আউল পদ্ধতিঃ কোরআনে উত্তরাধিকার আইনে ভুল

Table of Contents

সারসংক্ষেপ

কোরআনের সূরা নিসায় (১১ ও ১২ নং আয়াতে) উত্তরাধিকারীদের জন্য যে নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ (যেমন: ১/২, ২/৩, ১/৮) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, একাধিক বাস্তব ক্ষেত্রে সেগুলোর যোগফল মূল সম্পত্তির (১ বা ১০০%) চেয়ে বেশি হয়ে যায়। গাণিতিকভাবে ১-এর অধিক সম্পত্তি বন্টন করা অসম্ভব। এই গাণিতিক ত্রুটি নিরসনে পরবর্তীতে খলিফা উমর ‘আউল’ (Awl) পদ্ধতি চালু করেন, যার মাধ্যমে ওয়ারিশদের কোরআন-নির্ধারিত অংশ থেকে আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেওয়া হয়। তবে, ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের সর্বসম্মত ও অবিসংবাদিত মূলনীতি হলো— “লা ইজতিহাদা ফি মাওরিদিন নস” (لا اجتهاد في مورد النص)। অর্থাৎ, যেখানে কোরআন বা নবীর থেকে সহিহ হাদিসের স্পষ্ট বিধান (নস) বিদ্যমান, সেখানে কোনো ইজতিহাদ (গবেষণা) বা ইজমা কিয়াস বা মানুষের যুক্তি খাটে না।

যেহেতু কোরআনে ওয়ারিশদের অংশ একেবারেই সুনির্দিষ্ট ‘নস’, তাই উমর বা কোনো মানুষের পক্ষে ইজতিহাদ করে সেই সংখ্যা পরিবর্তন করার এখতিয়ার নেই। সুতরাং, ‘আউল’ পদ্ধতি প্রয়োগ করা স্পষ্টতই কোরআনের লঙ্ঘন। এই পরিস্থিতি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যেঃ হয় কোরআনের গাণিতিক হিসাবে মৌলিক ভুল আছে যা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধানযোগ্য নয়, অথবা বর্তমানে প্রচলিত ‘আউল’ ভিত্তিক উত্তরাধিকার আইন ইসলামি শরিয়তের নিজস্ব নীতির মানদণ্ডেই কোরআনের নির্দিষ্ট নসকে কার্যত সংশোধন করে। অর্থাৎ, হয় কোরআনের হিসাব মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কার্যকর নয়, নয়তো আউল পদ্ধতি কোরআনের ঘোষিত অংশকে বাস্তবে পরিবর্তন করে—দুই অবস্থাতেই “নিখুঁত ঐশী উত্তরাধিকার আইন” দাবিটি টেকে না। আসুন এই ডায়াগ্রামটি শুরুতে দেখে নেয়া যাক,

  • যেখানে কোরআন বা নবীর থেকে সহিহ হাদিসের স্পষ্ট বিধান (নস) বিদ্যমান, সেখানে কোনো ইজতিহাদ (গবেষণা) বা ইজমা কিয়াস বা মানুষের যুক্তি খাটে না।
  • আরেকটি ইসলামিক বিধান হচ্ছে, সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে কোনো মানুষের বিধান নয়, কোরআনের বিধান অনুসরণ করতে হবে।
  • সূরা নিসা-তে সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন হবে তা স্পষ্ট বলা আছে। [1]
  • কোরআনের আয়াত অনুসরণ করলে, কিছু গাণিতিক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অংশগুলোর যোগফল সম্পূর্ণ সম্পত্তির (১ অংশ) চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে নির্দিষ্ট নিয়মটি কার্যকর করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
  • এই অসামঞ্জস্যতা দূর করতে দ্বিতীয় খলিফা উমর ‘আউল’ (Awl) পদ্ধতির প্রবর্তন করেন, যা কোরআনের কোনো আয়াত বা সরাসরি নসে পাওয়া যায় না। [2]
  • যেহেতু নসের ওপর মানুষের যুক্তি বা ইজতিহাদ প্রাধান্য পাওয়ার সুযোগ নেই, তাই আউল পদ্ধতির প্রয়োগ ইসলামের মৌলিক বিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ আউল পদ্ধতি অবলম্বন করলে কোরআনের বিধান অনুসারে ভাগ হচ্ছে না।

ভূমিকা

কোরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকার আইন মূলত সম্পত্তি ভাগ করার একটি ত্রুটিপূর্ণ এবং ভুল পদ্ধতি। উত্তরাধিকার আইনের মত আইন প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে যেই অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, এই আইনটি পড়লেই বোঝা যায়, যিনি এই আইনটি করেছেন তার এই সম্পর্কে বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান নেই। কারণ এই ধরণের আইন প্রণয়নের পূর্বে বিভিন্ন ধরণের ঘটনা এবং বিভিন্ন সংখ্যক পারিবারিক সদস্যের ক্ষেত্রে আইনটি কীভাবে প্রয়োগ হবে, তার বিবেচনা থাকা জরুরি। কারণ এক একটি পরিবারে এক এক রকম সদস্য থাকে, কোন পরিবারে দুই ছেলে, কোন পরিবারে তিন মেয়ে, কোন পরিবারে এক ছেলে তিন মেয়ে, কোন পরিবারে তিন ছেলে এক মেয়ে, সাথে বাবা মা ইত্যাদি। উত্তরাধিকার আইন করলে প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই আইনটি কাজ করবে কিনা, সেটি জেনেবুঝে আইনটি করার দরকার হয়। কিন্তু কোরআনের এই নিয়মের মধ্যে এমন গাণিতিক ত্রুটি রয়েছে যা স্পষ্টভাবে আল্লাহ ও নবীর গণিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। গাণিতিক এই ভুল শুধুমাত্র একটি সাধারণ হিসাবের ভুল নয়, বরং এটি এক গভীর অসঙ্গতি, যা কোনো সর্বজ্ঞানী সত্তার পক্ষ থেকে আসা হতে পারে না। সপ্তম শতকের আরব সমাজের সীমিত আইনগত অভিজ্ঞতা, সীমিত গাণিতিক কাঠামো এবং অপরিণত বিধান-প্রণয়ন পদ্ধতির ছাপ এই উত্তরাধিকার আইনে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যেহেতু এরকম ভুল কোনো সর্বশক্তিমান সত্তার কাছ থেকে আসা হতে পারে না, তাই এই ভুলটি স্পষ্টভাবেই ইসলামের সত্যতা নিয়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কোরআনের উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, যখন সম্পত্তি ভাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ বর্ণিত হয়। কিন্তু কিছু বাস্তব ক্ষেত্রে, এসব ভগ্নাংশ যখন যোগ করা হয়, সেটি মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, একজন মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতা, স্ত্রী এবং সন্তানদের মধ্যে ভাগ করলে দেখা যায়, নির্ধারিত অংশগুলো যোগ করলে ১০০% এর বেশি হয়। এই ধরনের ত্রুটি কোনো নিখুঁত সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনায় থাকার কথা নয়। গণিত সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান থাকা একজন ব্যক্তির পক্ষেও, সম্পত্তি ভাগের এরকম বিধান দেওয়া অসম্ভব। এ থেকে বোঝা যায়, এই নির্দেশনার পেছনে সর্বজ্ঞ, সর্বকালদর্শী আইনপ্রণেতার নিখুঁত গাণিতিক পরিকল্পনার বদলে সপ্তম শতকের আরব সমাজের সীমিত আইনগত ও গাণিতিক ধারণার ছাপই বেশি স্পষ্ট।

গাণিতিক নিয়ম খুবই স্পষ্ট। কোনো সম্পত্তির ওপর নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ আরোপ করলে সেই নির্দিষ্ট অংশগুলোর যোগফল ১ অতিক্রম করতে পারে না। যোগফল ১-এর বেশি হলে বাস্তব সম্পত্তির চেয়ে বেশি সম্পত্তি বণ্টনের দাবি তৈরি হয়, যা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। কোরআনে বর্ণিত নিয়মগুলোতে এই সরল নিয়মটি মানা হয়নি, যা স্পষ্ট করে দেয় যে এই আইন কোনো অলৌকিক জ্ঞান থেকে আসেনি। বরং এটি সেই সময়ের মানুষের অপরিপক্ব জ্ঞানের প্রতিফলন।

এই বিষয়ে আমাদের যে বিষয়টি জানা থাকা জরুরি তা হচ্ছে, কোনো কিছু ভাগ করার সময় নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ দিয়ে সম্পূর্ণ সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে যোগফল ১ অতিক্রম করলে তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব হয়ে যায়। যোগফল ১-এর কম হলে অবশিষ্ট অংশ বণ্টনের জন্য আলাদা নিয়ম থাকতে পারে; কিন্তু যোগফল ১-এর বেশি হলে মৃত ব্যক্তি যত সম্পত্তি রেখে গেছে, তার চেয়েও বেশি সম্পত্তি বণ্টনের দাবি তৈরি হয়। কারণ সম্পূর্ণ সম্পত্তিকেই এক হিসেবে ধরে ভাগ করা হয়।

উত্তরাধিকার বন্টন: মতবাদের বিবর্তন ও সংঘাত
মূল পাঠ (কোরআন ও সুন্নাহ) এখানে অংশগুলো আক্ষরিক ও সুনির্দিষ্ট (নস)। তবে গাণিতিক সমস্যাটি এখানেই নিহিত।
বাস্তবতা: অনেক ক্ষেত্রে যোগফল ১-এর বেশি হয়। যেমন: স্বামী (১/২) + ২ বোন (২/৩) = ৭/৬
কোরআনে এই ১.১৬ বা বাড়তি অংশের কোনো সমাধান বা গাণিতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া নেই। [3]
খলিফা উমরের সমাধান (আউল পদ্ধতি) এটি সুন্নি মাযহাবের মূল ভিত্তি। গাণিতিক অসামঞ্জস্য মেটাতে তিনি ‘সমানুপাতিক হারে কমানোর’ নীতি গ্রহণ করেন।
প্রভাব: ওয়ারিশদের প্রত্যেকের নির্ধারিত অংশ কোরআনের ভগ্নাংশ থেকে কমিয়ে দেওয়া হয় যাতে যোগফল ১ হয়। এতে কোরআনের ‘নস’ বা নির্ধারিত সংখ্যাটি পরিবর্তিত হয়ে যায়। [2]
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের ভিন্নমত তিনি ‘আউল’ পদ্ধতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তার মতে, আল্লাহ কাউকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, কাউকে দেননি।
যুক্তি: নির্দিষ্ট কিছু ওয়ারিশের অংশ কোনোভাবেই কমানো যাবে না। বরং যাদের অংশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীল, কেবল তাদের অংশ থেকেই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। তিনি উমরের দেওয়া “সবার অংশ কমানো” নীতিকে অস্বীকার করেন।
শিয়া (ইমামিয়্যাহ) দৃষ্টিভঙ্গি শিয়ারা ইবনে আব্বাসের যুক্তি অনুসরণ করে ‘আউল’ নীতিকে ভ্রান্ত মনে করে।
পার্থক্য: তারা মা-বাবা এবং স্বামী/স্ত্রীর অংশকে ‘স্থির’ রাখে। বন্টনে ঘাটতি দেখা দিলে তারা কেবল সন্তানদের (বিশেষ করে কন্যাদের) অংশ থেকে তা কেটে সমন্বয় করে।
উপসংহার: সুন্নি ও শিয়া—উভয় পক্ষই স্বীকার করে যে কোরআনের আক্ষরিক প্রয়োগ অসম্ভব, কিন্তু কার অংশ কাটা হবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে মৌলিক সংঘাত বিদ্যমান।

আউল- কোরআনের ভুল সংশোধনের মানবিক প্রচেষ্টা

‘আউল’ মানে ‘বৃদ্ধি’। যখন অংশগুলোর যোগফল একটি ভগ্নাংশ হয় যার লব বড়, হর ছোট, তখন হরকে লবের সমান করে নিতে হয় তথা হরের মধ্যে বৃদ্ধি করতে হয় এটাকে ‘আউল’ বলে। যেমন, মৃত ব্যক্তি রেখে গেছেন স্বামী ও তিন বোন। তাহলে স্বামীর অংশ + তিন বোনের অংশ = ১/২  + ২/৩  = ৭/৬ । এ অবস্থায় স্বামীকে দিতে হবে ৩/৭  এবং তিন বোনকে দিতে হবে ৪/৭ । ‘রদ্দ’ অর্থ ‘ফেরত দেওয়া বা ফিরিয়ে দেওয়া’। ‘রদ্দ’ হলো আউলের বিপরীত। যখন অংশগুলোর যোগফল একটি ভগ্নাংশ হয় যার লব ছোট, হর বড়, তখন হরকে হ্রাস করে লবের সমান করতে হয়। এটাকে ‘রদ্দ’ বলে।

খলিফা উমরের আমলে যখন এই গাণিতিক সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে, তখন তিনি “আউল নীতি” প্রবর্তন করেন, যা কোরআনের ভগ্নাংশের ভুলগুলোকে সংশোধন করার একটি মানবিক প্রচেষ্টা মাত্র। কোনো সীমিত জ্ঞানের অধিকারী মরণশীল মানুষ যখন আল্লাহর বিধানকে যথাযথভাবে অনুসরণ না করে, উল্টো ঠিক করার চেষ্টা করে, সংশোধিত কোন নতুন আইন প্রবর্তন করে, যা কোরআনের আইনকে বদলে দেয় বা পরিমার্জনা করে ফেলে, তখনই সেখানে আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের কাছে পরাজিত হয়ে যায়। আল্লাহর সংজ্ঞা অনুসারে, আল্লাহ যেহেতু সর্বজ্ঞানী, তাই তার দেওয়া উত্তরাধিকার আইন সমস্ত ক্ষেত্রেই সঠিক হওয়ার কথা। কিন্তু সেই আইনের যেকোন প্রকার সংশোধনী আনাই, মূলত ইসলামের মৌলিক দাবীকেও ভুল প্রমাণ করে ফেলে। আউল নীতি অনুসারে, প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য অংশকে সামঞ্জস্য করে মূল সম্পত্তির মধ্যে ভাগ করা হয়। এটি কোরআনের আয়াতের ওপর একটি পরিবর্তনশীল নীতি, যা মূল আয়াতের ভুলকে ঢাকার চেষ্টা করে। এই ধরনের পরিবর্তন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কোরআন নিখুঁত কোনো দলিল নয় এবং এর মধ্যে গাণিতিক ভুল রয়েছে।


