
Table of Contents
ভূমিকাঃ করুণাময় আল্লাহ কাফেরদের রক্ত চান
ইসলামী জিহাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল ভূখণ্ড বিজয় নয়, বরং পৃথিবীতে অবিশ্বাসী বা কাফেরদের দাপট চূর্ণ করে দেওয়া। পূর্বের প্রবন্ধে আমরা দেখেছিলাম যে (উল্লেখ্য, এই প্রবন্ধের প্রেক্ষাপট বুঝতে আগের লেখাটি পড়া জরুরি), শিরক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করা মুমিনদের জন্য বৈধ নয়। তবে যুদ্ধের ময়দানে যখন অমুসলিমরা পরাজিত হয়ে অস্ত্র ফেলে দেয় বা বন্দী হয়, তখন তাদের সাথে ঠিক কী করা উচিত—সে সম্পর্কে আধুনিক মানবাধিকার আইন এবং ইসলামী শাস্ত্রীয় বিধানের মধ্যে এক আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক সভ্য জগতের জেনেভা কনভেনশন বা মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো পক্ষ আত্মসমর্পণ করলে বা যুদ্ধবন্দী হলে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন বা হত্যা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু ইসলামের যুদ্ধনীতিতে এই বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়েছে।
জিহাদের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আমাদের সূরা আনফালের ৬৭ নম্বর আয়াতের দিকে তাকাতে হবে, যা মূলত বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল। এই আয়াতে আল্লাহ খুব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, জিহাদের ময়দানে কাফেরদের ওপর প্রচুর রক্তপাত এবং হত্যাকাণ্ড না ঘটিয়ে তাদের বন্দী করা বা মুক্তিপণের জন্য জীবিত রাখা নবীর জন্য শোভনীয় নয়। অর্থাৎ, বিজয়ী হওয়ার পর প্রতিপক্ষকে কেবল পরাজিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টির জন্য এবং ইসলামের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার জন্য গণহারে হত্যাকাণ্ড বা রক্ত প্রবাহিত করা আল্লাহর নিকট একটি কাঙ্ক্ষিত ইবাদত। বানু কুরাইজা গণহত্যা এবং আরও কিছু উদাহরণেও আমরা একই চিত্র দেখি।
এই আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের ভর্ৎসনা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, দুনিয়াবী লাভের আশায় (মুক্তিপণ) যুদ্ধবন্দীদের জীবিত রাখার চেয়ে তাদের রক্তপাত ঘটানোই আখেরাতের জন্য উত্তম। আজকের প্রবন্ধে আমরা ধ্রুপদী তাফসীর ও নির্ভরযোগ্য দলিলাদির আলোকে দেখব যে, কেন ইসলামে যুদ্ধবন্দীদের ‘জবাই’ বা হত্যা করাকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে ‘উত্তম আমল’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং কীভাবে এই বিধান আধুনিক যুগের মানবিক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করে।
সূরা আনফাল, আয়াত ৬৭ঃ রক্তপাতের ঐশী আবশ্যকতা
ইসলামী যুদ্ধনীতির একটি অত্যন্ত নৃশংস এবং অমানবিক দিক ফুটে উঠেছে সূরা আনফালের এই ৬৭ নম্বর আয়াতে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, বদর যুদ্ধে যখন মুসলিমরা বিপুল সংখ্যক কাফের সৈন্যকে বন্দী করে এবং তাদের মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করে, তখন এই আয়াতটি নাজিল হয়। আয়াতে আল্লাহ সরাসরি নবীকে সতর্ক করে দেন যে, কেবল বিজয়ী হওয়াই লক্ষ্য নয়, বরং ভূখণ্ডে ইসলামের একচ্ছত্র প্রতাপ স্থাপনের জন্য কাফেরদের সমূলে বিনাশ এবং ব্যাপক রক্তপাত ঘটানো অপরিহার্য।
নিচে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এই আয়াতের অনুবাদগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রতিটি অনুবাদেই ‘রক্ত প্রবাহিত করা’ বা ‘প্রচুর হত্যাকাণ্ড’ ঘটানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে [3]
