শরীয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমদের ধর্মপ্রচার – উপাসনালয় নির্মান নিষিদ্ধ

ভূমিকা

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা যখন কোনো অমুসলিম বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে অভিবাসী হন কিংবা বসবাস শুরু করেন, তখন তারা সেখানে নিজেদের ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ অধিকারের দাবি তোলেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের এই দাবিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এবং মানবাধিকারের বিশ্বজনীন মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের সমঅধিকার নিশ্চিত করে। এসব দেশে নাগরিকের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার রাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রতি আনুগত্য ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে, কোনো বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাসের মাপকাঠিতে নয়। ফলে একজন মুসলিম সেখানে গিয়ে অনায়াসেই মসজিদ নির্মাণ করতে পারেন কিংবা ধর্মীয় সভা-সমাবেশ করার আইনি সুরক্ষা পান। এই ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, যা প্রতিটি মানুষকে তার নিজের বিশ্বাসের ওপর অটল থাকার স্বাধীনতা দেয় এবং রাষ্ট্রকে ধর্মের উর্ধ্বে রেখে সবার জন্য সমান সুযোগের পথ প্রশস্ত করে। তবে নৈতিক সংকটের জায়গাটি তৈরি হয় ঠিক তখনই, যখন কোনো একটি জনপদে এই মুসলিম জনগোষ্ঠীই সংখ্যাগুরু হয়ে ওঠে এবং অর্জিত গণতান্ত্রিক সুযোগকে ব্যবহার করে সেখানে একটি বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক শাসনকাঠামো বা শরিয়া আইন প্রবর্তনের প্রচেষ্টা চালায়। এটি একটি গভীরতর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক দ্বন্দ্ব; কারণ যে ব্যবস্থার কারণে তারা নিজেরা অধিকার অর্জন করতে সক্ষম হলো, শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছানোর পর সেই একই ব্যবস্থার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া বা অন্যের অধিকার খর্ব করা কোনোভাবেই মানবিক বা যুক্তিসিদ্ধ আচরণ হতে পারে না।

ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল একটি রাজনৈতিক কাঠামো নয়, বরং এটি সকল নাগরিকের সমান অধিকারের এক নৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যায়, অনেক মুসলিম জনগোষ্ঠী যখন কোনো দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠেন, তখন তারা সেই অঙ্গীকার ভুলে গিয়ে শরিয়া আইনের মতো একটি কঠোর এবং একপাক্ষিক ব্যবস্থা চালু করার প্রয়াস পান। এই মনোভাবটি আধুনিক বিশ্বের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দর্শনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যখন সংখ্যালঘু হিসেবে তারা একটি রাষ্ট্রে ধর্ম প্রচার ও উপাসনালয় নির্মাণের অধিকার পান, কিন্তু সংখ্যাগুরু হওয়ার পর অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঠিক সেই একই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন, তখন তাকে একটি বিপজ্জনক দ্বৈতনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই আচরণ কেবল সংখ্যালঘুদের মৌলিক স্বাধীনতা হরণ করে না, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক ধরণের ‘রেডিলাইজেশন’ বা মৌলবাদের চক্র তৈরি করে। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যকার এই রক্ষণশীলতা এবং একপাক্ষিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর হতাশার জন্ম দেয়। এর ফলে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান মৌলবাদীদেরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়, যা প্রকারান্তরে পুরো বিশ্বকে এক সাম্প্রদায়িক হানাহানির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরণের বিভাজনমূলক প্রবণতা সভ্য সমাজের ঐক্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং মানুষের মধ্যে অবিশ্বাসের স্থায়ী দেয়াল তুলে দেয়।

