মিরাজ: প্রাচীন স্বর্গারোহণ মিথ, আল-আকসা রাজনীতি ও ইসলামী আখিরাত-তত্ত্বের ভাঙন

Table of Contents

সারসংক্ষেপ

ইসলামের মিরাজের কাহিনি মুসলিম ধর্মতত্ত্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অলৌকিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ এক রাতে মক্কা থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসায় যান, সেখান থেকে কয়েকটি আকাশ অতিক্রম করেন, পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, জান্নাত-জাহান্নামের দৃশ্য দেখেন, আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছান এবং শেষে নামাজের বিধান নিয়ে ফিরে আসেন। বিশ্বাসীদের কাছে এই ঘটনা নবুওয়াতের মর্যাদা ও আল্লাহর অসীম ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু কোনো ধর্মীয় কাহিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাসের অংশ হলেই তা ইতিহাস, যুক্তি বা বিজ্ঞানের বিচারে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।

এই প্রবন্ধে মিরাজের কাহিনিকে আবেগ, ভক্তি বা ধর্মীয় পূর্বধারণার ভিত্তিতে নয়; বরং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, পাঠসমালোচনা, যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান ও আধুনিক মহাকাশবিদ্যার আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে। মূল প্রশ্ন হবে, মিরাজের বর্ণনাগুলো কি একটি বাস্তব, সশরীর, ঐতিহাসিক ও মহাজাগতিক ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এগুলো প্রাচীন ধর্মীয় মিথ, পরকাল-ভ্রমণ আখ্যান, পবিত্র ভূগোল নির্মাণ এবং পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার অংশ হিসেবে ধরে নেয়া বেশি যুক্তিযুক্ত?

প্রথমে দেখা হবে, ইসলামের মিরাজের গল্পটি আসলেই কতটা অনন্য। জরথুস্ত্রীয় আরদা ভিরাফ নামাগ, ইহুদি-খ্রিস্টান অ্যাপোক্রিফাল সাহিত্য, ইনোক ও আইজায়া-সংক্রান্ত স্বর্গারোহণ আখ্যানের সঙ্গে মিরাজের কাঠামোগত মিলগুলো তুলনামূলকভাবে পরীক্ষা করা হবে। এরপর জেরুজালেমের তথাকথিত মসজিদুল আকসা নিয়ে ঐতিহাসিক প্রশ্ন তোলা হবে: নবী মুহাম্মদের জীবদ্দশায় সেখানে বাস্তবে কোনো ইসলামি মসজিদ বা বর্তমান অর্থে আল-আকসা স্থাপনা ছিল কি না, এবং টেম্পল মাউন্টের সে সময়কার বাস্তব অবস্থা মিরাজের বর্ণনার সঙ্গে কতটা মেলে।

এরপর প্রবন্ধে মিরাজের বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা আলোচনা করা হবে। এক রাতের মধ্যে পৃথিবী থেকে আকাশের স্তর অতিক্রম, আলোর গতির সীমা, মানবদেহের মহাকাশে টিকে থাকার সমস্যা, সময় প্রসারণ, সাত আসমানের ধারণা, বায়তুল মামুরের অবস্থান, মৃত নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং প্রাচীন স্তরভিত্তিক মহাবিশ্বচিত্র—এসব বিষয় আধুনিক বিজ্ঞান ও মহাকাশবিদ্যার আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে। একইসঙ্গে দেখা হবে, মিরাজকে সশরীর ঘটনা বলা হলে কী ধরনের বৈজ্ঞানিক সমস্যা তৈরি হয়, আর একে স্বপ্ন বা রুহানি অভিজ্ঞতা বলা হলে তার ঐতিহাসিক দাবির মর্যাদা কতটা বদলে যায়। একইসঙ্গে প্রবন্ধে প্রশ্ন তোলা হবে—কিয়ামত, পুনরুত্থান ও চূড়ান্ত বিচার সংঘটিত হওয়ার আগেই মিরাজে জান্নাত-জাহান্নামে মানুষকে দেখা গেল কীভাবে; বিচার দিবসের আগেই পুরস্কার ও শাস্তি কার্যকর হলে আখিরাত-তত্ত্বের বিচারব্যবস্থার অর্থ কী থাকে? আরও প্রশ্ন তোলা হবে—বিভিন্ন যুগ, অঞ্চল ও ভাষার নবীদের আসমানে আরবীয় ধর্মীয় সংলাপে হাজির করা কি বাস্তব সাক্ষাতের দলিল, নাকি মুহাম্মদের নবুয়তকে পূর্ববর্তী সব নবীর বৈধ উত্তরাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার আখ্যানগত কৌশল?

শেষ অংশে হাদিস ও সীরাতের বিভিন্ন বর্ণনার অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হবে। মিরাজের সূচনায় কতজন ফেরেশতা এসেছিলেন, নবী কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন, জেরুজালেমে তিনি থেমেছিলেন কি না, বুরাক কোথায় বাঁধা হয়েছিল, দুধ ও মদের পাত্র কোথায় দেওয়া হয়েছিল, কোন নবী কোন আসমানে ছিলেন, এবং ৫০ ওয়াক্ত নামাজ থেকে ৫ ওয়াক্তে নেমে আসার বর্ণনায় কী ধরনের যুক্তিগত ও দালিলিক সমস্যা আছে—এসব প্রশ্ন পর্যায়ক্রমে আলোচিত হবে। উদ্দেশ্য হবে মিরাজের কাহিনিকে অস্বীকার বা গ্রহণের আবেগী অবস্থান নয়, বরং এর উৎস, বর্ণনা, যুক্তি, ইতিহাস ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতাকে কঠোরভাবে যাচাই করা।


ভূমিকা: মিরাজ—অলৌকিক দাবি, নাকি ধর্মীয় মিথ?

ইসলামি বিশ্বাসে মিরাজের কাহিনি নবী মুহাম্মদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অলৌকিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এক রাতে তিনি মক্কা থেকে জেরুজালেমের দূরবর্তী মসজিদে যান, সেখান থেকে আকাশের স্তর অতিক্রম করেন, পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, জান্নাত-জাহান্নাম দেখেন, আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছান এবং শেষে নামাজ ফরজ হওয়ার বিধান নিয়ে ফিরে আসেন। বিশ্বাসীদের কাছে এটি নবুওয়াতের মহিমা, আল্লাহর ক্ষমতা এবং ইসলামের সত্যতার অতিপ্রাকৃত প্রমাণ হিসেবে প্রচারিত হয়। কিন্তু প্রচার আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। কোনো কাহিনি ধর্মীয় আবেগে যতই মহিমান্বিত হোক, ইতিহাসের আদালতে সেটিকে দলিল, যুক্তি, অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য এবং প্রাকৃতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়াতেই হবে। মিরাজের দাবিটি যত বড়, তার প্রমাণের দায়ও তত বড়; আর সেই দায় কেবল ভক্তির ভাষা, হাদিসের উদ্ধৃতি বা “আল্লাহ পারেন” ধরনের বাক্যে শেষ হয়ে যায় না। কিন্তু কোনো দাবি ধর্মীয়ভাবে পবিত্র বিবেচিত হলেই তা ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিকভাবে সত্য হয়ে যায় না। একটি দাবিকে সত্য ধরে নেওয়ার আগে তার উৎস, বর্ণনাগত গঠন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা এবং অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এই প্রবন্ধে মিরাজের কাহিনিকে ধর্মীয় আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং ইতিহাস, তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব, পাঠসমালোচনা, যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান এবং মহাকাশবিদ্যার আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে। এখানে আলোচ্য প্রশ্নটি এই নয়, কেউ মিরাজে বিশ্বাস করতে পারে কি না। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাধীনতা আলাদা বিষয়; মানুষ চাইলে স্বপ্ন, দর্শন, অলৌকিকতা, পুরাণ—যেকোনো কিছুতে বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে যখন ঐতিহাসিক ঘটনা, মহাজাগতিক বাস্তবতা বা নবুওয়াতের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকে না; সেটি যাচাইযোগ্য দাবিতে পরিণত হয়। যাচাইযোগ্য দাবি প্রমাণ ছাড়া টিকতে পারে না। আলোচ্য প্রশ্ন হলো—মিরাজকে যদি বাস্তব, বস্তুগত, ঐতিহাসিক এবং শারীরিক ঘটনা হিসেবে দাবি করা হয়, তবে সেই দাবি যুক্তি, প্রমাণ এবং বিজ্ঞানের পরীক্ষায় দাঁড়ায় কি না।

মিরাজের বর্ণনাগুলো কেবল একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার দাবি নয়; এগুলোতে স্থান, সময়, ভ্রমণ, আকাশস্তর, নির্দিষ্ট স্থাপনা, শারীরিক গতি, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দূরত্ব, ঈশ্বরের অবস্থান, পূর্ববর্তী মৃত নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, জান্নাত-জাহান্নামের দৃশ্য এবং নামাজের সংখ্যাগত দর-কষাকষির মতো বহু নির্দিষ্ট উপাদান রয়েছে। অর্থাৎ দাবি যত নির্দিষ্ট, পরীক্ষা করার সুযোগও তত বেশি। আর পরীক্ষা শুরু করলেই দেখা যায়, মিরাজের কাহিনি একটি সুসংহত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় কল্পকাহিনি, স্বর্গারোহণ মিথ, পরকাল ভ্রমণ আখ্যান এবং পরবর্তী ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক নির্মাণের সমন্বিত রূপ হিসেবেই বেশি বোধগম্য।


প্রবন্ধের পদ্ধতি ও বিশ্লেষণের সীমা

এই আলোচনায় তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। প্রথমত, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও পুরাণতত্ত্বের পদ্ধতিতে দেখা হবে, মিরাজের গল্পটি আসলেই অনন্য কি না, নাকি ইসলামের আগেই ইহুদি, খ্রিস্টান, জরথুস্ত্রীয় এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যীয় ঐতিহ্যে একই ধরনের স্বর্গারোহণ ও পরকাল-ভ্রমণ আখ্যান প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে পরীক্ষা করা হবে, মিরাজের কেন্দ্রীয় স্থান হিসেবে যে আল-আকসা বা জেরুজালেমের মসজিদের কথা বলা হয়, নবী মুহাম্মদের জীবদ্দশায় তার বাস্তব অস্তিত্ব ছিল কি না। তৃতীয়ত, বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণে দেখা হবে, স্বল্প সময়ে মহাবিশ্ব অতিক্রম, আকাশের স্তরভিত্তিক কাঠামো, সশরীরে ঊর্ধ্বগমন, মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ঈশ্বরের স্থানিক অবস্থান, এসব ধারণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিদ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো ধর্মীয় কাহিনিকে সাহিত্য, উপমা, স্বপ্ন, প্রতীকী অভিজ্ঞতা বা মরমি দর্শন হিসেবে পড়লে তার অর্থ একরকম হতে পারে। কিন্তু একই কাহিনিকে যদি বাস্তব ঐতিহাসিক সত্য, মহাকাশ ভ্রমণ এবং মহাজাগতিক সত্য হিসেবে দাবি করা হয়, তাহলে সেটিকে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের মানদণ্ডেই বিচার করতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতি কোনো দাবিকে প্রমাণ করে না; জনবিশ্বাস কোনো ঘটনাকে ঐতিহাসিক করে না; আর “অলৌকিক” শব্দটি কোনো ব্যাখ্যা নয়; এটি ব্যাখ্যার ব্যর্থতাকে পবিত্র ভাষায় ঢেকে দেওয়ার কৌশল। যেখানে গতি, দূরত্ব, দেহ, মহাকাশ, সময়, স্থাপত্য ও ইতিহাসের প্রশ্ন আছে, সেখানে “অলৌকিক” বলা মানে সমস্যার উত্তর দেওয়া নয়—বরং সমস্যাকে প্রশ্নাতীত ঘোষণা করা। এই প্রবন্ধ সেই প্রশ্নাতীত ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে।

ধর্মীয় দাবির ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত কৌশল হলো—প্রথমে দাবিকে বাস্তব ইতিহাস হিসেবে প্রচার করা, তারপর প্রশ্ন উঠলে সেটিকে প্রতীক, রূপক, স্বপ্ন, অলৌকিকতা বা “মানববুদ্ধির ঊর্ধ্বে” বলে সরিয়ে নেওয়া। এই কৌশল যুক্তিবিদ্যার ভাষায় বিশেষ অব্যাহতি বা special pleading। কোনো দাবি ইতিহাস হলে ইতিহাসের প্রমাণ লাগবে; বিজ্ঞান হলে পরীক্ষাযোগ্য মডেল লাগবে; ব্যক্তিগত দর্শন হলে সেটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমাতেই থাকবে। মিরাজ একই সঙ্গে সব সুবিধা নিতে পারে না। একে যদি সশরীর মহাকাশযাত্রা বলা হয়, তবে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন আসবেই। একে যদি স্বপ্ন বলা হয়, তবে নবুওয়াতের বস্তুগত প্রমাণ হিসেবে এর মূল্য ভেঙে পড়বে।


মিরাজ, পবিত্র ভূগোল ও আধুনিক রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা

মিরাজের কাহিনি শুধু একটি পুরনো ধর্মীয় গল্প নয়। এটি আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। জেরুজালেমের আল-আকসা/হারাম আল-শরিফ/টেম্পল মাউন্ট আজ ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতের সবচেয়ে বিস্ফোরক ধর্মীয়-রাজনৈতিক স্থানগুলোর একটি। মুসলিমদের কাছে এটি ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত; ইহুদিদের কাছে একই এলাকা প্রাচীন মন্দিরস্থল বা Temple Mount হিসেবে সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। ফলে একই ভূখণ্ডকে দুই ধর্মীয় কল্পনা, দুই জাতীয় স্মৃতি এবং দুই রাজনৈতিক দাবি নিজেদের পবিত্র ইতিহাসের কেন্দ্রে বসায়। এই সংঘাত কেবল ধর্মতত্ত্বে আটকে থাকে না; এটি রাস্তায়, সীমান্তে, সামরিক অভিযানে, দখলনীতিতে, প্রতিরোধে, রাষ্ট্রনীতিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে রক্তাক্ত বাস্তবতা হয়ে ফিরে আসে।

মিরাজের বর্ণনা এই পবিত্র ভূগোল নির্মাণের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। বহু মুসলিমের দাবি—নবী মুহাম্মদ যেহেতু মিরাজের রাতে সেখানে গিয়েছিলেন, সেখানে নবীদের ইমামতি করেছিলেন, বোরাক বেঁধেছিলেন এবং সেখান থেকে আসমানে উঠেছিলেন, তাই সেই অঞ্চল মুসলিম অধিকারের অংশ। কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি নির্মম হয়ে ওঠে: একটি অলৌকিক দাবির ওপর কি আধুনিক ভূখণ্ড-অধিকার দাঁড়াতে পারে? কোনো ঘটনার বাস্তব, ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও দলিলগত প্রমাণ না থাকলে, সেই ঘটনাকে ব্যবহার করে একটি ভূখণ্ডের ওপর চিরস্থায়ী ধর্মীয় মালিকানা দাবি করা যুক্তির আদালতে দাঁড়ায় না। “নবী এখানে এসেছিলেন”—এই বাক্য আবেগ তৈরি করতে পারে, মিছিল সংগঠিত করতে পারে, ধর্মীয় পরিচয়কে উত্তেজিত করতে পারে; কিন্তু প্রমাণ ছাড়া এটি ভূমি-অধিকার প্রতিষ্ঠার বৈধ যুক্তি নয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। এই প্রবন্ধ প্যালেস্টাইনের জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে অস্বীকার করছে না, আবার ইসরায়েলের নাগরিক নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব-সংশ্লিষ্ট বাস্তব প্রশ্নকেও বাতিল করছে না। প্যালেস্টাইনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ, দখল, বসতি সম্প্রসারণ, সামরিক নিপীড়ন, নাগরিক অধিকার, শরণার্থী সমস্যা—এসব বাস্তব রাজনৈতিক ও মানবাধিকারগত প্রশ্ন। একইভাবে ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব, সন্ত্রাসী হামলা, জিম্মি সংকট এবং আঞ্চলিক শত্রুতাও বাস্তব প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় সেই পূর্ণ রাজনৈতিক সংঘাত নয়। এই প্রবন্ধের প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট: একটি অলৌকিক ধর্মীয় আখ্যানকে কি ইতিহাস, ভূগোল ও আধুনিক রাজনৈতিক অধিকারের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়?

উত্তর সরাসরি: যায় না। ভূখণ্ডের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আইন, ইতিহাস, জনসংখ্যা, নাগরিক অধিকার, দখলনীতি, যুদ্ধ, রাষ্ট্রচুক্তি, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের আলোচ্য বিষয়। কোনো নবীর কথিত রাতের আকাশযাত্রা, কোনো অদেখা উড়ন্ত প্রাণী বোরাক, কোনো আসমানি দরবার, কোনো মৃত নবীদের ইমামতি—এসব দিয়ে বাস্তব মানুষের জমি, অধিকার, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব নির্ধারণ করা যায় না। ধর্মীয় কল্পকাহিনি যখন ভূরাজনীতির অস্ত্র হয়, তখন তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ—মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান, নাস্তিক, শিশু, বৃদ্ধ, শরণার্থী, বেসামরিক নাগরিক—সবাই।

এই কারণেই মিরাজের দাবিকে যুক্তি, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের আলোকে পরীক্ষা করা শুধু ধর্মীয় সমালোচনা নয়; এটি আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যদি একটি অলৌকিক আখ্যানকে অপ্রশ্নিত রেখে দেওয়া হয়, তবে সেটি শুধু মসজিদের মিম্বারে থাকে না; সেটি সীমান্তের দাবি, যুদ্ধের স্লোগান, দখলের ভাষা, প্রতিরোধের প্রতীক এবং রক্তপাতের নৈতিক জ্বালানিতে পরিণত হয়। তাই মিরাজের ঐতিহাসিকতা পরীক্ষা করা মানে কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার অস্বীকার করা নয়; বরং ধর্মীয় মিথকে বাস্তব রাজনীতি ও মানবজীবনের ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকার অস্বীকার করা।

এই প্রবন্ধের অবস্থান তাই স্পষ্ট: প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা বা ইসরায়েলের নিরাপত্তা—যে প্রশ্নই হোক, তার বিচার হবে বাস্তবতা, অধিকার, আইন, ইতিহাস ও মানবিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। কিন্তু “মুহাম্মদ মিরাজে এখানে এসেছিলেন”—এই দাবিকে ভূখণ্ড-মালিকানার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। কারণ সেই দাবির পক্ষে স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই; আছে ধর্মীয় বর্ণনা, পরবর্তী পবিত্র ভূগোল নির্মাণ এবং বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো রাজনৈতিক আবেগ। বাস্তব পৃথিবীর রক্তক্ষয়ী সংঘাতে অপ্রমাণিত অলৌকিক কাহিনিকে আদালতের দলিল বানানো বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং নৈতিকভাবে বিপজ্জনক। বাস্তব মানুষের রক্ত, ঘর, জমি, অধিকার ও ভবিষ্যৎ কোনো অপ্রমাণিত রাতের অলৌকিক সফরের ওপর নির্ভর করতে পারে না।


ইসরা ও মিরাজের উৎসগত বিচ্ছেদ: কুরআন বনাম হাদিস

মিরাজ-আখ্যানের সবচেয়ে বড় টেক্সচুয়াল ফাটল হলো—কুরআন নিজে কোথাও “মক্কা → জেরুজালেম → সাত আসমান → আল্লাহর দরবার → নামাজের দর-কষাকষি”—এই পূর্ণ রৈখিক ও ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি দেয় না। সূরা বনি ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে কেবল এক রাতের একটি অনুভূমিক যাত্রার কথা বলা হয়েছে: মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত। এই আয়াতে সাত আসমান অতিক্রম, ঊর্ধ্বগমন, জান্নাত-জাহান্নামের দৃশ্য, মৃত নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বায়তুল মামুর, সিদরাতুল মুনতাহা কিংবা নামাজের সংখ্যা নিয়ে কোনো ঐশ্বরিক দর-কষাকষির উল্লেখ নেই [1]

অন্যদিকে, ঊর্ধ্বযাত্রার প্রমাণ হিসেবে সূরা আন-নাজমের যে অংশটি পেশ করা হয়, সেটিও কোনো ধারাবাহিক ভৌত মহাকাশভ্রমণের বিবরণ নয়। সেখানে “দেখা”, “নিকটবর্তী হওয়া”, “সিদরাতুল মুনতাহা” এবং “জান্নাতুল মাওয়া”-র মতো দর্শনমূলক ভাষা আছে; কিন্তু সেখানে জেরুজালেম নেই, বোরাক নেই, আল-আকসায় থামা নেই, নবীদের ইমামতি নেই, আসমানের দরজা-পাহারা নেই, এবং নামাজের সংখ্যা কমানোর কোনো দরবারি দর-কষাকষিও নেই [2]। অর্থাৎ কুরআনের সরাসরি পাঠে ইসরা ও মিরাজ পূর্ণাঙ্গ একক মহাকাব্য হিসেবে উপস্থিত নয়; উপস্থিত আছে দুটি বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় ইঙ্গিত, যেগুলোকে পরবর্তী ঐতিহ্য একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।

নাযিলের কালগত দিকটি দেখলেও এই ফাটল আরও স্পষ্ট হয়। সূরা আন-নাজম মক্কী জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ের সূরা হিসেবে পরিচিত; আর সূরা বনি ইসরাঈল মক্কী জীবনের শেষ ভাগের সূরা হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ ভিন্ন সময়, ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও ভিন্ন ভাষার দুটি কুরআনিক অংশকে পরবর্তী হাদিস-সীরাত ঐতিহ্য এক সুতোয় গেঁথে একটি একক রাতের ভৌত মহাকাশযাত্রায় রূপান্তর করেছে। এই রূপান্তর কুরআনের সরাসরি বর্ণনা নয়; এটি পরবর্তী আখ্যানগত সম্প্রসারণ।

আদি ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরেই এই সশরীর-মহাকাশযাত্রা ব্যাখ্যা অবিসংবাদিত ছিল না। আয়েশার নামে বর্ণিত হয়েছে—মিরাজের রাতে নবীর শরীর বিছানা থেকে অনুপস্থিত হয়নি; ঘটনাটি ছিল রুহানি অভিজ্ঞতা। মুয়াবিয়ার নামেও বর্ণিত হয়েছে—এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য স্বপ্ন বা রুইয়া। পরবর্তী আলেমরা এই রিপোর্টগুলোকে ব্যাখ্যা করে সশরীর মিরাজের মত রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেই ব্যাখ্যাগুলো নিজেই প্রমাণ করে যে প্রাথমিক ঐতিহ্যের ভেতরে ঘটনাটির প্রকৃতি নিয়ে মতভেদ ছিল। যে দাবি শুরু থেকেই একমত, স্বচ্ছ ও স্থির ছিল না, সেটিকে পরে ঈমানের অখণ্ড অলৌকিক মহাকাশযাত্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ধর্মতাত্ত্বিক অলৌকিকীকরণ ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রথমে দেখা যাক, মিরাজকে সশরীর ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচলিত বর্ণনা। এখানে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে মিরাজকে সশরীরে সংঘটিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে [3]

‘নাখলা’ নামক জায়গায় কয়েকদিন অতিবাহিত করার পর যায়েদ তাঁকে বললেন- মক্কার কুরাইশরা আপনাকে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছে। এখন আপনি কিভাবে সেখানে প্রবেশ করবেন? তিনি বললেন- হে যায়েদ! তুমি যেই মসীবত প্রত্যক্ষ করছ, আল্লাহ্ তা’আলা তা অবশ্যই বিদূরিত করবেন, তিনি তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন এবং তাঁর নাবীকে সাহায্য করবেন।
মক্কার নিকটবর্তী হয়ে তিনি খোযা’আ গোত্রের একজন লোকের মাধ্যমে মুতইম বিন আদীর কাছে আশ্রয় চাইলেন। তিনি মুতইমকে বললেন- আমি তোমার আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে চাই। সে রাজী হল এবং ঘোষণা দিল যে, আমি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিচ্ছি। সে তার ছেলেদেরকে ডেকে বলল- তোমরা অস্ত্র হাতে নাও এবং কাবার চারপাশে দাঁড়িয়ে যাও। আমি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিচ্ছি।
যায়েদকে সাথে নিয়ে তিনি মুতইম বিন আদীর আশ্রয়ে কাবায় প্রবেশ করলেন। মুতইম বিন আদী স্বীয় বাহনের উপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিল যে, হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছি। সুতরাং কেউ যেন তাঁর উপর আক্রমন না করে।
অতঃপর নাবী হাজরে আসওয়াদের কাছে গিয়ে তাতে চুম্বন করলেন এবং দু’রাকাত সলাত আদায় করলেন। মুতইম বিন আদী এবং তার ছেলেরা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাবী কে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিলেন। ২২২
নাবী এর মি’রাজ
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে মি’রাজ হয়েছিল সশরীরে। তিনি প্রথমে বুরাকে আরোহন করে মাসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত ভ্রমণ করলেন। জিবরীল ফিরিস্তা সাথেই ছিলেন। মাসজিদের দরজার হাতলের সাথে বুরাক বেঁধে সেখানে নেমে তিনি নাবীদের ইমাম হয়ে সলাত পড়লেন। কেউ কেউ বলেছেন- তিনি বেতেলহামে (জেরুজালেমে) যাত্রা বিরতি করেছিলেন এবং সেখানেই নাবীদের ইমামতি করেছেন। এটি মোটেও সঠিক নয়। মাসজিদুল হারাম থেকে বাইতুল মাকদিস পর্যন্ত ভ্রমণকে ‘ইসরা’ অর্থাৎ রাতের ভ্রমণ বলা হয়। সে রাত্রেই বাইতুল মাকদিস হতে উর্ধ্বাকাশ পর্যন্ত মি’রাজের ঘটনা সংঘটিত হয়।
দুনিয়ার আকাশের নিকটবর্তী হলে জিবরীল ফিরিস্তা তাঁর জন্য আকাশের দরজা খোলার আবেদন করলে তা খুলে দেয়া হয়। প্রথম আকাশে তিনি মানব জাতির পিতা আদমকে দেখতে পেলেন। তাঁর সাথে সাক্ষাত করে তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং স্বাগত জানালেন। আদম মুহাম্মাদ এর নবুওয়াতের স্বীকৃতি দিলেন। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে সেখানে আদমের সৌভাগ্যবান সন্তানদেরকে তাঁর ডান পাশে এবং হতভাগ্যদেরকে বাম পাশে দেখালেন।
অতঃপর তাঁকে দ্বিতীয় আকাশে উঠানো হল। সেখানে গিয়ে তিনি ঈসা এবং ইয়াহইয়া জে কে দেখতে পেলেন। তৃতীয় আকাশে ইউসূফ কে দেখতে পেলেন। এমনিভাবে চতুর্থ আকাশে গিয়ে…

মিরাজ

কিন্তু একই আলোচনাতেই দেখা যাচ্ছে, সশরীর মিরাজ কোনো একক অবিসংবাদিত অবস্থান ছিল না। আয়েশা, মুয়াবিয়া, হাসান বসরী এবং ইবনে ইসহাকের সূত্রে রুহানি মিরাজের মতও সংরক্ষিত হয়েছে। একই বইয়ের অন্য পাতায় বলা হয়েছে, আয়িশা ও মুয়াবিয়াসহ অনেক সাহাবী এবং ইবনে ইসহাক মিরাজকে স্বপ্নে বা আধ্যাত্মিকভাবে সংঘটিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন [4]

عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى – ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَى – وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى)
“তাঁকে শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী ফিরিস্তা। সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল। তখন সে ছিল উর্ধ্ব দিগন্তে”। (সূরা নাজম-৫৩: ৫-৭)
আর হাদীছে যেই নিকটবর্তী হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাতে সুস্পষ্ট যে, তিনি তাঁর মহান প্রভুর নিকটবর্তী হয়েছিলেন। সুতরাং সূরা নাজমের ঘটনার সাথে হাদীছে বর্ণিত মিরাজের ঘটনার কোন দ্বন্দ নেই। সূরা নাজমে বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী জিবরীলকে দুইবার আসল আকৃতিতে দেখেছেন। একবার আকাশে সিদরাতুল মুনতাহায়। আরেকবার যমীনে।
মিরাজের রাতে আল্লাহর যে সকল বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন সকাল বেলা তিনি তা লোকদেরকে বলতে লাগলেন। তারা এই ঘটনাকে কঠোরভাবে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিল এবং তাঁকে কষ্ট দিল। কুরাইশরা তাকে বাইতুল মাকদিসের বর্ণনা দিতে বলল। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর সামনে বাইতুল মাকদিস উন্মুক্ত করলেন। তিনি তাতে দৃষ্টি দিয়ে সব বলে দিলেন। তারা তাঁর একটি কথাও অস্বীকার করতে পারলনা। তিনি কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলার ভ্রমণ ও প্রত্যাবর্তন সম্পর্কেও খবর দিলেন, যেই কাফেলাকে তিনি মিরাজের রাতে যাত্রা পথে দেখে এসেছিলেন। তিনি কুরাইশদেরকে এ কথাও বলে দিলেন যে, উমুক দিন তারা ফেরত আসবে। এমন কি তিনি কাফেলার উটের বহরের সামনে যে উটটি ছিল সে সম্পর্কেও খবর দিলেন। দেখা গেল তিনি যেভাবে খবর দিয়েছিলেন সেভাবেই সত্যে পরিণত হল। কিন্তু তাতেও তারা মুহাম্মাদ এর প্রতি ঈমান আনয়ন করে নি। বরং তাদের সীমালংঘন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইবনে ইসহাক আয়িশা এবং মুআবিয়া থেকে বর্ণনা করে বলেন- মিরাজ হয়েছিল রূহানীভাবে। তবে রূহ তাঁর শরীর থেকে আলাদা হয়নি। হাসান বসরী থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। মিরাজ ‘স্বপ্নে হয়েছিল’ এবং ‘রূহের মাধ্যমে হয়েছিল’; সশরীরে নয়-এই কথা দু’টির মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা অবগত হওয়া জরুরী। উভয় কথার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। আয়িশা এবং মুআবিয়া এ কথা বলেন নি যে, স্বপ্নের মাধ্যমে মিরাজ হয়েছে। বরং তারা বলেছেন- ‘রূহের মাধ্যমে মিরাজ হয়েছে, কিন্তু রূহ শরীরকে হারায়নি। সুতরাং উভয়টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেননা ঘুমন্ত ব্যক্তি স্বপ্নে যা দেখে, তা কখনও জানা ও পরিচিত বিষয়ই দেখে। ঘুমন্ত ব্যক্তি কখনও দেখে যে, সে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে অথবা দেখে যে, তাকে মক্কার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অথচ তার রূহ আকাশের দিকেও উঠেনি এবং মক্কার দিকেও যায়নি। বরং স্বপ্নের ফিরিস্তা তার জন্য একটি উদাহরণ পেশ করে মাত্র।
যারা বলে রূহের মাধ্যমের মিরাজ হয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য এটি নয় যে, তা ছিল স্বপ্নে। বরং তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রকৃতপক্ষেই ‘রূহের মাধ্যমে মিরাজ হয়েছে এবং মৃত্যুর মাধ্যমে দেহ থেকে রূহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর যে রকম অবস্থার সম্মুখীন হবে নাবী এর রূহ মুবারকও মিরাজের রাত্রিতে সে রকম অবস্থারই সম্মুখীন হয়েছিল। আর এটি অবশ্যই ঘুমন্ত ব্যক্তি স্বপ্নে যা দেখে তার অনেক উর্ধ্বে। কিন্তু নাবী এর অবস্থা ছিল সাধারণ ও চিরাচরিত নিয়ম ও অভ্যাসের বাইরে। এ জন্য জীবিত অবস্থায়ই তাঁর পেট ফাড়া হয়েছে। অথচ তিনি ব্যথা অনুভব করেন নি। মৃত্যু ছাড়াই তাঁর রূহকে

মিরাজ 1

এই উদ্ধৃতির গুরুত্ব এখানেই: সশরীর মিরাজের দাবিকে পরে যতই “অকাট্য” ঈমানি সত্য হিসেবে চাপানো হোক, প্রাথমিক ঐতিহ্যের ভেতরেই ঘটনাটিকে রুহানি অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার শক্তিশালী ধারা ছিল। পরবর্তী লেখকরা এই রুহানি ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে তাকে সশরীর মতের সঙ্গে সামঞ্জস্য করানোর চেষ্টা করেছেন। এটাই প্রমাণ করে—আখ্যানটি শুরু থেকেই একমুখী, স্থির ও স্বচ্ছ ছিল না। বরং তা বিভিন্ন মত, ব্যাখ্যা ও ধর্মতাত্ত্বিক চাপে ধীরে ধীরে অলৌকিকীকৃত হয়েছে।

এবারে আসুন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস দেখা যাক। এখানে বিবরণের শুরুতে নবী ঘুমন্ত অবস্থায় আছেন; মাঝখানে বলা হচ্ছে, তাঁর চোখ ঘুমায় কিন্তু অন্তর ঘুমায় না; আর বর্ণনার শেষে তিনি জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদুল হারামে আছেন। এই ভাষা সশরীর মহাকাশযাত্রার চেয়ে স্বপ্ন/দর্শন/রুহানি অভিজ্ঞতার পাঠকে আরও শক্তিশালী করে [5]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৯. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ এবং মূসা (আঃ) এর সাথে আল্লাহ্‌ সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন (৪ঃ ১৬৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫১৭
৭০০৯। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু সালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক রাতে কাবার মসজিদ থেকে সফর করানো হল। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে ওহী প্রেরণের পুর্বে তার কাছে তিনজন ফেরেশতার একটি জামাআতে আসল। অথচ তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এদের প্রথমজন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের উত্তম ব্যাক্তি। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের উত্তম ব্যাক্তিকেই নিয়ে চল। সে রাতটির ঘটনা এটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। অবশেষে তারা অন্য এক রাতে আগমন করলেন যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তার চোখ ঘুমন্ত, অন্তর ঘুমায় না। অনুরূপ অন্য নবীগণেরও চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না।
এ রাতে তারা তার সাথে কোন কথা না বলে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার গলার নিচ হতে বক্ষস্থল পর্যন্ত ছেদন করলেন এবং তার বক্ষ ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিছন্ন করলেন, তারপর সেখানে একটি তশতরী আনা হয় এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিকমতে। তাঁর বক্ষ ও গলার রগগুলি এর দ্বারা পূর্ণ করলেন।
তারপর সেগুলো যখাস্থানে স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ফিরে আসমানের দিকে আরোহণ করলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসিগণ তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেনঃ জিবরীল। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন তারা বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন) শুভাগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা যমীনে কি করতে চাচ্ছেন তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না।
দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে পেলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সালাম দিলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) তার সালামের উত্তর দিলেন। এবং বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র। তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবাহমান নহর দুনিয়ার আসমানে অবলোকন করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এ নহর দুটি কোন নহর হে জিবরীল! জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ দুটি হলো নীল ও ফুরাতের মুল।
এরপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নহর অবলোকন করলেন। এর ওপর প্রতিঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নহরে হাত মারলেন। তা ছিল অতি উন্নতমানের মিসক। তিনি বললেনঃ হে জিবরীল! এটি কি? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হাউযে কাওসার। যা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গমন করলেন। প্রথম আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতাগণ তাকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেনঃ তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। তারা বললেনঃ আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা বললেনঃ তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গমন করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তৃতীয় আসমানের ফেরেশতাগণও তাই বললেন। তারপর তাকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গমন করলেন। তারাও তাঁকে পুর্বের ন্যায়ই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গমন করলেন। সেখানেও ফেরেশতারা পূর্বের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলে সেখানেও ফেরেশতারা তাকে পূর্বের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম উল্লেখ করেছেন।
তন্মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম), চতূর্থ আসমানে হারুন (আলাইহিস সালাম), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যায় নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর সাথে বাক্যলাপের মর্যাদার কারণে মূসা (আলাইহিস সালাম) আছেন সপ্তম আসমানে।
সে সময় মূসা বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমি তো ধারনা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এত ঊর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার প্রতি ওহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের কথা ওহী যোগে পাঠানো হলো।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করেন। আর মূসার কাছে পৌছলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতিপালক আপনাকে কি নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায়ে সক্ষম হবে না। সুতরাং আপনি ফিরে যান তাহলে আপনার প্রতিপালক আপনার এবং আপনার উম্মাতের থেকে এ আদেশটি সহজ করে দিবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের দিকে এমনভাবে লক্ষ্য করলেন, যেন তিনি এ বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হ্যাঁ। আপনি চাইলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মাত এটি আদায়ে সক্ষম হবে না। তখন আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে নামালেন। এভাবেই মূসা তাকে তাঁর প্রতিপালকের কাছে পাঠাতে থাকলেন। পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এর চেয়েও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তদুপরি তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছেন অথচ আপনার উম্মাত দৈহিক, মানসিক, শারীরিক সৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা সব দিকে আরো দুর্বল।
সুতরাং আপনি আবার যান এবং আপনার প্রতিপালক থেকে নির্দেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরীলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে গমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ নিতান্তই দুর্বল। তাই নির্দেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আপনার নিকটে হাযির, বারবার হাযির।
আল্লাহ বললেনঃ আমার কথার কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ’উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত (নামায/নামাজ) পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিপিবদ্ধ আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে প্রত্যাবর্তন করলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে দশটি সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে এর চাইতেও সামান্য জিনিসের প্রত্যাশ্য করছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার প্রতিপালকের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন আরো একটু কমিয়ে দেন।
এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মূসা, আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার গিয়েছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তার সাথে মতান্তর করছি। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ অবতরণ করতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই হাদিসটি মিরাজের সশরীর ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে আরেকটি ভেতরকার চাপ তৈরি করে। শুরুতে নবী ঘুমন্ত, মাঝখানে ঘটনা “অন্তর দ্বারা” দেখা হচ্ছে, শেষে তিনি জেগে দেখছেন মসজিদে হারামে আছেন। এই ঘুম-দর্শন-জাগরণ কাঠামোকে জোর করে সশরীর মহাকাশযাত্রা বানাতে হলে পাঠের সরল অর্থের ওপর ধর্মতাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ করতে হয়। বরং সরাসরি পাঠে এটি রুহানি/স্বপ্নগত/দর্শনমূলক অভিজ্ঞতার কাঠামোর সঙ্গেই বেশি মেলে।

এই দুই বিচ্ছিন্ন কুরআনিক ইঙ্গিত ও ভিন্ন আখ্যানগত কাঠামোকে পরবর্তী হাদিস-সীরাত ঐতিহ্য একত্র করে পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছে: প্রথমে মক্কা থেকে জেরুজালেম, তারপর জেরুজালেম থেকে আসমানের স্তরসমূহ, তারপর আল্লাহর দরবার, শেষে নামাজের সংখ্যা কমানোর প্রশাসনিক দর-কষাকষি। এই পুরো রৈখিক কাঠামো কুরআনের সরাসরি পাঠ থেকে আসে না; এটি পরবর্তী মৌখিক কিংবদন্তি, সীরাতীয় সম্প্রসারণ এবং হাদিসীয় ধর্মতত্ত্বের নির্মাণ।

যদি ঘটনাটি সত্যিই ইসলামের কেন্দ্রীয়, বস্তুগত ও ঐতিহাসিক অলৌকিক মহাকাশভ্রমণ হতো, তবে কুরআনের মতো প্রধান গ্রন্থে তার সুসংহত কাঠামো থাকার কথা ছিল। কিন্তু কুরআনে আছে বিচ্ছিন্ন ইঙ্গিত; পূর্ণ নাট্যমঞ্চ তৈরি হয়েছে পরবর্তী বর্ণনায়। এই ব্যবধানই দেখায়—মিরাজ কোনো সরাসরি, স্থির ও প্রত্যক্ষ কুরআনিক ঘটনা নয়; এটি কুরআনিক মোটিফ, সমসাময়িক ধর্মীয় কল্পনা, সীরাতীয় সম্প্রসারণ এবং হাদিসীয় ধর্মতত্ত্বের বিবর্তিত নির্মাণ।


নতুন বোতলে পুরনো মদঃ প্রাচীন মিথের পুনরাবৃত্তি

ইসলামি দাওয়াহ সাহিত্য ও ধর্মীয় বক্তৃতায় মিরাজকে প্রায়ই ইতিহাসের একক, অনন্য এবং অভূতপূর্ব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। দাবি করা হয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এর কোনো তুলনা নেই; একজন মানুষ এক রাতে পৃথিবী থেকে অনেকগুলো আকাশ অতিক্রম করে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে পৌঁছেছেন, এটি নাকি মুহাম্মদের নবুওয়াতের অন্যতম শক্তিশালী প্রমাণ। কিন্তু এই দাবির প্রথম দুর্বলতা হলো, মিরাজের কাঠামো মোটেই অনন্য নয়। বরং স্বর্গে আরোহণ, দেবদূতের সহায়তায় আকাশ ভ্রমণ, বহুস্তরবিশিষ্ট আসমান, ঈশ্বরের সিংহাসন, নরকদর্শন, পাপীদের শাস্তি এবং ফিরে এসে মানবসমাজকে সতর্ক করা, এসব উপাদান ইসলামের বহু আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, ইহুদি-খ্রিস্টান অ্যাপোক্রিফা এবং জরথুস্ত্রীয় ধর্মীয় সাহিত্যে প্রচলিত ছিল [6]। Tisdall-এর কাজ পুরনো ও পোলেমিক্যাল; তাই দুর্বল লেখক এখানে থেমে যাবে, কিন্তু শক্তিশালী বিশ্লেষণ এখান থেকে এগিয়ে যাবে। আসল প্রশ্ন Tisdall ঠিক না ভুল নয়; আসল প্রশ্ন হলো—ইসলামের আগেই নিকটপ্রাচ্য ও ইরানীয় ধর্মীয় পরিবেশে স্বর্গারোহণ, আকাশ-স্তর, দেবদূত-গাইড, পরকালদর্শন ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার মোটিফ সক্রিয় ছিল কি না। উত্তর হলো—ছিল। ফলে মিরাজের অনন্যতার দাবি শুরুতেই ভেঙে পড়ে। মূল বিশ্লেষণ দাঁড়াতে হবে Haug, Encyclopaedia Iranica, Kirdīr inscription এবং আধুনিক ইরানতাত্ত্বিক গবেষণার ওপর।

এখানে “মিল” বলতে শুধু সামান্য থিমগত সাদৃশ্য বোঝানো হচ্ছে না। ধর্মীয় পুরাণে স্বর্গ-নরক, দেবদূত বা ঈশ্বরের দরবারের ধারণা সাধারণভাবে বহু সংস্কৃতিতে থাকতে পারে, এটি আলাদা বিষয়। কিন্তু মিরাজের ক্ষেত্রে যে নির্দিষ্ট আখ্যানিক কাঠামো দেখা যায়—একজন নির্বাচিত ধর্মীয় ব্যক্তি বা পয়গম্বর, বিশেষ রাত বা বিশেষ অবস্থায় আধ্যাত্মিক/মহাজাগতিক যাত্রা, দেবদূতের পথপ্রদর্শন, স্তরভিত্তিক আকাশ, পূর্ববর্তী পুণ্যবান বা নবীসদৃশ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, স্বর্গ-নরক দর্শন, পাপীদের নির্দিষ্ট শাস্তি, শেষে ফিরে এসে ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা—এই পূর্ণ কাঠামো ইসলামের পূর্ববর্তী বহু ধর্মীয় সাহিত্যে বিদ্যমান। ফলে মিরাজকে ইতিহাসের একক অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখার আগে এটিকে প্রাচীন ধর্মীয় মিথ-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার মধ্যে স্থাপন করাই পদ্ধতিগতভাবে বেশি যুক্তিসঙ্গত।

মিরাজের সঙ্গে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে সবচেয়ে আলোচিত সাদৃশ্যগুলোর একটি পাওয়া যায় জরথুস্ত্রীয় স্বর্গারোহণ ও পরকাল-দর্শন ঐতিহ্যে, বিশেষত Ardā Wīrāz-nāmag বা ‘আরদা ভিরাফ নামাগ’-এ। এখানে যুক্তির কাঠামো পরিষ্কার রাখতে হবে: বর্তমান Ardā Wīrāz-nāmag-কে সরাসরি সপ্তম শতকের আগের সম্পূর্ণ লিখিত দলিল হিসেবে দেখানো প্রয়োজন নেই। কারণ এই প্রবন্ধের যুক্তি “মুহাম্মদ বই খুলে কপি করেছেন” নয়; যুক্তি হলো, ইসলামের আগেই ইরানীয় ও নিকটপ্রাচ্যীয় ধর্মীয় পরিবেশে স্বর্গারোহণ, পরকালদর্শন ও দৈব-যাত্রার মিথিক্যাল কাঠামো বিদ্যমান ছিল। তাই মিরাজকে আকাশ থেকে পড়া একক অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখানো ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল। Encyclopaedia Iranica অনুযায়ী এর চূড়ান্ত রূপ ৯ম–১০ম শতকের দিকে স্থির হয়েছে, যদিও এর মৌখিক রূপ আরও কয়েক শতাব্দী পুরনো। একই সঙ্গে Iranica দেখায়, ৩য় শতকের Kirdīr inscription-এও পবিত্র আত্মার স্বর্গ-নরক দর্শনধর্মী যাত্রার মোটিফ ছিল। ফলে শক্তিশালী যুক্তিটি কোনো সস্তা “চুরি” অভিযোগ নয়; বরং আরও গভীর ও ধ্বংসাত্মক: ‘স্বর্গারোহণ, দৈব গাইডলাইন, পরকাল দর্শন, ধর্মীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এসব মোটিফ ইসলামের আগে ইরানীয় ও নিকটপ্রাচ্যীয় ধর্মীয় পরিবেশে সক্রিয় ছিল।’ এইসব কাহিনিতে দেখা যায়, ধর্মীয় শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়লে ভিরাফ নামে এক পুণ্যবান ব্যক্তিকে পরকাল দর্শনের জন্য বেছে নেওয়া হয়। তিনি স্বর্গ ও নরক দেখে ফিরে এসে মানবসমাজকে সতর্ক করেন এবং ধর্মীয় সত্যের দাবি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এই কাঠামো মিরাজের ধর্মীয় ভূমিকার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়: নবী ঊর্ধ্বলোকে যান, জান্নাত-জাহান্নাম দেখেন, ঐশ্বরিক নির্দেশ নিয়ে ফিরে আসেন এবং তার অভিজ্ঞতা উম্মতের জন্য বিধানিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বে রূপান্তরিত হয় [7]

ভ্রমণের ধরণ ও প্রস্তুতি: ‘আরদা ভিরাফ নামাগ’-এর বর্ণনায় ভিরাফকে পরকাল দর্শনের আগে বিশেষ এক ধরনের পানীয় বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করানো হয়; এরপর তিনি গভীর নিদ্রা বা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় প্রবেশ করেন, শরীর নিথর থাকে, কিন্তু তার আত্মা স্বর্গ ও নরকের ভ্রমণে বের হয় [8]। মিরাজের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক ইসলামি বর্ণনাগুলোর মধ্যে ঘুম, তন্দ্রা, স্বপ্ন, রুহানি ভ্রমণ এবং শারীরিক ভ্রমণ, এই বিভিন্ন ব্যাখ্যার উপস্থিতি লক্ষণীয়। কোনো কোনো বর্ণনায় নবী নিজের ঘরে [9] বা মক্কার হাতিম চত্বরে [10] বা উম্মে হানির ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন; আবার পরবর্তী ধর্মতত্ত্বে ঘটনাটিকে সশরীর ভ্রমণ হিসেবে জোর দেওয়া হয়েছে [11] [12]। এই বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য নিজেই গুরুত্বপূর্ণ: একটি আধ্যাত্মিক দর্শন বা স্বপ্ন-অভিজ্ঞতা পরবর্তী কালে কীভাবে বস্তুগত অলৌকিক ইতিহাসে রূপান্তরিত হতে পারে, মিরাজ তার একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে।

