
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 মুহাম্মদের সর্বাত্মক জিহাদের আহ্বান এবং কিয়ামত পর্যন্ত কিতালের বিধান
- 3 আরবের বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তার এবং জিহাদের প্রকৃতি
- 4 অতর্কিত আক্রমণ এবং নারী-শিশুদের বন্দী করার বৈধতা
- 5 যুল খালাসাঃ একটি প্রাচীন তীর্থস্থান ধ্বংসের ইতিহাস
- 6 মূর্তিবিনাশ এবং জনপদ নির্মূলের সর্বাত্মক অভিযান
- 7 সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য বিলোপের এক চূড়ান্ত চিত্র
- 8 উপসংহার: ধর্মের নামে সামরিক আধিপত্যের ঐতিহাসিক রূপরেখা
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসের গতিধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, নবী মুহাম্মদের নবুয়ত পরবর্তী জীবনের দুই দশককে প্রধানত দুইটি স্বতন্ত্র তাত্ত্বিক ও কৌশলগত ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে, অর্থাৎ মক্কী জীবনে যখন তিনি রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল ছিলেন, তখন তার কর্মকাণ্ড ছিল মূলত ধর্ম প্রচার বা দাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু মদিনায় যাওয়ার সাথে সাথেই সে নানাভাবে আক্রমণাত্মক জিহাদের সূচনা করে এবং বিভিন্ন বাণিজ্য কাফেলা লুট করতে শুরু করে। একইসাথে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর যখন তার অস্ত্র এবং জনবল বৃদ্ধি পায়, তখন ইসলামের প্রসারের পদ্ধতিগত পরিবর্তন ঘটে এবং দাওয়াতের স্থান দখল করে নেয় ‘জিহাদ’ বা সশস্ত্র সংগ্রাম। এই পর্যায়ে মুহাম্মদের অনুসারীরা কেবল আত্মরক্ষার্থেই নয়, বরং বহুত্ববাদী ধর্মবিশ্বাসীদের উপাসনালয় ও মূর্তি ধ্বংস করতে এবং তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে বিভিন্ন আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনা শুরু করে। এর মূল ভিত্তি ছিল একটি বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা, যেখানে মুহাম্মদ দাবি করেন যে মানুষের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঐশ্বরিক আদেশ তাঁর ওপর রয়েছে, যতক্ষণ না তারা ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই’—এই সাক্ষ্য প্রদান করে ইসলামে প্রবেশ করে। একইসাথে যাদের সাথে মুহাম্মদের কোন পুর্ব শত্রুতা ছিল না, কোনদিন কোন সংঘর্ষও হয়নি, তাদেরও মুহাম্মদ হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠাতেন যে, ইসলাম কবুল না করলে আক্রমণ করা হবে। এই মতাদর্শিক অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, তৎকালীন আরবের বহু গোত্র বা জনপদের সাথে মুসলিমদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা পূর্ব উস্কানি না থাকলেও, স্রেফ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণেই তারা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় যারা ইসলাম গ্রহণ করত না, তাদের জান ও মাল নিরাপদ থাকত না, কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমান আনা বা আনুগত্য স্বীকার করাই ছিল প্রাণের নিরাপত্তা পাওয়ার একমাত্র শর্ত। এই পরিবর্তনটি কেবল কৌশলগত নয়, বরং একটি নীতিগত রূপান্তর—যেখানে বিশ্বাসের প্রচার থেকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বাস আরোপে রূপান্তর ঘটে। একইসাথে নবী হুকুম দিয়ে গেছেন, যেই ভারতের সাথে নবীর কোন পুর্ব শত্রুতা ছিল না, সেই ভারতে গাজওয়াতুল হিন্দের, যেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসলিমরা ভারত আক্রমণ করে কাফেরদের হত্যা করবে বলে নবী বলে গেছেন। পরবর্তী আলোচনাগুলোতে আমরা বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও সহিহ হাদিসের আলোকে এমন কিছু সামরিক অভিযানের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব, যা মূলত কোনো উস্কানি ছাড়াই শুধুমাত্র ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
মুহাম্মদের সর্বাত্মক জিহাদের আহ্বান এবং কিয়ামত পর্যন্ত কিতালের বিধান
নবী মুহাম্মদ কোনো প্রকার ধোঁয়াশা বা অস্পষ্টতা ছাড়াই অত্যন্ত দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বিশ্বব্যাপী সর্বাত্মক জিহাদের ডাক দিয়ে গেছেন। তার এই আহ্বান কেবল তৎকালীন আরবের জন্য সীমিত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বৈশ্বিক ও চিরস্থায়ী মূলনীতি। ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুহাম্মদ নিজেকে এমন এক মিশনে নিয়োজিত বলে ঘোষণা করেছিলেন, যেখানে অস্ত্রের ব্যবহার এবং মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে তলোয়ারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত ছিল। তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে ‘কিতাল’ বা সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন, যতক্ষণ না তারা ইসলাম কবুল করে এবং মুহাম্মদের নবুয়তকে মেনে নেয় [1]। এই ঘোষণায় কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা নির্দিষ্ট শত্রুতার শর্ত দেওয়া হয়নি; বরং ধর্মের ভিত্তিতে পুরো পৃথিবীকে ‘মুসলিম’ এবং ‘কাফের’—এই দুই ভাগে ভাগ করে যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে, ‘মানুষ’ (an-naas) শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট গোত্র বা আক্রমণকারী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়নি; বরং এটি একটি সাধারণ ও সর্বজনীন নির্দেশনার রূপে উপস্থাপিত হয়েছে, যা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে যুদ্ধের বৈধতাকে সার্বজনীন করে তোলে। আসুন কয়েকজন প্রখ্যাত আলেমের মুখ থেকে বিষয়টি জেনে নিই,
এই বিধানটির স্থায়িত্ব ও গুরুত্ব বোঝার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মুহাম্মদের মৃত্যুর পর প্রথম খলিফা আবু বকরের আমল। মুহাম্মদের ওফাতের পর যখন অনেক আরব গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে কিংবা জাকাত দিতে অস্বীকার করে, তখন খলিফা আবু বকর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সেই সময় উমর ইবনুল খাত্তাব যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে, আবু বকর মুহাম্মদের সেই আদি নির্দেশকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, মুহাম্মদের দেওয়া এই যুদ্ধের আদেশটি ‘মানসুখ’ বা রহিত হয়ে যায়নি [2]। যদি এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হতো, তবে আবু বকরের মতো ব্যক্তি নবীর মৃত্যুর পর এমন রক্তক্ষয়ী অভিযানে নামতেন না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট আরব গোত্রগুলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালায়নি; তাদের অপরাধ ছিল মূলত আনুগত্য ও কর প্রদানে অস্বীকৃতি। তবুও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো হয়, যা নির্দেশ করে যে ‘কিতাল’-এর প্রয়োগ কেবল আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
যেহেতু ইসলামের বিধান অনুযায়ী কোনো আয়াত বা হাদিস রহিত হওয়ার জন্য ঐশ্বরিক ওহী বা নবীর জীবদ্দশায় ঘোষণার প্রয়োজন হয়, এবং মুহাম্মদ যেহেতু শেষ নবী হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাই এই ‘কিতাল’-এর বিধানটি কিয়ামত বা শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় ও কার্যকর হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে গেছে। এটি কোনো সাময়িক কৌশল ছিল না, বরং ইসলামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আধিপত্য বজায় রাখার একটি স্থায়ী হাতিয়ার। এই দর্শনের আলোকেই পরবর্তী খলিফাগণ এবং মুসলিম সেনাপতিরা একের পর এক দেশ আক্রমণ করেছেন এবং মানুষের সামনে কেবল তিনটি বিকল্প রেখেছেন: ইসলাম গ্রহণ, দাসত্ব তথা জিজিয়া প্রদান, অথবা মৃত্যু। এই চিরস্থায়ী যুদ্ধের ঘোষণাটিই মূলত পরবর্তী চৌদ্দশ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় সংঘাত ও আগ্রাসনের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে আসছে। [1] [2] –
