ইসলামে অনুসারে অমুসলিমরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী

Table of Contents

ভূমিকা

ইসলাম মানুষকে এক ধরণের কাল্পনিক স্বপ্ন দেখায় যে, পৃথিবীর এই অবিচার অনাচার বা মানুষের অপ্রাপ্তিগুলো পরকালে পূরণ করা হবে। যদিও ইসলাম এসবের কোন প্রমাণ কখনো দেয় না, কিন্তু এক অদৃশ্য মুলোর মত মানুষকে ধর্মবিশ্বাসের অন্ধ আফিমে বুঁদ করে রাখে। পারলৌকিক ইনসাফমূলক ব্যবস্থার কাল্পনিক স্বপ্ন দেখিয়ে নৈতিক ও বিচারব্যবস্থার ধর্ম বলে দাবি করে, পরকালে মারাত্মক সব অবিচারের কথাও বলে। এই স্ববিরোধীতার উদাহরণ ইসলাম ধর্মে অনেক। সেই কারণে ইসলামের এই কাল্পনিক ইনসাফের জগতের কল্পনা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলোর সাথেই যে প্রবলভাবে সাংঘর্ষিক, সেটি বলাই বাহুল্য। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামে ইনসাফের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার তো নয়-ই, বরঞ্চ ন্যায় বিচারের সাথে প্রবলভাবে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে, ইসলামে বিশ্বাস ও কর্মের সম্পর্ক যে অনৈতিক বৈষম্যের ভিত্তিতে গঠিত, তা এই ধর্মের বিচারব্যবস্থার গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। কারণ ইসলাম ধর্ম অনুসারে, সকল অমুসলিমই চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আর ভিন্ন দিকে, একজন মুসলিম যত বড় অন্যায় বা অপরাধী করুক না কেন, তার মনে সামান্য ইমান থাকলে সে জান্নাতী।


ঈমান বনাম কর্মঃ একটি গভীর অসঙ্গতি

ইসলামের বিধান অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি সারাজীবন নৈতিক জীবন যাপন করে, অন্য মানুষের উপকার করে, তবুও সে যদি মুসলিম না হয়, তবে তার গন্তব্য হবে অনন্ত জাহান্নাম। অর্থাৎ চিরস্থায়ীভাবে সে জাহান্নামে যাবে। অপরদিকে, একজন মুসলিম যদি অসংখ্য পাপ করে, অসংখ্য মানুষ হত্যা করে, অসংখ্য নারী ধর্ষণ করে, তারপরেও সে সরাসরি জান্নাতে যাবে। শুধুমাত্র শর্ত হচ্ছে, তার অহংকারী হওয়া যাবে না। আবার অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, একজন মুসলিম যত বড় অন্যায় অপরাধী করুক না কেন, সে জান্নাতেই যাবে [1] [2] [3] [4]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছদঃ ৩৯. অহংকারের বিবরণ ও তা হারাম হওয়া
১৬৮। মিনজাব ইবনু হারিস আত তামীমী ও সুয়ায়দ ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমান ঈমান থাকবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আর যে ব্যাক্তির অন্তরে এক সরিষার দানা পরিমাণ অহমিকা থাকবে সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ ঈমান
২৬৪৪৷ আবূ যার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল (আঃ) আমার নিকট এসে এই সুসংবাদ দেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার সাথে কিছু শারীক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি প্রশ্ন করলাম, সে যদি ব্যভিচার করে থাকে, সে যদি চুরি করে থাকে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ (তবুও সে জান্নাতে যাবে)।
সহীহঃ সহীহাহ (৮২৬), বুখারী ও মুসলিম।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। এ অনুচ্ছেদে আবূদ দারদা (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ‏
৭০০১। ইউসুফ ইবনু রাশিদ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন যখন আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে তখন আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক! যার অন্তরে এক সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে তুমি জান্নাতে দাখিল করো। তারপর তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করা হবে। তারপর আমি বলব, তাকেও জান্নাতে প্রবেশ করাও, যার অন্তরে সামান্য ঈমানও আছে। আনাস (রাঃ) বলেনঃ আমি যেন এখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতের আঙুলগুলো দেখছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৭৭/ পোশাক
পরিচ্ছদঃ ৭৭/২৪. সাদা পোশাক প্রসঙ্গে
৫৮২৭. আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। তাঁর পরনে তখন সাদা পোশাক ছিল। তখন তিনি ছিলেন নিদ্রিত। কিছুক্ষণ পর আবার এলাম, তখন তিনি জেগে গেছেন। তিনি বললেনঃ যে কোন বান্দা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলবে এবং এ অবস্থার উপরে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললামঃ সে যদি যিনা করে, সে যদি চুরি করে? তিনি বললেনঃ যদি সে যিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ সে যদি যিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, সে যদি যিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও। আমি বললামঃ যদি সে যিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও? তিনি বললেনঃ যদি সে যিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আবূ যারের নাক ধূলি ধুসরিত হলেও। আবূ যার যখনই এ হাদীস বর্ণনা করতেন তখন আবূ যারের নাসিকা ধূলাচ্ছন্ন হলেও বাক্যটি বলতেন। আবূ ‘আবদুল্লাহ ইমাম বুখারী) বলেনঃ এ কথা প্রযোজ্য হয় মৃত্যুর সময় বা তার পূর্বে যখন সে তাওবাহ করে ও লজ্জিত হয় এবং বলে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’, তখন তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (১২৩৭) (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৪০১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৯৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


মুশরিকদের ‘নাপাক’ ঘোষণা: মানবমর্যাদার সরাসরি অবমাননা

ইসলামি শাস্ত্রে মুশরিকদের শুধু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে দেখা হয়নি; তাদেরকে সরাসরি “নাপাক” বা “অপবিত্র” হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সূরা তওবার ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মুশরিকরা অপবিত্র, তাই তারা যেন মসজিদুল হারামের নিকটবর্তী না হয়। এই বক্তব্য কেবল কোনো আচারগত পবিত্রতা-অপবিত্রতার প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব, পরিচয় ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাকে নৈতিকভাবে নিচু, অশুচি ও সামাজিকভাবে বর্জনযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার একটি ধর্মীয় ঘোষণা।

