Table of Contents
ভূমিকা
কোরআনকে বর্তমানে আমরা যেভাবে একটি সুসংবদ্ধ বই বা ‘মাসহাফ’ হিসেবে দেখি—যেখানে সূরার নির্দিষ্ট ক্রম, নাম এবং বিন্যাস রয়েছে—তার কোনো অস্তিত্বই মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর জীবদ্দশায় ছিল না। অর্থাৎ মুহাম্মদ তার জীবদ্দশায় কখনো কোরআন নামক কোন গ্রন্থ দেখে যাননি। মুহাম্মদের দীর্ঘ ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে ‘কোরআন’ ছিল মূলত একটি মৌখিক ঐতিহ্য (Oral Tradition), যা পরিস্থিতির প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে উচ্চারিত হতো। আধুনিক ঐতিহাসিক ও পাণ্ডুলিপি বিশারদদের মতে, মুহাম্মদ তাঁর মৃত্যুর আগে এই আয়াতগুলোকে একটি নির্দিষ্ট মলাটে সংবদ্ধ করার বা সেগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট অনুক্রম (Sequence) তৈরি করার কোনো নির্দেশ দিয়ে যাননি। এমনকি কোরআনের বর্তমান সূরার সুনির্দিষ্ট নামগুলোও যে মুহাম্মদের দেওয়া নয়, বরং পরবর্তী সংকলকদের উদ্ভাবন—তা মুসলিম ঐতিহ্যেরই বহু দলিলে স্পষ্ট। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমানের সংকলিত কোরআন, যা মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে একবার আবু বকরের সময়ে সংকলিত হয়েছিল, পরে আবার উসমানের আমলে পুনরায় ভিন্নভাবে সংকলিত হয়েছিল, তা কোনো ‘ঐশ্বরিক নকশা’র ফসল নয়, বরং মুহাম্মদের মৃত্যুর পর উদ্ভূত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং আয়াতগুলো চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার মানবিক আতঙ্ক থেকে তৈরি হওয়া একটি প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক উদ্ভাবন মাত্র।
ঐশ্বরিক সুরক্ষার দাবি বনাম বাস্তবতা
কোরআনের একটি বহুল আলোচিত দাবি হলো এর অবিকৃত অবস্থা এবং ঐশ্বরিক সুরক্ষা। কোরআনে সরাসরি ঘোষণা করা হয়েছে যে, স্বয়ং ঈশ্বরই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। কোরআনে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন [1] –
নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।
— Taisirul Quran
আমিই জিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই উহার সংরক্ষক।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আমি কুরআন* নাযিল করেছি, আর আমিই তার হেফাযতকারী। * الذكر দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আমরাই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরা অবশ্যই তার সংরক্ষক [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক মাপকাঠিতে এই আয়াতের দাবি এবং পরবর্তী ঘটনাবলির মধ্যে এক বিশাল বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। যদি আল্লাহই এই গ্রন্থের সংরক্ষক হতেন, তবে মুহাম্মদের মৃত্যুর পরপরই এটি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো না। ইসলামের ইতিহাস ও নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থসমূহ সাক্ষ্য দেয় যে, মুহাম্মদের যুগে কোরআনের কোনো সংকলিত রূপ ছিল না; বরং তা ছিল হাড়, পাথর, চামড়া কিংবা মানুষের স্মৃতির ওপর বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর যখন ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজ বা কোরআন মুখস্থকারী নিহত হন, তখন খলিফা উমর অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে, কোরআনের বড় একটি অংশ হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয়: ঈশ্বর যদি নিজেই সংরক্ষণের দায়িত্ব নেন, তবে উমরের মতো একজন সাহাবীর মনে কেন এটি বিলুপ্ত হওয়ার ‘আশঙ্কা’ তৈরি হলো? এটি কি ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির ওপর উমরের আস্থার অভাব ছিল, নাকি তৎকালীন বাস্তবতায় তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে সুরক্ষার পুরো বিষয়টিই ছিল মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল? আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, মুহাম্মদ নিজে কোরআনকে একটি গ্রন্থাকারে সাজানোর কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি বা কোনো নির্দেশ দিয়ে যাননি। আবু বকরের সাথে উমরের কথোপকথন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোরআন সংকলনের এই ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন এবং মুহাম্মদের আদর্শের বহির্ভূত একটি উদ্ভাবন। [2] [3]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-৮ঃ কুরআনের মর্যাদা
