকী দিকগুলো ব্যাখ্যা করেছেন (Furst, 1972)। ফার্স্ট দেখান যে মারিয়া সাবিনার মুখে উচ্চারিত দীর্ঘ স্তোত্রগুলো ছিল ক্যাথলিক সন্তদের নাম এবং প্রাচীন মাজাতেক প্রকৃতির শক্তির এক অদ্ভুত সমন্বয়। সাইলোসাইবিন যখন মস্তিষ্কে কাজ শুরু করত, তখন সাবিনা ছন্দময় তালি এবং সুরের সাহায্যে রোগীর অপরাধবোধ ও মানসিক ট্রমাকে প্রকাশ করতে বাধ্য করতেন। অন্ধকার এবং তীব্র ভেষজের মিথস্ক্রিয়া রোগীর মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্যাথারসিস বা আবেগমুক্তি ঘটাতে সাহায্য করত।
তবে বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে পশ্চিমা পর্যটক এবং বিজ্ঞানীদের আগমনের ফলে এই বিচ্ছিন্ন লোকায়ত সংস্কৃতির ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসে। পশ্চিমা শহুরে মানুষেরা আত্মিক শান্তির খোঁজে এবং নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে ওহাকার প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে ভিড় জমাতে শুরু করে। এস্ত্রাদার বিবরণে পাওয়া যায় কীভাবে এই অযাচিত প্রচার মারিয়া সাবিনার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। স্থানীয় গ্রামবাসীরা তাদের গোপন ঐতিহ্য বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অপরাধে সাবিনার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং তাকে সামাজিকভাবে একঘরে করে। পশ্চিমা সাইকেডেলিক আন্দোলন স্থানীয় মানুষের যে দারিদ্র্য ও সাংস্কৃতিক সংকট ছিল তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল নিজেদের ব্যক্তিবাদী আধ্যাত্মিক উন্মাদনার খোরাক হিসেবে এই আচারকে ব্যবহার করেছিল।
মাজাতেক মাশরুম সংস্কৃতির আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে সাইলোসাইবিনের আরোগ্যকারী ভূমিকা কোনো অলৌকিক দেবতার উপস্থিতি নয়। সাইলোসিন অণু মানব মস্তিষ্কের সেরোটোনিন টু-এ রিসেপ্টরের সাথে আবদ্ধ হয়ে মানসিক কঠোরতা শিথিল করে এবং অবদমিত স্মৃতিগুলোকে মুক্ত করে দেয়। মারিয়া সাবিনা যে কাজটিকে ভাষার জাদু বলতেন, তা ছিল সংজ্ঞানাত্মক পুনর্বিন্যাসের একটি সহায়ক পরিবেশ। আধ্যাত্মিকতার যে চাদর এই আচারের গায়ে জড়ানো ছিল, তা ছিল স্থানীয় মানুষের অজ্ঞানতা ও অসহায়ত্বের এক প্রতীকী প্রকাশ। যখন রোগ নিরাময়ের জন্য কোনো আধুনিক হাসপাতাল বা ওষুধ ছিল না, তখন বনের বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে নিজেদের মনের সাথে লড়াই করাই ছিল এই প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার একমাত্র করুণ বাস্তবতা।
চেতনা রূপান্তরের মনস্তত্ত্ব ও মরমী অনুভূতির ব্যবচ্ছেদ (Psychology of Consciousness Alteration and Dissection of Mystical Experience)
মরমীবাদ এবং মনঃসক্রিয় পদার্থের সম্পর্ক বুঝতে হলে পশ্চিমা দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের বিতর্কগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক উইলিয়াম জেমস (William James) বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই মানুষের চেতনা নিয়ে এক বিপ্লবী পর্যবেক্ষণ হাজির করেন (James, 1902)। জেমস তার ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ দ্য ভ্যারাইটিজ অব রিলিজিয়াস এক্সপেরিয়েন্স (The Varieties of Religious Experience)-এ নিজের ওপর নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাসের প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন। জেমস বলেন যে আমাদের স্বাভাবিক সচেতন মন হলো চেতনার একটি বিশেষ রূপ মাত্র, যার ঠিক পাশেই অদৃশ্য পর্দার আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপের চেতনা লুকিয়ে থাকে। তিনি যুক্তি দেন যে কোনো ভেষজ বা গ্যাস যখন এই পর্দাটি সরিয়ে দেয়, তখন মানুষের মধ্যে যে অখণ্ড ঐক্যের অনুভূতি তৈরি হয়, ইতিহাসজুড়ে ধর্মীয় ভাবুকেরা তাকেই ঈশ্বরের দর্শন বলে প্রচার করেছেন।
পরবর্তীকালে দার্শনিক ওয়াল্টার টেরেন্স স্টেস (Walter Terence Stace) বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মরমী অভিজ্ঞতাগুলোর একটি তুলনামূলক শ্রেণিবিন্যাস প্রস্তাব করেন (Stace, 1960)। স্টেস তার মিস্টিকালিজম অ্যান্ড ফিলোসফি (Mysticism and Philosophy) গ্রন্থে মরমীবাদকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন, যার একটি হলো অন্তর্মুখী এবং অন্যটি বহির্মুখী মরমীবাদ। স্টেস দাবি করেন যে মাদকজনিত অভিজ্ঞতার মূল অনুভূতি হলো স্থান ও কালের বিলুপ্তি এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর সাথে নিজের একত্ববোধ। তবে অক্সফোর্ডের প্রাচ্যতত্ত্ববিদ রবার্ট চার্লস জেহনার (R. C. Zaehner) এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেন (Zaehner, 1957)। জেহনার তার প্রভাবশালী বই মিস্টিকালিজম স্যাক্রেড অ্যান্ড প্রফেন (Mysticism Sacred and Profane)-এ মেসক্যালিন গ্রহণ করে নিজের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন। তিনি জোরালো যুক্তি দেন যে মাদকের প্রভাবে ঘটা অহংবোধের বিলুপ্তি আসলে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর অনুভূতি বা প্রকৃতির সাথে উন্মাদনাময় একাকার হয়ে যাওয়া, যা ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার সমতুল্য হতে পারে না।
আধুনিক সংজ্ঞানাত্মক স্নায়ুবিজ্ঞান এই সমস্ত দার্শনিক বিতর্কের বস্তুনিষ্ঠ জৈবিক সমাধান দিতে সক্ষম হয়েছে। মস্তিষ্কের নিউরোইমেজিং গবেষণা দেখায় যে সাইকেডেলিক পদার্থগুলো গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের একটি সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক, যার নাম ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক বা ডিএমএন, সাময়িকভাবে শান্ত হয়ে যায়। এই নেটওয়ার্কটি মানুষের নিজস্ব সত্তা বা অহংবোধ এবং পারিপার্শ্বিক জগতের মধ্যকার সীমারেখা তৈরি করে রাখে। যখন মাদকের প্রভাবে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ নিজেদের মধ্যে উন্মুক্ত সংকেত আদান-প্রদান করতে শুরু করে। এর ফলেই মানুষের মনে হয় তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে গেছে এবং সে পুরো মহাবিশ্বের সাথে এক হয়ে গেছে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় অহং-বিলুপ্তি (Ego Dissolution)।
সুতরাং তথাকথিত যে মরমী ঐক্যকে ধর্মীয় ঐতিহ্যে স্বর্গীয় মিলন বা পরম সত্যের উপলব্ধি বলে মহিমান্বিত করা হয়েছে, তা মূলত একটি বিশেষ স্নায়বিক নেটওয়ার্কের সাময়িক সংযোগবিচ্ছিন্নতার ফলাফল। মানুষের আত্মসচেতনতা কোনো স্থায়ী আত্মিক বস্তু নয়; এটি মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট কোষে চলা বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার এক সমন্বিত ভারসাম্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মরমীরা স্নায়ুবিজ্ঞানের এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন না বলেই নিজেদের সংবেদনশীল বিভ্রান্তিকে কোনো অনন্ত শক্তির প্রকাশ ভেবে বসেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় স্পষ্ট হয় যে চেতনার এই রূপান্তর কোনো মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচন করে না, বরং মানুষের মস্তিষ্কের জটিল ও ভঙ্গুর গঠনকেই আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে।
আধ্যাত্মিক বাণিজ্যায়ন, ঔপনিবেশিক রূপান্তর ও নিও-শামানবাদ (Spiritual Commodification, Colonial Transformation and Neo-Shamanism)
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বায়নের অভিঘাতে প্রাচীন শামানিক ও মরমী ঐতিহ্যগুলোর চরিত্র আমূল বদলে গেছে। শতাব্দীপ্রাচীন আদিবাসী আচারগুলো আজ আর কোনো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আশ্রয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সেগুলো পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যটন এবং বাণিজ্যিক পণ্যে। নৃবিজ্ঞানী মাইকেল টাউসিগ (Michael Taussig) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ শামানিজম, কলোনিয়ালিজম, অ্যান্ড দ্য ওয়াইল্ড ম্যান (Shamanism, Colonialism, and the Wild Man)-এ ঔপনিবেশিক সহিংসতার সাথে শামানবাদের ঐতিহাসিক রূপান্তরের সম্পর্ক চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন (Taussig, 1987)। টাউসিগ দেখান কীভাবে ঔপনিবেশিক যুগে সাদা চামড়ার শাসকেরা আদিবাসীদের বুনো ও অসভ্য বলে তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছিল, অথচ আধুনিক যুগে এসে সেই একই আধিপত্যকামী সংস্কৃতি নিজেদের মানসিক শূন্যতা পূরণের জন্য আদিবাসীদের শামানিক ভেষজ ও প্রজ্ঞাকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
এই প্রক্রিয়ার ফলে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ধরনের সামাজিক প্রপঞ্চ, যাকে নৃবিজ্ঞানীরা নিও-শামানবাদ বা সাইকেডেলিক পর্যটন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ধনিক শ্রেণির নাগরিকেরা হাজার হাজার ডলার খরচ করে আমাজনের জঙ্গল কিংবা পেরুর পাহাড়ে ভিড় জমাচ্ছে কেবল আয়াহুয়াস্কা বা সান পেড্রো ক্যাকটাসের নেশায় বুঁদ হওয়ার জন্য। এই বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে স্থানীয় শামানিক ঐতিহ্যগুলো তাদের গভীর সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে এক চটজলদি বিনোদনের রূপ নিয়েছে। তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরুরা বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য কৃত্রিম আচার ও মঞ্চ তৈরি করছে। এর ফলে স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভেতরে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে এবং তাদের আদি সংস্কৃতির অবক্ষয় ঘটছে। এটি আসলে সাংস্কৃতিক আত্মসাতের এক নব্য-ঔপনিবেশিক রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা এই ভেষজ অনুশীলনগুলোকে ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক সুস্থতা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নের ব্র্যান্ড হিসেবে সাজিয়ে বিক্রি করছে। অতীতে যে আচারগুলো ছিল গোষ্ঠীর যৌথ সংকট মোকাবেলা এবং টিকে থাকার প্রতীকী লড়াই, আধুনিক নিও-শামানবাদে তা ব্যক্তিবাদী আত্মতুষ্টি ও মানসিক অবসাদ কাটানোর তথাকথিত সুস্থতা কৌশলে পরিণত হয়েছে। আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতির যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষ এই ভেষজগুলোর বিভ্রান্তির ভেতর অলীক পরম শান্তি খুঁজে পেতে চায়। কিন্তু এই ব্যক্তিগত মোহমুক্তি সমাজের বাস্তব শোষণ ও কাঠামোগত সমস্যাগুলোকে কোনোভাবেই সমাধান করতে পারে না। বরং এটি ব্যক্তিকে সমাজের রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার বদলে নিজের অবচেতন মনের কাল্পনিক জগতেই বুঁদ হয়ে থাকতে উৎসাহিত করে।
সামগ্রিক আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সুফি দরবেশদের হাশিশ সাধনা, তান্ত্রিকদের বামাচারী পানীয় কিংবা আমাজনের শামানিক ভেষজ – কোনোটিই কোনো আধ্যাত্মিক সত্যের সন্ধান দেয়নি। এগুলোর প্রতিটিই ছিল নিজ নিজ যুগের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বঞ্চনা এবং মানুষের জৈবিক অজ্ঞতার ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া কিছু সাংস্কৃতিক অনুশীলন। আধুনিক মুক্তচিন্তা ও বস্তুবাদী বিজ্ঞানের কাজ হলো এই সমস্ত অনুশীলন থেকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতার কৃত্রিম রহস্য দূর করা। মনঃসক্রিয় পদার্থের (Psychoactive Substances) কার্যকারিতাকে অন্ধ বিশ্বাসের চাদর থেকে মুক্ত করে জৈব রসায়ন, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং সামাজিক শোষণের বাস্তব কাঠামোর নিরিখে পাঠ করাই একমাত্র যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি।
সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা ও ধর্মের স্নায়ুবিজ্ঞান (Psychedelic Experiences and Neuroscience of Religion): মস্তিষ্ক, আত্মবোধ, অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা ও স্নায়ুজৈবিক ব্যাখ্যা
সেরোটোনিন রিসেপ্টর ও রাসায়নিক উদ্দীপনার মেকানিজম (Serotonin Receptors and Mechanisms of Chemical Stimulation)
মানব মস্তিষ্কের জটিল জৈব রাসায়নিক ক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের আধ্যাত্মিক বা অতীন্দ্রিয় অনুভূতির ব্যাখ্যা দাঁড় করানো বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অবাস্তব। ইতিহাসজুড়ে মানুষ যেসব অভিজ্ঞতাকে স্বর্গীয় দর্শন বা ঐশ্বরিক ডাক বলে প্রচার করেছে, আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান সেগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু রিসেপ্টর ও নিউরোট্রান্সমিটারের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফার্মাকোলজিস্ট ডেভিড ই. নিকোলস (David E. Nichols) সাইকেডেলিক যৌগের রাসায়নিক গঠন এবং মস্তিষ্কে তাদের প্রবেশের পথ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করেন (Nichols, 2016)। নিকোলস দেখান যে ক্লাসিক্যাল সাইকেডেলিক যেমন সাইলোসাইবিন, এলএসডি কিংবা ডিএমটির আণবিক গঠন মানবদেহের স্বাভাবিক নিউরোট্রান্সমিটার সেরোটোনিনের সাথে প্রায় হুবহু মিলে যায়। এই কাঠামোগত মিলের কারণে বহিরাগত রাসায়নিক উপাদানটি সহজেই মস্তিষ্কের রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক পার হয়ে স্নায়ুকোষের সাথে যুক্ত হতে পারে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ এক্স. ভলেনউইডার (Franz X. Vollenweider) সাইকেডেলিকের আণবিক প্রক্রিয়া পরীক্ষা করতে গিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রিসেপ্টরের ওপর আলোকপাত করেন (Vollenweider & Kometer, 2010)। ভলেনউইডার প্রমাণ করেন যে সাইকেডেলিক অণুগুলো মূলত মস্তিষ্কের কর্টেক্স বা সেরিব্রাল কর্টেক্সের পঞ্চম স্তরে থাকা সেরোটোনিন টু-এ রিসেপ্টর (5-HT2A receptor)-এর সাথে শক্তিশালী অ্যাগোনিস্ট হিসেবে যুক্ত হয়। এই রিসেপ্টরগুলো যখন মাত্রাতিরিক্ত উদ্দীপিত হয়, তখন স্নায়ুকোষগুলোর স্বাভাবিক যোগাযোগ ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। ভলেনউইডারের গবেষণা দেখায় যে এই রাসায়নিক সংযোগ যদি কোনো ব্লকার বা প্রতিষেধক দিয়ে আটকে দেওয়া হয়, তবে ব্যক্তির সমস্ত তথাকথিত আধ্যাত্মিক দর্শন এবং দৃষ্টিভ্রম মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এই বৈজ্ঞানিক সত্য এটা স্পষ্ট করে যে চেতনা পরিবর্তনের পেছনে কোনো অলৌকিক শক্তির হাত নেই; বরং এটা একটি নির্দিষ্ট জৈব রাসায়নিক চাবির নির্দিষ্ট আণবিক তালায় প্রবেশের নিরেট শারীরবৃত্তীয় ঘটনা।
মস্তিষ্কের সংবেদনশীল সংকেত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে থ্যালামাসের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ অবস্থায় থ্যালামাস একটি জৈবিক ফিল্টার বা দরোয়ান হিসেবে কাজ করে, যা চারপাশের পরিবেশ থেকে আসা কোটি কোটি অপ্রয়োজনীয় সংকেতকে আটকে দিয়ে কেবল দরকারি তথ্যটুকু সচেতন মস্তিষ্কে পাঠায়। স্নায়ুবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, সেরোটোনিন টু-এ রিসেপ্টর অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠলে থ্যালামাসের এই ফিল্টারিং বা সংকেত ছাঁকন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যাকে স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় থ্যালামিক গেটিং ব্রেকডাউন (thalamic gating breakdown) বলা হয়। এর ফলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যের এক বাঁধভাঙা জোয়ার সরাসরি কর্টেক্সে আছড়ে পড়ে। চোখ বন্ধ থাকলেও ব্যক্তি উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি দেখতে পায় এবং সাধারণ শব্দকে কোনো মহাজাগতিক সুর বলে মনে করতে শুরু করে।
এই শারীরিক প্রক্রিয়াটি মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ভ্রান্তি তৈরি করে। প্রাচীন যুগের ধর্মতাত্ত্বিকেরা দাবি করেছিলেন যে আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে মানুষ এক অদৃশ্য জগতের দরজা খুলে ফেলে। স্নায়ুবিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠ পাঠ সেই দাবিকে নস্যাৎ করে দেয়। রাসায়নিক অণুর প্রভাবে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা যখন অতিরিক্ত বোঝায় অচল হয়ে পড়ে, তখন মস্তিষ্ক নিজের ভেতরের স্মৃতি ও কল্পনার টুকরোগুলোকে জোড়া লাগিয়ে অলীক দৃশ্য তৈরি করে। মানুষ নিজের জৈব রাসায়নিক বিশৃঙ্খলাকে ব্যাখ্যা করতে না পেরে তাকে ঈশ্বরের উপস্থিতি বা অতিলৌকিক সত্য বলে ভ্রম করে। সুতরাং সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা কোনো উচ্চতর জগতের বার্তা নয়, বরং মানুষের সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্রের একটি সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক বিপর্যয়।
ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক ও আত্মবোধের বিলুপ্তি (The Default Mode Network and Dissolution of the Self)
মনস্তত্ত্ব ও স্নায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মানুষের অহংবোধ বা আমি-ভাব কীভাবে তৈরি হয়। মানুষ নিজেকে চারপাশের পরিবেশ এবং অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে যে অনুভব করে, তা মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের কাজ। স্নায়ুবিজ্ঞানী রবিন কারহার্ট-হ্যারিস (Robin Carhart-Harris) এবং তার সহকর্মীরা ২০১২ সালে ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং বা এফএমআরআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সাইকেডেলিকের স্নায়বিক প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেন (Carhart-Harris et al., 2012)। কারহার্ট-হ্যারিস দেখান যে সাইলোসাইবিন গ্রহণের পর মস্তিষ্কের সার্বিক রক্তপ্রবাহ বা শক্তি বেড়ে যায় না, বরং এক বিশেষ নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। এই যোগাযোগ নেটওয়ার্কটিকে বলা হয় ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (Default Mode Network বা DMN)।
ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক মূলত মস্তিষ্কের মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং পোস্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্সের মতো প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলোকে যুক্ত করে রাখে। এই নেটওয়ার্কটি মানুষের আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি, অতীত ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তি বজায় রাখে। যখন সাইকেডেলিক রাসায়নিকের প্রভাবে এই নেটওয়ার্কের ভেতরের ছন্দপতন ঘটে, তখন ব্যক্তি নিজের পরিচিত অহং বা অহমিকা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। জ্ঞানীয় গবেষক রাফায়েল মিলিয়ার (Raphaël Millière) এই অবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করতে অহং-বিলুপ্তি (ego dissolution) ধারণাটি ব্যবহার করেন (Millière, 2017)। মিলিয়ার দেখান যে অহং-বিলুপ্তির সময় ব্যক্তির কাছে ‘আমি’ এবং ‘অন্য’-এর ভেতরের সীমারেখা পুরোপুরি মুছে যায়। মানুষ তখন মনে করে সে মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণার সাথে একাত্ম হয়ে গেছে।
ধর্মীয় ঐতিহ্যে এই আত্মবিলুপ্তির অনুভূতিকে বলা হতো ঈশ্বরের সাথে মিলন, মোক্ষ বা পরমাত্মার সাথে একীভূত হওয়া। তবে স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোয় দেখা যায়, এই অনুভূতির উৎস কোনো অসীম চেতনা নয়, বরং মস্তিষ্কের সীমানা নির্ধারণকারী ব্যবস্থার সাময়িক বিকলতা মাত্র। প্যারাইটাল লোবের যে অংশটি স্থানিক সচেতনতা এবং নিজের শরীরের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করে, ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক শিথিল হয়ে যাওয়ায় সেই অংশটি ভুল সংকেত দিতে থাকে। এর মানে দাঁড়ায়, মস্তিষ্ক যখন নিজের শরীরের শেষ সীমা এবং বাইরের জগতের শুরুর বিন্দুটি পৃথক করতে পারে না, তখন সংবেদনশীল চেতনা চারপাশের সবকিছুর সাথে মিশে যাওয়ার এক বিভ্রান্তিকর অনুভূতি তৈরি করে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেভিড নাট (David Nutt) তার গবেষণায় ডিএমএন-কে মস্তিষ্কের অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের সাথে তুলনা করেছেন (Nutt, 2020)। কন্ডাক্টর যখন হাত নামিয়ে নেয়, তখন সব বাদ্যযন্ত্র নিজেদের মতো বাজতে শুরু করে এবং নিয়মমাফিক সংগীত এক ধরনের কোলাহলে রূপ নেয়। সাইকেডেলিক ঠিক এই কাজটিই করে। এটি মানুষের ব্যক্তিত্বের অহংবোধকে স্তিমিত করে দিয়ে এমন এক অনুভূতির জন্ম দেয়, যা সাধারণ যুক্তিযুক্ত চিন্তার বাইরে। ধর্মীয় সাধকেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কঠোর অনাহার, শারীরিক নিপীড়ন বা ধ্যানের মাধ্যমে এই ডিএমএন-কে দুর্বল করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু আধুনিক ফার্মাকোলজি প্রমাণ করে যে এই অবস্থা অর্জনের জন্য কোনো আধ্যাত্মিক সাধনার দরকার হয় না; কয়েকটি রাসায়নিক অণুর ধাক্কায় মস্তিষ্কের এই নেটওয়ার্কটিকে সহজেই অকেজো করে দেওয়া সম্ভব।
এনট্রপিক ব্রেন হাইপোথিসিস ও সংজ্ঞানাত্মক বিশৃঙ্খলা (The Entropic Brain Hypothesis and Cognitive Disorder)
সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার জটিলতা ব্যাখ্যা করার জন্য একবিংশ শতাব্দীর স্নায়ুবিজ্ঞানে সবচেয়ে প্রভাবশালী তত্ত্বটি হাজির করেছেন রবিন কারহার্ট-হ্যারিস। তিনি মানুষের সচেতন মানসিক অবস্থাকে থার্মোডায়নামিক্সের এনট্রপির ধারণার সাথে যুক্ত করে প্রস্তাব করেন এনট্রপিক ব্রেন হাইপোথিসিস (entropic brain hypothesis) (Carhart-Harris, 2014)। কারহার্ট-হ্যারিস যুক্তি দেন যে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্ক সাধারণত একটি নিম্ন-এনট্রপি বা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল অবস্থায় কাজ করে। এই অবস্থায় চিন্তা থাকে কাঠামোগত, যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তবসম্মত। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি সাইকেডেলিক গ্রহণ করে, তখন মস্তিষ্কের এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলার মাত্রা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। মস্তিষ্ক তখন এমন এক অবস্থায় প্রবেশ করে, যাকে তিনি আদিম বা প্রাথমিক চেতনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এই উচ্চ-এনট্রপি অবস্থায় মস্তিষ্কের সাধারণ মডুলার কাঠামো ভেঙে পড়ে। সাধারণ অবস্থায় মস্তিষ্কের যে অঞ্চলগুলো নিজেদের মধ্যে কখনোই সরাসরি যোগাযোগ করে না, সাইকেডেলিকের প্রভাবে তারা পরস্পরের সাথে ব্যাপকভাবে সংকেত বিনিময় করতে শুরু করে। নিউরোইমেজিং গবেষক এনজো তাগলিয়াজুকি (Enzo Tagliazucchi) এলএসডি গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের সংযোগ পরীক্ষা করে এই অভূতপূর্ব সমন্বয় প্রত্যক্ষ করেন (Tagliazucchi et al., 2016)। তাগলিয়াজুকি দেখান যে মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স হঠাৎ করে শ্রবণ বা স্পর্শ নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চলের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এর প্রত্যক্ষ শারীরিক ফলাফল হলো সিনেসথেসিয়া (synesthesia) বা সংবেদনশীল বিভ্রান্তি, যেখানে মানুষ রং শুনতে পায় কিংবা শব্দ দেখতে পায়। এই অবস্থাকে প্রাচীন কালের মরমীরা স্বর্গীয় রূপদর্শন বলে ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন।
উচ্চ-এনট্রপিক এই মস্তিষ্কে যুক্তি ও অন্ধবিশ্বাসের সীমারেখা মুছে যায়। সাধারণ অবস্থায় মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অবাস্তব চিন্তাভাবনাকে সেন্সর করে বাতিল করে দেয়। কিন্তু যখন এনট্রপি বৃদ্ধি পায়, তখন মস্তিষ্ক প্রতিটি ভাবনাকেই পরম গুরুত্বপূর্ণ বা গভীর অর্থবহ মনে করতে শুরু করে। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সেলিয়েন্স বা গুরুত্ব নির্ধারণের ত্রুটি। একটি তুচ্ছ পাতার নড়াচড়া বা একটি সামান্য জ্যামিতিক নকশাকে তখন মহাবিশ্বের পরম রহস্যের উন্মোচন বলে মনে হয়। এই অবস্থাকে কোনো উচ্চতর প্রজ্ঞা বলা যায় না; বরং এটি হলো মস্তিষ্কের প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করার স্বাভাবিক ফিল্টারটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার এক করুণ দৃষ্টান্ত।
কারহার্ট-হ্যারিসের এই হাইপোথিসিস ধর্মীয় ইতিহাসের ভাববাদী ব্যাখ্যাগুলোকে নিরেট বস্তুবাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ধর্মের ইতিহাসে যত মহাপুরুষের অলৌকিক দর্শনের কথা লিপিবদ্ধ আছে, তাদের অনেকেরই মস্তিষ্ক কোনো না কোনোভাবে এই উচ্চ-এনট্রপিক অবস্থায় পৌঁছেছিল। মস্তিষ্কের অতিরিক্ত রাসায়নিক স্বাধীনতা যখন তথ্যের শৃঙ্খলা ভেঙে দেয়, তখনই জন্ম নেয় অবাস্তব বিভ্রম এবং অতীন্দ্রিয় বিশ্বাসের জাল। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান এটা উন্মোচন করেছে যে চেতনা কোনো স্বর্গীয় উপহার নয়, এটি হলো নিউরনের বৈদ্যুতিক যোগাযোগের একটি ভারসাম্যপূর্ণ নৃত্য। সেই ভারসাম্যে সামান্য বিশৃঙ্খলা তৈরি হলেই মানুষ নিজেকে সর্বজ্ঞানী বা দেবতার দূত ভাবতে শুরু করে, যার পেছনের আসল চালিকাশক্তি হলো মস্তিষ্কের এক সাময়িক সংজ্ঞানাত্মক পতন।
গবেষণাগারে ঈশ্বরানুভূতি: জনস হপকিন্স ও গ্রিফিথস পরীক্ষা (Laboratory-Induced Divine Experience: Johns Hopkins and Griffiths Experiments)
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মানুষের তথাকথিত মরমী অভিজ্ঞতাকে বিজ্ঞানাগারের বাইরে একটি অধরা মানসিক ঘটনা বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই ধারণাকে চিরতরে বদলে দেন। আচরণগত জীববিজ্ঞানী রোল্যান্ড আর. গ্রিফিথস (Roland R. Griffiths) এবং তার গবেষণা দল ২০০৬ সালে এক কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন (Griffiths et al., 2006)। গ্রিফিথস সুস্থ এবং অতীতে কখনো মাদক নেননি এমন ব্যক্তিদের ওপর নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সাইলোসাইবিন প্রয়োগ করেন। অংশগ্রহণকারীদের ডাবল-ব্লাইন্ড পদ্ধতিতে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনো ধরনের মানসিক পক্ষপাত ফলাফলে প্রভাব না ফেলতে পারে।
এই পরীক্ষার ফলাফল স্নায়ুবিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বের জগতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা পরিমাপ করার জন্য মনোবিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত হুডের মরমী স্কেল ব্যবহার করেছিলেন। দেখা গেল যে গবেষণাগারে বসে সাইলোসাইবিন গ্রহণকারী অধিকাংশ ব্যক্তি দাবি করলেন তারা তাদের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তারা যে অনুভূতির বিবরণ দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল স্থান ও কালের বোধহীনতা, গভীর আনন্দ এবং একটি পরম সত্তার সাথে একাত্মতা। গ্রিফিথসের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় সাধকেরা কঠোর তপস্যা বা উপবাসের মাধ্যমে যেসব অভিজ্ঞতা লাভ করতেন, নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারে একটি রাসায়নিক ক্যাপসুল খাইয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হুবহু সেই একই অনুভূতি তৈরি করা সম্ভব।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার তথাকথিত অলৌকিকত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কোনো অভিজ্ঞতা যদি একটি রাসায়নিক যৌগের নির্দিষ্ট মিলিগ্রামের ওপর নির্ভর করে ঘড়ির কাঁটা ধরে শুরু ও শেষ করা যায়, তবে তার পেছনে কোনো মহাজাগতিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব কল্পনা করা অবান্তর। গ্রিফিথস পরবর্তীতে আরও বিশদ গবেষণায় দেখান যে এই অনুভূতির স্থায়িত্ব এবং প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে ওষুধের মাত্রার সাথে সমানুপাতিক। মাত্রা বেশি হলে অহং-বিলুপ্তির সম্ভাবনা বাড়ে, আর মাত্রা কম হলে কেবল সাধারণ দৃষ্টিবিভ্রম ঘটে। এর মানে দাঁড়ায়, মানুষের তথাকথিত আত্মিক গভীরতা আসলে মস্তিষ্কের স্নায়বিক রিসেপ্টরে রাসায়নিক অণুর ঘনত্বের ওপর নির্ভরশীল একটি বস্তুগত উপজাত।
ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেকে দাবি করার চেষ্টা করেছিলেন যে সাইকেডেলিক হয়তো ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগের একটি রাসায়নিক অ্যান্টেনা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞান এই যুক্তিকে নাকচ করে দেয়। গ্রিফিথসের গবেষণাগারে প্রাপ্ত তথ্য স্পষ্ট দেখায় যে মানুষের মস্তিষ্ক একটি জটিল সংবেদনশীল যন্ত্র, যা বিভ্রান্ত হলে নিজের ভেতর থেকেই অর্থের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। বিবর্তনীয় কারণে মানুষের মস্তিষ্ক অর্থহীনতার চেয়ে একটি কাল্পনিক অর্থকে আঁকড়ে ধরতে বেশি পছন্দ করে। গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত এই ঈশ্বরানুভূতি প্রমাণ করে যে তথাকথিত পবিত্র অভিজ্ঞতা আসলে মানুষের স্নায়বিক কাঠামোর একটি অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, যাকে শতাব্দী ধরে ধর্মীয় ব্যবসায়ীরা আধ্যাত্মিক সত্যের মোড়কে বিক্রি করেছে।
নিউরোথিওলজি ও টেম্পোরাল লোব হাইপোথিসিস (Neurotheology and the Temporal Lobe Hypothesis)
সাইকেডেলিকের পাশাপাশি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলের বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা কীভাবে ধর্মীয় অনুভূতির জন্ম দেয়, তা নিয়ে এক স্বতন্ত্র ধারার বিকাশ ঘটেছে যার নাম নিউরোথিওলজি (neurotheology)। স্নায়ুবিজ্ঞানী মাইকেল এ. পারসিঙ্গার (Michael A. Persinger) আশির দশকে এই ক্ষেত্রে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণা শুরু করেন (Persinger, 1987)। পারসিঙ্গার তার পরীক্ষাগারে একটি বিশেষ হেলমেট তৈরি করেন, যা মানুষের মাথায় দুর্বল চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করতে পারত। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি “গড হেলমেট” নামে পরিচিতি পায়। পারসিঙ্গার দেখান যে মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবে সুনির্দিষ্টভাবে চৌম্বকীয় সংকেত পাঠালে সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষও ঘরের ভেতর কোনো অদৃশ্য সত্তার উপস্থিতি তীব্রভাবে অনুভব করে। অংশগ্রহণকারীরা দাবি করতেন যে তারা ঈশ্বর বা কোনো ফেরেশতার উপস্থিতি টের পাচ্ছেন।
টেম্পোরাল লোবের সাথে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার গভীর সংযোগ উন্মোচন করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট স্নায়ুবিজ্ঞানী ভিলায়ানুর এস. রামচন্দ্রন (Vilayanur S. Ramachandran) (Ramachandran & Blakeslee, 1998)। রামচন্দ্রন তার যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থ ফ্যান্টমস ইন দ্য ব্রেন (Phantoms in the Brain)-এ টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি বা মৃগীরোগে আক্রান্ত রোগীদের ওপর কাজ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে এই রোগীদের যখন খিঁচুনি হয়, তখন তারা প্রায়শই তীব্র ধর্মীয় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং নিজেদের ঈশ্বরের সাথে কথোপকথনকারী ভাবেন। রামচন্দ্রন প্রমাণ করেন যে টেম্পোরাল লোবের সাথে লিম্বিক সিস্টেম বা আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশের সংযোগ অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়লে মানুষ প্রতিটি সাধারণ বস্তুকে ঐশ্বরিক তাৎপর্যপূর্ণ মনে করে। তিনি এই বিশেষ স্নায়বিক সার্কিটটিকে রূপক অর্থে “ঈশ্বর মডিউল” হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা মূলত মস্তিষ্কের একটি অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়ার প্রকাশ।
এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান রেডিওলজিস্ট ও গবেষক অ্যান্ড্রু নিউবার্গ (Andrew Newberg) (Newberg et al., 2001)। নিউবার্গ তার সাড়াজাগানো বই হোয়াই গড ওন্ট গো অ্যাওয়ে (Why God Won’t Go Away)-এ ধ্যানমগ্ন তিব্বতি সন্ন্যাসী এবং প্রার্থনারত ক্যাথলিক নানদের মস্তিষ্কের ওপর একক ফোটন নির্গমন কম্পিউটেড টমোগ্রাফি বা স্পেক্ট স্ক্যান পরিচালনা করেন। নিউবার্গ দেখান যে তীব্র প্রার্থনার মুহূর্তে মস্তিষ্কের পোস্টেরিয়র সুপিরিয়র প্যারাইটাল লোবে রক্তপ্রবাহ নাটকীয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই অংশটিকে তিনি ‘ওরিয়েন্টেশন অ্যাসোসিয়েশন এরিয়া’ বলে অভিহিত করেন, যা মানুষকে তার চারপাশের স্থানিক বাস্তবতা বোঝায়। এই অংশটি যখন ইনপুট পাওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন ব্যক্তি স্থান ও কালের সীমানা হারিয়ে নিজেকে এক অসীম শূন্যতার অংশ ভাবতে শুরু করে। নিউবার্গের তথ্য এটা তুলে ধরে যে গভীর আধ্যাত্মিক মুক্তি আসলে মস্তিষ্কের একটি অংশের সাময়িক অন্ধত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।
স্নায়ুবিজ্ঞানী প্যাট্রিক ম্যাকনামারা (Patrick McNamara) ধর্মীয় অভিজ্ঞতার বিবর্তনীয় স্নায়ুবিজ্ঞান নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন (McNamara, 2009)। ম্যাকনামারা তার দ্য নিউরোসায়েন্স অব রিলিজিয়াস এক্সপেরিয়েন্স (The Neuroscience of Religious Experience) গ্রন্থে দেখান কীভাবে মানব মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিকতার বিকাশ ঘটিয়েছে। কিন্তু যখন টেম্পোরাল এবং প্যারাইটাল অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন ফ্রন্টাল লোব বাস্তবতার সঠিক বিচার করতে ব্যর্থ হয়। নিউরোথিওলজির এই সামগ্রিক গবেষণা সাইকেডেলিক ড্রাগের প্রভাবের সাথে হুবহু মিলে যায়। রাসায়নিক অণুর মাধ্যমেই হোক কিংবা মৃগীরোগের বৈদ্যুতিক ঝিলিক বা চৌম্বকীয় উদ্দীপনা – প্রতিটি পথই শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কের একই সার্কিটকে আঘাত করে। ঈশ্বর কোনো মহাজাগতিক সত্য নন; তিনি হলেন মানুষের টেম্পোরাল ও প্যারাইটাল লোবের ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া থেকে জন্ম নেওয়া এক নিখুঁত স্নায়বিক প্রতিচ্ছবি।
অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার স্নায়ুজৈবিক বিবর্তন ও বিভ্রান্তির অবসান (Neurobiological Evolution of Mystical Experience and Demystification)
মানব মস্তিষ্ক কেন এমন বিভ্রান্তিকর এবং অবাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতি এত সংবেদনশীল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের শরণাপন্ন হতে হয়। মানুষের মস্তিষ্ক লাখ লাখ বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে টিকে থাকার তাগিদে, কোনো তথাকথিত মহাজাগতিক সত্যের সন্ধান পাওয়ার জন্য নয়। বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, আদিম মানুষের মধ্যে পরিবেশের প্রতিটি নড়াচড়ার পেছনে সচেতন কোনো সত্তা বা শিকারীর উপস্থিতি কল্পনা করার একটি সহজাত প্রবণতা ছিল। একে বলা হয় হাইপারঅ্যাক্টিভ এজেন্সি ডিটেকশন। যে মানুষটি বাতাসে ঘাস নড়তে দেখে বাঘের উপস্থিতি কল্পনা করে পালিয়ে যেত, সে ভুল করলেও বেঁচে থাকত; কিন্তু যে ব্যক্তি প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে উদাসীন থাকত, সে বাঘের পেটে চলে যেত। ফলে অস্তিত্বহীন সত্তার উপস্থিতি কল্পনা করার এই স্নায়বিক ত্রুটিটি মানুষের জিনপুলে স্থায়ীভাবে টিকে গেছে।
