
Table of Contents
- 1 ভূমিকা: সংজ্ঞাগত দ্বন্দ্ব এবং নিরপেক্ষতার প্রশ্ন
- 2 কোরআনিক আখ্যান: একটি পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষার ব্লুপ্রিন্ট
- 3 যৌক্তিক বিশ্লেষণঃ মেধার মূল্যায়ন নাকি ক্ষমতার দম্ভ?
- 4 ফেরেশতাদের অসহায়ত্ব এবং ঐশ্বরিক স্বেচ্ছাতন্ত্র
- 5 বিনা অপরাধে শাস্তির বৈধতা এবং ঐশ্বরিক স্বৈরতন্ত্রের নগ্ন রূপ
- 6 উপসংহারঃ ন্যায়বিচারের মোড়কে ঐশ্বরিক স্বৈরতন্ত্রের অসারতা
ভূমিকা: সংজ্ঞাগত দ্বন্দ্ব এবং নিরপেক্ষতার প্রশ্ন
ইসলামী ধর্মতত্ত্বের একেবারে মৌলিক ভিত্তিগুলোর মধ্যে একটি হলো আল্লাহর নিখুঁত এবং প্রশ্নাতীত ন্যায়বিচার। ইসলামী বিশ্বাসে আল্লাহকে ‘চূড়ান্ত ন্যায়বিচারক’ (আল-আদল), সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। দাবি করা হয় যে, তাঁর জ্ঞানের পরিধি সীমাহীন এবং তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত বা বিচার কখনো পক্ষপাতদুষ্ট, অযৌক্তিক বা অন্যায্য হতে পারে না। কিন্তু ধর্মতাত্ত্বিক এই তাত্ত্বিক দাবির বাইরে এসে যখন আমরা যুক্তিবাদ এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে কোরআনের কিছু আখ্যান বিশ্লেষণ করি, তখন এই ‘নিখুঁত ন্যায়বিচারের’ দাবিটি গুরুতর যৌক্তিক সংকটের সম্মুখীন হয়।
যেকোনো যৌক্তিক বা আইনি কাঠামোতে ‘ন্যায়বিচার’-এর একটি সর্বজনীন ও সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি রয়েছে। এই মাপকাঠিগুলো হলো—সমান সুযোগের নিশ্চয়তা (Equal Opportunity), নিরপেক্ষতা (Impartiality) এবং পক্ষপাতহীন মূল্যায়ন। যদি কোনো প্রতিযোগিতামূলক বা পরীক্ষামূলক পরিবেশে অংশগ্রহণকারীদের প্রাথমিক সুযোগ বা শর্তগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসমান রাখা হয়, তবে যুক্তির নিরিখে সেই পরীক্ষাকে কখনোই ‘ন্যায়নিষ্ঠ’ বলা যায় না; বরং তা পরিণত হয় একটি পূর্বনির্ধারিত প্রহসনে।
কোরআনের সূরা বাকারার ৩১-৩৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত প্রথম মানব আদম এবং ফেরেশতাদের মধ্যকার জ্ঞানের পরীক্ষাটি এমনই একটি ধ্রুপদী উদাহরণ, যা সরাসরি ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের ধারণাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এই আখ্যানটিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে, আল্লাহ প্রথম মানব আদমকে মহাবিশ্বের সকল বস্তুর নাম বা বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দেন, যে জ্ঞান বা তথ্যভাণ্ডার থেকে ফেরেশতাদের সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। অথচ, আশ্চর্যজনকভাবে পরীক্ষার টেবিলে উভয়কেই একই প্রশ্নের সম্মুখীন করা হয়।
যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে যে প্রশ্নটি অনিবার্যভাবে সামনে আসে তা হলো: যে জ্ঞান কাউকে শেখানোই হয়নি, সেই অজানা জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তাকে পরীক্ষা করা এবং উন্মুক্তভাবে ব্যর্থ প্রমাণ করার অধিকার কি কোনো ন্যায়বিচারকের থাকতে পারে? এটি কি কোনো মেধার মূল্যায়ন ছিল, নাকি পূর্বনির্ধারিতভাবে একজনকে বিজয়ী এবং অন্য দলকে পরাজিত দেখানোর একটি সুপরিকল্পিত নাটক? এই প্রবন্ধে আমরা কোরআনের এই নির্দিষ্ট ঘটনাটির আলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করব যে, আল্লাহর এই পরীক্ষা কি সত্যিই কোনো ন্যায়নিষ্ঠ এবং যৌক্তিক মূল্যায়ন ছিল, নাকি এটি কেবল একচ্ছত্র ক্ষমতার একটি স্বেচ্ছাচারী প্রদর্শনী এবং পক্ষপাতিত্বের চরম দৃষ্টান্ত মাত্র।
কোরআনিক আখ্যান: একটি পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষার ব্লুপ্রিন্ট