একটি ন্যায়সংগত ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য যে ‘গোল্ডেন রুল’ বা স্বর্ণালী নীতি রয়েছে—অর্থাৎ “নিজে যা পেতে চাও অন্যের জন্য তাই করো”—সেটিই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। মুসলমানরা যখন অমুসলিম বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সমান নাগরিক অধিকারের সুফল নিয়ে নিজেদের ধর্মীয় জীবন যাপন করেন, তখন নৈতিকভাবেই তাদের ওপর এই দায়িত্ব বর্তায় যে, তারা যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন, তখন অমুসলিমদের জন্যও সেই একই পরিসর তৈরি করে দেবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কোনো ধর্মীয় শাসন বা কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া কেবল অমানবিক নয়, বরং এটি মানবাধিকারের বিশ্বজনীন ঘোষণাপত্রের চরম পরিপন্থী। সহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদকে কেবল সংখ্যালঘু থাকাকালীন সময়ের ‘সুবিধাবাদী ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার না করে, সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থায় একে একটি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করাই প্রকৃত সভ্যতার লক্ষণ। এমন একটি সমাজই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় যেখানে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের ধর্ম বড় নয়, বরং তার মানবিক অধিকারই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।


ডাক্তার জাকির নায়েকের দৃষ্টিভঙ্গিঃ ২+২=৪ মতবাদ

এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় আমরা যদি বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী ইসলামি বক্তা ড. জাকির নায়েকের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করি, তবে ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এক গভীর নৈতিক ও যৌক্তিক সংকট উন্মোচিত হয়। অমুসলিমদের অধিকার সংক্রান্ত একটি সাক্ষাৎকারে জাকির নায়েক যে যুক্তি প্রদান করেছেন, তা আধুনিক মানবাধিকারের ‘সার্বজনীনতা’ এবং ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা’র ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তিনি মূলত অমুসলিম প্রধান দেশে মুসলিমদের জন্য ধর্ম প্রচারের অধিকার দাবি করেন, কিন্তু মুসলিম প্রধান দেশে অমুসলিমদের জন্য সেই একই অধিকার প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। এই অবস্থানের সপক্ষে তিনি একটি গাণিতিক উপমা ব্যবহার করেন; তার মতে, ইসলাম হলো ‘২+২=৪’ এর মতো একটি ধ্রুব সত্য, আর অন্যান্য ধর্মগুলো হলো ‘২+২=৫’ বা ‘২+২=৩’ এর মতো ভুল সমীকরণ। ফলে, তার যুক্তি অনুযায়ী, কোনো বিবেকবান মানুষ যেমন ভুল অংক প্রচার করতে দিতে পারে না, তেমনি মুসলিমরাও অন্য কোনো ‘ভ্রান্ত’ ধর্মের উপাসনালয় নির্মাণ বা প্রচারের অনুমতি দিতে পারে না।

জাকির নায়েকের এই যুক্তিটি মূলত একটি ‘লজিক্যাল ফ্যালাসি’ বা যৌক্তিক হেত্বাভাস। গণিত যেখানে বস্তুনিষ্ঠ ও পরীক্ষাগারে প্রমাণযোগ্য সত্য, ধর্ম সেখানে একান্তই ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিষয়। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের বিশ্বাসকে একমাত্র ‘বস্তুনিষ্ঠ সত্য’ হিসেবে দাবি করে অন্যের মৌলিক অধিকার হরণ করে, তখন তা আর ন্যায়বিচারের পর্যায়ে থাকে না, বরং তা একটি আধিপত্যবাদী রূপ ধারণ করে। মানবাধিকারের মূল ভিত্তি হলো—প্রত্যেক মানুষ তার নিজের কাছে নিজের বিশ্বাসকে সত্য মনে করার অধিকার রাখে এবং রাষ্ট্র কাউকে তার বিশ্বাসের ভিত্তিতে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করতে পারে না বা তার অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না। জাকির নায়েকের এই ‘একতরফা সত্যের’ ধারণা কেবল পরমতসহিষ্ণুতার পরিপন্থীই নয়, বরং এটি সেই সব মুসলিমদের নৈতিক অবস্থানকেও দুর্বল করে দেয় যারা পশ্চিমা বা ধর্মনিরপেক্ষ দেশগুলোতে সমান অধিকার দাবি করে জীবন যাপন করছেন।


