হযরত উমরের সরাসরি কুফরি কর্মসমূহের তালিকা

Table of Contents

সারসংক্ষেপ

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে উমর ইবনুল খাত্তাবকে এমনভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে যেন তিনি প্রায় সমালোচনার ঊর্ধ্বে এক পবিত্র চরিত্র। তার সিদ্ধান্তকে বলা হয় দূরদর্শিতা, তার আপত্তিকে বলা হয় ইজতিহাদ, তার চাপকে বলা হয় মুওয়াফাকাত, আর তার আইনগত হস্তক্ষেপকে বলা হয় ইসলামের শক্তি। কিন্তু ইসলামি উৎসগুলো ঠান্ডা মাথায় পড়লে একেবারে ভিন্ন ছবি সামনে আসে। সেখানে দেখা যায়, উমর বারবার কোরআনের কার্যকর বিধান, নবীর প্রত্যক্ষ নির্দেশ, নবী-যুগের প্রচলিত আইন এবং ইসলামের নিজস্ব আনুগত্যনীতির সঙ্গে সংঘাতে গেছেন। সাধারণ কোনো মুসলমান একই কাজ করলে তাকে অবাধ্য, ফাসিক, বিদআতী, বিদ্রোহী, এমনকি কুফরি আচরণকারী বলা হতো; কিন্তু উমরের ক্ষেত্রে একই ঘটনাকে ধর্মীয় ভাষায় পালিশ করে ফজিলতপূর্ণ বিষয় এবং উমরের হিকমতে পরিণত করা হয়েছে।

এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন তাই খুব সরল: ইসলাম যদি সত্যিই আল্লাহ ও রাসূলের নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করে, তাহলে উমরের ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয় না কেন? কেন নবীর নির্দেশ অমান্য করা, নবী-যুগের বৈধ প্রথা নিষিদ্ধ করা, কোরআনের উত্তরাধিকার-গণিত মানবীয় পদ্ধতিতে মেরামত করা, দাসী-মালিকানা আইন বদলে দেওয়া, নারীর চলাচলে চাপ সৃষ্টি করা, কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে পলায়নের মতো ঘটনাগুলো উমরের ক্ষেত্রে অপরাধ নয়, বরং ইতিহাসের পবিত্র অলঙ্কার হয়ে যায়? এই দ্বৈতনীতিই সাহাবী-পূজার আসল চিত্র, যা সুন্দর সাজসজ্জা করে আমাদের ধর্মের নামে শেখানো হয়। এই প্রবন্ধে যা যা আলোচনা করা হবে সেগুলো হচ্ছে,

বিষয়উমরের ভূমিকাকোরআন/নবী/শরিয়তের সঙ্গে সংঘাতযৌক্তিক সিদ্ধান্ত
রমজানের রাতে সহবাসআল্লাহর নির্ধারিত কার্যকর নিষেধাজ্ঞা ভেঙে স্ত্রী সহবাস করেন; পরে আল্লাহ বিধান শিথিল করতে বাধ্য হন।কোরআন নিজেই বলে, মুসলমানরা নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত করছিলসর্বজ্ঞানী সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রদত্ত আইন মানুষের প্রবৃত্তি ও প্রভাবশালী সাহাবীদের চাপের সামনে বদলে যায়
মুতআ বিবাহনবী ও আবু বকরের যুগে প্রচলিত প্রথা উমরের সময় নিষিদ্ধ করা হয়, এমন বর্ণনা পাওয়া যায়সুন্নি উৎসের ভেতরেই নবীর নিষেধ বনাম উমরের নিষেধ: দুই বিপরীত বর্ণনাআইনটি ঐশী না রাজনৈতিকঃ এই প্রশ্ন ইসলামি উৎসই তৈরি করে
হজ্জে তামাত্তুউমর তামাত্তু নিষেধ করেন, অথচ হাদিসে তা কিতাবুল্লাহতে থাকা ও রাসূলের আমল হিসেবে উল্লেখিতকোরআন ও নবীর আমলের বিপরীতে খলিফার প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞাএখানে কোরআন-সুন্নাহর ওপর খলিফার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব গুরুত্ব পেয়েছে
আউল নীতিউত্তরাধিকার ভাগে কোরআনিক ভগ্নাংশ ১-এর বেশি হলে উমরের আমলে অনুপাতিক কাটছাঁটের পদ্ধতি চালু হয়কোরআনের নির্দিষ্ট ভাগ বাস্তবে গাণিতিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে“পূর্ণাঙ্গ কিতাব” মানবীয় গাণিতিক প্যাচ ছাড়া টিকতে পারেনি
উম্মে ওয়ালাদনবী ও আবু বকরের যুগে উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি করা যেত, পরে উমর তা নিষিদ্ধ করেননবী-যুগের দাসবাজার বনাম উমরের আইনগত সংশোধনউমর যদি নৈতিকভাবে উন্নত আইন করেন, তাহলে নবীর যুগের আইনই নৈতিকভাবে নিচু ছিল।
বয়স্ক লোকের দুধপাননবীর সালিম-সংক্রান্ত হুকুম পরে আয়িশা বিস্তৃতভাবে বুঝেছিলেন, অন্য স্ত্রীগণ সীমিত করেছিলেন, আর উমরের ফতোয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক দুধপানের কার্যকারিতা অস্বীকার করা হয়নবীর উদ্ভট হুকুম বনাম পরবর্তী সীমাবদ্ধকরণশরিয়তের স্পষ্টতা নয়; এখানে বিব্রতকর হুকুম, পারিবারিক মতভেদ ও পরবর্তী আইনি মেরামত দেখা যায়
স্ত্রী প্রহারউমরের অভিযোগের পর নবীর “নারীদের মারবে না” অবস্থান শিথিল হয়; সূরা নিসা ৪:৩৪ স্ত্রী প্রহারের বৈধতা দেয়নারীর নিরাপত্তা বনাম পুরুষতান্ত্রিক শাসন-অধিকারইসলামী পারিবারিক আইন স্বামীকে শাস্তিদাতা এবং স্ত্রীকে অধীনস্থ হিসেবে স্থাপন করে
দ্বীন পূর্ণতার আয়াততাফসিরি বর্ণনায় মায়িদা ৫:৩ নাজিলের পর উমরের কান্না পূর্ণতাকে সমাপ্তি ও ক্ষয়ের সংকেত হিসেবে দেখায়পূর্ণ দ্বীন ঘোষণার পরও পরবর্তী আইনগত প্যাচ, নিষেধ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন দরকার হয়“পূর্ণতা” বাস্তব আইনগত সম্পূর্ণতা নয়; বরং নবী-পরবর্তী ক্ষমতা-সংগ্রাম ও ব্যাখ্যার দরজা খুলে দেয়
নবীর শেষ লেখনীনবী মৃত্যুশয্যায় কাগজ-কলম চাইলে উমর বলেন, কোরআনই যথেষ্টনবী বলেছিলেন, তিনি এমন কিছু লিখবেন যাতে মুসলমানরা পথভ্রষ্ট হবে নাউমর কার্যত নবীর শেষ নির্দেশের ওপর ভেটো দেন
নবীর দেওয়া উপনামনবী কোনো ব্যক্তিকে উপনাম দিয়েছিলেন, জানার পরও উমর তা বদলে দেননবীর প্রদত্ত পরিচয়ও উমরের শাসনিক কর্তৃত্বের সামনে টেকেনিএটি নবী-আনুগত্য নয়; এটি ক্ষমতার প্রদর্শন
হাজরে আসওয়াদউমর পাথরকে ক্ষমতাহীন বলেন, কিন্তু হাদিসে পাথরকে কিয়ামতের সাক্ষী বলা হয়েছেপাথরপূজা-বিরোধী ভাষা বনাম পাথরকে আখিরাতি সাক্ষী বানানোইসলামের ভেতরেই নবীর বক্তব্যে পৌত্তলিকতার অবশেষ ও ধর্মীয় স্ববিরোধিতা আছে
সাওদা ও পর্দাউমর নবীর স্ত্রী সাওদাকে বাইরে চিহ্নিত করে অপমান করেন; প্রাকৃতিক প্রয়োজন প্রস্রাব পায়খানা করতে যেতে বাধা দেন এবং পর্দা চাপানোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেননারীর প্রাকৃতিক প্রয়োজনও পুরুষ-নজরদারির অধীন হয়ে পড়ে। নবী উমরকে এই কাজের জন্য কোন ধমকও দেন না, যা নবীর মৌন সম্মতিই প্রকাশ করে। নবীর মৌন সম্মতিও ইসলামে সুন্নাহর অংশ হলে, উমরের এই কাজটিও সুন্নাহর অংশ হয়ে যায়।উমর-কেন্দ্রিক ওহীর পিতৃতান্ত্রিক রূপ এখানে স্পষ্ট
হুনাইনের যুদ্ধযুদ্ধক্ষেত্রে পালানোদের মধ্যে উমরকে দেখা যায়কোরআন হুনাইনে পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারী মুসলমানদের তিরস্কার করেসাহাবী-নির্মলতার মিথ যুদ্ধক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়
তারাবিহ জামাতউমর বিচ্ছিন্ন নামাজিদের এক ইমামের পেছনে জড়ো করেন এবং এটিকে ভালো বিদআত বলেনবিদআতবিরোধী নবীর হুকুমের সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিদআতের বৈধতাক্ষমতাবান করলে বিদআতও পবিত্র রূপ পায়

এই সারসংক্ষেপ দেখায়, ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা অস্বস্তিকর কাহিনি নয়; এগুলো একই ক্ষমতাতাত্ত্বিক প্যাটার্নের অংশ। উমর কখনও শরীরী প্রবৃত্তির কারণে কার্যকর বিধান ভেঙেছেন, কখনও নবীর নির্দেশ আটকে দিয়েছেন, কখনও নবী-যুগের প্রথা বাতিল করেছেন, কখনও কোরআনের অকার্যকর আইনকে মানবীয় পদ্ধতিতে মেরামত করেছেন, কখনও নারীর ওপর নিজের পর্দা-আবেগ চাপিয়েছেন, আবার কখনও নিজের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় সত্যের পর্যায়ে বসিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, আদি ইসলামের আইন ও ওহী কোনো আকাশচ্যুত, অপরিবর্তনীয়, নিখুঁত ব্যবস্থা ছিল না; বরং ক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব, সামাজিক চাপ এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে তা বারবার বদলেছে।

তাই উমরকে নিয়ে আসল প্রশ্ন তার ব্যক্তিগত মহত্ত্ব বা সাহাবী-পরিচয় নয়। প্রশ্ন হলো, একই মানদণ্ড কি সবার জন্য প্রযোজ্য? যদি সাধারণ মুসলমান নবীর আদেশ অমান্য করলে জাহান্নামের হুমকি পায়, তাহলে উমর কেন “দূরদর্শী”? যদি সাধারণ কেউ নবীর যুগের বৈধ বিধান বাতিল করলে বিদআতী হয়, তাহলে উমর কেন “মুজতাহিদ”? যদি কোরআনের উত্তরাধিকার আইন সংশোধন দরকার হয়, তাহলে কোরআনকে পূর্ণাঙ্গ আইনগ্রন্থ বলা হয় কীভাবে? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই সাহাবী-সমালোচনা নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ সমালোচনা শুরু হলেই পবিত্র ইতিহাসের আবরণ খুলে যায়, আর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ক্ষমতা, দ্বৈতনীতি, পুরুষতন্ত্র, আইনগত বিশৃঙ্খলা এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের নগ্ন বাস্তবতা।


ভূমিকা

ইসলামী ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রগুলোর একটি হলো সাহাবীদের ‘আদালত’ বা সামগ্রিক নৈতিক নির্ভরযোগ্যতার ধারণা। এই ধারণা অনুসারে সাহাবীরা ভুল করতে পারেন, কিন্তু তাদের চরিত্র, উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক আচরণ, ক্ষমতালিপ্সা, সহিংসতা, নারী-সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত বা নবীর নির্দেশের সঙ্গে সংঘাত, এসব নিয়ে সমালোচনা করা নাকি ফিতনা, বিদ্বেষ, শিয়া-প্রভাব, নাস্তিকতা কিংবা ইসলামবিদ্বেষ। এর ফলে ইসলামের প্রথম যুগের মানুষগুলোকে বাস্তব ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে নয়, এক ধরনের ধর্মীয় প্রতিমা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মানুষকে মানুষ হিসেবে বিচার করার বদলে তাদের চারপাশে পবিত্রতার কুয়াশা তৈরি করা হয়।

কিন্তু ইতিহাসের কাজ ভক্তি করা নয়; ইতিহাসের কাজ বিচার করা। কোনো ব্যক্তির নামের আগে “হযরত”, “রাদিয়াল্লাহু আনহু” বা “সাহাবী” বসালেই তার কাজ নৈতিকভাবে সঠিক হয়ে যায় না। ক্ষমতাধর রাজনৈতিক চরিত্রদের ক্ষেত্রে তো আরও বেশি সন্দেহ, বিশ্লেষণ ও প্রশ্ন দরকার। কারণ যারা রাষ্ট্র, যুদ্ধ, আইন, নারী, দাস, সম্পদ, উত্তরাধিকার, যৌননীতি ও ধর্মীয় শাস্তির ওপর প্রভাব ফেলেছেন, তাদের ভুলের মূল্য শুধু ব্যক্তিগত ছিল না; তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। তাই সাহাবীদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার সংস্কৃতি আসলে সত্য অনুসন্ধানের শত্রু। এটি ইতিহাসকে গবেষণার ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে ইমানি আনুগত্যের কারাগারে ঢুকিয়ে দেয়।

দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব এই সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রচলিত সুন্নি বয়ানে তিনি ন্যায়পরায়ণ, দূরদর্শী, কঠোর কিন্তু সত্যনিষ্ঠ, ইসলামের শক্তিশালী স্তম্ভ। কিন্তু ইসলামি উৎসগুলোই যখন খুঁটিয়ে পড়া হয়, তখন দেখা যায়, এই একই উমর বারবার নবীর সিদ্ধান্তের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন, নবীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে বাধা দিয়েছেন, নবী-যুগে প্রচলিত প্রথা বাতিল করেছেন, কোরআনের গাণিতিক সমস্যার মানবীয় সমাধান দাঁড় করিয়েছেন, নারীর চলাচল ও পর্দা নিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে পলায়নকারী সাহাবীদের সারিতেও দেখা গেছেন, এবং বহু ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তকে পরবর্তীকালের ধর্মতত্ত্ব “মুওয়াফাকাত” বা আল্লাহর সঙ্গে উমরের ঐকমত্য বলে মহিমান্বিত করেছে।

এখানেই মূল সমস্যা। যদি কোনো সাধারণ মুসলমান নবীর নির্দেশ অমান্য করে, তাকে বলা হয় রাসূলের অবাধ্য। যদি কোনো সাধারণ ব্যক্তি নবী-যুগের বৈধ বিধান বাতিল করতে চায়, তাকে বলা হয় বিদআতী। যদি কেউ কোরআনের আইনকে গাণিতিকভাবে অকার্যকর বলে মানবীয় প্যাচ বসায়, তাকে বলা হয় কোরআনের অসম্পূর্ণতা প্রমাণকারী। যদি কেউ নারীর পথ আটকে পর্দা চাপাতে চায়, তাকে বলা হয় নিপীড়ক। কিন্তু এই কাজগুলোর সঙ্গে উমরের নাম যুক্ত হলেই ধর্মীয় ভাষা বদলে যায়। তখন অমান্যতা হয়ে যায় ইজতিহাদ, চাপ হয়ে যায় দূরদর্শিতা, আইন-বদল হয়ে যায় শরিয়তের বিকাশ, আর ক্ষমতা হয়ে যায় ফজিলত। এই দ্বৈতনীতি কোনো নিরপেক্ষ নৈতিকতা নয়; এটি ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বকে রক্ষা করার ধর্মীয় কৌশল।

এই প্রবন্ধে উমরকে ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণে নয়, ইসলামের নিজস্ব উৎস ও নিজস্ব মানদণ্ড ব্যবহার করেই বিচার করা হবে। ইসলাম যদি বলে আল্লাহ ও রাসূলের আদেশ মানা ফরজ, তাহলে উমর সেই আদেশের বাইরে দাঁড়াতে পারেন না। ইসলাম যদি বলে নবীর সিদ্ধান্তের পরে মুমিনের আর নিজের পছন্দ থাকে না, তাহলে উমরের আপত্তিও একই মানদণ্ডে বিচারযোগ্য। ইসলাম যদি দাবি করে কোরআন পূর্ণাঙ্গ, তাহলে উত্তরাধিকার আইনে আউল নামের মানবীয় সংশোধন কেন দরকার হলো—সেই প্রশ্নও বৈধ। ইসলাম যদি নবীর যুগকে আদর্শ যুগ বলে, তাহলে উম্মে ওয়ালাদ বিক্রি, মুতআ, তামাত্তু, দাসপ্রথা ও নারীর ওপর পিতৃতান্ত্রিক নজরদারির মতো প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

তাই এই লেখার উদ্দেশ্য উমরকে “অপমান” করা নয়; উদ্দেশ্য হলো সেই ধর্মীয় মুখোশ খুলে দেখা, যার আড়ালে ক্ষমতা, আইন, পুরুষতন্ত্র, দাসপ্রথা, ওহী-রাজনীতি এবং সাহাবী-পূজার নগ্ন কাঠামো লুকিয়ে আছে। যে ইতিহাসকে প্রশ্ন করা যায় না, সেটি ইতিহাস নয়; সেটি ধর্মীয় প্রচারণা। আর যে চরিত্রকে বিচার করা যায় না, সে নৈতিক আদর্শ নয়; সে রাজনৈতিক প্রতিমা। এই প্রবন্ধ সেই প্রতিমার গায়ে জমে থাকা পবিত্রতার রং ঘষে তুলে দেখাবে: ভেতরে কতখানি মানুষ, কতখানি ক্ষমতা, আর কতখানি ধর্মীয় পালিশ। আসুন সালাফী আলেম ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার বক্তব্য শুনি,

এই বক্তব্যটি দেখায়, সাহাবীদের নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনা ইসলামি পরিসরে কতটা নিয়ন্ত্রিত। “দোষ গোপন” করার নীতিকে যদি ধর্মীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সত্যের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ইতিহাস তখন তথ্যের ওপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় আনুগত্যের ওপর। আর আনুগত্য যখন সত্যের বিকল্প হয়ে ওঠে, তখন যে কোনো বর্বরতা, যে কোনো দ্বৈতনীতি, যে কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পবিত্রতার পোশাক পরানো সম্ভব হয়। উমরের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছে।


বিচারের মানদণ্ড: উমর কি ইসলামের সাধারণ নিয়মের ঊর্ধ্বে?

উমর ইবনুল খাত্তাবকে বিচার করার আগে ইসলামের নিজের ঘোষিত মানদণ্ডটি পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ সাহাবী-পূজার সবচেয়ে সুবিধাজনক কৌশল হলো—সাধারণ মুসলমানের জন্য এক নিয়ম, আর প্রভাবশালী সাহাবীর জন্য আরেক নিয়ম। সাধারণ মুসলমান নবীর কথা অমান্য করলে সে অবাধ্য, পথভ্রষ্ট, জাহান্নামের যোগ্য; কিন্তু উমর একই কাজ করলে তা হয়ে যায় ইজতিহাদ, হিকমত, মুওয়াফাকাত কিংবা দূরদর্শিতা। এই দ্বৈতনীতি চলতে পারে না। যদি ইসলাম সত্যিই আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যকে বাধ্যতামূলক করে, তাহলে সেই মানদণ্ড উমরের ওপরও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

কোরআনের ভাষা এই বিষয়ে অস্পষ্ট নয়। কোরআন বারবার বলে, আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মানতে হবে; রাসূল যা দেন তা গ্রহণ করতে হবে, যা নিষেধ করেন তা বর্জন করতে হবে; আল্লাহ ও রাসূল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে মুমিন পুরুষ বা নারীর আর নিজের পছন্দ রাখার অধিকার নেই। অর্থাৎ ইসলামের নিজস্ব কাঠামোতেই নবী মুহাম্মদের নির্দেশকে শুধু ব্যক্তিগত মতামত বা সাধারণ পরামর্শ হিসেবে দেখা হয় না; তা ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক। সুতরাং নবীর সরাসরি নির্দেশের সামনে “আমার মতে”, “আমাদের কাছে কোরআন যথেষ্ট”, “এটি আমার পছন্দ নয়”, “আমি নিষেধ করছি”—এই ধরনের অবস্থান ইসলামের অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডেই গুরুতর অবাধ্যতা। আসুন কোরআনের আয়াতগুলো পড়ি। মুহাম্মদ কোন নির্দেশ দিলে সেটি অবশ্য পালনীয় [1]

আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারী উক্ত নির্দেশের ভিন্নতা করার কোন অধিকার রাখে না। যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে সে স্পষ্টতই সত্য পথ হতে দুরে সরে পড়ল।
Taisirul Quran
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিনা নারীর সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবেনা। কেহ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সেতো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট।
Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য নিজদের ব্যাপারে অন্য কিছু এখতিয়ার করার অধিকার থাকে না; আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।
Rawai Al-bayan
আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো (১)।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদের দায়িত্ব ছিল মানুষকে কোরআন ব্যাখ্যা করে দেওয়া [2]

(অতীতের রসূলদেরকে পাঠিয়েছিলাম) স্পষ্ট প্রমাণাদি আর কিতাব দিয়ে; আর এখন তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে আর যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।
Taisirul Quran
তাদের প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্ট নিদর্শন ও গ্রন্থসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে।
Sheikh Mujibur Rahman
(তাদের প্রেরণ করেছি) স্পষ্ট প্রমাণাদি ও কিতাবসমূহ এবং তোমার প্রতি নাযিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাযিল হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে।
Rawai Al-bayan
স্পষ্ট প্রমাণাদি ও গ্রন্থাবলীসহ (১)। আর আপনার প্রতি আমরা কুরআন নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে (২), তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন এবং যাতে তারা চিন্তা করে।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

মুহাম্মদের বিধিনিষেধ মেনে চলতেও কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে [3]

রসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যাত্থেকে নিষেধ করে তাত্থেকে বিরত থাক, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।
Taisirul Quran
অতএব রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।
Sheikh Mujibur Rahman
রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।
Rawai Al-bayan
রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ কর তা থেকে বিরত থাক (২) এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্‌ শাস্তি দানে কঠোর।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আল্লাহর সাথে মুহাম্মদেরও আনুগত্য করতে হবে, যার স্পষ্ট নির্দেশনা আছে [4] [5] [6] [7] [8] [9]

যে রসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল, কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে (জোরপূর্বক তাকে সৎপথে আনার জন্য) আমি তোমাকে তাদের প্রতি পাহারাদার করে পাঠাইনি।
Taisirul Quran
যে কেহ রাসূলের অনুগত হয় নিশ্চয়ই সে আল্লাহরই অনুগত হয়ে থাকে, এবং যে ফিরে যায় আমি তার জন্য তোমাকে রক্ষক রূপে প্রেরণ করিনি।
Sheikh Mujibur Rahman
যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি।
Rawai Al-bayan
কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল (১), আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনাকে তো আমরা তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠাই নি।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর আর রসূলের আনুগত্য কর আর তোমাদের ‘আমালগুলোকে নষ্ট করে দিও না।
Taisirul Quran
হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের কর্মফল বিনষ্ট করনা।
Sheikh Mujibur Rahman
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।
Rawai Al-bayan
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

তোমরা আল্লাহকে মেনে চল আর তাঁর রসূলকে মেনে চল আর (মন্দ থেকে) সতর্ক থাক আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে জেনে রেখ আমার রসূলের দায়িত্ব হল সুস্পষ্টভাবে (আমার বাণী) পৌঁছে দেয়া।
Taisirul Quran
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করতে থাক ও রাসূলের অনুগত হও এবং সতর্ক থাকো, আর যদি বিমুখ থাকো তাহলে জেনে রেখ যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব ছিল শুধু স্পষ্টভাবে (আদেশ) পৌঁছে দেয়া।
Sheikh Mujibur Rahman
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের আর সাবধান হও। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব শুধু সুস্পষ্ট প্রচার।
Rawai Al-bayan
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। আর সাবধানতা অবলম্বন কর; তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, আমাদের রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

বল : আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য কর, অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে লও তাহলে তার (অর্থাৎ রসূলের) উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী, আর তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী, তোমরা যদি তার আনুগত্য কর তবে সঠিক পথ পাবে, রসূলের দায়িত্ব হচ্ছে স্পষ্টভাবে (বাণী) পৌঁছে দেয়া।
Taisirul Quran
বলঃ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর; অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী; এবং তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎ পথ পাবে, রাসূলের দায়িত্বতো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Sheikh Mujibur Rahman
বল, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে সে শুধু তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তবে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Rawai Al-bayan
বলুন, ‘তোমরা আল্লাহ্‌র আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনিই দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী; আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, মুলতঃ রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে লও (তাহলে তোমাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য জোর জবরদস্তি করা হবে না) কেননা, আমার রসূলের দায়িত্ব কেবল (আমার বাণী) স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।
Taisirul Quran
আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আমার রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা।
Sheikh Mujibur Rahman
তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। কিন্তু তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের তো একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে স্পষ্টভাবে বাণী পৌঁছে দেয়া।
Rawai Al-bayan
আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর; অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমাদের রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা।
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

বলে দাও, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তবে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসকল ক্ষমা করবেন, বস্তুতঃ আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
Taisirul Quran
তুমি বলঃ যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তাহলে আমার অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসেন ও তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করেন; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।
Sheikh Mujibur Rahman
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
Rawai Al-bayan
বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর (১), আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্‌ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

সেই সাথে, মুহাম্মদকে অমান্য করা যাবে না [10], এটিও পরিষ্কারভাবে বলা আছে,

আল্লাহর বাণী পৌঁছানো ও তাঁর পায়গাম প্রচার করাই আমার কাজ। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে, তার জন্য আছে জাহান্নামের আগুন; তাতে তারা চিরকাল থাকবে
Taisirul Quran
কেবল আল্লাহর বাণী পৌঁছানো এবং তা প্রচার করাই আমার কাজ। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Sheikh Mujibur Rahman
কেবল আল্লাহর বাণী ও তাঁর রিসালাত পৌঁছানোই দায়িত্ব। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।
Rawai Al-bayan
‘শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে পৌঁছানো এবং তাঁর রিসালতের বাণী প্রচারই আমার দায়িত্ব। আর যে-কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে (১)।’
Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

হাদিসেও একই দাবি আরও সরাসরি বলা হয়েছে [11]

হাদীস সম্ভার
১৩/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ সুন্নাহ পালনের গুরুত্ব ও তার কিছু আদব প্রসঙ্গে
(১৪৯৯) মিকদাম বিন মা’দিকারিব বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শোন! আমাকে কুরআন দান করা হয়েছে এবং তারই সাথে তারই মতো (সুন্নাহ) দান করা হয়েছে। শোন! সম্ভবতঃ নিজ গদিতে বসে থাকা কোন পরিতৃপ্ত লোক বলবে, ‘তোমরা এই কুরআনের অনুসরণ কর; তাতে যা হালাল পাও, তাই হালাল মনে কর এবং তাতে যা হারাম পাও, তাই হারাম মনে কর। সতর্ক হও! আল্লাহর রসূল যা হারাম করেন, তাও আল্লাহর হারাম করার মতোই।
(আবূ দাঊদ ৪৬০৬, ইবনে মাজাহ ১২, দারেমী ৫৮৬, মিশকাত ১৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মিকদাম (রাঃ)

এখানে আরেকটি হাদিস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাগজ-কলম ঘটনার ক্ষেত্রে সাধারণত বলা হয়, নবী তখন অসুস্থ ছিলেন; তাই উমর হয়তো নবীর কষ্ট দেখে বা অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে “কোরআনই যথেষ্ট” বলেছিলেন। কিন্তু ইসলামের নিজের হাদিস-ঐতিহ্য এই প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করে দেয়। সহিহ বুখারীর একটি বর্ণনায় দেখা যায়, নবী অসুস্থ অবস্থায় মুখে ওষুধ ঢালতে নিষেধ করেছিলেন। উপস্থিত লোকেরা তার নিষেধকে রোগীর সাধারণ বিরক্তি মনে করে অমান্য করেছিল। পরে নবী সুস্থবোধ করলে তাদের জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি তাদের ওষুধ ঢালতে নিষেধ করেননি? এরপর তিনি নির্দেশ দেন, আব্বাস ছাড়া বাড়ির প্রত্যেকের মুখে ওষুধ ঢালা হোক, কারণ আব্বাস তখন উপস্থিত ছিলেন না।

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৮৪. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ ও তাঁর ওফাত।
৪৪৫৮. ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাঁর মুখে ঔষধ ঢেলে দিলাম। তিনি ইশারায় আমাদেরকে তাঁর মুখে ঔষধ ঢালতে নিষেধ করলেন। আমরা বললাম, এটা ঔষধের প্রতি রোগীদের স্বাভাবিক বিরক্তিবোধ। যখন তিনি সুস্থবোধ করলেন তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের ওষুধ সেবন করাতে নিষেধ করিনি? আমরা বললাম, আমরা মনে করেছিলাম এটা ঔষধের প্রতি রোগীর সাধারণ বিরক্তিভাব। তখন তিনি বললেন, ‘আব্বাস ব্যতীত বাড়ির প্রত্যেকের মুখে ঔষধ ঢাল তা আমি দেখি। কেননা সে তোমাদের মাঝে উপস্থিত নেই।
[১] প্রথমতঃ এখানে অতি সামান্য ব্যাপারেও কিয়াসের বৈধতা প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয়তঃ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালনের অপরিহার্যতা সমভাবে প্রযোজ্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ

এই হাদিসের নিচের টীকার বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: নবীর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালন অপরিহার্য। অর্থাৎ “নবী অসুস্থ ছিলেন” যুক্তিটি ইসলামের অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডে নবীর নির্দেশ অমান্যের বৈধ অজুহাত নয়। বরং হাদিসটি দেখায়, অসুস্থ অবস্থায় নবীর ইশারাও গুরুত্বহীন নয়; সেটি অমান্য করলে পরে নবী প্রতিকারমূলক নির্দেশ দেন। তাহলে মৃত্যুশয্যায় নবী যখন সরাসরি লেখার উপকরণ চাইছেন এবং বলছেন, এমন কিছু লিখবেন যাতে মুসলমানরা পথভ্রষ্ট হবে না, তখন সেই নির্দেশকে অসুস্থতার অজুহাতে থামিয়ে দেওয়া কীভাবে বৈধ হয়?

সহজ দরসে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে নবীর বক্তব্যের উৎস সম্পর্কেও যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে। যদি নবী নিজ থেকে ধর্মীয় নির্দেশ না দেন, বরং তার বক্তব্য আল্লাহ-প্রদত্ত নির্দেশনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে নবীর সরাসরি নির্দেশ অমান্য করা শুধু একজন অসুস্থ মানুষের কথা না শোনা নয়; সেটি আল্লাহর নির্দেশ-ব্যবস্থাকেই অগ্রাহ্য করার পর্যায়ে পড়ে। তাই কাগজ-কলম ঘটনায় উমরের অবস্থানকে “বাস্তববুদ্ধি” বা “করুণা” বলে নরম করা যায় না। ইসলামের নিজের নীতি অনুযায়ী, নবীর নির্দেশ অসুস্থ অবস্থাতেও বাধ্যতামূলক। সেই মানদণ্ডে উমরের “কোরআনই যথেষ্ট” বক্তব্য সরাসরি নবী-আনুগত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

অর্থাৎ নবীকে শুধু কোরআনের বাহক বলা হয়নি; তাকে কোরআনের পাশাপাশি সুন্নাহপ্রদত্ত আইনদাতা হিসেবেও দেখানো হয়েছে। এমনকি এমন ব্যক্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে, যে আরামকেদারায় বসে বলবে, “আমাদের জন্য কোরআনই যথেষ্ট।” এই ভাষাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উমরের কাগজ-কলম ঘটনার বক্তব্যই ছিল: “আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব আছে, সেটাই যথেষ্ট।” অর্থাৎ যে মনোভাবকে পরবর্তী হাদিসসমূহে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করে, মৃত্যুশয্যার ঘটনায় উমর কার্যত সেই মনোভাবই প্রকাশ করেছিলেন।

অতএব এই প্রবন্ধে উমরকে বাইরের কোনো নাস্তিক, মানবতাবাদী বা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ মানদণ্ডে প্রথমে বিচার করা হচ্ছে না। প্রথমে বিচার করা হচ্ছে ইসলামের নিজের ঘোষিত নীতির আলোকে। ইসলাম যদি বলে রাসূলের নির্দেশ অমান্য করা যাবে না, তাহলে উমরের কাগজ-কলম বাধা দেওয়া কী? ইসলাম যদি বলে রাসূল যা বৈধ করেছেন তা গ্রহণ করতে হবে, তাহলে মুতআ বা তামাত্তু নিয়ে উমরের নিষেধাজ্ঞার অবস্থান কী? ইসলাম যদি বলে কোরআন পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট, তাহলে উত্তরাধিকার আইনে আউল নামের মানবীয় গাণিতিক প্যাচ কেন দরকার হলো? ইসলাম যদি নবীর যুগকে শ্রেষ্ঠ যুগ বলে, তাহলে উম্মে ওয়ালাদ বিক্রি করার নবী-যুগীয় বাস্তবতা পরে উমর এসে বদলালে, নবীর যুগের নৈতিকতা কোথায় দাঁড়ায়?

এই প্রশ্নগুলো এড়াতে ধর্মতত্ত্ববিদরা সাধারণত “উমরের ইজতিহাদ”, “উমরের ফজিলত”, “উমরের মুওয়াফাকাত”, “উমরের দূরদর্শিতা” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন। কিন্তু এগুলো আসলে ব্যাখ্যা নয়; এগুলো ভাষাগত পালিশ। একই কাজ সাধারণ মুসলমান করলে অপরাধ, আর উমর করলে ফজিলত, এটি কোনো নৈতিক নীতি নয়, এটি ক্ষমতাবান ব্যক্তির জন্য বিশেষ ছাড়। ধর্মীয় ভাষায় এই ছাড়কে যতই পবিত্র করা হোক, যুক্তির ভাষায় এর নাম দ্বৈতনীতি।

সুতরাং পরবর্তী আলোচনাগুলোতে একটি কঠোর কিন্তু ন্যায্য মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে: উমরের কাজগুলো কি কোরআনের ঘোষিত আনুগত্যনীতির সঙ্গে মিলে? নবীর প্রত্যক্ষ নির্দেশের সঙ্গে মিলে? নবী-যুগের প্রচলিত আইনের সঙ্গে মিলে? ইসলামি উৎসে বর্ণিত ঐশ্বরিক বিধানের সঙ্গে মিলে? যদি না মিলে, তাহলে সেগুলোকে “ফজিলত” বলে ধুয়ে-মুছে দেওয়া যাবে না। তখন সেগুলোকে বলতে হবে—অমান্যতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মানবীয় সংশোধন, ক্ষমতার প্রয়োগ, কিংবা ইসলামী আইনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা।

এই মানদণ্ড স্থাপন করলেই উমরের চরিত্র নিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় রোম্যান্টিকতার ভিত্তি যুক্তিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। তখন দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস কোনো সরল পবিত্রতার ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতা, আনুগত্য, আপস, চাপ, নীতির পরিবর্তন এবং ধর্মীয় ভাষায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বৈধ করার ইতিহাস। উমর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর একজন, একজন এমন চরিত্র, যার সামনে বহুবার কোরআন, নবী, সুন্নাহ ও শরিয়তের কথিত চূড়ান্ততা বাস্তব ক্ষমতার পরীক্ষায় নরম হয়ে গেছে।


সাহাবী-আদালত: সত্য গোপনের ধর্মীয় লাইসেন্স

সাহাবীদের ‘আদালত’ ধারণাটি ইসলামী ইতিহাসচর্চার ওপর চাপানো সবচেয়ে বড় সেন্সরশিপগুলোর একটি। এই ধারণার মূল কাজ সত্য অনুসন্ধান নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রকে সমালোচনার বাইরে সরিয়ে নেওয়া। যারা নবীর পাশে ছিল, যারা ইসলামের প্রথম যুগের রাজনীতি, যুদ্ধ, দাসপ্রথা, নারী-নীতি, শাস্তিবিধি, খিলাফত, সম্পদ-বণ্টন ও ক্ষমতার সংঘাতে সরাসরি জড়িত ছিল, তাদের কর্মকাণ্ডকে যদি প্রশ্নহীন মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না। সেটি হয়ে যায় ধর্মীয় প্রচারণা।

এই নীতির সবচেয়ে কুৎসিত দিক হলো, এটি নৈতিকতার বদলে পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়। একজন মানুষ কী করেছে, তা মুখ্য নয়; সে “সাহাবী” কি না, সেটিই মুখ্য। একই কাজ একজন সাধারণ মুসলমান করলে তাকে বলা হবে বিদ্রোহী, ফাসিক, অবাধ্য, মুনাফিক বা কুফরি আচরণকারী। কিন্তু একই কাজ কোনো বড় সাহাবী করলে তা হয়ে যায় ইজতিহাদ, হিকমত, ফজিলত, দূরদর্শিতা, কখনও আবার আল্লাহর সঙ্গে তার মতের মিল। এই বিচারপদ্ধতি ন্যায় নয়। এটি খোলাখুলি দলীয় পক্ষপাত। আরও সরাসরি বললে, এটি ধর্মীয় ভাষায় সাজানো ঐতিহাসিক দুর্নীতি।

সাহাবীদের দোষ গোপন করার যে সংস্কৃতি প্রচার করা হয়, সেটি মূলত মুসলমানদের সমালোচনাশক্তি ধ্বংস করার পদ্ধতি। বলা হয়, সাহাবীদের ভুল নিয়ে আলোচনা করা যাবে না, তাদের অন্তর নিয়ে সন্দেহ করা যাবে না, তাদের সমালোচনা করলে ঈমান নষ্ট হবে, ফিতনা ছড়াবে, উম্মাহ বিভক্ত হবে। এই যুক্তিগুলো শুনতে ধার্মিক মনে হলেও আসলে এগুলো ক্ষমতাধর মৃত ব্যক্তিদের জন্য নৈতিক দায়মুক্তি তৈরির ব্যবস্থা। যারা ইতিহাসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আইন বানিয়েছে, নারী ও দাসের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেছে, যুদ্ধ চালিয়েছে, বিরোধীদের দমন করেছে, তাদের সমালোচনা বন্ধ করে দিলে অপরাধের বিচার অসম্ভব হয়ে যায়।

ভূমিকায় উদ্ধৃত বক্তব্যে যেমন দেখা গেছে, সাহাবীদের দোষ গোপন করার সংস্কৃতিকে ইসলামি পরিসরে সরাসরি উৎসাহ দেওয়া হয়। এই নীতি কোনো নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা নয়; এটি ক্ষমতাধর ধর্মীয় চরিত্রদের দায়মুক্তি দেওয়ার মতাদর্শিক ব্যবস্থা।

প্রশ্ন হলো, দোষ যদি সত্যিই দোষ হয়, তাহলে সেটি গোপন করার ধর্মীয় দরকার কী? সত্য যদি সাহাবীদের পক্ষে থাকে, তাহলে সমালোচনার ভয় কেন? আর যদি সমালোচনা করলেই তাদের চরিত্র, সিদ্ধান্ত, ক্ষমতালিপ্সা, সহিংসতা বা দ্বৈতনীতি সামনে আসে, তাহলে সমস্যা সমালোচকের নয়; সমস্যা সেই ইতিহাসের। “দোষ গোপন করো” নীতিটি তাই কোনো উচ্চ নৈতিকতা নয়। এটি সত্যের বিরুদ্ধে ইমানি সেন্সরশিপ। এটি মুসলমানদের বলে দেয়, ইতিহাস জানতে চেও না; শুধু ভক্তি করো। বিচার করতে চেও না; শুধু মাথা নত করো। প্রশ্ন করো না; কারণ প্রশ্ন করলে পবিত্রতার মুখোশ নোংরা হয়ে যাবে।

উমর ইবনুল খাত্তাবের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও তীব্র। কারণ তিনি শুধু একজন ধর্মীয় অনুসারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তি, খলিফা, আইন-প্রয়োগকারী, সামরিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং বহু পরবর্তী ইসলামী আইনের বাস্তব উৎস। তার সিদ্ধান্ত বহু ক্ষেত্রে কোরআন, নবীর আমল, নবী-যুগের প্রথা এবং ইসলামি আইনচর্চার ওপর প্রভাব ফেলেছে। তাই তাকে সমালোচনার বাইরে রাখা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়; ইসলামী আইন ও ইতিহাসের একটি বড় অংশকে গবেষণার বাইরে সরিয়ে রাখা। এটি জ্ঞানচর্চা নয়। এটি মতাদর্শিক পাহারাদারি।

সাহাবী-আদালত ধারণা মুসলিম জনসাধারণকে একটি বিপজ্জনক মানসিক অভ্যাসে অভ্যস্ত করে। তারা শিখে, ক্ষমতাবান ধর্মীয় চরিত্রের ভুলকে ভুল বলা যাবে না। তার বদলে ব্যাখ্যা বানাতে হবে। যদি উমর নবীর সিদ্ধান্তে আপত্তি করেন, বলা হবে তিনি দূরদর্শী ছিলেন। যদি উমর নবীর যুগের বৈধ প্রথা নিষিদ্ধ করেন, বলা হবে তিনি শরিয়তের মঙ্গল বুঝেছিলেন। যদি উমরের মতের সঙ্গে পরে ওহী মিলে যায়, বলা হবে আল্লাহ তার সঙ্গে একমত হয়েছেন। যদি তিনি নারীদের চলাচলে চাপ সৃষ্টি করেন, বলা হবে তিনি পবিত্রতা চেয়েছিলেন। এইভাবে নৈতিক বিচারকে ধ্বংস করে ফেলা হয়, আর তার জায়গায় বসানো হয় ব্যক্তিপূজা।

এটি শুধু ইতিহাসের সমস্যা নয়; এটি বর্তমান সমাজেরও সমস্যা। কারণ যে সমাজ সাহাবীদের সমালোচনা সহ্য করতে শেখে না, সে সমাজ ধর্মীয় ক্ষমতাকেও সমালোচনা করতে শেখে না। তখন আলেম, খলিফা, নবী, ইমাম, মুজতাহিদ, দলীয় নেতা সবাই ক্রমে প্রশ্নের বাইরে চলে যায়। সত্যের বদলে আনুগত্য, যুক্তির বদলে ভয়, ন্যায়ের বদলে পক্ষপাত, এবং গবেষণার বদলে মুখস্থ ভক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সাহাবী-আদালত ধারণা তাই শুধু অতীতকে বিকৃত করে না; এটি বর্তমানের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকেও বিষাক্ত করে।

এই প্রবন্ধ সেই নীতিকে প্রত্যাখ্যান করছে। উমর সাহাবী ছিলেন কি না, সেটি নৈতিক দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। তিনি নবীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন কি না, সেটি তার কাজের সমালোচনা বন্ধ করতে পারে না। তিনি খলিফা ছিলেন কি না, সেটি তার আইনগত হস্তক্ষেপকে পবিত্র করে না। তিনি মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছেন কি না, সেটি কোরআন ও নবীর নির্দেশের সঙ্গে তার সংঘাত মুছে দেয় না। ইতিহাসের আদালতে পরিচয় নয়, কাজ বিচার্য। আর উমরের কাজগুলো ইসলামি উৎসের আলোতেই বিচার করলে দেখা যায়, প্রচলিত ধর্মীয় মহিমান্বয়ন আসলে যুক্তিহীন, পক্ষপাতদুষ্ট এবং গভীরভাবে অসৎ।

সুতরাং সাহাবী-সমালোচনা নিষিদ্ধ করার দাবি আসলে সত্যকে ভয় পাওয়ার দাবি। যে ইতিহাস আলো সহ্য করতে পারে না, তাকে পবিত্র বলা যায় না। যে চরিত্রকে প্রশ্ন থেকে বাঁচাতে হয়, তাকে নৈতিক আদর্শ বলা যায় না। আর যে ধর্মতত্ত্ব নিজের প্রথম যুগের মানুষদের ন্যায়বিচারের সাধারণ মানদণ্ডে বিচার করতে দেয় না, সেটি সত্যের প্রতি অনুগত নয়; সেটি ক্ষমতার প্রতি অনুগত। এই কারণেই উমরকে বিচার করা জরুরি। কারণ উমরকে বিচার করা মানে শুধু একজন সাহাবীকে বিচার করা নয়; ইসলামী ইতিহাসের পবিত্রতার দাবিকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।


উমর-কেন্দ্রিক ওহী: আল্লাহর সঙ্গে ঐকমত্য, নাকি উমরের মন রক্ষা?