কোনো মানুষকে তার বিশ্বাসের কারণে “অপবিত্র” বলা শুধু ধর্মতাত্ত্বিক মতামত নয়; এটি মানবমর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। আধুনিক মানবাধিকার-চিন্তার কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো—মানুষ তার জন্মগত মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমান অধিকারের অধিকারী। সেই অর্থে একজন মানুষ ভুল বিশ্বাস করতে পারে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন হতে পারে, অযৌক্তিক মতবাদে বিশ্বাস করতে পারে—এসবের সমালোচনা যুক্তি দিয়ে করা যায়। কিন্তু তাকে মানুষ হিসেবে ‘নাপাক’, ‘অশুচি’ বা ‘অস্পৃশ্য’ শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা নয়; এটি ব্যক্তির বিশ্বাসের সমালোচনা ছাড়িয়ে তার মানবিক অস্তিত্বকেই অবমাননা করে।

এই ধারণার ভয়াবহতা এখানেই যে, “মুশরিকরা নাপাক”—এই ঘোষণা শুধু একটি বিমূর্ত ধর্মীয় বাক্য হয়ে থাকে না; এর সামাজিক ও রাজনৈতিক ফলও তৈরি হয়। যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে পবিত্র-অপবিত্রতার ভাষায় শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, তখন তাদের সঙ্গে সমান নাগরিক হিসেবে আচরণ করার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা, সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে রাখা, জিজিয়া দিয়ে অধীনতা স্বীকারে বাধ্য করা, কিংবা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ মনে করা—এসবের পেছনে এই অপমানজনক ধর্মতাত্ত্বিক মনস্তত্ত্ব কাজ করে। অর্থাৎ “নাপাক” শব্দটি কেবল ভাষাগত গালি নয়; এটি অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, বর্জন ও অধীনতার একটি শাস্ত্রীয় মানসিক ভিত্তি। আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে বিষয়টি জেনে নিই, [5]

আলোচ্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিক ব্যক্তি অপবিত্র। সহীহ্ হাদীসে বর্ণিত রহিয়াছে, নবী করীম (সা) বলিয়াছেন: মু’মিন ব্যক্তি অপবিত্র হয় না। মুশরিক ব্যক্তির আত্মা যে অপবিত্র, উহা স্পষ্ট; কারণ, সে বাতিল ও অপবিত্র দীনের অনুসারী। মুশরিক ব্যক্তির দেহ অপবিত্র কিনা সে বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। অধিকাংশ ফকীহ্ বলেন :
মুশরিক ব্যক্তির দেহ অপবিত্র নহে। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা আহলে কিতাব জাতিসমূহের খাদ্যকে মুসলমানদের জন্যে হালাল করিয়াছেন। জাহিরী সম্প্রদায়ের কেহ কেহ বলেন : মুশরিক ব্যক্তির দেহও অপবিত্র। হাসান বসরী হইতে আশআস বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন: মুশরিক ব্যক্তির সহিত কেহ করমর্দন করিলে সে যেন অযু করে।

জাহান্নামী

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকেও দেখে নেয়া যাক, [6]

বীর্য, রক্ত ইত্যাদি। এগুলো প্রকৃত অর্থেই নাপাক। শরিয়তও এগুলোকে নাপাক বলেছে। এগুলোর নাপাকি অবশ্যই বাহ্যিক। এগুলোকে মুমিন, মুশরিক সকলেই নাপাক বলে থাকে। কিন্তু এখানে মুশরিকদেরকে অপবিত্র বলা হয়েছে এ সকল কারণে নয়। তাদের নাপাকি অস্তিত্বজ ও অভ্যন্তরীণ। বাহ্যিক নাপাকি থেকে যেমন মুক্ত থাকা আবশ্যক, তেমনি অভ্যন্তরীণ নাপাকী থেকেও মুক্ত থাকা অপরিহার্য। অতএব, অংশীবাদীদের স্পর্শ থেকেও মুক্ত থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে একত্রবাস বৈধ নয়। বসতবাটিও নির্মাণ করা সমীচীন নয় তাদের বসতবাটির সঙ্গে।
হজরত আবু উবায়দা এবং জুহাক বলেছেন, এখানে নাজাসাত অর্থ নাজাসাতে গলিজা (গুরু অপবিত্রতা), নাজাসাতে খফিফা (লঘু অপবিত্রতা) নয়। ইমাম বাগবী লিখেছেন, এখানে শারীরিক অপবিত্রতার কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে বিধানগত (হুকুমী) অপবিত্রতার কথা। কোনো প্রকার ব্যাখ্যা বা কারণ উল্লেখ ব্যতিরেকেই এখানে অংশীবাদীদেরকে কেবল হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে ‘অপবিত্র’।
কাতাদা বলেছেন, কাফেরেরা এ কারণে অপবিত্র যে, তারা ওজু ও রতিকর্ম পরবর্তী গোসল কিংবা বীর্যস্খলন পরবর্তী গোসল করে না। অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকে না।
হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মুশরিকেরা কুকুরের মতো অপবিত্র। কুকুরের দেহ যেমন নাপাক, তেমনি মুশরিকদের শরীরও নাপাক। হজরত ইবনে আব্বাস থেকে আবু শায়েখ ও ইবনে মারদুবিয়া লিখেছেন, রসুল স. নির্দেশ করেছেন, তোমরা অংশীবাদীদের সঙ্গে করমর্দন করলে ওজু করে নিয়ো। অথবা নির্দেশ করেছেন, হাত ধুয়ে নিয়ো। এই বিবরণটি আলেমগণের ঐকমত্যবিরোধী- তাই অগ্রহণীয়।
এরপর বলা হয়েছে- ‘সুতরাং এ বছরের পর তারা যেনো মসজিদুল হারামের নিকটে না আসে।’ হানাফী মতাবলম্বীগণ বলেছেন, এ কথার অর্থ এ বছরের পর থেকে মুশরিকেরা যেনো হজ ও ওমরা না করে। এই নির্দেশনাটির মাধ্যমে মসজিদুল হারামে তাদের প্রবেশকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তাই অন্যান্য মসজিদে তাদের প্রবেশ অসিদ্ধ নয়। ‘নিকটে না আসে’ কথাটির অর্থ এখানে-তারা যেনো মসজিদুল হারামের সন্নিকটে এসে হজ ও ওমরা না করে।