সাইকেডেলিক যৌগগুলো যখন স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে, তখন এই আদিম বিবর্তনীয় মেকানিজমটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ব্যক্তি তখন প্রতিটি আলো, ছায়া বা শব্দের পেছনে কোনো ঐশ্বরিক সত্তা বা অদৃশ্য আত্মার উপস্থিতি দেখতে পায়। সাইকিয়াট্রিস্ট রিক স্ট্রাসম্যান (Rick Strassman) একসময় দাবি করেছিলেন যে মানব মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে ডিএমটি নিঃসৃত হয়, যা মানুষের জন্ম, মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির সময় নির্গত হয়ে এক আত্মিক জগতের দ্বার উন্মোচন করে (Strassman, 2001)। স্ট্রাসম্যান তার বই ডিএমটি: দ্য স্পিরিট মলিকিউল (DMT: The Spirit Molecule)-এ এই ধরনের বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত আধ্যাত্মিক অনুমান ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালের নিখুঁত স্নায়ুজৈবিক ও ফার্মাকোলজিক্যাল গবেষণা স্ট্রাসম্যানের এই দাবিকে পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে। আধুনিক বায়োকেমিস্ট্রি প্রমাণ করেছে যে মানুষের মস্তিষ্কে কোনো অতীন্দ্রিয় ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত ডিএমটি তৈরি হয় না; যা তৈরি হয় তা নিতান্তই নগণ্য এবং রাসায়নিক বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার অংশ।
স্নায়ুবিজ্ঞান এবং সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞানের আধুনিক বিকাশ চেতনার সমস্ত অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে পরাস্ত করে এক শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেছে। মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে অতীন্দ্রিয় অনুভূতিকে পরম আধ্যাত্মিক জ্ঞান বলে অহংকার করেছে, বিজ্ঞান আজ নিশ্চিতভাবে দেখিয়েছে যে তা কেবল স্নায়ুকোষের রিসেপ্টর অবরোধ, সংকেত ছাঁকনের ব্যর্থতা এবং মস্তিষ্কের সংযোগ বিচ্ছিন্নতার সমষ্টি। এই অভিজ্ঞতার কোনো নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোনো পরলৌকিক সত্যতা নেই। এটি হলো মানুষের ভঙ্গুর জৈবিক মস্তিষ্কের ওপর নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগের একটি পূর্বাভাসযোগ্য শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া মাত্র।
অতএব, সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে হবে ধর্মতাত্ত্বিক মোহমুক্ত হয়ে। এই রাসায়নিকগুলোকে কোনো ঐশ্বরিক স্পর্শ বা আধ্যাত্মিকতার মাধ্যম হিসেবে দেখার অন্ধত্ব পরিহার করে এগুলোকে মানুষের মস্তিষ্কের জটিল সার্কিট বোঝার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করাই বিজ্ঞানসম্মত। সাইকেডেলিক গবেষণার আসল গুরুত্ব কোনো ঈশ্বর বা আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করায় নয়; বরং এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে মানসিক রোগ নিরাময়, নিউরোপ্লাস্টিসিটি বৃদ্ধি এবং মানুষের চেতনার জৈব রাসায়নিক ভিত্তি উন্মোচনে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় কুসংস্কার এবং আধ্যাত্মিকতার কুয়াশা সরিয়ে দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ককে একটি বস্তুগত ও বিবর্তনীয় অঙ্গ হিসেবে পাঠ করাই আধুনিক যুক্তিবাদী মানুষের একমাত্র কর্তব্য।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ঔপনিবেশিকতা ও মাদক নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি (Religious Institutions, Colonialism and Politics of Drug Control): নৈতিক আন্দোলন, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস
মিশনারি কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক মাদক নিষেধাজ্ঞার সূচনা (Missionary Diplomacy and the Genesis of International Drug Prohibition)
আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শেকড় কোনো নিরেট চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক গবেষণার ভেতর প্রোথিত ছিল না। উনিশ শতকের শেষার্ধে এশিয়ায় পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের সাথে সাথে ইউরোপীয় ও আমেরিকান খ্রিস্টান মিশনারিদের তৎপরতা এক বিশেষ রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে। ইতিহাসবিদ ক্যাথলিন এল. লোডউইক (Kathleen L. Lodwick) তার আকর গ্রন্থ ক্রুসেডার্স এগেইনস্ট ওপিয়াম (Crusaders Against Opium)-এ চীনের মাটিতে প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিদের দীর্ঘ প্রচারণার তথ্যভিত্তিক রূপরেখা তুলে ধরেছেন (Lodwick, 1996)। লোডউইক দেখান যে ব্রিটিশ ও আমেরিকান ধর্মপ্রচারকেরা যখন চীনে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, তখন তারা আফিম আসক্তিকে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেন। চীনা জনগোষ্ঠীর কাছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একই সাথে এক হাতে বাইবেল এবং অন্য হাতে আফিম পৌঁছে দিচ্ছিল। মিশনারিরা উপলব্ধি করেছিলেন যে আফিমের এই বাণিজ্যিক ভূমিকা প্রাচ্যে তাদের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছিল।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই সংকট কাটাতে নিজেদের দেশের সরকারের ওপর নৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল বেছে নেয়। ব্রিটেনে গড়ে ওঠা সোসাইটি ফর দ্য সাপ্রেশন অব দ্য ওপিয়াম ট্রেড (Society for the Suppression of the Opium Trade) এবং আমেরিকায় উইলবার ক্রাফটসের নেতৃত্বে পরিচালিত ইন্টারন্যাশনাল রিফর্ম ব্যুরোর মতো খ্রিস্টান সংগঠনগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল প্রভাব বিস্তার শুরু করে। কূটনৈতিক ইতিহাসবিদ আর্নল্ড এইচ. টেলর (Arnold H. Taylor) তার সাড়াজাগানো গবেষণা আমেরিকান ডিপ্লোম্যাসি অ্যান্ড দ্য নারকোটিকস ট্রাফিক (American Diplomacy and the Narcotics Traffic)-এ এই ধর্মীয় লবির রাজনৈতিক রূপান্তর উন্মোচন করেছেন (Taylor, 1969)। ফিলিপাইন অধিগ্রহণের পর সেখানকার এপিস্কোপাল চার্চের বিশপ চার্লস হেনরি ব্রেন্ট মার্কিন সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হন যে প্রাচ্যে আমেরিকার বাণিজ্যিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হলে মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক উদ্যোগের নেতৃত্ব আমেরিকাকেই নিতে হবে।
এই ধর্মীয় নৈতিক কূটনীতির প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে ১৯০৯ সালে চীনের সাংহাইয়ে এগারোটি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে সাংহাই আফিম কমিশন (Shanghai Opium Commission) আহ্বান করা হয়। ইতিহাস গবেষকদের বিশ্লেষণ দেখায় যে বিশপ ব্রেন্টের মতো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা সম্মেলনটিতে কেবল খ্রিস্টীয় পাপ ও পুণ্যের ধারণাকে আধুনিক কূটনীতির ভাষায় রূপ দেননি, বরং উদীয়মান আমেরিকান সাম্রাজ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকেও বৈধতা দিয়েছিলেন। সাংহাই কমিশনের ধারাবাহিকতায় ১৯১২ সালে স্বাক্ষরিত হয় প্রথম বহুপাক্ষিক মাদক চুক্তি যা হেগ আন্তর্জাতিক আফিম কনভেনশন (Hague International Opium Convention) নামে পরিচিত। টেলরের গবেষণা প্রমাণ করে যে এই আন্তর্জাতিক আইনগুলোর নেপথ্য চালিকাশক্তি ছিল পশ্চিমা প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল অ-খ্রিস্টান সমাজগুলোকে নিজেদের নৈতিক ছাঁচে পুনর্গঠন করা।
বাস্তব রাজনৈতিক দিক থেকে এই মিশনারি আন্দোলন প্রাচ্যের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সংকুচিত করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। পশ্চিমা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচার করেছিল যে এশিয়ার মানুষ নিজেদের শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে অক্ষম, তাই তাদের উদ্ধার করতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রয়োজন। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ঔপনিবেশিক শাসনের স্থায়িত্বের জন্য আদর্শিক ভিত্তি জুগিয়েছিল। বিজ্ঞানসম্মত জনস্বাস্থ্যের ধারণা তখনো আন্তর্জাতিক মাদকনীতিতে জায়গা পায়নি; বরং ধর্মীয় অপরাধবোধ এবং তথাকথিত ‘সভ্য করার দায়িত্ব বা সিভিলাইজিং মিশন’-এর মোড়কে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও কৃষির ওপর নিজেদের নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিমুখী চরিত্র ও আফিম রাজস্বের অর্থনীতি (The Dual Nature of the British Empire and the Political Economy of Opium Revenue)
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্ববিরোধ ছিল তাদের মাদকনীতি এবং রাজস্বের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক। একদিকে ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের চার্চ ও সমাজপতিরা দেশীয় নাগরিকদের মদ্যপান ও আফিম গ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিবাক্য শোনাতেন, অন্যদিকে উপনিবেশগুলোতে আফিম উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে রাজকোষ ভরিয়ে তুলতেন। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ কার্ল এ. ট্রকি (Carl A. Trocki) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ ওপিয়াম, এম্পায়ার অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি (Opium, Empire and the Global Political Economy)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক পুঁজিবাদ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি আফিম বাণিজ্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল (Trocki, 1999)। ট্রকি প্রমাণ করেন যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে আফিম চাষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে তা চীনে চোরাচালানের মাধ্যমে ভারতের প্রশাসনিক ব্যয় ও চায়ের বাণিজ্য ঘাটতি মেটাত।
ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার আফিম চাষের ওপর এক কঠোর রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করেছিল। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ জন এফ. রিচার্ডস (John F. Richards) ঔপনিবেশিক ভারতে আফিম শিল্পের পরিচালনা ব্যবস্থা বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন (Richards, 2002)। রিচার্ডস দেখান যে বাংলা প্রেসিডেন্সির অধীনে কৃষকদের অগ্রিম ঋণ দিয়ে আফিম পপি চাষে বাধ্য করা হতো। কৃষকদের নিজস্ব জমিতে খাদ্যশস্য উৎপাদনের অধিকার কেড়ে নিয়ে আফিম উৎপাদন করানো হতো শুধুমাত্র রাজকোষের মুনাফার জন্য। এই ব্যবস্থার নাম ছিল বেঙ্গল ওপিয়াম মনোপলি (Bengal Opium Monopoly)। একই সাথে মধ্য ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোতে উৎপাদিত মালওয়া আফিমের ওপর ট্রানজিট শুল্ক বসিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিত।
উপনিবেশের এই নির্লজ্জ রাজস্বনীতির বিরুদ্ধে যখন ব্রিটেনের নিজস্ব চার্চ ও সমাজ সংস্কারকেরা সোচ্চার হতে শুরু করেন, তখন ব্রিটিশ রাষ্ট্র নিজেদের রক্ষা করতে এক চাতুর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি রাজকীয় তদন্ত দল গঠন করে যা রয়্যাল কমিশন অন ওপিয়াম (Royal Commission on Opium) নামে সমধিক পরিচিত। ট্রকির ঐতিহাসিক অনুসন্ধান প্রকাশ করে যে এই কমিশন কীভাবে অত্যন্ত চতুরতার সাথে তথ্য বিকৃত করেছিল। ভারতে এসে তারা ঔপনিবেশিক চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সাক্ষ্য তৈরি করায় যে ভারতীয়দের জন্য আফিম কোনো ক্ষতিকর মাদক নয়, বরং এটি তাদের ম্যালেরিয়া নিরাময়কারী এবং কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজনীয় পথ্য। ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ব্রিটিশ রাষ্ট্র দাবি করে যে ভারতের সমাজব্যবস্থায় আফিম একটি সুপ্রাচীন ধর্মীয় ও সামাজিক উপাদান, তাই এতে হস্তক্ষেপ করা অনুচিত হবে।
এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কীভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনো ধর্মীয় নৈতিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত, আবার কখনো ঐতিহ্য রক্ষার নামে মাদকের বাণিজ্যিক বিস্তারকে আড়াল করত। যখন রাজস্বের স্বার্থ জড়িত ছিল, তখন সাম্রাজ্যবাদীরা হঠাৎ করেই প্রাচ্যের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি অদ্ভুত সহমর্মিতা দেখাতে শুরু করেছিল। তবে স্বদেশে প্রোটেস্ট্যান্ট মূল্যবোধ রক্ষার জন্য তারা ঠিকই নিজেদের নাগরিকদের আফিম থেকে দূরে রাখার আইন তৈরি করছিল। ব্রিটিশ রাজশক্তি প্রমাণ করেছিল যে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যের কাছে কোনো সার্বজনীন নৈতিকতা থাকে না; পুঁজিপতিদের মুনাফা এবং সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতাই ছিল তাদের তথাকথিত নৈতিকতা নির্ধারণের একমাত্র বাস্তব মাপকাঠি।
নৈতিক আন্দোলন ও সামাজিক পদমর্যাদার রাজনীতি (Moral Crusades and the Politics of Status Politics)
পশ্চিমা বিশ্বে মাদক নিষিদ্ধকরণের ইতিহাসকে কেবল আইনের বিবর্তন দিয়ে বোঝা অসম্ভব; এর পেছনে কাজ করেছে তীব্র সামাজিক ও ধর্মীয় আধিপত্যের রাজনীতি। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জোসেফ আর. গাসফিল্ড (Joseph R. Gusfield) তার ক্লাসিক্যাল গবেষণাগ্রন্থ সিম্বলিক ক্রুসেড (Symbolic Crusade)-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাদক ও মদ্যবিরোধ আন্দোলনের সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ হাজির করেন (Gusfield, 1963)। গাসফিল্ড প্রস্তাব করেন মোরাল ক্রুসেড তত্ত্ব (moral crusade theory)। তিনি দেখান যে আমেরিকার গ্রামীণ প্রোটেস্ট্যান্ট মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন দ্রুত নগরায়ণ এবং ইউরোপীয় ক্যাথলিক অভিবাসীদের আগমনের ফলে সমাজে নিজেদের পদমর্যাদা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছিল, তখন তারা মাদকবিরোধিতাকে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার হাতিয়ার বানিয়েছিল। মদ্যপান না করাকে তারা চিহ্নিত করেছিল উন্নত চরিত্রের লক্ষণ হিসেবে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সাধারণ আচরণকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক প্রচারণা চালাত। গাসফিল্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি ছিল মূলত প্রতীকী ক্ষমতার লড়াই। ক্যাথলিক আইরিশ, জার্মান ও ইতালীয় শ্রমিকেরা ঐতিহ্যগতভাবেই পানশালায় সময় কাটাত এবং বিয়ার বা ওয়াইন পান করত। প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জাগুলো এই ভিন্ন সংস্কৃতিকে সহ্য করতে পারেনি। তারা প্রচার করতে শুরু করে যে পারিবারিক অশান্তি, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির মূল উৎস হলো এই পানশালাগুলো। ১৯২০ সালে সংবিধানে অষ্টাদশ সংশোধনী এনে যখন দেশজুড়ে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করা হয়, তখন তা কেবল মদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল না; বরং তা ছিল আগন্তুক অভিবাসী সংস্কৃতির ওপর প্রাচীন অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রোটেস্ট্যান্ট মূল্যবোধের এক আইনি বিজয়।
একই ধরনের বর্ণবাদী ও ধর্মীয় পক্ষপাত কাজ করেছিল অন্যান্য মাদক নিষিদ্ধের ক্ষেত্রেও। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ডেভিড এফ. মাস্টো (David F. Musto) তার প্রামাণ্য গ্রন্থ দ্য আমেরিকান ডিজিজ (The American Disease)-এ আমেরিকান মাদক আইনের পেছনের বর্ণবৈষম্য উন্মোচন করেছেন (Musto, 1999)। মাস্টো প্রমাণ করেন যে প্রতিটি মাদক নিষিদ্ধ করার আগে আমেরিকান সমাজ কোনো না কোনো প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীকে সেই মাদকের সাথে যুক্ত করে ভীতির আবহ তৈরি করেছিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় রেলপথ নির্মাণের পর যখন চীনা অভিবাসীদের সাথে শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকদের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হলো, তখন চার্চ ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো প্রচার শুরু করল যে চীনারা আফিম খেয়ে শ্বেতাঙ্গ নারীদের চরিত্র হনন করছে। এর ফলেই ১৮৭৫ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে প্রথম আফিমবিরোধী নগর আইন জারি হয়।
অনুরূপভাবে দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে আফ্রিকান আমেরিকানদের দমনের উদ্দেশ্যে কোকেনের ভয়কে ব্যবহার করা হয়েছিল। চার্চের যাজক এবং পুলিশ কর্মকর্তারা প্রচার করত যে কোকেন খেলে কৃষ্ণাঙ্গরা অস্বাভাবিক শক্তির অধিকারী হয় এবং শ্বেতাঙ্গদের ওপর আক্রমণ চালায়। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে মেক্সিকান অভিবাসীদের লক্ষ্য করে মারিজুয়ানার বিরুদ্ধে একই ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছিল। মাস্টোর বিশ্লেষণ এটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে মাদক নিষিদ্ধকরণ কোনো সার্বজনীন জনস্বার্থের ফসল ছিল না। এটি ছিল প্রভাবশালী প্রভাবশালী ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সমাজের দুর্বল ও ভিন্নমতাবলম্বী অংশকে অপরাধী বানিয়ে জেলে পুরে রাখার এক সুপরিকল্পিত সামাজিক ও আইনি কৌশল।
ঔপনিবেশিক পিতৃতান্ত্রিকতা ও স্থানীয় নিরাময় ব্যবস্থার দমন (Colonial Paternalism and the Suppression of Indigenous Healing Systems)
ঔপনিবেশিক শাসনের আরেকটি অন্ধকার অধ্যায় হলো বিজিত অঞ্চলের প্রাচীন চিকিৎসাজ্ঞান ও ভেষজ সংস্কৃতিকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা। ইউরোপীয় শাসকেরা যখন এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় পদার্পণ করেছিল, তখন তারা শুধু ভৌগোলিক ভূখণ্ড দখল করেনি, বরং স্থানীয়দের শরীর ও জীবনযাত্রার ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী অ্যান লরা স্টোলার (Ann Laura Stoler) তার সাড়াজাগানো বই কার্নাল নলেজ অ্যান্ড ইম্পেরিয়াল পাওয়ার (Carnal Knowledge and Imperial Power)-এ ঔপনিবেশিক ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা বিশ্লেষণ করেছেন (Stoler, 2002)। স্টোলার দেখান যে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য ঔপনিবেশিক প্রভুদের নিজেদের নৈতিক ও শারীরিক শ্রেষ্ঠত্বের ভাবমূর্তি বজায় রাখা জরুরি ছিল। এই কারণে তারা স্থানীয় মানুষের খাদ্যাভ্যাস, যৌনতা এবং ভেষজের ব্যবহারকে কঠোর শৃঙ্খলায় বাঁধতে চেয়েছিল।
ব্রিটিশ ভারতে এই ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটেছিল আবগারি ব্যবস্থা বা আবগারি আইন (Abkari laws) প্রবর্তনের মাধ্যমে। শত শত বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের গ্রামীণ সমাজে কবিরাজ, হেকিম এবং সাধুসন্তরা ক্যানাবিস বা গাঁজা এবং আফিমকে ব্যথা উপশম ও বিভিন্ন রোগের পথ্য হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং উন্মুক্ত। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন ১৮৭৮ সালের আবগারি আইনের মাধ্যমে বুনো গাঁজা সংগ্রহ বা নিজের জমিতে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ক্যানাবিস চাষকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর বদলে সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু লাইসেন্সধারী ঠিকাদারের মাধ্যমে গাঁজা ও আফিম বিক্রির ব্যবস্থা করে, যার ওপর বিশাল শুল্ক আরোপ করা হতো। ফলে ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় ভেষজ ব্যবহার এক লহমায় বেআইনি চোরাচালান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে।
ঔপনিবেশিক শাসকেরা এবং তাদের সহযোগী খ্রিস্টান মিশনারিরা ভারতীয় আয়ুর্বেদ ও লোকায়ত ভেষজ চিকিৎসাকে ‘অন্ধবিশ্বাস ও নোংরামি’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল। স্টোলারের তত্ত্ব প্রয়োগ করলে দেখা যায়, এটি ছিল আধুনিক পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফার্মাসিউটিক্যাল পুঁজির বাজার তৈরির এক সুদূরপ্রসারী নকশা। স্থানীয় ভেষজবিদদের সামাজিক মর্যাদা ধূলিসাৎ করে পাশ্চাত্য ধাঁচের হাসপাতাল ও ঔষধালয়কে একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত মাধ্যম হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। যেসব উদ্ভিদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামীণ মানুষের ব্যথার উপশম দিত, সেগুলোকে সরকারি লাইসেন্সের বেড়াজালে আটকে দিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
এই দমননীতির পেছনে কাজ করেছিল চরম পিতৃতান্ত্রিক (patriarchal) দৃষ্টিভঙ্গি। ঔপনিবেশিক প্রশাসন নিজেদের দেখত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিভাবক হিসেবে। তারা মনে করত যে প্রাচ্যের মানুষের নিজস্ব ভালো-মন্দ বোঝার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা নেই, তাই তাদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সাদা চামড়ার প্রভুদেরই নিতে হবে। স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনকে অপরাধের চোখে দেখে তাদের পুরোপুরি ইউরোপীয় প্রশাসনিক যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল করে তোলাই ছিল এই নীতির মূল নির্যাস। ঐতিহ্যবাহী লোকায়ত চিকিৎসাজ্ঞানের এই বিনাশ আসলে কোনো সামাজিক উন্নয়ন ছিল না; এটি ছিল একটি প্রাচীন সমাজের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক ও শারীরিক স্বাধীনতা হরণ করার সুপরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন।
ফার্মাকোলজিক্যাল সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্ব বাণিজ্যের বিস্তার (Pharmacological Imperialism and the Expansion of Global Trade)
আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক রূপান্তর বুঝতে হলে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের বৈশ্বিক বিস্তারকে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে পাঠ করা প্রয়োজন। ইতিহাসবিদ ডেভিড টি. কোর্টরাইট (David T. Courtwright) তার প্রভাবশালী গ্রন্থ ফোর্সেস অব হ্যাবিট (Forces of Habit)-এ আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মনঃসক্রিয় পদার্থের ভূমিকাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন (Courtwright, 2001)। কোর্টরাইট একে বলেন সাইকোঅ্যাকটিভ বিপ্লব (psychoactive revolution)। তিনি দেখান যে ষোড়শ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বাণিজ্য বিশ্বজুড়ে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস বদলে দিয়েছিল। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইউরোপীয় শাসকেরা সমস্ত মাদককে সমান চোখে দেখেনি; বরং তারা অত্যন্ত সুচতুরভাবে কিছু পদার্থকে বিশ্বজুড়ে উৎসাহিত করেছিল আর কিছু পদার্থকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিল।
কোর্টরাইটের বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে যেসব উপাদান শিল্প কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করত এবং শ্রমিকদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে সহায়তা করত, সেগুলোকে পুঁজিবাদী অর্থনীতি অত্যন্ত সমাদরে গ্রহণ করেছিল। চা, কফি, চিনি এবং তামাকের মতো উপাদানগুলো এই প্রক্রিয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান পণ্যে পরিণত হয়। ইউরোপের শ্রমিকদের ক্লান্তি দূর করে দীর্ঘ শিফটে সজাগ রাখার জন্য চা ও কফির ক্যাফেইন ছিল অপরিহার্য। গির্জা এবং রাষ্ট্র উভয়ই এই উদ্দীপকগুলোকে সম্পূর্ণ নৈতিক ও স্বাস্থ্যসম্মত বলে প্রচার করেছিল, কারণ এগুলোর পেছনে কোনো নেশাগ্রস্ত ঝিমুনি ছিল না; ছিল কেবল কাজ করার নিরবচ্ছিন্ন শক্তি। পক্ষান্তরে, যেসব ভেষজ মানুষকে শ্রমের উৎপাদনশীল শৃঙ্খলা থেকে সরিয়ে অলস বা আত্মমগ্ন করে তুলত, যেমন গাঁজা বা হ্যালুসিনোজেনিক লতাপাতা, সেগুলোকে সমাজবিধ্বংসী এবং নৈতিক পাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ সমাজে এই শ্রেণিগত বৈষম্যের চমৎকার চিত্র তুলে ধরেছেন সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ ভার্জিনিয়া বেরিজ (Virginia Berridge) (Berridge, 1999)। বেরিজ তার আকর গ্রন্থ ওপিয়াম অ্যান্ড দ্য পিপল (Opium and the People)-এ দেখান কীভাবে উনিশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের কয়লা খনি ও কারখানার শ্রমিকেরা সস্তা তরল আফিম বা লডেনাম খেয়ে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ক্ষুধা ও শারীরিক যন্ত্রণা ভুলে থাকত। এমনকি ক্ষুধার্ত কান্নারত শিশুদের শান্ত রাখতেও এই বিষাক্ত মিশ্রণ খাওয়ানো হতো। সেই সময়ে উচ্চবিত্তদের কাছে এটি কোনো সমস্যাই মনে হয়নি। কিন্তু যখন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ চিকিৎসকেরা ফার্মেসির ওপর নিজেদের একচেটিয়া পেশাগত অধিকার দাবি করতে শুরু করেন এবং উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণি শ্রমিকদের এই মাদকাভ্যাসকে শিল্প শৃঙ্খলার জন্য বিপদ মনে করতে থাকে, তখনই আইন করে সাধারণ মানুষের জন্য এই উপাদানগুলো নিষিদ্ধ করা হয়।
বেরিজের গবেষণা এটা পরিষ্কার করে দেয় যে কোনো রাসায়নিক পদার্থ নিজ থেকে পাপ বা অপরাধ ছিল না। উপাদানটির ওপর রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করত পুঁজিবাদী কারখানা এবং সাম্রাজ্যবাদী শ্রমবাজারে তার ভূমিকার ওপর। ঔপনিবেশিক বণিকেরা একদিকে লক্ষ লক্ষ দাস শ্রমিক ব্যবহার করে ক্যারিবীয় অঞ্চলে চিনি ও তামাকের আবাদ করছিল, অন্যদিকে সেই একই মুনাফালোভী রাষ্ট্র নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে পুরনো ভেষজগুলোকে সমাজচ্যুত ঘোষণা করছিল। ফার্মাকোলজিক্যাল সাম্রাজ্যবাদ এইভাবে মানবজাতির শারীরবৃত্তীয় চাহিদাকে পুঁজিবাদী মুনাফা ও নিয়ন্ত্রণের একটি শক্তিশালী যন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিল।
সাম্রাজ্য-উত্তর আন্তর্জাতিক মাদক শাসনব্যবস্থা ও ধর্মীয় ছায়া (Post-Imperial International Drug Governance and the Shadow of Religion)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো একে একে ভেঙে পড়তে শুরু করল, তখন মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বটি চলে যায় নব্য গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হাতে। তবে ঔপনিবেশিক যুগের সেই ধর্মীয় নৈতিকতা এবং ক্ষমতার বিন্যাস পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, বরং তা এক নতুন আন্তর্জাতিক আমলাতান্ত্রিক রূপ ধারণ করে। আন্তর্জাতিক মাদকনীতির গবেষক উইলিয়াম বি. ম্যাকঅ্যালিস্টার (William B. McAllister) তার বিশদ গবেষণাগ্রন্থ ড্রাগ ডিপ্লোম্যাসি ইন দ্য টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি (Drug Diplomacy in the Twentieth Century)-তে এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর বিশদভাবে দেখিয়েছেন (McAllister, 2000)। ম্যাকঅ্যালিস্টার উন্মোচন করেন কীভাবে জাতিপুঞ্জ বা লিগ অব নেশনস এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রপুঞ্জের মাদক নিয়ন্ত্রণ কমিটিগুলোতে পশ্চিমা শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ ও নৈতিক এজেন্ডাকে আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদা দিয়েছিল।
এই বৈশ্বিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬১ সালে স্বাক্ষরিত জাতিসংঘের একক মাদক কনভেনশন (Single Convention on Narcotic Drugs, 1961)-এর মাধ্যমে। ম্যাকঅ্যালিস্টারের বিশ্লেষণ দেখায় যে এই চুক্তিতে তথাকথিত বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের কথা বলা হলেও এর ভেতরের অন্তর্নিহিত সুরটি ছিল শতাব্দীপ্রাচীন প্রোটেস্ট্যান্ট নৈতিকতাবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। কনভেনশনটিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর এমন এক দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয় যেন মাদককে পুরোপুরি পৃথিবী থেকে নির্মূল করা একটি পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য। চুক্তির তফসিলে এমন সব ভেষজ উপাদানকে কঠোর অপরাধের তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়, যা এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার প্রান্তিক মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
এই আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে বড় বৈষম্যের শিকার হয়েছিল গ্লোবাল সাউথ বা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। বলিভিয়া ও পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার আদিবাসীদের কাছে কোকা পাতা চিবানো ছিল উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলে বেঁচে থাকা এবং ক্লান্তিনাশের স্বাভাবিক অভ্যাস। একইভাবে ভারত ও নেপালের মতো দেশগুলোতে মেলা বা ধর্মীয় উৎসবে সীমিত ক্যানাবিসের ব্যবহার কোনো বড় অপরাধ বলে গণ্য হতো না। কিন্তু ১৯৬১ সালের জাতিসংঘ কনভেনশন এই সমস্ত স্থানীয় প্রথাকে সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করে ২৫ বছরের মধ্যে পুরোপুরি নির্মূল করার চরমপত্র জারি করে। অথচ একই সাথে পশ্চিমা কর্পোরেশনগুলোর তৈরি কোটি কোটি ট্রাঙ্কুলাইজার, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং অবাধে বিক্রি হওয়া অ্যালকোহল ও তামাককে এই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতার সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছিল।
ম্যাকঅ্যালিস্টারের ঐতিহাসিক পাঠ এটা প্রমাণ করে যে সমকালীন আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কোনো নিরপেক্ষ বিজ্ঞানভিত্তিক কাঠামো নয়। এটি হলো ঔপনিবেশিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ, খ্রিস্টীয় নৈতিক সংস্কার আন্দোলন এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক আধিপত্যের এক মিশ্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। প্রাচীন যুগে চার্চ যেভাবে ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে থাকা মানুষকে ডাইনি বা পৌত্তলিক আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মারত, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা ঠিক একইভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও পুলিশি তৎপরতার মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের কৃষকদের নিজেদের পূর্বপুরুষের ভেষজ ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। অন্ধ নৈতিকতাবাদী এই নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি বিজ্ঞানের যুক্তিবাদী অনুসন্ধানকে অবরুদ্ধ করে রেখে মানবজাতির সামনে এক স্থায়ী সহিংস ও বৈষম্যমূলক মাদক ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে।
ধর্ম, মাদকাসক্তি ও পুনর্বাসন (Religion, Substance Use Disorders and Recovery): ধর্মীয় মোকাবেলা-কৌশল, বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসা, দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচি ও কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন
ধর্মীয় মোকাবেলা-কৌশল ও মানসিক সংকটের সমাজতত্ত্ব (Religious Coping Mechanisms and the Sociology of Mental Distress)
মাদকাসক্তি এবং তা থেকে সেরে ওঠার দীর্ঘ যাত্রায় ধর্মের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে মানুষের তীব্র মানসিক সংকট মোকাবেলার মনস্তাত্ত্বিক দিকটি। ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী কেনেথ পারগামেন্ট (Kenneth Pargament) তার প্রভাবশালী গবেষণাগ্রন্থ দ্য সাইকোলজি অব রিলিজিয়ন অ্যান্ড কোপিং (The Psychology of Religion and Coping)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তে মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাসকে একটি মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে (Pargament, 1997)। পারগামেন্ট একে সংজ্ঞায়িত করেন ধর্মীয় মোকাবেলা তত্ত্ব (religious coping theory) হিসেবে। তিনি এই কৌশলকে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক – এই দুই ভাগে বিভক্ত করেন। যখন একজন আসক্ত ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তার দুর্দশা দূর করতে পারে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের কৃত্রিম স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়। তবে পারগামেন্টের গবেষণা এটাও স্পষ্ট করে যে এই সান্ত্বনা কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং এটি হলো চরম অসহায়ত্বের মুখে মানুষের নিজস্ব মস্তিষ্কজাত এক আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা কৌশল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক হ্যারল্ড জি. কোয়েনিগ (Harold G. Koenig) তার আকর গ্রন্থ হ্যান্ডবুক অব রিলিজিয়ন অ্যান্ড হেলথ (Handbook of Religion and Health)-এ ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন (Koenig et al., 2012)। কোয়েনিগ উল্লেখ করেন যে যেসব ব্যক্তি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নেয়, তাদের মধ্যে মাদক ব্যবহারের হার কিছুটা কম দেখা যায়। তবে এর পেছনের কারণ কোনো অলৌকিক পবিত্রতা নয়; এর আসল কারণ হলো শক্তিশালী সামাজিক নজরদারি এবং একটি সুসংহত সম্প্রদায়ের উপস্থিতি। ধর্মীয় দলগুলো ব্যক্তির দৈনন্দিন আচরণের ওপর যে নৈতিক চাপ ও নিয়ন্ত্রণ জারি রাখে, তা মানুষকে সাময়িকভাবে বিপথগামিতা থেকে বিরত রাখতে একটি বহিরাগত প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এটি মূলত সামাজিক পুঁজি এবং গোষ্ঠীগত শৃঙ্খলার এক নিরেট সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব।
তবে ধর্মীয় এই মোকাবেলা-কৌশল সব সময় ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না; বহু ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। পারগামেন্ট তার গবেষণায় নেতিবাচক ধর্মীয় মোকাবেলার অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করেছেন। যখন একজন আসক্ত ব্যক্তি বারবার চেষ্টা করেও মাদক ত্যাগ করতে ব্যর্থ হয়, তখন ধর্মীয় অনুশাসন তাকে বোঝায় যে ঈশ্বর হয়তো তার ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন অথবা এটি তার অতীতের কোনো মহাপাপের উপযুক্ত শাস্তি। এই ধরনের বিশ্বাস ব্যক্তির মনে ভয়াবহ অপরাধবোধ, আত্মঘৃণা এবং মানসিক অবসাদের জন্ম দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য দেখায় যে এই পাপবোধের কারণে আসক্ত ব্যক্তি আরো বেশি হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং সেই তীব্র গ্লানি ভুলতে পুনরায় অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক গ্রহণে বাধ্য হয়। ফলে ধর্মীয় ভয়ভীতি অনেক সময় রোগ নিরাময়ের বদলে আসক্তির দুষ্টচক্রকে আরো জটিল করে তোলে।