উমর ইবনুল খাত্তাবকে ঘিরে সুন্নি ধর্মতত্ত্বে একটি বিশেষ ধারণা প্রচলিত আছে, যার নাম “মুওয়াফাকাতে উমর”। অর্থাৎ উমরের মত, ইচ্ছা বা দাবি পরে আল্লাহর ওহীর সঙ্গে মিলে গেছে। ধর্মীয় ভাষায় এটিকে উমরের ফজিলত ও হিকমত হিসেবে দেখানো হয়। বলা হয়, উমরের অন্তর্দৃষ্টি এত প্রবল ছিল যে আল্লাহর বিধান তার মতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে নাজিল হয়েছে। কিন্তু এই দাবিকে ভক্তির চোখে না দেখে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের চোখে দেখলে চিত্রটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর। প্রশ্ন দাঁড়ায়, আল্লাহর ওহী কি সত্যিই স্বাধীন ঐশ্বরিক সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি প্রভাবশালী সাহাবীর চাপ, পছন্দ, অস্বস্তি ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এক পরিবর্তনশীল ধর্মীয় ভাষ্য?

উমর নিজেই বর্ণনা করেছেন যে তিনটি বিষয়ে তার মতের সঙ্গে তার প্রতিপালকের মত মিলে গেছে। মাকামে ইবরাহিমকে নামাজের স্থান করা, নবীর স্ত্রীদের পর্দার বিধান, এবং নবীর স্ত্রীদের ব্যাপারে তার বক্তব্যের সঙ্গে মিল রেখে আয়াত নাজিল হওয়া। সুন্নি বয়ানে এই ঘটনাগুলোকে উমরের বিশেষ মর্যাদা হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু এই বর্ণনাকে সমালোচনামূলকভাবে পড়লে দেখা যায়, এখানে ওহীর চরিত্রই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সর্বজ্ঞানী আল্লাহ আগে থেকে বিধান জানতেন না, পরে উমরের পরামর্শে বিধান দিলেন? নাকি উমর সমাজে এত শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন যে তার চাপকে “আল্লাহর সিদ্ধান্ত” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হলো? [12]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮/ সালাত
‏পরিচ্ছদঃ ২৭৩। কিবলা সম্পর্কে বর্ণনা।
৩৯৩। আমার ইবনু ‘আওন (রহঃ) …. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমর (রাঃ) বলেছেনঃ তিনটি বিষয়ে আমার অভিমত আল্লাহর অহির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা যদি মাকামে ইবরাহীম কে সালাতের স্থান বানাতে পারতাম! তখন এ আয়াত নাযিল হয়ঃ (وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى‏) “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও” (২ : ১২৫)
(দ্বিতীয়) পর্দার আয়াত, আমি বললামঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যদি আপনার সহধর্মিনীগনকে পর্দার আদেশ করতেন! কেননা, সৎ ও অসৎ সবাই তাদের সাথে কথা বলে। তখন পর্দার আয়াত নাযিল হয়।
আর একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ অভিমান সহকারে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। তখন আমি তাদেরকে বললামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তোমাদের তালাক দেয়, তাহলে তাঁর রব তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। (৬৬ : ৫) তখন এ আয়াত নাযিল হয়।

(অপর সনদে ইবন আবু মারয়াম (রহঃ) …. আনাস (রাঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

লক্ষণীয় যে, উমরের পরামর্শ আর সেই মহাবিশ্বের শুরুতে লাওহে মাহফুজে লিখে রাখা আল্লাহ পাকের আয়াতের মধ্যে প্রচণ্ড মিল! আসুন বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ নসরুল বারীতে এই বিষয়ে কী বলা আছে জেনে নেয়া যাক, [13]

১০. মুসাদ্দাদ র……… হযরত আনাস রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর রা বলেছেন, তিনিটি ক্ষেত্রে আমার মতামত আল্লাহর ওহীর অনুরূপ হয়েছে (অর্থাৎ, পরবর্তীতে যে হুকুম অবতীণ হবে আমার রায় পূর্বেই সেটির অনকুল হয়ে গেছে) অথবা (রাবীর সন্দেহ) তিনি বলেছেন, তিনটি বিষয়ে আমার মতামতের অনুকুলে আমার রব ওহী নাযিল করেছেন। (অর্থাৎ, এ তিনটি বিষয়ের হুকুম আল্লাহ তাআলা যেভাবে নির্ধারন করেছেন, সেহুকুম নাযিল করার পূর্বে সেভাবেই আমার অন্তরে ইলহাম হয়েছে, আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রকাশ করেছি।) তাহল, আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আপনি মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান হিসাবে গ্রহণ করতেন )অর্থাৎ, তাওয়াফের পর)। এ বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা আয়াত নাযিল করেন…. )۱۲۵( وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাযের স্থান বানাও।”
তিনি আরো বলেন, আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার নিকট নেককার বদকার সব লোকই যাতায়াত করতে থাকে। যদি আপনি উম্মুল মুমিনীনগনকে পরদার নির্দেশ দিতেন! তখন অবতীর্ণ হয় পরদার আয়াত। উমর রা. বলেন, আমি জানতে পেরেছিলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কিছুসংখ্যক স্ত্রীর (হযরত আয়েশা ও হাফসা রা.-এর) প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তখন আমি তাদের (পবিত্র স্ত্রীগনের) কাছে উপস্থিত হই, এবং বলি যে, তোমরা এর থেকে বিরত হবে অথবা আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমাদের চেয়েও উত্তম স্ত্রী প্রদান করবেন। এরপর (পরবর্তীতে) আমি তাঁর কোন এক স্ত্রীর কাছে আসি, তখন তিনি বললেন, উমর! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীগণকে নসিহত করে থাকেন আর এখন তুমি তাদের উপদেশ দিতে আরম্ভ করেছ? (অর্থাৎ, হযরত উম্মে সালামা রা. -এর নিকট আসলে তিনি বলতে লাগলেন, উমর! তুমি নসীহত করতে এসেছ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কি এতটুকু জ্ঞান ও গুরুত্বারোপ নেই যে, তিনি স্ত্রীদের নসীহত করবেন!) অর্থাৎ, হযরত উম্মে সালামা রা. হযরত উমর রা. এর নসীহতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন যে, উমর! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এতো নসীহত করেন না, যতটা তুমি করতে থাক!) পরিশেষে আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করেন: عَسَى رَبُّهُ إِنْ طَلْقَكُنَّ أَنْ يُبَدِّلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ مُسْلِمات টা “নবী যদি তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তার রব সম্ভবত তোমাদের স্থলে তাঁকে দিবেন তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আত্মসমর্পণকারী বাধ্যগত……..।” -৬৬: ৫
যেসব বিষয়ে হযরত উমর রা. এর অনুকুল ওহী এসেছে
এ হাদীসে উমর রা. এর অনুকূল ওহীর ক্ষেত্র তিনটি বর্ণিত হয়েছে। বস্তুত হযরত উমর রা. এর অনুকূল ওহীর ক্ষেত্র আরো বর্ণিত হয়েছে। যথা ১. বদর যুদ্ধবন্ধীদের সম্পর্কে মুক্তিপণ না নেয়ার রায়। এর উপর আয়াত নাযিল হয়েছে 1 150 151 ….. مَا كَانَ لَنَبِي أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرِي حَتَّى يُنْخِنَ فِي الْأَرْضِ
২. মুনাফিকদের জানাযা আদায়ে বারণ। এ সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে- وَلَاتُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا
-সূরা তাওবা। মোটকথা, কুরআন হাদীসে তালাশ করলে পাওয়া যায় যে, অনেক ক্ষেত্রেই উমর রা. এর সমর্থনে ওহী নাযিল হয়েছে।
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী র.বলেন, উলামায়ে কেরাম উমর রা. এর মুয়াফাকাত গণনা করে ২০টির মত স্থান
পেয়েছেন। -ফয়যুল বারী-৪/১৫৭
কেউ কেউ ২১টি ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন- আল্লামা সুয়ূতী র. তারীখুল খুলাফায় বর্ণনা করেছেন।
-বুখারীর হাশিয়া: পৃষ্ঠা ৫৮
ثلاث في وافقت : বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ কিরমানীতে আছে, এর অর্থ হল وافقی ربی অর্থাৎ, আমার প্রভু তিন স্থানে আমার সমর্থন করেছেন। কিন্তু আদবের প্রতি লক্ষ্য করে موافقت বা আনুকুল্যের অথবা সমর্থনের সম্বোধন করেছেন নিজের দিকে। হাশিয়ায়ে বুখারী: ৫৮।
وَقَالَ ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ أَخْبَرَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنِي حُمَيْدٌ سَمِعْتُ أَنَسًا عَنْ عُمَرَ মুহাম্মদ ইবনে হাকাম ইবনে আবু মরিয়ম মিসরী) র. ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ূব-হুমাইদ- আনাস রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, উমর রা. আমার কাছে এরূপ বলেছেন।
ব্যাখ্যা: ইমাম বুখারী র. কিতাবুস সালাতের ৫৮ পৃষ্ঠায় আলোচনা করতে গিয়ে এ বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। وَقَالَ ابْنُ أَبِي مَريم الخ وابو عبد الله هو البخاري وقال أبو عبد الله – Cat a face at E

কুফরি
কুফরি 1

এই ঘটনাগুলোর মধ্যে পর্দার বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উমর বারবার নবীকে বলতেন, আপনার স্ত্রীদের পর্দার বিধান দিন। নবী প্রথমে তা করেননি। পরে উমর নবীর স্ত্রী সাওদাকে বাইরে চিহ্নিত করে ডেকে অপমান করেন। এরপর পর্দা-সংক্রান্ত ওহী নাজিল হয় বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। ধর্মীয় বয়ান এটিকে আল্লাহর বিধান হিসেবে পেশ করে, কিন্তু ঘটনাক্রমে দেখা যায়, একজন পুরুষ সাহাবীর নারীর চলাচল, দেহ, পরিচয় ও দৃশ্যমানতা নিয়ে অস্বস্তি ও চাপই শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় বিধানের রূপ পেয়েছে। এটি কোনো মুক্ত নৈতিকতা নয়। এটি পিতৃতান্ত্রিক নজরদারিকে ওহীর ভাষায় বৈধ করার প্রক্রিয়া।

এখানে একটি নির্মম প্রশ্ন ওঠে: নবীর স্ত্রীরা মানুষ ছিলেন, নাকি উমরের পর্দা-আকাঙ্ক্ষার পরীক্ষাগার? একজন নারী প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যাবে, তার শরীরের গঠন দেখে তাকে চিনে ফেলা যাবে, তাই তাকে লজ্জিত করতে হবে, পথ আটকে দিতে হবে, তারপর সেই সামাজিক অপমানকে ধর্মীয় বিধান দিয়ে স্থায়ী করতে হবে। এটিই যদি “উমরের ফজিলত” হয়, তাহলে সেই ফজিলতের অর্থ দাঁড়ায় নারীর স্বাধীন চলাচলের ওপর পুরুষতান্ত্রিক পুলিশি নজরদারি। ধর্মতত্ত্ব এটিকে পবিত্র বললেও যুক্তির ভাষায় এর নাম নিছক পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা।

মাকামে ইবরাহিমের ঘটনাও একই সমস্যার আরেক রূপ। উমর কোনো স্থানকে নামাজের জায়গা করার প্রস্তাব দেন, পরে ওহী তার সঙ্গে মিলে যায়। প্রশ্ন হলো, সর্বজ্ঞানী আল্লাহ কি নিজে জানতেন না কোন স্থানকে নামাজের স্থান করা উচিত? যদি জানতেন, তাহলে উমরের পরামর্শের অপেক্ষা কেন? আর যদি উমরের পরামর্শই বিধান নাজিলের কার্যকর কারণ হয়, তাহলে ওহীর স্বাধীনতা কোথায়? ইসলামি বয়ান এই প্রশ্ন এড়িয়ে উমরের মর্যাদা প্রচার করে, কিন্তু যুক্তিসঙ্গত পাঠে এটি ঐশ্বরিক বিধানের ওপর মানবীয় প্রভাবের সরাসরি ইঙ্গিত দেয়।

নবীর স্ত্রীদের প্রসঙ্গে উমরের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রেখে আয়াত নাজিলের ঘটনাও একই ধরনের। ইসলামি ভাষ্য অনুযায়ী, নবীর স্ত্রীদের সতর্ক করা বা তাদের পরিবর্তে উত্তম স্ত্রী দেওয়ার প্রসঙ্গেও উমরের বক্তব্যের সঙ্গে ওহীর মিল পাওয়া যায়। এই বর্ণনাগুলোতে আল্লাহ যেন উমরের ভাষাকে অনুমোদনকারী এক ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ মাত্র। উমর আগে বলেন, আল্লাহ পরে তা ওহী হিসেবে নামান। এ ধরনের ধারাবাহিকতা ভক্তের কাছে অলৌকিক মনে হতে পারে, কিন্তু সমালোচকের কাছে এটি ওহীর মানবীয় উৎপত্তি, সামাজিক চাপ এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা-রাজনীতির স্পষ্ট চিহ্ন। [14]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌ তা’আলার বাণীঃ لا تدخلوا … عند الله عظيما হে মু’মিনগণ! তোমরা খাওয়ার জন্য খাবার প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নাবীর ঘরে তোমাদেরকে অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত প্রবেশ করবে না; তবে তোমাদেরকে ডাকা হলে তোমরা প্রবেশ করবে এবং খাওয়া শেষ হলে নিজেরাই চলে যাবে, কথাবার্তায় মাশগুল হয়ে পড়বে না। তোমাদের এ আচরণ অবশ্যই নাবীকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। তোমরা যখন তাঁর পত্নীদের নিকট হতে কোন কিছু চাইবে, তখন পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র উপায়। আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের কারও পক্ষে কখনও বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে সাংঘাতিক অপরাধ। বলা হয় إِنَاهُ খাদ্য পরিপাক হওয়া। এটা أَنَى يَأْنِيْ أَنَاةًথেকে গঠিত। لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُوْنُ قَرِيْبًا সম্ভবত ক্বিয়ামাত অতি নিকটবর্তী। যদি তুমি স্ত্রী লিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার কর, তবে قَرِيْبَةً বলবে। আর যদি الصِّفَةَ না ধর ظَرْفًا বা بَدَلًا হিসেবে ব্যবহার কর তবে ‘তা’ নিয়ে যুক্ত করবে না। তেমনি এ শব্দটি একবচন, দ্বি-বচন, বহুবচন এবং নারী-পুরুষ সকল ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৪৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৭৯৫
৪৪৩২। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর সাওদা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যান। সাওদা এমন মোটা শরীরের অধিকারিণী ছিলেন যে, পরিচিত লোকদের থেকে তিনি নিজকে গোপন রাখতে পারতেন না। উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) তাঁকে দেখে বললেন, হে সাওদা! জেনে রাখ, আল্লাহর কসম, আমাদের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকতে পারবে না। এখন দেখ তো, কেমন করে বাইরে যাবে? আয়িশা (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) সাওদা (রাঃ) ফিরে আসলেন। আর এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে রাতের খানা খাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল টুকরা হাড়। সাওদা (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম। তখন উমর (রাঃ) আমাকে এমন এমন কথা বলেছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ সময় আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নিকট ওহী নাযিল করেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়া শেষ হল, হাড় টুকরা তখনও তাঁর হাতেই ছিল, তিনি তা রাখেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই প্রয়োজনে তোমাদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

আরও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো মুনাফিকের জানাজা প্রসঙ্গ। বর্ণনায় দেখা যায়, নবী আব্দুল্লাহ ইবন উবাইয়ের জানাজা পড়াতে গেলে উমর বাধা দেন বা আপত্তি করেন। পরে এমন আয়াত নাজিল হয় যেখানে মুনাফিকদের জানাজা পড়তে নিষেধ করা হয়। এখানেও একই প্যাটার্ন। নবী একটি কাজ করতে যাচ্ছেন, উমর আপত্তি করছেন, পরে ওহী উমরের অবস্থানের দিকে সরে যাচ্ছে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা এটিকে উমরের দূরদর্শিতা বলবে। কিন্তু সমালোচনামূলক প্রশ্ন হলো, নবীর সিদ্ধান্ত কি তখন ভুল ছিল? যদি নবী ভুল পথে এগোচ্ছিলেন, তাহলে নবীর নৈতিক ও আইনগত কর্তৃত্ব কোথায়? আর যদি নবী ভুল না হন, তাহলে উমরের আপত্তির সঙ্গে আল্লাহর পরবর্তী ওহীর মিল কেন? [15]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২০/ জানাযা
পরিচ্ছেদঃ ৮৬৭. মুনাফিকদের জানাযার সালাত আদায় করা এবং মুশরিকদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা মাকরূহ হওয়া।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১২৮২ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৩৬৬
رَوَاهُ ابْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
(আব্দুল্লাহ) ইবনে উমর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিষয়টি রেওয়ায়েত করেছেন।
১২৮২। ইয়াহইয়া ইবনু বুকাইর (রহঃ) … উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মুনাফিক সর্দার) আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালূল* মারা গেলে তার জানাযার সালাতের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আহবান করা হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে) দাঁড়ালে আমি দ্রুত তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি ইবনু উবাই-এর জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতে যাচ্ছেন? অথচ সে অমুক অমুক দিন (আপনার শানে এবং ঈমানদারদের সম্পর্কে) এই এই কথা বলেছে। এ বলে আমি তার উক্তিগুলো গুনেগুনে পুনরাবৃত্তি করলাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, উমর, সরে যাও! আমি বারবার আপত্তি করলে তিনি বললেন, আমাকে (তার সালাত আদায় করার ব্যাপারে) ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। কাজেই আমি তা গ্রহণ করলাম। আমি যদি জানতাম যে, সত্তর বারের অধিক মাগফিরাত কামনা করলে তাকে মাফ করা হবে তা হলে আমি অবশ্যই তার চাইতে অধিক বার মাফ চাইতাম।
উমর (রাঃ) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারা জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন এবং ফিরে আসেন। এর কিছুক্ষণ পরেই সূরা বারাআতের এ দু’টি আয়াত নাযিল হলঃ ‏وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا‏)‏ إِلَى ‏(‏وَهُمْ فَاسِقُونَ‏ তাদের কেউ মারা গেলে আপনি কখনো তার জানাযার সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করবেন না। এমতাবস্থায় যে তারা ফাসিক। (সূরা তাওবাঃ ৮৪)
রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে আমার ঐ দিনের দুঃসাহসিক আচরণ করায় আমি বিস্মিত হয়েছি। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই সমধিক অবগত।
* মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ‌র পিতার নাম ছিল উবাই, আর মাতার নাম ছিল সালূল। তাই তাকে ইবনু সালূলও বলা হত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

এইসব ঘটনাকে আলাদা আলাদা “মহিমা” হিসেবে দেখালে মূল প্যাটার্নটি আড়াল থাকে। কিন্তু একত্রে রাখলে ছবিটি পরিষ্কার। উমরের মত, অস্বস্তি, সামাজিক চাপ, পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বা রাজনৈতিক অবস্থান বারবার ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে মিলে গেছে। এই মিল যদি একবার হতো, তাকে কাকতাল বলা যেত। দুইবার হলে তাকে আকর্ষণীয় ঘটনা বলা যেত। কিন্তু বারবার একই প্রবণতা দেখা গেলে প্রশ্ন করা বাধ্যতামূলক: ওহী কি আল্লাহর কাছ থেকে নেমেছে, নাকি উমরের মতো ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক প্রভাব ও রাজনৈতিক অবস্থানকে ধর্মীয় ভাষায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে?

ধর্মীয় বয়ানে উমর আল্লাহর সঙ্গে একমত হন না; বরং আল্লাহ উমরের সঙ্গে একমত হন। এই ভাষাটিই অস্বাভাবিক। একজন সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, অনাদি সত্তার বিধান যদি এক মানুষের মতামতের পরে এসে সেই মতামতকে বৈধ করে, তাহলে তা ঐশ্বরিক সর্বজ্ঞতার প্রমাণ নয়। বরং তা দেখায়, ওহী নামে প্রচারিত বিধানগুলো বাস্তব সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে দরকষাকষি করছিল। উমর সেই দরকষাকষির অন্যতম শক্তিশালী অংশগ্রহণকারী ছিলেন।

এখানে উমরের নৈতিক সমস্যা যেমন আছে, তেমনি ওহীর ধারণাতেও গুরুতর সমস্যা আছে। উমর যদি সত্যিই আল্লাহর বিধানের আগে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, আল্লাহর বিধান আগে নাজিল হলো না কেন? আর যদি আল্লাহ উমরের চাপ বা মতের পরে বিধান নাজিল করেন, তাহলে ওহীকে স্বাধীন, চিরন্তন, সর্বজ্ঞ পরিকল্পনা বলা কঠিন। এই অবস্থায় ওহীকে বরং ক্ষমতাবান পুরুষদের দাবি, সামাজিক টানাপোড়েন, যৌননীতি, পর্দা-রাজনীতি এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে অভিযোজিত এক ধর্মীয় ভাষ্য হিসেবে দেখতে হয়।

এই কারণেই “মুওয়াফাকাতে উমর” কোনো নিরীহ ফজিলতের তালিকা নয়। এটি ইসলামী ওহী-ধারণার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য। এটি দেখায়, আল্লাহর নামে প্রচারিত বিধানগুলো বাস্তবে মানবসমাজের ক্ষমতাসম্পর্ক থেকে মুক্ত ছিল না। উমর সেখানে শুধু অনুসারী নন; তিনি ছিলেন বিধান-প্রক্রিয়াকে প্রভাবিতকারী চরিত্র। তার ব্যক্তিগত অস্বস্তি কখনও পর্দা হয়ে গেছে, তার স্থান-প্রস্তাব ইবাদতের অংশ হয়েছে, তার রাজনৈতিক আপত্তি নবীর সিদ্ধান্তকে সংশোধন করেছে, তার বক্তব্য নারীদের ওপর ধর্মীয় চাপ বাড়িয়েছে। এটিকে ফজিলত বলা যায় কেবল তখনই, যখন ক্ষমতাকে নৈতিকতার উপরে বসানো হয়।

সুতরাং উমর-কেন্দ্রিক ওহীর ধারণা আসলে ইসলামের পবিত্র ইতিহাসের ভেতরে রাখা এক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি। এটি বলে দেয়, আদি ইসলামী বিধান কেবল আকাশ থেকে নেমে আসা নিখুঁত আইন নয়; তা ছিল মানুষের শরীর, পুরুষের ঈর্ষা, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক হিসাব, ক্ষমতাবান সাহাবীর মতামত এবং নবী-পরিবেশের বাস্তব টানাপোড়েনের সঙ্গে গঠিত। উমরকে যতই মহিমান্বিত করা হোক, এই সত্য অস্বীকার করা যায় না যে তার ইচ্ছা ও চাপ বহুবার ধর্মীয় বিধানের ভাষা পেয়েছে। আর এটি কোনো ঐশ্বরিক মহিমা নয়; এটি ধর্মীয় ভাষায় ক্ষমতার বৈধতা নির্মাণ।


রোজার রাতে সহবাস: বিধান ভাঙলেন উমর, আইন বদলালেন আল্লাহ

ইসলামী আইনকে সাধারণত আসমানি, নিখুঁত, সর্বজ্ঞ সত্তার প্রদত্ত বিধান হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু ইসলামের প্রাথমিক বিধানগুলোর ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, বহু ক্ষেত্রে এই আইন ছিল সাহাবীদের মধ্যে পরীক্ষামূলক, মাঝে মাঝে অকার্যকর, মানুষের বাস্তব আচরণের সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ এবং প্রভাবশালী সাহাবীদের চাপের সামনে পরিবর্তনশীল। রমজানের রাতে সহবাস ও পানাহারের বিধান সেই সমস্যার এক নগ্ন উদাহরণ। প্রাথমিক অবস্থায় রোজার বিধান ছিল কঠোর: কেউ ইশার নামাজের পরে বা ঘুমিয়ে পড়ার পরে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করতে পারত না। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল, কিন্তু মুসলমানদের বড় অংশ সেটি মানতে ব্যর্থ হয়। বিশেষভাবে উমর ইবনুল খাত্তাবের ঘটনাকে তাফসির ও বর্ণনা-সাহিত্যে এই বিধান পরিবর্তনের প্রধান পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ একটি বিধান দিলেন। সেই বিধান মুসলমানদের ওপর কার্যকর হলো। এরপর দেখা গেল, খোদ নবীর ঘনিষ্ঠ সাহাবীরাই তা মানতে পারছেন না। উমর নিজের প্রবৃত্তি দমন করতে পারলেন না; স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছেন জানার পরও তিনি সহবাস করলেন। পরে তিনি নবীর কাছে গিয়ে নিজের কাজ স্বীকার করেন। কোরআন নিজেই এই অবস্থাকে “নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত” বা আত্মপ্রতারণা বলে উল্লেখ করে। অর্থাৎ এটি কোনো নিরীহ ভুল ছিল না। এটি কার্যকর ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন। অথচ ফল কী হলো? উমর বা অন্য সাহাবীদের ওপর কঠোর শাস্তি এল না; বরং আল্লাহ নিজেই বিধান বদলে দিলেন। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলো, রাতের বেলা স্ত্রী সহবাস বৈধ হলো, পানাহারের সময়সীমাও সহজ হলো।

আসুন কোরআনের সূরা বাকারার আয়াতটি পড়ি, [16]

তোমাদের জন্য রমাযানের রাতে তোমাদের বিবিগণের নিকট গমন করা জায়িয করা হয়েছে, তারা তোমাদের আচ্ছাদন আর তোমরা তাদের আচ্ছাদন। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিলেন। অতএব, এখন থেকে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু বিধিবদ্ধ করেছেন তা লাভ কর এবং তোমরা আহার ও পান করতে থাক যে পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো রেখা হতে ঊষাকালের সাদা রেখা প্রকাশ না পায়। তৎপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর, আর মাসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় তাদের সাথে সহবাস করো না। এসব আল্লাহর আইন, কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না। আল্লাহ মানবজাতির জন্য নিজের আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে।
— Taisirul Quran
রামাযানের রাতে আপন স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, তারা তোমাদের জন্য এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ, তোমরা যে নিজেদের ক্ষতি করছিলে আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন, এ জন্য তিনি তোমাদের প্রতি প্রত্যাবৃত্ত হলেন এবং তোমাদের (ভার) লাঘব করে দিলেন; অতএব এক্ষণে তোমরা (রামাযানের রাতেও) তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে কালো সূতা হতে সাদা সূতা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা আহার ও পান কর, অতঃপর রাত সমাগম পর্যন্ত তোমরা সিয়াম পূর্ণ কর; তোমরা মাসজিদে ই‘তিকাফ করার সময় (তোমাদের স্ত্রীদের সাথে) মিলিত হবেনা; এটিই আল্লাহর সীমা। অতএব তোমরা উহার নিকটেও যাবেনা; এভাবে আল্লাহ মানবমন্ডলীর জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ বিবৃত করেন, যেন তারা সংযত হয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের তাওবা কবূল করেছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন। অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর। আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।
— Rawai Al-bayan
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে [১]। তারা তোমাদের পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরূপ। আল্লাহ্‌ জানেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে মার্জনা করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও এবং আল্লাহ্‌ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালোরেখা থেকে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রকাশ না হয় [২]। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত [৩] অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহ্‌র সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবতী হয়ো না [৪]। এভাবে আল্লাহ্‌ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই ঘটনাকে ইসলামি ভাষ্যে সাধারণত “আল্লাহর রহমত” বলা হয়। কিন্তু সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে এটি রহমত নয়; এটি আইনি পশ্চাদপসরণ। একটি বিধান কার্যকর করা হলো, মানুষ তা মানল না, প্রভাবশালী সাহাবীরাও মানল না, শেষে বিধান বদলে দেওয়া হলো। এই ঘটনাকে যদি ঐশ্বরিক জ্ঞান বলে মানতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: সর্বজ্ঞানী আল্লাহ শুরুতেই জানতেন না যে মানুষ এই বিধান পালন করতে পারবে না? যদি জানতেন, তাহলে এমন অকার্যকর বিধান আগে দিলেন কেন? আর যদি না জানতেন, তাহলে তার সর্বজ্ঞতার দাবি কোথায়? এখানে যে ছবি পাওয়া যায়, তা হলো আইন মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করেনি; বরং মানুষের আচরণ আইনকে বদলাতে বাধ্য করেছে।

তাফসিরে জালালাইন, মাযহারী, ইবনে কাসীরসহ বহু তাফসিরে এই ঘটনায় উমর ও অন্যান্য সাহাবীদের ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উমর নিষিদ্ধ সময়ে স্ত্রী সহবাস করেন, তারপর নবীর কাছে বিষয়টি জানান, অন্য সাহাবীরাও একই ধরনের কাজের স্বীকারোক্তি দেন, তারপর আয়াত নাজিল হয়। এই বর্ণনাগুলো একত্রে রাখলে স্পষ্ট হয়, বিধান পরিবর্তনের পেছনে ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়, সামাজিক মাত্রার অমান্যতা কাজ করেছিল। অর্থাৎ বিধানটি মুসলিম সমাজের ভেতরেই অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। আল্লাহর কথিত আইন বাস্তব সমাজের চাপ সহ্য করতে পারেনি।

আসুন এই আয়াতটির তাফসীর পড়ে দেখা যাক, [17]

অনুবাদ :
১৮৭. সিয়ামের রাত্রে তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সাথে বাধাহীন ব্যবহার সহবাস বৈধ করা হয়েছে ইসলামের প্রথম যুগে সিয়ামের সময় ইশার পরই খানা-পিনা ও স্ত্রীসম্ভোগ ছিল হারাম। উক্ত বিধান মানসূখ করে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাজিল করেন।
তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ এ স্থানে পরস্পরকে পরিচ্ছদরূপে আখ্যায়িত করে পরস্পরের নিবিড় সম্পর্ক এবং একজন অন্যজনের প্রতি মুখাপেক্ষিতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ জানতেন যে সিয়ামের রাত্রে স্ত্রীসম্ভোগ করে তোমরা নিজেদের সাথে প্রতারণা খেয়ানত করছিল। [নিষিদ্ধকালীন সময়ে) হযরত ওমর ও কতিপয় সাহাবীর তরফ হতে এ ধরনের কাজ সংঘটিত হয়েছিল। তাঁরা তখন রাসূলুল্লাহ -এর নিকট এ বিষয়ে ওজর পেশ করেন।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমা পরবশ হয়েছেন, তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন। সুতরাং এখন তোমাদের জন্য যখন বৈধ করে দেওয়া হয়েছে তাদের সাথে সঙ্গত হও সহবাসে লিপ্ত হও এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন অর্থাৎ স্ত্রীসম্ভোগ বৈধ করা বা যে সন্তান তোমাদের তকদীরে রাখা হয়েছে তা কামনা কর, অনুসন্ধান কর।

কুফরি 3

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারীতে কী বলা হয়েছে দেখে নিই, [18]

… এরপর তিনি স্ত্রীগমন করলেন। ওদিকে হজরত কা’ব বিন মালেকও এরকম করলেন। সকালে বিষয়টি রসুলে করীম স. এর গোচরীভূত করা হলে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। বাগবী বলেছেন, ইসলামের প্রথম দিকে এশার নামাজের আগে যদি কেউ শুয়ে পড়তো তবে অবশিষ্ট রাতের জন্য পানাহার ও সহবাস নিষিদ্ধ হয়ে যেতো। হজরত ওমর একদিন এই নিষিদ্ধতা ভেঙে ফেললেন। পরদিন তিনি রসুল আকদাস স. এর নিকট ঘটনাটি জানালেন। তিনি স. বললেন, ওমর। তোমার পক্ষে এমতো আচরণ শোভনীয় হয়নি। তখন আরো কিছুসংখ্যক সাহাবী দাঁড়িয়ে স্বীকার করলেন যে, এরকম ঘটনা আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তখনই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।
এরপরের বাক্যে এমর্মে সাক্ষ্য এসেছে, তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হয়ে তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং এখন থেকে রাতের যে কোনো অংশে সঙ্গত হওয়া বৈধ।
আল্লাহ্ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা করো- একথার অর্থ, আল্লাহপাক তোমাদের ভাগ্যে যে সন্তান-সন্ততি নির্ধারণ করেছেন, স্ত্রীসম্ভোগের মাধ্যমে সেই নির্ধারণের অন্বেষী হও। একথার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, সন্তান কামনাই স্ত্রীসম্ভোগের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ইন্দ্রিয়ের চাহিদা পূরণই যেনো প্রধান উদ্দেশ্য না হয়। রসুলে আকদাস স. এরশাদ করেছেন, তোমরা এমন রমণীকে বিবাহবদ্ধ করো, যে তার স্বামীকে ভালোবাসে এবং অধিক সন্তান প্রসবের যোগ্যা হয়। কেনোনা তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে আমি অন্য নবীদের উম্মতের সংখ্যা অতিক্রম করার গর্ব অনুভব করবো। হজরত মা’কাল বিন ইয়াসের থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ ও নাসাঈ। আয়াতের এই বাক্যটি দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়- সহবাসের সময় আজল (স্ত্রী অঙ্গের বাইরে শুক্রপাত করা) মাকরূহ (অনভিপ্রেত)। বাক্যটির মাধ্যমে একথাও বোঝা যায় যে, যথাঅঙ্গের মাধ্যমে সম্ভোগ তৃষ্ণা চরিতার্থ করা মোবাহ্ (বৈধ)। বাগবী বলেছেন, হজরত মুআজ বিন জাবালের মতে ‘মা কাতাবাল্লাহু লাকুম’ বাক্যটির মর্ম লাইলাতুল কদর। আমি বলি, বাক্যটির বাকভঙ্গিমা অভিমতটিকে সমর্থন করে না।
‘আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হইতে উষার শুভ্ররেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়’- এই বাক্যে উল্লেখিত ‘খাইতে আয়াদ’ অর্থ দিবসের আলো এবং ‘খাইতি আসওয়াদ’ অর্থ রাত্রির কৃষ্ণতা। ফজরের সূচনায় পুবের আকাশে উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত দীর্ঘ একটি রেখা পরিদৃষ্ট হয়। ওই রেখাকে নির্দেশ করতেই এখানে ‘খাইত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ‘খাইতিল আবইয়াদ’ ফজর (দিন) হলে ‘খাইতিল আসওয়াদ’ অর্থ রাত্রি হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়। ‘মিনাল ফাজরি’ বাক্যাংশটির মিন অব্যয়টি আংশিক অবস্থাকে প্রকাশ করে। আর ‘খাইতিল আবইয়াদ’ ফজরের অবস্থা প্রকাশক। এখানে ফজর অর্থ ফজরের কিয়দাংশ। ফজর প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত- এরকম কথা এখানে বলা…

কুফরি 5

এবারে আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে দেখে নেয়া যাক, উমর এবং অন্য সাহাবীদের স্ত্রী সহবাসের ইচ্ছার কাছে আল্লাহর অসহায় আত্মসমর্পণ [19]

عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتُنُونَ اَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ তা’আলা অবগত আছেন যে, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে খিয়ানত করিতেছিলে। অনন্তর তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করিয়াছেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিয়াছেন।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে আলী ইন্ন তালহা বর্ণনা করেন: রমযান মাসে মুসলমানগণ, যখন ইশার নামায সম্পন্ন করিত, তাহার পর হইতে পরবর্তী মাগরিব পর্যন্ত তাহাদের জন্য পানাহার ও স্ত্রীসংগম হারাম হইয়া যাইত। তথাপি তাহাদের কাহারও কাহারও ক্ষেত্রে রমযান মাসে উহার ব্যতিক্রম কার্য ঘটিয়া যায়। তাহাদের ভিতর হযরত উমর (রা)-ও ছিলেন। ফলে একদল লোক নবী করীম (সা)-এর দরবারে এই অভিযোগ উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ তা’আলা অবকাশ দানের এই আয়াত নাযিল করেন।
হযরত আওফা মূসা ইব্‌ন্ন উকবা হইতে, তিনি কুরায়েব হইতে ও তিনি ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
মুসলমানগণ সিয়ামের এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রাত্রিকালে পানাহার ও স্ত্রীগমন করিত। কিন্তু যখন ঘুমাইয়া পড়িত, তখন হইতে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহারা পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করিত না। এতদসত্ত্বেও একদিন আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছিল যে, উমর ইবন খাত্তাব ঘুম হইতে জাগিয়া স্ত্রীগমন করিয়াছেন। ইত্যবসরে তিনি নবী করীম (সা)-এর দরবারে হাযির হইয়া আরয করিলেন- ‘আমি আমার কৃতকার্যের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নিকট অভিযোগ করিতে আসিয়াছি।’ রাসূল (সা) প্রশ্ন করিলেন-তুমি কি করিয়াছ? তিনি জবাব দিলেন-‘আমি রোযা রাখার ইচ্ছা পোষণ করিয়াও ঘুম হইতে জাগিয়া স্ত্রীগমন করিয়াছি।’ রাসূল (সা) বলিলেন- ইহা তোমার জন্য শোভনীয় কাজ হয় নাই। অতঃপর আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়।’
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে আতা ইব্‌ন রুবাহ, কয়েস ইবন সা’দ ও সাঈদ ইব্‌ন আবূ উরওয়া বর্ণনা করেন:
এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রমযানে মুসলমানগণ ইশার নামায শেষ করার পর নিদ্রা গেলে পরবর্তী সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহাদের জন্য পানাহার ও স্ত্রী সংগম হারাম হইয়া যাইত। অতঃপর উমর ইব্‌ন খাত্তাব ইশার নামাযের পর স্ত্রী সংগম করেন এবং সুরাকা ইব্‌ন কয়েস আনসারী মাগরিবের নামাযের পর নিদ্রা কাতর হইয়া ঘুমাইয়া পড়েন এবং রাসূল (সা)-এর ইশার নামায পড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত নিদ্রামগ্ন থাকেন। অতঃপর ইশার নামায পড়িয়া তিনি পানাহার করেন। পর দিন সকালে আসিয়া তাহারা রাসূল (সা)-এর খিদমতে এই সকল অবস্থা ব্যক্ত করেন। তখনই নাযিল হইল:
أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصَّيَامِ الرَّفَثُ إِلَى نِسَائِكُمْ …… ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ বস্তুত ইহা আল্লাহ তা’আলার বিরাট করুণা ও অনুগ্রহ বৈ নহে।
আবদুর রহমান ইব্‌ন আবূ লায়লা হইতে যথাক্রমে হেসীন ইব্‌ন আবদুর রহমান ও হিশাম বর্ণনা করেন:
“একদিন উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা) দাঁড়াইয়া আরয করিলেন ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! বিগত রাত্রিতে আমি আমার স্ত্রীর কাছে সেই অভিলাষ ব্যক্ত করিয়াছিলাম, যাহা একটি পুরুষ নারীর কাছে করিয়া থাকে। আমার স্ত্রী জানাইল, সে নিদ্রা গিয়াছিল। আমি উহাকে তাহার বাহানা ভাবিয়া তাহার সহিত সহবাস করিয়াছি।’ তখনই তাহার উপলক্ষে এই আয়াত নাযিল হইলঃ ثُمَّ اَتِمُّوا الصَّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ …. ইব্‌ন আবু লায়লা হইতে শু’বা ও আমর ইব্‌ন শু’বা পর্যায়ক্রমে অনুরূপ বর্ণনা প্রদান করেন। কা’ব ইব্‌ন আবদুল মালেক হইতে পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইব্‌ন কা’ব বনু সালমার গোলাম মূসা ইব্‌ন্ন জুবায়ের, আবু লাহীআ, ইবনুল মুবারক সুয়ায়েদ, মুছান্না ও আবূ জা’ফর ইব্‌ন জারীর বর্ণনা করেন:
“রমযান মাসে লোকদের অবস্থা এই ছিল যে, যদি কেহ রোযা রাখিয়া রাত্রে ঘুমাইয়া পড়িত তাহা হইলে উহার পর হইতে তাহার জন্য পরবর্তী ইফতার পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হারাম হইত। এক রাত্রে উমর ইবন খাত্তাব রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার হইতে দেরীতে ঘরে ফিরেন। তখন তাহার স্ত্রী ঘুমাইতেছিলেন। তিনি তাহার কাছে কামনা চরিতার্থের অভিলাষ ব্যক্ত করিলে তাহার স্ত্রী বলিলেন, আমি তো নিদ্রা গিয়াছিলাম। তিনি উহা অবিশ্বাস করিলেন এবং তাহার সহিত সহবাস করিলেন। কা’ব ইব্‌ন মালেক বলেন-প্রত্যূষেই উমর ইবন খাত্তাব রাসূল (সা)-এর খিদমতে হাযির হন এবং তাঁহাকে এই অবস্থা বর্ণনা করেন। তখন আল্লাহ তা’আলা : … অর্থাৎ তোমরা যে নিজ ব্যাপারে খিয়ানত করিতেছিলে, তাহা আল্লাহ তা’আলা জানিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তোমাদের তাওবা কবুল করিয়াছিলেন তাই এখন হইতে তোমরা স্ত্রীগমন কর।
অনুরূপভাবে মুজাহিদ, আতা, ইকরামা, কাতাদাহ প্রমুখ হযরত উমর (রা) ও সুরাকা ইব্‌ন কয়েস আনসারীর ঘটনাকে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর আল্লাহর রহম, অনুগ্রহ ও ভালবাসা স্বরূপ রমযানের সারা রাত্র স্ত্রী সহবাস করা, আহার করা ও পান করাকে আল্লাহ তা’আলা মুবাহ করিয়া দিয়াছেন।
… উহা অন্বেষণ কর) আয়াতাংশের ব্যাখ্যা প্রসংগে আবূ হুরায়রা, ইব্‌ন আব্বাস, আনাস, কাজী শুরাইহ, মুজাহিদ, ইকরামা, সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র, আতা, রবী ইব্‌ন আনাস, সুদ্দী, যায়দ ইব্‌ন আসলাম, হাকাম ইব্‌ন উতবা, মাকাতিল ইব্‌ন হাইয়ান, হাসান বসরী, যিহাক, ও কাতাদাহ (র) প্রমুখ সাহাবা ও তাবেঈন বলেনঃ ইহার অর্থ ‘সন্তান’।
আবদুর রহমান ইব্‌ন যায়দ ইব্‌ন আসলাম وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ এর অর্থ ‘সহবাস’ করিয়াছেন। উমর ইবন মালেক আল বুকরী আবূ জাওযা হইতে ও তিনি হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে وَابْتَغُوا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ এর অর্থ লাইলাতুল কদর করিয়াছেন। ইব্‌ন আবি হাতিম ও ইব্‌ন জারীরও অনুরূপ রিওয়ায়েত করিয়াছেন।
আবদুর রাযযাক বলেনঃ মুআম্মার আমাকে সংবাদ দান করিয়াছেন যে, কাতাদাহ وَابْتَغُوا الرُّحْصَةُ الَّتِي كَتَبَ اللهُ لَكُمْ يَقُولُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ : তোমরা সেই অবকাশের অনুসন্ধান কর যাহা তোমাদের জন্য লিখিত হইয়া গেল। কেহ বলিয়াছেনঃ “যাহা কিছু তোমাদের জন্য হালাল করা হইয়াছে উহার অনুসন্ধান কর।”

