
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ জিজিয়া—ধর্মীয় দণ্ডনীতির রূপরেখা
- 2 আধুনিক মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও জিজিয়ার বৈষম্যমূলক কাঠামো
- 3 আক্রমণাত্মক যুদ্ধ ও জিজিয়া আরোপের প্রেক্ষাপট
- 4 জিজিয়ার ভাষাগত ও আদর্শিক অর্থঃ ‘প্রাণভিক্ষা’ ও ‘অবনতকরণ’-এর যোগসূত্র
- 5 জিজিয়া যাদের ওপর প্রযোজ্যঃ মুশরিকদের জিজিয়া ও ফিকহী বিচ্যুতি
- 6 আলেমদের ঘৃণাত্মক বক্তব্য (ভিডিও)
- 7 নির্ধারিত হার না থাকাঃ শাসকের খেয়াল-খুশির বৈধতা
- 8 ভারতে জিজিয়ার অমানবিক চাপ ও ঐতিহাসিক ভয়াবহতা
- 9 আশরাফুল হিদায়াঃ ইসলামী ফিকহ
- 10 তাফসীরে মাযহারীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
- 11 ইবনে কাসীরঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
- 12 ফতোয়ায়ে আলমগীরীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
- 13 উমরের আমলে অবমাননাকর জিজিয়া
- 14 উপসংহারঃ জিজিয়া—পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের হাতিয়ার
ভূমিকাঃ জিজিয়া—ধর্মীয় দণ্ডনীতির রূপরেখা
‘জিজিয়া’ (Poll Tax/Tribute) কেবল ইসলামি অর্থব্যবস্থার একটি সাধারণ রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি ইসলামি রাষ্ট্রতত্ত্ব এবং ফিকহ শাস্ত্রের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কাঠামোগত এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক হাতিয়ার। ঐতিহাসিকভাবে জিজিয়াকে অমুসলিম ‘জিম্মি’ বা ‘ধিম্মি’—অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে লাঞ্ছিত, অবনত ও বশ্যতা স্বীকারকারী অনুগত প্রজাদের ওপর আরোপিত এমন এক আর্থিক দায় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা তাদের জীবনের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ‘বিনিময় মূল্য’ বা ‘মুক্তিপণ’ হিসেবে গণ্য। তবে জিজিয়ার প্রকৃত স্বরূপ কেবল এর অর্থনৈতিক সংজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিজিয়ার মূল ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে অমুসলিমদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য বিস্তার এবং তাদের আত্মমর্যাদাকে চূর্ণ করার এক সুপরিকল্পিত দর্শনে। কুরআনের সূরা তওবা (৯:২৯)-এ জিজিয়ার বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণিত থাকলেও, এর প্রয়োগপদ্ধতি এবং আধ্যাত্মিক লক্ষ্য নিয়ে ধ্রুপদী তাফসির ও চার মাযহাবের ফিকহ গ্রন্থে যে আলোচনাগুলো এসেছে, তা মূলত অমুসলিমদের জন্য এক প্রকার ‘অপমানজনক দণ্ডবিধি’র চিত্র তুলে ধরে।
এই প্রবন্ধের একটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো—জিজিয়া আদায় ইসলামি শাসনে অমুসলিমদের লাঞ্ছিত করার একটি শক্তিশালী কৌশল। শরীয়তের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই করের উদ্দেশ্য কেবল কোষাগার সমৃদ্ধ করা নয়, বরং অমুসলিমদের ওপর এমন এক অসহনীয় লাঞ্ছনা ও সামাজিক চাপের সৃষ্টি করা, যেন তারা সেই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে অমুসলিম প্রজাকে প্রতি পদে পদে তার ‘পরাজিত’ ও ‘হিন’ অবস্থানটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকটি হলো—জিজিয়ার কোনো আল্লাহ প্রদত্ত বা নির্দিষ্ট স্থির হার (Fixed Rate) নেই। শরিয়তের প্রাথমিক উৎসগুলোতে জিজিয়ার কোনো সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে না দেওয়ার ফলে, এর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে সমকালীন শাসক বা কর্তৃপক্ষের ইজতিহাদ ও মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই কাঠামোগত অস্পষ্টতা ইতিহাসে মুসলিম শাসকদের হাতে এক সীমাহীন ক্ষমতার চাবিকাঠি তুলে দিয়েছিল। ফলে তারা তাদের প্রশাসনিক প্রয়োজন, ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি কিংবা রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী জিজিয়ার হার যখন-তখন বৃদ্ধি করতে পারত, যা বিভিন্ন সময়ে অমুসলিম প্রজাদের জন্য অমানবিক অর্থনৈতিক বোঝা ও মানবিক বিপর্যয়ে পর্যবসিত হয়েছিল।
জিজিয়ার সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর শব্দটি হলো ‘সাগিরুন’ (Saaghirun), যার অর্থ ‘অপমানিত ও অবনত’ অবস্থা। কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, জিজিয়া কেবল একটি লেনদেন নয়, বরং তা দাতা বা অমুসলিমের চরম হীনতা ও তুচ্ছতা প্রদর্শনের মাধ্যমে আদায় করতে হবে। ধ্রুপদী তাফসিরকারকদের মতে, জিজিয়া প্রদানের সময় অমুসলিমকে শারীরিক ও মানসিকভাবে এমনভাবে অপদস্ত করতে হবে যাতে তার পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে তার কোনো সম্মান অবশিষ্ট না থাকে। এই অবমাননাকর প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো অমুসলিমদের মনে এক প্রকার স্থায়ী হীনম্মন্যতা তৈরি করা, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন মুসলিম শাসনামলে জিজিয়ার এই কঠোর, বৈষম্যমূলক ও অমানবিক প্রয়োগ হিন্দু ও বৌদ্ধদের জীবনে যে ভয়াবহ দারিদ্র্য, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অস্তিত্বের সংকট ডেকে এনেছিল, তা সমকালীন ঐতিহাসিক দলিল ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এক বিস্তারিত বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
আধুনিক মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও জিজিয়ার বৈষম্যমূলক কাঠামো
জিজিয়া ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে সেটিকে কেবল সপ্তম শতাব্দীর আরবের উপজাতীয় বাস্তবতা বা মধ্যযুগীয় সাম্রাজ্যিক অর্থনীতির ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এটিকে আধুনিক মানবসভ্যতার অর্জিত নৈতিক, আইনগত এবং মানবাধিকারভিত্তিক মানদণ্ডের সাথেও তুলনা করতে হবে। কারণ, কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় তখনই, যখন সেটিকে মানুষের মর্যাদা, নাগরিক সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের দৃষ্টিতে সমঅধিকারের আধুনিক ধারণার আলোকে বিচার করা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে জিজিয়া কেবল একটি পুরনো করব্যবস্থা নয়; বরং এটি এমন একটি বৈষম্যমূলক ও শ্রেণিভিত্তিক রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিফলন, যেখানে মানুষের মৌলিক মর্যাদা তার মানবিক অস্তিত্বের কারণে নয়, বরং তার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
আধুনিক সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো—রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করবে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক আইনের মূল দর্শন দাঁড়িয়ে আছে এই ধারণার ওপর যে, মানুষ জন্মগতভাবেই সমান মর্যাদা ও সমঅধিকারের অধিকারী। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের Universal Declaration of Human Rights (UDHR)-এর প্রথম অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়:
“All human beings are born free and equal in dignity and rights.”
— Universal Declaration of Human Rights, Article 1
অর্থাৎ, একজন মানুষ মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি, নাস্তিক বা অন্য যেকোনো পরিচয়ের হোক না কেন—রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তার নাগরিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার সমান হবে। কিন্তু জিজিয়া ব্যবস্থা এই আধুনিক নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত এক দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে একজন মানুষের আইনি মর্যাদা তার মানবিক অস্তিত্ব দ্বারা নয়, বরং ইসলাম গ্রহণ করেছে কিনা তার ওপর নির্ধারিত হয়। মুসলিম নাগরিক এবং অমুসলিম ‘জিম্মি’—এই দ্বিস্তরবিশিষ্ট কাঠামো মূলত একটি ধর্মীয় বর্ণব্যবস্থা (religious caste hierarchy), যেখানে মুসলিমরা শাসক ও পূর্ণ নাগরিক, আর অমুসলিমরা সুরক্ষার বিনিময়ে কর প্রদানকারী অবনত অধীনস্থ জনগোষ্ঠী।
আধুনিক আইনের দৃষ্টিতে এটি কেবল বৈষম্যমূলকই নয়, বরং নাগরিক সমতার ধারণার সরাসরি লঙ্ঘন। কারণ, আধুনিক রাষ্ট্রে কর আরোপের ভিত্তি হয় নাগরিকের আয়, সম্পদ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম বা জনসেবার ব্যবহার; কিন্তু জিজিয়ার ভিত্তি হলো ধর্মীয় পরিচয়। অর্থাৎ, একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী দুই ব্যক্তি একই অর্থনৈতিক অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একজনকে ‘অপমানিত অবস্থায়’ বিশেষ কর দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, আর অন্যজন সেই দায় থেকে মুক্ত থাকছে। এটি আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
বিশেষ করে জিজিয়ার সাথে যুক্ত ‘সাগিরুন’ বা ‘অবনত ও লাঞ্ছিত অবস্থায় কর প্রদান’-এর ধারণাটি আধুনিক মানবাধিকারের আলোকে আরও গভীরভাবে সমস্যাজনক। কারণ আধুনিক মানবাধিকার দর্শনে মানুষের মর্যাদা (Human Dignity) একটি অবিচ্ছেদ্য ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে বিবেচিত। জার্মান সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে যেমন বলা হয়েছে:
“Human dignity shall be inviolable.”
— German Basic Law, Article 1
অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান, অবমাননা বা হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে না। কিন্তু জিজিয়া ব্যবস্থার বহু ধ্রুপদী ফিকহি ব্যাখ্যায় অমুসলিমকে প্রকাশ্যে হীন, অবনত ও সামাজিকভাবে অপদস্ত অবস্থায় কর প্রদান করাকে একটি ধর্মীয় কর্তব্যে রূপ দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়; বরং মানুষের আত্মমর্যাদাকে রাজনৈতিকভাবে ভেঙে ফেলার একটি রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তি (technology of domination)। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্র কর্তৃক ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীকে অপমানজনক আইনি মর্যাদায় নামিয়ে আনা বৈষম্যমূলক আচরণ (discriminatory treatment) হিসেবে গণ্য হয়।
জাতিসংঘের International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে তার ধর্ম পরিবর্তন করতে বা নির্দিষ্ট ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার মতো চাপ, জবরদস্তি বা বৈষম্যের শিকার করা যাবে না। কিন্তু জিজিয়ার ঐতিহাসিক বাস্তবতায় দেখা যায়, বহু ক্ষেত্রে এই কর এমন মাত্রায় আরোপ করা হতো এবং এর সাথে এমন সামাজিক অপমান জুড়ে দেওয়া হতো, যা কার্যত ধর্মান্তরের জন্য মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে কাজ করত। অর্থাৎ, “তুমি ইসলাম গ্রহণ না করলে অপমানিত নাগরিক হিসেবে বাঁচবে”—এই বার্তাটি জিজিয়ার অন্তর্নিহিত কাঠামোর মধ্যেই প্রোথিত ছিল।
আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব (Citizenship) একটি সার্বজনীন ও সমঅধিকারভিত্তিক ধারণা। একজন নাগরিক রাষ্ট্রের আইন মেনে চললে এবং কর প্রদান করলে তার ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রের কাছে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু ইসলামি জিম্মি ব্যবস্থায় অমুসলিম কখনোই মুসলিমের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক ছিল না। তাদেরকে আলাদা পোশাক পরা, আলাদা চিহ্ন বহন করা, উচ্চস্বরে ধর্মীয় আচার না করা, নতুন উপাসনালয় নির্মাণে সীমাবদ্ধতা মানা, অস্ত্র বহন না করা, ঘোড়ায় না চড়া—এমন বহু বিধিনিষেধের অধীনে রাখা হতো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফিকহি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় [3]। অর্থাৎ, জিজিয়া ছিল বৃহত্তর একটি বৈষম্যমূলক নাগরিক কাঠামোর কেবল একটি অংশ।
প্রায়ই একটি আপত্তি তোলা হয় যে, “মুসলিমরা যাকাত দিত, অমুসলিমরা জিজিয়া দিত”—অতএব এটি নাকি সমতাভিত্তিক একটি করব্যবস্থা। কিন্তু এই তুলনা বিভ্রান্তিকর। যাকাত এর পরিমাণ সুনির্দিষ্ট, ইসলামের অনুসারীদের জন্য একটি ধর্মীয় ইবাদত, যা মুসলমানের আত্মশুদ্ধি ও ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত। পক্ষান্তরে জিজিয়া ছিল পরাজিত অমুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপিত একটি রাজনৈতিক ও আইনি দণ্ডমূলক ব্যবস্থা, যার সাথে ‘অবনত অবস্থায়’ কর প্রদান করার শর্তও যুক্ত ছিল। একজন মুসলমান যাকাত দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রের কাছে অপমানিত নাগরিক হয়ে যায় না; কিন্তু জিজিয়ার বহু ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় অমুসলিমের অপমানকেই এর উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। কাজেই যাকাত ও জিজিয়াকে একই ধরনের কর হিসেবে উপস্থাপন করা মূলত একটি ভ্রান্ত সমীকরণ।
সভ্যতার ইতিহাসে দাসপ্রথা, সামন্তবাদ, বর্ণব্যবস্থা, রাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র—এসব ব্যবস্থাও একসময় ধর্ম, ঐতিহ্য বা আইনের দ্বারা বৈধতা পেয়েছিল। কিন্তু আধুনিক মানবসভ্যতা সেসব ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ মানুষ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেছে যে, জন্ম, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ একটি গভীর অন্যায়। ঠিক একইভাবে, জিজিয়া ও জিম্মি ব্যবস্থাও আধুনিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে একটি ধর্মভিত্তিক বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো, যা নাগরিক সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদার মৌলিক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।
মূলত, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে; কিন্তু জিজিয়া ব্যবস্থা ধর্মীয় পরিচয়কে আইনি ও রাজনৈতিক অধীনতার ভিত্তিতে পরিণত করে। আধুনিক মানবাধিকার দর্শন যেখানে বলে “সব মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী”, সেখানে জিজিয়া-ভিত্তিক জিম্মি ব্যবস্থা কার্যত ঘোষণা করে—“সব মানুষ সমান নয়; মুসলিম শাসকের অধীনে অমুসলিমকে অবনত অবস্থায় বেঁচে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে।” এই দুই দর্শনের মধ্যে পার্থক্য কেবল আইনি নয়; বরং এটি দুই ভিন্ন সভ্যতার নৈতিক ভিত্তির মধ্যকার সংঘাত।
আক্রমণাত্মক যুদ্ধ ও জিজিয়া আরোপের প্রেক্ষাপট
ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও ফিকহ শাস্ত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং প্রতিষ্ঠিত বিধান হলো ‘জিহাদ আল-তালাব’ বা আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। এই তত্ত্বানুসারে, মুসলিম উম্মাহ যখনই সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে গরিষ্ঠতা অর্জন করবে এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী হবে, তখন পার্শ্ববর্তী অমুসলিম রাষ্ট্র বা ‘দারুল হারব’-এ আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করা এবং তাদের পরাজিত করে ইসলামি শাসনের অধীনে নিয়ে আসা একটি ধর্মীয় আবশ্যকতা হিসেবে গণ্য হয়। এই আক্রমণাত্মক যুদ্ধের মূল লক্ষ্য কেবল ভৌগোলিক সম্প্রসারণ নয়, বরং অমুসলিম শক্তির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব খর্ব করে সেখানে ইসলামি শরীয়তের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত জিজিয়া বা ‘অমুসলিম কর’ আদায়ের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।
বিজিত অঞ্চলের অমুসলিমদের ওপর শরীয়তের দণ্ডবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামি ফিকহ অত্যন্ত কঠোর বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছে। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে পরাজিত জনগোষ্ঠীর সামনে সাধারণত তিনটি পথ খোলা রাখা হয়, তবে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এই বিকল্পগুলো পরিবর্তিত হয়:
১. মুশরিক বা মূর্তিপূজকদের পরিণতি: আরবের মূর্তিপূজক কিংবা খাটি মুশরিকদের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান অত্যন্ত রূঢ়। তাদের সামনে কেবল দুটি পথ খোলা থাকে—হয় ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হওয়া, নতুবা তরবারির আঘাতে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া (কতল)। তাদের কাছ থেকে জিজিয়া গ্রহণ করে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা মূর্তিপূজাকে সুরক্ষা দেওয়ার কোনো বিধান ইসলামি রাষ্ট্রে রাখা হয়নি। এটি একটি চূড়ান্ত দণ্ডমূলক ব্যবস্থা যা অমুসলিমদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।
২. আহলে কিতাবদের জিম্মি অবস্থা: ইহুদি ও নাসারাদের (খ্রিস্টান) মতো ‘আহলে কিতাব’ বা কিতাবধারী জাতির ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতর বিধান প্রযোজ্য। যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তবে তারা ‘জিম্মি’ হিসেবে ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস করার সুযোগ পেতে পারে। তবে এই ‘নিরাপত্তা’ বা জীবন রক্ষার শর্ত হলো—তাদের অত্যন্ত অবনত, লাঞ্ছিত ও অপদস্ত অবস্থায় ‘জিজিয়া’ প্রদান করতে হবে। এই জিজিয়া কেবল একটি কর নয়, বরং এটি তাদের পরাজিত ও নিম্নতর অবস্থানের এক প্রকাশ্য স্বীকৃতি। এই অপমানজনক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাদের জীবনের গ্যারান্টি প্রদান করা হয়।
৩. মাজুসী বা অগ্নি উপাসকদের ব্যতিক্রম: এই কঠোর বিভাজনের মাঝে ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে একটি বিশেষ ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় পারস্যের অগ্নি উপাসক বা মাজুসীদের ক্ষেত্রে। তারা মূলত মূর্তিপূজক ও মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাছ থেকে জিজিয়া গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছিল। কেন এবং কোন যুক্তিতে পারস্যের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ‘আহলে কিতাব’-এর ন্যায় সুযোগ দিয়ে জিজিয়ার আওতায় আনা হয়েছিল, তার পেছনে ইবনে আব্বাস ও হযরত আলীর দেওয়া এক চমকপ্রদ ব্যাখ্যা রয়েছে, যা পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে।
সুতরাং, জিজিয়া কোনো শান্তিপূর্ণ কর ব্যবস্থা নয়; বরং এটি একটি সফল সামরিক অভিযানের পর বিজিতদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক বাধ্যতামূলক আনুগত্যের নিদর্শন। যখন কোনো অমুসলিম রাষ্ট্র সামরিকভাবে পরাজিত হয়, তখনই কেবল এই অপমানজনক কর আদায়ের পথ প্রশস্ত হয়, যা প্রকারান্তরে অমুসলিমদের জন্য এক অন্তহীন লাঞ্ছনার সূচনা করে।
জিজিয়ার ভাষাগত ও আদর্শিক অর্থঃ ‘প্রাণভিক্ষা’ ও ‘অবনতকরণ’-এর যোগসূত্র
