ইসলাম অনুসারে নারীদের রাস্তার মাঝ দিয়ে চলা যাবে না

ভূমিকা

ইসলামি শরিয়াহ ব্যবস্থায় পাবলিক স্পেস বা জনপরিসরে নারী ও পুরুষের অবাধ চলাচলকে কেবল নিরুৎসাহিতই করা হয়নি, বরং নির্দিষ্ট কিছু বিধানের মাধ্যমে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি অন্যতম এবং বিতর্কিত বিধান হলো নারীদের রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের রাস্তার কিনার ঘেঁষে চলার নির্দেশ। এই বিধানটি মূলত লিঙ্গীয় পৃথকীকরণ (Gender Segregation) এবং নারীর দৃশ্যমানতাকে সংকুচিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস হিসেবে গণ্য হয়।


ধর্মীয় উৎস ও বিধানের প্রকৃতি

এই বিধানের মূল ভিত্তি হলো একটি হাদিস যা সুনান আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে। নবী মুহাম্মদ যখন মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন তিনি দেখতে পান পুরুষ ও মহিলারা রাস্তায় মিশে যাচ্ছেন। তখন নবী মহিলাদের রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল না করার নির্দেশ দেন এবং পরিবর্তে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে বলেন। এর ফলে মহিলাদের দেয়াল ঘেষে হাঁটতে বাধ্য হতে হয়, যার ফলে তাদের পোশাক দেয়ালে আটকে যায়। এই বক্তব্যটি স্পষ্টতই নারী অবমাননাকর এবং অসভ্য। এই ঘটনা লিঙ্গবৈষম্যের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। পুরুষ মনে করেন যে রাস্তা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত এবং মহিলাদের তাদের নির্দেশ মেনে চলতে হবে। সমাজে লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে এবং মহিলাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে এই ধরণের মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। এই হাদিস থেকে এরকম ধারনা মুসলিমদের মধ্যে তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে, রাস্তাঘাট আসলে পুরুষদের জন্যেই তৈরি, নারীরা এখানে হাঁটার সময় যেন ভীত এবং আতংকিতভাবে, মাথা নিচু করে দেয়াল ঘেঁষে চলাফেরা করে!

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ সালাম
৫১৮২. আবদুল্লাহ ইবন মাসলামা (রহঃ) ………. আবূ উসায়দ আনসারী (রাঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বর্ণনা কবতে শুনেছেন; যখন তিন মসজিদ থেকে বেরিয়ে দেখতে পান যে, পুরুষেরা রাস্তার মাঝে মহিলাদের সাথে মিশে যাচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের বলেনঃ তোমরা অপেক্ষা কর! তোমাদের রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল করা উচিত নয়, বরং তোমরা রাস্তার এক পাশ দিয়ে যাবে। এরপর মহিলারা দেয়াল ঘেষে চলাচল করার ফলে অধিকাংশ সময় তাদের কাপড় দেয়ালের সাথে আটকে যেত।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

লক্ষ্য করুন, বর্ণনাকারী আবু উসায়দ আনসারি উল্লেখ করেছেন যে, এই নির্দেশের পর মহিলারা দেয়ালের এত ঘেঁষে হাঁটতেন যে অনেক সময় তাদের পরিধেয় বস্ত্র দেয়ালের সাথে আটকে যেত।


ইসলামি আইনবিদ ও ফতোয়া সাইটগুলোর অবস্থান

ইসলামি আইনশাস্ত্রের আধুনিক ব্যাখ্যা প্রদানকারী সাইট যেমন IslamQA (Sheikh Munajjid) এবং Islamweb এই হাদিসটিকে নারীদের জন্য একটি বাধ্যতামূলক শিষ্টাচার হিসেবে গণ্য করে।