প্রাতিষ্ঠানিক অবমাননা ও মনস্তাত্ত্বিক বলপ্রয়োগের কৌশল

ব্রিটেনের মতো পশ্চিমা দেশগুলোতে সক্রিয় কিছু ইসলামি প্রচারকের বক্তব্যেও এই আধিপত্যবাদী ও বৈষম্যমূলক মানসিকতার চরম প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। একটি ভিডিওতে একজন ইসলামি স্কলারকে ব্যাখ্যা করতে দেখা যায় যে, একটি ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের সাথে ঠিক কেমন আচরণ করা উচিত। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে এক ধরণের সুপরিকল্পিত সামাজিক ও আইনি কাঠামোর চিত্র, যেখানে অমুসলিমদের প্রতি পদে পদে অপমানিত এবং লাঞ্ছিত বোধ করানো হয়। এই প্রচারকের মতে, অমুসলিমদের এমন এক অধস্তন অবস্থায় রাখা প্রয়োজন যাতে তারা নিজেদের সামাজিকভাবে প্রান্তিক ও হীনম্মন্য বলে মনে করে। এই কৌশলী অবমাননার মূল লক্ষ্য হলো তাদের ওপর এক ধরণের দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা নিজেদের বিদ্যমান জীবনব্যবস্থাকে দুর্বিষহ মনে করতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত পরিত্রাণ হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। নিদেনপক্ষে তার ছোট ছোট সন্তানেরা যেন পিতামাতার লাঞ্ছনাময় জীবন দেখে দেখে বড় হয়, এবং একসময়ে আর সহ্য করতে না পেরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য হয়,

এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি কেবল মানবাধিকারের বৈশ্বিক সনদের পরিপন্থী নয়, বরং এটি সুস্থ সামাজিক নৈতিকতারও চরম অবক্ষয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নাগরিকের মর্যাদা তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। কিন্তু যখন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক দর্শনে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ হিসেবে গণ্য করে তাদের লাঞ্ছিত করার বৈধতা দেওয়া হয়, তখন তা আর আধ্যাত্মিকতার স্তরে থাকে না; বরং তা একটি নিপীড়ক রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। এটি সেই ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক কাঠামোর প্রতি এক ধরণের চরম বিশ্বাসঘাতকতা, যে ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এই প্রচারকরা নিজেরাই পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্ম প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছেন। অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের এই উগ্র আকাঙ্ক্ষা সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল আরও মজবুত করে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।


সহাবস্থানের সংকট ও সংঘাতের আদর্শিক ভিত্তি

ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার বিপরীতে এক বিশাল সংখ্যক রক্ষণশীল ইসলামি চিন্তাধারায় চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুইজন বিখ্যাত আলেমের বক্তব্যে যখন দাবি করা হয় যে, মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কার্যত অসম্ভব, তখন তা আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন ও মানবিক সংহতির মূলে কুঠারাঘাত করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ইসলাম কেবল একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ধর্ম নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্যের দাবিদার, যা অন্য কোনো মতাদর্শ বা জীবনব্যবস্থার সাথে আপোষ করতে নারাজ। তাদের মতে, ‘কুফরি’ বা ‘তাগুত’ (যাকে তারা খোদাদ্রোহী শক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে) নির্মূল করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করাই হলো চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা ‘জিহাদ’-কে একটি আধিপত্যবাদী হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবর্তে সংঘাতের পথকে অনিবার্য করে তোলে।