গাইড বা পথপ্রদর্শক: প্রাচীন স্বর্গারোহণ আখ্যানগুলোর একটি প্রায় স্থায়ী উপাদান হলো—মানুষ একা ঊর্ধ্বলোকে যেতে পারে না; তাকে কোনো দেবদূত, ঐশ্বরিক সত্তা বা অতিমানবীয় পথপ্রদর্শক নিয়ে যায়। ভিরাফের কাহিনিতে ‘সরোশ’ (Srosh) এবং ‘আদার’ (Adar) নামের দুই ঐশ্বরিক সত্তা তাকে বিভিন্ন স্তর দেখিয়ে নিয়ে যায় [13]। মিরাজেও একই কাঠামো বজায় থাকে: জিবরাঈল নবীকে বোরাকে আরোহণ করান, মক্কা থেকে জেরুজালেমে নিয়ে যান, এরপর আসমানের স্তরগুলো অতিক্রম করান, প্রতিটি স্তরে পরিচয় করিয়ে দেন এবং সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পথ দেখান। এখানে মূল কাঠামোটি একই: মানব-নবী বা পুণ্যবান ব্যক্তি নিজ ক্ষমতায় নয়, বরং আকাশীয় গাইডের সহায়তায় ঈশ্বরীয় রাজ্যে প্রবেশ করেন।

স্বর্গ-নরক দর্শন ও বিচারসেতু: ভিরাফ তার যাত্রায় পুণ্যবানদের সুখভোগ এবং পাপীদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করেন। পরকালকে কেবল বিমূর্ত নৈতিক ধারণা হিসেবে নয়, দৃশ্যমান বিচারব্যবস্থা হিসেবে দেখানো হয়। জরথুস্ত্রীয় ঐতিহ্যে ‘চিনভাট ব্রিজ’ (Chinvat Bridge) বা বিচারসেতুর ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সেতু পুণ্যবানদের জন্য নিরাপদ ও প্রশস্ত, কিন্তু পাপীদের জন্য ভয়ংকর ও বিপজ্জনক; পাপীরা সেখান থেকে নরকে পতিত হয় [14]। ইসলামে পরবর্তী কালের পুলসিরাত ধারণায়ও একই ধরনের বিচারসেতু দেখা যায়—চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম, তরবারির চেয়ে ধারালো, যার উপর দিয়ে মানুষকে অতিক্রম করতে হবে [15]। এই সাদৃশ্য কেবল ভাষাগত নয়; এটি পরকাল-ন্যায়বিচারের একটি একই ধরনের নাটকীয় দৃশ্যকল্প। ধর্মীয় পুরাণে নৈতিক ভয় তৈরি করার জন্য দৃশ্যমান, শারীরিক, বিপজ্জনক সেতুর প্রতীকী ব্যবহার এখানে উভয় ঐতিহ্যেই কাজ করছে।

ইহুদি ও খ্রিস্টান অ্যাপোক্রিফাল সাহিত্যেও একই ধরনের স্বর্গারোহণ আখ্যানের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা যায়। ‘টেস্টামেন্ট অফ আব্রাহাম’ (Testament of Abraham), ‘এসেনশন অফ আইজায়া’ (Ascension of Isaiah), ইনোক-সাহিত্য এবং পরবর্তী মেরকাবাহ ঐতিহ্যে আকাশের স্তর, ফেরেশতা, ঈশ্বরের সিংহাসন, মৃতদের বিচার এবং স্বর্গীয় জগতের দর্শন বারবার ফিরে আসে [16]। সুতরাং মিরাজকে বিচ্ছিন্নভাবে পড়লে এটি অলৌকিক ও অনন্য মনে হতে পারে; কিন্তু একই অঞ্চলের পূর্ববর্তী ধর্মীয় সাহিত্যগুলোর পাশে রাখলে এটি পরিচিত স্বর্গারোহণ-মিথ, পরকাল-ভ্রমণ আখ্যান এবং পবিত্র কর্তৃত্ব নির্মাণের ইসলামি পুনর্বিন্যাস—এ ব্যাখ্যাই প্রমাণের ভার, উৎসের ইতিহাস এবং আখ্যানের কাঠামোর সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এখানে apologetic আপত্তি সাধারণত আসে—“মিল থাকলেই ধার করা প্রমাণ হয় না।” এই আপত্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মূল প্রশ্ন সরিয়ে দেয়। ইতিহাসচর্চায় সরাসরি নকল প্রমাণ করা সবসময় জরুরি নয়; অনেক সময় পূর্ববর্তী মোটিফ, ভৌগোলিক যোগাযোগ, ধর্মীয় পরিবেশ এবং আখ্যানের গঠনই যথেষ্ট শক্তিশালী ব্যাখ্যা দেয়। শুধু সাদৃশ্য থেকে সরাসরি “চুরি” প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু ইতিহাসে কোনো আখ্যানের উৎপত্তি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: পূর্ববর্তী মোটিফের অস্তিত্ব, ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক সংযোগ, এবং বর্ণনার কাঠামোগত সাদৃশ্য। মিরাজের ক্ষেত্রে তিনটিই উপস্থিত। সপ্তম শতাব্দীর আরব অঞ্চল বাণিজ্য, যুদ্ধ, ধর্মীয় বিতর্ক, ইহুদি-খ্রিস্টান সম্প্রদায়, সিরিয়া-ফিলিস্তিন, পারস্য এবং বাইজেন্টাইন জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং এই অঞ্চল ছিল নানা ধর্মীয় গল্প, লোকবিশ্বাস, নবী-কাহিনি ও পরকাল-ভীতির সক্রিয় বিনিময়ক্ষেত্র। ফলে মিরাজের গল্পকে শূন্য থেকে আকাশভেদী অলৌকিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং প্রচলিত ধর্মীয় উপাদানসমূহের পুনর্গঠন হিসেবে দেখা অধিকতর ঐতিহাসিকভাবে সংগত।

নির্মোহভাবে বিচার করলে মিরাজের কাহিনির শক্তি তার প্রমাণমূল্যে নয়, বরং তার কল্পনাশক্তিতে। এটি এক চমৎকার ধর্মীয় নাট্যকাহিনি: নবী রাত্রিতে যাত্রা করেন, আকাশের স্তর পার হন, পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে দেখা করেন, জান্নাত-জাহান্নাম দেখেন, ঈশ্বরের নির্দেশ নিয়ে ফিরে আসেন এবং নিজের ধর্মীয় কর্তৃত্ব আরও দৃঢ় করেন। কিন্তু সাহিত্যিক শক্তি আর ঐতিহাসিক সত্য এক জিনিস নয়। একটি আখ্যান মানুষের কল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে, নৈতিক ভয় তৈরি করতে পারে, রাজনৈতিক-ধর্মীয় কর্তৃত্ব নির্মাণ করতে পারে—তবু সেটি বাস্তবে ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য স্বাধীন প্রমাণ দরকার। মিরাজের ক্ষেত্রে সেই স্বাধীন প্রমাণ অনুপস্থিত; বরং বিপরীতে রয়েছে পূর্ববর্তী ধর্মীয় মিথের সঙ্গে গভীর কাঠামোগত সাদৃশ্য।

মিরাজের অনন্যতা দাবি করার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: ধর্মীয় ইতিহাসে “অদেখা জগতে ভ্রমণ করে ফিরে এসে সত্য ঘোষণা করা” একটি অত্যন্ত পুরনো ক্ষমতা-নির্মাণ কৌশল। যে ব্যক্তি নিজেকে স্বর্গ, নরক, ঈশ্বরের দরবার বা অদৃশ্য জগতের প্রত্যক্ষদর্শী বলে ঘোষণা করেন, তিনি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা এক বিশেষ জ্ঞানের দাবিদার হয়ে ওঠেন। এই দাবির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্য বিপুল। কারণ কেউ সেই জগতে গিয়ে যাচাই করতে পারে না, অথচ সেই অদেখা জগতের নামে পৃথিবীর মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মিরাজের আখ্যানও ঠিক এই কাজ করে—অদেখা আকাশকে ব্যবহার করে দৃশ্যমান সমাজে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

টেবিল: আর্দা ভিরাফ, ইহুদি–খ্রিস্টান অ্যাপোক্রিফা বনাম মিরাজ – একটি তুলনামূলক চিত্র

নিচের টেবিলে জরথুস্ত্রীয়, ইহুদি–খ্রিস্টান অ্যাপোক্রিফা এবং ইসলামি মিরাজ বর্ণনার প্রধান আখ্যানিক উপাদানগুলো তুলনামূলকভাবে উপস্থাপন করা হলো। এই তুলনার উদ্দেশ্য হলো—মিরাজের গল্পটি কতটা স্বতন্ত্র, আর কতটা পূর্ববর্তী ধর্মীয় স্বর্গারোহণ-সাহিত্যের ধারাবাহিকতার মধ্যে পড়ে তা বোঝানো।

বিষয়/উপাদানজরথুস্ত্রীয় (Zoroastrian) আরদা ভিরাফ নামাহ (৩য়–১০ম শতাব্দী)ইহুদি–খ্রিস্টান অ্যাপোক্রিফা (২য় শতাব্দী খ্রিপূ–৪র্থ শতাব্দী খ্রিস্টাব্দ)ইসলামিক মিরাজ (৭ম শতাব্দী)মিলের মাত্রা (১–১০)মন্তব্য
ভ্রমণের উৎসআরদা ভিরাফ নামাহ – সাসানীয় পারস্যের আধ্যাত্মিক রাতভ্রমণ কাহিনিBook of Enoch, Ascension of Isaiah, Testament of Abraham, 2 Enochকুরআন (১৭:১, ৫৩:১–১৮) + বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী১০/১০তিন ধারাতেই নির্বাচিত ব্যক্তির ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা ও পরকালদর্শনের কাঠামো আছে
ভ্রমণের শুরুর অবস্থামাং (হ্যালুসিনোজেনিক ওয়াইন) পান করে ৭ দিনের গভীর নিদ্রা/ট্রান্সইনোক/ইশায়া ঘুম বা ধ্যানে পড়ে যান, আত্মা শরীর ছেড়ে যায়অনেক হাদিসে নবী ঘুমন্ত অবস্থায় (বুখারী ৩৮৮৭: “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম…”)৯/১০স্বপ্ন, তন্দ্রা, ট্রান্স বা রুহানি ভ্রমণের মোটিফ তিন ধারাতেই শক্তিশালী
পথপ্রদর্শক দেবদূতসরোশ (Sraosha) ও আদার (Atar) – দুই দেবদূতArchangel Michael, Raphael, Gabrielজিবরাঈল (গ্যাব্রিয়েল), বা দুই অথবা তিনজন ফেরেশতা৯/১০মানব-ভ্রমণকারী আকাশীয় গাইড ছাড়া ঊর্ধ্বলোকে যেতে পারে না—এই কাঠামো একই
বিশেষ যানবাহনপ্রথমে ষাঁড়-মুখো জন্তু, পরে আলোকময় পথEnoch-এ “ঝড়ো বাতাসের রথ”, Isaiah-এ আলোর রথবোরাক – ষাঁড়-মুখো, ঘোড়ার শরীর, ডানা, বিদ্যুৎগতি৯.৫/১০অতিপ্রাকৃত বাহন বা আলোকগতির ভ্রমণ ধর্মীয় কল্পকাহিনির পরিচিত মোটিফ
সেতু বা বিচার পুলচিনভাট সেতু – চুলের চেয়ে সরু, তলোয়ারের চেয়ে ধারালোJewish Merkabah texts-এ “Bridge of Fire”, “Narrow Bridge”পুলসিরাত – চুলের চেয়ে সরু, তলোয়ারের চেয়ে ধারালো১০/১০বিচারসেতুর ধারণা পরকাল-ভীতির নাটকীয় ধর্মীয় রূপ
স্বর্গের স্তর সংখ্যাস্পষ্টভাবে ৭ স্তরের আসমান (star station, moon station…)2 Enoch-এ ৭ বা ১০ আসমান, Hekhalot literature-এ ৭ হেকালট৭ আসমান – প্রতিটিতে একজন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ১০/১০স্তরভিত্তিক মহাবিশ্ব প্রাচীন ধর্মীয় কসমোলজির সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো
প্রতি স্তরে নবী/পুণ্যবানদের সাক্ষাৎপ্রতি স্তরে পূর্ববর্তী যিশত, দেবতা, পুণ্যবান আত্মাEnoch-এ আদম, আবেল, ইত্যাদি; Isaiah-এ Abel, Enoch১ম: আদম, ২য়: ঈসা+ইয়াহিয়া, ৩য়: ইউসুফ, ৪র্থ: ইদরিস, ৫ম: হারুন, ৬ষ্ঠ: মূসা, ৭ম: ইব্রাহিম১০/১০ঊর্ধ্বযাত্রার প্রতিটি স্তরে পূর্ববর্তী পবিত্র ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি একই আখ্যানিক পদ্ধতি
সর্বোচ্চ স্তরে ঈশ্বরের সিংহাসনআহুরা মাজদার আরশ ও দরবারEnoch-এ “Great Glory”-র সিংহাসন, Isaiah-এ “Lord of Glory”সিদরাতুল মুনতাহা → আল্লাহর আরশ (কিছু বর্ণনায় সরাসরি দর্শন)৯.৫/১০ঈশ্বরকে স্থানিক রাজদরবারে কল্পনা করার প্রাচীন ধর্মীয় প্রবণতা এখানে স্পষ্ট
স্বর্গ-নরকের দৃশ্যপাপীদের নির্দিষ্ট শাস্তি (যেমন ব্যভিচারীদের লিঙ্গ কেটে খাওয়ানো)Enoch-এ পাপীদের শাস্তি: অন্ধকার গর্ত, আগুন, কীটজাহান্নামে ব্যভিচারীদের লিঙ্গে হুক, সুদখোরের পেটে সাপ৯/১০নৈতিক অপরাধকে শারীরিক নির্যাতনের দৃশ্যে অনুবাদ করা তিন ধারাতেই আছে
ভ্রমণের উদ্দেশ্যধর্মীয় বিশৃঙ্খলা দূর করা, মানুষকে সৎপথে আনাপাপ থেকে সতর্ক করা, ঈশ্বরের বার্তা পৌঁছানোনামাজ ফরজ করা, কাফেরদের চ্যালেঞ্জ, উম্মতকে সতর্ক করা১০/১০আধ্যাত্মিক ভ্রমণ শেষে ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা—এই কার্যকারিতা একই
ফিরে এসে বর্ণনা দেওয়া৭ দিন পর জেগে উঠে বিস্তারিত বর্ণনা দেনEnoch/Isaiah ফিরে এসে লিখে রাখেননবী ফিরে এসে কাফেরদের বলেন, আবু বকর বিশ্বাস করেন১০/১০অদেখা জগত দেখে ফিরে আসা ব্যক্তি ধর্মীয় সাক্ষীর ভূমিকা গ্রহণ করেন
সময়ের দৈর্ঘ্য৭ দিন শরীর ঘুমন্ত, আত্মা ভ্রমণ করেEnoch-এ ৭ দিনের ভ্রমণের উল্লেখ আছেএক রাতে পুরো ভ্রমণ, বিছানা ঠান্ডা হয়নি৮/১০সময়ের অস্বাভাবিক সংকোচন ধর্মীয় অলৌকিক আখ্যানের পরিচিত বৈশিষ্ট্য

এই তুলনা থেকে যে সিদ্ধান্তটি উঠে আসে তা সরল: মিরাজ কোনো বিচ্ছিন্ন, প্রমাণযোগ্য, ঐতিহাসিক মহাকাশভ্রমণ নয়; বরং এটি প্রাচীন ধর্মীয় আখ্যানভাণ্ডারের পরিচিত উপাদানগুলোকে ইসলামি ভাষা, নবুয়ত-তত্ত্ব এবং বিধানিক কর্তৃত্বের মধ্যে পুনর্গঠিত করেছে। এর ফলে গল্পটি বিশ্বাসীর কাছে অলৌকিক, বক্তার কাছে আবেগঘন, এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে কর্তৃত্ব-নির্মাণের উপযোগী হলেও, ইতিহাসবিদ বা বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকের কাছে এটি প্রাচীন মিথের ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি বলেই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত মনে হয়।


আল-আকসা মসজিদঃ ঐতিহাসিক বাস্তবতা বনাম মিরাজের উপকথা

মিরাজের কাহিনির সবচেয়ে গুরুতর ঐতিহাসিক সমস্যাগুলোর একটি হলো জেরুজালেমের তথাকথিত “মসজিদুল আকসা” বা “দূরবর্তী মসজিদ”-সংক্রান্ত দাবি। কুরআনের সূরা বনি ইসরাঈলের ১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নবীকে এক রাতে “মসজিদুল হারাম” থেকে “মসজিদুল আকসা” পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়। পরবর্তী হাদিস, সীরাত ও তাফসির-ঐতিহ্যে এই “মসজিদুল আকসা”কে জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট বা বর্তমান হারাম আল-শরীফ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এরপর বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত হয় নবীর সেখানে প্রবেশ, বোরাক বাঁধা, পূর্ববর্তী নবীদের ইমামতি করা, তারপর সেখান থেকে আকাশে আরোহণের কাহিনি।

এখানে প্রশ্নটি এত সরল যে ধর্মীয় ব্যাখ্যার কুয়াশা সরালেই সমস্যা নগ্ন হয়ে পড়ে: নবী মুহাম্মদের জীবদ্দশায়, বিশেষত মিরাজের প্রচলিত সম্ভাব্য সময়—আনুমানিক ৬২০-৬২১ খ্রিস্টাব্দে—জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্টে আদৌ কোনো ইসলামি মসজিদ, কার্যকর প্রার্থনালয়, দরজা, খুঁটি, বা এমন কোনো স্থাপনা ছিল কি, যেখানে একজন ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারেন, বোরাক বাঁধতে পারেন এবং নবীদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করতে পারেন?

ঐতিহাসিক সূত্র, মুসলিম ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং স্থাপত্য-ইতিহাসের আলোকে উত্তরটি স্পষ্ট: বর্তমান অর্থে কোনো ইসলামি মসজিদ সেখানে ছিল না—এটি কেবল একটি ছোটখাটো কালগত অসুবিধা নয়; এটি মিরাজ-আখ্যানের পবিত্র ভূগোল নির্মাণের বিরুদ্ধে মৌলিক ঐতিহাসিক আঘাত। যদি জেরুজালেমের সেই স্থান তখন মুসলিম নিয়ন্ত্রণে না থাকে, ইসলামি স্থাপত্য না থাকে, এবং পরবর্তী মুসলিম সূত্রেই স্থানটি আবর্জনায় ঢাকা বলে উঠে আসে, তাহলে “মসজিদে প্রবেশ”, “বোরাক বাঁধা” ও “নবীদের ইমামতি”কে সরল ইতিহাস হিসেবে পড়া বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। বরং টেম্পল মাউন্ট দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংসের পর দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক-ধর্মীয়ভাবে পরিবর্তিত ও অবহেলিত অবস্থায় ছিল। মুসলিম ঐতিহাসিক সূত্র—বিশেষত তাবারী ও ইবনে কাসীরের বর্ণনা—দেখায়, উমরের জেরুজালেম প্রবেশের সময় সাখরা/মন্দিরস্থল আবর্জনায় ঢাকা ছিল এবং তিনি নিজে তা পরিষ্কার করার কাজে অংশ নেন। অর্থাৎ এই দাবিটি প্রত্নতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং মুসলিম ঐতিহাসিক বর্ণনার বিরুদ্ধে পরবর্তী মিরাজ-স্থাপত্য কল্পনার অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। তাই মিরাজের বর্ণনায় “মসজিদুল আকসা” যদি কেবল একটি পবিত্র স্থান বা “সিজদার স্থান” অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবু পরবর্তী হাদিস-সীরাতের স্থাপত্যগত বর্ণনা—প্রবেশ করা, বোরাক বাঁধা, নির্দিষ্ট দরজা, নির্দিষ্ট প্রার্থনালয়—গুরুতর কালগত অসঙ্গতিতে পড়ে। আর যদি এটিকে বর্তমান আল-আকসা মসজিদের মতো একটি বাস্তব স্থাপনা হিসেবে পড়া হয়, তবে তা সরাসরি ইতিহাসবিরোধী।


ধ্বংসস্তূপের ইতিহাস: দ্বিতীয় মন্দিরের পতন থেকে বাইজেন্টাইন যুগ

জেরুজালেমের যে অঞ্চলকে বর্তমানে টেম্পল মাউন্ট বা হারাম আল-শরীফ বলা হয়, সেখানে প্রাচীনকালে ইহুদিদের দ্বিতীয় মন্দির বা Second Temple অবস্থিত ছিল। ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সেনাপতি টাইটাস জেরুজালেম দখল করেন এবং ইহুদি বিদ্রোহ দমনের সময় এই দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস করেন [17]। এই ঘটনা জেরুজালেমের ধর্মীয় ভূগোলকে আমূল বদলে দেয়। মন্দির ধ্বংসের পর স্থানটি আর ইহুদি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হয়নি; বরং রোমান ও পরে বাইজেন্টাইন ক্ষমতার অধীনে এটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতীকী অবমাননার ক্ষেত্রেও পরিণত হয়।

খ্রিস্টান শাসনামলে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরস্থলকে পুনর্নির্মাণ না করে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখার একটি ধর্মতাত্ত্বিক উদ্দেশ্যও ছিল। খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে যিশুর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কথা বলা হয় যেখানে মন্দিরের ধ্বংসের ইঙ্গিত রয়েছে। ফলে ইহুদি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষকে পুনর্গঠন না করে ধ্বংসাবশেষ হিসেবেই রাখা খ্রিস্টান শাসকদের জন্য ধর্মীয় বিজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে [18]। এই প্রেক্ষাপটে ৬২১ খ্রিস্টাব্দে সেখানে একটি কার্যকর ইসলামি মসজিদ থাকা ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব; কারণ তখনও ইসলাম জেরুজালেম জয় করেনি, মুসলিম স্থাপত্য-প্রকল্প শুরু হয়নি, এবং বর্তমান আল-আকসা বা ডোম অফ দ্য রকের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি পার্থক্য করা দরকার। আরবি “মসজিদ” শব্দের আক্ষরিক অর্থ সিজদার স্থান; তাই কেউ যুক্তি দিতে পারেন, কুরআনের “মসজিদুল আকসা” বলতে ইট-পাথরের মসজিদ নয়, বরং দূরবর্তী পবিত্র স্থান বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা পরবর্তী হাদিস-সীরাতের নির্দিষ্ট স্থাপত্যগত বর্ণনাকে উদ্ধার করতে পারে না। কারণ পরবর্তী ইসলামি বর্ণনাগুলো কেবল একটি পবিত্র স্থানের কথা বলে না; তারা এমন এক স্থানকাঠামোর কথা বলে, যেখানে প্রবেশ করা যায়, বাহন বাঁধা যায়, নির্দিষ্ট দরজা ও নির্দিষ্ট নামাজের স্থান নিয়ে আলোচনা করা যায়। এই স্থানীয়-স্থাপত্যগত ভাষা তখনকার জেরুজালেমের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


প্রার্থনালয় নাকি আবর্জনার ভাগাড়?

মিরাজের ঐতিহাসিক দাবির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণগুলোর একটি আসে মুসলিম ঐতিহাসিক সূত্র থেকেই। ইসলামের আবির্ভাবের সময় জেরুজালেম ছিল বাইজেন্টাইন খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রণে। একাধিক ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, টেম্পল মাউন্টের প্রাক্তন ইহুদি মন্দিরস্থান বাইজেন্টাইনদের কাছে সম্মানিত প্রার্থনাস্থল ছিল না; বরং এটি ছিল অবহেলিত ও আবর্জনায় ঢাকা অঞ্চল। কিছু সূত্রে এটিকে শহরের আবর্জনা ফেলার স্থান বা ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে [19]

এই তথ্যটি কেবল অমুসলিম ঐতিহাসিকদের ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। মুসলিম ঐতিহাসিক আল-তাবারির বর্ণনাতেও দেখা যায়, নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর কয়েক বছর পর, ৬৩৭-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করেন, তখন টেম্পল মাউন্ট বা বায়তুল মাকদিসের স্থান আবর্জনায় ঢাকা ছিল। তিনি নিজে সেখানে গিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজে অংশ নেন [20]

এই বর্ণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, যদি উমরের সময়—অর্থাৎ মিরাজের বহু বছর পর—সেই স্থান আবর্জনায় ঢাকা অবস্থায় থাকে এবং মুসলিম কর্তৃপক্ষের হাতে তখনই প্রথম পরিষ্কার ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাহলে মিরাজের রাতে সেখানে কোনো প্রস্তুত মসজিদ বা প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রার্থনাকেন্দ্র থাকার দাবি বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। বরং ইতিহাসের দিক থেকে বেশি যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা হলো—পরবর্তী মুসলিম স্মৃতি, রাজনৈতিক পবিত্রতা-নির্মাণ এবং জেরুজালেম দখলের পর ইসলামীকৃত ভূগোলের প্রয়োজন থেকেই “মসজিদুল আকসা” ধারণা ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট স্থাপত্যিক অর্থ পেতে শুরু করে।

তাবারীর বর্ণনা অনুযায়ী, খিলাফতের বিস্তারের সময় মুসলিম বাহিনী সিরিয়া–ফিলিস্তিন অঞ্চল দখল করছিল। জেরুজালেম, অর্থাৎ Bayt al-Maqdis, তখন বাইজেন্টাইনদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং অবরোধের মুখে পড়ে। জেরুজালেমের খ্রিস্টান নেতৃত্ব, বিশেষত প্যাট্রিয়ার্ক Sophronius, শান্তিচুক্তির জন্য শর্ত দেয় যে খলিফা উমর নিজে উপস্থিত থাকবেন। এই প্রেক্ষাপটে উমর মদিনা থেকে সিরিয়া যান, আল-জাবিয়াহ অঞ্চলে পৌঁছান, এবং পরবর্তীতে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন।

  • খলিফা উমর মদিনা থেকে সিরিয়ায় যান
  • আল-জাবিয়াহ পৌঁছে চুক্তির খসড়া প্রস্তুত হয়
  • এরপর তিনি জেরুজালেমে প্রবেশ করেন

জেরুজালেমে প্রবেশের পর তিনি যে স্থানটি দেখতে পান, সেটি কোনো প্রস্তুত, পরিচ্ছন্ন, কার্যকর মসজিদ ছিল না। বরং বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাক্তন মন্দিরস্থান আবর্জনার স্তূপে ঢাকা ছিল। এই তথ্যটি মিরাজ-আখ্যানের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী সমস্যা তৈরি করে। প্রথমত, নবীর জীবদ্দশায় সেখানে কোনো ইসলামি স্থাপনা থাকার সম্ভাবনা নেই। দ্বিতীয়ত, পরবর্তী মুসলিম ঐতিহ্য নিজেই স্বীকার করছে যে জেরুজালেম দখলের সময় সেই স্থান আবর্জনায় ঢাকা ছিল এবং উমর নিজে তা পরিষ্কার করেন।

  • উমর টেম্পল মাউন্ট এলাকায় যান; পরবর্তী মুসলিম বর্ণনায় এটিকে মসজিদ এলাকা বা বায়তুল মাকদিসের পবিত্র স্থান হিসেবে ভাষায়িত করা হয়
  • কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সেখানে নবীর সময়কার কোনো স্থায়ী ইসলামি মসজিদ ছিল না
  • স্থানটি রোমান ও বাইজেন্টাইনদের ফেলে রাখা আবর্জনার স্তূপে ঢাকা ছিল
  • ইহুদিদের প্রাচীন মন্দিরস্থানও আবর্জনার নিচে চাপা পড়েছিল বলে মুসলিম সূত্রে বর্ণনা করা হয়েছে
  • উমর নিজে সেই আবর্জনা পরিষ্কারে অংশ নেন
  • তারপর মুসলিমরা সেখানে প্রার্থনার জন্য একটি নতুন স্থান নির্ধারণ করে

এই বর্ণনাটি মিরাজের ঐতিহাসিক দাবির জন্য সংকটজনক নয়—প্রায় বিধ্বংসী। কারণ এটি দেখায়, মিরাজের পবিত্র ভূগোল পরবর্তী ইসলামী স্মৃতি ও রাজনৈতিক ধর্মীয়করণের ফল হতে পারে; কিন্তু ৬২০/৬২১ সালের বাস্তব জেরুজালেমের স্থাপত্যিক বর্ণনা হিসেবে এটি দাঁড়ায় না। কারণ এটি দেখায়, ইসলামের প্রথম প্রজন্মের জেরুজালেম জয়ের আগ পর্যন্ত টেম্পল মাউন্টের ইসলামিকরণ ঘটেনি। যদি জেরুজালেমে মুসলিম নিয়ন্ত্রণই না থাকে, যদি সেই স্থান আবর্জনার স্তূপে ঢাকা থাকে, যদি স্থাপত্যিক মসজিদ পরবর্তীকালে নির্মিত হয়, তাহলে নবীর সেখানে “মসজিদে প্রবেশ”, “বোরাক বাঁধা”, “নবীদের ইমামতি” ইত্যাদি বর্ণনা ঐতিহাসিক ঘটনার চেয়ে পরবর্তী ধর্মীয় কল্পনায় নির্মিত পবিত্র ভূগোল বলেই অধিকতর যুক্তিযুক্তভাবে ব্যাখ্যাত হয়।


আসুন তাবারির ইতিহাস গ্রন্থ থেকে দেখা যাক—

Then he (Umar) stood up from his place of prayer and went to the rubbish in which the Romans buried the temple (bayt al-maqdis) at the time of the sons of Israel. (When he came to the Byzantines, they had uncovered a part but left the rest under the rubbish.) He said: ‘O people, do what I am doing.’ He knelt in the midst of the rubbish and put it by the handful into the lower part of his mantle.

উমর তাঁর নামাজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং সেই আবর্জনার দিকে গেলেন, যার মধ্যে রোমানরা বায়তুল মাকদিস (Temple) কে পুঁতে রেখেছিল। যখন তিনি বাইজেন্টাইনদের কাছে এলেন, তারা এর একটি অংশ পরিষ্কার করেছিল, কিন্তু বাকিটা আবর্জনার নিচে রেখেছিল।”
“তিনি বললেন: ‘হে লোকেরা, তোমরা যা আমি করছি তাই করো।’
তিনি আবর্জনার মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং মুঠোভরে সেই আবর্জনা তুলে তাঁর চাদরের নিচের অংশে ভরতে লাগলেন।

মিরাজ 3

এখানে apologetic ব্যাখ্যা সাধারণত “মসজিদ মানে সিজদার স্থান” বলে সমস্যাটি এড়াতে চায়। কিন্তু এই উত্তর কুরআনের শব্দার্থকে সাময়িকভাবে রক্ষা করলেও হাদিস-সীরাতের স্থাপত্যিক কল্পনাকে রক্ষা করতে পারে না। কারণ বোরাক বাঁধা, নবীদের ইমামতি, নির্দিষ্ট প্রার্থনাস্থল, দরজা বা প্রবেশ—এসব ভাষা একটি কার্যকর পবিত্র স্থানের ধারণা তৈরি করে। যদি জায়গাটি তখন বাস্তবে পরিত্যক্ত, অমুসলিম শাসনের অধীন, এবং মুসলিম সূত্রেই আবর্জনায় ঢাকা ছিল বলে বোঝা যায়, তাহলে পরবর্তী মিরাজ-বর্ণনাকে সরল ইতিহাস নয়; বরং জেরুজালেম দখলের পর নির্মিত ইসলামীকৃত পবিত্র ভূগোল হিসেবে পড়াই বেশি যুক্তিযুক্ত।

তাবারির এই বর্ণনা থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: যদি ৬৩৭-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে খলিফা উমর নিজে টেম্পল মাউন্টে গিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করেন, তাহলে ৬২১ খ্রিস্টাব্দে নবী মুহাম্মদ সেখানে কোন মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন? যদি স্থানটি তখনও পরিত্যক্ত, আবর্জনায় ঢাকা, অমুসলিম শাসনের অধীন এবং ইসলামি স্থাপত্যহীন থাকে, তাহলে পরবর্তী মিরাজ-বর্ণনায় যে সুনির্দিষ্ট মসজিদীয় পরিবেশ দেখা যায় তা কীভাবে ঐতিহাসিক হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় বক্তৃতায় সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া হয়; কিন্তু ইতিহাসের আলোচনায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এবারে আসুন আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থ থেকে দেখি, [21]

হযরত উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা)-এর হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়
আবূ জা’ফর ইব্‌ন জারীর উল্লেখ করেছেন যে, এ ঘটনা ঘটেছে ১৫ হিজরী সনে। তিনি এটি বর্ণনা করেছেন সায়ফ ইবন উমর থেকে। তিনি এবং অন্যরা এ প্রসঙ্গে যা উল্লেখ করেছেন তার সারমর্ম এই যে, সেনাপতি আবূ উবায়দা দামেশক অভিযান শেষ করেন। তারপর তিনি জেরুযালেমের অধিবাসীদেরকে আল্লাহ্র পথে এবং ইসলামের পথে আসার আহ্বান জানিয়ে পত্র লিখেন। তিনি লিখেন যে, হয় ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা জিয়া কর প্রদান করবে অথবা যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হবে। তারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিতে অস্বীকার করে। তিনি তাঁর সেনাদল নিয়ে ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দামেশকের শাসনভার দিয়ে যান সাঈদ ইব্‌ন যায়দকে। তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। সেখানে খ্রিস্টানদের জীবন যাত্ৰা সংকটময় হয়ে ওঠে। তারপর তারা চুক্তি সম্পাদনে রাজী হয় এই শর্তে যে, স্বয়ং আমীরুল মু’মিনীন খলীফা উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা) এসে সন্ধিপত্র সম্পাদন করবেন। সেনাপতি আবূ উবায়দা এই সংবাদ খলীফাকে জানান। খলীফা তাঁর উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করেন। এ প্রসঙ্গে হযরত উসমান বললেন, স্বয়ং খলীফা ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। তাহলেই ওরা চরমভাবে অপমানিত হবে। হযরত আলী (রা) খলীফার যাবার পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। তাহলে অবরোধ আরোপকারী মুসলিম সৈন্যদের কষ্ট লাঘব হবে এবং সহজে ওই শহর জয় করা যাবে। খলীফা উমর (রা) হযরত আলী (রা)-এর পরামর্শ গ্রহণ করলেন। সৈন্য-সামন্ত নিয়ে তিনি জেরুযালেমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মদীনার শাসনভার দিয়ে গেলেন হযরত আলী (রা)-এর হাতে। তাঁর আগে আগে যাচ্ছিলেন হযরত আব্বাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব।
খলীফা সিরিয়া পৌঁছলে সেনাপতি আবূ উবায়দা ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সেনাপতিগণ তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ এবং ইয়াযীদ ইব্‌ন আবু সুফয়ান। আবূ উবায়দা পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন; উমর (রা)-ও পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আবূ উবায়দা (রা) হযরত উমর (রা)-এর হাতে চুমু খেতে চাচ্ছিলেন তখন হযরত উমর (রা) আবূ উবায়দার কদমবুচি অর্থাৎ পায়ে চুমু খেতে চাইলেন। আবূ উবায়দা (রা) তা দিলেন না। উমর (ঝ)-ও তাঁর হাতে চুমু খেতে দিলেন না। খলীফা উমর (রা) সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের খ্রিস্টানদের সাথে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করলেন এবং শর্ত করলেন যে, তিন দিনের মধ্যে সকল রোমান নাগরিক বায়তুল মুকাদ্দাস ছেড়ে চলে যাবে। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করলেন সেই দরজা দিয়ে, মি’রাজের রাতে রাসূলুল্লাহ্ যে দরজা দিয়ে প্রবশে করেছিলেন।
কেউ কেউ বলেছেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশের সময় তিনি তালবিয়া পাঠ করেছিলেন। ভেতরে গিয়ে দাউদ (আ)-এর মিহরাবের পার্শ্বে তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায আদায় করলেন। পরের দিন ফজরের নামায মুসলমানদেরকে সাথে নিয়ে জামাআতের সাথে আদায় করলেন। প্রথম রাক’আতে পাঠ করলেন সূরা সাদ (০)। তাতে তিনি তিলাওয়াতে সিজদা আদায় করলেন। তাঁর সাথে মুসলমানগণও সিজদায়ে তিলাওয়াত আদায় করলেন। দ্বিতীয় রাকআতে সূরা বনী ইসরাঈল পাঠ করলেন। এরপর তিনি ‘সাখরা’ বা বিশেষ পাথরের নিকট এলেন। কা’ব আল আহবার (রা) থেকে তিনি ওই স্থান সম্পর্কে জেনে নিয়েছিলেন। কা’ব (রা) এই ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন যেন তিনি মসজিদটি ওই পাথরের পেছনে তৈরি করেন। হযরত উমর (রা) বললেন, ইয়াহুদী ধর্ম তো শেষ হয়ে গিয়েছে। তারপর বায়তুল মুকাদ্দাসের সম্মুখে মসজিদ নির্মাণ করলেন। এখন সেটি উমরী মসজিদ নামে পরিচিত। এরপর তিনি সাখরা বা বিশেষ পাথর থেকে মাটি সরাতে লাগলেন। নিজ চাদর ও জামাতে করে তিনি মাটি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর সাথে মুসলমানগণও মাটি সরানোরা কাজে শরীক হয়। জর্ডানবাসীকে অবশিষ্ট মাটি সরানোর কাজে নিয়োজিত করা হয়। রোমানগণ ওই পাথরের স্থানকে ময়লার ডাস্টবিন বানিয়েছিল। কারণ ওই পাথর ছিল ইয়াহুদীদের কেবলা। এমনকি ঋতুমততী খ্রিস্টান মহিলাগণ তাদের রক্তমাখা কাপড় এনে ওখানে ফেলে যেত। এটি ছিল প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা। কারণ ইয়াহুদীগণ ‘আল কামামা’ নামক স্থানটিকে এভাবে ডাস্টবিন বানিয়েছিল। কামামা হলো সেই স্থান যেখানে ইয়াহুদীগণ ঈসা (আ) ভেবে তাঁর অনুরূপ এক ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল। ওই ব্যক্তির কবরে তারা ময়লা ও নোংরা বস্তু নিক্ষেপ করত। এজন্যে ওই স্থানটি আল-কামামা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পরবর্তীতে খ্রিস্টানগণ সেখানে যে গির্জা বানিয়েছিল সেটির নাম দিয়েছিল ‘আল কামামা’ গির্জা।
হিরাক্লিয়াস যখন জেরুযালেমে অবস্থান করছিল তখন তাঁর নিকট রাসূলুল্লাহ্ এসে পৌঁছেছিল। সে তখন খ্রিস্টানদের অপকর্মের বিরুদ্ধে ওদেরকে নসীহত করে। ওরা তখন ব্যাপকহারে ময়লা-আবর্জনা ফেলছিল সাখরা বা বিশেষ পাথরটির উপর। এমনকি ওই ময়লার ডিপো দাউদ (আ)-এর মিহরাব পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তখন হিরাক্লিয়াস বলেছিল, এই ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপের কারণে তোমরা খুন হবার- নিহত হবার যোগ্য। এর দ্বারা তোমরা এই মসজিদের অবমাননা করছ। ইয়াহ্ইয়া ইবন যাকারিয়া (আ)-এর খুনের অপরাধে যেমন বনী ইসরাঈল নিহত হয়েছিল, এই অপরাধে তোমরা নিশ্চয় খুন হবে। এরপর হিরাক্লিয়াস এই ময়লা আবর্জনা অপসারণের জন্যে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা অপসারণ শুরু করেছিল। ১ অংশ অপসারণের পরই মুসলমানগণ বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে নেয়। এরপর খলীফা উমার ইবন খাত্তাব (রা) ওগুলো অপসারণ করেন। হাফিজ বাহাউদ্দীন ইব্‌ন হাফিজ আবুল কাসিম ইবন আসাকির তাঁর “আল মুখতাস্কা ফী ফাদাইলিল মাসজিদিল আকসা” গ্রন্থে এই সকল হাদীস সনদ ও মতনসহ বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।
আপন সনদে সায়ফ উল্লেখ করেছেন যে, উমর (রা) মদীনা থেকে একটি ঘোড়ায় আরোহণ করেছিলেন যাতে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। তাঁর অবর্তমানে মদীনার শাসনভার দিয়ে যান হযরত আলী (রা)-এর হাতে। তিনি দ্রুত অগ্রসর হয়ে জাবিয়া গিয়ে পৌঁছেন। তিনি সেখানে অবতরণ
মোদ্দাকথা রাসূলুল্লাহ্ -এর নবুওয়াত প্রাপ্তির ৩০০ বছর পূর্ব থেকে খ্রিস্টানগণ যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের কর্তৃত্ব অর্জন করে, তখন তারা “আল-কুমামাহ্” নামক স্থানটিকে পরিষ্কার করে নেয় এবং সেখানে “হাইলা” গির্জা নির্মাণ করে। রাজা কনস্টানটিনোপলের মাতা ওই গির্জা নির্মাণ করেন। রাজার মায়ের নাম ছিল হায়লানাহ্ হিরানিয়্যাহ বুন্দুকিয়্যাহ্। সে তার পুত্রকে আদেশ দিল—সে যেন ঈসা (আ)-এর জন্ম স্থানে ‘বেথেলহাম’ তৈরি করে, আর মাতা নিজে তাদের ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁর কবরের উপর হাইলা গির্জা নির্মাণ করে। অর্থাৎ তারাও প্রতিশোধ হিসেবে ইয়াহূদীদের কিবলাকে ময়লার ডিপোতে পরিণত করে।
হযরত উমর (রা) যখন বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করলেন এবং সাখরার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন তখন সাখরার উপর স্তূপীকৃত ময়লা-আবর্জনা সরানোর নির্দেশ দিলেন। কথিত আছে যে, হযরত উমর (রা) নিজের চাদরে ভরে নিজে ময়লা সরিয়েছেন। তারপর হযরত কা’ব (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন—মসজিদ স্থাপন করবেন কোন্ জায়গায়। কবি পরামর্শ দিয়েছিলেন সাখরার পেছনে নির্মাণের। খলীফা উমর (রা) তাঁর বুকে হাত মেরে বললেন, হে কা’ব! ইয়াহুদী যুগের তো অবসান ঘটেছে। আমরা এখন ওই ধর্মের পক্ষে কাজ করব কেন ? শেষ পর্যন্ত খলীফা নির্দেশ দিলেন বায়তুল মুকাদ্দাসের সম্মুখে মসজিদ নির্মাণ করার জন্যে।
ইমাম আহমদ (র) বলেন, আসওয়াদ ইবন আমির আবূ গু’আয়ব থেকে বর্ণিত যে, উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা) জাবিয়ায় অবস্থান করেছেন তারপর বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করেছেন। তিনি বলেন যে, ইব্‌ন সালামা বলেছেন, আবূ সিনান বর্ণনা করেছেন উবায়দ ইব্‌ন আছম সূত্রে। তিনি বলেছেন, আমি শুনেছি উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা) কাব (রা)-কে বলেছেন, বলুন তো আমি কোন্ স্থানে নামায পড়ব? কাব বললেন, আপনি যদি আমার পরামর্শ গ্রহণ করেন তবে সাখরার পেছনে নামায পড়ুন তাহলে পুরো বায়তুল মুকাদ্দাস আপনার সম্মুখে থাকবে। হযরত উমর (রা) বললেন, “ইয়াহুদী ধর্মের তো অবসান হয়েছে, না—আমি বরং সেখানেই নামায পড়ব, যেখানে রাসূলুল্লাহ্ নিজে নামায পড়েছেন। তারপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের মধ্যে কিবলার দিকে অর্থাৎ সামনের দিকে অগ্রসর হলেন এবং সেখানে নামায পড়লেন। তারপর তাঁর চাদর বিছিয়ে সাখরা থেকে ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে নিতে লাগলেন। লোকজনও তা পরিষ্কার করতে লেগে গেল। এটি একটি উত্তম সনদ। হাফিজ যিয়াউদ্দীন মুকাদ্দেসী তাঁর ‘আলমুসতাখরাজ’ গ্রন্থে এটি উদ্ধৃত করেছেন। ‘মুসনাদই উমর’ নামে আমাদের লিখিত গ্রন্থে আমরা এই সনদের বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে পর্যালোচনা করেছি। তাছাড়া তিনি যে সব মারফূ’ হাদীস বর্ণনা করেছেন আর তাঁর থেকে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে ফিক্হ শাস্ত্রের অধ্যায় অনুযায়ী সন্নিবেশিত করেছি। সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ্।

মিরাজ 5
মিরাজ 7
মিরাজ 9

ইবনে কাসীরের বর্ণনাও একই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে। সেখানে বলা হচ্ছে, উমর জেরুজালেম বিজয়ের পর সাখরা বা পাথরের স্থান থেকে ময়লা-আবর্জনা সরান; রোমানরা সেটিকে ডাস্টবিনে পরিণত করেছিল; এমনকি ঋতুমতী নারীদের রক্তমাখা কাপড়ও সেখানে ফেলা হতো। এই বর্ণনা যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে মিরাজের প্রচলিত হাদিস-সীরাতীয় বর্ণনা আরও দুর্বল হয়ে যায়। কারণ মুসলিম ঐতিহাসিক সূত্রই স্বীকার করছে যে নবীর মৃত্যুর পরও স্থানটি পরিষ্কার মসজিদ ছিল না; বরং মুসলিম জয়ের পর রাজনৈতিক-ধর্মীয় পুনর্দখল ও পরিশোধনের মাধ্যমে তা নতুন পবিত্র ভূগোলে রূপান্তরিত হয়।

এখানে apologetic বা প্রতিরক্ষামূলক ব্যাখ্যা সাধারণত দুই রকম হয়। প্রথম ব্যাখ্যা: “মসজিদ” মানে স্থাপনা নয়, সিজদার স্থান। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: “আল-আকসা” বলতে বর্তমান মসজিদ নয়, বরং পুরো টেম্পল মাউন্ট বা বায়তুল মাকদিস অঞ্চল বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এই দুই ব্যাখ্যার কোনোটি সমস্যাটি সম্পূর্ণ সমাধান করে না। কারণ কুরআনের শব্দার্থকে নমনীয় করে পড়লেও হাদিস-সীরাতের বিবরণে যে বাস্তব স্থাপত্যিক দৃশ্য নির্মিত হয়েছে—দরজা, বাঁধার স্থান, নবীদের সম্মিলিত সালাত, নির্দিষ্ট মসজিদ-পরিসর—তা তখনকার ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। ফলে প্রতিরক্ষামূলক ব্যাখ্যাগুলো কেবল কুরআনের অস্পষ্ট বাক্যকে কিছুটা রক্ষা করতে পারে; কিন্তু পরবর্তী মিরাজ-পুরাণের পূর্ণ কাঠামোকে নয়।


মসজিদ শব্দের দ্বৈততা: সিজদার স্থান নাকি স্থাপত্য?

এখানে apologetic ব্যাখ্যাটি সাধারণত বলে, ‘মসজিদ’ মানে ইট-পাথরের ভবন নয়, সিজদার স্থান। এই ব্যাখ্যা কুরআনের অস্পষ্ট শব্দকে কিছুটা নমনীয় করে, কিন্তু হাদিস-সীরাতের পরবর্তী স্থাপত্যিক বিবরণকে রক্ষা করতে পারে না। কারণ সেখানে শুধু ‘দূরবর্তী পবিত্র স্থান’ নয়; বুরাক বাঁধা, মসজিদে প্রবেশ, দুই রাকাত সালাত, নবীদের সম্মিলিত নামাজ এবং নির্দিষ্ট দরজা-পরিসরের ভাষা এসেছে। যদি ‘মসজিদ’ শুধু সিজদার স্থান হয়, তাহলে পরবর্তী বর্ণনার স্থাপত্যিক বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়; আর যদি নির্দিষ্ট স্থাপনা হয়, তাহলে তা নবীর জীবদ্দশার জেরুজালেমের ইতিহাসের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।


বর্তমান আল-আকসার নির্মাতা কে?

