ইসরায়েল-ফিলিস্তিন অঞ্চলের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ–খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দ (History of the Israel-Palestine Region, Antiquity–63 BCE): কানান, ইসরায়েল ও স্বাধীন জুদিয়ার উত্থান
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 দক্ষিণ লেভান্টের ভূমি ও প্রাচীন ভিত্তি (Land and Ancient Foundations of the Southern Levant): ভূগোল, কানান ও প্রাচীন সমাজ
- 2.1 ভূগোল, জলবায়ু ও কৌশলগত অবস্থান (Geography, Climate and Strategic Location): তিন মহাদেশের সেতু
- 2.1.1 লেভান্টের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও ভূতাত্ত্বিক বিভাজন
- 2.1.2 জলবায়ুর অনিশ্চয়তা এবং মানব বসতির অভিযোজন
- 2.1.3 আন্তঃমহাদেশীয় সংযোগস্থল ও প্রাচীন বাণিজ্যপথের অর্থনীতি
- 2.1.4 ভূ-কৌশলগত দুর্বলতা এবং সাম্রাজ্যিক শক্তির ক্রীড়নক
- 2.1.5 ভূমির মালিকানা, কৃষি অর্থনীতি ও সামাজিক স্তরবিন্যাস
- 2.1.6 ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে মিথোলজির দ্বন্দ্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ
- 2.2 প্রাগৈতিহাসিক বসতি ও কৃষির সূচনা (Prehistoric Settlements and Early Agriculture): স্থায়ী জীবনের শুরু
- 2.2.1 প্রত্নপ্রস্তর যুগের যাযাবর জীবন এবং পরিবেশগত অভিযোজন
- 2.2.2 নাতুফিয়ান সংস্কৃতির উত্থান এবং আধা-স্থায়ী বসতির সূচনা
- 2.2.3 নিওলিথিক বিপ্লব এবং কৃষির পদ্ধতিগত বিকাশ
- 2.2.4 প্রাক-মৃৎপাত্র নিওলিথিক যুগ এবং জেরিকোর বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস
- 2.2.5 মৃৎপাত্রের উদ্ভাবন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণ
- 2.2.6 চালকোলিথিক যুগ এবং তামার ব্যবহার: জটিল সমাজের দিকে যাত্রা
- 2.3 কানানীয় সভ্যতা ও নগররাষ্ট্র (Canaanite Civilization and City-States): ব্রোঞ্জ যুগের রাজনীতি
- 2.3.1 কানানীয় পরিচয়ের উন্মেষ ও ব্রোঞ্জ যুগের রাজনৈতিক রূপরেখা
- 2.3.2 নগররাষ্ট্রের উদ্ভব ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
- 2.3.3 ব্রোঞ্জ যুগের অর্থনীতি, বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ও সামাজিক স্তরবিন্যাস
- 2.3.4 কানানীয় ধর্মীয় কাঠামো, মিথলজি ও প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা
- 2.3.5 আন্তর্জাতিক কূটনীতি, পরাশক্তির হস্তক্ষেপ ও বাফার জোন
- 2.3.6 নগররাষ্ট্রের পতন ও ব্রোঞ্জ যুগের কাঠামোগত অবসান
- 2.4 মিশরীয় প্রভাব ও কানানের অধীনতা (Egyptian Influence and Canaanite Subordination): সাম্রাজ্যের ছায়া
- 2.4.1 প্রাচীন মিশরের সম্প্রসারণ নীতি ও কানানের কৌশলগত গুরুত্ব
- 2.4.2 হিকসোসদের পতন ও নতুন রাজ্যের সাম্রাজ্যিক উত্থান
- 2.4.3 প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অধীনতামূলক মিত্রতার কাঠামো
- 2.4.4 অর্থনৈতিক শোষণ, বাণিজ্য ও সম্পদের অসম প্রবাহ
- 2.4.5 আমারনা পত্র ও কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
- 2.4.6 সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ও মিশরীয় আধিপত্যের ঐতিহাসিক অবসান
- 2.5 হিত্তি, মিতানি ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা (Hittites, Mitanni and Regional Rivalry): কানানের ক্ষমতার খেলা
- 2.5.1 মিতানি সাম্রাজ্যের উত্থান ও লেভান্টে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ
- 2.5.2 হিত্তি সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ও আনাতোলীয় পরাশক্তির আত্মপ্রকাশ
- 2.5.3 কানানের বাফার জোন ও পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধ
- 2.5.4 কাদেশের যুদ্ধ ও প্রাচীন বিশ্বের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য
- 2.5.5 বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তি ও কূটনৈতিক বিপ্লব
- 2.5.6 সাম্রাজ্যিক দ্বন্দ্বে কানানীয় সমাজের রূপান্তর ও অর্থনৈতিক অভিঘাত
- 2.6 ব্রোঞ্জ যুগের পতন ও নতুন জনগোষ্ঠী (Bronze Age Collapse and New Peoples): পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন
- 2.6.1 শেষ ব্রোঞ্জ যুগের কাঠামোগত পতন ও ভৌগোলিক বিপর্যয় (Structural Collapse and Geographical Catastrophe): ব্যবস্থার অন্তর্ধান
- 2.6.2 সমুদ্রের মানুষ এবং ফিলিস্তীয়দের উপকূলীয় আধিপত্য (Sea Peoples and Philistine Coastal Dominance): নতুন শক্তির প্রবেশ
- 2.6.3 পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি ও ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার উন্মেষ (Highland Settlements and Emergence of Israelite Identity): মিথ বনাম ইতিহাস
- 2.6.4 প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং লৌহ যুগের সূচনা (Technological Transformation and the Dawn of the Iron Age): অর্থনীতির নতুন ভিত্তি
- 2.6.5 সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস (Reconfiguration of Social and Political Power): উপজাতীয় কাঠামো থেকে রাষ্ট্রের দিকে
- 2.7 প্রত্নতত্ত্ব, আর্কিওজেনেটিক্স ও দক্ষিণ লেভান্টের জনগোষ্ঠী (Archaeology, Archaeogenetics and the Peoples of the Southern Levant): উৎপত্তির বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান
- 2.7.1 প্রাগৈতিহাসিক ভিত্তি ও জেনেটিক ধারাবাহিকতা (Prehistoric Foundations and Genetic Continuity)
- 2.7.2 ব্রোঞ্জ যুগের জিনপ্রবাহ ও কানানীয়দের মিশ্র পরিচয় (Bronze Age Gene Flow and the Mixed Identity of Canaanites)
- 2.7.3 লৌহ যুগের জনমিতিক রূপান্তর ও ফিলিস্তীয়দের উৎস (Demographic Transformation of the Iron Age and Origins of the Philistines)
- 2.7.4 ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্ভব (Archaeological Emergence of the Israelite Identity)
- 2.7.5 সাম্রাজ্যিক শাসন ও জনতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা (Imperial Rule and Demographic Stability)
- 2.7.6 আধুনিক জনগোষ্ঠীর শেকড় ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা (Roots of Modern Populations and Scientific Reality)
- 2.1 ভূগোল, জলবায়ু ও কৌশলগত অবস্থান (Geography, Climate and Strategic Location): তিন মহাদেশের সেতু
- 3 ইসরায়েলীয়দের উত্থান ও বাইবেলীয় রাজ্যসমূহ (Rise of the Israelites and Biblical Kingdoms): জাতিসত্তা, রাজনীতি ও ধর্মীয় পরিচয়
- 3.1 ইসরায়েলীয় জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব (Emergence of the Israelites): পরিচয়ের সূচনা
- 3.1.1 মেসনেপতাহ স্টিলি এবং প্রথম ঐতিহাসিক উল্লেখ (Merneptah Stele and the First Historical Mention)
- 3.1.2 মিথলজি বনাম প্রত্নতত্ত্ব: এক্সোডাস বা প্রস্থানের আখ্যান (Mythology vs. Archaeology: The Narrative of Exodus)
- 3.1.3 স্থানীয় কানানীয় শিকড় ও গ্রামীণ রূপান্তর (Local Canaanite Roots and Rural Transformation)
- 3.1.4 আর্কিওজেনেটিক্স ও স্থানীয় কানানীয় উত্তরাধিকার (Archaeogenetics and Local Canaanite Ancestry)
- 3.1.5 বস্তুগত সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার সীমানা (Material Culture and Ethnic Boundaries)
- 3.1.6 যাযাবর জীবন থেকে কৃষিভিত্তিক সমাজে উত্তরণ (Transition from Nomadic Life to Agrarian Society)
- 3.1.7 উপজাতীয় কনফেডারেশন ও নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ (Tribal Confederation and New Political Polarization)
- 3.2 ফিলিস্তীয়, ফিনিশীয় ও প্রতিবেশী সমাজ (Philistines, Phoenicians and Neighboring Societies): প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উত্থান
- 3.2.1 লেভান্টের ভূরাজনৈতিক রূপান্তর ও ফিলিস্তীয়দের আগমন (Geopolitical Transformation of the Levant and the Arrival of the Philistines)
- 3.2.2 ফিলিস্তীয় নগররাষ্ট্র, অর্থনীতি ও বস্তুগত সংস্কৃতি (Philistine City-States, Economy and Material Culture)
- 3.2.3 ফিনিশীয়দের সামুদ্রিক সাম্রাজ্য ও বাণিজ্যের বিস্তার (Maritime Empire and Trade Expansion of the Phoenicians)
- 3.2.4 ফিনিশীয় ধর্মীয় প্রথা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব (Phoenician Religious Practices and Cultural Influence)
- 3.2.5 ট্রান্সজর্ডানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি (Neighboring States of Transjordan and Political Dynamics)
- 3.2.6 ইসরায়েলীয়দের সাথে প্রতিবেশী সমাজগুলোর মিথস্ক্রিয়া ও সংঘাত (Interaction and Conflict of Neighboring Societies with the Israelites)
- 3.3 উপজাতীয় কনফেডারেশন ও প্রাথমিক ধর্ম (Tribal Confederation and Early Religion): কেন্দ্রহীন সমাজ
- 3.3.1 ঐতিহাসিক বাস্তবতা বনাম ধর্মীয় মিথোলজি (Historical Reality vs. Religious Mythology)
- 3.3.2 কেন্দ্রহীন সমাজ ও উপজাতীয় কনফেডারেশন (Stateless Society and Tribal Confederation)
- 3.3.3 শাফেত বা বিচারকদের ভূমিকা ও স্থানীয় নেতৃত্ব (Role of Judges and Local Leadership)
- 3.3.4 পাহাড়ি বসতির অর্থনীতি ও কৃষিজীবী জীবন (Economy of Highland Settlements and Agrarian Life)
- 3.3.5 প্রাথমিক ধর্মীয় বিশ্বাস ও কানানীয় শেকড় (Early Religious Beliefs and Canaanite Roots)
- 3.3.6 বহু-ঈশ্বরবাদ থেকে একশ্বরবাদের দিকে যাত্রা (Transition from Polytheism to Monotheism)
- 3.4 ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের ধারণা (Idea of the United Monarchy): সাউল, ডেভিড, সলোমন
- 3.4.1 উপজাতীয় ব্যবস্থা থেকে রাজতন্ত্রে উত্তরণ (Transition from Tribal System to Monarchy)
- 3.4.2 সাউলের উত্থান ও প্রাথমিক রাষ্ট্রগঠন (Rise of Saul and Early State Formation)
- 3.4.3 ডেভিডের রাজত্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা (Reign of David and Historical Reality)
- 3.4.4 সলোমনের যুগ ও প্রশাসনিক কাঠামো (Era of Solomon and Administrative Structure)
- 3.4.5 প্রত্নতাত্ত্বিক বিতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব (Archaeological Debate and the Existence of the United Monarchy)
- 3.4.6 মিথোলজি ও ইতিহাসের বিভাজন রেখা (Dividing Line Between Mythology and History)
- 3.5 জেরুজালেম, মন্দির ও রাজকীয় ক্ষমতা (Jerusalem, Temple and Royal Power): পবিত্র রাজধানীর নির্মাণ
- 3.5.1 জেরুজালেমের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব (Geographical and Strategic Importance of Jerusalem)
- 3.5.2 জেবুসীয় নগরী থেকে ডেভিডের শহর (From Jebusite City to the City of David)
- 3.5.3 প্রথম মন্দির নির্মাণ ও স্থাপত্যশৈলী (Construction and Architectural Style of the First Temple)
- 3.5.4 ধর্ম ও রাজনীতির সংমিশ্রণ (Amalgamation of Religion and Politics)
- 3.5.5 রাজকীয় আমলাতন্ত্র ও অর্থনীতির কেন্দ্রীকরণ (Royal Bureaucracy and Centralization of Economy)
- 3.5.6 প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা বনাম ধর্মীয় আখ্যান (Archaeological Reality vs. Religious Narrative)
- 3.6 ইসরায়েল ও জুদাহর বিভক্ত রাজ্য (Divided Kingdoms of Israel and Judah): রাজনীতির বিভাজন
- 3.6.1 ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের পতন ও বিভাজনের আর্থ-সামাজিক কারণ (Fall of the United Monarchy and Socio-Economic Causes of Division)
- 3.6.2 উত্তরের ইসরায়েল রাজ্য ও তার ভৌগোলিক সুবিধা (Northern Kingdom of Israel and Its Geographical Advantages)
- 3.6.3 ওম্রি রাজবংশ, সামারিয়া এবং আঞ্চলিক আধিপত্য (Omride Dynasty, Samaria and Regional Hegemony)
- 3.6.4 দক্ষিণের জুদাহ রাজ্য ও জেরুজালেমের বিচ্ছিন্নতা (Southern Kingdom of Judah and the Isolation of Jerusalem)
- 3.6.5 ধর্মীয় মিথোলজি বনাম প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা (Religious Mythology vs. Archaeological Reality)
- 3.6.6 দুই রাজ্যের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক ও সংঘাত (Geopolitical Relations and Conflicts Between the Two Kingdoms)
- 3.7 নবী, রাজনীতি ও সামাজিক সমালোচনা (Prophets, Politics and Social Critique): ধর্মীয় প্রতিবাদের ভাষা
- 3.7.1 প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে নবীত্বের ধারণা ও উৎপত্তি (Concept and Origin of Prophecy in the Ancient Near East)
- 3.7.2 ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নবীদের দ্বন্দ্ব (Conflict Between Religious Institutions and Prophets)
- 3.7.3 আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও নবীদের প্রতিবাদ (Socio-Economic Inequality and Prophetic Protest)
- 3.7.4 ভূরাজনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে নবী (Geopolitical Crisis and Prophets as Political Commentators)
- 3.7.5 মিথোলজি, ঐশ্বরিক দাবি ও প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা (Mythology, Divine Claims and Archaeological Reality)
- 3.7.6 সাহিত্যের বিবর্তন ও নবীভিত্তিক গ্রন্থের সংকলন (Evolution of Literature and the Compilation of Prophetic Texts)
- 3.8 অ্যাসিরীয় বিজয় ও ইসরায়েলের পতন (Assyrian Conquest and Fall of Israel): উত্তর রাজ্যের অবসান
- 3.8.1 নিও-অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও ভূরাজনৈতিক সম্প্রসারণ (Rise of the Neo-Assyrian Empire and Geopolitical Expansion)
- 3.8.2 লেভান্টের অর্থনীতি এবং অ্যাসিরীয় করব্যবস্থা (Economy of the Levant and the Assyrian Taxation System)
- 3.8.3 ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক বিদ্রোহ (Internal Politics and Military Rebellions of Israel)
- 3.8.4 সাইরো-ইফ্রাইমাইট যুদ্ধ ও রাজনৈতিক জোটের ব্যর্থতা (Syro-Ephraimite War and the Failure of Political Alliances)
- 3.8.5 সামারিয়ার পতন ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ (Fall of Samaria and Archaeological Evidences)
- 3.8.6 নির্বাসন, জনসংখ্যা স্থানান্তর ও দশটি হারানো উপজাতির মিথ (Exile, Population Transfer and the Myth of the Ten Lost Tribes)
- 3.9 ব্যাবিলনীয় বিজয় ও জুদাহর পতন (Babylonian Conquest and Fall of Judah): নির্বাসনের শুরু
- 3.9.1 নিও-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও লেভান্টের ভূরাজনীতি (Rise of the Neo-Babylonian Empire and Geopolitics of the Levant)
- 3.9.2 জুদাহর দোদুল্যমান কূটনীতি ও মিশরের প্ররোচনা (Vacillating Diplomacy of Judah and Egyptian Instigation)
- 3.9.3 প্রথম ব্যাবিলনীয় অবরোধ ও রাজা জেহোয়াকিনের নির্বাসন (First Babylonian Siege and the Exile of King Jehoiachin)
- 3.9.4 সিদিকিয়ার বিদ্রোহ ও জেরুজালেমের চূড়ান্ত অবরোধ (Rebellion of Zedekiah and the Final Siege of Jerusalem)
- 3.9.5 জেরুজালেমের পতন, মন্দির ধ্বংস ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ (Fall of Jerusalem, Destruction of the Temple and Archaeological Evidence)
- 3.9.6 ব্যাবিলনীয় নির্বাসন ও জুদাহর জনতাত্ত্বিক শূন্যতা (Babylonian Exile and the Demographic Void of Judah)
- 3.1 ইসরায়েলীয় জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব (Emergence of the Israelites): পরিচয়ের সূচনা
- 4 নির্বাসন, প্রত্যাবর্তন ও স্বাধীন জুদিয়ার উত্থান (Exile, Return and the Rise of Independent Judea): সাম্রাজ্য থেকে স্বশাসনে
- 4.1 ব্যাবিলনীয় নির্বাসন ও ইহুদি পরিচয়ের পুনর্গঠন (Babylonian Exile and Jewish Identity): জাতিস্মৃতির রূপান্তর
- 4.1.1 নির্বাসিত জীবন ও ব্যাবিলনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা (Exiled Life and the Socio-Economic Reality of Babylon)
- 4.1.2 ধর্মীয় সংকটের মনস্তত্ত্ব ও থিওডিসি (Psychology of Religious Crisis and Theodicy)
- 4.1.3 গ্রন্থভিত্তিক ধর্মের উদ্ভব ও লেখনীর রূপান্তর (Emergence of Text-Based Religion and Transformation of Writing)
- 4.1.4 সিনাগগ, বিশ্রামবার ও নতুন ধর্মীয় প্রথার বিকাশ (Synagogue, Sabbath and the Development of New Religious Practices)
- 4.1.5 জাতিস্মৃতির নির্মাণ ও পৌরাণিক আখ্যানের রাজনৈতিক ব্যবহার (Construction of National Memory and Political Use of Mythological Narratives)
- 4.1.6 পারসিক বিজয়, সাইরাস সিলিন্ডার ও প্রত্যাবর্তনের ভূরাজনীতি (Persian Conquest, Cyrus Cylinder and Geopolitics of Return)
- 4.2 পারসিক শাসন ও প্রত্যাবর্তন (Persian Rule and the Return): পুনর্গঠনের যুগ
- 4.2.1 পারসিক সাম্রাজ্যিক নীতি ও ইয়েহুদ প্রদেশ (Persian Imperial Policy and the Province of Yehud)
- 4.2.2 প্রত্যাবর্তনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও দ্বিতীয় মন্দির (Socio-Economic Reality of the Return and the Second Temple)
- 4.2.3 স্থানীয় জনগোষ্ঠী বনাম প্রত্যাবর্তনকারী সমাজ (Local Population vs. Returnee Community)
- 4.2.4 এজরা ও নেহেমিয়াহর সংস্কার এবং সামাজিক সীমানা (Reforms of Ezra and Nehemiah and Social Boundaries)
- 4.2.5 পারসিক যুগে জেরুজালেমের অর্থনীতি ও করব্যবস্থা (Economy and Taxation of Jerusalem in the Persian Period)
- 4.2.6 ধর্মীয় গ্রন্থের সংকলন ও নতুন পরিচয়ের ভিত্তি (Compilation of Religious Texts and the Foundation of New Identity)
- 4.3 দ্বিতীয় মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (Second Temple and Religious Institutions): নতুন ধর্মীয় কাঠামো
- 4.3.1 দ্বিতীয় মন্দিরের নির্মাণ ও পুরোহিততন্ত্রের উত্থান (Construction of the Second Temple and the Rise of Priesthood)
- 4.3.2 অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে মন্দির ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা (The Temple as an Economic Center and Wealth Management)
- 4.3.3 ধর্মীয় আচারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্নতা (Institutionalization of Religious Rituals and the Alienation of the Masses)
- 4.3.4 তোরাহ বা লিখিত আইনের প্রবর্তন ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ (Introduction of the Torah as Written Law and Social Control)
- 4.3.5 নতুন ধর্মীয় বিশ্বাস, পারসিক প্রভাব ও মিথোলজির বিবর্তন (New Religious Beliefs, Persian Influence and the Evolution of Mythology)
- 4.3.6 ধর্মীয় অভিজাত বনাম প্রান্তিক গোষ্ঠী এবং সামারিটান বিভাজন (Religious Elite vs. Marginalized Groups and the Samaritan Schism)
- 4.4 আলেকজান্ডার ও হেলেনিস্টিক প্রভাব (Alexander and Hellenistic Influence): গ্রিক বিশ্বের আগমন
- 4.4.1 আলেকজান্ডারের দিগ্বিজয় ও লেভান্টের রাজনৈতিক পালাবদল (Alexander’s Conquest and the Political Shift of the Levant)
- 4.4.2 হেলেনীয় সংস্কৃতির বিস্তার ও নগর-পরিকল্পনার রূপান্তর (Spread of Hellenistic Culture and Transformation of Urban Planning)
- 4.4.3 টলেমি ও সেলিউসিড শাসন: দুই সাম্রাজ্যের টানাপোড়েন (Ptolemaic and Seleucid Rule: Tug of War Between Two Empires)
- 4.4.4 ভাষা, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গ্রিকীকরণ (Hellenization of Language, Administration, and Economic Structure)
- 4.4.5 ইহুদি সমাজে বিভাজন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত (Division in Jewish Society and Intellectual Conflict)
- 4.4.6 মিথোলজির বিবর্তন ও গ্রিক দর্শনের প্রভাব (Evolution of Mythology and the Influence of Greek Philosophy)
- 4.5 সেলিউসিড শাসন ও ধর্মীয় সংঘাত (Seleucid Rule and Religious Conflict): সংস্কৃতি বনাম বিশ্বাস
- 4.5.1 সেলিউসিড সাম্রাজ্যের ভূরাজনীতি ও জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ (Geopolitics of the Seleucid Empire and the Control of Jerusalem)
- 4.5.2 হেলেনীয় সংস্কৃতির বিস্তার ও ইহুদি সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন (Spread of Hellenistic Culture and Internal Division of Jewish Society)
- 4.5.3 অ্যান্টিওকাস এপিফেনেস ও জেরুজালেমের ওপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ (Antiochus Epiphanes and Direct Intervention in Jerusalem)
- 4.5.4 ধর্মীয় রীতিনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা ও মিথোলজির রাজনীতি (Ban on Religious Practices and the Politics of Mythology)
- 4.5.5 মাকাবি বিদ্রোহের আর্থ-সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক রূপান্তর (Socio-Economic Foundation of the Maccabean Revolt and Political Transformation)
- 4.5.6 স্বাধীন হাসমোনীয় রাষ্ট্রের উত্থান ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের পরিণতি (Rise of the Independent Hasmonean State and the Consequences of Religious Nationalism)
- 4.6 মাকাবি বিদ্রোহ ও হাসমোনীয় রাষ্ট্র (Maccabean Revolt and Hasmonean State): স্বশাসনের পুনর্জন্ম
- 4.6.1 গ্রামীণ অসন্তোষ, সেলিউসিড ডিক্রি ও বিদ্রোহের সূচনা (Rural Discontent, Seleucid Decree and the Outbreak of the Rebellion)
- 4.6.2 গেরিলা যুদ্ধকৌশল, সামরিক সাফল্য ও জেরুজালেম পুনর্দখল (Guerilla Warfare, Military Success and the Recapture of Jerusalem)
- 4.6.3 জোনাথন ও সাইমনের কূটনীতি এবং স্বশাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Diplomacy of Jonathan and Simon and the Institutionalization of Self-Rule)
- 4.6.4 হাসমোনীয় রাজতন্ত্রের বিস্তার, হেলেনীকরণ ও স্বৈরতান্ত্রিক রূপান্তর (Expansion of the Hasmonean Monarchy, Hellenization and Autocratic Transformation)
- 4.6.5 সমাজকাঠামোর বিভাজন: ফ্যারিসি, সাদ্দুসি ও এসেনীয়দের বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত (Division of Social Structure: Intellectual Conflict of the Pharisees, Sadducees and Essenes)
- 4.6.6 রাজবংশের পতন, রোমান হস্তক্ষেপ ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন (Fall of the Dynasty, Roman Intervention and Historical Evaluation of Religious Nationalism)
- 4.1 ব্যাবিলনীয় নির্বাসন ও ইহুদি পরিচয়ের পুনর্গঠন (Babylonian Exile and Jewish Identity): জাতিস্মৃতির রূপান্তর
- 5 উপসংহার
- 6 তথ্যসূত্র
ভূমিকা
ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলের এক চিলতে ভূখণ্ড, যা দক্ষিণ লেভান্ট নামে পরিচিত, মানব ইতিহাসের অন্যতম জটিল এক রঙ্গমঞ্চ। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ঠিক সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলটি সব সময়ই একটি উন্মুক্ত করিডোর হিসেবে কাজ করেছে। এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই মূলত নির্ধারণ করে দিয়েছিল এখানকার মানুষের নিয়তি। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দে রোমান সেনাপতি পম্পেইয়ের আগমনের আগ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের ইতিহাস কোনো রৈখিক বা সরল গল্প নয়। বরং, এটি অসংখ্য ছোট-বড় জনগোষ্ঠীর উত্থান, সংঘাত এবং বিলুপ্তির এক নিরবচ্ছিন্ন আখ্যান। ইতিহাস চর্চায় এই অঞ্চলটিকে প্রায়শই ধর্মীয় আবেগের চশমা দিয়ে দেখা হয়। ফলে ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর পাতায় লেখা মিথলজি বা পৌরাণিক আখ্যানগুলোই অনেক সময় একচেটিয়া ইতিহাসের রূপ ধারণ করে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিতে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, এখানকার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগুলো কোনো আকাশ থেকে নাজিল হওয়া ঐশ্বরিক নির্দেশনায় গড়ে ওঠেনি। এগুলো ছিল মানুষের টিকে থাকার তাগিদ, সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তুসংস্থানিক অভিযোজন (Ecological Adaptation)-এর নিরেট পার্থিব ফলাফল।
প্রাগৈতিহাসিক কৃষিব্যবস্থার সূচনা থেকে শুরু করে ব্রোঞ্জ যুগের কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর বিকাশ প্রমাণ করে যে, এই ভূখণ্ডে মানব সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল অত্যন্ত ধীর এবং ধারাবাহিক এক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কানানীয়রা কোনো একক সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারেনি। খণ্ডিত ভূপ্রকৃতির কারণে তারা ছোট ছোট স্বাধীন রাজনৈতিক এককে বিভক্ত ছিল। ফলে মিশর বা হিত্তিদের মতো বিশাল সাম্রাজ্যগুলোর কাছে তারা প্রায়শই ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীকালে ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর যে এক বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা (Power Vacuum) তৈরি হয়, ঠিক সেই সুযোগেই ইসরায়েলীয়, ফিলিস্তীয় এবং অন্যান্য নতুন জাতিসত্তার উদ্ভব ঘটে। এই জাতিসত্তাগুলোর বিকাশ কোনো আকস্মিক বহিরাগত আক্রমণের ফসল ছিল না। প্রত্নতত্ত্ব এবং আধুনিক আর্কিওজেনেটিক্স পরিষ্কারভাবে দেখায় যে, নতুন এই পরিচয়গুলো মূলত স্থানীয় কানানীয় জনগোষ্ঠীরই আর্থসামাজিক রূপান্তর এবং ধীরগতির জনতাত্ত্বিক মিশ্রণ (Demographic Admixture)-এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল। পরিচয় নির্মাণের এই প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল, যেখানে ধর্ম, ভাষা এবং বস্তুগত সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে।
এই দীর্ঘ সময়কালের ইতিহাস পাঠের মূল উদ্দেশ্য হলো, সাম্রাজ্যিক আগ্রাসন এবং স্থানীয় স্বশাসনের মধ্যকার সেই চিরন্তন দ্বন্দ্বকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা। অ্যাসিরীয়দের নির্মম সামরিক অভিযান, ব্যাবিলনীয় নির্বাসন কিংবা হেলেনিস্টিক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ – প্রতিটি ঘটনাই এই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই প্রভাবগুলোই শেষ পর্যন্ত মাকাবি বিদ্রোহের মতো রাজনৈতিক বিস্ফোরণের জন্ম দেয় এবং হাসমোনীয়দের অধীনে একটি স্বাধীন জুদিয়া রাষ্ট্রের উত্থান ঘটায়। এই পুরো পর্যায়টিকে কেবল কয়েকটি রাজবংশের উত্থান-পতন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আসলে এটি হলো আদর্শিক বিবর্তন (Ideological Evolution) এবং রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের এক ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আমাদের এই যাত্রায় আমরা পুরাণ এবং ইতিহাসের মধ্যকার সীমারেখাকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করব। মাটির নিচের প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ এবং শিলালিপিগুলোর সাহায্যে আমরা সেই হারানো সময়কে পুনর্নির্মাণ করব, যেখানে মানুষের আসল ধর্ম ছিল রুক্ষ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা এবং প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া এক ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ রাখা।
দক্ষিণ লেভান্টের ভূমি ও প্রাচীন ভিত্তি (Land and Ancient Foundations of the Southern Levant): ভূগোল, কানান ও প্রাচীন সমাজ
ভূগোল, জলবায়ু ও কৌশলগত অবস্থান (Geography, Climate and Strategic Location): তিন মহাদেশের সেতু
লেভান্টের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও ভূতাত্ত্বিক বিভাজন
ভৌগোলিক দিক থেকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন অঞ্চলটি মূলত দক্ষিণ লেভান্টের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল বরাবর বিস্তৃত এই ভূখণ্ডের সীমানা প্রাকৃতিকভাবেই বেশ সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করেছে। পশ্চিমে দিগন্তবিস্তৃত ভূমধ্যসাগর, পূর্বে ঊষর সিরীয় মরুভূমি, উত্তরে লেবাননের বরফঢাকা পর্বতমালা এবং দক্ষিণে সিনাই উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ প্রান্তর এই অঞ্চলটিকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করেছে। সমাজবিজ্ঞানে একটি কথা চালু আছে যাকে ভৌগোলিক নিয়তিবাদ (Geographical Determinism) বলা হয়, আর এই ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে কথাটি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। আয়তনের দিক থেকে খুব একটা বড় না হলেও এই ভূখণ্ডের ভেতরের বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। এর প্রধান কারণ হলো এখানকার ভূতাত্ত্বিক গঠন, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে রূপায়িত হয়েছে। অঞ্চলটিকে মূলত চারটি সমান্তরাল ভৌগোলিক ফালিতে ভাগ করা যায়। পশ্চিমের একেবারে প্রান্তে রয়েছে উপকূলীয় সমভূমি, যা ভূমধ্যসাগরের জলরেখা ঘেঁষে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রলম্বিত। সমভূমিটি প্রাচীনকাল থেকেই বেশ উর্বর এবং যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক ছিল (Aharoni, 1979)। বণিক ও সামরিক বাহিনী উভয়ের জন্যই এই সমতল পথটি ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়।
উপকূলীয় সমভূমির ঠিক পূর্ব দিকেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চল। এই পাহাড়ি বলয়টি গালিলি, সামারিয়া এবং জুদিয়া – এই তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত। ভূ-প্রকৃতির দিক থেকে এটি বেশ বন্ধুর এবং এর মাটি মূলত চুনাপাথর দিয়ে গঠিত। প্রাচীনকালে পাহাড়গুলো দুর্গম অরণ্যে ঢাকা থাকায় সেখানে বড় কোনো সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীর পক্ষে সহজে প্রবেশ করা সম্ভব হতো না। দুর্গমতার কারণেই কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবেই অপেক্ষাকৃত স্বাধীনচেতা এবং বিচ্ছিন্ন জনবসতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পাহাড়ের ঢালগুলোতে কৃষিকাজ করা মোটেও সহজ ব্যাপার ছিল না। পাথর সরিয়ে ধাপ কেটে কেটে জমি তৈরি করার এই পদ্ধতিকে ধাপচাষ (Terrace Farming) বলা হয়। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই এখানকার আদিম মানুষেরা এক ধরনের স্বনির্ভর কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল (Mazar, 1990)। সমতলের বিলাসবহুল জীবন থেকে পাহাড়ের এই জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি সংগ্রামমুখর।
এই পাহাড়ি অঞ্চলের পূর্ব পাশেই রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম ভূতাত্ত্বিক ফাটল, যাকে জর্ডান রিফ্ট ভ্যালি (Jordan Rift Valley) বলা হয়। টেকটনিক প্লেটের চলনের ফলে সৃষ্টি হওয়া উপত্যকাটি এই অঞ্চলের ভূগোলে এক নাটকীয় মাত্রা যোগ করেছে। উপত্যকার বুক চিরে বয়ে গেছে জর্ডান নদী, যা উত্তরের গালিলি সাগর থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণের মৃত সাগরে গিয়ে পতিত হয়েছে। মৃত সাগর বা ডেড সি হলো পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে নিচু স্থান, যার জলের লবণাক্ততা সাধারণ সাগরের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এই উপত্যকার জলবায়ু এবং পরিবেশ আশেপাশের অঞ্চল থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। জর্ডান নদী পার হলেই পূর্বে ট্রান্সজর্ডান নামে পরিচিত মালভূমি শুরু হয়, আর দক্ষিণ দিকে এই পুরো ভূখণ্ড ধীরে ধীরে মিশে গেছে নেগেভ মরুভূমির শুষ্ক প্রান্তরে। এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ এত ছোট একটি জায়গায় অবস্থান করায় প্রাচীনকাল থেকেই এখানকার জনবসতি কখনো রাজনৈতিকভাবে একীভূত হতে পারেনি। খণ্ড খণ্ড ভৌগোলিক বিভাজন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিভাজনকেও অনিবার্য করে তুলেছিল (Smith, 2018)।
জলবায়ুর অনিশ্চয়তা এবং মানব বসতির অভিযোজন
ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলের জলবায়ু মূলত ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু (Mediterranean Climate) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ঋতুর উপস্থিতি। এখানে দেখা যায় বৃষ্টিবহুল আর্দ্র শীতকাল এবং চরম শুষ্ক গ্রীষ্মকাল। সাধারণ নিয়মের ভেতরেও এখানে রয়েছে প্রবল অনিশ্চয়তা। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কখনোই সুনির্দিষ্ট থাকে না, ফলে এক বছর প্রচুর বৃষ্টি হলেও পরের বছরই প্রচণ্ড খরা দেখা দিতে পারে। প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায় এই খরা আক্ষরিক অর্থেই জীবন ও মৃত্যুর নির্ধারক হিসেবে কাজ করত। মিশর বা মেসোপটেমিয়ার মানুষদের নীল নদ বা টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের মতো বিশাল এবং নির্ভরযোগ্য জলের উৎস ছিল। তাদের বিপরীতে লেভান্টের মানুষদের বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হতো আকাশের বৃষ্টির ওপর। এই বৃষ্টি নির্ভরতা একটি বিশেষ ধরনের অনিশ্চিত অর্থনীতি (Economy of Uncertainty) তৈরি করেছিল, যা এখানকার প্রাচীন মানুষদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছিল (Issar & Zohar, 2004)।
কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলেও, মাটির স্তরের নিচে চুনাপাথর থাকায় জল খুব দ্রুত শোষিত হয়ে যেত। পৃষ্ঠীয় জলের তীব্র অভাব দেখা যেত প্রায় সব জায়গাতেই। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এখানকার অধিবাসীরা পাথরের বুকে গর্ত খুঁড়ে জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় জলাধার (Cistern) বলা হয়। চৌবাচ্চাগুলোর ভেতরে চুনের প্রলেপ দিয়ে তাকে অভেদ্য করা হতো, যাতে শীতের বৃষ্টি ধরে রেখে দীর্ঘ শুষ্ক গ্রীষ্ম পার করা সম্ভব হয়। গ্রীষ্মের শুরুতে এবং শেষে মরুভূমি থেকে এক বিশেষ ধরনের শুষ্ক এবং উত্তপ্ত হাওয়া বইত, যাকে স্থানীয় ভাষায় খামসিন বা শারাভ বলা হয়। হাওয়াটি বইতে শুরু করলে চারপাশের সবুজ প্রান্তর কয়েক দিনের মধ্যেই বিবর্ণ হয়ে যেত। জলের এই চিরস্থায়ী সংকট এবং প্রকৃতির খেয়ালিপনা এই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে ভূমির প্রতি তীব্র এক অধিকারবোধ তৈরি করেছিল (Dever, 2003)।
জলবায়ুর এই বিভাজন একটি কাল্পনিক রেখা দিয়ে স্পষ্ট করা যায়, যাকে সমবর্ষণ রেখা বলা হয়। রেখার উত্তরের অঞ্চলগুলো কৃষি কাজের উপযোগী হওয়ায় সেখানে ঘন জনবসতি এবং নগর গড়ে ওঠে। রেখার দক্ষিণের জীবন ছিল মূলত মরুভূমির বাস্তবতার সাথে নিরন্তর সংগ্রাম। সেখানে স্থায়ী কৃষিভিত্তিক সমাজের বদলে যাযাবরদের উদ্ভব ঘটে, যারা যাযাবর পশুপালন (Pastoral Nomadism) ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভূগোলের তারতম্য একই ভূখণ্ডের ভেতরে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জীবনধারার জন্ম দেয়। উত্তরের কৃষিজীবী এবং দক্ষিণের যাযাবরদের মধ্যে সম্পদের বণ্টন নিয়ে প্রায়শই দ্বন্দ্ব লেগে থাকত। খরার বছরগুলোতে যাযাবরেরা তাদের পাল নিয়ে উত্তরের উর্বর ভূমিতে প্রবেশ করত, যা অনেক সময় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নিত। মানব বসতির এই অভিযোজন এবং তার ফলে সৃষ্ট দ্বন্দ্বগুলো মূলত পরিবেশগত বাধ্যবাধকতারই ফসল ছিল (Finkelstein & Silberman, 2001)।
আন্তঃমহাদেশীয় সংযোগস্থল ও প্রাচীন বাণিজ্যপথের অর্থনীতি
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি অঞ্চলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সামষ্টিক অবস্থান। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশের সংযোগস্থলে একটি সরু স্থলজ সেতুর মতো অবস্থান করছে এই ভূখণ্ড। প্রাচীন পৃথিবীতে সমুদ্রপথের চেয়ে স্থলপথের বাণিজ্যের ওপর মানুষ বেশি নির্ভরশীল ছিল। ফলে সরু সেতুটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান ধমনীতে পরিণত হয়। মিশরের সমৃদ্ধশালী সভ্যতা এবং উত্তরের মেসোপটেমিয়া বা আনাতোলিয়ার ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে যোগাযোগের প্রধান পথ ছিল এটি। একটি আদর্শ ভূ-কৌশলগত সংযোগস্থল (Geostrategic Hub) হওয়ার কারণে প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাণিজ্যপথ এই অঞ্চলের বুকের ওপর দিয়ে তৈরি হয়েছিল (Cline, 2014)। অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির আদান-প্রদান এই পথ ধরেই প্রসার লাভ করেছিল।
সবচেয়ে বিখ্যাত বাণিজ্যপথটির নাম ছিল ভায়া মারিস (Via Maris), বা সমুদ্রের পথ। পথটি মিশরের বদ্বীপ অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে সিনাইয়ের উত্তর উপকূল ধরে ফিলিস্তিনের সমভূমিতে প্রবেশ করত। কারমেল পর্বতের একটি সরু গিরিপথ – যাকে মেগিদ্দো বলা হয় – পার হয়ে এটি উত্তরের গালিলি অঞ্চল দিয়ে সোজা দামেস্ক এবং পরবর্তীতে মেসোপটেমিয়ার দিকে চলে যেত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই প্রধান সড়কটি নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ ছিল অপরিসীম সম্পদ এবং ক্ষমতার অধিকারী হওয়া। দূরপ্রাচ্যের মসলা, সাইপ্রাসের তামা, এবং মিশরের বিলাসবহুল পণ্য এই পথ দিয়েই এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে যেত। ভায়া মারিসের আশেপাশের সমভূমিগুলোতে দ্রুতই সমৃদ্ধশালী নগর গড়ে উঠতে শুরু করে। নগরগুলো বাণিজ্য থেকে শুল্ক আদায় করে বিপুল বিত্তের অধিকারী হয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয় (Levy, 1998)।
ভায়া মারিসের পাশাপাশি জর্ডান নদীর পূর্ব দিকের মালভূমি দিয়ে বিস্তৃত ছিল আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। এটি ইতিহাসে কিংস হাইওয়ে (King’s Highway) নামে পরিচিত। পথটি মূলত আরব উপদ্বীপ থেকে সুগন্ধি এবং মশলা নিয়ে উত্তরের দিকে যেত। দুটি প্রধান বাণিজ্যপথ ভূখণ্ডটিকে প্রাচীন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করে। তবে ভৌগোলিক সুবিধাই আবার অঞ্চলটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বাণিজ্যপথগুলো কেবল বণিকদের গন্তব্য ছিল না, এগুলো ছিল পরাশক্তিগুলোর সেনাবাহিনীর এগিয়ে যাওয়ার সহজ রুট। যেকোনো সাম্রাজ্য নিজেদের সীমানা বিস্তার করতে চাইলে তাদের প্রথম লক্ষ্যই ছিল এই বাণিজ্যপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া। সম্পদ এবং বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়ার কারণেই এই ভূমি হয়ে ওঠে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের নিরন্তর সংঘাতের এক রক্তাক্ত প্রান্তর (Knapp, 1988)।
ভূ-কৌশলগত দুর্বলতা এবং সাম্রাজ্যিক শক্তির ক্রীড়নক
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভূখণ্ডটি সর্বদাই দুটি বা ততোধিক বৃহৎ সাম্রাজ্যের মাঝখানে একটি বাফার জোন (Buffer Zone) বা বাফার রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান করেছে। এর একপাশে ছিল নীল নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা মিশরের পরাক্রমশালী ফারাওদের সাম্রাজ্য। অন্যদিকে, টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিসের তীরে পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠা অ্যাসিরীয়, ব্যাবিলনীয় এবং পারসিক সাম্রাজ্য। উত্তরের আনাতোলিয়ায় ছিল হিত্তিদের শক্ত ঘাঁটি। বড় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হলে তাদের রণক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াত ফিলিস্তিন বা লেভান্ট অঞ্চল। কেউই চাইত না শত্রু তাদের নিজ ভূখণ্ডে প্রবেশ করুক, তাই তারা মাঝখানের এই ভূমিতে এসে একে অপরের মোকাবেলা করত। ভূ-কৌশলগত বাস্তবতার কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী কখনোই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বা স্বাধীনভাবে বিকাশের সুযোগ পায়নি (Aharoni, 1979)।
ভৌগোলিক খণ্ডিতকরণ এই অঞ্চলের আরেকটি বড় দুর্বলতা ছিল। এখানকার নদী, পাহাড় এবং উপত্যকাগুলো ছোট ছোট পকেটের মতো বিভাজন তৈরি করেছিল। ফলে মিশর বা মেসোপটেমিয়ার মতো বিশাল কোনো একক সাম্রাজ্য এখানে ভেতর থেকে গড়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। পরিবর্তে এখানে গড়ে ওঠে অসংখ্য ছোট ছোট রাজনৈতিক একক, যাদেরকে নগররাষ্ট্র (City-State) বলা হয়। প্রতিটি নগরের নিজস্ব রাজা, সেনাবাহিনী এবং আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো ছিল। নগররাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে প্রায়শই দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকত। কোনো বড় পরাশক্তি আক্রমণ করলে এই খণ্ডিত নগরগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্ত কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারত না। তারা সহজেই বিদেশি শক্তির বশ্যতা স্বীকার করে কর প্রদান করতে বাধ্য হতো। রাজনৈতিক বিভাজন মূলত এখানকার ভূগোলেরই এক অবধারিত পরিণতি ছিল (Finkelstein & Silberman, 2001)।
পাহাড়ি অঞ্চলগুলো মাঝেমধ্যে এই সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীনভাবে টিকে থাকার সুযোগ পেত। ভায়া মারিস বা প্রধান বাণিজ্যপথগুলো সমভূমি দিয়ে যাওয়ায় বিদেশি সেনাবাহিনীগুলো পাহাড় এড়িয়ে সমভূমি ধরেই মার্চ করত। কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলের রুক্ষ ভূখণ্ডে কিছু স্থানীয় গোষ্ঠী আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করত। সমভূমির সাম্রাজ্যিক কাঠামো ভেঙে পড়লে বা বড় সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতার শূন্যতা দেখা দিলে পাহাড়ের গোষ্ঠীগুলো সমভূমিতে নেমে এসে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করত। ইতিহাস জুড়ে দেখা যায়, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র ভৌগোলিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির উত্থান-পতনের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে। ভূগোলের রূঢ় বাস্তবতা কখনোই এখানকার মানুষদের নিজস্ব কোনো নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সত্তা গঠনের দীর্ঘস্থায়ী সুযোগ দেয়নি, বরং তাদের সর্বদাই বহিরাগত শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে থাকতে হয়েছে (Smith, 2018)।
ভূমির মালিকানা, কৃষি অর্থনীতি ও সামাজিক স্তরবিন্যাস
ভূগোলের এই বৈচিত্র্য এখানকার আদিম অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। উত্তরের উপত্যকা এবং কেন্দ্রীয় পাহাড়ের ঢালগুলোতে একটি সুনির্দিষ্ট কৃষি অর্থনীতি (Agrarian Economy) গড়ে উঠেছিল। এখানকার কৃষির মূল ভিত্তি ছিল তিনটি ফসল – অলিভ বা জলপাই, আঙুর এবং গম। এই তিনটি শস্যকে ভূমধ্যসাগরীয় ত্রয়ী বলা হয়। ভূমির প্রকৃতি ঠিক করে দিত কোথায় কোন ফসলের আবাদ হবে। পাহাড়ের পাথুরে মাটিতে অলিভ গাছ খুব ভালো জন্মাতো, অন্যদিকে সমভূমিতে গমের আবাদ হতো। কৃষির এই ধরন কেবল মানুষের খাদ্যাভ্যাসই নির্ধারণ করেনি, বরং এটি সামাজিক কাঠামোরও ভিত্তি তৈরি করেছিল। যার হাতে আবাদযোগ্য উর্বর জমির নিয়ন্ত্রণ থাকত, সমাজে তার ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি সবচেয়ে বেশি হতো। জমির এই মালিকানার উপর ভিত্তি করেই সমাজে ধীরে ধীরে শ্রেণির উদ্ভব ঘটে (Levy, 1998)।
কৃষি উৎপাদনের এই উদ্বৃত্ত সম্পদকে কেন্দ্র করেই প্রাচীন নগরগুলোর বিকাশ ঘটে। নগরগুলো মূলত প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। শহরগুলো দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকত, তবে দেয়াল কেবল বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যই তৈরি হয়নি। দেয়ালগুলো ছিল গ্রামীণ কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা শস্য এবং সম্পদ নিরাপদে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা। শহরের অভিজাত সম্প্রদায় গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ওপর কর আরোপ করে নিজেদের বিলাসবহুল জীবন নিশ্চিত করত। গ্রামীণ উৎপাদক এবং শহুরে ভোক্তাদের এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট সামাজিক স্তরবিন্যাস (Social Stratification) তৈরি হয়। মেগিদ্দো বা হাজরের মতো বড় শহরগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বিশাল শস্যভাণ্ডার এবং সুরম্য প্রাসাদের অস্তিত্ব এই অসম সামাজিক কাঠামোরই প্রমাণ দেয় (Mazar, 1990)।
অন্যদিকে, পূর্বের মালভূমি এবং দক্ষিণের নেগেভ অঞ্চলে কৃষিকাজ সম্ভব না হওয়ায় সেখানে পশুপালনই ছিল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। যাযাবর পশুপালকেরা ছাগল ও ভেড়ার পাল নিয়ে এক চারণভূমি থেকে অন্য চারণভূমিতে ঘুরে বেড়াত। কৃষিজীবী এবং পশুপালকদের মধ্যে এক ধরনের মিথোজীবী সম্পর্ক ছিল। যাযাবরেরা তাদের পশুর চামড়া, উল এবং মাংসের বিনিময়ে কৃষকদের কাছ থেকে শস্য সংগ্রহ করত। আবার মাঝে মাঝেই এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদের দখল নিয়ে সংঘর্ষ বেধে যেত। কৃষিকাজ এবং পশুপালনের এই যে বিভাজন, তা মূলত ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারাই নির্ধারিত ছিল। ভূমির রূপ এবং জলবায়ু কীভাবে মানুষের অর্থনৈতিক জীবন এবং সামাজিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, প্রাচীন লেভান্ট তার এক ধ্রুপদী উদাহরণ (Dever, 2003)।
ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে মিথোলজির দ্বন্দ্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ
ইতিহাস আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাটি তৈরি হয় যখন ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে প্রাচীন ধর্মীয় বা মিথোলজিক্যাল বর্ণনাগুলো মেলানোর চেষ্টা করা হয়। প্রাচীন ধর্মীয় আখ্যানে এই ভূখণ্ডকে বারবার দুধ ও মধুর দেশ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এটি মূলত একটি আদর্শিক ধারণা, যা তৎকালীন শুষ্ক অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের উর্বর জমির প্রতি এক গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন মাত্র। সমাজবিজ্ঞানের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এখানকার ভূখণ্ড কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল না। টিকে থাকার জন্য এখানকার পরিবেশ ছিল চরম প্রতিকূল। মিথোলজিতে ঈশ্বর প্রদত্ত যে পবিত্র ভূমির কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে সেটি ছিল খরা, দুর্ভিক্ষ এবং বহিরাগত আক্রমণের এক অনিশ্চিত প্রান্তর (Herzog, 1999)।
বিজ্ঞানভিত্তিক প্রত্নতত্ত্ব আমাদের সামনে এই মিথোলজির বাইরের এক বস্তুনিষ্ঠ সত্য তুলে ধরে। কার্বন ডেটিং এবং প্রাচীন পরাগ বা পেলিওবোটানি (Paleobotany) বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায়, এই অঞ্চলের পরিবেশ প্রাচীনকালেও বর্তমানের মতোই খামখেয়ালি ছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীগুলো খনন করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে শহরগুলো কোনো ঐশ্বরিক গজব বা অলৌকিক কারণে ধ্বংস হয়নি। চরম খরা, জলবায়ু পরিবর্তন অথবা ভূমিকম্পের মতো ভূতাত্ত্বিক কারণেই অনেক শহর পরিত্যক্ত হয়েছে। জেরিকোর দেয়াল ধসে পড়ার যে গল্প মিথোলজিতে পাওয়া যায়, তার পেছনে কোনো অলৌকিক শক্তির হাত ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলে যে সেটি মূলত একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলাফল ছিল। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলো অনেক পরে রচিত হওয়ায়, সেগুলোতে অতীতের সাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে অলৌকিক রূপ দেওয়া হয়েছে (Dever, 2003)।
আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্ব ধর্ম এবং ইতিহাসকে স্পষ্টভাবে আলাদা করতে শেখায়। প্রাচীন মানুষ তাদের চারপাশের রুক্ষ প্রকৃতি, অনাবৃষ্টি এবং মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সেগুলোকে ঐশ্বরিক শক্তির ইচ্ছা হিসেবে ব্যাখ্যা করত। তারা মনে করত দেবতার সন্তুষ্টির ওপরই বৃষ্টিপাত নির্ভর করে। কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে এগুলো ভূতাত্ত্বিক এবং পরিবেশগত নিয়মেরই অংশ। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ ঐশ্বরিক পক্ষপাতিত্বের যে ধারণা মিথোলজিতে পাওয়া যায়, তার কোনো অস্তিত্ব ইতিহাসের পাতায় মেলে না। খননকাজে প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষ, কঙ্কাল এবং বস্তুগত সংস্কৃতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে লেভান্টের আদিম অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ছিল অন্য যেকোনো প্রাচীন সমাজের মতোই বস্তুগত বাস্তবতার অধীন। মিথোলজির চাদর সরিয়ে নির্মোহভাবে তাকালে আমরা দেখতে পাই, মানুষের এই টিকে থাকা কোনো অলৌকিক আশীর্বাদ ছিল না, বরং ছিল প্রকৃতির সাথে এক নিরন্তর ও বস্তুগত লড়াইয়ের ফসল (Finkelstein & Silberman, 2001)।
প্রাগৈতিহাসিক বসতি ও কৃষির সূচনা (Prehistoric Settlements and Early Agriculture): স্থায়ী জীবনের শুরু
প্রত্নপ্রস্তর যুগের যাযাবর জীবন এবং পরিবেশগত অভিযোজন
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে মানুষ কোনো স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেনি, বরং প্রকৃতির সাথে এক নিরন্তর অভিযোজনের মধ্য দিয়ে তাদের দিনাতিপাত করতে হয়েছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন অঞ্চল অর্থাৎ দক্ষিণ লেভান্টের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্লেইস্টোসিন যুগে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি আফ্রিকা থেকে ইউরেশিয়ায় মানব পরিযানের একটি প্রধান করিডোর হিসেবে কাজ করেছিল। আদিম মানুষেরা খাদ্যের সন্ধানে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এই পথ ধরেই ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর নানা প্রান্তে। প্রত্নপ্রস্তর যুগ বা প্যালিলিওথিক যুগে এখানকার মানুষদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করত প্রকৃতির দয়ার ওপর। তারা ছিল মূলত শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ (Hunter-Gatherer Society)-এর অন্তর্ভুক্ত। বন্য প্রাণী শিকার এবং প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ফলমূল, লতাপাতা ও শস্য সংগ্রহ করেই তারা তাদের খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করত। এই জীবনধারায় সম্পদের কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। গোষ্ঠীর সবাই মিলে খাদ্য সংগ্রহ করত এবং তা নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নিত। নৃবিজ্ঞানীরা এই ধরনের সমাজ ব্যবস্থাকে অনেক সময় সমতাভিত্তিক সমাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কারমেল পর্বতের গুহাগুলোতে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে এই আদিম মানুষদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বিশদ ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে পাথরের তৈরি নানা ধরনের হাতিয়ার, বিশেষ করে ধারালো ফলা এবং ছাঁচ আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্রাণী শিকার এবং চামড়া ছাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হতো (Shea, 2003)।
হাতিয়ার তৈরির কৌশলের ওপর ভিত্তি করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই সময়কালকে বিভিন্ন শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রিতে ভাগ করেছেন, যার মধ্যে মুস্টেরিয়ান এবং অরিগনেশিয়ান কৌশল উল্লেখযোগ্য। আদিম মানুষেরা মূলত চকমকি পাথর বা ফ্লিন্ট ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই হাতিয়ারগুলো তৈরি করত। লেভালয়েস নামক একটি বিশেষ পদ্ধতিতে পাথরের মূল অংশ থেকে সুনির্দিষ্ট আকারের ফলা বের করে আনা হতো। এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে তাদের জ্ঞানীয় ক্ষমতা এবং পূর্বপরিকল্পনা করার দক্ষতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের শিকারের ধরনেও পরিবর্তন আসত। বরফ যুগের শেষ দিকে যখন তাপমাত্রা কমতে থাকে, তখন তারা প্রধানত হরিণ, বন্য শুকর এবং বন্য গরুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই প্রাণীগুলোর সন্ধানে তাদের প্রতিনিয়ত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। শীতকালে তারা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিত এবং গ্রীষ্মকালে সমভূমিতে নেমে আসত। তাদের কোনো স্থায়ী ঘরবাড়ি বা স্থাপত্য ছিল না, কারণ ভারী জিনিসপত্র নিয়ে যাযাবর জীবনযাপন করা সম্ভব ছিল না। টিকে থাকার এই নিরন্তর সংগ্রামের মধ্যেই তারা প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে বুঝতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তীকালে কৃষিকাজের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে (Belfer-Cohen & Goring-Morris, 2003)।
যাযাবর জীবনধারার কারণে তাদের জনসংখ্যা সব সময়ই একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে অবস্থান করত। প্রকৃতির নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের বহন ক্ষমতা (Carrying Capacity) অনুযায়ী একটি গোষ্ঠীতে সাধারণত পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ জনের বেশি সদস্য থাকত না। জনসংখ্যা বেড়ে গেলে গোষ্ঠীর একটি অংশ আলাদা হয়ে নতুন কোনো খাদ্যের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যেত। দীর্ঘ কয়েক হাজার বছর ধরে লেভান্টের এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে নিয়ান্ডারথাল এবং আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সরা একই সাথে বসবাস করেছে। কারমেল পর্বতের কেবারা গুহায় পাওয়া একটি নিয়ান্ডারথাল কঙ্কাল প্রমাণ করে যে তারা মৃতদেহ সমাহিত করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলত। এটি মানব মস্তিষ্কে বিমূর্ত চিন্তার সূচনার একটি বড় প্রমাণ। জীবন এবং মৃত্যু সম্পর্কে তাদের মধ্যে এক ধরনের দার্শনিক বোধের জন্ম হচ্ছিল। তবে তাদের এই বিশ্বাস ব্যবস্থা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের রূপ নেয়নি, বরং প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিকে সমীহ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সর্বশেষ বরফ যুগের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে জলবায়ুতে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হলে এই যাযাবর জীবনযাত্রায় এক বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। খাদ্যের অভাব মেটাতে মানুষকে নতুন কোনো উৎসের সন্ধান করতে হয়, যা মানব সভ্যতাকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথের দিকে পরিচালিত করে (Bar-Yosef, 1998)।
নাতুফিয়ান সংস্কৃতির উত্থান এবং আধা-স্থায়ী বসতির সূচনা
প্রত্নপ্রস্তর যুগ এবং পরবর্তী নিওলিথিক যুগের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে লেভান্ট অঞ্চলে এক অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০০ থেকে ১১৫০০ অব্দের এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়কে এপিপ্যালিওলিথিক যুগ বলা হয়। এই সময়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি হলো নাতুফিয়ান সংস্কৃতি (Natufian Culture)-এর উদ্ভব। নাতুফিয়ানরা মানব ইতিহাসের প্রথম জনগোষ্ঠী যারা কৃষিকাজ আবিষ্কার করার আগেই স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছিল। সাধারণ ধারণা হলো মানুষ আগে কৃষিকাজ শুরু করেছে এবং তারপর বাড়িঘর বানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছে। কিন্তু নাতুফিয়ানরা এই চিরাচরিত ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। আধুনিক পলিওক্লাইমেটোলজি (Paleoclimatology) বা প্রাচীন জলবায়ুবিদ্যা থেকে জানা যায়, এই সময়ে লেভান্টের জলবায়ু তুলনামূলকভাবে বেশ উষ্ণ এবং আর্দ্র হয়ে উঠেছিল। ফলে পাহাড়ের ঢালগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বন্য গম, যব এবং ওক গাছের বন তৈরি হয়। এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য নাতুফিয়ানদের যাযাবর জীবন ত্যাগ করে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বছরের বেশি সময় ধরে থাকার সুযোগ করে দেয় (Bar-Yosef, 1998)। তারা এমন সব জায়গায় নিজেদের বসতি স্থাপন করত যেখান থেকে বন, সমভূমি এবং জলের উৎস খুব কাছাকাছি থাকে।
নাতুফিয়ানদের স্থাপত্যকলা মানব ইতিহাসের এক বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা পাহাড়ের গায়ে বা মাটির নিচে কিছুটা গর্ত করে গোলাকার পাথরের ভিত্তি দিয়ে ঘর তৈরি করত। ঘরগুলোর মাঝখানে চুল্লি থাকত এবং ছাদ তৈরি হতো লতাপাতা বা পশুর চামড়া দিয়ে। এই স্থায়ী কাঠামোগুলো প্রমাণ করে যে তারা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর দীর্ঘমেয়াদী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। খাদ্যাভ্যাসেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তারা বন্য শস্য কাটার জন্য ছোট ছোট ধারালো পাথর বা মাইক্রোলিথ দিয়ে তৈরি কাস্তে ব্যবহার করত। কাস্তের ফলাগুলোতে শস্য কাটার ফলে এক ধরনের চকচকে দাগ বা সিকল গ্লস তৈরি হতো, যা প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে তাদের শস্য ব্যবহারের অকাট্য প্রমাণ। শস্যগুলো মজুত করার জন্য তারা মাটির নিচে গর্ত করে শস্যভাণ্ডার তৈরি করত। সঞ্চয়ের এই প্রবণতা মানব সমাজে সম্পদের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দেয়। যার কাছে যত বেশি সঞ্চিত শস্য থাকত, সে প্রতিকূল সময়ে তত বেশি সুরক্ষিত অনুভব করত। বন্য প্রাণী শিকারের পাশাপাশি তারা কুকুরকে নিজেদের সঙ্গী হিসেবে পালন করতে শুরু করে। আইন মাল্লা নামক একটি নাতুফিয়ান বসতিতে বয়স্ক মানুষের কঙ্কালের সাথে একটি কুকুরের কঙ্কাল সমাহিত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা মানুষ এবং প্রাণীর মধ্যকার গভীর সম্পর্কের প্রথম প্রমাণ বহন করে (Kuijt & Goring-Morris, 2002)।
স্থায়ী বসতির কারণে নাতুফিয়ান সমাজের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ক্রমশ জটিল হতে শুরু করে। মৃতদেহ সমাহিত করার পদ্ধতিতেও আসে নতুনত্ব। তারা তাদের ঘরের মেঝের নিচেই মৃতদেহ কবর দিত। এর মাধ্যমে মূলত তারা নির্দিষ্ট একটি জমির ওপর তাদের বংশগত অধিকার বা দাবির একটি প্রতীকী রূপ দাঁড় করাত। মৃতদেহের সাথে বিভিন্ন ধরনের অলংকার, যেমন ঝিনুক বা হাড়ের তৈরি পুঁতির মালা দেওয়া হতো। কিছু কবরে অনেক বেশি দামি অলংকার পাওয়া গেছে, আবার কিছু কবরে কিছুই পাওয়া যায়নি। এই বৈষম্য থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনুমান করেন যে নাতুফিয়ান সমাজে প্রথমবারের মতো সামাজিক স্তরবিন্যাস (Social Stratification) বা ধনী-দরিদ্রের সূক্ষ্ম রেখা তৈরি হচ্ছিল। সম্পদ এবং প্রতিপত্তির ওপর ভিত্তি করে সমাজে কিছু মানুষের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে এই সমৃদ্ধি খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। খ্রিস্টপূর্ব ১০৮০০ অব্দের দিকে ইয়াঙ্গার ড্রায়াস নামক একটি আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লেভান্ট অঞ্চল প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং শুষ্ক হয়ে পড়ে। বন্য শস্যের প্রাচুর্য দ্রুত কমতে থাকে এবং নাতুফিয়ানদের সামনে অস্তিত্বের সংকট দেখা দেয়। এই তীব্র প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়েই তারা এমন এক উদ্ভাবন করে, যা মানব সভ্যতাকে চিরতরে বদলে দেয় (Munro, 2004)।
নিওলিথিক বিপ্লব এবং কৃষির পদ্ধতিগত বিকাশ
ইয়াঙ্গার ড্রায়াসের সেই তীব্র খাদ্য সংকটের মোকাবেলা করতে গিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। বন্য শস্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা নিজেরাই বীজ বপন করে ফসল উৎপাদন করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে। মানব ইতিহাসের এই অভাবনীয় রূপান্তরকে প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ভি. গর্ডন চাইল্ড তার বিখ্যাত বই Man Makes Himself-এ নিওলিথিক বিপ্লব (Neolithic Revolution) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অবশ্য এটি একদিনের কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং কয়েক হাজার বছর ধরে চলা এক দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল। দক্ষিণ লেভান্টের জর্ডান উপত্যকা এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতেই এই কৃষিকাজের প্রাথমিক সূচনা ঘটেছিল। মানুষ প্রথম যে শস্যগুলোর আবাদ শুরু করে তার মধ্যে ছিল গম, যব, মসুর এবং মটরশুঁটি। এই উদ্ভিদগুলোর বন্য প্রজাতির কিছু জেনেটিক দুর্বলতা ছিল। যেমন, বন্য গমের শিষ পেকে গেলে সহজেই মাটিতে ঝরে পড়ত, ফলে তা সংগ্রহ করা কঠিন ছিল। কিন্তু মানুষ বারবার সেই বীজগুলোই নির্বাচন করত যেগুলো সহজে ঝরে পড়ে না। মানুষের এই নির্বাচনের ফলে শস্যগুলোর জেনেটিক গঠন পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই পরিবর্তনকে বিজ্ঞানের ভাষায় উদ্ভিদ গৃহপালন প্রক্রিয়া (Plant Domestication Process) বলা হয়, যেখানে উদ্ভিদের টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে মানুষের হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে (Zeder, 2011)।
উদ্ভিদের পাশাপাশি প্রাণীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের রূপান্তর ঘটে। শিকার করার বদলে মানুষ বন্য ছাগল, ভেড়া এবং শুকর ধরে এনে নিজেদের কাছে পালন করতে শুরু করে। বন্য প্রাণীর আক্রমণাত্মক স্বভাব কমিয়ে তাদের পোষ মানানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে প্রজনন ঘটানো হয়। গৃহপালিত প্রাণীগুলো মানুষের জন্য একটি নিয়মিত এবং নির্ভরযোগ্য খাদ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে। পশুর মাংস এবং দুধ মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটায়, আবার পশুর চামড়া এবং পশম দিয়ে তারা পোশাক তৈরি করে। কৃষিকাজ এবং পশুপালনের এই সমন্বিত ব্যবস্থা লেভান্টের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়। মানুষ এখন আর কেবল প্রকৃতির উৎপাদিত খাদ্যের সংগ্রাহক ছিল না, তারা নিজেরাই হয়ে ওঠে খাদ্য উৎপাদনকারী। এই উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ডের ওপর অনেক বেশি মানুষ বসবাস করার সুযোগ পায়। শিকারি-সংগ্রাহক জীবনে যেখানে বিশাল এলাকায় অল্প কিছু মানুষ বাস করত, সেখানে কৃষিকাজের ফলে ছোট একটি জমিতে প্রচুর ফসল ফলিয়ে অনেক মানুষের আহার জোগানো সম্ভব হয়। ভূমির উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় (Fuller, 2007)।
কৃষি নির্ভর অর্থনীতি মানব সমাজের মনস্তত্ত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। স্থায়ীভাবে গ্রামে বসবাস করা মানুষের জন্য এক অপরিহার্য নিয়মে পরিণত হয়, কারণ শস্য রোপণ থেকে শুরু করে তা ঘরে তোলা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। খাদ্যাভ্যাসে প্রচুর পরিমাণে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট যুক্ত হওয়ায় মানুষের দাঁতের ক্ষয়রোগ বৃদ্ধি পায়, যা বিভিন্ন কঙ্কালের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। কৃষিকাজের জন্য অনেক বেশি কায়িক শ্রমের প্রয়োজন হতো, ফলে মানুষের শরীরে বিভিন্ন ধরনের হাড়ের সমস্যাও দেখা দেয়। এতসব শারীরিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কৃষিকাজ মানুষের টিকে থাকার সম্ভাবনাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। মানুষ নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে ফসলের মাঠে জল সেচের ব্যবস্থা করতে শেখে। প্রকৃতিকে ইচ্ছামতো পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রণ করার এই ক্ষমতা মানুষের মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। তারা বুঝতে শুরু করে যে সম্মিলিত শ্রমের মাধ্যমে প্রকৃতির অনেক বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব। এই সম্মিলিত শ্রম এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্যই সমাজে ধীরে ধীরে এক ধরনের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে আরও জটিল শাসন কাঠামোর জন্ম দিয়েছে (Richards, 2002)।
প্রাক-মৃৎপাত্র নিওলিথিক যুগ এবং জেরিকোর বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস
কৃষিকাজের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের সাথে সাথে লেভান্টের বসতিগুলো আকারে অনেক বড় হতে শুরু করে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই সময়কালকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেন: প্রাক-মৃৎপাত্র নিওলিথিক এ (PPNA) এবং প্রাক-মৃৎপাত্র নিওলিথিক বি (PPNB)। এই সময়ে স্থাপত্যকলায় এক বিশাল পরিবর্তন আসে। নাতুফিয়ান যুগের গোলাকার ঘরগুলোর বদলে মানুষ চতুর্ভুজ বা আয়তাকার ঘর বানাতে শুরু করে। আয়তাকার নকশা অনেক বেশি সুবিধাজনক ছিল, কারণ এতে সহজে নতুন কক্ষ যোগ করে বাড়ি বড় করা যেত এবং গ্রামগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো সম্ভব হতো। এই যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং আলোচিত প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট হলো তেল এস-সুলতান বা প্রাচীন জেরিকো। জর্ডান উপত্যকায় অবস্থিত এই প্রাচীন বসতিটি মানব ইতিহাসের অন্যতম আদিম একটি গ্রাম। এখানে মানুষ রোদে শুকানো কাদা-মাটির ইট দিয়ে বাড়িঘর তৈরি করত। জেরিকোর খননকাজে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে যে এখানকার অধিবাসীরা কৃষিকাজ এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সুসংগঠিত সমাজ গড়ে তুলেছিল। তবে জেরিকোর সবচেয়ে বিখ্যাত কাঠামোটি হলো এর বিশাল পাথরের দেয়াল এবং একটি গোল টাওয়ার বা মিনার (Kuijt, 2000)।
জেরিকোর এই দেয়াল এবং টাওয়ার নিয়ে ইতিহাসে এবং সাধারণ মানুষের মনে প্রচুর বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রাচীন ধর্মীয় মিথোলজিতে বলা হয়েছে যে, ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট একদল আক্রমণকারী যখন জেরিকো অবরোধ করে এবং শিঙায় ফুঁ দেয়, তখন অলৌকিকভাবে এই শহরের বিশাল দেয়াল ধসে পড়ে এবং তারা শহরটি দখল করে নেয়। দীর্ঘকাল ধরে অনেক মানুষ এই মিথোলজিকে নির্ভেজাল ইতিহাস হিসেবে বিশ্বাস করত। কিন্তু প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ক্যাথলিন কেনিয়নের পরিচালিত বৈজ্ঞানিক খননকাজ প্রমাণ করেছে যে, জেরিকোর এই দেয়াল এবং টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার অব্দে। অন্যদিকে ধর্মীয় মিথোলজিতে আক্রমণকারীদের যে সময়ের কথা বলা হয়, তার কয়েক হাজার বছর আগেই জেরিকোর এই আদিম বসতিটি প্রাকৃতিকভাবে পরিত্যক্ত হয়েছিল। ক্যাথলিন কেনিয়ন তার গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, এই দেয়াল কোনো সামরিক দুর্গ ছিল না, কারণ সেই যুগে এত বিশাল আক্রমণকারী সেনাবাহিনী থাকাটা অসম্ভব। দেয়ালটি মূলত নির্মাণ করা হয়েছিল আশেপাশের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড থেকে গ্রামটিকে রক্ষা করার জন্য। টাওয়ারটি সম্ভবত কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্র অথবা সম্পদের পাহাড়ার কাজে ব্যবহৃত হতো। প্রত্নতত্ত্ব অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে জেরিকোর পতন কোনো অলৌকিক সামরিক বিজয়ের ফল ছিল না, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ পরিবেশগত এবং সামাজিক পরিবর্তনের ফসল (Kenyon, 1957)।
প্রাক-মৃৎপাত্র নিওলিথিক বি (PPNB) পর্যায়ে এসে সমাজ ব্যবস্থায় এক ধরনের গভীর প্রতীকী এবং আচারগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই সময়ের একটি বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার হলো প্লাস্টার করা মানুষের মাথার খুলি। মানুষ মৃতদের খুলি সংগ্রহ করে তার ওপর কাদা এবং চুন দিয়ে প্রলেপ লাগিয়ে মৃত ব্যক্তির মুখের আদল তৈরি করত এবং চোখের জায়গায় ঝিনুক বসিয়ে দিত। এই খুলিগুলো তারা নিজেদের ঘরের মেঝের নিচে পুঁতে রাখত অথবা ঘরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সাজিয়ে রাখত। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন এটি ছিল মূলত এক ধরনের পূর্বপুরুষ পূজা (Ancestor Worship)। কৃষিনির্ভর সমাজে উর্বর জমির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছিল। কোনো একটি নির্দিষ্ট জমির ওপর অধিকার দাবি করার সবচেয়ে মোক্ষম উপায় ছিল এটা প্রমাণ করা যে, ওই জমিতে তার পূর্বপুরুষেরা বসবাস করত। এই খুলিগুলো জমির মালিকানার এক ধরনের আদিম আইনি দলিল হিসেবে কাজ করত। মৃত্যুর পরও পূর্বপুরুষরা যেন পরিবারের সম্পদের ওপর নজর রাখে এবং বংশধরদের অধিকার সুনিশ্চিত করে, এই ধারণা থেকেই এমন আচার পালন করা হতো। এই চর্চাগুলো প্রমাণ করে যে সম্পত্তির অধিকার এবং মালিকানার ধারণা সমাজে প্রবলভাবে প্রোথিত হচ্ছিল, যা একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় (Cauvin, 2000)।
মৃৎপাত্রের উদ্ভাবন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণ
খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০০ অব্দের দিকে দক্ষিণ লেভান্টে আরেকটি বড় ধরনের প্রযুক্তিগত উল্লম্ফন ঘটে। মানুষ মাটি পুড়িয়ে পাত্র তৈরি করার কৌশল আবিষ্কার করে। প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় এই সময়কালকে মৃৎপাত্র নিওলিথিক যুগ বলা হয়। জর্ডান উপত্যকার ইয়ারমুকিয়ান সংস্কৃতি এই মৃৎপাত্রের ব্যবহারের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। কৃষিকাজ আবিষ্কারের প্রায় হাজার বছর পর কেন মানুষ মাটির পাত্র তৈরি করতে শিখল, এর পেছনে স্পষ্ট ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। যাযাবর জীবনে মাটির ভারী এবং ভঙ্গুর পাত্র বহন করা এক প্রকার অসম্ভব ছিল। কিন্তু স্থায়ী গ্রামে বসবাস শুরু করার পর শস্য সংরক্ষণ, রান্না এবং জল বহনের জন্য এই পাত্রগুলো অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। মৃৎপাত্রের উদ্ভাবন মানব খাদ্যাভ্যাসে এক নীরব বিপ্লব নিয়ে আসে। এর আগে শস্য কেবল পুড়িয়ে বা পিষে খাওয়া হতো। কিন্তু আগুনে পোড়া টেকসই পাত্র আসার পর মানুষ শস্য সেদ্ধ করে এক ধরনের জাউ বা পরিজ তৈরি করতে শুরু করে। এতে করে খাদ্যের পরিপাক সহজ হয় এবং ছোট শিশু ও বয়স্কদের জন্য পুষ্টি গ্রহণ অনেক সুবিধাজনক হয়ে ওঠে (Garfinkel, 1999)। মাটির পাত্রে নকশা করার মধ্য দিয়ে মানুষের শৈল্পিক চিন্তারও নতুন বিকাশ ঘটে।
মৃৎপাত্র নিওলিথিক যুগে লেভান্টের জনবসতির ধরনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আগের যুগে জেরিকোর মতো গুটিকয়েক বড় এবং ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এই যুগে এসে বিশাল গ্রামগুলো ভেঙে গিয়ে অনেকগুলো ছোট ছোট গ্রামীণ বসতি পুরো অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে সমভূমি – প্রায় সব জায়গাতেই কৃষিভূমির সম্প্রসারণ ঘটে। কৃষিকাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছিল এবং মানুষ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছিল। এই ধারাবাহিকতায় সমাজে প্রথমবারের মতো উদ্বৃত্ত উৎপাদন (Surplus Production) একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যখন একজন কৃষক নিজের এবং পরিবারের চাহিদার চেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হয়, তখন সমাজের কিছু মানুষকে আর সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত থাকতে হয় না। এই উদ্বৃত্ত খাদ্যের বিনিময়ে সমাজে নানা ধরনের পেশাজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যেমন যারা কেবল হাতিয়ার বানাত, কিংবা যারা কেবল মৃৎপাত্র তৈরি করত। কারিগরি দক্ষতার এই পৃথকীকরণ একটি জটিল অর্থনীতির ভিত গড়ে তোলে, যেখানে সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে (Banning, 2003)।
গ্রামগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কও এই সময়ে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। নিজেদের এলাকায় পাওয়া যায় না এমন অনেক জিনিস মানুষ দূর দূরান্ত থেকে সংগ্রহ করতে শুরু করে। আনাতোলিয়া বা বর্তমান তুরস্ক থেকে আগ্নেয়গিরির কাঁচ বা অবসিডিয়ান আনা হতো, যা দিয়ে অত্যন্ত ধারালো ফলা তৈরি করা যেত। লোহিত সাগর থেকে আনা হতো বিভিন্ন ধরনের রঙিন ঝিনুক এবং সিনাই উপদ্বীপ থেকে আসত ফিরোজা পাথর। এই জিনিসগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ছোট ছোট গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ছিল না, বরং তারা এক বিশাল বাণিজ্যিক জালের অংশ ছিল। দূরপাল্লার এই বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো তখনও গড়ে ওঠেনি। বাণিজ্য মূলত পরিচালিত হতো ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে। তবে সম্পদের এই অবাধ প্রবাহ এবং আদান-প্রদান প্রমাণ করে যে সমাজের কাঠামো ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছিল। মানুষের আকাঙ্ক্ষা কেবল খাদ্য এবং আশ্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দুর্লভ এবং দামি জিনিসের প্রতি তাদের এক ধরনের সামাজিক আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল (Gopher, 1995)।
চালকোলিথিক যুগ এবং তামার ব্যবহার: জটিল সমাজের দিকে যাত্রা
প্রাগৈতিহাসিক যুগের একেবারে শেষ পর্যায় হলো চালকোলিথিক যুগ বা তাম্র-প্রস্তর যুগ, যা শুরু হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০ অব্দে। এই সময়ের সবচেয়ে যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ছিল ধাতুর ব্যবহার। পাথরের পাশাপাশি মানুষ তামা গলিয়ে বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ার এবং অলংকার তৈরি করতে শেখে। দক্ষিণ লেভান্টে এই যুগে ঘাসুলিয়ান সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ইসরায়েলের জুদিয়ান মরুভূমির নাহাল মিশমার নামক একটি গুহায় চারশোর বেশি তামার তৈরি বস্তুর এক বিশাল ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে। এই বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে মুকুট, রাজদণ্ড এবং বিভিন্ন রহস্যময় প্রতীক। তামা গলানোর জন্য যে উচ্চ তাপমাত্রার চুল্লির প্রয়োজন হতো এবং ছাঁচে ফেলে যে নিখুঁতভাবে এই জিনিসগুলো তৈরি করা হয়েছিল, তা প্রমাণ করে যে ঘাসুলিয়ান কারিগররা ধাতুবিদ্যায় কতটা দক্ষ ছিল। তামা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য খুব একটা সহজলভ্য ছিল না। এটি মূলত সমাজের উচ্চপদস্থ নেতা বা পুরোহিতদের মর্যাদা এবং ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সম্পদের এই পুঞ্জীভবন স্পষ্টভাবেই একটি অসম সামাজিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয় (Levy, 1986)।
এই সময়ে কৃষিব্যবস্থায় একটি দ্বিতীয় ধাপের বিপ্লব ঘটে, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেক সময় ‘সেকেন্ডারি প্রোডাক্টস রেভোলিউশন’ বলে থাকেন। কেবল শস্য উৎপাদনের বাইরে গিয়ে মানুষ ফলজ বৃক্ষের ব্যাপক আবাদ শুরু করে। জলপাই, ডুমুর এবং খেজুর গাছের বাগান তৈরি করা হয়। জলপাইয়ের গাছ থেকে ফল পেতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এর মানে দাঁড়ায়, মানুষ একটি নির্দিষ্ট জমির ওপর দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করতে শুরু করেছিল এবং জমির মালিকানা বংশপরম্পরায় হস্তান্তরিত হচ্ছিল। জলপাই পিষে যে তেল পাওয়া যেত, তা কেবল খাবার হিসেবেই নয়, বরং বাতি জ্বালানো এবং প্রসাধনী হিসেবেও বহুল ব্যবহৃত হতো। খুব দ্রুতই জলপাই তেল লেভান্টের একটি প্রধান বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়। পশুপালনের ক্ষেত্রেও আসে নতুন মাত্রা। পশু কেবল মাংসের জন্য জবাই না করে, মানুষ পশুর দুধ এবং উল বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে শেখে। দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি এবং পশুর পশম থেকে বস্ত্র বয়নের কাজ সমাজের একটি বড় শিল্পের রূপ নেয়। এই বহুমুখী অর্থনীতির কারণে সমাজের সম্পদ বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং তা অধিক সংখ্যক মানুষকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করার সুবিধা করে দেয় (Sherratt, 1981)।
অর্থনৈতিক এই বিপুল সমৃদ্ধি সমাজের রাজনৈতিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। চালকোলিথিক যুগের বসতিগুলো খনন করে দেখা যায়, গ্রামের ভেতরে সব ঘর একই আকৃতির নয়। কিছু ঘর সাধারণ আকারের হলেও বেশ কিছু বিশাল এবং সুরম্য ঘর পাওয়া গেছে, যেগুলোর ভেতরে প্রচুর পরিমাণে সম্পদ মজুত রাখা হতো। এর অর্থ হলো সমাজে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল। মৃত সাগর বা ডেড সির কাছে আইন গেদি নামক স্থানে একটি বিশাল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা কোনো নির্দিষ্ট বসতির ভেতরে অবস্থিত নয়, বরং একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে নির্মিত। আশেপাশের সব গ্রামের মানুষ এখানে এসে তাদের আচার-অনুষ্ঠান পালন করত। এ ধরনের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে যে ছোট ছোট গ্রামগুলো নিজেদের গণ্ডি পেরিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের এই দীর্ঘ ধারাবাহিক পরিক্রমা লেভান্ট অঞ্চলকে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করে দিয়েছিল একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য। চালকোলিথিক যুগের এই জটিল সমাজ ব্যবস্থাই পরবর্তী ব্রোঞ্জ যুগে নগররাষ্ট্র বা শহরভিত্তিক সভ্যতার উন্মেষের জন্য একটি মজবুত এবং অবধারিত ভিত্তি তৈরি করে দেয় (Rowan & Golden, 2009)।
কানানীয় সভ্যতা ও নগররাষ্ট্র (Canaanite Civilization and City-States): ব্রোঞ্জ যুগের রাজনীতি
কানানীয় পরিচয়ের উন্মেষ ও ব্রোঞ্জ যুগের রাজনৈতিক রূপরেখা
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ব্রোঞ্জ যুগ মূলত একটি যুগান্তকারী রূপান্তরের সময়কাল হিসেবে পরিচিত। এই সময়েই প্রথম সুসংগঠিত নগররাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে এবং তামার সাথে টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরির প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে ১২০০ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ সময়কালকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন: আদি ব্রোঞ্জ, মধ্য ব্রোঞ্জ এবং শেষ ব্রোঞ্জ যুগ। এই পুরো সময়কাল জুড়ে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটে, আধুনিক পণ্ডিতরা তাদের কানানীয় বা কেনানাইট হিসেবে চিহ্নিত করেন। কানানীয় কোনো একক রাজনৈতিক সত্তা বা সাম্রাজ্যের নাম ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বলয় (Cultural and Linguistic Sphere)। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং আর্কিওজেনেটিক গবেষণা নির্দেশ করে যে কানানীয়রা মূলত সেমিটিক ভাষাভাষী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক বিকাশের ফল, যদিও ব্রোঞ্জ যুগের পূর্বে ও ব্রোঞ্জ যুগ জুড়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সীমিত মাত্রার জনসংমিশ্রণও ঘটেছিল (Tubb, 1998; Haber et al., 2017; Agranat-Tamir et al., 2020)। তাদের ভাষা, মৃৎপাত্র তৈরির শৈলী, স্থাপত্যকলা এবং জিনগত গঠনে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়, যা দেখায় যে কানানীয় সভ্যতা মূলত স্থানীয় বিকাশের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল; বহিরাগত জনগোষ্ঠীর প্রভাব থাকলেও তা ব্যাপক জনবিনিময় বা সম্পূর্ণ জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের (Population Replacement) ফল ছিল না (Haber et al., 2017; Agranat-Tamir et al., 2020)।
আধুনিক আর্কিওজেনেটিক্সও এই ধারাবাহিকতার ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে, যদিও এটিকে একেবারে বিচ্ছিন্ন বা “বিশুদ্ধ” স্থানীয় জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সিডন থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৩,৭০০ বছর আগের পাঁচজন কানানীয় ব্যক্তির জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তারা মূলত পূর্ববর্তী লেভান্টীয় নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী এবং পূর্বদিক থেকে আসা ইরান-জাগ্রোস-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠীর মিশ্র উত্তরাধিকার বহন করত। এই গবেষণা আরও দেখায় যে আধুনিক লেবানিজ জনগোষ্ঠীর জিনগত গঠনের বড় অংশ ব্রোঞ্জ যুগের এই কানানীয়দের সাথে ধারাবাহিকতা বহন করে, অর্থাৎ কানানীয়রা কোনো আকস্মিক আক্রমণে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি (Haber et al., 2017)।
পরবর্তী বৃহত্তর গবেষণায় দক্ষিণ লেভান্টের পাঁচটি প্রত্নস্থল থেকে ব্রোঞ্জ ও লৌহ যুগের ৭৩ জন ব্যক্তির জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন নগররাষ্ট্রে বসবাসকারী “কানানীয়” জনগোষ্ঠীগুলো কেবল বস্তুসংস্কৃতিতেই নয়, জিনগতভাবেও একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল। তবে তাদের জিনগত গঠন ছিল দুই প্রধান উৎসের মিশ্রণ: একদিকে পূর্ববর্তী স্থানীয় লেভান্টীয় জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে ককেশাস বা জাগ্রোস-সম্পর্কিত উত্তর-পূর্ব নিকটপ্রাচ্যীয় জনগোষ্ঠী। এই বহিরাগত জিনপ্রবাহ সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে শুরু হয়ে ব্রোঞ্জ যুগ জুড়ে চলমান ছিল। ফলে কানানীয়দের ইতিহাসকে একদিকে স্থানীয় ধারাবাহিকতার ইতিহাস, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক মিশ্রণ ও নগরায়ণের ইতিহাস হিসেবে দেখা উচিত (Agranat-Tamir et al., 2020)।