কোরআনের আয়াত

এবারে আসুন কোরআনের উত্তরাধিকার আইনটি পড়ি। প্রথমেই এই সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতগুলো পড়ে নিই,

আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেনঃ একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু`এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের সন্তান থাকে। যদি সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয়, তবে মাতা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ ওছিয়্যতের পর, যা করে মরেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ। (কুরআন-৪:১১)

আর, তোমাদের হবে অর্ধেক সম্পত্তি, যা ছেড়ে যায় তোমাদের স্ত্রীরা যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের হবে এক-চতুর্থাংশ ঐ সম্পত্তির, যা তারা ছেড়ে যায়; ওছিয়্যতের পর, যা তারা করে এবং ঋণ পরিশোধের পর। স্ত্রীদের জন্যে এক-চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, যা তোমরা ছেড়ে যাও ওছিয়্যতের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর। যে পুরুষের, ত্যাজ্য সম্পত্তি, তার যদি পিতা-পুত্র কিংবা স্ত্রী না থাকে এবং এই মৃতের এক ভাই কিংবা এক বোন থাকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকে ছয়-ভাগের এক পাবে। আর যদি ততোধিক থাকে, তবে তারা এক তৃতীয়াংশ অংশীদার হবে ওছিয়্যতের পর, যা করা হয় অথবা ঋণের পর এমতাবস্থায় যে, অপরের ক্ষতি না করে। এ বিধান আল্লাহর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
(কুরআন-৪:১২)



উদাহরণ ১: পিটজা ভাগ করা

একটি পিটজা ভাগ করার সময় যদি ১/৮ করে ভাগ করা হয়, তবে মোট ৮টি টুকরো হবে। যদি ১/৮ করে ভাগ করার পরে দেখা যায়, নবম বা দশম মানুষ এসে যুক্ত হয়, তাহলে শেষে যুক্ত হওয়া ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা আর কোন পিটজার অংশ পাবেন না। কারণ ১/৮ করে টুকরো করা পিটজাকে ৮ জনার বেশী মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যাবে না। ৯ জনার মধ্যেও এটি ভাগ করা সম্ভব, কিন্তু তখন পিটজাটি পুনরায় ভাগ করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে প্রতিটি ভাগ ১/৯ করে হবে, এবং প্রত্যেককে ঐ ১/৯ করে দিতে হবে। ৯টি ১/৯ অংশ যোগ করলে যেন ১ হয়। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে মোট যোগফল ১ হতে হবে। সেই সময়ে মোট টুকরোগুলোর ভগ্নাংশের যোগফল যদি ১ এর বেশি হয়ে যায়, তাহলে ১ এর বেশী হয়ে যাওয়া অংশটুকু আর কাউকে দেওয়া যাবে না। এগুলো স্কুলজীবনেই মানুষ পাটিগণিত করলে শিখে যায়। আসুন ৮ জনার মধ্যে ভাগ করে দিলে যোগফল কেমন হবে দেখে নিই,

i=1818=1\sum_{i=1}^{8} \frac{1}{8} = 1 বা

18+18+18+18+18+18+18+18=1\frac{1}{8} + \frac{1}{8} + \frac{1}{8} + \frac{1}{8} + \frac{1}{8} + \frac{1}{8} + \frac{1}{8} + \frac{1}{8} = 1

এবার ধরুন, ৯ জন ব্যক্তির মধ্যে সেই একই পিটজা, যেটি ১/৮ অংশে ভাগ করা হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে ভাগ করার চেষ্টা করা হল। যেহেতু পিটজা ৮টি টুকরো আছে, ৯ জনের মধ্যে সমানভাবে পিটজা ভাগ করা সম্ভব হবে না। শেষ ব্যক্তি পিটজা থেকে বঞ্চিত হবে। অথবা অন্য সকলের অংশ কমিয়ে দিয়ে সেই অংশটি তাকে দিতে হবে। কিন্তু অন্যদের অংশ কমিয়ে দিলে, তাদের অংশ আর ১/৮ থাকবে না। তাদের অংশ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এই বিষয়টি গাণিতিকভাবে একটি সাধারণ ধারণা। অথচ কোরআনের আয়াতগুলোর মধ্যে এরকম গাণিতিক সমস্যা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা একটি আদর্শিক, নিখুঁত সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসা নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আউল

উদাহরণ ২: আবুল মিয়ার সম্পত্তির ভাগ

উপরে বর্ণিত কোরআনের আয়াতগুলো ইসলামে সম্পত্তির হিসেবের মৌলিক আয়াত। ছেলে মেয়ে স্বামী স্ত্রী কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন তার হিসেব। আচ্ছা, এবারে আসুন ধরি, জনাব আবুল মিয়ার পরিবারে রয়েছে তার বৃদ্ধ পিতা মাতা, তার স্ত্রী, এবং তিন কন্যা। আবুল মিয়া মারা গেলেন, এবং উনার সম্পত্তি কোরআনের উপরের আয়াত মোতাবেক ভাগ বাটোয়ারা করা হবে। হিসেব করার সুবিধার জন্য ধরে নিচ্ছি আবুল মিয়া ১০০ টাকার সম্পত্তি রেখে গেছেন। এখন ভাগ বাটোয়ারা কীভাবে করবো?

১। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের সন্তান থাকে।

  • এই আয়াত অনুসারে যেহেতু মৃতের সন্তান আছে, তাই তার বৃদ্ধ পিতা মাতা প্রত্যেকে পাবেন ছয় ভাগের এক ভাগ করে। অর্থাৎ এক একজন পাবেন (১০০÷৬ = ১৬.৬৬) টাকা করে। দুইজন মিলেে পাবেন ১৬.৬৬×২ = ৩৩.৩৩ টাকা।

২। আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেনঃ একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু`এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক।

  • এবারে আসুন তার তিন কন্যা কতটুকু সম্পত্তি পাবে তার হিসেবে। উপরের আয়াত থেকে বোঝা যায়, আবুল সাহেবের তিন কন্যা পাবে মালের তিনভাগের দুই ভাগ। অর্থাৎ ( ১০০× ২/৩ = ৬৬.৬৭)  টাকা।

৩। স্ত্রীদের জন্যে এক-চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, যা তোমরা ছেড়ে যাও ওছিয়্যতের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর।

  • এবারে মৃত আবুল মিয়ার স্ত্রীর হিসেব। উপরের আয়াত মোতাবেক তিনি পাবেন আট ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ (১০০÷৮ = ১২.৫০)  টাকা।

এভাবে আসুন হিসেব করি। আবুল সাহেব মোট ১০০ টাকা রেখে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে কোরআনের এই নিয়ম অনুসারে

যারা পাবেনযত পাবেন
পিতামাতা৩৩.৩৩ টাকা
তিন কন্যা৬৬.৬৭  টাকা
স্ত্রী১২.৫০  টাকা
মোট৩৩.৩৩ + ৬৬.৬৭ + ১২.৫০ = ১১২.৫০ টাকা

কিন্তু টাকাগুলো ভাগ করে দেওয়ার সময় দেখা যাচ্ছে, ১২.৫০ টাকা কম হয়ে যাচ্ছে। মোট টাকা আছে ১০০, অথচ সবাইকে দিতে হবে ১১২.৫০। এই বাড়তি ১২.৫০ টাকা কোথা থেকে আসবে? আল্লাহ পাক নাজিল করবেন? এরকম বড় ধরণের গাণিতিক ভুল দিয়ে সম্পত্তির হিসেব করা খুবই বিপদজনক।

আউল 1

উদাহরণ ৩: বিলকিস বেগমের সম্পত্তির ভাগ

ধরে নিই, বিলকিস বেগম মারা গেছেন। মৃত্যুর সময় তিনি ১০ লক্ষ টাকা রেখে গেছেন। তার এক কন্যা, পিতামাতা এবং স্বামী ছাড়া আর কোনো উত্তরাধিকারী নেই। এখন আসুন, কোরআন অনুসারে তার সম্পত্তির ভাগ করি। এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, ঋণ ও ওসিয়ত পরিশোধের পর নিট ত্যাজ্য সম্পত্তি ১০ লক্ষ টাকা।

কোরআনের সূরা নিসা ৪:১২ অনুসারে, স্ত্রী যদি সন্তান রেখে মারা যান, তাহলে স্বামী পাবে স্ত্রীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ। যেহেতু বিলকিস বেগমের এক কন্যা আছে, তাই তার স্বামী পাবেন ১/৪ অংশ।

১০,০০,০০০ × ১/৪ = ২,৫০,০০০ টাকা

সূরা নিসা ৪:১১ অনুসারে, মৃত ব্যক্তির যদি একমাত্র কন্যা থাকে, তাহলে সেই কন্যা পাবে অর্ধেক সম্পত্তি। সুতরাং বিলকিস বেগমের একমাত্র কন্যা পাবে ১/২ অংশ।

১০,০০,০০০ × ১/২ = ৫,০০,০০০ টাকা

একই আয়াতে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা-মাতার প্রত্যেকে পাবে ত্যাজ্য সম্পত্তির ১/৬ অংশ। যেহেতু বিলকিস বেগমের সন্তান আছে, তাই তার পিতা পাবেন ১/৬ এবং মাতা পাবেন ১/৬ অংশ।

পিতা পাবেন: ১০,০০,০০০ × ১/৬ = ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা
মাতা পাবেন: ১০,০০,০০০ × ১/৬ = ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা

এবার মোট হিসাব দাঁড়াচ্ছে:

স্বামী: ২,৫০,০০০ টাকা
এক কন্যা: ৫,০০,০০০ টাকা
পিতা: ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা
মাতা: ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা

মোট = ২,৫০,০০০ + ৫,০০,০০০ + ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ + ১,৬৬,৬৬৬.৬৭
= ১০,৮৩,৩৩৩.৩৪ টাকা

অর্থাৎ বিলকিস বেগম রেখে গেছেন ১০ লক্ষ টাকা, কিন্তু কোরআনের নির্ধারিত ভগ্নাংশগুলো সরাসরি প্রয়োগ করলে উত্তরাধিকারীদের দিতে হবে ১০,৮৩,৩৩৩.৩৪ টাকা। এখানে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮৩,৩৩৩.৩৪ টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে?

গাণিতিকভাবে একই হিসাব আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যায়:

১/৪ + ১/২ + ১/৬ + ১/৬
= ৩/১২ + ৬/১২ + ২/১২ + ২/১২
= ১৩/১২

অর্থাৎ মোট দাবি দাঁড়াচ্ছে ১৩/১২, যা ১-এর বেশি। শতাংশ হিসেবে এটি ১০৮.৩৩%। অথচ বাস্তবে সম্পত্তি আছে মাত্র ১০০%। তাই এখানে কোরআনের নির্ধারিত অংশগুলো একসাথে সরাসরি কার্যকর করা অসম্ভব। যদি সবাইকে কোরআন-নির্ধারিত অংশ দেওয়া হয়, তাহলে সম্পত্তির চেয়ে বেশি টাকা দরকার হবে। আর যদি আউল পদ্ধতিতে সবার অংশ কমিয়ে ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে হিসাব মেলানো হয়, তাহলে স্বামী ১/৪ পাবে না, কন্যা ১/২ পাবে না, পিতা-মাতা প্রত্যেকে ১/৬ পাবে না। অর্থাৎ কোরআনের ঘোষিত ভগ্নাংশগুলো বাস্তবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে।

এই উদাহরণটি দেখায়, সমস্যাটি কোনো বিরল বা কল্পিত জটিলতা নয়। একজন নারী মারা গেছেন, তার স্বামী, এক কন্যা ও পিতামাতা জীবিত—এটি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্ভব পারিবারিক পরিস্থিতি। অথচ এমন সাধারণ ক্ষেত্রেও কোরআনের উত্তরাধিকার-ভগ্নাংশ সরাসরি প্রয়োগ করলে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবির সৃষ্টি হয়। ফলে আউল ছাড়া এই হিসাব মেলানো যায় না, আর আউল প্রয়োগ করলেই কোরআনের নির্দিষ্ট অংশগুলো আর অক্ষত থাকে না।


আউল নীতির উদ্ভব

ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে, নবী মুহাম্মদ-এর সময় থেকে প্রথম খলিফা আবু বকর-এর শাসনামলে, উত্তরাধিকার আইন ছিল একেবারে সরল ও সুস্পষ্ট। কোরআনে যে নির্দিষ্ট বিধানগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো মেনে সম্পত্তির ভাগাভাগি হতো। কিন্তু ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, উমর ইবনে আল-খাত্তাবের শাসনামলে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল, যা ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

একদিন উমরের শাসনকালে একজন মহিলার মৃত্যু হয়। তিনি স্বামী ও দুই বোন রেখে গিয়েছিলেন। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুসারে, এই অবস্থায় স্বামী পাবেন এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোন পাবেন দুই-তৃতীয়াংশ। কিন্তু এই হিসেবটি সমস্যার সৃষ্টি করল। যদি স্বামীকে এক-অর্ধাংশ দেওয়া হয়, তবে দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ বাকি থাকবে না, এবং যদি দুই বোনকে তাদের অংশ দেওয়া হয়, তবে স্বামীর এক-অর্ধাংশ সম্পূর্ণভাবে দেওয়া সম্ভব হবে না।