কুফরি 7
কুফরি 9

এই ঘটনায় উমরের অবস্থান অত্যন্ত বিব্রতকর। যে মানুষকে পরবর্তীকালে ইসলামের কঠোর নৈতিকতা, শাসনশৃঙ্খলা, তাকওয়া ও ন্যায়নীতির প্রতীক হিসেবে পেশ করা হয়, সেই উমরই কার্যকর রোজার বিধান নিজের শরীরী চাহিদার সামনে ভেঙে ফেললেন। তিনি সাধারণ কোনো গ্রাম্য মুসলমান নন; তিনি নবীর ঘনিষ্ঠ, প্রভাবশালী, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাহাবী। তার এই কাজ তাই শুধু ব্যক্তিগত কামনার ঘটনা নয়। এটি দেখায়, ইসলামের শুরুতেই “আল্লাহর আইন” নামে প্রচারিত বিধান বাস্তবে ক্ষমতাধর অনুসারীদের জীবনযাপন ও প্রবৃত্তির সঙ্গে দরকষাকষি করছিল।

সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো, এই ব্যর্থতাকেও পরে আল্লাহর করুণা বলে প্রচার করা হয়েছে। আইন দিলেন আল্লাহ, আইন ভাঙলেন মানুষ, এরপর আইন বদলালেন আল্লাহ, আর ধর্মতত্ত্ব বলল: দেখো, কী রহমত! কিন্তু যুক্তির চোখে এটি করুণা নয়; এটি নীতিগত ব্যর্থতা। যে আইন শুরুতেই বাস্তবসম্মত নয়, সেটি পরে শিথিল করলে আইনদাতার দূরদর্শিতা প্রমাণিত হয় না। বরং প্রমাণিত হয়, আইনটি শুরুতেই মানুষের প্রকৃতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং আচরণগত সীমা সম্পর্কে ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়েছিল। সর্বজ্ঞতার দাবি এখানে কাগজে থাকে, বাস্তবে থাকে অদক্ষ আইনপ্রণয়ন।

কোরআনের ভাষা “তোমরা নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত করছিলে” অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে মুসলমানদের আচরণকে খিয়ানত বলা হচ্ছে, কিন্তু সেই খিয়ানতের জবাবে শাস্তি নয়, বিধান শিথিলতা আসছে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন প্রায়ই কঠোর, কিন্তু প্রভাবশালী সাহাবীদের ক্ষেত্রে আইন নিজেই নরম হয়ে যায়। এটাই উমর-কেন্দ্রিক ওহীর আরেকটি রূপ। উমর বিধান মানেননি, পরে বিধান তার মতো মানুষের জন্য মানানসই করে বদলানো হলো। এই প্রক্রিয়াকে পবিত্র বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে এটি ধর্মীয় আইনের মানবীয় ও রাজনৈতিক চরিত্রের কুৎসিত সাক্ষ্য।

এখানে আরেকটি নৈতিক প্রশ্নও আছে। বর্ণনায় এসেছে, উমরের স্ত্রী বলেছিলেন তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু উমর সেটিকে বাহানা মনে করে সহবাস করেন। এই অংশটি ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সাধারণত চেপে যাওয়া হয়, কারণ এটি উমরের চরিত্রের জন্য সুবিধাজনক নয়। একজন নারীর বক্তব্যকে অস্বীকার করে নিজের কামনা পূরণ করা কোনো নৈতিক মহিমা নয়। ইসলামী তাফসির এটিকে প্রায় বিধান পরিবর্তনের পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে, কিন্তু নারীর সম্মতি, অস্বস্তি বা অবস্থান নিয়ে কোনো গুরুতর নৈতিক আলোচনা করে না। অর্থাৎ ঘটনাটিতে কেবল আল্লাহর আইনই নরম হয় না; নারীর কণ্ঠও ধর্মীয় বয়ানের ভেতরে চাপা পড়ে যায়।

এই এক ঘটনাতেই আদি ইসলামের তিনটি দুর্বলতা প্রকাশ পায়। প্রথমত, আল্লাহর নামে ঘোষিত বিধান শুরুতেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। দ্বিতীয়ত, প্রভাবশালী সাহাবীদের অমান্যতা বিধান বদলের কারণ হতে পারত। তৃতীয়ত, নারীর শরীর, সম্মতি ও অভিজ্ঞতা ধর্মীয় আইনের আলোচনায় গৌণ হয়ে যায়। উমরের কামনা, সাহাবীদের অক্ষমতা এবং মুসলিম সমাজের বিধান-ভঙ্গ শেষ পর্যন্ত “রহমত” নামে বৈধতা পায়। এই ঘটনাকে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য বলা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। এটি সরাসরি দেখায়, ইসলামী আইন মানুষের প্রবৃত্তি, ক্ষমতা ও সামাজিক চাপের কাছে বদলেছে।

অতএব রমজানের রাতে সহবাসের এই বর্ণনা কোনো তুচ্ছ পারিবারিক ঘটনা নয়। এটি ইসলামের আইনগত দাবির বিরুদ্ধে এক গভীর অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য। উমর কার্যকর বিধান ভাঙলেন, অন্যরাও তা করল, তারপর ওহী এসে সেই ভাঙনকে বৈধ করল। এখানেই ইসলামের ঐশ্বরিক আইন-দাবি গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যদি আল্লাহর আইন মানুষের কামনার সঙ্গে না মিলে বদলে যায়, তাহলে সেটি চিরন্তন নৈতিক সত্য নয়; সেটি পরিস্থিতি-নির্ভর সামাজিক বিধান। আর যদি সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উমরের মতো প্রভাবশালী সাহাবী থাকেন, তাহলে তাকে পবিত্র দূরদর্শিতা বলা নয়, বরং ক্ষমতাবান অনুসারীর সামনে ওহীর নরম হয়ে যাওয়া বলা বেশি সৎ।


মুতআ বিবাহ: নবী-যুগের বৈধতা এবং উমরের নিষেধাজ্ঞা

মুতআ বিবাহ ইসলামী আইন-ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়গুলোর একটি। কারণ এটি শুধু যৌননীতি বা বিবাহের প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি দেখায়, ইসলামী বিধানের উৎস আসলে কতটা অস্থির, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তনশীল ছিল। সুন্নি ধর্মতত্ত্ব আজ মুতআকে হারাম বলে প্রচার করে, কিন্তু ইসলামি উৎসের ভেতরেই এমন বর্ণনা আছে যেখানে দেখা যায়, রাসূলের যুগে এবং আবু বকরের যুগেও মুতআ চালু ছিল, পরে উমর এসে তা নিষিদ্ধ করেন। এই তথ্যটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এটি নবী-সুন্নাহর ওপর খলিফার আইনগত হস্তক্ষেপের সরাসরি প্রশ্ন তোলে।

সহিহ মুসলিমে জাবির ইবনু আবদুল্লাহর বর্ণনায় এসেছে, তারা রাসূলুল্লাহর যুগে এবং আবু বকরের সময় সামান্য বিনিময়ে মুতআ করতেন, পরে উমর একটি ঘটনার পর তা নিষিদ্ধ করেন। একই ধারার আরেক বর্ণনায় “দুই মুতআ” প্রসঙ্গও এসেছে: নারীদের মুতআ এবং হজ্জের তামাত্তু। এই বর্ণনাগুলো যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়: যে প্রথা রাসূলের যুগে চলেছে এবং আবু বকরের সময়ও চলেছে, সেটি উমর কোন অধিকারে নিষিদ্ধ করলেন? নবীর বৈধ করা বা অন্তত নবী-যুগে চলতে দেওয়া একটি প্রথা খলিফা এসে বাতিল করলে, ইসলামের চূড়ান্ত আইনদাতা কে? আল্লাহ ও রাসূল, নাকি উমর? [20] [21] [22] [23] [24] [25]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৫। হাসান হুলওয়ানী (রহঃ) … আতা (রহঃ) বলেন, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) উমরা পালন করতে এলেন। তখন আমরা তাঁর আবাসে তাঁর নিকট গেলাম। লোকেরা তাঁর নিকট বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেসা করল। অতঃপর তারা মুত’আর উল্লেখ করলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) এর যুগে মুতআ (বিবাহ) করেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতা ইবনু আবী রাবাহ (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৬। মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) ... আবূ যুবায়র (রহঃ) বলেন, আমি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) কে বলতে শুনেছিঃ আমরা এক মুঠো খেজুর অথবা ময়দার বিনিময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বকর (রাঃ) এর যুগে মুতআ বিবাহ করতাম। শেষ পর্যন্ত উমর (রাঃ) আমর ইবন্‌ হুরায়সের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তা নিষিদ্ধ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবুয্ যুবায়র (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৭। হামিদ ইবনু উমর বাকরাবী (রহঃ) … আবূ নাদরাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও ইবনু যুবায়র (রাঃ) দুই প্রকারের মুতআ (তামাত্তু হজ্জ ও মুতআ বিবাহ) নিয়ে পরস্পর মতবিরোধ করেছেন। তখন জাবির (রাঃ) বললেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতে দুই প্রকারের মুত’আই করেছি। অতঃপর উমর (রাঃ) আমাদের এই উভয়টই করতে নিষেধ করলেন। অতএব আমরা তা আর করি নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত্’আহ বিবাহ বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, অতঃপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং তা কিয়ামাত পর্যন্ত স্থির থাকবে
৩৩০৭-(১৬/…) মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’ (রহঃ) ….. আবূ যুবায়র (রহঃ) বলেন, আমি জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি, আমরা এক মুঠো খেজুর অথবা ময়দার বিনিময়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বাকর (রাযিঃ) এর যুগে মুত’আহ বিবাহ করতাম। শেষ পর্যন্ত উমর (রাযিঃ) আমর ইবনু হুরায়স এর বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তা নিষিদ্ধ করেন।*। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৮২, ইসলামীক সেন্টার ৩২৮০)
* ‘আমর ইবন হুরায়স কুফায় তার মুক্তদাসীকে মুত’আহ বিবাহ করেন। এর ফলে সে গর্ভবতী হলে তাকে নিয়ে আমর ইবন হুরায়স উমার ফারুক (রাযিঃ) এর কাছে উপস্থিত হন, এ সময় তিনি মুত’আহ বিবাহকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবুয্ যুবায়র (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত্’আহ বিবাহ বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, অতঃপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং তা কিয়ামাত পর্যন্ত স্থির থাকবে
৩৩০৬-(১৫/…) হাসান আল হুলওয়ানী (রহঃ) ….. আত্বা (রহঃ) বলেন, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) উমরাহ পালন করতে এলেন। তখন আমরা তার আবাসে তার নিকট গেলাম। লোকেরা তার নিকট বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেস করল। অতঃপর তারা মুত‘আহ সম্পর্কে উল্লেখ করলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং আবূ বাকর (রাযিঃ) ও উমার (রাযিঃ) এর যুগে মুত’আহ (বিবাহ) করেছি।*। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩২৮১, ইসলামীক সেন্টার ৩২৭৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতা ইবনু আবী রাবাহ (রহঃ)

মুয়াত্তা মালিক
২৮. বিবাহ সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১৮. মুত‘আ বিবাহ প্রসঙ্গ
রেওয়ায়ত ৪২. খাওলা বিনত হাকিম (রাঃ) উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিলেনঃ রবি’আ ইবন উমাইয়া (রাঃ) এক মুওয়াল্লাদা(1) নারীকে মুত’আ বিবাহ করেন এবং সে নারী গর্ভবতী হয়। উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) ইহা শুনিয়া ঘাবড়াইয়া গেলেন এবং আপন চাদর টানিতে টানিতে বাহির হইলেন। অতঃপর তিনি বলিলেনঃ মুত’আ নিষিদ্ধ। লোকদের মধ্যে যদি এ বিষয়ে আমি পূর্বে ঘোষণা করিতাম তবে এই (মুত’আর কারণে) ব্যভিচারীর প্রতি রজম (প্রস্তর নিক্ষেপ) করিতাম।
(1) মুওয়াল্লাদা : যে মহিলা আরব নহে কিন্তু তাহার জন্ম হইয়াছে আরবে এবং আরবীয় রীতিনীতি আদব-কায়দা মুতাবিক তাহাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হইয়াছে।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ

এখানে সুন্নি বয়ান সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা যুক্তি দেবে: না, নবী নিজেই পরে মুতআ নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু এই যুক্তিই সমস্যা মেটায় না; বরং সমস্যাকে আরও গভীর করে। যদি নবী নিজেই মুতআ নিষিদ্ধ করে থাকেন, তাহলে রাসূলের মৃত্যুর পরও আবু বকরের সময় মুসলমানরা তা কীভাবে করছিল? জাবিরের মতো সাহাবী কেন বলছেন যে তারা রাসূল ও আবু বকরের যুগে তা করতেন? আর উমরের নিষেধাজ্ঞাকে কেন পৃথক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে? যদি নবীর নিষেধাজ্ঞা এত স্পষ্ট, চূড়ান্ত এবং সর্বজনবিদিত হতো, তাহলে উমরের নিষেধের আলাদা ঐতিহাসিক গুরুত্ব তৈরি হতো না। [26] [27] [28] [29]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৩। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) ও সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, আমাদের সামনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘোষক বেরিয়ে এসে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মুত’আ বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৪। উমায়্যা ইবনু বিসতাম আল আয়শী (রহঃ) … সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) ও জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এলেন এবং আমাদের মুত’আর (সাময়িক বিবাহের) অনুমতি দিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সালামাহ ইবনু আক্ওয়া‘ (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৮। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আয়্যাশ ইবনু সালামা (রহঃ) থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওতাস যুদ্ধের বছর
তিন দিনের জন্য মুতআ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তা নিষিদ্ধ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
পরিচ্ছেদঃ ৬৭/৩২. অবশেষে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত‘আহ বিয়ে নিষেধ করেছেন।
৫১১৭-৫১১৮. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ এবং সালাম আকওয়া’ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আমরা কোন এক সেনাবাহিনীতে ছিলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমাদেরকে মুত‘আহ বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা মুত‘আহ করতে পার। (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭৪২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

এমনকি, মক্কা বিজয়ের বছর মক্কায় প্রবেশকালেও মুতা বিবাহ বৈধ ছিল বলেই হাদিস থেকে জানা যায় [30] [31]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৯৪। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবদুল মালিক ইবনু রাবী ইবনু সাবরা জুহানী (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর আমাদের মক্কায় প্রবেশকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মুত’আ বিবাহের অনুমতি দান করেন। তিনি আমাদের তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত (নারী সঙ্গ ত্যাগ করে) বের হয়ে আসি নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ রবী’ ইবন সাবরা জুহানী (রহঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৭/ বিয়ে
পরিচ্ছেদঃ ৬৭/৩২. অবশেষে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত‘আহ বিয়ে নিষেধ করেছেন।
৫১১৯. ইবনু আবূ যিব বলেন, আয়াস ইবনু সালামাহ ইবনু আকওয়া‘ তার পিতা সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে কোন পুরুষ এবং মহিলা উভয়ে (মুত‘আহ করতে) একমত হলে তাদের পরস্পরের এ সম্পর্ক তিন রাতের জন্য গণ্য হবে। এরপর তারা ইচ্ছে করলে এর চেয়ে অধিক সময় স্থায়ী করতে পারে অথবা বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা জানি না এ ব্যবস্থা শুধু আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, না সকল মানুষের জন্য ছিল।
আবূ ‘আবদুল্লাহ্ (ইমাম বুখারী) বলেন, ‘আলী (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এটা পরিষ্কার করে ব’লে দিয়েছেন, মুতা‘আ বিবাহ প্রথা রহিত হয়ে গেছে। (মুসলিম ১৬/২, হাঃ ১৪০৫) (আধুনিক প্রকাশনী- ৪৭৪২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৭৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আসুন মুতা বিবাহ হারাম হওয়ার বিধানটি দেখি। এখানে দেখুন, বারবার আল্লাহ পাক এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন [32] [33]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮০। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র আল হামদানী (রহঃ) … কায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে জিহাদে অংশ গ্রহণ করতাম এবং আমাদের সঙ্গে আমাদের স্ত্রীগণ থাকত না। আমরা বললাম, আমরা কি খাসী হব না? তিনি আমাদের তা থেকে নিষেধ করলেন। তারপর তিনি পরিধেয় বস্ত্র দানের বিনিময়ে আমাদের নির্দিষ্ট কালের জন্য নারীদের বিবাহ করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আবদুল্লাহ (রাঃ) পাঠ করলেনঃ “হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য উৎকৃষ্ট যেসব বস্তু হালাল করেছেন, সেই সমুদয়কে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালংঘন করো না আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা মায়িদাঃ ৮৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ক্বায়স বিন আবু হাযিম (রহ.)

অতএব মুতআ প্রসঙ্গে সুন্নি উৎস নিজেই দুই বিপরীত অবস্থানে দাঁড়ায়। একদিকে বলা হয়, নবী নিষিদ্ধ করেছেন। অন্যদিকে সহিহ মুসলিমে সাহাবীর বর্ণনায় দেখা যায়, নবী ও আবু বকরের যুগে মুতআ করা হতো, পরে উমর নিষেধ করেন। এই দুই বর্ণনা একসঙ্গে সত্য হতে পারে না, অন্তত সরল অর্থে নয়। যদি নবী নিষিদ্ধ করেন, তাহলে জাবিরের বর্ণিত দীর্ঘকালীন প্রচলন ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ব্যাখ্যাকারীগণ যদি বলেন, নবী যে মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ করেছিলেন তা জাবিরের মত সাহাবী জানতেন না, তাহলে আরও অনেকগুলো প্রশ্নের উদ্ভব হয়। কারণ ইবনে আব্বাসের মত প্রখ্যাত সাহাবী এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মত ইমামও নবীর মৃত্যুর পরে মুতআ বিবাহের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। বিস্তারিত জানতে এই লেখাটি পড়ুন। আর যদি উমর নিষিদ্ধ করেন, তাহলে নবী-যুগের বৈধ বা সহনীয় প্রথাকে খলিফা নিজের ক্ষমতায় বাতিল করেছেন। দুই ক্ষেত্রেই ইসলামের আইনগত চূড়ান্ততার দাবি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

এখানে উমরের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু ব্যক্তিগত মত দিচ্ছেন না; তিনি একটি যৌন-আইনি প্রথা নিষিদ্ধ করছেন। মুতআ এমন প্রথা, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নারী-পুরুষ সম্পর্ক বৈধ করা হতো। আধুনিক নৈতিকতার চোখে এর মধ্যে নারী-শোষণ, অস্থায়ী যৌন-চুক্তি, দারিদ্র্য ও পুরুষতান্ত্রিক সুবিধাবাদের গুরুতর প্রশ্ন আছে। কিন্তু ইসলামী উৎসের সমস্যাটি আরও মৌলিক: এই প্রথা যদি নৈতিকভাবে নোংরা হয়, তাহলে নবীর যুগে তা কেন অনুমোদিত বা সহনীয় ছিল? আর যদি নবীর যুগে তা বৈধ হতে পারে, তাহলে উমর এসে সেটিকে হারাম করার নৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতা পেলেন কোথা থেকে?

এই জায়গায় ইসলামী ধর্মতত্ত্ব একটি সুবিধাবাদী অবস্থান নেয়। যখন নবী-যুগে মুতআর প্রচলনের কথা আসে, তখন বলা হয় এটি ছিল সাময়িক অনুমতি। যখন উমরের নিষেধাজ্ঞার কথা আসে, তখন বলা হয় তিনি নবীর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে জাবিরের মতো বর্ণনায় আবু বকরের সময় পর্যন্ত মুতআ চলার কথা থাকলে এই ব্যাখ্যা দুর্বল হয়ে যায়। কারণ নবী যদি চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করে থাকেন, তাহলে আবু বকরের সময় সাহাবীরা কীভাবে সেই নিষেধ অমান্য করছিলেন? আর যদি সাহাবীরা জানতেন না, তাহলে নবীর নিষেধাজ্ঞা কতটা পরিষ্কার ছিল? ইসলামী আইন কি এতই অস্পষ্ট ছিল যে এক প্রজন্মের মধ্যেই বৈধতা ও হারামের সীমা নিয়ে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো?

মুতআ প্রসঙ্গ তাই শুধু উমরের একটি আইনগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইসলামী আইন-গঠনের প্রকৃতি উন্মোচন করে। এখানে দেখা যায়, কোনো প্রথা প্রথমে বৈধ বা সহনীয় থাকে, পরে সামরিক-সামাজিক বাস্তবতায় ব্যবহৃত হয়, তারপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এসে তা বন্ধ করে, এবং পরবর্তী ধর্মতত্ত্ব সেই রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে চিরন্তন শরিয়ত হিসেবে সাজায়। অর্থাৎ আইন আগে সমাজে ঘটছে, পরে ক্ষমতা সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তারপর ধর্মতত্ত্ব সেটিকে পবিত্র ব্যাখ্যা দিচ্ছে। এটাই ঐশ্বরিক বিধান নয়; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আইন-উৎপাদনের সাধারণ মানবীয় প্রক্রিয়া।

আরও গভীর সমস্যা হলো, মুতআর নৈতিকতা নিয়ে ইসলামী অবস্থান নিজেই নোংরা দ্বিধায় দাঁড়িয়ে আছে। যদি মুতআ হারাম ও অনৈতিক হয়, তাহলে নবীর যুগে তার অনুমতি বা সহনশীলতা নবীর নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর যদি মুতআ কোনো এক সময় বৈধ ও নৈতিক হতে পারে, তাহলে পরবর্তী হারাম ঘোষণা ইসলামী নৈতিকতার আপেক্ষিকতা প্রমাণ করে। অর্থাৎ একই কাজ এক সময় হালাল, পরে হারাম; একই যৌন-চুক্তি এক সময় অনুমোদিত, পরে নিষিদ্ধ। এটি চিরন্তন নৈতিকতা নয়। এটি পরিস্থিতি-নির্ভর বিধান। আর পরিস্থিতি-নির্ভর বিধানকে চিরন্তন ঈশ্বরের আইন বলে চালানো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা।

উমরের নিষেধাজ্ঞা এখানে দ্বৈত আলো ফেলেছে। একদিকে তিনি নবী-যুগে চলা একটি প্রথা বন্ধ করেছেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়, যা নবীর আইনগত কর্তৃত্বের ওপর খলিফার হস্তক্ষেপ দেখায়। অন্যদিকে, যদি মুতআ সত্যিই নারীর মর্যাদার বিরুদ্ধে একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা হয়, তাহলে উমরের নিষেধাজ্ঞা নবী-যুগের যৌননীতির নৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে। দুই দিক থেকেই সমস্যা ইসলামের। উমর যদি ভুল করেন, তবে তিনি রাসূল-যুগের বৈধতা বাতিল করেছেন। উমর যদি ঠিক করেন, তবে রাসূল-যুগের বৈধতাই ভুল ছিল। ধর্মীয় পালিশ ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়ার সৎ পথ নেই।

এই কারণেই মুতআ প্রসঙ্গ সাহাবী-সমালোচনার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী দলিল। এটি দেখায়, উমর শুধু অনুসারী ছিলেন না; তিনি আইনগত বাস্তবতা পাল্টানো এক ক্ষমতাধর সিদ্ধান্তকারী। তার নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী শরিয়তে জায়গা পেয়েছে, কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার পেছনে থাকা ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ঢেকে রাখা হয়েছে। যে ঘটনাকে সরলভাবে “ইসলামে মুতআ হারাম” বলে শেখানো হয়, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে নবী-যুগের প্রথা, আবু বকরের সময়ের ধারাবাহিকতা, উমরের নিষেধ, এবং সুন্নি উৎসের গভীর আত্মবিরোধ।

সুতরাং মুতআ বিবাহের ইতিহাস ইসলামের আইনগত দাবির বিরুদ্ধে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আইনটি কোথা থেকে এল? কে তা বৈধ করল? কে তা নিষিদ্ধ করল? নবীর নিষেধাজ্ঞা থাকলে উমরের নিষেধ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? আর উমরের নিষেধ যদি কার্যকর মোড় হয়, তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের আইনের ওপর খলিফার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কতটা গভীর ছিল? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে মুতআকে শুধু “হারাম” বলে শেষ করা যায়, কিন্তু তাতে ইতিহাস মুছে যায় না। বরং স্পষ্ট হয়ে যায়, ইসলামী শরিয়ত আকাশ থেকে নামা নিখুঁত সিস্টেম নয়; এটি পুরুষতন্ত্র, যুদ্ধসমাজ, যৌন সুবিধাবাদ, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক মেরামতের জটিল ফল।


হজ্জে তামাত্তু: কিতাবুল্লাহ ও রাসূলের আমলের ওপর উমরের নিষেধাজ্ঞা

মুতআ বিবাহের মতো হজ্জে তামাত্তু প্রসঙ্গও উমরের আইনগত হস্তক্ষেপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে সমস্যা শুধু কোনো ফিকহি মতভেদ নয়। সমস্যা হলো, ইসলামি উৎসের ভেতরেই এমন বর্ণনা আছে যেখানে তামাত্তুকে কিতাবুল্লাহতে থাকা এবং রাসূলের আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ উমর সেটি নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ এখানে খলিফার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সরাসরি কোরআন ও নবীর আমলের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়। এই ঘটনাকে “ইজতিহাদ” বলে সাজানো যায়, কিন্তু তাতে মূল সংঘাত মুছে যায় না। নবীর আমল যদি শরিয়তের উৎস হয়, তাহলে উমরের নিষেধাজ্ঞা কোন অধিকারে সেই আমলের ওপর বসে?

হজ্জে তামাত্তু বলতে সাধারণভাবে বোঝায়, একই সফরে উমরা করে ইহরাম খুলে ফেলা, তারপর হজ্জের জন্য নতুন ইহরাম গ্রহণ করা। ইসলামি উৎসে এটি নবী-যুগে পরিচিত ও চর্চিত ছিল। কিন্তু উমরের অবস্থান ছিল ভিন্ন। বর্ণনায় এসেছে, তিনি তামাত্তু নিষেধ করছেন, অথচ আবু মূসার বর্ণনায় উমরের নিজের জবাবেই দেখা যাচ্ছে, রাসূল তা করেছেন—এ কথা উমর জানতেন; তবু তিনি তা অপছন্দ করে নিষেধ করেন। এই একটি বাক্যই পুরো সুন্নি আইনতত্ত্বের জন্য বিস্ফোরক। কারণ এখানে প্রশ্নটি অস্পষ্ট নয়: কোরআনে আছে, রাসূল করেছেন, কিন্তু উমর নিষেধ করছেন। তাহলে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার?

সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৪/ হজ্জের নিয়ম পদ্ধতি
পরিচ্ছেদঃ ৫০. হজ্জে তামাত্তু
২৭৩৭. মুহাম্মদ ইবন মুছান্না ও মুহাম্মদ বাশশার (রহঃ) … আবু মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি হজ্জ-ই-তামাত্তু-এর ফতোয়া দিতেন। তাকে এক ব্যক্তি বললোঃ আপনি এ ধরনের ফতোয়া দান থেকে বিরত থাকুন। কেননা আপনি জানেন না আমীরুল মু’মিনীন হজ্জের আহকামে কি নতুন আবিষ্কার করেছেন। পরে আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি। উত্তরে উমর (রাঃ) বলেনঃ আমি নিশ্চিতরূপে জানি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেছেন। কিন্তু লোক আরাকে* স্ত্রীসহবাস করে হজ্জে গমন করবে, আর তাদের মাথা থেকে পানি পড়তে থাকবে, তা আমার পছন্দনীয় নয়।
*আরাফাতের নিকটবর্তী স্থানে একটি গাছের নাম আরাক।
তাহক্বীকঃ সহীহ। ইবন মাজাহ ২৯৭৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)

এই বর্ণনাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন এড়ানো যায় না। যদি তামাত্তু আল্লাহর কিতাবে থাকে, তাহলে উমর সেটি নিষেধ করলেন কীভাবে? যদি রাসূল নিজে তা করে থাকেন, তাহলে উমর রাসূলের আমলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেন কোন অধিকার বলে? যদি কোনো সাধারণ মুসলমান রাসূলের করা কাজ নিষিদ্ধ করতে দাঁড়াত, তাকে কি “মুজতাহিদ” বলা হতো, নাকি রাসূলের সুন্নাহর বিরোধী বলা হতো? উমরের ক্ষেত্রে কেন শব্দ বদলে যায়? কেন একই কাজ সাধারণের ক্ষেত্রে অপরাধ, আর উমরের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা?

সহিহ মুসলিমেও “দুই মুতআ” প্রসঙ্গে এমন বর্ণনা আছে যেখানে নারীদের মুতআ এবং হজ্জের তামাত্তু উভয়ের কথাই রাসূলের যুগের প্রেক্ষাপটে এসেছে, এবং পরে উমরের নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখিত হয়েছে। এই মিলটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে একই প্যাটার্ন দেখা যায়: নবী-যুগে প্রথা চালু বা সহনীয়, আবু বকর বা প্রাথমিক পর্বে তা কার্যকর, তারপর উমর এসে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। অর্থাৎ আইনটি সরলভাবে “আল্লাহর চিরন্তন বিধান” হিসেবে কাজ করছে না; বরং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, প্রশাসনিক সুবিধা এবং পরবর্তী ব্যাখ্যার মাধ্যমে তার রূপ বদলাচ্ছে।

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৩. মুত’আ বিবাহ তা বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, তারপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার অবৈধতা বলবৎ থাকবে
৩২৮৭। হামিদ ইবনু উমর বাকরাবী (রহঃ) … আবূ নাদরাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও ইবনু যুবায়র (রাঃ) দুই প্রকারের মুতআ (তামাত্তু হজ্জ ও মুতআ বিবাহ) নিয়ে পরস্পর মতবিরোধ করেছেন। তখন জাবির (রাঃ) বললেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতে দুই প্রকারের মুত’আই করেছি। অতঃপর উমর (রাঃ) আমাদের এই উভয়টই করতে নিষেধ করলেন। অতএব আমরা তা আর করি নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানে ধর্মীয় প্রতিরক্ষা সাধারণত বলবে, উমর কোনো শরিয়ত বাতিল করেননি; তিনি প্রশাসনিক কারণে সাময়িকভাবে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু এই যুক্তি সমস্যাকে দূর করে না। বরং আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে। যদি খলিফা প্রশাসনিক কারণে রাসূলের আমল স্থগিত করতে পারেন, তাহলে শরিয়তের চূড়ান্ততা কোথায়? যদি রাষ্ট্রপ্রধান কোরআন ও সুন্নাহতে থাকা একটি প্রথা জনস্বার্থের নামে বন্ধ করতে পারেন, তাহলে ইসলামী আইন আসলে পরম নয়; তা শাসকের হাতে বদলযোগ্য। আর যদি বদলযোগ্য হয়, তাহলে সেটি চিরন্তন ঈশ্বরীয় আইন নয়, বরং রাজনৈতিক আইন।

উমরের তামাত্তু-নিষেধাজ্ঞা তাই শুধু একটি হজ্জ-সংক্রান্ত ফিকহি মত নয়; এটি ইসলামের কর্তৃত্বতত্ত্বের কেন্দ্রে আঘাত করে। সুন্নি কাঠামো বলে, কোরআন ও সুন্নাহ শরিয়তের মূল উৎস। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, খলিফার সিদ্ধান্ত অনেক সময় সেই উৎসের ওপর কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই নিয়ন্ত্রণ পরে ধর্মতাত্ত্বিক ভাষায় বৈধতা পেয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতা আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ধর্মতত্ত্ব পরে তার ব্যাখ্যা বানিয়েছে। ইসলামের প্রথম যুগকে পবিত্র বলে প্রচার করা হলেও, আইনগত বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি কাঁচা, রাজনৈতিক এবং ক্ষমতানির্ভর।

এই অংশে আবু মূসার বর্ণনা এবং জাবিরের “দুই মুতআ” সংক্রান্ত বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে রাসূলের আমল ও সাহাবীদের প্রচলন, অন্যদিকে উমরের নিষেধাজ্ঞা—এই দুই স্তর একই আলোচনায় সংঘর্ষে আসে। এই সংঘাতকে ভক্তিভাবে পড়লে বলা যায়, উমর গভীরতর প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন। কিন্তু যুক্তির ভাষায় এর অর্থ সরল: রাসূলের আমল থাকা সত্ত্বেও উমর তা নিষিদ্ধ করেছেন। নবীর অনুসরণ ফরজ হলে এটি গুরুতর সমস্যা। আর যদি উমরের নিষেধাজ্ঞা গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে নবীর আমল সর্বাবস্থায় বাধ্যতামূলক নয়। দুই অবস্থাতেই ইসলামী আনুগত্যনীতির ভেতরে ফাটল স্পষ্ট।

এখানে “উমরের ইজতিহাদ” কথাটি আসলে সমস্যার নাম বদলানো মাত্র। ইজতিহাদ কিসের বিরুদ্ধে? কোরআনের বিরুদ্ধে? রাসূলের আমলের বিরুদ্ধে? নবী-যুগের স্বীকৃত প্রথার বিরুদ্ধে? যদি ইজতিহাদ বলতে বোঝায়, খলিফা নিজের রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি দিয়ে কিতাব ও সুন্নাহর বাস্তব প্রয়োগ বাতিল বা স্থগিত করতে পারেন, তাহলে স্বীকার করতে হবে ইসলামী আইন শুরু থেকেই ক্ষমতার অধীন। আর যদি তা স্বীকার না করা হয়, তাহলে উমরের তামাত্তু-নিষেধাজ্ঞাকে সরাসরি রাসূলের আমলের বিরুদ্ধে অবস্থান বলতেই হবে।

এই ঘটনাকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে বোঝা যায়, ইসলামী বিধান কখনোই কেবল বইয়ের পাতায় থাকা আইন ছিল না। তা ক্ষমতার দ্বারা ব্যবহৃত, স্থগিত, বদলানো ও ব্যাখ্যাত হয়েছে। উমর ছিলেন সেই ক্ষমতার কেন্দ্রে। তিনি শুধু আইন পালনকারী নন; তিনি আইনকে নিজের প্রশাসনিক ধারণা অনুযায়ী রূপ দেওয়া এক শাসক। তামাত্তু প্রসঙ্গে তার ভূমিকা সেই বাস্তবতাকে নগ্ন করে। রাসূল করেছেন, কিতাবে আছে, তবুও উমর নিষেধ করেন। এর চেয়ে সরাসরি কর্তৃত্ব-সংঘাত আর কী হতে পারে?

এখানে আরেকটি বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার। হজ্জ ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। এটি কোনো ছোট পারিবারিক বিষয়, ব্যক্তিগত অভ্যাস বা স্থানীয় রীতি নয়। এমন একটি কেন্দ্রীয় ইবাদতের পদ্ধতি নিয়ে যদি নবী-যুগের আমল এবং উমর-যুগের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সংঘাত দেখা যায়, তাহলে ইসলামের আইনগত ধারাবাহিকতার দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। হজ্জের মতো কেন্দ্রীয় ইবাদতেও যদি পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রথা বদলাতে পারে, তাহলে ইসলামের “অপরিবর্তনীয় শরিয়ত” দাবিটি বাস্তব ইতিহাসের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।

অতএব হজ্জে তামাত্তু প্রসঙ্গ উমরের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কেস। এখানে তাকে কেবল ভুলকারী ব্যক্তি হিসেবে দেখা যায় না; দেখা যায় কোরআন ও নবীর আমলের ওপর প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী খলিফা হিসেবে। ধর্মীয় ভাষায় এই সিদ্ধান্তকে যতই ইজতিহাদ বলা হোক, কঠোর বিশ্লেষণে এটি নবী-সুন্নাহর ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের আরোপ। যদি আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ চূড়ান্ত হয়, তাহলে উমরের নিষেধাজ্ঞা অগ্রহণযোগ্য। আর যদি উমরের নিষেধাজ্ঞা গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ রাজনৈতিক ক্ষমতার সামনে চূড়ান্ত নয়। এই দ্বন্দ্ব থেকেই বোঝা যায়, আদি ইসলামী আইন আসলে আসমানি পরিপূর্ণতার ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতা, ব্যাখ্যা ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস।


আউল নীতি: কোরআনের উত্তরাধিকার-গণিত মেরামত

ইসলামি প্রচারণায় কোরআনকে পূর্ণাঙ্গ, নির্ভুল, সুস্পষ্ট এবং সর্বজ্ঞ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত চূড়ান্ত বিধানগ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে কোরআনের নির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলো একসঙ্গে প্রয়োগ করলেই দেখা যায়, কিছু বাস্তব পরিস্থিতিতে মোট ভাগ ১ বা ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি আছে ১০০ শতাংশ, কিন্তু কোরআনিক ভাগ যোগ করলে দাবি দাঁড়ায় ১১২.৫ শতাংশ, ১১৬.৬৭ শতাংশ, কখনও আরও বেশি। এটি কোনো ছোট ব্যাখ্যাগত সমস্যা নয়। এটি সরাসরি গাণিতিক সমস্যা। সম্পত্তি যত আছে, ভাগ তার চেয়ে বেশি দাবি করছে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর আইন ক্যালকুলেটরের পরীক্ষায় আটকে যাচ্ছে।

এই সমস্যার সমাধানে ফিকহে যে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, সেটিই আউল। আউল মানে হলো, কোরআনে নির্ধারিত অংশগুলো সরাসরি দেওয়া সম্ভব না হলে সব অংশীদারের ভাগ অনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, মৃত ব্যক্তি রেখে গেলেন স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং দুই কন্যা। কোরআনিক হিসাব অনুযায়ী স্ত্রী পাবে এক-অষ্টমাংশ, পিতা-মাতা মিলে পাবে এক-তৃতীয়াংশ, দুই কন্যা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ। এগুলো যোগ করলে দাঁড়ায় ১/৮ + ১/৩ + ২/৩ = ২৭/২৪। অর্থাৎ সম্পত্তি আছে ২৪ ভাগ, কিন্তু দাবিদারদের জন্য কোরআনিক ভাগ দাঁড়াচ্ছে ২৭ ভাগ। এই অসম্ভব অবস্থায় ফিকহ বলে: সবাইকে আসল কোরআনিক ভাগ দিও না; সবাইকে অনুপাতিকভাবে কমিয়ে দাও। এটিই আউল। এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে এখান থেকে পড়তে পারেন।

এখানে ইসলামি আইনতত্ত্বের সমস্যা একেবারে নগ্ন। যদি কোরআন সত্যিই সর্বজ্ঞ সত্তার দেওয়া নিখুঁত উত্তরাধিকার আইন হয়, তাহলে এমন কেস তৈরি হলো কেন যেখানে ভাগের যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়? একজন সাধারণ গণিত-শিক্ষার্থীও জানে, কোনো কিছুকে ১০০ শতাংশের বেশি ভাগে বিলি করা যায় না। কিন্তু কোরআনের উত্তরাধিকার আইনে এই মৌলিক গাণিতিক সতর্কতাটুকুও নেই। পরে ফকিহরা এসে বললেন, সমস্যা নেই, আমরা আউল করব। অর্থাৎ কোরআনের নির্দিষ্ট ভাগ বাস্তবে অসম্ভব হলে মানুষের বানানো অনুপাতিক কাটছাঁট দিয়ে সেটিকে চালানো হবে। এটি কোরআনের পূর্ণাঙ্গতা নয়; এটি কোরআনের গাণিতিক ব্যর্থতার ওপর মানবীয় ব্যান্ডেজ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আউল কোনো কোরআনিক শব্দ নয়। কোরআন নিজে কোথাও বলে না, “যদি ভাগগুলো যোগ করলে সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সবার ভাগ অনুপাতিকভাবে কমিয়ে দাও।” নবীর কাছ থেকেও এমন স্পষ্ট, কার্যকর, সর্বজনমান্য বিধান পাওয়া যায় না যা আউলকে কোরআনিক সমস্যার আসল সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। বরং ঐতিহাসিক ফিকহি আলোচনায় দেখা যায়, উমরের আমলে এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আউল পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ কোরআনের আইন বাস্তব জটিলতায় আটকে গেলে উমর এসে গাণিতিক প্যাচ বসালেন।

এই ঘটনায় উমরের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি এখানে শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা সমাধান করছেন না; তিনি কোরআনিক ভাগের বাস্তব অর্থ বদলে দিচ্ছেন। কোরআন যখন বলে অমুক পাবে অর্ধেক, অমুক পাবে এক-ষষ্ঠাংশ, অমুক পাবে দুই-তৃতীয়াংশ, তখন সাধারণ পাঠক বুঝবে এগুলো নির্দিষ্ট ভাগ। কিন্তু আউল এসে বলে, না, এগুলো বাস্তবে নির্দিষ্ট ভাগ নয়; এগুলো অনুপাতিক দাবি, প্রয়োজনে কমিয়ে দেওয়া যাবে। অর্থাৎ কোরআনের ভাষাকে তার সরল অর্থে নেওয়া যাচ্ছে না। আইনকে চালাতে হলে মানুষের তৈরি ব্যাখ্যা বসাতে হচ্ছে। এই ব্যাখ্যা ছাড়া কোরআনিক গণিত কিছু ক্ষেত্রে অকার্যকর।

ধর্মতাত্ত্বিকরা বলবেন, আউল কোরআন সংশোধন নয়; এটি কোরআনের উদ্দেশ্য বুঝে ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ। কিন্তু এই যুক্তি আসল সমস্যাকে ঢেকে রাখে। যদি কোরআনের উদ্দেশ্যই অনুপাতিক কমানো হতো, তাহলে কোরআন তা স্পষ্ট করে বলল না কেন? যে কোরআন অর্ধেক, এক-চতুর্থাংশ, এক-অষ্টমাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ, এক-তৃতীয়াংশ, এক-ষষ্ঠাংশ পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বলতে পারে, সে কোরআন কেন বলে না যে মোট ভাগ সম্পত্তির চেয়ে বেশি হলে কী করতে হবে? একটি পূর্ণাঙ্গ আইনগ্রন্থ উত্তরাধিকার-গণিতের এমন মৌলিক সংঘাতের সমাধান নীরব রেখে যায় কেন?