কোরআনের সূরা বাকারার ৩১ থেকে ৩৩ নম্বর আয়াতে প্রথম মানব আদম এবং ফেরেশতাদের মধ্যে সংঘটিত এই বহুল চর্চিত ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটির সাধারণ পাঠ আপাতদৃষ্টিতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটি আখ্যান মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত কাঠামোটি চরম অসমতা এবং পক্ষপাতিত্বে দুষ্ট। আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ স্বয়ং আদমকে “সকল বস্তুর নাম” বা বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দেন (আয়াত ৩১)। এরপর তিনি সেই বস্তুগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে তাদের কাছে নাম জানতে চান। স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক কারণেই ফেরেশতারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, কারণ তাদের সেই জ্ঞান দেওয়াই হয়নি। তখন তারা অত্যন্ত অসহায়ভাবে উত্তর দেয়, “আপনি পবিত্র মহান! আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই” (আয়াত ৩২)। এরপর আদমকে নির্দেশ দেওয়া হয় নামগুলো বলে দেওয়ার জন্য। আদম যখন নামগুলো বলে দেন, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে এক প্রকার তিরস্কারের সুরে বলেন যে, তিনি আসমান ও জমিনের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অধিক অবগত (আয়াত ৩৩)। [1]
সূরা বাকারা, আয়াত ৩১
এবং তিনি আদাম (আ.)-কে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিলেন, তারপরসেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন এবং বললেন, ‘এ বস্তুগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।
— Taisirul Quran
এবং তিনি আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন, অনন্তরতৎসমূদয় মালাইকা/ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপিত করলেন, অতঃপর বললেনঃ যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে আমাকে এ সব বস্তুর নামসমূহ বর্ণনা কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তিনি আদমকে নামসমূহ সব শিক্ষা দিলেন তারপরতা ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। সুতরাং বললেন, ‘তোমরা আমাকে এগুলোর নাম জানাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।
— Rawai Al-bayan
আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন [১] , তারপরসেগুলো [২] ফেরেশ্তাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন, ‘ এগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও ’।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা বাকারা, আয়াত ৩২
তারা বলল, ‘আপনি পবিত্র মহান, আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তাছাড়া আমাদের কোন জ্ঞানই নেই, নিশ্চয়ই আপনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়’।
— Taisirul Quran
তারা বলেছিলঃ আপনি পরম পবিত্র! আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তদ্ব্যতীত আমাদের কোনই জ্ঞান নেই, নিশ্চয়ই আপনি মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারা বলল, ‘আপনি পবিত্র মহান। আপনি আমাদেরকে যা শিখিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’।
— Rawai Al-bayan
তারা বলল, ‘আপনি পবিত্র মহান ! আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞানই নেই। নিশ্চয় আপনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় ‘।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সূরা বাকারা, আয়াত ৩৩
তিনি নির্দেশ করলেন, ‘হে আদাম! এ জিনিসগুলোর নাম তাদেরকে জানিয়ে দাও’। যখন সে এ সকল নাম তাদেরকে বলে দিল, তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা প্রকাশ কর ও গোপন কর, আমি তাও অবগত’?
