ভূমিকা
কোরআন সম্পর্কে ইসলামের সবচেয়ে মৌলিক দাবিগুলোর একটি হলো—এটি আল্লাহর সরাসরি বাণী, যা কোনো মানবীয় ভুল, বিকৃতি বা অসামঞ্জস্যতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত। সাধারণ মুসলিমদের কাছে এই দাবি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি অংশ নয়; বরং কোরআনের ঐশ্বরিকতার অন্যতম প্রধান প্রমাণ হিসেবেও উপস্থাপিত হয়। বাইবেল বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে কপি, সম্পাদনা, সংকলন, পাঠভেদ কিংবা লিখনগত পরিবর্তনের ইতিহাস স্বীকার করা হলেও কোরআনের ক্ষেত্রে সাধারণত সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ছবি তুলে ধরা হয়—যেন মুহাম্মদের মুখ থেকে যে শব্দগুলো উচ্চারিত হয়েছিল, সেগুলো কোনো মানবীয় অনিশ্চয়তা, কপিকারকের ভুল, লিখনগত সমস্যা বা পাঠসংক্রান্ত জটিলতা ছাড়াই হুবহু বর্তমান মুসহাফে এসে পৌঁছেছে। এই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করতে প্রায়ই বলা হয়, পৃথিবীর অন্য কোনো গ্রন্থের ইতিহাস যত জটিলই হোক, কোরআনের সংরক্ষণের ইতিহাস নাকি একেবারেই সরল, স্বচ্ছ এবং প্রশ্নাতীত।
কিন্তু প্রাথমিক ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরে প্রবেশ করলে ছবিটি এতটা সরল থাকে না। কোরআনের সংকলন, মুসহাফ প্রস্তুত, বিভিন্ন পাঠের মধ্যে বিরোধ, উসমানের নির্দেশে একটি মান্য পাঠ প্রতিষ্ঠা, অন্যান্য লিখিত কপি ধ্বংস, সাহাবিদের ব্যক্তিগত মুসহাফ, পাঠভেদ এবং কিছু নির্দিষ্ট শব্দের লিখিত রূপ নিয়ে বিতর্ক—এসব বিষয় প্রাচীন ইসলামি গ্রন্থেই সংরক্ষিত আছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামের তৃতীয় খলিফা এবং বর্তমান কোরআনিক মুসহাফের মান্য রূপ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি উসমান ইবন আফফানের নামেই এমন বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে মুসহাফে কিছু লাহন থাকার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে মুহাম্মদের স্ত্রী আয়েশার নামেও এমন একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বর্ণনা সংরক্ষিত আছে, যেখানে কোরআনের তিনটি বহুল আলোচিত শব্দরূপ সম্পর্কে তিনি কথিতভাবে বলেন—“এটি লেখকদের কাজ; তারা লেখার সময় ভুল করেছে।”
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়। কোরআনের বর্তমান লিখিত রূপ যদি শুরু থেকেই প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও ব্যাকরণগত গঠনে সম্পূর্ণ নিখুঁত, প্রত্যক্ষভাবে ঐশ্বরিক এবং কোনো মানবীয় ভুলের সম্ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে প্রাথমিক ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যেই “লাহন”, “লেখকদের ভুল”, “আরবরা জিহ্বা দিয়ে ঠিক করে নেবে” কিংবা “অন্য গোত্রের লোক লিখলে এই সমস্যা হতো না”—এ ধরনের বক্তব্য এল কোথা থেকে? এগুলোকে পরবর্তী যুগের অমুসলিম সমালোচকের অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ বর্ণনাগুলো ইসলামি হাদিস, আছার, তাফসির এবং উলুমুল কোরআনের নিজস্ব সাহিত্যেই সংরক্ষিত হয়েছে। অবশ্য সব বর্ণনার সনদ সমান শক্তিশালী নয়, এবং মুসলিম আলেমরা এগুলোর বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও খণ্ডনও দিয়েছেন। কিন্তু সনদগত বিতর্ক বা ব্যাখ্যার অস্তিত্ব নিজেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে: কোরআনের লিখিত ইতিহাস নিয়ে প্রাথমিক মুসলিম ঐতিহ্যের বক্তব্য মোটেও পরবর্তী জনপ্রিয় প্রচারণার মতো একরৈখিক ও সমস্যাহীন ছিল না।
এই প্রবন্ধে কোরআন সংকলনের পুরো ইতিহাস আলোচনা করা হবে না। আলোচনার বিষয় অত্যন্ত নির্দিষ্ট: উসমান ও আয়েশার নামে সংরক্ষিত সেই বর্ণনাগুলো, যেগুলো কোরআনের কিছু লিখিত রূপকে লাহন, কাতিবদের কাজ বা লেখকদের ভুল হিসেবে চিহ্নিত করেছে; এবং সেই বর্ণনাগুলোর সঙ্গে “কোরআনের প্রতিটি লিখিত রূপ শুরু থেকেই সম্পূর্ণ নির্ভুল ছিল” এই পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক দাবির সম্পর্ক। একই সঙ্গে দেখা হবে, সংশ্লিষ্ট তিনটি বহুল আলোচিত কোরআনিক রূপ—وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ, وَالصَّابِئُونَ এবং إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ—নিয়ে কেন এত বিতর্ক তৈরি হয়েছে, প্রাচীন মুসলিম সূত্রগুলো কী বলেছে এবং পরবর্তী ব্যাকরণবিদ ও মুফাসসিররা কীভাবে এগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। উদ্দেশ্য কোনো পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাস রক্ষা করা নয়; বরং প্রাথমিক উৎসগুলো আসলে কী বলছে, সেই বক্তব্যকে সরাসরি পরীক্ষা করা। কারণ একটি গ্রন্থকে ঐশ্বরিক ও মানবীয় ভুলের সম্ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত বলে দাবি করা হলে, সেই দাবি যাচাই করার মানদণ্ডও অবশ্যই সাধারণ মানব-রচিত গ্রন্থের চেয়ে কঠোর হওয়া উচিত।