ঐতিহাসিকভাবে কানানীয়দের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তি বিদ্যমান ছিল। এর অন্যতম কারণ হলো, উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত তাদের ইতিহাস পুনর্গঠনের প্রধান উৎস ছিল পরবর্তী সময়ে রচিত ধর্মীয় গ্রন্থ ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য। এসব গ্রন্থে কানানীয়দের প্রায়শই ইসরায়েলীয়দের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক রীতিনীতি নেতিবাচকভাবে বর্ণিত হয়েছে। তবে আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব এবং সাম্প্রতিক আর্কিওজেনেটিক গবেষণা কানানীয়দের সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, বস্তুসংস্কৃতির বিশ্লেষণ এবং প্রাচীন ডিএনএ গবেষণা থেকে জানা যায় যে কানানীয়রা মূলত দক্ষিণ লেভান্টের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক বিকাশের ফল, যদিও ব্রোঞ্জ যুগের পূর্বে ও ব্রোঞ্জ যুগ জুড়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সীমিত মাত্রার জনসংমিশ্রণও ঘটেছিল (Mazar, 1990; Haber et al., 2017; Agranat-Tamir et al., 2020)। তাদের সমাজ ছিল উন্নত, বহুমুখী এবং প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ। আদি ব্রোঞ্জ যুগে ছোট ছোট কৃষিভিত্তিক বসতি ধীরে ধীরে সুরক্ষিত নগরকেন্দ্রে রূপ নিতে শুরু করে। মধ্যবর্তী একটি সংকোচনের পর্যায় অতিক্রম করার পর মধ্য ব্রোঞ্জ যুগে এই অঞ্চলে পুনরায় নগরায়ণ, স্থাপত্য, ধাতুশিল্প এবং আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে। এই সময়ে কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলো মিশর, মেসোপটেমিয়া এবং সিরিয়ার অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফলে বর্তমান গবেষণার আলোকে কানানীয়দের দক্ষিণ লেভান্টের প্রাথমিক নগরসভ্যতার অন্যতম প্রধান নির্মাতা ও বিকাশকারী জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কানানীয়দের রাজনৈতিক কাঠামো গঠনে লেভান্টের ভূগোল ও পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পাহাড়ি অঞ্চল, সংকীর্ণ উপত্যকা, বিচ্ছিন্ন নদী অববাহিকা এবং উপকূলীয় সমভূমির সমন্বয়ে গঠিত এই ভূপ্রকৃতি বৃহৎ কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের আঞ্চলিক রাষ্ট্রের বিকাশের জন্য বেশি উপযোগী ছিল। ফলে দক্ষিণ লেভান্টে মেসোপটেমিয়া বা মিশরের মতো একক সাম্রাজ্যের পরিবর্তে অসংখ্য স্বাধীন নগররাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। প্রতিটি নগররাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট নগরকেন্দ্র ও তার পার্শ্ববর্তী কৃষিভূমিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো এবং নিজস্ব রাজা, প্রশাসন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলত। ভাষা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও বস্তুসংস্কৃতিতে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল থাকলেও রাজনৈতিকভাবে তারা ছিল স্বাধীন; কখনও পারস্পরিক সহযোগী, আবার কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্রোঞ্জ যুগ জুড়ে এই নগররাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোই দক্ষিণ লেভান্টের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় এবং একই সঙ্গে এটি অঞ্চলটিকে বহিরাগত বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলোর সঙ্গে জটিল কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে যুক্ত রাখে (Golden, 2004)।
নগররাষ্ট্রের উদ্ভব ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
ব্রোঞ্জ যুগে কানানীয় সভ্যতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক এবং কাঠামোগত উদ্ভাবন ছিল নগররাষ্ট্র মডেল (City-State Model)। প্রতিটি নগররাষ্ট্র ছিল মূলত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক একক। একটি প্রধান দেয়ালঘেরা শহর এবং তার চারপাশের বেশ কিছু কৃষিনির্ভর গ্রাম মিলিয়ে একটি নগররাষ্ট্র গঠিত হতো। শহরের ভেতরে রাজার বিশাল প্রাসাদ, প্রশাসনিক ভবন এবং প্রধান দেবতার মন্দির থাকত। আর চারপাশের গ্রামগুলো এই শহরের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য, অলিভ অয়েল এবং মদ সরবরাহ করত। মেগিদ্দো, হাজর, লাখিশ এবং জেরিকোর মতো শহরগুলো ছিল এই নগররাষ্ট্রগুলোর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এগুলোর মধ্যে উত্তরের হাজর ছিল সবচেয়ে বিশাল এবং প্রভাবশালী। খননকাজে দেখা গেছে, হাজরের বিস্তৃতি ছিল প্রায় দুইশো একর জায়গা জুড়ে, যেখানে প্রায় বিশ হাজার মানুষের বসবাস ছিল (Finkelstein, 1996)। প্রতিটি নগরের নিজস্ব রাজা ছিল, যিনি একাধারে প্রধান সেনাপতি, বিচারক এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। প্রশাসনিকভাবে এই নগরগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল।
এই নগরগুলোর স্থাপত্য কাঠামো ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং প্রতিরক্ষামূলক। মধ্য ব্রোঞ্জ যুগে নগর প্রতিরক্ষায় একটি যুগান্তকারী স্থাপত্যশৈলীর ব্যবহার শুরু হয়, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা গ্লাসিস বা ঢালু পরিখা বলে থাকেন। শহরের মূল দেয়ালের বাইরে মাটির একটি বিশাল ঢাল তৈরি করা হতো, যার ওপর মসৃণ পাথর বা চুনের প্রলেপ দেওয়া থাকত। ফলে শত্রুবাহিনীর পক্ষে দেয়াল বেয়ে ওঠা বা দেয়ালের নিচে সুড়ঙ্গ খোঁড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যেত (Kempinski, 1992)। শহরের প্রবেশমুখে থাকত বিশাল তোরণ, যেগুলো সাধারণত একাধিক চেম্বার বা প্রকোষ্ঠে বিভক্ত থাকত। তোরণগুলো কেবল শহরের প্রবেশদ্বার ছিল না, এগুলো মূলত প্রশাসনিক কাজ, বিচারকার্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সভার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। প্রাসাদের ভেতরের কাঠামো প্রমাণ করে যে রাজারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার প্রদর্শনীতে প্রচুর সম্পদ ব্যয় করতেন। নগররাষ্ট্রগুলো কখনোই রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়নি, বরং ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণই তাদের দীর্ঘস্থায়ী টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি ছিল।
শহরের অভিজাত শ্রেণি এবং গ্রামের সাধারণ কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের নির্ভরশীল কিন্তু অসম সম্পর্ক বিরাজ করত। রাজারা গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ওপর চড়া কর আরোপ করতেন। এই করের মাধ্যমেই রাজকোষ পূর্ণ হতো এবং সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো। কৃষকদের উদ্বৃত্ত ফসল শহরের বিশাল গোলাঘরে সংরক্ষণ করা হতো। সংকট বা খরার সময় এই সংরক্ষিত শস্যই শহরের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখত। অন্যদিকে, বহিরাগত কোনো শত্রুর আক্রমণ হলে গ্রামের কৃষকরা শহরের বিশাল দেয়ালের ভেতর আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পেত। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়েই রাজার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সম্পদের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজপরিবার এবং মুষ্টিমেয় অভিজাতদের হাতে (Ilan, 1995)। সাধারণ মানুষের জীবন ছিল কঠোর পরিশ্রমে ঘেরা। রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ কানানীয়দের সামরিক দিক থেকে কিছুটা দুর্বল রাখলেও অর্থনৈতিকভাবে তাদের স্বাধীনভাবে বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছিল।
ব্রোঞ্জ যুগের অর্থনীতি, বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ও সামাজিক স্তরবিন্যাস
কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল মূলত তাদের কৃষিব্যবস্থা এবং সুদূরপ্রসারী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। লেভান্টের উর্বর উপত্যকাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে গম এবং যব উৎপাদিত হতো। পাহাড়ি ঢালগুলোতে চাষ হতো জলপাই এবং আঙুর। জলপাই পিষে তৈরি করা তেল এবং আঙুর থেকে তৈরি মদ কেবল স্থানীয় চাহিদাই মেটাত না, এগুলো ছিল কানানীয়দের প্রধান রপ্তানি পণ্য। কৃষি উৎপাদনের এই উদ্বৃত্তকে কেন্দ্র করেই একটি শক্তিশালী উদ্বৃত্ত অর্থনীতি (Surplus Economy) গড়ে ওঠে। রাজা এবং মন্দিরগুলো এই উদ্বৃত্ত সম্পদের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করত। সম্পদ ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্যই সমাজে বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। কামার, কুমার, তাঁতি এবং কারিগররা তাদের নির্ধারিত কাজ করত এবং বিনিময়ে রাজভাণ্ডার থেকে খাদ্য পেত। ধীরে ধীরে সমাজ একটি জটিল রূপ ধারণ করে, যেখানে সম্পদের মালিকানার ভিত্তিতে মানুষের অবস্থান নির্ধারিত হতে শুরু করে (Knapp, 1993)।
ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় কানানীয়রা খুব সহজেই সামুদ্রিক বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। সাইপ্রাস থেকে প্রচুর পরিমাণে তামা আমদানি করা হতো, যা ব্রোঞ্জ তৈরির প্রধান কাঁচামাল। একই সাথে ইজিয়ান সাগর এবং ক্রিট দ্বীপের সাথেও তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অন্যদিকে, স্থলপথে মেসোপটেমিয়া এবং মিশরের সাথে নিয়মিত বাণিজ্য কাফেলা যাতায়াত করত। লেবানন অঞ্চলের সিডার কাঠ মিশরের ফারাওদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল, কারণ মিশরে বড় কোনো গাছ জন্মাত না। এই কাঠ বিক্রি করে কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলো বিপুল পরিমাণ সোনা এবং বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করত। হাজর এবং মেগিদ্দোর মতো শহরগুলোর খননে মিশরীয় স্কারাব, সাইপ্রাসের সিরামিক এবং মেসোপটেমিয়ার সিলিন্ডার সিল পাওয়া গেছে। এগুলো প্রমাণ করে যে ব্রোঞ্জ যুগের কানানীয় শহরগুলো ছিল এক একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র (Sherratt, 1998)। বাণিজ্যিক এই আদান-প্রদান কেবল পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এর মাধ্যমে বিভিন্ন সভ্যতার ধারণা এবং সংস্কৃতিরও মেলবন্ধন ঘটেছিল।
বাণিজ্যের এই বিপুল প্রসার সমাজে এক স্পষ্ট সামাজিক স্তরবিন্যাস (Social Stratification) তৈরি করে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন ব্রোঞ্জ যুগের কবরস্থানগুলো খনন করেন, তখন এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র একেবারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শহরের অভিজাত এবং রাজপরিবারের সদস্যদের কবর দেওয়া হতো প্রাসাদের নিচে বা বিশেষ কোনো সমাধিস্তম্ভে। তাদের কবরে প্রচুর পরিমাণে সোনা, রূপা, ব্রোঞ্জের অস্ত্র এবং দামি সিরামিকের পাত্র দেওয়া হতো। অন্যদিকে, সাধারণ কৃষক বা কারিগরদের কবর ছিল খুব সাধারণ; সেখানে দৈনন্দিন ব্যবহারের কয়েকটি মাটির পাত্র ছাড়া আর কিছুই জুটত না (Richard, 1987)। ক্রমাগত ঋণের দায়ে অনেক সাধারণ কৃষক তাদের জমি হারিয়ে ভূমিদাসে পরিণত হতো। সমাজের এই বৈষম্য কোনো ব্যক্তিগত মতাদর্শের ফল ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন অর্থনৈতিক কাঠামোরই একটি অনিবার্য পরিণতি। সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার এই প্রক্রিয়া ব্রোঞ্জ যুগের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
কানানীয় ধর্মীয় কাঠামো, মিথলজি ও প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা
কানানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠানগুলো ছিল মূলত তাদের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রতিফলন। তাদের ধর্মীয় ব্যবস্থা ছিল বহুঈশ্বরবাদ (Polytheism)-এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। কানানীয় প্যানথিয়ন বা দেবমণ্ডলীর প্রধান দেবতা ছিলেন ‘এল’ (El), যাকে সৃষ্টিকর্তা এবং দেবতাদের পিতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল দেবতা ‘বাল’ (Baal)-এর। বাল ছিলেন মেঘ, বৃষ্টি এবং ঝড়ের দেবতা। যেহেতু লেভান্টের কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই বৃষ্টির দেবতা বালের সন্তুষ্টি অর্জন করা কানানীয় কৃষকদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মরণের প্রশ্ন ছিল। উর্বরতার দেবী আশেরাহ এবং যুদ্ধের দেবী আনাতও সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯২৯ সালে বর্তমান সিরিয়ার রাস শামরা বা প্রাচীন উগারিট নামক শহরে প্রচুর মাটির ফলক আবিষ্কৃত হয়। উগারিটিক ভাষায় লেখা এই ফলকগুলো থেকেই আধুনিক বিশ্ব প্রথমবারের মতো কানানীয় মিথলজি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানতে পারে (Smith, 2002)।
ইতিহাস এবং ধর্মীয় মিথলজির মধ্যে পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে কানানীয় ধর্মের বিশ্লেষণ একটি চমৎকার উদাহরণ। পরবর্তীকালের একেশ্বরবাদী ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে কানানীয়দের ধর্মীয় আচারকে পাশবিক এবং ঘৃণ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ওই আখ্যানগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং পূর্ববর্তী সংস্কৃতিকে বাতিল করা। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক খননে কানানীয় মন্দির বা ‘কাল্টিক কেন্দ্র’গুলোতে এমন কোনো পাশবিকতার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না, যা তৎকালীন অন্যান্য সভ্যতার চেয়ে খুব আলাদা ছিল। কানানীয়রা পাথর কেটে বড় বড় স্তম্ভ বা ‘মাসেবোত’ (Massebot) তৈরি করত, যা তাদের দেবতাদের প্রতীক হিসেবে পূজিত হতো। এই মন্দিরগুলো কেবল ধর্মীয় আরাধনার স্থান ছিল না, এগুলো ছিল সম্পদের পুনর্বণ্টন এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষ তাদের ফসলের একটি অংশ মন্দিরে দান করত, যা খরা বা দুর্ভিক্ষের সময় সমাজের কাজে লাগত (Dever, 2005)।
কানানীয়দের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির শক্তিগুলোকে নিজেদের অনুকূলে রাখা। ফসল রোপণ এবং কাটার সময় বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো, যেখানে পশু উৎসর্গ করা ছিল একটি সাধারণ প্রথা। এই উৎসর্গকৃত পশুর মাংস পরবর্তীতে পুরোহিত এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো, যা সমাজের পুষ্টির চাহিদাও মেটাত। নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই ধর্মীয় প্রথাগুলো মূলত একটি কৃষিভিত্তিক সমাজের সামাজিক সংহতি ধরে রাখার মেকানিজম হিসেবে কাজ করত। বিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্ব পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে কানানীয় ধর্ম কোনো শয়তানের উপাসনা ছিল না, বরং তা ছিল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার সাথে মানুষের টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টারই একটি মনস্তাত্ত্বিক রূপ (Day, 2002)। পরবর্তীকালে এই কানানীয় সংস্কৃতি এবং ভাষার ওপর ভিত্তি করেই লেভান্টের অন্যান্য ধর্মীয় আখ্যানগুলোর জন্ম হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি, পরাশক্তির হস্তক্ষেপ ও বাফার জোন
শেষ ব্রোঞ্জ যুগে কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক জটিল ঘূর্ণাবর্তে পতিত হয়। এই সময়ের সবচেয়ে মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হলো ‘আমারনা পত্র’ বা Amarna Letters। মিশরের আমারনা শহরে আবিষ্কৃত এই মাটির ফলকগুলো মূলত মিশরীয় ফারাও (বিশেষ করে আখেনাতেন এবং তৃতীয় আমেনহোটেপ) এবং কানানীয় রাজাদের মধ্যকার কূটনৈতিক চিঠিপত্র। কিউনিফর্ম লিপিতে আক্কাদীয় ভাষায় লেখা এই চিঠিগুলো ব্রোঞ্জ যুগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক অভাবনীয় চিত্র তুলে ধরে। চিঠিগুলো থেকে জানা যায় যে, কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলো সেই সময়ে সরাসরি মিশরের সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে ছিল। কানানীয় রাজারা নিজেদের ফারাওয়ের অনুগত দাস হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই ব্যবস্থাকে ইতিহাসে অধীনতামূলক মিত্রতা (Vassalage) বলা হয়। ফারাওরা সরাসরি শাসন না করে স্থানীয় রাজাদের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতেন। স্থানীয় রাজারা ফারাওকে নিয়মিত সোনা, রূপা, দাস এবং বিলাসবহুল পণ্য কর হিসেবে প্রদান করতে বাধ্য থাকতেন (Moran, 1992)।
মিশরীয় নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও কানানীয় রাজাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কোনো শেষ ছিল না। আমারনা চিঠিগুলোতে দেখা যায়, রাজারা প্রতিনিয়ত ফারাওয়ের কাছে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। বাইব্লোস শহরের রাজা রিব-হাদ্দা ফারাওকে অসংখ্য চিঠি লিখে সামরিক সাহায্যের আবেদন করেছিলেন, কারণ তার প্রতিবেশী রাজারা তার শহর দখল করার চেষ্টা করছিল। ফারাওরা সাধারণত এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোতে সরাসরি মাথা ঘামাতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের কর আদায় বা বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতো। মিশরের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তরের আরেক পরাশক্তি, হিত্তি সাম্রাজ্যের হাত থেকে নিজেদের সীমানা রক্ষা করা। এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে কানানীয় অঞ্চলটি মূলত একটি বাফার জোন (Buffer Zone) হিসেবে কাজ করত। ফারাওরা চাইতেন হিত্তিদের সাথে যেকোনো যুদ্ধ যেন কানানের মাটিতে হয়, মিশরের মাটিতে নয় (Redford, 1992)।
পরাশক্তিগুলোর এই নিরন্তর উপস্থিতির কারণে কানানে এক ধরনের মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। মিশরীয় শিল্পকলা, স্থাপত্যের নকশা এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র কানানীয় সমাজ জীবনে গভীরভাবে প্রবেশ করে। অনেক কানানীয় রাজা নিজেদের প্রাসাদে মিশরীয় স্টাইলের ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র আঁকতেন। আবার মিশরীয় ফারাওরা কানানীয় রাজকন্যাদের বিয়ে করে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতেন। অন্যদিকে, উত্তরের মিতানি এবং হিত্তিদের সাংস্কৃতিক প্রভাবও এই অঞ্চলে এসে পৌঁছায়। এই কূটনৈতিক আদান-প্রদান এবং পরাশক্তির হস্তক্ষেপ কানানীয় সভ্যতাকে আন্তর্জাতিক চরিত্র দান করেছিল ঠিকই, কিন্তু একই সাথে তাদের রাজনৈতিক মেরুদণ্ডকেও দুর্বল করে দিয়েছিল। বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে তারা নিজস্ব কোনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় (Bryce, 2005)।
নগররাষ্ট্রের পতন ও ব্রোঞ্জ যুগের কাঠামোগত অবসান
খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এক অভাবনীয় বিপর্যয় নেমে আসে, যাকে ইতিহাসবিদরা ‘শেষ ব্রোঞ্জ যুগের পতন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই বিপর্যয় কেবল কানানে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মিশর, আনাতোলিয়া এবং গ্রিসের মাইসিনিয়ান সভ্যতা পর্যন্ত এর প্রভাবে ভেঙে পড়েছিল। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কীভাবে হঠাৎ করে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়তে পারে, এটি তার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। পতনের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি কাঠামোগত পতন (Systemic Collapse)। ভূমধ্যসাগর দিয়ে একদল রহস্যময় আক্রমণকারী লেভান্টের উপকূলে আছড়ে পড়ে, যাদের মিশরীয়রা ‘সমুদ্রের মানুষ’ বা Sea Peoples বলে উল্লেখ করেছে। এই আক্রমণকারীদের মধ্যে ফিলিস্তীয়রাও (Philistines) ছিল। তারা কানানের উপকূলীয় শহরগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হাজর, মেগিদ্দো এবং লাখিশের মতো বড় বড় নগররাষ্ট্রগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই শহরগুলোর ধ্বংসস্তূপের স্তরে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে (Cline, 2014)।
সাম্প্রতিক আর্কিওজেনেটিক গবেষণাও ফিলিস্তীয়দের উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে। দক্ষিণ লেভান্টের আশকেলনের সমাধিক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করা ব্রোঞ্জ ও লৌহ যুগের মানবদেহাবশেষের জিনগত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সেখানে দক্ষিণ ইউরোপ বা এজিয়ান-সম্পর্কিত একটি নতুন জিনগত উপাদান উপস্থিত হয়েছিল। তবে এই উপাদান দীর্ঘস্থায়ী ছিল না; কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই নবাগত জনগোষ্ঠী স্থানীয় লেভান্টীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাপকভাবে মিশে যায় এবং তাদের স্বতন্ত্র জিনগত বৈশিষ্ট্য অনেকাংশে বিলীন হয়ে যায়। ফলে আর্কিওজেনেটিক গবেষণা ফিলিস্তীয়দের ক্ষেত্রে সীমিত বহিরাগত অভিবাসনের প্রমাণ দিলেও একই সঙ্গে দ্রুত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের একীভূত হওয়ার বিষয়টিও নির্দেশ করে (Feldman et al., 2019)।
তবে বহিরাগত আক্রমণই এই পতনের একমাত্র কারণ ছিল না। অভ্যন্তরীণ অনেক কারণও সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে ওই সময়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তন ঘটেছিল। ফলে ক্রমাগত খরা এবং বৃষ্টিপাতের অভাব দেখা দেয়। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে খরা মানেই ছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ফসলের অভাবে শহরের বিশাল জনসংখ্যাকে খাওয়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সাথে রাজাদের অতিরিক্ত করের চাপে সাধারণ কৃষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। অনেক কৃষক শহর ছেড়ে পাহাড়ি অঞ্চলে পালিয়ে যায়। এই পালিয়ে যাওয়া মানুষদের অনেকেই ‘হাবিরু’ (Habiru) নামক দস্যু বা ভাড়াটে সৈন্যের দলে যোগ দেয়। হাবিরুরা সমাজ কাঠামোর বাইরে অবস্থান করত এবং সুযোগ পেলেই শহরের বাণিজ্য কাফেলা বা অভিজাতদের ওপর আক্রমণ চালাত। মূলত অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতার কারণেই নগররাষ্ট্রের মডেলটি আর কাজ করছিল না (Na’aman, 2005)।
এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলো আর কখনোই তাদের পূর্বের গৌরব ফিরে পায়নি। বিশাল প্রাসাদ এবং মন্দিরগুলো পরিত্যক্ত হয়। মানুষ বড় শহর ছেড়ে পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট ছোট গ্রাম গড়ে তুলতে শুরু করে। এর সাথে সাথেই লেভান্টে লোহা গলানোর প্রযুক্তির প্রচলন ঘটে এবং ব্রোঞ্জ যুগ শেষে লৌহ যুগের সূচনা হয়। রাজনৈতিকভাবে কানানীয় সভ্যতা ধ্বংস হলেও তাদের সাংস্কৃতিক এবং প্রযুক্তিগত অবদান পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাদের উদ্ভাবিত বর্ণমালা বা অ্যালফাবেট পরবর্তীকালে গ্রিক এবং ফিনিশীয়দের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের কৃষি পদ্ধতি, মৃতশিল্প এবং ভাষার প্রভাব লৌহ যুগের নতুন জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সঞ্চারিত হয়। ব্রোঞ্জ যুগের এই নগররাষ্ট্রগুলো মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা প্রমাণ করে যে সভ্যতার বিকাশ কোনো সরল রেখায় চলে না, বরং উত্থান এবং পতনের এক জটিল চক্রের মধ্য দিয়েই সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে যায় (Finkelstein, 1998)।
মিশরীয় প্রভাব ও কানানের অধীনতা (Egyptian Influence and Canaanite Subordination): সাম্রাজ্যের ছায়া
প্রাচীন মিশরের সম্প্রসারণ নীতি ও কানানের কৌশলগত গুরুত্ব
ভৌগোলিক মানচিত্রে প্রাচীন মিশর এবং কানান বা লেভান্ট অঞ্চলের অবস্থান পাশাপাশি হলেও, দীর্ঘকাল ধরে এই দুই অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না। নীল নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা মিশরীয় সভ্যতা প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল। পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি, পূর্বে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণে নীল নদের দুর্গম জলপ্রপাতগুলো মিশরকে বহিরাগত আক্রমণের হাত থেকে এক প্রকার প্রাকৃতিক বর্ম পরিয়ে রেখেছিল। ফলে প্রাচীন এবং মধ্য রাজ্যের যুগে মিশরীয় ফারাওরা তাদের সীমানার বাইরের জগত নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তাদের মূল মনোযোগ ছিল অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং নীল নদের কৃষিব্যবস্থার ওপর। কানান বা দক্ষিণ লেভান্টের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল মূলত বাণিজ্যিক। লেবাননের সিডার কাঠ, বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি রজন এবং দামি তেলের খুব প্রয়োজন হতো মিশরে, বিশেষ করে মন্দির নির্মাণ এবং মৃতদেহ মমি করার কাজে। এই অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর জন্যই তারা কানানের উপকূলীয় শহরগুলোর সাথে যোগাযোগ বজায় রাখত। তবে সময়ের সাথে সাথে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক একটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে রূপান্তরিত হতে শুরু করে।
কানান অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে এশিয়া এবং আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলোর কেন্দ্রবিন্দু। ফারাওরা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে, কানানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে তাদের উত্তরের বাণিজ্যপথগুলো কখনোই সুরক্ষিত থাকবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ভূ-কৌশলগত গভীরতা (Geostrategic Depth) বলা যেতে পারে। মিশরীয়রা বুঝতে পেরেছিল যে, কোনো শক্তিশালী বিদেশি শত্রু যদি কানানে এসে ঘাঁটি গাড়ে, তবে সেখান থেকে সিনাই মরুভূমি পার হয়ে মিশরে আক্রমণ করা খুব সহজ হয়ে যাবে। তাই মিশরের মূল ভূখণ্ডকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কানানকে একটি বাফার জোন হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বাণিজ্যের পাশাপাশি এই নিরাপত্তাবোধ থেকেই কানান অঞ্চলের প্রতি মিশরের এক ধরনের সাম্রাজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে শুরু করে। তারা সরাসরি শাসন করার বদলে কানানের নগররাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার দিকে মনোনিবেশ করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত মিশরীয় ‘অভিশাপ লিপি’ বা এক্সেক্রেশন টেক্সটগুলো এই সময়ের সম্পর্কের একটি চমৎকার বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ দেয়। মিশরীয়রা মাটির পাত্র বা ছোট পুতুলের ওপর তাদের শত্রুদের নাম, বিশেষ করে কানানীয় রাজাদের নাম লিখে সেগুলো ভেঙে ফেলত। তারা বিশ্বাস করত যে এর মাধ্যমে শত্রুদের জাদুকরী উপায়ে ধ্বংস করা সম্ভব (Weinstein, 1981)। এই লিপিগুলো থেকে বোঝা যায়, মিশরীয়রা কানানের রাজনৈতিক বিভাজন এবং স্থানীয় রাজাদের সম্পর্কে খুব ভালোভাবে ওয়াকিবহাল ছিল। তারা কানানের নির্দিষ্ট কিছু নগরের রাজাদের নিজেদের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করত এবং অবাধ্য রাজাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করত। আদি এবং মধ্য ব্রোঞ্জ যুগে সরাসরি কোনো সামরিক দখলদারি না থাকলেও, মিশরের এই পরোক্ষ প্রভাব কানানের স্থানীয় রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। স্থানীয় রাজারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ফারাওদের সন্তুষ্ট রাখাকেই সবচেয়ে নিরাপদ উপায় বলে মনে করতেন।
হিকসোসদের পতন ও নতুন রাজ্যের সাম্রাজ্যিক উত্থান
মিশরের ইতিহাসে একটি অভাবনীয় ঘটনা তাদের পুরো পররাষ্ট্রনীতিকে চিরতরে বদলে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব সতেরো শতকের দিকে এশিয়া থেকে আগত একদল সেমিটিক ভাষাভাষী মানুষ মিশরের উত্তরাঞ্চল বা নিম্ন মিশর দখল করে নেয়। ইতিহাসে তারা হিকসোস নামে পরিচিত, যার মিশরীয় অর্থ ‘বিদেশি শাসক’। হিকসোসরা মূলত দক্ষিণ লেভান্ট বা কানান অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল এবং ঘোড়াচালিত রথ ও কম্পোজিট ধনুকের মতো উন্নত সামরিক প্রযুক্তির সাহায্যে মিশরের একটি বড় অংশের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। দীর্ঘদিন তাদের আকস্মিক আক্রমণকারী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক, বায়োমলিকুলার ও আইসোটোপ গবেষণা ইঙ্গিত করে যে হিকসোস শাসনের আগে থেকেই বহু লেভান্টীয় অভিবাসী নীল বদ্বীপ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। অর্থাৎ হিকসোসদের উত্থান সম্ভবত এককালীন সামরিক আক্রমণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন, সামাজিক একীভূতকরণ এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের ফল ছিল (Bietak, 1996; Stantis et al., 2020)। এই ঘটনাটি মিশরীয়দের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ট্রমার জন্ম দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের সুরক্ষিত ও শ্রেষ্ঠ মনে করা একটি রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো বহিরাগত উৎসের এক রাজবংশের অধীনে চলে যায়। প্রায় একশো বছর ধরে হিকসোসরা নিম্ন মিশর শাসন করে। পরবর্তীতে থিবসের ফারাও প্রথম আহমোসের নেতৃত্বে মিশরীয়রা দীর্ঘ যুদ্ধের মাধ্যমে হিকসোসদের পরাজিত করে এবং তাদের দক্ষিণ লেভান্টের দিকে বিতাড়িত করে। এই বিজয়ের মাধ্যমেই মিশরে নতুন রাজ্য (New Kingdom) যুগের সূচনা হয়।
হিকসোসদের বিতাড়িত করার পর মিশরীয় ফারাওরা আর আগের মতো নিজেদের সীমানার ভেতর গুটিয়ে থাকতে রাজি ছিলেন না। নীল বদ্বীপে এশীয় উৎসের এক শাসকগোষ্ঠীর উত্থান এবং নিম্ন মিশরের ওপর তাদের দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ব মিশরীয় রাজনৈতিক স্মৃতিতে গভীর নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। ফলে নতুন রাজ্যের ফারাওদের মধ্যে এক ধরনের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা নীতি গড়ে ওঠে। তারা সিদ্ধান্ত নেন, সম্ভাব্য শত্রুকে আর মিশরের সীমান্তে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না; বরং মিশরকেই দক্ষিণ লেভান্ট ও সিরিয়া পর্যন্ত সামরিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। ফারাও প্রথম আহমোস এবং তার উত্তরসূরিরা নিয়মিতভাবে কানান অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে শুরু করেন (Hasel, 1998)। এর ফলে কানান আর কেবল বাণিজ্যের কেন্দ্র বা বাফার জোন থাকল না, বরং ধীরে ধীরে মিশরীয় সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণের অংশে পরিণত হতে থাকে। নতুন রাজ্যের ফারাওরা নিজেদের কেবল মিশরের দেবতা হোরাসের প্রতিনিধি হিসেবেই দেখতেন না; তারা নিজেদের সমগ্র পরিচিত বিশ্বের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
এই সাম্রাজ্যিক নীতির চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ফারাও তৃতীয় থুতমোসের শাসনামলে। খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫৭ অব্দে কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর একটি বিশাল জোট মিশরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই জোটের নেতৃত্বে ছিল উত্তরের শক্তিশালী নগর কাদেশ এবং মেগিদ্দো। তৃতীয় থুতমোস তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সিনাই পার হয়ে কানানে প্রবেশ করেন এবং মেগিদ্দো শহরের কাছে কানানীয় জোটের মুখোমুখি হন। ইতিহাসে এটিই হলো প্রথম কোনো যুদ্ধ, যার বিস্তারিত লিখিত বিবরণ এবং সামরিক কৌশল সংরক্ষিত রয়েছে। কার্নাক মন্দিরের দেয়ালচিত্রে এই যুদ্ধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা খোদাই করা আছে। থুতমোস একটি অত্যন্ত সরু এবং বিপদজনক গিরিপথ দিয়ে তার বাহিনীকে চালিত করে শত্রুদের সম্পূর্ণ চমকে দেন। মেগিদ্দোর যুদ্ধে কানানীয় জোটের শোচনীয় পরাজয় ঘটে এবং ফারাও কানানের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন (Murnane, 1990)। এই একটি যুদ্ধের মাধ্যমেই সমগ্র কানান অঞ্চল মিশরের পদানত হয় এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে তা মিশরের একটি অধীনস্থ প্রদেশ হিসেবেই শাসিত হয়।
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অধীনতামূলক মিত্রতার কাঠামো
মেগিদ্দোর যুদ্ধে বিজয়ের পর মিশরীয়রা কানানকে সরাসরি নিজেদের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করে নেয়নি। রোমান বা আধুনিক যুগের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতো প্রতিটি শহরে নিজস্ব শাসক বসিয়ে সরাসরি শাসন করার নীতি মিশরের ছিল না। কানানের রুক্ষ পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং খণ্ডিত নগররাষ্ট্রের কাঠামোর কারণে সরাসরি শাসন করা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রায় অসম্ভব। এর বদলে তারা অধীনতামূলক মিত্রতা (Vassalage) নামক একটি বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এই ব্যবস্থায় কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর স্থানীয় রাজাদের তাদের পদে বহাল রাখা হতো। বিনিময়ে সেই রাজাদের ফারাওয়ের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করতে হতো। স্থানীয় রাজারা নিজেদের শহরের অভ্যন্তরীণ বিচার এবং প্রশাসন স্বাধীনভাবেই পরিচালনা করতেন, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি এবং যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। মিশরের অনুমতি ছাড়া তারা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করতে পারতেন না।
এই আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য মিশরীয়রা একটি অত্যন্ত কার্যকর এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করত। তারা কানানীয় রাজাদের সন্তানদের, বিশেষ করে উত্তরাধিকারীদের জিম্মি হিসেবে মিশরে নিয়ে যেত। সেখানে রাজপুত্রদের মিশরীয় ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং প্রশাসনিক রীতিনীতি শেখানো হতো। দীর্ঘকাল মিশরে থাকার ফলে এই তরুণ রাজপুত্ররা মানসিকভাবে পুরোপুরি মিশরীয় হয়ে উঠত। তাদের পোশাক, চিন্তাধারা এবং জীবনাচরণে মিশরের প্রভাব গভীরভাবে গেঁথে যেত। এই প্রক্রিয়াকে সমাজবিজ্ঞানে সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ (Cultural Assimilation) বলা হয়। যখন কোনো কানানীয় রাজা মারা যেতেন, তখন মিশর থেকে সেই শিক্ষিত রাজপুত্রকে ফেরত পাঠিয়ে তাকে নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসানো হতো। ফলে ফারাওরা এমন একজন শাসক পেতেন যিনি জন্মসূত্রে কানানীয় হলেও মননে ছিলেন সম্পূর্ণ মিশরীয়। এই কৌশলের কারণে কানানীয় রাজারা ফারাওয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কথা খুব একটা ভাবতেন না (Higginbotham, 2000)।
পাশাপাশি সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য কানানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থানগুলোতে মিশরীয়রা কিছু স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল। গাজা, ইয়াফো (জাফা) এবং বেথ শিয়ান ছিল এরকম তিনটি প্রধান কেন্দ্র। এই শহরগুলোতে মিশরীয় গভর্নররা বসবাস করতেন, যাদের বলা হতো ‘রাবিসু‘। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেথ শিয়ান এবং দেইর এল-বালাহ শহরে চমৎকার সব মিশরীয় প্রশাসনিক ভবনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা The Architecture of Imperialism-এর এক ধ্রুপদী উদাহরণ (Morris, 2005)। এই গভর্নরদের কাজ কানানীয় রাজাদের দৈনন্দিন প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করা ছিল না। তারা মূলত তদারকি করতেন যেন রাজারা নিয়মিত কর পরিশোধ করেন এবং বাণিজ্যপথগুলো নিরাপদ থাকে। কোনো রাজা বিদ্রোহ করলে বা কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে এই সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠিয়ে বিদ্রোহ দমন করা হতো। ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকৃত কিন্তু কঠোর প্রশাসনিক জাল কানানকে দীর্ঘকাল মিশরের ছায়ায় বন্দি করে রেখেছিল।
অর্থনৈতিক শোষণ, বাণিজ্য ও সম্পদের অসম প্রবাহ
মিশরীয় সাম্রাজ্যবাদের মূল চালিকাশক্তি ছিল কানানের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং সেখান থেকে সর্বোচ্চ সম্পদ আহরণ করা। অধীনতামূলক মিত্রতা বা ভাসালেজের শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি কানানীয় নগররাষ্ট্রকে ফারাওয়ের কোষাগারে বার্ষিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রদান করতে হতো। এই করের তালিকায় থাকত বিপুল পরিমাণ গম, যব, জলপাই তেল, মদ, এবং গবাদিপশু। এর বাইরেও লেবাননের কাঠ, সাইপ্রাসের তামা এবং বিভিন্ন দামি রত্নপাথর কর হিসেবে দিতে হতো। ফারাওয়ের মেজাজ এবং সাম্রাজ্যের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে এই করের পরিমাণ মাঝেমধ্যেই বাড়ানো হতো। কানান থেকে দাস হিসেবে প্রচুর মানুষকে মিশরে পাঠানো হতো, যাদের মূলত বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প এবং খনিতে কাজ করানো হতো। এই বিশাল পরিমাণ সম্পদের বহিঃপ্রবাহ কানানের স্থানীয় অর্থনীতিতে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল (Ahituv, 1978)।
কর মেটানোর জন্য কানানীয় রাজারা তাদের নিজেদের সাধারণ কৃষক এবং কারিগরদের ওপর সীমাহীন চাপ প্রয়োগ করতেন। গ্রামীণ কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের একটি বিশাল অংশ জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হতো। ফলে কৃষকদের হাতে নিজেদের জীবন ধারণের জন্য খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকত। আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় একে উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) শোষণ বলা যেতে পারে, যেখানে উৎপাদকের পরিশ্রমের ফসল একটি শাসক শ্রেণি সম্পূর্ণভাবে ভোগ করে। এই শোষণের ফলে কানানীয় সমাজে এক বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়। শহরের অভিজাতরা ফারাওদের সন্তুষ্ট রেখে বিলাসবহুল জীবন যাপন করত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ক্রমশ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হতে থাকে। বারবার খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে এই কৃষকদের জীবন আক্ষরিক অর্থেই হুমকির মুখে পড়ত, কারণ তাদের কোনো সঞ্চয় করার সুযোগ ছিল না।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও মিশরের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যপথগুলো সম্পূর্ণভাবে মিশরীয় নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কানানীয় বণিকরা চাইলেই স্বাধীনভাবে যেকোনো দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারত না। তাদের বাণিজ্যের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে মিশর। কানানের বন্দর নগরীগুলো থেকে জাহাজে করে পণ্য নীল নদের বদ্বীপ অঞ্চলে যেত। বিনিময়ে মিশর থেকে আসত প্যাপিরাস, লিনেন কাপড়, এবং বিভিন্ন ধরনের বিলাসবহুল কারুশিল্প। কানানের অভিজাত সমাজে মিশরীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। তারা নিজেদের সামাজিক মর্যাদা প্রমাণের জন্য মিশরীয় আসবাবপত্র এবং গয়না ব্যবহার করত। এই অসম বাণিজ্যিক সম্পর্কের ফলে কানানীয় অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি পরনির্ভরশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়। সম্পদের এই একমুখী প্রবাহ কানানের নগররাষ্ট্রগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
আমারনা পত্র ও কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
কানানের ওপর মিশরীয় নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে স্পষ্ট এবং বস্তুনিষ্ঠ চিত্র পাওয়া যায় আমারনা পত্র থেকে। ১৮৮৭ সালে মিশরের আমারনা শহরে স্থানীয় কৃষকরা ভুলবশত কিছু মাটির ফলক আবিষ্কার করে। পরবর্তীতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেখানে খনন চালিয়ে প্রায় চারশোর মতো ফলক উদ্ধার করেন। এই ফলকগুলো ছিল মূলত ফারাও আখেনাতেন এবং তৃতীয় আমেনহোটেপের সময়কার কূটনৈতিক চিঠিপত্র। কিউনিফর্ম লিপিতে আক্কাদীয় ভাষায় লেখা এই চিঠিগুলো ব্রোঞ্জ যুগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক অমূল্য দলিল। এই চিঠিগুলো থেকে জানা যায় যে, বাইরে থেকে কানানকে মিশরের একটি সুশৃঙ্খল প্রদেশ মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে তীব্র দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। স্থানীয় রাজারা প্রতিনিয়ত ফারাওয়ের কাছে চিঠি লিখে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেন এবং নিজেদের ফারাওয়ের সবচেয়ে অনুগত দাস হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করতেন (Cohen & Westbrook, 2000)।
চিঠিগুলোতে কানানীয় রাজাদের অসহায়ত্ব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের চিত্র খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাইব্লোস শহরের রাজা রিব-হাদ্দা ফারাওকে কয়েক ডজন চিঠি লিখেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, তার প্রতিবেশী রাজা আবদি-আশিরতা তার শহরগুলো একে একে দখল করে নিচ্ছে। রিব-হাদ্দা ফারাওয়ের কাছে বারবার কিছু সৈন্য পাঠানোর আকুতি জানিয়েছিলেন শহর রক্ষা করার জন্য। একইভাবে জেরুজালেমের রাজা আবদি-হেবা অভিযোগ করেছিলেন যে, অন্য রাজারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ফারাওরা সাধারণত এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোতে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। কানানীয় রাজারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করলেও ফারাওদের কিছু যেত আসত না, যতক্ষণ পর্যন্ত না বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যেত বা কর আসা বন্ধ হতো। মিশরের এই কৌশলগত নীরবতা কানানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সব সময় অস্থিতিশীল করে রাখত।
আমারনা পত্রের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হাবিরু’ বা আপিরু নামক একটি গোষ্ঠীর উল্লেখ। কানানীয় রাজারা বারবার ফারাওকে চিঠি লিখে অভিযোগ করতেন যে হাবিরুরা তাদের শহর আক্রমণ করছে এবং কৃষিজমি ধ্বংস করে দিচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে অনেক পণ্ডিত মনে করতেন যে এই হাবিরুরাই হলো বাইবেলে উল্লেখিত হিব্রু বা ইসরায়েলীয় জাতি। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এবং ভাষাতত্ত্ব প্রমাণ করেছে যে হাবিরু কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মের নাম ছিল না। এরা ছিল মূলত কানানীয় সমাজেরই একটি অংশ, যারা অতিরিক্ত কর এবং শোষণের হাত থেকে বাঁচতে শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এই পলাতক কৃষক, ঋণগ্রস্ত মানুষ এবং দস্যুরা একতাবদ্ধ হয়ে শহরের অভিজাতদের ওপর আক্রমণ চালাত। সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এটি ছিল মূলত সামাজিক প্রান্তিকীকরণ (Social Marginalization)-এর একটি বাস্তব রূপ। নগররাষ্ট্রগুলোর এই অভ্যন্তরীণ সামাজিক অস্থিরতা প্রমাণ করে যে মিশরীয় শাসন কানানে কোনো টেকসই শান্তি আনতে পারেনি, বরং বৈষম্য এবং দ্বন্দ্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ও মিশরীয় আধিপত্যের ঐতিহাসিক অবসান
দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে মিশরের অধীনে থাকার ফলে কানানীয় সমাজে এক ধরনের ব্যাপক সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ঘটেছিল। কানানীয় অভিজাতরা কেবল রাজনৈতিকভাবেই ফারাওদের অধীন ছিল না, সাংস্কৃতিকভাবেও তারা মিশরকে এক ধরনের আদর্শ বলে মনে করত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে কানানের বিভিন্ন শহরে প্রচুর পরিমাণে মিশরীয় ভাস্কর্য, স্কারাব (গুবরে পোকার আকৃতির পবিত্র পাথর) এবং হাতির দাঁতের কারুকাজ পাওয়া গেছে। কানানীয় রাজারা নিজেদের প্রাসাদের নকশা মিশরীয় ধাঁচে তৈরি করতেন। এমনকি তাদের সমাহিত করার পদ্ধতিতেও মিশরীয় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেক মৃতদেহের সাথে মাটির তৈরি ছোট ছোট পুতুল বা ‘শাবতি’ দেওয়া হতো, যা মূলত মিশরীয়দের প্রথা ছিল। এই চর্চাগুলোকে নৃবিজ্ঞানীরা অভিজাত অনুকরণ (Elite Emulation) হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে একটি দুর্বল সমাজের উচ্চবিত্তরা শক্তিশালী সাম্রাজ্যের রীতিনীতি গ্রহণ করে নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা করে (Higginbotham, 2000)।
ধর্মীয় ক্ষেত্রেও এই দুই অঞ্চলের মধ্যে এক ধরনের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। প্রাচীন বিশ্বে আধুনিক কালের মতো ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বা জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের কোনো ধারণা ছিল না। মিশরীয়রা কানানীয়দের তাদের নিজস্ব দেবতার পূজা করতে বাধা দেয়নি। বরং তারা কানানীয় দেবতাদের সাথে নিজেদের দেবতাদের মিল খুঁজে পেত। কানানীয় দেবী আনাত বা আস্তার্তে মিশরেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, কানানের তিমনা উপত্যকায় তামার খনির কাছে মিশরীয় দেবী হাথরের একটি বিশাল মন্দির পাওয়া গেছে, যেখানে কানানীয় খনি শ্রমিকরাও পূজা করত। এই ধর্মীয় বহুত্ববাদ প্রমাণ করে যে প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ব্যবস্থা অনেক বেশি নমনীয় এবং সমন্বয়বাদী ছিল। পরবর্তীতে রচিত ধর্মীয় মিথলজিগুলোতে মিশরকে একটি চরম অত্যাচারী এবং ঈশ্বরবিরোধী রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলে ভিন্ন কথা। মিথলজির এক্সোডাস বা বিশাল জনসমষ্টির মিশর ত্যাগের বর্ণনার সাথে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের কোনো মিল পাওয়া যায় না। বাস্তবে কানানে মিশরীয় শাসন কোনো অলৌকিক কারণে শেষ হয়নি, বরং সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণেই তা ধীরে ধীরে গুটিয়ে গিয়েছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এক বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। ফারাও তৃতীয় রামেসিসের শাসনামলে ‘সমুদ্রের মানুষ’ বা সি পিপলস নামক একদল আক্রমণকারী লেভান্ট এবং মিশরের উপকূলে একযোগে আক্রমণ চালায়। ফারাও রামেসিস কোনোমতে মিশরের মূল ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারলেও কানানের ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ফসকে যায়। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং খরার কারণে মিশরের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। নিজস্ব সংকট সামাল দিতে গিয়ে মিশরীয়রা কানান থেকে তাদের সব সৈন্য এবং গভর্নরদের প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। প্রায় তিনশো বছরের মিশরীয় সাম্রাজ্যের ছায়া কানানের ওপর থেকে সরে যায়। মিশরের এই প্রস্থানের ফলে কানানে এক বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। নগররাষ্ট্রগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকেই ধীরে ধীরে লৌহ যুগের নতুন গ্রামীণ সমাজগুলো মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে, যারা পরবর্তীতে নতুন জাতিসত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
হিত্তি, মিতানি ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা (Hittites, Mitanni and Regional Rivalry): কানানের ক্ষমতার খেলা
মিতানি সাম্রাজ্যের উত্থান ও লেভান্টে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ
প্রাচীন লেভান্টের ভূরাজনীতিতে ব্রোঞ্জ যুগের শেষভাগ ছিল চরম উত্থান-পতনের এক নাটকীয় সময়কাল। এই সময়ে মেসোপটেমিয়ার উত্তরাঞ্চল এবং বর্তমান সিরিয়ার বিস্তীর্ণ সমভূমিতে হুরিয়ান নামক এক রহস্যময় জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে। ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে এরা সেমিটিক বা ইন্দো-ইউরোপীয় কোনো শাখারই অন্তর্ভুক্ত ছিল না। খ্রিস্টপূর্ব পনেরো শতকের দিকে এই হুরিয়ানরা নিজেদের সংগঠিত করে মিতানি নামক এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করে (Wilhelm, 1989)। ওয়াশুকান্নি নামক শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্য খুব দ্রুতই প্রাচীন প্রাচ্যের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হয়। মিতানিদের এই অভাবনীয় উত্থানের পেছনে প্রধান অনুঘটক ছিল তাদের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে হালকা, স্পোকযুক্ত চাকার ঘোড়াচালিত রথের ব্যাপক প্রচলন ঘটায়, যা তৎকালীন রণকৌশলে এক বিশাল বিপ্লব নিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক আর্কিওজেনেটিক গবেষণাও হুরিয়ান ও মিতানি জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন আলোকপাত করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত হুরিয়ান বা মিতানি জনগোষ্ঠীকে সরাসরি প্রতিনিধিত্বকারী পর্যাপ্ত প্রাচীন ডিএনএ নমুনা পাওয়া যায়নি, উত্তর মেসোপটেমিয়া, পূর্ব আনাতোলিয়া এবং উত্তর সিরিয়া অঞ্চলের মানবদেহাবশেষের জিনগত বিশ্লেষণ থেকে এই অঞ্চলের জনসংখ্যাগত ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেছে। এসব গবেষণায় দেখা যায়, ব্রোঞ্জ যুগে অঞ্চলটির জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জিনগত ধারাবাহিকতা বজায় ছিল, পাশাপাশি ককেশাস ও জাগ্রোস-সম্পর্কিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বহু শতাব্দী ধরে সীমিত জনসংমিশ্রণও ঘটেছিল। অন্যদিকে মিতানি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে যে ইন্দো-আর্য ভাষাগত ও ধর্মীয় উপাদান দেখা যায়, বর্তমান গবেষণার একটি প্রভাবশালী ব্যাখ্যা হলো এগুলো বৃহৎ জনসংখ্যাগত স্থানান্তরের ফল নয়; বরং তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র একটি অভিজাত যোদ্ধা গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন। ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও আর্কিওজেনেটিক তথ্য একত্রে ইঙ্গিত করে যে মিতানি রাষ্ট্রের জনভিত্তি প্রধানত স্থানীয় হুরিয়ান জনগোষ্ঠীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যার সঙ্গে সীমিত বহিরাগত অভিজাত উপাদান যুক্ত হয়েছিল।
এই উন্নত সামরিক প্রযুক্তির হাত ধরে মিতানি সমাজে এক বিশেষ ধরনের অভিজাত রথযোদ্ধা শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যাদেরকে মারিয়ান্নু (Maryannu) বলা হতো। এই যোদ্ধারা কেবল সামরিক বাহিনীর অভিজাত অংশই ছিল না, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিল। সমতল ভূমিতে ঘোড়াচালিত রথ পরিচালনায় তাদের অসাধারণ দক্ষতার কারণে মিতানি সেনাবাহিনী খুব সহজেই উত্তর সিরিয়া ও কানানের বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এই সম্প্রসারণবাদ স্বভাবতই দক্ষিণ দিক থেকে অগ্রসরমান মিশরীয় সাম্রাজ্যের স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ফারাও তৃতীয় থুতমোসের শাসনামলে মিশর ও মিতানির মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংঘাত সংঘটিত হয় এবং মিতানিরা কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর মিশরবিরোধী বিদ্রোহে সক্রিয় সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এর ফলে ফারাওদের পক্ষে কানানের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। এই মারিয়ান্নু অভিজাত শ্রেণির পরিচয়ই মিতানি রাষ্ট্রের আরেকটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
মিতানি রাষ্ট্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল এর শাসক ও সামরিক অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমিত কিন্তু স্পষ্ট ইন্দো-আর্য উপাদানের উপস্থিতি। মিতানি রাজাদের কয়েকটি নাম, কিক্কুলির ঘোড়া প্রশিক্ষণ পাঠ্যে ব্যবহৃত অশ্বচালনা-সম্পর্কিত শব্দ এবং মিতানি-হিত্তীয় চুক্তিতে মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র ও নাসত্য দেবতাদের নামে শপথ গ্রহণ – সবই এই অভিজাত স্তরের ইন্দো-আর্য ভাষাগত ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে (Mayrhofer, 1974; Anthony, 2007)। কিক্কুলির পাঠ্যে আইকা, তেরা, পানজা, সাত্তা ও না – এই সংখ্যা-সংক্রান্ত শব্দগুলো বৈদিক সংস্কৃতের এক, ত্রি, পঞ্চ, সপ্ত ও নব রূপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে আইকা রূপটি ইন্দো-ইরানীয়ের সাধারণ স্তরের তুলনায় ইন্দো-আর্য শাখার কাছাকাছি অবস্থান নির্দেশ করে। তবে এই ইন্দো-আর্য উপাদানকে মিতানির সমগ্র জনগোষ্ঠীর পরিচয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মিতানি রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা ও সামাজিক ভিত্তি ছিল হুরিয়ান। ইন্দো-আর্য উপাদানটি সম্ভবত একটি ক্ষুদ্র সামরিক-অভিজাত গোষ্ঠীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিল, যারা ঘোড়া, রথযুদ্ধ এবং রাজকীয় সামরিক সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল। তাদের দূরবর্তী পূর্বপুরুষ সম্ভবত বৃহত্তর ইন্দো-ইরানীয় ভাষাভাষী জগতের অংশ ছিল; পরে মধ্য এশিয়া, পূর্ব ইরান বা আফগানিস্তান-সংলগ্ন অঞ্চলে ইন্দো-আর্য ও ইরানীয় শাখার বিভাজনের পর একটি ছোট ইন্দো-আর্য গোষ্ঠী পশ্চিমে উত্তর মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। সেখানে তারা স্থানীয় হুরিয়ান সমাজের সঙ্গে একীভূত হয়ে মারিয়ান্নু ও মিতানি শাসকশ্রেণির অংশে পরিণত হয়। ফলে মিতানি রাষ্ট্রকে ইন্দো-আর্য রাষ্ট্র না বলে হুরিয়ানভিত্তিক রাষ্ট্র বলা বেশি সঠিক, যার সামরিক ও রাজকীয় সংস্কৃতির ওপর একটি সীমিত ইন্দো-আর্য অভিজাত প্রভাব প্রতিফলিত হয়।
মিশরীয়দের ক্রমাগত সামরিক অভিযানের মুখেও মিতানিরা উত্তর সিরিয়ার আলেপ্পো এবং আলালাখের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিল। এই ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা মূলত এশিয়া মাইনর এবং মেসোপটেমিয়ার মধ্যকার অত্যন্ত লাভজনক বাণিজ্যপথগুলোর একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করত। মিতানিদের এই শক্তিমত্তা লেভান্ট অঞ্চলে এক নতুন ধরনের দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দেয়। কানানের স্থানীয় রাজারা বুঝতে পারে যে, ফারাওদের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে এসেছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে উত্তর কানানের অনেক নগররাষ্ট্র মিশরের আনুগত্য ত্যাগ করে মিতানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ক্ষমতার এই নতুন মেরুকরণ কানানীয় সমাজকে এক দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে, যেখানে স্থানীয় স্বাধীন সত্তাগুলো ক্রমশ বৃহৎ সাম্রাজ্যের দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হতে শুরু করে।
হিত্তি সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ও আনাতোলীয় পরাশক্তির আত্মপ্রকাশ
মিতানি এবং মিশর যখন লেভান্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে আনাতোলিয়ার (বর্তমান তুরস্ক) রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলে আরেক দুর্ধর্ষ পরাশক্তির নীরবে উত্থান ঘটছিল। এরা ইতিহাসে হিত্তি বা হাত্তি নামে পরিচিত। আনাতোলিয়ার কেন্দ্রীয় মালভূমিতে অবস্থিত হাত্তুসা শহরকে রাজধানী করে তারা একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলেছিল। পাহাড়ি এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হিত্তিরা প্রাকৃতিকভাবেই বাইরের আক্রমণ থেকে বেশ সুরক্ষিত ছিল (Kuhrt, 1995)। তাছাড়া, প্রাচীন বিশ্বের অস্ত্র তৈরির প্রধান কাঁচামাল তামা এবং টিনের খনিগুলোর ওপর তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। প্রথমদিকে অভ্যন্তরীণ রাজবংশীয় কোন্দল এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে হিত্তি সাম্রাজ্য নিজেদের সীমানার বাইরে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু একপর্যায়ে কয়েকজন অত্যন্ত দূরদর্শী এবং শক্তিশালী রাজার নেতৃত্বে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়।
হিত্তি সাম্রাজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রধান কারিগর ছিলেন রাজা প্রথম সুপ্পিলুলিউমা। তিনি ছিলেন একাধারে অসাধারণ সমরবিদ এবং ধূর্ত কূটনীতিক। সুপ্পিলুলিউমা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, আনাতোলিয়া থেকে বের হয়ে সিরিয়ার সম্পদশালী শহরগুলোতে পৌঁছাতে হলে আগে মিতানি সাম্রাজ্যকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। মিতানি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ কলহের সুযোগ নিয়ে তিনি এক বিশাল সেনাবাহিনীসহ ইউফ্রেটিস নদী পার হয়ে সরাসরি মিতানির রাজধানী ওয়াশুকান্নি আক্রমণ করেন। এই ঝটিকা আক্রমণে মিতানি সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে যায় এবং তারা একটি দুর্বল করদ রাজ্যে পরিণত হয়। সুপ্পিলুলিউমার এই বিস্ময়কর সামরিক সাফল্য সমগ্র প্রাচীন প্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রকে এক ধাক্কায় সম্পূর্ণ বদলে দেয়। শক্তিশালী মিতানির পতনের পর সিরিয়া এবং উত্তর কানানের এক বিশাল এলাকা সরাসরি হিত্তিদের পদানত হয়।
দখলকৃত অঞ্চলগুলো শাসন করার জন্য হিত্তিরা মিশরীয়দের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতি অনুসরণ করত। তারা সরাসরি সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে আইনি কাঠামোর ওপর বেশি জোর দিত। স্থানীয় রাজাদের সাথে তারা লিখিত এবং আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতো, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় অধীনতামূলক চুক্তি (Vassal Treaty) বলা হয়। এই চুক্তিগুলোতে স্থানীয় রাজাকে হিত্তি মহারাজার প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের শপথ নিতে হতো এবং বিনিময়ে হিত্তিরা সেই রাজার সিংহাসন রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করত (Beckman, 1999)। শপথগুলো সাধারণত উভয় পক্ষের রাষ্ট্রীয় দেবতাদের নামে নেওয়া হতো, যা তৎকালীন সমাজকাঠামোয় চরম পবিত্র বলে গণ্য হতো। হিত্তিদের এই সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো কানানের উত্তর সীমান্তে এক প্রবল এবং দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে। কার্কেমিশ এবং আলেপ্পোর মতো শহরগুলোতে হিত্তি রাজপুত্রদের ভাইসরয় বা উপরাজা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা সেখান থেকে লেভান্টের ঘটনাবলির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন।
কানানের বাফার জোন ও পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধ
উত্তরে প্রবল পরাক্রমশালী হিত্তি সাম্রাজ্য এবং দক্ষিণে প্রাচীন মিশরীয় সাম্রাজ্য – এই দুই বিশাল শক্তির মাঝখানে আটকা পড়ে কানানের নগররাষ্ট্রগুলোর নিয়তি চরম অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এই পুরো অঞ্চলটি একটি ক্লাসিক বাফার জোন (Buffer Zone) বা মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ অঞ্চলে পরিণত হয়। প্রাচীন কূটনীতিতে বৃহৎ শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আগে এই ধরনের বাফার রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে একে অপরের শক্তি পরীক্ষা করত। কানানের ছোট ছোট নগররাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল না, ফলে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের সব সময় বড় সাম্রাজ্যগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো। এই চরম অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে হিত্তি এবং মিশরীয় উভয় পক্ষই কানানে নিজেদের অনুগত মিত্র তৈরি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ফলে লেভান্টের এই ভূমি এক দীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী প্রক্সি যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এই প্রক্সি যুদ্ধের সবচেয়ে নিখুঁত এবং বস্তুনিষ্ঠ চিত্রটি ফুটে ওঠে বিখ্যাত আমারনা পত্র বা Amarna Letters-এর বর্ণনা থেকে। বর্তমান লেবানন এবং সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আমুররু নামক একটি ছোট কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল। আমুররুর রাজা আবদি-আশিরতা এবং তার পুত্র আজিরু ছিলেন প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম ধূর্ত রাজনীতিবিদ। তারা অত্যন্ত নিপুণভাবে মিশর এবং হিত্তিদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। আজিরু ফারাও আখেনাতেনের কাছে নিয়মিত চিঠি পাঠিয়ে নিজেকে মিশরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভৃত্য হিসেবে দাবি করতেন এবং প্রচুর কর পাঠাতেন (Podany, 2010)। আবার একই সাথে তিনি গোপনে হিত্তি রাজা সুপ্পিলুলিউমার সাথেও চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। দুই পরাশক্তির এই রেষারেষির সুযোগ নিয়ে আমুররু তার প্রতিবেশী মিশর-অনুগত শহরগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে সেগুলোকে দখল করে নিতে শুরু করে।
আমুররুর এই আগ্রাসনের শিকার হয়ে বাইব্লোস শহরের রাজা রিব-হাদ্দা ফারাওকে বারবার চিঠি লিখে সৈন্য পাঠানোর আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু মিশরীয় দরবার এই স্থানীয় সংঘাতগুলোতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকে। ফারাওরা মনে করতেন যে, কানানের রাজারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে দুর্বল হয়ে থাকলে মিশরের জন্যই ভালো, কারণ এতে করে কানানীয়দের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মিশরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, হিত্তিরা দূর থেকে আমুররুকে অস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে সহায়তা করত, যাতে মিশরের প্রভাব বলয়ে অস্থিরতা বজায় থাকে। এই পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক খেলা কানানের সাধারণ মানুষের জীবনে এক অবর্ণনীয় দুর্যোগ ডেকে আনে। প্রতিনিয়ত শহর অবরোধ, ফসলের মাঠ জ্বালিয়ে দেওয়া এবং বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কানানীয় অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলোর অহমিকার লড়াইয়ে ছোট রাষ্ট্রগুলোর এই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার ইতিহাস প্রাচীন কূটনীতির এক নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
কাদেশের যুদ্ধ ও প্রাচীন বিশ্বের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য
হিত্তি এবং মিশরের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ একপর্যায়ে আর প্রক্সি যুদ্ধের সীমানায় আটকে থাকতে পারেনি। খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৪ অব্দে দুই পরাশক্তির মধ্যে প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং ভয়াবহ একটি সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা কাদেশের যুদ্ধ নামে পরিচিত। সিরিয়ার ওরন্টেস নদীর তীরে অবস্থিত কাদেশ শহরটি ছিল উত্তর কানান এবং সিরিয়ায় প্রবেশের মূল চাবিকাঠি। শহরটি মিশরের বলয় থেকে বের হয়ে হিত্তিদের আনুগত্য গ্রহণ করলে ফারাও দ্বিতীয় রামেসিস এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সেটি পুনরুদ্ধারের জন্য উত্তরের দিকে অগ্রসর হন। অন্যদিকে হিত্তি রাজা দ্বিতীয় মুওয়াতাল্লি তার সাম্রাজ্যের সব মিত্র এবং অধীনস্থ রাজ্য থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে কাদেশের আশেপাশে এক অকল্পনীয় সামরিক জোট প্রস্তুত করে রাখেন। এটি ছিল ব্রোঞ্জ যুগের ক্ষমতার চূড়ান্ত মহড়া, যেখানে দুই পক্ষের প্রায় দশ হাজারের বেশি রথ এবং হাজার হাজার পদাতিক সৈন্য সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে (Liverani, 2014)।
কাদেশের রণাঙ্গনে রাজা মুওয়াতাল্লি এক অসাধারণ সামরিক চাল চালেন। তিনি কয়েকজন গুপ্তচরকে স্থানীয় রাখালের ছদ্মবেশে ফারাওয়ের শিবিরের কাছাকাছি পাঠিয়ে দেন। এই গুপ্তচররা ধরা পড়ার পর মিথ্যা তথ্য দেয় যে, হিত্তি সেনাবাহিনী কাদেশ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। এই তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে রামেসিস তার সেনাবাহিনীর একটি ছোট অংশ নিয়ে কাদেশ শহরের দিকে দ্রুত এগিয়ে যান এবং বাকি তিন অংশকে পেছনে ফেলে আসেন। ঠিক সেই মুহূর্তে শহর সংলগ্ন জঙ্গল থেকে হাজার হাজার হিত্তি রথ প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে এসে অপ্রস্তুত মিশরীয় বাহিনীর ওপর আছড়ে পড়ে। মিশরীয় ‘রা’ (Ra) ডিভিশন প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে রামেসিস তার ব্যক্তিগত প্রহরীদের নিয়ে এক মরিয়া পাল্টা আক্রমণ চালান। ঠিক সেই সময় মিশরীয়দের একটি অতিরিক্ত সৈন্যদল হঠাৎ করে রণক্ষেত্রে উপস্থিত হলে হিত্তিরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
কৌশলগত দিক থেকে এই যুদ্ধটি ছিল একটি অমীমাংসিত সংঘাত। রামেসিস কাদেশ শহরটি দখল করতে ব্যর্থ হন এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে মিশরে ফিরে যান। অন্যদিকে হিত্তিরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে গেলেও তারা কাদেশের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং পরবর্তীতে কানানের আরও দক্ষিণের দামেস্ক পর্যন্ত নিজেদের সীমানা বিস্তার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু নিজ দেশে ফিরে গিয়ে দ্বিতীয় রামেসিস এই যুদ্ধের ফলাফলকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি মিশরের বিভিন্ন মন্দিরের বিশাল দেয়ালে খোদাই করে প্রচার করেন যে, তিনি সম্পূর্ণ একাকী এবং ঐশ্বরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে পুরো হিত্তি বাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে এটি একটি ধ্রুপদী উদাহরণ যে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করে। ধর্মীয় বা অলৌকিক বিজয়ের যে আখ্যান রামেসিস তৈরি করেছিলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা তার বিন্দুমাত্র সমর্থন করে না।
বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তি ও কূটনৈতিক বিপ্লব
কাদেশের যুদ্ধের পর প্রায় পনেরো বছর ধরে লেভান্ট অঞ্চলে দুই শক্তির মধ্যে ছোটখাটো সীমান্ত সংঘাত চলতে থাকে। কিন্তু উভয় পক্ষই ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, সামরিকভাবে কেউই অপর পক্ষকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম নয়। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ উভয় সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকেই চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এর সমান্তরালে, মেসোপটেমিয়ায় অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য নামে এক নতুন আগ্রাসী শক্তির উত্থান ঘটতে শুরু করে, যা হিত্তিদের পূর্ব সীমান্তের জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে হিত্তি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তৃতীয় হাত্তুসিলি সিংহাসন দখল করার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের বৈধতা প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং বাহ্যিক হুমকির মুখে পড়ে উভয় পরাশক্তিই শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতের পথ পরিহার করে কূটনীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
খ্রিস্টপূর্ব ১২৫৮ অব্দে ফারাও দ্বিতীয় রামেসিস এবং হিত্তি রাজা তৃতীয় হাত্তুসিলি একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এটি ইতিহাসে কাদেশের চুক্তি বা রৌপ্য চুক্তি নামে পরিচিত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটিই হলো উদ্ধারকৃত প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ সমকক্ষীয় চুক্তি বা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mutual Defense Pact)। এই চুক্তির শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের কাছাকাছি। উভয় পক্ষ প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তারা আর কখনোই একে অপরের ভূখণ্ড আক্রমণ করবে না। যদি কোনো তৃতীয় শত্রু (যেমন অ্যাসিরীয়রা) তাদের কাউকে আক্রমণ করে, তবে অন্য পক্ষ অবিলম্বে সামরিক সাহায্য পাঠাতে বাধ্য থাকবে (Bryce, 2003)। চুক্তির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ছিল রাজনৈতিক পলাতকদের প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত। কোনো বিদ্রোহী বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী যদি এক রাজ্য থেকে পালিয়ে অন্য রাজ্যে যায়, তবে তাকে ক্ষমা প্রদর্শনপূর্বক তার নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। এই চুক্তিটি একটি রৌপ্য ফলকে খোদাই করে উভয় দেশের রাজধানীতে বিনিময় করা হয়েছিল।
এই আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রভাব কানান এবং সিরিয়ার ভূরাজনীতিতে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। চুক্তির মাধ্যমে দুই পরাশক্তি লেভান্ট অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বলয়ের একটি চূড়ান্ত এবং স্থায়ী সীমারেখা টেনে দেয়। উত্তর লেভান্ট হিত্তিদের অধীনে থেকে যায় এবং দক্ষিণ লেভান্ট অর্থাৎ মূল কানান অঞ্চল মিশরের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সীমানা বিরোধ মীমাংসা হওয়ার কারণে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথগুলো পুনরায় সচল হয়ে ওঠে। ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলোতে সাইপ্রাস, ইজিয়ান এবং মিশরের বাণিজ্য জাহাজগুলো নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে শুরু করে। ব্রোঞ্জ যুগের শেষ পর্যায়ে এসে এই কূটনৈতিক বিপ্লব প্রাচীন বিশ্বকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী দীর্ঘ এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং শান্তির যুগ উপহার দেয়।
সাম্রাজ্যিক দ্বন্দ্বে কানানীয় সমাজের রূপান্তর ও অর্থনৈতিক অভিঘাত
বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলো যখন তাদের আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং চুক্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন কানানীয় সমাজের ভেতরের কাঠামোতে অত্যন্ত গভীর এবং নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তর ঘটে চলেছিল। দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধ এবং সামরিক উপস্থিতির কারণে কানানের সমাজ ব্যবস্থা প্রচণ্ডভাবে সামরিকায়িত হয়ে পড়ে। স্থানীয় নগররাষ্ট্রগুলোতেও মিতানি এবং হিত্তিদের অনুকরণে মারিয়ান্নু (Maryannu) বা রথচালক অভিজাত শ্রেণির প্রবল আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অভিজাতরা সমাজে প্রচুর জমির মালিকানা লাভ করে এবং সাধারণ মানুষের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়। তারা বহিরাগত পরাশক্তিগুলোর পোশাক, ভাষা এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন অনুকরণ করতে শুরু করে। ক্ষমতার এই কেন্দ্রীভবন কানানীয় সমাজকে স্পষ্টভাবে দুটি অর্থনৈতিক মেরুতে বিভক্ত করে ফেলে – একদিকে শহরের প্রাচুর্যময় অভিজাত শ্রেণি, অন্যদিকে গ্রামের চরম দরিদ্র কৃষক।
এই পরাশক্তিগুলোর রেষারেষির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মাশুল গুনতে হয়েছিল কানানের সাধারণ কৃষকদের। অধীনতামূলক চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, কানানের রাজাদের প্রতি বছর মিশর বা হিত্তিদের দরবারে প্রচুর পরিমাণে সোনা, শস্য এবং দাস পাঠাতে হতো। এই বিশাল পরিমাণ সম্পদের যোগান দিতে গিয়ে স্থানীয় রাজারা কৃষকদের ওপর করের বোঝা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। কৃষি উৎপাদনের উদ্বৃত্ত অংশটুকু জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ঋণের দায়ে অনেক কৃষক তাদের পৈতৃক জমি হারাতে বাধ্য হয় এবং ভূমিদাসে পরিণত হয় (Singer, 1999)। অর্থনৈতিক এই চরম শোষণের হাত থেকে বাঁচতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ শহর ছেড়ে পাহাড়ি জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। এই প্রান্তিক এবং বাস্তুচ্যুত মানুষেরাই পরবর্তীতে সংঘবদ্ধ হয়ে ‘হাবিরু‘ নামক দস্যুদলে পরিণত হয়েছিল, যারা প্রায়শই শহরের বাণিজ্য কাফেলাগুলোর ওপর আক্রমণ চালাত।
সাম্রাজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কানানীয় অর্থনীতিকে একটি অত্যন্ত জটিল কিন্তু ভঙ্গুর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশে পরিণত করেছিল। কানানের শহরগুলোর টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করত বড় সাম্রাজ্যগুলোর স্থিতিশীলতার ওপর। যখন বহিরাগত আক্রমণের কারণে হিত্তি সাম্রাজ্য সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায় এবং মিশরীয় সাম্রাজ্য চরম দুর্বলতার মুখে পড়ে, তখন কানানের এই নগররাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আর নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক শোষণ, কৃষিব্যবস্থার পতন এবং সামাজিক বিভাজনের কারণে ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যাওয়া এই সমাজকাঠামো খুব সহজেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ব্রোঞ্জ যুগের এই আঞ্চলিক ক্ষমতার খেলা শেষ পর্যন্ত কানানীয় নগর সভ্যতার পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল এবং লেভান্টের ভূখণ্ডকে সম্পূর্ণ নতুন এক ঐতিহাসিক যুগের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
ব্রোঞ্জ যুগের পতন ও নতুন জনগোষ্ঠী (Bronze Age Collapse and New Peoples): পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন
শেষ ব্রোঞ্জ যুগের কাঠামোগত পতন ও ভৌগোলিক বিপর্যয় (Structural Collapse and Geographical Catastrophe): ব্যবস্থার অন্তর্ধান
খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল এবং প্রাচীন প্রাচ্যে এক অভাবনীয় ও সর্বগ্রাসী বিপর্যয় নেমে আসে। এই বিপর্যয়কে ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা শেষ ব্রোঞ্জ যুগের পতন হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে মিশর, হিত্তি, মাইসিনিয়ান গ্রিস এবং কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। একটি নির্দিষ্ট কারণে এই বিশাল সভ্যতার পতন ঘটেনি। আধুনিক পণ্ডিতরা একে ব্যাখ্যা করার জন্য সিস্টেম কলাপস তত্ত্ব (Systems Collapse Theory) ব্যবহার করেন, যা অনুযায়ী একটি জটিল এবং পরস্পর নির্ভরশীল ব্যবস্থায় একটি উপাদানের পতন ঘটলে পুরো কাঠামোতেই তার চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব পড়ে (Drews, 1993)। শেষ ব্রোঞ্জ যুগের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত এবং বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। আনাতোলিয়ার তামা এবং আফগানিস্তানের টিনের বাণিজ্যপথগুলো যখন বিঘ্নিত হয়, তখন ব্রোঞ্জ উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। কানানের মতো বাফার জোনগুলোতে এই অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রভাব পড়েছিল সবচেয়ে ভয়াবহ রূপে, কারণ এখানকার নগররাষ্ট্রগুলো মূলত বাণিজ্যিক শুল্ক এবং উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
অর্থনৈতিক এই পতনের পেছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো এক বিরাট অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। আধুনিক প্যালিওক্লাইমেটোলজি (Paleoclimatology) বা প্রাচীন জলবায়ুবিদ্যার তথ্য থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব তেরো শতকের শেষভাগে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং ভয়াবহ খরা শুরু হয়েছিল। সিরিয়া এবং কানানের বিভিন্ন হ্রদের তলানি থেকে সংগৃহীত প্রাচীন পরাগ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, ওই সময়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছিল এবং এই শুষ্ক আবহাওয়া প্রায় তিন শতাব্দী ধরে স্থায়ী ছিল। কৃষিনির্ভর সমাজে খরা মানেই হলো অবধারিত দুর্ভিক্ষ। বৃষ্টিপাতের অভাবে কানানের উর্বর উপত্যকাগুলোতে গমের উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকে। নগররাষ্ট্রগুলোর বিশাল জনসংখ্যাকে খাওয়ানোর মতো পর্যাপ্ত খাদ্য রাজভাণ্ডারে মজুত ছিল না (Snodgrass, 1980)। এর সমান্তরালে ভূ-তাত্ত্বিকরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, এই সময়ে আনাতোলিয়া থেকে শুরু করে লেভান্ট পর্যন্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্পের ধারা বা ‘সিসমিক স্টর্ম’ আঘাত হেনেছিল। উগারিট, মেগিদ্দো এবং হাজরের মতো সমৃদ্ধ নগরীগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে ভূমিকম্পে ধসে পড়া দেয়ালের স্পষ্ট প্রমাণ প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবিষ্কার করেছেন।
খাদ্য সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার ফলে কানানীয় সমাজকাঠামো ভেতর থেকেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছিল। শহরের সাধারণ কৃষক এবং কারিগররা রাজাদের অতিরিক্ত করের চাপে এমনিতেই জর্জরিত ছিল। তার ওপর যখন খাদ্যের অভাব দেখা দিল, তখন রাজপ্রাসাদ এবং মন্দিরগুলো আর সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারল না। ফলে সামাজিক চুক্তির প্রাথমিক শর্তগুলো ভেঙে পড়ে এবং সমাজে এক প্রবল অস্থিরতা দেখা দেয়। বহু মানুষ শহর ছেড়ে পাহাড়ি অঞ্চলে বা দূরবর্তী প্রান্তরে পালিয়ে গিয়ে দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে। শক্তিশালী মিশরীয় সাম্রাজ্য নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে কানান থেকে তাদের সৈন্য এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। একই সময়ে উত্তরের প্রবল পরাক্রমশালী হিত্তি সাম্রাজ্যও সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর এই আকস্মিক প্রস্থানের ফলে কানানে এক বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। নগররাষ্ট্রগুলোর রাজারা নিজেদের রক্ষা করার মতো কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন। কয়েক দশকের মধ্যেই লেভান্টের বিশাল সব শহর জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং একসময়ের জাঁকজমকপূর্ণ ব্রোঞ্জ যুগের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চিরতরে ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
সমুদ্রের মানুষ এবং ফিলিস্তীয়দের উপকূলীয় আধিপত্য (Sea Peoples and Philistine Coastal Dominance): নতুন শক্তির প্রবেশ
শেষ ব্রোঞ্জ যুগের এই ডামাডোলের মধ্যেই ভূমধ্যসাগরের বুক চিরে একদল নতুন এবং আগ্রাসী জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে, যাদের মিশরীয় লিপিগুলোতে ‘সমুদ্রের মানুষ’ বা সি পিপলস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফারাও তৃতীয় রামেসিসের শাসনামলে মেদিনেত হাবু মন্দিরের দেয়ালে এই বহিরাগত আক্রমণকারীদের সাথে মিশরীয়দের নৌযুদ্ধ এবং স্থলযুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ খোদাই করা রয়েছে। সমুদ্রের মানুষ কোনো একক জাতি ছিল না; এরা ছিল মূলত ইজিয়ান সাগর, আনাতোলিয়া এবং দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষের একটি বিশাল কনফেডারেশন। নিজেদের জন্মভূমিতে খরা এবং দুর্ভিক্ষের কারণে টিকতে না পেরে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে জাহাজে করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে আছড়ে পড়েছিল। এই আক্রমণকারীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নাম মিশরীয় লিপিতে ‘পেলেসেত‘ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ইতিহাসে ফিলিস্তীয় বা ফিলিস্টাইন নামে পরিচিত (Sandars, 1987)। মিশরীয়রা কোনোমতে এই আক্রমণ প্রতিহত করে ফিলিস্তীয়দের কানানের দক্ষিণ উপকূলীয় সমভূমিতে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেয়, যা মিশরের সীমানার ঠিক বাইরে অবস্থিত ছিল।
কানানের দক্ষিণ উপকূলে বসতি স্থাপন করার পর ফিলিস্তীয়রা খুব দ্রুতই নিজেদের একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলে। তারা পাঁচটি প্রধান শহরকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করে, যাকে ইতিহাসে ফিলিস্তীয় পেন্টাপোলিস বলা হয়। শহরগুলো হলো – গাজা, আশকেলন, আশদোদ, এক্রন এবং গাথ। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা যায়, ফিলিস্তীয়রা কানানীয়দের তুলনায় ভিন্নধর্মী এক সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত ঐতিহ্যের বাহক ছিল। তাদের প্রাথমিক মৃৎপাত্রে মাইসিনীয় গ্রিসের শেষ ব্রোঞ্জ যুগের মাইসিনিয়ান টু-থ্রি-সি: ওয়ান-বি শৈলীর (Mycenaean IIIC:1b) সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়, যা পরবর্তীকালে স্থানীয়ভাবে বিকশিত হয়ে স্বতন্ত্র ফিলিস্তীয় দ্বিবর্ণ মৃৎশিল্পে (Philistine Bichrome ware) রূপ নেয় (Dothan, 1982)। এসব পাত্রে লাল ও কালো রঙের জ্যামিতিক নকশা, পাখির চিত্র এবং ইজিয়ান শিল্পরীতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। ফিলিস্তীয়রা তাদের খাদ্যাভ্যাসেও কানানীয়দের থেকে আলাদা ছিল; তারা প্রচুর পরিমাণে শুকরের মাংস ভক্ষণ করত, যা উপকূলীয় শহরগুলোর ধ্বংসস্তূপে পাওয়া বিপুল সংখ্যক শুকরের হাড় থেকে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া তাদের স্থাপত্যে ইজিয়ান ধাঁচের বৃহৎ কেন্দ্রীয় চুলা বা হার্থের ব্যবহার দেখা যায়, যা স্থানীয় কানানীয় স্থাপত্যে কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
সাম্প্রতিক আর্কিওজেনেটিক গবেষণা এই প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছে। ফিলিস্তীয় পেন্টাপোলিসের অন্যতম প্রধান নগর আশকেলন থেকে উদ্ধার করা ব্রোঞ্জ ও প্রারম্ভিক লৌহ যুগের মানবদেহাবশেষের প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের শুরুতে সেখানে ইজিয়ান বা দক্ষিণ ইউরোপ-সম্পর্কিত একটি নতুন জিনগত উপাদান প্রবেশ করেছিল। এই ফলাফল ফিলিস্তীয়দের পূর্ব ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমাঞ্চল থেকে আগমনের প্রত্নতাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এই বহিরাগত জিনগত উপাদান দীর্ঘদিন পৃথক অবস্থায় টিকে থাকেনি; কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই ফিলিস্তীয়রা স্থানীয় লেভান্টীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাপকভাবে মিশে যায় এবং তাদের জিনগত গঠনে পুনরায় স্থানীয় লেভান্টীয় উপাদানই প্রাধান্য লাভ করে। ফলে বর্তমান গবেষণা ফিলিস্তীয়দের এক বৃহৎ জনসংখ্যাগত প্রতিস্থাপনের ফল হিসেবে নয়, বরং সীমিত বহিরাগত অভিবাসন, দ্রুত স্থানীয় জনসংমিশ্রণ এবং সাংস্কৃতিক অভিযোজনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি নতুন সমাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করে (Feldman et al., 2019).
