ধর্ম

আমার চোখে ধর্ম – বেবী ইসলাম

( ধর্ম নিয়ে এ যাবৎকাল পৃথিবীর বিখ্যাত দার্শনিকগণ কোটি কোটি বাক্য বলেছেন। ধর্মের উদ্ভব, প্রচার এবং বিস্তার সম্পর্কে এখনও বলে চলেছে। মানুষ এবং মানুষের সমাজের যদ্দিন অস্তিত্ব থাকবে, তদ্দিন ধর্মের পক্ষে বিপক্ষে আলােচনাও থাকবে। আমি যেহেতু কোন দার্শনিক নই, নই কোন পণ্ডিত ব্যক্তি, দর্শনের এক পাতাও পড়িনি কখনও, জন্মসূত্রে সমাজে প্রচলিত একটি ধর্মের উত্তরাধিকারী, পেশায় চলচ্চিত্র শিল্পের একজন ক্ষুদে কারিগর, নিজস্ব অনুভূতিতে এই আটষট্টি বছর বয়সে মস্তিষ্কে ও হৃদয়ে ধর্মের যে ছাপ প্রােথিত হয়েছে এই লেখায় তারই প্রতিবিম্ব রচিত হবে। )

১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দে কোলকাতা শহরে আমার মা ছিলেন কোলকাতা কর্পোরেশনের ফ্রীপ্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষয়িত্রী।  ভাড়াটে বাসায় আমি এবং মা বসবাস করতাম। বাসা বদলের জন্য নতুন বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা পাকাপাকি করে পরদিন গেলাম অগ্রিম টাকা নিয়ে এগ্রিমেন্ট করার জন্য, বাড়িওলা যেই মাত্ৰ শুনলেন আমার মার নাম মােতাহারুন নেসা, সেইমাত্ৰ দুহাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন, বললেন, “মাফ করবেন, আমি হিন্দু ছাড়া কাউকে ঘর ভাড়া দেব না।”

১৯৯৫ খ্রীষ্টাব্দ। ঢাকা শহর। আমার সামনের বাড়ি খালি হল। বাড়ির মালিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত পদার্থ বিদ্যার অধ্যাপক বৈজ্ঞানিক। আমার পরিচিত ভদ্রলােক ভাড়া নেবার জন্য আমার কাছে এলেন, সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম। কথা হল, বাড়িওলা যখনই জানলেন ভদ্রলােক হিন্দু, কোন রকম দ্বিধা না করে বললেন, “আমি বুড়াে মানুষ নামাজ রােজা করি, মাথার ওপর হিন্দুকে ভাড়া দেব না।”

১৯৩৫-এ যা ছিল, ১৯৯৫তেও তাই। সময় বদলেছে, স্থান বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি সম্প্রদায়ের প্রতি সম্প্রদায়ের ঘৃণা, বিদ্বেষ। ধর্ম কি? বস্তু ও জীবের আচরণ। যেমন আগুনের ধর্ম পােড়ানাে। পানির ধর্ম ভেজানাে। বায়ুর ধর্ম প্রবাহ, উদ্ভিদের ধৰ্ম মাটি ভেদ করে ওঠা। জীবের ধর্ম বেঁচে থাকা। কীট-পতঙ্গ থেকে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সংগ্রাম করে চলেছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে। প্রথমে ছিল একক সংগ্রাম, পরবর্তীকালে মানুষ হললা যুথবদ্ধ। যৌথ সংগ্রাম জন্ম নিল সমাজের। সমাজে সৃষ্ট হলাে কিছু রীতিনীতি। বিধি, বিধান। বিধির প্রবক্ত। সমাজের বুদ্ধিমান ব্যক্তি। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক জীবনে নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হলাে। জটিলতার দূরীকরণ, সামাজিক শৃঙ্খলা স্থাপনের জন্য মনুষ্যসৃষ্ট বিধি বিধান কার্যকর অসম্ভব হয়ে দাড়ায়। তখনই অতিবুদ্ধিমান ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির সমাজে নিয়ে আসেন স্রষ্টা এবং স্রষ্টার বিধি বিধান। ইহকালের কৃতকর্মের জন্য পরকালের প্রাপ্তি। পুরস্কার এবং শক্তি। সামাজিক বিধি রূপান্তরিত হয়ে গেল অলৌকিক বিধানে। স্রষ্টার আইন, স্রষ্টার বিচার। না মেনে উপায় কি। সমাজের দুর্বল এবং নির্বোধশ্রেণী সবসময় এরা সংখ্যায় বেশি, মেনে নিল স্ৰষ্টাকে, পরকালকে নির্দ্বিধায়। মানুষের সংখ্যা বাড়ল, বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি গড়ে উঠলাে। গ্রাম, রাজ্য, দেশ। এক এক সভ্যতায় এলেন একজন প্রেরিত পুরুষ। প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক রীতিনীতির সাথে খাপ খাইয়ে প্রচার করলেন মানুষের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি। তাই হয়ে গেল ধৰ্ম। পৃথিবীর পূর্বে, পশ্চিমে, উত্তরে দক্ষিণে একই জিনিস ভিন্ন নামে মানুষ গ্রহণ করল। দজল্যফোরাতের অববাহিকা থেকে ভূমধ্য সাগরের পূর্ব তীর পর্যন্ত সভ্যতার আদি বিকাশ ভূমি হওয়ায় প্রেরিত পুরুষদের সংখ্যাধিক্য এখানেই বেশি।