12+23=3+46=76>1\frac{1}{2} + \frac{2}{3} = \frac{3+4}{6} = \frac{7}{6} > 1

খলিফা উমর এই জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার জন্য বিশিষ্ট সাহাবিদের একত্রিত করলেন। তিনি তাদের সামনে কোরআনের নির্দেশগুলো উপস্থাপন করে বলেন, “আল্লাহ স্বামীর জন্য এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু এখন আমি কীভাবে এই সম্পদ বণ্টন করব? যদি স্বামীর অংশ দিয়ে শুরু করি, তবে দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ থাকবে না, আর যদি দুই বোনকে আগে দেই, তাহলে স্বামীর জন্য তার প্রাপ্য অংশ থাকবে না। আমাকে পরামর্শ দিন।”

বর্ণনা অনুযায়ী, উপস্থিত সাহাবিদের মধ্যে কেউ কেউ ‘আউল’ পদ্ধতির পরামর্শ দেন—অর্থাৎ নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির বেশি হয়ে গেলে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ‘আউল’-এর মূল ধারণা ছিল, সম্পত্তি কম হলে উত্তরাধিকারীদের প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ সমানভাবে কমিয়ে সম্পদ বণ্টন করা। কিন্তু এই ‘আউল’ পদ্ধতি মানতে গেলে, কোরআনে যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবে দেওয়া যাচ্ছে না, তার চাইতে কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহাবী ইবনে আব্বাস ছিলেন এই প্রস্তাবের প্রবল বিরোধী। তিনি বললেন, “এটি আল্লাহর নির্ধারিত ভাগের বিপরীতে যাচ্ছে। কোরআনের বিধানে কোনো পরিবর্তন আনা উচিত নয়।” কিন্তু হযরত উমর বাদবাকি সাহাবিদের মধ্যে বেশিরভাগের মতামত গ্রহণ করলেন এবং বললেন, “আমি এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় দেখি না যাতে সম্পদকে সবার মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করা যায়।”

এভাবে খলিফা উমর প্রথমবারের মতো ‘আউল’-এর নিয়ম প্রয়োগ করলেন। স্বামীর প্রাপ্য এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোনের প্রাপ্য দুই-তৃতীয়াংশ সমানভাবে কমিয়ে সকলের মধ্যে বণ্টন করা হলো। এই সিদ্ধান্ত ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। পরবর্তীতে, চারটি সুন্নি মাযহাবও উমরের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেয় এবং ‘আউল’-এর ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। কিন্তু স্পষ্টতই, এই আইনটি কোরআনে আল্লাহর হুকুমের সরাসরি বরখেলাপ। কারণ এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে কোরআনের বিধানকে বদলে দিতে হয়।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস তার অবস্থানে অটল ছিলেন, কিন্তু উমরের এই সিদ্ধান্ত ছিল সাহসী এবং প্রয়োজনীয়। উমর বুঝতে পেরেছিলেন, কোরআনে সম্পত্তি ভাগে সমস্যা রয়েছে। নতুবা কোরআনের বাইরে তার নতুন কোন সংশোধিত বিধান দেওয়ার প্রয়োজনই ছিল না, যেখানে কোরআনেই এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে। সমস্যাটি হচ্ছে, কোরআনের আয়াতটি তো রয়েই গেছে, সেটি তো আর বদলে দেওয়া যায়নি। সেটি দেখলেই তো পরিষ্কার হয় যে, এই আইনটিতে সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু নবীর মৃত্যুর পরে ওহী আসা তো বন্ধ হয়ে গেছে, তাহলে কোরআনে আল্লাহর হুকুম উমর কীভাবে সংশোধন করতে পারেন? সম্পত্তি ভাগের এই নতুন বিধানের অর্থই হচ্ছে, কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর বিধানের ওপর মাতব্বরি করা, তাই না?


আউল সম্পর্কে আলেমদের মতামত

এবারে আসুন বিখ্যাত কয়েকটি ইসলামি ওয়েবসাইট থেকে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক, [4]

আউল 3

Al-‘Awl
‘Awl is applied where the shares exceed the heritage, such as where the decedent leaves behind a wife, parents and two daughters (the shares being, the wife’s one-eighth, the parents’ one-third, the two daughters’ two-thirds; here the estate falls short of the sum of one-eighth, one-third and two-thirds [27/24]). Similarly, if a woman dies and leaves behind her husband and two agnate sisters, the share of the husband is one-half, and that of the sisters two-thirds; here the estate falls short of the sum of half and two-thirds (7/6). ‘Awl occurs only if the husband or the wife is present.
The schools differ regarding the issue. Will he deficit, in such a case, be diminished proportionately from the shares of all the sharers, or will it be diminished from the shares of only some of them?
The four Sunni schools accept the doctrine of ‘awl, the rule that all the shares will be diminished proportionately, exact like the creditors’ claims when the assets fall short of meeting them. Hence the heirs are wife, parents and two daughters, according to these schools it will be an instance of ‘awl. The obligation is met by dividing the heritage into 27 parts, though it earlier comprised 24 parts. The wife will take 3/27 (i.e. her share becomes 1/9 instead of 1/8), the parents take 8/27 and the daughter 16/27.
The Imamiyyah do not accept the doctrine of ‘awl and keep the corpus (in the previous example) fixed at 24 parts by diminishing the share of the two daughters. Hence the wife takes her complete share of 1/8 (which is 3/24), the parents take 1/3 (which is 8/24), and the remainder goes to the two daughters.
The four schools argue in favour of the validity of ‘awl and the reduction of all the shares by citing the precedent of a woman who died during the reign of the Second Caliph, ‘Umar, leaving behind a husband and two agnate sisters. The Caliph gathered the Companions and said: “The shares determined by God for the husband and the two sisters are a half and two-thirds respectively. Now if I start with the husband’s share, the two-thirds will not remain for the two sisters, and if I start with the two sisters, the half will not remain for the husband. So give me advice.”
Some advised him to follow ‘awl by diminishing all the shares proportionately, while Ibn ‘Abbas vehemently opposed it. But ‘Umar did not accept his view and acted according to the opinion of others, telling the heirs: “I do not see any better way regarding this estate but to distribute it amongst you in proportion to your shares.” Hence ‘Umar was the first person to apply ‘awl to the shares and all the Sunni schools followed him.
The Imamiyyah argue regarding the invalidity of the doctrine of ‘awl by observing that it is impossible for Allah, subhanahu, to divide an estate into shares of half and two-thirds, or shares of one-eighth, one-third and two-thirds, because, otherwise, ignorance and frivolity would be attributed to Him, while He is too exalted to deserve such attributes. Hence, it has been narrated from ‘Ali (‘a) and his pupil ‘Abd Allah ibn ‘Abbas that they said: “He Who can count the number of sand grains (in the universe) surely knows that the number of shares do not exceed six.”
The Imamiyyah always diminish the share of the daughters or sisters, and the shares of the husband, the wife and the parents remain unaltered; because the daughters and the sisters have been assigned a single share and do not face a reduction from a higher to a lower share. They, therefore, inherit as sharers in the absence of a male heir and as residuaries in his presence, and at times they are entitled along with him to less than what they are entitled to when alone.
However, the share of the husband is reduced from a half to one-fourth, the wife’s from one-fourth to one-eighth, the mother’s from one-third to one-sixth, and in certain cases the father, inherits one-sixth as a sharer; the share of none of them further diminishes from its determined minimum, and nothing is reduced from it. Hence, when the shares exceed the corpus, a start will be made from this minimum limit and the remainder will go to the daughters or sisters.
Al-Shaykh Abu Zuhrah, in al-Mirath ‘inda al-Ja’fariyyah, quotes Ibn Shihab al-Zuhri1 as having said, “If it were not for the preference given to the fatwa of the just leader ‘Umar ibn al-Khattab over the fatwa of Ibn ‘Abbas, the observation of lbn ‘Abbas is worthy of being followed by every scholar and worthy of consensus over it.” The Imamiyyah have adopted the opinion of Ibn ‘Abbas –may God be pleased with both of them– which is a good rule, as pointed out by Ibn Shihab al-Zuhri, who was an ocean of knowledge.
……………………………………………
1.The famous and great Tabi’i faqih who has been highly eulogized by the Sunni ‘ulama’. He had met ten Sahabah.

বঙ্গানুবাদঃ

যখন উত্তরাধিকারের অংশগুলো মোট সম্পদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন ‘আউল প্রয়োগ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মৃত ব্যক্তি স্ত্রী, বাবা-মা এবং দুই কন্যা রেখে গেলে (যেখানে স্ত্রীর অংশ এক-অষ্টমাংশ, বাবা-মায়ের এক-তৃতীয়াংশ, এবং দুই কন্যার দুই-তৃতীয়াংশ হয়; এখানে মোট অংশ এক-অষ্টমাংশ, এক-তৃতীয়াংশ এবং দুই-তৃতীয়াংশের সমান হওয়ার কারণে সম্পদ কমে যায় [২৭/২৪])। একইভাবে, যদি একজন নারী মারা যান এবং তার স্বামী ও দুই বোন রেখে যান, তবে স্বামীর অংশ এক-অর্ধাংশ এবং বোনদের অংশ দুই-তৃতীয়াংশ হয়; এখানে সম্পত্তির পরিমাণ এক-অর্ধাংশ এবং দুই-তৃতীয়াংশের সমান হওয়ায় মোট সম্পদ কমে যায় (৭/৬)। ‘আউল কেবল তখনই ঘটে যখন স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকে।
এই বিষয়ে বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে, কি সমস্ত উত্তরাধিকারীর অংশ সমানভাবে কমানো হবে, নাকি কেবল কিছু উত্তরাধিকারীর অংশ কমানো হবে?
চারটি সুন্নি মাযহাব ‘আউল-এর মতবাদ মেনে নেয়, যেখানে সমস্ত উত্তরাধিকারীর অংশ সমানভাবে কমানো হয়, ঠিক যেমন ঋণদাতাদের দাবি তখন কমে যায় যখন সম্পদ তাদের দাবি পূরণের জন্য যথেষ্ট হয় না। তাই স্ত্রীর অংশ, বাবা-মায়ের অংশ এবং দুই কন্যার অংশ প্রয়োগ করা হলে এটি ‘আউল-এর একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। সম্পদকে ২৪ অংশের পরিবর্তে ২৭ অংশে ভাগ করে এই দাবিগুলো পূরণ করতে হয়। স্ত্রী ৩/২৭ অংশ পাবেন (অর্থাৎ তার অংশ এক-অষ্টমাংশের পরিবর্তে এক-নবমাংশ হবে), বাবা-মা ৮/২৭ পাবেন এবং দুই কন্যা ১৬/২৭ পাবেন।
ইমামিয়্যাহ ‘আউল-এর মতবাদ গ্রহণ করে না এবং সম্পদকে ২৪ অংশেই স্থির রাখে, দুই কন্যার অংশ কমিয়ে। তাই স্ত্রী তার পুরো এক-অষ্টমাংশ (যা ৩/২৪) পাবেন, বাবা-মা তাদের এক-তৃতীয়াংশ (যা ৮/২৪) পাবেন, এবং অবশিষ্ট অংশ দুই কন্যার মধ্যে বণ্টিত হবে।
চারটি সুন্নি মাযহাব ‘আউল-এর বৈধতার পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন, যেখানে দ্বিতীয় খলিফা উমর (রাযি.) এর শাসনকালে এক মহিলার মৃত্যু হয়, যিনি স্বামী ও দুই বোন রেখে যান। খলিফা সাহাবিদের একত্রিত করে বললেন, “আল্লাহ স্বামীর জন্য এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন। এখন যদি আমি স্বামীর অংশ দিয়ে শুরু করি, তবে দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ থাকবে না, এবং যদি আমি দুই বোনের অংশ দিয়ে শুরু করি, তবে স্বামীর জন্য এক-অর্ধাংশ থাকবে না। তাই আমাকে পরামর্শ দিন।”
কিছু সাহাবি পরামর্শ দিলেন ‘আউল অনুসরণ করার, যেখানে সমস্ত অংশ সমানভাবে কমানো হবে। ইবনে আব্বাস (রাযি.) কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করলেন। তবে উমর (রাযি.) তার মতামত গ্রহণ করেননি এবং অন্যান্যদের মতামত অনুযায়ী কাজ করেন। তিনি উত্তরাধিকারীদের বললেন, “আমি এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় দেখি না যাতে তোমাদের অংশ অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করা হয়।” তাই উমর (রাযি.) প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি ‘আউল প্রয়োগ করেন এবং চারটি সুন্নি মাযহাব তার অনুসরণ করেন।
ইমামিয়্যাহ ‘আউল-এর অগ্রহণযোগ্যতার পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন, তারা বলেন, আল্লাহ (সুবহানাহু) কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন না যেখানে সম্পদের ভাগ এক-অর্ধাংশ এবং দুই-তৃতীয়াংশ বা এক-অষ্টমাংশ, এক-তৃতীয়াংশ এবং দুই-তৃতীয়াংশ হয়। কারণ এতে অজ্ঞতা এবং খেয়ালীপনা তার প্রতি আরোপ করা হয়, যা আল্লাহর মহিমার সাথে মানানসই নয়। তাই আলী (আ.) এবং তার ছাত্র আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তারা বলেছেন, “যিনি পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণার সংখ্যা জানেন, নিশ্চয়ই জানেন যে অংশগুলো কখনো ছয়টির বেশি হবে না।”
ইমামিয়্যাহ সবসময় কন্যা বা বোনদের অংশ কমান, আর স্বামী, স্ত্রী ও বাবা-মায়ের অংশ অপরিবর্তিত থাকে। কারণ কন্যা ও বোনদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অংশ কমে যায় না। তারা একজন পুরুষ উত্তরাধিকারীর অনুপস্থিতিতে ভাগীদার হিসেবে এবং তার উপস্থিতিতে রেসিডুয়ারি হিসেবে উত্তরাধিকার পায়। মাঝে মাঝে তারা পুরুষ উত্তরাধিকারীর সাথে একসাথে কম উত্তরাধিকার পায়।
তবে স্বামীর অংশ এক-অর্ধাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশে এবং স্ত্রীর অংশ এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-অষ্টমাংশে কমে যায়। মায়ের অংশ এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-ষষ্ঠাংশে এবং কিছু ক্ষেত্রে বাবার অংশ এক-ষষ্ঠাংশে কমে যায়। তাদের নির্ধারিত সর্বনিম্ন অংশ কখনো আরও কমে না এবং তা থেকে কিছুই কমানো হয় না। তাই যখন অংশগুলো মোট সম্পদের চেয়ে বেশি হয়, তখন এই সর্বনিম্ন সীমা থেকে শুরু করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ কন্যা বা বোনদের কাছে যায়।
আল-শাইখ আবু জুহরা আল-মিরাথ ‘ইন্দা আল-জাফারিয়্যাহ-তে ইবনে শিহাব আল-জুহরির উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যিনি বলেছেন, “যদি ন্যায়পরায়ণ নেতা উমর ইবনে আল-খাত্তাবের ফতোয়াকে ইবনে আব্বাসের ফতোয়ার উপর অগ্রাধিকার না দেওয়া হত, তাহলে ইবনে আব্বাসের মতামত এমন ছিল যা প্রতিটি আলেম অনুসরণ করতেন এবং তার উপর ইজমা সংঘটিত হত।” ইমামিয়্যাহ ইবনে আব্বাসের মতামত গ্রহণ করেছেন, যা ইবনে শিহাব আল-জুহরি দ্বারা প্রমাণিত যে এটি একটি উত্তম নিয়ম।


