কোরআনকে নাকি মোট সাতটি উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল করা হয়েছিল। হযরত উসমান কোরআন বিকৃত হয়ে যাবে এই অযুহাত দেখিয়ে শুধুমাত্র কুরাইশদের উচ্চারণে কোরআন সংকলনের সিদ্ধান্ত নেন, বাদবাকি সকল ভাষার কোরআন পুড়িয়ে ফেলেন। অথচ, স্বয়ং মুহাম্মদের নির্দেশ ছিল যে, তোমাদের জন্য যেই পদ্ধতি সহজতর, তোমরা সেই পদ্ধতিতেই পড়। তাহলে উসমান কীভাবে বাদবাকি ভাষার কোরআন পুড়িয়ে ফেলতে পারলেন [1] [2]? কার নির্দেশে তিনি এরকম করলেন? নবীর নির্দেশনা এখন তাহলে মুসলিমরা কীভাবে মেনে চলবে? বাদবাকি উপভাষার কোরআন গুলো এখন কোথায়?
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছদঃ ২৩৯৯. কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল হয়েছে।
৪৬৩০। সাঈদ উব্ন উফায়র (রহঃ) … উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
… এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবেও কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এ কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের জন্য যা সহজতর, সে পদ্ধতিতেই তোমরা পাঠ কর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এবারে আসুন দেখি, কোরআন আরও যেই ছয়টি উপভাষায় নাজিল হয়েছিল বলে মুহাম্মদই বলেছিল, তার যত কপি ছিল, সবই উসমানের নির্দেশে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল কিনা। সারা পৃথিবীতে একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হচ্ছে, পুরনো কপিগুলোকে মিউজিয়ামে কিংবা পুরনো সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণ করা এবং নতুন সংশোধিত কপিগুলোকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া। মিউজিয়ামে বা সংরক্ষণাগারের কপিগুলোকে গবেষক এবং পণ্ডিতদের জন্য সংরক্ষণ করা ঐতিহাসিক কারণেই অত্যন্ত জরুরি। সারা পৃথিবীতেই এভাবে পুরনো সমস্ত জরুরি নথিপত্র সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু উসমান সেই অন্যান্য উপভাষার কোরআনের কপিগুলো পুড়িয়ে কেন ফেলেছিলেন? আসুন বুখারী শরীফ থেকে আরেকটি হাদিস পড়ে নেয়া যাক, যেখানে বোঝা যাচ্ছে, উসমান বলছে যে, কোরআন কুরাইশদের ভাষায় নাজিল হয়েছে এবং সেই ভাসাতেই লিপিবদ্ধ করতে হবে। বাদবাকি সকল কোরআন উসমান পরে জ্বালিয়ে দেন [3] [4]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন সংকলন
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৬২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৮৭ – ৪৯৮৮
৪৬২৬। মূসা (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) একবার উসমান (রাঃ) এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য রণ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাঁদের মতবিরোধ হুযায়ফাকে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান (রাঃ) কে বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! কিতাব সম্পর্কে ইহুদী ও নাসারাদের মত মত পার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসামান (রাঃ) হাফসা (রাঃ) এর কাছে জনৈক ব্যাক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মাসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব।
হাফসা (রাঃ) তখন সেগুলো উসমান (রাঃ) এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর উসমান (রাঃ) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ), আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ), সাঈদ ইবনু আস (রাঃ) এবং আবদুর রহমান ইবনু হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) কে নির্দেশ দিলেন। তাঁরা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় উসমান (রাঃ) তিনজন কুরাইশী ব্যাক্তিকে বললেন, কুরআনের কোন বিষয়ে যদি যায়দ ইবনু সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তাঁরা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়ে গেল, তখন উসমান (রাঃ) মূল লিপিগুলো হাফসা (রাঃ) এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এতদভিন্ন আলাদা আলাদা বা একত্রে সন্নিবেশিত কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
ইবনু শিহাব (রহঃ) খারিজা ইবনু যায়দ ইবনু সাবিতের মাধ্যমে যায়দ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমরা যখন গ্রন্থকারে কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমার থেকে হারিয়ে যায়; অথচ আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পাঠ করতে শুনেছি। তাই আমরা অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে আমরা তা খুযায়মা ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ) এর কাছে পেলাম। আয়াতটি হচ্ছে এইঃ “মু’মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তাঁরা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি”। (৩৩: ২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.
Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.
Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.
This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.

