নাজিল হওয়া কোরআন পোড়ানো বিষয়ে উসমানের কুফরি

ভূমিকাঃ সংরক্ষণের অলীক দাবি এবং প্রশাসনিক সেন্সরশিপ

ইসলামী ধর্মতত্ত্বের অন্যতম শক্তিশালী এবং অপ্রতিরোধ্য দাবি হলো—কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত একটি কিতাব। সূরা হিজরের বিখ্যাত আয়াতের দোহাই দিয়ে মুমিনদেরকে বলা হয় যে, এই গ্রন্থটির প্রতিটি অক্ষর এবং শব্দ স্বয়ং আল্লাহ রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। কিন্তু যখনই আমরা ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের উৎস ‘সহীহ বুখারী’ এবং তৃতীয় খলিফা উসমানের কর্মকাণ্ডের দিকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তাকাই, তখন এই অলৌকিক সুরক্ষার দাবিটি বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ে। ঐতিহাসিক নথিপত্রগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, কোরআনের তথাকথিত ‘সংরক্ষণ’ কোনো অলৌকিক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়ায় ঘটেনি, বরং এটি ছিল একটি কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক সেন্সরশিপের ফলাফল, যেখানে ভিন্নমতের পাণ্ডুলিপিগুলোকে আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়েছিল।

কোরআনের সংকলন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অসঙ্গতিটি লুকিয়ে আছে খোদ নবীর বক্তব্য এবং খলিফা উসমানের কর্মকাণ্ডের বৈপরীত্যের মধ্যে। যেখানে নবী মুহাম্মদ দাবি করেছিলেন যে, কোরআন সাতটি ভিন্ন উপভাষা বা আঞ্চলিক রূপে (Ahruf) নাজিল হয়েছে, সেখানে উসমান তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সেই সাতটি রূপের ছয়টিকেই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দেন। এই ধ্বংসলীলাকে ‘সংকলন’ বলে চালিয়ে দেওয়া এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা। যদি আল্লাহ সত্যিই কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতেন, তবে একজন মরণশীল শাসকের পক্ষে কীভাবে সেই আল্লাহর নাজিল করা ছয়টি রূপকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া সম্ভব হলো? উসমানের এই ‘একক সংস্করণ’ তৈরির জেদ মূলত ইসলামের আদি বৈচিত্র্যকে সমূলে উপড়ে ফেলেছে।

এই প্রবন্ধটির মূল উদ্দেশ্য হলো কোরআন সংকলনের সেই অন্ধকার অধ্যায়টি উন্মোচন করা, যেখানে ঐশ্বরিক সুরক্ষার দোহাই দিয়ে মূলত ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। আমরা দেখব, কীভাবে উসমান এক ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোরআনের অধিকাংশ রূপকে ধ্বংস করেছেন এবং কীভাবে এই ধ্বংসপ্রক্রিয়া স্বয়ং আল্লাহর ‘সংরক্ষক’ হওয়ার দাবিকে চরম উপহাসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যে গ্রন্থের ছয়টি রূপ পুড়িয়ে ফেলে একটি রূপকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে হয়, তার ‘অবিকৃত’ থাকার দাবিটি স্রেফ একটি ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এই প্রবন্ধটি প্রমাণ করবে যে, আজকের কোরআন কোনো অলৌকিকতার দান নয়, বরং এটি উসমানের রাজনৈতিক দাহপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে টিকে যাওয়া এক খণ্ডিত অবশিষ্টাংশ মাত্র।


উসমানের তথাকথিত ‘ভুল’ এবং ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি নিধন

ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটাভাসটি লুকিয়ে আছে তৃতীয় খলিফা উসমানের কোরআন সংকলন প্রক্রিয়ার মূলে। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, উসমান যখন কোরআনের একটি প্রমিত সংস্করণ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন, তখন তিনি এক চরম বিভ্রান্তিকর ও ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যদি কোনো শব্দের উচ্চারণে বা শব্দচয়নে মতভেদ দেখা দেয়, তবে যেন তা কেবল ‘কুরাইশদের ভাষায়’ লিপিবদ্ধ করা হয়, কারণ তাঁর মতে কোরআন কেবল তাদের ভাষাতেই নাজিল হয়েছে। অথচ এই তথ্যটি যে কতটা ভয়াবহভাবে ভুল ছিল, তা মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য থেকেই প্রমাণিত হয়। মুহাম্মদ স্বয়ং স্বীকার করেছিলেন যে, কোরআন কেবল কুরাইশদের আঞ্চলিক বুলিতে নয়, বরং সাতটি ভিন্ন ভিন্ন উপভাষা বা আঞ্চলিক ঢঙে (Ahruf) অবতীর্ণ হয়েছে।

