জাকির নায়েকঃ দাহাহা বা উটপাখির ডিম

ভূমিকা

ডাক্তার জাকির নায়েক তার বক্তৃতা ও লেখায় বহুবার দাবি করেছেন যে কোরআনের সূরা আন্-নাযিয়াত (৭৯:৩০)-এর “দাহাহা” (دحاها) শব্দটির অর্থ হলো “উটপাখির ডিম”। তার মতে, এর দ্বারা কোরআন আসলে পৃথিবীর ডিম্বাকৃতি (জিও-স্ফেরয়েড) আকারের দিকে ইঙ্গিত করেছে। অর্থাৎ, কোরআন আধুনিক বিজ্ঞানের বহু শতাব্দী আগেই পৃথিবীর আকৃতি ডিম্বাকার বলে ঘোষণা করেছে! আপাতদৃষ্টিতে এ বক্তব্য বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে একধরনের সেতুবন্ধনের প্রচেষ্টা মনে হলেও, ভাষাতত্ত্ব, প্রাচীন তাফসির, অনুবাদসম্মতি এবং বিজ্ঞানের নিরপেক্ষ তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এই ব্যাখ্যা আসলে টেকসই নয়। বরঞ্চ এই অনুবাদটি একদমই ভুল অনুবাদ। কোরআনের আয়াতের এই রকম অর্থ কোন প্রাচীন তাফসীরকারক, নবীর সাহাবায়ে একরাম বা তাবে তাবেইনগণ কেউই করেননি। এমনকি, বর্তমান সময়ের সবচাইতে বড় ইসলামিক আলেমগণই জাকির নায়েকের এই অর্থ গ্রহণকে মিথ্যা আখ্যায়িত করেছেন। জাকির নায়েক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বিজ্ঞানের সাথে মেলাবার জন্য মিথ্যা বলেছেন, এটিই আমরা এখানে প্রমাণ করবো। সেই সাথে এটিও জানবো, এর আসল অর্থ হচ্ছে বিছিয়ে দেয়া, বিস্তৃত করা।


জাকির নায়েক আরবি জানে না

জাকির নায়েক কোন ইসলামিক আলেম নন, তিনি শুধুমাত্র ইসলাম প্রচারক। এমনকি, আরবি ভাষাও তিনি জানেন না বলে বহুবার স্বীকার করেছেন। আসুন জাকির নায়েকের মুখ থেকেই শোনা যাক,


প্রাচীন আলেমদের মতামত

প্রথমেই জানা যাক প্রাচীন তাফসিরে এই শব্দের ব্যাখ্যা কেমন। তাবারী, কুরতুবী ও ইবন কাসীর—সবাই ৭৯:৩০-এ ব্যবহৃত “দাহাহা” শব্দের অর্থ করেছেন “বিস্তার করা” বা “প্রসারিত করা”। তাঁদের কারও ব্যাখ্যাতেই “ডিম” শব্দের উল্লেখ নেই। বরং তাঁরা দেখিয়েছেন যে এই আয়াতের পরপরই (৭৯:৩১–৩২) পানি প্রবাহিত হওয়া, উদ্ভিদ উৎপাদন এবং পর্বত স্থাপনের প্রসঙ্গ এসেছে—যা আসলে পৃথিবীকে মানুষের জন্য বাসযোগ্য করার প্রক্রিয়ারই বর্ণনা। অর্থাৎ, পুরো প্রসঙ্গটাই পৃথিবীকে ছড়িয়ে দেওয়া ও ব্যবহারোপযোগী করার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

ক্লাসিক্যাল আরবি অভিধানও এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। Lane’s Arabic-English Lexicon-এ “دحو (dahw)” ধাতুর অর্থ দেওয়া হয়েছে “to spread, expand, extend”—অর্থাৎ প্রসারিত বা বিস্তৃত করা। প্রাচীন লেক্সিকনে আরও পাওয়া যায় “أُدْحِيّ النَّعَام” শব্দ, যার অর্থ উটপাখির ডিম নয়, বরং উটপাখির তৈরি করা সমতল বাসা বা গর্ত। উটপাখি বালু সমতল করে সেখানে ডিম পাড়ে—সেই সমতলকরণ থেকে শব্দটি এসেছে। অর্থাৎ, উটপাখির ডিমের সাথে যে সম্পর্ক টানা হয়, সেটি মূলত পরোক্ষ ও রূপক, সরাসরি অর্থ নয়। তাই ভাষাগত দিক থেকেও “ডিম” অর্থ গ্রহণ করার ভিত্তি দুর্বল।


তাহলে জাকিরের “ডিম” কোথা থেকে এলো?