এবারে আসুন কাতারের বিখ্যাত ফতোয়ার ওয়েবসাইট ইসলামওয়েব থেকে এই সম্পর্কে পড়ি, [5]

আউল 5

The origion of ‘Awl in inheritance law
222526
2-10-2013 – Thul-Qi’dah 28, 1434
515
Question
Assalamu Alaykum, Scholars apply concept of Awl when the total inheritance shares shoots up more than what is available. Is there any Marfoo’ ahadith which says that the Prophet(pbuh) applied the doctrine of Awl. Why Allah mentioned shares in the Quran in such a way that in many cases, when we add up becomes greater than what is available?. Please explain.
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, is His Slave and Messenger.
There is no Hadeeth reported from the Prophet, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, that indicates that he, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, applied ‘Awl (which means that the shares of inheritors exceed the whole of the inheritance) regarding the issues of inheritance. However, he sallallaahu ‘alayhi wa sallam, urged us to act according to the Sunnah (way) of the rightly-guided caliphs and stated that that Sunnah and the consensus of scholars are sources of legislation, saying: “You must follow my Sunnah and that of the rightly-guided caliphs. Abide by it and hold on tight to it [as if] with your molar teeth…” [Abu Daawood, At-Tirmithi, Al-Haakim who graded it Saheeh (sound), and Ath-Thahabi and Al-Albaani agreed with him]
He, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, also said: “Allaah will not cause my Ummah (or he said: the Ummah of Muhammad) to agree on misguidance; and the Hand of Allaah is with the Jamaa’ah (the group which follows the Quran and authentic Sunnah); and whoever deviates from that will be in Hell.” [At-Tirmithi]
The Prophet, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, also said: “I asked my Lord for four things and He gave me three and refused to give me the fourth. I asked my Lord not to let my nation agree on misguidance and He gave me that……” [Ahmad narrated it as Marfoo‘, i.e. traceable to the Prophet sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention )]
‘Awl was applied by the rightly-guided caliph ‘Umar may Allaah be pleased with him and the Companions during his time agreed with that. However, Ibn ‘Abbaas may Allaah be pleased with him held another opinion after the death of ‘Umar, an opinion that has become nearly obsolete. Ibn Qudaamah said in Al-Mughni: “The opinion of applying ‘Awl has been adopted by all Muslim scholars except Ibn ‘Abbaas and a small group that held another opinion… We do not know at the present time anyone who adopts the opinion of Ibn ‘Abbaas. We do not know of any disagreement among the jurists of the Islamic states regarding applying ‘Awl. All perfect praise be to Allaah.”
The cause of ‘Awl presented itself during the time of the rightly-guided caliph ‘Umar ibn Al-Khattaab may Allaah be pleased with him. It was stated in the Al-Mawsoo‘ah Al-Fiqhiyyah:
“The first case of ‘Awl was for a woman who died and left behind a husband and two sisters. This occurred during the beginning of the caliphate of ‘Umar. He consulted the Companions and said: “By Allaah, I do not know which of you comes first and which comes next. If I start with the husband and give him his right in full, the two sisters will not take their right in full; and if I start with the two sisters and give them their right in full, the husband will not take his right in full.” According to the most recognized accounts, Al-‘Abbaas ibn ‘Abdul Muttalib may Allaah be pleased with him suggested that he could apply ‘Awl. Other accounts have it that it was ‘Ali ibn Abi Taalib or Zayd ibn Thaabit. It was narrated that Al-‘Abbaas said: “O Leader of the Believers, tell me: If a man passed away and left six dirhams, and he owed three dirhams to one man and four to another, what would you do? Would you not make the wealth into seven parts?” He said, “Yes.” Upon this, Al-‘Abbaas said: “It is the same thing.” Thus, ‘Umar applied the principle of ‘Awl.”
This is indeed justice because if the deceased is in debt to some persons and leaves wealth that cannot pay off his debt, it will not be fair to give some of them while depriving the others. Rather, what justice dictates is to decrease the share of each. Thus, someone who is entitled to one third of the total debt should take one-third of the existing assets, and someone who is entitled to one-sixth should take one-sixth of the existing assets, and so on.
Ibn Al-Qayyim may Allaah have mercy upon him said in I‘laam Al-Muwaqqi‘een: “The Companions applied ‘Awl in inheritance and applied decrease to all heirs by drawing analogy from the decrease applied to the shares of creditors in case where the total assets of a bankrupt person cannot pay off all entitlements. Moreover, the Prophet, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, said to creditors: ‘Take what you find and that is all that you are entitled to.’ This is pure justice, while exclusively depriving some creditors and giving some of them their full share is not just.”
Indeed, the principle of ‘Awl reflects the beauty of Islam in terms of its justice in matters and its suitability for dealing with new developments.
Allaah Knows best.

বঙ্গানুবাদঃ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয়, এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর দাস ও রাসূল।
কোনো সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়নি যে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মীরাসের ক্ষেত্রে ‘আউল (যা উত্তরাধিকারীদের অংশ মোট সম্পদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়) প্রয়োগ করেছেন। তবে তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে খলিফায়ে রাশেদীনদের সুন্নাহ অনুযায়ী চলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে তাদের সুন্নাহ ও বিদ্বানদের ইজমা শরিয়তের উৎস। তিনি বলেন: “তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাহ এবং খলিফায়ে রাশেদীনদের সুন্নাহ অনুসরণ করবে। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, যেন তোমরা তোমাদের কশ দাঁত দিয়ে এটি ধরে রেখেছো…” [আবু দাউদ, তিরমিজী, আল-হাকিম (যিনি এটিকে সহীহ বলেছেন) এবং তা সাথে ইমাম যাহাবী ও শাইখ আলবানী একমত হয়েছেন]।
তিনি আরও বলেন: “আল্লাহ আমার উম্মাহকে (বা তিনি বলেছেন: মুহাম্মাদের উম্মাহ) পথভ্রষ্টতার ওপর ঐক্যবদ্ধ হতে দেবেন না; এবং আল্লাহর সাহায্য জামা‘আতের সাথে থাকে; আর যে কেউ তা থেকে বিচ্যুত হবে, সে জাহান্নামে থাকবে।” [তিরমিজী]
আরও বলেছেন: “আমি আমার প্রভুর কাছে চারটি বিষয় চেয়েছিলাম, যার মধ্যে তিনটি আমাকে দেওয়া হয়েছে এবং একটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমি আমার প্রভুর কাছে আবেদন করেছিলাম যেন আমার জাতি পথভ্রষ্টতায় একমত না হয়, এবং তিনি আমাকে সেটি দিয়েছেন…” [আহমাদ মারফু‘ হিসেবে এটি বর্ণনা করেছেন, যা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর থেকে নির্দেশিত]।
‘আউল প্রথমবার খলিফায়ে রাশেদীন উমর (রাযি.) এর শাসনকালে প্রয়োগ করা হয়, এবং সেসময়ের সাহাবিগণ এতে সম্মত হন। তবে ইবনে আব্বাস (রাযি.) উমর (রাযি.) এর মৃত্যুর পর ভিন্ন মত পোষণ করেন, যা পরে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইবনে কুদামাহ আল-মুগনীতে বলেছেন: “‘আউল প্রয়োগের মতামত সকল মুসলিম ফকিহগণের মধ্যে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য হয়েছে, ইবনে আব্বাস এবং কিছু ক্ষুদ্র দল ছাড়া… বর্তমানে আমরা জানি না যে ইবনে আব্বাসের মতামত কেউ অনুসরণ করেন। ‘আউল প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের ফকিহদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।”
প্রথমবার ‘আউল-এর প্রয়োগ খলিফা উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রাযি.) এর শাসনকালে ঘটে। আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহতে বলা হয়েছে:
“প্রথম ‘আউল এর ঘটনা ঘটে এক মহিলার ক্ষেত্রে, যিনি স্বামী ও দুই বোন রেখে যান। এটি উমরের (রাযি.) খেলাফতের শুরুর সময় ঘটে। তিনি সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন এবং বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি জানি না কে আগে আসে আর কে পরে আসে। যদি আমি স্বামীকে পুরো অধিকার দেই, তবে দুই বোন তাদের অধিকার পুরো পাবেন না; আর যদি আমি দুই বোনকে পুরো অধিকার দেই, তবে স্বামী তার অধিকার পুরো পাবেন না।’ সর্বাধিক স্বীকৃত বর্ণনা অনুযায়ী, আল-আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাযি.) তাকে ‘আউল প্রয়োগের পরামর্শ দেন।”

‘আউল ইসলামের ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক, যা নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার উপযুক্ত সমাধান।
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।


আউল নীতি সম্পর্কে জাকির নায়েকের ব্যর্থ চেষ্টা

জাকির নায়েক-ধাঁচের BODMAS যুক্তিটি আসলে সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে আড়াল করার একটি অত্যন্ত দুর্বল কৌশল বা বলা ভাল, নির্লজ্জ মিথ্যাচার। কোরআনের উত্তরাধিকার আয়াত কোনো বীজগাণিতিক সমীকরণ নয়, যেখানে bracket, division, multiplication, addition, subtraction-এর ক্রম না জানলে ভুল উত্তর আসবে। এখানে বিষয়টি অত্যন্ত সরল: কোরআন নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ ঘোষণা করেছে। স্ত্রী ১/৮, পিতা ১/৬, মাতা ১/৬, দুই বা ততোধিক কন্যা ২/৩—এগুলো যদি মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তির অংশ হয়, তাহলে এদের যোগফল কোনোভাবেই ১ বা ১০০% ছাড়াতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে যোগ করলে দাঁড়ায় ১/৮ + ১/৬ + ১/৬ + ২/৩ = ২৭/২৪, অর্থাৎ ১১২.৫%। এখানে BODMAS টেনে আনা নিছক বাগাড়ম্বর; এটি গাণিতিক আপত্তির জবাব নয়।

আসুন জাকির নায়েকের বক্তব্য শুনি, যিনি সম্পূর্ণ মিথ্যাচারের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফুল ভিডিও ট্রান্সক্রিপ্টঃ

Brother has posed the question that according to Arun Shourie, in the Qur’an, in chapter 4, verses 11 and 12, if you add up the different parts of inheritance given to the heirs, the sum total becomes more than one. Therefore, Arun Shourie claims that the author of the Qur’an does not know mathematics.
As I mentioned in my talk, there are hundreds of people who have tried to find faults in the Qur’an. But if you analyze all of them, they are not true. None of them are true. Not a single one is true.
Regarding inheritance, the Qur’an speaks about inheritance in several places: in Surah Al-Baqarah, chapter 2, verse 180; Surah Al-Baqarah, chapter 2, verse 240; Surah An-Nisa, chapter 4, verse 9; Surah An-Nisa, chapter 4, verse 19; Surah Al-Ma’idah, chapter 5, verse 105; and in several other places.
But regarding the detailed explanation of the shares, it is mentioned in the Qur’an in Surah An-Nisa, chapter 4, verses 11 and 12, and in Surah An-Nisa, chapter 4, verse 176.
Regarding the translation of the verses quoted by Arun Shourie, that is Surah An-Nisa, chapter 4, verses 11 and 12, it says that regarding the shares of inheritance for your children, the male gets a share equal to that of two females. If there are only daughters, two or more, they share two-thirds. If there is only one daughter, she gets half.
The verse continues: regarding the parents, each gets one-sixth if the deceased has children. If there are no children, then the mother gets one-third, after payment of legacies and debts.
Verse 12 says that regarding what your wives leave, you get half if there are no children, and one-fourth if there are children, after payment of debts and legacies. Regarding what you leave for your wives, they get one-fourth if there are no children, and one-eighth if there are children.
It may sound confusing. Do not get confused; you can go home and refer to it.
In short, in verse 11 of Surah An-Nisa, chapter 4, the first share mentioned is that of the children, then of the parents, and later in verse 12 it gives the share of the spouses.
Now regarding inheritance, Islam speaks in great detail. The Qur’an only gives the basic outline. For the details, you have to refer to the hadith. A person can spend his full life only doing research on inheritance, and Arun Shourie expects to know about this just by quoting two verses.
It is somewhat similar to a person who wants to solve an arithmetic equation but does not know basic arithmetic. That is bad mathematics.
According to the rule of BODMAS, irrespective of whichever arithmetic sign comes first or last, first you have to solve the brackets, then division, then multiplication, then addition, and then subtraction. If you do not know the rule of BODMAS and you first do subtraction, then multiplication, then addition, and then solve the brackets, you will surely get the answer wrong.
In the same way, Arun Shourie himself does not know mathematics, because according to Islamic law for the division of inheritance, the first share goes to the spouses and the parents. After that, whatever remains is shared between the children.
If you follow this rule, the sum total can never be more than 100 percent.