এখানে “পূর্ণাঙ্গ কিতাব” দাবি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। উত্তরাধিকার আইন কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়। এটি পরিবার, সম্পদ, নারী-পুরুষ, পিতা-মাতা, সন্তান, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বণ্টনের সঙ্গে জড়িত। এমন কেন্দ্রীয় আইনে যদি কোরআন নিজেই এমন ভগ্নাংশ দেয় যা কিছু ক্ষেত্রে একত্রে বসে না, তাহলে এই আইনকে নিখুঁত বলা যায় না। আর যদি নিখুঁত আইন চালাতে উমরের মতো মানুষের উদ্ভাবিত আউল পদ্ধতি দরকার হয়, তাহলে কোরআন নিজে পূর্ণাঙ্গ নয়। কোরআন তখন পূর্ণাঙ্গ হয় ফকিহদের গণিত, খলিফার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী আইনি মেরামতের সাহায্যে।

উমরের আউল তাই শুধু ফিকহি প্রযুক্তি নয়; এটি কোরআনের বিরুদ্ধে এক নীরব সাক্ষ্য। এটি বলে, কোরআনের উত্তরাধিকার আইন সরাসরি প্রয়োগ করলে সমস্যা হয়। এটি বলে, কোরআনিক ভাগ সব বাস্তব পরিস্থিতির জন্য গণিতগতভাবে যথেষ্ট নয়। এটি বলে, মানুষের বানানো অনুপাতিক কাটছাঁট ছাড়া এই আইন কার্যকর করা যায় না। ধর্মীয় ভাষায় এটিকে বলা হয় ফিকহি সমাধান। যুক্তির ভাষায় এটি কোরআনের গাণিতিক ত্রুটির ওপর মানবীয় সংশোধন।

এখানে ইবনে আব্বাসের আপত্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, আউল নিয়ে সাহাবীদের মধ্যেই মতভেদ ছিল। অর্থাৎ উমরের পদ্ধতি শুরু থেকেই প্রশ্নহীন ঐশ্বরিক সত্য ছিল না। এটি ছিল একটি মানবীয় সিদ্ধান্ত, যার বিরোধী মতও ছিল। পরে সুন্নি ফিকহ উমরের পদ্ধতিকে গ্রহণ করেছে, কিন্তু গ্রহণ করা মানেই সেটি কোরআনিক সত্য নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, কোরআনের অস্পষ্টতা ও গাণিতিক অকার্যকারিতার জায়গায় ক্ষমতাবান ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছে।

এখানে একটি কঠোর প্রশ্ন করা আবশ্যক: উমর যদি আউল না করতেন, তাহলে কোরআনের উত্তরাধিকার আইন কীভাবে বাস্তবে চলত? ভাগ ২৭/২৪ হলে অতিরিক্ত ৩ ভাগ কোথা থেকে আসত? মৃত ব্যক্তি কি কবর থেকে উঠে অতিরিক্ত সম্পত্তি তৈরি করত? নাকি আল্লাহর অদৃশ্য ভাণ্ডার থেকে ঘাটতি পূরণ হতো? বাস্তব জগতে এগুলোর কোনোটিই হয় না। তাই ফকিহরা সবাইকে কমিয়ে দিলেন। কিন্তু সেই কমানো কোরআনে নেই। এই কমানো মানুষের বানানো। এখানেই কোরআনের পূর্ণাঙ্গতার দাবি কাগুজে স্লোগানে পরিণত হয়।

আউল প্রসঙ্গে ইসলামি প্রতিরক্ষা প্রায়ই বলে, এটি ন্যায্য অনুপাতিক সমাধান। ঠিক আছে, মানবীয় আইনে এটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু সমস্যা ন্যায্য অনুপাতিক সমাধান আছে কি না, সেটি নয়। সমস্যা হলো, কেন সেই সমাধান কোরআনে নেই? কেন সর্বজ্ঞ আল্লাহ উত্তরাধিকার ভাগের এমন ব্যবস্থা দিলেন, যা চালাতে গেলে মানুষের তৈরি পরবর্তী অ্যালগরিদম দরকার হয়? একটি মানবীয় আইনসভা ভুল করলে পরে সংশোধনী আসে। কিন্তু কোরআন যদি ঈশ্বরীয় আইন হয়, তাহলে তার গাণিতিক সংশোধনী উমরের আমলে কেন আসবে?

এই ঘটনাটি উমরের চরিত্রের আরেকটি দিকও দেখায়। তিনি শুধু নবীর পাশে থাকা অনুসারী নন; তিনি এমন এক শাসক, যার আমলে কোরআনের আইন বাস্তব সমস্যায় পড়লে নতুন পদ্ধতি বসানো হয়। এই পদ্ধতি পরে মুসলিম সমাজে ফিকহি মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ আবারও দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাবান খলিফার সিদ্ধান্ত পরবর্তী ধর্মতত্ত্বের ভিত হয়ে যাচ্ছে। কোরআনের ভাষা একদিকে, বাস্তব সমস্যা অন্যদিকে, আর মাঝখানে উমরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এটিকে আসমানি আইন বলা নয়; এটি ক্ষমতানির্ভর আইন-উৎপাদন।

অতএব আউল নীতি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ আইন দাবির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী দলিল। এটি দেখায়, কোরআন উত্তরাধিকার আইনে এমন ভাগ দিয়েছে যা কিছু ক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে অসম্ভব। পরে উমর ও ফিকহি ঐতিহ্য সেই অসম্ভবতাকে আউল দিয়ে মেরামত করেছে। এই মেরামতকে যতই প্রজ্ঞা বলা হোক, বাস্তবতা পাল্টায় না: কোরআনের আইন নিজে যথেষ্ট ছিল না। তাকে চালাতে মানুষের হিসাব, খলিফার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ফিকহি কৌশল দরকার হয়েছে। যে আইন নিজেকে পূর্ণাঙ্গ বলে, কিন্তু বাস্তবে মানবীয় প্যাচ ছাড়া দাঁড়াতে পারে না, তাকে সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের নিখুঁত বিধান বলা যায় না। তাকে বলতে হয় অসম্পূর্ণ আইনের ওপর ধর্মীয় পালিশ।


উম্মু ওয়ালাদ: উমরের আইন-সংশোধন এবং ইসলামের নৈতিক দেউলিয়াত্ব

উম্মু ওয়ালাদ প্রসঙ্গ ইসলামের দাসপ্রথা-সংক্রান্ত নৈতিকতার ওপর এক নির্মম আলো ফেলে। উম্মু ওয়ালাদ বলতে বোঝায় সেই দাসী নারীকে, যার গর্ভে তার মালিকের সন্তান জন্মেছে। অর্থাৎ তিনি শুধু দাসী নন; তিনি সেই পুরুষের সন্তানের মা। আধুনিক মানবিক ন্যায়নীতির দৃষ্টিতে এই পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল তাকে অবিলম্বে স্বাধীন মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। কিন্তু ইসলামি উৎসে দেখা যায়, নবী মুহাম্মদের যুগে এবং আবু বকরের যুগে উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি করা হতো বলে বর্ণনা আছে। পরে উমর এসে এই বিক্রি নিষিদ্ধ করেন। এই একটি ঘটনাই ইসলামের দাসপ্রথা-নৈতিকতা, নবী-যুগের আদর্শ দাবি এবং উমরের আইনগত হস্তক্ষেপকে একসঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ করে। [34] [35] [36] [37]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৪/ দাসত্বমুক্তি
পরিচ্ছেদঃ ৮. উম্মু ওয়ালাদ আযাদ হওয়া
৩৯৫৪। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকরের যুগে উম্মু ওয়ালাদ বাঁদীদেরকে বিক্রি করেছি। পরবর্তীতে উমার (রাঃ)-এর যুগে তিনি আমাদের বারণ করায় আমরা বিরত হই।[1]
সহীহ।
[1]. বায়হাক্বী, হাকিম। ইমাম হাকিম বলেনঃ এই হাদীসটি মুসলিমের শর্ত মোতাবেক।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সুনান ইবনু মাজাহ
১৩/ বিচার ও বিধান
পরিচ্ছেদঃ ১৩/৯৫. উম্মু ওয়ালাদ সম্পর্কে
৩/২৫১৭। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে জীবিত থাকা অবস্থায় আমরা আমাদের যুদ্ধবন্দিনী ক্রীতদাসী ও উম্মু ওয়ালাদ বিক্রয় করতাম। আমরা এটিকে দূষণীয় মনে করতাম না।
আবূ দাউদ ৩৯৫৪। সহীহাহ ২৪১৭।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৭ঃ ক্ৰয়-বিক্রয়ের বিধান
পরিচ্ছেদঃ ১. ক্রয় বিক্রয়ের শর্তাবলী ও তার নিষিদ্ধ বিষয় – উম্মুল আলাদ (যে দাসীর গর্ভে মনিবের সন্তান জন্মগ্রহন করেছে তার) বিক্রয়ের বিধান
৭৯১. ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার (রাঃ) জননী দাসী বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন, তিনি বলেছেন, বিক্রি করা যাবে না, হেবা (দান) করা যাবে না, ওয়ারিস হিসেবেও কেউ তাকে অধিগ্রহণ করতে পারবে না। তার মালিক যতদিন চাইবে ততদিন তার দ্বারা ফায়দা উঠাবে। মালিকের মৃত্যুর পর সে স্বাধীন হয়ে যাবে। —বাইহাকী বলেছেন- এ হাদীসের কিছু বর্ণনাকারী, অহম বা অনিশ্চয়তার ভিত্তিতে ’মারফূ’ বৰ্ণনা করেছেন।[1]
[1] ইবনু মাজাহ ২৫১৭, আবূ দাউদ ৩৯৫৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

কুফরি 11
কুফরি 13

প্রথমে এখানে দাসপ্রথার নোংরা বাস্তবতাটি স্পষ্ট করা দরকার। একজন দাসী নারী কোনো স্বাধীন যৌনসঙ্গী নন। তার শরীর মালিকের অধীনে। তার সঙ্গে মালিকের যৌনসম্পর্ককে ইসলামি আইন বৈধ করেছে। এই সম্পর্কের মধ্যে আধুনিক অর্থে স্বাধীন সম্মতি নেই, কারণ দাসী নারী মালিকের সমান সামাজিক, অর্থনৈতিক বা আইনি অবস্থানে দাঁড়িয়ে “না” বলার স্বাধীনতা রাখেন না। সেই দাসীর গর্ভে মালিকের সন্তান জন্মালেও, নবী ও আবু বকরের যুগে তাকে বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। অর্থাৎ একজন সন্তানের মাকেও বাজারে তোলা যেত। এটাই তথাকথিত সোনালী যুগের মানবিকতা।

এই অবস্থায় উমরের আইনগত হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এসে বললেন, উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি করা যাবে না, দান করা যাবে না, উত্তরাধিকার করা যাবে না; মালিক জীবিত থাকা পর্যন্ত তার সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারবে, কিন্তু মালিক মারা গেলে সে মুক্ত হবে। এই বিধানকে অনেকে মানবিক অগ্রগতি হিসেবে দেখাতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি এখানেই। যদি উমরের সিদ্ধান্ত মানবিক অগ্রগতি হয়, তাহলে নবীর যুগের আইন মানবিকভাবে পশ্চাৎপদ ছিল। আর যদি নবীর যুগের আইনই পরিপূর্ণ ও আদর্শ হয়, তাহলে উমর সেই আদর্শের ওপর নিজের আইন বসিয়েছেন। দুই অবস্থাতেই ইসলামের প্রচলিত পবিত্র ইতিহাসের দাবি বিপদে পড়ে।

উমরের এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেনি। এটি দাসী নারীর পূর্ণ মানবমর্যাদা স্বীকার করেনি। এটি মালিকের যৌন-অধিকার বাতিল করেনি। এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট স্তরে দাসী-মাকে বাজারে বিক্রি করার ক্ষমতা সীমিত করেছে। অর্থাৎ একজন নারী এখনও দাসী, এখনও মালিকের যৌন-অধীনে, এখনও স্বাধীন নাগরিক নন, কিন্তু অন্তত সন্তান জন্মানোর পর তাকে আর বাজারে বিক্রি করা যাবে না। এটুকু সীমিত সংশোধনও যদি নবী-যুগের আইনে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে নবী-যুগের আইনকে নৈতিকভাবে চূড়ান্ত বলা যায় না। বরং বলতে হয়, উমরও নবীর আইনের চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহারিক মানবিকতা দেখিয়েছেন। সেই কথাটি মেনে নিলে নবীর নৈতিক পূর্ণতা ধাক্কা খায়। না মেনে নিলে উমরের নিষেধাজ্ঞা নবী-যুগের প্রথার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আইন-হস্তক্ষেপ হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামি প্রতিরক্ষা এখানে সাধারণত বলবে, উমর শরিয়তের উদ্দেশ্য বুঝে আইন প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু এই কথাটি আসলে সমস্যাকে আরও প্রকট করে। শরিয়তের উদ্দেশ্য যদি উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি বন্ধ করা হয়, তাহলে নবী নিজে তা স্পষ্ট করে বন্ধ করলেন না কেন? আল্লাহর রাসূলের যুগে সন্তানের মা দাসী বিক্রি চলল কেন? আবু বকরের সময়েও তা চলল কেন? উমর এসে সেই উদ্দেশ্য বুঝলেন, কিন্তু নবী বুঝলেন না? যদি বলা হয়, সময়ের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে আইন এসেছে, তাহলে ইসলামি নৈতিকতার চিরন্তনতা হারিয়ে যায়। যদি বলা হয়, নবীর যুগেই যথেষ্ট বিধান ছিল, তাহলে উমরের নিষেধাজ্ঞা অপ্রয়োজনীয় বা বিদআতসদৃশ হয়ে পড়ে।

এই প্রসঙ্গে একটি নৈতিক দ্বৈততা স্পষ্ট। ইসলামি প্রচারণা প্রায়ই বলে, ইসলাম দাসদের অধিকার দিয়েছে, দাসপ্রথাকে মানবিক করেছে, ধীরে ধীরে মুক্তির পথ খুলেছে। কিন্তু উম্মু ওয়ালাদের ঘটনা দেখায়, ইসলাম দাসী নারীকে প্রথমে সম্পত্তি হিসেবেই ধরে রেখেছিল। সন্তান জন্মানোর পরও তার মানবিক অবস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন মানুষের পর্যায়ে ওঠেনি। তাকে বিক্রি করার প্রশ্নই উঠেছে, কারণ আইন তাকে সম্পত্তি হিসেবে দেখত। যে ব্যবস্থায় সন্তানের মাকেও মালিকের সম্পত্তি হিসেবে বিক্রি করার সুযোগ থাকে, সেই ব্যবস্থাকে মানবিক বলা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

উমরের নিষেধাজ্ঞা তাই একসঙ্গে দুইটি সত্য প্রকাশ করে। প্রথমত, নবী-যুগের দাসপ্রথা নৈতিকভাবে নোংরা ছিল। দ্বিতীয়ত, ইসলামী আইন নবীর মৃত্যুর পরও খলিফার হাতে পরিবর্তিত হয়েছে। উমর এখানে শুধু প্রশাসনিক আদেশ দেননি; তিনি মালিকানা, যৌনতা, মাতৃত্ব, দাসবাজার এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে কার্যকর আইন বদলেছেন। পরবর্তী ফিকহ এই পরিবর্তনকে আইন হিসেবে গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ আবারও দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর চূড়ান্ত আইন নয়, বরং ক্ষমতাবান খলিফার সিদ্ধান্তই বাস্তব শরিয়তের অংশ হয়ে গেছে।

এখানে একটি কঠোর প্রশ্ন তুলতেই হবে: যদি একজন দাসী নারী তার মালিকের সন্তানের মা হওয়ার পরও নবী-যুগে বিক্রয়যোগ্য থাকেন, তাহলে ইসলামি নৈতিকতা আসলে নারীকে কী মর্যাদা দিয়েছে? তিনি মা, কিন্তু মানুষ নন; তিনি সন্তানের জন্মদাত্রী, কিন্তু স্বাধীন নন; তিনি মালিকের বিছানার অংশ, কিন্তু নিজের শরীরের মালিক নন; তিনি পরিবারের ভেতরে সন্তান জন্ম দেন, কিন্তু বাজারে বিক্রি হওয়ার ঝুঁকি বহন করেন। এমন ব্যবস্থাকে ঈশ্বরীয় ন্যায়বিচার বলা যায় না। এটি দাসমালিক পুরুষের সুবিধার জন্য বানানো যৌন-অর্থনৈতিক আইন।

উমরের আইন এই নোংরামির কিছু অংশ সীমিত করেছে, কিন্তু মূল দাসপ্রথাকে ছুঁয়ে দেখেনি। উম্মু ওয়ালাদকে সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত মানুষ করা হয়নি। মালিকের জীবদ্দশায় সে তার অধীনে থাকে। মালিক তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। তার স্বাধীনতা মালিকের মৃত্যুর ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ নারী নিজের মানবিক অধিকারের কারণে মুক্ত নয়; পুরুষ-মালিকের মৃত্যু তার স্বাধীনতার শর্ত। এই ধরনের বিধানকে মানবিক বলা যায় কেবল তখনই, যখন মানবিকতার মানদণ্ডকে দাসমালিক সমাজের নর্দমায় নামিয়ে আনা হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ঘটনাটি ইসলামের “নবী-যুগ শ্রেষ্ঠ যুগ” দাবিকে সরাসরি আঘাত করে। যদি নবী-যুগ শ্রেষ্ঠ হয়, তাহলে উমর এসে কেন দাসী-মাতার বিক্রি বন্ধ করবেন? শ্রেষ্ঠ যুগেই কেন এই নোংরা বাজার চলছিল? আর যদি উমর এসে ভালো আইন করেন, তাহলে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি উমরের দিকে সরে যায়, নবীর দিকে নয়। তখন স্বীকার করতে হয়, নবীর শরিয়ত অসম্পূর্ণ ছিল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেটিকে সংশোধন করেছে। এই স্বীকারোক্তি ইসলামী ধর্মতত্ত্বের জন্য মারাত্মক, কারণ তা নবীর আইনগত পূর্ণতা ও কোরআনিক নৈতিকতার চূড়ান্ততা দুটোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই প্রসঙ্গটি আরও একটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি আইনতত্ত্বে নবীর সুন্নাহকে আল্লাহর আইনের সমতুল্য গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু উম্মু ওয়ালাদের ক্ষেত্রে যদি নবী-যুগের চলমান প্রথা পরে উমর নিষিদ্ধ করেন, তাহলে সুন্নাহর স্থায়িত্ব কোথায়? নবীর যুগে যা চলেছে, তা কি সব সময় আদর্শ? যদি আদর্শ হয়, উমরের নিষেধাজ্ঞা অগ্রহণযোগ্য। যদি আদর্শ না হয়, তাহলে নবী-যুগকে নৈতিক মডেল বলা যায় না। এই দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে ধর্মতত্ত্ব অনেক ব্যাখ্যা বানাতে পারে, কিন্তু মূল সমস্যা থেকে যায়: নবী-যুগের আইন ও উমর-যুগের আইন একই নয়।

উম্মু ওয়ালাদ প্রসঙ্গ তাই কেবল দাসপ্রথার একটি উপ-আইন নয়। এটি ইসলামের নৈতিক দাবির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী দলিল। এটি দেখায়, নবী-যুগে সন্তানের মা দাসীও সম্পত্তি ছিল; আবু বকরের সময়েও সেই বাস্তবতা চলেছে বলে বর্ণনা আছে; পরে উমর এসে সীমিত সংশোধন করেছেন। এই ধারাবাহিকতা আকাশি ন্যায়বিচারের ইতিহাস নয়। এটি দাসমালিক সমাজের আইন, যেখানে নারীর শরীর পুরুষের মালিকানায়, মাতৃত্ব সম্পত্তির সম্পর্কের ভেতরে বন্দী, আর মানবতা পরে খলিফার প্রশাসনিক সংশোধনের অপেক্ষায় থাকে।

অতএব উম্মু ওয়ালাদ প্রসঙ্গে ইসলামের জন্য কোনো সম্মানজনক পালানোর পথ নেই। উমর যদি ভুল করেন, তাহলে তিনি নবী-যুগের বৈধ প্রথা বদলেছেন। উমর যদি ঠিক করেন, তাহলে নবী-যুগের প্রথাই নৈতিকভাবে ভুল ছিল। আর যদি বলা হয় উভয়ই ঠিক, তাহলে ইসলামি নৈতিকতা সময়, ক্ষমতা ও সুবিধা অনুযায়ী বদলানো এক আপেক্ষিক ব্যবস্থা, চিরন্তন ন্যায় নয়। এই ঘটনায় উমর শুধু একজন খলিফা নন; তিনি ইসলামের নৈতিক অসম্পূর্ণতার অনিচ্ছাকৃত সাক্ষী। তার নিষেধাজ্ঞা দেখায়, নবীর আইনও মানবীয় সংশোধনের প্রয়োজন থেকে মুক্ত ছিল না।


বয়স্ক লোকের দুধপান: কোরআন ও নবীর ওপরে উমরের প্রাধান্য

ইসলামী শরিয়তের সবচেয়ে অস্বস্তিকর ও কুৎসিত বিষয়গুলোর একটি হলো বয়স্ক লোকের দুধপান বা রাদাআতুল কাবীর। বিষয়টি এতটাই বিব্রতকর যে আধুনিক মুসলিম এপোলজিস্টরা সাধারণত এটিকে চাপা দিতে চায়, বিশেষ ঘটনা বলে পাশ কাটাতে চায়, অথবা নানা ব্যাখ্যার জাল বুনে ঘটনাটিকে গ্রহণযোগ্য দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সহিহ মুসলিমসহ ইসলামি উৎসগুলো পড়লে দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ নিজেই সালিম নামের একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে দুধপান করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে সে একটি ঘরে যাতায়াত করতে পারে। নারী-পুরুষ সম্পর্ক, পর্দা, মাহরাম, দেহ, যৌনতা ও সামাজিক শালীনতার প্রশ্নে এর চেয়ে হাস্যকর এবং নোংরা আইনগত কল্পনা আর কী হতে পারে?

হাদিসগুলো আগে দেখা যাক [38] [39] [40] [41] [42] [43] [44] [45] [46]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৬৯। আমরুন নাকিদ ও ইবনু আবূ উমর (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুহায়লের কন্যা সাহলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাযির হায়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার সাথে সালিমের দেখা সাক্ষাৎ করার কারণে আমি আবূ হুযায়ফার মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টির আলামত দেখতে পাচ্ছি অথচ সালিম হল তার হালীফ (পোষ্য পূত্র)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তাকে দুধপান করিয়ে দাও। তিনি বললেন, আমি কেমন করে তাকে দুধপান করাব, অথচ সে একজন বয়স্ক পূরুষ। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসি দিলেন এবং বললেন, আমি জানি যে, সে একজন বয়স্ক পুরুষ। আম্‌র (রাবী) তাঁর হাদীসে অতিরিক্ত বলেছেন, সালিম বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর ইবনু আবূ উমরের বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

কুফরি 15

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৭০। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম হানযালী ও মুহাম্মাদ ইবনু আবূ উমর (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবূ হুযায়ফার দাস সালিম (রহঃ) আবূ হুযায়ফা ও তাঁর পরিবারের সাথে একই ঘরে বসবাস করত। একদা সুহায়লের কন্যা (হুযায়ফার স্ত্রী) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট নিকট এসে বলল, সালিম বয়স্ক পুরুষের স্তরে পৌছে গেছে, সে বুঝে লোকে যা বুঝতে পারে অথচ সে আমাদের নিকট প্রবেশ করে থাকে। আমি ধারণা করি এই কারণে আবূ হুযায়ফার মনে অভিযোগের ভাব সৃষ্টি হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি তাকে দুধপান করিয়ে দাও, তুমি তার জন্য হারাম হয়ে যাবে এবং আবূ হুযায়ফার মনের অভিযোগ দুরীভূত হবে। তারপর তিনি তার (আবূ হুযায়ফার) নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি তাকে (সালিমকে) দুধপান করিয়েছি। তাতে আবূ হুযায়ফার মনের অসন্তোষ দুর হয়ে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৭২। মুহাম্মাদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) … উম্মু সালমা (রাঃ) আয়িশা (রাঃ)-কে বললেন, তোমার নিকট বালিগ হওয়ার নিকটর্তী ছেলে প্রবেশ করে থাকে, কিন্তু আমার নিকট ঐ ধরনের ছেলের প্রবেশ করাকে পছন্দ করি না। রাবী বলেন, আয়িশা (রাঃ) বললেন, তোমার জন্য কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে সুন্দর আদর্শ বিদ্যমান নেই? তিনি আরো বললেন, একদা আবূ হুযায়ফার স্ত্রী আরয করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সালিম আমার নিকট প্রবেশ করে থাকে, অথচ সে একজন বয়স্ক পুরুষ এবং এ জন্য আবূ হুযায়ফার অন্তরে কিছুটা অসন্তোষভাব বিদ্যমান। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তাকে তোমার দুধ পান করিয়ে দাও যাতে সে তোমার নিকট প্রবেশ করতে পারে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৭৩। আবূ তাহির ও হারুন ইবনু সাঈদ আয়লী (রহঃ) … রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী উম্মু সালামা (রাঃ) একদিন আয়িশা (রাঃ)-কে বললেন, আল্লাহর কসম আমি পছন্দ করি না যে, যে ছেলে দুধপানের বয়স পার হয়ে গেছে, সে আমাকে দেখুক। তিনি বললেন, কেন? একদা সুহায়লের কন্যা সাহলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর কসম! আমার নিকট সালিমের প্রবেশ করার কারণে আমি আবূ হুযায়ফার মুখমণ্ডলে অসন্তোষের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে তোমার দুধপান করিয়ে দাও। সাহলা বললেন, সে (সালিম) তো দাড়িবিশিষ্ট। তিনি বললেন, তুমি তাকে দুধ পান করিয়ে দাও, তাতে আবূ হুযায়ফার মুখমন্ডলের মলিনতা দূর হয়ে যাবে। সাহলার বর্ণনা, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, তারপরে আমি আবূ হুযায়ফার চেহারায় মলিনতা আর দেখতে পাই নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)

সুনান ইবনু মাজাহ
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/৩৬. বয়স্ক লোকে দুধ পান করলে
১/১৯৪৩। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহ্লা বিনতে সুহাইল (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললো, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমার নিকট সালেমের যাতায়াতের কারণে আমি (আমার স্বামী) আবূ হুযাইফাহর চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি তাকে দুধ পান করিয়ে দাও। সে বললো, আমি তাকে কিভাবে দুধপান করাবো, সে যে বয়স্ক পুরুষ? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বলেনঃ আমিও অবশ্য জানি যে, সে বয়স্ক পুরুষ। সে তাই করলো, দুধ পান করানোর পর আবূ হুযাইফাহর চেহারায় আমি কোন অপছন্দের ভাব লক্ষ্য করিনি। (রাবী বলেন), তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
সহীহুল বুখারী ৪০০০, ৫০৮৮, মুসলিম ১৪৫৩, নাসায়ী ৩২২৩, ৩২৩৪, ৩৩১৯, ৩৩২০, ৩৩২১, ৩৩২২, ৩৩২৩, আবূ দাউদ ২০৬১, আহমাদ ২৫১২১, মুয়াত্তা মালেক ১২৮৮, দারেমী ২২৫৭, ইরওয়াহ ৬/২৬৪, রওদুন নাদীর ৩৫৪
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

ঘটনাটির মূল সমস্যা খুব স্পষ্ট। একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ কোনো ঘরে যাতায়াত করলে পর্দা ও মাহরামের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সেই সমস্যার সমাধানে নবী বললেন, তাকে দুধপান করাও। এর অর্থ দাঁড়ায়, নারীর শরীর থেকে দুধ পান করানোকে সামাজিক সম্পর্কের আইনগত যন্ত্র বানানো হলো। মানুষ জন্মসূত্রে আত্মীয় হতে পারে, বিবাহসূত্রে আত্মীয় হতে পারে, কিন্তু এখানে শরীরের তরল পদার্থকে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রবেশাধিকার বৈধ করার জন্য। এই আইনি কল্পনা কেবল অদ্ভুত নয়; এটি নারীদেহকে শরিয়তের সামাজিক প্রকৌশলের একটি বস্তুতে পরিণত করে।

এই ঘটনায় এপোলজিস্টদের সবচেয়ে সাধারণ প্রতিরক্ষা হলো, এটি শুধু সালিমের জন্য বিশেষ ছাড় ছিল। কিন্তু ইসলামি উৎস নিজেই বিষয়টিকে এত সহজে শেষ হতে দেয় না। কারণ আয়িশা এই ঘটনাকে কেবল সালিমের বিশেষ ঘটনা হিসেবে দেখেননি; তিনি যাদের ঘরে প্রবেশ করতে দিতে চাইতেন, তাদের ক্ষেত্রে দুধপানের মাধ্যমে মাহরাম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ধারণা গ্রহণ করেছিলেন বলে বর্ণনা আছে। অন্যদিকে নবীর অন্যান্য স্ত্রীগণ এই ব্যাখ্যা অস্বীকার করেন এবং বলেন, এটি সালিমের জন্য বিশেষ অনুমতি ছাড়া আর কিছু নয়। অর্থাৎ নবীর ঘরের ভেতরেই এই আইন নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছিল। নবীর এক স্ত্রী একে সাধারণ প্রয়োগযোগ্য মনে করছেন, অন্য স্ত্রীরা এটিকে সীমিত ব্যতিক্রম বলছেন। এটাই শরিয়তের কথিত স্পষ্টতা।

মুয়াত্তা মালিক (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩০. সন্তানের দুধ পান করানোর বিধান সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২. বয়স্ক হওয়ার পর দুধ পান করা
রেওয়ায়ত ১২. ইবন শিহাব (রহঃ)-কে প্রশ্ন করা হইল বয়স্কের দুধ পান করা সম্বন্ধে। তিনি (উত্তরে) বলিলেনঃ উরওয়াহ ইবন যুবায়র (রহঃ) আমাকে বলিয়াছেনঃ আবু হুযায়ফা ইবন উতবা ইবন রবি’আ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে একজন সাহাবী ছিলেন। তিনি বদরের যুদ্ধে শহীদ হইয়াছেন, তিনি সালিম (রাঃ)-কে পালক পুত্র করিয়াছিলেন যাহাকে বলা হইত-সালিম মাওলা আবু হুযায়ফা। [সায়িবা নামক জনৈকা মহিলা তাহাকে আযাদ করেন, পরে আবু হুযায়ফা তাহাকে লালন-পালন করেন এবং পুত্ররূপে গ্রহণ করেন। এইজন্য সালিমকে আবু হুযায়ফার মাওলা বলা হইয়াছে] যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়দ ইবন হারিস (রাঃ)-কে পুত্র সন্তান বানাইয়ছিলেন এবং আবু হুযায়ফা সালিমের নিকট তাহার ভাতিজী ফাতেমা বিনত ওয়ালিদ ইবন উতবা ইবন রবি’আকে বিবাহ দিলেন, তিনি সালিমকে নিজের পুত্র বলিয়া মনে করিতেন।
ফাতেমা ছিলেন প্রথম ভাগে হিজরতকারিণীদের মধ্যে একজন মহিলা এবং তিনি তখন কুরাইশদের অবিবাহিত মহিলাদের মধ্যেও ছিলেন অন্যতমা। যখন আল্লাহ তাহার কিতাবে যায়দ ইবন হারিসা সম্পর্কে এই আয়াত অবতীর্ণ করিলেনঃ
‏ادْعُوهُمْ لآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ فَإِنْ لَمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ‏
(অর্থাৎ তোমরা উহাদিগকে ডাক উহাদের পিতৃপরিচয়ে। আল্লাহর নিকট ইহাই ন্যায়সঙ্গত, যদি তোমরা উহাদের পরিচয় না জান তবে উহদিগকে তোমাদের ধর্মীয় ভ্রাতা ও বন্ধুরূপে গণ্য করবে।) যাহাদিগকে পোষ্যপুত্র বানাইয়াছ তাহাদিগকে তাহদের পিতৃপরিচয়ের দিকে ফিরাইয়া দাও। আর যদি পিতার পরিচয় না জান তবে তাহার মাওলার (মনিব বা মিত্রতা সূত্রে স্থাপিত সম্পর্কের স্বজন) দিকে তাহাদিগকে ফিরাইয়া দাও। আর হুযায়ফার স্ত্রী সাহলা বিনত সুহায়ল যিনি ছিলেন আমির ইবন লুয়াই গোত্রের, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সালিমকে আমরা পুত্ররূপে গ্রহণ করিয়াছিলাম। সে আমার কক্ষে প্রবেশ করে এই অবস্থায় যে, আমি তখন একটি কাপড় পরিধান করিয়া থাকি। আর আমার গৃহও মাত্র একটি। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেনঃ এ বিষয়ে আমাদের কথা হইল তাহাকে পাঁচবার (স্তন হইতে) দুধ পান করাইয়া দাও। তাহা হইলে এই দুধের কারণে সে হারাম হইয়া যাইবে এবং সাহলা দুধপান করানোর কারণে তাহাকে পুত্র বলিয়া জানিতেন।
উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ অভিমত গ্রহণ করিয়াছেন, অতএব সেই সকল পুরুষের তাঁহার নিকট প্রবেশ করা তিনি পছন্দ করিতেন। তিনি তাহার ভগ্নী উম্মে কুলসুম বিনত আবি বকর সিদ্দীক (রাঃ)-কে এবং তাহার ভাতিজীদিগকে সেই সকল পুরুষকে দুধ পান করানোর নির্দেশ দিতেন। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যান্য সহধর্মিণী এই প্রকার দুধ পানের দ্বারা কোন পুরুষের তাহদের নিকট প্রবেশ করাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। তাহারা বলিতেন, [’আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করিয়া] আল্লাহর কসম, আমরা মনে করি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহলা বিনত সুহাইলকে যে হুকুম দিয়াছিলেন তাহা কেবলমাত্র সালিমের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হইতে রুখসত (বিশেষ অনুমতি) স্বরূপ ছিল। কসম আল্লাহর! এই প্রকারের দুধ পান করানো দ্বারা আমাদের নিকট কোন লোক প্রবেশ করিতে পরিবে না। বয়স্কদের দুধ পান করানো সম্বন্ধে আর সকল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণীগণ এই অভিমতের উপর অটল ছিলেন।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ ইবনু শিহাব আয-যুহরী (রহঃ)

এখানে উমরের ভূমিকা বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। মুআত্তা মালিকে একটি বর্ণনায় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি উমরের কাছে এসে বলে, তার একটি দাসী ছিল যার সঙ্গে সে যৌনসম্পর্ক করত; তার স্ত্রী সেই দাসীকে দুধপান করিয়েছে, যেন সে স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়। উমর এই কৌশলকে গ্রহণ করেননি। বরং তিনি বলেন, স্ত্রীকে শাস্তি দাও এবং দাসীর কাছে যাও; দুধপান তো ছোটদের দুধপান। অর্থাৎ নবীর দেওয়া বয়স্ক দুধপানের অদ্ভুত আইনি সম্ভাবনাকে উমর কার্যত বাতিল করে দিলেন। তার ফতোয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক দুধপান কোনো মাহরাম সম্পর্ক তৈরি করে না। এখানে আবারও দেখা যাচ্ছে, নবী-উৎসারিত এক অস্বস্তিকর বিধানকে পরবর্তী কর্তৃত্ব এসে সীমিত করছে, নিষ্ক্রিয় করছে, অথবা কার্যত বাতিল করছে।

মুয়াত্তা মালিক (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩০. সন্তানের দুধ পান করানোর বিধান সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২. বয়স্ক হওয়ার পর দুধ পান করা
রেওয়ায়ত ১৩. ’আবদুল্লাহ ইবন দীনার (রহঃ) হইতে বর্ণিত, তিনি বলিয়াছেনঃ বয়স্কদের দুধ পানের বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্য “দারুল কাযা” (বিচারালয় ইহা ছিল উমর ফারুক (রাঃ)-এর ঘর, তাহার শাহাদতের পর তাহার ঋণ পরিশোধ করার জন্য এই ঘর বিক্রি করা হয়, তাই ইহাকে দারুল কাযা বলা হয়)-এর নিকট এক ব্যক্তি আসিল। আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)-এর নিকট তখন আমি উপস্থিত ছিলাম। আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বলিলেনঃ এক ব্যক্তি উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, আমার এক দাসী ছিল। আমি উহার সহিত সঙ্গম করিতাম – আমার স্ত্রী ইচ্ছাপূর্বক উহাকে দুধ খাওয়াইয়া দেয়, তারপর আমি সেই দাসীর নিকট (সঙ্গমের উদ্দেশ্যে) প্রবেশ করিলাম। আমার স্ত্রী বলিল থাম। উহার সাথে সংগত হইও না আল্লাহর কসম, আমি উহাকে দুধ পান করাইয়াছি। উমর (রাঃ) বলিলেন তোমার স্ত্রীকে শাস্তি দাও, তারপর দাসীর নিকট গমন কর, দুধ পান করানো ছোটদের বেলায় গ্রহণযোগ্য হইয়া থাকে।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু দ্বীনার (রহঃ)

এখানে প্রশ্নটি সরাসরি। নবী যদি পূর্ণবয়স্ক সালিমকে দুধপান করিয়ে মাহরাম সম্পর্ক তৈরির নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে উমর কোন অধিকারে বলেন দুধপান শুধু ছোটদের ক্ষেত্রে কার্যকর? যদি উমর ঠিক হন, তাহলে নবীর সালিম-হুকুম নৈতিক ও আইনি দিক থেকে অদ্ভুত, অকার্যকর বা বিপজ্জনক ছিল। আর যদি নবী ঠিক হন, তাহলে উমরের ফতোয়া নবীর হুকুমের বিপরীত। দুই দিক থেকেই সমস্যা ইসলামের। একদিকে নবীর আইন অস্বাভাবিক ও বিব্রতকর, অন্যদিকে উমরের আইন সেই নবী-নির্দেশকে বাস্তব শরিয়ত থেকে সরিয়ে দেয়।

এই ঘটনায় দাসপ্রথা, নারী-শরীর, যৌন-অধিকার এবং আইনগত কৌশলের নোংরা সংমিশ্রণ দেখা যায়। একজন পুরুষের দাসী আছে, সে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করে। স্ত্রী সেই দাসীকে দুধপান করিয়ে সম্পর্ক হারাম করার কৌশল নেয়। উমর বলেন, স্ত্রীকে শাস্তি দাও এবং দাসীর কাছে যাও। এখানে দাসী নারীর নিজের ইচ্ছা কোথায়? তার শরীরের মালিক কে? তার ওপর যৌন অধিকার কার? স্ত্রীকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কে দিল? এই পুরো বর্ণনায় নারী দুজনই পুরুষ-আইনের বস্তু: একজন দাসী, যাকে যৌনসম্পত্তি হিসেবে ধরে রাখা হচ্ছে; আরেকজন স্ত্রী, যাকে শাস্তি দিতে বলা হচ্ছে। এটিই ইসলামি পারিবারিক ও দাসনৈতিক বাস্তবতার নগ্ন চিত্র।

বয়স্ক লোকের দুধপান প্রসঙ্গ তাই শুধু একটি হাস্যকর হাদিস নয়। এটি ইসলামী আইন-প্রণালীর বিশৃঙ্খলা উন্মোচন করে। নবী এক নির্দেশ দেন; আয়িশা সেটিকে বিস্তৃত প্রয়োগযোগ্য বলে গ্রহণ করেন; নবীর অন্য স্ত্রীরা তা অস্বীকার করেন; উমর কার্যত প্রাপ্তবয়স্ক দুধপানের আইনি কার্যকারিতা বাতিল করেন; পরে ফিকহি ঐতিহ্য প্রধানত এটিকে শিশু-দুধপানের সীমায় আটকে দেয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, শরিয়ত কোথায়? নবীর কথায়? আয়িশার প্রয়োগে? অন্য স্ত্রীদের সীমাবদ্ধকরণে? উমরের ফতোয়ায়? নাকি পরবর্তী ফিকহি মেরামতে?