কোন নবীর সাথে যুদ্ধরত কাফিরদের মাঝে প্রচুর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তাদেরকে ভালোভাবে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত নিজের কাছে বন্দী রাখা তাঁর জন্য উচিৎ হবে না। যেন তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চারিত হয় এবং তারা তাঁর সাথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করতে না আসে। হে মু’মিনরা! তোমরা মূলতঃ বদরের কাফিরদেরকে বন্দী করে তাদের থেকে মুক্তিপণ নিতে চাও। অথচ আল্লাহ তা‘আলা আখিরাত চাচ্ছেন যা ধর্মের বিজয় ও তার পরাক্রমশীলতার মাধ্যমে হাসিল করা সম্ভব। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সত্তা, গুণাবলী ও ক্ষমতায় অপ্রতিদ্ব›দ্বী। তাঁকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। তেমনিভাবে তিনি তাঁর শরীয়ত প্রণয়নে ও তাক্বদীর নির্ধারণে অতি প্রজ্ঞাময়।
— Bengali Mokhtasar
কোন নাবীর জন্য এটা সঠিক কাজ নয় যে, দেশে (আল্লাহর দুশমনদেরকে) পুরোমাত্রায় পরাভূত না করা পর্যন্ত তার (হাতে) যুদ্ধ-বন্দী থাকবে। তোমরা দুনিয়ার স্বার্থ চাও আর আল্লাহ চান আখিরাত (এর সাফল্য), আল্লাহ প্রবল পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞানী।
— Taisirul Quran
কোন নাবীর পক্ষে তখন পর্যন্ত বন্দী (জীবিত) রাখা শোভা পায়না, যতক্ষণ পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠ (দেশ) হতে শক্র বাহিনী নির্মূল না হয়, তোমরা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদ কামনা করছ, অথচ আল্লাহ চান তোমাদের পরকালের কল্যাণ, আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
— Sheikh Mujibur Rahman
কোন নবীর জন্য সঙ্গত নয় যে, তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে (এবং পণের বিনিময়ে তিনি তাদেরকে মুক্ত করবেন) যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছ, অথচ আল্লাহ চাচ্ছেন আখিরাত। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।
— Rawai Al-bayan
কোনো নবীর জন্য সংগত নয় যে [১] তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে, যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন [২]। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ [৩] এবং আল্লাহ্ চান আখেরাত; আর আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই অনুবাদগুলো থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ইসলামে যুদ্ধবন্দীদের প্রাণের মায়ার চেয়ে তাদের রক্ত ঝরানোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক মানবাধিকার আইনে যেখানে যুদ্ধবন্দীদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব, সেখানে ইসলামী দর্শনে ‘পার্থিব সম্পদ’ বা মুক্তিপণের চেয়ে রক্ত প্রবাহিত করাকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এরপরেও আরও ভালভাবে বোঝার জন্য আমরা তাফসীরগুলো দেখবো।
তাফসীরে জালালাইন
এই আয়াতটির অনুবাদ তাফসীরে জালালাইন থেকে পড়ে নিই [4] –
৬৭. বদর যুদ্ধে বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ গ্রহণ করলে এই আয়াত নাজিল হয় যে, পৃথিবীতে ভালোভাবে রক্ত প্রবাহিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে কাফের-বধ না হওয়া পর্যন্ত تكُونُ এটা প্রথমপুরুষ, পুংলিঙ্গ ও [প্রথমপুরুষ, স্ত্রীলিঙ্গ) উভয়রূপেই পঠিত রয়েছে। বন্দী রাখা কোনো নবীর জন্য সঙ্গত নয়। হে মুমিনগণ। মুক্তিপণ গ্রহণ করে তোমরা পার্থিব সম্পদ তার তুচ্ছ সামগ্রী কামনা কর,

তাফসীরে মাযহারী
তাফসীরে মাযহারীতে এই আয়াতে বর্ণিত ‘ইউসখিনা ফিল আরদ’ (যমীনে রক্ত প্রবাহিত করা) বাক্যাংশটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, কাফেরদের সম্পূর্ণ পরাস্ত এবং তাদের সংখ্যা কমিয়ে না ফেলা পর্যন্ত যুদ্ধবন্দী রাখা জায়েজ নয়। অর্থাৎ, যুদ্ধের ময়দানে শত্রুপক্ষ আত্মসমর্পণ করলেও তাদের ওপর তলোয়ার চালানোই ছিল প্রথম পছন্দ। নিচে তাফসীরে মাযহারীর দলিলসমূহ সংযুক্ত করা হলো [5] –
সুরা আনফাল: আয়াত ৬৭
مَا كَانَ لِنَبِي أَنْ يَكُونَ لَهُ أَثْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ .
تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمُ
দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নহে; তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ্ চাহেন পরলোকের কল্যাণ; আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
‘মা কানা লিনাবিয়ি্যন আঁয়্যাকুনা লাহু আস্ত্রা হাত্তা ইউছুখিনা ফিল আরদ্ব’
অর্থ- দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোনো নবীর জন্য সংগত নয়।
জ্ঞাতব্যঃ কাযী আবুল ফজল আয়ায তাঁর আশিফা গ্রন্থে লিখেছেন ‘দেশে সম্পূর্ণরূপে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোনো নবীর জন্য সংগত নয়’ কথাটির মাধ্যমে রসুল স. এর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি। বরং এ কথাটির মাধ্যমেই ফুটে উঠেছে রসুল স. এর অনন্য সাধারণ মর্যাদা। যেমন অন্যান্য নবীগণের জন্য গণিমতের মাল গ্রহণ করা হালাল ছিলো না। কিন্তু রসুল স. এর জন্য তা হালাল করা হয়েছে। তাই তিনি স. বলেছেন, যুদ্ধলব্ধ-সম্পদ অন্য নবীদের জন্য হালাল ছিলো না। কিন্তু আমার জন্য হালাল।
কাযী আয়ায আরো লিখেছেন, ‘তোমরা কামনা করো পার্থিব সম্পদ’ এ কথাটিও রসুল স. কিংবা তাঁর সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বলা হয়নি। বলা হয়েছে ওই সকল লোককে লক্ষ্য করে, যারা পৃথিবীর বিত্ত-বৈভবের প্রতি লালসাপরায়ণ। জুহাকের বর্ণনায় এসেছে, বদর যুদ্ধের দিন যখন অংশীবাদী সৈন্যরা পালিয়ে যাচ্ছিলো, তখন বিজয় নিশ্চিত জেনে কেউ কেউ তাদের ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলো। হজরত ওমর তখন আশংকা করেছিলেন, এ রকম করলে অংশীবাদীরা হয় তো পুনরাক্রমণের উদ্যোগ নিতে পারে।
‘ইউছুখিনা’ অর্থ নিপাত করা, নিশ্চিহ্ন করা, পরাভূত করা, হত্যা করা অথবা পরাস্ত করা। এখানে মূল কর্ম বা হত্যা করার কথাটি রয়েছে অনুক্ত। এভাবে আয়াতে এই নির্দেশনাটি দেয়া হয়েছে শত্রুকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত বন্দীদেরকে ছেড়ে দেয়া যাবে না। হত্যা করতে হবে তাদেরকে। এ রকম দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক। যেমন- ‘আছখানা ফলানা’ অর্থ অমুক ব্যক্তিকে নিপাত করা হয়েছে, ‘আছখানা ফিল আদুবি’ অর্থ শত্রুকে যথেষ্ট পরিমাণে আঘাত করা হয়েছে ইত্যাদি।
এরপর বলা হয়েছে ‘তুরিদুনা আরদ্বাদ দুনইয়া’ (তোমরা কামনা করো পার্থিব সম্পদ)। এ কথার অর্থ হে মুসলমানেরা! তোমরা চাও ধ্বংসশীল পার্থিব বৈভব।
শেষে বলা হয়েছে- ‘ওয়াল্লহু ইউরিদুল আখিরা’ ওয়াল্লহু আযিযুন্ হাকীম’ (এবং আল্লাহ্ চান পরলোকের কল্যাণ; আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়)। এ কথার অর্থ- আল্লাহ্তায়ালা পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তাই তিনি চান তাঁর অপার পরাক্রমের অধীনে এবং অতুলনীয় প্রজ্ঞাময়তার অনুসরণে তোমরা পরকালাভিমুখী হও। অংশীবাদীদেরকে হত্যা করে সাহায্যকারী হও সত্যধর্মের। অর্জন করো পুণ্য এবং আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি।
হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, ঘটনাটি ঘটেছিলো বদর যুদ্ধের সময়। তখন মুসলমান সৈন্যের সংখ্যা ছিলো অল্প। পরবর্তী সময়ে যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটলো তখন অবতীর্ণ হলো- ‘ফাইম্মা মান্না বা’দু ওয়া ইন্না ফিদাআন্’ (এরপর হয় অনুগ্রহ করবে নয়তোবা রক্তপণ নেবে)। এই আয়াতের মাধ্যমে রসুল স. কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দেয়া হলো। যুদ্ধবন্দীকে হত্যা, অথবা তাদেরকে ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীতে পরিণত করা কিংবা মুক্তিপণ গ্রহণের মাধ্যমে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তখন থেকে রসুল স. কে এবং মুসলমানদেরকে দেয়া হয়েছে।