আজকের জেরুজালেমে যে সোনালি গম্বুজওয়ালা ডোম অফ দ্য রক বা কুব্বাতুস সাখরা এবং যে আল-আকসা মসজিদ দেখা যায়, সেগুলো নবী মুহাম্মদের সময়কার স্থাপনা নয়। এগুলো উমাইয়া যুগে নির্মিত। বিশেষত খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান এবং তার উত্তরাধিকারী আল-ওয়ালিদ-এর শাসনামলে সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে জেরুজালেমে বৃহৎ ইসলামি স্থাপত্য নির্মাণ শুরু হয় [22]

এটি মিরাজের ঐতিহাসিকতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্তিশালী কালগত আপত্তি। কারণ নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর বহু বছর পরে যে স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে, তাকে নবীর জীবদ্দশার ভ্রমণকাহিনির নির্দিষ্ট গন্তব্য হিসেবে ধরে নেওয়া ইতিহাসকে উল্টো করে পড়ার নামান্তর। ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে পরবর্তী স্থাপনা দিয়ে পূর্ববর্তী ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করা যায় না। বরং বেশি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো—জেরুজালেম মুসলিম রাজনৈতিক কল্পনা ও ধর্মীয় ভূগোলে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পর, মিরাজের কাহিনি সেই পবিত্রতার ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সুতরাং সমস্যাটি শুধু “মসজিদ ছিল কি ছিল না” এতটুকু নয়। সমস্যাটি আরও গভীর। একটি ধর্মীয় কাহিনি পরবর্তী শতাব্দীতে রাজনৈতিক, স্থাপত্যিক ও তীর্থ-সংক্রান্ত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ পায়। এরপর সেই পরবর্তী অর্থকে পেছনে প্রক্ষেপণ করে বলা হয়—এটি তো শুরু থেকেই এমন ছিল। এই পদ্ধতিকে ইতিহাসে retrojection বা পরবর্তী ধারণাকে অতীতে বসিয়ে দেওয়া বলা যায়। মিরাজের আল-আকসা বর্ণনায় ঠিক এই প্রবণতা দেখা যায়।

অর্থাৎ, কুরআনের অস্পষ্ট “দূরবর্তী মসজিদ” থেকে শুরু করে পরবর্তী হাদিসের বোরাক-বাঁধা স্থাপনা, তারপর উমাইয়া স্থাপত্য, তারপর বর্তমান আল-আকসা পরিচয়—এই পুরো প্রক্রিয়াটি এক সরল ঐতিহাসিক রেখা নয়। বরং এটি ধর্মীয় স্মৃতি, রাজনৈতিক প্রয়োজন, পবিত্র ভূগোল নির্মাণ এবং সাম্রাজ্যিক স্থাপত্যের যৌথ ফল। এই প্রক্রিয়াকে বুঝলে মিরাজের গল্প আর নিরপেক্ষ ইতিহাস বলে মনে হয় না; বরং ক্ষমতা ও বিশ্বাসের পারস্পরিক নির্মাণ হিসেবে বোঝা যায়।

এই প্রেক্ষাপটে মিরাজের জেরুজালেম অংশকে অলৌকিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং এর মধ্যে রয়েছে গুরুতর কালগত অসঙ্গতি: যে স্থাপনা পরবর্তীকালে নির্মিত, সেটিকে পূর্ববর্তী নবীজীবনের ঘটনায় সক্রিয়ভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে; যে স্থান মুসলিম জয়ের সময়ও আবর্জনায় ঢাকা ছিল বলে মুসলিম সূত্রে বর্ণিত, সেটিকে নবীর সময়কার কার্যকর মসজিদ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে; এবং যে পবিত্র ভূগোল মুসলিম সাম্রাজ্যিক যুগে নির্মিত, তাকে সপ্তম শতকের প্রথম দিকের আধ্যাত্মিক ভ্রমণের অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

আল-আকসা / টেম্পল মাউন্ট – ঐতিহাসিক টাইমলাইন
ধ্বংসপ্রাপ্ত ইহুদি মন্দির থেকে রোমানদের আবর্জনার স্তূপ, সেখান থেকে উমরের আমলে পরিষ্কার ও পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণ—মূল টার্নিং পয়েন্টগুলোর সারাংশ।
মন্দির ধ্বংস / দখল
পরিত্যক্ত / আবর্জনার স্তূপ
মসজিদ / ইসলামী স্থাপনা
রাজনৈতিক দখল ও রূপান্তর
৫৮৬ খ্রিষ্টপূর্ব (আনুমানিক)
প্রথম মন্দির ধ্বংস
ব্যাবিলনীয় রাজা নবূখদ নসর জেরুজালেম দখল করে সোলোমনের মন্দির ধ্বংস করেন। টেম্পল মাউন্ট প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়।
৭০ খ্রিস্টাব্দ
দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস
রোমান জেনারেল টাইটাস ইহুদি বিদ্রোহ দমন করে সেকেন্ড টেম্পল ধ্বংস করেন। টেম্পল মাউন্ট আবারও ধ্বংসস্তূপ ও পুড়িয়ে দেয়া অবকাঠামোতে ভরে যায়।
২য়–৬ষ্ঠ শতক খ্রিস্টাব্দ
পরিত্যক্ত / আবর্জনার স্তূপ
রোমান ও পরে বাইজেন্টাইন যুগে এই চত্বর ধর্মীয় কেন্দ্র না থেকে বরং আংশিক ধ্বংসস্তূপ, আংশিক আবর্জনার ফেলা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইসলামী উৎসে (তাবারী প্রভৃতি) বর্ণিত—রোমানরা বায়তুল মাকদিসকে আবর্জনার নিচে পুঁতে রেখেছিল।
৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ / ১৫ হিজরি
উমরের আগমন ও পরিষ্কার
খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব জেরুজালেম দখলের পর আল-মাসজিদ এলাকায় প্রবেশ করলে দেখেন পুরো স্থানটি আবর্জনার স্তূপে ঢাকা। তিনি নিজে হাঁটু গেড়ে আবর্জনা পরিষ্কার করতে অংশ নেন এবং দক্ষিণ দিকে একটি সরল কাঠামোর নামাজঘর স্থাপন করেন।
৬৯১–৬৯২ খ্রিস্টাব্দ (আনুমানিক)
ডোম অফ দ্য রক
উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান টেম্পল মাউন্টের মাঝখানে শিলাখণ্ডের উপর বিশাল গম্বুজওয়ালা স্থাপনা কুব্বাতুস সাখরা (Dome of the Rock) নির্মাণ করেন। এটি বর্তমান সোনালী গম্বুজওয়ালা ভবন।
প্রায় ৭০৫ খ্রিস্টাব্দ
বৃহৎ মসজিদুল আকসা
আব্দুল মালিকের পুত্র খলিফা আল-ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক দক্ষিণ প্রান্তে আজকের “মসজিদুল আকসা” ভবনের পূর্বসূরি বৃহৎ জামেয় মসজিদ নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করেন। নবীর সময়ে এই স্থাপনাগুলোর কোনোটিই ছিল না।
১০৯৯–১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ
ক্রুসেড ও পুনরুদ্ধার
ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করলে আল-আকসা ভবনকে প্রাসাদ ও নাইটস টেম্পলার-এর সদর দফতর বানায়। সালাহুদ্দিন আইয়ূবী ১১৮৭ সালে শহর পুনর্দখল করে স্থাপনাকে আবার মসজিদে রূপান্তর করেন।
পরবর্তী শতকগুলো
সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ
মামলুক, উসমানীয় ও আধুনিক যুগে ভূমিকম্প ও যুদ্ধের ক্ষতির পর বহুবার আল-আকসা কমপ্লেক্সে সংস্কার, পুনর্নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছে। বর্তমান কাঠামোটি বিভিন্ন যুগের স্থাপত্য পরিবর্তনের ফল।
নোট: কিছু সাল আনুমানিক (≈) এবং ইতিহাসবিদদের সাধারণ মতের উপর ভিত্তি করে। মূল ফোকাস হলো ধারাবাহিকতা দেখানো—প্রথমে ইহুদি মন্দির, তারপর দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপ ও আবর্জনার স্তূপ, এবং অবশেষে উমাইয়া যুগে বর্তমান ইসলামী স্থাপনাগুলোর উদ্ভব।

এই টাইমলাইন থেকে যুক্তিটি আরও পরিষ্কার হয়। ৭০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস, এরপর দীর্ঘ রোমান-বাইজেন্টাইন অবহেলা ও আবর্জনায় ঢাকা অবস্থা, ৬৩৭-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে উমরের আগমন ও পরিষ্কারকরণ, তারপর উমাইয়া যুগে ডোম অফ দ্য রক ও আল-আকসা নির্মাণ—এই ধারাবাহিকতা মিরাজের প্রচলিত বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নবীর জীবদ্দশায় সেখানে বর্তমান অর্থে আল-আকসা মসজিদ ছিল—এই দাবি ইতিহাসের ক্রমধারার সঙ্গে মেলে না।

এ কারণে মিরাজের আল-আকসা অংশটি ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল, পাঠসমালোচনাগতভাবে জটিল, এবং ধর্মীয় স্মৃতি-নির্মাণের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যাযোগ্য। যদি কেউ এটিকে কেবল প্রতীকী বা স্বপ্ন-অভিজ্ঞতা বলে পড়েন, তাহলে ঐতিহাসিক আপত্তির তীব্রতা কমে যায়। কিন্তু যদি দাবি করা হয় যে এটি বাস্তব, সশরীর, ভৌগোলিক এবং স্থাপত্যগতভাবে নির্দিষ্ট ঘটনা—তাহলে সেই দাবি টিকে না। কারণ প্রমাণ বলছে, নবীর সময়কার জেরুজালেমে সেই মসজিদীয় বাস্তবতা ছিল না; ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরস্থল, বাইজেন্টাইন অবহেলা, এবং পরবর্তী মুসলিম পুনর্দখলের অপেক্ষায় থাকা এক রাজনৈতিক-ধর্মীয় ভূখণ্ড।


মিরাজের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণঃ পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিদ্যার আলোকে

বিজ্ঞান এখানে ধর্মের দাবির প্রকৃতি অনুযায়ী বিচারক হিসেবে উপস্থিত। কেউ যদি বলে “আমি স্বপ্নে আকাশে গিয়েছিলাম”, বিজ্ঞান তাকে মহাকাশযাত্রা হিসেবে পরীক্ষা করবে না। কিন্তু কেউ যদি বলে “একজন মানুষ সশরীরে পৃথিবী ছেড়ে বহু আকাশ অতিক্রম করে ফিরে এসেছে”, তখন প্রশ্ন আসবে: কী গতিতে? কী শক্তিতে? কী মাধ্যমে? শরীর কীভাবে টিকল? মহাশূন্যে চাপ, অক্সিজেন, বিকিরণ, তাপমাত্রা কীভাবে সামলানো হলো? স্থানকাল কীভাবে অতিক্রান্ত হলো? এই প্রশ্নগুলো ধর্মবিদ্বেষ নয়; দাবির যৌক্তিক পরিণতি।

মিরাজের বর্ণনা যদি কেবল একটি স্বপ্ন, রুহানি অভিজ্ঞতা, মরমি দর্শন বা প্রতীকী ধর্মীয় ভাষ্য হিসেবে পড়া হয়, তাহলে সেটি মূলত মনস্তত্ত্ব, সাহিত্য ও ধর্মীয় কল্পনার আলোচ্য বিষয়। কিন্তু প্রচলিত ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মিরাজকে প্রায়ই বাস্তব, সশরীর, স্থানিক এবং মহাজাগতিক ভ্রমণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। হাদিসের ভাষ্যমতে, নবী মুহাম্মদ এক রাতেই মক্কা থেকে জেরুজালেম যান, সেখান থেকে সপ্ত আসমান অতিক্রম করেন, পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছান, আল্লাহর সান্নিধ্যে যান এবং শেষে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসেন [23]

এই দাবি ধর্মীয় আবেগে যতই শক্তিশালী শোনাক, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এটি একগুচ্ছ পরস্পর-নির্ভর অসম্ভব দাবিতে ভেঙে যায়: অতিমানবীয় গতি, মহাকাশে জৈবদেহের সুরক্ষা, স্থানকালীয় দূরত্ব অতিক্রম, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ, অদৃশ্য আকাশস্তর, এবং পৃথিবীতে প্রায় সময়হীন প্রত্যাবর্তন। এগুলোর একটিও সাধারণ প্রমাণের মানদণ্ডে টিকে না; সবগুলো একসঙ্গে ধরলে দাবিটি প্রকৃতিবিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে পড়ে। কারণ এখানে কেবল “আধ্যাত্মিক উন্নতি” বা “ঈশ্বরীয় অনুপ্রেরণা”-র কথা বলা হচ্ছে না; এখানে বলা হচ্ছে ভ্রমণ, গতি, দূরত্ব, মহাকাশ, আকাশের স্তর, জীবিত দেহ, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা। অর্থাৎ এই দাবির মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান, মহাকাশবিদ্যা, জীববিজ্ঞান ও জ্যামিতির সরাসরি প্রশ্ন জড়িত। তাই এই ঘটনাকে যদি বাস্তব মহাকাশ ভ্রমণ হিসেবে দাবি করা হয়, তাহলে সেটিকে বাস্তব মহাবিশ্বের নিয়মের অধীনেই পরীক্ষা করতে হবে।

সমস্যাটি এখানেই। আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী মহাবিশ্ব কোনো প্রাচীন স্তরভিত্তিক আকাশমণ্ডল নয়, যেখানে দরজা আছে, প্রহরী আছে, একেক স্তরে একেক নবী বসে আছেন, আর সর্বোচ্চ স্তরে কোনো স্থানিক রাজদরবার আছে। মহাবিশ্ব হলো বিস্তৃত স্থানকাল, গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, ধূলিকণা, বিকিরণ, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি এবং মহাকর্ষীয় কাঠামোর এক জটিল বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মধ্যে একটি জৈব মানবদেহ, কোনো লাইফ সাপোর্ট ছাড়া, আলোর গতির সীমা অতিক্রম করে, এক রাতে মহাজাগতিক স্তর পেরিয়ে ফিরে আসতে পারে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে পড়ে।


বিশেষ আপেক্ষিকতা ও আলোর গতির সীমাবদ্ধতা

মিরাজের বর্ণনায় দাবি করা হয়, নবী মুহাম্মদ অত্যন্ত স্বল্প সময়ে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং সেখান থেকে আকাশের বহু স্তর অতিক্রম করেন। মক্কা থেকে জেরুজালেমের স্থলদূরত্ব নিজেই সপ্তম শতাব্দীর আরব বাস্তবতায় একটি দীর্ঘ ভ্রমণ; কিন্তু মিরাজের মহাজাগতিক অংশ এই সমস্যাকে অসীম মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবী থেকে নিকটতম নক্ষত্রব্যবস্থা আলফা সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতেও আলোর গতিতে প্রায় ৪.৩৭ বছর লাগে। আর দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ আনুমানিক ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। সুতরাং “সপ্ত আসমান” যদি কোনো বাস্তব মহাজাগতিক স্তর বা মহাবিশ্বের ঊর্ধ্বগত অঞ্চল বোঝায়, তবে এক রাতের মধ্যে সেখানে যাতায়াত করতে হলে আলোর গতির চেয়েও বহু গুণ বেশি গতির কথা ধরে নিতে হয়।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে এই দাবি মৌলিক সমস্যায় পড়ে। আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে (Special Theory of Relativity) দেখিয়েছেন যে, ভরযুক্ত কোনো বস্তু আলোর গতি অর্জন করতে পারে না। কোনো বস্তু যত আলোর গতির কাছাকাছি যায়, তাকে আরও ত্বরান্বিত করতে তত বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়; আলোর গতিতে পৌঁছাতে গেলে প্রয়োজনীয় শক্তি অসীমের দিকে ধাবিত হয় [24]। মানুষ, প্রাণী, বোরাক, কিংবা কোনো বস্তুগত বাহন—সবই যদি ভরযুক্ত হয়, তাহলে তাদের পক্ষে আলোর গতি অর্জন করা বা অতিক্রম করা পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে অসম্ভব।

এখানে “বোরাক তো অলৌকিক বাহন” বলা আসলে যুক্তির দরজা বন্ধ করার ঘোষণা। এটি ব্যাখ্যা নয়; এটি ব্যাখ্যার স্থানে বিশেষ অব্যাহতি বসানো। বিজ্ঞান কোনো দাবিকে “ধর্মীয় চরিত্র আছে” বলে পদার্থবিজ্ঞানের বাইরে ছুটি দেয় না। যদি বোরাক বস্তুগত বাহন হয়, তবে তার ভর, গতি, ত্বরণ, শক্তি, পথ এবং যাত্রীর দেহরক্ষার ব্যাখ্যা লাগবে। আর যদি এগুলোর কোনো ব্যাখ্যা না থাকে, তাহলে সেটি বিজ্ঞান নয়—পুরাণ। কিন্তু এই উত্তর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়; এটি ব্যাখ্যার স্থানে অলৌকিকতাকে বসিয়ে দেওয়া। “অলৌকিক” বললেই পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা সমাধান হয় না; বরং তখন স্বীকার করতে হয় যে দাবিটি প্রকৃতিবিজ্ঞানের নিয়মের অধীন নয়, পরীক্ষাযোগ্য নয়, যাচাইযোগ্য নয়। সে ক্ষেত্রে মিরাজকে বাস্তব মহাকাশভ্রমণ বলা ভাষাগত প্রতারণা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ “বাস্তব” শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতার নিয়মগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হচ্ছে। এটি একই সঙ্গে ইতিহাস, বিজ্ঞান ও অলৌকিকতার সুবিধা নিতে চায়—কিন্তু কোনো ক্ষেত্রের প্রমাণের দায় নিতে চায় না। বিজ্ঞানসম্মত দাবি করতে হলে পদার্থগত মডেল, শক্তির উৎস, গতি, ত্বরণ, দেহের সুরক্ষা, স্থানকালীয় পথ এবং প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে হবে। মিরাজের বর্ণনায় এগুলোর কোনো কার্যকর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।

অনেকে আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু জনপ্রিয় ধারণা, যেমন ওয়ার্মহোল (Wormhole), আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজ, বা স্থানকাল-ভাঁজের কথা এনে মিরাজকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এগুলো মূলত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জটিল গাণিতিক মডেল, প্রমাণিত মহাকাশযাত্রা-পদ্ধতি নয়। তদুপরি কোনো ওয়ার্মহোল স্থিতিশীল রাখতে কী ধরনের exotic matter প্রয়োজন, তার মধ্য দিয়ে জৈবদেহ অক্ষত থাকতে পারে কি না, প্রবেশ ও প্রস্থান কোথায় হবে, স্থানকালীয় স্থিতিশীলতা কীভাবে বজায় থাকবে—এসবের কোনো বাস্তব সমাধান নেই। তাই ওয়ার্মহোলের নাম উচ্চারণ করে মিরাজকে বৈজ্ঞানিক বলা কেবল বিজ্ঞান-শব্দের অলঙ্কার ব্যবহার; এটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়।

অতএব, বোরাক যদি প্রাণী হয়, সে জীববিজ্ঞানের নিয়মে সীমাবদ্ধ; যদি বস্তুগত বাহন হয়, তবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে সীমাবদ্ধ; আর যদি এ দুটির কোনোটিই না হয়, তবে তা বাস্তব ভ্রমণের বাহন নয়, বরং পুরাণগত কল্পচরিত্র। ফলে মিরাজকে সশরীর মহাকাশযাত্রা হিসেবে গ্রহণ করতে হলে প্রথমেই বিশেষ আপেক্ষিকতার আলোর গতিসীমা ভেঙে ফেলতে হয়। কিন্তু কোনো ধর্মীয় বর্ণনার জন্য প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান বাতিল করার আগে তার পক্ষে অসাধারণ মাত্রার স্বাধীন প্রমাণ দরকার। সেই প্রমাণ অনুপস্থিত।


সময় প্রসারণ, প্রত্যাবর্তন এবং বর্ণনার অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতি

ধরা যাক, বিতর্কের খাতিরে নবী মুহাম্মদ কোনোভাবে আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করেছিলেন। তবু সমস্যা শেষ হয় না; বরং নতুন সমস্যা শুরু হয়। বিশেষ আপেক্ষিকতার একটি সুপরিচিত ফল হলো সময় প্রসারণ (Time Dilation)। উচ্চ গতিতে ভ্রমণকারী পর্যবেক্ষকের সময় পৃথিবীতে অবস্থানকারী পর্যবেক্ষকের সময়ের তুলনায় ভিন্নভাবে অতিক্রান্ত হয়। এই ধারণাটি পদার্থবিজ্ঞানে টুইন প্যারাডক্স নামে পরিচিত [25]

যদি কেউ মহাজাগতিক দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে, তাহলে ভ্রমণকারীর নিজস্ব সময় এবং পৃথিবীর সময় একই থাকবে না। বিশেষত যদি সে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে চলে, তবে তার নিজের কাছে সময় কম অতিক্রান্ত মনে হলেও পৃথিবীর ফ্রেমে অনেক বেশি সময় অতিক্রান্ত হতে পারে। ফলে “এক রাতেই মহাবিশ্ব ভ্রমণ করে ফিরে আসা” ধারণাটি কেবল গতি-সমস্যা নয়, সময়-সমস্যাও তৈরি করে।

কিন্তু প্রচলিত মিরাজ-বর্ণনায় বলা হয়, নবী ফিরে এসে দেখেন বিছানা এখনো উষ্ণ, বা ওজুর পানি এখনো গড়িয়ে পড়ছে—অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রায় কোনো সময়ই অতিক্রান্ত হয়নি। এই ধরনের বর্ণনা বিজ্ঞানসম্মত সময়-ব্যবস্থার সঙ্গে মেলে না। যদি পুরো মহাবিশ্বের সময় থামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি আর কোনো ভ্রমণ নয়; বরং সমস্ত পদার্থ, শক্তি, গতি, তাপগতিবিদ্যা ও কারণ-কার্য সম্পর্ক স্থগিত করার দাবি। আর যদি পৃথিবীর সময় স্বাভাবিক থাকে, তবে মহাজাগতিক ভ্রমণকারীর ক্ষেত্রে আপেক্ষিক সময়ের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে হবে। মিরাজের বর্ণনায় এই দুই সমস্যার কোনো সুসংহত সমাধান নেই।

এখানে আবার “অলৌকিক” বলা যেতে পারে। কিন্তু সেই উত্তর একই সমস্যায় ফিরে যায়। যদি বলা হয়, আল্লাহ সময় থামিয়ে দিয়েছিলেন, দূরত্ব সংকুচিত করেছিলেন, শরীরকে রক্ষা করেছিলেন, আলোর গতির সীমা বাতিল করেছিলেন, মহাকাশের সব নিয়ম স্থগিত করেছিলেন—তাহলে ঘটনাটি আর বিজ্ঞানের আলোচ্য থাকে না। তখন এটি পরীক্ষাতীত বিশ্বাসে পরিণত হয়। কিন্তু পরীক্ষাতীত বিশ্বাসকে আবার বৈজ্ঞানিক সত্য বা ঐতিহাসিক বাস্তব বলে প্রচার করা যৌক্তিকভাবে অসঙ্গত।


মহাকাশের পরিবেশ ও মানবদেহের জীবতাত্ত্বিক সীমা

মিরাজকে সশরীর ভ্রমণ হিসেবে ধরলে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন আসে: মানবদেহ কীভাবে মহাকাশে টিকে রইল? বর্ণনাগুলোতে নবীকে কোনো স্পেসস্যুট, চাপ-নিয়ন্ত্রিত যান, অক্সিজেন সরবরাহ, বিকিরণ সুরক্ষা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থাসহ দেখানো হয় না। তিনি সাধারণ মানবদেহ নিয়ে বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে আকাশে উঠেছেন—এমন ধারণাই প্রচলিত ধর্মীয় কল্পচিত্রে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আধুনিক এরোস্পেস মেডিসিন অনুযায়ী মানবদেহের পক্ষে এমন পরিবেশে টিকে থাকা অসম্ভব।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১৯ কিলোমিটার উচ্চতার উপরে গেলে আর্মস্ট্রং লাইন (Armstrong Line) অতিক্রান্ত হয়। এই অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এত কমে যায় যে মানুষের শরীরের তরল পদার্থ স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই ফুটতে শুরু করতে পারে; এই অবস্থাকে ইবুলিজম (Ebullism) বলা হয় [26]। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অক্সিজেনের ঘাটতি, তীব্র বিকিরণ, নিম্নচাপ, তাপমাত্রার চরম ওঠানামা এবং শূন্যতার প্রভাব। সুতরাং কোনো সুরক্ষা ছাড়া মানুষের দেহ নিয়ে মহাশূন্যে যাত্রা বিজ্ঞানসম্মতভাবে অসম্ভব।

  • হাইপোক্সিয়া (Hypoxia): অক্সিজেনের অভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মস্তিষ্ক কার্যক্ষমতা হারায়। সচেতনতা, স্নায়ুপ্রক্রিয়া এবং দেহের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত ভেঙে পড়ে।
  • নিম্নচাপ ও ইবুলিজম: চাপ কমে গেলে শরীরের তরল পদার্থের স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হয়। চোখ, ফুসফুস, রক্তসঞ্চালন ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।
  • মহাজাগতিক বিকিরণ (Cosmic Radiation): ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশন বেল্ট, সৌর বিকিরণ এবং উচ্চ-শক্তির কণাপ্রবাহ কোনো সুরক্ষা ছাড়া ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
  • তাপমাত্রা ও তাপবিনিময়: মহাকাশে সরাসরি সূর্যালোক ও ছায়ার মধ্যে তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্য থাকে। চাপ-নিয়ন্ত্রিত সুরক্ষা ছাড়া জৈবদেহ স্থিতিশীল তাপমাত্রা বজায় রাখতে পারে না।

এই সীমাবদ্ধতাগুলো কোনো “নাস্তিক আপত্তি” নয়; এগুলো মানবদেহের জীবতাত্ত্বিক বাস্তবতা। মানুষের শরীর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, চাপ, তাপমাত্রা, অক্সিজেন এবং চৌম্বকীয় সুরক্ষার মধ্যে বিবর্তিত হয়েছে। এই শর্তগুলো সরিয়ে দিলে শরীর দ্রুত অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে কোনো লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম ছাড়া একজন মানুষের সশরীরে মহাশূন্যে গমন, স্তর অতিক্রম এবং জীবিত ফিরে আসার দাবি জীববিজ্ঞান ও এরোস্পেস মেডিসিনের আলোকে অবাস্তব।

এখানে ধর্মীয় উত্তর আবার একই: “আল্লাহ রক্ষা করেছেন।” কিন্তু এই উত্তর বৈজ্ঞানিক নয়। কারণ বিজ্ঞান কারণ-কার্য সম্পর্ক, পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষাযোগ্য মডেল খোঁজে। অদৃশ্য শক্তি সব নিয়ম সাময়িকভাবে বাতিল করেছে—এটি বিশ্বাসের বিবৃতি; বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা নয়। তাই মিরাজকে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। সর্বোচ্চ বলা যায়, এটি বিশ্বাসীর কাছে বিশ্বাসের বিষয়; কিন্তু বাস্তব মহাকাশযাত্রা হিসেবে দাবি করলে তা মানবদেহের সীমার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।


‘সাত আসমান’ বনাম আধুনিক কসমোলজি

মিরাজের বর্ণনায় মহাবিশ্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তা স্তরভিত্তিক একটি ঊর্ধ্বমুখী স্থাপত্য: প্রথম আসমান, দ্বিতীয় আসমান, তৃতীয় আসমান—এভাবে সপ্তম আসমান, প্রতিটি স্তরে দরজা, প্রহরী, প্রশ্নোত্তর, অনুমতি এবং আলাদা আলাদা পবিত্র ব্যক্তিত্বের অবস্থান। হাদিসে বলা হয়েছে, প্রথম আসমানে পৌঁছে জিবরাঈল দরজা খুলতে বলেন, প্রহরী জিজ্ঞেস করে—কে এসেছে, সঙ্গে কে আছে, তাকে ডাকা হয়েছে কি না [27]। এই বর্ণনা আধুনিক মহাকাশবিদ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; এটি প্রাচীন পৃথিবীকেন্দ্রিক, স্তরভিত্তিক, রাজদরবার-ধাঁচের কসমোলজির ভাষা। এখানে মহাবিশ্বকে পদার্থবিজ্ঞানের বাস্তবতা হিসেবে নয়, প্রশাসনিক দালান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে—দরজা আছে, প্রহরী আছে, অনুমতি আছে, উপরের স্তরে ক্ষমতার কেন্দ্র আছে।

প্রাচীন বহু সভ্যতায় মহাবিশ্বকে স্তরযুক্ত আকাশমণ্ডল হিসেবে কল্পনা করা হতো। পৃথিবী নিচে, তার ওপর চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্রমণ্ডল, তারপর দেবলোক বা ঈশ্বরীয় রাজ্য—এমন একটি পেঁয়াজের খোসার মতো স্তরভিত্তিক মহাবিশ্ব কল্পনা ধর্মীয় সাহিত্যে খুব সাধারণ। টলেমীয় জ্যোতির্বিদ্যা এবং মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মহাবিশ্বচিত্রে এই ধরনের স্থাপত্যিক মহাকাশচিন্তা দেখা যায়। মিরাজের সাত আসমান, দরজা, প্রহরী ও স্তরভিত্তিক ঊর্ধ্বযাত্রা সেই প্রাচীন কল্পমহাবিশ্বের ভাষার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।

আধুনিক কসমোলজিতে মহাবিশ্ব এমন কোনো দালান নয় যেখানে একেক স্তরে একেক দরজা আছে। মহাবিশ্ব হলো স্থানকালীয় ধারাবাহিকতা। নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, নেবুলা, ব্ল্যাক হোল, কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড—এসব পর্যবেক্ষণযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা; কিন্তু কোথাও সাতটি কঠিন আসমান, প্রবেশদ্বার, প্রহরী ফেরেশতা, বা স্তরভিত্তিক প্রশাসনিক আকাশের কোনো প্রমাণ নেই। মহাকাশযান পৃথিবীর কক্ষপথে গেছে, মানুষ চাঁদে গেছে, রোবট মঙ্গলগ্রহে গেছে, বিভিন্ন প্রোব সৌরজগতের প্রান্ত ছাড়িয়ে গেছে; কিন্তু কোনো পর্যবেক্ষণেই আকাশের দরজা বা স্তরভিত্তিক স্বর্গীয় স্থাপত্য পাওয়া যায়নি।

এই কারণে “সাত আসমান” ধারণাটি আক্ষরিকভাবে পড়লে তা আধুনিক কসমোলজির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আর যদি বলা হয়, সাত আসমান বস্তুগত নয়, মেটাফিজিক্যাল বা অদৃশ্য স্তর—তাহলে আবার মিরাজকে সশরীর মহাকাশযাত্রা বলা কঠিন হয়ে যায়। কারণ সশরীর ভ্রমণ মানে দেহসহ স্থানান্তর; দেহসহ স্থানান্তর মানে স্থান, দূরত্ব, দিক, গতি এবং পরিবেশের প্রশ্ন। কিন্তু অদৃশ্য, অস্থানিক, মেটাফিজিক্যাল স্তরে শারীরিকভাবে ভ্রমণ করার ধারণা নিজেই অসংলগ্ন।

মিরাজ 11
১৪৭৫ সালের একটি ইউরোপীয় কাঠখোদাই চিত্রে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চন্দ্র, সূর্য এবং গ্রহসহ ক্রমাগত আকাশমণ্ডলী ও তারও উপরে দেবদূত এবং সৃষ্টিকর্তার অবস্থানচিত্র। এ ধরনের মডেলে সবচেয়ে বহির্ভাগে একটি দৃঢ় বা আকাশ-চম্বুক কল্পনা করা হত, যার ঐ পাড়েই স্বর্গলোক।

উপরের ধরনের ঐতিহাসিক মহাকাশচিত্র থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন মানুষের কাছে আকাশ ছিল দৃশ্যমান গম্বুজ বা স্তরবিন্যাসযুক্ত জগত। তাদের কাছে পৃথিবী ছিল কেন্দ্রে; আকাশ ছিল উপরে; ঈশ্বর ছিল আরও উপরে। এই চিন্তার মধ্যে “উপরে ওঠা” মানেই ঈশ্বরের দিকে যাওয়া। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানে “উপরে” কোনো মহাজাগতিক ধর্মীয় দিক নয়; এটি কেবল পৃথিবীপৃষ্ঠের স্থানীয় রেফারেন্স। পৃথিবীর এক অঞ্চলে যে দিক “উপরে”, পৃথিবীর বিপরীত পাশে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে নির্দেশ করে। সুতরাং “আল্লাহর দিকে উপরে ওঠা” ধারণাটিও ভূকেন্দ্রিক কল্পবিশ্বের ভাষা, আধুনিক মহাবিশ্বের ভাষা নয়।

প্রশ্নটি তাই সঙ্গত: প্রথম আসমানের দরজা কোথায়? পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের শেষে? চাঁদের কক্ষপথে? মঙ্গলের পরে? সৌরজগতের বাইরে? নাকি গ্যালাক্সির সীমানায়? যদি এই দরজা বাস্তব হয়, তবে তার অবস্থান, প্রকৃতি, ভৌত বৈশিষ্ট্য এবং পর্যবেক্ষণযোগ্যতা থাকা উচিত। আর যদি তা পর্যবেক্ষণযোগ্য না হয়, স্থানিক না হয়, বস্তুগত না হয়—তাহলে মিরাজের শারীরিক ভ্রমণকাহিনি কেবল প্রতীকী বা স্বপ্নগত অভিজ্ঞতা হিসেবেই বেশি বোধগম্য হয়। কিন্তু তখন সেটিকে বাস্তব মহাকাশভ্রমণ বলা যায় না।


মৃত নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ: ইতিহাস, জীববিজ্ঞান ও পুরাণের সংঘর্ষ

মিরাজের কাহিনিতে নবী মুহাম্মদ আদম, ইয়াহইয়া, ঈসা, মূসা, ইবরাহিমসহ পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথোপকথন করেছেন বলে বর্ণিত আছে [28]। ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিতে এটি স্বাভাবিক মনে হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি আরেকটি বড় সমস্যা। মৃত ব্যক্তির দেহ মৃত্যুর পর পচে-গলে বিলীন হয়; মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বন্ধ হলে ব্যক্তিগত চেতনার পরিচিত জৈব ভিত্তিও শেষ হয়ে যায়। মৃত্যুর পর ব্যক্তির সচেতন সত্তা কোথাও বসে থাকে, কথা বলে, সালাম নেয়, নামাজ নিয়ে পরামর্শ দেয়—এমন কোনো পরীক্ষাযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো প্রমাণের। কেউ আত্মা, পরকাল, বরযখ, জান্নাত বা আসমানে নবীদের অবস্থানে বিশ্বাস করতে পারেন; কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে বাস্তবতার প্রমাণ বলা যায় না। যদি দাবি করা হয়, বহু শতাব্দী বা সহস্রাব্দ আগে মৃত ব্যক্তিরা বাস্তবভাবে কোনো আকাশস্তরে অবস্থান করছিলেন এবং নবী মুহাম্মদের সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন, তাহলে সেই দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ দরকার। হাদিসের অভ্যন্তরীণ বর্ণনা নিজেই সেই দাবির একমাত্র উৎস হলে তা বৃত্তাকার যুক্তি হয়ে যায়: “ঘটনাটি সত্য, কারণ হাদিসে আছে; হাদিস সত্য, কারণ ঘটনাটি নবীর অলৌকিকতা।” এভাবে ইতিহাস বা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয় না।

বিশেষত আদমের সঙ্গে প্রথম আসমানে সাক্ষাতের বর্ণনা কসমোলজিক্যাল ও নৃতাত্ত্বিক দিক থেকেও সমস্যাযুক্ত। আদমকে যদি বাস্তব ঐতিহাসিক প্রথম মানুষ হিসেবে ধরা হয়, তবে আধুনিক জীববিজ্ঞান ও বিবর্তনীয় মানববিদ্যার সঙ্গে সমস্যা তৈরি হয়। আর যদি তাকে প্রতীকী মানবপিতা ধরা হয়, তাহলে আসমানে তার সঙ্গে বাস্তব সাক্ষাৎ আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা যায় না। আবার ঈসা জীবিত আসমানে, মূসা মৃত কিন্তু আসমানে কথোপকথন করছেন, ইবরাহিম সপ্তম আসমানে—এসব বর্ণনা এক ধরনের ধর্মীয় নাট্যমঞ্চ তৈরি করে, যা প্রাচীন আখ্যানের কাঠামোতে অর্থবহ হলেও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কার্ল সাগানের বিখ্যাত নীতিটি এখানে প্রাসঙ্গিক। অসাধারণ দাবি করলে অসাধারণ প্রমাণ দিতে হয়। মৃত ব্যক্তির সঙ্গে আকাশে সাক্ষাৎ, মহাবিশ্বের স্তরভিত্তিক ভ্রমণ, ঈশ্বরের দরবারে গমন—এসব সাধারণ দাবি নয়; এগুলো বাস্তবতার মৌলিক কাঠামো বদলে দেওয়ার মতো দাবি। তাই কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস, পরবর্তী বর্ণনা বা ভক্তিমূলক সাহিত্য দিয়ে এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয় না।

Extraordinary claims require extraordinary evidence!


নবীদের ভাষা: আসমানে আরবিকৃত সংলাপের সমস্যা

মিরাজের বর্ণনায় আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো ভাষার প্রশ্ন। নবী মুহাম্মদ আসমানে আদম, মূসা, ঈসা, ইব্রাহিম, হারুন, ইদরিস, ইয়াহইয়া—বিভিন্ন যুগ, অঞ্চল ও ভাষার নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। কিন্তু এই সাক্ষাৎগুলো এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেন সবাই আরবীয় ধর্মীয় ভাষা, আরবীয় সালাম, আরবীয় সম্মানসূচক বাক্য এবং আরবীয় নবুয়ত-সংলাপের কাঠামোতে কথা বলছেন। আসমানের এই কথোপকথনে ভাষাগত দূরত্ব, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সংস্কৃতিগত পার্থক্য বা অনুবাদের কোনো প্রশ্নই নেই। যেন সব যুগের সব নবী শুরু থেকেই আরবীয় ধর্মতত্ত্বের চরিত্র।

এটি সরল ভাষাগত সমস্যা নয়; এটি আখ্যানের নির্মাণ-পদ্ধতিকে উন্মোচন করে। মূসা হিব্রু ঐতিহ্যের চরিত্র, ঈসা আরামাইকভাষী অঞ্চলের মানুষ, ইব্রাহিম প্রাচীন সেমিটিক পরিমণ্ডলের পিতৃপুরুষ-ধর্মীয় চরিত্র, হারুন ও ইয়াহইয়াও ভিন্ন ভাষা ও ঐতিহাসিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। আর আদম তো আধুনিক জীববিজ্ঞান, বিবর্তনীয় মানববিদ্যা ও নৃতত্ত্বের আলোকে কোনো একক ঐতিহাসিক প্রথম মানুষ হিসেবেই দাঁড়ান না। তবু মিরাজের আসমানি নাট্যমঞ্চে এই সব চরিত্রকে এমনভাবে হাজির করা হয়েছে যেন তারা আরবের শ্রোতাদের বোঝার সুবিধামতো একক আরবীয় ধর্মীয় ভাষায় কথা বলছেন।

হাদিসের সংলাপগুলোতে সবাই একই ধরনের ধর্মীয় স্বীকৃতি দিচ্ছেন: “স্বাগতম”, “নেক নবী”, “নেক ভাই”, “নেক সন্তান”—এই ধরনের বাক্য। মূসা আবার নামাজের সংখ্যা নিয়ে দর-কষাকষির উপদেষ্টা চরিত্রে দাঁড়ান। এই উপস্থাপনায় পূর্ববর্তী নবীদের নিজস্ব ঐতিহাসিকতা নেই; তারা সবাই মুহাম্মদের নবুয়তকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সাজানো আসমানি চরিত্রে পরিণত হন। অর্থাৎ আখ্যানের কাজ ইতিহাসের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ নয়; কাজ হলো আরব শ্রোতাদের সামনে মুহাম্মদকে পূর্ববর্তী সব নবীর বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বাস্তব কোনো আন্তঃযুগীয় সাক্ষাৎ হলে ভাষার প্রশ্ন অনিবার্য হতো। আদম কোন ভাষায় কথা বললেন? মূসা কি হিব্রুতে কথা বললেন, ঈসা কি আরামাইকে, ইব্রাহিম কি প্রাচীন কোনো সেমিটিক ভাষায়? মুহাম্মদ তাদের কথা কীভাবে বুঝলেন? জিবরাঈল কি অনুবাদক ছিলেন? হাদিসের বর্ণনাগুলো এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না। কারণ এগুলো বাস্তব ভাষাতাত্ত্বিক সাক্ষাতের রিপোর্ট নয়; এগুলো ধর্মীয় নাট্যরূপ, যেখানে ভাষার বাস্তবতা মুছে দিয়ে সব চরিত্রকে আরবীয় নবুয়ত-রাজনীতির মঞ্চে দাঁড় করানো হয়েছে।

এই আরবিকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় আখ্যান যখন অন্য যুগের, অন্য ভাষার, অন্য ভূগোলের চরিত্রদের এক কেন্দ্রীয় আরবীয় নবুয়ত-থিয়েটারে এনে দাঁড় করায়, তখন বোঝা যায়—এটি আসমানে সংঘটিত বাস্তব কথোপকথনের দলিল নয়; এটি আরবীয় ধর্মীয় কল্পনার মঞ্চায়ন। পূর্ববর্তী নবীদের এখানে স্বাধীন ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে রাখা হয়নি; তাদের ব্যবহার করা হয়েছে মুহাম্মদের ধর্মীয় কর্তৃত্ব বৈধ করার সাক্ষী হিসেবে।

ফলে মিরাজের এই সংলাপ-পর্ব ঐতিহাসিক ঘটনার চেয়ে ধর্মীয় ক্ষমতা-নির্মাণের কাহিনি হিসেবে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আকাশের স্তরে স্তরে পূর্ববর্তী নবীদের বসিয়ে, তাঁদের মুখ দিয়ে মুহাম্মদকে স্বীকৃতি দেওয়ানো, আর মূসাকে নামাজ-দর-কষাকষির পরামর্শদাতা বানানো—এসব বাস্তব মহাজাগতিক অভিজ্ঞতার চেয়ে আরব শ্রোতাদের জন্য নির্মিত ধর্মীয় নাট্যকাঠামোর সঙ্গে অনেক বেশি মেলে। এখানে আসমান নয়, আরবীয় ধর্মীয় কল্পনার মঞ্চই আসল দৃশ্যপট।


বিচার দিবসের আগেই জান্নাত-জাহান্নামে মানুষ এলো কীভাবে?

মিরাজের বর্ণনায় আরেকটি মারাত্মক কালগত অসঙ্গতি হলো—নবী মুহাম্মদ জান্নাত ও জাহান্নামে মানুষকে দেখেছেন বলে দাবি করা হয়। কোথাও পাপীদের শাস্তি, কোথাও ব্যভিচারী, সুদখোর, মিথ্যাবাদী, কুরআন ত্যাগকারী, আবার কোথাও সাধারণ মুমিন ও শহীদদের আবাসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইসলামি আখিরাত-তত্ত্ব অনুযায়ী কিয়ামত এখনো সংঘটিত হয়নি; মানুষ এখনো গণহারে পুনরুত্থিত হয়নি; চূড়ান্ত হিসাব, মিজান, আমলনামা, বিচার ও রায় এখনো হয়নি। তাহলে বিচার শেষ হওয়ার আগেই মানুষ জান্নাত ও জাহান্নামে গেল কীভাবে?

এই প্রশ্নটি আখ্যানের কেন্দ্রেই ছুরি বসায়। যদি মানুষ বিচার দিবসের আগে জাহান্নামে শাস্তি পেতে থাকে, তাহলে কিয়ামতের বিচার নাটকীয়ভাবে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। আর যদি বলা হয়, এগুলো ভবিষ্যতের দৃশ্য দেখানো হয়েছিল, তাহলে বর্ণনায় “দেখলেন”, “এরা ব্যভিচারী”, “এরা সুদখোর”, “এটি সাধারণ মুমিনদের বাসস্থান”, “এটি শহীদদের আবাস”—এই বাস্তব উপস্থিতির ভাষা সমস্যায় পড়ে। ভবিষ্যৎ দৃশ্য হলে সেটি প্রত্যক্ষ বাস্তব ভ্রমণ নয়; ভবিষ্যদ্বাণীমূলক দর্শন। আর যদি বাস্তব উপস্থিতি হয়, তাহলে বিচার দিবসের পূর্বেই বিচার কার্যকর হয়ে গেছে।

এখানে apologetic ব্যাখ্যা সাধারণত “বরযখ”, “রূহের জগত”, “আল্লাহ ভবিষ্যৎ দেখিয়েছেন”, বা “আখিরাতের দৃশ্য আগাম দেখানো হয়েছে”—এই পথে পালাতে চায়। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো আখ্যানকে উদ্ধার করে না; বরং সমস্যাকে আরও প্রকাশ করে। কারণ বরযখ জান্নাত-জাহান্নামের চূড়ান্ত অবস্থা নয়; ভবিষ্যৎ-দর্শন বাস্তব সশরীর ভ্রমণ নয়; আর আগাম শাস্তি দেখানো হলে চূড়ান্ত বিচার পূর্বনির্ধারিত নাটকে পরিণত হয়। তখন মানুষের বিচার, আমলনামা, সাক্ষ্য, মিজান—সবই কার্যত পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

ধর্মতত্ত্বের ভেতর থেকে দেখলেও সমস্যা তীব্র। আল্লাহ যদি আগেই জানেন কে জান্নাতে যাবে, কে জাহান্নামে যাবে, এবং মিরাজে সেই ফলাফল নবীকে দেখিয়েও দেন, তাহলে মানবজীবনের নৈতিক পরীক্ষা কোথায় দাঁড়ায়? বিচার দিবসের আগে রায় কার্যকর হলে বিচার দিবসের দরকার কী? আর বিচার দিবস যদি সত্যিই ভবিষ্যতের নির্ণায়ক ঘটনা হয়, তাহলে মিরাজে জান্নাত-জাহান্নামে মানুষ দেখার দাবি কালগতভাবে ভাঙা।

ফলে মিরাজের জান্নাত-জাহান্নাম দর্শন আক্ষরিক ইতিহাস হিসেবে দাঁড়ায় না। এটি প্রাচীন পরকাল-ভ্রমণ সাহিত্যের পরিচিত নাট্যমঞ্চ: পাপীদের ভয়াবহ শাস্তি দেখানো, পুণ্যবানদের পুরস্কার দেখানো, তারপর ফিরে এসে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার নৈতিক আতঙ্ক তৈরি করা। বাস্তব বিচারব্যবস্থার সঙ্গে এটি মেলে না; ধর্মীয় ভয় নির্মাণের আখ্যান হিসেবে এটি নিখুঁতভাবে কাজ করে।


জীবিত বিলালের পায়ের আওয়াজ জান্নাতে: বিচার-পূর্ব পুরস্কারের সমস্যা

মিরাজ-সংশ্লিষ্ট জান্নাত-জাহান্নাম দর্শনের সমস্যাকে আরও নগ্ন করে একটি সহিহ হাদিস। সেখানে বলা হয়েছে, নবী মুহাম্মদ বিলালকে ফজরের সময় জিজ্ঞেস করেন, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এমন কী আমল করেছেন, যার কারণে নবী জান্নাতে নিজের সামনে বিলালের জুতার শব্দ শুনেছেন। বিলাল উত্তর দেন, তিনি যখনই অজু করতেন, সেই অজু দিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী নফল সালাত আদায় করতেন। হাদিসটি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত; মিশকাতুল মাসাবীহেও তা নফল সালাত অধ্যায়ে এসেছে। [29]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৪: সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৩৯. প্রথম অনুচ্ছেদ – নফল সালাত
সকল প্রকার নফল সালাত, যেগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত, যথাক্রমে সালাতুল তাহ্ইয়্যাতুল উযূ, সালাতুন ইস্তিখারাহ্, তওবা্, সালাতুল হাজাত এবং সালাতুত্ তাসবীহ।
التَّطَوُّعِ শব্দটি الطوع، والطاعة শব্দ হতে গৃহীত অর্থ মান্য করা, বাস্তবায়ন করা, মেনে নেয়া ইত্যাদি এবং التَّطَوُّعِ শব্দটি ফরয ও ওয়াজিব ব্যতীত সকল নফলের উপর মুত্বলাক (তালাক)্ব (সকল নফলের ক্ষেত্রে এ শব্দটি প্রযোজ্য) আর যে বা যারা ফরয কিংবা ওয়াজিবের উপর অতিরিক্ত ’আমলুস্ সালিহ বা সৎকর্ম সম্পাদন করে তাকে (مُتَطَوِّعِ) বলা হয়।
১৩২২-[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলালকে ফাজ্‌রের (ফজরের) সালাতের সময়ে ইরশাদ করলেনঃ হে বিলাল! ইসলাম কবূল করার পর তুমি এমনকি ’আমল করেছ যার থেকে অনেক সাওয়াব হাসিলের আশা করতে পার। কেননা, আমি আমার সম্মুখে জান্নাতে তোমার জুতার শব্দ শুনতে পেয়েছি। (এ কথা শুনে) বিলাল বললেন, আমি তো অনেক আশা করার মতো কোন ’আমল করিনি। তবে রাত্রে বা দিনে যখনই আমি উযূ (ওযু/ওজু/অজু) করেছি, আমার সাধ্যমতো সে উযূ দিয়ে আমি (তাহ্ইয়্যাতুল উযূর) সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করেছি। (বুখারী, মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ১১৪৯, মুসলিম ২৪৫৮, ইরওয়া ৪৬৪, সহীহ আত্ তারগীব ২২৬, আহমাদ ৮৪০৩, ইবনু খুযায়মাহ্ ১২০৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই হাদিসের ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা অত্যন্ত স্পষ্ট। বিলাল তখন জীবিত। তিনি এখনো মারা যাননি। কিয়ামত সংঘটিত হয়নি। পুনরুত্থান হয়নি। আমলনামা দেওয়া হয়নি। মিজান স্থাপিত হয়নি। আল্লাহর সামনে চূড়ান্ত বিচার হয়নি। তাহলে জীবিত বিলালের জুতার শব্দ জান্নাতে শোনা গেল কীভাবে?

