
Table of Contents
ভূমিকাঃ নবুয়্যতের ন্যায্যতা এবং ঐশ্বরিক পক্ষপাত
ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় ‘নবুয়্যত’ বা নবী হওয়াকে সাধারণত একটি সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক সম্মান হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর বা আল্লাহ যাকে মনোনীত করেন তাকেই এই পদে অভিষিক্ত করেন। কিন্তু যখন আমরা সহিহ হাদিস এবং ধর্মীয় পাঠ্যসমূহকে যুক্তি ও সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করি, তখন একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে: নবুয়্যত কি সত্যিই কোনো মানুষের ব্যক্তিগত কর্মগুণ বা যোগ্যতার ফসল, নাকি এটি একটি পূর্বনির্ধারিত ঐশ্বরিক নির্বাচন? যদি নবুয়্যত কোনো ব্যক্তির নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে অর্জিত ফলাফল না হয়ে বরং জন্মের আগেই নির্ধারিত কোনো বিষয় হয়, তবে তা ‘ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার’ (Divine Justice) এবং ‘মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা’র (Free Will) ধারণাকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জ করে। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো—মুহাম্মদের জীবন থেকে প্রাপ্ত অলৌকিক হস্তক্ষেপসমূহ এবং ইসলামের তাকদীর সংক্রান্ত ধারণা ব্যবহার করে এটি প্রমাণ করা যে, ধর্মীয় ‘পরীক্ষা’র ধারণাটি আদতে একটি অসম এবং পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবস্থা, যেখানে কিছু মানুষের জন্য সফলতার পথকে অলৌকিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিষ্কণ্টক করা হয়েছে, যা নৈতিক পরীক্ষার মূল শর্ত বা ‘ইমপার্শিয়ালিটি’ (Impartiality)-কে ক্ষুণ্ণ করে।
নবুয়্যতঃ অর্জিত যোগ্যতা নাকি প্রাক-নির্ধারিত চিত্রনাট্য?
ইসলামী ধর্মতত্ত্বে দাবি করা হয় যে, পার্থিব জীবন মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা। কিন্তু সহিহ হাদিসের ভাষ্যমতে, এই পরীক্ষার ফলাফল পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই, এমনকি মানবজাতির আদি পিতা আদমের সৃষ্টির আগেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। মুহাম্মদের নবুয়্যত প্রাপ্তির সময়কাল সম্পর্কে সাহাবীদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন যে, যখন আদম (আ.) আত্মা ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন, তখনই তার নবুয়্যত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল [1]। এই তথ্যটি একটি গুরুতর যৌক্তিক প্রশ্নের জন্ম দেয়: যদি একজনের ভূমিকা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ঊষালগ্নেই নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে তার জীবনে সংঘটিত ‘পরীক্ষা’ বা যোগ্যতা অর্জনের ধারণাটি কি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতামাত্র? তবে কি নবীদের জীবন স্রেফ একটি পূর্বনির্ধারিত ঐশ্বরিক থিয়েট্রিক্যাল পারফরম্যান্স, যেখানে মানুষের নিজস্ব সংকল্পের কোনো ভূমিকা নেই?
অন্যদিকে, এই একই ‘উম্মূল কিতাব’ বা মহাগ্রন্থে আবূ লাহাবের ধ্বংস এবং তার জাহান্নামী হওয়ার বিষয়টি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেই লিখে রাখা হয়েছিল [2] [3]। এখানে ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগের অভাব স্পষ্ট। যদি একজনের জন্য জান্নাত ও নবুয়্যত এবং অন্যজনের জন্য জাহান্নাম ও ধ্বংস স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্টির পূর্বেই বরাদ্দ করা থাকে, তবে সেখানে মানুষের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ (Free Will) এবং ‘ব্যক্তিগত কর্মগুণ’ অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে ঢোকার আগেই যদি শিক্ষক নির্ধারণ করে রাখেন যে ছাত্র ক-কে সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়া হবে এবং ছাত্র খ-কে ফেল করানো হবে, তবে সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে যেমন ন্যায়সংগত বলা যায় না, তেমনি আল্লাহ কর্তৃক মুহাম্মদের জন্য অলৌকিক সুরক্ষা (যেমন সিনা চাক বা বক্ষ বিদীর্ণ করা) এবং আবূ লাহাবের জন্য পূর্বনির্ধারিত ললাট-লিখন স্রষ্টার চরম স্বেচ্ছাচারিতারই বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর এই আগাম সিলেকশন ধর্মতাত্ত্বিক ‘জাস্টিস’ (Justice)-এর ধারণাকে ‘ডিটারমিনিজম’ (Determinism) বা অদৃষ্টবাদের গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে, আধুনিক একাডেমিক এবং যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি একটি ‘সার্কুলার রিজনিং’ বা চক্রাকার যুক্তির মতো। যেখানে স্রষ্টা নিজেই ফলাফল নির্ধারণ করেন এবং নিজেই সেই ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি প্রদান করেন। এখানে ব্যক্তির নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব বা ব্যর্থতার দায়ভার থাকে না, কারণ পুরো প্রক্রিয়াটিই একটি পূর্বলিখিত চিত্রনাট্যের অংশ মাত্র। [1] [2] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৯: চারিত্রিক গুণাবলি ও মর্যাদাসমূহ