জাহান্নামী 1

আধুনিক এপোলোজিস্টরা অনেক সময় বলেন, এখানে “নাপাক” বলতে শারীরিক অপবিত্রতা বোঝানো হয়নি, বরং আকিদাগত বা আধ্যাত্মিক অপবিত্রতা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও সমস্যাকে দূর করে না। বরং প্রশ্নটিকে আরও নগ্ন করে। কারণ শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ব্যক্তির আচরণের বিষয়; কিন্তু আকিদাগত অপবিত্রতা ব্যক্তির বিশ্বাস-পরিচয়ের ওপর আরোপিত স্থায়ী অবমাননা। অর্থাৎ একজন মানুষ কেবল মুসলিম নয় বলে, অথবা আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করে বলে, তাকে আধ্যাত্মিকভাবে নিকৃষ্ট ও অপবিত্র ঘোষণা করা হচ্ছে। এই ঘোষণাই মানবমর্যাদার পরিপন্থী।

মানবমর্যাদা বলতে বোঝায়—মানুষকে প্রথমে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে; তার মতবাদ, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সংস্কৃতি বা পরিচয়ের কারণে তাকে ontologically নীচু, অশুচি বা বর্জনযোগ্য সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না। ইসলামি শাস্ত্রে মুশরিকদের “নাপাক” ঘোষণা সেই মৌলিক নীতির বিরোধী। এটি ভিন্নমতের সমালোচনা নয়; এটি ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের মর্যাদাকেই অস্বীকার করে। তাই মুশরিকদের “নাপাক” ঘোষণাকে শুধু ধর্মীয় ভাষা বলে পাশ কাটানো যায় না; এটি ধর্মীয় বৈষম্য, সামাজিক বর্জন এবং মানবমর্যাদা লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।


অমুসলিমরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী

কোরআন খুব পরিষ্কারভাবেই ঘোষণা করেছে যে, অমুসলিমরা অনন্তকালের জন্য অর্থাৎ চিরস্থায়ী জাহান্নামী [7]

আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ও কাফিরদের জন্য জাহান্নামের আগুনের ওয়া‘দা দিয়েছেন, তাতে তারা চিরদিন থাকবে, তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের উপর আছে আল্লাহর অভিশাপ, আর আছে তাদের জন্য স্থায়ী ‘আযাব।
— Taisirul Quran
আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও নারীদের এবং কাফিরদের সাথে জাহান্নামের আগুনের অঙ্গীকার করেছেন, তাতে তারা চিরকাল থাকবে,ওটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদেরকে লা’নত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী শাস্তি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ওকাফিরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাতে তারা চিরদিন থাকবে, এটি তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের লা‘নত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব।
— Rawai Al-bayan
মুনাফেক পুরুষ, মুনাফেক নারী ওকাফেরদেরকে আল্লাহ্‌ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাহান্নামের আগুনের, যেখানে তারা স্থায়ী হবে, এটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট।আর আল্লাহ তাদেরকে লা’নত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Allah has promised the hypocrite men and hypocrite women andthe disbelievers the fire of Hell, wherein they will abide eternally. It is sufficient for them. And Allah has cursed them, andfor them is an enduring punishment.
— Saheeh International

নবী মুহাম্মদ বলেছেন, মুমিনদের নাবালেগ বাচ্চারা যদি ছোট অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, তবে তারা তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে, অর্থাৎ জান্নাতে যাবে। আবার, মুশরিকদের নাবালেগ বাচ্চারা তাদের পিতামাতার আমল অনুসারে জাহান্নামে যাবে। কোন আমল ছাড়াই [8]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১১-(৩৩) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মু’মিনদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের (জান্নাত-জাহান্নাম সংক্রান্ত ব্যাপারে) কী হুকুম? তিনি উত্তরে বললেন, তারা বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আমি বললাম, কোন (নেক) ‘আমল ছাড়াই? তিনি বললেন, আল্লাহ অনেক ভালো জানেন, তারা জীবিত থাকলে কী ‘আমল করতো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা মুশরিকদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের কী হুকুম? তিনি বললেন, তারাও তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে। (অবাক দৃষ্টিতে) আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন (বদ) ‘আমল ছাড়াই? উত্তরে তিনি বললেন, সে বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকলে কী ‘আমল করত, আল্লাহ খুব ভালো জানেন। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪০৮৯। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন : হাদীসটি দু’টি সানাদে বর্ণিত যার একটি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এবারে আসুন আরেকটি হাদিস পড়ি এবং বোঝার চেষ্টা করি যে, ইসলামের এই বিষয়গুলো কেমন [9]

জাহান্নামী 3

আরও একটি হাদিস পড়ি, [10]

জাহান্নামী 5


দাওয়াত না পাওয়া অমুসলিমদের কেয়ামতে পুনরায় পরীক্ষা?

আধুনিককালের ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক ও দাঈদের মাঝে একটি বহুল প্রচলিত দাবি হলো—যেসব অমুসলিমের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি বা বিকৃতভাবে পৌঁছেছে (আহলুল ফাতরাহ), কেয়ামতের দিন তাদের জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষা (ইমতিহান) নেওয়া হবে। দাবি করা হয়, সেখানে তাদের সামনে আগুন উপস্থিত করা হবে এবং যারা আল্লাহর আদেশে তাতে ঝাঁপ দেবে, তারা জান্নাতি হবে। কিন্তু এই তত্ত্বটি ইসলামের আদি এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহের (সহিহাইন) বক্তব্যের সাথে কেবল সাংঘর্ষিকই নয়, বরং এটি পরবর্তী যুগের একটি ‘ধর্মতাত্ত্বিক সংকট নিরসনকারী’ (Theological patch) প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।


সহিহ বুখারি ও মুসলিমের সাক্ষ্যঃ পরীক্ষা নাকি পূর্বজ্ঞান?

ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিস সংকলনগুলোতে যখন অমুসলিম শিশুদের (যারা দাওয়াত না পাওয়া মানুষের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ) পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখন নবী মুহাম্মদ কোনো ‘পুনরায় পরীক্ষা’র কথা উল্লেখ করেননি। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলকে মুশরিকদের শিশুদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন— “আল্লাহ ভালো জানেন তারা (বেঁচে থাকলে) কী আমল করত” [11]

এই ‘আল্লাহু আলাম’ (আল্লাহ ভালো জানেন) বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর বিচার হবে তাঁর ‘পূর্বজ্ঞান’ বা ‘Pre-destination’-এর ভিত্তিতে, কোনো নতুন পরীক্ষার ভিত্তিতে নয়। যদি পরকালে একটি নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি নির্ধারিত থাকতই, তবে নবী সেই সুনির্দিষ্ট তথ্যটি জানাতেন। তিনি তা না করে বিষয়টিকে আল্লাহর ইলমের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে আদি ইসলামি তত্ত্বে ‘মৃত্যু-পরবর্তী নতুন কর্মফল’ বা ‘সেকেন্ড চান্স’-এর কোনো স্থান ছিল না।


‘চার ব্যক্তির হাদিস’ ও বর্ণনার দুর্বলতা

পুনরায় পরীক্ষার দাবিটি মূলত মুসনাদে আহমদ এবং তাবারানীতে বর্ণিত ‘চার ব্যক্তির হাদিস’-এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। আল-আসওয়াদ ইবনে সারী থেকে বর্ণিত এই হাদিসে বলা হয়েছে যে, বধির, উন্মাদ, অতি বৃদ্ধ এবং ফাতরাহ (দাওয়াত না পাওয়া) ব্যক্তিরা আল্লাহর কাছে অজুহাত দেখাবে এবং তাদের জন্য আগুনের পরীক্ষা নেওয়া হবে [12]

যদিও নাসেরুদ্দিন আলবানী বা ইবনে কাসিরের মতো পরবর্তী যুগের কিছু স্কলার এই বর্ণনাগুলোকে হাসান বা সহিহ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ধ্রুপদী হাদিসতত্ত্বের মানদণ্ডে এগুলো চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথমত, এই বর্ণনাগুলো ‘আহাদ’ বা একক সূত্র থেকে আসা, যা দিয়ে কোনো মৌলিক ‘আকীদা’ বা পরকালীন বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের বিধান অনুসারেই অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, এই বর্ণনাগুলো বুখারি ও মুসলিমের ‘আল্লাহু আলাম’ সংবলিত হাদিসগুলোর সরাসরি পরিপন্থী। হাদিস শাস্ত্রের নীতি অনুযায়ী, যখন একটি দুর্বল বা মধ্যম সারির বর্ণনা (মুসনাদে আহমদের হাদিস) একটি উচ্চতর সহিহ বর্ণনার (বুখারি-মুসলিমের হাদিস) অর্থকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন উচ্চতরটিই ইসলামি বিশ্বাসে গ্রহণযোগ্য হয়।


তাত্ত্বিক অসঙ্গতি ও ‘অ্যাড-হক’ ব্যাখ্যার স্বরূপ

এই ‘পুনরায় পরীক্ষা’র তত্ত্বটি মূলত একটি পরবর্তীকালীন উদ্ভাবন, যা দুটি প্রধান কারণে তৈরি করা হয়েছে:

নৈতিক সংকট নিরসন: “বার্তা না পাওয়া মানুষকে অনন্তকাল আগুনে পোড়ানো কি ন্যায়বিচার?”—পরবর্তী যুগের যুক্তিবাদী বা মুতাজিলা ঘরানার এই প্রশ্নের মুখে যখন আলেম সমাজ চাপে পড়েন, তখন তারা এই কাল্পনিক পরীক্ষার তত্ত্বকে ‘ডিফেন্স মেকানিজম’ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন।
কোরআনি আয়াতের ভুল প্রয়োগ: কোরআনে বলা হয়েছে— “আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত শাস্তি দেই না” [13]। এই আয়াতটিকে ব্যবহার করে তারা দাবি করেন যে শাস্তি হবে না মানেই সেখানে একটি পরীক্ষা হবে। অথচ কোরআন বা সহিহ সুন্নাহর কোথাও এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘আগুনের পরীক্ষা’র কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে বড় যৌক্তিক অসঙ্গতি হলো ‘ঈমান বিল গায়েিব’ বা অদৃশ্যের বিশ্বাসের ধারণা। ইসলামের মূল ভিত্তি হলো দুনিয়াতে অদৃশ্য থেকে আল্লাহকে বিশ্বাস করা। কিন্তু কেয়ামতের ময়দানে যখন আল্লাহ এবং পরকাল দৃশ্যমান (Certitude), তখন সেখানে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার ধারণাটিই ‘পরীক্ষা’ বা ‘ইমতিহান’ শব্দের সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে ‘পুনরায় পরীক্ষা’র ধারণাটি একটি পরবর্তীকালীন সমন্বয় প্রচেষ্টা (Harmonization effort), যা মূল ইসলামি আকীদার অংশ নয় বরং বিদ্যমান নৈতিক অসামঞ্জস্য ঢাকতে সংযোজিত হয়েছে। এই বিষয়ে ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার এই বক্তব্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। এখানে যাকারিয়া সাহেব বলছেন, ইমানের পরীক্ষা বিষয়টিই হচ্ছে না দেখে না জেনে ইমান আনা। দেখে ফেললে সেটি আর ইমানের পরীক্ষা হয় না। তাহলে, কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহকে দেখার পরে সেই বান্দাদের ইমানের পরীক্ষা কীভাবে হবে?


ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভৌগোলিক সুবিধাঃ কিছু নৈতিক প্যারাডক্স

ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘ভৌগোলিক ও জন্মগত সুবিধা’ (Geographical and Birth Privilege)-এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করা। যদি জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা কেবল সঠিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে, তবে জন্মগতভাবে প্রাপ্ত পরিবেশ একজন মানুষের বিচার প্রক্রিয়ায় বিশাল প্রভাব ফেলে। এই বৈষম্যটি নিচের কেস স্টাডিগুলোর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:

অন্ধবিশ্বাসের সমান্তরাল অবস্থান
ব্যক্তি ‘ক’ একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মেছে। সে তার চারপাশের পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষায় কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ইসলামকে গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে, ব্যক্তি ‘খ’ একটি কট্টর হিন্দু পরিবারে জন্মেছে এবং একইভাবে তার পরিবেশের প্রভাবে সে হিন্দু ধর্মকে পরম সত্য বলে ধরে নিয়েছে। যৌক্তিকভাবে, দুজনেই তাদের পৈত্রিক ধর্মকে ‘অন্ধভাবে’ অনুসরণ করছে।
প্রশ্ন হলো: একই মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় (অন্ধবিশ্বাস) তাড়িত হওয়ার পর কেবল জন্মসূত্রে প্রাপ্ত লেবেলের কারণে একজন কেন পুরস্কৃত হবে আর অন্যজন কেন দণ্ডিত হবে?
তথ্যের প্রবেশাধিকার ও জ্ঞানতাত্ত্বিক অসমতা
একজন মুসলিম ব্যক্তি আরবে বড় হওয়ার সুবাদে ইসলামের মূল ভাষা ও ব্যাখ্যা খুব সহজে লাভ করেন। বিপরীতে, ইসরায়েলের একজন ইহুদি ইসলাম সম্পর্কে কেবল সেটুকুই জানে যা তার মিডিয়া বা রাষ্ট্রীয় শিক্ষায় ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘ভীতি’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। সে তার সাধ্যমতো সত্য অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেও যদি এই নেতিবাচক তথ্যের জালে আটকা পড়ে নাস্তিক্যবাদ বেছে নেয়—
প্রশ্ন হলো: যে সত্যের দরজা একজনের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং অন্যজনের জন্য হাজারো কুসংস্কার ও মিথ্যা তথ্যে অবরুদ্ধ ছিল, তাদের বিচার কি একই পাল্লায় হওয়া সম্ভব?
সংস্কৃতি বনাম সত্যের সংঘাত
জাপানের একজন বৌদ্ধ বা নাস্তিক ব্যক্তি এমন এক সংস্কৃতিতে বড় হয়েছেন যেখানে পরকাল বা ঐশ্বরিক বাণীর কোনো অস্তিত্বই সামাজিকভাবে স্বীকৃত নয়। সেখানে ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্মের প্রচার অত্যন্ত সীমিত। অথচ একজন আরব বা পাকিস্তানির কাছে ধর্মই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রশ্ন হলো: একজনের জন্য যা তার অস্তিত্বের অংশ, অন্যজনের কাছে তা কেবলই এক ভিনদেশি সংস্কৃতি। এই বিশাল সাংস্কৃতিক ব্যবধান কি একজন বিচারকের কাছে বিবেচ্য হবে না?
নৈতিকতা বনাম আনুষ্ঠানিক আনুগত্য
এমন একজন মানবতাবাদী অমুসলিম যিনি সারা জীবন আর্তমানবতার সেবা করেছেন কিন্তু সঠিক দাওয়াত না পৌঁছানোর কারণে ধর্মীয় আচার পালন করেননি। বিপরীতে একজন মুসলিম যিনি কেবল নামমাত্র বিশ্বাসী কিন্তু তার কর্ম নৈতিকতা বিবর্জিত।
প্রশ্ন হলো: ধর্মতাত্ত্বিক বিচারে কেবল ‘লেবেল’ না থাকার কারণে মানবতাবাদীর চিরস্থায়ী শাস্তি কি ন্যায়বিচারের কোনো সংজ্ঞায় পড়ে?

এই প্যারাডক্সগুলো প্রমাণ করে যে, মানুষের বিশ্বাস কেবল তার একক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; বরং তার পরিবেশ, শিক্ষা এবং তথ্যের প্রাপ্যতা এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে। প্রচলিত ‘পুনরায় পরীক্ষা’ বা ‘ইমতিহান’—এর তত্ত্বটি এই বিশাল বৈষম্যকে দূর করতে ব্যর্থ, কারণ এটি শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্মগত সুবিধা বা অসুবিধাকেই স্বীকার করে নেয়। যদি কোনো মানুষের বিচার তার কর্মের বদলে তার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে সেই বিচার ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।


সীমিত সময়ের অপরাধের জন্য অনন্ত শাস্তি

সীমিত সময়ে সংঘটিত কোনো কাজ বা “অপরাধ”-এর জন্য অনন্তকালব্যাপী শাস্তি (eternal punishment) ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ন্যায়বিচারের একটি ন্যূনতম শর্ত হলো অনুপাতিকতা (proportionality): অপরাধ যতটা গুরুতর, শাস্তিও ততটাই—অন্তত একই “মাত্রার” ভেতরে থাকতে হবে। কিন্তু মানুষের যে কোনো কাজই জীবনের সীমিত সময়ের মধ্যে সংঘটিত; তার প্রভাব, উদ্দেশ্য, ক্ষতি—সবই সীমাবদ্ধ। সেই সীমাবদ্ধতার বিপরীতে অসীম (infinite) শাস্তি বসালে গাণিতিকভাবেই অনুপাত ভেঙে পড়ে: সীমিত/সসীম কিছুর বিপরীতে অসীম প্রতিদান মানে শাস্তির “মাত্রা” অপরাধের “মাত্রা”-কে চিরকাল ছাড়িয়ে যাবে। ফলে শাস্তি এখানে বিচার নয়, চিরস্থায়ী প্রতিশোধ বা প্রতিরোধহীন নিষ্ঠুরতা হয়ে দাঁড়ায়।

আরও গভীর সমস্যাটি হলো দণ্ডনীতির লক্ষ্য (purpose of punishment)। সাধারণভাবে শাস্তির ন্যায্যতা দাঁড়ায় কয়েকটি ভিত্তিতে—(ক) সংশোধন/পুনর্বাসন (rehabilitation), (খ) প্রতিরোধ (deterrence), (গ) জনসুরক্ষা/অক্ষমকরণ (incapacitation), এবং (ঘ) প্রতিদানমূলক ন্যায় (retribution)। অনন্ত শাস্তি এই চারটিরই সাথে অসঙ্গত। সংশোধনের লক্ষ্য থাকলে শাস্তির একটি “শেষ” দরকার—শাস্তি এমন হতে হবে যাতে মানুষ শিক্ষা নিয়ে বদলাতে পারে। কিন্তু অনন্ত শাস্তিতে সংশোধনের কোনো সুযোগই বাস্তবে অর্থহীন, কারণ শাস্তির শেষ নেই। প্রতিরোধের যুক্তিও দুর্বল—কারণ প্রতিরোধ যুক্তিসঙ্গত হতে হলে শাস্তির মাত্রা সমাজ-মানবমনস্তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত; “অনন্ত আগুন” ধরনের শাস্তি মানুষের কাছে বাস্তবসম্ভব শাস্তির চেয়ে ভয়ের অলৌকিক অতিরঞ্জন হয়ে দাঁড়ায়, যা যুক্তিবোধের বদলে আতঙ্ক, গুজব, এবং কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা জন্ম দেয়। জনসুরক্ষার যুক্তিতেও অনন্তকাল অপ্রয়োজনীয়—যদি কেউ সংশোধন-অযোগ্যও হয়, তবু “অসীম শাস্তি” ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ন্যূনতম পথ কল্পনা করা সম্ভব। আর প্রতিদানমূলক ন্যায় (retribution) যদি বলা হয়, তাতেও অনুপাতিকতার শর্ত ভাঙে—কারণ সীমিত অপরাধের জন্য অসীম প্রতিদান কোনো “ন্যায়সঙ্গত বদলা” হতে পারে না; এটি নীতিগতভাবে অপরিমেয় অতিরিক্ত শাস্তি

