
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 নূহের প্রার্থনা: অবিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক বিনাশের আবেদন
- 3 গণহত্যার ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি: জন্মের আগেই অপরাধী ঘোষণা
- 4 অবিশ্বাসকে অপরাধ বানানোর বিপজ্জনক নৈতিকতা
- 5 তাফসীরে ইবনে কাসীর: গণবিনাশের ব্যাখ্যা, নৈতিক সংকটের প্রশমন নয়
- 6 হেদায়াত যদি আল্লাহর হাতে, তবে কাফিরদের অপরাধ কোথায়?
- 7 আবু তালিবের ঘটনা: নবীও হেদায়াত দিতে পারেন না
- 8 দৈব নিয়ন্ত্রণ ও মানবদায়: কোরআনিক যুক্তির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ
- 9 উপসংহার
ভূমিকা
ধর্মীয় আখ্যানের নৈতিক মূল্যায়ন করতে গেলে একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না: কোনো কাহিনি পবিত্র গ্রন্থে আছে বলেই কি সেটি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়? কোনো চরিত্রকে নবী, রাসূল বা ঈশ্বর-নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা হলেই কি তার বক্তব্য, প্রার্থনা বা কর্মকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে? আধুনিক নৈতিক দর্শন, মানবাধিকার-চিন্তা এবং যুক্তিবাদী বিচারপদ্ধতির দৃষ্টিতে উত্তরটি স্পষ্ট—না। কোনো দাবির উৎস যতই পবিত্র, প্রাচীন বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত হোক, তার নৈতিক ও যৌক্তিক পরিণতি পরীক্ষা করার অধিকার মানুষের আছে। বরং যে দাবি মানুষের জীবন, মৃত্যু, শাস্তি, দায়িত্ব, অপরাধ, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মতো গভীর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত, সেটিকে আরও কঠোরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
এই প্রবন্ধে কোরআনের নূহ-আখ্যানের একটি বিশেষ অংশকে সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টিতেই পরীক্ষা করা হবে। এখানে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে নূহ নবীর সেই প্রার্থনা, যেখানে তিনি অবিশ্বাসীদের কাউকেই পৃথিবীতে অবশিষ্ট না রাখার আবেদন করেন; এবং সেই প্রার্থনার পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, অবিশ্বাসীরা অন্যদের পথভ্রষ্ট করবে এবং ভবিষ্যতে শুধু পাপাচারী অবিশ্বাসী সন্তান জন্ম দেবে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি ধর্মীয় কাহিনি মনে হলেও, এর ভেতরে রয়েছে অত্যন্ত গভীর নৈতিক ও দার্শনিক সমস্যা: সামষ্টিক শাস্তি, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অপরাধের ভিত্তিতে বিনাশ, শিশু ও অনাগত প্রজন্মকে গোষ্ঠী-পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা, এবং সর্বোপরি—হেদায়াত ও ভ্রষ্টতার দায় আসলে কার ওপর বর্তায় সেই প্রশ্ন।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো বিশ্বাসী ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা নয়; বরং একটি ধর্মীয় টেক্সটের অভ্যন্তরীণ যুক্তি, নৈতিক পরিণতি এবং দার্শনিক সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা। যদি একই ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরে একদিকে বলা হয় যে হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা চূড়ান্তভাবে ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণাধীন, অন্যদিকে আবার সেই পথভ্রষ্টতার জন্য মানুষকে সমূলে ধ্বংস করা হয়, তাহলে সেখানে ন্যায়বিচার, স্বাধীন ইচ্ছা, দায়বদ্ধতা এবং করুণার ধারণা গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই প্রবন্ধ সেই প্রশ্নগুলোকে সরাসরি সামনে আনবে এবং দেখাবে, পবিত্রতার আবরণ সরিয়ে টেক্সটটিকে মানবিক ও যুক্তিনিষ্ঠ মাপকাঠিতে বিচার করলে কী ধরনের নৈতিক সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নূহের প্রার্থনা: অবিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক বিনাশের আবেদন
কোরআনের নূহ-আখ্যানের সবচেয়ে নৈতিকভাবে সমস্যাজনক অংশগুলোর একটি হলো সূরা নূহের ২৬–২৭ নম্বর আয়াত। এখানে নূহ নবী তাঁর দীর্ঘ প্রচারকাজের ব্যর্থতার পর আল্লাহর কাছে এমন একটি প্রার্থনা করেন, যার সরল অর্থ দাঁড়ায়—পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী অবিশ্বাসীদের একজনকেও যেন জীবিত রাখা না হয়। এই প্রার্থনাটি কেবল কিছু নির্দিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে নয়, কোনো নির্দিষ্ট সহিংস গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও নয়; বরং “কাফির” পরিচয়ধারী পুরো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। অর্থাৎ এখানে বিচার হচ্ছে ব্যক্তির অপরাধ, কর্মকাণ্ড বা প্রমাণিত দোষের ভিত্তিতে নয়; বরং বিশ্বাসগত পরিচয়ের ভিত্তিতে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, পরের আয়াতে এই গণবিনাশের যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে—তাদের বাঁচিয়ে রাখলে তারা অন্যদের পথভ্রষ্ট করবে এবং ভবিষ্যতে কেবল পাপাচারী কাফির সন্তান জন্ম দেবে। এই যুক্তি আধুনিক নৈতিকতার ভাষায় একধরনের প্রজন্মগত অপরাধ আরোপ বা collective guilt-এর ধারণার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে বর্তমান প্রজন্মকে শুধু তাদের নিজস্ব কাজের জন্য নয়, ভবিষ্যতে তাদের সন্তানরা কী হতে পারে—সেই অনুমানের ভিত্তিতেও ধ্বংসের যোগ্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। আসুন নূহ নবীর সেই প্রার্থনাটি পড়ি [1] [2] –
নূহ বলল, ‘হে আমার রব্ব! ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী কাফিরদের একজনকেও তুমি রেহাই দিও না।
— Taisirul Quran
নূহ আরও বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিওনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর নূহ বলল, ‘হে আমার রব! যমীনের উপর কোন কাফিরকে অবশিষ্ট রাখবেন না’।
— Rawai Al-bayan
নূহ্ আরও বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! যমীনের কাফিরদের মধ্য থেকে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দেবেন না [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআন, সূরা নূহ, আয়াত ২৬