আধুনিক সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞান ধর্মীয় সান্ত্বনাকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্লাসিবো প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করে। একজন ব্যক্তি যখন বিশ্বাস করে যে প্রার্থনা বা ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে তার ভেতরের শূন্যতা পূরণ হচ্ছে, তখন মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী ডোপামিনার্জিক রিওয়ার্ড পাথওয়ে সাময়িকভাবে এক কৃত্রিম সন্তুষ্টি লাভ করে। এই প্রক্রিয়ার পেছনে কোনো ঈশ্বর বা পরলৌকিক অস্তিত্বের প্রয়োজন হয় না; মানুষের নিজস্ব প্রত্যয় এবং সামাজিক প্রত্যাশাই এই স্নায়বিক পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট। বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো এই কাল্পনিক নির্ভরতাকে ভেঙে দিয়ে মানুষের বাস্তব সমস্যাকে তার জৈবিক, মানসিক এবং সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে সমাধান করা। ধর্মীয় অনুশাসন ব্যক্তিকে পরনির্ভরশীল ও অন্ধবিশ্বাসী করে তোলে, পক্ষান্তরে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা মানুষের নিজস্ব যুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করে।
দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচির উদ্ভব ও অক্সফোর্ড গ্রুপের ধর্মতত্ত্ব (Genesis of the Twelve-Step Program and the Theology of Oxford Group)
বিশ্বজুড়ে মাদকাসক্তি নিরাময়ে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত কিন্তু তীব্রভাবে বিতর্কিত পদ্ধতি হলো দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচি। ১৯৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিল উইলসন এবং ড. বব স্মিথের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল অ্যালকোহলিকস অ্যানোনিমাস (Alcoholics Anonymous) বা এএ। গবেষক উইলিয়াম এল. হোয়াইট (William L. White) তার বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ স্লেয়িং দ্য ড্রাগন: দ্য হিস্ট্রি অব অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড রিকভারি ইন আমেরিকা (Slaying the Dragon: The History of Addiction Treatment and Recovery in America)-এ এই আন্দোলনের গোড়াপত্তন বিশদভাবে নথিভুক্ত করেছেন (White, 1998)। হোয়াইট দেখান যে এএ কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গবেষণাগারে জন্ম নেয়নি; বরং এর মূল শেকড় ছিল ফ্রাঙ্ক বুখম্যানের প্রতিষ্ঠিত উগ্র খ্রিস্টীয় পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন অক্সফোর্ড গ্রুপ (Oxford Group)-এর ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরে।
সমাজবিজ্ঞানী ও আইনতাত্ত্বিক মারিয়ানা ভালভের্দে (Mariana Valverde) তার আকর গ্রন্থ ডিজিজেস অব দ্য উইল (Diseases of the Will)-এ দ্বাদশ-ধাপের অভ্যন্তরীণ দর্শন ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Valverde, 1998)। ভালভের্দে দেখান কীভাবে অক্সফোর্ড গ্রুপের খ্রিস্টীয় পাপমোচনের ধারণাগুলোকে পরিমার্জন করে এএ-র বারোটি ধাপে রূপান্তর করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির মূল কথাই হলো ব্যক্তিকে স্বীকার করতে হবে যে সে নিজের মদ্যপানের ওপর সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন এবং একমাত্র একটি ‘উচ্চতর শক্তি’ বা ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলেই তার মুক্তি সম্ভব। ভালভের্দের বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে এই তথাকথিত উচ্চতর শক্তি আসলে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টধর্মের ঈশ্বরের এক ধর্মনিরপেক্ষ ছদ্মবেশ মাত্র। ব্যক্তিকে তার নিজের ইচ্ছা বা স্বাধীন বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে এক কাল্পনিক শক্তির কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এই আহ্বান আধুনিক বিজ্ঞান ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচির সাহিত্য হিসেবে পরিচিত তথাকথিত ‘বিগ বুক’ বা অ্যালকোহলিকস অ্যানোনিমাস (Alcoholics Anonymous) গ্রন্থে আসক্তিকে একটি শারীরিক অ্যালার্জি এবং একই সাথে এক ধরনের ‘আত্মিক দেউলিয়াত্ব বা স্পিরিচুয়াল ব্যাংক্রাপ্টসি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই তত্ত্বে দাবি করা হয় যে ব্যক্তির অহংকার এবং চারিত্রিক ত্রুটিই তার নেশার কারণ, তাই নিয়মিত প্রার্থনা, জনসমক্ষে নিজের পাপ বা ভুলের স্বীকারোক্তি এবং অন্য আসক্তদের ধর্মান্তরিত করার মতো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কেবল নিরাময় সম্ভব। এই কাঠামোটি নিরেট মধ্যযুগীয় ধর্মীয় চার্চের স্বীকারোক্তি ব্যবস্থার এক আধুনিক প্রতিচ্ছবি। একজন মানুষ যে একটি জটিল নিউরোবায়োলজিক্যাল রোগে ভুগছে, তাকে নৈতিক ত্রুটিযুক্ত পাপী হিসেবে চিত্রিত করে তার ওপর আধ্যাত্মিক বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের চোখে এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ।
ভালভের্দে আরও লক্ষ্য করেন যে দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচি মানুষের সংজ্ঞানাত্মক সক্ষমতাকে খাটো করে এক ধরনের পরোক্ষ ধর্মীয় রূপান্তরের আবহ তৈরি করে। আসক্ত ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যে সে আজীবন একজন রোগী বা অসুস্থ মানুষ এবং এই দলের সার্বক্ষণিক আনুগত্য ছাড়া সে কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না। বিজ্ঞান যেখানে একজন মানুষকে স্বাবলম্বী এবং আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে চায়, সেখানে এই ধরনের কর্মসূচি ব্যক্তিকে এক আজীবন অনুগত অনুসারীতে পরিণত করে। দ্বাদশ-ধাপ আন্দোলন আসক্তি নিরাময়ের প্রক্রিয়াটিকে চিকিৎসকদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এক আধ্যাত্মিক মতাদর্শের অধীনে বন্দি করে ফেলেছিল, যা বহু দশক ধরে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বিশ্বাসভিত্তিক পুনর্বাসন কেন্দ্র ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংঘাত (Faith-Based Rehabilitation Centers and the Conflict with Modern Medicine)
পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আজ হাজার হাজার তথাকথিত বিশ্বাসভিত্তিক পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এই কেন্দ্রগুলো প্রায়শই কোনো স্বীকৃত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া চার্চ, মসজিদ বা বিভিন্ন ধর্মীয় উপদল দ্বারা পরিচালিত হয়। আসক্তি বিষয়ক গবেষক উইলিয়াম আর. মিলার (William R. Miller) এই ধরনের আধ্যাত্মিক নিরাময় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন (Miller, 1998)। মিলার দেখান যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা টিন চ্যালেঞ্জের মতো ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে যে একমাত্র যিশুর প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাসই মাদকাসক্তি দূর করতে পারে। বিজ্ঞান ও আধুনিক সাইকিয়াট্রির পরিবর্তে সেখানে রোগীদের দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইবেল পাঠ করানো হয়, বাধ্যতামূলক প্রার্থনায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয় এবং কঠোর অনুশাসনের মধ্যে রাখা হয়।
এই বিশ্বাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সাথে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতটি ঘটে ফার্মাকোথেরাপি বা ওষুধভিত্তিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে। আধুনিক আসক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞান অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছে যে ওপিওড বা অন্যান্য মারাত্মক মাদকের ক্ষেত্রে মেডিকেশন-অ্যাসিস্টেড ট্রিটমেন্ট (Medication-Assisted Treatment বা MAT) হলো জীবনের সুরক্ষার প্রধান উপায়। মেথাডোন কিংবা বুপ্রেনরফিনের মতো বৈজ্ঞানিক ওষুধ গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের রিসেপ্টর শান্ত থাকে এবং প্রত্যাহারের মারাত্মক শারীরিক যন্ত্রণা দূর হয়। কিন্তু ধর্মীয় পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো বিজ্ঞানকে অগ্রাহ্য করে এই ওষুধগুলোকে ‘এক মাদক ছেড়ে আরেক মাদক ধরা’ বলে আখ্যা দেয় এবং রোগীদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এই গোঁড়ামির পরিণতি হিসেবে শত শত মানুষ অসহনীয় যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করে কিংবা কেন্দ্র থেকে পালিয়ে গিয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক গ্রহণ করে মৃত্যুবরণ করে।
সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে অনেক বিশ্বাসভিত্তিক কেন্দ্রে রোগীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। তথাকথিত ভূত তাড়ানো, শারীরিক প্রহার, অনাহারে রাখা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করাকে সেখানে শয়তানের প্রভাব মুক্তির আধ্যাত্মিক কৌশল হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়। লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে পরিচালিত এই অবৈধ আশ্রমগুলোতে রোগীদের শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও সাধারণ বিষয়। রাষ্ট্রীয় নজরদারির অভাব এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই কেন্দ্রগুলো বছরের পর বছর ধরে এক অনিবন্ধিত ও বিপজ্জনক বন্দিশিবির হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। মানুষের রোগকে পুঁজি করে নিজেদের ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার এবং অনুদান সংগ্রহের এক লাভজনক ব্যবসা খুলে বসেছে এই চক্রগুলো।
মিলার তার বিশ্লেষণে পরিষ্কার করেছেন যে আসক্তি কোনো আত্মিক ভ্রষ্টতা বা ধর্মহীনতার ফল নয়; এটি মস্তিষ্কের এক জটিল নিউরোকেমিক্যাল ব্যাধি। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে যেভাবে কেবল ধর্মগ্রন্থ পড়ে বা প্রার্থনা করে সারিয়ে তোলা অসম্ভব, ঠিক তেমনিভাবে ওপিওড বা অ্যালকোহল আসক্তিকেও কোনো আধ্যাত্মিক মন্ত্র দিয়ে নিরাময় করা যায় না। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে ডিটক্সিফিকেশন, প্রামাণ্য সাইকোথেরাপি এবং সামাজিক পুনর্বাসনের সমন্বিত বিজ্ঞানসম্মত মডেলের ওপর জোর দেয়, সেখানে বিশ্বাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো মানুষকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা থেকে আসক্ত মানুষকে বঞ্চিত করে তাদের ওপর ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচির কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন (Scientific Evaluation of the Twelve-Step Program’s Efficacy)
দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচি ও অ্যালকোহলিকস অ্যানোনিমাসের কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে মিথ প্রচলিত ছিল, আধুনিক এপিডেমিওলজিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল গবেষণা তার কঠোর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন হাজির করেছে। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট ল্যান্স ডোয়েডস (Lance Dodes) এবং মনোবিজ্ঞানী জ্যাকারি ডোয়েডস তাদের বহুল আলোচিত বই দ্য সোবার ট্রুথ (The Sober Truth)-এ দ্বাদশ-ধাপের পেছনের পরিসংখ্যানগত ধাপ্পাবাজি উন্মোচন করেছেন (Dodes & Dodes, 2014)। ডোয়েডস প্রমাণ করেন যে এএ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল তাদের সাফল্যের হার শতকরা পঁচাত্তর থেকে পঁচাশি ভাগ, যা ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া ও মনগড়া। স্বাধীন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং পিয়ার-রিভিউড তথ্য পরীক্ষা করে তারা দেখান যে দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্যের হার শতকরা মাত্র পাঁচ থেকে দশ ভাগের বেশি নয়, যা কোনো চিকিৎসা না নিয়ে স্বাভাবিকভাবে সুস্থ হওয়ার হারের সমান।
ডোয়েডসের গবেষণায় দ্বাদশ-ধাপের এক ভয়াবহ দুর্বলতা ধরা পড়ে, যা হলো এর আকাশচুম্বী ঝরে পড়ার হার। কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া প্রায় একশত জনের মধ্যে নব্বই থেকে পঁচানব্বই জনই প্রথম তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে দল ত্যাগ করে চলে যায়। এএ কেবল সেই মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের সাফল্যকে প্রচার করে যারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় নির্বাচন পক্ষপাত (selection bias)। যারা ব্যর্থ হয় বা ফিরে যায়, তাদের ক্ষেত্রে দাবি করা হয় যে তারা আন্তরিকভাবে ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি অথবা তাদের চরিত্রে ত্রুটি ছিল। ডোয়েডস দেখান কীভাবে এটি একটি বিপজ্জনক ভিকটিম-ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি তৈরি করে। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় কোনো ওষুধ কাজ না করলে ওষুধের পরিবর্তন করা হয়, কিন্তু দ্বাদশ-ধাপে রোগীকে বলা হয় সে নিজেই যথেষ্ট বিশ্বাসী হতে পারেনি।
তবে এই কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণায় কিছু ভিন্নমাত্রিক পর্যবেক্ষণও রয়েছে। প্রখ্যাত আসক্তি বিশেষজ্ঞ জন এফ. কেলি (John F. Kelly) এবং তার সহযোগীরা ২০২০ সালে প্রকাশিত সুবিশাল কোচরান সিস্টেমেটিক রিভিউতে দ্বাদশ-ধাপ ও অন্যান্য চিকিৎসার তুলনামূলক ফলাফল বিশ্লেষণ করেন (Kelly et al., 2020)। কেলি দেখান যে যেসব ব্যক্তি এই কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে, তাদের ক্ষেত্রে মদ বর্জনের হার প্রচলিত কিছু মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার সমতুল্য হতে পারে। তবে কেলি এবং অন্যান্য সংজ্ঞানাত্মক গবেষকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এই সাফল্যের পেছনে কোনো ‘উচ্চতর শক্তি’ বা আধ্যাত্মিকতার হাত নেই। এর আসল রহস্য নিহিত রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের পরিবর্তনের মধ্যে। একজন ব্যক্তি যখন পুরনো মাদকাসক্ত সঙ্গীদের ত্যাগ করে একদল মদ্যপানহীন মানুষের সাথে প্রতিদিন মেলামেশা করে, তখন তার আচরণগত পরিবর্তন ঘটে।
জনস হপকিন্স এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন অ্যালকোহল অ্যাবিউজ অ্যান্ড অ্যালকোহলিজমের পরিচালিত ঐতিহাসিক গবেষণা প্রজেক্ট ম্যাচ (Project MATCH)-এর ফলাফলও এই বাস্তবতাকে সমর্থন করে (Project MATCH Research Group, 1997)। প্রজেক্ট ম্যাচের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল যে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি, মোটিভেশনাল এনহ্যান্সমেন্ট থেরাপি এবং টুয়েলভ-স্টেপ ফ্যাসিলিটেশনের ফলাফলের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। এর মানে দাঁড়ায়, দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচির যেটুকু ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়, তা মূলত পিয়ার সাপোর্ট বা সহমর্মী মানুষের সামাজিক সমর্থন, অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি এবং নজরদারির মনস্তাত্ত্বিক ফল। কোনো ব্যক্তি যদি এই কাঠামোর ভেতরে থাকা ধর্মীয় কুসংস্কারগুলোকে বর্জন করে কেবল সামাজিক সহায়তাটুকুকে গ্রহণ করতে পারত, তবে সে ঠিক একই ফল পেত। আধ্যাত্মিক অলীক ধারণাকে কার্যকর উপাদান বলে প্রচার করা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিভ্রান্তিকর।
আসক্তির নৈতিক মডেল বনাম জৈব-মনো-সামাজিক বাস্তবতা (The Moral Model of Addiction versus Biopsychosocial Reality)
মাদকাসক্তিকে বোঝার ক্ষেত্রে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহাসিকভাবেই একটি সংকুচিত ও অবদমনমূলক কাঠামো ব্যবহার করেছে, যাকে সমাজবিজ্ঞানে বলা হয় আসক্তির নৈতিক মডেল। এই মডেল অনুযায়ী আসক্তি হলো ব্যক্তির দুর্বল ইচ্ছাশক্তি, পাপপ্রবৃত্তি এবং ধর্মীয় আনুগত্যের অভাব। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বহু আগেই বাতিল করে দিয়েছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সাইকিয়াট্রিস্ট জর্জ ই. ভ্যালান্ট (George E. Vaillant) তার যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব অ্যালকোহলিজম রিভিজিটেড (The Natural History of Alcoholism Revisited)-এ আসক্তির বাস্তব দীর্ঘমেয়াদী গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করেছেন (Vaillant, 1995)। ভ্যালান্ট দেখান যে মাদকাসক্তি কোনো চরিত্রগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্রনিক মস্তিষ্কের রোগ, যার শেকড় মানুষের স্নায়বিক গঠন ও জিনগত দুর্বলতার সাথে জড়িত।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মার্ক গ্যালান্টার (Marc Galanter) দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক সমাজ এখনও এই নৈতিক মডেল এবং চিকিৎসাগত মডেলের মধ্যকার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে (Galanter, 2007)। গ্যালান্টার তার গবেষণায় উল্লেখ করেন যে দ্বাদশ-ধাপ বা বিশ্বাসভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো মুখে আসক্তিকে রোগ দাবি করলেও তাদের কার্যপদ্ধতি পরিচালিত হয় সেই প্রাচীন নৈতিক কাঠামোর আলোকেই। রোগীকে নিজের চারিত্রিক দোষত্রুটি খুঁজে বের করে অনুতপ্ত হতে বলা আসলে পাপবোধ তৈরিরই নামান্তর। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে মাদক গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র। ফলে একজন ব্যক্তি তার মাদক গ্রহণের তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কোনো নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে নয়, বরং তার স্নায়বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে।
বিজ্ঞান আজ আসক্তিকে ব্যাখ্যা করে সুপ্রতিষ্ঠিত জৈব-মনো-সামাজিক মডেল (biopsychosocial model)-এর মাধ্যমে। এই মডেল স্পষ্ট করে দেয় যে আসক্তি তৈরি হয় তিনটি প্রধান উপাদানের জটিল মিথস্ক্রিয়ায়: জৈবিক উপাদান যেমন জিনগত সংবেদনশীলতা ও নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতা; মনস্তাত্ত্বিক উপাদান যেমন শৈশবের মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা ও উদ্বেগ; এবং সামাজিক উপাদান যেমন চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বর্ণবাদ ও বৈষম্যমূলক পারিবারিক পরিবেশ। এই ত্রিবিধ বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যখন কোনো ধর্মীয় বক্তা দাবি করেন যে আসক্তির মূল কারণ হলো স্রষ্টার প্রতি অবিশ্বস্ততা, তখন তা সমস্যার মূল শেকড় থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়। সামাজিক অর্থনৈতিক সংস্কার না করে কেবল ব্যক্তির ঘাড়ে পাপের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রতিক্রিয়াশীলতা।
ভ্যালান্টের পর্যবেক্ষণ এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরে যে নৈতিক অনুশাসন বা ধর্মীয় ভীতি মানুষের আসক্তি নিরাময়ে কোনো টেকসই সমাধান দিতে পারে না। একজন মানুষকে সুস্থ করতে হলে প্রয়োজন তার মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরোটোনিন সিস্টেমের চিকিৎসা, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির মাধ্যমে মানসিক ট্রমা দূরীকরণ এবং একটি সহায়ক সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। ধর্মীয় মডেল আসক্ত ব্যক্তিকে সমাজচ্যুত করে তার গায়ে অপরাধীর তকমা এঁটে দেয়, যা তাকে আরো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান মানুষকে কোনো বিচার না করে একজন রোগী হিসেবে দেখে এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে স্বাভাবিক মানব মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করে।
ধর্মনিরপেক্ষ নিরাময় আন্দোলন ও ক্ষতি হ্রাসের ভবিষ্যৎ (Secular Recovery Movements and the Future of Harm Reduction)
দ্বাদশ-ধাপ কর্মসূচি এবং বিশ্বাসভিত্তিক পুনর্বাসনের ধর্মীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ নিরাময় আন্দোলন। যেসব মানুষ কোনো কাল্পনিক উচ্চতর শক্তিতে বিশ্বাস করেন না অথবা নিজেদের ইচ্ছাশক্তিকে ঈশ্বরের পদতলে বিসর্জন দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের জন্য আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক বিকল্প তৈরি হয়েছে। আসক্তি গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানী কিথ হামফ্রিস (Keith Humphreys) তার বিখ্যাত গ্রন্থ সার্কেলস অব রিকভারি (Circles of Recovery)-তে এই ধর্মনিরপেক্ষ আত্মসহায়ক সংস্থাগুলোর বিকাশ বিশ্লেষণ করেছেন (Humphreys, 2004)। হামফ্রিস দেখান যে অ্যালবার্ট এলিসের র্যাশনালাইজড ইমোটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত স্মার্ট রিকভারি (SMART Recovery), লাইফরিং সেকুলার রিকভারি এবং সেকুলার অর্গানাইজেশনস ফর সোব্রাইটি বা এসওএস-এর মতো সংগঠনগুলো আজ বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
এই ধর্মনিরপেক্ষ মডেলগুলোর কেন্দ্রীয় দর্শন হলো মানুষের নিজস্ব আত্মসচেতনতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আত্মনির্ভরশীলতাকে জাগ্রত করা। স্মার্ট রিকভারির মতো প্ল্যাটফর্মে কোনো উচ্চতর শক্তির কাছে ক্ষমতা সমর্পণের কথা বলা হয় না; বরং সেখানে ব্যক্তিকে বৈজ্ঞানিক মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার শেখানো হয় যাতে সে নিজে তার মাদকের তীব্র তাড়না বা ক্রেভিং মোকাবেলা করতে পারে। এখানে ব্যক্তিকে আজীবন রোগী বা ক্ষমতাহীন বলে ঘোষণা করা হয় না। মানুষ নিজেকে নিজের জীবনের চালক হিসেবে দেখতে শেখে। হামফ্রিসের তুলনামূলক তথ্য প্রমাণ করে যে ধর্মনিরপেক্ষ এই বৈজ্ঞানিক দলগুলোতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা দ্বাদশ-ধাপের চেয়ে অনেক বেশি আত্মমর্যাদা এবং মানসিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
একই সাথে সমকালীন আন্তর্জাতিক মাদকনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে ক্ষতি হ্রাস (harm reduction) দর্শন। সমাজবিজ্ঞানী ও আচরণগত গবেষক রুডলফ এইচ. মুস (Rudolf H. Moos) এবং বার্নিস এস. মুস তাদের দীর্ঘ ষোল বছরের ফলো-আপ গবেষণায় আসক্তি নিরাময়ের বহুমাত্রিক গতিপ্রকৃতি পরীক্ষা করেছেন (Moos & Moos, 2006)। মুস দেখান যে ধর্মীয় সংস্থাগুলো যে শর্তহীন শতভাগ মাদক বর্জনের চরমপন্থী দাবি তোলে, তা অধিকাংশ মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে মেলে না। ক্ষতি হ্রাস আন্দোলন আসক্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে মেথাডোন মেইনটেন্যান্স, নিরাপদ ইনজেকশন সেন্টার, সুই বিনিময় কর্মসূচি এবং ন্যালোক্সন বিতরণের মতো জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ধর্ম যেখানে নীতিবাক্য শুনিয়ে মানুষকে অবহেলায় মরতে দেয়, ক্ষতি হ্রাস সেখানে কোনো নৈতিক বিচার ছাড়াই মানুষের জীবন রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।
ভবিষ্যতের মাদক নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার মুক্তি নিহিত রয়েছে ধর্মীয় কুসংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপিয়ে দেওয়া বিশ্বাস থেকে বিজ্ঞানকে পুরোপুরি মুক্ত করার মধ্যে। আসক্তি কোনো পরলৌকিক বিচারের বিষয় নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট মোকাবেলা করতে হলে প্রয়োজন বিশ্বজুড়ে প্রমাণভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার, সাশ্রয়ী ওষুধের প্রাপ্যতা এবং বৈষম্যহীন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। শতাব্দীপ্রাচীন আধ্যাত্মিক বিভ্রান্তির অবসান ঘটিয়ে যখন রাষ্ট্র ও সমাজ আসক্ত মানুষকে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান, যুক্তি এবং মানবিক অধিকারের আলোকে দেখতে শিখবে, তখনই মাদকাসক্তি পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এক সত্যিকারের বৈপ্লবিক রূপান্তর সম্ভব হবে।
সমকালীন সাইকেডেলিক আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা (Contemporary Psychedelic Spirituality and Religious Freedom): আয়াহুয়াস্কা, পেয়োটি, নিও-শামানবাদ, সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ ও আইনগত বিতর্ক
পেয়োটি ঐতিহ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতার আইনি লড়াই (Peyote Tradition and the Legal Battle for Religious Freedom in the United States)
উত্তর আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিরোধে মেসক্যালিনসমৃদ্ধ ক্যাকটাস পেয়োটি এক শতাব্দীপ্রাচীন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উনিশ শতকের শেষভাগে যখন শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক সরকার আদিবাসীদের জমি দখল করে তাদের রিজার্ভেশনে বন্দি করে ফেলেছিল, তখন নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে গড়ে ওঠে নেটিভ আমেরিকান চার্চ (Native American Church বা NAC)। ঐতিহাসিক টমাস সি. মারুকিস (Thomas C. Maroukis) তার প্রামাণ্য গ্রন্থ দ্য পেয়োটি রোড (The Peyote Road)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে এই ধর্মীয় সংগঠনটি আদিবাসী বিভিন্ন গোত্রের বিভেদ ভুলে এক সাধারণ মঞ্চ তৈরি করেছিল (Maroukis, 2010)। মারুকিস উল্লেখ করেন যে ইউরোপীয় মিশনারিদের চাপিয়ে দেওয়া খ্রিস্টধর্মের উপাদান এবং ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় আচারের সমন্বয়ে তৈরি এই নতুন আচার আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষার একটি প্রধান আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। তবে রাষ্ট্র শুরু থেকেই এই উদ্ভিজ্জ প্রথাকে সমাজবিরোধী ও ক্ষতিকর মাদকাসক্তি হিসেবে দেখেছে।
এই টানাপোড়েন একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। আইনের গবেষক ক্যারোলিন এন. লং (Carolyn N. Long) তার গবেষণাধর্মী বই রিলিজিয়াস ফ্রিডম অ্যান্ড ইন্ডিয়ান রাইটস (Religious Freedom and Indian Rights)-এ ১৯৯০ সালের বিখ্যাত এমপ্লয়মেন্ট ডিভিশন বনাম স্মিথ (Employment Division v. Smith) মামলার বিশদ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন (Long, 2000)। এই মামলায় আলফ্রেড স্মিথ নামক এক আদিবাসী মাদকাসক্তি নিরাময়কারীকে নেটিভ আমেরিকান চার্চের আচারিক পেয়োটি সেবনের দায়ে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং রাষ্ট্র তাকে বেকারত্ব ভাতা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অ্যান্টোনিন স্কালিয়া তার সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে ঘোষণা করেন যে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো সাধারণ নিরপেক্ষ আইন অমান্য করার সার্বজনীন অধিকার সংবিধানে নেই। এই রায় আমেরিকার তথাকথিত ধর্মীয় স্বাধীনতার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের চোখে সংখ্যালঘু সংস্কৃতির কোনো স্বতন্ত্র সাংবিধানিক সুরক্ষা নেই।
স্মিথ মামলার রায়ের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সংগঠন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস বিপুল ভোটে পাস করে ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা আইন (Religious Freedom Restoration Act বা RFRA) এবং পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে আদিবাসী ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনে সংশোধনী এনে নেটিভ আমেরিকান চার্চের সদস্যদের জন্য পেয়োটি সেবনকে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়। তবে নৃতাত্ত্বিক ও আইন বিষয়ক গবেষক কেভিন ফিনি (Kevin Feeney) এই সুরক্ষার বর্ণবাদী সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছেন (Feeney, 2014)। ফিনি দেখান যে মার্কিন সরকার এই আইনি ছাড়টি দিয়েছিল শুধুমাত্র তাদের জন্য যাদের দেহে সরকারি সনদে স্বীকৃত আদিবাসী রক্ত বা উপজাতীয় সদস্যপদ রয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, কোনো অ-আদিবাসী ব্যক্তি যদি একই বিশ্বাসের অংশীদার হতে চাইত, তবে তাকে জেলে যেতে হতো। ফিনির বিশ্লেষণ দেখায় কীভাবে একটি রাসায়নিক যৌগের ব্যবহারকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের পরিবর্তে জাতিগত পরিচয়ের বেড়াজালে আটকে দিয়েছিল।
মার্কিন পেয়োটি বিতর্কের এই ইতিহাস স্পষ্ট করে যে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কীভাবে নিজের সুবিধাজনক মানদণ্ড অনুযায়ী ধর্মীয় অধিকারকে সংজ্ঞায়িত করে। যে উদ্ভিদটি হাজার বছর ধরে কোনো রাষ্ট্রের অনুশাসন ছাড়াই ব্যবহৃত হচ্ছিল, তাকে গ্রহণ করার জন্য মানুষকে রাষ্ট্রের কাছে নিজের উপজাতীয় বংশমর্যাদার সার্টিফিকেট দেখাতে বাধ্য করা হয়। পেয়োটিকে তথাকথিত পবিত্র ওষুধ হিসেবে দেখার পেছনে আদিবাসীদের যে মনস্তাত্ত্বিক দাবি ছিল, বিজ্ঞান তাকে একটি সাইকেডেলিক অ্যালকালয়েড ছাড়া আর কিছু মনে করে না। তবে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আইনকে এমন এক গোলকধাঁধায় পরিণত করেছিল, যেখানে একটি রাসায়নিক পদার্থ নির্দিষ্ট একদল মানুষের জন্য বৈধ আর অন্যদের জন্য চরম দণ্ডনীয় অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।
ব্রাজিলীয় আয়াহুয়াস্কা গির্জা ও বৈশ্বিক বিস্তার (Brazilian Ayahuasca Churches and Global Expansion)
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রাজিলের আমাজন অরণ্য থেকে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন ধারার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাস, যা সাইকেডেলিক ক্বাথ আয়াহুয়াস্কার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। রাবার শ্রমিকদের মেস্তিজো সংস্কৃতির ভেতরে জন্ম নেওয়া এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো সান্তো দাইমে (Santo Daime) এবং উনিয়াও দো ভেজেতাল (União do Vegetal বা UDV)। নৃবিজ্ঞানী বিয়া ল্যাবাতে এবং এডওয়ার্ড ম্যাকরে তাদের যৌথ গবেষণাগ্রন্থ আয়াহুয়াস্কা, রিচুয়াল অ্যান্ড রিলিজিয়ন ইন ব্রাজিল (Ayahuasca, Ritual and Religion in Brazil)-এ এই আন্দোলনের সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তন তুলে ধরেন (Labate & MacRae, 2010)। ল্যাবাতে দেখান কীভাবে রায়মুন্দো ইরিনিউ সেরা নামক এক কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী আমাজনীয় ভেষজ সংস্কৃতির সাথে ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম, আফ্রিকান উমবান্দা এবং ইউরোপীয় স্পিরিটিজমের মিশ্রণ ঘটিয়ে সান্তো দাইমে গির্জা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ধর্মে আয়াহুয়াস্কাকে সাধারণ পানীয় নয়, বরং আলোর শিক্ষক বা স্বয়ং যিশুর প্রতিরূপ হিসেবে পূজা করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ডসন (Andrew Dawson) তার মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ সান্তো দাইমে: আ নিউ ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন (Santo Daime: A New World Religion)-এ এই ধর্মীয় আন্দোলনের নগরায়ণ ও বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ব্যবচ্ছেদ করেছেন (Dawson, 2013)। ডসন পর্যবেক্ষণ করেন যে ব্রাজিলের গভীর জঙ্গল থেকে এই গির্জাগুলো আশির দশকে রিও ডি জেনিরো ও সাও পাওলোর মতো আধুনিক মেট্রোপলিটন শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় নিজেদের শাখা বিস্তার করে। আধুনিক শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ যারা প্রচলিত ক্যাথলিক চার্চের একঘেয়েমি এবং পুঁজিবাদী জীবনের যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত ছিল, তারা এই আচারের তীব্র হ্যালুসিনেটরি অভিজ্ঞতার ভেতর অলীক শান্তি খুঁজতে শুরু করে। এই গির্জাগুলোতে কঠোর শৃঙ্খলা, সমবেত সংগীত এবং সাদা পোশাক পরিধান বাধ্যতামূলক করে প্রাচীন ভেষজ উন্মাদনাকে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল চার্চের কাঠামোয় বেঁধে ফেলা হয়েছিল।
এই ব্রাজিলীয় গির্জাগুলোর বৈশ্বিক বিস্তার আন্তর্জাতিক আইনের সাথে তীব্র সংঘাত তৈরি করে, কারণ আয়াহুয়াস্কার প্রধান উপাদান ডিএমটি ১৯৭১ সালের জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী একটি নিষিদ্ধ প্রথম শ্রেণির মাদক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৬ সালে এক ঐতিহাসিক আইনি লড়াই শুরু হয়, যা সুপ্রিম কোর্টে গঞ্জালেস বনাম উনিয়াও দো ভেজেতাল (Gonzales v. O Centro Espírita Beneficente União do Vegetal) মামলা নামে পরিচিত লাভ করে। ল্যাবাতে ও ক্ল্যান্সি কাভনারের সম্পাদিত গ্রন্থ প্রহিবিশন, রিলিজিয়াস ফ্রিডম, অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (Prohibition, Religious Freedom, and Human Rights)-এ এই মামলার রায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে (Labate & Cavnar, 2014)। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা আইনের কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করে রায় দেন যে মার্কিন সরকার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে ইউডিভি সদস্যদের এই পানীয় সেবনের ফলে জনস্বাস্থ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষতি হচ্ছে। ফলে আদালত এই খ্রিস্টানীয় ধারার গির্জাকে ডিএমটিযুক্ত চা পানের আইনি অনুমোদন দিতে বাধ্য হয়।
এই আইনি নজির সমকালীন সাইকেডেলিক আন্দোলনের এক গভীর শ্রেণিগত ও মতাদর্শিক বৈষম্য উন্মোচন করে। ডসনের গবেষণা এটা পরিষ্কার করে দেয় যে পশ্চিমা আইন আদালত ততক্ষণ পর্যন্ত একটি মনঃসক্রিয় উদ্ভিদকে সহ্য করে, যতক্ষণ তাকে খ্রিস্টীয় গির্জার পরিচিত মোড়কে পরিবেশন করা হয়। যেসব স্থানীয় আদিবাসী শতাব্দী ধরে অরণ্যে এই ভেষজ ব্যবহার করছিল, তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চার্চ বা সুপ্রিম কোর্টে লড়ার মতো মিলিয়ন ডলারের তহবিল ছিল না। পক্ষান্তরে, সুসংগঠিত ব্রাজিলীয় গির্জাগুলো আধুনিক আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নিজেদের মাদকাভ্যাসকে ধর্মীয় স্বাধীনতার একচেটিয়া অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক বিশ্বে তথাকথিত ধর্মীয় মুক্তি কোনো নিরপেক্ষ মানবিক অধিকার নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও লবিংয়ের মাধ্যমে আদায় করে নেওয়া এক রাজনৈতিক সুযোগ মাত্র।
নিও-শামানবাদ ও সাংস্কৃতিক আত্মসাতের রাজনীতি (Neo-Shamanism and the Politics of Cultural Appropriation)
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পশ্চিমা বিশ্বে সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার প্রতি যে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা জন্ম দিয়েছে নিও-শামানবাদ নামক এক কৃত্রিম সাংস্কৃতিক ধারার। উত্তর গোলার্ধের ধনী দেশগুলোর নাগরিকেরা আজ আমাজন বা মেক্সিকোর মতো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে গিয়ে আদিবাসী নিরাময়কারীদের আচারগুলোকে নিজেদের মতো করে পুনর্নির্মাণ করছে। নৃতাত্ত্বিক ইভজেনিয়া ফৌটিও (Evgenia Fotiou) তার গবেষণা প্রবন্ধে আমাজনীয় আয়াহুয়াস্কা শামানবাদের বিশ্বায়নের অন্ধকার দিকটি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন (Fotiou, 2016)। ফৌটিও দেখান যে পশ্চিমা নিও-শামানরা স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতি থেকে তাদের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রাম, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং পরিবেশগত লড়াইকে পুরোপুরি মুছে ফেলে কেবল তাদের ভেষজ ব্যবহারের অংশটুকুকে ভোগবাদী পণ্যে রূপান্তর করেছে। আদিবাসীদের দারিদ্র্য ও ভূমি দখলের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে তাদের কেবল রহস্যময় প্রাকৃতিক গুরু হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো নৃবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলা হয় সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ (cultural appropriation)। সাংস্কৃতিক সমালোচক ডেবোরা রুট (Deborah Root) তার বই ক্যানিবাল কালচার (Cannibal Culture)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে পশ্চিমা পুঁজিবাদ অন্যান্য প্রান্তিক সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক প্রতীকগুলোকে শোষণ করে মুনাফা তৈরি করে (Root, 1996)। রুট একে সাংস্কৃতিক নরমাংসভক্ষণ বলে আখ্যা দেন। পশ্চিমা সাদা চামড়ার নিও-শামানরা কয়েক সপ্তাহ আমাজনে গিয়ে স্থানীয় একজন ওঝার কাছে কয়েকটি গান শিখে এসেই নিজেদের মহাজ্ঞানী বা সার্টিফাইড শামান হিসেবে ঘোষণা করছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় শহরে তারা একেকটি আয়াহুয়াস্কা সেশনের জন্য মানুষের কাছ থেকে শত শত ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে। স্থানীয় আদিবাসীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে চর্চাকে নিজেদের সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছিল, সেই জ্ঞান আজ পশ্চিমা ধনিক শ্রেণির এক বিলাসবহুল মানসিক সুস্থতার পণ্যে পরিণত হয়েছে।