মাসআলাঃ আলেমগণের ঐকমত্য এই যে, মুসলমানদের শাসক বা অধিনায়ককে এই আয়াতের মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীদেরকে হত্যা করার অধিকার দেয়া হয়েছে। তাই রসুল স. বনী কুরায়জার পুরুষদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বন্দী করার পর হত্যা করিয়েছিলেন নজর বিন হারেস, তাইমিয়া বিন আদী এবং উকবা বিন আবী মুঈতকে। সাবিলুর রাশাদ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, উকবা বিন আবী মুঈত তখন বলেছিলো, মোহাম্মদ শিশুদেরকে দেখবে কে? রসুল স. বলেছিলেন, আগুন। ইবনে ইসহাক বলেছেন, উকবাকে হত্যা করেছিলেন হজরত ইবনে আবীল আফলা। ইবনে হিশাম বলেছেন, হজরত আবী ইবনে আবী তালেব।
মাসআলাঃ বন্দীদেরকে ক্রীতদাসে পরিণত করা সিদ্ধ। আলেমগণ এ ব্যাপারে
একমত। এর মাধ্যমে অংশীবাদীতা নিপাত করা হয় এবং সম্মানিত করা হয় ইসলামকে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, শাসক বা অধিনায়ক ছাড়া বন্দীকে হত্যা করার অধিকার অন্য কারো নেই। প্রয়োজনবোধে কেবল শাসকই যুদ্ধবন্দীকে হত্যার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে কেউ যদি অতর্কিতে কোনো যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করে ফেলে তবে এর জন্য তাকে রক্তপণ দিতে হবে না।


এই আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের সত্যিকারের এই রূপটি আসলে অত্যন্ত কঠোর এবং রক্তপিপাসু। শত্রুদের হৃদয়ে ত্রাস সৃষ্টি করতে এবং তাদের দ্বিতীয়বার যুদ্ধের সাহস কেড়ে নিতে গণহারে হত্যাযজ্ঞ চালানোই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশী নির্দেশনা।
যুদ্ধবন্দীদের জবাই করাই আল্লাহর কাছে উত্তম!
ইসলামের যুদ্ধনীতিতে বিজিত শত্রুর ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে খলিফা বা সেনাপতির সামনে সাধারণত কয়েকটি পথ থাকে: হত্যা করা, দাস বানানো অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ করা। তবে সূরা আনফালের ৬৭ ও ৬৮ নম্বর আয়াতের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরুর দিকে আল্লাহ তায়ালা মুক্তিপণ বা দয়া প্রদর্শনের চেয়ে হত্যাকাণ্ডকেই অগ্রধিকার দিয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কাফেরদের রক্ত প্রবাহিত করা কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি ‘উত্তম আমল’।
তাফসীরে মাযহারীর বর্ণনা অনুযায়ী, বদর যুদ্ধের পর যখন সাহাবীরা বন্দীদের থেকে মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেন, তখন আল্লাহ সেই প্রস্তাবকে দুনিয়াবী লালসা হিসেবে অভিহিত করে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এমনকি প্রখ্যাত ফকীহ কাযী আবুল ফজল আয়ায তাঁর বিখ্যাত ‘আশিফা’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বন্দীদের ক্ষেত্রে ‘হত্যা ও মুক্তিপণ গ্রহণ’—উভয়ই বৈধ হলেও, ‘হত্যা করাই ছিল উত্তম’ এবং মুক্তিপণ গ্রহণ ছিল অনুত্তম [6]।
নিচে তাফসীরে মাযহারীর সেই অকাট্য দলিলের অংশবিশেষ দেওয়া হলো, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে হযরত ওমর এবং হযরত সা’দ (রা.) সেই সময়কার ‘উত্তম আমল’ বা হত্যার পক্ষ নিয়েছিলেন: [6] –
অথবা ফিদিয়া— যে কোনো একটিকে আপনি গ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু ফিদিয়া গ্রহণ করলে প্রতি বন্দীর পরিবর্তে আপনার দলের একজন মৃত্যুবরণ করবে। রসুল স. এ কথা সাহাবীগণকে জানালেন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসুল! বন্দীরা আমাদেরই স্বজন। তাদেরকে ফিদিয়ার বিনিময়ে মুক্ত করে দিলে ফিদিয়ার অর্থে আমরা সমর-সরঞ্জাম বৃদ্ধি করতে পারবো। আর তাদের একজনের বদলে আমাদের একজন যদি শহীদও হয়, তবুও তা আমাদের নিকট অপছন্দনীয় নয়। তাই হয়েছিলো। বদরের সত্তরজন যুদ্ধবন্দীর বদলে উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন সত্তরজন সাহাবী।