যৌক্তিক ও মানবাধিকারের মানদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, এই ধরণের চরমপন্থী বয়ান একটি সিভিল সোসাইটি বা সভ্য সমাজের ভিত্তিকে ধসিয়ে দেয়। আধুনিক বিশ্ব ‘লিভ অ্যান্ড লেট লিভ’ (নিজে বাঁচো এবং অন্যকে বাঁচতে দাও) নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা সুনিশ্চিত। কিন্তু যখন কোনো গোষ্ঠী অন্যকে ‘শত্রু’ বা ‘অস্বীকৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের হটিয়ে দেওয়ার ডাক দেয়, তখন তা প্রকারান্তরে একটি অন্তহীন যুদ্ধের আহ্বান হয়ে দাঁড়ায় [1] । এটি কেবল অমুসলিমদের জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এটি খোদ মুসলিমদের জন্যও আত্মঘাতী; কারণ এই একই যুক্তি যদি পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও গ্রহণ করে, তবে সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলিমদের অস্তিত্বও সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। সুতরাং, ধর্মের দোহাই দিয়ে সহাবস্থানকে অস্বীকার করা কেবল নৈতিকভাবেই অগ্রহণযোগ্য নয়, বরং এটি একটি চরম যুক্তিহীন ও অদূরদর্শী অবস্থান। যারা এই প্রসঙ্গে কোরআনের যার যার দ্বীন তার তার কিংবা ধর্মে কোন জোরাজুরি নেই আয়াতগুলোর কথা ভাবছেন, তারা এই প্রবন্ধগুলো পড়ে দেখতে পারেন [2] [3] [4]

এবারে আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আহমাদুল্লাহর একটি ভিডিও দেখে নিই। এই ভিডিওর এই বক্তব্যে অমুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণাটিকে একটি সাময়িক এবং কৌশলগত ব্যবস্থা হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যা প্রকারান্তরে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করে। বক্তা আহমাদুল্লাহ মদিনা সনদকে একটি “চুক্তি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা কেবল পরিস্থিতির চাপে ইহুদিদের সাথে করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সূরা তাওবার মাধ্যমে তা “বাতিল” বা “রহিত” হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি এই বার্তাই দিচ্ছেন যে, অমুসলিমদের সাথে সমানাধিকারভিত্তিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ইসলামের চিরস্থায়ী আদর্শ নয়। বিশেষ করে, অমুসলিমদের ওপর অবমাননাকর ‘জিজিয়া’ বা কর আরোপ করে তাদের ‘নাগরিক’ নয় বরং নির্দিষ্ট ‘ফি’ দিয়ে বসবাসের শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক রাষ্ট্রের সমান নাগরিক অধিকারের ধারণার পরিপন্থী। বক্তা অমুসলিমদের সাথে “কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকা” বা “জগাখিচুড়ি হয়ে থাকা” বিষয়টিকে একটি “ধোঁকা” হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং ইহুদিদের সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক ও বর্ণবাদী মন্তব্য (যেমন: তারা চতুর বা বাহির থেকে এসে খুটি গেড়েছে) করে তাদের প্রতি এক ধরণের সামাজিক ঘৃণা ও অবিশ্বাস উসকে দিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, অমুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে একটি “সুবিধাবাদী” এবং “রহিত” ব্যবস্থা হিসেবে দেখিয়ে তিনি তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদাকে খাটো করেছেন।


খলিফা উমরের চুক্তিঃ পদ্ধতিগত বৈষম্যের ঐতিহাসিক দলিল

ইসলামী শাসনব্যবস্থায় অমুসলিম বা ‘জিম্মি’ নাগরিকদের সামাজিক ও আইনি অবস্থান পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘উমরের চুক্তি’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। এই চুক্তিটি মূলত খলিফা উমরের শাসনামলে বিজিত শাম (সিরিয়া) অঞ্চলের অমুসলিমদের সাথে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বলে বর্ণিত আছে। প্রখ্যাত তাফসীরকারক ইবনে কাসীরের বর্ণনা থেকে এই চুক্তির যে স্বরূপ পাওয়া যায়, তা আধুনিক মানবাধিকার এবং নাগরিক সমঅধিকারের ধারণার সাথে সম্পূর্ণ বৈপরীত্য প্রকাশ করে। এই চুক্তির মূল সুরটি ছিল অমুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্রে একটি স্থায়ীভাবে অধস্তন এবং অবদমিত গোষ্ঠী হিসেবে রাখা, যেখানে তাদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর কঠোর ও অপমানজনক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