তুমি যদি তাদেরকে রেহাই দাও, তাহলে তারা তোমার বান্দাহদেরকে গুমরাহ করে দেবে আর কেবল পাপাচারী কাফির জন্ম দিতে থাকবে।
— Taisirul Quran
তুমি তাদেরকে অব্যাহতি দিলে তারা তোমার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুস্কৃতিকারী ও কাফির।
— Sheikh Mujibur Rahman
‘আপনি যদি তাদেরকে অবশিষ্ট রাখেন তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং দুরাচারী ও কাফির ছাড়া অন্য কারো জন্ম দেবে না’।
— Rawai Al-bayan
আপনি তাদেরকে অব্যাহতি দিলে তারা আপনার বান্দাদেরকে বিভ্ৰান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে শুধু দুস্কৃতিকারী ও কাফির।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআন, সূরা নূহ, আয়াত ২৭
এই আয়াতদ্বয়ের নৈতিক সমস্যা শুধু “কাফিরদের ধ্বংস” কথাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর যুক্তিগত কাঠামোতে। এখানে অবিশ্বাসকে এমন এক বংশগত বিপদ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যার কারণে বর্তমান অবিশ্বাসী জনগোষ্ঠী তো বটেই, তাদের ভবিষ্যৎ সন্তানদেরও আগাম ধ্বংসযোগ্য ধরে নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিচারটি ব্যক্তির প্রমাণিত অপরাধের ভিত্তিতে নয়, বিশ্বাসগত পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ অনুমানের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। এইখানেই ন্যায়বিচারের ব্যক্তিকেন্দ্রিক নীতি ভেঙে পড়ে।
গণহত্যার ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি: জন্মের আগেই অপরাধী ঘোষণা
এই আয়াতগুলোর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হচ্ছে, এখানে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে শুধু বর্তমানের অভিযোগ আনা হচ্ছে না; তাদের ভবিষ্যৎ সন্তানদেরও জন্মের আগেই অপরাধী ঘোষণা করা হচ্ছে। যুক্তিটি দাঁড়াচ্ছে এমন—কাফিররা বেঁচে থাকলে তারা অন্যদের পথভ্রষ্ট করবে এবং ভবিষ্যতে কেবল পাপাচারী কাফির সন্তান জন্ম দেবে; অতএব তাদের একজনকেও বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এটি কোনো নৈতিক বিচার নয়, এটি সরাসরি গোষ্ঠী-পরিচয়ভিত্তিক বিনাশের যুক্তি। এখানে ব্যক্তি অপরাধ করেছে কি না, শিশু অপরাধী কি না, বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তি কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম কি না, এমনকি অনাগত সন্তান আদৌ কেমন মানুষ হবে—এসব কোনো প্রশ্নেরই স্থান নেই। “কাফির” পরিচয়ই যথেষ্ট। এই পরিচয় একবার বসিয়ে দিলেই পুরো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসযোগ্য বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। এমন চিন্তাকে সভ্য ন্যায়বিচার বলা যায় না; এটি বরং ধর্মীয় ভাষায় মোড়ানো সামষ্টিক নির্মূলের আদর্শিক অনুমোদন।
এখানে সমস্যাটি আরও গভীর, কারণ এই যুক্তি বাস্তবে যেকোনো গণহত্যামূলক মতাদর্শের কেন্দ্রীয় কাঠামোর সঙ্গে মিলে যায়। ইতিহাসে যে সব নিষ্ঠুর শাসক বা উগ্র মতাদর্শ কোনো জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে, তারা প্রায় সব সময়ই একই ধরনের যুক্তি ব্যবহার করেছে: “এরা বিপজ্জনক”, “এদের সন্তানরাও বিপজ্জনক হবে”, “এদের বংশ টিকে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য হুমকি হবে।” পার্থক্য শুধু ভাষার। এক জায়গায় জাতি, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহৃত হয়; এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে ধর্মীয় পরিচয়—“কাফির”। কিন্তু নৈতিক কাঠামো একই: ব্যক্তিকে মানুষ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং একটি বিপজ্জনক প্রজনন-যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে, যে ভবিষ্যতে আরও “ভুল” মানুষ জন্ম দেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অমানবিক নয়; এটি মানুষের নৈতিক স্বাধীনতা, পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং ব্যক্তিগত দায়িত্ব—সবকিছুকেই অস্বীকার করে।
একটি শিশু বড় হয়ে কী হবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। অবিশ্বাসী পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশু ভবিষ্যতে বিশ্বাসীও হতে পারে, নাস্তিকও হতে পারে, মানবতাবাদীও হতে পারে, আবার অপরাধীও হতে পারে। একইভাবে ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুও শান্তিপ্রিয়, যুক্তিবাদী, অথবা সহিংস উগ্রবাদী—যেকোনো কিছু হতে পারে। জন্মপরিচয় থেকে নৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যুক্তির কাজ নয়; এটি পূর্বধারণা ও গোষ্ঠীঘৃণার কাজ। সূরা নূহের এই যুক্তিতে অবিশ্বাসী পিতামাতার সন্তানদের আগাম “দুষ্কৃতিকারী কাফির” ধরে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শিশুটি জন্মানোর আগেই তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এই ধরনের চিন্তা ন্যায়বিচার নয়; এটি ধর্মীয় ভাষায় প্রকাশিত প্রি-এম্পটিভ ডিহিউম্যানাইজেশন।
এই যুক্তির বর্বরতা বোঝার জন্য বিষয়টি উল্টো করে ভাবলেই যথেষ্ট। যদি কোনো আধুনিক রাষ্ট্র বা সামরিক বাহিনী বলে, একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শিশুরা বড় হয়ে সন্ত্রাসী হতে পারে, তাই তাদের পরিবারসহ ধ্বংস করে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত—তাহলে আমরা সেটিকে নিঃসন্দেহে গণহত্যার ভাষা বলব। যদি কেউ বলে, কোনো জাতিগোষ্ঠীর সন্তানরা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রদ্রোহী বা অপরাধী হবে, তাই তাদের জন্ম নেওয়ার আগেই তাদের বংশ মুছে দিতে হবে—তাহলে সেটিকে আমরা নৈতিকতা নয়, ফ্যাসিবাদী নির্মূল-চিন্তা বলব। কিন্তু একই যুক্তি যখন ধর্মীয় আখ্যানের ভেতরে আসে, তখন সেটিকে “ঈশ্বরের বিচার”, “নবীর প্রার্থনা” বা “দৈব হিকমত” বলে নরম করার চেষ্টা করা হয়। এই দ্বিমুখী নৈতিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। যে যুক্তি মানুষের মুখে বললে ঘৃণ্য, সেটি ধর্মীয় টেক্সটে থাকলেও ঘৃণ্যই থাকে। পবিত্রতার দাবি কোনো বর্বর যুক্তিকে নৈতিক করে তোলে না।