পরবর্তীকালের ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে ফিলিস্তীয়দের অত্যন্ত বর্বর, অসভ্য এবং সংস্কৃতিহীন এক জাতি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এই মিথোলজিক্যাল ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করেছে। বাস্তবে ফিলিস্তীয়রা ছিল অত্যন্ত উন্নত এবং পরিশীলিত এক সংস্কৃতির অধিকারী। তারা লোহা গলানোর প্রযুক্তি কানানে নিয়ে আসে এবং উন্নত অস্ত্র ও কৃষি সরঞ্জাম তৈরি করে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি মজবুত করে। উপকূলীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে তারা খুব দ্রুতই কানানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত হয়। ফিলিস্তীয়দের এই উত্থান কানানের আদি বাসিন্দাদের জন্য এক বিশাল অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। পাহাড়ে বসবাসরত নতুন কানানীয় গোষ্ঠীগুলোর সাথে ফিলিস্তীয়দের সীমানা এবং সম্পদ নিয়ে প্রতিনিয়ত সংঘাত বেধে থাকত। এই সংঘাতগুলোই মূলত পরবর্তীকালে ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার বিকাশে এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। ফিলিস্তীয়দের আগমন কানানের রাজনৈতিক মানচিত্রকে কেবল নতুন রূপই দেয়নি, বরং অঞ্চলটির নামও চিরতরে বদলে দেয়, কারণ এই ফিলিস্তীয়দের নাম অনুসারেই পরবর্তীতে গ্রিক এবং রোমানরা সমগ্র ভূখণ্ডটিকে ‘প্যালেস্টাইন’ নামে ডাকতে শুরু করে।
পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি ও ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার উন্মেষ (Highland Settlements and Emergence of Israelite Identity): মিথ বনাম ইতিহাস
উপকূলীয় সমভূমিতে যখন ফিলিস্তীয়রা নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছিল, ঠিক সেই সময়ে কানানের কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জনতাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটছিল। শেষ ব্রোঞ্জ যুগে এই পাহাড়ি অঞ্চলগুলো তুলনামূলকভাবে কম জনবসতিপূর্ণ ছিল। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের দিকে গালিলি, সামারিয়া এবং জুদিয়ার পাহাড়জুড়ে দ্রুত অসংখ্য ছোট ছোট কৃষিভিত্তিক গ্রামের উদ্ভব ঘটে। প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে দেখা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই এই অঞ্চলে প্রায় আড়াইশোরও বেশি নতুন বসতি গড়ে ওঠে। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই পাহাড়ি বসতিগুলোর জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই ধীরে ধীরে প্রাথমিক ইসরায়েলীয় পরিচয়ের বিকাশ ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধর্মীয় আখ্যানগুলোতে বলা হয়েছে যে, ইসরায়েলীয়রা বহিরাগত একটি জাতি, যারা মিশর থেকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে জশুয়ার নেতৃত্বে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কানান জয় করেছিল এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে অধিকাংশ আধুনিক ইতিহাসবিদ এই বিবরণকে একটি ধর্মীয় জাতীয় আখ্যান হিসেবে মূল্যায়ন করেন, যা বর্ণিত ঘটনাগুলোর বহু শতাব্দী পরে রচিত হয়েছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এখন পর্যন্ত এই সামরিক বিজয়ের চিত্রকে সমর্থন করেনি। জেরিকো, আইসহ ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লিখিত একাধিক স্থানে খননকাজে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে হয় সেখানে উল্লেখযোগ্য জনবসতি ছিল না, নয়তো বৃহৎ সামরিক ধ্বংসস্তরের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে আধুনিক গবেষণায় শান্তিপূর্ণ অনুপ্রবেশ মডেল, কৃষক বিদ্রোহ তত্ত্ব এবং ধাপে ধাপে স্থানীয় সমাজের রূপান্তর – এই বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয় (Gottwald, 1979; Finkelstein, 1988)। বর্তমানে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিকের মতে, প্রাথমিক ইসরায়েলীয়রা মূলত স্থানীয় কানানীয় জনগোষ্ঠীরই একটি অংশ ছিল। ব্রোঞ্জ যুগের পতনের ফলে নগররাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়লে শহরের কৃষক, পশুপালক, কারিগর এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন বসতি স্থাপন করে। তাদের ভাষা, মৃৎশিল্প, স্থাপত্য এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কানানীয় ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায় (Finkelstein, 1988)।
সাম্প্রতিক আর্কিওজেনেটিক গবেষণাও এই প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল উপস্থাপন করেছে। ব্রোঞ্জ যুগের কানানীয় এবং পরবর্তী লৌহ যুগের দক্ষিণ লেভান্টের জনগোষ্ঠীর প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য জিনগত ধারাবাহিকতা দেখা যায়, যা ইঙ্গিত করে যে প্রাথমিক ইসরায়েলীয়দের উৎপত্তি প্রধানত স্থানীয় কানানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই হয়েছিল। বর্তমান পর্যন্ত এমন কোনো আর্কিওজেনেটিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ বা একাদশ শতকে দক্ষিণ লেভান্টে বৃহৎ বহিরাগত জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের ধারণাকে সমর্থন করে। বরং প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং জিনগত তথ্য একত্রে নির্দেশ করে যে প্রাথমিক ইসরায়েলীয় পরিচয় ছিল মূলত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় পুনর্গঠনের ফল, কোনো বৃহৎ বহিরাগত অভিবাসনের নয় (Agranat-Tamir et al., 2020; Feldman et al., 2019)।
এই পাহাড়ি বসতিগুলোর বস্তুগত সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করলে তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তারা এক বিশেষ ধরনের স্থাপত্যরীতি গড়ে তোলে, যা ‘চার-কক্ষ বিশিষ্ট বাড়ি’ বা ফোর-রুম হাউস নামে পরিচিত। এসব বাড়ির নিচতলায় পশুপালন ও শস্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকত, আর ওপরের তলায় মানুষ বসবাস করত। পাহাড়ি অঞ্চলের সীমিত জলসম্পদ সংরক্ষণের জন্য তারা চুনের প্রলেপ দেওয়া জলাধার নির্মাণ করত। তাদের মৃৎপাত্র ছিল তুলনামূলকভাবে সাধারণ ও অলংকারহীন; বিশেষ করে কলার্ড-রিম জার শস্য সংরক্ষণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো (Killebrew, 2005)। খাদ্যাভ্যাসেও একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। উপকূলীয় ফিলিস্তীয় বসতিতে বিপুল সংখ্যক শুকরের হাড় পাওয়া গেলেও, অধিকাংশ পাহাড়ি বসতিতে শুকরের হাড় অত্যন্ত বিরল বা অনুপস্থিত। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই পার্থক্য শুরুতে ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে নয়; বরং পার্শ্ববর্তী ফিলিস্তীয় জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের একটি সামাজিক কৌশল হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এভাবেই স্থানীয় কানানীয় সমাজের একটি অংশ ধীরে ধীরে এমন এক স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করে, যা পরবর্তীকালে ইসরায়েলীয় জাতিসত্তায় পরিণত হয়।
প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং লৌহ যুগের সূচনা (Technological Transformation and the Dawn of the Iron Age): অর্থনীতির নতুন ভিত্তি
ব্রোঞ্জ যুগের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতনের সাথে সাথে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও এক বিশাল পালাবদল ঘটে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক ভেঙে যাওয়ার ফলে তামার সাথে মেশানোর জন্য প্রয়োজনীয় টিনের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। টিনের অভাবে ব্রোঞ্জ তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়লে মানুষ বাধ্য হয়ে বিকল্প কোনো ধাতুর সন্ধান করতে শুরু করে। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লৌহ বা আয়রন গলানোর প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে। আকরিক লোহা প্রকৃতিতে তামার চেয়ে অনেক বেশি সহজলভ্য ছিল এবং কানানের পাহাড়ি অঞ্চলেও এর সন্ধান পাওয়া যেত। কিন্তু সমস্যা ছিল প্রযুক্তিগত; তামা গলানোর চেয়ে লোহা গলানোর জন্য চুল্লিতে অনেক বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হতো। প্রথমদিকে ফিলিস্তীয়রা এই প্রযুক্তিতে একচেটিয়া দক্ষতা অর্জন করলেও ধীরে ধীরে পাহাড়ি বসতিগুলোর কারিগররাও লোহা গলানোর জটিল পদ্ধতিটি আয়ত্ত করে নেয়। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমেই মানব ইতিহাসে ব্রোঞ্জ যুগের অবসান ঘটে এবং লৌহ যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
লৌহ প্রযুক্তির সহজলভ্যতা কানানের পাহাড়ি সমাজগুলোর অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লব নিয়ে আসে। ব্রোঞ্জ ছিল অত্যন্ত দামি একটি ধাতু, যা মূলত অস্ত্র তৈরি এবং রাজকীয় অলংকারে ব্যবহৃত হতো, সাধারণ কৃষকদের এর নাগাল পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু লোহা সহজলভ্য হওয়ায় তা দিয়ে কৃষিকাজের জন্য মজবুত হাতিয়ার তৈরি করা শুরু হয়। লোহার তৈরি কুঠার ব্যবহার করে কানানের পাহাড়ি অরণ্যগুলো দ্রুত পরিষ্কার করে কৃষিজমিতে পরিণত করা হয়। লোহার ফাল যুক্ত লাঙল দিয়ে পাহাড়ের কঠিন ও পাথুরে মাটি চষা অনেক সহজ হয়ে যায় (Gitin, Mazar, & Stern, 1998)। এর পাশাপাশি পাহাড়ের ঢালে পাথর দিয়ে ধাপ কেটে কেটে বা টেরেস তৈরি করে সেখানে জলপাই এবং আঙুরের আবাদ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে অল্প জমির ওপর অনেক বেশি ফসল ফলানো সম্ভব হয়, যা পাহাড়ি অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল।
লৌহ প্রযুক্তির এই বিস্তার সমাজে প্রযুক্তিগত বিকেন্দ্রীকরণ (Technological Decentralization) ঘটিয়েছিল। এর ফলে কৃষকদের আর শহরের কারিগর বা অভিজাতদের ওপর নির্ভর করতে হতো না। প্রতিটি ছোট গ্রামেই কামাররা স্থানীয়ভাবে কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় হাতিয়ার তৈরি করতে পারত। উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য গ্রামীণ সমাজগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলে। এর ফলে ব্রোঞ্জ যুগের সেই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত প্রাসাদকেন্দ্রিক অর্থনীতির বদলে একটি গ্রামভিত্তিক এবং সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর উদ্ভব ঘটে। মানুষ বুঝতে পারে যে, টিকে থাকার জন্য বিশাল নগরী বা রাজকীয় সুরক্ষার প্রয়োজন নেই, বরং নিজস্ব প্রযুক্তি এবং যৌথ শ্রমের মাধ্যমেই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা সম্ভব। লোহার এই ব্যাপক ব্যবহার কেবল সামরিক রণকৌশলকেই বদলায়নি, বরং এটি সমাজের একদম প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মানও আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছিল। লৌহ যুগের এই কৃষি বিপ্লবই পরবর্তীকালে লেভান্ট অঞ্চলে নতুন সব শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠার শক্ত অর্থনৈতিক ভিত তৈরি করে দেয়।
সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস (Reconfiguration of Social and Political Power): উপজাতীয় কাঠামো থেকে রাষ্ট্রের দিকে
ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর লেভান্ট অঞ্চলে প্রায় তিনশো বছরের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। মিশরীয় ফারাও এবং হিত্তি রাজাদের অনুপস্থিতিতে কানান ভূখণ্ডটি বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে নিজেদের মতো করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। নগররাষ্ট্রের কেন্দ্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সমাজের গঠনতন্ত্রে এক মৌলিক পরিবর্তন আসে। বিশাল শহরের পরিবর্তে অসংখ্য ছোট ছোট গ্রামকে কেন্দ্র করে সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এই গ্রামগুলোতে কোনো রাজা বা একক স্বৈরাচারী শাসক ছিল না। এর বদলে সমাজ পরিচালিত হতো জ্ঞাতিভিত্তিক সমাজ (Kinship-based Society) ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেখানে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা মিলে গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতেন। এই ব্যবস্থাটি মূলত উপজাতীয় কাঠামো বা ট্রাইবাল সিস্টেমের একটি রূপ ছিল, যেখানে একাধিক পরিবার মিলে একটি গোষ্ঠী বা ক্ল্যান তৈরি করত এবং কয়েকটি গোষ্ঠী মিলে একটি বৃহত্তর উপজাতি (Tribe) গঠন করত (Knauf, 1991)।
এই উপজাতীয় সমাজে সম্পদের কোনো বিশাল পাহাড় ছিল না, বরং জমির মালিকানা নির্দিষ্ট পরিবারের হাতে বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত থাকত। বিবাহ, ধর্মীয় উৎসব এবং কৃষি মৌসুমের আচার-অনুষ্ঠানগুলো এই গোষ্ঠীগুলোকে সাংস্কৃতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখত। পাহাড়ি অঞ্চলে উদ্ভূত ইসরায়েলীয় গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি জর্ডান নদীর পূর্ব তীরে অর্থাৎ ট্রান্সজর্ডান অঞ্চলেও মোয়াব, ইদোম এবং আম্মোন নামক নতুন কিছু উপজাতীয় কনফেডারেশনের উত্থান ঘটে। এই উপজাতিগুলো মূলত পশুপালন এবং সীমিত কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বহিরাগত কোনো বড় পরাশক্তির চাপ না থাকায় এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পেরেছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমিত কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়তে থাকায় এই উপজাতিগুলোর নিজেদের মধ্যে এবং পার্শ্ববর্তী ফিলিস্তীয়দের সাথে দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফিলিস্তীয়দের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং আগ্রাসনের মুখে এই বিচ্ছিন্ন উপজাতিগুলো অনুধাবন করতে শুরু করে যে, তাদের এই বিকেন্দ্রীভূত সমাজব্যবস্থা দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
প্রতিরক্ষার এই বাস্তব তাগিদ থেকেই উপজাতীয় সমাজগুলো ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করে। গ্রামভিত্তিক সমতাভিত্তিক সমাজ থেকে তারা একধরনের কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের দিকে অগ্রসর হয়। জরুরি যুদ্ধের সময় বিভিন্ন উপজাতি একত্রিত হয়ে একজন শক্তিশালী নেতার অধীনে যুদ্ধ করত, যাদেরকে ইতিহাসে ‘বিচারক’ বা চিফ বলা হয়েছে। এই অস্থায়ী নেতৃত্বই মূলত ধীরে ধীরে স্থায়ী রাজতন্ত্রের বীজ বপন করে (Mazar, 1992)। ব্রোঞ্জ যুগের আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা মূলত লেভান্টের স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে একটি দীর্ঘ রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করে। পুরনো ব্যবস্থার এই সম্পূর্ণ ভাঙনের ওপর দাঁড়িয়েই লৌহ যুগের নতুন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি হতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে ইসরায়েল, জুদাহ এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর জন্ম দেয়। কানানের এই অন্ধকার যুগ মূলত ধ্বংসের যুগ ছিল না, এটি ছিল নতুন জাতিসত্তা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণের এক দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রস্তুতি পর্ব।
প্রত্নতত্ত্ব, আর্কিওজেনেটিক্স ও দক্ষিণ লেভান্টের জনগোষ্ঠী (Archaeology, Archaeogenetics and the Peoples of the Southern Levant): উৎপত্তির বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান
প্রাগৈতিহাসিক ভিত্তি ও জেনেটিক ধারাবাহিকতা (Prehistoric Foundations and Genetic Continuity)
দক্ষিণ লেভান্টের মানববসতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর শিকড় কোনো আকস্মিক অভিবাসন বা অলৌকিক সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা এক দীর্ঘ ও জটিল বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফসল। প্রাগৈতিহাসিক যুগে এই ভৌগোলিক পরিসরে যে মানবগোষ্ঠীর পদচারণা ছিল, প্রত্নতত্ত্ববিদরা তাদের নাতুফীয় সংস্কৃতি বা নাতুফিয়ান কালচার হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্লেইস্টোসিন যুগের (আনুমানিক ২৬ লক্ষ বছর আগে–খ্রিস্টপূর্ব ৯,৭০০) শেষভাগে, যখন পৃথিবীর জলবায়ু ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে শুরু করে এবং পরে হলোসিন যুগের (খ্রিস্টপূর্ব ৯,৭০০–বর্তমান) সূচনা ঘটে, তখন দক্ষিণ লেভান্টের নাতুফীয়রা যাযাবর শিকারি-সংগ্রাহক জীবন থেকে বেরিয়ে এসে স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী বসতি গড়তে শুরু করে। তারা বন্য শস্য সংগ্রহ করত এবং বন্য প্রাণীদের পোষ মানানোর প্রাথমিক কৌশলগুলো আয়ত্ত করেছিল। এই সময়কালটি মানব ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে পরিচিত, যাকে তাত্ত্বিক পরিভাষায় নব্যপ্রস্তর বিপ্লব (Neolithic Revolution) বলা হয়। ধর্মীয় মিথলজিতে প্রায়শই পৃথিবীর উৎপত্তি বা মানবজাতির সূচনা নিয়ে নানা ধরনের রূপকথার অবতারণা করা হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে হঠাৎ করেই একটি নির্দিষ্ট জাতির জন্য বরাদ্দ করে দেওয়া হয়। তবে মাটির নিচের বিজ্ঞান আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প শোনায়, যা প্রমাণ করে যে সভ্যতা কোনো ঐশ্বরিক উপহার ছিল না, বরং তা ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী এবং বাস্তববাদী লড়াইয়ের ফলাফল। নাতুফীয়দের এই স্থায়ী বসতিগুলোই পরবর্তীতে কৃষিভিত্তিক গ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল, যা আধুনিক সভ্যতার আদি রূপ।
বিজ্ঞানের এক নতুন শাখা হিসেবে আর্কিওজেনেটিক্স বা প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ ইতিহাস চর্চায় এক অভূতপূর্ব মাত্রার যোগ করেছে। প্রাচীন কঙ্কালের পেট্রাস হাড় বা কানের ভেতরের শক্ত হাড় থেকে ডিএনএ নিষ্কাশন করে বিজ্ঞানীরা এখন হাজার হাজার বছর আগের মানুষের জিনগত মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। দক্ষিণ লেভান্টের প্রাগৈতিহাসিক কঙ্কালগুলোর ওপর চালানো এই জিনোমিক গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, নাতুফীয় এবং পরবর্তী নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের গভীর জিনগত ধারাবাহিকতা (Genetic Continuity) বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, কৃষিকাজের উদ্ভাবন বা প্রসারের ফলে আদিম শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি বা কোনো উন্নত বহিরাগত জাতি এসে তাদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করেনি। বরং, স্থানীয় অধিবাসীরাই ধীরে ধীরে নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল এবং নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছিল। প্রাচীন জিনোমের এই তথ্যগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, লেভান্টের মাটির সাথে এই প্রাচীনতম অধিবাসীদের এক অবিচ্ছেদ্য জীববৈজ্ঞানিক সম্পর্ক ছিল। তাদের ডিএনএ মূলত একটি আদিম ইউরেশীয় বংশধারার প্রতিনিধিত্ব করে, যা পরবর্তীকালের সকল লেভান্টীয় জনগোষ্ঠীর আদিমতম স্তর বা বেসলাইন হিসেবে কাজ করেছে (Lazaridis et al., 2016)।
এই প্রাগৈতিহাসিক জিনগত ভিত্তিটি অনুধাবন করা ঐতিহাসিক গবেষণার জন্য অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি আধুনিককালের অনেক রাজনৈতিক ও জাতিগত পরিচয় নির্মাণের ধারণাকে মূলে গিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কোনো জাতিই সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ বা আকাশ থেকে পড়া কোনো একক সত্তা নয়। লেভান্টের নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষকদের জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, তারা কেবল নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আনাতোলিয়া বা বর্তমান তুরস্কের আদিম কৃষকদের সাথেও তাদের ধীরে ধীরে সংমিশ্রণ ঘটছিল। বাণিজ্যের প্রসার এবং কৃষিজমির খোঁজে মানুষের এই ধীরগতির স্থানান্তরের ফলে মানবগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জিনগত আদান-প্রদান একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে জনতাত্ত্বিক মিশ্রণ (Demographic Admixture) হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই মিশ্রণ প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক সীমানা প্রাচীনকালেও মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো দুর্লঙ্ঘনীয় বাধা ছিল না। মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়েছে, নতুন মানুষের সাথে মিশেছে এবং একটি বৃহত্তর মানবীয় জিনপুলের অংশ হয়েছে। নাতুফীয় থেকে নব্যপ্রস্তর যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত এই বৈজ্ঞানিক আখ্যান আমাদের শেখায় যে, দক্ষিণ লেভান্টের আদি পরিচয় কোনো একক ধর্মের বা গোত্রের নিজস্ব সম্পত্তি নয়, বরং এটি মানব বিবর্তনের এক উন্মুক্ত ও প্রবহমান ধারা।
ব্রোঞ্জ যুগের জিনপ্রবাহ ও কানানীয়দের মিশ্র পরিচয় (Bronze Age Gene Flow and the Mixed Identity of Canaanites)
নব্যপ্রস্তর যুগের পর দক্ষিণ লেভান্ট যখন ব্রোঞ্জ যুগে প্রবেশ করে, তখন এখানকার সমাজকাঠামো এবং অর্থনীতিতে এক বিপুল পরিবর্তন সাধিত হয়। এই সময়েই প্রথম নগররাষ্ট্র বা সিটি-স্টেটগুলোর উদ্ভব ঘটে এবং তামার সাথে টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরির প্রযুক্তি সামরিক ও কৃষি ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই সময়কালের স্থানীয় অধিবাসীদের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে কানানীয় বা কেনানাইট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে কানানীয়দের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং সম্পূর্ণ বহিরাগত শত্রু হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা থাকলেও, বস্তুগত সংস্কৃতি বা মেটেরিয়াল কালচার প্রমাণ করে যে তারা মূলত স্থানীয় জনগোষ্ঠীরই ধারাবাহিক বিবর্তিত রূপ। তাদের তৈরি মৃৎপাত্র, নগর পরিকল্পনা এবং উপাসনার স্থানগুলোতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের স্থানীয় সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কানানীয়রা কখনোই নিজেদের একটি একক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি। এর বদলে তারা অসংখ্য ছোট ছোট স্বাধীন রাজনৈতিক এককে বিভক্ত ছিল, যা তাদেরকে মেসোপটেমিয়া বা মিশরের মতো পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসনের মুখেও নিজেদের স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
সাংস্কৃতিক দিক থেকে কানানীয়রা স্থানীয় হলেও আর্কিওজেনেটিক্স আমাদের তাদের পরিচয়ের আরেকটি অত্যন্ত চমকপ্রদ দিক উন্মোচন করে। মেগিড্ডো, হাজোর এবং সিডনের মতো প্রাচীন নগরীগুলো থেকে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জ যুগের কঙ্কালগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, কানানীয়দের জিনগত গঠনে একটি নতুন উপাদানের মিশ্রণ ঘটেছিল। পূর্ববর্তী স্থানীয় লেভান্টীয় কৃষকদের জিনোমের সাথে ককেশাস বা জাগ্রোস পর্বতমালা অঞ্চল থেকে আসা উত্তর-পূর্ব নিকটপ্রাচ্যীয় জনগোষ্ঠীর জিনের এক বিশাল সংমিশ্রণ এই সময়ে পরিলক্ষিত হয়। এই জিনগত পরিবর্তন কোনো আকস্মিক বা রক্তক্ষয়ী সামরিক আগ্রাসনের ফসল ছিল না। এটি ছিল মূলত ব্রোঞ্জ যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার, ধাতুবিদ্যার জ্ঞান স্থানান্তর এবং পশুপালক গোষ্ঠীগুলোর ধীরগতির অভিবাসনের ফলাফল। আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে জিনগত আত্তীকরণ (Genetic Assimilation) বলা যেতে পারে। বহিরাগত এই গোষ্ঠীগুলো স্থানীয় কানানীয় সমাজে এসে মিশে গিয়েছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে একটি নতুন, মিশ্র কিন্তু সুসংহত কানানীয় জিনোমের জন্ম দিয়েছিল (Skourtanioti et al., 2020)।
ব্রোঞ্জ যুগের এই জিনগত মিশ্রণ আমাদের ইতিহাস পাঠের গতানুগতিক ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। প্রাচীন যুগের ইতিহাস মানেই কেবল এক জাতির দ্বারা অন্য জাতিকে সমূলে ধ্বংস করে দেওয়ার গল্প নয়। কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলো ছিল আক্ষরিক অর্থেই প্রাচীন যুগের কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন কেন্দ্র, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বণিক, কারিগর এবং অভিবাসীরা নিজেদের বসতি গড়ে তুলেছিল। ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে আসা এই মানুষগুলো কেবল নিজেদের জিনই আদান-প্রদান করেনি, বরং তারা নিজেদের প্রযুক্তি, ভাষা এবং লোকজ বিশ্বাসগুলোকেও একে অপরের সাথে ভাগ করে নিয়েছিল। এই বহুমাত্রিক মিশ্রণের ফলেই কানানীয় সংস্কৃতি এতটা সমৃদ্ধ এবং টেকসই হতে পেরেছিল। ধর্মীয় মিথলজিতে প্রায়শই বিশুদ্ধ রক্ত বা বিশুদ্ধ জাতির যে ধারণা প্রচার করা হয়, বিজ্ঞানের লেন্স দিয়ে দেখলে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। ব্রোঞ্জ যুগের কানানীয়রা প্রমাণ করে যে, একটি সভ্যতার আসল শক্তি তার বিশুদ্ধতায় নয়, বরং তার বৈচিত্র্য এবং বাইরের জগত থেকে নতুন উপাদান গ্রহণ করার সক্ষমতার মধ্যে নিহিত থাকে। এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা আমাদের লেভান্টের প্রাচীন ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয়।
লৌহ যুগের জনমিতিক রূপান্তর ও ফিলিস্তীয়দের উৎস (Demographic Transformation of the Iron Age and Origins of the Philistines)
খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ কাঠামোগত বিপর্যয় নেমে আসে, যাকে ইতিহাসবিদরা ‘ব্রোঞ্জ যুগের পতন’ বা ‘ব্রোঞ্জ এজ কোলাপ্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই সময়ে মাইসেনীয় গ্রিস, হিত্তি সাম্রাজ্য এবং কানানের অসংখ্য নগররাষ্ট্র প্রায় একই সাথে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ঠিক এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ লেভান্টের উপকূলীয় সমভূমিতে এক নতুন জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে, যারা ইতিহাসে ফিলিস্তীয় বা ফিলিস্টিন নামে পরিচিত। বাইবেলীয় মিথলজিতে ফিলিস্তীয়দের একটি বর্বর, অসভ্য এবং ইসরায়েলীয়দের চিরশত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক খনন আমাদের সামনে তাদের এক ভিন্ন এবং অত্যন্ত পরিশীলিত রূপ তুলে ধরে। আশকেলন, গাজা, আশদোদ, এক্রোন এবং গাথ – এই পাঁচটি প্রধান শহর বা পেন্টাপলিস নিয়ে ফিলিস্তীয়রা তাদের রাজনৈতিক বলয় গড়ে তুলেছিল। তাদের তৈরি মৃৎপাত্র, যা ‘মাইসেনিয়ান আইআইআইসি’ স্টাইলের মৃৎপাত্র হিসেবে পরিচিত, পরিষ্কারভাবে ঈজিয়ান বা ভূমধ্যসাগরের ইউরোপীয় অংশের সংস্কৃতির সাথে তাদের সম্পর্ক নির্দেশ করে। তারা শূকরের মাংস খেত, যা স্থানীয় কানানীয় বা ইসরায়েলীয়দের খাদ্যাভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
ফিলিস্তীয়দের প্রকৃত উৎস নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক ছিল। তারা কি কেবল কানানীয়দেরই একটি ভিন্ন রূপ, নাকি তারা সত্যিই বহিরাগত কোনো জাতি? সম্প্রতি আশকেলনের প্রাচীন কবরস্থান থেকে প্রাপ্ত কঙ্কালগুলোর ওপর চালানো আর্কিওজেনেটিক গবেষণা এই বিতর্কের একটি বৈজ্ঞানিক সমাধান নিয়ে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, লৌহ যুগের ঠিক শুরুতে আশকেলনে বসবাসকারী মানুষের জিনোমে হঠাৎ করেই একটি শক্তিশালী ইউরোপীয়, বিশেষ করে দক্ষিণ ইউরোপীয় বা ঈজিয়ান ডিএনএ সিগনেচার আবির্ভূত হয়। এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ঐতিহাসিকদের সেই দীর্ঘদিনের ধারণাকেই সত্য প্রমাণ করে যে, ফিলিস্তীয়রা মূলত ‘সি পিপলস’ বা সমুদ্র মানব নামক এক বিশাল সামুদ্রিক অভিবাসী গোষ্ঠীর অংশ ছিল, যারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লেভান্টের উপকূলে আছড়ে পড়েছিল। এই ঘটনাটিকে আমরা স্থানিক স্থানান্তর তত্ত্ব (Spatial Migration Theory)-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্ভিক্ষ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নতুন একটি ভূখণ্ডে নিজেদের বসতি স্থাপন করে (Feldman et al., 2019)।
তবে এই বৈজ্ঞানিক গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি হলো ফিলিস্তীয়দের জিনগত বিবর্তনের দ্রুততা। আশকেলন থেকে প্রাপ্ত পরবর্তীকালের বা লৌহ যুগের শেষ দিকের কঙ্কালগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, সেই ইউরোপীয় ডিএনএ সিগনেচারটি মাত্র কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মানে দাঁড়ায়, ফিলিস্তীয়রা লেভান্টে এসে একটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা এন্ডোগ্যামাস সমাজ হিসেবে টিকে থাকেনি। বরং তারা খুব দ্রুত স্থানীয় কানানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে শুরু করে। তারা স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনযাত্রার অনেক উপাদান গ্রহণ করে নিয়েছিল। সমাজবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াটিকে সাংস্কৃতিক ও জীবতাত্ত্বিক আত্তীকরণ (Cultural and Biological Assimilation) বলা হয়। কয়েক প্রজন্ম পার হওয়ার পর, জিনগতভাবে একজন ফিলিস্তীয় এবং একজন স্থানীয় কানানীয়র মধ্যে পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, যদিও তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিচয় বজায় রেখেছিল। এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি প্রমাণ করে যে, অভিবাসী জনগোষ্ঠী যতই শক্তিশালী বা স্বতন্ত্র হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে তারা স্থানীয় জিনপুলের বিশাল স্রোতে মিশে যেতে বাধ্য হয়।
ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্ভব (Archaeological Emergence of the Israelite Identity)
দক্ষিণ লেভান্টের ইতিহাসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং বহুল আলোচিত বিষয়টি হলো প্রাচীন ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার উদ্ভব। ধর্মীয় মিথলজি এবং বুক অফ জশুয়া-তে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইসরায়েলীয়রা মিশর থেকে দাসত্বমুক্ত হয়ে একটি সুসংগঠিত বিশাল বাহিনী হিসেবে কানানে প্রবেশ করে এবং একের পর এক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কানানীয় শহরগুলো ধ্বংস করে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে। কিন্তু বিগত কয়েক দশকের নিবিড় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এই অলৌকিক সামরিক বিজয়ের আখ্যানকে সম্পূর্ণরূপে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। জেরিকো বা আই-এর মতো শহরগুলোতে, যেখানে বাইবেলের বর্ণনামতে ইসরায়েলীয়রা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেই নির্দিষ্ট সময়কালের কোনো সুরক্ষিত শহরের অস্তিত্বই খুঁজে পাননি। বরং, খনন থেকে যা বেরিয়ে এসেছে তা হলো লৌহ যুগের শুরুতে কানানের কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে অসংখ্য ছোট ছোট, অরক্ষিত এবং ছিমছাম গ্রাম বা বসতির ধীরগতির উত্থান। এই বস্তুগত প্রমাণগুলো নির্দেশ করে যে ইসরায়েলীয়রা বাইরে থেকে আসা কোনো বিধ্বংসী সামরিক বাহিনী ছিল না।
প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ইসরায়েল ফিঙ্কেলস্টাইনের মতো গবেষকরা বস্তুগত প্রমাণের ভিত্তিতে একটি নতুন ধারণার প্রস্তাব করেছেন, যাকে অভ্যন্তরীণ রূপান্তর তত্ত্ব (Internal Transformation Theory) বলা হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রাথমিক ইসরায়েলীয়রা মূলত কানানীয় সমাজেরই একটি অংশ ছিল। ব্রোঞ্জ যুগের পতনের সময় যখন কানানের বড় বড় নগররাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন স্থানীয় কৃষিজীবী এবং পশুপালক শ্রেণির একটি বড় অংশ সমতলভূমি ছেড়ে কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা নতুন করে নিজেদের বসতি গড়ে তোলে। এই নতুন বসতিগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য কানানীয় সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের ব্যবহৃত মৃৎপাত্রগুলো পূর্ববর্তী কানানীয় মৃৎপাত্রেরই অনুকরণ। তবে তাদের সংস্কৃতিতে কিছু স্বকীয়তাও গড়ে উঠতে শুরু করে, যেমন শূকরের হাড়ের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং ‘ফোর-রুম হাউস’ বা চার কক্ষবিশিষ্ট বিশেষ ধরনের বাড়ির নকশা। শূকর পালন না করাটা শুরুতে কোনো ধর্মীয় অনুশাসন ছিল না, বরং পাহাড়ি রুক্ষ পরিবেশে শূকর পালনের অর্থনৈতিক অলাভজনকতার কারণেই এই রীতির উদ্ভব হয়েছিল, যা পরবর্তীতে একটি জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় বা আইডেন্টিটি মার্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় (Finkelstein & Silberman, 2001)।
ইসরায়েলীয়দের ধর্মীয় বিবর্তনও কোনো আকস্মিক ঐশ্বরিক উন্মোচনের ফল ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক এবং এপিগ্রাফিক (শিলালিপি সংক্রান্ত) প্রমাণাদি দেখায় যে, প্রাথমিক পর্যায়ে ইসরায়েলীয়রা কানানীয় প্যান্থিয়ন বা দেবমণ্ডলীর অনেক দেবদেবীরই উপাসনা করত, যার মধ্যে ‘এল’ এবং ‘বাআল’ অন্যতম। ‘ইয়াহওয়েহ’ বা তাদের প্রধান ঈশ্বর শুরুতে এই বৃহত্তর দেবমণ্ডলীরই একজন অংশ ছিলেন। কালের বিবর্তনে, রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণ এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সাথে পার্থক্যের রেখা টানার প্রয়োজনে ধীরে ধীরে এই উপাসনা পদ্ধতি একেশ্বরবাদ (Monotheism)-এর দিকে অগ্রসর হয়। ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে এই দীর্ঘ এবং জটিল আর্থসামাজিক বিবর্তনকে একটি সরল, একরৈখিক এবং ঐশ্বরিক আদেশে মোড়ানো রূপকথায় পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব আমাদের সামনে ইতিহাসকে তার নগ্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ রূপে হাজির করে। ইসরায়েলীয়দের উত্থান কোনো অলৌকিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর টিকে থাকার তাগিদে স্থানীয় কানানীয় জনগোষ্ঠীরই একটি অংশের আর্থসামাজিক এবং স্থানিক পুনর্গঠন মাত্র।
সাম্রাজ্যিক শাসন ও জনতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা (Imperial Rule and Demographic Stability)
লৌহ যুগের শেষভাগ থেকে শুরু করে বাইজান্টাইন যুগ পর্যন্ত দক্ষিণ লেভান্ট একের পর এক পরাশক্তির আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। অ্যাসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, পারসিক, হেলেনিস্টিক, রোমান এবং বাইজান্টাইন – প্রতিটি সাম্রাজ্যই এই অঞ্চলকে নিজেদের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই দীর্ঘ সময়কালের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত যুদ্ধ, ধ্বংস এবং নির্বাসনের গল্প বলে। বিশেষ করে ব্যাবিলনীয়দের দ্বারা জেরুজালেম ধ্বংস এবং পরবর্তীতে রোমানদের দ্বারা প্রথম ও দ্বিতীয় ইহুদি বিদ্রোহ দমনের ঘটনাগুলোকে ধর্মীয় সাহিত্যে পুরো জাতির দেশান্তর বা ডায়াস্পোরা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মিথলজিতে একটি ‘শূন্য ভূমির মিথ’ বা মিথ অফ দ্য এম্পটি ল্যান্ড প্রচার করা হয়, যেখানে দাবি করা হয় যে নির্বাসনের পর ফিলিস্তিন অঞ্চল সম্পূর্ণ জনমানবহীন হয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে নতুন করে এর বসতি স্থাপন করা হয়। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ এবং জনসংখ্যাগত বিশ্লেষণ এই চরমপন্থী দাবিকে সরাসরি খণ্ডন করে।
সাম্রাজ্যগুলো যখন কোনো অঞ্চল দখল করত, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকত কর আদায় এবং অর্থনৈতিক শোষণ, সাধারণ মানুষকে সমূলে উৎখাত করা নয়। ব্যাবিলনীয় বা রোমানরা বিদ্রোহ দমনের পর মূলত সমাজের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামরিক অভিজাত শ্রেণিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল বা দাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিল। কিন্তু সমাজের বৃহত্তর অংশ, অর্থাৎ সাধারণ কৃষক, কামার বা কুমোররা নিজেদের ভিটেমাটিতেই থেকে গিয়েছিল। কারণ সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য কৃষিজাত পণ্য এবং খাজনার প্রয়োজন ছিল, যা এই সাধারণ কৃষকদের ছাড়া মেটানো সম্ভব ছিল না। এই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের উপস্থিতি অঞ্চলে এক অবিশ্বাস্য মাত্রার জনতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা (Demographic Stability) বজায় রেখেছিল। রোমান বা বাইজান্টাইন যুগে গ্রিক ভাষা, রোমান স্থাপত্য এবং নতুন ধর্মের প্রসার ঘটেছিল ঠিকই, কিন্তু এর মানে এই নয় যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জিনগত কাঠামো সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। সাম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে আসা সৈন্য বা প্রশাসকরা স্থানীয়দের সাথে মিশেছিল, তবে তা লেভান্টের বিশাল জিনপুলকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করার মতো যথেষ্ট ছিল না।
সপ্তম শতাব্দীতে আরব মুসলিমদের বিজয়ের ক্ষেত্রেও একই বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক সত্য প্রযোজ্য। ধর্মীয় আখ্যানগুলোতে আরব বিজয়কে একটি অভাবনীয় মোড়ক দিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন রাতারাতি লেভান্টের জনতত্ত্ব সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং জেনেটিক ডেটা দেখায় যে, আরব বিজয়ীরা মূলত একটি ক্ষুদ্র সামরিক এলিট শ্রেণি হিসেবে লেভান্টে প্রবেশ করেছিল। তারা স্থানীয় খ্রিস্টান, ইহুদি এবং সামারিটান জনগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের শাসন কায়েম করেছিল, কিন্তু তাদের উচ্ছেদ করেনি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় অধিবাসীরা ধীরে ধীরে আরবি ভাষা গ্রহণ করে এবং আর্থসামাজিক সুবিধার্থে অনেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এটি ছিল মূলত সাংস্কৃতিক রূপান্তর (Cultural Transformation) এবং আত্তীকরণের একটি ধীর প্রক্রিয়া, কোনো জীবতাত্ত্বিক প্রতিস্থাপন নয়। ফলে, প্রাচীন কানানীয়দের যে বংশধারা হাজার হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলে প্রবহমান ছিল, তা বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের পরও স্থানীয় সাধারণ মানুষের ধমনীতে অবিকৃতভাবেই টিকে ছিল (Richards et al., 2000)।
আধুনিক জনগোষ্ঠীর শেকড় ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা (Roots of Modern Populations and Scientific Reality)
ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং আর্কিওজেনেটিক্সের এই দীর্ঘ যাত্রা শেষে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং সংবেদনশীল প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায় আধুনিক জনগোষ্ঠীর শেকড় নিয়ে। বর্তমান সময়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন অঞ্চলের রাজনৈতিক সংঘাতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় ইতিহাস এবং পরিচয়ের মনোপলি। বিভিন্ন গোষ্ঠী দাবি করে যে তারাই এই ভূমির একমাত্র আদিম এবং খাঁটি উত্তরাধিকারী। কিন্তু একুশ শতকের জিনোমিক গবেষণা এই ধরনের এক্সক্লুসিভ বা বর্জনশীল জাতীয়তাবাদী দাবিগুলোকে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে ধূলিসাৎ করে দেয়। বর্তমান লেভান্টের স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর, যাদের মধ্যে আধুনিক ফিলিস্তিনি, লেবানিজ, জর্ডানি এবং বিভিন্ন ইহুদি সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত, ব্যাপকভাবে ডিএনএ পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এই গবেষণার ফলাফলগুলো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর হলেও বিজ্ঞানের জগতে তা এক অবিসংবাদিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, আধুনিক ইহুদি সম্প্রদায়গুলো (যাদের মধ্যে ইউরোপে বসবাসরত আশকেনাজি ইহুদি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত সেফার্ডিক ইহুদিরা অন্তর্ভুক্ত) এবং আধুনিক ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে জিনগত নৈকট্য অত্যন্ত গভীর। উভয় গোষ্ঠীরই জিনোমের একটি বিশাল অংশ সরাসরি ব্রোঞ্জ যুগের সেই আদিম কানানীয় এবং স্থানীয় লেভান্টীয় কৃষকদের সাথে মিলে যায়। ইউরোপে দীর্ঘকাল বসবাসের কারণে আশকেনাজি ইহুদিদের মধ্যে ইউরোপীয় বা দক্ষিণ ইউরোপীয় জিনের সংমিশ্রণ ঘটেছে, ঠিক একইভাবে ফিলিস্তিনি বা অন্যান্য আরব গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আরব উপদ্বীপ বা আফ্রিকান জিনের মিশ্রণ ঘটেছে। কিন্তু তাদের জিনের একেবারে মূল ভিত্তি বা কোর অ্যানসেস্ট্রি একই উৎসের দিকে নির্দেশ করে। জেনেটিক্সের পরিভাষায় একে জিনগত সমাপতন (Genetic Overlap) বলা হয়। এর অর্থ হলো, আধুনিক রাজনৈতিক সীমানা এবং ধর্মীয় পরিচয়গুলো মানুষের জীবতাত্ত্বিক বাস্তবতার কাছে একেবারেই কৃত্রিম এবং অগভীর। কোনো একক গোষ্ঠীই নিজেদের বিশুদ্ধ ব্রোঞ্জ যুগীয় লেভান্টীয় হিসেবে দাবি করতে পারে না, আবার কেউ তাদের আদিম শেকড়কেও অস্বীকার করতে পারে না (Ostrer, 2012)।
বিজ্ঞান আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাহদের যুদ্ধ বা ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির আখ্যান নয়। ইতিহাস হলো মানুষের প্রতিনিয়ত মানিয়ে নেওয়া, একে অপরের সাথে মিশে যাওয়া এবং টিকে থাকার গল্প। আর্কিওজেনেটিক্স প্রমাণ করে দিয়েছে যে, দক্ষিণ লেভান্টের মাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বা জাতির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এই ভূমির ধূলিকণায় মিশে আছে হাজার হাজার বছরের অসংখ্য মানুষের ঘাম, রক্ত এবং মিশ্র জিনোম। নাতুফীয় শিকারি থেকে শুরু করে কানানীয় কৃষক, ফিলিস্তীয় কারিগর, ইসরায়েলীয় পশুপালক এবং আধুনিক ফিলিস্তিনি ও ইহুদি – সবাই একটি বৃহত্তর এবং অবিচ্ছিন্ন মানবীয় শৃঙ্খলের অংশ। ধর্মীয় মিথলজি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ যখন ইতিহাসকে খণ্ডিত করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়, তখন প্রত্নতত্ত্ব এবং জেনেটিক্স তার বস্তুনিষ্ঠ এবং নির্লিপ্ত প্রমাণাদি দিয়ে সেই কৃত্রিম বিভাজনের দেয়াল ভেঙে দেয়। দক্ষিণ লেভান্টের জনগোষ্ঠীর উৎপত্তির এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দিনের শেষে আমরা সবাই স্থানান্তরিত, মিশ্রিত এবং বিবর্তিত মানুষেরই সন্তান।
ইসরায়েলীয়দের উত্থান ও বাইবেলীয় রাজ্যসমূহ (Rise of the Israelites and Biblical Kingdoms): জাতিসত্তা, রাজনীতি ও ধর্মীয় পরিচয়
ইসরায়েলীয় জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব (Emergence of the Israelites): পরিচয়ের সূচনা
মেসনেপতাহ স্টিলি এবং প্রথম ঐতিহাসিক উল্লেখ (Merneptah Stele and the First Historical Mention)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তার উৎপত্তির খোঁজ করা বেশ জটিল একটি কাজ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাচীন গোষ্ঠীগুলোর শুরুর দিকের ইতিহাস মিথলজি বা পৌরাণিক আখ্যানের কুয়াশায় ঢাকা থাকে। ১৮৯৬ সালের কথা। মিশরের প্রাচীন নগরী থিবসে খননকাজ চালাচ্ছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ফ্লিন্ডার্স পেট্রি। একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের ভেতরে তিনি কালো গ্রানাইট পাথরের তৈরি বিশাল এক স্মৃতিস্তম্ভ বা স্টিলি আবিষ্কার করেন। ফারাও মেসনেপতাহর শাসনামলে, আনুমানিক ১২০৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ফারাও মেসনেপতাহ ছিলেন বিখ্যাত ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের পুত্র। এই স্তম্ভের গায়ে খোদাই করা হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে ফারাওয়ের বিভিন্ন সামরিক বিজয়ের বিবরণ দেওয়া ছিল। লিপিটির একদম শেষের দিকে কানান অঞ্চলে মিশরের একটি সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বেশ কয়েকটি কানানীয় শহরের পতনের কথা লেখা ছিল। তবে ইতিহাসবিদদের সবচেয়ে বেশি চমকে দেয় একটি নির্দিষ্ট লাইন, যেখানে লেখা ছিল, “ইসরায়েল ধ্বংস হয়েছে, তার আর কোনো বীজ অবশিষ্ট নেই।” প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আবিষ্কারটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই যুগান্তকারী, কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই হলো ‘ইসরায়েল‘ শব্দটির প্রথম কোনো লিখিত এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ (Dever, 2001)।
মেসনেপতাহ স্টিলিতে ব্যবহৃত হায়ারোগ্লিফিক লিপির একটি বিশেষ দিক গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রাচীন মিশরীয় লিপিতে কোনো নাম লেখার পর একটি ‘ডিটারমিনেটিভ’ বা নির্ধারক চিহ্ন ব্যবহার করা হতো, যা দিয়ে বোঝানো হতো নামটির ধরন কেমন। কানানের অন্যান্য শহর যেমন আশকেলন বা গেজের-এর নামের পাশে এমন একটি নির্ধারক চিহ্ন ছিল যা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট নগররাষ্ট্র বা ভৌগোলিক অঞ্চল বোঝায়। কিন্তু ‘ইসরায়েল’ নামের পাশে যে চিহ্নটি খোদাই করা ছিল, তার অর্থ হলো একটি মানবগোষ্ঠী বা উপজাতি, যাদের কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী রাষ্ট্র বা সীমানা নেই। এই সূক্ষ্ম ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে ঐতিহাসিকরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ব্রোঞ্জ যুগের একদম শেষ পর্যায়ে কানানের মাটিতে ইসরায়েল নামে একটি জনসমষ্টির অস্তিত্ব সত্যিই ছিল। তারা সেসময় কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারেনি। তারা ছিল মূলত যাযাবর বা আধা-যাযাবর একটি উপজাতীয় গোষ্ঠী, যারা কানানের পাহাড়ি অঞ্চল বা প্রান্তিক এলাকায় বসবাস করত (Grabbe, 2007)।
এই ঐতিহাসিক দলিলের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি প্রমাণ করে যে ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে ইসরায়েলীয়দের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তার পুরোটা শূন্য থেকে তৈরি হয়নি, বরং এর পেছনে একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ফারাওয়ের দাবি অনুযায়ী ইসরায়েলীয়রা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। প্রাচীন রাজারা নিজেদের সামরিক সাফল্যকে অনেক বাড়িয়ে বলতেন। ফারাও হয়তো তাদের একটি বড় অংশকে পরাজিত করেছিলেন, কিন্তু এই গোষ্ঠীটি কানানের রুক্ষ পাহাড়ি পরিবেশে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মেসনেপতাহ স্টিলি ইতিহাসের এক অমূল্য টাইমলাইন বা সময়রেখা নির্ধারণ করে দেয়। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে লেভান্টের মাটিতে এই নতুন পরিচয়ের মানুষদের অস্তিত্ব একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা ছিল। এই নির্দিষ্ট বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণটির ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার শেকড় সন্ধানের পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন (Davies, 1992)।
মিথলজি বনাম প্রত্নতত্ত্ব: এক্সোডাস বা প্রস্থানের আখ্যান (Mythology vs. Archaeology: The Narrative of Exodus)
ইসরায়েলীয়দের পরিচয়ের সূচনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবে একটি সুপরিচিত আখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মিথলজি অনুযায়ী, ইসরায়েলীয়রা দীর্ঘকাল মিশরে দাস হিসেবে বন্দি ছিল। পরবর্তীতে এক নেতার অধীনে লক্ষ লক্ষ মানুষ একযোগে মিশর থেকে পালিয়ে আসে, যা ইতিহাসে ‘এক্সোডাস’ বা মহাপ্রস্থান নামে পরিচিত। এরপর তারা চল্লিশ বছর ধরে সিনাই মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ায় এবং অবশেষে কানান আক্রমণ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে নিজেদের বসতি স্থাপন করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গল্পটি একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং সামাজিক ঐক্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। অনেক মানুষ আজও এই পৌরাণিক আখ্যানকে নির্ভেজাল ইতিহাস বলে মনে করেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক প্রত্নতত্ত্ব এবং ইতিহাসচর্চা এই কাহিনীর সাথে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পায় না। বস্তুত, ধর্মীয় মিথলজি এবং ঐতিহাসিক প্রমাণ এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি মেরুতে অবস্থান করছে (Meyers, 2005)।
প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আখ্যানের অসারতা বেশ কিছু নিরেট প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সিনাই উপদ্বীপ এবং পার্শ্ববর্তী মরুভূমিগুলোতে বিগত এক শতাব্দী ধরে ব্যাপক খননকাজ চালানো হয়েছে। যদি সত্যিই কয়েক লক্ষ মানুষ চল্লিশ বছর ধরে এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত, তবে তাদের ব্যবহৃত মৃৎপাত্র, অস্থায়ী শিবিরের ধ্বংসাবশেষ, অগ্নিকুণ্ড বা অন্তত কিছু হাড়গোড় অবশ্যই পাওয়া যেত। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকরা পুরো সিনাই মরুভূমিতে শেষ ব্রোঞ্জ যুগের এমন কোনো জনবসতি বা পরিযানের বিন্দুমাত্র চিহ্ন খুঁজে পাননি। কাদেশ বার্নিয়ার মতো মরূদ্যানগুলোতে, যেখানে মিথলজি অনুযায়ী এই বিশাল জনসমষ্টি দীর্ঘকাল অবস্থান করেছিল, সেখানেও ওই নির্দিষ্ট সময়ের কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্তর অস্তিত্বশীল নেই। তাছাড়া, মিশরের মতো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং আমলাতান্ত্রিক একটি সাম্রাজ্য থেকে এত বিশাল সংখ্যক দাস একসাথে পালিয়ে যাবে, আর মিশরীয় নথিপত্রে তার কোনো উল্লেখ থাকবে না, এটি ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব। প্রাচীন মিশরের প্রচুর প্রশাসনিক দলিল, কর আদায়ের হিসাব এবং চিঠিপত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যার কোথাও এই বিশাল প্রস্থানের কোনো উল্লেখ নেই (Grabbe, 2007)।
তাহলে এই মিথলজি কেন তৈরি হলো? সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের আলোকে এর একটি চমৎকার ব্যাখ্যা রয়েছে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ছোট একটি গোষ্ঠী হয়তো কোনো একসময় মিশর থেকে পালিয়ে কানানে এসেছিল। এই গোষ্ঠীটির সাথে কানানের পাহাড়ি অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের মিশে যাওয়ার পর, ওই ছোট গোষ্ঠীটির মিশর থেকে পালানোর গল্পটি পুরো সম্প্রদায়ের সাধারণ স্মৃতি হিসেবে গৃহীত হয়। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় স্মৃতির রূপান্তর (Transformation of Memory) বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালে ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের মতো বড় রাজনৈতিক সংকটের সময় এই বিচ্ছিন্ন গল্পগুলোকে একত্রিত করে একটি জাতীয় মহাকাব্যের রূপ দেওয়া হয়, যাতে মানুষ বিপদের মুখে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো কোনো আধুনিক ইতিহাসের বই নয়; এগুলো মূলত ধর্মতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য রচিত হয়েছিল। বিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলীয়রা বাইরে থেকে আসা কোনো বিশাল আক্রমণকারী সেনাদল ছিল না। মিথলজির এই বিশাল সামরিক অভিযানের সাথে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই (Davies, 1992)।
স্থানীয় কানানীয় শিকড় ও গ্রামীণ রূপান্তর (Local Canaanite Roots and Rural Transformation)
যদি তারা বাইরে থেকে বিশাল কোনো বাহিনী নিয়ে কানানে প্রবেশ না করে থাকে, তবে তারা কোথা থেকে এলো? আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার হলো, ইসরায়েলীয়রা মূলত কানানেরই আদি বাসিন্দা ছিল। ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর লেভান্ট অঞ্চলের সমাজ কাঠামোতে যে বিশাল পরিবর্তন আসে, তার গর্ভ থেকেই এই নতুন জাতিসত্তার জন্ম। এই উত্থানকে ব্যাখ্যা করার জন্য পণ্ডিতরা বেশ কয়েকটি তাত্ত্বিক মডেল দাঁড় করিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হলো আলব্রেখট আল্ট এবং মার্টিন নথ প্রস্তাবিত শান্তিপূর্ণ অনুপ্রবেশ মডেল (Peaceful Infiltration Model)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জর্ডান নদীর পূর্ব দিকের আধা-যাযাবর পশুপালকেরা ধীরে ধীরে চারণভূমির সন্ধানে কানানের কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলে প্রবেশ করে। এই পাহাড়ি এলাকাগুলো মূলত জনশূন্য ছিল, তাই সমভূমির নগররাষ্ট্রগুলোর সাথে তাদের কোনো সংঘাত হয়নি। সময়ের সাথে সাথে এই পশুপালকেরা যাযাবর জীবন ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে কৃষিকাজ শুরু করে এবং নতুন একটি সমাজে পরিণত হয় (Alt, 1966)।
তবে এই মডেলটির পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী তত্ত্ব ইতিহাসবিদদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। জর্জ মেন্ডেনহল এবং নর্মান গটওয়াল্ড সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যা কৃষক বিদ্রোহ তত্ত্ব (Peasant Revolt Theory) নামে পরিচিত। শেষ ব্রোঞ্জ যুগে কানানের সমভূমি এবং উপত্যকাগুলোতে শক্তিশালী নগররাষ্ট্রগুলো অবস্থান করছিল। এই শহরের রাজারা এবং অভিজাত শ্রেণি সাধারণ কৃষকদের ওপর সীমাহীন করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। দাসত্ব এবং অতিরিক্ত করের হাত থেকে বাঁচতে হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষক, কারিগর এবং ঋণগ্রস্ত মানুষ শহর ছেড়ে দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে পালিয়ে যায়। পাহাড়ে গিয়ে তারা ছোট ছোট গ্রাম গড়ে তোলে, যেখানে শহরের মতো কোনো বৈষম্য বা শোষণের অস্তিত্ব ছিল না। গটওয়াল্ডের মতে, ইসরায়েলীয় পরিচয়ের উন্মেষ মূলত কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফল (Mendenhall, 1962)।
আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই দুটি তত্ত্বের একটি সমন্বিত রূপকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। কানানের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা ছোট ছোট গ্রামগুলোর বস্তুগত সংস্কৃতির সাথে কানানীয় নগর সংস্কৃতির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। সমভূমির উৎপীড়িত কৃষক, ‘হাবিরু’ নামক পলাতক দস্যুদল এবং ‘শাসু’ নামক আধা-যাযাবর পশুপালক – এই সব ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী কানানের কেন্দ্রীয় পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিল। পাহাড়ি পরিবেশের কঠোর বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য তাদের নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এই সম্মিলিত অস্তিত্বের সংগ্রাম থেকেই ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটি নতুন এবং অভিন্ন আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে। তারা আর নিজেদের কানানীয় শহরের অধীনস্থ প্রজা হিসেবে দেখত না। ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার এই আবির্ভাব কোনো আকস্মিক অলৌকিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল ব্রোঞ্জ যুগের বৈষম্যমূলক আর্থসামাজিক কাঠামোর পতনের এক অবধারিত পরিণতি (Lemche, 1985)।
আর্কিওজেনেটিক্স ও স্থানীয় কানানীয় উত্তরাধিকার (Archaeogenetics and Local Canaanite Ancestry)
একবিংশ শতাব্দীতে আর্কিওজেনেটিক্স বা প্রাচীন মানবদেহাবশেষ থেকে ডিএনএ বিশ্লেষণের প্রযুক্তি বিকশিত হওয়ার ফলে ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। অতীতে ইতিহাসবিদরা মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং প্রাচীন লিখিত দলিলের ওপর নির্ভর করে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেন। কিন্তু বর্তমানে ব্রোঞ্জ যুগ এবং লৌহ যুগের মানুষের দাঁত ও অস্থি থেকে সংগৃহীত প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক জিনগত সম্পর্ক সরাসরি পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। দক্ষিণ লেভান্টের মেগিদ্দো, হাজর, আবেল বেত-মাআখা, আশকেলনসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধার করা মানবদেহাবশেষের বিশ্লেষণ এই অঞ্চলের জনসংখ্যাগত ইতিহাস সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করেছে। ফলে ইসরায়েলীয়দের উৎপত্তি নিয়ে যে প্রশ্ন একসময় কেবল প্রত্নতত্ত্ব ও ধর্মীয় ইতিহাসের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন জিনগত গবেষণার মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়েছে (Agranat-Tamir et al., 2020)।
এই গবেষণাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো ব্রোঞ্জ যুগের কানানীয় এবং পরবর্তী লৌহ যুগের দক্ষিণ লেভান্টের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুস্পষ্ট জিনগত ধারাবাহিকতার উপস্থিতি। অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ বা একাদশ শতকে কানানের পাহাড়ি অঞ্চলে সম্পূর্ণ নতুন কোনো বহিরাগত জনগোষ্ঠী এসে স্থানীয়দের প্রতিস্থাপন করেছিল – এমন ধারণার পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী আর্কিওজেনেটিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং প্রাপ্ত তথ্য নির্দেশ করে যে প্রাথমিক ইসরায়েলীয়দের পূর্বপুরুষ মূলত স্থানীয় কানানীয় জনগোষ্ঠীরই অংশ ছিল, যারা ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে নিজেদের পুনর্গঠিত করেছিল। অবশ্যই দক্ষিণ লেভান্ট সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অঞ্চল ছিল না। হাজার হাজার বছর ধরে প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সীমিত জনসংমিশ্রণ ঘটেছে। তবে সেই সংমিশ্রণ কোনো বৃহৎ জনসংখ্যাগত প্রতিস্থাপনের রূপ নেয়নি। একই সময়ে উপকূলীয় ফিলিস্তীয় বসতিগুলোতে ইজিয়ান-সম্পর্কিত একটি নতুন জিনগত উপাদানের সাময়িক উপস্থিতি এবং পাহাড়ি বসতিগুলোতে তার অনুপস্থিতি এই দুই সমাজের ভিন্ন উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশকেও আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে (Feldman et al., 2019; Agranat-Tamir et al., 2020)।
এই আর্কিওজেনেটিক তথ্যগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার সঙ্গে একত্রে বিবেচনা করলে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ঐতিহাসিক চিত্র ফুটে ওঠে। পাহাড়ি অঞ্চলের নতুন বসতিগুলোর স্থাপত্য, মৃৎশিল্প, কৃষিপদ্ধতি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যেমন কানানীয় ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তেমনি তাদের জিনগত গঠনেও সেই ধারাবাহিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার উন্মেষকে কোনো বৃহৎ বহিরাগত সামরিক আক্রমণ, গণঅভিবাসন বা আকস্মিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল হিসেবে নয়; বরং ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর স্থানীয় কানানীয় সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। অর্থাৎ ইসরায়েলীয় পরিচয়ের জন্ম ছিল একটি ধীর, বহুমাত্রিক এবং অভ্যন্তরীণ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অভিযোজন, সামাজিক পুনর্গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি জিনগত ধারাবাহিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বস্তুগত সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার সীমানা (Material Culture and Ethnic Boundaries)
পাহাড়ি অঞ্চলের এই নতুন গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা কেমন ছিল, তা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো তাদের বস্তুগত সংস্কৃতি বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর বিশ্লেষণ। ব্রোঞ্জ যুগের বিশাল রাজপ্রাসাদ এবং বিলাসবহুল নগরীর বিপরীতে লৌহ যুগের শুরুতে এই পাহাড়ি বসতিগুলো ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং সমতাভিত্তিক। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই গ্রামগুলোতে বিশেষ এক ধরনের স্থাপত্যশৈলী পাওয়া যায়, যাকে চার-কক্ষ বিশিষ্ট বাড়ি (Four-room house) বা পিলিয়ার্ড হাউস বলা হয়। এই বাড়িগুলোর নকশা ছিল বেশ অভিনব এবং ব্যবহারিক। সাধারণত নিচতলায় তিনটি লম্বাটে কক্ষ থাকত, যেখানে গৃহপালিত পশু রাখা হতো এবং কৃষি যন্ত্রপাতি মজুত করা হতো। আর পেছনের একটি আড়াআড়ি কক্ষ এবং দোতলায় পরিবারের মানুষেরা বসবাস করত। এই স্থাপত্য নকশাটি পাহাড়ি পরিবেশে বসবাসকারী একটি কৃষিভিত্তিক পরিবারের সব ধরনের দৈনন্দিন প্রয়োজন নিখুঁতভাবে মেটাত। প্রায় প্রতিটি গ্রামে একই আকারের বাড়ি প্রমাণ করে যে, সমাজে তখনো ধনী-দরিদ্রের তীব্র বিভাজন তৈরি হয়নি (Faust, 2006)।
মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রেও এই সমাজগুলোর একটি নিজস্ব ধারা গড়ে উঠেছিল। সমভূমির ফিলিস্তীয়রা যখন মাইসিনিয়ান ধাঁচের লাল-কালো নকশা করা দৃষ্টিনন্দন মৃৎপাত্র ব্যবহার করছিল, তখন পাহাড়ি গ্রামগুলোতে অত্যন্ত অমসৃণ এবং সাধারণ মাটির পাত্র তৈরি হচ্ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো কলার-রিম জার (Collared-rim jar)। এগুলো ছিল বিশাল আকৃতির মাটির পাত্র, যার গলার কাছে একটি উঁচু বর্ডার বা কলারের মতো অংশ থাকত। এই বিশাল পাত্রগুলো মূলত বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য এবং সংগৃহীত শস্য দীর্ঘকাল মজুত রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো। এই মৃৎপাত্রগুলো কোনো শৌখিন জিনিস ছিল না, এগুলো ছিল আক্ষরিক অর্থেই টিকে থাকার হাতিয়ার। পাহাড়ি সমাজগুলোর কাছে শিল্পের চেয়ে উপযোগিতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই নির্দিষ্ট ধরনের বাড়ি এবং মৃৎপাত্র কানানের পাহাড়ি অঞ্চল জুড়ে এত ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় যে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা একে প্রাথমিক ইসরায়েলীয় বসতি শনাক্ত করার একটি প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেন।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত এবং সুস্পষ্ট পার্থক্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের নজরে আসে, যা জাতিসত্তা নির্মাণের প্রক্রিয়াটি বুঝতে দারুণ সাহায্য করে। ফিলিস্তীয় শহরগুলোর আবর্জনার স্তূপ খনন করে দেখা গেছে সেখানে প্রচুর পরিমাণে শুকরের হাড় রয়েছে, অর্থাৎ শুকরের মাংস তাদের দৈনন্দিন খাদ্যের একটি বড় অংশ ছিল। এর ঠিক বিপরীতে, পাহাড়ি ইসরায়েলীয় গ্রামগুলোর খননে হাজার হাজার পশুর হাড় পাওয়া গেলেও সেখানে শুকরের হাড়ের উপস্থিতি প্রায় শূন্য। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুকরের মাংস না খাওয়ার এই প্রথাটি শুরুতে কোনো ঐশ্বরিক বা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সমাজবিজ্ঞানে একটি ধারণা আছে যাকে জাতিসত্তার সীমানা (Ethnic Boundaries) বলা হয়। যখন দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত থাকে, তখন তারা নিজেদের আলাদা প্রমাণের জন্য খাদ্যাভ্যাস বা পোশাকের মতো নির্দিষ্ট কিছু প্রতীক বেছে নেয়। ফিলিস্তীয়দের থেকে নিজেদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্যই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীটি নিজেদের খাদ্যাভ্যাসে এই সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন এনেছিল (Hesse & Wapnish, 1997)।
যাযাবর জীবন থেকে কৃষিভিত্তিক সমাজে উত্তরণ (Transition from Nomadic Life to Agrarian Society)
লৌহ যুগের প্রাথমিক পর্যায়ে কানানের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর রুক্ষ পরিবেশ এই নতুন জনগোষ্ঠীর জীবনপ্রণালীকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। যাযাবর বা আধা-যাযাবর জীবন ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে এক জায়গায় বসবাস শুরু করার প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ ছিল না। কেন্দ্রীয় পাহাড়গুলো ছিল মূলত চুনাপাথরে গঠিত এবং ঘন ভূমধ্যসাগরীয় অরণ্যে ঢাকা। কৃষিকাজ করার জন্য সবার আগে তাদের এই কঠিন পাথর কেটে এবং জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদযোগ্য জমি তৈরি করতে হয়েছিল। এই অসাধ্য সাধন করা সম্ভব হয়েছিল মূলত লোহা গলানোর প্রযুক্তির বিকাশের কারণে। লোহার তৈরি শক্ত কুঠার এবং শাবল ব্যবহার করে তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে। পাহাড়ের ঢালু জমিতে মাটি যাতে বৃষ্টিতে ধুয়ে না যায়, সেজন্য তারা পাথর সাজিয়ে ধাপ বা টেরেস তৈরি করে। এই ধাপচাষ পদ্ধতি পাহাড়ি কৃষি অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লব নিয়ে আসে। তারা উপত্যকায় গম এবং যব চাষ করত, আর পাহাড়ের ধাপে ধাপে রোপণ করত জলপাই এবং আঙুর গাছ (Borowski, 1987)।
যাযাবর জীবন থেকে একটি স্থিতিশীল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি (Agrarian Economy)-তে রূপান্তরের ফলে তাদের দৈনন্দিন রুটিন এবং সামাজিক উৎসবগুলোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। কৃষিকাজ প্রকৃতির ঋতুচক্রের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফসল বোনা, ফসল কাটা এবং ঘরে তোলার নির্দিষ্ট সময়গুলোকে কেন্দ্র করে তাদের সমাজে নতুন কিছু গ্রামীণ উৎসবের প্রচলন ঘটে। বসন্তকালে যব কাটার উৎসব, গ্রীষ্মের শুরুতে গম কাটার উৎসব এবং শরতে ফল ও আঙুর সংগ্রহের উৎসব তাদের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন যে, পরবর্তীকালে ইসরায়েলীয়দের যেসব ধর্মীয় উৎসবকে ঐতিহাসিক রূপ দেওয়া হয়েছিল (যেমন পাসওভার বা সুককোট), সেগুলো মূলত এই প্রাচীন গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক উৎসবগুলোরই বিবর্তিত রূপ। প্রকৃতির শক্তির ওপর নির্ভরতা এবং কৃষিজ ফলন নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
এই কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে বেঁচে থাকার জন্য একক মানুষের চেয়ে যৌথ পরিবারের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা বেত আভ (Bet Av) বা ‘পিতার গৃহ’ নামক একটি সামাজিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বসবাস করত। এটি মূলত একাধিক প্রজন্ম নিয়ে গঠিত একটি বর্ধিত পরিবার ব্যবস্থা, যেখানে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য সব সিদ্ধান্ত নিতেন। পাহাড়ি পরিবেশে খরার ঝুঁকি সব সময় থাকত। কোনো বছর যদি একটি পরিবারের ফসল নষ্ট হয়ে যেত, তখন গোষ্ঠীর অন্যান্য পরিবার তাদের সাহায্য করত। এই ধরনের যৌথ নির্ভরতা এবং সম্পদের ভাগাভাগি সমাজে এক ধরনের আদিম সুরক্ষাবলয় বা সোশ্যাল সেফটি নেট তৈরি করেছিল। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীর টিকে থাকাই এখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই মূলত বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে একটি অভিন্ন জাতিগত পরিচয়ের দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত করেছিল (Stager, 1985)।
উপজাতীয় কনফেডারেশন ও নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ (Tribal Confederation and New Political Polarization)
গ্রামগুলো যতই বড় এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে থাকে, ততই তাদের সামনে নতুন ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। পাহাড়ি এলাকার এই ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন বসতিগুলোর নিজস্ব কোনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল না। অন্যদিকে সমভূমির ফিলিস্তীয়রা সামরিক দিক থেকে ক্রমশ আগ্রাসী হয়ে উঠছিল এবং পাহাড়ের দিকে নিজেদের সীমানা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল। তাছাড়া জর্ডান নদীর পূর্ব দিকের মোয়াব এবং আম্মোন উপজাতিগুলোও প্রায়শই সম্পদের লোভে আক্রমণ চালাত। এই বহুমুখী বাহ্যিক হুমকির মুখে পড়ে পাহাড়ি সমাজগুলো বুঝতে পারে যে, বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিরক্ষার এই বাস্তব তাগিদ থেকেই বিভিন্ন গ্রামের গোষ্ঠীগুলো একত্রিত হয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলে, যাকে সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা উপজাতীয় কনফেডারেশন (Tribal Confederation) হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এই উপজাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি ছিল কাল্পনিক বা আংশিক রক্তসম্পর্কের ধারণা। তারা নিজেদের বারোটি উপজাতির একটি কনফেডারেশন হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করে। তবে আধুনিক নৃবিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, এই বারো উপজাতির ধারণাটি পুরোপুরি কোনো নিখুঁত বংশলতিকা বা জেনেটিক লাইন ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক জোট। বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা মানুষ – পলাতক কৃষক, যাযাবর পশুপালক, এমনকি কিছু স্থানীয় কানানীয় গোষ্ঠী – এই নতুন পরিচয়ের ছাতার নিচে সমবেত হয়েছিল। জরুরি পরিস্থিতিতে যখনই কোনো বহিরাগত শত্রু আক্রমণ করত, তখন এই উপজাতিগুলো নিজেদের মধ্য থেকে একজন দক্ষ সামরিক নেতা নির্বাচন করত। এই নেতাদেরকে ইতিহাসে ‘বিচারক’ বা চিফ বলা হয়েছে। তারা কোনো স্থায়ী রাজা ছিলেন না বা তাদের ক্ষমতা বংশানুক্রমিক ছিল না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা আবার সাধারণ জীবনে ফিরে যেতেন। ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো একটি স্বাধীন এবং সমতাভিত্তিক সমাজের প্রতিফলন ছিল (Cross, 1998)।
তবে সময়ের সাথে সাথে এই ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। ফিলিস্তীয়দের মতো সুসংগঠিত এবং স্থায়ী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে কেবল অস্থায়ী জোট গঠন করে লড়াই করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফিলিস্তীয়দের রথ এবং উন্নত অস্ত্রের মোকাবেলা করার জন্য একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন তীব্র হয়ে ওঠে। বাহ্যিক শক্তির এই নিরন্তর চাপ পাহাড়ি সমাজগুলোকে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেয়। সমতাভিত্তিক উপজাতীয় ব্যবস্থা থেকে তারা বাধ্য হয়েই একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র বা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর সম্পূর্ণ শূন্য থেকে শুরু করে টিকে থাকার যে নিরন্তর সংগ্রাম এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠী চালিয়েছিল, তা মূলত তাদের আত্মপরিচয় গঠনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল। কানানীয় শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, নতুন ভূগোলে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই দীর্ঘ এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়াই ছিল ইসরায়েলীয় জাতিসত্তার প্রকৃত ইতিহাস, যার সাথে অলৌকিক আখ্যানের চেয়ে বরং মানবসমাজের টিকে থাকার বাস্তব নিয়মের সম্পর্কই অনেক বেশি গভীর (Miller & Hayes, 2006)।
ফিলিস্তীয়, ফিনিশীয় ও প্রতিবেশী সমাজ (Philistines, Phoenicians and Neighboring Societies): প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উত্থান
লেভান্টের ভূরাজনৈতিক রূপান্তর ও ফিলিস্তীয়দের আগমন (Geopolitical Transformation of the Levant and the Arrival of the Philistines)
প্রাচীন দক্ষিণ লেভান্টের মানচিত্রটি কোনো নির্দিষ্ট একক রঙে রাঙানো ছিল না। ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে এক বিশাল পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এই পুরো অঞ্চল। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শুরু হয় এক ব্যাপক অস্থিরতা, যা ইতিহাসের পাতায় ব্রোঞ্জ যুগের পতন (Bronze Age Collapse) নামে পরিচিত। শক্তিশালী হিত্তি সাম্রাজ্য এই সময়ে প্রায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। অন্যদিকে বিশাল মিশরীয় সাম্রাজ্য নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল নিজেদের সীমানার ভেতরে। ঠিক সেই শূন্যতার সুযোগে একদল নতুন মানুষের আবির্ভাব ঘটে এই ভূখণ্ডে। ঐতিহাসিকদের কাছে তারা ‘সি পিপলস’ বা সমুদ্রের মানুষ নামে পরিচিত। এই সমুদ্রগামী জনগোষ্ঠীরই একটি বড় ও শক্তিশালী অংশ ছিল ফিলিস্তীয়রা। তারা কোথা থেকে এসেছিল, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে পণ্ডিতদের মধ্যে নানা ধরনের বিতর্ক ছিল। ধর্মীয় মিথোলজিগুলো তাদের চিত্রিত করেছে একদল অসভ্য ও বর্বর আক্রমণকারী হিসেবে, যাদের একমাত্র কাজ ছিল ধ্বংসলীলা চালানো। তবে আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব আমাদের সামনে তুলে ধরে একদম ভিন্ন এক বাস্তবতার চিত্র। খননকাজ ও জিনগত গবেষণার তথ্যমতে, ফিলিস্তীয়দের আদি নিবাস ছিল মূলত ইজিয়ান সাগর বা ক্রিট দ্বীপের আশেপাশে (Finkelstein, 1988)। সেখান থেকেই তারা ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে এসে বসতি স্থাপন করে।
উপকূলীয় সমভূমিতে তারা গড়ে তুলেছিল পাঁচটি প্রধান শহর। এই শহরগুলো হলো গাজা, অ্যাশকেলন, অ্যাশদোদ, এক্রন এবং গ্যাথ। ইতিহাসে এই পাঁচটি শহরকে একত্রে পেন্টাপোলিস বলা হয়। ফিলিস্তীয়রা শুরুতে আক্রমণকারী হলেও খুব দ্রুতই তারা নিজেদের গুছিয়ে নেয় নতুন এই পরিবেশে। তারা রূপান্তর ঘটায় নিজেদের জীবনযাত্রায় এবং অর্থনীতিতে। যাযাবর বা জলদস্যুর খোলস ছেড়ে তারা হয়ে ওঠে পুরোদস্তুর কৃষিভিত্তিক ও বাণিজ্যনির্ভর এক গোছানো সমাজ। স্থানীয় কানানীয় সংস্কৃতির সাথে তাদের ব্যাপক মাত্রায় মিথস্ক্রিয়া ঘটে। ধীরে ধীরে তারা কানানীয় ভাষা ও কিছু রীতিনীতিও নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে গ্রহণ করে। তবে তারা নিজেদের আদি স্বকীয়তা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেনি। তাদের তৈরি মৃৎশিল্প, বিশেষ করে ‘মাইসেনীয় থ্রি-সি’ ঘরানার তৈজসপত্রগুলো তাদের ইজিয়ান শেকড়ের কথা খুব স্পষ্টভাবেই মনে করিয়ে দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই শহরগুলোর ধ্বংসাবশেষে এমন অনেক প্রমাণ পেয়েছেন, যা নির্দেশ করে ফিলিস্তীয়রা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও উন্নত এক নগরজীবন যাপন করত। তারা নির্মাণ করেছিল সুরম্য অট্টালিকা, চওড়া রাস্তাঘাট এবং সুরক্ষিত নগরপ্রাচীর।
মিশরীয় ফারাও তৃতীয় রামসেসের সময়কার শিলালিপিতে এই ফিলিস্তীয়দের সাথে প্রবল সংঘাতের কথা উল্লেখ আছে। মেদিনেত হাবু মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা চিত্রে দেখা যায় মিশরীয় বাহিনী সমুদ্রের বুকে এই নতুন আগন্তুকদের সাথে লড়ছে। শুরুতে মিশরীয়রা তাদের পরাজিত করে নিজেদের অধীনে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে বিভিন্ন দুর্গে নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মিশরের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হতে শুরু করলে ফিলিস্তীয়রা নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। স্থানীয় ভূরাজনীতিতে তারা পরিণত হয় এক অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তিতে। তাদের এই উত্থানের পেছনে প্রধান কারণ ছিল সুসংগঠিত কাঠামো এবং উন্নত প্রযুক্তিগত জ্ঞান। প্রাচীন ধর্মীয় উপাখ্যানে তাদের যে নেতিবাচক প্রতিমূর্তি দাঁড় করানো হয়েছে, মাটি খুঁড়ে পাওয়া ইতিহাস তার সাথে মোটেও একমত নয় (Mazar, 1990)। ফিলিস্তীয়রা আসলে ছিল সমসাময়িক যুগের অন্যতম পরিশীলিত এক জাতি, যারা কেবল যুদ্ধই করত না, বরং উন্নত জীবনযাপনেও অভ্যস্ত ছিল। তাদের নগরগুলোতে ছিল পরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যা সে যুগে খুব কম জায়গাতেই দেখা যেত। কৃষি উৎপাদন এবং কারুশিল্পে তারা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছিল।