নিও-শামানবাদের কারণে স্থানীয় সমাজগুলোতে মারাত্মক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাঙন তৈরি হচ্ছে। পেরুর ইকিতোস কিংবা উকায়ালির মতো শহরগুলোতে শত শত তথাকথিত হিলিং সেন্টার গড়ে উঠেছে, যা মূলত বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য তৈরি। ফৌটিও উল্লেখ করেন যে এই অর্থের লোভে স্থানীয় অনেক সুবিধাবাদী ব্যক্তি কোনো ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ছাড়াই ভেষজ চিকিৎসক সেজে প্রতারণার জাল বিস্তার করেছে। এর ফলে যেসব স্থানীয় মানুষ বাস্তবিক চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা আজ এই উদ্ভিদগুলো কিনতে পারছে না অতিরিক্ত চড়া দামের কারণে। আদিম উপজাতীয় ঐক্যের যে কাঠামো হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল, বিদেশি ডলারের আগ্রাসনে তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নিও-শামানবাদ কোনো আত্মিক মুক্তি নয়; এটি হলো পুঁজিবাদী সমাজের এক চরম আত্মতৃপ্তিমূলক বিভ্রান্তি। কর্পোরেট জীবনের একঘেয়েমি এবং নীতিহীনতায় ভোগা পশ্চিমা মানুষেরা মনে করে একটি ভেষজ খেয়ে নিলেই তারা প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাবে। অথচ তারা যে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের অংশীদার হয়ে জীবনযাপন করে, সেই বাস্তবতাকে তারা বদলাতে চায় না। আদিবাসীদের জ্ঞানকে রোমান্টিক রূপ দিয়ে নিজেদের বিনোদনের খোরাক বানানো নব্য-ঔপনিবেশিক মানসিকতারই এক নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। এই অলীক আধ্যাত্মিকতা স্থানীয় মানুষের কোনো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তো দেয়ই না, বরং তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে নামিয়ে এনে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে তরান্বিত করে।
সাইকেডেলিক পর্যটন ও জৈব-উপনিবেশবাদ (Psychedelic Tourism and Biopiracy)
বিশ্বায়নের সাথে সাথে সাইকেডেলিক পদার্থের বাণিজ্যিকীকরণ যে ভয়াবহ সংকটের জন্ম দিয়েছে, তার অন্যতম প্রধান রূপ হলো সাইকেডেলিক পর্যটন এবং জৈব-উপনিবেশবাদ। শিক্ষাবিদ ও নীতি গবেষক কেনেথ ডব্লিউ. টুপার (Kenneth W. Tupper) তার গবেষণায় আয়াহুয়াস্কার এই অপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকিগুলো বিশদভাবে আলোচনা করেছেন (Tupper, 2008)। টুপার দেখান যে প্রতি বছর হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক প্রস্তুতি ছাড়া ল্যাটিন আমেরিকার গভীর জঙ্গলে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তিশালী হ্যালুসিনোজেন গ্রহণ করছে। এই নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল থেকে বানিস্তেরিওপসিস ক্যাপাই লতা ব্যাপকভাবে উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে, কারণ যে উদ্ভিদটি বড় হতে বিশ থেকে ত্রিশ বছর সময় লাগে, তা পর্যটকদের চাহিদার কারণে নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে।
চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী অ্যালেক্স কে. গিয়ারিন (Alex K. Gearin) তার মাঠপর্যায়ের গবেষণায় এই অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করেছেন (Gearin, 2015)। গিয়ারিন দেখান যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনিবন্ধিত লজগুলোতে কোনো ধরনের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বা জরুরি ওষুধের ব্যবস্থা থাকে না। মানসিক ভারসাম্যহীন বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন অভিজ্ঞতাহীন তথাকথিত শামানদের হাতে সাইকেডেলিক পান করে, তখন প্রায়শই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনা, যৌন নির্যাতন এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক বিপর্যয়ের অসংখ্য ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে। তবুও এই বিপজ্জনক বাণিজ্য রমরমিয়ে চলছে, কারণ এর পেছনে রয়েছে বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক আধ্যাত্মিক পর্যটন সিন্ডিকেট।
এই পর্যটনের সমান্তরালে শুরু হয়েছে এক নতুন ধরনের লুটতরাজ, যাকে বলা হয় বায়োপাইরেসি বা জৈব-চৌর্যবৃত্তি (biopiracy)। পশ্চিমা বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা স্থানীয় আদিবাসীদের শতাব্দীর প্রাচীন ভেষজ জ্ঞান চুরি করে তার ওপর পেটেন্ট নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। টুপারের বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে অতীতে ঔপনিবেশিক প্রভুরা যেভাবে সোনা, রুপা বা মশলা লুট করে নিজেদের দেশে নিয়ে যেত, সমকালীন কর্পোরেট শক্তিগুলো ঠিক একইভাবে আদিবাসীদের ডিএমটি বা মেসক্যালিনের আণবিক ফর্মুলা চুরি করে নিজেদের বাণিজ্যিক সম্পত্তি বানাচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু মার্কিন কোম্পানি সাইকেডেলিক অণুর সামান্য রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়ে সিন্থেটিক ওষুধের পেটেন্ট দাবি করছে, অথচ যেসব আদিবাসী প্রজন্ম ধরে এই জ্ঞান সংরক্ষণ করেছে তারা এর কোনো লভ্যাংশ বা স্বীকৃতি পাচ্ছে না।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেয় যে তথাকথিত সাইকেডেলিক বিপ্লব আসলে পুঁজিবাদী শোষণের এক নতুন স্তর। এখানে আধ্যাত্মিকতার যে গল্প শোনানো হয়, তা কেবল ধনিক শ্রেণির বিনিয়োগ ও মুনাফাকে আড়াল করার একটি চটকদার বিজ্ঞাপন। তৃতীয় বিশ্বের বনজ সম্পদ ও জ্ঞানকে অবাধে ব্যবহার করে প্রথম বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা কোটিপতি হচ্ছে, আর স্থানীয় কৃষকেরা জলবায়ু পরিবর্তন ও বন উজাড়ের প্রত্যক্ষ শিকারে পরিণত হচ্ছে। বিজ্ঞানসম্মত সমাজতাত্ত্বিক পাঠ এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে সাইকেডেলিক বাণিজ্যের এই বিস্তার কোনো বিশ্বজনীন আলোর উন্মেষ নয়, বরং এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত শতাব্দীপ্রাচীন ঔপনিবেশিক নিপীড়নের এক ডিজিটাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্করণ।
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মীয় আধিকারের স্ববিরোধ (The Paradox of Religious Rights in a Secular State)
সমকালীন সাইকেডেলিক নীতিমালার সবচেয়ে জটিল ও স্ববিরোধী ক্ষেত্রটি তৈরি হয়েছে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের আইনের চোখে নাগরিকদের সমতা রক্ষার প্রশ্নে। যখন কোনো রাষ্ট্র কেবল একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীকে কোনো সাইকেডেলিক ড্রাগ ব্যবহারের অনুমোদন দেয় কিন্তু একই কাজ করার জন্য সাধারণ অ-ধর্মীয় নাগরিকদের অপরাধী হিসেবে জেলে পাঠায়, তখন তা আধুনিক আইনের মৌলিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আইনতাত্ত্বিক ও জ্ঞানীয় অধিকারকর্মী রিচার্ড গ্লেন বোয়ার (Richard Glen Boire) এই কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংজ্ঞানাত্মক স্বাধীনতা (cognitive liberty) নামক মৌলিক ধারণার প্রস্তাব করেন (Boire, 2000)। বোয়ার যুক্তি দেন যে একজন মানুষের নিজের মস্তিষ্ক ও চেতনার ওপর নিরঙ্কুশ সার্বভৌম অধিকার থাকা উচিত। রাষ্ট্র যদি একজন নাগরিকের নিজস্ব চিন্তা বা অনুভূতির রূপান্তর ঘটানোর অধিকার কেড়ে নেয়, তবে তা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর চরম আঘাত।
বোয়ারের তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্তমান আইনি ব্যবস্থা একটি চরম ভণ্ডামির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আদালত সান্তো দাইমে বা নেটিভ আমেরিকান চার্চের মতো সংগঠনগুলোকে সাইকেডেলিক ব্যবহারের অনুমতি দেয় এই যুক্তিতে যে তারা এটি কোনো ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। অথচ একজন মুক্তমনা বিজ্ঞানী, দার্শনিক বা শিল্পী যদি নিজের বৌদ্ধিক অন্বেষণ, মনস্তাত্ত্বিক আত্ম-আবিষ্কার বা শিল্প সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঠিক একই রাসায়নিক অণু নিজের দেহে গ্রহণ করতে চায়, তবে রাষ্ট্র তাকে ভয়ংকর মাদকাসক্ত দাগিয়ে দিয়ে বহু বছরের কারাদণ্ড দেয়। এই ব্যবস্থাটি দেখায় যে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র মূলত বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে শাস্তি দিচ্ছে আর অন্ধ বিশ্বাস ও ধর্মীয় আনুগত্যকে বিশেষ আইনি সুবিধা প্রদান করছে। আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান – এই সাংবিধানিক নীতির এমন নির্লজ্জ লঙ্ঘন খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
নৃবিজ্ঞানী বিয়া ল্যাবাতে এবং ক্ল্যান্সি কাভনার এই আইনি অসঙ্গতির সমাজতাত্ত্বিক দিকগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন (Labate & Cavnar, 2014)। ল্যাবাতে দেখান যে রাষ্ট্র মূলত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে পছন্দ করে। একজন মানুষ যখন কোনো সুসংগঠিত গির্জার অনুশাসনে থেকে মদ বা ড্রাগ গ্রহণ করে, তখন সে সমাজের নজরদারির ভেতরেই থাকে। কিন্তু একজন স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি যখন নিজের মতো করে চেতনার পরিবর্তন ঘটায়, তখন সে রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক শৃঙ্খলার বাইরে চলে যায়। রাষ্ট্র এই নিয়ন্ত্রণহীন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ভয় পায়। এ কারণে আইন বিভাগ বিজ্ঞানসম্মত ক্ষতি হ্রাসের নীতি গ্রহণ না করে ধর্মীয় আচারের নামে বিশেষ বিশেষ উপদলকে তোষণ করার নীতি বেছে নিয়েছে।
এই স্ববিরোধিতা দূর করতে হলে আইনের ভিত্তি থেকে ধর্মীয় পক্ষপাতকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে হবে। কোনো নাগরিক ড্রাগ ব্যবহার করতে পারবে কি পারবে না, তা তার ধর্মীয় বিশ্বাস দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। একটি যুক্তিবাদী ও আধুনিক সমাজে প্রতিটি নীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত নিরেট ফার্মাকোলজিক্যাল প্রমাণ, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং ব্যক্তির মৌলিক মানবাধিকারের নিরিখে। কোনো কাল্পনিক ঈশ্বরের স্তব করলে মাদক বৈধ হয়ে যাবে আর যুক্তিযুক্ত দার্শনিক অনুসন্ধানে তা অপরাধ হবে – এমন মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য চরম কলঙ্কজনক। বিজ্ঞানের আলোয় মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের স্বায়ত্তশাসনকে একটি মৌলিক মানবীয় অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে মাদকের রাজনীতি থেকে এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য কোনোদিন দূর করা সম্ভব নয়।
সমকালীন নীতি সংস্কার ও মোহমুক্তির ভবিষ্যৎ (Contemporary Policy Reforms and the Future of Demystification)
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে বিশ্বজুড়ে মাদকনীতির ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, যা শতাব্দীপ্রাচীন নিষেধাজ্ঞার দেয়ালকে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভার, ওকল্যান্ডের মতো শহরগুলোতে এবং পরবর্তীতে ওরেগন অঙ্গরাজ্যে প্রাকৃতিক সাইকেডেলিক উপাদানগুলোর ব্যবহারকে আইনি অপরাধের আওতামুক্ত বা অপরাধমুক্তকরণ (decriminalization) করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর অন্যতম স্লোগান হলো প্রকৃতি কোনো অপরাধ হতে পারে না। তবে এই সংস্কারের সমান্তরালে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন কর্পোরেট যুদ্ধ। বড় বড় বহুজাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সাইকেডেলিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। একদিকে কৃত্রিম আধ্যাত্মিকতার ভণ্ডামি, অন্যদিকে কর্পোরেট একচেটিয়া পেটেন্ট নীতি – সমকালীন সাইকেডেলিক আন্দোলন আজ এই দুই মারাত্মক প্রান্তিকতার মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এই জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সাইকেডেলিক পদার্থগুলো নিয়ে চলা শতাব্দীপ্রাচীন সমস্ত রহস্যময়তা ও ধর্মীয় অন্ধত্বের অবসান ঘটানো। মানুষ যখনই এই উদ্ভিদগুলোকে কোনো স্বর্গীয় ওষুধ বা আত্মার রূপান্তরকারী হিসেবে দেখতে গেছে, তখনই সেখানে ধর্মীয় ব্যবসা, সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ এবং চরম সামাজিক বৈষম্য জেঁকে বসেছে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোচিকিৎসাবিজ্ঞান পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করেছে যে সাইকেডেলিক যৌগগুলো কোনো ঐশ্বরিক শক্তির আধার নয়; এগুলো হলো মানব মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সংবেদনকে গভীরভাবে নাড়া দিতে সক্ষম কিছু শক্তিশালী রাসায়নিক টুল বা হাতিয়ার। একজন দক্ষ সার্জন যেভাবে স্ক্যাল্পেল ব্যবহার করে টিউমার অপসারণ করেন, ঠিক একইভাবে সুনির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল পরিবেশে এই যৌগগুলো ব্যবহার করে মারাত্মক বিষণ্নতা বা ট্রমার চিকিৎসা করা সম্ভব।
ভবিষ্যতের মাদকনীতির মুক্তি নিহিত রয়েছে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর: সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ আইনি সমতা, উন্মুক্ত বিজ্ঞানভিত্তিক জনস্বাস্থ্য নীতি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকারের সুরক্ষা। আদিবাসীদের নিজস্ব ভূখণ্ড ও বনভূমির অধিকার নিশ্চিত না করে তাদের ভেষজ জ্ঞান থেকে মুনাফা লোটার ঔপনিবেশিক প্রবণতা আইন করে বন্ধ করতে হবে। একই সাথে সাধারণ নাগরিকদের সংজ্ঞানাত্মক স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজস্ব পছন্দের ওপর রাষ্ট্রীয় পুলিশি দমন বন্ধ করতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া কিংবা ধর্মহীনতার কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়ার বৈষম্যমূলক নীতির অবসান ঘটাতে হবে।
পরিশেষে এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে সমকালীন সাইকেডেলিক আধ্যাত্মিকতা মূলত প্রাচীন কুসংস্কার এবং আধুনিক ভোগবাদের এক সংকর রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের মুক্তির পথ কোনো উদ্ভিদের অলীক ঘোরের ভেতর লুকিয়ে নেই; তা নিহিত রয়েছে যুক্তি, বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান এবং সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাস্তব লড়াইয়ের মধ্যে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিকতার কৃত্রিম মুখোশটি খুলে ফেলে যখন আমরা মনঃসক্রিয় পদার্থগুলোকে বিজ্ঞানের একটি নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল অংশ হিসেবে দেখতে শিখব, তখনই একটি সত্যিকারের মানবিক, যুক্তিবাদী ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সমাজ, প্রতিরোধ ও ভবিষ্যৎ (Society, Prevention and Future Directions): প্রতিরোধ, পুনর্বাসন ও নীতি
মাদক প্রতিরোধে সমাজের ভূমিকা (Role of Society in Drug Abuse Prevention): পরিবার, শিক্ষা ও সম্প্রদায়
সামাজিকীকরণ ও প্রাথমিক প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা (Socialization and Family’s Role in Primary Prevention)
মানুষের জীবনের প্রথম পাঠশালা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভবন নয়, মানুষের জীবনের প্রথম পাঠশালা তার পরিবার। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিবার হলো প্রাথমিক সামাজিকীকরণের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে একজন শিশু শেখে নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক মূল্যবোধ। মাদকাসক্তির বিস্তার কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতা নয়; এর পেছনে পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা এক নীরব অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) তার যুগান্তকারী গ্রন্থে সামাজিক শিখন তত্ত্ব (Social Learning Theory) আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, মানুষ কেবল নির্দেশ শুনে শেখে না, সে শেখে চারপাশের আচরণ পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণের মাধ্যমে (Bandura, 1977)। একটি পরিবারে মা-বাবা কিংবা অভিভাবকরা যখন পারস্পরিক সম্মান, সুস্থ জীবনধারা ও কার্যকর যোগাযোগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তখন তা সন্তানের জন্য একটি প্রাকৃতিক মানসিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করে।
পারিবারিক কাঠামোর সুরক্ষামূলক শক্তিকে সবচেয়ে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী ট্রাভিস হার্শি (Travis Hirschi)। হার্শি তার প্রণীত কজেস অব ডেলিনকুয়েন্সি (Causes of Delinquency) গ্রন্থে সামাজিক বন্ধন তত্ত্ব (Social Bond Theory) উপস্থাপন করে যুক্তি দেন যে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ বা বিচ্যুতিতে তখনই জড়ায় যখন সমাজের মূলধারার প্রতিষ্ঠানের সাথে তার মানসিক ও আত্মিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে (Hirschi, 1969)। হার্শি চারটি উপাদানের কথা বলেছেন – সংযুক্তি, প্রতিশ্রুতি, সম্পৃক্ততা এবং বিশ্বাস। যখন একটি পরিবারের ভেতর সন্তানের সাথে পিতা-মাতার গভীর মানসিক সংযুক্তি থাকে, তখন সেই সন্তান কোনো ক্ষতিকর আচরণে জড়ানোর আগে বারবার ভাবে যে তার এই কাজ তার প্রিয়জনদের কষ্ট দেবে। এই মানসিক টানই তাকে মাদকের প্রলোভন থেকে দূরে রাখতে সবচেয়ে শক্তিশালী বর্ম হিসেবে কাজ করে।
বাস্তব জীবনে দেখা যায়, কেবল আর্থিক প্রাচুর্য বা আরাম-আয়েশ দিয়ে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় না। অনেক সচ্ছল পরিবারেও দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক কলহ, গৃহবিবাদ, পিতা-মাতার দূরবর্তী আচরণ এবং সন্তানের মানসিক চাহিদাকে উপেক্ষা করার কারণে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। সেই মানসিক একাকীত্ব এবং অনিশ্চয়তা দূর করতে কিশোর ও তরুণরা ক্ষণস্থায়ী সান্ত্বনা হিসেবে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আবার অতি-নিয়ন্ত্রণমূলক বা কর্তৃত্বপরায়ণ অভিভাবকত্বও সন্তানের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা তাকে অবাধ্য আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে, অতিরিক্ত উদাসীনতা সন্তানকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। ফলে সবচেয়ে কার্যকর মডেল হলো গণতান্ত্রিক অভিভাবকত্ব, যেখানে শাসনের পাশাপাশি সহমর্মিতা, মুক্ত আলোচনা এবং গভীর মনোযোগের ভারসাম্য বজায় থাকে।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ থাকা অত্যন্ত জরুরি। সন্তান বাইরের জগৎ থেকে কী তথ্য পাচ্ছে, তার মানসিক চাপ বা উদ্বেগ কেমন, সে বন্ধুদের সাথে কেমন সময় কাটাচ্ছে – এসব বিষয়ে প্রতিদিনের সহজ আলাপচারিতা অনেক বড় বিপদের আগাম সংকেত দিতে পারে। পরিবার যদি মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে কোনো ট্যাবু বা সংকোচ ছাড়া বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলতে পারে, তবে তরুণেরা বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় সহজে পা দেয় না। প্রাথমিক প্রতিরোধের এই সূক্ষ্ম কাজ রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনী করতে পারে না; এটা কেবল একটি উষ্ণ, সংবেদনশীল এবং সচেতন পারিবারিক পরিবেশেই সম্ভব।
শিক্ষাঙ্গন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা (Educational Institutions and Efficacy of Institutional Prevention)
পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে একজন মানুষের সামাজিক জীবনের দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী ক্ষেত্র হলো তার শিক্ষাঙ্গন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান বিতরণের কারখানা নয়, এগুলো ব্যক্তিত্ব গঠন এবং সামাজিক আচরণের রূপরেখা নির্ধারণের কেন্দ্র। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষার ফলাফল ও গ্রেড অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের দিকটি বহুলাংশে উপেক্ষিত থেকে যায়। মাদক প্রতিরোধ গবেষক জে. ডেভিড হকিন্স (J. David Hawkins) এবং তার সহগবেষকরা তাদের তাত্ত্বিক মডেলে চিহ্নিত করেছেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে একজন শিক্ষার্থীর ইতিবাচক বন্ধন কীভাবে মাদকের অপব্যবহার রোধে অন্যতম প্রধান সুরক্ষামূলক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে (Hawkins et al., 1992)।
শিক্ষাঙ্গনে মাদক প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভয় দেখানোর কৌশলের ওপর নির্ভর করে এসেছে। ভয়ানক সব শারীরিক পরিণতির ছবি দেখানো বা পুলিশ ডেকে এনে শাস্তির ভয় দেখিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার চিরাচরিত পদ্ধতি যে কিশোর-তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে, আধুনিক মূল্যায়ন গবেষণাগুলো তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। গবেষক পিম কুইপার্স (Pim Cuijpers) স্কুলভিত্তিক প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, নিছক তথ্য সরবরাহ বা ভীতি প্রদর্শনের বদলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচিগুলোই টেকসই ফল দেয় (Cuijpers, 2002)। ভয় দেখিয়ে কৌতূহলী তরুণ মনকে আটকে রাখা যায় না; বরং নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তাদের আকর্ষণ উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই ব্যর্থতার বিকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে গৃহীত হয়েছে আচরণগত দক্ষতা বৃদ্ধির মডেল। মনোবিজ্ঞানী গিলবার্ট বোটভিন (Gilbert J. Botvin) উদ্ভাবিত জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষণ (Life Skills Training বা LST) মডেলটি শিক্ষাঙ্গনে মাদক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক সাফল্য দেখিয়েছে (Botvin & Griffin, 2004)। এই মডেলে শিক্ষার্থীদের মাদক না গ্রহণের নীতিবাক্য শোনানোর চেয়ে বেশি শেখানো হয় কীভাবে সহপাঠীদের নেতিবাচক চাপকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা যায়, কীভাবে আবেগ ও মানসিক চাপ সামলানো যায় এবং কীভাবে আত্মমর্যাদাবোধ বজায় রেখে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া যায়। যখন একজন কিশোর শেখে ‘না’ বলার কার্যকর সামাজিক কৌশল, তখন সে বন্ধুদের আড্ডায় উপহাসের শিকার হওয়ার ভয়ে মাদক গ্রহণ করা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক বা সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলরের উপস্থিতি এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি হয়ে উঠেছে। প্রতিটি স্কুলে নিয়মিত কাউন্সেলিং সুবিধা থাকা উচিত যাতে কিশোর-কিশোরীরা তাদের বিষণ্ণতা, ট্রমা বা পারিবারিক অশান্তির কথা নিঃসংকোচে প্রকাশ করতে পারে। শিক্ষকরা কেবল পাঠদানকারী নন, তারা হবেন সংবেদনশীল পর্যবেক্ষক, যারা একজন শিক্ষার্থীর আচরণগত পরিবর্তন – যেমন হঠাৎ ক্লাসে অনুপস্থিতি, মনোযোগহীনতা বা বিচ্ছিন্নতা – দেখে প্রাথমিক পর্যায়েই সহায়তা দিতে এগিয়ে আসবেন। শিক্ষাঙ্গন যদি একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত সামাজিক ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তবে মাদক সেখানে নিজের আসন গাড়তে পারে না।
সমবয়সী দলের প্রভাব ও বিকল্প যুব সংস্কৃতি (Peer Influence and Alternative Youth Culture)
কৈশোর ও তারুণ্যের সবচেয়ে সংকটময় দিক হলো সমবয়সী দল বা পিয়ার গ্রুপের তীব্র মানসিক প্রভাব। এই বয়সে মানুষ তার পরিবার ও শিক্ষকদের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয় বন্ধুদের মতামতকে। নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করা, দলের সদস্য হিসেবে একাত্ম বোধ করা এবং ‘কুল’ বা আধুনিক সাজার এক সহজাত চাপ প্রতিটি তরুণের ওপর কাজ করে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড (Edwin Sutherland) তার ধ্রুপদী গ্রন্থ প্রিন্সিপালস অব ক্রিমিনোলজি (Principles of Criminology)-তে উপস্থাপন করেছিলেন বিখ্যাত পার্থক্যমূলক মেলামেশা তত্ত্ব (Differential Association Theory) (Sutherland, 1947)। সাদারল্যান্ড দেখিয়েছেন যে, অপরাধমূলক বা বিচ্যুত আচরণ মানুষ কোনো জন্মগত ত্রুটি থেকে শেখে না, সে শেখে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত মহলের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে।
সাদারল্যান্ডের তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন তরুণ যখন এমন বন্ধুদের সাহচর্যে বেশি সময় কাটায় যারা মাদক ব্যবহারকে ইতিবাচক, রোমাঞ্চকর বা স্বাভাবিক বলে মনে করে, তখন সে ধীরে ধীরে মাদকের কৌশল ও যৌক্তিকতা আয়ত্ত করে ফেলে। বন্ধুদের বৃত্তে যখন একটি যৌথ সম্মতি গড়ে ওঠে যে মাদক নিলে দুঃখ ভুলে থাকা যায় বা আনন্দ তীব্র হয়, তখন সেই তরুণের পক্ষে একা সেই সাংস্কৃতিক চাপ প্রতিহত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মাদকের সাথে পরিচিতি ঘটার ক্ষেত্রে সিংহভাগ সময়ই কোনো অজানা পাচারকারী প্রথম ভূমিকা রাখে না; প্রথম প্ররোচনা আসে কোনো না কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সহপাঠীর হাত ধরে।
এই বাস্তবতায় তরুণ সমাজকে কেবল ঘরে আটকে রেখে বা ইন্টারনেট বন্ধ করে রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন এক গঠনমূলক বিকল্প তৈরি করা যা তরুণের সৃজনশীল শক্তি ও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তাকে ইতিবাচক খাতে প্রবাহিত করবে। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বিকল্প যুব সংস্কৃতি (Alternative Youth Culture) হিসেবে অভিহিত করেন। তরুণদের স্বাভাবিক জৈবিক ও মানসিক চাহিদা হলো উত্তেজনা, রোমাঞ্চ এবং স্বীকৃতি। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নাট্যচর্চা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান ক্লাব ও পর্বতারোহণের মতো অ্যাডভেঞ্চারমূলক কর্মকাণ্ডের অবারিত সুযোগ তৈরি করতে না পারে, তবে সেই প্রাণশক্তি বিপথগামী হতে বাধ্য।
স্থানীয় পর্যায়ে পাঠাগার, উন্মুক্ত খেলার মাঠ এবং সংগীত ও চিত্রকলার পরিসরগুলো দিনে দিনে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক বিপজ্জনক সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি করেছে। ইট-কাঠের মেগাসিটিতে তরুণদের সামনে আড্ডা দেওয়ার মতো কোনো মুক্ত সামাজিক স্থান নেই, ফলে তারা আশ্রয় খুঁজছে অন্ধকার কোণে বা অনলাইন জুয়া ও মাদকের গোপন বলয়ে। এই সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব ঘোচাতে হবে স্থানীয় সমাজকেই। তরুণদের জন্য খেলাধুলা, বিতর্ক, বইপড়া ও সামাজিক স্বেচ্ছাসেবার বিকল্প বলয় তৈরি করে দিলে তারা আর মাদকের বিষাক্ত রোমাঞ্চের দিকে তাকাবে না। সৃষ্টিশীলতার আনন্দের চেয়ে বড় কোনো মাদক প্রতিরোধক পৃথিবীতে নেই।
সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও সামাজিক সংহতি (Community Collective Prevention and Social Cohesion)
সমাজ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; এটি পরস্পরের সাথে যুক্ত মানুষের এক জটিল বাস্তুতন্ত্র। কোনো এলাকায় মাদকের বাজার তখনই নির্বিঘ্নে টিকে থাকতে পারে, যখন সেই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ভেঙে পড়ে এবং সামাজিক সংহতি নষ্ট হয়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট স্যাম্পসন (Robert J. Sampson) ও তার সহগবেষকরা তাদের যুগান্তকারী মাঠপর্যায়ের গবেষণায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সম্মিলিত কার্যকারিতা তত্ত্ব (Collective Efficacy Theory) (Sampson et al., 1997)। স্যাম্পসন দেখান যে, কোনো পাড়া বা মহল্লায় অপরাধের বিস্তার কেবল দারিদ্র্যের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে প্রতিবেশীদের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সাধারণের মঙ্গলের জন্য একসাথে কাজ করার সম্মিলিত ইচ্ছার ওপর।
স্যাম্পসনের তত্ত্ব আমাদের দেখায় যে, যখন একটি মহল্লার বাসিন্দারা একে অপরকে চেনে, রাস্তায় কোনো কিশোরকে বিপথগামী হতে দেখলে স্নেহভরে শাসন করতে দ্বিধা করে না এবং এলাকার প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানায়, তখন সেখানে অপরাধীরা কোনো নিরাপদ আশ্রয় পায় না। কিন্তু আধুনিক নগরায়ণ আমাদের এই প্রতিবেশ সুলভ আত্মিক সম্পর্ককে ধ্বংস করে দিয়েছে। একই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে থেকেও মানুষ পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাকে চেনে না। সবাই যার যার ব্যক্তিগত বলয়ে বন্দি। এই সামাজিক উদাসীনতা ও বিচ্ছিন্নতা পাচারকারী চক্রগুলোর জন্য এক স্বর্গরাজ্য তৈরি করে, কারণ তারা জানে যে এলাকার কেউ তাদের কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করবে না।
সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ের নাগরিক সংগঠনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। মহল্লাভিত্তিক অভিভাবক কমিটি, যুব পরিষদ, স্থানীয় বাজার সমিতি এবং সাংস্কৃতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি সমন্বিত সামাজিক নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশে এই ধরনের নেইবারহুড ওয়াচ মডেল দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। কোনো এলাকায় অচেনা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়লে বা কোনো পরিত্যক্ত স্থানে মাদক সেবনের আড্ডা গড়ে উঠলে স্থানীয় নাগরিকরাই প্রথমে সচেতন হন এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এটা কোনো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়; এটা হলো সামাজিক নজরদারির মাধ্যমে অপরাধের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়গুলোকেও এই প্রতিরোধে তাদের চিরাচরিত কুসংস্কার ও অন্ধভীতির খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেবল ব্যক্তিগত পাপ-পুণ্যের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে উপাসনালয়গুলোকে সমাজের বাস্তব সমস্যার আলোচনায় অংশ নিতে হবে। তবে কোনো আধ্যাত্মিক অলৌকিকতার ওপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও মানবিক সহানুভূতির ভাষায় তরুণদের সম্বোধন করতে হবে। পাড়ার প্রবীণ ও নবীনদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারলে যে সামাজিক পুঁজি তৈরি হয়, তা মাদক কারবারিদের যেকোনো অস্ত্র বা অর্থের শক্তির চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও স্থায়ী বর্ম হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক কলঙ্ক, প্রান্তিকীকরণ ও পুনর্বাসনে সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ (Social Stigma, Marginalization and Community-Based Reintegration)
মাদকাসক্তি থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পথটি অত্যন্ত বন্ধুর, কিন্তু সেই পথটিকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে সমাজের নিষ্ঠুর দৃষ্টিভঙ্গি। একজন মানুষ যখন একবার মাদকের ফাঁদে পড়ে যায়, সমাজ তখন তাকে চিরতরে এক ‘নষ্ট চরিত্র’ বা অস্পৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান (Erving Goffman) তার বিখ্যাত গ্রন্থ স্টিগমা (Stigma)-তে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কীভাবে সমাজ কোনো বিচ্যুত ব্যক্তিকে একটি কলঙ্কিত সামাজিক পরিচয় বা ‘স্পয়েল্ড আইডেনটিটি’ চাপিয়ে দিয়ে মূলধারা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে (Goffman, 1963)। এই সামাজিক কলঙ্কায়ন বা স্টিগমা কোনো ব্যক্তিকে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করে না; বরং তাকে আরও বেশি অপরাধের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে।
গফম্যানের তত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায়, একজন আসক্ত ব্যক্তি যখন নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসে, সমাজ তাকে স্বাভাবিক চোখে দেখতে পারে না। পরিবার তাকে সন্দেহের চোখে দেখে, আত্মীয়স্বজন দূরত্ব বজায় রাখে এবং কোনো নিয়োগকর্তা তাকে চাকরি দিতে রাজি হয় না। এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বর্জন সেই ব্যক্তির মনে তীব্র হতাশা ও আত্মগ্লানির জন্ম দেয়। সে দেখে যে সুস্থ হয়েও সে সমাজের কাছে একজন ‘মাদকসেবী’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। ফলে সমাজে কোনো স্থান না পেয়ে সে আবারও তার পুরোনো মাদকসেবী বন্ধুদের বৃত্তেই ফিরে যায়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় রিল্যাপ্স (Relapse)। কলঙ্কই তাকে পুনরায় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
এই দুষ্টচক্র ভাঙার জন্য প্রয়োজন সম্প্রদায়ভিত্তিক পুনর্বাসন (Community-Based Rehabilitation বা CBR) পদ্ধতির প্রসার। আসক্ত মানুষকে কেবল একটি চারদেয়ালের নিরাময় কেন্দ্রে তিন মাস আটকে রাখলে তার স্থায়ী নিরাময় নিশ্চিত হয় না। নিরাময়ের আসল যুদ্ধটি শুরু হয় যখন সে ঘরে ফিরে আসে। সম্প্রদায়কে শিখতে হবে যে আসক্তি কোনো নৈতিক দেউলিয়াত্ব নয়, এটি একটি জটিল জৈব-মনস্তাত্ত্বিক দীর্ঘমেয়াদী ব্যাধি, যার জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক পরিচর্যা। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীর মতো তাকেও নিয়মিত মানসিক সাপোর্ট দিতে হবে।
স্থানীয় সমাজ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে সুস্থ হয়ে ওঠা তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা এবং কাজের মাধ্যমে তাকে সমাজে একজন উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে পুনর্বাসিত করা অপরিহার্য। পরিবার ও প্রতিবেশীদের তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়ার মতো মানসিক উদারতা দেখাতে হবে। সুস্থ হয়ে ফেরা মানুষদের সমাজের মূলধারার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে উৎসাহিত করতে হবে যাতে তারা নিজেদের হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারে। যে সমাজ ক্ষমা করতে এবং ধারণ করতে জানে, সেই সমাজই কেবল পারে নিজের সন্তানদের অন্ধকারের হাত থেকে ছিনিয়ে আনতে।
নাগরিক উদ্যোগ ও রাষ্ট্র-সমাজ অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ (Civil Initiatives and the Future of State-Society Partnership)
