ইসলামকে খুব মানবিক ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে অনেক মুসলিমই দাবী করেন, ইসলামে দাসদাসীকে সামান্য প্রহার করাও নাকি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ বা হারাম এবং সামান্যতম প্রহার করলেই নাকি সেই দাসদাসীকে মুক্ত করে দেয়া ইসলামে বাধ্যতামূলক! অথচ এই ধরণের কোন বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। বুখারী শরীফেই বলা হয়েছে, ক্রীতদাসকে মারলে মুখমণ্ডলে মেরো না। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, ক্রীতদাসকে মারধোর করা ইসলামে একটি বৈধ বিষয়। বুখারী শরীফে সরাসরিই এই কথাটিও বলা আছে, “দাসদের মারধোর করা মাকরূহ” বা অপছন্দনীয় কিন্তু নিষেধ নয়, এরপরেও অনেক মুমিনই এই নিয়ে প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করে থাকে [1] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৪৯/ ক্রীতদাস আযাদ করা
পরিচ্ছেদঃ ৪৯/১৭. দাসদের মারধোর করা এবং আমার ক্রীতদাস ও আমার বাঁদী এরূপ বলা মাকরূহ।
২৫৫২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন এমন কথা না বলে ‘‘তোমার প্রভুকে আহার করাও’’ ‘‘তোমার প্রভুকে অযু করাও’’ ‘‘তোমার প্রভুকে পান করাও’’ আর যেন (দাস ও বাঁদীরা) এরূপ বলে, ‘‘আমার মনিব’’ ‘আমার অভিভাবক’, তোমাদের কেউ যেন এরূপ না বলে ‘‘আমার দাস, আমার দাসী’’। বরং বলবে- ‘আমার বালক’ ‘আমার বালিকা’ ‘আমার খাদিম’। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৬৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৩৮৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
যেখানে নিজের স্ত্রীকে মারধোর করাই ইসলামে একটি বৈধ এবং স্বীকৃত কাজ, সেখানে দাসদাসীকে প্রহার ইসলামে হারাম, এরকম উদ্ভট দাবী করতে মুমিনদের একটুও লজ্জা করে না। এই বিষয়ে বিস্তারিত এই লেখাটিতে রয়েছে [2]। এখানে আমরা শুধু এই বিষয়ক হাদিসটি উল্লেখ করছি, যেই হাদিসে ক্রীতদাসীর মত পেটাতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু ক্রীতদাসীদের পেটানো আদৌ নিষিদ্ধ হয়ে থাকলে নবী কেন স্ত্রীদের ক্রীতদাসীদের মত পেটাতে নিষেধ করবেন? [3] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১০. প্রথম অনুচ্ছেদ – স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৪২-[৫] ’আব্দুল্লাহ ইবনু যাম্’আহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন ক্রীতদাসীর ন্যায় স্ত্রীকে না মারে (অত্যাচার না করা হয়), অথচ দিনের শেষেই তার সাথে সহবাস করে।
অপর বর্ণনায় আছে- তোমাদের কেউ যেন ইচ্ছা করে স্ত্রীকে ক্রীতদাসীর ন্যায় মারমুখো না হয়, হয়তো দিন শেষে তার সাথে সহবাস করতে চাইবে; আর এতে সে অনাগ্রহ প্রকাশ করবে। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বায়ু নির্গত হওয়ায় হাসি-ঠাট্টাচ্ছলের কারণে উপদেশ করলেন, যে কাজ নিজে কর অন্যের সে কাজে তোমরা কেন হাসবে! (বুখারী ও মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৪৯৪২, মুসলিম ১৪৭০।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু যাম‘আহ (রাঃ)
আসুন দারুস সালাম প্রকাশনী থেকে বের হওয়া বুখারী শরীফের একটি হাদিস দেখি [4] –

আসুন প্রাসঙ্গিক একটি হাদিস পড়ে নিই। লক্ষ্য করুন, এই হাদিসে স্ত্রীদেরকে গোলাম বা দাসের মত প্রহার করতে নিষেধ করা হচ্ছে। যদি গোলাম বা দাসকে প্রহার করা নিষিদ্ধই হতো, তাহলে স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্রহার করতে নিষেধ কেন করা হবে? [5]
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৮ঃ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৫. স্ত্রীদের হক বণ্টন – স্ত্রীকে অধিক প্ৰহার করা নিষেধ
১০৬৪। ’আবদুল্লাহ বিন যাম’আহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্ৰহার করো না।[1]
[1] বুখারী ৫২০৪, ৩৩৭৭, ৫৯৪২, ৬০৪২, মুসলিম ২৮৫৫, তিরমিযী ৩৩৪৩, ইবনু মাজাহ ১৯৮৩, আহমাদ ১৫৭৮৮, দারেমী ২২২০। পূর্ণাঙ্গ হাদীসটি হচ্ছেঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لا يجلد أحدكم امرأته جلد العبد ثم يجامعها في آخر اليوم তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্রহার করো না। কেননা, দিনের শেষে তার সঙ্গে তো মিলিত হবে। ইমাম হাইসামী তাঁর মাজমাউয যাওযায়েদ ৫/৭ গ্রন্থে বলেন, এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে হাজ্জাজ বিন আরত্বআ নামক বর্ণনাকারী রয়েছে সে মুদাল্লিস।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু যাম‘আহ (রাঃ)
এবারে আসুন ইযাহুল মুসলিম গ্রন্থ থেকে এই বিষয়টি জেনে নেয়া যাক [6] –