অবিশ্বাসকে অপরাধ বানানোর বিপজ্জনক নৈতিকতা
এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: অবিশ্বাস নিজে কোনো অপরাধ নয়। কোনো মানুষ কোনো ধর্মীয় দাবিকে সত্য বলে গ্রহণ করবে কি করবে না, সেটি তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, যুক্তি, পরিবেশ, প্রমাণ-বোধ এবং ব্যক্তিগত বিবেকের সঙ্গে সম্পর্কিত। কেউ কোনো দাবিতে বিশ্বাস করল না বলেই সে অপরাধী হয়ে যায় না। অপরাধ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি এমন কোনো কাজ, যার মাধ্যমে অন্য মানুষের অধিকার, জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতবাদে বিশ্বাস না করা নিজে অন্যের ওপর আক্রমণ নয়। তাই অবিশ্বাসকে অপরাধে রূপান্তর করা মানেই চিন্তা, বিবেক ও অনুসন্ধানের স্বাধীনতাকে অপরাধ বানানো। এই জায়গাতেই কোরআনিক নূহ-আখ্যানের নৈতিক সমস্যা অত্যন্ত নগ্নভাবে সামনে আসে। এখানে মানুষকে তার প্রমাণিত সহিংস কাজের জন্য নয়, বরং তার বিশ্বাসগত অবস্থানের জন্য ধ্বংসযোগ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এই যুক্তির ভেতরে লুকিয়ে আছে ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদের সবচেয়ে নির্মম রূপ। প্রথমে একটি মতবাদ নিজেকে পরম সত্য বলে ঘোষণা করে; তারপর সেই মতবাদে অবিশ্বাসকে নৈতিক ব্যর্থতা বানায়; এরপর অবিশ্বাসীকে বিপজ্জনক শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করে; এবং শেষ পর্যন্ত সেই শ্রেণিকে দমন, শাস্তি বা নির্মূল করার নৈতিক অনুমোদন তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটি শুধু ধর্মীয় ইতিহাসে নয়, রাজনৈতিক মতাদর্শের ইতিহাসেও বারবার দেখা গেছে। কোনো কর্তৃত্ববাদী মতাদর্শ যখন নিজেকে প্রশ্নাতীত সত্য বলে দাবি করে, তখন অবিশ্বাসী, সন্দেহকারী, ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচককে মানুষ হিসেবে নয়, “সমস্যা” হিসেবে দেখতে শুরু করে। সূরা নূহের ২৬–২৭ নম্বর আয়াতে একই ধরনের কাঠামো দেখা যায়: অবিশ্বাসী মানুষ নয়, অবিশ্বাসী গোষ্ঠী; তাদের সন্তানও শিশু নয়, ভবিষ্যৎ কাফির; তাদের বেঁচে থাকা জীবন নয়, ভবিষ্যৎ বিপদের উৎস। এভাবে মানুষকে প্রথমে নৈতিকভাবে নিচে নামানো হয়, তারপর তার বিনাশকে ন্যায়সঙ্গত দেখানো হয়।
আরও বিপজ্জনক হলো, এই আখ্যান অবিশ্বাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সেটি সংক্রামক রোগের মতো—কাফিররা বেঁচে থাকলে অন্যদের পথভ্রষ্ট করবে, তাদের সন্তানরাও কাফির হবে, ফলে তাদের অস্তিত্বই সমস্যার উৎস। এই ভাষা মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে স্বীকার করে না; বরং মানুষকে মতাদর্শিক দূষণের বাহক হিসেবে দেখে। কোনো জনগোষ্ঠীকে যখন “দূষণ”, “ভবিষ্যৎ বিপদ” বা “ধ্বংসযোগ্য বংশ” হিসেবে দেখা হয়, তখন তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নৈতিকভাবে সহজ হয়ে যায়। কারণ তখন হত্যাকে আর হত্যা বলা হয় না; বলা হয় পবিত্রতা রক্ষা, সত্য রক্ষা, সমাজ রক্ষা, ঈমান রক্ষা। অথচ বাস্তবিক অর্থে এটি মানুষের বিরুদ্ধে মানুষেরই নির্মমতা, শুধু ধর্মীয় ভাষায় সাজানো।
এইখানে আপত্তিটি কোনো আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া নয়; এটি ন্যায়বিচারের একেবারে মৌলিক প্রশ্ন। যদি একজন মানুষ কাউকে হত্যা না করে, লুট না করে, নির্যাতন না করে, অন্যের অধিকার নষ্ট না করে, শুধু একটি ধর্মীয় দাবিতে বিশ্বাস না করার কারণে ধ্বংসযোগ্য হয়—তাহলে নৈতিকতার ভিত্তিই ধ্বংস হয়ে যায়। তখন ন্যায়বিচার আর কাজের ওপর দাঁড়ায় না, দাঁড়ায় পরিচয়ের ওপর। তখন মানুষ কী করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; সে কোন দলে, কোন বিশ্বাসে, কোন পরিচয়ে দাঁড়িয়ে আছে—সেটাই বিচার নির্ধারণ করে। এই চিন্তা সভ্য ন্যায়বিচারের বিপরীত। এটি সেই আদিম গোষ্ঠীগত নৈতিকতা, যেখানে “আমরা” পবিত্র, “ওরা” অপবিত্র; “আমরা” রক্ষার যোগ্য, “ওরা” ধ্বংসের যোগ্য। সূরা নূহের এই প্রার্থনা সেই বিভাজনকেই ধর্মীয় অনুমোদন দেয়, এবং সেটিই এই আখ্যানের সবচেয়ে গভীর নৈতিক বিপদ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর: গণবিনাশের ব্যাখ্যা, নৈতিক সংকটের প্রশমন নয়
এই আয়াতগুলোকে অনেক সময় আধুনিক পাঠক বা apologetic ব্যাখ্যাকারীরা নরম করার চেষ্টা করেন। বলা হয়, এখানে হয়তো শুধু নূহের যুগের চরম দুষ্ট লোকদের কথা বলা হয়েছে; হয়তো শিশু, দুর্বল, অক্ষম বা অপরাধে জড়িত নয় এমন মানুষদের কথা বোঝানো হয়নি; হয়তো এটি প্রতীকী ভাষা; হয়তো “কাফির” বলতে শুধু সক্রিয় অত্যাচারীদের বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ক্লাসিক্যাল তাফসিরে গেলে এই নরম ব্যাখ্যার জায়গা খুব বেশি থাকে না। তাফসীরে ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নূহের প্রার্থনার ফলে কাফিরদের “সমূলে ধ্বংস” করা হয়, এমনকি নূহের নিজের কাফির সন্তানও রক্ষা পায়নি। অর্থাৎ ধ্বংসটি সীমিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ছিল—এমন কোনো সহজ apologetic আশ্রয় এখানে পাওয়া যায় না; বরং গোষ্ঠী-পরিচয়ভিত্তিক সামগ্রিক বিনাশের ধারণাই সেখানে শক্তিশালীভাবে উপস্থিত। আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা পড়ি, [3]
সূরা নূহ্ ২৮৭ যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ্ বলেন:
… অর্থাৎ আল্লাহ্ যাহার প্রতি দয়া করেন সে ব্যতীত কেহ আজ তাহার আযাব হইতে রক্ষাকারী কাউকে পাইবে না।
… অর্থাৎ নূহ (আ.) আরো বলিয়াছিলেন যে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি পৃথিবীতে কাফিরগণের মধ্য হইতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না। সুদ্দী (র) বলেনঃ অর্থ যে গৃহে বসবাস করে অর্থাৎ গৃহবাসী। আল্লাহ্ তা’আলা নূহ (আ)-এর এই দু’আর ফলে উহাদিগকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দেন। এমনকি নূহ (আ)-এর ঔরসজাত কাফির সন্তানকেও ধ্বংসের কবল হইতে রক্ষা করেন নাই। সে বলিয়াছিলঃ