মাদকের মতো একটি বহুমুখী দানবীয় সংকটকে কোনো একক শক্তির পক্ষে পরাজিত করা সম্ভব নয় – রাষ্ট্র একা তা পারে না, আবার সমাজও বিচ্ছিন্নভাবে সফল হতে পারে না। ভবিষ্যৎ মাদক প্রতিরোধের চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় ও অর্থপূর্ণ অংশীদারিত্বের মধ্যে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম (Robert D. Putnam) তার বিখ্যাত গ্রন্থ বোলিং অ্যালোন (Bowling Alone)-এ সামাজিক পুঁজি তত্ত্ব (Social Capital Theory) উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন যে, যে সমাজে নাগরিক উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক আস্থার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, সেই সমাজ যেকোনো দুর্যোগ বা সামাজিক অবক্ষয় সবচেয়ে সফলভাবে সামাল দিতে পারে (Putnam, 2000)।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্পর্ক প্রায়শই একপেশে এবং অবিশ্বাসে ভরা। রাষ্ট্র মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেবল পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কারাগারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে। নাগরিক সমাজকে সেখানে কেবল কিছু সচেতনতামূলক পোস্টার ছাপানো বা বছরে একদিন মাদকবিরোধী র্যালি করার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু প্রকৃত অংশীদারিত্ব হতে হবে নীতি নির্ধারণের পর্যায় থেকে তৃণমূলের বাস্তবায়ন পর্যন্ত। বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক কমিটি এবং মানবাধিকার কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রমাণভিত্তিক ও মানবিক জাতীয় প্রতিরোধ কৌশল প্রণয়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নাগরিক উদ্যোগগুলোরও নিজেদের চিরাচরিত এনজিও-সুলভ প্রকল্পকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেবল বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর অর্থায়নে পরিচালিত স্বল্পমেয়াদী কার্যক্রম দিয়ে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক রূপান্তর সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্থানীয় সম্পদের ওপর ভিত্তি করে টেকসই গণআন্দোলন গড়ে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, সমাজকর্মী, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক নেতৃত্বকে একত্রিত হয়ে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্ম একদিকে রাষ্ট্রের নীতিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন না ঘটে, অন্যদিকে সমাজের ভেতরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিজ্ঞানসম্মত তথ্য সরবরাহ করবে।
মাদক প্রতিরোধ কোনো একদিনের অভিযান নয়, এটা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক বিপ্লব। পরিবারকে হতে হবে স্নেহের নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষাঙ্গনকে হতে হবে জীবনের দক্ষতা অর্জনের মুক্তাঙ্গন, সমবয়সীদের দল হতে হবে সৃষ্টিশীলতার সঙ্গী, আর সম্প্রদায়কে হতে হবে সংবেদনশীল অভিভাবক। রাষ্ট্রীয় দমননীতির লোহার খাঁচার চেয়ে একটি সচেতন, সংহত এবং সহানুভূতিশীল সমাজের অদৃশ্য সুরক্ষা প্রাচীর অনেক বেশি শক্তিশালী। মানুষ যখন তার পরিবার, প্রতিবেশী এবং সংস্কৃতির ভেতর নিজের বেঁচে থাকার আসল অর্থ খুঁজে পাবে, তখনই মাদক নামক মরীচিকা তার সমস্ত মোহ হারিয়ে সমাজের দৃশ্যপট থেকে চিরতরে মুছে যাবে।
প্রতিরোধ কর্মসূচির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ (Prospects and Challenges of Drug Prevention): বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা
প্রতিরোধ কৌশলের স্তরবিন্যাস: প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায় (Stratification of Prevention Strategies: Primary, Secondary, and Tertiary Levels)
যেকোনো জটিল সামাজিক ব্যাধির মতো মাদক সমস্যার ক্ষেত্রেও নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম – এই প্রবচনটি সর্বত্র শোনা যায়। কিন্তু প্রতিরোধের ধারণাটি বাস্তবে কতটা বিস্তৃত এবং বহুমুখী, নীতি নির্ধারকদের আলোচনায় সেই গভীরতা প্রায়শই ধরা পড়ে না। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রতিরোধ কোনো একমাত্রিক একক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি সুসংহত স্তরবিন্যাস। মনোরোগবিজ্ঞানী জেরাল্ড ক্যাপলান (Gerald Caplan) তার প্রণীত চিকিৎসা দর্শনে প্রথম প্রতিরোধ স্তরবিন্যাস মডেল (Prevention Stratification Model) উপস্থাপন করেছিলেন (Caplan, 1964)। ক্যাপলান দেখিয়েছেন যে, যেকোনো রোগের বিস্তার ঠেকাতে হলে তিনটি স্বতন্ত্র ধাপে কাজ করতে হয় – প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং তৃতীয় পর্যায়। মাদকের অপব্যবহার রোধের ক্ষেত্রেও এই স্তরবিন্যাসটি আজ আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রাথমিক প্রতিরোধের লক্ষ্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট – কোনো ব্যক্তি যাতে জীবনের প্রথমবার কোনো নিষিদ্ধ মাদকের সংস্পর্শে না আসে, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা। এটি সমাজের সাধারণ সুস্থ জনগোষ্ঠীর ওপর প্রয়োগ করা হয়, যাদের মধ্যে কোনো আসক্তির লক্ষণ নেই। এই স্তরে কাজ করে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন এবং সুস্থ বিনোদনের সামাজিক পরিসর। পরবর্তীতে গবেষক রবার্ট গর্ডন (Robert S. Gordon) এই মডেলটিকে আরও পরিমার্জিত করে একটি পরিচালনগত কাঠামো তৈরি করেন, যাকে বলা হয় সর্বজনীন, নির্বাচিত ও নির্দেশিত প্রতিরোধ (Universal, Selective, and Indicated Prevention) (Gordon, 1983)। গর্ডনের সর্বজনীন প্রতিরোধ পুরো জনসংখ্যার জন্য প্রযোজ্য, যেমন গণমাধ্যমে সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রচার করা বা বিদ্যালয়ে জীবন দক্ষতা শিক্ষা দেওয়া। এই স্তরের সাফল্য নির্ভর করে একটি সুস্থ, সচেতন এবং মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার ওপর।
মাধ্যমিক বা নির্বাচিত প্রতিরোধের ক্ষেত্রটি অপেক্ষাকৃত বেশি সংবেদনশীল। এই ধাপটি কাজ করে এমন সব জনগোষ্ঠীর সাথে, যারা নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক, পারিবারিক বা পরিবেশগত কারণে সাধারণের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বস্তিবাসী পথশিশু, সংঘাতপীড়িত সীমান্ত অঞ্চলের তরুণ, অথবা যে পরিবারগুলোতে আগে থেকেই মাদকের ইতিহাস রয়েছে – তাদের চিহ্নিত করে বিশেষ সহায়তা দেওয়া। এখানে মূল কাজ হলো প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই দ্রুত হস্তক্ষেপ করা, যাতে তাদের বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক কৌতূহল একটি স্থায়ী অভ্যাসে রূপ নিতে না পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং পারিবারিক সংকট নিরসনের উদ্যোগ।
সর্বশেষ ধাপটি হলো তৃতীয় বা নির্দেশিত পর্যায়, যা মূলত তাদের জন্য যারা ইতোমধ্যে মাদকের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই স্তরের প্রতিরোধ আর মাদক গ্রহণ ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর কাজ হলো আসক্তির কারণে সৃষ্ট ধ্বংসাত্মক শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি রোধ করা। পুনর্বাসন, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজে পুনরায় মর্যাদাপূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই এই পর্যায়ের লক্ষ্য। সমাজবিজ্ঞানীরা একে প্রায়শই রিল্যাপ্স প্রতিরোধ হিসেবেও চিহ্নিত করেন। এই তিনটি স্তরের ভেতর একটি সমন্বিত ভারসাম্য বজায় না থাকলে কোনো জাতীয় প্রতিরোধ নীতিই কেবল শূন্যগর্ভ কাগুজে পরিকল্পনা হয়ে থেকে যায়।
প্রমাণভিত্তিক হস্তক্ষেপ বনাম প্রতীকী প্রচারণা (Evidence-Based Interventions versus Symbolic Campaigns)
উন্নয়নশীল বিশ্বের মাদকবিরোধী কার্যক্রমের দিকে তাকালে একটি দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত মনে হয় – আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে বর্ণাঢ্য ব্যানার নিয়ে শোভাযাত্রা, কিছু নীতিবাক্য সংবলিত লিফলেট বিতরণ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আবেগঘন বক্তৃতা। এই ধরনের প্রতীকী সচেতনতা কর্মসূচি দেখতে খুব চমৎকার লাগে এবং গণমাধ্যমে সহজে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে এদের কার্যকারিতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। সমাজবিজ্ঞানী ও নীতি বিশ্লেষক ডেনিস গোরম্যান (Dennis M. Gorman) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ‘ড্রাগ অ্যাবিউজ রেজিস্ট্যান্স এডুকেশন’ বা ডেয়ার কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, নিছক ভীতি প্রদর্শনমূলক বা স্লোগানভিত্তিক প্রচারণা শিক্ষার্থীদের মাদক ব্যবহার কমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে (Gorman, 2002)।
প্রতীকী প্রচারণার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি মানুষের আচরণের জটিল জৈব-মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোকে অগ্রাহ্য করে। কেবল ‘মাদকে না বলুন’ বা ‘মাদক জীবনকে ধ্বংস করে’ – এই ধরনের সরল স্লোগান দিয়ে একজন তরুণের অবদমিত কৌতূহল, মানসিক বিষণ্ণতা বা সমবয়সীদের তীব্র দলগত চাপ মোকাবেলা করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অদক্ষভাবে উপস্থাপিত ভীতি প্রদর্শনমূলক প্রচারণা কিশোরদের মনে মাদকের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করে। যখন তাদের বলা হয় কোনো একটি বিশেষ ট্যাবলেট খেলে মারাত্মক উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন ঝুঁকিপূর্ণ মানসিকতার তরুণেরা নিষেধের তোয়াক্কা না করে সেই নিষিদ্ধ অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে প্রলুব্ধ হয়।
এর বিপরীতে আধুনিক প্রতিরোধ বিজ্ঞানের দাবি হলো প্রমাণভিত্তিক অনুশীলন (Evidence-Based Practice)। প্রতিরোধ গবেষক মোরিন নেশন (Maureen Nation) এবং তার সহগবেষকরা কার্যকর প্রতিরোধ কর্মসূচির বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি প্রভাবশালী সমীক্ষা পরিচালনা করেন (Nation et al., 2003)। নেশন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সফল প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলোর কিছু সাধারণ লক্ষণ থাকে – এগুলো কেবল তথ্য দেয় না, বরং তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়; এগুলো দীর্ঘমেয়াদী হয় এবং একাধিক স্তরে কাজ করে; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এগুলো বাস্তব তথ্য ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। যে কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা স্বাধীন গবেষণাগারে বারবার প্রমাণিত হয়েছে, নীতি নির্ধারকদের উচিত কেবল সেগুলোর ওপরই সরকারি অর্থ ব্যয় করা।
প্রমাণভিত্তিক হস্তক্ষেপের প্রয়োগ ঘটলে প্রচারণার ধরন আমূল বদলে যায়। সেখানে পুলিশি হুমকির বদলে গুরুত্ব পায় তরুণদের আবেগকে ইতিবাচক পথে পরিচালনার বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাত্ত্বিক আলোচনার বদলে সিমুলেশন বা দলগত ভূমিকার অভিনয়ের মাধ্যমে শেখানো হয় কীভাবে বন্ধুদের অন্যায্য আবদারকে বুদ্ধিমত্তার সাথে এড়িয়ে যাওয়া যায়। প্রতীকী প্রচারণার ফাঁপা চমক থেকে বেরিয়ে এসে সমাজকে এই বাস্তবমুখী, তথ্যনির্ভর এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈজ্ঞানিক কাঠামোর দিকে এগোতে হবে, অন্যথায় প্রতিরোধ কর্মসূচির নামে কেবল রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদের অপচয়ই ঘটতে থাকবে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: সম্পদ বরাদ্দের সংকট (Institutional and Economic Constraints: The Crisis of Resource Allocation)
একটি দেশের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার কোথায়, তা বোঝা যায় সেই দেশের জাতীয় বাজেটের পাতা উল্টালে। মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সম্পদ বরাদ্দের চিত্রটি এক ভয়াবহ বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্বের গল্প বলে। বিশ্বজুড়ে, এবং বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মতো দেশগুলোতে, মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে যে বিশাল বাজেট বরাদ্দ করা হয়, তার নব্বই শতাংশেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সীমান্ত পাহারা, কারাগার নির্মাণ এবং আদালতের পেছনে। অন্যদিকে, প্রতিরোধ, জনসচেতনতা, বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা এবং চিকিৎসার মতো গঠনমূলক খাতগুলো পায় বরাদ্দের সামান্যতম অংশ। এই ভারসাম্যহীন অর্থনীতিই মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বাধা।
অর্থনীতিবিদ ও অপরাধবিজ্ঞানী রবার্ট ম্যাককাউন (Robert E. MacCoun) এবং পিটার রয়টার (Peter Reuter) তাদের যৌথ গবেষণাগ্রন্থ ড্রাগ ওয়ার হেরেসিজ (Drug War Heresies)-এ মাদক যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক অযৌক্তিকতাকে উন্মোচিত করেছেন (MacCoun & Reuter, 2001)। ম্যাককাউন দেখিয়েছেন যে, সরবরাহ দমনের পেছনে রাষ্ট্র প্রতি ডলার বিনিয়োগ করে যে সামান্য ফলাফল পায়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সুফল পাওয়া যেত যদি সেই একই অর্থ চাহিদা হ্রাস ও প্রাথমিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে ব্যয় করা হতো। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো সবসময় দৃশ্যমান ও চটকদার ফলাফল পছন্দ করে। একজন শীর্ষ পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা বা সীমান্তে কোটি টাকার মাদক জব্দের খবর গণমাধ্যমে যত সহজে প্রচার করা যায়, একটি স্কুলে শিশুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখিয়ে পাঁচ বছর পর তাদের বিপথগামী হওয়া ঠেকানোর সাফল্য তত সহজে ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন করা যায় না।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে প্রতিরোধমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক রক্তস্বল্পতায় ভোগে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যে শাখাগুলো প্রতিরোধ ও চিকিৎসার দায়িত্বে থাকে, তাদের না থাকে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল, না থাকে আধুনিক গবেষণার বাজেট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধ কার্যক্রম নির্ভর করে কিছু বেসরকারি সংস্থা বা আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর অনির্ভরযোগ্য অনুদানের ওপর। যখন কোনো প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তখন সেই তহবিলের সাথে সাথে চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রমও মুখ থুবড়ে পড়ে। কোনো ধারাবাহিকতা বা জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি গড়ে ওঠে না।
তদুপরি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যকার আমলাতান্ত্রিক রেষারেষি সম্পদ বরাদ্দের এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করে মাদক ঠেকানো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ, আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে সচেতনতা তৈরি করা তথ্য বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এই পারস্পরিক দায় এড়ানোর খেলায় আসল কাজটি আর কারও এজেন্ডায় প্রাধান্য পায় না। বিজ্ঞানসম্মত প্রতিরোধ কর্মসূচি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট, নিয়মিত এবং টেকসই জাতীয় তহবিল। প্রতিরোধকে যদি কোনো অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা না ভেবে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা না হয়, তবে এই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার বৃত্ত কোনোদিনই ভাঙা সম্ভব হবে না।
সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা ও স্থানীয় বাস্তবতার দ্বন্দ্ব (Cultural Relevance and Conflicts with Local Realities)
বিশ্বায়নের এই যুগে উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় অভ্যাস হলো পশ্চিমা বিশ্বের যেকোনো সফল মডেলকে অন্ধভাবে আমদানি করা। কিন্তু একটি মডেল যা নিউ ইয়র্ক বা লন্ডনের সামাজিক বাস্তবতায় চমৎকার ফল দিয়েছে, তা হুবহু এনে ঢাকা, করাচি বা কলকাতার পাড়া-মহল্লায় প্রয়োগ করলে তা প্রায়শই ব্যর্থ হতে বাধ্য। কারণ মাদক গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কোনো বিমূর্ত রাসায়নিক সমীকরণ নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট সমাজের সংস্কৃতি, পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। স্থানীয় বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে চাপিয়ে দেওয়া যেকোনো নীতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধ গবেষক ফেলিপ গনজালেস ক্যাস্ত্রো (Felipe González Castro) তার সহকর্মীদের সাথে প্রণয়ন করেছিলেন সাংস্কৃতিক রূপান্তর তত্ত্ব (Cultural Adaptation Theory) (Castro et al., 2004)। ক্যাস্ত্রো দেখান যে, যেকোনো প্রতিরোধ কর্মসূচি সফল হতে হলে দুটি পরস্পরবিরোধী চাহিদার মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় ঘটাতে হয় – মূল বৈজ্ঞানিক কাঠামোর বিশ্বস্ততা রক্ষা করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চাহিদার সাথে সেটিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজগুলোতে পরিবার এখনো ব্যক্তিজীবনের ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করে। এখানে পিতা-মাতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজের মতো নয়। ফলে পারিবারিক যোগাযোগ বাড়ানোর কর্মসূচিগুলোকে স্থানীয় যৌথ পরিবারের মানসিকতা এবং সামাজিক অনুশাসনকে বিবেচনায় নিয়ে সাজাতে হয়।
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করার আরেকটি বড় বিপদ হলো সামাজিক ট্যাবু ও লজ্জা। অনেক রক্ষণশীল পরিবারে মাদকাসক্তিকে কোনো অসুস্থতা মনে না করে পরিবারের সম্মানহানি বা পাপ হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে সন্তান কোনো ভুল পথে পা বাড়ালেও পরিবার তা লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং যথাসময়ে চিকিৎসা নিতে ভয় পায়। প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলোতে যদি এই সামাজিক মনস্তত্ত্বকে স্পর্শ করা না যায় এবং কেবল শুকনো চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষা ব্যবহার করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ সেই বার্তা নিজের জীবনের সাথে মেলাতে পারে না। ভাষা, উদাহরণ, স্থানীয় রূপক এবং জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বার্তাগুলোকে সাজাতে হবে।
একই সাথে অর্থনৈতিক বাস্তবতার পার্থক্যও এখানে অত্যন্ত প্রকট। পশ্চিমা প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলো প্রায়শই ধরে নেয় যে একজন তরুণের জন্য উপযুক্ত সামাজিক নিরাপত্তা বলয় রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বস্তি ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে চরম দারিদ্র্য, অপুষ্টি এবং বেকারত্ব হলো দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতা। যে কিশোর পরিবারের ক্ষুধার অন্ন জোগাতে প্রতিদিন সংগ্রাম করে, তার জন্য কেবল ‘মানসিক চাপ সামলানোর’ তাত্ত্বিক পাঠ কোনো অর্থ বহন করে না। সেখানে প্রতিরোধ কর্মসূচিকে জীবিকা উন্নয়ন, বিকল্প কারিগরি শিক্ষা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সুরক্ষার সাথে যুক্ত করতে হয়। সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মাটির সাথে না মিললে আকাশের সব উজ্জ্বল তত্ত্বই মাটিতে আছড়ে পড়ে ব্যর্থ হয়।
ডিজিটাল যুগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন বিপদের মাত্রা (Digital Age, Social Media and Dimensions of Emerging Risks)
একবিংশ শতাব্দীর প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলো এমন এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে যা আগের শতাব্দীর নীতি নির্ধারকরা কল্পনাও করতে পারেননি। ইন্টারনেটের সর্বব্যাপী বিস্তার, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং অ্যালগরিদম-চালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মাদক বাজারের ভূগোলকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। এখন আর মাদক কেনার জন্য কোনো অন্ধকার গলির কুখ্যাত আড্ডায় যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। হাতের মুঠোয় থাকা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ যেমন টেলিগ্রাম, সিগন্যাল কিংবা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমেই ক্রেতা ও বিক্রেতার ভার্চুয়াল যোগাযোগ ঘটে যায়। এই ডিজিটাল রূপান্তর প্রতিরোধ ব্যবস্থার চিরাচরিত ধারণাকে এক বিরাট সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মাদক গবেষক মনিকা জে. বারাত (Monica J. Barratt) ক্রিপ্টোমার্কেট ও অনলাইন মাদক লেনদেনের সমাজতাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছেন (Barratt et al., 2014)। বারাত তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ইন্টারনেটের ডার্ক ওয়েব বা এনক্রিপ্টেড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল মাদক সংগ্রহকেই সহজ করেনি, বরং এটি বিশ্বজুড়ে মাদকের একটি নতুন ডিজিটাল সাব-কালচার বা উপসংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে কীভাবে সিন্থেটিক রাসায়নিক উপাদান নিজের ঘরে তৈরি করা যায়, কীভাবে প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহার করে নেশা করা যায় – এই সব তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান চলছে। ফলে তরুণ সমাজ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের চেয়ে এই ভার্চুয়াল পিয়ার গ্রুপের তথ্যকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে।
এই ভার্চুয়াল বিপদের বিপরীতে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো এখনো পড়ে আছে প্রাক-ডিজিটাল যুগে। যখন অপরাধীরা অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভিপিএন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখছে, তখন সরকারি সংস্থাগুলো এখনো লিফলেট ছাপিয়ে এবং রাস্তায় ব্যানার টাঙিয়ে মাদক প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সার ও বিনোদন জগতের মাধ্যমে মাদকের যে ‘গ্ল্যামারাইজেশন‘ বা আকর্ষণীয় রূপ উপস্থাপন করা হয়, তার বিপরীতে কোনো আকর্ষণীয়, আধুনিক এবং ডিজিটাল-বান্ধব প্রতিরোধ বার্তা হাজির করা যাচ্ছে না। তরুণদের নিজস্ব ভাষা ও মাধ্যমে প্রবেশ করতে না পারলে তাদের সচেতন করা অসম্ভব।
প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল শূন্যতা দূর করতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত সাইবার প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Cyber Prevention Framework)। ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে অনলাইনে মাদকের বিস্তার সংক্রান্ত সার্চ ট্রেন্ড পর্যবেক্ষণ করা, ক্ষতিকর কন্টেন্টের বিপরীতে অ্যালগরিদমভিত্তিক ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ডিজিটাল স্পেসেই তরুণদের জন্য নিরাপদ পিয়ার সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করা সময়ের দাবি। ইন্টারনেট কেবল বিপদের উৎস নয়, এটি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহনও হতে পারে। প্রযুক্তিকে প্রযুক্তির মাধ্যমেই মোকাবেলা করতে হবে; প্রাচীন আমলের লাঠি দিয়ে ডিজিটাল যুগের ড্রাগ সিন্ডিকেট থামানো সম্ভব নয়।
একটি সমন্বিত ভবিষ্যৎ: টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থার রূপকল্প (An Integrated Future: Vision for a Sustainable Prevention System)
মাদক প্রতিরোধের অতীত অভিজ্ঞতা, বর্তমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোকে বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে – কোনো একক জাদুকরী সমাধান দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ, সাময়িক পুলিশি অভিযান বা বছরের একটি দিনে আয়োজিত প্রতীকী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কোনো দীর্ঘমেয়াদী রূপান্তর আনা অসম্ভব। তাত্ত্বিক জীববিজ্ঞানী ও দার্শনিক লুডভিগ ফন বের্টালানফি (Ludwig von Bertalanffy) তার প্রবর্তিত জেনারেল সিস্টেমস থিওরি (General System Theory)-তে দেখিয়েছিলেন যে, কোনো জটিল ব্যবস্থার সামগ্রিক চরিত্র তার প্রতিটি উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে (Bertalanffy, 1968)। মাদক প্রতিরোধকেও ঠিক তেমনি একটি অখণ্ড সামাজিক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে দেখতে হবে।
একটি কার্যকর ও টেকসই ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ কাঠামোর জন্য প্রয়োজন পাঁচটি মূল স্তম্ভের সমন্বয় – পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং আধুনিক প্রযুক্তি। এই পাঁচটি স্তম্ভ যখন পরস্পরের সাথে কার্যকর তথ্যের আদান-প্রদানে যুক্ত থাকবে, তখনই একটি দুর্ভেদ্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি হবে। পরিবার চিহ্নিত করবে মানসিক পরিবর্তনের প্রাথমিক সংকেত, বিদ্যালয় শেখাবে আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের জীবন দক্ষতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেবে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা ও ট্রমা কাউন্সেলিং, সম্প্রদায় নিশ্চিত করবে নিরাপদ সুস্থ পরিবেশ ও কর্মসংস্থান, আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সরবরাহ করবে রিয়েল-টাইম সহায়তা ও সচেতনতা। রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই সার্বিক জনস্বাস্থ্য কাঠামোর সহযোগী শক্তি হিসেবে কেবল বড় মাপের অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু করবে, সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না।
একই সাথে প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন কঠোর ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা। যে কর্মসূচিগুলোর পেছনে সরকারি অর্থ ও জনগণের সময় ব্যয় হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবে তরুণদের আচরণে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে কি না, তা নিয়মিত পরিসংখ্যান ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার মাধ্যমে পরিমাপ করতে হবে। যে পদ্ধতি ব্যর্থ প্রমাণিত হবে, তা কোনো রাজনৈতিক দ্বিধা ছাড়াই বাতিল করতে হবে; আর যে পদ্ধতি কার্যকর ফল দেবে, তাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রসারিত করতে হবে। নীতি নির্ধারণ হতে হবে অন্ধ আবেগ ও নৈতিক আতঙ্কের বাইরে গিয়ে নির্মোহ তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
সবশেষে বলা যায়, প্রতিরোধ কোনো নির্দিষ্ট দিনের কর্মসূচি নয়, এটি একটি সভ্য সমাজের অবিরাম আত্মবিকাশের প্রক্রিয়া। একটি সমাজ যখন তার তরুণদের সামনে একটি অর্থপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন তুলে ধরতে পারে, যেখানে তাদের মেধা প্রকাশের পথ থাকে উন্মুক্ত, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা কোনো লজ্জার বিষয় নয় এবং যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানুষের মর্যাদাকে মূল্য দেয় – সেই সমাজেই মাদক তার সমস্ত আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। ভীতি, নিষেধাজ্ঞা আর শাস্তির অন্ধকার প্রাচীর পেরিয়ে আমাদের একটি সংবেদনশীল, বিজ্ঞানমনস্ক এবং সহমর্মিতাপূর্ণ প্রতিরোধ সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুক্তি নিহিত রয়েছে কেবল এই গভীর ও টেকসই মানবিক রূপান্তরের ভেতরেই।
বিশ্বব্যাপী সফল অনুশীলন (Global Best Practices in Drug Prevention): কার্যকর মডেল
আইসল্যান্ড মডেল: সম্প্রদায় ও যুবকল্যাণভিত্তিক সামগ্রিক প্রতিরোধ (The Icelandic Model: Community and Youth Welfare-Based Holistic Prevention)
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উত্তর আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশটির কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মদ্যপান ও মাদকের ব্যবহার ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে বিপজ্জনক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। উইকএন্ড বা ছুটির দিনগুলোতে রাজধানী রেইকিয়াভিকের রাস্তায় মাতাল ও মাদকাসক্ত তরুণদের উপস্থিতি এক সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়। কিন্তু পরবর্তী দুই দশকের মধ্যে দেশটি এমন এক নাটকীয় রূপান্তর ঘটায় যা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। ভীতি প্রদর্শন, পুলিশি নির্যাতন বা কারাগার ভরার প্রচলিত পথ পরিহার করে আইসল্যান্ড উদ্ভাবন করে এক সামাজিক বিপ্লব, যা আজ বিশ্বজুড়ে আইসল্যান্ডিক প্রতিরোধ মডেল (Icelandic Prevention Model) বা ‘প্ল্যানেট ইয়ুথ’ নামে পরিচিত।
এই রূপান্তরের মূল কারিগরদের একজন ছিলেন সমাজবিজ্ঞানী ইনগা ডোরা সিগফুসদোতির (Inga Dóra Sigfúsdóttir) এবং তার সহকর্মীরা। সিগফুসদোতির তার গবেষণায় দেখান যে, কিশোরদের মাদকাসক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক আচরণ নয়, বরং এটি তাদের চারপাশের সামাজিক পরিবেশ, একাকীত্ব এবং মানসিক ক্লান্তির একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন (Sigfúsdóttir et al., 2009)। এই গবেষণার তাত্ত্বিক ভিত্তি জোগান মার্কিন মনোবিজ্ঞানী হার্ভে মিল্কম্যান (Harvey Milkman)। মিল্কম্যানের ধারণা ছিল সহজ কিন্তু গভীর – মানুষ কেন মাদক গ্রহণ করে? কারণ সে তার মস্তিষ্কের রসায়নে পরিবর্তন আনতে চায়, সে উত্তেজনা বা মানসিক স্বস্তি খোঁজে। মিল্কম্যান যুক্তি দেন যে, যদি কিশোরদের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াই শরীরের নিজস্ব ডোপামিন ও অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণের স্বাস্থ্যকর বিকল্প দেওয়া যায়, তবে তারা আর কৃত্রিম নেশার দিকে ঝুঁকবে না।
আইসল্যান্ড সরকার এই বৈজ্ঞানিক ধারণাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপান্তর করে। রাষ্ট্র কেবল প্রচারণায় অর্থ অপচয় না করে সরাসরি প্রতিটি পরিবার ও কমিউনিটিতে বিনিয়োগ করে। প্রতিটি কিশোরের জন্য খেলাধুলা, সংগীত, চিত্রকলা, মার্শাল আর্ট এবং নাট্যচর্চার মতো সৃজনশীল কার্যকলাপে অংশ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় ‘লেইজার কার্ড’ বা আর্থিক ভাউচার চালু করা হয়। এর ফলে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু বিকেলে কোনো না কোনো গঠনমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একই সাথে আইন করে রাত দশটার পর অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাস্তায় চলাচলের ওপর যৌথ সামাজিক নজরদারি চালু করা হয়, যেখানে অভিভাবকরা দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় সান্ধ্যকালীন টহল দিতেন – পুলিশের মতো শাস্তির জন্য নয়, সন্তানদের বাড়ি ফিরতে স্নেহশীল তাগিদ দেওয়ার জন্য।
ফলাফল ছিল বিস্ময়কর ও ঐতিহাসিক। ১৯৯৮ সালে যেখানে আইসল্যান্ডের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় বিয়াল্লিশ শতাংশ নিয়মিত মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল এবং তেইশ শতাংশ ধূমপান করত, সেখানে ২০১৬ সাল নাগাদ এই হার নেমে আসে যথাক্রমে পাঁচ ও তিন শতাংশে। ক্যানাবিস বা অন্যান্য মাদকের ব্যবহারও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। এই মডেল প্রমাণ করে দেয় যে, শিশুদের ‘মাদক গ্রহণ করো না’ বলে শুকনো উপদেশ দেওয়ার চেয়ে তাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ, আনন্দময় ও সক্রিয় করে তোলা হাজার গুণ বেশি কার্যকর। আইসল্যান্ড বিশ্বকে দেখিয়েছে যে প্রতিরোধ কোনো আইনগত লড়াই নয়, এটি একটি ভালোবাসাপূর্ণ, সংহতিপূর্ণ এবং সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার সম্মিলিত সাধনা।
পর্তুগালের অপরাধমুক্তকরণ মডেল: জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ (Portugal’s Decriminalization Model: Public Health and Social Reintegration)
ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত পর্তুগাল ১৯৯০-এর দশকে ছিল মাদকের এক চরম নরককুণ্ড। তৎকালীন সময়ে দেশটির প্রায় এক শতাংশ জনগোষ্ঠী – অর্থাৎ প্রতি এক শ জনে একজন – মারাত্মকভাবে হেরোইন আসক্তির শিকার ছিল। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস সংক্রমণের হার। প্রচলিত ফৌজদারি আইন, পুলিশি অভিযান এবং জেলখানার ভীতি মাদক পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র উন্নতি করতে পারছিল না। এই ভয়াবহ জাতীয় বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে পর্তুগিজ সরকার এক চরম সাহসী ও যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০০১ সালে কার্যকর হওয়া বিখ্যাত ৩০/২০০০ আইনের মাধ্যমে পর্তুগাল ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সব ধরনের মাদকের ধারণকে অপরাধমুক্ত বা ডিক্রিমিনালাইজ ঘোষণা করে।
আইন বিশেষজ্ঞ কেইটলিন এলিজাবেথ হিউজ (Caitlin Elizabeth Hughes) এবং অপরাধবিজ্ঞানী অ্যালেক্স স্টিভেন্স (Alex Stevens) পর্তুগালের এই নীতিগত পরিবর্তনের ওপর বিশদ গবেষণা পরিচালনা করেন (Hughes & Stevens, 2010)। হিউজ ও স্টিভেন্স তাদের গবেষণায় স্পষ্ট করেছেন যে, অপরাধমুক্তকরণ মানে মাদকের অবাধ আইনি বৈধতা বা লিগালাইজেশন নয়। মাদক পাচার ও বড় আকারের বিক্রয় এখনো পর্তুগালে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু কোনো ব্যক্তির কাছে যদি সর্বোচ্চ দশ দিনের ব্যক্তিগত ব্যবহারের পরিমাণ (যেমন এক গ্রাম হেরোইন বা দুই গ্রাম কোকেন) মাদক পাওয়া যায়, পুলিশ তাকে আর গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় না।
পরিবর্তে সেই ব্যক্তিকে হাজির করা হয় একটি বিশেষ প্রশাসনিক প্যানেলের সামনে, যার নাম ‘কমিশন ফর দ্য ডিসুয়েশন অব ড্রাগ অ্যাডিকশন‘। এই কমিশনে কোনো বিচারক বা পুলিশ কর্মকর্তা বসেন না; সেখানে থাকেন একজন চিকিৎসক, একজন মনোবিজ্ঞানী এবং একজন সমাজকর্মী। তারা অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করেন যে সে কি কেবল কৌতূহলবশত মাদক নিয়েছে, নাকি সে জটিল আসক্তির শিকার। ব্যক্তিটি যদি আসক্ত হয়, কমিশন তাকে শাস্তি দেওয়ার বদলে রাষ্ট্রীয় খরচে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়। অপরাধের তকমা মুছে ফেলে রাষ্ট্র মাদক ব্যবহারকারীকে একজন চিকিৎসাপ্রত্যাশী নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
পর্তুগালের এই অপরাধমুক্তকরণ মডেল (Decriminalization Model) বিশ্বজুড়ে ড্রাগ পলিসির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। দুই দশক পর দেখা যায়, পর্তুগালে মাদকের অতিমাত্রায় মৃত্যু বা ওভারডোজের হার ইউরোপের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ইনজেকশন ব্যবহারকারীদের মধ্যে নতুন এইচআইভি সংক্রমণের হার প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অপরাধীদের পেছনে রাষ্ট্রের যে বিপুল পুলিশি ও বিচারিক অর্থ অপচয় হতো, সেই অর্থ বাঁচিয়ে সরকার জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করেছে। পর্তুগাল দেখিয়েছে যে দয়া, সহানুভূতি এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা যে কোনো কঠোর আইন বা কারাগারের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ফলাফল দিতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের ‘চার স্তম্ভ’ নীতি: চিকিৎসা ও নজরদারিকৃত নিরাপদ সেবনকেন্দ্র (Switzerland’s ‘Four Pillars’ Policy: Medical Treatment and Supervised Consumption Facilities)