আসুন ভিডিওটি দেখি,


“আগে স্বামী/স্ত্রী ও পিতা-মাতার অংশ দাও, তারপর বাকি সম্পত্তি সন্তানদের দাও”—এই যুক্তিও সরাসরি কোরআনের ঘোষিত অংশকে বাতিল করে। কারণ কোরআন কন্যাদের “বাকি যা থাকে” দিতে বলেনি; বলেছে দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা ২/৩ পাবে। এখন স্ত্রী, পিতা, মাতা ও দুই কন্যার উদাহরণে স্ত্রী-পিতা-মাতাকে আগে দিলে অবশিষ্ট থাকে ১৩/২৪। কিন্তু কোরআন অনুযায়ী কন্যাদের পাওয়ার কথা ১৬/২৪। তাহলে প্রশ্নটি স্পষ্ট: কন্যারা কি কোরআনের ১৬/২৪ পাবে, নাকি এপোলোজিস্টদের বাঁচানো ১৩/২৪ পাবে? যদি ১৬/২৪ পায়, মোট সম্পত্তি ২৭/২৪ হয়ে যায়। আর যদি ১৩/২৪ পায়, তাহলে কোরআনের ২/৩ অংশ মিথ্যা হয়ে যায়। এই দ্বন্দ্ব থেকে পালানোর কোনো সৎ পথ নেই।

এই যুক্তির সবচেয়ে হাস্যকর দিক হলো—এপোলোজিস্টরা গাণিতিক ভুল ঢাকতে গিয়ে উল্টো নিজেরাই স্বীকার করে নেয় যে কোরআনের ভগ্নাংশগুলো সরাসরি কার্যকর করা যায় না। তারা বলে, কোরআন “basic outline” দিয়েছে, বিস্তারিত ফিকহে আছে। কিন্তু অভিযোগ তো ফিকহের বই নিয়ে নয়; অভিযোগ কোরআনের নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলো নিয়ে। যদি সর্বজ্ঞ ঈশ্বর ১/৮, ১/৬, ১/৬, ২/৩ বলে দেন, তাহলে সেই সংখ্যাগুলো যোগ করলে ১১২.৫% হওয়া উচিত নয়। পরে উমর, ফকিহ, মাজহাব বা আউল এসে সেটিকে ১০০%-এ নামিয়ে আনতে পারে—কিন্তু সেটি মূল গাণিতিক অসামঞ্জস্যের সমাধান নয়; সেটি মূল সমস্যার পরবর্তী মানবিক প্যাচ।

সুতরাং BODMAS যুক্তি একটি স্পষ্ট red herring এবং category error। এটি উত্তরাধিকার-গণিতের প্রশ্নকে arithmetic-order-এর প্রশ্নে বদলে দেয়, যেন শ্রোতারা আসল সমস্যাটি ভুলে যায়। আসল সমস্যা এখনো আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে: কোরআন যে fixed shares দিয়েছে, সেগুলো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এপোলোজিস্টরা যতই “ক্রম”, “ফিকহ”, “হাদিস”, “basic outline” বা “গভীর জ্ঞান” শব্দ ব্যবহার করুক, ২৭/২৪ কখনো ১ হয় না। ১১২.৫% সম্পত্তি বণ্টন করা যায় না। এই সরল সত্যই পুরো এপোলোজেটিক কাঠামোকে ভেঙে দেয়।


সালাফি আলেম আসিমের বক্তব্য

এবারে আসুন একজন প্রখ্যাত সালাফি আলেম আসিমের বক্তব্য পড়ি। তার মূল বক্তব্যঃ

So my question was about inheritance in the Qur’an, specifically the ratios. I know this is mentioned in Surah An-Nisa, verse 11, but many non-Muslims are saying that this verse is an example of a mistake in the Qur’an.
For example, they give a case where a man dies with one hundred dollars and leaves behind a wife, three daughters, and parents. The shares would be one-eighth to the wife, two-thirds to the daughters, and one-sixth to each of the parents. But when you add these up, they do not equal one hundred dollars. They become more than one hundred percent, so we would need to give one hundred and twelve and a half dollars.
So my question is: how would such a situation be solved, and how can we respond to people who say this is a mistake?
First of all, we address the non-Muslims and say to them: is this the only mistake you found in the whole of Islam? Eureka! That is good. That is fine. And we will have an answer for that as well.
But if it is the only mistake, would it be logical that the 99.9 percent which is all correct, valid, and foolproof would be covered and overwhelmed by this single mistake that your minds could not comprehend?
Or, if we look at your own religion and find that it is 75 percent filled with errors, or even 60 percent filled with errors and 40 percent correct, what logic and what ratio are you talking about?
What you have mentioned, along with other cases in the laws of inheritance, is solved by, if I am not mistaken, the word “awl.” It means recalculating the percentages, because this is an offshoot—something that is not normal or regular.
So they deduct proportionally from all the parties so that the shares would be equivalent and the ratio would remain the same. This is a correction that the Companions did, may Allah be pleased with them, and they never doubted the Qur’an or the Sunnah. The Tabi‘in and Muslims for fifteen centuries have been applying it. It is not something new.
It is also found in some cases when the wife and the parents are left, or when the husband and the parents are left; when the wife dies or the husband dies. There is also a form of correction between the ratio of the father and the mother of the deceased, where it should have been different.
This is all fixed and known by the Companions, and there is consensus among the Companions and the Muslims regarding fixing this ratio. So there is no mistake.
And again, we say to the non-Muslims: is this the only thing you found wrong in the Shariah? Alhamdulillah. The other overwhelming correct, logical, fair, and just rules of Shariah should overwhelm this thing that your head could not comprehend.

ভিডিওটি আসুন দেখি,


এই আলেমের বক্তব্যে প্রথমেই একটি স্পষ্ট কুযুক্তি দেখা যায়: “পুরো ইসলামে কি এই একটাই ভুল পেয়েছ?”—এটি কোনো জবাব নয়, এটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। একটি ব্যবস্থায় ৯৯টি দাবি সঠিক হলেও একটি নির্দিষ্ট দাবির গাণিতিক ভুল ভুলই থাকে। গণিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোট চলে না। ১/৮ + ২/৩ + ১/৬ + ১/৬ = ২৭/২৪ হলে সেটি ১ হয় না, ১১২.৫% হয়। তাই “অন্য সব ঠিক আছে” বা “তোমাদের ধর্মে আরও ভুল আছে”—এসব tu quoque ও red herring। এগুলো উত্তরাধিকার-গণিতের মূল সমস্যাকে এক বিন্দুও খণ্ডন করে না।

বরং বক্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি হলো তিনি নিজেই বলেছেন, এই সমস্যার সমাধান হলো “আউল”—অর্থাৎ percentages পুনরায় গণনা করা এবং প্রত্যেকের অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া। এটিই আসল পয়েন্ট। যদি কোরআনের ঘোষিত ভগ্নাংশগুলো নিজে থেকেই নিখুঁত ও সরাসরি প্রয়োগযোগ্য হতো, তাহলে পরে “recalculating the percentages” দরকার হতো না। স্ত্রী ১/৮ পাবে বলা হলে বাস্তবে তাকে ১/৯ দেওয়া, কন্যাদের ২/৩ বলা হলে বাস্তবে কম দেওয়া—এগুলো তাফসির নয়; এগুলো সংখ্যাগত সংশোধন। আলেমটি “correction” শব্দ ব্যবহার করে অজান্তেই মূল অভিযোগকে শক্তিশালী করেছেন।

“সাহাবিরা করেছেন”, “তাবেঈনরা করেছেন”, “১৫ শতাব্দী ধরে মুসলিমরা করছে”, “ইজমা আছে”—এসবও গাণিতিক সমস্যার উত্তর নয়। ঐতিহ্য কোনো ভগ্নাংশকে বদলে দিতে পারে না। হাজার বছর ধরে কেউ ২৭/২৪-কে ১ বললেও ২৭/২৪ কখনো ১ হয় না। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম ফকিহরা আউল পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন—এটি প্রমাণ করে যে একটি ব্যবহারিক আইনগত প্যাচ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি প্রমাণ করে না যে মূল কোরআনিক ভগ্নাংশগুলো গাণিতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। বরং আউলের প্রয়োজনীয়তাই দেখায় যে সরাসরি আয়াত-নির্ধারিত অংশগুলো নির্দিষ্ট বাস্তব কেসে একসাথে কার্যকর করা যায় না।

সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো বক্তার শেষ দাবি—“তোমাদের মাথা বুঝতে পারেনি।” এটি যুক্তি নয়, অহংকারী হাত নাড়ানো। সমস্যা বোঝার জন্য জটিল ফিকহ লাগে না; সাধারণ ভগ্নাংশের যোগ জানলেই যথেষ্ট। কোরআন যদি নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ দেয়, তাহলে সেই অংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হতে পারে না। আর যদি বেশি হয়, তবে দুটি পথ: হয় কোরআনিক অংশগুলো কমাতে হবে, নয়তো অসম্ভব ১১২.৫% সম্পত্তি বানাতে হবে। আউল প্রথম পথটাই নেয়—অর্থাৎ কোরআনের ঘোষিত অংশগুলোকে বাস্তবে কমিয়ে দেয়। তাই এই বক্তব্য কোরআনের উত্তরাধিকার-সমস্যা খণ্ডন করে না; বরং নিজেই স্বীকার করে যে সমস্যাটি ফিকহি “correction” ছাড়া চালানো যায় না।

আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আলেম নিজেই বক্তব্যের মাঝখানে আসল সত্যটি স্বীকার করে ফেলেছেন: এটি ছিল “a correction that the Companions did”—অর্থাৎ সাহাবিরা একটি সংশোধন করেছিলেন। এই স্বীকারোক্তিই পুরো এপোলোজেটিক যুক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ যদি কোরআনের উত্তরাধিকার-হিসাব শুরু থেকেই নিখুঁত, সম্পূর্ণ ও গাণিতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো, তাহলে সাহাবিদের “সংশোধন” করার কোনো প্রয়োজনই থাকত না। সংশোধন শব্দটি নিজেই প্রমাণ করে যে মূল বিধান সরাসরি প্রয়োগ করলে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল, এবং সেই সমস্যা মেটাতে পরবর্তী মানবিক আইনগত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। সাহাবিরা করেছেন বলেই সেটি ভুল নয়—এই যুক্তি হাস্যকর; বরং সাহাবিদের সংশোধন করতেই হয়েছে, এটাই দেখায় যে কোরআনিক ভগ্নাংশগুলো নির্দিষ্ট বাস্তব কেসে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। সংশোধন তখনই দরকার হয়, যখন মূল নিয়ম সরাসরি প্রয়োগ করলে ফল মেলে না।


আউল-এর গাণিতিক ও আইনি সংকট

কোরআনের সূরা নিসায় বর্ণিত উত্তরাধিকার বন্টনের হারগুলো গাণিতিকভাবে ‘ওভার ডিটারমিনড’ (Over-determined)। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রাপ্য অংশগুলোর যোগফল ১ বা ১০০% ছাড়িয়ে যায়। যেমন: একজন মৃত ব্যক্তির স্বামী এবং দুই বোন থাকলে অংশ হয়:

12(স্বামী)+23(দুই বোন)=761.16\frac{1}{2} (\text{স্বামী}) + \frac{2}{3} (\text{দুই বোন}) = \frac{7}{6} \approx 1.16

গাণিতিকভাবে ১ এর বেশি সম্পত্তি বন্টন করা অসম্ভব। এই ত্রুটি নিরসনে খলিফা উমর ‘আউল’ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যা মূলত একটি গাণিতিক রি-স্কেলিং (Rescaling)। কিন্তু এটি করতে গিয়ে কোরআনের সুনির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলোকে পরিবর্তন করতে হয় [2]

ইসলামি আইনের মূলনীতি হলো— “লা ইজতিহাদা ফি মাওরিদিন নস”। যেখানে কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশ আছে, সেখানে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা যুক্তি খাটে না। ‘আউল’ পদ্ধতি প্রয়োগ করার অর্থ হলো—বাস্তবতার প্রয়োজনে কোরআনের ‘নস’ বা অকাট্য বিধানকে সংশোধন করা। এটি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া যে, মূল টেক্সটের গাণিতিক নকশাটি প্রয়োগযোগ্য নয়।


আল্লাহর বিধান নাকি উমরের বিধান?