… অর্থাৎ পাহাড়ে আশ্রয় নিয়া আমি পানি হইতে বাঁচিয়া যাইব। (নূহ বলিলেন, ) আল্লাহ্র আযাব হইতে বাঁচিয়া থাকার আজ কোন উপায় নাই। তবে আল্লাহ্ যাহার প্রতি দয়া করেন। ইহার পর দুইজনের মাঝে আড়াল হইয়া যায় আর সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হইয়া যায়।
ইব্ন আবূ হাতিম(র) ইব্ন আব্বাস(রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, নূহ (আ)-এর প্লাবনের সময় এক মহিলা প্রথমে তাহার শিশু পুত্রকে কোলে তুলিয়া লয়। এরপর পানি বৃদ্ধি পাইলে সে শিশুটিকে কাঁধের উপর তুলিয়া লয়। পানি কাঁধ পর্যন্ত পৌছিলে সে শিশুটিকে মাথায় তুলিয়া লয়। তারপর যখন পানি মাথার উপরও বাড়িয়া গেল তখন শিশুটিকে লইয়া পাহাড়ে উঠিয়া যায়। পানি পাহাড় পর্যন্ত পৌছিয়া গেলে প্রথমে সে শিশুটিকে কাঁধে অতঃপর মাথায় তারপর দুই হাতে ধরিয়া মহিলাটি শিশুটিকে মাথার উপর উঁচু করিয়া ধরিয়া রাখে। সেই সময় কাউকে দয়া করিবার থাকিলে আল্লাহ্ তা’আলা সেই মাহিলাটির উপর দয়া করিতেন। এই হাদীসটি গরীব তবে তাহার সনদের সকল রাবীগণ নির্ভরযোগ্য।
উল্লেখ্য, নূহ (আ)-এর সেই ভয়াবহ প্লাবনের সময় ঈমানদারগণ হযরত নূহ (আ)-এর সহিত রক্ষা পাইয়াছিলেন। আল্লাহর আদেশে নূহ (আ) তাহাদিগকে নৌকায় তুলিয়া লইয়াছিলেন ৷
… অর্থাৎ তুমি যদি উহাদিগের একজনকে আযাব হইতে অব্যাহতি দাও তাহা হইলে সে ভবিষ্যত বংশধরকে বিভ্রান্ত করিবে। আর কেবল দুষ্কৃতিকারী ও কাফিরই জন্ম দিতে থাকিবে। নিজ সম্প্রদায়ের সহিত দীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর অবস্থান করিয়া নূহ (আ) ইহা অনুভব করিতে পারিয়াছিলেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ
… অর্থাৎ হে আল্লাহ্ তুমি ক্ষমা কর আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যাহারা মু’মিনরূপে আমার ঘরে প্রবেশ করিবে এবং ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদিগকে।
যাহ্হাক বলেন, “আমার ঘরে” অর্থাৎ আমার মসজিদে। তবে ‘ঘর’-এর বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করাতেও কোন অসুবিধা নাই। অর্থাৎ হযরত নূহ (আ) তাহাদিগের জন্য দু’আ করিয়াছিলেন যাহারা ঈমান লইয়া তাঁহার ঘরে প্রবেশ করিয়াছিল।
ইমাম আহমদ (র) আবূ সাঈদ (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, আবূ সাঈদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিয়াছেনঃ মু’মিন ব্যতীত তুমি কাউকে সাথী বানাইও না আর মুত্তাকী ব্যতীত কেহ তোমার খাদ্য খাইতে পারে না। হযরত নূহ (আ) সবশেষে … বলিয়া জীবিত ও মৃত সকল মু’মিন নারী-পুরুষের জন্য দু’আ করিয়াছেন।
… অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতে জালিমদের ধ্বংস ছাড়া তুমি আর কিছুই বৃদ্ধি করিও না।


এই তাফসির অংশটি নৈতিক সংকটকে কমায় না; বরং আরও তীব্র করে। বিশেষ করে যে বিবরণে এক মা প্লাবনের পানি থেকে নিজের শিশুকে বাঁচানোর জন্য বারবার শিশুটিকে উঁচুতে তুলতে থাকে, সেটি ধর্মীয় ভাষার আড়ালে লুকানো নির্মমতার সবচেয়ে নগ্ন ছবি। এখানে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নেই, কোনো অস্ত্রধারী শত্রু নেই, কোনো বিচার নেই, কোনো ব্যক্তিগত অপরাধপ্রমাণ নেই; আছে শুধু মৃত্যুভয়ে সন্তানকে বাঁচাতে চাওয়া এক মা এবং তার শিশু। তারপরও আখ্যানটি আমাদের বলে—যদি কাউকে দয়া করা হতো, তাহলে সেই নারীকে করা হতো; কিন্তু তাকেও দয়া করা হয়নি। অর্থাৎ এই গল্পের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর ঘোষণা: অবিশ্বাসী গোষ্ঠীর ওপর দৈব শাস্তি নেমে এলে মাতৃত্ব, শিশুত্ব, অসহায়ত্ব, নিরপরাধিতা—কিছুই রেহাই পাওয়ার কারণ নয়। ধর্মীয় আনুগত্যের বাইরে মানুষ এখানে মানুষ নয়; সে শুধু ধ্বংসের উপাদান।
এই বর্ণনাকে “ঈশ্বরীয় ন্যায়বিচার” বলে চালানো অত্যন্ত সমস্যাজনক। কারণ ন্যায়বিচার যদি সত্যিই ন্যায়বিচার হয়, তবে সেটি ব্যক্তির দায়, কাজ, উদ্দেশ্য ও অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। কিন্তু এখানে শাস্তি এমনভাবে কার্যকর হচ্ছে, যেন পুরো অবিশ্বাসী সমাজ একটি একক অপরাধী দেহ—যার মধ্যে শিশু, মা, বৃদ্ধ, দুর্বল, অসুস্থ, সংশয়ী, অনুসন্ধানী, অজ্ঞ, ভীত, দ্বিধাগ্রস্ত—কেউ আলাদা ব্যক্তি হিসেবে গণ্য নয়। সবাই একই বন্যার পানিতে বিলীন। এই যুক্তি কোনো উন্নত নৈতিক দর্শন নয়; এটি গোষ্ঠী-শাস্তির আদিমতম রূপ। আর এটিকে পবিত্রতার ভাষায় ঢেকে দিলে তার নির্মমতা কমে না; বরং প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়—একটি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, সর্বদয় সত্তার ন্যায়বিচার যদি শিশুকে মায়ের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ডুবিয়ে মারার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, তবে সেই “ন্যায়বিচার” শব্দটির অর্থ আদৌ কী থাকে?
হেদায়াত যদি আল্লাহর হাতে, তবে কাফিরদের অপরাধ কোথায়?
নূহের আখ্যানের এই নির্মমতা আরও গভীর দার্শনিক সমস্যায় পরিণত হয় যখন কোরআনের হেদায়াত ও ভ্রষ্টতা সম্পর্কিত অন্যান্য আয়াতের সঙ্গে এটিকে পাশাপাশি রাখা হয়। কোরআন বারবার বলে, হেদায়াতের মালিক আল্লাহ; মানুষ কাউকে ইচ্ছামতো সৎপথে আনতে পারে না; আল্লাহ যাকে চান হেদায়াত দেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। এই ধারণা ইসলামী ধর্মতত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস বা অবিশ্বাসকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছা, অনুমতি ও নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এখানেই নৈতিক বিপর্যয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদি হেদায়াত সত্যিই আল্লাহর হাতে থাকে, যদি মানুষ নিজে কাউকে হেদায়াত দিতে না পারে, যদি অবিশ্বাসী মানুষ আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া বিশ্বাসী হতে না পারে—তাহলে সেই মানুষদের অবিশ্বাসের জন্য সমূলে ধ্বংস করা কোন যুক্তিতে ন্যায়বিচার হয়?
