কোরআন হাদিস থেকে পরিষ্কারভাবে জানা যায়, আল্লাহ তাকদীর আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। এর সাথে আমলের কী আদৌ কোন মূল্য রয়েছে? আমল করে কী আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর পরিবর্তন সম্ভব? এমনকি নবী নিজেই এই হাদিস যদি শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন, তার জান্নাত প্রাপ্তিও শতভাগ নিশ্চিত নয়। আসুন হাদিস থেকেই পড়ি, [1] [2] [3]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. কোন ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে না, বরং জান্নাতে যাবে আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে
৬৮৫২। কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে জান্নাতে দাখিল করতে পারে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমিও নই। তবে আমার পালনকর্তা যদি তার অনুগ্রহের দ্বারা আমাকে আবৃত করে নেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. কোন ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে না, বরং জান্নাতে যাবে আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে
৬৮৫৩। মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে নাজাত দিতে পারে। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? উত্তরে তিনি বললেনঃ আমিও নই। তবে যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে তার ক্ষমা ও রহমতের দ্বারা ঢেকে নেন। বর্ণনাকারী ইবনু আউন (রহঃ) তাঁর হাত দ্বারা নিজ মাথার দিকে ইশারা করে বললেন, আমিও না। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা’আলা তাঁর ক্ষমা ও রহমত দ্বারা আমাকে ঢেকে নেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. কোন ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে না, বরং জান্নাতে যাবে আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে
৬৮৫৪। যুহারয়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার আমল তাকে নাজাত দিতে পারে। তারা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি নন? তিনি বলেন, আমিও নই। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা’আলা আমাকে তাঁর রহমত দ্বারা রক্ষা করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এবারে আসুন তাফসীর গ্রন্থ থেকে একটি বক্তব্য দেখে নিই, [4]

এবারে আসুন মতিউর রহমান মাদানীর বক্তব্য শুনে নিই,
মানুষ কী স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে কিছু করতে সক্ষম?
এই হাদিসটি ইসলামী বিশ্বাসে মানব স্বাধীন ইচ্ছা ও তাকদীর (divine predestination) সম্পর্কিত মৌলিক ধারণাগত পরস্পরবিরোধীতাকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে। এতে দেখা যায়, প্রাক-ইসলামিক যুগে অজ্ঞ মানুষরা যেকোনো ঘটনার জন্য তাকদীরকে দায়ী করত—অর্থাৎ তারা মনে করত, মানুষের কর্মকাণ্ডের পেছনে স্বাধীন ইচ্ছা নয়, বরং কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির নিয়ন্ত্রণ কার্যকর। ইসলাম এই ধারণাকে কেবল অব্যাহত রাখেনি, বরং ধর্মতাত্ত্বিকভাবে আরও দৃঢ় করেছে। মানে পূর্বের অজ্ঞদের সেই ধারনাকেই পাকাপোক্ত করেছে।
হাদিসের বর্ণনায় উমর ইবনু আব্দুল আজীয উল্লেখ করেন যে, তাকদীরের এই ধারণা কোনো নতুন চিন্তাধারা নয়; বরং জাহিলিয়াত যুগেও মানুষ নিজেদের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তাকদীরকেই দায়ী করত। ইসলাম এসে এই ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক আকার দিয়েছে এবং নবী মুহাম্মদের বাণী ও হাদিসসমূহের মাধ্যমে তাকদীরকে এক সর্বব্যাপী নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ আর স্বাধীন সত্তা নয়, বরং ঈশ্বরের ইচ্ছানির্ভর এক নির্বাহী সত্তা—যার কর্ম, সিদ্ধান্ত, এমনকি নৈতিক প্রবণতাও পূর্বনির্ধারিত।
এই বিশ্বাসের কেন্দ্রে রয়েছে এক প্রকার নির্ধারণবাদ (determinism), যেখানে ঈশ্বরই সর্বকিছুর নিয়ন্তা এবং মানুষের কোনো কর্মকাণ্ডই তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত সংঘটিত হতে পারে না। এর ফলে নৈতিক দায়বদ্ধতা ও স্বাধীন ইচ্ছার ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। যদি মানুষ কেবল ঈশ্বরের নির্ধারিত স্ক্রিপ্ট অনুসারেই কাজ করে, তবে সৎ বা অসৎ আচরণের জন্য নৈতিক প্রশংসা বা নিন্দা—উভয়ই যুক্তিগতভাবে অসঙ্গত হয়ে যায়।
সুতরাং, এই হাদিস ইসলামী চিন্তাধারায় এক গভীর দার্শনিক সমস্যার দিক নির্দেশ করে, যাকে বলা যায় ইসলামের “ফিলোসফিকাল ডিজাস্টার”—যেখানে তাকদীরের ধারণা মানব স্বাধীনতার ধারণাকে বিলোপ করে দেয়। এটি এক প্রকার ধর্মীয় নির্ধারণবাদের (theological determinism) প্রতিনিধিত্ব করে, যা মানুষকে অনৈতিক কাজের জন্য দায়ী দায়ী করলেও, তার কার্যকর স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। অর্থাৎ আল্লাহ তাদের দিয়ে কী করাবেন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আছেন, রীতিমত নির্ধারণ করে রেখেছেন, এবং সেসব কাজ তাদের দিয়ে করিয়েও নেন, এরপরে তাদেরি সেই কাজের দায়ভার দিয়ে তাদের জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি দেন [5]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ৭. সুন্নাত অনুসরণে আহবান