— Taisirul Quran
তিনি বলেছিলেনঃ হে আদম! তুমি তাদেরকে ঐ সকলের নামসমূহ বর্ণনা কর; অতঃপর যখন সে তাদেরকে ঐগুলির নামসমূহ বলেছিল তখন তিনি বলেছিলেনঃ আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নিশ্চয়ই আমি আসমান ও যমীনের অদৃশ্য বিষয় অবগত আছি এবং তোমরা যা প্রকাশ কর ও যা গোপন কর আমি তাও পরিজ্ঞাত আছি?
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি বললেন, ‘হে আদম, এগুলোর নাম তাদেরকে জানাও’। অতঃপর যখন সে এগুলোর নাম তাদেরকে জানাল, তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, নিশ্চয় আমি আসমানসমূহ ও যমীনের গায়েব জানি এবং জানি যা তোমরা প্রকাশ কর এবং যা তোমরা গোপন করতে’?
— Rawai Al-bayan
তিনি বললেন, ‘ হে আদম ! তাদেরকে এসবের নাম বলে দিন ’। অতঃপর তিনি (আদম) তাদেরকে সেসবের নাম বলে দিলে তিনি (আল্লাহ্) বললেন, ‘ আমি কি তোমাদের কে বলিনি যে, নিশ্চয় আমি আসমান ও যমীনের গায়েব জানি। আরও জানি যা তোমরা ব্যক্ত কর এবং যা তোমরা গোপন করতে [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
যৌক্তিক বিশ্লেষণঃ মেধার মূল্যায়ন নাকি ক্ষমতার দম্ভ?
এই পুরো আখ্যানটি যদি আমরা কোনো নিরপেক্ষ বা যৌক্তিক বিচারালয়ের মানদণ্ডে ফেলে বিচার করি, তবে এটি কোনোভাবেই একটি ‘ন্যায়নিষ্ঠ পরীক্ষা’ হিসেবে উত্তীর্ণ হয় না; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রহসন হিসেবে প্রমাণিত হয়। পরীক্ষার মূল শর্ত হলো—সকল পরীক্ষার্থীর জন্য সিলেবাস বা পাঠ্যক্রম অভিন্ন হতে হবে এবং জ্ঞান অর্জনের সমান সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু এখানে বিচারক (আল্লাহ) নিজেই পরীক্ষার আগে একজনকে (আদমকে) গোপনে সমস্ত উত্তরপত্র বা জ্ঞান সরবরাহ করেছেন এবং অন্যদের (ফেরেশতাদের) সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেছেন।
এই অসম প্রতিযোগিতাকে আধুনিক সমাজব্যবস্থার একটি সাধারণ উদাহরণের সাহায্যে খুব সহজেই বোঝা যায়। ধরুন, একটি শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার আগে কেবল একজন বিশেষ পছন্দের ছাত্রকে নিজের কাছে ডেকে আলাদাভাবে প্রাইভেট পড়ালেন এবং পরীক্ষার সমস্ত প্রশ্নোত্তর তাকে মুখস্থ করিয়ে দিলেন। কিন্তু ক্লাসের বাকি ছাত্রদের তিনি সেই বিষয়ে একটি শব্দও শেখালেন না। এরপর পরীক্ষার দিন শিক্ষক পুরো ক্লাসের সামনে সেই নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোই করলেন। স্বাভাবিকভাবেই, কেবল সেই প্রাইভেট পড়া ছাত্রটিই উত্তর দিতে পারবে এবং বাকিরা ব্যর্থ হবে। এখন, এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক যদি দাবি করেন যে ওই বিশেষ ছাত্রটিই ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী এবং বাকিরা অযোগ্য, তবে কি সেই শিক্ষককে ন্যায়পরায়ণ বলা যাবে? নাকি তিনি একজন চূড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত এবং স্বজনপ্রীতিতে লিপ্ত শিক্ষক হিসেবে আখ্যায়িত হবেন? সূরা বাকারার এই আখ্যানে আল্লাহর ভূমিকা ঠিক সেই পক্ষপাতদুষ্ট শিক্ষকের মতোই, যিনি নিজের ক্ষমতা এবং পছন্দের বৈধতা দিতে একটি ভুয়া পরীক্ষার আয়োজন করেছেন।
ফেরেশতাদের অসহায়ত্ব এবং ঐশ্বরিক স্বেচ্ছাতন্ত্র
এই আখ্যানে ফেরেশতাদের যে উত্তরটি (আয়াত ৩২) দেওয়া হয়েছে, ধর্মতাত্ত্বিকরা এটিকে ফেরেশতাদের ‘আনুগত্য’ হিসেবে আখ্যা দিলেও, মনস্তাত্ত্বিক এবং যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মূলত ক্ষমতাহীনদের করুণ আর্তনাদ। “আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞানই নেই”—এই বাক্যটি প্রকারান্তরে ওই প্রহসনমূলক পরীক্ষারই এক নিদারুণ সমালোচনা। ফেরেশতারা মূলত অত্যন্ত নিরীহভাবে এই সত্যটিই তুলে ধরেছেন যে, তাদের না-পারাটা তাদের অযোগ্যতা নয়, বরং এটি স্রষ্টার বঞ্চনার ফসল। যে বিচারক জ্ঞান বিতরণে বৈষম্য করেন, তিনি কীভাবে মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় নিরপেক্ষ হতে পারেন?