উসমানের মুসহাফে ‘লাহন’: “আরবরা জিহ্বা দিয়ে ঠিক করে নেবে”
কোরআনের বর্তমান মান্য মুসহাফের ইতিহাসে উসমান ইবন আফফানের ভূমিকা কেন্দ্রীয়। ইসলামি বর্ণনা অনুসারে, বিভিন্ন অঞ্চলে কোরআনের পাঠ নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়ার পর তার শাসনামলে একটি নির্দিষ্ট লিখিত পাঠকে মান্য রূপ দেওয়া হয় এবং সেই মুসহাফের কপি বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ফলে বর্তমান কোরআনিক পাঠের লিখিত ইতিহাস নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে উসমানের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই কারণেই উসমানের নামে সংরক্ষিত একটি বর্ণনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন কোরআন-সংক্রান্ত গ্রন্থ কিতাব আল-মাসাহিফ-এ আবদুল আ’লা ইবন আবদুল্লাহ ইবন আমির আল-কুরাশির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, মুসহাফ প্রস্তুত শেষ হওয়ার পর তা উসমানের কাছে আনা হলে তিনি সেটি দেখে বলেন:
لَمَّا فَرَغَ مِنَ الْمُصْحَفِ أُتِيَ بِهِ عُثْمَانُ فَنَظَرَ فِيهِ، فَقَالَ: قَدْ أَحْسَنْتُمْ وَأَجْمَلْتُمْ، أَرَى شَيْئًا مِنْ لَحْنٍ سَتُقِيمُهُ الْعَرَبُ بِأَلْسِنَتِهَا
“মুসহাফ প্রস্তুতের কাজ শেষ হলে তা উসমানের কাছে আনা হলো। তিনি সেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা ভালো ও সুন্দরভাবে কাজ করেছ। তবে আমি এতে কিছু লাহন দেখতে পাচ্ছি; আরবরা তাদের জিহ্বা দিয়ে তা ঠিক করে নেবে।’”
এই বর্ণনার ভাষা লক্ষ করার মতো। এখানে উসমানকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যিনি সদ্য প্রস্তুতকৃত মুসহাফ পরীক্ষা করে তাতে কিছু লাহন দেখতে পাচ্ছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত পাঠ সংশোধন না করে বলছেন যে, আরবরা উচ্চারণের মাধ্যমে সেগুলো ঠিক করে নেবে। অর্থাৎ বর্ণনাটি সরল অর্থে গ্রহণ করলে অন্তত দুটি স্তর আলাদা হয়ে যায়—লিখিত রূপ এবং মুখে সঠিকভাবে পাঠ করার রূপ। লিখিত পাঠে এমন কিছু থাকতে পারে, যা অভিজ্ঞ আরব পাঠক ভাষাজ্ঞান ব্যবহার করে সঠিকভাবে উচ্চারণ করবে। এই চিত্রটি আধুনিক জনপ্রিয় দাবির সঙ্গে সহজে মেলে না, যেখানে প্রায়ই এমন ধারণা দেওয়া হয় যে উসমানি মুসহাফের প্রতিটি লিখিত রূপ প্রথম মুহূর্ত থেকেই কোনো প্রশ্ন বা সমস্যার ঊর্ধ্বে ছিল। [1]
এখানেই শেষ নয়। একই গ্রন্থে উসমানের নামে আরও একটি ঘনিষ্ঠ অর্থের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, মুসহাফ তার কাছে আনা হলে তিনি তাতে কিছু লাহন দেখতে পান এবং বলেন:
لَوْ كَانَ الْمُمْلِي مِنْ هُذَيْلٍ، وَالْكَاتِبُ مِنْ ثَقِيفٍ، لَمْ يُوجَدْ فِيهِ هَذَا
“যদি নির্দেশ দিয়ে লেখানো ব্যক্তি হুযাইল গোত্রের এবং লেখক সাকিফ গোত্রের হতো, তাহলে এতে এই সমস্যা পাওয়া যেত না।”
এই দ্বিতীয় বর্ণনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে সমস্যাটিকে শুধু রহস্যময় কোনো “বিশেষ ভাষাশৈলী” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না; বরং লেখক ও নির্দেশদাতার ভাষাগত দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। যদি অন্য গোত্রের অধিক দক্ষ ব্যক্তিরা লিখতেন, তাহলে “এটি” থাকত না—এই বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি লিখনগত বা ভাষাগত সমস্যার ধারণা দেয়, যা মানব লেখকের দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি চিরন্তন ঐশ্বরিক গ্রন্থের লিখিত রূপ সম্পর্কে এমন বক্তব্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর, কারণ এখানে সমস্যার কারণ হিসেবে ওহির রহস্য, বহুস্তরীয় অলৌকিক ব্যাকরণ বা ভবিষ্যৎ কালের কোনো গভীর ভাষাতত্ত্বের কথা বলা হচ্ছে না; বরং ভালো লেখক ও ভালো নির্দেশদাতা হলে সমস্যাটি এড়ানো যেত—এমন একটি একেবারেই মানবীয় ব্যাখ্যা সামনে আসছে। [2]
