সম্পাদকীয়

পবিত্র সঙ্গম, বেড়ালেরা এবং চিন্তাদমন আইন

প্রায় প্রতিটি রাতেই আমার ঘরের মাচার উপর দু’টো কামার্ত সঙ্গমরত বেড়াল বেড়ালির বিকট বীভৎস প্রায় মানুষের স্বরে শীৎকার আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়। গভীর রাতে তাদের গোঙানি শুনে আমি আতংকে ঘেমে উঠি, যেন দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছি। বেড়াল বেড়ালির একান্ত এই ব্যক্তিগত ভালবাসাবাসির মুহূর্ত আমার ঘুম কেন ভাঙিয়ে দেয়, সেই প্রশ্নটি ঠিক কাকে করবো সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না।

আমার বাসাটি একতলা, উপরে টিনের চাল। বেড়া দিয়ে তৈরি মাচার অনেকখানি অংশই ভেঙ্গে গেছে, ভাঙা অংশ দিয়ে বৃষ্টির সময় আমার বিছানা থেকে শুরু করে সবকিছুই ভিজে ওঠে। মাচার উপরে কী হচ্ছে না হচ্ছে, ভাঙা অংশ দিয়ে পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। আমার ঘরে প্রাণী বলতে আমি, দু’টো বেড়াল, আর প্রায় বিড়ালের মতই স্বাস্থ্যবান কয়েকটি ইঁদুর। ইঁদুরগুলো আমার খাবারদাবার বইপত্র খেয়ে খেয়ে এতবেশি স্বাস্থ্যবান হয়ে গেছে যে, বেড়ালদু’টো এখন রীতিমত তাদের সমীহ করে চলে। ইঁদুর বেড়ালের এই পারস্পরিক সহাবস্থান, আমার খাবার ভাগ বাটোয়ারা করায় তাদের সাম্যবাদী মার্কসবাদী চেতনা আমাকে হতবাক করে। বেড়ালদের সামনে দিয়ে ইঁদুরগুলো আমার খাবার নিয়ে দৌড়ে চলে যায়, বেড়াল দু’টো অহিংসবাদী মহাত্মা গান্ধীর মত নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে তা দেখে। আমি এদের আচার আচরণ দেখে মুগ্ধ হই, মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। প্রকৃতির বেধে দেয়া নিয়ম, ইঁদুর বেড়ালদের স্বাভাবিক খারাপ সম্পর্ককে কলা দেখিয়ে তারা যে এমন মহান মহান সব দার্শনিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠছে, না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন। সম্ভবত আমার ঘরের বইপত্রগুলো খেয়ে খেয়েই তাদের এমন দার্শনিক চিন্তাভাবনা জন্ম নিয়েছে, নতুবা আর কী কারণ থাকতে পারে আমি জানি না! সেই বেড়াল-দু’টোই আবার গভীর ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটায় মাঝরাতে, আদিম অকৃত্রিম জৈবিক তাড়নায় মেতে উঠে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।

বেড়াল দু’টো গৃহপালিত হলেও তাদের আচার আচরণ প্রায় বুনো, সঙ্গমপূর্ব দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব সম্ভবত যেকোনো মানুষের পিলে চমকে দেবে। দীর্ঘ সময় ধরে তারা প্রায় মানুষের কণ্ঠে চিৎকার করে, মনে হয় তারা একে অপরকে শাসাচ্ছে, ধমকাচ্ছে, খিস্তিখেউর করছে। এরপরে শুরু হয় তাদের ধস্তাধস্তি এবং হুটোপুটির শব্দ। দীর্ঘ শৃঙ্গারপর্বের পরে তারা একে অপরের উপরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, পুরুষ বেড়ালটি তখন উপগত হয় মেয়ে বেড়ালটির উপর; এবং এরপরে যা শুরু হয় তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে চিৎকারগুলো সেই অন্ধকার নিস্তব্ধ রাতে প্রায় মানুষের আর্তচিৎকারের মতই ভয়াবহ শোনায়।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমি মাঝে মাঝেই পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করি। তারা আমার দিকে তাকায়, তাদের দৃষ্টিতে থাকে সীমাহীন অবহেলার স্পষ্ট ছাপ। আমি যে একজন জলজ্যান্ত মানুষ, তাদের এই সকল ব্যক্তিগত বিষয়াদি যে আমি দেখে ফেলছি, বা তাদের এইসকল কর্মকাণ্ডে যে আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, তাতে তাদের বিন্দুমাত্র বিকার নেই। আমার মত নিরীহ মানুষকে তারা সম্ভবত খুব একটা পাত্তাই দেয় না, তাদের দৃষ্টি দেখে মনে হয়, “তুমি আবার কোন আপদ হে বাপু?”