আদমের উত্তর দেওয়ার পর আল্লাহর যে উক্তি (“আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি অদৃশ্য বিষয় অবগত…”), তা কোনো ন্যায়বিচারকের যৌক্তিক উপসংহার নয়; বরং এটি একজন চরম স্বেচ্ছাচরী শাসকের অহমিকা বা ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করে। এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ আদমের মেধা প্রমাণ করেননি, বরং ফেরেশতাদের জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করে নিজের একচ্ছত্র এবং স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতারই প্রদর্শনী করেছেন। একটি ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবস্থায় যেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে মর্যাদা নির্ধারিত হওয়ার কথা, সেখানে এই আখ্যানটি প্রমাণ করে যে, ঐশ্বরিক মানদণ্ডে ‘ন্যায়বিচার’ মূলত স্রষ্টার খেয়ালখুশি এবং অন্ধ পক্ষপাতিত্বের ওপর নির্ভরশীল। এই পরীক্ষাটি আদমের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়, বরং এটি ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের ধারণার এক চূড়ান্ত যৌক্তিক পরাজয়।
বিনা অপরাধে শাস্তির বৈধতা এবং ঐশ্বরিক স্বৈরতন্ত্রের নগ্ন রূপ
ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর ‘ন্যায়বিচার’-এর যে বয়ান দেওয়া হয়, তা সবচেয়ে বড় যৌক্তিক এবং নৈতিক হোঁচট খায় তাকদির বা ভাগ্য নির্ধারণের ধারণার কাছে এসে। মিশকাতুল মাসাবীহ-এর ১১৫ নম্বর সহিহ হাদিসটি এই ধর্মতাত্ত্বিক সংকটের একটি চূড়ান্ত এবং ভয়ংকর দৃষ্টান্ত, যা মূলত ন্যায়বিচারের ধারণাকে আক্ষরিক অর্থেই পদদলিত করে। এই হাদিসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ যদি মহাবিশ্বের আকাশ ও পৃথিবীর সকল অধিবাসীকে কোনো কারণ বা অপরাধ ছাড়াই শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবুও তিনি ‘জালিম’ বা অত্যাচারী হিসেবে সাব্যস্ত হবেন না। এই বক্তব্যটি কেবল সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক বিচারেই নয়, বরং সর্বজনীন নৈতিকতার মানদণ্ডেও সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং ন্যায়বিচারের প্রতি এক চরম উপহাস। [2]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৫-(৩৭) ইবনু আদ্ দায়লামী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছে আমি তাকে বললাম, তাক্বদীর সম্পর্কে আমার মনে একটি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তাই আপনি আমাকে কিছু হাদীস শুনান যাতে আল্লাহর মেহেরবানীতে আমার মন থেকে (তাক্বদীর সম্পর্কে) এসব সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তবে তা দিতে পারেন। এতে আল্লাহ যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না। পক্ষান্তরে তিনি যদি তাঁর সৃষ্টজীবের সকলের প্রতিই রহমত করেন, তবে তাঁর এ রহমত তাদের জন্য সকল ‘আমল হতে উত্তম হবে। সুতরাং তুমি যদি উহুদ পাহাড়সম স্বর্ণও আল্লাহর পথে দান কর, তোমার থেকে তিনি তা গ্রহণ করবেন না, যে পর্যন্ত তুমি তাক্বদীরে বিশ্বাস না করবে এবং যা তোমার ভাগ্যে ঘটেছে তা তোমার কাছ থেকে কক্ষনো দূরে চলে যাবে না- এ কথাও তুমি বিশ্বাস না করবে, আর যা এড়িয়ে গেছে তা কক্ষনো তোমার নিকট আর আসবে না- এ বিশ্বাস স্থাপন করা ব্যতীত যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