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ১. যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করতে আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি
২৬০৭। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যুর পর আবূ বকর (রাযিঃ) যখন খলীফা নির্বাচিত হন, তখন আরবের কিছু সংখ্যক লোক কাফির হয়ে যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) আবূ বাকর (রাযিঃ)-কে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে কিভাবে অস্ত্ৰধারণ করবেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষ যে পর্যন্ত না “আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” এই কথার স্বীকৃতি দিবে সেই পর্যন্ত আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। আর যে ব্যক্তি বললো, “আল্লাহ ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই” সে আমার থেকে তার মাল ও রক্ত (জীবন) নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামের অধিকার সম্পর্কে ভিন্ন কথা। আর তাদের প্রকৃত হিসাব-নিকাশ রয়েছে আল্লাহ তা’আলার দায়িত্বে।
আবূ বকর (রাযিঃ) বললেনঃ আল্লাহর শপথ নামায ও যাকাতের মধ্যে যে ব্যক্তি পার্থক্য করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। কেননা যাকাত সম্পদের হাক্ক। কেউ উটের একটি রশি দিতেও যদি অস্বীকার করে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দিত, আল্লাহর কসম! আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবোই। তারপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি দেখতে পেলাম আল্লাহ যেন যুদ্ধের জন্য আবূ বাকরের অন্তর উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। অতঃপর আমি বুঝতে পারলাম যে, তার সিদ্ধান্তই যথার্থ।
সহীহঃ সহীহাহ (৪০৭), সহীহ আবূ দাউদ (১৩৯১-১৩৯৩), বুখারী ও মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ। শু’আইব ইবনু আবী হামযা (রহঃ) যুহরী হতে, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ হতে, তিনি আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস মামার-যুহরী হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ) হতে, তিনি আবূ বাকর (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে ইমরান আল-কাত্তান বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনাটি ভুল। ‘ইমরানের ব্যাপারে মা’মার হতে বর্ণিত বর্ণনাতে বিরোধিতা করা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩৮/ ঈমান
পরিচ্ছেদঃ ২. আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে এবং নামায আদায় করবে
২৬০৮। আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্ৰভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ তা’আলার বান্দা ও তার রাসূল এবং আমাদের কিবলামুখী হয়ে নামায আদায় করবে, আমাদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাবে এবং আমাদের মতো নামায আদায় করবে। তারা এগুলো করলে তাদের জান ও মালে হস্তক্ষেপ করা আমাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলামের অধিকারের বিষয়টি ভিন্ন। মুসলিমদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা তারাও পাবে এবং মুসলিমদের উপর অর্পিত দায়-দায়িত্ব তাদের উপরও বর্তাবে।
সহীহঃ সহীহাহ (৩০৩) ও (১/১৫২), সহীহ আবূ দাউদ (২৩৭৪), বুখারী অনুরূপ।
মুআয ইবনু জাবাল ও আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতেও এই অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ এবং উপরোক্ত সূত্রে গারীব। ইয়াহইয়া (রাহঃ) হুমাইদ হতে, তিনি আনাস (রাযিঃ)-এর সূত্রে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আরবের বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তার এবং জিহাদের প্রকৃতি
মদিনা রাষ্ট্রের শক্তি সঞ্চয়ের পর মুসলিম বাহিনী কেবল আরবের অভ্যন্তরীণ গোত্রগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের দিকেও তাদের অভিযান প্রসারিত করে। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমরের শাসনামলে পারস্য অভিযানের সময় সেনাপতি মুগীরাহ ইবনু শু‘বাহর বক্তব্য থেকে জিহাদের এই আক্রমণাত্মক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি কিসরার সেনাপতির সামনে অকপটে স্বীকার করেন যে, আরবীয়রা একসময় চরম দারিদ্র্য, অনাহার এবং সামাজিক বিপর্যয়ের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। সেই শোচনীয় অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং পরকালীন মুক্তির প্রলোভন—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এই বক্তব্যটি জিহাদের দ্বৈত প্রণোদনাকে উন্মোচিত করে—একদিকে পরকালীন পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে পার্থিব সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের বাস্তব সুযোগ। [3] [4]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৮/ জিযিয়াহ্ কর ও সন্ধি স্থাপন
পরিচ্ছেদঃ ৫৮/১. জিম্মীদের নিকট থেকে জিযইয়াহ গ্রহণ এবং হারবীদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি।
৩১৫৯. জুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন বড় বড় শহরের দিকে সৈন্য দল প্রেরণ করলেন। সে সময় হুরমযান ইসলাম গ্রহণ করে। ‘উমার (রাঃ) তাঁকে বললেন, আমি এসব যুদ্ধের ব্যাপারে তোমার পরামর্শ গ্রহণ করতে চাই। তিনি বললেন, ঠিক আছে। এ সকল দেশ এবং দেশে মুসলিমদের দুশমন যে সব লোক বাস করছে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি পাখির মত, যার একটি মাথা, দু’টি ডানা ও দু’টি পা রয়েছে। যদি একটি ডানা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে সে পাখিটি উভয় পা, একটি ডানা ও মাথার ভরে উঠে দাঁড়াবে। যদি অপর ডানা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে সে দু’টি পা ও মাথার ভরে উঠে দাঁড়াবে। আর যদি মাথা ভেঙ্গে দেয়া হয়, তবে উভয় পা, উভয় ডানা ও মাথা সবই অকেজো হয়ে যাবে। কিসরা শত্রুদের মাথা, কায়সার হল একটি ডানা, আর পারস্য অপর একটি ডানা। কাজেই মুসলিমগণকে এ আদেশ করুন, তারা যেন কিসরার উপর হামলা করে।
বাকর ও যিয়াদ (রহ.) উভয়ে যুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অতঃপর ‘উমার (রাঃ) আমাদের ডাকলেন আর আমাদের উপর নু‘মান ইবনু মুকাররিনকে আমীর নিযুক্ত করেন।আমরা যখন শত্রু দেশে পৌঁছলাম, কিসরার এক সেনাপতি চল্লিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আমাদের মুকাবিলায় আসল। তখন তার পক্ষ হতে একজন দোভাষী দাঁড়িয়ে বলল, তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমার সঙ্গে আলোচনা করুক। তখন মুগীরাহ (ইবনু শু‘বাহ) (রাঃ) বললেন, যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার। সে বলল, তোমরা কারা?তিনি বললেন, আমরা আরবের লোক। দীর্ঘ দিন আমরা অতিশয় দুর্ভাগ্য এবং কঠিন বিপদে ছিলাম। ক্ষুধার জ্বালায় আমরা চামড়া ও খেজুর গুটি চুষতাম। চুল ও পশম পরিধান করতাম। বৃক্ষ ও পাথর পূজা করতাম। আমরা যখন এ অবস্থায় পতিত তখন আসমান ও যমীনের প্রতিপালক আমাদের মধ্য হতে আমাদের নিকট একজন নবী পাঠালেন। তাঁর পিতা-মাতাকে আমরা চিনি। আমাদের নবী ও আমাদের রবের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন, যে পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহ্ তা‘আলার ‘ইবাদাত কর কিংবা জিযইয়াহ দাও। আর আমাদের নবী আমাদের রবের পক্ষ হতে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, আমাদের মধ্য হতে যে নিহত হবে, সে জান্নাতে এমন নি‘মাত লাভ করবে, যা কখনো দেখা যায়নি। আর আমাদের মধ্য হতে যারা জীবিত থাকবে তোমাদের গর্দানের মালিক হবে। (৭৫৩০) (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৩৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুবাইর ইবনু হাইয়াহ (রহঃ)