জিজিয়া শব্দটি কেবল একটি ‘কর’ বা ‘ট্যাক্স’ হিসেবে অনুবাদ করলে এর প্রকৃত সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনা আড়ালে রয়ে যায়। ব্যুৎপত্তিগতভাবে, জিজিয়া শব্দটি আরবি ‘জাযা’ (Jaza) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো—প্রতিদান, বিনিময় বা শাস্তি। ইসলামি ফিকহ ও তাফসির শাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অর্থটি অমুসলিমদের ‘কুফর’ বা অবিশ্বাসের এক প্রকার দণ্ড বা বিনিময় হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো রাষ্ট্রীয় সেবা বা নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিনিময় নয়, বরং এটি একজন অমুসলিমের ইসলামি রাষ্ট্রে ‘অবিশ্বাসী’ হিসেবে টিকে থাকার দণ্ড। অনেক আধুনিক ব্যাখ্যাকার একে সাধারণ কর হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করলেও ধ্রুপদী উৎসগুলো একে স্পষ্টভাবে একটি শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই বিষয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ তাফসীরে জালালাইন-এ যা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে অত্যন্ত স্পষ্ট ও রূঢ়। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, জিজিয়া শব্দটি মূলত ‘জাযা’ শব্দ থেকে নিষ্পন্ন, যার নিহিতার্থ হলো—একজন অমুসলিম মূলত তার কুফরি বা অবাধ্যতার কারণে মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত অপরাধী ব্যক্তি; কিন্তু তাকে এই বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যে, তার ওপর এই দণ্ড আপাতত জারি হচ্ছে না এবং তাকে ‘দারুল ইসলামে’ নিরাপত্তার সাথে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। [4]। অর্থাৎ, জিজিয়া আদায়ের মাধ্যমে অমুসলিম ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে তার ‘প্রাণভিক্ষা’ বা ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ ক্রয় করে। এটি এক প্রকার ‘মুক্তিপণ’ (Ransom), যা প্রদান না করলে ইসলামি রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অমুসলিমের জীবনের নিরাপত্তা বা ‘জিম্মাদারী’ ছিন্ন হয়ে যায়।
তাফসীরে জালালাইন : আরবি-বাংলা, দ্বিতীয় খণ্ড (দশম পারা) পৃষ্ঠা ৬৫৩
অর্থাৎ আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা আল্লাহ পাকের প্রতি ঈমান আনে না, আখিরাতের প্রতিও বিশ্বাস করে না, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর।
মুজাহিদ (র.) বলেছেন যখন রুমীয়দের সাথে প্রিয়নবী কে জিহাদের আদেশ দেওয়া হয়, তখন এ আয়াত নাজিল হয়। এ আয়াত নাজিল হওয়ার পরই প্রিয়নবী তাবুকের যুদ্ধে তাশরিফ নিয়ে যান।
-[মা’আরিফুল কুরআন : আল্লামা ইদ্রীস কান্ধলভী (র.) খ. ৩, পৃ. ৩০৮, তাফসীরে মাযহারী খ. ৫ পৃ. ২৩৫]
আহলে কিতাব তথা ইহুদি নাসারাদের মধ্যে যখন চারটি দোষ পাওয়া যায় তখন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়ে। যথা-
১. এ অর্থাৎ তারা আল্লাহ পাকের প্রতি ঈমান আনে না। কেননা তারা হযরত ঈসা (আ.) ও ওজায়ের (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করে [নাউজুবিল্লাহ] এটি ঈমান বিরোধী কাজ, আল্লাহ পাকের একত্ববাদে তারা বিশ্বাস করে না।
২. ১১। ১৮১, আর তারা আখিরাতের প্রতিও বিশ্বাস করে না। ইহুদিরা মনে করে তারাই জান্নাতে যাবে, আর নাসারারা মনে করে জান্নাতের আধিকারী একমাত্র তারাই। ইহুদিরা দাবি করে সামান্য কয়েক দিন দোজখ তাদেরকে স্পর্শ করবে, এরপর তারা নাজাত পাবে। আর ইহুদি নাসারারা এ কথাও বলে যে, জান্নাতের নিয়ামত দুনিয়ার নিয়ামতের ন্যায়ই হবে। তাদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে যে, জান্নাত চিরস্থায়ী না সাময়িক, এসব কারণে আখিরাতের প্রতি তাদের ঈমান নেই এ কথাই প্রমাণিত হয়।
৩. … অর্থাৎ আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল যে সব বিষয়কে হারাম ঘোষণা করেছেন তারা সেগুলোকে হারাম মনে করে না। এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। ক. পবিত্র কুরআনে এবং প্রিয়নবী -এর মহান আদর্শে যা হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে তারা সেগুলোকে হারাম বলে মনে করে না। খ. তাওরাত ইঞ্জিলে যা হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে তারা সেগুলোও মানে না; বরং তাওরাত ইঞ্জিলে তারা পরিবর্তন করেছে এবং নিজেদের ইচ্ছা মতো বিধান তৈরি করেছে। কোনো কোনো তত্ত্বজ্ঞানী বলেছেন, আলোচ্য আয়াতে , শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য করা হয়েছে সেই রাসূল, যার অনুসরণের দাবি করে তারা, অথচ সে রাসূলেরও অনুসরণ তারা করে না। কেননা হযরত মূসা (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.) আদেশ দিয়ে গেছেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ-এর অনুসরণ করতে, কিন্তু তারা তা করে না ।
৪. … অর্থাৎ তারা সত্য ধর্মকে গ্রহণ করে না। ইমাম কাতাদা (র.) বলেছেন, আলোচ্য বাক্যের ‘হক’ শব্দটি দ্বারা আল্লাহ পাককে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এমন অবস্থায় এর অর্থ হবে যারা আল্লাহর দীন সত্য ধর্মকে গ্রহণ করে না । কেননা অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন … অর্থাৎ “আল্লাহ পাকের নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো ইসলাম” আর তারা ইসলাম গ্রহণ করে না।
জিযিয়া ও খেরাজ : জিযিয়া বলা হয় সে করকে, যা কাফেরদের জীবনের বদলে আদায় করা হয় । যিজিয়া শব্দটি “জাযা” থেকে নিষ্পন্ন অর্থাৎ তুমি মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত অপরাধী ব্যক্তি। কিন্তু তোমাকে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যে, তোমার উপর এ দণ্ড জারি হচ্ছে না এবং দারুল ইসলামে নিরাপত্তার সঙ্গে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তোমাকে হত্যাও করা হয়নি এবং তোমাকে গোলামও বানানো হয়নি। যেভাবে মুক্তিপণ আদায় করলে মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়ে যায় ঠিক তেমনিভাবে জিযিয়া আদায় করলেও হত্যার বিধান কার্যকর হয় না।
দ্বিতীয়ত ইসলামি রাষ্ট্র আর একটি উপকার করে তা হলো, ঠিক মুসলমানদের ন্যায় তোমাদের জানমাল, ইজ্জত আবরুর হেফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করে। আর শরিয়তের দৃষ্টিতে জান মালের হেফাজত মুসলিম অমুসলিম সকলের ব্যাপারে সমভাবে করা হয়, এটি ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর ইসরামি রাষ্ট্র সে রাষ্ট্রকে বলা হয় যার সংবিধান ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিতে তৈরি হয় যাতে ইসলামি আইন কানুন কার্যকর হয়। আর খেরাজ হলো সে কর যা অমুসলিম প্রজাদের জমিনের উপর ধার্য করা হয়।
… অর্থাৎ আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা ঈমান আনে না : তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত তারা অপমানিত অবস্থায় জিজিয়া বা অমুসলিম কর আদায় করে। আলোচ্য আয়াতে এ “আন্ ইয়াদীন” শব্দ দ্বারা আনুগত্য বুঝানো হয়েছে অথবা এর অর্থ হলো অমুসলিমরা এ জিযিয়া স্বহস্তে আদায় করবে অন্য কারো হাতে নয় ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য অনুধাবন করা জরুরি, যা প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়—তা হলো ‘জিজিয়া’ এবং ‘খেরাজ’-এর মধ্যকার পার্থক্য। খেরাজ হলো মূলত অমুসলিমদের মালিকানাধীন বা তাদের দ্বারা কর্ষিত জমির ওপর ধার্যকৃত ভূমি কর। পক্ষান্তরে, জিজিয়া হলো অমুসলিম ব্যক্তির ‘মাথার ওপর’ বা তার ‘অস্তিত্বের ওপর’ ধার্যকৃত একটি কর। খেরাজ যেখানে অর্থনৈতিক লেনদেনের পর্যায়ে পড়ে, জিজিয়া সেখানে সরাসরি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লাঞ্ছনার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। জিজিয়া দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো বিজয়ী মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট ‘ফি’ প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের ধর্ম পালন ও বেঁচে থাকার সাময়িক অনুমতি লাভ করা। কুরআন এবং হাদিসের বিভিন্ন স্থানে জিজিয়া প্রদানের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার মূল সুরটিই হলো—এই অর্থ দিতে হবে অত্যন্ত নত ও লাঞ্ছিত অবস্থায়। এটি কেবল অর্থনৈতিক রাজস্ব নয়, বরং এটি বিজয়ীদের প্রতি বিজিতদের নিঃশর্ত আনুগত্য এবং তাদের নিম্নতর অবস্থানের এক প্রকাশ্য স্বীকৃতি। সহিহ বুখারী এবং বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, এই ‘অবনত’ অবস্থার অর্থ আদায়ের পদ্ধতিতে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা অন্তর্ভুক্ত থাকা [5]। জিজিয়া আদায়ের সময় অমুসলিমকে সশরীরে উপস্থিত হতে হয়, সে অন্যের মাধ্যমে বা ডাকযোগে এই কর পাঠাতে পারে না। তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এবং জিজিয়া সংগ্রহকারী মুসলিম কর্মকর্তা উচ্চ আসনে আসীন থাকেন। এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে পরে দেয়া হচ্ছে, আপাতত বুখারী শরীফ থেকে লাঞ্ছিত হওয়ার প্রমাণটি দেখি,

এবারে আসুন ড. মুহাম্মদ আবু বকর যাকারিয়ার সম্পাদিত ইসলামহাউজ থেকে প্রকাশিত একটি বই থেকেই দেখে নেয়া যাক, জিজিয়া অপমানজনক নাকি সম্মানজনক? [6] –


জিজিয়া যাদের ওপর প্রযোজ্যঃ মুশরিকদের জিজিয়া ও ফিকহী বিচ্যুতি
জিজিয়ার প্রয়োগিক পরিধি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রকৃত ধর্মীয় কাঠামো এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রয়োজনে এর যে প্রসারণ ঘটানো হয়েছে, তার মধ্যে এক বিশাল তাত্ত্বিক ব্যবধান বিদ্যমান। পবিত্র কুরআনের সূরা তওবার ২৯ নম্বর আয়াতে জিজিয়া আদায়ের নির্দেশটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সীমাবদ্ধ। আয়াতে বলা হয়েছে:
যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, আর শেষ দিনের প্রতিও না, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা সহকারে স্বেচ্ছায় ট্যাক্স দেয়।
— Taisirul Quran
তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সে সব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিয্য়া দেয়।
— Rawai Al-bayan
যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে [১] তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্তে ঈমান আনে না এবং শেষ দিনেও নয় এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দীন অনুসরণ করে ন; তাদের সাথে যুদ্ধ কর [২], যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে নিজ হাতে জিয্ইয়া [৩] দেয় [৪]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কুরআনের এই ‘নস’ বা অকাট্য বর্ণনা দ্বারা এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, জিজিয়া কেবল ইহুদি ও নাসারাদের (খ্রিস্টান) জন্য নির্ধারিত একটি দণ্ড বা কর। নবুয়তের যুগে এবং প্রথম খলিফা আবুবকরের আমলে আরবের মূর্তিপূজক বা মুশরিকদের ক্ষেত্রে ‘ইসলাম অথবা তরবারি’—এই দুইটির বাইরে তৃতীয় কোনো পথ (জিজিয়া) খোলা রাখা হয়নি। অর্থাৎ, তাদের হয় ইসলাম গ্রহণ করতে হতো, নতুবা যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হতো।
তবে মুহাম্মদের আমলে শুধুমাত্র অগ্নিউপাসক বা ‘মাজুসীদের’ (Zoroastrians) ক্ষেত্রে এই নিয়মের একটি বিশেষ ব্যতিক্রম দেখা যায়। মাজুসীরা যেহেতু বাহ্যিকভাবে মূর্তিপূজক বা অগ্নিউপাসক ছিল, তাই তাদের কাছ থেকে জিজিয়া গ্রহণের বৈধতা নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে প্রাথমিক সংশয় তৈরি হয়েছিল। এই জটিলতার এক চমকপ্রদ ধর্মতাত্ত্বিক সমাধান দিয়েছিলেন হযরত আলী। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, মাজুসীরা মূলত আদি নবী হযরত আদমের শরীয়তের অনুসারী ছিল এবং তাদের কাছে একটি আসমানি কিতাবও ছিল। কিন্তু তাদের এক রাজা মদমত্ত অবস্থায় নিজের আপন বোনকে বিয়ে করে বসেন এবং এই জঘন্য পাপকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তাদের মূল কিতাবটি পুড়িয়ে ফেলেন ও শরীয়ত বিকৃত করেন। অর্থাৎ, মাজুসীরা আদিতে ‘আহলে কিতাব’ বা কিতাবধারী ছিল বলেই তাদের ওপর জিজিয়া ধার্য করা হয়েছিল। মুহাম্মাদবলেছিলেন, “তাদের সাথে আহলে কিতাবের ন্যায় আচরণ করো” (সুন্নু বিহীন সুন্নাতা আহলিল কিতাব), যা পুনরায় প্রমাণ করে যে, জিজিয়া নেওয়ার জন্য ‘কিতাবধারী’ হওয়া একটি অপরিহার্য শর্ত।

কিন্তু ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে জিজিয়ার এই সংজ্ঞাকে এক চরম ফিকহী বিচ্যুতির মাধ্যমে প্রসারিত করা হয়েছে। ইমাম আবু হানিফার এক বিতর্কিত ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করেই মূলত ভারতের মূর্তিপূজকদের ওপর জিজিয়া আরোপের পথ প্রশস্ত হয়। হানাফি মাযহাবের যুক্তি ছিল—আরব ভূখণ্ডের বাইরের মূর্তিপূজক বা মুশরিকদের কাছ থেকে জিজিয়া নেওয়া জায়েজ, কারণ তাদের ‘গোলাম’ বানানো সম্ভব হলে জিজিয়া নেওয়াও সম্ভব। এই ইজতিহাদের ফলাফল ছিল ভারতের হিন্দু বৌদ্ধ শিখদের জীবন রক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ছিল ভয়াবহ। ভারতের হিন্দু ও বৌদ্ধরা শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই ‘আহলে কিতাব’ না হওয়া সত্ত্বেও, মুসলিম শাসকরা (যেমন মুহাম্মাদ বিন কাসিম থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাটরা) কেবল বিশাল রাজস্ব হারানো থেকে বাঁচতে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে তাদের ‘ধিম্মি’ হিসেবে গণ্য করেন। প্রকৃতপক্ষে, এটি ছিল কুরআন ও সুন্নাহর মূলনীতির একটি বাণিজ্যিক প্রসারণ।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে খলিফা হযরত উমরের কঠোর সিদ্ধান্তে। উমর যখন মিশরে অভিযান পরিচালনা করেন, তখন তিনি সেখানকার খাটি মুশরিক বা মূর্তিপূজকদের ক্ষেত্রে জিজিয়া গ্রহণের প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর নীতি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ—মুশরিকদের জন্য কেবল ইসলাম অথবা মৃত্যু; জিজিয়া দিয়ে তাদের কুফরি বা মূর্তিপূজাকে সুরক্ষা দেওয়ার কোনো অবকাশ ইসলামি বিধানে নেই। অথচ ভারতবর্ষে শাসক ও ফকীহদের যোগসাজশে এই কঠোর নীতিকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। আবু হানিফার এই শিথিল বা ভুল ইজতিহাদই মূলত ভারতীয় প্রজাদের জীবন রক্ষা পেলেও তাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক অবমাননাকর ও লাঞ্ছনাকর জিজিয়ার যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার আইনি সুযোগ করে দিয়েছিল।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৯৬১. যিম্মীদের থেকে জিযিয়া গ্রহণ এবং হারবীদের সাথে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি। আর আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, এবং শেষ দিনের উপর বিশ্বাস করে না, আর আল্লাহ তা’আলা ও তার রাসুল যা হারাম করেছেন তা হারাম বলে মানে না, তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর … আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (৯ঃ ২৯) আয়াতে উল্লেখিত مسكين শব্দের মুল হল مسكنة অর্থ হল অভাবগ্রস্ত اسكن من فلان এর অর্থ সে অমুক থেকে অধিক অভাবগ্রস্থ। এ শব্দটি سكون থেকে নিশপন্ন নয়। صاغرون এর অর্থ লাঞ্চিত। ইয়াহুদি, খ্রিস্টান, অগ্নিপুজক ও আজমীদের থেকে জিযিয়া গ্রহন। ইবন উয়াইনা (রহঃ) (আবদুল্লাহ) ইবন নাজীহ (রহঃ) থেকে বলেন, আমি মুজাহিদ (রহঃ) এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, এর কারন কি যে, সিরিয়া বাসীদের উপর চার দীনার এবং ইয়ামান বাসীদের উপর এক দীনার করে জিযিয়া গ্রহন করা হয়। তিনি বললেন, তা স্বচ্ছলতার প্রেক্ষিতে ধার্য করা হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৯৩৫ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩১৫৬ – ৩১৫৭
২৯৩৫। আলী ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … (আমর) ইবনু দ্বীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু যায়দ ও আমর ইবনু আউস (রহঃ) সহ যমযমের সিড়ির নিকট বসাছিলাম, হিজরী সত্তর সনে যে বছর মুসআব ইবনু যুবায়র (রাঃ) বসরা বাসীদের নিয়ে হাজ্জ (হজ্জ) আদায় করেছিলেন। তখন বাজালাহ তাদের উভয়কে এ হাদীস বর্ণনা করেন, আমি আহনাফের চাচা জাযই ইবনু মুআবিয়া (রাঃ) এর লেখক ছিলাম। আমাদের নিকট উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে একখানি পত্র আসে যে, যে সব মাজুসী মাহরামদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ তাদের বিচ্ছিন্ন করে দাও। আর উমর (রাঃ) মাজুসীদের কাছ থেকে জিযিয়া গ্রহণ করতেন না, যে পর্যন্ত না আবদুর রাহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এ মর্মে সাক্ষী দিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজার এলাকার মাজুসীদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করেছেন।
[পারসিক অগ্নিপূজকদের মাজুসী বলে]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু দ্বীনার (রহঃ)
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
১৭. যুদ্ধাভিযান অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ৫৮. ‘মাজুসী’ বা অগ্নিপুজকদের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা সম্পর্কে
২৫৩৯. বাজালাহ হতে আমর বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি তাকে বলতে শুনেছি যে, উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু অগ্নি-উপাসকদের থেকে জিযিয়া কর গ্রহণ করেননি, যতক্ষণ না আব্দুর রহমান ইবন আওফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এরূপ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’হাজার’ নামক স্থানের অগ্নি-উপাসকদের থেকে জিযিয়া কর গ্রহণ করেছিলেন।[1]
[1] তাহক্বীক্ব: এর সনদ বুখারীর শর্তানুযায়ী সহীহ।
তাখরীজ: বুখারী, জিযিয়া, ৩১৫৬;
তাখরীজ: আমরা এর পূর্ণ তাখরীজ দিয়েছি মুসনাদুল মাউসিলী ৮৬০, ৮৬১ ও মুসনাদুল হুমাইদী নং ৬৪ তে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এবারে আসুন দেখি, ইবনে আব্বাস মাজুসীদের থেকে জিজিয়া গ্রহণের কী যুক্তি দিয়েছিল, যা থেকে পরিষ্কার প্রমাণ হয়, জিজিয়া গ্রহণের জন্য আহলে কিতাব হওয়া আবশ্যক।
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬৯. অগ্নি-উপাসকদের থেকে জিযিয়া কর গ্রহন সম্পর্কে।
৩০৩২. আহমদ ইবন সানান ওয়াসিতী (রহঃ) ….. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, যখন পারসিকদের নবী ইনতিকাল করেন, তখন ইবলিস তাদের অগ্নিপূজায় লাগিয়ে দেয় (অর্থাৎ গুমরাহ করে ফেলে)।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
আলেমদের ঘৃণাত্মক বক্তব্য (ভিডিও)
আসুন এই নিয়ে আলোচনার শুরুতেই একটি ভিডিও দেখি, যেখানে আরবের একজন ইসলামিক আলেম শেখাচ্ছেন, কীভাবে একটি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রতি পদে পদে অপমান অপদস্ত করতে হবে, যেন তারা বাধ্য হয় ইসলাম গ্রহণ করতে!
