
Table of Contents
ভূমিকা
মানুষের ধর্মীয় আদি-কল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মহাজাগতিক স্থানিক বিন্যাস বা ‘Cosmic Mapping’। প্রায় প্রতিটি প্রাচীন ধর্মতত্ত্বেই নৈতিকতাকে একটি ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে—যেখানে পুণ্য বা স্বর্গ থাকে উচ্চে (আকাশে), আর পাপ বা নরক থাকে নিম্নে (পৃথিবীর গভীরে)। ইসলামী শাস্ত্রীয় বর্ণনা ও হাদিস-ভিত্তিক ব্যাখ্যাগুলোতে এই ‘নিচে’ থাকার ধারণাটি কেবল রূপক হিসেবে থাকেনি, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ভূ-তাত্ত্বিক দাবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে পাপিষ্ঠদের আমলনামা সংরক্ষণের স্থান ‘সিজ্জিন’ এবং খোদ ‘জাহান্নাম’-কে “সপ্তম জমিনেরও নিচে” বা “জমিনের সর্বনিম্নে” অবস্থিত বলে অভিহিত করা হয়।
এই অবস্থানগত দাবিটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের জন্ম দেয়। একদিকে রয়েছে মধ্যযুগীয় বা প্রাচীন স্তরীভূত বিশ্ব-ধারণা (Layered Worldview), যা পৃথিবীকে একটি অসীম গভীর বা বহুতল বিশিষ্ট মঞ্চ হিসেবে কল্পনা করত। অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূ-তত্ত্ব, যা পৃথিবীকে মহাকাশে ভাসমান একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের গোলক হিসেবে প্রমাণ করেছে। যখন জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা বা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় জাহান্নামকে আক্ষরিক অর্থেই “মাটির নিচে” স্থাপন করা হয়, তখন তা কেবল বিশ্বাসের বিষয় থাকে না—তা বিজ্ঞানের পরীক্ষিত বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব, কেন এই “পৃথিবীর নিচে জাহান্নাম” ধারণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে একটি বড় ধরণের ভৌগোলিক ও যৌক্তিক অসামঞ্জস্যতা এবং কীভাবে প্রাচীন বিশ্ব-চেতনা এই ধরণের স্থানিক উপকথা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।
কেন মানুষ উপকথা তৈরি করে?
সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জানা ছিল, মাটির অভ্যন্তরের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি। বিশেষভাবে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এবং লাভা সম্পর্কে প্রাচীনকালের মানুষের ধারণা ছিল। সেখান থেকেই আসলে প্রাচীন ধর্মগুলোতে পাতাললোকের উপকথাগুলো প্রচলিত হয়, যা নাকি অত্যন্ত উত্তপ্ত। মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো অজানা বিষয়ের একটি কারণ খুঁজে বের করা, আর তা কোনভাবেই বোঝা সম্ভব না হলে কল্পনা দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা। যখন প্রাচীনকালে মানুষের কাছে বিজ্ঞান বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না, তখন তারা প্রাকৃতিক বা জৈবিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য মানুষের আবেগ (রাগ, অভিশাপ, বিশ্বাসঘাতকতা) বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ব্যবহার করত। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Anthropomorphism’ বা প্রকৃতিকে মানুষের রূপ দান করা।