এই অভিযানের মূল দর্শন ছিল অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন: হয় পৌত্তলিকতা ও বিজাতীয় সংস্কৃতি ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত (ইসলাম) গ্রহণ করতে হবে, নয়তো বিজিত হিসেবে ‘জিজিয়া’ কর প্রদানের মাধ্যমে হীনম্মন্যতা স্বীকার করতে হবে। মুগীরাহর বক্তব্যে যুদ্ধের এই আধিপত্যবাদী চরিত্রটি স্পষ্ট হয় যখন তিনি বলেন যে, তাদের নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দিয়েছেন যে এই যুদ্ধে নিহত হলে জান্নাত সুনিশ্চিত, আর জীবিত থাকলে বিজয়ীরা শত্রুর ‘গর্দানের মালিক’ হবে। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষের ভূমি, সম্পদ এবং মানুষের ওপর নিরঙ্কুশ মালিকানা লাভ করাই ছিল এই জিহাদের জাগতিক লক্ষ্য। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন এই যুদ্ধগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট উস্কানি বা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ছিল না, বরং তা ছিল একটি নতুন ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তারের সুপরিকল্পিত সশস্ত্র অভিযান।
অতর্কিত আক্রমণ এবং নারী-শিশুদের বন্দী করার বৈধতা
ইসলামী যুদ্ধের ইতিহাসে কেবল সম্মুখ সমর নয়, বরং অপ্রস্তুত শত্রুর ওপর অতর্কিত আক্রমণ বা ‘সারপ্রাইজ অ্যাটাক’ পরিচালনা করার নজিরও বিদ্যমান। বিশেষ করে কোনো জনপদ বা গোত্রের কাছে যদি একবার ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে থাকে, তবে পরবর্তীতে তাদের ওপর আক্রমণ করার আগে পুনরায় সতর্ক করার প্রয়োজন ইসলামে নেই বলে গণ্য করা হয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ‘বনূ মুসতালিক’ গোত্রের ওপর চালানো সামরিক অভিযান। সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, যখন বনূ মুসতালিক গোত্রের লোকেরা তাদের গবাদি পশুদের পানি পান করাচ্ছিল—অর্থাৎ তারা যুদ্ধের জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না—ঠিক সেই অপ্রস্তুত মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই অতর্কিত হামলায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের বন্দী করা হয়, যা যুদ্ধের এক চরম নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এমনকি এই অভিযানেই মুহাম্মদের অন্যতম স্ত্রী জুওয়ায়রিয়া বিনতুল হারিস যুদ্ধবন্দী হিসেবে হস্তগত হন। [5] [6] –
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পরিচ্ছেদঃ ১. যে সকল বিধর্মীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে, পূর্ব ঘোষণা ব্যতীত তাদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা বৈধ
৪৩৭০। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া তামীমী (রহঃ) … ইবনু আউন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি নাফি’ (রহঃ) কে এই কথা জানতে চেয়ে পত্র লিখলাম যে, যুদ্ধের পূর্বে বিধর্মীদের প্রতি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রয়োজন কি না? তিনি বলেন, তখন তিনি আমাকে লিখলেন যে, এ (নিয়ম) ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ মুসতালিকের উপর আক্রমণ করলেন এমতাবস্থায় যে, তারা অপ্রস্তুত ছিল (তা জানতে পারেনি।) তাদের পশুদের পানি পান করানো হচ্ছিল। তখন তিনি তাদের যোদ্ধাদের (পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ) হত্যা করলেন এবং অবশিষ্টদের (নারী শিশুদের) বন্দী করলেন। আর সেই দিনেই তাঁর হস্তগত হয়েছিল। (ইয়াহইয়া বলেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি বলেছেন) জুওয়ায়রিয়া অথবা তিনি নিশ্চিতরূপে ইবনাতুল হারিছ (হারিছ কন্যা) বলেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদীস আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি সেই সেনাদলে ছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবনু ‘আউন (রহঃ)

এই যুদ্ধের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো আত্মরক্ষামূলক লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আক্রমণাত্মক অভিযান যেখানে শত্রু পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সমূলে দমনের চেষ্টা করা হয়েছে। ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতে, যেহেতু আধুনিক যুগে ইসলামের বার্তা প্রায় সকলের কাছেই পৌঁছে গেছে, তাই বর্তমান সময়েও অমুসলিমদের ওপর কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই আক্রমণ পরিচালনা করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ বলে বিবেচিত হয় [7]। এই বিধানটি মূলত যুদ্ধের প্রচলিত নৈতিকতাকে ছাপিয়ে গিয়ে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলকে অগ্রাধিকার দেয়। এখানে মানবিক বা নৈতিক বিবেচনার চেয়ে ‘কাফের’ দমনের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাটিই মুখ্য হয়ে উঠেছে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আক্রমণের পূর্বে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি বা যুদ্ধ ঘোষণা ছিল না, যা এটিকে প্রতিরক্ষামূলক সংঘর্ষের পরিবর্তে পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
অধ্যায়: জিহাদ পৃষ্ঠা ৩৩৭
৪৭২৪. মুহাম্মদ ইব্ন খুযায়মা (র) … মানসূর (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবরাহীম (র)-কে দায়লামীদেরকে দাওয়াত দেয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ইসলামের দাওয়াত তার অবহিত রয়েছে।
ইমাম আবূ জা’ফর তাহাবী (র) বলেন: যা কিছু আমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রিওয়ায়াত করেছি তাতে স্পষ্ট হয়ে
গিয়েছে যে, দাওয়াতের আবশ্যকতা ইসলামের শুরুতে ছিল। কেননা তখন সবার কাছে দাওয়াত পৌঁছায়নি এবং তারা জানতও না যে, তাদের বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করা হয়। তাই দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ ছিল যেন তা তাদের জন্য তাবলীগ হয়ে যায় এবং তাদেরকে অবহিত করা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ কি? অতঃপর অপর লোকদের উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এর মর্ম এটাই হলো যে, এরা আহ্বানের মুখাপেক্ষী ছিল না, কেননা তারা অবহিত ছিল যে, তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে। আর যদি তারা আহ্বানে সাড়া দিত তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হত না। সুতরাং আহ্বানের কোন অর্থ হয় না। ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম আবূ ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র)-এরূপই বলতেন যে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছে। এখন ইমাম আগাম দাওয়াত দেয়া ছাড়াই তাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারেন। আর যে সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছায়নি তাদের সঙ্গে লড়াই করা সমীচীন নয়, যতক্ষণ না তাদের উপর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কিসের জন্য বা কি কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে এবং তাদেরকে কিসের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে।