তারা যে আমারই ঘরে বসে এইসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, মাঝরাতে আমার ঘুম ভাঙিয়ে আমাকে বিরক্ত করছে, তাদের ভেতর এইসব নিয়ে অনুশোচনার লেশমাত্র দেখা যায় না। রোজ রাতে আমারই খাবার চুরি করে তাদের পেট চলে, মাঝে মাঝে খাবার খেতে না পেরে আমার ক্ষুধার্ত অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়তে হয়। অথচ আমারই খাবার খেয়ে, আমার বাসাতেই থেকে আমাকে একটু শান্তির ঘুম ঘুমাতে না দেয়ায় তাদের মধ্যে কোন বিকার নেই। তাদের এই মাঝরাত্রির উৎকট প্রেমভালবাসা বিকট বীভৎস চিৎকার আমার মত অবিবাহিত ভদ্রলোকের ঘুম নষ্ট করছে, এর বিচার আমি কার কাছে দেবো ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।

দীর্ঘসময় ধরে আমি একটি বেড়ালের শরীরের ভেতর অন্য বেড়ালটির প্রবেশের শব্দ শুনি, তাদের গলা দিয়ে ঘরঘর আওয়াজ বেরুতে থাকে, সেটা আনন্দের নাকি ব্যথার ঠিক বোঝা যায় না। আমার শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণীর সুরুচি এইসব শব্দে দারুণভাবে আহত হয়, আমার যৌনানুভূতিতে আঘাত লাগে, আমার শব্দানুভূতিতে আঘাত লাগে, আমার সৌন্দার্যনুভূতিতে আঘাত লাগে, আমার ভাষানুভূতিতে আঘাত লাগে, আমার নিদ্রানুভূতি দারুণভাবে ব্যাহত হয়। অথচ এই সব কারণে আমি তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারি না, আমাদের রাষ্ট্র এবং আইনকানুন মাচার উপরের এই বেড়াল দু’টোর বিরুদ্ধে আমাকে কোন মামলা করতে দেবে না। তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জাড়ি করবে না, তাদের গ্রেফতার করবে না, তাদের রিমান্ডে নেবে না। তারা মাচার উপরে বসে বসে একে অপরকে খিস্তি খেউর করে যাবে, অশালীনভাবে একে অপরকে কামড়াবে, আঁচড়াবে, রক্তাক্ত করবে, আর আমার সব চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে। আমার কিছুই করার নেই।
নির্মোহভাবে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি চলচ্চিত্রটি শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি, মাঝে মাঝে একটু আধটু হুটহাট শব্দ করি, নিজের উপস্থিতি জানান দেই। কিন্তু তারা আমার দিকে ফিরেও তাকায় না, তারা তাদের কাজেই ব্যস্ত থাকে। সম্ভবত তারাও বুঝে গেছে, নিচের বিছানায় শুয়ে থাকা এই হিজড়েটার কিছুই করার ক্ষমতা নেই।