ফিলিস্তীয় নগররাষ্ট্র, অর্থনীতি ও বস্তুগত সংস্কৃতি (Philistine City-States, Economy and Material Culture)
ফিলিস্তীয়দের রাজনৈতিক কাঠামো ছিল সেকালের তুলনায় বেশ গোছানো এবং আধুনিক। তাদের প্রতিটি নগররাষ্ট্রের শাসনভার ন্যস্ত ছিল একজন ‘সেরেন’ বা নগরপতির হাতে। এই সেরেনরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে স্বাধীন থাকলেও বিপদের সময় তারা গঠন করেছিল এক শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট। দরকারের সময় তারা একত্রিত হয়ে যেকোনো বহিরাগত শত্রুর মোকাবেলা করত অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে। তাদের এই শাসনব্যবস্থা অনেকটা গ্রিক নগররাষ্ট্র মডেল (City-State Model)-এর সাথে খুব ভালোভাবে মিলে যায়। অর্থনীতিতে তারা শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকেনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের অংশগ্রহণ ছিল বেশ উজ্জ্বল এবং লাভজনক। উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থানের কারণে তারা সমুদ্রপথে সাইপ্রাস, ইজিয়ান দীপপুঞ্জ এবং মিশরের সাথে নিয়মিত বাণিজ্য করত। খননকাজে ফিলিস্তীয় শহরগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি বিলাসবহুল সামগ্রী পাওয়া গেছে, যা তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার অকাট্য প্রমাণ দেয়। তারা উৎপাদন করত উন্নত মানের জলপাই তেল এবং মদ। এক্রন শহরে পাওয়া গেছে প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলপাই তেল উৎপাদনের কারখানা, যেখানে শতাধিক তেলের ঘানি আবিষ্কৃত হয়েছে (Killebrew, 2005)।
প্রযুক্তিগত দিক দিয়েও ফিলিস্তীয়রা সমসাময়িক অন্যান্য জাতিগুলোর চেয়ে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে ছিল। লৌহ যুগের প্রযুক্তি (Iron Age Technology) তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। বেশ কিছুকাল তারা লোহা নিষ্কাশন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কৌশল নিজেদের একচেটিয়া দখলে রেখেছিল। ইসরায়েলীয় বা কানানীয়রা লোহার কৃষি সরঞ্জাম বা অস্ত্রের জন্য ফিলিস্তীয় কামারদের ওপর নির্ভরশীল থাকত, যার বিনিময়ে ফিলিস্তীয়রা চড়া মূল্য আদায় করত। এই প্রযুক্তিগত মনোপলি তাদের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করত। তাদের সামরিক বাহিনী ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং ভারী অস্ত্রে সজ্জিত। লোহার বর্শা, মজবুত শিরস্ত্রাণ এবং সুসজ্জিত রথ ব্যবহার করে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করত। ডেভিড ও গোলিয়াথের মতো ধর্মীয় গল্পগুলোতে ফিলিস্তীয়দের এই সামরিক শক্তির একটি ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। পুরাণ যেখানে তাদের দানবীয় রূপ দেয়, ইতিহাস সেখানে তাদের উন্নত সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যৌক্তিক ব্যাখ্যা হাজির করে।
তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসও ছিল স্থানীয় কানানীয় বা ইসরায়েলীয়দের থেকে বেশ আলাদা। প্রত্নতাত্ত্বিকরা অ্যাশকেলন বা এক্রনের মতো ফিলিস্তীয় বসতিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে শুকরের হাড় পেয়েছেন, যা ইসরায়েলীয় বসতিগুলোতে একেবারেই অনুপস্থিত ছিল (Dothan, 1982)। এই খাদ্যাভ্যাস কেবল একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক পার্থক্যই নয়, বরং এটি তাদের ভিন্ন ভৌগোলিক উৎপত্তির একটি জোরালো প্রমাণ হিসেবে আর্কিওলজিতে ব্যবহৃত হয়। তারা তাদের নিজস্ব কিছু ধর্মীয় রীতিনীতিও পালন করত অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে। তাদের উপাসনালয়গুলো ছিল স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য এবং প্রশস্ত। সেখানে নানা ধরনের দেবদেবীর মূর্তি ও আচার-অনুষ্ঠানের বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া গেছে। মজার ব্যাপার হলো, সময়ের সাথে সাথে ফিলিস্তীয়রা স্থানীয় দেবতা যেমন দগন বা বাল-এর উপাসনা শুরু করে নিজেদের মতো করে। এই সাংস্কৃতিক সমন্বয়বাদ (Cultural Syncretism) প্রমাণ করে যে তারা স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষী ছিল না। তারা ধীরে ধীরে এই অঞ্চলেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল এবং শাসন করেছিল এক বিস্তীর্ণ এলাকা।
ফিনিশীয়দের সামুদ্রিক সাম্রাজ্য ও বাণিজ্যের বিস্তার (Maritime Empire and Trade Expansion of the Phoenicians)
দক্ষিণ লেভান্টের উত্তরে, বর্তমান লেবানন অঞ্চলে, উত্থান ঘটেছিল ফিনিশীয়দের। ফিলিস্তীয়রা যেমন বাইরে থেকে পাড়ি জমিয়েছিল এই অঞ্চলে, ফিনিশীয়রা তেমনটা ছিল না। তারা ছিল মূলত প্রাচীন কানানীয়দেরই সরাসরি এবং স্থানীয় উত্তরসূরি। লেবাননের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং উর্বর কৃষিজমির অভাব তাদের বাধ্য করেছিল বিকল্প উপার্জনের খোঁজে সমুদ্রের দিকে তাকাতে। তারা পরিণত হয় প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে সাহসী নাবিক এবং ধূর্ত ব্যবসায়ীতে। টায়ার, সিডন এবং বাইবলস ছিল তাদের প্রধান নগররাষ্ট্র। এই শহরগুলো ছিল ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের মূল ধমনী। ফিনিশীয়রা শুধু নিজেদের এলাকায় আটকে থাকেনি, তারা জাহাজ ভাসিয়েছিল দূর সাগরের অজানা পথে। ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন উপকূলে তারা অসংখ্য বাণিজ্যিক উপনিবেশ গড়ে তোলে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। উত্তর আফ্রিকার কার্থেজ ছিল তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং শক্তিশালী উপনিবেশ। বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে তারা গড়ে তুলেছিল এক বিশাল সামুদ্রিক সাম্রাজ্য (Maritime Empire), যা প্রাচীন বিশ্বে অনন্য ছিল (Aubet, 2001)। তাদের এই সাম্রাজ্য কোনো সামরিক আগ্রাসনের ফসল ছিল না; এটি ছিল নিখাদ অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের এক চমৎকার উদাহরণ।
ফিনিশীয়দের সবচেয়ে যুগান্তকারী উদ্ভাবন ছিল তাদের সহজবোধ্য বর্ণমালা। এর আগে লেখালেখির কাজ করা হতো মেসোপটেমিয়ার জটিল কিউনিফর্ম বা মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে, যা শিখতে বছরের পর বছর সময় লাগত। ফিনিশীয়রা উদ্ভাবন করে মাত্র ২২টি ব্যঞ্জনবর্ণের এক সরল ও ব্যবহারিক লিপি। বর্ণমালার বিবর্তন (Evolution of the Alphabet)-এর ইতিহাসে এটি একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ এবং মজুত পণ্যের তালিকা দ্রুত লেখার তাগিদেই তারা এই লিপি তৈরি করেছিল। তাদের কাছ থেকেই এই বর্ণমালা গ্রিকদের হাতে পৌঁছায় বাণিজ্যের হাত ধরে। পরে তা ইউরোপসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রূপে। মানব সভ্যতায় ফিনিশীয়দের এই অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের প্রধান পণ্য ছিল লেবাননের বিখ্যাত সিডার কাঠ এবং এক বিশেষ ধরনের বেগুনি রং। ম্যুরেক্স নামের এক প্রজাতির সামুদ্রিক শামুক থেকে অত্যন্ত জটিল ও দুর্গন্ধযুক্ত প্রক্রিয়ায় এই রং তৈরি করা হতো। এই বেগুনি রং ছিল রাজকীয় আভিজাত্যের প্রধান প্রতীক। প্রাচীন বিশ্বের রাজারা ফিনিশীয়দের এই রঙের জন্য কাড়িকাড়ি অর্থ ব্যয় করতেন (Markoe, 2000)।
বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিনিশীয়রা ছিল অত্যন্ত দক্ষ কারিগর। ধাতু, কাঁচ এবং হাতির দাঁতের ওপর তাদের সূক্ষ্ম কাজ প্রাচীন বিশ্বে দারুণ সমাদৃত ছিল। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তাদের বড় বড় স্থাপনা নির্মাণের জন্য ফিনিশীয় স্থপতি ও কারিগরদের মোটা পারিশ্রমিকে ভাড়া করত। তাদের জাহাজ নির্মাণের কৌশলও ছিল সে সময়ের সাপেক্ষে বিস্ময়কর। বড় বড় সিডার কাঠের গুঁড়ি জোড়া লাগিয়ে তারা তৈরি করত বিশাল সব বাণিজ্যতরী, যেগুলো গভীর সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী ছিল। এই জাহাজগুলো ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ সামলে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পারত। রাজনৈতিকভাবে ফিনিশীয় নগররাষ্ট্রগুলো ছিল স্বাধীন এবং স্বায়ত্তশাসিত। তবে বাণিজ্যের স্বার্থে তারা প্রায়ই বড় সাম্রাজ্যগুলোকে, যেমন মিশর বা অ্যাসিরিয়াকে, নিয়ম করে কর প্রদান করত। তারা পারতপক্ষে সংঘাত এড়িয়ে চলত। যুদ্ধ করে সম্পদ নষ্ট করার চেয়ে তারা আপস করে বাণিজ্যের পথ খোলা রাখাকেই বেশি যৌক্তিক মনে করত। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাদের শত শত বছর ধরে সমৃদ্ধির চূড়ায় টিকিয়ে রেখেছিল।
ফিনিশীয় ধর্মীয় প্রথা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব (Phoenician Religious Practices and Cultural Influence)
যেকোনো প্রাচীন সমাজের মতোই ফিনিশীয়দের জীবনও আবর্তিত হতো তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। তবে তাদের ধর্ম নিয়ে ইতিহাসে প্রচুর বিভ্রান্তি এবং ভুল তথ্য রয়েছে। হিব্রু বাইবেল এবং পরবর্তীকালের গ্রিক-রোমান লেখকরা ফিনিশীয় ধর্মকে অত্যন্ত নেতিবাচক, অমানবিক ও বর্বর হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তারা ফিনিশীয় দেবতাদের তুলে ধরেছেন ভয়ংকর রূপে। কিন্তু আধুনিক আর্কিওলজি আমাদের শিখিয়েছে যে, ধর্মীয় মিথোলজি এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। ফিনিশীয় সমাজ ছিল মূলত বহু-ঈশ্বরবাদী। তাদের প্রতিটি নগররাষ্ট্রের একজন নিজস্ব প্রধান দেবতা বা দেবী ছিলেন, যারা সেই নগরের রক্ষাকর্তা হিসেবে বিবেচিত হতেন। টায়ার শহরের প্রধান দেবতা ছিলেন মেলকার্ত, সিডনের ছিলেন এশমুন এবং বাইবলসের ছিলেন বাআলাত। তাদের এই বহু-ঈশ্বরবাদী কাঠামো (Polytheistic Structure) ছিল মূলত কৃষিজীবী ও সমুদ্রচারী মানুষের প্রকৃতির শক্তির প্রতি একধরনের আত্মসমর্পণ। দেবতাদের তারা সন্তুষ্ট রাখতে চাইত ভালো ফলন এবং নিরাপদ সমুদ্রযাত্রার আশায়।
ফিনিশীয় ধর্ম নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি হলো শিশু বলিদানের প্রথা। রোমান লেখকরা দাবি করতেন যে, কার্থেজের ফিনিশীয়রা তাদের দেবতা বাল হাম্মনের উদ্দেশ্যে নিজেদের সন্তানদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করত। খননকাজে ‘তোফেত’ নামের কিছু বিশেষ গোরস্তান পাওয়া গেছে, যেখানে অনেক শিশুর পোড়া হাড় মিলেছে (Moscati, 1968)। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে, এটি ঢালাওভাবে শিশু বলিদানের অকাট্য প্রমাণ নয়। প্রাচীনকালে চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবে শিশুমৃত্যুর হার ছিল ভয়াবহ রকমের বেশি। মৃত শিশুদের হয়তো বিশেষ কোনো ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে এই তোফেতগুলোতে সমাহিত করা হতো শোক পালনের অংশ হিসেবে। শত্রুদের লেখা ইতিহাস অনেক সময় রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে কাজ করে। ফিনিশীয়দের বর্বর হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে রোমানদের নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়া সহজ হতো। তাই ইতিহাসের পাতা থেকে মিথোলজি এবং প্রোপাগান্ডাকে আলাদা করাটা অত্যন্ত জরুরি। বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ছাড়া প্রাচীন সমাজের সঠিক চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
তাদের ধর্মীয় স্থাপত্য ও আচার-অনুষ্ঠান প্রতিবেশী সমাজগুলোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ফিনিশীয়রা পাথর কেটে বিশাল মন্দির নির্মাণে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তাদের মন্দিরের নকশায় সাধারণত একটি প্রবেশদ্বার, একটি মূল উপাসনালয় এবং একটি পবিত্রতম কক্ষ থাকত। এই স্থাপত্যশৈলী পরবর্তীতে অন্যান্য জাতি, এমনকি ইসরায়েলীয়রাও গ্রহণ করেছিল। সলোমনের মন্দিরের যে বর্ণনা বাইবেলে পাওয়া যায়, তার নকশা ফিনিশীয় মন্দিরের প্রায় হুবহু অনুরূপ (Gras, 1989)। ফিনিশীয় কারিগররাই যে সেই মন্দির নির্মাণে যুক্ত ছিল, সে কথাও সেখানে বলা আছে। এই সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রমাণ করে যে, প্রাচীন লেভান্টে ধর্মগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো ধারণা ছিল না। তারা একে অপরের কাছ থেকে উপাদান ধার করেছে অবলীলায়। দেবদেবীর ধারণা, মিথোলজি এবং ধর্মীয় আচারগুলো ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে প্রবাহিত হয়েছে। ফিনিশীয় ধর্ম কোনো ঐশ্বরিক বা অলৌকিক কিছু ছিল না; এটি ছিল সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট এক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যা তাদের নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
ট্রান্সজর্ডানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি (Neighboring States of Transjordan and Political Dynamics)
জর্ডান নদীর পূর্ব তীরে, যাকে ঐতিহাসিকভাবে ট্রান্সজর্ডান বলা হয়, ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে তিনটি নতুন শক্তির উত্থান ঘটে। এগুলো হলো ইদোম, মোয়াব এবং আম্মন। এরা ফিলিস্তীয় বা ফিনিশীয়দের মতো সমুদ্রনির্ভর উপকূলীয় শক্তি ছিল না। তাদের শেকড় ছিল শুষ্ক মরুভূমি এবং পাহাড়ি উপত্যকায়। শুরুতে এরা ছিল মূলত যাযাবর বা আধা-যাযাবর পশুপালক গোষ্ঠী। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তারা স্থায়ী বসতি স্থাপন করে এবং ছোট ছোট রাজ্য গঠন করে। এই রাষ্ট্রগঠন তত্ত্ব (State Formation Theory) প্রাচীন ইতিহাসের এক অত্যন্ত চমকপ্রদ অধ্যায় (Levy, 2008)। কৃষির পাশাপাশি তাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। প্রাচীনকালের বিখ্যাত ‘কিংস হাইওয়ে’ বা রাজকীয় সড়ক তাদের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বিস্তৃত ছিল। এই সড়কটি লোহিত সাগর ও মিশর থেকে শুরু করে সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করত। বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে এবং প্রতিবেশীদের সাথে প্রায়ই সংঘাত বেধে যেত।
মোয়াব রাজ্যটি অবস্থিত ছিল মৃত সাগরের ঠিক পূর্ব দিকে। তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল হলো মেশা শিলালিপি (Mesha Stele)। ১৮৬৮ সালে আবিষ্কৃত এই কালো ব্যাসাল্ট পাথরের শিলালিপিটি খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীর। এতে মোয়াবের রাজা মেশার বিজয়ের কাহিনী প্রাচীন হিব্রু-মোয়াবীয় লিপিতে খোদাই করা আছে। শিলালিপিতে রাজা মেশা বর্ণনা করেছেন কীভাবে তিনি ইসরায়েলীয়দের শাসন থেকে নিজের দেশকে মুক্ত করেছিলেন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার, কারণ এটি হিব্রু বাইবেলের বাইরে সেই সময়ের ইতিহাসের প্রথম কোনো বস্তুনিষ্ঠ লিখিত প্রমাণ হাজির করে (Dever, 2001)। বাইবেলে এই যুদ্ধের কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে ইসরায়েলীয়দের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মেশা শিলালিপি আমাদের সুযোগ দেয় পরাজিতদের নয়, বরং মোয়াবীয়দের নিজেদের জবানিতে ইতিহাস জানার। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ধর্মীয় টেক্সটগুলো নিখুঁত ইতিহাস নয়; সেগুলো মূলত নিজস্ব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য লেখা হতো।
ইদোম রাজ্যের অবস্থান ছিল মোয়াবের দক্ষিণে, এক চরম বৈরী এবং শুষ্ক এলাকায়। কৃষিকাজের সুযোগ সেখানে খুব সীমিত ছিল। কিন্তু ইদোমীয়রা এর অভাব পুষিয়ে নিয়েছিল তামা নিষ্কাশনের মাধ্যমে। ফায়নান বা খিরবেত এন-নাহাস নামের এলাকাটি ছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামা উৎপাদন কেন্দ্র। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সেখানে বিশাল আকারের ধাতব কারখানা এবং হাজার হাজার টন তামার বর্জ্য পাওয়া গেছে (MacDonald, 2000)। এই তামা বাণিজ্যের মাধ্যমেই ইদোম এক শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হয়। অন্যদিকে উত্তরের আম্মন রাজ্যটি ছিল বেশ উর্বর এবং কৃষিনির্ভর। আম্মনীয়রা চমৎকার কিছু দুর্গ ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করেছিল নিজেদের সীমানা সুরক্ষার জন্য। এই তিনটি রাজ্যই ছিল নিজেদের মতো করে সংগঠিত। তাদের নিজস্ব রাজতন্ত্র, সেনাবাহিনী এবং প্রশাসন ছিল। তারা কোনো বিচ্ছিন্ন উপজাতি ছিল না, বরং সমসাময়িক ভূরাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিল। তাদের এই উত্তরণ প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশ কীভাবে মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আকার দেয়।
ইসরায়েলীয়দের সাথে প্রতিবেশী সমাজগুলোর মিথস্ক্রিয়া ও সংঘাত (Interaction and Conflict of Neighboring Societies with the Israelites)
দক্ষিণ লেভান্টের ইতিহাসকে কেবল নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের ইতিহাস হিসেবে দেখলে বড় ধরনের ভুল হবে। ফিলিস্তীয়, ফিনিশীয়, ইদোমীয় বা মোয়াবীয়দের সাথে ইসরায়েলীয়দের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক। ধর্মীয় মিথোলজিগুলোতে এই প্রতিবেশী জাতিগুলোকে চিরস্থায়ী শত্রু হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মকে আখ্যায়িত করা হয়েছে অপবিত্র হিসেবে। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আমাদের এক ভিন্ন আঞ্চলিক আধিপত্য (Regional Hegemony)-এর গল্প শোনায় (Finkelstein & Silberman, 2001)। বাস্তবে এই জাতিগুলোর মধ্যে কেবল সংঘাতই ছিল না; তাদের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক জোট, অর্থনৈতিক লেনদেন এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও ঘটত। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা প্রায়ই একে অপরের সাথে হাত মেলাত। আবার স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত। এটি ছিল প্রাচীন কূটনীতির এক চিরায়ত রূপ।
উদাহরণস্বরূপ, ৮৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংঘটিত কারকার যুদ্ধের কথা বলা যেতে পারে। এই যুদ্ধে শক্তিশালী অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের আগ্রাসন রুখে দিতে লেভান্টের ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে একতাবদ্ধ হয়েছিল। অ্যাসিরীয় রাজা তৃতীয় শালমানেসারের শিলালিপিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ইসরায়েলের রাজা আহাব, ফিনিশীয় শহরগুলো এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিলে এক বিশাল সম্মিলিত বাহিনী গঠন করেছিল। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা ধর্মীয় ও জাতিগত পার্থক্য দূরে সরিয়ে রাখতে পারত। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তাদের মিথস্ক্রিয়া ছিল চোখে পড়ার মতো। ইসরায়েলীয়রা ফিলিস্তীয়দের কাছ থেকে লোহা, ফিনিশীয়দের কাছ থেকে কাঠ ও বিলাসবহুল দ্রব্য এবং ইদোমীয়দের কাছ থেকে তামা সংগ্রহ করত। বিনিময়ে তারা সরবরাহ করত কৃষিজাত পণ্য। রাজপরিবারগুলোর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেও রাজনৈতিক জোট গঠন করা হতো সে যুগে।
ইতিহাসের এক দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো একে অপরের অস্তিত্বকে প্রভাবিত করে গেছে। ফিলিস্তীয়দের উন্নত সামরিক চাপ ইসরায়েলীয়দের বাধ্য করেছিল নিজেদের উপজাতীয় বিভেদ ভুলে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্র গড়ে তুলতে। আবার ফিনিশীয়দের সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যশৈলী তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রূপ দিয়েছিল। এই সব প্রতিবেশী সমাজের অবদান ছাড়া প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ধর্মীয় পুরাণগুলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে মহান করার জন্য বাকিদের খলনায়ক বানিয়েছিল। কিন্তু মাটি খুঁড়ে বের করা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ সেই পুরাণকে বাতিল করে দেয়। আর্কিওলজি আমাদের দেখায় যে, প্রতিটি জাতিই তাদের নিজ নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে সভ্যতা বিনির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের কাজ হলো মিথোলজির এই মায়াজাল ছিন্ন করে বাস্তবতার শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে অতীতকে পাঠ করা। ফিলিস্তীয়, ফিনিশীয় বা মোয়াবীয়রা তাই ইতিহাসের কোনো খলনায়ক নয়, বরং তারা ছিল এই প্রাচীন ভূখণ্ডের সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং সৃজনশীল অংশীদার।
উপজাতীয় কনফেডারেশন ও প্রাথমিক ধর্ম (Tribal Confederation and Early Religion): কেন্দ্রহীন সমাজ
ঐতিহাসিক বাস্তবতা বনাম ধর্মীয় মিথোলজি (Historical Reality vs. Religious Mythology)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ইসরায়েলীয়দের উত্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল বিভ্রান্তি রয়েছে। হিব্রু বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, লক্ষ লক্ষ মানুষ মিশর থেকে পালিয়ে এসে জশুয়ার নেতৃত্বে এক দুর্দান্ত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কানান দখল করে নেয়। বাইবেলের গল্পে বলা হয়, তারা একের পর এক শহর ধ্বংস করে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের উৎখাত করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এই বিবরণ হাজার হাজার বছর ধরে একটি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কাছে সমাদৃত হয়ে আসছে। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব মাটি খুঁড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্য আবিষ্কার করেছে। এই সামরিক বিজয়ের গল্পটি মূলত একটি মিথোলজি বা পৌরাণিক আখ্যান, যার কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। জেরিকো বা আই-এর মতো যেসব শহরের পতন নিয়ে বাইবেলে রোমাঞ্চকর গল্প রয়েছে, খননকাজে দেখা গেছে যে নির্দিষ্ট সেই সময়ে ওই শহরগুলোর অস্তিত্বই ছিল না। জেরিকোতে তখন কোনো সুরক্ষাপ্রাচীর ছিল না এবং আই শহরটি তারও শত শত বছর আগে ধ্বংস হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই সামরিক আগ্রাসনের তত্ত্বকে বাতিল করে দিয়েছেন। এর বদলে তারা শান্তিপূর্ণ অনুপ্রবেশ তত্ত্ব (Peaceful Infiltration Theory) এবং অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছেন (Finkelstein & Silberman, 2001)। ব্রোঞ্জ যুগের পতনের পর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যখন বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, কানানের উপকূলীয় নগররাষ্ট্রগুলো তখন ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই নগরগুলোর অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত শোষণমূলক। সেই শোষণের হাত থেকে বাঁচতে কানানেরই এক বিশাল সংখ্যক প্রান্তিক মানুষ, পশুপালক ও যাযাবর গোষ্ঠী দলে দলে পাহাড়ি অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করে। তারা কোনো বাইরের আক্রমণকারী ছিল না। তারা ছিল কানানেরই স্থানীয় অধিবাসী, যারা একটি নতুন ধরনের সমাজ গড়তে চেয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো দেখায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে কানানের কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলে হঠাৎ করেই শত শত ছোট ছোট অনাবাসিক বা আধা-আবাসিক বসতি গড়ে ওঠে, যা কোনো ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে হয়নি, বরং অত্যন্ত ধীর ও শান্তিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ার ফসল ছিল।
এই নতুন বসতি স্থাপনকারীদের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তাদের মৃৎশিল্প, ঘরবাড়ির ধরন এবং কৃষি কৌশলগুলো স্থানীয় কানানীয় সংস্কৃতিরই সরাসরি ধারাবাহিকতা। বাইরে থেকে আসা কোনো নতুন জাতির সংস্কৃতির ছাপ সেখানে নেই। তারা কেবল নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করেছিল এবং সময়ের সাথে সাথে নিজেদের একটি নতুন জাতিগত পরিচয় বা ‘ইসরায়েলীয়‘ পরিচয় গড়ে তুলেছিল (Dever, 2003)। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো শত শত বছর পর লেখা হয়েছিল মূলত একটি জাতীয়তাবাদী চেতনা তৈরি করার উদ্দেশ্যে। সেকারণে সেখানে অতীতকে মহিমান্বিত করে সামরিক বিজয়ের গল্প ফাঁদা হয়েছে। ইতিহাস ও মিথোলজির এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝাটা খুব জরুরি। ধর্মীয় আখ্যানগুলো মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত। মাটি খুঁড়ে পাওয়া বস্তুগত প্রমাণগুলো আমাদের সেই মিথোলজির খোলস ভেঙে ফেলে সত্যিকারের মানুষদের জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
কেন্দ্রহীন সমাজ ও উপজাতীয় কনফেডারেশন (Stateless Society and Tribal Confederation)
পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে ওঠা এই নতুন সমাজটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের রাজনৈতিক কাঠামো। প্রাচীন মিশর বা কানানের মতো তাদের কোনো রাজা ছিল না, কোনো কেন্দ্রীয় রাজধানী ছিল না, এমনকি কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনীও ছিল না। তারা ছিল মূলত একটি কেন্দ্রহীন সমাজ। বাইবেলে বারোটি উপজাতির কথা বলা হলেও, ঐতিহাসিকভাবে এই বারো উপজাতির ধারণাটি অনেক পরের একটি রাজনৈতিক উদ্ভাবন। বাস্তবে তারা ছিল অসংখ্য ছোট ছোট পরিবার ও বংশের একটি শিথিল জোট বা কনফেডারেশন। নৃবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের রাজনৈতিক কাঠামোগুলোকে সেগমেন্টারি লিনিয়েজ সিস্টেম (Segmentary Lineage System) বলা হয় (Gottwald, 1979)। এই ব্যবস্থায় মানুষ দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয়ে বিভক্ত থাকে। কিন্তু যখনই বাইরের কোনো শত্রুর আক্রমণ ঘটে, তখন তারা রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে একত্রিত হয়ে একটি বৃহত্তর জোটে পরিণত হয়। সংকট কেটে গেলে তারা আবার নিজেদের ছোট ছোট গণ্ডিতে ফিরে যায়।
এই সমাজটি কেন রাষ্ট্র বা রাজতন্ত্র গঠন করল না, তার একটি চমৎকার আর্থ-সামাজিক ব্যাখ্যা রয়েছে। আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী নরম্যান গটওয়াল্ড (Norman Gottwald) তার বিখ্যাত কৃষক বিদ্রোহ তত্ত্ব (Peasant Revolt Theory)-তে দেখিয়েছেন যে, এই মানুষগুলো মূলত কানানের নগররাষ্ট্রগুলোর শোষিত কৃষক ও দাস শ্রেণী থেকে উঠে এসেছিল। তারা রাজতন্ত্র, করপ্রদান এবং বাধ্যতামূলক শ্রমের মতো প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা পোষণ করত। তাই তারা সচেতনভাবেই এমন একটি সমাজ কাঠামো গড়ে তুলেছিল, যেখানে কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হতে পারবে না। তাদের সমাজ ছিল মূলত সমতাভিত্তিক বা ইগালিটেরিয়ান। পাহাড়ি রুক্ষ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তাদের একে অপরের সহযোগিতার ওপর প্রবলভাবে নির্ভর করতে হতো। সেখানে কেউ বড় জমিদার বা কেউ ভূমিহীন দাস – এমন বিভাজন তৈরি হওয়ার মতো উদ্বৃত্ত সম্পদ বা অর্থনৈতিক সুযোগ ছিল না।
উপজাতীয় এই কনফেডারেশনের ভিত্তি ছিল আত্মীয়তা এবং কাল্পনিক বংশলতিকা। তারা নিজেদের মধ্যে একটি কাল্পনিক ঐক্যের বোধ তৈরি করেছিল। বিভিন্ন উপজাতি নিজেদের আলাদা ভৌগোলিক এলাকায় স্বাধীনভাবে কৃষিকাজ ও পশুপালন করত। তাদের মধ্যে মাঝে মাঝেই চারণভূমি বা জলের উৎস নিয়ে ছোটখাটো দ্বন্দ্ব লেগে থাকত। তবে ফিলিস্তীয় বা কানানীয় রাজাদের মতো শক্তিশালী বহিরাগত শত্রুর সম্মুখীন হলে তারা নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব ভুলে একতাবদ্ধ হতো। প্রাচীন লেভান্টে রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এই পর্যায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র বা রাজতন্ত্র মানুষের কোনো সহজাত প্রবৃত্তি নয়। মানুষ তার নির্দিষ্ট পরিবেশ ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সমাজ কাঠামো নির্বাচন করে। ইসরায়েলীয়দের এই উপজাতীয় কনফেডারেশন ছিল মূলত সমসাময়িক যুগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব সামাজিক প্রতিরোধ।
শাফেত বা বিচারকদের ভূমিকা ও স্থানীয় নেতৃত্ব (Role of Judges and Local Leadership)
যে সমাজে কোনো রাজা বা স্থায়ী প্রশাসন নেই, সেখানে নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হয় – এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে। এই উপজাতীয় সমাজে সংকটের সময় যারা অস্থায়ীভাবে নেতৃত্বের হাল ধরতেন, হিব্রু ভাষায় তাদের বলা হতো ‘শাফেত’। ইংরেজিতে একে অনুবাদ করা হয়েছে ‘জাজ’ বা বিচারক হিসেবে। তবে আধুনিক আইনি কাঠামোর বিচারকদের সাথে তাদের কোনো মিল নেই। তারা আদালতে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন না। তারা ছিলেন মূলত উপজাতীয় সামরিক নেতা বা যুদ্ধবাজ সর্দার। যখন কোনো উপজাতি বাইরের শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হতো, তখন এই শাফেতরা সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber)-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, এই শাফেতরা ছিলেন ক্যারিশম্যাটিক কর্তৃত্ব (Charismatic Authority)-এর সর্বোত্তম উদাহরণ (Weber, 1952)। তাদের ক্ষমতা কোনো বংশানুক্রমিক রাজবংশ বা প্রাতিষ্ঠানিক আইনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। মানুষ তাদের অনুসরণ করত তাদের ব্যক্তিগত সাহস, সামরিক দক্ষতা এবং কথিত আধ্যাত্মিক শক্তির কারণে।
দেবরাহ, গিডিওন বা স্যামসনের মতো চরিত্রগুলো এই শাফেতদেরই উদাহরণ। তারা কেউ পেশাদার সৈন্য ছিলেন না। তাদের দৈনন্দিন জীবন ছিল সাধারণ কৃষকদের মতোই। কিন্তু সংকটের সময় তারা সাধারণ কৃষকদের নিয়ে একটি মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তুলতেন। নির্দিষ্ট যুদ্ধ জয়ের পর তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রায়শই শেষ হয়ে যেত। তারা কোনো স্থায়ী রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেননি বা কৃষকদের কাছ থেকে নিয়মিত কোনো কর আদায় করতেন না। এটি ছিল অত্যন্ত বিকেন্দ্রীকৃত এবং সাময়িক একটি নেতৃত্ব ব্যবস্থা। এই শাফেতদের মূল কাজ ছিল শত্রুদের আক্রমণ থেকে নিজেদের চারণভূমি ও কৃষিভূমি রক্ষা করা। অনেক সময় নিজেদের উপজাতিগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটানোর জন্য তারা সালিশকারী হিসেবেও কাজ করতেন। তবে তাদের রায় চাপিয়ে দেওয়ার মতো কোনো পুলিশ বা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তাদের ছিল না। তাদের রায় মানা বা না মানা সম্পূর্ণভাবে উপজাতিগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করত।
শাফেতদের এই নেতৃত্ব ব্যবস্থা সাময়িক সংকট মোকাবেলায় কার্যকর হলেও, এর অনেক বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। সময়ের সাথে সাথে লেভান্টের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। উপকূলীয় সমভূমিতে ফিলিস্তীয়রা অত্যন্ত সুসংগঠিত সামরিক বাহিনী এবং লোহার অস্ত্রের সাহায্যে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। ফিলিস্তীয়দের মতো সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এই অস্থায়ী মিলিশিয়া ও শাফেতদের ক্যারিশমা খুব বেশি দিন টিকতে পারেনি। উপজাতীয় বিভাজন এবং স্থায়ী সামরিক বাহিনীর অভাব ইসরায়েলীয়দের অস্তিত্বের জন্য একসময় বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাইরের এই নিরবচ্ছিন্ন সামরিক চাপই ধীরে ধীরে উপজাতীয় কনফেডারেশনের পতন ডেকে আনে। টিকে থাকার তাগিদে এই স্বাধীনচেতা মানুষগুলো একসময় বাধ্য হয় একজন স্থায়ী রাজার অধীনে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে। শাফেতদের যুগ তাই মূলত যাযাবর বা আধা-যাযাবর জীবন থেকে স্থায়ী রাজতন্ত্রের দিকে যাওয়ার একটি ক্রান্তিকালীন বা ট্রানজিশনাল ফেজ হিসেবে কাজ করেছে।
পাহাড়ি বসতির অর্থনীতি ও কৃষিজীবী জীবন (Economy of Highland Settlements and Agrarian Life)
প্রাথমিক ইসরায়েলীয় সমাজটিকে বুঝতে হলে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং অর্থনীতিকে বোঝা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাদের বসতিগুলো ছিল মূলত জুদিয়া এবং সামারিয়ার রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলে। এই অঞ্চলের মাটি ছিল পাথুরে এবং সেখানে জলের অভাব ছিল তীব্র। এরকম একটি বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তাদের প্রচুর পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল। পাহাড়ের ঢালে কৃষিকাজ করার জন্য তারা ধাপচাষ বা টেরেস ফার্মিং (Terrace Farming) পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে। পাহাড়ের গা কেটে পাথরের দেয়াল তুলে তারা ছোট ছোট কৃষিজমি তৈরি করত, যাতে বৃষ্টির জল মাটি ধুয়ে নিয়ে যেতে না পারে (Stager, 1985)। এই টেরেসগুলো তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ, যা কোনো একক পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পুরো গোষ্ঠীর মানুষকে একসাথে মিলে এই কাজগুলো করতে হতো। এই যৌথ শ্রমই তাদের সমাজের সমতাভিত্তিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
জলের সমস্যা সমাধানের জন্য তারা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কাজে লাগিয়েছিল। তারা পাহাড়ের পাথর কেটে বড় বড় চৌবাচ্চা তৈরি করত এবং সেগুলোর ভেতরের দিকে চুনাপাথরের প্লাস্টার লাগিয়ে দিত। এই প্লাস্টারের কারণে চৌবাচ্চাগুলো জলনিরোধক হতো। বর্ষাকালে বৃষ্টির জল এই চৌবাচ্চাগুলোতে জমিয়ে রাখা হতো, যা শুষ্ক মৌসুমে মানুষ ও গবাদিপশুর পানীয় জল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তাদের ঘরবাড়ির স্থাপত্যও ছিল এই কৃষিনির্ভর জীবনের সাথে মানানসই। আর্কিওলজিস্টরা এই সময়ের বসতিগুলোতে এক বিশেষ ধরনের বাড়ির প্রচুর নিদর্শন পেয়েছেন, যাকে বলা হয় ‘চার-কক্ষ বিশিষ্ট ঘর’ বা ফোর-রুম হাউস। এই বাড়িগুলোর নিচতলায় গবাদিপশু রাখা হতো এবং কৃষিপণ্য মজুত করা হতো, আর ওপরের তলায় মানুষ বসবাস করত। নিচতলার পশুর শরীরের উত্তাপ শীতকালে ওপরের তলাকে গরম রাখতে সাহায্য করত।
তাদের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণভাবে সাবসিস্টেন্স বা টিকে থাকার অর্থনীতি। তারা শুধু ততটুকুই উৎপাদন করত, যতটুকু তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন। উদ্বৃত্ত কোনো ফসল তাদের ছিল না, যা দিয়ে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে। ফিলিস্তীয় বা ফিনিশীয়দের মতো তাদের কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই পাহাড়ি বসতিগুলোতে কোনো বিলাসবহুল সামগ্রী, বিদেশি মৃৎপাত্র বা অলংকারের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তাদের ব্যবহৃত মাটির পাত্রগুলো ছিল অত্যন্ত সাদামাটা ও কারুকাজহীন, যা ‘কোলার্ড-রিম জার’ নামে পরিচিত। সম্পদের এই সমবণ্টন এবং বিলাসিতার অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে এটি ছিল মূলত একটি দরিদ্র কৃষিজীবী সমাজ। কঠিন ভৌগোলিক বাস্তবতা তাদের একতাবদ্ধ থাকতে বাধ্য করেছিল। প্রকৃতির সাথে এই নিরন্তর সংগ্রামই তাদের সামাজিক ও মানসিক গঠনকে একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাদের জাতিগত পরিচয়ের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
প্রাথমিক ধর্মীয় বিশ্বাস ও কানানীয় শেকড় (Early Religious Beliefs and Canaanite Roots)
বর্তমান বিশ্বে ইহুদি, খ্রিস্টান বা ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা ইসরায়েলীয়দের প্রাচীন ধর্মকে একটি বিশুদ্ধ একশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে বিশ্বাস করে। কিন্তু ইতিহাস ও আর্কিওলজি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। প্রাথমিক ইসরায়েলীয়দের ধর্ম মোটেও একশ্বরবাদী ছিল না। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত ছিল প্রাচীন কানানীয় মিথোলজির ভেতরে। কানানীয় দেবমণ্ডলীতে প্রধান দেবতার নাম ছিল ‘এল’ (El)। তিনি ছিলেন দেবতাদের পিতা এবং বিশ্বজগতের স্রষ্টা। মজার ব্যাপার হলো, ‘ইসরায়েল’ শব্দটির মধ্যেই এই কানানীয় দেবতার নাম লুকিয়ে আছে, যার অর্থ ‘এল শাসন করেন’ বা ‘এল সংগ্রাম করেন’। প্রাথমিক পর্যায়ে এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠী কানানীয়দের মতোই এল, বাল, আশেরাহ এবং অন্যান্য দেবদেবীর পূজা করত। কোনো একক দেবতার প্রতি তাদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য ছিল না।
ইয়াহওয়েহ (Yahweh) নামক দেবতার ধারণাটি শুরুতে তাদের মধ্যে ছিল না। ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ নির্দেশ করে যে, ইয়াহওয়েহ ছিলেন মূলত দক্ষিণ লেভান্টের শুষ্ক মরুভূমি অঞ্চল, বিশেষ করে ইদোম বা মিদিয়ানের একজন যুদ্ধ ও ঝড়ের দেবতা (Smith, 2002)। বাণিজ্য পথ ধরে অথবা যাযাবরদের মাধ্যমে এই দেবতার ধারণাটি ধীরে ধীরে উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে প্রবেশ করে। ইতিহাসবিদ মার্ক এস. স্মিথ (Mark S. Smith) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে কানানীয় দেবমণ্ডলীতে একটি বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছিল। ইয়াহওয়েহ যখন ইসরায়েলীয়দের মধ্যে জনপ্রিয় হতে শুরু করেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে প্রধান দেবতা এল-এর অনেক গুণাবলি নিজের মধ্যে আত্মসাৎ করে নেন। একপর্যায়ে এল এবং ইয়াহওয়েহ মিলেমিশে এক হয়ে যান। একইভাবে, উর্বরতা ও বৃষ্টির দেবতা বাল-এর অনেক বৈশিষ্ট্যও ইয়াহওয়েহের ওপর আরোপ করা হয়। ধর্মীয় মিথোলজির এই বিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক প্রক্রিয়ারই অংশ।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো এই মিশ্র ধর্মীয় বিশ্বাসের অকাট্য প্রমাণ হাজির করে। কুন্টিলেত আজরুদ এবং খিরবেত এল-কোম নামের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে এমন কিছু শিলালিপি পাওয়া গেছে, যা ধর্মীয় ইতিহাসবিদদের চমকে দিয়েছে। এই শিলালিপিগুলোতে স্পষ্টভাবে লেখা আছে “ইয়াহওয়েহ এবং তার আশেরাহ-র নামে আশীর্বাদ করছি” (Dever, 2005)। আশেরাহ ছিলেন একজন কানানীয় দেবী, যাকে এল-এর স্ত্রী হিসেবে মানা হতো। শিলালিপি প্রমাণ করে যে, প্রাচীন ইসরায়েলীয়রা ইয়াহওয়েহের পাশাপাশি দেবী আশেরাহরও উপাসনা করত এবং তাকে ইয়াহওয়েহের সঙ্গিনী হিসেবে বিবেচনা করত। বিভিন্ন বসতির খননে প্রচুর পরিমাণে ছোট ছোট নারীমূর্তি পাওয়া গেছে, যেগুলো উর্বরতার দেবীর প্রতীক। হিব্রু বাইবেলে পরবর্তীকালে অন্যান্য দেবতার উপাসনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও, সেটি অনেক পরের যুগের সম্পাদকীয় সংযোজন। উপজাতীয় যুগে মানুষ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করত।
বহু-ঈশ্বরবাদ থেকে একশ্বরবাদের দিকে যাত্রা (Transition from Polytheism to Monotheism)
বহু-ঈশ্বরবাদ থেকে একশ্বরবাদের দিকে ইসরায়েলীয়দের এই রূপান্তর রাতারাতি ঘটেনি। এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা একটি ধীর এবং জটিল ভূরাজনৈতিক প্রক্রিয়া। শুরুতে তারা সরাসরি একশ্বরবাদে যায়নি, বরং তারা পালন করত একেশ্বরপ্রধান ধর্ম বা হেনোথেইজম (Henotheism)। হেনোথেইজম হলো এমন একটি বিশ্বাস ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ স্বীকার করে যে মহাবিশ্বে অনেক দেবতা রয়েছে, কিন্তু তারা কেবল একজন নির্দিষ্ট দেবতারই উপাসনা করে। প্রাচীন লেভান্টে প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব একজন রক্ষাকর্তা দেবতা ছিল। মোয়াবীয়দের দেবতা ছিল কেমোশ, আম্মনীয়দের ছিল মিলকম, ঠিক তেমনি ইসরায়েলীয়দের জাতীয় দেবতা হয়ে ওঠেন ইয়াহওয়েহ। তারা মনে করত ইয়াহওয়েহ তাদের রক্ষা করবেন এবং যুদ্ধে জয় এনে দেবেন, কিন্তু তারা মোয়াব বা ফিলিস্তীয়দের দেবতাদের অস্তিত্বকেও অস্বীকার করত না।
এই ধর্মীয় পরিবর্তনের পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক কারণ ছিল। ফিলিস্তীয়দের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ এবং পরবর্তীতে অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের মুখে ইসরায়েলীয়দের একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয়ের খুব দরকার ছিল। সমাজ যখন বিভক্ত থাকে, তখন একটি নির্দিষ্ট দেবতার ছাতার নিচে সবাইকে একত্রিত করাটা রাজনৈতিকভাবে খুব লাভজনক। ইয়াহওয়েহ যেহেতু মূলত একজন শক্তিশালী যুদ্ধদেবতা ছিলেন, তাই সংকটময় পরিস্থিতিতে তাকে কেন্দ্র করেই ইসরায়েলীয়রা নিজেদের সামরিক ও মানসিক শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক নেতারা এবং পুরোহিত শ্রেণী ধীরে ধীরে ইয়াহওয়েহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালান। অন্যান্য দেবদেবীর মন্দির বা বেদিগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। ধর্ম এখানে নিছক আধ্যাত্মিক কোনো ব্যাপার ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সংহতি ও জাতীয়তাবাদ নির্মাণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
পরবর্তীতে যখন হিব্রু বাইবেলের মূল অংশগুলো লেখা ও সম্পাদিত হয়, তখন লেখকরা এই একশ্বরবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকেই অতীতের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। তারা এমনভাবে ইতিহাস রচনা করেছিলেন যেন ইসরায়েলীয়রা গোড়া থেকেই একশ্বরবাদী ছিল এবং মাঝেমধ্যে পথভ্রষ্ট হয়ে তারা অন্যান্য দেবতার পূজা করত। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব আমাদের দেখায় যে, বহু-ঈশ্বরবাদই ছিল তাদের আসল এবং প্রাথমিক ধর্মীয় চর্চা। সম্পূর্ণ এবং কঠোর একশ্বরবাদ বা মোনোথেইজম মূলত ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের সময় এবং তার পরে গিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট আকার ধারণ করে (Halpern, 2001)। ঈশ্বরের ধারণা কোনো আকাশ থেকে পড়া ধ্রুব সত্য নয়। প্রাচীন মানুষেরা নিজেদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, ভয়, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদেই দেবতাদের সৃষ্টি করেছিল এবং নিজেদের সুবিধামতো সেই দেবতাদের চরিত্র ও ক্ষমতাকে যুগে যুগে পরিবর্তন করেছিল। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো মূলত সেই বিবর্তনেরই একটি সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক দলিল মাত্র।
ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের ধারণা (Idea of the United Monarchy): সাউল, ডেভিড, সলোমন
উপজাতীয় ব্যবস্থা থেকে রাজতন্ত্রে উত্তরণ (Transition from Tribal System to Monarchy)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ইসরায়েলীয়দের উপজাতীয় কনফেডারেশন বা কেন্দ্রহীন সমাজব্যবস্থা চিরকাল স্থায়ী হতে পারেনি। সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে এই বিকেন্দ্রীভূত সমাজ এক গভীর অস্তিত্বের সংকটে পতিত হয়। পাহাড়ের রুক্ষ পরিবেশে তারা এতদিন যে স্বায়ত্তশাসিত জীবনযাপন করছিল, তা মূলত সম্ভব হয়েছিল শক্তিশালী কোনো বহিরাগত শত্রুর অনুপস্থিতির কারণে। কিন্তু উপকূলীয় সমভূমিতে ফিলিস্তীয়দের সামরিক শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ফিলিস্তীয়দের ছিল সুশৃঙ্খল স্থায়ী সেনাবাহিনী, লোহার উন্নত অস্ত্রশস্ত্র এবং যুদ্ধরথ। অন্যদিকে ইসরায়েলীয়দের ছিল কেবল অস্থায়ী কৃষক মিলিশিয়া, যারা বিপদের সময় একত্রিত হতো এবং বিপদ কেটে গেলে আবার চাষাবাদে ফিরে যেত। ফিলিস্তীয়দের নিয়মিত ও সুসংগঠিত আক্রমণের মুখে এই অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থ হতে থাকে। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং নিজেদের ভৌগোলিক সীমানা রক্ষার জন্য একটি স্থায়ী সামরিক কাঠামো ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাষ্ট্রগঠন তত্ত্ব (State Formation Theory) অনুযায়ী, ঠিক এভাবেই বাহ্যিক সামরিক চাপ একটি বিভক্ত সমাজকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে আসতে বাধ্য করে।
সমাজকাঠামোতে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক রূপান্তরও একটি বড় ভূমিকা রেখেছিল। পাহাড়ি অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষিজমি ও সম্পদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। প্রথম দিকের ইগালিটেরিয়ান বা সমতাভিত্তিক সমাজ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং সমাজে সম্পদের বৈষম্য তৈরি হয়। কিছু পরিবার কৃষিকাজ ও পশুপালনে অন্যদের চেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করে সমাজের অভিজাত শ্রেণীতে পরিণত হয়। এই নব্য অভিজাতরা নিজেদের সম্পদ রক্ষার জন্য একটি স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাব বোধ করছিল, যা উপজাতীয় সমাজকাঠামোয় সম্ভব ছিল না। তারা এমন একজন নেতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, যিনি স্থায়ীভাবে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারবেন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। এই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেই রাজতন্ত্রের ধারণাটি ক্রমশ জনপ্রিয় হতে থাকে। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা মনে করেন, রাজতন্ত্র কোনো একক ব্যক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি অপরিহার্য সামাজিক বিবর্তন (Finkelstein, 2013)।
তবে এই উত্তরণটি মোটেও মসৃণ বা বাধাহীন ছিল না। স্বাধীনচেতা উপজাতিগুলো সহজে একজন রাজার হাতে নিজেদের সব ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। হিব্রু বাইবেলের বিবরণগুলোতে রাজতন্ত্রের প্রতি এই প্রবল সামাজিক বিরোধিতার স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে দেখা যায়, মানুষ যখন বিচারক স্যামুয়েলের কাছে গিয়ে একজন রাজা দাবি করছে, স্যামুয়েল তাদের সতর্ক করে বলছেন যে রাজা তাদের ছেলেদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ দেবেন, মেয়েদের দাসী বানাবেন এবং তাদের ফসলের ওপর চড়া কর বসাবেন। এই আখ্যানটি মূলত রাজতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের প্রতি সাধারণ মানুষের ঐতিহাসিক ভীতি ও অবিশ্বাসেরই সাহিত্যিক রূপ। একদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যদিকে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা – এই দুই বিপরীতমুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রাচীন ইসরায়েলীয় সমাজ একটি আপস করতে বাধ্য হয়। তারা রাজতন্ত্র গ্রহণ করে, কিন্তু সেই রাজতন্ত্র মিশর বা মেসোপটেমিয়ার মতো নিরঙ্কুশ ও স্বৈরতান্ত্রিক ছিল না। এটি ছিল মূলত উপজাতীয় সর্দারতন্ত্র এবং পূর্ণাঙ্গ রাজতন্ত্রের মাঝামাঝি একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।
সাউলের উত্থান ও প্রাথমিক রাষ্ট্রগঠন (Rise of Saul and Early State Formation)
ইসরায়েলীয়দের ইতিহাসে প্রথম রাজা হিসেবে আবির্ভূত হন সাউল। তবে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাপকাঠিতে তাকে ঠিক ‘রাজা’ বলা চলে না। ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সাউলের শাসনব্যবস্থা ছিল মূলত একটি চিফডম বা সর্দারতন্ত্র (Chiefdom)। তিনি কোনো বিশাল প্রাসাদে বাস করতেন না, তার কোনো সুসংগঠিত আমলাতন্ত্র ছিল না এবং তিনি বিশাল কোনো করব্যবস্থাও গড়ে তোলেননি। গিবিয়া নামক একটি পাহাড়ি গ্রামে ছিল তার সাধারণ ক্ষমতার কেন্দ্র, যাকে বড়জোর একটি স্থানীয় দুর্গ বলা যেতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সেখানে একটি সাদামাটা পাথরের কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে সাউলের রাজদরবার ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং জাঁকজমকহীন। তার মূল দায়িত্ব ছিল মূলত সামরিক। ফিলিস্তীয় এবং জর্ডান নদীর পূর্ব তীরের আম্মনীয়দের আক্রমণ থেকে পাহাড়ি বসতিগুলোকে রক্ষা করাই ছিল তার প্রধান কাজ। তিনি ছিলেন একজন ক্যারিশম্যাটিক সামরিক নেতা, যিনি বিপদের সময় বিভিন্ন উপজাতির কৃষকদের একত্রিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতেন।
সাউলের এই প্রাথমিক রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। তিনি উপজাতিগুলোর মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ সেনাবাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের শত বছরের পুরনো বিভেদ পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেননি। তার সেনাবাহিনীর মূল শক্তি ছিল তার নিজ গোত্র বেঞ্জামিন এবং আশেপাশের কিছু উত্তরের উপজাতি। দক্ষিণের জুদাহ অঞ্চলের উপজাতিগুলোর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল খুবই সামান্য। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন, সাউলের তা ছিল না। তিনি মূলত যুদ্ধের ময়দান থেকে পাওয়া লুটতরাজের সম্পদের ওপর নির্ভর করে তার অনুগত সৈন্যদের পুরস্কৃত করতেন (Miller & Hayes, 2006)। প্রশাসনিক কাঠামো বা বড় আকারের কোনো নির্মাণ প্রকল্পের অভাবই প্রমাণ করে যে সাউলের রাজ্যটি ছিল মূলত একটি সামরিক জোট। তার শাসনকাল ছিল নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের কাল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোনো অবকাশ বা সুযোগ তিনি পাননি।
সাউলের রাজনৈতিক পতনও ঘটেছিল এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই। ধর্মীয় মিথোলজিতে বলা হয়, ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়ার কারণে সাউল রাজত্ব হারিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস ও রাজনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার পতনের মূল কারণ ছিল তৎকালীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। একদিকে বিচারক স্যামুয়েলের মতো পুরনো উপজাতীয় ও ধর্মীয় নেতারা নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছিলেন, অন্যদিকে ডেভিডের মতো নতুন ও জনপ্রিয় সামরিক নেতাদের উত্থান সাউলের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছিল। ডেভিড তার সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে জনগণের একটি বড় অংশের সমর্থন আদায় করে নেন, যা সাউলের জন্য সরাসরি রাজনৈতিক হুমকিতে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত গিলবোয়া পর্বতের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ফিলিস্তীয়দের হাতে সাউল এবং তার তিন পুত্রের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর মাধ্যমে লেভান্টের বুকে প্রথম ইসরায়েলীয় রাষ্ট্রগঠনের এই প্রাথমিক ও অসম্পূর্ণ পরীক্ষাটির মর্মান্তিক সমাপ্তি ঘটে। সাউল মূলত এমন একজন ট্র্যাজিক ঐতিহাসিক চরিত্র, যিনি পুরনো উপজাতীয় ব্যবস্থা এবং নতুন রাজতান্ত্রিক কাঠামোর মাঝখানে পিষ্ট হয়েছিলেন।
ডেভিডের রাজত্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা (Reign of David and Historical Reality)
সাউলের মৃত্যুর পর ডেভিড ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ইসরায়েলীয় রাজতন্ত্রকে একটি নতুন রূপ দেন। ডেভিডের উত্থানের গল্পটি প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম চমকপ্রদ রাজনৈতিক আখ্যান। তিনি শুরুতে সাউলের দরবারে একজন সফল যোদ্ধা হিসেবে থাকলেও পরে তার সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে ডেভিড একপর্যায়ে পলাতক জীবন বেছে নেন এবং ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে ফিলিস্তীয়দের অধীনেও কাজ করেন। সাউলের মৃত্যুর পর তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে প্রথমে দক্ষিণের জুদাহ অঞ্চলে এবং পরে উত্তরের উপজাতিগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাল ছিল জেরুজালেম দখল করা। সেই সময়ে জেরুজালেম ছিল জেবুসীয় নামের একটি স্বাধীন উপজাতির অধীনে, যা উত্তরের ইসরায়েল এবং দক্ষিণের জুদাহর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ছিল। ডেভিড এই শহরটি দখল করে একে নিজের রাজধানী ঘোষণা করেন। জেরুজালেম কোনো নির্দিষ্ট ইসরায়েলীয় উপজাতির অংশ না হওয়ায়, এটি উত্তর ও দক্ষিণের মানুষের কাছে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ডেভিড ছিলেন এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি, যার সীমানা মিশর থেকে শুরু করে মেসোপটেমিয়ার ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্ব এই বিশাল সাম্রাজ্যের দাবিকে সমর্থন করে না। দীর্ঘকাল ধরে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক ছিল যে ডেভিড নামের কোনো বাস্তব ঐতিহাসিক চরিত্র আদৌ ছিলেন কি না। ১৯৯৩ সালে উত্তর ইসরায়েলের তেল দান নামক স্থানে একটি অসামান্য প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এই বিতর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেখানে নবম খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি আরামীয় শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়, যেখানে স্পষ্ট অক্ষরে ‘হাউস অফ ডেভিড’ বা ডেভিডের রাজবংশের কথা উল্লেখ রয়েছে (Biran & Naveh, 1993)। এই আবিষ্কারটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে ডেভিড কোনো কাল্পনিক পৌরাণিক চরিত্র ছিলেন না; তিনি সত্যিই একটি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তবে তিনি বাইবেলে বর্ণিত বিশাল কোনো আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন না। তিনি ছিলেন মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের একজন শক্তিশালী স্থানীয় রাজা বা গোষ্ঠীপতি, যিনি নিজের সামরিক দক্ষতার মাধ্যমে একটি সুসংহত রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
ডেভিড তার শাসনকালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তন আনেন, যা উপজাতীয় সমাজকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যায়। তিনি কেবল অস্থায়ী মিলিশিয়াদের ওপর নির্ভর না করে একটি স্থায়ী ও পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। তার এই বাহিনীতে চেরেথীয় ও পেলেথীয়দের মতো বিদেশি ভাড়াটে সৈন্যরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা সরাসরি রাজার প্রতি অনুগত থাকত। এর ফলে উপজাতীয় নেতাদের সামরিক ক্ষমতা খর্ব হয়। একই সাথে তিনি জেরুজালেমকে কেবল রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন। পবিত্র ‘আর্ক অফ দ্য কোভেন্যান্ট’ বা চুক্তিসিন্দুক জেরুজালেমে নিয়ে আসার মাধ্যমে তিনি রাজনীতি এবং ধর্মকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার এই কৌশল প্রাচীন বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের একটি সাধারণ চর্চা ছিল। ডেভিডের এই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোই মূলত পরবর্তীকালে ইসরায়েলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
সলোমনের যুগ ও প্রশাসনিক কাঠামো (Era of Solomon and Administrative Structure)
ডেভিডের পর তার পুত্র সলোমন সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং তার রাজত্বকালকে প্রাচীন ইসরায়েলের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডেভিড যেখানে তার জীবন কাটিয়েছিলেন যুদ্ধবিগ্রহ ও সীমানা বিস্তারে, সলোমন সেখানে মনোযোগ দিয়েছিলেন অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং বিশাল সব নির্মাণ প্রকল্পে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় সলোমনকে একজন প্রজ্ঞাবান ও ঐশ্বর্যশালী রাজা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তিনি মিশর, ফিনিশিয়া এবং আরবের সাথে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ফিনিশীয় রাজা হিরামের সাথে তার চুক্তি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার মাধ্যমে তিনি লেবাননের উন্নত মানের সিডার কাঠ এবং দক্ষ স্থপতিদের সহায়তা লাভ করেন। এই স্থপতিদের সহায়তায় তিনি জেরুজালেমে প্রথম মন্দির বা ফার্স্ট টেম্পল এবং নিজের জন্য এক বিশাল রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইসরায়েলীয়দের ধর্মীয় উপাসনাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত করেছিল। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার কারণে আজ পর্যন্ত এই মন্দিরের কোনো বস্তুগত ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সলোমনের আমলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছিল তার প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে। বিশাল নির্মাণ প্রকল্প এবং জাঁকজমকপূর্ণ রাজদরবার পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। এই অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে সলোমন পুরো রাজ্যকে বারোটি প্রশাসনিক বা কর অঞ্চলে বিভক্ত করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বারোটি অঞ্চলের সীমানা প্রাচীন উপজাতীয় সীমানার সাথে মিলত না। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সলোমন সচেতনভাবেই পুরনো উপজাতীয় পরিচয় মুছে ফেলে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় পরিচয় গড়ে তোলার জন্য এই নতুন বিভাজন তৈরি করেছিলেন (Ahlström, 1993)। প্রতিটি অঞ্চলকে বছরে এক মাস রাজার দরবারের সমস্ত খরচ বহন করতে হতো। কর আদায়ের পাশাপাশি তিনি কোরভে (Corvée) বা বাধ্যতামূলক শ্রমব্যবস্থা চালু করেন। সাধারণ কৃষকদের বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় রাজার নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে হতো। এই শ্রমব্যবস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে উত্তরের উপজাতিগুলোর মধ্যে, ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দেয়।
সলোমনের এই কঠোর প্রশাসনিক কাঠামো শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। তিনি মেগিদ্দো, হাতসোর এবং গিজারের মতো শহরগুলোতে শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, যা রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল ঠিকই, কিন্তু এর অর্থনৈতিক মূল্য চোকাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল। উত্তরের দশটি উপজাতি মনে করত যে দক্ষিণের জুদাহ অঞ্চল এবং সলোমনের রাজপরিবার তাদের সম্পদ শোষণ করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। বৈষম্যের এই অনুভূতি এবং বাধ্যতামূলক শ্রমের প্রতি তীব্র ক্ষোভ সলোমনের রাজত্বের শেষ দিকে একটি বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। সলোমন যতদিন বেঁচে ছিলেন, তার কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই ক্ষোভ বড় কোনো বিদ্রোহের রূপ নিতে পারেনি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার এই স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। সলোমনের যুগ তাই একই সাথে চরম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং গভীর সামাজিক বিভাজনের এক জটিল অধ্যায়।
প্রত্নতাত্ত্বিক বিতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব (Archaeological Debate and the Existence of the United Monarchy)
ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের এই পুরো ইতিহাসটি আধুনিক প্রত্নতত্ত্বে একটি তুমুল বিতর্কের বিষয়। সাউল, ডেভিড এবং সলোমনের অধীনে সত্যিই কি কোনো বিশাল এবং ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য ছিল, নাকি এটি কেবল একটি ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মূলত দুটি প্রধান শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একটি শিবিরের নাম মিনিমালিস্ট বা ন্যূনতমবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Minimalist Perspective)। ফিলিপ ডেভিস এবং টমাস থম্পসনের মতো পণ্ডিতরা মনে করেন যে, দশম খ্রিস্টপূর্বাব্দে জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে কোনো ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না। তাদের মতে, সেই সময়ে জেরুজালেম ছিল বড়জোর একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম, যেখান থেকে বিশাল কোনো অঞ্চল শাসন করা বা বড় সেনাবাহিনী পরিচালনা করা একেবারেই অসম্ভব ছিল। তারা দাবি করেন যে ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের পুরো ধারণাটিই হলো শত শত বছর পরের লেখকদের তৈরি করা একটি অতীতমুখী রাজনৈতিক ফিকশন (Davies, 1992)।
অন্যদিকে ম্যাক্সিমালিস্ট বা সর্বোচ্চবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Maximalist Perspective)-এর গবেষকরা বাইবেলের মূল কাঠামোর ঐতিহাসিকতাকে সমর্থন করেন। ইয়োসেফ গারফিনকেলের মতো প্রত্নতাত্ত্বিকরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খিরবেত কেইয়াফা নামক স্থানে খনন করে দশম শতাব্দীর একটি সুরক্ষিত নগরীর সন্ধান পেয়েছেন। তারা দাবি করেন যে এই ধরনের সুরক্ষিত নগরী প্রমাণ করে ডেভিডের আমলে জুদাহ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অস্তিত্ব ছিল (Garfinkel et al., 2012)। এছাড়া মেগিদ্দো, হাতসোর এবং গিজারে পাওয়া ছয়-কক্ষ বিশিষ্ট বিশাল প্রবেশদ্বারগুলোকে তারা সলোমনের আমলের নির্মাণ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা বাইবেলের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায়। তাদের মতে, সাম্রাজ্যটি হয়তো মিশরের মতো ততটা বিশাল ছিল না, তবে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজতন্ত্র হিসেবে এর অস্তিত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই দুই বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাস পাঠ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ।
এই বিতর্কে সবচেয়ে যুগান্তকারী তত্ত্বটি হাজির করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিক ইসরায়েল ফিঙ্কেলস্টাইন, যা লো ক্রোনোলজি বা নিম্ন কালপঞ্জি (Low Chronology) নামে পরিচিত। তিনি কার্বন ডেটিং এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, মেগিদ্দো বা হাতসোরের যে বিশাল দুর্গগুলোকে সলোমনের আমলের বলে মনে করা হতো, সেগুলো আসলে আরও অন্তত এক শতাব্দী পরের নির্মাণ। তার মতে, এগুলো দশম শতাব্দীর সলোমনের তৈরি নয়, বরং নবম শতাব্দীতে উত্তর ইসরায়েলের শক্তিশালী ওম্রি রাজবংশের তৈরি। ফিঙ্কেলস্টাইনের এই তত্ত্ব লেভান্টের প্রাচীন ইতিহাসের পুরো মানচিত্রকেই বদলে দেয়। এটি ইঙ্গিত করে যে, ডেভিড ও সলোমনের আমলে পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ সাম্রাজ্য ছিল না; তারা ছিলেন মূলত প্রান্তিক অঞ্চলের ছোট শাসক। আসল শক্তিশালী রাজতন্ত্র গড়ে উঠেছিল আরও অনেক পরে, উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক বিতর্ক প্রমাণ করে যে মাটি খুঁড়ে ইতিহাস বের করে আনা কোনো সহজ সমীকরণ নয়, এটি নিরন্তর বিশ্লেষণ ও সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া।
মিথোলজি ও ইতিহাসের বিভাজন রেখা (Dividing Line Between Mythology and History)
ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের ইতিহাস বুঝতে হলে হিব্রু বাইবেলের স্যামুয়েল ও কিংস বইগুলোর সাহিত্যিক চরিত্র অনুধাবন করা অপরিহার্য। এই বইগুলো কোনো আধুনিক ইতিহাসের বই নয়; এগুলো মূলত ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রচিত আখ্যান। ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, এই বইগুলোর একটি বড় অংশ সংকলিত ও সম্পাদিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে, জুদাহর রাজা জোসিয়াহর রাজত্বকালে। এই সম্পাদনার কাজটিকে পণ্ডিতরা ডিউটেরোনোমিস্টিক ইতিহাস (Deuteronomistic History) বলে থাকেন। সেই সময়ে উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যটি অ্যাসিরীয়দের হাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। রাজা জোসিয়াহ সুযোগ বুঝে উত্তরের সেই হারানো ভূখণ্ডগুলো দখল করে নিজের রাজ্যের সীমানা বাড়াতে চাইছিলেন। এই রাজনৈতিক সম্প্রসারণবাদকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই তার আমলের পণ্ডিতরা অতীতের ডেভিড ও সলোমনের এক বিশাল ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের গল্প অত্যন্ত সুনিপুণভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তারা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, উত্তর ও দক্ষিণ একসময় ডেভিডের অধীনে এক ছিল, তাই উত্তরের ভূখণ্ডের ওপর জোসিয়াহর শাসন সম্পূর্ণ বৈধ।
ইতিহাস ও মিথোলজির এই সূক্ষ্ম বিভাজন রেখাটি বুঝতে না পারলে প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি থাকে। ডেভিডের রাজবংশকে কেন্দ্র করে যে এক বিশাল ধর্মীয় মিথোলজি গড়ে উঠেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত রাজতন্ত্রকে একটি পবিত্র রূপ দেওয়া। ঈশ্বরের সাথে ডেভিডের রাজবংশের চিরস্থায়ী চুক্তির যে ধারণা প্রচার করা হয়েছিল, তা ছিল সাধারণ মানুষের বিদ্রোহ দমন করার একটি কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার। রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি – এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে রাজার যেকোনো অন্যায় বা শোষণকে ঐশ্বরিক বিধান হিসেবে মেনে নিতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়। সলোমনের অপরিসীম জ্ঞান এবং সম্পদের গল্পগুলোও ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার অংশ। প্রাচীনকালের শাসকরা নিজেদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে এভাবেই ধর্ম এবং মিথোলজির সফল ব্যবহার করতেন। বস্তুনিষ্ঠ একাডেমিক পাঠ আমাদের শিখায় যে, এই ধর্মীয় আখ্যানগুলোর ভেতরে ঐতিহাসিক সত্যের কিছু উপাদান থাকলেও, সেগুলোকে নিখুঁত বাস্তব ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা বিজ্ঞানসম্মত নয়।
সার্বিকভাবে বিচার করলে, ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্র ছিল মূলত উত্তর ও দক্ষিণের পাহাড়ি উপজাতিগুলোর একটি সাময়িক এবং ভঙ্গুর রাজনৈতিক জোট। উত্তর ইসরায়েল ছিল কৃষিতে সমৃদ্ধ এবং বাণিজ্যিকভাবে অনেক বেশি উন্মুক্ত, অন্যদিকে দক্ষিণের জুদাহ ছিল রুক্ষ, বিচ্ছিন্ন এবং রক্ষণশীল। এই দুটি অঞ্চলের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য ছিল বিস্তর। ডেভিড ও সলোমনের মতো নেতাদের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ এই দুটি ভিন্ন সত্তাকে কিছুকালের জন্য এক ছাতার নিচে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু সলোমনের মৃত্যুর পর এই কৃত্রিম ঐক্য আর টিকে থাকতে পারেনি। বাধ্যতামূলক শ্রম ও অতিরিক্ত করের বোঝায় অতিষ্ঠ হয়ে উত্তরের উপজাতিগুলো বিদ্রোহ করে এবং একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্র ভেঙে ইসরায়েল ও জুদাহ নামে দুটি পৃথক রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। যদিও ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যটি ছিল স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু মিথোলজি ও রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে এটি হাজার হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতার ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে গেছে।
জেরুজালেম, মন্দির ও রাজকীয় ক্ষমতা (Jerusalem, Temple and Royal Power): পবিত্র রাজধানীর নির্মাণ
জেরুজালেমের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব (Geographical and Strategic Importance of Jerusalem)
প্রাচীন লেভান্টের মানচিত্রের দিকে তাকালে জেরুজালেমের অবস্থান প্রথম দেখায় খুব একটা সুবিধাজনক মনে হয় না। প্রাচীনকালের বড় বড় বাণিজ্যিক পথগুলো, যেমন বিখ্যাত ‘ভায়া মারিস’ বা সমুদ্রপথ এবং ‘কিংস হাইওয়ে’ বা রাজকীয় সড়ক, জেরুজালেমকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলে গেছে। এই শহরটি অবস্থিত কেন্দ্রীয় পাহাড়ি অঞ্চলের এক রুক্ষ ও পাথুরে এলাকার ঠিক মাঝখানে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আটশো মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই শহরটি চারপাশে গভীর উপত্যকা দ্বারা বেষ্টিত। পূর্ব দিকে রয়েছে কিদ্রোন উপত্যকা, দক্ষিণ ও পশ্চিমে রয়েছে হিন্নোম উপত্যকা এবং মাঝখান দিয়ে চলে গেছে টাইরোপোয়ন উপত্যকা। এই গভীর খাতগুলো জেরুজালেমকে প্রাকৃতিকভাবে এক দুর্ভেদ্য দুর্গের রূপ দিয়েছিল। বাইরের কোনো শত্রুর পক্ষে সহজে এই শহরে আক্রমণ চালানো প্রায় অসম্ভব ছিল। প্রাচীন যুগে শহর গড়ে তোলার জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার বিষয়টি ছিল সবচেয়ে জরুরি। বাণিজ্যের চেয়ে সামরিক নিরাপত্তাকেই প্রাচীন শাসকরা বেশি প্রাধান্য দিতেন।
পাহাড়ি এলাকার সবচেয়ে বড় সংকট হলো জলের অভাব। জেরুজালেম প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত হলেও এর ভেতরে জলের কোনো বড় আধার ছিল না। শহরের একমাত্র জলের উৎস ছিল কিদ্রোন উপত্যকার নিচে অবস্থিত গিহোন প্রস্রবণ। এই প্রস্রবণের জল শহরের সীমানার বাইরে থাকায় অবরোধের সময় তা শত্রুদের হাতে পড়ার ঝুঁকি থাকত। প্রাচীন প্রকৌশলীরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য পাথর কেটে এক জটিল সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, যা প্রত্নতত্ত্বে ‘ওয়ারেনস শ্যাফট’ নামে পরিচিত। এই সুড়ঙ্গের সাহায্যে শহরের ভেতরের মানুষ নিরাপদে মাটির নিচ দিয়ে গিয়ে প্রস্রবণের জল সংগ্রহ করতে পারত। এই জলের উৎসটি শহরটিকে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের মুখেও টিকে থাকার সক্ষমতা দিয়েছিল। মূলত এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন জলের উৎসের কারণেই হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই রুক্ষ পাহাড়ের চূড়ায় বসতি স্থাপন করেছে (Kenyon, 1974)।
ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি জেরুজালেমের একটি বড় কৌশলগত ও রাজনৈতিক সুবিধা ছিল। এটি ছিল উত্তরের শক্তিশালী ইসরায়েলীয় উপজাতি এবং দক্ষিণের জুদাহ উপজাতির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি নিরপেক্ষ এলাকা। উত্তরের কৃষিনির্ভর উপজাতিগুলো এবং দক্ষিণের পশুপালক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বিভাজন ছিল। কোনো ইসরায়েলীয় উপজাতির নিজস্ব শহরের ওপর রাজধানী স্থাপন করলে অন্য উপজাতিগুলো বিদ্রোহ করতে পারত। জেরুজালেম ছিল একটি জেবুসীয় শহর, যা কোনো নির্দিষ্ট উপজাতির পৈতৃক সম্পত্তি ছিল না। এই নিরপেক্ষ অবস্থানটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাজনৈতিক ভূগোলের তত্ত্ব (Theory of Political Geography) অনুযায়ী, একটি বিভক্ত সমাজকে একত্রিত করার জন্য এমন একটি নিরপেক্ষ রাজধানীর প্রয়োজন হয়, যা সব পক্ষের কাছেই সমভাবে গ্রহণযোগ্য। ডেভিড ঠিক এই রাজনৈতিক সুবিধাটি কাজে লাগানোর জন্যই জেরুজালেমকে নিজের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
জেবুসীয় নগরী থেকে ডেভিডের শহর (From Jebusite City to the City of David)
ডেভিডের জেরুজালেম দখলের আগে শহরটি জেবুসীয় নামের একটি স্থানীয় কানানীয় জনগোষ্ঠীর অধীনে ছিল। প্রাচীন মিশরীয় নথিপত্রে, বিশেষ করে চতুর্দশ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বিখ্যাত এল-আমারনা চিঠিপত্রে এই শহরের নাম ‘উরুসালিম‘ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চিঠিপত্রগুলো প্রমাণ করে যে ডেভিডের আগমনের শত শত বছর আগে থেকেই জেরুজালেম একটি স্বাধীন ও সক্রিয় কানানীয় নগররাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বশীল ছিল। এখানকার স্থানীয় শাসকরা মিশরীয় ফারাওদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে চিঠি লিখতেন এবং সামরিক সাহায্য চাইতেন। জেবুসীয়দের শাসনামলে শহরটি খুব বড় না হলেও এর প্রশাসন এবং সামরিক ব্যবস্থা বেশ গোছানো ছিল। তারা শহরের পূর্ব দিকের ঢালে পাথর দিয়ে এক বিশাল সমর্থন-কাঠামো বা রিটেইনিং ওয়াল তৈরি করেছিল, যার ওপর তাদের দুর্গ ও প্রশাসনিক ভবনগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। এই কাঠামোটিকে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা ‘স্টেপড স্টোন স্ট্রাকচার’ বলে থাকেন।
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী ডেভিড এক আকস্মিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে জেরুজালেম দখল করেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে দশম খ্রিস্টপূর্বাব্দে জেরুজালেমে কোনো বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ বা অগ্নিকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি (Shiloh, 1984)। এর মানে দাঁড়ায়, ক্ষমতা দখল প্রক্রিয়াটি সম্ভবত ততটা রক্তক্ষয়ী ছিল না, যতটা ধর্মীয় মিথোলজিতে তুলে ধরা হয়েছে। ডেভিড সম্ভবত কোনো চুক্তির মাধ্যমে অথবা শহরের ভেতরের কোনো দুর্বল পয়েন্ট, যেমন জলের সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। শহর দখলের পর তিনি জেবুসীয়দের নির্বিচারে হত্যা করেননি বা বিতাড়িত করেননি। বিপরীতে তিনি পুরনো জেবুসীয় প্রশাসন এবং আমলাতন্ত্রকে নিজের কাজে লাগিয়েছিলেন। প্রাচীন ইসরায়েলীয়রা ছিল মূলত কৃষিজীবী ও পশুপালক, রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। ডেভিড খুব বুদ্ধিমানের মতো স্থানীয় জেবুসীয় করণিক, স্থপতি এবং হিসাবরক্ষকদের নিজের নতুন প্রশাসনে যুক্ত করে নেন।
এই শহরটি দখলের পর ডেভিড এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘সিটি অব ডেভিড’ বা ডেভিডের শহর। এই নামকরণের মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক কৌশল লুকিয়ে ছিল। শহরটিকে কোনো উপজাতির নামে নয়, বরং সরাসরি রাজার নামে নামকরণ করা হয়। এর ফলে শহরটি রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়, যার ওপর অন্য কোনো উপজাতীয় নেতার দাবি খাটত না। তিনি শহরের অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন করেন এবং নিজের জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা আজও ডেভিডের সেই প্রাসাদের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ খুঁজে পাননি। কয়েক বছর আগে প্রত্নতাত্ত্বিক ইলাত মাজার একটি বড় পাথরের কাঠামোর সন্ধান পেয়ে সেটিকে ডেভিডের প্রাসাদ বলে দাবি করেছিলেন, কিন্তু তার সেই দাবি একাডেমিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয় (Mazar, 2006)। প্রাসাদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও এটা স্পষ্ট যে ডেভিড একটি সাধারণ কানানীয় নগররাষ্ট্রকে একটি আঞ্চলিক শক্তির রাজধানীতে রূপান্তরিত করেছিলেন।
প্রথম মন্দির নির্মাণ ও স্থাপত্যশৈলী (Construction and Architectural Style of the First Temple)
ডেভিডের পুত্র সলোমনের আমলের সবচেয়ে বড় এবং চর্চিত নির্মাণ প্রকল্প হলো জেরুজালেমের প্রথম মন্দির বা ফার্স্ট টেম্পল। হিব্রু বাইবেলে এই মন্দির নির্মাণের অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এই মন্দির তৈরিতে প্রচুর সোনা, রুপা এবং লেবাননের উন্নত মানের সিডার কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রে এখানে একটি বড় বাধা রয়েছে। আধুনিক জেরুজালেমের ‘টেম্পল মাউন্ট’ বা হারাম আল-শরিফ এলাকায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার কারণে কোনো স্বাধীন প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ চালানো সম্ভব নয়। তাছাড়া হাজার হাজার বছর ধরে ওই নির্দিষ্ট স্থানে একের পর এক নতুন স্থাপনা তৈরি হওয়ায় সলোমনের আমলের মূল মন্দিরের কোনো বস্তুগত ধ্বংসাবশেষ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই ঐতিহাসিকরা এই মন্দিরের কাঠামো বোঝার জন্য মূলত সমসাময়িক অন্যান্য কানানীয় ও সিরীয় মন্দিরগুলোর ওপর নির্ভর করেন।