ইসলাম ত্যাগকারী মুরতাদ সম্পর্কে ফকীহগণ বিরোধ করেছেন যে, তার থেকে তাওবা তলব করা হবে কিনা? একদল আলিম বলেন, মুরতাদ থেকে ইমামের তাওবা তলব করা উত্তম। যদি সে তাওবা করে তবে তো ভাল, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। এ অভিমত যারা পোষণ করেছেন ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম আবু ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র) তাদের অন্যতম। অপর একদল আলিম বলেন, তার থেকে তাওবা তলব করা হবে না। তারা তার বিধানকে হারবী কাফিরদের বিধানানুরূপ সাব্যস্ত করেছেন। যেমনভাবে আমরা তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত (আহ্বান) দেয়া না দেয়া সম্পর্কে বর্ণনা করেছি। তাঁরা বলেছেন যে, ঐ ব্যক্তি থেকে তাওবা তলব করা আবশ্যক, যে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মুরতাদ হয়েছে। পক্ষান্তরে যে জেনেশুনে মুরতাদ হয়েছে তাকে হত্যা করা হবে, তার থেকে তাওবা তলব করা হবেনা। ইমাম আবূ ইউসুফ (র) ‘কিতাবুলু ইমলাতে’ এ কথাটি বলেছেন। তিনি বলেন, আমি তো তাকে হত্যা করব এবং তার থেকে তাওবা তলব করব না। তবে সে যদি হত্যার পূর্বে তাওবা করে তাহলে তাকে অব্যাহতি দেবো এবং তার (অন্তরের) বিষয়টি আল্লাহর হাওয়ালা করে দিব।
সুলায়মান ইব্ন শু’আইব (র) স্বীয় পিতা থেকে, তিনি ইমাম আবু ইউসুফ (র) থেকেও এটা রিওয়ায়াত করেছেন।
মুরতাদ থেকে তাওবা তলব করা না করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্-এর সাহাবাদের একদল থেকে মতবিরোধ বর্ণিত আছে। তাদের থেকে কিছু রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:
٤٧٢٥ – حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي دَاوُدَ قَالَ ثَنَا عَمْرُو بْنُ عَوْنٍ قَالَ أَخْبَرَنَا هُشَيْمُ عَنْ دَاوُدَ بْنِ أَبِي هِنْدِ عَنِ الشَّعْبِي قَالَ ثَنَى أَنْسُ بْنُ مَالِكَ قَالَ لَمَّا فَتَحْنَا تُسْتُرْ بَعَثَنِي أَبُو مُوسَى إِلَى عُمَرَ فَلَمَّا قَدِمْتُ عَلَيْهِ قَالَ مَا فَعَلَ حُجَيْبَةً وَأَصْحَابُهُ وَكَانُوا ارْتَدُّوا عَنِ الْإِسْلَامِ وَلَحِقُوا بِالْمُشْرِكِينَ
তাহাবী শরীফ (৩য় খণ্ড) -৪৩

যুল খালাসাঃ একটি প্রাচীন তীর্থস্থান ধ্বংসের ইতিহাস
ইসলামী আগ্রাসনের ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য এবং বিতর্কিত ঘটনা হলো ইয়ামেনের ‘যুল খালাসা’ নামক উপাসনালয়টি ধ্বংস করা। এটি ছিল মূলত খাশআম ও বাজীলা গোত্রের একটি পবিত্র তীর্থস্থান, যাকে আরবরা ‘ইয়ামানী কাবা’ হিসেবে অভিহিত করত [8]। এটি কেবল একটি ধর্মীয় প্রতীক ধ্বংসের ঘটনা নয়; বরং একটি বিকল্প ধর্মীয় কেন্দ্রকে পরিকল্পিতভাবে নির্মূল করার পদক্ষেপ, যা একক ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশলের অংশ।
লাত ও উয্যা সম্বন্ধে এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্বন্ধে? (নাজম: ১৯)-এর তাফসীরে একটি অনুচ্ছেদে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আমি বলি: ইমাম বুখারী মক্কা বিজয়ের বর্ণনা শেষে খাছআম গোত্রের ইবাদতখানা ভাংগার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তারা এটাকে ইয়ামানী কা’বা বলতো এবং মক্কার কা’বা গৃহের শাখা মনে করতো। তারা মক্কার কা’বাকে আল-কা’বাতুল শামিয়া (সিরিয়ার কা’বা) এবং তাদের ওটাকে আল-কা’বাতুল ইয়ামানিয়া (ইয়ামানী কা’বা) বলতো। ইমাম বুখারী বলেন: ইউসুফ ইন্ন মূসা জারীর (রা) সূত্রে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বললেন, “তুমি কি আমাকে যুল-খালাসার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করবে না”? আমি বললাম “জ্বী, হ্যাঁ”। তখন আমি আহমাস গোত্রের একশ’ পঞ্চাশজন অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ছুটে চললাম। এরা সবাই ছিল ঘোড়-সাওয়ারে পারদর্শী। কিন্তু আমি ঘোড়ার পিঠে স্থির থাকতে পারতাম না। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আমার এ বিষয়টি ব্যক্ত করলে তিনি তাঁর মুবারক হাত দ্বারা আমার বুকে একটি মৃদু আঘাত করলেন। আমি আমার বুকে তার হাতের স্পর্শের প্রভাব অনুভব করলাম। আঘাতের সাথে তিনি দু’আ করলেন: “হে আল্লাহ্! তাকে স্থির হয়ে থাকতে দিন এবং তাকে হিদায়াত লাভকারী ও হিদায়াত দানকারী হিসেবে কবুল করুন”। জারীর (রা) বলেন, এরপর আর কখনও আমি ঘোড়ার উপর থেকে পড়ে যাইনি। তিনি বলেন, যুল-খালাসা ছিল ইয়ামানের অন্তর্গত খাছআম ও বুজায়লা গোত্রের ইবাদত গৃহ। সেখানে কিছু মূর্তি স্থাপিত ছিল। লোকেরা এর পূজা করতো। এ ঘরটিকে বলা হতো ইয়ামানী কা’বা। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি সেখানে এসে ঘরটিকে ভেংগে দিলেন এবং আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন। বর্ণনাকারী আরও বলেন, জারীর (রা) যখন ইয়ামানে পৌঁছেন তখন সেখানে এক ব্যক্তি থাকতো এবং সে তীরের সাহায্যে ভাগ্য গণনা করতো। তাকে বলা হলো, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দূত এখানে আছেন, তোমাকে ধরতে পারলে গর্দান উড়িয়ে দিবেন। একদিন সে তীর দিয়ে ভাগ্য গণনা কাজে রত ছিল। এমন সময় জারীর (রা) সেখানে উপস্থিত হন। তিনি তাকে বললেন, “তীরগুলো ভেংগে ফেলো ও আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই এ কথার সাক্ষ্য দাও; অন্যথায় তোমার গর্দান উড়িয়ে দিব”। লোকটি তখন তীরগুলো ভেংগে ফেললো এবং এক আল্লাহর সাক্ষ্য দিল। এরপর জারীর (রা) আহমাস গোত্রের আরতাত নামক এক ব্যক্তিকে এ সংবাদ জানাবার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট পাঠিয়ে দেন। লোকটি নবী করীম (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন, সে ইবাদত-খানাটিকে ঠিক পাঁচড়া আক্রান্ত উটের মত করে রেখে আমি এসেছি। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনার পর নবী করীম (সা) আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী ও পদাতির বাহিনীর কল্যাণের জন্যে পাঁচবার দু’আ করলেন। এ হাদীছটি ইমাম মুসলিম বিভিন্ন সূত্রে ইসমাঈল ইব্ন আবূ খালিদ কায়স ইবন আবূ হাযিম- জারীর ইব্ন আবদুল্লাহ বাজালী (রা) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
আলহামদু লিল্লাহ, ইব্ন কাছীরের তারীখুল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার চতুর্থ খণ্ড শেষ হলো। এরপর পঞ্চম খণ্ড শুরু হয়েছে তাবুক যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে। এ যুদ্ধ হয়েছিল সে বছর রজব মাসে।

ঐতিহাসিক তথ্য ও হাদিস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই গোত্রের সাথে মুসলিমদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল না; স্রেফ তারা সেখানে মূর্তিপূজা করত—এই ধর্মীয় কারণেই মুহাম্মদ সেটি ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ সাহাবী জারীর ইবন আবদুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, “তুমি কি আমাকে যুল খালাসার পেরেশানী থেকে স্বস্তি দেবে না?” অর্থাৎ, একটি ভিন্নধর্মী উপাসনালয়ের অস্তিত্ব মুহাম্মদের মানসিক প্রশান্তির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল [9] [10] [11] [12] [13] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৮৯৫. ঘরবাড়ী ও খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া