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – কিরাআতের ভিন্নতা ও কুরআন সংকলন প্রসঙ্গে
২২২০-(১০) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধের পর পর খলীফাতুর রসূল আবূ বাকর (রাঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি গেলাম। দেখলাম ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) তাঁর কাছে উপবিষ্ট। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, ‘উমার আমার কাছে এসে খবর দিলেন, ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক কুরআনের হাফেয শহীদ হয়ে গেছেন। আমার আশংকা হয়, বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে এভাবে হাফেয শহীদ হতে থাকলে কুরআনের অনেক অংশ লোপ পেয়ে যাবে। তাই আমি সঙ্গত মনে করি যে, আপনি কুরআনকে মাসহাফ বা কিতাব আকারে একত্রিত করতে হুকুম দেবেন। আবূ বাকর (রাঃ) বলেন, আমি ‘উমারকে বললাম, এমন কাজ কিভাবে আপনি করবেন, যে কাজ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি? ‘উমার (রাঃ) উত্তরে বললেন, আল্লাহর শপথ। এটা হবে একটা উত্তম কাজ। ‘উমার (রাঃ) এভাবে আমাকে বার বার বলতে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহ এ কাজের গুরুত্ব বুঝার জন্য আমার হৃদয় খুলে দিলেন এবং আমিও এ কাজ করা সঙ্গত মনে করলাম।
…
(বুখারী)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৪৯৮৬, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২৩৭২, সহীহ ইবনু হিববান ৪৫০৬।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

নবীর নীরবতা এবং সংকলন প্রক্রিয়ার মানবিক সীমাবদ্ধতা
ইসলামী ধর্মতত্ত্বের একটি বড় দাবি হলো—কোরআন একটি সুসংহত এবং অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ যা লওহে মাহফুজ থেকে অবতীর্ণ। কিন্তু ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক বিচারে এই দাবির ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে যখন আমরা দেখি যে, ইসলামের প্রবর্তক মুহাম্মদ স্বয়ং তার জীবদ্দশায় এই ‘ঐশ্বরিক কিতাব’ সংকলনের কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করে যাননি। আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে প্রশ্ন ওঠে—যে কিতাবকে মানবজাতির জন্য ‘চূড়ান্ত গাইড’ বলা হচ্ছে, সেই কিতাবকে একটি মলাটবদ্ধ পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার কোনো তাগিদ কেন মুহাম্মদের ছিল না? যদি কোরআনকে কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রাখাই ঈশ্বরের লক্ষ্য হতো, তবে মুহাম্মদের মাধ্যমেই তার একটি প্রমিত (Standard) সংস্করণ তৈরি হওয়া ছিল সবচাইতে যৌক্তিক ও নিরাপদ পথ। কিন্তু মুহাম্মদ তার মৃত্যুর আগে কোরআনকে কেবল বিভিন্ন মানুষের মুখস্থ স্মৃতি এবং হাড়-চামড়া-পাথরের মতো অস্থায়ী বস্তুর ওপর বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রেখে গেছেন।
সহিহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, নবীর বিশ্বস্ত সাহাবী এবং প্রধান সংকলক যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) যখন খলিফা আবু বকরের পক্ষ থেকে কোরআন সংকলনের প্রস্তাব পান, তখন তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল চরম বিস্ময় ও দ্বিধা। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনারা কীভাবে এমন একটি কাজ করবেন যা স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা.) করেননি?” এই একটিমাত্র প্রশ্নই প্রমাণ করে দেয় যে, কোরআন সংকলন কোনো নববী নির্দেশনা ছিল না; বরং এটি ছিল সাহাবীদের একটি নিজস্ব ‘বিদাআত’ বা উদ্ভাবন। যদি এটি ধর্মের অংশ হতো, তবে নবী মুহাম্মদ কেন তা উপেক্ষা করে গেলেন? একজন নবীর নীরবতা কি এখানে পদ্ধতিগত অবহেলার ইঙ্গিত দেয়, নাকি তিনি নিজেও জানতেন না যে তাঁর মৃত্যুর পর এই বাণীগুলো কীভাবে সংরক্ষিত হবে?