এই প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নূহের সম্প্রদায় যদি কাফির থেকে থাকে, তবে কোরআনিক কাঠামোর ভেতরেই প্রশ্ন ওঠে—তারা কাফির হলো কেন? তাদের কাছে প্রমাণ যথেষ্ট ছিল না? তারা বুঝতে পারেনি? তারা সামাজিক, মানসিক বা বৌদ্ধিক কারণে নূহের বাণী গ্রহণ করেনি? নাকি আল্লাহ নিজেই তাদের হেদায়াত দেননি? যদি বলা হয়, তারা স্বাধীনভাবে অবিশ্বাস বেছে নিয়েছিল, তাহলে কোরআনের সেই সব আয়াতের কী হবে যেখানে বলা হয় আল্লাহ যাকে চান হেদায়াত দেন এবং যাকে চান ভ্রষ্ট করেন? আর যদি বলা হয়, আল্লাহ তাদের হেদায়াত দেননি, তাহলে তাদের কাফির থাকার জন্য তাদেরই ডুবিয়ে মারা এক নিষ্ঠুর নৈতিক প্রহসনে পরিণত হয়। একদিকে দরজা বন্ধ রাখা, অন্যদিকে দরজা দিয়ে না ঢোকার অপরাধে শাস্তি দেওয়া—এটিকে ন্যায়বিচার বলা যায় না। এটি ক্ষমতার খেলা, নৈতিক বিচার নয়।
এই দ্বন্দ্বটি আরও স্পষ্ট হয় যখন কোরআনের অন্য আয়াতগুলোতে হেদায়াতের মালিকানা সরাসরি আল্লাহর হাতে অর্পিত হয়েছে বলে দেখা যায়। এমনকি নবী মুহাম্মদও তাঁর প্রিয়জনকে ইচ্ছামতো হেদায়াত দিতে পারেন না—এই ধারণা কোরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে। ফলে নূহের সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন দাঁড়ায়: নূহ দীর্ঘদিন প্রচার করেও যদি তাঁর সম্প্রদায়কে বিশ্বাসী করতে না পারেন, তাহলে সেটি কি কেবল মানুষের দোষ, নাকি কোরআনিক কাঠামোর ভেতরেই হেদায়াতের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে? এই প্রশ্নের উত্তর পরের আয়াতগুলোকে সামনে আনলে আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এই জায়গায় apologetic ব্যাখ্যাগুলো সাধারণত অস্পষ্ট ভাষার আশ্রয় নেয়। বলা হয়, আল্লাহ জানতেন তারা কখনোই বিশ্বাস করবে না; আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানতেন; তাই তাদের ধ্বংস ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু এই উত্তর সমস্যার সমাধান করে না, বরং সমস্যাকে আরও গভীর করে। সর্বজ্ঞতা যদি ভবিষ্যৎ জানার নাম হয়, তবুও ভবিষ্যৎ অপরাধের আগেই কাউকে হত্যা করা ন্যায়বিচার হয়ে যায় না। আর যদি আল্লাহ নিজেই জানেন এবং নির্ধারণ করেন কে হেদায়াত পাবে আর কে পাবে না, তাহলে সেই পূর্বনির্ধারিত বা ঈশ্বরনির্ভর অবস্থার জন্য মানুষকে শাস্তি দেওয়া আরও অযৌক্তিক। “আল্লাহ জানতেন তারা খারাপ হবে”—এই যুক্তি কোনো আদালতে গ্রহণযোগ্য নৈতিক নীতি হতে পারে না। কারণ বিচার কাজের পরে হয়, সম্ভাবনার আগে নয়; অপরাধ প্রমাণের পরে হয়, জন্মপরিচয় বা ঈশ্বরীয় পূর্বজ্ঞান দেখিয়ে নয়। অন্যথায় ন্যায়বিচার আর বিচার থাকে না, সেটি হয়ে যায় পূর্বনির্ধারিত নিষ্ঠুরতার ধর্মীয় অনুমোদন।
আবু তালিবের ঘটনা: নবীও হেদায়াত দিতে পারেন না
এই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয় নবী মুহাম্মদের জীবন থেকে প্রচলিত একটি ঘটনার আলোকে। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ তাঁর চাচা আবু তালিবকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাঁকে ইসলাম গ্রহণ করাতে চেয়েছিলেন। আবু তালিব মুহাম্মদকে সামাজিক ও গোত্রীয় সুরক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁর বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি—এমন বর্ণনাই ইসলামী ঐতিহ্যে প্রচলিত। এই প্রেক্ষাপটে কোরআনে ঘোষণা করা হয়, নবী নিজেও যাকে ভালোবাসেন তাকে হেদায়াত দিতে পারেন না; হেদায়াত দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। এই ঘোষণা নূহের আখ্যানের সঙ্গে পাশাপাশি রাখলে দ্বন্দ্বটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। যদি সর্বশেষ নবীও তাঁর প্রিয়জনকে হেদায়াত দিতে না পারেন, তাহলে নূহের সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেদের হেদায়াতের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখবে? আর যদি হেদায়াতের ক্ষমতা মানুষের হাতে না থাকে, তাহলে অবিশ্বাসীদের “কাফির” পরিচয়ের ভিত্তিতে ধ্বংস করা ন্যায়বিচার নয়; এটি এমন এক ধর্মতাত্ত্বিক নির্মমতা, যেখানে মানুষকে এমন একটি অবস্থার জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, যার চূড়ান্ত চাবিকাঠি তাদের হাতে নেই। আসুন আয়াতটি পড়ি [4] –
তুমি যাকে ভালবাস তাকে সৎপথ দেখাতে পারবে না, বরং আল্লাহ্ই যাকে চান সৎ পথে পরিচালিত করেন, সৎপথপ্রাপ্তদের তিনি ভাল করেই জানেন।
— Taisirul Quran
তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎ পথে আনতে পারবেনা। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎ পথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎ পথ অনুসরণকারী।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।
— Rawai Al-bayan
আপনি যাকে ভালবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। বরং আল্লাহ্ই যাকে ইচ্ছে সৎপথে আনয়ন করেন এবং সৎপথ অনুসারীদের সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআন, সূরা কাসাস, আয়াত ৫৬
এই আয়াতের বক্তব্য অস্পষ্ট নয়। এখানে মানুষকে কেবল দুর্বল প্রচারক বলা হচ্ছে না; বলা হচ্ছে, নবী নিজেও হেদায়াতের মালিক নন। তিনি ভালোবাসতে পারেন, বোঝাতে পারেন, আহ্বান করতে পারেন, কিন্তু কাউকে সৎপথে আনা তাঁর ক্ষমতার মধ্যে নেই। তাহলে একই ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরে নূহের সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে ধরে নিয়ে তাদের সমূলে ধ্বংস করা কীভাবে ন্যায়সঙ্গত হয়? কেউ যদি বলে, নূহ যথেষ্ট দীর্ঘ সময় প্রচার করেছিলেন, তাই তারা দোষী—তবুও প্রশ্নটি থেকে যায়: দীর্ঘ প্রচার শুনলেই কি হেদায়াত নিশ্চিত হয়? কোরআনের ভাষায় তো নয়। কোরআনের ভাষায় হেদায়াত আল্লাহর হাতে। তাহলে যাদের আল্লাহ হেদায়াত দেননি, তাদের বিরুদ্ধে গণবিনাশের প্রার্থনা আসলে নৈতিক বিচারের ভাষা নয়; এটি পরাজিত প্রচারের পর শাস্তিমূলক বিনাশের ভাষা।