আসুন আরও একজন আলেমের বক্তব্য শুনি,
এবারে আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমাদুল্লাহর একটি ভিডিও দেখে নিই। এই ভিডিওর এই বক্তব্যে অমুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণাটিকে একটি সাময়িক এবং কৌশলগত ব্যবস্থা হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যা প্রকারান্তরে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করে। বক্তা আহমাদুল্লাহ মদিনা সনদকে একটি “চুক্তি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা কেবল পরিস্থিতির চাপে ইহুদিদের সাথে করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সূরা তাওবার মাধ্যমে তা “বাতিল” বা “রহিত” হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি এই বার্তাই দিচ্ছেন যে, অমুসলিমদের সাথে সমানাধিকারভিত্তিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ইসলামের চিরস্থায়ী আদর্শ নয়। বিশেষ করে, অমুসলিমদের ওপর অবমাননাকর ‘জিজিয়া’ বা কর আরোপ করে তাদের ‘নাগরিক’ নয় বরং নির্দিষ্ট ‘ফি’ দিয়ে বসবাসের শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক রাষ্ট্রের সমান নাগরিক অধিকারের ধারণার পরিপন্থী। বক্তা অমুসলিমদের সাথে “কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকা” বা “জগাখিচুড়ি হয়ে থাকা” বিষয়টিকে একটি “ধোঁকা” হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং ইহুদিদের সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক ও বর্ণবাদী মন্তব্য (যেমন: তারা চতুর বা বাহির থেকে এসে খুটি গেড়েছে) করে তাদের প্রতি এক ধরণের সামাজিক ঘৃণা ও অবিশ্বাস উসকে দিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, অমুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে একটি “সুবিধাবাদী” এবং “রহিত” ব্যবস্থা হিসেবে দেখিয়ে তিনি তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদাকে খাটো করেছেন।
নির্ধারিত হার না থাকাঃ শাসকের খেয়াল-খুশির বৈধতা
জিজিয়া ব্যবস্থার অন্যতম ভয়াবহ এবং অমানবিক দিক হলো, এটি যাকাতের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট এবং চিরস্থায়ী হারে (Fixed Rate) সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামি অর্থব্যবস্থায় যাকাতের ক্ষেত্রে যেমন সম্পদের আড়াই শতাংশের একটি সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় মানদণ্ড রয়েছে, জিজিয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঐশী বা আইনি ঊর্ধ্বসীমা কুরআন বা সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত হয়নি। যদিও পরবর্তীকালে বিভিন্ন মাযহাবের ফকীহগণ বার্ষিক ১২, ২৪ বা ৪৮ দিরহামের একটি কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তা কেবল পরামর্শমূলক। মূলনীতি অনুযায়ী, জিজিয়ার হার কত হবে তা সম্পূর্ণভাবে সমকালীন শাসক বা কর্তৃপক্ষের ইজতিহাদ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের (Siyasa) ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই কাঠামোগত অস্পষ্টতা ইতিহাসে অমুসলিম প্রজাদের ওপর চরম অর্থনৈতিক নিপীড়ন চালানোর একটি বৈধ আইনি চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই ‘ফিক্সড রেট’ না থাকার সরাসরি ফলাফল হলো শাসকের নিরঙ্কুশ মর্জিনির্ভরতা। যেহেতু কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই, তাই শাসক চাইলে অমুসলিমদের ওপর যেকোনো পরিমাণ অর্থ জিজিয়া হিসেবে চাপিয়ে দিতে পারতেন। রাষ্ট্রের কোষাগার শূন্য হলে বা কোনো ব্যয়বহুল যুদ্ধাভিযানের প্রয়োজন পড়লে, অমুসলিমদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করাই ছিল শাসকদের জন্য সহজতম পথ। অনেক ক্ষেত্রে জিজিয়ার হার এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হতো যা বহন করা সাধারণ কৃষিজীবী বা শ্রমজীবী অমুসলিমদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। ইমাম শাফিঈর মতে, জিজিয়ার সর্বনিম্ন হার এক দিনার হলেও এর সর্বোচ্চ সীমার কোনো নির্দিষ্টতা নেই, যা মূলত শাসকের ইচ্ছাধীন। [7]। এই নীতিগত শূন্যতাই জিজিয়াকে একটি স্বচ্ছ রাজস্ব নীতির বদলে শাসকের ব্যক্তিগত আক্রোশ বা খেয়াল-খুশি চরিতার্থ করার হাতিয়ারে পরিণত করেছিল।
শাসক-নির্ভর এই কর নির্ধারণী ক্ষমতা কীভাবে সামাজিক সংঘাত ও ব্যক্তিগত ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে, তার একটি জলজ্যান্ত ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো আবু লুলু বা ফিরোজের ঘটনা। বর্ণনামতে, মুগীরা ইবন শু’বা তাঁর অধীনস্ত এই পারসিক কারিগরের ওপর প্রতিদিন দুই দিরহাম অর্থাৎ মাসে ৬০ দিরহাম কর ধার্য করেছিলেন। আবু লুলু যখন এই কর কমানোর জন্য খলিফা উমরের কাছে আবেদন করেন, তখন উমর তাঁর পেশাগত দক্ষতার কথা বিবেচনা করে কর কমানোর পরিবর্তে উল্টো সেই কর বাড়িয়ে প্রতিদিন ৪ দিরহাম বা মাসে ১০০ দিরহাম করার ইঙ্গিত দেন। এই হুট করে কর বৃদ্ধি এবং শাসকের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিকার না পাওয়ার তীব্র ক্ষোভ থেকেই শেষ পর্যন্ত আবু লুলু উমরের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালায়। [8]। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জিজিয়া বা অনুরূপ করের হার যখন স্বচ্ছ নীতিমালার বাইরে গিয়ে শাসকের খেয়াল-খুশিতে নির্ধারিত হয়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়, বরং চরম রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অসন্তোষের জন্ম দেয়। মূলত, হারের এই অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনশীলতা জিজিয়া দেওয়া কাফেরদের জীবনে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের সৃষ্টি করেছিল।
ভারতে জিজিয়ার অমানবিক চাপ ও ঐতিহাসিক ভয়াবহতা
ভারতবর্ষে জিজিয়া কেবল একটি রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল অমুসলিম প্রজাদের—বিশেষ করে হিন্দু ও বৌদ্ধদের—অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। যেহেতু জিজিয়ার কোনো নির্দিষ্ট হার ছিল না, তাই ভারতীয় সুলতান ও সম্রাটরা একে অমুসলিমদের দারিদ্র্যের চরম সীমায় পৌঁছে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই করের মূল উদ্দেশ্যই ছিল অমুসলিমদের মনে এই বোধ তৈরি করা যে, ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের জীবনে কোনো সুখ বা স্বস্তি নেই।
১. আলাউদ্দিন খিলজির আমলে চরম দারিদ্র্য ও নিগ্রহ
সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির শাসনামলে জিজিয়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক করের হার এতটাই বৃদ্ধি করা হয়েছিল যে, অমুসলিম প্রজাদের জীবন আক্ষরিক অর্থেই বিষিয়ে উঠেছিল। সমকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি তাঁর ‘তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী’ গ্রন্থে এই পরিস্থিতির এক বীভৎস চিত্র তুলে ধরেছেন। বারানির বর্ণনা অনুযায়ী, হিন্দুদের ওপর করের বোঝা এমনভাবে চাপানো হয়েছিল যে তারা ঘোড়ায় চড়া, ভালো পোশাক পরা বা এমনকি পান খাওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল। খিলজি এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন যাতে অমুসলিমদের কাছে কেবল বেঁচে থাকার মতো সামান্য খাদ্যটুকু অবশিষ্ট থাকে, যাতে তারা কখনোই বিদ্রোহ করার সাহস না পায়। অনেক ক্ষেত্রে কর দিতে না পেরে অমুসলিমদের ঘরের নারীদের মুসলিমদের বাড়িতে দাসী হিসেবে কাজ করতে হতো। [9]।
এই সকল কাজ শেষ করিবার পর সুলতান আলাউদ্দিন জ্ঞানীদের নিকট এমন একটি পথ বা নিয়ম জানিতে চাহিলেন, যদ্বারা হিন্দুদিগকে শায়েস্তা করা যায়। যে ধনসম্পদ বিদ্রোহের কারণ হইয়া থাকে, উহার বিন্দু মাত্রও যেন তাহাদের নিকট না থাকে এবং ক্ষত্রিয় ও শূদ্র উভয়ের নিকট হইতে সমানভাবে যেন খেরাজ আদায় করা হয়। অবশ্য এই ব্যাপারে যাহাতে সক্ষম ও অক্ষমের খেরাজ একপ্রকার না হয়, তৎপ্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে। শুধু হিন্দুদের নিকট যেন এই পরিমাণ মাল দৌলত না থাকে, যাহাতে তাহারা ভাল অস্ত্র কিনিয়া, পোশাক পরিয়া ও মনোমত ভোগ সম্ভোগ করিয়া দিন কাটাইতে পারে। রাজ্যশাসনের অন্তর্গত এই বিশেষ ব্যাপারটির জন্য দুইটি কানুন তৈরী করিতে হইবে। প্রথমটি হইল যাহারা কৃষিকাজ করে, তাহাদের জমির শ্রেণী, পরিমাণ, দূরত্ব ও তারতম্যের হিসাবে তাহারা অর্ধেক খেরাজ দিতে বাধ্য থাকিবে। এই ব্যাপারে ‘খুতা’ (ক্ষত্রিয়) ও ‘বুলাহার’ (শূদ্র) একই প্রকার নিয়মের অধীন হইবে। তদুপরি ক্ষত্রিয়ের নিকট প্রাপ্য খেরাজের কোন অংশই মাফ করা হইবে না। দ্বিতীয়টি হইল যে সকল গরু, মহিষ ও বকরী দুধ দেয় ও মাঠে চরিয়া বেড়ায়, উহাদের জন্য নির্দিষ্ট চারণভূমি রাখিতে হইবে এবং যত্রতত্র উহাদের রাত্রিবাসের স্থান না করিয়া প্রকাশ্য ও নির্দিষ্ট স্থানে উহা করিতে হইবে। যাহাতে খেরাজ ধরিবার সময় উহাদিগকে একস্থানে পাওয়া যায় এবং কোনপ্রকার তারতম্যের সৃষ্টি না হয়। অবশ্য খেরাজের ব্যাপারে কাহাকেও রেহাই দেওয়া হইবে না।
এই ব্যাপারে যাহাতে যথাযথ কাজ করা হয়, তজ্জন্য সুলতান কর্মচারী, লেখক ‘মুসরিফ’ ও কারকুনদের মধ্যে যাহারা ঘুষ খাইত ও তহবিল তছরুপ করিত, তাহাদের সকলকে পদচ্যুত করিলেন এবং শরফ কাইকে এই দপ্তর পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন। শরফ কাই নায়েব উজির মুমালেকের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং জ্ঞানগুণ ও অভিজ্ঞতা দক্ষতায় তিনি সেই যুগে রাজ্যে প্রায় অতুলনীয় খ্যাতির অধিকারী ছিলেন। তিনি মনোযোগের সহিত কয়েক বৎসর এই দায়িত্ব পালন করেন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন। শহরের আশেপাশের সমস্ত গ্রামাঞ্চল, দোয়াব অঞ্চল, বায়ানা হইতে ঝাবুন, পালাম হইতে দেবপালপুর ও লাহোর, সামানা ও সানামের সমুদয় অঞ্চল, রেউড়ী হইতে নাওর, কোড়া হইতে কানুদী, আবরুহা, আফগানপুর ও কাবেরের গ্রামগুলি ধরিয়া বাদাউন, ঝরক ও কুয়েলা পর্যন্ত এবং কাথিয়াড়ের সমুদয় অঞ্চলকে খেরাজের হিসাব অনুসারে ভাগ করিলেন। সমুদয় অঞ্চলকে দূরত্ব, পরিমাণ, কৃষি ও চারণ ভূমির মানানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইলেন। এই হিসাব মত খেরাজ আদায়ের ব্যাপারটি এতই মজবুত হইল যে, চৌধুরী, খুতা ও মুকদিমদের মধ্যে ঘোড়ায় চড়া, তলোয়ার হাতে লওয়া, ভাল কাপড় পরা, পান খাওয়া প্রভৃতি আয়েশের কাজ একবারে বন্ধ হইয়া গেল। ইহার লজে তাহাদের মাথা চাড়া দিয়া উঠিবার অভ্যাসও দূর হইল। খেরাজ আদায়ের ব্যাপারে ইহারা সকলে একই আদেশের অধীন ছিল। ইহাদের আনুগত্য এমন চরম আকার ধারণ করিল যে, গ্রাম-গঞ্জের একজন খেরাজ আদায়কারী বিশ জন চৌধুরী, খুতা ও মুকদিমকে একত্রে বাঁধিয়া খেরাজের জন্য মারপিট করিত; অন্যান্য হিন্দুরা ইহা দেখিয়াও উচ্চবাচ্য করিত না। বস্তুতঃ হিন্দুদের ঘরে এমন কোন সোনা চান্দি ও তঙ্কা শীতল অবশিষ্ট ছিল না, যাহার বলে তাহারা মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে। এই প্রকার অসহায় অবস্থার ফলে হিন্দুদের জনবাচ্চারা মুসলমানদের ঘরে চাকুরী করিয়া দিন যাপন করিতে বাধ্য হইয়াছিল।
নায়েব উজির শরফ কাই খেরাজ আদায়কারী কর্মচারীদের ব্যাপারেও যথেষ্ট কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহার ফলে জরিমানা ও জবরদস্তি করিয়া যে সকল মুসরিফ, আমলা, দপ্তরী উদাদার, গোমস্তা ও তহশিলদার ধন সম্পদ আদায় করিত, তাহারা উহার একটি শীতলও তছরুপ করিতে পারিত না। পাটোয়ারীরা হিসাব মত তাহাদের নিকট হইতে এক এক শীতল আদায় করিত এবং তজ্জন্য প্রয়োজন মত লাঠি, জিঞ্জির ও কয়েদের সাহায্য লইতেও তাহারা কসুর করিত না। অথচ এই ব্যাপারে হিন্দু বা মুসলমান কাহারও নিকট হইতে কোন প্রকার ঘুষ লওয়া একেবারেই সম্ভব ছিল না। অনেক সময় হাজার বা পাঁচশত তঙ্কার জন্য এই সকল আমলা, মুসরিফ ও উদাদার বৎসরের পর বৎসর কয়েদ থাকিত। এই ব্যাপার তাহাদের উপর জবর দস্তিও করা হইত। ফলে আমলা, উদাদার ও মুসরিফের চাকুরী মানুষের নিকট শত্রুর তোপের ন্যায় ভীতির বিষয় হইয়া দাঁড়াইল এবং হিসাব লেখার কাজ শিক্ষিত লোকদের জন্য দোষ হিসাবে গণ্য হইতে লাগিল। এই কারণে হিসাব লেখকদের নিকট কেহ মেয়ে বিবাহ দিতে চাহিত না আর মুসরিফের কাজ কেহ গ্রহণ করিলে সকলেই তাহার ব্যাপারে নিরাশ হইয়া পড়িত। কারণ মুসরিফ ও আমলারা অহরহ কয়েদ হইয়া লাথি গুঁতা খাইত এবং কয়েদখানায় বাস করিত।
সুলতান আলাউদ্দিন লেখাপড়া জানিতেন না এবং জ্ঞানী ও আলেমদের সহিত মেলামেশা করিবার অভ্যাসও তাঁহার ছিল না। তখতে বসিবার পর তাঁহার ধারণা জন্মিল যে, লেখাপড়া ও শরীয়তের ব্যাপার এবং বাদশাহী সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। বাদশাহী বাদশাহের কাজ এবং শরীয়ত মুফতী ও কাজীদের কাজ। এইজন্য রাজ্যশাসনের ব্যাপারে যে বিষয় তাঁহার নিকট রাজ্যের নিমিত্ত মঙ্গলজনক ও যোগ্য বলিয়া মনে হইত, তাহা শরীয়ত অনুযায়ী ভাল হউক বা না হউক, তিনি তাহা করিতে দ্বিধা করিতেন না। এই ব্যাপারে আলেমদের পরামর্শ লওয়াও তিনি দরকারী বলিয়া ভাবিতেন না। জ্ঞানীগুণীরাও তাঁহার দরবারে খুব কম যাওয়া আসা করিতেন। কাজী জিয়া উদ্দিন বায়ানা, মওলানা জহির উদ্দিন লজ ও মওলানা মুশিদ কহরামী সুলতানের দরবারে প্রায় প্রায়শঃ যাইতেন। কাজী মুগিস উদ্দিন বয়ানাও সুলতানের দরবারে যাইতেন এবং আমীর উমরাহদের মধ্যে আসন গ্রহণ করিতেন।
একদিন কাজী মুগিস দরবারে আসিয়াছেন; ইহা সেই সময়ের কথা, যখন খেরাজের আতিশয্য ও জরিমানার কড়াকড়ি চরমে পৌঁছিয়াছিল। সুলতান তাঁহাকে বলিলেন, আপনার নিকট আমি কয়েকটি মসলা জিজ্ঞাসা করিব, ইহার উত্তরে আপনি যাহা সত্য বলিয়া জানেন, তাহাই আমাকে বলিবেন। ইহা শুনিয়া কাজী মুগিস সুলতানকে বলিলেন, মনে হয়, আমার মৃত্যু ঘনাইয়া আসিয়াছে। সুলতান বলিলেন, আপনার মৃত্যু নিকটবর্তী হইয়াছে, তাহা জানিলেন কী করিয়া। কাজী মুগিস বলিলেন, খুব সম্ভব জাঁহাপনা আমাকে শরাশরিয়তের বিষয় জিজ্ঞাসা করিবেন এবং আমি যাহা সত্য বলিয়া জানি, তাহাই বলিব। ইহার ফলে জাঁহাপনা, খুব সম্ভব, রাগান্বিত হইয়া আমাকে হত্যা করিবেন। সুলতান বলিলেন, না সে ভয় নাই; আমি আপনাকে হত্যা করিব না। সুতরাং আপনি যাহা সত্য বলিয়া জানেন, তাহাই আমার সম্মুখে পেশ করিতে পারেন। কাজী মুগিস বলিলেন, জাঁহাপনা যেমন বলিলেন, যদি তাহা হয়, তবে আমি প্রশ্ন অনুসারে কিতাবে যাহা পাইয়াছি, সেইমত উত্তর দিতে চেষ্টা করিব।
সুলতান কাজী মুগিসকে প্রথম যে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইল এই যে, হিন্দুদের নিকট হইতে খেরাজ লওয়ার ব্যাপারে শরিয়তে কীরূপ নির্দেশ আছে এবং তাহারা কীভাবে এই খেরাজ আদায় করিবে? কাজী বলিলেন, শরিয়তে আছে, যখন দেওয়ানের তহশিলদার তাহাদের নিকট খেরাজ চাহিবে তৎক্ষণাৎ তাহারা বিনা দ্বিধায় অত্যন্ত তা’জিমের সহিত তাহা আদায় করিবে। যদি কোন কারণে তহশিলদার তাহাদের মুখে থুথুও দেয়, তবে তাহা প্রাপ্য বলিয়া গ্রহণ করিবে এবং আরও বেশি করিয়া তহশিলদারের খেদমত করিতে থাকিবে। এই প্রকার তা’জিম তোয়াজ ও থুথু গিলিয়া ফেলিবার তাৎপর্য এই যে, জিম্মীরা সর্বদাই অসম্মানের মধ্যে থাকিবে। কারণ ইহার মধ্য দিয়া সত্য ধর্ম ইসলামের সম্মান ও মিথ্যা ধর্মের অসম্মান প্রতিষ্ঠা লাভ করিবে। আল্লাহ্ তা’লা ইহাদিগকে হেয় করিয়া রাখিবার জন্য বলিয়াছেন, ‘তোমরা এমনভাবে তাহাদের হাত হইতে গ্রহণ কর, যাহাতে তাহারা হেন হইয়া থাকে।’ বিশেষ করিয়া হিন্দুদিগকে অসম্মানকর অবস্থার মধ্যে রাখা ধার্মিকতার অংশ বলিয়া গণ্য। কারণ ইহারা হজরত মুহাম্মদ মোস্তফার ধর্মের সর্বাপেক্ষা মারাত্মক শত্রু। এই জন্য হযরত ইহাদিগকে হত্যা করা, ইহাদের ধনসম্পদ লুট করা এবং ইহাদিগকে দাসদাসী হিসাবে গ্রহণ করিবার আদেশ দিয়াছেন। আমরা যে ইমামের মজহাব মানিয়া চলি, সেই ইমাম আজম আবু হানিফাই শুধু ইহাদিগকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা অথবা ইহাদিগকে মারিয়া কাটিয়া ধনসম্পদ লুট করিয়া দাসদাসী হিসাবে গ্রহণ করিবার কথা বলিয়াছেন। অন্যান্য ইমাম ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা ইহাদের জন্য দুইটি পন্থা নির্দেশ করিয়াছেন—হয় ইহারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিবে; নতুবা ইহাদিগকে হত্যা করিতে হইবে।
কাজী মুগিসের উত্তর শুনিয়া সুলতান আলাউদ্দিন বলিলেন, আপনি যে সকল কথা বলিয়াছেন, উহার একটিও আমি জানিতাম না। কিন্তু অন্যদিকে আমার নিকট অনেক সংবাদই পৌঁছিয়াছিল। আমি শুনিতে পাইয়াছিলাম যে, খুতা ও মুকদিমরা খুব সুন্দর ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়ায়, সাফসুুতরা কাপড় পরে, ফারসী ধনুকে তীর চালায়, পরস্পর যুদ্ধ করে, শিকারে যায়; এই সমুদয় কার্যই করে, কিন্তু তাহাদের নিকট প্রাপ্য খেরাজ ও জিজিয়া আদায় করিতে চাহে না। গ্রামাঞ্চল হইতে তাহারা তাহাদের খুওতীর ভাগ আলাদাভাবে উসুল করে, ইহা দ্বারা শরাবের জলসা বসায় এবং আমোদ স্ফূর্তি করে। দেওয়ান হইতে তলব হউক বা না হউক, তাহারা উহার ছায়া মাড়াইতে চাহে না এবং তহশিলদারদিগকে উপেক্ষা করিয়া থাকে। এই সকল সংবাদ শুনিয়া আমার খুব রাগ হইল। মনে মনে বলিলাম, আক্ষেপ, আমি আরও রাজ্য জয় করিয়া আমার সীমা বাড়াইতে চাহিতেছি; অথচ আমার অধীনে যে সকল দেশ আছে, উহারাই আমার অনুগত নহে! এমন অবস্থায় আমি আরও রাজ্য জয় করিয়া কী করিব! সুতরাং প্রথমে এমন কোন উপায় অবলম্বন করা দরকার, যাহাতে রায়তরা আমার যথার্থ অনুগত ও বাধ্য হয় এবং তাহা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে, যেন আমার আদেশ মাত্র তাহারা ইঁদুরের গর্তে প্রবেশ করিতেও দ্বিধা না করে। এখন আপনার মুখে শুনিলাম যে, হিন্দুদিগকে এমনভাবে একান্ত বাধ্য ও অনুগত করিয়া রাখাই শরিয়তের হুকুম।
ইহার পর সুলতান আলাউদ্দিন বলিলেন, মওলানা মুগিস, আপনি জ্ঞানী ব্যক্তি হইলেও আপনার অভিজ্ঞতা অল্প। আমি লেখাপড়া না জানিলেও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়াছি। ইহাতে বুঝিতে পারিয়াছি যে, যতদিন হিন্দুরা নিঃস্ব ও অসহায় না হইবে, ততদিন তাহারা মুসলমানদের আনুগত্য স্বীকার করিতে রাজী হইবে না। এইজন্য আমি হুকুম দিয়াছি যে, ইহাদের নিকট এই পরিমাণ জমি ও সম্পদ রাখা উচিত, যাহাতে কৃষি কাজ করিয়া কোন প্রকারে বৎসরের আয়ের দ্বারা বৎসর চালাইতে পারে; কোন প্রকার বাড়তি সঞ্চয় যেন ইহাদের ভাগ্যে না জুটে।




২. আওরঙ্গজেবের শাসনামলে জিজিয়ার পুনঃপ্রবর্তন ও গণ-অসন্তোষ
মুঘল সম্রাট আকবর জিজিয়া রহিত করলেও, ১৬৭৯ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব তা পুনরায় প্রবর্তন করেন। এটি ছিল ভারতীয় প্রজাদের ওপর এক চরম অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত। অনেক ক্ষেত্রে জিজিয়ার পরিমাণ ছিল একজন দরিদ্র চাষীর বার্ষিক আয়ের একটি বিশাল অংশ, যা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। ঐতিহাসিক খাফি খান বর্ণনা করেছেন যে, জিজিয়া পুনঃপ্রবর্তনের পর দিল্লির অগণিত হিন্দু প্রজা লাল কেল্লার সামনে সমবেত হয়ে এই অমানবিক কর বাতিলের জন্য ফরিয়াদ জানিয়েছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেব তাদের আর্তনাদে কান না দিয়ে বরং জমায়েত হওয়া নিরস্ত্র প্রজাদের ওপর হাতি চালিয়ে তাদের পিষে মারার নির্দেশ দেন। [10]।
৩. জিজিয়া সংগ্রহের অবমাননাকর পদ্ধতি
ঐতিহাসিক দলিলগুলোতে জিজিয়া আদায়ের যে প্রক্রিয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়, তা সভ্য সমাজের যেকোনো মানদণ্ডে চরম অমানবিক। জিজিয়া আদায়ের সময় প্রজাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা ছিল অনেক শাসকের কাছে একটি ধর্মীয় কর্তব্য। ফিকহ-ই-ফিরোজ শাহী এবং বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে জিজিয়া সংগ্রহের যে নির্দেশনাবলী দেখা যায়, তা ছিল নিম্নরূপ:
- শারীরিক লাঞ্ছনা: করদাতা যখন জিজিয়া দিতে আসত, তখন জিজিয়া সংগ্রহকারী কর্মকর্তা তাকে চপেটাঘাত করত বা তার দাড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান দিত।