একই কথা বলা রয়েছে সহীহ মুসলিম গ্রন্থের ব্যাখ্যা গ্রন্থেও [7] –

ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মুহাম্মদের পরে ইসলামি সাম্রাজ্যের খলিফা আবু বকরের একজন দাস একটি উট হারিয়ে ফেলায় আবু বকর তাকে প্রহার করছিলেন, সেই দৃশ্য দেখে নবী মুহাম্মদ হাসছিলেন বলে হাদিস গ্রন্থ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় [8] [9]। এর অর্থ হচ্ছে, দাসকে প্রহারের সময় নবী তার কোন প্রতিবাদ তো করেনই নি, বরঞ্চ উৎসাহই দিয়েছেন। তাই দাসদাসীকে প্রহার ইসলামে হারাম, এরকম বলার কোন সুযোগ নেই।
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ২৮. ইহরা্ম অবস্থায় কোনো ব্যক্তি নিজ গোলামকে প্রহার করলে।
১৮১৮. আহমাদ ইবন হাম্বল (রহঃ) …… আসমা বিনত আবূ বাকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (বিদায় হজ্জের সময়) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমরা আরাজ নামক স্থানে উপনীত হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাহন থেকে অবতরণ করলেন এবং আমরাও অবতরণ করলাম। আয়েশা (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পার্শ্বে উপবেশন করেন এবং আমি আমার পিতা (আবূ বাকর) এর পার্শ্বে উপবেশন করি। আবূ বাকর (রাঃ) ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খাদ্য পানীয় ও সফরের সরঞ্জাম একই সংগে আবূ বাকরের একটি গোলামের নিকট (একটি উষ্ট্রের পৃষ্ঠে) রক্ষিত ছিল।
আবূ বাকর (রাঃ) গোলামের অপেক্ষায় ছিলেন (যেন খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করা যায়)। কিন্তু সে এমন অবস্থায় উপস্থিত হল যে, সে উট তার সাথে ছিল না। তিনি (আবূ বাকর) জিজ্ঞাসা করেন, তোমার সে উটটি কোথায়? জবাবে সে বলল, আমি গতকাল তাকে হারিয়ে ফেলেছি। আবূ বাকর (রাঃ) বলেন, মাত্র একটি উট, তুমি তাও হারিয়ে ফেললে? রাবী বলেন, তখন তিনি তাকে মারধর করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বলেনঃ তোমরা এ মুহরিম ব্যক্তির দিকে দেখ, কী করছে। রাবী ইবন আবূ রিয্মা বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উক্তির চাইতে অধিক কিছু বলেননি যে, ‘তোমরা এ মুহরিম ব্যক্তির দিকে দেখ কী কাজ করছে, আর তিনি মুচকি হাসছিলেন।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আসমা বিনতু আবূ বাকর (রাঃ)

ইবনে হিশামের সিরাতুন নবী থেকে জানা যায়, আয়িশার একটি পরকীয়ার গুজব উঠেছিল। সেই সময়ে আলী আয়িশার একজন দাসীকে ধরে বেদম প্রহার করে সত্যি কথা বের করারও চেষ্টা করেন [10]। সেই সময়ে সামনে নবী মুহাম্মদও উপস্থিত ছিলেন, তিনি বাধা দেননি। তাই দাসদাসীকে প্রহার করা হারাম, এরকম বক্তব্য শুধুমাত্র নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.
Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.
Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.
This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস নম্বরঃ ২৫৫২ ↩︎
- ইসলাম ও নারী – সর্বোচ্চ সম্মান এবং সুমহান মর্যাদা! ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিস নম্বরঃ ৩২৪২ ↩︎
- Sahih Al-bukhari, Vol-3, Page 421, Dr. Muhammad Muhsin khan, Darus salam Publications, Saudi Arabia ↩︎
- বুলুগুল মারাম, হাদিস নম্বরঃ ১০৬৪ ↩︎
- ইযাহুল মুসলিম, পৃষ্ঠা ৩৬৪, ৩৬৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদিস প্রকাশনী, ১৬ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ১৮১৮ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮, ৩৯ ↩︎
- সিরাতুন নবী (সাঃ), ইবনে হিশাম, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৯, ৩১০ ↩︎