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছদঃ ২৩৯৯. কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল হয়েছে।
৪৬২৬। সাঈদ উব্‌ন উফায়র (রহঃ) … উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
… এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবেও কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এ কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের জন্য যা সহজতর, সে পদ্ধতিতেই তোমরা পাঠ কর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এখানেই এক বিরাট যৌক্তিক সংকটের জন্ম হয়: যদি স্বয়ং নবীর ঘোষণা অনুযায়ী সাতটি উপভাষাই ঐশ্বরিক এবং বৈধ হয়ে থাকে, তবে উসমান কোন অধিকারে দাবি করলেন যে কোরআন কেবল কুরাইশদের ভাষায় নাজিল হয়েছে? এটি কি স্রেফ তথ্যের ভুল, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য একটি সুপরিকল্পিত মিথ্যাচার? উসমানের এই একতরফা সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ফলাফল ছিল ভয়াবহ। তিনি কুরাইশীয় সংস্করণটি রেখে বাকি ছয়টি উপভাষায় লিখিত বা সংগৃহীত যাবতীয় পাণ্ডুলিপি—সেগুলো ব্যক্তিগত কপি হোক বা খণ্ডিতাংশ—জ্বালিয়ে দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিলেন। এই অগ্নিকাণ্ডটি ছিল মূলত এক প্রকার ‘ঐতিহাসিক ভাঙচুর’ (Vandalism), যেখানে মুহাম্মদের দাবি অনুযায়ী খোদ আল্লাহর পাঠানো ছয়টি ভিন্ন রূপকে চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা হলো।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন সংকলন
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৬২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৮৭ – ৪৯৮৮
৪৬২৬। মূসা (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) একবার উসমান (রাঃ) এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য রণ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাঁদের মতবিরোধ হুযায়ফাকে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান (রাঃ) কে বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! কিতাব সম্পর্কে ইহুদী ও নাসারাদের মত মত পার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসামান (রাঃ) হাফসা (রাঃ) এর কাছে জনৈক ব্যাক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মাসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব।
হাফসা (রাঃ) তখন সেগুলো উসমান (রাঃ) এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর উসমান (রাঃ) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ), আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ), সাঈদ ইবনু আস (রাঃ) এবং আবদুর রহমান ইবনু হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) কে নির্দেশ দিলেন। তাঁরা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় উসমান (রাঃ) তিনজন কুরাইশী ব্যাক্তিকে বললেন, কুরআনের কোন বিষয়ে যদি যায়দ ইবনু সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তাঁরা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়ে গেল, তখন উসমান (রাঃ) মূল লিপিগুলো হাফসা (রাঃ) এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এতদভিন্ন আলাদা আলাদা বা একত্রে সন্নিবেশিত কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
ইবনু শিহাব (রহঃ) খারিজা ইবনু যায়দ ইবনু সাবিতের মাধ্যমে যায়দ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমরা যখন গ্রন্থকারে কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমার থেকে হারিয়ে যায়; অথচ আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পাঠ করতে শুনেছি। তাই আমরা অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে আমরা তা খুযায়মা ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ) এর কাছে পেলাম। আয়াতটি হচ্ছে এইঃ “মু’মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তাঁরা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি”। (৩৩: ২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