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরের কথা মনে পড়লে অনেকের চোখেই ভেসে ওঠে আল্পস পর্বতমালা কিংবা শান্ত লেকের ছবি। কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শেষভাগে এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এই জুরিখেরই প্ল্যাটজস্পিটজ পার্ক বিশ্বজুড়ে কুখ্যাতি পেয়েছিল ‘নিডল পার্ক’ হিসেবে। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মাদকসেবী প্রকাশ্যে হেরোইন ইনজেকশন নিত, যত্রতত্র পড়ে থাকত রক্তমাখা সিরিঞ্জ এবং নিয়মিত ঘটত ওভারডোজে মৃত্যুর ঘটনা। পুলিশ বারবার অভিযান চালিয়ে পার্ক খালি করত, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাদকসেবীরা অন্য কোনো গলিতে গিয়ে জড়ো হতো। এই দুঃসহ জনস্বাস্থ্য সংকট সুইস প্রশাসনকে বাধ্য করে প্রচলিত রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি ঝেড়ে ফেলে এক বাস্তবমুখী সমাধান খুঁজতে।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে সুইজারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে তাদের বিখ্যাত চার স্তম্ভ নীতি (Four Pillars Policy)। সুইস মনোরোগবিজ্ঞানী ও মাদক বিশেষজ্ঞ অ্যামব্রোস উচেনহেগেন (Ambros Uchtenhagen) এই মডেলের বৈজ্ঞানিক রূপরেখা প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন (Uchtenhagen, 2010)। উচেনহেগেন দেখান যে, মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর নীতি দাঁড়িয়ে থাকতে হবে চারটি সমান স্তম্ভের ওপর – প্রতিরোধ, চিকিৎসা, ক্ষতি হ্রাস এবং আইন প্রয়োগ। এই নীতির সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক ছিল তৃতীয় স্তম্ভ বা ক্ষতি হ্রাসের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, যার অধীনে চালু করা হয় বিশ্বের প্রথম চিকিৎসাগতভাবে নিয়ন্ত্রিত হেরোইন থেরাপি বা ‘হেরোইন-অ্যাসিস্টেড ট্রিটমেন্ট’।
সুইস সরকার বুঝতে পেরেছিল যে এমন কিছু দীর্ঘস্থায়ী হেরোইন আসক্ত মানুষ রয়েছে যারা প্রচলিত মেথাডন বা কোনো চিকিৎসার মাধ্যমেই নেশা ছাড়তে পারছে না। তাদের কালোবাজারের বিষাক্ত ড্রাগ এবং অপরাধমূলক জীবন থেকে রক্ষা করতে সরকার বিশেষ ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসকের সরাসরি নজরদারিতে বিশুদ্ধ ডায়াফিন বা মেডিকেল হেরোইন সরবরাহের ব্যবস্থা করে। একই সাথে শহরজুড়ে স্থাপন করা হয় নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত সেবন কেন্দ্র বা সুপারভাইজড ইনজেকশন ফ্যাসিলিটি। সেখানে নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতিতে ব্যবহারকারীরা পরিষ্কার সিরিঞ্জ দিয়ে মাদক গ্রহণের সুযোগ পায়। কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত মাত্রার ঝুঁকিতে পড়লে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে অ্যান্টিডোট প্রয়োগ করে তার জীবন বাঁচান।
এই নীতির ফল দাঁড়ায় অবিশ্বাস্য রকমের ইতিবাচক। রাস্তার উন্মুক্ত মাদক বাজার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, কারণ মাদকসেবীদের আর কালোবাজার থেকে অতিরিক্ত দামে ড্রাগ কেনার জন্য চুরি বা ছিনতাই করতে হতো না। মাদক সংক্রান্ত অপরাধ নাটকীয়ভাবে কমে যায় এবং সুইজারল্যান্ডের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে জননিরাপত্তাবোধ ফিরে আসে। সবচেয়ে বড় কথা, এই ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত আসার ফলে বহু প্রান্তিক মানুষ স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং একসময় নিজেরাই ধীরে ধীরে মূলধারার পুনর্বাসন চিকিৎসার দিকে পা বাড়ায়। সুইজারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে বাস্তবতা অস্বীকার করে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না; বাস্তবতাকে স্বীকার করে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনাই আধুনিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যের ক্ষতি হ্রাস ও ওভারডোজ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Harm Reduction and Overdose Prevention in Canada and the United Kingdom)
উত্তর আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদকের যে রূপটি সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, তা হলো সিন্থেটিক ওপিওড, বিশেষ করে প্রাণঘাতী ফেন্টানাইর বিস্তার। সাধারণ হেরোইনের চেয়ে পঞ্চাশ থেকে এক শ গুণ বেশি শক্তিশালী এই রাসায়নিক উপাদানটি বাজারে আসার পর হাজার হাজার তরুণ ঘুমের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে শুরু করে। এই নজিরবিহীন ওভারডোজ সংকটের প্রেক্ষাপটে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশ, বিশেষ করে ভ্যাঙ্কুভার শহর, এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ মডেলের জন্ম দেয়। ২০০৩ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তর আমেরিকার প্রথম আইনি ও অনুমোদিত নজরদারিকৃত সেবন কেন্দ্র (Supervised Consumption Services), যার নাম ‘ইনসাইট’ (Insite)।
চিকিৎসাবিজ্ঞানী থমাস কার (Thomas Kerr) এবং অধ্যাপক হুলিও মন্তানের (Julio Montaner) ইনসাইটের কার্যকারিতার ওপর বছরের পর বছর ধরে নিবিড় গবেষণামূলক সমীক্ষা চালান (Kerr et al., 2008)। কার তার গবেষণায় উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরেন যে, ইনসাইট চালু হওয়ার পর এর আশপাশের এলাকায় ওভারডোজে মৃত্যুর হার পঁয়ত্রিশ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে, অথচ শহরের অন্যান্য এলাকায় এই হার অপরিবর্তিত ছিল। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিসংখ্যান হলো, ইনসাইটের চার দেয়ালের ভেতরে লক্ষাধিক ইনজেকশন গ্রহণের ঘটনা ঘটলেও এবং হাজার হাজার ওভারডোজের পরিস্থিতি তৈরি হলেও, সেখানে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত হস্তক্ষেপে একজন মানুষেরও মৃত্যু ঘটেনি। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক চিকিৎসা সহায়তা থাকলে ওভারডোজের প্রতিটি মৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যের প্রতিরোধ ব্যবস্থার আরেকটি অন্যতম স্তম্ভ হলো ন্যালোক্সন নামক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের গণবিতরণ। ওপিওডের অতিরিক্ত মাত্রায় শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে এই ওষুধটি প্রয়োগ করলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তার চেতনা ফিরে আসে। যুক্তরাজ্য ও কানাডার সরকার এই ওষুধটিকে কোনো প্রেসক্রিপশনের গণ্ডিতে আটকে না রেখে পুলিশ, প্যারামেডিক, লাইব্রেরিয়ান এমনকি সাধারণ পথচারী ও মাদকসেবীদের হাতে হাতে তুলে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। এর পাশাপাশি চালু করা হয় ড্রাগ চেকিং বা রাসায়নিক পরীক্ষার পরিষেবা, যেখানে ব্যবহারকারীরা বেনামে তাদের কেনা মাদকের সামান্য অংশ জমা দিয়ে জেনে নিতে পারে তাতে কোনো বিষাক্ত ফেন্টানিল বা ক্ষতিকর ভেজাল মেশানো আছে কি না।
অনেকে প্রথমদিকে অভিযোগ করেছিলেন যে এই ধরনের সেবা মাদক ব্যবহারকে উৎসাহিত করবে। কিন্তু বাস্তব গবেষণা ঠিক তার বিপরীত সত্য প্রকাশ করেছে। যখন একজন প্রান্তিক মানুষ কোনো বিচার বা তিরস্কারের মুখোমুখি না হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আসে, তখন সে জীবনের প্রতি পুনরায় শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে। ইনসাইটের মাধ্যমে হাজার হাজার ব্যবহারকারী পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী মাদক নিরাময় কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। এই দেশগুলো দেখিয়েছে যে কোনো সমাজ যদি তার সবচেয়ে পথভ্রষ্ট নাগরিকের জীবনের মূল্য দিতে শেখে, তবেই সেখানে প্রকৃত জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি রচিত হয়।
উরুগুয়ে ও উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রিত বাজার মডেল (Regulated Market Models in Uruguay and North America)
কালোবাজারকে নির্মূল করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী? অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের বহু গবেষক আজ এক বিস্ময়কর উত্তর দিচ্ছেন – কালোবাজারকে ধ্বংস করতে হলে পণ্যটিকে রাষ্ট্রের কঠোর ও বৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই সাহসী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৩ সালে লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ক্যানাবিস বা গাঁজার উৎপাদন, বিতরণ ও বিক্রয়কে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে বৈধ ঘোষণা করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসে মুজিকার সরকার স্পষ্ট ঘোষণা করে যে, মাদক কার্টেল ও সহিংস মাফিয়া চক্রের হাত থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও মাদকনীতি বিশেষজ্ঞ জোনাথন পি. কলকিন্স (Jonathan P. Caulkins) উত্তর আমেরিকা ও উরুগুয়ের এই নীতিগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত বাজার তত্ত্ব (Regulated Market Theory)-র প্রয়োগ দেখিয়েছেন (Caulkins et al., 2012)। উরুগুয়ের মডেলে তিনটি স্পষ্ট পথ উন্মুক্ত রাখা হয় – ব্যক্তি তার নিজের বাড়িতে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ লাগাতে পারে, নাগরিকরা সমবায় ভিত্তিক ‘ক্যানাবিস ক্লাব‘ গড়ে তুলতে পারে, অথবা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিবন্ধিত ফার্মেসি থেকে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে ও নির্দিষ্ট পরিমাণে প্যাকেটজাত পণ্য কিনতে পারে। এই ব্যবস্থায় কোনো উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং কেবল প্রাপ্তবয়স্ক উরুগুয়ান নাগরিকদের জন্যই এই প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।
উরুগুয়ের এই পদক্ষেপের পথ ধরে উত্তর আমেরিকাতেও এক বিশাল নীতিগত রূপান্তর ঘটে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ও ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য এবং পরবর্তীতে পুরো কানাডা ২০১৮ সালের ক্যানাবিস অ্যাক্টের মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা চালু করে। এই মডেলের মূল যুক্তি হলো, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যে পণ্যটি গোপনে কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করছিল, তাকে অন্ধকার থেকে বের করে এনে গুণগত মান নিশ্চিত করা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশ কঠোরভাবে রুদ্ধ করা এবং সেই বাণিজ্য থেকে প্রাপ্ত বিপুল কর রাজস্ব জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধ শিক্ষায় পুনর্বিনিয়োগ করা।
এই মডেলগুলোর প্রাথমিক ফলাফল মিশ্র কিন্তু অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে চোরাচালানকারী কার্টেলগুলো তাদের আয়ের একটি বিশাল উৎস হারিয়েছে এবং গাঁজা সংক্রান্ত অপরাধে গ্রেপ্তার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে, যার ফলে আদালত ও কারাগারের ওপর চাপ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে সংগৃহীত কোটি কোটি ডলারের কর দিয়ে নতুন স্কুল, খেলার মাঠ এবং মাদকাসক্তি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক মুনাফালোভী কর্পোরেট স্বার্থ যাতে জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রাধান্য না পায়, সে বিষয়ে কঠোর রাষ্ট্রীয় নজরদারি বজায় রাখাই এখন এই মডেলগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বৈশ্বিক মডেলের পাঠ ও উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রয়োগযোগ্যতা (Lessons from Global Models and Applicability to the Developing World)
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের এই সফল ও বৈচিত্র্যময় মডেলগুলো পর্যালোচনা করলে কিছু মৌলিক সত্য আমাদের সামনে অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সফল মডেলগুলোর কোনোটিই এক রাতের জাদুতে তৈরি হয়নি এবং কোনোটিই নিছক পুলিশি দমননীতির ওপর ভরসা করেনি। তাদের সাফল্যের সাধারণ সূত্রটি নিহিত রয়েছে তিনটি মূল উপাদানে – নৈতিক আতঙ্কের বদলে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর আস্থা, শাস্তি দেওয়ার চেয়ে মানুষকে বাঁচানোর অগ্রাধিকার, এবং বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সমগ্র সমাজকে এক সুতোয় বাঁধার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইসল্যান্ড, পর্তুগাল বা সুইজারল্যান্ডের মতো ধনী কল্যাণকামী রাষ্ট্রের এই অভিজ্ঞতাগুলো কি দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রয়োগ করা সম্ভব?
নীতি স্থানান্তর বিশেষজ্ঞ ডেভিড পি. ডলোউইৎস (David P. Dolowitz) এবং ডেভিড মার্শ (David Marsh) তাদের প্রভাবশালী কাজে নীতি স্থানান্তর তত্ত্ব (Policy Transfer Theory) ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সতর্ক করেছেন যে, এক দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান অন্য দেশে অন্ধভাবে অনুকরণ করলে তা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে (Dolowitz & Marsh, 2000)। উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো সম্পদের অপ্রতুলতা, দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। সুইজারল্যান্ডের মতো ব্যয়বহুল ক্লিনিক বা আইসল্যান্ডের মতো প্রতিটি শিশুর জন্য রাষ্ট্রীয় ভাউচার চালু করার আর্থিক সক্ষমতা হয়তো অনেক দরিদ্র রাষ্ট্রের নেই।
কিন্তু অর্থের অভাব থাকলেও মানসিকতার রূপান্তর ঘটাতে কোনো অতিরিক্ত বাজেটের প্রয়োজন হয় না। পর্তুগালের অপরাধমুক্তকরণ দর্শনের মূল কথাটি কোনো জটিল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি কেবল আইনের ধারা থেকে শাস্তির বিধান তুলে দিয়ে মানুষকে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার সদিচ্ছা। উন্নয়নশীল দেশগুলো খুব সহজেই তাদের প্রচলিত ঔপনিবেশিক মাদক আইনগুলোকে সংস্কার করে ক্ষুদ্র ব্যবহারকারীদের কারাগার থেকে মুক্তি দিতে পারে। পুলিশের পেছনে যে বিপুল অর্থ অপচয় হয়, তার একটি সামান্য অংশ দিয়ে স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সাধারণ কাউন্সেলিং ও বিকল্প ক্ষতি হ্রাস সেবা চালু করা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত।
একইভাবে আইসল্যান্ডের মডেল থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি নেওয়া যায়, তা হলো তরুণদের সৃজনশীল বিকাশের গুরুত্ব। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যে বিপুল খেলার মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে মুক্ত করা কোনো অসম্ভব কাজ নয়। বিশ্বের সফল অনুশীলনগুলো আমাদের কোনো তৈরি করা রেসিপি দেয় না, তারা আমাদের একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি হলো – মাদকাসক্ত মানুষ আমাদের শত্রু নয়, তারা আমাদের সমাজেরই সবচেয়ে আহত সন্তান। তাদের শাস্তি দিয়ে নির্মূল করা যায় না, তাদের কেবল ভালোবাসা, বিজ্ঞান এবং সুস্থ জীবনের হাতছানি দিয়েই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
মাদক, অপরাধ ও জনস্বাস্থ্যের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি (Integrated Perspective on Drugs, Crime and Public Health): বহুমাত্রিক নীতি
ত্রিভুজ সম্পর্ক: মাদক, সহিংসতা ও অপরাধের গতিপ্রকৃতি (The Tripartite Relationship: Dynamics of Drugs, Violence and Crime)
মানব সমাজের সবচেয়ে জটিল সমীকরণগুলোর একটি হলো মাদক ও অপরাধের মধ্যকার পারস্পরিক যোগসূত্র। সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, মানুষ মাদক নিলেই হিংস্র হয়ে ওঠে এবং অপরাধ করে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এই সরল ধারণার চেয়ে অনেক বেশি স্তরবিশিষ্ট। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী পল গোল্ডস্টেইন (Paul J. Goldstein) তার যুগান্তকারী গবেষণায় প্রথম এই সম্পর্কের একটি বৈজ্ঞানিক রূপরেখা দাঁড় করান, যা অপরাধবিজ্ঞানে ত্রিভুজীয় সহিংসতা মডেল (Tripartite Framework of Violence) নামে পরিচিত (Goldstein, 1985)। গোল্ডস্টেইন দেখান যে, মাদক এবং অপরাধের সম্পর্কটি মূলত তিনটি স্বতন্ত্র ধারায় প্রবাহিত হয় – সাইকোফার্মাকোলজিক্যাল, ইকোনমিক-কমপালসিভ এবং সিস্টেমেটিক বা কাঠামোগত।
প্রথম ধারাটি হলো সাইকোফার্মাকোলজিক্যাল সহিংসতা, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিক দ্রব্য মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করে তার বিচারবুদ্ধি, আবেগ ও আচরণকে সাময়িকভাবে বদলে দেয়। মেথঅ্যাম্ফেটাইন, অতিরিক্ত অ্যালকোহল কিংবা কোকেনের মতো উত্তেজক পদার্থ গ্রহণের ফলে ব্যক্তির মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে, যার ফলে সে তুচ্ছ কারণে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে, সমাজের সামগ্রিক মাদক অপরাধের খুব সামান্য অংশই এই জৈবিক উত্তেজনার কারণে ঘটে। বেশিরভাগ অপরাধের পেছনে কাজ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধারাটি।
দ্বিতীয় ধারাটি হলো ইকোনমিক-কমপালসিভ বা অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাজনিত অপরাধ। একজন ব্যক্তি যখন কোনো মাদকের ওপর তীব্রভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার শরীর প্রতিদিন সেই মাদকের জোগান দাবি করে। কিন্তু নিষিদ্ধ বাজারে কৃত্রিম ঘাটতির কারণে মাদকের দাম থাকে আকাশচুম্বী। নিয়মিত কাজের আয় দিয়ে এই বিপুল ব্যয় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়লে সেই ব্যক্তি বাধ্য হয়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বা জালিয়াতির মতো সম্পত্তিকেন্দ্রীক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এখানে অপরাধের মূল চালিকাশক্তি কোনো শারীরিক হিংস্রতা নয়, বরং পরবর্তী ডোজটি সংগ্রহের চরম মরিয়া অর্থনৈতিক তাড়না।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ধারাটি হলো সিস্টেমেটিক বা পদ্ধতিগত সহিংসতা। যেহেতু মাদকের বাজার সম্পূর্ণ অবৈধ, তাই সেখানে কোনো আইনি আদালত, পুলিশ বা চুক্তি কার্যকর করার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেই। ফলে মাদক কারবারিরা তাদের ব্যবসায়িক বিরোধ মেটাতে, পাওনা টাকা আদায় করতে, ভৌগোলিক এলাকা দখল করতে এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অবৈধ অস্ত্রের চরম বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। গ্যাং ওয়ার, গুপ্তহত্যা এবং বন্দুকযুদ্ধের মতো যে ভয়াবহ অপরাধগুলো সমাজকে আতঙ্কিত করে, তার প্রায় পুরোটাই এই পদ্ধতিগত সহিংসতার ফসল। গোল্ডস্টেইনের এই বিশ্লেষণ আমাদের দেখায় যে, অপরাধ দমনের জন্য কেবল মাদক গ্রহণকারীকে শাস্তি দিলে চলবে না; অবৈধ বাজারের যে কাঠামো সহিংসতা তৈরি করে, সেই মূল অর্থনৈতিক শিকড়টিকে স্পর্শ করতে হবে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও জনস্বাস্থ্য প্যারাডাইমের উত্থান (Failure of Punitive Regimes and Rise of the Public Health Paradigm)
বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে মাদক সমস্যার সমাধানে যে প্রধান অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলো ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা এবং পুলিশি বলপ্রয়োগ। কারাগার ভরে ফেলা, কঠোর কারাদণ্ড প্রদান এবং সামরিক ধাঁচে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা ছিল এই দমননীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরেছে যে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে জনস্বাস্থ্যের কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সমাধান করা যায় না। বরং এই অন্ধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের ওপর অবিচারের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে, কারাগারগুলোতে উপচে পড়া ভিড় তৈরি করেছে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের মুনাফাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ঐতিহাসিক ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটেই আধুনিক নীতিবিজ্ঞানে ঘটে গেছে এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গিগত রূপান্তর, যাকে বলা হয় জনস্বাস্থ্য প্যারাডাইম। এই নতুন চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানী নোরা ডি. ভলকোভ (Nora D. Volkow) এবং তার সহগবেষকরা (Volkow et al., 2016)। ভলকোভ তার যুগান্তকারী ক্লিনিক্যাল গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন মস্তিষ্কের দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি মডেল (Chronic Brain Disease Model)। আধুনিক মস্তিষ্কের ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে ভলকোভ দেখান যে, দীর্ঘকাল মাদক ব্যবহারের ফলে মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন রিওয়ার্ড সিস্টেম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জৈবিক সার্কিট স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে আসক্তি আর কোনো ব্যক্তির দুর্বল নৈতিক চরিত্রের প্রকাশ থাকে না; এটি ডায়াবেটিস, অ্যাজমা বা উচ্চ রক্তচাপের মতো একটি ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য ব্যাধিতে রূপ নেয়।
যখন আসক্তিকে একটি চিকিৎসাযোগ্য ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন পুরো আইনি সমীকরণটি বদলে যায়। একজন রক্তচাপের রোগীকে যেমন ওষুধ না খাওয়ার অপরাধে জেলে পাঠানো যায় না, তেমনই একজন আসক্ত মানুষকেও তার অসুস্থতার জন্য কারাগারে নিক্ষেপ করা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। জনস্বাস্থ্য দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে যে, মাদক ব্যবহারকারীকে বিচারালয়ের আসামির কাঠগড়া থেকে বের করে এনে হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে। তাকে অপরাধী হিসেবে কলঙ্কিত করার বদলে একজন নাগরিক হিসেবে তার সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বনাম জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই দ্বন্দ্বে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন সম্পূর্ণভাবে দ্বিতীয়টির পক্ষে। জনস্বাস্থ্য মডেল কেবল আসক্ত ব্যক্তির জীবনই বাঁচায় না, এটি সমাজের সার্বিক অপরাধের হারও কমিয়ে দেয়। একজন ব্যক্তি যখন চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন তাকে আর মাদকের টাকার জন্য ছিনতাই করতে হয় না, কিংবা মাফিয়া চক্রের বাহক হতে হয় না। ফলে সমাজ নিরাপদ হয়, পুলিশের অপ্রয়োজনীয় কাজের বোঝা কমে এবং রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী হয়। দণ্ডবিধির অন্ধ অন্ধকারের চেয়ে বিজ্ঞানের আলোকোজ্জ্বল পথই যে মাদক সমস্যার প্রকৃত প্রতিষেধক, বিশ্ব আজ তা ধীরে ধীরে স্বীকার করে নিচ্ছে।
সামাজিক নির্ধারক ও কাঠামোগত দুর্বলতা (Social Determinants and Structural Vulnerability)
মানুষের স্বাস্থ্য বা অসুস্থতা কখনোই বায়বীয় কোনো শূন্যতায় তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় সে যেখানে জন্মায়, বড় হয়, কাজ করে এবং বেঁচে থাকে – সেই বাস্তব সামাজিক মাটির ভেতর। জনস্বাস্থ্যের এই গভীর সত্যটিকে একাডেমিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রখ্যাত মহামারিবিজ্ঞানী স্যার মাইকেল মারমট (Sir Michael Marmot)। মারমট তার বিশ্বখ্যাত গবেষণায় রূপরেখা দিয়েছেন স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ধারক তত্ত্ব (Social Determinants of Health Theory) (Marmot, 2005)। মারমট দেখান যে, হৃদরোগ থেকে শুরু করে মাদকাসক্তি পর্যন্ত প্রতিটি শারীরিক ও মানসিক সংকটের পেছনে ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছার চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর থাকে সামাজিক অসমতা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা।
মাদকাসক্তির শিকড় অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষকরা দেখেছেন যে, শৈশবের মানসিক আঘাত বা ট্রমা এই ব্যাধির অন্যতম প্রধান অনুঘটক। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ভিনসেন্ট জে. ফেলিত্তি (Vincent J. Felitti) এবং তার গবেষক দল তাদের বিখ্যাত গবেষণায় উন্মোচন করেন প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতা (Adverse Childhood Experiences বা ACEs)-র প্রভাব (Felitti et al., 1998)। ফেলিত্তি দেখান যে, শৈশবে শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক অবহেলা, পিতা-মাতার বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা পারিবারিক কলহের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মাদকের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে সাধারণের চেয়ে বহুগুণ বেশি। মাদক তখন তাদের কাছে নিছক কোনো বিনোদন থাকে না; এটি হয়ে ওঠে শৈশবের অবদমিত বেদনা ও ট্রমা থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পাওয়ার এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টা।
একই সাথে নৃতত্ত্ববিদ ফিলিপ বুর্জোয়া (Philippe Bourgois) তার ক্লাসিক নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণাগ্রন্থ ইন সার্চ অব রেসপেক্ট (In Search of Respect)-এ উন্মোচন করেছেন কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence) কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাদক গ্রহণকে ত্বরান্বিত করে (Bourgois, 2003)। বুর্জোয়া নিউ ইয়র্কের বস্তি অঞ্চলের ক্র্যাক কোকেন বাজারের ভেতর বছরের পর বছর বসবাস করে দেখিয়েছেন যে, চরম বর্ণবাদ, শিক্ষাহীনতা এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি কীভাবে একদল তরুণকে মাদক অর্থনীতির দিকে ঠেলে দেয়। তাদের কাছে মাদক বিক্রি ও সেবন কেবল বেঁচে থাকার একমাত্র অর্থনৈতিক উপায় নয়, সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও কিছুটা কৃত্রিম আত্মসম্মান বা ‘রেসপেক্ট’ অর্জনের করুণ চেষ্টা।
অতএব, সামাজিক নির্ধারকগুলোকে অগ্রাহ্য করে কেবল কিছু সচেতনতামূলক পরামর্শ দিয়ে বা ব্যক্তিগত কাউন্সিলিং করিয়ে মাদক সমস্যার সমাধান করা অসম্ভব। যতক্ষণ না পর্যন্ত দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানসম্মত সর্বজনীন শিক্ষা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মাদক ব্যবহারের উর্বর সামাজিক জমিটি তৈরিই থাকবে। একটি সমতাভিত্তিক, সহানুভূতিশীল এবং মানবিক সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলাই হলো যেকোনো মাদকবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে মৌলিক ও স্থায়ী পূর্বশর্ত।
ন্যায়বিচার ও স্বাস্থ্যের মেলবন্ধন: ড্রাগ কোর্ট ও ডাইভারশন মডেল (Bridging Justice and Health: Drug Courts and Diversion Models)
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের বিপরীত মেরু হিসেবে দেখা হয়েছে – একটি শাস্তি দিতে চায়, অন্যটি সেবা দিতে চায়। কিন্তু এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে যদি একটি সেতুবন্ধন রচনা করা যায়, তবে কী ঘটতে পারে? এই যুগান্তকারী প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই জন্ম নিয়েছে আইন দর্শনের এক নতুন শাখা, যার নাম থেরাপিউটিক জুরিসপ্রুডেন্স (Therapeutic Jurisprudence)। আইনবিজ্ঞানী ডেভিড বি. ওয়েক্সলার (David B. Wexler) এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা (Wexler, 1990)। ওয়েক্সলার যুক্তি দেন যে, আইন কেবল একটি কঠোর শাস্তিদাতা কাঠামো নয়; আইন নিজেই একটি আরোগ্যকারী মাধ্যম বা থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে, যা একজন অপরাধীকে ধ্বংস না করে তার মানসিক ও শারীরিক পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
এই দর্শনের সবচেয়ে সফল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো ড্রাগ ট্রিটমেন্ট কোর্ট (Drug Treatment Court বা DTC) এবং পুলিশ-চালিত ডাইভারশন মডেল। গতানুগতিক ফৌজদারি আদালতে একজন বিচারক কেবল শুনানির পর রায় দিয়ে আসামিকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ড্রাগ কোর্টের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বিচারক কাজ করেন একটি বহু-বিভাগীয় দলের নেতা হিসেবে, যে দলে থাকেন আইনজীবী, চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজকর্মী। অহিংস ও লঘু মাদক অপরাধে আটক ব্যক্তিদের প্রচলিত সাজার বদলে একটি কঠোর ও নজরদারিকৃত চিকিৎসা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যক্তিটি যদি নিয়মিত প্রস্রাব পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে মাদকমুক্ত রাখে এবং পুনর্বাসন সম্পন্ন করে, তবে আদালত তার বিরুদ্ধে থাকা সব ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়।
একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল শহরে শুরু হওয়া এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়া ল এনফোর্সমেন্ট অ্যাসিস্টেড ডাইভারশন (Law Enforcement Assisted Diversion বা LEAD) কর্মসূচি পুলিশি ভূমিকায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এই মডেলে টহলরত পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে স্বল্প পরিমাণ মাদকসহ বা লঘু অপরাধে আটক করলে তাকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যায় না; বরং ঘটনাস্থল থেকেই তাকে একজন কেস ম্যানেজারের হাতে তুলে দেয়। সেই কেস ম্যানেজার তাৎক্ষণিকভাবে তাকে খাদ্য, বাসস্থান এবং চিকিৎসা সেবার সাথে যুক্ত করে দেন। এর ফলে একজন অপরাধীকে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ার আগেই অপরাধের মূল কারণটি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই মডেলগুলোর সাফল্য আজ বিশ্বজুড়ে পরিসংখ্যানগতভাবে স্বীকৃত। গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রচলিত আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের চেয়ে ড্রাগ কোর্ট থেকে চিকিৎসা নিয়ে বের হওয়া ব্যক্তিদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার প্রায় অর্ধেক। একই সাথে কারাগারের পেছনে রাষ্ট্রের যে বিপুল অর্থ ব্যয় হতো, তার তুলনায় ড্রাগ কোর্টের খরচ অনেক কম। সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যবস্থা মানুষকে তার হারানো মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়। পুলিশ ও বিচার বিভাগ যখন শাস্তির লাঠি ফেলে জীবনের সহযোগী হয়ে দাঁড়ায়, তখনই প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন এবং জনস্বাস্থ্যের এক মধুর মেলবন্ধন রচিত হয়।
বহুমাত্রিক সমন্বয়: আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা ও ডেটা-ভিত্তিক শাসন (Multidimensional Coordination: Inter-Agency Collaboration and Data-Driven Governance)
মাদক সমস্যার কোনো একক মালিকানা নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মনে করতে পারে এটি তাদের বিষয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভাবতে পারে এটি তাদের সীমানা, আবার শিক্ষা বা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় মনে করতে পারে তাদের দায়িত্ব। এই বিচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অহমিকা এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যকার তথ্যের প্রাচীরই মাদক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসা গবেষক জন স্ট্র্যাঙ্গ (John Strang) এবং তার সহকর্মীরা দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত তাদের প্রভাবশালী গবেষণায় জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, মাদক সমস্যার মতো জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং আধুনিক ডেটা-ভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োগ (Strang et al., 2012)।
আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আন্তঃসংস্থা সহযোগিতার একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ওভারডোজ ফ্যাটালিটি রিভিউ (Overdose Fatality Review বা OFR) টিম। কোনো একটি শহরে যখন একজন ব্যক্তি মাদকের অতিরিক্ত মাত্রায় মারা যায়, তখন পুলিশ, জরুরি স্বাস্থ্যকর্মী, করোনার (coroner) বা ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, সমাজকর্মী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একটি টেবিলে বসেন। তারা কোনো ব্যক্তিকে দোষারোপ করার জন্য বসেন না; তারা অনুসন্ধান করেন সেই মৃত ব্যক্তির জীবনের শেষ কয়েক মাসের ইতিহাস। সে কি সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল? সে কি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ চেয়ে ব্যর্থ হয়েছিল? এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে তারা সিস্টেমের ফাঁকগুলো চিহ্নিত করেন, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো নাগরিককে একই ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারাতে না হয়।
এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিপ্লব আজ মাদকনীতি পরিচালনায় এনেছে এক নতুন মাত্রা, যাকে বলা হয় ডেটা-ভিত্তিক সুশাসন (Data-Driven Governance)। উন্নত বিশ্বে এখন আর অতীতের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অভিযান চালানো হয় না। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডেটা, পয়ঃনিষ্কাশন নালার বর্জ্য পরীক্ষা করে নির্দিষ্ট মাদকের উপস্থিতির রিয়েল-টাইম তথ্য এবং বিষণ্নতাজনিত হটলাইনের ফোন কল বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সের সাহায্যে চিহ্নিত করা হয় শহরের কোন অঞ্চলে কোন ধরনের মাদকের বিস্তার ঘটছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সেই তথ্যের ভিত্তিতে তৎক্ষণাৎ সেই এলাকায় অতিরিক্ত অ্যান্টিডোট এবং মোবাইল ক্লিনিক পাঠায়, আর নিরাপত্তা বাহিনী নজরদারি বাড়ায় পাইকারি সরবরাহকারীদের রুখতে।
এই ধরনের সমন্বিত পরিচালন ব্যবস্থা রাষ্ট্রের সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে। স্বাস্থ্যকর্মীরা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ান না, আর পুলিশও দিকভ্রান্ত হয়ে নিরীহ পথচারীদের হয়রানি করে না। সব সংস্থা যখন একটি একক লক্ষ্য – নাগরিকের জীবন রক্ষা করা এবং অপরাধের শিকড় উপড়ে ফেলা – নিয়ে একটি অভিন্ন ডিজিটাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়, তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ডেটা যখন অনুমানের স্থান দখল করে এবং আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে পেছনে ফেলে, তখনই একটি আধুনিক রাষ্ট্র মাদকের মতো বৈশ্বিক দানবের চোখে চোখ রেখে দাঁড়াতে পারে।
একটি সমন্বিত জাতীয় মাদকনীতির ব্লুপ্রিন্ট (Blueprint for an Integrated National Drug Policy)