অবশ্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সনদগত সমস্যা সৎভাবে উল্লেখ করা জরুরি। উসমানের নামে বর্ণিত প্রথম আছারটির নির্দিষ্ট সনদকে পরবর্তী মুহাদ্দিস ও গবেষকদের একটি অংশ দুর্বল বলেছেন। আবদুল আ’লা ইবন আবদুল্লাহ ইবন আমির সরাসরি উসমানের কাছ থেকে শুনেছেন কি না, তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে; অর্থাৎ সনদে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ আছে। অন্য কিছু সূত্রেও কাছাকাছি বক্তব্য এসেছে, কিন্তু সবগুলো সনদ সমান শক্তিশালী নয়। অতএব শুধু এই একটি বর্ণনা দেখিয়ে “নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে উসমান কোরআনে ভুল স্বীকার করেছিলেন”—এমন চূড়ান্ত দাবি করা গবেষণাগতভাবে অতিরঞ্জিত হবে। কিন্তু এখানেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। কারণ প্রথমত, এই বক্তব্য কোনো আধুনিক অমুসলিম লেখকের উদ্ভাবন নয়; এটি প্রাচীন মুসলিম কোরআন-সাহিত্যের মধ্যেই সংরক্ষিত এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম আলেমদের আলোচনার বিষয় হয়েছে। দ্বিতীয়ত, একই ধরনের বক্তব্য একাধিক সূত্রে প্রচলিত ছিল বলেই পরবর্তী আলেমদের কেউ সনদ দুর্বল বলেছেন, কেউ লাহন শব্দের বিকল্প অর্থ দাঁড় করিয়েছেন, আবার কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে উসমান প্রকৃত ব্যাকরণগত ভুল বোঝাননি। অর্থাৎ বর্ণনাটি এতটাই পরিচিত ও সমস্যাজনক ছিল যে একে ব্যাখ্যা, পুনর্ব্যাখ্যা বা প্রত্যাখ্যান করার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে বিষয়টি পড়ি, [3]
সালাত কায়েম করা বা নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা আয়াতে বলা হয়েছে এভাবে-আল মুকুিমিনাস্ সলাহ্ (যারা সালাত কায়েম করে)। বাগবীর বর্ণনায় রয়েছে, হজরত আয়েশা এবং হজরত আবান বিন ওসমান বলেছেন, কথাটি লিখতে হতো এভাবে-আল মুকিমুনাস্ সলাহ (যারা সালাত প্রতিষ্ঠাকারী)। সূরা মায়িদার মধ্যেও এ রকম ভুল রয়েছে। যেমন একস্থানে ‘সাবেয়ুন’ লেখা হয়েছে। অথচ শব্দটি লেখা উচিৎ ছিলো ‘সাবেইন।’ আরেকস্থানে লেখা হয়েছে ‘হাজানি’- যার শুদ্ধ লিখিতরূপ ‘হাজাইনি।’ হজরত ওসমান বলেছেন, কোরআনে এ রকম কিছু কিছু ভুল উচ্চারণের শব্দ লিপিবদ্ধ রয়েছে যেগুলোকে আরববাসীরা পাঠ করার সময় সঠিকভাবে উচ্চারণ করে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আপনি শব্দগুলোকে শুদ্ধরূপে লেখার ব্যবস্থা করেননি কেনো? উত্তরে হজরত ওসমান বলেছিলেন, এভাবেই থাকতে দাও। এর মাধ্যমে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করা হয়নি। প্রকৃত কথা এই যে, এ রকম মন্তব্য অসমীচীন। ঐকমত্যসম্মত মত এই যে, কোরআনে যা কিছু লিপিবদ্ধ রয়েছে তা ঐকমত্যসম্মতভাবেই বিশুদ্ধ। অবশ্য সেগুলোর ব্যাখ্যার বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে। কোরআন ব্যাখ্যাকারগণ বিভিন্নভাবে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।


এখানে এপোলোজেটিক ব্যাখ্যার একটি পরিচিত কৌশল হলো লাহন শব্দটির অর্থ বদলে দেওয়া। আরবি ভাষায় লাহন শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে ভাষার ধরন, উপভাষা, পাঠভঙ্গি কিংবা ভুল—একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে বলা হয়, উসমান এখানে “ভুল” বোঝাননি; হয়তো কোনো বিশেষ ভাষাগত রীতি বা পাঠভঙ্গি বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, শব্দের অভিধানগতভাবে একাধিক অর্থ থাকা মানেই যেকোনো প্রসঙ্গে সুবিধাজনক অর্থটি বসিয়ে দেওয়া যায় না। “আমি এতে কিছু লাহন দেখতে পাচ্ছি, আরবরা জিহ্বা দিয়ে তা ঠিক করে নেবে”—এর সঙ্গে “অন্য গোত্রের লোক নির্দেশ দিত এবং লিখত, তাহলে এটি থাকত না”—এই দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে সাধারণ ভাষাগত অর্থে একটি সমস্যা বা অসামঞ্জস্যতার ধারণাই প্রবল হয়ে ওঠে। যদি এটি সম্পূর্ণ সঠিক ও ইচ্ছাকৃত ঐশ্বরিক রূপই হয়ে থাকে, তাহলে “ঠিক করে নেওয়া” কেন? আর দক্ষতর লেখক থাকলে সেটি “থাকত না” কেন? কোনো শব্দের সম্ভাব্য বিকল্প অর্থ দেখানো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নয়।