এখানে ইসলামের স্পষ্ট আইন দাবির আরেকটি মৃত্যু ঘটে। একটি এত সংবেদনশীল বিষয়, যেখানে নারী-পুরুষের গোপনীয়তা, দেহ, মাহরাম সম্পর্ক, যৌন সীমা এবং পারিবারিক নৈতিকতা জড়িত, সেখানে নবী এমন এক নির্দেশ দেন যা পরবর্তী মুসলিম সমাজ নিজেই হজম করতে পারেনি। তাই সেটিকে বিশেষ ঘটনা, সীমিত অনুমতি, শিশুদুধপান, পাত্রে দুধ দেওয়া, সরাসরি নয়, পরোক্ষ, ব্যতিক্রম, প্রসঙ্গনির্ভর ইত্যাদি ব্যাখ্যার নিচে চাপা দিতে হয়েছে। সত্যটি খুব সরল: বিধানটি এত অস্বস্তিকর যে মুসলিম ফিকহ নিজেই সেটিকে সাধারণ আইন হিসেবে বহন করতে সাহস করেনি।

উমরের ফতোয়া এই বিব্রতকর সত্যকে আরও উন্মুক্ত করে। তিনি বাস্তবিকভাবে বুঝেছিলেন, প্রাপ্তবয়স্কদের দুধপানকে মাহরাম সম্পর্কের উৎস বানালে সামাজিক ও যৌন আইনের হাস্যকর বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। তাই তিনি সেটিকে ছোটদের দুধপানের মধ্যে সীমিত করলেন। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা কোরআনিক স্পষ্টতা বা নবীর চূড়ান্ত বিধান থেকে এলো না; এলো পরবর্তী কর্তৃত্বের বাস্তববোধ থেকে। অর্থাৎ আবারও দেখা গেল, নবীর নির্দেশ বাস্তব সমাজে অস্বস্তিকর হলে, উমর বা পরবর্তী ফিকহ এসে সেটিকে মেরামত করে। এটি ঐশ্বরিক আইন নয়; এটি বিব্রতকর হাদিসকে সামাজিকভাবে ব্যবস্থাপনাযোগ্য করার মানবীয় প্রচেষ্টা।

এই ঘটনায় আয়িশার ভূমিকা আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। তিনি যদি সালিম-ঘটনাকে বিস্তৃতভাবে প্রয়োগযোগ্য মনে করে থাকেন, তাহলে নবীর ঘরের ভেতরেই একজন প্রধান বর্ণনাকারী নারী প্রাপ্তবয়স্ক দুধপানের আইনগত প্রভাব স্বীকার করছিলেন। অন্য স্ত্রীগণ যদি তা অস্বীকার করেন, তাহলে নবী-পরিবারেই শরিয়তের ব্যাখ্যা এক ছিল না। উমর যদি প্রাপ্তবয়স্ক দুধপান অকার্যকর বলেন, তাহলে সাহাবীদের মধ্যেও মতভেদ তীব্র। তাহলে কোন ইসলামটি সত্য? আয়িশার ইসলাম? উম্মে সালামার ইসলাম? উমরের ইসলাম? নাকি পরবর্তী ফকিহদের সুবিধাজনক ইসলাম? এই প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়, “একটি স্পষ্ট, চূড়ান্ত, অপরিবর্তনীয় শরিয়ত” ধারণাটি বাস্তব উৎসের সামনে টেকে না।

এখানে এপোলজিস্টদের আরেকটি হাস্যকর কৌশল হলো, তারা বলে সরাসরি স্তন্যপান নয়, পাত্রে দুধ দিয়ে পান করানো হয়েছিল। যেন সমস্যাটি এতে মিটে যায়। আসল সমস্যা পদ্ধতি নয়; আসল সমস্যা আইনগত ধারণা। সরাসরি হোক বা পাত্রে, প্রশ্ন একই থাকে: একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ নারীর দুধ পান করলে কীভাবে সে মাহরাম হয়ে যায়? এই সম্পর্কের নৈতিক ভিত্তি কী? একজন নারীকে কেন নিজের দেহের দুধ দিয়ে পুরুষের যাতায়াতের সমস্যা সমাধান করতে হবে? ধর্মতত্ত্ব পদ্ধতি নিয়ে যতই ধোঁয়াশা বানাক, মূল অস্বাভাবিকতা অক্ষত থাকে।

উমরের অবস্থান এই অস্বাভাবিকতাকে চাপা দেওয়ার প্রাথমিক রাজনৈতিক-আইনি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। তিনি বললেন, প্রাপ্তবয়স্ক দুধপান গণ্য নয়। এতে সামাজিক সমস্যা কমে, কিন্তু নবীর সালিম-নির্দেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নবীর নির্দেশকে অক্ষত রাখতে চাইলে উমরের ফতোয়া সমস্যায় পড়ে। উমরকে অক্ষত রাখতে চাইলে নবীর নির্দেশ সীমিত, অস্বাভাবিক, ব্যতিক্রমী এবং কার্যত অপ্রযোজ্য হয়ে যায়। ইসলামী ধর্মতত্ত্ব এই দ্বন্দ্বকে “বিশেষ রুখসত” বলে পাশ কাটায়। কিন্তু বিশেষ রুখসত বললেই প্রশ্ন শেষ হয় না; বরং আরও তীব্র হয়। সর্বজ্ঞ আইনদাতা কেন এমন একটি বিশেষ ছাড় দেবেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এত বিব্রতকর যে সবাই সেটিকে সীমিত করতে ব্যস্ত?

অতএব বয়স্ক লোকের দুধপান প্রসঙ্গ ইসলামের আইনগত ও নৈতিক বিশৃঙ্খলার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। নবী একটি অদ্ভুত নির্দেশ দিলেন, আয়িশা সেটিকে প্রয়োগযোগ্য মনে করলেন, অন্য স্ত্রীগণ তা প্রত্যাখ্যান করলেন, উমর প্রাপ্তবয়স্ক দুধপানের কার্যকারিতা অস্বীকার করলেন, এবং পরবর্তী ফিকহ সেটিকে শিশু-দুধপানের সীমায় বন্দী করল। এটি চিরন্তন ঐশ্বরিক আইনের ইতিহাস নয়। এটি বিব্রতকর হুকুম, পারিবারিক মতভেদ, খলিফার ফতোয়া এবং পরবর্তী আইনগত মেরামতের ইতিহাস। আর এই ইতিহাস আবারও দেখায়, ইসলামী শরিয়ত আকাশ থেকে নেমে আসা পরিপূর্ণ বিধান নয়; বরং মানুষের অস্বস্তি, সামাজিক চাপ, যৌননীতি, দাসপ্রথা এবং ক্ষমতাবান পুরুষদের সিদ্ধান্তে ক্রমাগত রূপ বদলানো এক বিশৃঙ্খল আইনব্যবস্থা।


স্ত্রী প্রহার: উমরের আপত্তির মুখে নবীর নিষেধ শিথিল

উমর ইবনুল খাত্তাবের প্রভাব কেবল পর্দা, মুতআ, তামাত্তু, দাসী-মালিকানা বা বয়স্ক লোকের দুধপানের মতো আইনগত অস্বস্তির জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নারী-নির্যাতনের প্রশ্নেও ইসলামি উৎসে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণনায় দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ প্রথমে স্ত্রীদের প্রহার করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু উমর এসে অভিযোগ করলেন, নারীরা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে সাহসী হয়ে উঠেছে বা অবাধ্য হয়ে উঠেছে। এরপর নবী স্ত্রী প্রহারের অনুমতি দিলেন। পরে বহু নারী নবীর পরিবারের কাছে এসে স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তখন নবী বললেন, যারা স্ত্রীদের মারধর করে তারা তোমাদের উত্তম লোক নয়। এই ঘটনাটি ইসলামী নৈতিকতার এক অদ্ভুত ও নোংরা দ্বৈততা প্রকাশ করে: প্রথমে নিষেধ, তারপর উমরের আপত্তির মুখে অনুমতি, তারপর অভিযোগের ঢল নেমে গেলে নৈতিক অসন্তোষ। [47] [48]

সুনান ইবনু মাজাহ
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/৫১. স্ত্রীদের প্রহার করা নিকৃষ্ট কাজ।
৩/১৯৮৫। ইয়াস ইবনু ’আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ যুবাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর দাসীদের প্রহার করো না। অতঃপর ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! নারীরা তো তাদের স্বামীদের অবাধ্যাচরণ করছে। তিনি তাদেরকে মারার অনুমতি দিলেন এবং তারা প্রহৃত হলো। পরে অনেক নারী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাড়িতে সমবেত হলো।সকাল বেলা তিনি বলেনঃ ’’আজ রাতে মুহাম্মাদের পরিবারে সত্তরজন মহিলা এসে তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে।তোমরা মারপিটকারীদেরকে তোমাদের মধ্যে উত্তম হিসাবে পাবে না।
আবূ দাউদ ২১৪৬, দারেমী ২২১৯, গায়াতুল মারাম ২৫১, সহীহ আবী দাউদ ১৮৬৩।
তাহকীক আলবানীঃ হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১০. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রত্যেকের (স্বামী-স্ত্রীর) পারস্পরিক হক ও অধিকার সংক্রান্ত
৩২৬১-[২৪] আয়াস ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহ তা‘আলার বান্দীগণকে (স্ত্রীগণকে ক্রীতদাসীর ন্যায়) মেরো না। অতঃপর ‘উমার এসে বললেন, (আপনার নিষেধাজ্ঞার দরুন) স্বামীদের ওপর রমণীদের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে (প্রয়োজনসাপেক্ষে) মারার অনুমতি দিলেন। এমতাবস্থায় রমণীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণীগণের নিকট পুনঃপুন এসে স্বামীদের (অত্যাচারের) ব্যাপারে অভিযোগ করতে লাগল। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শুনে রাখ! আমার পরিবার-পরিজনের নিকট স্ত্রীগণ স্বামীদের অভিযোগ নিয়ে পুনঃপুন আসছে যে, তোমাদের মধ্যে (যারা স্ত্রীদেরকে এরূপে কষ্ট দেয়) তারা কোনক্রমেই ভালো মানুষ নয়। (আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ ও দারিমী)[1]
[1] সহীহ : আবূ দাঊদ ২১৪৬, ইবনু মাজাহ ১৯৮৫, দারিমী ২২৬৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪১৮৯, সহীহ আল জামি‘ ৭৩৬০।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন সায়িব (রহঃ)

এই বর্ণনাটি সরাসরি দেখায়, নবীর নৈতিক অবস্থান স্থির ছিল না। তিনি প্রথমে স্ত্রী প্রহার নিষিদ্ধ করলেন। এটি ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান। কিন্তু উমর এসে বললেন, নারীরা স্বামীদের ওপর চড়াও হচ্ছে বা স্বামীদের প্রতি অবাধ্য হচ্ছে। এরপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়ে গেল। অর্থাৎ নারীর শরীরের নিরাপত্তা স্বামীর কর্তৃত্ব রক্ষার কাছে হার মানল। নারীকে না মারার নীতি পুরুষের অভিযোগের সামনে টিকল না। আর সেই অভিযোগের প্রধান বাহক ছিলেন উমর। এখানে উমর আবারও সেই পুরুষতান্ত্রিক চাপের প্রতিনিধি, যার সামনে ধর্মীয় বিধান নিজের অবস্থান বদলায়।

বর্ণনার ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উমর বলেন, নারীরা স্বামীদের বিরুদ্ধে “সাহসী” বা “অবাধ্য” হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ সমস্যা ছিল না যে নারীরা পুরুষদের হত্যা করছে, পুরুষদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করছে, পরিবার ধ্বংস করছে। সমস্যা ছিল নারীরা স্বামী-শাসনের সামনে মাথা নত করছে না। এই অভিযোগের জবাবে যে বিধান আসে, তা নারীর স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা নয়; পুরুষকে আবার প্রহারের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া। এটাই পিতৃতন্ত্রের স্বাভাবিক ভাষা: নারী প্রতিবাদ করলে তাকে অবাধ্য বলা হয়, পুরুষের দমনকে শৃঙ্খলা বলা হয়, আর প্রহারকে পরিবার রক্ষার পদ্ধতি বলা হয়।

এর সঙ্গে সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতের কাঠামো সরাসরি মিলে যায়। আয়াতে পুরুষদের নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল বা দায়িত্বপ্রাপ্ত বলা হয়েছে, কারণ আল্লাহ এক শ্রেণিকে অন্য শ্রেণির ওপর শ্রেষ্ঠতা দিয়েছেন এবং পুরুষেরা সম্পদ ব্যয় করে। এরপর “নুশূয” বা অবাধ্যতার আশঙ্কায় স্ত্রীদের উপদেশ দেওয়া, শয্যা ত্যাগ করা, এবং শেষ ধাপে তাদের প্রহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। “ইদরিবুহুন্না” শব্দটি নিয়ে আধুনিক এপোলজিস্টরা যতই ভাষাতাত্ত্বিক কসরত করুক, ইসলামের প্রাচীন ও প্রধানধারার ব্যাখ্যা-ঐতিহ্যে এর অর্থ স্ত্রীকে প্রহার করা হিসেবেই গৃহীত হয়েছে, যদিও পরে সেটিকে “হালকা”, “আঘাতহীন”, “মিসওয়াক দিয়ে” ইত্যাদি বলে নরম করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য এই প্রবন্ধটি পড়তে পারেন।

এখানে ইসলামি প্রতিরক্ষার প্রধান কৌশল হলো “হালকা প্রহার” শব্দবন্ধ। যেন প্রহার হালকা হলেই সেটি নৈতিক হয়ে যায়। এটি নীতিগত প্রতারণা। একজন স্বামী তার স্ত্রীকে মারার অধিকার রাখে, এই ধারণাটিই অমানবিক। প্রহার কত জোরে করা হলো, সেটি দ্বিতীয় প্রশ্ন। মূল প্রশ্ন হলো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কি তার স্বামীর অধীনস্থ শাস্তিযোগ্য বস্তু? তার মতভেদ, রাগ, আপত্তি, অসন্তোষ বা অবাধ্যতার শাস্তি কি শারীরিক আঘাত হতে পারে? একটি সভ্য নৈতিকতায় উত্তর স্পষ্ট: না। স্ত্রী মানুষ, দাসী নয়; নাগরিক, শিশুসন্তান নয়; সমান মর্যাদার ব্যক্তি, স্বামীর প্রশিক্ষণযোগ্য পশু নয়।

আসবাবুন নুযুল ধারায় সূরা নিসা ৪:৩৪-এর প্রেক্ষাপট আরও কুৎসিত। বর্ণনায় আসে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে থাপ্পড় মারে; স্ত্রী বা তার পরিবার নবীর কাছে অভিযোগ করে; নবী প্রথমে কিসাস বা প্রতিশোধের কথা বলেন; পরে আয়াত নাজিল হয়, এবং সেই কিসাস স্থগিত হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রথম অবস্থানে একজন নারী স্বামীর হাতে প্রহৃত হলে প্রতিশোধ বা ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আয়াত এসে সেই সম্ভাবনা সরিয়ে পুরুষের কর্তৃত্ব ও প্রহারের অধিকারকে ধর্মীয় ভাষায় প্রতিষ্ঠা করে। এই প্রেক্ষাপট সত্য হলে, ৪:৩৪ কোনো নারী-রক্ষাকারী আয়াত নয়; এটি স্বামী-প্রহারের বিরুদ্ধে নারীর ন্যায়বিচারের পথ বন্ধ করে পুরুষতান্ত্রিক শাস্তির অধিকারকে বৈধ করে।

[রেফারেন্স/ব্লককোট প্লেসহোল্ডার: আল-ওয়াহিদী, আসবাবুন নুযুল, সূরা নিসা ৪:৩৪; সা‘দ ইবনুর রাবি/এক ব্যক্তি স্ত্রীকে আঘাত করেন; নবী কিসাসের কথা বলেন; আয়াত নাজিলের পর কিসাস স্থগিত হয়; “আমরা এক জিনিস চেয়েছিলাম, আল্লাহ অন্য জিনিস চেয়েছেন” ধরনের বর্ণনা]

এই প্রেক্ষাপটটি উমর-সম্পর্কিত সুনান আবু দাউদের বর্ণনার সঙ্গে একই পিতৃতান্ত্রিক ধারায় যুক্ত। দুই জায়গাতেই প্রথমে স্ত্রী প্রহারের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে ন্যায়সংগত অবস্থান দেখা যায়। এক জায়গায় নবী বলেন, নারীদের মারবে না। আরেক জায়গায় প্রহৃত স্ত্রীকে কিসাস দেওয়ার কথা আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বই জেতে। উমরের আপত্তির মুখে স্ত্রী প্রহারের অনুমতি ফিরে আসে। সূরা নিসা ৪:৩৪-এ স্ত্রী অবাধ্য হলে প্রহারকে ধাপে ধাপে পারিবারিক শাস্তির অংশ করা হয়। ফল একই: নারী স্বামীর অধীনস্থ, স্বামী শাস্তিদাতা, আল্লাহ সেই ক্ষমতাকে অনুমোদনকারী।

এই ঘটনায় উমরের নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার। তিনি নারীর নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়াননি। তিনি বলেননি, স্বামীরা যেন নারীদের ওপর জুলুম না করে। তিনি বলেননি, পরিবারে মতভেদ হলে বিচার, সালিশ, বিচ্ছেদ বা সমান অধিকার থাকা দরকার। তিনি অভিযোগ করলেন, নারীরা স্বামীদের ওপর সাহসী হয়ে উঠেছে। এই অভিযোগের মধ্যে পুরুষ-শাসিত সমাজের আতঙ্ক আছে। নারী যদি কথা বলে, তাকে অবাধ্য বলা হবে। নারী যদি মাথা নত না করে, তাকে সাহসী হওয়ার অভিযোগে দোষী করা হবে। আর সেই অভিযোগের চিকিৎসা হিসেবে পুরুষের হাতে প্রহার করার অনুমতি তুলে দেওয়া হবে। এটিই উমরের পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতি।

এখানে নবীর অবস্থানও সমানভাবে সমস্যাযুক্ত। তিনি প্রথমে ভালো কথা বললেন: নারীদের মারবে না। কিন্তু সেই নীতিতে স্থির থাকলেন না। উমরের আপত্তির পর অনুমতি দিলেন। পরে যখন নারীরা দল বেঁধে অভিযোগ করতে লাগল, তখন স্ত্রী-প্রহারকারীদের “উত্তম নয়” বললেন। এই নৈতিক দ্বিধা অত্যন্ত দুর্বল। যদি স্ত্রী প্রহার ভুল হয়, তাহলে অনুমতি কেন? আর যদি অনুমতি বৈধ হয়, তাহলে প্রহারকারীরা উত্তম নয় কেন? একটি নীতি হয় ন্যায়সংগত, নয় অমানবিক। “অনুমতি আছে, কিন্তু ভালো লোকেরা করবে না” ধরনের অবস্থান আসলে নৈতিক কাপুরুষতা। এতে সহিংসতা বন্ধ হয় না; বরং সহিংস মানুষ আইনি লাইসেন্স পায়, আর ভুক্তভোগী নারী পায় কেবল নরম উপদেশ।

এই দ্বৈততা আজও মুসলিম সমাজে কাজ করে। বলা হয়, ইসলাম স্ত্রীকে মারতে বলেনি, শুধু “হালকা শাসন” বলেছে। বলা হয়, নবী স্ত্রীদের মারেননি, তাই না মারাই উত্তম। কিন্তু একই সঙ্গে কোরআন ৪:৩৪ দেখিয়ে স্বামীকে প্রহারের অনুমতি দেওয়া হয়। ফল হলো, স্ত্রী-প্রহারের নৈতিক দরজা খোলা থাকে। স্বামী জানে, সে একেবারে নিষিদ্ধ কাজ করছে না; সে শুধু “শেষ ধাপ” ব্যবহার করছে। আলেম বলবে, বেশি মারবে না, দাগ ফেলবে না, মুখে মারবে না। কিন্তু এইসব সীমাবদ্ধতা আসল অপরাধকে নৈতিক করে না। শারীরিক শাস্তির অধিকার স্বামীর হাতে দেওয়া মানেই নারীকে অধীনস্থ মর্যাদায় নামিয়ে দেওয়া।

সূরা নিসা ৪:৩৪-এর ভাষা নিজেই পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষ নারীর ওপর কর্তৃত্বশীল, কারণ পুরুষ ব্যয় করে এবং আল্লাহ এককে অন্যের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ব্যয়কে শাসন-অধিকারের ভিত্তি বানানো হয়েছে। একজন পুরুষ অর্থ খরচ করে, তাই সে শাসক; নারী রক্ষণীয়, তাই অনুগত। এই কাঠামোতে বিবাহ সমান মর্যাদার সম্পর্ক নয়। এটি একটি শ্রেণিবিন্যাস: উপরে পুরুষ, নিচে নারী। সেই শ্রেণিবিন্যাসের শাস্তিমূলক হাতিয়ার হলো প্রহার। ফলে ৪:৩৪ কেবল একটি পারিবারিক উপদেশ নয়; এটি ধর্মীয় ভাষায় পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার সাংবিধানিক ঘোষণা।

এখানে “নুশূয” শব্দটিও গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রী কী করলে নুশূয হবে? স্বামীর কথা না শুনলে? যৌনসম্পর্কে অস্বীকৃতি জানালে? ঘর ছাড়তে চাইলে? স্বামীর কর্তৃত্ব মানতে না চাইলে? এই অস্পষ্টতা নিজেই বিপজ্জনক। কারণ শাস্তির ক্ষমতা যখন স্বামীর হাতে, তখন স্বামীই প্রায়শই বিচারক, অভিযোক্তা এবং শাস্তিদাতা। নারীর “অবাধ্যতা” পুরুষের চোখে নির্ধারিত হয়। তারপর সেই অভিযোগের ধাপ: উপদেশ, শয্যা ত্যাগ, প্রহার। এটি কোনো ন্যায়বিচার নয়; এটি গৃহস্থালী ক্ষমতার নামে ব্যক্তিগত শাস্তি ব্যবস্থার ধর্মীয় অনুমোদন।

আধুনিক এপোলজিস্টরা প্রায়ই বলে, “ইদরিবুহুন্না” মানে প্রহার নয়, আলাদা হয়ে যাওয়া বা দূরে সরে যাওয়া হতে পারে। এই ব্যাখ্যা আধুনিক লজ্জা থেকে জন্ম নেওয়া শব্দকৌশল। যদি অর্থ সত্যিই “দূরে সরে যাওয়া” হতো, তাহলে প্রথম ধাপ উপদেশ, দ্বিতীয় ধাপ বিছানা পৃথক করা, তৃতীয় ধাপ আবার দূরে সরে যাওয়া: এই পুনরাবৃত্তি অর্থহীন হয়ে যায়। তাছাড়া প্রাচীন তাফসির-ঐতিহ্য, ফিকহি আলোচনা এবং স্ত্রী প্রহারের সীমা নিয়ে গড়ে ওঠা হাদিস-ব্যাখ্যাই দেখায় যে ঐতিহ্যগত বোঝাপড়া প্রহারকেই ধরে নিয়েছে। আধুনিক অস্বস্তি প্রাচীন অর্থকে মুছে দিতে পারে না।

স্ত্রী প্রহার প্রসঙ্গে উমর-কেন্দ্রিক প্যাটার্ন আবারও স্পষ্ট। নারীরা কিছুটা স্বাধীন আচরণ করছে বলে উমরের অস্বস্তি তৈরি হয়। তিনি নবীর কাছে অভিযোগ করেন। নবীর নিষেধ শিথিল হয়। পরে সহিংসতার ফল দেখা যায়: নারীরা অভিযোগ করতে থাকে। তারপর আবার নৈতিক ভাষায় বলা হয়, স্ত্রী প্রহারকারীরা উত্তম নয়। কিন্তু ততক্ষণে দরজা খুলে গেছে। আইন পুরুষের হাতে অস্ত্র দিয়েছে, আর নৈতিকতা দূর থেকে বলছে, ভালো পুরুষ হলে ব্যবহার করো না। এই ধরনের নীতি সহিংসতা ঠেকায় না; সহিংসতাকে শর্তসাপেক্ষ বৈধতা দেয়।

এই ঘটনাকে উমরের ফজিলত বলা যায় না। এটি নারীর ওপর পুরুষতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উমরের ভূমিকার দলিল। তিনি সেই ব্যক্তি, যার অভিযোগের ফলে নবীর “মারবে না” অবস্থান নরম হলো। তিনি সেই রাজনৈতিক-সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রতিনিধি, যার কাছে নারীর স্বর, প্রতিবাদ ও আত্মমর্যাদা ছিল শৃঙ্খলাভঙ্গ। পরবর্তীকালের কোরআনিক কাঠামোও একই শাসন-তত্ত্বকে স্থায়ী রূপ দিল: পুরুষ কর্তৃত্বশীল, নারী অনুগত, অবাধ্য হলে ধাপে ধাপে শাস্তিযোগ্য। এটিই ইসলামি পারিবারিক আইনের পুরুষতান্ত্রিক মেরুদণ্ড।

এখানে ইসলামের নৈতিক ব্যর্থতা সরাসরি। একটি সর্বজ্ঞ, সর্বদয়, ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বরের আইন হলে প্রত্যাশিত ছিল: কোনো স্বামী স্ত্রীকে মারতে পারবে না; দাম্পত্যে বিরোধ হলে সমান মর্যাদার বিচার হবে; প্রহার হলে নারী কিসাস বা আইনগত প্রতিকার পাবে; অর্থনৈতিক ব্যয় শাসনের লাইসেন্স হবে না। কিন্তু কোরআন ৪:৩৪ ঠিক বিপরীত কাঠামো দেয়। সেখানে পুরুষের শ্রেষ্ঠতা, নারীর আনুগত্য, অবাধ্যতার শাস্তি এবং শেষ ধাপে প্রহার আছে। এটিকে নারী-রক্ষা বলা যায় না। এটি নারী-নিয়ন্ত্রণের ধর্মীয় আইন।

অতএব স্ত্রী প্রহারের প্রসঙ্গ উমরের বিরুদ্ধে এবং ইসলামী শরিয়তের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অভিযোগ। এখানে দেখা যায়, নারীর ওপর সহিংসতা বন্ধের প্রাথমিক নীতি উমরের আপত্তির মুখে টেকে না; স্বামীর হাতে শাস্তির ক্ষমতা ফিরে আসে; কোরআন সেই ক্ষমতাকে বিধিবদ্ধ করে; পরে ধর্মতত্ত্ব তাকে “হালকা”, “শেষ ধাপ”, “উত্তম নয়” ইত্যাদি ভাষায় পালিশ করে। কিন্তু পালিশ যতই করা হোক, মূল সত্য থাকে: ইসলাম স্বামীকে স্ত্রী প্রহারের অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকার পিতৃতন্ত্রের ভাষায় শৃঙ্খলা, ধর্মতত্ত্বের ভাষায় বিধান, কিন্তু মানবিক ন্যায়নীতির ভাষায় এটি বৈধতাপ্রাপ্ত গৃহস্থালী সহিংসতা।


দ্বীন পূর্ণতার আয়াত: পূর্ণতা-ঘোষণার পর উমরের অসন্তুষ্টি

সূরা মায়িদার ৩ নম্বর আয়াত ইসলামী ধর্মতত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আয়াতে বলা হয়েছে, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” সাধারণ ধর্মীয় ভাষ্যে এই আয়াতকে ইসলামের পরিপূর্ণতা, শরিয়তের পূর্ণতা এবং আল্লাহর নেয়ামতের সমাপ্ত ঘোষণার দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এই আয়াতকে উমর ইবনুল খাত্তাবের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে একটি গভীর অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি হয়। যদি দ্বীন সত্যিই পূর্ণাঙ্গ হয়ে থাকে, তাহলে এই পূর্ণতা কি আনন্দের বিষয়, নাকি নবীর মিশনের সমাপ্তি ও অবসানের সংকেত?

সহিহ বুখারী ও অন্যান্য উৎসে এসেছে, এক ইহুদি ব্যক্তি উমরকে বলেছিল, তোমাদের কিতাবে এমন একটি আয়াত আছে, সেটি যদি আমাদের ওপর নাজিল হতো, আমরা সেই দিনটিকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতাম। উমর উত্তরে বলেন, তিনি জানেন আয়াতটি কখন ও কোথায় নাজিল হয়েছে: জুমার দিন, আরাফার দিন, রাসূলুল্লাহ আরাফায় অবস্থান করছিলেন। এই বর্ণনা দেখায়, আয়াতটির ঐতিহাসিক মুহূর্ত উমরের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি ছিল সাধারণ কোনো আইনগত আয়াত নয়; এটি ছিল ইসলামের পূর্ণতা-ঘোষণা, নবীজীবনের শেষ পর্বে নাজিল হওয়া এক বিশাল ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ৩৩/ ঈমানের বাড়া-কমা।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৫
৪৩। হাসান ইবনুুস সাব্বাহ্ (রহঃ) … ’উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, এক ইয়াহূদী তাঁকে বললঃ হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে যা আপনারা পাঠ করে থাকেন, তা যদি আমাদের ইয়াহূদী জাতির উপর নাযিল হত, তবে অবশ্যই আমরা সে দিনকে ঈদ হিসেবে পালন করতাম। তিনি বললেন, কোন আয়াত? সে বললঃ
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا
“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।” (৫ : ৩) ’উমর (রাঃ) বললেন এটি যে দিন এবং যে স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর নাযিল হয়েছিল তা আমরা জানি; তিনি সেদিন ’আরাফায় দাঁড়িয়েছিলেন এবং তা ছিল জুম’আর দিন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

কিন্তু তাফসিরি বর্ণনায় এই আয়াতকে ঘিরে আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, যখন “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম” আয়াতটি নাজিল হয়, উমর কেঁদে ফেলেন। নবী তাকে জিজ্ঞেস করেন, কী তোমাকে কাঁদাচ্ছে? উমর বলেন, আমরা তো আমাদের দ্বীনে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিলাম; কিন্তু যখন কোনো জিনিস পূর্ণ হয়, তখন পূর্ণতার পরে তার ঘাটতি বা অবনতি শুরু হয়। বর্ণনায় নবী তার কথাকে সত্য বলে স্বীকার করেন। এই প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে উমর পূর্ণতাকে বিজয় বা আনন্দ হিসেবে নয়, বরং সমাপ্তি ও আসন্ন ক্ষয়ের সংকেত হিসেবে পড়ছেন। আসুন আয়াতটির মাঝের অংশটি পড়ি, [49]

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসাবে মনোনীত করলাম।
— Sheikh Mujibur Rahman
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।
— Rawai Al-bayan
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম [১৪], আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম [১৫]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন এর তাফসীর পড়ি, [50]

নীচের দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন। বাহনটি ওহীর ভার সহ্য করিতে না পারিয়া বসিয়া পড়িল। তৎক্ষণাৎ আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর আমার চাদরটি জড়াইয়া দিলাম।
ইন জারীর বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফাত হইতে বিদায় গ্রহণ করার ৮১ (একাশি) দিন পর ইন্তিকাল করেন। উভয় রিওয়ায়াত ইব্‌ন জারীর (র) উদ্ধৃত করিয়াছেন।
ইন জারীর (র)……হারূন ইন্ন আনতারার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, হারূন ইন্ন আনতারার পিতা বলেন: اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ এই আয়াতটি হজ্জে আরাফাতের দিন যখন অবতীর্ণ হইল, হযরত উমর (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তুমি কাঁদিতেছ কেন? তিনি বলিলেন, আমরা এই দীন সম্পর্কে আরো বেশি আশা করিয়াছিলাম। কিন্তু যখন উহা পূর্ণাঙ্গতা লাভ করিয়াছে, তখন তো আর ইহার চেয়ে বেশি আশা করা যায় না; বরং ক্রমান্বয়ে ইহার অবনতিই আশা করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বলিলেন, তুমি ঠিক বলিয়াছ।’
এই হাদীসটির সমর্থনে অন্য আর একটি হাদীস আসিয়াছে। হাদীসটি এই: ইসলাম অপরিচিতের বেশে যাত্রা করিয়াছিল, আবার সত্বর সে অপরিচিত হইয়া প্রত্যাবর্তন করিবে। তাই সুসংবাদ সেই অপরিচিত সংখ্যক লোকদের জন্য।
ইমাম আহমদ (র)…… তারিক ইব্‌ন শিহাব হইতে বর্ণনা করেন যে, তারিক ইন্ন শিহাব বলেন: একজন ইয়াহুদী আসিয়া হযরত উমর ইব্‌ন্ন খাত্তাব (রা)-এর নিকট বলিল: হে আমিরুল মু’মিনীন! আপনারা আপনাদের গ্রন্থে এমন একটি আয়াত পাঠ করেন, তাহা যদি ইয়াহুদীদের উপর অবতীর্ণ হইত, তাহা হইলে আমরা সেই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদ্যাপন করিতাম। উমর (রা) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সেই আয়াত কোন্টি? ইয়াহুদী বলিল, উহা হইল:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي
উমর (রা) বলিলেন: আল্লাহর কসম! যেদিন ও যে সময়ে এই আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়, সেই সম্পর্কে আমি যথাযথ অবহিত রহিয়াছি। ইহা আরাফার দিন শুক্রবার বিকালে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ হয়।
জাফর ইব্‌ন আওনের সূত্রে ইমাম বুখারী এবং কায়স ইন্ন মুসলিমের সূত্রে ইমাম মুসলিম, তিরমিযী ও নাসাঈও এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন।
আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী (র)…… তারিক হইতে বর্ণনা করেন যে, তারিক বলেন: ইয়াহুদীরা উমর (রা)-কে বলিয়াছিল যে, আপনারা কুরআনে এমন একটি আয়াত পাঠ করেন, যদি উহা আমাদের প্রতি নাযিল হইত তাহা হইলে উহা নাযিলের দিনটিকে আমরা ঈদ হিসাবে উদ্যাপন করিতাম। তখন উমর (রা) বলেন, আমার সঠিকভাবে জানা আছে যে, সেই আয়াতটি কখন, কোথায় এবং কিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর নাযিল হইয়াছিল। সেই দিনটি ছিল আরাফার দিন। আল্লাহর শপথ! আমি সে সময় আরাফায় ছিলাম।
সুফিয়ান (র) বলেন: আলোচ্য আয়াতটি শুক্রবার দিন অবতীর্ণ হইয়াছিল কিনা এই ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রহিয়াছে।

কুফরি 17

এই ঘটনাটি উমরের চরিত্র ও ইসলামের পূর্ণতা-দাবি, দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ইসলামি বয়ান বলে, দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। অন্যদিকে উমরের প্রতিক্রিয়া দেখায়, পূর্ণতা-ঘোষণাকে তিনি ধর্মীয় সমাপ্তির সংকেত হিসেবে বুঝেছিলেন। এটি নিছক আবেগ নয়; এটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় দূরদৃষ্টি। উমর বুঝেছিলেন, নবীর মিশন যখন পূর্ণতার ঘোষণা পায়, তখন নবীর উপস্থিতির সময়ও শেষের দিকে। এরপর শুরু হবে নবী-পরবর্তী ক্ষমতা, ব্যাখ্যা, নেতৃত্ব, আইন, সংঘাত ও কর্তৃত্বের নতুন অধ্যায়। অর্থাৎ পূর্ণতার আয়াত ইসলামের বিজয়ের পাশাপাশি ইসলামের মানবীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের দরজাও খুলে দেয়।

এখানে একটি কঠোর প্রশ্ন তৈরি হয়। যদি সূরা মায়িদা ৫:৩-এ দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তীকালে এত আইনগত মেরামত, ব্যাখ্যা, নিষেধ, সংশোধন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন কেন দরকার হলো? যদি দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে আউল কেন? যদি দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে নবী-যুগে চলা মুতআ ও তামাত্তু নিয়ে উমরের নিষেধাজ্ঞা কেন? যদি দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে উম্মু ওয়ালাদ বিক্রির মতো নবী-যুগীয় প্রথা পরে বদলাতে হলো কেন? যদি দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে তারাবিহ জামাতের মতো নবী-পরবর্তী সংগঠিত ইবাদতরূপকে “উত্তম বিদআত” বলে প্রতিষ্ঠা করতে হলো কেন?

এই আয়াতের পূর্ণতা-ঘোষণা তাই ইসলামের পক্ষে যতটা ব্যবহৃত হয়, সমালোচনামূলক পাঠে তা ইসলামের বিরুদ্ধে ততটাই শক্তিশালী প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ “পূর্ণতা” শব্দটি যত বড় দাবি, তার ব্যর্থতাও তত বড়। একটি অসম্পূর্ণ আইনব্যবস্থা ভুল করতে পারে, পরে সংশোধন আনতে পারে। কিন্তু যে ব্যবস্থা নিজেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ বলে ঘোষণা করে, তার ক্ষেত্রে প্রতিটি পরবর্তী মানবীয় প্যাচ, প্রতিটি রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রতিটি ফিকহি মেরামত, প্রতিটি ক্ষমতানির্ভর ব্যাখ্যা সেই পূর্ণতার দাবিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পূর্ণতা-ঘোষণার পরে মানবীয় মেরামত যত বাড়ে, ততই বোঝা যায় পূর্ণতা ছিল ধর্মীয় স্লোগান, বাস্তব আইনগত সত্য নয়।

উমরের কান্না এই কারণে অস্বস্তিকর। তিনি যেন বুঝেছিলেন, পূর্ণতা মানেই স্থিরতা নয়; পূর্ণতা মানে সমাপ্তি, আর সমাপ্তির পরে শুরু হয় ক্ষয়, বিরোধ, ব্যাখ্যা, ক্ষমতার লড়াই। নবীর জীবদ্দশায় ওহী ছিল বিরোধ মেটানোর চূড়ান্ত ভাষা। নবীর মৃত্যুর পরে সেই চূড়ান্ততা থাকবে না; থাকবে সাহাবীদের সিদ্ধান্ত, খলিফার ক্ষমতা, রাজনৈতিক সংঘাত, ফকিহদের ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক পালিশ। ইতিহাসে ঠিক সেটিই ঘটেছে। উমর নিজেই সেই নবী-পরবর্তী আইন-ক্ষমতার প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন।

এই ঘটনাটিকে “উমরের দূরদর্শিতা” বলে মহিমান্বিত করা যায়। কিন্তু সেই মহিমান্বয়নও ইসলামের জন্য নিরাপদ নয়। যদি উমর সত্যিই বুঝে থাকেন যে পূর্ণতার পরে ক্ষয় শুরু হয়, তাহলে তা ইসলামের অপরিবর্তনীয়তা-দাবির সঙ্গে সংঘর্ষে যায়। আর যদি তিনি ভুল বুঝে থাকেন, তাহলে তার কান্না ধর্মীয় পূর্ণতা-ঘোষণার অর্থ বুঝতে ব্যর্থতার লক্ষণ। দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থাকে: আল্লাহ যে আয়াতকে দ্বীনের পূর্ণতা হিসেবে ঘোষণা করলেন, সেটি শুনে উমরের স্বাভাবিক আনন্দ নয়, বরং শোক বা আতঙ্ক কেন তৈরি হলো? পূর্ণতা কি ঈদের কারণ, নাকি সমাপ্তির শোকবার্তা?

এই অংশটি কাগজ-কলম ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একদিকে দ্বীন পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে নবী মৃত্যুশয্যায় এমন কিছু লিখে দিতে চান, যাতে মুসলমানরা পথভ্রষ্ট না হয়। প্রশ্ন হলো, যদি দ্বীন সত্যিই পূর্ণাঙ্গ ও যথেষ্ট হয়, তাহলে নবী আর কী লিখতে চেয়েছিলেন? আর যদি নবীর সেই লেখা পথভ্রষ্টতা রোধের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল, তাহলে পূর্ণতা-ঘোষণার বাস্তব অর্থ কী? এখানেই উমরের ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। মায়িদা ৩-এর পূর্ণতা-ঘোষণা শুনে তিনি সমাপ্তির সংকেত বুঝেছিলেন; মৃত্যুশয্যায় নবী লিখতে চাইলে তিনিই বললেন, কোরআনই যথেষ্ট। একদিকে পূর্ণতা শুনে কান্না, অন্যদিকে নবীর অতিরিক্ত নির্দেশ ঠেকাতে “পূর্ণ কিতাব”-এর অজুহাত। এই বৈপরীত্যই উমরের চরিত্রের রাজনৈতিক গভীরতা দেখায়।

এই ঘটনাকে তাই শুধু আবেগপূর্ণ ধার্মিকতা হিসেবে পড়া ভুল। এটি ইসলামের পূর্ণতা-দাবি, নবীর মৃত্যুর পূর্বাভাস, ওহীর সমাপ্তি, ক্ষমতার স্থানান্তর এবং নবী-পরবর্তী শরিয়ত-নির্মাণের সূচনা হিসেবে পড়তে হবে। মায়িদা ৩ ঘোষণা করে দ্বীন পূর্ণ। উমর বুঝলেন, পূর্ণতার পরে ক্ষয় আসে। তারপর বাস্তব ইতিহাসে দেখা গেল, সেই পূর্ণ দ্বীন চালাতে উমরের নিষেধ, উমরের প্যাচ, উমরের বিদআত, উমরের পর্দা-চাপ, উমরের আইনগত হস্তক্ষেপ দরকার হলো। তাহলে পূর্ণতা কোথায় ছিল? কিতাবে? স্লোগানে? নাকি পরবর্তী ক্ষমতার হাতে তৈরি শরিয়তের মেরামতকৃত কাঠামোতে?