হযরত উমরের শাসনামলে যেই বিধানটি প্রবর্তন হয়েছিল, সেটি আল্লাহর দেওয়া কোরআনের বিধানের সাথে স্পষ্টতই আলাদা একটি বিধান। তাহলে একজন ইমানদার মুসলিম আল্লাহর বিধান মানবে, নাকি উমরের বিধান? আসুন আহমদুল্লাহর একটি বক্তব্য শুনি,


কোরআনের আয়াতটি কেমন হলে নিখুঁত হতো

📖 সূরা নিসা: আয়াত ১১ – মূল অনুবাদ (সারাংশ)

“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ দেন: পুরুষের ভাগ নারীর দ্বিগুণ। যদি কেবল কন্যা থাকে দুই বা ততোধিক, তবে তারা পাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। যদি একজন কন্যা থাকে, তবে সে পাবে অর্ধেক। মৃতের বাবা-মা যদি জীবিত থাকে: প্রত্যেকে পাবে এক-ষষ্ঠাংশ যদি তার সন্তান থাকে। সন্তান না থাকলে এবং তার পিতা-মাতা ও ভাই-বোন আছে, তবে মা পাবে এক-তৃতীয়াংশ…” ইত্যাদি।

এখানে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভাগ আছে, এবং একাধিক স্থানে ভগ্নাংশের যোগফল ১-এর বেশি বা কম হয়ে যায়।


✅ পুনর্লিখিত, গাণিতিকভাবে নিখুঁত সংস্করণ

“আল্লাহ তোমাদের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বিধান দিয়েছেন,
– যদি কেউ মৃত্যুবরণ করে, এবং তার স্ত্রী, সন্তান, ও পিতা-মাতা জীবিত থাকে, তবে,
– স্ত্রী পাবে ১/৮ (সন্তান থাকলে), নতুবা ১/৪ (সন্তান না থাকলে)।
– পিতা ১/৬ পাবে, আর বাকি সম্পত্তি পুত্র-কন্যার মধ্যে ভাগ হলে, তিনি পুত্রের ন্যায় কন্যার চেয়ে দ্বিগুণ অংশ পাবেন।
– মাতা পাবে ১/৬, যদি মৃতের সন্তান বা ভাই-বোন থাকে; নতুবা ১/৩।
– সন্তানরা অবশিষ্ট অংশ পাবে, যেখানে প্রত্যেক পুত্র = দুই কন্যা।
– আর যদি মৃতের কেবল এক কন্যা থাকে, সে পাবে ১/২। যদি একাধিক কন্যা থাকে, তারা সম্মিলিতভাবে পাবে ২/৩, এবং অবশিষ্ট অংশ পিতা-মাতা বা স্বামী/স্ত্রীর মধ্যে ভাগ হবে এমনভাবে, যেন অংশগুলো যুক্ত করলে সর্বমোট ১ (এক) হয়।
– আর যদি মৃতের কোনো সন্তান না থাকে, তবে,
– পিতা-মাতা মিলে পাবে ১/৩ (তার থেকে মা ১/৩, বাবা ২/৩)।
– স্ত্রী পাবে ১/৪, স্বামী পাবে ১/২।
– যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ওয়ারিস না থাকে, এবং তার ভাই বা বোন থাকে, তবে তারা পাবে মোট ১ এর মধ্যে নির্ধারিত অংশ, নির্ভর করে ভাইবোনের সংখ্যা ও আত্মীয়তার ক্ষেত্রে নিকটত্বের উপর।”


শিয়া (ইমামিয়্যাহ) ফিকহ ও ‘আউল’ প্রত্যাখ্যানের যুক্তি

ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের গাণিতিক জটিলতা নিরসনে শিয়া বা ইমামিয়্যাহ মাযহাবের অবস্থান অত্যন্ত কট্টর; তারা খলিফা উমর কর্তৃক প্রবর্তিত ‘আউল’ (Awl) নীতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। শিয়া ফকিহদের মতে, আল্লাহ যেহেতু সর্বজ্ঞ, তাই তাঁর দেওয়া বিধানে এমন কোনো গাণিতিক ভুল থাকা অসম্ভব যেখানে অংশগুলোর যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যায়। তারা মনে করেন, একই অংকে সবার অংশ সমানুপাতিক হারে কমিয়ে দেওয়া (যা সুন্নিরা করে) মূলত আল্লাহর সুনির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণের ‘নস’ বা অকাট্য বিধানকে লঙ্ঘন করার শামিল।


ঘাটতি পূরণের পদ্ধতিঃ নির্দিষ্ট ওয়ারিশদের ওপর দায়ভার

শিয়া ফিকহ অনুযায়ী, যখন অংশীদারদের ভাগের যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যায়, তখন সবার অংশ না কমিয়ে কেবল নির্দিষ্ট কিছু ওয়ারিশের (যেমন: কন্যা বা বোন) অংশ থেকে সেই ঘাটতিটুকু কমানো হয়। শিয়াদের যুক্তি হলো—উত্তরাধিকারীদের দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. অপরিবর্তনীয় অংশীদার (Fixed Heirs): যাদের অংশ কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ প্রদত্ত সীমার নিচে নামতে পারে না (যেমন: মা, বাবা, স্বামী বা স্ত্রী)।
  2. পরিবর্তনশীল অংশীদার (Variable Heirs): যাদের অংশ বিশেষ পরিস্থিতিতে কমতে পারে (যেমন: কন্যা বা বোন)।

গাণিতিক উদাহরণ:

যদি কোনো মৃত ব্যক্তির পিতা, মাতা, স্ত্রী এবং দুই কন্যা থাকে, তবে কোরআনিকভাবে ঘোষিত অংশগুলো দাঁড়ায়:

16(পিতা)+16(মাতা)+18(স্ত্রী)+23(দুই কন্যা)=2724\frac{1}{6} (\text{পিতা}) + \frac{1}{6} (\text{মাতা}) + \frac{1}{8} (\text{স্ত্রী}) + \frac{2}{3} (\text{দুই কন্যা}) = \frac{27}{24}

এখানে যোগফল ১-এর বেশি হওয়ায় সুন্নিরা ‘আউল’ পদ্ধতিতে হর ২৪-কে বাড়িয়ে ২৭ করে দেয়। কিন্তু শিয়া পদ্ধতিতে পিতা, মাতা এবং স্ত্রী তাদের পূর্ণ অংশই পাবেন। যা অবশিষ্ট থাকবে, তা দুই কন্যা পাবেন। অর্থাৎ কন্যাদের নির্ধারিত 23\frac{2}{3} বা 1624 \frac{16}{24} অংশ থেকে ৩ ভাগ কেটে নেওয়া হবে, ফলে তারা পাবেন 1324\frac{13}{24} অংশ।


ইমাম আলী ও ইবনে আব্বাসের যুক্তি

শিয়াগণ তাদের এই পদ্ধতির সপক্ষে হযরত আলী এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। ইবনে আব্বাস এই সমস্যার গাণিতিক দায় সরাসরি টেক্সটের ওপর না চাপিয়ে মানুষের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর চাপিয়েছেন। তিনি বলতেন:

“যিনি মরুভূমির বালুকণা গণনা করতে পারেন, তিনি অবশ্যই জানতেন যে অংশগুলো ১-এর বেশি হতে পারে না।” [6]

শিয়াদের এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা টেক্সটের গাণিতিক ত্রুটি ঢাকার জন্য এক ধরনের ‘প্রায়োরিটি লজিক’ ব্যবহার করে। তবে এটিও প্রকারান্তরে প্রমাণ করে যে, কোরআনের আক্ষরিক ভগ্নাংশগুলো (যেমন: ২/৩ বা ১/২) কোনো অলৌকিক গাণিতিক ভারসাম্যের ওপর নয়, বরং একটি প্রশাসনিক সমঝোতার ওপর টিকে আছে—যেখানে শিয়ারা কন্যাদের অংশ কমিয়ে ভারসাম্য আনে, আর সুন্নিরা সবার অংশ কমিয়ে ভারসাম্য আনে [7]

এই বিভাজনটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কোরআনের গাণিতিক নকশাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; যদি এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো, তবে নবী পরবর্তী যুগে শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে কার অংশ কাটা হবে তা নিয়ে এমন মৌলিক মতভেদ তৈরি হতো না। শিয়াদের এই ভিন্ন অবস্থান মূলত ‘আউল’-এর মাধ্যমে কোরআনের ভুল সংশোধনের আরেকটি বিকল্প মানবিক প্রচেষ্টা মাত্র।


‘আপেক্ষিক অধিকার’ বা অনুপাত তত্ত্বের অসারতা

কোরআনের উত্তরাধিকার আইনে যখন দেখা যায় নির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির ১ বা ১০০% অতিক্রম করছে, তখন কিছু ইসলামি এপোলোজিস্ট একটি নতুন রক্ষাকবচ হাজির করেন। তারা বলেন, কোরআনে উল্লিখিত ১/২, ১/৪, ১/৮, ১/৬ বা ২/৩ অংশগুলো নাকি মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তির চূড়ান্ত বা পরম অংশ নয়; এগুলো আসলে উত্তরাধিকারীদের পারস্পরিক “আপেক্ষিক অধিকার” বা “অনুপাত” মাত্র। তাই বাস্তবে যখন মোট অংশ ১-এর বেশি হয়ে যায়, তখন আউল পদ্ধতিতে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া নাকি কোরআনের বিরুদ্ধে যায় না।

এই যুক্তিটি শুনতে চাতুর্যপূর্ণ মনে হলেও, বাস্তবে এটি একটি স্পষ্ট পোস্ট-হক রেশনালাইজেশন—অর্থাৎ ভুল ধরা পড়ার পরে সেই ভুলকে রক্ষা করার জন্য পরে বানানো ব্যাখ্যা। কোরআনের ভাষা, ফিকহি ইতিহাস, সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া এবং সাধারণ গাণিতিক যুক্তি—চার দিক থেকেই এই “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্ব ভেঙে পড়ে। কারণ কোরআন কোথাও বলেনি, “স্ত্রীর অংশ কন্যাদের অংশের তুলনায় এত”, বা “মায়ের অংশ বোনদের অংশের অনুপাতে এত”। বরং কোরআন সরাসরি মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে, তার ওপর নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ আরোপ করেছে। এখানেই এপোলোজিস্টদের অনুপাত তত্ত্বের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।


“مِمَّا تَرَكَ” শব্দবন্ধ: অংশগুলো মোট সম্পত্তির ওপরই আরোপিত

সূরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণের সময় বারবার বলা হয়েছে—مِمَّا تَرَكَ বা مَا تَرَكَ, অর্থাৎ “সে যা রেখে গেছে তা থেকে”। এই বাক্যাংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি স্পষ্ট করে দেয়, নির্ধারিত ভগ্নাংশের ভিত্তি হচ্ছে মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি—অন্য কোনো ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ নয়, এবং কোনো বিমূর্ত পারস্পরিক অনুপাতও নয়। [8]

যেমন, কোরআন বলে, দুইয়ের অধিক কন্যা থাকলে তারা পাবে মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ। আবার স্ত্রীদের ক্ষেত্রে বলা হয়, সন্তান থাকলে তারা পাবে মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে তার আট ভাগের এক ভাগ। এখানে ভাষাটি সরাসরি সম্পত্তিভিত্তিক। “সে যা রেখে গেছে” কথাটি মৃত ব্যক্তির মোট ত্যাজ্য সম্পত্তিকে নির্দেশ করছে। যদি কোরআনের উদ্দেশ্য সত্যিই শুধু পারস্পরিক অনুপাত বোঝানো হতো, তাহলে ভাষাটি হতো ভিন্নরকম—যেমন, “কন্যাদের অংশের তুলনায় স্ত্রীর অংশ এত”, অথবা “মায়ের অংশ পিতার অংশের তুলনায় এত”। কিন্তু কোরআন তা বলেনি।

অতএব, “এগুলো পরম অংশ নয়, আপেক্ষিক অনুপাত”—এই দাবি কোরআনের নিজস্ব বাক্যগঠনের বিরুদ্ধে যায়। ভগ্নাংশ যখন সরাসরি “মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে” তার ওপর বসানো হয়, তখন সেটি মোট সম্পত্তির অংশ হিসেবেই বোঝা হবে। পরে হিসাব না মেলায় সেটিকে “অনুপাত” বলে চালিয়ে দেওয়া ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নয়; এটি টেক্সট বাঁচানোর কৃত্রিম কৌশল।


‘হুদুদুল্লাহ’ বা আল্লাহর নির্ধারিত সীমার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত

উত্তরাধিকার বণ্টনের এই আয়াতগুলোর পরপরই সূরা নিসার ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা”—تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ। অর্থাৎ এই বিধানগুলোকে কোরআন নিজেই আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা হিসেবে ঘোষণা করছে। [9]

এখন প্রশ্ন হলো, কোনো অংশ যদি সত্যিই আল্লাহর নির্ধারিত সীমা হয়, তাহলে মানুষের তৈরি আউল পদ্ধতিতে সেটি কমে যায় কীভাবে? কোরআন যদি স্ত্রীকে ১/৮ দেয়, আর আউল প্রয়োগের পরে বাস্তবে স্ত্রী পায় ১/৯, তাহলে ১/৮ অংশটি আর কার্যকর থাকল না। কোরআন যদি দুই কন্যাকে ২/৩ দেয়, আর আউলের পরে তারা পায় ১৬/২৭, তাহলে ২/৩ অংশটিও বাস্তবে বাতিল হয়ে গেল। নামমাত্র বলা হচ্ছে কোরআন মানা হচ্ছে, কিন্তু কার্যত কোরআনের সংখ্যা পরিবর্তন করা হচ্ছে।

এখানে সমস্যাটি সরল। সীমা যদি পরিস্থিতি অনুযায়ী কমে যায়, তাহলে সেটি নির্ধারিত সীমা নয়। যদি ১/৮ চাপ পড়লে ১/৯ হয়ে যায়, ২/৩ চাপ পড়লে ১৬/২৭ হয়ে যায়, তাহলে এগুলোকে “অলঙ্ঘনীয় আল্লাহর সীমা” বলা অর্থহীন। সীমা যদি রাবারের মতো টানাটানি করে বদলানো যায়, তাহলে সেটি সীমা নয়; সেটি মানুষের সুবিধামতো সংশোধনযোগ্য একটি আনুমানিক নির্দেশনা মাত্র। কিন্তু কোরআন নিজে এই অংশগুলোকে আনুমানিক নির্দেশনা বলেনি—বলেছে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। এখানেই আউল এবং “হুদুদুল্লাহ” ধারণার মধ্যে মৌলিক স্ববিরোধ তৈরি হয়।