এখানে আরেকটি নৈতিক সমস্যা হলো দায় ও সক্ষমতার সীমা। মানুষ জ্ঞানগতভাবে সীমাবদ্ধ: সে ভুল করে, আবেগে সিদ্ধান্ত নেয়, পরিবেশ-সংস্কৃতি-শিক্ষা দ্বারা গঠিত হয়, এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার উপলব্ধি বদলায়। এমন সীমাবদ্ধ সত্তার ওপর “চিরন্তন” শাস্তি আরোপ মানে—তার সীমাবদ্ধতার ভেতরেই তাকে অসীমভাবে দায়ী করা। এটি এমন এক মানদণ্ড যেখানে মানুষ কখনোই “পর্যাপ্ত” হতে পারে না, কারণ ভুলের খেসারত কোনোদিন শেষ হবে না। আধুনিক নৈতিক দর্শনে এটিকে অনেক সময় ক্রুয়েলটি/নিষ্ঠুরতার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়: শাস্তি যদি শেষই না হয়, তবে শাস্তির যেকোনো মুহূর্তেই প্রশ্ন ওঠে—এখনও এই কষ্ট দেওয়ার ন্যায়সঙ্গত কারণ কী? একশ বছর, এক লক্ষ বছর, এক ট্রিলিয়ন বছর পরেও যদি শাস্তি অব্যাহত থাকে, তবে তা “ন্যায়” নয়—শুধু কষ্টকে চিরস্থায়ী করে রাখার একটি নিষ্ঠুর স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত।

সবশেষে, অনন্ত শাস্তির ধারণা ন্যায়বিচারের “নৈতিক সর্বোচ্চতা”র দাবিকেও দুর্বল করে। ন্যায়বিচার সাধারণত সংযমী—তার লক্ষ্য ক্ষতি কমানো, সঠিক মাপ বজায় রাখা, এবং অকারণ নিষ্ঠুরতা এড়ানো। কিন্তু অনন্ত শাস্তি এমন একটি শাস্তি-ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমা, সংশোধন, অনুপাত, করুণা—কোনোটিই শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকে না। তাই সীমিত সময়ের ভুল/অপরাধের জন্য অনন্তকাল শাস্তির ধারণা নৈতিকভাবে অমানবিক এবং দার্শনিকভাবে অসংগত: এটি বিচারকে উন্নীত করে না, বরং বিচারকে ভেঙে চিরস্থায়ী নিষ্ঠুরতার রূপ দেয়।


অফুরন্ত ঘৃণা বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িকতার দীক্ষা

ইদানীংকালের মুমিনগণ কোরআনের আরেকটি আয়াত নিয়ে এসে দাবী করে থাকেন যে, ইসলাম নাকি সকল ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থান এবং বন্ধুত্বপুর্ণ ভালবাসার সম্পর্কের ওপর খুব জোর দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে বলে! কিন্রু আসলেই কি এইসব তথ্য সত্য? ইসলাম কী অমুসলিমদের সাথে সহাবস্থান বা বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক রাখতে বলে? আসুন শুরুতেই কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক। বাংলাদেশের সবচাইতে প্রখ্যাত কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনি,

এবারে আসুন আরও দুইটি ওয়াজ শুনে নিই,


ম্যান্ডেলা আর লাদেন, কে জান্নাতে যাবে?

ধরা যাক, নেলসন ম্যান্ডেলা, যিনি কালো মানুষের অধিকারের জন্য সারা জীবন লড়াই করেছেন, তিনি ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল অমুসলিম হওয়ার কারণে চিরস্থায়ী শাস্তির যোগ্য। অপরদিকে, ওসামা বিন লাদেন, যিনি হাজার হাজার নিরীহ মানুষের হত্যার জন্য দায়ী, ইসলামী দৃষ্টিতে তওবা করলে বা কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলে জান্নাত লাভ করবে। এই ধরনের মূল্যবোধ কীভাবে ন্যায়বিচারের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে পারে? নিচের মানুষ দুইজনার দিকে তাকিয়ে বলুন তো, এদের মধ্যে কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী?

হিটলার ও গান্ধীর উদাহরণ ব্যবহার করে চিন্তা করলে দেখা যায়, বিশ্বাস বনাম কর্মের মধ্য কোনটি আসলে জান্নাত জাহান্নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে জরুরি, সে সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে: এক ব্যক্তির পুরো জীবনের নৈতিকতা, মানবতার প্রতি তার অবদান, এবং তার কর্মের প্রভাব কী শুধুমাত্র তার সঠিক অন্ধবিশ্বাসের কারণে মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে? ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ যদি মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, বা মৃত্যুর পূর্বে খাঁটি মনে তওবা করে এবং ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তার পূর্ববর্তী সমস্ত পাপ ক্ষমা হয়ে যায়। অন্যদিকে, একজন নীতিবান ও মানবতাবাদী ব্যক্তি, যিনি সারা জীবন ন্যায়, সততা ও মানবসেবার জন্য কাজ করেছেন, যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ না করেন, তবে তাকে চিরস্থায়ী শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

জাহান্নামী 7

হলি আর্টিজানের নৃশংস হত্যাকারীরা কোথায় যাবে?