ঘটনার পরে আমার আর ঘুম আসে না, একবার ঘুম ভেঙে গেলে আবার ঘুমানো আমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। আমার পাশের রুমে ভাড়া থাকেন এলাকার পরিচিত সরকারী কর্মচারী মোহম্মদ ইয়াকুব সাহেব, যিনি জীবনে ঘুষ নেয়া ছাড়া একটি মাত্র কাজেই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, তা হচ্ছে তার চতুর্থ স্ত্রীটি বেশ কমবয়সী এবং রূপবতী। ইয়াকুব সাহেব এলাকার গণ্যমান্য পরহেজগার ব্যক্তি, এলাকার মসজিদ হেফাজত কমিটির চেয়ারম্যান তিনি। সর্বক্ষণ সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পড়া ইয়াকুব সাহেবকে দেখলেই কলবের ভেতর শান্তি শান্তি ভাব আসে। তার নুরানি খুবসুরত চেহারা মুবারক কেন জানি একাত্তরের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়। তিনি তার স্ত্রীদেরকে বোরখার ভেতরে রাখেন, কখনও বাইরে বের হতে দেন না। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, মেয়ে মানুষ ঘরের আসবাবপত্র রক্ষণাবেক্ষণ করবে, স্বামীর আয় ব্যয়ের হিসাব রাখবে। সন্তান উৎপাদন এবং স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণের পবিত্র কর্ম রেখে যেই সব নারী ঘরের বাইরে বের হয়, তারা সব জেনাকারী। তাদের পাথর ছুড়ে মেরে ফেলতে পারলেই তিনি শান্তি পেতেন। তার নুরানি খোমা দেখে আমার কেন জানি জলপাই রঙের অন্ধকারের কথা মনে পড়ে, অথবা মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যের সংকরজাতের হিংস্র বুলডগের কথা, মুখ থেকে যে সব কুকুরের সর্বক্ষণ লালা ঝরছে, এবং মাংস দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হচ্ছে!
বেড়ালদু’টো প্রায় বুনো স্বভাবের হলেও, আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, তারা এই ইয়াকুব সাহেবকে খুব সমীহ করে চলে। ইয়াকুব সাহেবের পায়ের কাছে তারা তাদের গাল ঘষে, ইয়াকুব সাহেব মাঝে মাঝেই কষে তাদের পাছায় লাথি মারেন, ঢিল মারেন, কিন্তু বেড়ালদু’টোর বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান বোধ নেই। তারা লাথি খেয়েও গাল ঘষতে থাকে ইয়াকুব সাহেবের পায়ের কাছে, আর তার ফেলে দেয়া কাটা তারা ঐশ্বরিক খাবারের মতই কাড়াকাড়ি করে খায়।
মাঝরাত্রে বেড়ালদু’টোর মৈথুনের শব্দে মাঝে মাঝেই ইয়াকুব সাহেব “নাউজুবিল্লা” “ওয়াস্তাগফিরুল্লা” বলে চিৎকার করতে করতে মাচা লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়েন। মাঝে মাঝে লাঠি নিয়ে তাড়া করেন বেড়ালদু’টোকে। বেড়ালদু’টো আমাকে মোটেও পাত্তা না দিলেও, ইয়াকুব সাহেবকে বাঘের মতই ভয় পায়। তাদের সঙ্গম যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তিনি তেড়ে এলেই পড়িমরি করে দৌড়ে পালাতে শুরু করে তারা। সেই সাথে আশে পাশের ইঁদুরগুলোও গর্তে গিয়ে ঢোকে, আমিও কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। এরপরে মোল্লা ইয়াকুব সাহেব তার ঘরে ঢুকে খুব দ্রুততার সাথে দরজা বন্ধ করেন, এবং তার অল্প বয়সী স্ত্রীটিকে প্রায় টেনে তোলেন। তার স্ত্রীটির চেহারা কোমল, স্নিগ্ধ চেহারার এই কিশোরী মেয়েটি কোন কলেজে পড়লেই বেশি মানাতো। বর্ষাকালের টইটম্বুর পুকুরের মত সুন্দর বউটিকে সে সেই মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে বেড়ালদু’টোর অমধ্যবিত্তসুলভ, কুরুচিপূর্ণ, অনৈস্লামিক নাপাক কর্মকাণ্ডকে গালাগালি করতে করতে মোল্লাসাহেব পাক পবিত্র ছহি পদ্ধতিতে উপগত হন, সেই গভীর রাতে তার বউটির চাপা কান্নার আওয়াজ অনেক দূর থেকে শুনতে পাওয়া যায়। মোল্লা ইয়াকুব সাহেবের ধমকের শব্দ কানে আসে, বউটির মুখ তিনি যে হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছেন, তা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। মাঝরাতের এই পুণ্য হাসিলের শব্দ আমার সকল অনুভূতিতে খানখান করে ভেঙ্গে দেয়, আমার ইচ্ছা করে চিৎকার করে উঠি। আমার মনে হতে থাকে সমগ্র বাঙলাদেশ ধর্ষিত হচ্ছে, আমার মনে হতে থাকে বাঙলাদেশের নদীনালা খাল বিল সবুজ বন সব কিছু ধর্ষিত হয়ে চাপা সুরে কেঁদে যাচ্ছে। আর আমি অনুভুতিশুন্য ক্লীবের মত সেই শব্দ শুনতে থাকি, কারণ আমার কোন অনুভূতি থাকতে নেই। আর যার অনুভূতিই নেই, তার অনুভূতি আহত হল না নিহত হল, তাতে কারো কিছু যায় আসে না।