মানুষের মস্তিষ্ক সবসময় একটি প্যাটার্ন খোঁজে। যখন তারা দেখত হঠাৎ মেঘ ডাকছে বা সূর্য অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা এর পেছনে কোনো ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘শাস্তি’ খুঁজত। এই ধরণের উপকথাগুলো আসলে মানুষের আদিম কৌতূহল এবং ভয়ের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। নিচে বিভিন্ন সংস্কৃতির কিছু চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হলো:
সাত জমিনের নিচে ‘সিজ্জিন’ ধারণা
হাদিসে কুদসি হিসেবে প্রচলিত দীর্ঘ বর্ণনায়—বিশেষত বারা ইবনু আযেব (রা.)-এর সূত্রে—মৃত্যুর পর পাপিষ্ঠ/কাফের ব্যক্তির রূহকে আসমানে তোলা হলে তার জন্য আসমানের দরজা খোলা হয় না; এরপর নির্দেশ আসে: “তার আমলনামা জমিনের সর্বনিম্নে সিজ্জিনে লিখে রাখো।” এই বাক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে “সিজ্জিন” শুধু নৈতিক প্রতীক নয়—একটি ‘লোকেশন’ হিসেবে কাজ করছে, এবং সেটিও “জমিনের সর্বনিম্ন” স্তর হিসেবে উপস্থাপিত।
বহু আলেম ও ব্যাখ্যাকার (সালাফি ধারার বহু আলোচনায়ও) ‘ইল্লিয়্যিন বনাম সিজ্জিন’কে এক ধরনের উল্টো-সমান্তরাল মানচিত্রে সাজান: ইল্লিয়্যিন যদি সপ্তম আসমানের ‘উপরে’, তবে সিজ্জিন হবে সপ্তম জমিনের ‘নিচে’। এই তুলনামূলক কাঠামো থেকে প্রাপ্ত ইঙ্গিত হলো—জাহান্নাম/সিজ্জিনকে কোনো দূর গ্রহ বা ভিন্ন মহাবিশ্বে না রেখে, পৃথিবীকেন্দ্রিক “নিচে-পাথাল” ধারণার মধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখানে শাস্তি-লোকের ধারণা আধুনিক ‘কসমিক স্কেল’-এ নয়, বরং প্রাচীন ‘স্তরভিত্তিক পৃথিবী-ভূগোল’-এ বাঁধা।
হাদিসে কুদসির বর্ণনা
উল্লেখিত দীর্ঘ হাদিসটি সাধারণত “রূহ বের হওয়া, কবরের প্রশ্ন, এবং মুমিন-কাফেরের পরিণতি”—এই কাঠামোয় পড়ানো হয়। তবে এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো: বর্ণনাটি শুধু নৈতিক শিক্ষা দেয় না; একই সঙ্গে একটি কসমোলজিক্যাল ‘ডিরেকশন’ স্থির করে দেয়—মুমিনের দফতর ‘উপরে’ (ইল্লিয়্যিন), আর পাপিষ্ঠের দফতর ‘নিচে’ (সিজ্জিন)। এই উপর-নিচ বাইনারি প্রাচীন বিশ্বচিন্তায় খুবই পরিচিত: “উচ্চে পবিত্র/আলো”, “নিচে অন্ধকার/শাস্তি”—এটি নৈতিকতার ভাষা হলেও একইসাথে স্থান-ধারণার ভাষাও।
এই বর্ণনার ভেতরে “আসমানের দরজা খোলা/না খোলা”, “উর্ধ্বারোহণ”, “নিক্ষেপ”—এসব ক্রিয়া-শব্দও একই দিক-ধারণাকে পুনর্ব্যক্ত করে। ফলে, “সিজ্জিনে লিখে রাখো”—এখানে সিজ্জিন কেবল ‘রেকর্ডের নাম’ নয়; বরং ‘রেকর্ড রাখার নির্দিষ্ট জায়গা’ও বোঝায়—যা “জমিনের সর্বনিম্নে” অবস্থিত বলে দাবি করা হচ্ছে।
সহীহ হাদিসে কুদসি
১/ বিবিধ হাদিসসমূহ
পরিচ্ছেদঃ মুমূর্ষু হালত, রুহ বের হওয়া ও জীবন সায়ান্নে মুসলিম-কাফিরের অবস্থার বর্ণনাসহ মহান হাদিস
