Knowledge Base Article

মুমিন হচ্ছে নাকে দড়ি বাধা উট

প্রকাশিত: এপ্রিল 23, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 5 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ধর্মীয় বিশ্বাসব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—সেগুলো সাধারণত নিজেদেরকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, কোনো দাবিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে তাকে যুক্তি, অভিজ্ঞতা এবং প্রমাণের আলোকে পরীক্ষা করা মানববুদ্ধির একটি মৌলিক প্রবণতা। দর্শন, বিজ্ঞান এবং আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বে এই অনুসন্ধানী মনোভাবকে জ্ঞানের অগ্রগতির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইসলামের ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এখানে উঠে আসে: একজন মুসলিমের জন্য ধর্মীয় নির্দেশনা অনুসরণের আদর্শ পদ্ধতি কী—সমালোচনামূলক চিন্তার মাধ্যমে যাচাই করা, নাকি প্রশ্নহীন আনুগত্যের মাধ্যমে গ্রহণ করা? ইসলামের কোরআন ও হাদিস এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদ্ধতিটিকেই আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে একটি বহুল আলোচিত হাদিসে মুমিন ব্যক্তিকে এমন এক উটের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যার নাসারন্ধ্রে লাগাম পরানো থাকে—যে দিকেই তাকে টেনে নেওয়া হয়, সে বাধ্য হয়ে সেদিকেই এগিয়ে যায়। এই উপমাটি কেবল একটি রূপক নয়; বরং ইসলামী আনুগত্যের ধারণাকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগত কাঠামো তৈরি করে। এই প্রবন্ধে সেই ধারণাটির যৌক্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হবে।


হাদিসে মুমিনের উপমাঃ লাগাম পরানো উট

ইসলামের হাদিস গ্রন্থসমূহেবর্ণিত একটি বক্তব্যে বলা হয়েছে, মুমিন ব্যক্তি এমন এক উটের মতো যার নাসারন্ধ্রে লাগাম পরানো থাকে। যে দিকেই তাকে টেনে নেওয়া হয়, সে বাধ্য হয়ে সেই দিকেই অগ্রসর হয়। যার অর্থ হচ্ছে, একজন প্রকৃত মুমিন ব্যাক্তিকে হতে হবে নাসারন্ধ্রে লাগাম পরানো উটতুল্য। লাগাম ধরে যে দিকেই তাকে টানা হয়, সে দিকেই যেতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ইসলামের বিধান সমূহ অন্ধভাবে বিশ্বাস করা এবং মেনে নেয়া। কোন ধরণের যাচাই বাছাই করে দেখা, যুক্তি প্রমাণ দিয়ে চিন্তা করে তারপরে মেনে নেয়া কিংবা না মানার সিদ্ধান্ত নেয়া, এগুলো কিছুই ইসলাম সমর্থন করে না। যুক্তি তথ্য প্রমাণ দিয়ে যাচাই করে দেখার কোন সুযোগই ইসলাম রাখে নি [1]

সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ৬. হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ি রাশিদীনের সুন্নাতের অনুসরণ।
২/৪৩। ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন হৃদয়গ্রাহী নাসীহাত করেন যে, তাতে (আমাদের) চোখগুলো অশ্রু ঝরালো এবং অন্তরসমূহ প্রকম্পিত হল। আমরা বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! এতো যেন নিশ্চয়ই বিদায়ী ভাষণ। অতএব আপনি আমাদের থেকে কি প্রতিশ্রুতি নিবেন (আদেশ দিবেন)? তিনি বলেনঃ আমি তোমাদের আলোকিত দ্বীনের উপর রেখে যাচ্ছি, তার রাত তার দিনের মতই (উজ্জ্বল)। আমার পরে নিজেকে ধ্বংসকারীই কেবল এ দ্বীন ছেড়ে বিপথগামী হবে।
তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে সে অচিরেই অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। অতএব তোমাদের উপর তোমাদের নিকট পরিচিত আমার আদর্শ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের আদর্শ অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। তোমরা তা শক্তভাবে দাঁত দিয়ে আকড়ে ধরে থাকবে। তোমরা অবশ্যই আনুগত্য করবে, যদি হাবশী গোলামও (তোমাদের নেতা নিযুক্ত) হয়। কেননা মুমিন ব্যাক্তি হচ্ছে নাসারন্ধ্রে লাগাম পরানো উটতুল্য। লাগাম ধরে যে দিকেই তাকে টানা হয়, সে দিকেই যেতে বাধ্য হয়।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। 
তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ ৯৩৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইরবায ইবনু সারিয়াহ্ (রাঃ)

এই উপমাটি ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আনুগত্যের ধারণাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে বিশ্বাসীর আদর্শ আচরণ হিসেবে এমন একটি মানসিক অবস্থার কথা বলা হয়েছে যেখানে ধর্মীয় নির্দেশনা প্রশ্নাতীতভাবে মেনে নেওয়াই শ্রেয়। অর্থাৎ ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যই এখানে ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

হাদিসটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন ইসলামী ব্যাখ্যাগ্রন্থেও একই ধরনের ধারণা পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দরসে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, একজন মুমিনের কর্তব্য হচ্ছে ধর্মীয় নির্দেশনাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং নেতৃত্ব বা ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা। এবারে আসুন এই হাদিসটির ব্যাখ্যা জেনে নিই দরসে ইবনে মাজাহ গ্রন্থ থেকে [2]

মুমিন

আলেমদের বক্তব্যঃ কীভাবে হবেন নাকে দড়ি বাধা উট?