অতএব সূরা মায়িদা ৫:৩-এর পূর্ণতা-ঘোষণা উমর-সমালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ-পর্ব। এটি দেখায়, ইসলাম নিজেকে পূর্ণ বলে ঘোষণা করলেও তার বাস্তব ইতিহাস পূর্ণতার নয়; বরং সমাপ্তির পর ক্ষমতা-সংগ্রাম, ব্যাখ্যা, সংশোধন ও মানবীয় হস্তক্ষেপের ইতিহাস। উমরের কান্না সেই ইতিহাসের প্রথম অশনি-সংকেতের মতো। আর তার পরবর্তী ভূমিকা দেখায়, তিনি শুধু সেই সমাপ্তি বুঝেছিলেন না; তিনি নিজেই নবী-পরবর্তী অসম্পূর্ণতাকে আইন, নিষেধ, প্যাচ ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দিয়ে পূরণ করার অন্যতম প্রধান কারিগর হয়েছিলেন। এই দৃষ্টিতে মায়িদা ৩ আনন্দের আয়াত নয়; এটি ইসলামের পূর্ণতার দাবির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসম্পূর্ণতার দরজা।


নবীর শেষ লেখনী ঠেকানো: “কোরআন যথেষ্ট” বলে নবীকেই অপ্রয়োজনীয় করা

উমর ইবনুল খাত্তাবের সঙ্গে নবীর নির্দেশের সংঘাতের সবচেয়ে বিস্ফোরক উদাহরণ হলো মৃত্যুশয্যার কাগজ-কলম ঘটনা। এই ঘটনায় নবী মুহাম্মদ নিজে লেখার উপকরণ চাইছেন, যাতে এমন কিছু লিখে দিতে পারেন যার পর মুসলমানরা পথভ্রষ্ট হবে না। অর্থাৎ নবীর নিজের ভাষায়, এটি সাধারণ নোট, ব্যক্তিগত নির্দেশ বা তুচ্ছ প্রশাসনিক কথা ছিল না; এটি ছিল ভবিষ্যৎ পথভ্রষ্টতা রোধের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর নির্দেশনা। কিন্তু এই মুহূর্তেই উমর বলেন, নবীর ওপর ব্যথা বা অসুস্থতা প্রাধান্য পেয়েছে, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব আছে, সেটাই যথেষ্ট। এরপর ঘরে মতভেদ ও উচ্চস্বরে তর্ক শুরু হয়, এবং শেষ পর্যন্ত নবী কিছু না লিখেই তাদের চলে যেতে বলেন। [51] [52] [53]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩/ ইলম বা জ্ঞান
পরিচ্ছেদঃ ৮১। ইলম লিপিবদ্ধ করা
১১৫। ইয়াহইয়া ইবনু সুলায়মান (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ যখন বেড়ে গেল তখন তিনি বললেনঃ আমার কাছে কাগজ কলম নিয়ে এস, আমি তোমাদের এমন কিছু লিখে দিব যাতে পরবর্তীতে তোমরা ভ্রান্ত না হও। ‘উমর (রাঃ) বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ যন্ত্রণা প্রবল হয়ে গেছে (এমতাবস্থায় কিছু বলতে বা লিখতে তাঁর কষ্ট হবে)। আর আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব রয়েছে, যা আমাদের জন্য যথেষ্ট। এতে সাহাবীগণের মধ্য মতবিরোধ দেখা দিল এবং শোরগোল বেড়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও। আমার কাছে ঝগড়া-বিবাদ করা উচিত নয়। এ পর্যন্ত বর্ণনা করে ইবনু আব্বাস (রাঃ) (যেখানে বসে হাদীস বর্ণনা করছিলেন সেখান থেকে এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন যে, ‘হায় বিপদ, সাংঘাতিক বিপদ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর লেখনীর মধ্যে যা বাধ সেধেছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

কুফরি 19

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
২৬। ওয়াসিয়্যাত
পরিচ্ছেদঃ ৫. যার কাছে ওয়াসিয়্যাতযোগ্য কিছু নেই, তার ওয়াসিয়্যাত না করা
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪১২৬ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৩৭
৪১২৬-(২২/…) মুহাম্মাদ ইবনু রাফি ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) ….. ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুশয্যায় ছিলেন এবং ঘরে বেশ লোক উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উমার ইবনু খাত্তাবও ছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এসো, আমি তোমাদের এক কিতাব লিখে দিই। এরপরে আর তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। উমর (রাযিঃ) বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তোমাদের কাছে কুরআন বর্তমান আছে। আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্যে যথেষ্ট। তখন ঘরের লোকজনের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয় এবং তারা ঝগড়ায় লিপ্ত হন। তাদের কেউ কেউ বলেন, তোমরা (কাগজ) কাছে নিয়ে এসো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের এমন এক কিতাব লিখে দিবেন, যার পরে আর তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আর কেউ কেউ সে কথা বলেন, যা উমর (রাযিঃ) বলেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যখন তাদের এ ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি বৃদ্ধি পায়, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা উঠে যাও।
উবাইদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, এরপর থেকে ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) আক্ষেপ করে বলতেন, বিপদ সে যে কত বড় বিপদ! রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাদের জন্য সে কিতাব লিখে দেয়ার মাঝখানে তাদের মতবিরোধ ও ঝগড়া যে অন্তরায় হয়ে পড়ল।
(ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪০৮৮, ইসলামিক সেন্টার ৪০৮৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

এখানে উমর-পক্ষের সবচেয়ে প্রচলিত অজুহাত হলো, নবী তখন অসুস্থ ছিলেন; তাই তার কাগজ-কলম চাওয়াকে বাধ্যতামূলক নির্দেশ হিসেবে না-ও ধরা যেতে পারে। কিন্তু ইসলামের নিজের হাদিস-ঐতিহ্য এই অজুহাতকে দুর্বল করে। সহিহ বুখারীর আরেকটি বর্ণনায় স্পষ্ট দেখা যায়, নবী অসুস্থ অবস্থায় ইশারায় নিষেধ করলেও সেই নির্দেশ অমান্য করাকে পরে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এমনকি টীকাতেও বলা হয়েছে, নবীর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালন অপরিহার্য। এবারে আসুন এই হাদিসের নিচের অংশে বর্ণিত নির্দেশনাটি পড়ে নিই [54] [55]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৮৪. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ ও তাঁর ওফাত।
৪৪৫৮. ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তাঁর মুখে ঔষধ ঢেলে দিলাম। তিনি ইশারায় আমাদেরকে তাঁর মুখে ঔষধ ঢালতে নিষেধ করলেন। আমরা বললাম, এটা ঔষধের প্রতি রোগীদের স্বাভাবিক বিরক্তিবোধ। যখন তিনি সুস্থবোধ করলেন তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের ওষুধ সেবন করাতে নিষেধ করিনি? আমরা বললাম, আমরা মনে করেছিলাম এটা ঔষধের প্রতি রোগীর সাধারণ বিরক্তিভাব। তখন তিনি বললেন, ‘আব্বাস ব্যতীত বাড়ির প্রত্যেকের মুখে ঔষধ ঢাল তা আমি দেখি।[1] কেননা সে তোমাদের মাঝে উপস্থিত নেই। এ হাদীস ইবনু আবূ যিনাদ ……. ‘আয়িশাহ (রাঃ) থেকে এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। [৫৭১২, ৬৮৮৬, ৬৮৯৭; মুসলিম ৩৯/২৭, হাঃ ২২১৩, আহমাদ ২৪৩১৭] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪১০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪১০৪)
[1] প্রথমতঃ এখানে অতি সামান্য ব্যাপারেও কিয়াসের বৈধতা প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয়তঃ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালনের অপরিহার্যতা সমভাবে প্রযোজ্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

কুফরি 21

এবারে আসুন সহজ দরসে ইবনে মাজাহ গ্রন্থের একটি পাতা পড়ে নেয়া যাক, যা থেকে বোঝা যায়, নবী নিজে থেকে কিছুই বলেন না। আল্লাহই নবীকে দিয়ে আসলে বলায়। তাহলে, উমর কেন আল্লাহ তথা নবীর কথা শুনতে চাইছিলেন না? [56]

কুফরি 23

এই দুইটি সূত্র একত্রে রাখলে কাগজ-কলম ঘটনার এপোলজিস্ট প্রতিরক্ষা ভেঙে যায়। নবী অসুস্থ ছিলেন, এটি তার নির্দেশ অমান্যের বৈধ অজুহাত নয়। বরং বুখারীর টীকা অনুযায়ী, অসুস্থ অবস্থাতেও নবীর নির্দেশ পালন অপরিহার্য। আবার যদি নবীর ধর্মীয় বক্তব্য আল্লাহ-প্রদত্ত নির্দেশনার অংশ হয়, তাহলে মৃত্যুশয্যায় তার কাগজ-কলম চাওয়া নিছক অসুস্থ মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়; এটি রাসূলি কর্তৃত্বের নির্দেশ। সেই নির্দেশের সামনে উমরের “কোরআনই যথেষ্ট” বলা তাই করুণা, বাস্তববুদ্ধি বা সতর্কতা নয়; এটি নবীর জীবিত অবস্থাতেই নবীর নির্দেশের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত বসানো।

এই ঘটনাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। নবী বলছেন, লিখে দিলে মুসলমানরা পথভ্রষ্ট হবে না। উমর বলছেন, কোরআনই যথেষ্ট। প্রশ্ন হলো, এই অবস্থায় নবীর নির্দেশের মূল্য কোথায়? ইসলাম যদি বলে রাসূল যা দেন তা গ্রহণ করতে হবে, রাসূলের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য, রাসূলের সিদ্ধান্তের পরে মুমিনের নিজের পছন্দ নেই, তাহলে মৃত্যুশয্যায় রাসূলের এই সরাসরি নির্দেশের সামনে উমরের “কোরআন যথেষ্ট” বলা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়? কোনো সাধারণ মুসলমান যদি নবীকে বলত, “আপনার কথা দরকার নেই, কোরআনই যথেষ্ট”, তাকে কি আহলে সুন্নাহর আলেমরা মুজতাহিদ বলতেন, নাকি রাসূল-অমান্যকারী বলতেন?

এখানে উমরের বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সুন্নি হাদিস-ঐতিহ্য নিজেই এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক করে, যে আরামকেদারায় বসে বলবে: আমাদের জন্য কোরআনই যথেষ্ট। সেই ধরনের ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে সুন্নাহ অস্বীকারকারী মানসিকতার উদাহরণ হিসেবে। অথচ মৃত্যুশয্যার ঘটনায় উমরের বাস্তব অবস্থান ছিল ঠিক এই: আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব আছে, সেটাই যথেষ্ট। অর্থাৎ যে কথাকে পরবর্তী হাদিস-তত্ত্ব বিপজ্জনক মনোভাব হিসেবে চিহ্নিত করে, উমর সেই কথাই নবীর মুখের সামনে ব্যবহার করেছেন। এখানে ধর্মতত্ত্বের দ্বৈতনীতি নগ্ন হয়ে যায়। সাধারণ কেউ বললে সুন্নাহ-বিরোধী, উমর বললে দূরদর্শী।

এই ঘটনার নৈতিক ও আইনগত গুরুত্ব আরও গভীর। নবীর দাবি ছিল, তার লেখা ভবিষ্যৎ পথভ্রষ্টতা ঠেকাবে। তাহলে উমরের বাধা কি মুসলমানদের সম্ভাব্য হিদায়াত-নির্দেশ থেকে বঞ্চিত করেনি? যদি লেখা সত্যিই জরুরি না হতো, নবী কেন লিখতে চাইতেন? যদি লেখা জরুরি হতো, উমর কেন বাধা দিলেন? যদি নবী ভুল করে জরুরি মনে করেছিলেন, তাহলে নবীর সিদ্ধান্তক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। আর যদি নবী ঠিক ছিলেন, তাহলে উমরের বাধা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর অবাধ্যতাগুলোর একটি। দুই অবস্থাতেই প্রচলিত সাহাবী-মহিমান্বয়ন বিপদে পড়ে।

ইবনে আব্বাসের প্রতিক্রিয়া এই ঘটনার গুরুত্ব স্পষ্ট করে। তিনি এটিকে বিপর্যয়, প্রকৃত বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ লোকদের বিরোধ নবীকে সেই লেখা লিখতে বাধা দেয়। যদি ঘটনাটি তুচ্ছ হতো, ইবনে আব্বাস এভাবে শোক করতেন না। যদি উমরের অবস্থান নিখুঁত হতো, তাহলে এটিকে বিপর্যয় বলা হতো না। ইবনে আব্বাসের ভাষা নিজেই প্রমাণ করে, অন্তত সাহাবী-ঐতিহ্যের ভেতরেই এই ঘটনাকে গভীর ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ উমরের আচরণ নিয়ে অস্বস্তি কোনো আধুনিক নাস্তিকের আবিষ্কার নয়; ইসলামি বর্ণনার ভেতরেই এই আঘাত সংরক্ষিত আছে।

এখানে “নবী অসুস্থ ছিলেন” অজুহাতটি ইসলামের নিজের হাদিস-ঐতিহ্যের সামনে টেকে না। সহিহ বুখারীর ৪৪৫৮ নম্বর বর্ণনায় দেখা যায়, নবী অসুস্থ অবস্থায় মুখে ওষুধ ঢালতে নিষেধ করেছিলেন। উপস্থিত লোকেরা সেটিকে রোগীর সাধারণ বিরক্তি মনে করে অমান্য করলে নবী পরে তাদের সেই অমান্যের জবাব দিতে বলেন। ওই হাদিসের টীকাতেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নবীর সুস্থ ও অসুস্থ সর্বাবস্থাতেই তার নির্দেশ পালন অপরিহার্য। সুতরাং মৃত্যুশয্যায় নবীর কাগজ-কলম চাওয়াকে অসুস্থতার অজুহাতে উপেক্ষা করা ইসলামের নিজস্ব আনুগত্যনীতির সঙ্গেই সংঘর্ষে যায়। নবী অসুস্থ ছিলেন—এটি নির্দেশ অমান্যের লাইসেন্স নয়; বরং হাদিস-ঐতিহ্য অনুযায়ী সেই অবস্থাতেও তার নির্দেশ বাধ্যতামূলক ছিল।

এই কারণে উমরের “কোরআনই যথেষ্ট” বক্তব্য শুধু একটি পরিস্থিতিগত মন্তব্য নয়। এটি এমন মুহূর্তে বলা হয়েছে, যখন নবী নিজে ভবিষ্যৎ পথভ্রষ্টতা রোধের জন্য লিখতে চাইছেন। যদি নবী নিজ থেকে ধর্মীয় কথা বলেন না, বরং আল্লাহর নির্দেশনাতেই বলেন—যেমন ইসলামি ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো দাবি করে—তাহলে উমরের বাধা নবীর ব্যক্তিগত অনুরোধ ঠেকানো নয়; সেটি আল্লাহ-নির্দেশিত রাসূলি কর্তৃত্বের সামনে নিজের সিদ্ধান্ত বসানো। এই অবস্থায় উমরকে রক্ষার জন্য “নবী অসুস্থ ছিলেন” বলা আসলে নবীর শেষ নির্দেশের কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে।

এখানে এপোলজিস্টরা সাধারণত বলে, নবীর অসুস্থতা খুব বেশি ছিল, তাই উমর করুণা থেকে তা বলেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সমস্যাকে মেটায় না। প্রথমত, নবী নিজে কথা বলছিলেন এবং একটি নির্দিষ্ট নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তিনি যদি এতটাই অক্ষম হন যে তার নির্দেশ গুরুত্বহীন, তাহলে মৃত্যুশয্যার অন্য কথাগুলো কীভাবে গ্রহণযোগ্য? দ্বিতীয়ত, করুণা দেখানোর অর্থ নবীর নির্দেশ বাতিল করা নয়। নবী যদি লেখার উপকরণ চান, আনুগত্যের ন্যূনতম দাবি হলো তা এনে দেওয়া। তৃতীয়ত, করুণার নামে এমন একটি লেখা ঠেকানো হয়েছে, যা নবীর ভাষায় পথভ্রষ্টতা রোধ করতে পারত। এই ধরনের করুণা আসলে আনুগত্য নয়; এটি নবীর সিদ্ধান্তের ওপর অভিভাবকসুলভ হস্তক্ষেপ।

আরও বিপজ্জনক হলো “নবীর ওপর ব্যথা প্রাধান্য পেয়েছে” ধরনের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ। যদি এর দ্বারা বোঝানো হয়, নবী অসুস্থতার কারণে যথাযথ বিচারবুদ্ধিতে নেই, তাহলে তা নবীর শেষ নির্দেশ, শেষ বক্তব্য এবং শেষ দিকের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে সন্দেহের মুখে ফেলে। একজন রাসূল মৃত্যুর আগে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিতে চাইছেন, আর তার ঘনিষ্ঠ সাহাবী বলছেন, অসুস্থতা তাকে প্রভাবিত করেছে। এই বক্তব্য যতই ভক্তিভরে ব্যাখ্যা করা হোক, এর রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট: নবীর জীবিত উপস্থিতিতেই তার সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে।

এখানে ইসলামী আনুগত্যতত্ত্ব সরাসরি বিপর্যস্ত। কোরআন বলে রাসূলের আনুগত্য করতে হবে। হাদিস বলে রাসূল যা হারাম করেন তা আল্লাহর হারামের মতো। সুন্নি ইসলাম বলে কোরআন একা যথেষ্ট নয়; সুন্নাহও আইন। কিন্তু উমর মৃত্যুশয্যার ঘটনায় কার্যত কোরআন-সর্বস্ব অবস্থান নিলেন। তিনি নবীর অতিরিক্ত লিখিত নির্দেশকে অপ্রয়োজনীয় করে দিলেন। যদি উমরের বক্তব্য সঠিক হয়, তাহলে সুন্নি সুন্নাহ-তত্ত্বই দুর্বল হয়ে যায়। আর যদি সুন্নাহ দরকার হয়, তাহলে উমরের “কোরআন যথেষ্ট” বক্তব্য সরাসরি ভুল। দুই দিক থেকেই এটি ইসলামী ধর্মতত্ত্বের জন্য অস্বস্তিকর।

এই ঘটনায় ক্ষমতার গন্ধও প্রবল। নবী তখন মৃত্যুশয্যায়। তার পরবর্তী নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই তীব্র। এমন সময় নবী যদি কিছু লিখে দিতেন, তা পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারত। কী লিখতেন, আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, তিনি বলেছিলেন, তা লিখলে মুসলমানরা পথভ্রষ্ট হবে না। এই লেখাকে থামিয়ে দেওয়া শুধু চিকিৎসাগত সহানুভূতি নয়; এটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নির্দেশনার ওপর রাজনৈতিক বাধা হিসেবেও পড়া যায়। ইতিহাসে ক্ষমতার মুহূর্তগুলো কখনও নিরীহ নয়। বিশেষ করে যখন মৃতপ্রায় নবীর শেষ নির্দেশ কক্ষে উপস্থিত লোকদের তর্কে হারিয়ে যায়।

ধর্মীয় ভাষ্য উমরকে রক্ষা করতে বলতে পারে, তিনি কোরআনের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোরআনের মর্যাদা রক্ষা করতে নবীর লিখিত নির্দেশ ঠেকাতে হয় কেন? নবী কি কোরআনের বিরুদ্ধে কিছু লিখতে যাচ্ছিলেন? যদি না যান, তাহলে উমরের বাধার অর্থ কী? আর যদি ধরে নেওয়া হয়, নবীর সম্ভাব্য লেখা বিভ্রান্তিকর হতে পারত, তাহলে নবীর রাসূলি কর্তৃত্বই নষ্ট হয়। ইসলাম একই সঙ্গে বলতে পারে না যে নবী আল্লাহর নির্দেশিত সর্বোত্তম পথপ্রদর্শক, আবার তার শেষ গুরুত্বপূর্ণ লেখাকে “কোরআন যথেষ্ট” বলে অপ্রয়োজনীয় করা যায়।

এই ঘটনাকে “ইজতিহাদ” বলাও ভাষাগত পালিশ ছাড়া কিছু নয়। ইজতিহাদ সাধারণত অস্পষ্ট বিষয়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রচেষ্টা। কিন্তু এখানে অস্পষ্টতা ছিল না। নবী সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন: লেখার উপকরণ আনো। উমর সরাসরি পাল্টা অবস্থান নিয়েছেন: কোরআন যথেষ্ট। এই সংঘাতকে ইজতিহাদ বললে যেকোনো নবী-অমান্যতাকে ইজতিহাদ বলা যাবে। তাহলে আনুগত্যের অর্থ কী? নবী জীবিত থাকতেই তার নির্দেশের সামনে সাহাবী নিজের মত বসাতে পারেন, আর তাও যদি ফজিলত হয়, তাহলে রাসূল-আনুগত্য কেবল সাধারণ মানুষের জন্য রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, ক্ষমতাবানদের জন্য নয়।

এখানে আরেকটি কঠোর প্রশ্ন আছে: যদি নবী সেই লেখা লিখতে পারতেন, মুসলিম ইতিহাস কি ভিন্ন হতো? সুন্নি-শিয়া বিভাজন, খিলাফত সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, উত্তরাধিকার-সংকট, নেতৃত্বের রক্তাক্ত ইতিহাস, এসব কি অন্যরকম হতে পারত? নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু নবীর নিজের ভাষা অনুযায়ী, তিনি এমন কিছু লিখতে চেয়েছিলেন যাতে পথভ্রষ্টতা এড়ানো যায়। সেই লেখা না হওয়ার ঘটনাকে ইবনে আব্বাস বিপর্যয় বলেছেন। তাই এই ঘটনার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা অসৎ। এটি শুধু একটি অসুস্থ রোগীর কক্ষে ছোটখাটো মতভেদ নয়; এটি ইসলামের ভবিষ্যৎ নির্দেশনাকে ঘিরে এক গুরুতর ক্ষমতা-সংঘাত।

এই ঘটনায় উমর আবারও একই প্যাটার্নে হাজির হন। রোজার বিধানে আল্লাহর আইন তার প্রবৃত্তির সামনে বদলায়। মুতআ ও তামাত্তুতে নবী-যুগের প্রথা তার নিষেধাজ্ঞার সামনে সরে যায়। পর্দায় তার অস্বস্তি ওহীর ভাষা পায়। স্ত্রী প্রহারে তার অভিযোগ নারীর নিরাপত্তার ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনে। আর এখানে নবীর শেষ সম্ভাব্য লিখিত নির্দেশ তার “কোরআন যথেষ্ট” ঘোষণায় থেমে যায়। এটিকে আলাদা ঘটনা বলা যায় না। এটি ক্ষমতাবান সাহাবীর হাতে ধর্মীয় কর্তৃত্ব পুনর্বিন্যাসের ধারাবাহিকতা।

অতএব কাগজ-কলম ঘটনা উমরের সমালোচনায় কেন্দ্রীয় দলিল। এখানে তিনি নবীর নির্দেশের সামনে দাঁড়িয়েছেন, নবীর প্রয়োজনীয় লেখাকে অপ্রয়োজনীয় বলেছেন, কোরআনকে নবীর অতিরিক্ত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি লেখা হতে দেননি যা নবীর ভাষায় মুসলমানদের পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচাতে পারত। ধর্মীয় বয়ানে তাকে যতই রক্ষা করা হোক, সরল পাঠে এটি রাসূল-আনুগত্য নয়। এটি নবীর শেষ কর্তৃত্বের ওপর উমরের কার্যকর ভেটো। আর যে ধর্মতত্ত্ব এই ভেটোকে ফজিলত বানায়, সে ধর্মতত্ত্ব সত্যের প্রতি নয়; ক্ষমতার প্রতি অনুগত।


নবীর দেওয়া উপনাম বাতিল: রাসূলের সিদ্ধান্তের ওপর উমরের কর্তৃত্ব

উমর ইবনুল খাত্তাবের নবী-অমান্যতার আলোচনায় একটি ছোট কিন্তু নীতিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো আবূ ঈসা উপনাম পরিবর্তনের ঘটনা। বর্ণনায় দেখা যায়, এক ব্যক্তির উপনাম ছিল আবূ ঈসা। উমর এই উপনাম পছন্দ করেননি এবং তাকে সেই নামে ডাকার কারণে আপত্তি করেন, এমনকি শাস্তিমূলক আচরণও করেন। তখন সেই ব্যক্তি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এই উপনাম তাকে রাসূলুল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। এখানেই সাধারণ প্রত্যাশা ছিল, উমর থেমে যাবেন। কারণ ইসলামের নিজের নীতি অনুযায়ী, নবীর সিদ্ধান্তের পরে মুমিনের আর নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার থাকে না। কিন্তু উমর থামলেন না। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহর পূর্বাপর গুনাহ ক্ষমা করা হয়েছে, কিন্তু আমরা তো উদ্বিগ্ন। এরপর থেকে সেই ব্যক্তির উপনাম আবূ আব্দুল্লাহ হয়ে যায়।

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৬/ শিষ্টাচার
পরিচ্ছেদঃ ৭২. আবূ ঈসা উপনাম রাখা
৪৯৬৩। যায়িদ ইবনু আসলাম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। উমার (রাঃ) তার এক ছেলে আবূ ঈসা উপনাম করায় তাকে প্রহার করেন। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ)-এর উপনাম ছিলো আবূ ঈসা। উমার (রাঃ) তাকে বললেন, তোমার উপনাম পালটে আবূ আব্দুল্লাহ রাখলে কি যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এ উপনাম দিয়েছেন। উমার (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পূর্বাপরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আর আমরা তো উদ্বিগ্ন আছি। এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার পদবী আবূ আব্দুল্লাহ ছিলো।[1]
হাসান সহীহ।
[1]. বায়হাক্বী।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ যায়দ ইবনু আসলাম (রহঃ)

এই ঘটনাটি বাহ্যিকভাবে ছোট মনে হতে পারে। এখানে কোনো যুদ্ধ নেই, খিলাফত নেই, দাসপ্রথা নেই, নারী-প্রহার নেই, উত্তরাধিকার-গণিত নেই। কিন্তু নীতিগত দিক থেকে ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রশ্নটি সরল: নবী যদি কাউকে একটি উপনাম দিয়ে থাকেন, উমর কোন অধিকারে সেটি বদলালেন? একজন সাধারণ মুসলমান যদি রাসূলের দেওয়া কোনো পরিচয়, নাম বা সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিত, তাকে কি ফজিলতপূর্ণ বলা হতো? নাকি তাকে নবী-আনুগত্যের সীমা লঙ্ঘনকারী বলা হতো?

উমরের যুক্তিটি আরও গভীরভাবে সমস্যাজনক। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহর পূর্বাপর গুনাহ ক্ষমা করা হয়েছে, আর আমরা উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ নবী একটি কাজ করতে পারেন, কারণ নবীর বিশেষ মর্যাদা আছে; কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই কাজ করলে বিপদের আশঙ্কা। এই যুক্তি শুনতে সাবধানতামূলক মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি নবীর সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা সীমিত করে। নবী কাউকে উপনাম দিলেন, উমর বললেন, নবীর জন্য তা নিরাপদ, আমাদের জন্য নয়। তাহলে নবীর কাজ কি অনুসরণযোগ্য, নাকি শুধু নবীর ব্যক্তিগত বিশেষাধিকার? যদি নবীর দেওয়া উপনামও পরবর্তী খলিফার নৈতিক উদ্বেগের সামনে টিকতে না পারে, তাহলে রাসূল-সুন্নাহর বাধ্যতামূলকতা কোথায়?

এখানে ইসলামী আনুগত্যতত্ত্ব আবার সমস্যায় পড়ে। কোরআন বলে, রাসূল যা দেন তা গ্রহণ করো, যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। কোরআন আরও বলে, আল্লাহ ও রাসূল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে মুমিনের নিজের পছন্দ থাকে না। কিন্তু এই ঘটনার বাস্তব চিত্র হলো: রাসূল একটি উপনাম দিলেন, উমর তা গ্রহণ করলেন না, বরং বদলে দিলেন। এই সংঘাতকে যদি ইজতিহাদ বলা হয়, তাহলে ইজতিহাদের অর্থ দাঁড়ায়, নবীর নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও খলিফা নিজের বিচার বসাতে পারেন। তখন রাসূলের সিদ্ধান্ত আর চূড়ান্ত থাকে না; চূড়ান্ত হয় ক্ষমতাবান সাহাবীর প্রশাসনিক পছন্দ।

আবূ ঈসা উপনাম নিয়ে আপত্তির সম্ভাব্য কারণ ছিল ঈসার পিতা নেই, তাই “আবূ ঈসা” বা ঈসার পিতা ধরনের উপনাম ধর্মীয়ভাবে অস্বস্তিকর। কিন্তু সমস্যা হলো, এই অস্বস্তি যদি সত্যিই এত গুরুতর হয়, তাহলে নবী নিজে কেন সেই উপনাম দিলেন? নবী কি জানতেন না ঈসার পিতা নেই? নবী কি ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যাটি বুঝতে পারেননি? উমর কি নবীর চেয়ে বেশি সতর্ক ছিলেন? আর যদি নবী জেনেশুনে উপনাম দিয়ে থাকেন, তাহলে উমরের আপত্তি নবীর বিচারবুদ্ধির ওপর সরাসরি সংশোধনী। এই প্রশ্নের কোনো সহজ সম্মানজনক উত্তর নেই।

এই ঘটনাটি উমরের চরিত্রে একটি ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য দেখায়। তিনি শুধু ব্যক্তিগত পরামর্শদাতা নন; তিনি নিজেকে ধর্মীয় শৃঙ্খলার বাস্তব প্রহরী হিসেবে দাঁড় করান। নবীর জীবিত বা নবী-প্রদত্ত সিদ্ধান্তও তার নৈতিক-প্রশাসনিক উদ্বেগের সামনে চূড়ান্ত নয়। রোজার রাতে বিধান ভাঙলে আল্লাহ আইন বদলান। তামাত্তুতে নবী করেছেন, তবু উমর পছন্দ করেন না। মুতআতে নবী-যুগের প্রথা উমরের নিষেধে থামে। বয়স্ক দুধপানে নবীর অদ্ভুত হুকুম পরবর্তী কর্তৃত্বে সীমিত হয়। আর এখানে নবীর দেওয়া উপনামও উমরের হাতে বদলে যায়। প্যাটার্ন একই: নবীর সিদ্ধান্ত একদিকে, উমরের সংশোধন অন্যদিকে।

এই ঘটনায় ধর্মতত্ত্বের দ্বৈতনীতি পরিষ্কার। সাধারণ মুসলমানের ক্ষেত্রে নবীর প্রতি আনুগত্যের ভাষা কঠোর। রাসূলের কথার বিরোধিতা করলে ফিতনা, শাস্তি, পথভ্রষ্টতা, জাহান্নাম পর্যন্ত হুমকি আছে। কিন্তু উমরের ক্ষেত্রে নবীর দেওয়া উপনাম বদলে দেওয়াও “সতর্কতা”, “দূরদর্শিতা” বা “ফিকহি সাবধানতা” হয়ে যায়। অর্থাৎ অপরাধের প্রকৃতি কাজ দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না; নির্ধারিত হচ্ছে কাজটি কে করেছে তার ওপর। এটাই সাহাবী-আদালতের আসল অসততা।

এখানে আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। উপনাম মানুষের সামাজিক পরিচয়ের অংশ। কারও নাম বা উপনাম পরিবর্তন করা শুধু শব্দ বদলানো নয়; এটি তার পরিচয়ের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। নবী তাকে যে পরিচয় দিয়েছেন, উমর সেটি মুছে অন্য পরিচয় বসিয়েছেন। এটি ব্যক্তির ওপর রাষ্ট্র-ধর্মীয় ক্ষমতার প্রয়োগ। সেই ক্ষমতা এতটাই প্রবল যে ব্যক্তি বলতে বাধ্য হচ্ছেন, এই নাম তো আমাকে রাসূলই দিয়েছেন; তবু তা তার পরিচয় রক্ষা করতে পারছে না। নবীর নাম-দেওয়া যথেষ্ট নয়, উমরের অনুমোদন দরকার। এই দৃশ্য ইসলামি আনুগত্যতত্ত্বের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর।

উমরের বক্তব্যে যে “আমরা উদ্বিগ্ন” ভাষাটি আছে, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বেগ কার? কোন কর্তৃত্বে? কার ঝুঁকি নির্ধারণ করছেন উমর? এখানে ব্যক্তির নিজের উপনাম নয়, নবীর দেওয়া পরিচয় নয়, বরং উমরের ধর্মীয় নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্ব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্বই পরে অনেক ধর্মীয় আইনের ভিত্তি হয়েছে: মানুষকে কী বলা যাবে, কী নাম রাখা যাবে, কোন সম্পর্ক বৈধ, কোন আচরণ বিপজ্জনক, কোন নারী বাইরে যাবে, কোন স্ত্রীকে মারা যাবে, কোন প্রথা বন্ধ হবে। উমর সেই শাসনিক ধর্মমনের প্রতিনিধি, যা স্বাধীন নৈতিক বিচার নয়, নিয়ন্ত্রণকে ধর্মীয় সতর্কতা বলে চালায়।

এই ঘটনায় এপোলজিস্টরা বলতে পারে, উমর নবীর বিরোধিতা করেননি; তিনি সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু সেটিই তো সমস্যা। নবী যদি কোনো কাজ করে বা অনুমোদন দিয়ে থাকেন, তারপরও উমর যদি “নিরাপদ পথ” নামে সেটি বদলাতে পারেন, তাহলে নবীর কাজ সাধারণ মানুষের জন্য আদর্শ নয়। তখন নবীর সুন্নাহ শর্তাধীন: উমর বা পরবর্তী ফকিহরা নিরাপদ মনে করলে অনুসরণযোগ্য, না হলে সীমিত বা বাতিলযোগ্য। এই অবস্থান সুন্নাহর বাধ্যতামূলকতার দাবিকে ভিতর থেকে দুর্বল করে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, এখানে নবীর বিশেষ মর্যাদার যুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে নবীর সিদ্ধান্ত অকার্যকর করতে। “নবীর গুনাহ ক্ষমা করা হয়েছে” কথাটি সাধারণত নবীর মর্যাদা দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই ঘটনায় সেটি ব্যবহৃত হচ্ছে নবীর দেওয়া উপনাম সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য দেখাতে। অর্থাৎ নবীর মর্যাদা নবীর অনুসরণকে শক্তিশালী করছে না; বরং দুর্বল করছে। নবী করেছেন, কিন্তু আপনি করতে পারবেন না। নবী দিয়েছেন, কিন্তু আপনি রাখতে পারবেন না। নবী অনুমোদন করেছেন, কিন্তু উমর উদ্বিগ্ন। এ কেমন রাসূল-আনুগত্য?

এই ছোট ঘটনাটি তাই প্রবন্ধের বড় থিসিসকে আরও শক্ত করে। উমর শুধু বড় আইনি বিষয়ে নয়, ক্ষুদ্র পরিচয়গত বিষয়ে পর্যন্ত নবী-প্রদত্ত সিদ্ধান্ত বদলানোর মানসিকতা রাখতেন। তিনি শুধু খলিফা নন, ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের কঠোর প্রহরী। তার কাছে নবীর কাজও শেষ কথা নয়; শেষ কথা হলো তার নিজের সাবধানতা, তার নিজের ধর্মীয় উদ্বেগ, তার নিজের শাসনিক বিচার। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরে ইসলামী রাজনীতির পরিচিত রূপ হয়ে দাঁড়ায়: ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব, নারীর ওপর কর্তৃত্ব, দাসের ওপর কর্তৃত্ব, ভাষা ও নামের ওপর কর্তৃত্ব, এমনকি নবী-প্রদত্ত সিদ্ধান্তের ওপরও কর্তৃত্ব।

অতএব আবূ ঈসা উপনামের ঘটনা তুচ্ছ নয়। এটি দেখায়, উমর নবীর সিদ্ধান্তকে নিজের ধর্মীয়-প্রশাসনিক বিচার দিয়ে সংশোধন করতে দ্বিধা করেননি। নবী উপনাম দিয়েছেন, ব্যক্তি তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, তবু উমর সেটি বদলে দিয়েছেন। এই ঘটনাকে যদি ফজিলত বলা হয়, তাহলে নবীর সিদ্ধান্তের চূড়ান্ততা শুধু কথার কথা। বাস্তবে চূড়ান্ততা থাকে ক্ষমতার হাতে। আর উমর সেই ক্ষমতার অন্যতম প্রধান মুখ।


হাজরে আসওয়াদ: পাথরচুম্বন এবং ইসলামের পৌত্তলিক অবশেষ

হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর ইসলামের ভেতরে থাকা পৌত্তলিক অবশেষগুলোর সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। ইসলাম নিজেকে মূর্তিপূজা, পাথরপূজা, দেবতা-প্রতিমা ও জড়বস্তুর পবিত্রতা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক কঠোর একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু একই ধর্মের কেন্দ্রীয় ইবাদত হজ্জে মুসলমানরা কাবার কোণে বসানো একটি পাথরের দিকে ছুটে যায়, সেটিকে চুম্বন করে, স্পর্শ করে, ইশারা করে, তার সামনে আবেগ দেখায়, এবং সেই পাথরকে ঘিরে বিশেষ পবিত্রতার বয়ান তৈরি করে। এই দ্বৈততার মধ্যে ইসলামের প্রাক-ইসলামি আরবীয় ধর্মাচারের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। নাম বদলেছে, ব্যাখ্যা বদলেছে, কিন্তু পাথরকেন্দ্রিক পবিত্রতার রীতি টিকে গেছে।

উমর ইবনুল খাত্তাবের বিখ্যাত বক্তব্য এই সমস্যাটিকে আরও নগ্ন করে। তিনি হাজরে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি জানি তুমি একটি পাথর; তুমি ক্ষতি করতে পারো না, উপকারও করতে পারো না। আমি যদি রাসূলুল্লাহকে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে তোমাকে চুম্বন করতাম না। এই বাক্যে উমর যেন এক মুহূর্তের জন্য যুক্তিবাদী হয়ে ওঠেন। তিনি বোঝেন, পাথর পাথরই; তার নিজস্ব কোনো শক্তি নেই। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তিনি সেই পাথর চুম্বন করেন, কারণ নবী তা করেছেন। অর্থাৎ যুক্তি পাথরকে অস্বীকার করে, কিন্তু ধর্মীয় অনুকরণ সেই পাথরকে আবার পবিত্র আচারের কেন্দ্রে বসায়। [57]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৬/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ৩৭. তাওয়াফের সময় হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করা মুস্তাহাব
২৯৩৯। খালফ ইবনু হিশাম, মুকাদ্দমী, আবূ কামিল ও কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি টাক মাথাওয়ালা অর্থাৎ উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে কালো পাথর হাজারে আসওয়াদ চুমো দিতে দেখেছি এবং তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই তোমাকে চুন্বন করব এবং আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একটি পাথর, তুমি কারও ক্ষতিও করতে পার না এবং উপকারও করতে পার না। আমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তবে আমি তোমায় চুম্বন করতাম না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ)

এই বক্তব্য ইসলামের ভেতরে থাকা টানাপোড়েনকে পরিষ্কার করে। উমর একদিকে পাথরের অক্ষমতা স্বীকার করছেন, অন্যদিকে সেই অক্ষম পাথরকে চুম্বন করছেন। প্রশ্ন হলো, যদি পাথর কোনো উপকার-ক্ষতি করতে না পারে, তাহলে তাকে চুম্বন করার ধর্মীয় অর্থ কী? যদি উত্তর হয়, “নবী করেছেন”, তাহলে সমস্যা আরও বড়। নবী কেন এমন একটি কাজ করবেন, যা বাহ্যিকভাবে পাথরপূজার সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়? আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠানো নবী কেন একটি পাথরকে কেন্দ্রীয় ইবাদতের আবেগঘন অংশ বানাবেন? আর যদি এটি শুধু আনুগত্যের পরীক্ষা হয়, তাহলে এই আনুগত্যের রূপ এত পৌত্তলিক কেন?