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – নবীকুল শিরোমণি -এর মর্যাদাসমূহ
৫৭৫৮-[২০] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য নুবুওয়্যাত কখন হতে নির্ধারণ করা হয়েছে? তিনি (সা.) বললেন, সে সময় হতে, যখন আদম আলায়হিস সালাম আত্মা ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন। (তিরমিযী)
সহীহ: তিরমিযী ৩৬০৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ ১৮৫৬, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৪২১০, আল মু’জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১২৪০৭, মুসনাদে আহমাদ ১৬৬৭৪, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৩৬৫৫৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
২১৫৮. ইয়াহইয়া ইবন মূসা (রহঃ) ….. আবদুল ওয়াহিদ ইবন সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মক্কায় এলাম। সেখানে আতা ইবন আবু রাবাহ (রহঃ) এর সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে বললামঃ হে আবূ মুহাম্মদ, বাসরাবাসরীরা তো তাকদীরের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলে। তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস, তুমি কি কুরআন তিলাওয়াত কর? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ সূরা আয-যুখরুখ তিলাওয়াত কর তো। আমি তিলাওয়াত করলামঃ
حم* وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ * إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ * وَإِنَّهُ فِي أُمِّ الْكِتَابِ لَدَيْنَا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ
হা-মীম, কসম সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। তা রয়েছে আমার কাছে উম্মূল কিতাবে, এ তো মহান, জ্ঞান গর্ভ (৪৩ঃ ১, ২, ৩, ৪)।
তিনি বললেনঃ উম্মূল কিতাব কি তা জান? আমি বললামঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ হল একটি মহাগ্রন্থ, আকাশ সৃষ্টিরও পূর্বে এবং যমীন সৃষ্টিরও পূর্বে আল্লাহ তাআলা তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আছে ফির’আওন জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, এতে আছে তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবীও ওয়া তাব্বা(تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ) আবূ লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হয়েছে আর ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
আতা (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যতম সাহাবী উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র ওয়ালীদ (রহঃ)-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাত করেছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ মৃত্যুর সময় তোমার পিতা কি ওয়াসীয়ত করেছিলেন?
তিনি বললেনঃ তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেনঃ হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করবে। যেনে রাখবে যতক্ষণ না আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাকদীরের সব কিছুর ভাল-মন্দের উপর ঈমান আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কখনো আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে জাহান্নামে দাখেল হতে হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর একে নির্দেশ দিলেন, লিখ, সে বললঃ কি লিখব? তিনি বললেনঃ যা হয়েছে এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত যা হবে সব তাকদীর লিখ। সহীহ, সহিহহ ১৩৩, তাখরিজুত তহাবিয়া ২৩২, মিশকাত ৯৪, আযযিলাল ১০২, ১০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৫৫ [আল মাদানী প্রকাশনী]
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি এ সূত্রে গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ এবং নৈতিক সংকটঃ ‘সিনা চাক’-এর যৌক্তিক বিশ্লেষণ