প্রধান অনুবাদকদের কাজও এই অর্থকেই নিশ্চিত করে। ইউসুফ আলী, পিকথল, সাহিহ ইন্টারন্যাশনাল, আরবেরি, শাকির—সবাই ৭৯:৩০-কে অনুবাদ করেছেন “spread” বা “extended” দিয়ে। কেবলমাত্র একান্ত কিছু ব্যতিক্রমী অনুবাদ, যেমন রাশাদ খলিফার অনুবাদ, “egg-shaped” শব্দ ব্যবহার করেছে। মূলধারার অনুবাদসম্মত ঐকমত্য এই যে এখানে পৃথিবীকে বিস্তৃত করার কথাই বলা হয়েছে।

তাহলে “ডিম” তত্ত্বটি কোথা থেকে এলো? আপোলজিস্টরা যুক্তি দেন যে “দাহাহা” ধাতু থেকেই এসেছে “উদহিয়্য” (উটপাখির বাসা), যা নাকি ডিমের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু অভিধান অনুযায়ী “উদহিয়্য” মানে বাসা, সমতল গর্ত—ডিম নয়। তাই এই ধরণের দাবী আসলে একটি জোরপূর্বক মেলাবার চেষ্টা, যার কোন ভিত্তি নেই।

এখন বিজ্ঞানের সাথে এর মিল-অমিলও দেখা যাক। পৃথিবীর প্রকৃত আকার হলো “অবলেট স্ফেরয়েড”—অর্থাৎ নিরক্ষরেখায় সামান্য স্ফীত এবং মেরু অঞ্চলে সামান্য চাপা। পার্থক্য প্রায় ২১ কিলোমিটার। কিন্তু উটপাখির ডিমের গঠন এর বিপরীত—এটি অপেক্ষাকৃত লম্বাটে, প্রোলেট ধাঁচের। অর্থাৎ, পৃথিবীর আকৃতি ও উটপাখির ডিমের আকৃতি বিজ্ঞানের বিচারে মোটেই একরকম নয়। তাই বৈজ্ঞানিক দিক থেকেও জাকির নায়েকের দাবি খাপ খায় না।

দাহাহা

ইসলামওয়েবের প্রখ্যাত ফতোয়া

উল্টোদিকে, ইসলামওয়েব ডট নেট ওয়েবসাইটে যারা ফতোয়া দেন, তারা সকলেই মদিনা ও আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা এক একজন আরবি ভাষার ওপর বিশেষজ্ঞ, আলেম, মুফতি এবং সারা পৃথিবীতে স্বনামধন্য স্কলার হিসেবে গণ্য। তারাই বলে দিয়েছেন, জাকির নায়েকের এই দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা। আসুন কাতারের এই বিখ্যাত ফতোয়া ওয়েবসাইটের ফতোয়াটি দেখে নিই, [1]

Meaning of Quran 79:30
Fatwa No: 92448
Fatwa Date:19-9-2006
Question
Salamvalekum, This is regarding the verse of Surah Naziat 79: 30 where Allaah subhanawataala says in the Quran “And after that He spread the earth” Most of the Modern day scholars translate this verse to “Earth is like egg shaped”. To exactly proof the shape of the earth is Spherical. Yousuf Ali, Picktall and Shakir have translated the word dahaha as “spread”. The word dahaha by the modern scholars is also spread as well as ostrich egg shaped, which is exactly the shape of the earth. I would appreciate if you can provide me with the etymology of the word daha. I would also like to know can we change the meaning and quote is as egg shaped. JazakAllaah Khair
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad is His slave and Messenger. We ask Allaah to exalt his mention as well as that of his family and all his companions.
Allaah Says (what means): {And after that He spread (in Arabic the word used is Dahaahaa) the earth.} [Quran 79:30]. The Arabic word Dahaahaa is extracted from the root Daha which means spreading as interpreted by Imaams Al-Qurtubi, Ibn Manthoor and other interpreters of the Quran .
Indeed Allaah explained the fact of the Earth being spread just right after mentioning the above verse, as He Says (what means): {And brought forth therefrom its water and its pasture. And the mountains He has fixed firmly.} [Quran 79:31-32]. Therefore, it becomes evident that the verse does not mean that He made it egg-shaped.
This, of course, does not contradict the fact the Earth is round-shaped as agreed by the scholars .
Allaah Knows best.