২৮১১। মুসাদ্দাদ (রহঃ) … জারীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি কি আমাকে যিলখালাসার ব্যাপারে শাস্তি দিবে না? খাশআম গোত্রে একটি মূর্তি ঘর ছিল। যাকে ইয়ামানের কাবা নামে আখ্যায়িত করা হত। জারীর (রাঃ) বলেন, তখন আমি আহমাসের দেড়শ’ আশ্বরোহী সাথে নিয়ে রওনা করলাম। তারা নিপুন অশ্বারোহী ছিল। জারীর (রাঃ) বলেন, আর আমি অশ্বের উপর স্থির থাকতে পারতাম না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, আমি আমার বুকে তাঁর আঙ্গুলীর চিহৃ দেখতে পেলাম এবং তিনি আমার জন্য এ দোয়া করলেন যে, ‘হে আল্লাহ! তাকে স্থির রাখুন এবং হেদায়েত প্রাপ্ত, পথ প্রদর্শনকারী করুন।’
তারপর জারীর (রাঃ) সেখানে গমন করেন এবং যুলখালাসা মন্দির ভেঙ্গে ফেলে ও জ্বালিয়ে দেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সংবাদ নিয়ে এক ব্যক্তিকে তাঁর নিকট প্রেরণ করেন। তখন জারীর (রাঃ)-এর দূত বলতে লাগল, কসম সে মহান আল্লাহ তা‘আলার! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি আপনার নিকট তখনই এসেছি যখনই যুলখালাসাকে আমরা ধংস করে দিয়েছি। জারীর (রাঃ) বলেন, তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাসের অশ্ব ও অশ্বারোহীদের জন্য পাচঁবার বরকতের দু‘আ করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জারীর ইবনু আবদুল্লাহ আল বাজলী (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৪/ মাগাযী (যুদ্ধ)
পরিচ্ছদঃ ৬৪/৬৩. যুল খালাসার যুদ্ধ।
৪৩৫৬. ক্বায়স (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জারীর (রাঃ) থেকে আমাকে বলেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি কি আমাকে যুল খালাসা থেকে স্বস্তি দেবে না? যুল খালাসা ছিল খাসআম গোত্রের একটি ঘর, যার নাম দেয়া হয়েছিল ইয়ামানী কা‘বা। এ কথা শুনে আমি আহ্মাস গোত্র থেকে একশ’ পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে চললাম। তাঁদের সকলেই অশ্ব পরিচালনায় পারদর্শী ছিল। আর আমি তখন ঘোড়ার পিঠে স্থিরভাবে বসতে পারছিলাম না। কাজেই নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকের উপর হাত দিয়ে আঘাত করলেন। এমন কি আমি আমার বুকের উপর তার আঙ্গুলগুলোর ছাপ পর্যন্ত দেখতে পেলাম। তিনি দু‘আ করলেন, হে আল্লাহ! একে স্থির রাখুন এবং তাকে হিদায়াত দানকারী ও হিদায়াত লাভকারী বানিয়ে দিন। এরপর জারীর (রাঃ) সেখানে গেলেন এবং ঘরটি ভেঙ্গে দিলেন আর তা জ্বালিয়ে দিলেন। এরপর তিনি (জারীর (রাঃ)) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে দূত পাঠালেন। তখন জারীরের দূত (রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) বলল, সেই মহান সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমি ঘরটিকে চর্মরোগে আক্রান্ত কাল উটের মতো রেখে আপনার কাছে এসেছি। রাবী বলেন, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর জন্য পাঁচবার বারাকাতের দু‘আ করলেন। (৩০২০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪০১০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪০১৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)



এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য জারীর ১৫০ জন দক্ষ অশ্বারোহী নিয়ে যুল খালাসায় অতর্কিত আক্রমণ চালান। সেখানে অবস্থানরত বহু মানুষকে হত্যা করা হয় এবং প্রাচীন মন্দিরটি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয় [14]। এই অভিযানের নৃশংসতা এতটাই ছিল যে, জারীর নিজেই বর্ণনা করেছেন যে তিনি মন্দিরটিকে ‘খুজলি-পাঁচড়া আক্রান্ত কালো উটের’ মতো বীভৎস অবস্থায় রেখে এসেছেন। এমনকি সেখানে ভাগ্য গণনা করারত এক ব্যক্তিকে তরবারির ভয় দেখিয়ে তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়, অন্যথায় তার শিরশ্ছেদ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল [15]।
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২১৩১. জারীর ইবন আবদুল্লাহ বাজালী (রাঃ) এর আলোচনা
৩৫৪৯। ইসহাক আল ওয়াসিতী (রহঃ) … জারীর ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গৃহে প্রবেশ করতে কোনদিন আমাকে বাঁধা প্রদান করেন নি এবং যখনই আমাকে দেখেছেন মুচকি হাসি দিয়েছেন। জারীর (রাঃ) আরো বলেন, জাহিলী যুগে (খাস’আম গোত্রের একটি প্রতীমা রক্ষিত মন্দির) যুল-খালাসা নামে একটি ঘর ছিল। যাকে কা’বায়ে ইয়ামানী ও কা’বায়ে শামী বলা হত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি কি যুল-খালাসার ব্যাপারে আমাকে শান্তি দিতে পার? জারীর (রাঃ) বলেন, আমি আহমাস গোত্রের একশ পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে যাত্রা করলাম এবং (প্রতীমা ঘরটি) বিধ্বস্ত করে দিলাম। সেখানে যাদেরকে পেলাম হত্যা করে ফেললাম। ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সংবাদ শোনালাম। তিনি (অত্যন্ত খুশী হয়ে) আমাদের জন্য এবং আহমাস গোত্রের জন্য দু’আ করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধাভিযান)
পরিচ্ছদঃ ২২২৬. যুল খালাসার যুদ্ধ
৪০১৮। ইউসুফ ইবনু মূসা (রহঃ) … জারীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আমাকে যুল-খালাসার পেরেশানী থেকে স্বস্থি দেবেনা? আমি বললামঃ অবশ্যই। এরপর আমি (আমাদের) আহমাস গোত্র থেকে একশত পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সৈনিক নিয়ে চললাম। তাদের সবাই ছিলো অশ্ব পরিচালনায় অভিজ্ঞ। কিন্তু আমি তখনো ঘোড়ার উপর স্থির হয়ে বসতে পারতাম না। তাই ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানালাম। তিনি তাঁর হাত দিয়ে আমার বুকের উপর আঘাত করলেন।
এমনকি আমি আমার বুকে তাঁর হাতের চিহ্ন পর্যন্ত দেখতে পেলাম। তিনি দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ্! একে স্থির হয়ে বসে থাকতে দিন এবং তাকে হেদায়েত দানকারী ও হেদায়েত লাভকারী বানিয়ে দিন’। জারীর (রাঃ) বলেন, এরপরে আর কখনো আমি আমার ঘোড়া থেকে পড়ে যাইনি। তিনি আরো বলেছেন যে, যুল-খালাসা ছিলো ইয়ামানের অন্তর্গত খাসআম ও বাজীলা গোত্রের একটি (তীর্থ) ঘর। সেখানে কতগুলো মূর্তি স্থাপিত ছিলো। লোকেরা এগুলোর পূজা করত এবং এ ঘরটিকে বলা হতো কা’বা।
রাবী বলেন, এরপর তিনি সেখানে গেলেন এবং ঘরটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন আর এর ভিটামাটিও চুরমার করে দিলেন। রাবী আরো বলেন, আর যখন জারীর (রাঃ) ইয়ামানে গিয়ে উঠলেন তখন সেখানে এক লোক থাকত, সে তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্নয় করত, তাকে বলা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিনিধি এখানে আছেন, তিনি যদি তোমাকে পাকড়াও করার সুযোগ পান তাহলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবেন।