উসমানের এই বিধ্বংসী পদক্ষেপের ফলে আজ সেই ছয়টি উপভাষার কোরআনের কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই। প্রশ্ন ওঠে, যদি সেই ছয়টি সংস্করণও আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়ে থাকে, তবে সেগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব কি আল্লাহর ছিল না? উসমান কি তাহলে আল্লাহর ইচ্ছার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন যে তিনি অবলীলায় ঐশ্বরিক বাণীর অধিকাংশ রূপকে ভস্মীভূত করতে সক্ষম হলেন? এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আজকের কোরআন কোনো অলৌকিক সুরক্ষার ফসল নয়, বরং এটি উসমানের একরোখা সেন্সরশিপের মাধ্যমে টিকে থাকা একটি খণ্ডিত রাজনৈতিক সংস্করণ। যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই পাণ্ডুলিপি পোড়ানো হয়েছিল, সেই তথ্যটিই যখন স্বয়ং নবীর হাদিস দ্বারা ভুল প্রমাণিত হয়, তখন এই পুরো সংকলন প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং এর ‘নির্ভুলতা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা কেবল যুক্তিসঙ্গত নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

উসমান

ঐশ্বরিক সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি বনাম আগুনের বাস্তবতা

কোরআনের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য ইসলামপন্থীরা সুরা হিজরের ৯ নম্বর আয়াতকে একটি অলঙ্ঘনীয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, যেখানে আল্লাহ সগর্বে ঘোষণা করেছেন—“নিশ্চয় আমিই কোরআন নাজিল করেছি এবং অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।” কিন্তু এই ‘ঐশ্বরিক সুরক্ষার’ দাবিটি যখন খলিফা উসমানের পাণ্ডুলিপি পোড়ানোর ইতিহাসের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন এটি স্রেফ একটি অন্তঃসারশূন্য অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। যদি বিশ্বাস করা হয় যে, স্বয়ং মহাবিশ্বের স্রষ্টা এই গ্রন্থটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, তবে একজন মরণশীল শাসকের পক্ষে কীভাবে সম্ভব হলো সেই স্রষ্টার নাজিল করা ছয়টি রূপকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলা? এই ঐতিহাসিক সত্যটি সরাসরি আল্লাহর ‘সংরক্ষক’ হওয়ার দাবিকে এক চরম উপহাসের মুখে ঠেলে দেয়। [1]

নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।
— Taisirul Quran
আমিই জিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই উহার সংরক্ষক।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আমি কুরআন* নাযিল করেছি, আর আমিই তার হেফাযতকারী। * الذكر দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আমরাই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরা অবশ্যই তার সংরক্ষক [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

নবী মুহাম্মদের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, কোরআন কেবল কুরাইশদের ভাষায় নয়, বরং সাতটি ভিন্ন ভিন্ন উপভাষা বা আঞ্চলিক ঢঙে নাজিল হয়েছিল। এই সাতটি রূপের প্রতিটিই যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়ে থাকে, তবে যুক্তিসঙ্গতভাবেই সেই সাতটি রূপেরই সমান সুরক্ষা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উসমান তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এককত্ব বজায় রাখার নেশায় আল্লাহর নাজিল করা সেই ঐশ্বরিক বৈচিত্র্যের সিংহভাগ—অর্থাৎ ছয়টি উপভাষার কোরআন—আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছেন। প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ কি তবে কেবল কুরাইশদের আঞ্চলিক ভাষার অংশটুকুর সংরক্ষক ছিলেন? বাকি ছয়টি উপভাষার কোরআনকে রক্ষা করতে তিনি কি ব্যর্থ হয়েছিলেন, নাকি উসমানের জ্বালানো আগুনের তেজ আল্লাহর ‘সংরক্ষণ’ ক্ষমতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল?

এই স্ববিরোধিতাটি প্রমাণ করে যে, কোরআন সংরক্ষণের বিষয়টি কোনো অতিপ্রাকৃত বা ঐশ্বরিক অলৌকিকতার ওপর নির্ভর করেনি, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে মানুষের তৈরি একটি সংকলন প্রক্রিয়া। আল্লাহ যদি সত্যিই তাঁর কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতেন, তবে উসমানের মতো একজন শাসক কখনোই ঐশ্বরিক বাণীর অধিকাংশ রূপকে ধ্বংস করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারতেন না। প্রকৃতপক্ষে, আজকের মুসলিমরা যে কোরআন পাঠ করে, তা আল্লাহর দ্বারা সংরক্ষিত কোনো নিখুঁত গ্রন্থ নয়; বরং তা হলো উসমানের ‘সেন্সরশিপ’ এবং অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া একটি খণ্ডিত অবশিষ্টাংশ মাত্র। যে স্রষ্টা তাঁর নিজের নাজিল করা সাতটি রূপের ছয়টিকেই একজন মানুষের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন না, তাঁর ‘সংরক্ষণ’ করার প্রতিশ্রুতি যে স্রেফ একটি কাব্যিক অতিরঞ্জন, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।