২০১৬ সালের ১ জুলাই, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সেদিন ঢাকার গুলশানের অভিজাত এলাকা হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটেছিল এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড, যা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যা আনুমানিক পৌনে নয়টা। পাঁচজন সশস্ত্র জঙ্গি ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে রেস্তোরাঁর ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের হাতে ছিল অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো চাপাতি এবং বিস্ফোরক দ্রব্য। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দমুখর পরিবেশ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। আগত অতিথিদের জিম্মি করে তারা শুরু করে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ।

জঙ্গিরা প্রথমেই রেস্তোরাঁর কর্মীদের জিম্মি করে এবং তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। এরপর তারা বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে এবং তাদের ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন। যারা আরবিতে কোরানের আয়াত বলতে পারেনি, তাদের ওপর নেমে আসে নির্মম পরিণতি। এদের মধ্যে কে মুসলিম আর কে অমুসলিম, তা নির্ধারণ করে, বিশেষভাবে অমুসলিমদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আল্লাহ আকবর ধ্বনি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে জঙ্গিরা। সেদিনের ভয়াবহতা ছিল বর্ণনাতীত। জঙ্গিরা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদেরই হত্যা করেনি, বাদ যায়নি শিশুরাও। এমনকি, সেদিন একজন গর্ভবতী নারীকেও তারা নৃশংসভাবে হত্যা করে। তার পেট চিরে শিশুটিকে বের করে হত্যা করা হয়। এই বর্বরতা ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম ঘটনা।

রাত যত গভীর হয়, নৃশংসতার মাত্রাও তত বাড়তে থাকে। জঙ্গিদের নির্মমতা আর চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে গুলশানের বাতাস। জিম্মিদের আর্তনাদ আর স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।সকাল পর্যন্ত চলে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। অবশেষে, সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো দল ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। উদ্ধার করা হয় জিম্মিদের। কিন্তু ততক্ষণে ঝরে গেছে ২০টি প্রাণ, যাদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি। নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তাও। প্রশ্ন হচ্ছে, এই নারকীয় ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা সকলে কোথায় যাবে? আর যেই গর্ভবতী নারীকে তারা কেটে টুকরো করে [14] পেটের শিশুটি বের করে ফেলে, তারা কোথায় যাবে? জান্নাতে, না জাহান্নামে? উল্লেখ্য, তারা মুসলিম ছিল না।

জাহান্নামী 9
জাহান্নামী 11

এই অমুসলিমরাও চিরস্থায়ী জাহান্নামী

নিম্নে ওষুধ ও চিকিৎসা জগতে বিপ্লব ঘটানো ১০ জন ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হলো। উনাদের আবিষ্কার আস্তিক নাস্তিক কিংবা কারো ধর্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল নয়। উনারা উনাদের সারাজীবনের পরিশ্রম সকল মানুষের কল্যাণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, যেন হিন্দু মুসলিম ইহুদি খ্রিস্টান সকল মানুষ ভাল থাকে, সুস্থ থাকে। আল্লাহর দেয়া অসুখ থেকে যেন তারা রক্ষা পায়। ইসলাম অনুসারে উনারা সকলেই চিরস্থ্যী জাহান্নামী।

জাহান্নামী 13

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং: স্কটিশ ব্যাকটেরিয়োলজিস্ট, ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন, যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রথম কার্যকরী অ্যান্টিবায়োটিক। অ্যান্টিবায়োটিক হচ্ছে একটি জীবন রক্ষাকারী ঔষধ। এর গুরুত্ব কতটা, তা সারা পৃথিবীতে শুধু একদিন অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন ও সরবরাহ না হলেই বোঝা যাবে। সারা পৃথিবী জুড়ে সেদিন এক ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দেবে।

হারমোন নর্থ্রপ মর্স: আমেরিকান রসায়নবিদ, ১৮৭৭ সালে প্যারাসিটামল (অ্যাসিটামিনোফেন) প্রথম সংশ্লেষণ করেন, যা ব্যথা ও জ্বর উপশমে ব্যবহৃত হয়। প্যারাসিটামল উৎপাদনের মাত্রা জানলেই আপনি বুঝতে পারবেন, এটি নিঃসন্দেহে সারা পৃথিবীতে সবচাইতে জরুরি ঔষধের একটি।

জাহান্নামী 15
জাহান্নামী 17

ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং এবং চার্লস বেস্ট: কানাডীয় বিজ্ঞানী, ১৯২০-এর দশকে ইনসুলিন আবিষ্কার করেন, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা। ডায়াবেটিকসের রোগী মাত্রই জানেন, এটি আসলে কী জিনিস।

এডওয়ার্ড জেনার: ইংরেজ চিকিৎসক, ১৭৯৬ সালে গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে এই সারা পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে, এই মারণব্যাধির নির্মূলে সহায়তা করে।

জাহান্নামী 19
জাহান্নামী 21

জোনাস সাল্ক: আমেরিকান ভাইরোলজিস্ট, ১৯৫৫ সালে পোলিও টিকা উন্নয়ন করেন, যা পোলিও রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। পোলিও কি এবং এটি কতটা মারাত্মক, তা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না। এই ভদ্রলোকও ইসলামের দৃষ্টিতে জাহান্নামী।


অপরাধ, ক্ষমা, এবং জান্নাতের বৈষম্য

ধরুন, পাঁচজন মুসলিম পুরুষ মিলে একটি ছয় বছর বয়সী হিন্দু মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। হিন্দু মেয়েটি মারা যায়। সেই পাঁচজন শেষ বয়সে নামাজ কালাম করে হজ্ব করে মৃত্যুবরণ করে। কিয়ামতের ময়দানে বিচারের দিনে তাদের সাথে কী করা হবে, বলতে পারেন? ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুবরণ করা হিন্দুমেয়েটিকে নিশ্চয়ই চিরস্থায়ী জাহান্নামে পাঠানো হবে। অন্যদিকে সেই পাঁচজন মুসলিমের মনে যদি একটু ইমান থাকে, এবং তারা অহংকার না করে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, নৈতিকতা এবং অপরাধের পরিণতি কি আদৌ ইসলামে গুরুত্ব পায়, নাকি শুধুমাত্র ধর্মীয় আনুগত্যই মূল বিচার্য?