আসুন প্রখ্যাত আলেম মুফতি ইব্রাহিমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,

এবারে আসুন আহমদুল্লাহর একটি বক্তব্য শুনে নিই,


আনুগত্য বনাম সমালোচনামূলক চিন্তা

মানবসভ্যতার বৌদ্ধিক ইতিহাসে একটি মৌলিক নীতি হলো—যে কোনো দাবির ক্ষেত্রে তার পক্ষে প্রমাণ ও যুক্তি অনুসন্ধান করা। আজকের পৃথিবীতে হাজার হাজার ধর্ম ও মতবাদ বিদ্যমান, এবং প্রতিটিরই নিজস্ব সত্যের দাবি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো দাবিকে যাচাই করার জন্য প্রশ্ন তোলা এবং প্রমাণ অনুসন্ধান করা একটি স্বাভাবিক বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া।

বিজ্ঞান ও দর্শনের পদ্ধতিতে কোনো ধারণা গ্রহণ করার আগে তাকে সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ভুল ধারণা সংশোধিত হয় এবং জ্ঞানের পরিধি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। কিন্তু যখন কোনো বিশ্বাসকে প্রশ্নাতীত ঘোষণা করা হয় এবং সমালোচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়, তখন সেই বিশ্বাস জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে কর্তৃত্বভিত্তিক আনুগত্যের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।


ইসলামী আকীদার বিরুদ্ধে প্রমাণ চাওয়াও কুফরি

বিশ্বে বর্তমানে ৪,২০০-রও বেশি ধর্ম ও মতবাদ বিদ্যমান, প্রতিটিরই নিজস্ব কিছু মৌলিক বিশ্বাস, দাবি এবং ঐশী বা দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে। একজন যুক্তিনিষ্ঠ ও চিন্তাশীল মানুষের নৈতিক ও বৌদ্ধিক দায়িত্ব হলো—প্রতিটি দাবির ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা, তার পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ বা যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে তা অনুসন্ধান করা, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করা এবং তথ্য-তথ্যাদির আলোকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা—সব ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়াকে জ্ঞানের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু ইসলামী শরীয়াহ ও আকীদাহর কাঠামোতে এর সম্পূর্ণ বিপরীত একটি নীতি বিদ্যমান। এখানে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানই নয়, বরং এমনকি সেই বিশ্বাসের বিপরীত কোনো দাবির প্রমাণ চাইতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ইসলামী ফিকহ ও আকীদাহ শাস্ত্র অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ইসলামের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস—যেমন আল্লাহর অস্তিত্ব, কুরআনের ঐশী উৎস, মুহাম্মদের নবুয়ত, কিয়ামতের অবধারিত আগমন ইত্যাদি—এর বিপরীত কোনো বক্তব্য শুনে এবং কৌতূহলবশত বা বৌদ্ধিক সততার কারণে তার প্রমাণ চায়, তবে এই কর্মটি একটি সরাসরি “কুফর”, যার অর্থ হচ্ছে ভয়ঙ্করতম অপরাধের একটি।

অর্থাৎ, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো আকীদাহ-বিরোধী বক্তব্যকে যাচাই করার জন্যও প্রমাণের আবেদন করা ইসলামের মৌলিক আনুগত্যের নীতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। এখানে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য উন্মুক্ত অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করার বদলে, প্রশ্ন তোলার আগেই তা ধর্মের অবমাননা এবং ঈমানের পরিত্যাগ বলে বিবেচনা করা হয়। ফলস্বরূপ, একজন মুসলিমের জন্য জ্ঞানের স্বাধীন অনুসন্ধান ও বিশ্বাসের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা আইনগত ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়।


উপসংহার

উপরের আলোচনায় দেখা যায় যে ইসলামী হাদিস সাহিত্যের কিছু অংশে বিশ্বাসীর আদর্শ বৈশিষ্ট্য হিসেবে নিঃশর্ত আনুগত্যের ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মুমিনকে লাগাম পরানো উটের সঙ্গে তুলনা করার উপমাটি এই মানসিক কাঠামোটিকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে প্রশ্নের পরিবর্তে আনুগত্যকে প্রধান গুণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

কিন্তু আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দৃষ্টিকোণ থেকে সত্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনো দাবিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে তাকে সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা অপরিহার্য। ফলে প্রশ্নহীন আনুগত্যের ধারণা এবং স্বাধীন অনুসন্ধানের আদর্শের মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

এই দ্বন্দ্বটি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক নয়; বরং এটি মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত—মানুষ কি সত্যকে অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে পাবে, নাকি কর্তৃত্বের নির্দেশনা অনুসরণ করে তা মেনে নেবে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ৪৩ ↩︎
  2. সহজ দরসে ইবনে মাজাহ, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১২৭ ↩︎

Leave a comment

Your email will not be published.