এই চুক্তির শর্তাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে অমুসলিমদের জন্য নতুন কোনো গির্জা, মঠ বা উপাসনালয় নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি পুরনো কোনো ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে তা পুনর্নির্মাণের অধিকারও তাদের ছিল না। সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও তাদের ওপর চরম বৈষম্যমূলক বিধি আরোপ করা হয়েছিল; যেমন—তারা মুসলমানদের অনুকরণে কোনো পোশাক পরতে পারবে না, মাথায় পাগড়ি বা পায়ে জুতা পরার ক্ষেত্রেও তাদের বিশেষ নিয়ম মেনে চলতে হবে যাতে তাদের আলাদাভাবে ‘নিচু’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা ঘোড়ায় চড়লে গদি ব্যবহার করতে পারবে না এবং কোনো অস্ত্র বহন করতে পারবে না। ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে তাদের ওপর এতটাই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল যে, তারা জনসম্মুখে ক্রুশ প্রদর্শন করতে পারত না, উচ্চস্বরে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতে পারত না, এমনকি মৃতদেহ বহনের সময় শব্দ করে কাঁদতেও পারত না। এই শর্তগুলো কেবল ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার পরিচয় দেয় না, বরং এগুলো একটি জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করার মাধ্যমে তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ [5]

ধর্ম
ধর্ম 1

আশরাফুল হিদায়াতে অমুসলিমদের অধিকার

হানাফী ফিকাহশাস্ত্রের অন্যতম মৌলিক ও প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘আশরাফুল হিদায়া’-তে অমুসলিম বা জিম্মি নাগরিকদের অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়ে যে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করলে মারাত্মক পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে। এই গ্রন্থের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি ইসলামি রাষ্ট্র বা ‘দারুল ইসলাম’-এ অমুসলিমদের জন্য নতুন কোনো উপাসনালয় বা গির্জা নির্মাণ করা আইনত নিষিদ্ধ। এর তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামি রাষ্ট্রে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব এবং এর নিদর্শনাদি সংরক্ষিত রাখা আবশ্যক; ফলে এমন কোনো ধর্মীয় স্থাপনা তৈরি করতে দেওয়া যাবে না যা ইসলামের বিপরীতে অন্য কোনো বিশ্বাসের প্রভাব বা দৃশ্যমান উপস্থিতি জাহির করে [6]। যদিও পুরনো গির্জা বা উপাসনালয় মেরামতের সুযোগের কথা বলা হয়েছে, তবে সেটিকে স্থানান্তর করার অনুমতি দেওয়া হয়নি, কারণ স্থানান্তরকে প্রকৃতপক্ষে নতুন নির্মাণের সমতুল্য হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধরণের বিধান মূলত অমুসলিমদের ধর্মীয় চর্চাকে একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার একটি আইনি কৌশল, যা আধুনিক বিশ্বের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সমান নাগরিকত্বের ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সংঘাতপূর্ণ।