প্রত্নতাত্ত্বিক তুলনামূলক আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে সলোমনের মন্দির কোনো মৌলিক ইসরায়েলীয় স্থাপত্য ছিল না। এটি ছিল মূলত ফিনিশীয় স্থাপত্যশৈলীর একটি নিখুঁত প্রতিরূপ। সলোমন এই মন্দির নির্মাণের জন্য ফিনিশিয়ার টায়ার শহরের রাজা হিরামের কাছ থেকে প্রধান স্থপতি এবং দক্ষ কারিগরদের ভাড়া করে এনেছিলেন। সিরিয়ার আইন দারা নামক স্থানে খনন করে যে প্রাচীন মন্দিরটি পাওয়া গেছে, তার নকশা সলোমনের মন্দিরের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায় (Cahill, 2003)। মন্দিরটি মূলত তিনটি প্রধান কক্ষে বিভক্ত ছিল – উলাম বা প্রবেশকক্ষ, হেখাল বা মূল উপাসনালয় এবং দবির বা পবিত্রতম কক্ষ। পবিত্রতম কক্ষটি ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকার, যেখানে কেবল প্রধান পুরোহিত বছরে একবার প্রবেশ করতে পারতেন। মন্দিরের প্রবেশপথে ব্রোঞ্জের তৈরি দুটি বিশাল স্তম্ভ ছিল, যাদের নাম ছিল জাচিন এবং বোয়াজ। এই পুরো নকশাটি প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের মন্দির নির্মাণের এক চিরায়ত কাঠামো।
এই মন্দির নির্মাণের পেছনে যে বিশাল অর্থনৈতিক ব্যয় হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। মন্দিরটি আজকের দিনের কোনো পাবলিক মসজিদ বা গির্জার মতো ছিল না, যেখানে সাধারণ মানুষ গিয়ে প্রার্থনা করতে পারে। এটি ছিল মূলত রাজকীয় আঙিনার একটি অংশ, রাজার নিজস্ব উপাসনালয় বা রয়্যাল চ্যাপেল। সাধারণ মানুষের এই মন্দিরের ভেতরে প্রবেশের কোনো অধিকার ছিল না, তারা কেবল বাইরের প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে পারত। মন্দির নির্মাণের জন্য হাজার হাজার কৃষককে তাদের জমি থেকে তুলে এনে বাধ্যতামূলক শ্রমে বা কোরভে ব্যবস্থায় নিয়োগ করা হয়েছিল। কৃষিকাজ বাদ দিয়ে পাথর কাটা এবং কাঠ বয়ে আনার এই অমানবিক খাটুনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চরম দরিদ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। ধর্মীয় গ্রন্থে মন্দিরটিকে একটি পবিত্র এবং ঐশ্বরিক প্রকল্প হিসেবে মহিমান্বিত করা হলেও, বাস্তবে এটি ছিল স্থাপত্যিক আধিপত্য (Architectural Hegemony)-এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যার মাধ্যমে রাজপরিবার নিজেদের ক্ষমতা জাহির করত।
ধর্ম ও রাজনীতির সংমিশ্রণ (Amalgamation of Religion and Politics)
জেরুজালেমের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্ম কখনো আধ্যাত্মিকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সুসংহত করার একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার। উপজাতীয় যুগে ইসরায়েলীয়দের ধর্মীয় উপাসনা কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা পাহাড়ের চূড়ায়, খোলা মাঠে বা গাছের নিচে ছোট ছোট বেদি তৈরি করে নিজেদের মতো করে উপাসনা করত। এই স্থানীয় উপাসনালয়গুলোকে বলা হতো ‘বামট’ বা হাই প্লেসেস। কিন্তু ডেভিড যখন জেরুজালেম দখল করলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করতে হলে উপাসনার কেন্দ্রটিকেও এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। এই উদ্দেশ্যেই তিনি ‘আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট’ বা চুক্তিসিন্দুকটিকে জেরুজালেমে নিয়ে আসেন। এই চুক্তিসিন্দুকটি ছিল বিভিন্ন উপজাতির কাছে একটি অত্যন্ত পবিত্র বস্তু। এটিকে রাজধানীর কেন্দ্রে স্থাপন করার মাধ্যমে ডেভিড খুব সুকৌশলে প্রমাণ করেন যে, উপজাতিগুলোর দেবতা এখন থেকে রাজধানীর রাজপরিবারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সলোমনের মন্দির নির্মাণের পর ধর্ম এবং রাজনীতির এই সংমিশ্রণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। রাজপরিবার এবং পুরোহিত শ্রেণী মিলে একটি নতুন আদর্শ তৈরি করে, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রীয় ধর্মতত্ত্ব (State Theology) বলে থাকেন। এই ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী রাজাকে ঈশ্বরের সরাসরি প্রতিনিধি বা পালিত পুত্র হিসেবে প্রচার করা হয়। রাজ্যাভিষেকের সময় রাজাদের মাথায় পবিত্র তেল লেপন করা হতো, যার মাধ্যমে বোঝানো হতো যে রাজার শাসন ক্ষমতা সরাসরি ঈশ্বরের তরফ থেকে এসেছে। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক। ঈশ্বর যদি রাজাকে মনোনীত করে থাকেন, তবে রাজার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ করা মানে সরাসরি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। প্রাচীনকালের শাসকরা নিজেদের তৈরি করা অন্যায় করব্যবস্থা এবং শোষণমূলক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই মূলত ধর্মের এই ঢাল ব্যবহার করতেন। এটি কোনো ঐশ্বরিক বিধান ছিল না, বরং ছিল নিখাদ এক রাজনৈতিক কৌশল।
তবে জেরুজালেমকেন্দ্রিক এই ধর্মীয় একচেটিয়াকরণ সাধারণ মানুষ খুব সহজে মেনে নেয়নি। গ্রামের মানুষ তাদের পুরনো স্থানীয় উপাসনালয় বা বেদিগুলোতেই যেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। কারণ জেরুজালেমের মন্দিরে গিয়ে উপাসনা করা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেখানে উপাসনা করতে হলে রাজকীয় পুরোহিতদের নির্দিষ্ট পরিমাণ পশু বা ফসল কর হিসেবে দিতে হতো। জেরুজালেমের রাজকীয় পুরোহিত এবং প্রান্তিক গ্রামের স্থানীয় পুরোহিতদের মধ্যে তাই এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছিল। রাজধানীর শাসকরা বারবার ডিক্রি জারি করে গ্রামের বেদিগুলো ধ্বংস করার নির্দেশ দিতেন এবং দাবি করতেন যে কেবল জেরুজালেমের মন্দিরেই উপাসনা করা বৈধ। এই ধর্মীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযানের আড়ালে লুকিয়ে ছিল মূলত গ্রামীণ উদ্বৃত্ত সম্পদকে রাজধানীর কোষাগারে টেনে আনার অর্থনৈতিক বাসনা। ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের সম্পদ নিয়ন্ত্রণের এই কৌশল মানব ইতিহাসের এক আদিমতম রাজনৈতিক খেলা।
রাজকীয় আমলাতন্ত্র ও অর্থনীতির কেন্দ্রীকরণ (Royal Bureaucracy and Centralization of Economy)
রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে জেরুজালেমে একটি সম্পূর্ণ নতুন সামাজিক ও প্রশাসনিক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। উপজাতীয় যুগে কোনো স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তা ছিল না, কিন্তু ডেভিড ও সলোমনের আমলে শহরটি একটি পূর্ণাঙ্গ আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। রাজপ্রাসাদ এবং মন্দির পরিচালনার জন্য শত শত করণিক, হিসাবরক্ষক, সামরিক কমান্ডার এবং পুরোহিত নিয়োগ করা হয়। এদের বলা হতো রাজকীয় আমলা। লেখাপড়া জানা এবং হিসাব সংরক্ষণে দক্ষ এই গোষ্ঠীর হাতেই রাষ্ট্রের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করত, সরকারি গুদামে শস্য মজুত করত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হিসাব রাখত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই সময়ের প্রচুর মাটির সিলমোহর বা বুলা পাওয়া গেছে, যেগুলো সরকারি নথিপত্র সিল করার কাজে ব্যবহৃত হতো। এই সিলমোহরগুলো প্রমাণ করে যে জেরুজালেমে একটি অত্যন্ত জটিল এবং স্তরভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল।
প্রশাসনের এই বিস্তারের সাথে সাথে অর্থনীতির ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ ঘটে। সলোমন পুরো রাষ্ট্রকে বারোটি কর অঞ্চলে ভাগ করে দিয়েছিলেন। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের একটি বড় অংশ জোরপূর্বক রাজধানীতে নিয়ে আসা। রাজপরিবার, বিশাল আমলাতন্ত্র, ভাড়াটে সেনাবাহিনী এবং মন্দির পরিচালনার সমস্ত খরচ আসত এই কৃষকদের রক্তঘাম করা ফসলের উদ্বৃত্ত থেকে। গ্রামের মানুষ যা উৎপাদন করত, তার সামান্যই নিজেদের ভোগের জন্য রাখতে পারত। বাকিটা চলে যেত জেরুজালেমের বিশাল সরকারি গুদামগুলোতে। সমাজবিজ্ঞানের কেন্দ্র-প্রান্ত তত্ত্ব (Center-Periphery Theory) দিয়ে এই পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র তার চারপাশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোকে শোষণ করে নিজেদের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। জেরুজালেম ঠিক একইভাবে সমগ্র দেশের সম্পদ শুষে নেওয়ার একটি বিশাল যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
পাশাপাশি জেরুজালেম একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রেও পরিণত হয়। যদিও শহরটি প্রধান বাণিজ্য পথের ওপর ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখান থেকেই পরিচালিত হতো। দক্ষিণ আরবের মশলা এবং ফিনিশিয়ার বিলাসবহুল পণ্যের বাণিজ্য থেকে রাজকোষে প্রচুর রাজস্ব জমা হতো। এই বাণিজ্যের ফলে জেরুজালেমের সমাজে এক ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়। শহরের রাজকীয় আমলা, বণিক এবং প্রধান পুরোহিতরা একচেটিয়া সম্পদের মালিক হয়ে এক অভিজাত শ্রেণীতে পরিণত হয়। তারা বড় বড় পাথরের বাড়িতে বসবাস করত এবং বিদেশি দামি মৃৎপাত্র ব্যবহার করত। অন্যদিকে গ্রামের সাধারণ কৃষক এবং শহরের সাধারণ শ্রমিকরা মাটির ঘরে থাকত এবং বেঁচে থাকার ন্যূনতম সংগ্রাম করত। রাজতন্ত্র ইসরায়েলীয়দের একটি রাষ্ট্র দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছিল তাদের পুরনো সমাজের সাম্য এবং অর্থনৈতিক মুক্তি।
প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা বনাম ধর্মীয় আখ্যান (Archaeological Reality vs. Religious Narrative)
জেরুজালেমের ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধর্মীয় গ্রন্থের জাঁকজমকপূর্ণ গল্পের সাথে মাটির তলার প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতার ফারাকটুকু মেনে নেওয়া। হিব্রু বাইবেলে ডেভিড এবং সলোমনের জেরুজালেমকে বর্ণনা করা হয়েছে এক বিশাল, ঐশ্বর্যশালী এবং আন্তর্জাতিক মহানগরী হিসেবে। সেই শহরের রাস্তায় নাকি সোনার ছড়াছড়ি ছিল এবং হাজার হাজার রথ আর ঘোড়ায় শহর গমগম করত। কিন্তু আধুনিক আর্কিওলজি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। গত কয়েক দশকে জেরুজালেমের সিটি অব ডেভিড এলাকায় ব্যাপক খননকাজ চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি প্রত্নতাত্ত্বিক ইসরায়েল ফিঙ্কেলস্টাইন এবং নীল আশের সিলবারম্যান তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দশম খ্রিস্টপূর্বাব্দে, অর্থাৎ ডেভিড ও সলোমনের আমলে, জেরুজালেম মোটেও কোনো বিশাল মহানগরী ছিল না (Finkelstein & Silberman, 2006)। এটি ছিল মূলত একটি ছোট, সাদামাটা এবং পাহাড়ি গ্রাম বা বড়জোর একটি ছোট প্রশাসনিক কেন্দ্র।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সেই সময় জেরুজালেমের মোট আয়তন ছিল মাত্র দশ থেকে বারো একর এবং এর জনসংখ্যা কোনোভাবেই দেড় বা দুই হাজারের বেশি ছিল না। এত ছোট একটি শহর থেকে বাইবেলে বর্ণিত বিশাল কোনো আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্য শাসন করা যৌক্তিকভাবেই অসম্ভব। সেখানে কোনো বড় স্মৃতিস্তম্ভ, প্রশস্ত রাস্তা বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তাহলে প্রশ্ন জাগে, বাইবেলে কেন এত জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণনা দেওয়া হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাইবেল রচনার পেছনের রাজনীতিতে। ইতিহাসবিদরা একমত যে, বাইবেলের এই ঐতিহাসিক অংশগুলোর বেশিরভাগই লেখা এবং সম্পাদিত হয়েছিল ডেভিড ও সলোমনের সময়ের অন্তত তিন থেকে চারশো বছর পর। সপ্তম খ্রিস্টপূর্বাব্দে জুদাহর রাজা জোসিয়াহর আমলে এই সম্পাদনার কাজ চরম আকার ধারণ করে। সেই সময় জেরুজালেম সত্যি সত্যিই একটি বড় শহরে পরিণত হয়েছিল।
রাজা জোসিয়াহর আমলের লেখকরা মূলত তাদের নিজেদের সময়ের সমৃদ্ধ জেরুজালেমের চিত্রটিকে পেছনের দিকে প্রজেক্ট করেছিলেন। তারা নিজেদের রাজবংশের অতীতকে মহিমান্বিত করার জন্য, বিশেষ করে উত্তরের হারানো রাজ্যগুলোর ওপর নিজেদের দাবি বৈধ করার জন্য ডেভিড ও সলোমনের কাল্পনিক সাম্রাজ্যের গল্প ফেঁদেছিলেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে ঐতিহাসিক সংশোধনবাদ (Historical Revisionism) বলা হয়। তারা অতীতকে সেভাবে লেখেননি যেভাবে তা ঘটেছিল, বরং তারা অতীতকে সেভাবেই লিখেছেন যেভাবে লিখলে তাদের বর্তমান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়। ধর্মীয় মিথোলজির কাজই হলো বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিত করে তাকে একটি পবিত্র রূপ দেওয়া। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার প্রথম শর্ত হলো এই মিথোলজির মায়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা। ডেভিড বা সলোমন হয়তো ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন এবং জেরুজালেমে তাদের শাসনও ছিল, কিন্তু সেই শাসন কোনো ঐশ্বরিক জাঁকজমকের গল্প ছিল না; সেটি ছিল প্রাচীন লেভান্টের অত্যন্ত সাধারণ এবং রুক্ষ এক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতারই অংশ (Grabbe, 2007)।
ইসরায়েল ও জুদাহর বিভক্ত রাজ্য (Divided Kingdoms of Israel and Judah): রাজনীতির বিভাজন
ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্রের পতন ও বিভাজনের আর্থ-সামাজিক কারণ (Fall of the United Monarchy and Socio-Economic Causes of Division)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে সলোমনের মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই একটি বড় ধরনের কাঠামোগত বিভাজনের দিকে মোড় নেয়। ধর্মীয় মিথোলজিগুলো এই বিভাজনকে সলোমনের পাপের কারণে ঈশ্বরের দেওয়া শাস্তি হিসেবে চিত্রিত করে থাকে, কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা বলে। ঐতিহাসিকদের মতে, এই তথাকথিত ঐক্যবদ্ধ রাজতন্ত্র মূলত কখনোই একটি সুসংহত বা হোমোজিনিয়াস রাষ্ট্র ছিল না; এটি ছিল উত্তর এবং দক্ষিণের উপজাতিগুলোর একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর রাজনৈতিক জোট। সলোমনের রাজত্বকালে বিশাল সব নির্মাণ প্রকল্প এবং জাঁকজমকপূর্ণ রাজদরবার পরিচালনার জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতো, তার প্রায় পুরোটাই আসত উত্তরের কৃষিনির্ভর উপজাতিগুলোর কাছ থেকে। উত্তরের সাধারণ কৃষকদের জোরপূর্বক কর ও শ্রমশোষণ ব্যবস্থা (Taxation and Corvée Labor System)-এর আওতায় এনে জেরুজালেমের মন্দির ও প্রাসাদ নির্মাণের কাজে বাধ্য করা হয়েছিল। এই অর্থনৈতিক শোষণ উত্তরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মুখ বুজে সহ্য করলেও, সলোমনের মৃত্যুর পর তারা আর এই অন্যায় মেনে নিতে রাজি ছিল না। ফলে ৯৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে যখন সলোমনের পুত্র রেহোবোয়াম সিংহাসনে বসেন, তখন উত্তরের নেতারা শেচেম শহরে সমবেত হয়ে দাবি জানান যে নতুন রাজাকে অবশ্যই করের বোঝা কমাতে হবে।
রেহোবোয়ামের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং অহংকার এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। প্রবীণ উপদেষ্টারা তাকে জনগণের দাবি মেনে নিয়ে কর কমানোর পরামর্শ দিলেও, তিনি তরুণ ও অনভিজ্ঞ রাজসভাসদদের কথায় প্রভাবিত হয়ে কর আরও বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে উত্তরের দশটি উপজাতি সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং ডেভিডের রাজবংশের সাথে তাদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে। তারা জেরোবোয়াম নামের এক জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাকে তাদের নিজস্ব রাজা হিসেবে নির্বাচিত করে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে, যা ইতিহাসে উত্তরের ইসরায়েল রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে কেবল দক্ষিণের জুদাহ এবং বেঞ্জামিন উপজাতি জেরুজালেমের রাজবংশের প্রতি অনুগত থাকে, যা পরিচিত হয় দক্ষিণের জুদাহ রাজ্য হিসেবে। এই বিভাজন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কাঠামোগত শোষণের এক অনিবার্য পরিণতি। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, জেরুজালেমকেন্দ্রিক অভিজাত শ্রেণী উত্তরের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের যে বিলাসবহুল জীবনযাত্রা গড়ে তুলেছিল, তা টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিক বা অর্থনৈতিক ভিত্তি সাধারণ মানুষের কাছে ছিল না (Knoppers, 1993)।
এই রাজনৈতিক বিভাজনের পেছনে ভৌগোলিক বাস্তবতাও একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। উত্তরের অঞ্চলগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত নিচু, সমতল এবং কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত উর্বর। সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও ছিল দক্ষিণের চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে দক্ষিণের জুদাহ অঞ্চল ছিল মূলত রুক্ষ, পাথুরে এবং পাহাড়ি এলাকা, যেখানে কৃষিকাজের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। ভূগোলের এই মৌলিক পার্থক্যের কারণেই উত্তর ও দক্ষিণের মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি এবং মানসিকতায় বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছিল। উত্তরের মানুষেরা ছিল অনেক বেশি বহির্মুখী, বাণিজ্যনির্ভর এবং মিশ্র সংস্কৃতির অধিকারী। বিপরীতে দক্ষিণের পশুপালক সমাজ ছিল অনেক বেশি রক্ষণশীল এবং নিজেদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। রাজনৈতিক জোটের মাধ্যমে এই দুই ভিন্ন প্রকৃতির সমাজকে সাময়িকভাবে এক রাখা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বার্থের সংঘাত এড়ানো সম্ভব ছিল না। বিভাজনের পর উত্তরের ইসরায়েল রাজ্য তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তিতে দ্রুত একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, আর দক্ষিণের জুদাহ রাজ্য দীর্ঘদিন একটি প্রান্তিক ও দুর্বল শক্তি হিসেবেই টিকে থাকে।
উত্তরের ইসরায়েল রাজ্য ও তার ভৌগোলিক সুবিধা (Northern Kingdom of Israel and Its Geographical Advantages)
উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যটি ভৌগোলিকভাবে এমন এক জায়গায় অবস্থিত ছিল, যা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক সুবিধা এনে দিয়েছিল। এই রাজ্যের বুক চিরে চলে গিয়েছিল জেজরিল উপত্যকার মতো বিশাল এবং উর্বর কৃষিভূমি, যা প্রাচীন যুগে খাদ্য উৎপাদনের এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। এখানকার কৃষকরা বিপুল পরিমাণে গম, জলপাই এবং আঙুর উৎপাদন করত। জলপাই তেল এবং ওয়াইন সে যুগে অত্যন্ত লাভজনক রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতো। কেবল কৃষিনির্ভরতা নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান সড়কগুলোও এই রাজ্যের ওপর দিয়ে বিস্তৃত ছিল। বিখ্যাত ‘ভায়া মারিস’ বা সমুদ্রপথ, যা মিশরকে সিরিয়া এবং মেসোপটেমিয়ার সাথে যুক্ত করেছিল, তা সরাসরি ইসরায়েল রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর ভেতর দিয়ে গেছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তারা খুব সহজেই ফিনিশীয়, আরামীয় এবং মিশরীয় বণিকদের সাথে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিল। বাণিজ্যের এই অবাধ প্রবাহ ইসরায়েল রাজ্যকে খুব দ্রুতই অগাধ সম্পদের মালিক করে তোলে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মেগিদ্দো, হাতসোর এবং ডানের মতো শহরগুলোতে বিশাল সব শস্যভাণ্ডার এবং সুরক্ষাপ্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা তাদের এই ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অকাট্য প্রমাণ দেয়।
বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যটি হয়ে উঠেছিল একটি কসমোপলিটান বা বহুসাংস্কৃতিক সমাজ। ফিনিশীয় বা আরামীয় সংস্কৃতির সাথে তাদের প্রতিনিয়ত আদান-প্রদান ঘটত। এই সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার প্রভাব পড়েছিল তাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক জীবনেও। দক্ষিণের জুদাহর লেখকরা পরবর্তীতে বাইবেলে অভিযোগ করেছেন যে, উত্তরের মানুষেরা ভিনদেশি দেবদেবীর উপাসনা করে পথভ্রষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো ধর্মীয় স্খলন ছিল না; বরং এটি ছিল সাংস্কৃতিক সমন্বয়বাদ (Cultural Syncretism)-এর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া (Na’aman, 2005)। একটি বাণিজ্যনির্ভর এবং উন্মুক্ত সমাজ স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন সংস্কৃতির উপাদান গ্রহণ করে নিজেদের জীবনযাত্রাকে সমৃদ্ধ করে। ইসরায়েল রাজ্যে এল, বাল এবং ইয়াহওয়েহ – সবার উপাসনা চলত পাশাপাশি। কৃষিনির্ভর সমাজ হিসেবে উর্বরতা এবং বৃষ্টির দেবতা বালের প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল খুবই যৌক্তিক একটি ব্যাপার। ধর্মীয় বিশুদ্ধতার চেয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক মিত্রতাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ইসরায়েল রাজ্যকে একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়তে সাহায্য করেছিল। তাদের ছিল বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং উন্নত যুদ্ধরথ। তারা নির্মাণ করেছিল সুরম্য সব প্রাসাদ এবং প্রশাসনিক ভবন, যেগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছিল উন্নত মানের কাটা পাথর বা অ্যাশলার মেসনারি। অন্যদিকে সেই একই সময়ে দক্ষিণের জুদাহ রাজ্যে এই ধরনের কোনো জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্যের অস্তিত্ব ছিল না। উত্তরের রাজারা কেবল নিজেদের রাজ্যের ভেতরেই ক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখেননি, তারা পার্শ্ববর্তী মোয়াব এবং আম্মনের মতো রাজ্যগুলোর ওপরও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। মেশা শিলালিপির মতো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো স্পষ্টভাবেই দেখায় যে, ইসরায়েল রাজ্য তার প্রতিবেশীদের ওপর কীভাবে কর আরোপ করত এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করত। সব মিলিয়ে, বিভাজনের প্রথম দুই শতকে উত্তরের রাজ্যটি ছিল লেভান্টের রাজনীতিতে এক অত্যন্ত দাপুটে এবং প্রভাবশালী শক্তি, যার ছায়ায় ঢাকা পড়েছিল দক্ষিণের জুদাহর অস্তিত্ব।
ওম্রি রাজবংশ, সামারিয়া এবং আঞ্চলিক আধিপত্য (Omride Dynasty, Samaria and Regional Hegemony)
ইসরায়েল রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী অধ্যায়টি শুরু হয় রাজা ওম্রির সিংহাসনে আরোহণের মধ্য দিয়ে। বিভাজনের পর প্রথম কয়েক দশক ইসরায়েলে বেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল এবং একাধিক রাজবংশের পালাবদল ঘটেছিল। কিন্তু নবম খ্রিস্টপূর্বাব্দের প্রথমার্ধে সামরিক কমান্ডার ওম্রি ক্ষমতা দখল করে একটি স্থিতিশীল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে যুগান্তকারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল সামারিয়া নামের একটি নতুন রাজধানী স্থাপন করা। তিনি শেচেম বা তির্জার মতো পুরনো উপজাতীয় কেন্দ্রগুলোকে বাতিল করে একটি নতুন পাহাড়ি এলাকা কিনে সেখানে সম্পূর্ণ শূন্য থেকে সামারিয়া শহরটি গড়ে তোলেন। ডেভিড যেমন জেবুসীয়দের কাছ থেকে জেরুজালেম দখল করে একটি নিরপেক্ষ রাজধানী বানিয়েছিলেন, ওম্রির এই পদক্ষেপটিও ছিল ঠিক একই রকম একটি দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল। সামারিয়া কোনো নির্দিষ্ট ইসরায়েলীয় উপজাতির পৈতৃক সম্পত্তি ছিল না, ফলে এটি সরাসরি রাজার ব্যক্তিগত এবং নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। শহরটি এমন এক পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ছিল, যেখান থেকে চারপাশের বিশাল এলাকা খুব সহজেই নজরে রাখা যেত এবং সামরিক সুরক্ষার দিক থেকেও এটি ছিল প্রায় দুর্ভেদ্য।
ওম্রির মৃত্যুর পর তার পুত্র আহাব সিংহাসনে বসেন এবং ইসরায়েল রাজ্যের আঞ্চলিক আধিপত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। আহাব অত্যন্ত সুকৌশলে প্রতিবেশী ফিনিশিয়ার সাথে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক জোট গঠন করেন। এই জোটকে পাকাপোক্ত করার জন্য তিনি ফিনিশীয় রাজকন্যা ইজেবেলকে বিয়ে করেন। ধর্মীয় গ্রন্থে রাজা আহাব এবং রানি ইজেবেলকে ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং পাপী চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা ইসরায়েলে বালের উপাসনা চালু করে ইয়াহওয়েহ-র ধর্মকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায় যে, এই আখ্যানটি পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি মিথোলজি (Finkelstein, 2013)। বাস্তবে আহাব ছিলেন প্রাচীন লেভান্টের অন্যতম সফল এবং প্রজ্ঞাবান একজন শাসক। ফিনিশিয়ার সাথে জোট বাঁধার ফলে ইসরায়েলের অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। সামারিয়ার রাজপ্রাসাদে খনন করে হাতির দাঁতের তৈরি অসংখ্য সূক্ষ্ম কারুকাজ করা আসবাবপত্রের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে, যা ইতিহাসে ‘সামারিয়া আইভরিজ’ নামে পরিচিত। এই বিলাসবহুল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আহাবের আমলের অকল্পনীয় সম্পদেরই বাস্তব প্রমাণ।
আহাবের সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় একটি অ্যাসিরীয় শিলালিপিতে, যা ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ৮৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংঘটিত বিখ্যাত কারকার যুদ্ধে লেভান্টের ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হয়ে শক্তিশালী নিও-অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের রাজা তৃতীয় শালমানেসারের আগ্রাসন রুখে দিয়েছিল। এই যুদ্ধের বর্ণনা সংবলিত ‘কুরখ মনোলিথ’ নামক শিলালিপিতে অ্যাসিরীয় রাজা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, রাজা আহাব এই সম্মিলিত বাহিনীতে দুই হাজার যুদ্ধরথ এবং দশ হাজার পদাতিক সৈন্য সরবরাহ করেছিলেন, যা ছিল জোটের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক অবদান (Hasegawa et al., 2018)। এত বিশাল সংখ্যক যুদ্ধরথ রক্ষণাবেক্ষণ করা কোনো সাধারণ রাজ্যের পক্ষে সম্ভব ছিল না; এর জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং দক্ষ লজিস্টিকস। ধর্মীয় লেখকরা আহাবের এই বিশাল ভূরাজনৈতিক সাফল্যকে পুরোপুরি চেপে গেছেন, কারণ তাদের চোখে তিনি ছিলেন একজন ধর্মত্যাগী রাজা। ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে এই ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক সেন্সরশিপ (Theological Censorship) বারবার সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব মাটি খুঁড়ে সেই সত্যকে আবার দিনের আলোতে নিয়ে এসেছে।
দক্ষিণের জুদাহ রাজ্য ও জেরুজালেমের বিচ্ছিন্নতা (Southern Kingdom of Judah and the Isolation of Jerusalem)
উত্তরের ইসরায়েল যখন সম্পদ এবং সামরিক শক্তিতে ফুলেফেঁপে উঠছিল, দক্ষিণের জুদাহ রাজ্য তখন ভুগছিল চরম অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতায়। জুদাহর ভৌগোলিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। সেখানে কোনো বড় নদী বা উর্বর উপত্যকা ছিল না; পুরোটাই ছিল পাহাড় এবং মরুভূমির এক শুষ্ক প্রান্তর। এই বৈরী পরিবেশে বড় আকারের কৃষিকাজ করা প্রায় অসম্ভব ছিল, ফলে অর্থনীতি মূলত টিকে ছিল পশুপালনের ওপর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান পথগুলো জুদাহর সীমানার অনেক দূর দিয়ে চলে যাওয়ায় তারা বাণিজ্যের লভ্যাংশ থেকেও বঞ্চিত ছিল। জেরুজালেম, যাকে ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে এক বিশাল ঐশ্বর্যশালী মহানগরী হিসেবে দাবি করা হয়, তা দশম এবং নবম খ্রিস্টপূর্বাব্দে ছিল মূলত একটি ছোট এবং অনুন্নত পাহাড়ি গ্রাম মাত্র। এর জনসংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য এবং সেখানে বড় কোনো সুরক্ষাপ্রাচীর বা প্রশাসনিক ভবনের অস্তিত্ব ছিল না। উত্তরের জাঁকজমকপূর্ণ শহরগুলোর তুলনায় জেরুজালেম ছিল অত্যন্ত সাদামাটা এক বসতি।
অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে দুর্বল হলেও জুদাহ রাজ্যের একটি বড় রাজনৈতিক সুবিধা ছিল, আর তা হলো তাদের রাজবংশের ধারাবাহিকতা। উত্তরে যেখানে বারবার রক্তক্ষয়ী ক্যু এবং রাজবংশের পালাবদল ঘটছিল, দক্ষিণে সেখানে কেবল ডেভিডের বংশধররাই নিরবচ্ছিন্নভাবে শাসন চালিয়ে যাচ্ছিল। এই ধারাবাহিকতা জুদাহ রাজ্যে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। তবে এই স্থিতিশীলতার মানে এই নয় যে তারা খুব শক্তিশালী ছিল। বাস্তবে জুদাহ প্রায়শই উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যের একটি প্রান্তিক সামন্ত রাষ্ট্র বা ভাসাল স্টেট হিসেবে কাজ করত। সমাজবিজ্ঞানের প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়া (Marginalization Process) অনুযায়ী, একটি দুর্বল রাষ্ট্র যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের পাশে অবস্থান করে, তখন সে ধীরে ধীরে তার স্বাধীনতা হারিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বলয়ে ঢুকে পড়ে। ইসরায়েলের রাজা আহাবের আমলে জুদাহর রাজপরিবার ইসরায়েলের রাজপরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, যা আদতে ছিল ইসরায়েলের আধিপত্য মেনে নেওয়ারই একটি পরোক্ষ স্বীকারোক্তি।
নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রান্তিকতা ঢাকতে জুদাহর রাজকীয় পুরোহিত এবং লেখকরা এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। তারা ধর্ম এবং মিথোলজিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একটি নতুন রাষ্ট্রীয় আদর্শ প্রচার করা শুরু করেন। তারা প্রচার করেন যে, সম্পদ এবং সামরিক শক্তি কোনো ব্যাপার নয়; আসল ব্যাপার হলো ঈশ্বরের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তারা দাবি করেন, যেহেতু জেরুজালেমের মন্দিরে চুক্তিসিন্দুক রয়েছে এবং ডেভিডের রাজবংশ ঈশ্বরের মনোনীত, তাই একমাত্র জুদাহ রাজ্যই হলো সত্যিকারের পবিত্র রাষ্ট্র। এই জেরুজালেম কেন্দ্রিক মতাদর্শ (Jerusalem-centric Ideology)-এর মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করা এবং উত্তরের রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে এক ধরনের কৃত্রিম ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা। যখন বাস্তব পৃথিবীতে তরবারি এবং সম্পদের জোরে জেতা সম্ভব হয় না, তখন শাসকরা এভাবেই ধর্মীয় প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। জুদাহর এই কৌশল প্রাচীন রাজনীতির একটি অত্যন্ত চতুর এবং সফল উদাহরণ।
ধর্মীয় মিথোলজি বনাম প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা (Religious Mythology vs. Archaeological Reality)
হিব্রু বাইবেলের ‘কিংস’ বা রাজাবলি বইগুলোতে দুই রাজ্যের বিভাজন এবং তাদের ইতিহাস যেভাবে লেখা হয়েছে, তা পুরোপুরি দক্ষিণের জুদাহ রাজ্যের লেখকদের পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। এই লেখকদের মূল উদ্দেশ্য ইতিহাস রচনা করা ছিল না; তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক বার্তা প্রতিষ্ঠা করা। তাদের বর্ণনায় উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যের প্রতিটি রাজাকেই ঢালাওভাবে “ঈশ্বরের চোখে মন্দ কাজ করেছেন” বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই অভিযোগের মূল ভিত্তি ছিল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিভাজনের পর উত্তরের রাজা জেরোবোয়াম বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার রাজ্যের মানুষ যদি উপাসনা করার জন্য দক্ষিণের জেরুজালেমে যাতায়াত করে, তবে তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই তিনি নিজের রাজ্যের সীমানার ভেতরে দান এবং বেথেল নামের দুটি শহরে দুটি নতুন জাতীয় উপাসনালয় স্থাপন করেন। তিনি সেখানে দুটি সোনার বাছুরের মূর্তি তৈরি করেছিলেন। দক্ষিণের লেখকরা এই সোনার বাছুরকে ‘পৌত্তলিকতা‘ বা মূর্তিপূজা হিসেবে আখ্যায়িত করে উত্তরের রাজাদের কলঙ্কিত করেছেন।
কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা এই ধর্মীয় অপপ্রচারের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। প্রাচীন কানানীয় এবং লেভান্টীয় সংস্কৃতিতে দেবতাকে প্রায়শই একটি ষাঁড় বা বাছুরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত; বাছুরটি নিজে দেবতা ছিল না, এটি ছিল দেবতার সিংহাসন বা বাহন। ঠিক যেমন জেরুজালেমের মন্দিরে ইয়াহওয়েহ-র কাল্পনিক উপস্থিতি বোঝানোর জন্য চেরুবিম বা ডানাওয়ালা প্রাণীর মূর্তি ব্যবহার করা হতো। দান এবং বেথেলের সোনার বাছুরগুলোও ছিল ঠিক একই রকম ধর্মীয় প্রতীক। এগুলো কোনোভাবেই ইয়াহওয়েহ-র ধর্মের পরিপন্থী ছিল না (Sweeney, 2007)। উত্তরের রাজারা তাদের নিজস্ব স্বাধীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যা দক্ষিণের পুরোহিতদের একচেটিয়া ধর্মীয় ব্যবসায়ে ভাগ বসিয়েছিল। মূলত এই অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকেই দক্ষিণের লেখকরা উত্তরের রাজাদের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার করেছিলেন। মিথোলজি তৈরি করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দানব হিসেবে চিত্রিত করার এই প্রবণতা মানব ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে।
আধুনিক আর্কিওলজি এই দুই রাজ্যের মধ্যকার বাস্তব ব্যবধানকে খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা যায় যে, অষ্টম খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইসরায়েল রাজ্যে ব্যাপক হারে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছিল, স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছিল। বিপরীতে জুদাহ ছিল অত্যন্ত জনবিরল এবং গ্রাম্য এক জনপদ। প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রস্তাবিত নিম্ন কালপঞ্জি (Low Chronology) তত্ত্ব অনুযায়ী, জুদাহ রাজ্যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিকাশ ঘটেছিল ইসরায়েলের চেয়ে অন্তত এক বা দেড় শতাব্দী পরে। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো আমাদের বোঝাতে চায় যে ঈশ্বরের আশীর্বাদ থাকায় জুদাহ ছিল মহান এবং পবিত্র, আর ইসরায়েল ছিল পাপে নিমজ্জিত এক অভিশপ্ত রাজ্য। কিন্তু মাটির নিচের প্রমাণগুলো দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে যে, প্রাচীন বাস্তবতায় ইসরায়েলই ছিল মূল কেন্দ্র এবং জুদাহ ছিল তার এক অবহেলিত প্রান্ত মাত্র। ইতিহাস লেখার কলমটি দক্ষিণের লেখকদের হাতে থাকায় তারা এই সত্যকে আড়াল করে একটি কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্বের মিথোলজি তৈরি করেছিলেন, যা আজও বহু মানুষের বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে।
দুই রাজ্যের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক ও সংঘাত (Geopolitical Relations and Conflicts Between the Two Kingdoms)
ইসরায়েল এবং জুদাহর মধ্যকার সম্পর্ক কখনোই একমুখী ছিল না; এটি ছিল সংঘাত, প্রতিযোগিতা এবং মিত্রতার এক জটিল মিশ্রণ। বিভাজনের পরপরই দুই রাজ্যের মধ্যে সীমানা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়। বিশেষ করে বেঞ্জামিন উপজাতির ভূখণ্ডটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বারবার রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে। এই এলাকাটি জেরুজালেমের খুব কাছাকাছি হওয়ায় জুদাহর রাজারা যেকোনো মূল্যে এটি দখল করতে চাইতেন। প্রথম দিকে জুদাহ ফিনিশিয়া বা আরাম-দামেস্কের মতো বিদেশি শক্তিকে অর্থ দিয়ে ভাড়া করে ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ চালাত। কিন্তু নবম খ্রিস্টপূর্বাব্দে ওম্রি রাজবংশের উত্থানের পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। ইসরায়েল এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে জুদাহ বাধ্য হয়ে তাদের সাথে সংঘাতে যাওয়ার পথ পরিহার করে। এই সময়ে জুদাহ কার্যত ইসরায়েলের একটি অনুগত মিত্র রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দুই রাজপরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং তারা যৌথভাবে আরামীয় বা মোয়াবীয়দের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে শুরু করে।
তবে এই ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য চিরস্থায়ী হয়নি। অষ্টম খ্রিস্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময়ে মেসোপটেমিয়ায় নিও-অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য এক প্রবল ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী বাণিজ্যপথগুলো পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। অ্যাসিরীয়দের এই আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদ পুরো লেভান্টের ভূরাজনীতিকে তছনছ করে দেয়। উত্তরের ইসরায়েল রাজ্য, যা ভৌগোলিকভাবে অনেক বেশি উন্মুক্ত এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ছিল, তা স্বাভাবিকভাবেই অ্যাসিরীয়দের প্রথম শিকারে পরিণত হয়। ইসরায়েলের রাজারা শুরুতে অ্যাসিরিয়াকে কর দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু একপর্যায়ে তারা মিশরের সাথে আঁতাত করে অ্যাসিরিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। এই রাজনৈতিক ভুলের মাশুল তাদের চরমভাবে দিতে হয়। ৭২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যাসিরীয় বিশাল বাহিনী ইসরায়েলের রাজধানী সামারিয়া অবরোধ করে এবং শহরটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এর মাধ্যমে উত্তরের সমৃদ্ধ ইসরায়েল রাজ্যের চিরতরে পতন ঘটে।
উত্তরের এই পতন দক্ষিণের জুদাহ রাজ্যের জন্য এক অদ্ভুত আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়। ইসরায়েলের পতনের সময় জুদাহর রাজা ছিলেন আহাজ। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে অ্যাসিরীয়দের বিরুদ্ধে কোনো জোটে না গিয়ে স্বেচ্ছায় তাদের বশ্যতা স্বীকার করেন এবং বিপুল পরিমাণ কর প্রদান করেন। এর ফলে অ্যাসিরীয়রা জুদাহ আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে। তবে ইসরায়েলের পতনের সবচেয়ে বড় প্রভাবটি পড়ে জুদাহর জনতাত্ত্বিক কাঠামোতে। সামারিয়া ধ্বংস হওয়ার পর উত্তরের হাজার হাজার শিক্ষিত আমলা, ধনী বণিক এবং সাধারণ কৃষক পালিয়ে গিয়ে দক্ষিণের জুদাহতে আশ্রয় নেয়। এই বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর আগমনের ফলে রাতারাতি জেরুজালেমের আয়তন এবং জনসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। জুদাহ হঠাৎ করেই একটি অনুন্নত গ্রাম্য রাষ্ট্র থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। উত্তরের এই শিক্ষিত শ্রেনীই মূলত নিজেদের সাথে নিয়ে এসেছিল লেখনী বিদ্যা এবং প্রাচীন অনেক মিথোলজিক্যাল গল্প, যা পরবর্তীতে জুদাহর রাজারা নিজেদের স্বার্থে বাইবেলের আখ্যান হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন (Schniedewind, 2004)। প্রতিবেশীর ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়ে এভাবেই জুদাহ তার রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক পরিচয়ের চূড়ান্ত রূপটি নির্মাণ করেছিল।
নবী, রাজনীতি ও সামাজিক সমালোচনা (Prophets, Politics and Social Critique): ধর্মীয় প্রতিবাদের ভাষা
প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে নবীত্বের ধারণা ও উৎপত্তি (Concept and Origin of Prophecy in the Ancient Near East)
নবী বা প্রফেট শব্দটির কথা শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে এমন একজন আধ্যাত্মিক পুরুষের ছবি ভেসে ওঠে, যিনি অলৌকিক ক্ষমতাবলে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন। ধর্মীয় মিথোলজিগুলো যুগে যুগে এভাবেই তাদের চিত্রিত করেছে। ইতিহাস এবং প্রাচীন সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এই ধারণাটির বাস্তব ভিত্তি বেশ নড়বড়ে। প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নবীত্বের ধারণাটি কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মূলত প্রাচীনকালের এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। মেসোপটেমিয়ার মারি শহর থেকে উদ্ধার করা কিউনিফর্ম শিলালিপিগুলোতে এই বিষয়ে চমৎকার কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে (Nissinen, 2003)। ওই শিলালিপিগুলো থেকে জানা যায় যে, ইসরায়েলীয়দের অনেক আগে থেকেই মেসোপটেমিয়া এবং সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে রাজদরবারে একদল বিশেষ পেশাজীবী মানুষ থাকতেন, যাদের কাজই ছিল দেবতাদের বার্তা রাজাকে পৌঁছে দেওয়া। তারা কোনো ঐশ্বরিক বা জাদুকরী মানুষ ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন প্রাচীন রাষ্ট্রকাঠামোর এক ধরনের গোয়েন্দা বা রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
প্রাচীন লেভান্টেও এই পেশার মানুষের আনাগোনা ছিল। রাজারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে বা বড় কোনো চুক্তি করার আগে এই দরবারি নবীদের ডাকতেন। রাজাদের দেওয়া মোটা বেতনের বিনিময়ে তারা মূলত এমন সব কথাই বলতেন, যা রাজা শুনতে পছন্দ করতেন। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব নবম এবং অষ্টম শতাব্দীর দিকে ইসরায়েল ও জুদাহ সমাজে এক নতুন ধরনের চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। এরা রাজদরবারের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে সাধারণ মানুষের ভেতর থেকে উঠে এসেছিলেন। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে প্রান্তিকতার সমাজতত্ত্ব (Sociology of Marginality) দিয়ে খুব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় (Wilson, 1980)। সমাজ যখন খুব দ্রুত বদলাতে শুরু করে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়, তখন সমাজের প্রান্তিক অংশ থেকে এমন কিছু কণ্ঠস্বরের জন্ম হয়, যারা প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলে। এই স্বাধীন বা প্রান্তিক নবীগুলো রাজাদের স্তুতি গাওয়ার বদলে তাদের নীতির কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু তাদের ছিল সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে ভাষায় রূপ দেওয়ার এক অসাধারণ সাহিত্যিক ক্ষমতা।
প্রাথমিক দিকের স্বাধীন নবীদের কাজ করার ধরন ছিল বেশ আলাদা। তারা প্রায়শই দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াতেন এবং গান-বাজনা বা বিশেষ ধরনের নাচের মাধ্যমে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঘোরের মধ্যে চলে যেতেন। সাধারণ মানুষ তাদের এই অবস্থাকে দেবতাদের ভর করা বলে মনে করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই ব্যবস্থার বিবর্তন ঘটে। অষ্টম শতাব্দীর দিকে এসে আমরা এমন কিছু নবীর দেখা পাই, যারা আর দলবদ্ধভাবে থাকতেন না এবং ঘোরের মধ্যে গিয়ে কথাও বলতেন না। তারা মূলত ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন সামাজিক পর্যবেক্ষক। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে, শহরের প্রবেশদ্বারে বা মন্দিরের সামনে গিয়ে অত্যন্ত গুছিয়ে এবং যৌক্তিকভাবে সমাজের অসংগতিগুলো তুলে ধরতেন। তাদের ভাষা ছিল কাব্যিক, কিন্তু তাদের বার্তা ছিল নিখাদ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক। তারা মূলত প্রাচীন যুগের অ্যাক্টিভিস্ট বা প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করতেন। দেবতাদের নাম ব্যবহার করাটা ছিল তাদের বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি কৌশল মাত্র, কারণ প্রাচীন সমাজে ধর্মের মোড়ক ছাড়া সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নবীদের দ্বন্দ্ব (Conflict Between Religious Institutions and Prophets)
প্রাচীন লেভান্টের সমাজকাঠামোতে মন্দির কেবল প্রার্থনার জায়গা ছিল না। জেরুজালেম বা সামারিয়ার মতো বড় শহরগুলোর মন্দিরগুলো ছিল মূলত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের একটি বড় অংশ কর হিসেবে এই মন্দিরগুলোতে জমা দিত। পশুপালকরা তাদের সেরা পশুগুলো নিয়ে আসত দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার নামে, যা শেষ পর্যন্ত পুরোহিত এবং রাজকীয় আমলাদের কোষাগারেই জমা হতো। এই বিশাল সম্পদের ওপর ভিত্তি করে পুরোহিত শ্রেণী এক প্রবল প্রতাপশালী অভিজাত গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলো যত জাঁকজমকপূর্ণ হতো, তাদের আয় তত বাড়ত। স্বাধীন নবীরা ঠিক এই অর্থনৈতিক শোষণের জায়গাটিতেই আঘাত করেছিলেন। তারা সরাসরি ঘোষণা করেন যে, সমাজ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তবে মন্দিরে উৎসর্গ করা এই পশু বা ফসল দেবতাদের কোনো কাজেই আসে না। তাদের এই বক্তব্য ছিল সমসাময়িক ধর্মীয় অর্থনীতির মূলে এক বিশাল কুঠারাঘাত, যা পুরোহিতদের সরাসরি প্রতিপক্ষে পরিণত করে।
এই দ্বন্দ্বটি মূলত ছিল প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিসত্তার মধ্যকার সংঘাত। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তার আলোচনায় একে প্রাতিষ্ঠানিক বনাম ক্যারিশম্যাটিক কর্তৃত্ব (Institutional vs. Charismatic Authority) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। পুরোহিতদের ক্ষমতা আসত রাষ্ট্রের আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর থেকে। অন্যদিকে নবীদের ক্ষমতা আসত তাদের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতার ওপর ভর করে। আমোস নামের এক নবীর গল্প থেকে এই দ্বন্দ্বের একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। আমোস উত্তরের বেথেল শহরের রাজকীয় মন্দিরে গিয়ে সেখানকার বিলাসবহুল ধর্মীয় আচারের তীব্র সমালোচনা করেন। বেথেলের প্রধান পুরোহিত আমাসিয়া তখন তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করে শহর থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন (Blenkinsopp, 1996)। পুরোহিতদের চোখে নবীরা ছিলেন মূলত রাজনৈতিক উসকানিদাতা, যারা ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছিলেন। তারা নবীদের এই সামাজিক সমালোচনাকে নিজেদের একচেটিয়া ধর্মীয় ব্যবসার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখতেন।
নবীরা দাবি করতেন যে, আসল ধর্ম মন্দিরের চার দেয়ালের ভেতর বা বলিদানের রক্তে আটকে নেই; এর আসল প্রকাশ ঘটে সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। প্রাচীন পৃথিবীতে এই ধারণাটি ছিল এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব। সে যুগের মানুষের সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে, দেবতাদের ঠিকমতো খাবার দিলে এবং তাদের মন্দির পরিষ্কার রাখলেই তারা খুশি থাকেন। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক কেমন, তা নিয়ে দেবতাদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই বলেই ধরে নেওয়া হতো। নবীরা এই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি উল্টে দেন। তারা দেবতাদের এমন এক নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে তুলে ধরেন, যারা মন্দিরের ধূপের গন্ধের চেয়ে আদালতের ন্যায়বিচারকে বেশি পছন্দ করেন। তবে এটি কোনো ঐশ্বরিক বা আকাশ থেকে নাজিল হওয়া জ্ঞান ছিল না। এটি ছিল মূলত সম্পদের অসম বণ্টন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত শ্রেণীর এক স্বতঃস্ফূর্ত দার্শনিক প্রতিক্রিয়া। ধর্মীয় ভাষাকে ব্যবহার করে তারা মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমতাভিত্তিক সমাজেরই স্বপ্ন দেখছিলেন।
আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও নবীদের প্রতিবাদ (Socio-Economic Inequality and Prophetic Protest)
অষ্টম খ্রিস্টপূর্বাব্দে লেভান্টের ভূরাজনীতিতে এক বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক জোয়ার এসেছিল। ইসরায়েল এবং জুদাহ উভয় রাজ্যেই কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে এবং তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়। জলপাই তেল এবং ওয়াইন রপ্তানি করে রাজপরিবার এবং নগরকেন্দ্রিক অভিজাতরা রাতারাতি অকল্পনীয় সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বাণিজ্যের সুবিধার জন্য বড় বড় ব্যবসায়ীরা গ্রামের ছোট কৃষকদের জমিগুলো কিনে নিতে শুরু করে। ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে অসংখ্য কৃষক তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে বড় খামারগুলোতে দিনমজুর বা ভূমিদাসে পরিণত হয়। প্রাচীনকালের সেই ইগালিটেরিয়ান বা সমতাভিত্তিক উপজাতীয় সমাজব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং সমাজে এক বিশাল শ্রেণীবিভাজন তৈরি হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই সময়ের শহরগুলোতে একই সাথে বিশাল পাথরের অট্টালিকা এবং তার পাশেই অত্যন্ত জীর্ণ ও ছোট ছোট মাটির ঘরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা এই ভয়াবহ বৈষম্যেরই বস্তুগত প্রমাণ।
এই চরম আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটেই মিকা এবং হোসিয়ার মতো নবীদের উত্থান ঘটে। তারা মূলত ছিলেন গ্রামের সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান, যারা চোখের সামনে নিজেদের সমাজকে পুঁজিপতি বণিক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারকদের হাতে ধ্বংস হতে দেখছিলেন। তারা শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই নব্য ধনীদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার কঠোর সমালোচনা করেন। তারা হাতির দাঁতের তৈরি বিছানা, শীত এবং গ্রীষ্মের জন্য আলাদা আলাদা রাজপ্রাসাদ এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন (Dearman, 1992)। তাদের এই বক্তব্যের মূলে কোনো আধ্যাত্মিক পবিত্রতাবাদ ছিল না, ছিল নিখাদ ক্ষোভ। তারা বারবার মনে করিয়ে দিতেন যে, প্রাচীনকালে মরুভূমিতে থাকার সময় সবাই সমান ছিল এবং সম্পদের এমন কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল না। এই নবীরা মূলত একটি নষ্টালজিক বা অতীতমুখী আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমানের পুঁজিবাদী বিকাশের সমালোচনা করছিলেন। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ছিল নিখাদ একটি শ্রেণী সংগ্রাম (Class Struggle), যা ধর্মীয় ভাষার মোড়কে প্রকাশিত হয়েছিল।
নবীরা তাদের এই সামাজিক প্রতিবাদকে তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী এবং রূপকধর্মী ভাষা ব্যবহার করতেন। তারা দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারকদের নেকড়ে বা শিয়ালের সাথে তুলনা করতেন এবং ব্যবসায়ীদের বলতেন যারা গরিব মানুষের ঘাম বিক্রি করে বড়লোক হচ্ছে। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতেন যে, এই অবিচারের কারণে দেবতারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ এবং খুব শিগগিরই এই শহরগুলোর ওপর ধ্বংস নেমে আসবে। ভয়াবহ খরার ভবিষ্যদ্বাণী বা মহামারির ভয় দেখানো মূলত ছিল প্রাচীনকালের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল। তারা দাবি করতেন যে, অর্থনীতি যদি গরিবের পক্ষে না থাকে, তবে দেবতাদের সাথে করা প্রাচীন চুক্তিটি এমনিতেই বাতিল হয়ে যায় (Premnath, 2003)। তাদের এই প্রতিবাদ কোনো অলৌকিক বাণী ছিল না; এটি ছিল বাস্তব পৃথিবীর মাটি, ফসল এবং ক্ষুধার সাথে সম্পর্কিত। প্রাচীন যুগে ট্রেড ইউনিয়ন বা রাজনৈতিক দল গঠন করার সুযোগ ছিল না। তাই সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল এই নবীদের ধর্মীয় প্রতিবাদের ভাষা।
ভূরাজনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে নবী (Geopolitical Crisis and Prophets as Political Commentators)
নবীরা কেবল সমাজের ভেতরের অর্থনীতি নিয়েই চিন্তিত ছিলেন না, তারা তাদের সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কেও অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মেসোপটেমিয়ার বুকে নিও-অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য এক প্রবল আগ্রাসী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের বিশাল সেনাবাহিনী একের পর এক রাষ্ট্র দখল করে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল। এই বিশাল বিপদের মুখে লেভান্টের ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোর রাজারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কখনো তারা মিশরের সাথে চুক্তি করে অ্যাসিরিয়াকে ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন, আবার কখনো বা আরামীয়দের সাথে সামরিক জোট গঠন করছিলেন। এই ভূরাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে নবীরা আবির্ভূত হন সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে ধূর্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে। আইজায়াহ বা জেরেমিয়াহর মতো নবীরা রাজাদের বারবার সতর্ক করে দেন যে, বিদেশী বড় সাম্রাজ্যগুলোর সাথে জোট বাঁধা মানেই হলো আত্মহত্যার শামিল। তারা খুব ভালো করেই বুঝতেন যে সুপারপাওয়ারদের প্রক্সি যুদ্ধে ছোট রাষ্ট্রগুলো কেবল দাবার ঘুঁটি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, শেষমেশ তাদের ভাগ্যে জোটে কেবল ধ্বংস।
রাজাদের এই কূটনৈতিক দুর্বলতার সমালোচনা করার জন্য নবীরা এক অভিনব ধর্মতাত্ত্বিক কৌশল বেছে নেন। তারা দাবি করেন যে, মিশরের ঘোড়া বা আরামের রথের ওপর নির্ভর করা মানেই হলো নিজেদের জাতীয় দেবতার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। তারা রাজাদের পরামর্শ দেন কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকার জন্য (Matthews, 2001)। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে ধর্মীয় বিশ্বাস মনে হলেও, রাজনৈতিক দিক থেকে এটি ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি উপদেশ। অ্যাসিরিয়ার মতো বিশাল এক সামরিক যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটা আসলেই বোকামি ছিল। নবীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে সামরিক সংঘাতের চেয়ে বশ্যতা স্বীকার করে কর দেওয়াই টিকে থাকার একমাত্র উপায়। তারা তাদের এই ভূরাজনৈতিক জ্ঞানকে দেবতাদের বাণী হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করতেন। তারা বলতেন যে, অ্যাসিরীয় সম্রাট আসলে কোনো স্বাধীন শক্তি নন, বরং তিনি হলেন ইসরায়েলীয়দের জাতীয় দেবতার হাতের একটি লাঠি মাত্র, যা দিয়ে তিনি তার নিজের পথভ্রষ্ট জাতিকে শাস্তি দিচ্ছেন। এটি ছিল রাজনৈতিক বিপর্যয়কে ধর্মীয় চাদরে ঢেকে ফেলার এক মাস্টারস্ট্রোক।
এই ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় নবীরা প্রাচীন একটি জনপ্রিয় বিশ্বাসকে পুরোপুরি উল্টে দেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ছিল যে, ‘ডে অফ দ্য লর্ড’ বা প্রভুর দিন নামের এমন একটি নির্দিষ্ট দিন আসবে, যেদিন দেবতারা এসে তাদের সব শত্রুকে ধ্বংস করে ইসরায়েলকে সারা বিশ্বের অধিপতি বানিয়ে দেবেন। কিন্তু নবীরা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেন যে, এই দিনটি বিজয়ের দিন হবে না; এটি হবে ধ্বংস এবং পরাজয়ের দিন। তারা বলেন যে, সামাজিক অবিচারের কারণে দেবতারা এবার শত্রুদের নয়, বরং নিজেদের জাতিকেই ধ্বংস করবেন। এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করে (Gottwald, 2001)। নবীরা মূলত বিদেশী সাম্রাজ্যের ভীতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমাজের ভেতরের দুর্নীতি এবং বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করছিলেন। ৭২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন অ্যাসিরীয় বাহিনী সত্যিই উত্তরের সামারিয়া শহর ধ্বংস করে দেয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে নবীদের এই রাজনৈতিক বিশ্লেষণগুলো ঐশ্বরিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
মিথোলজি, ঐশ্বরিক দাবি ও প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা (Mythology, Divine Claims and Archaeological Reality)
নবীদের ইতিহাস পড়তে গেলে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া বিশাল মিথোলজির জঙ্গল। বাইবেলের পাতায় আমরা এমন অনেক নবীর গল্প পাই, যারা মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুলেছেন, আকাশ থেকে আগুন নামিয়েছেন বা নদীর জল দুভাগ করে দিয়েছেন। সাধারণ ধার্মিক মানুষের কাছে এগুলো অলৌকিক ক্ষমতার অকাট্য প্রমাণ হলেও, একাডেমিকভাবে এই গল্পগুলোর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। প্রাচীনকালে যখন এই গল্পগুলো মুখে মুখে ছড়াত, তখন সাধারণ মানুষ তাদের নেতাদের মহিমান্বিত করার জন্য নানা রকম অতিপ্রাকৃত রং চড়াত। এটি মানব সভ্যতার এক অত্যন্ত সাধারণ বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন গ্রিস বা মিশরের সাহিত্যেও আমরা ঠিক একই রকম অলৌকিক গল্প দেখতে পাই। এই ঐশ্বরিক দাবিগুলো মূলত ছিল নবীদের সামাজিক বক্তব্যকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি সাহিত্যিক মাধ্যম। বিজ্ঞান এবং যুক্তির যুগে এই অলৌকিক গল্পগুলোকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করাটা বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পাঠের পরিপন্থী।
তবে নবীদের এই অলৌকিক গল্পগুলো মিথ্যা হলেও, তারা সমাজের যে বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরেছিলেন, প্রত্নতত্ত্ব তাকে পুরোপুরি সমর্থন করে। নবীরা যখন বড়লোকদের বিলাসবহুল বাড়ির সমালোচনা করছিলেন বা জমি দখলের কথা বলছিলেন, মাটির তলার প্রমাণগুলো ঠিক সেই কথাই বলছে। তিরজা বা শেচেমের মতো শহরগুলোতে খনন করে দেখা গেছে যে অষ্টম শতাব্দীর দিকে এসে সাধারণ মানুষের বাসস্থানের মান ব্যাপকভাবে নিচে নেমে গিয়েছিল। শহরের ভেতরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে গিয়েছিল। এই প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা প্রমাণ করে যে নবীরা কোনো কাল্পনিক দুনিয়ার কথা বলছিলেন না; তারা অত্যন্ত বাস্তব এবং নির্মম এক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধেই লড়ছিলেন। তাদের প্রতিবাদী ভাষা হয়তো কাব্যিক বা ধর্মীয় ছিল, কিন্তু তাদের ক্ষোভের কারণগুলো ছিল সম্পূর্ণ বস্তুবাদী এবং আর্থ-সামাজিক।
একটি ধর্মান্ধ সমাজে কোনো সমাজ সংস্কারক যখন নতুন কোনো ধারণা নিয়ে আসেন, তখন তাকে একটি নির্দিষ্ট মোড়ক ব্যবহার করতে হয়। প্রাচীন যুগে সেই মোড়কটি ছিল ধর্মের মোড়ক। নবীরা খুব ভালো করেই জানতেন যে, তারা যদি কেবল অর্থনৈতিক সাম্যের কথা বলেন, তবে কেউ তাদের কথা শুনবে না। তাই তারা নিজেদের বক্তব্যকে দেবতাদের সরাসরি আদেশ হিসেবে প্রচার করতেন। সমাজবিজ্ঞানে একে ঐশ্বরিক বৈধতা (Divine Legitimation) বলা হয়। বর্তমান যুগে যেমন আমরা কোনো অধিকার আদায়ের জন্য সংবিধান বা মানবাধিকার সনদের উদ্ধৃতি দিই, প্রাচীন লেভান্টে নবীরা ঠিক তেমনি দেবতাদের চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিতেন। এই ঐশ্বরিক দাবি তাদের একটি অলঙ্ঘনীয় সুরক্ষাকবচ দিয়েছিল, যার কারণে রাজারা চাইলেও সহজে তাদের হত্যা বা বন্দি করতে পারতেন না। এটি ছিল মূলত ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার এক অত্যন্ত চতুর রাজনৈতিক চাল, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল প্রাচীন লেভান্টের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার দীর্ঘশ্বাস।
সাহিত্যের বিবর্তন ও নবীভিত্তিক গ্রন্থের সংকলন (Evolution of Literature and the Compilation of Prophetic Texts)
আমরা আজ বাইবেলে নবীদের যে বইগুলো পড়ি, তা তারা নিজেদের হাতে লিখে যাননি। প্রাচীনকালে নবীরা ছিলেন মূলত বক্তা, লেখক নন। তারা শহরের মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে মুখে মুখে কথা বলতেন। তাদের শিষ্যরা এই বক্তৃতা বা কবিতাগুলো মুখস্থ করে রাখত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ছড়িয়ে দিত। এই মৌখিক ঐতিহ্য (Oral Tradition) দীর্ঘকাল ধরে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে ছিল। কিন্তু ৫৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য জেরুজালেম ধ্বংস করে দেয় এবং হাজার হাজার মানুষকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যায়, তখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। দেশ এবং মন্দির হারিয়ে এই নির্বাসিত মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে এক চরম সংকটে পড়ে। এই সংকটময় মুহূর্তেই মূলত নবীদের হারিয়ে যাওয়া কথাগুলোকে লিখিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাচীনকালের করণিক বা স্ক্রাইবরা ব্যাবিলনের নির্বাসনে বসে এই মৌখিক গল্পগুলোকে প্যাপিরাস বা চামড়ার স্ক্রোলে লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন (Ben Zvi, 2000)।
এই সংকলন প্রক্রিয়াটি কোনো সাধারণ টাইপিংয়ের কাজ ছিল না; এটি ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক এবং আদর্শিক সম্পাদনার কাজ। নির্বাসনে থাকা লেখকরা নবীদের পুরনো কথাগুলোর সাথে নিজেদের সময়ের অনেক নতুন কথা যোগ করে দেন। ধ্বংসের আগে নবীরা যে কেবল শাস্তির কথা বলেছিলেন, নির্বাসিত লেখকরা তার সাথে আশার বাণী এবং পুনর্গঠনের ভবিষ্যদ্বাণী জুড়ে দেন। তারা মূলত অতীতকে নিজেদের মতো করে সাজিয়েছিলেন, যাকে একাডেমিকভাবে সম্পাদনাগত স্তরবিন্যাস (Redactional Stratification) বলা হয়। তারা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে নবীদের কথা না শোনার কারণেই তাদের এই পরিণতি হয়েছে, কিন্তু এখন যদি তারা নতুন করে নিজেদের সংগঠিত করে, তবে তারা আবার নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারবে। এই সম্পাদনার মাধ্যমে নবীদের মূল সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বক্তব্যগুলো অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যায় এবং তার জায়গায় একটি নির্দিষ্ট জাতীয়তাবাদী ধর্মতত্ত্ব বড় হয়ে ওঠে (Carroll, 1986)। নবীরা পরিণত হন একটি নতুন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আইকনে।
এই লিখিত গ্রন্থগুলো পরবর্তীতে ইহুদি পরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। মন্দির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর ধর্মচর্চার জন্য আর কোনো নির্দিষ্ট জায়গার প্রয়োজন রইল না; ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল এই গ্রন্থগুলো। এটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক বিশাল বাঁক বদল। গ্রন্থভিত্তিক এই ধর্মের কারণেই তারা ব্যাবিলনের মতো এক ভিনদেশি সংস্কৃতিতে হারিয়ে না গিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। নবীদের নামে সংকলিত এই বইগুলো মূলত এক একটি রাজনৈতিক অ্যান্থোলজি বা সংকলন, যেখানে শত শত বছরের বিভিন্ন লেখকের চিন্তাভাবনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এগুলো কোনো একক ব্যক্তির লেখা ডায়েরি নয়; এগুলো হলো একটি প্রাচীন জাতির টিকে থাকার এবং নিজেদের ধ্বংসকে যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করার সাহিত্যিক দলিল। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, নবীদের এই সাহিত্যগুলো আকাশ থেকে অবতীর্ণ কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়, বরং এগুলো হলো প্রাচীন মানুষের আর্থ-সামাজিক সংগ্রাম এবং তাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারারই এক অসামান্য বিবর্তন।
অ্যাসিরীয় বিজয় ও ইসরায়েলের পতন (Assyrian Conquest and Fall of Israel): উত্তর রাজ্যের অবসান
নিও-অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও ভূরাজনৈতিক সম্প্রসারণ (Rise of the Neo-Assyrian Empire and Geopolitical Expansion)
প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের ইতিহাসে অষ্টম খ্রিস্টপূর্বাব্দ এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। মেসোপটেমিয়ার উত্তরাংশে, টাইগ্রিস নদীর তীরে অ্যাসিরিয়া নামের একটি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এক অপ্রতিরোধ্য সামরিক দানবে পরিণত হচ্ছিল। এর আগে লেভান্টের রাজনীতি মূলত স্থানীয় ছোট ছোট নগররাষ্ট্র এবং উপজাতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তৃতীয় তিগলাথ-পিলেসারের সিংহাসনে আরোহণের মধ্য দিয়ে অ্যাসিরিয়ার সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। তিনি একটি স্থায়ী ও পেশাদার সেনাবাহিনী গঠন করেন, যা বছরের যেকোনো সময় যুদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকত। এর আগে রাজারা মূলত কৃষকদের নিয়ে অস্থায়ী মিলিশিয়া বাহিনী গড়তেন, যাদের ফসল কাটার মৌসুমে বাড়ি ফিরে যেতে হতো। তিগলাথ-পিলেসার এই প্রথা বাতিল করে এমন এক যুদ্ধযন্ত্র তৈরি করেন, যার মূল পেশাই ছিল অন্য রাষ্ট্র দখল করা এবং সম্পদ লুণ্ঠন করা। তিনি নতুন পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, দেয়াল ভাঙার বিশেষ যন্ত্র বা সিজ ইঞ্জিন তৈরি করেন। এই প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত উৎকর্ষের ফলে প্রাচীন বিশ্বের কোনো শহরের সুরক্ষাপ্রাচীরই আর অ্যাসিরীয়দের কাছে নিরাপদ ছিল না।
অ্যাসিরীয়দের এই আগ্রাসী সম্প্রসারণের পেছনে কেবল সামরিক অহংকার ছিল না, এর পেছনে ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট একটি অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা একে কেন্দ্র-প্রান্ত নির্ভরতা (Center-Periphery Dependency) তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করেন (Tadmor, 1994)। অ্যাসিরিয়ার রাজধানী নিনেভে বা কালহুর মতো বিশাল শহরগুলোর জাঁকজমক টিকিয়ে রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণে কাঠ, লোহা, তামা এবং রুপার প্রয়োজন ছিল। তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে এই প্রাকৃতিক সম্পদের যথেষ্ট অভাব থাকায় তারা চোখ দেয় ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর দিকে। লেভান্টের ফিনিশীয় বন্দরগুলো ছিল প্রাচীন বিশ্বের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র। অ্যাসিরীয়দের লক্ষ্য ছিল এই বাণিজ্যপথগুলোর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যটি ভৌগোলিকভাবে এমন একটি জায়গায় অবস্থিত ছিল, যার ওপর দিয়ে বিখ্যাত সমুদ্রপথ বা ভায়া মারিস অতিক্রম করেছে। ফলে মিশর বা ফিনিশিয়ার সাথে বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে অ্যাসিরিয়াকে যেকোনো মূল্যে ইসরায়েলকে নিজেদের করতলগত করতে হতো। এটি কোনো ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল নিখাদ সম্পদের দখল নেওয়ার এক ভূরাজনৈতিক খেলা।
এই সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য অর্জনের জন্য অ্যাসিরীয়রা রাষ্ট্রিয়ভাবে এক বিশেষ ধরনের ভীতি প্রদর্শনের নীতি গ্রহণ করেছিল। তারা শত্রুদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সামরিক সন্ত্রাসবাদ (Military Terrorism) প্রয়োগ করত। কোনো শহর যদি আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করত এবং যুদ্ধে পরাজিত হতো, তবে অ্যাসিরীয় সেনারা শহরের নেতাদের জীবন্ত চামড়া ছাড়িয়ে নিত অথবা শূলে চড়িয়ে রাখত। তাদের নিজেদের তৈরি করা শিলালিপিগুলোতে অত্যন্ত গর্বের সাথে এই বীভৎস শাস্তির বর্ণনা খোদাই করা আছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মনস্তাত্ত্বিক। তারা চেয়েছিল একটি শহরের এই নির্মম পরিণতি দেখে আশেপাশের অন্য শহরগুলো যেন বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে এবং নিয়মিত কর প্রদান করে। ধর্মীয় মিথোলজিগুলোতে দাবি করা হয় যে ইসরায়েলীয়দের পাপের কারণে ঈশ্বর অ্যাসিরীয়দের পাঠিয়েছিলেন শাস্তিস্বরূপ। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতায় দেখা যায় যে, অ্যাসিরিয়া ছিল একটি সুসংগঠিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যারা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে পদ্ধতিগতভাবে একের পর এক রাষ্ট্র গিলে খাচ্ছিল। তাদের এই রাষ্ট্রীয় নীতির সামনে লেভান্টের ছোট রাষ্ট্রগুলোর টিকে থাকার কোনো যৌক্তিক উপায় ছিল না।
লেভান্টের অর্থনীতি এবং অ্যাসিরীয় করব্যবস্থা (Economy of the Levant and the Assyrian Taxation System)
অষ্টম খ্রিস্টপূর্বাব্দের প্রথমার্ধে, রাজা দ্বিতীয় জেরোবোয়ামের শাসনামলে উত্তরের ইসরায়েল রাজ্য এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মুখ দেখেছিল। সামারিয়া এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলো পরিণত হয়েছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক ব্যস্ততম কেন্দ্রে। কৃষিতে বিশেষায়িতকরণের মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ জলপাই তেল এবং উন্নত মানের ওয়াইন উৎপাদন শুরু করে। ফিনিশিয়া এবং মিশরের বাজারে এই পণ্যগুলোর ব্যাপক চাহিদা ছিল। খননকাজে এই সময়ের প্রচুর তেল নিষ্কাশন যন্ত্র এবং বিশাল সব মদের গুদামের সন্ধান মিলেছে। বাণিজ্য থেকে অর্জিত এই সম্পদের ফলে সামারিয়ার রাজদরবার এবং নগরকেন্দ্রিক অভিজাত শ্রেণী এক বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। হাতির দাঁতের কারুকাজ করা আসবাবপত্র, উন্নত মানের অ্যাশলার পাথর দিয়ে তৈরি প্রাসাদ এবং দামি মৃৎপাত্র তাদের এই সচ্ছলতারই প্রমাণ বহন করে। কিন্তু সম্পদের এই পাহাড়ই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই বড় সাম্রাজ্যগুলোর নজর কাড়ে। অ্যাসিরিয়ার রাজারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইসরায়েলকে নিজেদের করদ রাজ্যে পরিণত করতে পারলে তাদের রাজকোষে বিপুল পরিমাণ রুপা এবং কৃষিজাত পণ্য জমা হবে।
অ্যাসিরীয়দের অর্থনীতি মূলত দাঁড়িয়ে ছিল তাদের দখলকৃত রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক নিষ্ঠুর করব্যবস্থার ওপর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি একটি নিখুঁত শোষণমূলক অর্থনীতি (Exploitative Economy)। তারা দুই ধাপে এই কর আদায় করত। প্রথমে তারা স্থানীয় রাজাকে সিংহাসনে রেখে তাকে বিপুল পরিমাণ বাৎসরিক নজরানা বা ‘মাদ্দাত্তু’ দিতে বাধ্য করত। এই নজরানার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে স্থানীয় অর্থনীতি পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যেত। অ্যাসিরীয় শিলালিপিতে রাজা তৃতীয় তিগলাথ-পিলেসার গর্ব করে লিখেছেন যে তিনি ইসরায়েলের রাজা মেনাহেমের কাছ থেকে এক হাজার ট্যালেন্ট রুপা আদায় করেছিলেন। প্রাচীন যুগে এই পরিমাণ রুপার মূল্য ছিল অকল্পনীয়। যদি কোনো রাজ্য এই কর দিতে ব্যর্থ হতো বা বিদ্রোহ করত, তখন অ্যাসিরীয়রা সরাসরি সেই রাজ্য দখল করে তাকে নিজেদের একটি প্রদেশে পরিণত করত এবং সেখানে নিজস্ব গভর্নর নিয়োগ দিত। তখন শুরু হতো সরাসরি কর আদায় বা ‘বিলতু’, যা ছিল আরও বেশি ভয়াবহ।
এই বিশাল পরিমাণ নজরানা শোধ করতে গিয়ে ইসরায়েলের রাজারা নিজেদের সাধারণ কৃষকদের ওপর চরম শোষণের স্টিম রোলার চালিয়েছিলেন। রাজা মেনাহেম এক হাজার ট্যালেন্ট রুপা জোগাড় করার জন্য রাজ্যের প্রত্যেক ধনী এবং সাধারণ কৃষকের ওপর মাথাপিছু বিশেষ কর আরোপ করেন। এর ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা এমনিতেই টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিল, তারা তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই ঋণের দায়ে নিজেদের জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয় এবং ভূমিদাসে পরিণত হয় (Cogan, 2001)। নবীদের ধর্মীয় প্রতিবাদের ভাষা, যা আমরা আগের ইতিহাস থেকে জানতে পারি, তার বাস্তব ভিত্তি ছিল মূলত এই অ্যাসিরীয় করব্যবস্থার পরোক্ষ চাপ। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছিল না যে কেন তাদের এত কষ্ট করে ফলানো ফসল রাজারা কেড়ে নিচ্ছেন। তারা রাজাদের দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করত। বাস্তবে রাজারা ছিলেন অ্যাসিরীয় শক্তির হাতের পুতুল, যারা নিজেদের গদি বাঁচাতে সাধারণ কৃষকের রক্ত নিংড়ে নিচ্ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদের এই অর্থনৈতিক চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে কীভাবে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেয়, ইসরায়েল তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক বিদ্রোহ (Internal Politics and Military Rebellions of Israel)
দ্বিতীয় জেরোবোয়ামের মৃত্যুর পর ইসরায়েল রাজ্যে যে স্থিতিশীলতা ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এরপর শুরু হয় এক চরম রাজনৈতিক অরাজকতা এবং ধারাবাহিক গুপ্তহত্যার যুগ। মাত্র বিশ বছরের ব্যবধানে ইসরায়েলের সিংহাসনে ছয়জন রাজা বসেন এবং তাদের মধ্যে চারজনই ক্ষমতা দখল করেছিলেন পূর্ববর্তী রাজাকে হত্যা করে। জাকারিয়া, শাল্লুম, মেনাহেম, পেকাহিয়া, পেকাহ এবং সবশেষে হোশিয়া – এই রাজাদের শাসনকাল ছিল মূলত সামরিক ক্যু এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের এক দীর্ঘ ইতিহাস। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মূলত বহিঃশত্রুর চাপের মুখে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ভেঙে পড়ার সুস্পষ্ট লক্ষণ। যখন কোনো দেশ বিশাল কোনো পরাশক্তির হুমকির মুখে থাকে, তখন দেশের ভেতরের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। রাজদরবার এবং সামরিক বাহিনী পরিষ্কারভাবে দুটি বিবদমান শিবিরে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়।
এই রাজনৈতিক বিভাজনের মূল কারণ ছিল অ্যাসিরিয়ার সাথে ইসরায়েল কী ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তা নিয়ে মতানৈক্য। রাজদরবারের একটি অংশ বিশ্বাস করত যে, অ্যাসিরিয়ার বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটা হবে আত্মঘাতী। তাদের মতে, বিপুল পরিমাণ কর দিয়ে হলেও অ্যাসিরিয়ার বশ্যতা স্বীকার করে টিকে থাকাটাই সবচেয়ে যৌক্তিক পথ। রাজা মেনাহেম এবং তার পুত্র পেকাহিয়া ছিলেন এই প্রো-অ্যাসিরীয় বা অ্যাসিরীয়-পন্থি শিবিরের নেতা। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশের ধারণা ছিল ভিন্ন। তারা মনে করত যে, এভাবে নিরন্তর কর দিতে থাকলে রাজ্যের অর্থনীতি এমনিতেই ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের দাবি ছিল মিশরের মতো পরাশক্তির সাথে সামরিক জোট গঠন করে অ্যাসিরিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ করা। সেনাপতি পেকাহ ছিলেন এই অ্যান্টি-অ্যাসিরীয় বা মিশর-পন্থি শিবিরের মূল হোতা। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা একে ভৌগোলিক নির্ধারণবাদ (Geographical Determinism) দিয়ে ব্যাখ্যা করেন (Becking, 1992)। ইসরায়েলের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশর এবং উত্তর-পূর্বে অ্যাসিরিয়ার ঠিক মাঝখানে। দুটি সুপারপাওয়ারের মাঝখানে বাফার স্টেট বা বাফার রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার চেষ্টা করতে গিয়েই তারা নিজেদের ভেতরে খণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল।