ইসলামি আখিরাত-তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ পৃথিবীতে পরীক্ষা দেয়, মৃত্যুর পর বরযখে থাকে, তারপর কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত হয়, বিচার হয়, তারপর জান্নাত বা জাহান্নামের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হয়। কিন্তু এই হাদিসে বিচার-প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার আগেই বিলালকে জান্নাতের বাস্তব উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এটি শুধু একটি আবেগঘন ফজিলতের গল্প নয়; এটি আখিরাত-তত্ত্বের কালগত কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে।

যদি বলা হয়, বিলাল ভবিষ্যতে জান্নাতে যাবেন—তাহলে নবীর “জান্নাতে তোমার জুতার শব্দ শুনেছি” বাক্যটি বাস্তব জান্নাত-দর্শনের ভাষা নয়, ভবিষ্যৎ-দর্শন বা প্রতীকী দৃশ্যের ভাষা হয়ে যায়। কিন্তু তখন এটিকে বাস্তব জান্নাত-অভিজ্ঞতা বলা যায় না। আর যদি বলা হয়, নবী সত্যিই জান্নাতে বিলালের জুতার শব্দ শুনেছেন, তাহলে বিচার দিবসের আগেই একজন জীবিত মানুষের জান্নাত-অবস্থান কার্যকর হয়ে গেছে। এতে বিচার দিবস, হিসাব, মিজান, আমলনামা ও চূড়ান্ত রায়—সবই পরবর্তী আনুষ্ঠানিক নাটকে পরিণত হয়।

এখানে apologetic ব্যাখ্যা সাধারণত বলবে—এটি বিলালের মর্যাদা দেখানোর জন্য আল্লাহ নবীকে ভবিষ্যৎ ফলাফল দেখিয়েছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মূল সমস্যাকে সরায় না; বরং আখ্যানকে বাস্তব ঘটনা থেকে প্রতীকী বা দর্শনমূলক অভিজ্ঞতায় নামিয়ে আনে। ভবিষ্যৎ দেখানো হলে সেটি জান্নাতে বাস্তব উপস্থিতি নয়। বাস্তব উপস্থিতি হলে বিচার-পূর্ব পুরস্কারের সমস্যা তৈরি হয়। দুই অবস্থাতেই আক্ষরিক জান্নাত-দর্শনের দাবি ভেঙে পড়ে।

এই হাদিস তাই মিরাজ-ধরনের স্বর্গ-দর্শন আখ্যানের একটি বড় সমস্যা সামনে আনে: ধর্মীয় বর্ণনাগুলো জান্নাত-জাহান্নামকে এমনভাবে ব্যবহার করে যেন সেগুলো ইতিমধ্যেই চলমান দৃশ্যমান স্থান—যেখানে পাপী শাস্তি পাচ্ছে, পুণ্যবান পুরস্কৃত হচ্ছে, এমনকি জীবিত মানুষের ভবিষ্যৎ উপস্থিতির শব্দও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু একই ধর্মতত্ত্ব আবার বলে, চূড়ান্ত বিচার এখনো হয়নি। এই দুই ধারণা একসঙ্গে দাঁড়ায় না।

ফলে বিলালের পায়ের শব্দের হাদিস কোনো সরল ফজিলতের গল্প নয়; এটি আখিরাত-তত্ত্বের সময়রেখায় সরাসরি ফাটল তৈরি করে। বিচার হওয়ার আগেই যদি জান্নাতের পুরস্কার কার্যকর দেখা যায়, তাহলে বিচার দিবসের অপরিহার্যতা ধসে পড়ে। আর যদি এটি কেবল প্রতীকী বা ভবিষ্যৎ-দর্শন হয়, তাহলে মিরাজের জান্নাত-জাহান্নাম দর্শনকেও বাস্তব ভ্রমণ নয়, ধর্মীয় দৃশ্যকল্প হিসেবে পড়তে হবে।


বায়তুল মামুর ও জিওস্টেশনারি সমস্যা

মিরাজ-সংক্রান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, সপ্তম আসমানে অবস্থিত ‘বায়তুল মামুর’ পৃথিবীর কাবার ঠিক সোজাসুজি উপরে অবস্থিত [30]। ধর্মীয় কল্পনায় এই বক্তব্য অর্থবহ হতে পারে: পৃথিবীর কাবার আসমানি প্রতিরূপ, নিচের মসজিদের উপর আকাশের মসজিদ। কিন্তু একে যদি জ্যামিতিক বা মহাকাশগত বাস্তবতা হিসেবে ধরা হয়, তখন সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা তৈরি হয়। কারণ পৃথিবী স্থির সমতল নয়; এটি একটি ঘূর্ণায়মান গোলক।

পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর প্রায় ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘোরে, সূর্যকে বছরে একবার প্রদক্ষিণ করে, সূর্য আবার মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে, এবং গ্যালাক্সিও বৃহত্তর মহাজাগতিক কাঠামোর মধ্যে গতিশীল। এই বাস্তবতায় “কাবার ঠিক উপরে” কথাটির অর্থ স্থির নয়। কাবার উপর লম্ব সরলরেখা সময়ের সঙ্গে দিক বদলায়; পৃথিবীর ঘূর্ণন ও কক্ষপথগত গতির কারণে সেই লাইন ক্রমাগত মহাকাশের ভিন্ন অঞ্চলের দিকে নির্দেশ করে। তাহলে সপ্তম আসমানের বায়তুল মামুর কীভাবে প্রতি মুহূর্তে কাবার ঠিক সোজাসুজি উপরে থাকে?

যদি বলা হয়, বায়তুল মামুর কাবার উপর নির্দিষ্ট জ্যামিতিক অবস্থানে থাকে, তবে সেটিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো জিওস্টেশনারি ধারণার মতো কল্পনা করতে হয়। কিন্তু জিওস্টেশনারি কক্ষপথ পৃথিবীর বিষুবরেখার উপর প্রায় ৩৫,৭৮৬ কিলোমিটার উচ্চতায় সীমিত; মক্কার কাবা বিষুবরেখায় নয়। তাই ‘সপ্তম আসমানে কাবার ঠিক উপর’ কথাটি বাস্তব জ্যামিতি নয়, পৃথিবীকেন্দ্রিক ধর্মীয় প্রতীক।

এই দাবির অন্তর্নিহিত সমস্যা হলো এটি পৃথিবীকেন্দ্রিক কল্পবিশ্ব ধরে নেয়। যেন পৃথিবী স্থির, কাবা মহাবিশ্বের নিচের কেন্দ্র, তার সরাসরি উপরে আসমানি কাবা। কিন্তু আধুনিক মহাকাশবিদ্যায় পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়; কাবাও কোনো মহাজাগতিক স্থানাঙ্কের কেন্দ্র নয়। তাই বায়তুল মামুরকে কাবার ঠিক উপরে ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিক জ্যামিতির চেয়ে ধর্মীয় প্রতীকী ভূগোলের সঙ্গে বেশি মেলে।

আসুন এই বিষয়ে আহমদুল্লাহ সাহেবের একটি বক্তব্য শুনে নিই,


এবারে আসুন দেখি, তাফসীরে জাকারিয়াতে খুব পরিষ্কারভাবে বলা আছে, বায়তুল মামুর নামক আসমানি মসজিদ দুনিয়ার কাবার ঠিক উপরে রয়েছে। [31]

মিরাজ 13

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে দেখে নেয়া যাক, [32]

মিরাজ 15

এবারে আসুন দেখি তাফসীরে ইবনে কাসিরে কী বলা হয়েছে, [33]

মিরাজ 17
মিরাজ 19

উপরের আলোচনাগুলো থেকে দেখা যায়, মিরাজের বৈজ্ঞানিক সমস্যা কোনো একক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। আলোর গতির সীমা, আপেক্ষিক সময়, মানবদেহের মহাকাশ-অযোগ্যতা, আকাশের স্তরভিত্তিক প্রাচীন কসমোলজি, মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথোপকথন, এবং পৃথিবীর কাবার ঠিক উপর সপ্তম আসমানে একটি মসজিদের অবস্থান—প্রতিটি দাবি পৃথকভাবে সমস্যাযুক্ত; একত্রে এগুলো মিরাজকে বাস্তব মহাকাশঘটনা হিসেবে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে।

অবশ্য বিশ্বাসী ব্যক্তি চাইলে বলতে পারেন, “এটি অলৌকিক, তাই বিজ্ঞানের নিয়ম এখানে প্রযোজ্য নয়।” কিন্তু এই অবস্থান নিলে তাকে সৎভাবে স্বীকার করতে হবে যে মিরাজ বিজ্ঞানের আলোচ্য নয়, প্রমাণভিত্তিক ইতিহাসের আলোচ্য নয়, বরং বিশ্বাসের দাবিমাত্র। বিশ্বাসের দাবি হিসেবে কেউ তা গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু বৈজ্ঞানিক, যৌক্তিক বা ঐতিহাসিক দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তার পক্ষে স্বাধীন, পরীক্ষাযোগ্য, অসাধারণ প্রমাণ লাগবে। সেই প্রমাণ মিরাজের ক্ষেত্রে নেই। বরং প্রাপ্ত বর্ণনাগুলো প্রাচীন ধর্মীয় কল্পবিশ্ব, স্বপ্ন/দর্শনধর্মী অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক অলৌকিকীকরণের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।


মিরাজের বর্ণনায় কাঠামোগত ভাঙন

কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই করার ক্ষেত্রে বর্ণনার সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঘটনা যদি বাস্তব, প্রত্যক্ষ এবং সুস্পষ্ট হয়, তবে তার মৌলিক কাঠামো—ঘটনাটি কোথায় শুরু হলো, কারা উপস্থিত ছিল, কী ঘটল, কোন পথে যাওয়া হলো, কোথায় থামা হলো, কার সঙ্গে দেখা হলো, এবং শেষে কীভাবে ফিরে আসা হলো—এসব বিষয়ে বর্ণনাগুলোর মধ্যে অন্তত মৌলিক সামঞ্জস্য থাকার কথা। ছোটখাটো ভাষাগত পার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু একই ঘটনার কেন্দ্রীয় উপাদানগুলো যদি এক বর্ণনায় একরকম, আরেক বর্ণনায় সম্পূর্ণ ভিন্নরকম হয়, তাহলে সেটি ঐতিহাসিক ঘটনার চেয়ে পরবর্তী কালের মৌখিক কিংবদন্তি, ধর্মীয় সম্প্রসারণ বা বর্ণনাগত বিবর্তনের লক্ষণ হিসেবেই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।

আইন, সাক্ষ্যতত্ত্ব এবং ইতিহাসচর্চায় একটি সাধারণ পদ্ধতি হলো—একই ঘটনার একাধিক বর্ণনা আলাদা করে পরীক্ষা করা। প্রত্যক্ষদর্শীরা ভিন্ন ভাষায় বলতেই পারেন, কিন্তু মৌলিক তথ্য যদি বারবার বদলে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে। কে এসেছে? কোথায় এসেছে? কতজন এসেছে? যাত্রা কোথা থেকে শুরু হয়েছে? মাঝপথে কোথায় থামা হয়েছে? কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নামাজ পড়া হয়েছে কি না? দুধ ও মদের পাত্র কোথায় দেওয়া হয়েছে? কোন নবী কোন আসমানে ছিলেন? এই প্রশ্নগুলো ঘটনাটির বাহ্যিক অলঙ্কার নয়; এগুলো মিরাজ-আখ্যানের কেন্দ্রীয় কাঠামো।

মিরাজের বর্ণনায় ঠিক এই ধরনের গুরুতর অসামঞ্জস্য দেখা যায়। কোনো বর্ণনায় নবী মক্কায় নিজের ঘরে ছিলেন, কোনো বর্ণনায় কাবার হাতিমে বা হিজরে শুয়ে ছিলেন, আবার সীরাতধর্মী বর্ণনায় বাল্যকালের প্রেমিকা উম্মে হানীর ঘর থেকে মিরাজের সূচনা পাওয়া যায় [34]। কোনো বর্ণনায় একজন ফেরেশতা, কোথাও দুইজন, কোথাও তিনজনের উপস্থিতির আভাস পাওয়া যায়। কোনো বর্ণনায় জেরুজালেমে গিয়ে বুরাক বাঁধা, মসজিদে প্রবেশ, দুই রাকাত নামাজ এবং তারপর ঊর্ধ্বলোকে আরোহণের কথা আছে; অন্য বর্ণনায় সরাসরি দুনিয়ার আসমানে উঠে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো বর্ণনায় দুধ ও মদের পাত্র জেরুজালেমে দেওয়া হয়েছে; অন্য বর্ণনায় তা বায়তুল মামুর বা ঊর্ধ্বলোকে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের পার্থক্য সামান্য ভাষাগত ভিন্নতা নয়; এগুলো আখ্যানের অস্থিমজ্জাগত অসঙ্গতি।

এই অসঙ্গতিগুলো সমাধান করার জন্য অনেক আলেম নানা ব্যাখ্যা দেন। কেউ বলেন, মিরাজ একাধিকবার হয়েছে; কেউ বলেন, একবার ইসরা, আরেকবার মিরাজ; কেউ বলেন, একবার স্বপ্নে, একবার সশরীরে; কেউ বলেন, সব বর্ণনা একত্র করলে পূর্ণ ঘটনা পাওয়া যায়। কিন্তু এই ধরনের ব্যাখ্যার সমস্যা হলো—এসব প্রায়ই উৎস থেকে সরাসরি উঠে আসে না, বরং পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক মীমাংসা হিসেবে তৈরি হয়। যখন একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ একে অপরের সঙ্গে মেলে না, তখন সেগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে মিলিয়ে নেওয়া ইতিহাসচর্চা নয়; এটি ধর্মীয় বিশ্বাস রক্ষার apologetic পদ্ধতি।

এই আলোচনায় জইফ বর্ণনার ওপর নির্ভর করা হবে না। দুর্বল বর্ণনাগুলো একত্র করলে অসঙ্গতির তালিকা আরও দীর্ঘ হবে, কিন্তু তাতে আপত্তির সুযোগও বাড়বে। তাই এখানে মূলত সহিহ, হাসান এবং প্রাসঙ্গিকভাবে একটি মুনকার বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা হবে। কারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মিরাজের সমস্যাগুলো শুধু দুর্বল বর্ণনায় নয়; সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত বর্ণনার মধ্যেও মৌলিক পার্থক্য আছে।

নিচের আলোচনায় প্রতিটি অসঙ্গতিকে আলাদা করে দেখা হবে। ধর্মীয় অনুভূতি এখানে প্রমাণের বিকল্প নয়; এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, একটি অতিপ্রাকৃত দাবিকে তার নিজস্ব উৎসের আলোতেই পরীক্ষা করা। যদি বর্ণনাগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে সেই অসামঞ্জস্যকে “রহস্য” বা “আল্লাহ ভালো জানেন” বলে এড়িয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। বরং প্রশ্ন করতে হবে—এই গল্পটি কি সত্যিই প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক ঘটনা, নাকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বদলাতে বদলাতে গড়ে ওঠা ধর্মীয় কিংবদন্তি?


কয়জন ফেরেশতা এসেছিল?

মিরাজের বর্ণনায় প্রথম অসঙ্গতি দেখা যায় যাত্রার সূচনাতেই। নবীর কাছে কে বা কারা এসেছিল? প্রচলিত ধর্মীয় কল্পচিত্রে সাধারণত জিবরাঈলকে একক পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, কখনো জিবরাঈল একাই আসছেন, কখনো “একজন আগন্তুক” আসছেন, আবার কোনো কোনো বর্ণনায় তিন ব্যক্তির উপস্থিতির কথা পাওয়া যায়। একটি বাস্তব ঘটনার ক্ষেত্রে এ ধরনের মৌলিক উপস্থিতি-সংক্রান্ত পার্থক্য ছোটখাটো বিষয় নয়। কারণ ঘটনা শুরুই হচ্ছে এই আগমনের মাধ্যমে।

প্রথম বর্ণনায় দেখা যায়, জিবরাঈল এসে নবীর ঘরের ছাদ খুলে দেন, বুক বিদীর্ণ করেন, জমজমের পানি দিয়ে তা ধৌত করেন, ঈমান ও হিকমতে পূর্ণ করেন এবং এরপর তাকে আসমানের দিকে নিয়ে যান। এখানে জিবরাঈল পরিচিত চরিত্র, নামসহ স্পষ্টভাবে উপস্থিত। এই বর্ণনা অনুসারে নবী জানেন কে এসেছে, এবং আসমানের দরজায় প্রহরীর প্রশ্নের উত্তরে জিবরাঈল নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন [9]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮/ সালাত
পরিচ্ছেদঃ ২৪২। মি’রাজে কিভাবে সালাত ফরজ হল?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৪২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৪৯
ইবন ’আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আমার কাছে আবূ সুফিয়ান ইবন হারব (রাঃ) হিরাকল-এর হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি এ কথাও বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমদেরকে সালাত, সত্যবাদিতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার নির্দেশ দিয়েছেন।
৩৪২। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আবূ যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমার ঘরের ছাদ খুলে দেয়া হল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। তারপর জিবরীল (আঃ) এসে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। আর তা যমযমের পানি দিয়ে ধুইলেন। এরপর হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি সোনার পাত্র নিয়ে আসলেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। তারপর হাত ধরে আমাকে দুনিয়ার আসমানের দিকে নিয়ে চললেন। যখন দুনিয়ার আসমানে পৌঁছালাম, তখন জিবরীল (আঃ) আসমানের রক্ষককে বললেনঃ দরযা খোল। তিনি বললেনঃ কে? উত্তর দিলেনঃ আমি জিবরীল, আবার জিজ্ঞাসা করলেনঃ আপনার সঙ্গে আর কেউ আছে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, আমার সঙ্গে মুহাম্মদ। তিনি আবার বললেনঃ তাঁকে কি আহবান করা হয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ হাঁ।
তারপর আসমান খোলা হলে আমরা প্রথম আসমানে উঠলাম। সেখানে দেখলাম, এক লোক বসে আছেন এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি তাঁর ডান পাশে রয়েছে এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি বাম পাশেও রয়েছে। যখন তিনি ডান দিকে তাকাচ্ছেন, হাসছেন আর যখন তিনি বাম দিকে তাকাচ্ছেন, কাঁদছেন। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ, হে পুণ্যবান নবী! হে নেক সন্তান! আমি জিবরীল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলামঃ ইনি কে? তিনি বললেনঃ ইনি আদম (আঃ)। আর তাঁর ডানে ও বায়ে তাঁর সন্তানদের রুহ। ডান দিকের লোকেরা জান্নাতী আর বা দিকের লোকেরা জাহান্নামী। এজন্য তিনি ডান দিকে তাকালে হাসেন আর বাঁ দিকে তাকালে কাঁদেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় আকাশে উঠলেন। সেখানে উঠে রক্ষক কে বললেনঃ দরযা খোল। তখন রক্ষক প্রথম আসমানের রক্ষকের অনুরুপ প্রশ্ন করলেন। তারপর দরযা খুলে দিলেন।
আনাস (রাঃ) বলেনঃ এরপর আবূ যার বলেনঃ তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আসমানসমূহে আদম (আঃ), ঈদরীস (আঃ), মূসা (আঃ), ’ঈসা (আঃ), ও ইবরাহীম (আঃ)-কে পেলেন। আবূ যার (রাঃ) তাঁদের অবস্থান নির্দিষ্ট ভাবে বলেন নি। কেবল এতটুকু বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদম (আঃ)-কে প্রথম আসমানে এবং ইবরাহীম (আঃ)-কে ষষ্ট আসমানে পেয়েছেন। আনাস (রাঃ) বলেনঃ যখন জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইদরীস (আঃ) এর পাশ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঈদরীস (আঃ) বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নবী ও নেক ভাই! আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈদরীস (আঃ)। তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পূণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি বললাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ মূসা (আঃ)। তারপর আমি ঈসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈসা (আঃ)।
তারপর ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন যে, ইবনু হাযম আমাকে খবর দিয়েছেন ইবনু আব্বাস ও আবূ হাব্বা আনসারী (রাঃ) উভয়ে বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আমাকে আরো উপরে উঠানো হল, আমি এমন এক সমতল স্থানে উপনীত হলাম, যেখান থেকে কলমের লেখার শব্দ শুনতে পেলাম। ইবনু হাযম (রহঃ) ও আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আল্লাহ তা’আলা আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করে দিলেন। আমি এ নিয়ে প্রত্যাবর্তনকালে যখন মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মূসা (আঃ) বললেনঃ আপনার উম্মতের উপর আল্লাহ কি ফরয করেছেন? আমি বললামঃ পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান। কারণ আপনার উম্মত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না।
আমি ফিরে গেলাম। আল্লাহ পাক কিছু অংশ কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আঃ) এর কাছে আবার গেলাম আর বললামঃ কিছু অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। আমি ফিরে গেলাম। তখন আরো কিছু অংশ কমিয়ে দেওয়া হল। আবার মূসা (আঃ) এর কাছে গেলাম, এবারো তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। তখন আমি আবার গেলাম, তখন আল্লাহ বললেনঃ এই পাঁচই (সওয়াবের দিক দিয়ে) পঞ্চাশ (গণ্য হবে)। আমার কথার কোন পরিবর্তন নেই। আমি আবার মূসা (আঃ) এর কাছে আসলে তিনি আমাকে আবারো বলললেনঃ আপনার রবের কাছে আবার যান। আমি বললামঃ আবার আমার রবের কাছে যেতে আমি লজ্জাবোধ করছি। তারপর জিবরীল(আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। আর তখন তা বিভিন্ন রঙে ঢাকা ছিল, যার তাৎপর্য আমার জানা ছিল না। তারপর আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হল। আমি দেখলাম তাতে মুক্তার হার রয়েছে আর তাঁর মাটি কস্তুরি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই বর্ণনার সমস্যা হলো, অন্য বর্ণনায় ঘটনাটির সূচনা এত সরল নয়। সেখানে বলা হচ্ছে, নবী কাবার হাতিমে বা হিজরে শুয়ে ছিলেন; হঠাৎ একজন আগন্তুক এলেন এবং তার শরীরের নির্দিষ্ট অংশ চিরে ফেললেন [10]। আগন্তুকটি জিবরাঈল হলে বর্ণনার অস্থিরতা আরও নগ্ন হয়—পরিচিত ফেরেশতাকে কেন অনির্দিষ্ট “আগন্তুক” বলা হলো? নবী যদি পূর্ব থেকেই জিবরাঈলকে চিনে থাকেন, তবে বর্ণনায় তার নাম সরাসরি আসার কথা। আর যদি বর্ণনাকারী জানতেন না আগন্তুক কে, তাহলে ঘটনাটির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২১৫১. মি’রাজের ঘটনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৬০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৮৮৭
৩৬০৮। হুদবা ইবনু খালিদ (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যে রাতে তাঁকে ভ্রমণ করানো হয়েছে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদা আমি কা’বা ঘরের হাতিমের অংশে ছিলাম। কখনো কখনো রাবী (কাতাদা) বলেছেন, হিজরে শুয়েছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট এলেন এবং আমার এ স্থান থেকে সে স্থানের মধ্যবর্তী অংশটি চিরে ফেললেন। রাবী কাতাদা বলেন, আনাস (রাঃ) কখনো কাদ্দা (চিরলেন) শব্দ আবার কখনো শাক্‌কা (বিদীর্ণ) শব্দ বলেছেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ দ্বারা কী বুঝিয়েছেন? তিনি বললেন, হলকুমের নিম্নদেশ থেকে নাভী পর্যন্ত। কাতাদা (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ) কে এ-ও বলতে শুনেছি বুকের উপরিভাগ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত। তারপর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আগন্তুক আমার হৃদপিণ্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার হৃদপিণ্ডটি (যমযমের পানি দ্বারা) ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে পুনরায় রেখে দেয়া হল।
তারপর সাদা রং এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হল। যা আকারে খচ্চর থেকে ছোট ও গাধা থেকে বড় ছিল? জারূদ তাকে বলেন, হে আবূ হামযা, ইহাই কি বুরাক? আনাস (রাঃ) বললেন, হাঁ। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ প্রান্তে। আমাকে তার উপর সাওয়ার করানো হল। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) চললেন, প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, ইনি কে? তিনি বললেন জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। তখন বলা হল, তার জন্য খোশ-আমদেদ, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হল।
আমি যখন পোঁছালাম, তখন তথায় আদম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর উপরের দিকে চলে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল কে? তিনি বললেন জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তারপর বলা হল- তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর খুলে দেওয়া হল। যখন তথায় পৌঁছালাম। তখন সেখানে ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। তাঁরা দু’জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। তিনি (জিবরীল) বললেন, এরা হলেন ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)। তাঁদের প্রতি সালাম করুন। তখন আমি সালাম দিলাম। তাঁরা জবাব দিলেন, তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন, সেখানে পৌঁছে জিবরীল বললেন খুলে দাও। তাঁকে বলা হল কে? তিনি উত্তর দিলেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর দরজা খুলে দেওয়া হল। আমি তথায় পৌঁছে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) আপনি তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করলেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। আর (ফিরিশ্‌তাকে) দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তখন বলা হল- তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তখন খুলে দেওয়া হল। আমি ইদ্রীস (আলাইহিস সালাম) এর কাছে পৌঁছলে জিবরীল বললেন, ইনি ইদ্রীস আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি (জিবরীল) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করে পঞ্চম আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল। তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তথায় পৌঁছে হারূন (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি হারূন (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনিও জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। ফিরিশ্‌তা বললেন, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগন্তুক এসেছেন। তথায় পৌঁছে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল(আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনি জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন? তিনি বললেন আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার উম্মত আমার উম্মত থেকে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞাসা করা হল, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছে কি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। আমি সেখানে পৌঁছে ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার পিতা। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর আমাকে সিদ্‌রাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম, উহার ফল হাজার অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং তার পাতাগুলি এই হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, এ হল সিদরাতুল মুন্‌তাহা (জড় জগতের শেষ প্রান্ত)।
সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দু’টি ছিল অপ্রকাশ্য দু’টি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ নহরগুলো কী? অপ্রকাশ্য দু’টি হল জান্নাতের দুইটি নহর। আর প্রকাশ্য দুটি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী। তারপর আমার সামনে ’আল-বায়তুল মামুর’ প্রকাশ করা হল, এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র পরিবেশন করা হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরীল বললেন, এ-ই হচ্ছে ফিতরাত (দ্বীন-ই-ইসলাম)। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর আমার উপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত সালাম ফরয করা হল।
এরপর আমি ফিরে আসলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কী আদেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে সমর্থ হবে না। আল্লাহর কসম। আমি আপনার আগে লোকদের পরীক্ষা করেছি এবং বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের(বোঝা) হাল্কা করার জন্য আবেদন করুন।
আমি ফিরে গেলাম। ফলে আমার উপর থেকে (দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) হ্রাস করে দিলেন। আমি আবার মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম তিনি আবার আগের মত বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। ফলে আল্লাহ তা’আলা আরো দশ ওয়াক্ত সালাত কমিয়ে দিলেন। ফিরার পথে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট পৌঁছালে, তিনি আবার পূর্বোক্ত কথা বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। আল্লাহ তা’আলা আর দশ (ওয়াক্ত) হ্রাস করলেন। আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বললেন আমি আবার ফিরে গেলাম। তখন আমাকে দশ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ দেওয়া হয়। আমি (তা নিয়ে) ফিরে এলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) ঐ কথাই আগের মত বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আমাকে পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ করা হয়।
তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কী আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমি বললাম, দৈনিক পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাত আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ সালাত আদায় করতেও সমর্থ হবে না। আপনার পূর্বে আমি লোকদের পরীক্ষা করেছি। বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আমার রবের নিকট (অনেকবার) আবেদন করেছি, এতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এরপর তিনি বললেন, আমি যখন মূসা (আলাইহিস সালাম) কে অতিক্রম করে অগ্রসর হলাম, তখন জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, আমি আমার অবশ্য পালনীয় আদেশটি জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর লঘু করে দিলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)

এবারে আসুন দেখা যাক, দুইজন ফেরেশতার বর্ণনা। এই বিবরণটি নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এটি মিরাজের ঘটনা কিনা। কিন্তু ভালভাবে পড়লেই আপনি বুঝবেন, এটি মিরাজেরই ঘটনা [35]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২০/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৮৭৬. পরিচ্ছেদ নাই।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১৩০৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৮৬
১৩০৩। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … সামুরা ইবনু জুনদাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ফজর) সালাত (নামায/নামাজ) শেষে আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসতেন এবং জিজ্ঞাসা করতেন, তোমাদের কেউ গত রাতে কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? (বর্ণনাকারী) বলেন, কেউ স্বপ্ন দেখে থাকলে তিনি তা বিবৃত করতেন। তিনি তখন আল্লাহর মর্জি মুতাবিক তা’বীর বলতেন। একদিন আমাদেরকে প্রশ্ন করলেন, তোমাদের কেউ কি কোন স্বপ্ন দেখেছ? আমরা বললাম, জী না।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ গত রাতে আমি দেখলাম, দু’জন লোক এসে আমার দু’হাত ধরে আমাকে পবিত্র ভূমির দিকে নিয়ে চললো। হঠাৎ দেখতে পেলাম, এক ব্যাক্তি বসে আছে আর ব্যাক্তি লোহার আকড়া হাতে দাঁড়িয়ে আছে। (ইমাম বুখারী রহ বলেন) আমাদের এক সাথি মূসা (রহঃ) বর্ণনা করেছেন যে, দণ্ডায়মান ব্যাক্তি উপবিষ্ট ব্যাক্তির (এক পাশের) চোয়ালটা এমনভাবে আকড়া দ্বারা বিদ্ধ করছিল যে, তা (চোয়াল বিদীর্ণ করে) মস্তকের পশ্চাদভাগ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল। তারপর অপর চোয়ালটিও পূর্ববৎ বিদীর্ণ করছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ কি হচ্ছে? সাথীদ্বয় বললেন, (পরে কথা হবে এখন) চলুন।
আমরা চলতে চলতে চিৎ হয়ে শায়িত এক ব্যাক্তির পাশে এসে উপস্থিত হলাম, তার শিয়রে পাথর হাতে এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে পাথর দিয়ে তার মাথা চূর্ণ করে দিচ্ছিল। নিক্ষিপ্ত পাথর দূরে গড়িয়ে যাওয়ার ফলে তা তুলে নিয়ে শায়িত ব্যাক্তির নিকট ফিরে আসার পূর্বেই বিচূর্ণ মাথা পূর্ববৎ জোড়া লেগে যাচ্ছিল। সে পুনরায় মাথার উপরে পাথর নিক্ষেপ করছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, লোকটি কে? তাঁরা বললেন, চলুন।
আমরা অগ্রসর হয়ে চুলার ন্যায় এক গর্তের নিকট উপস্থিত হলাম। গর্তের উপরিভাগ ছিল সংকীর্ণ ও নীচের অংশ প্রশস্থ এবং এর নীচদেশ থেকে আগুন জ্বলছিল। আগুন গর্ত মুখের নিকটবর্তী হলে সেখানের লোকগুলোও উপরে চলে আসত যেন তারা গর্ত থেকে বের হয়ে যাবে। আগুণ ক্ষীণ হয়ে গেলে তারাও (তলদেশে) ফিরে যায়। গর্তের মধ্যে বহুসংখ্যক উলঙ্গ নারী-পুরুষ ছিল। জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তাঁরা বললেন, চলুন।
আমরা চলতে চলতে একটি রক্ত প্রবাহিত নদীর নিকট উপস্থিত হলাম। নদীর মাঝখানে এক ব্যাক্তি দাঁড়ানো ছিল, (ইমাম বুখারী রহ বলেন) ইয়াযীদ ইবনু হারূন ও ওহাব ইবনু জারীল ইবনু হাযিম (রহঃ) বর্ণনায় وعلى شط النهر رجل بين يديه حجارة রয়েছে। নদীর তীরে অপর এক ব্যাক্তি যার সামনে ছিল পাথর। নদীর মাঝখানের লোকটি নদী থেকে বের হয়ে আসার জন্য অগ্রসর হলেই তীরে দাঁড়ানো লোকটি সে ব্যাক্তির মুখ বরাবর পাথর নিক্ষেপ করত, এতে সে তাকে পূর্বস্থানে ফিরিয়ে দিত। এমনভাবে যতবার সে তীরে উঠে আসতে চেষ্টা করে ততবার সে ব্যাক্তি তার মুখ বরাবর পাথর নিক্ষেপ করে পূর্বস্থানে ফিরে যেতে বাধ্য করে। আমি জানতে চাইলাম, এ ঘটনার কারণ কি? তাঁরা বললেন, চলতে থাকুন।
আমরা চলতে চলতে একটি সবুজ বাগানে উপস্থিত হলাম। এতে একটি বড় গাছ ছিল। গাছটির গোড়ায় একজন বয়ঃবৃদ্ধ লোক ও বেশ কিছু বালক-বালিকা ছিল। হঠাৎ দেখি যে, গাছটির সন্নিকটে এক ব্যাক্তি সামনে আগুন রেখে তা প্রজ্জলিত করছে। সাথীদ্বয় আমাকে নিয়ে গাছে আরোহণ করে এমন একটি বাড়ীতে প্রবেশ করালেন যে, এর চেয়ে সুদৃশ্য বাড়ী পূর্বে আমি কখনো দেখিনি। বাড়ীতে বহু সংখ্যক বৃদ্ধ, যুবক, নারী এবং বালক-বালিকা ছিল। এরপর তাঁরা আমাকে সেখান হতে বের করে নিয়ে গাছের আরো উপরে আরোহণ করে অপর একটি বাড়ীতে প্রবেশ করালেন। এটা পূর্বাপেক্ষা অধিক সুদৃশ্য ও সুন্দর। বাড়ীটিতে কতিপয় বৃদ্ধ ও যুবক অবস্থান করছিলেন। আমি বললাম, আজ রাতে আপনারা আমাকে (বহুদূর পর্যন্ত) ভ্রমণ করালেন। এখন বলুন, যা দেখলাম তার তাৎপর্য কী?
তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, আপনি যে ব্যাক্তির চোয়াল বিদীর্ণ করার দৃশ্য দেখলেন সে মিথ্যাবাদী; মিথ্যা কথা বলে বেড়াতো, তার বিবৃত মিথ্যা বর্ণনা ক্রমাগত বর্ণিত হয়ে দূর দূরান্তে পৌঁছে যেতো। কিয়ামত পর্যন্ত তারা সাথে এ ব্যবহার করা হবে।
আপনি যার মাথা চূর্ণ করতে দেখলেন, সে এমন ব্যাক্তি যাকে আল্লাহ কুরআনের শিক্ষা দান করেছিলেন, কিন্তু রাতের বেলায় সে কুরআন থেকে বিরত হয়ে নিদ্রা যেতো এবং দিনের বেলায় কুরআন অনুযায়ী আমল করতো না। তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত এরূপই করা হবে।
গর্তের মধ্যে যাদেরকে আপনি দেখলেন, তারা ব্যভিচারী।
(রক্ত প্রবাহিত) নদীতে আপনি যাকে দেখলেন, সে সুদখোর।
গাছের গোড়ায় যে বৃদ্ধ ছিলেন তিনি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর চারপাশের বালক-বালিকারা মানুষের সন্তান।
যিনি আগুন জ্বালাচ্ছিলেন তিনি হলেন, জাহান্নামের খাযিন মালিক নামক ফিরিশতা।
প্রথম যে বাড়ীতে আপনি প্রবেশ করলেন তা সাধারণ মু’মিনদের বাসস্থান। আর এ বাড়ীটি হল শহীদগণের আবাস।
আমি (হলাম) জিবরীল আর ইনি হলেন মীকাঈল। (এরপর জিবরীল আমাকে বললেন) আপনার মাথা উপরে উঠান। আমি উঠিয়ে মেঘমালার ন্যায় কিছু দেখতে পেলাম। তাঁরা বললেন, এটাই হল আপনার আবাসস্থল। আমি বললাম, আমাকে ছেড়ে দিন আমি আমার আবাসস্থলে প্রবেশ করি। তাঁরা বললেন, এখনো আপনার হায়াতের কিছু সময় অবশিষ্ট রয়ে গেছে যা পূর্ণ হয়নি। অবশিষ্ট সময় পূর্ণ হলে অবশ্যই আপনি নিজ আবাসে চলে আসবেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ)

এবারে আসুন, আরও একটি বিবরণ পড়ি, যেখানে তিনজন ফেরেশতার বর্ণনা দেয়া আছে যে, নবীর মিরাজের রাতে সর্বমোট তিনজন ফেরেশতার আগমন হয়েছিল [5] [36]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৯. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ এবং মূসা (আঃ) এর সাথে আল্লাহ্‌ সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন (৪ঃ ১৬৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫১৭
৭০০৯। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু সালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক রাতে কাবার মসজিদ থেকে সফর করানো হল। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে ওহী প্রেরণের পুর্বে তার কাছে তিনজন ফেরেশতার একটি জামাআতে আসল। অথচ তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এদের প্রথমজন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের উত্তম ব্যাক্তি। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের উত্তম ব্যাক্তিকেই নিয়ে চল। সে রাতটির ঘটনা এটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। অবশেষে তারা অন্য এক রাতে আগমন করলেন যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তার চোখ ঘুমন্ত, অন্তর ঘুমায় না। অনুরূপ অন্য নবীগণেরও চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না।
এ রাতে তারা তার সাথে কোন কথা না বলে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার গলার নিচ হতে বক্ষস্থল পর্যন্ত ছেদন করলেন এবং তার বক্ষ ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিছন্ন করলেন, তারপর সেখানে একটি তশতরী আনা হয় এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিকমতে। তাঁর বক্ষ ও গলার রগগুলি এর দ্বারা পূর্ণ করলেন।
তারপর সেগুলো যখাস্থানে স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ফিরে আসমানের দিকে আরোহণ করলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসিগণ তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেনঃ জিবরীল। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন তারা বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন) শুভাগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা যমীনে কি করতে চাচ্ছেন তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না।
দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে পেলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সালাম দিলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) তার সালামের উত্তর দিলেন। এবং বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র। তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবাহমান নহর দুনিয়ার আসমানে অবলোকন করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এ নহর দুটি কোন নহর হে জিবরীল! জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ দুটি হলো নীল ও ফুরাতের মুল।
এরপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নহর অবলোকন করলেন। এর ওপর প্রতিঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নহরে হাত মারলেন। তা ছিল অতি উন্নতমানের মিসক। তিনি বললেনঃ হে জিবরীল! এটি কি? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হাউযে কাওসার। যা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গমন করলেন। প্রথম আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতাগণ তাকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেনঃ তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। তারা বললেনঃ আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা বললেনঃ তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গমন করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তৃতীয় আসমানের ফেরেশতাগণও তাই বললেন। তারপর তাকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গমন করলেন। তারাও তাঁকে পুর্বের ন্যায়ই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গমন করলেন। সেখানেও ফেরেশতারা পূর্বের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলে সেখানেও ফেরেশতারা তাকে পূর্বের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম উল্লেখ করেছেন।
তন্মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম), চতূর্থ আসমানে হারুন (আলাইহিস সালাম), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যায় নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর সাথে বাক্যলাপের মর্যাদার কারণে মূসা (আলাইহিস সালাম) আছেন সপ্তম আসমানে।
সে সময় মূসা বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমি তো ধারনা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এত ঊর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার প্রতি ওহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের কথা ওহী যোগে পাঠানো হলো।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করেন। আর মূসার কাছে পৌছলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতিপালক আপনাকে কি নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায়ে সক্ষম হবে না। সুতরাং আপনি ফিরে যান তাহলে আপনার প্রতিপালক আপনার এবং আপনার উম্মাতের থেকে এ আদেশটি সহজ করে দিবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের দিকে এমনভাবে লক্ষ্য করলেন, যেন তিনি এ বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হ্যাঁ। আপনি চাইলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মাত এটি আদায়ে সক্ষম হবে না। তখন আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে নামালেন। এভাবেই মূসা তাকে তাঁর প্রতিপালকের কাছে পাঠাতে থাকলেন। পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এর চেয়েও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তদুপরি তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছেন অথচ আপনার উম্মাত দৈহিক, মানসিক, শারীরিক সৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা সব দিকে আরো দুর্বল।
সুতরাং আপনি আবার যান এবং আপনার প্রতিপালক থেকে নির্দেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরীলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে গমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ নিতান্তই দুর্বল। তাই নির্দেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আপনার নিকটে হাযির, বারবার হাযির।
আল্লাহ বললেনঃ আমার কথার কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ’উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত (নামায/নামাজ) পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিপিবদ্ধ আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে প্রত্যাবর্তন করলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে দশটি সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে এর চাইতেও সামান্য জিনিসের প্রত্যাশ্য করছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার প্রতিপালকের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন আরো একটু কমিয়ে দেন।
এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মূসা, আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার গিয়েছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তার সাথে মতান্তর করছি। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ অবতরণ করতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

মিরাজ 21

আসুন হাদিসে বর্ণিত বিষয়টি হাদিস দুইটি পাশাপাশি রেখে পড়ি যেন ভালভাবে বোঝা যায় [37] [38]

মিরাজ 23

ফেরেশতার সংখ্যার প্রশ্ন আখ্যানের গোড়াতেই যুক্তির ছুরি বসায়। কারণ মিরাজের মতো অতিপ্রাকৃত দাবি যদি ঈশ্বরীয়ভাবে পরিচালিত বাস্তব ঘটনা হয়, তবে এর সূচনা-পর্বে উপস্থিত চরিত্রগুলোর বর্ণনা এত অস্থির হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যদি ধরে নেওয়া হয়, গল্পটি মৌখিকভাবে প্রচারিত হয়েছে, বিভিন্ন বর্ণনাকারী তা নিজের মতো করে সম্প্রসারিত করেছেন, এবং পরে হাদিস-সংকলনে ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ পাশাপাশি সংরক্ষিত হয়েছে—তাহলে এই পার্থক্যগুলো স্বাভাবিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

সুতরাং “কয়জন ফেরেশতা এসেছিল?” প্রশ্নটি তুচ্ছ নয়। এটি মিরাজের আখ্যান-গঠনের প্রথম ফাটল। যদি একটি অলৌকিক ঘটনার সূচনাতেই বর্ণনাগুলো একমত না হয়, তাহলে পরবর্তী আসমান, নবী, পাত্র, নামাজ, বায়তুল মামুর, সিদরাতুল মুনতাহা—এসব আরও জটিল অংশের ওপর অন্ধভাবে আস্থা রাখার যৌক্তিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।


যাত্রা শুরু কোথা থেকে?