আরও বড় সমস্যা হলো, পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা প্রায়ই একটি বৃত্তাকার যুক্তির ওপর দাঁড়ায়: কোরআনে ভুল থাকতে পারে না, কারণ কোরআন আল্লাহর বাণী; অতএব যে বর্ণনা কোরআনে ভুলের সম্ভাবনা দেখায় সেটি হয় দুর্বল, নয়তো “ভুল” শব্দের অর্থ আসলে ভুল নয়। কিন্তু এভাবে কোনো ঐতিহাসিক প্রশ্নের সমাধান হয় না। প্রথমে “কোরআন অবশ্যই নির্ভুল”—এই ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে সত্য ধরে নিয়ে তারপর সব প্রমাণকে সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো গবেষণা নয়; এটি পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাস রক্ষা। ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে উল্টো কাজটি করতে হয়: উৎস কী বলছে, কোন বর্ণনা কত পুরোনো, তার সনদ কতটা শক্তিশালী, একই বক্তব্য অন্য কোথাও আছে কি না, এবং পরবর্তী যুগে এর ব্যাখ্যা কীভাবে বদলেছে—এসব পরীক্ষা করার পর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। উসমানের এই বর্ণনাটি একা কোরআনের বিকৃতি প্রমাণ করে না; কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে সেই সরল প্রচারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যেখানে দাবি করা হয় কোরআনের লিখিত ইতিহাসে কখনো কোনো সমস্যার কথা মুসলিম ঐতিহ্যের ভেতরেই ওঠেনি। বাস্তবতা হলো, প্রশ্ন উঠেছিল; বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছিল; এবং পরবর্তী আলেমদের সেই বর্ণনার সঙ্গে মোকাবিলা করতেও হয়েছে।
আয়েশার আরও স্পষ্ট বক্তব্য: “লেখকেরা কিতাবে ভুল করেছে”
উসমানের নামে বর্ণিত লাহন-সংক্রান্ত আছারটির সনদ নিয়ে আপত্তি থাকলেও একই বিষয়কে আরও স্পষ্ট ভাষায় সামনে নিয়ে আসে মুহাম্মদের স্ত্রী আয়েশার নামে বর্ণিত একটি আছার। এই বর্ণনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে অস্পষ্ট কোনো শব্দ ব্যবহার করা হয়নি, যাকে পরে সুবিধামতো “উপভাষা”, “পাঠভঙ্গি” বা “বিশেষ ভাষাশৈলী” বলে ব্যাখ্যা করা যায়। বর্ণনা অনুসারে, আয়েশাকে কোরআনের তিনটি বহুল আলোচিত শব্দরূপ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল—সূরা ত্বহার إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ, সূরা নিসার وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ এবং সূরা মায়িদার وَالصَّابِئُونَ। জবাবে আয়েশা বলেন:
يَا ابْنَ أَخِي، هَذَا عَمَلُ الْكُتَّابِ، أَخْطَؤُوا فِي الْكِتَابِ
“হে আমার ভাতিজা, এটি লেখকদের কাজ; তারা কিতাব লেখার ক্ষেত্রে ভুল করেছে।”
আল-সুয়ূতি তাঁর বিখ্যাত আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন গ্রন্থে হিশাম ইবন উরওয়া, তাঁর পিতা উরওয়া এবং আয়েশার সূত্রে এই বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর স্পষ্টভাবে বলেন: “هذا إسناد صحيح على شرط الشيخين”—অর্থাৎ, “এই সনদ বুখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ।” এখানে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উসমানের বর্ণনার ক্ষেত্রে যেমন সনদ দুর্বল বলে পুরো বিষয়টি সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, আয়েশার এই বর্ণনার ক্ষেত্রে সেই একই জবাব দেওয়া এত সহজ নয়। ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উলুমুল কোরআন বিশেষজ্ঞ আল-সুয়ূতি নিজেই এর সনদকে বুখারি-মুসলিমের মানদণ্ড অনুযায়ী সহিহ বলেছেন। অবশ্য কোনো বর্ণনার সনদ সহিহ হওয়া মানেই তার বক্তব্যের প্রতিটি ব্যাখ্যা নিয়ে সবাই একমত—এমন নয়। পরবর্তী বহু আলেম এই বর্ণনার সরল অর্থ মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করেছেন এবং বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বর্ণনার ভাষা নিজে অত্যন্ত পরিষ্কার: “এটি লেখকদের কাজ; তারা লেখায় ভুল করেছে।” [4]
এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা দরকার। আয়েশা কোরআনের কোনো অজ্ঞাত, হারিয়ে যাওয়া বা প্রান্তিক পাঠ সম্পর্কে কথা বলছেন না; তিনি বর্তমান কোরআনের মধ্যেই থাকা তিনটি নির্দিষ্ট রূপের কথা বলছেন। অর্থাৎ প্রশ্নকারী এমন কিছু দেখেছিলেন, যা প্রচলিত আরবি ব্যাকরণের সাধারণ প্রত্যাশার সঙ্গে সহজে মিলছিল না, এবং সেই কারণেই মুহাম্মদের স্ত্রী ও ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানসূত্র হিসেবে বিবেচিত আয়েশার কাছে ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। আয়েশার নামে সংরক্ষিত উত্তরটি ছিল না—“এটি অলৌকিক ব্যাকরণ”, “তোমরা আরবি বোঝ না”, “এটি ভাষার সর্বোচ্চ সৌন্দর্য”, অথবা “এর মধ্যে এমন গভীর রহস্য আছে যা মানুষ বুঝতে পারবে না।” বরং উত্তরটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং মানবীয়: লেখকেরা লিখতে গিয়ে ভুল করেছে। পরবর্তী শতাব্দীতে যে বিশাল ব্যাকরণগত প্রতিরক্ষা নির্মিত হয়েছে, তার তুলনায় এই প্রাথমিক বর্ণনার সরলতা তাই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
এই বর্ণনা নিয়ে পরবর্তী আলেমদের অস্বস্তিও গোপন কিছু নয়। কুরতুবি সূরা নিসা ৪:১৬২-এর তাফসিরে আয়েশার এই বক্তব্য উল্লেখ করার পর অন্য ব্যাকরণগত ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন এবং কাতিবদের ভুলের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। আলুসিও বর্ণনাটির সনদ সম্পর্কে আল-সুয়ূতির মূল্যায়ন উল্লেখ করে স্বীকার করেন যে বিষয়টি অত্যন্ত সমস্যাজনক; কারণ সাহাবিরা যদি কোরআনের লিখিত পাঠে ভুল করে থাকেন এবং সেই ভুল দীর্ঘকাল বহাল থাকে, তাহলে কোরআনের পাঠের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। এরপর তিনিও বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে বর্ণনাটিকে সরল অর্থে গ্রহণ না করার পথ খোঁজেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলোই আসলে সমস্যাটির গুরুত্ব দেখায়। যদি আয়েশার বক্তব্য একেবারেই নিরীহ, সুস্পষ্ট এবং নির্ভুল সংরক্ষণের দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো, তাহলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এত ব্যাখ্যা, প্রত্যাখ্যান এবং পুনর্ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ত না। [5]
এপোলোজিস্টদের একটি প্রচলিত জবাব হলো, আয়েশা “ভুল” বলতে প্রকৃত ভুল বোঝাননি; তিনি হয়তো সাত আহরুফের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম উপযুক্ত কোনো রূপ নির্বাচন করার কথা বলেছেন। অর্থাৎ লেখকেরা নাকি ভুল শব্দ লেখেননি, শুধু সম্ভাব্য একাধিক বৈধ পাঠের মধ্যে “সর্বোত্তম” রূপটি বেছে নিতে ভুল করেছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যার সমস্যা হলো, এটি বর্ণনার ভাষা থেকে সরাসরি পাওয়া যায় না। আয়েশার নামে বর্ণিত বাক্য “أخطؤوا في الكتاب”—“তারা কিতাব লেখায় ভুল করেছে।” এখানে “সাত আহরুফের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম উত্তম পাঠ নির্বাচন করেছে” এমন কোনো কথা নেই। সেই ব্যাখ্যা এসেছে পরে, যখন সরল অর্থটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কোনো বক্তব্যের স্পষ্ট অর্থ বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেই তার ভেতরে এমন একটি নতুন অর্থ ঢুকিয়ে দেওয়া, যা মূল বক্তা বলেননি, ব্যাখ্যা হতে পারে; কিন্তু তাকে মূল বক্তব্যের সরল অর্থ বলে চালানো যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানে একটি স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করে। একই সনদে কোনো বর্ণনা যদি ইসলামের পক্ষে সুবিধাজনক কোনো দাবি প্রতিষ্ঠা করত, তাহলে “বুখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ” কথাটি তার নির্ভরযোগ্যতার শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হতো। কিন্তু একই মানের সনদে একটি বর্ণনা যখন কোরআনের লিখিত রূপ নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে, তখন হঠাৎ বলা হয়—এটি গ্রহণ করা যাবে না, কারণ কোরআন তো মুতাওয়াতির; একটি আছার দিয়ে তাকে প্রশ্ন করা যায় না। কিন্তু এই যুক্তি আবারও বৃত্তাকার। প্রথমে ধরে নেওয়া হচ্ছে, বর্তমান মুসহাফের প্রতিটি বিতর্কিত রূপ অবশ্যই নির্ভুল; তারপর যে ঐতিহাসিক বর্ণনা সেই ধারণার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করছে, সেটিকে “গ্রহণযোগ্য নয়” বলা হচ্ছে ঠিক এই কারণে যে তা পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের সঙ্গে মেলে না। ইতিহাস যাচাই করার পদ্ধতি এটি নয়। ঐতিহাসিকভাবে সৎ প্রশ্ন হলো—প্রাথমিক মুসলিম সমাজে এমন একটি বর্ণনা কেন প্রচলিত ছিল, কেন আয়েশার মতো ব্যক্তিত্বের নামে তা সংরক্ষিত হলো এবং কেন পরবর্তী আলেমদের সেটির সরল অর্থ থেকে সরে যাওয়ার জন্য এত ব্যাখ্যা নির্মাণ করতে হলো?