এতক্ষণ যে বহুমুখী তত্ত্ব, জনস্বাস্থ্য মডেল এবং আইনি উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনা করা হলো, সেগুলোর চূড়ান্ত সার্থকতা নির্ভর করে একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার সামগ্রিক জাতীয় মাদকনীতিতে এগুলোকে সংহত করে তার ওপর। বিগত কয়েক দশক ধরে গ্লোবাল কমিশন অন ড্রাগ পলিসি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার একটি সমন্বিত ও মানবকেন্দ্রিক জাতীয় নীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মাদকনীতি গবেষক জোয়ান ক্রেন (Joanne Csete) এবং তার আন্তর্জাতিক গবেষক প্যানেল তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন যে, জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার এবং টেকসই উন্নয়নকে বাদ দিয়ে কোনো কার্যকর বৈশ্বিক বা জাতীয় মাদকনীতি প্রণয়ন করা সম্ভব নয় (Csete et al., 2016)।
একটি আধুনিক, মানবিক এবং বৈজ্ঞানিক জাতীয় মাদকনীতির ব্লুপ্রিন্ট দাঁড়াতে হবে চারটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর। প্রথম স্তম্ভটি হবে অপরাধমুক্তকরণ বা ডিক্রিমিনালাইজেশন। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ক্ষুদ্র পরিমাণ মাদক ধারণকে ফৌজদারি অপরাধের তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে। কোনো ব্যক্তিকে কেবল মাদক ব্যবহারের কারণে গ্রেপ্তার করা যাবে না, তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি রেকর্ড তৈরি করা যাবে না এবং তাকে কারাগারে পাঠানো নিষিদ্ধ করতে হবে। এর ফলে একটি রাষ্ট্র রাতারাতি তার হাজার হাজার তরুণকে পুলিশি হয়রানি ও অপরাধ জগতের সংস্পর্শ থেকে রক্ষা করতে পারবে এবং বিচার বিভাগের ওপর থেকে মামলার পর্বতসমান বোঝা নেমে যাবে।
দ্বিতীয় স্তম্ভটি হবে সর্বজনীন ও প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার অধিকার। মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোকে কোনো কারাগার বা নির্যাতনের গোপন কুঠুরি হতে দেওয়া যাবে না; সেগুলোকে হতে হবে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং স্বেচ্ছাসেবী মানসিক হাসপাতাল। সরকারি স্বাস্থ্যবীমার আওতায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য ওপিওড সাবস্টিটিউশন থেরাপি, কাউন্সেলিং এবং ক্ষতি হ্রাস সেবার অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা হতে হবে বিজ্ঞানসম্মত, যেখানে কোনো অবৈজ্ঞানিক বা মানসিক নির্যাতনমূলক পদ্ধতির স্থান থাকবে না। আসক্ত মানুষকে তার সমাজ ও পরিবারের ভেতরে রেখেই সুস্থ করে তোলার বহির্বিভাগীয় চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তৃতীয় স্তম্ভটি হবে সামাজিক পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবনযাত্রার নিশ্চিতকরণ। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের কোটা, ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং আবাসন সহায়তা প্রদান করতে হবে। তাদের ওপর সমাজ যে কলঙ্কের ছাপ এঁকে দেয়, তা দূর করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে জনসচেতনতামূলক সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তরুণদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুক্ত মানসিক বিকাশের পর্যাপ্ত সামাজিক পরিসর তৈরি করে একটি আনন্দময় বিকল্প পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থ এবং চূড়ান্ত স্তম্ভটি হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকার পুনর্নির্ধারণ। নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহারকারীদের পেছনে ছুটতে না দিয়ে তাদের পুরো মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে আন্তর্জাতিক পাচারকারী সিন্ডিকেট, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং মাদক বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিপুল কালো টাকার অর্থপাচার বা মানি লন্ডারিং তদন্তের দিকে। গোয়েন্দা নজরদারিকে করতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্বচ্ছ। এই চারটি স্তম্ভ যখন একটি সামগ্রিক জাতীয় দর্শনের ভেতর একীভূত হবে, তখনই কেবল একটি রাষ্ট্র মাদক, অপরাধ ও জনস্বাস্থ্যের এই জটিল ঘূর্ণিপাক থেকে বেরিয়ে এসে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মানবিক পৃথিবীর আলো দেখাতে পারবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ (Future of Drug Control): প্রযুক্তি, নীতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতা
সিন্থেটিক মাদকের যুগ ও রাসায়নিক রূপান্তর (The Era of Synthetic Drugs and Chemical Transformations)
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বৈশ্বিক মাদক অর্থনীতির মানচিত্র এমনভাবে বদলে গেছে যা অতীতের মাদক নিয়ন্ত্রকদের কল্পনার বাইরে ছিল। শতবর্ষ ধরে মাদকের বাণিজ্য মূলত টিকে ছিল কৃষিজাত ফসলের ওপর – যেমন আফগানিস্তানের পপি ক্ষেত, লাতিন আমেরিকার কোকা গাছ কিংবা মরক্কোর গাঁজা খেত। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রবেশ করেছে সিন্থেটিক বা কৃত্রিম মাদকের ভয়াল যুগে। পপি বা কোকা চাষের জন্য বিস্তীর্ণ জমির প্রয়োজন হতো, আবহাওয়া অনুকূলে থাকা লাগত, এবং স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং বা বিমান থেকে সেই চাষাবাদ শনাক্ত করা সহজ ছিল। বর্তমানের সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের জন্য কোনো মাটির প্রয়োজন হয় না, সূর্যের আলোর প্রয়োজন হয় না; কেবল একটি ছোট গোপন গবেষণাগার এবং কয়েকটি রাসায়নিক প্রি-কার্সর বা প্রাথমিক উপাদানই যথেষ্ট।
ক্লিনিক্যাল টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ পল আই. ডারগান (Paul I. Dargan) এবং ডেভিড এম. উড (David M. Wood) তাদের যৌথ গ্রন্থে নভেল সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্সেস (Novel Psychoactive Substances বা NPS)-এর আবির্ভাব ও রাসায়নিক বিস্তার বিশ্লেষণ করেছেন (Dargan & Wood, 2013)। তারা দেখিয়েছেন যে, কীভাবে রসায়নবিদরা অণু-পরমাণুর গঠন সামান্য পরিবর্তন করে প্রতিনিয়ত শত শত নতুন রাসায়নিক যৌগ তৈরি করছেন। কোনো একটি যৌগ যখন রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ হয়, আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলো তার আণবিক গঠনে একটি কার্বন বা হাইড্রোজেন পরমাণু পরিবর্তন করে নতুন আরেকটি যৌগ বাজারে ছেড়ে দেয়। এই নতুন যৌগটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিদ্যমান আইনের আওতার বাইরে চলে যায়, যার ফলে একে নিষিদ্ধ করতে রাষ্ট্রের কয়েক বছর সময় লেগে যায়। আইনি কাঠামোর চেয়ে রসায়নাগারের গতি এখানে বহু ধাপ এগিয়ে।
এই রাসায়নিক রূপান্তরের সবচেয়ে মারাত্মক বহিঃপ্রকাশ হলো সিন্থেটিক ওপিওড, বিশেষ করে ফেন্টানিল এবং অতি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া নাইটাজিন শ্রেণির যৌগগুলো। এই পদার্থগুলো সাধারণ মরফিন বা হেরোইনের চেয়ে শত শত এমনকি হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। একটি চিনির দানার সমান ফেন্টানিল একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। এর ফলে মাদক পাচারের লজিস্টিকস সম্পূর্ণ বদলে গেছে। কয়েক টন আফিম বা হেরোইন সীমান্ত পার করার যে ঝুঁকি ও ব্যয় ছিল, তার বদলে কয়েক গ্রাম কৃত্রিম পাউডার একটি সাধারণ চিঠির খামে ভরে আন্তর্জাতিক ডাকযোগে যেকোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সামনে এক অভূতপূর্ব অন্ধকার দেওয়াল তুলে দিয়েছে। বর্ডার সিল করা বা সমুদ্র উপকূল পাহারা দেওয়ার যে সনাতন সামরিক কৌশল রাষ্ট্রগুলো ব্যবহার করত, তা এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রাসায়নিক চালানের সামনে প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কৃষিভিত্তিক মাদকের বিরুদ্ধে বিকল্প ফসল চাষের যে নীতি জাতিসংঘ এতদিন প্রচার করত, সিন্থেটিক মাদকের যুগে সেই নীতি আর কোনো অর্থ বহন করে না। বিশ্ব এখন এমন এক রাসায়নিক মহামারির মুখোমুখি, যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সনাতন পুলিশি চিন্তার গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থার শরণাপন্ন হতে হবে।
প্রযুক্তির দ্বিমুখী ভূমিকা: সাইবার অপরাধ বনাম ডিজিটাল নজরদারি (Dual Role of Technology: Cybercrime versus Digital Surveillance)
আধুনিক প্রযুক্তি একটি দ্বিধারী তলোয়ারের মতো – এটা যেমন অপরাধীদের ক্ষমতাকে দানবীয় রূপ দিয়েছে, তেমনই এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও দিয়েছে নজিরবিহীন নজরদারির চোখ। সমাজবিজ্ঞানী মানুয়েল কাস্তেলজ (Manuel Castells) তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রাইজ অব দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি (The Rise of the Network Society)-তে নেটওয়ার্ক সমাজ তত্ত্ব (Network Society Theory) উপস্থাপন করে দেখিয়েছিলেন যে, কীভাবে বৈশ্বিক তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমানা ভেঙে দিয়ে সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলোকে বিকেন্দ্রীভূত ও অধরা শক্তিতে রূপান্তর করে (Castells, 2000)। মাদকের বর্তমান বৈশ্বিক বাজার কাস্তেলজের এই তত্ত্বেরই সবচেয়ে বাস্তব প্রয়োগ।
আজকের মাদক বাজার আর কোনো অন্ধকার গলির মুখাপেক্ষী নয়। অপরাধবিজ্ঞানী জুডিথ অলড্রিজ (Judith Aldridge) এবং ডেভিড ডেকারি-হেতু (David Décary-Hétu) ডার্ক ওয়েবের ক্রিপ্টোমার্কেট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে ইন্টারনেট মাদকের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসাকে সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল ও নিরাপদ করে তুলেছে (Aldridge & Décary-Hétu, 2016)। ডার্ক নেটের গোপন বাজারগুলোতে বিটকয়েন বা মনেরোর মতো ট্র্যাকিং-অযোগ্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। বিক্রেতা ও ক্রেতা একে অপরকে চেনে না, কোনো শারীরিক অস্ত্রের লেনদেন নেই, আর পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সাধারণ বৈধ পার্সেলের ভেতরে লুকিয়ে। এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চ্যাটবটগুলো মাদক সরবরাহের কাজকে এক স্পর্শহীন প্রযুক্তিতে রূপান্তর করেছে।
তবে প্রযুক্তির অপর পিঠে রয়েছে প্রতিরোধের নতুন হাতিয়ার। অপরাধীরা যখন উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করছে, তখন রাষ্ট্রগুলোও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা এবং জৈবপ্রযুক্তির সমন্বয়ে পাল্টা নজরদারি গড়ে তুলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র হলো পয়ঃনিষ্কাশন নর্দমার জলভিত্তিক মহামারি বিজ্ঞান বা ‘ওয়েস্টওয়াটার এপিডেমিওলজি‘। কোনো শহরের পয়ঃনিষ্কাশন পাইপলাইনের জলের নমুনা পরীক্ষা করে আধুনিক বায়ো-সেন্সরের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা যায় যে সেই শহরের কোন অঞ্চলে ঠিক কী পরিমাণ এবং কোন জাতের মাদক গ্রহণ করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করেই একটি শহরের সামগ্রিক আসক্তির গতিপ্রকৃতি রিয়েল-টাইমে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে।
একই সাথে সীমান্ত নজরদারিতে যুক্ত হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিং এবং এআই-চালিত এক্স-রে স্ক্যানার যা কনটেইনারের লাখ লাখ সাধারণ পণ্যের ভিড়ে লুকিয়ে রাখা রাসায়নিকের আণবিক ঘনত্ব শনাক্ত করতে পারে। পোস্টাল বা ডাক বিভাগগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক স্পেকট্রোমিটার, যা প্যাকেট না খুলেই লেজার রশ্মির সাহায্যে ভেতরের রাসায়নিকের প্রকৃতি বলে দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের মাদক যুদ্ধটি কোনো পাহাড়ি উপত্যকায় বা সমুদ্রের বুকে রাইফেল হাতে লড়া হবে না; এই যুদ্ধটি লড়া হবে ডেটাবেজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোডিং এবং উন্নত রসায়নাগারের মাইক্রোস্কোপের নিচে। যে পক্ষ প্রযুক্তির উদ্ভাবনী দৌড়ে এগিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতের মাদক নিয়ন্ত্রণের লাগাম তাদের হাতেই থাকবে।
আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সংস্কার: ১৯৬১ কনভেনশনের সংকট ও ভবিষ্যৎ (Reform of the International Legal Framework: Crisis and Future of the 1961 Convention)
আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণের বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাটি দাঁড়িয়ে আছে বিগত শতাব্দীর তিনটি প্রধান জাতিসংঘের সনদের ওপর – ১৯৬১ সালের একক সনদ, ১৯৭১ সালের সাইকোট্রপিক সনদ এবং ১৯৮৮ সালের চোরাচালান বিরোধী সনদ। এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর মূল দর্শন ছিল একটি মাদকমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা, যার ভিত্তি ছিল কঠোর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ছয় দশক পর এসে এটি স্পষ্ট যে, এই তিনটি সনদ আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাদকনীতি বিশ্লেষক মার্টিন জেলসমা (Martin Jelsma) বহুপাক্ষিক মাদক চুক্তির বিবর্তন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবস্থার মধ্যে এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ফাটল তৈরি হয়েছে যা পুরোনো ঐক্যমত্যকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে (Jelsma, 2003)।
এই ফাটলের সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিগত রূপান্তর। উরুগুয়ে, কানাডা, জার্মানি, মাল্টা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু অঙ্গরাজ্য যখন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্যানাবিস বা গাঁজাকে সম্পূর্ণ আইনি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত পণ্যে রূপান্তর করেছে, তখন তারা সরাসরি ১৯৬১ সালের কনভেনশনের বাধ্যবাধকতাকে লঙ্ঘন করেছে। ১৯৬১ সালের সনদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে গাঁজা কেবল চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে। এখন এই প্রভাবশালী দেশগুলো একদিকে জাতিসংঘের চুক্তির অংশীদার হয়ে থাকছে, আবার অন্যদিকে নিজেদের দেশে সেই চুক্তির মূল ধারা লঙ্ঘন করে উন্মুক্ত বাজার পরিচালনা করছে। এই দ্বিমুখী আচরণ আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সাধারণ পরিষদ বিশেষ অধিবেশন বা উনগাস (UNGASS)-এর মঞ্চগুলোতে এই মতাদর্শিক বিভাজন এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। একদিকে রয়েছে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, যারা এখনো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, মৃত্যুদণ্ড এবং শূন্য সহনশীলতার নিষেধাজ্ঞাবাদকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে লাতিন আমেরিকার সংঘাতপীড়িত দেশগুলো যেমন কলম্বিয়া, মেক্সিকো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিংহভাগ রাষ্ট্র, যারা খোলামেলাভাবে ঘোষণা করছে যে মাদকযুদ্ধ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং এখন সময় এসেছে মানবাধিকার, স্বাস্থ্য এবং নিয়ন্ত্রিত আইনি বাজারের দিকে হাঁটার।
ভবিষ্যতের বৈশ্বিক মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য এই চুক্তিগুলোর সংস্কার কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর উচিত হবে একতরফা কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে না দিয়ে দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক বিকল্প নীতি গ্রহণের সুযোগ দেওয়া। ১৯৬১ সালের প্রাচীন মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে আন্তর্জাতিক সনদগুলোকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে সেগুলো জনস্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র উৎপাদকদের জীবিকা এবং মানবাধিকারের আধুনিক সনদের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। বিশ্ব যদি এই সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়, তবে জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচিরেই একটি অকার্যকর ও অপ্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হবে।
ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক শাসন ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পুনর্গঠন (Geopolitics, Global Governance and the Restructuring of Multilateral Cooperation)
মাদক কখনোই নিছক কোনো স্থানীয় অপরাধ ছিল না, এটি চিরকালই বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। বর্তমান বিশ্বের নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার উত্তেজনা আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক রবার্ট ও. কিওহেন (Robert O. Keohane) তার বিখ্যাত গ্রন্থে নয়া-উদারনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ (Neoliberal Institutionalism) আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে যখন পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ন্যূনতম স্বার্থের মিল এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ থাকে (Keohane, 1984)। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনীতিতে সেই সহযোগিতার স্থান দখল করেছে তীব্র অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার চলমান শীতল যুদ্ধ এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিলের কারণে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটছে, এবং এই ফেন্টানিল তৈরির মূল রাসায়নিক প্রি-কার্সরগুলো উৎপাদিত হয় চীনের রাসায়নিক কারখানাগুলোতে। অতীতে এই ধরনের সংকট মোকাবেলায় দুই দেশ যৌথ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করলেও তাইওয়ান ইস্যু, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই সহযোগিতা প্রায়শই স্থগিত হয়ে যায়। চীন প্রায়শই দাবি করে যে ফেন্টানিল সংকট আমেরিকার অভ্যন্তরীণ চাহিদার ব্যর্থতা, আর আমেরিকা দাবি করে চীন ইচ্ছা করেই এই রাসায়নিকের প্রবাহ বন্ধ করছে না। পরাশক্তির এই রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির সুযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল অবাধে সচল রাখছে।
একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের সূচনার পর রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার কারণে ইন্টারপোল বা জাতিসংঘের ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম অফিসের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউরেশিয়া অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ড্রাগ রুটগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক যৌথ নজরদারি আজ কার্যত ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্ব এখন আর পশ্চিমা দেশগুলোর প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে মেনে নিতে রাজি নয়। কলম্বিয়া ও বলিভিয়ার মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলছে – কেন ধনী দেশগুলোর ভোক্তাদের বিনোদনের মূল্য শোধ করতে গিয়ে লাতিন আমেরিকার হাজার হাজার সাধারণ কৃষক ও পুলিশ সদস্যকে রক্ত দিতে হবে?
এই ভূরাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বৈশ্বিক শাসনের কাঠামোটিকে পুনর্গঠন করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা দরকষাকষির হাতিয়ার বানানো বন্ধ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আন্তর্জাতিক নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ড (INCB) এবং ইন্টারপোলকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মাদক সংকটও কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে একা সামাল দেওয়া অসম্ভব। যতক্ষণ না পর্যন্ত পরাশক্তিগুলো বুঝতে পারবে যে এই রাসায়নিক বিষ কোনো রাজনৈতিক সীমানা বা মতাদর্শের তোয়াক্কা করে না, ততক্ষণ পর্যন্ত বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই থেকে যাবে।
বিজ্ঞান, জৈবপ্রযুক্তির বিকাশ ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসার দিগন্ত (Science, Biotechnology and Horizons of Future Therapeutics)
যেখানে প্রচলিত আইন ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়, সেখান থেকেই শুরু হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপার সম্ভাবনা। ভবিষ্যতের মাদক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলো সম্ভবত কোনো আদালতের এজলাসে আসবে না; সেগুলো আসবে বায়োমেডিকেল এবং জেনেটিক গবেষণাগার থেকে। স্নায়ুবিজ্ঞান ও আচরণগত অর্থনীতির গবেষক ওয়ারেন কে. বিকেল (Warren K. Bickel) এবং তার সহকর্মীরা একবিংশ শতাব্দীর আসক্তি তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক নিউরোবায়োলজি কীভাবে আসক্তির চিকিৎসাকে একটি সম্পূর্ণ নতুন স্তরে নিয়ে যাচ্ছে (Bickel et al., 2019)। মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে পুরস্কৃত হয় এবং কেন সে ক্ষতিকর জেনেও একটি বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, সেই রহস্য বিজ্ঞান আজ একের পর এক উন্মোচন করছে।
এই বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ক্ষেত্রটি হলো মাদকবিরোধী ভ্যাক্সিন বা প্রতিষেধক টিকা। চিকিৎসা গবেষক টমাস আর. কস্টেন (Thomas R. Kosten) এবং তার দল ওপিওড ও কোকেন আসক্তির বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিন উদ্ভাবনের গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন (Kosten & Domingo, 2013)। কস্টেন দেখিয়েছেন যে, এই ভ্যাক্সিনগুলো মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে যাতে শরীরে প্রবেশ করা মাদকের অণুগুলোর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডিগুলো রক্তপ্রবাহের ভেতরেই মাদকের অণুগুলোকে এমনভাবে ঘিরে ফেলে যে সেগুলো আর মস্তিষ্কের রক্তনালী ভেদ করে রিসেপ্টরে পৌঁছাতে পারে না। ফলে একজন ব্যক্তি যদি ভুলবশত বা দুর্বল মুহূর্তে মাদক গ্রহণও করে, সে কোনো ধরনের নেশা বা মানসিক উত্তেজনা অনুভব করবে না। মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পথ বন্ধ করে দিয়ে আসক্তির জৈবিক আনন্দকেই নির্মূল করে দেওয়া এই ভ্যাক্সিন গবেষণার মূল লক্ষ্য।
একই সাথে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার জগতে ঘটছে আরেক অভূতপূর্ব রূপান্তর, যাকে বলা হচ্ছে সাইকেডেলিক-অ্যাসিস্টেড সাইকোথেরাপি। যেসব প্রাকৃতিক উপাদানকে গত শতকে সবচেয়ে বিপজ্জনক মাদক হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল – যেমন সিলোসাইবিন (ম্যাজিক মাশরুম), এমডিএমএ এবং ইবোগেইন – চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখন সেগুলোর ভেতরেই খুঁজে পাচ্ছেন দীর্ঘস্থায়ী আসক্তি এবং গভীর মানসিক ট্রমার অলৌকিক প্রতিষেধক। নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে যে, অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মাত্র কয়েকটি সিলোসাইবিন বা ইবোগেইন সেশন একজন দীর্ঘস্থায়ী অ্যালকোহল বা অপিয়েট ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কের নিউরাল সংযোগগুলোকে এমনভাবে ‘রিসেট’ করে দেয় যা বছরের পর বছর প্রচলিত থেরাপি দিয়েও সম্ভব হতো না।
নিউরোটেকনোলজির অগ্রগতিও ভবিষ্যতের চিকিৎসায় নতুন আশা দেখাচ্ছে। ‘ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন‘ বা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রিওয়ার্ড সেন্টারে ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড স্থাপন করে আসক্তির তীব্র তাড়না বা ক্রেভিং সুইচ টিপে বন্ধ করে দেওয়ার প্রযুক্তি আজ আর কল্পবিজ্ঞান নয়; এটি পরীক্ষামূলকভাবে সফল প্রমাণিত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ডিজিটাল অ্যাপস এখন একজন ব্যবহারকারীর হৃৎস্পন্দন, গলার স্বর এবং ফোনের ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণ করে সে কখন আবার মাদকের দিকে ঝুঁকতে পারে তা আগাম সতর্ক করে দিতে পারছে। ভবিষ্যতের মাদক নিয়ন্ত্রণ কোনো অন্ধ দমন-পীড়ন হবে না; এটি হবে জেনেটিক্স, নিউরোবায়োলজি এবং প্রযুক্তির এক মানবিক মেলবন্ধন, যা মানুষকে তার নিজের জৈবিক খাঁচা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করবে।
ভবিষ্যতের রূপকল্প: একটি মানবিক, বৈজ্ঞানিক ও টেকসই মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Vision for the Future: A Human, Scientific and Sustainable Drug Control System)
আমরা যখন এই দীর্ঘ আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াই, তখন ভবিষ্যৎ আমাদের সামনে দুটি পথ উন্মুক্ত করে দেয়। একটি পথ হলো অতীতের সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি – আরও বেশি অস্ত্র কেনা, আরও বেশি কারাগার তৈরি করা, মৃত্যুদণ্ডের পরিধি বাড়ানো এবং হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষকে সমাজের আবর্জনা ভেবে ছুঁড়ে ফেলা। বিগত এক শতাব্দীর ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, এই পথে কোনো শান্তি বা সমাধান নেই। এই পথ কেবল রক্তক্ষয়ী অপরাধ সিন্ডিকেট, অপূরণীয় সামাজিক বৈষম্য এবং সীমাহীন মানবাধিকার লঙ্ঘন উপহার দিয়েছে। অন্য পথটি হলো এক নতুন মানবিক দিগন্তের পথ – যেখানে অন্ধ ভীতি ও নৈতিক আতঙ্কের স্থান দখল করবে বিজ্ঞান, সহমর্মিতা এবং টেকসই সামাজিক ন্যায়বিচার।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেন (Amartya Sen) তার কালজয়ী গ্রন্থ উন্নয়নই স্বাধীনতা (Development as Freedom)-তে সামর্থ্য দৃষ্টিভঙ্গি (Capabilities Approach) উপস্থাপন করে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যেকোনো রাষ্ট্রীয় নীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা (Sen, 1999)। মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চাবিকাঠিও এই দর্শনের ভেতরেই নিহিত। মানুষকে কেবল অপরাধের ভয়ে আটকে রাখা নয়, তাকে এমন একটি সমাজ ও জীবন দিতে হবে যেখানে বেঁচে থাকার আনন্দ সে কোনো কৃত্রিম রাসায়নিকের ভেতর না খুঁজে নিজের কর্ম, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার ভেতরে খুঁজে পায়। মাদকাসক্তি কোনো ব্যক্তির অপরাধ নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে একটি অসুস্থ ও ব্যর্থ সমাজের গভীর উপসর্গের প্রকাশ।
ভবিষ্যতের টেকসই মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার রূপরেখাটি হতে হবে বহুস্তরবিশিষ্ট। সেখানে অপরাধমুক্তকরণ হবে সাধারণ নিয়ম, কারাগার হবে কেবল সহিংস অপরাধীদের জন্য শেষ আশ্রয়, আর আসক্ত ব্যক্তির জন্য প্রস্তুত থাকবে মানসম্মত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা। রাষ্ট্রগুলোকে সাহসের সাথে প্রাকৃতিক ও কম ক্ষতিকর উপাদানগুলোর নিয়ন্ত্রিত আইনি ব্যবস্থাপনার দিকে এগোতে হবে, যাতে মাফিয়া সিন্ডিকেটগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেওয়া যায়। একই সাথে বিকল্প জীবিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে সেই সব সাধারণ কৃষকদের জন্য, যারা দারিদ্র্যের চাপে পপি বা কোকা চাষ করতে বাধ্য হয়। সীমান্ত নজরদারি থাকবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হাতে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির চালিকাশক্তি হবে অপরাধীদের অর্থনৈতিক শেকড় উপড়ে ফেলা, সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা নয়।
এই রূপকল্প কোনো অসম্ভব ইউটোপিয়া নয়; এটি বিজ্ঞান ও মানবতার যৌথ অভিজ্ঞতার সারনির্যাস। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, কিন্তু সমাজ যদি তার সবচেয়ে পথভ্রষ্ট সদস্যদের সুস্থ করে তুলতে না পারে, তবে সেই সমাজ তার নিজের ভবিষ্যৎকেই অস্বীকার করে। মাদক নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের সামগ্রিক চেতনার রূপান্তরের ওপর। যেদিন রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারবে যে অস্ত্রের চেয়ে বিজ্ঞান শক্তিশালী, শাস্তির চেয়ে ভালোবাসা গভীর, এবং কারাগারের চার দেয়ালের চেয়ে একটি মুক্ত, আনন্দময় ও সমতাভিত্তিক সমাজ অনেক বেশি অপরাধমুক্ত – সেদিনই এই দীর্ঘ বৈশ্বিক অন্ধকারের অবসান ঘটবে এবং মানব সভ্যতা এক নতুন ভোরের আলোয় মুখ তুলে তাকাবে।
উপসংহার
বিশ্বজুড়ে মাদক নিয়ন্ত্রণের এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিকীকৃত নীতি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তথাকথিত মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (War on Drugs) মাদক দ্রব্যের বৈশ্বিক সরবরাহ কমাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একই সাথে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নজিরবিহীন সামাজিক অস্থিতিশীলতা (social destabilization) সৃষ্টি করেছে। অপরাধবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা প্রমাণ করে যে, কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা মূলত পণ্যের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে একটি সুবিশাল সমান্তরাল অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে। এই অর্থনৈতিক শক্তি জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব (state sovereignty) এবং বিচারব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যাপক সামরিকীকরণ (militarization) প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল স্তরের মানুষকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রধান শিকারে পরিণত করেছে, অথচ আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের মূল আর্থিক নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবশালী চক্রগুলো থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মাদকের ব্যবহার ও আসক্তি মোকাবেলার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ ঐতিহাসিকভাবেই একটি বিভ্রান্তিকর পদক্ষেপ। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রমাণ করেছে যে, চেতনার তথাকথিত অতীন্দ্রিয় বা ট্রান্সসেন্ডেন্টাল অভিজ্ঞতা আসলে বাহ্যিক কোনো অলৌকিক শক্তির সংস্পর্শ নয়, বরং মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ও রিসেপ্টরের মিথস্ক্রিয়ায় সৃষ্ট স্নায়ুজৈবিক প্রক্রিয়া (neurobiological mechanisms) মাত্র। ভেষজ উপাদানের আচারগত ব্যবহারের পেছনে যে রহস্যময়তার আবরণ চাপানো হয়েছিল, আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান তাকে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ রাসায়নিক বাস্তবতা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছে। একইভাবে, রাসায়নিক নির্ভরতাকে নৈতিক অধঃপতন হিসেবে দেখার ধর্মীয় ধারণা সম্পূর্ণ অকার্যকর। আধুনিক বিজ্ঞান আসক্তিকে সংজ্ঞায়িত করে একটি জটিল জৈব-মনো-সামাজিক মডেল (biopsychosocial model) হিসেবে, যা ব্যক্তির মস্তিষ্কের গঠন, পারিপার্শ্বিক আর্থ-সামাজিক ট্রমা এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার সম্মিলিত ফল। ফলে বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসা বা কোনো নৈতিক অনুশাসনের বদলে আসক্তি নিরাময়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে কেবল প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা।
আন্তর্জাতিক মাদকনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অন্ধ দমননীতি থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ, বাস্তবসম্মত এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত প্রগতিশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রমাণ করেছে যে, শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত আইনি কাঠামো, অপরাধমুক্তকরণ (decriminalization) এবং কার্যকর ক্ষতি হ্রাস (harm reduction) কৌশল অবলম্বন করলে অপরাধের হার এবং প্রাণহানি দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। মাদকের বাজারকে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হলে প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কাঠামোগত পুনর্গঠন (structural restructuring) এবং কুসংস্কারমুক্ত প্রমাণভিত্তিক নীতি (evidence-based policy) প্রণয়ন। অর্থনৈতিক অসমতা নিরসন, মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া মাদকজনিত সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি অসম্ভব। শতাব্দীপ্রাচীন ঔপনিবেশিক ও ধর্মীয় নৈতিকতার প্রভাববলয় ভেঙে ফেলে বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং মানবাধিকারের মানদণ্ডে একটি মানবিক ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের মাধ্যমেই সমকালীন মাদক ব্যবস্থার বাস্তবসম্মত রূপান্তর সম্ভব।
তথ্যসূত্র
- Agamben, G. (2005). State of exception (K. Attell, Trans.). University of Chicago Press.
- Aldridge, J., & Décary-Hétu, D. (2014). Not an ‘Ebay for drugs’: The cryptomarket Silk Road as a paradigm shifting criminal innovation. SSRN Electronic Journal.
- Aldridge, J., & Décary-Hétu, D. (2016). Hidden wholesale: The drug diffusing capacity of online drug cryptomarkets. International Journal of Drug Policy, 35, 7–15.
- Amnesty International. (2019). Killed in ‘crossfire’: Allegations of extrajudicial executions in Bangladesh in the guise of a war on drugs. Amnesty International.
- Andreas, P. (2009). Border games: Policing the U.S.–Mexico divide (2nd ed.). Cornell University Press.
- Asad, A. Z., & Harris, R. (2003). The politics and economics of drug production on the Pakistan-Afghanistan border. Ashgate Publishing.
- Babor, T. F., Caulkins, J., Edwards, G., Fischer, B., Foxcroft, D. R., Humphreys, K., Obot, I. S., Rehm, J., Reuter, P., Room, R., Rossow, I., & Strang, J. (2010). Drug policy and the public good. Oxford University Press.
- Bagley, B. M. (2013). Drug trafficking and organized crime in the Americas: Major trends in the twenty-first century. Woodrow Wilson Center Update on the Americas, 1–23.
- Bailey, S. H. (1936). The anti-drug campaign: An experiment in international control. P. S. King & Son.
- Bandura, A. (1977). Social learning theory. Prentice-Hall.
- Barratt, M. J., Ferris, J. A., & Winstock, A. R. (2014). Use of Silk Road, the online marketplace for illicit drugs: Survey of users. Addiction, 109(5), 774–783.
- Barrett, D., Reyes, G., & Nowak, M. (2008). Children of the drug war: Perspectives on the impact of drug policies on young people. International Harm Reduction Association.
- Barrett, R. L. (2008). Aghor medicine: Pollution, death, and healing in northern India. University of California Press.
- Bayer, I., & Ghodse, H. (1999). Evolution of international drug control, 1945–1995. Bulletin on Narcotics, 51(1-2), 1–17.
- Beccaria, C. (1764). On crimes and punishments (R. Bellamy, Ed., R. Davies, Trans.). Cambridge University Press.
- Becker, G. S. (1968). Crime and punishment: An economic approach. Journal of Political Economy, 76(2), 169–217.