নিজের অসহায়ত্বের কথা ভাবতে ভাবতে সেই মাঝরাতে আমি নির্ঘুম বসে থাকি, বসে থাকতে থাকতে একসময় খবরের কাগজগুলো পড়তে শুরু করি। খবরের কাগজ খুললেই সেনাবাহিনীর ঔরসে জন্ম নেয়া গণতন্ত্রবাদী আর মুসলিম লীগের ঔরসে জন্ম নেয়া ইসলামি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের সংসদীয় আলাপ আলোচনা আমার সামনে চলে আসে। পবিত্র সংসদে তাদের ভাষাজ্ঞান এবং তাদের উচ্চারিত শব্দগুলো আমার সকল অনুভূতির পাছায় কষে লাথি মারতে শুরু করে। তাদের পারস্পরিক হুমকি ধামকি, খিস্তিখেউর, আলটিমেটাম, হরতাল ইত্যাদি দেখতে দেখতে আমি আরো বিপর্যস্ত বোধ করতে থাকি। তারা এই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ এবং জনগণের মালিক এবং ভাগ্য বিধাতা। দেশের স্বাধীনতা এবং ধর্ম রক্ষায় তারা সর্বদাই সোচ্চার, জীবন দিতে প্রস্তুত এবং যুদ্ধংদেহী; কিন্তু এদেশের স্বাধীনতা এবং জনগণের ধর্ম কে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে তা আমি কখনই বুঝে উঠতে পারি নি। এই দুটো রাজনৈতিক দলের উৎকট ভালবাসাবাসি, প্রেম এবং সঙ্গম অথবা ধর্ষণ ইচ্ছা না থাকলেও দেখতে হয়, তাদের কথা আমাদের শুনতে হয়। মাঝে মাঝে তাদের বিকট সঙ্গমের শব্দে দেশরক্ষক জলপাই বাহিনী বা ধর্ম হেফাযতকারি মোল্লা বাহিনী অস্ত্র হাতে তেড়ে আসে, তখন এলাকার ছিচকে সন্ত্রাসীরা কয়েকদিনের জন্য গা ঢাকা দেয়। ছিচকে চোরদের দমন করে বিজয়ীর ভঙ্গিতে তারা এরপরে ছহি কায়দায় উপগত হয় বাঙলাদেশের উপর, ধর্ষণ করতে থাকে বাঙলাদেশকে, এই দেশের প্রতিটি ইঞ্চিকে তারা ধর্ষণ করে।

বাঙলাদেশ ধর্ষিত হতে থাকে, ধর্ষণে ধর্ষণে চাপচাপ রক্ত জমাট বাধে বাঙলাদেশের প্রতিটি মানুষের বুকে। মাতৃধর্ষনের বিনিময়ে আমরা লাভ করি রাষ্ট্রখৎনা, সংবিধানে বিসমিল্লাহ দেখে পাছায় বুটের লাথি ভুলে যাওয়া আমাদের জন্য খুব কঠিন কাজ নয়। আমরা আমাদের মাতৃধর্ষকদের শৌর্যবীর্যে মুগ্ধ হই, মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। আমরা তাদের নিয়ে নানান উপকথা সৃষ্টি করি, তাদের সম্মান এবং মর্যাদা রক্ষায় আমরা জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকি, কারণ পশ্চাতদ্বেশে বন্দুকের নল আর গলায় বুটের চাপ থাকলে শরিয়তসম্মত মৌলিক গণতন্ত্রকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বিধান মনে হয়, মনে হতেই হবে।