কোরআনে এ ধরনের বক্তব্য এককভাবে নেই; বহু জায়গায় একই ধারণা পুনরাবৃত্ত হয়েছে। আল্লাহ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, সে-ই সৎপথপ্রাপ্ত; আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোনো পথপ্রদর্শক নেই—এই বক্তব্য কোরআনিক ধর্মতত্ত্বে বারবার ফিরে আসে। ফলে নূহের গল্পকে শুধু “অবাধ্য মানুষের ন্যায্য শাস্তি” বলে পাশ কাটানো যায় না। কারণ এখানে অবাধ্যতা ও ভ্রষ্টতার পেছনে ঈশ্বরীয় ইচ্ছার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। যদি আল্লাহই কাউকে পথভ্রষ্ট করেন, তাহলে সেই পথভ্রষ্টতার জন্য মানুষকে ধ্বংস করা নৈতিকভাবে অত্যন্ত বিকৃত যুক্তি। এটি এমন এক বিচারব্যবস্থা, যেখানে বিচারক নিজেই অভিযুক্তের অবস্থার ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ রাখেন, তারপর সেই অবস্থার জন্য অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এমন ব্যবস্থা কোনো সভ্য নৈতিকতার ভাষায় ন্যায়বিচার নয়; এটি সর্বশক্তিমান কর্তৃত্বের একতরফা নিষ্ঠুরতা। কোরআনে এটিও বহুবারই বলা হয়েছে, আল্লাহ হচ্ছেন পথ দেখাবার এবং পথভ্রষ্ট করার একমাত্র মালিক [5] [6] –
তুমি দেখতে পেতে সূর্য উদয়ের সময় তাদের গুহা হতে ডান দিকে হেলে যেত, আর যখন তা অস্তমিত হত তখন তা তাদের থেকে বাম দিকে নেমে যেত, আর তারা ছিল গুহার অভ্যন্তরে বিশাল চত্বরে। এ হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আল্লাহ যাকে সৎপথ দেখান সে সঠিকপথপ্রাপ্ত আর যাকে তিনি পথহারা করেন, তার জন্য তুমি কক্ষনো সৎপথের দিশা দানকারী অভিভাবক পাবে না।
— Taisirul Quran
তুমি সূর্যকে দেখবে যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে শায়িত। এসবই আল্লাহর নিদর্শন। আল্লাহ যাকে সৎ পথে পরিচালিত করেন সে সৎ পথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনও তার কোন পথ প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তুমি দেখতে পেতে, সূর্য উদিত হলে তাদের গুহার ডানে তা হেলে পড়ছে, আর অস্ত গেলে তাদেরকে বামে রেখে কেটে যাচ্ছে, তখন তারা ছিল তার আঙিনায়। এগুলো আল্লাহর আয়াতসমূহের কিছু। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, সে হেদায়াতপ্রাপ্ত। আর যাকে ভ্রষ্ট করেন, তুমি তার জন্য পথনির্দেশকারী কোন অভিভাবক পাবে না।
— Rawai Al-bayan
আর আপনি দেখতে পেতেন- সূর্য উদয়ের সময় তাদের গুহার ডান পাশে হেলে যায় এবং অস্ত যাওয়ার সময় তাদেরকে অতিক্রম করে বাম পাশ দিয়ে [১], অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে, এ সবই আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ্ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, সে সৎপথপ্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনো তার জন্য কোনো পথনির্দেশকারী অভিভাবক পাবেন না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন সেই হিদায়াত লাভ করে, আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তারাই হয় ক্ষতিগ্রস্ত।
— Taisirul Quran
আল্লাহ যাকে পথ দেখান সে’ই পথ প্রাপ্ত হয়, আর যাকে তিনি পথ প্রদর্শন হতে বঞ্চিত করেন সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
যাকে আল্লাহ হিদায়াত করেন সে-ই হিদায়াতপ্রাপ্ত আর যাদেরকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
— Rawai Al-bayan
আল্লাহ যাকে পথ দেখান সে-ই পথ পায় এবং যাদেরকে তিনি বিপথগামী করেন তারাই ক্ষতিগ্রস্ত [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
দৈব নিয়ন্ত্রণ ও মানবদায়: কোরআনিক যুক্তির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ
এখন সূরা নূহের ২৬–২৭ নম্বর আয়াত এবং সূরা কাসাসের ৫৬ নম্বর আয়াতকে পাশাপাশি রাখলেই কোরআনিক ন্যারেটিভের একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব নগ্নভাবে সামনে আসে। একদিকে বলা হচ্ছে, আল্লাহ যাকে চান তাকেই হেদায়াত দেন, যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন; অন্যদিকে নূহ তাঁর সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে এমন প্রার্থনা করছেন, যেন তাদের একজনও পৃথিবীতে জীবিত না থাকে। এই দুই বক্তব্য একসঙ্গে গ্রহণ করলে নৈতিক প্রশ্নটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়: যদি হেদায়াতের চূড়ান্ত ক্ষমতা আল্লাহর হাতে থাকে, তাহলে যারা হেদায়াত পায়নি, তাদের অপরাধ কোথায়? তারা কি স্বাধীনভাবে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে, নাকি আল্লাহ তাদের হেদায়াত দেননি? যদি প্রথমটি বলা হয়, তাহলে কোরআনের হেদায়াত-সংক্রান্ত বহু আয়াতের বক্তব্য দুর্বল হয়ে যায়; আর যদি দ্বিতীয়টি বলা হয়, তাহলে নূহের প্রার্থনা এবং আল্লাহর গণবিনাশী শাস্তি এক ভয়াবহ নৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়। কারণ তখন দেখা যাচ্ছে, যাদের বিশ্বাসী করার চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে, তাদের অবিশ্বাসী অবস্থায় রেখে আবার সেই অবিশ্বাসের কারণেই ধ্বংস করা হচ্ছে।
এই সমস্যাকে কোনো অস্পষ্ট “ঈশ্বরের হিকমত” বলে ঢেকে দিলে যুক্তিগত সংকট দূর হয় না। বরং সেটি আরও স্পষ্ট হয়। একজন মানুষকে যদি এমন একটি অবস্থায় রাখা হয়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার চূড়ান্ত ক্ষমতা তার নিজের হাতে নেই, তারপর সেই অবস্থায় থাকার জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়—তাহলে সেটি ন্যায়বিচার নয়। এটি বিচারকের হাতে তৈরি ফাঁদ। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বন্দিকে একটি তালাবদ্ধ ঘরে আটকে রাখে, চাবি নিজের কাছে রাখে, তারপর বন্দিকে ঘর থেকে বের না হওয়ার অপরাধে শাস্তি দেয়, সেটি ন্যায়বিচার নয়; সেটি নিষ্ঠুর প্রহসন। কোরআনিক হেদায়াত-ধারণার সঙ্গে নূহের গণবিনাশী প্রার্থনাকে পাশাপাশি রাখলে একই রকম কাঠামো দেখা যায়: হেদায়াতের দরজা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু দরজার বাইরে থাকা মানুষের ওপরই নেমে আসে চূড়ান্ত শাস্তি।