ইবনু আদ্ দায়লামী বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর এ বর্ণনা শুনে আমি সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে এ কথাই প্রত্যুত্তর করলেন। তিনি বলেন, তারপর হুযায়ফাহ্ ইবনু ইয়ামান (রাঃ)-এর নিকট যেয়েও জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে একই প্রত্যুত্তর করলেন। এরপর যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর কাছে আসলাম। তিনি স্বয়ং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম করেই আমাকে একই ধরনের কথা বললেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)(1)
(1) সহীহ : আহমাদ ২১১৪৪, আবূ দাঊদ ৪৬৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৭৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
যেকোনো যৌক্তিক ও মানবিক কাঠামোতে ‘ন্যায়বিচার’-এর ন্যূনতম এবং অবিচ্ছেদ্য শর্ত হলো—বিনা অপরাধে কাউকে শাস্তি প্রদান না করা। যে বিচার ব্যবস্থায় নিরপরাধ এবং অপরাধীকে একই পাল্লায় মেপে খেয়ালখুশিমতো শাস্তি দেওয়া যায়, তাকে আর যা-ই হোক ‘ন্যায়বিচার’ বলা চলে না; সেটি হলো বিশুদ্ধ স্বৈরতন্ত্র। এই হাদিসটি কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার সমস্ত দাবিকে ধূলিসাৎ করে দেয়। কারণ, যদি কোনো সত্তা বিনা অপরাধে সমগ্র সৃষ্টিকুলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার অধিকার রাখেন এবং এরপরও তাকে ‘ন্যায়বিচারক’ হিসেবে মানতে বাধ্য করা হয়, তবে ‘ন্যায়’ এবং ‘অন্যায়ের’ সংজ্ঞাগত কোনো পার্থক্য আর অবশিষ্ট থাকে না। এটি প্রমাণ করে যে, এখানে ন্যায়বিচারের কোনো বস্তুনিষ্ঠ বা নৈতিক ভিত্তি নেই, বরং “ক্ষমতাবানের ইচ্ছাই আইন”—এই আদিম ও পাশবিক নীতিটিকেই ঐশ্বরিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
এই হাদিসটি আল্লাহর চরিত্রকে একজন নিরপেক্ষ ও দয়ালু বিচারক হিসেবে নয়, বরং একজন চরম অহংকারী, গোঁয়ার এবং স্বেচ্ছাচারী শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পৃথিবীতে একজন স্বৈরশাসক যেমন নিজের সমস্ত অন্যায় ও নিষ্ঠুরতাকে তার তৈরি করা আইনের মাধ্যমে ‘বৈধ’ বা ‘ন্যায়সঙ্গত’ বলে দাবি করে, এই হাদিসে আল্লাহর চরিত্রটিও ঠিক একইভাবে চিত্রিত হয়েছে। এখানে আল্লাহর কোনো সুনির্দিষ্ট নৈতিক নিয়ম বা নীতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি চাইলেই যেকোনো চরম অন্যায় কাজ করতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে তাকে ‘ন্যায়পরায়ণ’ বলতে হবে। এটি এমন এক ভীতিকর দর্শন, যা মানুষকে নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার বদলে অন্ধ আনুগত্য এবং ভীতির শিক্ষা দেয়।
এই হাদিসটি ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত কোনো সমস্যার সমাধান তো করেই না, বরং এটি সমস্যাটিকে আরও জটিল ও বীভৎস করে তোলে। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইসলামে আল্লাহর ‘ন্যায়বিচার’ আসলে কোনো নৈতিক আদর্শ নয়, বরং এটি একচ্ছত্র ক্ষমতার দম্ভ ও স্বৈরতান্ত্রিক নিপীড়নের একটি প্রচ্ছদপত্র মাত্র। বিনা অপরাধে শাস্তি দেওয়ার অধিকার যার আছে, তাকে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারী সত্তা বলাই যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়বিচারক নয়।