৪৬১২। আবুস সালাত (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি উমার ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর নিকট তাকদীর সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি লিখলো। উত্তরে তিনি লিখেন, অতঃপর আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, আল্লাহকে ভয় করো, ভারসাম্যপূর্ণভাবে তাঁর হুকুম মেনে চলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করো, তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভের ও সংরক্ষিত হওয়ার পর বিদ’আতীদের বিদ’আত বর্জন করো। সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমার কর্তব্য। কারণ এ সুন্নাত তোমাদের জন্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে রক্ষাকবজ। জেনে রাখো! মানুষ এমন কোনো বিদ’আত করেনি যার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বা তার বিরুদ্ধে এমন কোনো শিক্ষা নেই যা তার ভ্রান্তি প্রমাণ করে। কেননা সুন্নাতকে এমন এক ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন, যিনি সুন্নাতের বিপরীত সম্বন্ধে অবগত।
আর ইবনু ফাসির তার বর্ণনায় ’’তিনি জানতেরন ভুলত্রটি, অজ্ঞতা ও গোঁড়ামি সম্পর্কে’’ এ কথাগুলো উল্লেখ করেননি। কাজেই তুমি নিজের জন্য ঐ পথ বেছে নিবে যা তোমার পূর্ববর্তী মহাপুরুষগণ তাদের নিজেদের জন্য অবলম্বন করেছেন। কারণ তারা যা জানতে পেরেছেন তার পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতার সঙ্গে বিরত থেকেছেন এবং তারা দীন সম্পর্কে পারদর্শী ছিলেন, আর যা করতে তারা নিষেধ করেছেন, তা জেনে-শুনেই নিষেধ করেছেন। তারা দীনের অর্থ উপলদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে অনেক জ্ঞানী ছিলেন। আর তোমাদের মতাদর্শ যদি সঠিক পথ হয় তাহলে তোমরা তাদেরকে ডিঙ্গিয়ে গেলে। আর যদি তোমরা বলো যে, তারা দীনের মধ্যে নতুন কথা উদ্ভাবন করেছেন তবে বলো, পূর্ববর্তী লোকেরাই উত্তম ছিলেন এবং তারা এদের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন। যতটুকু বর্ণনা করার তা তারা বর্ণনা করেছেন, আর যতটুকু বলার প্রয়েঅজন তা তারা বলেছেন। এর অতিরিক্ত বা এর কমও বলার নেই। আর এক গোত্র তাদেরকে উপেক্ষা করে কিছু কমিয়েছে, তারা সঠিক পথ থেকে সরে গেছে, আর যারা বাড়িয়েছে তারা সীমালঙ্ঘন করেছে। আর পূর্ববর্তী মহাপুরুষগণ ছিলেন এর মাঝামাঝি সঠিক পথের অনুসারী।
পত্রে তুমি তাকদীরে বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে চেয়ে লিখেছো। আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি এমন ব্যক্তির নিকট এ বিষয়ে জানতে চেয়েছো যিনি এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ। আমার জানা মতে, তাকদীরে বিশ্বাসের উপর বিদ’আতীদের নবতর মতবাদ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এটা কোনো নতুন বিষয় নয়; জাহিলিয়াতের সময়ও এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। অজ্ঞ লোকেরা তখনও তাদের আলোচনা ও কবিতায় এ বিষয়টি উল্লেখ করতো এবং তাদের ব্যর্থতার জন্য তাকদীরকে দায়ী করতো। ইসলাম এসে এ ধারণাকে আরো বদ্ধমূল করেছে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। আর মুসলিমগণ তাঁর নিকট সরাসরি শুনেছে এবং তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে পরস্পর আলোচনা করেছে।
তারা অন্তরে বিশ্বাস রেখে, তাদের রবের অনুগত হয়ে, নিজেদেরকে অক্ষম মনে করে এ বিশ্বাস স্থাপন করেছে যে, এমন কোনো বস্তু নেই যা আল্লাহর জ্ঞান, কিতাব ও তাকদীর বহির্ভূত। এছাড়া তা আল্লাহর আমোঘ কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। আর যদি তোমরা বলো, কেন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেছেন এবং কেন এ কথা বলেছেন, তবে জেনে রাখো! তারাও কিতাবের ঐসব বিষয় পড়েছেন যা তোমরা পড়েছো; উপরন্ত তারা সেসব ব্যাখ্যা ছিলেন যা তোমরা জানো না। এতদসত্ত্বেও তারা বলেছেন, সবকিছু আল্লাহর কিতাব ও তকদীর অনুযায়ী সংঘটিত হয়ে থাকে। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তা অবশ্যই ঘটবে, আল্লাহ যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। লাভ বা ক্ষতি কোনো কিছুই আমরা নিজেদের জন্য করতে সক্ষম নই। অতঃপর তারা ভালো কাজের প্রতি উৎসাহী ও খারাপ কাজের ব্যাপারে সাবধান হয়েছেন।[1]
সহীহ মাকতু।
[1]. আজরী ‘আশ-শারী‘আহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
About This Article
Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis
Epistemic Position: Scientific Skepticism
This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.
It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.
The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.
This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.