তিনটি বিতর্কিত রূপ: ভুল, ব্যতিক্রম, নাকি পরবর্তী ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা?
আয়েশার বর্ণনায় যে তিনটি কোরআনিক রূপের কথা এসেছে, সেগুলো আকস্মিকভাবে নির্বাচিত নয়। তিনটিই এমন জায়গা, যেখানে প্রচলিত আরবি ব্যাকরণের সাধারণ নিয়ম অনুসারে প্রথম দর্শনে একটি অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। অবশ্য পরবর্তী আরবি ব্যাকরণবিদরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই এক বা একাধিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এবং আরবি ভাষার বিস্তৃত ব্যবহার থেকে ব্যতিক্রমী নির্মাণের উদাহরণও সামনে এনেছেন। কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন শুধু “কোনোভাবে একটি ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা তৈরি করা যায় কি না”—এতটুকু নয়। প্রায় যেকোনো প্রাচীন টেক্সটের অস্বাভাবিক বাক্যকে যথেষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। আসল প্রশ্ন হলো, কেন প্রাথমিক ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যেই এই তিনটি রূপকে লেখকদের ভুল বলে ব্যাখ্যা করার বর্ণনা তৈরি ও সংরক্ষিত হয়েছিল, এবং পরে কেন একই রূপগুলোর জন্য একাধিক জটিল বিকল্প ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলো।
১. সূরা নিসা ৪:১৬২ — وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ
সূরা নিসার ১৬২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
لَٰكِنِ الرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَالْمُؤْمِنُونَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ…
“কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং মুমিনগণ—তারা বিশ্বাস করে যা তোমার প্রতি নাজিল হয়েছে এবং যা তোমার আগে নাজিল হয়েছে; এবং সালাত প্রতিষ্ঠাকারীগণ এবং যাকাত প্রদানকারীগণ…”
এখানে الرَّاسِخُونَ (সুপ্রতিষ্ঠিতরা), الْمُؤْمِنُونَ (মুমিনরা) এবং পরে الْمُؤْتُونَ (যাকাত প্রদানকারীরা)—সবগুলোই রফা বা nominative অবস্থায় এসেছে। স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় “সালাত প্রতিষ্ঠাকারীরা”-ও وَالْمُقِيمُونَ الصَّلَاةَ হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমান মুসহাফে রয়েছে وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ—অর্থাৎ মুকিমুন-এর পরিবর্তে accusative রূপ মুকিমিন। আয়েশার নামে বর্ণিত আছারে এই রূপটিকেই লেখকদের ভুলের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী ব্যাকরণবিদদের সবচেয়ে পরিচিত জবাব হলো النصب على المدح—অর্থাৎ প্রশংসার উদ্দেশ্যে বাক্যের স্বাভাবিক ব্যাকরণগত ধারাবাহিকতা ভেঙে কোনো বিশেষ গুণকে accusative অবস্থায় আনা। সহজভাবে বললে, অর্থ দাঁড়ায়: “বিশেষভাবে আমি সালাত প্রতিষ্ঠাকারীদের প্রশংসা করছি।” আরবি সাহিত্যে এ ধরনের قطع বা grammatical interruption-এর নজির আছে, তাই এই ব্যাখ্যাকে ব্যাকরণগতভাবে একেবারেই অসম্ভব বলা যাবে না। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়: যদি বাক্যটি এত স্বাভাবিক ও নিঃসন্দেহে শুদ্ধ হয়, তাহলে আয়েশার নামে কেন এটিকেই কাতিবদের ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হলো? এবং কেন কুরতুবির মতো মুফাসসিরকে একাধিক ভিন্ন ব্যাকরণগত সম্ভাবনা তালিকাভুক্ত করে শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বেছে নিতে হলো? ব্যাকরণগতভাবে কোনো রূপকে রক্ষা করা সম্ভব হওয়া এবং সেই রূপটি মূল লেখকের ইচ্ছাকৃত নির্মাণ ছিল—এই দুই দাবি এক জিনিস নয়। [6]
২. সূরা মায়িদা ৫:৬৯ — وَالصَّابِئُونَ
দ্বিতীয় উদাহরণটি সূরা মায়িদার ৬৯ নম্বর আয়াত:
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ وَالنَّصَارَىٰ…
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি, এবং সাবিয়ানরা ও খ্রিষ্টানরা…”