- হিনতা প্রদর্শন: কর আদায়ের সময় মুসলিম কর্মকর্তা উচ্চাসনে বসে থাকতেন এবং অমুসলিম প্রজাকে ধুলোয় বা নিচে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।
- পরিচয়ের চিহ্ন: অনেক সময় জিজিয়া দেওয়া প্রজাদের গলায় বিশেষ চিহ্ন বা সিল লাগিয়ে দেওয়া হতো যাতে রাস্তাঘাটে তাদের সহজেই ‘জিম্মি’ হিসেবে চেনা যায় এবং অপদস্ত করা যায়।
এই চরম লাঞ্ছনা ও অর্থনৈতিক চাপের মূল লক্ষ্যই ছিল অমুসলিমদের আত্মসম্মানবোধ ধ্বংস করে দেওয়া। জিজিয়ার এই অমানবিক চাপের মুখে পড়ে অনেক উচ্চবংশীয় হিন্দু পরিবারও দারিদ্র্যের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল এবং অনেকে কেবল এই নরকযন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মূলত, জিজিয়া ছিল ভারতীয় ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়, যা কয়েক শতাব্দী ধরে একটি বিশাল জনপদকে হীনম্মন্যতা ও চরম অভাবের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
আশরাফুল হিদায়াঃ ইসলামী ফিকহ
জিযিয়া কাকে বলে, এর অর্থ এবং উদ্দেশ্য আসুন আমরা পড়ে দেখি হানাফি ফিকাহ শাস্ত্রের গ্রন্থ আশরাফুল হিদায়া থেকে [11]
অনুবাদ: আরেক প্রকার জিজিয়া হলো কাফেরদের উপর বিজয় লাভ করা এবং তাদেরকে তাদের সহায় সম্পদের উপর বহাল রাখার পর শাসক নিজেই শুরুতে যা নির্ধারণ করেন। সেক্ষেত্রে মালদার ব্যক্তির উপর প্রতি বছর আটচল্লিশ দিরহাম নির্ধারণ করবেন এবং প্রতিমাসে চার দিরহাম হারে উশুল করবেন। আর মধ্যবিত্ত ব্যক্তির উপর চল্লিশ দিরহাম জিষিয়া নির্ধারণ করবেন এবং প্রতি মাসে দুই দিরহাম হারে উসুল করবেন। আর শ্রমে নিযুক্ত ব্যক্তির উপর বার দিরহাম ধার্য করবেন এবং মাস প্রতি এক দিরহাম উসুল করবেন। এটা আমাদের অভিমত।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
দ্বিতীয় প্রকার জিজিয়া হলো, যা মুসলিম বিজিত কাফেরদের উপর অনুগ্রহ পূর্বক ধার্য করে দেন। অর্থাৎ মুসলমান বাহিনী যখন কাফেরদের উপর শক্তি-বলে জয় লাভ করে, তখন শাসকের এখতিয়ার থাকে। সে ইচ্ছা করলে তাদেরকে হত্যা করতে পারে। ইচ্ছা করলে তাদেরকে দাস বানাতে পারে। ইচ্ছা করলে তাদেরকে তাদের সহায় সম্পদের উপর বহাল রেখে তাদের উপর জিজিয়া ধার্য করে দিতে পারে।
অতএব, মুসলিম শাসক যদি বিজিত কাফেরদেকে হত্যা না করে এবং দাস না বানিয়ে অনুগ্রহ পূর্বক তাদের মালিকানায় বহাল রাখেন, তাহলে তাদের উপর একটি জিজিয়া আরোপ করে দিবেন। এই জিজিয়ার পরিমাণ নির্ধারিত হবে কাফেরদের অর্থনৈতিক অবস্থার তারতম্যের ভিত্তিতে। তাদেরকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হবে- ১. বিত্তবান শ্রেণি ২. মধ্যবিত্ত শ্রেণি ৩. দরিদ্র শ্রেণি।
যারা দশ হাজার দিরহাম বা তার চেয়ে বেশি অর্থের মালিক হয়, তাদেরকে বিত্তবান শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তাদের জিজিয়ার পরিমাণ হবে বাৎসরিক আটচল্লিশ দিরহাম। বোঝা হালকা করার উদ্দেশ্যে প্রতিমাসে চার দিরহাম করে উসুল করা হবে। যারা দুইশত দিরহাম থেকে দশ হাজার দিরহামের কম সম্পদের মালিক হয় তাদেরকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাদের জিজিয়ার পরিমাণ হবে বাৎসরিক চব্বিশ দিরহাম বোঝা হালকা করণার্থে প্রতিমাসে দুই দিরহাম করে উসুল করা হবে।
যারা দুইশত দিরহামের কম অর্থের মালিক বা যাদের কাছে কোনো সম্পদ সঞ্চিত নেই কিন্তু কর্মক্ষম, তারা হবে দরিদ্র শ্রেণি। তাদের জিজিয়ার পরিমাণ হবে বৎসরে বারো দিরহাম। প্রতিমাসে উসুল করা হবে এক দিরহাম এ হলো জিজিয়ার হার, আহনাফের মতানুসারে।
কোনো কাফেরের উপর জিযিয়া আরোপিত হওয়ার জন্য শর্ত হলো লোকটি বা কর্মক্ষম হতে হবে। যুদ্ধ করার উপযুক্ত হতে হবে। অতএব, হাত পা অসার এমন ব্যক্তির উপর এবং লেংড়া ব্যক্তির উপর জিজিয়া আরোপ করা হবে না।
অনুরূপভাবে যদি কোনো কাফের পূর্ণ একবছর অসুস্থ থাকে কিংবা বছরের অধিকাংশ সময় অসুস্থ থাকে কিংবা অর্ধেক বছর অসুস্থ থাকে, তাহলে তার উপরও জিজিয়া আরোপ করা হবে না।
কোনো কাফের যদি কাজ করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বে কাজ না করে বেকার বসে থাকে, তাহলে তার জিজিয়া মওকুফ হবে না; বরং সে কর্মক্ষম হওয়ার কারণে তার উপর জিজিয়া ওয়াজিব হবে। ফকীহ আবু জাফর (র.) বলেছেন, ধনী মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র হওয়ার বিষয়টি পরিবেশ নির্ভর। কেননা বলখ শহরে কোনো ব্যক্তি পঞ্চাশ হাজার দিরহামের মালিক হলে তাকে ধনী মনে করা হয়। অথচ বাগদাদে সে ব্যক্তিকে ধনী মনে করা হয় না। অতএব, প্রত্যেক দেশের পরিবেশের দিকে লক্ষ্য রেখে ধনী, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নির্ণয় করা কর্তব্য। কেউ কেউ বলেছেন, যে ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপনের সামর্থা রাখে না সে দরিদ্র। যে ব্যক্তি নিজের ও নিজ পরিবার-পরিজনের ব্যয়ভার বহন করতে সক্ষম সে মধ্যবিত্ত যে ব্যক্তি নিজের ও পরিবারের খরচের তুলনায় বেশি অর্থের মালিক, সে ধনী বা বিত্তবান।
ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, জিজিয়ার পরিমাণ হলো একদিনার সমপরিমাণ সম্পদ। এতে ধনী-গরিব সমান।
দলিল পর্ব: ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর প্রথম দলিল হলো হযরত মু’আয (রা.)-কে সম্বোধন করে রাসূল-এর উক্তি:
خُذْ مِنْ كُلِّ خالم وحالِمَةٍ دِينَارًا أَوْ عِدْلَهُ مَغافر
অর্থাৎ (হে মু’আয) প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী থেকে এক দিনার বা তার সমপরিমাণ মাআফেরী চাদর উসুল করো। হাদীসটি ইমাম তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।
ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, উক্ত হাদীসে নবী করীম হযরত মু’আযকে আদেশ করেছেন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের কাছ থেকে এক দিনার করে জিজিয়া উসুল করতে। ধনী-গরিবের মাঝে কোনোরূপ পার্থক্য করা হয়নি। অতএব, এটাই হবে জিজিয়ার বিধান।
ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দ্বিতীয় দলিল হলো, জিজিয়া ওয়াজিব হয় হত্যার পরিবর্তে। অর্থাৎ জিজিয়া প্রদানের কারণে জিম্মি ব্যক্তি মুসলমানের হাতে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। এ কারণে যেসব কাফের হত্যা করা বৈধ নয়, তাদের উপর জিজিয়া আরোপ করা যায় না। যেমন- কাফের শিশু এবং কাফের মহিলা। এরা কাফের হওয়া সত্ত্বেও এদেরকে হত্যা করা যায় না। ফলে এদের উপর জিজিয়াও আরোপ করা হয় না। এর দ্বারা বুঝা যায়, জিজিয়া হলো হত্যার বদলা স্বরূপ। অতএব, হত্যার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু ধনী-গরিব সমান, সেহেতু জিজিয়ার মধ্যে ধনী-গরিব সমান হবে।
আহনাফের দলিল: আহনাফের প্রথম দলিল হলো, সাহাবীগণের ইজমা। কেননা আহনাফ যে মত অবলম্বন করেছেন, তা হযরত ওমর, ওসমান ও আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে। এ সম্পর্কিত হাদীসটি ইবনে আবী শায়বাহ তার মুসান্নাফে উল্লেখ করেছেন। যার সনদ ও মতন নিম্নরূপ:
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مَسهَرٍ عَنِ الشَّيْبَانِي عَنْ أَبِي عَوْنٍ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الثَّقَفِى قَالَ وَضَعَ عُمَرُ بْنُ الخَطَّابِ رَضِ فِي الجِزْيَةِ عَلَى رُؤُوسِ الرِّجَالِ عَلَى الغَنِي ثَمَانِيَةً و أَرْبَعِيْنَ دِرْهَمًا وعَلَى المُتَوَسُطِ أَرْبَعَةً وَعِشْرِينَ وَعَلَى الفَقِيْرِ إِثْنَا عَشَرَ دِرْهَمًا –
অর্থাৎ হযরত ওমর (রা.) জিজিয়া ধার্য করেছেন পুরুষদের উপর, ধনীর উপর আটচল্লিশ দিরহাম। মধ্যবিত্তের উপর চব্বিশ দিরহাম, আর দরিদ্রের উপর বারো দিরহাম।
হযরত ওমর (রা.)-এর এ আমলটি ছিল আনসার মুহাজির সকল সাহাবীদের সম্মুখে। কিন্তু কেউ কোনো আপত্তি করেননি। হযরত ওমর (রা.)-এর পরে হযরত ওসমান (রা.)ও এ নীতির উপর আমল করেছেন। হযরত ওসমান (রা.)-এর পর এভাবে উক্ত মতের উপর সাহাবীদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর সাহাবীদের ইজমা نص قطعی -এর সমকক্ষ। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীসের অকাট্য উক্তির সমান।
আহনাফের দ্বিতীয় দলিল হলো, জিজিয়া ওয়াজিব হয় মুসলমানদেরকে যুদ্ধের সময় জানমাল দিয়ে সাহায্য করার পরিবর্তে, অর্থাৎ কাফেরদের উপর ওয়াজিব ছিল মুসলমানদের সাথে জান মাল নিয়ে যুদ্ধে শরিক হওয়া। কিন্তু তা তারা করে না, এর পরিবর্তে তাদের উপর জিজিয়া ওয়াজিব হয়। আর জানমাল দিয়ে যুদ্ধের সময় সাহায্য করার বিষয়টি আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে তারতম্য হয়ে থাকে। অতএব, এবিষয়ের বিকল্প বিষয় যা অর্থাৎ জিজিয়া, তাও সামর্থ্যের তার তম্যের কারণে তারতম্য হবে। অর্থাৎ তারা যদি জিহাদের সময় মুসলমানদেরকে জান মাল দিয়ে সাহায্য করত, তাহলে তারা অবশ্যই সকলে একরকম সাহায্য করতে পারত না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাধ্য অনুয়ায়ী সাহায্য করত। কেউ কম কেউ বেশি। অতএব, এ সাহায্যের বদলায় যে জিজিয়া ওয়াজিব হবে তাও তাদের সাধ্যের তারতম্যের ভিত্তিতে তারতম্য হবে। বিত্তবান লোকের জিযিয়া হবে সবচেয়ে বেশি। মধ্য বিত্তদের হবে মধ্যম পর্যায়ে। দরিদ্র লোকদের জিজিয়া হবে সবচেয়ে কম।
ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলিলের জবাব: ইমাম শাফেয়ী (র.) যে হাদীসটি দলিল হিসাবে পেশ করেছেন, তা আলোচ্য জিজিয়া তথা দ্বিতীয় প্রকার জিজিয়া সম্পর্কিত নয়; বরং হাদীসটি জিজিয়ার প্রথম প্রকার সম্পর্কিত। অর্থাৎ হাদীসে যে বলা হয়েছে, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী হতে এক দিনার জিজিয়া উসুল কর। তা ছিল সুলাহ বা সমঝোতার ভিত্তিতে ধার্যকৃত জিজিয়া অর্থাৎ জিজিয়ার প্রথম প্রকার। এর প্রমাণ হলো, উক্ত জিজিয়া প্রথম প্রকার তথা সমঝোতার ভিত্তিতে না হলে, নারীর কাছ থেকে জিজিয়া নেওয়া হতো না। যখন নারীর কাছ থেকেও এক দিনার নিতে বলা হলো, তখন বুঝা গেল এটি জিজিয়ার দ্বিতীয় প্রকার নয়; বরং জিজিয়ার প্রথম প্রকার। অতএব, হাদীস দ্বারা জিজিয়ার দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে দলিল পেশ করা যাবে না।
অনুবাদ: ইমাম কুদূরী (র.) বলেন, এবং অনারবী মূর্তিপূজকদের উপর জিজিয়া ধার্য করা হবে। এ ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর ভিন্নমত রয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহর আদেশ وقائِلُوهُمْ )তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর)-এর কারণে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা অবশ্যকর্তব্য। তবে কিতাবীদের ক্ষেত্রে লড়াই পরিহার করার বৈধতা আমরা বিতাবুল্লার দ্বারা জেনেছি। আর মাজুসীদের ক্ষেত্রে হাদীস দ্বারা জেনেছি। সুতরাং অন্যদের ক্ষেত্রে বিধানটি মূল অবস্থায় বহাল থাকবে।
আমাদের দলিল হলো, যেহেতু তাদেরকে দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা বৈধ হবে, সেহেতু তাদের উপর জিযিয়া আরোপ করাও বৈধ হবে। কেননা উভয়ের প্রতিটি দেহসত্তার স্বত্ব হরণ করার অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে এভাবে যে, সে উপার্জন করে মুসলমানদেরকে প্রদান করে অথচ তার ভরণপোষণ নিজের উপার্জনের উপর।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
আরবের মুশরিকদের উপর জিজিয়া আরোপ করা হয় না। তারা হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা তাদেরকে হত্যা করা হবে। অনারবী মুশরিকদের উপর জিজিয়া আরোপ করা যাবে কিনা, এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আহনাফের মতে অনারবী মুশরিকদের উপর জিজিয়া আরোপ করা হবে। ইমাম শাফেয়ী (রা.)-এর মত হলো, অনারবী মুশরিকদের উপরও জিযিয়া আরোপ করা যাবে না। তারা হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা তাদেরকে হত্যা করা হবে। এক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলিল হলো, আল্লাহ তা’আলা আদেশ করেছেন তোমরা তাদের (বিধর্মীদের) সাথে লড়াই কর। এ “নির্দেশ সকল বিধর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করে। পরে আমরা কুরআনের আয়াত দ্বারা জানতে পেরেছি আহলে কিতাবীদের উপর জিজিয়া আরোপ করা যায় এবং তাদেরকে নিজেদের ধর্মের উপর থাকতে দেওয়া যায়। তদ্রূপ হাদীস দ্বারা জানতে পেরেছি মাজুসীদের উপরও জিজিয়া আরোপ করে তাদেরকে তাদের ধর্মের উপর থাকতে দেওয়া যায়। অতএব, যুদ্ধ করার বিধান থেকে আহলে কিতাব ও মাজুসীরা আওতামুক্ত হবে। এছাড়া অন্য সব বিধর্মী ; (তাদের সাথে যুদ্ধ কর) এ বিধানের আওতাভুক্ত থাকবে। অতএব, অনারবী মুশরিককরা যেহেতু আহলে কিতাব বা মাজুসী নয়, সেহেতু তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। তাদের উপর জিজিয়া আরোপ করে, নিজ ধর্মের উপর থাকতে দেওয়া যাবে না।
আহনাফের দলিল হলো, ‘অনারবী মুশরিকদের গোলাম বানানো সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ আছে। তাই তাদের উপর জিজিয়া আরোপ করাও জায়েজ হবে। কারণ গোলাম বানানো এবং জিজিয়া আরোপ একই ধরনের বিষয়। কেননা গোলাম বানানোর মাধ্যমে যেমন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব হরণ করা হয়, তেমনি জিজিয়া আরোপের দ্বারাও ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব হরণ করা হয়। গোলাম বানানোর দ্বারা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব হরণ করা হয়। এভাবে যে, গোলাম যা উপার্জন করে তার মালিক সে হতে পারে না: ববং তার উপার্জনের মালিক হয় তার মনিব। এ হিসাবে গোলাম হয়ে যায় পশুর মতো। তার কোনো ব্যক্তিত্ব থাকে না। তেমনি জিযিয়া আরোপ করা হলেও ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব হারায়। তা এভাবে যে, জিযিয়া আরোপকৃত ব্যক্তির উপার্জিত অর্থ মুসলমানদেরকে দিয়ে দিতে হয়। সাথে সাথে তার নিজের ভরণপোষণও থাকে তার নিজ দােিয়ত্ব। এ হিসাবে জিষিয়া আরোপিত বাক্তি আর গোলাম ব্যক্তি এক সমান। অতএব, কাউকে গোলাম বানানো এবং কারো উপর জিজিয়া আরোপ করা একই কথা। সুতরাং অনারবী মুশরিককে যদি গোলাম বানানো বৈধ হয়, তাহলে তার উপর জিজিয়া আরোপ করাও বৈধ হবে আর গোলাম বানানো তো সর্ব সম্মতিক্রমে বৈধ, তাই জিজিয়া আরোপ করাও বৈধ। এটাই আহনাফের মাযহাব
অনুবাদ: যদি জিজিয়া নির্ধারণের পূর্বেই তাদের উপর বিজয় অর্জন হয়, তাহলে তারা, তাদের স্ত্রীরা, তাদের সন্তানরা মালে গনিমত হবে। কেননা তাদেরকে গোলাম বানানো বৈধ আছে।
আরবের মূর্তিপূজকদের উপর এবং (আরব-অনারব) মুরতাদদের উপর জিজিয়া নির্ধারণ করা হবে না। কেননা তাদের কুফরি গুরুতর। আরবের মুশরিকদের ক্ষেত্রে কারণ এই যে, নবী করীম ও তাদের মাঝেই আবির্ভূত হয়েছেন এবং কুরআন তাদের ভাষায় নাজিল হয়েছে। সুতরাং মু’জিয়া তাদের ক্ষেত্রে অধিক প্রকাশিত। আর মুরতাদের ক্ষেত্রে কারণ এই যে, সে তার প্রতিপালকের সাথে কুফরি করেছে তাকে ইসলামের দিকে পথপ্রদর্শন করার পর এবং ইসলামের যাবতীয় সৌন্দর্য অবগত করার পর সুতরাং অধিক শাস্তি হিসাবে উভয় দল থেকে ইসলাম কিংবা তলোয়ার ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করা হবে না
ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে আরব মুশরিকদের দাস বানানো যাবে এর জবাব তা-ই, যা আমরা পূর্বে বলেছি।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
আহলে কিতাব, মাজুসী এবং অনারবী মুশরিকদের উপর যদি জিজিয়া আরোপ করার পূর্বে মুসলমানদের বিজয় লাভ হয়ে যায়, তাহলে তাদের পুরুষ, নারী, শিশু সবই গনিমতের মালে পরিণত হবে তখন ইমামের এখতিয়ার থাকবে ইচ্ছা করলে তিনি তাদেরকে দাস-দাসী বানাতে পারবেন। আবার ইচ্ছা করলে তাদের উপর জিজিয়াও আরোপ করতে পারবেন
: قوله ولا تُوضع على عبدة الأوثان من العرب الخ নিজ ধর্মের উপর পাকতে দেওয়া হবে না। তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো এই তারা হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবে, অন্যথায় তাদেরকে হত্যা করা হবে এ সিদ্ধান্তের কারণ হলো, তাদের অপরাধ গুরুতর কেননা মুরতাদদেরকে ইসলামের দিকে আল্লাহ তা’আলা একবার পথ দেখিয়েছেন। তারা ইসলামে প্রবেশ করে ইসলামের সকল সৌন্দর্য বা ভালো দিকসমূহ প্রত্যক্ষ করেছে তারপরও সে ইসলাম ত্যাগ করেছে। নিজ প্রভুর সাথে কুফরি করেছে তাই তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে
অনুরূপভাবে আরব মুশরিকদের অপরাধও গুরুতর। কারণ স্বয়ং রাসূলুল্লাহও তাদের মাঝে প্রেরিত হয়েছেন তিনি তাদের সমাজে বসবাস করেই বড় হয়েছেন। ঐশীগ্রন্থ কুরআনে কারীমও তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। তারা রাসূল এর মু’জিযা সমূহের প্রত্যক্ষদর্শী। তাই তাদের কর্তব্য ছিল সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ করা। নবী করীম কে সর্বাধিক সাহায্য সহযোগিতা করা। কিন্তু তারা করেছে বিপরীত। অতএব, তাদের শান্তি কঠোর হবে। তারা হয়তো ইসলাম গ্রহণ করবে নতুবা তাদেরকে হত্যা করা হবে। জিযিয়া আরোপ করে তাদেরকে নিজ মতবাদের উপর থাকতে দেওয়া হবে না। অবশ্য আরব মুশরিকদের ব্যাপারে ইমামগণের মতানৈক্য বয়েছে ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, আরব মুশরিকদেরকে গোলাম বানানো জায়েজ আছে। ইমাম মালেক ও আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) এ কথাই বলেন। তাদেব যুক্তি হলো, গোলাম বানানো আর হত্যা করা একই কথা। কেননা হত্যা করলে প্রকৃত অর্থে ধ্বংস করা হয়, আর গোলাম বানালে গুণগতভাবে ধ্বংস করা হয়। অতএব, যেমন হত্যা করা জায়েজ, তেমনি গোলাম বানানোও জায়েজ। তাদের জবাবে আহনাফ সে কথাই বলেন যা ইতঃপূর্বে বলেছেন। অর্থাৎ তাদের অপরাধ গুরুতর। তাই তারা হয়তো অপরাধ ত্যাগ করবে তথা কুফরি ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করবে, অন্যাথায় তাদেরকে হত্যা করা হবে। দ্বিতীয় কোনো পথ তাদের জন্য খোলা নেই।
অনুবাদ: যদি তাদের উপর বিজয় অর্জিত হয়, তবে তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা মালে গনিমত হবে। কেননা, মুরতাদ হওয়ার অপরাধে হযরত আবূ বকর (রা.) বনী হানীফ গোত্রের স্ত্রীলোকদের এবং সন্তানদের দাস বানিয়েছিলেন এবং তাদেরকে মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছিলেন।
তাদের পুরুষদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে না, তাদেরকে হত্যা করা হবে। আমাদের উল্লেখকৃত কারণে: কোনো স্ত্রীলোক এবং কোনো শিশুর উপর জিজিয়া আরোপ করা হবে না। কেননা তা হত্যা কিংবা লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার বিকল্প হিসাবে ওয়াজিব হয়। আর এদেরকে হত্যাও করা যায় না এবং লড়াইয়েও নিযুক্ত করা যায় না। তাদের সে যোগ্যতা না থাকার কারণে।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
যদি আরব মুশরিক ও মুরতাদদের উপর মুজাহিদগণ বিজয় লাভ করতে পারে, তাহলে তাদের যুবক শ্রেণিকে হত্যা করা হবে এবং তাদের স্ত্রীলোক ও সন্তানদেরকে গনিমত হিসাবে মুজাহিদগণের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে। কেননা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.) বনী হানীফা গোত্রের মুরতাদদের স্ত্রী ও শিশুদেরকে মুজাহিদদের মাঝে ভাগ করে দিয়েছিলেন।
তাদের ঘটনা এই যে, বনী হানীফা গোত্রের এক ব্যক্তির নাম ছিল মুসাইলামাতুল কাযযাব। সে নবী করীম-এর উপর ঈমান এনেছিল। নবী করীম-এর মৃত্যুপূর্ব অসুস্থতাকালে সে ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করে নিজেকে নবী বলে দাবী করে। নবী করীম-এর মৃত্যুর পর হযরত আবূ বকর (রা.) হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদ (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবীদের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন তাদের সাথে লড়াই করার জন্য। তাদের লোকজন ছিল অনেক। ষাট হাজারেরও অধিক লোক সাহাবীদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ গ্রহণ করে। তুমুল যুদ্ধ হয়। সাহাবীদের মধ্য থেকে হযরত আবূ দুজানাহ আনসারী, হযরত নযর ইবনে আনাস ও অনেক আলেম সাহাবী (রা.) সে যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। শেষ পর্যন্ত মুসলমানরাই বিজয় লাভ করে। মুসাইলামা কাযযাবকে হত্যা করা হয়। তখন বনূ হানীফা গোত্রের লোকদেরকে আটক করা হয়। তখন হযরত আবূ বকর (রা.) তাদের স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদেরকে মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করে দেন। হযরত আলী (রা.)-এর ভাগেও একটি নারী এসেছিল। তার পেটে হযরত আলী (রা.) -এর পুত্র সন্তান জন্মে। যার নাম ছিল মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ।