রাবী বলেন, এরপর একদা সে ভাগ্য নির্নয়ের কাজে লিপ্ত ছিল, সেই মূহুর্তে জারীর (রাঃ) সেখানে পৌঁছে গেলেন। তিনি বললেন, তীরগুলো ভেঙ্গে ফেল এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই- এ কথার সাক্ষ্য দাও, অন্যথায় তোমার গর্দান উড়িয়ে দেব। লোকটি তখন তীরগুলো ভেঙ্গে ফেলল এবং (আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, এ কথার) সাক্ষ্য দিল। এরপর জারীর (রাঃ) আবূ আরতাত নামক আহমাস গোত্রের এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পাঠালেন খোশখবরী শোনানোর জন্য। লোকটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ‘‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে সত্তার (আল্লাহর) কসম করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্য বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন, ঘরটিকে ঠিক খুজলি-পাঁচড়া আক্রান্ত উটের মতো কালো করে রেখে আমি এসেছি। বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈনিকদের সার্বিক কল্যাণ ও বরকতের জন্য পাঁচবার দোয়া করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই ধ্বংসযজ্ঞের খবর যখন মুহাম্মদের কাছে পৌঁছায়, তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং আক্রমণকারী আহমাস গোত্রের জন্য পাঁচবার বরকতের দোয়া করেন [11]। এই ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে এটিই প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে ইসলামের বিস্তার কেবল প্রচারের মাধ্যমে নয়, বরং বলপ্রয়োগ এবং অন্যের পবিত্র উপাসনালয় ধ্বংস করার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হতো। কোনো পূর্ব উস্কানি ছাড়াই স্রেফ মতাদর্শিক পার্থক্যের কারণে একটি জাতির ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জীবন কেড়ে নেওয়া জিহাদের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধাভিযান)
পরিচ্ছদঃ ২২২৬. যুল খালাসার যুদ্ধ
৪০১৭। মুহাম্মাদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … কায়স (রহঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, জারীর (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি কি আমাকে যুল-খালাসা থেকে স্বস্থি দেবে না? যুল-খালাসা ছিল খাসআম গোত্রের একটি (বানোয়াট তীর্থ) ঘর, যাকে বলা হত ইয়ামনী কা’বা। এ কথা শুনে আমি আহমাস্ গোত্র থেকে একশত পঞ্চাশজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে চললাম। তাঁদের সকলেই অশ্ব পরিচালনায় পারদর্শী ছিল। আর আমি তখন ঘোড়ার পিঠে শক্তভাবে বসতে পারছিলাম না। কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকের উপর হাত দিয়ে আঘাত করলেন। এমন কি আমার বুকের উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র আঙ্গুলগুলোর ছাপ পর্যন্ত দেখতে পেলাম।
(এ অবস্থায়) তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ্! একে (ঘোড়ার পিঠে) শক্তভাবে বসে থাকতে দিন এবং তাকে হেদায়েত দানকারী ও হেদায়েত লাভকারী বানিয়ে দিন। এরপর জারীর (রাঃ) সেখানে গেলেন এবং ঘরটি ভেঙ্গে দিয়ে তা জ্বালিয়ে ফেললেন। এরপর তিনি (জারীর (রাঃ)) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দূত পাঠালেন। তখন জারীর (রাঃ) এর দূত (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে) বলল, সেই মহান সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য বাণী সহকারে পাঠিয়েছেন, আমি ঘরটিকে খুজলি-পাঁচড়া আক্রান্ত কালো উঠের মত রেখে আপনার কাছে এসেছি। রাবী বলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈনিকদের জন্য পাঁচবার বরকতের দোয়া করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মূর্তিবিনাশ এবং জনপদ নির্মূলের সর্বাত্মক অভিযান
মূর্তিপূজা সমূলে উৎপাটন করার জন্য মুহাম্মদ কেবল বড় শহরগুলোতেই নয়, বরং আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপাসনালয়গুলোতেও দুর্ধর্ষ সেনাপতিদের নেতৃত্বে বিশেষ বাহিনী প্রেরণ করতেন। মক্কা বিজয়ের পর তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় আরবের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোকে ধ্বংস করা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদকে ‘উযযা’ নামক দেবীর মন্দির ধ্বংস করতে নাখলায় পাঠান। সেখানে এক বৃদ্ধা মহিলাকে খালিদ তলোয়ারের আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেন, যাকে মুহাম্মদ পরবর্তীকালে স্বয়ং ‘উযযা’ বলে শনাক্ত করেন এবং ঘোষণা দেন যে এখন থেকে আর কেউ তার পূজা করবে না [16]।
বিভিন্ন অভিযান ও প্রতিনিধি প্রেরণঃ
১. মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজকর্ম সুসম্পন্ন করার পর যখন তিনি কিছুটা অবকাশ লাভ করলেন তখন ৮ম হিজরীর ২৫ রমযান উযযা নামক দেব মূর্তি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একটি ছোট সৈন্যদল প্রেরণ করলেন। উযযা মূর্তির মন্দিরটি ছিল নাখলা নামক স্থানে। এটি ভেঙ্গে ফেলে খালিদ (রাঃ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, (هَلْ رَأَيْتَ شَيْئًا؟)‘তুমি কি কিছু দেখেছিলে?’ খালিদ (রাঃ) বললেন, ‘না’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, (فَإِنَّكَ لَمْ تَهْدِمْهَا فَارْجِعْ إِلَيْهَا فَاهْدِمْهَا) ‘তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙ্গ নি। পুনরায় যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও।’ উত্তেজিত খালিদ (রাঃ) কোষমুক্ত তরবারি হস্তে পনুরায় সেখানে গমন করলেন। এবারে বিক্ষিপ্ত ও বিস্ত্রস্ত চুলবিশিষ্ট এক মহিলা তাঁদের দিকে বের হয়ে এল। মন্দির প্রহরী তাকে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। কিন্তু এমন সময় খালিদ (রাঃ) তরবারি দ্বারা তাকে এতই জোরে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে তিনি এ সংবাদ অবগত করালে তিনি বললেন, (نَعَمْ، تِلْكَ الْعُزّٰى، وَقَدْ أَيِسَتْ أَنْ تَعْبُدَ فِيْ بِلَادِكُمْ أَبَدًا) ‘হ্যাঁ’, সেটাই ছিল উযযা। এখন তোমাদের দেশে তার পূজা অর্চনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে পড়েছে (অর্থাৎ কোন দিন তার আর পূজা অর্চনা হবে না)।
২. এরপর নাবী কারীম (সাঃ) সে মাসেই ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ)-কে ‘সুওয়া’ নামক দেবমূর্তি ভাঙ্গার জন্য প্রেরণ করেন। এ মূর্তিটি ছিল মক্কা হতে তিন মাইল দূরত্বে ‘রিহাত’ নামক স্থানে বনু হুযাইলের একটি দেবমূর্তি। ‘আমর যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন প্রহরী জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কী চাও?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর নাবী (সাঃ) এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার জন্য আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন।’
সে বলল, ‘তোমরা এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারবে না।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘কেন?’
সে বলল, ‘প্রাকৃতিক নিয়মেই তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘তোমরা এখনও বাতিলের উপর রয়েছ? তোমাদের উপর দুঃখ, এই মূর্তিটি কি দেখে কিংবা শোনে?’
অতঃপর মূর্তিটির নিকট গিয়ে তিনি তা ভেঙ্গে ফেললেন এবং সঙ্গীসাথীদের নির্দেশ প্রদান করলেন ধন ভান্ডার গৃহটি ভেঙ্গে ফেলতে। কিন্তু ধন-ভান্ডার থেকে কিছুই পাওয়া গেল না। অতঃপর তিনি প্রহরীকে বললেন, ‘বল, কেমন হল?’
সে বলল, ‘আল্লাহর দ্বীন ইসলাম আমি গ্রহণ করলাম।’
৩. এ মাসেই সা‘দ বিন যায়দ আশহালী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে বিশ জন ঘোড়সওয়ার সৈন্য প্রেরণ করেন মানাত দেবমূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। কুদাইদের নিকট মুশাল্লাল নামক স্থানে আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য ছিল এ ‘মানত’ মূর্তি। সা‘দ (রাঃ)-এর বাহিনী যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, ‘তোমরা কী চাও?’