আরবি ব্যাকরণের সাধারণ নিয়মে إِنَّ-এর পরে তার নাম accusative অবস্থায় আসে। তাই বাক্যের ধারাবাহিকতায় وَالصَّابِئِينَ প্রত্যাশিত মনে হয়। কোরআনের অন্য একটি আয়াতেও—সূরা বাকারা ২:৬২—ঠিক الصَّابِئِينَ রূপটিই ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সূরা মায়িদা ৫:৬৯-এ রয়েছে وَالصَّابِئُونَ, অর্থাৎ nominative রূপ। এই অমিলটিও আয়েশার বর্ণনায় কাতিবদের ভুলের উদাহরণ হিসেবে এসেছে।
পরবর্তী ব্যাকরণবিদরা এরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একটি বহুল ব্যবহৃত ব্যাখ্যায় الصابئون-কে আলাদা একটি নতুন বাক্যের কর্তা বা মুবতাদা হিসেবে ধরা হয়, যার খবর পরে নিহিত বা অনুমিত; অর্থাৎ বাক্যের স্বাভাবিক দৃশ্যমান ধারাবাহিকতা ভেঙে একটি মধ্যবর্তী স্বাধীন গঠন ধরে নেওয়া হয়। অন্য ব্যাখ্যায় বলা হয়, এটি আরবি ভাষার বিশেষ অলঙ্কারিক নির্মাণ। আবার কেউ কেউ শব্দটির অবস্থান ও সংযোজনকে অন্যভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থাৎ ব্যাকরণগত প্রতিরক্ষা আছে, কিন্তু সেই প্রতিরক্ষা একক ও স্বতঃসিদ্ধ নয়। বরং একটি আপাত অস্বাভাবিক রূপকে ব্যাখ্যা করতে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্লেষণ তৈরি হয়েছে। এটিই দেখায় যে সমস্যাটি শুধু আধুনিক সমালোচকের কল্পনা নয়; প্রাচীন ব্যাকরণবিদ ও মুফাসসিররাও এই রূপের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন।
৩. সূরা ত্বহা ২০:৬৩ — إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ
তিনটির মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ সূরা ত্বহার ৬৩ নম্বর আয়াত:
إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ
“নিশ্চয়/এরা দুজন অবশ্যই দুই জাদুকর।”
প্রচলিত মানক আরবিতে إِنَّ যদি এখানে তার স্বাভাবিক অর্থ ও ব্যাকরণগত কাজ করে, তাহলে দ্বিবচন demonstrative هَذَانِ-এর পরিবর্তে accusative هَذَيْنِ প্রত্যাশিত হয়। অর্থাৎ সাধারণ নিয়মে বাক্যটি হওয়ার কথা إِنَّ هَذَيْنِ لَسَاحِرَانِ। কিন্তু প্রচলিত কোরআনিক পাঠে রয়েছে هَذَانِ। আয়েশার নামে বর্ণিত আছারে এটিও লেখকদের ভুলের উদাহরণ হিসেবে এসেছে।
এই আয়াতকে ব্যাখ্যা করার জন্য পরবর্তী ভাষাবিদরা একাধিক পথ নিয়েছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যায় বলা হয়, এখানে إِنْ আসলে ভারমুক্ত বা مخففة রূপ; ফলে هذان বাক্যের কর্তা হিসেবে nominative অবস্থায় থাকতে পারে এবং পরবর্তী لَ পার্থক্যসূচক লাম হিসেবে কাজ করছে। অন্য ব্যাখ্যায় বলা হয়, কিছু আরব গোত্র দ্বিবচনের ক্ষেত্রে رفع, نصب ও جر—তিন অবস্থাতেই আলিফযুক্ত একই রূপ ব্যবহার করত; ফলে هذان কোনো ভুল নয়, বরং একটি স্বীকৃত উপভাষাগত ব্যবহার। আবার কিরাআতের ইতিহাসে আয়াতটির ভিন্ন পাঠ ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণও আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ এখানেও একটি মাত্র স্বচ্ছ ও অবিসংবাদিত ব্যাখ্যা নেই; বরং একটি অস্বাভাবিক রূপকে শুদ্ধ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক পথ তৈরি হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: এই তিনটি রূপের প্রতিটির জন্যই কোনো না কোনো ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। অতএব “আধুনিক মানক আরবির সরল নিয়মের সঙ্গে না মিললেই নিশ্চিতভাবে ভুল”—এমন দাবি করা অতিসরলীকরণ হবে। ভাষা গণিতের সূত্র নয়; উপভাষা, অলঙ্কার, ব্যতিক্রমী construction এবং ঐতিহাসিক ব্যবহারের বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু ঠিক একই কারণে বিপরীত অতিসরলীকরণও গ্রহণযোগ্য নয়—অর্থাৎ পরে কোনো ব্যাকরণবিদ একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলেই প্রমাণ হয়ে গেল যে শুরু থেকেই রূপটি ইচ্ছাকৃত, নিখুঁত এবং কোনো লিখনগত সমস্যার প্রশ্নই কখনো ছিল না। বিশেষ করে যখন প্রাথমিক ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরেই আয়েশার নামে একটি শক্তিশালী সনদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা সংরক্ষিত আছে: “এটি লেখকদের কাজ; তারা লেখায় ভুল করেছে।”