একই রাজনীতির পুনরাবৃত্তিমূলক খবর পড়তে পড়তে একসময় টেলিভিশন সেটটি ছেড়ে বসি, এবং টেলিভিশনের কোন বাঙলা চ্যানেল ছাড়লেই কেন জানি মনে হয়, আমি ক্রমশ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীতে পরিণত হচ্ছি। পাশ্চাত্যের রেসলিং এখন খুব জনপ্রিয় খেলা, এন্টারটেইনমেন্ট, আমাদের চ্যানেলগুলোতে তার দেশিয় সংস্করণ হচ্ছে টকশো সমূহ। মানসিকভাবে অপরিপক্ব অথবা বিকারগ্রস্ত না হলে এই অনুষ্ঠান দেখা আসলেই দুরূহ কাজ। রেসলিং এ যেমন এক একটি মাংসের দোকান মাসল ফুলিয়ে নানা শারীরিক কসরত করে একে অন্যের উপরে চড়াও হয়, টকশো গুলোতেও তেমনি এক একজন গলার রগ ফুলানো রাজনীতিবিদ একে অন্যকে অশ্রাব্য গালাগালি করে যেতে থাকে, গালাগালি মারামারি যত বেশি নোংরা পর্যায়ে পৌঁছে, টকশো ততবেশী দর্শকপ্রিয় হয়। জনগণ সম্ভবত রাজনীতিবিদদের কর্মকাণ্ড দেখে নিজেদের অবদমিত যৌন কামনাগুলো পূরণ করেন, রাজনৈতিক বেশ্যাদের গালে কষিয়ে চড় মারার সুখ তারা খুঁজে বেড়ান এই সব টকশো অনুষ্ঠানে, এবং একই সাথে নিজেদের ভেতরে লালন করতে থাকেন অসুস্থতাকে, ভয়ংকর সব রোগকে।

চ্যানেল পাল্টালেই শুরু হয় চামড়া ব্যবসায়ীদের চামড়া ফর্সাকারী আরেক অসুস্থ সমাজসেবামূলক বিজ্ঞাপনের কুৎসিত দৃশ্যায়ন। মধ্যযুগে নারী দাসীদের সুন্দর করে সাজিয়ে নগ্ন করে বাজারে নিলামে উঠানো হতো; যেই নারীর চামড়া সুন্দর, যার শরীর যত কমনীয়, গরুর হাটের মত তারও বাজার মূল্য থাকতো সবচেয়ে বেশি। আধুনিক যুগে নারী উন্নয়নের জোয়ার বইছে, সংসদের স্পিকার এখন নারী-প্রধান দু’টো রাজনৈতিক দলের নেতা এখন নারী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে নারীদের জয়জয়কার। তাই বুঝি আধুনিক নারীগণ এখন স্বেচ্ছায় ঘষে ঘষে কয়েক পরত চামড়া তুলে অর্ধনগ্ন হয়ে নিজের শরীরের বাকগুলো প্রদর্শন করে, তাদের এখন আর জোর করতে হয় না। স্বেচ্ছায় ভোগ্যপণ্য হবার বাসনা নারীকে নিশ্চিতভাবেই মুক্ত করবে!

অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বলা হয় জেনাকারী, যারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে প্রচণ্ড পরিশ্রমে, যাদের ঘামের টাকায় এই দেশ চলে, তাদের বলা হয় বেশ্যা। গার্মেন্টসের মেয়েদের প্রতি ধর্মান্ধ মৌলবাদীগোষ্ঠীর এই অদ্ভুত রাগ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, অর্থনৈতিকভাবে নারী যত শক্তিশালী হয়ে উঠবে, শিক্ষায় নারী যত এগিয়ে যাবে, ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ধর্মব্যবসা তত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই মেরুকরণ স্পষ্ট, এবং দৃশ্যমান। এই সময়ে যারা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের পায়ের তলায় ভোট ভিক্ষা করতে ছুটছে, তাদের চিনে রাখতে হবে।

নরম পলিমাটির এই সবুজ বাঙলাদেশ ক্রমশ অসুস্থ, রক্তাক্ত এবং ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠছে। অসুস্থ রুগ্ন হয়ে উঠছে আমাদের নদীনালা, খালবিল, ধানক্ষেত আর বনভূমি। সম্ভবত প্রকৃতিও বুঝে গেছে, এখানকার মানুষ আর সবুজ সহ্য করতে পারছে না। সহ্য করতে পারছে না ভাটিয়ালি গান, প্রবল বর্ষণে ভেজা মাটির গন্ধ। তাই দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে নদীনালা, উজাড় হয়ে যাচ্ছে বনভূমি, হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ অরণ্য। মরুভূমি ক্রমশ ধেয়ে আসছে বাঙলাদেশের দিকে, এই দেশ ক্রমশ বাঙলাস্থানে পরিণত হচ্ছে। তাই দেখে খেজুর আর মরূদ্যানের স্বপ্ন দেখা খচ্চরেরা প্রবল তৃপ্তিতে দাড়িতে হাত বুলাচ্ছে, অসংখ্য তেঁতুল আর ছিলা কলা খাবার স্বপ্নে তাদের মুখ লালায় লালায় ভরে উঠছে। লালসালুতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে এই বদ্বীপ, হুজুর কেবলারা এখন রাষ্ট্রপতি হবার স্বপ্নে বিভোর, ধর্ম হেফাজত করে তারা এই দেশকে তাদের তীর্থের আরেক মিনি সংস্করণ বানাতে বদ্ধ পরিকর।

শুভব্রতের সুসমাচার এখন রাষ্ট্রের সংবিধানের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক, সংস্কৃতির ভাঙা সেতু ক্রমশ আরো বিকৃত হয়ে উঠছে। মৃতপ্রায় হয়ে উঠছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল, আর আমরা ক্রীতদাসের মত হেসেই যাচ্ছি অনন্তকাল ধরে। লালনের মূর্তি এখন গুড়িয়ে দেয়া হয়, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ধর্মনিরপেক্ষ সরকার বিমান উড়ায় অলৌকিক বাবা কেবলা কাবাদের অলৌকিক দোয়ায়, তাদের নাম ছাড়া সম্ভবত বিমান আকাশে উড়তেই চাইতো না। যারা বিমান আবিষ্কার করেছে, তাদের নাম কেউ জানে না, বিমান বলতে তারা জানে কেরামতি বাবাদের নাম। আর হবেই বা না কেন? যেই দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হয় বিজ্ঞানের মৌল চেতনার বিরোধী পীর ফকিরের নামে, যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার শিক্ষকতা করেন দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ, সেখানে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরঞ্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জগদীশ চন্দ্র বসু হওয়াটাই আপত্তিকর এবং অস্বাভাবিক। জগদীশ চন্দ্র বসুটা আবার কে হে বাপু? আমাদের দেশে কী পীর আউলিয়ার অভাব পড়লো নাকি যে তার নামে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে হবে?

একাত্তরের দেশিয় দালালদের, ধর্ষক আর ঘাতকদের বিচারের দাবীতে যারা রাজপথে নেমেছিল, আত্মপরিচয়ের প্রবল সংকটে তারা মাঝখানে রাজপথে বসে হামদ নাত আর কেরাত প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়েছিল। মঞ্চে উঠে তারা বারবার নিজেদের কর্তিত প্রত্যঙ্গ প্রদর্শন করে নিজেদের পরিচয় সংকট থেকে রক্ষা করেছে, যাদের পরিচয় খৎনাকৃত লিঙ্গের প্রদর্শনে জায়েজ হয়, তাদের স্যালুট না করে পারা যায় না। আজকের তারুণ্যের কোন তুলনা হয় না। তারা তাদের পূর্বের নেতাদের যোগ্য উত্তরসূরিই বটে। নিজেদের সাচ্চা ধার্মিক প্রমাণে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় এক একজন নেতা নেত্রী এখন সংসদে নিজ নিজ নামাজ রোজার খতিয়ান বয়ান করছে, কেউ কেউ বলছে ও ঠাকুর আমি মদ খাই না, কেউ কেউ টেবিলে দাঁড়িয়ে প্যান্ট খুলে দেখাতে চাচ্ছে।