তাঁরা বললেন, ‘মানাত দেবমূর্তি ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে আমরা এখানে এসেছি।’
সে বলল, ‘তোমরা জান এবং তোমাদের কার্য জানে।’
সা‘দ মানাত মূর্তির দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে একজন উলঙ্গ কালো ও বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখতে পেলেন। সে আপন বক্ষদেশ চাপড়াতে চাপড়াতে হায়! রব উচ্চারণ করছিল।
প্রহরী তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মানাত! তুমি এ অবাধ্যদের ধ্বংস কর।’
কিন্তু এমন সময় সা‘দ তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন। অতঃপর মূর্তিটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিলেন। ধন-ভান্ডারে ধন-দৌলত কিছুই পাওয়া যায় নি।
৪. উযযা নামক দেবমূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার পর খালিদ বিন ওয়ালীদ (সাঃ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ৮ম হিজরী শাওয়াল মাসেই বনু জাযামাহ গোত্রের নিকট তাঁকে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আক্রমণ না করে ইসলাম প্রচার। খালিদ (রাঃ) মুহাজির, আনসার এবং বনু সুলাইম গোত্রের সাড়ে তিনশ লোকজনসহ বনু জাযীমাহর নিকট গিয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তারা (ইসলাম গ্রহণ করেছি) বলার পরিবর্তে (আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি) বলল। এ কারণে খালিদ (রাঃ) তাদের হত্যা এবং বন্দী করতে আদেশ দিলেন। তিনি সঙ্গী সাথীদের এক একজনের হস্তে এক এক জন বন্দীকে সমর্পণ করলেন। অতঃপর এ বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর নিকটে সমর্পিত বন্দীকে হত্যা করবে। কিন্তু ইবনু উমার এবং তাঁর সঙ্গীগণ এ নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। অতঃপর যখন নাবী কারীম (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি দু’ হাত উত্তোলন করে দু’বার বললেন, (اللهم إِنِّيْ أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ خَالِدًا) ‘হে আল্লাহ! খালিদ যা করেছে আমি তা হতে তোমার নিকটে নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করছি।’(1)
এ পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র বনু সুলাইম গোত্রের লোকজনই নিজ বন্দীদের হত্যা করেছিল। আনসার ও মহাজিরীনগণ হত্যা করেন নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করে তাদের নিহত ব্যক্তিদের শোণিত খেসারত এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এ ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে খালিদ (রাঃ) ও আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সম্পর্কের অবণতি হয়েছিল। এ সংবাদ অবগত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন,
(مَهَلًّا يَا خَالِدُ، دَعْ عَنْكَ أَصْحَابِيْ، فَوَاللهِ لَوْ كَانَ أَحَدٌ ذَهَبًا، ثُمَّ أَنْفَقَتْهُ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ مَا أَدْرَكَتْ غُدْوَةَ رَجُلٍ مِّنْ أَصْحَابِيْ وَلَا رَوْحَتَهُ)
‘খালিদ থেমে যাও, আমার সহচরদের কিছু বলা হতে বিরত থাক। আল্লাহর কসম! যদি উহুদ পাহাড় সোনা হয়ে যায় এবং তার সমস্তই তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করে দাও তবুও আমার সাহাবাদের মধ্য হতে কোন এক জনেরও এক সকাল কিংবা এক সন্ধ্যার ইবাদতের নেকী অর্জন করতে পারবে না।(2)


একইভাবে ‘সুওয়া’ এবং ‘মানাত’ দেবীর মন্দিরগুলোও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মানাত মন্দির ধ্বংসের সময়ও এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাকে হত্যা করা হয়, যা নির্দেশ করে যে ইসলামের আদর্শিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চূড়ান্ত সহিংসতা ছিল নিয়মিত কৌশল [17]।
ইবন ইসহাক (র) তাঁর সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে, আরববাসীরা কা’বার পাশাপাশি আরো কতগুলি তীর্থ স্থান বানাইয়া লইয়াছিল। সেইগুলিকে তাহারা গিলাফ দ্বারা ঢাকিয়া রাখিত, কা’বার ন্যায় সম্মান করিত; তথায় কুরবানীর পশু প্রেরণ করিত উহার নিকট পশু যবাহ করিত এবং কা’বার ন্যায় সেইগুলি তাওয়াফ করা হইত। অথচ তাহারা কা’বার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা স্বীকার করিত এবং উহাকে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর নির্মিত মসজিদ বলিয়া সম্মান ও শ্রদ্ধা করিত। ইবন ইসহাক (র) আরো বলেন যে, কুরাইশ ও বনূ কিনানাহ নাখলায় অবস্থিত উয্যার পূজারী ছিল। কবীলা আলীমের শাখা গোত্র বন্ শারবান উহার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করিত। মক্কা বিজয়ের পর এই মূর্তিটি ভাঙ্গিয়া ফেলার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) হযরত খালিদ ইব্ন ওলীদ (রা)-কে প্রেরণ করিয়াছিলেন। খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) মূর্তিটি ভাঙ্গিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়া বলিতেছিলেন : انی رایت اللَّهَ قَدَاهَائِكَ অর্থাৎ ওহে উযযা! আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি না- তোমাকে অস্বীকার করি। আমার বিশ্বাস আল্লাহ্ তোমাকে লাঞ্ছিত করিয়াছেন। يا عزى كَفَرَأَنَّكَ سُبْحَانَكَ
ইমাম নাসায়ী (র)……. আবূ তুফায়ল (রা) হইতে বর্ণনা করেন। আবূ তুফায়ল (রা) বলেন, মক্কা বিজয়ের পর উযযার অবসান ঘটাইবার জন্য রাসূল (সা) হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-কে নাখলায় প্রেরণ করেন। তিনটি বাবুল বৃক্ষের উপর এই মূর্তিটি স্থাপন করা হইয়াছিল। হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) বৃক্ষগুলি কাটিয়া ফেলিলেন এবং ঘরটি মাটির সহিত মিশাইয়া দেন। অতঃপর নবী করীম (সা)-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া সংবাদ দেন। রাসূল (সা) শুনিয়া বলিলেন, “তুমি আবার যাও। কারণ আসল কাজ তুমি এখনও করিতে পার নাই।” অগত্যা খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) পুনরায় নাখলায় পৌছান। নাখলায় পৌছিবার পর তথাকার প্রহরীরা খালিদ ইবন ওয়ালীদকে দেখিয়া ইয়া উয্যা! ইয়া উয্যা! বলিয়া তাকবীর ধ্বনি দিয়া উঠিল। খালিদ ইন্ন ওয়ালীদ (রা) আরো নিকটে আসিয়া দেখিতে পাইলেন যে, এক উলঙ্গ রমণী এলোমেলো রুক্ষ চুল মাথায় ধুলা মাখিতেছে। দেখিয়াই খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা) তরবারীর এক আঘাতে তাহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিলেন। অতঃপর ফিরিয়া আসিয়া রাসূল (সা)-কে সংবাদ শুনাইলেন। শুনিয়া রাসূল (সা) বলিলেন, উহাই উয্যা।”
ইন্ন ইসহাক (র) বলেন, ছাকীফ গোত্রের মূর্তির নাম ছিল লাত। তায়েফে ছিল উহার অবস্থান। বন্ মুআত্তেব উহার রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখাশুনা করিত। উহার অবসান ঘটাইবার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) মুগীরা ইব্ন শু’বা ও আবু সুফিয়ান ছাত্র ইবন হারব (রা)-কে প্রেরণ করেন। ইহারা দুইজন তায়েফ গিয়া মূর্তিটি ভাঙ্গিয়া মাটির সহিত মিশাইয়া দিয়া তথায় একটি মসজিদ স্থাপন করেন।
মানাত আউস্ খাযরাজ এবং তাহাদের সমমনা লোকদের উপাস্য ছিল। মুশাল্লাল যাওয়ার পথে সমুদ্রের তীরে কুদাইদ নামক স্থানে ছিল ইহার অবস্থান। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে আবু সুফিয়ান (রা) এই মূর্তিটিও ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলেন। কাহারে। কাহারো ধারণা যে, হযরত আলী (রা)-এর হাতে এই স্থানটি ধ্বংস হয়। যুলখালছাহ নামক স্থানটি ছিল দাউস, খাছআম ও বাজীলা গোত্রের দেবতালয়। ইবন কাসীর (র) বলেন, তাবাকায় অবস্থিত এই স্থানটিকে ইহারা ইয়ামানী কা’বা নামে আখ্যায়িত করিত। আর মক্কার কা’বাকে বলিত শামী কা’বা। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশে জারীর ইব্ন আব্দুল্লাহ বাজালী (রা)-এর হাতে এই স্থানটি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।
কাল্স নামক বুতখানাটি ছিল কবীলা তাই ও উহার পার্শ্ববর্তী আরবীদের। তাই পাহাড়ে সালমা ও সাজা স্থানের মাঝে ছিল ইহার অবস্থান। ইন্ন হিশাম বলেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) এই স্থানটি ধ্বংস করেন। এবং তথা হইতে রসূল মহাররম নামক দুইটি তরবারী উদ্ধার করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই তরবারী দুইটি হযরত আলী (রা)-কে দান করেন।