আরও বড় সমস্যা হলো, নূহের প্রার্থনায় এই শাস্তি ব্যক্তি-ভিত্তিক নয়, বরং শ্রেণি-ভিত্তিক। সেখানে বলা হচ্ছে না—যারা নির্দিষ্টভাবে হত্যা করেছে, নির্যাতন করেছে, আক্রমণ করেছে, তাদের শাস্তি দাও। বলা হচ্ছে—কাফিরদের একজনকেও রেহাই দিও না। এই ভাষা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ন্যায়বিচারের ভাষা নয়; এটি পরিচয়কেন্দ্রিক নির্মূলের ভাষা। অপরাধের প্রমাণের বদলে পরিচয়ই এখানে মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তি। এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নিষ্ঠুর যুক্তি: তারা ভবিষ্যতে কাফির সন্তান জন্ম দেবে। অর্থাৎ যে শিশুর জন্ম হয়নি, যে মানুষ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, যে কোনো কাজ করেনি, যে নিজের বিশ্বাস বেছে নেওয়ার সুযোগও পায়নি—তাকেও সম্ভাব্য কাফির হিসেবে ধ্বংসের যুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি নৈতিক বিচার নয়; এটি প্রজন্মগত অপরাধ আরোপের বর্বর রূপ।
এই দ্বন্দ্বের ফলে কোরআনিক ন্যায়বিচারের দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ ন্যায়বিচার বলতে আমরা বুঝি দায়িত্ব ও শাস্তির মধ্যে যুক্তিসঙ্গত সম্পর্ক। যে ব্যক্তি কোনো কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে না, তাকে সেই কাজের জন্য দোষী বলা যায় না। যে শিশু এখনো জন্মায়নি, তাকে ভবিষ্যৎ বিশ্বাসের জন্য দণ্ডিত করা যায় না। যে মানুষকে ঈশ্বর নিজেই হেদায়াত দেননি, তাকে হেদায়াত না পাওয়ার অপরাধে ধ্বংস করা যায় না। কিন্তু নূহের আখ্যান এই সব মৌলিক নৈতিক সীমারেখাকে অতিক্রম করে যায়। এখানে অবিশ্বাস একদিকে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন, অন্যদিকে মানুষের মৃত্যুদণ্ডের কারণ। এই দ্বৈততা কোনো গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য নয়; এটি ন্যায়বিচারের ধারণাকে ভেঙে দেওয়া একটি সরাসরি যুক্তিগত অসামঞ্জস্য।
এখানেই এই আখ্যানের ভয়াবহতা। মানুষকে প্রথমে এমন এক ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরে রাখা হচ্ছে, যেখানে তার বিশ্বাসের শেষ নিয়ন্ত্রণ ঈশ্বরের হাতে; তারপর সেই বিশ্বাস না থাকার কারণে তাকে ধ্বংসযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে; তারপর তার সন্তানদেরও সম্ভাব্য কাফির হিসেবে একই ধ্বংসের নৈতিক যুক্তিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই যুক্তি যদি কোনো আধুনিক স্বৈরশাসক ব্যবহার করত, আমরা একে নিঃসন্দেহে গণহত্যার মতাদর্শ বলতাম। কিন্তু ধর্মীয় টেক্সটে থাকার কারণে সেটিকে “দৈব ন্যায়বিচার” বলা হলে নৈতিকতা শব্দটির অর্থই বিকৃত হয়ে যায়। কোনো ধারণা ধর্মীয় হলেই তা নৈতিক হয় না; কোনো নির্মমতা ঈশ্বরের নামে বলা হলেই তা ন্যায়বিচার হয়ে যায় না। বরং এমন দাবিকেই সবচেয়ে কঠোরভাবে পরীক্ষা করা উচিত, কারণ এর ভেতরেই মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের নিষ্ঠুরতা পবিত্রতার পোশাক পরে ফিরে আসার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
সুতরাং নূহের আখ্যানকে “ঈশ্বরীয় বিচার” বলে গ্রহণ করতে হলে ন্যায়বিচারের সাধারণ মানবিক ধারণাকে কার্যত বিসর্জন দিতে হয়। তখন স্বীকার করতে হয়, কোনো গোষ্ঠীকে তাদের বিশ্বাসগত পরিচয়ের কারণে সমূলে ধ্বংস করা যেতে পারে; শিশু ও অনাগত প্রজন্মকেও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অবিশ্বাসের কারণে বিনাশযোগ্য ধরা যেতে পারে; এবং ঈশ্বর যার হেদায়াত নিয়ন্ত্রণ করেন, তাকেই হেদায়াত না পাওয়ার কারণে শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু এই সব স্বীকার করলে “ন্যায়বিচার” শব্দটি তার স্বাভাবিক অর্থ হারিয়ে ফেলে। ক্ষমতা দিয়ে শাস্তি দেওয়া যায়; কিন্তু ক্ষমতা দিয়ে কোনো শাস্তিকে ন্যায়সঙ্গত বানানো যায় না।
নূহের দোয়া + হেদায়াত-ভ্রষ্টতার ধারণা → দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের কনট্রাডিকশন
• নূহ নবী সব কাফির (নারী–শিশু–বৃদ্ধসহ) ধ্বংসের জন্য দোয়া করেন, কারণ তারা গুমরাহ করে এবং ভবিষ্যতে শুধু “দুষ্কৃতিকারী কাফির” জন্ম দেবে।
• অন্য আয়াতে বলা হয়: হেদায়াত ও ভ্রষ্টতা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হাতে – মানুষ কাউকে হেদায়াত দিতে পারে না।
Premise A2: “আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সে-ই সৎপথ প্রাপ্ত; যাকে ভ্রষ্ট করেন, তার আর পথপ্রদর্শক নেই।”
👉 সিদ্ধান্ত: কে মুমিন আর কে কাফির – এর চূড়ান্ত নির্ধারণ আল্লাহর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
• মানুষ তার অবিশ্বাস বা গুমরাহ হওয়ার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই।
• সেক্ষেত্রে “কাফির হওয়া” একটি স্বাধীন, সম্পূর্ণ স্বনির্ধারিত পছন্দ নয়, বরং দৈব সিদ্ধান্তের ফসল – এই ধারণা উঠে আসে।
Premise B2: যুক্তি: কাফিররা তোমার বান্দাদের গুমরাহ করবে এবং ভবিষ্যতে শুধু পাপাচারী কাফিরই জন্ম দেবে।
Premise B3 (তাফসির): প্লাবনে কাফির পুরুষ–নারী–শিশু–এমনকি নূহের নিজ কাফির ঔরসজাত সন্তানও ধ্বংস হয়।
• বর্তমানে যেসব কাফির বেঁচে আছে – সবাইকে ডুবিয়ে মারা।
• ভবিষ্যতে যারা জন্মাতে পারত – তাদের বংশও উড়িয়ে দেওয়া, যেন “কাফির সন্তান” আর জন্ম নাায়।
• শিশু ও জন্ম না নেওয়া প্রজন্ম পর্যন্ত “সম্ভাব্য কাফির” হওয়ার অপরাধে টার্গেটেড।
Step 2: মানুষ কাফির এই জন্য যে আল্লাহ হেদায়াত দেননি – এই ধারণা সরাসরি টেক্সট থেকে আসে।
Step 3: একই মানুষকে আবার “কাফির হওয়ার কারণে” সমূলে ধ্বংস (Premise B1–B3)।