ধর্মতাত্ত্বিক বয়ানে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা হয় তার রিপু দমন এবং নৈতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। অর্থাৎ, পাপ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা বর্জন করাই হলো প্রকৃত পুণ্য। কিন্তু মুহাম্মদের শৈশবকালে জিব্রাইল কর্তৃক তার বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃদপিণ্ড থেকে ‘শয়তানের অংশ’ বা রক্তপিণ্ড বের করে ফেলার যে বর্ণনা সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়, তা এই নৈতিক নির্বাচনের ধারণাকেই সমূলে বিনাশ করে দেয় [4]। এখানে একটি গুরুতর যৌক্তিক সংকট পরিলক্ষিত হয়: যদি কোনো ব্যক্তির জৈবিক বা আধ্যাত্মিক গঠন থেকে পাপ করার প্রবৃত্তিটিকেই অলৌকিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়, তবে তার পরবর্তী ‘নিষ্পাপ’ জীবন কি আদৌ তার নিজস্ব অর্জিত কোনো গুণ? যদি কোনো যন্ত্রের ত্রুটি আগে থেকেই মেরামত করে দেওয়া হয়, তবে সেই যন্ত্রটি ঠিকভাবে কাজ করার জন্য কোনো প্রশংসা বা পুরস্কার পেতে পারে না। তেমনিভাবে, মুহাম্মদের ‘নিষ্পাপ’ হওয়ার কৃতিত্ব তার নিজের নয়, বরং তার স্রষ্টার অলৌকিক কারিগরি কৌশলের। অর্থাৎ, এখানে ‘সংগ্রাম’ বা ‘রিপু দমন’-এর কোনো স্থান নেই; যা আছে তা কেবল একটি যান্ত্রিক অলৌকিকতা।
একটি নিরপেক্ষ পরীক্ষার প্রাথমিক শর্ত হলো সকল পরীক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, স্রষ্টা নিজেই পক্ষপাতের আশ্রয় নিচ্ছেন। একজনকে শৈশবেই ‘শয়তান-মুক্ত’ বা পাপের প্রভাবমুক্ত করে তৈরি করা হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষকে তাদের ভেতরে সহজাত প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনা দিয়ে একটি অসম যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যদি এই অলৌকিক শোধন প্রক্রিয়া আবু লাহাব বা অন্য কোনো সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হতো, তবে তাদের পক্ষেও পাপ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। ফলে, মুহাম্মদ যে নিজ যোগ্যতায় বা কর্মগুণে নবী হয়েছেন—এই দাবিটি যুক্তির কষ্টিপাথরে অকেজো। বরং এটি পরিষ্কার করে যে, নবুয়্যত কোনো নৈতিক অর্জনের ফলাফল নয়, বরং একটি স্বেচ্ছাচারী ঐশ্বরিক সিলেকশন, যেখানে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার (Free Will) চেয়ে অলৌকিক প্রকৌশলই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
এবারে আসুন আরো একটি হাদিস পড়ি, যেখানে বোঝা যায় নবীর হৃদপিণ্ড আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। এই কাজটি আবু লাহাবের বেলাতে করা হলে, আবু লাহাবও তো জান্নাতে যেতে পারতো, তাই না? [4] [5]
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পরিচ্ছদঃ ৭৩. রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মি’রাজ এবং নামায ফরয হওয়া
৩১০। শায়বান ইবনু ফাররুখ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) এলেন, তখন তিনি শিশুদের সাথে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন এ অংশটি শয়তানের। এরপর হৎপিণ্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পূনঃস্থাপন করলেন। তখন ঐ শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, মুহাম্মাদ -কে হত্যা করা হয়েছে। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বক্ষে সে সেলাই-এর চিহ্ন দেখেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


মেধা ও শ্রম বনাম অলৌকিক পদায়নঃ যোগ্যতার মাপকাঠি বিশ্লেষণ
পার্থিব জগতের দিকে তাকালে আমরা দেখি, যেকোনো সম্মানজনক বা দায়িত্বশীল পদে আসীন হতে গেলে একজন মানুষকে নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা, মেধা এবং যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। যেমন—জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়া, সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়া কিংবা গুগলের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সিইও হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এই অবস্থানগুলোতে পৌঁছাতে গেলে বছরের পর বছর পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং অসামান্য পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু যখন আমরা নবুয়্যতের মতো একটি ‘সর্বোচ্চ’ পদের দাবি বিচার করি, তখন সেখানে কোনো অর্জনযোগ্য যোগ্যতার মাপকাঠি খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, নবুয়্যত কি সত্যিই কোনো নৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ফল, নাকি এটি স্রেফ একটি ঐশ্বরিক ‘নেপোটিজম’ (Nepotism) বা ‘ডিভাইন প্রেফারেন্স’?