উপসংহারঃ ন্যায়বিচারের মোড়কে ঐশ্বরিক স্বৈরতন্ত্রের অসারতা
সামগ্রিক আলোচনা এবং কোরআন-হাদিসের দলিলগুলো যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর ‘ন্যায়বিচার’-এর যে ধারণাটি প্রচার করা হয়, তা বাস্তব অর্থে ন্যায়বিচারের সর্বজনীন সংজ্ঞার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। প্রথম মানব আদম এবং ফেরেশতাদের মধ্যকার জ্ঞানের পরীক্ষার আখ্যানটি কোনোভাবেই মেধা বা যোগ্যতার নিরপেক্ষ যাচাই ছিল না; বরং এটি ছিল পূর্বনির্ধারিত একটি অসম এবং পক্ষপাতদুষ্ট নাটক। যেখানে বিচারক নিজেই একজনকে সমস্ত উত্তর শিখিয়ে দিয়ে অন্যদের অন্ধকারে রেখে একই প্রশ্নের মুখোমুখি করেন, সেখানে সেই বিচারককে ‘ন্যায়পরায়ণ’ দাবি করা চরম যুক্তিবিরুদ্ধ এবং হাস্যকর। এই ঘটনাটি মূলত আদমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেয়েও স্রষ্টার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগের একটি নগ্ন রূপকেই প্রকট করে তোলে।
অন্যদিকে, তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কিত হাদিসটি ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের কল্পিত কাঠামোর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। যে বিধানে বিনা অপরাধে বা বিনা কারণে সমগ্র সৃষ্টিকুলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার পরও স্রষ্টাকে ‘জালিম’ বা অন্যায়কারী বলা যায় না, সেই বিধান কখনোই কোনো ন্যূনতম নৈতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে না। এটি একটি বিশুদ্ধ স্বৈরতান্ত্রিক দর্শন, যেখানে ক্ষমতার অন্ধ দম্ভের কাছে নৈতিকতা, মানবিকতা এবং যুক্তির কোনো স্থান নেই। পৃথিবীতে যেমন চরম স্বৈরশাসকরা নিজেদের যেকোনো খেয়ালখুশিকে আইন বলে চাপিয়ে দেয় এবং নিজেদের ‘ন্যায়পরায়ণ’ দাবি করে, ইসলামী ধর্মতত্ত্বেও আল্লাহকে ঠিক একইভাবে চিত্রিত করা হয়েছে—যাঁর কোনো যৌক্তিক জবাবদিহিতা নেই এবং যাঁর প্রতিটি স্বৈরাচারী কাজকে অন্ধভাবে ‘ন্যায়বিচার’ বলে মেনে নিতে অনুসারীদের বাধ্য করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের এই ‘ন্যায়বিচারক আল্লাহ’র ধারণাটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রহেলিকা এবং ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার মাত্র। যখন স্রষ্টার কাজকে যৌক্তিক বা নৈতিক মানদণ্ডে স্বাধীনভাবে বিচার করার কোনো সুযোগ থাকে না এবং চরম বৈষম্য বা অন্যায়কেও গায়ের জোরে ‘ন্যায়’ বলে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়, তখন সেই ধর্ম বা দর্শন মানুষকে উন্নত নৈতিকতার শিক্ষা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আদমের সেই প্রহসনমূলক পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিনা অপরাধে শাস্তির ঐশ্বরিক বৈধতা—এই সমস্ত আখ্যান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামী কাঠামোর এই ন্যায়বিচারের দাবিটি যুক্তির কষ্টিপাথরে একটি অসার, স্ববিরোধী এবং একনায়কতান্ত্রিক ধারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