অনুবাদ: অনুচ্ছেদ: দারুল ইসলামে গির্জা ও উপাসনালয় নতুনভাবে তৈরি করা জায়েজ নয়।
কেননা রাসূলুল্লাহ বলেছেন- لا حصاء في الإسلام ولا كنيسة অর্থাৎ ইসলামে খোঁজাকারণ ও গির্জার অবকাশ নেই। উদ্দেশ্যে হলো নতুনভাবে তৈরি করা।
যদি প্রাচীন গির্জা বা উপাসনালয় ভেঙ্গে যায়, তাহলে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে পারে। কেননা ভবন তো চিরস্থায়ী থাকে না। অথচ শাসক যখন দারুল ইসলামে তাদের বহাল রেখেছেন তখন (ধরে নেওয়া হবে যে,) তিনি তাদের পুনর্নির্মাণের সুযোগ দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তাদের তা স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হবে না। কেননা প্রকৃতপক্ষে এটা নতুন বানানো। আর নির্জনতার জন্য সাধুনিবাস গির্জার সমতুল্য। তবে ঘরে প্রার্থনাস্থল নির্ধারণের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা সেটা বাসস্থানের অনুবর্তী।
(নিষেধাজ্ঞা) এ বিধান শহরের সাথে সীমিত। গ্রামে প্রযোজ্য নয়। কেননা শহরেই ইসলামের বিশিষ্ট নিদর্শনসমূহ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। সুতরাং তার বিপরীত কিছু প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না।
কারো কারো মতে আমাদের দেশে গ্রামেও নিষেধ করা হবে। কেননা সেখানেও কতিপয় ইসলামি নিদর্শন রয়েছে। আর মাযহাব প্রধান ইমাম আবু হানীফা (র.) হতে যা বর্ণিত হয়েছে তা হলো কুফার প্রমাঞ্চল সম্পর্কে। কেননা সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী হলো জিম্মি।
আরব ভূখণ্ডে শহরে-গ্রামে সবত্রই নিষেধ করা হবে। কেননা রাসূল বলেছেন- لا يجتمع بينان في جزيرة الغرب অর্থাৎ জাবীরাতুল আরবে দুটি দীন একত্র হতে পারে না।
শব্দ-বিশ্লেষণ: خ – خضاء হরফে যেরযোগে। শব্দটি মাসদার বা ক্রিয়ামূল। তার অর্থ হলো خضۂ বা অণ্ডকোষ বের করা বা কেটে ফেলে দেওয়া।
بيغه – শব্দটি একবচন। তার বহুবচন হলো بیع।
که শব্দটি ও একবচন। এর বহুবচন হলো كَنَائش
মূলত بيعة এবং كنيسة উভয় শব্দ ইহুদি ও খ্রিস্টান উভয়ের উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে শুধু ইহুদিদের উপাসনালয়কে কানীসাহ বলা হতে থাকে। আর খ্রিস্টানদের উপাসনালয়কে বলা হয় বীআ।
বক্ষ্যমাণ অনুচ্ছেদে মূলত জিম্মি সম্পর্কিত আরো কিছু বিধিবিধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মতনে উল্লিখিত মাসআলার মর্ম হলো, ইসলাম ধর্মে কোনো পুরুষের অণ্ডকোষ কোটে তাকে খাসি বানানোর অনুমতি নেই। অনুরূপভাবে দারুল ইসলামে ইহুদি বা খ্রিস্টানদের জন্য নতুনভাবে গির্জা নির্মাণ করাও বৈধ নয়। এ সম্পর্কে দলিল হলো রাসূল-এর বাণী لَا خِصَاءَ وَلَا كَبَيْسَةَ فِي الْإِسْلَام এ হাদীসটি ইমাম বায়হাকী, আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম, ইবনে আদী প্রমুখ মুহাদ্দিস নিজ নিজ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস ও ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদীসটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে।
প্রশ্ন হতে পারে যে, রাসূল দুয়ের সামঞ্জস্য কি? খোঁজাকরণ (নপংসুক) ও গির্জা নির্মাণ বিষয় দুটিকে একত্রে উল্লেখ করেছেন কেন?
এর উত্তর হলো এই যে, দুইয়ের মাঝে সামঞ্জস্য রয়েছে। তা এভাবে যে, গির্জা হয়ে থাকে খ্রিস্টানদের। তদ্রূপ খোঁজাকরণের নিয়মও খ্রিস্টানদের মাঝে প্রচলিত ছিল, তাই রাসূলুল্লাহও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট দুটি বিষয় একত্রে নিষিদ্ধ করেছেন।