❗ দার্শনিক কনট্রাডিকশন: যে অবস্থায় (গুমরাহ/কাফির) রাখার ক্ষমতা প্রধানত সৃষ্টিকর্তার হাতে, সেই অবস্থার জন্যই তাদেরকে সর্বোচ্চ শাস্তি (গণবিনাশ) দেওয়া – এটি ন্যায়বিচার ও নৈতিক দায়বদ্ধতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
Step 2: যুক্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে ভবিষ্যত প্রজন্মও “দুষ্কৃতিকারী কাফির” হবে – অর্থাৎ সম্ভাব্য অপরাধের আগেই “প্রি-এম্পটিভ” গণহত্যা।
❗ নৈতিক সমস্যা:
• শিশুরা, ভবিষ্যত প্রজন্ম, দুর্বল ও অপরাধে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তিরা – সবাইকে এক কাতারে ধরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
• আধুনিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে জন্ম-পরিচয় ও ভবিষ্যৎ অনুমানের ভিত্তিতে বিনাশ – গণহত্যা ও সামষ্টিক শাস্তির স্পষ্ট উদাহরণ, যা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নৈতিকতার বিপরীত।
Step 2: নূহের প্লাবনে এমনকি নিজের সন্তানের মৃত্যু, এক শিশুকে বাঁচানোর চেষ্টা করা মায়ের মৃত্যু – এগুলোকে “দয়ার বাহিরে” রেখে, কোনো ব্যতিক্রম না করে ডুবিয়ে মারা – তাফসিরে এভাবেই বর্ণিত।
❗ দার্শনিক কনট্রাডিকশন: সর্বদয়, সর্বকরুণ সত্তা একই সঙ্গে সম্পূর্ণ অনুগ্রহহীন গণবিনাশের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী – এই দুটি গুণকে একসাথে মেলানো যুক্তিগতভাবে অত্যন্ত সমস্যাপূর্ণ।
উপসংহার
নূহের প্লাবনের আখ্যানকে যদি ধর্মীয় আবেগ, পবিত্রতার দাবি এবং ঐতিহ্যগত শ্রদ্ধার আবরণ সরিয়ে বিচার করা হয়, তাহলে এর ভেতরে এক গভীর নৈতিক সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প নেই; আছে একটি বিশ্বাসগত গোষ্ঠীকে সমূলে ধ্বংস করার প্রার্থনা, আছে ভবিষ্যৎ সন্তানদের জন্মের আগেই অপরাধী ধরে নেওয়ার যুক্তি, আছে মা ও শিশুর অসহায়তার ওপরও দয়া না দেখানো এক সর্বগ্রাসী শাস্তির ধারণা। এই আখ্যানকে যতই “ঈশ্বরীয় বিচার” বলা হোক, এর নৈতিক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে সামষ্টিক অপরাধ, প্রজন্মগত দায় আর পরিচয়ভিত্তিক বিনাশের ওপর। এগুলো সভ্য ন্যায়বিচারের ভাষা নয়; এগুলো নির্মূল-চিন্তার ভাষা।
আরও বড় সমস্যা হলো, একই কোরআনিক কাঠামোর মধ্যে হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতাকে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল বলা হয়েছে। মানুষ নিজে কাউকে হেদায়াত দিতে পারে না; নবীও তাঁর প্রিয়জনকে সৎপথে আনতে পারেন না; আল্লাহ যাকে চান হেদায়াত দেন, যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। তাহলে যাদের হেদায়াত দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা আল্লাহর হাতে, তাদেরই অবিশ্বাসী থাকার কারণে ধ্বংস করা ন্যায়বিচার নয়; এটি যুক্তিগত ও নৈতিকভাবে এক গভীর অসামঞ্জস্য। যে ব্যবস্থায় বিচারক নিজেই পথের দরজা নিয়ন্ত্রণ করেন, তারপর দরজার বাইরে থাকা মানুষকে অপরাধী ঘোষণা করেন, সেই ব্যবস্থাকে ন্যায় বলা যায় না। সেটি সর্বশক্তিমান ক্ষমতার প্রদর্শন হতে পারে, কিন্তু নৈতিক বিচার নয়।
এই আখ্যানের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি মানুষকে ব্যক্তি হিসেবে বিচার করে না। মানুষ কী করেছে, সে কাকে ক্ষতি করেছে, তার অপরাধ প্রমাণিত কি না—এসব প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে তাকে “কাফির” পরিচয়ের মধ্যে গলিয়ে দেওয়া হয়। তারপর সেই পরিচয়ই হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ। শিশুও আলাদা নয়, মা-ও আলাদা নয়, বৃদ্ধ-অসুস্থ-অক্ষম কেউ আলাদা নয়; সবাই এক সামষ্টিক শাস্তির বন্যায় বিলীন। এই ধরনের চিন্তা মানবিক ন্যায়বোধের পরিপন্থী। কোনো মানুষকে তার কাজের জন্য নয়, তার বিশ্বাসগত পরিচয় বা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বংশের জন্য ধ্বংসযোগ্য ভাবা—এটি নৈতিকতা নয়, ধর্মীয় ভাষায় প্রকাশিত ডিহিউম্যানাইজেশন।
তাই নূহের এই আখ্যানকে প্রশ্ন করা কোনো আবেগপ্রসূত ধর্মবিদ্বেষ নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবতা এবং যুক্তির স্বাভাবিক দাবি। কোনো গল্প প্রাচীন হলেই তা নৈতিক হয় না, কোনো চরিত্র নবী হিসেবে বর্ণিত হলেই তার প্রার্থনা সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না, কোনো শাস্তি ঈশ্বরের নামে বর্ণিত হলেই তা ন্যায়সঙ্গত হয়ে ওঠে না। বরং যে দাবির ভেতরে গণবিনাশ, শিশুহত্যা, সামষ্টিক শাস্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আগাম অপরাধীকরণ লুকিয়ে থাকে, সেটিকেই সবচেয়ে কঠোরভাবে পরীক্ষা করা দরকার। কারণ মানবসভ্যতার ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যখন কোনো গোষ্ঠীকে মানুষ হিসেবে নয়, “অবিশ্বাসী”, “অপবিত্র”, “বিপজ্জনক” বা “ধ্বংসযোগ্য” শ্রেণি হিসেবে দেখা শুরু হয়, তখন নৃশংসতাই ধর্ম, রাষ্ট্র বা মতাদর্শের নামে বৈধতা পেতে শুরু করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল: ন্যায়বিচার কি ব্যক্তির কাজ, দায় এবং প্রমাণের ওপর দাঁড়াবে, নাকি বিশ্বাসগত পরিচয়, জন্মগত সম্পর্ক এবং ঈশ্বরীয় কর্তৃত্বের ঘোষণার ওপর? যদি প্রথমটি গ্রহণ করি, তাহলে নূহের আখ্যান নৈতিকভাবে সমস্যাজনক, এমনকি ভয়াবহ। আর যদি দ্বিতীয়টি গ্রহণ করি, তাহলে ন্যায়বিচার শব্দটির অর্থই বদলে যায়—সেটি আর ন্যায় থাকে না, কেবল ক্ষমতার আরেক নাম হয়ে দাঁড়ায়। একটি সত্যিকারের মানবিক ও যুক্তিবাদী সমাজের কাজ হলো এমন আখ্যানকে ভয় না পেয়ে পরীক্ষা করা, প্রশ্ন করা এবং স্পষ্টভাবে বলা: কোনো পবিত্রতার দাবিই গণবিনাশকে নৈতিক করে তুলতে পারে না।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা নূহ, আয়াত ২৬ ↩︎
- সূরা নূহ, আয়াত ২৭ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৮৭, ২৮৮ ↩︎
- সূরা কাসাস, আয়াত ৫৬ ↩︎
- কোরআন ১৮:১৭ ↩︎
- কোরআন ৭:১৭৮ ↩︎