৬৬. বারা ইবনু আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জনৈক আনসারির জানাজায় বের হলাম, আমরা তার কবরে পৌঁছলাম, তখনো কবর খোঁড়া হয়নি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবসলেন আমরা তার চারপাশে বসলাম, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে, তার হাতে একটি লাকড়ি ছিল তিনি মাটি খুড়তে ছিলেন, অতঃপর মাথা উঠিয়ে বললেন: “তোমরা আল্লাহর নিকট কবরের আযাব থেকে পানাহ চাও, দুইবার অথবা তিনবার (বললেন)”। অতঃপর বললেন: “নিশ্চয় মুমিন বান্দা যখন দুনিয়া প্রস্থান ও আখেরাতে পা রাখার সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয় তার নিকট আসমান থেকে সাদা চেহারার ফেরেশতাগণ অবতরণ করেন, যেন তাদের চেহারা সূর্য। তাদের সাথে জান্নাতের কাফন ও জান্নাতের সুগন্ধি থাকে, অবশেষে তারা তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মালাকুল মউত আলাইহিস সালাম এসে তার মাথার নিকট বসেন, তিনি বলেন: হে পবিত্র রুহ তুমি আল্লাহর মাগফেরাত ও সন্তুষ্টির প্রতি বের হও”। তিনি বললেন: “ফলে রুহ বের হয় যেমন মটকা/কলসি থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। তিনি তা গ্রহণ করেন, যখন গ্রহণ করেন চোখের পলক পরিমাণ তিনি নিজ হাতে না রেখে তৎক্ষণাৎ তা সঙ্গে নিয়ে আসা কাফন ও সুগন্ধির মধ্যে রাখেন, তার থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘ্রাণ বের হয় যা দুনিয়াতে পাওয়া যায়”। তিনি বললেন: “অতঃপর তাকে নিয়ে তারা ওপরে ওঠে, তারা যখনই অতিক্রম করে তাকে সহ ফেরেশতাদের কোন দলের কাছ দিয়ে তখনই তারা বলে, এ পবিত্র রুহ কে? তারা বলে: অমুকের সন্তান অমুক, সবচেয়ে সুন্দর নামে ডাকে যে নামে দুনিয়াতে তাকে ডাকা হত, তাকে নিয়ে তারা দুনিয়ার আসমানে পৌঁছে, তার জন্য তারা আসমানের দরজা খোলার অনুরোধ করেন, তাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হয়, তাকে প্রত্যেক আসমানের নিকটবর্তীরা পরবর্তী আসমানে অভ্যর্থনা জানিয়ে পৌঁছে দেয়, এভাবে তাকে সপ্তম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়, অতঃপর আল্লাহ বলেন: আমার বান্দার দফতর ইল্লিয়্যিনে লিখ এবং তাকে জমিনে ফিরিয়ে দাও, কারণ আমি তা (মাটি) থেকে তাদেরকে সৃষ্টি করেছি, সেখানে তাদেরকে ফেরৎ দেব এবং সেখান থেকেই তাদেরকে পুনরায় উঠাব”। তিনি বলেন: “অতঃপর তার রুহ তার শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হয়, এরপর তার নিকট দু’জন ফেরেশতা আসবে, তারা তাকে বসাবে অতঃপর বলবে: তোমার রব কে? সে বলবে: আল্লাহ। অতঃপর তারা বলবে: তোমার দ্বীন কি? সে বলবে: আমার দ্বীন ইসলাম। অতঃপর বলবে: এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলবে: তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতঃপর তারা বলবে: কিভাবে জানলে? সে বলবে: আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, তাতে ঈমান এনেছি ও তা সত্য জ্ঞান করেছি। অতঃপর এক ঘোষণাকারী আসমানে ঘোষণা দিবে: আমার বান্দা সত্য বলেছে, অতএব তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও, তাকে জান্নাতের পোশাক পরিধান করাও এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। তিনি বলেন: ফলে তার কাছে জান্নাতের সুঘ্রাণ ও সুগন্ধি আসবে, তার জন্য তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত তার কবর প্রশস্ত করে দেয়া হবে। তিনি বলেন: তার নিকট সুদর্শন চেহারা, সুন্দর পোশাক ও সুঘ্রাণসহ এক ব্যক্তি আসবে, অতঃপর বলবে: সুসংবাদ গ্রহণ কর যা তোমাকে সন্তুষ্ট করবে তার, এটা তোমার সেদিন যার ওয়াদা করা হত। সে তাকে বলবে: তুমি কে, তোমার এমন চেহারা যে শুধু কল্যাণই নিয়ে আসে? সে বলবে: আমি তোমার নেক আমল। সে বলবে: হে আমার রব, কিয়ামত কায়েম করুন, যেন আমি আমার পরিবার ও সম্পদের কাছে ফিরে যেতে পারি”। তিনি বলেন: “আর কাফের বান্দা যখন দুনিয়া থেকে প্রস্থান ও আখেরাতে যাত্রার সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়, তার নিকট আসমান থেকে কালো চেহারার ফেরেশতারা অবতরণ করে, তাদের সাথে থাকে ’মুসুহ’ (মোটা-পুরু কাপড়), অতঃপর তারা তার নিকট বসে তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত, অতঃপর মালাকুল মউত আসেন ও তার মাথার কাছে বসেন। অতঃপর বলেন: হে খবিস নফস, আল্লাহর গোস্বা ও গজবের জন্য বের হও। তিনি বলেন: ফলে সে তার শরীরে ছড়িয়ে যায়, অতঃপর সে তাকে টেনে বের করে যেমন ভেজা উল থেকে (লোহার) সিক বের করা হয়[1], অতঃপর সে তা গ্রহণ করে, আর যখন সে তা গ্রহণ করে চোখের পলকের মুহূর্ত হাতে না রেখে ফেরেশতারা তা ঐ ’মোটা-পুরু কাপড়ে রাখে, তার থেকে মৃত দেহের যত কঠিন দুর্গন্ধ দুনিয়াতে হতে পারে সে রকমের দুর্গন্ধ বের হয়। অতঃপর তাকে নিয়ে তারা ওপরে উঠে, তাকেসহ তারা যখনই ফেরেশতাদের কোন দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখনই তারা বলে, এ খবিস রুহ কে? তারা বলে: অমুকের সন্তান অমুক, সবচেয়ে নিকৃষ্ট নাম ধরে যার মাধ্যমে তাকে দুনিয়াতে ডাকা হত, এভাবে তাকে নিয়ে দুনিয়ার আসমানে যাওয়া হয়, তার জন্য দরজা খুলতে বলা হয়, কিন্তু তার জন্য দরজা খোলা হবে না”। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামতিলাওয়াত করেন:
﴿لَا تُفَتَّحُ لَهُمۡ أَبۡوَٰبُ ٱلسَّمَآءِ وَلَا يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ ٱلۡجَمَلُ فِي سَمِّ ٱلۡخِيَاطِۚ ٤٠﴾ [الاعراف: ٤٠]
“তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে”।[2] অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন: তার আমলনামা জমিনে সর্বনিম্নে সিজ্জিনে লিখ, অতঃপর তার রুহ সজোরে নিক্ষেপ করা হয়। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন:
﴿وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ ٱلسَّمَآءِ فَتَخۡطَفُهُ ٱلطَّيۡرُ أَوۡ تَهۡوِي بِهِ ٱلرِّيحُ فِي مَكَانٖ سَحِيقٖ ٣١﴾ [الحج : ٣١]
“আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিম্বা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল”।[3] তার রুহ তার শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হয়, অতঃপর তার নিকট দু’জন ফেরেশতা আসে ও তাকে বসায়, তারা তাকে জিজ্ঞাসা করে: তোমার রব কে? সে বলে: হা হা আমি জানি না। অতঃপর তারা বলে: তোমার দ্বীন কি? সে বলে: হা হা আমি জানি না। অতঃপর তারা বলে: এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছিল? সে বলে: হা হা আমি জানি না, অতঃপর আসমান থেকে এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে যে, সে মিথ্যা বলেছে, তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও, তার দরজা জাহান্নামের দিকে খুলে দাও, ফলে তার নিকট তার তাপ ও বিষ আসবে এবং তার ওপর তার কবর সংকীর্ণ করা হবে যে, তার পাঁজরের হাড় একটির মধ্যে অপরটি ঢুকে যাবে। অতঃপর তার নিকট বীভৎস চেহারা, খারাপ পোশাক ও দুর্গন্ধসহ এক ব্যক্তি আসবে, সে তাকে বলবে: তুমি সুসংবাদ গ্রহণ কর, যা তোমাকে দুঃখ দিবে, এ হচ্ছে তোমার সে দিন যার ওয়াদা করা হত। সে বলবে: তুমি কে, তোমার এমন চেহারা যে কেবল অনিষ্টই নিয়ে আসে? সে বলবে: আমি তোমার খবিস আমল। সে বলবে: হে রব কিয়ামত কায়েম কর না”। [আহমদ ও আবূ দাউদ] হাদিসটি সহিহ।