আসুন এই ফতোয়াটির বাঙলা অনুবাদও একইসাথে পড়ে নিই। ফতোয়াটি অনুবাদ করে দিয়েছেন সংশয় পরিবারের আবুল ফজল ভাই।

কোরানে দাহাহা শব্দটি নিয়ে এক মুমিন ভাইয়ের প্রশ্ন
প্রশ্ন
আমি কোরানের সুরা নাজিয়াতের (৭৯ নাম্বার সুরা) ৩০ নাম্বার আয়াতের বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাই। এখানে আল্লাহ বলেন, “এরপর তিনি জমিনকে বিস্তৃত করেছেন”। বর্তমান সময়ের বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ দাবী করেন যে এই আয়াতে ‘দাহাহা’ শব্দটি দিয়ে নাকি বিস্তৃত করাও বোঝায়, আবার এটাও নাকি বোঝায় যে “পৃথিবীর আকৃতি উটপাখির ডিমের মত”। কিন্তু ইউসুফ আলী, পিকথাল ও শাকিরের অনুবাদে আমরা দাহাহা শব্দটির ইংরেজি হিসেবে দেখতে পাই শুধুমাত্র spread শব্দটি, যার বাংলা অর্থ বিস্তৃত করা। আমি খুব বাধিত হবো যদি এই দাহাহা শব্দটির ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে আমাকে অবহিত করেন। আমি আরও জানতে চাই যে আমরা কি দাহাহা শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে এটিকে “উটপাখির ডিম” হিসাবে উপস্থাপন করতে পারি? জাজাকাল্লাহ খায়ের।
উত্তর
কোরানে সুরা নাজিয়াতের ৩০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেন, “এরপর তিনি জমিনকে বিস্তৃত (এখানে বিস্তৃত বোঝাতে ব্যবহৃত আরবি শব্দটি দাহাহা) করেছেন”। আরবি দাহাহা শব্দটির ব্যুৎপত্তি হয়েছে যে শব্দ থেকে, সেই মূল শব্দটি হল দাহা, যার মানে হচ্ছে ছড়ানো, যেটা কিনা ইমাম আল কুরতুবি, ইমাম ইবনে মনসুর প্রমুখ খ্যাতনামা ইমামবৃন্দসহ কোরানের অন্যান্য বহু বিখ্যাত ভাষ্যকার ও ব্যাখ্যাকারীদেরও অভিমত।
এমনকি, আল্লাহ নিজেও পৃথিবীকে ছড়ানো বা বিস্তৃত করার ব্যাপারটি সুরা নাজিয়াতের পরবর্তী দুটি আয়াতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন –
“তিনি তার ভিতর থেকে বের করেছেন তার পানি ও তার তৃণভূমি”।
“আর পর্বতগুলোকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন”।
(কোরান ৭৯:৩১-৩২)
এ থেকে প্রমাণ হয় যে ৩০ নং আয়াতে তিনি এটা কোনভাবেই বোঝান নি যে তিনি পৃথিবীকে ডিমের আকৃতিতে তৈরি করেছেন।
পৃথিবী যে গোলাকৃতি, এ বিষয়ে পৃথিবীর সব বিজ্ঞানীরাই একমত, এবং এই আয়াত বিজ্ঞানীদের ঐক্যমতের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও নয়।
আল্লাহই ভাল জানেন!


উপসংহার

সবশেষে প্রসঙ্গের দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায়—আয়াতটির মূল বক্তব্য হলো পৃথিবীকে মানুষের জন্য ব্যবহারোপযোগী করা। কোরআনে বারবার এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে: কখনো বলা হয়েছে পানি নামানো হয়েছে, ফসল উৎপন্ন হয়েছে, পর্বত স্থাপন করা হয়েছে। এর কোনোটিই জ্যামিতিক আকৃতি নির্ধারণ করছে না। সুতরাং এখানে “ডিম্বাকৃতি” খুঁজে নেওয়া কেবলই একধরনের আপোলজেটিক প্রচেষ্টা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জাকির নায়েকের উত্থাপিত “দাহাহা = উটপাখির ডিম” দাবি প্রাচীন তাফসির, ক্লাসিক্যাল লেক্সিকন, অনুবাদসম্মতি এবং বিজ্ঞানের তথ্য—সবকিছুর বিপরীতে অবস্থান করছে। এর ফলে দাবি-টি ভাষাতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক দুই ক্ষেত্রেই দুর্বল প্রমাণিত হয়। বাস্তব অর্থে “দাহাহা” মানে হলো বিস্তার বা প্রসারিত করা—এটাই কোরআনের মূল প্রাসঙ্গিকতা, আর “ডিম” তত্ত্ব আসলে একটি পরবর্তীকালের কৃত্রিম ব্যাখ্যা মাত্র।

দাহাহা 1

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.

Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.

This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.


তথ্যসূত্রঃ
  1. Fatwa No: 92448 ↩︎