সিংহাসন দখলের এই খেলা চুড়ান্ত আকার ধারণ করে যখন সেনাপতি পেকাহ তার রাজা পেকাহিয়াকে রাজপ্রাসাদের ভেতরেই হত্যা করে নিজে সিংহাসনে বসেন। পেকাহ ক্ষমতা দখল করেই অ্যাসিরিয়াকে কর দেওয়া বন্ধ করে দেন এবং সরাসরি বিদ্রোহের ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত আবেগী এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাবিবর্জিত। একটি বিভক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্র নিয়ে সে যুগের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। ধর্মীয় লেখকরা এই রাজাদের ধারাবাহিক পতনকে তাদের ব্যক্তিগত পাপ বা ঈশ্বরবিমুখতার ফল হিসেবে প্রচার করেছেন। তারা ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন ইসরায়েলের নেতারা ধর্মীয় রীতিনীতি ঠিকমতো পালন করলে এই পতন ঠেকানো যেত। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো ধর্মীয় সমস্যা ছিল না। এটি ছিল মূলত ভুল বৈদেশিক নীতি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বুঝতে না পারার চরম ব্যর্থতা। রাজনীতিতে যখন বাস্তবতার চেয়ে আবেগ বড় হয়ে ওঠে, তখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের পতনও অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়।
সাইরো-ইফ্রাইমাইট যুদ্ধ ও রাজনৈতিক জোটের ব্যর্থতা (Syro-Ephraimite War and the Failure of Political Alliances)
অ্যাসিরিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ইসরায়েলের রাজা পেকাহ বুঝতে পেরেছিলেন যে একা এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। তিনি উত্তরের প্রতিবেশী রাষ্ট্র আরাম-দামেস্কের রাজা রেজিনের সাথে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গঠন করেন। তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল লেভান্টের সমস্ত ছোট রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করে অ্যাসিরিয়ার বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট তৈরি করা। এই উদ্দেশ্যে তারা দক্ষিণের জুদাহ রাজ্যের রাজা আহাজকেও তাদের জোটে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু রাজা আহাজ ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং সতর্ক একজন শাসক। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে অ্যাসিরিয়ার মতো এক দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে এই ধরনের জোটবদ্ধ বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই তিনি পেকাহ এবং রেজিনের প্রস্তাবে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। জুদাহর এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে পেকাহ এবং রেজিন তাদের সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে জুদাহ আক্রমণ করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল আহাজকে সিংহাসনচ্যুত করে সেখানে এমন একজন পুতুল রাজা বসানো, যে তাদের অ্যাসিরিয়াবিরোধী জোটে সমর্থন দেবে। ইতিহাসের পাতায় এই সংঘাতটি ‘সাইরো-ইফ্রাইমাইট যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
এই যুদ্ধটি প্রাচীন লেভান্টের ভূরাজনীতিতে এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পেকাহ এবং রেজিনের সেনাবাহিনী যখন জেরুজালেম অবরোধ করে, তখন কোণঠাসা রাজা আহাজ এক অপ্রত্যাশিত এবং সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মন্দির এবং রাজকোষের সমস্ত সোনা ও রুপা বের করে অ্যাসিরিয়ার রাজা তৃতীয় তিগলাথ-পিলেসারের কাছে পাঠান এবং তাকে জুদাহর রক্ষাকর্তা হিসেবে অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানান। এটি ছিল কূটনীতির এক চরম জুয়া খেলা। তিগলাথ-পিলেসার এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে লেভান্টে প্রবেশ করেন এবং আরাম-দামেস্ক গুঁড়িয়ে দেন। রাজা রেজিনকে হত্যা করা হয় এবং আরাম-দামেস্ক পরিণত হয় একটি অ্যাসিরীয় প্রদেশে। এরপর তিগলাথ-পিলেসার তার মনোযোগ ঘোরান ইসরায়েলের দিকে। তিনি ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা গালিলি এবং জর্ডান নদীর পূর্ব তীরের গিলাদ অঞ্চল দখল করে নেন। ওই অঞ্চলগুলোর বহু মানুষকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ইসরায়েলের সীমানা সংকুচিত হয়ে কেবল সামারিয়া শহরের আশেপাশে এসে ঠেকে (Younger, 1998)। পেকাহর এই রাজনৈতিক জোটের প্রচেষ্টা ইসরায়েলকে শক্তিশালী করার বদলে উল্টো রাজ্যটির অর্ধেক ভূখণ্ড চিরতরে কেড়ে নেয়।
এরপর ইসরায়েলের সিংহাসনে বসেন হোশিয়া, যিনি পেকাহকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। হোশিয়া শুরুতে অ্যাসিরিয়ার বশ্যতা মেনে নিয়েছিলেন এবং নিয়মিত কর দিচ্ছিলেন। কিন্তু কিছুকাল পর অ্যাসিরিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল হলে তিনি সুযোগ বুঝে বিদ্রোহ করে বসেন। এই বিদ্রোহের পেছনে তার মূল ভরসা ছিল মিশর। তিনি মিশরের ফারাওয়ের কাছে দূত পাঠিয়ে সামরিক সাহায্যের আবেদন করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা এই ধরনের নীতিকে ভারসাম্যহীন কূটনীতি (Unbalanced Diplomacy) বলে থাকেন। হোশিয়া বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন যে সেই সময়ে মিশর নিজেই চরম অভ্যন্তরীণ সংকটে ভুগছিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৈন্য পাঠানোর মতো অবস্থায় তারা ছিল না। মিশর থেকে কোনো সাহায্য তো আসেইনি, উল্টো হোশিয়ার এই বিদ্রোহের খবর অ্যাসিরিয়ার নতুন রাজা পঞ্চম শালমানেসারের কানে পৌঁছালে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। ধর্মীয় আখ্যানে ঈশ্বরের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার যে কথা বলা হয়, ইতিহাস তাকে আন্তর্জাতিক মিত্রতার এক চরম হিসাবের ভুল হিসেবেই চিহ্নিত করে। হোশিয়ার এই ভুল পদক্ষেপের কারণেই অ্যাসিরীয় বাহিনী চূড়ান্তভাবে ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার জন্য যাত্রা শুরু করে।
সামারিয়ার পতন ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ (Fall of Samaria and Archaeological Evidences)
অ্যাসিরীয় রাজা পঞ্চম শালমানেসার এক বিশাল এবং সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে ইসরায়েলের রাজধানী সামারিয়া অবরোধ করেন। সামারিয়া শহরটি রাজা ওম্রির আমলে অত্যন্ত দুর্গম একটি পাহাড়ের চূড়ায় নির্মাণ করা হয়েছিল এবং এর চারপাশের সুরক্ষাপ্রাচীর ছিল সে যুগের অন্যতম সেরা স্থাপত্য নিদর্শন। এই শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কারণেই শহরটি সহজে অ্যাসিরীয়দের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই অবরোধ চলতে থাকে। প্রাচীনকালের অবরোধ যুদ্ধগুলো ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। শহরের বাইরে থেকে খাবার বা জলের কোনো সরবরাহ ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হতো না। দীর্ঘদিনের অবরোধে সামারিয়ার ভেতরের মানুষের অবস্থা চরম শোচনীয় হয়ে ওঠে। খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ এবং মহামারিতে শহরের ভেতরের অসংখ্য মানুষ মারা যায়। এর মধ্যেও তারা মিশরের সাহায্যের আশায় প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই সাহায্য আর কখনোই এসে পৌঁছায়নি। ৭২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে সামারিয়ার পতন ঘটে এবং এর মধ্য দিয়ে উত্তরের ইসরায়েল রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্বের চূড়ান্ত অবসান হয়।
এই দীর্ঘ অবরোধ চলাকালীন সময়েই রাজা পঞ্চম শালমানেসারের মৃত্যু হয় এবং দ্বিতীয় সারগন অ্যাসিরিয়ার সিংহাসনে আরোহণ করেন। ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, দ্বিতীয় সারগনই মূলত সামারিয়ার পতনের কৃতিত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ইরাকের খোরসাবাদে সারগনের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া বেশ কয়েকটি মাটির প্রিজম বা শিলালিপিতে এই বিজয়ের বিস্তারিত বিবরণ খোদাই করা আছে। সারগনের নিজের জবানিতে লেখা এই শিলালিপিগুলোতে তিনি দাবি করেছেন, “আমি সামারিয়া অবরোধ করেছি এবং জয় করেছি। আমি ২৭,২৯০ জন অধিবাসীকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে ধরে নিয়ে এসেছি। আমি সেখান থেকে ৫০টি রথ আমার রাজকীয় বাহিনীর জন্য সংগ্রহ করেছি।” এই শিলালিপিগুলো হিব্রু বাইবেলের বর্ণনার পাশাপাশি এক বস্তুনিষ্ঠ সমান্তরাল ইতিহাস আমাদের সামনে হাজির করে (Oded, 1979)। ধর্মীয় গ্রন্থে যেখানে বলা হয়েছে যে ঈশ্বর রেগে গিয়ে ইসরায়েলকে ধ্বংস করেছেন, সারগনের লিপিগুলো সেখানে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সামরিক হিসাব-নিকাশ তুলে ধরে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননগুলো সামারিয়া এবং অন্যান্য উত্তরের শহরগুলোতে এই ধ্বংসলীলার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। মেগিদ্দো, হাতসোর এবং সামারিয়ার ধ্বংসাবশেষে অষ্টম শতাব্দীর শেষ দিকের এক বিশাল পোড়া মাটির স্তর বা ডেসট্রাকশন লেয়ার পাওয়া গেছে। এই স্তরটি প্রমাণ করে যে শহরগুলোকে দখল করার পর অ্যাসিরীয়রা সেখানে ব্যাপক লুটতরাজ চালায় এবং আগুন লাগিয়ে দেয়। তবে তারা শহরগুলোকে চিরতরে পরিত্যক্ত করে রাখেনি। সামারিয়া দখল করার পর সারগন সেখানে একটি নতুন প্রাদেশিক রাজধানী গড়ে তোলেন। তিনি ইসরায়েলের পুরনো প্রশাসনিক ভবনগুলো ভেঙে তার ওপর অ্যাসিরীয় রীতির বিশাল সব ইমারত নির্মাণ করেন। স্বাধীন ইসরায়েল রাজ্যটিকে অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে রূপান্তর করা হয়, যার নতুন নাম দেওয়া হয় ‘সামেরিনা‘। সেখানে একজন অ্যাসিরীয় গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয় এবং অ্যাসিরীয় করব্যবস্থা সরাসরি চালু করা হয়। মাটি খুঁড়ে বের করা এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় পতন কোনো ঐশ্বরিক ঘটনা নয়; এটি মূলত সামরিক এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের কাছে একটি দুর্বল ভূরাজনৈতিক সত্তার কাঠামোগত বিলুপ্তি।
নির্বাসন, জনসংখ্যা স্থানান্তর ও দশটি হারানো উপজাতির মিথ (Exile, Population Transfer and the Myth of the Ten Lost Tribes)
সামারিয়া দখলের পর অ্যাসিরীয়রা তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং কার্যকর কৌশলটি প্রয়োগ করে, যাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জনতাত্ত্বিক প্রকৌশল (Demographic Engineering) বলা হয়। কোনো বিদ্রোহী প্রদেশ যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেজন্য তারা স্থানীয় জনসংখ্যার এক বিশাল অংশকে জোরপূর্বক অন্য জায়গায় সরিয়ে নিত। এটি কোনো সাধারণ বন্দিশিবিরে আটকে রাখা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির শেকড় উপড়ে ফেলার সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান। সারগনের শিলালিপি এবং ঐতিহাসিক তথ্যমতে, সামারিয়া থেকে হাজার হাজার অভিজাত নাগরিক, সামরিক কর্মকর্তা, কারিগর এবং বুদ্ধিজীবীকে মেসোপটেমিয়া এবং দূরবর্তী মিডিয়ার (বর্তমান ইরান) বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাসিত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং স্থানীয় মাটির প্রতি তাদের টান পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া। একই সাথে, ব্যাবিলন, কুথা এবং অন্যান্য দখলকৃত অঞ্চল থেকে ভিনদেশি মানুষদের এনে সামারিয়ায় বসতি স্থাপন করতে বাধ্য করা হয়। এই দ্বিমুখী জনসংখ্যা স্থানান্তরের ফলে সামারিয়ার আদি জনতাত্ত্বিক চরিত্র চিরতরে বদলে যায়।
এই ভিনদেশি মানুষগুলোর সাথে স্থানীয় যে দরিদ্র ইসরায়েলীয় কৃষকরা সামারিয়ায় রয়ে গিয়েছিল, তাদের এক ব্যাপক মিশ্রণ ঘটে। নতুন আসা মানুষগুলো নিজেদের দেবদেবীর পাশাপাশি স্থানীয় দেবতা ইয়াহওয়েহ-র উপাসনাও শুরু করে। এই মিশ্র সমাজ থেকেই পরবর্তীতে ‘সামারিটান’ বা শোমরোনীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। দক্ষিণের জুদাহ রাজ্যের ধর্মীয় লেখকরা বাইবেলে এই সামারিটানদের অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখেছেন এবং তাদের ‘অপবিত্র’ বা ধর্মত্যাগী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তারা প্রচার করেছেন যে সামারিয়ার এই নতুন মানুষেরা আসলে প্রকৃত ইসরায়েলীয় নয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক এবং জিনগত ইতিহাস প্রমাণ করে যে, অ্যাসিরীয়রা সামারিয়ার সমস্ত মানুষকে নির্বাসিত করেনি; তারা মূলত অভিজাত শ্রেণীকে সরিয়েছিল। সাধারণ কৃষকদের একটি বিশাল অংশ নিজেদের জমিতেই রয়ে গিয়েছিল এবং তারা তাদের পুরনো ইসরায়েলীয় সংস্কৃতির অনেক কিছুই ধরে রেখেছিল। দক্ষিণের এই ঘৃণা মূলত ছিল ধর্মীয় বিশুদ্ধতার দোহাই দিয়ে একটি রাজনৈতিক এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অপচেষ্টা মাত্র।
সাম্প্রতিক আর্কিওজেনেটিক্স বা প্রাচীন ডিএনএ গবেষণা এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দক্ষিণ লেভান্টের ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগীয় মানবদেহাবশেষের জিনগত বিশ্লেষণ দেখায় যে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থানীয় ধারাবাহিকতা ছিল, যদিও বিভিন্ন সময়ে জাগ্রোস, ককেশাস এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জিনগত মিশ্রণও ঘটেছিল (Agranat-Tamir et al., 2020)। এর অর্থ, অ্যাসিরীয় বিজয়ের পর জনসংখ্যা স্থানান্তর ঘটলেও সামারিয়ার স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। আধুনিক সামারিটান জনগোষ্ঠীর জিনগত গবেষণাও দেখায় যে তাদের পিতৃসূত্রীয় বংশধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রাচীন ইসরায়েলীয়-ইহুদি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত, যদিও মাতৃসূত্রীয় ও সামগ্রিক জনসংখ্যাগত ইতিহাসে পরবর্তী মিশ্রণ ও দীর্ঘস্থায়ী অন্তর্বিবাহের প্রভাবও স্পষ্ট (Shen et al., 2004)। ফলে আর্কিওজেনেটিক প্রমাণ বাইবেলীয় “সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন” ধারণাকে দুর্বল করে এবং দেখায় যে অ্যাসিরীয় নীতির ফল ছিল সম্পূর্ণ জাতিগত বিলুপ্তি নয়, বরং স্থানীয় ধারাবাহিকতার ওপর নতুন জনসংখ্যাগত ও সাংস্কৃতিক স্তর যুক্ত হওয়া।
নির্বাসিত ইসরায়েলীয়দের কী হয়েছিল, তা নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে একটি রোমান্টিক মিথোলজি প্রচলিত আছে, যা ‘দশটি হারানো উপজাতি’ বা টেন লস্ট ট্রাইবস নামে পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দশটি উপজাতি পৃথিবীর কোনো এক অজানা প্রান্তে লুকিয়ে আছে এবং শেষ বিচারের দিন তারা আবার ফিরে আসবে। কিন্তু ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞান এই রহস্যময় অন্তর্ধানের এক অত্যন্ত বস্তুবাদী এবং বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়। নির্বাসিত ইসরায়েলীয়রা মিডিয়া বা মেসোপটেমিয়ার বিশাল সমাজে গিয়ে আলাদা কোনো দ্বীপের মতো বসবাস করেনি। কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল (Dalley, 1985)। তারা অ্যাসিরীয় ভাষা গ্রহণ করেছিল, স্থানীয় মানুষদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল এবং ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। সমাজবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াটিকে অ্যাসিমিলেশন বা আত্মীকরণ (Assimilation) বলা হয়। তারা আকাশে মিলিয়ে যায়নি বা জাদুর বলে হারিয়ে যায়নি; তারা কেবল একটি বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর ভেতরে নিজেদের স্বাধীন সত্তা বিলীন করে দিয়েছিল। ধর্মীয় পুরাণ যেখানে অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখায়, ইতিহাস সেখানে অত্যন্ত নির্মমভাবে জাতিগত আত্মীকরণের বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
ব্যাবিলনীয় বিজয় ও জুদাহর পতন (Babylonian Conquest and Fall of Judah): নির্বাসনের শুরু
নিও-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও লেভান্টের ভূরাজনীতি (Rise of the Neo-Babylonian Empire and Geopolitics of the Levant)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে সপ্তম খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষভাগটি ছিল এক চরম রাজনৈতিক পালাবদলের সময়। দীর্ঘকাল ধরে পুরো নিকট প্রাচ্যকে ভয়াবহ সামরিক ত্রাসে শাসন করা নিও-অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য তখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছিল। অ্যাসিরিয়ার এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাংশে ব্যাবিলন শহরকে কেন্দ্র করে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটে, যা ইতিহাসে নিও-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য নামে পরিচিত। রাজা নাবোপোলাসার এবং পরবর্তীতে তার পুত্র দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের নেতৃত্বে ব্যাবিলনীয়রা মেদীয়দের সাথে জোট বেঁধে ৬১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যাসিরিয়ার রাজধানী নিনেভে ধ্বংস করে দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষমতার পালাবদল তত্ত্ব (Power Transition Theory) অনুযায়ী, যখন একটি আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য নতুন শক্তিগুলোর মধ্যে এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অ্যাসিরিয়ার পতনের পর লেভান্টের উর্বর ভূখণ্ড এবং ভূমধ্যসাগরের লাভজনক বাণিজ্যপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ব্যাবিলন এবং মিশরের মধ্যে শুরু হয় এক নতুন ভূরাজনৈতিক লড়াই। লেভান্টের ছোট রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণের জুদাহ রাজ্য, এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে পড়ে এক চরম অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত হয়।
জুদাহ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই সময়ে বেশ নাজুক হয়ে পড়েছিল। রাজা জোসিয়াহর শাসনামলে জুদাহ কিছুটা স্বাধীন এবং স্থিতিশীল একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠলেও, ৬০৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেগিদ্দোর যুদ্ধে মিশরের ফারাও দ্বিতীয় নেকোর হাতে জোসিয়াহর মৃত্যু পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। ফারাও নেকো মূলত অ্যাসিরিয়ার অবশিষ্টাংশকে সাহায্য করার জন্য উত্তর দিকে যাচ্ছিলেন, কারণ মিশর চাইছিল না যে ব্যাবিলন খুব বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠুক। জোসিয়াহ মিশরের সেই সামরিক অগ্রগতি ঠেকানোর চেষ্টা করতে গিয়েই প্রাণ হারান। জোসিয়াহর মৃত্যুর পর জুদাহ রাজ্যটি মূলত একটি বাফার স্টেট (Buffer State) বা দুই বৃহৎ শক্তির মাঝখানের একটি ক্রীড়নকে পরিণত হয়। ফারাও নেকো জোসিয়াহর পুত্র জেহোয়াহাজকে সরিয়ে দিয়ে আরেক পুত্র জেহোয়াকিমকে জুদাহর পুতুল রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসান। জেহোয়াকিমকে সিংহাসনে টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে মিশর জুদাহর ওপর বিপুল পরিমাণ কর আরোপ করে। এই কর মেটাতে গিয়ে জুদাহর সাধারণ কৃষকদের ওপর ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়, যা রাজ্যের ভেতরে এক গভীর সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দেয়।
ভূরাজনৈতিক এই সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে যায় ৬০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কারকেমিশের বিখ্যাত যুদ্ধের মাধ্যমে। সিরিয়ার কারকেমিশ প্রান্তরে দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের নেতৃত্বাধীন ব্যাবিলনীয় বাহিনী মিশরীয়দের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এই যুদ্ধের পর লেভান্ট অঞ্চল থেকে মিশরের প্রভাব কার্যত মুছে যায় এবং ব্যাবিলন এই অঞ্চলের নিরঙ্কুশ অধিপতি হিসেবে আবির্ভূত হয় (Lipschits, 2005)। কারকেমিশের যুদ্ধের পর নেবুচাদনেজার তার সামরিক বাহিনী নিয়ে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন এবং লেভান্টের অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি জুদাহকেও ব্যাবিলনের বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য করেন। রাজা জেহোয়াকিম বাধ্য হয়ে মিশরের আনুগত্য ত্যাগ করে ব্যাবিলনকে নিয়মিত কর প্রদানের চুক্তি করেন। প্রাচীন পৃথিবীর এই রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রমাণ করে যে ছোট রাষ্ট্রগুলোর আসলে কোনো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি থাকে না; তাদের টিকে থাকা নির্ভর করে বৃহৎ শক্তিগুলোর দয়ার ওপর। জুদাহর রাজারা এই রূঢ় বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং বারবার ভুল পরাশক্তির ওপর বাজি ধরে পুরো জাতিকে এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।
জুদাহর দোদুল্যমান কূটনীতি ও মিশরের প্ররোচনা (Vacillating Diplomacy of Judah and Egyptian Instigation)
ব্যাবিলনের বশ্যতা মেনে নিলেও রাজা জেহোয়াকিম কখনোই মনে প্রাণে নেবুচাদনেজারের প্রতি অনুগত ছিলেন না। তার রাজদরবার পরিষ্কারভাবে দুটি রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একটি শিবির ছিল ব্যাবিলন-পন্থি, যারা মনে করত ব্যাবিলনের বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হবে স্রেফ আত্মহত্যার শামিল। আরেকটি শিবির ছিল মিশর-পন্থি, যারা ক্রমাগত রাজাকে প্ররোচিত করছিল ব্যাবিলনকে কর দেওয়া বন্ধ করে মিশরের সাথে সামরিক জোট গঠন করার জন্য। এই ধরনের উপনিবেশিক করব্যবস্থা (Colonial Taxation System) জুদাহর অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। রাজাকে নিজের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রা ঠিক রাখতে এবং ব্যাবিলনের কর মেটাতে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যন্ত কঠোরভাবে রাজস্ব আদায় করতে হতো। গ্রামের সাধারণ কৃষকরা নিজেদের আবাদ করা ফসলের সামান্য অংশই ঘরে তুলতে পারত, বাকিটা চলে যেত রাজকোষে। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মিশর-পন্থি অভিজাতরা রাজদরবারে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
মিশর সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে লেভান্টের রাষ্ট্রগুলোকে ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিল। ফারাওরা জুদাহর রাজাদের বারবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন যে তারা যদি ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তবে মিশর তাদের শক্তিশালী রথ এবং পদাতিক বাহিনী দিয়ে সাহায্য করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা একে রাজনৈতিক বাস্তববাদ (Political Realism)-এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে দেখেন, যেখানে একটি বড় রাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ছোট রাষ্ট্রগুলোকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করে। মিশরের এই ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে ভুলে রাজা জেহোয়াকিম ৬০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এক মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল করে বসেন। ওই বছর ব্যাবিলনীয় বাহিনী মিশরের সীমান্তে আক্রমণ করতে গিয়ে বেশ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং নেবুচাদনেজার বাধ্য হয়ে নিজের সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের জন্য ব্যাবিলনে ফিরে যান। এই সাময়িক পিছু হটাকে জেহোয়াকিম ব্যাবিলনের চূড়ান্ত দুর্বলতা ভেবে বসেন এবং ব্যাবিলনকে বাৎসরিক কর দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেন।
জেহোয়াকিমের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। নেবুচাদনেজার তাৎক্ষণিকভাবে জুদাহ আক্রমণ করার মতো অবস্থায় না থাকলেও, তিনি জুদাহকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এক ভিন্ন কৌশল বেছে নেন। তিনি আরামীয়, মোয়াবীয় এবং আম্মনীয়দের নিয়ে গঠিত কিছু ছোট ছোট অনুগত সেনাদলকে জুদাহর সীমানায় লেলিয়ে দেন। এই সেনাদলগুলো জুদাহর গ্রামগুলোতে ক্রমাগত গেরিলা আক্রমণ চালাতে থাকে, ফসল জ্বালিয়ে দেয় এবং অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করে ফেলে। এই ছোটখাটো আক্রমণগুলো ছিল মূলত নেবুচাদনেজারের মূল সেনাবাহিনী আসার আগের একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ধর্মীয় মিথোলজিতে বলা হয় ঈশ্বর জুদাহকে ধ্বংস করার জন্য এই জাতিগুলোকে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো এটি ছিল ব্যাবিলনীয়দের অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এক সামরিক কৌশল। নেবুচাদনেজার চাইছিলেন মূল আক্রমণ করার আগেই জুদাহ যেন অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। তিন বছর ধরে চলা এই গেরিলা আক্রমণের ফলে জুদাহর সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করে এবং রাজদরবারের ভেতরেও চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
প্রথম ব্যাবিলনীয় অবরোধ ও রাজা জেহোয়াকিনের নির্বাসন (First Babylonian Siege and the Exile of King Jehoiachin)
৫৯৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নেবুচাদনেজার তার পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তি নিয়ে জেরুজালেম অবরোধ করার জন্য অগ্রসর হন। প্রাচীন ইতিহাসে ব্যাবিলনীয়দের এই অভিযানের কথা খুব স্পষ্টভাবে লেখা আছে। বিখ্যাত ব্যাবিলনীয় ক্রনিকল (Babylonian Chronicles) নামক মাটির শিলালিপিতে নেবুচাদনেজারের নিজের জবানিতে এই অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় (Wiseman, 1956)। ওই শিলালিপিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, নেবুচাদনেজার তার রাজত্বের সপ্তম বছরে চিসলেভ মাসে সৈন্যবাহিনী নিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আসেন এবং জুদাহর শহর অবরোধ করেন। ঠিক এই অবরোধ শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে রাজা জেহোয়াকিমের হঠাৎ মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল নাকি ব্যাবিলনের রোষ থেকে বাঁচার জন্য তাকে প্রাসাদের ভেতরেই কেউ হত্যা করেছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র আঠারো বছর বয়সী জেহোয়াকিন জুদাহর সিংহাসনে বসেন। এক বিশাল এবং অপ্রতিরোধ্য ব্যাবিলনীয় বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে এই তরুণ রাজার আসলে করার মতো কিছুই ছিল না।
অবরোধের মাত্র তিন মাসের মাথায় রাজা জেহোয়াকিন বুঝতে পারেন যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ অর্থহীন। মিশরের যে সামরিক সাহায্যের আশায় তার পিতা বিদ্রোহ করেছিলেন, সেই সাহায্য কখনোই এসে পৌঁছায়নি। শহরকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে জেহোয়াকিন তার মা, রাজপরিবারের সদস্য এবং রাজদরবারের মন্ত্রীদের নিয়ে শহরের বাইরে এসে নেবুচাদনেজারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। নেবুচাদনেজার শহরটি পুড়িয়ে দেননি ঠিকই, কিন্তু তিনি এমন একটি পদক্ষেপ নেন যা জুদাহর রাজনৈতিক মেরুদণ্ডকে চিরতরে ভেঙে দেয়। তিনি জুদাহর রাজপরিবার, সামরিক কর্মকর্তা, ধনী বণিক, দক্ষ কামার এবং স্থপতিসহ প্রায় দশ হাজার মানুষকে বন্দি করে ব্যাবিলনে নিয়ে যান। সমাজবিজ্ঞানে এই কৌশলটিকে অভিজাতদের নির্বাসন (Deportation of the Elite) বলা হয়। ব্যাবিলনীয়দের উদ্দেশ্য ছিল জুদাহ সমাজ থেকে এমন সব মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, যাদের মেধা, সম্পদ বা নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে। ফলে সেখানে আর কখনোই শক্তিশালী কোনো বিদ্রোহ দানা বাঁধতে পারবে না।
নেবুচাদনেজার শুধু মানুষই নিয়ে যাননি, তিনি জেরুজালেমের মন্দির এবং রাজপ্রাসাদের সমস্ত মূল্যবান সম্পদ, সোনা এবং রুপার পাত্রগুলো লুট করে ব্যাবিলনে পাঠিয়ে দেন। এই লুণ্ঠন কোনো ধর্মীয় অবমাননা ছিল না; এটি ছিল প্রাচীন যুদ্ধের সাধারণ অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রথা। জেহোয়াকিনকে বন্দি করার পর নেবুচাদনেজার তার আংকল মাত্তানিয়াহকে জুদাহর নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসান এবং তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন সিদিকিয়া। নতুন নাম রাখার অর্থ হলো সিদিকিয়া এখন আর স্বাধীন কেউ নন, তিনি পুরোপুরি ব্যাবিলনীয় সম্রাটের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছেন। প্রথম এই নির্বাসনের ফলে জুদাহর অর্থনীতি এবং প্রশাসন এক বিশাল শূন্যতার মুখে পড়ে। দক্ষ কারিগর এবং শিক্ষিত আমলাদের হারিয়ে রাজ্যটি একটি পঙ্গু এবং মেধা-শূন্য সমাজে পরিণত হয়। যারা জেরুজালেমে থেকে গিয়েছিল, তারা ছিল মূলত সাধারণ এবং দরিদ্র কৃষক, যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। এই কাঠামোগত পঙ্গুত্বই মূলত জুদাহকে তার চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।
সিদিকিয়ার বিদ্রোহ ও জেরুজালেমের চূড়ান্ত অবরোধ (Rebellion of Zedekiah and the Final Siege of Jerusalem)
রাজা সিদিকিয়ার শাসনকাল শুরু হয়েছিল এক চরম অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বৈধতার সংকটের মধ্য দিয়ে। তিনি যদিও নেবুচাদনেজারের দ্বারা নিযুক্ত রাজা ছিলেন, কিন্তু জুদাহর সাধারণ মানুষ এবং নির্বাসনে থাকা অভিজাতরা তাকে কখনোই সত্যিকারের রাজা হিসেবে মেনে নেয়নি। তাদের চোখে ব্যাবিলনে বন্দি থাকা জেহোয়াকিনই ছিলেন জুদাহর একমাত্র বৈধ শাসক। এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সিদিকিয়াকে সারাক্ষণ এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগত। রাজদরবারে যে নতুন এবং অনভিজ্ঞ অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল, তারা ছিল চরম মাত্রায় জাতীয়তাবাদী এবং হঠকারী। তারা সিদিকিয়াকে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছিল ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য। এই নব্য অভিজাতরা বিশ্বাস করত যে, জেরুজালেমের মন্দির যেহেতু ঈশ্বরের বাসস্থান, তাই এই শহরের কখনোই পতন হবে না। ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস এবং অতি-জাতীয়তাবাদের এই মারাত্মক সংমিশ্রণ রাজদরবারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি অন্ধ করে দিয়েছিল।
৫৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরে নতুন ফারাও হোফরা (অ্যাপ্রিস) ক্ষমতায় এলে লেভান্টের ভূরাজনীতিতে আবার চাঞ্চল্য তৈরি হয়। হোফরা আগের ফারাওদের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী ছিলেন এবং তিনি লেভান্টে মিশরের হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। তিনি সিদিকিয়াকে বিপুল সামরিক সাহায্য এবং ঘোড়া পাঠানোর জোরালো প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যদিকে জেরেমিয়াহর মতো বাস্তববাদী সামাজিক পর্যবেক্ষকরা রাজাকে বারবার সতর্ক করছিলেন যে, ব্যাবিলনের জোয়াল মেনে নেওয়া ছাড়া জুদাহর বাঁচার আর কোনো পথ নেই। তারা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে মিশরের প্রতিশ্রুতি আসলে একটি ফাঁদ মাত্র। কিন্তু সিদিকিয়া এই বাস্তববাদী কথাগুলো শোনার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না। দেশপ্রেম এবং ধর্মীয় আবেগের কাছে যুক্তির পরাজয় ঘটে। ৫৮৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিদিকিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাবিলনকে কর দেওয়া বন্ধ করেন এবং মিশরের সাথে সামরিক জোটে যোগ দেন। এই খবর ব্যাবিলনে পৌঁছানো মাত্রই নেবুচাদনেজার তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য লেভান্টের দিকে যাত্রা করেন।
নেবুচাদনেজার এবার আর কোনো ক্ষমার সুযোগ রাখেননি। তিনি পুরো জুদাহ রাজ্য জুড়ে এক ভয়াবহ সামরিক অভিযান চালান। জুদাহর সুরক্ষিত শহরগুলো একের পর এক ব্যাবিলনীয়দের হাতে পতন হতে থাকে। সবশেষে ব্যাবিলনীয় বাহিনী জেরুজালেম শহরটিকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। প্রাচীন যুগের অবরোধ যুদ্ধকৌশল (Siege Warfare Tactics) ছিল অত্যন্ত নির্মম। শহরের চারপাশে পরিখা খনন করে এবং উঁচু দেয়াল তুলে বাইরের পৃথিবীর সাথে এর সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। শহরের ভেতরে খাদ্য এবং পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। মাসের পর মাস চলা এই অবরোধের ফলে জেরুজালেমের ভেতরের পরিস্থিতি এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়। মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় মৃত পশুর মাংস থেকে শুরু করে নিজেদের সন্তানদের মাংস পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয় বলে ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ আছে (Oded, 1977)। শহরের ভেতরে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যেও ধর্মান্ধ একটি গোষ্ঠী বিশ্বাস করছিল যে শেষ মুহূর্তে কোনো অলৌকিক শক্তি এসে ব্যাবিলনীয়দের ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু ইতিহাস এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো অলৌকিকতার স্থান নেই; সেখানে জয়লাভ করে কেবল সামরিক শক্তি এবং উন্নত প্রযুক্তি।
জেরুজালেমের পতন, মন্দির ধ্বংস ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ (Fall of Jerusalem, Destruction of the Temple and Archaeological Evidence)
দীর্ঘ আঠারো মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী অবরোধের পর ৫৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে (কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে ৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) ব্যাবিলনীয় বাহিনী জেরুজালেমের দেয়াল ভেঙে শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। যখন শহরের পতন নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন রাজা সিদিকিয়া তার কিছু অনুগত সৈন্য নিয়ে রাতের অন্ধকারে শহর থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যাবিলনীয় সৈন্যরা তাকে ধাওয়া করে জেরিকোর সমভূমিতে বন্দি করে। সিদিকিয়াকে শেকল পরিয়ে সিরিয়ার রিবলাহ নামক স্থানে নেবুচাদনেজারের সামনে হাজির করা হয়। নেবুচাদনেজার এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য সিদিকিয়াকে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক এবং শারীরিক শাস্তি দেন। সিদিকিয়ার চোখের সামনে তার সব পুত্রকে হত্যা করা হয়, এবং তারপর তার দুই চোখ অন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্ধ অবস্থায় তাকে শেকল পরিয়ে ব্যাবিলনে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে শেষ জীবনে কারাগারেই তার মৃত্যু ঘটে। এই নির্মম শাস্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরো লেভান্টকে একটি বার্তা দেওয়া যে, ব্যাবিলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
সিদিকিয়াকে বন্দি করার এক মাস পর নেবুচাদনেজারের প্রধান সেনাপতি নেবুজারাদান জেরুজালেমে প্রবেশ করেন এবং শহরটিকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করার কাজ শুরু করেন। তিনি সলোমনের তৈরি বিখ্যাত প্রথম মন্দির, রাজপ্রাসাদ এবং শহরের সমস্ত বড় বড় অট্টালিকায় আগুন লাগিয়ে দেন। শহরের সুরক্ষাপ্রাচীরগুলো পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে এই শহর আর কখনোই সামরিক দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করা না যায়। ধর্মীয় গ্রন্থে মন্দিরের এই ধ্বংসকে ঈশ্বরের ইচ্ছা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও, এটি ছিল মূলত ব্যাবিলনীয়দের একটি অত্যন্ত যৌক্তিক সামরিক সিদ্ধান্ত। মন্দির ছিল জুদাহর জাতীয়তাবাদ এবং বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র। এই কেন্দ্রটিকে ধ্বংস করার মাধ্যমেই তারা মূলত জুদাহর রাজনৈতিক অস্তিত্বকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এই ধ্বংসলীলার অকাট্য প্রমাণ হাজির করে। জেরুজালেমের ‘সিটি অব ডেভিড’ এলাকায় খনন করে একটি পুরু ছাইয়ের স্তর পাওয়া গেছে, যা আর্কিওলজিতে ধ্বংসাবশেষ স্তর (Destruction Layer) নামে পরিচিত। সেখানে পুড়ে যাওয়া কাঠ, ভাঙা পাত্র এবং প্রচুর মাটির সিলমোহর বা বুলা পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে শহরটি এক বিশাল এবং ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়েছিল (Shiloh, 1984)।
জেরুজালেমের পতনের ঠিক আগের মুহূর্তের ইতিহাস জানা যায় ‘লাখিশ লেটারস’ বা লাখিশের চিঠিগুলো থেকে। লাখিশ ছিল জেরুজালেমের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত জুদাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম দুর্গনগরী। ১৯৩০-এর দশকে লাখিশে খনন করে বেশ কিছু মাটির টুকরো বা অস্ট্রাকা পাওয়া যায়, যেগুলোতে প্রাচীন হিব্রু লিপিতে সামরিক বার্তা লেখা ছিল। এই চিঠিগুলো মূলত জুদাহর বিভিন্ন সামরিক ফাঁড়ির কমান্ডারদের মধ্যে আদান-প্রদান করা হয়েছিল। একটি চিঠিতে অত্যন্ত করুণ সুরে লেখা আছে, “আমরা লাখিশের সংকেত আগুনের দিকে তাকিয়ে আছি… কারণ আমরা আর আজেকার সংকেত দেখতে পাচ্ছি না।” আজেকা ছিল পার্শ্ববর্তী আরেকটি দুর্গ। এই চিঠিটি প্রমাণ করে যে জুদাহর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল এবং একের পর এক শহরের পতন ঘটছিল। এই লাখিশ অস্ট্রাকাগুলো ধর্মীয় বা সম্পাদনামূলক কোনো ফিল্টার ছাড়াই আমাদের সরাসরি সেই যুদ্ধের ভয়াবহতার চিত্র দেখায় (Torczyner, 1938)। এটি প্রমাণ করে যে জেরুজালেমের পতন কোনো মিথোলজি ছিল না; এটি ছিল একটি পরাশক্তির সামরিক আগ্রাসনের নিচে চাপা পড়া এক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের চরম বস্তুবাদী ধ্বংসের ইতিহাস।
ব্যাবিলনীয় নির্বাসন ও জুদাহর জনতাত্ত্বিক শূন্যতা (Babylonian Exile and the Demographic Void of Judah)
জেরুজালেম ধ্বংস করার পর ব্যাবিলনীয়রা দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় নির্বাসন অভিযান চালায়। শহরের যারা বেঁচে ছিল, তাদের বেশিরভাগকেই বন্দি করে মেসোপটেমিয়ার দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ব্যাবিলনীয়রা জুদাহকে পুরোপুরি জনশূন্য করে দেয়নি। তারা রাজ্যের সবচেয়ে দরিদ্র এবং ভূমিহীন কৃষকদের (যাদের ‘আম হা-আরেৎজ’ বলা হতো) জুদাহর গ্রামগুলোতে রেখে যায়। এই কৃষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয় পরিত্যক্ত জমি এবং আঙুর খেতগুলো চাষাবাদ করার জন্য, যাতে সেখান থেকে ব্যাবিলনীয়রা নিয়মিত কর আদায় করতে পারে। পরবর্তীতে ধর্মীয় লেখকরা এই ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন জুদাহ পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল, যা একাডেমিকভাবে জনতাত্ত্বিক শূন্যতা মিথ (Myth of the Empty Land) নামে পরিচিত। লেখকরা এই মিথ তৈরি করেছিলেন মূলত এই প্রমাণ করার জন্য যে, নির্বাসনে যাওয়া লোকেরাই কেবল খাঁটি ইসরায়েলীয় এবং তাদের অনুপস্থিতিতে পুরো দেশ বিরান পড়ে ছিল (Barstad, 1996)। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব প্রমাণ করে যে, জুদাহর জনসংখ্যা কমে গেলেও গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং কৃষি অর্থনীতি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়নি।
ব্যাবিলনীয়রা জুদাহকে একটি নিজস্ব প্রদেশ হিসেবে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করেছিল। তারা গেদালিয়া নামের এক জুদাহর স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে এই নতুন প্রদেশের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। গেদালিয়া ছিলেন একজন বাস্তববাদী মানুষ, যিনি মিজপাহ নামক স্থানে তার রাজধানী স্থাপন করে সাধারণ কৃষকদের নিয়ে সমাজ পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন। কিন্তু কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, যারা রাজপরিবারের সাথে যুক্ত ছিল, তারা ব্যাবিলনের এই পুতুল সরকারকে মেনে নিতে পারেনি। ইশমায়েল নামের এক রাজকীয় বংশধরের নেতৃত্বে একদল ঘাতক গেদালিয়াকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে জুদাহর অবশিষ্ট প্রশাসনও পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ব্যাবিলনীয়রা এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারে, এই ভয়ে অবশিষ্ট জুদাহর মানুষদের একটি বড় অংশ পালিয়ে মিশরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। গেদালিয়ার মৃত্যুর মাধ্যমেই মূলত লেভান্টে প্রাচীন জুদাহ রাজ্যের রাজনৈতিক অস্তিত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, যারা ব্যাবিলনে নির্বাসিত হয়েছিল, তাদের জীবনযাত্রা প্রাচীন যুগের অন্যান্য বন্দিদের মতো ততটা অমানবিক ছিল না। ব্যাবিলনীয়রা তাদের কারাগারে আটকে রাখেনি, বরং তাদের নিপ্পুর এবং চেবার খালের আশেপাশের বিভিন্ন কৃষিজমিতে বসতি স্থাপন করতে দিয়েছিল। সম্প্রতি আবিষ্কৃত আল-য়াহুদু ট্যাবলেট (Al-Yahudu Tablets) নামক মাটির শিলালিপিগুলো থেকে ব্যাবিলনে বসবাসকারী এই নির্বাসিতদের দৈনন্দিন জীবনের চমৎকার চিত্র পাওয়া যায় (Pearce & Wunsch, 2014)। এই শিলালিপিগুলো প্রমাণ করে যে নির্বাসিত জুদাহর মানুষেরা সেখানে কৃষিকাজ করত, বাড়ি কিনত, ব্যবসা করত এবং ব্যাবিলনীয় প্রশাসনের অধীনে সরকারি চাকরিও করত। তারা অর্থনৈতিকভাবে বেশ সচ্ছল হয়ে উঠেছিল। তবে এই ভিনদেশি সংস্কৃতিতে টিকে থাকতে গিয়ে তাদের অনেকেই সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ (Cultural Assimilation)-এর শিকার হয়। তারা ব্যাবিলনীয় নাম গ্রহণ করে এবং আরামীয় ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। মন্দির এবং রাষ্ট্র হারিয়ে এই নির্বাসিত মানুষগুলো নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্মকে একটি নির্দিষ্ট জায়গার গণ্ডি থেকে বের করে লিখিত গ্রন্থের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। এই নির্বাসনই মূলত তাদের প্রাচীন উপজাতীয় বিশ্বাসকে একটি বিশ্বজনীন এবং গ্রন্থভিত্তিক ধর্মে রূপান্তরিত করার সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল।
নির্বাসন, প্রত্যাবর্তন ও স্বাধীন জুদিয়ার উত্থান (Exile, Return and the Rise of Independent Judea): সাম্রাজ্য থেকে স্বশাসনে
ব্যাবিলনীয় নির্বাসন ও ইহুদি পরিচয়ের পুনর্গঠন (Babylonian Exile and Jewish Identity): জাতিস্মৃতির রূপান্তর
নির্বাসিত জীবন ও ব্যাবিলনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা (Exiled Life and the Socio-Economic Reality of Babylon)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ৫৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের জেরুজালেম ধ্বংস এবং তৎপরবর্তী ব্যাবিলনীয় নির্বাসন এক অসামান্য বাঁক বদলের সূচনা করে। ধর্মীয় মিথোলজি এবং শিল্পকলাগুলোতে এই নির্বাসিত জীবনকে প্রায়শই শেকল পরা দাসত্ব, চাবুকের আঘাত এবং চরম অমানবিক নির্যাতনের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্তোত্রগুলোতে লেখা হয়েছে ব্যাবিলনের নদীর তীরে বসে নির্বাসিত মানুষের কান্নার কথা। কিন্তু আধুনিক ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্ব আমাদের সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা হাজির করে। ব্যাবিলন কোনো বিশাল বন্দিশিবির ছিল না; এটি ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় এবং কসমোপলিটান এক মহানগরী। জুদাহ থেকে যাদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তারা মূলত সমাজের শিক্ষিত আমলা, ধনী বণিক, দক্ষ কারিগর এবং রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন। নেবুচাদনেজারের মতো একজন বিচক্ষণ সম্রাট এই বিপুল সংখ্যক মেধাবী এবং দক্ষ মানুষকে খাঁচায় বন্দি করে রাখার মতো বোকামি করেননি। তিনি তাদের ব্যাবিলনের অর্থনীতিতে যুক্ত করে সাম্রাজ্যের উৎপাদন বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
নির্বাসিত এই মানুষগুলোকে মূলত নিপ্পুর শহরের আশেপাশে এবং চেবার খালের তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এই অঞ্চলগুলো ছিল মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে উর্বর কৃষিজমিগুলোর অংশ। সম্প্রতি আবিষ্কৃত আল-য়াহুদু ট্যাবলেট (Al-Yahudu Tablets) নামক মাটির শিলালিপিগুলো নির্বাসিত জীবনের এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। এই শিলালিপিগুলো মূলত প্রাচীন ব্যাবিলনের করণিকদের লেখা বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি, জমির ইজারা এবং কর প্রদানের রসিদ। সেখান থেকে জানা যায় যে, জুদাহর নির্বাসিত মানুষেরা সেখানে স্বাধীনভাবে কৃষিকাজ করত, বাড়ি কিনত, ব্যবসা পরিচালনা করত এবং ব্যাবিলনীয় প্রশাসনের অধীনে সরকারি চাকরিও করত। কয়েক দশকের মধ্যেই তাদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে প্রবল সচ্ছলতা অর্জন করেছিল। তারা ব্যাবিলনের খালের জল ব্যবহার করে খেজুর, যব এবং গমের বিশাল সব খামার গড়ে তুলেছিল। অর্থনৈতিকভাবে তারা জুদাহর সেই রুক্ষ পাহাড়ি জীবনের চেয়ে ব্যাবিলনের এই সমতল কৃষিজমিতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল (Albertz, 2003)।
অর্থনৈতিক এই স্বাধীনতার পাশাপাশি তাদের সামনে একটি বড় সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। ব্যাবিলনের জাঁকজমকপূর্ণ সংস্কৃতি, আকাশচুম্বী জিগুরাত (মন্দির), বিশাল বাজার এবং বহুজাতিক জীবনযাত্রা তাদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করছিল। একটি ছোট এবং প্রান্তিক পাহাড়ি রাজ্য থেকে আসা মানুষদের জন্য এই বিশাল সাম্রাজ্যের চাকচিক্য এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব ছিল। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এই পরিস্থিতিকে সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ (Cultural Assimilation) বলা হয়। স্বাভাবিকভাবেই জুদাহর অনেক মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের প্রাচীন পরিচয় ভুলে ব্যাবিলনীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে যেতে শুরু করে। তারা তাদের সন্তানদের ব্যাবিলনীয় নাম রাখতে শুরু করে; যেমন বাইবেলে উল্লিখিত জেরুব্বাবেল বা মোর্দেকাই নামগুলো পুরোপুরি ব্যাবিলনীয় নাম। তারা আরামীয় ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, যা ছিল সে যুগের আন্তর্জাতিক ভাষা। এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আত্তীকরণের কারণেই পরবর্তীতে যখন দেশে ফেরার সুযোগ আসে, তখন নির্বাসিতদের একটি বিশাল অংশ ব্যাবিলনের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে জুদাহর ধ্বংসস্তূপে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এই নির্বাসন কোনো দাসত্বের গল্প ছিল না, বরং এটি ছিল একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বিশ্বজনীন সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার অত্যন্ত বাস্তববাদী গল্প।
ধর্মীয় সংকটের মনস্তত্ত্ব ও থিওডিসি (Psychology of Religious Crisis and Theodicy)
জেরুজালেমের পতন এবং মন্দির ধ্বংসের ঘটনাটি নির্বাসিত মানুষদের কেবল ভৌগোলিকভাবেই বাস্তুচ্যুত করেনি, বরং তাদের এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছিল। প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে, প্রতিটি জাতির নিজস্ব একজন রক্ষাকর্তা দেবতা থাকে। যখন দুটি জাতির মধ্যে যুদ্ধ হয়, তখন মূলত তাদের দেবতাদের মধ্যেই লড়াই চলে। জেরুজালেমের পতন এবং তাদের দেবতা ইয়াহওয়েহর নিজস্ব মন্দির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মানে সে যুগের চিন্তাধারায় একটাই ছিল – ব্যাবিলনের প্রধান দেবতা মারদুক জুদাহর দেবতা ইয়াহওয়েহকে পরাজিত করেছেন। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট (Epistemological Crisis) জুদাহর ধর্মীয় পরিচয়কে পুরোপুরি মুছে ফেলার উপক্রম করেছিল। যদি তাদের দেবতা তাদের রক্ষা করতেই না পারেন, তবে কেন তারা ব্যাবিলনে বসে সেই পরাজিত দেবতার উপাসনা চালিয়ে যাবে? এই চরম সংকটের মুহূর্তেই নির্বাসনে থাকা পুরোহিত এবং বুদ্ধিজীবীরা এক অভূতপূর্ব দার্শনিক কৌশল উদ্ভাবন করেন, যা তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।
তারা প্রচলিত এই ধারণাটিকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে দাবি করেন যে, ব্যাবিলনের কাছে তাদের পরাজয় মানে ইয়াহওয়েহর পরাজয় নয়। বরং ইয়াহওয়েহ নিজেই ব্যাবিলনকে ব্যবহার করে জুদাহকে শাস্তি দিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞান এবং ধর্মতত্ত্বে এই ধারণাকে থিওডিসি (Theodicy) বলা হয়। থিওডিসি হলো এমন একটি দার্শনিক যুক্তি, যার মাধ্যমে ঈশ্বরের সর্বময় ক্ষমতা এবং পৃথিবীতে অমঙ্গলের উপস্থিতির মধ্যে একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হয়। নির্বাসিত লেখকরা প্রচার করতে শুরু করেন যে, জুদাহর রাজা এবং সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অবিচার এবং অন্যান্য দেবতার উপাসনা করে আসছিল। এই পাপের কারণেই তাদের জাতীয় দেবতা ক্ষুব্ধ হয়ে নেবুচাদনেজারকে একটি লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে তাদের শাস্তি দিয়েছেন। এই অভিনব যুক্তির মাধ্যমে তারা মূলত নিজেদের পরাজয়ের দায় নিজেদের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল এক বিশাল প্রতিরক্ষামূলক কৌশল। নিজেদের অপরাধী সাব্যস্ত করার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছিলেন যে তাদের দেবতা এখনো সর্বশক্তিমান; তিনি পরাজিত হননি, তিনি কেবল বিচার করেছেন।
এই থিওডিসির ধারণাটি নির্বাসিত সম্প্রদায়কে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে জাদুর মতো কাজ করেছিল। যখন কোনো মানুষ বা জাতি বুঝতে পারে যে তাদের বর্তমান দুর্দশার পেছনে একটি যৌক্তিক কারণ আছে এবং সেই কারণটি সংশোধন করা সম্ভব, তখন তারা টিকে থাকার নতুন অর্থ খুঁজে পায়। পুরোহিতরা তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, যেহেতু পাপের কারণে এই শাস্তি এসেছে, তাই যদি তারা নিজেদের সংশোধন করে এবং প্রাচীন রীতিনীতিগুলো কঠোরভাবে মেনে চলে, তবে একদিন তাদের দেবতা তাদের আবার নিজেদের ভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। এই অপরাধবোধ এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মিলে নির্বাসিত সমাজে এক প্রবল জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়। তারা নিজেদের একটি বিশেষ এবং নির্বাচিত জাতি হিসেবে ভাবতে শুরু করে, যাদের ঈশ্বর সরাসরি শাসন করেন। বাস্তব পৃথিবীতে তারা যখন সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি পরাজিত, ঠিক তখনই মনস্তাত্ত্বিক জগতে তারা নিজেদের এই কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। মানুষের মন যখন চরম অস্তিত্বহীনতায় ভোগে, তখন টিকে থাকার জন্য এভাবেই সে নতুন অর্থ এবং মতাদর্শের জন্ম দেয়।
গ্রন্থভিত্তিক ধর্মের উদ্ভব ও লেখনীর রূপান্তর (Emergence of Text-Based Religion and Transformation of Writing)
ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের সবচেয়ে দূরপ্রসারী এবং যুগান্তকারী প্রভাবটি পড়েছিল তাদের ধর্মচর্চার কাঠামোর ওপর। প্রাচীন ইসরায়েল এবং জুদাহর ধর্ম ছিল মূলত আচার এবং মন্দিরকেন্দ্রিক। মানুষ জেরুজালেমের মন্দিরে যেত, পশু বলি দিত এবং পুরোহিতদের মাধ্যমে দেবতাদের সন্তুষ্ট করত। কিন্তু মন্দির যখন ধ্বংস হয়ে গেল এবং তারা হাজার মাইল দূরে ব্যাবিলনে নির্বাসিত হলো, তখন এই আচারভিত্তিক ধর্মচর্চা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্যই ধর্মের ইতিহাসে এক বিশাল বিপ্লব ঘটে। রক্ত এবং বলিদানের ধর্মের জায়গায় জন্ম নেয় লেখনী এবং গ্রন্থভিত্তিক ধর্ম। নির্বাসনে থাকা শিক্ষিত করণিক এবং পুরোহিতরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের সমাজকে এক রাখতে হলে তাদের এমন কিছু তৈরি করতে হবে যা কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকবে না। তারা তাদের প্রাচীনকালের প্রচলিত মৌখিক গল্প, রাজাদের ইতিহাস, নবীদের বক্তৃতা এবং আইনি বিধিবিধানগুলো সংগ্রহ করে সেগুলোকে চামড়ার স্ক্রোলে লিখিত রূপ দিতে শুরু করেন।
এই লেখনী প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই এলোমেলো বা বিচ্ছিন্ন কিছু ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এক রাজনৈতিক এবং আদর্শিক প্রকল্প। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা এই প্রক্রিয়াটিকে সম্পাদনাগত স্তরবিন্যাস (Redactional Stratification) বলে আখ্যায়িত করেন (Carr, 2005)। ব্যাবিলনে বসে এই লেখকরা মূলত অতীতকে নতুন করে সম্পাদনা করেছিলেন। তারা উত্তরের হারিয়ে যাওয়া ইসরায়েল রাজ্যের কিছু পুরনো পাণ্ডুলিপি এবং দক্ষিণের জুদাহর পাণ্ডুলিপিগুলোকে একত্র করে একটি নিরবচ্ছিন্ন জাতীয় ইতিহাস তৈরির চেষ্টা করেন। এই সম্পাদনার কাজে তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেদের সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তাধারাগুলোকে প্রাচীন চরিত্রগুলোর মুখে বসিয়ে দেন। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাবিলনের নির্বাসিত জীবনে তারা যে আইন বা নৈতিক নিয়মগুলো তৈরি করেছিলেন, সেগুলোকে তারা শত শত বছর আগের পৌরাণিক চরিত্র মোজেস বা মূসার দেওয়া ঐশ্বরিক আইন হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন। প্রাচীনকালে যেকোনো নতুন ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য সেগুলোকে প্রাচীন এবং ঐশ্বরিক বলে দাবি করাটা একটি সাধারণ চর্চা ছিল।
এইভাবে ধীরে ধীরে রচিত হতে থাকে তোরাহ এবং হিব্রু বাইবেলের অন্যান্য মূল অংশগুলো। এই গ্রন্থগুলো হয়ে ওঠে তাদের নতুন পোর্টেবল বা বহনযোগ্য মন্দির। ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগের জন্য এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বেদি বা পশু বলির দরকার রইল না; গ্রন্থের বাণী পাঠ করা এবং তা নিয়ে আলোচনা করাই হয়ে উঠল উপাসনার মূল ভিত্তি। এটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরণ। এই গ্রন্থভিত্তিক ধর্মের কারণেই ইহুদি পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল থাকেনি। রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে গেলেও তারা এই গ্রন্থগুলোকে বুকে আঁকড়ে ধরে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। এই পাণ্ডুলিপিগুলো কোনো একক ঐশ্বরিক লেখকের হাতে লেখা ছিল না; এগুলো ছিল মূলত একটি বাস্তুচ্যুত জাতির টিকে থাকার নিরন্তর বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের ফসল। ব্যাবিলনের মতো এক উন্নত ও শিক্ষিত সমাজে বসে, তাদের সাহিত্যিক উৎকর্ষের সংস্পর্শে এসেই মূলত জুদাহর করণিকরা এই বিশাল সাহিত্যকর্ম সম্পাদনা করার কৌশল এবং অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন।
সিনাগগ, বিশ্রামবার ও নতুন ধর্মীয় প্রথার বিকাশ (Synagogue, Sabbath and the Development of New Religious Practices)
বিশাল এবং বহুজাতিক ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের ভেতরে একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চারপাশে যখন অন্য সংস্কৃতি এবং ভাষার প্রবল দাপট, তখন খুব সহজেই একটি ছোট সম্প্রদায় মূল স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে। এই আত্মীকরণ ঠেকানোর জন্য নির্বাসিত নেতারা এমন কিছু দৃশ্যমান এবং প্রাত্যহিক রীতিনীতির উদ্ভাবন করেন, যা তাদের অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখবে। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় বহির্গোষ্ঠী সীমানা (Out-group Boundary) নির্মাণ। তারা খাদ্যাভ্যাস এবং প্রাত্যহিক জীবনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেন। এই সময়েই মূলত ‘কোশার’ বা হালাল খাদ্যাভ্যাসের নিয়মাবলি অত্যন্ত কঠোরভাবে সংকলন করা হয়। কী খাওয়া যাবে আর কী খাওয়া যাবে না – এই ছোট ছোট নিয়মগুলো মূলত প্রতিদিনের জীবনে তাদের মনে করিয়ে দিত যে তারা ব্যাবিলনীয়দের থেকে আলাদা এবং তারা একটি বিশেষ চুক্তিবদ্ধ জাতি।
এই সীমানা নির্ধারণের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে বিশ্রামবার (সাবাথ) এবং খতনা। প্রাচীন বিশ্বেও সপ্তাহে একদিন বিশ্রামের ধারণা বিভিন্ন সমাজে ছিল, কিন্তু নির্বাসিত জুদাহর মানুষেরা এটিকে একটি চূড়ান্ত ধর্মীয় আচারে পরিণত করে। তারা সপ্তাহের সপ্তম দিনটিতে যেকোনো ধরনের শারীরিক শ্রম বা কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয়। ব্যাবিলনের ব্যস্ত অর্থনৈতিক জীবনে, যেখানে প্রতিদিন কাজ চলত, সেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এই একদিন সম্পূর্ণ কাজ বন্ধ রাখাটা তাদের অত্যন্ত দৃশ্যমান একটি পরিচয় এনে দেয়। খতনা প্রথাটিও প্রাচীন লেভান্ট এবং মিশরে আগে থেকেই প্রচলিত ছিল, কিন্তু ব্যাবিলনীয়রা এই প্রথা পালন করত না। তাই ব্যাবিলনে বসে খতনা হয়ে ওঠে তাদের জাতিগত পরিচয়ের সবচেয়ে বড় এবং অলঙ্ঘনীয় শারীরিক প্রতীক। এই প্রথাগুলো পালনের জন্য কোনো মন্দির বা রাষ্ট্রের দরকার ছিল না; এগুলো মানুষ নিজের ঘরে বসেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করতে পারত, যা তাদের পরিচয়কে একটি অভেদ্য বর্মের ভেতর সুরক্ষিত করেছিল।
পাশাপাশি, উপাসনার জন্য তারা এক নতুন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, যাকে আজ আমরা ‘সিনাগগ‘ বলে চিনি। সিনাগগ শব্দটি মূলত গ্রিক, যার অর্থ হলো সমাবেশ বা একত্রে জড়ো হওয়া। প্রথম দিকে এটি কোনো নির্দিষ্ট ইমারত বা ভবন ছিল না। নির্বাসিত মানুষেরা বিশ্রামবারের দিনটিতে নিজেদের মধ্যে কোনো একজনের বাড়িতে বা কোনো নদীর তীরে একত্রে জড়ো হতো (Runesson, 2001)। সেখানে তারা নিজেদের সংকলিত গ্রন্থগুলো পাঠ করত, নিজেদের পুরনো দিনের কথা স্মরণ করত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করত। এই সমাবেশগুলো ছিল মূলত তাদের সামাজিক সংহতি ধরে রাখার প্রধান কেন্দ্র। এখানে কোনো বেদিতে রক্ত ঝরত না, বরং সেখানে চলত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার কাজ। একটি স্বাধীন ভূখণ্ড হারিয়ে তারা মূলত সমাজ এবং পরিবারের ভেতরেই নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নতুন করে সাজিয়েছিল। এই পোর্টেবল বা বহনযোগ্য ধর্মীয় প্রথাগুলোই ছিল তাদের টিকে থাকার আসল রহস্য, যা কোনো ঐশ্বরিক অলৌকিকতা নয়, বরং নিখাদ সামাজিক প্রকৌশলের এক অসামান্য উদাহরণ।
জাতিস্মৃতির নির্মাণ ও পৌরাণিক আখ্যানের রাজনৈতিক ব্যবহার (Construction of National Memory and Political Use of Mythological Narratives)
যেকোনো জাতিকে একত্রিত রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটি অভিন্ন এবং গৌরবময় অতীত ইতিহাসের। জুদাহর মানুষ যখন ব্যাবিলনে নির্বাসিত হলো, তখন তারা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত ছিল। তাদের দরকার ছিল এমন একটি গল্পের, যা তাদের আশা জোগাবে এবং তাদের বোঝাবে যে তারা আসলে একটি মহান জাতি। এই প্রয়োজন মেটাতেই নির্বাসিত লেখকরা জাতিস্মৃতি (National Memory) নির্মাণের এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প হাতে নেন। তারা প্রাচীনকালের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন উপজাতীয় গল্প, লোককথা এবং মিথোলজিগুলোকে একত্র করে একটি সুশৃঙ্খল এবং মহাকাব্যিক আখ্যান তৈরি করেন। আব্রাহাম, আইজ্যাক, জ্যাকব এবং বিশেষ করে মোজেসের মতো চরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করে তারা এমন এক ইতিহাস রচনা করেন, যা বাস্তবে কখনো সেভাবে ঘটেনি, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্বের আলোকে এই পৌরাণিক আখ্যানগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায় না। আধুনিক আর্কিওলজি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, লক্ষ লক্ষ মানুষের মিশর থেকে পালিয়ে আসার বা এক্সোডাসের কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ সিনাই উপদ্বীপে বা কানানের কোথাও নেই (Liverani, 2005)। একইভাবে আব্রাহামের মতো প্যাট্রিয়ার্ক বা আদি পিতাদের গল্পগুলোও মূলত ব্রোঞ্জ যুগের যাযাবর জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা সাহিত্যিক রূপক। কিন্তু ব্যাবিলনের নির্বাসিত জীবনে এই এক্সোডাস বা প্রস্থানের গল্পটি ছিল তাদের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। লেখকরা সচেতনভাবেই এই মিথোলজিটি তৈরি বা সম্পাদনা করেছিলেন তাদের নিজেদের সমসাময়িক অবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য। গল্পে বলা হয় যে তাদের পূর্বপুরুষরা একসময় মিশরের বিশাল সাম্রাজ্যের দাসে পরিণত হয়েছিল এবং সেখান থেকে তারা অলৌকিকভাবে মুক্ত হয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরে গিয়েছিল। এই গল্পের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক বার্তাটি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার – যদি তারা মিশরীয় সাম্রাজ্যের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে কানানে আসতে পারে, তবে তারা অবশ্যই ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের নির্বাসন থেকেও মুক্ত হয়ে একদিন জেরুজালেমে ফিরে যেতে পারবে।
এই আখ্যানগুলো মূলত ছিল উদ্ভাবিত ঐতিহ্য (Invented Tradition)-এর ক্লাসিক উদাহরণ। অতীতকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে তারা বর্তমানের রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করছিলেন। আব্রাহামের গল্পে বলা হয়েছে যে তিনি মূলত মেসোপটেমিয়ার উর শহর থেকে যাত্রা শুরু করে কানানে এসেছিলেন। ব্যাবিলনের নির্বাসিত মানুষেরাও মেসোপটেমিয়াতেই আটকে ছিল এবং তারাও কানানে ফিরে যেতে চাইছিল। তাই আব্রাহামের চরিত্রটি তাদের নিজেদেরই একটি সাহিত্যিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করেছিল। এই পৌরাণিক আখ্যানগুলো সাধারণ মানুষের মনে এক অটুট বিশ্বাস এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়। ইতিহাস চর্চার সবচেয়ে বড় ভুল হলো এই ধর্মীয় মিথোলজিগুলোকে বাস্তব ইতিহাস হিসেবে ধরে নেওয়া। এই গল্পগুলো ইতিহাস বর্ণনা করার জন্য লেখা হয়নি; এগুলো লেখা হয়েছিল একটি ভেঙে পড়া জাতিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য। পৌরাণিক আখ্যানগুলো এভাবেই যুগে যুগে রাজনৈতিক এবং সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।
পারসিক বিজয়, সাইরাস সিলিন্ডার ও প্রত্যাবর্তনের ভূরাজনীতি (Persian Conquest, Cyrus Cylinder and Geopolitics of Return)
দীর্ঘ কয়েক দশকের নির্বাসিত জীবনের পর ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নিকট প্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আরেকটি বিশাল ভূমিকম্প ঘটে। পূর্ব দিক থেকে পারস্যের রাজা সাইরাস দ্য গ্রেট এক বিশাল এবং অপ্রতিরোধ্য বাহিনী নিয়ে ব্যাবিলন আক্রমণ করেন। ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য তখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। সাইরাস খুব সহজেই, প্রায় বিনা রক্তপাতে ব্যাবিলন দখল করে নেন এবং পুরো লেভান্ট অঞ্চল পারসিক সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। সাইরাসের এই বিজয়ের ফলে জুদাহর নির্বাসিতদের ভাগ্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। সাইরাস ছিলেন প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে এক অত্যন্ত দূরদর্শী এবং বাস্তববাদী শাসক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জোর করে মানুষকে নির্বাসিত করে এবং তাদের মন্দির ধ্বংস করে সাম্রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়। এর বদলে তিনি গ্রহণ করেছিলেন সাম্রাজ্যিক সহনশীলতা (Imperial Tolerance)-এর নীতি।
ব্যাবিলন জয়ের পরপরই সাইরাস একটি রাজকীয় ডিক্রি বা আদেশ জারি করেন, যা ইতিহাসে ‘সাইরাস সিলিন্ডার’ নামে বিখ্যাত। এই মাটির সিলিন্ডারে খোদাই করা আদেশে তিনি ঘোষণা করেন যে, ব্যাবিলনীয়রা যাদের জোরপূর্বক বন্দি করে এনেছিল, তারা সবাই চাইলে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে এবং তাদের ধ্বংস হওয়া মন্দিরগুলো আবার তৈরি করতে পারে। হিব্রু বাইবেলে সাইরাসকে ঈশ্বরের মনোনীত ‘মসিহ’ বা ত্রাণকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যেন তিনি কেবল ইহুদিদের মুক্ত করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাইরাসের এই আদেশ কেবল জুদাহর মানুষদের জন্য ছিল না; এটি ছিল ব্যাবিলনে বন্দি থাকা সব জাতির জন্যই প্রযোজ্য। এর পেছনে কোনো ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য ছিল না; এটি ছিল নিখাদ এক ভূরাজনৈতিক কৌশল (Briant, 2002)। সাইরাসের মূল লক্ষ্য ছিল মিশরের দিকে সাম্রাজ্য বিস্তার করা। মিশর অভিযানের পথে লেভান্ট অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন জুদাহর মানুষদের জেরুজালেমে ফেরত পাঠিয়ে সেখানে একটি অত্যন্ত অনুগত বাফার স্টেট বা মিত্র রাষ্ট্র গড়ে তুলতে, যারা মিশরের বিরুদ্ধে পারস্যের স্বার্থ রক্ষা করবে।
সাইরাসের এই আদেশের পর নির্বাসিতদের একটি অংশ জেরুজালেমে ফিরে আসার প্রস্তুতি নেয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, সবাই কিন্তু ফিরে আসেনি। ব্যাবিলনে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে ধনী হয়ে গিয়েছিল এবং সেখানকার জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তাদের অনেকেই ব্যাবিলন ছেড়ে রুক্ষ পাহাড়ি এলাকা জুদাহতে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। যারা ফিরে এসেছিল, তারা মূলত ছিল অত্যন্ত ধর্মান্ধ এবং জাতীয়তাবাদী একটি ক্ষুদ্র অংশ। তারা জেরুজালেমে ফিরে এসে সম্পূর্ণ নতুন একটি সমাজ নির্মাণ করে। তারা ব্যাবিলন থেকে নিজেদের সাথে করে নিয়ে এসেছিল কঠোর একশ্বরবাদের ধারণা, লিখিত তোরাহ বা আইন এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের এক অনড় বিশ্বাস। তারা যখন দেশে ফিরে আসে, তখন সেখানে আগে থেকে বসবাস করা স্থানীয় দরিদ্র কৃষকদের তারা আপন করে নিতে অস্বীকার করে। এই ফিরে আসা অভিজাতরাই মূলত প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মকে রূপান্তরিত করে আধুনিক ইহুদি ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। ব্যাবিলনের নির্বাসন তাদের ধ্বংস করেনি, বরং সাম্রাজ্যবাদের চুল্লিতে পুড়ে তারা একটি সুসংগঠিত এবং গ্রন্থভিত্তিক জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
পারসিক শাসন ও প্রত্যাবর্তন (Persian Rule and the Return): পুনর্গঠনের যুগ
পারসিক সাম্রাজ্যিক নীতি ও ইয়েহুদ প্রদেশ (Persian Imperial Policy and the Province of Yehud)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করে। পারস্যের রাজা সাইরাস দ্য গ্রেট ব্যাবিলন দখল করার পর নিকট প্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক সম্পূর্ণ নতুন সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে, যা হাখমানেশি বা পারসিক সাম্রাজ্য নামে পরিচিত। ধর্মীয় পুরাণ ও ঐতিহ্যবাহী আখ্যানগুলোতে সাইরাসের এই বিজয়কে ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখানো হয়, যেন তিনি কেবল ব্যাবিলনে বন্দি থাকা জুদাহর মানুষদের মুক্ত করার জন্যই আবির্ভূত হয়েছিলেন। বাস্তবে এই ঘটনাটি ছিল সুনির্দিষ্ট এক ভূরাজনৈতিক কৌশল (Geopolitical Strategy)। পারসিকরা আগের ব্যাবিলনীয় বা অ্যাসিরীয়দের মতো ধ্বংস এবং জোরপূর্বক স্থানান্তরের নীতিতে বিশ্বাসী ছিল না। তারা বুঝতে পেরেছিল, বিশাল এক সাম্রাজ্য বিনা বিদ্রোহে শাসন করতে হলে স্থানীয় মানুষদের মন জয় করা প্রয়োজন। বিশেষত মিশরের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের সীমানা সুরক্ষিত রাখতে হলে লেভান্টের মতো কৌশলগত অঞ্চলে অনুগত মিত্র দরকার। তাই সাইরাস একটি ডিক্রি বা রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে ব্যাবিলনে নির্বাসিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকে তাদের নিজ নিজ ভূমিতে ফিরে গিয়ে নিজেদের উপাসনালয় পুনর্নির্মাণের অনুমতি দেন। জুদাহর মানুষদের জেরুজালেমে প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি মূলত পারসিকদের এই বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক নীতিরই একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই জুদাহ অঞ্চলটি পারসিক সাম্রাজ্যের ‘এভার-নারি’ বা ট্রান্স-ইউফ্রেটিস সত্রাপির (প্রদেশের) অধীনে একটি ছোট উপ-প্রদেশ বা ‘মেদিনাতা’ হিসেবে পুনর্গঠিত হয়, যার নতুন নাম দেওয়া হয় ইয়েহুদ।
ধর্মীয় গ্রন্থগুলো পড়লে মনে হয় যেন সাইরাসের ঘোষণার পরপরই ব্যাবিলনে থাকা সমস্ত মানুষ আনন্দোল্লাসে জেরুজালেমের দিকে ছুটে গিয়েছিল। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণাটি মোটেও সত্য নয়। ব্যাবিলনে কাটানো প্রায় অর্ধশতাব্দীতে জুদাহর নির্বাসিত সমাজ সেখানে ব্যাপকভাবে থিতু হয়ে গিয়েছিল। তারা ব্যাবিলনের উর্বর কৃষিজমিতে চাষাবাদ করত, ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল এবং অনেকেই পারসিক প্রশাসনে ভালো পদে চাকরি পেয়েছিল। আরামদায়ক এবং নিরাপদ সেই জীবন ছেড়ে, শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে জেরুজালেমের ধ্বংসস্তূপে ফিরে যাওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কারণ সাধারণ মানুষের কাছে ছিল না। ফলে ব্যাবিলন থেকে যারা ফিরে এসেছিল, তারা মোট জনসংখ্যার একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র (Grabbe, 2004)। এই প্রত্যাবর্তনকারীরা মূলত ছিল অত্যন্ত আদর্শবান, কট্টর জাতীয়তাবাদী এবং পুরোহিত শ্রেণীর মানুষ, যাদের কাছে ব্যাবিলনের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার চেয়ে জেরুজালেমের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সহজ করে বললে, এটি কোনো সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রত্যাবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আদর্শিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রকল্প।
পারসিক সাম্রাজ্য এই প্রত্যাবর্তনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করত। ইয়েহুদ প্রদেশে পারসিকরা তাদের নিজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলে এবং সেখানে গভর্নর নিয়োগ দেয়। প্রথম দিকে জুদাহর রাজবংশের বংশধর, যেমন শেসবাজার এবং জেরুব্বাবেলকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও, খুব দ্রুতই পারসিকরা বুঝতে পারে যে রাজবংশের কাউকে ক্ষমতায় রাখলে ভবিষ্যতে তারা স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ করতে পারে। তাই পারসিক প্রশাসন অত্যন্ত সুকৌশলে ডেভিডের রাজবংশকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়ে পুরোহিত শ্রেণীকে সামনে নিয়ে আসে। কারণ পুরোহিতদের কোনো সেনাবাহিনী থাকে না, তাদের ক্ষমতা কেবল মন্দিরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে পারসিকদের জন্য পুরোহিতদের মাধ্যমে একটি প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি নিরাপদ ছিল। এই সাম্রাজ্যিক হস্তক্ষেপের ফলেই প্রাচীন ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোটি রাজতন্ত্র থেকে একটি থিওক্রেসি বা ধর্মতন্ত্র (Theocracy)-তে রূপান্তরিত হয়। পারসিক শাসনব্যবস্থা এভাবেই অত্যন্ত সুনিপুণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে ইয়েহুদ প্রদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
প্রত্যাবর্তনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও দ্বিতীয় মন্দির (Socio-Economic Reality of the Return and the Second Temple)
ব্যাবিলন থেকে ফিরে আসা মানুষগুলোর চোখে জেরুজালেম নিয়ে অনেক রোমান্টিক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু বাস্তবে তাদের চরম এক রূঢ় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ৫৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে যখন প্রথম দলটি জেরুজালেমে পৌঁছায়, তখন শহরটি ছিল মূলত এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। নবীদের বর্ণনায় এই শহরকে সোনায় মোড়ানো এবং দুধে-ভাতে পরিপূর্ণ বলে কল্পনা করা হলেও, আর্কিওলজিক্যাল বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ভিন্ন কথা বলে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, পারসিক যুগের শুরুতে জেরুজালেমের জনসংখ্যা এক বা দেড় হাজারের বেশি ছিল না এবং পুরো শহরটি অত্যন্ত ছোট ও জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল (Carter, 1999)। কৃষিজমিগুলো ছিল অবহেলিত, আর শহরের সুরক্ষাপ্রাচীরগুলো মাটিতে মিশে ছিল। টিকে থাকার জন্য এই নতুন বাসিন্দাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়। একে তো স্থানীয় শুষ্ক জলবায়ু, তার ওপর প্রতিবেশী প্রদেশগুলোর সাথে সীমান্ত বিরোধ – সব মিলিয়ে প্রত্যাবর্তনের প্রথম কয়েক দশক ছিল এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংগ্রাম ও টিকে থাকার লড়াই।
এই চরম অভাব ও দারিদ্র্যের মধ্যেই ধর্মীয় নেতৃত্ব একটি নতুন মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ৫১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পারসিক রাজা দারিয়ুসের রাজত্বকালে এই দ্বিতীয় মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। হিব্রু বাইবেলের বর্ণনায় এই মন্দির নির্মাণকে এক বিশাল ধর্মীয় বিজয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিচার করলে মন্দির নির্মাণের পেছনে ধর্মীয় আবেগের চেয়েও বড় একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে মন্দির কেবল প্রার্থনার স্থান ছিল না, এটি ছিল মূলত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। পারসিক সাম্রাজ্য ইয়েহুদ প্রদেশ থেকে নিয়মিত কর আদায় করার জন্য একটি কেন্দ্রীভূত প্রতিষ্ঠান খুঁজছিল। মন্দির ছিল সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠান। সাধারণ কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ মন্দিরে দান করত, যা পরবর্তীতে পারসিক কোষাগারে কর হিসেবে জমা হতো। ইতিহাসবিদরা এই ব্যবস্থাকে মন্দির-কেন্দ্রিক অর্থনীতি (Temple-City Economy) বলে সংজ্ঞায়িত করেন। পারসিকরা মন্দির নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল এবং এর সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছিল, কারণ এটি তাদের নিজস্ব সাম্রাজ্যিক কর আদায়ের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।
দ্বিতীয় মন্দিরটি দেখতে সলোমনের আমলের প্রথম মন্দিরের মতো বিশাল বা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত সাদামাটা একটি পাথরের ইমারত। মজার ব্যাপার হলো, এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রত্যাবর্তনকারী সম্প্রদায়ের ভেতরেই বিশাল দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যারা ব্যাবিলনের উন্নত স্থাপত্য দেখে অভ্যস্ত ছিল, এই ছোট মন্দিরটি তাদের হতাশ করে। অন্যদিকে, যারা জেরুজালেমের পুরনো জাঁকজমক দেখেনি, তাদের কাছে এটিই ছিল বিশাল অর্জন। মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও রাজনৈতিক কোন্দল দেখা দেয়। জেরুব্বাবেল, যিনি ছিলেন প্রাচীন রাজবংশের প্রতিনিধি এবং জোশুয়া, যিনি ছিলেন প্রধান পুরোহিত – এই দুজনের মধ্যে ক্ষমতার প্রবল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত পারসিক প্রশাসনের নীরব হস্তক্ষেপে জেরুব্বাবেল ইতিহাসের দৃশ্যপট থেকে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যান এবং প্রধান পুরোহিত মন্দিরের পাশাপাশি ইয়েহুদ প্রদেশের অলিখিত শাসকে পরিণত হন। এই ঘটনাটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যুগে যুগে কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং কীভাবে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলো সেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠী বনাম প্রত্যাবর্তনকারী সমাজ (Local Population vs. Returnee Community)