قَوْلُهُ وَمَنْ لَمْ يُسْلِمُ مِنْ رِجَالِهِمْ قُتِلَ الحَ : মুরতাদ ও আরব মুশরিক পুরুষদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করবে না, তাদেরকে হত্যা করা হবে পূর্ববর্ণিত কারণে। অর্থাৎ তাদের অপরাধ গুরুতর হওয়ার কারণে তাদের শাস্তিও কঠিন করার উদ্দেশ্যে।
স্ত্রীলোকের উপর এবং শিশুর উপর জিজিয়া আরোপ করা যাবে না। কারণ জিজিয়া ওয়াজিব হয় হত্যার বিকল্প রূপে অথবা লড়াইয়ে অংশ গ্রহণের বিকল্প রূপে। অর্থাৎ পরাজিত কাফেরকে হত্যা করা বৈধ। কিন্তু সে হত্যার কবল থেকে রক্ষা পায় জিজিয়ার মাধ্যমে। অনুরূপভাবে তাদের কর্তব্য ছিল জানমাল নিয়ে মুসলমানদের সাথে লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করা। কিন্তু তারা তা করে না। তাই এর বিকল্প হিসাবে তাদের উপর জিজিয়া ওয়াজিব হয় তাই বলা হয়েছে জিজিয়া ওয়াজিব হয় হত্যার এবং লড়াইয়ে অংশগ্রহণের বিকল্প হিসাবে। এখন শিশু এবং স্ত্রীলোককে যেহেতু হত্যা করা জায়েজ নয়। অনুরূপভাবে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ শিশু ও স্ত্রী লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই হত্যার বিকল্প বিষয় জিজিয়া আরোপ করাও জায়েজ নয়। অনুরূপভাবে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করা শিশু ও স্ত্রীলোকের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বিকল্প বিষয় জিজিয়’ আরোপ করাও তাদের উপর সম্ভব নয়।
অধিকারের বদলা হিসেবে। তাই জানমালের নিরাপত্তা বা বসবাসের অধিকার হলো জিম্মির প্রাপ্য। আর এব বিনিময়ে জিম্মির কাছে মুসলিম সরকারের পাওনা হলো জিজিয়া। অতএব, জিম্মি ব্যক্তি যেহেতু তার প্রাপ্য বিষয় উসুল করে নিয়েছে বা ভোগ করেছে, তাই এর বিনিময় তার উপর অবশ্যই ওয়াজিব হবে এবং তা তাকে পরিশোধ করতে হবে মুসলমান হওয়ার দ্বারা বা মৃত্যুবরণ করার দ্বারা রহিত হবে না।
ইমাম শাফেয়ী
(র.) নিজ মতের পক্ষে দুটি নজির পেশ করেছেন-
১. যেমন কোনো জিম্মি যদি কারো কাছ থেকে একটি বাড়ি ভাড়া নেয় এবং বাড়িতে বসবাস করার পর মারা যায় বা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে বাড়ির ভাড়া তার উপর থেকে রহিত হয় না। বাড়ির উপকারিতা ভোগ করার কারণে বাড়ির ভাড়া তার উপর অবধারিত হবে এবং তা অবশ্যই তাকে পরিশোধ করতে হবে।
২. কোনো জিম্মি যদি কাউকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করে যার ফলে তার উপর কিসাস ওয়াজিব হয়, অতঃপর সে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের সাথে সম্পদ বা অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করল। এমতাবস্থায় যদি হত্যাকারী জিম্মি মুসলমান হয়ে যায় কিংবা মারা যায় তাহলে তার উপর থেকে কিসাসের বিকল্পরূপে ধার্যকৃত অর্থ রহিত হয় না। কেননা এ অর্থের বিনিময়ে যা লাভ করার তা সে লাভ করেছে। অর্থাৎ সে তার প্রাণ রক্ষা করেছে। অতএব, এর বদলা তাকে পরিশোধ করতেই হবে
মোটকথা, বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাড়ির উপকারিতা ভোগ করলে যেমন ভাড়া দিতে হয় এবং অর্থের বিনিময়ে প্রাণ রক্ষা করলে যেমন অর্থ পরিশোধ করতে হয়, মারা গেলে বা মুসলমান হয়ে গেলে রহিত হয় না, তেমনি জানমালের নিরাপত্তা তোগ বা “দারুল ইসলামে বাস করলে জিম্মির উপর জিজিয়া ওয়াজিব হবে এবং সে জিজিয়া তাকে পরিশোধ করতে হবে। মুসলমান হয়ে গেলে কিংবা মৃত্যুবরণ করলে তা রহিত হবে না।
আহনাফের দলিল:
১. আহনাফের প্রথম দলিল হলো হাদীস। নবী করীম ইরশাদ করেছেন- لَيْسَ عَلَى مُسْلِم جزية কনো মুসলমানের উপর জিজিয়া নেই। উক্ত হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। ইমাম তিরমিযী, আবু দাউদ, ইমাম আহমদ, দারাকুতনী, তাবারানী, প্রমুখ মুহাদ্দিস নিজ নিজ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। কোনো কোনো বর্ণনায় হাদীসটি এরূপে বর্ণিত আছে ) مَنْ أَسْلَمَ فَلَا جِزْيَةً عَلَيْهِ যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে, তার উপর কোনো জিজিয়া নেই। অতএব, এ হাদীসের আলোকে আহনাফ বলেন, কোনো জিম্মি ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে তার জিজিয়া রহিত হযে যাবে।
২. জিম্মির উপর জিজিয়া ওয়াজিব হয়, তার কুফরির শাস্তি হিসাবে। এ কারণেই অত্যন্ত লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার সাথে জিজিয়া পরিশোধ করতে হয়। অতএব, ব্যক্তি যখন ইসলাম গ্রহণ করার মাধ্যমে কুফরি ত্যাগ করল, তখন আর তার উপর কুফরির শাস্তি (জিজিয়া) প্রয়োগ করা যাবে না। অনুরূপ যদি জিম্মি মারা যায়, তাহলেও জিজিয়া রহিত হবে। কারণ মৃতের উপর শাস্তি বাস্তবায়ন করা যায় না।
৩. দুনিয়াতে শাস্তির (জিজিয়ার) বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে, কাফেরদের দুষ্কৃতি রোধ করার জন্য। আর কাফের যখন ইসলাম গ্রহণ করে কিংবা মৃত্যুবরণ করে, তখন তার দুষ্কৃতি এমনিতেই রোধ হয়। তাই তখন তার উপর শাস্তি তথা জিজিয়া প্রদানের প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না।
৪. জিম্মির উপর জিজিয়া ওয়াজিব হয়েছিল যুদ্ধের সময় মুসলমানদেরকে সাহায্য করার বিকল্প হিসাবে। কিন্তু জিম্মি যখন মুসলমান হলো, তখন সে সাহায্য করতে সক্ষম হয়ে গেল। অর্থাৎ মুসলমান হওয়ার পর সে অন্য মুসলমানদের সাথে জিহাদে শরিক হতে পারবে অতএব, সে যখন মূল বিষয় আদায় করতে পারছে তখন তার উপর বিকল্প (জিজিয়া) আরোপ করার প্রশ্ন আসে না। কেননা বিকল্পের প্রয়োজন তখনই হয়, যখন মূল বিষয় অসম্ভব হয়।
ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলিলের জবাব মানুষ, মানুষ হিসাবে নিরাপত্তাগুণের অধিকারী হয়। কেননা মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে, সংরক্ষিত ও নিরাপত্তাগুণ বিশিষ্ট করে। তবে কুফরির কারণে সেটা সাময়িকভাবে বাতিল হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর যখন সে ইসলাম গ্রহণ করল তখন পুনরায় নিজ অবস্থায় ফিরে আসবে অর্থাৎ মানুষ হিসাবেই সে নিরাপত্তা গুণের অধিকারী হবে। জিজিয়ার বদলায় নয়।
অনুরূপভাবে জিম্মি ব্যক্তি নিজের মালিকানাধীন ভূমিতে বাস করে অন্যের মালিকানা জমিতে সে বাস করে না। অতএব, তার বসবাসের কারণেও জিজিয়া আরোপ করা হবে না। কেননা জিজিয়া যদি জিম্মি ব্যক্তির বসবাসের কারণে আরোপ করা হতো, তাহলে সেটা জিজিয়া থাকত না; বরং সেটা ভাড়া হয়ে যেত, আর ভাড়ার ক্ষেত্রে মেয়াদ বা ভোগ কাল নির্দিষ্ট থাকে। অথচ জিযিয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভোগ কাল নির্দিষ্ট নেই। অর্থাৎ জিম্মি কয় মাস বা কয় বৎসর দারুল ইসলামে বাস করবে সেটা নির্ধারিত নয়। এর দ্বারা বুঝা যায়, জিম্মির নিকট থেকে যে জিযিয়া নেওয়া হয়, তার বসবাসের বিনিময়ে, ভাড়া হিসাবে নয়।
অতএব, ইমাম শাফেয়ী (র.) যে বলেছিলেন জিম্মির নিরাপত্তা এবং বসবাসের অধিকারের বিনিময়ে জিজিয়া ওয়াজিব হয়, একথা সঠিক নয়; বরং সঠিক কথা হলো, জিজিয়া ওয়াজিব হয় তার হত্যা এবং মুসলমানকে যুদ্ধে সাহায্য করার বিকল্প হিসাবে।
উক্ত মাসআলার দলিল হলো, জিম্মির মৃত্যুটি হয়তো জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার পূর্বে সংঘটিত হয়েছে অথবা জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার পরে সংঘটিত হয়েছে। যদি জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার পূর্বে জিম্মির মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে জিজিয়া রহিত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আর যদি জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে (আমাদের মতে) মৃত্যুর দ্বারা জিজিয়া রহিত হয়ে যাবে। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে মৃত্যুর দ্বারা জিজিয়া রহিত হয়ে যাবে। কারণ তাঁর মতে জিযিয়া ওয়াজিব হয় বৎসরের শেষে। অতএব, যেন জিম্মি ব্যক্তিটি জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার পূর্বেই মারা গেল। তাই তার কাছে থেকে জিজিয়া উসুল করা হবে না।
وأمَّا مشثَلْةُ الْمَوْتِ فَقَدْ ذَكَرْنَاهَا বলে মুসান্নিফ (র.) ইঙ্গিত করেছেন পূর্বে অতিবাহিত একটি ইবারতের দিকে।
we are fafaria – ولأن شرع العُقُوبَة فِي الدُّنْيا لا يكون إلا لدفع الشر وقد انْدَفَعَ بِالْمَوْتِ والإسْلامِ Taraf a শাস্তি প্রবর্তন করা হয়েছে কাফেরদের দুষ্কৃতি রোধ করার জন্য। আর মৃত্যুর দ্বারা এবং ইসলাম গ্রহণের দ্বারা তাদের দুষ্কৃতি রোধ হয়ে যায়। বিধায় মৃত্যুর পর জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ প্রসঙ্গটি ইতঃপূর্বেও বর্ণিত হয়েছে।
বিষয় নং ২. খারাজ সম্পর্কিত যে ইখতেলাফী মাসআলার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
কোনো ব্যক্তির উপর যদি দুই বৎসরের খারাজ একত্রিত হয়ে যায় তাহলে খারাজ দুটি তাদাখুল বা একীভূত হবে কি–না এ বিষয়ে মাশায়েখগণ দু-ধরনের মত বর্ণনা করেছেন। কোনো কোনো মাশায়েখের অভিমত খারাজের মাসআলাটিও জিজিয়ার মাসআলার অনুরূপ। অর্থাৎ দুই বৎসরের খারাজ একত্র হয়ে গেলে ইমাম আবূ হানীফা (র.)-এর মতে তাদাখুল হবে। অতএব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে একটি মাত্র খারাজ আদায় করা হবে। সাহেবাইনের মতে তাদাখুল হবে না, ফলে তার থেকে দুই বৎসরের জন্য পৃথক পৃথক দুটি খারাজই উসুল করা হবে। আবার অন্য কতিপয় মাশায়েখ বলেন, দুটি খারাজ একত্র হলে একীভূত হবে না। এটি সর্বসম্মত। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। এ মাসআলাটির দিকে মুসাল্লিফ (র.) ইঙ্গিত করেছেন নিম্নোক্ত বাক্য দ্বারা-
وقيل حراج الأرض على هذا الخلاف وقيل لا تَداخُلَ فِيْهِ بِالاتفاقِ
বিষয় নং ৩. জিজিয়া তাদাখুল হওয়া না হওয়া সম্পর্কিত মাসআলায় দু’পক্ষের দলিলসমূহ নিম্নরূপ : لهما في الخلافية -এর ইবারত হতে সাহেবাইনের দলিল শুরু। সাহেবাইন বলেছিলেন, দুটি জিজিয়া একত্র হলে পরস্পরে তাদাখুল তথা একীভূত হবে না; বরং দুটি জিজিয়াই সংশ্লিষ্ট জিম্মির কাছ থেকে উসুল করা হবে। এক্ষেত্রে তাঁদের দলিল হলো, জিজিয়া ওয়াজিব হয় বিনিময় স্বরূপ। (যেমন পূর্বে বলা হয়েছে) আর একাধিক বিনিময় যখন একত্রিত হয়ে যায় এবং সেগুলো উসুল করা সম্ভব হয়, তখন সবকয়টি বিনিময়ই উসুল করা হয়। যেমন- কোনো বাড়ির ভাড়াটে ব্যক্তির কাছে যদি দু-মাস বা তিন মাসের ভাড়া আটকে যায়, তাহলে সব কয়টি ভাড়াই তার থেকে উসুল করা হয়। ভাড়াগুলো একীভূত হয়ে যায় না। তেমনি আলোচ্য মাসআলায়ও যদি কোনো জিম্মির কাছে গড়ে কয়েক বৎসরের জিজিয়া একত্র হয়ে যায়, তাহলেও সেগুলো উসুল করা সম্ভব বিধায় সবগুলো জিজিয়া পৃথক পৃথকভাবে উসুল করা হবে। দুই বা ততোধিক জিজিয়া একীভূত হবে না। পক্ষান্তরে যদি ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে তাহলে তার থেকে জিজিয়া উসুল করা সম্ভব নয়। কেননা জিজিয়া ওয়াজিব হয় ব্যক্তির অপমানের জন্য, তাকে লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যে। আর মুসলমান ব্যক্তি নিজের ঈমানের বদৌলতে সম্মান ও শ্রদ্ধার যোগ্য হয়ে যায়। তাই মুসলমান থেকে জিজিয়া আদায় করা যায় না।
ولأبي حنيفة (رح) قَوْلُة -এখান থেকে ইমাম আবু হানীফা (র.)-এর দলিল শুরু। ইমাম আবু হনীফা (র.)-এর দলিল হলো, জিজিয়া একটি শান্তি, যা কুফরির উপর হঠকারিতা করার কারণে সাব্যস্ত হয়ে থাকে। শাস্তি হওয়ার বিষয়টি এভাবে প্রতীয়মান হয় যে, জিজিয়া জিম্মির নিজ হাতে পরিশোধ করতে হয়। জিম্মি যদি নিজের কর্মচারীর মাধ্যমে জিজিয়া পাঠায় তাহলে তা গ্রহণ করা হয় না। জিজিয়া দাঁড়ানো অবস্থায় প্রদান করতে হয় এবং গ্রহণকারী বাক্তি তা বসে বসে গ্রহণ করে। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, জিম্মি যখন জিজিয়া প্রদান করতে আসবে, তখন জিজিয়া উসুলকারী বাক্তি জিম্মির জামার বুকে ধরে ঝাকুনি দিবে এবং বলবে, এই আল্লাহর দুশমন, জিজিয়া দাও। এসব কথা ও আচরণ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জিজিয়া একটি শান্তি। আর শাস্তির ক্ষেত্রে নিয়ম হলো যদি এক জাতীয় একাধিক শান্তি একত্র হয় তাহলে পরস্পরে তাদাখুল হয়ে যায় তথা একীভূত হয়ে যায়। যেমন- কোনো ব্যক্তির উপর একাধিক হদ্দ একত্র হলে, সব মিলে এক হন্দে পরিণত হয়। অতএব, জিজিয়া যেহেতু শাস্তি, সেহেতু একাধিক জিজিয়া একত্র হলে একীভূত হয়ে যাবে।
তা ছাড়া আরেকটি বিষয় হলো এই যে, জিম্মিকে ভবিষ্যতের যে কোনো সময় হত্যা করা যেত, সে হত্যার বিনিময়ে জিজিয়া ওয়াজিব হয় এবং ভবিষ্যতের কোনো যুদ্ধে আমাদেরকে যে সহযোগিতা করার বাধ্যবাধকতা ছিল তার বিনিময়ে। অতএব, জিজিয়ার ক্ষেত্রে অতীতকাল ততটা বিবেচ্য নয়। তাই অতীতে দুই বৎসরের জিজিয়া একত্র হয়ে গেলে একটি জিজিয়াই উসুল করা হবে। মুসান্নিফ (র.) এ কারণটির দিকে ইশারা করেছেন নিম্নোক্ত ইবারত দ্বারা-
ولائها وَجَبَتْ بَدَلًا عَنِ الْقَتْلِ في حقهم وعن النصرة في حقنا الخ
মাবসূত কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, জিম্মিদের থেকে যে জিজিয়া উসুল করা হয়, তার সম্পদ সঞ্চয় করা উদ্দেশ্য নয়; বরং আসল উদ্দেশ্য হলো জিম্মিদেরকে লাঞ্ছিত করা। আর এ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য দুটি জিজিয়া উসুল করার প্রয়োজন হয় না। একটি জিজিয়া দ্বারাই উক্ত উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যায়।
বিষয় নং ৪. জামেউস সাগীরে বর্ণিত ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর বক্তব্যটি হলো-
fef – ومَنْ لَمْ يُؤْخَذُ مِنْهُ خَرَاجُ رأسه حَتَّى مَضَتْ السنة وجَانَتْ سَنَةً أُخْرَى لَمْ يُؤْخَذْ উসুল করা হলো না, ইতোমধ্যে বৎসর শেষ হয়ে গেল এবং অন্য বৎসর এসে পড়ল, তার থেকে (বিগত বৎসরের জিজিয়া) উসুল করা হবে না।
এ বক্তব্যে وجائتْ سَنَةً أُخْرَى )অন্য বৎসর এসে গেল) বাক্যটি দ্বারা কি উদ্দেশ্য- এ ব্যাপারে দুরকম মতামত রয়েছে। কোনো কোনো মাশায়েখ جائت سنة أخرى বাক্যটিকে “আরেকটি বৎসর অতীত হয়ে গেল” এ অর্থে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ جاء শব্দটিকে مضث শব্দের অর্থে নিয়েছেন। সে হিসাবে তাদের মতে ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর বক্তব্যের অর্থ দাঁড়াবে এই, যে ব্যক্তির জিযিয়া উসুল করা হয়নি, এমতাবস্থায় বৎসর শেষ হয়ে গেল এরপর আরও একটি বৎসর অতীত হয়ে গেল। (সে ব্যক্তির নিকট থেকে দুটি জিজিয়া) উসুল করা হবে না।
অতএব, তাঁদের মতে দুটি জিজিয়া তখনই একত্র হবে, যখন দ্বিতীয় বৎসরও অতিক্রান্ত হয়ে যায় এবং তখনই দুটি জিজিয়া পরস্পর তাদাখুল বা একীভূত হবে এবং সংশ্লিষ্ট জিম্মির নিকট হতে একটি জিজিয়া উসুল করা হবে।
ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর বক্তব্যের উপরিউক্ত ব্যাখ্যা অনুয়ায়ী জিজিয়া ওয়াজিব হবে বৎসরের শেষে।
বাকি থাকল একথা যে, উল্লিখিত মাশায়েখগণ جاءت শব্দকে যে مضت শব্দের অর্থে গ্রহণ করেছেন, এর ভিত্তি কি? এর উত্তর হলো جاءَث শব্দকে অمض -এর অর্থে গ্রহণ করার ভিত্তি হলো مجاز। কোনো علاق বা সামঞ্জস্যের উপর ভর করে এক শব্দকে অন্য শব্দের অর্থে প্রয়োগ করাকে مجاز বলে। আরবি ভাষায় যে সব আলাকার ভিত্তিতে مجاز হয়ে থাকে, সেসবের একটি হলো علاقه تلازم তথা দুই বস্তু বা বিষয়ের পরস্পর আবশ্যকীয়তার সম্পর্ক। আলোচ্য বাক্যে এধরনের علاقة -এর ভিত্তিতেই جاءت শব্দকে مضت শব্দের অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। কেননা جاءَتْ سَنةُ – )একটি বৎসর এসে গেল এবং مضت سنه )একটি বৎসর অতীত হলো) এ দুয়ের মাঝে পরস্পর আবশ্যকীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান। কারণ নতুন বৎসরে আগমনের জন্য অত্যাবশ্যক হলো পুরান বৎসর অতিবাহিত হওয়া এবং পুরান বৎসর অতীত হওয়ার জন্য আবশ্যক হলো নতুন বৎসর আগমন করা।
মোটকথা, বৎসর আসা এবং বৎসর যাওয়া এ দুয়ের মাঝে علاقة تلازم থাকার কারণে একটিকে অপরটির অর্থে গ্রহণ করা যেতে পারে। উপরিউক্ত মাশায়েখগণ তাই করেছেন।
অন্য মাশায়েখগণ বলেন, ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর বক্তব্যে جاءَتْ سَنَةٌ শব্দটি নিজ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। এ হিসাবে ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর বক্তব্যটির অর্থ হবে যে ব্যক্তির জিজিয়া নেওয়া হয়নি এমতাবস্থায় প্রথম বৎসরটি অতীত হয়ে গেল এরপর দ্বিতীয় বৎসর আগমন করল, তার কাছ থেকে অতীত বৎসরের জিজিয়া উসুল করা হবে না। এ ব্যাখা অনুযায়ী দুই জিজিয়া একত্র হওয়ার জন্য দুই বৎসর অতিক্রান্ত হওয়া আবশ্যক নয়; বরং এক বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় বৎসর শুরু হলেই দুটি জিজিয়া একত্র হয়ে যাবে এবং এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার সময় হলো বৎসরের শুরু লগ্ন। মুসাল্লিফ (র.) এ প্রসঙ্গটি আলোচনা করেছেন )ثُمَّ قول محمد (رح বলে।
বিষয় নং ৫. জিজিয়া ওয়াজিব হওয়ার সময় সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। বিশুদ্ধ মতানুসারে আহনাফের মতে বৎসরের শুরুতে জিজিয়া ওয়াজিব হয়, ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে জিজিয়া ওয়াজিব হয় বৎসরের শেষে।
ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলিল হলো, জাকাতের উপর কিয়াস। অর্থাৎ তিনি বলেন, জাকাত যেমন বৎসরের শেষে ওয়াজিব হয় তেমনি জিজিয়াও বৎসরের শেষে ওয়াজিব হবে।
আহনাফের দলিল হলো, জিজিয়া ওয়াজিব হয়ে থাকে ভবিষ্যতকালীন হত্যা ও যুদ্ধে সাহায্য করার বিনিময় হিসাবে। তাই এটা বৎসরের শেষে ওয়াজিব করা সম্ভব নয়। কেননা বৎসরের শেষে ওয়াজিব করা হলে সেটা অতীতকালের হত্যা ও যুদ্ধে সাহায্যের বিনিময় হয়ে যাবে। অথচ পূর্বে প্রমাণ করা হয়েছে যে, জিজিয়া হলো ভবিষ্যতকালীন হত্যা ও যুদ্ধের সাহায্য করার বিনিময়। অতএব, বৎসরান্তে ওয়াজিব করা অসম্ভব হওয়ার কারণে আহনাফ তা বৎসরের শুরুতে ওয়াজিব করেছেন।








তাফসীরে মাযহারীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী রচিত তাফসীরে মাযহারী কোরআনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসীর গ্রন্থ। এই গ্রন্থে জিযিয়া সম্পর্কিত সুরা তওবার ২৯ নম্বর আয়াতে কী বলা আছে এবং তার ব্যাখ্যা কী, তা স্পষ্টভাবে বিবৃত রয়েছে। জিযিয়া যে আসলে অপমান, অপদস্থতার নিদর্শন, এবং জিযিয়া কীভাবে গ্রহণ করা হবে, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই অধ্যায়টি পড়ে দেখতে হবে [12]
সুরা তওবাঃ আয়াত ২৯
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَغِرُونَ
∎ যাহাদিগের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাদিগের মধ্যে যাহারা আল্লাহে বিশ্বাস করে না ও পরকালেও নহে এবং আল্লাহ্ ও তাঁহার রসূল যা নিষিদ্ধ করিয়াছেন তাহা নিষিদ্ধ করে না এবং সত্য দ্বীন অনুসরণ করে না তাহাদিগের সহিত যুদ্ধ করিবে যে পর্যন্ত না তাহারা নত হইয়া আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ স্বেচ্ছায় জিযিয়া দেয়।
মুজাহিদ বলেছেন, এই আয়াতে রোমানদের বিরুদ্ধে জেহাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাই রসুল স. এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রোমানদের বিরুদ্ধে জেহাদ করার জন্য তাবুক গমন করেন।
প্রথমে বলা হয়েছে- ‘যাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহকে ও পরকালকে বিশ্বাস করে না।’ এখানে ‘যাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে’ বলে বুঝানো হয়েছে ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে। আল্লাহ্ ও আখেরাতের প্রতি সঠিক বিশ্বাস তাদের নেই।
একটি সন্দেহঃ ইহুদী ও খৃষ্টানেরা তো আল্লাহকে ও আখেরাতকে মানে। তবুও তাদেরকে এখানে এভাবে অবিশ্বাসী বলা হলো কেনো?