কোরআনের বর্তমান গঠনশৈলী—অর্থাৎ সূরার বিন্যাস, ক্রম এবং নামকরণ—পুরোটাই মানবিক সিদ্ধান্তের ফসল। বর্তমান কোরআনে সূরাগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কালানুক্রম (Chronological order) অনুসরণ করা হয়নি, বরং বড় থেকে ছোট—এই এক অদ্ভুত জ্যামিতিক বিন্যাসে সাজানো হয়েছে। ফলস্বরূপ, কোরআনের বাণীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বা ‘শানে নুযুল’ সাধারণ পাঠকের কাছে অস্পষ্ট থেকে যায়। প্রশ্ন ওঠে, এই বিন্যাস কি কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশনালব্ধ, নাকি সংকলক যায়েদ ইবনে সাবিত ও তার কমিটির ব্যক্তিগত অভিরুচি? আধুনিক পাণ্ডুলিপি বিশারদদের মতে, এই ধরনের এলোমেলো বিন্যাস প্রমাণ করে যে, কোরআন সংকলনকালে সাহাবীদের কাছে কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছিল না; তারা কেবল যেখান থেকে যা পেয়েছেন, তা-ই জোড়াতালি দিয়ে একটি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তদুপরি, মানুষের স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে কোনো টেক্সট সংরক্ষণ করা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের মস্তিষ্ক তথ্য বিকৃতি (Memory distortion) এবং বিস্মৃতির শিকার হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ইয়ামামার যুদ্ধে হাফেজদের মৃত্যুর পর উমরের যে ‘হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক’ তৈরি হয়েছিল, তা-ই প্রমাণ করে যে কোরআন সংরক্ষণের ঐশ্বরিক গ্যারান্টিটি ছিল মূলত একটি আলঙ্কারিক দাবি, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি তৎকালীন সাহাবীদের কাছেও ছিল না। যদি উমর হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে আজকের কোরআনের বিশাল একটি অংশ হয়তো ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে যেত। অর্থাৎ, বর্তমান কোরআন আল্লাহর চেয়েও উমর ও যায়েদ ইবনে সাবিতের কাছে বেশি ঋণী। এই মানবিক হস্তক্ষেপের ফলে কোরআনের ‘বিশুদ্ধতা’ এবং ‘ঐশ্বরিক অপরিবর্তনীয়তা’র যে দাবি মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত, তা যুক্তির কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এই প্রসঙ্গে এই সেকশনের অন্যান্য লেখাগুলো পাঠকদের পড়তে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
উপসংহার
পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, মুহাম্মদের প্রয়াণের পর তার অনুসারীরা যে প্রক্রিয়ায় কোরআনকে একটি গ্রন্থবদ্ধ রূপ দিয়েছিলেন, তা কোনো ঐশ্বরিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ছিল না—বরং তা ছিল তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখে নেওয়া একটি জরুরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। মুহাম্মদের সমগ্র নবুয়তি জীবনে তিনি একবারের জন্যও কোরআনকে একটি ‘পুস্তক’ বা ‘গ্রন্থ’ হিসেবে সাজানোর প্রয়োজন বোধ করেননি, এমনকি তার অবর্তমানে কেউ এটি করবে—এমন কোনো খসড়া বা নির্দেশনাও রেখে যাননি। এই ঐতিহাসিক নীরবতা প্রমাণ করে যে, বর্তমানে প্রচলিত কোরআনের বিন্যাস, সূরাগুলোর নামকরণ এবং ক্রমবিন্যাস কোনো ধর্মীয় অলৌকিকত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং এগুলো একদল মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং ভাষাগত নির্বাচনের ফসল।
যদি কোরআনকে একটি অপরিবর্তনীয় এবং স্বর্গীয়ভাবে সংরক্ষিত কিতাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে মুহাম্মদের এই নিষ্ক্রিয়তা এবং পরবর্তী সাহাবীদের দ্বারা সংকলন প্রক্রিয়ার সময়কার ‘হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক’ এক বিশাল তাত্ত্বিক সংকটের জন্ম দেয়। সাহাবীদের নিজেদের বয়ানেই স্পষ্ট যে, তারা এমন একটি কাজ করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন যা স্বয়ং নবী অনুমোদন দিয়ে যাননি। অর্থাৎ, যে গ্রন্থটিকে আজ ইসলামের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়, সেই গ্রন্থের ‘মলাটবদ্ধ রূপ’ স্বয়ং প্রবর্তকের কাছেই ছিল একটি অজ্ঞাত বিষয়। যুক্তি ও ইতিহাসের নির্মোহ বিচারে, বর্তমান কোরআন তাই একটি আসমানী কিতাব হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে মুহাম্মদের পরবর্তী সংকলকদের একটি ‘ঐতিহাসিক প্রজেক্ট’। এই সংকলন প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই পাঠ্যটি মূলত একটি মানবিক হস্তক্ষেপের ফলাফল, যা সময়ের প্রয়োজনে মানুষের হাতেই নির্দিষ্ট আকার ও ক্রম লাভ করেছে।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা হিজর, আয়াত ৯ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) হাদিসঃ ২২২০ ↩︎
- সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৬ ↩︎