নবী মুহাম্মদ কোথাও বলেছেন তার ঘরের ছাদ বিদীর্ণ করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কোথাও আবার বলেছেন কাবার হাতিম থেকে। মুহাম্মদের ঘরের ছাদ বিদীর্ণ করে এরপরে তাকে মিরাজে নেয়া হয়েছিল বলে যেখানে বর্ণিত আছে, সেটি শুরুতে দেখে নেয়া যাক, [9]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮/ সালাত
পরিচ্ছেদঃ ২৪২। মি’রাজে কিভাবে সালাত ফরজ হল?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৪২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৪৯
ইবন ’আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আমার কাছে আবূ সুফিয়ান ইবন হারব (রাঃ) হিরাকল-এর হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি এ কথাও বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমদেরকে সালাত, সত্যবাদিতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার নির্দেশ দিয়েছেন।
৩৪২। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আবূ যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমার ঘরের ছাদ খুলে দেয়া হল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। তারপর জিবরীল (আঃ) এসে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। আর তা যমযমের পানি দিয়ে ধুইলেন। এরপর হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি সোনার পাত্র নিয়ে আসলেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। তারপর হাত ধরে আমাকে দুনিয়ার আসমানের দিকে নিয়ে চললেন। যখন দুনিয়ার আসমানে পৌঁছালাম, তখন জিবরীল (আঃ) আসমানের রক্ষককে বললেনঃ দরযা খোল। তিনি বললেনঃ কে? উত্তর দিলেনঃ আমি জিবরীল, আবার জিজ্ঞাসা করলেনঃ আপনার সঙ্গে আর কেউ আছে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, আমার সঙ্গে মুহাম্মদ। তিনি আবার বললেনঃ তাঁকে কি আহবান করা হয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ হাঁ।
তারপর আসমান খোলা হলে আমরা প্রথম আসমানে উঠলাম। সেখানে দেখলাম, এক লোক বসে আছেন এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি তাঁর ডান পাশে রয়েছে এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি বাম পাশেও রয়েছে। যখন তিনি ডান দিকে তাকাচ্ছেন, হাসছেন আর যখন তিনি বাম দিকে তাকাচ্ছেন, কাঁদছেন। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ, হে পুণ্যবান নবী! হে নেক সন্তান! আমি জিবরীল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলামঃ ইনি কে? তিনি বললেনঃ ইনি আদম (আঃ)। আর তাঁর ডানে ও বায়ে তাঁর সন্তানদের রুহ। ডান দিকের লোকেরা জান্নাতী আর বা দিকের লোকেরা জাহান্নামী। এজন্য তিনি ডান দিকে তাকালে হাসেন আর বাঁ দিকে তাকালে কাঁদেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় আকাশে উঠলেন। সেখানে উঠে রক্ষক কে বললেনঃ দরযা খোল। তখন রক্ষক প্রথম আসমানের রক্ষকের অনুরুপ প্রশ্ন করলেন। তারপর দরযা খুলে দিলেন।
আনাস (রাঃ) বলেনঃ এরপর আবূ যার বলেনঃ তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আসমানসমূহে আদম (আঃ), ঈদরীস (আঃ), মূসা (আঃ), ’ঈসা (আঃ), ও ইবরাহীম (আঃ)-কে পেলেন। আবূ যার (রাঃ) তাঁদের অবস্থান নির্দিষ্ট ভাবে বলেন নি। কেবল এতটুকু বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদম (আঃ)-কে প্রথম আসমানে এবং ইবরাহীম (আঃ)-কে ষষ্ট আসমানে পেয়েছেন। আনাস (রাঃ) বলেনঃ যখন জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইদরীস (আঃ) এর পাশ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঈদরীস (আঃ) বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নবী ও নেক ভাই! আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈদরীস (আঃ)। তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পূণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি বললাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ মূসা (আঃ)। তারপর আমি ঈসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈসা (আঃ)।
তারপর ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন যে, ইবনু হাযম আমাকে খবর দিয়েছেন ইবনু আব্বাস ও আবূ হাব্বা আনসারী (রাঃ) উভয়ে বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আমাকে আরো উপরে উঠানো হল, আমি এমন এক সমতল স্থানে উপনীত হলাম, যেখান থেকে কলমের লেখার শব্দ শুনতে পেলাম। ইবনু হাযম (রহঃ) ও আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আল্লাহ তা’আলা আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করে দিলেন। আমি এ নিয়ে প্রত্যাবর্তনকালে যখন মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মূসা (আঃ) বললেনঃ আপনার উম্মতের উপর আল্লাহ কি ফরয করেছেন? আমি বললামঃ পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান। কারণ আপনার উম্মত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না।
আমি ফিরে গেলাম। আল্লাহ পাক কিছু অংশ কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আঃ) এর কাছে আবার গেলাম আর বললামঃ কিছু অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। আমি ফিরে গেলাম। তখন আরো কিছু অংশ কমিয়ে দেওয়া হল। আবার মূসা (আঃ) এর কাছে গেলাম, এবারো তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। তখন আমি আবার গেলাম, তখন আল্লাহ বললেনঃ এই পাঁচই (সওয়াবের দিক দিয়ে) পঞ্চাশ (গণ্য হবে)। আমার কথার কোন পরিবর্তন নেই। আমি আবার মূসা (আঃ) এর কাছে আসলে তিনি আমাকে আবারো বলললেনঃ আপনার রবের কাছে আবার যান। আমি বললামঃ আবার আমার রবের কাছে যেতে আমি লজ্জাবোধ করছি। তারপর জিবরীল(আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। আর তখন তা বিভিন্ন রঙে ঢাকা ছিল, যার তাৎপর্য আমার জানা ছিল না। তারপর আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হল। আমি দেখলাম তাতে মুক্তার হার রয়েছে আর তাঁর মাটি কস্তুরি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আরেকটি বিবরণে কাবার হাতিম বা হিজর থেকে নবীকে মিরাজে নেয়া হয়েছিল, যা পূর্বের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। উল্লেখ্য, কাবার হাতিমে কোন ছাদ নেই। নিচে কাবার হাতিমের একটি ছবি দেয়া হল, বোধগম্যতার উদ্দেশ্যে [10]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২১৫১. মি’রাজের ঘটনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৬০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৮৮৭
৩৬০৮। হুদবা ইবনু খালিদ (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যে রাতে তাঁকে ভ্রমণ করানো হয়েছে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদা আমি কা’বা ঘরের হাতিমের অংশে ছিলাম। কখনো কখনো রাবী (কাতাদা) বলেছেন, হিজরে শুয়েছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট এলেন এবং আমার এ স্থান থেকে সে স্থানের মধ্যবর্তী অংশটি চিরে ফেললেন। রাবী কাতাদা বলেন, আনাস (রাঃ) কখনো কাদ্দা (চিরলেন) শব্দ আবার কখনো শাক্‌কা (বিদীর্ণ) শব্দ বলেছেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ দ্বারা কী বুঝিয়েছেন? তিনি বললেন, হলকুমের নিম্নদেশ থেকে নাভী পর্যন্ত। কাতাদা (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ) কে এ-ও বলতে শুনেছি বুকের উপরিভাগ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত। তারপর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আগন্তুক আমার হৃদপিণ্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার হৃদপিণ্ডটি (যমযমের পানি দ্বারা) ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে পুনরায় রেখে দেয়া হল।
তারপর সাদা রং এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হল। যা আকারে খচ্চর থেকে ছোট ও গাধা থেকে বড় ছিল? জারূদ তাকে বলেন, হে আবূ হামযা, ইহাই কি বুরাক? আনাস (রাঃ) বললেন, হাঁ। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ প্রান্তে। আমাকে তার উপর সাওয়ার করানো হল। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) চললেন, প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, ইনি কে? তিনি বললেন জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। তখন বলা হল, তার জন্য খোশ-আমদেদ, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হল।
আমি যখন পোঁছালাম, তখন তথায় আদম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর উপরের দিকে চলে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল কে? তিনি বললেন জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তারপর বলা হল- তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর খুলে দেওয়া হল। যখন তথায় পৌঁছালাম। তখন সেখানে ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। তাঁরা দু’জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। তিনি (জিবরীল) বললেন, এরা হলেন ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)। তাঁদের প্রতি সালাম করুন। তখন আমি সালাম দিলাম। তাঁরা জবাব দিলেন, তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন, সেখানে পৌঁছে জিবরীল বললেন খুলে দাও। তাঁকে বলা হল কে? তিনি উত্তর দিলেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর দরজা খুলে দেওয়া হল। আমি তথায় পৌঁছে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) আপনি তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করলেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। আর (ফিরিশ্‌তাকে) দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তখন বলা হল- তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তখন খুলে দেওয়া হল। আমি ইদ্রীস (আলাইহিস সালাম) এর কাছে পৌঁছলে জিবরীল বললেন, ইনি ইদ্রীস আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি (জিবরীল) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করে পঞ্চম আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল। তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তথায় পৌঁছে হারূন (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি হারূন (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনিও জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। ফিরিশ্‌তা বললেন, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগন্তুক এসেছেন। তথায় পৌঁছে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল(আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনি জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন? তিনি বললেন আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার উম্মত আমার উম্মত থেকে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞাসা করা হল, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছে কি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। আমি সেখানে পৌঁছে ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার পিতা। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর আমাকে সিদ্‌রাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম, উহার ফল হাজার অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং তার পাতাগুলি এই হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, এ হল সিদরাতুল মুন্‌তাহা (জড় জগতের শেষ প্রান্ত)।
সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দু’টি ছিল অপ্রকাশ্য দু’টি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ নহরগুলো কী? অপ্রকাশ্য দু’টি হল জান্নাতের দুইটি নহর। আর প্রকাশ্য দুটি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী। তারপর আমার সামনে ’আল-বায়তুল মামুর’ প্রকাশ করা হল, এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র পরিবেশন করা হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরীল বললেন, এ-ই হচ্ছে ফিতরাত (দ্বীন-ই-ইসলাম)। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর আমার উপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত সালাম ফরয করা হল।
এরপর আমি ফিরে আসলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কী আদেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে সমর্থ হবে না। আল্লাহর কসম। আমি আপনার আগে লোকদের পরীক্ষা করেছি এবং বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের(বোঝা) হাল্কা করার জন্য আবেদন করুন।
আমি ফিরে গেলাম। ফলে আমার উপর থেকে (দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) হ্রাস করে দিলেন। আমি আবার মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম তিনি আবার আগের মত বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। ফলে আল্লাহ তা’আলা আরো দশ ওয়াক্ত সালাত কমিয়ে দিলেন। ফিরার পথে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট পৌঁছালে, তিনি আবার পূর্বোক্ত কথা বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। আল্লাহ তা’আলা আর দশ (ওয়াক্ত) হ্রাস করলেন। আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বললেন আমি আবার ফিরে গেলাম। তখন আমাকে দশ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ দেওয়া হয়। আমি (তা নিয়ে) ফিরে এলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) ঐ কথাই আগের মত বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আমাকে পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ করা হয়।
তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কী আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমি বললাম, দৈনিক পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাত আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ সালাত আদায় করতেও সমর্থ হবে না। আপনার পূর্বে আমি লোকদের পরীক্ষা করেছি। বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আমার রবের নিকট (অনেকবার) আবেদন করেছি, এতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এরপর তিনি বললেন, আমি যখন মূসা (আলাইহিস সালাম) কে অতিক্রম করে অগ্রসর হলাম, তখন জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, আমি আমার অবশ্য পালনীয় আদেশটি জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর লঘু করে দিলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)

মিরাজ 25

আসুন হাদিস দুইটি পাশাপাশি রেখে পড়ি [39] [38]

মিরাজ 27

আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, ঘটনা ঘটেছিল উম্মে হানীর ঘর থেকে। উম্মে হানীর মতে, অন্য কোথাও থেকে নয়। অর্থাৎ উম্মে হানী শুধু নিজের বক্তব্যই দেননি, অন্যদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যকে বাতিলও করেছেন। ইবনে ইসহাকের সিরাতে রাসুলাল্লাহ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মিরাজ হয়েছিল উম্মে হানির ঘর থেকে [40] [12]

রাসুলে করিমের (সা.) মিরাজ সম্পর্কে উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব ওরফে হিন্দের কাছ থেকে কিছু বর্ণনা আমি পেয়েছি। তিনি বলেছেন, ‘আমার বাড়িতে থাকা অবস্থায়ই তিনি মিরাজে গেছেন, অন্য কোনো খান থেকে যাননি। সে রাতে তিনি আমার বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। সে রাতে তিনি এশার নামাজ পড়ে ঘুমাতে গেলেন। আমরাও ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরের একটু আগে রাসুলে করিম (সা.) আমাদের জাগিয়ে দিলেন। আমরা ফজরের নামাজ পড়লাম। তারপর তিনি বললেন, “উম্মে হানি, কালকে তো এইখানে এই উপত্যকায় আপনাদের সঙ্গে আমি এশার নামাজ পড়লাম। সে তো আপনি দেখেছিলেন। তারপর আমি জেরুজালেমে গেলাম এবং ওখানে নামাজ পড়লাম। আবার এখানে আমি এক্ষনি আপনাদের সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়লাম, এই যেমন দেখলেন । তিনি বাইরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই আমি তাঁর জামা চেপে ধরলাম, তাতে টান লেগে তাঁর পেট উদাম হয়ে গেল, যেন আমি এক ভাঁজ করা মিসরীর কাপড় ধরে টেনেছিলাম। আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ, এ কথা কাউকে যেন বলবেন। না, ওরা বলবে এটা মিথ্যা কথা, আপনাকে তারা অপমান করবে।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তাদের আমি বলবই।’

মিরাজ 29

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, মুহাম্মদ ইবন সাইব কালবী…. উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ(ﷺ)-এর মিরাজ সম্পর্কে বলেন, যেই রাত্রে রাসুলুল্লাহ(ﷺ)-এর মিরাজ সংঘটিত হয় সেই রাতে তিনি আমার বাড়ীতে শায়িত ছিলেন। ঈশার সলাত শেষে তিনি ঘুমিয়ে যান। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। ফজরের সামান্য আগে তিনি আমাদেরকে জাগালেন। তিনি সালাত পড়লেন এবং আমরাও তাঁর সাথে (ফজরের) সালাত পড়লাম তখন তিনি বললেনঃ হে উম্মে হানী, তোমরা তো দেখেছো আমি তোমাদের সাথে ঈশার সালাত পড়ে তোমাদের এখানেই শুয়ে পড়ি। কিন্তু এরপরে আমি বাইতুল মুকাদ্দাস গমন করি এবং সেখানে সলাত আদায় করি। এখন ফজরের সলাত তোমাদের সাথে পড়লাম যা তোমরা দেখলে। উম্মে হানী বলেন, এই বলে তিনি চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁর চাদরের কিনারা ধরে ফেললাম। ফলে তাঁর পেট থেকে কাপড় সরে গেল। তা দেখতে ভাঁজ করা কিবতী বস্ত্রের মত স্বচ্ছ ও মসৃণ। আমি বললাম : হে আল্লাহর নবী! আপনি এ কথা লোকদের কাছে প্রকাশ করবেন না। অন্যথায় তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং আপনাকে কষ্ট দেবে। কিন্তু তিনি বললেন : আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তাদের কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করব। তখন আমি আমার এক হাবশী দাসীকে বললাম ; বসে আছো কেন, জলদি, রাসূলুল্লাহ্(ﷺ)-এর সঙ্গে যাও, তিনি লোকদের কি বলেন তা শোনো, আর দেখো তারা কী মন্তব্য করে।

মিরাজ 31

জিবরাইলের সাথে কোথায় সাক্ষাৎ হয়েছিল?

কোরআনের এই আয়াত দুইটি লক্ষ্য করুন। এখানে বলা হচ্ছে, জিবরাইলের সাথে মুহাম্মদের দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, প্রথমবার দেখা হয়েছিল অন্য আরেকটি সময়ে [41] [42]। কিন্তু মিরাজের হাদিস থেকে জানা যায়, সেই রাতে জিবরাইল মক্কায় এসে মুহাম্মদকে নিয়ে গিয়েছিল। তাহলে কোরআনে সিদরাতুল মুনতাহার কাছে দেখা হয়েছিল, এমন কথা লিখিত হল কেন? একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন কলিমুদ্দীনের সাথে আমার দেখা হল কমলাপুর রেলস্টেশনে। সেখান থেকে আমরা এয়ারপোর্টে গেলাম। এরপরে প্লেনে চেপে জার্মানির বার্লিনে এসে পৌঁছালাম। এরপরে কাজ শেষে আবার ঢাকা এয়ারপোর্ট আসলাম, এরপরে কমলাপুর চলে গেলাম। তাহলে, কলিমুদ্দীনের সাথে আমার কোথায় দেখা হয়েছিল বলে আমি বর্ণনা করবো? বার্লিনে দেখা হয়েছিল, এরকম কথা বলবো, নাকি তার সাথে দেখা হয়েছি কমলাপুরে, এই কথাটি বলাটিই সঠিক হবে? তাহলে, সেই রাতে তো জিবরাইলের সাথে দেখা হয়েছিল মক্কায়, এরকম বিবরণ থাকার কথা। সিদরাতুল মুনতাহাতেও নিশ্চয়ই দেখা হয়েছিল, কিন্তু সেটি তো পুরো ঘটনার মাঝের একটি ঘটনা। এরকম ঘটনা বর্ণনার সময় সাধারণত মানুষ ঐ মূহুর্তটিকেই সাক্ষাতের সময় হিসেবে বিবেচনা করে, যখন তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হল! প্রথম মূহুর্তের কথাই বলা হয়, পরের মূহুর্তের কথা বলা হয় না। বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন, [43]

53:13
অবশ্যই সে [অর্থাৎ নবী (সা.)] তাকে [অর্থাৎ জিবরাঈল (আঃ)-কে] আরেকবার দেখেছিল
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর সে তো তাকে* আরেকবার** দেখেছিল। * জিবরীলকে।
— Rawai Al-bayan
আর অবশ্যই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

53:14
শেষসীমার বরই গাছের কাছে,
— Taisirul Quran
সিদরাতুল মুনতাহার নিকট,
— Sheikh Mujibur Rahman
সিদরাতুল মুনতাহার* নিকট। * সিদরাতুল মুনতাহা হল সপ্তম আকাশে আরশের ডান দিকে একটি কুল জাতীয় বৃক্ষ, সকল সৃষ্টির জ্ঞানের সীমার শেষ প্রান্ত। তারপর কি আছে, একমাত্র আল্লাহই জানেন।
— Rawai Al-bayan
‘সিদরাতুল মুন্তাহা’ তথা প্রান্তবর্তী কুল গাছ এর কাছে [১],
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


মিরাজে যাওয়ার বাহন কী?

মুহাম্মদ ঠিক কীভাবে, অর্থাৎ কোন বাহনে চড়ে নাকি জিবরাইলের হাত ধরে নাকি লিফট বা সিড়িতে চড়ে মিরাজে গিয়েছিলেন, তার বর্ণনাতেও রয়েছে গড়মিল। আসুন দেখা যাক। নিচের বর্ণনাটি পড়ুন। এখানে বলা হচ্ছে, বুরাক নামক সাদা জন্তুতে চড়লেন এবং এরপরেই প্রথম আসমানে গিয়ে পৌঁছালেন, অর্থাৎ সেই বুরাকই ছিল বাহন [44]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৪
৩১৩। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাবী বলেন, আনাস (রাঃ) সম্ভবত তার সম্প্রদায়ের জনৈক মালিক ইবনু সা’সাআ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ একদা আমি কাবা শরীফের কাছে নিদ্রা ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। তখন তিন ব্যাক্তির মধ্যবতী একজনকে কথা বলতে শুনতে পেলাম। যাহোক তিনি আমার কাছে এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। তারপর আমার কাছে একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল, তাতে যমযমের পানি ছিল। এরপর তিনি আমার বক্ষ এখান থেকে ওখান পর্যন্ত বিদীর্ন করলেন। বর্ণনাকারী কাতাদা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পার্শ্বস্থ একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এখান থেকে ওখান পর্যন্ত- বলে কি বোঝাতে চেয়েছেন?
তিনি জবাব দিলেন, “বক্ষ থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত”। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর আমার হৃদপিণ্ডটি বের করা হল এবং যমযমের পানি দিয়ে তা ধৌত করে পূনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হল। ঈমান ও হিকমতে আমার হৃদয় পূর্ন করে দেয়া হয়েছে। এরপর আমার কাছে ’বুরাক’- নামের একটি সাদা জন্তু উপস্থিত করা হয়। এটি গাধা থেকে কিছু বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট। যতদুর দৃষ্টি যায় একেক পদক্ষেপে সে ততদুর চলে। এর উপর আমাকে আরোহণ করান হল। আমরা চললাম এবং দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত পৌছলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, আমার সাথে মুহাম্মাদ আছেন। দাররক্ষী বললেন, তাঁর কাছে আপনাকে পাঠান হয়েছিল কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর দরজা খুলে দিলেন এবং বললেন, মারহাবা! কত সম্মানিত আগন্তুকের আগমন হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারপর আমরা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আসলাম … এভাবে বর্ণনাকারী পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। তবে এ রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহইয়া, তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতূর্থ আসমানে ইদরীস, পঞ্চম আসমানে হারুন (আলাইহিমুস সালাম) এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রাসুলাল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তারপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে গিয়ে পৌছি এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দেই। তিনি বললেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য নবী, সুযোগ্য ভ্রাতা! এরপর আমরা ডাঁকে অতিক্রম করে চলে গেলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। আওয়াজ এল, আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি জবাব দিলেন, প্রভু, এ বালককে আপনি আমার পরে পাঠিয়েছেন; অথচ আমার উম্মাত অপেক্ষা তাঁর উম্মাত অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমরা আবার চললাম এবং সপ্তম আসমানে গিয়ে পৌছলাম ও ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। সাহাবী তাঁর এ হাদীসে আরো উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেনঃ সেখানে তিনি চারটি নহর দেখেছেন। তন্মধ্যে দুটি প্রকাশ্য ও দুটি অপ্রকাশ্য। সবগুলোই সিদরাতূল মুনতাহার গোড়া হতে প্রবাহিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি বললাম, হে জিবরীল! এ নহর গুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহরদ্বয় তো জান্নাতের নহর আর প্রকাশ্যগুলো নীল ও ফূরাত। অর্থাৎ এ দুটি নহরের সাদৃশ্য রয়েছে জান্নাতের ঐ দুটি নহরের সাথে।
এরপর আমাকে বায়তুল মামুরে উঠান হল। বললামঃ হে জিবরীল! এ কি? তিনি বললেন, এ হচ্ছে ’বায়তুল মামুর’। প্রত্যহ এতে সত্তর হাজার ফেরেশতা (তাওয়াফের জন্য) প্রবেশ করে। তারা একবার তাওয়াফ সেরে বের হলে কখনও আর ফের তাওয়াফের সুযোগ হয় না তাদের। তারপর আমার সম্মুখে দূটি পাত্র পেশ করা হলো, একটি শরাবের, অপরটি দুধের। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনি ঠিক করেছেন। আল্লাহ আপনার উম্মাতকেও আপনার ওসীলায় ফিতরাত এর উপর কায়েম রাখুন। তারপর আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়… এভাবে বর্ণনাকায়ী হাদীসের শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আরেকটি হাদিস পড়ি, যেখান থেকে বোঝা যাবে, মুহাম্মদ বুরাকে চড়ার পরে জান্নাত জাহান্নাম ভ্রমণ করার আগে সেই বুরাক থেকে নামেনি। অর্থাৎ বুরাকই ছিল মুহাম্মদের বাহন [45] [46]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৪/ তাফসীরুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ ১৮. সূরা বানী ইসরাঈল
৩১৪৭৷ যির ইবনু হুবাইশ (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাযি:) -কে প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বাইতুল মাকদিসে নামায আদায় করেছেন? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, হ্যাঁ তিনি নামায আদায় করেছেন। তিনি বললেন, হে টেকো! তুমি এ ধরনের কথা বলছ, তা কিসের ভিত্তিতে বলছ? আমি বললাম, কুরআনের ভিত্তিতে। কুরআন আমার ও আপনার মাঝে ফাঈসালা করবে। হুযাইফা (রাযিঃ) বললেন, কুরআন হতে যে ব্যক্তি দলীল গ্রহণ করল সে কৃতকার্য হল।
সুফইয়ান (রাহঃ) বলেন, তিনি (মিসআর) কখনো “কাদ ইহতাজ্জা” আবার কখনো “কাদ ফালাজা” বলেছেন। তারপর তিনি (যির) এই আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ “পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি এক রাতে তার বান্দাকে মাসজিদুল হারাম হতে দূরবর্তী মসজিদে নিয়ে গেলেন”- (সূরা বানী ইসরাঈল ১)। হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে কি তুমি প্রমাণ করতে চাও, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে নামায আদায় করেছেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সেখানে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করতেন, তাহলে তোমাদের উপরও সেখানে নামায আদায় করা বাধ্যতামূলক হত, যেমন মাসজিদুল হারামে নামায আদায় করা তোমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি পশু আনা হল। এর পিঠ ছিল দীর্ঘ এবং (চলার সময়) এর পা দৃষ্টির সীমায় পতিত হয়। তারা দু’জন (মহানাবী ও জিবরীল) জান্নাত, জাহান্নাম এবং আখিরাতের প্রতিশ্রুত বিষয়সমূহ দেখার পূর্ব পর্যন্ত বোরাকের পিঠ হতে নামেননি। তারপর তারা দু’জন প্রত্যাবর্তন করেন। তারা যেভাবে গিয়েছিলেন অনুরূপভাবেই ফিরে আসেন (অর্থাৎ সওয়ারী অবস্থায়ই ফিরে আসেন)। হুযাইফাহ (রাযিঃ) বলেন, লোকেরা বলাবলি করে, তিনি বোরাককে বেঁধেছিলেন। কেন এটি তার নিকট হতে পালিয়ে যাবে। অথচ গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানার মালিক (আল্লাহ তা’আলা) বোরাককে তার নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছিলেন।
সনদ হাসান।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ যির ইবন হুবায়শ (রহঃ)

আরেকটি বিবরণে বলা আছে, বায়তুল মাকদিস থেকে একটি সিড়িতে চড়ে নবী সাত আসমানে গিয়েছিলেন, [47]

মিরাজ 33

আরও একটি বিবরণ অনুসারে, জিবরাইল তাকে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন, [9]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮/ সালাত
পরিচ্ছেদঃ ২৪২। মি’রাজে কিভাবে সালাত ফরজ হল?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৪২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৪৯
ইবন ’আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আমার কাছে আবূ সুফিয়ান ইবন হারব (রাঃ) হিরাকল-এর হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তাতে তিনি এ কথাও বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমদেরকে সালাত, সত্যবাদিতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার নির্দেশ দিয়েছেন।
৩৪২। ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আবূ যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমার ঘরের ছাদ খুলে দেয়া হল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। তারপর জিবরীল (আঃ) এসে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। আর তা যমযমের পানি দিয়ে ধুইলেন। এরপর হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি সোনার পাত্র নিয়ে আসলেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। তারপর হাত ধরে আমাকে দুনিয়ার আসমানের দিকে নিয়ে চললেন। যখন দুনিয়ার আসমানে পৌঁছালাম, তখন জিবরীল (আঃ) আসমানের রক্ষককে বললেনঃ দরযা খোল। তিনি বললেনঃ কে? উত্তর দিলেনঃ আমি জিবরীল, আবার জিজ্ঞাসা করলেনঃ আপনার সঙ্গে আর কেউ আছে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, আমার সঙ্গে মুহাম্মদ। তিনি আবার বললেনঃ তাঁকে কি আহবান করা হয়েছে? তিনি উত্তরে বললেনঃ হাঁ।
তারপর আসমান খোলা হলে আমরা প্রথম আসমানে উঠলাম। সেখানে দেখলাম, এক লোক বসে আছেন এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি তাঁর ডান পাশে রয়েছে এবং অনেকগুলো মানুষের আকৃতি বাম পাশেও রয়েছে। যখন তিনি ডান দিকে তাকাচ্ছেন, হাসছেন আর যখন তিনি বাম দিকে তাকাচ্ছেন, কাঁদছেন। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ, হে পুণ্যবান নবী! হে নেক সন্তান! আমি জিবরীল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলামঃ ইনি কে? তিনি বললেনঃ ইনি আদম (আঃ)। আর তাঁর ডানে ও বায়ে তাঁর সন্তানদের রুহ। ডান দিকের লোকেরা জান্নাতী আর বা দিকের লোকেরা জাহান্নামী। এজন্য তিনি ডান দিকে তাকালে হাসেন আর বাঁ দিকে তাকালে কাঁদেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় আকাশে উঠলেন। সেখানে উঠে রক্ষক কে বললেনঃ দরযা খোল। তখন রক্ষক প্রথম আসমানের রক্ষকের অনুরুপ প্রশ্ন করলেন। তারপর দরযা খুলে দিলেন।
আনাস (রাঃ) বলেনঃ এরপর আবূ যার বলেনঃ তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আসমানসমূহে আদম (আঃ), ঈদরীস (আঃ), মূসা (আঃ), ’ঈসা (আঃ), ও ইবরাহীম (আঃ)-কে পেলেন। আবূ যার (রাঃ) তাঁদের অবস্থান নির্দিষ্ট ভাবে বলেন নি। কেবল এতটুকু বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদম (আঃ)-কে প্রথম আসমানে এবং ইবরাহীম (আঃ)-কে ষষ্ট আসমানে পেয়েছেন। আনাস (রাঃ) বলেনঃ যখন জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইদরীস (আঃ) এর পাশ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঈদরীস (আঃ) বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নবী ও নেক ভাই! আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈদরীস (আঃ)। তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পূণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি বললাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ মূসা (আঃ)। তারপর আমি ঈসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান রাসূল ও নেক ভাই। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ঈসা (আঃ)।
তারপর ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেনঃ খোশ আমদেদ! পুণ্যবান নবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইনি কে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ ইনি ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন যে, ইবনু হাযম আমাকে খবর দিয়েছেন ইবনু আব্বাস ও আবূ হাব্বা আনসারী (রাঃ) উভয়ে বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আমাকে আরো উপরে উঠানো হল, আমি এমন এক সমতল স্থানে উপনীত হলাম, যেখান থেকে কলমের লেখার শব্দ শুনতে পেলাম। ইবনু হাযম (রহঃ) ও আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তারপর আল্লাহ তা’আলা আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করে দিলেন। আমি এ নিয়ে প্রত্যাবর্তনকালে যখন মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মূসা (আঃ) বললেনঃ আপনার উম্মতের উপর আল্লাহ কি ফরয করেছেন? আমি বললামঃ পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান। কারণ আপনার উম্মত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না।
আমি ফিরে গেলাম। আল্লাহ পাক কিছু অংশ কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আঃ) এর কাছে আবার গেলাম আর বললামঃ কিছু অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। আমি ফিরে গেলাম। তখন আরো কিছু অংশ কমিয়ে দেওয়া হল। আবার মূসা (আঃ) এর কাছে গেলাম, এবারো তিনি বললেনঃ আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান। কারণ আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। তখন আমি আবার গেলাম, তখন আল্লাহ বললেনঃ এই পাঁচই (সওয়াবের দিক দিয়ে) পঞ্চাশ (গণ্য হবে)। আমার কথার কোন পরিবর্তন নেই। আমি আবার মূসা (আঃ) এর কাছে আসলে তিনি আমাকে আবারো বলললেনঃ আপনার রবের কাছে আবার যান। আমি বললামঃ আবার আমার রবের কাছে যেতে আমি লজ্জাবোধ করছি। তারপর জিবরীল(আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। আর তখন তা বিভিন্ন রঙে ঢাকা ছিল, যার তাৎপর্য আমার জানা ছিল না। তারপর আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হল। আমি দেখলাম তাতে মুক্তার হার রয়েছে আর তাঁর মাটি কস্তুরি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আসুন হাদিসের বিবরণগুলো একসাথে দেখি, [48] [49] [47]

মিরাজ 35


জেরুজালেমে থামা হয়েছিল, নাকি সরাসরি আসমানে যাওয়া হয়েছিল?

মিরাজের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হলো মক্কা থেকে জেরুজালেমে যাত্রা—যাকে ইসরা বলা হয়—এবং তারপর জেরুজালেম থেকে আসমানে আরোহণ—যাকে মিরাজ বলা হয়। প্রচলিত ইসলামি বয়ানে এই দুই অংশ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নবী বুরাকে আরোহণ করেন, বায়তুল মাকদিসে যান, বুরাক বাঁধেন, মসজিদে প্রবেশ করেন, দুই রাকাত সালাত আদায় করেন, এরপর জিবরাঈল তাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যান [23]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬২
৩০৮। শায়বান ইবনু ফাররূখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আমার কাছে বুরাক আনা হল। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদুর দৃষ্টি যায়, এক এক পদক্ষেপে সে ততাদূর চলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এতে আরোহন করলাম এবং বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে রজ্জুতে বাধতেন, আমি সে রজ্জুতে আমার বাহনটিও বাধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু-রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে বের হলাম।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বললেন, আপনি ফিরতকেই গ্রহণ করলেন। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌছে দার খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ, ডেকে পাঠানো হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দরজা খূলে দেয়া হল। সেখানে আমি আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সাক্ষাৎ পাই তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন এবং আমার মঙ্গলের জন্য দুআা করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে চললেন এবং দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত পৌছলেন ও দ্বার খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি উত্তরে বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, তাকে কি আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া (আলাইহিমুস সালাম) দুই খালাত ভাইয়ের সাক্ষাৎ পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন, আমার জন্য কল্যাণের দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়েঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইউসূফ (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাঁকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেওয়া হলো। সেখানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুঃআ করলেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا‏ “এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়—” (৫৭ঃ ১৯)।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খূলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেওয়া হল। সেখানে হারুন (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খূলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রাস্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললোন, জিবরীল। বলা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি বায়তুল মা’মুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। বায়তুল মামুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন, যারা আর সেখানে পূনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হস্থিনীর কানের মত আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে বৃক্ষটিকে যখন আল্লাহর নির্দেশে যা আবৃত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তায়াআলা আমার উপর যা অহী করার তা অহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। এরপর আমি মূসা(আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মাত এ নির্দেশ পাননে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মাতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মাত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এভাবে আমি একবার মূসা (আলাইহিস সালাম) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়াহ করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! যাও, দিন ও রাতের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাত দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যাক্তি কোন নেক কাজের ইচ্ছা করল এবং তা কাজে রুপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখব; অ্যর তা কাজে রুপায়িত করলে তার জন্য লিখব দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের অভিপ্রায় করল, অথচ তা কাজে পরিণত করল না, তার জন্য কোন গুনাহ লেখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লেখা হয় একটি মাত্র গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে নেমে এলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বিযয় নিয়ে বারবার আমি আমার রবের কাছে আসা-যাওয়া করেছি, এখন পূনরায় যেতে লজ্জা হচ্ছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

কিন্তু সহিহ মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায়, বুরাকে আরোহণের পর সরাসরি দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে; মাঝখানে জেরুজালেমে থামা, বুরাক বাঁধা, মসজিদে প্রবেশ, বা নামাজ পড়ার উল্লেখ নেই [50]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৪
৩১৩। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাবী বলেন, আনাস (রাঃ) সম্ভবত তার সম্প্রদায়ের জনৈক মালিক ইবনু সা’সাআ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ একদা আমি কাবা শরীফের কাছে নিদ্রা ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। তখন তিন ব্যাক্তির মধ্যবতী একজনকে কথা বলতে শুনতে পেলাম। যাহোক তিনি আমার কাছে এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। তারপর আমার কাছে একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল, তাতে যমযমের পানি ছিল। এরপর তিনি আমার বক্ষ এখান থেকে ওখান পর্যন্ত বিদীর্ন করলেন। বর্ণনাকারী কাতাদা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পার্শ্বস্থ একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এখান থেকে ওখান পর্যন্ত- বলে কি বোঝাতে চেয়েছেন?
তিনি জবাব দিলেন, “বক্ষ থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত”। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর আমার হৃদপিণ্ডটি বের করা হল এবং যমযমের পানি দিয়ে তা ধৌত করে পূনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হল। ঈমান ও হিকমতে আমার হৃদয় পূর্ন করে দেয়া হয়েছে। এরপর আমার কাছে ’বুরাক’- নামের একটি সাদা জন্তু উপস্থিত করা হয়। এটি গাধা থেকে কিছু বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট। যতদুর দৃষ্টি যায় একেক পদক্ষেপে সে ততদুর চলে। এর উপর আমাকে আরোহণ করান হল। আমরা চললাম এবং দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত পৌছলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, আমার সাথে মুহাম্মাদ আছেন। দাররক্ষী বললেন, তাঁর কাছে আপনাকে পাঠান হয়েছিল কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর দরজা খুলে দিলেন এবং বললেন, মারহাবা! কত সম্মানিত আগন্তুকের আগমন হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারপর আমরা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আসলাম … এভাবে বর্ণনাকারী পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। তবে এ রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহইয়া, তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতূর্থ আসমানে ইদরীস, পঞ্চম আসমানে হারুন (আলাইহিমুস সালাম) এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রাসুলাল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তারপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে গিয়ে পৌছি এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দেই। তিনি বললেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য নবী, সুযোগ্য ভ্রাতা! এরপর আমরা ডাঁকে অতিক্রম করে চলে গেলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। আওয়াজ এল, আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি জবাব দিলেন, প্রভু, এ বালককে আপনি আমার পরে পাঠিয়েছেন; অথচ আমার উম্মাত অপেক্ষা তাঁর উম্মাত অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমরা আবার চললাম এবং সপ্তম আসমানে গিয়ে পৌছলাম ও ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। সাহাবী তাঁর এ হাদীসে আরো উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেনঃ সেখানে তিনি চারটি নহর দেখেছেন। তন্মধ্যে দুটি প্রকাশ্য ও দুটি অপ্রকাশ্য। সবগুলোই সিদূরাতূল মুনতাহার গোড়া হতে প্রবাহিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি বললাম, হে জিবরীল! এ নহর গুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহরদ্বয় তো জান্নাতের নহর আর প্রকাশ্যগুলো নীল ও ফূরাত। অর্থাৎ এ দুটি নহরের সাদৃশ্য রয়েছে জান্নাতের ঐ দুটি নহরের সাথে।
এরপর আমাকে বায়তুল মামুরে উঠান হল। বললামঃ হে জিবরীল! এ কি? তিনি বললেন, এ হচ্ছে ’বায়তুল মামুর’। প্রত্যহ এতে সত্তর হাজার ফেরেশতা (তাওয়াফের জন্য) প্রবেশ করে। তারা একবার তাওয়াফ সেরে বের হলে কখনও আর ফের তাওয়াফের সুযোগ হয় না তাদের। তারপর আমার সম্মুখে দূটি পাত্র পেশ করা হলো, একটি শরাবের, অপরটি দুধের। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনি ঠিক করেছেন। আল্লাহ আপনার উম্মাতকেও আপনার ওসীলায় ফিতরাত এর উপর কায়েম রাখুন। তারপর আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়… এভাবে বর্ণনাকায়ী হাদীসের শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই পার্থক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ জেরুজালেমে থামা মিরাজ-আখ্যানের কোনো পার্শ্ব-উপাদান নয়; এটি কুরআনের সূরা বনি ইসরাঈলের প্রথম আয়াতের সঙ্গে পরবর্তী ইসলামি ব্যাখ্যার কেন্দ্রীয় সংযোগ। যদি কোনো বর্ণনায় জেরুজালেমে থামার কথা থাকে, আর অন্য বর্ণনায় তা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে: জেরুজালেম-পর্বটি কি ঘটনাটির প্রাথমিক অংশ, নাকি পরবর্তী ধর্মীয়-রাজনৈতিক স্মৃতি যুক্ত হওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

এই সন্দেহ আরও বাড়ে তিরমিজির একটি বর্ণনায়। সেখানে হুযাইফা ইবনুল ইয়ামানের সঙ্গে যির ইবনু হুবাইশের বিতর্কে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ বায়তুল মাকদিসে নামাজ পড়েছেন কি না—এ নিয়ে সরাসরি মতবিরোধ আছে। হুযাইফা বলেন, তিনি সেখানে নামাজ আদায় করেননি। বরং তিনি যুক্তি দেন, যদি সেখানে নবী নামাজ পড়তেন, তাহলে সেই স্থানে নামাজ আদায় করা মুসলমানদের জন্যও বিশেষভাবে বাধ্যতামূলক বা বিধানিক মর্যাদাপূর্ণ হয়ে যেত, যেমন মসজিদুল হারামে নামাজের মর্যাদা আছে [45] [46]

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৪/ তাফসীরুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ ১৮. সূরা বানী ইসরাঈল
৩১৪৭৷ যির ইবনু হুবাইশ (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাযিঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বাইতুল মাকদিসে নামায আদায় করেছেন? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, হ্যাঁ তিনি নামায আদায় করেছেন। তিনি বললেন, হে টেকো! তুমি এ ধরনের কথা বলছ, তা কিসের ভিত্তিতে বলছ? আমি বললাম, কুরআনের ভিত্তিতে। কুরআন আমার ও আপনার মাঝে ফাঈসালা করবে। হুযাইফা (রাযিঃ) বললেন, কুরআন হতে যে ব্যক্তি দলীল গ্রহণ করল সে কৃতকার্য হল।
সুফইয়ান (রাহঃ) বলেন, তিনি (মিসআর) কখনো “কাদ ইহতাজ্জা” আবার কখনো “কাদ ফালাজা” বলেছেন। তারপর তিনি (যির) এই আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ “পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি এক রাতে তার বান্দাকে মাসজিদুল হারাম হতে দূরবর্তী মসজিদে নিয়ে গেলেন”- (সূরা বানী ইসরাঈল ১)। হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে কি তুমি প্রমাণ করতে চাও, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে নামায আদায় করেছেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সেখানে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করতেন, তাহলে তোমাদের উপরও সেখানে নামায আদায় করা বাধ্যতামূলক হত, যেমন মাসজিদুল হারামে নামায আদায় করা তোমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি পশু আনা হল। এর পিঠ ছিল দীর্ঘ এবং (চলার সময়) এর পা দৃষ্টির সীমায় পতিত হয়। তারা দু’জন (মহানাবী ও জিবরীল) জান্নাত, জাহান্নাম এবং আখিরাতের প্রতিশ্রুত বিষয়সমূহ দেখার পূর্ব পর্যন্ত বোরাকের পিঠ হতে নামেননি। তারপর তারা দু’জন প্রত্যাবর্তন করেন। তারা যেভাবে গিয়েছিলেন অনুরূপভাবেই ফিরে আসেন (অর্থাৎ সওয়ারী অবস্থায়ই ফিরে আসেন)। হুযাইফাহ (রাযিঃ) বলেন, লোকেরা বলাবলি করে, তিনি বোরাককে বেঁধেছিলেন। কেন এটি তার নিকট হতে পালিয়ে যাবে। অথচ গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানার মালিক (আল্লাহ তা’আলা) বোরাককে তার নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছিলেন।
সনদ হাসান।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ যির ইবন হুবায়শ (রহঃ)

এই বর্ণনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে প্রাথমিক মুসলিম স্মৃতির মধ্যেই জেরুজালেমে নবীর নামাজ আদায়ের বিষয়টি সর্বসম্মত ছিল না। কেউ কুরআনের আয়াত থেকে বায়তুল মাকদিসে যাত্রার ধারণা নিচ্ছেন; কিন্তু হুযাইফা প্রশ্ন তুলছেন—আয়াতে কি নামাজ আদায়ের কথা আছে? এই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। কুরআনের আয়াত কেবল এক রাতের ভ্রমণের কথা বলে; পরবর্তী হাদিস ও সীরাত সেই ভ্রমণের ওপর বুরাক বাঁধা, নামাজ, নবীদের ইমামতি, স্থাপত্যিক মসজিদ—এসব বিশদ যুক্ত করে।

তাই এখানে দুটি পৃথক স্তর আলাদা করা দরকার। প্রথম স্তর: কুরআনিক ইসরা—মসজিদুল হারাম থেকে দূরবর্তী মসজিদে নিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় স্তর: পরবর্তী হাদিস-সীরাতীয় মিরাজ—বুরাক, জেরুজালেমে সালাত, নবীদের ইমামতি, আসমানে দরজা, সিদরাতুল মুনতাহা, নামাজের দর-কষাকষি। ইতিহাসসম্মত পাঠে দেখা যায়, দ্বিতীয় স্তরটি অনেক বেশি বিস্তৃত, নাটকীয় এবং বর্ণনাগতভাবে পরিবর্তনশীল। ফলে এটিকে প্রাথমিক ঐতিহাসিক ঘটনার সরল বিবরণ না ধরে, ধর্মীয় আখ্যানের ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণ হিসেবে পড়া প্রমাণের ভারে বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত।

আসুন হাদিস দুইটি পাশাপাশি রেখে পড়ি,

মিরাজ 37

এই তুলনা থেকে মূল সমস্যা স্পষ্ট হয়। একটি বর্ণনায় জেরুজালেমে থামা, বুরাক বাঁধা, মসজিদে প্রবেশ এবং নামাজ আদায়ের পূর্ণ দৃশ্য আছে। অন্য বর্ণনায় বুরাকে আরোহণের পর সরাসরি দুনিয়ার আসমানে পৌঁছানোর দৃশ্য আছে। আবার তিরমিজির বর্ণনায় একজন সাহাবী পর্যায়ের ব্যক্তি বায়তুল মাকদিসে নামাজ আদায়ের দাবিকেই অস্বীকার করছেন। যদি একটি ঘটনা বাস্তব ও কেন্দ্রীয় হয়, তবে এমন মৌলিক পার্থক্য ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

এখানে সাধারণ apologetic কৌশল হলো: “সবগুলো বর্ণনা মিলিয়ে পড়তে হবে।” কিন্তু সব বর্ণনা মিলিয়ে পড়া মানে যদি এক বর্ণনার অনুপস্থিত অংশ অন্য বর্ণনা থেকে জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য নয়; সেটি পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক সংকলন। ইতিহাসে বর্ণনা মিলিয়ে পড়া যায় তখনই, যখন তারা একে অপরকে সম্পূরক করে; কিন্তু যখন তারা ঘটনাক্রম, স্থান, থামা/না-থামা, নামাজ পড়া/না-পড়া—এসব মৌলিক বিষয়ে ভিন্ন হয়, তখন সেগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে একক আখ্যান বানানো পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল।


দুধ ও মদ কোথায় দেয়া হয়েছিল?

মিরাজের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি হলো দুধ ও মদের পাত্র কোথায় দেওয়া হয়েছিল। ইসলামি বর্ণনায় দুধ গ্রহণকে ফিতরাত বা স্বাভাবিক পথ গ্রহণের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। এই অংশটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নবীর পছন্দকে উম্মতের সঠিক পথের প্রতীক বানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো—বিভিন্ন বর্ণনায় এই ঘটনাটির স্থান এক নয়।

একটি সহিহ মুসলিম বর্ণনায় দেখা যায়, নবী বায়তুল মাকদিসে পৌঁছান, বুরাক বাঁধেন, মসজিদে প্রবেশ করেন, দুই রাকাত সালাত আদায় করেন, তারপর বের হলে জিবরাঈল তার সামনে শরাবের পাত্র ও দুধের পাত্র আনেন। নবী দুধ গ্রহণ করেন; জিবরাঈল বলেন, তিনি ফিতরাত গ্রহণ করেছেন। এরপর জিবরাঈল তাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে যান [23]। অর্থাৎ এই বর্ণনা অনুযায়ী দুধ-মদ নির্বাচনের ঘটনা জেরুজালেমে, আসমানে ওঠার আগেই ঘটে।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬২
৩০৮। শায়বান ইবনু ফাররূখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আমার কাছে বুরাক আনা হল। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদুর দৃষ্টি যায়, এক এক পদক্ষেপে সে ততাদূর চলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এতে আরোহন করলাম এবং বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে রজ্জুতে বাধতেন, আমি সে রজ্জুতে আমার বাহনটিও বাধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু-রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে বের হলাম।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বললেন, আপনি ফিরতকেই গ্রহণ করলেন। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌছে দার খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ, ডেকে পাঠানো হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দরজা খূলে দেয়া হল। সেখানে আমি আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সাক্ষাৎ পাই তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন এবং আমার মঙ্গলের জন্য দুআা করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে চললেন এবং দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত পৌছলেন ও দ্বার খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি উত্তরে বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, তাকে কি আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া (আলাইহিমুস সালাম) দুই খালাত ভাইয়ের সাক্ষাৎ পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন, আমার জন্য কল্যাণের দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়েঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইউসূফ (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাঁকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেওয়া হলো। সেখানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুঃআ করলেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا‏ “এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়—” (৫৭ঃ ১৯)।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খূলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেওয়া হল। সেখানে হারুন (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খূলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রাস্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললোন, জিবরীল। বলা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি বায়তুল মা’মুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। বায়তুল মামুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন, যারা আর সেখানে পূনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হস্থিনীর কানের মত আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে বৃক্ষটিকে যখন আল্লাহর নির্দেশে যা আবৃত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তায়াআলা আমার উপর যা অহী করার তা অহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। এরপর আমি মূসা(আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মাত এ নির্দেশ পাননে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মাতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মাত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এভাবে আমি একবার মূসা (আলাইহিস সালাম) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়াহ করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! যাও, দিন ও রাতের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাত দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যাক্তি কোন নেক কাজের ইচ্ছা করল এবং তা কাজে রুপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখব; অ্যর তা কাজে রুপায়িত করলে তার জন্য লিখব দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের অভিপ্রায় করল, অথচ তা কাজে পরিণত করল না, তার জন্য কোন গুনাহ লেখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লেখা হয় একটি মাত্র গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে নেমে এলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বিযয় নিয়ে বারবার আমি আমার রবের কাছে আসা-যাওয়া করেছি, এখন পূনরায় যেতে লজ্জা হচ্ছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

কিন্তু আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায়, দুধ ও মদের পাত্রের ঘটনা ঊর্ধ্বলোকে, বায়তুল মামুর বা আসমানি পরিসরের প্রসঙ্গে এসেছে [50]। এই বর্ণনায় ঘটনাক্রম ভিন্ন: নবী কাবার কাছে নিদ্রা ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলেন, তাকে প্রস্তুত করা হয়, বুরাক আনা হয়, তিনি সরাসরি দুনিয়ার আসমানে পৌঁছান, আসমানসমূহ অতিক্রম করেন, বায়তুল মামুরের প্রসঙ্গ আসে, তারপর দুধ-মদের পাত্র আসে। অর্থাৎ একই প্রতীকী ঘটনা এক বর্ণনায় জেরুজালেমে, আরেক বর্ণনায় আসমানি স্তরে।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩১৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৪
৩১৩। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাবী বলেন, আনাস (রাঃ) সম্ভবত তার সম্প্রদায়ের জনৈক মালিক ইবনু সা’সাআ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ একদা আমি কাবা শরীফের কাছে নিদ্রা ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। তখন তিন ব্যাক্তির মধ্যবতী একজনকে কথা বলতে শুনতে পেলাম। যাহোক তিনি আমার কাছে এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। তারপর আমার কাছে একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল, তাতে যমযমের পানি ছিল। এরপর তিনি আমার বক্ষ এখান থেকে ওখান পর্যন্ত বিদীর্ন করলেন। বর্ণনাকারী কাতাদা (রাঃ) বলেন, আমি আমার পার্শ্বস্থ একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এখান থেকে ওখান পর্যন্ত- বলে কি বোঝাতে চেয়েছেন?
তিনি জবাব দিলেন, “বক্ষ থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত”। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর আমার হৃদপিণ্ডটি বের করা হল এবং যমযমের পানি দিয়ে তা ধৌত করে পূনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হল। ঈমান ও হিকমতে আমার হৃদয় পূর্ন করে দেয়া হয়েছে। এরপর আমার কাছে ’বুরাক’- নামের একটি সাদা জন্তু উপস্থিত করা হয়। এটি গাধা থেকে কিছু বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট। যতদুর দৃষ্টি যায় একেক পদক্ষেপে সে ততদুর চলে। এর উপর আমাকে আরোহণ করান হল। আমরা চললাম এবং দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত পৌছলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, আমার সাথে মুহাম্মাদ আছেন। দাররক্ষী বললেন, তাঁর কাছে আপনাকে পাঠান হয়েছিল কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর দরজা খুলে দিলেন এবং বললেন, মারহাবা! কত সম্মানিত আগন্তুকের আগমন হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারপর আমরা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আসলাম … এভাবে বর্ণনাকারী পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। তবে এ রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহইয়া, তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতূর্থ আসমানে ইদরীস, পঞ্চম আসমানে হারুন (আলাইহিমুস সালাম) এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রাসুলাল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তারপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে গিয়ে পৌছি এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দেই। তিনি বললেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য নবী, সুযোগ্য ভ্রাতা! এরপর আমরা ডাঁকে অতিক্রম করে চলে গেলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। আওয়াজ এল, আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি জবাব দিলেন, প্রভু, এ বালককে আপনি আমার পরে পাঠিয়েছেন; অথচ আমার উম্মাত অপেক্ষা তাঁর উম্মাত অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমরা আবার চললাম এবং সপ্তম আসমানে গিয়ে পৌছলাম ও ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। সাহাবী তাঁর এ হাদীসে আরো উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেনঃ সেখানে তিনি চারটি নহর দেখেছেন। তন্মধ্যে দুটি প্রকাশ্য ও দুটি অপ্রকাশ্য। সবগুলোই সিদূরাতূল মুনতাহার গোড়া হতে প্রবাহিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি বললাম, হে জিবরীল! এ নহর গুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহরদ্বয় তো জান্নাতের নহর আর প্রকাশ্যগুলো নীল ও ফূরাত। অর্থাৎ এ দুটি নহরের সাদৃশ্য রয়েছে জান্নাতের ঐ দুটি নহরের সাথে।
এরপর আমাকে বায়তুল মামুরে উঠান হল। বললামঃ হে জিবরীল! এ কি? তিনি বললেন, এ হচ্ছে ’বায়তুল মামুর’। প্রত্যহ এতে সত্তর হাজার ফেরেশতা (তাওয়াফের জন্য) প্রবেশ করে। তারা একবার তাওয়াফ সেরে বের হলে কখনও আর ফের তাওয়াফের সুযোগ হয় না তাদের। তারপর আমার সম্মুখে দূটি পাত্র পেশ করা হলো, একটি শরাবের, অপরটি দুধের। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনি ঠিক করেছেন। আল্লাহ আপনার উম্মাতকেও আপনার ওসীলায় ফিতরাত এর উপর কায়েম রাখুন। তারপর আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়… এভাবে বর্ণনাকায়ী হাদীসের শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এখানে প্রশ্ন হলো: দুধ-মদ নির্বাচনের ঘটনাটি যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তবে সেটি কোথায় ঘটেছিল? জেরুজালেমে? আসমানে? বায়তুল মামুরের কাছে? সিদরাতুল মুনতাহার আগে? নাকি এই ঘটনাটি প্রতীকী ধর্মীয় মোটিফ, যা বিভিন্ন বর্ণনাকারী ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বসিয়েছেন? ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে শেষ ব্যাখ্যাটি বেশি যুক্তিসঙ্গত। কারণ ধর্মীয় কাহিনিতে প্রতীকী উপাদান প্রায়ই স্থানান্তরিত হয়—কখনো যাত্রার শুরুতে, কখনো মধ্যখানে, কখনো চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক স্তরে। আসুন হাদিস দুইটি পাশাপাশি রেখে পড়ি,

মিরাজ 39

এই অসঙ্গতিটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দুধ-মদের পাত্র কেবল একটি খাবারের ঘটনা নয়। এটি ধর্মীয়ভাবে “ফিতরাত বনাম বিভ্রান্তি”, “সঠিক পথ বনাম বিকৃতি”—এই নৈতিক প্রতীক তৈরি করে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী মুহূর্তের স্থান যদি বর্ণনা অনুযায়ী বদলে যায়, তাহলে বোঝা যায় যে আখ্যানটি একটি স্থির প্রত্যক্ষদর্শী-রিপোর্ট নয়; বরং ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত পরিবর্তনশীল গল্প-কাঠামো।


মুসার সাথে কোথায় সাক্ষাৎ হয়?