উমরের যুক্তিবাদ এখানে অর্ধেক পথে থেমে যায়। তিনি পাথরকে দেবতা বানান না, কিন্তু পাথরচুম্বন ত্যাগও করেন না। তিনি বলেন, পাথর কোনো শক্তির মালিক নয়, কিন্তু নবীর অনুকরণে পাথরের প্রতি আচার পালন করেন। এটি এক ধরনের অর্ধেক-যুক্তিবাদ: যুক্তি সমস্যাটি চিনতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় কর্তৃত্বের সামনে আত্মসমর্পণ করে। এই দৃশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে দেখা যায়, ইসলামি আনুগত্য কীভাবে মানুষের সরল যুক্তিবোধকে থামিয়ে দেয়। “পাথর তো পাথর” বলা পর্যন্ত অনুমতি আছে; কিন্তু “তাহলে চুম্বন করব না” বলা যাবে না।

হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে ইসলামি হাদিস-ঐতিহ্য আবার এই পাথরকে আরও অলৌকিক মর্যাদা দিয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, এটি জান্নাত থেকে এসেছে। কোথাও বলা হয়েছে, এটি দুধের চেয়েও সাদা ছিল, মানুষের পাপ একে কালো করে দিয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন এর চোখ ও জিহ্বা থাকবে এবং যারা সত্যভাবে একে স্পর্শ করেছে তাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। অর্থাৎ পাথরটি শুধু একটি স্মারক নয়; হাদিস-ঐতিহ্য সেটিকে অতিপ্রাকৃত ইতিহাস, নৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং পরকালীন সাক্ষ্যক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি জড়বস্তুকে ধর্মীয় শক্তি ও ব্যক্তিসদৃশ ভূমিকা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

এক্ষেত্রে, সেই ব্যক্তি অতিরিক্ত সুবিধা পেল, যা প্রমাণ করে যে এই পাথরের নিজস্ব কিছু ক্ষমতা রয়েছে। তা না হলে, শুধুমাত্র চুম্বনের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা নয়। মূর্তি এবং পাথরের কোন ক্ষমতা নেই, এই দাবী করা মুহাম্মদের মুখে যখন এরকম স্ববিরোধী বক্তব্য শোনা যায়, তখন হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠতে পারি না।

সুনান ইবনু মাজাহ
১৯/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১৯/২৭. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা
২/২৯৪৪। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে উপস্থিত করা হবে। তার দু‘টি চোখ থাকবে, তা দিয়ে সে দেখবে, যবান থাকবে তা দিয়ে সে কথা বলবে এবং সে এমন লোকের অনুকূলে সাক্ষ্য দিবে যে তাকে সত্যতার সাথে চুমা দিয়েছে।
তিরমিযী ৯৬১, আহমাদ ২২১৬, ২৩৯৪, ২৬৩৮, ২৭৯৩, ৩৫০১, দারেমী ১৮৩৯, মিশকাত ২৫৭৮, আত-তালীক আলা ইবনু খুযাইমাহ ২৭৩৫, ২৭৩৬।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘ঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৭/ হাজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১১৩. হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে
৯৬১। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ আল্লাহর শপথ! এই পাথরকে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠাবেন যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। যে লোক সত্য হৃদয়ে একে পর্শ করবে তার সম্বন্ধে এই পাথর আল্লাহ্ তা’আলার নিকটে সাক্ষ্য দিবে।
— সহীহ, মিশকাত (২৫৭৮), তা’লীকুর রাগীব (২/১২২), তা’লীক আলা ইবনু খুযাইমা (২৭৩৫)
এই হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

সুনান আদ-দারেমী
৫. হজ্জ অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ২৬. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার ফযীলত
১৮৭৬. ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে আল্লাহ এমন অবস্থায় পুন:উত্থিত করবেন যে, এর দু‘টি চোখ থাকবে, যা দিয়ে সেটি দেখবে এবং একটি জিহবা থাকবে যা দিয়ে সেটি কথা বলবে এবং যে ব্যক্তি তাকে যথাযথভাবে চুম্বন করেছে, সেটি সেই লোকের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে।(1)
সালমান (তার বর্ণনায়) বলেন: যে ব্যক্তি তাকে চুম্বন করেছে, তার জন্য (অর্থাৎ ‘যথাযথভাবে’ শব্দটি ব্যতীত)।
(1) তাহক্বীক্ব: এর সনদ সহীহ।
তাখরীজ: [41]
আমরা এর পূর্ণ তাখরীজ দিয়েছি মুসনাদুল মাউসিলী নং ২৭১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান নং ৩৭১১, ৩৭১২ ও মাওয়ারিদুয যাম’আন নং ১০০৫ তে।
এছাড়া, তাবারানী, আল কাবীর ১২/৬৩ নং ১২৪৭৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

এখানেই ইসলামের একেশ্বরবাদী দাবি সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। একদিকে বলা হয়, পাথর, মূর্তি, প্রতিমা, গাছ, কবর, দেবমূর্তি, এগুলো কোনো উপকার-ক্ষতি করতে পারে না। অন্যদিকে হাজরে আসওয়াদকে বলা হয় জান্নাতি পাথর, মানুষের পাপে রঙ বদলানো পাথর, পরকালে সাক্ষ্যদাতা পাথর। প্রশ্ন হলো, এটি পাথরপূজার থেকে কত দূরে? দেবতা বলা হয়নি, ঠিক। কিন্তু পাথরকে আসমানি উৎস, নৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং কিয়ামতি সাক্ষ্যের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর পরও যদি কেউ বলে এটি নিছক পাথর, তাহলে সে নিজেরই হাদিস-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আর যদি বলে পাথরটির বিশেষ মর্যাদা আছে, তাহলে জড়বস্তুর পবিত্রতা-বিশ্বাসকে স্বীকার করতেই হয়।

এই স্ববিরোধিতা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কিত ভিডিওটি দেখা যেতে পারে।

ইসলামি প্রতিরক্ষা এখানে সাধারণত বলে, মুসলমানরা পাথরকে পূজা করে না, শুধু নবীর সুন্নাহ অনুসরণ করে। কিন্তু এই যুক্তি সমস্যাটি এড়ায়। কারণ একই যুক্তি প্রায় সব ধর্মীয় প্রতীকের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়। কোনো হিন্দু মূর্তিকে “ঈশ্বর নিজে” মনে না করে ঈশ্বরস্মৃতি বা পূজার মাধ্যম বলতে পারে। কোনো খ্রিস্টান ক্রুশকে কাঠ নয়, যিশুর আত্মত্যাগের স্মারক বলতে পারে। কোনো লোক পবিত্র তাবিজকে নিজে শক্তিশালী নয়, বরং ঈশ্বরের বরকতের মাধ্যম বলতে পারে। তাহলে শুধু মুসলমানের পাথরচুম্বনই কেন বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদ, আর অন্যের প্রতীকী ভক্তি পৌত্তলিকতা? এখানে দ্বৈতনীতি স্পষ্ট। নিজের পাথর সুন্নাহ, অন্যের পাথর শিরক।

উমরের বক্তব্য এই দ্বৈতনীতিকে ঢাকতে পারে না; বরং আরও উন্মোচন করে। তিনি জানেন পাথর অক্ষম। কিন্তু নবীর অনুকরণে চুম্বন করেন। অর্থাৎ কাজটির নৈতিক ও যুক্তিগত ভিত্তি পাথরের ক্ষমতা নয়; ভিত্তি হলো নবীর আচরণ। কিন্তু নবীর আচরণ যদি কোনো জড়বস্তুকে কেন্দ্র করে এমন ভক্তিপূর্ণ শারীরিক আচার প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে সেই আচরণ নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ। একেশ্বরবাদ কেবল এই দাবি নয় যে পাথর ঈশ্বর নয়; একেশ্বরবাদের দাবি হওয়া উচিত পাথরকে ধর্মীয় আবেগ, পরকালীন সাক্ষ্য ও পবিত্র স্পর্শের কেন্দ্র না বানানো। ইসলাম সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ।

এখানে কাবার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। কাবা ছিল প্রাক-ইসলামি আরবদের পবিত্র কেন্দ্র। সেখানে বহু মূর্তি ছিল, বিভিন্ন গোত্রের ধর্মাচার চলত, তাওয়াফ ছিল, পবিত্র স্থান-চেতনা ছিল, এবং হাজরে আসওয়াদও সেই পবিত্র স্থাপত্যের অংশ ছিল। ইসলাম মূর্তিগুলো সরিয়ে দিলেও কাবা, তাওয়াফ, কালো পাথর, দিক-নির্ভর ইবাদত, চুম্বন ও স্পর্শের আবেগ, এসব রেখে দিল। ফলে প্রাক-ইসলামি ধর্মাচারের একটি বড় অংশ ইসলামের ভাষায় পুনর্ব্যাখ্যাত হয়ে টিকে গেল। এটিই ধর্মীয় ধারাবাহিকতার স্বাভাবিক ইতিহাস, কিন্তু একে আকাশ থেকে নামা সম্পূর্ণ নতুন একেশ্বরবাদী বিশুদ্ধতা বলা কঠিন।

হাজরে আসওয়াদের ক্ষেত্রে ইসলাম যে পার্থক্য তৈরি করতে চায় তা মূলত ভাষাগত। অন্যরা পাথর মানলে শিরক, মুসলমান পাথর চুম্বন করলে সুন্নাহ। অন্যরা পবিত্র বস্তুতে বরকত দেখলে কুসংস্কার, মুসলমান হাজরে আসওয়াদকে জান্নাতি বস্তু বললে ঈমান। অন্যরা মূর্তির সামনে আবেগ দেখালে পৌত্তলিকতা, মুসলমান কালো পাথরের জন্য ভিড় করলে ইবাদতের অংশ। এই দ্বৈতনীতি যুক্তির বিচার সহ্য করে না। আচারের কাঠামোতে জড়বস্তুর পবিত্রতা, স্পর্শ-আকাঙ্ক্ষা, চুম্বন, দেহী ভক্তি এবং অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস সবই আছে। শুধু নাম বদলেছে।

উমরের অবস্থান তাই দ্ব্যর্থক। তিনি একদিকে পাথরকে দেবত্বহীন বলেন, যা একেশ্বরবাদী যুক্তির দিকে এক ধাপ। কিন্তু অন্যদিকে তিনি পাথরচুম্বন বজায় রাখেন, যা রীতিগত পৌত্তলিকতার ধারাবাহিকতা। এই দ্ব্যর্থকতা আসলে ইসলামেরও দ্ব্যর্থকতা। ইসলাম জড়বস্তুর পবিত্রতা অস্বীকার করতে চায়, কিন্তু কাবা ও হাজরে আসওয়াদকে কেন্দ্র করে জড়বস্তুর পবিত্রতা বজায় রাখে। ইসলাম শিরকের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু নিজের পবিত্র পাথরকে ব্যতিক্রম বানায়। ইসলাম মূর্তিপূজা ভাঙার গল্প বলে, কিন্তু পাথরচুম্বনের আচার ধরে রাখে।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। হাজরে আসওয়াদকে যদি কিয়ামতে সাক্ষী হিসেবে কল্পনা করা হয়, তাহলে পাথরটি আর নিছক পাথর থাকে না। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সচেতনতা, স্মৃতি, পরিচয়, ভাষা বা অন্তত অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা দরকার। হাদিস যখন পাথরকে চোখ, জিহ্বা ও সাক্ষ্যক্ষমতা দেয়, তখন সেটি জড়বস্তুকে প্রায় ব্যক্তিসত্তায় উন্নীত করে। এই ধরনের বিশ্বাসই প্রাচীন ধর্মে পবিত্র বস্তু, টোটেম, প্রতিমা ও দেবীয় চিহ্নের ভিত্তি। ইসলাম অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে এই মানসিকতাকে শিরক বলে নিন্দা করে; নিজের ক্ষেত্রে একে হাদিস বলে পবিত্র করে।

এপোলজিস্টরা আরও বলতে পারে, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বাধ্যতামূলক নয়; দূর থেকে ইশারা করলেও হয়। কিন্তু এতে সমস্যাটি মেটে না। বাধ্যতামূলক না হলেও আচারের ধর্মীয় মর্যাদা আছে। মানুষ সেটিকে ছোঁয়ার জন্য ভিড় করে, চুম্বনকে বিশেষ ফজিলত মনে করে, নবীর সুন্নাহ বলে পালন করে, এবং হাদিস-ঐতিহ্য সেটিকে পরকালীন সাক্ষ্যক্ষমতা দেয়। কোনো কিছু বাধ্যতামূলক না হলেই তা পৌত্তলিক অবশেষ হওয়া থেকে মুক্ত হয় না। বহু ধর্মীয় আচার ঐচ্ছিক, কিন্তু তবুও তা জড়বস্তুর পবিত্রতা-বিশ্বাস বহন করে।

হাজরে আসওয়াদের ঘটনাটি এই প্রবন্ধের বৃহত্তর থিসিসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। উমর এখানে ইসলামের ভেতরে থাকা এক অস্বস্তি শনাক্ত করেন। তিনি বুঝতে পারেন, পাথর নিজে কিছুই নয়। কিন্তু তিনি সেই বোধকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করেন না। নবীর অনুকরণ তাকে আবার পাথরের সামনে নত করে। এই দৃশ্য দেখায়, ইসলামি ঐতিহ্যে যুক্তির সীমা কোথায়। যুক্তি যদি নবীর আচারের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, যুক্তিকেই থামতে হয়। ফলে পাথরচুম্বন থেকে যায়, একেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা তার ওপর পালিশ বসায়, আর মুসলমানরা নিজেদের পাথরকে পাথরপূজা নয় বলে ঘোষণা করে।

অতএব হাজরে আসওয়াদ প্রসঙ্গে উমরের বক্তব্য ইসলামের পক্ষে প্রমাণ নয়; বরং ইসলামের ভেতরের স্ববিরোধিতার প্রমাণ। তিনি নিজেই স্বীকার করছেন পাথর কোনো উপকার-ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু সেই স্বীকারোক্তির পরও পাথরচুম্বন বজায় থাকে। হাদিস-ঐতিহ্য সেই পাথরকে অলৌকিক মর্যাদা দেয়। কাবা-আচার সেই পাথরকে মুসলিম আবেগের কেন্দ্রে রাখে। একদিকে পাথরপূজা-বিরোধী ভাষা, অন্যদিকে পবিত্র পাথরচুম্বন। এই দ্বৈততার নাম একেশ্বরবাদ নয়; এটি প্রাক-ইসলামি পৌত্তলিকতার ইসলামি পুনর্ব্যাখ্যা।


নবীর স্ত্রী সাওদাকে অপমান: নবীর নীরবতা ও মৌন সম্মতি

উমর ইবনুল খাত্তাবের পর্দা-আগ্রহ ইসলামী ইতিহাসে সাধারণত ফজিলত হিসেবে প্রচার করা হয়। বলা হয়, তিনি নারীর পবিত্রতা, নবীর পরিবারের মর্যাদা এবং মুসলিম সমাজের নৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উৎসগুলো খুঁটিয়ে পড়লে এই তথাকথিত পবিত্রতার মুখোশ খুলে যায়। সেখানে দেখা যায়, উমরের পর্দা-আগ্রহ ছিল নারীর শরীর, চলাচল, দৃশ্যমানতা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ওপর পুরুষতান্ত্রিক নজরদারি চাপানোর একটি প্রকট উদাহরণ। এই নজরদারির সবচেয়ে অস্বস্তিকর ঘটনা হলো নবীর স্ত্রী সাওদা বিনতে জামআকে বাইরে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যাওয়ার সময় চিহ্নিত করে ডাকা ও লজ্জিত করা।

বর্ণনায় এসেছে, পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার পর সাওদা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যান। তিনি এমন শারীরিক গঠনের অধিকারিণী ছিলেন যে পরিচিত লোকদের চোখে তাকে চেনা যেত। উমর তাকে দেখে বলেন, “হে সাওদা, আমাদের দৃষ্টি থেকে তুমি গোপন থাকতে পারবে না; এখন দেখো, কীভাবে বাইরে যাও।” এই বাক্য কোনো নিরীহ মন্তব্য নয়। এটি একজন নারীর শরীরকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা, তার প্রাকৃতিক প্রয়োজনকে সামাজিক লজ্জার বিষয় বানানো, এবং তার চলাচলের ওপর পুরুষ-নজরদারির চাপ তৈরি করা। একজন নারী বাইরে গেছে, কারণ মানুষের শরীরের প্রাকৃতিক প্রয়োজন আছে। উমর সেই মানবিক প্রয়োজনকে সম্মান করেননি; বরং সেটিকে পর্দা-রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়েছেন। [58] [59]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪০/ সালাম
পরিচ্ছদঃ ৭. মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য স্ত্রীলোকের বাইরে যাওয়ার বৈধতা
৫৪৮৪। আবদুল মালিক ইবনু শুআয়ব ইবনু লায়স (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীগণ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় রাতের বেলা ‘মানাসি’ এর দিকে বেরিয়ে যেতেন। الْمَنَاصِع (মানাসি) হল প্রশস্ত ময়দান। ওদিকে উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতেন, আপনার স্ত্রীগণের প্রতি পর্দা বিধান করুন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেননি। কোন এক রাতে ইশার সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনা সাওদা বিনত যাম’আ (রাঃ) বের হলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। উমার (রাঃ) তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, হে সাওদা! আমরা তোমাকে চিনে ফেলেছি। পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষায় (তিনি এরূপ করলেন)। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন আল্লাহর তাআলা পর্দা-বিধি নাযিল করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫২/ তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌ তা’আলার বাণীঃ لا تدخلوا … عند الله عظيما হে মু’মিনগণ! তোমরা খাওয়ার জন্য খাবার প্রস্তুতির অপেক্ষা না করে নাবীর ঘরে তোমাদেরকে অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত প্রবেশ করবে না; তবে তোমাদেরকে ডাকা হলে তোমরা প্রবেশ করবে এবং খাওয়া শেষ হলে নিজেরাই চলে যাবে, কথাবার্তায় মাশগুল হয়ে পড়বে না। তোমাদের এ আচরণ অবশ্যই নাবীকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচবোধ করেন না। তোমরা যখন তাঁর পত্নীদের নিকট হতে কোন কিছু চাইবে, তখন পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র উপায়। আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের কারও পক্ষে কখনও বৈধ নয়। এটা আল্লাহর কাছে সাংঘাতিক অপরাধ। বলা হয় إِنَاهُ খাদ্য পরিপাক হওয়া। এটা أَنَى يَأْنِيْ أَنَاةًথেকে গঠিত। لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُوْنُ قَرِيْبًا সম্ভবত ক্বিয়ামাত অতি নিকটবর্তী। যদি তুমি স্ত্রী লিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার কর, তবে قَرِيْبَةً বলবে। আর যদি الصِّفَةَ না ধর ظَرْفًا বা بَدَلًا হিসেবে ব্যবহার কর তবে ‘তা’ নিয়ে যুক্ত করবে না। তেমনি এ শব্দটি একবচন, দ্বি-বচন, বহুবচন এবং নারী-পুরুষ সকল ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৪৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৭৯৫
৪৪৩২। যাকারিয়া ইবনু ইয়াহ্ইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর সাওদা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যান। সাওদা এমন মোটা শরীরের অধিকারিণী ছিলেন যে, পরিচিত লোকদের থেকে তিনি নিজকে গোপন রাখতে পারতেন না। উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) তাঁকে দেখে বললেন, হে সাওদা! জেনে রাখ, আল্লাহর কসম, আমাদের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকতে পারবে না। এখন দেখ তো, কেমন করে বাইরে যাবে? আয়িশা (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) সাওদা (রাঃ) ফিরে আসলেন। আর এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে রাতের খানা খাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল টুকরা হাড়। সাওদা (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম। তখন উমর (রাঃ) আমাকে এমন এমন কথা বলেছে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ সময় আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নিকট ওহী নাযিল করেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়া শেষ হল, হাড় টুকরা তখনও তাঁর হাতেই ছিল, তিনি তা রাখেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই প্রয়োজনে তোমাদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

এই ঘটনার নৈতিক কুৎসিততা বোঝার জন্য কোনো আধুনিক তত্ত্বেরও দরকার নেই। একজন নারী রাতে বা বাইরে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে গেছেন। একজন পুরুষ তাকে দেখে তার শরীরের গঠন, দৃশ্যমানতা ও পরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছে। সে মন্তব্যের ফলে নারী অস্বস্তিতে পড়ে ফিরে আসছেন এবং নবীর কাছে অভিযোগ করছেন। আজকের ভাষায় এটিকে রাস্তার হয়রানি, দেহ-নজরদারি এবং চলাচল-নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বলা যায়। কিন্তু ধর্মীয় বয়ানে ঘটনাটি উমরের ফজিলত হয়ে যায়। অর্থাৎ যেখানে নৈতিক বিচার হওয়ার কথা ছিল, সেখানে পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে পবিত্রতার ভাষায় সাজানো হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উমর শুধু সাধারণ কোনো নারীকে লক্ষ্য করেননি; তিনি নবীর স্ত্রীকে লক্ষ্য করেছেন। ইসলামী বয়ানে নবীর স্ত্রীদের “উম্মুল মুমিনীন” বলা হয়। কিন্তু সেই মর্যাদাও সাওদাকে উমরের নজরদারি থেকে রক্ষা করেনি। বরং তার নবী-স্ত্রী পরিচয়ই তাকে আরও বেশি নজরদারির বস্তুতে পরিণত করেছে। নারী যত ধর্মীয়ভাবে মর্যাদাপূর্ণ, তার শরীর তত বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এই প্যাটার্ন শুধু ইসলামে নয়, প্রায় সব পিতৃতান্ত্রিক ধর্মীয় সংস্কৃতিতে দেখা যায়: নারীকে মর্যাদা দেওয়ার নামে তাকে ঘিরে ফেলা, ঢেকে ফেলা, নজরদারি করা, এবং তার চলাচলকে পুরুষের নৈতিক উদ্বেগের অধীন করা।

সাওদার ঘটনা এই পিতৃতান্ত্রিক যুক্তিকে নগ্ন করে। সমস্যা ছিল না সাওদার কোনো অপরাধ। সমস্যা ছিল, তাকে দেখা যাচ্ছে। তার শরীর পরিচিত। তাই তার বাইরে যাওয়া উমরের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে নারীর অপরাধ তার অস্তিত্বের দৃশ্যমানতা। পুরুষের চোখ তাকে দেখে ফেলছে, তাই নারীকে আরও আড়াল হতে হবে। প্রশ্ন হলো, পুরুষের চোখ নিয়ন্ত্রণ করার বদলে নারীকে কেন বন্দী করা হবে? উমর নিজের দৃষ্টি সরাতে পারেননি, কিন্তু দায় চাপালেন নারীর ওপর। এই যুক্তিই পর্দা-নৈতিকতার কেন্দ্রীয় অসততা: পুরুষ দেখে, নারী ঢাকে; পুরুষ অস্বস্তি পায়, নারী ঘরে থাকে; পুরুষ নিয়ন্ত্রণ চায়, আল্লাহ ওহী দেন।

ধর্মীয় প্রতিরক্ষা বলবে, উমর নবীর স্ত্রীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা চেয়েছিলেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা ঘটনাটির ভাষা ও পরিস্থিতিকে বিকৃত করে। নিরাপত্তা চাইলে ভাষা হতে পারত, “আপনার নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা দরকার।” মর্যাদা চাইলে তিনি সম্মানজনকভাবে নবীর সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি সরাসরি সাওদাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি আমাদের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকতে পারবে না, এখন দেখো কীভাবে বাইরে যাও। এটি নিরাপত্তা নয়; এটি লজ্জা দেওয়া। এটি মর্যাদা নয়; এটি সামাজিক শাসন। এটি শালীনতা নয়; এটি নারীর প্রাকৃতিক প্রয়োজনের ওপর পুরুষতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ।

নবীর প্রতিক্রিয়াও এখানে নৈতিকভাবে দুর্বল। সাওদা ফিরে এসে অভিযোগ করলেন। নবী শেষে বললেন, প্রয়োজনে তোমাদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই বাক্য নারীদের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনকে স্বীকার করে, কিন্তু উমরের আচরণের নৈতিক নিন্দা কোথায়? বর্ণনার কাঠামোতে উমরকে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করা হয় না। তার দেহ-নজরদারি, নারীর লজ্জিতকরণ, প্রাকৃতিক প্রয়োজনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা—এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান দেখা যায় না। ফলত ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত নারীর চলাচলের অধিকার নয়, বরং পর্দা-রাজনীতির অংশ হিসেবেই পড়া হয়।

এই জায়গায় সাবধানতা দরকার। কেউ বলতে পারে, নবী তো শেষ পর্যন্ত নারীদের প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। ঠিক, কিন্তু সেটি সমস্যার সমাধান নয়। কারণ নারীর প্রাকৃতিক প্রয়োজনের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি কোনো উচ্চ নৈতিক অগ্রগতি নয়; এটি ন্যূনতম মানবিকতা। প্রশ্ন হলো, সেই ন্যূনতম প্রয়োজন কেন উমরের মতো পুরুষের নজরদারি ও আপত্তির বিষয় হলো? কেন একজন নারীকে নিজের দেহের জন্য লজ্জিত হতে হলো? কেন নবী-স্ত্রীকেও নিজের প্রয়োজনের বৈধতা পুরুষদের কথোপকথনের মাধ্যমে পেতে হলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পিতৃতন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়।

পর্দা-ওহীর প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা আরও গুরুতর। উমর বারবার নবীকে বলছিলেন, স্ত্রীদের পর্দা দিন। তার যুক্তি ছিল, সৎ ও অসৎ সবাই তাদের সঙ্গে কথা বলে। এই ভাষার মধ্যেই নারীকে সম্ভাব্য বিপদের বস্তু, পুরুষের দৃষ্টির কেন্দ্র এবং সামাজিক সন্দেহের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরে পর্দা-সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়। ভক্তিমূলক পাঠে এটি আল্লাহর বিধান। কিন্তু সমালোচনামূলক পাঠে দেখা যায়, উমরের পুরুষতান্ত্রিক উদ্বেগ, নারীর দৃশ্যমানতা নিয়ে অস্বস্তি, এবং নবী-পরিবারের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের চাপই ধর্মীয় বিধানের ভাষা পেয়েছে।

এই ঘটনার সঙ্গে “মুওয়াফাকাতে উমর” ধারণা সরাসরি যুক্ত। উমর পর্দা চান, পরে পর্দার আয়াত আসে। উমর সাওদাকে বাইরে চিহ্নিত করে চাপ দেন, পরে নারীদের প্রয়োজনের প্রসঙ্গে ওহী-সংক্রান্ত বর্ণনা আসে। এই ধারাবাহিকতাকে ফজিলত বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি ফজিলত নাকি পুরুষের সামাজিক অস্বস্তির ধর্মীয়করণ? একজন পুরুষ নারীদের কম দৃশ্যমান করতে চাইলেন, তারপর সেই ইচ্ছা আল্লাহর বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এই চিত্রে আল্লাহর ওহী স্বাধীন নৈতিক সত্য নয়; বরং ক্ষমতাবান পুরুষের উদ্বেগকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার যন্ত্র।

এখানে ইসলামী পর্দা-নৈতিকতার একটি মৌলিক সমস্যা দেখা যায়। এটি পুরুষের কামনা, দৃষ্টি, সন্দেহ ও অস্বস্তির বোঝা নারীর শরীরে চাপিয়ে দেয়। পুরুষ দেখছে, তাই নারী ঢাকবে। পুরুষ চিনে ফেলছে, তাই নারী আরও অদৃশ্য হবে। পুরুষের মন অশান্ত, তাই নারীর চলাচল নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু সভ্য নৈতিকতার দাবিটি উল্টো হওয়া উচিত: পুরুষ নিজের দৃষ্টি, আচরণ ও শালীনতা নিয়ন্ত্রণ করবে; নারীকে নিজের মানবিক প্রয়োজন, চলাচল ও সামাজিক উপস্থিতির জন্য লজ্জিত হতে হবে না। ইসলামি পর্দা-রাজনীতিতে এই ভারসাম্য নেই। সেখানে পুরুষের অক্ষমতা নারীর শাস্তি হয়ে যায়।

সাওদার ঘটনায় দেহ-রাজনীতিও স্পষ্ট। বর্ণনায় তার শারীরিক গঠনের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ নারীর শরীরের আকার, পরিচিতি, দৃশ্যমানতা, অন্যের চোখে ধরা পড়া—এসবই ধর্মীয় আলোচনার উপাদান হয়ে যায়। একজন নারী মোটা, লম্বা, পরিচিত, চেনা যায়—এসব কারণে তার চলাচল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এখানে নারী কোনো পূর্ণ মানবসত্তা নয়; সে পুরুষের দৃষ্টিতে গঠিত একটি দৃশ্যমান শরীর। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পিতৃতান্ত্রিক ধর্মের কেন্দ্রীয় সমস্যা। নারীকে আত্মা, বুদ্ধি, ইচ্ছা, অধিকার ও স্বাধীনতার মানুষ হিসেবে নয়, বরং ঢাকতে হবে এমন দেহ হিসেবে দেখা হয়।

ধর্মতত্ত্ব এই ঘটনাকে যতই পবিত্র করার চেষ্টা করুক, এর মানবিক পাঠ স্পষ্ট। সাওদা বাইরে গিয়েছিলেন কারণ তার প্রয়োজন ছিল। উমর তাকে লজ্জিত করলেন। সাওদা ফিরে এসে অভিযোগ করলেন। নবী নারীদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন, কিন্তু উমরের এই অপমানজনক আচরণ ইসলামি ঐতিহ্যে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হলো না। বরং উমরের পর্দা-আগ্রহই পরবর্তী বয়ানে মহিমান্বিত হলো। এর অর্থ, নারী লজ্জিত হলেও সমস্যা নেই; পুরুষের পর্দা-আবেগ পবিত্র। নারীর অস্বস্তি গৌণ; পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রধান।

এই ঘটনাকে আজকের ভাষায় বিচার করলে এটি স্পষ্টভাবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও চলাচলের মর্যাদার লঙ্ঘন। কোনো নারী প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গেলে তাকে চিহ্নিত করে বলা, “তোমাকে দেখা যাচ্ছে, এখন দেখো কীভাবে বের হও”, এটি শালীনতা নয়। এটি নজরদারি। এটি ধর্মীয় নৈতিকতা নয়। এটি সামাজিক অপমান। একজন নারীকে তার শরীরের জন্য দায়ী করা, পুরুষের চোখে ধরা পড়ার জন্য তাকে লজ্জিত করা, এবং তার চলাচলকে পুরুষের অনুমোদনের অধীন করা—এসব আধুনিক মানবাধিকার মানদণ্ডে সরাসরি অগ্রহণযোগ্য।

এই প্রসঙ্গটি উমরের বৃহত্তর চরিত্রের সঙ্গেও মেলে। তিনি মুতআ ও তামাত্তুতে যৌন-সামাজিক প্রথা নিয়ন্ত্রণ করেন। স্ত্রী প্রহারের ক্ষেত্রে নারীর “সাহসী হয়ে ওঠা” নিয়ে আপত্তি করেন। বয়স্ক দুধপানে নারীর দেহকে মাহরাম-আইনের অদ্ভুত যন্ত্র বানানো নিয়ে পরবর্তী সীমাবদ্ধতার অংশ হন। সাওদার ক্ষেত্রে নারীর চলাচল ও দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা নেন। অর্থাৎ উমরের ধর্মীয়-আইনি চরিত্রের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হলো নারী ও যৌনতার ওপর পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ। তাকে শুধু ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে দেখালে এই অস্বস্তিকর ধারাবাহিকতা আড়াল হয়ে যায়।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: পর্দা কি নৈতিকতা, নাকি নিয়ন্ত্রণ? যদি নৈতিকতা হতো, তাহলে তা পুরুষ ও নারীর সমান মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীন চলাচলের ওপর দাঁড়াত। কিন্তু সাওদার ঘটনায় দেখা যায়, পর্দা আসলে নারীর দৃশ্যমানতা নিয়ে পুরুষের অস্বস্তির আইনগত রূপ। নারী বাইরে গেলে সমস্যা, নারী চেনা গেলে সমস্যা, নারী শরীর নিয়ে উপস্থিত হলে সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে পুরুষের দৃষ্টি নয়, নারীর আড়ালকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। এটিই পর্দা-নৈতিকতার মৌলিক পিতৃতান্ত্রিকতা।

অতএব সাওদার ঘটনা কোনো ছোট পারিবারিক বিব্রতকর কাহিনি নয়। এটি দেখায়, উমরের পর্দা-আগ্রহ নারীর মর্যাদা রক্ষা করেনি; বরং নারীর শরীর ও চলাচলকে পুরুষ-নজরদারির অধীন করেছে। নবীর স্ত্রীও এই নজরদারি থেকে মুক্ত ছিলেন না। তার প্রাকৃতিক প্রয়োজনও ধর্মীয় রাজনীতির বিষয় হয়ে গেছে। পরবর্তী ঐতিহ্য উমরের এই আচরণকে নিন্দা না করে পর্দা-ফজিলতের ধারায় বসিয়েছে। ফলে স্পষ্ট হয়ে যায়, ইসলামের পর্দা-নীতি নারী-সম্মান নয়; এটি পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ধর্মীয় বৈধতা। আর উমর সেই বৈধতা নির্মাণের অন্যতম প্রধান মুখ।


হুনাইনের যুদ্ধ: সাহাবী-পলায়ন, উমরের উপস্থিতি এবং পবিত্রতার মিথ

সাহাবীদের নিয়ে প্রচলিত সুন্নি কল্পকাহিনির একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে বীরত্ব, আত্মত্যাগ, নবীর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচল থাকার রোম্যান্টিক ছবির ওপর। সাধারণ মুসলমানদের শেখানো হয়, সাহাবীরা ছিলেন ঈমানের পাহাড়, নবীর জন্য জীবন দিতে সদা প্রস্তুত, যুদ্ধক্ষেত্রে অটল, ভয়হীন, অনন্য। কিন্তু ইসলামের নিজস্ব উৎসগুলো খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যায়, এই ছবি অনেক বেশি জটিল, মানবীয় এবং অস্বস্তিকর। হুনাইনের যুদ্ধ সেই অস্বস্তির অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ। কোরআন নিজেই হুনাইনের দিন মুসলমানদের আত্মতুষ্টি, সংখ্যাগর্ব, যুদ্ধক্ষেত্রে সংকট এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শনের কথা উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ সাহাবীদের বীরত্বকাহিনির ভেতরেই পলায়ন, ভয়, বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতার দলিল আছে। [60]

বস্তুতঃ আল্লাহ তোমাদেরকে বহু যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন আর হুনায়নের যুদ্ধের দিন, তোমাদের সংখ্যার আধিক্য তোমাদেরকে গর্বে মাতোয়ারা করে দিয়েছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি, যমীন সুপ্রশস্ত হওয়া সত্বেও তা তোমাদের নিকট সংকীর্ণই হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পিছন ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে।
— Taisirul Quran
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে (যুদ্ধে) বহু ক্ষেত্রে বিজয়ী করেছেন এবং হুনাইনের দিনেও। যখন তোমাদেরকে তোমাদের সংখ্যাধিক্য গর্বে উম্মত্ত করেছিল, অতঃপর সেই সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনই কাজে আসেনি, আর ভূ-পৃষ্ঠ প্রশস্ত থাকা সত্ত্বেও তা তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গেল, অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন পূর্বক পলায়ন করলে।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।
— Rawai Al-bayan
অবশ্যই আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু ক্ষেত্রে এবং হুনায়নের যুদ্ধের দিনে [১] যখন তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল তোমাদের সংখ্যাধিক্য হওয়া; কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি এবং বিস্তৃত হওয়া সত্বেও যমীন তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়েছিল। তারপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়েছিলে [২]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

কোরআনের ভাষা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো শত্রুর প্রচারণা নয়, কোনো নাস্তিক ঐতিহাসিকের ব্যঙ্গ নয়, কোনো শিয়া বিতর্কও নয়। এটি ইসলামের নিজস্ব পবিত্র গ্রন্থের ভাষা। সেখানে বলা হচ্ছে, হুনাইনের দিন মুসলমানদের সংখ্যা তাদের আত্মতুষ্ট করেছিল, কিন্তু সেই সংখ্যা তাদের কোনো কাজে আসেনি; পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাছে সংকীর্ণ মনে হয়েছিল; তারপর তারা পেছন ফিরে পালায়। এই বর্ণনা সাহাবীদের যুদ্ধক্ষেত্রের নিখুঁত বীরত্বের প্রচলিত ছবিকে সরাসরি ধাক্কা দেয়। যারা নবীর সাহচর্যে ছিল, যারা ঈমানের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম বলে প্রচারিত, তারাও যুদ্ধের ভয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে পেছন ফিরে যেতে পারে।

হাদিসেও হুনাইনের এই বিশৃঙ্খলার বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়। আবু কাতাদার বর্ণনায় দেখা যায়, মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যাচ্ছে বা পালাচ্ছে। তিনি নিজেও বলেন, তিনিও পালানোদের সঙ্গে পালিয়ে যান। এই অবস্থায় তিনি উমর ইবনুল খাত্তাবকে মানুষের মধ্যে দেখতে পান এবং জিজ্ঞেস করেন, লোকদের কী হয়েছে? উমর বলেন, এটি আল্লাহর ব্যাপার। পরে মুসলমানরা ফিরে আসে। এই বর্ণনায় উমর কোনো একক অবিচল বীর হিসেবে দাঁড়িয়ে নেই। তিনি সেই বিশৃঙ্খল জনতার ভেতরেই আছেন, যারা প্রাণভয়ে নবীকে ফেলেই পালাচ্ছিল, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের স্থিরতা ভেঙে গেছে। [61]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৪/ মাগাযী [যুদ্ধ]
পরিচ্ছেদঃ ৬৪/৫৫. মহান আল্লাহর বাণীঃ
৪৩২২. আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইন যুদ্ধের দিন আমি দেখলাম যে, এক মুসলিম এক মুশরিকের সঙ্গে লড়াই করছে। আরেক মুশরিক মুসলিম ব্যক্তিটির পেছন থেকে তাকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ করছে। তখন আমি তার হাতের উপর আঘাত ক’রে তা কেটে ফেললাম। সে আমাকে ধরে ভীষণ চাপে চাপ দিল। এমনকি আমি শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। এরপর সে আমাকে ছেড়ে দিল ও দুর্বল হয়ে পড়ল। আমি তাকে আক্রমণ করে হত্যা করলাম। মুসলিমগণ পালাতে লাগলে আমিও তাঁদের সঙ্গে পালালাম। হঠাৎ লোকের মাঝে ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে দেখতে পেলাম। তাকে বললাম, লোকজনের অবস্থা কী? তিনি বললেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা। এরপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘যে (মুসলিম) ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছে বলে প্রমাণ পেশ করতে পারবে নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ সে-ই পাবে। আমি যাকে হত্যা করেছি তার সম্পর্কে সাক্ষী খোঁজার জন্য আমি দাঁড়ালাম। কিন্তু আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে এমন কাউকে পেলাম না। তখন বসে পড়লাম। এরপর আমার সুযোগমত ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালাম। তখন তাঁর পাশে উপবিষ্ট একজন বললেন- উল্লিখিত নিহত ব্যক্তির হাতিয়ার আমার কাছে আছে, সেগুলো আমাকে দিয়ে দেয়ার জন্য আপনি তাকে সম্মত করুন। তখন আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, না, তা হতে পারে না। আল্লাহর সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তাকে না দিয়ে এ কুরাইশী দুর্বল ব্যক্তিকে তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] দিতে পারেন না। রাবী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালেন এবং আমাকে তা দিয়ে দিলেন। আমি এর দ্বারা একটি বাগান কিনলাম। আর ইসলাম গ্রহণের পর এটিই ছিল প্রথম সম্পদ, যদ্দবারা আমি আমার আর্থিক বুনিয়াদ করেছি। [২১০০] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৯৭৮/৩৯৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৯৮৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ ক্বাতাদাহ সালামী (রাঃ)

এখানে সতর্কভাবে পড়া দরকার। দাবি করা হচ্ছে না যে উমর একাই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কাপুরুষের মতো পালিয়েছিলেন এবং অন্য সবাই দাঁড়িয়ে ছিল। দাবিটি আরও শক্তিশালী ও বেশি ন্যায্য: হুনাইনের ঘটনায় সাহাবীদের সমষ্টিগত পলায়ন বা বিশৃঙ্খলা ইসলামের নিজস্ব উৎসে স্বীকৃত, এবং উমর সেই পবিত্র, অটল, অপরাজেয়, সমালোচনাতীত সাহাবী-চিত্রের বাইরে একজন সাধারণ মানবিক চরিত্র হিসেবে দৃশ্যমান হন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়, বিশৃঙ্খলা ও পিছু হটার বাস্তবতার বাইরে ছিলেন না। এইটুকুই সাহাবী-নির্মলতার মিথ ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সাহাবী-পূজার বড় সমস্যা হলো, এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে দেয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ ভয় পেতে পারে, বিশৃঙ্খল হতে পারে, পালাতে পারে, আবার ফিরে আসতে পারে। ইতিহাসের দৃষ্টিতে এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ধর্মীয় প্রচারণা যখন সাহাবীদের প্রায় অতিমানবীয় করে তোলে, তখন হুনাইনের মতো ঘটনা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ এটি দেখায়, সাহাবীরা বাস্তব মানুষ ছিলেন: তারা ভয় পেতেন, ভুল করতেন, পিছু হটতেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতেন, নারীদের ওপর নজরদারি করতেন, দাসব্যবসা চালাতেন, নবীর নির্দেশে আপত্তি করতেন, এবং প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ বা মনস্তত্ত্বের সঙ্গে ধর্মীয় বিধানকে বদলে নিতেন।

হুনাইনের যুদ্ধ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রের। যুদ্ধক্ষেত্র সাহাবী-বীরত্বের প্রধান মঞ্চ। ইসলামী ইতিহাসে বদর, উহুদ, খন্দক, হুনাইন, তাবুক—এসব যুদ্ধের গল্প দিয়ে সাহাবীদের ঈমান, সাহস ও আত্মত্যাগের মহিমা নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এই একই যুদ্ধক্ষেত্রেই দেখা যায়, সংখ্যাগর্বে মুগ্ধ হওয়া, হঠাৎ আক্রমণে ভেঙে পড়া, নবীর কাছ থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া, পৃষ্ঠপ্রদর্শন করা। অর্থাৎ যে জায়গায় বীরত্বের কাহিনি তৈরি হয়, সেই জায়গাতেই দুর্বলতার দলিলও আছে। ধর্মীয় ইতিহাস দুর্বলতা মুছে বীরত্ব রেখে দেয়; সমালোচনামূলক ইতিহাস দুটোই দেখে।

কোরআনের ভাষায় “সংখ্যাধিক্য তোমাদের মুগ্ধ করেছিল” অংশটিও তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে মুসলমানদের ঈমানি বিনয় নয়, আত্মতুষ্টি দেখা যাচ্ছে। তারা সংখ্যায় বড়, তাই এক ধরনের আত্মবিশ্বাস বা গর্ব তৈরি হয়েছে। তারপর বাস্তব যুদ্ধের ধাক্কায় সেই আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এই বর্ণনা মানুষের সাধারণ সামরিক মনস্তত্ত্বের সঙ্গে মেলে। দল বড় হলে আত্মতুষ্টি আসে; বিপর্যয় এলে আতঙ্ক ছড়ায়; আতঙ্ক ছড়ালে পলায়ন ঘটে। এতে অলৌকিক কিছু নেই। বরং কোরআনের বর্ণনাই দেখায়, নবীর যুগের মুসলিম বাহিনীও অন্যান্য মানবসমাজের মতোই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার অধীন ছিল।

এখানে উমরকে আলাদা করে দেখা জরুরি, কারণ পরবর্তী সুন্নি বয়ানে তিনি কঠোরতা, সাহস, ন্যায়, দৃঢ়তা ও ইসলামের শক্তির প্রতীক। কিন্তু হুনাইনের বর্ণনায় তিনি সেই রোম্যান্টিক প্রতীকের মতো আলাদা কোনো অতিমানবীয় অবস্থানে নেই। তিনি যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার মাঝখানে, পালানো বা পিছু হটা জনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দৃশ্যে উপস্থিত। আবু কাতাদা যখন জিজ্ঞেস করেন, লোকদের কী হয়েছে, উমরের উত্তর কোনো বীরোচিত সামরিক ঘোষণা নয়; বরং “এটি আল্লাহর ব্যাপার” ধরনের ভাগ্যনির্ভর মন্তব্য। এই দৃশ্য উমরকে মিথের আসন থেকে নামিয়ে বাস্তব মানবিক অবস্থানে বসায়।

অবশ্য ইসলামি প্রতিরক্ষা বলবে, পরে মুসলমানরা ফিরে এসেছে, আল্লাহ সাহায্য করেছেন, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের পক্ষে গেছে। কিন্তু সেটি মূল সমস্যাকে মুছে দেয় না। পলায়ন ঘটেছিল কি না, সেটিই প্রশ্ন। কোরআন নিজেই পৃষ্ঠপ্রদর্শনের কথা বলছে। হাদিসে পালানোর স্বীকারোক্তি আছে। পরে ফিরে আসা প্রথম পিছু হটার ঘটনাকে অদৃশ্য করে না। কেউ প্রথমে পালিয়ে পরে ফিরে এলে সে পিছু হটেনি, এমন বলা যায় না। বরং বলা উচিত, সে পিছু হটেছিল, পরে ফিরে এসেছে। ধর্মীয় প্রচারণা শেষের বিজয় দেখিয়ে মাঝের দুর্বলতা ঢাকতে চায়। কিন্তু ইতিহাসে দুটোই সত্য।

এই ঘটনায় কোরআনের আরেকটি নৈতিক দ্বৈততাও দেখা যায়। অন্যান্য ক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন বা পৃষ্ঠপ্রদর্শনের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সাহাবীদের ক্ষেত্রে পলায়নকে পরে আল্লাহর সাহায্য, রহমত, প্রশান্তি নাজিল, পুনরায় সংগঠিত হওয়া—এসব ভাষায় নরম করা হয়। একই কাজের বিচার ব্যক্তির পরিচয়ের ওপর বদলে যায়। সাধারণ যুদ্ধপলায়ন কাপুরুষতা, কিন্তু সাহাবীদের যুদ্ধক্ষেত্রের পলায়ন ইতিহাসের সাময়িক পরীক্ষা। এটাই ধর্মীয় বিশেষাধিকার। যাদের পবিত্র করতে হবে, তাদের দুর্বলতাও পবিত্র গল্পের অংশ হয়ে যায়।

হুনাইনের ঘটনা তাই শুধু উমরের সমালোচনা নয়; এটি সাহাবী-আদালত ধারণার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যদি সাহাবীরা নৈতিকভাবে নির্ভরযোগ্য, চরিত্রগতভাবে প্রায় প্রশ্নাতীত এবং ঈমানি দৃঢ়তার আদর্শ হন, তাহলে হুনাইনের পলায়ন কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? যদি বলা হয়, তারা মানুষ ছিলেন, ভয় পেয়েছিলেন, ভুল করেছিলেন, পরে সংশোধিত হয়েছিলেন—তাহলে খুব ভালো; কিন্তু সেই স্বীকারোক্তি সাহাবী-পূজার ভিত্তি দুর্বল করে। মানুষ হলে তারা সমালোচনাযোগ্য। ভুল করলে তাদের ভুল বলা যাবে। যুদ্ধক্ষেত্রে পিছু হটলে পিছু হটা বলা যাবে। নবীর নির্দেশে আপত্তি করলে আপত্তি বলা যাবে।

সাহাবী-আদালতের ভক্তরা সাধারণত ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করেন: সাহাবীদের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা, অন্যদের ক্ষেত্রে বিচার। সাহাবী পালালে বলা হয়, আল্লাহর পরীক্ষা। সাধারণ সৈনিক পালালে বলা হয় কাপুরুষতা। সাহাবী নবীর সিদ্ধান্তে আপত্তি করলে বলা হয় ইজতিহাদ। সাধারণ মানুষ আপত্তি করলে বলা হয় বিদ্রোহ। সাহাবী নারীর ওপর নজরদারি করলে বলা হয় পবিত্রতার আকাঙ্ক্ষা। সাধারণ মানুষ করলে বলা হয় হয়রানি। হুনাইনের ঘটনা এই দ্বৈতনীতির মুখোশ খুলে দেয়, কারণ এখানে পবিত্র প্রজন্মের লোকেরাও সাধারণ মানুষের মতোই যুদ্ধক্ষেত্রে আতঙ্কিত হয়েছে।