সন্দেহ ভঞ্জনঃ আল্লাহর প্রতি যেভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে বলা হয়েছে, ইহুদী ও খৃষ্টানেরা সেভাবে আল্লাহকে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করে তাদের মনগড়া নিয়মে। এ রকম বিশ্বাস আল্লাহ্পাকের নিকট গ্রহণীয় নয়। যেমন-আল্লাহ্পাক চির অমুখাপেক্ষী। তিনি কারো সন্তান অথবা পিতা নন। অথচ ইহুদীরা হজরত উযায়েরকে এবং খৃষ্টানেরা হজরত ঈসাকে আল্লাহ্ পুত্র বলে। যারা এ রকম বলে, তাদের ‘ইমান’ বলে আর কি কিছু অবশিষ্ট থাকে? আখেরাতের প্রতিও তাদের সঠিক বিশ্বাস নেই। তারা মনে করে, জান্নাত তাদের জন্য অবধারিত। ইহুদীরা বলে, তারা দোজখে গমন করলেও সেখানে তারা অবস্থান করবে অল্প কয়েকদিন মাত্র। তারা আরো বলে, জান্নাত দুনিয়ার মতোই। দুনিয়ার মতোই সেখানে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। আবার নাও থাকতে পারে। আখেরাত সম্পর্কে এ রকম ধারণা যারা রাখে তাদেরকে কি বিশ্বাসী বলা যায়? উল্লেখ্য যে, মোতাজিলারাও আখেরাতের প্রতি সঠিক বিশ্বাস রাখে না।
এরপর বলা হয়েছে- ‘এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রসুল যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা নিষিদ্ধ করে না।’ এ কথার অর্থ আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রসুল মোহাম্মদ স. যে সকল বিষয়কে হারাম ঘোষণা করেন, সেগুলোকে ইহুদী ও খৃষ্টানেরা হারাম বলে মান্য করে না। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, এখানে ‘রসুল’ বলে মোহাম্মদ মোস্তফা স. কে বুঝানো হয়নি। বুঝানো হয়েছে তাদের আপনাপন রসুলকে। অর্থাৎ হজরত মুসা ও হজরত ঈসাকে। তাঁরা ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, শেষ রসুল মোহাম্মদ স. আবির্ভূত হলে তাঁর অনুসারী হতে হবে। কিন্তু তারা এই নির্দেশ লংঘন করেছে। তাঁর অনুসরণ তো করেইনি, বরং করে চলেছে ক্রমাগত ষড়যন্ত্র ও বিরুদ্ধাচরণ।
এরপর বলা হয়েছে- ‘এবং সত্য দ্বীনের অনুসরণ করে না।’ কাতাদা বলেছেন, এখানে ‘দ্বীনুল হাকু’ (সত্য দ্বীন) কথাটির অর্থ হবে আল্লাহ্র দ্বীন। কেউ কেউ বলেছেন দ্বীন ইসলাম। হজরত আবু উবায়দা বলেছেন, এখানে ‘সত্য দ্বীন অনুসরণ করে না’ বলে এ কথাই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, যারা সত্যধর্মের অনুসারী, ইহুদী ও খৃষ্টানেরা তাদের প্রতি অনুগত নয়।
শেষে বলা হয়েছে ‘তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ স্বেচ্ছায় জিযিয়া দেয়।’
‘জিযিয়া’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ বিনিময় বা বদলা। শব্দটির শেষ অক্ষর ‘তা’ প্রতিদান প্রকাশক। ‘জিযিয়া’ হচ্ছে অপদস্থতার নিদর্শন। ওই সকল লোককে জিযিয়া কর দিতে হবে, যাদেরকে ফেকাহ্ শাস্ত্রবিদগণ জিযিয়া প্রদাতা নির্ধারণ করেছেন।
কেউ কেউ বলেছেন, জিযিয়া শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে ‘জাযা দাইনাহু’ থেকে, যার অর্থ সে তার ঋণ পরিশোধ করেছে। এখানে আঁইয়্যাদিউ অর্থ আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ। ‘ইয়াদ’ অর্থ হাত। এখানে অর্থ আনুগত্যের হাত। অর্থাৎ এখানে বলা হয়েছে, নিজ হাতে জিযিয়া প্রদান করতে হবে। অন্যের মাধ্যমে নয়। হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, জিম্মীরা (কর প্রদাতা অবিশ্বাসীরা) নিজ হাতে জিযিয়া প্রদান করবে। অন্য কাউকে মাধ্যম নিযুক্ত করতে পারবে না। এ রকমও হতে পারে যে, ‘আন ইয়াদিন’ কথাটির অর্থ এখানে অপদস্থতার সঙ্গে জিযিয়া পরিশোধ করা। আবু উবায়দা বলেছেন, কাফেরদেরকে জিযিয়া দিতে হবে বাধ্যতার বিস্বাদ ও ভয়ের অনুভূতির সঙ্গে। এভাবে বাধ্যতামূলক দেয়কে আরববাসীরা প্রকাশ করে এভাবে- ফুলানুন আয়’তা আন ইয়াদিন। কেউ কেউ বলেছেন, ‘আন ইয়াদিন’ অর্থ নগদ প্রদান করা। বাকী না রাখা। কেউ কেউ আবার বলেছেন, কথাটির অর্থ এখানে- কৃতজ্ঞচিত্ততার নিদর্শনরূপে জিযিয়া দেয়া। অর্থাৎ জিযিয়া প্রদান করতে হবে এ রকম মনোভাব নিয়ে যে ‘মুসলমানেরা অতি মহৎ- তাই দয়া করে জিযিয়া গ্রহণ করতে সম্মত হয়ে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
‘সগিরুন’ অর্থ নত হয়ে, অপমানিত ও পরাজিত হয়ে। হজরত ইকরামা বলেছেন, এখানে কথাটির উদ্দেশ্য হবে জিযিয়া গ্রহণকারী থাকবে উপবিষ্ট অবস্থায়। আর প্রদানকারী দাঁড়িয়ে থাকবে তার সামনে। এক বর্ণনায় এসেছে, তাঁদের স্কন্ধদেশ পদদলিত করে আদায় করতে হবে জিযিয়া। কালাবী বলেছেন, জিযিয়া গ্রহণকালে তাদের ঘাড়ে মুষ্টাঘাত করে প্রাপ্তি স্বীকারের কথা জানিয়ে দেয়া যাবে। কেউ কেউ বলেছেন, জিযিয়া গ্রহণের সময় তাদের দাড়ি ধরে তাদেরকে চড় থাপ্পড়ও মারা যাবে। কেউ কেউ আবার বলেছেন, তাদের জামার গলার কাছে ধরে বলপূর্বক তাদেরকে তাদের সঞ্চয়স্থলের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, বিধর্মীদের উপর জিযিয়া কর আরোপ করার অর্থই তাদেরকে অপদস্থ করা। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, জিম্মীদেরকে ইসলামের বিধানের আওতায় আনার অর্থই হচ্ছে তাদেরকে পরাভূত করা।
আলোচ্য আয়াতে কেবল আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিযিয়া আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যান্য বিধর্মীর কথা এখানে বলা হয়নি। তাই হজরত ওমর তাঁর খেলাফতের সময় অন্যান্য বিধর্মীদের রাজ্য জয় করার পর তাদের উপর জিযিয়া আরোপ করেননি। কিন্তু হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ যখন এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করলেন যে, রসুলুল্লাহ্ স. অগ্নিউপাসকদের নিকট থেকেও জিযিয়া আদায় করতে বলেছেন, তখন হজরত ওমর অন্যান্য বিধর্মীদের উপরেও জিযিয়া নির্ধারণ করলেন। বোখারী এই বর্ণনাটি এনেছেন বাজালাহ্ বিন ইবাদ থেকে। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, বাজালাহ্ বর্ণনাকারী হিসেবে অপরিচিত। কিন্তু তাঁর গ্রন্থের ‘জিযিয়া’ অধ্যায়ে লিখেছেন, তার সূত্রে বর্ণিত হাদিস বিশুদ্ধ পদবাচ্য। এ কারণে অগ্নিউপাসকদের উপর জিযিয়া নির্ধারণের ব্যাপারটি ঐকমত্যসম্মত।
মতপার্থক্যঃ ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, আরব অনারব সকল ইহুদী-খৃষ্টানদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা যাবে। অনারব মুশরিকদের নিকট থেকেও জিযিয়া গ্রহণ করা যাবে তারা অগ্নিপূজক হোক অথবা মূর্তিপূজক। মুরতাদদের (ধর্মত্যাগীদের) নিকট থেকে জিযিয়া নেয়া যাবে না। ইমাম আবু ইউসুফ বলেছেন, আরববাসীদের নিকট থেকে পুরোপুরি জিযিয়া গ্রহণ করা যাবে না, তারা ইহুদী, খৃষ্টান, মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজক- যেই হোক না কেনো। জিযিয়া আদায় করতে হবে কেবল অনারব আহলে কিতাব ও মুশরিকদের নিকট থেকে।
ইমাম মালেক এবং ইমাম আওজায়ী বলেছেন, আরব অনারব সকল স্থানের কাফেরদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা যাবে। তবে মুরতাদ এবং কুরায়েশ মুশরিকদের নিকট থেকে জিযিয়া নেয়া যাবে না। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, ব্যক্তির উপর জিযিয়া আরোপ করা যাবে না। জিযিয়া আরোপ করতে হবে বিধর্মীদের দলের উপর। তাই জিযিয়া আদায় করতে হবে আরব ও অনারব ইহুদী-খৃষ্টানদের নিকট থেকে। মূর্তিপূজকদের নিকট থেকে সম্পূর্ণ জিযিয়া আদায় করা যাবে না। তবে ইমাম শাফেয়ীর নিকটে অগ্নিপূজারীরাও আহলে কিতাবদের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম মালেক তাঁর মুয়াত্তায় এবং ইমাম শাফেয়ী তাঁর আল-উমে লিখেছেন, জাফর বিন মোহাম্মদ বলেছেন, আমার নিকট আমার পিতা বর্ণনা করেছেন, হজরত ওমর একবার বললেন, আমি জানি না অগ্নিপূজারীদের ব্যাপারে আমার কি করা উচিত। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ বললেন, আমি স্বয়ং রসুল স. কে বলতে শুনেছি, আহলে কিতাবেরা যে পদ্ধতিই অবলম্বন করুক না কেনো (তাদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করতে হবে)।
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, আমার নিকট নসর বিন আসেমের একটি বর্ণনা সাঈদ বিন মারজুবানের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন সুফিয়ান। ওই বর্ণনায় এসেছে, ফারওয়াহ্ বিন নওফেল বললেন, অগ্নিপূজারীর নিকট থেকে জিযিয়া নেয়া হবে কিসের ভিত্তিতে? তারা তো আহলে কিতাব নয়। এ কথা শুনে রাগান্বিত হলেন মাসতুরাদ। তিনি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে ফারওয়ার জামার গলদেশ পেঁচিয়ে ধরে হুংকার ছেড়ে বললেন, রে আল্লাহ্র দুশমন! কীভাবে তুই হজরত আবু বকর, হজরত ওমর ও হজরত আলীর প্রতি দোষারোপ করতে পারলি! তাঁরা তো অগ্নিপূজারীদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করেছিলেন। এরপর মাসতুরাদ গেলেন খলিফার গৃহে। হজরত আলী তখন বললেন, আহা! আমি তো অগ্নিপূজারীদের সম্পর্কে অন্যদের চেয়ে বেশী জানি। তাদের মধ্যেও ধর্মের জ্ঞান ও কিতাব ছিলো। তারা তা শিক্ষা করতো ও অন্যকে শিক্ষা দিতো। একবার তাদের রাজা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জড়িয়ে ধরলো তার মা অথবা কন্যাকে। ঘটনাটি
জানাজানি হয়ে গেলো। তাদের আলেম সম্প্রদায় বললো, কিতাবের বিধান অনুসারে রাজাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। রাজা তখন জনসাধারণকে একত্র করে বললো, প্রথম নবী হজরত আদমের চেয়ে উত্তম ধর্ম আর কার হতে পারে? তিনি তাঁর আপন পুত্রের সঙ্গে আপন কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। আমি তাঁরই অনুসারী।
তোমাদেরও উচিত হজরত আদমের ধর্মমতের অনুসারী হওয়া। জনসাধারণ রাজার বিধানকেই মেনে নিলো। রাজার বিরুদ্ধবাদীদেরকে করা হলো হত্যা। এক রাতের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলো তাদের আলেম সম্প্রদায়। তাই অগ্নি উপাসকেরাও আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। রসুল স. স্বয়ং, হজরত আবু বকর ও হজরত ওমর তাদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করেছিলেন। হাদিসটি ইবনেজাওজী উল্লেখ করেছেন তাঁর ‘আত্তাহকিক’ গ্রন্থে। কিন্তু সাঈদ বিন মারজুবানের বিরূপ সমালোচনাও সেখানে করা হয়েছে। ইয়াহ্ইয়া বিন সাঈদ বলেছেন, সাঈদ বিন মারজুবানের বর্ণনাকে আমি নির্ভরযোগ্য মনে করি না। ইয়াহ্ইয়া বিন কাত্তান বলেছেন, ওই লোকটি গ্রহণযোগ্য নয়। তার বর্ণনা লিপিবদ্ধযোগ্যও নয়। কাল্লাস বলেছেন, সাঈদ বিন মারজুবান পরিত্যক্ত। কিন্তু আবু উসামা তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আবু জারআ বলেছেন, তিনি ছিলেন সত্যবাদী, কিন্তু মুদলাস (প্রবঞ্চক)।
আমি বলি, ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খেরাজ গ্রন্থে রয়েছে, সুফিয়ান বিন উয়াইনিয়ার মাধ্যমে নজর বিন আসেম বর্ণনা করেছেন, হজরত আলী বলেছেন, রসুলুল্লাহ্ স., হজরত আবু বকর এবং হজরত ওমর অগ্নিপূজারীদের নিকট থেকে জিযিয়া কর আদায় করেছেন। আর আমি অগ্নিপূজারীদের সম্পর্কে অন্যদের চেয়ে ভালো জানি। তারা ছিলো আহলে কিতাব। তারা কিতাব পড়তো এবং শরিয়ত সম্পর্কে শিক্ষাও দিতো। কিন্তু তাদের বক্ষাভ্যন্তর থেকে ইলমে ইলাহী উঠিয়ে নেয়া হয়েছিলো। ইমাম আবু ইউসুফ নসর বিন খলিফা সূত্রে আরো লিখেছেন, ফারওয়াহ্ বিন নওফেল আশজায়ী একবার বললেন, অগ্নি উপাসকদের কাছ থেকে কর আদায় করা হয়েছিলো- এ কথাটি মেনে নেয়া কঠিন। কারণ তারা আহলে কিতাব ছিলো না। এ কথা শুনে মাসতুর বিন আহনাফ রাগের চোটে দাঁড়িয়ে বললেন, তুই রসুল স. এর সিদ্ধান্ত নিয়ে রসিকতা করেছিস। এক্ষুণি তওবা কর। নয়তো আমি তোকে হত্যা করবো। রসুল স. তওবাজারে বসবাসকারী অগ্নিউপাসকদের নিকট থেকে কর আদায় করেছেন। শেষে দু’জনে বিষয়টি ফয়সালার জন্য উপনীত হলেন হজরত আলীর নিকটে। হজরত আলী বললেন, আমি অগ্নিউপাসকদের সম্পর্কে এমন একটি কথা বলবো, যা তোমাদের দু’জনেরই পছন্দ হবে। অগ্নিউপাসকেরা আসলে আহলে কিতাব। তাদের কাছে একটি আসমানী কিতাব ছিলো। তারা ওই কিতাবটি পাঠ করতো। তাদের এক রাজা ছিলো ঘোর মদ্যপ। সে একদিন মাতাল অবস্থায় তার নিজের বোনকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেলো এবং কামরিপু চরিতার্থ করলো তার সাথে। চারজন লোক অনুসরণ করেছিলো তাদের। তারা ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখলো। যখন নেশা কেটে গেলো, তখন তার বোন তাকে বললো, চারজন লোকের সামনে তুমি এ রকম অপকর্ম করলে! এখন তো শরিয়তের আইনে তোমাকে হত্যা করা হবে। রাজা বললো, তাইতো। আমার যে কিছুই খেয়াল ছিলো না। তার বোন বললো, এখন আমার কথা যদি শোনো, তবেই কেবল তুমি শাস্তি থেকে অব্যাহতি লাভকরতে পারবে। রাজা বললো, বলো, অবশ্যই আমি তোমার কথা মান্য করবো। তার বোন বললো, তুমি যা করলে সেটাকেই ধর্মীয় বিধানরূপে প্রচার করো। জনসাধারণকে ডেকে বলে দাও, এটাই আদমের ধর্মাদর্শ। হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো আদম থেকে। এই হিসেবে হাওয়া ছিলো আদমের কন্যা। অথচ দু’জনে ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। প্রথম নবীর এই ধর্মাদর্শ আমাদের জন্য মান্য করা অত্যাবশ্যক। এই ঘোষণা দেয়ার পর যারা তোমার কথা মানবে তাদেরকে অব্যাহতি দিবে। আর যারা তোমার কথা মানবে না তাদেরকে তলোয়ারের মাধ্যমে হত্যা করে ফেলবে। রাজা তার বোনের কথামতো কাজ করলো। কিন্তু জনতার মধ্যে অনেকেই রাজার এ প্রস্তাব মেনে নিতে পারলো না। কেউ কেউ বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। বিদ্রোহীদেরকে হত্যার নির্দেশ দিলো রাজা। কিন্তু জনবিদ্রোহ প্রশমিত হলো না। তার বোন বললো- জনতা এখনো ভীতসন্ত্রস্ত নয়। সুতরাং তুমি এবার ঘোষণা করে দাও, আমার বিধান যে মানবে না তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে। তাই করলো রাজা। নির্মাণ করলো বিশাল অগ্নিকুণ্ড।
ঘোষণা করে দিলো- যারা আমার ধর্মমতকে মানবে না তাদেরকে পুড়িয়ে মারা হবে এই অগ্নিকুণ্ডে। এবার ভীত হলো লোকেরা। মেনে নিলো রাজার বিধান। এই ঘটনাটি বর্ণনার পর হজরত আলী বললেন, এবার বুঝলে তো, অগ্নিউপাসকেরা ছিলো আহলে কিতাব। তাই রসুল স. তাদের নিকট থেকে কর আদায় করেছিলেন। অবশ্য পরে তারা মুশরিক হয়ে যায়। তাই তাদের সঙ্গে বিবাহ এবং তাদের দ্বারা জবাইকৃত পশুর গোশত হারাম করে দেয়া হয়েছে।
ইবনে জাওজী তাঁর আত্ তাহকিক গ্রন্থে লিখেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, পারস্যবাসীদের পয়গম্বর যখন পরলোকগমন করলেন, তখন ইবলিস তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করলো অগ্নিউপাসনার দিকে।
উত্তরঃ রসুল স. বলেছেন, অগ্নিপূজারী ও আহলে কিতাব এর সাথে একই ব্যবহার কোরো। এ কথায় প্রমাণিত হয় না যে অগ্নি উপাসকেরাও আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত এবং আহলে কিতাবদের সঙ্গে যা করা যাবে, তা অগ্নি-উপাসকদের সঙ্গেও করা যাবে। ঐকমত্যাগত অভিমত এই যে, অগ্নিউপাসকদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ এবং তাদের দ্বারা জবাইকৃত পশুর গোশত ভক্ষণও নিষিদ্ধ। হাদিসের উদ্দেশ্য শুধু এতোটুকুই যে, আহলে কিতাবের মতো অগ্নি-উপাসকদের উপরেও করারোপ সিদ্ধ। আর হাদিসের মাধ্যমে আমরা এ কথাও জানতে পারি যে, অগ্নিউপাসকদের পূর্বপুরুষেরা ছিলো আহলে কিতাব। তারা আল্লাহ্পাকের কিতাব পড়তো এবং প্রচার করতো। কিন্তু যখন তারা আল্লাহ্র দ্বীন পরিত্যাগ করলো, মুখ ফিরিয়ে নিলো কিতাবের বিধান থেকে, তখন এলেম উঠিয়ে নেয়া হলো তাদের হৃদয় থেকে। ইবলিস তখন তাদেরকে বানিয়ে ফেললো অগ্নিউপাসক। তখন থেকে তারা আর আহলে কিতাব নয়। তাই আলেমগণ বলেছেন, তারা আহলে কিতাব নয়। তবে ইমাম শাফেয়ীর এক বর্ণনায় এসেছে, তারাও আহলে কিতাব। আবার অপর বর্ণনানুসারে ইমাম শাফেয়ীর অভিমত জমহুরের অনুকূলে। সে অভিমতটি হচ্ছে অগ্নিউপাসকেরা আহলে কিতাব নয়।