কয়েকটি সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, মিরাজের রাতে মুহাম্মদ মুসাকে দেখেছিল মুসার কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়। মুসা তখন কবরে সালাত আদায় করছিলেন [51] [52] [53]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৫/ ফযীলত
পরিচ্ছেদঃ ৩৮. মুসা (আঃ) এর ফযীলত
৫৯৪২। হাদ্দাব ইবনু খালিদ এবং শায়বান ইবনু ফাররুখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রাতে আমার মি’রাজ হয়েছিল, সে রাতে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর পাশ দিয়ে গেলাম। লাল বালূকা স্তূপের কাছে তাঁর কবরে তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৩. কিতাবুল ইসরা [ও মে’রাজ]
পরিচ্ছেদঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্থানে মূসা (আঃ) কে তার কবরে তিনি সালাত আদায় করতে দেখেছিলেন- তার বর্ণনা:
৫০. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রাত্রে আমার মি’রাজ হয়েছিল সে রাত্রে আমি মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। লাল বালুকা স্তুপের নিকট তার কবরে তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন।[1]
[1] আলবানী: সহীহ।
আরনাউত্ব: মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ।
তাখরীজ: মুসলিম ২৩৭৫; নাসাঈ ৩/২১৫; আহমাদ ৩/১৪৮, ২৪৮; ইবনু আবী শাইবা, আল মুসান্নাফ ১৪/৩০৭, ৩০৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৩. কিতাবুল ইসরা [ও মে’রাজ]
পরিচ্ছেদঃ
৪৯. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে রিওয়ায়াত করেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রাত্রে আমার মি’রাজ হয়েছিল সে রাত্রে আমি মূসা (আঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তার কবরে সালাত[1] আদায় করছিলেন।[2]
[1] সালাত বলতে এখানে শরীয়াহর মুকাল্লিফ হিসেবে সাওয়াবের জন্য সালাত আদায় করছেন- তা উদ্দেশ্য নয়। বরং এখানে নবীদের বারযাখী জিন্দেগী অন্যদের থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, যেমন সাধারণ মৃতের চেয়ে শহীদগণের বিশেষ জীবন রয়েছে বারযাখী জীবনে। এছাড়া, দুনিয়ার সালাতের মতও এ সালাত নয়, বরং তা ফিরিশতাদের তাসবীহ বা জান্নাতী ব্যক্তিদের তাসবীহের মতো। (বিস্তারিত দেখুন, মাজমু’ ফাতোয়া, ইবনু তাইমিয়া ৪/৩৩০; আলবানী, তাওয়াস্সুল, পৃ: ৬০।)
[2] আলবানী: সহীহ।
আরনাউত্ব: বুখারীর শর্তানুযায়ী সহীহ।
তাখরীজ: মুসলিম ২৩৭৫; নাসাঈ ৩/২১৬; আহমাদ ৩/১২০।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আরেকটি হাদিস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ মুসাকে বায়তুল মাকদিসে অন্যান্য নবীদের সাথে সালাত আদায় করতে দেখেছিলেন। মুসা তার কবরে নামাজ পড়লে বায়তুল মাকদিসে গেলেন কীভাবে? [54]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৪. মাসীহ ইবন মারয়াম (আঃ) ও মাসীহুদ-দাজ্জাল প্রসঙ্গে
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩২৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭২
৩২৭। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি হিজর অর্থাৎ হাতামে ছিলাম। এ সময় কুরায়শরা আমাকে আমার ইসরা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে। তারা আমাকে বায়তুল মাকদিসের এমন সব বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল, যা আমি ভালভাবে মনে রাখিনি। ফলে আমি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর আল্লাহ তাআলা আমার সম্মুখে বায়তুল মাকদিসকে উদ্ভাসিত করে দিলেন এবং আমি তা দেখছিলাম। তারা আমাকে যে প্রশ্ন করছিল, তার জবাব দিতে লাগলাম। এরপর নবীদের এক জামাতেও আমি নিজেকে দেখলাম।
মূসা (আলাইহিস সালাম) কে সালাতে (নামায/নামাজ) দণ্ডায়মান দেখলাম তিনি শানূয়া গোত্রের লোকদের মত মধ্যমাকৃতির। তাঁর চুল ছিল কোঁকড়ানো। ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কেও সালাতে দাঁড়ানো দেখলাম। উরওয়া ইবনু মাসঊদ আবূ সাকাফী হচ্ছেন তাঁর নিকটতম সদৃশ। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কেও সালাতে দাঁড়ানো দেখলাম। তিনি তোমাদের এ সাথীরই সদৃশ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর সালাতের সময় হল, আমি তাঁদের ইমামতি করলাম।
সালাত শেষে এক ব্যাক্তি আমাকে বললেন, হে মুহাম্মাদ! ইনি জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক ’মালিক’ ওকে সালাম করুন। আমি তাঁর দিকে তাকালাম। তিনি আমাকে আগেই সালাম করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

আরেকটি হাদিস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ মুসাকে দেখেছিলেন ষষ্ঠ আসমানে। একইসাথে কবরে, বায়তুল মাকদিসে এবং ষষ্ঠ আসমানে মুসা ছিল কীভাবে? মুসা আসলে কয়জন? [55]


সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১৯৮৮. ফিরিশ্তার বিবরণ। আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রাঃ) নবী (সাঃ) এর নিকট বললেন, ফিরিশতাকূলের মধ্যে জিবরীল (আঃ) ইয়াহুদীদের শত্রু। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন لَنَحْنُ الصَّافُّونَ এই উক্তি ফিরিশ্তাদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৯৮০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩২০৭
২৯৮০। হুদবা ইবনু খালিদ ও খলিফা (ইবনু খাইয়াত) (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কাবা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ-এ দু’ অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এরপর তিনি দু’ ব্যাক্তির মাঝে অপর এক ব্যাক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট স্বর্ণের একটি তশতরী নিয়ে আসা হল-যা হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তাপর আমার বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। এরপর আমার পেটে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলা হল।
তারপর হিকমত ও ঈমান পরিপূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা থেকে বড় অর্থাৎ বুরাক। এরপর তাতে আরোহণ করে আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেওয়া হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে ধন্যবাদ, তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম।
তারপর আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নবী! তোমার প্রতি ধন্যবাদ। এরপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমুস সালাম) এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নবী! আপনার প্রতি ধন্যবাদ।
তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। তাঁকো আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমরা হারুন (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বলেছেন, হে রব! এ ব্যাক্তি যে আমার পর প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। এরপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর বায়তুল মা’মুরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মামুর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফিরিশতা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। এরা এখান থেকে একবার বের হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসে না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন, হাজার নামক স্থানের মটকার ন্যায়। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার মূল দেশে চারটি ঝরনা প্রবাহিত।’ দু’টি অভ্যন্তরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, অভ্যন্তরে দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল (ইরাকের) ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
তারপর আমি প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি আর আপনার উম্মাত এত (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ে) সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর অনুরোধ করুন।
আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। পুনরায় অনুরূপ ঘটল। আর সালাত (নামায/নামাজ)ও ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেওয়া হল। পুনরায় অনুরূপ ঘটলে তিনি সালাত (নামায/নামাজ) বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার অনুরূপ হল। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) কে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, এবার আল্লাহ সালাত (নামায/নামাজ) কে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কি করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিয়েছেন।
এবারও তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছে। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরয জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের থেকে হালকা করে দিয়েছে। আর আমি প্রতিটি পূণ্যের জন্য দশ গুন সওয়াব দিব।
আর বায়তুল মামুর সম্পর্কে হাম্মাম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)

আরেকটি হাদিস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ মুসাকে দেখেছিলেন সপ্তম আসমানে। একদমই মাথা খারাপ অবস্থা! [5]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৯. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ এবং মূসা (আঃ) এর সাথে আল্লাহ্‌ সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন (৪ঃ ১৬৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫১৭
৭০০৯। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু সালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক রাতে কাবার মসজিদ থেকে সফর করানো হল। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে ওহী প্রেরণের পুর্বে তার কাছে তিনজন ফেরেশতার একটি জামাআতে আসল। অথচ তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এদের প্রথমজন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের উত্তম ব্যাক্তি। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের উত্তম ব্যাক্তিকেই নিয়ে চল। সে রাতটির ঘটনা এটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। অবশেষে তারা অন্য এক রাতে আগমন করলেন যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তার চোখ ঘুমন্ত, অন্তর ঘুমায় না। অনুরূপ অন্য নবীগণেরও চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না।
এ রাতে তারা তার সাথে কোন কথা না বলে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার গলার নিচ হতে বক্ষস্থল পর্যন্ত ছেদন করলেন এবং তার বক্ষ ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিছন্ন করলেন, তারপর সেখানে একটি তশতরী আনা হয় এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিকমতে। তাঁর বক্ষ ও গলার রগগুলি এর দ্বারা পূর্ণ করলেন।
তারপর সেগুলো যখাস্থানে স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ফিরে আসমানের দিকে আরোহণ করলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসিগণ তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেনঃ জিবরীল। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন তারা বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন) শুভাগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা যমীনে কি করতে চাচ্ছেন তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না।
দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে পেলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সালাম দিলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) তার সালামের উত্তর দিলেন। এবং বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র। তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবাহমান নহর দুনিয়ার আসমানে অবলোকন করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এ নহর দুটি কোন নহর হে জিবরীল! জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ দুটি হলো নীল ও ফুরাতের মুল।
এরপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নহর অবলোকন করলেন। এর ওপর প্রতিঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নহরে হাত মারলেন। তা ছিল অতি উন্নতমানের মিসক। তিনি বললেনঃ হে জিবরীল! এটি কি? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হাউযে কাওসার। যা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গমন করলেন। প্রথম আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতাগণ তাকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেনঃ তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। তারা বললেনঃ আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা বললেনঃ তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গমন করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তৃতীয় আসমানের ফেরেশতাগণও তাই বললেন। তারপর তাকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গমন করলেন। তারাও তাঁকে পুর্বের ন্যায়ই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গমন করলেন। সেখানেও ফেরেশতারা পূর্বের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলে সেখানেও ফেরেশতারা তাকে পূর্বের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম উল্লেখ করেছেন।
তন্মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম), চতূর্থ আসমানে হারুন (আলাইহিস সালাম), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যায় নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর সাথে বাক্যলাপের মর্যাদার কারণে মূসা (আলাইহিস সালাম) আছেন সপ্তম আসমানে।
সে সময় মূসা বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমি তো ধারনা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এত ঊর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার প্রতি ওহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের কথা ওহী যোগে পাঠানো হলো।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করেন। আর মূসার কাছে পৌছলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতিপালক আপনাকে কি নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায়ে সক্ষম হবে না। সুতরাং আপনি ফিরে যান তাহলে আপনার প্রতিপালক আপনার এবং আপনার উম্মাতের থেকে এ আদেশটি সহজ করে দিবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের দিকে এমনভাবে লক্ষ্য করলেন, যেন তিনি এ বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হ্যাঁ। আপনি চাইলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মাত এটি আদায়ে সক্ষম হবে না। তখন আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে নামালেন। এভাবেই মূসা তাকে তাঁর প্রতিপালকের কাছে পাঠাতে থাকলেন। পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এর চেয়েও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তদুপরি তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছেন অথচ আপনার উম্মাত দৈহিক, মানসিক, শারীরিক সৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা সব দিকে আরো দুর্বল।
সুতরাং আপনি আবার যান এবং আপনার প্রতিপালক থেকে নির্দেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরীলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে গমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ নিতান্তই দুর্বল। তাই নির্দেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আপনার নিকটে হাযির, বারবার হাযির।
আল্লাহ বললেনঃ আমার কথার কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ’উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত (নামায/নামাজ) পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিপিবদ্ধ আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে প্রত্যাবর্তন করলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে দশটি সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে এর চাইতেও সামান্য জিনিসের প্রত্যাশ্য করছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার প্রতিপালকের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন আরো একটু কমিয়ে দেন।
এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মূসা, আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার গিয়েছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তার সাথে মতান্তর করছি। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ অবতরণ করতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আসুন সবগুলো বিবরণ একসাথে দেখি। সবগুলোই সহিহ হাদিস এবং রাবিগণের বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, মুসা আসলে কয়জন?

মিরাজ 41

ইব্রাহিম কত নম্বর আসমানে?

একটি বর্ণনা থেকে জানা যাচ্ছে, নবী ইব্রাহিম নাকি সাত আসমানের ষষ্ঠ আসমানে অবস্থান করছিল [5]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৯. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ এবং মূসা (আঃ) এর সাথে আল্লাহ্‌ সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন (৪ঃ ১৬৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫১৭
৭০০৯। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু সালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক রাতে কাবার মসজিদ থেকে সফর করানো হল। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে ওহী প্রেরণের পুর্বে তার কাছে তিনজন ফেরেশতার একটি জামাআতে আসল। অথচ তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এদের প্রথমজন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের উত্তম ব্যাক্তি। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের উত্তম ব্যাক্তিকেই নিয়ে চল। সে রাতটির ঘটনা এটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। অবশেষে তারা অন্য এক রাতে আগমন করলেন যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তার চোখ ঘুমন্ত, অন্তর ঘুমায় না। অনুরূপ অন্য নবীগণেরও চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না।
এ রাতে তারা তার সাথে কোন কথা না বলে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার গলার নিচ হতে বক্ষস্থল পর্যন্ত ছেদন করলেন এবং তার বক্ষ ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিছন্ন করলেন, তারপর সেখানে একটি তশতরী আনা হয় এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিকমতে। তাঁর বক্ষ ও গলার রগগুলি এর দ্বারা পূর্ণ করলেন।
তারপর সেগুলো যখাস্থানে স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ফিরে আসমানের দিকে আরোহণ করলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসিগণ তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেনঃ জিবরীল। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন তারা বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন) শুভাগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা যমীনে কি করতে চাচ্ছেন তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না।
দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে পেলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সালাম দিলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) তার সালামের উত্তর দিলেন। এবং বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র। তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবাহমান নহর দুনিয়ার আসমানে অবলোকন করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এ নহর দুটি কোন নহর হে জিবরীল! জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ দুটি হলো নীল ও ফুরাতের মুল।
এরপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নহর অবলোকন করলেন। এর ওপর প্রতিঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নহরে হাত মারলেন। তা ছিল অতি উন্নতমানের মিসক। তিনি বললেনঃ হে জিবরীল! এটি কি? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হাউযে কাওসার। যা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গমন করলেন। প্রথম আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতাগণ তাকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেনঃ তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। তারা বললেনঃ আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা বললেনঃ তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গমন করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তৃতীয় আসমানের ফেরেশতাগণও তাই বললেন। তারপর তাকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গমন করলেন। তারাও তাঁকে পুর্বের ন্যায়ই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গমন করলেন। সেখানেও ফেরেশতারা পূর্বের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলে সেখানেও ফেরেশতারা তাকে পূর্বের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম উল্লেখ করেছেন।
তন্মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম), চতূর্থ আসমানে হারুন (আলাইহিস সালাম), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যায় নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর সাথে বাক্যলাপের মর্যাদার কারণে মূসা (আলাইহিস সালাম) আছেন সপ্তম আসমানে।
সে সময় মূসা বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমি তো ধারনা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এত ঊর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার প্রতি ওহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের কথা ওহী যোগে পাঠানো হলো।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করেন। আর মূসার কাছে পৌছলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতিপালক আপনাকে কি নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায়ে সক্ষম হবে না। সুতরাং আপনি ফিরে যান তাহলে আপনার প্রতিপালক আপনার এবং আপনার উম্মাতের থেকে এ আদেশটি সহজ করে দিবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের দিকে এমনভাবে লক্ষ্য করলেন, যেন তিনি এ বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হ্যাঁ। আপনি চাইলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মাত এটি আদায়ে সক্ষম হবে না। তখন আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে নামালেন। এভাবেই মূসা তাকে তাঁর প্রতিপালকের কাছে পাঠাতে থাকলেন। পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এর চেয়েও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তদুপরি তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছেন অথচ আপনার উম্মাত দৈহিক, মানসিক, শারীরিক সৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা সব দিকে আরো দুর্বল।
সুতরাং আপনি আবার যান এবং আপনার প্রতিপালক থেকে নির্দেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরীলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে গমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ নিতান্তই দুর্বল। তাই নির্দেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আপনার নিকটে হাযির, বারবার হাযির।
আল্লাহ বললেনঃ আমার কথার কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ’উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত (নামায/নামাজ) পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিপিবদ্ধ আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে প্রত্যাবর্তন করলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে দশটি সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে এর চাইতেও সামান্য জিনিসের প্রত্যাশ্য করছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার প্রতিপালকের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন আরো একটু কমিয়ে দেন।
এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মূসা, আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার গিয়েছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তার সাথে মতান্তর করছি। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ অবতরণ করতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আরেকটি বিবরণে পাওয়া যায়, নবী ইব্রাহিমের সাথে মুহাম্মদের দেখা হয়েছিল সপ্তম আসমানে [55]


সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১৯৮৮. ফিরিশ্তার বিবরণ। আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রাঃ) নবী (সাঃ) এর নিকট বললেন, ফিরিশতাকূলের মধ্যে জিবরীল (আঃ) ইয়াহুদীদের শত্রু। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন لَنَحْنُ الصَّافُّونَ এই উক্তি ফিরিশ্তাদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৯৮০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩২০৭
২৯৮০। হুদবা ইবনু খালিদ ও খলিফা (ইবনু খাইয়াত) (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কাবা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ-এ দু’ অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এরপর তিনি দু’ ব্যাক্তির মাঝে অপর এক ব্যাক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট স্বর্ণের একটি তশতরী নিয়ে আসা হল-যা হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তাপর আমার বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। এরপর আমার পেটে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলা হল।
তারপর হিকমত ও ঈমান পরিপূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা থেকে বড় অর্থাৎ বুরাক। এরপর তাতে আরোহণ করে আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেওয়া হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে ধন্যবাদ, তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম।
তারপর আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নবী! তোমার প্রতি ধন্যবাদ। এরপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমুস সালাম) এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নবী! আপনার প্রতি ধন্যবাদ।
তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। তাঁকো আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমরা হারুন (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বলেছেন, হে রব! এ ব্যাক্তি যে আমার পর প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। এরপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর বায়তুল মা’মুরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মামুর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফিরিশতা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। এরা এখান থেকে একবার বের হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসে না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন, হাজার নামক স্থানের মটকার ন্যায়। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার মূল দেশে চারটি ঝরনা প্রবাহিত।’ দু’টি অভ্যন্তরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, অভ্যন্তরে দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল (ইরাকের) ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
তারপর আমি প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি আর আপনার উম্মাত এত (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ে) সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর অনুরোধ করুন।
আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। পুনরায় অনুরূপ ঘটল। আর সালাত (নামায/নামাজ)ও ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেওয়া হল। পুনরায় অনুরূপ ঘটলে তিনি সালাত (নামায/নামাজ) বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার অনুরূপ হল। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) কে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, এবার আল্লাহ সালাত (নামায/নামাজ) কে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কি করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিয়েছেন।
এবারও তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছে। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরয জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের থেকে হালকা করে দিয়েছে। আর আমি প্রতিটি পূণ্যের জন্য দশ গুন সওয়াব দিব।
আর বায়তুল মামুর সম্পর্কে হাম্মাম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)


হারুন কোন আসমানে ছিলেন?

একটি বিবরণ অনুসারে, হারুনের সাথে দেখা হয়েছিল চতুর্থ আসমানে [5]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৯. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ এবং মূসা (আঃ) এর সাথে আল্লাহ্‌ সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন (৪ঃ ১৬৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫১৭
৭০০৯। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু সালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক রাতে কাবার মসজিদ থেকে সফর করানো হল। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে ওহী প্রেরণের পুর্বে তার কাছে তিনজন ফেরেশতার একটি জামাআতে আসল। অথচ তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এদের প্রথমজন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের উত্তম ব্যাক্তি। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের উত্তম ব্যাক্তিকেই নিয়ে চল। সে রাতটির ঘটনা এটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। অবশেষে তারা অন্য এক রাতে আগমন করলেন যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তার চোখ ঘুমন্ত, অন্তর ঘুমায় না। অনুরূপ অন্য নবীগণেরও চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না।
এ রাতে তারা তার সাথে কোন কথা না বলে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার গলার নিচ হতে বক্ষস্থল পর্যন্ত ছেদন করলেন এবং তার বক্ষ ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিছন্ন করলেন, তারপর সেখানে একটি তশতরী আনা হয় এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিকমতে। তাঁর বক্ষ ও গলার রগগুলি এর দ্বারা পূর্ণ করলেন।
তারপর সেগুলো যখাস্থানে স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ফিরে আসমানের দিকে আরোহণ করলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসিগণ তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেনঃ জিবরীল। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন তারা বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন) শুভাগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা যমীনে কি করতে চাচ্ছেন তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না।
দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে পেলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সালাম দিলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) তার সালামের উত্তর দিলেন। এবং বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র। তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবাহমান নহর দুনিয়ার আসমানে অবলোকন করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এ নহর দুটি কোন নহর হে জিবরীল! জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ দুটি হলো নীল ও ফুরাতের মুল।
এরপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নহর অবলোকন করলেন। এর ওপর প্রতিঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নহরে হাত মারলেন। তা ছিল অতি উন্নতমানের মিসক। তিনি বললেনঃ হে জিবরীল! এটি কি? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হাউযে কাওসার। যা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গমন করলেন। প্রথম আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতাগণ তাকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেনঃ তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। তারা বললেনঃ আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা বললেনঃ তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গমন করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তৃতীয় আসমানের ফেরেশতাগণও তাই বললেন। তারপর তাকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গমন করলেন। তারাও তাঁকে পুর্বের ন্যায়ই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গমন করলেন। সেখানেও ফেরেশতারা পূর্বের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলে সেখানেও ফেরেশতারা তাকে পূর্বের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম উল্লেখ করেছেন।
তন্মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম), চতূর্থ আসমানে হারুন (আলাইহিস সালাম), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যায় নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর সাথে বাক্যলাপের মর্যাদার কারণে মূসা (আলাইহিস সালাম) আছেন সপ্তম আসমানে।
সে সময় মূসা বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমি তো ধারনা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এত ঊর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার প্রতি ওহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের কথা ওহী যোগে পাঠানো হলো।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করেন। আর মূসার কাছে পৌছলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতিপালক আপনাকে কি নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায়ে সক্ষম হবে না। সুতরাং আপনি ফিরে যান তাহলে আপনার প্রতিপালক আপনার এবং আপনার উম্মাতের থেকে এ আদেশটি সহজ করে দিবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের দিকে এমনভাবে লক্ষ্য করলেন, যেন তিনি এ বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হ্যাঁ। আপনি চাইলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মাত এটি আদায়ে সক্ষম হবে না। তখন আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে নামালেন। এভাবেই মূসা তাকে তাঁর প্রতিপালকের কাছে পাঠাতে থাকলেন। পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এর চেয়েও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তদুপরি তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছেন অথচ আপনার উম্মাত দৈহিক, মানসিক, শারীরিক সৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা সব দিকে আরো দুর্বল।
সুতরাং আপনি আবার যান এবং আপনার প্রতিপালক থেকে নির্দেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরীলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে গমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ নিতান্তই দুর্বল। তাই নির্দেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আপনার নিকটে হাযির, বারবার হাযির।
আল্লাহ বললেনঃ আমার কথার কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ’উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত (নামায/নামাজ) পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিপিবদ্ধ আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে প্রত্যাবর্তন করলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে দশটি সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে এর চাইতেও সামান্য জিনিসের প্রত্যাশ্য করছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার প্রতিপালকের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন আরো একটু কমিয়ে দেন।
এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মূসা, আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার গিয়েছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তার সাথে মতান্তর করছি। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ অবতরণ করতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আরেকটি বিবরণ অনুসারে, হারুন ছিলেন পঞ্চম আসমানে [55]


সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১৯৮৮. ফিরিশ্তার বিবরণ। আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রাঃ) নবী (সাঃ) এর নিকট বললেন, ফিরিশতাকূলের মধ্যে জিবরীল (আঃ) ইয়াহুদীদের শত্রু। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন لَنَحْنُ الصَّافُّونَ এই উক্তি ফিরিশ্তাদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৯৮০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩২০৭
২৯৮০। হুদবা ইবনু খালিদ ও খলিফা (ইবনু খাইয়াত) (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কাবা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ-এ দু’ অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এরপর তিনি দু’ ব্যাক্তির মাঝে অপর এক ব্যাক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট স্বর্ণের একটি তশতরী নিয়ে আসা হল-যা হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তাপর আমার বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। এরপর আমার পেটে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলা হল।
তারপর হিকমত ও ঈমান পরিপূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা থেকে বড় অর্থাৎ বুরাক। এরপর তাতে আরোহণ করে আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেওয়া হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে ধন্যবাদ, তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম।
তারপর আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নবী! তোমার প্রতি ধন্যবাদ। এরপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমুস সালাম) এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নবী! আপনার প্রতি ধন্যবাদ।
তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। তাঁকো আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমরা হারুন (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বলেছেন, হে রব! এ ব্যাক্তি যে আমার পর প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। এরপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর বায়তুল মা’মুরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মামুর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফিরিশতা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। এরা এখান থেকে একবার বের হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসে না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন, হাজার নামক স্থানের মটকার ন্যায়। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার মূল দেশে চারটি ঝরনা প্রবাহিত।’ দু’টি অভ্যন্তরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, অভ্যন্তরে দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল (ইরাকের) ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
তারপর আমি প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি আর আপনার উম্মাত এত (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ে) সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর অনুরোধ করুন।
আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। পুনরায় অনুরূপ ঘটল। আর সালাত (নামায/নামাজ)ও ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেওয়া হল। পুনরায় অনুরূপ ঘটলে তিনি সালাত (নামায/নামাজ) বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার অনুরূপ হল। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) কে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, এবার আল্লাহ সালাত (নামায/নামাজ) কে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কি করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিয়েছেন।
এবারও তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছে। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরয জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের থেকে হালকা করে দিয়েছে। আর আমি প্রতিটি পূণ্যের জন্য দশ গুন সওয়াব দিব।
আর বায়তুল মামুর সম্পর্কে হাম্মাম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)


ইদ্রিস ছিলেন কোন আসমানে?

মিরাজের বর্ণনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি দেখা যায় বিভিন্ন নবীর অবস্থান নিয়ে। প্রচলিত ইসলামি বয়ানে বলা হয়, নবী মুহাম্মদ সাত আসমান অতিক্রম করার সময় প্রতিটি আসমানে পূর্ববর্তী কোনো না কোনো নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই অংশটি মিরাজ-আখ্যানের নাটকীয় কেন্দ্রগুলোর একটি। কারণ এর মাধ্যমে মুহাম্মদকে পূর্ববর্তী নবুয়ত-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী এবং শেষ নবী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে কোন নবী কোন আসমানে ছিলেন—এটি কেবল পার্শ্ব-তথ্য নয়; এটি আখ্যানের ধর্মতাত্ত্বিক বিন্যাসের অংশ।

কিন্তু বিভিন্ন হাদিস পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, এই বিন্যাস স্থির নয়। একটি বর্ণনায় হযরত ইদ্রিসকে দ্বিতীয় আসমানে পাওয়া যায় [5]। অন্য বর্ণনায় আবার ইদ্রিসকে চতুর্থ আসমানে দেখানো হয় [55]। একই ব্যক্তিকে একই ঘটনায় দুই ভিন্ন আসমানে রাখা কোনো সামান্য ভাষাগত পার্থক্য নয়; এটি বর্ণনার ভৌগোলিক-ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর পার্থক্য।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৯. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ এবং মূসা (আঃ) এর সাথে আল্লাহ্‌ সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন (৪ঃ ১৬৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫১৭
৭০০৯। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু সালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক রাতে কাবার মসজিদ থেকে সফর করানো হল। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে ওহী প্রেরণের পুর্বে তার কাছে তিনজন ফেরেশতার একটি জামাআতে আসল। অথচ তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এদের প্রথমজন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের উত্তম ব্যাক্তি। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের উত্তম ব্যাক্তিকেই নিয়ে চল। সে রাতটির ঘটনা এটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। অবশেষে তারা অন্য এক রাতে আগমন করলেন যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তার চোখ ঘুমন্ত, অন্তর ঘুমায় না। অনুরূপ অন্য নবীগণেরও চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না।
এ রাতে তারা তার সাথে কোন কথা না বলে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার গলার নিচ হতে বক্ষস্থল পর্যন্ত ছেদন করলেন এবং তার বক্ষ ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিছন্ন করলেন, তারপর সেখানে একটি তশতরী আনা হয় এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিকমতে। তাঁর বক্ষ ও গলার রগগুলি এর দ্বারা পূর্ণ করলেন।
তারপর সেগুলো যখাস্থানে স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ফিরে আসমানের দিকে আরোহণ করলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসিগণ তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেনঃ জিবরীল। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন তারা বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন) শুভাগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা যমীনে কি করতে চাচ্ছেন তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না।
দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে পেলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সালাম দিলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) তার সালামের উত্তর দিলেন। এবং বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র। তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবাহমান নহর দুনিয়ার আসমানে অবলোকন করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এ নহর দুটি কোন নহর হে জিবরীল! জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ দুটি হলো নীল ও ফুরাতের মুল।
এরপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নহর অবলোকন করলেন। এর ওপর প্রতিঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নহরে হাত মারলেন। তা ছিল অতি উন্নতমানের মিসক। তিনি বললেনঃ হে জিবরীল! এটি কি? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হাউযে কাওসার। যা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গমন করলেন। প্রথম আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতাগণ তাকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেনঃ তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। তারা বললেনঃ আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা বললেনঃ তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গমন করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তৃতীয় আসমানের ফেরেশতাগণও তাই বললেন। তারপর তাকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গমন করলেন। তারাও তাঁকে পুর্বের ন্যায়ই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গমন করলেন। সেখানেও ফেরেশতারা পূর্বের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলে সেখানেও ফেরেশতারা তাকে পূর্বের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম উল্লেখ করেছেন।
তন্মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম), চতূর্থ আসমানে হারুন (আলাইহিস সালাম), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যায় নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর সাথে বাক্যলাপের মর্যাদার কারণে মূসা (আলাইহিস সালাম) আছেন সপ্তম আসমানে।
সে সময় মূসা বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমি তো ধারনা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এত ঊর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার প্রতি ওহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের কথা ওহী যোগে পাঠানো হলো।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করেন। আর মূসার কাছে পৌছলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতিপালক আপনাকে কি নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায়ে সক্ষম হবে না। সুতরাং আপনি ফিরে যান তাহলে আপনার প্রতিপালক আপনার এবং আপনার উম্মাতের থেকে এ আদেশটি সহজ করে দিবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের দিকে এমনভাবে লক্ষ্য করলেন, যেন তিনি এ বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হ্যাঁ। আপনি চাইলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মাত এটি আদায়ে সক্ষম হবে না। তখন আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে নামালেন। এভাবেই মূসা তাকে তাঁর প্রতিপালকের কাছে পাঠাতে থাকলেন। পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এর চেয়েও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তদুপরি তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছেন অথচ আপনার উম্মাত দৈহিক, মানসিক, শারীরিক সৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা সব দিকে আরো দুর্বল।
সুতরাং আপনি আবার যান এবং আপনার প্রতিপালক থেকে নির্দেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরীলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে গমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ নিতান্তই দুর্বল। তাই নির্দেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আপনার নিকটে হাযির, বারবার হাযির।
আল্লাহ বললেনঃ আমার কথার কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ’উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত (নামায/নামাজ) পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিপিবদ্ধ আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে প্রত্যাবর্তন করলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে দশটি সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে এর চাইতেও সামান্য জিনিসের প্রত্যাশ্য করছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার প্রতিপালকের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন আরো একটু কমিয়ে দেন।
এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মূসা, আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার গিয়েছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তার সাথে মতান্তর করছি। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ অবতরণ করতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

উপরের বর্ণনায় ইদ্রিসকে দ্বিতীয় আসমানে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু অন্য বর্ণনায় দৃশ্যপট বদলে যায়। সেখানে প্রথম আসমানে আদম, দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহিয়া, তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতুর্থ আসমানে ইদ্রিস—এই ক্রম দেখা যায়। অর্থাৎ একই মিরাজ-ঘটনার একই স্তরভিত্তিক ভ্রমণে ইদ্রিসের অবস্থান বদলে গেছে।


সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১৯৮৮. ফিরিশ্তার বিবরণ। আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রাঃ) নবী (সাঃ) এর নিকট বললেন, ফিরিশতাকূলের মধ্যে জিবরীল (আঃ) ইয়াহুদীদের শত্রু। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন لَنَحْنُ الصَّافُّونَ এই উক্তি ফিরিশ্তাদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৯৮০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩২০৭
২৯৮০। হুদবা ইবনু খালিদ ও খলিফা (ইবনু খাইয়াত) (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কাবা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ-এ দু’ অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এরপর তিনি দু’ ব্যাক্তির মাঝে অপর এক ব্যাক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট স্বর্ণের একটি তশতরী নিয়ে আসা হল-যা হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তাপর আমার বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। এরপর আমার পেটে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলা হল।
তারপর হিকমত ও ঈমান পরিপূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা থেকে বড় অর্থাৎ বুরাক। এরপর তাতে আরোহণ করে আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেওয়া হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে ধন্যবাদ, তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম।
তারপর আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নবী! তোমার প্রতি ধন্যবাদ। এরপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমুস সালাম) এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নবী! আপনার প্রতি ধন্যবাদ।
তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। তাঁকো আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমরা হারুন (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বলেছেন, হে রব! এ ব্যাক্তি যে আমার পর প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। এরপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর বায়তুল মা’মুরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মামুর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফিরিশতা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। এরা এখান থেকে একবার বের হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসে না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন, হাজার নামক স্থানের মটকার ন্যায়। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার মূল দেশে চারটি ঝরনা প্রবাহিত।’ দু’টি অভ্যন্তরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, অভ্যন্তরে দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল (ইরাকের) ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
তারপর আমি প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি আর আপনার উম্মাত এত (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ে) সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর অনুরোধ করুন।
আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। পুনরায় অনুরূপ ঘটল। আর সালাত (নামায/নামাজ)ও ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেওয়া হল। পুনরায় অনুরূপ ঘটলে তিনি সালাত (নামায/নামাজ) বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার অনুরূপ হল। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) কে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, এবার আল্লাহ সালাত (নামায/নামাজ) কে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কি করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিয়েছেন।
এবারও তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছে। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরয জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের থেকে হালকা করে দিয়েছে। আর আমি প্রতিটি পূণ্যের জন্য দশ গুন সওয়াব দিব।
আর বায়তুল মামুর সম্পর্কে হাম্মাম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)

এখানে apologetic ব্যাখ্যা হতে পারে—হয়তো নবী একাধিকবার মিরাজে গিয়েছিলেন, অথবা ইদ্রিস একাধিক আসমানে থাকতে পারেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো পাঠ্যসূত্র থেকে সরাসরি উঠে আসে না; এগুলো পরবর্তী অসঙ্গতি মেলানোর প্রচেষ্টা। যদি প্রতিটি বিরোধের ক্ষেত্রে নতুন নতুন অদৃশ্য অনুমান বসাতে হয়, তাহলে যে কোনো অসঙ্গতিই কৃত্রিমভাবে মিলিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু ইতিহাসচর্চা এভাবে চলে না। ইতিহাসে মূল প্রশ্ন হলো: উৎসগুলো নিজে কী বলছে, এবং সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

ইদ্রিসের অবস্থান-বৈপরীত্য তাই গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, সাত আসমানে নবীদের বিন্যাস কোনো একক, প্রত্যক্ষ, অপরিবর্তিত ঘটনার নির্ভুল স্মৃতি নয়; বরং বিভিন্ন বর্ণনায় গড়ে ওঠা একটি পরিবর্তনশীল ধর্মীয় নাট্যমঞ্চ। গল্পের ধর্মীয় উদ্দেশ্য স্থির—মুহাম্মদকে নবীদের ধারাবাহিকতায় বসানো; কিন্তু মঞ্চসজ্জা এক বর্ণনা থেকে আরেক বর্ণনায় বদলে গেছে।


ইয়াহিয়া ছিলেন কোন আসমানে?

হযরত ইয়াহিয়ার অবস্থান নিয়েও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়াহিয়া দ্বিতীয় আসমানে ঈসার সঙ্গে অবস্থান করছেন [55]। এই বিন্যাসে দ্বিতীয় আসমানটি ঈসা ও ইয়াহিয়ার যৌথ অবস্থানস্থল। কিন্তু অন্য বর্ণনায় যখন দ্বিতীয় আসমানে ইদ্রিসের অবস্থানের কথা বলা হয়, তখন ইয়াহিয়ার স্থানীয় বিন্যাস অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে একই ঘটনার আসমান-মানচিত্র একাধিক রূপে পাওয়া যায়।


সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১৯৮৮. ফিরিশ্তার বিবরণ। আনাস ইবন মালিক (রাঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রাঃ) নবী (সাঃ) এর নিকট বললেন, ফিরিশতাকূলের মধ্যে জিবরীল (আঃ) ইয়াহুদীদের শত্রু। আর ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন لَنَحْنُ الصَّافُّونَ এই উক্তি ফিরিশ্তাদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৯৮০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩২০৭
২৯৮০। হুদবা ইবনু খালিদ ও খলিফা (ইবনু খাইয়াত) (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কাবা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ-এ দু’ অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। এরপর তিনি দু’ ব্যাক্তির মাঝে অপর এক ব্যাক্তি অর্থাৎ নিজের অবস্থা উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট স্বর্ণের একটি তশতরী নিয়ে আসা হল-যা হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তাপর আমার বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। এরপর আমার পেটে যমযমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলা হল।
তারপর হিকমত ও ঈমান পরিপূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা চতুষ্পদ জন্তু আনা হল, যা খচ্চর হতে ছোট আর গাধা থেকে বড় অর্থাৎ বুরাক। এরপর তাতে আরোহণ করে আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেওয়া হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে ধন্যবাদ, তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম।
তারপর আদম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নবী! তোমার প্রতি ধন্যবাদ। এরপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমুস সালাম) এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নবী! আপনার প্রতি ধন্যবাদ।
তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। তাঁকো আমি সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমরা হারুন (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী আপনাকে ধন্যবাদ।
তারপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বলেছেন, হে রব! এ ব্যাক্তি যে আমার পর প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। এরপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। জিজ্ঞাসা করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল তাঁকে ধন্যবাদ আর তাঁর শুভাগমন কতই না উত্তম। তারপর আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর কাছে গেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নবী! আপনাকে ধন্যবাদ।
এরপর বায়তুল মা’মুরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মামুর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফিরিশতা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন। এরা এখান থেকে একবার বের হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসে না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন, হাজার নামক স্থানের মটকার ন্যায়। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার মূল দেশে চারটি ঝরনা প্রবাহিত।’ দু’টি অভ্যন্তরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, অভ্যন্তরে দু’টি জান্নাতে অবস্থিত। আর বাইরের দু’টির একটি হল (ইরাকের) ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ।
তারপর আমি প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছি আর আপনার উম্মাত এত (সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ে) সমর্থ হবে না। অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর অনুরোধ করুন।
আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) চল্লিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। পুনরায় অনুরূপ ঘটল। আর সালাত (নামায/নামাজ)ও ত্রিশ ওয়াক্ত করে দেওয়া হল। পুনরায় অনুরূপ ঘটলে তিনি সালাত (নামায/নামাজ) বিশ ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার অনুরূপ হল। তিনি সালাত (নামায/নামাজ) কে দশ ওয়াক্ত করে দিলেন। এরপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে আসলাম। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, এবার আল্লাহ সালাত (নামায/নামাজ) কে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কি করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয করে দিয়েছেন।
এবারও তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছে। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরয জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের থেকে হালকা করে দিয়েছে। আর আমি প্রতিটি পূণ্যের জন্য দশ গুন সওয়াব দিব।
আর বায়তুল মামুর সম্পর্কে হাম্মাম (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)

আরেকটি হাদিস থেকে জানা যায়, ইয়াহিয়া ছিলেন তৃতীয় আসমানে। এই হাদিসটির বাঙলা অনুবাদে ভুল অনুবাদ কিংবা ইচ্ছাকৃত বাটপারি করা হয়েছে, এই কারণে ইংরেজি অনুবাদ দিচ্ছি, [56]

Reference : Sahih Muslim 164a
In-book reference : Book 1, Hadith 321
USC-MSA web (English) reference : Book 1, Hadith 314
(deprecated numbering scheme)
(74)Chapter: The night journey on which the messenger of Allah (saws) was taken up into the heavens and the prayers were enjoined(74)باب الإِسْرَاءِ بِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى السَّمَوَاتِ وَفَرْضِ الصَّلَوَاتِ ‏‏
Anas b. Malik reported on the authority of Malik b. Sa sa’, perhaps a person of his tribe, that the Prophet of Allah (ﷺ) said:
I was near the House (i. e. Ka’bah) in a state between sleep and wakefulness when I heard someone say: He is the third among the two persons. Then he came to me and took me with him. Then a golden basin containing the water of Zamzam was brought to me and my heart was opened up to such and such (part). Qatada said: I asked him who was with me (i e. the narrator) and what he meant by such and such (part). He replied: (It means that it was opened) up to the lower part of his abdomen (Then the hadith continues): My heart was extracted and it was washed with the water of Zamzam and then it was restored in its original position, after which it was filled with faith and wisdom. I was then brought a white beast which is called al-Buraq, bigger than a donkey and smaller than a mule. Its stride was as long as the eye could reach. I was mounted on it, and then we went forth till we reached the lowest heaven. Gabriel asked for the (gate) to be opened, and it was said: Who is he? He replied: Gabriel. It was again said: Who is with thee? He replied: Muhammad (ﷺ). It was said: Has he been sent for? He (Gabriel) said: Yes. He (the Prophet) said: Then (the gate) was opened for us (and it was said): Welcome unto him! His is a blessed arrival. Then we came to Adam (peace be upon him). And he (the narrator) narrated the whole account of the hadith. (The Holy Prophet) observed that he met Jesus in the second heaven, Yahya (peace be on both of them) in the third heaven, Yusuf in the third, Idris in the fourth, Harun in the fifth (peace and blessings of Allah be upon them). Then we travelled on till we reached the sixth heaven and came to Moses (peace be upon him) and I greeted him and he said: Welcome unto righteous brother and righteous prophet. And when I passed (by him) he wept, and a voice was heard saying: What makes thee weep? He said: My Lord, he is a young man whom Thou hast sent after me (as a prophet) and his followers will enter Paradise in greater numbers than my followers. Then we travelled on till we reached the seventh heaven and I came to Ibrahim. He (the narrator) narrat- ed in this hadith that the Prophet of Allah (ﷺ) told that he saw four rivers which flowed from (the root of the lote-tree of the farthest limits): two manifest rivers and two hidden rivers. I said: ‘ Gabriel! what are these rivers? He replied: The two hidden rivers are the rivers of Paradise, and as regards the two manifest ones, they are the Nile and the Euphrates. Then the Bait-ul-Ma’mur was raised up to me. I said: O Gabriel! what is this? He replied: It is the Bait-ul-Ma’mur. Seventy thousand angels enter into it daily and, after they come out, they never return again. Two vessels were then brought to me. The first one contained wine and the second one contained milk, and both of them were placed before me. I chose milk. It was said: You did right. Allah will guide rightly through you your Ummah on the natural course. Then fifty prayers daily were made obligatory for me. And then he narrated the rest of the hadith to the end.‏

এখানে আপত্তি করা যেতে পারে যে, এক আসমানে একাধিক নবী থাকা অসম্ভব নয়। এই বক্তব্য তাত্ত্বিকভাবে সত্য; কিন্তু প্রশ্নটি “অসম্ভব কি না” নয়। প্রশ্ন হলো, বর্ণনাগুলো একই কাঠামো দিচ্ছে কি না। যদি এক বর্ণনা বলে দ্বিতীয় আসমানে ঈসা-ইয়াহিয়া, আরেক বর্ণনা বলে দ্বিতীয় আসমানে ইদ্রিস, আবার অন্য বর্ণনায় স্মৃতিতে কিছু নবীর নাম অনির্দিষ্ট থাকে, তাহলে ঘটনাটি ইতিহাসের নির্ভুল রিপোর্ট নয়; বরং মৌখিক বর্ণনার পরিবর্তনশীলতা প্রকাশ করে।

এ ধরনের পরিবর্তন ধর্মীয় পুরাণে খুব স্বাভাবিক। গল্পের মূল বার্তা থাকে, কিন্তু চরিত্রের স্থান, ক্রম, সংখ্যা, পার্শ্বঘটনা বদলায়। মিরাজের বর্ণনাগুলোতেও তাই দেখা যায়। নবী আসমানে উঠেছেন—এই কেন্দ্রীয় বিশ্বাসটি অটুট রাখা হয়েছে; কিন্তু কোন আসমানে কোন নবী ছিলেন—এই স্মৃতি একক নয়। ফলে আখ্যানটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়ে।


বায়তুল মামুর ও সিদরাতুল মুনতাহা!