জ্ঞাতব্যঃ কাযী আবুল ফজল আয়ায তাঁর আশিফা গ্রন্থে লিখেছেন, হত্যা ও মুক্তিপণ গ্রহণ— দু’টোই ছিলো বৈধ। তবে হত্যা ছিলো উত্তম এবং মুক্তিপণ গ্রহণের মাধ্যমে বন্দী মুক্তির ব্যাপারটি ছিলো অনুত্তম। রূপকার্থে তাই মুক্তিপণ গ্রহণ করাকে অন্যায় বলা হয়েছে। নির্দেশনাটি ছিলো এ রকম– উত্তম আমল গ্রহণ করাই সমীচীন। তিবরানীও এ রকম বলেছেন। হজরত ওমর এবং হজরত সা’দ গ্রহণ করেছিলেন উত্তম আমলটি। তাই রসুল স. বলেছিলেন, আযাব এলে ওমর ও সা’দ ছাড়া আর কেউ বাঁচতে পারতো না। কিন্তু তকদীরের নির্ধারণ ছিলো আযাব আসবে না। তাই আযাব আসেনি।
দাউদ জাহেরী বলেছেন, পূর্বাহ্নে ফিদিয়াকে নিষেধ করা হয়নি। নিষেধ করা হলেও এ কথা বলা যেতো না যে রসুল স. আল্লাহর নিষেধের বাইরে কোনো কাজ করেন। এ রকম করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাই, বলা হয়েছে ‘আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে’। এভাবে বলে বরং রসুল স. কে সম্মানিতই করা হয়েছে। প্রকাশ করা হয়েছে আল্লাহর প্রতি রসুল স. এর একনিষ্ঠ আনুগত্যকে। বাগবী লিখেছেন, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে সাহাবীগণ ফিদিয়ার অর্থ গ্রহণের প্রতি তাঁদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তখন অবতীর্ণ হয় নিম্নের আয়াত।

ইসলামিক জিহাদের পর অমুসলিম যুদ্ধবন্দীদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, সে সম্পর্কে তাফসীরে ইবনে কাসীর আরও ভয়াবহ বর্ণনা প্রদান করে। সেখানে ইবনে আব্বাস-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, কাফেরদের কেবল হারানোই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের কঠোরভাবে বন্দী করে ‘জ্বালা-যন্ত্রণা’ দেওয়া এবং ‘নির্দয়ভাবে হত্যা’ করা প্রয়োজন, যাতে অন্য শত্রুরা ভীত হয় [7] –
তাফসীরঃ উল্লেখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ পাক কাফিরদের প্রতি তাঁহার ঘৃণা এবং তাহাদের অপকর্মের বর্ণনা দিয়া বলিতেছেন যে, ভূপৃষ্ঠে জীবকুলের মধ্যে বেঈমান কাফিরগণই হইল আল্লাহর নিকট অতি নিকৃষ্ট জীব। উহাদের মধ্যকার যাহাদের সাথে তুমি যখনই কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হও, তখনই উহারা সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে। যখন উহাদিগকে বিশ্বাস করিয়া আস্থা স্থাপন কর, তখন বিশ্বাস ভঙ্গ করিয়া তোমার আস্থা নষ্ট করিয়া ফেলে। উহারা আল্লাহকে আদৌ কোনরূপ ভয়ই করে না। নির্ভয় দাম্ভিকতার সহিত পাপাচারে লিপ্ত হয়। আলোচ্য আয়াতাংশের মর্ম হইলঃ তুমি যদি উহাদের যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া বিজয় লাভ করিতে পার, তবে কঠোরভাবে বন্দী করিয়া জ্বালা-যন্ত্রণা দিবে। এই ব্যাখ্যা প্রদান করেন ইবন আব্বাস (রা)।
হাসান বসরী, যাহহাক, সুদ্দী, আতা খুরাসানী ও ইবন উআয়না (র) ইহার ব্যাখ্যায় বলেনঃ যুদ্ধে উহাদিগকে পরাস্ত করিতে পারিলে অতি কঠোরভাবে শাস্তি দিবে এবং নির্দয়ভাবে উহাদিগকে হত্যা করিবে যেন ইহাদের ছাড়া আরবের অন্যান্য শত্রুগণ এই শাস্তির কথা শুনিয়া ভীত হয় এবং নসীহত ও শিক্ষা গ্রহণ করে। তাহাদের মধ্যে লজ্জা ও অনুশোচনার সৃষ্টি হয়।

বানু কুরাইজা গোত্রের সাবালক পুরুষদের গণহত্যা