আমি বলি, যদি অগ্নিপূজারীদের পূর্বপুরুষ আহলে কিতাব হয়ে থাকে, তবে তাদেরকে আহলে কিতাব না বলার কোনো কারণ নেই। আর এ রকম হলে আমাদের দেশের হিন্দু মূর্তিপূজকদেরকেও আহলে কিতাব বলা যেতে পারে। কারণ তাদের কাছে রয়েছে বেদ নামক একটি কিতাব। ওই কিতাবে রয়েছে চারটি পর্ব। একত্রে সেগুলোকে বলা হয় চতুর্বেদ। ওই বেদসমূহের অনেক বিধান শরিয়তের বিধানের অনুরূপ। সেগুলোতে বর্ণনাবৈসাদৃশ্য অবশ্য রয়েছে। আর সেগুলো নিশ্চয় ঘটেছে শয়তানের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে। শয়তানের কারসাজির ফলে মুসলমানদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে তিয়াত্তরটি ফেরকা। হিন্দুরা যে আহলে কিতাব, তার প্রমাণ কোরআন মজীদেও রয়েছে। যেমন, একস্থানে এরশাদ করা হয়েছে ওয়া ইম্মিন উম্মাতিন ইল্লা খালা ফিহা নাজিরুন (আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোনো না কোনো পয়গম্বর অবশ্যই প্রেরণ করেছি)। অগ্নি-উপাসকদেরকে আহলে কিতাব বললে হিন্দুদেরকে আরো বেশী আহলে কিতাব বলতে হয়। অগ্নিউপাসকদের রাজা মাতাল অবস্থায় তার বোনের সঙ্গে ব্যভিচার করেছিলো। বিধান দিয়েছিলো আল্লাহ্র কিতাবের বিরুদ্ধে। হজরত আদমের নামে প্রচার করেছিলো তার বিকৃত মতবাদ। কিন্তু হিন্দুরা তেমন কিছু করেনি। অবশ্য তারা রসুল স. এর রেসালত অস্বীকার করার কারণে কাফের। আমার নিকট এ রকম সংবাদ পৌঁছেছে যে চতুর্বেদের মধ্যে রয়েছে রসুল স. এর আবির্ভাবের শুভসংবাদ। ওই শুভসংবাদ পাঠ করেই কোনো কোনো হিন্দু মুসলমান হয়েছে। ওয়াল্লহু আ’লাম।
মূর্তিপূজারীদের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা যাবে না- ইমাম শাফেয়ীর
এই অভিমতের সমর্থনে এই আয়াতটি উপস্থাপন করা হয়েছে- কাতিলুহুম হাত্তা লাতাকুনা ফিত্নাতান (কাফেরদের সঙ্গে লড়াই করো যতক্ষণ না ফেনা উচ্ছেদ হয়)। কিন্তু কথা হচ্ছে, এ রকম কষ্ট করার দরকারই বা কি। আহলে কিতাবদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করার কথাতো আলোচ্য আয়াতেই সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আর অগ্নি পূজারীদের নিকট থেকে জিযিয়া সংগ্রহের কথা বর্ণিত হয়েছে হাদিস শরীফে। বলা হয়েছে, রসুল স. হেজাজের অধিবাসী অগ্নিপূজকদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করেছিলেন।
আমি বলি, ঐকমত্যানুসারে অগ্নিপূজকেরা আলোচ্য আয়াতের অন্তর্ভূত নয়। তাদের সম্পর্কে নির্দেশনা এসেছে হাদিস শরীফে। আর এ সম্পর্কে একটি যুক্তিপূর্ণ কারণও নির্দেশ করা হয়েছে। সে কারণটি হচ্ছে- শিরিক। অর্থাৎ তারা হবে মুশরিক (অংশীবাদী)। মূর্তিপূজকেরা অগ্নিপূজকদের মতো মুশরিক। তাই মূর্তিপূজক ও অগ্নিপূজকের উপর প্রবর্তিত হবে একই বিধান। এখন কথা হচ্ছে, অগ্নিপূজকদের পূর্বপুরুষগণ ছিলো আহলে কিতাব- এ কথা যদি বলা হয়, তবে এ কথাটিও মেনে নিতে হবে যে, মূর্তিপূজকদের পূর্বপুরুষও আহলে কিতাবই ছিলো। কিন্তু মূর্তিপূজক ও অগ্নিপূজকদেরকে কিছুতেই আহলে কিতাব বলা যায় না। কারণ তারা আহলে কিতাবদের আদর্শানুসারী নয়।
আলেমগণের ঐকমত্যানুসারে অগ্নিপূজকদের মতো মূর্তিপূজকদেরকেও ক্রীত-দাস ও ক্রীতদাসী বানানো যাবে। তাই অগ্নিপূজকদের মতো মূর্তিপূজকদের নিকট থেকে জিযিয়াও আদায় করা যাবে। সুতরাং গোলাম অথবা স্বাধীন উভয় অবস্থায় তাদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা বৈধ। উভয় অবস্থায় তারা নিজেরা উপার্জন করবে। সেই উপার্জন দ্বারা তাদের সংসারের ব্যয় নির্বাহ করবে এবং জিযিয়াও পরিশোধ করবে।
সুলায়মান বিন বুরায়দা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুল স. কোথাও কোনো সেনাদলকে প্রেরণ করলে অধিনায়ককে বিশেষভাবে আল্লাহকে ভয় করার এবং সঙ্গীগণের প্রতি সহমর্মী হওয়ার নির্দেশ দিতেন। তারপর বলতেন, আল্লাহ্ নাম নিয়ে আল্লাহর পথে জেহাদ কোরো, আল্লাহদ্রোহীদেরকে হত্যা কোরো, শত্রুরা পরাভূত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেয়ো, চুক্তি ভঙ্গ কোরো না, কারো নাক কান কেটো না (চেহারা বিকৃত কোরো না), পশ্চাৎ দিক থেকে কাউকে আক্রমণ কোরো না, শত্রুরা সম্মুখীন হলে প্রথমে তাদেরকে তিনটি বিষয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ো ১. তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাও। যদি তারা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তবে তোমরা আর যুদ্ধ কোরো না। তাদেরকে বোলো তারা যেনো মদীনায় চলে আসে। এ রকম করলে তারাও হয়ে যাবে মুহাজির। মুসলমানদের সুখ ও দুঃখের সঙ্গে তারা হবে সমঅংশীদার। যদি তারা মদীনায় আসতে সম্মত না হয় তবে তাদেরকে বোলো, তোমাদেরকে গণ্য করা হবে মদীনার বাইরের মুসলমান হিসেবে। সাধারণ মুসলমানদের প্রতি যে সকল বিধান প্রযোজ্য সে সকল বিধান প্রযোজ্য হবে তোমাদের উপরেও। তোমরা তখন আর গণিমত, ফায় এবং চুক্তির মাধ্যমে অন্যান্য উপার্জনের অংশ পাবে না। ২. যদি তারা ইসলামের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে, তবে তাদের নিকট জিযিয়া দাবী কোরো। জিযিয়া প্রদানে সম্মত হলে তাদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ কোরো না। ৩. যদি তারা জিযিয়া দিতে অসম্মত হয় তবে আল্লাহর সাহায্যকামী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কোরো। মুসলিম।
হজরত আনাসের বর্ণনায় এসেছে, আরববাসী আহলে কিতাবদের নিকট থেকেও জিযিয়া গ্রহণ করা জায়েয। তাঁর বর্ণনায় আরো এসেছে, রসুল স. হজরত খালিদ বিন ওলিদকে প্রেরণ করলেন দুমাতুল জানদলের শাসক উকায়দারের বিরুদ্ধে। তিনি তাকে বন্দী করে আনেন। রসুল স. উকায়দার জীবন ভিক্ষা দেন এবং জিযিয়া পরিশোধের শর্তে তার সঙ্গে চুক্তি করেন। আবু দাউদ।
হজরত ইয়াজিদ বিন রুমমান এবং হজরত আবদুল্লাহ্ বিন সিদ্দীকে আকবরের বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. দুমাতুল জানদলের শাসক উকায়দার বিন আব্দুল মালেক কান্দীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলেন হজরত খালিদ বিন ওলিদকে। রসুল স. জিযিয়ার বিনিময়ে নিরাপত্তা দান করেছিলেন তাকে। আবু দাউদ, বায়হাকী।
হাফেজ ইবনে হাজার লিখেছেন উপরে বর্ণিত হাদিসের তথ্য সঠিক মনে করা হলে জিযিয়া কেবল আনসারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আরবেরাও জিযিয়ার আওতায় পড়বে। উকাইদা যে আরবী, সে কথা নিশ্চিত (বনী কুন্দা আরবের একটি শাখা)। এভাবে এ কথাটিও প্রমাণিত হবে যে, জিযিয়া কেবল আহলে কিতাব ও আজমীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তখন ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালেকের অভিমতই বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত হবে। পার্থক্য থাকবে কেবল
এতোটুকু যে, ইমাম আবু হানিফার মতে আরবের পৌত্তলিকদের নিকট থেকে জিযিয়া নেয়া নাজায়েয। আর তাদেরকে গোলামও বানানো যাবে না। উকাইদা ছিলো খৃষ্টান অথবা অগ্নিপূজক পৌত্তলিক নয়।
আবদুর রাজ্জাক ও জুহুরীর বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. আরবের পৌত্তলিকদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু জিযিয়া গ্রহণ করেননি।
ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, আরবের পৌত্তলিকেরা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ ও প্রভাবশালী। কোরআন মজীদও নাজিল হয়েছিলো তাদের স্বভাষায়। তাই তারা ছিলো দুর্বিনীত ও প্রকাশ্য মোজেজা অস্বীকারকারী। সেকারণেই তাদের নিকট থেকে ইসলামের স্বীকৃতি ছাড়া অন্য কিছুই গ্রহণ করা হবে না। ইসলাম গ্রহণ না করলে তারা হবে হত্যার উপযুক্ত। মুরতাদদের (ধর্ম পরিত্যাগকারীদের) বিধানও এ রকম। তারা স্বেচ্ছায় জেনে শুনে ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম সম্পর্কে সবকিছু জেনে শুনে বুঝে ধর্মত্যাগ করে। সুতরাং তাদের অজ্ঞতা ক্ষমার্হ নয়। তাদের সঙ্গে কেবল যুদ্ধ। জিযিয়া নয়।
হজরত ইবনে আব্বাস থেকে মুসলিমের মাধ্যমে ইমাম মোহাম্মদ বিন হাসান বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, আরবের অংশীবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল
দু’টি ইসলাম অথবা যুদ্ধ। মূর্তিপূজক ও মুরতাদেরা বন্দী হয়ে গেলে তাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিকে ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীতে পরিণত করা যাবে। রসুল স. আওতাস ও হাওয়াজেনদের পরিবার পরিজনদেরকে ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীতে পরিণত করেছিলেন। তারা ছিলো আরবী ও অংশীবাদী। বনী মুস্তালিকের পরিবার পরিজনদেরকেও এ রকম করা হয়েছিলো। আবু বনী হানিফা মুরতাদ হয়ে গেলে হজরত আবু বকর তাদের পরিবার পরিজনকে বানিয়েছিলেন গোলাম ও বাঁদী। আর ওই গোলাম বাঁদীদেরকে বণ্টন করে দিয়েছিলেন মুজাহিদদের মধ্যে। মোহাম্মদ বিন আলী বিন আবু তালেবের আম্মা এবং জায়েদ বিন আবদুল্লাহ্ বিন ওমরের আম্মাও ছিলো তাদের মধ্যে।
বন্দী করে পূর্ণ কর্তৃত্বে নিয়ে আসার পর মুরতাদদের স্ত্রী-পুত্রকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু অংশীবাদীদের স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে ইসলামের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো যাবে না। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, অংশীবাদী আরবীদের স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে বন্দী করে ক্রীতদাস বানানো যাবে। ও
ইমাম আবু ইউসুফ লিখেছেন, উকাইদা সম্পর্কিত হাদিসে দেখা যায়-আরববাসী কাফেরদের নিকট থেকেও জিযিয়া গ্রহণ করা হতো। তারা আহলে কিতাব, মূর্তিপূজক বা অগ্নিপূজক- যাই হোক না কেনো। অন্য হাদিসে এসেছে জাজিরাতুল আরব থেকে ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। সুতরাং উকাইদা সম্পর্কিত হাদিসের বিধানটি রহিত হয়েছে বলে স্বীকার করতে হবে। কারণ আরব এলাকায় বসবাসও ছিলো জিযিয়া প্রদানের উপযোগী হওয়ার একটি শর্ত। অতএব, বসবাসের অস্তিত্বই যখন নেই, তখন জিযিয়া ধার্য করার প্রেক্ষা-পটটি আর রইলো কোথায়?
হজরত ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. তিনটি উপদেশ প্রদান করেছিলেন ১. আরব উপদ্বীপ থেকে অংশীবাদীদেরকে বিতাড়িত কোরো। ২. অন্যান্য দেশের কাফেরদেরকে কোরো বন্দী। হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, তৃতীয় উপদেশটির কথা রসুল স. আর উচ্চারণ করেননি। অথবা আমিই তা বিস্মৃত হয়েছি।
হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহর বর্ণনায় এসেছে, হজরত ওমর বলেছেন, আমি স্বকর্ণে শুনেছি, রসুল স. এরশাদ করেছেন, আমি ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে জাজিরাতুল আরব থেকে বহিষ্কার করবোই। এই আরবে মুসলমান ছাড়া অন্য কারো বসবাসের অধিকার নেই। মুসলিম।
ইমাম মালেক তাঁর মুয়াত্তায় জুহুরী থেকে একটি বর্ণনা এনেছেন। অনুরূপ বর্ণনা হজরত আবু হোরায়রা থেকে সালেহ্ বিন আখদারের মাধ্যমেও জুহুরী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। বর্ণনাটি এই- জাজিরাতুল আরবে দুই ধর্মের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। সবশেষে ইসহাক বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন স্বসূত্রে।
হজরত আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ্ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. এর শেষ
উপদেশ ছিলো- ইহুদীদেরকে হেজাজ থেকে এবং নাসারাদেরকে জাজিরাতুল আরব থেকে বের করে দাও। আহমদ, বায়হাকী।
জিযিয়ার পরিমাণঃ ইমাম আবু হানিফার অভিমত হচ্ছে- জিযিয়ার নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ নেই। জিযিয়া আদায়কারী এবং জিযিয়া প্রদাতা পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে জিযিয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করবে। রসুল স. দুই হাজার জোড়া কাপড় পরিশোধের শর্তে ইয়ামেনবাসীদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেছিলেন। হজরত ইবনে আব্বাস থেকে আবু দাউদ লিখেছেন, রসুল স. দুই হাজার জোড়া বস্ত্রের বিনিময়ে নাজরানবাসীদের সঙ্গে ‘যুদ্ধ নয়’ চুক্তি করেছিলেন। ওই চুক্তি অনুসারে নাজরানবাসীদেরকে সফর মাসের মধ্যে এক হাজার জোড়া এবং রজব মাসের মধ্যে এক হাজার জোড়া কাপড় দিতে হতো। ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর কিতাবুল আমওয়াল গ্রন্থে লিখেছেন, রসুল স. নাজরানবাসীদেরকে একটি লিখিত ফরমান দিয়েছিলেন যাতে লেখা ছিলো তারা বছরে দুই হাজার জোড়া কাপড় দিবে। প্রতি জোড়ার মূল্য হতে হবে এক আউকিয়া। ইবনে হুম্মাম লিখেছেন, কিতাবুল আমওয়ালের বিবরণ অনুসারে প্রতি জোড়া কাপড়ের দাম চল্লিশ দিরহাম হয়- পঞ্চাশ দিরহাম নয় (যেমন কেউ কেউ বলে থাকেন)।
এক জোড়া কাপড় অর্থ দু’টি কাপড়- তহবন্দ ও চাদর। ব্যক্তি ও ভূমি উভয়ের জন্য জিযিয়া হিসাবে কাপড় প্রদান করতে হতো। ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর কিতাবুল আমওয়ালে এ রকমই লিখেছেন। জমিনের জিযিয়া প্রতিষ্ঠিত…











ইবনে কাসীরঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
একই বিষয় আমরা দেখতে পারি তাফসীরে ইবনে কাসীরেও [13]
মুশরিক ব্যক্তির দেহ অপবিত্র নহে। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা আহলে কিতাব জাতিসমূহের খাদ্যকে মুসলমানদের জন্যে হালাল করিয়াছেন। জাহিরী সম্প্রদায়ের কেহ কেহ বলেন: মুশরিক ব্যক্তির দেহও অপবিত্র। হাসান বসরী হইতে আশআস বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন: মুশরিক ব্যক্তির সহিত কেহ করমর্দন করিলে সে যেন অযু করে। ইমাম ইব্ন জারীর (র) হাসান বসরী হইতে এই অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন।
وَإِنْ خِفْتُمْ عَيْلَةً فَسَوْفَ يُعْنِيكُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ
-আর যদি তোমরা অভাবে পড়িবার আশংকা কর, তবে আল্লাহ চাহেন তো তিনি স্বীয় রহমত দ্বারা তোমাদের অভাব দূর করিয়া দিবেন।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) বলেন: মসজিদুল-হারামে মুশরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষিত
হইবার পর একদল মুসলমান বলিল-ইহার ফলে আমাদের বাজারসমূহ অচল হইয়া যাইবে, আমাদের তিজারত ও ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হইয়া যাইবে এবং মুশরিকদের সহিত ব্যবসা বাণিজ্য করিয়া আমরা যাহা আয় করিয়া থাকি, তাহা হইতে আমরা বঞ্চিত হইব। এইরূপে আমাদের উপর অভাব ও অর্থ কষ্ট নামিয়া আসিবে। ইহাতে আল্লাহ্ তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করিলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ عَيْلَةَ فَسَوْفَ يُغْنِيكُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ، قَاتِلُوا الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ .
অর্থাৎ আর যদি তোমরা অভাবে পড়িবার আশংকা করো, তবে আল্লাহ্ চাহেন তো তিনি অন্য কোন পথে স্বীয় রহমত দ্বারা তোমাদের অভাব দূর করিয়া দিবেন। তিনি প্রজ্ঞাবান ও সূক্ষ্মজ্ঞানী। তিনি ভালরূপে জানেন কখন কাহাদের বিষয়ে কিরূপ বিধান প্রবর্তন করিতে হইবে। যাহারা আল্লাহর প্রতিও ঈমান আনে না আর আখিরাতের প্রতিও ঈমান আনে না, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল যাহাকে হারাম করিয়াছেন, তাহাকে হারাম বলিয়া বিশ্বাস করে না এবং সত্য দীনকে মানিয়া চলে না, সেই সকল কিতাবধারীর বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তাহারা নিজেদের লাঞ্ছিত অবস্থায় এবং তোমাদের বিজয়ী অবস্থায় জিযিয়া কর প্রদান করে।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা মুশরিকদিগকে ‘মসজিদুল হারাম’ এ প্রবেশ করিতে দিতে মু’মিনদিগকে নিষেধ করিবার কারণে তাহাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হইবার এবং উহার ফলে তাহাদের উপর অভাব নামিয়া আসিবার যে আশংকা ছিল, দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদিগকে কিতাবধারীদের নিকট হইতে জিযিয়া কর আদায় করিবার আদেশ দিবার মাধ্যমে সেই আশংকা দূর করিয়া দিয়াছেন। ইব্ন আব্বাস (রা), মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইব্ন জুবাইর, কাতাদা, যাহহাক প্রমুখ তাফসীরকার হইতে অনুরূপ তাফসীর বর্ণিত হইয়াছে।
إِنَّ اللَّهَ عَلَيْمٌ حَكِيمٌ অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্ সম্যক অবগত যে, কোন কাজে তোমরা সংশোধিত হইবে। সেই জন্যে তোমাদিগকে তিনি কোন কাজের আদেশ দিবেন আর কোন কাজ করিতে নিষেধ করিবেন তাহা নির্ধারণের ব্যাপারে তিনি প্রজ্ঞাময়। কারণ, তিনি তাঁহার কাজে ও কথায়
সর্বাধিক পারদর্শী ও পরিপক্ক এবং নিজ সৃষ্টি ও তাহাদের প্রতি নির্দেশনার ব্যাপারে তিনি শ্রেষ্ঠতম ইনসাফগার। তাই তিনি তাহাদের জিহাদের বিনিময় দিলেন বিজয় লাভ ও বিজিত জিম্মীদের নিকট হইতে জিযিয়া কর লাভের মাধ্যম।
e Road for a fat ice a rest قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالله পূর্ববর্তী নবীগণের প্রতি ঈমান রাখে। প্রকৃতপক্ষে তাহারা কোন নবীর প্রতিই ঈমান রাখে না। তাহাদের মধ্যে সত্যাগ্রহ ও সত্য-পিপাসার গুণ নাই। তাহাদের মধ্যে উক্ত গুণ থাকিলে তাহারা নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল-তাঁহার শ্রেষ্ঠতম রাসূল মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি ঈমান আনিত। তাহারা পূর্ববর্তী নবীগণের প্রতি ঈমান রাখে তাহাদের এই দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাহারা সত্যই যদি পূর্ববর্তী নবীগণের প্রতি ঈমান রাখিত, তবে তাহরা নবীকুল শিরোমণি মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা)-এর প্রতিও ঈমান আনিত; কারণ পূর্ববর্তী সকল নবীই তো মুহাম্মদ (সা)-এর আগমন সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী ব্যক্ত করিয়া গিয়াছেন। তদনুসারেও তাহারা মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা)-এর প্রতি ঈমান আনিতে আদিষ্ট হইয়াছে। বস্তুত কিতাবধারীগণ যদি পূর্ববর্তী নবীগণের শরীআতের কোন অংশকে মানিয়া চলে, তবে উহার কারণ এই নহে যে, তাহারা প্রকৃতই সংশ্লিষ্ট নবীর প্রতি ঈমান রাখে; বরং উহার কারণ এই যে, উহাকে মানিয়া চলিবার মধ্যে তাহাদের পৈত্রিক উত্তরাধিকার বা অনুরূপ কোন পার্থিব সুবিধা ও স্বার্থ নিহিত রহিয়াছে। এইরূপ অনুসরণ ঈমানের পরিচায়ক নহে; তাই, উহা তাহাদের কোন কাজেও আসিবে না।
আলোচ্য আয়াত দ্বারা একদল ফকীহ্ প্রমাণ করিয়া থাকেন যে, আহলে কিতাব জাতিসমূহ এবং তাহাদের অনুরূপ জাতি-যেমন: অগ্নি-উপাসক জাতি ছাড়া অন্য কোন জাতি হইতে জিযিয়া কর আদায় করা যাইবে না। অগ্নি-উপাসক জাতির নিকট হইতে এই কারণে জিযিয়া কর আদায় করা যাইবে যে, সহীহ হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে যে, নবী করীম (সা) হুজর )هجر( নামক এলাকার অগ্নি-উপাসকদের নিকট হইতে জিযিয়া কর আদায় করিয়াছিলেন। ইমাম শাফিঈ (র) এবং মশহুর রিওয়ায়েত অনুযায়ী ইমাম আহমদ (র) উপরোক্ত অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, অনারব প্রতিটি কাফির, সে আহলে কিতাব, মুশরিক যে কোন জাতির লোকই হউক না কেন, তাহাদের হইতে জিযিয়া কর আদায় করিতে হইবে। পক্ষান্তরে আরবের শুধু আহলে কিতাব জাতিসমূহের লোকদের নিকট হইতে জিযিয়া কর আদায় করিতে হইবে। ইমাম মালিক (র) বলেন, যে কোন কাফির-সে আহলে কিতাব, অগ্নি-উপাসক, মূর্তি-পূজক অথবা যে কোন জাতির লোকই হউক না কেন তাহার নিকট হইতে জিযিয়া কর আদায় করা যাইবে।
উপরোক্ত অভিমতসমূহের পক্ষের বিপক্ষের প্রমাণ আলোচনা করিবার স্থান ইহা নহে। সুতরাং এখানে উহা উল্লেখিত হইল না। আল্লাহই অধিকতর জ্ঞানের অধিকারী।
حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يُهِ وَهُمْ صَاغَرُونَ অর্থাৎ যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে
তাহারা যতক্ষণ না মুসলমানদের বিজয়ী অবস্থায় এবং নিজেদের লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অবদমিত অবস্থায় স্বহস্তে জিযিয়া প্রদান করিবে ….। উক্ত কারণেই কোন যিম্মীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা বা তাহাকে কোন ভাবে মুসলমানের ঊর্ধ্বে রাখা মুসলমানের জন্যে নিষিদ্ধ


ফতোয়ায়ে আলমগীরীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
এবারে আসুন ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত একটি ফতোয়া গ্রন্থ ফাতায়ায়ে আলমগীরী থেকে দেখি যে, অমুসলিম জিম্মি মহিলাদের গলায় লোহার শেকল এবং তাদের হেয়তা ও তুচ্ছতা প্রমাণের জন্য বাড়িতে কিছু আলামত রাখার বিধান ইসলাম রেখেছে কিনা। তথ্যগুলো সরাসরি বই থেকে জেনে নিই, [14]
৬৪২ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী
ভিত্তিতে হবে, না দুই বা তিন আলামতের ভিত্তিতে হবে এ বিষয়ে মাশায়িখে কিরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে । হাকিম আবূ মুহাম্মদ (র) বলেন, যদি খলীফাতুল মুসলিমীন তাদের সাথে সন্ধি করেন এবং এক আলামতের ভিত্তিতে তাদের যিম্মাদারী গ্রহণ করেন তাহলে এক্ষেত্রে আলামত একটিই থাকবে। বাড়ানো যাবে না। আর কোন দেশে বা শহর যদি জোর পূর্বক জয়যুক্ত হয় তাহলে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের ইখতিয়ার থাকবে তিনি যত ইচ্ছা পার্থক্য সূচক আলামত তাদের উপর অবধারিত করে দিতে পারবেন, এটিই সহীহ্ অভিমত। (মুহীত)
১১. মাসআলা : রাস্তায় চলাফেরা করা এবং গোসল খানায় প্রবেশ করার অবস্থার মধ্যে মুসলমান ও যিম্মী মহিলাদের মধ্যে পার্থক্য থাকা আবশ্যক। সুতরাং যিম্মী মহিলাদের গর্দানে লোহার শৃংখল লাগিয়ে দেওয়া হবে। মুসলমান মহিলাদের ইযার থেকে তাদের ইযার ভিন্নতর হতে হবে। তাদের বাড়ী ঘরে এমন কিছু আলামত থাকবে যার দ্বারা মুসলিম বাড়ী ও যিম্মা বাড়ীর মধ্যে পার্থক্য বুঝা যাবে। যাতে কোন যাঞ্চাকারী যিম্মী বাড়ীতে দাড়িয়ে তাদের জন্য মাগফিরাতের দু’আ না করে বসে। মোদ্দাকথা হচ্ছে, তাদের মধ্যে এমন কিছু আলামত বিদ্যমান থাকা চাই যাদ্বারা তাদের হেয়তা ও তুচ্ছতা প্রতীয়মান হয় যা প্রতিযুগ ও প্রতি শহরের লোকেরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে (ইখতিয়া শরহিল মুখতার)। যদি যিম্মী ব্যক্তি কোন মুসলমানের নিকট তাদের উপাসনালয়ের দিকে পথ দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বলে তবে মুসলমানের জন্য তাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না। কেননা এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার শামিল। যদি কোন মুসলমানের পিতা-মাতা যিম্মী হয় তবে তাদেরকে গীর্জায় নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তবে গীর্জা থেকে বাড়ীতে নিয়ে জাইয হবে (ফাতাওয়ায়ে কাযী খান)।যিম্মী লোকেরা প্রকাশ্যে হাতিয়ার বহন করে চলতে পারবে না। তারা রাস্তায় বের হলে মুসলমানগণ এমনভাবে একত্রিত হয়ে চলবে যেন তারা চলার জন্য রাস্তা না পায়। মুসলমানগণ তাদেরকে প্রথমে সালাম দিবে না। তবে তারা যদি মুসলমানদেরকে সালাম দেয় তাহলে তারা সালামের জবাব দিবে কিন্তু শুধুমাত্র “ওয়া-আলায়কুম” (Sleg) বলবে (ফাতহুল কাদীর)। যিম্মীদের গোলামদের প্রতি পৈতা বাধার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হবে না। এটিই পসন্দনীয় অভিমত। (আল ফাতাওয়াল কুবরা
১২. মাসআলা :খৃস্টান সম্প্রদায় মুসলমানদের শহরে নিজ বাড়ীতে শঙ্খ বাজাতে দেওয়া যাবে না। এমনিভাবে তাদের রীতি অনুসারে নামায আদায় করার জন্য লোকদেরকে সমবেত করার তাদের জন্য জাইয নেই। অবশ্য নিজে একা নামায আদায় করতে পারবে। তারা তাদের উপাসনালয় এবং গীর্জা থেকে ক্রশ (…..) ইত্যাদি বের করতে পারবে না। যদি তারা উচ্চকণ্ঠে যবূর এবং ইন্জীল তিলাওয়াত করে এবং এতে যদি শির্ক মিশ্রিত কথা থাকে তাহলে তাদেরকে তা করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু তদ্রূপ কিছু না থাকলে নিষেধ করা যাবে না। তবে মুসলমানদের বাজারে এসব কিছু তিলাওয়াত করতে পারবে না। ১. যেমন খলীফা তাদেরকে বললেন, তোমরা যিম্মী হিসাবে থাকবে, এ কথা আমরা মেনে নিলাম, তবে তোমােেদর ও আমাদের বেশ ভূষায় পার্থক্য থাকতে হবে। আর তা হল এই যে, তোমরা তোমাদের গলায় যুন্নার (পৈতা) বাঁধবে।

ইসলামি আইনশাস্ত্রে জিজিয়া কেবল একটি আর্থিক দণ্ড ছিল না, বরং এর সাথে যুক্ত ছিল অমুসলিম বা জিম্মিদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে একগুচ্ছ অবমাননাকর বিধিনিষেধ। ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রামাণ্য ফিকহ সংকলন ফতোয়ায়ে আলমগীরী (যা সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তৈরি হয়েছিল) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অমুসলিমদের ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন সব নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল যা তাদের প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করত। এই বিধানগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল অমুসলিমদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রজা’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তাদের মধ্যে এক প্রকার স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতা তৈরি করা।
অমুসলিম মহিলাদের জন্য অবমাননাকর পোশাক ও শৃঙ্খল
ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অমুসলিম জিম্মি মহিলাদের পোশাক মুসলিম মহিলাদের থেকে আলাদা হতে হবে। এমনকি জনসমক্ষে বা গোসলখানায় প্রবেশের সময় তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে এবং তাদের হেয়তা প্রমাণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। আলমগীরীর বর্ণনামতে:
“রাস্তায় চলাফেরা করা এবং গোসলখানায় প্রবেশ করার অবস্থার মধ্যে মুসলমান ও জিম্মি মহিলাদের মধ্যে পার্থক্য থাকা আবশ্যক। সুতরাং জিম্মি মহিলাদের গর্দানে লোহার শৃঙ্খল লাগিয়ে দেওয়া হবে।” [15]।
এই লোহার শৃঙ্খল বা বিশেষ আলামত পরিধানের উদ্দেশ্য ছিল অমুসলিম মহিলাদের সম্মানহানি করা এবং তাদের সামাজিক অবস্থানকে নিচু করে দেখানো।
বাড়িঘরে পৃথক আলামত ও সামাজিক বৈষম্য
কেবল পোশাক নয়, অমুসলিমদের বাসস্থানেও বিশেষ চিহ্ন রাখার বিধান ছিল। আলমগীরীর মাসআলা অনুযায়ী, জিম্মিদের বাড়িঘরে এমন কিছু আলামত বা চিহ্ন থাকতে হবে যা দেখে মুসলিমদের বাড়ি থেকে তা আলাদা করা যায়। এর পেছনে একটি অদ্ভুত যুক্তি কাজ করত—যেন কোনো যাঞ্চাকারী বা ভিখারি ভুল করে অমুসলিমদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য মাগফিরাত বা ক্ষমার দোয়া না করে বসে। মোদ্দাকথা ছিল, সমাজের প্রতিটি স্তরে তাদের ‘তুচ্ছতা’ প্রতীয়মান করা।
প্রকাশ্য চলাফেরা ও সম্বোধনে বিধিনিষেধ
রাস্তাঘাটে চলাফেরার ক্ষেত্রেও জিম্মিদের জন্য ছিল অবমাননাকর নিয়ম। ফতোয়ায়ে আলমগীরী এবং ফাতহুল কাদীর-এর মতো গ্রন্থে বলা হয়েছে:
- রাস্তায় বশ্যতা: জিম্মিরা প্রকাশ্য কোনো হাতিয়ার বহন করতে পারবে না। মুসলমানরা রাস্তায় বের হলে তারা এমনভাবে দলবদ্ধ হয়ে চলবে যেন জিম্মিরা চলার জন্য যথেষ্ট জায়গা না পায় এবং তারা রাস্তার এক পাশ দিয়ে কুঁকড়ে চলতে বাধ্য হয়।
- সালামের উত্তর: মুসলমানরা জিম্মিদের প্রথমে সালাম দেবে না। যদি কোনো জিম্মি সালাম দেয়, তবে উত্তর হবে সংক্ষিপ্ত ও নিরুত্তাপ—কেবল “ওয়া-আলায়কুম” (তোমাদের ওপরও)।
ধর্মীয় আচার ও শঙ্খ ধ্বনিতে বাধা
অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করার অধিকারকেও অত্যন্ত সংকুচিত করা হয়েছিল। ফিকহী বিধান অনুযায়ী:
- খ্রিস্টান বা অমুসলিমরা মুসলমানদের শহরে নিজ বাড়িতে শঙ্খ (Bells) বাজাতে পারবে না।
- নামাজের জন্য বা ধর্মীয় জমায়েতের জন্য তারা উচ্চকণ্ঠে ডাক দিতে পারবে না।
- বাজার বা জনসমক্ষে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ (যেমন বাইবেল বা বেদ) উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করতে পারবে না, বিশেষ করে যদি তাতে মুসলিম বিশ্বাসের বিরোধী কিছু থাকে।
- তারা তাদের উপাসনালয় থেকে ক্রুশ বা অনুরূপ কোনো ধর্মীয় প্রতীক প্রকাশ্যে বের করতে পারবে না। [16]।
এই সামগ্রিক বিধিনিষেধগুলো প্রমাণ করে যে, জিজিয়া ব্যবস্থার মূল দর্শন ছিল অমুসলিমদের ওপর এক প্রকার ‘সামাজিক বর্ণবাদ’ (Social Segregation) চাপিয়ে দেওয়া। তাদের কেবল অর্থনৈতিকভাবে দণ্ড দেওয়া হয়নি, বরং তাদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় আলামত এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে পদদলিত করা হয়েছিল। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মূল লক্ষ্যই ছিল অমুসলিমদের মধ্যে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে—তাদের এই অপমানজনক জীবন থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ইসলাম গ্রহণ করা।
উমরের আমলে অবমাননাকর জিজিয়া
এবারে আসুন উমরের আমলের একটি ঘটনা পড়ে নিই, যেখানে দেখা যাচ্ছে, উমর কীভাবে খ্রিস্টানদের অপমান করতো এবং অপমানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করছে [17]
তিনি সায়ফ ইবন উমরের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, এই বছর জাযীরা বিজিত হয়েছে। ইবন ইসহাক বলেন, এই বিজয় এসেছে ১৯ হিজরী সালে। জাযীরা জয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন ইয়ায ইব্ন গানাম । তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন হযরত আবূ মূসা আশ’আরী (রা) এবং উমর ইব্ন সা’দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস। ইনি ছিলেন অল্পবয়সী বালক। যুদ্ধের কোন বড় দায়িত্ব তাঁর হাতে ছিল না। তাঁদের সাথে ছিলেন উসমান ইব্ন আবুল আস। তাঁরা ‘রাহা’ নামক স্থানে গিয়ে শিবির স্থাপন করেন। সেখানকার লোক জিয়া কর প্রদানের শর্তে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করে। ‘হাররান’ শহরের লোকেরাও একই শর্তে সন্ধি করে। এরপর আবূ মূসা আশ’আরী (রা)-কে প্রেরণ করা হয় নসীবীনের উদ্দেশ্যে। উমর ইব্ন সা’দকে প্রেরণ করা হয় ‘রাসুল ‘আয়ন’-এর উদ্দেশ্যে। আর ইয়ায ইব্ন গানাম নিজে যাত্রা করেন ‘দারা’ অঞ্চলের উদ্দেশ্যে । এসব শহর তাঁরা জয় করে নেন। উসমান ইব্ন আবিল ‘আসকে পাঠানো হয় আরমিনিয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানে সামান্য যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে সাফওয়ান ইব্ন মুআত্তাল সুলামী শহীদ হন। এরপর জিয়া কর প্রদানের শর্তে তারা উসমান ইব্ন আবিল ‘আসের সাথে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করে। সমঝোতা হয় যে, প্রতি পরিবার এক দীনার বা স্বর্ণমুদ্রা করে জিয়া কর পরিশোধ করবে।
সায়ফ বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন গাস্সান যাত্রা করে মুসেল পৌঁছেন । তারপর যেতে যেতে নসীবীন পর্যন্ত অগ্রসর হন। সেখানকার অধিবাসিগণ সন্ধি স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। অতঃপর ‘রিকা’ অধিবাসিগণ যে শর্তে সন্ধি স্থাপন করেছে তারাও সেই শর্তে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করে। তিনি জাযীরার নেতৃস্থানীয় আরব খ্রিস্টানদেরকে মদীনায় খলীফা উমর (রা)-এর নিকট পাঠিয়ে দেন। খলীফা উমর (রা) ওদেরকে বললেন, তোমরা জিয়া কর প্রদান কর। ওরা বলল, না, আপনি বরং আমাদেরকে আমাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দিন। আপনি যদি আমাদের উপর জিয়া কর ধার্য করেন তাহলে আমরা রোম দেশে চলে যাব, ওদের সাথে মিলিত হব। আরব হিসেবে আমাদেরকে অপমান করা হচ্ছে। হযরত উমর (রা) বললেন, “ইসলাম গ্রহণ না করে তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে অপমানিত করেছ, তোমাদের মূলনীতির উল্টো কাজ করেছ। এখন তোমরা অবশ্যই নত হয়ে জিয়া কর প্রদান করবে। আর যদি তোমরা রোম দেশে পালিয়ে যাও তাহলে তোমাদেরকে ধরে আনার জন্যে আমি সেনা অভিযান প্রেরণ করব । তারপর তোমাদের বন্দী করে নিয়ে আসব।’ তারা বলল, ‘তবে আপনি আমাদের থেকে কিছু অর্থ সম্পদ গ্রহণ করবেন কিন্তু তা ‘জিযয়া কর’ নামে নয়। খলীফা বললেন, “আমরা জিয়া কর’ নামেই তা গ্রহণ করব, তোমরা দেয়ার সময় যে নামেই দাও না কেন ?” তখন হযরত আলী ইব্ন আবী তালিব (রা) বললেন, “হযরত সা’দ (রা) কি তাদের উপর দ্বিগুণ সাদকা ধার্য করেন নি?” খলীফা বললেন, হ্যাঁ, তাইতো, তারপর হযরত আলী (রা)-এর বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনলেন এবং আরব খ্রিস্টানদের প্রস্তাব মেনে নিলেন।
ইবন জারীর (র) বলেন, এই বছর অর্থাৎ ১৭ হিজরী সালে হযরত উমর (রা) সিরিয়া আগমন করেছিলেন। তিনি সারা এসে পৌঁছেন। মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক তাই বলেছেন। সায়ফ ইবন উমর বলেছেন যে, খলীফা জাবিয়া এসে পৌঁছেন। আমি বলি, প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে তিনি ১. ওয়াকিদীর মতে তাঁর নাম ছিল উমায়র ইব্ন সা’দ ইবন উবায়দ।

উপসংহারঃ জিজিয়া—পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের হাতিয়ার
সামগ্রিক বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, জিজিয়া কেবল একটি সেকেলে কর ব্যবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল অমুসলিমদের ওপর আরোপিত এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দণ্ডনীতি। এর সবচাইতে ভয়াবহ দিক ছিল হারের অনিশ্চয়তা। যাকাতের মতো কোনো ঐশী বা অপরিবর্তনীয় সীমা নির্ধারিত না থাকায়, জিজিয়া আদায় প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে শাসকের ব্যক্তিগত মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে মুসলিম শাসকরা যখনই অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন কিংবা কোনো বিশেষ জনপদকে পদানত করতে চেয়েছেন, তখনই জিজিয়াকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হারের এই অনিশ্চয়তা অমুসলিম প্রজাদের জীবনে এমন এক ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল, যেখানে তারা জানত না যে পরের বছর তাদের ওপর কত বড় আর্থিক বোঝা চেপে বসবে। এটি কেবল তাদের সম্পদ হরণ করেনি, বরং তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
ভারতের ইতিহাসে জিজিয়ার প্রভাব ছিল আরও বিধ্বংসী। এ অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রজাদের ওপর জিজিয়ার অমানবিক প্রয়োগ কেবল তাদের দরিদ্র করেনি, বরং তাদের আত্মমর্যাদাকে সমূলে উৎপাটন করার চেষ্টা করেছিল। ফিকহ শাস্ত্রের অবমাননাকর বিধানগুলো—যেমন গলায় লোহার শৃঙ্খল পরা, রাস্তায় মাথা নিচু করে চলা কিংবা ধর্মীয় প্রতীক প্রকাশে বাধা—প্রমাণ করে যে, জিজিয়ার মূল লক্ষ্য কেবল রাজস্ব সংগ্রহ ছিল না। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল অমুসলিমদের মনে এক প্রকার স্থায়ী হীনম্মন্যতা ও অপরাধবোধ তৈরি করা। এই ব্যবস্থার আড়ালে কাজ করত এক মনস্তাত্ত্বিক প্রকৌশল, যার উদ্দেশ্য ছিল অমুসলিমদের জীবনকে এতটাই দুর্বিষহ করে তোলা যাতে তারা এই লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে স্বেচ্ছায় কিংবা বাধ্য হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করে।
পরিশেষে বলা যায়, জিজিয়া ব্যবস্থাটি আধুনিক মানবাধিকার এবং নাগরিক সাম্যের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এটি একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে প্রজাদের বিভাজিত করে এক পক্ষকে ‘বিজয়ী’ এবং অন্য পক্ষকে ‘লাঞ্ছিত’ হিসেবে চিহ্নিত করত। জিজিয়া আদায়ের প্রতিটি মুদ্রার সাথে মিশে থাকত একজন অমুসলিমের সম্মানহানি এবং চরম সামাজিক বৈষম্যের গ্লানি। ঐতিহাসিক দলিল এবং ফিকহী ভাষ্যগুলো একবাক্যে স্বীকার করে যে, এই কর ব্যবস্থাটি ছিল একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রান্তিকীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক হাতিয়ার। জিজিয়ার এই ইতিহাস কেবল একটি কর ব্যবস্থার বিবরণ নয়, বরং এটি অমুসলিমদের ওপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চালানো এক পদ্ধতিগত নিপীড়নের জীবন্ত দলিল।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৬৫২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৫৩৩ ↩︎
- শরীয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমদের ধর্মপ্রচার – উপাসনালয় নির্মান নিষিদ্ধ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৫৩ ↩︎
- সহিহ বুখারী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২৮ ↩︎
- সূরা আত তওবার তাফসীর, ইবনে কাসীর, সম্পাদনাঃ ড. মুহাম্মদ আবু বকর যাকারিয়া, ইসলাম হাউজ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৪৯ ↩︎
- আল-উম্ম, ইমাম শাফিঈ; আল-হিদায়া, খণ্ড ২ ↩︎
- ইবনে সাদ, কিতাব আল-তবকাত আল-কুবরা, খণ্ড ৩; সহিহ বুখারি ↩︎
- জিয়াউদ্দিন বারানি, তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী; অনুবাদ: গোলাম সামদানী কোরায়শী , বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ২৩৬ – ২৩৯ ↩︎
- খাফি খান, মুন্তাখাব-উল-লুবাব; স্ট্যানলি লেন-পুল, আওরঙ্গজেব ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭৬-৪৯২ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯১-৩০১ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৪-৫৬৫ ↩︎
- ফাতায়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪২ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪২ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, প্রাগুক্ত ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১৪৩ ↩︎