কিছু সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদ মিরাজের রাতে যাওয়ার পথে প্রথমে সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন, এরপরে দেখেন বায়তুল মামুর বা ফেরেশতাদের ইবাদতখানা [10]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২১৫১. মি’রাজের ঘটনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩৬০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৮৮৭
৩৬০৮। হুদবা ইবনু খালিদ (রহঃ) … মালিক ইবনু সা’সা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যে রাতে তাঁকে ভ্রমণ করানো হয়েছে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদা আমি কা’বা ঘরের হাতিমের অংশে ছিলাম। কখনো কখনো রাবী (কাতাদা) বলেছেন, হিজরে শুয়েছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট এলেন এবং আমার এ স্থান থেকে সে স্থানের মধ্যবর্তী অংশটি চিরে ফেললেন। রাবী কাতাদা বলেন, আনাস (রাঃ) কখনো কাদ্দা (চিরলেন) শব্দ আবার কখনো শাক্‌কা (বিদীর্ণ) শব্দ বলেছেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ দ্বারা কী বুঝিয়েছেন? তিনি বললেন, হলকুমের নিম্নদেশ থেকে নাভী পর্যন্ত। কাতাদা (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ) কে এ-ও বলতে শুনেছি বুকের উপরিভাগ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত। তারপর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আগন্তুক আমার হৃদপিণ্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার হৃদপিণ্ডটি (যমযমের পানি দ্বারা) ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে পুনরায় রেখে দেয়া হল।
তারপর সাদা রং এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হল। যা আকারে খচ্চর থেকে ছোট ও গাধা থেকে বড় ছিল? জারূদ তাকে বলেন, হে আবূ হামযা, ইহাই কি বুরাক? আনাস (রাঃ) বললেন, হাঁ। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ প্রান্তে। আমাকে তার উপর সাওয়ার করানো হল। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) চললেন, প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, ইনি কে? তিনি বললেন জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। তখন বলা হল, তার জন্য খোশ-আমদেদ, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হল।
আমি যখন পোঁছালাম, তখন তথায় আদম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর উপরের দিকে চলে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল কে? তিনি বললেন জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তারপর বলা হল- তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর খুলে দেওয়া হল। যখন তথায় পৌঁছালাম। তখন সেখানে ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) এর সাক্ষাত পেলাম। তাঁরা দু’জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। তিনি (জিবরীল) বললেন, এরা হলেন ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)। তাঁদের প্রতি সালাম করুন। তখন আমি সালাম দিলাম। তাঁরা জবাব দিলেন, তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন, সেখানে পৌঁছে জিবরীল বললেন খুলে দাও। তাঁকে বলা হল কে? তিনি উত্তর দিলেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর দরজা খুলে দেওয়া হল। আমি তথায় পৌঁছে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) আপনি তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করলেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। আর (ফিরিশ্‌তাকে) দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। তখন বলা হল- তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তখন খুলে দেওয়া হল। আমি ইদ্রীস (আলাইহিস সালাম) এর কাছে পৌঁছলে জিবরীল বললেন, ইনি ইদ্রীস আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
এরপর তিনি (জিবরীল) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্ব-যাত্রা করে পঞ্চম আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। জিজ্ঞেস করা হল। তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তথায় পৌঁছে হারূন (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি হারূন (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনিও জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হাঁ। ফিরিশ্‌তা বললেন, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগন্তুক এসেছেন। তথায় পৌঁছে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) কে পেলাম। জিবরীল(আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনি জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।
আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন? তিনি বললেন আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার উম্মত আমার উম্মত থেকে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞাসা করা হল, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছে কি? তিনি বললেন, হাঁ। বলা হল, তাঁর প্রতি খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। আমি সেখানে পৌঁছে ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আপনার পিতা। তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্‌কার পুত্র ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর আমাকে সিদ্‌রাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম, উহার ফল হাজার অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং তার পাতাগুলি এই হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, এ হল সিদরাতুল মুন্‌তাহা (জড় জগতের শেষ প্রান্ত)।
সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দু’টি ছিল অপ্রকাশ্য দু’টি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে জিজ্ঞেস করলাম, এ নহরগুলো কী? অপ্রকাশ্য দু’টি হল জান্নাতের দুইটি নহর। আর প্রকাশ্য দুটি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী। তারপর আমার সামনে ’আল-বায়তুল মামুর’ প্রকাশ করা হল,
এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র পরিবেশন করা হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরীল বললেন, এ-ই হচ্ছে ফিতরাত (দ্বীন-ই-ইসলাম)। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর আমার উপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত সালাম ফরয করা হল।
এরপর আমি ফিরে আসলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে কী আদেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে সমর্থ হবে না। আল্লাহর কসম। আমি আপনার আগে লোকদের পরীক্ষা করেছি এবং বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের(বোঝা) হাল্কা করার জন্য আবেদন করুন।
আমি ফিরে গেলাম। ফলে আমার উপর থেকে (দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) হ্রাস করে দিলেন। আমি আবার মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম তিনি আবার আগের মত বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। ফলে আল্লাহ তা’আলা আরো দশ ওয়াক্ত সালাত কমিয়ে দিলেন। ফিরার পথে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট পৌঁছালে, তিনি আবার পূর্বোক্ত কথা বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। আল্লাহ তা’আলা আর দশ (ওয়াক্ত) হ্রাস করলেন। আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বললেন আমি আবার ফিরে গেলাম। তখন আমাকে দশ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ দেওয়া হয়। আমি (তা নিয়ে) ফিরে এলাম। মূসা (আলাইহিস সালাম) ঐ কথাই আগের মত বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আমাকে পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাতের আদেশ করা হয়।
তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কী আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমি বললাম, দৈনিক পাঁচ (ওয়াক্ত) সালাত আদায়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ সালাত আদায় করতেও সমর্থ হবে না। আপনার পূর্বে আমি লোকদের পরীক্ষা করেছি। বনী ইসরাইলের হেদায়েতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আমার রবের নিকট (অনেকবার) আবেদন করেছি, এতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এরপর তিনি বললেন, আমি যখন মূসা (আলাইহিস সালাম) কে অতিক্রম করে অগ্রসর হলাম, তখন জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, আমি আমার অবশ্য পালনীয় আদেশটি জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর লঘু করে দিলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ)

আবার, ভিন্ন সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, মিরাজের রাতে যাওয়ার পথে নবী মুহাম্মদ প্রথমে বায়তুল মামুর দেখেন, যেখানে নবী ইব্রাহীম পিঠ ঠেকিয়ে বসে ছিলেন। এরপরে তিনি সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন [23]। প্রশ্ন হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ আগে বায়তুল মামুর দেখেন নাকি আগে সিদরাতুল মুনতাহা? কারণ দুই ধরণের বর্ণনাই পাওয়া যাচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছ থেকে। সমস্যা হচ্ছে, দুই ধরণের বর্ণনাই সহিহ, অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে রাবীদের স্মরণশক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহের অবকাশ নেই!

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬২
৩০৮। শায়বান ইবনু ফাররূখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আমার কাছে বুরাক আনা হল। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদুর দৃষ্টি যায়, এক এক পদক্ষেপে সে ততাদূর চলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এতে আরোহন করলাম এবং বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে রজ্জুতে বাধতেন, আমি সে রজ্জুতে আমার বাহনটিও বাধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু-রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে বের হলাম।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বললেন, আপনি ফিরতকেই গ্রহণ করলেন। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌছে দার খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ, ডেকে পাঠানো হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দরজা খূলে দেয়া হল। সেখানে আমি আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সাক্ষাৎ পাই তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন এবং আমার মঙ্গলের জন্য দুআা করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে চললেন এবং দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত পৌছলেন ও দ্বার খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি উত্তরে বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, তাকে কি আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া (আলাইহিমুস সালাম) দুই খালাত ভাইয়ের সাক্ষাৎ পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন, আমার জন্য কল্যাণের দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়েঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইউসূফ (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাঁকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেওয়া হলো। সেখানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুঃআ করলেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا‏ “এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়—” (৫৭ঃ ১৯)।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খূলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেওয়া হল। সেখানে হারুন (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খূলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রাস্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললোন, জিবরীল। বলা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি বায়তুল মা’মুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। বায়তুল মামুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন, যারা আর সেখানে পূনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হস্থিনীর কানের মত আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে বৃক্ষটিকে যখন আল্লাহর নির্দেশে যা আবৃত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
এরপর আল্লাহ তায়াআলা আমার উপর যা অহী করার তা অহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। এরপর আমি মূসা(আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মাত এ নির্দেশ পাননে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মাতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মাত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এভাবে আমি একবার মূসা (আলাইহিস সালাম) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়াহ করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! যাও, দিন ও রাতের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাত দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যাক্তি কোন নেক কাজের ইচ্ছা করল এবং তা কাজে রুপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখব; অ্যর তা কাজে রুপায়িত করলে তার জন্য লিখব দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের অভিপ্রায় করল, অথচ তা কাজে পরিণত করল না, তার জন্য কোন গুনাহ লেখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লেখা হয় একটি মাত্র গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে নেমে এলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বিযয় নিয়ে বারবার আমি আমার রবের কাছে আসা-যাওয়া করেছি, এখন পূনরায় যেতে লজ্জা হচ্ছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আসুন হাদিস দুইটি পাশাপাশি রেখে পড়ি,

মিরাজ 43

৫০ ওয়াক্ত নামাজ থেকে ৫ ওয়াক্ত: সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের বিধান, নাকি দরবারি দর-কষাকষির নাটক?

মিরাজের সবচেয়ে পরিচিত এবং ধর্মীয়ভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নামাজ ফরজ হওয়ার গল্প। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ প্রথমে মুহাম্মদ ও তার উম্মতের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেন। ফেরার পথে মূসা নবী মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করেন, কী বিধান দেওয়া হয়েছে। মুহাম্মদ বলেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। মূসা বলেন, আপনার উম্মত এটি পারবে না; আপনি ফিরে গিয়ে কমানোর আবেদন করুন। এরপর মুহাম্মদ বারবার আল্লাহর কাছে ফিরে যান, নামাজ কমে আসে, এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্তে এসে স্থির হয়। অনেক বর্ণনায় বলা হয়, পাঁচ ওয়াক্ত আদায় করলেও পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব থাকবে।

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬০/ আম্বিয়া কিরাম (‘আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৬০/৫. ইদ্রীস (আঃ)-এর বিবরণ।
৬০/৪. অধ্যায় :
(মহান আল্লাহর বাণীঃ) আর নিশ্চয়ই ইলিয়াসও রাসূলগণের মধ্যে একজন ছিলেন। স্মরণ কর, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা কি সাবধান হবে না? ………… আমি তা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। (আস্সাফফাতঃ ১২৩-১২৯)
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, (ইলয়াস আঃ-এর কথাকে) মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ইলয়াসের প্রতি সালাম। আমি সৎ-কর্মশীলদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন আমার মু’মিন বান্দাদের অন্যতম- (আস্সাফফাত ১৩০-১৩২)
এবং তিনি নূহ (আঃ)-এর পিতার দাদা ছিলেন। মহান আল্লাহর বাণীঃ আর আমি তাঁকে (ইদরীস) উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি। (মারইয়াম ৫৭)
৩৩৪২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ যার (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, (লাইলাতুল মি’রাজে) আমার ঘরের ছাদ উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। অতঃপর জিব্রাঈল (আঃ) অবতরণ করলেন এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। অতঃপর তিনি যমযমের পানি দ্বারা তা ধুলেন। এরপর হিকমত ও ঈমান (জ্ঞান ও বিশ্বাস) দ্বারা পূর্ণ একখানা সোনার তশ্তরি নিয়ে আসেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিলেন। অতঃপর আমার বক্ষকে আগের মত মিলিয়ে দিলেন। এবার তিনি আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে আকাশের দিকে উঠিয়ে নিলেন। অতঃপর যখন দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে পৌঁছলেন, তখন জিবরাঈল (আঃ) আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? জবাব দিলেন, আমি জিবরাঈল। দ্বাররক্ষী বললেন, আপনার সঙ্গে কি আর কেউ আছেন? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আছেন। দ্বাররক্ষী জিজ্ঞেস করলেন, তাঁকে কি ডাকা হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর দরজা খোলা হল। যখন আমরা আকাশের উপরে আরোহণ করলাম, হঠাৎ দেখলাম এক ব্যক্তি যার ডানে একদল লোক আর তাঁর বামেও একদল লোক। যখন তিনি তাঁর ডান দিকে তাকান তখন হাসতে থাকেন আর যখন তাঁর বাম দিকে তাকান তখন কাঁদতে থাকেন। (তিনি আমাকে দেখে) বললেন, মারাহাবা! নেক নবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি জবাব দিলেন, ইনি আদম (আঃ) আর তাঁর ডানের ও বামের এ লোকগুলো হলো তাঁর সন্তান। এদের মধ্যে ডানদিকের লোকগুলো জান্নাতী আর বামদিকের লোকগুলো জাহান্নামী। অতএব যখন তিনি ডানদিকে তাকান তখন হাসেন আর যখন বামদিকে তাকান তখন কাঁদেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে জিবরাঈল (আঃ) আরো উপরে উঠলেন। এমনকি দ্বিতীয় আকাশের দ্বারে এসে গেলেন। তখন তিনি এ আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন! দ্বাররক্ষী তাঁকে প্রথম আকাশের দ্বাররক্ষী যেরূপ বলেছিল, তেমনি বলল। অতঃপর তিনি দরজা খুলে দিলেন।
আনাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর আবূ যার (রাঃ) উল্লেখ করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশসমূহে ইদ্রীস, মূসা, ‘ঈসা এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তাঁদের কার অবস্থান কোন্ আকাশে তিনি আমার নিকট তা বর্ণনা করেননি। তবে তিনি এটা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে আদম (আঃ)-কে এবং ষষ্ঠ আকাশে ইবরাহীম (আঃ)-কে দেখতে পেয়েছেন।
আনাস (রাঃ) বলেন, জিবরাঈল (আঃ) যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ) ইদ্রীস (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, তখন তিনি (ইদ্রীস (আঃ)) বলেছিলেন, হে নেক নবী এবং নেক ভাই! আপনাকে মারহাবা। (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল) জবাব দিলেন, ইনি ইদ্রীস (আঃ)! অতঃপর মুসা (আঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি মূসা (আঃ)। অতঃপর ‘ঈসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি ‘ঈসা (আঃ)। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা। হে নেক নবী এবং নেক সন্তান! আমি জানতে চাইলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি ইবরাহীম (আঃ)।
ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, আমাকে ইবনু হাযম (রহ.) জানিয়েছেন যে, ইবনু ‘আব্বাস ও আবূ ইয়াহয়্যা আনসারী (রাঃ) বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর জিবরাঈল আমাকে ঊর্ধ্বে নিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত আমি একটি সমতল স্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখান হতে কলমসমূহের খসখস শব্দ শুনছিলাম।
ইবনু হাযম (রহ.) এবং আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তখন আল্লাহ আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। অতঃপর আমি এ নির্দেশ নিয়ে ফিরে আসলাম। যখন মূসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার রব আপনার উম্মাত উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম, তাদের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। তিনি বললেন, পুনরায় আপনার রবের নিকট ফিরে যান। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য রাখে না। তখন ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার জন্য আবেদন করলাম। তিনি তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে পুনরায় কমাবার আবেদন করুন এবং তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পূর্বের অনুরূপ কথা আবার উল্লেখ করলেন। এবার তিনি (আল্লাহ) তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আবার আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তিনি পূর্বের মত বললেন। আমি তা করলাম। তখন আল্লাহ তার এক অংশ মাফ করে দিলেন। আমি পুনরায় মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁকে জানালাম। তখন তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আরো কমাবার আরয করুন। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য থাকবে না। আমি আবার ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার আবেদন করলাম। তিনি বললেন, এ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বাকী রইল। আর তা সাওয়াবের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান হবে। আমার কথার পরিবর্তন হয় না। অতঃপর আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি এবারও বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আবেদন করুন। আমি বললাম, এবার আমার রবের সম্মুখীন হতে আমি লজ্জাবোধ করছি। এবার জিবরাঈল (আঃ) চললেন এবং অবশেষে আমাকে সাথে নিয়ে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। দেখলাম তা এমন চমৎকার রঙে পরিপূর্ণ যা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। অতঃপর আমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করানো হল। দেখলাম এর ইট মোতির তৈরী আর এর মাটি মিসক বা কস্তুরীর মত সুগন্ধময়। (৩৪৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১০৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই গল্পের গাণিতিক দিকটি সমস্যাপূর্ণ। বর্ণনায় বলা হয়েছে, প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হয়, এরপর তার অর্ধেক কমানো হয়, তারপর আবার অর্ধেক কমানো হয়। সরল হিসাবে ৫০-এর অর্ধেক ২৫, আর ২৫-এর অর্ধেক ১২.৫। কিন্তু আখ্যান শেষে পাঁচ ওয়াক্তে এসে দাঁড়ায়। আলেমরা বিভিন্ন রেওয়ায়েত মিলিয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু সেটিই মূল সমস্যা—একটি ঈশ্বরীয় বিধানপ্রাপ্তির ঘটনাকে বোঝার জন্য পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীর জোড়াতালি দরকার হচ্ছে। যদি ঘটনাটি সত্যিই সুস্পষ্ট, প্রত্যক্ষ ও ঈশ্বরীয়ভাবে নির্ধারিত হতো, তাহলে তার সংখ্যাগত কাঠামো এত অস্বচ্ছ হওয়ার কথা নয়।

এই গল্প ধর্মীয় আবেগে জনপ্রিয়, কিন্তু যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিতে এটি ঈশ্বরীয় সর্বজ্ঞতার ধারণাকে দুর্বল করে। এখানে আল্লাহ শুরুতে এমন বিধান দেন যা মানুষের পক্ষে অকার্যকর; মূসা বাস্তবতা বোঝান; মুহাম্মদ বারবার ফিরে যান; বিধান কমতে থাকে। ধর্মীয় ভাষায় এটি রহমত, কিন্তু যুক্তির ভাষায় এটি সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের আইনপ্রণয়ন নয়—একটি দর-কষাকষিমূলক প্রশাসনিক কাহিনি। কারণ এখানে আল্লাহকে সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, মানুষের ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার পূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন সত্তা হিসেবে নয়; বরং এমন এক শাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি প্রথমে অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত বিধান দেন, পরে একজন পূর্ববর্তী নবীর বাস্তববাদী আপত্তির কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ হন, তবে তিনি শুরুতেই জানতেন মানুষের পক্ষে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা সম্ভব হবে না। তাহলে প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরজ করার অর্থ কী?

প্রশ্নটি আরও কঠিন হয় যখন দেখা যায়, এই সংশোধন আল্লাহ নিজে শুরু করেন না; মূসা তা নির্দেশ করেন। আখ্যানের ভেতরে মূসা কার্যত মানুষের সক্ষমতা সম্পর্কে আল্লাহর চেয়ে বেশি ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন চরিত্রে দাঁড়ান। এই সমস্যা ছোট নয়; এটি গল্পটির ঈশ্বরতাত্ত্বিক মেরুদণ্ডে আঘাত করে। সর্বজ্ঞ সত্তা যদি শুরুতেই মানুষের সামর্থ্য জানেন, তাহলে ৫০ থেকে ৫-এ নেমে আসার নাটক কেন? আর যদি নাটকটি শিক্ষামূলক হয়, তবে সেটি বিধান-প্রাপ্তির ইতিহাস নয়, ধর্মীয় নাট্যরূপ। তিনি বারবার বলেন—উম্মত পারবে না, ফিরে যান। অর্থাৎ আখ্যানের ভেতরে মূসা একজন প্রশাসনিক পরামর্শকের ভূমিকা পালন করছেন, আর মুহাম্মদ আল্লাহর দরবারে বারবার আপিল করছেন। এই কাঠামো ঈশ্বরীয় সর্বজ্ঞতার ধারণার সঙ্গে অস্বস্তিকরভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

এখানে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে। প্রথম ব্যাখ্যা: আল্লাহ পরীক্ষা করছিলেন। কিন্তু সর্বজ্ঞ সত্তার পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কী? তিনি তো আগেই জানেন কে কী করতে সক্ষম। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: আল্লাহ উম্মতের ওপর দয়া দেখিয়ে কমিয়েছেন। কিন্তু দয়া দেখাতে হলে অযৌক্তিকভাবে পঞ্চাশ দিয়ে শুরু করার দরকার ছিল কেন? তৃতীয় ব্যাখ্যা: পাঁচ ওয়াক্তের সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান দেখানোর জন্য এই গল্প। কিন্তু সেটি হলে গল্পটি ধর্মীয় প্রণোদনা-নির্মাণ; বাস্তব দর-কষাকষি নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিধানিক সিদ্ধান্তের কাঠামো। কোনো নৈতিক বা ধর্মীয় বিধান যদি সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের পক্ষ থেকে আসে, তবে সেটির প্রথম সংস্করণই যুক্তিযুক্ত, উপযোগী এবং বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, বিধানটি বারবার সংশোধিত হচ্ছে। প্রথমে পঞ্চাশ, তারপর কমতে কমতে পাঁচ। এই কাঠামো মানুষের প্রশাসনিক দর-কষাকষি, রাজদরবারে আবেদন, কর মওকুফ বা শাসকের অনুগ্রহের গল্পের সঙ্গে বেশি মেলে; সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের নিখুঁত বিধানপ্রণালীর সঙ্গে নয়।

এখানে আরও একটি যৌক্তিক সমস্যা আছে। যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজেই পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব দেওয়া হয়, তাহলে পঞ্চাশ ওয়াক্তের প্রাথমিক ফরজের বাস্তব অর্থ কী ছিল? মানুষ কাজ করবে পাঁচ, কিন্তু হিসাব হবে পঞ্চাশ—এটি ধর্মীয়ভাবে উদার শোনালেও যুক্তিগতভাবে অস্পষ্ট। কারণ তখন বিধান ও পুরস্কারের মধ্যে বাস্তব সম্পর্ক ভেঙে যায়। যদি উদ্দেশ্য ছিল পাঁচই ফরজ করা, তবে শুরুতে পঞ্চাশ কেন? আর যদি সত্যিই পঞ্চাশ ফরজ করার উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে পরে পাঁচে নামিয়ে পঞ্চাশের সওয়াব দেওয়া নৈতিক হিসাবের কোন যুক্তিতে দাঁড়ায়?

নামাজ কমানোর এই গল্পকে যদি ধর্মীয় নাট্যরূপ হিসেবে পড়া হয়, তাহলে এর অর্থ বোঝা সহজ। এখানে মূসা পূর্ববর্তী নবুয়ত-ঐতিহ্যের অভিজ্ঞ প্রতিনিধি; মুহাম্মদ নতুন উম্মতের নেতা; আল্লাহ রাজদরবারের কেন্দ্র; আর নামাজের সংখ্যা কমে আসা ঈশ্বরীয় দয়ার নাটকীয় প্রকাশ। এই কাঠামো সাহিত্যে কার্যকর। কিন্তু এটিকে যদি বাস্তব ঈশ্বরীয় নীতিনির্ধারণী ঘটনা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সর্বজ্ঞতা, ন্যায়, যুক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বিধানের স্থিরতার ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরও একটি সমস্যা হলো, কিছু বর্ণনায় নামাজ কমানোর ধাপ একরকম, আবার কিছু বর্ণনায় ভিন্নরকম। কোথাও দশ দশ করে কমার কথা, কোথাও অর্ধেক, কোথাও অন্যভাবে কমার কথা দেখা যায়। আরও একটি হাদিস আছে যা মুনকার হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে বলা হয়েছে আল্লাহ আকাশ-পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই পঞ্চাশ ওয়াক্ত নির্ধারণ করেছিলেন, কিন্তু শেষে পাঁচকে পঞ্চাশের সমান গণ্য করা হয়। এই ধরনের বর্ণনা দেখায়, নামাজ-দর-কষাকষির গল্পও একক আকারে স্থির নয়; তারও ভিন্ন ভিন্ন রূপ আছে।

সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ নামাজ প্রসঙ্গে
পরিচ্ছেদঃ ১/ সালাতের ফরযসমূহ এবং আনাস ইবন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের বর্ণনাকারীদের সনদ সম্পর্কিত মতভেদ ও শব্দ প্রয়োগে তাদের বিভিন্নতা
৪৫১। আমর ইবনু হিশাম (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার সামনে এমন একটি জন্তু আনা হল যা আকারে গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট এবং যার কদম পড়ত দৃষ্টির শেষ সীমায়। আমি তার উপর আরোহণ করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমার সঙ্গে ছিলেন। আমরা সফর করলাম (মদিনা পর্যন্ত)। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি নেমে সালাত আদায় করুন। আমি সালাত আদায় করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি কোথায় সালাত আদায় করেছেন তা কি জানেন?
আপনি সালাত আদায় করেছেন তায়বায়। এ শহরেই আপনি হিজরত করবেন। আবার জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি অবতরণ করে সালাত আদায় করুন। আমি তখন নেমে সালাত আদায় করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি কি জানেন কোন্‌ জায়গায় সালাত আদায় করেছেন? আপনি ’তূরে সায়না’ নামক স্থানে সালাত আদায় করেছেন। যেখানে আল্লাহ্‌ পাক মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে কথা বলেছিলেন।
তারপর আবার এক স্থানে গিয়ে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, অবতরণ করে সালাত আদায় করুন। আমি তা-ই করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি কি জানেন, আপনি কোথায় সালাত আদায় করেছেন? আপনি ’বায়ত লাহম’ নামক স্থানে সালাত আদায় করেছেন। যেখানে হজরত ঈসা (আলাইহিস সালাম) জন্মগ্রহন করেছিলেন। তারপর আমি ’বায়তুল মাকদিস’-এ প্রবেশ করলাম এবং সমস্ত নবীকে আমার নিকট একত্র করা হল এবং জিব্রাঈল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সম্মুখে এগিয়ে দিলেন আমি সকলের ইমামতি করলাম। তারপর আমাকে নিয়ে প্রথম আসমানে উঠলেন।
সেখানে আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সাক্ষাত লাভ করলাম। পরে আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে উঠলেন। সেখানে পরপর দু’খালাত ভাই ঈসা (আলাইহিস সালাম) ও ইয়াহইয়া (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাত হল। তারপর আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানে উঠলেন এবং সেখানে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে দেখা হল। এরপর আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানে উঠলেন এবং সেখানে হারুন (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাত হল। তারপর আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানে উঠলেন সেখানে ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাত হল। তারপর আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানে উঠলেন। সেখানে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাত হল।
তারপর আমাকে সপ্তম আসমানে নিয়ে গেলেন এবং সেখানে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাত হল। এরপর আমাকে নিয়ে সপ্তম আসমানের উপরে উঠলেন। তখন আমরা সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হলাম। সেখানে একখণ্ড ধুঁয়াশা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল আমি সিজদায় পড়ে গেলাম। তখন আমাকে বলা হল -যেদিন আমি এ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছি, সেদিন আপনার উপর ও আপনার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছি। সুতরাং আপনি এবং আপনার উম্মত এই সালাত কায়েম করুন।
তখন আমি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন করলাম। তিনি আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না। পরে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আপনার এবং আপনার উম্মতের উপর আল্লাহ্‌ কি ফরয করেছেন? আমি বললাম পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তখন মূসা(আলাইহিস সালাম) বললেন, নিশ্চয়ই আপনি এবং আপনার উম্মত পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত যথাযথ আদায় করতে সক্ষম হবেন না। আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং কমানোর জন্য আরয করুন। আমি প্রতিপালকের নিকট ফিরে গেলাম। তিনি আমার থেকে দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। তারপর আবার মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলাম। তিনি আমাকে পুনরায় ফিরে যেতে বললেন। আমি ফিরে গেলাম। তখন তিনি আরো দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসার পর তিনি আমাকে পুনরায় ফিরে যেতে বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। তিনি দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন।
তারপর সর্বশেষ সালাতকে পাঁচ ওয়াক্তে পরিণত করা হল। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি পুনরায় প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং সালাত আরও কমানোর আবেদন করুন। কেননা আল্লাহ্‌ বনী ইসরাঈলের উপর শুধু দুই ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছিলেন। তারা এই দুই ওয়াক্তও আদায় করেনি। তখন আমি আবার আল্লাহ্‌র নিকট ফিরে গিয়ে সালাত কমিয়ে দেয়ার জন্য আরয করলাম। তখন তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি যেদিন এই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছি, সেদিন আপনার ও আপনার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছি। আর এই পাঁচ ওয়াক্ত পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান বলে গণ্য হবে। আপনি ও আপনার উম্মত এটা আদায় করুন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আল্লাহ্‌র পাকের পক্ষ হতে অবশ্য পালনীয়। এরপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ফিরে আসলাম। এবারও তিনি আমাকে ফিরে যেতে বললেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম যে, পাঁচ ওয়াক্ত আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে অবশ্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তাই আমি আর ফিরে গেলাম না।
হাদিসের মানঃ মুনকার (সহীহ হাদীসের বিপরীত)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই মুনকার বর্ণনাটিকে মূল প্রমাণ হিসেবে ধরার দরকার নেই; বরং এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি দেখায়, মিরাজ-সংক্রান্ত বিধানিক আখ্যান কীভাবে বিভিন্ন রূপে প্রচারিত হয়েছে। সহিহ বর্ণনায়ও গল্পের যৌক্তিক সমস্যা রয়ে যায়; মুনকার বর্ণনা সেই পরিবর্তনশীলতার মাত্রা আরও স্পষ্ট করে। তাই আপত্তিটি দুর্বল বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল নয়; আপত্তির কেন্দ্রে আছে সহিহ বর্ণনাতেই পাওয়া ঈশ্বরীয় বিধান-দর-কষাকষির অদ্ভুত কাঠামো।

সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের বিধান যদি মূসার পরামর্শে বারবার বদলায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—প্রথম সিদ্ধান্তটি কি মানুষের সামর্থ্য বিবেচনা করেই দেওয়া হয়েছিল? যদি হ্যাঁ, তবে মূসার আপত্তি অপ্রয়োজনীয়। যদি না, তবে সর্বজ্ঞতার দাবি দুর্বল। আবার যদি বলা হয় পুরো ঘটনাই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত নাট্যরূপ, তাহলে সেটি বাস্তব দর-কষাকষি নয়, বরং শিক্ষামূলক গল্প। তখনও মিরাজের আক্ষরিক ঐতিহাসিকতা দুর্বল হয়।

সুতরাং নামাজ ৫০ থেকে ৫ হওয়ার গল্প অলৌকিক বিধানপ্রাপ্তির নিখুঁত ইতিহাস নয়; এটি দরবারি দর-কষাকষির ধর্মীয় নাটক। এটি প্রাচীন ধর্মীয় রাজদরবার-কল্পনার একটি শক্তিশালী উদাহরণ: ঈশ্বর সিংহাসনে, নবী দরবারে, অন্য নবী পরামর্শদাতা, বিধান দর-কষাকষির মাধ্যমে কমছে, শেষে করুণা ঘোষিত হচ্ছে। গল্প হিসেবে এটি আকর্ষণীয়; কিন্তু সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, নিখুঁত বিধানদাতার ধারণার সঙ্গে এটি যৌক্তিকভাবে দুর্বল এবং ধর্মতাত্ত্বিকভাবে অস্বস্তিকর।

এই পর্যায়ে মিরাজের বর্ণনাগত সমস্যাগুলো একত্র করলে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়। যাত্রার সূচনা নিয়ে গণ্ডগোল, জেরুজালেমে থামা নিয়ে গণ্ডগোল, দুধ-মদের পাত্র কোথায় দেওয়া হলো তা নিয়ে গণ্ডগোল, নবীদের অবস্থান নিয়ে গণ্ডগোল, এবং নামাজের বিধান কমানোর যুক্তিগত অস্বস্তি—সব মিলিয়ে মিরাজকে সুসংহত প্রত্যক্ষ ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা অসম্ভব। বরং এটি বিভিন্ন ধর্মীয় মোটিফ, মৌখিক বর্ণনা, পূর্ববর্তী নবুয়ত-ঐতিহ্য, পরকাল-ভ্রমণ মিথ এবং বিধানিক কর্তৃত্ব নির্মাণের সমন্বিত আখ্যান বলেই বেশি যুক্তিযুক্তভাবে ব্যাখ্যাত হয়।


বুরাককে বাঁধার প্রয়োজন কী: অলৌকিক বাহনেরও কি পালিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল?

মিরাজের বর্ণনায় বুরাক একটি অদ্ভুত সত্তা। এটি সাধারণ ঘোড়া নয়, সাধারণ খচ্চর নয়, সাধারণ গাধাও নয়; বরং এমন এক অতিপ্রাকৃত বাহন যার একেক পদক্ষেপ দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিছু বর্ণনায় দেখা যায়, বুরাক কেবল দ্রুতগামী প্রাণীই নয়, বরং ভাষা বোঝে, জিবরাঈলের কথায় প্রতিক্রিয়া দেখায়, এমনকি লজ্জিত হয়ে ঘর্মাক্ত হয়। অর্থাৎ বর্ণনাটি নিজেই বুরাককে সাধারণ পশু থেকে আলাদা করে এমন এক সচেতন বা অন্তত ভাষা-সংবেদী সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করছে [57]

সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ কুরআন তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ সূরা বনী ইসরাঈল
৩১৩১. ইসহাক ইবন মানসূর (রহঃ) …… আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। মি’রাজের রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জিন পরিয়ে লাগাম লাগিয়ে বুরাক আনা হল কিন্তু সে হঠকারিতা করল। তখন জিবরীল (আঃ) বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাপারেও তুমি এরূপ করছ? আল্লাহর কাছে তাঁর চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কেউ তোমার উপর কখনও আরোহণ করেনি। লজ্জায় বুরাকটি ঘর্মাক্ত হয় উঠল।
এ হাদীসটি হাসান-গারীব। আবদুর রাজ্জাক (রহঃ) এর রিওয়ায়ত ছাড়া এটি সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা নেই।
সহীহ, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩১৩১ [আল মাদানী প্রকাশনী]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এই বর্ণনার সঙ্গে আরেকটি বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে সমস্যা তৈরি হয়। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় নবী বলেন, তিনি বায়তুল মাকদিসে পৌঁছে বুরাককে সেই রজ্জুতে বাঁধেন, যেখানে অন্যান্য নবীরাও নিজেদের বাহন বেঁধেছিলেন [23]। প্রশ্নটি তাই সরল: যে বুরাক ভাষা বুঝতে পারে, জিবরাঈলের ধমক বুঝে শান্ত হয়, নবীর মর্যাদা সম্পর্কে লজ্জিত হয়—তাকে আবার পশুর মতো বেঁধে রাখার প্রয়োজন কী?

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬২
৩০৮। শায়বান ইবনু ফাররূখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আমার কাছে বুরাক আনা হল। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদুর দৃষ্টি যায়, এক এক পদক্ষেপে সে ততাদূর চলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এতে আরোহন করলাম এবং বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে রজ্জুতে বাধতেন, আমি সে রজ্জুতে আমার বাহনটিও বাধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু-রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে বের হলাম।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বললেন, আপনি ফিরতকেই গ্রহণ করলেন। তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌছে দার খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ, ডেকে পাঠানো হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দরজা খূলে দেয়া হল। সেখানে আমি আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সাক্ষাৎ পাই তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন এবং আমার মঙ্গলের জন্য দুআা করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে চললেন এবং দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত পৌছলেন ও দ্বার খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি উত্তরে বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, তাকে কি আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া (আলাইহিমুস সালাম) দুই খালাত ভাইয়ের সাক্ষাৎ পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন, আমার জন্য কল্যাণের দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়েঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইউসূফ (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাঁকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দার খুলে দেওয়া হলো। সেখানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুঃআ করলেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا‏ “এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়—” (৫৭ঃ ১৯)।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খূলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। অনন্তর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেওয়া হল। সেখানে হারুন (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খূলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দুআ করলেন।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রাস্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললোন, জিবরীল। বলা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ বলা হল, আপনাকে কি তাঁকে আনতে পাঠান হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাঁকে ডেকে পাঠান হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হলো। সেখানে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি বায়তুল মা’মুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। বায়তুল মামুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন, যারা আর সেখানে পূনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না।
তারপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হস্থিনীর কানের মত আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সে বৃক্ষটিকে যখন আল্লাহর নির্দেশে যা আবৃত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তায়াআলা আমার উপর যা অহী করার তা অহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। এরপর আমি মূসা(আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মাত এ নির্দেশ পাননে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মাতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মাত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এভাবে আমি একবার মূসা (আলাইহিস সালাম) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়াহ করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তায়ালা বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! যাও, দিন ও রাতের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাত দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যাক্তি কোন নেক কাজের ইচ্ছা করল এবং তা কাজে রুপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখব; অ্যর তা কাজে রুপায়িত করলে তার জন্য লিখব দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের অভিপ্রায় করল, অথচ তা কাজে পরিণত করল না, তার জন্য কোন গুনাহ লেখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লেখা হয় একটি মাত্র গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে নেমে এলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বিযয় নিয়ে বারবার আমি আমার রবের কাছে আসা-যাওয়া করেছি, এখন পূনরায় যেতে লজ্জা হচ্ছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সাধারণ বাহনকে বাঁধার যুক্তি পরিষ্কার। ঘোড়া বা গাধা মানুষের ভাষা বুঝে নির্দেশ মেনে দাঁড়িয়ে থাকে না; তারা ভয় পেতে পারে, ছুটে যেতে পারে, হারিয়ে যেতে পারে। তাই মানুষ তাদের বেঁধে রাখে। কিন্তু মিরাজের বুরাক যদি অতিমানবীয় গতি ও আংশিক সচেতনতার অধিকারী হয়, যদি সে জিবরাঈলের বক্তব্য বুঝতে পারে, যদি সে নবীর মর্যাদা উপলব্ধি করে, তাহলে তাকে দড়িতে বাঁধা একটি আখ্যানগত অদ্ভুততা। এতে গল্পের দুটি স্তর সংঘর্ষে পড়ে: একদিকে বুরাক অলৌকিক ও বোধসম্পন্ন; অন্যদিকে তাকে সাধারণ পশুর মতো নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

এখানে বিষয়টি কেবল হাস্যরসের নয়; এটি আখ্যানের গঠনগত সমস্যা। ধর্মীয় গল্পে অলৌকিকতা প্রায়ই পুরনো ভ্রমণ-কাহিনির উপাদান নিয়ে তৈরি হয়। “বাহন বাঁধা” একটি সাধারণ যাত্রাকাহিনির মোটিফ; মানুষ ভ্রমণে যায়, বাহন বাঁধে, তারপর ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু যখন সেই মোটিফকে অতিপ্রাকৃত বুরাকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন তা গল্পের অভ্যন্তরীণ যুক্তির সঙ্গে মেলে না। এই ধরনের অসামঞ্জস্যই দেখায় যে মিরাজের গল্পটি একক পরিকল্পিত, নিখুঁত, প্রত্যক্ষ ঘটনার বিবরণ নয়; বরং বিভিন্ন পুরনো আখ্যান-উপাদান জোড়া লাগিয়ে তৈরি হওয়া ধর্মীয় কল্পকাহিনি।

আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাহাবী পর্যায়েও বুরাক-বাঁধা নিয়ে বিস্ময় বা প্রশ্নের সূত্র পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই প্রশ্ন আধুনিক সংশয়বাদীর তৈরি করা কৃত্রিম আপত্তি নয়; বর্ণনাগুলোর মধ্যেই এমন অস্বস্তি আছে, যা শ্রোতার মনে প্রশ্ন জাগাতে বাধ্য। যদি বুরাক নবীদের বাহন, আল্লাহ-প্রেরিত অলৌকিক প্রাণী, ভাষা-বোঝা ও লজ্জা-অনুভবকারী সত্তা হয়, তবে সে পালিয়ে যাবে—এই ধারণা আখ্যানের মহিমাকে নিজেই দুর্বল করে। আর যদি সে সাধারণ পশুর মতোই পালিয়ে যেতে পারে, তাহলে তার অলৌকিক মর্যাদা কতটুকু?


কলমের আওয়াজ কীভাবে?