সারারাত এপাশ ওপাশ করতে থাকি, পাশের বাড়িতে মোল্লা সাহেবের নিজ স্ত্রী ধর্ষণের শব্দ এক ধরণের পোড়ানোর মত অনুভূতি দিতে থাকে। এইসব দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে সকাল হয়ে আসে, আমি নির্ঘুম বসে থাকি সূর্যের অপেক্ষায়। সকাল বেলা কলিং বেল বেজে উঠতেই দরজাটা খুলি, দেখি আট দশজন পুলিশ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অবাক হই, এত সকালে তারা আমার বাসায় কী করছে বুঝতে পারি না। সম্ভবত এলাকায় কোন ডাকাতি হয়েছে, তারা আমাদের নিরাপত্তা দিতে এসেছে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, কী ব্যাপার? তারা আমাকে ঠেলে হুড়মুড় করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঘরে ঢুকেই তারা প্রশ্ন করে, আপনার ঘরের মাচাই কি দুটো বেড়াল বসবাস করে? তারা কি প্রতিরাতে সঙ্গম করে?

আমি তাদের জানালাম, হ্যাঁ, তাদের নিয়ে আমি খুবই বিরক্ত। তারা তাদের কাজ করুক, দিনরাত সঙ্গম করুক, আমার কোন আপত্তি নেই; কিন্তু আমার ঘুম তারা চেঁচামেচি খিস্তিখেউর করে কেন ভাঙায়! কিন্তু সেসব যাই হোক, আপনারা এইসব প্রশ্ন কেন করছেন? এসবের সাথে আপনাদের কী সম্পর্ক?

তারা বললো, আপনাকে আমাদের সাথে ডিবি অফিসে যেতে হবে। আপনি এই রাষ্ট্রের প্রধান দু’টো রাজনৈতিক দল এবং তাদের নেতাদের সম্পর্কে অশালীন ও কটূক্তিমূলক চিন্তা করেছেন, ধর্মীয় বুজুর্গ মসজিদ হেফাজতকারী মোল্লা ইয়াকুব সাহেবকে নিয়ে মনে মনে কটূক্তি করেছেন; এতে একই সাথে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং ধর্ম অবমাননা ঘটেছে। “চিন্তা দমন আইন ২০১৩” অনুসারে আপনি আইন ভঙ্গ করেছেন যার শাস্তি দশ বছর জেল এবং এক কোটি টাকা জরিমানা। আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।
আমি হতভম্ব হয়ে বলি, আমি রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে কীভাবে বাজে চিন্তা করলাম? আমি তো আমার মাচার বেড়াল দু’টোকে মনে মনে গালি দিচ্ছিলাম!

তারা আমাকে বললো, আমাদের কী নির্বোধ মনে হয়? আমরা কী কিছুই বুঝি না মনে করেছেন?

অতঃপর!

ডিবি অফিসে একদিন রাখার পরে মাননীয় বিজ্ঞ আদালত রাষ্ট্রদ্রোহিতা, সংসদ অবমাননা, মাননীয় সাংসদ এবং রাজনৈতিক নেতৃবর্গ- দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী- ধর্ম এবং ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের সম্পর্কে কটূক্তিমূলক চিন্তার অভিযোগে “চিন্তা দমন আইন ২০১৩” আইনে আমার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন।

লেখাটি ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে থাকাকালীন লেখা, কয়েকটি টিস্যু পেপারে। 

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.

আসিফ মহিউদ্দীন

আসিফ মহিউদ্দীন সম্পাদক সংশয় - চিন্তার মুক্তির আন্দোলন [email protected]

Leave a comment

Your email will not be published.