IslamQA-এর ব্যাখ্যা: ফিতনা ও অগোচরে থাকা
IslamQA-এর মতে, এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘ফিতনা’ বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ এবং নারী-পুরুষের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মুমিন নারীর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি রাস্তাঘাটে নিজের উপস্থিতিকে যতটা সম্ভব অগোচরে রাখবেন [1]। রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাকে পুরুষের আধিপত্যের জায়গা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে নারীর প্রবেশকে “পুরুষের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়া” (Imitating men) হিসেবেও কোনো কোনো ব্যাখ্যায় বিবেচনা করা হয়েছে।
Islamweb-এর ফতোয়া: ইখতিলাত ও স্পর্শ এড়ানো
Islamweb-এর ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নারী ও পুরুষের ভিড়ের মধ্যে সংমিশ্রণ (Ikhtilat) হারাম। সুতরাং রাস্তায় চলাচলের সময় যদি পুরুষ উপস্থিত থাকে, তবে নারীর জন্য আবশ্যক হলো রাস্তার কিনার দিয়ে চলা যাতে কোনোভাবেই পুরুষের শরীরের সাথে তার স্পর্শ না লাগে [2]

নারী অবমাননার রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

পাবলিক স্পেসে নারীর অধিকার ও প্রবেশাধিকার সংকুচিত করা
এই বিধানটি জনপরিসরকে মূলত ‘পুরুষের এলাকা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। নারীদের রাস্তার কিনার দিয়ে চলতে বাধ্য করা বা দেয়াল ঘেঁষে হাঁটতে বলা প্রকারান্তরে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করার নামান্তর। এটি আধুনিক মানবাধিকারের ‘চলাচলের স্বাধীনতা’ (Freedom of Movement)-র সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যখন কোনো সমাজ ব্যবস্থায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে রাস্তার কিনারে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন সেই পাবলিক স্পেস আর সার্বজনীন থাকে না।
দ্বৈত মানদণ্ড ও ফিতনা তত্ত্ব
ইসলামি স্কলারদের মতে, নারীদের এই বিধিনিষেধ মেনে চলা উচিত যাতে পুরুষরা প্রলুব্ধ না হয়। এটি একটি ভিক্টিম-ব্লেমিং মানসিকতার প্রতিফলন। পুরুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে নারীর চলাফেরাকে সীমাবদ্ধ করাকেই এখানে সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছে। আধুনিক ফুটপাতহীন সরু রাস্তায় এই নিয়ম অনুসরণ করতে গিয়ে পোশাক দেয়ালে আটকে যাওয়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হওয়াকে ‘ধর্মীয় আনুগত্য’ হিসেবে দেখা হয়। এটি যৌক্তিক নিরাপত্তার চেয়ে অন্ধ বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেওয়ার বহিঃপ্রকাশ।
প্রতীকী অবমাননা
প্রাচীন অনেক সংস্কৃতিতে রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলা ছিল মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতীক। নারীদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কেবল ট্রাফিক নিয়ম নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী বার্তা যে সামাজিক পদমর্যাদায় নারী সর্বদা গৌণ। আবু দাউদের বর্ণনায় নারীদের কাপড় দেয়ালে আটকে যাওয়ার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে এই নিয়মটি পালন করা নারীদের জন্য কতটা অবমাননাকর ও কষ্টকর ছিল। এটি নারী সত্তার প্রান্তিকীকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল।

উপসংহার

নারীদের রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচলে এই নিষেধাজ্ঞা কেবল ঐতিহাসিক কোনো ঘটনা নয়, বরং বর্তমানের সালাফি ও রক্ষণশীল ইসলামি সমাজে এটি একটি জীবন্ত চর্চা। IslamQA বা Islamweb-এর মতো প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মগুলো যখন এই লিঙ্গবৈষম্যমূলক আচরণকে ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি’ ও ‘লজ্জাশীলতা’র অংশ হিসেবে প্রচার করে, তখন তা আধুনিক সমঅধিকারের ধারণাকে বাধাগ্রস্ত করে। জনপরিসরে নারীর অবাধ ও সম্মানজনক চলাচলের পথ রুদ্ধ করে তাদের দেয়াল ঘেঁষে চলতে বাধ্য করা একটি প্রগতিশীল সমাজের জন্য চরম পশ্চাৎপদতা হিসেবেই বিবেচিত হতে বাধ্য।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.

Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.

This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.


তথ্যসূত্রঃ
  1. IslamQA, Fatwa No. 121110 ↩︎
  2. Islamweb, Fatwa No. 83870 ↩︎