পারসিক যুগে ইয়েহুদ প্রদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক সংকটটি তৈরি হয়েছিল প্রত্যাবর্তনকারী গোষ্ঠী এবং সেখানে আগে থেকে বসবাসরত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ব্যাবিলনীয়রা যখন জেরুজালেম ধ্বংস করেছিল, তখন তারা সবাইকে নির্বাসিত করেনি। সমাজের দরিদ্র কৃষক এবং সাধারণ মানুষদের তারা জুদাহর গ্রামগুলোতেই রেখে গিয়েছিল। এই মানুষগুলো দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে সেখানে কৃষিকাজ করেছে, নিজেদের মতো করে ধর্ম পালন করেছে এবং শূন্য পড়ে থাকা জমিগুলোর মালিকানা গ্রহণ করেছে। কিন্তু ব্যাবিলন থেকে যখন অভিজাত শ্রেণী ফিরে আসে, তখন তারা এই স্থানীয় মানুষদের অধিকার মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রত্যাবর্তনকারীরা দাবি করে যে, এই ভূমি ঈশ্বর কেবল তাদেরই দিয়েছেন এবং স্থানীয় মানুষজন এই জমির বৈধ মালিক নয়। বাইবেলের গ্রন্থগুলোতে এই স্থানীয় মানুষদের ‘আম হা-আরেৎজ’ বা ‘ভূমির মানুষ’ বলে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে এবং তাদের ধর্মীয়ভাবে অপবিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো ধর্মীয় সংকট ছিল না, এটি ছিল নিখাদ এক সম্পত্তি ও সম্পদের দ্বন্দ্ব (Conflict over Property and Resources) (Edelman, 2005)।
ফিরে আসা গোষ্ঠীটি নিজেদের একটি বিশুদ্ধ এবং উচ্চবর্গীয় সমাজ হিসেবে বিবেচনা করত। তারা ব্যাবিলন থেকে উন্নত প্রশাসনিক জ্ঞান, লিখিত আইন এবং একটি সুসংগঠিত ধর্মতত্ত্ব নিয়ে এসেছিল। তাদের চোখে স্থানীয় কৃষকরা ছিল অশিক্ষিত এবং কানানীয় বা অন্যান্য সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়া এক ভ্রষ্ট জাতি। অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রত্যাবর্তনকারীরা ছিল মূলত বিদেশি অনুপ্রবেশকারী, যারা পারসিক সাম্রাজ্যের সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় এসে তাদের বাপ-দাদার দখল করা জমি ছিনিয়ে নিতে চাইছে। স্থানীয় মানুষেরা চেয়েছিল দ্বিতীয় মন্দির নির্মাণের কাজে যুক্ত হতে এবং নতুন সমাজে নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে। কিন্তু প্রত্যাবর্তনকারী নেতৃত্ব অত্যন্ত কঠোরভাবে তাদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা ঘোষণা দেয় যে, যারা ব্যাবিলনের নির্বাসনের কষ্ট সহ্য করেনি, তারা প্রকৃত ইসরায়েলীয় নয় এবং মন্দির নির্মাণে তাদের কোনো অধিকার নেই। ধর্মীয় বিশুদ্ধতার এই বর্মটি মূলত ব্যবহার করা হয়েছিল স্থানীয় কৃষকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করার জন্য।
এই চরম বিভাজন এবং বর্জনের নীতির একটি সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ফলাফল ছিল। প্রত্যাখ্যাত স্থানীয় মানুষেরা এবং ইয়েহুদ প্রদেশের উত্তরের সামারিয়া অঞ্চলের অধিবাসীরা মিলে একটি নতুন জোট গঠন করে। জেরুজালেমের মন্দিরে প্রবেশাধিকার না পেয়ে তারা গেরিজিম পর্বতে নিজেদের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা মন্দির নির্মাণ করে। এখান থেকেই মূলত সামারিটান বা শোমরোনীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে, যারা আজও নিজেদের প্রাচীন ইসরায়েলীয়দের প্রকৃত বংশধর বলে দাবি করে। ধর্মীয় সাহিত্যে সামারিটানদের প্রায়শই খলনায়ক বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের লেন্স থেকে দেখলে বোঝা যায় যে, এই বিভাজন কোনো ঐশ্বরিক বিধান ছিল না। এটি ছিল মূলত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঠেকাতে প্রত্যাবর্তনকারী অভিজাত শ্রেণীর একটি স্বার্থান্বেষী পদক্ষেপ। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে যখন সম্পদের পরিমাণ সীমিত থাকে, তখন সমাজের একটি অংশ ধর্ম বা জাতীয়তাবাদের ধুঁয়া তুলে অন্য অংশকে প্রান্তিক করে দেয়। ইয়েহুদ প্রদেশের এই গৃহবিবাদ মানব ইতিহাসের সেই চিরায়ত আর্থ-সামাজিক দ্বন্দ্বেরই এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
এজরা ও নেহেমিয়াহর সংস্কার এবং সামাজিক সীমানা (Reforms of Ezra and Nehemiah and Social Boundaries)
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইয়েহুদ প্রদেশের রাজনীতিতে দুজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তির আগমন ঘটে – এজরা এবং নেহেমিয়াহ। ধর্মীয় আখ্যানে তাদের মহান ধর্মসংস্কারক এবং ঈশ্বরের দূত হিসেবে সম্মান করা হলেও, ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো তারা দুজনেই ছিলেন পারসিক সাম্রাজ্যের অত্যন্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। সেই সময়ে পারসিক সাম্রাজ্যের সাথে মিশরের এবং গ্রিকদের বেশ কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত চলছিল। লেভান্ট অঞ্চলটি পারসিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সীমান্ত হওয়ায় সেখানে যেকোনো মূল্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি ছিল। নেহেমিয়াহ, যিনি পারসিক রাজার রাজদরবারে একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন, তাকে ইয়েহুদের গভর্নর হিসেবে পাঠানো হয়। তার প্রধান কাজ ছিল জেরুজালেমের ভাঙা সুরক্ষাপ্রাচীর পুনরায় নির্মাণ করে শহরটিকে একটি সামরিক দুর্গে পরিণত করা, যাতে ইয়েহুদ প্রদেশ পারসিকদের একটি শক্তিশালী বাফার স্টেট হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রবল স্থানীয় বাধা এবং প্রতিবেশী সামারিয়ার গভর্নর সানবাল্লাতের হুমকি উপেক্ষা করে নেহেমিয়াহ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই প্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ করেন।
অন্যদিকে এজরা ছিলেন একজন পারসিক রাজকীয় আমলা এবং তোরাহ বা আইনের পণ্ডিত। পারসিক রাজা প্রথম আর্টাজারক্সেস তাকে একটি বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে জেরুজালেমে পাঠান। এজরার মূল কাজ ছিল ইয়েহুদ প্রদেশে পারসিক আইনের পাশাপাশি স্থানীয় ধর্মীয় আইনকে একটি বিধিবদ্ধ রূপ দেওয়া। জেরুজালেমে এসে এজরা এক অদ্ভুত সামাজিক সংকটের সম্মুখীন হন। তিনি দেখতে পান যে ব্যাবিলন থেকে ফিরে আসা অনেক মানুষ, এমনকি পুরোহিত শ্রেণীর অনেকেও স্থানীয় কানানীয়, মোয়াবীয় বা আশদোদীয় নারীদের বিয়ে করেছে। এজরা এই আন্তঃবিবাহকে ধর্মের চোখে চরম অবমাননা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি সমস্ত প্রত্যাবর্তনকারীদের একত্রিত করে এক কঠোর নির্দেশ জারি করেন যে, যারা ভিনদেশি নারীদের বিয়ে করেছে, তাদের অবিলম্বে স্ত্রী ও সন্তানদের ত্যাগ করতে হবে, নতুবা তাদের সমাজচ্যুত করা হবে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। ধর্মীয়ভাবে একে পবিত্রতা রক্ষার লড়াই বলা হলেও, সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ছিল সামাজিক সীমানা তত্ত্ব (Social Boundary Theory)-এর এক ধ্রুপদী প্রয়োগ (Bedford, 2001)।
একটি ছোট এবং দুর্বল সম্প্রদায় যখন বৃহত্তর কোনো সংস্কৃতির মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করে, তখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চারপাশের সমাজের সাথে অত্যন্ত কঠোর একটি দেয়াল তুলে দেয়। এজরার এই আইনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল প্রত্যাবর্তনকারী সমাজের ভেতরের সম্পদ এবং জমির অধিকার যেন কোনোভাবেই বিয়ের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষদের হাতে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করা। ভিনদেশি স্ত্রীদের তাড়িয়ে দেওয়ার এই অমানবিক প্রথাটি আসলে কোনো ঐশ্বরিক আধ্যাত্মিকতা থেকে আসেনি, এটি এসেছিল নিখাদ অর্থনৈতিক এবং পরিচয় টিকিয়ে রাখার রাজনীতি থেকে। এজরা এবং নেহেমিয়াহ দুজনেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি তারা স্থানীয় মানুষদের সাথে মিশে যায়, তবে পারসিক সাম্রাজ্যের কাছে তাদের বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তারা ধর্মীয় আইনের চাদরে ঢেকে অত্যন্ত কঠোরভাবে একটি ‘বিশুদ্ধ’ জাতি গঠন করার উদ্যোগ নেন। তাদের এই চরম রক্ষণশীল সংস্কারের ফলেই মূলত প্রাচীন ইগালিটেরিয়ান ইসরায়েলীয় সমাজ একটি অত্যন্ত রুদ্ধদ্বার এবং আত্মকেন্দ্রিক সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত হয়, যারা নিজেদের বিশ্বের বাকি সব জাতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মনে করতে শুরু করে।
পারসিক যুগে জেরুজালেমের অর্থনীতি ও করব্যবস্থা (Economy and Taxation of Jerusalem in the Persian Period)
পারসিক যুগে ইয়েহুদ প্রদেশের অর্থনীতি পুরোপুরিভাবে পারস্যের বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। পারসিক সাম্রাজ্য তাদের করব্যবস্থার জন্য প্রাচীন বিশ্বে বিখ্যাত ছিল। ইয়েহুদ প্রদেশের অর্থনীতিও পরিচালিত হতো এই কর আদায়ের মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে। পারসিকরা মূলত তিন ধরনের কর আদায় করত: ‘মিনদাহ’ বা জমির উপর সরাসরি কর, ‘বেলো’ বা নির্দিষ্ট পণ্যের উপর ভোগকর এবং ‘হালাখ’ বা রাস্তা ও বাণিজ্যপথের উপর টোল। এই বিপুল পরিমাণ করের বোঝা মূলত গিয়ে পড়ত সমাজের প্রান্তিক কৃষকদের কাঁধে। কারণ জেরুজালেমের পুরোহিত এবং রাজকীয় আমলারা প্রায়শই পারসিকদের কাছ থেকে কর মওকুফের সুবিধা ভোগ করত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই সময়ের বেশ কিছু বিশেষ রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলোতে প্রাচীন আরামীয় বা হিব্রু লিপিতে ‘ইয়েহুদ‘ লেখা রয়েছে (Fried, 2004)। এই মুদ্রাগুলো প্রমাণ করে যে ইয়েহুদ প্রদেশ পারসিক সাম্রাজ্যের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত, যদিও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পারসিক কোষাগারকে সমৃদ্ধ করা।
এই কঠোর করব্যবস্থার কারণে ইয়েহুদের ভেতরে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। খরা বা ফসলের ক্ষতির সময় সাধারণ কৃষকরা পারসিক কর মেটানোর জন্য শহরের ধনী বণিক এবং অভিজাতদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতো। ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে তাদের নিজেদের কৃষিজমি ধনীদের হাতে তুলে দিতে হতো এবং শেষ সম্বল হিসেবে নিজেদের ছেলেমেয়েদের দাস হিসেবে বিক্রি করতে হতো। নেহেমিয়াহ যখন জেরুজালেমের গভর্নর হয়ে আসেন, তখন তিনি সাধারণ কৃষকদের এই চরম দুর্দশা এবং ক্ষোভের কথা জানতে পারেন। একটি বিদ্রোহ যেকোনো সময় পারসিক শাসনকে বিপন্ন করতে পারে, এই আশঙ্কায় নেহেমিয়াহ একটি যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সংস্কার করেন। তিনি শহরের সমস্ত ধনী ঋণদাতাদের ডেকে তাদের সমস্ত ঋণ মওকুফ করতে এবং কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। এটি কোনো অলৌকিক দয়া ছিল না, এটি ছিল মূলত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা (Economic Stabilization) বজায় রাখার একটি চতুর রাজনৈতিক পদক্ষেপ। কৃষকরা যদি সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, তবে পারসিক সাম্রাজ্যের কর আদায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেত। তাই নেহেমিয়াহ মূলত সাম্রাজ্যের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই ঋণ মওকুফের নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
নিজেদের ভেতরে এত কঠোর ধর্মীয় এবং সামাজিক সীমানা তৈরি করলেও, অর্থনৈতিকভাবে ইয়েহুদ প্রদেশ কিন্তু বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো আমাদের এক চমকপ্রদ তথ্য দেয়। জেরুজালেম এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে খনন করে প্রচুর পরিমাণে গ্রিক মৃৎপাত্র বা ‘অ্যাটিক পটারি’ পাওয়া গেছে, যা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতাব্দীর। এই গ্রিক মৃৎপাত্রগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে ইয়েহুদ প্রদেশ ভূমধ্যসাগরীয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল স্রোতের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। ফিনিশীয় এবং গ্রিক বণিকদের মাধ্যমে তারা ওয়াইন, জলপাই তেল এবং অন্যান্য বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করত। অর্থাৎ, মতাদর্শগতভাবে তারা যতই নিজেদের বহির্বিশ্ব থেকে আলাদা দাবি করুক না কেন, বাস্তব অর্থনীতিতে টিকে থাকার জন্য তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ওপরই নির্ভর করতে হতো। ধর্ম এবং অর্থনীতির এই সাংঘর্ষিক অবস্থান প্রমাণ করে যে প্রাচীন সমাজগুলো কোনো একক রেখায় চলত না। তাদের নীতিগুলো প্রায়শই বাস্তবতার চাপে নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তিত হতো।
ধর্মীয় গ্রন্থের সংকলন ও নতুন পরিচয়ের ভিত্তি (Compilation of Religious Texts and the Foundation of New Identity)
পারসিক যুগে ইয়েহুদ প্রদেশে সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী যে কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল, তা হলো তাদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোর সংকলন এবং সম্পাদনা। ব্যাবিলনের নির্বাসিত জীবনে যে লেখনী প্রক্রিয়ার শুরু হয়েছিল, পারসিক যুগে এসে তা একটি চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এজরা যখন ব্যাবিলন থেকে জেরুজালেমে এসেছিলেন, তখন তিনি তার সাথে করে ‘তোরাহ’ বা আইনের একটি লিখিত পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছিলেন। পারসিক সাম্রাজ্যের একটি বিশেষ নীতি ছিল, তারা তাদের বিভিন্ন প্রদেশের স্থানীয় আইনগুলোকে একটি লিখিত এবং সর্বসম্মত রূপ দেওয়ার জন্য স্থানীয় পণ্ডিতদের উৎসাহিত করত, যাতে সেই আইনের ভিত্তিতে তারা প্রদেশগুলো শাসন করতে পারে। পণ্ডিতরা একে সাম্রাজ্যিক অনুমোদন তত্ত্ব (Imperial Authorization Theory) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন (Watts, 2001)। অর্থাৎ, তোরাহ কেবল একটি ঐশ্বরিক গ্রন্থ হিসেবেই নয়, এটি পারসিক সাম্রাজ্যের অনুমোদিত একটি রাষ্ট্রীয় সংবিধান হিসেবেও ইয়েহুদ প্রদেশে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই লিখিত আইনটি সমাজের সমস্ত মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস এবং বিচারব্যবস্থাকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে।
এই সময়ে তাদের ধর্মীয় চিন্তাধারায় পারসিক বা জরাথুস্ট্রীয় (Zoroastrian) ধর্মের এক বিশাল প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মে শয়তান, পরকাল, স্বর্গ-নরক বা শেষ বিচারের দিনের মতো ধারণাগুলো তেমন একটা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু পারসিক সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার সময় জরাথুস্ট্রীয় ধর্মের দ্বৈতবাদ (Dualism) – অর্থাৎ আলো ও অন্ধকার বা মঙ্গল ও অমঙ্গলের মধ্যকার নিরন্তর সংঘাতের ধারণাটি তাদের ধর্মীয় চিন্তায় গভীরভাবে প্রবেশ করে। এই যুগেই প্রথম ফেরেশতা বা স্বর্গীয় দূত এবং শয়তানের একটি সুসংগঠিত ধারণা তাদের সাহিত্যে জায়গা করে নিতে শুরু করে। তারা তাদের প্রাচীন ধর্মকে নতুন যুগের এই দার্শনিক কাঠামোর সাথে সমন্বয় করে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং বিশ্বজনীন একশ্বরবাদে রূপান্তরিত করে। তবে তারা সরাসরি কখনো স্বীকার করেনি যে তারা পারসিকদের কাছ থেকে এই ধারণাগুলো নিয়েছে। তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই নতুন দার্শনিক উপাদানগুলোকে নিজেদের প্রাচীন ইতিহাস এবং নবীদের বাণীর সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল, যাতে মনে হয় এগুলো আগে থেকেই তাদের ধর্মের অংশ ছিল।
পারসিক যুগের এই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ধর্মীয় পুনর্গঠন মূলত প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে একটি যুগের অবসান এবং নতুন যুগের সূচনা করেছিল। একটি রাষ্ট্র যা একসময় রাজা এবং সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল, তা এখন পুরোপুরি একটি গ্রন্থ, একটি মন্দির এবং একদল পণ্ডিতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাজতন্ত্রের যুগ শেষ হয়ে জন্ম নেয় আধুনিক ইহুদি পরিচয়ের একদম প্রাথমিক ভিত্তি। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা হয়তো বারবার হাতছাড়া হতে পারে, শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলো হয়তো বারবার তাদের ভূমি দখল করতে পারে, কিন্তু একটি লিখিত গ্রন্থ এবং সুসংগঠিত ধর্মতত্ত্ব থাকলে কোনো জাতি কখনো হারিয়ে যায় না। এজরা এবং নেহেমিয়াহর মতো আমলারা পারসিক সাম্রাজ্যের ছদ্মবেশে মূলত এমন এক সামাজিক এবং ধর্মীয় সীমানা নির্মাণ করেছিলেন, যা শত শত বছরের পরাধীনতা সত্ত্বেও তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছিল। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এই পুনর্গঠনের যুগটি কোনো ঐশ্বরিক জাদুর কাঠির স্পর্শে হয়নি; এটি ছিল মানুষের বেঁচে থাকার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা এবং অত্যন্ত ধূর্ত আর্থ-সামাজিক হিসাব-নিকাশেরই এক অনবদ্য বুদ্ধিবৃত্তিক ফসল।
দ্বিতীয় মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (Second Temple and Religious Institutions): নতুন ধর্মীয় কাঠামো
দ্বিতীয় মন্দিরের নির্মাণ ও পুরোহিততন্ত্রের উত্থান (Construction of the Second Temple and the Rise of Priesthood)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ব্যাবিলনীয় নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর জেরুজালেমে যে নতুন সমাজকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দ্বিতীয় মন্দির। ৫১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পারসিক সম্রাট দারিয়ুসের রাজত্বকালে এই মন্দিরটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। ধর্মীয় মিথোলজিগুলোতে এই নির্মাণ প্রক্রিয়াকে ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি পূরণের এক মহিমান্বিত অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে এই প্রক্রিয়াটি ছিল সমসাময়িক ভূরাজনীতির এক নিখুঁত হিসাব-নিকাশ। পারসিক সাম্রাজ্য তাদের বিশাল ভূখণ্ডের প্রান্তিক প্রদেশগুলোকে শান্ত রাখার জন্য স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করত। জেরুজালেমের এই মন্দির নির্মাণ কোনো বিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল পারসিকদের বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক নীতিরই একটি অংশ। প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, সলোমনের আমলের প্রথম মন্দিরের তুলনায় এই নতুন ইমারতটি ছিল বেশ সাদামাটা। তারপরও এই কাঠামোটাই জুদাহ বা ইয়েহুদ প্রদেশের পুরো আর্থ-সামাজিক গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। এই সময় থেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র রাজপ্রাসাদ থেকে সরে গিয়ে মন্দিরের আঙিনায় স্থানান্তরিত হয়।
পারসিক শাসকরা খুব সচেতনভাবেই ডেভিডের প্রাচীন রাজবংশকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। একজন রাজার অধীনে রাজনৈতিক বিদ্রোহের যে ঝুঁকি থাকে, একজন পুরোহিতের অধীনে সেই ঝুঁকি প্রায় শূন্য। একারণে পারসিকরা জেরুজালেমের স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব প্রধান পুরোহিতের হাতে তুলে দেয়। সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় এই শাসনব্যবস্থাকে থিওক্রেসি বা ধর্মতন্ত্র (Theocracy) হিসেবে চিহ্নিত করা হয় (Grabbe, 2004)। এই ব্যবস্থায় প্রধান পুরোহিত কেবল ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, একই সাথে তিনি ছিলেন পারসিক সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত কর আদায়কারী এবং ইয়েহুদ প্রদেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ব্যক্তি। একটি কৃষিনির্ভর সমাজে যখন রাষ্ট্রের কোনো রাজা থাকে না, তখন মন্দিরের পুরোহিতরাই সমাজের নতুন অভিজাত শ্রেণীতে পরিণত হন। ধর্মীয় পবিত্রতার আড়ালে তারা নিজেদের এমন এক রাজনৈতিক স্তরে উন্নীত করেন, যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। একে তো তাদের হাতে ছিল ধর্মীয় আইনের নিয়ন্ত্রণ, তার ওপর ছিল পারসিক তলোয়ারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন।
নতুন এই শাসনব্যবস্থায় মন্দিরের স্থাপত্য নকশাও সমাজের শ্রেণিবিভাজনকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করত। মন্দিরের ভেতরের পবিত্রতম স্থানে কেবল প্রধান পুরোহিতের প্রবেশের অধিকার ছিল। এর বাইরের প্রাঙ্গণগুলোতে সাধারণ পুরোহিতরা যাতায়াত করতেন, আর সাধারণ মানুষদের জন্য ছিল সবচেয়ে বাইরের আঙিনা। এই স্থানিক বিভাজন মূলত ছিল সামাজিক মর্যাদারই এক দৃশ্যমান রূপ। সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, স্থাপত্য কীভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। মন্দিরের এই বিশাল পাথরের দেয়ালগুলো সাধারণ কৃষকদের মনে প্রতিনিয়ত একটি বার্তা দিত যে, ঐশ্বরিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাদের কোনো সরাসরি প্রবেশাধিকার নেই। দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে হলে তাদের অবশ্যই এই মধ্যস্বত্বভোগী পুরোহিত শ্রেণীর দ্বারস্থ হতে হবে। অর্থাৎ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি রূপ ধারণ করে, যা মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদাকে একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে বন্দি করে ফেলে। সহজ করে বললে, দ্বিতীয় মন্দিরের নির্মাণ মূলত প্রাচীন লেভান্টে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজাত শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল।
অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে মন্দির ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা (The Temple as an Economic Center and Wealth Management)
প্রাচীন যুগে যেকোনো বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কেবল প্রার্থনার জায়গা হিসেবে টিকে থাকতে পারত না। জেরুজালেমের দ্বিতীয় মন্দিরও এর ব্যতিক্রম ছিল না; এটি খুব দ্রুত ইয়েহুদ প্রদেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। ঐতিহাসিকরা এই ব্যবস্থাকে মন্দির-কেন্দ্রিক অর্থনীতি (Temple-State Economy) বলে আখ্যায়িত করেছেন (Schaper, 2000)। পারসিক সাম্রাজ্য এই মন্দিরটিকে ব্যবহার করত তাদের রাজস্ব আদায়ের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে। সাধারণ কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের প্রথম অংশ, গবাদিপশু এবং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য মন্দিরে দান হিসেবে নিয়ে আসত। ধর্মীয় মোড়কে এটি দান বা কোরবানি হিসেবে পরিচিত হলেও, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে এটি ছিল এক ধরনের বাধ্যতামূলক কর। এই বিপুল পরিমাণ কৃষিজ উদ্বৃত্ত মন্দিরের বিশাল সব গুদামে জমা হতো। পুরোহিত শ্রেণী এই সম্পদের একটি অংশ নিজেদের জীবনযাত্রার জন্য ব্যয় করত এবং বাকি অংশ রূপা বা অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতে রূপান্তর করে পারসিক রাজকোষে প্রেরণ করত।
এই অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে সমাজের ভেতরে এক গভীর বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। পাহাড়ি অঞ্চলের শুষ্ক জলবায়ুতে কৃষিকাজ করে এমনিতেই কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন ছিল। তার ওপর পারসিক সাম্রাজ্যের সরাসরি কর এবং মন্দিরের ধর্মীয় কর মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। খরা বা ফসলের ক্ষতির সময় কৃষকরা তাদের কর মেটানোর জন্য মন্দিরের অভিজাত পুরোহিতদের কাছ থেকেই চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতো। ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাদের পৈতৃক জমিগুলো শেষ পর্যন্ত মন্দিরের এস্টেট বা পুরোহিতদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হতো। ধর্মীয় আখ্যানে পুরোহিতদের পরম ধার্মিক ও ঈশ্বরের সেবক হিসেবে দেখানো হলেও, মাটির তলার অর্থনীতি তাদের এক সুদখোর ও শোষক জমিদার শ্রেণীতে পরিণত করেছিল। মন্দিরের কোষাগার ফুলেফেঁপে উঠছিল, আর অন্যদিকে ইয়েহুদ প্রদেশের গ্রামীণ জনপদগুলো পরিণত হচ্ছিল ভূমিহীন দিনমজুরদের বস্তিতে।
মন্দিরের এই সম্পদ কেবল কৃষি খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের একটি বড় অংশ মন্দিরের কোষাগারের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফিনিশীয় এবং গ্রিক বণিকরা জেরুজালেমে আসত বাণিজ্য করতে, আর মন্দিরের অভিজাতরা তাদের প্রধান ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে জেরুজালেমের অভিজাত এলাকাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি বিলাসবহুল সামগ্রী এবং গ্রিক মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। এই বস্তুগত প্রমাণগুলো নির্দেশ করে যে, মন্দিরের সাথে যুক্ত থাকা মানুষেরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লভ্যাংশ ভোগ করত। ধর্মের সাথে অর্থনীতির এই শক্তিশালী জোটবদ্ধতা প্রাচীন বিশ্বের একটি সাধারণ চিত্র। মন্দিরটি মূলত কাজ করত একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে, যেখানে সাধারণ মানুষের শ্রমের ফসল জমা হতো এবং তা দিয়ে অভিজাতদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা পরিচালিত হতো। বস্তুত, দ্বিতীয় মন্দির কোনো অলৌকিক আশীর্বাদ ছিল না; এটি ছিল সম্পদের পুঞ্জীভবন এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের এক অত্যন্ত কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্র।
ধর্মীয় আচারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্নতা (Institutionalization of Religious Rituals and the Alienation of the Masses)
দ্বিতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার পর ধর্মচর্চার প্রকৃতিতে এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন আসে। প্রাচীনকালের উপজাতীয় যুগে ধর্ম ছিল অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত এবং বিকেন্দ্রীভূত। গ্রামের মানুষেরা নিজেদের বাড়ির আশেপাশের ছোট ছোট বেদিতে বা পাহাড়ের চূড়ায় নিজেদের মতো করে প্রার্থনা করত। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় এই ধরনের স্বাধীন ধর্মচর্চাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সমস্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে জেরুজালেমের মন্দিরে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং তাকে একটি অত্যন্ত জটিল আইনি কাঠামোর ভেতরে বেঁধে ফেলা হয়। এই সময়ের ধর্মীয় সাহিত্যে বিশুদ্ধতা ও অশুচিতার ধারণা (Concept of Purity and Impurity) অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে (Klawans, 2005)। একজন সাধারণ মানুষ কখন পবিত্র আর কখন অপবিত্র, তা নির্ধারণ করার একক ক্ষমতা চলে যায় পুরোহিতদের হাতে। জন্ম, মৃত্যু, অসুস্থতা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশকে ধর্মীয় আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়।
এই প্রাতিষ্ঠানিক আচারের সবচেয়ে বড় দিকটি ছিল পশু বলির প্রথা। মন্দিরে কেবল নির্দিষ্ট মানের এবং খুঁতহীন পশুই বলি হিসেবে গ্রহণ করা হতো। এই খুঁতহীন পশুগুলো সাধারণ কৃষকদের পক্ষে সবসময় জোগান দেওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে তাদের মন্দিরের অনুমোদিত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া দামে পশু কিনতে হতো। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধর্মকে একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছিল। যাজক বা পুরোহিতরা বলির পশুর মাংসের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজেদের প্রাপ্য হিসেবে গ্রহণ করত, যা তাদের খাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করত। ধর্মীয় গ্রন্থে এই বলিদান প্রথাকে ঈশ্বরের সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, সমাজতাত্ত্বিক লেন্স থেকে দেখলে এটি ছিল সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো সম্পদের এক সুকৌশল লুণ্ঠন। যারা এই ব্যয়বহুল আচারে অংশ নিতে পারত না, সমাজ তাদের অপবিত্র এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট নয় বলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রান্তিক করে রাখত।
ফলে গ্রামীণ সাধারণ কৃষকদের সাথে জেরুজালেমের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এক বিশাল মানসিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব তৈরি হয়। কৃষকরা বছরের পর বছর হয়তো একবারও জেরুজালেমে যাওয়ার সুযোগ পেত না। তাদের কাছে মন্দির ছিল একটি দূরবর্তী এবং শোষক প্রতিষ্ঠান, যা কেবল তাদের ফসল নিয়ে যায়, কিন্তু বিনিময়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো সরাসরি সুবিধা দেয় না। ধর্মীয় অভিজাতরা নিজেদের এই জটিল আচারগুলো নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকত যে, গ্রামীণ মানুষের বাস্তব জীবনের অভাব বা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। আচারের এই বাড়াবাড়ি মূলত ধর্মের আসল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে এক ধরনের যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছিল। সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল যে, মন্দিরের এই জাঁকজমক তাদের জন্য নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার। ধর্মীয় আচারের এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শেষ পর্যন্ত সমাজকে এক সুতোয় গাঁথার বদলে মানুষের মধ্যে বিভাজনের দেয়াল আরও মজবুত করেছিল।
তোরাহ বা লিখিত আইনের প্রবর্তন ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ (Introduction of the Torah as Written Law and Social Control)
পারসিক যুগে ইয়েহুদ প্রদেশের ধর্মীয় কাঠামোতে সবচেয়ে দূরপ্রসারী যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনটি ঘটে, তা হলো লিখিত আইনের চূড়ান্ত প্রবর্তন। হিব্রু বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, এজরা নামের একজন পারসিক রাজকীয় আমলা ব্যাবিলন থেকে তোরাহ বা আইনের বই নিয়ে জেরুজালেমে এসেছিলেন। ঐতিহাসিক গবেষণায় এই ঘটনাটিকে সাম্রাজ্যিক অনুমোদন তত্ত্ব (Imperial Authorization Theory) দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় (Watts, 2001)। পারসিক সাম্রাজ্যের একটি সাধারণ নীতি ছিল তাদের বিভিন্ন প্রদেশের স্থানীয় আইনগুলোকে বিধিবদ্ধ করা, যাতে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ সহজ হয়। এজরার নিয়ে আসা এই তোরাহ কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ ছিল না, এটি ছিল পারসিক সাম্রাজ্য দ্বারা অনুমোদিত ইয়েহুদ প্রদেশের নতুন সংবিধান। এই লিখিত আইনটির প্রবর্তন প্রাচীন ইসরায়েলীয় সমাজে এক নীরব বিপ্লবের জন্ম দেয়। এর আগে সমাজের নিয়মকানুনগুলো মূলত মৌখিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় বিচারকদের সাধারণ জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন সবকিছু একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থে আবদ্ধ হয়ে গেল।
লিখিত আইনের সবচেয়ে বড় সুবিধা ভোগ করত সেই সময়ের শিক্ষিত পুরোহিত ও করণিক শ্রেণী। কারণ সাধারণ মানুষের সিংহভাগই ছিল নিরক্ষর। গ্রন্থ পড়তে পারা এবং তার ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বিশাল সামাজিক ক্ষমতা তুলে দেয়। আইন যখন লিখিত হয়, তখন তা আর নমনীয় থাকে না। পুরোহিতরা এই তোরাহর মাধ্যমেই সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রা, বিবাহ, উৎসব এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রাচীনকালের লোককথা, মিথোলজি এবং বিভিন্ন উপজাতীয় নিয়মকানুনগুলোকে একত্র করে সেগুলোকে ঐশ্বরিক আদেশ হিসেবে প্রচার করেন। সাধারণ মানুষের কাছে দাবি করা হয় যে, এই আইনগুলো সরাসরি ঈশ্বর তাদের পূর্বপুরুষদের দিয়েছিলেন। ধর্মীয় পবিত্রতার এই মোড়ক আইনগুলোকে এমন এক প্রশ্নাতীত রূপ দেয়, যার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস সাধারণ মানুষের ছিল না। মূলত, জ্ঞান বা লেখনী বিদ্যাকে ব্যবহার করে কীভাবে একটি জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তোরাহর প্রবর্তন তার এক ধ্রুপদী ঐতিহাসিক উদাহরণ।
লিখিত এই গ্রন্থের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছিল নবীদের ওপর। প্রাচীনকালে নবীরা ছিলেন সমাজের এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যারা প্রায়শই রাজশক্তি এবং পুরোহিততন্ত্রের সমালোচনা করতেন। কিন্তু তোরাহ যখন চূড়ান্ত ঐশ্বরিক আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন সমাজে নতুন করে আর কোনো নবীর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। পুরোহিতরা ঘোষণা করলেন যে ঈশ্বরের যা কিছু বলার ছিল, তা এই গ্রন্থে লেখা হয়ে গেছে; নতুন করে আর কোনো প্রত্যাদেশের সুযোগ নেই। এর ফলে ধর্মের ভেতরে থাকা যেকোনো ধরনের প্রগতিশীল বা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। ধর্ম পুরোপুরি একটি রুদ্ধদ্বার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে নতুন চিন্তার কোনো জায়গা ছিল না। গ্রন্থভিত্তিক এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত চেতনাকে ধ্বংস করে দিয়ে তাদের এক আক্ষরিক এবং কঠোর কাঠামোর দাসে পরিণত করেছিল। এটি সমাজকে সুশৃঙ্খল করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই শৃঙ্খলার বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছিল মানুষের চিন্তার মুক্তি।
নতুন ধর্মীয় বিশ্বাস, পারসিক প্রভাব ও মিথোলজির বিবর্তন (New Religious Beliefs, Persian Influence and the Evolution of Mythology)
দ্বিতীয় মন্দিরের যুগে ইহুদি ধর্মতত্ত্বে এমন কিছু নতুন ধারণার প্রবেশ ঘটে, যা এর আগে প্রাচীন ইসরায়েলীয় সমাজে পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল। একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা কখনো একটি বদ্ধ ঘরে বিকশিত হয় না; পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আবহাওয়া তাকে প্রতিনিয়ত রূপ দেয়। পারসিক সাম্রাজ্যের দীর্ঘ দুই শতাব্দীর শাসনে জরাথুস্ট্রীয় (Zoroastrian) ধর্মের প্রচুর দার্শনিক উপাদান স্থানীয় বিশ্বাসে মিশে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো দ্বৈতবাদ (Dualism)-এর ধারণা। প্রাচীনকালে ইসরায়েলীয়রা বিশ্বাস করত যে ভালো এবং মন্দ উভয়ই সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকেই আসে। কিন্তু পারসিকদের প্রভাবে তাদের মধ্যে এক নতুন ধারণার জন্ম হয়, যেখানে জগৎকে আলো এবং অন্ধকারের দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তির যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখা শুরু হয়। এই যুগেই প্রথম শয়তান (Satan) বা অন্ধকারের এক স্বাধীন অশুভ শক্তির ধারণা ধর্মীয় সাহিত্যে শক্তভাবে জায়গা করে নেয়। একই সাথে বিভিন্ন স্তরের ফেরেশতা বা স্বর্গীয় দূতের ধারণাও এই সময়েই বিকশিত হয়, যা মূলত পারসিক রাজদরবারের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোরই এক স্বর্গীয় প্রতিচ্ছবি।
মিথোলজির এই বিবর্তন কেবল স্বর্গ বা নরকেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি মানবজীবনের চূড়ান্ত পরিণতি বা পরকালের ধারণাকেও আমূল বদলে দেয়। প্রাচীন ইসরায়েলীয়দের পরকাল বা মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে তেমন কোনো সুস্পষ্ট বা আশাব্যঞ্জক ধারণা ছিল না। তারা বিশ্বাস করত যে মৃত্যুর পর সব মানুষ ‘শিওল’ নামের এক অন্ধকার পাতালপুরীতে ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াবে, যেখানে ঈশ্বরের কোনো অধিকার নেই। কিন্তু পারসিক যুগে এবং পরবর্তীতে হেলেনিস্টিক যুগে, বিশেষ করে যখন সাধারণ মানুষ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চরম শোষণের শিকার হচ্ছিল, তখন তাদের টিকে থাকার জন্য এক নতুন আশার বাণী দরকার ছিল। ঠিক তখনই মৃত্যু পরবর্তী বিচার, স্বর্গে পুরস্কার এবং নরকে শাস্তির ধারণাগুলো তাদের ধর্মীয় সাহিত্যে প্রবেশ করে (Bickerman, 1988)। এই ধারণাগুলো মূলত ছিল এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিপূরণ। বাস্তবে যখন তারা বিদেশি শাসকদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছিল এবং ন্যায়বিচার পাচ্ছিল না, তখন তারা এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা শুরু করে, যেখানে মৃত্যুর পর সমস্ত অন্যায়ের বিচার হবে।
এই নতুন মিথোলজিগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের প্রাচীন লোককথা এবং ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা কখনোই সরাসরি স্বীকার করেনি যে এই ধারণাগুলো পারসিকদের কাছ থেকে ধার করা। বরং তারা এমনভাবে তাদের সাহিত্যকে সম্পাদনা করেছিল, যেন মনে হয় এই দ্বৈতবাদ বা পরকালের ধারণা আগে থেকেই তাদের ধর্মে লুক্কায়িত ছিল। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এটি পরিষ্কার যে, ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো কোনো আকাশ থেকে পড়া অপরিবর্তনীয় ধ্রুব সত্য নয়। আর্থ-সামাজিক সংকট, রাজনৈতিক পরাধীনতা এবং ভিনদেশি সংস্কৃতির সংস্পর্শ – এই সব কিছুর মিথস্ক্রিয়াতেই ধর্ম যুগে যুগে নতুন রূপ ধারণ করে। পরকালের শাস্তির ভয় এবং পুরস্কারের প্রলোভন মূলত একটি শোষিত জাতিকে শান্ত রাখার জন্য অত্যন্ত কার্যকর এক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। মানুষ বর্তমানের কষ্ট ভুলে ভবিষ্যতের এক কাল্পনিক স্বর্গের আশায় নিজেদের নিয়তির কাছে সমর্পণ করতে শুরু করে।
ধর্মীয় অভিজাত বনাম প্রান্তিক গোষ্ঠী এবং সামারিটান বিভাজন (Religious Elite vs. Marginalized Groups and the Samaritan Schism)
দ্বিতীয় মন্দিরের যুগে সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতটি তৈরি হয়েছিল একটি গভীর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে, যা পরবর্তীকালে ধর্মীয় মোড়কে উপস্থাপিত হয়। ব্যাবিলন থেকে ফিরে আসা অভিজাত গোষ্ঠী বা ‘গোলাহ’ সম্প্রদায় যখন জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তারা স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের এবং উত্তরের সামারিয়া অঞ্চলের মানুষদের পুরোপুরি বর্জন করার নীতি গ্রহণ করে। এই স্থানীয় মানুষেরা, যারা ব্যাবিলনীয় আক্রমণের সময় নির্বাসিত হয়নি এবং যুগ যুগ ধরে সেখানেই কৃষিকাজ করে আসছিল, তারা নতুন এই মন্দির নির্মাণে অংশ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু জেরুজালেমের ধর্মীয় নেতৃত্ব তাদের প্রস্তাব অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ধর্মীয় সাহিত্যে এই স্থানীয় মানুষদের অশুচি এবং ধর্মত্যাগী হিসেবে চিত্রিত করা হলেও, এই বিরোধের মূলে ছিল নিখাদ সম্পদ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব (Conflict over Resources and Power) (VanderKam, 2001)। ফিরে আসা অভিজাতরা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং জমির মালিকানা স্থানীয়দের সাথে ভাগ করে নিতে রাজি ছিল না।
এই বর্জনের নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য এজরা এবং নেহেমিয়াহ আন্তঃবিবাহ বা স্থানীয় নারীদের বিয়ে করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যারা এই আইন অমান্য করবে, তাদের সমাজ থেকে বহিষ্কার করার হুমকি দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপটিকে ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার লড়াই বলা হলেও, এটি মূলত ছিল নব্য অভিজাতদের নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ। যদি স্থানীয়দের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি হয়, তবে জমির উত্তরাধিকার এবং মন্দিরের সম্পদে স্থানীয়দের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তাই একটি কাল্পনিক ধর্মীয় বিশুদ্ধতার দেয়াল তুলে স্থানীয় বিশাল জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিহীন করে রাখা হয়। এই কাঠামোগত বৈষম্য এবং অপমানের কারণে স্থানীয় প্রান্তিক মানুষেরা জেরুজালেমের মন্দিরের ওপর থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তারা বুঝতে পারে যে, জেরুজালেমের এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি তাদের আধ্যাত্মিক মুক্তির জন্য নয়, বরং তাদের শোষণের জন্যই তৈরি হয়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে জন্ম নেয় একটি নতুন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মেরুকরণ। সামারিয়া অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ এবং জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত কিছু পুরোহিত মিলে গেরিজিম পর্বতে নিজেদের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা মন্দির নির্মাণ করে। এই ঘটনাটি থেকেই মূলত সামারিটান বা শোমরোনীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব, যারা আজও নিজেদের প্রাচীন ইসরায়েলীয় ঐতিহ্যের প্রকৃত ধারক বলে দাবি করে। হিব্রু বাইবেলে এবং পরবর্তীকালের সাহিত্যে এই সামারিটানদের চরম খলনায়ক, ষড়যন্ত্রকারী এবং বিদেশি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সামারিটানরা ভিনদেশি কেউ ছিল না; তারা ছিল এই মাটিরই সন্তান, যাদের কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে প্রান্তিক করে দেওয়া হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিভাজন বা স্কিজম (Schism) প্রমাণ করে যে, কীভাবে একটি সমাজের ভেতরের অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ক্ষমতালিপ্সা শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় ভাঙনের রূপ নেয়। জেরুজালেমের দ্বিতীয় মন্দির হয়তো একটি চমৎকার পাথরের ইমারত ছিল, কিন্তু এর ভিত্তি রচিত হয়েছিল অসংখ্য স্থানীয় মানুষের বঞ্চনা এবং ঐতিহাসিক অবিচারের ওপর।
আলেকজান্ডার ও হেলেনিস্টিক প্রভাব (Alexander and Hellenistic Influence): গ্রিক বিশ্বের আগমন
আলেকজান্ডারের দিগ্বিজয় ও লেভান্টের রাজনৈতিক পালাবদল (Alexander’s Conquest and the Political Shift of the Levant)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এক অভাবনীয় রাজনৈতিক ঝড়ের বার্তা নিয়ে আসে। মেসিডোনিয়ার তরুণ রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এক বিশাল ও অপ্রতিরোধ্য গ্রিক বাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনর পার হয়ে পারসিক সাম্রাজ্যের সীমানায় প্রবেশ করেন। ইসাসের যুদ্ধে পারস্যের রাজা তৃতীয় দারিয়ুসকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার পর আলেকজান্ডারের জন্য মিশর এবং লেভান্ট দখলের পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যায়। এই সামরিক অভিযানটি নিছক কোনো রাজ্য দখলের লড়াই ছিল না; এটি ছিল মূলত প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার এক চূড়ান্ত পালাবদল। এতকাল ধরে লেভান্ট অঞ্চলটি পারসিক সাম্রাজ্যের পূর্বমুখী ভূরাজনৈতিক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আলেকজান্ডারের বিজয়ের ফলে এই অঞ্চলটি চিরতরে ভূমধ্যসাগরীয় বা পশ্চিমামুখী বলয়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা আলেকজান্ডারের এই অভিযানকে সাম্রাজ্যিক সম্প্রসারণবাদ (Imperial Expansionism)-এর এক ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখেন। আলেকজান্ডার কেবল মাটি দখল করছিলেন না, তিনি প্রাচীন বিশ্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করছিলেন। তার সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে মেসিডোনীয় ফ্যালাংক্স বা বর্শাধারী পদাতিক বাহিনীর রণকৌশল, প্রাচীন বিশ্বের যেকোনো প্রতিরোধকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিচ্ছিল।
লেভান্ট অঞ্চলে আলেকজান্ডারের অভিযান খুব একটা মসৃণ ছিল না, বিশেষ করে উপকূলীয় শহরগুলোতে তাকে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ফিনিশীয় নগররাষ্ট্র টায়ার এবং দক্ষিণের গাজা শহর আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়। পারসিক নৌবাহিনীর মূল ঘাঁটি ছিল এই শহরগুলো, তাই আলেকজান্ডারের জন্য এগুলো দখল করা কৌশলগতভাবে অপরিহার্য ছিল। দীর্ঘ সাত মাসের এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী অবরোধের পর টায়ার শহরের পতন ঘটে এবং এর হাজার হাজার অধিবাসীকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। গাজার পরিণতিও একই রকম নির্মম ছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো আলেকজান্ডারের রোমান্টিক ‘মহান বীর’ ইমেজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক চরম বাস্তববাদী ও নিষ্ঠুর সামরিক শাসকের রূপ উন্মোচন করে। অন্যদিকে, জেরুজালেম এবং জুদাহর ইহুদিরা বিনা যুদ্ধে আলেকজান্ডারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীকালের ইহুদি মিথোলজি, বিশেষ করে ফ্ল্যাভিয়াস জোসেফাসের লেখায় দাবি করা হয়েছে যে, আলেকজান্ডার জেরুজালেমে এসে প্রধান পুরোহিতকে সম্মান জানিয়েছিলেন এবং ঈশ্বরের মন্দিরে উপাসনা করেছিলেন। তবে আধুনিক ইতিহাস চর্চা এই ধরনের ধর্মীয় আখ্যানকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবেই দেখে। বাস্তবে, টায়ার ও গাজার করুণ পরিণতি দেখেই জুদাহর নেতৃত্ব অত্যন্ত চতুরতার সাথে বিনা রক্তপাতে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল (Grabbe, 2008)।
৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যু পুরো নবগঠিত সাম্রাজ্যকে এক চরম বিশৃঙ্খলার মুখে ঠেলে দেয়। তিনি কোনো যোগ্য উত্তরাধিকারী রেখে যাননি, ফলে তার সেনাপতিদের মধ্যে ক্ষমতা দখলের এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ইতিহাসে এই সেনাপতিরা ডায়াডোকি বা উত্তরাধিকারী নামে পরিচিত। এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লেভান্ট অঞ্চলটি বারবার হাতবদল হতে থাকে। কখনও তা সিরিয়াকেন্দ্রিক সেলিউসিডদের দখলে যেত, তো কখনও মিশরকেন্দ্রিক টলেমিদের দখলে। এই ডায়াডোকি যুদ্ধগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যের উত্থান বা পতন কোনো ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ নয়। এগুলো সম্পূর্ণভাবে সামরিক লজিস্টিকস, নেতৃত্বের সংকট এবং ক্ষমতার পাশবিক লড়াইয়ের ওপর নির্ভরশীল। আলেকজান্ডারের বিশাল সাম্রাজ্য খণ্ড খণ্ড হয়ে গেলেও, তিনি যে গ্রিক ভাষা, সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বীজ রোপণ করে গিয়েছিলেন, তা পরবর্তী শত শত বছর ধরে লেভান্টের সমাজ ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। গ্রিক বিশ্বের এই আগমন প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের চিন্তাধারা ও জীবনযাত্রায় এক অলঙ্ঘনীয় ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিল, যা আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।
হেলেনীয় সংস্কৃতির বিস্তার ও নগর-পরিকল্পনার রূপান্তর (Spread of Hellenistic Culture and Transformation of Urban Planning)
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য বিভক্ত হলেও গ্রিক সংস্কৃতির এক অপ্রতিরোধ্য স্রোত পুরো প্রাচ্যকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই নতুন মিশ্র সংস্কৃতিকে ঐতিহাসিকরা হেলেনিজম বলে আখ্যায়িত করেছেন। হেলেনিজম কেবল গ্রিক ভাষা বা পোশাকের অনুকরণ ছিল না; এটি ছিল এক নতুন ধরনের জীবনবোধ এবং বিশ্বস্তরের আদর্শ। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে হেলেনীয় সমন্বয়বাদ (Hellenistic Syncretism) বলা হয়, যেখানে গ্রিক সংস্কৃতির সাথে স্থানীয় প্রাচ্য সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিথস্ক্রিয়া ঘটেছিল (Hengel, 1974)। হেলেনিস্টিক শাসকরা লেভান্টের বিভিন্ন স্থানে আলেকজান্দ্রিয়া, অ্যান্টিওক বা টলেমেস-এর মতো অসংখ্য নতুন শহর নির্মাণ করেন। এই শহরগুলো প্রাচীন কানানীয় বা ইসরায়েলীয় শহরের মতো অপরিকল্পিত ছিল না। এগুলো গড়ে উঠেছিল গ্রিক ‘পোলিস’ বা নগররাষ্ট্রের ধারণার ওপর ভিত্তি করে। হিপ্পোডামিয়ান গ্রিড বা সমান্তরাল রাস্তাঘাটের নকশা ব্যবহার করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই শহরগুলো সাজানো হয়েছিল। এর পাশাপাশি প্রতিটি শহরে গড়ে উঠেছিল জিমনাসিয়াম, থিয়েটার, এগোরা বা উন্মুক্ত বাজার এবং বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির। এই স্থাপত্যগুলো নিছক ইট-পাথরের ইমারত ছিল না, এগুলো ছিল সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
জিমনাসিয়াম এবং এফিবিওন-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লেভান্টের অভিজাত সমাজের মনস্তত্ত্বকে পুরোপুরি বদলে দেয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তরুণরা কেবল শরীরচর্চাই করত না, সেখানে গ্রিক সাহিত্য, দর্শন এবং রাজনীতি শেখানো হতো। সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ধাক্কাটি ছিল নগ্ন হয়ে শরীরচর্চা বা খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার গ্রিক রীতি। প্রাচীন ইহুদি বা লেভান্টীয় সমাজে জনসমক্ষে শরীর প্রদর্শন চরম লজ্জাজনক বলে বিবেচিত হতো। তার ওপর ইহুদিদের খতনা প্রথার কারণে জিমনাসিয়ামে তারা খুব সহজেই আলাদা হয়ে যেত এবং গ্রিকদের কাছে উপহাসের পাত্র হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নতুন শাসকগোষ্ঠীর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য জুদাহর শহুরে অভিজাতরা এই গ্রিক রীতিগুলো প্রবল উৎসাহে গ্রহণ করতে শুরু করে। তারা স্থানীয় পোশাক ছেড়ে গ্রিক চাদর বা ‘হিমেশন‘ পরতে শুরু করে এবং নিজেদের নাম পরিবর্তন করে গ্রিক নাম গ্রহণ করে। জেসন, মেনেলাউস বা অ্যান্টিগোনাসের মতো নামগুলো জেরুজালেমের অভিজাত পাড়ায় খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা অনেক সময় দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক গোঁড়ামিকে খুব সহজেই পরাজিত করতে পারে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ এই সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক চমৎকার দৃশ্যমান চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। মারেশা বা তেল আনাফা-এর মতো শহরগুলোতে খনন করে প্রচুর পরিমাণে রোডস দ্বীপ থেকে আমদানি করা ওয়াইন অ্যাম্ফোরা বা মদের পাত্র পাওয়া গেছে। এর সাথে পাওয়া গেছে সূক্ষ্ম গ্রিক মৃৎপাত্র, গ্রিক ধাঁচের মোজাইক করা মেঝে এবং স্নানাগার। এই বস্তুগত প্রমাণগুলো নির্দেশ করে যে, হেলেনীয় সংস্কৃতি কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিষয় ছিল না; এটি ছিল সেই সময়ের এক গ্ল্যামারাস এবং উন্নত জীবনব্যবস্থা, যাকে স্থানীয় অভিজাতরা স্বেচ্ছায় আপন করে নিয়েছিল (Levine, 1998)। একটি উন্নত সভ্যতার ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তি কীভাবে তরবারির চেয়েও বেশি কার্যকরভাবে একটি সমাজকে ভেতর থেকে বদলে দিতে পারে, হেলেনিজমের বিস্তার তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। গ্রিকরা স্থানীয় ধর্মগুলোকে ধ্বংস করতে চায়নি; তারা কেবল সেগুলোকে নিজেদের বিশাল সাংস্কৃতিক ছাতার নিচে একীভূত করতে চেয়েছিল। জিউসের সাথে স্থানীয় প্রধান দেবতার একীকরণ বা হারকিউলিসের সাথে স্থানীয় বীরদের মেলবন্ধন ঘটানোর মাধ্যমে তারা এই কাজগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পন্ন করেছিল।
টলেমি ও সেলিউসিড শাসন: দুই সাম্রাজ্যের টানাপোড়েন (Ptolemaic and Seleucid Rule: Tug of War Between Two Empires)
৩০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইপসাসের যুদ্ধের পর লেভান্ট অঞ্চলটি মিশরের টলেমিক রাজবংশের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং পরবর্তী প্রায় এক শতাব্দী তারা এই অঞ্চল শাসন করে। ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সময়ে জুদাহ ছিল মূলত একটি বাফার স্টেট (Buffer State), যা উত্তরের সেলিউসিড সাম্রাজ্য এবং দক্ষিণের টলেমিক সাম্রাজ্যের মাঝখানে অবস্থান করছিল। টলেমিক শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং চরম আমলাতান্ত্রিক ছিল। তারা ধর্মীয় বিষয়ে স্থানীয়দের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতির ওপর এক অক্টোপাসের মতো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। টলেমিরা পুরো লেভান্টকে একটি বিশাল বাণিজ্যিক খামার হিসেবে বিবেচনা করত। তারা ‘ট্যাক্স ফার্মিং’ বা কর ইজারা ব্যবস্থা চালু করে, যেখানে স্থানীয় ধনী ব্যক্তিরা নিলামের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট এলাকার কর আদায়ের অধিকার কিনে নিত। এই ব্যবস্থায় ইজারাদাররা রাজকোষে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দেওয়ার পর সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে যত খুশি তত অর্থ আদায় করতে পারত। এই নির্মম অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে গ্রামীণ কৃষকরা চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে, অন্যদিকে স্থানীয় ইজারাদাররা ফুলেফেঁপে ওঠে।
এই টলেমিক শাসনামলেই জুদাহ সমাজে তোবিয়াদ নামের এক অত্যন্ত প্রতাপশালী পরিবারের উত্থান ঘটে। জেনন প্যাপিরাই (Zenon Papyri) নামক সমসাময়িক মিশরীয় নথিপত্র থেকে এই তোবিয়াদ পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। জোসেফ নামের এক তোবিয়াদ নেতা পুরো লেভান্টের কর আদায়ের ইজারা লাভ করে রাতারাতি এক বিশাল ধনকুবেরে পরিণত হন। তিনি এবং তার পরিবার গ্রিক ভাষায় কথা বলতেন, আলেকজান্দ্রিয়ার রাজদরবারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং দাস ব্যবসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন (Tcherikover, 1959)। এই ঐতিহাসিক দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, প্রাচীন জুদাহ সমাজ কেবল পুরোহিত এবং ধার্মিক কৃষকদের নিয়ে গঠিত ছিল না; সেখানে এক অত্যন্ত চতুর, ধর্মনিরপেক্ষ এবং পুঁজিপতি অভিজাত শ্রেণীও ছিল, যারা ভিনদেশি সাম্রাজ্যের সাথে হাত মিলিয়ে নিজেদের সাধারণ মানুষকে শোষণ করত। ধর্মীয় ইতিহাসগুলো প্রায়শই এই অর্থনৈতিক শোষণের গল্পগুলোকে আড়াল করে কেবল ধর্মীয় পবিত্রতার গল্প ফেঁদেছে। কিন্তু জেনন প্যাপিরাই-এর মতো বস্তুনিষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল সেই ধর্মের মোড়কের ভেতরের আসল অর্থনৈতিক কঙ্কালটিকে উন্মোচন করে দেয়।
১৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্যানিয়ামের যুদ্ধে সেলিউসিড রাজা তৃতীয় অ্যান্টিওকাস টলেমিদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন এবং এর ফলে পুরো লেভান্ট অঞ্চল সেলিউসিডদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় জেরুজালেমের ইহুদি নেতৃত্ব অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেলিউসিডদের সমর্থন জুগিয়েছিল। এর পুরস্কারস্বরূপ তৃতীয় অ্যান্টিওকাস একটি রাজকীয় ডিক্রি জারি করেন, যার মাধ্যমে ইহুদিদের তাদের নিজস্ব পৈতৃক আইন অনুযায়ী ধর্ম পালনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং জেরুজালেমের মন্দিরের জন্য কর মওকুফ করা হয়। প্রাচীনকালে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি বর্তমান আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারণার মতো কোনো মৌলিক মানবাধিকার ছিল না। এটি ছিল মূলত সাম্রাজ্যিক কূটনীতির একটি অংশ। রাজারা স্থানীয় অভিজাতদের অনুগত রাখার বিনিময়ে তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিতেন। সেলিউসিডদের এই ডিক্রি প্রমাণ করে যে, ঐশ্বরিক বিধান নয়, বরং অত্যন্ত নিপুণ রাজনৈতিক দরকষাকষির মাধ্যমেই প্রাচীন লেভান্টে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অস্তিত্ব এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখত।
ভাষা, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামোর গ্রিকীকরণ (Hellenization of Language, Administration, and Economic Structure)
আলেকজান্ডারের বিজয়ের পর লেভান্টের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছিল ভাষাতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে। এতদিন পর্যন্ত আরামীয় ভাষা ছিল এই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু খুব দ্রুতই গ্রিক ভাষার একটি বিশেষ রূপ, যা ‘কোইনে গ্রিক’ নামে পরিচিত, তা কূটনীতি, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা বা সাধারণ ভাষায় পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানে একে সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ (Cultural Assimilation) বলা হয়। কোনো ব্যক্তি যদি সরকারি দপ্তরে কাজ করতে চাইত বা বড় কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি করতে চাইত, তবে তার জন্য গ্রিক ভাষা জানাটা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। গ্রিক ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারা এবং দর্শনের বাহক। গ্রিক ভাষায় কথা বলা এবং গ্রিক সাহিত্য পড়া স্থানীয় অভিজাতদের জন্য একটি আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের সন্তানদের গ্রিক শিক্ষকদের কাছে পাঠাত হোমার বা প্লেটো পড়ার জন্য। এই ভাষাতাত্ত্বিক বিপ্লব পুরো সমাজকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলে – গ্রিক জানা শহুরে অভিজাত শ্রেণী এবং আরামীয় বা হিব্রু জানা গ্রামীণ সাধারণ মানুষ।
অর্থনৈতিক কাঠামোতেও এক বিশাল পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। হেলেনিস্টিক রাজারা পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে গ্রিক ড্রাকমা বা স্ট্যান্ডার্ড মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন করেন। এর আগে বাণিজ্য মূলত বিনিময় প্রথা বা ওজনের ভিত্তিতে রৌপ্য খণ্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু এই নতুন মানসম্মত মুদ্রাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে অভাবনীয় গতি এনে দেয়। জুদাহর অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি স্বনির্ভর কৃষিব্যবস্থা থেকে একটি অত্যন্ত বাণিজ্যিক এবং মুদ্রানির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়। তারা বিপুল পরিমাণ জলপাই তেল, ওয়াইন এবং বালসাম (এক ধরনের সুগন্ধি) রপ্তানি করত এবং বিনিময়ে গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে বিলাসবহুল মৃৎপাত্র, মার্বেল পাথর এবং দাস আমদানি করত। এই মুদ্রানির্ভর অর্থনীতি বা মনিটাইজেশন প্রাচীন গ্রামীণ সমাজের সামাজিক সুরক্ষা জালকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। কৃষকরা এখন আর ফসল দিয়ে নয়, মুদ্রা দিয়ে কর মেটাতে বাধ্য হতো। ফসল খারাপ হলে তারা মুদ্রার জন্য মহাজনদের কাছে যেত এবং ঋণের ফাঁদে পড়ে নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি হারাত। পুঁজিবাদের এই প্রাচীন রূপটি গ্রামীণ সমাজের চিরায়ত সাম্যকে চিরতরে বিনষ্ট করে দিয়েছিল।
প্রশাসনিক দিক থেকেও হেলেনিস্টিক শাসকরা এক নতুন আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর জন্ম দেন। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট এবং আইনগতভাবে কঠোর হয়। এর ফলে ধনী পরিবারগুলোর হাতে বিশাল পরিমাণ জমি পুঞ্জীভূত হতে শুরু করে। জেরুজালেমের প্রধান পুরোহিতের পদটিও এই সময়ে তার প্রাচীন ধর্মীয় পবিত্রতা হারিয়ে একটি নিখাদ রাজনৈতিক এবং লাভজনক লাভজনক প্রশাসনিক পদে পরিণত হয়। প্রধান পুরোহিত মূলত ছিলেন হেলেনিস্টিক রাজাদের স্থানীয় গভর্নর। কে প্রধান পুরোহিত হবেন, তা নির্ভর করত কে রাজকোষে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঘুষ হিসেবে দিতে পারবে তার ওপর। পবিত্রতম এই ধর্মীয় পদটি যখন নিলামে বিক্রি হওয়া শুরু হলো, তখন তা সাধারণ মানুষের মনে ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি এক চরম ঘৃণার জন্ম দেয় (Cohen, 1987)। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বৃহত্তর অর্থনৈতিক এবং সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তারা খুব সহজেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ধর্ম এখানে আর কোনো অলৌকিক শক্তি থাকে না, বরং এটি পুঁজি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের একটি হাতিয়ার মাত্র হয়ে দাঁড়ায়।
ইহুদি সমাজে বিভাজন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত (Division in Jewish Society and Intellectual Conflict)
হেলেনিস্টিক যুগে জুদাহ সমাজের সবচেয়ে বড় সংকটটি কোনো বিদেশি শক্তির সাথে ছিল না; এটি ছিল মূলত সমাজের ভেতরের এক তীব্র গৃহযুদ্ধ। ইতিহাস বইগুলোতে প্রায়শই একে ‘ইহুদি বনাম গ্রিক’ সংঘাত হিসেবে সরলীকরণ করা হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ইহুদি সমাজের ভেতরের দুটি মতাদর্শগত গোষ্ঠীর মধ্যকার লড়াই – হেলেনিস্ট বা গ্রিক-পন্থি এবং ঐতিহ্যবাদী বা ট্র্যাডিশনালিস্ট। গ্রিক-পন্থি অভিজাতরা মনে করত যে, গ্রিক সংস্কৃতি হলো প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে প্রগতিশীল এবং বিশ্বজনীন সংস্কৃতি। তারা নিজেদের প্রাচীন উপজাতীয় আইন এবং রীতিনীতিগুলোকে সেকেলে এবং রক্ষণশীল বলে মনে করত। তাদের দর্শন ছিল বিশ্বজনীনতাবাদ (Universalism) – তারা চেয়েছিল জেরুজালেমকে একটি আধুনিক গ্রিক নগররাষ্ট্র বা পোলিস হিসেবে গড়ে তুলতে, যার নাম হবে ‘অ্যান্টিওক অ্যাট জেরুজালেম’। এই গোষ্ঠীটির নেতৃত্বে ছিল তোবিয়াদ পরিবারের মতো পুঁজিপতিরা এবং জেসন বা মেনেলাউসের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান পুরোহিতরা। তারা জিমনাসিয়াম নির্মাণ করে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের আধুনিক হিসেবে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে।
অন্যদিকে, হাসিদিয়ান বা ঐতিহ্যবাদী গোষ্ঠীটি এই হেলেনীয় প্রভাবকে তাদের অস্তিত্বের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দেখত। তাদের দর্শন ছিল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদ (Cultural Particularism)। তারা বিশ্বাস করত যে, গ্রিক দর্শনের বস্তুবাদী চিন্তাধারা, নগ্ন শরীরচর্চা এবং বহুদেববাদের প্রভাব তাদের প্রাচীন ধর্মীয় চুক্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। গ্রিক দর্শনে প্রকৃতি, মানবদেহ এবং যুক্তির ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হতো, তা ঐতিহ্যবাদীদের কাছে চরম অগ্রহণযোগ্য ছিল, কারণ তারা জীবনকে দেখত কেবল ঐশ্বরিক আইনের অন্ধ অনুকরণের মাধ্যম হিসেবে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাতটি চরমে পৌঁছায় যখন ১৭৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে প্রধান পুরোহিত জেসন সেলিউসিড রাজা চতুর্থ অ্যান্টিওকাসকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ দিয়ে জেরুজালেমকে একটি গ্রিক পোলিস হিসেবে ঘোষণা করার অনুমতি আদায় করেন। তিনি জেরুজালেমে জিমনাসিয়াম স্থাপন করেন এবং এমনকি মন্দিরের তরুণ পুরোহিতরাও তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব ফেলে রেখে জিমনাসিয়ামে গ্রিক খেলাধুলায় অংশ নিতে শুরু করে। ধর্মীয় অবক্ষয়ের এই দৃশ্য ঐতিহ্যবাদীদের মনে চরম ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
এই সংঘাতের সবচেয়ে ভুক্তভোগী ছিল গ্রামীণ সাধারণ মানুষ। তারা জেরুজালেমের এই গ্রিক-ভাষী, বিলাসী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের দ্বারা ভয়াবহ অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হচ্ছিল। গ্রিক-পন্থি নেতারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সেলিউসিড রাজাদের যে বিপুল পরিমাণ কর দিত, তার পুরো বোঝাই চাপানো হতো এই দরিদ্র কৃষকদের কাঁধে। ফলে ঐতিহ্যবাদীদের ধর্মীয় ক্ষোভের সাথে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বঞ্চনা মিলে এক ভয়াবহ বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেলিউসিড রাজা চতুর্থ অ্যান্টিওকাস যখন পরে জেরুজালেমের ওপর কঠোর হস্তক্ষেপ করেন, তা মূলত শুরু হয়েছিল এই ইহুদি গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা থামানোর একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে (Gruen, 1998)। ‘জোরপূর্বক গ্রিকীকরণ’-এর যে মিথোলজি পরবর্তীতে তৈরি করা হয়েছে, তা আংশিক সত্য। বাস্তবে, হেলেনাইজেশন বা গ্রিকীকরণ কোনো বিদেশি রাজার চাপিয়ে দেওয়া নীতি ছিল না; এটি ছিল মূলত ইহুদি সমাজের নিজেদেরই অভিজাত অংশের অত্যন্ত আগ্রহী এবং স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তর, যা শেষ পর্যন্ত তাদের সমাজকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
মিথোলজির বিবর্তন ও গ্রিক দর্শনের প্রভাব (Evolution of Mythology and the Influence of Greek Philosophy)
হেলেনিস্টিক যুগের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনগুলোর একটি হলো আলেকজান্দ্রিয়ায় হিব্রু বাইবেলের গ্রিক অনুবাদ, যা ইতিহাসে ‘সেপ্টুয়াজিন্ট’ (Septuagint) নামে পরিচিত। লেটার অব অ্যারিস্টেয়াস (Letter of Aristeas) নামক একটি প্রাচীন রচনায় দাবি করা হয়েছে যে, ৭২ জন পণ্ডিত আলাদা আলাদা কক্ষে বসে অনুবাদ করেও ঈশ্বরের অলৌকিক ক্ষমতায় হুবহু একই অনুবাদ তৈরি করেছিলেন। এই মিথোলজিটি মূলত অনুবাদের ঐশ্বরিক বৈধতা প্রমাণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, মিশরে বসবাসকারী ইহুদি প্রবাসীদের একটি বিশাল অংশ হিব্রু ভাষা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিল এবং তারা কেবল গ্রিক ভাষাতেই কথা বলত। তাদের ধর্মীয় চাহিদা মেটানোর জন্যই অত্যন্ত বাস্তব প্রয়োজনে এই অনুবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ভাষাতাত্ত্বিক রূপান্তর (Linguistic Transformation) কেবল শব্দের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল পুরো ধর্মতত্ত্বের এক বিশাল পরিবর্তন। যখন হিব্রু ধারণাগুলোকে গ্রিক দার্শনিক পরিভাষায় অনুবাদ করা হলো, তখন ইহুদি ঈশ্বর এবং ধর্মতত্ত্ব গ্রিক প্লেটোনিক দর্শনের এক নতুন মাত্রা লাভ করল। ঈশ্বর হয়ে উঠলেন গ্রিক দর্শনের ‘লোগোস’ বা বিশ্বজনীন বুদ্ধিমত্তার সমতুল্য।
গ্রিক দর্শনের প্রভাব প্রাচীন ইহুদি মিথোলজি এবং চিন্তাধারাকে আমূল বদলে দেয়। প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মে মানুষের মৃত্যুর পর আত্মা বা পরকাল নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু হেলেনিস্টিক যুগে, প্লেটোর ‘আত্মার অবিনশ্বরতা’ বা Immortality of the Soul-এর ধারণা ইহুদি চিন্তাধারায় গভীরভাবে প্রবেশ করে। গ্রিকদের ‘হেডিস’ বা পাতালপুরীর ধারণা থেকে প্রভাবিত হয়ে ইহুদি সাহিত্যে ‘গেহেন্না’ বা নরকের এক বীভৎস চিত্র গড়ে উঠতে শুরু করে, যেখানে পাপিষ্ঠদের অনন্তকাল ধরে শাস্তি দেওয়া হবে। এই যুগের সাহিত্য, যেমন বাইবেলের বুক অব এক্লেসিয়াস্টেস (Book of Ecclesiastes) বা উপদেশক বইটিতে গ্রিক সিনিক (Cynic) এবং এপিকিউরিয়ান (Epicurean) দর্শনের স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায়। জীবন যে অর্থহীন, এবং আনন্দ উপভোগ করাই যে মানবজীবনের একমাত্র লক্ষ্য – এই ধরনের পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ এবং বস্তুবাদী গ্রিক চিন্তাধারা কীভাবে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থের অংশ হয়ে গেল, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় গ্রন্থগুলো কোনো অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক বাণী নয়; এগুলো তাদের সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতগুলোকে নিজেদের ভেতরে শুষে নিয়ে প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয়।
হেলেনিস্টিক সাম্রাজ্যের চরম রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় এই সময়ে এক নতুন ধরনের সাহিত্যের জন্ম হয়, যা অ্যাপোক্যালিপটিক সাহিত্য (Apocalyptic Literature) নামে পরিচিত। বাইবেলের বুক অব ড্যানিয়েল (Book of Daniel) এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই সাহিত্যে অত্যন্ত রহস্যময় এবং কোডেড ভাষার মাধ্যমে, যেমন অদ্ভুত সব দানব বা মূর্তির রূপক ব্যবহার করে, গ্রিক সাম্রাজ্যগুলোকে চিত্রিত করা হয়েছিল। লেখকরা দাবি করতেন যে, খুব শিগগিরই এক বিশাল মহাজাগতিক যুদ্ধের মাধ্যমে ঈশ্বর এই গ্রিক সাম্রাজ্যগুলোকে ধ্বংস করে দেবেন এবং একটি নতুন পৃথিবী গড়ে তুলবেন। বাস্তবে এগুলো কোনো ঐশ্বরিক ভবিষ্যৎবাণী ছিল না। ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করেছেন যে, এই বইগুলো মূলত লেখা হয়েছিল ঘটনাগুলো ঘটে যাওয়ার পর, যাকে ল্যাটিন পরিভাষায় ‘ex eventu’ বলা হয় (Collins, 1993)। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন এবং সামরিকভাবে পঙ্গু একটি জনগোষ্ঠী যখন বাস্তব পৃথিবীতে তাদের শোষকদের পরাজিত করতে পারে না, তখন তারা নিজেদের মানসিক সান্ত্বনার জন্য এ ধরনের অলৌকিক ধ্বংসের মিথোলজি তৈরি করে। অ্যাপোক্যালিপটিক সাহিত্য মূলত ছিল হেলেনিস্টিক সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া এক অসহায় সমাজের চরম হতাশা এবং কল্পিত প্রতিশোধের এক অসামান্য সাহিত্যিক দলিল।
সেলিউসিড শাসন ও ধর্মীয় সংঘাত (Seleucid Rule and Religious Conflict): সংস্কৃতি বনাম বিশ্বাস
সেলিউসিড সাম্রাজ্যের ভূরাজনীতি ও জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ (Geopolitics of the Seleucid Empire and the Control of Jerusalem)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ১৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এক বিশাল ভূরাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী হয়ে আছে। দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলটি মিশরকেন্দ্রিক টলেমিক রাজবংশের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্যানিয়ামের যুদ্ধে সেলিউসিড রাজা তৃতীয় অ্যান্টিওকাস টলেমিদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে সিরিয়া এবং লেভান্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন। এই সামরিক বিজয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি। সেলিউসিডরা মূলত মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়াকেন্দ্রিক এক বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করত। তাদের জন্য লেভান্ট অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ছিল কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। মিশরের মতো একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নিজেদের সীমানা সুরক্ষিত রাখতে হলে জুদাহর মতো একটি অনুগত এবং শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটির প্রয়োজন ছিল। ধর্মীয় মিথোলজিতে এই ক্ষমতার পালাবদলকে অনেক সময় ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, এটি ছিল নিখাদ এক বাফার স্টেট কূটনীতি (Buffer State Diplomacy), যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
ক্ষমতা দখলের পরপরই তৃতীয় অ্যান্টিওকাস জেরুজালেমের ইহুদি নেতৃত্বের প্রতি বেশ নমনীয় নীতি গ্রহণ করেন। ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় জেরুজালেমের পুরোহিত এবং অভিজাত শ্রেণী অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেলিউসিডদের সামরিক ও লজিস্টিক সমর্থন জুগিয়েছিল। এর পুরস্কারস্বরূপ তৃতীয় অ্যান্টিওকাস একটি রাজকীয় ডিক্রি জারি করেন, যার মাধ্যমে ইহুদিদের তাদের নিজস্ব পৈতৃক আইন বা তোরাহ অনুযায়ী সমাজ পরিচালনার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়। একই সাথে জেরুজালেমের মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজকোষ থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হয় এবং পুরোহিতদের কর মওকুফ করা হয়। এই পদক্ষেপটিকে অনেক সময় ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রাচীন দৃষ্টান্ত হিসেবে রোমান্টিসাইজ করা হয়। বাস্তবে প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলো ধর্মীয় কারণে কাউকে এমন সুবিধা দিত না। একটি নতুন দখলকৃত অঞ্চলে বিদ্রোহ ঠেকানোর জন্য এবং স্থানীয় অভিজাতদের অনুগত রাখার জন্য এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা ছিল অত্যন্ত সাধারণ এক সাম্রাজ্যিক তুষ্টিকরণ নীতি (Imperial Appeasement Policy) (Bickerman, 1979)। অ্যান্টিওকাস জানতেন যে, মন্দিরের পুরোহিতদের খুশি রাখতে পারলে পুরো সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অনেক সহজ হবে।
সেলিউসিডদের এই উদারতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অত্যন্ত কঠোর এবং শোষণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো। লেভান্ট অঞ্চলটি সেলিউসিডদের জন্য এক বিশাল রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করত। তারা টলেমিদের মতো সরাসরি কর আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক পথের ওপর টোল এবং কৃষিজ পণ্যের ওপর ভারী শুল্ক আরোপ করেছিল। এই সাম্রাজ্যিক করব্যবস্থা (Imperial Taxation System)-এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছিল গ্রামীণ সাধারণ কৃষক। জেরুজালেমের অভিজাত পুরোহিত এবং ধনী ব্যবসায়ীরা সেলিউসিড প্রশাসকদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের সম্পদ কয়েকগুণ বাড়িয়ে নিচ্ছিল। গ্রামীণ মানুষের ঘাম ঝরানো ফসলের একটি বড় অংশ চলে যেত সরাসরি অ্যান্টিওকিয়ার রাজকোষে। সমাজের উঁচু স্তরে যখন হেলেনিস্টিক জাঁকজমক এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রার বিস্তার ঘটছিল, ঠিক সেই সময়েই নিচের স্তরের কৃষকরা ঋণের দায়ে নিজেদের পৈতৃক জমি হারাচ্ছিল। ধর্মীয় আবরণ এবং আচারের জাঁকজমক দিয়ে এই কাঠামোগত অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের এই চাপা ক্ষোভই পরবর্তীকালে এক ভয়াবহ সামাজিক বিস্ফোরণের রূপ নেয়।
হেলেনীয় সংস্কৃতির বিস্তার ও ইহুদি সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন (Spread of Hellenistic Culture and Internal Division of Jewish Society)