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল কিংবা আলেকজান্দ্রিয়ার হাইপেশিয়ার মতো মনীষীদের। তারা কোনো অলৌকিক ফেরেশতার সাহায্য ছাড়াই নিজেদের মেধা, যুক্তি এবং চিন্তাশক্তির মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে ঋণী করে গেছেন। তাদের শিক্ষা বা দর্শন কোনো আকাশ থেকে পড়া ওহী নয়, বরং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের ফসল। সক্রেটিস বা হাইপেশিয়ার জ্ঞান ছিল ‘এম্পিরিক্যাল’ বা অভিজ্ঞতালব্ধ এবং যুক্তিগ্রাহ্য, যা অন্য যেকোনো মানুষ অর্জন করতে পারে। কিন্তু নবুয়্যত একটি ‘ক্লোজড সিস্টেম’, যা সাধারণ মানুষের মেধার নাগালের বাইরে রাখা হয়েছে। বিপরীতে, মুহাম্মদের নবুয়্যত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাকে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়নি। যদি তার শৈশবেই ফেরেশতা পাঠিয়ে তার হৃদপিণ্ড থেকে ‘শয়তানের অংশ’ অপসারিত করা হয় এবং আকাশ-যমিন সৃষ্টির আগেই তার নাম চূড়ান্ত করে রাখা হয়, তবে এখানে তার ব্যক্তিগত কোনো কৃতিত্বের স্থান থাকে না [4] [1]।
এই বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, নবুয়্যত কোনো ‘মেরিট-বেসড’ বা যোগ্যতানির্ভর ব্যবস্থা নয়। এটি একটি চরম এক্সক্লুসিভ বা একচেটিয়া পদায়ন, যেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের বা ভালো কাজের মাধ্যমে সেই স্তরে পৌঁছানোর কোনো পথ খোলা নেই। যদি একজন মানুষ তার সারাজীবনের সমস্ত ভালো কাজ দিয়েও নবীর স্তরে পৌঁছাতে না পারে এবং অন্যদিকে একজন নবী জন্মগতভাবেই ‘পাপমুক্ত’ ও ‘মনোনীত’ হিসেবে পৃথিবীতে আসেন, তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি অসম প্রতিযোগিতার নামান্তর। এটি প্রমাণ করে যে, তথাকথিত ঐশ্বরিক পরীক্ষাটি সাধারণ মানুষের জন্য যতটা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ, নবীদের জন্য সেটি স্রষ্টা নিজেই ততটা সহজ ও নিশ্চিত করে রেখেছেন।
উপসংহার: ঐশ্বরিক স্বৈরতন্ত্র এবং নৈতিক পরীক্ষার অসারতা
পুরো আলোচনাটি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের নবুয়্যত এবং তাকদীরের ধারণা একটি গভীর যৌক্তিক স্ববিরোধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যদি একজন স্রষ্টা পরম ন্যায়বিচারক হন, তবে তার সাজানো ‘জীবন-পরীক্ষা’ সবার জন্য সমান হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু মুহাম্মদের শৈশবে অলৌকিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পাপ করার প্রবণতা দূর করা এবং সৃষ্টির শুরুতেই তার সফলতা চূড়ান্ত করে রাখা প্রমাণ করে যে, এই ব্যবস্থায় ‘ন্যায়বিচার’ (Justice) অপেক্ষা ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ (Arbitrariness) অধিক কার্যকর [4] [2]। যখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এবং ফলাফল আগে থেকেই নির্দিষ্ট থাকে, তখন সেই পরীক্ষাকে কেবল একটি প্রসহন ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না।
তাত্ত্বিকভাবে, যদি আবু লাহাবের ধ্বংস হওয়া এবং মুহাম্মদের সফল হওয়া মহাবিশ্ব সৃষ্টির ঊষালগ্নেই ‘উম্মূল কিতাবে’ লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে, তবে আবু লাহাবের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা বা মুহাম্মদকে তার নৈতিকতার জন্য কৃতিত্ব দেওয়া—উভয়ই অযৌক্তিক। কারণ তারা দুজনেই একটি পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্টের অভিনেতা মাত্র। একজন মানুষ হিসেবে আবু লাহাবের কোনো সুযোগই ছিল না তার ভাগ্য পরিবর্তন করার, ঠিক তেমনি মুহাম্মদেরও কোনো সম্ভাবনা ছিল না ‘নবী’ না হওয়ার। এই তকদীরী কাঠামো অনুযায়ী, স্রষ্টার এই দ্বিমুখী আচরণ প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল খেলোয়াড়ই নন, বরং তিনি রেফারির ভূমিকা পালন করে নিজের প্রিয় দলকে অলৌকিক উপায়ে জয়ী করছেন।
পরিশেষে বলা যায়, নবুয়্যত কোনো মানবিক উৎকর্ষের চূড়া নয়, বরং এটি একটি ঐশ্বরিক পক্ষপাতিত্বের দলিল। বৈষয়িক জগতে মানুষ যখন তার মেধা ও শ্রমে বড় কোনো অর্জন করে, তখন তাকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু যেখানে সফলতা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং ব্যর্থতা আগে থেকে লিখে রাখা হয়, সেখানে নৈতিক দায়বদ্ধতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। ইসলামের এই প্রাক-নির্ধারিত নবুয়্যত এবং তাকদীরের বয়ান শেষ পর্যন্ত স্রষ্টাকে একজন ন্যায়বিচারকের পরিবর্তে একজন নৈতিক স্ববিরোধিতা সম্পন্ন মহাজাগতিক স্বৈরাচারী হিসেবেই চিত্রায়িত করে, যার কাছে মানুষের কর্মের চেয়ে নিজের খেয়াল-খুশিই প্রধান।