এই জায়গাতেই পরবর্তী এপোলোজেটিক যুক্তির দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়। প্রথমে বলা হয়, কোরআনে কোনো ভুল থাকা অসম্ভব। এরপর কোনো অস্বাভাবিক গঠন দেখানো হলে তার জন্য সম্ভাব্য দশটি ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা হাজির করা হয়। তারপর সেই সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর অস্তিত্বকেই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে বলা হয়—দেখুন, কোনো ভুল নেই। কিন্তু “একটি বাক্যকে কোনো ব্যাকরণগত নিয়ম ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব” এবং “এই ব্যাখ্যাটিই মূল রচয়িতার উদ্দেশ্য ছিল”—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। প্রথমটি একটি সম্ভাবনা; দ্বিতীয়টির জন্য ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রয়োজন। আর এখানে ঐতিহাসিক প্রমাণের অংশ হিসেবেই আয়েশার বর্ণনা অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যে তিনটি রূপকে পরবর্তী যুগে গভীর ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, প্রাথমিক ইসলামি ঐতিহ্যের একটি শক্তিশালী বর্ণনায় সেগুলোকেই একেবারে সরাসরি কাতিবদের ভুল বলা হয়েছে।
অতএব বিতর্কটি “আরবি ব্যাকরণে এই তিনটি রূপের কোনো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে কি না” এই সংকীর্ণ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ইসলামের প্রাথমিক স্মৃতিতে একই রূপ সম্পর্কে এমন একটি ব্যাখ্যা কেন ছিল, যেখানে মানব লেখকের ভুলকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে? যদি পরবর্তী ব্যাকরণগত ব্যাখ্যাই একমাত্র প্রকৃত ও সুস্পষ্ট অর্থ হয়ে থাকে, তাহলে আয়েশার মতো আরবি ভাষাভাষী, মুহাম্মদের ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিদের একজন এবং হাদিস ও ধর্মীয় জ্ঞানের প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃত একজন ব্যক্তি কেন এগুলোকে সেইভাবে বুঝলেন না? আর যদি তাঁর নামে বর্ণিত বক্তব্যই ভুল হয়, তাহলে আল-সুয়ূতির মূল্যায়নে বুখারি ও মুসলিমের শর্ত পূরণকারী একটি সনদে এমন বক্তব্য কীভাবে ইসলামের নিজস্ব জ্ঞান-ঐতিহ্যের মধ্যে প্রবেশ করল? যে পথেই উত্তর দেওয়া হোক, “কোরআনের লিখিত ইতিহাসে কোনো প্রশ্নই নেই, কোনো জটিলতাই নেই, সবকিছু শুরু থেকেই সম্পূর্ণ সরল ও নিখুঁত”—এই জনপ্রিয় প্রচারণা আর অক্ষত থাকে না।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.
Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.
Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.
This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.
তথ্যসূত্রঃ
- আবু বকর আবদুল্লাহ ইবন আবি দাউদ আল-সিজিস্তানি, কিতাব আল-মাসাহিফ, উসমানি মুসহাফে ‘লাহন’ সংক্রান্ত বর্ণনা; তাহকীক: সেলিম ইবন ঈদ আল-হিলালি, পৃ. ২৩৭-এর সংশ্লিষ্ট আলোচনা ↩︎
- ইবন আবি দাউদ, কিতাব আল-মাসাহিফ, উসমানের নামে বর্ণিত “لو كان المملي من هذيل والكاتب من ثقيف…” আছার ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৮-৩৪৯ ↩︎
- জালালুদ্দিন আল-সুয়ূতি, আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন, কোরআনের ই‘রাব ও মুসহাফের কথিত লাহন সম্পর্কিত আলোচনা; আয়েশা থেকে বর্ণিত আছারের পরে: “هذا إسناد صحيح على شرط الشيخين” ↩︎
- তাফসির আল-কুরতুবি, সূরা নিসা ৪:১৬২-এর ব্যাখ্যা; আল-আলুসি, রূহ আল-মা‘আনি, সূরা ত্বহা ২০:৬৩-এর ব্যাখ্যা ↩︎
- তাফসির আল-কুরতুবি, সূরা নিসা ৪:১৬২ ↩︎