এই অংশে উমরকে একমাত্র দোষী বানানোর দরকার নেই; বরং পুরো সাহাবী-নির্মলতার কাঠামোকেই প্রশ্ন করা দরকার। উমর ছিলেন সেই প্রজন্মের অন্যতম প্রধান চরিত্র। যদি সেই প্রজন্মের যুদ্ধক্ষেত্রেও পলায়ন, বিশৃঙ্খলা ও ভয় দেখা যায়, তাহলে তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, যৌন ও আইনগত সিদ্ধান্তগুলোও সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। যারা যুদ্ধক্ষেত্রে ভয় পেয়েছে, তারা ক্ষমতার লোভ থেকেও মুক্ত নয়। যারা পলায়ন করতে পারে, তারা ভুল আইনও করতে পারে। যারা মানুষ, তাদের মানুষ হিসেবেই বিচার করতে হবে। সাহাবী পরিচয় কোনো ঐশ্বরিক সিলমোহর নয়।

হুনাইনের ঘটনা উমরের আগের আলোচনাগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে ধারাবাহিকতা আরও পরিষ্কার হয়। রোজার রাতে তিনি কার্যকর বিধান ভাঙেন। মুতআ ও তামাত্তুতে নবী-যুগের প্রথা তার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। আউলে কোরআনের গাণিতিক সমস্যা মানবীয় পদ্ধতিতে মেরামত হয়। উম্মু ওয়ালাদে নবী-যুগের দাসবাজারের ওপর উমর সীমিত সংশোধন আনেন। স্ত্রী প্রহারে নারীর ওপর পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের পক্ষে তার আপত্তি কাজ করে। কাগজ-কলমে নবীর শেষ সম্ভাব্য নির্দেশ থেমে যায়। আর হুনাইনে দেখা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি সেই সাধারণ মানবিক দুর্বলতার জগতেরই অংশ। এই সব মিলিয়ে উমরকে পবিত্র প্রতিমা নয়, ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী, ভুলকারী, পিতৃতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক মানুষ হিসেবে দেখা বাধ্যতামূলক।

অতএব হুনাইনের যুদ্ধ সাহাবীদের বিরুদ্ধে অশ্রদ্ধা নয়; এটি উৎসসম্মত বাস্তবতা। কোরআন নিজেই পিছু হটার কথা বলেছে। হাদিস নিজেই যুদ্ধক্ষেত্রের বিশৃঙ্খলা দেখিয়েছে। উমর সেই ইতিহাসের বাইরে নন। ফলে যারা সাহাবীদের সব সমালোচনা বন্ধ করতে চায়, তারা আসলে ইসলামের নিজস্ব উৎসের সঙ্গেই অসৎ আচরণ করে। উৎস যখন দুর্বলতা দেখায়, তারা মহিমা বানায়। উৎস যখন পলায়ন দেখায়, তারা বীরত্ব বানায়। উৎস যখন মানবিক ভয় দেখায়, তারা অতিমানবীয় ফজিলত বানায়। সমালোচনামূলক পাঠ এই ধর্মীয় মেকআপ মুছে দেয়।

সুতরাং হুনাইনের ঘটনা এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় যুক্তিকে আরও শক্ত করে: উমর ও সাহাবীরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তারা নবীর চারপাশের বাস্তব রাজনৈতিক-সামরিক মানুষ ছিলেন, দেবদূত নন। তারা ভয় পেয়েছেন, পিছু হটেছেন, আইন বদলেছেন, নারীদের নিয়ন্ত্রণ করেছেন, নবীর সিদ্ধান্তে বাধা দিয়েছেন, এবং নিজেদের সময়ের সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোকে ধর্মীয় ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হুনাইন সেই পবিত্রতার মিথের সামরিক মুখোশ খুলে দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রেই দেখা যায়, সাহাবী-নির্মলতার দাবি ইতিহাস নয়; এটি পরবর্তী ধর্মীয় প্রচারণা।


তারাবিহ জামাত: বিদআত যখন খলিফার হাতে বৈধতা পায়

ইসলামী ধর্মতত্ত্বে “বিদআত” শব্দটি অত্যন্ত শক্তিশালী নিন্দাবাচক শব্দ। নবীর পরে ধর্মীয় বিষয়ে নতুন কিছু চালু করা, ইবাদতের রূপ পাল্টানো, বা নবী-যুগে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না এমন কোনো প্রথাকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া, এসবকে সাধারণত বিদআত বলে আক্রমণ করা হয়। বহু হাদিসে বিদআতকে পথভ্রষ্টতা বলা হয়েছে, বিদআতীকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে, এবং মুসলিম সমাজে “বিদআত” অভিযোগ ব্যবহার করে অসংখ্য প্রথা, মত, দল ও মানুষকে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তারাবিহ জামাতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেই বিদআত-ভীতি ক্ষমতাবান খলিফার হাতে এসে নরম হয়ে যায়। উমর নিজেই একটি নতুন সংগঠিত জামাত ব্যবস্থা চালু করে বলেন, “এটি কতই না উত্তম বিদআত।” [62]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৪/ তারাবীহর সালাত
পরিচ্ছেদঃ ১২৫২. কিয়ামে রমযান-এর (রমযানে তারাবীহর সালাতের) ফযীলত
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১৮৮৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২০০৯ – ২০১০
১৮৮৩। ’আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় তারাবীহর সালাতে দাঁড়াবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। হাদীসের রাবী ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন এবং তারাবীহর ব্যাপারটি এ ভাবেই চালু ছিল। এমনকি আবূ বকর (রাঃ) এর খিলাফতকালে ও ’উমর (রাঃ) এর খিলাফতের প্রথম ভাগে এরূপই ছিল।
ইবনু শিহাব (রহঃ) ’উরওয়া ইবনু যুবায়র (রহঃ) সূত্রে ’আবদুর রাহমান ইবনু ’আবদ আল ক্বারী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রমযানের এক রাতে ’উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখতে পাই যে, লোকেরা বিক্ষিপ্ত জামায়াতে বিভক্ত। কেউ একাকী সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করছে আবার কোন ব্যাক্তি সালাত আদায় করছে এবং তার ইকতেদা করে একদল লোক সালাত আদায় করছে। ’উমর (রাঃ) বললেন, আমি মনে করি যে, এই লোকদের যদি আমি একজন ক্বারীর (ইমামের) পিছনে একত্রিত করে দেই, তবে তা উত্তম হবে।
এরপর তিনি উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) এর পিছনে সকলকে একত্রিত করে দিলেন। পরে আর এক রাতে আমি তাঁর [’উমর (রাঃ)] সঙ্গে বের হই। তখন লোকেরা তাদের ইমামের সাথে সালাত আদায় করছিল। ’উমর (রাঃ) বললেন, কত না সুন্দর এই নতুন ব্যবস্থা!
তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাক তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় কর, এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন, কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা সালাত আদায় করত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এখানেই তারাবিহ-জামাত প্রসঙ্গে ইসলামী বিদআততত্ত্বের দ্বৈতনীতি প্রকাশ পায়। নবীর ভাষায় দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত বিষয় নিকৃষ্ট, প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা, আর দ্বীনে এমন কিছু প্রবর্তন যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। কিন্তু উমর যখন নবী-পরবর্তী একটি সংগঠিত জামাতরূপ প্রতিষ্ঠা করে নিজেই সেটিকে “উত্তম বিদআত” বলেন, তখন সেই বিদআত আর ভ্রষ্টতা থাকে না; হয়ে যায় খলিফা-সমর্থিত ধর্মীয় প্রথা। অর্থাৎ বিদআত নিন্দিত কি না, তা কাজের প্রকৃতি দিয়ে নয়; কাজটি কার হাতে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা দিয়েই বাস্তবে নির্ধারিত হয়। হাদিসের বর্ণনায় নবী নতুন উদ্ভাবিত ধর্মীয় বিষয়কে সরাসরি নিকৃষ্ট বিষয় বলেছেন এবং প্রত্যেক বিদআতকে ভ্রষ্টতা বলেছেন [63]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৯৬/ কুরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে ধরে থাকা
পরিচ্ছেদঃ ৯৬/২. রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর সুন্নাতের অনুসরণ।
৭২৭৭. ’আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ও’য়াদা দেয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না’’- (সূরাহ আন’আম ৬/১৩৪)।[1] [৬০৯৮] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৬৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৮১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)

ঘটনাটি সাধারণভাবে এমন: রমজানের রাতে মানুষ মসজিদে আলাদা আলাদা বা ছোট ছোট দলে নামাজ পড়ছিল। উমর তা দেখে সবাইকে এক ইমামের পেছনে একত্র করলেন। পরে তিনি এই সংগঠিত রূপ দেখে সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “কত উত্তম বিদআত।” এই বাক্যটি ইসলামি আইনতত্ত্বের জন্য অস্বস্তিকর, কারণ এখানে বিদআত শব্দটি গালাগাল নয়, প্রশংসাসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ উমর স্বীকার করছেন, তিনি এমন একটি রূপ প্রতিষ্ঠা করেছেন যা আগের অবস্থার ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি নয়; এটি নতুন সংগঠন, নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, এবং নবী-পরবর্তী খলিফা-নির্মিত ইবাদতব্যবস্থা।

এই ঘটনায় ইসলামি প্রতিরক্ষা সাধারণত বলে, এটি প্রকৃত বিদআত নয়; কারণ নবী নিজেও কয়েক রাত জামাতে রমজানের রাতের নামাজ পড়িয়েছিলেন। পরে তিনি তা ছেড়ে দেন, কারণ ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। উমর শুধু সেই সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সমস্যাকে পুরোপুরি দূর করে না। কারণ নবী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়মিত জামাত বন্ধ রেখে থাকেন, তাহলে উমর সেটিকে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন কোন অধিকার বলে? নবী যে কাজ স্থায়ী করেননি, উমর সেটিকে স্থায়ী সামাজিক রীতিতে পরিণত করলেন। এটিকে শুধু “পুনরুজ্জীবন” বলা হলো ভাষাগত পালিশ; বাস্তবে এটি নবী-পরবর্তী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানায়ন।

নবীর কয়েক রাতের আমল আর উমরের স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এক জিনিস নয়। একজন নবী সাময়িকভাবে কিছু করলেন, পরে তা বন্ধ করলেন; অন্যদিকে খলিফা এসে পুরো সমাজকে এক ইমামের পেছনে জড়ো করে নতুন নিয়মিত রূপ দিলেন। ইসলামী ফিকহে ইবাদতের রূপ, সংখ্যা, পদ্ধতি, সময়, সংগঠন—এসবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে প্রশ্ন হলো, ইবাদতের এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরকে বিদআত বলা হবে না কেন? যদি সাধারণ কেউ নবী-পরবর্তী কোনো ইবাদতকে এভাবে সংগঠিত করত, তাকে কি “সুন্নাহ পুনরুজ্জীবনকারী” বলা হতো, নাকি বিদআতী বলা হতো?

উমরের নিজের ভাষাই এখানে সবচেয়ে বড় দলিল। তিনি বলেননি, “এটি নবীর সুন্নাহ।” তিনি বলেননি, “আমি শুধু পুরোনো বিধান চালু করলাম।” তিনি বলেছেন, “এটি উত্তম বিদআত।” এই শব্দচয়ন অপ্রয়োজনীয় নয়। এটি দেখায়, তিনি নিজেই বুঝেছিলেন যে তিনি একটি নতুন সংগঠিত রূপ তৈরি করছেন। কিন্তু যেহেতু তিনি উমর, যেহেতু তিনি খলিফা, যেহেতু ক্ষমতা তার হাতে, তাই এই নতুন রূপ পাপী বিদআত নয়; হয়ে গেল উত্তম বিদআত। এখানেই বিদআততত্ত্বের রাজনৈতিক চরিত্র প্রকাশ পায়। বিদআত ভালো না মন্দ, তা কাজের প্রকৃতি দিয়ে নয়; কাজটি কার হাতে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামী বিদআত-বিরোধিতার ভেতরে দ্বৈততা স্পষ্ট। সাধারণ মানুষ নতুন কিছু করলে সেটি বিভ্রান্তি। দরবার-বহির্ভূত দল নতুন আচার করলে সেটি পথভ্রষ্টতা। অন্য মাজহাব বা অন্য সম্প্রদায় নতুন ব্যাখ্যা আনলে সেটি গোমরাহি। কিন্তু উমর করলে সেটি “উত্তম বিদআত।” এই ভাষা ধর্মীয় নীতি নয়; এটি ক্ষমতার নীতি। যে ক্ষমতাবান, তার নবপ্রবর্তন শরিয়তের অংশ হতে পারে। যে ক্ষমতার বাইরে, তার নবপ্রবর্তন বিদআত ও পথভ্রষ্টতা।

তারাবিহ জামাত তাই কেবল একটি নামাজের সংগঠন নয়; এটি নবী-পরবর্তী ধর্মীয় কর্তৃত্বের পরীক্ষা। নবী বেঁচে থাকাকালে যে রূপ স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, উমর সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক করলেন। পরবর্তী মুসলিম সমাজ সেটিকে গ্রহণ করল। আজ বহু মুসলমান তারাবিহ জামাতকে রমজানের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় চিহ্ন মনে করে। অথচ এর সংগঠিত রূপের পেছনে আছে উমরের রাজনৈতিক-ধর্মীয় সিদ্ধান্ত। এই বাস্তবতা দেখায়, মুসলিম ইবাদত-প্রথার অনেক অংশই কেবল নবী-যুগের সরাসরি প্রতিলিপি নয়; বরং পরবর্তী ক্ষমতার দ্বারা সংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং পবিত্র করা প্রথা।

এখানে আরও একটি গভীর প্রশ্ন আছে। যদি বিদআতের মধ্যে ভালো বিদআত থাকতে পারে, তাহলে “প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা” ধরনের কঠোর হাদিস-ভাষ্য কীভাবে বোঝা হবে? আর যদি প্রত্যেক বিদআত সত্যিই পথভ্রষ্টতা হয়, তাহলে উমরের “উত্তম বিদআত” কীভাবে বৈধ? ইসলামি ব্যাখ্যাকারীরা সাধারণত বিদআতকে ভাষাগত ও শরিয়তগত অর্থে ভাগ করে এই সমস্যা সামলাতে চান। বলা হয়, উমর ভাষাগত অর্থে বিদআত বলেছেন, শরিয়তগত অর্থে নয়। কিন্তু এই ভাগ নিজেই পরবর্তী ব্যাখ্যাগত মেরামত। সাধারণ মুসলমানের প্রথাকে আক্রমণ করতে গেলে এই সূক্ষ্মতা প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়, আর উমরের ক্ষেত্রে তা জরুরি হয়ে ওঠে।

এই দ্বৈততা বিশেষভাবে দেখা যায় সালাফি-ধারার বিদআত-বিরোধী বক্তৃতায়। তারা মিলাদ, জিকিরের নির্দিষ্ট রূপ, সমষ্টিগত দোয়া, কবর-সংক্রান্ত আচার, নানা স্থানীয় ধর্মীয় প্রথাকে বিদআত বলে নিন্দা করে। কিন্তু তারাবিহ জামাতের ক্ষেত্রে উমরের “উত্তম বিদআত”কে গ্রহণ করে। অর্থাৎ নীতিটি সার্বজনীন নয়। নিজেদের ঐতিহ্যের বিদআত সুন্নাহর অংশ, অন্যদের ঐতিহ্যের বিদআত পথভ্রষ্টতা। এই নীতিকে যুক্তি বলা যায় না; এটি দলীয় ধর্মীয় রাজনীতি।

উমরের তারাবিহ সিদ্ধান্ত আগের আলোচনাগুলোর সঙ্গে একই প্যাটার্নে যুক্ত। মুতআতে নবী-যুগের প্রথা বন্ধ করা হলো। তামাত্তুতে নবী-আমল থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক অপছন্দ কাজ করল। আউলে কোরআনের গাণিতিক সমস্যায় মানবীয় পদ্ধতি বসানো হলো। উম্মু ওয়ালাদে নবী-যুগের দাসবাজার সীমিত করা হলো। বয়স্ক দুধপানে নবীর অদ্ভুত হুকুম পরবর্তী কর্তৃত্বে সংকুচিত হলো। আর তারাবিহে নবী-পরবর্তী একটি সংগঠিত ইবাদতরূপ খলিফার হাতে প্রতিষ্ঠা পেল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ইসলামি আইন ও আচার কেবল ওহী-নির্ভর নয়; তা ক্ষমতাধর মানুষের সিদ্ধান্তে রূপ বদলেছে।

তারাবিহের ক্ষেত্রে উমরের সিদ্ধান্তকে কেউ ইতিবাচক বলতেই পারে। কেউ বলতে পারে, এতে মুসলমানরা একত্রিত হয়েছে, ইবাদতে শৃঙ্খলা এসেছে, সমাজে ঐক্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটি এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, যদি একটি নতুন সংগঠিত ইবাদতরূপ ভালো ফল দেয় বলে বৈধ হয়, তাহলে ইসলামে বিদআত-বিরোধিতার নীতি এত কঠোর কেন? যদি সামাজিক মঙ্গল, শৃঙ্খলা ও ঐক্যকে ভিত্তি করে নতুন রূপ গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে অন্য অনেক প্রথাকেও সেই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। কিন্তু ধর্মীয় বাস্তবে তা হয় না। উমরের নতুনত্ব গ্রহণযোগ্য, অন্যের নতুনত্ব সন্দেহজনক।

এই ঘটনায় উমরকে নিন্দা করার চেয়েও বড় কথা হলো ইসলামী আইন-আচার গঠনের বাস্তবতা বোঝা। মুসলমানরা আজ যে তারাবিহ জামাতকে প্রায় স্বতঃসিদ্ধ রমজানি প্রথা হিসেবে জানে, সেটি নবী-পরবর্তী রাজনৈতিক-ধর্মীয় সংগঠনের ফল। নবী নিজে নিয়মিতভাবে এটিকে স্থায়ী জামাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। উমর সেটি করলেন। পরবর্তী সমাজ তা গ্রহণ করল। তারপর ধর্মতত্ত্ব সেটিকে সুন্নাহর ধারায় বসিয়ে দিল। এই প্রক্রিয়া দেখায়, “শরিয়ত” আসলে বহু ক্ষেত্রে পরবর্তী ঐতিহাসিক নির্মাণ, যেখানে নবী, খলিফা, ফকিহ, সমাজ ও ক্ষমতা একত্রে কাজ করেছে।

এখানে একটি কঠোর প্রশ্ন তোলা যায়: যদি উমর বিদআত করতে পারেন এবং সেটি ভালো বিদআত হতে পারে, তাহলে বিদআতের দরজা কে বন্ধ করল? কোরআন? নবী? নাকি পরবর্তী আলেমসমাজ, নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী? যদি বিদআতকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলা হয়, তাহলে উমরের তারাবিহ প্রশ্নবিদ্ধ। যদি ভালো বিদআত মানা হয়, তাহলে বিদআত-বিরোধী কঠোর প্রচারণা ভেঙে যায়। ইসলামি ঐতিহ্য এই দ্বন্দ্বকে ভাষাগত ব্যাখ্যা দিয়ে সামলাতে চায়, কিন্তু মূল বাস্তবতা থাকে: ক্ষমতাবান খলিফার হাতে নতুন ধর্মীয় রূপ বৈধতা পেয়েছে।

তারাবিহ জামাত প্রসঙ্গ তাই উমর-সমালোচনার মধ্যে আলাদা গুরুত্ব রাখে। এখানে তিনি কোনো নিষিদ্ধ কাজ ভাঙছেন না, কোনো নারীকে লজ্জিত করছেন না, কোনো দাসী-আইন বদলাচ্ছেন না, কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের পলায়নের দৃশ্যে নেই। এখানে তিনি ধর্মীয় আচার নির্মাণ করছেন। এই নির্মাণই দেখায়, উমর শুধু আইন সংশোধনকারী বা প্রশাসনিক শাসক নন; তিনি মুসলিম ইবাদত সংস্কৃতিরও নির্মাতা। তার সিদ্ধান্ত পরে শরিয়ত-সমাজের অংশ হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের বাস্তব রূপ তৈরিতে উমরের ভূমিকা এতটাই বড় যে নবী-যুগ বনাম খলিফা-যুগের সীমা বহু ক্ষেত্রে অস্পষ্ট হয়ে যায়।

এই ঘটনায় “সুন্নাহ” ধারণাও জটিল হয়ে যায়। যদি সুন্নাহ মানে নবীর নিয়মিত প্রতিষ্ঠিত প্রথা হয়, তাহলে উমরের তারাবিহ-জামাত সরাসরি সেই অর্থে নবী-সুন্নাহ নয়। যদি সুন্নাহ মানে খোলাফায়ে রাশেদীনের পথও হয়, তাহলে স্বীকার করতে হবে নবী-পরবর্তী খলিফার নতুন সংগঠিত রূপও শরিয়তের উৎসে ঢুকে গেছে। তখন ইসলামি আইন আর শুধু আল্লাহ ও রাসূলের নয়; খলিফার সিদ্ধান্তও ধর্মীয় মাপকাঠি। এই স্বীকারোক্তি এই প্রবন্ধের মূল যুক্তিকে আরও শক্ত করে: ইসলামের আইন ও আচার আকাশ থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় নামেনি; তা ক্ষমতার হাতে গঠিত হয়েছে।

অতএব তারাবিহ জামাতের ঘটনা উমরের বিরুদ্ধে সরল অপরাধের অভিযোগ নয়; এটি ইসলামের বিদআততত্ত্ব ও কর্তৃত্বতত্ত্বের বিরুদ্ধে গভীর প্রশ্ন। এখানে দেখা যায়, নতুন ধর্মীয় সংগঠন যদি ক্ষমতাবান খলিফা প্রতিষ্ঠা করেন, তা “উত্তম বিদআত” হতে পারে। কিন্তু একই নীতি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। ফলে বিদআত-বিরোধিতা আসলে নীতিগত বিশুদ্ধতা নয়; এটি ধর্মীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ভাষা। কে নতুন কিছু করার অধিকার রাখে? কার নতুন প্রথা বৈধ হবে? কারটা পথভ্রষ্টতা? তারাবিহর ঘটনায় উত্তর পরিষ্কার: ক্ষমতার কাছে বিদআতও পবিত্র হতে পারে।

সুতরাং উমরের “উত্তম বিদআত” ইসলামী ইতিহাসের একটি ছোট শব্দ নয়; এটি একটি বড় স্বীকারোক্তি। এটি বলে, নবী-পরবর্তী রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ধর্মীয় আচারকে নতুন রূপ দিতে পারে। এটি বলে, বিদআত শব্দটি নীতিগতভাবে যত কঠোরই হোক, বাস্তবে ক্ষমতার হাতে নমনীয়। এটি বলে, মুসলিম সমাজের প্রচলিত ইবাদতরূপের কিছু অংশ ইতিহাসে নির্মিত, ওহীতে প্রস্তুত নয়। আর এই কারণেই তারাবিহ জামাতের ঘটনা উমরের ভূমিকা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ: তিনি শুধু ইসলামের অনুসারী নন; তিনি ইসলামের পরবর্তী বাস্তব রূপ নির্মাণকারী ক্ষমতার মুখ।


উপসংহার: সাহাবী-পূজার আড়ালে ক্ষমতা, দ্বৈতনীতি ও ইতিহাস-দমন

উমর ইবনুল খাত্তাবকে নিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় বয়ান সাধারণত একমুখী। সেখানে তিনি ন্যায়পরায়ণ, দূরদর্শী, কঠোর কিন্তু সত্যনিষ্ঠ, ইসলামের শক্তিশালী রক্ষক, খোলাফায়ে রাশেদীনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই বয়ানে উমরের আপত্তি ফজিলত, তার চাপ হিকমত, তার আইনগত পরিবর্তন ইজতিহাদ, তার পিতৃতান্ত্রিক নজরদারি পবিত্রতা, তার নতুন প্রথা উত্তম বিদআত, আর নবীর সঙ্গে তার সংঘাতও শেষ পর্যন্ত মহিমা। কিন্তু ইসলামি উৎসগুলোকে ভক্তির চশমা খুলে পড়লে দেখা যায়, এই মহিমান্বিত ছবির নিচে আছে ক্ষমতা, দ্বৈতনীতি, আইনগত অস্থিরতা, নারী-নিয়ন্ত্রণ, দাসপ্রথা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং নবী-আনুগত্যের ঘোষিত নীতির সঙ্গে বারবার সংঘাত।

এই প্রবন্ধে আলোচিত ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। রমজানের রাতে কার্যকর বিধান ভঙ্গের পর বিধান শিথিল হওয়া, মুতআ বিবাহে নবী-যুগের প্রচলিত প্রথা উমরের নিষেধাজ্ঞায় থেমে যাওয়া, হজ্জে তামাত্তুর ক্ষেত্রে রাসূলের আমল থাকা সত্ত্বেও উমরের অপছন্দ কাজ করা, কোরআনের উত্তরাধিকার-গণিত আউলের মানবীয় প্যাচ ছাড়া না চলা, উম্মু ওয়ালাদ বিক্রির নবী-যুগীয় বাস্তবতা পরে উমরের হাতে সীমিত হওয়া, বয়স্ক লোকের দুধপানের নবী-হুকুম পরবর্তী কর্তৃত্বে সংকুচিত হওয়া, স্ত্রী প্রহারে উমরের আপত্তির পর নবীর নিষেধ শিথিল হওয়া, কাগজ-কলম ঘটনায় নবীর শেষ সম্ভাব্য লিখিত নির্দেশ থেমে যাওয়া, নবীর দেওয়া উপনাম বদলে যাওয়া, হাজরে আসওয়াদের ক্ষেত্রে অর্ধেক-যুক্তিবাদ, সাওদার ওপর দেহ-নজরদারি, হুনাইনে সাহাবী-পলায়ন, এবং তারাবিহ জামাতে “উত্তম বিদআত”—সবগুলো একই গভীর প্যাটার্নের অংশ।

প্যাটার্নটি হলো: ইসলামের কথিত চূড়ান্ত আইন বাস্তবে স্থির ছিল না। তা ক্ষমতাবান পুরুষদের সিদ্ধান্ত, সামাজিক চাপ, যৌন-রাজনীতি, যুদ্ধ-পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সুবিধা, দাসমালিক সমাজের বাস্তবতা এবং পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বারবার রূপ বদলেছে। উমর এই রূপবদলের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর একজন। তিনি শুধু নবীর অনুসারী নন; তিনি নবী-পরবর্তী ইসলামের বাস্তব আইন, আচার, নীতি ও ক্ষমতা-কাঠামোর নির্মাতা। তার ভূমিকা যতই ফজিলতের ভাষায় সাজানো হোক, তার সিদ্ধান্তগুলো বহু ক্ষেত্রে নবী-যুগের প্রথা, কোরআনিক দাবি, সুন্নাহর কর্তৃত্ব এবং নারীর মানবিক মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দ্বৈতনীতি। সাধারণ মুসলমানের জন্য রাসূলের আনুগত্য বাধ্যতামূলক; উমরের জন্য নবীর নির্দেশের সামনে আপত্তি ইজতিহাদ। সাধারণ মুসলমান কোরআন যথেষ্ট বললে সুন্নাহ-বিরোধী; উমর মৃত্যুশয্যায় নবীর লেখনী ঠেকাতে একই যুক্তি দিলে দূরদর্শী। সাধারণ কেউ নবী-যুগের বৈধ প্রথা নিষিদ্ধ করলে বিদআতী; উমর করলে শরিয়তের মঙ্গলরক্ষক। সাধারণ কেউ নতুন ধর্মীয় আচার প্রতিষ্ঠা করলে বিদআত; উমর করলে উত্তম বিদআত। সাধারণ পুরুষ নারীর চলাচল ও শরীর নিয়ে লজ্জা দিলে হয়রানি; উমর করলে পর্দা-ফজিলত। এই দ্বৈতনীতি নৈতিকতা নয়। এটি ক্ষমতাবান ধর্মীয় চরিত্রকে রক্ষার জন্য বানানো ভাষাগত কৌশল।

সাহাবী-আদালত ধারণা এই দ্বৈতনীতিকে ধর্মীয় লাইসেন্স দেয়। বলা হয়, সাহাবীদের ভুল নিয়ে কথা বলো না, তাদের অন্তর নিয়ে সন্দেহ করো না, তাদের দোষ গোপন করো। কিন্তু সত্য গোপন করার ধর্মীয় নির্দেশ কোনো নৈতিকতা নয়; এটি ইতিহাসের বিরুদ্ধে সেন্সরশিপ। যে মানুষ আইন বদলায়, নারীকে নিয়ন্ত্রণ করে, দাসপ্রথার ওপর সিদ্ধান্ত দেয়, যুদ্ধ করে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে, নবীর সিদ্ধান্তে আপত্তি করে, তার সমালোচনা বন্ধ করা মানে ইতিহাসকে ইমানি প্রচারণায় পরিণত করা। সাহাবী যদি মানুষ হন, তাহলে তারা সমালোচনাযোগ্য। আর যদি তারা সমালোচনার ঊর্ধ্বে হন, তাহলে ইতিহাসের আদালত বন্ধ হয়ে যায়।

উমরের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি বিশেষভাবে তীব্র, কারণ তার প্রভাব ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক। তিনি কেবল ভুল করেছেন কি না, সেটিই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, তার ভুল, মত, আপত্তি, অস্বস্তি ও সিদ্ধান্ত কীভাবে পরবর্তী ইসলামী আইন ও ধর্মতত্ত্বের অংশ হয়ে গেল। তার পর্দা-আকাঙ্ক্ষা নারীর ওপর বিধান হলো। তার মুতআ ও তামাত্তু-নিষেধ শরিয়তের অংশ হলো। তার আউল পদ্ধতি কোরআনিক উত্তরাধিকার আইনের গাণিতিক মেরামত হলো। তার উম্মু ওয়ালাদ-সংক্রান্ত নিষেধ নবী-যুগের দাসবাজারের ওপর পরবর্তী সংশোধন হলো। তার তারাবিহ-সংগঠন মুসলিম রমজান সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় অংশ হলো। অর্থাৎ উমর ইসলামের বাইরে দাঁড়ানো ব্যক্তি নন; তিনি ইসলামের পরবর্তী বাস্তব রূপ নির্মাণকারী ক্ষমতার মুখ।

এই বাস্তবতা ইসলামের “পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত” দাবিকে গভীরভাবে দুর্বল করে। যদি শরিয়ত পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত হয়, তাহলে এত মানবীয় প্যাচ কেন? যদি কোরআন নিখুঁত আইনগ্রন্থ হয়, তাহলে উত্তরাধিকার ভাগে আউল কেন? যদি নবীর সুন্নাহ চূড়ান্ত হয়, তাহলে মুতআ, তামাত্তু, উম্মু ওয়ালাদ, বয়স্ক দুধপান, তারাবিহ—এসব ক্ষেত্রে নবী-যুগ ও উমর-যুগের পার্থক্য কেন? যদি আল্লাহর বিধান সর্বজ্ঞ পরিকল্পনা হয়, তাহলে রোজার রাতের বিধান মানুষের অক্ষমতার সামনে বদলালো কেন? যদি নারীর মর্যাদা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে থাকে, তাহলে পর্দা, স্ত্রী প্রহার, দাসী যৌনতা ও সাওদার অপমানের মতো ঘটনাগুলো কীভাবে সেই মর্যাদার সঙ্গে মেলে?

ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারীরা এসব প্রশ্নের জবাবে নানা শব্দ ব্যবহার করেন: নাসিখ-মানসুখ, রুখসত, ইজতিহাদ, মাকাসিদ, তাদরিজ, হিকমত, মুওয়াফাকাত, উত্তম বিদআত, বিশেষ ঘটনা, প্রসঙ্গ, ভাষাগত অর্থ, প্রশাসনিক নিষেধ। কিন্তু এই শব্দগুলো প্রায়ই ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি ঢাকনা হিসেবে কাজ করে। যেখানে নবী-যুগের আইন অস্বস্তিকর, বলা হয় ধাপে ধাপে পরিবর্তন। যেখানে উমর নবী-যুগের প্রথা বদলান, বলা হয় মঙ্গল। যেখানে কোরআনের ভাগ মেলে না, বলা হয় ফিকহি সমাধান। যেখানে নারীর ওপর সহিংসতার অনুমতি থাকে, বলা হয় হালকা প্রহার। যেখানে পাথরচুম্বন থাকে, বলা হয় সুন্নাহ। ভাষা পাল্টায়, কিন্তু সমস্যাগুলো থেকে যায়।

আসলে আদি ইসলামের ইতিহাস কোনো দেবদূতীয় নৈতিকতার ইতিহাস নয়। এটি সপ্তম শতকের আরব সমাজ, গোত্ররাজনীতি, পুরুষতন্ত্র, যুদ্ধ, দাসপ্রথা, যৌন-আইন, সম্পদ-বণ্টন, নেতৃত্ব-সংকট এবং ক্ষমতার ইতিহাস। কোরআন ও হাদিস সেই ইতিহাসের ভেতরে তৈরি, ব্যবহৃত, ব্যাখ্যাত ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে। উমর সেই ইতিহাসের শক্তিশালী অভিনেতা। তাকে পবিত্র প্রতিমায় পরিণত করলে এই মানবীয় ইতিহাস অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু উৎসগুলো একত্রে রাখলেই দেখা যায়, ইসলামি আইন আকাশ থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে নামেনি; তা বাস্তব ক্ষমতা ও সামাজিক দরকষাকষির ভেতরে গড়ে উঠেছে।

উমরকে নিয়ে সমালোচনার উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়। উদ্দেশ্য হলো ইসলামী ইতিহাসের দাবিগুলোকে ইসলামের নিজের উৎসের সামনে দাঁড় করানো। যদি ইসলাম বলে রাসূলের আনুগত্য ফরজ, তাহলে উমরের কাগজ-কলম বাধা বিচারযোগ্য। যদি ইসলাম বলে নবীর আমল অনুসরণীয়, তাহলে তামাত্তু ও মুতআতে উমরের নিষেধ বিচারযোগ্য। যদি ইসলাম বলে নারীকে সম্মান দিয়েছে, তাহলে সাওদাকে লজ্জিত করা, স্ত্রী প্রহার বৈধ করা, দাসী-মালিকের যৌন অধিকার, উম্মু ওয়ালাদের বিক্রয়যোগ্যতা বিচারযোগ্য। যদি ইসলাম বলে বিদআত পথভ্রষ্টতা, তাহলে উমরের উত্তম বিদআত বিচারযোগ্য। একই মানদণ্ড সবার জন্য প্রয়োগ করলেই পবিত্রতার কৃত্রিম আবরণ খুলে যায়।

এই প্রবন্ধ তাই উমরকে “খারাপ মানুষ” প্রমাণ করার সরল প্রচেষ্টা নয়। বরং এটি দেখায়, ইসলামের প্রথম যুগের চরিত্রদের দেবত্বময় নৈতিকতার বদলে বাস্তব রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পড়তে হবে। উমর ছিলেন ক্ষমতাবান পুরুষ, শাসক, আইন-প্রভাবক, সামাজিক নিয়ন্ত্রক, নবী-পরবর্তী ইসলামের নির্মাতা। তার কিছু সিদ্ধান্ত আধুনিক চোখে নবী-যুগের চেয়ে কম নোংরা মনে হতে পারে, যেমন উম্মু ওয়ালাদ বিক্রি বন্ধ করা। আবার কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ্য পিতৃতান্ত্রিক, যেমন স্ত্রী প্রহার ও পর্দা-চাপ। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই মূল সত্য একই: শরিয়ত স্থির, নিখুঁত, অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক ব্যবস্থা ছিল না। তা মানুষের হাতে বদলেছে।

এই সত্য স্বীকার করলে ইসলামের প্রচলিত পবিত্র ইতিহাস আর আগের মতো থাকে না। তখন দেখা যায়, আল্লাহর আইন বহুবার মানুষের আচরণের পরে বদলেছে। নবীর সিদ্ধান্ত বহুবার উমরের আপত্তির সামনে প্রশ্নে পড়েছে। নারীর দেহ পুরুষের আইনগত আলোচনার বস্তু হয়েছে। দাসী নারী মা হয়েও সম্পত্তি থেকেছে। পাথরকে অক্ষম বলা হয়েছে, আবার সেই পাথরকে চুম্বন ও পরকালীন সাক্ষ্যক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সাহাবীরা পিছু হটেছে, তবু তাদের পবিত্রতার মিথ রক্ষা করা হয়েছে। বিদআত নিন্দিত হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতাবান খলিফার বিদআত পবিত্র হয়েছে। এই সব মিলিয়ে ইসলামের প্রথম যুগকে নৈতিক আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার ইতিহাস হিসেবে পড়াই বেশি সৎ।

সুতরাং উমর-সমালোচনা আসলে সাহাবী-পূজার বিরুদ্ধে ইতিহাসচর্চার দাবি। এটি বলে, কোনো ব্যক্তি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কোনো পরিচয় নৈতিক দায়মুক্তি দেয় না। কোনো ধর্মীয় উপাধি ইতিহাসকে বদলে দেয় না। “সাহাবী” শব্দটি মানুষের কাজের ওপর নৈতিক সিলমোহর নয়। যদি উমর নবীর নির্দেশ ঠেকান, সেটি ঠেকানোই। যদি তিনি নবী-যুগের প্রথা নিষিদ্ধ করেন, সেটি নিষেধাজ্ঞাই। যদি তিনি নারীর চলাচলে চাপ দেন, সেটি নজরদারিই। যদি তিনি নতুন ইবাদতরূপ চালু করেন, সেটি নবী-পরবর্তী ধর্মীয় নির্মাণই। ভক্তি শব্দ বদলাতে পারে, ইতিহাস বদলাতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু উমরকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটি ইসলামের সত্যদাবি নিয়ে। একটি ধর্ম যদি সত্য হয়, তাহলে তার ইতিহাসও সত্যের পরীক্ষায় দাঁড়াতে পারার কথা। কিন্তু যদি সেই ইতিহাস টিকিয়ে রাখতে সাহাবীদের দোষ গোপন করতে হয়, দ্বৈতনীতি ব্যবহার করতে হয়, নবীর সঙ্গে সংঘাতকে ফজিলত বানাতে হয়, নারীর ওপর সহিংসতাকে হালকা প্রহার বলতে হয়, দাসপ্রথাকে মানবিকতা বলতে হয়, এবং মানবীয় আইন-সংশোধনকে ঐশ্বরিক হিকমত বলতে হয়, তাহলে সমস্যা সমালোচকের নয়। সমস্যা সেই ধর্মতত্ত্বের, যা সত্যের বদলে পবিত্রতার নাটক রক্ষা করতে ব্যস্ত।

উমরকে তাই ইতিহাসের সাধারণ মানদণ্ডেই বিচার করতে হবে। তিনি ছিলেন প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান, কঠোর, রাজনৈতিকভাবে দক্ষ, কিন্তু একই সঙ্গে ভুলকারী, পিতৃতান্ত্রিক, নবী-সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপকারী এবং পরবর্তী শরিয়ত নির্মাণে সক্রিয় একজন মানুষ। তাকে পবিত্র প্রতিমা বানানো সত্যের প্রতি অবিচার। তাকে সমালোচনা করা বিদ্বেষ নয়; বরং ইতিহাসকে ধর্মীয় প্রচারণা থেকে উদ্ধার করার কাজ। আর এই উদ্ধারকাজ যতদিন না হবে, ততদিন সাহাবী-পূজা ইসলামের প্রথম যুগের বাস্তব ক্ষমতা, সহিংসতা, দ্বৈতনীতি ও মানবীয় বিশৃঙ্খলাকে ঢেকে রাখবে। সেই ঢাকনা সরানোই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন ৩৩ঃ৩৬ ↩︎
  2. কোরআন ১৬ঃ৪৪ ↩︎
  3. কোরআন ৫৯ঃ৭ ↩︎
  4. কোরআন ৪ঃ৮০ ↩︎
  5. কোরআন ৪৭ঃ৩৩ ↩︎
  6. কোরআন ৫ঃ৯২ ↩︎
  7. কোরআন ২৪ঃ৫৪ ↩︎
  8. কোরআন ৬৪ঃ১২ ↩︎
  9. কোরআন ৩ঃ৩১ ↩︎
  10. কোরআন ৭২ঃ২৩ ↩︎
  11. হাদীস সম্ভার, হাদিস নম্বরঃ ১৪৯৯ ↩︎
  12. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৯৩ ↩︎
  13. নসরুল বারী, শরহে সহিহ বুখারী, নবম খণ্ড, শিবলী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৯৩, ৯৪ ↩︎
  14. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪৩২ ↩︎
  15. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১২৮২ ↩︎
  16. সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৭ ↩︎
  17. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪ ↩︎
  18. তাফসীরে মাযহারী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২ ↩︎
  19. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১১১ ↩︎
  20. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮৫ ↩︎
  21. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮৬ ↩︎
  22. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮৭ ↩︎
  23. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৩০৭ ↩︎
  24. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৩০৬ ↩︎
  25. মুয়াত্তা মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১১৪১ ↩︎
  26. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৩২৮৩ ↩︎
  27. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৩২৮৪ ↩︎
  28. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস: ৩২৮৮ ↩︎
  29. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস: ৫১১৭ ↩︎
  30. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৯৪ ↩︎
  31. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫১১৯ ↩︎
  32. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩২৮০ ↩︎
  33. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৬২ ↩︎
  34. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৯৫৪ ↩︎
  35. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ২৫১৭ ↩︎
  36. বুলুগুল মারাম, হাদিসঃ ৭৯১ ↩︎
  37. সুনানু ইবনে মাজাহ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৩৫ ↩︎
  38. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৬৯ ↩︎
  39. সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০০ ↩︎
  40. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭০ ↩︎
  41. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭২ ↩︎
  42. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭৩ ↩︎
  43. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৪৩ ↩︎
  44. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৪২ ↩︎
  45. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৯০ ↩︎
  46. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৬৬ ↩︎
  47. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩২৬১ ↩︎
  48. সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৮৫ ↩︎
  49. সূরা মায়িদা, আয়াত ৩ ↩︎
  50. তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৪২৪ ↩︎
  51. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১১৫ ↩︎
  52. সহিহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২ ↩︎
  53. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৪১২৬ ↩︎
  54. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৪৫৮ ↩︎
  55. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭০ ↩︎
  56. সহজ দরসে ইবনে মাজাহ, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৬৮ ↩︎
  57. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৯৩৯ ↩︎
  58. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৮০৬ ↩︎
  59. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৮২ ↩︎
  60. সূরা তওবা, আয়াত ২৫ ↩︎
  61. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৩২২ ↩︎
  62. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৮৮৩, উমর রমজানের রাতে লোকদের বিচ্ছিন্নভাবে নামাজ পড়তে দেখে উবাই ইবনু কা‘বের পেছনে একত্র করেন; পরে বলেন, “নি‘মাতিল বিদআতু হাযিহি” বা “এটি কতই না উত্তম বিদআত” ↩︎
  63. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৭২৭৭ ↩︎