উপসংহারঃ অলৌকিক সুরক্ষার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

সামগ্রিক আলোচনা ও নির্ভরযোগ্য ইসলামী দলিলের ভিত্তিতে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, কোরআন সংরক্ষণের তথাকথিত ‘ঐশ্বরিক’ ও ‘অলৌকিক’ দাবিটি ইতিহাসের কষ্টিপাথরে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামের প্রবর্তক মুহাম্মদ যেখানে কোরআনকে সাতটি ভিন্ন উপভাষা বা আঞ্চলিক রূপের (Ahruf) এক বৈচিত্র্যময় সংকলন হিসেবে দাবি করেছিলেন, সেখানে তৃতীয় খলিফা উসমান সেই বৈচিত্র্যের গলা টিপে ধরেছেন। উসমানের এই সংকলন প্রক্রিয়া কোনো ঐশ্বরিক হেদায়েতের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ছিল এক নগ্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সেন্সরশিপ। মুহাম্মদের নিজের বর্ণনাকৃত সাতটি রূপের মধ্যে ছয়টিকেই আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে উসমান যে ‘একক সংস্করণ’ তৈরি করেছেন, তা প্রমাণ করে যে কোরআনের বর্তমান রূপটি কোনো অতিপ্রাকৃত সুরক্ষার ফসল নয়, বরং এটি খলিফার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার এক পরিমার্জিত অবশিষ্টাংশ।

সবচেয়ে বড় কূটাভাসটি এখানে যে, কোরআন নিজেই দাবি করে যে স্বয়ং আল্লাহ এর সংরক্ষক। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যদি স্রষ্টা সত্যিই তাঁর ‘জিকর’ বা বাণী রক্ষার দায়িত্ব নিতেন, তবে একজন মরণশীল শাসকের জ্বালানো আগুন কীভাবে সেই বাণীর ছয়-সপ্তমাংশকে চিরতরে ভস্মীভূত করতে সক্ষম হলো? উসমানের এই ‘পাণ্ডুলিপি পোড়ানো’র ঘটনাটি আল্লাহর ‘সংরক্ষণ’ করার প্রতিশ্রুতিকে এক চরম উপহাসের মুখে ঠেলে দেয়। হয় আল্লাহ তাঁর প্রেরিত ছয়টি রূপকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, অথবা কোরআনের সেই সংরক্ষণের আয়াতটি ছিল কেবল একটি অলঙ্কারিক ও ভিত্তিহীন দাবি। যখন খলিফা উসমান তাঁর নিজস্ব ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে—যে কোরআন কেবল কুরাইশদের ভাষায় নাজিল হয়েছে—বাকি সব পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি কার্যত আল্লাহর নাজিল করা ঐশ্বরিক বৈচিত্র্যকেই ধ্বংস করেছিলেন।

উসমান 1

পরিশেষে বলা যায়, আজকের মুসলিমরা যে কোরআনকে ‘অপরিবর্তনীয়’ ও ‘সুরক্ষিত’ বলে বিশ্বজুড়ে দাবি করে, তা মূলত উসমানের সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে টিকে যাওয়া এক খণ্ডিত ঐতিহাসিক দলিল মাত্র। মুহাম্মদের দাবিকৃত বাকি ছয়টি উপভাষার কোরআন আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে হারিয়ে গেছে, যার একমাত্র কারণ ছিল মানুষের তৈরি এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যে গ্রন্থের অধিকাংশ রূপ পুড়িয়ে ফেলে একটি মাত্র সংস্করণকে গায়ের জোরে চাপিয়ে দিতে হয়, তার ‘ঐশ্বরিক বিশুদ্ধতা’র দাবিটি স্রেফ একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবোধ ও অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। উসমানের সেই লেলিহান আগুনের শিখা কেবল কাগজই পোড়ায়নি, বরং তা ইসলামের ‘অলৌকিক সংরক্ষণ’ তত্ত্বে চিরস্থায়ী ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা হিজর, আয়াত ৯ ↩︎