এই ধারণা সভ্য সমাজের বিচারব্যবস্থার মূলনীতির পরিপন্থী। ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত হলো অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট ও অনিবার্য শাস্তি। কিন্তু ইসলামে তা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে গঠিত, যেখানে বিশ্বাস অপরাধকে ছাপিয়ে যায়। এর ফলে প্রকৃত অর্থে ইনসাফ বলতে যা বোঝানো হয়, তা ইসলামে একদমই অনুপস্থিত।


উপসংহারঃ বিশ্বাসের একাধিপত্য ও ইনসাফের নৈতিক সংকট

উপরে আলোচিত যুক্তি এবং কেস স্টাডিগুলো বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি পরকালতত্ত্ব এবং ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের প্রচলিত ধারণাটি একটি গভীর পদ্ধতিগত অসঙ্গতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে আধুনিক নীতিশাস্ত্র ন্যায়বিচারকে সংজ্ঞায়িত করে ব্যক্তির ‘অভিপ্রায়’ (Intention), ‘প্রচেষ্টা’ (Effort) এবং ‘আচরণ’ (Conduct)-এর ভিত্তিতে, সেখানে ইসলামি বিচারব্যবস্থায় ‘ধর্মতাত্ত্বিক আনুগত্য’ বা ‘বিশ্বাস’ (Iman)-কেই একমাত্র চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশ্বাসের প্রাধান্য বনাম নৈতিকতার অবমূল্যায়ন
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘হাবত আল-আমাল’ (Habt al-A’mal) বা সৎকর্ম নিষ্ফল হওয়ার ধারণাটি একটি বড় নৈতিক সংকট তৈরি করে। কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন অমুসলিম সারাজীবন মানবতার সেবা করলেও যদি সে ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে তার সকল ভালো কাজ পরকালে মূল্যহীন হয়ে পড়বে। এটি প্রমাণ করে যে, এই বিচারব্যবস্থায় নৈতিকতার চেয়ে আনুগত্যই মুখ্য। ফলে এটি একটি সার্বজনীন ন্যায়বিচার না হয়ে বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট (Tribalistic) কাঠামোতে পরিণত হয়।[15]
ঐশ্বরিক স্বেচ্ছাচারিতা ও আশআরী দর্শন
সুন্নি ইসলামের প্রধান ধারা ‘আশআরী’ (Ash’arism) মতবাদ অনুযায়ী, ন্যায়বিচার হলো তা-ই যা আল্লাহ করেন; এখানে ন্যায়বিচারের কোনো স্বাধীন বা বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নেই। ইবনে হাজমের মতো আলেমদের মতে (যা সহিহ হাদিসেও রয়েছে), আল্লাহ যদি সব নেককারকে জাহান্নামে এবং সব বদকারকে জান্নাতে দেন, তবে সেটিই হবে ইনসাফ, কারণ তাঁর ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই ‘ডিভাইন ভলান্টারিজম’ বা আল্লাহর নিরঙ্কুশ ইচ্ছার ধারণাটি ন্যায়বিচারের ধারণাকে একটি ‘স্বেচ্ছাচারী একনায়কত্বে’ রূপান্তর করে, যেখানে যৌক্তিক নৈতিকতার কোনো স্থান নেই।
ভৌগোলিক লটারি ও এপিজেনেটিক অবিচার
মানুষের বিশ্বাস তার ইচ্ছা অপেক্ষা তার পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর বেশি নির্ভরশীল। একজন ব্যক্তি জন্মসূত্রে ইসলামের সহজলভ্যতা পাওয়ায় যে সুবিধা ভোগ করেন, অন্য একজন ব্যক্তি প্রতিকূল পরিবেশে বড় হয়ে সেই সত্য বঞ্চিত হওয়ার কারণে যে দণ্ড ভোগ করবেন—তা কোনোভাবেই ‘ইনসাফ’ হতে পারে না। ‘দাওয়াত না পাওয়াদের পুনরায় পরীক্ষা’ বা ‘আল্লাহু আলাম’ (আল্লাহ ভালো জানেন তারা কী করত) এর মতো পরবর্তীকালীন ব্যাখ্যাগুলো মূলত এই জন্মগত বৈষম্যের সংকটকে ঢাকা দেওয়ার একটি দুর্বল প্রচেষ্টা মাত্র।

সারসংক্ষেপ: পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম নিজেকে ‘ন্যায়বিচারের ধর্ম’ হিসেবে দাবি করলেও এর বিচারিক দর্শন মূলত একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের সীমানায় আবদ্ধ। এটি মানুষের সহজাত নৈতিক বোধ এবং বৈশ্বিক মানবিক মূল্যবোধের পরিবর্তে কেবল ধর্মীয় লেবেলের ওপর ভিত্তি করে জান্নাত-জাহান্নাম বণ্টন করে। এই দ্বিমুখী ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, তথাকথিত ‘ঐশ্বরিক ইনসাফ’ আসলে কোনো নিরপেক্ষ সুষম ব্যবস্থা নয়; বরং এটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো যা মানুষের যৌক্তিক ন্যায়বোধের সাথে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। ন্যায়বিচার যদি কেবল ‘লটারি’ বা ‘আনুগত্যের’ বিষয় হয়, তবে তা আর নৈতিক ইনসাফ থাকে না, বরং তা একটি পক্ষপাতমূলক রাজনৈতিক দর্শনে পরিণত হয়।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is not theological neutrality or artificial both-sides balance, but evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Neutrality here means methodological fairness: accurate use of sources, logical rigor, evidentiary discipline, and factual consistency. It does not mean moral indifference or equal treatment between harmful doctrines and their criticism.

Strong criticism should not be mistaken for bias if it is supported by evidence and sound reasoning.

This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, logical rigor, factual consistency, and fairness in representing opposing claims—not through theological sensitivity, apologetic expectations, or demand for rhetorical softness.


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৬৮ ↩︎
  2. সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ২৬৪৪ ↩︎
  3. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ‏ ৭০০১ ↩︎
  4. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫৮২৭ ↩︎
  5. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৫৬৩, ৫৬৪ ↩︎
  6. তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৮ ↩︎
  7. সূরা তওবা, আয়াত ৬৮ ↩︎
  8. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১১১ ↩︎
  9. মিশকাতুল মাসাবীহ ( মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৪ ↩︎
  10. সুনান আবু দাউদ, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৯ ↩︎
  11. সহিহ বুখারি, হাদিসঃ ১৩৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৬৫৯ ↩︎
  12. মুসনাদে আহমদ, হাদিসঃ ১৬৩০১; তাবারানী, হাদিসঃ ৮৪১ ↩︎
  13. কোরআন ১৭:১৫ ↩︎
  14. Autopsy finds Italian victims of Dhaka attack were tortured ↩︎
  15. কোরআন ৩:৮৫; ১৮:১০৫ ↩︎