সাহাবিদের বিভ্রান্তিই প্রমাণ করে তারা এগুলোকে পরম অংশ হিসেবে বুঝতেন

যদি কোরআনের ভগ্নাংশগুলো আরবদের ভাষা ও আইন-সংস্কৃতিতে স্বাভাবিকভাবেই “আপেক্ষিক অনুপাত” হিসেবে বোঝা হতো, তাহলে খলিফা উমরের আমলে এই সমস্যা দেখা দিলে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার কথা নয়। উপস্থিত সাহাবিরা সহজেই বলতেন—এগুলো তো অনুপাত, তাই মোট যোগফল ১-এর বেশি হলে অনুপাত রেখে কমিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়, ঘটনা মোটেও এত সরল ছিল না। উমর নিজেই সমস্যাটি নিয়ে বিপাকে পড়েন এবং সাহাবিদের পরামর্শ চান।

উমরের বক্তব্যের সারকথা ছিল: আল্লাহ স্বামীর জন্য অর্ধেক এবং দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন; এখন স্বামীকে আগে দিলে দুই বোনের অংশ পূর্ণ হয় না, আর দুই বোনকে আগে দিলে স্বামীর অংশ পূর্ণ হয় না। তাই কীভাবে বণ্টন করা হবে, এ বিষয়ে তিনি সাহাবিদের পরামর্শ চান। [10]

এই ঘটনাটিই এপোলোজিস্টদের “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্বের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ঐতিহাসিক প্রমাণ। কারণ ভগ্নাংশগুলো যদি শুরু থেকেই অনুপাত হিসেবে বোঝা হতো, তাহলে উমরের এই দোটানা তৈরি হতো না। সাহাবিদের আলোচনাও প্রয়োজন হতো না। ইবনে আব্বাসের বিরোধিতাও অর্থহীন হয়ে যেত। বাস্তবে এই বিতর্ক দেখায়, তারা কোরআনের অংশগুলোকে পরম, নির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবেই বুঝতেন। সমস্যাটি তৈরি হয়েছিল কারণ কোরআনের নির্দিষ্ট অংশগুলো একসাথে প্রয়োগ করলে গাণিতিকভাবে সম্পত্তি যথেষ্ট হচ্ছিল না।

অতএব, আউল কোনো পূর্বনির্ধারিত কোরআনিক পদ্ধতি ছিল না; এটি ছিল পরবর্তী মানবিক সমন্বয়। আর মানবিক সমন্বয়ের প্রয়োজনই প্রমাণ করে যে মূল বিধানে এমন একটি বাস্তব সমস্যা ছিল, যা কোরআন নিজে সমাধান করেনি।


গাণিতিকভাবে “ভগ্নাংশ” ও “অনুপাত” এক জিনিস নয়

এপোলোজিস্টদের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো—ভগ্নাংশ এবং অনুপাতকে গুলিয়ে দেওয়া। কিন্তু গণিতে ভগ্নাংশ এবং অনুপাত এক জিনিস নয়। যখন বলা হয়, কেউ মোট সম্পত্তির ১/২ পাবে, কেউ ১/৬ পাবে, কেউ ১/৮ পাবে—তখন এগুলো মোট ১ বা পূর্ণ সম্পত্তির অংশ। এই অংশগুলো একসাথে যোগ করলে সর্বোচ্চ ১ হওয়া বাধ্যতামূলক। যোগফল ১-এর বেশি হলে তার অর্থ দাঁড়ায়, মৃত ব্যক্তি যত সম্পত্তি রেখে গেছে, তার চেয়ে বেশি সম্পত্তি বণ্টনের দাবি তৈরি হয়েছে। এটি অনুপাতের সমস্যা নয়; এটি হিসাবের সমস্যা।

কোনো সর্বজ্ঞ সত্তা যদি সত্যিই শুধু অনুপাত বোঝাতে চাইতেন, তাহলে তিনি সরাসরি অনুপাতের ভাষা ব্যবহার করতে পারতেন। যেমন, “এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী, পিতা-মাতা ও কন্যাদের অনুপাত হবে ৩:৮:১৬”—এভাবে বললে কোনো গাণিতিক সমস্যা থাকত না। কিন্তু কোরআন তা করেনি। কোরআন নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ দিয়েছে, এবং সেই ভগ্নাংশগুলো বাস্তব কিছু ক্ষেত্রে ১-এর বেশি হয়ে যায়। পরে সেই ভগ্নাংশগুলোকে অনুপাত বলে চালিয়ে দেওয়া মূল সমস্যাকে দূর করে না; বরং দেখায় যে টেক্সটের সরল অর্থ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

একটি উদাহরণ নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মৃত ব্যক্তি যদি স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং দুই কন্যা রেখে যায়, তাহলে স্ত্রী পাবে ১/৮, পিতা-মাতা মিলিয়ে পাবে ১/৩, এবং দুই কন্যা পাবে ২/৩। যোগফল দাঁড়ায়: ১/৮ + ১/৩ + ২/৩ = ২৭/২৪। অর্থাৎ ২৪ অংশের সম্পত্তিতে ২৭ অংশ দাবি তৈরি হচ্ছে। সুন্নি আউল পদ্ধতিতে তখন ২৪-কে ২৭ বানিয়ে অংশগুলো কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে স্ত্রী আর ১/৮ পায় না; পায় ৩/২৭ বা ১/৯। পিতা-মাতা এবং কন্যাদের অংশও তাদের কোরআন-নির্ধারিত ভগ্নাংশ থেকে কমে যায়।

এখানে “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্ব কোনো সমাধান দেয় না। কারণ আউল প্রয়োগের আগে যে অংশগুলো কোরআনে ছিল, আউল প্রয়োগের পরে সেগুলো আর থাকে না। অর্থাৎ বাস্তব বণ্টন কোরআনের সংখ্যার সঙ্গে মেলে না। তাই সরল সিদ্ধান্ত হলো: হয় কোরআনের ভগ্নাংশগুলো বাস্তব সব অবস্থার জন্য গাণিতিকভাবে যথেষ্ট নয়, অথবা আউল প্রয়োগ করে কোরআনের নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন করা হচ্ছে। দুই অবস্থাতেই “কোরআনের উত্তরাধিকার আইন নিখুঁত”—এই দাবি টেকে না।


শেষ কথা: ভুলকে আপেক্ষিকতা বলা ভুলকে শুদ্ধ করে না

“আপেক্ষিক অধিকার” তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য হলো কোরআনের গাণিতিক সমস্যাকে ভাষার খেলায় ঢেকে দেওয়া। কিন্তু এই কৌশল ব্যর্থ। কোরআনের ভাষা মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তির ওপর নির্দিষ্ট অংশ আরোপ করে; পরের আয়াতগুলো সেই অংশগুলোকে আল্লাহর সীমা বলে ঘোষণা করে; সাহাবিদের ঐতিহাসিক বিতর্ক দেখায় তারা এগুলোকে বাস্তব ও পরম অংশ হিসেবেই বুঝতেন; এবং গণিত দেখায়, এই অংশগুলো কিছু ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবি তৈরি করে।

অতএব, আউল কোনো “অলৌকিক গাণিতিক প্রজ্ঞা” নয়; এটি একটি পরবর্তী মানবিক প্যাচ। আর “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্ব সেই প্যাচকে ধর্মতাত্ত্বিকভাবে বৈধ দেখানোর চেষ্টা মাত্র। ভুলকে “আপেক্ষিকতা” নাম দিলে ভুলটি শুদ্ধ হয় না। বরং এতে আরও পরিষ্কার হয়, কোরআনের উত্তরাধিকার আইন বাস্তব জটিলতা সামলানোর মতো নিখুঁতভাবে নির্মিত ছিল না, এবং সেটিকে চালু রাখতে মানুষের তৈরি সংশোধনী পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হয়েছে।


ঋণদাতা-দেউলিয়া উপমার ভ্রান্তি: উত্তরাধিকার আইন ঋণ-সমন্বয় নয়

আউল পদ্ধতিকে বৈধ দেখানোর জন্য ইসলামি এপোলোজিস্টরা আরেকটি জনপ্রিয় উপমা ব্যবহার করেন। তারা বলেন, কোনো মৃত বা দেউলিয়া ব্যক্তির সম্পদ যদি তার সব ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে ঋণদাতাদের প্রত্যেকের পাওনা আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। একজনের পুরো পাওনা দিয়ে আরেকজনকে বঞ্চিত করা হয় না। সুতরাং, উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রেও যদি নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তাহলে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত। ইসলামওয়েবের ফতোয়াতেও এই যুক্তিই দেওয়া হয়েছে; সেখানে ঋণদাতাদের দাবির সঙ্গে উত্তরাধিকারীদের অংশ কমানোর তুলনা করে আউলকে “ন্যায়বিচার” এবং ইসলামের সৌন্দর্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [11]

কিন্তু এই উপমাটি মূলত একটি false analogy—ভুল তুলনা। কারণ ঋণদাতাদের দাবি এবং কোরআনিক উত্তরাধিকার অংশ একই ধরনের বিষয় নয়। ঋণ তৈরি হয় মানুষের পারস্পরিক লেনদেন থেকে। কেউ ধার নেয়, কেউ ধার দেয়, কেউ বেশি পাওনা রাখে, কেউ কম পাওনা রাখে। পরে দেখা যেতে পারে, ঋণগ্রহীতার সম্পদ সব ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট নয়। সেখানে সম্পদ কম পড়ে যাওয়া ঋণগ্রহীতার অর্থনৈতিক অক্ষমতা; আইনপ্রণেতার গাণিতিক ভুল নয়। কিন্তু কোরআনের উত্তরাধিকার অংশ কোনো মানুষের লেনদেন-জাত দাবি নয়; এগুলো কোরআনের দাবি অনুযায়ী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারিত অংশ। তাই এই দুই ক্ষেত্রকে এক করে দেখা যুক্তিগতভাবে অসৎ তুলনা।

দেউলিয়া ব্যক্তির ঋণের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো—বাস্তব সম্পদ ঋণের মোট দাবির তুলনায় কম। কিন্তু উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর। এখানে কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত দাবি তৈরি করেনি; বরং কোরআন নিজেই বিভিন্ন ওয়ারিশের জন্য নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ ঘোষণা করেছে। সেই ভগ্নাংশগুলো একসাথে যোগ করলে কিছু ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি ওয়ারিশদের দাবিতে নয়, আইনটির গাণিতিক নির্মাণে। দেউলিয়া ব্যক্তি সম্পদ কম রেখে গেছে—এটি এক ধরনের বাস্তব অর্থনৈতিক সংকট; কিন্তু আল্লাহর নামে ঘোষিত আইনে ১-এর বেশি অংশ বণ্টনের নির্দেশ তৈরি হওয়া—এটি আইন-প্রণয়নের ভেতরের গাণিতিক সংকট।

ঋণদাতা-উপমা আরও একটি কারণে ব্যর্থ। ঋণদাতাদের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের পাওনা আগে থেকেই মোট সম্পদের নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ হিসেবে ঘোষিত থাকে না। একজনের পাওনা ৩০০ টাকা, আরেকজনের ৪০০ টাকা, আরেকজনের ৫০০ টাকা হতে পারে। পরে যদি দেখা যায় মোট সম্পদ মাত্র ৮০০ টাকা, তখন বাস্তবতার কারণে সবার পাওনা আনুপাতিকভাবে কমানো হয়। কিন্তু কোরআনের উত্তরাধিকার আইনে বলা হয়েছে, অমুক পাবে ১/২, অমুক পাবে ১/৬, অমুক পাবে ১/৮, অমুক পাবে ২/৩। এগুলো সরাসরি মোট ত্যাজ্য সম্পত্তির অংশ হিসেবে ঘোষিত। তাই পরে এগুলো কমিয়ে দেওয়া মানে পাওনা সমন্বয় নয়; বরং ঘোষিত ভগ্নাংশ বদলে দেওয়া।

এখানে এপোলোজিস্টদের কৌশলটি পরিষ্কার। তারা এমন একটি মানবিক সংকটের উপমা আনে, যেখানে সম্পদ অপর্যাপ্ত হওয়া স্বাভাবিক এবং ঋণদাতাদের মধ্যে আনুপাতিক হ্রাস বাস্তবসম্মত। তারপর সেই উপমা টেনে এনে কোরআনের গাণিতিক অসামঞ্জস্য ঢাকার চেষ্টা করে। কিন্তু সর্বজ্ঞ সত্তার আইনকে দেউলিয়া মানুষের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করাই মূল সমস্যাকে আরও নগ্ন করে দেয়। একজন দেউলিয়া মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না, সম্পদের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সব ঋণ শোধ করার সক্ষমতাও রাখে না। কিন্তু আল্লাহকে যদি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান এবং সর্বোত্তম আইনপ্রণেতা বলা হয়, তাহলে তাঁর দেওয়া উত্তরাধিকার আইন এমনভাবে হওয়া উচিত ছিল যাতে কোনো বাস্তব অবস্থাতেই মোট অংশ ১-এর বেশি না হয়।

অতএব, ঋণদাতা-দেউলিয়া উপমা আউলকে বৈধ করে না। বরং এই উপমা অনিচ্ছাকৃতভাবে স্বীকার করে নেয় যে কোরআনের উত্তরাধিকার আইনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ঘোষিত দাবিগুলো পূরণ করার মতো সম্পত্তি নেই। ঋণদাতাদের ক্ষেত্রে এটি অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব; কোরআনের ক্ষেত্রে এটি গাণিতিক দেউলিয়াত্ব। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো—প্রথমটি মানুষের সীমাবদ্ধতা, দ্বিতীয়টি সর্বজ্ঞতার দাবির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ। তাই আউলকে “ন্যায়বিচার” বলা হলেও, সেটি কোরআনের ভুল দূর করে না; শুধু ভুলটি প্রশাসনিকভাবে সামলে নেয়।


ইজমা ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ কি কোরআনের সংখ্যা বদলাতে পারে?