- Becker, H. S. (1963). Outsiders: Studies in the sociology of deviance. The Free Press.
- Bentham, J. (1789). An introduction to the principles of morals and legislation. T. Payne and Son.
- Berdal, M., & Malone, D. M. (Eds.). (2000). Greed and grievance: Economic agendas in civil wars. Lynne Rienner Publishers.
- Berger, P. (1967). The sacred canopy: Elements of a sociological theory of religion. Doubleday.
- Berridge, V. (1999). Opium and the people: Opiate use and drug control policy in nineteenth and early twentieth century England. Free Association Books.
- Berridge, V., & Edwards, G. (1981). Opium and the people: Opiate use in nineteenth-century England. Allen Lane.
- Bertalanffy, L. von. (1968). General system theory: Foundations, development, applications. George Braziller.
- Bewley-Taylor, D. R. (1999). The United States and international drug control, 1909–1997. Continuum.
- Bewley-Taylor, D. R. (2012). International drug control: Consensus fractured. Cambridge University Press.
- Bickel, W. K., Mellis, A. M., Snider, S. E., Athamneh, L. N., Stein, J. S., & Pope, D. A. (2019). 21st century neurobehavioral theories of addiction. Neuropharmacology, 153, 144–156.
- Blackman, S. (2004). Chilling out: The cultural politics of substance consumption, youth and drug policy. Open University Press.
- Bogoras, W. (1909). The Chukchee. E. J. Brill.
- Boire, R. G. (2000). On cognitive liberty. Journal of Cognitive Liberties, 1(1), 7–13.
- Boister, N. (2001). Penal aspects of the UN drug conventions. Kluwer Law International.
- Botvin, G. J., & Griffin, K. W. (2004). Life skills training: Empirical findings and future directions. The Journal of Primary Prevention, 25(2), 211–232.
- Bourdieu, P. (1986). The forms of capital. In J. Richardson (Ed.), Handbook of theory and research for the sociology of education (pp. 241–258). Greenwood Press.
- Bourgois, P. (2003). In search of respect: Selling crack in El Barrio (2nd ed.). Cambridge University Press.
- Bourguignon, E. (1973). Religion, altered states of consciousness, and social change. Ohio State University Press.
- Boyer, P. (2001). Religion explained: The evolutionary origins of religious thought. Basic Books.
- Brennan, T. (1988). Public drinking and popular culture in eighteenth-century Paris. Princeton University Press.
- Brook, T., & Wakabayashi, B. T. (Eds.). (2000). Opium regimes: China, Britain, and Japan, 1839–1952. University of California Press.
- Bruun, K., Pan, L., & Rexed, I. (1975). The gentlemen’s club: International control of drugs and alcohol. University of Chicago Press.
- Buxton, J. (2006). The political economy of narcotics: Production, consumption and global markets. Zed Books.
- Buzan, B., Wæver, O., & de Wilde, J. (1998). Security: A new framework for analysis. Lynne Rienner Publishers.
- Caplan, G. (1964). Principles of preventive psychiatry. Basic Books.
- Carhart-Harris, R. L. (2014). The entropic brain: A theory of conscious states informed by neuroimaging research with psychedelic drugs. Frontiers in Human Neuroscience, 8, 20.
- Carhart-Harris, R. L., Erritzoe, D., Williams, T., Stone, J. M., Reed, L. J., Colasanti, A., & Nutt, D. J. (2012). Neural correlates of the psychedelic state as determined by fMRI studies with psilocybin. Proceedings of the National Academy of Sciences, 109(6), 2138–2143.
- Castells, M. (2000a). The information age: Economy, society and culture. Vol. III: End of millennium (2nd ed.). Blackwell.
- Castells, M. (2000b). The rise of the network society (2nd ed.). Blackwell Publishers.
- Castro, F. G., Barrera, M., & Martinez, C. R. (2004). The cultural adaptation of prevention interventions: Resolving tensions between fidelity and fit. Prevention Science, 5(1), 41–45.
- Catanzaro, R. (1992). Men of respect: A social history of the Sicilian Mafia. Free Press.
- Caulkins, J. P., Hawken, A., Kilmer, B., & Kleiman, M. A. (2012). Marijuana legalization: What everyone needs to know. Oxford University Press.
- Charles, M., Bewley-Taylor, D., & Neidpath, A. (2005). Drug policy in India: Compounding harm? (Briefing Paper No. 10). Beckley Foundation Drug Policy Programme.
- Chatterjie, S. K. (1981). Legal aspects of international drug control. Martinus Nijhoff Publishers.
- Chayes, A., & Chayes, A. H. (1993). On compliance. International Organization, 47(2), 175–205.
- Chin, K. L. (1996). Chinatown gangs: Extortion, enterprise, and ethnicity. Oxford University Press.
- Chouvy, P. A. (2009). Opium: Uncovering the politics of the poppy. Harvard University Press.
- Chouvy, P. A. (2013). An atlas of trafficking in Southeast Asia: The illegal trades in the Asian temperate and tropical zones. I.B. Tauris.
- Clark, N. H. (1976). Deliver us from evil: An interpretation of American prohibition. W. W. Norton & Company.
- Clawson, P. L., & Lee, R. W. (1998). The Andean cocoon: The politics of drug trafficking in South America. Westview Press.
- Collier, P. (2000). Doing well out of war: An economic perspective on armed conflict. In M. Berdal & D. M. Malone (Eds.), Greed and grievance: Economic agendas in civil wars (pp. 91–111). Lynne Rienner Publishers.
- Collier, P., & Hoeffler, A. (2004). Greed and grievance in civil war. Oxford Economic Papers, 56(4), 563–595.
- Collins, J. (2020). Legalizing the drug wars: A regulatory history of UN drug control, 1912–1972. Cambridge University Press.
- Coomber, R. (Ed.). (1998). The control of drugs and drug users: Reason or reaction? Harwood Academic Publishers.
- Cornell, S. E. (2007). Narcotics and armed conflict: Interaction and implications. Studies in Conflict & Terrorism, 30(3), 207–227.
- Courtwright, D. T. (2001). Forces of habit: Drugs and the making of the modern world. Harvard University Press.
- Csete, J., Kamarulzaman, A., Soriano, M., Becerra, M., Celentano, D., & Beyrer, C. (2016). Public health and international drug policy. The Lancet, 387(10026), 1427–1480.
- Cuijpers, P. (2002). Effective ingredients of school-based drug prevention programs: A systematic review. Addictive Behaviors, 27(6), 1009–1023.
- Curtis, R., & Wendel, T. (2007). “You’re always training the dog”: Systematic variations in street-level drug markets. Journal of Drug Issues, 37(4), 867–890.
- Czaplicka, M. A. (1914). Aboriginal Siberia: A study in social anthropology. Clarendon Press.
- Dargan, P. I., & Wood, D. M. (Eds.). (2013). Novel psychoactive substances: Classification, pharmacology and toxicology. Academic Press.
- Dawson, A. (2013). Santo Daime: A new world religion. Bloomsbury Academic.
- Devlin, P. (1965). The enforcement of morals. Oxford University Press.
- Dishman, C. (2001). Terrorism, crime, and transformation. Studies in Conflict & Terrorism, 24(1), 43–58.
- Dobkin de Rios, M. (1972). Visionary vine: Hallucinogenic healing in the Peruvian Amazon. Chandler Publishing Company.
- Dodes, L., & Dodes, Z. (2014). The sober truth: Debunking the bad science behind 12-step programs and the rehab industry. Beacon Press.
- Dolowitz, D. P., & Marsh, D. (2000). Learning from abroad: The role of policy transfer in contemporary policy-making. Governance, 13(1), 5–23.
- Doniger O’Flaherty, W. (1968). The post-Vedic history of the Soma plant. In R. G. Wasson (Ed.), Soma: Divine mushroom of immortality (pp. 95–147). Harcourt Brace Jovanovich.
- Douglas, M. (1966). Purity and danger: An analysis of concepts of pollution and taboo. Routledge & Kegan Paul.
- Durkheim, É. (1912). Les formes élémentaires de la vie religieuse: Le système totémique en Australie. Félix Alcan.
- Dworkin, G. (1972). Paternalism. The Monist, 56(1), 64–84.
- Dworkin, G. (1988). The theory and practice of autonomy. Cambridge University Press.
- Eisenlohr, L. E. S. (1934). International narcotics control. George Allen & Unwin.
- Eliade, M. (1951). Le chamanisme et les techniques archaïques de l’extase. Payot.
- Estrada, Á. (1981). María Sabina: Her life and chants. Ross-Erikson.
- Fazey, C. S. (2003). The Commission on Narcotic Drugs and the United Nations International Drug Control Programme: Politics, policies and prospect for change. International Journal of Drug Policy, 14(2), 155–169.
- Federici, S. (2004). Caliban and the witch: Women, the body and primitive accumulation. Autonomedia.
- Feeney, K. (2014). Peyote, race, and equal protection in the United States. In B. C. Labate & C. Cavnar (Eds.), Prohibition, religious freedom, and human rights: Regulating traditional drug use (pp. 65–88). Springer.
- Feinberg, J. (1986). Harm to self: The moral limits of the criminal law (Vol. 3). Oxford University Press.
- Felbab-Brown, V. (2010). Shooting up: Counterinsurgency and the illicit economy. Brookings Institution Press.
- Felitti, V. J., Anda, R. F., Nordenberg, D., Williamson, D. F., Spitz, A. M., Edwards, V., & Marks, J. S. (1998). Relationship of childhood abuse and household dysfunction to many of the leading causes of death in adults: The Adverse Childhood Experiences (ACE) Study. American Journal of Preventive Medicine, 14(4), 245–258.
- Finckenauer, J. O. (2005). Problems of definition: What is organized crime? Trends in Organized Crime, 9(3), 63–83.
- Flattery, D. S., & Schwartz, M. (1989). Haoma and harmaline: The botanical identity of the Indo-Iranian sacred hallucinogen. University of California Press.
- Fotiou, E. (2016). The globalization of ayahuasca shamanism and the erasure of indigenous shamanism. Anthropology of Consciousness, 27(2), 151–179.
- Foster, A. L. (2003). Prohibiting opium in the Philippines and the United States: The limits of American empire. Pacific Historical Review, 72(2), 223–233.
- Foucault, M. (1975). Surveiller et punir: Naissance de la prison. Gallimard.
- Foucault, M. (1978). The history of sexuality, volume 1: An introduction (R. Hurley, Trans.). Pantheon Books.
- Friedman, M. (1991). The war on drugs is destroying us. The Wall Street Journal, 12(7), 14.
- Friesendorf, C. (2007). US foreign policy and the war on drugs: Displacing the problem. Routledge.
- Furst, P. T. (Ed.). (1972). Flesh of the gods: The ritual use of hallucinogens. Praeger.
- Galanter, M. (2007). Spirituality and recovery in 12-step programs: An empirical approach. Recent Developments in Alcoholism, 18, 235–246.
- Gambetta, D. (1993). The Sicilian Mafia: The business of private protection. Harvard University Press.
- Gearin, A. K. (2015). Good mixed up: Amazonian ayahuasca and the medicalization of shamanism in Australia. Social Science & Medicine, 147, 262–271.
- Gilmore, W. C. (1995). Dirty money: The evolution of money laundering counter-measures. Council of Europe Press.
- Glenny, M. (2008). McMafia: A journey through the global criminal underworld. Alfred A. Knopf.
- Goffman, E. (1963). Stigma: Notes on the management of spoiled identity. Prentice-Hall.
- Goldstein, P. J. (1985). The drugs/violence nexus: A tripartite conceptual framework. Journal of Drug Issues, 15(4), 493–506.
- Gombrich, R. (2006). Theravada Buddhism: A social history from ancient Benares to modern Colombo (2nd ed.). Routledge.
- Goodhand, J. (2005). Frontiers and wars: The opium economy in Afghanistan and Pakistan. Journal of Agrarian Change, 5(2), 191–216.
- Gootenberg, P. (2008). Andean cocaine: The making of a global drug. University of North Carolina Press.
- Gordon, R. S. (1983). An operational classification of disease prevention. Public Health Reports, 98(2), 107–109.
- Gorman, D. M. (2002). The failure of school-based education to reduce adolescent drug use: The case of D.A.R.E. Journal of Drug Issues, 32(4), 1205–1226.
- Griffiths, R. R., Richards, W. A., McCann, U., & Jesse, R. (2006). Psilocybin can occasion mystical-type experiences having substantial and sustained personal meaning and spiritual significance. Psychopharmacology, 187(3), 268–283.
- Grillo, I. (2011). El Narco: Inside Mexico’s criminal insurgency. Bloomsbury Press.
- Guerra-Doce, E. (2015). The origins of psychoactive plant use: A review of the archaeological evidence. Science and Engineering Ethics, 21(3), 781–797.
- Guha, A. (1977). Planter-raj to swaraj: Freedom struggle and electoral politics in Assam, 1826–1947. Indian Council of Historical Research.
- Guha, A. (1982). The agrarian structure of British Assam: 1826–1947. In D. Kumar & M. Desai (Eds.), The Cambridge economic history of India (Vol. 2, pp. 478–511). Cambridge University Press.
- Gusfield, J. R. (1963). Symbolic crusade: Status politics and the American temperance movement. University of Illinois Press.
- Habermas, J. (1975). Legitimation crisis (T. McCarthy, Trans.). Beacon Press.
- Hall, W. (2019). The Indian Hemp Drugs Commission Report (1894) on the health and social effects of cannabis use. Addiction, 114(7), 1315–1319.
- Hallaq, W. B. (1997). A history of Islamic legal theories: An introduction to Sunnī uṣūl al-fiqh. Cambridge University Press.
- Haq, I. (1996). Pak-Afghan drug trade in historical perspective. Asian Survey, 36(10), 945–963.
- Harding, G. (2008). Opiate addiction, morality and medicine: From moral weakness to pathological disease. Macmillan.
- Harner, M. (Ed.). (1973). Hallucinogens and shamanism. Oxford University Press.
- Hart, H. L. A. (1963). Law, liberty, and morality. Stanford University Press.
- Hawkins, J. D., Catalano, R. F., & Miller, J. Y. (1992). Risk and protective factors for alcohol and other drug problems in adolescence and early adulthood: Implications for substance abuse prevention. Psychological Bulletin, 112(1), 64–105.
- Hayden, B. (2003). A prehistory of religion: Shamans, sorcerers and saints. Smithsonian Books.
- Herz, J. H. (1950). Idealist internationalism and the security dilemma. World Politics, 2(2), 157–180.
- Hirschi, T. (1969). Causes of delinquency. University of California Press.
- Houben, J. E. M. (2003). The Soma-Haoma problem: Introductory overview and observations on the discussion. Electronic Journal of Vedic Studies, 9(1), 1–7.
- Hudson, M. O. (1931). The international regulation of the traffic in dangerous drugs. American Journal of International Law, 25(3), 534–539.
- Hughes, C. E., & Stevens, A. (2010). What can we learn from the Portuguese decriminalization of illicit drugs? The British Journal of Criminology, 50(6), 999–1022.
- Humphreys, K. (2004). Circles of recovery: Self-help organizations for addictions. Cambridge University Press.
- Husak, D. (1992). Drugs and rights. Cambridge University Press.
- Husak, D. (2008). Overcriminalization: The limits of the criminal law. Oxford University Press.
- Hutchinson, S., & O’Maley, P. (2007). A crime-terror nexus? Thinking on alternative models. Studies in Conflict & Terrorism, 30(12), 1095–1107.
- James, W. (1902). The varieties of religious experience: A study in human nature. Longmans, Green, and Co.
- Jelsma, M. (2003a). Drugs in the UN system: The unwritten history. International Journal of Drug Policy, 14(2), 181–195.
- Jelsma, M. (2003b). The summit of good intentions: The UNGASS on drugs 5-year review. Transnational Institute Drug Policy Briefing, 5, 1–12.
- Jennings, J. M. (2005). The opium empire: Japanese imperialism and drug trafficking in Asia, 1895–1945. Praeger.
- Kaldor, M. (2012). New and old wars: Organised violence in a global era (3rd ed.). Stanford University Press.
- Karamustafa, A. T. (1994). God’s unruly friends: Dervish groups in the Islamic later middle period, 1200–1550. University of Utah Press.
- Keene, J. (2005). Drug misuse: Prevention, minimisation and intervention. Routledge.
- Kelly, J. F., Humphreys, K., & Ferri, M. (2020). Alcoholics Anonymous and other 12-step programs for alcohol use disorder. Cochrane Database of Systematic Reviews, 2020(3), CD012880.
- Kenney, M. (2007). From Pablo to Osama: Trafficking and terrorist networks, government bureaucracies, and competitive adaptation. Pennsylvania State University Press.
- Keohane, R. O. (1984). After hegemony: Cooperation and discord in the world political economy. Princeton University Press.
- Keown, D. (2001). The nature of Buddhist ethics. Palgrave Macmillan.
- Kerenyi, C. (1967). Eleusis: Archetypal image of mother and daughter. Princeton University Press.
- Kerr, T., Montaner, J., & Wood, E. (2008). Supervised injection facilities: Evidence from the evaluation of Vancouver’s Insite. Canadian Medical Association Journal, 179(1), 25–26.
- Kingsberg, M. (2014). Moral nation: Modern Japan and narcotics in global history. University of California Press.
- Kleiman, M. A. R. (1992). Against excess: Drug policy for results. Basic Books.
- Knepper, P. (2011). The invention of international crime: A global issue in the making, 1881–1914. Palgrave Macmillan.
- Koenig, H. G., King, D. E., & Carson, V. B. (2012). Handbook of religion and health (2nd ed.). Oxford University Press.
- Korf, D. J. (1995). Dutch treat: Formal control and illicit drug use in the Netherlands. Thesis Publishers.
- Kosten, T. R., & Domingo, C. B. (2013). Can vaccines help treat substance abuse? Expert Opinion on Biological Therapy, 13(8), 1093–1097.
- Kueny, K. (2001). The rhetoric of sobriety: Wine in early Islam. State University of New York Press.
- La Barre, W. (1938). The peyote cult. Yale University Press.
- Labate, B. C., & Cavnar, C. (Eds.). (2014). Prohibition, religious freedom, and human rights: Regulating traditional drug use. Springer.
- Labate, B. C., & MacRae, E. (Eds.). (2010). Ayahuasca, ritual and religion in Brazil. Equinox Publishing.
- Labrousse, A. (2005). The geopolitics of drugs in South America. International Social Science Journal, 57(186), 613–622.
- Lévi-Strauss, C. (1962). La pensée sauvage. Plon.
- Levitt, M. (2013). Hezbollah: The global footprint of Lebanon’s Party of God. Georgetown University Press.
- Levy, B. B. (1990). Drink and be merry: Wine and alcohol in Jewish tradition. Jewish Educational Workshop.
- Lewis, I. (1971). Ecstatic religion: An anthropological study of spirit possession and shamanism. Penguin Books.
- Lewis-Williams, D. (2002). The mind in the cave: Consciousness and the origins of art. Thames & Hudson.
- Lines, R. (2017). Drug control and human rights in international law. Cambridge University Press.
- Lintner, B. (1999). Burma in revolt: Opium and insurgency since 1948 (2nd ed.). Silkworm Books.
- Lintner, B. (2019). The costliest pearl: China’s struggle for India’s ocean. Hurst & Company.
- Lodwick, K. L. (1996). Crusaders against opium: Protestant missionaries in China, 1874–1917. University of Kentucky Press.
- Long, C. N. (2000). Religious freedom and Indian rights: The case of Oregon v. Smith. University Press of Kansas.
- Lovell, J. (2011). The Opium War: Drugs, dreams and the making of China. Picador.
- Lowes, P. D. (1966). The genesis of international narcotics control. Librairie Droz.
- Luna, L. E. (1986). Vegetalismo: Shamanism among the mestizo population of the Peruvian Amazon. Almqvist & Wiksell International.
- Lupsha, P. A. (1996). Transnational organized crime versus the nation-state. Transnational Organized Crime, 2(1), 21–48.
- Lyman, M. D., & Potter, G. W. (2007). Organized crime (4th ed.). Pearson Prentice Hall.
- MacCoun, R. J., & Reuter, P. (2001). Drug war heresies: Learning from other vices, times, and places. Cambridge University Press.
- Makarenko, T. (2004). The crime-terror continuum: Tracing the interplay between transnational organised crime and terrorism. Global Crime, 6(1), 129–145.
- Manger, L. (2001). The Golden Crescent: Opium production, trafficking and addiction in Central Asia and the Middle East. Nordic Institute of Asian Studies.
- Marmot, M. (2005). Social determinants of health inequalities. The Lancet, 365(9464), 1099–1104.
- Maroukis, T. C. (2010). The peyote road: Religious freedom and the Native American Church. University of Oklahoma Press.
- McAllister, W. B. (2000). Drug diplomacy in the twentieth century: An international history. Routledge.
- McCoy, A. W. (2003). The politics of heroin: CIA complicity in the global drug trade (Rev. ed.). Lawrence Hill Books.
- McNamara, P. (2009). The neuroscience of religious experience. Cambridge University Press.
- Merlin, M. D. (2003). Archaeological evidence for the tradition of psychoactive plant use in the Old World. Economic Botany, 57(3), 295–323.
- Meyer, K., & Parssinen, T. (1998). Webs of smoke: Smugglers, warlords, spies, and the history of the international drug trade. Rowman & Littlefield.
- Mill, J. S. (1859). On liberty. John W. Parker and Son.
- Miller, W. R. (1998). Researching the spiritual dimensions of alcohol and other drug problems. Addiction, 93(7), 979–990.
- Millière, R. (2017). Looking for the self: Phenomenology, neurobiology and philosophical significance of drug-induced ego dissolution. Frontiers in Human Neuroscience, 11, 245.
- Mills, J. H. (2000). Madness, cannabis and colonialism: The ‘native-only’ lunatic asylums of British India, 1857–1900. Palgrave Macmillan.
- Moorhead, H. H. (1930). International administration of narcotic drugs. Foreign Policy Reports, 6(26), 495–510.
- Moos, R. H., & Moos, B. S. (2006). Participation in treatment and Alcoholics Anonymous: A 16-year evaluation of natural history of drinking disorders. Addiction, 101(2), 212–223.
- Morselli, C. (2009). Inside criminal networks. Springer.
- Musto, D. F. (1999). The American disease: Origins of narcotic control (3rd ed.). Oxford University Press.
- Mylonas, G. E. (1961). Eleusis and the Eleusinian mysteries. Princeton University Press.
- Naoroji, D. (1901). Poverty and un-British rule in India. Swan Sonnenschein & Co.
- Nation, M., Crusto, C., Wandersman, A., Kumpfer, K. L., Seybolt, D., Morrissey-Kane, E., & Davino, K. (2003). What works in prevention: Principles of effective prevention programs. American Psychologist, 58(6-7), 449–456.
- National Institute on Drug Abuse. (2019). Methamphetamine research report. National Institutes of Health.
- Naylor, R. T. (2002). Wages of crime: Black markets, illegal finance, and the underworld economy. Cornell University Press.
- Newberg, A., D’Aquili, E., & Rause, V. (2001). Why God won’t go away: Brain science and the biology of belief. Ballantine Books.
- Nichols, D. E. (2016). Psychedelics. Pharmacological Reviews, 68(2), 264–355.
- Nozick, R. (1974). Anarchy, state, and utopia. Basic Books.
- Nutt, D. (2020). Drugs without the hot air: Making sense of legal and illegal drugs (2nd ed.). UIT Cambridge.
- Olivelle, P. (2005). Manu’s code of law: A critical edition and translation of the Mānava-Dharmaśāstra. Oxford University Press.
- Packer, H. L. (1968). The limits of the criminal sanction. Stanford University Press.
- Paoli, L. (2002). The illegal drugs market. Journal of Modern Italian Studies, 7(3), 377–400.
- Pargament, K. I. (1997). The psychology of religion and coping: Theory, research, practice. Guilford Press.
- Pearson, G., & Hobbs, D. (2001). Middle market drug distribution (Home Office Research Study 227). Home Office.
- Persinger, M. A. (1987). Neuropsychological bases of god beliefs. Praeger.
- Peters, G. (2009). Seeds of terror: How drugs, thugs, and the Taliban are funding the Afghan war. Thomas Dunne Books.
- Polachek, J. M. (1992). The inner Opium War. Harvard University Asia Center.
- Project MATCH Research Group. (1997). Matching alcoholism treatments to client heterogeneity: Project MATCH posttreatment drinking outcomes. Journal of Studies on Alcohol, 58(1), 7–29.
- Putnam, R. D. (2000). Bowling alone: The collapse and revival of American community. Simon & Schuster.
- Ramachandran, V. S., & Blakeslee, S. (1998). Phantoms in the brain: Probing the mysteries of the human mind. William Morrow and Company.
- Rao, R. (2017). The journey of opioid substitution therapy in India: Achievements and challenges. Indian Journal of Psychiatry, 59(1), 39–45.
- Rappaport, R. (1999). Ritual and religion in the making of humanity. Cambridge University Press.
- Rashid, A. (2000). Taliban: Militant Islam, oil and fundamentalism in Central Asia. Yale University Press.
- Rätsch, C. (2005). The encyclopedia of psychoactive plants: Ethnopharmacology and its applications. Park Street Press.
- Reichel-Dolmatoff, G. (1975). The shaman and the jaguar: A study of narcotic drugs among the Tukano Indians of Colombia. Temple University Press.
- Renborg, B. A. (1944). Principles of international control of narcotic drugs. American Journal of International Law, 38(3), 438–459.
- Renborg, B. A. (1947). International drug control: A study of international administration by and for the League of Nations. Carnegie Endowment for International Peace.
- Reuter, P. (2009). The mobility of drug enforcement: The balloon effect. In H. Trasov (Ed.), Evaluating the impact of drug policy (pp. 77–89). Cambridge University Press.
- Reuter, P., & Trautmann, F. (2009). A report on global illicit drug markets 1998–2007. European Commission.
- Richards, J. F. (2002a). The Indian Empire and peasant production of opium in the nineteenth century. Modern Asian Studies, 36(1), 59–82.
- Richards, J. F. (2002b). The opium industry in British India. The Indian Economic & Social History Review, 39(2-3), 149–180.
- Room, R., & Reuter, P. (2012a). How regulating and taxing a drug affects its consumption and harms: A research agenda. International Journal of Drug Policy, 23(4), 282–289.
- Room, R., & Reuter, P. (2012b). How well do international drug conventions protect public health? The Lancet, 379(9810), 84–91.
- Room, R., Fischer, B., Hall, W., Lenton, S., & Reuter, P. (2010). Cannabis policy: Moving beyond stalemate. Oxford University Press.
- Root, D. (1996). Cannibal culture: Art, appropriation, and the commodification of difference. Westview Press.
- Rosenthal, F. (1971). The herb: Hashish versus medieval Muslim society. E. J. Brill.
- Ruck, C. A. P., Bigwood, J., Staples, D., Ott, J., & Wasson, R. G. (1979). Entheogens. Journal of Psychoactive Drugs, 11(1-2), 145–146.
- Rudgley, R. (1993). The alchemy of culture: Intoxicants in society. British Museum Press.
- Ruggiero, V. (2000). Crime and markets: Essays in anti-criminology. Oxford University Press.
- Saikia, A. (2011). Forest and ecological history of Assam, 1826–2000. Oxford University Press.
- Samorini, G. (1992). The oldest representations of hallucinogenic mushrooms in the world (Sahara Desert, 9000-7000 BP). Integration, 2(3), 69–78.
- Sampson, R. J., Raudenbush, S. W., & Earls, F. (1997). Neighborhoods and violent crime: A multilevel study of collective efficacy. Science, 277(5328), 918–924.
- Sarianidi, V. (1998). Margiana and protozoroastrism. Kapon Editions.
- Sarkar, S. (1983). Modern India, 1885–1947. Macmillan.
- Saviano, R. (2006). Gomorrah: A personal journey into the violent international empire of Naples’ organized crime system. Farrar, Straus and Giroux.
- Scheerer, S. (1997). North American bias and world drug control. The Howard Journal of Criminal Justice, 36(3), 264–277.
- Schelling, T. C. (1971). What is the business of organized crime? The American Scholar, 40(4), 643–652.
- Seddon, T. (2010). A history of drugs: Drugs and freedom in the liberal age. Routledge.
- Seddon, T. (2014). Inventing drugs: A genealogy of a regulatory concept. Routledge.
- Sen, A. (1999). Development as freedom. Oxford University Press.
- Sharma, J. (2009). Lazy natives, coolie labour, and the contestation of moral economies in colonial Assam. The Indian Economic & Social History Review, 46(3), 401–424.
- Sharma, J. (2011). Empire’s garden: Assam and the making of India. Duke University Press.
- Shelley, L. I. (2014). Dirty entanglements: Corruption, crime, and terrorism. Cambridge University Press.
- Sherratt, A. (1995). Alcohol and its alternatives: Symbol and substance in early modern Europe. In J. Goodman, P. E. Lovejoy, & A. Sherratt (Eds.), Consuming habits: Drugs in history and anthropology (pp. 11–46). Routledge.
- Sigfúsdóttir, I. D., Thorlindsson, T., Kristjánsson, Á. L., Roe, K. M., & Allegrante, J. P. (2009). Substance use prevention for adolescents: The Icelandic approach. Health Promotion International, 24(1), 16–25.
- Singer, P. (2011). Practical ethics (3rd ed.). Cambridge University Press.
- Sinha, J. (2008). China and the international opium conferences, 1909 to 1925. Proceedings of the Indian History Congress, 69, 843–852.
- Smith, B. K. (1994). Classifying the universe: The ancient Indian varṇa system and the origins of caste. Oxford University Press.
- Stace, W. T. (1960). Mysticism and philosophy. Lippincott.
- Stares, P. B. (1996). Global habit: The drug problem in a borderless world. Brookings Institution Press.
- Starke, J. G. (1937). The convention of 1936 for the suppression of the illicit traffic in dangerous drugs. American Journal of International Law, 31(1), 31–43.
- Stavenhagen, R. (2007). Indigenous peoples: Rights and challenges. Human Rights Consortium.
- Stoler, A. L. (2002). Carnal knowledge and imperial power: Race and the intimate in colonial rule. University of California Press.
- Strang, J., Babor, T., Caulkins, J., Fischer, B., Foxcroft, D., & Humphreys, K. (2012). Drug policy and the public good: Evidence for effective interventions. The Lancet, 379(9810), 71–83.
- Strassman, R. (2001). DMT: The spirit molecule: A doctor’s revolutionary research into the biology of near-death and mystical experiences. Park Street Press.
- Sutherland, E. H. (1947). Principles of criminology (4th ed.). J.B. Lippincott.
- Szasz, T. (1974). Ceremonial chemistry: The ritual persecution of drugs, addicts, and pushers. Doubleday.
- Tagliazucchi, E., Roseman, L., Kaelen, M., Orban, C., Muthukumaraswamy, S. D., Murphy, K., & Carhart-Harris, R. (2016). Increased global functional connectivity correlates with LSD-induced ego dissolution. Current Biology, 26(8), 1043–1050.
- Tandon, T. (2015). Drug policy in India: Compounding harm through criminalisation (International Drug Policy Consortium Briefing Paper, 12, 1–16).
- Taussig, M. (1987). Shamanism, colonialism, and the wild man: A study in terror and healing. University of Chicago Press.
- Taylor, A. H. (1969). American diplomacy and the narcotics traffic, 1900–1939: A study in international humanitarian reform. Duke University Press.
- Thoumi, F. E. (2003). Illegal drugs, economy, and society in the Andes. Woodrow Wilson Center Press.
- Trace, M. (2013). Drug policy: The growing global consensus for change. Centre for Crime and Justice Studies.
- Trocki, C. A. (1999). Opium, empire and the global political economy: A study of the Asian opium trade, 1750–1950. Routledge.
- Tupper, K. W. (2008). The globalization of ayahuasca: Harm reduction or benefit maximization? International Journal of Drug Policy, 19(4), 297–303.
- Turner, B. S. (1984). The body and society: Explorations in social theory. Basil Blackwell.
- Turner, V. (1969). The ritual process: Structure and anti-structure. Aldine Publishing Company.
- Uchtenhagen, A. (2010). Heroin-assisted treatment in Switzerland: A case study in policy change. Addiction, 105(1), 29–37.
- United Nations Office on Drugs and Crime. (2013). Drug use in Pakistan 2013. United Nations Office on Drugs and Crime & Ministry of Narcotics Control, Government of Pakistan.
- United Nations Office on Drugs and Crime. (2023). Crime-related illicit financial flows: Latest progress. UNODC.
- Urban, H. B. (2003). Tantra: Sex, secrecy, politics, and power in the study of religion. University of California Press.
- Vaillant, G. E. (1995). The natural history of alcoholism revisited. Harvard University Press.
- Valverde, M. (1998). Diseases of the will: Alcohol and the dilemmas of freedom. Cambridge University Press.
- van Duyne, P. C., & Levi, M. (2005). Drugs and money: Managing the problem of drug-derived assets. Routledge.
- van Ree, E. (1999). Drugs as a human right. International Journal of Drug Policy, 10(2), 89–98.
- Van Schendel, W. (2005). The Bengal borderland: Beyond state and nation in South Asia. Anthem Press.
- Varese, F. (2011). Mafias on the move: How organized crime conquers new territories. Princeton University Press.
- Villoldo, L. C. (2000). Shaman, healer, sage: How to heal yourself and others with the energy medicine of the Americas. Harmony Books.
- Volkov, V. (2002). Violent entrepreneurs: The use of force in the making of Russian capitalism. Cornell University Press.
- Volkow, N. D., Koob, G. F., & McLellan, A. T. (2016). Neurobiologic advances from the brain disease model of addiction. New England Journal of Medicine, 374(4), 363–371.
- Vollenweider, F. X., & Kometer, M. (2010). The neurobiology of psychedelic drugs: Legal and clinical aspects. Nature Reviews Neuroscience, 11(9), 642–651.
- Waley, A. (1958). The Opium War through Chinese eyes. George Allen & Unwin.
- Walker, W. O. (1991). Opium and foreign policy: The Anglo-American search for order in Asia, 1912–1954. University of North Carolina Press.
- Wasson, R. G. (1968). Soma: Divine mushroom of immortality. Harcourt Brace Jovanovich.
- Wasson, R. G., Hofmann, A., & Ruck, C. A. P. (1978). The road to Eleusis: Unveiling the secret of the mysteries. Harcourt Brace Jovanovich.
- Weber, M. (1922). Wirtschaft und Gesellschaft. J.C.B. Mohr.
- Weinstein, J. M. (2007). Inside rebellion: The politics of insurgent violence. Cambridge University Press.
- Wexler, D. B. (1990). Therapeutic jurisprudence: The law as a therapeutic agent. Carolina Academic Press.
- White, D. G. (2003). Kiss of the yoginī: “Tantric sex” in its South Asian contexts. University of Chicago Press.
- White, W. L. (1998). Slaying the dragon: The history of addiction treatment and recovery in America. Chestnut Health Systems.
- Williams, P. (2001). Transnational criminal networks. In J. Arquilla & D. Ronfeldt (Eds.), Networks and netwars: The future of terror, crime, and militancy (pp. 61–97). RAND.
- Willoughby, W. W. (1925). Opium as an international problem: The Geneva conferences. Johns Hopkins Press.
- Winkelman, M. (2010). Shamanism: A biopsychosocial paradigm of consciousness and healing (2nd ed.). Praeger.
- Wright, Q. (1931). The international narcotic convention. American Journal of International Law, 25(4), 743–746.
- Youngers, C. A., & Rosin, E. (Eds.). (2005). Drugs and democracy in Latin America: The impact of U.S. policy. Lynne Rienner Publishers.
- Zaehner, R. C. (1957). Mysticism sacred and profane: An inquiry into some varieties of praeternatural experience. Clarendon Press.
- Zirnite, P. (1998). Reluctant recruits: The U.S. military and the war on drugs. Washington Office on Latin America (WOLA) Special Report, 1–28.
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