. সাতটি উপভাষা বা আহরুফ (Seven Ahruf)
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) বলেছিলেন যে কুরআন সাতটি হরফে (আহরুফ) নাযিল হয়েছে। এটি করা হয়েছিল যাতে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এবং বিভিন্ন গোত্র সহজে কুরআন পড়তে ও বুঝতে পারে। কারণ তখনকার সময়ে আরবের বিভিন্ন গোত্রের উচ্চারণে কিছুটা ভিন্নতা ছিল।
২. গোত্রগুলোর ভূমিকা
যদিও নির্দিষ্ট সাতটি গোত্রের নাম নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে, তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী এই উপভাষাগুলো মূলত আরবের প্রধান ও প্রভাবশালী গোত্রগুলোর বাচনভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে ছিল। সেই গোত্রগুলো হলো:
কুরাইশ (সবচেয়ে প্রধান)
হুযাইল
হাওয়াযিন
আল-আমান
তামীম
তাই
হাওয়ান
৩. বর্তমান অবস্থা
হযরত উসমান (রা.)-এর সময় যখন কুরআনের একটি প্রমিত পান্ডুলিপি তৈরি করা হয়, তখন কুরাইশ গোত্রের উপভাষাকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল, কারণ এটি ছিল তৎকালীন আরবের সবচেয়ে মার্জিত ও কেন্দ্রীয় ভাষা। বর্তমানে আমরা যে কুরআন পড়ি, তা মূলত সেই সংকলিত রূপ।
একটি ছোট সংশোধনী: অনেকে “সাতটি উপভাষা” (Ahruf)-কে “সাতটি কিরাত” (Qira’at)-এর সাথে মিলিয়ে ফেলেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আহরুফ হলো নাযিলের সময়কার ভাষাগত বৈচিত্র্য, আর কিরাত হলো পরবর্তীতে প্রথিতযশা ক্বারীগণের পঠন পদ্ধতি।
আহরুফ এবং কিরাতের মধ্যে পার্থক্য
অনেকেই মনে করেন সাতটি উপভাষা মানেই সাতটি কিরাত। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়:
আহরুফ (Ahruf): এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে আসা সাতটি ভাষাগত বৈচিত্র্য। এটি শব্দের উচ্চারণ, বিন্যাস বা ব্যাকরণগত সূক্ষ্ম ভিন্নতা যা নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই অনুমোদিত ছিল।
কিরাত (Qira’at): এটি হলো কুরআন পড়ার পদ্ধতি যা পরবর্তীতে বিখ্যাত কারীগণ (যেমন: ইমাম হাফস, ইমাম আসিম) তাঁদের ওস্তাদদের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে শিখেছেন। বর্তমান বিশ্বে আমরা সাধারণত ‘হাফস আন আসিম’ পদ্ধতিতে কুরআন তিলাওয়াত করি।
২. কেন এই সাতটি উপভাষা ছিল?
তৎকালীন আরবে গোত্রীয় আভিজাত্য এবং ভাষার টান ছিল প্রবল। সবার জন্য একই টানে কথা বলা কঠিন ছিল। উদাহরণস্বরূপ:
কোনো গোত্র হয়তো ‘سين’ (সিন) কে ‘শিন’ এর মতো উচ্চারণ করত।
কারো উচ্চারণে ‘ইমালা’ (স্বরবর্ণের ঝোঁক) বেশি ছিল।
কারো শব্দভাণ্ডারে একই অর্থের জন্য ভিন্ন শব্দ ব্যবহার হতো।
আল্লাহ তাআলা সহজ করার জন্য এই সাতটি উপভাষায় পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন যাতে বৃদ্ধ, শিশু বা অন্য গোত্রের মানুষের জন্য কুরআন মুখস্থ করা সহজ হয়।
৩. হযরত উসমান (রা.)-এর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
ইসলাম যখন আরবের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, তখন বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন উপভাষায় কুরআন পড়তে গিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়ত। কেউ বলত “আমারটি সঠিক”, কেউ বলত “তোমারটি ভুল”। এই বিশৃঙ্খলা এড়াতে হযরত উসমান (রা.):
মানক কপি তৈরি: কুরাইশ উপভাষাকে মূল ভিত্তি ধরে একটি প্রমিত কপি তৈরি করেন।
ঐক্য প্রতিষ্ঠা: তিনি সাহাবীদের পরামর্শে বাকি লিখিত কপিগুলো নষ্ট করে দিয়ে একটিই মূল পাঠ (Text) নির্ধারণ করে দেন।
সাতটি হরফের সমন্বয়: তিনি এমনভাবে কুরআনটি লিখিয়েছিলেন যাতে আগের সাতটি উপভাষার মৌলিক সারমর্ম সেখানে সংরক্ষিত থাকে।
সাতটি বিখ্যাত কিরাত (The Seven Reciters)
পরবর্তীতে হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে সাতজন ইমামের তিলাওয়াত পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধি পায়। তারা হলেন:
১. ইমাম নাফি (মদিনা)
২. ইমাম ইবনে কাসির (মক্কা)
৩. ইমাম আবু আমর (বসরা)
৪. ইমাম ইবনে আমির (দামেস্ক)
৫. ইমাম আসিম (কুফা)
৬. ইমাম হামযাহ (কুফা)
৭. ইমাম আল-কিসায়ি (কুফা)
মজার তথ্য: আপনি যদি আজ উত্তর আফ্রিকায় (যেমন মরক্কো বা আলজেরিয়া) যান, তবে সেখানে অধিকাংশ মানুষ ‘ওয়ারশ’ (ইমাম নাফি-র ছাত্র) পদ্ধতিতে কুরআন পড়েন, যা আমাদের প্রচলিত তিলাওয়াতের চেয়ে শুনতে কিছুটা ভিন্ন মনে হতে পারে।