কেউ কেউ এরূপ সমঞ্জস্যও বর্ণনা করেছন যে, খোঁজার কারণ হলো মানুষের ক্ষেত্রে একটি দুর্বলতা, আর দারুল ইসলামে গির্জা নির্মাণ হলো ইসলামের একটি দুর্বলতা, তাই দুটি দুর্বলতা সম্পর্কে রাসূল একত্রে সতর্ক করেছেন।
কারো কারো মতে প্রকৃত ব্যাপার হলো এই যে, এক ব্যক্তি রাসূলকে খোঁজাকরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছে। তখনই সাথে সাথে আরেক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছে, গির্জা বানানো সম্পর্কে। এরপর রাসূল উভয় প্রশ্নকারীর জবাব একসঙ্গে এভাবে দিয়েছেন যে, … কিংবা ধ্বংস হয়ে গেল পুননির্মাণ করতে পারবে। পুরাতন গির্জা দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো, মুসলমানদের বিজয় লাভ করার পূর্বকাল হতে যেসব গির্জা বিদ্যমান থাকে।
জাযীরাতুল আরবের গ্রাম-শহর সবখানেই গির্জা নির্মাণ নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো, রাসূলুল্লাহ-এর বাণী لا يَجْتَیعُ دِينَانِ فِي جَزِيرَةِ الْغَرْبِ াৎ আরব ভূখণ্ডে দুটি দীন একত্র হতে পারে না। হাদীসটি ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। যার সনদ ও মতন নিম্নরূপ:
قَالَ رَاهْوَيْة : أَخْبَرَنَا النَّضْرُ بْنُ شُمَيْلٍ حَدَّثَنَا صَالِحُ ابْنُ أَبِي الْأَحْوَصِ عَنِ الزُّهْرِى عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رض) أن النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فِي مَرَضِهِ الَّذِي تُوُفِّيَ فِيْهِ لَا يَجْتَمِعُ دِينَانِ فِي جَزِيرَةِ الْعَرَبِ.
অর্থাৎ উল্লিখিত সনদে হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ তাঁর অন্তিম অসুস্থতাকালে ইরশাদ করেছেন, জাযীরাতুল আরবে দুটি দীন একত্র হতে পারে না।
অনুবাদ: ইমাম কুদূরী (র.) বলেন, জিম্মিদেরকে তাদের পোশাকে, বাহনে, জিন বা গদিতে এবং টুপিতে মুসলমানদের থেকে ভিন্নতা রক্ষা করতে বাধ্য করা হবে। সুতরাং তারা ঘোড়ায় চড়বে না এবং অস্ত্র বহন করবে না।
জামেউস সগীর কিতাবে রয়েছে যে, জিম্মিদের বাধ্য করা হবে তাদের ধর্মীয় ডোর প্রকাশ্যভাবে বাঁধতে এবং গাধার পিঠে ব্যবহৃত জিনের অনুরূপ জিন ব্যবহর করতে। এ বিষয়ে বাধ্য করার কারণ হচ্ছে তাদের প্রতি তুচ্ছতা প্রকাশ করা এবং দুর্বল মুসলমানদের ঈমান রক্ষা করা। তাছাড়া মুসলমান হলো সম্মানের যোগ্য আর জিম্মি হলো অসম্মানের যোগ্য। তাকে আগে সালাম দেওয়া যাবে না এবং রাস্তায় তাকে পাশ কেটে যেতে বাধ্য করা হবে। অথচ তার মাঝে যদি পার্থক্যকারী কোনো চিহ্ন না থাকে, তাহলে হয়তো তার সাথে মুসলমানদের অনুরূপ আচরণ করা হবে যা জায়েজ নয়।
আর চিহ্ন হতে হবে পশমের মোটা ডোর যা তাদের কোমরে বাঁধবে। রেশমের ডোর বাঁধতে পারবে না। কেননা এতে মুসলমানদের প্রতি হাম বড়াই ভাব রয়েছে। পাথেঘাটে ও হাম্মামখানায় তাদের নারীরা আমাদের নারীদের থেকে পৃথক পরিচয় বহন করবে এবং তাদের বাড়িঘরেও পরিচয় চিহ্ন রাখবে, যাতে তাদের দুয়ারে ভিক্ষুক গিয়ে না দাঁড়ায় এবং তাদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া না করে।
মাশায়েখগণ বলেছেন, বরং অধিকতর সঙ্গত হলো প্রয়োজন ছাড়া তাদেরকে বাহনে আরোহণ করতে না দেওয়া।
আর প্রয়োজনে আরোহণ যদি করেই, তাহলে মুসলমানদের সমাবেশ স্থলে যেন নেমে যায়। আর বাহনে আরোহণের প্রয়োজন যদি দীর্ঘ স্থায়ী হয় তাহলে যেন পূর্ববর্ণিত রকমের জিন (গাধার পিঠে ব্যবহৃত জিনের অনুরূপ জিন) ব্যবহার করে। আলেম, বুজুর্গ ও অভিজ্ঞাত লোকদের বিশিষ্ট পোশাক ব্যবহার করা থেকে তাদের বিরত রাখা হবে।