মুসা, ইসাা, মােহাম্মদ, জরথুস্ট্র, বুদ্ধ, মহাবীর, নানক, চৈতন্য, কনফুসিয়াস, লাওচে, সবাই মানুষের মঙ্গলের জন্য তাদের চিন্তা চেতনা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন। কেউ ঈশ্বর বা স্ৰষ্টাকে গভীরভাবে আঁকড়ে ধরেছেন কেউ তাকে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু সবাই একই কথা বলেছেন। মানুষকে ভালবাস। কেউ বলেনি ঘৃণা করতে। আধুনিক পৃথিবীর কার্লমাক্সও একটি নূতন ধর্মের প্রবর্তক।।

সব ধর্মই যদি মানুষের মঙ্গলের কথা বলে তাহলে বর্তমান পৃথিবীতে ধর্মে ধর্মে এই ঘৃণা বিদ্বেষ লড়াই কেন? কেন চলেছিল বছরের পর বছর খ্রীস্টানদের ক্রুসেড, মুসলমানদের জেহাদ। আবার মুসলমানদের শিয়া সুন্নীর লড়াই। ভারতবর্ষ বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন ধর্মকে নিজের বুকে আশ্রয় দিয়েছে, লালন করেছে, বিকশিত হয়েছে এক অনন্য সাধারণ সভ্যতা সংস্কৃতির।

যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলমান শিখ পিরসীক জৈন, শাক্ত, বৈষ্ণব পাশাপাশি বাস করেছে একজন আরেকজনের সঙ্গে স্বাধীনভাবে ধর্ম আচরণ করেছে, অংশগ্রহণ করেছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে, বদল হয়েছে রাজা, সাধারণ মানুষ কিন্তু বদলায়নি। তারা একইসঙ্গে আযান দিয়েছে মসজিদে, ঘণ্টা বাজিয়েছে মন্দিরে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বুদ্ধের ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রবল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার কিছুতেই রােধ করা যাচ্ছিল না, তখনই ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবক্তরা স্লোগান দিলেন বুদ্ধদেব তাদেরই একজন অবতার। পৌরাণিক নবম অবতার হিসাবে বুদ্ধদেবের স্বীকৃতি মিলল। অর্থাৎ মেনে নেয়াটা বােকামি নয় বাস্তবকে স্বীকার করা।

চৈতন্যদেব, ইসলামের সাম্যবাদ অর্থাৎ একই সঙ্গে সবমানুষ স্রষ্টার আরাধনা করতে পারে কোন বিভেদ নেই, এই সার বিষয়টুকু গ্রহণ করে প্রচার করেছিলেন বৈষ্ণবধর্ম। কোন আচার নেই, কোন সংস্কার নেই, কোন পূজ্য নেই, শুধু নাম কীর্তন। যার ভাল লেগেছে গ্রহণ করেছে, ভাললাগে নাই যার, গ্রহণ করেনি। তাই বলে চৈতন্যদেবের মতবাদকে বাতিল বলে উড়িয়ে দেন নি। অথচ অর্থনৈতিক রাজনৈতিক কারণে ধর্ম যখন স্বাৰ্থান্ধ মানুষের হাতে ব্যবহৃত হতে লাগলাে তখনই ধর্ম তার ধর্ম হারালাে। অতীতে পুরােহিত, রাজা। বর্তমানে সমাজপতি তথা রাজনৈতিক নেতাদের হাতে ধর্ম হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, যাকে যখন যেমন ইচ্ছা আকৃতি দেওয়া যায়। আর সেই খেলার আহুতি দিচ্ছে সমস্ত পৃথিবীর নিরীহ এবং ধর্মবিশ্বাসী মনুষ্য সন্তানগণ।
যে ধর্ম এসেছিল মানুষকে ভালবাসার আহ্বান জানিয়ে সেই ধর্ম টিকে থাকবে যতদিন মানুষ থাকবে, সমাজ থাকবে, পৃথিবী থাকবে। যদিও বার বার কলুষিত হচ্ছে স্বাৰ্থান্ধ তথাকথিত মানুষদের হাতে, তবুও বলছি ধর্ম আছে, ধর্ম থাকবে, হয়তাে ঈশ্বর থাকবে না। মানুষ থাকবে, থাকবে মানুষেরই ধর্ম।

শুধু বিগ্রহের মাথায় ফুল চড়ানো ও পাঁচবার মাথাঠোকা ধর্ম নয়।

সম্পাদকের কথাঃ শ্রদ্ধেয় বেবী ইসলামের এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল “দুই বাংলার যুক্তিবাদীদের চোখে ধর্ম” বইতে। প্রচুর পরিশ্রমের পরে লেখাগুলোকে নাস্তিক্য ডট কমে ক্রমান্বয়ে যুক্ত করা হচ্ছে।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.

2 thoughts on

Leave a comment

Your email will not be published.