ইসলামী যুদ্ধনীতির এই যে রক্তক্ষয়ী ও নির্দয় দর্শনের কথা আমরা উপরে আলোচনা করলাম, তার সবচেয়ে বাস্তব এবং ভয়াবহ প্রয়োগ দেখা যায় মদিনার ইহুদি গোত্র বানু কুরাইজার ক্ষেত্রে। খন্দকের যুদ্ধের পর যখন এই গোত্রটি অবরুদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে, তখন তাদের ভাগ্য নির্ধারণের ভার দেওয়া হয়েছিল সাহাবী সা’দ ইবনে মু’আজের ওপর। সা’দ ইবনে মু’আজ ফয়সালা দেন যে, এই গোত্রের সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা করা হবে এবং নারী ও শিশুদের গনিমতের মাল বা দাস হিসেবে বণ্টন করা হবে। নবী মুহাম্মাদ এই রায়কে ‘সাত আসমানের ওপর থেকে আসা আল্লাহর ফয়সালা’ হিসেবে অভিহিত করে এর ঐশী বৈধতা নিশ্চিত করেছিলেন [8] । এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং সূরা আনফালের সেই ‘রক্ত প্রবাহিত করার’ দর্শনেরই এক চূড়ান্ত ও চাক্ষুষ বাস্তবায়ন ছিল, যেখানে শত্রুকে ক্ষমা করার চেয়ে সমূলে বিনাশ করাকেই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
এই গণহত্যার সবচেয়ে নৃশংস এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী দিকটি ছিল ‘যোদ্ধা’ বা ‘অপরাধী’ নির্ধারণের পদ্ধতি। কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের বিচার না করে, কেবল শারীরিক বয়ঃপ্রাপ্তি বা ‘সাবালকত্ব’কেই হত্যার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছিল। ইসলামী ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থ ও নির্ভরযোগ্য হাদিসগুলোতে বর্ণিত হয়েছে যে, বন্দীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের পরনের কাপড় খুলে পরীক্ষা করা হয়েছিল যে কারো নাভির নিচে বা লজ্জাস্থানে পশম বা চুল গজিয়েছে কি না। যার দেহেই বয়ঃপ্রাপ্তির এই শারীরিক চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল, তাকেই ‘সাবালক’ গণ্য করে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে শিরচ্ছেদ করা হয়েছিল। এই পৈশাচিক পরীক্ষার মাধ্যমে এমনকি অনেক কিশোরকেও রেহাই দেওয়া হয়নি, যারা কেবল বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর কারণে সেই রক্তক্ষয়ী গণহত্যাকাণ্ডের শিকারে পরিণত হয়েছিল। নিচে এই অমানবিক প্রক্রিয়ার স্বপক্ষে হাদিসের অকাট্য এবং সহিহ দলিলসমূহ তুলে ধরা হলো: [9] [10] [11] [12] [13] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ১৭. নাবালকের অপরাধের শাস্তি
৪৪০৪। আতিয়্যাহ আল-কুরাযী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বনী কুরাইযার বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। তারা দেখতো, যার নাভীর নীচে চুল উঠেছে তাকে হত্যা করা হতো; আর যার উঠেনি, তাকে হত্যা করা হতো না। আর আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম, যাদের তা উঠেনি।(1)
সহীহ।
(1). তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ১৭. নাবালকের অপরাধের শাস্তি
৪৪০৫। আব্দুল মালিক ইবনু উমাইর (রহঃ) সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত। আতিয়্যাহ (রাঃ) বলেন, তারা (মুসলিমরা) আমার নাভীর নীচ অনাবৃত করে দেখলো যে, চুল উঠেনি। সুতরাং তারা আমাকে বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত করলো।(1)
সহীহ।
(1). এর পূর্বেরটি দেখুন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছেদঃ ১৭. নাবালেগ ছেলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলে।
৪৩৫২. মুহাম্মদ ইবন কাছীর (রহঃ)….আতিয়া কুরাযী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি কুরায়যা গোত্রের বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম, (যাদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল). সে সময় লোকেরা তদন্ত করে দেখছিল এবং যাদের নাভীর নীচে চুল উঠেছিল, তাদের হত্যা করা হচ্ছিল। আর আমি তাদের দলভুক্ত ছিলাম, যাদের তখনো নাভীর নীচে পশম উঠেনি। ফলে আমাকে হত্যা করা হয় নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮৪। আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমাদেরকে বানূ কুরাইযার যুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আনা হল। যাদের লজ্জাস্থানের লোম উঠেছে (বালেগদের) তাদেরকে হত্যা করা হল, আর যাদের তা উঠেনি (নাবালেগদের) তাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হল। আমার লজ্জাস্থানে তখনও লোম উঠেনি। একারণে আমাকে মুক্ত করে দেওয়া হল।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৫৪১)