ধর্ম 3
শরিয়া
ধর্ম 6

আশরাফুল হিদায়ার এই অংশে অমুসলিমদের ওপর কেবল ধর্মীয় নয়, বরং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের ওপরও চরম অবমাননাকর বিধিবিধানের কথা বর্ণিত হয়েছে। নাগরিকদের মধ্যে পোশাক, বাহন ও চলাফেরার ক্ষেত্রে যে বিভাজন রেখা টেনে দেওয়া হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যই হলো অমুসলিমদের সামাজিকভাবে তুচ্ছ ও নিচু প্রমাণ করা। এই বিধান অনুযায়ী, অমুসলিমদের এমন পোশাক পরতে বাধ্য করা হয় যাতে তারা মুসলমানদের থেকে আলাদা ও ‘নিকৃষ্ট’ হিসেবে চিহ্নিত থাকে। এমনকি তাদের বাহনের ক্ষেত্রেও গাধার পিঠে ব্যবহারের মতো বিশেষ জিন ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সম্মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ঘোড়ায় চড়া বা অস্ত্র বহন করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাস্তায় চলার সময় তাদের পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা এবং আগে সালাম দেওয়া থেকে বিরত থাকার যে বিধান, তা মূলত মানুষের আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি কেবল সাম্য ও মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, যা মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ‘সম্মানিত’ এবং ‘অসম্মানিত’—এই দুই মেরুতে বিভক্ত করে ফেলে।


উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ধর্মীয় অধিকারের ক্ষেত্রে এই দ্বৈতনীতি কেবল একটি রাজনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীরতর নৈতিক সংকট। যখন একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য সাম্য ও স্বাধীনতার সুযোগ গ্রহণ করে, কিন্তু অন্যের ক্ষেত্রে সেই একই সুযোগ রুদ্ধ করে দেয়, তখন তা ন্যায়বিচারের মূল চেতনাকে কলঙ্কিত করে। সভ্য সমাজের পরিচয় এখানে নয় যে, আমরা সংখ্যালঘু অবস্থায় কেমন অধিকার দাবি করি; বরং এর প্রকৃত পরীক্ষা হয় যখন আমরা সংখ্যাগুরু বা শক্তিশালী অবস্থানে থাকি। আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন আমাদের শেখায় যে, নাগরিকের মর্যাদা কোনো বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বা ঐতিহাসিক চুক্তির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, বরং তা হওয়া উচিত সার্বভৌম মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে। ধর্মের নামে বিভাজন, ঘৃণা বা অপরকে লাঞ্ছিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত একটি আত্মঘাতী পরিবেশ তৈরি করে, যা কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন এমন এক মানবিক চেতনা, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যকে সমমর্যাদার মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে শিখবে। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং পরমতসহিষ্ণুতাকে কেবল সাময়িক কৌশলী অস্ত্র হিসেবে নয়, বরং একটি চিরন্তন আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করাই হবে আধুনিক সভ্যতার প্রকৃত সার্থকতা।

ধর্ম 8

তথ্যসূত্রঃ
  1. ইসলামি জিহাদের লক্ষ্যঃ শিরক নিশ্চিহ্ন না হওয়া অবধি কিয়ামত পর্যন্ত আক্রমণাত্মক জিহাদ-কিতাল চালাতে হবে ↩︎
  2. লা ইকরাহা ফিদ-দীনঃ ইসলামে কি আসলেই কোন জবরদস্তি নেই? ↩︎
  3. লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীনঃ তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আমাদের ধর্ম আমাদের? ↩︎
  4. কোরআনের আয়াত বিশ্লেষণঃ নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা মানবজাতিকে হত্যা? ↩︎
  5. তাফসিরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৬৬-৫৬৭ ↩︎
  6. আশরাফুল হিদায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯৩-৪৯৫ ↩︎