[1] কারণ ভেজা উল সাধারণত: লোহার সাথে লেগে থাকে। তখন তা ছাড়িয়ে নেয়া কষ্টকর হয়। [সম্পাদক]
[2] সূরা আরাফ: (৪০)
[3] সূরা হজ: (৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মতিউর রহমান মাদানির বক্তব্য
ওয়াজ/ব্যাখ্যায় (যেমন মতিউর রহমান মাদানির আলোচনায়) জাহান্নামকে “মাটির নিচে” হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা যায়। এই ধরনের বক্তৃতা ধর্মীয় বর্ণনাকে আক্ষরিক ভূগোলের সাথে জুড়ে দেয়—যেন ‘জাহান্নাম’ কোনো বিমূর্ত নৈতিক-অবস্থা নয়, বরং পৃথিবীর তলদেশে অবস্থিত বাস্তব শাস্তি-কারাগার। এতে সাধারণ শ্রোতার কাছে ধারণাটি আরও “কংক্রিট” হয়, কিন্তু একই সাথে এটি বৈজ্ঞানিক ও ভৌত বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষের ক্ষেত্রও তৈরি করে। আসুন একটি ওয়াজ শুনি,
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূ-তত্ত্বের সাথে সংঘর্ষ
আধুনিক ভূ-তত্ত্ব পৃথিবীর অভ্যন্তরকে “ফাঁকা পাতাল” হিসেবে দেখে না; বরং এটি স্তরভিত্তিক ঘন পদার্থের এক জটিল কাঠামো: ভূত্বক (Crust), ম্যান্টেল (Mantle), এবং কেন্দ্রে কোর (Core)—যেখানে তাপমাত্রা, চাপ ও পদার্থের অবস্থা (কঠিন/তরল) অত্যন্ত চরম। পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭০ কিলোমিটার—এটি কোনো অসীম গভীর খাদ নয়, সীমিত পরিসরের এক গোলক। আর জ্যোতির্বিজ্ঞান দেখায়—পৃথিবী মহাকাশে ভাসমান অসংখ্য জ্যোতিষ্কের মধ্যে একটি; এখানে “উপর/নিচ” কোনো সার্বজনীন দিক নয়, বরং পর্যবেক্ষকের অবস্থানভিত্তিক আপেক্ষিক নির্দেশ।
এই প্রেক্ষিতে “জাহান্নাম পৃথিবীর নিচে” ধারণা ধরে নিলে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে:
যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি: ধারণার উৎস কোথায়
সংশয়বাদী/যুক্তিবাদী পাঠে এই বর্ণনাগুলোকে দেখা হয় একটি ঐতিহাসিক জ্ঞান-কাঠামোর ভেতর থেকে: প্রাচীন মানুষের কাছে আকাশ ছিল “উপরের ছাদ”, পৃথিবী ছিল “নিচের মঞ্চ”, এবং “নিচে” ছিল অন্ধকার পাতাল—যেখানে ভয়, শাস্তি ও অজানা জগত কল্পনা করা হতো। ফলে ‘উপরে পুরস্কার’ এবং ‘নিচে শাস্তি’—এটি ধর্মীয় নৈতিকতার সাথে জড়ালেও, একই সাথে সে যুগের সীমিত মহাবিশ্ব-চিন্তার স্বাভাবিক উপজাত।
কিন্তু আধুনিক কসমোলজি—গোলকীয় পৃথিবী, আপেক্ষিক দিক-ধারণা, এবং মহাবিশ্বের বিশাল স্কেল—এই কাঠামোকে ভেঙে দেয়। তাই একই বর্ণনাকে আজ আক্ষরিক ভূগোল হিসেবে ধরে রাখতে গেলে তা বিজ্ঞানভিত্তিক বাস্তবতার সাথে দ্বন্দ্বে পড়ে; আর যদি প্রতীকী/রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে আবার প্রশ্ন আসে—প্রাথমিক বর্ণনায় কেন এত “লোকেশনাল ভাষা” (জমিনের সর্বনিম্ন, দরজা খোলা, উর্ধ্বারোহণ, নিক্ষেপ) ব্যবহৃত হচ্ছে?