আউল পদ্ধতিকে রক্ষা করার শেষ আশ্রয় হিসেবে সাধারণত আরেকটি যুক্তি দেওয়া হয়। বলা হয়, আউল কোরআনে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব সাহাবিদের পরামর্শে এটি চালু করেছিলেন; পরে অধিকাংশ ফকিহ ও আলেমও তা গ্রহণ করেছেন। অতএব, এটি খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ, সাহাবিদের ইজমা এবং উম্মাহর গৃহীত ফিকহি সমাধান। তাই কোরআনের আয়াতে সরাসরি আউল না থাকলেও, ইসলামী আইনশাস্ত্রের বৃহত্তর কাঠামোর ভেতরে আউল বৈধ।

এই যুক্তিটি প্রথমে শক্তিশালী মনে হতে পারে, কারণ ইসলামী ফিকহে কোরআনের পাশাপাশি সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসকেও আইনগত উৎস হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এখানেই মূল বিভ্রান্তি স্পষ্ট হয়। ইজমা বা ইজতিহাদ কোনো অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে পারে; কোনো সাধারণ বিধানকে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করতে পারে; নতুন পরিস্থিতিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কিন্তু ইজমা বা ইজতিহাদ কোরআনের সরাসরি ঘোষিত সংখ্যাকে বদলে দিতে পারে না। কারণ সরাসরি নস বা ব্যাখ্যা আর সংশোধন এক জিনিস নয়।

যদি কোরআন বলে স্ত্রী পাবে ১/৮, আর আউল প্রয়োগের পরে স্ত্রী বাস্তবে পায় ১/৯, তাহলে এটি ১/৮-এর ব্যাখ্যা নয়। ১/৯ কখনো ১/৮-এর তাফসির হতে পারে না। যদি কোরআন বলে দুই কন্যা পাবে ২/৩, আর আউলের পরে তারা বাস্তবে পায় ১৬/২৭, তাহলে এটিও ২/৩-এর ব্যাখ্যা নয়। এটি কোরআনিক সংখ্যার বাস্তব পরিবর্তন। অর্থাৎ আউল কোরআনের বিধান ব্যাখ্যা করছে না; বরং কোরআনের ঘোষিত ভগ্নাংশকে কমিয়ে নতুন বণ্টন তৈরি করছে।

এখানে ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি মৌলিক নীতি স্মরণীয়: لا اجتهاد مع النص—স্পষ্ট নসের উপস্থিতিতে ইজতিহাদ চলে না। অর্থাৎ যেখানে কোরআন বা সহিহ নস সরাসরি কোনো বিধান নির্ধারণ করেছে, সেখানে মানুষের ইজতিহাদ দিয়ে সেই বিধান বদলানো যায় না। উত্তরাধিকার আয়াতগুলোতে অংশগুলো অস্পষ্ট ভাষায় দেওয়া হয়নি; সেগুলো নির্দিষ্ট সংখ্যায় দেওয়া হয়েছে—অর্ধেক, এক-তৃতীয়াংশ, এক-চতুর্থাংশ, এক-ষষ্ঠাংশ, এক-অষ্টমাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ। এগুলো অনুমান, নীতি বা দিকনির্দেশনা নয়; এগুলো সরাসরি ভগ্নাংশ। তাই এখানে ইজতিহাদের কাজ ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু সংখ্যা বদলানো হতে পারে না।

সমস্যাটি আরও পরিষ্কার হয় যদি প্রশ্নটি এভাবে করা হয়: কোরআনের নির্দিষ্ট অংশ ভুল নয়, তাহলে আউল দরকার কেন? আর আউল দরকার হলে, কোরআনের নির্দিষ্ট অংশগুলো সব বাস্তব পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নয়—এ কথা স্বীকার করতে হবে। এপোলোজিস্টরা একদিকে বলেন, কোরআনের উত্তরাধিকার আইন নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ; অন্যদিকে বলেন, সেই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে খলিফা উমরের ইজতিহাদ প্রয়োজন হয়েছে, কারণ কোরআনের অংশগুলো সরাসরি প্রয়োগ করলে বণ্টন মেলে না। এই দুই দাবি একসাথে সত্য হতে পারে না। কোনো আইন একইসাথে “পূর্ণাঙ্গ” এবং “মানবিক প্যাচ ছাড়া অচল”—দুই-ই হতে পারে না।

খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহর দোহাইও এখানে সমস্যার সমাধান করে না। কারণ কোনো খলিফার সিদ্ধান্ত যদি কোরআনের অস্পষ্ট প্রয়োগ পরিষ্কার করত, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু আউলের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে খলিফার সিদ্ধান্ত কোরআনের ভাষা ব্যাখ্যা করছে না; বরং কোরআনের নির্ধারিত সংখ্যাগুলো বাস্তবে কমিয়ে দিচ্ছে। ১/৮-কে ১/৯ বানানো, ২/৩-কে ১৬/২৭ বানানো, কিংবা ১/৬-কে কমিয়ে দেওয়া—এসব কোনো ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নয়; এগুলো বাস্তব গাণিতিক সংশোধন।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। যদি আউল সত্যিই আল্লাহর বিধানের অংশ হতো, তাহলে কোরআন নিজেই কেন সেটি উল্লেখ করল না? উত্তরাধিকার বিষয়ে কোরআন এত নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ দিল, এত বিস্তারিতভাবে কে কত পাবে তা বলল, কিন্তু এমন একটি মৌলিক পরিস্থিতির কথা বলল না যেখানে মোট অংশ ১-এর বেশি হয়ে যাবে এবং সবাইকে আনুপাতিকভাবে কমাতে হবে। অথচ বাস্তবে এই সমস্যা এত গুরুত্বপূর্ণ যে পরবর্তী ফিকহে আউল ছাড়া বহু বণ্টন করা যায় না। তাহলে কি ধরে নিতে হবে, আল্লাহ এমন একটি আইন দিলেন যার জরুরি সংশোধনী মানুষ পরে আবিষ্কার করল?

ইজমার যুক্তিও শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় এসে ভেঙে পড়ে। কারণ ইজমা কোনো ভুলকে সত্যে পরিণত করতে পারে না। বহু মানুষ কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করলেই সেটি কোরআনিক হয়ে যায় না। ইতিহাসে কোনো মানবিক সমাধান ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়া আর সেটি আল্লাহর মূল বিধান হওয়া এক কথা নয়। আউল হয়তো একটি প্রশাসনিকভাবে কার্যকর সমাধান; কিন্তু সেটি কার্যকর বলেই কোরআনের গাণিতিক সমস্যাকে মুছে দেয় না। বরং আউলের প্রয়োজনীয়তাই দেখায়, কোরআনের নির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলো সব উত্তরাধিকার পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট ছিল না।

অতএব, “উমরের ইজতিহাদ”, “সাহাবিদের ইজমা” বা “খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ”—কোনোটিই মূল সমস্যাকে দূর করে না। এগুলো সর্বোচ্চ যা প্রমাণ করে তা হলো, সাহাবিরা কোরআনিক বণ্টনের একটি বাস্তব গাণিতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং তা সামলাতে মানবিক সমাধান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু মানবিক সমাধান তৈরি হওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে, মূল বিধান নিজে নিজে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করছিল না। তাই আউলকে ইসলামী ফিকহের অংশ বলা যেতে পারে, কিন্তু সেটিকে কোরআনের নিখুঁত গাণিতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ বলা যায় না। বরং এটি কোরআনিক উত্তরাধিকার আইনের সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।


উপসংহার

কোরআনের উত্তরাধিকার আইনকে সাধারণত “নিখুঁত” ও “আল্লাহ নির্ধারিত” বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এই প্রবন্ধের আলোচনায় দেখা যায়—কিছু বাস্তব পারিবারিক কনফিগারেশনে কোরআন নির্ধারিত অংশগুলো যোগ করলে মোট যোগফল ১ (সম্পূর্ণ সম্পত্তি)-কে ছাড়িয়ে যায়, ফলে সরল গাণিতিক নিয়মেই একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়। এই অসঙ্গতি কেবল “হিসাবের ছোট ভুল” নয়; উত্তরাধিকার আইনের মতো নীতিগত বিধানে এটি কার্যকরতা ও নির্ভুলতার মৌলিক শর্তকে আঘাত করে।

এই সমস্যার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরেই এর সমাধান হিসেবে ‘আউল’ নীতির উদ্ভব, যা মূলত খলিফা উমরের আমলে প্রয়োগ/প্রবর্তিত হয়। অর্থাৎ যেখানে কোরআনের ভগ্নাংশগুলো বাস্তবে “ওভারফ্লো” তৈরি করে, সেখানে সম্পত্তি বণ্টন চালাতে গিয়ে আয়াতে নির্ধারিত অংশগুলোকে কমিয়ে-সমন্বয় করতে হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে: যদি আইনটি সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে নিখুঁতভাবে নাজিল হত, তবে তা কি এমন পরিস্থিতি তৈরি করত—যেখানে বাস্তব প্রয়োগ টিকিয়ে রাখতে মানবিক সংশোধনী অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়?

আরও লক্ষ্যণীয় হলো—পরবর্তী যুগে বহু আলেম ‘আউল’-কে প্রতিষ্ঠিত সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং ইবনে আব্বাসের ভিন্ন মতকে প্রায় “অচল” অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ সমাধানটি কেবল সাময়িক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—পরবর্তীতে এটি ফিকহি ঐকমত্যের মতো কাঠামোর ভেতর স্থায়ীভাবে ঢুকে পড়ে। এতে কোরআনের আয়াত ও বাস্তব প্রয়োগের মাঝখানে এক ধরনের টানাপড়েন দেখা যায়: “আল্লাহর অংশ” বলেই যে ভাগগুলো দেওয়া—বাস্তবে বণ্টন করতে হলে সেই অংশগুলোই অনুপাত বদলে ফেলতে হয়।

সুতরাং, এই আলোচনার শেষ কথা দাঁড়ায় এভাবে: ‘আউল’ আসলে কোরআনের উত্তরাধিকার বিধানের “চূড়ান্ত প্রমাণ” নয়; বরং এটি সেই ভুলকে কার্যকরভাবে ঢেকে দিয়ে চালু রাখার মানবিক কৌশল—যা নিজেই ইঙ্গিত করে যে মূল টেক্সটের ভগ্নাংশ-ডিজাইন সর্বক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এক অর্থে, উত্তরাধিকার বিধানের এই সমস্যা ধর্মীয় দাবির একটি কেন্দ্রীয় দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে: “সর্বজ্ঞ বিধান সব ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে কাজ করবে”—বাস্তবতা সেখানে একটি ব্যতিক্রম তৈরি করে। এই কারণেই প্রবন্ধে দেখানো “গাণিতিকভাবে নিখুঁত” পুনর্লিখন-ধাঁচের প্রস্তাব (যেখানে যোগফল সর্বদা ১ থাকে)—এটি কেবল বিকল্প ভাষ্য নয়, বরং সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে একটি বিশ্লেষণাত্মক আয়না।

About This Article

Genre: Mathematical, Juristic, and Source-Based Critical Analysis of Quranic Inheritance Law

Epistemic Position: Mathematical Reasoning, Legal Consistency, Historical Criticism, Source-Internal Islamic Critique, and Secular Rational Inquiry

This article examines the Quranic inheritance rules in Surah An-Nisa and the classical problem of awl, where the fixed shares assigned to heirs can exceed the total estate.

Its scope is not general criticism of inheritance law, but a precise critique of a specific mathematical and legal contradiction: the Quran gives fixed fractions, yet in some real cases those fractions add up to more than 1, making literal implementation impossible.

The article follows Shongshoy's tradition of sharp, evidence-based, non-apologetic criticism. It does not treat awl as a miraculous solution or a harmless technical adjustment; it examines it as a human intervention that reduces Quran-assigned shares in order to make an otherwise impossible distribution workable.

The central argument is that either the Quranic fractions contain a structural mathematical flaw, or the later awl-based inheritance system effectively modifies explicit Quranic shares. In both cases, the claim of a perfectly self-sufficient divine inheritance law is seriously weakened.

The discussion covers Surah An-Nisa 4:11–12, over-allocation cases, pizza and estate examples, Umar's introduction of awl, Ibn Abbas's objection, Sunni acceptance, Shia rejection, the “no ijtihad against clear text” principle, the failure of relative-share apologetics, and the weakness of comparing inheritance shares to bankrupt debt settlement.

This article should be evaluated through mathematical accuracy, correct handling of fractions, source accuracy, internal consistency in Islamic legal theory, and clarity in distinguishing Quranic text from later juristic repair—not through religious sensitivity, apologetic expectation, inherited reverence, fear of criticizing scripture, or the demand that a mathematical contradiction be softened into theological mystery.


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা নিসা, আয়াত: ১১-১২ ↩︎
  2. তাবারী, ফিকহ শাস্ত্রের ইতিহাস 1 2 3
  3. সূরা নিসা: ১১-১২ ↩︎
  4. Al-‘Awl, Wayback Machine Archive link ↩︎
  5. The origion of ‘Awl in inheritance law ↩︎
  6. আল-মিরাথ ইন্দা আল-জাফরিয়্যাহ ↩︎
  7. ইনহেরিটেন্স একর্ডিং টু ফাইভ স্কুলস অফ ইসলামিক ল ↩︎
  8. সূরা নিসা, ৪:১১-১২ ↩︎
  9. সূরা নিসা, ৪:১৩-১৪ ↩︎
  10. আল-বায়হাকি, সুনান আল-কুবরা, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৫৩; আরও দেখুন: The Origin of ‘Awl in Inheritance Law, IslamWeb ↩︎
  11. IslamWeb, “The origin of ‘Awl in inheritance law”, Fatwa No. 222526 ↩︎