সেলিউসিড শাসনের অধীনে জুদাহর সমাজে সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি ঘটেছিল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। গ্রিক ভাষা, দর্শন, স্থাপত্য এবং জীবনযাত্রার যে স্রোত আলেকজান্ডারের আমল থেকে শুরু হয়েছিল, তা এই যুগে এসে এক প্রবল জোয়ারে পরিণত হয়। ইতিহাস বইগুলোতে প্রায়শই বলা হয় যে, বিদেশি রাজারা জোর করে ইহুদিদের ওপর গ্রিক সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়েছিলেন। আর্কিওলজিক্যাল বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং সমসাময়িক দলিলগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা বলে। হেলেনীয় সংস্কৃতির এই অনুপ্রবেশ ঘটেছিল মূলত সমাজের ভেতর থেকেই। জেরুজালেমের ধনী ব্যবসায়ী, রাজকীয় আমলা এবং এমনকি অনেক উচ্চপদস্থ পুরোহিত অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রিক জীবনধারা গ্রহণ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার এবং সেলিউসিড রাজদরবারের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তাদের এই সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ (Cultural Assimilation) অত্যন্ত জরুরি ছিল (Tcherikover, 1959)। তারা নিজেদের প্রাচীন নাম পরিবর্তন করে জেসন বা মেনেলাউসের মতো গ্রিক নাম গ্রহণ করেন এবং গ্রিক পোশাক পরতে শুরু করেন। একটি উন্নত ও প্রভাবশালী সভ্যতার ছোঁয়ায় এসে নিজেদের প্রাচীন উপজাতীয় সংস্কৃতিকে সেকেলে মনে করার এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা মানব ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে।
সাংস্কৃতিক এই রূপান্তর জেরুজালেমকে একটি আধুনিক হেলেনিস্টিক নগরী বা ‘পোলিস’-এ পরিণত করার উদ্যোগের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ১৭৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে জেসন নামের এক উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি সেলিউসিড রাজা চতুর্থ অ্যান্টিওকাসকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ দিয়ে নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে প্রধান পুরোহিতের পদটি ছিনিয়ে নেন। জেসন কেবল ধর্মীয় নেতাই হতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন জেরুজালেমের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক খোলনলচে বদলে দিতে। তার উদ্যোগে জেরুজালেমের ঠিক প্রাণকেন্দ্রে, মন্দিরের খুব কাছেই একটি জিমনাসিয়াম এবং এফিবিওন নির্মাণ করা হয়। জিমনাসিয়াম ছিল গ্রিক সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র, যেখানে তরুণরা নগ্ন হয়ে শরীরচর্চা করত এবং গ্রিক দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করত। ইহুদিদের প্রাচীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় জনসমক্ষে শরীর প্রদর্শন ছিল চরম আপত্তিকর। তারপরও মন্দিরের অনেক তরুণ পুরোহিত ধর্মীয় দায়িত্ব অবহেলা করে জিমনাসিয়ামে গ্রিক খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার জন্য মেতে ওঠেন। জেসনের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল জেরুজালেমের অভিজাতদের গ্রিক নাগরিকত্বের মর্যাদা পাইয়ে দেওয়া, যাতে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা লাভ করতে পারে।
এই হেলেনিস্টিক প্রভাব জুদাহ সমাজকে পরিষ্কারভাবে দুটি বিবদমান শিবিরের বিভক্ত করে ফেলে। একদিকে ছিল গ্রিক-পন্থি বা হেলেনিস্ট অভিজাতরা, যারা মনে করত যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ধর্ম ও সংস্কৃতিকে আধুনিক করা প্রয়োজন। অন্যদিকে ছিল হাসিদিয়ান বা ঐতিহ্যবাদী গোষ্ঠী, যারা এই পরিবর্তনকে তাদের প্রাচীন অস্তিত্বের ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে দেখত। ঐতিহ্যবাদীদের মতে, গ্রিক দর্শনের বস্তুবাদী চিন্তাধারা এবং বহুদেববাদের প্রভাব তাদের ধর্মীয় বিশুদ্ধতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। এই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ধর্মীয় বিভাজন মূলত ছিল এক গভীর আর্থ-সামাজিক বৈষম্যেরই সরাসরি প্রতিফলন (Gruen, 1998)। যারা গ্রিক সংস্কৃতি গ্রহণ করেছিল, তারা ছিল মূলত শহুরে পুঁজিপতি এবং শোষক শ্রেণীর প্রতিনিধি। আর যারা এর বিরোধিতা করেছিল, তারা ছিল মূলত গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক এবং প্রান্তিক মানুষ। ধর্মীয় পবিত্রতার মোড়কে যে ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছিল, তার আসল কারণ ছিল জমি হারানো এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার জ্বালা। সংস্কৃতি ও ধর্মের এই সংঘাত ক্রমশ একটি গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে শুরু করে।
অ্যান্টিওকাস এপিফেনেস ও জেরুজালেমের ওপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ (Antiochus Epiphanes and Direct Intervention in Jerusalem)
সেলিউসিড সাম্রাজ্যের সিংহাসনে যখন চতুর্থ অ্যান্টিওকাস এপিফেনেস আরোহণ করেন, তখন সাম্রাজ্যটির অর্থনৈতিক অবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে ছিল। এর আগে ১৮৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান প্রজাতন্ত্রের সাথে ম্যাগনেসিয়ার যুদ্ধে সেলিউসিডরা পরাজিত হয়েছিল এবং আপামিয়ার চুক্তির মাধ্যমে রোম তাদের ওপর এক বিশাল অংকের যুদ্ধক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দিয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ শোধ করতে গিয়ে অ্যান্টিওকাসকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছিল। রাজকোষের এই চরম শূন্যতা পূরণের জন্য তিনি একটি অত্যন্ত আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেন। তিনি তার সাম্রাজ্যের ভেতরের বিভিন্ন ধনী মন্দিরগুলো লুট করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রাচীন যুগে মন্দিরগুলো কেবল প্রার্থনার স্থান ছিল না, সেগুলো ব্যাংক এবং বিপুল ধনসম্পদের গুদাম হিসেবে কাজ করত। অ্যান্টিওকাসের এই পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ প্রসূত ছিল না। এটি ছিল মূলত এক মরিয়া সম্রাটের অর্থনৈতিক লুণ্ঠন নীতি (Policy of Economic Plunder) (Goldstein, 1976)। তিনি কেবল জেরুজালেমের মন্দিরই নয়, পারস্যের এলাইমাইস অঞ্চলের বিখ্যাত মন্দিরগুলোতেও একই ধরনের লুণ্ঠন চালিয়েছিলেন।
অ্যান্টিওকাস যখন মিশরে সামরিক অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন, তখন জেরুজালেমে এক চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। জেসন, যিনি আগে ঘুষ দিয়ে প্রধান পুরোহিত হয়েছিলেন, তাকে হটিয়ে মেনেলাউস নামের আরেক ব্যক্তি রাজাকে আরও বেশি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই পদটি দখল করে নেন। মেনেলাউস ছিলেন চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তিনি তার প্রতিশ্রুত অর্থ জোগাড় করার জন্য মন্দিরের পবিত্র সোনার পাত্রগুলো চুরি করে বিক্রি করতে শুরু করেন। মিশরে অ্যান্টিওকাসের মৃত্যুর একটি মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে পড়লে জেসন তার নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ে জেরুজালেম আক্রমণ করেন এবং মেনেলাউসকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। জেরুজালেমের রাস্তায় দুই ইহুদি গোষ্ঠীর মধ্যে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। মিশর থেকে ফেরার পথে অ্যান্টিওকাস এই গৃহযুদ্ধের খবর পান। তিনি এই অভ্যন্তরীণ দাঙ্গাকে তার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করেন। একজন সম্রাট হিসেবে সীমান্ত এলাকায় কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সহ্য করার মতো অবস্থায় তিনি ছিলেন না।
অ্যান্টিওকাস তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে জেরুজালেমের ওপর আছড়ে পড়েন। শহরটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করার পর তিনি জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ চিরতরে নিষ্কণ্টক করার জন্য এক সুদূরপ্রসারী সামরিক পদক্ষেপ নেন। শহরের ঠিক মাঝখানে, মন্দিরের উল্টো দিকে অ্যাক্রা (Acra) নামের এক বিশাল এবং দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করা হয়। এই দুর্গে সেলিউসিড সৈন্য এবং তাদের অনুগত হেলেনিস্ট ইহুদিদের মোতায়েন করা হয়। অ্যাক্রা দুর্গটি ছিল মূলত জেরুজালেমের সাধারণ মানুষের ওপর সেলিউসিড সাম্রাজ্যের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি এবং আধিপত্যের এক প্রতীক। ধর্মীয় মিথোলজিগুলোতে অ্যান্টিওকাসকে এক উন্মাদ এবং রক্তপিপাসু দানব হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। ইতিহাস এবং ভূরাজনীতির আলোকে দেখলে বোঝা যায় যে, তিনি কোনো পাগল রাজা ছিলেন না। তিনি ছিলেন মূলত একটি জরাজীর্ণ সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় রত এক ব্যর্থ শাসক, যিনি স্থানীয় রাজনীতি এবং ধর্মীয় আবেগের জটিল সমীকরণগুলো বুঝতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
ধর্মীয় রীতিনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা ও মিথোলজির রাজনীতি (Ban on Religious Practices and the Politics of Mythology)
১৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যান্টিওকাস এপিফেনেস এমন একটি রাজকীয় আদেশ জারি করেন, যা প্রাচীনকালের সাম্রাজ্যিক শাসনব্যবস্থায় আক্ষরিক অর্থেই এক নজিরবিহীন ঘটনা ছিল। তিনি ইহুদিদের সমস্ত প্রধান ধর্মীয় রীতিনীতির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তোরাহ বা ধর্মীয় আইন পাঠ করা, বিশ্রামবার বা সাবাথ পালন করা এবং খতনা করা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। জেরুজালেমের দ্বিতীয় মন্দিরটিকে গ্রিকদের প্রধান দেবতা জিউস অলিম্পিয়সের মন্দির হিসেবে উৎসর্গ করা হয় এবং সেখানে শুকর বলিদানের মতো অত্যন্ত অবমাননাকর প্রথা চালু করা হয়। প্রাচীন গ্রিক বা হেলেনিস্টিক রাজারা সাধারণত অন্য কোনো জাতির ধর্মের ওপর এভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন না। তাদের নীতি ছিল বিভিন্ন ধর্মকে নিজেদের সংস্কৃতির সাথে সমন্বয় করা। ঐতিহাসিকরা এই অস্বাভাবিক ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ধর্মীয় নিপীড়ন তত্ত্ব (Theory of Religious Persecution) নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক করেছেন (Schäfer, 2003)। অ্যান্টিওকাস কেন এমন একটি চরম পদক্ষেপ নিলেন, তা নিয়ে আজও পণ্ডিতদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
বেশিরভাগ বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিকের মতে, অ্যান্টিওকাসের এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে ধর্মীয় বিদ্বেষের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বেশি কাজ করেছিল। অ্যান্টিওকাস বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইহুদি সমাজের ঐতিহ্যবাদী অংশটি তাদের ধর্মীয় আইনের দোহাই দিয়ে প্রতিনিয়ত সাম্রাজ্যিক আনুগত্য অস্বীকার করছে এবং বারবার বিদ্রোহের চেষ্টা করছে। তিনি ধর্মীয় পার্থক্যগুলোকে পুরোপুরি মুছে ফেলে পুরো লেভান্ট অঞ্চলে একটি অভিন্ন হেলেনিস্টিক সংস্কৃতি ও আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যকে সাংস্কৃতিকভাবে একতাবদ্ধ করা। অন্যদিকে, কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন যে, অ্যান্টিওকাস নিজে থেকে এই সিদ্ধান্ত নেননি। জেরুজালেমের উগ্র হেলেনিস্ট ইহুদিরাই মূলত তাকে এই আদেশ জারি করতে প্ররোচিত করেছিল। তারা চেয়েছিল প্রাচীন এবং রক্ষণশীল ধর্মীয় আইনগুলোকে রাষ্ট্রীয় শক্তির সাহায্যে বাতিল করে সমাজকে পুরোপুরি গ্রিক ছাঁচে ঢেলে সাজাতে। যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা হোক না কেন, এটি ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক চরম বলপ্রয়োগ।
এই নিপীড়নের সময়কালের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে এক বিশাল এবং শক্তিশালী মিথোলজির জন্ম হয়, যা ইহুদি ধর্মীয় আখ্যানে শহীদত্ব বা ‘মার্টায়ারডম’-এর ধারণা যোগ করে। বুক অফ ম্যাকাবিজ (Books of Maccabees)-এ এমন অনেক গল্প লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় রীতিনীতি ছাড়তে অস্বীকার করায় অসংখ্য মানুষকে ভয়াবহভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। বৃদ্ধ এলিয়াজার কিংবা সাত সন্তানসহ এক মায়ের ভয়ানক মৃত্যুর গল্পগুলো হাজার বছর ধরে মানুষকে আলোড়িত করেছে। এই গল্পগুলোর সাহিত্যিক আবেদন অসামান্য হলেও, আধুনিক ইতিহাস চর্চায় এগুলোকে বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। এগুলো ছিল মূলত ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী প্রোপাগান্ডা, যা লেখা হয়েছিল সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহের জন্য মানসিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। মৃত্যুর পর স্বর্গে অনন্ত পুরস্কারের যে ধারণাগুলো এই গল্পগুলোতে প্রচার করা হয়েছে, তা মূলত নিপীড়িত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনার একটি কৌশল। মিথোলজিগুলো এভাবেই বাস্তব পৃথিবীর চরম রাজনৈতিক নিপীড়নকে এক অলৌকিক এবং পবিত্র রূপ দিয়ে সমাজকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
মাকাবি বিদ্রোহের আর্থ-সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক রূপান্তর (Socio-Economic Foundation of the Maccabean Revolt and Political Transformation)
অ্যান্টিওকাসের এই চরম ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া হিসেবে মোডিন নামের এক অখ্যাত পাহাড়ি গ্রামে এক অভূতপূর্ব বিদ্রোহের সূচনা হয়। মাত্তাথিয়াস নামের এক গ্রাম্য পুরোহিত সেলিউসিড কর্মকর্তাদের আদেশ অমান্য করে গ্রিক দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদান করতে অস্বীকৃতি জানান এবং একজন রাজকীয় কর্মকর্তাকে হত্যা করেন। এরপর তিনি তার পাঁচ পুত্রকে নিয়ে পাহাড়ে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকেই শুরু হয় এক প্রবল গেরিলা যুদ্ধ। তার পুত্র জুদাহ, যিনি ‘মাকাবি’ বা হাতুড়ি নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি এই বিদ্রোহের প্রধান সামরিক নেতায় পরিণত হন। ধর্মীয় সাহিত্যে এই মাকাবি বিদ্রোহকে কেবল মাত্র একটি ধর্মযুদ্ধ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়েছে, যেখানে আলোর সাথে অন্ধকারের লড়াই হয়েছিল। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের লেন্স দিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে, এর পেছনে এক প্রবল আর্থ-সামাজিক বঞ্চনার ইতিহাস লুকিয়ে ছিল (Grabbe, 1992)। মোডিন বা অন্যান্য গ্রামের কৃষকরা কেবল ধর্ম বাঁচানোর জন্য অস্ত্র তুলে নেয়নি। তারা অস্ত্র তুলে নিয়েছিল জেরুজালেমের দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত এবং সেলিউসিড কর আদায়কারীদের হাত থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য।
এই বিদ্রোহটি মূলত ছিল একটি বহুমাত্রিক সংঘাত। একদিকে এটি ছিল সেলিউসিড সাম্রাজ্যের শোষণের বিরুদ্ধে এক জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম, অন্যদিকে এটি ছিল নিজেদের সমাজের ভেতরের গ্রিক-পন্থি অভিজাতদের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ শ্রেণী সংগ্রাম (Class Struggle)। জুদাহ মাকাবি এবং তার যোদ্ধারা কেবল সেলিউসিড বাহিনীর ওপরই হামলা করত না, তারা সেইসব ইহুদিদের বাড়িঘর এবং সম্পত্তিতেও আগুন লাগিয়ে দিত, যারা গ্রিক সংস্কৃতি গ্রহণ করেছিল এবং ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করেছিল। গেরিলা যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে জুদাহ মাকাবি লেভান্টের রুক্ষ ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির চরম সুবিধা আদায় করে নেন। সেলিউসিডদের ভারী পদাতিক বাহিনী এবং রথগুলো সরু পাহাড়ি রাস্তাগুলোতে বারবার জুদাহর অতর্কিত হামলার শিকার হয়ে পর্যুদস্ত হয়। এই সামরিক সাফল্য কোনো ঐশ্বরিক জাদুর ফল ছিল না। এটি ছিল মূলত স্থানীয় ভূখণ্ড সম্পর্কে নিখুঁত জ্ঞান এবং সাধারণ গ্রামীণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের এক যৌক্তিক পরিণতি। একটি নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই গেরিলা যুদ্ধ আধুনিক যুগের অনেক জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সাথে সরাসরি তুলনীয়।
১৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে জুদাহ মাকাবির বাহিনী জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং মন্দির থেকে গ্রিক মূর্তিগুলো সরিয়ে সেটি পুনরায় নিজেদের দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে ‘হানুক্কা’ বা আলো জ্বালানোর উৎসবের প্রচলন হয়। ধর্মীয় মিথোলজিতে একটি চমৎকার গল্প বলা হয় যে, মন্দিরে মাত্র এক দিনের তেল ছিল, কিন্তু তা দিয়ে অলৌকিকভাবে আট দিন ধরে প্রদীপ জ্বলেছিল। আধুনিক আর্কিওলজি এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রে এই ধরনের কোনো তেলের অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ নেই। প্রথম দিকের ঐতিহাসিক দলিলগুলোতে একে কেবল একটি সামরিক এবং রাজনৈতিক বিজয় হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। অনেক পরে যখন ধর্মীয় পণ্ডিতরা বুঝতে পারলেন যে, কেবল সামরিক বিজয়ের গল্প মানুষকে খুব বেশি দিন ধর্মীয়ভাবে আকৃষ্ট করতে পারে না, তখন তারা এই তেলের অলৌকিক মিথোলজিটি আবিষ্কার করেন। ইতিহাসকে এভাবেই যুগে যুগে ধর্মীয় মোড়কে ঢেকে দিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের খোরাক জোগানো হয়। মাকাবিদের এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংগঠিত জনরোষ কীভাবে একটি বিশাল সাম্রাজ্যিক শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে।
স্বাধীন হাসমোনীয় রাষ্ট্রের উত্থান ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের পরিণতি (Rise of the Independent Hasmonean State and the Consequences of Religious Nationalism)
জুদাহ মাকাবির মৃত্যুর পর বিদ্রোহের নেতৃত্ব তার ভাই জোনাথন এবং সাইমনের হাতে চলে যায়। এই সময়ে সেলিউসিড সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে চরম উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। জোনাথন এবং সাইমন অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে সেলিউসিডদের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নেন। তারা দুই বিবদমান সেলিউসিড প্রার্থীর মধ্যে দরকষাকষি করে নিজেদের জন্য একের পর এক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিতে শুরু করেন। সামরিক বিদ্রোহ যে পথে শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে এক নিখুঁত এবং বাস্তববাদী কূটনীতিতে রূপান্তরিত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৪২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাইমনের নেতৃত্বে জুদাহ অঞ্চলটি সেলিউসিডদের কর প্রদান থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি লাভ করে এবং প্রায় সাড়ে চার শতাব্দী পর লেভান্টে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তার জন্ম হয়। এই নতুন রাজবংশটি ইতিহাসে হাসমোনীয় রাজবংশ নামে পরিচিতি লাভ করে। একটি ধর্মীয় এবং গ্রামীণ বিদ্রোহ কীভাবে ধাপে ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিণত হয়, এটি তার এক চমৎকার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
তবে হাসমোনীয় রাষ্ট্রের উত্থানের গল্পটি এক চরম আদর্শিক পতনেরও গল্প। যে ধর্মীয় বিশুদ্ধতা এবং গ্রিক সংস্কৃতির বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে মাকাবিরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, ক্ষমতায় বসার পর তারা সেই একই গ্রিক সংস্কৃতি গ্রহণ করতে শুরু করে। সাইমনের বংশধররা, যেমন জন হিরকানাস এবং আলেকজান্ডার জান্নিয়াস, নিজেদের কেবল প্রধান পুরোহিত হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ‘রাজা’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তারা সেলিউসিড রাজাদের মতোই বিশাল ভাড়াটে সেনাবাহিনী গঠন করেন, গ্রিক ধাঁচের বিলাসবহুল প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং নিজেদের মুদ্রায় গ্রিক নাম খোদাই করতে শুরু করেন। ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা যখন একই ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তখন তা কতটা ভয়ংকর স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়, হাসমোনীয় রাজারা তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করেছিলেন। সমাজবিজ্ঞান একে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ (Centralization of Power) হিসেবে ব্যাখ্যা করে (Cohen, 1987)। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ফ্যারিসি বা ঐতিহ্যবাদী ধর্মীয় পণ্ডিতরা এই স্বৈরতন্ত্রের তীব্র প্রতিবাদ করেন, যার ফলে হাসমোনীয় রাজারা নিজেদের দেশের মানুষের ওপরই অত্যন্ত নির্মম গণহত্যা চালান।
হাসমোনীয় রাষ্ট্রটি খুব দ্রুত একটি আগ্রাসী এবং সম্প্রসারণশীল শক্তিতে পরিণত হয়। তারা পার্শ্ববর্তী ইদুমিয়া (প্রাচীন ইদোম), সামারিয়া এবং গ্যালিলির মতো অঞ্চলগুলো দখল করে নেয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, যারা একসময় নিজেদের ধর্মের ওপর জবরদস্তির বিরুদ্ধে লড়েছিল, তারা ক্ষমতায় গিয়ে ঠিক একই কাজ করে। জন হিরকানাস ইদুমীয়দের পরাজিত করে তাদের জোরপূর্বক ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন। সামারিয়া দখল করে তারা সামারিটানদের অতি পবিত্র গেরিজিম পর্বতের মন্দিরটি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে জেরিকো এবং মাসাদায় হাসমোনীয় রাজাদের বিশাল সব প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে তারা বিলাসবহুল জীবনে সেলিউসিড রাজাদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। যে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ (Religious Nationalism) একসময় তাদের মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতিবেশীদের শোষণের এবং নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের এক নিষ্ঠুর যন্ত্রে পরিণত হয়। ইতিহাসের এই অমোঘ বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার সিংহাসনে বসলে ধর্ম ও আদর্শের দোহাইগুলো কীভাবে খুব দ্রুতই স্বার্থপর সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
মাকাবি বিদ্রোহ ও হাসমোনীয় রাষ্ট্র (Maccabean Revolt and Hasmonean State): স্বশাসনের পুনর্জন্ম
গ্রামীণ অসন্তোষ, সেলিউসিড ডিক্রি ও বিদ্রোহের সূচনা (Rural Discontent, Seleucid Decree and the Outbreak of the Rebellion)
প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসে ১৬৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সেলিউসিড রাজা চতুর্থ অ্যান্টিওকাস এপিফেনেসের জারি করা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞাগুলো এক অভূতপূর্ব সামাজিক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর মাধ্যমে ইহুদিদের চিরায়ত প্রথা যেমন সাবাথ পালন বা খতনা করা রাষ্ট্রীয়ভাবে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছিল। ধর্মীয় মিথোলজিগুলোতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ ধর্মযুদ্ধের আখ্যান তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয় যে সাধারণ মানুষ কেবল তাদের বিশ্বাস রক্ষার জন্যই অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে এই বিদ্রোহের শেকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত ছিল বলে জানা যায়। সেলিউসিড সাম্রাজ্যের অতিরিক্ত করের বোঝা এবং জেরুজালেমের হেলেনিস্ট বা গ্রিক-পন্থি অভিজাতদের লাগামহীন দুর্নীতির কারণে গ্রামীণ কৃষকদের পিঠ আগেই দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। শহরের ধনী ব্যবসায়ীরা যখন গ্রিক সংস্কৃতির চাকচিক্যে নিজেদের গা ভাসাচ্ছিল, ঠিক তখনই গ্রামের সাধারণ মানুষ ঋণের দায়ে নিজেদের শেষ সম্বল কৃষিজমিটুকু হারাচ্ছিল। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা এই পরিস্থিতিকে কৃষক বিদ্রোহ তত্ত্ব (Peasant Revolt Theory)-এর আলোকে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে ধর্মীয় ক্ষোভ মূলত গভীর অর্থনৈতিক বঞ্চনার একটি বাহন হিসেবে কাজ করেছিল (Portier-Young, 2011)।
এই বঞ্চনা এবং ক্ষোভের প্রথম বাস্তব বহিঃপ্রকাশ ঘটে মোডিন নামের এক অখ্যাত পাহাড়ি গ্রামে। সেখানে মাত্তাথিয়াস নামের এক স্থানীয় পুরোহিত সেলিউসিড কর্মকর্তাদের আদেশ অমান্য করে গ্রিক দেবতার উদ্দেশ্যে বলিদান করতে অস্বীকৃতি জানান। স্থানীয় এক ইহুদি যখন রাজার আদেশ মেনে বলিদান করতে এগিয়ে আসে, তখন মাত্তাথিয়াস ক্ষুব্ধ হয়ে সেই ইহুদি ব্যক্তি এবং সেলিউসিড কর্মকর্তাকে হত্যা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই মূলত মাকাবি বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। মাত্তাথিয়াস তার পাঁচ পুত্রকে নিয়ে পাহাড়ে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকেই সাধারণ কৃষকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, মাত্তাথিয়াসের এই ক্ষোভ কেবল বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে ছিল না, তার ক্ষোভের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের সমাজের সেইসব মানুষ, যারা গ্রিক সংস্কৃতি গ্রহণ করে গ্রামীণ সমাজকে শোষণ করছিল। অন্যভাবে বললে, এটি ছিল একাধারে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম এবং নিজেদের সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণীর বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ।
মাত্তাথিয়াসের মৃত্যুর পর তার পুত্র জুদাহ, যিনি ‘মাকাবি’ বা হাতুড়ি নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি এই বিদ্রোহের সামরিক নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। জুদাহ মাকাবি কোনো প্রথাগত সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাপতি ছিলেন না। তিনি ছিলেন মূলত একজন অসাধারণ গেরিলা কৌশলবিদ, যিনি সাধারণ কৃষকদের নিয়ে এক দুর্ধর্ষ মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলেন। তার বাহিনীর মূল শক্তি ছিল স্থানীয় রুক্ষ পাহাড়ি ভূখণ্ড সম্পর্কে তাদের নিখুঁত জ্ঞান। সেলিউসিডদের বিশাল এবং সুসজ্জিত নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করা এই কৃষক বাহিনীর পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই জুদাহ বেছে নিয়েছিলেন অসম যুদ্ধকৌশল (Asymmetric Warfare)। তারা রাতের অন্ধকারে সেলিউসিডদের রসদ সরবরাহকারী দলগুলোর ওপর অতর্কিত হামলা চালাত এবং দ্রুত পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে পড়ত। জুদাহ মাকাবির এই প্রাথমিক সাফল্যগুলো গ্রামীণ মানুষের মনে এক প্রবল আশার সঞ্চার করে। দলে দলে প্রান্তিক মানুষ তার বাহিনীতে যোগ দিতে শুরু করে। ধর্মীয় সাহিত্যে জুদাহ মাকাবিকে ঈশ্বরের প্রেরিত এক পবিত্র বীর হিসেবে মহিমান্বিত করা হলেও, বাস্তব ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং ধূর্ত রাজনৈতিক নেতা, যিনি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষোভকে একটি সফল সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন।
গেরিলা যুদ্ধকৌশল, সামরিক সাফল্য ও জেরুজালেম পুনর্দখল (Guerilla Warfare, Military Success and the Recapture of Jerusalem)
জুদাহ মাকাবির সামরিক অভিযানগুলো প্রাচীন লেভান্টের যুদ্ধকৌশলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৬৬ থেকে ১৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে জুদাহর বাহিনী সেলিউসিডদের বেশ কয়েকটি বড় নিয়মিত সেনাদলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এর মধ্যে বেথ হোরন এবং এমাউসের যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এমাউসের যুদ্ধে জুদাহ মাকাবি এক অভাবনীয় সামরিক মেধার পরিচয় দেন। সেলিউসিড সেনাপতি গর্গিয়াস যখন তার মূল বাহিনী নিয়ে জুদাহর ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য পাহাড়ে ওঠেন, জুদাহ তখন তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে সমভূমিতে নেমে আসেন এবং গর্গিয়াসের অরক্ষিত মূল ক্যাম্পে আগুন লাগিয়ে দেন। সেলিউসিড বাহিনী পাহাড় থেকে নেমে তাদের ক্যাম্প জ্বলতে দেখে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং যুদ্ধ না করেই পালিয়ে যায় (Bar-Kochva, 1989)। এই বিজয়গুলো প্রমাণ করে যে, একটি সুশৃঙ্খল সাম্রাজ্যিক বাহিনীও যদি স্থানীয় ভূখণ্ড এবং গেরিলা কৌশলের সাথে পরিচিত না থাকে, তবে তারা সহজেই সাধারণ কৃষক মিলিশিয়াদের হাতে পর্যুদস্ত হতে পারে। এই সামরিক বিজয়গুলোর পেছনে কোনো অলৌকিক শক্তির হাত ছিল না; এগুলো ছিল নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য, দ্রুত গতিবিধি এবং শত্রুর দুর্বল মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগানোর বাস্তব ফল।
১৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষ ভাগে জুদাহ মাকাবি তার বাহিনী নিয়ে জেরুজালেম শহরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। শহর দখলের পর তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল অপবিত্র হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় মন্দিরটি পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। তারা মন্দির থেকে গ্রিক জিউস দেবতার মূর্তি এবং অন্যান্য হেলেনিস্টিক নিদর্শনগুলো সরিয়ে ফেলেন এবং নতুন করে মন্দিরটিকে তাদের নিজেদের দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। ইতিহাসে এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করেই ‘হানুক্কা’ বা আলো জ্বালানোর উৎসবের প্রচলন ঘটে। ইহুদি ধর্মীয় আখ্যানে এই হানুক্কা উৎসবকে ঘিরে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মিথোলজি তৈরি করা হয়েছে। গল্পে দাবি করা হয় যে, মন্দির পরিষ্কার করার পর সেখানে প্রদীপ জ্বালানোর জন্য মাত্র এক দিনের ব্যবহারযোগ্য পবিত্র তেল পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু সেই তেল দিয়ে অলৌকিকভাবে টানা আট দিন প্রদীপ জ্বলেছিল। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা এই গল্পকে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে বিশ্বাস করলেও, একাডেমিকভাবে এটি পুরোপুরি বাতিল বলে গণ্য হয়।
এই তেলের অলৌকিক গল্পের আসল উদ্দেশ্য ছিল বিদ্রোহের মূল রাজনৈতিক এবং সামরিক চরিত্রটিকে আড়াল করা। মাকাবিদের বিজয়ের পরপরই লেখা সমসাময়িক ঐতিহাসিক দলিল, যেমন ফার্স্ট মাকাবিজ (First Maccabees) গ্রন্থে এই তেলের কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে যে, জুদাহ মাকাবি মূলত আট দিন ধরে ‘সুক্কোত’ বা তাবু উৎসব পালন করেছিলেন, যা যুদ্ধের কারণে তারা সঠিক সময়ে পালন করতে পারেননি। শত শত বছর পর রাব্বাই বা ধর্মীয় পণ্ডিতরা যখন তালমুদ সংকলন করেন, তখন তারা সচেতনভাবেই এই তেলের গল্পটি উদ্ভাবন করেছিলেন। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ঐতিহাসিক সংশোধনবাদ (Historical Revisionism) হিসেবে দেখেন। রাব্বাইরা চাননি সাধারণ মানুষ জুদাহ মাকাবির মতো সামরিক শক্তি বা বিদ্রোহের ওপর নির্ভর করুক, কারণ ততদিনে রোমানদের হাতে তারা ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়েছিল। তাই তারা সামরিক বিজয়ের ইতিহাসকে এক নিরীহ এবং অলৌকিক ধর্মীয় গল্পে রূপান্তরিত করেছিলেন। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, জেরুজালেম পুনর্দখল কোনো ঐশ্বরিক জাদুর ফল ছিল না; এটি ছিল একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষের নিরন্তর রক্তপাত এবং বলিষ্ঠ সামরিক কৌশলের বাস্তব অর্জন।
জোনাথন ও সাইমনের কূটনীতি এবং স্বশাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Diplomacy of Jonathan and Simon and the Institutionalization of Self-Rule)
জুদাহ মাকাবির মৃত্যুর পর বিদ্রোহের নেতৃত্ব তার ভাই জোনাথনের হাতে চলে যায়। এই সময় থেকেই মাকাবিদের আন্দোলন একটি আদর্শিক কৃষক বিদ্রোহের খোলস ছেড়ে নিখাদ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির পথে পা বাড়ায়। সেলিউসিড সাম্রাজ্য তখন নিজেদের ভেতরেই সিংহাসন নিয়ে চরম গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। ডেমেট্রিয়াস এবং আলেকজান্ডার বালাস নামের দুই সেলিউসিড প্রার্থীর মধ্যে যখন ক্ষমতা দখলের লড়াই চলছিল, জোনাথন অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে এই সুযোগ কাজে লাগান। তিনি কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের প্রতি অনুগত না থেকে, যে পক্ষ তাকে বেশি সুবিধা দিচ্ছিল, সেই পক্ষকেই সমর্থন করা শুরু করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় জোনাথনের এই কৌশলটি ছিল একটি নিখুঁত ভারসাম্যনীতি (Balance of Power)। ১৫২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার বালাস জোনাথনের সমর্থন আদায়ের জন্য তাকে জেরুজালেমের ‘প্রধান পুরোহিত’ বা হাই প্রিস্ট পদে নিয়োগ দেন। এই ঘটনাটি প্রাচীন জুদাহ সমাজের জন্য এক বিশাল ধাক্কা ছিল। মাকাবি পরিবার কোনোভাবেই প্রধান পুরোহিত হওয়ার মতো প্রাচীন জাদোকীয় বংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
যে জোনাথন একসময় বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলেন, তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে এক বিদেশি এবং পৌত্তলিক সেলিউসিড রাজার হাত থেকে প্রধান পুরোহিতের পবিত্র পদটি গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি সেলিউসিড রাজদরবারের সম্মানসূচক পদবি গ্রহণ করেন এবং রাজকীয় বেগুনি রঙের পোশাক পরতে শুরু করেন। এই ঘটনাটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, ক্ষমতায় আরোহণের পর ধর্ম এবং আদর্শ কীভাবে খুব দ্রুতই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে (Regev, 2013)। জোনাথনের পর তার ভাই সাইমন নেতৃত্বের হাল ধরেন এবং তিনি কূটনীতির এই খেলাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। ১৪২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাইমন সেলিউসিড রাজা দ্বিতীয় ডেমেট্রিয়াসের কাছ থেকে জুদাহর জন্য সম্পূর্ণ কর মওকুফের ঘোষণা আদায় করতে সক্ষম হন। প্রাচীন বিশ্বে কর মওকুফ পাওয়ার মানেই ছিল কার্যত রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন। সাইমন এই দিনটিকে জুদাহর জন্য এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সরকারি নথিপত্রে ‘স্বাধীনতার প্রথম বছর’ কথাটি ব্যবহার শুরু করেন।
এই কর মওকুফ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই মূলত মাকাবি বিদ্রোহ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়, যা ইতিহাসে হাসমোনীয় রাষ্ট্র নামে পরিচিত। সাইমন নিজেকে একই সাথে প্রধান পুরোহিত এবং সামরিক শাসক বা ‘এথনার্ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর ফলে ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যা প্রাচীন উপজাতীয় রীতিনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। একটি গেরিলা আন্দোলন কীভাবে ধাপে ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রে পরিণত হয়, সাইমনের শাসনকাল তার এক অসামান্য উদাহরণ। তারা নিজেদের নামে মুদ্রা চালু করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য গ্রিক বা রোমানদের মতো নিজস্ব প্রশাসনিক সিলমোহর ব্যবহার শুরু করেন। সমাজবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে স্বশাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Institutionalization of Self-Rule) বলা হয়। যে প্রান্তিক কৃষকরা একদিন সমতার আশায় বিদ্রোহ করেছিল, তারা এখন দেখতে পেল তাদেরই নেতারা এক নতুন অভিজাত শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। বিদেশি সেলিউসিডদের জায়গা দখল করল দেশীয় হাসমোনীয়রা, কিন্তু সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং শোষণের কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন হলো না।
হাসমোনীয় রাজতন্ত্রের বিস্তার, হেলেনীকরণ ও স্বৈরতান্ত্রিক রূপান্তর (Expansion of the Hasmonean Monarchy, Hellenization and Autocratic Transformation)
সাইমনের মৃত্যুর পর তার পুত্র জন হিরকানাস হাসমোনীয় রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসেন এবং তার সময় থেকেই এই রাষ্ট্রটি একটি আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। হিরকানাস একটি বিশাল ভাড়াটে সেনাবাহিনী গঠন করেন। এর আগে মাকাবিদের বাহিনী ছিল মূলত আদর্শবান কৃষকদের নিয়ে গঠিত, কিন্তু হিরকানাস বুঝতে পেরেছিলেন যে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে হলে পেশাদার বিদেশি সৈন্যদের ওপর নির্ভর করতে হবে। তিনি তার প্রতিবেশী ইদুমিয়া (প্রাচীন ইদোম) এবং সামারিয়া আক্রমণ করে বিশাল ভূখণ্ড দখল করে নেন। তার এই সামরিক অভিযানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল সামারিয়ায়। তিনি সামারিটানদের অতি পবিত্র গেরিজিম পর্বতের মন্দিরটি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেন। একই সাথে তিনি ইদুমীয়দের পরাজিত করে তাদের জোরপূর্বক ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন। যারা একসময় নিজেদের ধর্মের ওপর জবরদস্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, ক্ষমতায় গিয়ে তারা ঠিক একই কায়দায় প্রতিবেশীদের ওপর নিজেদের ধর্ম চাপিয়ে দিতে শুরু করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে এটি হলো সম্প্রসারণবাদ (Expansionism)-এর একটি চিরচেনা রূপ, যেখানে নিপীড়িত একসময় নিজেই নিপীড়ক হয়ে ওঠে (Honigman, 2014)।
জন হিরকানাসের পর তার পুত্র অ্যারিস্টোবুলাস ক্ষমতায় এসে নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাজা‘ হিসেবে ঘোষণা করেন। মাকাবিরা বিদ্রোহ শুরু করেছিল মূলত ঈশ্বরের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করার ধুঁয়া তুলে, কিন্তু তাদের বংশধররা নিজেদের মাথায় রাজার মুকুট পরতে একটুও দ্বিধা করেনি। অ্যারিস্টোবুলাসের পর সিংহাসনে বসেন তার ভাই আলেকজান্ডার জান্নিয়াস। জান্নিয়াসের শাসনকাল ছিল হাসমোনীয় রাজবংশের সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। তিনি তার সামরিক অভিযানগুলো পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন, যার পুরো চাপ পড়ত সাধারণ কৃষকদের ওপর। তার স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ফ্যারিসি বা ঐতিহ্যবাদী ধর্মীয় পণ্ডিতরা যখন বিদ্রোহ করেন, তখন জান্নিয়াস নিজ দেশের মানুষের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালান। ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ আছে যে, জান্নিয়াস একবার ৮০০ বিদ্রোহী ফ্যারিসিকে একসাথে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন এবং তাদের মৃত্যুর সময় তিনি তার উপপত্নীদের নিয়ে ভোজসভায় উল্লাস করছিলেন। ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্র কতটা ধর্মনিরপেক্ষ এবং পাশবিক হতে পারে, জান্নিয়াসের এই আচরণ তার এক চূড়ান্ত প্রমাণ।
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিহাসের বিষয় হলো, মাকাবিরা যে হেলেনিস্টিক বা গ্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষমতা দখল করেছিল, হাসমোনীয় রাজারা সেই একই সংস্কৃতি অত্যন্ত সাড়ম্বরে গ্রহণ করেছিলেন। হিরকানাস, অ্যারিস্টোবুলাস বা জান্নিয়াস – এই নামগুলোই গ্রিক নাম। তারা গ্রিক রাজাদের মতো বিলাসবহুল প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন এবং নিজেদের মুদ্রায় একদিকে হিব্রু এবং অন্যদিকে গ্রিক ভাষায় নিজেদের নাম খোদাই করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে জেরিকো এবং মাসাদায় তাদের তৈরি বিশাল সব সুইমিং পুল এবং স্নানাগারের সন্ধান পাওয়া গেছে। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ (Cultural Assimilation) বলা হয়। যখন কোনো গোষ্ঠী রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে, তখন তারা স্বভাবতই সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংস্কৃতিটি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। হাসমোনীয় রাজারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্র চালাতে হলে উপজাতীয় ধর্মীয় আইন দিয়ে কাজ হবে না; এর জন্য গ্রিক প্রশাসনিক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামো প্রয়োজন। ফলে মাকাবি বিদ্রোহের মূল আদর্শটি রাজপ্রাসাদের বিলাসী জীবনে চিরতরে হারিয়ে যায়।
সমাজকাঠামোর বিভাজন: ফ্যারিসি, সাদ্দুসি ও এসেনীয়দের বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত (Division of Social Structure: Intellectual Conflict of the Pharisees, Sadducees and Essenes)
হাসমোনীয় রাষ্ট্রের এই স্বৈরতান্ত্রিক এবং হেলেনিস্টিক রূপান্তরের ফলে সমাজের ভেতরে এক তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়। এই সময়েই মূলত ইহুদি সমাজে তিনটি প্রধান গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে – সাদ্দুসি, ফ্যারিসি এবং এসেনীয়। ইতিহাস বইগুলোতে এদের প্রায়শই কেবল ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উপদল হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই গোষ্ঠীগুলোর বিভাজনের মূলে ছিল নিখাদ আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। সাদ্দুসিরা ছিল সমাজের উঁচু তলার মানুষ। তারা মূলত মন্দিরের অভিজাত পুরোহিত, ধনী ব্যবসায়ী এবং বড় জমির মালিকদের নিয়ে গঠিত ছিল। তারা হাসমোনীয় রাজাদের হেলেনিস্টিক নীতিগুলোকে পূর্ণ সমর্থন দিত, কারণ এর ফলে তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত হতো। ধর্মীয়ভাবে তারা ছিল অত্যন্ত আক্ষরিক। তারা কেবল লিখিত তোরাহ বা আইনকেই মান্য করত এবং পরকাল, স্বর্গ-নরক বা ফেরেশতার মতো নতুন ধারণাগুলোকে পুরোপুরি অস্বীকার করত। তাদের কাছে ধর্ম ছিল মূলত বর্তমান পৃথিবীতে নিজেদের সম্পদ এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি হাতিয়ার।
অন্যদিকে ফ্যারিসিরা ছিল মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণী, সাধারণ পণ্ডিত এবং গ্রামীণ মানুষের প্রতিনিধি। তারা সাদ্দুসিদের এই অভিজাততন্ত্র এবং হাসমোনীয় রাজাদের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একসাথে কুক্ষিগত করার তীব্র বিরোধী ছিল। ফ্যারিসিরা বিশ্বাস করত যে, রাজাদের কাজ রাষ্ট্র চালানো এবং পুরোহিতদের কাজ ধর্ম দেখা, এই দুটিকে মেশানো যাবে না। তারা লিখিত আইনের পাশাপাশি মৌখিক আইন বা লোকজ রীতিনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিত। সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য তারা পরকাল এবং মৃত্যুর পর বিচারের ধারণাগুলোকে জোরালোভাবে প্রচার করত। তাদের এই ধর্মীয় অবস্থানটি ছিল মূলত সাদ্দুসিদের শোষণের বিরুদ্ধে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবাদ (Schiffman, 1994)। ফ্যারিসিরা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে ধর্মীয় বিশুদ্ধতার ভাষায় প্রকাশ করে হাসমোনীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক নীরব সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
এই দুই গোষ্ঠীর বাইরে এসেনীয়রা ছিল সমাজের সবচেয়ে কট্টর এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশ। তারা জেরুজালেমের মন্দির এবং হাসমোনীয় রাজাদের পুরোপুরি অবৈধ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করত। তাদের মতে, জেরুজালেমের পুরোহিতরা ঈশ্বরের পথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল। এই ক্ষোভ থেকে তারা নগরজীবন ত্যাগ করে মৃত সাগরের তীরবর্তী কুমরান নামক মরুভূমি এলাকায় গিয়ে নিজেদের জন্য একটি সম্পূর্ণ আলাদা কমিউন বা সমাজ গড়ে তোলে। বিংশ শতাব্দীতে আবিষ্কৃত বিখ্যাত ডেড সি স্ক্রল (Dead Sea Scrolls) মূলত এই এসেনীয়দেরই রেখে যাওয়া সাহিত্যিক এবং ধর্মীয় দলিল। এই স্ক্রলগুলো থেকে জানা যায় যে তারা অত্যন্ত কঠোর নিয়মকানুনের মধ্যে জীবনযাপন করত, নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছু রাখত না এবং একটি মহাজাগতিক যুদ্ধের মাধ্যমে বর্তমান পৃথিবীর ধ্বংসের জন্য অপেক্ষা করত। এসেনীয়দের এই মরুভূমিতে নির্বাসন কোনো আধ্যাত্মিক রোমান্টিসিজম ছিল না। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ছিল চরম হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া এক প্রকার রাজনৈতিক পলায়নবাদ (Political Escapism)। হাসমোনীয় রাষ্ট্রের দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্য কীভাবে একটি অংশকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, এসেনীয়রা তার এক জীবন্ত প্রমাণ।
রাজবংশের পতন, রোমান হস্তক্ষেপ ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন (Fall of the Dynasty, Roman Intervention and Historical Evaluation of Religious Nationalism)
হাসমোনীয় রাষ্ট্রের এই বাহ্যিক জাঁকজমক এবং সামরিক বিস্তারের আড়ালে সমাজটি ভেতর থেকে পুরোপুরি পচে গিয়েছিল। রানী সালোম আলেকজান্দ্রার নয় বছরের রাজত্বকালে কিছুটা শান্তি বিরাজ করলেও, তার মৃত্যুর পর তার দুই পুত্র দ্বিতীয় হিরকানাস এবং দ্বিতীয় অ্যারিস্টোবুলাসের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। হিরকানাস ছিলেন ফ্যারিসিদের সমর্থিত এবং একটু দুর্বল প্রকৃতির, অন্যদিকে অ্যারিস্টোবুলাস ছিলেন সাদ্দুসিদের সমর্থিত এবং চরম ক্ষমতালোভী। ক্ষমতার এই অন্ধ লড়াইয়ে দুই ভাই এত নিচে নেমে গিয়েছিলেন যে, তারা দুজনেই বাইরের শক্তির সাহায্য চাইতে দ্বিধা করেননি। ঠিক সেই সময়ে রোমান সেনাপতি পম্পেই দ্য গ্রেট এশিয়া মাইনর এবং সিরিয়া জয় করে লেভান্টের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছিলেন। দুই ভাই পাল্লা দিয়ে পম্পেইর কাছে উপঢৌকন পাঠান এবং তাকে জুদাহর সিংহাসনের ফয়সালা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এটি ছিল প্রাচীন লেভান্টের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক আত্মহত্যা। নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তারা এমন এক সাম্রাজ্যকে ডেকে আনল, যা তাদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে দেবে।
৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পম্পেই তার দুর্ধর্ষ রোমান বাহিনী নিয়ে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। দ্বিতীয় অ্যারিস্টোবুলাসের সমর্থকরা মন্দিরের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও রোমানদের উন্নত যুদ্ধকৌশলের সামনে তা খুব বেশি দিন টিকতে পারেনি। তিন মাসের অবরোধের পর রোমানরা মন্দিরে প্রবেশ করে এবং হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করে। পম্পেই স্বয়ং মন্দিরের পবিত্রতম স্থানে প্রবেশ করেন, যেখানে কেবল প্রধান পুরোহিতের যাওয়ার অধিকার ছিল। এই ঘটনাটি হাসমোনীয় স্বশাসনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। পম্পেই জুদাহকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র থেকে রোমান সাম্রাজ্যের একটি করদ রাজ্যে বা ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’-এ পরিণত করেন (Rajak, 1990)। দ্বিতীয় হিরকানাসকে নামেমাত্র প্রধান পুরোহিত হিসেবে রাখা হয়, কিন্তু সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা রোমানদের হাতে চলে যায়। এই সাম্রাজ্যিক হস্তক্ষেপ (Imperial Intervention) প্রমাণ করে যে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং গৃহযুদ্ধে লিপ্ত একটি রাষ্ট্র খুব সহজেই বিদেশি শক্তির সহজ শিকারে পরিণত হয়। প্রায় আশি বছরের হাসমোনীয় স্বাধীনতার সূর্য এভাবেই নিজেদের অযোগ্যতা এবং ক্ষমতালিপ্সার কারণে চিরতরে অস্তমিত হয়।
মাকাবি বিদ্রোহ এবং হাসমোনীয় রাষ্ট্রের এই পুরো ইতিহাসটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতার এক অসামান্য ঐতিহাসিক পাঠ। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল বিদেশি শোষণ এবং ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ হিসেবে, তা শেষ পর্যন্ত নিজেদের দেশের মানুষের ওপরই সবচেয়ে বড় শোষক হিসেবে আবির্ভূত হয়। হাসমোনীয় শাসকরা প্রমাণ করেছিলেন যে, ধর্মের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করা গেলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার সময় ধর্ম কোনো কার্যকরী দর্শন হিসেবে কাজ করে না; সেখানে টিকে থাকে কেবল নগ্ন ক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। সাধারণ কৃষকদের যে অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় মাকাবিরা যুদ্ধ করেছিল, তা কোনোদিনই অর্জিত হয়নি। বরং প্রাচীন পুরোহিত এবং নতুন রাজাদের জোটবদ্ধ অর্থনীতি সাধারণ মানুষকে আরও বেশি প্রান্তিক করে দিয়েছিল। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস আমাদের এই রূঢ় সত্যটিই শেখায় যে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ (Religious Nationalism) মূলত একটি অত্যন্ত বিভ্রম সৃষ্টিকারী মতাদর্শ। এটি মানুষকে আবেগের বশবর্তী করে বিদ্রোহ করতে শেখায় ঠিকই, কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে ক্ষমতার সিংহাসনে বসানো ছাড়া সমাজের কাঠামোগত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
উপসংহার
খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দে রোমান সেনাপতি পম্পেই যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করেন, তখন দক্ষিণ লেভান্টের ইতিহাসে এক যুগের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। পম্পেইয়ের এই বিজয় কেবল একটি শহরের পতন ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাচীন লেভান্টের স্থানীয় রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের কফিনে শেষ পেরেক। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে হাসমোনীয়দের প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন জুদিয়া রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা হারায় এবং পুরো অঞ্চলটি আনুষ্ঠানিকভাবে রোমান সাম্রাজ্যের একটি উপশাসিত অংশে পরিণত হয়। প্রাচীন কানানীয় নগররাষ্ট্র থেকে শুরু করে স্বাধীন জুদিয়ার পতন পর্যন্ত এই দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আর তা হলো, এই ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কোনো রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনই স্থায়ী হয়নি। প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা সাম্রাজ্যিক সমীকরণ (Imperial Equation) এই অঞ্চলের মানুষদের কখনোই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার স্বাদ নিতে দেয়নি।
এই কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের দেখায় যে, চরম সংকটের মুহূর্তে একটি সমাজ কীভাবে নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখার কৌশল উদ্ভাবন করে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাবিলনীয় নির্বাসনের সময় ইহুদি সমাজ যখন তাদের ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু এবং মন্দির হারিয়েছিল, তখন তারা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। পরিবর্তে, তারা তাদের অস্তিত্বের সংকটকে মোকাবেলা করার জন্য এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক রূপান্তর (Cultural Transformation) ঘটিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং মন্দিরের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তারা লিখিত ঐতিহ্য এবং স্মৃতিভিত্তিক পরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই রূপান্তর কোনো ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ ছিল না। এটি ছিল পরাশক্তির আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক টিকে থাকার এক নিখুঁত কৌশল। ঠিক একইভাবে, আলেকজান্ডারের বিজয়ের পর যখন হেলেনিস্টিক বা গ্রিক সংস্কৃতির জোয়ার আসে, তখন স্থানীয় সমাজ তার সাথে যে সংঘাত ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যায়, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক সংকরায়ণ (Cultural Hybridization)-এর উদাহরণ। মাকাবি বিদ্রোহকে প্রায়শই ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়, কিন্তু গভীরে গিয়ে দেখলে এটি ছিল মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদ এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখার এক নিরেট পার্থিব সংগ্রাম।
খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দে রোমানদের আগমন আমাদের এই ঐতিহাসিক সত্যটিই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দক্ষিণ লেভান্টের মতো একটি কৌশলগত সংযোগস্থল (Strategic Nexus)-এ বিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। হাসমোনীয়দের স্বাধীনতা ছিল মূলত সেলিউসিড সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পতনের ফলে তৈরি হওয়া একটি ক্ষণস্থায়ী সুযোগ। যখনই রোমের মতো একটি সুসংগঠিত, বৈশ্বিক এবং অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তখনই স্থানীয় স্বশাসনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে এই সময় পর্যন্ত ফিলিস্তিন অঞ্চলের ইতিহাস কোনো ধর্মীয় মহাকাব্য নয়। এটি মূলত সাধারণ মানুষ, উচ্চাভিলাষী শাসক এবং লোভী সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যকার এক নিরন্তর ক্ষমতার লড়াই। মাটি খুঁড়ে পাওয়া অস্ত্র, মুদ্রা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়ালগুলো সেই কাঠামোগত বাস্তবতারই অকাট্য প্রমাণ বহন করে। এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, সভ্যতার গতিপথ কোনো পূর্বনির্ধারিত ঐশ্বরিক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ধারিত হয় অর্থনীতি, ভূগোল এবং মানুষের ক্ষমতা দখলের চিরন্তন স্পৃহার দ্বারা।
তথ্যসূত্র
- Agranat-Tamir, L., et al. (2020). The genomic history of the Bronze Age Southern Levant. Cell, 181(5), 1146–1157.e11. https://doi.org/10.1016/j.cell.2020.04.024
- Aharoni, Y. (1979). The Land of the Bible: A Historical Geography. Westminster Press.
- Ahlström, G. W. (1993). The History of Ancient Palestine. Sheffield Academic Press.
- Ahituv, S. (1978). Economic Factors in the Egyptian Conquest of Canaan. Israel Exploration Journal, 28(1/2), 93-105.
- Albertz, R. (2003). Israel in Exile: The History and Literature of the Sixth Century B.C.E. Society of Biblical Literature.
- Alt, A. (1966). Essays on Old Testament History and Religion. Blackwell.
- Anthony, D. W. (2007). The horse, the wheel, and language: How Bronze-Age riders from the Eurasian steppes shaped the modern world. Princeton University Press.
- Aubet, M. E. (2001). The Phoenicians and the West: Politics, Colonies and Trade. Cambridge University Press.
- Banning, E. B. (2003). Housing the Household in Early Neolithic the Levant. Antiquity, 77(295), 4-22.
- Bar-Kochva, B. (1989). Judas Maccabaeus: The Jewish Struggle Against the Seleucids. Cambridge University Press.
- Bar-Yosef, O. (1998). The Natufian Culture in the Levant, Threshold to the Origins of Agriculture. Evolutionary Anthropology, 6(5), 159-177.
- Barstad, H. M. (1996). The Myth of the Empty Land: A Study in the History and Archaeology of Judah During the “Exilic” Period. Scandinavian University Press.
- Becking, B. (1992). The Fall of Samaria: An Historical and Archaeological Study. Brill.
- Beckman, G. (1999). Hittite Diplomatic Texts. Scholars Press.
- Bedford, P. R. (2001). Temple Restoration in Early Achaemenid Judah. Brill.
- Belfer-Cohen, A., & Goring-Morris, A. N. (2003). Current Issues in Levantine Upper Palaeolithic Research. More than Meets the Eye: Studies on Upper Palaeolithic Diversity in the Near East, 1-12.
- Ben Zvi, E. (2000). Micah. Eerdmans.
- Bickerman, E. J. (1979). The God of the Maccabees: Studies on the Meaning and Origin of the Maccabean Revolt. Brill.
- Bickerman, E. J. (1988). The Jews in the Greek Age. Harvard University Press.
- Bietak, M. (1996). Avaris: The capital of the Hyksos. British Museum Press.
- Biran, A., & Naveh, J. (1993). An Aramaic Stele Fragment from Tel Dan. Israel Exploration Journal, 43(2/3), 81-98.
- Blenkinsopp, J. (1996). A History of Prophecy in Israel. Westminster John Knox Press.
- Borowski, O. (1987). Agriculture in Iron Age Israel. Eisenbrauns.
- Briant, P. (2002). From Cyrus to Alexander: A History of the Persian Empire. Eisenbrauns.
- Bryce, T. (2003). Letters of the Great Kings of the Ancient Near East. Routledge.
- Bryce, T. (2005). The Kingdom of the Hittites. Oxford University Press.
- Cahill, J. M. (2003). Jerusalem at the Time of the United Monarchy: The Archaeological Evidence. Jerusalem in Bible and Archaeology: The First Temple Period, 13-80.
- Carter, C. E. (1999). The Emergence of Yehud in the Persian Period: A Social and Demographic Study. Sheffield Academic Press.
- Cauvin, J. (2000). The Birth of the Gods and the Origins of Agriculture. Cambridge University Press.
- Cline, E. H. (2014). 1177 B.C.: The Year Civilization Collapsed. Princeton University Press.
- Cogan, M. (2001). The Raging Torrent: Historical Inscriptions from Assyria and Babylonia Relating to Ancient Israel. Carta.
- Cohen, R., & Westbrook, R. (2000). Amarna Diplomacy: The Beginnings of International Relations. Johns Hopkins University Press.
- Cohen, S. J. D. (1979). Josephus in Galilee and Rome: His Vita and Development as a Historian. Brill.
- Cohen, S. J. D. (1987). From the Maccabees to the Mishnah. Westminster John Knox Press.
- Collins, J. J. (1993). The Apocalyptic Imagination: An Introduction to Jewish Apocalyptic Literature. Eerdmans.
- Cross, F. M. (1998). From Epic to Canon: History and Literature in Ancient Israel. Johns Hopkins University Press.
- Dalley, S. (1985). Foreign Chariotry and Cavalry in the Armies of Tiglath-Pileser III and Sargon II. Iraq, 47, 31-48.
- Davies, P. R. (1992). In Search of ‘Ancient Israel’. Sheffield Academic Press.
- Day, J. (2002). Yahweh and the Gods and Goddesses of Canaan. Sheffield Academic Press.
- Dearman, J. A. (1992). Religion and Culture in Ancient Israel. Hendrickson Publishers.
- Dever, W. G. (2001). What Did the Biblical Writers Know and When Did They Know It? Wm. B. Eerdmans Publishing.
- Dever, W. G. (2003). Who Were the Early Israelites and Where Did They Come From? Wm. B. Eerdmans Publishing.
- Dever, W. G. (2005). Did God Have a Wife? Archaeology and Folk Religion in Ancient Israel. Wm. B. Eerdmans Publishing.
- Dothan, T. (1982). The Philistines and Their Material Culture. Yale University Press.
- Drews, R. (1993). The End of the Bronze Age: Changes in Warfare and the Catastrophe ca. 1200 B.C.. Princeton University Press.
- Edelman, D. V. (2005). The Origins of the ‘Second’ Temple: Persian Imperial Policy and the Rebuilding of Jerusalem. Equinox Publishing.
- Eshel, H. (2006). The Dead Sea Scrolls and the Hasmonean State. Wm. B. Eerdmans Publishing.
- Faust, A. (2006). Israel’s Ethnogenesis: Settlement, Interaction, Expansion and Resistance. Equinox Publishing.
- Feldman, M., Master, D. M., Bianco, R. A., Burri, M., Stockhammer, P. W., Mittnik, A., … & Krause, J. (2019). Ancient DNA sheds light on the genetic origins of early Iron Age Philistines. Science Advances, 5(7), eaax0061.
- Finkelstein, I. (1988). The Archaeology of the Israelite Settlement. Israel Exploration Society.
- Finkelstein, I. (1996). The Territorial-Political System of Canaan in the Late Bronze Age. Ugarit-Forschungen, 28, 221-255.
- Finkelstein, I. (1998). Philistine Chronology: High, Middle or Low?. Mediterranean Archaeology and Archaeometry, 1(1), 39-54.
- Finkelstein, I. (2013). The Forgotten Kingdom: The Archaeology and History of Northern Israel. Society of Biblical Literature.
- Finkelstein, I., & Silberman, N. A. (2001). The Bible Unearthed: Archaeology’s New Vision of Ancient Israel and the Origin of Its Sacred Texts. Free Press.
- Finkelstein, I., & Silberman, N. A. (2006). David and Solomon: In Search of the Bible’s Sacred Kings and the Roots of the Western Tradition. Free Press.
- Fried, L. S. (2004). The Priest and the Great King: Temple-Palace Relations in the Persian Empire. Eisenbrauns.
- Fuller, D. Q. (2007). Contrasting Patterns in Crop Domestication and Agronomic Change: Multiplying the Models. Annals of Botany, 100(5), 903-924.
- Garfinkel, Y. (1999). Neolithic and Chalcolithic Pottery of the Southern Levant. Institute of Archaeology, Hebrew University of Jerusalem.
- Garfinkel, Y., Ganor, S., & Hasel, M. G. (2012). Footsteps of King David in the Valley of Elah. Yediot Ahronot.
- Gitin, S., Mazar, A., & Stern, E. (1998). Mediterranean Peoples in Transition: Thirteenth to Early Tenth Centuries BCE. Israel Exploration Society.
- Golden, J. M. (2004). Ancient Canaan and Israel: New Perspectives. ABC-CLIO.
- Goldstein, J. A. (1976). I Maccabees: A New Translation with Introduction and Commentary. Doubleday.
- Gopher, A. (1995). Early Pottery-Bearing Groups in Israel – The Pottery Neolithic Period. The Archaeology of Society in the Holy Land, 205-225.
- Gottwald, N. K. (1979). The Tribes of Yahweh: A Sociology of the Religion of Liberated Israel, 1250-1050 B.C.E. Orbis Books.
- Gottwald, N. K. (2001). The Politics of Ancient Israel. Westminster John Knox Press.
- Grabbe, L. L. (1992). Judaism from Cyrus to Hadrian. Fortress Press.
- Grabbe, L. L. (2004). A History of the Jews and Judaism in the Second Temple Period, Volume 1: Yehud. T&T Clark.
- Grabbe, L. L. (2007). Ancient Israel: What Do We Know and How Do We Know It? T&T Clark.
- Grabbe, L. L. (2008). A History of the Jews and Judaism in the Second Temple Period, Volume 2: The Coming of the Greeks. T&T Clark.
- Gras, M. (1989). L’univers phénicien. Hachette.
- Gruen, E. S. (1998). Heritage and Hellenism: The Rebuttal of Jewish Tradition. University of California Press.
- Haber, M., et al. (2017). Continuity and admixture in the last five millennia of Levantine history from ancient Canaanite and present-day Lebanese genome sequences. The American Journal of Human Genetics, 101(2), 274–282.
- Halpern, B. (2001). David’s Secret Demons: Messiah, Murderer, Traitor, King. Wm. B. Eerdmans Publishing.
- Hasegawa, S., Levin, Y., & Radner, K. (2018). The Rebellion of King Hoshea, Assur-maco-eriba and the Fall of Samaria. Eisenbrauns.
- Hasel, M. G. (1998). Domination and Resistance: Egyptian Military Activity in the Southern Levant, ca. 1300-1185 B.C.. Brill.
- Hengel, M. (1974). Judaism and Hellenism. Fortress Press.
- Hengel, M. (1989). The Zealots. T&T Clark.
- Herzog, Z. (1999). Deconstructing the Walls of Jericho. Ha’aretz.
- Hesse, B., & Wapnish, P. (1997). Can Pig Remains Be Used for Ethnic Diagnosis in the Ancient Near East?. The Archaeology of Israel, 238-270.
- Higginbotham, C. R. (2000). Egyptianization and Elite Emulation in Ramesside Palestine. Brill.
- Honigman, S. (2014). Tales of High Priests and Taxes: The Books of the Maccabees and the Judean Rebellion against Antiochos IV. University of California Press.
- Ilan, D. (1995). The Dawn of Internationalism – The Middle Bronze Age. The Archaeology of Society in the Holy Land, 297-319.
- Issar, A. S., & Zohar, M. (2004). Climate Change: Environment and History of the Near East. Springer.
- Kempinski, A. (1992). Urbanization and Town Plans in the Middle Bronze Age II. The Architecture of Ancient Israel, 121-134.
- Kenyon, K. M. (1957). Digging Up Jericho: The Results of the Archaeological Excavations 1952-1956. Ernest Benn.
- Killebrew, A. E. (2005). Biblical Peoples and Ethnicity: An Archaeological Study of Egyptians, Canaanites, Philistines, and Early Israel. Society of Biblical Literature.
- Knapp, A. B. (1988). The History and Culture of Ancient Western Asia and Egypt. Dorsey Press.
- Knapp, A. B. (1993). Society and Polity in Bronze Age Pella. Journal for the Study of the Old Testament, 18(24), 21-43.
- Knauf, E. A. (1991). Midian: Untersuchungen zur Geschichte Palästinas und Nordarabiens am Ende des 2. Jahrtausends v. Chr.. Otto Harrassowitz.
- Knoppers, G. N. (1993). Two Nations Under God: The Deuteronomistic History of Solomon and the Dual Monarchies. Scholars Press.
- Kuijt, I. (2000). People and Space in Early Agricultural Villages. Journal of Anthropological Archaeology, 19(1), 75-102.
- Kuijt, I., & Goring-Morris, N. (2002). Foraging, Farming, and Social Complexity in the Pre-Pottery Neolithic of the Southern Levant. Journal of World Prehistory, 16(4), 361-440.
- Kuhrt, A. (1995). The Ancient Near East, c. 3000-330 BC. Routledge.
- Lazaridis, I., et al. (2016). Genomic insights into the origin of farming in the ancient Near East. Nature, 536(7617), 419-424.
- Lemche, N. P. (1985). Early Israel: Anthropological and Historical Studies on the Israelite Society Before the Monarchy. Brill.
- Levy, T. E. (1986). The Chalcolithic Period. The Biblical Archaeologist, 49(2), 82-108.
- Levy, T. E. (1998). The Archaeology of Society in the Holy Land. Leicester University Press.
- Levy, T. E. (2008). Historical Biblical Archaeology and the Future: The New Pragmatism. Equinox Publishing.
- Liverani, M. (2005). Israel’s History and the History of Israel. Equinox.
- Liverani, M. (2014). The Ancient Near East: History, Society and Economy. Routledge.
- Magen, Y. (2008). Mount Gerizim Excavations: A Temple City. Israel Antiquities Authority.
- Markoe, G. E. (2000). Phoenicians. University of California Press.
- Mazar, A. (1990). Archaeology of the Land of the Bible, 10,000-586 B.C.E. Doubleday.
- Mazar, A. (1992). Archaeology of the Land of the Bible, 10,000-586 B.C.E. Doubleday.
- Mazar, E. (2002). The Complete Guide to the Temple Mount Excavations. Shoham Academic Research and Publication.
- Mendenhall, G. E. (1962). The Hebrew Conquest of Palestine. The Biblical Archaeologist, 25(3), 66-87.
- Meyers, C. (2005). Exodus. Cambridge University Press.
- Miller, J. M., & Hayes, J. H. (2006). A History of Ancient Israel and Judah. Westminster John Knox Press.
- Moran, W. L. (1992). The Amarna Letters. Johns Hopkins University Press.
- Morris, E. F. (2005). The Architecture of Imperialism: Military Bases and the Evolution of Foreign Policy in Egypt’s New Kingdom. Brill.
- Moscati, S. (1968). The World of the Phoenicians. Praeger.
- Munro, N. D. (2004). Zooarchaeological Measures of Hunting Pressure and Occupation Intensity in the Natufian. Current Anthropology, 45(S4), S5-S33.
- Murnane, W. J. (1990). The Road to Kadesh: A Historical Interpretation of the Battle Reliefs of King Sety I at Karnak. Oriental Institute of the University of Chicago.
- Na’aman, N. (2005). Ancient Israel and Its Neighbors: Interaction and Counteraction. Eisenbrauns.
- Na’aman, N. (2005). Canaan in the Second Millennium B.C.E.. Eisenbrauns.
- Nissinen, M. (2003). Prophets and Prophecy in the Ancient Near East. Society of Biblical Literature.
- Oded, B. (1977). Judah and the Exile. Israelite and Judaean History, 435-488.
- Oded, B. (1979). Mass Deportations and Deportees in the Neo-Assyrian Empire. Reichert.
- Pearce, L. E., & Wunsch, C. (2014). Judeans in Babylonia: A Study of Deportees in the Sixth and Fifth Centuries BCE. CDL Press.
- Podany, A. H. (2010). Brotherhood of Kings: How International Relations Shaped the Ancient Near East. Oxford University Press.
- Portier-Young, C. E. (2011). Apocalypse Against Empire: Theologies of Resistance in Early Judaism. Wm. B. Eerdmans Publishing.
- Premnath, D. N. (2003). Eighth Century Biblical Prophets: A Socio-Economic Analysis. Macmillan.
- Rajak, T. (1990). The Hasmoneans and the Uses of Hellenism. A Tribute to Geza Vermes: Essays on Jewish and Christian Literature and History, 261-280.
- Rajak, T. (2002). Josephus: The Historian and His Society. Duckworth.
- Regev, E. (2013). The Hasmoneans: Ideology, Archaeology, Identity. Vandenhoeck & Ruprecht.
- Redford, D. B. (1992). Egypt, Canaan, and Israel in Ancient Times. Princeton University Press.
- Richards, M. P. (2002). A Brief Review of the Archaeological Evidence for Palaeolithic and Neolithic Subsistence. European Journal of Clinical Nutrition, 56(12), 1270-1278.
- Richard, S. (1987). The Early Bronze Age: The Rise and Collapse of Urbanism. The Biblical Archaeologist, 50(1), 22-43.
- Rocca, S. (2008). Herod’s Judaea: A Mediterranean State in the Classic World. Mohr Siebeck.
- Rowan, Y. M., & Golden, J. (2009). The Chalcolithic Period of the Southern Levant: A Synthetic Review. Journal of World Prehistory, 22(1), 1-92.
- Sanders, E. P. (1985). Jesus and Judaism. Fortress Press.
- Sandars, N. K. (1987). The Sea Peoples: Warriors of the Ancient Mediterranean. Thames and Hudson.
- Schäfer, P. (2003). The History of the Jews in the Greco-Roman World. Routledge.
- Schaper, J. (2000). Priesthood in Persian Period Judah and the Crisis of Empire. Brill.
- Schniedewind, W. M. (2004). How the Bible Became a Book: The Textualization of Ancient Israel. Cambridge University Press.
- Schürer, E. (1973). The History of the Jewish People in the Age of Jesus Christ (175 B.C.-A.D. 135). T&T Clark.
- Shea, J. J. (2003). Neandertals, Competition, and the Origin of Modern Human Behavior in the Levant. Evolutionary Anthropology, 12(4), 173-187.
- Sherratt, A. (1981). Plough and Pastoralism: Aspects of the Secondary Products Revolution. Pattern of the Past, 261-305.
- Sherratt, S. (1998). Sea Peoples and the Economic Structure of the Late Second Millennium in the Eastern Mediterranean. Mediterranean Peoples in Transition, 292-313.
- Shiloh, Y. (1984). Excavations at the City of David I, 1978-1982. Institute of Archaeology, Hebrew University of Jerusalem.
- Singer, I. (1999). Hittite Prayers. Society of Biblical Literature.
- Skourtanioti, E., et al. (2020). Genomic history of Neolithic to Bronze Age Anatolia, Northern Levant, and Southern Caucasus. Cell, 181(5), 1158-1175.
- Smith, G. A. (2018). The Historical Geography of the Holy Land. Wentworth Press.
- Smith, M. S. (2002). The Early History of God: Yahweh and the Other Deities in Ancient Israel. William B. Eerdmans Publishing.
- Snodgrass, A. M. (1980). The Dark Age of Greece: An Archaeological Survey of the Eleventh to the Eighth Centuries BC. Edinburgh University Press.
- Stager, L. E. (1985). The Archaeology of the Family in Ancient Israel. Bulletin of the American Schools of Oriental Research, 260(1), 1-35.
- Stantis, C., Schutkowski, H., & Tyldesley, J. (2020). Strontium isotope evidence for immigration and mobility at Tell el-Dab’a (Avaris): New insights into the Hyksos. PLOS ONE, 15(10), e0241055. https://doi.org/10.1371/journal.pone.0241055
- Sweeney, M. A. (2007). I, II Kings: A Commentary. Westminster John Knox Press.
- Tadmor, H. (1994). The Inscriptions of Tiglath-Pileser III, King of Assyria. Israel Academy of Sciences and Humanities.
- Torczyner, H. (1938). Lachish I: The Lachish Letters. Oxford University Press.
- Tubb, J. N. (1998). Canaanites. British Museum Press.
- VanderKam, J. C. (2001). An Introduction to Early Judaism. Wm. B. Eerdmans Publishing.
- Watts, J. W. (Ed.). (2001). Persia and Torah: The Theory of Imperial Authorization of the Pentateuch. Society of Biblical Literature.
- Weber, M. (1952). Ancient Judaism. Free Press.
- Weinstein, J. M. (1981). The Egyptian Empire in Palestine: A Reassessment. Bulletin of the American Schools of Oriental Research, 241(1), 1-28.
- Wilhelm, G. (1989). The Hurrians. Aris & Phillips.
- Wilson, R. R. (1980). Prophecy and Society in Ancient Israel. Fortress Press.
- Wiseman, D. J. (1956). Chronicles of Chaldaean Kings (626-556 B.C.) in the British Museum. British Museum.
- Younger, K. L. (1998). The Deportations of the Israelites. Journal of Biblical Literature, 117(2), 201-227.
- Zeder, M. A. (2011). The Origins of Agriculture in the Near East. Current Anthropology, 52(S4), S221-S235.
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.
Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.
Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.
This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.