উপসংহার
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাহান্নাম বা সিজ্জিনকে আক্ষরিক অর্থেই “সপ্তম জমিনের নিচে” বা “পৃথিবীর অভ্যন্তরে” স্থাপন করার দাবিটি একটি প্রাক-আধুনিক বিশ্ব-চেতনার প্রতিফলন। প্রাচীন মানুষের কাছে পৃথিবী ছিল স্থির এবং মহাবিশ্বের ভিত্তি; তাই তাদের পক্ষে ‘নিচে’ বলতে পৃথিবীর গভীরতাকে কল্পনা করা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণ—যেমন পৃথিবীর গোলকীয় আকৃতি, মহাকাশে এর আপেক্ষিক অবস্থান এবং অভ্যন্তরের কঠিন ও তরল ধাতব স্তরের বিন্যাস—এই প্রাচীন মানচিত্রকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়।
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ যেহেতু মাত্র , তাই এখানে অসীম কোনো ‘নিচ’ বা ‘পাতাল’ থাকার ভৌত অবকাশ নেই। তাছাড়া, মহাজাগতিক স্কেলে ‘অ্যাবসলিউট ডাউন’ বা ধ্রুব কোনো নিম্নমুখী দিক না থাকায়, পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের জন্য যা ‘নিচে’, অন্য প্রান্তের মানুষের জন্য তা ‘উপরে’। ফলে সিজ্জিন বা জাহান্নামকে এই গোলকের ভেতরে আক্ষরিক কোনো জায়গায় খুঁজে পাওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।
যৌক্তিকভাবে এটি স্পষ্ট যে, এই বর্ণনাগুলো মূলত একটি নৈতিক বার্তাকে স্থানিক রূপক (Spatial Metaphor) দেওয়ার চেষ্টা ছিল। পরাধীন বা আদিম সমাজগুলোতে ভয় ও আনুগত্য তৈরির জন্য শাস্তির স্থানকে ‘অন্ধকার পাতাল’ হিসেবে কল্পনা করা হতো। কিন্তু আজকের দিনে যখন আমরা জানি যে পৃথিবীর নিচে কোনো ফাঁপা শাস্তির জগত নয়, বরং উচ্চচাপের গলিত ম্যাগমা ও ধাতব কোর রয়েছে, তখন এই বর্ণনাগুলোকে আক্ষরিক ভূগোল হিসেবে আঁকড়ে ধরা এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা ছাড়া আর কিছু নয়। পরিশেষে বলা যায়, এই অবস্থান-ভিত্তিক ধর্মতাত্ত্বিক দাবিগুলো মূলত প্রাচীন মানুষের সীমিত ভৌগোলিক জ্ঞানের ফসল, যা আধুনিক কসমোলজির বিশালতার সামনে তার ভৌত প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.