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। এ হাদীস মোতাবিক একদল অভিজ্ঞ আলিম আমল করেছেন। তাদের মতে, যে লোকের বয়স এবং বীর্যপাতের ব্যাপারে সঠিকভাবে অনুমান করা না যাবে- তার নাভির নীচের লোম উঠাই বয়ঃপ্রাপ্তির লক্ষণ বলে গণ্য হবে। এই অভিমত দিয়েছেন ইমাম আহমাদ এবং ইসহাকও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
সুনানে ইবনে মাজাহ
১৪/ হদ্দ (দন্ড)
পরিচ্ছেদঃ ১৪/৪. যার উপর হদ্দ কার্যকর করা আবশ্যিক নয়
১/২৫৪১। আতিয়্যা আল-কুরাজী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ কুরায়জাকে হত্যার দিন আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে উপস্থিত করা হলো। যার (লজ্জাস্থানের) লোম গজিয়েছিল, তাকে হত্যা করা হলো এবং যার লোম গজায়নি তাকে রেহাই দেয়া হলো। আমি ছিলাম লোম না গজানোদের অন্তর্ভুক্ত, তাই আমাকে রেহাই দেয়া হয়।
হাদিসটি ইমাম ইবনু মাজাহ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী ফিস সুনান ৭/২৩৯, আল-হাকিম ফিল মুসতাদরাক ৪/৩৬৫, মিশকাত ৩৯৭৪।
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)
এই বিষয়ে আধুনিক আলেমদের অবস্থান
এই মধ্যযুগীয় এবং রক্তক্ষয়ী বিধানগুলো কেবল প্রাচীন কেতাবেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বর্তমান যুগের ওলামায়ে কেরামও এই আয়াতগুলোর কঠোর ব্যাখ্যা প্রদান করে থাকেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের এই যুদ্ধনীতি সময়ের সাথে সাথে বিলীন হয়ে যায়নি, বরং আজও তা ধর্মতাত্ত্বিক ও আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।
নিচে পাকিস্তানের একজন প্রখ্যাত আলেমের বক্তব্য শুনলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে, যেখানে তিনি সূরা আনফালের ৬৭ নম্বর আয়াতের প্রেক্ষাপট ও যুদ্ধবন্দীদের হত্যার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন:
অর্থাৎ যেখানে আধুনিক সভ্যতা যুদ্ধবন্দীদের অধিকার রক্ষার কথা বলে, সেখানে ইসলামের ধ্রুপদী উৎসগুলো রক্তপাত এবং নৃশংসতাকে বিজয়ের মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
উপসংহারঃ আধিপত্যবাদ ও মানবিক সংকট
সার্বিক দালিলিক পর্যালোচনা ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পর এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ধ্রুপদী ইসলামের জিহাদ ও কিতাল সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি কেবল কোনো বিশেষ সময়ের সীমাবদ্ধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়। বরং এটি একটি সুসংগঠিত ধর্মতাত্ত্বিক আধিপত্যবাদ, যার মূল ভিত্তি হচ্ছে ভিন্নমতের বিনাশ এবং একক ধর্মীয় হুকুমত প্রতিষ্ঠা। এই প্রবন্ধে আলোচিত তথ্যসূত্রগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামের সম্প্রসারণবাদী নীতি মূলত ‘শিরক’ বা অংশীবাদিতাকে একটি বৈশ্বিক ‘ফিতনা’ বা বিশৃঙ্খলা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তার বিরুদ্ধে চিরন্তন যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