ইন্ন ইসহাক (র) বলেন: ছানআয় অবস্থিত রিয়াম নামক বুতখানাটি ছিল হিমইয়ার গোত্র ও ইয়ামানবাসীর তীর্থ স্থান। কথিত আছে যে, তথায় একটি কালো কুকুর ছিল। তুব্বার সহিত আগত দুইজন হিমইয়ারী সর্দার কুকুরটিকে হত্যা করে এবং মূর্তিখানা ধ্বংস করিয়া ফেলে।
ইবন ইসহাক (র) বলেন: বনূ রবীয়া ইন্ন কা’ব ইবন সা’দ এর তীর্থস্থান ছিল রিযা নামক স্থান। মুস্তাওগির ইন্ন রবীয়া ইবন সা’দ ইসলাম গ্রহণের পর এই স্থানটি ধ্বংস করিয়া ফেলেন। ইবন হিশাম (র) বলেন, উল্লেখ্য যে, এই লোকটি তিনশত তিরিশ বছর বাঁচিয়া ছিলেন। 1


খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে বনু জাযীমাহ গোত্রের ওপর পরিচালিত অভিযানটি ইসলামের যুদ্ধকালীন চরমপন্থার এক অনন্য উদাহরণ। গোত্রটির সদস্যরা যখন আক্রমণ থেকে বাঁচতে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করতে গিয়ে প্রচলিত শব্দের বদলে ‘আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি’ (সাবানা) বলেছিল, তখন খালিদ তাদের আত্মসমর্পণ গ্রহণ না করে নির্বিচারে হত্যা ও বন্দী করার আদেশ দেন। এমনকি বন্দীদেরও হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই হত্যাকাণ্ডগুলো এতটাই অমানবিক ছিল যে মুহাম্মদ প্রকাশ্যে এই কার্যের দায় অস্বীকার করতে বাধ্য হন, যদিও ঘাতক সেনাপতি খালিদকে কোনো কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। এই ঘটনাটি দেখায় যে, নৈতিক আপত্তি প্রকাশ করা হলেও বাস্তবিক জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি সহিংসতার ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করেনি। এছাড়াও, আলী ইবনে আবি তালিবকে দেওয়া মুহাম্মদের নির্দেশে কেবল মন্দির নয়, বরং যেকোনো উঁচু সমাধি এবং ধর্মীয় প্রতিকৃতি ধ্বংস করার কঠোর আদেশ ছিল। এটি স্পষ্ট করে যে, মুহাম্মদ কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে চাননি, বরং সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে একটি অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শিকড় পুরোপুরি মুছে ফেলে সেখানে একাধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছিলেন [18]।
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১০/ কাফন-দাফন
পরিচ্ছেদঃ কবর সমান করে দেওয়া।
১০৪৯. মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) ….. আবূ ওয়াইল (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু আবূল- হায়্যাজ আল-আসা’দী (রহঃ) কে বলেছিলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন, আমি তোমাকেও সেই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করছি। তা হলো, কোন উঁচু কবরকে (মাটি) সমান করা ব্যতীত ছাড়বেনা, আর কোন প্রতিকৃতি বিধ্বংস করা ব্যতীত ছাড়বে না। – আল আহকাম ২০৭, ইরওয়া ৭৫৯, তাহযীরুস সাজিদ ১৩০, মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১০৪৯ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এই বিষয়ে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও হাদীস বর্ণিত রয়েছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান। কোন কোন আলিম এতদনুসারে আমল করেছেন। তারা যমীনের উপর কবর উচূঁ করে বাঁধা অপছন্দনীয় বলে মনে করেন। ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন, যতটুকু উঁচু করলে এটিকে কবর বলে চিনা যায় তদপেক্ষা কবরকে উঁচু করা আমি পছন্দ করি না। তবে চিহ্নস্বরূপ কিছু উঁচু করার দরকার এই জন্য যে, এটিকে যেন কেউ পদদলিত না করে বা এর উপর যেন কেউ না বসে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ ওয়াইল (রহঃ)
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য বিলোপের এক চূড়ান্ত চিত্র
ইসলামের আধিপত্য সুসংহত করার লক্ষ্যে কেবল প্রধান দেবীমূর্তিগুলোই নয়, বরং আরবের প্রতিটি প্রান্তের আঞ্চলিক উপাসনালয়গুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তাফসীরে ইবনে কাসীরের বিবরণ অনুযায়ী, তায়েফের সাকীফ গোত্রের উপাস্য ‘লাত’ মূর্তিটি ধ্বংস করার জন্য মুগীরা ইবনু শু’বা ও আবু সুফিয়ানকে পাঠানো হয়েছিল, যারা মন্দিরটি মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করেন [17]। একইভাবে সমুদ্রতীরবর্তী কুদাইদ নামক স্থানে অবস্থিত ‘মানাত’ মূর্তি এবং তাই পাহাড়ের ‘ফুলস’ নামক বুতখানাও সমূলে ধ্বংস করা হয়। ইয়েমেনের হিমইয়ার গোত্রের পবিত্র স্থান ‘রিয়াম’ এবং বনু রবীয়া গোত্রের তীর্থস্থান ‘রিযা’—কোনোটিই এই ধ্বংসাত্মক অভিযান থেকে রক্ষা পায়নি।
এই পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়: মুহাম্মদ কেবল একটি নতুন ধর্ম প্রচার করেননি, বরং আরবের দীর্ঘদিনের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কাঠামোটিকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ মুছে দিতে চেয়েছিলেন। এই অভিযানগুলো পরিচালিত হয়েছিল এমন সব গোত্রের বিরুদ্ধে, যারা কোনোভাবেই মুসলিমদের জন্য সামরিক হুমকি ছিল না। স্রেফ ভিন্ন উপাসনা পদ্ধতি এবং ‘মূর্তিপূজা’র অজুহাতে তাদের পবিত্র ভূমিগুলোকে অপবিত্র করা এবং জনপদগুলোকে আতঙ্কিত করার মধ্য দিয়ে একটি এককেন্দ্রীক ধর্মীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক যুগের বিভিন্ন ধর্মীয় বক্তা বা ‘ওয়াজ’ মাহফিলে এই চরমপন্থী ও আক্রমণাত্মক ইতিহাসগুলো সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হলেও, ইসলামের মূলধারার ঐতিহাসিক দলিলগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, এই জিহাদগুলো ছিল মূলত পরধর্মসহিষ্ণুতার বিপরীতে এক ঘোরতর অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল আরবের বুক থেকে ইসলাম ভিন্ন অন্য সকল বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের চিহ্ন চিরতরে বিলোপ করা।
উপসংহার: ধর্মের নামে সামরিক আধিপত্যের ঐতিহাসিক রূপরেখা
পুরো প্রবন্ধটি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের আদি পর্বে জিহাদের ধারণাটি কেবল আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মক্কায় রাজনৈতিকভাবে দুর্বল থাকাকালীন ধর্মীয় সহনশীলতা ও প্রচারের পথ বেছে নেওয়া হলেও, মদিনায় রাষ্ট্রীয় ও সামরিক শক্তি অর্জনের পর তা একটি আক্রমণাত্মক ও সম্প্রসারণবাদী রূপ ধারণ করে। ঐতিহাসিক এবং হাদিসগত প্রমাণগুলো এই পরিবর্তনের সাক্ষ্য দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের আদি ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো এটিই নির্দেশ করে যে, আক্রমণাত্মক জিহাদ ছিল তৎকালীন সময়ে একটি নতুন ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার। যেখানে পরমতসহিষ্ণুতার চেয়ে ধর্মীয় একত্ববাদ এবং সামরিক শক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছিল। এটি কেবল ধর্মের প্রচার নয়, বরং একটি আদর্শিক আধিপত্য বিস্তারের ঐতিহাসিক দলিল। এই প্রক্রিয়াটি দেখায় যে, ধর্মীয় মতাদর্শ যখন রাষ্ট্রীয় ও সামরিক ক্ষমতার সাথে একীভূত হয়, তখন তা কেবল বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুনর্গঠনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
তথ্যসূত্রঃ
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৭ 1 2 3
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬০৮ 1 2
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩১৫৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ৩৫৭, ৩৫৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৭০ 1 2
- সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮১, হাদিসঃ ৪৩৭০ ↩︎
- তাহাবী শরীফ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৭ ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৮১১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৩৬৫-৩৬৬, হাদিসঃ ৩৫৪৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪০১৭ 1 2
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৪৩৫৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৫-১৮৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৫৪৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪০১৮ ↩︎
- আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ), তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৪৬৬, ৪৬৭ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১০ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৫২৬, ৫২৭ 1 2
- সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিসঃ ১০৪৯ ↩︎
- সীরাত ও ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহ ↩︎