মিরাজের আরেকটি দালিলিক ও ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা হলো “কলমের খসখস শব্দ”। হাদিসে তাকদীরের প্রসঙ্গে বলা হয়, আল্লাহ সৃষ্টির ভাগ্যলিপি পূর্বেই নির্ধারণ করেছেন; এমনকি কিছু বর্ণনায় “কলম শুকিয়ে গেছে” ধরনের ভাষাও ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ, যা লেখা হওয়ার তা লেখা হয়ে গেছে, ভাগ্য নির্ধারিত, কার্যকারণ ও পরিণতি পূর্বজ্ঞান বা পূর্বনির্ধারণের কাঠামোর মধ্যে স্থির। কিন্তু মিরাজের বর্ণনায় নবী ঊর্ধ্বলোকে উঠে “কলমসমূহের খসখস শব্দ” শুনেছেন বলে বলা হয় [58] [59]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮২/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৮২/২. আল্লাহর ইলম-মুতাবিক (লেখার পর) কলম শুকিয়ে গেছে।
আল্লাহর বাণীঃ ‘‘আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে গুমরাহ করেছেন’’- (সূরাহ জাসিয়াহ ৪৫/২৩) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ যার সম্মুখীন তুমি হবে (তোমার যা ঘটবে) তা লেখার পর কলম শুকিয়ে গেছে। ইবনু ‘আব্বাস(রাঃ) বলেছেন,(لَهَا سَابِقُوْنَ) তাদের উপর নেকবখতি প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
৬৫৯৬. ‘ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! জাহান্নামীদের থেকে জান্নাতীদেরকে চেনা যাবে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। সে বলল, তাহলে ‘আমলকারীরা ‘আমল করবে কেন? তিনি বললেনঃ প্রতিটি লোক ঐ ‘আমলই করে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অথবা যা তার জন্য সহজ করা হয়েছে। [৭৫৫১; মুসলিম ৩৮/১, হাঃ ২৬৪৯] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬১৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬০/ আম্বিয়া কিরাম (‘আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৬০/৫. ইদ্রীস (আঃ)-এর বিবরণ।
৬০/৪. অধ্যায় :
(মহান আল্লাহর বাণীঃ) আর নিশ্চয়ই ইলিয়াসও রাসূলগণের মধ্যে একজন ছিলেন। স্মরণ কর, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা কি সাবধান হবে না? ………… আমি তা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। (আস্সাফফাতঃ ১২৩-১২৯)
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, (ইলয়াস আঃ-এর কথাকে) মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ইলয়াসের প্রতি সালাম। আমি সৎ-কর্মশীলদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন আমার মু’মিন বান্দাদের অন্যতম- (আস্সাফফাত ১৩০-১৩২)
এবং তিনি নূহ (আঃ)-এর পিতার দাদা ছিলেন। মহান আল্লাহর বাণীঃ আর আমি তাঁকে (ইদরীস) উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি। (মারইয়াম ৫৭)
৩৩৪২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ যার (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, (লাইলাতুল মি’রাজে) আমার ঘরের ছাদ উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। অতঃপর জিব্রাঈল (আঃ) অবতরণ করলেন এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। অতঃপর তিনি যমযমের পানি দ্বারা তা ধুলেন। এরপর হিকমত ও ঈমান (জ্ঞান ও বিশ্বাস) দ্বারা পূর্ণ একখানা সোনার তশ্তরি নিয়ে আসেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিলেন। অতঃপর আমার বক্ষকে আগের মত মিলিয়ে দিলেন। এবার তিনি আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে আকাশের দিকে উঠিয়ে নিলেন। অতঃপর যখন দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে পৌঁছলেন, তখন জিবরাঈল (আঃ) আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? জবাব দিলেন, আমি জিবরাঈল। দ্বাররক্ষী বললেন, আপনার সঙ্গে কি আর কেউ আছেন? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আছেন। দ্বাররক্ষী জিজ্ঞেস করলেন, তাঁকে কি ডাকা হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর দরজা খোলা হল। যখন আমরা আকাশের উপরে আরোহণ করলাম, হঠাৎ দেখলাম এক ব্যক্তি যার ডানে একদল লোক আর তাঁর বামেও একদল লোক। যখন তিনি তাঁর ডান দিকে তাকান তখন হাসতে থাকেন আর যখন তাঁর বাম দিকে তাকান তখন কাঁদতে থাকেন। (তিনি আমাকে দেখে) বললেন, মারাহাবা! নেক নবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি জবাব দিলেন, ইনি আদম (আঃ) আর তাঁর ডানের ও বামের এ লোকগুলো হলো তাঁর সন্তান। এদের মধ্যে ডানদিকের লোকগুলো জান্নাতী আর বামদিকের লোকগুলো জাহান্নামী। অতএব যখন তিনি ডানদিকে তাকান তখন হাসেন আর যখন বামদিকে তাকান তখন কাঁদেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে জিবরাঈল (আঃ) আরো উপরে উঠলেন। এমনকি দ্বিতীয় আকাশের দ্বারে এসে গেলেন। তখন তিনি এ আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন! দ্বাররক্ষী তাঁকে প্রথম আকাশের দ্বাররক্ষী যেরূপ বলেছিল, তেমনি বলল। অতঃপর তিনি দরজা খুলে দিলেন।
আনাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর আবূ যার (রাঃ) উল্লেখ করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশসমূহে ইদ্রীস, মূসা, ‘ঈসা এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তাঁদের কার অবস্থান কোন্ আকাশে তিনি আমার নিকট তা বর্ণনা করেননি। তবে তিনি এটা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে আদম (আঃ)-কে এবং ষষ্ঠ আকাশে ইবরাহীম (আঃ)-কে দেখতে পেয়েছেন।
আনাস (রাঃ) বলেন, জিবরাঈল (আঃ) যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ) ইদ্রীস (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, তখন তিনি (ইদ্রীস (আঃ)) বলেছিলেন, হে নেক নবী এবং নেক ভাই! আপনাকে মারহাবা। (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল) জবাব দিলেন, ইনি ইদ্রীস (আঃ)! অতঃপর মুসা (আঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি মূসা (আঃ)। অতঃপর ‘ঈসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি ‘ঈসা (আঃ)। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা। হে নেক নবী এবং নেক সন্তান! আমি জানতে চাইলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি ইবরাহীম (আঃ)।
ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, আমাকে ইবনু হাযম (রহ.) জানিয়েছেন যে, ইবনু ‘আব্বাস ও আবূ ইয়াহয়্যা আনসারী (রাঃ) বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর জিবরাঈল আমাকে ঊর্ধ্বে নিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত আমি একটি সমতল স্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখান হতে কলমসমূহের খসখস শব্দ শুনছিলাম।
ইবনু হাযম (রহ.) এবং আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তখন আল্লাহ আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। অতঃপর আমি এ নির্দেশ নিয়ে ফিরে আসলাম। যখন মূসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার রব আপনার উম্মাত উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম, তাদের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। তিনি বললেন, পুনরায় আপনার রবের নিকট ফিরে যান। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য রাখে না। তখন ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার জন্য আবেদন করলাম। তিনি তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে পুনরায় কমাবার আবেদন করুন এবং তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পূর্বের অনুরূপ কথা আবার উল্লেখ করলেন। এবার তিনি (আল্লাহ) তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আবার আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তিনি পূর্বের মত বললেন। আমি তা করলাম। তখন আল্লাহ তার এক অংশ মাফ করে দিলেন। আমি পুনরায় মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁকে জানালাম। তখন তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আরো কমাবার আরয করুন। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য থাকবে না। আমি আবার ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার আবেদন করলাম। তিনি বললেন, এ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বাকী রইল। আর তা সাওয়াবের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান হবে। আমার কথার পরিবর্তন হয় না। অতঃপর আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি এবারও বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আবেদন করুন। আমি বললাম, এবার আমার রবের সম্মুখীন হতে আমি লজ্জাবোধ করছি। এবার জিবরাঈল (আঃ) চললেন এবং অবশেষে আমাকে সাথে নিয়ে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। দেখলাম তা এমন চমৎকার রঙে পরিপূর্ণ যা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। অতঃপর আমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করানো হল। দেখলাম এর ইট মোতির তৈরী আর এর মাটি মিসক বা কস্তুরীর মত সুগন্ধময়। (৩৪৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১০৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এখানে প্রশ্ন ওঠে: এই কলম কি সেই তাকদীরের কলম? যদি সেটিই হয়, তাহলে কলম শুকিয়ে যাওয়ার পর আবার লেখার শব্দ কেন? আর যদি ভিন্ন কলম হয়, তাহলে কী লেখা হচ্ছিল? ভাগ্য কি পূর্বেই নির্ধারিত, নাকি চলমানভাবে লেখা হচ্ছে? যদি পূর্বেই সব লেখা থাকে, তাহলে মিরাজে নবীর শোনা “খসখস শব্দ” কী বোঝায়? আর যদি তখনও লেখা চলতে থাকে, তাহলে পূর্বনির্ধারিত তাকদীরের ধারণা দুর্বল হয়।

এই সমস্যা কেবল শব্দগত নয়; এটি ইসলামী তাকদীরতত্ত্বের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের সঙ্গে যুক্ত। একদিকে বলা হয়, সব পূর্বনির্ধারিত; অন্যদিকে প্রার্থনা, বিধান, নামাজ কমানো, কলমের চলমান লেখনী—এসব বর্ণনা ঈশ্বরীয় সিদ্ধান্তকে চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মতো দেখায়। মিরাজের গল্পে আল্লাহর দরবার, ফেরেশতাদের দরজা, প্রহরীর প্রশ্ন, কলমের শব্দ, মূসার পরামর্শে বিধান কমানো—সব মিলিয়ে ঈশ্বরীয় বাস্তবতা যেন এক সাম্রাজ্যিক দপ্তর বা রাজকীয় কার্যালয়ের মতো কল্পিত হয়েছে। এই আখ্যান সাহিত্যিকভাবে বোধগম্য, কিন্তু দার্শনিকভাবে সমস্যাযুক্ত।

যদি কেউ বলেন, “কলম শুকিয়ে যাওয়া” রূপক, আর “কলমের শব্দ”ও রূপক—তাহলে সমস্যা কমে যায়, কিন্তু তখন পুরো মিরাজের আক্ষরিক বাস্তবতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ একই বর্ণনার এক অংশকে আক্ষরিক, আরেক অংশকে রূপক, আরেক অংশকে গায়েবী, আরেক অংশকে ঐতিহাসিক—এইভাবে বেছে বেছে পড়া পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল। যে বর্ণনায় আসমান, দরজা, বোরাক, নবী, কলম, নামাজ—সব একত্রে এসেছে, সেই বর্ণনার কোন অংশ বাস্তব, কোন অংশ রূপক—তার নিরপেক্ষ মানদণ্ড দেখাতে হবে। শুধু অসুবিধাজনক অংশকে রূপক বলা যুক্তির কাজ নয়; সেটি বিশ্বাসরক্ষাকারী ব্যাখ্যা।


চল্লিশ নাকি পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে

হাদিসে বর্ণিত আছে, নবী মুহাম্মদ মিরাজের রাতে আদম ও মুসার একটি বিতর্ক দেখেছিলেন। সেই বিতর্কে মুসার ওপর আদম বিজয়ী হয়েছিল। সমস্যা হচ্ছে, ঐ বিতর্ক সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস থেকে জানা যায়, আদমকে সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগে তাওরাত গ্রন্থ লিখিত হয়েছিল, সেখানেই আদমের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। আরেকটি সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, আদমকে সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই আদমের ভাগ্যলিপি নির্ধারিত হয়ে গেছে। দুইটি বক্তব্য একইসাথে সঠিক হতে পারে না। তাই এই বিষয়েও পাওয়া যাচ্ছে সমস্যা। আসুন হাদিস দুইটি পড়ে দেখা যাক। [60] [61]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৩। ইসহাক ইবনু মূসা ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মূসা, ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ আনসারী (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আদম (আলাইহিস সালাম) ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁদের প্রতিপালকের কাছে তর্কে অবতীর্ণ হলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর বিজয়ী হলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই আদম (আলাইহিস সালাম) যাকে আল্লাহ তা’আলা আপন হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মাঝে তিনি তাঁর রুহ ফুঁকে দিয়েছেন, তিনি তাঁর ফিরিশতাদের দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন এবং তাঁর জান্নাত আপনাকে বসবাস করতে দিয়েছেন। এরপর আপনি আপনার ভুলের দ্বারা মানুষকে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছেন।
আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি তো সেই মূসা (আলাইহিস সালাম) যাকে আল্লাহ তা’আলা রিসালাতের দায়িত্ব ও তার কালামসহ বিশেষ মর্যাদায় মনোনীত করেছেন এবং আপনাকে দান করেছেন ফলকসমূহ (তাওরাত কিতাব), যাতে সব কিছুর বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে এবং একান্তে কথোপকথনের জন্য অন্যান্যকে নৈকট্য দান করেছেন। আচ্ছা আমার সৃষ্টির কত বছর আগে আল্লাহ তায়ালা তাওরাত লিপিবদ্ধ করেছেন বলে আপনি দেখতে পেয়েছেন? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, চল্লিশ বছর আগে। আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনি কি তাতে একথা পেয়েছেন, আদম তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করেছে এবং পথ হারা হয়েছে। বললেন, হ্যাঁ।
আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, এরপর আপনি আমাকে আমার এমন কাজের জন্য কেন তিরস্কার করছেন যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর আগে আল্লাহ তাআলা আমার উপর নির্ধারণ করে রেখেছেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর আদম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর বিজয়ী হলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ২. আদম (আঃ) ও মুসা (আঃ) এর বিতর্ক
৬৫০৭। আবূ তাহির আহমাদ ইবনু আমর ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু সারহ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ তাঁআলা সমগ্র সৃষ্টির ভাগ্যলিপি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, সে সময় আল্লাহর আরশ পানির উপরে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ)

আসুন হাদিস দুইটি পাশাপাশি রেখে পড়ি, [62]

মিরাজ 45

স্বপ্নে বা আধ্যাত্মিকভাবে নাকি সশরীরে?

মিরাজের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো: ঘটনাটি সশরীরে ঘটেছিল, নাকি স্বপ্নে, রুহানি অবস্থায় বা আধ্যাত্মিক দর্শন হিসেবে ঘটেছিল? এই প্রশ্নটি আধুনিক সংশয়বাদীর তৈরি নয়; ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরেই এ নিয়ে মতভেদ আছে। অধিকাংশ পরবর্তী আলেম মিরাজকে সশরীর ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন; কিন্তু আয়িশা, মুয়াবিয়া এবং ইবনে ইসহাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূত্রে মিরাজকে রুহানি, আধ্যাত্মিক বা স্বপ্নজাত অভিজ্ঞতা হিসেবে বোঝার প্রবণতা পাওয়া যায় [3] [4]

মিরাজ 47
মিরাজ 49

এই মতভেদ মিরাজ-আখ্যানের কেন্দ্রে বিস্ফোরক সমস্যা তৈরি করে। সশরীর মিরাজ বললে বিজ্ঞান, মহাকাশ, আলোর গতি, মানবদেহ—সব প্রশ্ন এসে পড়ে। স্বপ্ন বা রুহানি মিরাজ বললে বিজ্ঞানগত আপত্তি পাশ কাটানো যায়, কিন্তু তখন মিরাজ আর বস্তুগত ইতিহাস থাকে না; সেটি ব্যক্তিগত ধর্মীয় দর্শনে নেমে আসে। উভয় দিক একসঙ্গে নেওয়া যায় না। কারণ মিরাজকে যদি স্বপ্ন বা রুহানি অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে পদার্থবিজ্ঞান, মানবদেহ, মহাকাশ-দূরত্ব, আলোর গতি, বায়ুমণ্ডল, বোরাকের বাস্তব গতি—এসব আপত্তির বড় অংশ সরাসরি প্রযোজ্য থাকে না। কিন্তু তখন আর মিরাজকে সশরীর মহাকাশভ্রমণ, বাস্তব ভৌগোলিক যাত্রা বা বৈজ্ঞানিকভাবে বিস্ময়কর ঘটনা বলা যায় না। সেটি তখন একজন ধর্মীয় ব্যক্তির স্বপ্ন, দর্শন বা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা—যার বাস্তবতা ব্যক্তিগত দাবি মাত্র।

অন্যদিকে, মিরাজকে যদি সশরীর ঘটনা বলা হয়, তাহলে স্বপ্ন/তন্দ্রা/ঘুমের বর্ণনাগুলো সমস্যা তৈরি করে। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় দেখা যায়, বিবরণের শুরুতে নবী ঘুমন্ত ছিলেন, তার চোখ ঘুমাচ্ছিল কিন্তু অন্তর ঘুমাচ্ছিল না; আবার শেষে তিনি জাগ্রত হয়ে দেখেন, তিনি মসজিদুল হারামে আছেন [5]। এই ধরনের বর্ণনা স্বপ্ন বা দর্শনের ভাষার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেউ যদি বলেন, “নবীদের চোখ ঘুমায়, অন্তর ঘুমায় না”—তবু প্রশ্ন থাকে: এটি কি শারীরিক ভ্রমণ, নাকি অন্তর-দর্শন?

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৯. মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ এবং মূসা (আঃ) এর সাথে আল্লাহ্‌ সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন (৪ঃ ১৬৪)
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৭০০৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৭৫১৭
৭০০৯। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস ইবনু সালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক রাতে কাবার মসজিদ থেকে সফর করানো হল। বিবরণটি হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে ওহী প্রেরণের পুর্বে তার কাছে তিনজন ফেরেশতার একটি জামাআতে আসল। অথচ তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এদের প্রথমজন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন বলল, তিনি এদের উত্তম ব্যাক্তি। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের উত্তম ব্যাক্তিকেই নিয়ে চল। সে রাতটির ঘটনা এটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। অবশেষে তারা অন্য এক রাতে আগমন করলেন যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তার চোখ ঘুমন্ত, অন্তর ঘুমায় না। অনুরূপ অন্য নবীগণেরও চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না।
এ রাতে তারা তার সাথে কোন কথা না বলে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কূপের কাছে রাখলেন।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার সাথীদের থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তার গলার নিচ হতে বক্ষস্থল পর্যন্ত ছেদন করলেন এবং তার বক্ষ ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিছন্ন করলেন, তারপর সেখানে একটি তশতরী আনা হয় এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিকমতে। তাঁর বক্ষ ও গলার রগগুলি এর দ্বারা পূর্ণ করলেন।
তারপর সেগুলো যখাস্থানে স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে ফিরে আসমানের দিকে আরোহণ করলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসিগণ তাকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেনঃ জিবরীল। তারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন তারা বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন) শুভাগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা যমীনে কি করতে চাচ্ছেন তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না।
দুনিয়ার আসমানে তিনি আদম (আলাইহিস সালাম) কে পেলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাকে সালাম দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সালাম দিলেন। আদম (আলাইহিস সালাম) তার সালামের উত্তর দিলেন। এবং বললেনঃ মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র। তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি প্রবাহমান নহর দুনিয়ার আসমানে অবলোকন করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এ নহর দুটি কোন নহর হে জিবরীল! জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, এ দুটি হলো নীল ও ফুরাতের মুল।
এরপর জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নহর অবলোকন করলেন। এর ওপর প্রতিঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরি একটি প্রাসাদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নহরে হাত মারলেন। তা ছিল অতি উন্নতমানের মিসক। তিনি বললেনঃ হে জিবরীল! এটি কি? জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হাউযে কাওসার। যা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গমন করলেন। প্রথম আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতাগণ তাকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেনঃ তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেনঃ জিবরীল। তারা বললেনঃ আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা বললেনঃ তার কাছে কি দুত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গমন করলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানে অবস্থানরত ফেরেশতারা যা বলেছিলেন তৃতীয় আসমানের ফেরেশতাগণও তাই বললেন। তারপর তাকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গমন করলেন। তারাও তাঁকে পুর্বের ন্যায়ই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গমন করলেন। সেখানেও ফেরেশতারা পূর্বের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গমন করলে সেখানেও ফেরেশতারা তাকে পূর্বের ফেরেশতাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নাম উল্লেখ করেছেন।
তন্মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে ইদরীস (আলাইহিস সালাম), চতূর্থ আসমানে হারুন (আলাইহিস সালাম), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যায় নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এবং আল্লাহর সাথে বাক্যলাপের মর্যাদার কারণে মূসা (আলাইহিস সালাম) আছেন সপ্তম আসমানে।
সে সময় মূসা বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমি তো ধারনা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এত ঊর্ধ্বে আরোহণ করানো হলো, যা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। অবশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় আগমন করলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তার প্রতি ওহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের কথা ওহী যোগে পাঠানো হলো।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করেন। আর মূসার কাছে পৌছলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার প্রতিপালক আপনাকে কি নির্দেশ দিলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত (নামায/নামাজ) আদায়ের। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায়ে সক্ষম হবে না। সুতরাং আপনি ফিরে যান তাহলে আপনার প্রতিপালক আপনার এবং আপনার উম্মাতের থেকে এ আদেশটি সহজ করে দিবেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলের দিকে এমনভাবে লক্ষ্য করলেন, যেন তিনি এ বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হ্যাঁ। আপনি চাইলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহর কাছে গেলেন।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাস্থানে থেকে বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মাত এটি আদায়ে সক্ষম হবে না। তখন আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে নামালেন। এভাবেই মূসা তাকে তাঁর প্রতিপালকের কাছে পাঠাতে থাকলেন। পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত অবশিষ্ট থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বনী ইসরাঈল কাওমের কাছে এর চেয়েও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তদুপরি তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছেন অথচ আপনার উম্মাত দৈহিক, মানসিক, শারীরিক সৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণক্ষমতা সব দিকে আরো দুর্বল।
সুতরাং আপনি আবার যান এবং আপনার প্রতিপালক থেকে নির্দেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য জিবরীলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিবরীল তাঁকে নিয়ে গমন করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক। আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ নিতান্তই দুর্বল। তাই নির্দেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ বললেনঃ মুহাম্মাদ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আপনার নিকটে হাযির, বারবার হাযির।
আল্লাহ বললেনঃ আমার কথার কোন প্রকার পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ’উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত (নামায/নামাজ) পঞ্চাশ ওয়াক্তই লিপিবদ্ধ আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসার কাছে প্রত্যাবর্তন করলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলের বিনিময়ে দশটি সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে এর চাইতেও সামান্য জিনিসের প্রত্যাশ্য করছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার প্রতিপালকের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন আরো একটু কমিয়ে দেন।
এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে মূসা, আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতিপালকের কাছে বারবার গিয়েছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তার সাথে মতান্তর করছি। এরপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ অবতরণ করতে পারেন আল্লাহর নামে। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে দেখলেন, তিনি মসজিদে হারামে আছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

এখানে দুই ধরনের ব্যাখ্যা একসঙ্গে রাখা যায় না। যদি বলা হয়, নবী বাস্তব শরীর নিয়ে মহাকাশে গিয়েছিলেন, তাহলে “ঘুমন্ত”, “অন্তরে দেখা”, “জাগ্রত হয়ে দেখা”—এই ভাষাগুলোর অর্থ পরিষ্কার করতে হবে। আর যদি বলা হয়, এগুলো আধ্যাত্মিক দর্শনের ভাষা, তাহলে বোরাক, বাঁধা, দরজা, প্রহরী, আকাশের স্তর, বায়তুল মাকদিস, নবীদের ইমামতি—এসবকে আক্ষরিক ইতিহাস হিসেবে দাবি করা যায় না।

ধর্মীয় apologetics প্রায়ই এই দুই অবস্থানকে সুবিধামতো ব্যবহার করে। বৈজ্ঞানিক আপত্তি এলে বলা হয়, এটি গায়েবী, আধ্যাত্মিক, মানুষের বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। আবার অলৌকিকতার প্রমাণ দেখাতে হলে বলা হয়, এটি সশরীর বাস্তব ঘটনা। এই দ্বৈত কৌশল যুক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। একটি দাবি বাস্তব ও পরীক্ষাযোগ্য হলে তাকে বাস্তবতার মানদণ্ডে বিচার করতে হবে; আর যদি দাবি পরীক্ষাতীত হয়, তবে তাকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

এই কারণে সশরীর বনাম রুহানি/স্বপ্নগত বিতর্ক মিরাজের কেন্দ্রীয় দুর্বলতা। ঘটনা আক্ষরিক হলে তা বিজ্ঞান ও ইতিহাসে ভেঙে পড়ে; ঘটনা রূপক/স্বপ্ন হলে তা নবুয়তের বাহ্যিক প্রমাণ হিসেবে ভেঙে পড়ে। দুই অবস্থানের যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয়; প্রয়োজনমতো দুটিই ব্যবহার করা যায় না।


আসমানি প্রহরী, দরজা ও প্রশাসনিক ঈশ্বরচিত্র

মিরাজের বর্ণনায় প্রতিটি আসমানের দরজায় প্রহরী আছে, জিবরাঈল দরজা খুলতে বলেন, প্রহরী জিজ্ঞেস করেন—কে? সঙ্গে কে? তাকে কি ডাকা হয়েছে? তারপর অনুমতি মেলে। এই দৃশ্য ধর্মীয় কল্পনায় নাটকীয়, কিন্তু দার্শনিকভাবে অদ্ভুত। কারণ সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের আসমানে প্রহরীরা জানে না কে আসছে; জিবরাঈলকে পরিচয় দিতে হচ্ছে; মুহাম্মদকে ডাকা হয়েছে কি না তা যাচাই করা হচ্ছে। এটি সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী, অস্থানিক ঈশ্বরের মহাবিশ্ব নয়; বরং রাজপ্রাসাদের মতো দরজা-প্রহরী-অনুমতিনির্ভর প্রশাসনিক আকাশ।

প্রাচীন রাজনীতি ও সাম্রাজ্যিক সংস্কৃতিতে রাজদরবারে প্রবেশের আগে দরোয়ান, প্রশ্নোত্তর, অনুমতি, দপ্তর, দরবার—এসব স্বাভাবিক ছিল। ধর্মীয় কল্পনায় ঈশ্বরের রাজ্যকেও মানুষ প্রায়ই পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামো দিয়ে কল্পনা করে। মিরাজের আসমানি দরজা ও প্রহরী সেই মানসিকতার প্রতিফলন বলেই বেশি বোধগম্য। কিন্তু একে যদি বাস্তব মহাকাশ বা বাস্তব ঈশ্বরীয় ব্যবস্থাপনা হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে তা সর্বজ্ঞতার ধারণার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের প্রশাসনে প্রহরীর অজ্ঞতা কেন? জিবরাঈলকে পরিচয় দিতে হবে কেন? ডাকা হয়েছে কি না তা প্রশ্ন করতে হবে কেন?

এটি মিরাজের আরেকটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য: আখ্যানটি মানুষের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক জগতকে আকাশে প্রক্ষেপণ করেছে। দরজা, প্রহরী, রজ্জু, বাহন, সিংহাসন, দরবার, আবেদন, বিধান কমানো—সবই মানবসমাজের প্রশাসনিক ভাষা। অতএব আখ্যানটি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিকভাবে অর্থপূর্ণ হলেও বাস্তব মহাজাগতিক ঘটনার বর্ণনা হিসেবে দুর্বল।


ঘোড়ার আবার ডানা হয়?

সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, একবার আয়িশার ঘরে ডানাওয়ালা ঘোড়ার পুতুল দেখে নবী মুহাম্মদ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ঘোড়ার আবার ডানা কীভাবে হতে পারে! এই প্রশ্ন শুনে আয়িশা উত্তর দিয়েছিল, আপনি কী জানেন না, সুলায়মান নবীর ঘোড়ার ডানা ছিল? এই কথা শুনে নবী মুহাম্মদ অট্টহাসি দিতে থাকেন। এই হাদিসটি মিরাজ-পরবর্তী ডানাওয়ালা বোরাক-কল্পনার বিরুদ্ধে ধারালো দলিল। কারণ নবীর সাথে আয়িশার সংসার জীবনের অনেক আগেই মিরাজ হয়ে গেছে। নবী মুহাম্মদের তো জানা থাকার কথা যে, বুরাক ঘোড়াটির ডানা ছিল এবং সেটি উড়তে পারে! [63] [64]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬৫-[২৮] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূক বা হুনায়নের যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনকালে তাঁর ঘরে (প্রবেশের সময়) পর্দা ঝুলানো দেখতে পেলেন, আর বাতাসে পর্দা দুলতে থাকায় পর্দার অপরদিক দিয়ে ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর খেলনাগুলো দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, হে ’আয়িশাহ্! এগুলো কী? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, আমার কন্যাগণ (খেলনা)। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খেলনাগুলোর মাঝে কাপড়ের দুই ডানাবিশিষ্ট ঘোড়া দেখতে পেয়ে বললেন, এগুলোর মধ্যখানে যা দেখছি, তা কী? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, ঘোড়া। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তার উপরে ঐ দু’টি কী? আমি বললাম, দু’টি ডানা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (বিস্ময়াভিভূত হয়ে) বললেন, ঘোড়ারও কি আবার দু’টি ডানা হয়? ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বললেন, আপনি কি শুনেননি সুলায়মান (আঃ)-এর ঘোড়ার অনেকগুলো ডানা ছিল। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এত বেশি হেসে উঠলেন যে, আমি তাঁর মাড়ির দাঁতগুলো পর্যন্ত দেখতে পেলাম। (আবূ দাঊদ)[1]
[1] সহীহ : আবূ দাঊদ ৪৯৩২, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৮৬৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৬/ আদব
পরিচ্ছেদঃ ৬০. কাপড়ের স্ত্রী পুতুল নিয়ে খেলা করা সম্পর্কে।
৪৮৫০. মুহাম্মদ ইবন আওফ (রহঃ) ….. আইশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূক অথবা খায়বরের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেন, আর এ সময় আমার ঘরে একটা পর্দা ঝুলানো ছিল। বাতাসের কারণে পর্দার এক কোণা খুলে যাওয়ায় আমার খেলার পুতুলগুলো, যা একটি তাকের উপর ছিল, তা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। তখন তিনি বলেনঃ হে আইশা! এগুলো কি? তিনি বলেনঃ এগুলো আমার পুতুল। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মধ্যে একটি ঘোড়া দেখতে পান, যার দু’টি ডানা ছিল কাপড় দিয়ে তৈরী। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেনঃ এটা কি যা আমি দেখছি? তিনি বলেনঃ এটা ঘোড়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এর উপর এটা কি? তিনি বলেনঃ দু’টি ডানা বিশিষ্ট ঘোড়া? আইশা (রাঃ) বলেনঃ আপনি কি শোনেননি, সুলায়মান (আঃ) এর ডানা বিশিষ্ট ঘোড়া ছিল? আইশা (রাঃ) বলেনঃ আমার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে উঠেন, যার ফলে আমি তাঁর সামনের দাঁত স্পষ্টরূপে দেখতে পাই।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

অথচ, ইসলামের মিরাজ গল্পটির মূল ভিত্তিই এই ডানাওয়ালা বোরাক নামক গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকৃতির একটি জন্তুর গল্প। আসুন সীরাত গ্রন্থ থেকে এবারে দেখে নেয়া যাক, [65]

মিরাজ 51

এবারে আসুন সৌদি আরবের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমের একটি বই থেকে পড়ে নিই [66]

মিরাজ 53
মিরাজ 55


মিরাজের দালিলিক পর্যালোচনা

উপরের আলোচনার পর মিরাজ-সংক্রান্ত প্রধান উৎসগুলো একত্র করলে একটি পরিষ্কার প্যাটার্ন দেখা যায়। আলাদা আলাদা অসঙ্গতি apologetic ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা যায়; কিন্তু সবগুলো একত্রে রাখলে সমস্যা আর বিচ্ছিন্ন থাকে না—এটি কাঠামোগত ভাঙন। একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বহুসূত্রীয় বর্ণনায় সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু স্থান, সূচনা, মাধ্যম, ক্রম, চরিত্র, আসমানের বিন্যাস, পানীয়ের স্থান, বোরাক, স্বপ্ন-সশরীরতা—সব জায়গায় পরিবর্তন দেখা গেলে সেটি স্থির ইতিহাস নয়, চলমান ধর্মীয় কাহিনি-গঠনের লক্ষণ। ফেরেশতার সংখ্যা, যাত্রার সূচনা, জিবরাঈলের সাক্ষাতের স্থান, বাহন, জেরুজালেমে থামা, পানীয় পরিবেশনের স্থান, নবীদের অবস্থান, সিদরাতুল মুনতাহা ও বায়তুল মামুরের ক্রম, আদম-মূসার বিতর্ক, বুরাক বাঁধা, আসমানি প্রহরী, নামাজের গাণিতিক সমস্যা, কলমের শব্দ, সশরীর বনাম স্বপ্ন—সব মিলিয়ে মিরাজের আখ্যান একটি স্থির ঐতিহাসিক রিপোর্ট হিসেবে দাঁড়ায় না।

নিচের টেবিলে প্রধান অসঙ্গতিগুলো একত্রে রাখা হলো। এর উদ্দেশ্য হলো পাঠককে দেখানো—মিরাজের সমস্যা কোনো একক দুর্বল বর্ণনার ওপর নির্ভর করে না; বরং গ্রহণযোগ্য, প্রচলিত এবং প্রভাবশালী ইসলামী উৎসগুলোর মধ্যেই একাধিক স্তরের বিরোধ আছে।

বিষয়দলিল ১দলিল ২দলিল ৩
ফেরেশতার সংখ্যাজিবরাইল একা [9] বা ১ জন আগন্তুক অর্থাৎ অচেনা ব্যক্তি [10]দুইজন [35]তিনজন ফেরেশতা [5][36]
যাত্রা শুরুর স্থানমুহাম্মদের ঘরের ছাদ খুলে [9]মুহাম্মদের সাথে জিবরাইলের দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয় কাবার হাতিমে [10]উম্মে হানীর ঘর থেকে [11] [12]
জিবরাইলের সাথে সাক্ষাতের স্থানমুহাম্মদের সাথে জিবরাইলের দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয় মুহাম্মদের ঘরে বা কাবার হাতিমে [9] [10]মুহাম্মদের সাথে জিবরাইলের দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয় উম্মে হানীর ঘর থেকে [11] [12]মুহাম্মদের সাথে জিবরাইলের দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয় সপ্তম আসমানে সিদরাতুল মুনতাহায় [43]
আসমানের বাহনবুরাকে চড়ে [44] [45] [46] সিঁড়িতে চড়ে [47] জিবরাইল নবীর হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন [9]
জেরুজালেমে যাত্রাবিরতিবায়তুল মাকদিসে থেমেছিলেন [23] সরাসরি আসমানে গিয়েছিলেন, বায়তুল মাকদিসে থামেননি [50]
পানীয় পরিবেশনের স্থানজেরুজালেমে দেয়া হয়েছিল [23] আসমানে বায়তুল মামুরে দেয়া হয়েছিল [50]
মুসার অবস্থানমুসা কবরে সালাত আদায় করছেন [51] [52] [53]জেরুজালেমে বায়তুল মাকদিসে সালাত আদায় করছেন [54] ষষ্ঠ আসমানে অবস্থান করছেন [55] আরেকটি বর্ণনায় সপ্তম আসমানে অবস্থান করছেন [5]
ইব্রাহিমের অবস্থানষষ্ঠ আসমানে অবস্থান করছেন [5] সপ্তম আসমানে অবস্থান করছেন [55]
হারুনের অবস্থান চতুর্থ আসমানে অবস্থান করছেন [5] পঞ্চম আসমানে অবস্থান করছেন [55]
ইদ্রিসের অবস্থানদ্বিতীয় আসমানে অবস্থান করছেন [5] চতুর্থ আসমানে অবস্থান করছেন [55] পঞ্চম আসমানে অবস্থান করছেন, মুনকার হাদিস [67]
ইয়াহিয়ার অবস্থানদ্বিতীয় আসমানে অবস্থান করছেন [55] তৃতীয় আসমানে অবস্থান করছেন [68]
আগে সিদরাতুল মুনতাহা নাকি বায়তুল মামুরনবী আগে সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন, যা হচ্ছে জড় জগতের শেষ সীমানা। এরপরে তিনি দেখেন বায়তুল মামুর। [10] সপ্তম আসমানে পৌঁছে নবী দেখেন, বায়তুল মামুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে ইব্রাহিম। তারপরে তিনি দেখেন সিদরাতুল মুনতাহা। [23]
আদম-মুসার বিতর্কঃ চল্লিশ নাকি পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেআদমের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার সৃষ্টির চল্লিশ বছর পূর্বে [60] তা নির্ধারিত হয় আদমের সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে [61]
বুরাক বাঁধার প্রয়োজনকথা বোঝা বুদ্ধিমান প্রাণী বুরাককে [57] বেঁধে রাখার দরকার হয়েছিল [23]সাহাবীগণও বুরাক বাঁধা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতো এবং সন্দেহ করতো [45] [46]
আসমানি প্রহরীর অজ্ঞতাআসমানি পাহারাদারগণ জানতেন না, কে আসছে। রাজাবাদশাদের পাহারাদারদের মত জিজ্ঞাসাবাদ [23]
নামাজে গাণিতিক সমস্যামুসার অনুরোধে ৫০ এর অর্ধেক, এরপরে আবারো অর্ধেক, অর্থাৎ ১২.৫ ওয়াক্ত [69]
কলমের আওয়াজশুকিয়ে যাওয়া কলমের [58] লেখার শব্দ [59]
মুসাই সর্বজ্ঞানীসর্বজ্ঞানী আল্লাহ যা বোঝেনি, আল্লাহর চেয়েও মহাপণ্ডিত মুসার তা অনুধাবন [69]
ডানাওয়ালা ঘোড়ার পুতুল দেখে বিস্ময়মিরাজের রাতে ডানাওয়ালা বুরাকে চড়া [66] ডানাওয়ালা ঘোড়ার পুতুল দেখে নবীর বিস্ময় এবং অবিশ্বাসের হাসি [63] [64]
শারীরিকভাবে নাকি স্বপ্নে বা রূহানীভাবেআয়িশা, মুয়াবিয়া, ইবনে ইসহাকের মতে মিরাজ হয়েছিল রূহানীভাবে বা আধ্যাত্মিকভাবে বা স্বপ্নে [4] [5]অধিকাংশ আলেমের মতে মিরাজ হয়েছিল সশরীরে বা শারীরিকভাবে [3]

এই টেবিল থেকে একটি জরুরি পদ্ধতিগত সিদ্ধান্ত আসে। কোনো ধর্মীয় দাবিকে যাচাই করতে হলে কেবল একটি সুবিধাজনক বর্ণনা তুলে ধরা যথেষ্ট নয়। সব প্রাসঙ্গিক বর্ণনা একত্রে রাখতে হয়। যখন সব বর্ণনা পাশাপাশি রাখা হয়, তখন দেখা যায় মিরাজের কাহিনি ভেতর থেকে স্থির নয়। এখানে একাধিক গল্প-রেখা আছে: কোথাও নবী ঘরে, কোথাও হাতিমে, কোথাও উম্মে হানীর ঘরে; কোথাও বুরাক, কোথাও সিঁড়ি, কোথাও জিবরাঈলের হাতধরা; কোথাও জেরুজালেমে থামা, কোথাও সরাসরি আসমান; কোথাও নবী সশরীরে, কোথাও ঘুমন্ত ও অন্তর-দর্শনে; কোথাও ইদ্রিস দ্বিতীয় আসমানে, কোথাও চতুর্থে, কোথাও অন্যত্র। এগুলো “বর্ণনার সৌন্দর্য” নয়; এগুলো উৎসগত অস্থিরতার লক্ষণ।

ইতিহাসচর্চায় এ ধরনের অবস্থা সাধারণত তিনটি সম্ভাবনার দিকে নির্দেশ করে: এক, প্রাথমিক ঘটনা ছিল কিন্তু পরবর্তী মৌখিক বর্ণনায় তা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে; দুই, কোনো স্বপ্ন/দর্শনধর্মী অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে সশরীর অলৌকিক আখ্যান হিসেবে সম্প্রসারিত হয়েছে; তিন, পুরো কাহিনিই পূর্ববর্তী ধর্মীয় মোটিফ, রাজনৈতিক পবিত্রতা-নির্মাণ ও বিধানিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য গড়ে ওঠা ধর্মীয় মিথ। মিরাজের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যাখ্যা প্রথমটির চেয়ে বেশি শক্তিশালী, কারণ ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক এবং দালিলিক—তিন স্তরেই আক্ষরিক ঘটনাটি টিকে না।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার: “অনেক মানুষ বিশ্বাস করে” — এটি কোনো প্রমাণ নয়। কোনো দাবি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত থাকতে পারে; তাতে তার সত্যতা প্রমাণ হয় না। মানবসভ্যতার বহু কাহিনি, উপকথা, মিথ, অলৌকিক গল্প, দেবতা-আখ্যান, স্বর্গ-নরক ভ্রমণ, দেবদূতের সাক্ষাৎ, মৃতদের সঙ্গে কথা বলা—সবই দীর্ঘদিন বিশ্বাসের বিষয় ছিল। ইতিহাসের কাজ বিশ্বাসের বয়স গণনা নয়; প্রমাণের মান বিচার করা। মিরাজের ক্ষেত্রে প্রমাণের মান নিচু, আর বিরোধের পরিমাণ বিধ্বংসী।


উপসংহার: মিরাজ—বিশ্বাসের গল্প, ইতিহাসের ঘটনা নয়

মিরাজের কাহিনি ধর্মীয় সাহিত্য হিসেবে প্রভাবশালী এবং ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে বড় ভূমিকা রাখা আখ্যান। কিন্তু গুরুত্ব আর সত্যতা এক জিনিস নয়। একটি গল্প ধর্মীয় পরিচয় নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, সামাজিক আবেগ তৈরি করতে পারে, আচার-অনুষ্ঠানের ভিত্তি হতে পারে, রাজনৈতিক পবিত্রতা প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হতে পারে—তবু সেটি বাস্তব ইতিহাস বা বৈজ্ঞানিক সত্য হয়ে যায় না। মিরাজের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে।

প্রথমত, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, মিরাজের গল্প অনন্য নয়। ইসলামের বহু আগে থেকেই জরথুস্ত্রীয়, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় ধর্মীয় সাহিত্যে স্বর্গারোহণ, আকাশস্তর, দেবদূতের পথপ্রদর্শন, ঈশ্বরের সিংহাসন, পরকালদর্শন, পাপীদের শাস্তি এবং ফিরে এসে মানুষকে সতর্ক করার আখ্যান প্রচলিত ছিল। মিরাজ সেই বিস্তৃত মিথ-ঐতিহ্যের ইসলামি সংস্করণ।

দ্বিতীয়ত, আল-আকসা বা বায়তুল মাকদিস-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক দাবি গুরুতর সমস্যায় পড়ে। নবী মুহাম্মদের জীবদ্দশায় বর্তমান অর্থে আল-আকসা মসজিদের অস্তিত্ব ছিল না। টেম্পল মাউন্ট ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত, অবহেলিত, এবং মুসলিম জয়ের সময়ও আবর্জনায় ঢাকা বলে মুসলিম ঐতিহাসিক সূত্রেই বর্ণিত। পরে উমাইয়া যুগে জেরুজালেমে বৃহৎ ইসলামি স্থাপত্য নির্মাণ হয়। ফলে পরবর্তী আল-আকসা বাস্তবতাকে নবীর মিরাজ-রজনীতে পেছনে প্রক্ষেপণ করা ইতিহাসসম্মত নয়।

তৃতীয়ত, আধুনিক বিজ্ঞান মিরাজের আক্ষরিক সশরীর ভ্রমণকে সমর্থন করে না। আলোর গতির সীমা, মহাজাগতিক দূরত্ব, সময় প্রসারণ, মানবদেহের মহাকাশ-অযোগ্যতা, বায়ুমণ্ডলের সীমা, বিকিরণ, শূন্যতা, তাপমাত্রা, এবং আধুনিক কসমোলজির আলোকে সাত আসমান-দরজা-প্রহরী-স্তরবিশিষ্ট মহাবিশ্ব গ্রহণযোগ্য নয়। “অলৌকিক” শব্দ ব্যবহার করলে বিশ্বাস রক্ষা করা যায়, কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।

চতুর্থত, হাদিস ও সীরাতের অভ্যন্তরীণ বর্ণনাগুলো স্থির নয়। কোথাও একজন ফেরেশতা, কোথাও দুইজন, কোথাও তিনজন; কোথাও ঘর, কোথাও হাতিম, কোথাও উম্মে হানীর ঘর; কোথাও জেরুজালেমে থামা, কোথাও সরাসরি আসমান; কোথাও দুধ-মদ জেরুজালেমে, কোথাও আসমানে; কোথাও ইদ্রিস দ্বিতীয় আসমানে, কোথাও চতুর্থে; কোথাও মূসা ষষ্ঠ আসমানে, কোথাও সপ্তমে; কোথাও ঘটনাটি ঘুম/অন্তর-দর্শনের ভাষায়, কোথাও সশরীর। এই বৈচিত্র্য কেবল “বহুমাত্রিকতা” নয়; এটি ঐতিহাসিক স্থিতিশীলতার অভাব।

পঞ্চমত, নামাজ ৫০ থেকে ৫ ওয়াক্তে কমার গল্প সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গে অস্বস্তিকরভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ হন, তবে মানুষের সামর্থ্য সম্পর্কে তাঁর আগে থেকেই জানা থাকার কথা। মূসার পরামর্শে বারবার ফিরে যাওয়া, বিধান কমানো, শেষে পাঁচকে পঞ্চাশের সমান গণ্য করা—এসব সাহিত্যিক ও ধর্মীয় নাট্যরূপ হিসেবে বোঝা যায়, কিন্তু নিখুঁত ঈশ্বরীয় বিধানপ্রণালী হিসেবে এটি আত্মবিরোধী।

সুতরাং মিরাজ ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক প্রতীক, ধর্মীয় কল্পনা বা সাহিত্যিক মিথ হিসেবে থাকতে পারে; কিন্তু তাতে এর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণ হয় না। কিন্তু মিরাজকে যদি বাস্তব, সশরীর, ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব ঘটনা হিসেবে দাবি করা হয়, তাহলে সেই দাবি ধসে পড়ে। ঐতিহাসিক প্রমাণ দুর্বল, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনুপস্থিত, দালিলিক বর্ণনা অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং আখ্যানিক কাঠামো প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যীয় স্বর্গারোহণ মিথের সঙ্গে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।

অতএব, যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে মিরাজ নবুওয়াতের প্রমাণ নয়; এটি ধর্মীয় মিথ-নির্মাণ, প্রাচীন কসমোলজি, পরকাল-ভীতি, পবিত্র ভূগোল নির্মাণ এবং ইসলামি বিধানিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী আখ্যান। বিশ্বাসের চোখে এটি মহিমাময়; কিন্তু ইতিহাসের চোখে কালগতভাবে ভাঙা, উৎস-সমালোচনার চোখে অস্থির, বিজ্ঞানের চোখে অবাস্তব, এবং যুক্তিবিদ্যার চোখে বিশেষ অব্যাহতির ওপর দাঁড়ানো ধর্মীয় মিথ। আর উৎস-সমালোচনার চোখে এটি পরবর্তী ধর্মীয় বয়ানের জটিল পুনর্গঠন।

এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য তাই সরল: মিরাজের গল্পকে ধর্মীয় সাহিত্য হিসেবে পড়া এক জিনিস; একে বাস্তব ইতিহাস, মহাকাশবিজ্ঞান বা নবুয়তের প্রমাণ হিসেবে দাবি করা আরেক জিনিস। প্রথমটি বিশ্বাসের অধিকার; দ্বিতীয়টি প্রমাণের দাবি। এই প্রবন্ধ দেখাবে, দ্বিতীয় দাবিটি প্রমাণের ভার বহন করতে ব্যর্থ। আর সত্য যাচাই করতে হলে ধর্মীয় আবেগের কাছে যুক্তিকে আত্মসমর্পণ করানোরও দরকার নেই। একটি দাবি যত বড়, তার প্রমাণের ভারও তত বড়। মিরাজ সেই ভার বহন করতে পারে না।

About This Article

Genre: Semi-Academic Historical, Textual, Scientific, and Comparative Religious Critique

Epistemic Position: Scientific Skepticism, Historical Criticism, Comparative Mythology, Textual Analysis, and Anti-Apologetic Reasoning

This article critically examines the Islamic narrative of Isra and Mi'raj through the standards of history, textual consistency, comparative religion, archaeology, physics, cosmology, and logical coherence.

Its purpose is not devotional interpretation, miracle protection, or theological harmonization. The article asks whether the Mi'raj narrative can stand as a real, bodily, historical, and cosmic event—or whether it is better understood as a later religious construction shaped by older ascension myths, sacred geography, political memory, and theological storytelling.

This article does not treat “Allah can do anything” as an explanation. When a claim involves physical travel, time, distance, the human body, celestial layers, Jerusalem, dead prophets, paradise, hell, and divine negotiation, it becomes subject to historical, scientific, and logical scrutiny.

Modern apologetic attempts to shift the narrative between bodily journey, dream, spiritual vision, metaphor, miracle, and mystery are not accepted by default. If a claim is presented as history, it must face historical evidence; if it is presented as physical travel, it must face physical reality; if it is presented as spiritual vision, it cannot also be used as a hard proof of cosmic geography.

Special attention is given to the separation between Quranic hints and later hadith expansions, the historical problem of al-Aqsa in Muhammad's lifetime, structural parallels with earlier Zoroastrian and Judeo-Christian ascension traditions, and the scientific problems of a one-night journey through layered heavens.

Strong criticism in this article should not be mistaken for bias. If a sacred narrative is used to prove prophethood, establish religious authority, or support claims over geography and political memory, then that narrative deserves stricter scrutiny—not immunity from criticism.

This article should be evaluated through source transparency, historical plausibility, textual consistency, scientific accuracy, comparative analysis, and logical rigor—not through theological sensitivity, inherited reverence, apologetic expectation, or demands that miraculous claims be exempt from ordinary standards of evidence.


তথ্যসূত্রঃ
  1. কুরআন, ১৭:১ ↩︎
  2. কুরআন, ৫৩:১৩-১৮ ↩︎
  3. মুখতাসার যাদুল মা’আদ, পৃষ্ঠা ২১০ 1 2 3
  4. মুখতাসার যাদুল মা’আদ, পৃষ্ঠা ২১৩ 1 2 3
  5. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭০০৯ 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13
  6. St. Clair Tisdall, The Sources of Islam, T. & T. Clark, 1901, pp. 74-81 ↩︎
  7. Haug, Martin. The Book of Arda Viraf. Bombay: Government Central Book Depot, 1872, Introduction ↩︎
  8. Arda Viraf Namag, Chapters 1-2 ↩︎
  9. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪২ 1 2 3 4 5 6 7 8
  10. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৬০৮ 1 2 3 4 5 6 7 8
  11. সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ), অনুবাদ, শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২১৮ 1 2 3
  12. সীরাতুন নবী (সা.), ইবন হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬ 1 2 3 4
  13. Arda Viraf Namag, Chapter 4 ↩︎
  14. Arda Viraf Namag, Chapter 5 ↩︎
  15. সহীহ বুখারী, আজান অধ্যায়; এবং মুসলিম, ঈমান অধ্যায় ↩︎
  16. R. H. Charles, The Ascension of Isaiah, A & C Black, 1900 ↩︎
  17. Flavius Josephus, The Jewish War, Book VI, Chapter 4 ↩︎
  18. Oleg Grabar, The Shape of the Holy: Early Islamic Jerusalem, Princeton University Press, 1996, pp. 27-29 ↩︎
  19. Moshe Gil, A History of Palestine, 634-1099, Cambridge University Press, 1997, p. 69 ↩︎
  20. Al-Tabari, The History of al-Tabari, Vol. XII: The Battle of al-Qadisiyyah and the Conquest of Syria and Palestine, SUNY Press, 1992, pp. 190-195 ↩︎
  21. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইবনে কাসীর, পৃষ্ঠা ১০৭, ১০৮, ১১২-১১৩ ↩︎
  22. K. A. C. Creswell, Early Muslim Architecture, Vol. 1, Oxford University Press, 1969, pp. 65-131 ↩︎
  23. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৮ 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
  24. Einstein, A. 1905. “On the Electrodynamics of Moving Bodies” ↩︎
  25. Resnick, R. & Halliday, D., Basic Concepts in Relativity ↩︎
  26. Davis, J. R., et al., Fundamentals of Aerospace Medicine ↩︎
  27. সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ৩২০৭ ↩︎
  28. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯ ↩︎
  29. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১৩২২ ↩︎
  30. সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ৩১০ ↩︎
  31. কুরআনুল কারীম, ২য় খণ্ড – ড. যাকারীয়া, পৃষ্ঠা ২৪৮২ ↩︎
  32. তাফসীরে মাযহারী, ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২ ↩︎
  33. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ১০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৪৮০-৪৮১ ↩︎
  34. উম্মে হানী- মুহাম্মদের গোপন প্রণয় ↩︎
  35. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৩০৩ 1 2
  36. তাফসীরে মাযহারী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯ 1 2
  37. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৮, হাদিসঃ ১৩০৩ ↩︎
  38. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০১, হাদিসঃ ৩৪২ 1 2
  39. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১২, হাদিসঃ ৩৬০৮ ↩︎
  40. সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ), অনুবাদ, শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২১৮ ↩︎
  41. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩২৮ ↩︎
  42. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৩৬ ↩︎
  43. সূরা আন-নজম, আয়াত ১৩, ১৪ 1 2
  44. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১৩ 1 2
  45. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ৩১৪৭ 1 2 3 4
  46. সূনান আত তিরমিজী, ইসলামিক সেন্টার, হাদিসঃ ৩০৮৫ 1 2 3 4
  47. সীরাতুন নবী (সা), ইবন হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৭ 1 2 3
  48. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০২, ২০৩, হাদিস ৩১৩ ↩︎
  49. সূনান আত তিরমিজী, ইসলামিক সেন্টার, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১১, ৩১২, হাদিসঃ ৩০৮৫ ↩︎
  50. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১৩ 1 2 3 4
  51. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৯৪২ 1 2
  52. সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ৫০ 1 2
  53. সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ৪৯ 1 2
  54. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৭ 1 2
  55. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৮০ 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
  56. Sahih Muslim 164a, In-book reference : Book 1, Hadith 321, USC-MSA web (English) reference : Book 1, Hadith 314 ↩︎
  57. সুনান আত তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১৩১ 1 2
  58. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৬৫৯৬ 1 2
  59. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩৩৪২ 1 2
  60. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫০৩ 1 2
  61. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৫০৭ 1 2
  62. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৮, ১৬৯ ↩︎
  63. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩২৬৫ 1 2
  64. সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৮৫০ 1 2
  65. সীরাতুন নবী (সা), দ্বিতীয় খণ্ড, ইবনে হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৭২ ↩︎
  66. Muhammad ‘Alawi al-Maliki. The Prophet’s Night Journey and Heavenly Ascent., translated by Gibril Fouad Haddad, chapter 2 1 2
  67. সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৫১ ↩︎
  68. Sahih Muslim 164a, In-book reference : Book 1, Hadith 321, USC-MSA web (English) reference : Book 1, Hadith 314 ↩︎
  69. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৩৩৪২ 1 2