এই যুদ্ধনীতির সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত হয় সূরা আনফালের ৬৭ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে। যেখানে আধুনিক সভ্যতা যুদ্ধবন্দীদের অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে, সেখানে এই আয়াত খুব স্পষ্টভাবে বিজয়ের শর্ত হিসেবে ‘প্রচুর রক্তপাত’ ও ‘হত্যাকাণ্ড’ ঘটানোর আবশ্যকতা তুলে ধরেছে। এটি কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং একটি আদর্শিক বার্তা—যেখানে শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করা এবং তাদের অস্তিত্বকে পর্যুদস্ত করাকে ‘উত্তম আমল’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী দর্শনের বিপরীতে “দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তি নেই” কিংবা “শান্তি”র স্লোগানগুলো ধ্রুপদী ফিকাহ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সামনে অত্যন্ত দুর্বল ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সংঘাতের কয়েকটি মূল দিক এখানে প্রণিধানযোগ্য:
মানবাধিকারের লঙ্ঘন: অস্ত্র সংবরণ করা বা আত্মসমর্পণ করা যুদ্ধবন্দীদের নির্বিচারে হত্যা করা আধুনিক জেনেভা কনভেনশন ও বৈশ্বিক মানবিক আইনের পরিপন্থী। কিন্তু শাস্ত্রীয় ইসলামে একে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা সরাসরি যুদ্ধাপরাধের নামান্তর।
স্থায়ী যুদ্ধের দর্শন: যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে শিরক নিশ্চিহ্ন না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কিতাল চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ মূলত একটি ‘অন্তহীন সংঘাত’ (Perpetual War) এর জন্ম দেয়। এটি আধুনিক বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ধর্মীয় জবরদস্তি: অমুসলিমদের সামনে ইসলাম গ্রহণ, জিযিয়া প্রদান বা মৃত্যুর যে তিনটি পথ খোলা রাখা হয়, তা মূলত একটি সুকৌশলী জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও দাসত্বের পরিকাঠামো। এখানে ‘নির্বাচনের অধিকার’ এর চেয়ে ‘প্রাণের ভয়’ বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের এই মধ্যযুগীয় যুদ্ধনীতি এবং যুদ্ধবন্দীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বৈধতা কোনোভাবেই সমসাময়িক মানবিক মূল্যবোধ ও যুক্তিবাদী চেতনার সাথে খাপ খায় না। সত্য ও ন্যায়ের আধুনিক মানদণ্ড কেবল কোনো প্রাচীন লিপির অন্ধ আনুগত্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং একে হতে হবে সর্বজনীন ও পক্ষপাতহীন। যুক্তি এবং প্রমাণের নিরিখে এটি আজ অনস্বীকার্য যে, যে দর্শন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্বকে ‘ফিতনা’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের রক্ত ঝরানোকে বিজয়ের শর্ত বানায়, তা আধুনিক সভ্য সমাজের জন্য এক বিরাট আদর্শিক চ্যালেঞ্জ। এই বিধানগুলোর নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ ও সমালোচনা করাই হতে পারে গোঁড়ামিমুক্ত একটি মানবিক বিশ্ব গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৬৫২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৫৩৩ ↩︎
- সূরা আনফাল, আয়াত ৬৭ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০১ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৯-২০০ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৭ 1 2
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৮১ ↩︎
- বনু কুরাইজার গণহত্যাঃ ইসলামি ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায় ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৪০৪ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৪০৫ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৩৫২ ↩︎
- সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ১৫৮৪ ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ২৫৪১ ↩︎
